নশ্বর নিয়তির মুদ্রা

পলা ঝুম বৃষ্টিতে একা হয়ে গেল। সে আর যেন ফেরত আসবে না। কইতে পারে না কিছু। কেন যে আর সেইসব দিন ফেরত আসিবে না তা ওই ভোরমাখা বটগাছটাই শুধু বলতে পারে। হায়রে বটগাছ! বিশাল চাহনিতে ঝুরি নামিয়া আসিয়াছে মাটিতে, কী সে শ্যাওলা সম্ভ্রমভরা মাটি যেখানে ঝুরির শত মাথা দুলিতে দুলিতে একপ্রহরে কুশি গজাইয়া তাহাতে বীজ ও শেকড়ে পরিণত হইছে। পলা সরল মনে তাকাইয়া রয়, এই গাছের দিকে। সেখানে সন্ধ্যার পরই থোকা থোকা অন্ধকার নাইমা আসে। কা-টার ওপরে ঠিক মোটা হ্যাকনায় ঘন জমাট এক অন্ধকার গাছটাকে পাহারা দেয়। গাছটা এই এলাকার জনপদকেই শুধু শাসায় না শাসনও করে। ভয় দেখায়। সে ভয়ে সকলের সমীহ তৈরি করে। তবে সে অনেককে সেবাও দেয়। প্রশ্রয় করে। বটবৃক্ষের ছায়ার মতো তার নিদান মায়া। এ মায়া বহু পুরাতন। সে মায়া রাখিয়া চলে। এ এলাকায় সবচেয়ে বয়সি মানুষটাও তার ছায়ার ওপর ভর কইরে বড়ো হইছে। পলা তো সেদিনের! পলা তির তির করা আগায় বিষণœ চক্ষুচোষা নয়নে গাঢ় ঘুমধরা পাতার দিকে তাকাইয়া রয়। কী এক ঊর্ধ্বমুখি তার ক্লেশ ও প্রসন্নরূপ। তার কোনো তমঃগুণ নাই। সে সবকিছু আঁকড়িয়া আছে। বটগাছটাও এখন শুকাইয়া চলিছে, বুঝি আর বাঁচিবে না। বহুবর্ষজীবী বলিয়া নয়, এলাকার অনুশাসনে ইহার বৃদ্ধি ব্যাহত। আর না বাড়িয়া তাহা কুঁকরাইয়া যাইতেছে। ক’দিন আগে সেই বড় ডালটাও পড়িয়া গিয়াছে। এবার অন্যগুলাও পড়ন্ত, রসে শুকাইয়া ক্ষীণতর। আর বুঝি তাহার প্রাণ রহিবে না। মানুষকুলও কী তাই! তাহারও বুঝি এভাবেই মায়া রাখিয়া যায়। তার জন্যই নির্বিকার গাঢ় সবুজমায়ায় সে ধরা। পলা এ গাছটার সঙ্গে নিজের একাকীত্বের সম্বিৎ মেলায়। কিন্তু পারে না। ভাবতে ভাবতে এলোমেলো হয়ে যায়। ভেতর থেকে ধেয়ে আসে ক্লান্তিকর ঘুম। ঘুমটা ধরে আসে চক্ষু জুইড়া। তখন এ নগরবাড়ির তিনতলাটা বেশ ছায়ালো হয়। আরামের হাওয়ায় ঘুম বাড়ে। বন্ধুর মতো সে মায়া। রজত, সেই রজত! তবে সে এখন একা। দুর্ভাগার পৃথিবীতে আগমনের সংবাদলগ্নে গতরখালি করা মায়ে কবে মইরা গেছেন, চক্ষের আগালে নেই মত্যু— কেউ জানে না। তখন থিইকা বাবার কাঁধে থাকেন। পরে পলা বাবার তুল্য আদর্শ লইয়া এই নগরবাড়িতে রোদ্দুর হয়, রাসকলনিকব মার্কা পায়, তাহাতে সেঁধিয়া হয় অপরাধী, শাস্তির শক্তি অর্জন করেন। পদার্পিত হয় ফেনেগানস জগতে। ডার্কনেস আত্মার ক্রন্দন তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। এই তৃতীয় মা এখানে নাই। বেশ কাজবাজ নিয়া ব্যস্ত। খুব একটা আসেন না, এই বাসাটায়। বিদেশ ভ্রমণ বা নিজের কীসব বিদেশি কামকাজে তাহার সময় ঘোরে চলে, অতিবাহিত হয়। বিবাহ সম্পদ নহে, কিন্তু বাবার ঘটে তাহা তৃতীয় পর্যন্ত কেন গড়াইয়াছিল সে প্রশ্ন অনেক রহস্যে নিমজ্জিত। পলা যে মোনাইলের স্মৃতিতে গড়া সেখানে বাবা তাহার আশীর্বাদ। তিনি আসিয়াছিলেন মধুমতির সেই পুরনো এলাকা হইতে। তবে তাহার চৌধুরী আভিজাত্য বলিষ্ঠ কাঠামোতে ছিল অতুল্য এবং এ এলাকায় নিঃস্ব হইয়া নতুন বসতি করিলেও তাহার ক্ষমতা আর সমীহ এক ছাঁদে গঠিত। তুচ্ছ বিষয়েও তিনি প্রধান, প্রটোকল থাকে তাহার বাড়ির দেউড়ি পর্যন্ত। সে সব পুরানা কথা। কিন্তু এই তৃতীয় মা-জান কী এক হঠকারি প্রয়োজন নাকি নিছক বাবার কোনো ভ্রান্তির দায় নিয়া এই নগরবাড়িতে আসীন— ঠিক তার কারণ অনুধাবন করা কঠিন। ওইটুকু বাবার ব্যক্তিত্বের ফাঁদে আছিল আটকাইয়া। কে তাহাতে হাত লাগাইবে। কে-ই বা বলিবে আপনের জীবনডা এমুন কান! পলা শুধু জানে এই মা তাহার প্রভাব বা অধিকার থেকে দূরের ছায়ায় ঘেরা এবং সর্বাত্মক নির্ঝঞ্ঝাটরূপিনী। তাহার কাজে সেই একশ’।
তবে অনেক ঘোরাল পরিবারের কানাকাঞ্ছির সদস্য পলা বাস্তবের কার্নিশ বহিয়া অনেককাল অবিসম্বাদিত স্বপ্নে বড় হইয়াছে। গঞ্জনা ছিল সমাজে অনেকগুলা মা থাকিবার কারণে। ‘কেডা কাহার ছাওয়াল বুঝি না তো!’ কিংবা ‘ও ওই তিন বৌ অলা চৌধুরী!’— এসব সামাজিক নীতির বিরুদ্ধ আচারে কিছু কর্ম চিরকাল কীভাবে বিদ্রুপে পরিণত হইয়াছে, কিন্তু অনেকটাই আবার সমাজের নিকট ধন্য বলিয়া গৃহীতও হইয়াছে। আয়রনি ছাড়া এসব আর কী! রজত ও পলার এই এক এককালীন জীবন, আহা সেই চীৎ পঙ্গরের উদাস হাওয়া আর বাওয়া নদীর তরে মাঝি বাইয়া যাওয়ার কোমল সুরধ্বনি। সেই সে বাড়িতে বসন্তবাবুর গড়া কাঁঠালতলায় আছিল কোটার বাড়ির শান্তিমাখা রূপালী দিনসমূহ। রজত কই! এভাবে সে হারাইয়া যাইবে কী! ভয়কাতুরে ঝড়ে বা বেহিসাবি জীবনের অনেক টানা মুহূর্তগুলা ছিল ওর বায়নায় ভরা ভরপুর। তবে খরায় আটকে যাওয়া নৌকোর ন্যায় সে এখন অচল নয়, অনিশ্চিতরূপে নাই, আবার আসিবে, আপাতত শূন্যে মিলান। কাহিনি তাহার ছোঁড়া তীরের ন্যায় গড়াইয়া গিয়াছে। তুমুর এক প্রেমিক হিসেবেই পলার মনে সে জীবিত। কী দুর্মর হাসি আর আনন্দে সে তাহাকে জড়াইয়া ধরে। ইঁদারার পাড়ে হাত বাড়াইয়া কয়, ননীর মতো হাত। সে ননীকে চেনে না। সত্যিই ননীর মতোই দেখিয়াছে সে এইসব ধ্যানের সময়। নির্ণিমেষরূপে সে জীবনের সময়সমূহ কাটাইয়াছে। তাহার জীবনে আসিয়াছে ঝরা শিউলির মতো। আক্ষেপ বা অনিন্দ্য করিয়া তোলা নয়, রজত সবকিছুরই ঊর্ধ্বে। প্রেমময় পৃথিবীতে সে অপরূপ। কিন্তু বাবা বরাবরই অভিভাবকরূপে মরহুম দাদার মধুমতির তল্লাটের পুরান বাড়ি নিয়া কী সব ভোগ লালন করিতে থাকেন। উষ্ণীষ আমেজে কইয়া যান— এসব ঘরের মাইর নাই। এই দরদলানে কতোকাল কবুতর আর বাবুই আসিয়া বসে, তাহাতে পুণ্যি হয়। বখিল মানুষের মুক্তি ঘটে। জীবনের গতি বাড়িয়া যায়। সুবেহ সাদেকের মুগ্ধতা ফেরে। ওরা ফেরেশতার কলকণ্ঠ ধারণ করে। এসব ভাঙুম না, এইটা এয়ারকন্ডিশন দলান। গরমে শীত, শীতে গরম। খুব কনকনে শীতে এই ঘরের কড়িবর্গা কাঠের দরোজা-জানালা আর উপরের নকশাকাটা বাঁশের জিগজ্যাগ পরিবেশনায় তাহা কুটিল আনন্দময়। এক ধরনের বনেদি বাসনাও থরে থরে ভরাট থাকে। এক-দুই-তিন ঘরের নশ্বর নিয়তির গাঁথা পলার বাবার এই শেষ নগরবাড়ি। মধুমতি-মোনাইল পার হইয়া বুঝি এই নগরবাড়ি। একালের এখন একাকী এক পলার গৃহ। তৃতীয় মা তাহার পথে পরিচালিত। শূন্যজীবনের দ্বারে তাহার কেউ নাই। অনিমেষ আলোর বলয়ে সে একা। সময়সিন্ধুর ভেতরে সবকিছু তাহার এখন চিড়িয়াখানার ভারে আটকানো। একাকী এই মোনাইলে। কিন্তু সুখ আসিয়াছে, ফসলের তরে, শিশুদের ও মানুষীর মুখে দেখিয়া। ভরা চান্দমাখা স্থূল সুখ তাহার ফুরফুর করে, অবরুদ্ধরূপে। উষ্ণতার ভেতরে তাহা কত্তোকালের মনোটোনাস, দুঃখ আর দুঃসাধ্য চিন্তায় গড়ানো। তাই সে ফেনেগানস। অন্ধকার এক আত্মা।

দুই.
মধুমতী পার হওয়া চিক্কন সুতোপড়া রাস্তার পাশে এই ঘরে কে ছিলেন আগে! দাদা পরদাদা বা আরও অন্য কেউ— যতোদূর দেখন যায় ধান আর জলা। সেই পুরনো কপচা। সে জলায় পলায় ওঠে কী সব গুজার আর ব্যাম। পেশা আছিল মাঝির। আরও অন্য সব মানুষের পেশা বা চলন-বলন কী আছিল! কেউ তাহা জানে নাই। এখন আমরা এই ঘরকে গৃহ বলি। আগে কেউ গুহা বলিত। গর্তের মাজেজাও আছে। যুদ্ধের সময় গর্তের মধ্যে ঢুকিয়া প্রাণ বাঁচানোর প্রচেষ্টায় তখন প্লেন ওড়ে, গর্তে লুকাও। পাকবাহিনি গুলি করতাছে গর্তে ঢোক। মশার কামড় আর গরমমাখা বৃষ্টিতে শ্বাস ছাড়ানো কষ্টকর ঘটনা এই গর্তের কাল। পাকবাহিনি তখনও চেনে নাই, এই গর্তের মাজেজা। গর্তের নিরাপত্তাই কী জীবনের নিরাপত্তা আছিল। খালে কয়, তোর বাপরে বাঁচাইছি। সেই গলা তখন মিয়ানো। তবে জিদ আর অভিমানের খেয়ায় মেনাইলে তাহার দ্বিতীয় বিবাহের নতুন পথ রচিত হইয়াছিল। কীভাবে এই পুরানা করতোয়া তারে আশ্রয় দেয়, বাপের কইত্থেকার পুরানো ভিটা ছাইড়া, সম্বলহীন হইছিলেন। বসন্তবাবুর গড়া কোঠায় আশ্রয় হয়। চৌধুরীর তখন আর সে সব আছিল না। সিমেন্ট শিলবাধা সাড়েতিনহাত চওড়া সাপ প্যাঁচানো রাস্তার পাশে পশ্চিমমুখো চিক্কন সরু ধুলামোড়া রাস্তার মাথায় বসন্তবাবুর বসতি। ছায়াঢাকা, পাখিডাকা গ্রাম মোনাইল। পলা পাশের পুকুরে নিজের ছায়া দেখে। চিমচিম পানিপোকা সাঁতরায়। বিলি কাটে। পঙ্গর দেয়। তখন কাঁপে পলার মায়াবিমুখ। ভারি হয় বা পাতলা হয় সে ছবি। ছবি ঘিরে বাঁশকঞ্চি অহেতুক ছায়ার ভেতরে এক সাদা রোদে কালো রঙিন পোঁচ দেয়। সে পোঁচ এতোই শরীরী যে তাতে পূর্ণ হয়ে ওঠে কারো মায়াবি মুখ। কী পলা তা নয়, কিন্তু পূর্ণ মুখে তীব্র আগুনমুখো কোমর-জঙ্ঘা। সেখানে প্রজননমুখ চিহ্নিত। প্রজননের পরিতৃপ্তিতে ভরা শরীর। স্নিগ্ধ পীঠ আর কোমর বেয়ে নেমে এসেছে মাংসপেটা অবয়ব, গড়ে ওঠে তীক্ষè মূর্তি, তবে ওকি প্রজাতির অবচেতন জন্মের স্বাদ এঁকে দেয়! ঠিক তাই হবে, আবার নাও হতে পারে। পলা তখন থেকেই বাবাকে চেনে। আকৃষ্ট হয়। ক্ষুধার্তের সম্মুখে গনগনা ভাতের উত্তাপ নাসারন্ধ্রে আঘাত হানে। ক্ষুধা আর অশেষ আনন্দের ভেতরে পিতৃমুখই সর্বাত্মক হয়ে ওঠে। কী তার লুব্ধলহরি। বিরতিহীন অভীপ্সা চিরল পাতার কোণে উল্কিরশ্মি আঁকে। সেখানে অনেক জীবনের প্রতিরূপ অঙ্কিত হলে পুবাল হাওয়ায় বিরাট বিরান পাথার প্রকম্পিত হয়। তখন কী সে একাকি ছিল। ঠিক সেটি নয়। আরও কে একজন। সে ওই পিতৃপ্রতিচ্ছবিরই দহ। শন শন হাওয়ায় পেছনের সবুজ ক্ষেত মাথা নোয়াইয়া হেলিয়া যায়, অনেকরকম স্বর আসে, চেনা-অচেনা-অজানা এবং লুপ্তপ্রায় প্রতিধ্বনি; অনেকটা পুরনো প্রত্ন কষ্ট। সেখানে অন্ধকারের রূপের ভেতর প্রতিষ্ঠিত হয় চিরায়ত পিতৃমূর্তি। সে কী অন্ধকারের আলো! আলোটুকু কেন তাহার হাতে স্পর্শ ও অনুরাগ তোলে। তার মধ্যে সেঁধিয়া যায়। বিপুল হাওয়া যখন এসব সুখমুখে বিলোড়ন তোলে, তখন ভয় আসে। বিষণ্ন ভয়, অপার আমোদও বহাইয়া তোলে। এ তো সেই পুরনো সুন্দরের আগমন। পলা তখন বড় হয়, আরও বড়। তার ভেতরে এক অন্য রমণীরূপ রমনীয় হয়। কে যেন ডাকে। কার যেন স্বর, বাবার, পিতার, ও-সে প্রভাবিত জীবনের উত্থান বুঝি। কে সে! সে সেই জন্মরত মায়ের বিচ্ছেদে ভরা তুমুল আর্তনাদ! পলা সম্মুখে এ বাস্তবটুকু অতর্কিত পিতার স্বরূপে প্রকাশ। এখন একাকি নগরবাড়ির এই বসতের পীঠে এক মনোটোনাস ধইরে আসে। পলার এ ধারার ভেতরে দোয়েল আর শ্যামার ডাক করুণা তোলে। সেই কবে ফেলিয়া আসিয়াছিল সে দুধিয়াবাড়ি মোনাইল গ্রাম। আর তার মনে নাই। সেখানে কলরোলে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে অতীতের সব কামুক আস্তাবলের স্মৃতি। এলাকার সকল মানুষ তো তখন একান্নবর্তী। তাহাতে যোগ ঘটিয়াছিল চৌধুরী নামের এক একাকী তাহাদের। সেই যাযাবর হইয়া বাবা আসেন মধুমতির দরদালান ছাড়িয়া। ওখানে শিক্ষা আছিল, রাজনীতিও ছিল কিংখাবের পাতায় মোড়ানো। মধুমতির পাড়ে দাদা পরদাদার ঘোড়া চরিত। হাতিতে আসিত কোনো এক রাজার সংবাদ আসিত। কী তার রোশনাই। মুসলিম জীবনের এসব রোশনাইয়ের ভেতর রাজার বেশে দাদা যখন হজ্বে যান শোনা যায় তখন পাড়া জুড়িয়া মানুষের উৎসব উঠিত। কী করুণ সেই উৎসবের দিন। পলারা তখনও জন্মায় নাই তার বাপের বয়সও তেমন হয় নাই, পুরনো মানুষ নাকি আদি জনতা ভরা যুবকে জীবনের সমস্ত সুখ ধরায় নামাইয়া আনেন। বলক দেন আর প্রাণ ছাড়িয়া উজান গাঙ্গের নাইয়ারূপে রাধারমণ জীবনের সময় কাটাইয়া দেন।
রাজা আসিয়াছে বাদ্য বাজাও সকলে মিইলা ভোরের মন্দিরা বহাইয়া আনো, সেকালে এ এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য অনেক লোক মোনাইলে মাদ্রাসা বানায়। কতোদূর থেকে মানুষ আসিয়া বসে। মাদ্রাসার মধ্যে তখন কোলাহল ওঠে। কান্না আর করুণের কারুণ্য জ্বলে। বাতাসে ফোয়ারা ওঠে। কুল কুল করিয়া মোনাইলের পাশের চওড়া নদীতে বজরা আসিয়া ভেড়ে। পলার মাতুলালয়ের বংশধররা তাহাতে জীবনের অস্তিত্ব খুঁজিয়া লন। কতোদূর থেকে অনেক মানুষ কোনো কোনো দিন এ এলাকায় আসে। আর বলে, কইগো করুলের বাঁশিতে আর স্রোত বহাবে না কোনোকালে? তখনও সূর্য পূবাল হাওয়ায় তাহার রশ্মি ঝইরা তোলে নাই। স্বর ওঠে, অনেককালের স্বরে মাদ্রাসার বারান্দা থেকে শোরগোল আনে। শোনা যায় কোন যে বৃটিশ ফর্সাওয়ালা এই মাদ্রাসায় আসিয়াছেন। তিনি বলেন, ফার্সি নয় আর এখন যে ইংরাজি শিখিবে তাহার চাকরির ব্যবস্থা লিবে সরকার। এই মাদ্রাসায় তখনও বাইরের দূর থেকে মৌলবি আসেন, তিনি কি নোয়াখালির মানুষ কি-না জানা যায় না, কিন্তু তাহার অনেক আদর থাকে নানা বাড়িতে পড়ান তিনি, তাই তার আদেশ নির্দেশে পাতা ঝরে, পাতা ওড়ে, মানুষও এক লয়ে কথা ওড়ায় আর কয় মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। একদিন একটা বড় ঘটনা ঘটিয়া গেল। মাদ্রাসার ভেতরে এক কোণায় হঠাৎ ভসকা মাটিতে কিশোরী কলি বেগমের পা ডুবিয়া গিয়াছে। তার পর হইতে কলি কীসের আঁচে প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছে। তাহার মুখ থেকে গান পড়িয়া গিয়াছে, হাসি নির্বাপিত, কথা নাই শুধু এক পলকের দৃষ্টিতে সারাদিন তাকাইয়া থাকা। এইখানে গর্ত কীসের? অনেকের সে হৈচৈ মার্কা প্রশ্নের পর একদিন শোনা গেল কোনো এক বিকেলে ওখানে কলি বেগমের একাকি গমন ছিল। তখন ফিরতি পথে কাহারা যেন হাতে একপ্রকার মার্কিন কাপড়ের পুটুলি দেখিয়াছে। পুটুলিতে কী আছে, কেন সে পুটুলি আনতে গিয়াছিল সে উত্তর কোনোকালেই না মিলিলেও কলি বেগম একপ্রকার ক্রমশ সমাজবিচ্যুত হইয়া পড়েন। মানুষ স্বপ্নানোর কথা বলে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়া সে চলে। স্বপ্নের টানেই সে ওই গর্তের দিকে গিয়াছিল এবং সোনাদানা জাতীয় কিছু পাইয়াছে। সেই সোনাদানার পরিমাণ অনেকভাবে গুঞ্জরিত হয়, পল্লবিত হয় এবং এক এলাকা শুধু নয় অনেক এলাকায় তা বৃষ্টির ছাটে পাওয়া পানির মতো সিক্ত-সান্নিধ্য পাইয়া দেয়। ভেতরে ভেতরে নির্বাক এক মাইয়ার নাম ভুবনডাঙায় ভাসে। ব্যাপ্ত চরাচরে কূলুকূলু রবে তরঙ্গ তুলিয়া ব্যাপক আকাশ নীলে জড়াইয়া কয় : ওহে, ওখানে জ্বীন পড়িছে। ওটা আগুনের দলা। ওটাকে বেশি অশান্ত করিয়া না তুলিও। বিগড়াইয়া গেলে সে তোমাকেও হরণ করিতে পারে। এভাবে কলি বেগম কীভাবে পাল্টান, কীভাবে তিনি শক্তিশালী হইয়া ওঠেন, কীভাবে অনেককালের স্মৃতির ভেতরে দৃঢ় প্রপাতে অবস্থান করিয়া লন তা কেউ হিসেব করে না। হিসেবের তো অনেক সময় তখন। মোনাইল এলাকায় অনেক জমি পরিত্যক্ত, করতোয়ার ধারায় নৌকা বাইলেই মাছ ওঠে, এক ফসলা ধানে অনেকের অন্নসংস্থান হইয়া যায়। গুরুগুরু দেয়া ডাকিলে গৃহের তলে নারীপুরুষের নির্বাক জীবন যাপনের ভেতর একমাত্র আশিস দাদা চমৎকার বাঁশি বাজাইয়া কাজল ভোমরার সুর তুলিয়া বর্ষাকে আরও বরিষধারায় যুক্ত করেন। প্যাঁচ প্যাঁচ করা কর্দমাক্ত উঠানে মাথোল মাথায় আশিস কাহা ঘরবারান্দার ঘোরাঘুরির ভেতর বাঁশিতে নিয়োজিত হন। এ এলাকায় তিনি বাঁশি কাহা। সেই অসীম অবসর মাখা সময়ে দিনরাতের ছন্দোময় আগমন-প্রস্থানে লাগোয়া মাদ্রাসার ভেতরের কোণার ভসকা গর্তের টানে কলি কখন কখন যুক্ত হন, আরও কোনো পোটলা তিনি পাইয়াছেন কি-না, নাকি এবার নতুন পোটলা পাইয়াছেন— যাহার রঙ লাল সালু কাপড়ের ন্যায়, নাকি পান নাই, পাইলেও স্বীকার করেন নাই, বা কে-ইবা জিগাইছে, কারে কেডা জিগায়, সক্কলেই তো ভয়ে পুরাট, তবে আবার কেউ জিগাইছে উহা লালা রঙা, কেউবা দেখিয়াছে সত্যিই উহা লাল— তাহলে কখন তাহার এ প্রাপ্তিযোগ, কেউ কী ওই মাদ্রাসার দিকে যাইতে দেখিয়াছে, কেউ কয় দেখিয়াছে কেউ কয় সন্দো হয় গেছিল বুঝি আবার কেউ কিছু দেখে নাই, দেখিলেও দেখে নাই— ভয়ে চাইপা যায়। এরকমে কলি আর কলি থাকেন না। যে কলি কিশোরী আছিল, তখন তাহার বালেগ হওয়ার লক্ষণ পাওয়া যায় নাই, এখন কয়েক মাসের ব্যবধানে তাহার সবকিছু পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মুখ পাল্টায় বুক পাল্টায় গঠন পাল্টায় দেহ পাল্টায় ঘন লোমও বুঝি দেখা যায় কী যায় না— সেটা কেউ দেখে নাই। ক্যামনে মাইয়াডা এমন হইলো বাড়ির গার্জেন অলস অনেক সময়ে ভাবতে ভাবতে কঠোরভাবে ক্লান্ত। এখন খালি গড়িমসি। ওই মাইয়া নিয়া আর চিন্তা কইরে লাভ নাই। কী হয় হোক। মায়ে কান্দে আর কয় কপালডা ক্যান এমুন হইলো। বাপে কয় এই মাইয়া সারা জেবন পালোন লাগবো। কিন্তু বাইরের স¹লে কয় হালার মাইয়া বাপমায়ের কপাল ফিইরা দেছে। অনেক কিছু পাইছে। ওডা আগুনপরী। ওর ভেতরে অনেক মুশকিলের আছান আছে। আসাদ মিঞা তোমার সন্তানের আছানও তিনি করব্যার পারেন। তেনার লগে কতা কও। অনেকবার কতা কইলে একবার তিনি জবাব দেবেন। সেই জবাবেই তোমার আছান হইয়া যাইবে। দ্যাহেন নাই কলিমপুরের ছেইলেডা তো তার কাছেই ভালো হইয়া গেল। এরূপ সংবাদের ভেতর একদিন মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব অস্থির হইয়া উঠিলেন। তিনি ওছিহত দিয়া দেলেন ওই মাইয়ার নাম কেউ মুখে আনবার পারবা না। কেন কী কারণ, তাহার সবিশেষ উত্তর কাহারো জানা নাই। টুপটুপ আলো জ্বলা পুরাণকথা মোনাইল মোড়ের একটুকরা দোকানে পৃথিবীর সব সংবাদের ন্যায় তখন সকলের কানে আঘাত মারিতে থাকে।
পলার ক্রন্দনময় জীবনের সঙ্গে যে বৃষ্টির প্রলাপের সংবেদন লুক্কায়িত তাহার প্রভাব ওই মোনাইল গ্রামের কোনো প্রান্ত থেকে ভাসিয়া আসা আশিস কাহার মরমী সুর কিনা তাহা বোঝা যায় না। তবে কলি বেগমের প্রবাহিত জীবনের ন্যায় অনেক আলো আর অভিক্ষেপ মাতৃকুলের কোনো পূর্বপুরুষের ছায়ায় আলোড়িত এবং তাহা এ প্রকৃতির ভেতরে নির্ধারিত আছে। ওই গ্রামে আরও সিক্ত জীবনের খবর মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন। মুসলমানগণের জলডোবা হাওয়ায় করতোয়ার এপার ওপার লোকসমাগম স্থির ছিল। এখানো কোনো জীবনের স্রোত আছিল না। অন্ধকারের ভেতরে কোনো কোনো গৃহে কুপি জ্বালিত, বাইরে বিরাট কাছারির বারান্দায় সুন্দর আঁকশি করা দুয়ারে বসিতেন চৌধুরী সাব। তার গায়ের গন্ধ আছিল পোলাওয়ের লাকান। সফেদ পাতলা যে পাঞ্জাবি তিনি পরিধান করিতেন, তখন তাহার হাতা মগরা পর্যন্ত ডুবাইয়া যাইত আর পরিতেন কোলাপুরির জুতা। এসব এ গ্রামে কেউ বুঝি দেখে নাই। সর্বস্তরের মানুষ কাছারিতে আসিয়া সুসম্মানে তাহাকে মাথায় তুলিয়া আদেশনির্দেশের অপেক্ষায় থাকিয়া লেজনাড়া কুকুরের ন্যায় অধর নয়নে চাহিয়া কন, বাবা আমার সময় ফুইরা আসছে, এবার তুমি একটা কিছু করো। চৌধুরী শুধু ইশারা করেন। মোনাইল গ্রামে তখন বাইরে চিকনা রোদে হাওয়া ওড়ে। বলশীল বাতাস বহাইয়া দেয় প্রচুর বাবুই পাখি। তারা হাওয়া দোলায় তালগাছের ঊর্ধ্ব শাখায়। এক পায়ে দাঁড়ানো তালগাছের ন্যায় নারকেল সুপুরি আর শিরিস এক হইয়া চৌধুরীকে উনপঞ্চাশ বায়ুতে দোলা দেয় তখন কোন মন্দিরে ঊলুধ্বনি পড়ে, ডাক ওঠে আইজ পূর্ণিমা। এই কোজাগরি পূর্ণিমায় রীতি মানিয়া এখানে যাত্রাদল আসে। চাকুন্দার মাঠে এবারের এই যাত্রাপাট্টির নাম ওস্তাদ আলীর যাত্রাপাট্টি, যাহা সুদূর যশোর হইতে আসিবে।
কিন্তু এই নগরবাড়ি তো কোটাঘর নয়। এতে বসিয়া ঘিরিয়া ধরে বসন্তবাবুর কোটাঘরের গপ্পো। সে তো গর্ত আছিল না। পলার মনে আছে সেই কতোকাল আগে সে এক শীতের রাতের কোমল গন্ধমাখা ভোরে হুড়কা খুলিয়া বাহিরে আসিলে সত্যিই তার গর্ত থেকে বাইরে আসার ভাবটাই মনে হইতো। হায়রে শীত! অথচ গর্তের মধ্যে কী মখমলে গরম। এইটা কেমন গরম! কুসুম কুসুম। নাকি মজাদার গরম। মার হাতের সুতোয় বোনা স্ট্রাইপ নকশাদার সোয়েটারের ভেতরে হাত রাখা উষ্ণতা নাকি ঠাণ্ডা পানির গোসলের পর শীতের উঠানে এক চিলতে রোদ্দুরের জমে ওঠা নরমগরম ভাপ নাকি গ্রামে শীত আসিয়া যাওয়ার সময়ে নাড়ার আগুনের তাপের কোমল সুখের স্বাদ। ঠিক বোঝা যায় না তরে ওই শীত সকালে কোটার ঘরের ভেতর থেকে সত্যিই বেশ উষ্ণ হাওয়া বাহির হইয়া বাইরের ঠাণ্ডা প্রকৃতির ভেতর নেতিয়া পড়ে। ঘরের বাইরে টিনের চালার বারান্দা, তাতে ফোঁটা ফোঁটা নেওর জমানো, আর টুপটুপ কাঁঠাল পাতা বাইয়া ঝমঝম করা বৃষ্টিটিন— যেখানে জল পড়ে পাতা নড়ে— শব্দটুকু কানের পর্দায় লাগে। মধ্যকর্ণের ভেতরে অনুরণিত হয়। সেটা অনেকক্ষণ বজায় থাকিলেও পরে বাইরের ঠাণ্ডা সুমন্দ বায়ুতে বকুলপাতার গন্ধ কিংবা কৃষি ব্যাংকের সামনের সার করা ফুল গাছের মধ্যে দুধসাদা গন্ধরাজ একরকম ঘন বোলে সুগন্ধ তোলে। পলা তখন মোটা সোয়েটারে হাত ঢুকাইয়া তাৎক্ষণিক পেছনের উষ্ণ ঘরের রজতের ডাক শুনতে পায় ‘স্যার আইছে তাড়াতাড়ি আয়’। সবকিছু দ্রবীভূত হয়, ক্রন্দনরতা বিরক্তি ভর করে। রাগে একটা গন্ধরাজ ছিঁড়া ফেলে। একটু এগিয়ে যে কমিনী গাছের সারিতে থোকা থোকা ফুল নিজস্ব সত্তা জুড়িয়া বিছাইয়া রাখার আয়োজন করে— তাতে বাগড়া আসে। কোমল কুয়াশা আর কামিনী কদিন আগে বেলালের দোকান থেকে কেনা নতুন সেন্ডেলের আঘাতে ধরাশায়ী হয়। এক ঝপ্ সুশ্রী আলো যেন নিইভা যায়। বিষণ্নতার বাতাসে পুরো এলাকাই শুধু নয় উঠান ও স্কুল গমনের সোজা রাস্তার পথও বিচলিত হইয়া পড়ে। কেনো মাস্টার আইলো। তাইলে তো সে কোটাঘরের বাইরে আইতো না। প্রভাতসূর্য তখন বেশ কড়া হয়ে উঠছে। যদিও শীত, তবুও তার উন্মোচনটুকু কড়াই মনে হয়। পরে কী হইয়াছিল মনে নাই। রজত চলিয়া গেলে কোটাঘরের স্থায়িত্ব তাহাকে তাড়ায়। এই কোটাঘরটার ওপরে একটা বয়সি কাঁঠালগাছ সর্বদা অভিভাবকত্বের মর্যাদা নিয়া মনে হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। তাতে উৎকীর্ণ সূর্যতাপ আর নিমীলিত হাওয়ার করুণ প্রতিশ্রুতি এই কোটাঘরের নিমিত্ত বরাদ্দ হয়। স্বভাবসুলভ কোটাঘরটা আরও এসিমূলক সক্রিয়তায় দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে। টুপটাপ নেওর ঝরে আর টিনের চালের নীচে ফোঁটা ফোঁটা দলবদ্ধ শিশিররূপজলদল একপ্রকার নকশী আঁকিয়া ঘর ও তাহার সন্নিকটস্থ বারান্দার সুস্থ পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখিয়া চলে। কড়িবর্গায় মোট বারোটির মধ্যে কয়েকটি মোটা তল্লাবাঁশের ঘন ঘন পোরের শক্ত জয়েন্টে তাহাতে সংঘবদ্ধ। সেখানে কেন এই তল্লাবাঁশ আসিল তাহার কারণ জানা যায় অপর যুদ্ধের কাহিনিতে। পাকবাহিনি একাত্তরের জুন নাগাদ এই ঘরে কিছু মালপত্র নিয়া জোরপূর্বক বসতি নেয়। বাড়ির মালিক চৌধুরী সাব আগেই তালা লাগাইয়া চলিয়া যান। যেহেতু যুদ্ধ শুরু হইয়াছে, শোনা যায় ভাঙ্গিয়াছে আঙরার পুল, আখিরার পুল, হরিণসিংদীঘির ওপরের কালভার্টÑ তখন দলে দলে জলপাইরঙা মেলেটারি ঢুকছে আর ঢুকছে। তার মধ্যে শুরু হয় বর্ষা। তখন পলার বয়স বার পার হইয়াছে। আশ্রিতা কইলেন আপনে পলারে নিয়া যান। আমার যানের চাইয়া পলারে আমি চাই কিন্তু হের যদি কিচ্চু হয় আমি আফনেরে কী কমু! শুনলাম রাইতে মেলেটারি ঘিরিবে। আপনে তো মুক্তি। পলান। পলারে লইয়া যান। এই মাইয়ারে জেবনের ওপর দিয়া বাঁচোন লাগবো। চৌধুরী কান্দিয়া ওঠেন। ভরিয়া যায় অশ্রু। মোনাইল থাইকা তিনি কোথায় পলাইবেন। এই বাড়ির কোটাঘর নিয়া তিনি যে জেবন শুরু করেন তাহার ফল কী পলানোতেই স্থির হইবে। অনেক ভাবিয়া সময় গত হইলে তিনি তালা লাগাইয়া করতোয়া দিয়া উত্তরে এগুনোর সিদ্ধান্ত নেন। কীভাবেই বা যাইবেন। নৌকা নাই। কেউ এসকল পথে আর চলিতে রাজি না। কিন্তু উপায়হীনের উপায় আছে। সেই সত্যটুকু তিনি উপলব্ধি করেন। নিজের প্রতিরোধের মুখেও পড়েন। তিনি পলাতক হন কীভাবে। শুধুমাত্র নিজ আর এই মাইয়াকে উপলক্ষ করিয়া তিনি সবকিছু ছাড়িতে পারিলেন। পেছনে কী রহিয়া যাইবে সব কর্ম! মাদ্রাসার কী হইবে। যে মুক্তির লোকদের তিনি তৈরি করিয়াছেন তাহারা কার নিমিত্তে যুদ্ধ করিবেন! কীসের সে যুদ্ধকৌশল! আশ্রিতা কিংবা যাদের সঙ্গে তাহার মিলমিশ, যাহারা এক অন্নবস্ত্রে এখানে অনেককাল তাহাকে রাখিয়াছিল। অনেককাল অর্থটি যতোদিনই হোক, বসতি তো মায়ার হাওয়ায় তৈরি। সেই মায়াটুকু তো তাহাকে পেছনে টানে। কী করিবেন ঠিক হয় না। কয়েক রাত নির্ঘুম চলিয়া যায়। মুক্তিদের চোখের দিকে তাকানো অসম্ভব হয়। তিনি কালই তাহাদের সমস্ত কৌশল নিয়া বসিবেন। গেরিলাদের অস্ত্র কিংবা ওপার থাইকা যে সরঞ্জাম আসার কথা সেসব বিষয়ে বুঝিয়া দেবেন। অনেক দায় নিয়া এভাবে সারারাত কাটিয়া চলেন দুঃস্বপ্নে, এ জীবনকে আর কতো ঠেলিবেন তিনি। সেখানে কতোলোক নিশিরাইতে আসিয়া ভর করে। অধিকার করে বিবেকের প্রাচীরে। অবরুদ্ধ হইয়া তিনি একপ্রকার মরণযন্ত্রণায় উপনীত হইয়া চলেন। মৃতবাবা সামনে আসেন। আবার সেই মোহন চরিত্র! আসেন তাহার মা কিংবা বিবি ও পলার মা। সবকিছুর জড়ানোপ্যাঁচানো ভারে শব্দহীন মূক হইয়া তিনি অবিন্যস্ত বেশ লইলেন। গ্রামের জব্বার, হবিবর তাহাকে দেখিয়া হুম হুপ কইরা কয় মিয়াবাই আফনে ছইলে যান, মেলেটারি আপনারে খুঁজতাছে, আর কী কী লোক আসিয়া আপনারের নাম জিগায়। সে তাহার পানে তাকাইয়া কন্দোনে ফেরে। আরও এরকম কতোজন কতো সংবাদ দেয়। ব্লাকআউটের কালে এই তো সত্য! বিশ্বযুদ্ধের সময় বা দাঙ্গার সময়ের কিছু ঘটনা তো তার স্মরণে আছে! তবে কী চৌধুরীর মৃত্যু হইতেছে! না তিনি কিছু করিবেন না। এখানেই থাকিয়া যাইবেন। থাকিতেই হইবে। বেঈমান হইবেন কেন। না থাকেন নাই। এসব ভাবতে ভাবতে একরাত্রে তড়িৎ তিনি করতোয়া দিয়া উত্তরে পৌঁছান। পরে পুনর্ভবা, ইছামতি বাইয়া ক্রমশ মহানন্দার দিকে চলিলে তাহারই শাখা নাগর দিয়া এপারে জগদল রাখিয়া ওপারে চলিয়া যান। কী নির্নিমেষ প্রশান্ত আকাশ তখন। সেসব বাহিয়া জনমানবহীন প্রান্তরে চলেন তিনি— তবে কেউ তাহা সেসব জানিতে পারে নাই। ওপারের কী এক নিস্তরঙ্গ গ্রামে তাহার আশ্রয় হয়। শুধু একটি নদীই তখন সমস্ত নিরাপত্তা দিয়াছিল। কী কষ্টের সেসব দিন। আত্মঅবমান। এক স্বার্থে এই দেশ, শুধু ঔরসজাত সন্তানের অছিলায় তিনি বিশ্বাসঘাতকের দলে পড়িয়া যান কিনা তাহা নিয়া ভেতরে তোলপাড় উঠিলেও, এক অজানা শক্তিতে তাহা সামলিয়া নেন। তারপর মোনাইলে ঘনবর্ষার চাকায় লাল মাটিতে ধীরে ধীরে উঁইপোকার সারির নাহান মেলেটারি আসে। সে বর্ষায় তাহাদের গাড়ির চাকা দাবাইয়া যায়, উহা দুলদুলের পায়ের খুরের ন্যায় আটকাইয়া পড়ে, কষ্টে ওঠে ধীরে চলে এবং স্থানীয় লোকদের সহায়তা নিয়া তাহারা একপ্রকার বন্ধুর পরিবেশ পুনর্গঠিত করে। সেই বন্ধুদের মধ্যে যুক্ত হইয়া যান চৌধুরীপ্রিয় হবিবর রিফিউজি। তার অভাব অনটন যেমনই হোক, তিনি ধরিয়া নেন এই জীবন দোয়েলের— এখানে ফিরিবার কিছু নাই। কপালের লিখনের বাইরে আর কিছু ঘটিবে না। সেই কবে ছেষট্টির বড় ঝড়ে যে লাকসাম থাইকা চইলা আসেন এই অঞ্চলে, বাক্সপেটরা আর পানসুপুরি নিয়া সেবায় জনতার আদালতে আসীন হন তারপর মোনাইলের সরকারি খাস জমিতে একচালা নিয়া জীবন চলা শুরু। মোনাইলে চৌধুরীর তখনও ততোটা প্রতাপ হয় নাই। ক্রমাগত কয়েকটা সন্তান জন্মের সুখে সে ডেরা যখন দ্রুত ভর্তি তখন এই যুদ্ধ ঢাক বাজিয়া ওঠে। ডেরায় তখনেই সকলেই আছিল। দ্বারাপুত্রপরিজনসমেত সেই ফাঁকা একটিয়া বাড়িতে হাগার কিছু নাই, নাই কোনো কুয়ার পানি। অনেকদূর কৃষি ব্যাংকের টিউবওয়েলের লাইনধরা মানুষের লগে পানি আইনা বিবি দুমুঠা খাওনের ব্যবস্থা করে আর ঝংকার দিয়া কয়, ‘আমার আর নিদানেও কিছুই ফায়দা হইবো না। হালার কুত্তার জেবন, মরণও হয় না!’ ঝংকারের শরীরে নাচন উঠিলে ফাঁকা পঙ্গর দেওয়া বাতাসে জলের ঘূর্ণি ওঠে। তাহাতে কী ছবি দেখা যায়? উহা কাহার ছবি! রঙিন, সম্পূর্ণ রঙিন। ঝালর তোলা গুমগুম মূর্ছনা। চলচ্ছবির দোলা। এইসব জেবন রঙিন জলের ঘূর্ণিতে নাচিয়া ওঠে। নিজের ছবি দেখা যায়। তাহাতে ঠিকরে পরে পুবের আলো। গড়ে ওঠে উত্তাপের রোশনাই। ঝির ঝির হাওয়া কঞ্চির প্যাঁচ আর পাতলা বাঁশপাতার নোছনা বিবির গায়ে আসিয়া ঠেকিলে শূন্যতার ভরকেন্দ্র গাঢ় হয়। ময়লামাখা আঁচল দোলে বাতাসে। কাঁপে। ব্লাউজহীন কালা মাতৃশরীর আরও আহ্বান জানায়। ভয় হয়। আরও ভয় তীব্রতর হয়। বাঁশঝাড়ের ভেতরের কুশন্নি হাঁক ওঠে। এই ফাঁকা মাঠের আন্ধারে যখন একটি কুপি জ্বলে তখনও এক শিকারী কুকুর নির্বিকার জীবনের নস্যাৎ আকুল আহ্বানই ধারণ করে। ভয়টুকু রিফিউজির শরীরে উল্টা প্রতিক্রিয়া তোলে। তাইতো এক আকাঙ্ক্ষায় চৌধুরীকে ভুলিয়া পাকসেনাকে সে অবলীলায় অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করে। সেখানে কর্মলয় তাহার বেশ দ্রুত। তৎপরতার বোলও কম থাকে না। পাক অফিসার গ্রহণ করে তাকে। সে মেলেটারির আদেশ-নির্দেশে ব্যাকুলভাবে তৎপর হয়। এক পর্যায়ে দিকনির্দেশনা দিয়া এই এলাকায় মেলেটারি বহরকে ঢুকাইয়া লয়। হবিবর একা থাকে না কিছু দোসর যুক্ত হয়। একসারিতে আসে আরও অনেকেই। চেনা এলাকাগুলা আরও চিরপরিচিতি পায়। চতুর্দিকের ঘাসে ঘাসে রব ওঠে। কুলু কুলু নদীর স্রোত ভরাবর্ষায় আরও স্থির হয়। স্রোতের বলোকে ভেসে আসে অনেককালের জমানো বর্জ্য আর কারো ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক রাবারের দোমড়ানো পুতুল। সে পুতুলের পায়ের সঙ্গে বাঁধা কিছু খেলনাপত্র। সবুজ জীবনসমূহ অনেক ক্লান্ত তারে আটকা পড়ে। ঘরের ভেতরে আরও অনেক ঘর আর কম্পমান সুখ অসুখের আহাজারিতে থাকে ত্রস্ত। তারপর হট্টমেলার পলায়নপর মানুষের তৎপরতা বাড়িয়া গেলে হবিবর রিফিউজি সবকিছু নিজের তরীতে ভাসায়। স্বপ্নের আরশিতে তুল্য করিয়া তোলে বাস্তবভূমির বিপুল রূপালী-ক্রন্দন স্বর। কী আছে উহাতে! কীসের জীবনের হাতছানি তাহাকে সম্মুখে ডাকে— কেউ তা জানে না। কোন সকালে কীসের ডাক কেউ কী তার খোঁজ রাখে!
চৌধুরীর কোটাঘরের তালা ভাঙিয়া হবিবরের নির্দেশেই একপ্রকার মোকাম তৈরি হয়। চৌধুরীর আশ্রিতা উধাও হন। কী তাহার পরিণতি কেউ জানে না। অনেক ডামাডোলে আশ্রিতা হারাইয়া যায়। পলা পরে কড়িবর্গার ইতিহাস শুনিয়া বলিয়াছিল ‘এই বুদ্ধি কী করিয়া আসিল!’ মোটা মোটা বর্গা নামাইয়া কোটাঘরের বাইরে বিশাল চুল্লীতে ঢুকাইয়া চলিত বড়ো বড়ো হাঁড়ির রান্না। মুরগি, গরু-খাসি জবাই আর আনন্দের উৎসব তখন সেখানে। এই এলাকায় কারো গরু-খাসি জীবিত থাকে নাই। অবারিতভাবে সকল প্রাণীর শরীর আহার দেশ উদ্ধারের নিমিত্ত নিষ্পত্তি হইতে থাকে। কোটা ঘরের উঠানের সামনে বড়ো চুলায় বাঁশ-বাতি, জামা-কাপড় নামাইয়া মালিকহীনের মালিকানায় রান্ধনের কর্ম চলিতে থাকে। হবিবর রিফিউজি যোগানদাতারূপে কিংবা সাহসী ইনফর্মাররূপে নেতৃস্থানীয় হন, সম্মুখ অধিকার করেন। পাক সেনাদের কর্মের নেতৃত্ব লইয়া ফেলিলে কোটা বাড়িটি কেন্দ্রীয় আস্তানায় পরিণত হয়। তখন রন্ধনশালার ব্যঞ্জনে কড়িবর্গা, বুনোবাঁশ, স্থানীয় আমগাছের ঝড়ে পড়া শুকনা ডাল কিংবা পরিকীর্ণ পানশালার গ্রহণীয় বস্তুসামগ্রী গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্ত নিমজ্জিত হয়। ম্যাসেব চিক্কুরে একবার বাড়ির মালিক আসিলে হবিবর কয় ‘তোরা পালাও’। দ্রুত গ্রেফতার বা চোখবান্ধার ভয়ে সে একসময়ের দাঙ্গায় ভাঙ্গা সাইকেলের গুণা দিয়া বান্ধা হ্যান্ডেল ধরিয়া গাত্রোত্থানের উদ্যোগ হইতে শুরু করিলে সম্মুখতটে এ্যারেস্ট হন অন্য এক পাকসেনার হাতে। তখন আরও দেখে মতি, নবি, দছিসহ আরও কয়েকজনের একই দশা। গর্তে নামাইয়া ঝুট বলার দায়ে উদ্যত কঠোর লোহার বন্দুকের নল। পরিবেশটা নিরিবিলি ও নির্মিয়মান। কট্টর ক্লেশ সবার বুকে। স্কুলঘরটা গত মে’র ঝড়ে চাল উড়ানো। পেছনের ফাঁকা প্রান্তরের মাঠ পেরিয়ে পঁচাকন্দর গ্রামে মুষ্টিমেয় ক’জনা লুক্কায়িত ও ত্রস্ত। আইয়ুব জান্তার হাতে গড়া চৌকোণা লোহার উপর আরসিসি ঢালাইয়ের তিনহাত প্রস্থের চিক্কন রাস্তায় বালুধুলা উড়ার চেয়ে আরও বেশি স্তব্ধতা থাকে শিয়াল-কুকুরের ডাক। কিংবা দূরের কোনো একটিয়া কোটাবাড়ির কুপি আলো কিংবা মাত্র কদিন আগে গড়া ইলেকট্রিক পোলের ওপর তীরহানা সূর্যের আলোতে রূপালি উজ্জ্বল আলোর দুপুর ক্লান্ত রোশনাই নিয়া রাত্রিদিন চলিলে এই গর্তে দাঁড়ানো মোর্দারূপপ্রাণের কী দশা হয় সাইকেল পালানো এই বাড়ির ধরার পড়া মালিক তা জানে না। একবার ছল করে, একবার সুযোগ খোঁজে, একবার রিস্ক লইয়া কোনোদিকে ফাঁক খোঁজে। মনে মনে ভাবে হবিবর রিফিউজিকে হাত করিলে সবকিছুর বুঝি আকুল অবসান হইতে পারিত। কিন্তু না! গর্তে নামানো তিনজন আর এই পলায়নপর ব্যক্তি একত্রিত হইতে থাকিলে এ এলাকার নিথরতা ভাঙিতে থাকে। তীব্রতর হয় আসন্ন কষ্ট। জটিল হতে থাকে গোটা পরিবেশ। বায়ু ওড়ে শীতল ও করুণ আবহে। কোটাবাড়িতে তখন আশ্রিতার ক্রন্দন ছাপিয়া ওঠে। এক সুখ আর শান্তির স্বপ্ন গাঢ়তর হয়ে ওঠে। আরও বায়ুবয় উত্তরের দিকে। শোনা যায় কোনখানে গ্রাম জ্বলিয়া গিয়াছে। আবার গড়িয়া ওঠে রাতের আলো। সেখানে ভূত পেত্নী আর শ্মশানের শব্দ আসে। মোনাইল দুর্গাপুর নামের গ্রামে কেউ থাকে না। পাটের ক্ষেত, সবুজ প্রকৃতির অরণ্যানী মানুষকে যে সবুজরূপে রাখে তা যেন কোন ইশারায় বিষণ্নতার বাতাসে হুহু রবে বইয়া চলে। কোনো গ্রাম নাই, শুধু পাথার আর পরের পাথারের ক্লান্তি। শূন্যতার পরে আরও অধিক শূন্যতা। দুধিয়াবাড়ির পাশে যে বড় নদী তাহার বেগ স্থির কুলু কুলু রব কারো আশায়-নিরাশার দোলায় স্তম্ভিত অবয়বে করুণ। এই তলে আরও বলক ওঠে, বৃন্তদল দুলিয়া ওঠে, ক্রমশ ফুটিয়া ওঠে কাঁঠালিচাপার কুন্দমুখ। বুনো ওরসে পলে পলে হাওয়ার যশ তৃপ্তিময় হইলে আরও অধ্যাত্মপ্রীতি প্রমুখের সংশ্রবে প্রবল হয়। প্রান্তরের চোখজুড়ানো আঁকশিতে কিছু মনুষ্য স্বর এক আবাহনের জ্বরে ভাসে। সশস্ত্র জলপাই রঙা গাড়িতে গোয়ারমেন্ট বা তার আদেশ কোপানো কণ্ঠ নুয়ে পড়া আকাশকেও সংঘবদ্ধ করে। তুলে ফেলে তোলা আঁকশি। তাতে যুক্ত করে কঠোর শক্তিভূতির দাপট। তখনও চোখ বান্ধা হয় নাই। মেলেটারি কোঠাবাড়িতে খাওয়ায় ব্যস্ত। দ্বিতীয়বার রান্নার হাড়ির জন্য গত রাত্রিতে কিছু মুরগী ধরিয়া আনা হইয়াছে। কিছু ছাগলছানা অদূরে ভ্যাবায়। ভুখা পেটে নোলায়। নিয়তির ক্রুদ্ধ অভিশাপে দাবিয়া গিয়াছে তাহাদের পা। এরাও কী অপেক্ষমান! জান যাওয়ার চিন্তায় ভরপুর। একপ্রকার তাকানোর ক্ষেত্র একই হইলেও দছি বা মতি বা চৌধুরী কেউই আর প্রাণের আশা করে না। প্রাণহীন প্রাণও তুচ্ছ সময়ের প্রলম্বিত রূপ খোঁজে। এভাবেই কী জীবনের সুর একলয়ে ভাসে ওই দুধিয়াবাড়ির করতোয়া ছাড়া নুয়ে পড়া মেঘদলে একত্রিত হয়! ঠিক ছিন্ন ভিন্ন চিন্তার আসর ও অবসরগুলা। এর সম্মুখে পেছনে কোনো রীতি বা নীতি ধরা পড়ে না। হবিবর রিফিউজিকে বুটজুতার এক লাত্থিতে দূরে চটকাইয়া দিয়া এক পাকসেনা কয়, হঠ্ যা! সে উঠিয়া পায়ের নীচে হুমড়ি খাইয়া কোঁকায়। আনিবে তো আজই বিশাল একখান গোরু। লাত্থিগুড়ি খাইয়াও হবিবর আঠার মতো লাগিয়া বাংলা ভাষার অবলম্বনে তোলপাড় করা গাল তুলিলেও বডি ল্যাংগুয়েজে তার প্রকাশ ঠিক দেখায় না। এইটুকু বুঝিলে গর্দান নিয়া নিবে। একটুক্ষণের মধ্যেই বিরাট ঝালোরঅলা মোটা চাকার তিনখান টেরাক ধাই ধাই রবে আসিয়া মোড়ের বটতলায় দাঁড়ায়। কী এক ইশারায় তাহাদের নতুন এজেন্ডা রচিত হইছে। পরিচিত রাস্তাচেনা মানুষের প্রয়োজন বুঝি— কিংবা ঠিক কী এক টেনশান সকলের কাঁধে অলঙ্ঘনীয়রূপে ক্রিয়াশীল। অঙ্গুলি ইশারায় পলকেই সকলকে মুক্তির আদেশ দেয়। এক লম্ফেই সক্কলেই ছাড়া পায়। দে এক জানছেঁড়া দৌড়, কোটাবাড়ির মালিক ওই ভাঙ্গা সাইকেলকে কাছেই হেলানোরূপে পায়। সে তাহাতে উঠিয়া সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে দূরদেশের উদ্দেশে নয় চিরকাল সে আর ফিরিবে না সেই প্রত্যয়েই চলিয়া যায়। হবিবর ঈর্ষার ভেতরে এই ঘটনাকে অসুখরূপেই চিত্তের মধ্যে রেখে একপ্রকার ক্রদ্ধ হয়। এই কোটাবাড়িটি যুদ্ধশেষে কাহার হইবে। কেন সে অধিকার হারাইল। পলাইয়া চলিলে সে কি আবার আসিবে! হায়রে কপালÑ এই লাত্থিগুঁতার কী আর দাম থাকিল। সে কারণে হবিবর কী কুপিত! দমনে তার আড়ষ্টতা বাড়ে, মনোযোগ পায় না কোনো কামে। পেছনে পেছনে তার আত্মা লাগামছুট হয়। মনে হয় অধিকৃত অধিকারও বুঝি দুর্বল হইয়া গিয়াছে। সেও কী এক রাত্রিতে সব ছাড়িয়া অন্য কোনো আস্তানার দিকে ধাবিত হইবে। সন্ধ্যাবাতির আলোর তেজ দুর্বল হলে দূর থেকে চিক্কুর শোনা যায়। তাতে আছে হিক পাড়া হাহাকার। বেলোয়াড়ি সুরের মধ্যেই করুণকান্নার লয়শীল বিলাপ-বিনাশী স্বর। সেও বিনাশী এখন। একইরূপে তার জীবনেরও পাদপ্রদীপ নিবিয়া গেল মনে হয়। নিভন্ত প্রদীপের মুখে যে হাহাকার ধ্বনি সে কী তারই প্রতিধ্বনি! ঠিক জানে না। কিন্তু আর পেছনেই বা ফিরিবে কীভাবে। বিবির কণ্ঠটি আবার নিকটে চলিয়া আসে। সেই রাত্রিতেই সে বলিয়াছিল ‘ট্যাকার কিছু নাই, দুই বান্ডেল টিন তো পাওয়ার কতা।’ চালফুটার ভেতরে কুত্তার গা-ঝাড়া চলিলে সে চিক্কুর দিয়া কয়, শোয়োরের বাচ্চা, তামান দিন কী করোস বাল। জেবনের তামানটা চুকলি দিয়া কী করলু! এসব আকার প্রকারে চতুর্দিক দিয়া তাকে যখন ঘিরিয়া ধরে তখন পেছনে ওঠে হুহু বাতাসের টান। বিলি কাটা রোদের ওপর দিয়া বিষণ্ন ছায়া দৌড়ায়। তারপর হিম ঠাণ্ডা নামিয়া তার দৃষ্টিজোড়া নিমীলিত নশ্বর দৃকপাতে সুনসান নীরবতায় একপ্রকার অসহায়ত্বের অভিজ্ঞান দানা বাধিয়া ওঠে— মেলেটারির দিকে একপ্রকার তাকায়। চুতমারানি তোদের ঘরোত আর কেউ নাই। ক্যান যে তোদের ফাঁদোত পাও দিছিনু। এরপর আর দ্বিধা থাকে না। সে নির্বিকার উঠিয়া বলে মোরগের রানগুলা চুরি করি নিয়া বউয়ের হাতে দিলে আর বেশি কথা থাকে না। সেই ব্যবস্থা নিয়া সে বলে পাক জাউরাদের পুটকিৎ আর রান ঢুকপান্নায়। এরপর সে ডুমা ডুমা গোশত চালানের চোখে যখন উদ্ধত তখন কীসের এক চিক্কুরে বাথানে ওপার দিয়া ডোকরাডুকরি ওঠে। আগুন জ্বলে। পাকিদের হাসাহাসি থামে না। কান্নার রোলে উপরের চিলকানো আকাশের বিজলী জমে। চীৎকার পরিব্যাপ্ত হয়, চরাচর জ্বলিয়া ওঠে। গঠনরূপে আকাশ-বায়ু-বৃষ্টি নতুন অবয়বে হাতছানি দেয়। এ কীসের উল্লাস! জল্লাদের দরবারে কার সে প্রদাহ? দহের নৈঃশব্দ্য যেন আরও ক্রন্দনরত। সে সকল অশান্ত অভিপ্রেত প্রেতরূপ তুমুল কাঠিন্যে প্রলুব্ধ। হবিবর রিফিউজির সুযোগের অপেক্ষার অবসান ঘনিয়া এলে গোশতের বাটির ভরাট ভা- ওই ফাঁকা উত্তুরে জীবনে আনে স্বস্তির প্র¯্রবন। তৎপরতার ভেতরে আগুনলাল উষ্ণতার আওয়াজের রব যখন দীপিত তখন বিবির মুখে চোখে নতুন স্বপ্নের আস্বাদ কাঁপে, দুলে ওঠে কম্প্রমান কোলাজবুননি। চোখশাদা দৃষ্টির ছায়া দূরের ক্ষীণ আলোয় তখন পাতলা সারস দেখে, চৈ চৈ আওয়াজে সারস নাকি হাঁসদল পাছা দুলিয়া দ্রুতলয়ে চলে। দলবাঁধিয়া নামিয়া যায় উত্তর-দক্ষিণে চওড়া পুকুরনদীতে, তারপর ভাসে, ডাগরমাথা দোলায়, কেশর ঝাপটিয়া জৈবিক ভঙ্গিমায় দাঁড়ায়— নাহ তারপরও রোশনাই নাকি থামে না ঘুলঘুলির ভেতর ঝুলন্ত কুলায় দোলে দোলদোল দোদুল নাচ লালিমা মোরগ পাখায় ফুড়–ৎ বিভাসে ঝির ঝির গুড়া ধুলা। বিবিসাব বায়না আর নেয়না। কত্তোকালের সুরম্য শানের ইঁদারায় ঝুপঝুপ আওয়াজ যখন প্রগাঢ় হয় তখন জলছায়ায় মুখ কাঁপে, ক্ষীণ ঢেউ দোলে তখনও নিজের মুখটুকু চেনা যায় বা ফেটে ওঠে। বিবির খাওয়ার আয়োজন আরও তুমুল। তসরের তাগে আটকায়। তাগায় তাগায় জোড়সেলাই অনেককালের সুখকে মাখায় নাকি দুঃখকে বিলোড়িত করে জানা যায় না। কত্তোকাল আগে একমাত্র সন্তানটা মরিয়া তাকে ভুলিয়া গেছে। সে মৃত্যু কী কঠোর না আদরের! আর আশা জাগানিয়া অভিপ্রায় পাড়া জুড়িয়া হাওয়ায় ভাসিয়া বেড়ায়। হবিবরের দ্বারা দুইবারের অ্যাবরসনের পরে বিবির প্যাট নষ্ট হইলে এই পাথারের একাকিত্ব আর ইঁদারার মুখ দেখা মুখ কালিছায়ায় আকুল। হবিবর তখন কোটার কোণায় অবসরনিদ্রা যায়। পাক মেলেটারির গতরাতের কা-টা তাকে বসানো ঘুমে দুঃস্বপ্নগ্রস্ত করে। এই দুঃস্বপ্ন কীসের। সারা দেশব্যাপী তারই দান চলিতেছে। কেউ কিচ্ছু কয় নাই। খালি কান্দোনের ভারময় কণ্ঠ, সুনসান নীরবতা। কোটার ঘরেই পালাক্রমে পাশবিক ক্রিয়ার পর সে বেহুঁশ হইলে খালি গলায় কয়, ম্যাবাই ও ম্যাবাই! বাই বাই মোর, আয়… আং…!
হবিবর তখন পাক বহিনির হাস্যসুখের বিপরীতে হাহাকারের তোলপাড় শুনিতে থাকিলে সেও তার জীবনের ক্রন্দন শোনে। পাড় ভাঙ্গা প্রতিধ্বনি ভাসিয়া আসে। রাত্রির অন্ধকার ক্রদ্ধ হইয়া কয়, ক্যান মনে নাই- ইইইই… তলোত এক দর্জাল তোর মায়ের ওপর উপগত হইছিলো আর তুই চিক্কুর দিয়া … চিলস হাটিয়া বাঁশবন বাঁশের আড়া ভেদিয়া য়ায়ায়া… পা কাঁপে কম্পমান পা এক তলা দুই… তিন চার পাঁচছয় তারপর উপরের ছাদ থেকে ঝিম ঝিম কইরে কাঁপতে কাঁপতে সড়াক কইরে নিচের দিকে অনেক নিচেচেচে চে চলে আসে থ্যাককককককক। হাহহা সে মইরে গেলনি… নাহ তার আগেই হবিবরের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে জেগে উঠে ভাবে ছয়তলার নিচে পাকার ওপর ক্যাডা ফেলে দিল! বাঁচিল। হায়রে বাঁচন মন। প্রায়ই আজকাল এই ঝিমঝিমঝিমমমমমম… স্বপ্ন তাকে তাড়ায়। ঘুমের ভেতরে আরেক ঘুম গড়ে ওঠে। ঘুমের গড়নে গড়নে পাহাড় পর্বতের উঁচু চূড়া খাড়ায়। সেখানে সে পৌঁছায় নাবে আবার পৌঁছায় নাবে উহা বুঝি বান্দরের তৈলমাখা বাঁশের ন্যায়— তারপর সড়াক করিয়া পইড়ে যেতে থাকলে কে তাকে আটকায় নাকি থ্যাতলা হয়্যা যায়। তারপর রক্ত… রক্তমাখামুখ… জান আছে না নাই… নাক সোত্তায়া ঠিক করে কয়জন। সিদ্ধান্ত নেয় কী নেয় না, বোঝে কী বোঝে না… মরলে কান্দোনের ঢেউয়ে পঙ্গর দেয় তামান মানুষ। সে পঙ্গরে দখিনা হাওয়া নাই নাই বুলবুলির থির হয়্যা থাকে, হিক পাড়ে ছোট্ট অবোলা শিশু। ঘুমের দ্বিতীয় স্তরে এই পঙ্গর সে দেখে, ঘুম নাকি কান্দনের পঙ্গর, নাহ কিছুই বোঝে না, তাহলে বুলবুলিটা ওভাবে থির হয় কেন! ওর কী কোনো জবান নাই, ও কী কথা কইতে জানে না! বুলবুলিও কী টের পাইছে যে মানুষটা আর বাইচে নাই। সে বিশাল পাথার দিয়া ধানের ভিঁয়ের নরোম আলের ওপর দিয়া বড় বড় পায়ে দৌড়াইয়া আসিতেছে। মেলা বড় খালের পাশের পাড় দিয়া আটাষ্যড়ির গাছের ভেতরে পিঁপড়ার ভাসা আউলাইয়া দিয়া জামের তলে গোরস্থানের মোর্দাদের বুকে পা দিয়া সে এই মুহূর্তে সোবানের বাপের বাড়ির পাশের পাছকা বারান্দায় লুকিয়া দম নেয়। সেখানে দম ফাটা ধুকপুকানির ভেতর ডালিম গাছের দিকে চোখ পড়তেই দেখে বুলবুলি চুপচাপ। এখানেও ওই বুলবুলি! সে কী তাহার পিছ নেছে! ক্যান তার অপরাধ কী! সে কী করতে পারে। মাকে গর্তের ভেতর ফেলে অরা কী করছে দেখে নাই, মা-ই তো তাকে কইছে বাবা তুই পালা অরা তোক মারি ফেলাইবে। পালালালা….., তখন সে কী করিবে। কুত্তারা মার গলা আর কাপড়া নিয়া টানাটানি করতে থাকলে সে কিছুই করে নাই তা ঠিক কিন্তু কুত্তগুলা পাইলে তো তাক আগে মারি ফেলাইতো। মা-ই তো তাকে জানের বদলে বাঁচাইয়া দেওয়ার জন্য হিক পাড়িয়া কয় পালা বাবাধন, কসম খাাাা… যাাাাাাাা… তখন কী করিবে মাকে ফেলাইয়া সে চইলা আসছে। কুত্তাগুলা পরে কী করেছিল কেডা জানে কিন্তু ওই জায়গায় গিয়া আর সে কাউকে পায় নাই। সে মুক্তপ্রান্তরে হিক পাড়িয়া কতো কান্দিছে… কেউ আছিল না… আর এখন এই বুলবুলি তার পাছ নাগিছে। স্বপ্নের ভেতর আসিয়া মাতব্বরি করতিছে। বার বার বুলবুলি আর দুঃস্বপ্ন তাকে যেন খাইয়া ফেলাইতেছে। পাছকাবান্দায় সে বসিয়া হাফায় আর পাকা ডালিমের দিকে বুলবুলির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় আর হাসে, কোত্থেকে যেন তার মনে ভেসে ওঠে তারে বাঁধা আকুল বৃষ্টিপাত : বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল, বাগিচায় বুলবুলি তুই … তারপর আরও সে হাসে… বুলবুলির পাখা ঠোঁট নিয়া কী সব ভাবে। সড়াক করে দরোজায় বিপুল আওয়াজ হলে বিবি তুমুল কর্কশ গলায় ডুমা গোশতের কথা বাদ দিয়া টিনের বান্ডিলের কথা পাড়ে। তখন দোতরফা ঘুমের ভেতরের গহীন রাস্তা বন্ধ হইয়া যায়। খুব চাপ বাড়ে। মাথার ভারে মেরুদ- নুয়ে পড়ে। বাঁকা হয়ে পড়ে। কোটাবাড়িতে মেলেটারির আশা-আশ্বাস হাতাশ করে। হাড় জ্বলুনি অসুখে পেয়ে বসছে যেন। দিনরাত্রির প্রদাহ আর কতো! চিত্র ও চিহ্নিত অভিযোগসমূহ দোটানায় আনে। ভেতরে জ্বর ছাইয়া গেলে বিবির বৃহৎ মুখ আড়ালে চলে যায়। সেও কী এই ঘরবাড়ি-সংসার আর মইরা যাওয়া সন্তানের স্মৃতিকে বড়ো করিবে। কবে তা ঘটবে? কে তাকে আস্থা ও নিশ্চয়তা নেবে। যুদ্ধ কী শ্যাষ হইবে! মুক্তি নাকি গেরিলা নাকি কীসব আক্রমণের কথা পাকবাহিনি কয়। যুদ্ধ শ্যাষ হলে এই কোটা বাড়িটাই কী তাহার দখলে আসিবে। হারজিতের মাহাত্ম্যও অপরিষ্কার। সে বিবির দিকে তাকাইয়া কয়, ‘হবি হবি…’।

তিন.
পলার একাকীত্ব জীবনের তারগুলা কী পূর্ববর্তী বংশের ধারার মধ্যে ছায়ায় আটকানো? তার এখনকার চিড়িয়াখানায় কী এক ফেনেগানস হয়ে সে বাস করছে। যুগের প্রবাহ এখন তাকে নানাদিকে টানিয়া নিয়া চলে। প্রতিদিন তার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলা একপ্রকার আপোষহীনতার দিকেই টেনে নিয়ে চলে। না, সে কোনো কম্প্রোমাইজ করতে জানে না। এ তল্লাটে পিতৃহারার হবার পরও কয়েকটি বছর চলে গেছে। যে বাবা সবকিছু তাহাকে দিয়া গড়িয়া গেছেন তার প্রতি তার কোনো অভিযোগ নাই। বরং বাবাই তাহার মুখশ্রী। কতো কীভাবে তিনিই জানাইয়া দিয়াছে এই পৃথিবী তোমার মা, তুমি সেখানে সেভাবেই স্বাধীনতা নিয়া চলিবে, সততায়-সাহসে আপস করিবে না। কই আর আপস! রজত নাই, ননীর খবর কোথায় কিছুই তো সজীব নয় আজকাল। এখন তাহার সময় বহিয়া যায় দেশি-বিদেশি ছবি দেখিয়া আর আঁকিয়া। বই পড়াটাও এখন নেশায় পরিণত। প্রতিটি জগতই যেন ফেনেগানস প্রত্যাশা। এইসব নেশা নিয়া সমাজে চলাটা কঠিন মনে হয় না। কারণ, পলা সিদ্ধান্তে অটল। যে একাকীত্বটা আছে, সেটা বাবার দাদার তিনভিটের স্মৃতি ও শ্রুতির সরীসৃপ মোহে কাটানো। আর তার অনুপস্থিত জীবন নিয়া সে কী করিবে? নিজেই যেখানে শূন্য সেখানে কে পৃথিবীর জন্য কী করিয়াছিল— সে অবশেষ চিহ্ন দিয়া কী প্রয়োজন! বাবাও তো তাই ভাবতেন। যে অভিমানে তিনি ফিরিয়া আসিয়াছিলেন মধুমতী থেকে এক মায়ের কোলে। যেখানে হঠাৎই পলা আসিয়া পড়ে। আসলে এতো পলা নয়, চৌধুরী বাবারই মাইমেসিস মুখ। সেখানে তাই বার বার ফিরিয়া আসে বাবার জীবন মুহূর্তের অবিনাশী সংবাদ— যাহা তার মেয়ে পাইয়াছে, তমঃসম্পূর্ণতার সূত্রে। কিন্তু প্রেম আর বিপ্লবের রোরুদ্যমান কলরব তো তার জীবনে কম নয়। বাবার জীবনে প্রেম আছিল, দোয়েলের স্বপ্ন ছিল, ছিল এক পরকীয়া জীবন। নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় তাহা মাখা। সত্যের ছানানো রূপকথা, ক্লান্তি আর হতাশার নিছক এই ছিল শাসনমাত্র। তাই সেই বাবাই তাহার কণ্ঠস্বর। কিন্তু মধুমতী আর তার বাবা তো কুলীন, কুলীনের বংশগতি তুমুল সংস্কারে নিকানো। তাই ধরিয়া আসে রজনী হলো উতলার কিম্ভূত আবেশে। চৌধুরীর তখন মধুমতি আম্রবর্ণের মহিমায় তোস্তরীরূপে মনে আসে। সেখানে আবার বোতোফেন বিমুগ্ধতার প্রলাপন তোলে। ক্যানভাস রঙ অতলে বিভাসিত হয়। এমন শূন্যতা কি তাহার জন্য! বড়বিবি তো নিছক এক মেয়েলি মানবী। ওর জীবনভর সংসারের টানটা আর মানুষকে ভালোবাসার মোহটা বেঢপ নয়। কিন্তু কোথায় এক অচল অথর্ব জীবনের বাসিন্দা হন তিনি। যেখানে তার অভিমানটা রাগান্বিত সাপের বেরুয়া পাকানো রাগের মতো স্থির-ফনানো। একটুকু হাওয়া লাগলেই দ্রুতলয়ে সে ফোঁস শব্দে বিরূপতা প্রকাশ করে। রান্না আর আরাম আয়েশের সুখশায়রে তাহার জুড়ি এ তল্লাটে নাই। বড়বিবি যেভাবে হেরেমে ছিলেন, সেটা অস্বাভাবিক বলা যায় না। কিন্তু ভেতরের বিবিবাসনা নাই। তেমন শক্তি-সামর্থ্য তাহার নিকট অচিন। যা অচিন তাহার বাস কূল ছাপাইয়া একদিন সমুদ্রকে অস্বীকার করে। পেছনে ফেরে। অন্যদিকে বাঁক বদলায়। পূর্ণিমা ভরা সৌন্দর্য তাহাতে নাই, নাই কঠিন জীবনের চীবর উপাসনা— যাতে কোমলরূপে বাধা পড়ে সর্বরকম সংশ্রবে। একবার ভোরে সে বিবির পাশে শুইয়া আছে। অনেকরকমে সে সোহাগের ভাণ্ডার রচনা করে। কিন্তু ঠাণ্ডা-শীতল সম্বন্ধ সবকিছু বাতিল করিয়া দেয়। তখন চৌধুরী এক বড় শিমুলতলায় জটলা অন্ধকারে দাঁড়ান। এই অন্ধকারের মিতালীটা তাহাকে জাগাইয়া তোলে। শিমুলতলাই তাহাকে ভোরের যোগ-বিয়োগ শেখায়। এই ছায়ার আলোর সঙ্গে মনে পড়ে মধুমতি তীরের উপর ছাওয়া বিরাট বনবাড়ির বিসংবাদ। সেখানে ঠিক খাড়া ছায়াটা তার শরীরে ছুইলে তখন সরল অঙ্ক নিয়া আসিতেন ‘অঙ্কের জাহাজ’ ওয়াহেদ মাস্টার মশাই। গুরুগম্ভীরভাবে অনেকটা তুলনা দিয়া বলেন, জীবনের হিসাব সোজা, তোরা সোজা পথে চলিস, নিয়মের ভেতরে— তখন সরল অঙ্ক মিলিবে। সামন্ত সমাজের শেষ রেশ বহাল। ডাক আসে ওই বড়বাড়ি থাইকা। তোমার পড়াশোনার খবর কী? কী পড়? বড়বাড়ির মুরুব্বী ওসব অঙ্ক তেমন বোঝেন না, বলেন : ট্র্যাজেডি কয়টা আছে ক দেহি… শেক্সপীয়ারের। খুব পড়তেন তিনি শেক্সপীয়ার। মকবুল চৌধুরী বলিতে পারলে, এই বিবির লগে পবিত্র বিয়ার লগন ঠিক হইতো। বড়বিবি সুন্দরী চোখে ধরে। কিন্তু সেই যৌবনে সবটুকুই নিরূপদ্রব হইয়া রহেন। পাছ বাড়ির পাছকাবান্দায় বিবিকে কন, তোমার কী হইছে। শরম কর ক্যা! বিবি কয়, আমার ডর করে। আরও পরে ব্যাপক ভয়ে কয়, আমার কাছে আইয়েন না— আমি মইরে যামু। ক্যান তোমার কী যাদুটোনা ঠেকছে? না, আফনে যান। এভাবে মাস-বছর পড়িলে দীঘির পুকুর আর ঠাণ্ডা নিমতলার গন্ধ-প্রশস্তি তাহাকে বেপরোয়া করিয়া তোলে। অভিমানটা জমাট চলে। ভোরের ডাক অচিন মনে হয়, একটিমাত্র মোরগের বাঁকও কঠিন হইয়া পড়ে। ছাব্বিশ বছর বয়সী চৌধুরী নিজেকে বেশরম কইরে তোলেন। হঠাৎ কইরে জোরমতোন করেন তাকে, তারপর জ্ঞানহীন বিবি কীসব বইলে চলে— তুমি তো মরিয়ম। ওই যে মরিয়ম আসিছে। হ্যা, রাতে আসিবে। তোমার সঙ্গে আমি দেখা করবো আমলির পাথারে। নাহ, কখনোই বিয়া করবো না। এক ধরনের শুদ্ধ বাংলায় অকাতরে কী সব বলতে থাকে। তখন দূর থেকে ফকির ধরা হয়। বিশাল বাড়ির বিরান আঙিনায় মাছরাঙা উইড়া আসে। কোণার গোলাপ গাছটা ন্যূব্জ হইয়া বাতাসে কাঁপে। ঘন দোলায় ছোট্ট ফুসকো পোকা ঘোরাঘুরি করে, রেণু ছড়ায়। ডাকাডাকিতে ‘তুমি’-ডাক ধরে আসে। জন্মদানের আবহে তার ডগা ফুলিয়া ওঠে। ডগার ওপরে অনেক অভিসার-আশিস ভরা। এরকম আয়েজন বুঝি বেশ কয়েক বসন্ত ধরে চলিছে গোলাপের শরীরে। কাঁটা পড়িয়া গেছে, পাতায় দাগ আসিয়াছে, ছিনাইয়া নিয়াছে জীবনের অনেক আনন্দ। সে আনন্দে ঘন ঘন বাসর কথা উপচিয়া পড়ে তুচ্ছ বাবুই ডানার ন্যায়। ফুড়–ৎ করে বাবুই— যার পাখা দোলে তালগাছের ডগায়, শীর্ণ পাতার কোণে ছন্দ তোলে আর দো-দুল উচ্চ করে স্বরে বলিয়া ওঠে এই নীড়ে বসত গড়ি আর একত্রে গাহিয়া কই স্বরের প্রলাপন। সবকিছুতে জীবের জন্মকৌশলের নাচানাচি। সেসব যেন এখানে কষ্টে আর দুর্বলতার কম্পনে হারানো জৌলুস। লাল মাটির প্রাচীরের ওপর তখন নাড়ার ছাউনিতে অসময়ে মোরগ ডাকে। এমন মোরগ ডাকার অর্থ করেন অনেকেই। চৌধুরীর বিবি ফাঁসাইয়া গেছে, ওই চৌধুরীর কারণেই। কী করছে সে! কেন বিবি অজ্ঞান হইলেন। কেন ইহজীবনের আর বিবি এ বাড়ির সজাগ ঘরণীরূপে থাকিবেন না। কলকাতায় লইয়া চল। সেখানে বৈদ্যি দেখান হইবে। এসব নানা বিতিকিচ্ছিরির পর সবকিছু উলোট-পালট হইছে। খবর আসে চৌধুরী কী যেন করিয়া বিবিকে বিপদগ্রস্ত করিয়াছেন। চৌধুরী বড়বাড়ির কাছাকাছি আর যায় না। তখন থেকে বড় শিমুলগাছটাই তার রোমন্থনের জায়গায় পরিণত হয়। তাহাতে ফুলে ফুলে যে পতঙ্গ ওড়ে তার প্রশ্বাস নেয়। তাই এই শিমুলই তাহার সর্বত্র এক স্বর রচনা করে। এই শিমুলের ভেতরেই বৃক্ষবীজ ও জীবনের নতুন রূপ খুঁজিয়া লন। তাই তিনি বড়বিবির সব জ্বীনধরা কর্মকা- নিয়া চিন্তিত হইয়া থাকেন। কীভাবে পরে এক পাতলা ঠুনঠুনা মানুষে পরিণত হন। খাবার-দাবার বন্ধ হইয়া যায়। চলাফেরা স্বাভাবিক থাকে না। ক্যাডা যে ফকির করছে— না হইলে এমন হইবো ক্যা। এসব থেকে রোধ পেতে গোটা বাড়ি বন্ধ করার ব্যবস্থা হইল। মানুষজনকে কদু আর গোশত দিয়া ভরপেট খাওয়ানো হইল। জ্বীন তাড়ানো হুজুর ঘর বন্ধ করিয়া দিলেন। সারাদিন এসব নিয়া বেশ এন্তেজাম। বেশ খানাপিনা ছিল। কিন্তু কর্ম কিছুটি হইলো না। শুকনো বিবি এখনও বেসামাল হইয়া ক্রুদ্ধ হন, গালি দেন। বাড়ির স্বাভাবিক পরিবেশ দূষিত হয়। মুরুব্বীরা বিব্রত হন। সকলেই বলিলেন নিশ্চয়ই কেউ বান মারিয়াছে। সেডা কে হইতে পারে। অলিতে গলিতে কিংবা ভেতরের নানা মহল্লায় ও পাশবাড়িতে এ নিয়া কানাঘুষা চলিল। মানুষের কুষন্নি পড়িয়াছে। মানুষ এর ভালোমন্দ নিয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এভাবে বেশ সময় গত হইলে তারে কলকাতায় লইয়া যাওন হয়। কিন্তু পরে তাহার পাগলামি আরও ভীষণ রূপ পাইলে সকলের ধৈর্য্য ত্যাগ করিয়া তিনি আলাদা হইয়া বসতি লন। কিন্তু মানুষের তীব্র কানকথা আর অপৌরুষেও ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়া চৌধুরী আর বাড়ি ফেরেন না। এইটি ছাড়াও তাহার আরও ক্ষোভ আছিল। সকলে ভার নিজের স্কন্ধে নিয়া তিনি চইলা যান। তবে এরপর আর কখনো ভীষণ কালো মেঘ তাহাকে ছায় নাই। কারণ, এ গ্রামে তাহার বসতি কঠিন হইয়া পড়ে। সকলেই নানারকম প্রশ্নে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। পরের জিনিস নিয়া এলাকার সকল মানুষ যখন ব্যাপকভাবে কলকাকলিতে মুখর তখনই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ছাড়িয়া আসার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু একজন মানুষের সময় আর জীবনের কাঁচামিঠা স্বপ্নগুলা তো এরকম আছিল না। একটি নারীই মনে হয় তাহার সময়কে বিরূপ করিয়া তোলে। সব ছাড়িয়া গেলেÑ সিদ্ধান্ত নিয়া ফেলেন আর বিবাহের গতিমুখ খুঁজিবেন না। কিন্তু কিছুই তো ভাগ্যে নাই। নাই নিয়তিতে বাড়া। তবে এক ঝাঁক জীবনের স্বপ্ন তার কণ্ঠে। বাইরের অনির্দেশ্য জীবন তাই নিয়া তিনি করতোয়া অভিমুখে চলিয়াছিলেন। কিন্তু বাড়ির পাদপ্রদীপে দেখিয়াছিলেন প্রত্যক্ষ অনেককিছু। অপরিচিত জীবনের রূপ নিয়া চৌধুরী সংসারের এমন বিরূপ ক্রন্দন ছাপিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও দেখেছেন। মানুষের ভেতরের বেদনার নীল রূপ তাহাকে হাহাকারে অন্ধকারে ফেলিয়া দেয়। এই দেশে সম্প্রদায় আর ভেদের দ্বন্দ্ব আগে আছিল না, আধুনিক সময়ে তাহা সর্পের লেলিহান স্বাদের ন্যায় গড়িয়া ওঠে। সেখানে মানুষ তো ছোটতে পরিণত হয়। সে অভিসম্পাতি হইয়া ওঠে। অনেকরকমে কষ্ট ও ক্লান্তিতে তাহার রূপ নিস্পন্দ হইয়া আসে। অনেক রাজনৈতিক কর্মকা- সম্পর্কেও জানিয়াছেন। তাহাদের বাড়ির ভেতরে বাইরে কোনো আওয়াজ নাই। বড়বাড়ির চেয়েও এ বাড়ি অনেকসময় বেশি সমীহ অর্জন করে। তবে চোরডাকাতের সমারোহও ছিল। হিন্দুমুসলমানের সংঘাতে চুরি যায় মন, চুরি যায় জীবনের অর্জিত সামগ্রীও। একবার অনেক মানুষ দেখে চৌধুরীর ড্রয়ার ভাঙা, সেখানে অনেক গহনা আছিল। এসব সামন্তকালের বিকার নিয়া যখন তিনি খুব তীব্র শূন্যতায় আছড়াইয়া পড়েন করতোয়ায়, তখন কে যেন আসে! পায়ের মল শোনা যায়। নূপুরের নিক্বনে প্রতিবিম্বিত হয় তাহার মন। খাজুরাহ অবয়বে ভরে চলেন। প্রতীক্ষার অবসান হয়। কামের ভেতরে সবটুকু শুষে নেন তিনি। কিন্তু কোথায় যেন শূন্যতা হাওয়া দিয়া ওঠে। ফেরেন দেখে আসা চলে আসা চলমান কান্তজীউ, অদ্ভুত তার লেখনী। কম্বিনেশান। পরে সেই আড়ার ভেতরেই বুভুক্ষ অন্তর দায়িত্ব নিয়া ফেলে। পলা আসে। এসব কয়েকটি ব্যর্থ মুদ্রা দিয়া বিরাটত্বের কাহিনি সাজানো চলে না। কিন্তু কার্যত কিছ্ইু হয় না। তখন কেউ চৌধুরীকে চেনে না। পলার ভেতরেই চৌধুরীর সবটুকু নির্যাস নির্মিত হয়। সে জন্মিলে মৃত্যু আরও তুচ্ছ হয়, জীবন জটিল পথ যেন হাঁটিয়া চলে।

চার.
মকবুলার রহমান চৌধুরী মেনাইল গ্রামের বাসিন্দা হইয়া যান, কখন কী এক অপরিচিত রহস্যে! খুব ভরা রাইতে নাকি শোনা যায় তিনি করতোয়ায় আসিয়াছিলেন। বিরাট নদীর কুলুধ্বনিতে পার রাখিয়া উঁচু এক পাকা সেতুর ওপর দাঁড়াইয়া শুধু নিধুয়া দৃষ্টিতে সবুজ আদিম প্রকৃতির রঙ দেখিয়া চলেন। তখন তিনি ক্ষুধার্ত। একটু পানের নেশা আছিল। কিন্তু তারও বেশি নেশা নদীতে-পানিতে। পানির আকাক্সক্ষা তাহার প্রচুর। সেও জন্মরক্ত স্বপ্নের বোনা। নৌকা করতোয়ায় আটকালে অনেক ক্রোশ হাঁটিয়া ক্লান্ত হন। সেই রাতে ভরা পূর্ণিমা আছিল। কী এক অভিমান বুঝি তাকে এ পথে নামাইয়া আনিয়াছিল। ঝম ঝম বৃষ্টি নামে, কালো মেঘ চাপিয়া আসে পশ্চিম দিগন্তে। আদিম অরণ্য আর বিস্তর সবুজ বন বনানীর ভেতরে বেপরোয়া মনে ভাসেন ডোবেন। অন্তর রহস্য নিয়া তিনি খুব কাতর। চৌধুরীর গাম্ভীর্য নয়, বয়সের তারুণ্যের কণা তাকে ফলবান করে। অন্ধকারে পথরেখা বিলীন। বিজলীর আলোয় পাটাতন দেখা চলে। তিনি আজান শোনেন। ক্ষীণ শব্দ। কিন্তু দিগভ্রান্ত। তারপর আড়ার কোণে পৌঁছে দেখতে পান বান্দিনীর বিচার নিয়া তুমুল হট্টগোল। নামাজের পর তাহা অধিক সংঘটনের আশঙ্কা। ঘটনার জ্বর রূপকথায় আটকানো। শোনা যায় ওই বান্দিনীই অভিমানির হেরেমবন্দিনী। সে হেরেম কই? চৌধুরী কিছু সাথে আনেন নাই। তবে নিস্বঃতর আশীর্বাদ আর কী! কপর্দকশূন্যরূপেই সবকিছু সম্প্রদান হইলে ওই বসন্তবাবুর ভূতমন্ত্রের আখ্যা পাওয়া পতিত কোঠাবাড়ি নীড় রূপ ঘনাইয়া আসে। সেই কোটাঘরে অনেক রকমারি কিছু নাই— যাহা চৌধুরীর গ্রহণে ধরা পড়িবে। ওই জ্যেৎস্নালোকিত দুধঝরা রোশনাই রাত্রিতে ভরাবর্ষার ধারায় ওই বাড়িই আছিল নগদ আশীর্বাদ। তুমুল সে বৃষ্টিমাথা শারদ রাত্রি। তার বেশিদিন নয় পরের বছরের আগোনের আগেই পলা জন্মিয়াছিল। খুব নিকট ধারে কাছেই তাহাদের প্রচার-সম্প্রচারে সমীহ গড়িয়া ওঠে। কারণ, চৌধুরীর সমতুল্য মানব তল্লাটে কেহ নাই। ক্রমশ এলাকার অধিকার আর ন্যায়সত্যে কিছু কাজকর্ম পেয়ে গেলে সবকিছুর কর্তারূপেই তার অবস্থান দৃঢ় হয়। তখন তিনি পাকিরাষ্ট্রের শোষণ নিয়া কথা কন। বইলা চলেন হক-ভাসানীর কথাবার্তা। কৃষক-প্রজাসমেত অলঙ্ঘিত ন্যায্য পাওনা তেভাগার দাবি নিয়া কীসব মূল্যবান ও জটিল কানে ধরা কথাবার্তা। কিন্তু চৌধুরী ভেতরে ভেতরে অসুখ অনুভব করেন। শোপেনহাওয়ার প্রভাবিত করে। দুঃখবাদী দর্শন আর দুঃখ তো এক জিনিস নহে। তবুও ওর প্রতাপ অনুভব করেন তিনি। একসময় কাছের কাউকে ডাকেন। ক্যারে আজ নদীর বাতাত মাছ নাই। মাছের নেশা তাহাকে ভরাইয়া তোলে। ভরাবৃষ্টিতে তো মাছ আসে, সেই পুনর্ভবা, দুধকুমার তাড়াইয়া মাছগুলা ফূর্তিতে চলাচলি করে। গায়ের আভায় ঠিকরে পড়ে তড়পানো আলো। ও আলোর রঙ কেমন জানি। গুজার বা শোল অন্য রকমের। ঠিক কালো নয়, মেটেও নয়, শ্যাওলাধরাও নয়। কেন ওদের এতো উল্লাস— ওই কালো চোখে, সেখানে মানুষ কেন এতো শূন্যে ভরা। অনেক দিকের বাতাস আসে। বৃষ্টিও দৌড়ায়। পতপত আওয়াজে মোনাইল তখন ভরপুর। সবুজ শানানো বন আর উঁচু উঁচু বৃক্ষসকল অতিশয় মায়াবী হইয়া যেন আশ্রম বানাইছে মানুষের সাথে। মানুষের বসতি তাহাতে ধরিয়া আসে। বত্থ নামার কথা আলাপ হয়। এই জলসীমানার পর বিস্তর বিরাট বিল আকড়াইয়া আছে তাহার অনেকটা জুড়িয়া। বর্ষায় নৌকা চলে না। অনেক জেলে যে আসেন তাও নয়। তবে তখনও মোনাইলে রাস্তা নাই, বিল্ডিং নাই, বাতি নাই। সন্ধ্যার ভেতরে অন্ধকার ধরিয়া আসে। চতুর্দিকে পড়িয়া থাকে শুনশান নীরবতা। হাটবাজার বা আইলে ডারকা বসানো মানুষ পরাণ বন্ধুরে কইয়া বিরাট খুলির ভেতরে ঢুকিয়া পড়ে। হাতের আগুনে খয়বার, হবিবর, আজগার, জব্বার গান আর সুরের ভাঙা রোদ-অন্ধকারে বাবুই বাসার ন্যায় দুলিতে থাকে। জ্বলজলা চোখে তাহাদের রঙ চেনা যায় না। চোখে মুখে আলো ছাওয়ায় লটকানো অন্ধকারে কন— মিয়াভাই, চলেন কাচারিত যাই। আরে আপনে তো আসরের আসল মানুষ। চলেন আজ ভাওয়াইয়া শুনামু। পাট্টি আচে। কিন্তু তেমন সাড়া পান না চৌধুরী। অসুখে আনন্দ যে নিষ্প্রভ করিয়াছে তাহা নয়, ভেতরের দাহটুকু নানাভাবে তীব্র ও তাড়াহত। তার ভেতরে রয়েছে বিচিত্র শাহী মার্কা গণ্ডগোল। রেডিওতে শোনা যায়, পাক-ভারত যুদ্ধের কথা। এদেশে নাকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়া শোরগোল উঠছে। জন্মদিন পালন নিয়া সরকার বাধা দিছে। ওদিকে চীন-ভারত উত্তেজনারও আওয়াজ ওঠে। তিব্বত নিয়া কীসব চলতাছে। তাইলে কী এই অঞ্চল আবার অশান্ত? ঠিক অনেক কিছু বুঝে উঠতে পারলেও চৌধুরী নিমজ্জিত হইয়া অনেক কিছু ভাবেন। বেচইন হয়ে পড়েন। আড়ালে এই দেশের মানুষ নিয়াও বেশ সক্রিয় হন। কিছুই তো জানা যায় না। এই জনপদ শান্ত আর নির্বিকার, কিছু মানুষের ভেতর। দ্বিচক্রযান ঘাড়ে করিয়া কাদামাটি অতিক্রান্ত পথে যোগাযোগহীন জীবন। ওসবে মানুষের কান নাই। সভ্যতার আলোশূন্য এ গ্রামে তার চলিবে না। কেউ সময়কে ঠিক কান পাতিয়া দেখে না। চলতে ফিরতে হাওয়ায় শুধু বাবুই দোলানো জীবন। তাহাতে সুখ আর সুখের প্রহরা। শান্ত করতোয় বাঁধানো পুরানকথা। উহাতে চলৎশক্তি তিরোহিত। দুই পাড়ে করতোয়ার কর্তা সকল আড়ষ্ট ধরিয়া কহেন, উহাতে ভাসোন আর ডুবোনকলা তুমি পাইয়াছ মৎসজীবন, সে ফলন করে যুবতীরে, তাহাতে বহাইয়া লাঙ্গল তুমি জমিতে আনো ফলন। জলাঞ্জলি দেও এই নদীর ভাসমান জলায় খড়কুটো বা পরানভাঙা বেদনা-বিরহকাল। তাই কহিয়া চলে কলাপাতা, আ¤্রকানন আর পাইকুড়তলার স্নিগ্ধছায়া। ওখানে পিঁপড়েজীবন পালন করে শেকড়বাকড়ের সার, নারকেলের কন্দরে আটকান বাড়ন্ত ডাব আর কচি নারকেলের শরীর, পথের পাশে বৃষালির মুখ, আটাস্যড়ি-ধুন্দল-শেয়ালমুত্রা-লজ্জালতা আর খেজুরকাঁটা। তাহাতে বিস্তর ভূমি মোড়াইলে আজগার-জব্বাবৃন্দ জমিতে মাতৃবন্দনা করে আর ওড়ায় সবুজ ধানশীসের বাতি, বিলিকাটা বহানো তারে ছুঁইয়া চলে ভরা পালকাটা প্রশান্ত ছায়ার রূপ। সে ছায়ায় মনের মানুষ ভাসানো নরোম রোদে, খড়ের পৌষসন্ধ্যায় নাড়ার আগুনে শরীরে ওঠে ওমমাখা জ্বর। তারপর চৌধুরী ওসব জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়া ভাবেন আর বড় হওয়া পলার জন্য মনে মনে ইন্দিরাকে ঠিক করেণ। একমাত্র কন্য সে তার আদর্শ পাইবে। কিন্তু এ গ্রামে তাহার বসত ও স্বপ্নের নিরাপত্তা কে দিবে। কে তাহার অনুপস্থিতিতে সুখের ভেলায় পাঠাইবে কোনো বড় পাঠনিকেতনে। এই বাড়ন্তর জন্যই এখন জীবটুকু ভরা। যে মা তাহাকে প্রশ্রয় দেবার কথা, ভরিয়া তুলিবার কথা সে তো শুরুতেই তার শেষবিন্দুতে পৌঁছাইয়াছে। হায়রে মৃত্যু! মানব মৃত্যু আসলে কী! সে কেন সবকিছু আউলাইয়া দেয়। কিংবা তাহার কারণইবা কী। যে করতোয়া কয় এই মোনাইল তুমি মানুষের ভেতরে বন্ধন রচনা কর, যে শস্যভূমি কয় তোমাকে শস্য দিয়া আমি বাঁচিয়া রাখি, যে প্রেম কয় তক্ষণি তোমার গর্ভে জীবন আসিবে এবং তুমি তাহার ভেতরে পাইবে অনন্ত প্রজন্মের দিকহারা শূন্যতার প্রশ্রয়— সেখানে কীভাবে এই পলার জন্ম হইল আর পরেই তাহার মা মরিয়া গেলেন। এই জীবন আরও গভীর শূন্যতায় জড় হয়। বেশ বেশুমার বেপথু পথে চলে। অসহায় হইয়া ওঠে। সবকিছু এই নিশ্চল স্থাবর প্রকৃতির ন্যায় আটকাইয়া যায়। এসব দুর্ভর বেদনা যখন চৌধুরীকে ভরাইয়া তোলে ঠিক তখনই আজগার আর জব্বায় কয় ‘মিয়াভাই আজ হামার বাড়িত পিঠা খাওনের দাওয়াত’। কীরকম এক প্রশ্রয়ে সে দাওয়াত তিনি গ্রহণ করেন ঠিক জানা যায় না। তবে তার মধ্যেই শোনা যায় ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়া যে কাজকর্ম চলিতেছে তাহার ওপর জারি হইয়াছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিলে অনেক কঠোর ব্যবস্থা। তখন এই প্রতিরোধ আরও শানিত বলিয়া জানা যায়। সেখানে ঐক্য ক্রমশ একজালে বন্ধনী পাইতেছে। এই বন্ধনীই কী আমাদের এই করতোয়ান্যায় নিশ্চিন্ত মানুষের ভেতরে আরও নতুন কোনো সত্যে আদিষ্ট হইবে। ঠিক করিয়া কওন মুশকিল। পলা আসিয়া গৃহকোণে দাঁড়ায়, বোবা শিশুর বৃদ্ধি এবং তার ভেতরের ঐক্য-আনন্দ কী এই দেশের প্রতিটি মানুষের ভেতরের সুখ! আশ্চর্য সবকিছু মিলিয়া চলে। মধুমতি তীরের কথা মানে আসিলেও সে বাড়ির ভেতরে আরও আগে শোনা গিয়াছিল অনেনককাল আগের মানুষের কণ্ঠ। ক্ষুদিরাম বা সূর্যসেনরা এদেশের জন্য জীবনী দিয়া গেছেন। আর গল্পচ্ছলে চৌধুরীর বৃদ্ধ পিতা তখন কন, কইছিনে! নজরুল মুসলমান। সরকার তাহারে সংস্কার করিবে, এইতো পাকিস্তান হইছিনে? সেসব ঠিক বোঝেন না চৌধুরী। এর মাঝে তো কেটে গেছে প্রায় দেড়যুগ। তাহার জীবনের স্রোত পাল্টাইয়াছে। হাঁক পাড়ে, কই মিয়াভাই, পিঠা তো তৈরি। সম্বিৎ ঠিক নয়, এই অঞ্চলের ম্যাপ আনিতে হইবে। এতে পূর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম দুনিয়ার খোঁজ থাকা চাই। মস্কোটা কী কয়! সেডা তো ভারতের পথেই থাকার কথা। কিন্তু তার স্বরূপ তো বোঝা দায়। স্ট্যালিন নিয়া কইছিলেন তার বাপ। লেনিনের পরে সাম্য নিয়া সমাজতন্ত্র নিয়া তো কতো কীই হইলো, বিশ্বযুদ্ধও বাধাইয়া ফেলাইল, এর ভেতরে ভারতভাগ করিয়া দিয়া সব পলাই পলাই করছিলো। মিয়া মাউন্ট ব্যাটেন নৌবাহিনীর জাঁদরেল মানুষ হইয়া কন, ওহে নেহেরু-জিন্নাহ মিয়া তোমগো দ্যাশ তোমরা নাও। হ্যা, এই মারপ্যাঁচে পইড়া এ বাংলার মুসলমানরা অচ্ছুৎ হইছে। তাদের শাসন করে। এর প্রতিকার কী? স্ট্যালিনের পরে আবার উত্তেজনা, ক্রুশ্চেভ কোল্ডওয়ার পয়দা করিলেন। চৌধুরী সেইসব বিচিত্র অনুভবের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ নিয়া সরকারের তেলেসমাতি আর ওদিকে জার্মানিরে ভাগ কইরা ওয়াল তুইলা দিল। এক্কেবারে কোল্ড ওয়ারের পরেকটা ঠুইকা দিছে। কই আসেন মিয়া! কিন্তু এসব ভেতরে পৃথিবীর সব পূর্ব-পশ্চিম দ্বন্দ্ব বা ন্যাটো-ওয়ারশ ভাগাভাগির অস্থিরতায় তার শূন্যতা বাড়ে। কী এক সামন্ত জীবনের ভেতরে টুকটাক যা জানাশোনা আছিল, তাই নিয়া মহা বিপাক রচিত হইলো। তবে রাশিয়াপন্থী বা অন্য যে পন্থীই হোন স্ট্যালিন পরবর্তী ক্রুশ্চেভ শাসন, তার ডি-স্ট্যালিন নীতি, কোল্ড ওয়ারের পরিণতি আর এদিকে বৃটিশদের উপনিবেশ ছাড়ার মরিয়া সব হিজিবিজি সিদ্ধান্ত তাকে মানুষের লাভক্ষতির বিভায় দোদুল্যমান করিয়া তোলে। রাষ্ট্রনায়কদের মূল্যয়নের শক্তি তাহার নাই, এখন তার প্রভাব তো ছড়াইয়া পড়িতেছে, টেনশান আছে মিলিটারীতে, অর্থনীতিতেও— পক্ষ-প্রতিপক্ষ তো কুরাইয়া খাইবে সকলকে। তখন কী এই মোনাইলেও ট্যাংক আসিবে? সরল স্মৃতিমাখা জীবনে, তার সেই বড় দরদলানের মধুমতীও কী আক্রান্ত হইবে, সে না হয় তাহার নিজের কথা কিন্তু আপামন মানুষজন তো সমরাস্ত্রের খেলা বোঝে না, বোঝে না কে বড় কেডা ছোট, তাহাদের ভেতরে এখনও শুধু পীঠা-পুলির টান, বাউল হইবার বাসনা— আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বাতিল হয়, ওদিকে চিরকালের জার্মান প্রাচীর যদি মানুষ-সংস্কৃতি ভাগ করে তবে কী হইবে এই জীবনের। ভাবিতে ভাবিতে তার সন্তান পলার ছবি তৈরি হয়। পলা হাসে, ওলে…, হিহিহি, তুই কী স্ট্যালিন হইবি, ঝগড়া-ঝাটি দল নিয়া পলিট ব্যুরোর নেতা লেনিন আসেন, ট্রটস্কি আসেন, পার্টি সমাজতন্ত্র যে কোনো মূল্যে থাকিবে, ঘন গোঁফে ট্রটস্কি দাঁড়ান, আলো মাখা তার চোখ, কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিÑ ধারালো বৃদ্ধিতে সবকিছু পুড়িয়া যাইতেছে, শ্রেণিহীন সমাজ, বুর্জোয়া ভ-দের লাথি দিয়া, মারিয়া পিটিয়া বিদায় কর। সোশ্যালিস্ট সমাজের নামে কোনো ব্যুরোক্র্যাসি চলিবে না, স্ট্যালিন জনতার শত্রু, তার বিরুদ্ধে এফআই সকলকে এক করিতেছে, উঠুন জাগিয়া উঠুন… ট্যা ট্যা ট্যা… স্ট্যালিনের স্বার্থে আঘাত পড়িলে সে দুনিয়া হইতে বহিষ্কার, ওই মেক্সিকোতেই মার্সেডার মার্ডার। হত্যার নায়ক বিপ্লবীদের হিরো হন, অর্ডার অব লেনিন পান এইভাবে দুনিয়ায় ভিন্নমতের অবসান হইয়াছে পাওয়ার রাজনীতির হাতে। ক্ষমতার অধিকারীগণ কালের কালচক্রে পছন্দ করেন নাই স্বজন-বিজন কাউকেই। কোনো স্থানেই নাই তাহার প্রহরা। সর্বকালে বুঝি এই নিয়মই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। মারিয়া মার্সেডার বিজয়ী হইলে, সম্মান পাইলে, জেলখাটার পর মুক্তি পাইলে ক্ষমতা তাহাকে সংবর্ধিত করে। সেখানে নীতির কী গুণ! চৌধুরী বোঝেন, ট্রটস্কির কণ্ঠ অবরুদ্ধতার নীতি গোড়া থেকেই গঠিত হয়, হত্যার নায়করা স্বীকৃতি পান কিন্তু ইহাও সত্য যে এ পৃথিবী কোনোকালেই কাহারো দাসত্ব মানিয়া লয় নাই। নীতির চাকায় সত্য তো বেপথ নেয়নি। সে ধীর কমলপ্রবণ সন্ধ্যায় চলিয়াছে। সেই চোখ ছাড়ে না কাউকেই, লিয়াকত আলীর হত্যার পরে একের পর এক শাসন পট পরিবর্তিত হইয়া চলে। পাকিস্তানের হেফাজত কেউ দেখিতে পান না। সবকিছু বুঝি তাহারই ধারাবাহিকতা। ট্রটস্কিপন্থীরা ক্ষমতার বাইরে সটকে যান, প্রতিশোধপ্রবণ স্ট্যালিনও কোন এক ঘুমে চিরনিদ্রা পাইয়া লন। মাসেডার তো মার্ডারের পরে বীর ঘোষিত হইয়াও বাঁচিয়া থাকেন না। স্ট্যালিন মূর্তি জর্জিয়ার লেগাসি তৈরি করে কিন্তু সত্যিই ইতিহাসের কাঠগড়াতে তিনি রেহাই পান নাই। ইতিহাসের সোনার পাথর বাটি তো আটকানো থাকে অনেক মানুষেরই হাতে, এক কাল হইতে অন্য কালের রথে। চৌধুরীও তাই রেহাই পান না। সেই কড়িবর্গার কণ্ঠরোধ করা বিবিজানের নিকট হইতে। সবই সবটুকু মানুষের চলমান অভিপ্রায়ের ভেতরে, ভক্তের দ্বারে বাধা। পীঠার ডাকে উঠিয়া পড়িলে সকলেই ত্রস্ত হইয়া কন, মিয়াসাব কী কোনো সমেস্যা! আবার হাঁটেন, একসময় বিরাট কাঁঠাল গাছের নীচ দিয়া, লম্বা সুপারির সারি পার হইয়া, শিমুলতলায় আসেন। সেখানে একটু থামেন, মনে হয় ওটা একটা বোধীবৃক্ষ, গত রাত্রিতে তার পরিবেশনা বেশ আনন্দ দিয়াছে। কতো আন্দময় সব সময় কিন্তু কেউ বেশিদিনের জন্য সবটুকু নিতে পারে না। যে নির্মম মৃত্যুর ভেতর দিয়া স্ট্যালিন ঘুমের বাসিন্দা হইলেন পরে তাহারই অনুসারী ক্রুশ্চেভ এখন তা বাতিল করিয়াছে। দোর্দ- শাসকের আদেশে লৌহমেহফুজ কাঁপিলেও সত্যশাসন তো মরে না। ট্রটস্কি মরেন নাই। তার পন্থা নিয়া দেশে দেশে নতুন সময় আসিবে। রোদে তিনি বিশাল বপুর স্ট্যালিনকে দেখেন, মার্সাল! হে মার্সাল!!, তুমিও কলঙ্কিত, জিন্নাও কলঙ্কিত, আইয়ুব আসিয়াছে… স্তাবক অনুসারীরা বাদ্য বাজাচ্ছে, কিন্তু ইহার পরিণতি নতশিরে সক্কলেই জানিবে। একদিন সত্যই বলিয়া দিবে, তুমি জিঘাংসার বাদক। তুমি মত-পথ-সত্য মানো নাই, ক্ষমতার কৃষ্ণ উপভোগে তুমি বিনাশী। আর এই তো জীবন, ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন-দেশবন্ধু-সুভাস সকলেই ডেস্পারেট, অসুবিধায় নিপতিত কালপরিক্রমা— এখন ওই আকাশের নীলিমায়, গোধূলির রঙিমায় তাহারা জ্বলিয়া কন, দেশপ্রেম রাখুন, সত্যটি নিয়া আসুন, শিক্ষা নিয়া এখন ছাত্রদের যুঝছে মত্তপ্রবণ মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষানীতিটি নিয়া কথা নাই, মনে মনে ছাত্রদের সমর্থন দেন তিনি। বোধীবৃক্ষটি পরে জব্বার তাহার এলাকার সকল ফসল জমায়। ছাত্রদেরও বোঝায়, কী যেন কন মার্শাল মিয়া, তোদের ঘাড়ে সোভিয়েত ভূত চাপছে। শালার ছাত্রগণের বয়স বেজায় কম, খালি সোজা সোজা চায়। এর ভেতরে গুণ্ডা নামোনোর কাম আছে। মোনেম খা’রে ডাক। এইসব এখন তাহার ঘাড়ে ওঠে, এর মধ্যেই খবর পান বিশাল গ্রেট ম্যান মরিয়া গেছেন। চার্চিল নাই। আর্টিস্টের মৃত্যু নিয়া ভ্রুক্ষেপ কে করে কিন্তু দাগ রাইখা যান। সবুজ পাতায় আর পিলপিলানি মধুর বাতাসে চার্চিল চলিয়া গেলেন। খুব ক্রান্তি লগ্ন, পুব-অঞ্চলে ছাত্ররা ক্ষেপিয়াছে। একর পর এক ক্ষমতার গৃহে চলে তড়পানি। তখন জব্বারের বৌ হাক পারে পানি আন মিয়ারে ওজু করা। চিয়ারে বসা হইলে শোনা যায় ঘুঘুর ডাক, এই ঘুঘু নাকি সোনাঘুঘু, সে অনেক রকম ভাবে ডাকে, আহাজারি করে, আদেশ দেয়, পুব দিকের কোণায় সে প্রত্যহ তাহার নিয়ম করা ডাক সকলকে পাহারা দেয়, ওপারে নারার ভেতর আজই ধরা শোল আর পুঁটির চচ্চড়ি মজার বাসনা ছাড়ে। অনেক কালের পোষা মোরগে রান্নার ধোঁয়া কানে আসার আগেই পলার কান্না তাহাকে গ্রাস করে।
চৌধুরী পলার দিকে মুখ ফেরান। এ তল্লাটে তাহার বিস্তর আলাপন ঘটে, এক সময় তার ভেতর দিয়া গড়িয়া তুলিতে চান ওই পড়াশোনার জন্য কিছু ঘর-দলান। করতোয়ার ধারা বাহিয়া যেদিন আসেন তখন তো কিছু জিনিসপত্রও আছিল। দাম তার কম নয়। সেগুলা দিয়া কিছু ক্রয় হয়। কিছু কাজে খাটে আবার কিছুর সঞ্চয়ে কাজে লাগে। বিষয়গুলা শুধুই নিরাপত্তার জইন্যে। কিন্তু ক্রমশ কিছু করোনের ভেতরে সব শূন্যতার উড়াল দিতে চাহেন। ফারসি আর আরবি দিয়া কী হয়, ইংরেজি না শিখিলে। যেসব কাম ওই মাদ্রাসায় হয় তিনি তাহাতে বেকুব ছাড়া কিছু দেখেন না। তাই ভাবিয়া লন মৌলবীর লগে বসিয়া কিছু করিবেন তিনি। কিছু লাঘবের জইন্যে বুঝি মনের এই প্রস্তাব। সংসারে যুদ্ধ যেমন আছে দেশে দেশে যুদ্ধেরও রব উঠিল। পাক ভারত যুদ্ধ লাগিল, পাশাপাশি পাকিদের ব্যস্ততায় শেখ মিয়া প্রস্তুত করিয়া লন ছয়দফার বিষয় আশয়। কী সব দফা দফায় কাম নাই, মৌলভী বেপরোয়া হইয়া কর, পাকিস্তান ভাঙলে জান দিমু গিয়া। চৌধুরী শিহরিয়া ওঠেন। উন্মূল বলে আঁচড়ও নাকি সে ইতিমধ্যেই কাটিয়াছে। আর নানা রটনা তৈরি হইছে, চৌধুরীকে নিয়া। কিন্তু মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেবের সঙ্গে তার শলা আছে। করতোয়ায় আনো এবার নতুন জলসীমা। যে মাদ্রাসায় সময় চলে ধর্মীয় কাহিনি নিয়া, দুলদুল ঘোড়া আর চৌথা আসমানের আড়ম্বরে সকলে শির নীচু করিয়া আল্লারসুলের কীর্তন করে— হুজুর কয় এখানে তো ইংরেজি চলবো না চৌধুরী। বড়ো বেদাত কাম। কোনোকালে এইডা হয় নাই। আপনে অনেক শিক্ষিত মানুষ এইডা করিলে আপনের সম্মান হারাইতে পারে। যুক্তি পরম্পরায় নতুন শিক্ষক আনা বা নোয়খালির মাস্টোররে দিয়া নতুন কিছু জ্ঞানের ব্যবস্থা করার কথা ভাবলে হুজুর কিছুটা সংযত হন। এক পর্যায়ে চৌধুরী নিজেই ইংরেজি বিষয়টা পড়াইতে আগ্রহী হন। কিন্তু সে লক্ষ্যে তেমন মানুষ মেলে না। আগ্রহ বড় দুর্বল। আর চতুর্দিকে ঘিরিয়া ধরা কুসংস্কার কীভাবে দূর হইবে সেটি প্রশ্নশীল বিষয়। ভাবিলেন জেলাশহরের কোনো পরিদর্শককের পরামর্শ নিতে হইবে। অনেক এলোমেলো বিষয়ভাবনায় তার সহায়ক হবেন যিনি তারই বা অস্তিত্ব কই! কাউকে সঙ্গে নিতে পারেন না। হবিবর রিফিউজি স্কুল পাড়ের বেশ কাছের, তাকে নিয়া তিনি সদরের দিকে চলতে শুরু করেন। পথ কয়েকদিনের। মোনাইল থেকে প্রথমে দ্বিচক্রযান। কিন্তু দুইজন চলবেন কীভাবে। শেষে ঠিক হইলো গরুরগাড়িই যোগ্য। চৌধুরী হবিবর রিফিউজিকে ইশারা দিলে তিনি সে মতো উদ্যমী হন। কিছু বই আর রেডিও নিয়া সুবেহসাদেক অন্তে চৌধুরী যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ভোরের খবরে জানা যায় শেখ সাহেব ছয়দফা দিয়াছেন। সেসব নিয়া কী সব গোলমাল সর্বত্র। একটা ভয় ভয় আর লুকোচুরি খেলা। কোনো বিসম্বাদ কি-না বোঝা যায় না। জড়ানো প্যাঁচানো মনে হয় অনেক কিছু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক হচ্ছে। ছাত্র-জনতা নিয়া শেখ সাহেব কী করেন তাহা বোধগম্য হচ্ছে না। উইনস্টন চার্চিলের একটি বাণীর কথা মনে আসে ‘লেট আওয়ার এ্যডভান্স ওয়ারিয়িং বিকাম এ্যডভান্স থিংকিং এন্ড প্লানিং’। সে রকম দূরদর্শিতা না হলে তো মারা পড়তে পারে অনেকেই। কয়েকদিন অপ্রস্তুতির ভেতরে চৌধুরীর বিপন্নতা বাড়তে থাকে। শিশু পলার জন্য উদ্বিগ্নতা আর ক্ষেদ তৈরি হয়। তখন তিনি দূরে শোনেন কোনো এক বোটম্যানের ভরা গলা :
রাই জাগো রাই জাগো সুখসারি বলে/
কতো নিদ্রা যাও গো রাধে শ্যমনাগরের কূলে
মোনাইল গ্রামে এসব নিয়া কেউ ভাবে না। তবে শেখ সাহেবরে অনেকেই চেনে। তার পক্ষে সকলের অনেক আস্থা। কেউই মনে করেন না তিনি পরাজিত হবেন। জান দিয়ে তারা নেতার জন্য লড়তে রাজি। তবে এসব নিয়া ভাবারও মানুষ কম। কৃষক মনের ভেতরের সম্পর্ক মাটি আর জলের সঙ্গে। সেখানে তাদের আহার-অন্ন আর উর্বরতার সম্পর্ক, রাষ্ট্র-শিল্প নিয়ে খুব জ্ঞানগম্যি তাদের নাই। এটা সহজেই চিনে নেওয়ায় যায়। মোনাইলে বৃষ্টি নামলে জমির উর্বরতা তৈরি হয়, কোনো না কোনো সিজেনে জমে ওঠে ফুল আর ফলের সুশোভন উল্লাস। সেই উল্লাসে মানুষের মন ও মর্জি অবমুক্ত। ভরা করতোয়া তো আরও বেশি যৌবনময়। সে বহাইয়া আনে বিস্তর জীবনের প্রহল্লাদ। চৌধুরী রুশ ইতিহাস বা ভারতবর্ষের ইতিহাস যেটুকু সনাক্ত করেন সেখানে কৃষকের সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের তরিকা আলাদা। ভূমি মাটি মানুষের ভেতরে যে পরিক্রমা তাহাতে উত্তর এশিয়া বা ইউরোপ একরকম। আর এখানে ধর্ম আর ধর্মীয় আবেগের জৌলুশ মৌলভী মাস্টার থেকে শুরু করিয়া সকলের ভেতরে একই। একই ভবে, একই রীতিতে জীবনের যুদ্ধ তৈরি, গড়ে ওঠে সমূহ সম্মুখ চলার প্রেরণা ও আবেগ। কিন্তু ভূপ্রকৃতির গড়নে তা আলাদা। ভারতীয় ধর্ম আর পুঁজির মধ্যে একটা বিরোধ আছে। পুঁজি সৃষ্টির কাঠামো আলাদা। এর ভেতরে শ্রম ও শ্রমিক চেতনা জড়িত। এ বঙ্গে শ্রমিক কই! এখনও সে ধারণাও নাই। এই মোনাইলে কৃষক আছে, ভূমিতে ফলন দেয়, বর্ষা আসে, গরম আসে, শীত আসে— এক খন্দ বা দুখন্দ চাষ করিয়া— গোয়ালে গরু, বৃক্ষে ফল, মাটিতে বাড়ন্ত সব্জি চাষিয়া— জীবন ও জীবিকার উপকরণ রচনা করে। এর জন্য যে অর্থ বা শ্রম তাই তাহাদের মোক্ষ। এর বেশি সংগ্রাম তাহাদের কই। তাইতো জীবনের সংগ্রাম আলাদা। সম্মুখের অবস্থান নেওয়ার প্রতিযোগিতাও সেইরকম। কীসের প্রতিযোগিতা, কার ক্ষমতা, কার অধিকার এসব প্রত্যয় বুদ্ধির চেয়ে ধর্ম দিয়া বাঁধা। এখানে দুর্বল বুদ্ধির শক্তি। শেখ সাহেবের ডাক এদের কাছে তাই দেশাত্ম আবেগের পৈঠায় বাঁধা। দেশের মাটি আর জমিনের জন্য এই আহ্বান। এইটি তাহারা হারাইতে দেবে না। চৌধুরী সম্পদ হরণ, পাটশিল্প স্থাপন, অর্থপাচার নিয়া বলিলে শুনিতে সক্ষম কিন্তু শোণিতধারায় তাহার স্থান অল্প। তাই অবিসংবাদী নেতাকে মানিয়া নেয়। সেখানে ছাড় নাই। শক্তির অপচয়ও সেখানেই। কিন্তু কলকারখানা নিয়া তাহাদের বুদ্ধি কম। মোনাইলে কী এসব আছে! চৌধুরীও ব্যবহার্য জীবনের সঙ্গে কী সম্পর্কিত নন! বইপুস্তকে পৃথিবীর ঘটনা-পরম্পরাই তো তার পুঁজি। আর কিছু ওই বাবার বানানো গল্প। কিন্তু এটুকু অনুমান করেন যে, ভূমিতে কৃষ্ণ-বৈষ্ণব-শাক্ত-বুদ্ধ কিংবা পীর-মুনি-ঋষির যে আশ্রম সেখানে জীবনধারণ অবিমিশ্র— সেখানে কার কী। ওই জব্বার-আজগার তো প্রকৃতির পুরানা মুরিদ। কেন সে যুদ্ধ করিবে। তাই তার বিবেচনায় একটা আশঙ্কা তৈরি হয়, পাঞ্জাবী পাণ্ডারা যুদ্ধ করিলে এদেশের মাটি তো পুড়াইয়া কালসিরা করিয়া দিবে। কিছুতেই তাহা পারা সম্ভব নয়। কে অস্ত্রের মুখে লড়িবে, কে শত্রুকে খতম করিবে— কী তাহার উপায় সে বুঝিয়া পায় না। যুদ্ধ যদি হয়, তবে নিজেরই বা কী হইবে, পলাকে নিয়া সে কী করিবে, কোথায় যাইবে? আর সত্যিই কী কিছু হইবে। তখন এই মাদ্রাসাটা নিয়া তার যে স্বপ্ন আছে, কী হইবে তার। কীভাবে সে এ অঞ্চলের নিরক্ষর মানুষের দায় কাঁধে লইবে। ভাবিয়া অস্থির হয়। মনে মনে একটা মীমাংসার কথাই ভাবেন। কিন্তু ছয়দফার পর ক্রমশ জনতার আস্ফালন বাড়িয়া চলছে, প্রতিপক্ষও বেশ শক্ত হচ্ছে। পূর্ব-বাংলা নিয়া আইয়ুব খান বিপদেই আছেন। বিডি মেম্বারগণ তো তাহাকে আর রক্ষা করিতে পারিবেন না। এই তো সেদিন এক বিডি মেম্বার দায়সারা গোছের কথা বলিতেছেন। সে তো সরকারি দালাল, অনেক অর্থকড়ির উচ্ছিষ্ট তাহার পকেটে, এক ধরনের দাপটও আছে, কার কার সমস্যার কথা বলিয়া সে অর্থের বিনিময়ে নিজের আখের গুছাইতেছে— সরকারের অবস্থানে তাহার ভ্রুক্ষেপ নাই। এইসব লেজুড় দিয়া সরকারের কী উপকার বোঝা দায়। শুধু এজেন্ট হইয়া কে কী বলে তার সংবাদ প্রচার করে। কওমী রক্ষার বড় দায়িত্ব যেন সে কাঁধে নিয়াছে। এইভাবে যেমনটাই ঘটুক চৌধুরী যুদ্ধের ডামাডোলকে মন থেকে পছন্দ করিতেছেন না। তিনি ছাড়িয়া দেন। ভানায় ব্যাকুল হন। সকলকে ডাকেন, তোরা গান ধর। বা আমাকে করতোয়ার তীরে বাউলের কাছে নিয়া চল। দ্যাশের ঠিক পরিণতি না জানিয়া ক্যমনে কামে বাহির হই। রিফিউজি ব্যাটাকে কয়েকদিন ক্ষান্ত দিতে ক। এভাবে সময়ক্ষেপন হইলেও একটা ডর তাকে বেশি চাইপে ধরে, যুদ্ধ-যুদ্ধ আর যুদ্ধ নিনাদ। সে আরও অস্থির হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা নিয়া। সেখানে সকলকে কী এক অপবাদে মান-অপমান করা হইলো। এই দ্বন্দ্ব তো সরকার ও জনতার। এখান থেকে সরার উপায় নাই। আইয়ুব বা অন্যরা টাসেল-এ যাচ্ছে বলেই মনে হয়। এর মধ্যে সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার খবর ঘটে। পরিস্থিতি আরও বেপরোয়া। খোলা আকাশের নীচে হাঁটিয়া, তাহাকে পরিবেষ্টন করিয়া অনেকেই থাকে। দূর হইতে মৌলবীর ফর্সা পাঞ্জাবী দেখা যায়। আজকের আবহাওয়া বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময়। এর ভেতরে একটা চিমটা দেন। রক্তসঞ্চালনে বাধা নাই তো! হায়রে এই রক্তেই তো ভক্ত দিয়া বাঁধানো। কতোরকম বিস্ময় দিয়া বাধা এ শরীর। তার রহস্যও কী কম। প্রতিটি মানুষ ভাবনা চিন্তায় বিষম হইলেও প্রত্যেককেরই প্রাণস্ফূর্তি বিশেষ রহস্যে ঘেরা। অতীতেরস্বপ্ন আর অভিভূত ভাবনা দিয়া গড়া। সেজন্য দয়া আর করুণার্দ্র তো এই প্রকৃতির ভেতরেই আচ্ছাদিত। বাড়ির ভেতর হইতে তাহার একজন আশ্রিতা খবর দেয়। পলার পাহারায় সে থাকে। ছোট্ট শিশুর জন্য কী কী সওদা প্রয়োজন। কোটাবাড়ির শব্দ দূরে পৌঁছায় না। সম্পর্কটা তো রক্তে বাঁধা। সেখানে সর্বপ্রকার অনুভূতিও তার নিজের। সে কইয়া দেয়, আসিতেছি। বাড়িতে অনেক তাপশোক এই পঞ্চাশোর্ধ্ব আশ্রিতারই হাতে। সে তাহার কাছের, পলার মার ধাত্রীরূপে আসীন। এ পর্যন্ত সবকিছু তাহার হস্তেই পুরামাত্রায় অর্পিত। সেখানে আশ্রিতার আরও কেউ কেউ আসেন যান, কিন্তু পলা তাহাকে জন্মের পর পরই গ্রহণ করিয়াছে। মৌলবী কন, সাব কই চললেন! যাইবা মিঞা ওই নদীর দিকে। আজানের তো দেরি আছে। নাহ্ মোড়ে আজ জলছা আছে। ওখানে বোগদাদী মহাশয় আসিবেন। সারা রাইত ওয়াজ হইবে। সেসব নিয়া একটু কামে আছি। হুম! আমারে দাওয়াত লইবানা। কী যে কন, আপনি তো আইবেনই। কিন্তু … যাক আসি তাইলে। এ অঞ্চলে অনেক কিছুরই অভাব। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলে বা রবিউল আউয়াল মাসে, মোহররমে উৎসব হয়। পাড়া গ্রাম জুড়ে মেলা বসে। বাদ্য বাজে। খাবারের বিশাল মহরত নিয়া আসে লোকজন। কোনো কার্পণ্য নাই। মোনাইলের আশেপাশের কমদপুর, মাদারীপুর, ফুলপুর, ঢোলভাঙা প্রভৃতি এলাকা থেকে লোক আসে, ওরশ হয়। সকলেই রাতদিন ব্যস্ত হইয়া পড়ে। সে ব্যস্ততার সময় ঘনাইয়া আসিতেছে। বোগদাদীর কথাবার্তা শুনিতে বেশ সুরেলা, কিন্তু অনেকটাই অন্যরকম। যাইবেন আজ। কিন্তু তার আগে পলার সংবাদ আর সংসারের খবরটুকু তো নেওয়া দরকার।
মোনাইলের নিস্তরঙ্গ জীবনে তরঙ্গ আছে অনেক। কোজাগরি পূর্ণিমার যাত্রা, দুর্গাপূজায় মেলা, মহররমের মেলা অনেক ঘর ভরিয়া ওঠে। ভেদ থাকে না। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো হয় যখন কালবৈশাখি আসে। ভয় আর ভীতি বৈশাখ জুড়েই। কোনো সময় ডাকাতি বেশ বাড়িয়া যায়। চোরও আছে। এসব অনেকটাই পুরানা রীতি। চোর নিয়া অনেক গল্পও আছে, পুলিশ-থানা নিয়া এখনও এখানে ভীতিসংকুল মানুষ জীবনকে বার বার নতুন করিয়া দেখে। শামসুজ্জোহা হত্যার খবর আজ প্রচারিত হওয়ার পর ঢাকার খবরে নতুন উত্তাপ উঠিয়াছে। কী সে রোদজ্বলা তাপ! ঠিক অনুমানও হয় নাÑ এর কারণ কী? ছাত্রমিছিলে হামলা, ছাত্রদের নির্যাতন করা, শিক্ষক হত্যার খবরসমূহ ক্রমশ গতি পাচ্ছে শহরের নানা জায়গায়। এবার ছাত্ররা নতুন দফা দিবে। নিস্তরঙ্গ গ্রামে অনটন-অভাব আর কল্পকথার ব্যাকুল করা ভাব নিশা নিয়া বহমান। সেটির সুর ও তাল অনবদ্য। তাহার ভেতরে কোনো মৃত্যু সঠিক বলিয়া মনে হয় না। চিন্তায়-চৈতন্যে তাহার ব্যাকুল মন বহুমুখি। হঠাৎই এই মৃত্যু সংবাদ চৌধুরীকে একটা বিষম পরিবেশে তুলিয়া ধরে। কতোকাল মানুষের প্রাণিতুল্য বাঁচনের চাপ। সে কী সত্যিই চিরকাল থাকিতে পারে? সে কী অমরত্বের দোঁহে ভরাট হইয়া ওঠে। কে তাহাকে চিরসুখি করিবে! জোহা সাহেব মরিয়া গেলেন, এখন সে মৃত্যুর পরিণতি কী! এ সংসারে কে আপন আর পর। বাতাসের আহ্বানে পঙ্গর ওঠে, জীবনের সারসত্য পল্লবিত হয়, বাঁশঝাড়ে বিবি ডাকে, পলারে চিনছ— সে তোমারই মাইয়া, জন্মের কষ্টে মইরা গেছি, তুমি তাহার সমস্ত সম্পদে রাইখ। পেছনে যা ফেলিয়াছ সেরকম পিছনে ফিরিয়া ফল কী— বুদ্ধিতে ফেলাইয়া দিও না। মনে আছে, ওই আড়ার ভেতর তুমিই তো পরথম কইলা এর দায়িত্ব আমি নিমু। কী অচিন আছিলা। তোমার মুখচোখ আর শরীরের তাপ সুন্দর হইয়া উঠিলে আমি তোমার দিকে একবার তাকাইয়াছিলাম। জুম্মাঘরের পাশে বড় ইঁদারার কোণে দাঁড়াইয়া তুমি কীসব ভাবছ, তখন নীরব বাতাসে তোমার চুল ওড়ে, চক্ষে বিড়ালের আলো ঘিরিয়া ধরে, রোশনাই নাই কিন্তু মুখশ্রী বেশ আনন্দময়। আমার মন ভরিয়া যায়। সেরকম সময়েই একদিন ফুলশয্যায় তুমি আমার হইয়া গেছিলা। হায়রে সুখ! এই মোনাইলে তো মনে হয় তুমি আমার জইন্যেই আসিয়াছিলা। তাহাতে কতো জন্মের কান্না আর বিবাদ জড়ানো ছিল। বেশ তারুণ্যের কলাপাতা নড়ানো হাওয়ায় তুমি আমারে চুম্বন দিলা। শিহরণে তখন যেন বন্যার মতো আবেগ উপচাইয়া পড়ে। বন্যার আহাজারি তো কম নয়। সে এই মোনাইল গেরামেও মেলাবার আইছে। মোনাইল-গজনফরপুর ভাসিয়া যায় তার দুই বছর আগে। মেলা মানুষের জেবন কষ্ট ছিল। তবুও নিজে মরি নাই। আমার কিচ্ছু আছিল না। সেই জইন্যে তো মানুষ আমালে লইয়া ফুটবল খেলার সুযোগ পাইছে। তুমিই পুরুষ হইয়া আমার গায়ে হাত রাখছ। তখন পরথম মনে হইছিলো যৌবন আইছে। স্তন ফুটিয়াছে। রোমকূপে শিউলি ফুটিয়াছে। বকুলের আবেগ আর গন্ধ ছাইয়া গেছে গোটা এলাকা। তুমিই আমার ধন। বাপে তো সেই বন্যায় মরিয়া গেল। সে খুব আদরে গামছাভরা বাতেসা আর গুড়ের জিলাপি দিত। আগুনে সেঁকা জিলাপি। বাপটা হঠাৎ করতোয়ার পানির তোড়ে পাঁকের ভেতরে পইড়া নাই হইছিল। কান্দছি অনেক, চিরকালের কান্না ভেতরে শুকিয়া যায়। এসব নিয়া তুমি এখন বিরাট আশ্রয়। পরথম রাত্রিতেই তুমি আমার শরীরে বাসা বাঁধিয়াছিলে। ফুল আর নদী তখন একাকার। ক্রমশ পাল্টে দেহ, শরীর আর মন। ত্বকে নতুন গন্ধ সৃষ্টি হয়। আওয়াজ ওঠে কোটাবাড়ির পাশের বাঁশবনে। তোমার চক্ষে নতুন স্বপ্ন আছিল। পরের দিনও খুব আদর দিয়া গলায় তুলিয়া লইছিলা। হায়রে আমার সোনার মানুষ। কী এক কারণ পক্ষীর আওয়াজ উঠিলে ভয় আর সীনার কাঁপুনি ঘন হয়। তীব্র হয় গোদম পাখির আওয়াজ। কেডা ডাকে গো! এই এলাকায় ডাকাত আপিনি! হাসি পাইছিল। কতোকালের হাসি আর সুখ তখন তুমি চোখে আর মুখের সাঁতারে ভরিয়া দাও। আমি আর কিচ্ছু কই নাই। তখন কুকুর আসে ওসরায়। একটু নীচু আঙিনায় পানি ফেলি, ডাব গাছটা সে পানিতে চিরল পাতার হাসি দেয়। ওখানে টুনু নাকি রে! এই টুনু… ওগো টুনুরে মারিও না। সে বড় ভালা, নাতদিন খালি পাহারা দেয়। বাপের মরণের পর হুল হুল কইরা কান্দে আর গোরস্থান শুঁকে শুঁকে বেড়ায়। নাই আমিও এখন ওই বাপের লগে আছি। তোমার পলা কতোবড় হইছে। আমার কান্দোন আসে। ওর হাসিটা কী তোমার নাখান। বেহুঁশহইয়া মরনের ভেতর আর ওখ পাই নাই। কেড! মিয়া ভাইনি! জব্বারের আওয়াজে সবকিছু যেন থেকে গেল। কী কইছিলেন মিয়া ভাই! কেডা নাকি মরছে। কই আর তো কইলেন না। বাঁশঝাড়টায় কী দেখেন…। ও বুচ্ছি। এইডা তো ভাবীসাবের গোর। আপনে তো জ্ঞানী, কন তো মরণের কাম কী? মানুষ মইরা যায় কোহানে। একদিন আমগোরে দাদী কইছিলো, এক্কেবারে হারাইয়া যায়। মইরা গেলে যতো খোঁজ তার আর পাওন যায় না। অথচ মনে রয়, সবটি বুঝি আচেন। এগুলা নিয়া কিচু কন তো মিয়া বাই। তুই বুঝবি না রে জব্বার। তবে মৃত্যু খুব আনন্দের। একে আনন্দের চোখেই দেখা ভালো। চিন্তা করবি কিন্তু দুশ্চিন্তা করিস না। চিন্তা-দুশ্চিন্তার সারার্থের বাইরে মৃত্যু কী তবে কিছুই নয়! জব্বারের ওসব মাথায় ঢোকার কথা নয় কিন্তু সে আশ্চর্য হয় এসব নিয়া চৌধুরী যা বলেন তা ঠিক বিশ্বাস হয় না। সবই আল্লার ইচ্ছা। জোহার মৃত্যু নিয়া ছাত্ররা এক হইয়া রাস্তায় নামলে খুব দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাইয়া যায়। নানা স্থানে বিচিত্র সব ঘটনার সংবাদ আসছে। ঘরে-বাইরে কী নতুন কিছু ঘটবে? শেখ সাহেব বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠিছেন, পশ্চিমাদের কাছে। তারা নানাভাবে বুঝি তাকে মানাতে চাইছেন। কিন্তু এটা মানানোর তো কিছু নাই। কারণ, ন্যায্য অধিকারই শুধু নয়, ক্রমাগত যে পীড়ন-অত্যাচার-বঞ্চনা যে চলছে তার বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম। পাকিস্তান ভাঙা নিয়া যে ব্লেম শেখকে দেওয়া হচ্ছে তা তো অভ্যন্তরীণ সমস্যা কিংবা সমস্যাকে সমস্যা বানাবার চেষ্টা। এসব নিয়া এখন বেশ ঘনীভূত কিছু হচ্ছে। মুদি দোকানে আলাপ হয়, পানের দোকানে খবর-প্রার্থী মানুষের হিড়িক আর নানা রকম স্ল্যাং দিয়া পাকিস্তানীদের বর্বরতার শিক্ষার কথা বালে। কিন্তু এটি তো কঠিন বিষয়। শেখ সাহেবের বিষয়ে এ অঞ্চলের মানুষজন এখন বেশ কনসার্ন। এটি দু/এক বছর আগেও এতোটা ছিল না। এখন জোরালো, কেউবা জেবন দেওয়ার জন্যও পাগলা। হায়রে জেবন! এইটা সহজে দেওন যায় না রে জব্বার। কিন্তু এখন বুঝি মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেভাবে তৈরিও হচ্ছে। তবে আবেগ দিয়ে তো যুদ্ধ করা যাবে না। তাহলে মারা পড়বে অনেক। সাফল্যও আসবে না। কী কৌশল নিতে যাচ্ছেন নেতৃবৃন্দ। ছাত্ররা যে এগারো দফা দিচ্ছে, সেটি নিয়া কী রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হচ্ছে। ঠিক কিছুই বোঝা যায় না। খবরই মোটিভেশন করছে সব মানুষকে। কারো মধ্যে কোনো রাজনীতি দেখি না। কিন্তু তিনিইবা এসব নিয়া এতো উতলা কেন! এলাকায় মেলেটারি এলে, এ্যারেস্ট হলে তিনিই হবেন। তখন পলার কী হবে। আপাতত তিনি নিজেরটাই ভাবছেন। দেশের মানুষের কথা আর কী ভাববেন। ক্ষমতা কাঠামো ভাঙ্গতে গেলে দূরদর্শিতা দরকার। সেটি শেখ সাহেবের আছে কী? মনে হয়, এতো বেশি সংখ্যক বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়া তিনি বেশ শঙ্কিত, ভয় ও দ্বিধাও আছে। তবে তাঁর এসব চিন্তার মধ্যে একটা সততাও আছে। কারণ, মানুষের মৃত্যু তো তিনি চান না। এই অধিক সংখ্যক মানুষ নিয়া তিনি যাইবেন কই— সে রকম দ্বিধাও কাজ করছে বলে মনে হয়।
মোনাইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক মায়ার আদরে শেখ সাহেবকে গ্রহণ করেছে। এইটিই বোঝা যায়, রক্ত-সম্পর্কিত মনে করছে তারা তাকে— ঠিক রাজনীতি বোঝে না কিন্তু শেখ সাহেবের দিকে থাকে। গ্রামটাকে ঘিরে এখন আলোচনাও হয়। মনে হয় প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, বাইরের বসতি ক্রমশ বাড়ার ফলে। কিন্তু মানুষের চিন্তাজগতে এতোকাল মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখিতিছি না। ওসব পা-ুলিপি যেন পাতায় পাতায় পড়া নিশির শিশিরের রহস্য। কোনো এক আস্থা বলে মানুষ পেছন ফিরিয়া চলে, জীবনের রাগ-অনুরাগের মায়ায় জড়ায়। মরীচিকার পেছনে জাটাজালে আবদ্ধ। অমোঘ রহস্যের সঙ্গে নিজেদের জীবনের বাস্তবতা তীব্রতর। যে বাস্তবতার মধ্যে তাহারা বসবাস করে তাহার মধ্যে নাই কোনো লৌকিক জীবনের সংগ্রাম। কলি বেগম বা বঁশি কাহারা বুনিয়া চলেন তাহার অনন্ত রহস্যাবলী। সে সব রহস্য নানাদিকের বাস্তবতাকে পুনর্গঠিত করে। বাস্তবতার ভেতরে গড়িয়া ওঠে অনন্তের রহস্য। এ রহস্য কী পুরানা ভিটায়, বাঁশবাদারে, খড়ের আখড়ায় কিংবা সন্ধ্যায়-রাত্রির অবিশ্বাস্য আঁধারে ঠিক কে বুঝিবে। দাদা-পরদাদার পরভূমে মর্ত্যরে উড়ন্ত শালিকে, চিরল পাতার স্বত্বে, চূতমুকুলের গন্ধে কতোকালের বধির সাক্ষ্য রহিয়া যায়। এরূপ রহস্যের তাগাদার ভেতরে চৌধুরীও তো কম যান না। যে পরিবর্তনে ট্রটস্কি তাহার আইডলে পরিণত, যেখানে পূর্ব-বাংলার পরিবর্তনের রেশ বহাইয়া যাইতেছে তাহার চিত্তভূমিতে সেখানে কেন তাহার সম্মুখে মৃত বিবি পেখম মেলে, করতোয়ার মধ্যরাতের শিস কানে আসে, বাঁশঝাড়ের তীরমাথায় ছুঁচলা সাপের খেলা শিরার ভেতরে প্লাবন তোলে, কীভাবে আড়ার ভেতরের জুম্মাঘরে বিশেষ পাপ-নিরূপিত স্বর কোনো বিড়ালের চোখে বহাইয়া যায়— সেখানে চৌধুরী বেচইন হন— তবে কী পার্থক্য জ্ঞান আর ভবের অনুসারীদের। এইরূপ কী বাঙালি মধ্যবিত্তের অর্থব্যবস্থার কাঠামোতে পরিকীর্ণ নাকি ভবের ভাবে উপনিবেশ ঢুকিয়া পড়ে— সমস্ত প্রতাপ নিয়া— তাহাতে গান্ধী আর সুভাস বসু বিরোধ বাধায়, দেশবন্ধু আর সাম্যের পথে থাকেন না, বুর্জোয়া আর প্রগতির ভেদ-পার্থক্য ঘুচিয়া যায়, বস্তু আর ভাব অবিমিশ্ররূপে চেতনার মণিকোটায় সখ্য গড়িয়া তোলে। এইভাবে তো জীবন কোন এক বেড়াজালে থেমে যায়। চৌধুরী নিজেও বুঝি সেই ধারা বহন করেন। নইলে কেন ভেতরে এতো সংশয় ও দ্বিধা নিয়া চলিতেছেন। বাঙালির নেতা শেরে বাংলার উত্তরসূরি হইয়া শেখ সাহেবও বুঝি সে গড়নেই মানুষকে মুক্তির আহ্বান করেন। সে মুক্তি সত্য ও বাস্তবের রেখায় আবদ্ধ হইলেও বেগের আবেগ আছে। সেখানে তিনি গড়িয়া ওঠেন। কবি হইয়া দাঁড়ান। নিজের আবেগে অতুল্য হইয়া ভাষণ দেন। এই অনুভূতি তো মাটির মায়ায় ধইরা আসে। মৃত্তিকার ভেতরেই তো তাহার ঘনানো কাহিনি। চৌধুরী এসব ভাবচক্রের ভেতরেই নির্বাচনের সংবাদ পান। নির্বাচনের দিকে আগাইয়া আসো হে পাকি সরকার। কেন এই নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার রুষ্টরূপ মোকাবেলার জইন্যে না অন্য কোনো কিছু। কিন্তু সমাধানের পথ নিয়া তুমি দ্বিধান্বিত। ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্রের গন্ধ প্রকট হইছে। তীব্র হাওয়ায় তখন কে একজন অপরিচিত মানুষ সালাম প্রদানপূর্বক সম্মুখে দাঁড়ান। পরনে মলিন বেশ। পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরিহিত। সময়টা শীত পেরুনো, চৈত্রের কাছাকাছি। পড়ন্ত সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিছে। এইমাত্র দুয়ার থাইকা তিনি বাইরে বেরুবেন তখনই এই সফেদ দরবেশধারীর আগমন। বোঝা বড় দায়, তার উদ্দেশ্য কী? সাহায্য চান না কিন্তু বিশেষ তন্ত্র সাধকের ন্যায় তাহাকে বিশেষ জ্ঞান দিতে শুরু করিছেন। বুঝিয়া বলেন, তাহার ভেতরের প্রৈতিশক্তির কথা। এ শক্তির মাহাত্ম্য নিয়া তিনি বেশ চকিত। পেয়েছেন তীক্ষè দিব্যশক্তি। এ অধ্যাত্মশক্তি তিনি দিতে চান মিয়াকে। এ লইয়া তাহার বিশেষ আগ্রহ। কিন্তু পলার ক্রন্দনধ্বনি তাহাকে বিচলিত করে। সে আশ্রিতাকে ডাকে এবং তাহার সমাধান দিতে বলে। অভিমানি দরবেশ চলিয়া যায়। কীভাবে এক মায়া রহিয়া যায়। পলার কাছে যান। তাহার কিশোর স্পর্শী বাতাস নতুন ধারা নিয়া আসে। সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর প্রশ্ন করে। বিদ্যাসাগরের সহজ পাঠ তাহার কেন্দ্র। পড়িয়া ফেলিয়াছে দুএকটি ডিকেন্সীয় পঠন। আলেক্সাজান্ডার ডুমার থ্রি মাস্কেটার্স-এর কাহিনি নিয়া সে প্রশ্ন করে। যুক্তিহীন অনেককিছুর উত্তর নাই। অবুঝ উত্তর, কিন্তু এর জিজ্ঞাসা এতো প্রখর কেন। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন এক অনন্য সৃষ্টি। পলার বৃদ্ধি ও ক্রমবিকাশ তাহাকে মুগ্ধ করে। জিজ্ঞাসার পর্যায়গুলা বহুমাত্রিক। বিজ্ঞানও বহুমাত্রিক। কিন্তু তাহার সবচাইতে আগ্রহ বিস্ময়মুগ্ধ রোমান্টিক দৃষ্টি। ‘স্কাইলার্ক’-এর অপরূপ সৃষ্টি। সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে। সকল কবিই তো সেদিকেই অগ্রবর্তী। পলার মুখে এক স্বরূপ তিনি লক্ষ করেন। অনেকরকম মুগ্ধতায় যে সময়টা কাটিয়া যায় তাহা এক অমোঘ নিয়তি। পলার বৃদ্ধি, দৃষ্টি, আকর্ষণ ও অভিপ্রায় দুরন্ত হইয়া ওঠে। পলাকে নিয়া সে করতোয়ায় পৌঁছায়। ভীষণ ধারায় নামাইয়া কয়, ‘আইজ তোরে পাল নৌকোয় তুলিয়া দিই’। ওড়াও পাল ওড়াও। উড়ন্ত বাতাসে ঢেউ উঠুক, জেগে উঠুক সব চরাচর, পৃথিবী পাক নবতর রূপ। সে রূপে পলা আর প্রকৃতি একরূপে চলুক। সে এক নতুন নবশাখে গাহুক প্রেমের গান। ঢেউ আর পঙ্গরে সমস্ত তীব্রতা ছাইয়া যাক, দৃষ্টির অভিমুখ প্রচ- হইয়া পড়–ক। তী ছাপিয়া জীবনে দেখা দিক নবলব্ধ জীবনধারা। সে তাকাইয়া রয়, দৃষ্টি অনুসন্ধান করে, আরও আনন্দে বইলা ওঠে ‘বাবা, ওই সবুজে আলো আসিলে তার রঙ কেমন হইবে’— আহা আনন্দ। এই আনন্দের প্রশ্নে চৌধুরী অতীতকে সুন্দর করে ফিরে পান, জীবনকে ফিরে পান, আর অতিশয় মুহ্যমান হইয়া কন, উহার রঙ আর রূপের ব্যাখ্য কহতব্য নহে মা— তুমি প্রশ্নে প্রশ্নে নিজেকে আরও অনেক রকম করিয়া তোল— তুমিই তোমার উত্তর খুঁজিয়া পাইবে। এই আশ্চর্য অভিপ্রায়সমূহ লইয়া হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি জইমা আসিল। তুমুল করতোয়া বাতাস ধাইয়া তোলে। পলা বাবার মুখের দিকে তাকিয়া কয়, তোমার ভয় নাই রে বাবা! সত্যিই আলো নিবিয়া অন্ধকার হইলে ভয় তো আসিবেই। অন্ধকার তো ভয়েরই প্রদীপ। উহা ঠেলিয়া আলোর সন্ধানে সম্মুখে এগুতে হয়। আলোর উৎপাদনে নিজেকে যুযুধান করিয়া লইলে ক্রমশ পরাস্ত অন্ধকার বিলোপ হয় কিংবা তাবৎ ভ্রষ্ট মিথ্যালোলুপদের বিপরীতে সত্যের দ্বার উন্মোচিত হয়। সত্যই সঠিক, সদা সত্য বলিবে— ইহার জন্য সাহস দরকার— এখনও ভাবি হায়রে! ট্রটস্কি আর ডিক্টেটর স্ট্যালিন! কে পরাজিত আজ? এমনই বাঁকে আছেন কতো বিশ্বমানব, কেউই চিরকাল রহে না কিন্তু সাহসী আর কর্মপ্রবণ মতের প্রতিষ্ঠা হয় চিরকাল, মানুষ মরে রে মা কিন্তু সত্য মরে না… বলিতে বলিতে তাহার বাপের কথা মনে আসে, সেই তো তাহাকে এইসব ইতিহাস ধরিয়া দিয়াছেন, আজ তাহা সে প্রত্যক্ষ দেখিতে পায়। পলার মুখকালো অন্ধকার ওই বহিয়া চলা ঝড়বাতাসের অন্ধকারের ন্যায় বহাইয়া আসে। সে বাড়ির অভিমুখে যখন চলে তখন প্রচুর বৃষ্টি ধরে। মুষলধারের বরিষণে মনের ভেতরে আলোড়ন ওঠে। কী একটা দেখিতে পায়! চলৎশক্তিতে বর্ষার ধারায় রহিত হইলে বিশাল এক গুঁইসাপ নামিয়া সরু গর্তে ঢোকে। বাঁশঝাড়ের ভেতরে তাহার নির্বিকার গমনপথ। পরে অনেক সবুজের লতাগুল্মের ভেতরে হানাবৃষ্টি তাহার শক্তি তুলিয়া ধরিলে— তাহার সমস্ত লালরাস্তায় আঠালো মাটির ভেতরে পা চালাইয়া সম্মুখে চলে। তখন আরও বাতাস উত্তর দিক হইতে বয়। কিছুদূর পরেই তাহার বসতি কোটাঘর। আশ্রিতা তাহাদের অপেক্ষায় ভয় পাইয়া আছেন। কেন তাহার নৌকায় উঠিতে গেল— ঠিক বুঝিতে পারিল না। তবে চৌধুরী একটু আনন্দই পায়। পলাকে আশ্রিতার হাতে তুলিয়া দিয়া অবমুক্ত হয় এবং আবার ওইপথে চলিতে থাকে। কোনো পেছন ডাকের অপেক্ষায় সে থাকে না। উপর থাইকা ছোট্ট পাহাড় গড়াইয়া ধারা বর্ষা নামিছে। গর্জন খুব কঠিন। দেখা যায় বিজলীর রেখা। মাদ্রাসা ময়দান ভরিয়া গিয়াছে। তবুও তর নাই। চৌধুরীর এসব বৃষ্টিতে পাপমুক্তির কামনা দিয়া ওঠেন। কবে তিনি আইলেন এই গ্রামে! পলার মা তাহাকে কতো প্রশ্রয় দিয়াছে। অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে তিনিই তাহার স্ত্রীপ্রেম দিয়া ভরাইয়াছিলেন। ডাকিতেন সোনার মানুষ বইলা। সেই সোনার মানুষ ছাড়িয়া কই তিনি! সোনার পিদিম, সোনার ধান, সোনার কাহিনি, সোনার ছেলে এই রূপোলি জলরেখার ভেতরে পশ্চিমে সোনালী রঙ ভাসিয়া ওঠে। সেই সোনার ভেতরে দেখেন সোনার হাঁস। সোনার রিংপরা বেগমজাদি। গোটা শরীরে সোনার জড়োয়া আর সোনার মুখে তীব্র চাহনি। কিচ্ছু দেখেন না। কিন্তু আছে প্রচুর সোনার বিছা। ছড়ানো সে বিছায় জলসাঘরে আওাজ ওঠে। ভীষণ ঘূর্ণাবতে আটকায় সোনার নিক্বন, শরীরের আলো আর বিস্তর পড়ানো জড়োয়া-বিছা। ঘোরে আর ঘোর তীব্র হয়, আরও বর্ষা নাকি গুঁই ঠিক চেনা যায় না। ওপারে যেমন পচা গন্ধ এপারে তেমনি সতেজ বৃষ্টিচাঁন্দ টপটপ রবে সবকিছু আঘাতে আঘাতে মর্মর করিয়া তোলে। ভাসেন না ঠিক দেখেন নাকি অনেক ছাত্রের ভেতরে জিগান, এই বাবু কও তো ‘মাউন্টেইন’ মানে কী! সমস্বরে কয় পাহাড়। আরে! পাহাড়, কই পাহাড়। এইটা যুদি পাহাড় হয় তবে মালভূমি, পর্বত কোনটা। সে আবার একই প্রশ্ন জিগায়! কইছি তো, পরের প্রশ্নডা কন! ওহ আচ্ছা আচ্ছা, ক, ভাষার জইন্যে কেডা জেবন দেছে! জব্বার নাহ এই জব্বার কোন জব্বার, তাহার কয়েকজন জব্বার পরিচিত। এক জয়নাব তাহার স্ত্রী কিংবা গ্রামের জব্বার মিয়া নাকি জব্বার মুন্সী কিংবা আরও অনেক কিন্তু সেও ঠিক কইরা ওঠে না জব্বার কেডা। এরপর আবার সে নতুন কিন্তু লম্বা একটা মোরগের ডাক শোনে— সে বুঝি সাপ দেখছে, ওরা কী সাপ দেখে! নাহ, পলা নাই তো, সাপ নাই, মোরগ নাই, সোনা নাই তাহলে এখন সে এতো মাদ্রাসার ছাত্র দেখছে কেন! কারণ, কী? কীভাবে সে ছাত্রদের ইংরেজি শেখায়? শিখাইতে পারছে কী? ক, অল দ্যাট গ্লিটার্স আর নট গোল্ড— মানে কী? পড়াশোনার খবর নিয়া চলে সে। একলা চলে কিন্তু ছাত্রদের সাথে চায়, ওদের ছেইলে মনে করে। কিন্তু কয় না, আবার জিগাইলে কয়, স্যার মেলা বেল হইছে, আপনারে কখন কইছি! হাঁটেন চলেন। বেল নাই, ঝরি হবি। হ্যা, এই ঝরিই তোর তার এতো আনন্দ দিছে, সোনারে ফিরাইয়া দিছে। এসব কী যেন একটা বোল তাকে পদ্মফুলের মতো শোভিত করিয়াছে। কিন্তু আওয়াজ আসে না, দমদম ভয় দ্রিম দ্রিম কইরা তাহার দিকে ধরিয়া আসে। আবার কন, ক মাউন্টেন কী! কয়বার কন, ক ক মাউন্টেন কী, মাউন্টেন বানান কর। কইছি, তো আবার ক, আবার ক, বইলা তিনি পাকুড়-আম আর শিরিস গাছের তলে গাছের শিপায় খাড়ান। শিপা নাকি গুঁই নাকি বাতাসা ওই বাতার তলে পটাস আওয়াজ, ট্রটস্কিকে মারছে, মরছে তো! কইত্থে কন তুমি হ, ওডানা মেক্সিকো, বিশ্বকাপ, জেতছে, ওখানে আরও আছে উরুগুয়ে, ব্রাসিল আর চিলি। চিলি, পেরু, চে, ক্যাস্ট্রো তখন কেবল সরিছে স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ আইছে, মরণযাত্রার যাত্রার স্মৃতি হাতড়ায় চার্চিল, তাহার সঙ্গী কবেই মইরে যায় বিশ্বযুদ্ধটা শ্যাষ করবার আগেই। ফাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, খাটিলেন, করিলেন, পরিলেন কিন্তু জয় দেখনের আগেই টুপুস… খুব শরীর খাপার; তখন কী এই শিপায় গুঁই পেঁচাইয়া আছিল! হ, টপাস টপাস তর তর কইরে এখন আবার পড়িতে হয় কীসের য্যান মাউন্টেন-এর উত্তর। উত্তর দেয় ক্যাডা! আর পাশ করে নাই। ক্যামনে পাশ করিবে, কেউই তো পড়ে নাই। হুজুর নাকি গোপনে গোপনে কয়, চৌধুরী পাগলা একটা, ইংরেজি পড়োস মানে! বেদাত বেদাত বেদাত কাম! নাউজুবিল্লাহ্। খোদার কসম, ওইডা আরবির লগে চলবো না। হ হ আর চলবো না। কেডা! মিয়া বাই না কেউ… হামরা ওই পাড়ার কেউতা বা, মুই কেউতা চাচা, ওইযে তোমার কামোত নামচিনু, কুয়া খুড়বার গেনু তারপর গর্তোত ঠ্যাং দিয়া নামবার সময় ওটি যে গোমা সাপ আছিল, ঠ্যাংগোত দিলি কামোড়, তারপর না মুখ দিয়া উঠিল ফ্যাপনা, মরি গেনু। তোরা তো আছিনেন না, কী এক কামোত জানি গরুর গাড়িত সদরোত গেনেন। কেউতা বা মুই কেউতা। সাপের কামোড়োত, বিষ উঠি মরি গেনু, তারপর মোর ব্যাটাটা এখন নাকি খালি বাউদিয়া হয়্যা ঘুরি বেড়ায়, কাম পায় না। মাগ্ তো ফির বিয়া বচ্চে। কে! হে! কে ওখানে, কেউতার বাচ্চা। চিক্কুর তোলে! কবেকার কথা। আমি তো চে নিয়া ভাবছি। তুই কেডা। ক, মাউন্টেন কারে কয়? পড়িস নি। মাস্টার দাঁড়াইয়া থাকে। কেউ কইতে পারে না। ক্যান, তিনি তো এতো খারাপ টিচার না। টিচাররা কী কিছুই পড়াইতে পারেন না। হতাশা বাড়ে, ক্রন্দন ছুইটা যায়। ভাঁটফুলে ঘর ভরে। বাসা ভরে জলে। কতো জল। এতো কাজল। পলার মার কাজল নাই। সে তো খালি চোখে থাকিতেন না। কাজলের আলাদা শক্তি। সুরমার চেয়ে তাহার সৌন্দর্য অন্য। এই কাজল, নিজেরাই বানান। ধানসেদ্ধ ডেকচির তলে কাঁসার পাত্র দিয়া আগুনের কালি নিয়া সর্ষার তেল দিয়া বানোন যায়। পলার মা কোনোদিন কাজল কেনেন নাই। কিনিবার কী প্রয়োজন! সেই কাজলে সরিষার তেল ঢুকাইয়া টানা দিয়া কন, দেখেন না কেমুন হইছে। তোমার মাইয়া আসিলে তারেও দিও। ক্যামনে যে হে বড় হইবো। পলার মা কী জানিত যে, সে মরিয়া যাইব। সকলেই কী চে, ট্রটস্কি, রুজভেল্ট, চার্চিল মার্কা খালি মইরা যায়। ঠেকায় না ক্যা! মরলে আর কী থাকে কিছু? শিপাটায় পা পেছলে না, ওখানে এখনও টুপ টুপ পড়ছে। কেউ কী নাই এই উত্তরটা দিবার, ক মাউন্টেন কী! কখন তোরা বাড়িত যাবি! ক, তাড়াতাড়ি ক। আবার ভোর না অন্ধকার, না সোবেহ সাদেক না গোধূলিবেলা! সবই এক ধরনের। ক দেখি কীসের জইন্যে দিন শ্যাষ হয় আর রাইত নাইমে আসে। কেউ কয় না। স্যার, ওগলা তো বেদাত উত্তর। আল্লা দেছে, তাই হয়। কেডা শিখাইছে? আহ্নিক গতির কারণে। বার্ষিক গতি, চাঁদ কীসের উপগ্রহ। পৃথিবী গোলাকার, ডিমের ন্যায়। কেউবা কয়, কমলালেবুর নাহান গোল। আর সূর্য ঘোরে না পৃথিবী ঘোরে। মাথা ঘোরে এসব শুনিলে। মাথা ঘুরিলে, তামান কাঁপেÑ ভূমিকম্প হয়। ভূমি কাঁপে, ভূমির ধ্বস নামে। হাওয়া দোলে। কঠিনে কঠিনে বাতাসে সবকিছু হয় কঠিন। তাহাতে কতো কী যে দোলায়, হাওয়া উড়ে, ফোরাতকূল কুলু কুলু বহায়। তাইলে কেউ পারোস নাই, মাউন্টেনের উত্তর। স্যার, কইছি তো পাহাড়! পাহাড়!! পাহাড়!!! পাহাড়, ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়-ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়, চৌধুরীর সম্বিৎ ফেরে না। হঠাৎ ঘোর ভাঙে। দুইটা চারটা ছয়টা দুই দুই দোঁহে কী যেন সমান তালে বাড়ে। কই তিনি! পলা! পলা!! পলাকে রেখে আসেন নাই নাকি সেও অন্য কিছু হইয়া গেল। সে কি পলা না মা মা পলা মা মা মায়ের মুখ, দেবী মূর্তমান, দেবতা নাকি সে নিজেই এই শিরিস গাছের তলে বসিয়া আছেন। পূজে দেন। সামলান না আর। শেরে বাংলা তো কিছুই করিতে পারিলেন না। বড়ো বড়ো চল্লিশখান আম একাই খাইয়া এত বড় মেধা নিয়া দ্যাশের মানুষের লাগি কোনো কামই করিলেন না। হিজিবিজি কইরা, দুই চারদিন মন্ত্রী থাইকা শ্যাষ। কৃষকও নাই প্রজাও নাই। সুহরাওয়াদী মিয়ারও কিছু তো পাওন যায় না। এবার সব শিষ্য বাদ দিয়া একজনরে নিয়া সগগলে ভাবিছে। আর কী নিয়া ভাবছেন। এতোক্ষণ কী দুঃস্বপ্ন দেখিছেন। স্যার, ইলেকশন তো হইছে। আপনে যা কইছেন তাই হইছে। শেখ সাহেবের দল নাকি পাশ করিছে। হুম কেডা কয় রে, কীয়ের খবর, চৌধুরী একটু স্বাভাবিক হন। সবগুলা ছবি মাথা থেকে সরিয়ে ফেলেন। একে এক সব সরান। বিশেষ করে ‘মাউন্টেন’ বিষয়ক ছবি। ওসব সরাইলে মৌলবীই দৌড় দিয়া আসে, জিতছিইই…। আপনে এক্কবারে জুতিষি। হুম, মেজাজ ওঠে চৌধুরীর। কীসব বেদাত টেদাত হইলো একটু আগে… কে? এই মৌলবী না? ঠিক কী! হুম… কী হইছে, রেডিও ধর, আমারে ডাকিস। আমি একটু কোটাত্থে আসি। সন্ধ্য তো পার হইছে নাকি! যা আইতাছি। জব্বাররে ডাককক, হু হু… আরে জব্বারও তো আছিল… ও কি রে আবদুল জব্বার, জয়নাবের সোয়ামি, খালি সোয়ামি স্বামী লাগে, ও দিয়া কী হয়! কাম নাই কিছু, সোয়ামী হইছে। হুম, ডাক তো জব্বাররে। এই তো আমাদের মোনাইলের জব্বার। মাথা থেকে ছবিগুলা পঙ্গর তুইলা আসে। সে পঙ্গরে তাল-নারকেল ছবি পড়ে। কী উঁচু সে লম্বা গাছ। পুকুরের পানিতে গোছলে নামিলে ওই তাল আর নারকেল গাছে তাকাইয়া মনে হয় আহা যদি লম্ফ দিয়া ডানায় ভর দিয়া যাইতাম। পলাও কইছিলো। ওখানে উড়িয়া উঠি। যদি পাখির ডানা থাকে, মোরগের পাখা থাকে… চৌধুরী কন, মা সময়েরও ডানা থাকে। সবকিছুরই ডানা আছে। কিন্তু তাহা চিনিতে হইবে। ঠিক বোঝে না পলা। কিন্তু উড়িবার পাখা সে চায়। হে হংসবলাকা,/ ঝঞ্ঝামদরসে-মত্ত তোমাদের পাখা কিংবা মনে হল, এ পাখার বাণী দিল আনি… তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি। কিন্তু এতো বেদনার ঢেউ! তাই পাখা সুদূরের লাগি বিবাগী! দোলে সে পানিতে, উঁচু তাল ঝুপ করিয়া পানিতে পড়ে, নীচেই পড়ে, অভিকর্ষজরূপে তাহার টান নীচে কিন্তু কী সে পলকের দৃষ্টি। চৌধুরীর শিমুল গাছের ন্যায় পুকুর পাড়ের ওই বৃহৎ সব একপায়ে খাড়ানো বৃক্ষপুঞ্জের কথা স্মরণে আসে। সে তাহা আর টানিতে পারে না। সব ছবি মুছিতে চায়। এখন তাহার নেশা রহিয়াছে। কী এক খবর দিয়াছে মৌলবী। সে কী যেন উল্লাসে তাহা বলে। তবে সে তো খুশি হওয়ার কথা বলিল কেন। পাকিস্তানী ঈমান রক্ষায় তো এইসব জয়বিজয়ের প্রভাব ঠিক মিলিতেছে না।
তারপর খবরের ভিতর দিয়াই সর্বদিকে যখন জনযুদ্ধের সূত্রপাত তখন আবার বর্ষা আসিয়া পড়ে। তার আগেই নানাদিকে শুরু হইছে যুদ্ধ। মইরা গেছেন একরাতেই গোলা গোলা মানুষ। ফড়াৎ ফড়াৎ আওয়াজে কপ্টার ওড়ে। গরমটার ভেতরেই মানুষ মারা শুরু হয়। বাজারে আগুন দেয়, বাড়িত লাগায়, পুল ভাঙ্গে আর গেরিলা না কি কার কেডা কিছু বোঝন যায় না। শুরুতে পাকিদের পাখির নাকান একতরফা মানুষ মারা সম্পন্ন হইলে থামে। আবার শুরু হয় রাত-বিরাতে। আস্তে আস্তে নানাদিক ছড়াইয়া পড়ে। পিঁপড়ার নাকান পিরপির কইরে মানুষ মারে আর আগায়। প্রতিহত করার পাঁয়তারাও তো কম নয়। মুক্তিরা কাম করে। গেরিলা হয়। পাগারোত ঠেসি ধরে, ঢ্যাল মারে, পুল ভাঙ্গি দেয়, পেছনের বাতাস আটকায়া দেয়, বাড়ির ভিটাত কাকাতাড়–য়া টাঙ্গায়া ভয় দেখায় আর গর্ত খোঁড়ে। মানুষের মুখে মুখে এসব সংবাদসকল বেপরোয়া ছড়াইয়া গেলে সকলেই প্রস্তুতি নেয়। দলে দলে মুক্তির লোকও তৈরি হয় নানরকম। চৌধুরী বিপুল বেগে তাহার ঐক্য তুলিয়া ধরেন। কিন্তু মোনাইলের ভীড় আসে পরে। বর্ষার ভেতরে।
বসন্ত কোটাবড়িতে করে ফিরিয়াছিলেন চৌধুরী ঠিক বিশেষ জানা নাই। কারণ, সকলে জানে উহা আর নাই। হবিবর রিফুউজি সব ধুইয়া দিয়াছে। কুলনাশিনী যুদ্ধের তা-বের পর তারপর মোনাইল একটু আলো পায়। দোকান আসে। ফেরী করা মানুষ ঘরে ঘরে ঘোরে। মোড়ে প্রথম সাইকেল আসে। চৌধুরী সাহেবের সাইকেল। যুদ্ধ শুরু হইলে বড় সড়ক দিয়া পাকিবাহিনি এড়াইয়া চলিলে হঠাৎ গোলা আসিয়া পড়ে। পরে দেখে সে বিপদের সম্মুখীন। খালেবিবি তাহারে তখন উদ্ধার করে। হবিবর রিফুজি তখন বেশ মৌজে থাকে। থুলথুলা হয়, তাজা কুত্তার নাকান। তারপর চৌধুরী কী করেন বিশেষ কূল-কিনারা থাকে না। শহরের দিকে ফেরেন। পলার জন্যই নগরবাড়ি কিনিয়া লন। যুদ্ধের পরে হবিবর রিফুজির দিকে তাকালে, তাহার শক্তি-সাহস বাড়ন্ত মনে হইয়াছিল। গলা কর্কশ। এক অদরকারি জায়গায় তখন তাহার বাড়ি। লোকে বলে, সে বাড়ি করি আছে। এ জায়গায় সে কেন, কীভাবে এখানে সে আসে বা বসত গড়িয়া স্থির হইছে— পলা জানিত না। শুধু লোকমুখে কিছু প্রচার আছে। যেখানে প্রায়শ কানে আসে খালি বান্ডিল টিনই নয়, অনেক সোনা-দানাও আছে রিফুজির গৃহে। যুদ্দের সময় সব হাতাইছে ওগুলা সময় গেলে আস্তে আস্তে বাহির হবো। যেমন আটফুটা বার ফুটা টিন বাহির হইছে তেমন। কুত্তার লাকান লাত্থি-গুঁতা খাইছে, তাও এলাকা ছাড়ে নাই। আল্লায় এহন সুখ দেছে। এই এলাকায় পলারা অনেককাল নয়, তারা তো মধুমতির সন্তান। কখন তা! সে জানে না। বাবার সেই বজরানৌকো নিয়া এই শূন্য ঘরে যে সুন্দর চাপিয়া আসিয়াছিল তখন সে ভীষণভাবে আছিল লাকসাম ফেরা ভাগ্যগড়া দুখি যুবক।

পাঁচ.
পলার একাকি অবস্থানে এসব স্মৃতিমাখা সময়ের গল্পগুলা এখন তার সময়কে অধিকার করে। অশেষ আনন্দ দেয়। নিজেকে সেঁধিয়া রাখে। কলি বেগম কেমন আছিলেন? সত্যিই কী তিনি শেষমেষ ওই গ্রামে ক্ষমতাধর হইয়াছিলেন। একপ্রকার নিজের সঙ্গেই তার মিল হয়, কলিই বুঝি তার মনে কলি। পলা খাইতে বসে, আয়নায় মুখ ফেললে আজকাল অনেকবারই কলিদীদুর কথাই মনে হয়। সে তো তার দীদু। বাবা প্রায়শই এই দীদুর গল্প বলেন। দীদুর প্রাণ তার বাবার সাথে গাঁথা। মোনাইল গ্রামের ভোরটা মোরগ-ডাকা ভোর। আশ্চর্য সেই প্রতিটি সময়! ভোরের আযান পড়ার আগে চালাপ্রাচীরে মোরগ বাকে, কী চকচকা সে মোরগ! বেশ ঝালর চড়ানো, চিকচিক রঙ তার। যখন সে বাকে তখন ঢেউ উঠিয়া আসে গ্রীবা উঁচিয়া, লেজের মতো ফড়ে ঢেউদোলা দিয়া পুরুষালি বর্ণ ধারণ করে। সান্নিধ্যে মুরগী পাইলে সে বোল তোলে আর চরকি পাকে ঘোরে, কুয়াশা শীতে এই মোরগটাই আযানের ডাক তোলে, টুপ টুপ কুয়াশায় হ্যাজাকের ক্ষীণ আলোয় একটা রশ্মি বিলাইয়া দেয় ইঁদারার চতুর্দিক দিয়া। কেমন একটা রাখালি সুর ঠাণ্ডা প্রভাতে তখন ধাইয়া আসে, নীরব নিস্তব্ধতার ফাঁকে সে হনহন করিয়া দৌড়ায়, আমলির পাথার, জামগাছ, পাকরি আমের গাছ, শিরিস গাছ আরও কতো কিছু পেরিয়া অনেকদূর হয় সে বাঁশীর আওয়াজ :
কাছে পাইবা না রে হায়
কাছে পাইবা না…
হায়রে আমার নশ্বর রে হায়
হায়রে আমার মন (২)
নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়া সশব্দে এক ঝাঁপি আলো, কুপির ডগায় থির হইলে পলার চেতন ফেরে। কে যেন আসিয়াছে। বাইরে প্রচুর শব্দ। কানকানি করছে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, এখনকার সময়টা এমন নয়, কিন্তু এমন কেন? দোতলার সিঁড়ি পেরিয়ে থকথকে হৃদয়টা কঠোরতার দিকে নিয়ে যায়। যেন শার্টার পড়ে গেল মনের ওপর। কৃত্রিম কলকণ্ঠে দোতলার কড়িডোরে দাঁড়ায়। এই আছের! ওখানে কী? নগরের রাস্তাটা এ বাড়ির সম্মুখে বেশ সোজা। সদর গেটের সম্মুখেই সদ্য বসানো বিরাট ইলেকট্রিক পোল। তার নীচেই ঘটনাটা ঘটেছে। নতুন তারে চিকচিক চান্দ্রআলোয় কাক আসে, পলা দেখছে। নতুন আলোর নাকি ঝলকানি তৈরি হবে। সুইচে জ্বালবে আলো। কিন্তু ব্যতিক্রমী ঘটনাটা আছের যেভাবে পরে বয়ান করেছিল, তাতে তার ভয় বা কষ্ট দুটোই ছিল। এই আছেরই শুধু তার আরামঘর পর্যন্ত যেতে পারে। সে বলে, পরে কমু, আপনে ঘরে যান। পলার একাকি জীবন আর এই বাইরের ঘটনায় অনেক তফাৎ। সে রেডিও খোলে, বিবিসির খবরে কান দেয়। বাইরে হ্যাজাগ নেই। তেল ফুরানোর পরে আর ঠিক করা হয়নি। কুপির আলোই শিখা প্রদীপ্ত করে তাকে আলোকিত করছে। কই, কোনো খবর নেই রজতের। ঢাকা, কলকাতা, হংকং আর কোথায় কোথায় তার কাজ থাকে। ওই পৃথিবীটায় তার হঠাৎই আগমন। যে কলিদীদু আর মোনাইল গ্রাম সেখানেই সে তাকে প্রথম দেখে, তখন সেই মধুপূর্ণিমার রাত আর যশোরের নামকরা যাত্রাদলের ‘জল্লাদের দরবার’ মঞ্চস্থ হওয়ার খবর পায়। সেই মঞ্চের এক কোণায় রজতও আছিল। দুনিয়ার রোশনাই যেন ঠিকরে পড়ে সেখানে। ভরা বাতিতে কোমর দুলানো নর্তকী কণ্ঠশীলন তপ্ত করে তোলে। সময় আর কর্মসংযোগের মুহূর্তগুলা অনেক মানুষের হৈরৈ আর চমকপ্রদ মুহূর্তগুলা দীপ্তিমান করে তোলে। সড়কি আওয়াজে তখন কে যেন পুরনো হিন্দি গান ধরে আসে। প্যান্ডেলের ভীষণ পুরাতন সে মুহূর্ত অনেককাল স্মৃতিবন্দী হয় পলার ভেতরে। সাথে রজতও। কই সে রজত। বাইরের গুলতানি কিছুটা কমিয়ে আসলে ক্যামিজলের ঝুলন্ত জাফরিতে হাত নাড়ে, আরও অশেষ হইয়া ওঠে। সাথে এখন তুচ্ছ একটি বই। ফেনেগানস ওয়েক। কীসব যে লেখা। মগজের তাবৎ বুদবুদ ওতে গেথে দেওয়া হয়েছে। মগজের চিন্তাগুলা কী এমনই। এতোই এলোমেলো। রজত আর ওই প্যান্ডেলের অন্য মানুষদের সঙ্গে শ্রেণিগত ফারাক যেমনই হোক— ওদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ চিরন্তন ছিল। ফড়িংয়ের রোদের মতো মায়াবী সব অন্তর্জাল। ভেতরে মর্মকুসুম। ঝেড়ে আসা অপেক্ষমান বৃষ্টির ঠিক পূর্বমুহূর্ত। তারপর ডগডগ আওয়াজে খুব নীচু দিয়া কপ্টার কী যেন পাতাঝরা পত্র ফেলিয়া যায়। ঠিক ফাল্গুনের দিন যেন। প্রস্বেদনের কারণে হলুদ পাতার বোটা ছাড়া মগ্নতা। তাতে বিচ্ছিন্নতা আছে কিন্তু কান্না নেই। ছিন্ন ভিন্ন রঙ সর সর রুক্ষ্ম হাওয়ায় পায়ের কাছে নুয়ে যায়। তেমনই ওই মধুমতি, পশুর আর খালিশপুর নিউজপ্রিন্টের কাগজ উড়িয়া আসে, ধানক্ষেতে আর প্যান্ডেলের ভেতর। ‘উড়–জাহাজ থাকি কাগজ পড়চে’- রজত একটি হাতে নিয়ে পড়ে শোনায়, ওহ দেশ গড়ার আহ্বান, কোদাল ধরার আহ্বান, বয়স্ক শিক্ষার আহ্বান। তখন ওসবের অর্থের চেয়ে কপ্টারের ফাটা আওয়াজ, ধেয়ে আসা কলমিবাতাস আর জলপাই রঙের অনেক খরখরা যন্ত্রপাতি আকাশে ভাসতে থাকে এবং তা কাছে চলিয়া আসে। ওড়ে, বিশাল ঘূর্ণিতে, পটপট আওয়াজে, মুখ নামাইয়া তীরবেগে তা উঠাইয়া লয়। রজত খুব দ্রুত এসে পলার কণ্ঠ চেপে বলেছিল, বল লোহা কীভাবে আকাশে ভাসে। হাঃ হাঃ, সেসব উত্তর কলাপাতার বুকপিঠ ভরে কবেই ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে। পলাতকা ছায়ার ন্যায় আমবাগানের তারে বা অন্ধকারের ঘুলঘুলিতে লটকোনে লটকাইয়া হারাইয়া গিয়াছে। প্রচুর পাকাপাতা আর শুকনা পাতার ইঁদুর আওয়াজে সম্বন্ধহীন মিলাইয়া গিয়াছে। তাহারা ফাঁসিয়া যায় সময়ের ভেতরে, দুরন্ত সাহসে আর ভরা অভিমানের খেয়ায়। তখন সেই লয়েই গড়ে ওঠে দুমদুম শব্দ। আছেরের পা তাহাতে মেলায়। অপার আহ্বানে ছন্দ তোলে। হুড়পাড় কইরা কয় ‘কাটামু-ু’। কম্বলের উষ্ণতা ছেড়ে পলা ক্যমিজলের ভেতরের মাংসপি- অনায়াসে স্তননের তরে কয়, মানে? হ আপা! বিস্ময়কর। এ পাড়ায় কী সমস্যা আবার? তাই কী মানুষের এতো কানাঘুষা। কিন্তু কীসের তা! ভয় তীব্রতর হয়। বিশ্বস্তরূপে ঘরের আসবাবের দিকে তাকায়। তাতে অর্থ তৈরি নাকি ভয় তৈরি নাকি মায়া তৈরি নাকি দামেস্ক নাকি সীমার ব্রাহ্মণ একের পর এক ফোরাতকুলের পাড়ে দাঁড়াইয়া যায়। ক্রন্দন নয়, অসহায়ত্বের পাহারা আসে। আছের কাটামু- নিয়া আবার কী বলতে চাইলে, সে ইশারা করে, কম্বল জড়াইয়া পঞ্জটাসহই পালঙ্কে ওঠে, গায়ে জড়ায়, বলে লাইট জ্বালা আরও, ওখানে দরোজার পাশে দাঁড়ায়।
‘পটাস করি লাত্থি দিয়া চিৎ করি ফ্যালা’— কে করে এইসব উচ্ছৃঙ্খল উক্তি করে। কারণ কী। তীব্রভাবে কানে হাক দেয়। তখন এসির বাতাসটাও গরম বোধ হয়। কিছুটা হরর ছবি চলছিল পলার এলইডিতে। সোফার পাশে খাবার আর মোটা টানানো পর্দায় বার বাই পাঁচ এ রুমটাতে একপ্রকার ভূমিকম্পই ওঠে। আছেরের ডাক আসে। পলা জিন্সটা পরে নেয়। গলায় ওড়না টেনে নেয়। নীচে নামতে প্রস্তুতি নেয়। এর মাঝে আবার চিক্কুর বাড়ে। বাইরের পরিবেশটা ততোধিক গুমোট হয়ে ওঠে। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। পুড়ছে সব। বাইরের দিকে আসতেই প্রচুর হল্কা তাকে ঘিরিয়া ধরে। একপ্রকার আগ্রহ থেকেই পলা নিচে নামিতে চায়। মরা বটগাছের পাশ দিয়া আসিতে চায়। এ জনমে মানুষজন ছাড়া, কোলাহল না করে অনেকটা সময় পার করলেও পেছনের জীবনের যতো বিস্তৃত কোলাহল তা তো হাতছানি দিয়েই ডাকে তাকে। সেখানে তো অসন্তোষ নাই। তার হাসিই পায়। একলা জীবনে ওসব উপভোগ চলে। সেই হবিবর রিফিউজি বা কলিদীদু যেন এক বিরাট হস্তীদেখার গমক গমক আনন্দ। বটতলার সেই হাতী দর্শনের দৃশ্য এখনও চোখের সামনে তরঙ্গ তোলে। হাতীই দেখছিল সে টিভিস্ক্রীনে। হাতীর পাল, হায়রে গজদন্ত… গজ… গজ, সেই গজ মেয়ে লিজার নাকি আজও বিয়া হয়নি। ঢাউস শরীরে কোনো এক সকালে ভোরে স্কুল বারান্দায় সে শিউলী ফুল কুড়ায়। তখন প্রকাশ তাহাকে দেখিয়া কয় ‘ক্যারে… এতো ভোরে তুই এটি ক্যা!’ সে কইছিলো ‘হামরা খুজতিছি, শিল্পি ফুপুক’। পরে শোনা যায় সে তাহার প্রেমিকের হাত ধরিয়া রাতের আঁধারে পলাইয়া গিয়াছে। হায় সে কে, তাহা তো এখন সে জানে। আর বুনো ঘাসের ফলনে এক তুমুল তৃপ্তির ভেতরেই এসব বায়না তাকে ছেকে ধরে। ‘নাইমেন না’— আছের বাধা দেয়। খুব খারাপ অবস্থা। রক্ত আর রক্ত। পুলিশ আইছে। কিছুক্ষণ আগের কাটামু-ু বিষয়ক তত্ত্ব কানে চাপিয়া আসে। ফর্সা শরীরে তখন তারও রক্ত জমে যায়। আছের… তুমি দজ্জা লাগাও, আমি যাবো। না আফা নাইমেন না। আরও কিছু হইতে পারে। আরও কিছু…কী! বীভৎস এসব দেখে তার হাত কাঁপে, পদস্ফীতি ঘটে। নেমে আসে। রাস্তাটায় লোকরণ্য। ইলেকট্রিক বাল্ব টিমটিমে। সে ঠেলিয়া দাপটের সঙ্গে সামনে চলে। তখন সে শোনে কুচকুচে কালো মোটা খালি শরীরের একজন খুব কর্কশ গলায় স্ল্যাং বলে। এতোই বিরূপ যে ভেতরের দশা ওখানে তিষ্ঠানো দায়। পলা ফেস করতে পারে না। সমস্যাটা কী তারও কিনারা করা যায় না। সবাই অশিষ্ট হয়ে উঠেছে। এ-কী কোনো রাজনৈতিক ব্যাপার, না পূর্বসূত্রের পারিবারিক কোন্দল। তখন পাশ দিয়া হরিবোল ধ্বনি ওঠে। একটি অংশে টুংটাং আওয়াজ হয়। শ্মশান যাত্রায় গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষ নির্ধারিত ছন্দে হাঁটে। ওপাশে চীৎকার শোনা গুঞ্জরন। কুকুর নির্ধারিত ভঙ্গিতে লেজ দুলায়। কিছু ইঁদুর এখন স্ল্যাবের নিচে ড্রেনে কী উদ্দেশে যেন ছুটোছুটি করছে। পলা বাইরের ফাঁকা জায়গায় সরে এলে দেখে আরও পরিচ্ছন্ন পোশাকের দারোগা এসে নামছে। ঘটনার ময়না তদন্ত হবে। একজন নারী হত্যা হয়েছে। সে অন্তঃসত্ত্বা। আঁধারের টুকরীতে ছিল ভ্রুণ। সে রক্তজবা। রক্তলাল হয়ে উঠেছিল। সেই রক্ত আরও প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাইরে ছড়ালো। বাইরের দূষণে বীভৎসতা লাল হয়ে ক্রমশ কালিমায় পর্যবসিত। কালো রূপটায় এখানে আরও দাঁড়ানো। সমাজ ওটাকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়াছে। ফলে তার এ সুন্দর-করুণ পরিণতি। কিন্তু ভেতরের কারুণ্যটুকু কী? পলা আরও অবসাদ ও ত্রস্ত হয়ে ওঠে। একাকীত্ব আর অনভ্যস্ত চিন্তার ভেতরে এক সময় সে নিজেও ঝুর ঝুর প্রকৃতির অংশীদার হতে থাকে। কী এক বাসনার সীমা ঘিরে ধরে। বুকের ভেতরে শীৎকার জমাটবদ্ধ হয়। মেঘও তৈরি হয়। মেঘলা আকাশে এক পরদেশী আবেশ ভেসে ওঠে। পলার শিরায় তখন আনন্দের উদ্গম ঘটে। একি ওই রক্তবীজের ধারণা নিয়া তৈরি। আছের আবার ডাক পাড়ে। হু হু হাওয়ায় হিমালয় বা তক্ষ্মশীলা কিংবা উজ্জয়িনীর পাড় কাঁপতে থাকে। তখন ওপার থেকে পুলিশের পিটানির শব্দ আসে। তখন হাত বাঁধা এক পুরুষের দোদুল্যমান দেহ দেখে। বাড়ির খরগোশবাচ্চাসমূহ বিদ্ বিদ্ করে তাকায়, ফুচকি মারে। ওপাশে মুরগীর ঘরে কুই কুই শব্দ আসে। শ্যাঁওলা ধরা প্রাচীরে প্রচুর জোনাকী ওড়ে। সুপুরির সারিতে ছায়া দোলায়, তখন ওই ঝুলন্ত দেহটিও আলো-ছায়ায় দোলে। মাথাটাও দোলে, ঝোলে, সুপুরির ছায়ার ভেতরে আলোও দোলে, খেলে, হাঁটে, চলে, ছড়িয়ে পড়ে, এগিয়ে চলে পলা, সেও দেখে, সেও কী দুলছে কাঁপছে, হাঁটছে কেন? নাহ ওদিকে খরকোশ আছে, ওর চোখ মাথা আছে তা জ্বলে, কুঁৎ কুঁৎ করে আর কান উঁচু করে ঝাপটায়, সময় খরচ করে। জ্যৈষ্ঠের গরমটা পেকে এখন দূরের মেঘ প্রভঞ্জন তুলছে। একপ্রকার গরম ভাপ তাতে। কালবৈশাখি কী? কোণায় কোণায় বিজলীরেখার চোখ রাঙানি ঝুলছে ওয়াও শব্দে মারপিটও জোরালো হয়। মেঘ না বাতাস নাকি ওই লম্বা সুপুরির সারির ছন্দদোলা নাকি চিক্কুরের ভেতরে কোঁকড়া পাও ঝোলে, লাঠির ডাঙে ক্যাকায়, পলাকেও সেগুলা বেভুলো করে তোলে, সম্বিৎ ফেরে অচেনা এক বাউল তখন ছড়ানো গলায় নিশ্চিন্তে বলে যায়Ñ আমি মরিয়া হইবো শ্রীনন্দের নন্দন তোমাকে বানাবো আধা। উফ, টক করে পলার কানে ওঠে সুরটা। সে ফেরে নিজের ভেতরে, ওই যশোরের যাত্রাদলের মোঘল রাজমুকুট, দারুণ প্যাঁচানো মঞ্চ, হ্যাজাগের আলো আর ব্যাটারিতে চলা উঁচু লম্বা তিনকোণা টাওয়ারের মাথায় আলো জ্বলা রঙিন বাল্ব। কী দুম দুম সব আওয়াজ কানে আসে। ও কি মাইরের আওয়াজ নাকি প্যান্ডেলের ভেতরে দারোয়ানের থপথপ চলার আওয়াজ। কড়া ক্যাপ্টেন। মোটা লাঠি নিয়া ডাঙায়, টিনে বাঁশে কখনোবা ধান কাটা কাঁদা শুকানো উঁচুনিচু ভূমির উপরে। গুছির শেকড়ে মাইরে উপড়ে ওঠে, নাহ, ওতো ক্যাপ্টেন নয়, পুলিশ মারে ওই রক্তমাখা বাড়ির অপরাধীরে, ঝুলাইয়া ঘুলিয়া ওঠে মনপবনের নাও , দাবড়ায় আরও দূরে টিমটিম আলোতে প্যান্ডেলের ভেতরে বাঁশ দিয়া ঘেরা ফান্ট কেলাস সেকেন্ড কেলাস কেউবা থরে থরে উপরে ওঠে, বেশ উঁচা টোঙ, কষ্ট আর ক্লান্তির ভোর তাতে কাটে না, দূরে নায়িকা দৌড়ায়, ভাবিয়া সরোজ কয় ঐ কৃষ্ণ ফদ প্রেমেরও মায়া ডোরে বান্ধিও বান্ধিও। পলা তখন অনেক মানুষের ভেতরে প্রবেশ করলেও তার মধ্যেই সে দূরে পেঁচা ও ঘুঘুর ডাক শুনতে পায়। কেন ঘুঘুর ডাক, রাতে তো তা হয় না। না উহা অন্য ডাক, অন্য আহ্বান। তখন বুলবুলা শরীরে কে যেন হাত দেয়। আলোআঁধারে টোনা দেয়, একটু চাপও অনুভব হয়। খুব নরম শরম মিশে গাঢ় ও ঘনানো অনুভূতি প্রলেপ জড়ায়। সে প্রলেপে ঘি না ননী… না ননী নামের অনেক পুরনো মেধাবী ছেলে এ পাড়ায় আছিল। সে খুব অংকের ভালো ছাত্র। সেই কবে টুক করে মরে যাওয়া বাবাটা বলতো ও অঙ্কের ভালো ছেলে, ও গণিত নয় শুধু ফিজিক্স ভালো পারে। সেই ননী এসেছিল, তাহার কাছে। আব্বাই ওকে লাই দেয়, প্রশ্রয় দেয়। খুব কঠোর মন ওর। গায়ে কম দামে কেনা রঙচটা ব্লেজার আর একপ্যান্ট ও চটি পড়ে আসতো। ননীই সুন্দর অর্থ করতো চাঁদ-সূর্য আর জ্যোৎস্নার। নাহ, ননী এখানে কেন, সে তো কতোকাল আসে না। বাবা তাকে নতুন উইংসাং কলম দিয়াছিল। রঙও মনে আছে। ওটা কী রঙ যেন! পিংক কালার বুঝি! খুব যতœ পেত, ফলে আরও ভালো লেখে। ওটা কলম না আরও অন্য কিছু, বুক পকেট বা নখকাটা হাতে যখন পিং পং করে মজা লাগে। মামা কইছিলো উইংসাং কলম দিয়া পরীক্ষা দিস, আরে ওটা তো কাগজের ওপর উড়–জাহাজের নাকান দৌড়ায়, তিন ঘণ্টা ক্যা আড়াই ঘন্টায় তোমার পরীক্ষা শ্যাষ হবি, আর পায় কেটা! এখন সাপ্লাই ঠিকমতো হলি হলো। তয় তোমার ননীক দিয়া এ কাম হাবানায়। কিন্তু ননীই কী এখানে এতো ভীড়ে শরীর টেপে, ধাক্কায় আরও টেপার সংবাদ সকলেই বলে কে টেপে নজিমা, করিমা, জয়নব, আরও মেলা জন, সবাই টেপার রস অনুভব করে। তখন পলা বাবাকে ধমকায়। ক্যান ননী টেপে? হাসে এবং কইতে থাকে দেখ ওর মতো ছেলে হয় না। নীতি আর আইন ওর ধর্ম। ও তোমারে টেপে নাই, পার নাই তাই গালে দিয়া মারছে। ঠিক করছে। এতই কিছু যদি শিক্ষণ হয়। তখন বেলা গড়ায়। আরও অন্ধকার হলে ননী চলিয়া যায়। কিন্তু বিজলী পরাস্ত হইয়া দড়দড় বৃষ্টির ফোঁটা আসে। ঝড় নাই কিন্তু একসাথে মেলা ফোঁটা পড়তে শুরু করলে, সবাই সরাসরি করে, টেপার আরামও চলিয়া যায়। পলা চমকে ওঠে, আরে আছের কই? সে দ্রুত বৃষ্টির ফোঁটায় কিছুটা গা ভেজাইয়া বড় গেট পার হইয়া প্রচুর কড়ি ফুল আর পাতলা লম্বা চিকন পাতা ছানাইয়া বাড়ির সামনের সরু রাস্তা দিয়া এক ধাপ সিঁড়িতে ওঠে। হুল্লোড় করে আছেরকে ডাকে। কইরে… কই থাকিস! আরও ঘোর বরষা অবিরাম হলে, ফোঁটাগুলা হুল ফোঁটায় পরিণত হয়। হুলে অনেকে এলাকা ছাড়ে। যে গম গম ছমছম ভয় ছিল সর্বত্র তা ঝেটিয়া বিদায় করে ফোঁটাসমূহ। ফোঁটার তেজ আরও বাড়ে, আরও তীব্রতা ছড়ায়। কণ্ঠধরা হয়। প্রলাপন ধামে। কিন্তু ননীর টেপার অনুভব যায় না। কেমন রাগ-ভৈরব কাছটান করে। হায়রে ননী। পলা এখন জানালাটা ছেড়ে দেয়। হনহন বৃষ্টি তাকে ডাকে। মৃত বাবার শরীরে এখন কিছু নাই। টপটপ করা বৃষ্টিতে সরে যায় নীরবে দাঁড়ানো গোরস্থানের ধূলিকণা। বাইরের হাওয়ায় ভর করে বাবার সাথে ননী ঘরে এসে ঢোকে। হ্যাঁ, আজ দুপুরের খাবার কী? মুগের ডাল মুড়িঘণ্ট আছে তো! ননী বসো বসো। মা মা বলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়তেই বড় পর্দায় আরশোলা আর টিকটিকির ধরাধরি শুরু হয়। তাতে ভেলকিবাজিটা মজার লাগে। এই ভেলকিই কী জীবনের রূপ? সবাই কী ভেলকিই করছে। কই, টিকটিকি বা আরশোলার তো কোনো বিকার নেই, তবে জীবনটা কেন ওদের মতো প্রতীকী হয়া উঠছে। নাকি সব ওতেই আটকি গেল। পলার বৃষ্টির ছন্দ আর ওসব তুরুক তুরুক খেলা বেশ একরেখায় চলে। হাওয়া ওড়ে। ভেসে আসে বৃষ্টিধোয়া শীতল বাতাস। দৌড়াতে থাকে ডাঙ খাওয়া চোর। সে কি ছাড়া পেয়ে হাসে আর কয়, মাগির এরপর হবি! জানি না সে কী কয়। কার কথা কয়। কেন সে এমন রূঢ় হয়ে ওঠে। পলাও তো কিছু কবার পারে না। সে শুধু শোনে আর বৃষ্টির ফোঁটার নাকান তওবা পইড়ে দাঁড়াইয়া রহিয়াছিল। আর তাই কী! ননীর টেপার জন্য সবকিছু করছে। চলবো না। পলা তুই তোর বাপের মতো হস নাই। কিছু পাস নাই। তয় মায়ের অনেক কিছু আছে। তার তো মাসকে মাস খবর নাই। বিটিক নিয়াও ভাবনা নাই। এভাবে আবার তপ্ত পলা ভেলকিতেই গড়াইয়া পড়ে। হাপিত্যেস নয়। গোটা শরীর জুড়ে বৃষ্টির ভরম পেয়ে বসে। বৃষ্টিটাই বুঝি সবকিছুর জন্য দায়ি। সে তুচ্ছ করে, কর্মনাশা করে। সে যে গুণ গুণ করে গান গায়। সে গানের রেশ বৃষ্টির ছাঁটে বাউল রূপ ধরে। চলে কী এ সময়? পলা অর্থ পায় না। তবুও ননীর আকর্ষণ টের পায়। ননী আসছে, চুম্বনে চুম্বনে ঠোঁট শানিয়ে নিচ্ছে, স্তনে স্বনন তুলছে, বাতিতে আলো দিচ্ছে আর অপার করে দিচ্ছে তুমুল করা অনেক সময়। অনেক রকম উপভোগে সে সোনার মানুষের কথা শোনায়। তখন নাকি কোন ভোরে এক মহানায়ক হত্যা হয়। এই কী ভবিষ্যতের দায়। তাহারে না মারিলে, কিছু নষ্টের সীমানা না তৈরি করিলে সৃষ্টি হয় না, তখন ইটের ওপর খোলা কোনো নির্মিয়মান ভিটায় উঠিয়া পলা দেখিয়াছিল পুবের তীব্র বাতাস আর লেকের পাড় জুড়ে ত্রিপলে আটকান অনেকগুলা লিলিপুট মার্কা মানুষ। তাহার মধ্যে শেখ এক কেমন মূর্তি ধরে। সে গালিভারের ভূমিকা নেয়। অনেকরকমে বাঁধিয়া ফেলা হইয়াছে তাহাকে। সে চীৎ হইয়া কয় এদেশে ডিম ভাঙা নিয়া যুদ্ধ হইছে, সকলে মিলিয়া আমারে মারিয়া ফেলার কায়দা চলছে কিন্তু মনে রাইখ : এই দেশ মুক্ত হইবে। তারপর লেকের টল টল পানিতে তাহার মুখ আঁকা হয়। সেখানে পসরা সাজিয়া বসে অনেকেই। শেখ সেখানে হাঁটেন আর ভাবেন শেরে বাংলা বা সুহরাওয়ার্দী এবং আরও কেবা কইছিল তখন, তুমি হইবা এইদেশের মূল নায়ক। বাঙালিরে স্বাধীন দিবা, কইবা শাসনের সমান জিন্দার ব্যাখ্যা। তা ছড়াইবে মধুমতীর হাওয়ায়, ভেলকিবাজির নাহান পঙ্গর দিবা পদ্মায়-ভাঙ্গায় আর বহুকালের কোনো গম্বুজের তীর মাথায়। তোমারে তাই সাজনের দরকার। সাজিলে তোমাকে নবাব নবার লাগে। তুমি নতুন নবাব। তোমার জন্মলাভ এদেশের ভেতরে ভোর আনিয়াছে। তখন কেউ হাসে আবার আড়ালে কান্দেও। গাও গেরামের মানুষ নবাব ডাকে, এক নজরে তাকাইয়া কয়, সে কী করে তার লগে আমরা সগলে এক থাকি। অনেক লোক পালা হয় তাকে দেখার জইন্যে। সে বড় গলা কইরা কয়, আরে পাকিরা যাইব গিয়া। কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না। এক থাকেন সবাই। পাড়ায় পাড়ায় সজাগ করেন সকলকে। ওই শামসুল ডাক্তার, হোসেন মিঞা আর ওইপাড়ের গোলতার সর্দার এক হওনের পরামিশ নেন। বেতার শোনেন। স্বাধীন বাংলা বা আকাশবাণী এইসব, বাইরের। সেই হাওয়া তখন নানা রকম হয়া জায়গায় জায়গায় ছড়ায়, একটাই কথা তিনি কইছেন… তাহা ব্লিসিং— বাণীরূপে ছড়াইয়া যায়। ছয়দফা এগার দফা নিয়া তারে তখন ঠেইসা ধরে শাহবাগের সামনে। পঙ্গর দেওয়া মানুষের মেলায় ভাসে নানা আওয়াজের শব্দ, হাল্কা-পাতলা, ভারী-শক্ত, কমবেশি আরও। পর্দা ফাটনো চীৎকারও। শুধু সাঁতরায় আর হাত টানে নেতার কাছে যাওনের জন্য উৎলায়। কী হবে, এবার কই যামু, লীডার কন, ভালা কইরা তাকান। দুলা, মহিরা, বায়েজীদ, আকাশ, আনোয়ার, খালেদ, তাহের, শওকত, মঞ্জুর, হায়দার, জিয়া সবাই নেতার ছাতার তলে দাঁড়ায় আর হৈ হৈ রব কইরা তাকায়। আশেপাশে অনেক চ্যাংড়া নেতাও থাহে কিন্তু কাররো পরামর্শ কামে দেয় না। সবাই একমুখে তারে তাকাইয়া কয়, শেখ, আপনি সবার নেতা কিছু পরামিশ করেন! বিশাল বুকে তখন কী যে কান্না আসে, মধুমতীর হাওয়ায় ওড়ে পরাণ, পদ্মাপাড়ের রেণু ডাকে, শুনশান বত্রিশ নাম্বারে কী যে এক গরম খরা তোলপাড় তোলে, লেক এরিয়ায় ওড়ে বাদুড়। এভাবে অনেক অনেক সময়ের ঘটনা বাপের কথার তোড়ে বড়বড়া হয়া পলার কোচড়ে আছড়াইয়া পড়ে। ওম ওড়ায়। কচিকাচা সৌন্দর্যে সুখ সৃষ্টি হয়। ওতে মাতৃত্বও ভর করে। কতোকালের মর্মমাখা মা, মমতার ধারায় দ্রৌপদীর অগ্নিজন্ম হয়া ওঠেন। এক বিরাট অগ্নিস্ফূলিঙ্গের ভেতরে জন্ম নিয়া সমস্ত সন্তাপ তিনি ধারণ করেন। তার তার গড়ন, প্রকৃতির ভেতরে আস্বাদন আর তাতে স্বয়ম্বর হওয়া। পুরুষের গ্রহণ কী তাহার জীবনে এতোই কাম্য ছিল! কতো রাজা, রাজন্য এ কূল ভাঙেন অন্য কূল গড়েন, তাদের বীরত্ব বা শৌর্য একসময় বিবির ভেতরেই প্রকাশিত হয়। যুগে যুগান্তেরে দ্রৌপদীরা সেভাবেই রাজাদের সম্মান সূত্র পয়দা করিয়াছে। দ্রেীপদীর স্বয়ম্বর সভায় অর্জুনের জয়, কর্ণের পরাজয় সুকঠিন হইলেও দ্রৌপদী বাধা আছেন অলঙ্ঘনীয় কুন্তীর আদেশে। কুন্তীও মা, মায়ের আদেশেও বিরাজিত ওই পুরুষধর্ম, সেও পূর্ণরূপে কামকামিনীর ধারায় পুরুষকে অধিকৃত করে, যাহা দ্রৌপদীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রুচি- সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে এক শয্যাশায়িনীর অভিনয়। ইহাতেই নারী প্রকৃতিগর্ভা। সেই সুখে ভোর হয়, রোদ ওঠে, স্নানবসনার গন্ধ রচিত হয়। আহা! সে সুখ, সকলেই তাহাতে নির্বাপিত, সেই নির্বাপিত স্মৃতিতে পলা নারীরূপ পাইয়া বসে। সে দেখে সমস্ত প্রকৃতির রূপ তাহার শরীরে ধৃত। সে আর বালিকা নয়। রমনী শ্রম অধিষ্ঠিত। যখন বাবা আসিয়া দাঁড়ান বিরাট দরদালানে, তখন তার নবাবী চালে জন্মআধার ঘনিয়া আসে— পলা তাহার সেই মা, সে নতুন করিয়া কীর্তিস্বরূপা, কীর্তিনাশার কীর্তন গায়। বাবা নৌকা চালান, বৈঠায় তরঙ্গ তোলেন, যৌবন ভরমিয়া ওঠে— ভরা মধুমতিতে। হায়! ইহা এক গোপালীর অভিবাদন। সে তাহার বাবাকে পুষ্ট করে, গড়ায়, বৃদ্ধির ছায়া দেয়, ক্লান্তি কাটাইয়া কর্ম ঘটায়, সেই নদীর তীর ধরে অনেক আদান-প্রদান চলে, কুলু কুলু নদীতে বজরা আসে, সারবাঁধা সব ডিঙ্গি বহাইয়া যায় আর লঞ্চ বা ছোট স্টীমারে গজারিয়া গজরায়। বাবা, তুমিই জাতি জন্মদাত্রী, জাতির পিতার জন্মক্রোড়ের আলিঙ্গন। পলা বাবাকে তাকাইয়া দেখে কিন্তু ঘুমের গলায় আবেশ ধরায়। একলয়ে শোনায় তাহার বাবার কণ্ঠস্বর, তিনি অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরী। পুরনো একটা সোফার ফাঁকে যে গোঁফওয়ালা বিড়াল কাঁটা চিবোচ্ছে সেও ওসব কান পাতিয়া শোনে। এটি অনেক পুরনো গোথিক নকশার বাড়ি। কার এ নকশা, পূর্ববর্তী চৌধুরী নাকি কোনো হিন্দু জমিদারের, পরে ছিনাইয়া লওয়া, তাড়াইয়া দেওয়া জনপদ। আহা, এই দেশে ইতিহাস খুঁড়িলে শুধু তাড়ানো আর পালানোর ইতিহাস জড়াইয়া পড়ে। মোনাইলে পলার বড় হওয়ার কাহিনি তো সে সূত্রই কহে। সেই উঁচাটন জীনমার্কা কোটাঘরের জেবন, সেখানে তো কাহারও ইতিহাস নাই। কিন্তু বিচ্যুত ইতিহাসের শাখায় ঝোলান তাহার অন্তহীন গড়িমসি কাল পার হইয়া চলে। চৌধুরী তখন কোথায় আছিলেন! নাকি অন্য বীজরক্তে অনেক আগেই পলা প্রত্যূষ দেখিয়াছিল। বাবার কোনো এক বসতির নাড়ীই পলা বহাইয়া যান। অন্তরের আহাজারি তো কঠিন। সেখানে হবিবর রিফিউজি বা দেওয়ালে কতো শ্বাসকষ্টের আওয়াজ লুক্কায়িত, মাঝে মাঝে সে খাঁজ উঠান— তাহাতে ফুচকি মারে অনেক টিকটিকি-গান্ধী পোকারা, কেউ আছে বা চলিয়া গিয়াছে, বংশপরম্পরায় তাহাদেরও আনাগোনা এখনও কম নাই, ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষè আলো দেওয়া জোনাই উড়াইয়া চলে, গড়গড়াইয়া আরও অনেক পোকা উড়ে ধরে, তখন চৌধুরী এক ঢংয়ে প্রত্যক্ষ বয়ান করিয়া চলেন, বিরাট তাহার নাদ, কানে পৌঁছয় শীর্ণ সান্নিধ্য নিয়া, কখনও উচ্চ তারে আটকানো, তাহাতে চকচকে শাদা বেড়ালের চক্ষুতে পলক আসে না, ফুচকি মারে আর আয়েশে চিবায়— সেকি নিজেরে এই দরদলানের মালিক ভাবে, বোঝা দায়। সামন্ত স্বরের হুলো মেজাজ আর হেজাগরঙা শাদা শরীর আর শাদা বেড়াল মিলিয়া ঠুকঠাক আলাপনের পরিবেশ আনে, সেটি ঘরের বাতাসে গুমোট পরিবেশে পলকা ধ্বনিপ্রবাহ তোলে। শ্রোতার কর্ণে দোলায়। অনেকগুলা মানুষ যখন শেখের মুখের পানে চাহিয়া থাকে, তখন সে বুঝি একটু দিশাহারা হয়, বিপুল গগনে ভরা আলোর পানে তাকায়, নিশানা খেঁজে, নিজেই পলকা আশ্বাসে ভেবে নেয়Ñ এইসব বহুত জনতা লইয়া আমি কোন দিকে যামু, আমি ঠিক পথ কী! ঠিক পথে আছি তো! সংশয় হয়, ভয় হয়, তবুও সকলের সম্মিলিত স্বরে আশ্বাস আর আত্মবিশ্বাস জাগরিয়া গলা ধরিয়া লয়— সে গলায় গ্রীবা উন্মুক্ত, টুপ করিয়া কোনো পাতা গায়ে পড়ে, বটবৃক্ষ কোণায় দাঁড়াইয়া কয়, শেখবাবু তোমার কপালে বহুত কষ্ট আছে, তয় মেহন্নত করো কিন্তু কই কিছুই তো হয় না এখানে। পুলিশ আসিয়াছিল, চলিয়া গিয়াছে, যাহার পাপ তার কিছু নাই, মাইয়াডারে কাস্টুডি করিছে। এইডা কী আইন অইলো? ট্যাকা নেছে, আর কাস্টুডিতে রাখছে। কেউ কারো কথা না কইলে শেখ সাহেব উল্টান, পেছন হাঁটেন, একদিন সেখানে চাঁদতারার রহস্য প্রতিবিম্বিত হয়। আসের দেখে, দুনিয়া ফিইরা আসছে। কিন্তু শান্তি নাই কেন? গয়েবানা আওয়াজে একদিন মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব কন আবার এই দেশে আমাদের দল ফিরিবে। কারণ এটা সকলের আস্থার পাট্টি। এতে ধর্মীয় অনুশাসন মান্য করার মন্ত্র আছে। সকলেই সেই ধাঁচে গড়া। কিন্তু নেপথ্যে একজন নেতা তৈরি হওনের কথা। সেই নেতা সব করিবে। শেখের মাথার ওপর চাটি মারিবে। বিশ্বাসঘাতকতার রজ্জু বুনিবে। অনেক বড় ও উদ্দীপনার সে রজ্জু। তাহাতে বাধা পড়ে এই মাটি ভূখণ্ডের জ্বরকাঁপা অসহায় মানুষজন। বাসন্তীর নামে, পি-ব্যবস্থার নামে, নৌবহর আটকানোর নামে কতো রকম কর্ম চলেÑ মানুষ কিছুই জানে না। পাকিস্তান মরিয়া গেলে শাসনের ভেতরে অনেকপ্রকার শাসন শুরু হয়। সুবিধা অসুবিধার তোপে আসেরের বাপ কইছিল ‘এইটা চোরের দ্যাশ’। সেই কিসিঞ্জার মিয়ার নাকান এমন সব উক্তি ছাপড়ার উপরে বসিয়া গেলে অজগরের প্রশ্বাস বাড়ে, অনেকমুখা অন্ধকার হাতড়ায়, দোলায় আলো ফোটা কিরণের ভেতরে চিকচিক ধুলা নাচন দেয়, টর্চের বাতির লাহান ঠিকরানো আলো পড়লে ওপারে তখন দুলির মাওয়ের কাপড় খুলে যায়। সেখানে মোনাইলের আছাদ মিয়ার পরিবারের কেউ ওই জানালার রোদের ওপর তারে ঠেসিয়া ধরে। সে শ্বাস বন্ধ হয়, চিক্কুর পাড়ে, বাইরে কুত্তা ডাকে, অনেকক্ষণ… তখন জল গড়িয়া যায় পলার, সেও কান্দে, হাঁপায়, দরোজার ওপারে আওয়াজ পড়লে দেখে আছের দাঁড়াউয়া কয় —আফা, আপনে ডাকতে কইছিলেন’। হুম! যা এখন। গরম পানি দে! জিন্দা মানুষ এমন কেন! এরপর পলা প্রশ্নের ওপারে নিজের জীবনের অনায়াস মুহূর্তগুলার ওপর নিজেকে খোঁজে। সেখানে জোনাকি-বৃষ্টি-দেবতা-পুষস্ন-ওষ-ত্যালপিঠা-ছাইয়ের কষ্ট ভর্তি। নামানো দেবতারা ওখানে শান্তি দেয়। তারা রোদে পঙ্গর দেয়। তীব্র ঘনানো রোদ মাঝ মাঠে বিলি কেটে প্রচ- বেগে ধাইয়া আসে। পলারে পলা…, বাড়িতে মুন্সী আইছে। আমছিপারা লইয়া যা। মোনাইল এলাকার এই মুন্সী পেটের তাগিদে পড়ায়। কেডা রে! হবিবর রিফিউজির বাড়ির না! হ, কতোদূর থাকি তোরা তামান দুনিয়া মাইরা এই এলাকায় আইছ। বেশ বোল পড়ে, টুপ টুপ করে কানে টঙ্কার ওঠে। হাহাকার নয়, একটানা নিরাশা দৌড়ায়। পলা পিরপির করে এসে দাঁড়ায় বুঝি! হুজুর গাল টেপে, আর এদিক ওদিক তাকায়, অনেকক্ষণ পরে কয় মাতাথ কাপড় টান। কীসের কাপড়! বাইরে বেলকোনিতে কাপড় ওড়ে, পানি পড়ে, সেটানো কাপড়ের ভেতরে কোনো গর্ভবতীর শরীর বা ভেজা ভাঁজ— এসব অনেকপ্রকার গভীরতায় পলার সজাগ দৃষ্টি তৈরি হয়। সে বারবার তাহার অজান্তের আদর্শ অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরীর ছবির দিকে তাকায়। সে এখন তার সম্মুখ দেয়ালে পোট্রেটতুল্য। এটি ফ্রেমে আঁটা বেশ জীবন্ত। হ্যা, তার দিকে তাকিয়েই সময় গড়ায়, ননী গোপালের কথাও মনে আসে। সেও একটা প্রতিবিম্ব যেন, প্রাণপ্রিয় প্রতিবিম্ব। একাকীত্বের প্রতিবিম্ব।

ছয়.
জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ তিনটি সত্য ভাগ্যের অনেকের কাজে দিলেও পলা ব্যতিক্রম। এখন ফাল্গুন মাস। পাড়ায় কার যেন বিবাহের সকল এন্তেজাম চলছে। ওখানে ওর যাওয়া হয় নাই। তবে একপ্রকার জীবনের দাগ রইয়া গেছে। পলা সে দাগটা খোঁজে। রজত আর ননী গোপাল অনেক সময় পার করে। সে রজতকে চিনিয়াছিল রঙের টানা রেখার ভেতরে। আর ননী গোপাল তো বাপের খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন। সেজন্যই তার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। সে আকর্ষণে ছিল না বেশি কোনো ব্যঞ্জনা। অকাট্য কোনো বিষয়ও নয়। তীব্র সত্যে তাহার নগদ যাওয়া-আসা ছাড়া ননী গোপাল আর কিছু নয়। কিন্তু ভেতরের শূন্যতাগুলি মাঝে মাঝে পেখম মেলে দেয়। সে নিজে সাজায়, ঘরকে সাজায় কিংবা নতুন মডেলের কিছু সামগ্রী কিনিয়া তাহাতে সে নিজের মনের তুলনা করে। যাচাই করে পছন্দের উচ্চতা! কিন্তু সমাজের প্রতিরোধটাই তাকে পীড়িত করে। একজন মেয়ের জীবন, মানুষের জীবন নয়। যে সময়ে তার কৈশোরকাল বাবা কোনোরকম মানুষের ভেদে মানুষকে নির্ণয়ের কথা শোনাননি। তাহার সামনে ছিল চার্লস ডিকেন্সের জীবন, কড়া কঠিন রোদের দুপুরে সময় অতিক্রম করে তিনি জানিয়েছিলেন, একলা চলতে শেখার নির্মম সত্যগুলি। কী আছে ওর ভেতরে, সেজন্য মনীষীর জীবনী পাঠ করো। মৃত্যুর আগেও তেমনটি ভাবেন তিনি। মেয়ের জন্য সর্বরকম প্রস্তুতি গড়িয়া দেন। নগরবাড়ির দেউড়িতে দাঁড়াইয়া তিনি মানুষের জীবনকে দেখেন। বলিয়া ওঠেন ‘পলা দেখ, মানুষের কী রসবোধ, সে ঘোড়াকে নিজের সন্তানের চেয়েও যত্ন করে। সেই যেন তাহাকে সাজাইয়া দেয়। আওয়াজ দিলে সে কথা কয়’। মানুষও সেরকম করে, টাকা পয়সা দিয়া মানুষকেও পোষা যায় আজকাল। মানুষতো পণ্য, সে পণ্যের মাপে নিজেকে নামাইয়া আনিয়াছে। মহাপৃথিবী মানুষের মূল্যকে বিক্রি করিয়াছে। মানুষ এখন মূল্যহীন। এই মূল্য পাওনের জন্য মনের চোখে সবকিছু দেখিতে হয়, আপনারে চিনিতে হয়। পলার চোখ ভইরা চল নামে। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই বাবা এসব বলিয়া এই প্রকৃতিতে বৃষ্টি আনিয়াছিল। বাবা কেন চলিয়া গেলেন। পলার মা নাই বাবা নাই, সে তো এ মহাপৃথিবীতে একা এক নারী। সে চাইলেও তো নিজের মতো কিছু করতে পারে না। বেসামাল হইয়া যায়। জ্যেৎস্না দেখিয়া সে কষ্ট পায়। ভোর দেখিলে কোনো এক গোবৎসের লেজ নাড়ানো আনন্দের উপসুখ পাইয়া বসে। ঘোড়া দেখিলে তাহার আত্মীয়তা চেপে বসে। আর বৃষ্টি তো মনে হয় বাবারই তৈরি। কী এক একাকী আমার বাবা। সবকিছুর ভেতরে মাখানো। পলার এই মাখানো বৃষ্টি, তাহার বাবাকে ভাসিয়া আনে, আর কয় কতোকাল তোমার সঙ্গে সাঁতরাইনি, যাইনি সেই জগদল, নাগর উপকূল আর বৃষ্টিতে সেই খোলা প্রান্তরে কাটানো কী চঞ্চল মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হইলে, সেই আত্মসমর্পনের সংবাদ এই খোলা মাঠেই বাবা বলিয়া বসেন। চল আজই দেশে ফিরিয়া যাই। সেই কোটাঘরে বসি। তোর মায়ের নামে মিরাদ দিই। দেখির আশ্রিতা এখনও বাঁচিয়া আছে। কিন্তু কিচ্ছু হয় নাই। বাবা সব থেকে ফিরিয়া নিয়া কন, চল সদরে যাই। সেখানেই বসত গড়ি। এই সেই নগরবাড়ি। কতো সেই যুদ্ধের স্মৃতি ঘিরিয়া ধরে। আকাশবাণীর দেবদুলাল বাবুর কণ্ঠ পাইলেই বাবা তরঙ্গ উঠাইয়া কন, দেখ একটা ফেলাইছে। এসব লইয়া একদিন এই নগরবাড়ির লনে আসর বসে। আশরাফ চাচাসহ অনেকেই আসেন। বাবা মধুমতীর তীরের বাসা থেকেও ঘুরিয়া আসেন। সবকিছু কী আনন্দের উপলক্ষ বহাইয়া আনে। সবকিছু হারাইয়াও যেন স্বাধীনতার আনন্দে ভুলিয়া যান তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা। এরপর এই বাড়ির ভেতরেই গানের আসর বসে। পলা ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে সুপ্ত রাতে’ গেয়ে শোনায়। সে রাতে খুব পূর্ণিমা ছিল। তখন ননী গোপাল আসে। সে তাহাকে ফিজিক্স পড়াতে থাকে। ননী গোপাল লম্বা, ফর্সা এবং ব্যক্তিত্ববান বলিয়া প্রতীয়মান হয়। অনেকভাবে সে মহাজাগতিক রহস্যের ব্যাখ্যা বয়ান করে। আইনস্টাইন বা ম্যক্সপ্ল্যাংক পড়ায়। শ্রুডিংগারও। এস পড়ে সে বস্তুবাদি হয়। বস্তুর দর্শন আর ব্যক্তির কল্পনা এক কইরা সে নতুন কিছু বিস্ময়ের আনন্দ খোঁজে। সত্যের ভেতরের আনন্দই তো মন দিয়া গড়া। মনের বিপুল রহস্য নিয়া সে প্রশ্ন করে, মানুষ যে প্রকৃতির অংশ তাহার সত্যিকারের সৌন্দর্য কী, মনেরই বা প্রভাব কতোটুকু ইত্যাদি দুর্মর হইয়া চলে। ননীর যুক্তি উপস্থাপনে আড়ষ্টতা আছে কিন্তু কথা বলায় সে বেশ পরিপক্ব। ধারণাও অনেক পরিষ্কার। পলা নানাভাবে পড়াশোনার ভেতরে থাকলেও বাবা বলেছিল, ননী তোকে পছন্দ করে। তুই কী বলিস! আশ্চর্য হইয়া যায়। পরে পলা নিজেকে নিয়া প্রশ্ন করিয়াছে অনেক, তারপর সবকিছু থেকে নিজেকে ননকম্প্রোমাইজ বানাইয়া বাতিল করিয়া দিয়াছে। পুরুষ মানুষ নিয়া তার আপত্তি নাই কিন্তু পুরুষতন্ত্র তাহাকে টর্চার করে। সে যে কোনোভাবেই হোক তাহা মানিয়া লইতে পারিবে না। বরং একাকী সমস্ত কিছু উপভোগ করিয়াই সে চলিতে চায়। মকবুলার রহমান চৌধুরী যে ছাঁচে মেয়েকে গড়িয়াছেন, সেখানে আপস শব্দটা অচল, বহিষ্কার হইয়া গেছে বহু আগেই। স্বতন্ত্র হইয়া চলাই তার স্বভাব। কিন্তু পিতৃমৃত্যুর পর সে যেন নারীর পৃথিবীতে একা অনুভব করে। অনেক কাজেই সে জড়াতে চায়। কাজ করার শক্তি ও যোগ্যতা নিয়া তার প্রশ্ন নাই কিন্তু সব পুরুষই একইভাবে নারীকে দেখে। এই বেপরোয়া বিষদৃষ্টি কোথায় নাই। মাঝে মাঝে সে নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, তার মনটাই কী এভাবে গড়া। সে কী আসলে ওই চোখেই পুরুষকে দেখছে। কিন্তু সে সবকিছুর উত্তর পাইলেও এই সত্যটি দেখে এ পৃথিবীতে পুরুষের নারীর সম্মান নাই। পৃথিবীটা নারীরা দ্বিতীয় হিসেবে পরিগণিত। এই পরিগণন থেকে সে কোনো কিছুই বাদ যাইতে বা বিরত হইতে দেখে না। কমোডিটির মধ্যে নারী অবলুপ্ত। বড় বড় কবিরা বস্তুতে বিলীন হন, আর নারীরা বিলীন হন পুরুষে। এর ফলেই পলা একা। সে বিলীন হওয়ার সত্তা নয়। বাবা কীভাবে বড় করেন, বাবাও তো পুরুষ? কিন্তু মেয়ে তো বাবাকে পুরুষ মনে করে না। সে বাবাই মনে করে সেজন্য যে ব্যক্তিটুকু পায়, সেও ব্যক্তি হইয়া ওঠে, জীবনের চাকায় সে হইয়া ওঠে স্বতন্ত্র। পলা, বাবার মৃত্যুকে এক অতিন্দ্রীয় দৃষ্টিতে চর্চা করে। কোনো আকাশগঙ্গায় সে বাবাকে দেখে সে তাকাইয়া আছে, সপ্তর্ষিতে দেখে বাবা তাকাইয়া হাসিতেছে আর চাঁদ উঠিলে অনেক বেশি তার হইয়া ওঠে। কারণ, ভরাট চাঁদের রঙে বাবাই তাহাকে স্নান করিতে শেখাইয়াছে। বাবাই তাহাকে ওই আলোরঙা করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছে। কী এক অমোঘ শক্তিতে তিনি তুমুল হইয়া আসেন আর কন, কই সকালবেলায় ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে’ গাসনি? না, আর কতোকাল সে গান গাওয়া হয়নি। কোনো বৃষ্টিতে বাবার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতও আর গলায় ওঠে না, বিপুল তরঙ্গ রে..। ওসব গেঁথে গেলেও আর গলায় সাধানো যায় না। কিন্তু গভীর স্বরে চতুর্দিকে বিশাল প্রতিমা ভরণ করিয়া ওঠে। কেন এ বিশাল মূর্তি? কীসের এ দ্বেষ! এসবের ভেতরে মানুষও তো সবাই একা। ননী আসিয়া পড়ে। সে বলিতে থাকে, তুমি তো গান গাও, বলো তো গানের সুরস্রষ্টা মানুষ হইলেও তার ধ্বনিলোক কোথায় বিরাজে! এমন প্রশ্নে সে আৎকে ওঠে? সত্যিই… সে অবচেতনে বলিয়া ওঠে কেন— এই প্রকৃতিতে, বস্তুর ভেতরেই। ননী লাফাইয়া ওঠে, মাভৈ! চলো তোমাকে বেরিয়া আনি। সত্যি সে বেড়াইতে যায়, অনেক রকম পথ পেরিয়া এক খোলা মাঠোর মুখে আসিয়া দাঁড়ায়। সেখানে নিস্তব্ধ পুকুরে সন্তরণ করে হাঁস আর চড়–ই। ওতে ছাপাইয়া আসে পেয়ারার সবুজ কচি পাতা। ফুড়–ৎ করিয়া বাবুই কী মাছরাঙা পেখম মেলিয়া আনন্দ প্রকাশ করে। ওটা পার্ক। নগরবাড়ি থেকে কিছু দূরে। ননী কাছে আসে। সে বলে, দেখো তুমি যেভাবে পৃথিবীর সব পুরুষকে আটকাইয়া দিয়াছ ওটা কিন্তু অবিশ্বাস্য। ওতে বস্তুর মাহাত্ম্য কী আছে! পলা থামিয়া যায়। ননী তুমি অন্যরকম ছেলে। তোমার পুরুষ ডিফেন্ড করার ভিত্তি কী! কেন এসব প্রশ্ন করো? তখন ফর্সা মুখে খুব কমলা রোদ আসিয়া পড়ে। ভেষজ প্রকৃতি তার চুলে নতুন ছাঁদ রচনা করে। আরও বেশি হাওয়া উড়িয়া আসে। সবুজ শাড়িতে যুক্ত হয় এক নতুন প্যানোরমা। সেখানে নতুন পল্লবিত ধারা প্রকৃতিময় হইয়া ওঠে। ধারে ও পাড়ে জমিয়া ওঠে জোনাকআলোর রাশীকৃত চুর্ণি, দিগন্ত জুড়িয়া ভরিয়া ওঠে প্রভূত সালোক পাতান স্বর। ওখানে গাভী চরে গোবৎসের মতো। মানুষ আর সবুজ নালী ঘাস জুড়িয়া বসে বারো মাসি বৃষ্টির উপলভ্য আলিঙ্গনেÑ কীভাবে যেন সে শব্দের বিন্যস্ত করে। কারো শোনা কবিতার বাণী অন্যভাবে ছায়া দেয়, আলোতে আনে গভীর স্পর্শ। এসব যখন সহজাত রূপ পায় তখন ননী গোপাল তাহার হাত ধরে। সে উত্তাপের ভেতরে অনুভব নরোম। প্রলাপন সুখময়। পলা এসব অনুরাগের স্পর্শটুকু একইরকমে অনুরাগে আনে। সেখানে আরও রূপ-অরূপ মহিমা জড়াইয়া আসে। সে হাতের পরশে গোল সূর্য রঙের রেখায় পরিপ্লুত হইলে অনেক আকাশ ছাইয়া আসে। কবিতার পাখিরা নীড়ে ফেরে। পলা আর ননী গোপাল সামনে চলে। সে মনের কোঠরে অধিক প্রশ্ন আনিয়া বলে, তুমি বলিয়াছ এই প্রকৃতি বস্তুর দাগে তৈরি। আমি সেটি আরও গভীর করিয়া কই যদি আবেগ আর অনুরাগ বস্তুতে না বসিয়া থাকে তখন তো বস্তু বিলীন হইতে পারিবে না। মনবীর রূপই সেখানে মুখ্য। এই মহাকাশ বা বিশ্বময় যে প্রলাপন সেখানে উত্থান-পতন আছে, স্থিরতাও আছে গতিও আছে, অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নও আছে— কিন্তু সবকিছুই মানুষ পরিবেস্টিত। মানুষের ভেতরেই সে পরিপূর্ণ হইয়া ওঠে। এসব কথার আড়ালে ননী গভীর হইতে চায়। ননীর ভেতরে অমোঘ আনুগত্য রচিত হয়। সে পথে পলা একেবারে নতুন হইলেও সে বলে ওসব পুরুষ আধিপত্যের প্রাথমিক পর্ব। সে কিছুতেই এর ভেতরে নিজেকে এক করিতে পারিবে না। অনেক নারীই এসব প্রতিটি অচ্ছুৎ মুহূর্ত রচনা করিয়াছে। এতে আছে সমর্পণ আর ওই লাঠি-দর্শন। লাঠি ছাড়া নারীর চলে না। শৈশবে-কৈশোরে-যৌবনে-প্রৌঢ়ত্বে সর্বদা তাহার পিতা বা বাবা বা পুত্ররূপি লাঠি লাগিয়াছে। এই লাঠির বিরুদ্ধে গেলেই সমাজ চীৎকার করিয়া উঠিয়াছে। সমাজ শাসাইছে। নকল চক্ষুতে তাকাইয়াছে। আর নারী তার প্রতিপক্ষ হইয়াছে। এসব বক্তব্য সে অনেককাল দেখিয়াছে। অনেককালের রচনায় তাহা রাখিয়া আছে চরম স্বাক্ষর। এই স্বাক্ষরের ভেতরেই জীবনের আশা ও আলো নিভু নিভু হইয়াছে। সে আদিকালে যে স্বাধীনতা সমজে আছিল, একালে তাহা নাই। অনেক পুঁজি ধরা দিয়াছে, অনেক জৌলুস আসিয়াছে কিন্তু মানুষের মুক্তি ঘটে নাই। সেই কুঁড়েঘরেই আছে মেয়েসকল। পলা ননীকে কিছু বুঝায় নাই। সে বুঝাইতে চায়ও নাই। কেননা ননীর ভেতরে পরিপুষ্ট আছে বা নাই কিন্তু সে তাহার আহ্বানকে গ্রহণ করিতে পারিবে না। সে আহ্বানে তাহার এতাটুকু আবেগ রচনা করে না। এসব শক্তি বুঝি অনেককাল তিরোহিত হইয়া গিয়াছে। ব্যক্তির ভেতরে সেঁধিয়া জীবন পার করিতে পারিবে না। সেটি সাফ করিয়া বলারও কোনো অর্থ নাই। ননী বোকা নয়। কিন্তু একপ্রকার অন্ধকার আত্মা রচিত হয় পলার ভেতরে। একা চলা বা না চলা মুখ্য নয়। কিন্তু সে একটি পরম্পরা শক্তি। সে শক্তির বেতরে জন্ম বা গ্রহণের আনন্দ আছে। আছে পূর্ণতার তরঙ্গ। সেখানে তো একজন পুরুষ অবশ্যম্ভাবী। এই একাকী জীবনে সবকিছু তাহার মতোই চলুক কিন্তু তাহার তো পরম্পরা-অবকাশটুকু দরকার। সেখানে তো পিছুটান থাকা মানে গতিহীন হওয়া তাল পড়িয়া যাওয়া, তবে সেখানে ননী বা যে কেউই হোক, তাহার সিদ্ধান্ত পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন আছে। এসব দিবধা দোলাচলতার ভেতরে আরও একটি উলম্ব রেখা তাহার ভেতর দিয়া চলিয়া যায়। এই মর্ত্যে মৃত্যু তো আছেই। বাবা নাই। আমিও নাই। তবে কী কাহার পরম্পরা নষ্ট হইল, রহিল কী! টিকিল কী! সত্য-মিথ্যা কী! জগতে অনেককাল মানববসতি আছে, বহুকাল আগে যে সভ্যতা বিলুপ্ত ঘটিয়াছে তাহার কে প্রজন্ম রাখিয়াছে বা রাখে নাই সে সবের খরচ এই পুথিবীতে কীভাবে ঘটিয়াছে, কাহারা তাহার হিসাব রাখিয়াছেন— এসব প্রশ্ন তো আছেই! আরও অনেক যুক্তির ভেতরে ননীর প্রতিপাদ্য তাহাকে হন্ট করিতে থাকে। একপ্রকার আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রও রচিত করে।
ঘুম আর অচেতন সত্তার ভেতরে ননী আসে। সে তাহাকে তুলিয়া ধরে। পলা আজ রাগ করিয়াছে। কারণ, বৃষ্টির ভেতরে অসীম শূন্যতার সে বাবাকে অনুভব করিয়াছে। ননী বেসামাল হইয়া তাহার ওপর রুষ্ট হয়। পলা বলে, হাঃ হাঃ, ইহা তো আগেই জানি, তোমাকে বলিহারি দেই। এখন তাহার বাড়ির উঠোনে একটু রৌদ্র আর ছায়ার খেলা। সেখানে সন্তানহীন এক রমণী পলা। ননী ফিরিয়া আসিয়া সে তাহার সন্ধানে ব্যাপৃত। কিছু একটু সোহাগ-অনুরাগে জড়তে চায়। কিন্তু তাহার মুড নাই। সে অসহায়। ননী অপ্রস্তুত হয়। আর ঘরে ফিরিয়া আসে নাই। রাত্রি পার হইলে পলা অসুখী হইয়া পড়ে। একপ্রকার সুখের ভেতরে অসুখ জড়াইয়া আসিলে সে বেশি সময়ে তাহার নিকটস্থ থাকিয়া আশার সংবাদ দেয়, সম্মুখের সুখ-চিন্তায় হয় বিভোর। একটি সন্তান এ পৃথিবীর মুখ দেখুক। সন্তান সে কেন? পুরুষ কেন সন্তানের জন্মদাতা নয়! এই প্রক্রিয়া কী বায়ো-পরীক্ষণে আবিষ্কৃত হয় না। এখানেই তো তাহার সমস্ত সত্তা আটকাইয়া আছে। পলার ভেতরে এসব বিষয় গভীরে একটি পরিবেশ তৈরি করে। মঙ্গলে মনুষ্য বসতি পাইলে কিংবা চাঁদে বসতির পরিবেশ রচিত হইলে তবে মানবজন্মের প্রক্রিয়া কেন শুধু একজন রমণী লইবে? সে প্রশ্নটান তাহাকে এবং ননীর সম্মুখে তুলিয়া ধরিলে— ননী বিশেষ কিছু বলে না। এখানে তাহার বিজ্ঞান যেন থমকিয়া দাঁড়ায়। তবে কী পুরুষ সমাজ এই দায় নিতে চায় না। বিষয়গুলা ননীকে সেপ্রস্তাবরূপে দেয়। ননী হাসিয় বলে তোমার মাথায় কিছু নাই। তুমি সৃষ্টি ও প্রকৃতিকে অস্বীকার করিতে চাও! বৈজ্ঞানিক নিষ্পত্তিতে তাহার তুমুল অযৌক্তিক আপত্তি। এভাবে এক রাত্রিতে তুমুল বিবাদ উঠিলে, সে তাহার পৌরুষরূপ প্রকাশ্য ধরিয়া পেলে। শুধুই একপ্রকার জৈব চাহিদা নিয়া কাছে আসিলে পলা অসুস্থ হইয়া পড়ে। এটিকে সে জন্তুতুল্য করিতে চায় না। ননীও তাহা জানে। কিন্তু পুরুষ বলিয়া খুব দ্রুত সে কর্মস্থলে নিয়া চলে, সেখানে ডমিনেশন আছে, আরোপিত হওয়ার আছে, সে রমনী শরীরকে ভোগের ভেতরে ঢুকাইতে চায়। ভোগ আর নিষ্পত্তি। ভুক্তভোগী হওয়াই কী নারীর গলগ্রহ রূপ নয়। সে কেন ওভাবে প্রেমহীন শরীরে তাহাকে কাছে নিবে— হোক না সে স্বামী। ননী সেটিই চায়। শুধু একপ্রকার আমোদ, কিন্তু তা অনন্তরূপে থাক— তাহা নয়। এই জৈবপ্রক্রিয়ার ভেতরে সে প্রেমের প্রস্তুতিতে রহে না, দাঁড়ায় না। অবশিষ্টও রাখে না। কেন তার এ দমন? প্রশ্ন করিলে উত্তর মেলে না। ননীর বিজ্ঞানমনষ্কতাও কী ওই দরোজায় গিয়া আটকাইয়া যায়! পলা প্রেমহীন সেক্স করিবে না। এতে তাহার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হইলেও নয়। সে ফিরিয়া যাইবে। অনমনীয়তার একশেষ ঘটাইয়া দেবে। পলার এ রূপটিকে সে অর্জনের পক্ষে নেয়। সে অপ্রতিরোধ্যরূপে নিজেকে আটকাইয়া রাখে। কিছুতেই আপোষের দিকে নেয় না। এমনকি সন্তানও নয়। হঠাৎ এসব তর্ক ফুরাইয়া যায়— যখন আছের আসিয়া পড়ে। আফা! দরোজায় কেডা যান আইছে। কে! কে! কেন? কেন? ননী? সে কেন এখানে। ফিরিয়া তাকায়। অনেকদূর পর্যন্ত আলো চলে। তীরবেগে ঠিকরাইয়া পড়া আলো বেসামাল হইয়া তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। নো নো… তুই কেন ডেকেছিস! তুইও তো পুরুষ। ভাগ! বেটা… ভাগ, তুই কেন এঘেরে আসিয়াছিস। আছের চলিয়া যায়। সে কিছুই বুঝিতে পারে না। কোনো উত্তরও তাহার মুখে আসে না। কোনোরকম কথার লাইনও সে পায় না। হ্যা, সে তাহার নগরবাড়িতে নিজেকে নিয়া আছিল। ননী কই। অনেক আগেই তো সে চলিয়া গিয়াছে। ননী কেন আসিল? ঠিক সে বুঝিতে পারে না। বরং তাহার খুব প্রিয় মুখ রজত। যাহাকে সে অনুভব করে। সে তো নাই। সে তা বিভুঁইয়ে। বেচইন কখনো হয় মনটা। সত্যিই সেবার তাহার আগমন নতুন বলিয়া মনে হইয়াছিল। লম্বা, ফ্রেন্সকাট দাড়ি আর অনেক শান্ত পারফিউমে আটকানো তার ব্যক্তিত্ব। সে বলিয়াছিল ‘অবসেশন’। মুগ্ধ হইয়া সে তাকাইয়া থাকে। আরও অতি বিশুদ্ধ শব্দে বলে চল, এখনতো বোম্বাই আছি। তুই গেলে গোয়া, কর্ণাটক আর কাশ্মীর ঘোরা যাবে। সব তোর ইচ্ছে। আমার কার্ডটা নে। কতো মনে পড়ে। কী মনে পড়ে! কিশোর… কিশোর… আর কিশোররূপ। মোনাইলের কিছু মুহূর্ত, স্যার আইছে। কী ছিলি তুই। ঘুমটা অন্যরকম হইয়া পড়ে। রাগটাও পড়ে যায়। এভাবে ঘুম ভাঙার পর রজত এসে পড়ায় একপশলা বৃষ্টিতে ভিজিয়া গেল ক্লিন্ন মনটা। বেশ প্রফুল্ল মনে হয়। আছেরকে ডাকে। শাওয়ারটা ছেড়ে দে! দেখ পানির অবস্থা কী? আমার মনটা বেজায় মন্দ ছিল। নাস্তা কী করেছিস। প্রহরটা বেশ চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিপুলরকম তরঙ্গ তাহাকে ছেয়ে ফেলে। পলা দাঁড়ায়। উঠিয়া কয়, জানালাটা খুলে দে। তুই একটা কার্ড নিয়ে আয় তো। আজই রজতকে ফোন করবো। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর তো কাটেনি। রজতই যদি আকর্ষণ করে তবে ননী কী মন্দ! তাহাকে সে যেভাবে পাইল তা কী? রজতের প্রতি আকর্ষণই বা কেন? রজতও কী পুরুষ নয়। কিন্তু বিপরীত প্রতিরূপের বাইরে একপ্রকার শ্রেয়োতর প্রেম বুলাইয়া ওঠে, শিউলি ফুলের মতো। সেখনে ভোর আর নগ্নবাতাস এক হইয়া গান তোলে। তাহাতে রজত আগাইয়া আসে। নির্বাচিত হয়। সে যাইবে, দেখিবে এবং চলিবে। তবে এর মীমাংসা কই? পার্থক্য তো রহিল না। একা আর রহিবে না! না রহিবে! চলিবে, আসিবে, তাহার সঙ্গী যেই হোক, রজত এখন অন্যতর। পলা কেন যেন ওই স্বপ্নের ভেতরেই ননীকে বাতিল করিয়া দিয়াছিল। বিপরীতে উঠিয়া আসে রজত। তবুও সে জানে ওর ভেতরেই তাহার অবস্থান বুঝি সত্য হইয়া উঠিয়াছে। তবে কী ইহাই প্রেম! এর মধ্যে কী রমণীমুদ্রা নাই। সমর্পণ নাই। তুচ্ছতা নাই। পুরুষতন্ত্রের অনুগ্রহ সে পাইবে না? সবকিছু ছাপাইয়া তবে রজত কেন উঠিয়া আসে। সে কেন অবিসম্বাদিত রূপে তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়ায়— ঠিক প্রশ্নাতীত হইয়া ওঠে যেন সবকিছু। পলা নিজেই অনেককিছুর উত্তর খুঁজিয়া পায় না।
এসব ভেতরের প্রশ্নের ভেতরে জোসেফ কানরাডের হার্ট অব ডার্কনেস পড়া যায়। ওটা শেষ হলে টমাস মানের দীর্ঘ উপন্যাস ম্যাজিক মাউন্টেন নিয়াও বসা যায়। উপন্যাসের নিখুঁত বিবরণীতে মন তৃপ্ত হয়। কতো সুকঠিন জীবনের আঘাত তীব্রতর হইয়া ধরা দেয়। সময়ের প্রবাহে রজত কেন যেন এক আশ্রয় প্রশ্রয়ের কিনারায় দৃশ্যমান হয়। সেখানে সে বহাইয়া আনে কলাপাতার সুবাস। তুমুল গন্ধের ভেতরে ছায়াঘন কুয়াশার আস্বাদ তৃপ্তিময় হইয়া ওঠে। কতো কঠিন হৃদস্পন্দনে সর্বরকম ভোরের আহ্বান তাহাতে বহাইয়া আনে। পলা একের পর এক উপন্যাসের পাতা ওল্টায়। ননী গোপাল কই! সত্যিই বাবা একজন ভালো ও শিক্ষিত ছেলেকে নির্বাচন দিয়াছিলেন। সে নানা যুক্তিতে বিজ্ঞান চেতনার সঙ্গেও যুক্ত হইয়াছিল। যে বিজ্ঞানমনস্কতা তাহাকে যুক্তির জালে সারাক্ষণ আটকায় সেটি ননী গোপালেরও ছিল। কিন্তু পুরুষ বলেই মনে হয় তাহাকে। পুরুষের শক্তিতেই সে স্বাবলম্বী। সেখানে অন্য কারো সংযুক্তি মানে আটকাইয়া যাওয়া। হায়রে পুরুষ! সে ভয় পায়, সাহসী হইতে পারে না, কাপুরুষ হইয়া নিজেকে সমাজ-নিরাপত্তার ভেতরে রাখে আর হিপোক্রেসি কইরা অন্যরে পরামর্শ দেয়। এ পরামর্শের ভেতরে কষ্ট আর গ্লানি ছাড়া আর কী আছে। এরকমভাবে এক সময় সে মনের পর্দায় নষ্ট পচা মাছিহানা কুমড়ার ন্যায় গলিত বস্তুতে পরিণত হয়। সেখানে সে চিহ্নিত হয় পলাতক হিসেবে। ফেরারির সম্মুখে কিছু নাই, শুধুই পলানোর ভয়। জীবন থেকে, সমাজ থেকে, নিজের মন থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়। পলায়নপর মানুষ হিসেবে সে পরিগণিত হয়। এমনটা তো অধিকাংশ পুরুষ মানুষই। আচরণে এক কর্মে আলাদা। তারা প্রকৃতির ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধরে। নিজের জীবন থেকেই তারা পলাতক। কারণ, যাহা বিশ্বাস করে তাহা করিতে পারে না। আবার যাহা তাদের অবিশ্বাস তাহাই করিতে হয়। পলার অভিজ্ঞতার স্কেলে ননী গোপালই সূত্রধর। সেইটি সে নিজের নানা প্রান্তের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলায়। এই অভিজ্ঞতাই জীবনের নতুন প্রবর্তনা। সেখানে সে চিনিতে পারে নতুন নতুন অনেক রঙীন মুখোশ ও চরিত্রকে। বিশেষভাবে যিনি কৃতজ্ঞতার ঝুলিতে আবদ্ধ করিয়াছেন তিনিই অনেকভাবেই এখন সত্যে পরিণত হইয়াছেন। তবে ননী মানুষ হিসেবে অপরিচ্ছন্ন নয়। বিজ্ঞাসমনস্কতার ধারে কাছে যেখানে মানুষ পাওয়া কঠিন সেখানে সে এ পর্যায়ে প্রখর যুক্তিবাদী ও অনেস্ট। তবে রজত থাকে অপার অনুভবে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করিয়া। রজতের প্রতি তার যে আকর্ষণ সেখানেও তো এক অর্থে তার নীতি ও আদর্শের প্রতি প্রতারণা— ননী আর রজতের প্রকৃতি কী ভিন্ন? সেখানে শৈশবের সংযুক্তিই তাহার কারণ বলিয়া মনে হয়। পলা একপর্যায়ে তারবার্তা পাঠায়। সে রজতকে পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। মোনাইলের রজত! ঠিক কীভাবে তিনি এ পর্যায়ে আসীন— সে বিষয়ক প্রভূত অভিজ্ঞতা তাহার নাই। কিন্তু একপ্রকার প্রবল আত্মবিশ্বাসী হইয়া উঠিলে নিজের প্রশ্নটি জোরাল হয়। কিন্তু সে যোগ স্থাপন করে। আছেরকে ডাকিতে থাকে। সে নাই! বাইরে ফিরিয়া তাকায়, ধেয়ে আসে সেই পুষ্পবৃষ্টি— বাচুপান কে মোহাব্বাত কো/ দিল সে… না যুদা কার না/ যবইয়াদ মেরিয়া আয়ে মেল মি কি দুয়া কারনা কিংবা মেরায় দিল ইয়ে পুকারে আজা/ মেরায় ঘুম কে সাহারায় আজা/ ভিগা ভিগা হেসামা এইসে মেরে ফুকাহা… সে সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়া যায় এক অপূর্ব রোমান্টিক জগতে। সে স্মৃতিময় সুধায় ভরিয়া আসে বাবা আর জগদলের বৃষ্টিমুখর মুহূর্ত। মিউজিক তবে বুঝি স্মৃতিকে ধরিয়া রাখে, মনকে পবিত্র করে, মরে ওষুধও বটে। সে পুরো ‘লেখে পেহলা পেহলা পিয়ার ভারকে আখো মেখো মার যাদু নাগরিব পেয়াইয়া… হে কইই যাদুগর’ মনে আসিলে ঈষৎ বাঁকা মুখের দেবআনন্দকে মনে আসে। মিউজিকের সঙ্গে রংঢংয়ের কী অসামান্য মিক্সিং তাকে হাসির উত্তাপের ভেতরে ঠেলিয়া দেয়। পলা ফিরিয়া চলে, রোদের পৃথিবীতে। যতোদূর মানুষের চোখ চলিয়া যায়, অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত সে জন্মাইতে দেখে। আর ভুলিয়া যায় অগণন মানুষের শরীরের ভেতরে এক বন্দিনী নারীর জীবনের গল্পকথা।
সত্যিই একদিন রজত ফিরিয়া আসে। এক দমকা বাতাসে নারীরূপী পলার রূপ ও মনকে সে যতিহীনভাবে গ্রহণ করে। অনেক দিনে স্রোত আজ হিজলের সূর্যকিরণে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে। নগরবাড়িতে নতুন আলোয় অন্ধকারের মুখ যেন ঢাকিয়া যায়! তবে ঠিক অনুমানও সহজ হয় না। নাকি আলোই ঢাকিয়া গেল। অরব প্রহরায় ঘরে ঢুকিয়া চুম্বনে ভাসিয়া দেয় পলার শরীর, অনেক দিনে বুভুক্ষু ক্ষুধা নিবিড় হইয়া আসে। নিষ্ফলতার অধম অন্ধকার পলাইয়া যায়। নতুন এক আত্মবোধের দ্বীপ জাগিয়া ওঠে। তোমারে জেনেছি কহিয়া এক নতুন পৃথিবীর প্রাণ সে উপভোগ করে। জামের বনে দেখা দেওয়া হলুদ পাখি গান ধরে। রজত আর পলা, পলার প্রেরণায় রজত আজ এ বাড়ির অতিথি। কী এক পূর্ণতার ভেতরে নক্ষত্র আকাশ বুঝি নীড় খুঁজিয়া পাইয়াছে। ঋতুর কামচক্রে হেমন্ত খুব স্থির। পলা নিজ হাতে রাঁধিয়া চলে এবং সপ্রতিভ গতিতে মনে আনে কল্যাণের গভীরতা। অনেক কিছু সে পেছনে ফেলিয়া আসে। প্রশ্নের অনেক স্থিরকথায় হংসী প্রেম কেন রক্তের ভিতরে প্রবেশ করে! পলার আদর্শ আর ওই ফেনেগানস জগতের ভেতরে যুদ্ধ-রক্ত আর রিরংসা বুঝি ঢাকিয়া গেছে। পলার অহংকার দূরীভূত। বাবার জীবনকেও সে এখন ইতিহাসের রৌদ্রে ভাসাইয়া দিয়াছে। কিন্তু কেন? একশ এমন সম্পর্ক সঠিক নিশানা পায় না। পলার ভেতরে সে ধারণা অমূলক মনে হয় না। কিন্তু রজতের সবটুকু সে গ্রহণ করিতে চায়। সম্প্রদায়গত বিভেদে, অনেক বড় প্রতিরোধ তাদের আছে, রজত সেটা অতিক্রম করিতে পারে না। কিন্তু পলা সেটি মানিবে না। এভাবে যুদ্ধ এবার নতুন মাত্রা লইয়া চলিতে লাগিল। সেখানে রজত আর পলার সম্পর্কটি একরথে চলিলেও ধর্ম আর সমাজের দেশীয় উপলক্ষ্যে প্রাণের একাগ্রতা শ্রীহীনতার টাটকা স্বদে থামিয়া যায়। কিন্তু পলা বেশি অনুভবে জড়ায়। সে অনুভবের স্বীকৃতি কী কেমন এসবের অর্থ তাহার কাছে মূল্যহীন। রজতের নিকট যা গুরুত্বপূর্ণ। তবুও পলাই সম্পর্কটি অফুরন্ত রৌদ্রের উৎসবে টানিয়া চলে। আজও সে আসিয়াছে। আছের সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া দেয়। এ বাড়ির ভৃত্য হিসেবে সে সবকিছুতেই সাময়িক হইলেও রজতকে সে গ্রহণ করিতে পারে না। পলার তীব্র অনুকম্পায় সে অনেক কিছু অবিশ্বাসের দুলুনিতে দোলায়। তখন তাহার চোখ ভরিয়া জল আসে। মিনতি দুর্বার হইয়া আসে। কী এক প্রচুর সৌভাগ্যই সে পাইয়াছিল, সেখানে রজত কেন! কী তাহার উদ্দেশ্য, কোথায় তাহার পরিণতিÑ আছের ভৃত্য হইয়া এসবের কী অনুমান করিবে। কিন্তু যে জীবন ফড়িংয়ের উৎসব আছিল সেখানে এই নতুন রূপান্তর কী অচিন নয়, কে তাহাকে এপারে ঠেলিয়া দিল? ধর্মবিভেদটা বাড়ির বাইরে গুরুতর হইতে পারে কিন্তু পলা ওসবে ঠিক বেপরোয়া হইয়া পড়ে। যেভাবে পাশের বাড়িতে পুলিশ আসিয়াছিল, সে কুকর্মের অভিধা দিয়া চোরকে সাক্ষ্য করার কথা দিদির মনে নাই বুঝি। আছের সাহসে ভর করিয়া তাহা একদিন বুঝাইয়া বলে। তখন পলা কাকাতুয়া দেখিয়াছিল, ডাহুকের ডাক শুনিয়াছিল, সেই ডাক বুঝি এবার এ ঘরেও কেউ ডাকিতেছে। একে কী বলে! কাহার আকুতি তাহার প্রতি চাহিয়া আছে? কেন সে তাহাকে প্রশ্রয় দেয়। রজত তো অনেককালের হইলেও এখন কেন ছাড়িয়া যায় না। অনেক প্রশ্ন ঘর ছাড়িয়া বাইরে আছেরের কাছে আশ্রয় পাইল। ঘরের সীমানা ছাড়্য়াা তাহা একদিন বাইরের রাস্তাতেও গড়াইল। পলার ভেতরের সুখ সকলে জানিলে সে কী করিবে, এসংসারে তো তাহার কেউ নাই, কিন্তু না বুঝিয়া সে প্রেমের মরা জলে ডোবে না— ভাবিয়া অকাতরে সময় বিসর্জন দিতে থাকে।

সাত.
একাকি মেয়েটির মনের আর বাইরের ঝড় প্রবল হয়। সে রজতকে নিয়া আর ভাবিতে চায় না। রজতের কর্মকাজ চলিয়া যায়। রজত কর্মে পটু। সে বিচিত্র রহস্যে ও অনুসন্ধানে ভরপুর। কিন্তু আশৈশব গাছ নদী মেঘ আর রৌদ্রমাখা সময়ে সে তো তাহারই। কর্মের মাঝেও সেই তাহার কেন্দ্র। যে পলা তাহার কাছে গড়িয়া ওঠে বঁইচির ঝোপ আর শাঁইবাবলার ঝাড়ে— সেখানে টুপটুপ বৃষ্টি আসিলে যে পতনের শব্দ শুনিতে পায় সে তো তাহারই আলিঙ্গন, ক্লান্ত কষ্টেও সে হইয়া ওঠে বটের পাতার মসৃণ পথ। কিন্তু রজত এক পর্যায়ে এসে দৃঢ় হইতে চায়। সমস্ত সংস্কারগুলাই বুঝি তাহাকে কঠিন ও ক্লান্ত সিদ্ধান্তের দিকে আগাইয়া দেয়। মাঝে মাঝে সে ক্লান্ত শকুনের মতো হইয়া ওঠে। পলার ক্রমিক সম্পর্কটি ঠিক বেশিদিন না হইলেও সময় তো আগাইয়াছে। বছর ঘুরিয়া আসিয়াছে। বন্ধুমহলে বা বাইরের এনডেন্টিং-এ তাহার কাজে ধীরগতি আসিয়াছে এখন। তবুও সেসব নিয়া তাহার স্বতন্ত্র জীবনে কোনো ভয় বা দ্বিধা প্রবলরকম নয়। কারণ সেগুলা একটা পর্যায়ে পুষাইয়া লওয়ার ক্ষমতা তাহার আছে। তবে চলাফেরার মাঝে খুব একটা দ্বিধা বা আড়ষ্টতাও যে নেই— তাহা নয়। কিন্তু সে পলাকে ক্যাজুয়ালি দেখিতে চায়। নীরবে নিঃশব্দে সে আসলে নারীর প্রতিমূর্তিতেই তাহার স্বরূপ ফিরে চায়। এ ধরনের নারীরূপ প্রকাশ পাক সেদিকেই তাহার অনিমেষ নজরদারি। এসব নিয় পলার এই গৃহে অনেকবার সে ভাবিয়াছে। সেখানে সে টিকটিকির সঙ্গে খেলিয়াছে— এইসব সিদ্ধান্ত নিয়া। তখন বাইরে প্রখর রোদ্দুরের আলো বিজলীরেখা অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে। কোনো এ পার্শ্ব দিয়া পলা তাহার পাশ থেকে উঠিয়া গিয়াছে। পলা কাঁদছিল। সে কান্নার ভেতরেই সে দেখে এক স্ফটিক আলো খুব তীক্ষ্ণভাবে তাহার চোখে লাগিতেছে। এইটা কীসের আলো! তাকাইয়া ও মুখ ফিরাইয়া দেখে এক টিকটিকি দেওয়ালে খেলা করিতেছে একটি উড়ন্ত পোকার সঙ্গে। সে পোকাটি আর টিকটিকির খেলা তুমুলভাবে বাহাজপ্রবন হইয়া ওঠে। কে কাহার অস্তিত্ব ধরিয়া রাখিবে তাই নিয়া তুমুল ধস্তাধস্তি চলিতেছে। সেখানে অনেক আলো নাই কিন্তু এই তুচ্ছ আলোতেই তাহাদের যুদ্ধ চরিতেছে। টিকটিকি পোকার কাছে যখন পরাস্ত হওয়ার পথে তখন সে বেশ বলপ্রয়োগে তাহার শরীরে আঘাত করিতে চায়। কিন্তু খুব বুদ্ধিদীপ্তরূপে তাহা কৌশলে আয়ত্বে আনিতে পারিতেছে। রজত এ খেলার অংশীদার হইয়া যায়। পলার অশ্রুরেখা তখনও চলে। সে ওয়াশরুমের দিকে ধাবিত হইলে দেয়ালের ঠিক প্রান্তরেখায় যুদ্ধ থামাইয়া তাহারা কী যেন ঠাহর করিতে চায়। তখন সবকিছু থেমে যায়। বিরতি আসে। ক্ষণিক সময় পরে আর যুযুধান মনোভাব থাকে না। ছাড়াইয়া নেয়। রজত গভীর হয়ে ওসব তা- দেখিয়া চলে। এ বাড়ির দেয়ালে প্রচুর কাজ আছে। কোনোটা অহেতুক, কোনোটা বেশ সৌন্দর্যমতি। ভারতবর্ষের দক্সিণে সে অনেক মন্দির দেখিয়াছে। সেসব মন্দিরের প্রাচ্যীয় স্থাপত্য তাহাকে মুগ্ধ করে। সে বিস্মত হইয়া অনেকদিন সেসব স্থানে কাল অতিবাহিত করিয়াছে। বিস্মত তো কম হয় নাই। অনেকদিন সে মন্দিরের পাশেই হোটেলে নিয়া থাকিয়াছে। বেনারস কিংবা খাজুরাহ, অজান্তা-ইলোরা কিংবা লাক্ষেèৗতে বারাসাতে কোথায় সে যায় নাই। কিন্তু সে সব কিছু নয় এক ধরনের গোথিক অবয়বই তার চোখে পড়ে। এর মধ্যে মুসলিম কিছু আছে তাও বলা চলে না। অত্যন্ত আগ্রহ নিয় সে পলাকে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্র্কটি কী বলবে? কবে কীভাবে এটা তোমরা নিয়াছিলে? পলা ক্রুদ্ধ ফণিনীর মতো বলিয়া ওঠে, ওসবে তোমার কাজ নাই। এ বাড়ি নিয়া তোমার কোনো প্রশ্নে আমার আগ্রহ নাই। ওসব তৃতীয় মার মতো কথা বলিও না। বিহ্বলরূপে সে বিষম হয়। কিন্তু গোথিক প্যাটার্নের ভেতরে যে বাঁক সেইটিই এখানে আছে, নিশ্চয়ই এটি বেশ পুরনো বাড়ি। পলে তাহার কাজের ফাঁকে যত্ন আছে। এই যত্ন তো এখন বিলীন। যেভাবে সবকিছু পুঁজির চলমান চাকায় আটকাইয়া গিয়াছে, তাহার নিশানা নাই, নির্মাণও নাই। টিকটিকি আর নাই। এখানে অসংখ্য ঘন ঘন ফুটা, তাহার ভেতরে বাইরে জুড়িয়া বসিয়াছে মাকসড়সা। ছাদজুড়ে মস্ত ছায়াময় আঁকা প্যান্ডেল। তাতে ভর করিয়া আছে নানা রঙের ছায়া আর স্মৃতির নকশা। মনে পড়ে পলার বাবা চৌধুরীকে। কিন্তু রজত সংস্কারের চালাকিতে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়িলে পলার প্রেম আর বৈরাগ্য নিয়া সে মাঝে মাঝে ভয়ও পায়। ভয়ের ছবিতে তাহার ছায়া দুলায়। সে কোন পথে চলিতেছে। আদৌ তাহা নিষ্ঠুরতার দিকে তাহাকে টানিয়া নেয় কিনা। দায়িত্বই তো একটি মানুষের জীবনের সব নয়। এর বাইরে মনের বিহ্বলতা বা আকুলতাও তো একটি বস্তু। তাহার দাম মানুষ ছাড়া আর কে দেবে! এরূপে মসৃণ তুলি হাতে নিয়া সে জীবনের ছবিগুলি আঁকিতে থাকে। নীচে নামিয়া আসে। এক চিলতে উঠানে তুচ্ছ একটি গাছে সে জন্মের উৎসবে ব্যাকুল। ইহা কী পুরনো বটগাছটার নবীন রূপ! বৃক্ষের টানে বটটা আর মনে রাখার মতো নয়। নতুনটাই এখন জন্মোৎসবের মোহে কাতর। সেখানে দাঁড়াইয়া সে নিজেরও জন্ম ও মৃত্যুর খেলা বুঝিতে পারে। একটু দূরে একটি পরিত্যক্ত ইঁদারা। সেখানে অনেককালের জল জমিয়া আছে। স্থির জলে পোকা ভাসমান। মুখ দিয়া সে দেখে। মুখ নাকি তাহার অবয়ব। সে কাঁপে, টুপ করিয়া পোকার লম্ফঝম্ফ দেখিয়া থামে। তখন তাহার মুখশ্রী কাঁপে, শীর্ণ ঢেউয়ে দোদুল্যমান হয়। এক দুই তিন ঢেউয়ে ধারা জন্মে। সেখানে ধারণা তৈরি হয়। আকুলতাও আসে। তখন অনেক দিন হয়ে গিয়াছে, পৃথিবী চলিয়া গিয়াছে— ভরা কলসের শব্দ, ঝনঝন আওয়াজে বাটিবাসনের শব্দ, তীব্রতর হয় উপরের অনেকজনের পালাক্রমে পানি ঢালার শব্দ। শব্দ আরও সত্য, উপেক্ষিত শব্দ, আলোড়িত শব্দ, বালতির-কুটিকালেরপাত্রের ধোয়া কোমল হাত আর স্নেহভরা মন দিয়া সবকিছু রচিত। এ রচনার ভেতরে উঁচু একটা স্তম্ভ— যেখানে অযু বা অর্চনা চলে। এই নিমিত্ত ক্জা ছাড়াও ওখানে বসিয়া পাড়ার কলহ মিটানো যায়। কলহের কেন্দ্রে যিনি তিনি একটু নীচুতে থাকিবেন আর যিনি বিচারদাতা তিনি উপরে অন্যরা সব আম-পাবলিক। কিন্তু কম্পমান মুখ থরে সাজানো ইটের ভেতরে ভাসে আর চলে থামে আর নড়ে। ইটগুলার ফাঁকে পুরনো শ্যাওলা আর একটা চিকন সাপ লম্বা করিয়া শুইয়া ধ্যানস্থ নাকি ঘুমায় ঠিক বোঝা যায় না। আছের ঢিল দিলে বুঝি তাহার ধ্যান ভাঙে। সে বোলায়, নাড়ে আরও কিছু করিতে চায় স্তনের বোটায় তুমুল আদরের খেপ তোলে, সরিয়া যায় ফর্সা বুকের চতুর্দিকে, তাহার বুক কালো ও ফর্সা নাকি সেও ফর্সা ঠিক টের পাওয়া যায় না। কিন্তু সে সাজে বেশ ফনাইয়া ওঠে, রাগ নাই কিন্তু প্যাঁচাইয়া ধরে, সাজে, চুম্বন দেয়, খুব ভালোভাবে আকাড়িয়া কয় মিশে আছি তোমার শরীরে। তখনও ঢেউ কাঁপে নাকি আরও দোলা দ্রুত হয় ঠিক বোঝা যায় না, তরঙ্গই তো, কিন্তু সাপের পঙ্গরে তা অন্য ঢেউ সৃষ্টি করে। আরেকটি ঢেউ পাইলে দেখে পলাও আসিয়াছে। সে তো তাহার পাশে। নাগ-নাগিণী পাশাপাশি। ওই পানিতে সে খুঁজিয়া বেড়ায়। ঠিকই ইটের ফাঁকে জিহ্বার পিলপিল আহ্বানে বেরিয়া আসিল। তারপর একটু খুনসুটি ভরা পাখিপলক নির্বাপিত, তারপর খুব কাছাকাছি। পলার ফোরা চোখ এখন একটু প্রশান্তিময়, সেখানে ডানা মেলিয়া চিল উড়িতেছে, ভয় বা দ্বিধা আর অনেক প্রশ্ন আপাতত অন্যায় করিয়া পলাইয়া গিয়াছে। রজত মুখ ফেরায় না। সে ইঁদারার কূপে বশীভূত মনে হয়। বশে আর বিষণ্নতা থাকে না। কেটে যায় সবটুকু গোয়ার পুঁজির লাভ আর বিনিময়। সাপের সন্তর্পনে গর্জায় কম্পমান মুখ আরও গভীরে তলাইয়া যায়, দ্রুত উপর নীচ করে, ভাসে, গতি পায়, মন্থর হয়, কিন্তু নাগ আর নাগিন এখন বেশ মুখোমুখি। সে হস্ত ডানার মতো প্রসারিত করে। হাত বাড়ায়। পলা নাই। কেন? দূরে, সে দাঁড়াইয়া আছে ওই জন্ম বৃক্ষের তলায়। হাত গুটাইয়া, চুল ছাড়িয়া, ওড়না ঝুলাইয়া, খোলা পঞ্জে পা ঢুকাইয়া, ঢোলা স্যালোয়ার পরিয়া আর প্রিন্টঅলা সুতির কারুকাজে বুনানো জামা পরিয়াÑ কী এক মুগ্ধতা! সে কী যেন খোঁজে। কিন্তু রজতের হাতচাড়া সে এখন। ইঁদারায় তাহার কম্প্রমান মুখে সে এখনও ঝুলন্ত, সম্বিৎময়। তারপর চীৎকার। কাহার ঠিক বোঝা যায় না। হাহাকারের চীৎকার। কে যেন খুন হইয়াছে। সে খুন হইলো! কইয়া যায় আছের। নাহ এ খুন সে খুন নয়, পাশে পাশা খেলা চলিতেছে! সে খেলায় যাহা হারজিৎ তাহাই খুনোখুনি। যাহা উল্লাস তাহা শোষণ বা সনাক্তময় রক্তরেখা। অনেকমুখ এখানে আসিল কোন সময়! চীৎকারের পরই পলা আসিয়াছে। এবার সে হাতের মুঠোয়। পলা পত্রপুটে বন্দিনী, এই বন্দিই আমার প্রাণেশ্বর। টুপ শব্দে ঢিল ছুঁড়িলে সে মাথা তোলে, কে এই কুয়াপাড়ে নাকি ইঁদারা পাড়ে আসিয়াছে রে! ইঁদারাই তো উদারা, এখানেই শুরু হয় স্বরগমের প্রথম চরণ। সক্কালের ভোরে সকলেই আমন্ত্রিত। সেখানে বাড়ির কুশল আর কাহার কী সম্বাদ তাহা রেকর্ডে আটকা পড়ে। এরপর আবার একদল তারপর দলের ভেতরেই দল, দল আর দল, কেউবা যায় কেউবা কথা কহিতে কহিতে আসে, আসা যাওয়ার মাঝে সাক্ষাৎ আর সম্বন্ধ রচিত। এই মাটি আর কণারাশির ভেতরে সেই শব্দই প্রতিধ্বনিত। তাহাই সে এই কূপের ভেতরে ক্রম-অভিযাত্রারূপে পাইতেছে। ভয়ও তৈরি হয় তাহাতে। কারণ, উহা চৌদ্দ হাত পরিমাণ খালি ইটের উপর ইট দিয়া গাঁথা। তাহার পর আরও আছে। গভীরে নাকি এক সময় কুমীরও আছিল। সে কুমীরের ছিল কুম্ভীরাশ্রু। সে পলাকে ঠাট্টা করিয়া একবার কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণের কথা কহিয়াছিল। তখন সে কষ্ট পাইছে। তাহাতে আরও কয়েকদিন বিষণ্নতার প্রহর আর সন্দেহের সীমারেখা বৃদ্ধি পাইয়াছিল। কয়েকদিন তাহাকে ছোঁয়া বেশ দুষ্কর আছিল। পরে কী করিয়া যেন সবটুকু বাষ্পাচ্ছন্নতা পাইয়া উবিয়া যায়। সময় নষ্ট আর প্রেম নষ্ট ধরিয়া চলে— এইসব কুম্ভীর বিষয়ক কথকতা। তারপর সে সতর্ক হয়। পলা আর শোনে নাই কিন্তু সন্দেহটা কিংবা এইসব কথনের সংজ্ঞাটা ভেতরের মণিকোঠায় সুন্দর করিয়া স্থাপন করিয়াছে। এসব আর সহজে বাহির হইবে না। এই ইঁদারায় তখনও মুখ কাঁপে আর ভয় ধরে, পায়ে কী সাপ বাঁধিল, পা ঘোরায়, তাহার হাফপ্যান্ট আর কোলাপুরিটা টানে বাহির করে, নাহ পিঁপড়া ঢুকিছে, তয় অশনি কাকা দূরে কাকা করে ক্যা! ওই কী আমারে কপালডা খাইতে চায়। এমনিই তো পলারে লইয়া মহাবিপদে আছি। তাহার ওপর আবার বিপদ সংকেত দেয় কিনা! রজতের মাথা ঘোরে, সে দুইটা মুখ দেখে ক্রমশ তা বাড়তে থাকে চার ছয় দশ এতো মুখ কেন, তোমার ভেতরে ক্যান এতো মুখ, জনতা ঘিরিয়া আসিয়াছে, হেন্দু শালা হেন্দু এই বাড়িত থাকি কী করোস! পাড়ার ইজ্জত ডুবাইচস। হারামীর পূত, বাড়িত্থেন বারা… শালা কুত্তার বাচ্চা, মালুর বাচ্চা, বাইর হ, পলা তীব্রবেগে বাহির হয়, নাহ, কে তোমরা! এখানে কেন? ও আমার লোক। ওর দায়িত্ব আমার। সমস্বরে পাড়া নষ্টের হুংকার দেয় চল্লিশোর্ধ্ব কিছু যুবক। কীসের পাড়া নষ্ট! কোন বংশ তোদের। চৌধুরীর মেয়ে এই নগরবাড়ির মেয়ে সে কোনোদিন পাড়া নষ্ট করবে না। তোরা বিশ্বাস রাখ। কে তোদের উস্কাইছে। এরকম করে তোরা শুয়োরের দলের মতো আসছিস কেন? যা, চলে যা। কোনো অঘটন আমি ঘটাইনি। তোদের কোনো সমস্যা আমি করি নাই। এভাবে আসিলে ঘটিলে এই এলাকার ছাড়িয়া, জয়গা জমি লোপাট করিয়া চলে যাবো। তোদের সম্মানের হানি আমি করবো না। কে একজন মুরুব্বী নারীকণ্ঠের দুর্বার শাণিত গলার স্বর শুনিয়া কন্ভিন্স হইয়া কয়, চৌধুরী সায়েবের মাইয়া তো! চল পরে দেখা যাবে। কী সব রকম যে ব্যাপার… আইল এক ভিনদেশী তাহার নাগর নিয়া এ পাড়ায়…। উফ বিচ্ছিরি… আছের আছের পানি আন? হ ম্যাম পানি চাইছে। যা, রজত তখনও আওয়াজ শোনে, এক নয় অনেক তাড়াইয়া আসে, ভয়ানকরূপে আসে, ভীতিকররূপে আসে, দাবানলের ন্যায় আসে কানে প্রতিধ্বনিত হয় অনেক বার, অনেক রঙে আর অনেক বর্ণে, অনেক ছন্দে। তবে সমাজে কী তাহার অবস্থান এখন দ্বিতীয় শ্রেণির। গলার স্বর নিচু। সাপদ্বয় এবার জড়াইয়া নিয়াছে উভয়কে। দেখ দেখ… পলাকে সে ডাকিতে চায়। কিন্তু বিষণœ পলা এখন কঠোর ও আগুনে আক্রান্ত। সে পলাতক কিছুই মানিতে চায় না। সে ভীরু নয়। সে অপরাজিত নয়। রজত আর ননী গোপালের যে কোনো পার্থক্য নাই তাহা তো আর কোনো রেখা দিয়া আলাদা করা যাইবে না। কিন্তু তবুও রজত তাহার অনেক প্রিয় হয়। শরীরের দুঁহুঁ সম্বিৎ কাটে না। বিচ্ছেদ অনেক কষ্টের হইয়া ওঠে। বিরহ মানা যায় না। ননীকে সে যোগ্য অযোগ্য করিতে চায় না কিন্তু সে তাহাকে একপ্রকার আড়ষ্ট করিয়া ফেলে। অধিক কিছু থাকিলেও তাহার জন্য মনের আহ্বান নাই। তাহার ঠোঁটে মুখে চরণে নাই কোনো ঘাসের শোভা, নাই কোনো প্রেমময় আবেশ, সে পারে না জ্যেৎস্নার নদীতে রূপোলী রাজহাঁস চরাইতে— সে একরাশ পৃথিবীর বড় বেশি বৈষয়িক মানুষ। তবুও তাহার প্রতি আকর্ষণ আছে। কিন্তু প্রেম নয়। তাহার প্রতি আকাক্সক্ষা আছে, অবিশ্বাস নয়। রজত তো সবকিছুই হইয়া আছে। রজত রাজমণি। সে কী তাহা মুখ্য নয়, সে আমার, পলার। তবে কেন সে সবটুকু মিটাইয়া ফেলিতে পারিতেছে না। এভাবে হিন্দু-মুসলিম বসতি তো ক্রমেই সমস্যার ভেতরে নতুন সমস্যা করিয়া তুলিতে পারে। তাহারা কী বিবাহিত! বিবাহ তো একটি সামাজিক আচার। উহা অনেকালের চলমান রূপ! সেটিই তো এখন দৈনন্দিন তাহার প্রশান্তির জায়গা! সকলের গ্রহণযোগ্য জায়গা। তখন দল বাঁধিয়া আর কেউ আসিবে না। সমস্বরে চৌধুরীর মেয়েকে অসম্মান করিতে পারিবে না। সে কেন তবে সবটুকু সিদ্ধান্ত নেয় না! নাহ! মন আর নীতির বাইরে সে কিছু করিবে না। সে চোর নয়। যাহা করিয়াছে প্রকাশ্যই করিয়াছে। সবটুকুর দায় তাহার নিজের। রজত আর পলা একরকম জীবন যাপন করিবে। সেখানে তাহাদের মন আর মনের ভিটার বিশুদ্ধ চাষাবাদই মুখ্য। ইহা নিয়া সে এই কর্পোরেট সমাজে লুকোচুরি করিতে পারিবে না। কী হয় না এদেশে! ধর্মের নামে, সমাজের নামে, অর্থের নামে— সব মুখোশধারীরাই সমাজে এক বর্ম পরে আছে। তাহারাই তো দেশের অধিকাংশ সম্পদ লুঠ করিয়া চলিতেছে। তাহার সমস্ত অসামাজিক কাজ করে গোপনে, রাতের আঁধারে, লুকাইয়া, বিবেককে চাপা দিয়া, ধর্মের ন্যায়সত্যকে হিপোক্রেসী করিয়া চালাইয়া দিয়া— সেখানে তাহার অবস্থান স্পষ্ট। এজন্য সে মনের বিরুদ্ধ কিছু কেন করিবে। একাকী হইয়াই সে থাকিবে। একার ভেতর দিয়াই সে মনের সমস্ত শিক্ষা ও স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে প্রতিরোধ আসিবে, কিন্তু প্রতারক সমাজে সেটুকু প্রতিবন্ধকতা সে করিতে না পারিলে তবে কীসের শিক্ষা সে অর্জন করিয়াছে। বাবা অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরীর মেয়ে তো নিজের অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্ব নিয়া চলিবে। সেখানে সে যতো প্রতিবন্ধকতা আর প্রতারণা দেখুক সে প্রতিরোধ করিবে, যুদ্ধ করিবে, জয়ী হইবে। নয়তো এ জীবনের কী লাভ। প্রতারণার জীবন লইয়া সে কী করিবে। ক্রমশ সে সিদ্ধান্তের দিকে আগাইয়া চলে। কিন্তু রজত! সে তো পুরুষ! সেও প্রতারক? নইলে সে কেন পলাকে কুম্ভীরাশ্রু বলিয়া তাচ্ছিল্য করিবে। সে কনে নিজেকে মানুষ না ভাবিয়া দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করিবে— সেজন্য অর্থই তাহার নিরাপত্তা— সেটিই তাহার জীবনের দর্শন হইবে। তাহার বৈষয়িক জ্ঞানকে সে গুরুত্ব দিয়াছে কিন্তু এও তো সত্য যে একপ্রকার নব-জীবনানুসন্ধানী রজত অনেক বেশি ভালোবাসে পলাকে। জীবনবাদী মানুষ হিসেবে সে অনেক বেশি রুচিময় ও ভাবানুরাগী। পলা জানে মানুষের মূল্য কীসে! মানুষের ভেতরের সত্য কীভাবে প্রলুব্ধকর। কীভাবে সে সংগ্রামকে জীবনকে মোকাবেলা করে— যতো মত তত পথ— এটি তো দর্শনের কথা— তবে সে কেন তাহাকে নিজের জীবনের বোধ চাপিয়া দিবে। পলা তো নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত নয়— নিজের কাছেই, তবে তা তা কেন অন্যের জীবনের পাথেয় হবে। সকলেই তো একটি ধারণা নিয়া চলে, এই ধারণাই কারো কারো কাছে মত ও দর্শনস্বরূপ, সেটি একটি উচ্চতায় পৌঁছাইলেই সত্যটি দাঁড়ায়— পলা সেভাবেই তার মকে বিচার করে। কিন্তু অস্তিত্বের স্বাধীনতা তাহার প্রধান ধারণা।

আট.
রজত কমাসের জন্য চলিয়া যাইবে। এবার একটু ভারতবর্ষের বাইরেও তাহার সিডিউল। পলা যেতে চাইলে আপত্তি নাই। কিন্তু সে যেতে চায় না। রজতকে বলে, এখনও যে দিন পনের সময় তোমার আছে আমরা সেটুকুই উপভোগ করিতে চাই। চলো, মধুপুর ঘুরিয়া আসি। খুব ঘন বনানীময় রাস্তা। ওখানে একটা সরকারি বাংলোয় আমরা কাটিয়া আসি। কিছু আদিবাসীদের সঙ্গে দেখা হবে। পলা তো স্থির জীবন নিয়া, পুস্তকের কুটুরীতেই সময় কাটাইয়াছে। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর পর সে এই বাড়িতে প্রায় একাই। রজতের সঙ্গে যোগাযোগ আর ক্রমশ ননীর সঙ্গে সম্পর্কটা থিতিয়ে আসা— সব মিলিয়া সে এক স্থির জীবনের ভেতরেই সময় কাটাইয়াছে। রজত প্রস্তাবটি নিতে বরাবরের মতো দ্বিধা করে। কারণ, ভেতরের ভয়! সংকুচিত আত্মার পেছন ফিরানো টান। পলা ওসব তুড়িতে উড়িয়ে দেয়, যাহা সত্য তাহাই সদা সত্য— রজত তা মানিলে যাইবে নচেৎ নয়। ওই গহীন অরণ্যে কোনো দুর্ঘটনা হইলে পলা কী করিবে! কী পরিচয়ই বা তাহাদের! ওসব রিস্ক। নো নো… পলা বেদমরকম হাসিয়া ওঠে। পুরুষ তো! আবার হিন্দু পুরুষ! তাইতো এতো অবরোধ? একটা চারদিকের দেয়াল উঁচু করা ঘরই কী সবটুকু নিরাপত্তা মানুষের! প্রশ্নগুলি সে রজতকে করতে চায় না। এই নগরবাড়ি, এই ভিটে, পুরানা ইঁদারার পাড়, শঙ্খচিলের বাসা বাধা আমলকি গাছ, পাশের বাড়ির বাড়তি হরীতকীর শ্যাওলাপড়া ডাল আর এই ছোট্ট সবুজ পাতার নামহীন বৃক্ষটাই তো অনেকবার করে রজত দেখেছে, কাছে গেছে, কোমল করে আদর দিয়াছে কোনো অসুবিধা হয়নি। অনেকদিন ধরে এই তো চলছে। সে গেছে আবার ফিরে এসেছে। যোগাযোগ নানাভাবেই হয়েছে হয়ে চলেছে। তবে তাই হোক। এখন আমরা কোথাও যাবো না তাহলে— নাহ, ইচ্ছে করছে না। মনের ভেতরে সবটুকু সে পুষে রাখে, স্বপ্নগুলা থৈথৈ করে হেঁটে বেড়ানোর সুযোগ পায় না। রিস্ক রিস্ক, ভয়, অপমান, আত্মসম্মান দিয়ে ঘেরা রজত নামক এক পুরুষের জীবন। সেখানে সে দাম্ভিক কেন? কেন অহংকারী, কেন অনেকভাবে পুরুষ হিসেবে সমাজে জাহির করতে চায়। একসময় তো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানগুলা কতোকিছুই নিষিদ্ধ করে দিয়াছিল। এর মধ্যে তো স্বার্থ লুক্কায়িত ছিল। সে স্বার্থের পর্দা তো কেউ না কেউ ভেঙেছে। সামান্য সত্যের ভেতর দিয়ে অসামান্য সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একটি ন্যায়ের ভেতর দিয়েই দশটি ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। এইরূপ কর্মপ্রয়াসে জোয়ান আর্ক, এলিজাবেথ টেলর, প্রিন্সেস ডায়ানা, মেরিলিন মনরো এখন হিরো হইয়া বাঁচিয়া আছেন। মডেলরূপে বন্দিত। অথচ কেউ সেসব মনে রাখে না। কেউ মনে রাখে নাই, কেউ তা মনে রাখার দায়ও নেয় না। ইতিহাসের বড়ো সত্য ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। পলার এই চিড়িয়াখানাটা আরও মজবুত হয়ে পড়ে। কেউ এটা ভাঙতে পারে নাই। বাবাও পারে নাই। রজতও নয়। কারণ, সবাই পুরুষতন্ত্রের ধারক, ওই একই মন্ত্রের উপাসক— কিন্তু কেউ তো এ খাঁচা ভাঙবেই। কথাগুলা রজতের জন্য নয়। একটি পক্ষের ওপর চাপাইয়া দেয়া নয়, কোনো ধর্মের ভয়ের অবদমনও নয়—পলা জানে নারীর সংস্কার আর টানও তো আরও বহুদূর। কিন্তু তুচ্ছ তুচ্ছ বিশ্বাসগুলাকে আমরা কেন মারিয়া ফেলি। ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা আর সৎ অনুভবপুঞ্জকে কেন আমরা বিসর্জন দিয়া ফেলি— কেন একবারও বলিয়া ফেলি না ওই মহানন্দা তুমি যেন ছোট মেয়ে, তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আর আমারি নিজের শিশু সারাদিন নিজ মনে আমারি সাথে যেন কথা কই। সেটি মানুষের আকাঙক্ষা, শুধুই কোনো নারীর বা পুরুষের আকাক্সক্ষা নয়, গভীরতর জীবনের ভেতরের ঘুম, সে পাখি সেইতো শাদা পাখি, সে চরিয়া মরে মাঠে আকাশে বাতাসে। এসো তাহাকে আলিঙ্গন করি। মোনাইলের হইয়া কই বাঁশি কাহার আনন্দ কথা, কই সেই সাহসী অপাপবিদ্ধ মানুষের গল্পকথা। তাহারাই তো বিশ্বের সম্রাট সভ্যতার সম্রাজ্ঞী। প্রকৃত জন্মের স্বরূপ ও সার্থকতা তো তাহাতেই। পলার প্রতিরোধ যুদ্ধের রণাঙ্গন এরকম নানারূপে সজ্জিত, তাহার ভেতরে সুখ আর নিরন্তর শান্তির সদা মুক্তি নিহিত। সেজন্যই সে নিজের ভেতরের সংস্কারগুলাকেও দূরীভূত করিয়া ফেলিতে চায়। অপরূপ আনন্দ দিয়া তাহার শরীরের ছন্দকে পুরুষের ছন্দের সহিত মেশাইতে চায়। সাহস আর বিপ্লব তো সেখানেও। কাম আর প্রেমই তো বিপ্লবের সাহচর্য। রজত সবকিছু বুঝিয়া লয়। পলার আত্মাকে সে পিতৃভূমি মোনাইলের তালতলার পুকুর বলিয়া গ্রহণ করে। সেখানে প্রতিটি সঙ্গম আর ভোর নতুনরূপে আসে। অপরিসীম তৃপ্তি খা-বদাহন তাহাকে অনেক দূর ভেলাই ভাসাইয়া তোলে। ঘুরাইয়া প্যাঁচাইয়া অনেক সংহত সমীহে সে আলিঙ্গন করে। পরণকথার গন্ধে কাঁধ রোমশ বুক জঙ্ঘা উরু লোমরাজি পদনখ চোখ নাক মুখ গ্রীবা বুক স্তন নাভীমূল অনবদ্য কামাগ্নিতে পল্লবিত হইয়া ওঠে। এককালের অসীম অসূর যেন তাহারা, সেখানে স্রোত বড় উদ্দামময়, উচ্ছ্বাস বড় দুরন্ত আড়ম্বরপূর্ণ। এক সময় সে চুলে আর তাহার ভেতরে আত্মালালিত অবসর খুঁজিয়া ফেরে, তখন স্পন্দন-সংঘর্ষ গতি পায়, সব কালপুরুষ জেগে ওঠে, অন্ধকার যেন অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকে। রজতততত তুমিইইই পলা তার রৌদ্র আক্রান্ত পৃথিবীতে কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদ শুনিতে পায়। সেখানে কে ভয় পায়! কে তাহার পুরানা সংস্কারের ভেতরে মুখ লুকায়! কে সে বেঈমান নিজেকে নির্জীব বলিয়া ঘোষণা করে? মাঘসংক্রান্তির কাল উপচাইয়া পরে তখন তাবৎ পুরুষগ্রন্থিতে। নারীর কমলিনী আর ঘরে থাকে না, সে বলিয়া ওঠে আমি নীল কস্তুরি আভার চাঁদ। বেশুমার অনুগ্রহ অস্বীকার করিয়া তোমার কাঁধে উঠিয়াছি, আমাকে তুমি গ্রহণ করো, আমি তোমার সাহচর্যে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াই, তুমি কেন কুঁকড়াইয়া থাক, বেশ্যার আহ্লাদে উজ্জ্বল হও, নামিয়া আস ভয়াবহ আরতিতে। আলো আর স্বপ্নের কথা না বলিয়া উদ্যম হওয়ার অস্ত্র গ্রহণ করো, আমি অনেক দিন তোমাকে এইভাবেই পাইয়াছি, পাইয়া চাই। আক্রোশ তখন আর থাকে না। রজত হাসিয়া ওঠে, খাজুরাহ ভঙ্গিমায় সে জঙ্ঘা তুলিয়া নেয়, তাহার অপবাদ আর আড়ষ্টতা বাহিষ্কার নিয়া জন্মায়, অসীম মোহে স্তনের ভেতরে আকাশগ্রন্থি রচনা করিয়া চলে, সোনার হরিণ দৌড়ায়, পলা হিম হাওয়ায় জাগিয়া ওঠে— নীলবসনার সত্যে সে গাহিয়া যায় :
চঞ্চলা হাওয়া রে ফিরে ফিরে চল রে
গুণ গুণ গুঞ্জনে ঘুম দিয়ে যা রে
পরদেশী মেঘ রে আর কোথা যাসনে
বন্ধু ঘুমিয়ে আছে দে ছায়া তারে
বন্ধু ঘুমায় রে
পলার স্বরে মাঘনিশীথের কোকিল জাগিয়া ওঠে। ঘুমঘোর রচিত হয়। মেঘ আর মৈথুন রোরুদ্যমান হইয়া ওঠে। কী অসীম এক রাত্রির নক্ষত্র তাহাকে ভরিয়া তোলে। পলার ভেতরের সমস্ত রিপুদল যখন আত্মসাৎ করে রজত তখন সে চরম কোমলে বাঁধিয়া কহে : ‘ফিরে এসো’। তারপর টুকটুক আওয়াজ ওঠে, ওবাড়ির ঘরনীদের তাড়া চলিতেছে বুঝি— ঠিক জানা যায় না— যেমনটা উপসাগরের অথৈ ধ্বনি এখানে নাই— কারায় কিছু থাকে না। থাকে শুধু মানুষের জীবন।
রজত চলিয়া যাওয়ার পর পলার ভেতরে একপ্রকার সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। আবার সে এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের নতুন শব্দার্থ তৈরি করিতে চায়। প্রলুব্ধ স্বপ্নকে নতুন করিয়া জাগাইয়া দেয়। সম্ভাব্য জীবনের সন্ধান দোদুল্যমান করিতে করিতে সে নিজেই জ্যোৎস্নার শরে নিমগ্ন হন। যে সূর্য স্নিগ্ধ তাহাকে শাশ্বত সূর্যে পরিণত করেন। আছেরকে ডাকেন। এই ঘর পাল্টাইতে হইবে। পেছনের বড় ঘরটায় আমার সবকিছু নিয়া যা। এখন থেকে এই ঘরে আর কেউ বসত করিবে না। খুব দ্রুতই রজতের ইমেল সংবাদ আসিল। ফোনে অধিকবার কথা হইলেও লিখিয়া বচন বিস্তারিত করা তাহার অভ্যাস। এতে তার একটপ্রকার স্বস্তিও আছে। যতোটা অসাধারণ করিয়া সবকিছু অর্থারোপ করিতে পারে ততোটাই সে কথা বরার সময় নিরুত্তর থাকে। একাকি এখন সেও। শিঘ্রই সে গোয়া যাইবে। সেখানে সে তাহাকে সঙ্গে লইতে চায়। কেন পলা এসব আহ্বানে সম্মতি দিবে। মানুষের স্বভাব তো ক্ষেত্রবিশেষে আটকায় না। সেসব তাহার পছন্দ নয়। আর যে ঘরে সে সমাসীন হইতে চায় তাহা একান্তই নিজের নতুন শয্যা। অনেককাল আগে বাবা ট্রটস্কির কথা বলিয়া শিখাইয়াছিলেন অনেককিছু। পরে এ ধারায় এই নতুন বাংলাদেশেও হত্যাকা- হইয়াছে। যিনি মধুমতি তীরের মানুষ, যাহার আবেগ আছিল দ্যাশ স্বাধীন করা নিয়া, সে কঠিন স্বপ্নটি তিনি বাস্তবে রূপ দিয়াও বাঁচিতে পারে নাই। স্বার্থলিপ্সু বেনিফিসিয়ারির দল একে একে রাজার অনুচরদের অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকা অবস্থায় কারাকক্ষে হত্যা করে। কিন্তু পৃথিবী তো আরও নির্মম। বিশ্বাসঘাতকরা নির্বোধের মতো কিছুই বুঝিতে পারে নাই। নতুন রাষ্ট্রের পরিবর্তন আসিয়াছে, জীবনের গতিমুখ পাল্টাইয়াছে, পেছনের অভিশাপের লেশ এখনও শ্যাষ হয় নাই। কর্ম ও কাঠিন্য প্রভূতরূপে নীরব। বিন্তু পাখির ঝরনা সবকিছু মনে রাখে। কঠিন অভিশাপ যিনি বহন করেন তিনিও মরিয়া যান কিন্তু কালে কণ্ঠে দাগ রাখিয়া যান। বলির পাঠা হন মঞ্জুর নামের একজন, ইতিহাসে সে খুনী বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে, অথচ তিনি খুনী নন। খুনের দাগ আঁকিয়া রহিয়াছে তাহার নামের অক্ষরে। আজ বলিয়া ওঠে খালেদ হত্যার বিচার চাই, তাহের হত্যার বিচার চাই, হায়দার হত্যার বিচার চাই, মঞ্জুর হত্যার বিচার চাই— সকলের সাথে আরও অনেক নাম না জানা মুক্তিসেনারা নতুন দেশে কারণে অকারণে মরিয়া গিয়াছেন। বাবার স্মৃতি ঘিরিয়া যেসব হত্যাকা- সারাক্ষণ থাকিত, প্রলুব্ধ করিতÑ এখন তাহাই এই নতুন গৃহে বুঝি জমা হইল। সে এখন ট্রটস্কির জীবনী পড়ে। স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ, ব্রেজনেভ-এর পাশাপাশি স্টেটস্ম্যান চার্চিল, রুজভেল্টের জীবন ও রাষ্ট্রপরিচালন নীতির প্রতি তাহার স্বীয় আকর্ষণ এখন তুঙ্গে। এসব পড়িয়া সে এই দেশের ফিরে আসা প্রান্তরে ফিরিতে চান। স্বাধীনতার বীরযোদ্ধারা অকাতরে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা কারণে অকারণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই নিহত হইয়াছেন। যেসব মিলিটারী অফিসার শেখহত্যার পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে নির্মমভাবে হত্যার স্বীকার হইয়াছেন তাহারাই এ রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্টের বেনিফিসিয়ারি। কিন্তু ইতিহাস তো স্থির নয়। পলা তাহার বাবাকে দেখে। তিনিই বলিয়াছিলেন, সকল কমিটেড মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু বুঝি অবশ্যম্ভাবী হইতে পারে— দেশ তো ভিন্ন দিকে চলিল। এরূপ অভিপ্রায়ের কণ্ঠটি তাহার খুব দুর্বল ছিল। কারণ, যুদ্ধের সময় তিনিই বিবেকরুদ্ধ হইয়া পলাইয়া যান পাশের দেশে। সেখানে যে কাজই করুন কিন্তু কষ্ট ছিল অনেক। এই স্বাধীন ঘরে আবার রজত ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত সে কিছু কাজ করিতে চায়। কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নয় নিরপেক্ষ মননের বীজ রোপন করা প্রয়োজন। সে কারণেই স্টেট্সম্যানদের ইতিহাস তাহার বিশেষ প্রয়োজন। কোন পথেরকথা কীভাবে কতোটা সত্যের সহ্যে উপস্থাপিত করা সম্ভব। এসব বেপরোয়ার ভাবনা যখন তাহাকে ছাপিয়া ফেলে, অনেক প্রকারে বাবার প্রচ্ছায়া হিম হইয়া দাঁড়ায়, তখনই এক প্রহেলিকা ভর করে। রজত-ননীর প্রহেলিকা। রজত মেলে বিশদ প্রেমকথা বলিয়া নরওয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করিয়াছে। ওখানে গিয়া সে দুজনের সম্পর্ককে পরিণতি দিতে চায়। পলা লিখিল, ‘আমি রাজি নই’। এই একটি বাক্যেরই প্রতিউত্তরে সে আবার বহু দার্শনিক অর্থ তৈরি করে। ক্ষীণ পরিসরে এসবের উত্তর নিয়া যে গোসিপ— এতে তাহার আগ্রহ নাই। বিশ শতক শেষ হতে চলিল। এসব যোগযোগে তাহার আড়ষ্টতা রহিয়াছে। রজতের অর্থখরচে যায় আসে না। সে তাহাকে পেতে চায়। কাছে চায়। একাকীত্ব তাহার অধৈর্য। কিন্তু পলা নিজের যুদ্ধমান জীবনের ভেতরে একটিই স্বপ্ন নিয়া বাঁচিবে—সেটি মন ও মুখের সততায় চিহ্নিত। আছের আসিয়া পড়ে, দোতলাটায় যে জানালা আর ছাদের কারুকাজ ছিল তাহা এখানে নাই— বাতাস কম, আলো কম কিন্তু কলোরব নাই— তাই সে বলে তুই সব ব্যবস্থা কর। এর মাঝে মালিন্যযুক্ত এক চিঠি আসিয়া পড়ে। কে যেন লিখিয়াছে। ‘কিছুদিন আগে ননীগোপাল মরিয়া গিয়াছে, তাহার ক্যান্সার হইয়াছিল’। বজ্রাঘাত মনে হইল পলার। এই সেই ননীগোপাল! কে লিখিয়াছে এ চিঠি, কোথায় থেকে এ চিঠি আসিয়াছে— কী হইবে কী করিবে সে এখন… অস্থিরতা বাড়তে থাকে, দ্বিগুন বেগে তা বহাইয়া যায়। সে বুক ফাটা আর্তনাদ করিয়া আসে। আছেরকে পানি আনিতে বলে। গলা শুকাইয়া যায়। মৃত্যু এতো কঠিন কেন? বাবার মৃত্যুর পর অনেক কিছুই তাহার গ্রহণযোগ্য মনে হইয়াছিল। কিন্তু ননী! সে কীভাবে কোন কষ্টে মরিয়া গেল। হায়! হে মৃত্যু, তুমি এক স্থবির যৌবন।
ননী একবারই তাহার হাত ছুঁইয়াছিল। সেটি তাহার নিবেদন নয়। কিন্তু কষ্ট পাইলেও পলা তাহাকে গ্রহণ করে নাই। মনের দামটুকু সর্বদা সে উচ্চে স্থান দিয়াছে। মনকে প্রতিপক্ষ করিয়া সে কিছু করে নাই। জীবনের সবটুকু তাহার নীল রঙের ছায়ায় জড়ানো। ননী ক্রমশ তাহাকে অধিকার করিয়া ফেলে। সে হাতে চন্দন দিয়া সে অনেক রকম সত্যের কথা বলে। কিন্তু কিছুই তাহার নিরাপরাধ মনকে পায় নাই। ননী বুঝি আর কারো স্পর্শ পায় নাই। সেই প্রতিজ্ঞা তাহার ছিল। কিন্তু এই অবিচল জীবনে সে ব্যর্থ না অব্যর্থ তাহা জানে না কিন্তু মৃতের গল্পে নারীর প্রণয় ব্যর্থ হয় নাই। বিবাহিত জীবনের সাধ নির্বাণবস্তুপ্রতীম হইয়াছে, কিন্তু ননী তাই বাঁচিয়া রহিয়াছে। এক নতুন উপলব্ধির সময় তাহাকে আচ্ছন্ন করে। যেখানে ননীর অভিনয় শেষ হইল। শেষ তো নয় যেন সাক্ষ্য সৃষ্টি করিয়া গেল।

নয়.
পলা আজ যেন প্রথম ঝুম বরষা দেখিল। কদম আসিয়াছে। জারুল ঝরিয়া আকাশকে শ্বেত-কমলায় বর্ণিল করিয়া দিয়াছে। এখন আর একা নয় সে। নগরবাড়ির স্মৃতিময় বটগাছটার নাই ধ্বনি এখন চরাচরে প্রতিবিম্বিত। রজত কী করিয়া তাহার মনকে বাধিয়া ফেলে তাহার উত্তর শুধু প্রেমের ডোরেই সীমাবদ্ধ। রজত আসিবে, ফিরিবে। ননী চিরকাল ফিরিবে না। আসিবেও না। কিন্তু ননীর মতো হাত তাহারই প্রিয়। খুব ঘনঘোর ঘনঘটায় বৃষ্টির সাথে তাহার সময়টাও কূলে ভিড়িল। এটি ঠিক কূল নয়। ব্যাকুল মনে কুটিল দ্বন্দ্বের তীর। যেখানে আরও একটি নতুন জীবন শুরু হইবে। কী তাহার নতুন জীবন! মৃত ননীর কুয়াশায় হাঁটার শব্দ, ক্লান্ত রজতের না ফেরার ব্যস্ততা আর পলার অফুরন্ত সময়ের বিন্যস্ত নতুন রূপ। যেখানে এখন নতুন কিছু করার সময় আসিয়াছে। এই নগরবাড়িটা সে বেচিয়া দিবে। গচ্ছিত অর্থ নিয়া সে মোনাইল ফিরিবে। সম্মুখ নয়, পেছনে ফিরিয়া আবার সে সম্মুখে ফিরিবে। পলার মোহন্তরূপ তো সবটুকু ব্যক্তিত্বেই ঘেরা। অপমানের স্বাদ সে নিতে জানে না। সে ফিরিবে মোনাইলে। কোটাবড়িটি না থাক, হবিবর রিফুউজি হয়তো পলাইয়া থাকিবে বা মরিয়া গিয়াছে— সেসব দাবি নিয়া নয় সে ওখানে যাইবে একটি গৃহের জন্য। এই গৃহটি তাহার অতিশয় কাম্য। রজতকে সে জানিয়া দেয়, ফিরিলাম গৃহে। তৃতীয় মার হাতে নগরবাড়ি ছাড়িয়া দিয়াছি। তুমি কবে আসচ। এবার শুন্য ঘরে আসিয়াছে এক সুন্দর। পলার এসব কর্মকাণ্ডের ভেতরে নতুন রূপ ধরিয়া আসিবে আরও অধিক কুসংস্কার আর কানকথার শব্দ। এই গ্রাম তো আরও অধিক কানাকানিতে উচ্ছল, সেখানে সে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে! চৌধুরী তো এখানে পুরানা মানুষ। তাহাকে কেউ চিনিবে না, সমীহ করিবারও প্রশ্ন নাই। তবে পলার আশ্রয় কী? বইপুস্তক আর গান-গজল-সিনেমায় তাহার কতোকাল চলিবে, এসবের সরবরাহ কে করিবে? কে তাহার সেবা দিবে? একলা আকাশে তাহার প্রশ্রয় কীভাবে ঘটিবে— জানা নাই। জীবনের বিবাদ তো মনে হয় আরও বাড়িবে। মৌলবী আমীর আলী সাব কিংবা কলি বেগমের খবর কেউ জানিবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত কেন? পলা কিছুতেই তাহার অবস্থান পরিবর্তন করিবে না। গৃহকেই শুধু জানে। একাকী জীবনে এই গৃহই সে চায়। নতুন গৃহ। মায়ার গৃহ। বন্ধনে বাধা গৃহ। ইহাই তাহার স্বপ্ন। প্রতিপক্ষ আসিলে তাহা মোকাবেলা করিবার সামর্থ তাহার রহিয়াছে।
মোনাইল ফিরিবার আগে আছের কর্তৃক সমস্ত বন্দোবস্ত শেষ করিলে— এই গ্রামে তাহার নতুন স্বস্তি মিলিল। তৃতীয় মা তো নিরুদ্দেশ। সে নিজেও এখন নিরুদ্দেশ। এতেই বুঝি মনের মুক্তি আসিবে। নতুন এক সমাজ গড়িবার লক্ষ্য নিয়া সে এবার মাঠে নামিবে। সেটি শুধু প্রজন্ম সৃজন নয়, পূর্ণ মানুষ সৃষ্টির নিমিত্ত কাজ। সে কাজ নিয়া সে কারো দ্বারস্থ হইবে না। অভাব বা দারিদ্র্য বিতাড়নের ব্যবসা নয়, কোনো শ্রেণি-সোসাইটি গড়ার কেন্দ্র নয় সেটি, আধুনিক মনস্ক মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক কেন্দ্র। সেখানে পাখির স্বর পুঞ্জীভূত হইবে, পুকুরের তরঙ্গ চলিবে, প্রচুর বৃক্ষের দর্শন সৃজন হইবে, রাজনৈতিক দেশপ্রেমিকের ইতিহাস রচিত হইবে। গুচ্ছ গুচ্ছ স্বরে এই গৃহ তো তাহারই গৃহ। তবে বিন্দুমাত্র মুখ ও মনের ভিন্নতা রইবে না। গোটা জীবনের চলিকাশক্তির যে দর্শন সেইটিই প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র এই মোনাইল। এইটি তাহার কর্মক্ষেত্র। রজত বলিয়াছিল অনেক স্মৃতির কারণেই তোমার এই বসতি— ইহাও একপ্রকার আপোষ ও সীমাবদ্ধতা। পলা তীব্র উত্তরে বলিয়া চলে ‘আদিম দেবতারা’ পড়িয়াছ তো! আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে তোমাকে দিল রূপ… তোমার সংস্পর্শের মানুষদের রক্তে দিলো মাছির মতো কামনা। এইসব কামনা নিয়া তোমার ভাবিবার অবকাশ নাই, পলা তাহার জন্য যাহা স্বাভাবিক তাহাই করিবে এবং করিয়া চলিবে। সত্যিই সে বুঝি আদিম দেবতার আগুন নিয়া সম্মুখে চলিতেছে, একাই— একাকী, অপ্রতিদ্বন্দ্বীরূপে; এই অস্বাভাবিক সমাজে, স্বাভাবিক কাজ করিবার নিমিত্ত। সে তো কারো মুখাপেক্ষী নয়, রজত সেখানে মুখ্যও নয়— পুরুষশাসিত সমাজের এই গৌণরূপ গোড়া থেকে শুরু করিয়া যদি সর্বত্র প্রতিফলিত হয় সে অভিজ্ঞতা সমাজ কীভাবে নিবে— ননী বলিয়াছিল, বস্তুই প্রকৃতির নিশানা। সে সম্মুখে চলে, পেছনে নয়। পলার তো সে বিশ্বাস আছে। এই সিদ্ধান্ত তো বিশ্বাসের পাথরেই নির্মিত! ##
shiqbal70@gmail.com
২১/০৬/১৫

আলোচনা