হয়নাকো দেখা

শহীদ ইকবাল

1

মৌলবীসাব খুব সুর করে কীসব গপ্পো পাড়েন ‘ত্বরা জ্বীন দেখচোস? আল্লাতালা মানুষ আর জ্বীনের সম্মান দেছেন, তার বিচার হইবো, কাল কেয়ামতের ময়দানে।’ কপাল ভেতোরে ভেতোরে জপ করে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে’- মানে কী? গা শিউরে ওঠে, কয় কি হুজুর! কাল কেয়ামত পুন্নি, মানে তো সব শ্যাষ। হুজুর কঠোর চাবালিতে কন, ‘মানুষ তোমার হুস হয় না?’ কাল আর বেশি দূরে নাই। এই পুলসেরাত, গরম পানি, দেড়হাত মাতার ওপর সূর্য, হু হু করে কান্দি বেড়ানো মানুষের প্রলাপ, এ ওর দ্বারে, সে আরেকজনের দ্বারে ঘুরছে তো ঘুরছে, কোনো ফায়দা পাচ্ছে না। হে মানুষ দুনিয়ায় যদি ঠিকঠাক চলতিস তবে কী আজ এই দশা হয়!- কিন্তু সবই কী কালকের ব্যাপার! হিসাব মেলে না কপালের। তার কানে বার বার ফুইটে ওঠে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ মারাত্মক ধ্বনি। কী ভয়ঙ্কর কথা! এর মধ্যেই বুঝি পুন্নির পুনর্জন্ম হইছে। ভাবতে ভাবতে কুঁকড়ে যায়। ক্লান্তি কামড়ায়। কী এক কুৎসিত ক্রোধ তাকে চেপে ধরে। স্বস্তি দেয় না। খড়ের মাঠে দাবড়ায়। আর চিক্কন হিহি আওয়াজে তাড়া করে। পুন্নি পুন্নি… ছাইড়ে দেয়, আর ভাল্লাগে না। বাপ-মাও, পুন্নি আর এই তামান মানুষ তাইলে কোথায় যায়! কী হয় সবার। নাকি ভূমিকম্প হবে, কড়া কথাবার্তার পর হুজুর থামলে বাইরে সক্কলে কয়, একনা গোরজিয়ারত করা নাগে, সব্বাই হাটো। ভাগে ভাগে হাঁটো। থোকা থোকা হয়া চলো। গায়ে গায়ে। হাঁটাহাঁটি ভাগে ভাগে চলো। তখনও বেল ফোটে নাই। এ পাড়ায় লোকচলাচল এক্ষুণি শুরু হবে। ছুটবে সাইকেলে, ভ্যানে বা তরিকামতো যার যা বাহনে। এ সময়টা বেশ ঠাণ্ডা, বেশি পরিমাণ সুনসানও। কোথাও কেউ নাই, ঘুপঘুপ্যা আন্ধার, টাটির ভেতোর ক্যাৎ-কুত আওয়াজ। ধরপড় হয়। দৌড়ায় আর তাড়ায়। সর্বদিকে কৃপণ আওয়াজ। বাঁচোনের মইদ্যে হড়হড় কোপানি। দূরে ব্যাঙ ডাকে। ক্যান ব্যাঙ ডাকে, ও কারে ডাকে, ও-কি জানে না কাল কেয়ামত পুন্নি! পন্নি ভাসিবে। সে ভয় নাই? ক্যান এই তো কদিন আগে ওই পুকুর পাড়ের গোরের পাশে গরু বান্ধা আছিল, তাই অবলা বলি কার যেন জান আজাবের আওয়াজ পাইছে। হায়রে কোপাওচে! মাইনসের হাতে খুন হওয়া মরা ব্যান আরও তেজী। মাইয়া মানুষ ক্যাং করি কোপায়, হাঁটুর ওপর সপাং সপাং আর ওই খালি ওল্টোচে। না না ওটা আবেদ দর্জিই হবি। পুন্নি তো মরিছে অন্যের হাতে, তার পাপ নাই। সব পাপ নেছে নিজে। কেন সে মরি যায়! মরণের ওপারে সে কী হাঁটিয়া বেড়ায়। তাড়ায়… রাতে-আন্ধারে, পুকুরে, কেমন একটা বিস্ময়কর বেশে সে সেদিন রাতে আসিয়া দাঁড়ায়। সে আসিয়া কয়, আড়ার ওপারের মসজিদের কোণার পুকুরে রাইতে IQBALঅনেক মুসল্লি আসে। সেখানে আপনে যান। কাম করেন। নিয়ত করেন এবারের দুইখন্দের এস্তেমার অন্তত এক খন্দে যাইয়েন। সেখানে মেলা মানুষ। তাদের লগে সময় পার করাটা ফরজ বইলে মনে করেন। এরপর ঘুমটা কার ডাকে ছুটে যায়। তারপর থেকে মাথায় খুব চাপ কপালের। সারা দেহ ছম ছম করে। বাতাসে কান্না ওড়ে। হায় পুন্নি কেন মইরে যায়। সে কি আবেদ দর্জির পাশে নাই। নাকি সকলে এক হইয়া ওরশ করে। কী মজার সে ওরশ। গরুর পাল একের পর এক জমা হয় ওরস ময়দানে। কী সুন্দর নাদুস-নুদুস সেখানকার গরু। নধরকান্তি এসব গরুর রঙবেরঙ-এর পোশাক কতো আকর্ষণীয়। নানা রঙের গরু। গরুর গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্লাগ টানানো। চোখের ঠুলির উপরে লাল নীল চশমা। শিঙে ওড়ানো পতাকা। পায়ে ঘুঙুর। নালে পেতলের বেড়। গলায় রঙীন কাগজের কথামার্কা মালা। দয়াল বাবা আর নকশাবান্দা মোজাদ্দেীর জয়গান। গরুই বান্দার জান। সে তার সেবা করে, মায়ার চোখে দেখে। আদর দেয়। সেই ওরশে এক হয় পুন্নি আরও অনেকেই। এখানে আজ অনেক জান কোরবানী হইবে। জানের বদলে জান। পুন্নির জান কী নতুন করিয়া পয়দা হয়! তাও হোক! তাহলে এখানে ব্যাঙ ডাকার কি হলো। ওইটাও তো অবলা, হে বোঝে না। কিছুকাল আগের কথা, পুন্নির পরেই আবেদ দর্জি মারা গেছেন এখানে। তার ওপর বিরাট জামের গাছ। গাছটা ফলে টুসটুস। ছায়া দেয়, পাহারা দেয়, আর ঘিরিয়া ধরে থাকে দর্জি। লোকমুখে শোনা যায় তিনি খুব ভালো মানুষ আছিলেন। এলাকায় তখন যেমন সুনাম এখনও তা বহাল আছে। তিনি কাঁচা বাড়িতে বইসে দর্জিগিরি করেন। আসলে নামে তিনি দর্জি কিন্তু কাজ করতো তার ছেলেরা আর পোষ্য কর্মচারিরা। এলাকায় তিনি সকলের হইয়া থাকিতেন, দল বাইন্ধা সকলকে কীসব শেখাতেন। কপালের সেয়ান মনটা কিচ্ছু ভোলে নাই, সব মনে আছে। তিনি সক্কলকে পুকুর পাড়ে বইসে কন, ওই দেখ মেঠো চাঁদ, ওইহানে কয়দিন আগে মানুষ বেড়াইয়া আসচে। দুধের মতোন চাঁন্দ, চন্দ্রকারিগর কে? ভাবিতে ভাবিতে তখন চোখে পানি আসে, আবেদ দর্জি চইলে আসেন না, ভয়ে সবাই একে একে সইরে পড়ে, শুধু তিনি বইসে থাকেন। দোয়া পড়েন, সুরা ইয়াসিন পড়েন। আল্লা-নবী-চৌথা আসমান তামান বিল যেন বিলবিল করে। কী সে পুন্নি রোশনাই! এ মাঠের চতুর্দিকে ফটফটা আলো। আলো তো নয়, পুন্নির নাহান দুধের নহর। এই গ্রামটা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আইলের ওপর বসলে বিল পর্যন্ত রাতের চাদ্দোর বিছানো। কী মজার সে চাদ্দোর। জ্যোৎস্নারাতে তার আরও বাহার রঙ। মনে হয় ধারালো কুয়াশার ভেতর কেউ যেন পালের নৌকা ভাসাইয়া দিছে। বাইয়া যাও মাঝি নাকি সোহাগ চান্দ বদনী ধ্বনি- ভাবতে পারে না দর্জি। দর্জির চোখ কী শাদা! পুন্নি শাদা, পাঞ্জাবী শাদা, পায়জামা শাদা, বকলেসঅলা শাদা জামা বানাইতে বানাইতে তার চোখ শাদা হইয়া উঠছে। শাদা কইতর কত্তো প্রিয় তার। দাদায় কইতেন আবেদ শাদা কইতর মারিস না, ওই কইতরের রক্তে যাদু-টোনার কাম হয়। কোন কালে চতুর্দিকে বাড়ি বন্ধ করে নিয়াছিলেন তিনি। কিন্তু শাদা কইতর বাকবাকুম করে আর দুলে দুলে পা হাটিয়ে চললে ভেতরটা দুপ দুপ করে। পুন্নি না শাদা কইতর। পুন্নির বৃদ্ধি, ষোলকলা পূর্ণ, তার আগেই মইরে যায়। সে মরে গিয়ে শাদা হাঁস হইছে, কইতর হইছে। তাইতো সে আলাদা সমীহ পায়। কপালের চোখে এসব দুললে তা হঠাৎ করে তামাদি হইয়ে যায়। কিন্তু কপালের বিশ্বাসে আবেদ দর্জি ছিলেন অন্য মানুষ। ভাবের ঘোরে এক মত্ত বাউল, ফর্সা ধবধবে দর্জি। আবেদ দর্জির তখন পাকুর পাড়ে বইসে মনে করে পুরান কথা। এই শাদা নহর কী সব কথা তার মনে কইরা দিল। মনের ভেতরে কাফনের জ্বর ওঠে। মনটা বেসুরো হয়ে ওঠে। ফিরে আসেন বাড়ি। নাতনিকে কোলে করে ঝুম বৃষ্টিটা ধরে গেলে কোটার ঘরে ঢোকেন। বাসনে ওঠানো আলু দিয়া রাঁধা মুরগির মাংস তোলা ছিল। কেউ ছিল না। যে যার কাজে ব্যস্ত। পুকুর পাড়ের ভয় কাটে না। শাদা আলেয়া ঘিরিয়া ধরে তাকে। ক্রমশ কঠিন হচ্ছে তার শাদা ভীতি। পুন্নির ভয়? তিনি দাঁড়ান। নাতিকে কোলে তুলে অবলম্বন করেন। বাইরে মেঘলা রাতের অন্ধকার, জোনাকী নাই। কেন যেন একা হয়ে যান দর্জি। নাতিকে নামিয়ে দিয়ে কাঁসার থালায় মাংসের ভাতটুকু নিয়ে নেন। খুব তৃপ্তি মেখে খুওয়ার পর এলাকার নেভানো আলোয় স্বস্তি পান। এ তো সাদা নয়। কালো। মরণসুখ এখন আলাদা লাগে। কী যে এক মরণের খেলা। এশার নামাজ পড়ার আগেই পাতানো তোশকের চৌকিতে একটু শুইয়ে নেন। টুকটাক ঝিরঝির আলো এ ঘরে আসে আর চলে যায়। বাড়ির গৃহিনী বুঝি ফিরে আসছে। সেই গৃহস্থ গৃহিনীর কাজে আলোর পায়চারি তোলেন। কাঁচা দেয়ালে আলোক নকশা আঁকে, উল্কি হেঁটে বেড়ায়, দানা দানা ছায়া ঘোরে, সাঁতার তোলে মাটির দেওয়ালে। দর্জি আলো-আন্ধারী চোখে এইসব আলোর রেখাপাত আরও গাঢ় করে তোলেন। ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে চিক্কন রেখার কণিকা। নিকানো দেয়ালে শুষে নেয় আলো। শোষণের প্রক্রিয়াটি ধারালো। গৃহিনীর কাজের ছন্দে নির্মিত পদশব্দের ভেতরে সে আলোর রেখা কেঁপে কেঁপে উজানভাটি করে, আবার সরে যায়, চলে আসে। নিকানো দেয়াল আরও ভাস্করময় হয়ে ওঠে। কত্তোকাল আগের এই ঘরের কড়িবর্গার ওপরে কোণাকুণি বাঁশের ছাওয়া ছাদের চিত্রপট আরও মিইয়ে আসে। আলোর অধিকার খুব প্রচ-তর হলে দর্জি ঝিমিয়ে পড়ে। ঘুমায়। কিন্তু ঘুমটা ঠিক কম্পমান। আলোটা কী খুব তাড়া করে তাকে। একি আলোর তাড়া নাকি জীবনের পালানো কুত্তার বহুমুখি শ্লেষ। না এসব চান না তিনি। একপর্যায়ে আলোর দেয়ালিই তার মস্তিষ্কের ভেতর প্রবেশ করে। খুব হাঁপিয়ে ওঠেন। চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িবর্গার ভেতর থেকে টেনে তোলেন অনেককালের সময় সাক্ষ্যের ইতিহাস। যথোচিত উপায়ে সব কাজ চলে। একসময় রাত গাঢ়তর হয়। শান্ত হয়ে আসে পাড়া। কালি সরে গিয়ে আবার এক ফর্সা প্রকৃতি উন্মুখ হতে চায়। তবে সে ফর্সা ‘শাদা’ নয়। চলাচল থেমে গেলে বাড়ি জুড়ে কনকন সুর আর দুদ্দাড় আওয়াজের তোড় ওঠে। কেউ খোঁজ নেয় না আবেদ দর্জির। সে চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমায়। ঘুম তো শন্তির শাসন। আর মগজে যে আলোর মায়াজাল নিয়ে তিনি শুয়ে আছেন তা তো প্রশান্তিরই। মুরগির ঝোল আর আউশধানের মোটা চালের ভাত ঘুমকে আরও নীচের দিকে টানে। তলিয়ে যায়। এ ঘরের সামনে দুইঘর উঠান। সেখানে ধীরে ধীরে হাটফেরত মানুষরা ভীড় করে। বিভিন্ন জিনিসের দর নিয়ে শলাপরামর্শ করে। কেউবা রাতে মাছ মারার জন্য জাল, হেংগা, ডারকি ঠিক করে। টিপ টিপ আলো জ্বলে। সে আলো কম কী বেশি তা কারো খেয়াল নেই। আলোর কাজও এখন কম। মুখ দেখাটাই আসল। ফলত তারও খুব দরকার নয়। পায়ের শব্দে মানুষ চেনা যায়, ঘুঘুর ডাকে অবস্থা বোঝা যায়। গলার শব্দে আহ্বান জানা যায়। আশ্চর্য ধ্বনি আর কানের অনুভূতি। প্রখর তার শব্দটান। কান থাকলে আলোর প্রয়োজন পড়ে না। তাই এ রাতে একে একে একটু ঢেউ খেলানো উঠানে বিভিন্ন বাহনে মানুষ এলে বা আলাপ আলোচনা হলে আলোর চেয়ে কানের কাজ আর মুখের বাক্য বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সেভাবেই একে একে উঁচু শান বাঁধানো বারান্দায় খাওয়া-দাওয়া চলে। উঠানে চলে আলাপ, আর বাইরে বিশাল খুলিতে গভীর ফর্শা। এর রূপ রাত বাড়ার সাথে সাথে একটু একটু করে বাড়তে থাকলে কাছারির পাশবারান্দায় আর একটি বৈঠক শুরু হয়। ভেতরের উঠানের আলোচনা আর এখানকার বৈঠকী আলোচনার মধ্যে অনেক ফারাক। সাধারণত বিড়ি বা কনডম বা দুধ টেপার বিষয়ে প্রাধান্য বেশি। মেয়েলি আলোচনাটাই নয় শুধু রাতের অপারেশানের নানা পরিকল্পনা থাকে তাতে। তবে বিশ্রম্ভালাপের সবচেয়ে উচ্চতর পর্যায়টি সিনেমার নায়ক ও নায়িকাদের নিয়ে। বিপরীতে খোলা প্রান্তরের হাওয়া উঁচিয়ে কাঁচা কাছারির অন্য বারান্দা। এ কাছারির জৌলুস নাই। এর সাথে লাগোয়া গোয়াল ঘর। সেটি খেড় দিয়ে ছাওয়া। চৌকোণ গোয়ালঘরের পিড়ালিটা সাধারণত শীতের রোদের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফর্সা রাতের কানসোনা আলোতে যখন দলবদ্ধ হয়ে এসব আলাপ চলে তখন কারো চোখ একটু প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দিলে চোখে পড়বে সবুজ কচি কোষ্টার ক্ষেত, বিশাল ইন্দিরার শান আর পাশ দিয়ে কাঁচা সবুজ রাস্তা। সেদিক দিয়েই আরোহীরা বাড়ির উঠানে পা রাখছে। কাজের লোকরা ফিরতে ফিরতে হাঁক দেয়, কোনো বিশেষ ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। এই যখন রাতের অবস্থা আবেদ দর্জি তখন এক হয়ে অন্ধকারের ভেতরে চিৎপাতই আছেন। কোনো সাড়া নেই। স্বাভাবিক মানুষজন কিছু মনেও করে না। বিশেষ করে ঘুমন্ত মানুষের প্রতি কারো আগ্রহ থাকার কথাও নয়। গৃহিনী অজুর পর এশা শেষ করে, সকল কাজের ইতি টানবেন, নাতির ঘুমানোর জায়গা পরিবর্তন করবেন, তখন একটু ডাক পাড়েন। ‘কী হলো!’ ক্যা গো! নড়েন না। চিৎ মানুষের তখনও বুঝি আলোর রেখাসমুদ্র পাঠ করা হয় নাই। এসব কী তিনি পাড়ি দিচ্ছিলেন না ‘শাদা’র অর্থ খুঁজছিলেন? দর্জির জীবনে কোনো পাপ নেই। একটু বেশিই বেঁচেছেন, তার রেস্ট আরাম বা উৎপাতের বাইরেই তিনি থাকেন। যে শাদা তার চোখের সামনে ঝুলে থাকে, পলকের পর পলক যেভাবে মাঠ-তালদিঘি পেরোয়, বিলের বাতা পর্যন্ত ঠেলে নেয় সেখানে শাদা কাফনও কী এক হয়। শাদাতত্ত্বের ভেতরে নিজের মনের ধারাবিবরণী যখন আলোর রেখায় অভিষিক্ত হতে থাকে তখন কী হিক্কা ওঠে! কষ্ট হয়! বেলা পড়ে যায়। টুপ করে ফুটফুটে চাঁদ ডুবে যায়। সত্যিই গৃহিনী আর কোনো সাড়া পান না। ঠাণ্ডার ভেতর চাপ বাড়ে। অন্যরকম তার ঠাসা স্বাদ। এক্কেবারে নরোম ও নেওর নেওয়া। এমনটা তো সাপের গাও-ও নয়। চিক্কুর পাড়েন। চট করে গৃহিণীর আওয়াজ কাঁচা দেওয়ালে হোঁচোট খায়। অনেক পুরনো কাঠের জানালার পাল্লায় আটকে যায়। কোনো  পর্দা থাকে না এ জানালায়। ছিলও না কোনোদিন। বাইরের জটলা তখনও একই গতির। আরও বাইরে যারা বিশ্রম্ভালাপে মাহেল তারা বেশ জমিয়ে বসেছে। গল্প চালিয়ে যাচ্ছে গানের দৃশ্যের বিচিত্র কাহিনির। এখানে সকলেই মত্ত মাতোয়ারা। একটু পরেই তারা বন্দরের দিকে হাঁটা দেবে। আজ শিষকাটার ধানের টাকার মজমা অনেক। কিন্তু মুহূর্তেই বিপরীত হাওয়া তৈরি হয়। ভেতর থেকে খবর আসে আবেদ দর্জি আর নাই। সকলেই ভাইঙা পড়েন। মুহূর্তের টর্নেডো যেন অনেক কিছুই ছিনতাই করে নিয়া গেছে। পুন্নি তখন ভাইস্যা ওঠে। তড়পায় এবং আরও পরিষ্কার হয়। গড়ে ওঠে নতুন ভাবমূর্তি। কেন সে এমন কইরা জাপটে ধরে তাকে। ওর তো বুনি ওঠে নাই। খুব নরোম নরোম আদরে সে কয়, কপাল তুই তো কপাইল্যা। তোর লগে চইলে যাম। মিষ্টি হাসিতে তার দম ফাটে। কদুর তেলে ভেজা জবজবে পাতলা চুলের লম্বা বিনুনি। সেটি দুইলা ওঠে। সাপের মতো গোটা পীঠ জুড়ে হাটে। ইঙ্গিত করে। ছন্দে দোলায়। উঁচু জামবৃক্ষের প্রশাখার ন্যায় আস্তে আসে বেণী দোলায়। তার ফাঁক দিয়া আলোর কিরণ নাকি যৌবনের ধূপ বিলায় বোঝা যায় না। হতে পারে কটাক্ষের ত্রপামাখা নিক্ষিপ্ত তীর। সরমে ছিন্ন সে। জামপ্রশাখা ফলবান কিন্তু ছুঁইতে দেয় না সে ফল, পুন্নিও ছুঁইতে পায় না, অপাঙ্গে তাকায়। ইঙ্গিতে ডাক দেয়। সে এবার নতুর রূপে কপালের সম্মুখে আনে। আবেদ দর্জির সঙ্গে। সে কী দর্জির প্রতিবিম্ব নাকি! কপাল ভয় পায়। আবেদ দর্জির মৃত্যু নিয়া যখন সবাই ব্যস্ত কপাল তখন পুন্নির ছায়ায় কম্পমান। বেঁধে নেয় সে তারে কঠোর বিহনে। হ, কত্তোকাল আমারে মাইরা খুব আরামে আছ। বিরহে পুড়মু কতোকাল। অন্যায় না কইরাই মারলা আমারে ডাক্তারের অবহেলার করো নাই প্রতিকার। আর কাউরে এ অবহেলার শিকার কইরো না। কী যে বিরহের জ্বালা। খুন করছো তুমি। খুনী হইয়াও তুমি আমার- চিরকালের আমার। এখনও তুমি তেমনিই আছ। এই মরাবাড়িতে করো কী! যে মানুষটার অস্তিত্বের কোনো জায়গায় নাই, সে হঠাৎ করে নায়কের আসনে আসীন হয়। পরের ঘটনা গুরুত্বহীন। সেই আবেদ দর্জির গোরজিয়ারত পর্ব নিয়া সকলে ব্যস্ত থাকলেও ‘কাল কেয়ামতের ময়দান’ কথাটা কপালের ভেতর থেকে নামে না। পুন্নির অবলা মন আর অবলা পশুর আওয়াজ আর লোকমুখে শোনা কাতর কথার ভেতর সে নিজেকে বুলায়, আদর করে মৈথুন করে। ক্যান ওই পশুটা কব্বরের পাশে বিরান পাথারে লেজ উঁচিয়া এতো উন্মত্ত হইছিল। বাওয়ানো এঁড়ে পশু তো ও নয়। কিন্তু কেন সে এরাম হইলো। হুজুর কয় গোর আজাবের তাপ ওই অবোলা বুঝতে পারছে। এই মাঘ-পৌষসন্ধ্যায় যখন নেতিয়া পড়িছে সবুজ আলো, পশ্চিমে গোধূলীর আলো বিলীন হচ্ছিল তখন ওই পশুটা জানতে পারে এই গোরে শব্দ হইতাছে। শুধু একটি নয় কয়েকটি পশু আশেপাশে একই প্রকৃতির আওয়াজে রোরুদ্যমান। সকলের ভেতরেই তখন একই উত্তেজনা দেখা গেছে। এবং সময়টাও একই। হুজুর এই দৃষ্টান্ত দেখিয়া বলেন, আবেদ দর্জির মতো পুণ্যবান মানুষের যদি এই অবস্থা হয় তবে ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ তোমার কী সাক্ষ্য চায়! হে মানুষ তোমরা বুঝিয়া লও। সেই ঘটনার পর নানাভাবে আবেদ দর্জির বাড়িতে ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। শুক্রবার, রবিউল আউয়াল কিংবা শবেবরাত, রমজান পূণ্যবান সময়ে আয়োজন চলে জেয়ারতসহ সাধ্যমতো মিস্কিন খাওয়ানোর কাজ। কপাল সুবেহ সাদেকে আজকের জেয়ারত শেষে এই পুণ্যবান মানুষটার পক্ষে নিজেও কিছু কাজ করে। কিন্তু হুজুরের ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ শব্দটা কপালের ভয় ভয় ঠেকে। কানের ভেতর দিয়া মরমে পশে। সেখানে যেন সে বসে পড়ে। বার বার হন্ট করে। কতো মানুষ মইরা গেল মরিয়া পচিয়া হাজিয়া গেল কিন্তু ‘কাল কেয়ামত… পুন্নি’ শ্যাষ হয় না। উদাসীন হয়ে সে সাঁতরায়, চিক্কুর দেয়, ইশারায় সেই শ্বেত জোব্বা পরিহিত ব্যক্তি তার কাছে আইসা কয় ‘এই বরফ চাঁদ আর জ্যোৎস্না তামাম আসমানে যিনি ছড়াইয়া দেছেন তরতর কইরা জমিনে সাজাইয়া দেছেন তার লাগে ত্বর মন কান্দে, শিশুমনে তুই জপ কর, কাল কেয়মতে ত্বর আসান হইবে, মানুষকে শেখা, মনকে ভেজা, পাগল মনের হাহাকারকে নিষ্ঠুরতায় বাইন্ধে রাখ- এমন আলাবোলা আওয়াজের পর সব ফর্সা হইয়া যায়, জ্যোৎস্নাআর চাঁদ তখনও দূরে হাসে, সোনালী সিংহের গল্পে ডাক পাড়ে আয়-আয়…, আয়-আয়…! আবেদ দর্জির তারপর চাঁদের পাল্কীনায়ে ভাসেন, চাঁন্দের কারিগর খোঁজেন, চাঁন্দবদনী চান, মাইনসে মাইনসে চাঁন্দের ফেরী করেন আর কন ‘আইসো চান্দের পাল্কীতে/ ভাইসো সোনার পঙ্খীতে, যা আমার যামিনী/ চইড়া চল কামিনী’। সেই আবেদ দর্জি জ্যোৎস্না নিয়া কতো গপ্পো বানান, সকলকে ঠেইলে লইয়া যান চান্দের দ্যাশে। এসব গল্প এখনও আওয়াজ তোলে এই চাঁন্দনিভা সুবেহ সাদেকে। কপাল সেই অবলার তরে জাম গাছের কথা পাড়েন, সত্যিই আবেদ দর্জির তো এমন গোরআজাব হওয়ার কথা নয়। শোনা যায় সত্যিই তিনি জ্যোৎস্না পাগল মানুষ আছিলেন। মানুষের লগে চন্দ্রকারিগরের কাহিনি বলা, আর ওই পুকুরপাড়ের সাদা মানুষের বাণী প্রচারই তার কাজ ছিল। তার সুনামও বয় তাতে। শোনা যায় দেখতেও তিনি ছিলেন জ্যোৎস্নার মতোই। হাহাকারের পানশালায় তার ভোজ নিত্যদিন। সেই হাহাকার ছইড়ে পড়ে মনের স্বাস্থ্যে। সেভাবেই তিনি গত হন। তার ভক্তকুল এমন মৃত্যুতে বেহুঁশ হইয়া কান্দে। অনেক মানুষের ভেতরে সে মৃত্যুকাফেলায় ব্যতিক্রমী ছিল পাড়ার সকল শিশুর আগমন ঘটে। শিশু তো নয় পুন্নির চেহারা। পুন্নির ভরে কপাল তাকায়। শিশু নাকি পুন্নি, পুন্নি নাকি শিশু সব পুন্নিই তার শবকে ঘিইরা রাখে, চিইনা কয় ইনিই সেই চাঁন্দবুড়া। চান্নিতেই তার গোসল হবে। অদ্ভুত সব আলোমাখা আয়োজন। সে আলোতে বর্ণালী বয়, হাওয়া বন্দ হয়। গোলাপজল ছিটায়। কাপড়ায় পড়্ পড়্ শব্দ করে। টস্স্যা নাগা টরটরা চোখে কোঁকড়া কোঁকড়া হাতপায়ে ঝ্যালঝ্যালা চামড়া সাট্ হয়্যা থাকে। গোছল দেও, কাপড়া পরাও, কাফেলায় তোল। সেই তোলা মানুষটার কাল কেয়ামতের বিচার শুরু হলে- সে নাকি ঘ্যাঙগায়। পুন্নির লগে আসপি। পরে দেখা হবি। ভুল বকে। কপাল কব্বরের পাশে গিয়া জল ফেলে। কেটা যে কয় ওটি গোরআযাব হওচে। কিন্তু কপাল খুঁজে পায় না কিছু। খালি হাতড়ায়, আর হুলহুল করে কান্দে। টপটপ করে জল পড়ে, হায়রে সেইসব মানুষ! যখন তোকে ওখানে রাখি তখন তুই আগামী কঙ্কাল, আর কত্তোদিন কপাল তার লগে পইড়ে আছে।
আবেদ দর্জির গোর কাঁপানো আওয়াজ কেউ দেখে নাই। পুন্নির মতো অবলা জন্তুরা দেখিছে। দড়ি ছিরি পালাইছে বাছুর, পাশের ষাড় তখন আর্ত হিম। বোঝা যায় ভয়ে তার লিঙ্গ খাটো হয়া গেছে। খালি হুঙ্কার পাড়ে, লম্বা করে ডাক পাড়ে। গোরে শোওয়া আবেদ দর্জি তখন ওঠে, এশরাক পড়ে। ভেতরে খুব হাওয়া। গূঢ় আওয়াজ সারাক্ষণ তার কানে চিক্কুর দেয়। ভেতরে এক নবীন দুনিয়ার জামিন্দার সে। পুন্নি আছে, বিবি আছে, ফল আছে, রংবেরঙ পাখি আছে, আছে মৃদুমন্দ নহর। তাতে সাদা সাদা বিলাই নাফ পাড়ে। নাদুস নুদুস শরীরে তার পিরপিরানি ভাব। হ, সেই কত্তোকল আগে বড়বাড়ির উঠানে সায়েবগো বিবির কোলে এইরাম বিড়াল দেখছে সে। সে বিড়াল হাগেও না মোতেও না। সে মানুষের চ্যায়াও দামী খাবার খায়। কড়া গলায় চৌধুরী এসব কাজ নাযায়েজ বলে তাড়িয়ে দিলেও বিবিরা তার প্রতিবাদ করেন। বিবির তো কোনো কাম নাই। সে করবে কী?  খালি বিড়াল পালন করাই তার কাজ। এই বিরাট বাড়ির ভেতরে উঁচু খাটের ওপর মাসায়েল গন্ধে বিড়াল স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। এমন স্বাধীনতা মানুষেরও নাই। বাড়ির অনেক চাকর-বাকরও এই বিড়ালের দাস। গত বকরিঈদের পরের দিন যখন বাড়ি জুড়ে মানুষের মেলা বিরাট উঁচু করে ফটফটা ছবিঅলা বাক্সতে ব্যাটারি দিয়া আগুন লাগানো হয় তখন সেনেমার জন্য তিণ ধারণের ঠাঁই নাই, তখনও এই বিড়াল ম্যাম সায়েবের কোলে বইসে সেনেমা দেখছে। কিন্তু কাল কেয়ামতে এই অবোলা বিড়াল কী ম্যাম সায়েবের গোরআজাবের খবর পৌঁছাইবে? এ বাড়িতে কী তখন সেই ওছিলায় মেলা ফকির মিস্কিনের খাওয়ার আয়োজন হইবে, চান্দে চান্দে নানা অকেশানে! কপাল এই বিড়াল পালার মর্তবা আবিষ্কার করে ফেলে। কপলও পুন্নির আদেশ শুনিছে। সে যাইবে মসজিদের ভিটায় আর এস্তেমার মুনাজাতের মাঠে। নাজাতের জন্যি। বিড়াল পালার চাইতে এইডা বড় কাম। পুন্নি যে স্বপ্নাইচে! উচ্ছল প্রাণশিখায় সে সাহস স্বপ্ন হইয়া ধরা দিছে।


বিশেষ কোনো ব্যাপার নয়, হঠাৎই জেদ হয় কপালের : আজ রাতেই একটা কিছু হবে। দুধে-আলতায় পুন্নির বুকে চাপা ধাক্কা দেয়, পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায়। হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই নিদানকাল উপস্থিত। মৃত্যু। বোধহয় বেপরোয়া আঘাত বা বেকায়দার আঘাত। এ নিয়ে হৈচৈ। হট-টক।
তারপর দশবছর ছয়মাস তিনদিন আজ। কপাল তখন শিন্নিপুরের মানুষ। এখনও ফিরে ফিরে পুন্নিকে মনে পড়ে। কেন তাকে ফেলে দিল, মাইরে ফেলল, কী তার অপরাধ। সে অপরাধের মাত্রা কতো। একটা মাইয়ের গায়ে হাত দেছেল সে কেন। তখন কী সে কিছু বুঝতো না! ভাবে আর হাঁটে- ওই নির্জন সঙ্গহীন রাস্তাটায়। খুনী ফেরারী সে। রাস্তাটায় চলে একা কিন্তা সমস্ত রাস্তাই বন্ধ। চতুর্দিকে বন্ধ। ঘিরে থাকে অক্টোপাশের মতো। কত্তোদিন এভাবে? এর শেষ কোথায়। এ নিশি রাইত কী পোহাইবে না! জীবনের এ তিনটি বছর তো কতোকাল। আর কী হবে এ জীবনের! হাঁটে আর নিজেকে প্রশ্ন করে। কত্তোকাল হাসি নাই। হাসার কালগুলো আরও না-হাসার কথা বলে। কিন্তু বিপরীতে কান্নাইবা কোথায়। কাঁদিয়ে কী হইবে। যা হওনের তা তো হইয়া গেছে। কপালের কতো কথা মনে পড়ে। এর মাঝে ঝুমঝুম হাওয়ার ভেতর দিয়া বৃষ্টি নাইমে আসে। সে বৃষ্টিতে তার চিন্তা আরও পলি পায়। যেন ফিরে পেয়েছে তার পুরনো সময়। বৃষ্টি তুই কত্তো পুরনো! সেই বেরাকার কথা মনে আছে, যখন মোটা হেডস্যার চিক্কুর পাইড়ে কয় এ কাল্টু কপাল জামতলায় গিয়া খাড়া। তোর অখন বৃষ্টিভেজা শাস্তি। তেরোর ঘরের নামতা তিনমাস ধরে শ্যাষ করিস নাই। হ, বৃষ্টি-শাস্তি। সে শাস্তিতে শরীরের কষ্ট নাই, বেশি কষ্ট মনের। তাও আবার নামতা না পারার জন্যে নয়। জেদ করিলেও ওটা শ্যাষ হইতো! কিন্তু হেডস্যার কাল্টু কয় ক্যা! সক্কলেই শুনলে কাল্টু আরও কালোতে পায়। অন্ধকার কালা। কালো কালা। গুজগুজা কালা। সে কী এতোই কালা। শেষ হয় না। পুন্নি ছাড়া জীবনের সবই তাকে কালা কইছে, কাল্টু কইছে। কিন্তু পুন্নি কয় নাই। পুন্নি আহারে পুন্নি! পুন্নির তখনও দুধ ওঠে নাই। হাফ প্যান্ট পরে। অনেক মাইয়ার মধ্যে ঝুপ করে বইসে পড়া বানায়। সাদা ফুলঅলা ডোরাকাটা ফ্রক পরে। পায়ে স্যান্ডেল। গোছা হয় নাই, রোমও নাই। এক রাতে এই পুন্নিকেই স্বপনে দেখে কপাল। সেখানে কী বিশ্রী ময়লা পানিতে নামছে সে! পুন্নি তাকে এমন অকাম করলেও কাল্টু বলে না। সে চারআনার সিকি তোলে ময়লা পানি থেকে। ওটা ফেইলা দিছিল অন্য বন্ধু। কিন্তু পানিটা ময়লা কেন? এ পানিতে কী হয়। তাতে বা তাকেই নামতে হলো কেন? সে কি বন্ধু সেবায় রত ছিল। তার বিত্তান্ত নাই। খালি স্বপ্নের ভেতরে পানিতে নামার আওয়াজ। অনেক কষ্টে যখন সিকিটা পাইলো তখন পুন্নি কয় তুই কি চাকর! কোনো জবাব দেয় নাই কপাল। একটা সুকি তুলে উপকার করলে কেউ চাকর হয় নাকি। সেটা মনে মনেই থাকে। এরপর খুব হিসু লাগে। আরামে সে হিসু সম্পন্ন হয়। ঘুমটাও খুব গাঢ় হয়। পুন্নির জন্য তখন খুব মন খারাপ হয়। ও কেন তাকে চাকর কইল। আবার মুখ ফেরায়। এবার কেমন চাপা রোদ তাকে চেপে নেয়। সইরে গেছে পুন্নি। কুট শব্দে চোখ খুইলে দেখে বেল উঠছে। কেউ নাই, খালি বিছনে ভেজা। হাসি পায় কপালের। কত্তোকাল যেন পুন্নিরে দেখে নাই। সেই সুকি ফিরে নিয়াছিল ওই বন্ধু! সে কোথায়। মা পরে বলছিল হারামি কাল্টু ফির বিছানাত মুতচোস! এভাবে সক্কলেই কাল্টু প্রতিষ্ঠা দিলেও পুন্নি ফ্রি করে দেয় তাকে। কেন? সে জানে না। পরে একবার ভীষণ ঝড় হলে কয়েকদিল স্কুল বন্ধ থাকে। হেডস্যার আসেন কিন্তু আর কেউ আসেন নাই। রাইতেও হেডস্যার কী কী করেন স্কুলে। পরে হাঁটতে হাঁটতে জামতলা দিয়া, কালিমন্দিরের পাশের কোণায় এস্তেঞ্জা কইরে সোজা হাঁটা দেন বাড়ির দিকে। বিড়বিড় করে কী যেন বলা তার অভ্যাস। তখন স্কুলে সাবান দেয়, বিস্কুট দেয়, লেখার জন্য বোর্ড আসে, খাতা আসে- মাইরি গন্ধে কী মজা সেসব। কপালের বেশ মনে আছে, অনেক খাতা এসে স্কুল বারান্দায় দাঁড়াইলে সে হাত দিয়া নাড়িলে আফের স্যার কাল্টু বলে চিক্কর দিয়া গাল দিছিল। পরে সে আর ওখানে ছিল না। ওখানে কেডা! ও তুমি, প্রত্যহ এখানে কী করো। ধ্যান করো বুঝি! এইহানে ধ্যান কইরে কিচ্ছু হইবো না। উপাসনালয়ে যাও। সারাক্ষণ ক্ষমা চাও। না-কি? কে এই লোকটা। সেও কি কপালকে খুনি বলে জানে? এককালের কাল্টু এখন সবার কাছে কি খুনী! সে আটকে যায়। উপাসনালয়ে কেন যাবে? ইচ্ছে করে অনেক কিছুই করা যায় কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছুই করা ঠিক না। কপাল এ রাস্তায় ঠিকানা খোঁজে। পথ খোঁজে। এতো উন্মুক্ত উদার রাস্তা, মুক্ত হাওয়া, পুন্নির নাকান জোছনা, দূরে বিস্তারিত আকাশ, উদার পাগলা হাওয়া, বৃষ্টিভারী যৌবনমাঠ সবই আছে। সবকিছু হাতছানি দিয়া ডাকে। কিন্তু কাছে যাওন যায় না। সবই পবিত্র। বুজর্গ। কিন্তু কপাল একা খুনী। একাই সে খুনের বোঝা নিয়া ঘুরে বেড়াইতেছে। কেন সবকিছু প্রাণখুলে তাকে ডাকে কিন্তু যেতে পারে না। হেডস্যারের মতো শাস্তি পাইলেও তো ভালো লাগে। কাল্টু বললেও ভালো লাগে। কিন্তু কোথায় তার ঠিকানা! কেন সে এতো অসহায়। এ রাস্তায় আরও চলে কপাল। বেরুতে পারে না। সবাই তাকে ঘিরিয়া ধরে। পথ আগলাইয়া কয়, ফিসফিসে কয়- তুই খুন করছোস। কিন্তু কেন সে পুন্নিকে আঘাত করে, কীভাবে বা কোন্ স্বার্থে সে এ কাজটি করিয়াছিল- তাহার জবাব কী? বা সে তো সেইদিন একপ্রকার প্রস্তুতিই লইয়াছিল, মারিবার- কী করিয়া সে মারে! কেন মারে! অবলা বালেগেরে কেউ মারতে পারে? পারে না। কিন্তু সে মারিয়াছিল। কেন- তাহা বলে নাই। কত্তোকাল বলিতে পারে না। সে কাল্টু বলে নাই তাই বুঝি তাহার অপরাধ।
কপাল কুৎসিত, কালো কিন্তু পুন্নি তো উজালা। আগুনের আলোতে জ্যোতির্ময়।


কপাল আর পুন্নি হঠাৎ এক গাঁয়ের মানুষ হয়ে গিয়েছিল। কপালের মায়ের অন্যত্র বিয়ের পর সে নিজের মানুষকে চিনতে পারেনি। মাকে চেনাও কষ্ট মনে হতো তার। মা কী ভালোবাসতে পারেনি তাকে? আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা… হায়রে মা! জন্ম দিলি, পেটে ধরলি, খাওয়াইলি, কসমধরা কষ্টে জন্ম দিলি, তারপর নাই। নামও রাখছিলি ‘কপাল’। কী কষ্টের নাম। মনে হয় যৌবনটা খুব মজার। তোর ভিটায় তখন নকল মানুষ। মায়ের আঁচল তাতে ফুরিয়া যায়। কী লম্বা সে আঁচল! দুধমাখা ভাত আর ওমমাখা আরামের দিন কতো মানুষের থাকে। আঁচলে বোনে তারা, অফুরন্ত তার ফুটন্ত আসর, চলতে চলতে কতো সুর আর কতো গান। তুই মা হইয়া কিচ্ছু দিলি না। এখন মনে হয় হামাগুড়ির ভেতরে রোশনাই চাঁদে কতো কীই তো ঘটিতে পারিতো। বাড়ির পাশের কুল গাছটার মিষ্টিকুল, তার ভেতরে টলমল পুকুরের পানিতে নিজের মুখ, একটা সুন্দর ডালে পা দোলাইয়া ‘হায়রে আমার মায়ের দুপুর’ গাওয়া যাইতো। কিন্তু কই। এখনও নিমতলার শ্মশানে মরা পোড়ে, ইছামতির বুক বাইয়া মানুষের জীবন-জীবিকা ফুরাইয়া আসে, শুকনা নদী এখন কুলুকুলু- ধীর ও শান্ত। কেন মা নদীটা শুকাইয়া গেল। পাশের গোরস্থানটায় বহু কচি নওলি ঘাস উপরের দিকে হাঁ কইরা ডাকছে। তাতে বাতাসের দোলা বইয়া চলছে। মৃত মানুষদের মতো তুমিও মইরা গেছ। সেই মানুষটার লগে তোমার দিন যায় রাত আসে। সেখানে নতুন নতুন মুখ পয়দা হইছে। তাদের নিয়া তুমি এখন কুন্তীমা। আর আমার নাম দিছ কপাল, আমি ওই কর্ণ-কপাল। কর্ণের বঞ্চিত মাতা কান্দে, আড়ালে বালিশ ভিজায়, চক্ষু লাল করে, কান্দনে মুখ ফোলায় কিন্তু তোমার কী অবস্থা? ক্যামনে দোষ দিমু তোমার যৈবনের, আর আমি তো জানি না তুমি কেমন আছ, কী তোমার কষ্ট। তোমার মায়ের আঁচলেরই বা দশা কী! এসব বইলা কাম কী। নিজের জীবনটা ভস্মসাৎ হইলো রিফুজির মর্যাদা নিয়া। আর পরে প্যাট খসানো কপালের যতো কু-কাম তার সাথে যুক্ত হয় পুন্নিকে মাইরা ফেলিয়া। সে মরছে কিন্তু আমারে ছাড়ে নাই। কিছুতেই সে পিছ ছাড়ে না। খালি দুয়ারে দাঁড়ায়। বাধা হয়। আটকায় আর নছিহত করে। সর্বশেষ নছিহত তার এস্তেমায় যাওয়ার আদেশ। মরণের ওপার থাকি আদেশ আসলে তা আটকায় কেডা। কিছু বলি নাই। এর মদ্যে এখন এইহানে হাসপাতালের দেয়াল ঘেষা এক রিফুজির ঘরে এক বেলা খাবার দিয়া হাসপাতালের ভেতরে আমারে ডোমের কামে লাগায়। মানুষ কাটার কাম। এইটাই আশ্রয়। একটা দুটা তিনটা মানুষ কাটতে হয় প্রায় দিনই। আর কতো ক্লান্তি। একে তো পুন্নির চাপ, রিফুজি হয়া সারাক্ষণ অশান্তির ভুল নিয়া হাঁটা, তার ওপর খাওন-দাওন আর এই ডোমের কাম। করণ যায় কিন্তু আনন্দ নাই। কিন্তু এইটা তো পেশা না। কতোকাল মানুষ কাটমু। প্যাটের দায়ে কাম করি। যে ফুলতলার ফুলের গন্ধে জীবন চলার কথা তা ডোম ঘরের নিষ্ঠুরতায় আটকানোর ইচ্চে নাই। মাঝে মাঝে চাক্কু ধরলে ঘাম ছুইটা যায়। কিন্তু ডাক্তারদের নির্দেশ থাকে। এক পর্যায়ে ঘাড় ঘুইরা যায়। বাতাস উল্টা বয়। মানুষের স্থাপনা বদলায়। ফুলতলার সার করা কামিনী হারাইয়া যায়। সকালের বকুল আর পড়ে না। পড়লেও তাতে মালা হয় না। ধুলোয় মেলায় সে গন্ধ। বাপের কেনা হজমি জিহ্বায় টানতে টানতে ভোরবেলা বকুলতলায় কে ওই যায়! উঁচু বকুলতরার ফুল মুখ্য নয়, মরা বাপের কাম হলো ফজর পড়া। জন্মের আগ দিয়া সে ঝরা বকুলের গন্ধসমেত পলাইছে। তাই এখন দূরের অনেকেই। সবাই পলাইছে। অফিসপাড়াটা এখন শহরের অনেক মানুষের মোতার জায়গা। পাশের অন্ধকারে অনেক কনডমের পাতা। এর পরে গোলজারের ভিটায় গড়ে ওঠে বড় বিল্ডিং। যে চোখে বিলের বাতা চোখে পড়ত তাতে এখন চকচকে টিনের ঝলকানি। খেরা করে রোদ্দুর। তাতেই পাল্টায় আর ফেরায় নতুন কিছু। এটা এখন কঠিন কাজ নয়। গরু জবাইয়ের পর কসাইরা যে কাম করে তেমনই। বডি ফাড়া, তারপর মূল কামটা তো ডাক্তাররাই করেন। কামডা কঠিন না। কিন্তু সমস্যা পুন্নিরে নিয়া। একটা খুন করা মাইয়া পোস্টমর্টেম করতে যাইয়া আরও সমস্যার তৈরি হইলো। কী আর কমু! ভয়ে সিটসিটা! কুন্তীমায়ের কথা তখন মনে হলো। সেই য্যান রক্ষা করবি। মা কী করুম! ধূর শালা মাকে চেনোস তুই? কবে তোর মা আছিল? মা পলাইয়া গেছে কবে, সেই কোন সকালে কাঠগোলাপ ফোটার আগেই। এগলো ফুটতো বুঝি মাকে বাঁচানোর জন্যই। দোকানের আড়ালে একটা বড় টকটকা কৃষ্ণচূড়া ঠিক তার বিপরীতেই মিশমিশা শান্ত গন্ধরাজের গাছ। এতো মড়কা ডাল, ওঠাও যায় না পাড়াও যায় না। কিন্তু খুব যৌনলোভা ফুল। কী তার মদমত্ত রঙ। গরমের হাল্কা বাতাসে সে বেণী দোলায়। গ্রীবার ভঙ্গি তার পুষ্ট রমণীর আনত শ্রদ্ধার মতো। মা-টা তেমনই ছিল। এ মা-ই ফুলতলার পরিচয় বলে বলে ভেতরে বাস্নাটা দিয়া দিছে। সেই বাসনায় জেবন বহিয়া চলে। প্যাটের মইদ্যে থাকতেই শুনছিনু! এইসব ভেবে এভাবে কতোকাল যায় কপাল ভাবে না। রিফুজি তাকে আশ্রয় দেয়- এক প্রকার জীবন চলছিলই। ভালোই ছিল তা। এক ধরনের রঙ ছিল তাতে। লাশ কাটা ঘরে মানুষ পশুতে তেমন পার্থক্য নাই। এক প্রকার কশাই-ই সে। এমনকি নারী-পুরুষ পার্থক্যও সেখানে নেই। প্রথম দিকে না বুঝেই সাহসের সঙ্গে সে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন। মাইয়াটা বাছকানা। ক্যমানে খুন হইলো? পুন্নি তো না! সে দৌড়ায় তখন। ওড়না ফেলে চলে। বেনী দোলায়। অনেক দূর থেকে আসে আর কয় তোমারে মানুষ কাল্টু কয় ক্যা? ছায়া তোলে। চোখ খোলা। বিদ্যুত চলে যায়। অন্ধকার যেন আলোর চেয়ে অনে বেশি। ১০০ পাওয়ার নাকি ৫০০, ১০০০। বাড়তে থাকে। ডোমঘরের ওপর খুব বৃষ্টি নামে। ফর্সা বৃষ্টি। নাহ শাদা। দর্জির শাদা। ভয়ের শাদা কবুতর। ভয়ার্ত কবুতর হাঁটে। ঠ্যাং দোলায়। পাচা নড়ায়। বাকবাকুম শব্দের ভেতর বোঁ বোঁ ফ্যান ঘোরে। বাতায়ন নাই। বাঁশের আগায় বাঁশপাতালি সাপ দৌড়ায়। সাপ না পুন্নি। সাপের মতো ঠা-া। প্যাঁচায়। যুৎ করে ধরে। সঙ্গমের আয়োজনে ওস্তাদী করে। নুনুতে হাত দেয়। কয় ক্যারে তাপ নাই ক্যা। সাপ তো সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত। বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর ফ্যান তোলে। মাইয়াটার শরীরে সাপের কাটা কাটা দাগ। চিহ্নগুলো আরও চেরা। সে তাকায় বড়ো বড়ো চোখে। জাপটায়। সাপকেই সঙ্গী করে। পায়ে কী সাপ নাকি? নাকি চাটাই আর দড়ি। এতো প্যাঁচ। পুন্নির চোখ আরও বড়ো হয়। জাপটায়…। আছড়ায়। হঠাৎ সে বেহুঁশ হয়। কপালের কপালে চোট খায়। হুড়কায় টোকা পড়ে। ক্যারে! কপাল কপাল!! কপাল!!! ডাক্তার এসে গেছে। ডোম দরোজা খোলে না কেন? মুচি রিফুজির লোক এসে ভাওলে দেখে কপাল অজ্ঞান। আলোর মধ্যে রক্তাক্ত। ডাকলে ধরপড় করে ওঠে। রোশনাই আলোয় সে ঠিক কিছুই বুঝতে পারে না। ডাক্তার সাব বলে, ওকে দিয়ে আর বুঝি চলবে না। ভয় পেয়েছে। এ কাজটা এখনও হয়নি।’ ওকে বদরান। রিফুজির লোক পক্ষে বলার চেষ্টা করলে থামে…। বেশ। তারপর আর লাশকাটা ঘরে ঢোকা হয়নি। সে থমকে যায়। এই বিলাপ আর সাপের নহরের সাথে যুক্ত হয় পুন্নি। কপাল ভালোবাসার পুন্নির জন্য মন ভরে কাঁদে। অনেক কান্নার পর সেদিন সে নতুন জন্ম পায়। সে রাত্রের এক গভীর স্বপ্নে পৃথিবীর সবকিছু পাল্টে যায়। এই লাশ কাটার কাজ ছেড়ে নিজেই এক ওয়ারিশহীন মানুষে পরিণত হয়। রিফুজির ঘর ছাড়ে। রথগুলো বদলায়। কিন্তু রথ তো একই। ফিরতে চলতে দুবরাজপুর গ্রামে আসে। এটি নতুন গ্রাম। একটা টানে পলের ভিটে, উঁচু ইলেকট্রিক তার আর বিরান পাথারে সে একাকী। কোনো গৃহস্থ নয়। এক পিলারের নীচে বসে পড়ে। পরিব্রাজকের বেশে। ধানচাষী, মৎস্য বিক্রেতা বা কেউ এলে বলে, কিছু না ভাই। চলি বেড়াই। কপাল এরপর অনেক রাত্রে ঢুকে পড়ে দূরে এক আলোর ম-পে। আলোর নিশানায়। অন্ধকারের বিপরীতে তো আলোই।
লালদিঘীর বাজারে তখন মানুষের ভীড় কমেনি। ইউনিয়ন কাউন্সিলে জটলা। একটা ভ্যান দাঁড়ানো। উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই বলে ‘মরার ভ্যান’। মানুষ ওঠে না ওতে। শীর্ণ শরীরে প্যাঁচানো গোঁফে ভ্যানের দায়িত্ব তার হাতে। সে কম কথা বলে। জটলার ভেতরের নানা কথায় সে একদম নিঝুম চুপ। দাঁড়িয়ে টানতে থাকে কোমরে প্যাঁচানো গফুর বিড়ি। পঁচিশটির প্যাকেট এটি। দাম সোয়া দুই টাকা। ৫০ লেবেল ফেরত দিলে এক প্যাকেট ফ্রি। বাম কোমরে লেবেলগুলা অন্যভাবে আটকানো। সম্ভবত সিমেন্টের ব্যাগের টুকরায়। তবনটা কঠোর রোদে রংপোড়া। দুএক জায়গায় সেলাই মারা। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। ধুলোয় মাখা পায়ে, গোছার ওপরে লাল সুতা বাঁধা। সুতাতে কীসের তাবিজ! সম্ভবত এক্সিডেন হইছিলো ভ্যান। তারপর পায়ের আঘারে বিষ বিশল্যকরণের নিমিত্ত এই তাবিজ। মরা কোথাকার! কপাল কি মরা নিয়েই জন্মেছে? এ জটলার ভেতরে সে ঢুকে পড়ে। যদিও তার উদ্দেশ্য কিছু খাদ্য-খাবার। গত দুদিন খুব অনাহার। কিন্তু মরাটা ওভাবেই ভ্যানে পড়ে থাকলে আর কাউন্সিলের ভেতর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে সময় এভাবেই বেশুমার পার হবে। ভ্যানঅলা টাকা দাবি করবে। কারণ, আরও ট্রিপ আছে তার। এসব নির্দিষ্ট খেপ মিস হলে অনেক লস। সে একটু বিহ্বল হয়। কপাল লাশের দিকে তাকায়। মনে পড়ে ডোমঘরের কথা। এখানে ওই মেয়েটিই নাই তো! নীল পলিথিনের ভেতর সে নড়ছে না তো! চোখ কী খোলা না বন্ধ। সে পাশ ফেরায়। বড়োরাস্তার ওপারে চলে যায়। বড়ো একটা দোকানে ঢুকে পড়ে। অনেক লেনদেনে মাঝে মালিকের সঙ্গে কথা হয় না। সে চোর নয়। মিথ্যাও বলবে না। মোটা আমগাছের তলায় ফিরে আসে।  সেখানে গোলজার! গোলজার!! করে আওয়াজ ওঠে। ক্যারে বা তুমাক তো ভর সাঁঝোত ওটি বসি থাকপ্যার দেকনু, কি কাম বাহে। কোটেত্থাহি আচ্চেন-  নোয়াখালি নাকি।’ কপাল উত্তর খুঁজে পায় না। খাবার চায়। জীর্ণ মলিন পাঞ্জাবীতে এখন অনেক দাগ। মুচি রিফুজি কোত্থেকে এটা আনি দিছিল-  কে জানে। ডোমের কাজের জন্য দুটা তবনের একটা এটা। এখন দাড়িগোঁফ মুসল্লিমার্কায় পরিণত, কদ্দিন কাটা হয় না। খাবারটা গোলজার মালিকের হাত দিয়াই আসে। আলুর ডাল আর অর্ধেক ডিম। হোটেলের সকালের রান্না, এখন সে পাতিল তুলছে, এটা না দিলে খাবারটা ফেলে দিতে হবে। প্রতি রাতে গোলজার মিয়া সব মূল্যবান পাতিল ও জরুরি জিনিস পাশের বাড়িতে রেখে আসে। এ হোটেলের চতুর্দিকে ফাঁকা। কটা পচাকাঠের চেয়ারটেবিল আর কোণায় একটা নড়বড়ে নলকূপ। সারাক্ষণ এ টেবিলে থাকে ঢিলা আড্ডা। আমগাছের ছায়ায় ভরা এ ঘরটার স্যাতসেতে ভাব খারাপ লাগে না। গরমে বেশ ছায়া দেয়। ভোটভাটে খুব সরগরম। দুপুরে আর রাতে বিশ থেকে পচিশজনের ভাত চলে। বৈঠকি মেজাজের এ হোটেলে খাওয়া দাওয়ায় মালিক বেশ উদার। কপাল মাছের পিচ পায়। দুটুকরা মাংসও জোটে। ক্ষুধা নিবারণ হলে এবার আলোর দিকে হাঁটে। বিশাল উঁচু আলোর হাতছানি যেন? কাউকে কিছু বলে না। আনমনে আলোর টানটাই ঠেলে নেয় তাকে। খেয়াল করে ততোক্ষণে কাউন্সিলের সামনটা ফাঁকা হয়ে গেছে। পুন্নি কী চইলে গেল তাইলে? এই কাউন্সিলঘর, জটলা মানুষ, ভ্যানঅলা তারে কই নিয়া গেল। এখন রাত নাইমা আসছে। যে আলোর দিকে সে যাচ্ছে তা এখনও তারার মতোন। আলোর কুটিল চোখ তাতে এখনও শ্যাষ হয় নাই। একটু সামনে এগুলে আলোর তারা হয়তো স্পষ্ট হবে। কিন্তু ততোদূর পুন্নি যাইতে দিবো না? সে তো এতো মানুষের ভেতর থেকে ছাড়া পাইছে। কিন্তু নিজের ভেতর থেকে তো মুক্তি মেলে নাই।
রাত্রি গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোনাকীর আলো আর দূরের বিচ্ছুরিত আলোর ঝলকানিতে গোলমাল ধরা পড়ে। কীসের এক কাঠিন্য যেন ক্রমাগত গ্রাস করে তাকে। হাঁটার পথে পুরনো আমলিগাছের অন্ধকার আর তার পাশোর খাদের কর্কশ ভূতুড়ে পরিবেশ এড়িয়ে সে যখন রাস্তার ধার দিয়া সম্মুখে চলে তখন হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির তেরছা তীব্র তীর শুরু হলে আমলির গাছের আড়ালে সে নিরাপদ বোধ করে। কিন্তু খাদের নিরিহ ভয় তাকে স্থির করে দেয়। সে অপেক্ষা করে পথচারি কেউ তাকে সহায়তা করুক। তার পাশে এসে নিরাপদে দাঁড়াক। ব্যাগভর্তি সওদা নিয়া দুজন লোক ঝরির ভেতর থাকি গা বাঁচায়। কপাল এখন বেশ স্বস্তিতে। এই মুহূর্তে পুন্নির ভয় মুখ্য থাকে না, যতোটা বৃষ্টির ভয়। কিন্তু এ বৃষ্টি তো ভয়ের নয়। এক সকালে শিন্নিপুরে এ বৃষ্টিতে ভিজে সে নওলি ঘাস দেখেছিল। কতোকাল আগের কথা। কষ্টগুলো তখন এমন ছিল না। মানুষের বয়স বাড়লে কষ্টও বাড়ে। নানারকম কষ্ট ঘিরে ধরে। কষ্টের রঙে তখন গোলাপ-কামিনী-জবা-গন্ধরাজ বিরাজ করে। পুন্নির সঙ্গে খেলতে পারেনি সে কখনো। খালি একসঙ্গে বসে নানারকম আলাপ। গ্রামছাড়া হওয়ার সুখ, একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন প্রভৃতি। কিন্তু শর্ত ছিল পোলার মা হমু না। ওইডা কেমুন য্যান কষ্ট। এ দুনিয়ায় খালি সুখ আর অনন্তসুখ। কারো লগে কিচ্ছু রাখোনের কাম নাই। খামু-দামু মইরা যামু। পুন্নি তখন আকাশের দিকে তাকায়। সন্ধ্যা হয় হয় সময় তখন লাল-গোলাপী আকাশে রঙের তুমুল মাখামাখি। তখন তাকাইয়া কয়, জানোস ওই আকাশের মইদ্যে আমাদের দুজনের মিলনের কথা আছে। ভালোলাগার কথা আছে। তাকায়া দেখ গোলাপীর নীচে যে হালকা একটা টান ওইটা দুইজনের মুখের আয়না! খোদার কী কেরামত এগুলা আঁকে ক্যামনে। মনে হয় শিলপাটায় বাটি বাটি লাগায়া দেছে। যারা মানুষ আঁকে, ছবি বানায়, লম্বাচুলের নাকান আর্টিস তাদের কত্তো সুখ। কত্তো কী বানায় তারা! তুমি লম্বা চুল রাখবা। আর্টিস হবা। লম্বা লম্বা চুল রাইখা রাত জাইগা মানুষের ছবি আঁকবা। আমার ছবি আঁকবা। হায়! কী সুন্দর এক ভরা সন্ধ্যায় সে এসব কথা কইছিল। ভাবলে চোখে কান্দোন আসে। মানুষ ক্যান চইলা যায়! চইলা গেলে তার বাঁচোনের কাম কী! এমন কথা পুন্নিও বলছিল। আহা! সে আগেই চইলা গেছে, আমি তাকে মাইরা ফেলাইছি। হঠাৎ করেই সে হুপ পাইড়া চিক্কুর দেয়। তখন ব্যাগঅলা দুইজনের মশগুল আলাপ ভঙ্গ হয়। এ্য পাগল কেডা! আমলি ডালে আর বৃষ্টি আটকায় না। ঝুর ঝুর করে ছিমছাম পড়তে শুরু করে। একটা সময়ে তা আরও বাড়ে। ঝরিভেজা মানুষের মধ্যে মিল হয়। কিন্তু সম্পর্ক কার কি তেমন জানা হয় না। কপাল নামটা বুঝতে পারে না। পরে হাসতে হাসতে উপভোগ করে। আফনে কপালি রে ভাই। কই থাক্ক্যা আইছেন। যামেন কই? এসব নগদ প্রশ্নে তেমন উত্তর আসে না। কিন্তু জেনে যায় সে আলোর ঝালোর ওখানে যাবে। ওখানে না যাত্রা চল্ছে। এগজিবিশনের আলোর কতা কন! ওহ্হ। তা তো মেলা দূর। অবশ্য ঝরি থামলে সারারাতই যাওনের লোক পামেন। এদিক থাকি অনেকেই যায় ওখানে। ভয়ের কিছু নাই। কপালের মনে তৃপ্তি জাগলেও এই বৃষ্টি তাকে বহুদূর নিয়া চলে। সেই শিন্নিপুর! খাদের অন্ধকারটা এখন থিতু। তাছাড়া এই দুইজন তাকে আস্থা দেওয়ার জইন্যে গর্তটা তেমন বিশেষ রূপ নিচ্ছে না। ওখানে কিছু পোকামাকড় ও সরীসৃপের খোলস আছে। নিশ্চয়ই ওই সরীসৃপ। যে ডোমঘরে তাকে পুন্নির মতো জড়াইয়া ঠা-া সুখ দিতাছিল। এতোক্ষণ একাকী পাইলে সে আবার আগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতো। দুনিয়াতে সুযোগের অপেক্ষা থাকে সকল প্রাণী। কে কাকে কীভাবে হেনস্থা করবে, কে কার আগে যাবে বা খবরদারি করবে এই নিয়া প্রাণিজগত। পুন্নি মইরে গিয়া আরামে আছে। সব এখন তার কান্দে। কিন্তু ওদিকটায় হেঁটে আসা বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। তাহলে কী এখানেই থাকতে হবে আরো।
পরিবেশটা ক্রমাগত দুর্বিষহ। চতুর্দিকে বিরান পাথার। এ অঞ্চলে নাম আছে ইসলাম ডাকাইতের। সে জবাই করে মানুষ। শোনা যায় ওদের মুখে। ওরাও একপ্রকার অস্থির হয়ে উঠছে। এ এলাকার বৃত্তান্ত আর ব্যবসার কথা বলছে। মানুষ মাইরে লাশটা বাড়ির বারান্দায় ফেলে রেখে মার্ডার কেসের প্রধান আসামী বানায়া দেয়। শরীফুলের বাবা তেমনই একজন নিরাপরাধ ফেরারী আসামি। পালানু গ্রামের রানুর নিরাপরাধ বাবাও জেল খাটছেন আজ দশ বছর। ট্যাকা যার থানা-পুলিশ তার। জমি বেচতে বেচতে এখন সর্বস্বান্ত তারা। তবুও জেলের ঘানি শ্যাষ হচ্ছে না। এছাড়া মানুষের ঘরে আগুন দেওয়া, আর পাড়ায় পাড়ায় দ্বন্দ্ব চলছেই। চাচা-ভাস্তার দ্বন্দ্বের জের ধরে সেদিন সকালে ভাস্তারা সুবেহ সাদেকের সময় প্রকৃতির ডাকে আসা চাচা বাড়ির খুলিতে সাপকোপান করে শুইয়া রাখে। লাঠালাঠিতে উভয় পক্ষে দশজন আহত, ওরা হাসপাতালে যায় না, চলছে কবিরাজি মলম-মালিশ। চাচার এখনও পা ঠিক হয় নাই। ওর মৃত্যুও হবে ভাস্তার মারের দৃষ্টান্ত শরীরে রেখে। কপাল এসব শুনে তেমন প্রতিক্রিয়া অনুভব করে না। সে কিছু শোনে কিছু শোনে না। এই তেঁতুল গাছটার অবশেসান তার লেগেই আছে। এক্সিবিশন তো অনিশ্চিত জায়গা। এখানে গল্পের ভেতর বয়ে যাওয়ার সময় আর পুন্নির বৃষ্টিস্মৃতি খারাপ কী! যে পরিবেশটা বিরক্তধরা ছিল তা আবার রিফ্রেশে এক আনন্দের জন্ম নিয়েছে। সম্বলহীন একজন মানুষের এমন স্থানিক আনন্দ খারাপ কী! চলুক না আরও বৃষ্টি। নেমে আসুক ঢল। এক জেনারেল তো এদেশে খাল কেটে উন্নয়নের কথা বলে গেছেন। সে খালে এখন বইছে পানির নহর। ঢল নেমে আসুক তাতে আরও তীব্রতায়। পানির মধ্যে আলোহীন অন্ধকারের কলতান দৃঢ়তর হাক। এসব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে ওরা সিদ্ধান্ত নেয় ঝরিবৃষ্টি মাথায় নিয়াই হাঁটা দেবে। আর রাত করা যাবে না। গ্রামের বিপুল গল্পের তোড়ে তাদের সময় পেরুনোর আনন্দ শেষ হলে, ওরা হাঁটার প্রস্তাব দিলে একবার কপালের দিকে ত্রস্ত তাকায়। তার সিদ্ধান্ত জানতে চায়। কীভাবে এ সময় ও সঙ্গের পরিত্রাণ হবে সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দুইজনই একপ্রকার বিপদ মনে করে তাকে। পরিচয়হীন কপালকে না নিতে পারে ঘরে, না ছাড়তে পারে দ্বারে। বিষয়টি প্রশ্নহীন নয়! কপাল আশ্রয়হীন। কিন্তু করুণাহীনও তো! অনেক ভয় অস্বীকার করে সাহসের পায়ে ভর করে বহু কথার মাঝে সে একটা নির্বিকার উত্তর করে ‘আফনেরা যান’। তিরতির করে তখন বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে দিচ্ছে বিজলীর চমক। ওতে কী মুখ দেখা যায়! মুখ দেখে পথিক দুজন যে তাকে আমন্ত্রণ জানাবে সে প্রয়াসও খুব কম। অসহায় মানুষকে তারা ধর্মের বিধান মেনে নিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার দ্বিধাহীন হয়ে তাদের সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব করে। ‘চলেন। সমেস্যা কী!’-  কপাল এবার গম্ভীর হয়া বলে, ‘নাহ্’। অনেক তর্কে তারা ব্যর্থ হয়ে আমলিবৃক্ষের ভেতরেই প্রতিকূল আবহাওয়া অতিক্রমণের প্রস্ততি নিআ সোজা পুবদিকের ঢালু কাঁচা রাস্তায় নাইমে পড়তে শুরু করে। কালিগোলা অন্ধকারে ক্রমশ দুটো অবয়ব এবং কমলামাথার আকার ঘোলা হওয়ার আগেই শুষে নেয়। শব্দসীমাও ইথার তরঙ্গের বাইরে চইলে যায়। নিঃশব্দের ভেতরে তখন ঝুপ ঝুপ আওয়াজ ওঠে। খালের পানির শীর্ণ স্বর ছাইয়া কী যেন একটা সপাৎ শব্দ হয়। ওপারে কোষ্টার খেত থেকে ভেজা কুত্তা গা-ঝাড়া দেয়। আমলীর মোটা গুঁড়ির ভেতর সিটিয়ে থাকা মানুষটা তখন বোবা। নেমে যাওয়া রাস্তার ওপারে একটু দূরেই ঊর্ধ্বমুখি নিমগাছ। সেখানে অন্ধকারের ভেতরে আরও অন্ধকার গায়ে নিয়ে বসে আছে কালো পাখি। ও কী কাক! না শকুন! নাকি কিছুই নয়! এতো বেশি অন্ধকার হইলে সন্দেহ হয়। সেই গোল ডাগর চোখ নয় তো। এতো অন্ধকার, নাকি সেই নিজে অন্ধ। কাজলকালোরূপ কী ছিল তার! তখন হঠাৎই  খুব জোরে চিক্কুর ওঠে- ‘মাইরেন না। বাঁচান…।’ তৎক্ষণাৎ হাওয়া খুব বেগবান হয়। একটু আগের শিথিল পরিবেশ খুব কঠোর হয়া আসে। ভয়ে সিটিয়ে গেছে কপাল। পানি দে। ম্যাচ জ্বালা। খাল থেকে প্রবহমান পানির আঁজলায় তখন বেহুঁশ কপালের জ্ঞান ফেরে। এবার সেও শর্তহীন পুবদিকের কাঁচা রাস্তায় অসুস্থ পদে চলতে থাকে।
অন্ধকার আকাশ আর আঁকাবাঁকা রাস্তায় খুব আন্তরিক হয়ে যায় তিনজন। দূর থেকে আসা একটি মোটর সাইকেলের আলোয় কাজ হয় অনেক। বোধ হয় এটি এক্সিবিশনে যাচ্ছে। উঁচু বড়ো পুলটা পার হয়ে ক্রমাগত নিকটে আসা বাড়ির উঠান পর্যন্ত তখন কেউ নাই। বৃষ্টি মানুষের ঘুমকে আরও গভীর করে তুলেছে যেন। এ গ্রামের পরিবেশ এখন ভীতিকর। কখন কে সিং দেয়, কে কাকে মেরে ফেলে, কার প্রতিদ্বন্দ্বী কে বোঝা কঠিন। এলাকায় সালিশ বসে, মাঝে মধ্যেই। একটা বিরাট এজমালি পুকুর আছে। এ পুকুরের মাছের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এখন দুইভাগারের দ্বন্দ্ব। সেটা নিয়া চলছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো কাটাকাটি। সীমানার বাইরে কাউকে পেলেই হাত-পা কেটে নেওয়া হচ্ছে। আর এ এলাকায় অচেনা কাউকে দেখলেও সে ভাড়াটে বলে টার্গেট হচ্ছে। দুই পক্ষের মুখ দেখা বন্ধ। মামলা হয়েছে, জমি বিক্রি করে মামলা চালানো হচ্ছে। কেউ মামলার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব। কপালেও অচেনা মুখও হতে পারে এ টার্গেটের শিকার। কারণ, তার পক্ষ-প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হইছে, গত বৃষ্টির রাতেই। চোরের মতো এখন তার গৃহবাস। এ আর এক বন্দীশালা। ভাবতে থাকে পৃথিবীটাই কী জেলখানা! এ কারাগার বানাইল কে! এক জেল থেকে আরেক জেল- যেন মুক্তি নাই। কপাল তো জেলের কয়েদি। এক শেকল থেকে আরেক শেকল পরেই চলছে ক্রমাগত। এ শেকল সে ছিঁড়বে কীভাবে? গৃহিনীর আতিথ্যে মুগ্ধ সে। এমন আয়েশের রাত কতোকাল পর যেন সে পার করলো। মনে নেই কবে সে স্বস্তিতে বিছানা-বালিশে ঘুমাইয়াছে। কে তাহাকে খাইয়া দিয়াছে! কুন্তী-মা তো কষ্টের বিনিয়োগ দুনিয়ায় ছাইড়া দিয়াই খালাস। তারপর আবেদ দর্জি। পুন্নি। পুন্নির মৃত্যুর পরেও একযুগ শ্যাষ। ডোমের চাকরির পর কর্মহীন ভবঘুরে, সম্বলহীনও। কিন্তু আশ্রয়দাতারা আগন্তুকের আতিথ্যে হতে চায় পুণ্যবান। কী রহস্যময় এ জগত! ঈশ্বরের কৃপার কী মাহাত্ম্য! রাত্রিছাড়া এখন সে বেরুতে পারবে না। ঘরের জানালায় তাকিয়ে বাইরের উদাসী হাওয়া আর কিশোর-কিশোরীর লোকখেলার আওয়াজ শোনে সে। মাঝে মাঝেই জলখাবার আর শরবত আসে। কাল রাতের দুইজনের নামও ঠিক বলতে পারছে না সে। কোথায় তারা? ঠিক চেনাও যাবে না বোধহয়। তবে গলার আওয়াজে চিনে নিতে পারে সব। গৃহিনী বলে : ‘আফনে সন্ধ্যার পর যাইয়েন’। আমগোরে পাড়া খারাপ। কপাল দুপুরঘুমের ঘোরে চইলা যায়। বাইরে তখন দুদ্দাড় আওয়াজ আর মানুষ চলাচলের হনহন শব্দ। এক অনিশ্চিত পথের অপেক্ষা এখন তার।


রশীদ মাস্টার এই প্যান্ডেলের প্রধান মানুষ। অপেরার ভালোমন্দ তিনিই দেখেন। সার্কাস আর জুয়ার কাজেও তিনি। রাতে হাউসি চলে- এটাও তার নির্দেশে। এবার এক্সিবিশান জমজমাট। হাউসিতে কার-মোটরসাইকেল-ফ্রিজ থেকে শুরু করে ১০০০/-পর্যন্ত আছে। লোকজনের আসা-যাওয়া রাতদিন সবসময়। যাত্রা শুরু হয় রাত আড়াউটায়। বাবরিঅলা এক সঙ সে নির্ধারিত মাইকে ভরাট গলায় প্রচার শুরু করে ‘বইয়ের নাম মোগলেআযম…’। অনেক দূর পর্যন্ত মেলার বিস্তৃতি। শীতের মৌসুমে এ জমিতে আবাদ নাই। একমাসের এ মেলায় খুদে দোকানদার থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। বিরাট টাওয়ারে শতরঙা বাতিতে উজালা গোটা প্রান্তর। ঠিক মধ্যিখানে উঁচু মঞ্চ। সেখানে লাইট আলাদা। চৌকোণার চার লাইটের আলোয় অভিনয় চলে, পরে তা মঞ্চের ঠিক কোণার ঢালু রাস্তায় অবনমিত হয়। কপাল এই প্যান্ডেলে আইসা দিশেহারা হয়া এ দোকানদারের কাছে কীসব জিজ্ঞাসা করে। কথাগুলা প্রলাপ মনে করে কেউ এর গুরুত্ব দেয় না। প্যন্ডেলের নানা দিকের উজ্জ্বলতা আর নানা বর্ণের মানুষের ব্যস্ততা তাকে আর্টিস মানুষের কথা মনে করায়। রশীদ মাস্টার আজ মোগলে আযমে অভিনয় করবেন। সে রেহার্সেল হচ্ছে সাজঘরে। কপাল দরোজায় দাঁড়াইয়া একেকটি মানুষের অভিনয় আর বিপুল অট্টহাসি ও আনন্দের রাশি উপভোগ করে। জীবন কতো বৈচিত্র্যময়। কতোভাবে এক এক চরিত্রের ওপর দাঁড়াইয়া তাহারা অভিনয় করে। সত্যজীবন বা মিথ্যাজীবনের সোনালী গল্প করে। জীবন নিয়া এতোই রসিকতা! এ যাত্রাদলেই সে থাকিয়া যাইবে। সে আর্টিস হইবে। পুন্নির পরাগায়ণ আর নতুন করিয়া সে চায় না। সে বাঁচিবে। সে জীবিত। ভয় আর মৃত্যুকে সে বাতিল করিয়া দিয়া এমন সব অভিনয়ের ভেতর জীবন কাটাইবে। আজই তার রশীদ মাস্টারের লগে দেখা করোন চাই।
মাস্টারির পেশা তার বহুকালের। সেসব দিনে যাত্রার নেশা রক্তে। অভিনয় তার আনন্দ। কপাল তোর বদলী জীবন শুরু হইবে। কীয়ের কপাল! তুই এখন সিন্হা। স্যর আমারে ঢুকাইয়া দেন। মাস্টোর কয় আমার বাড়িত আয়। তালিম নে। প্রত্যেক বছর যাত্রা হবি। নাটক তোরে শিখামু। গান ধর আমার লগে :
রঙ্গ মশাল জ্বাইলা দিমু আমার জীবনে
সে পথ ধইরা আয় রে হায়
সে পথ ধইরা আয়.. (২)
রঙ্গ মশাল জ্বাইলা দিমু আমার জীবনে
সে পথ ধইরা আয় রে বন্ধু
সে পথ ধইরা আয়… (২)
এক জীবনে দেখুম তরে
নিশা লইবা না রে বন্ধু
নিশা লইবা না (৩)
রঙ্গ মশাল জ্বাইলা দিমু আমার জীবনে…
বাউল নাকি মাস্টোর? লগে লগে গান বান্ধে, শায়োর বানায়। এসব কাওয়ালি-ধ্বক কপালের দেহতরীকে পুলকিত করে তোলে। ভবদরিয়া কী তার জন্য অন্য পথ আবিষ্কার করল নাকি? মাস্টোর মাঝে মাঝে ডায়লোগ কয়। বিদেশী নাটকের ডায়ালগ বুঝাইয়া দেয়। ‘দাউ টু ব্রুটাস’ নিয়া টেরাজিডির কথা কয়। মুখস্থ আর মুখস্থ। কপাল তো পড়ে নাই। সে কিচ্চু জানে না। কী করিয়া সে অভিনয় করিবে! যে আর্টিস হওয়ার জন্য সে উন্মত্ত তা কী প্রকারে সম্ভব। স্যরকে সুযোগমতো বলার অপেক্ষা দরকার। শুধু খাওন থাকোন তো তার কাম নয়। ডাক আসে- সিনহা…, সে বুঝতে পারে না। অভ্যস্ত নয় এসব নামে। কানে পড়ার আগেই মাস্টোর কয় : ‘কাম কর, তুই ভেত্রে যা’। মাস্টোর ইশারায় তার স্থান বদলায়। আজ তার আসর। কামের মানুষ না থাকলে বিরক্ত লাগে। পুরো সময় জুড়ে চলবে কাওয়ালি। সব একসাথে না থাকলে আসর জমে না। শালা এখনও বুঝে ওঠেনি। একটু পরেই জমে ওঠে আসর। কাওয়ালির সুরে মাতাল হয়ে উঠলে, সবাইকে নিবেদন করে মাস্টোর। গাঁজার টান ধরে গুলজার হন, আসর আরও মাত হয়। সিনহারে ডাক-  চলে যায় ডাকু। মাস্টোরের এ পরিবেশ দেখে তার ভয় আর সাহস তীব্রতর হয়। পলকে তাকায়, মনের হাওয়ায় দুলে ওঠে ভেতরের সম্বিৎ। সে কী যুক্ত হবে এখানে! কেন যেন সবই এক আকর্ষণের প্রহেলিকা। এক ধ্যানে অনেক রাত চলে যায়। বাড়ির পাশে এক খাঙ্গায় তার বসত শুরু হয়। এ মাস্টোরেরই নির্দেশ।
একটা নিরাপদ সময় চললেও কপাল নিরানন্দই থাকে। এক্সিবিশন শেষ হলেও মাস্টোর তাকে রাইখা দেয়। এতো বড়ো বাড়ির সীমানায় মাস্টোরের নিজের লোক নাই। সে দুনিয়াদারি করে, এলাকার শেঠজি। কিন্তু আশ্চর্য, তার কোনো একান্তজন নাই। কপাল সেটা এতাদিনে বুইঝা ফেলছে। মাস্টোর রহস্যময়। মাঝে মাঝে থানার লোক, তহশিল অফিসের লোক, এলাকার চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত গডফাদাররাও আসে তার কাছে। কাজীর দরবারিও সে করে। আবার এ এলাকার গান-গজলের সবকিছুর মধ্যমণিও সে। তার অনুমতি ছাড়া সব অচল। এতো কিছুর সাম্রাজ্য তার অথচ বিশ্বস্ত ও একান্তজন তার কেউ নাই। কপালের মাথায় এসব থাকে না। কী হিসাব-কেতাব কে জানে! আর যে গান আর যাত্রার পাটের আশায় সে এখানে আসে- সেগুলো মাস্টোরের অনুমতি ছাড়া হওয়ার উপায় নাই। কিন্তু মাস্টোরকে কঠিন মনে হয়। যখন সিন্হা স্বর ওঠে, তখন সব পাতা উইড়া চলে, আকাশের মেঘ পালেয়া যায়, গোধূলীর রঙ পাল্টায়। কুঁকড়ে যায়- ‘স্যর’। আর কানোত কিচ্ছু ঢোকে না। চোখের সামনের কমলা রোদ হারায় তার স্নিগ্ধতা, বাতাসের রব থাইমা যায়। লালমুরুগ পাখা ঝাপটে উড়ে ওঠে চালঅলা প্রাচীরে ক্ষীণস্বরে বাঁকে, তখন উচ্চৈঃস্বরটা কানে আসে-  ‘তাহাজ্জদ পড়ে আসিস’। মাস্টোরের এই এক স্বভাব নামাযের টাইম ধরে কাজকর্মকরা। অথচ ধর্মকর্ম কী করেন কারো জানার সাধ্য নাই। সেসব নিয়া কারো প্রশ্নও নাই। এ বাড়ির অন্দরমহল অনেকটা সুনসান। তার পরিবার নিয়া তেমন কোনো কথা শোনা যায় না। তবে মাস্টোরের এসব বিচিত্র বিষয়ের দাপট কপাল উপভোগ করে। বিশেষ করে গানের আসরের ভূমিকা অতুলনীয়। কপাল এই দস্তুরের মানুষকে ভালোবাসে, গভীর দরদ করে। কিন্তু সেসব প্রকাশের অভিপ্রায় কোথায়! যে খাঙ্গায় সে থাকে সেখানে তার ভাতে পেটে রাখার গুরুত্ব কি তাও তো সে জানে না। তবে কী সে আবার আরেক বন্দীশালার আসামী! ক্রুদ্ধতা নয়, ভেতরের অবসাদ তাতে আরও বাড়ে। আবেদ দর্জি বুঝি ঠিকই কইছিল শাদা জীবন নাই। কিন্তু শাদা ছাড়া কাম নাই। এভাবে এক হর্ম্য প্রাসাদময় অভিজ্ঞতায় ডুবন্ত প্রতিবেদন নির্মিত হয়- কপালকর্ণের। কিন্তু সে তো কর্ণের মতো প্রতিষ্ঠিত যোদ্ধা নয়। নিছক মা-হারানো এক মানবপি- ছাড়া। দ্রোণ আর কৃষ্ণ আশীর্বাদপুষ্ট অর্জুনের অহং সে মুছড়ে দিয়েছিল। প্রথাকে অস্বীকার করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ সে দিতে পেরেছিল। একইভাবে দুর্যোধনের মিত্রতাও শত কষ্টের মাঝেও ধর্মের সঙ্গেই পালন করেছে। কপাল সেখানে তুচ্ছ। কেউ তাকে অধিকার যেমন দেয় না তেমনি সে অধিকার কায়েমও করতে পারে না। এ ভুবনে সে কী এতোই তুচ্ছ! এই আশ্রয় কীসের! মাস্টোরের কৃপা কেন! সে তো মিথ্যা বলে না। তার তো কৃপার লোভ নাই। সে তো অবিশ্বাসী নহে। তবে কী আজই মাস্টোরের লগে সব খুলে বলবে! তাই তো শ্রেয়। বিহন বিজনে এই কারাগার অমৃতময় হয় কী করে! রক্তমাংসের কোনো মানুষই তা পারে না। এছাড়া মাস্টোরের রহস্যও সে ধরতে পারছে না। সে কঠিন এবং প্রচুর মনের বিত্তে পরিপূর্ণ। সে মনের কুলকিনারা পাওয়া কঠিন। সে দাঁড়াবে কোথায়। কার কাছে যাবে! নাকি এমনই তার শেষ জীবনের স্বপ্ন! শখের যাত্রা বা গানের আসরের ব্যর্থতার পর এ বাড়িতে সে এখন শেকড়হীন মানুষ বলেই গণ্য। রাতের ঘুমের পর প্রায়ই সে বোবাক্রান্ত হয়। কে যেন বলেছে খাঙ্গা ঘরে চিল্লায় ক্যাডা! বোবায় ধরছেনি। খুঁজে পায় না কিছু। অনেক রাতে এসব খবর নিয়া নানারকম গুঞ্জরন চলে। সত্যিই হের কী কুনো সমেস্যা আছেনি!
এক সময় রশীদ মাস্টোর কয় সিনহা তুমার তো কেউ নাই। তুমি এইহানে থাইকা যাও। মনে মনে কিন্তু… শব্দটি বইলে আবার তা থাকে না। মিলাইয়া যায়। দ্বিতীয়বার আর জিহ্বা নড়ে না সিনহার। এমনিতেই এ এলাকার পাড়া পড়শি বোবায় ধরা বা নানারকম আলাপে তাকে আলাদাভাবে চিনতে থাকে। কথা কম কয়, বিশেষ তৎপর নয়। শক্তি-সামর্থ্য কি আছে তা জানা যায় না। নাম-ধামেরও ঠিক নাই। সিনহার সাথে মাস্টোরের সম্পর্ক কী? জানে না কেউ। একপ্রকার ঘনানো রহস্য চারিদিকে সংক্রামিত হতে থাকে। এ বাড়িতে তাহার নাম সিনহা বলিয়া সকলের কাছে পরিগণিত হয়। কপাল মুছিয়া গেল। আর কি কি তাহার জীবন হইতে মুছিয়া গেল কেউ জানে না। এমনকি কপালও জানে না। কিন্তু সবকিছু যেন এক ঘোর আর চক্রের মধ্যে প্রধাবিত। কী এক ক্রীড়নকে যেন সে আটকাইয়া। জীবনের এ ফের সম্পর্কে কপাল কিছুই জানে না। মানুষ বুঝি এরকমই। কে তাহার জীবনের সাক্ষী? আকাশ-মেঘ না বৃষ্টি! একদিন যখন খুব বৃষ্টি হয় তখন তার কাছে শুধুই পুন্নি ছিল। তার তরে জীবনের সব কথা অকূল পাথার আর বৃষ্টির লগে প্রকাশ পায়। সে তো সুখের কাল। ভিজতে ভিজতে সে চুলের বেণীজোড়া ঘাড়ের পাশ দিয়া সম্মুখে আনে। তখন ঘাড়ে ছিল কপালের উষ্ণ হাত। সে চুল নাড়ে, পিঠে হাত দেয় বিপরীতে সেও রঙজ্বলা তবনের ভাঁজ পড়া থাইয়ের ওপর আঙ্গুল দিয়া কী কী সব আঁকে। মুঠো দিয়া নরোম চাপ দেয়। মাথায়-গালে-চুলে হাত বুলায়। তখনই মেঘ করিয়া আসে এবং ঝমঝম ঝুম বৃষ্টি নাইমা পড়ে। সবকিছুকে উতরোল করিয়া তোলে। রাখাল তখন গরুর পাল নিয়া যায়, ঈশ্বরকাকা দূর থেকে কী য্যান ভাইবা খুব জোরে চিক্কুর দেন। সূর্যডোবা ধোঁয়াটে কুয়াশান্ধকারে তখন নিধুয়া পাথার বিদায়ের বোল তোলে। বৃষ্টিটাই তো তখন পুন্নিকে সাক্ষ্য তরে। সে বিলাপরাগে সন্তোষ প্রকাশ করে। কঠিন ও সত্যকে বাতিল করিয়া দিয়া পর্বতের উৎসবে ডাইকা আনে হিমালয়ভোর। ঈশ্বরকাকা কোনো এককালে দেখতে কী আবেদ দর্জির মতো ছিলেন! নাকি তিনিই আবেদ দর্জি। চিক্কুর পাইরা কুায়শাঢাকা পাথারে তখন শীর্ণ আওয়াজ বাতাস তরঙ্গে বিচ্ছুরিত হয়। ঠিক বহুদূর থেকে ভাইসা আসা কোনো কিশোরীর আওয়াজ। এই কিশোরীই কি ঈশ্বরকাকার ছাইড়া যাওয়া মাইয়া। নাহ্ ভুল দেখে কপাল। এখানে শাদা আবেদ দর্জি আর কুয়াশার মশারি এক হইয়া তৈরি করে লঘু ভয়ের পরিবেশ। সেখান থেকে বাহির হইতে গেলে তাতে চাপ আসে। বলকানো হুতাশন তাতে আচ্ছন্ন কইরা তোলে। এটা তো শাদা দর্জি নয়। ঈশ্বরকাকা! ঈশ্বরকাকা খুব নরোম রোমে ভালোবাসেন, কথা বলেন কত্তোকালের উচ্চারণে। তিনি দর্জি নন। জীবনের বড়ো কষ্ট কখনো বুঝিতে দেন না কাউকে। কী তাহার কষ্ট। আবছায়া ধইরা নিষ্প্রাণ না হইয়া এক চলৎশক্তি অর্জন করেন তিনি। বিবাহিত একমাত্র সন্তান স্ত্রী ছাড়িয়া যাওয়ার পর তিনি আর বিবাহিত হন নাই। এক কঠোর ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে। জীবনের উৎসবগুলোতে হইয়া পড়েন ম্রিয়মান। তিনি চলতে ফিরতে এক বুক জ্বালা বুকে কইরা চলেন। ফিরে ফিরে তার জীবনে ছন্দপতন ঘটায় তার হারানো জ্বালা হারিয়ে যাওয়া একমাত্র কন্যার শোক। এ শোক দ্রবীভূত হয়। গঠিত ও পুনর্গঠিত হয়। কেন তিনি কন্যা হারালেন! তার বিসর্জন কোন প্রাণের নিমিত্ত! এই আলোহাওয়ায় এক শোক তাকে কেন কুড়ে কুড়ে খায়। যে একান্নবর্তী পরিবারে তাহার জন্ম সেখানে তো অপরাধ ছিল না। শিন্নিপুর গ্রামে খুব আগ্রহ নিয়া তাহার নতুন জীবন শুরু হয় যুদ্দের বছর। পাকসেনা গ্রামে আইসা পড়ছে। দখল করছে ভূমি-জমি-বাড়িসব। চিক্কুর উঠছে চতুর্দিক থাইকা। কয়েকটি গ্রামের কর্তারূপে আবেদ দর্জির ‘শাদা’চিন্তা তখনও গাঢ় হয় নাই। তরতাজা তরুণই বলা চলে। ভূমিকাটা বিশেষ ভালো আছিল না তার। শান্তির সাথেই তিনি আছিলেন বলে এ এলাকার কয়েক গ্রামের মানুষের ধারণা। কিন্তু ঈশ্বরকাকার যুবক বয়সের তেজে দ্যাশের লাইগা পরাণ দিমু, পেছামু না। শান্তিটান্তি বুঝি না। তার কারণেই অনেক মানুষের ইজ্জত বাইচে যায়। ক্যান এ যুদ্ধ, কীসের লাগি এ যুদ্ধের প্রকাশ ও সৃষ্টি তা না বুঝিলেও বেদনার্ত জনপদে তিনি ত্রাতাই আছিলেন। অনেককে বাঁচাইয়া দেন, পার কইরা দেন। একক হাতে মুক্তির টেরনিং নেন। মনে আছে, শিন্নিপুরয় তখন রোজার মাস। বৃষ্টিও খুব। নৌকা চালানোর নেশাই তাকে জয় আনিয়া দেয়। পাকসেনারা দলিত হয়। ওল্লাউল্লির ভেতর য্যান ত্রাতা হইয়া ওঠেন তিনি। খালবিল আর দুধডোবা শীর্ণ নদী পার হইয়া ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলের ভেতরে কয়েক রকমের গর্ত তৈরি করে সেখানে শত শত অনেককেই আশ্রয়ের ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। সেই গর্তে মশার কামড় আর বর্ষার ঝড়ের তুমুল প্রশ্বাস তুচ্ছ হইয়ে যায় শুধু বাঁচনের জন্য। মরণের ভেতর থেকে যারা ফেরেননি তারা বাইচে যান। আর মরণে যাদের বাস তারা চিনতে থাকে মৃত্যুর কষ্ট আর বাঁচার দ্বিধাকাতর উদ্বিগ্নতা। যুদ্ধের ভেতরে বাঁচার অহঙ্কারও তৈরি হয়। সাহসটুকুও পায় অসীমতা। ঈশ্বরকাকা সেসব জয় করেন। মানুষকে তার সৃষ্টির চাইয়া বড়ো কইরে দেখেন। দ্যাশ আর মাটির দরদ সবকিছুর সঙ্গে মেশানো ছিল। কপাল সেই ঈশ্বরকাকার দিকে তাকাইয়া কইছিলো, কাকা তোমার ছাওয়ালডা আর আইবো না। এখনও সেই কষ্ট বহিয়া যায়। ঈশ্বরকাকা তারই শাস্তির প্রতীকে পরিণত হন। দূর কুয়াশায় আটকানো মানুষটা গল্পের সিঁড়িতে পা দিয়া এক দহে আটকাইয়া পড়েন। সেখানেই কী সমস্ত বেদনার প্রতিমূর্তি রচিত হয়! সারাজীবন যেন দান আর দানীর তপ্ত সুখ কাঁধেই রাখিয়া যান। ঈশ্বরকাকার যে বিবাহিত জীবন শুরু হয় তা নিরানন্দ ছিল না। অনেক সহায়রূপে যে লক্ষ্মী গৃহে আসিয়াছিল তা তার ভাগ্যলিপি। সেখানে জীবনের সুখ-আনন্দের প্রভূত প্রবাহ তরঙ্গমালা অনেকর জন্যই ছিল ঈর্ষণীয়। লোভ বা পাপ তাকে স্পর্শ করে না। তা যাতে কোমল জীবনে স্পর্শশীল না হয় সে ঐক্য দৃঢ় ছিল। সুখের সময়ে সবকিছু নতুনরূপে আবির্ভূত হয়। সে আবির্ভাবে বুঝি সবকিছু নতুনরূপে ধরা পড়ে। সম্মুখের সমস্ত স্বপ্ন তাতে অনিঃশেষরূপে গৃহীত হয়। ঈশ্বরকাকা এক নবজীবন পাইয়াছিলেন। নবজীবন, নতুনরূপ। নাম তার দেন নবোদা। এ নবোদা বুঝি আবার ফিরিয়া আসিয়াছেন। নানা রূপে তার আবির্ভাব। জাতিস্মররূপে। নাম দেন নবোদা। শিশুটি উভয়ের মধ্যে এক চিরন্তন লীলা বররূপে কামিনীকুঞ্জে বিকশিত হয়। সে নবোদারূপে এ পৃতিবীতে আসিয়াছে। সেই তো কুয়াশায় কায়া। সে নবীনরূপে ধরা দিয়াছে। হাস, দেশযোদ্ধার দল, হাসিয়া ফাটিয়া বল এ এক দেশযোদ্ধার পুত্রী। যে আঁধাররাত্রে অন্যের জীবনকে ধরায় আনিয়া দিয়াছিল, সে জীবনের আশীর্বাদ পাইয়া সে এইরূপ ধরিয়াছে। এ তাই কুঞ্জকামিনী। নবোদারূপে আসিয়াছে। ঈশ্বরকাকা এখন এই কুয়াশায় ভাসিয়া বেড়ান। সে কি তাহারই নবোদার জন্য। কপাল জানে না। কিন্তু শিন্নিপুর ও দুধডোবা নদীর পাড়ের সক্কলেই জানে এ এক যোদ্ধার ঔরসজাত। তাহা তাহার প্রেমের ফসল। প্রেমপ্রতীকের পূর্ণপ্রবাহ। এ জীবনে অনেকের জন্মই হয়, কিন্তু নবোদা আলাদা পূণ্যে কথিত কামিনী হইয়া ওঠেন। অকস্মাৎ নয়, দেশ স্বাধীনের পর ক্রমশ এক ঢেউ জীবনের দান বিফলে যাইতে থাকে। বিরোধ তৈরি হয়। একে অপরের প্রতিপক্ষরূপে দাঁড়ায়। প্রবলতার ধার উচ্চৈঃস্বরে বহিয়া চলে। কেউ আর আপন পরের মুখে নয়। সে হইয়া পড়ে নিজ নিজ স্বার্থে ব্যাকুল। সে রকমই ঈশ্বরকাকা আঁচ বোঝেন। গৃহিনী আর তার থাকেন না। অনটন, লোভ, অতৃপ্তি, অনাহত আকাক্সক্ষা বাড়িয়া উঠিলে একদিন দেখা যায় চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে। আগুয়ান আগ্রাসন অতৃপ্তির প্রবাহে হয়ে উঠেছে দৈন্য। ভাঙ্গিয়া যায় সেই আকুল স্বপ্নদিনের প্রত্যয়গুলি। নষ্ট হয় তাবৎ বাতারণ। কী এক ঢেউ যেন তড়পাইয়া কয়, আয় আয় আয়! সে কি দুধডোবা নদীর হাস্যরস না দুঃখতীরের হাহাকার। শান্ত এ নদীটাও যুদ্ধের আত্মীয়তা ভুলিয়া গিয়াছে। তাতে এখন বিষসাপ ভাসিয়া বেড়ায়। সেখানে আর আসে না অনেক বিরহের আনন্দমাখা জীবনের স্পন্দন। এতো তাড়াতাড়ি সে যখন শুকিয়া যায় গৃহীনির জীবনও তেমনই হয়। কপালের মুন পড়ে সেই বৃষ্টিসাক্ষী। ঈশ্বরকাকাকে সন্তানসমেত ছাড়িয়া যান গৃহিনী। মেয়েটির জন্য সে অনুনয় করিলে তা আইনের কোটায় আটকা পড়ে। এই সন্তানের লালসা আর তার অমোঘ মোহ অনস্বীকার্য হলে ঈশ্বরকাকা রাগী চোখে এক সময় বিনষ্টির জন্য সবকিছু করেন। যদিও স্বাধীনতার পর সেই আবেগের মূল্য ও দান কে দেবে তা নিয়া সংশয় কম থাকে না। সবকিছুর বিপরীতে একটি বিকশিত শিশুই তার কাছে মেরীমা হয়ে ওঠেন। নবোদা বা মেরীমা তার প্রথম প্রেম কী? সে জড়াইয়া ধরে। পৃথিবীর সব প্রেম তাহার বাবার জন্যে। বাবার প্রেম সেই ডাক তার জীবনে এক অপ্রতিহত কষ্ট হইয়া উদিত হয়। সে উদয় সুবেহ সাদেক পার হইয়া মধ্যগগনে আসিলে- এক প্রকার সিদ্ধান্তই আসে ‘এ জীবনের পিতৃত্ব অবহায়তার আরও নিষ্ঠুর’। সত্যিই তা-ই। তাই হয়েছিল তার জীবনে। ঈশ্বরকাকা কুয়াশার বুক ভেসে বাউরা হইয়া পথে পথে চলেন। ভূমি-মাটি তার কেহই নাই। সে উন্মাদ ও বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে কী। শিন্নিপুর গ্রামের মানুষ তাকে যতোটা ভালোবাসে ততোটাই তার প্রতি বিরূপ হইয়া ওঠে। তাবে কী তার প্রয়োজন ফুরাইয়া গিয়াছে! সেই যুদ্ধের কালে, যুদ্ধের ময়দানের সেই উদ্ধার হওয়া জবিন আর সুখস্বপ্নের জীবন এখন তিরোহিত তর্পন। সে কটকটকটাস আওয়াজ করে। শিশুদের তাড়ায়, ঘ্যাঙায়, উত্যক্ত করে। এভাবে পাগল না বিহ্ববল ঠিক বোঝা যায় না। অনেকদিন এভাবে গড়তে থাকলে, কিংবা তারই খাল-সদী আর নৌকার বিস্মৃত সুখস্মৃতি পড়ে থাকা মানুষহীন নৌকো পাইয়া গেলে হঠাৎ তিনি উধাও হন। বায়ুতে মিশিয়া যান। এ পাড়ায় তখন গুঞ্জন ওঠে। ঈশ্বরকাকা নাই, তিনি পাগল হইয়া চলিয়া গিয়াছেন। বেদে হইয়াছেন, সাপুড়ে হইয়া তিনি সাপখেলা দেখান, কেউবা সে সাপখেলা নাকি সাপলুডু, দ্যাশটাই তো সাপলুডুতে চলতাছে- তাই ঈশ্বরকাকাও তাই করেন। এভাবে বিনাশী কাকা পেরোন বহু ক্রোশ। সবকিছুর আশ্রয় তার নবোদা। সে তাহাকে ছাইড়ে গেল! আর কী ফিরিবে না? নবোদার কথায় সে শান্ত হয়, ছবি দেখে, নাদুস নুদুস হয়, তুলতুলে হয়, কিউটি বাবুর কথা কয়! পরে আবার চিক্কুর, দু! দুংদাং আওয়াজ। এসবে সে ডিসঅর্ডার। লেজ যেন বডিকে নাড়ায়। গায়ে পুরনো পাঞ্জাবী আর সেই পুরনো পায়জামা। কপাল সেই ঈশ্বরকাকার ছবি ভাসতে দেখেন এই কুয়াশার মশারীতে। আরও তরতাজা মনে হয়, হ কবেকার কথা, ঈশ্বরকাকা কই? তিনি কী আর ফিরিয়াছিলেন। তার খোঁজ কেউ কী জানে। কাহার আর সময় আছে! যে দেশযোদ্ধা, এই দ্যাশের জন্য সাহসী হইয়াছিলেন, কিন্তু সে কী সেই প্রতিদানেই দ্যাশছাড়া হইলো? রশীদ মাস্টোরের আদেশ তো পার হওয়ার নয়। সেটি কার্যকরের ফরমান আসিবে! বৃষ্টিসাক্ষ্যতে সে পুন্নির ভেতরে ঈশ্বরকাকার কষ্টকে কেন গাঁথিয়া দিল। পুন্নির জন্য এক বিশেষ ভয় যেমন, তেমনি ঈশ্বরকাকারও নবোদা আর আবেদদর্জির ‘শাদা’- এসব নিয়া কী প্রতিটি মানুষ ভীত ও সংকুচিত হইয়া এ কারাগারে বাস করিবে। অসুখগুলি এতো নিষ্পাপ কেন? কেউই কী খুব বেশি অপরাধী! পুন্নির স্মৃতিমাখা সময়ে ঈশ্বরকাকা অহংকারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভূমির-দ্যাশের আর সর্বোচ্চ্ সেবক- এই গাঁয়ের। তার এই নিরুদ্দেশ পরিণতি বেদনাবহ। হায়রে, সেই সন্ধ্যায় যখন সে পুন্নির চুলে বিলি কাটে, পিঠে-শরীরে অনুরাগের গন্ধ নেয়, করতলে তার মুখ স্থাপন করিয়া চুম্বনরত থাকে- তখন ক্রোশদূরের ছায়ায় ঈশ্বরকাকা খুব নির্জলা সুন্দর মানুষরূপে হলুদ শর্ষের আলের দারে পা ফেলিয়া কমেশ উজ্জ্বল হইলে কন, ত্বরা কুসুম চিনোস? ক কুসুমের অর্থ কী? উভয়ে লজ্জায় সিটিয়ে ন্যূব্জ হইয়া পড়িলে কন, কাঠগোলাপের গন্ধ চেনোস? আমি পথের হাঁটানিতে তা চিনতে পারি। এরাম বইসে ত্বরা কাঠগোলাপের গন্ধ দে, সেই গন্ধে তোদের কেউ ভুলিবে না। আর এদিনও সহজে আসিবে না। হাঃ হাঃ। সত্যিই কী তাই হইয়াছিল! এতোকাল পর কপালের আর মনে নাই। এখনও সেই কাঠগোলাপের ভরা বারান্দায় বসিয়া সে মাস্টোরের আদেশ নিয়া ব্যস্ত। ওই দূরে এক ভিটেয় তার অবস্থান। সেখানে সে ছাইয়া ফেলেছে, চারিদিকে পিড়ালি পাতাও আছে। পাশে পুকুর ও বিস্তৃত লেবু, কমলা-করমচার আবাদ। সেই ঘরে তাহার আরম্ভ হইবে নতুন জীবন। নতুন কর্মকা-। সে উত্তর না পাইলেও মানসিক প্রস্তুতিতে এগিয়া চলে। আশ্রয় কী যে নির্মম। অনাঘ্রাত হলেও আরও বেশি আঘ্রাত। কপাল এখন সিনহা হইয়া একটা ভিটেতে পুনর্বাসিত হইতে থাকিবে। পুন্নি কী এভাবেই তার ছাওয়া ঘর ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। পুন্নির ঘর মুটিয়া যাইবে। নতুন কী কেউ আসিবে! তবে তার মনে থাকুক, ঈশ্বরকাকার মুগ্ধ স্মৃতি। মাঝে মাঝে জিয়ারতের উপদেশে এক সময় দরুদ ভেজানোর পথের শাদা দর্জিকে। কিন্তু কিছুই কী থাকে! ফিকে কী একটুও হয়ে যায়নি- পুন্নি বা কাকা। মুখিয়া থাকে ভয়। কিন্তু পরিবর্তন তো চাই।

৫.
খুব তপ্তরূপে, বিসর্জিত মানসিক চিন্তার ভারে ক্রম-অপসৃত ও অপ্রকাশিত একাকী (এখন থেকে সিনহা) ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ হয়ে ওঠা কপাল মনে হয় পাল্টাচ্ছে। তবে কী এই প্রান্তরে মাস্টোরের দেওয়া বাড়িতে তার কোনো অভিষেক ঘটেছে। তার জীবনতো এক হত্যাকারীর গল্প। নিজের ঔরসজাত সন্তান ছাইড়া শোক ভুলতে পারেননি ঈশ্বরকাকা। আর সে পুন্নির মতো মাইয়ারে খুন কইরা পরের দেওয়া পরের জমি নিয়া সে এখন পাল্টাইতে চায়! মনে আছে বড়ো বড়ো চোখ আর হিম সাপ তাকে প্যাঁচাইয়া ধরার যে কাম করেছিল- সে প্রতিশোধ তো শ্যাষ হয় নাই। এই বাড়ির শান-শওকত নিরুত্তর। একটিয়া বাড়ি। সে একখান ট্রানজিস্টর পাইয়াছে। তাহাতে সে সময় গুণিয়া পুরনো গান শোনে। গোল হইয়া কয়েকজন খবরও শুনে। বিশ্বস্ত খবরের মধ্যে একটি ‘জেনারেল পদত্যাগ  করিয়াছেন। এখন গণতন্ত্র বাঁচানোর ভোট। কী চমৎকার লোকসুরে বিবিসিবাংলা শুরু হইলে কথা কয় ‘সুভদ্রা…’। ঢাকায় মিলন ডাক্তার মরছে। ট্রাক চালানো দিয়া শুরু হইছে মিলন দিয়া কী শ্যাষ হইলো…। জনতা এখন বিচার চায়। কপাল মূর্খ হইলেও খবর শোনার ন্যাশা কম নাই। সে প্রায়ই তাকাইয়া থাহে পুণ্নিমার পূর্ণির দিকে। জীনের ন্যাশা কি! মিছিলের পর মিছিল আসে। এ এলাকায় সরকারি দলের লুক আছে। চিয়ারম্যান সাব এসব দেখাশোনা করেন। আল্লাঅলা বিল্ডিংয়ের অফিস নাশ হইছে। জানালা ভাঙছে। দরোজা ভাঙছে। সিঁড়ির ওপর দিয়া টাইনে নামাইছে ফ্যান, লোহার রড, দামি আসবাবপত্র। দোতলা থাইক্য তিনতলা… ছয়তলার স্টিল আলমিরার তালা ভাইঙ্গা জিনিসপত্র নামানো হইছে। কাগজপাতিতে আগুন দেছে। এক রাত্তিরে আল্লাওলা ভবন নাশ হইলে মতিঝিলপাড়ার আর কেউ নাই। সব পলাইছে। চিয়ারম্যান সাব ঢাকাত থাকি নাইটকোচে ফিরা এসব বিবরণ দ্যান। পাড়ার মানুষ কবস্থানের পাশে শিরিসের গাছের তলে বইসে চিয়ারমেনের মুখের শোনা কতা আওড়ায়। সব পাট্টির মানুষরা ওটি আচিলো! পলাইয়া গেছে। সক্কলেই পলাইয়া জায়গা নিল কই। মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রী গেল কোনহানে। শালাগোরে চ্যালাগুলার কী হইলো। হ, এসব প্রশ্ন থাকলেও কপাল খবরেই সরকার পইরা গেছে- কতাটা বিশ্বাস করে। কিন্তু চিয়ারম্যানের এ সকল কতা আমলে নেওয়ার কোনো কাম নাই। সে আজিই পোনে আটটার পর ঠিক ঠিক কী হইছে কইতে পারবো। নতুন রেডিও নিয়া তার গর্ব। সে শর্টওয়েভের জায়গাটা ঠিক কইরা রাখছে। মাস্টোরের তীব্র গলার ডাক অন্যমনস্কতা ছেড়ে দেয়। তীরের মতো তার ভেদরেখা। কঠিন তার বেষ্টনী। গূঢ় সে বেদনারস। তুমি একডা কাজের লোক রাখ। জ্বি! বইলা কয়, আমি কই পামু। কাওরে তো চিনি না। এহানে তুমার অনেক কাম। এ বাড়ির জন্য তার প্রয়োজন আছে। ঠিক আছে দেহুমনে।
শিরিসতলায় সব লুটপাটের খবর গমগম করতে থাকলে কেউ কয় হাটো ঢাকাত যায়া হামরাও ওই কাম করি। কপাল ভালো হলি কত্তো কী পাওন যায়। শালা সরকারের গোয়ার মইদ্যে তামান ঢুইক্যে গেছে। সেদিন কুন মন্ত্রীক দেখনু, ঠাট বাটের চোদনে কাম শ্যাষ। সেও নাকি পলাইছে। ঢাকা শহরে হ্যারা পলায় কই। ক্যাডা আশ্রয় দেয়। এসব তামশার নাগাল পাওয়া কঠিন। আরও খবর আসে- ঢাকার পর বিভিন্ন শহরে একই ঘটনা ঘটিছে। নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, চট্টগ্রাম, বগুড়া সবখানে ছড়িয়ে গেছে আগুন। সরকারের তখত পুড়ছে। পলাইছে সব চ্যালারা। এসব দেইখ্যা মফঃস্বলের মানুষ মিশ্র কথা বলে। পক্ষ-বিপক্ষ নয়, কিছু সমেস্যার মিটকোট হলি ভালো। আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর রাইখা কাম কী! শিরিসতলার বাঘ-বকরীর ঘর ছেড়ে গৃহস্থ হলে শুনশান পাড়ায় শান্তি নাইম্যা আসে।  হাওয়ায় ওড়ে গাছের পাতা। দোলা লাগে একটিয়া ওই বাড়িতে। সেখানে শান্তির বাতাস গভীর হয় না। তাপে ভাপে স্পন্দনশীল থাকে একটি মানুষ। একাকী। জীবনের ভেতরে সূক্ষ্ম কাঁচা পাতায় তেজী বাড়ন্ত ভাব আসে। কুঁড়িতে সবুজাভ আলো আসে। বাতাস শুষে নেয়। ভার নাই তাতে। মাস্টোরের আশার লেজে আটকানো সুখে সে কী আসন পেল! শিন্নিপুরর ঈশ্বরকাকা তো পাগল হইছিলো, হারাইয়া গিয়াছে। কিন্তুক কেন বৃষ্টি ফিইরা আসিছে। বৃষ্টির সাক্ষ্য কী আবার পুনরুদ্গম হইলো! একপ্রকার আশা আর অনিন্দ্যসুখ তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। এই বাড়ির চতুষ্পার্শ্বে যে গাছালি বুনা হইয়াছে, তাহাতে যে কিশলয় রঙ ধরিয়াছে তাহার প্রতি তীব্রতা বাড়ে। কপাল স্নানের সময় বড় ইঁদারার ভেতরে শান্ত প্রতিকৃতি লক্ষ করে। আধো তিমিরে ছোট্ট বলকানো ঢেউয়ে একটি বুনি পোকা হাঁটিয়া বেড়ায়। সে তরঙ্গ তৈরি করে। ত্রস্ত তরঙ্গ এক অনু-কাঁপুনি ছড়ালে কপালের মুখশ্রী দুলতে থাকে। দোলায় দোলায় রঙ পাল্টায়, চুল চোপ-বড়ো দেখায়। মুখাকৃতি কাঁপে, আরও কাঁপে তখন ঘাড়ের করার বা ঠোঁটের সেকেন্ড ব্রাকেটের অবয়ব তির তির করে। ওখানে সে কেমন! পাতলা গোঁফের রেখায় হাত দিয়ে নাড়লে বা চুলকালে বোঝা যায় সে সুন্দর হইয়া উঠছে। বুকে তেমন পশম নাই। চীপটা কান পর্যন্ত নামানো। এতে কালো-ধলা বোঝা না গেলেও বাহুতে বল আর এই জমির কর্তৃত্ব এক হইয়া বেশ মোটা পেশি ওখানেও মোটা আকার পায়। বগলের নীচে চুল দেখা যায় না। চওড়া সীনা আর মোটা চোখ ইঁদরার বুক জোড়া অধিকার করিয়া রাখে। সে বুঝি নতুন আস্বাদে লালিত। নানা রূপে কাঁপুনিময় ছবিতে সে কাহার রঙ ধরানো ছবি দেখে। ওখানে পুন্নি নাই, সে এখন পুন্নির যোগ্য, নাকি আরও যোগ্য হইলে দুধডোবা নদীর জলের ছবিতে আঁকা ছবিটিও নবরূপ পায়; উঁচু সাঁকোতে তখন রেলিংয়ে বসা দুই নরনারীর একাকৃতি গড়তে তাকে, এই ইঁদারা আর ওই সাঁকোর রেলিং ঝোলা মানুষের পীঠ দুই না এক ঠিক বোঝা যায় না। আকারও সাকার হয় না। চারিদিক থেকে আওয়াজ আসে, এক শব্দে এক চিত্রকল্পে ঈশ্বরকাকা আবেদ দর্জি আর সাপ সুপসুপ চলে। সে চলার ভেতরেই মানুষ এক শব্দে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, আল্লাওয়ালার দালালেরা নিপাত যাক’ বলে থোকা থোকা গ্রামভরা মানুষ হাঁটিয়া গেলে সে টের পায় না। সে অন্যকিছু শোনে। বোধ হয়, ‘কাজের লোক রাখ’ শব্দটাই বহিয়া চলে। এইডা কেডা? সে কেন তাহার আশ্রয় পাইবে। আশ্রয়ের আবার আশ্রয় কী। কে কাকে আশ্রয় দেয়! ঠিক মামুলি নয়, আবার কম্পমান মানুষ কম্প্ররূপে দাঁড়াইয়া উহাতেই মুখ দেখে। পুন্নির হাতে চুরি কইরা লাউ আর গড়াই মাছের তরকারির হাতেমাখা ভাতের গন্ধ আসে। কালো রঙের পাকা ধানের ম ম রূপ নাকের ভেতরে টাক টাক করে। সন্ধ্যার ধূ ধূ বাতাসের ভেতর দিয়া সর্ষে ফুলের বাসনা নাকি সর্ষে পাতার ভর্তা আর পোড়া মরিচের গন্ধমাকা ভাত গলা দিয়া নামে। কুন্তীমার টক দুধও গাল বহাইয়া থুতনিতে লাগিয়া থাকে, পরে কী তার আঠা না মাস্টোরের বাড়ি থেকে পাঠানো ঠা-া মিষ্টির আঠা মুখে লাগিয়া থাকে বোঝা যায় না। ‘ক্যারে ওটি কী?’ তখন সে দেখে দূরে ‘নিপাত যাক’ আর গোধূলী রাঙা ধুলা রাশি রাশি বিন্দু বিন্দু উড়ছে পাছে পাছে। তারও পাছে গরু তারও পাছে অশীতিপর বুড়ি আর তার পর এই শিরিসের তল। যেখান থেকে এই একটিয়ার বাড়ি আর ইঁদারা স্থিরীকৃত দাঁড়াইয়া আছে। পরে তার ধ্যান ভাঙ্গে। এবং বাড়ির ভেতরে ওজু সারে, তবন ছাড়িয়া পাজামা পরে। বোবাধরা শব্দটা কষ্ট দেয়। ক্যান যে মানুষ এসব কয়। এ গ্রামে চিয়ারম্যানের হাতে নতুন পাট্টির ডাক আসতিছে। এখন নতুন সরকারের জন্যি সে অপেক্ষা করে। সে লক্ষ্যে জমায়েত ও মিছিল চলে। মিলাদও হবে কাছারিতে। মাস্টোরের যাত্রার আর গানের নেশা। চিয়ারম্যানের ওসব কামে না থাকলেও মৌলুদে যান। ফেরার সমে কন, সিনহা কাল আইলে ঠিক কইরা নিস। জ্বি! হ, ওডা আমার দায়িক্ত। এসবে এখন জ্বর আসে। কে কী কয়! একপ্রকার নিজ হাতের ওসব রান্না কী তবে বাতিল! শুইয়া গেলে, ঘুম আসে না। দাঁড়ায়-বসে-ওঠে, কেমন যেন কশ পড়ে। তীব্রতার কিছু নাই, আবার তা বাড়েও। কখন গরমের ভেতর ঘুম তাকে টানিয়া নিয়া যায়।

৬.
‘ওই তুই পুঁইছেনায় কবে আইচ!’ তিনদিনের শরম ভাঙ্গার পর কপাল এই সংলাপ দিয়া তার সঙ্গে কথা কয়। তোতলামিটা বাদ দিয়া ব্যক্তিত্ব নিয়া সে আবার কয়, ‘ত্বর কেউ নাই’। মাস্টোর যখন এই ম্যায়াটারে পাডায় তখন সে চুক্তির কথা কিছু কয় নাই। এইডা নিজেরই করতে হইবো। বাড়ির কাম সারা হইলে সে চইলা যায় মাস্টোরের কাছারিতে। সেখানে কে আছে, কী তার কাম সে রহস্য কপালের অজানা। কিন্তু এই আগন্তুককে নিয়া তাহার বিশেষ কোনো সমেস্যা নাই বইলাই এখন তা আরও বাড়তি নিরূপদ্রব বলিয়া মনে হইল। সারা দিন কুন কাম নাই কিন্তু সমস্ত আহারের যোগান আসে মাস্টোরের গোলা থেকে। যদিও এসব বিশেষ সহানুভূতির ভেদ সে এখনও করিতে পারে নাই। এই বাড়ি আর তার মালিকানা নিয়া সে এখন আনন্দিত কিন্তু কর্মহীনতা তুমুলভাবে বেদনাদায়ক। এককালে যে অতিরিক্ত কষ্টের সময় ছেল তা এখন একদম নাই কিন্তু সেই কষ্টই এখন আশীর্বাদ। একলা থাকলেও নিজের কাম কিছু ছেল! কিন্তু এখন সে কী করিবে। ফড়িংয়ের দিকে তাকায়। তুচ্ছ ফড়িং সে মধু আহরণ করে। ফুলে ফুলে ভ্রমর বসে। আকাশের উদার হাওয়ায় পাখি গান গায়। অলস মস্তিষ্ক বেপরোয়া হইয়া ওঠে। চিয়ারম্যানের কামে যাওনও সম্ভবপর নয়। মাস্টোরের নিষেধ নাই কিন্তু চলিবে না। নিষেধ এই চোখের বাঁধনে। তখন প্রথম আহ্বান ছিল মাস্টোরের রেহার্সেলে। কোনো কিছুই বলেন নাই কিন্তু তার বাইরের আদেশ চোখের ইঙ্গিতে করে ওঠানামা। ব্যক্তিত্বের প্রবলতায় নিষ্পত্তি করতে হয় সবকিছু। এসবে তার চলাফেরা অনেকেই বুঝে নেয়। কপাল এমনিতেই নির্দয়ভাবে সবরকম সহায়তা নিয়ে তার আশ্রয়ে আছে, তার ওপর সেখানে নানাবিধ প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা বরাবরের মতো অনেক কঠিনই থাকে। ভরদুপুরের নির্জনতায় যখন আচ্ছন্ন গোটা প্রকৃতি তখন উপায়ান্তর এক মানুষের দুচোখ বেয়ে ঘুম আসে। এ সময়টা ঘুমের নয় কিন্তু পরিবেশের কোমলতা এনে দেয় আলস্য। গড়িয়ে পড়ে কপাল। ক্রমশ অনেক মানুষের চলাচলে সে সুন্দর এক শহরের ভ্রাম্যমান মানুষে পরিণত হয়। তার ইচ্ছে দেশ-দর্শন। সে ঘুরিয়া বেড়ায়। ভারত-সিকিম-মিশর-ওয়েস্ট ইন্ডিজ-নায়াগ্রা-ভ্যানকুবার কী নয়। দেখে আন্দালুসিয়া, লুভ্যে আরও কতো কী? স্বপ্নে দেশে যখন সে ক্যাংগারু দেখে তখন খুব শীত নামে। পাশের জানালা দিয়া বৃষ্টির ঝাট গায়ে লাগে। তখন আরও গভীর হলে পুঁইছেনায় সুন্দর নছনছা প্রকৃতি তেজোদীপ্ত হয়। নানা দেশের বরফবৃষ্টি কিংবা খরোতাপের আঁচে মধ্য গ্রেডের উষ্ণতায় বেনীআসহকলা উজ্জ্বলতা নিয়া ক্যাংগারু জিরাফ নাকি উটে পরিণত হয়। দেখে এই নতুন দ্যাশ। এহানে মাইয়া-পুরুষ সব এক নাহান। এক হইয়া রাস্তায় হাঁটে আর কী সব কয়। … রাস্তার আলো কইমে আসে, উঁচু উঁচু দলানে আর সার বাঁধা নিয়মের গাড়িতে তার দ্যাশের কথা শূন্যে মিলায়। তখন গোলে হঠাৎ কামে ঘরে ঢ়ুকে দেখে তিনি ভিজেন। আল্লা, এই ঘুমন্ত মানুষটারে তিনি কী কইরা জাগাইবেন! সইরে আসতে কন, একবার দুইবার…। তখনও একই লয়ে পূর্বের ঘটনা ঘটিয়া চলে। সে তখন জেব্রার লম্বা উঁচু ঘাড়ের সঙ্গে উটের তুলনা চালায়। হ, সে উট দেখছিল ওরোশের সময়। একই নাকান নয়, তবে এইডা আরও সুন্দর। পরিষ্কার, সৌম্য। এবার গোলে দাতনাত ধাক্কা মারে। সে উল্টাইয়া আবার ঘুমায়। ভোঁস ভোঁস শব্দের ভেতর তখন জেব্রার পালে সে ছবি তোলে। কী কী সব বিড় বিড় করে, বোবা নাকি! বোবায় ধরে তাকে সব সময়Ñ এবারও কী ঘটে আবার। হ, তারপর আরও চুপিসারে হলুদ শর্ষের ছবি নাকি কোনো বিদেশের ছবি নাকি লনে দাঁড়ানো সারবাঁধা কোনো ফুলের ছবির পাশে পোচ দেয় জানা যায় না। এ মাঝে গোলে অন্যান্য কাজ সারলে একটু শান্ত প্রকৃতি নিস্তব্ধতায় ডাকিয়া চলে। সে তখন ডাকে। হুড়মুড় করে চোখ খোলে। পাঞ্জাবীর কানি ভেজা। আচমকা তাকায়, চতুর্দিকে ভাসে সবুজ পত্রের নীর। গোলে হাসে, কী নিয়া নানান কতা কন। কিন্তু আবার সে ঘুমানোর কথা বলে। এ কি আশ্চর্য!
একদিন সকল আশ্চর্যের অবসান করিয়া গোলের কাছে আসিয়া কী রকম করে। কিন্তু মাস্টোরের কতা মনে রয়! ভয় আর লোভ প্রসারিত হয়। অনেক মিথ্যার গল্প তাকে ঘিরিয়া ধরে। যে মাস্টোর তার কাছে এতা কঠিন- সে তখন মিথ্যের ভেতরে নস্যিরূপে দাঁড়ায়। কাঁপেন, অবস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। কিন্তু ভয় গত হয় না। গোলেকে কুন্তীমার বরণে কাছে নেন। হ্যাচকা টানেন। সরু শরীরের তেজ কঠোর হলে কপাল কিছু বোঝার আগেই গর্জানো আওয়াজ কানে আসে। তয় কী হইলো! আশ্রয় ঠিক আছে তো! গোলে ফাসাইয়া দিলে মৃত্যু অনিবার্য। এসব কেন সে করিল। তয় কী পুন্নি আসিয়া বসিল! মানবে ক্যাডা! সব্বাই কী ঈশ্বর কাহা নাকি? এসবে কিছু না, সে গোলেকে চায়। তার জন্যই কী মাস্টোরের এ পরিকল্পিত বন্দোবস্ত! নাহ, সে কোনো কিছুই মানবে না। আশ্রয়ও ছাড়তে পারে। গোলেকে লইতে হইবো! কাল নয়, দুই একের মধ্যে সে সব কতা জানাইয়া আবার টার্গেট করিল। অতৃপ্তির বেপরোয়া ভাব দিনে দিনে পেছাইয়া গেলে, একবার নিশি কঠিন হয়। সে উষ্ণ কোলের ভেতরে ঢোকে। আয়নায় মুখ দেখে। ব্রণযুক্ত মুখের খুটে কষ্টকাঁটা বাহির হয়! তখন সে ঠক ঠক আওয়াজে ঘরের বাইরে আসে! জানতে চায় খোলেন। ম্যাসাব আফনেরে রাইতে ডাকেন। কিন্তু অন্যায়ের প্রবাহ নিয়া তিনি অনেক কল্পকথা করেন। হাত রাখেন নিজের কোলে। টুন টুন আওয়াজে তা বাড়ে। গত দিনের কথা মনে হওয়ার পর আরোপ হয় সে! মনে মনে চুক চুক করে, ফেনিয়া ওঠা জান্তব বস্তুটি সর্বোচ্চ সময় পার করার মুহূর্তে শরীর জুড়ে জ্বরের মাত্রা আরও বাড়ে। রিলিজ হয়ে এলে, তখনও গোলে কী সমস্ত কাজে ব্যতিবস্তু। তখন সে সরিয়া যায়। অবসাদের মধ্যে ডুবে ফেলে নিজেকে। ‘এরে রাহুম না’- এমন শব্দে তার চলে না। আরও অস্তে কন, ওরেই বিয়া করুম। এভাবে পুরুষ বিনষ্ট করে নিজেরে! মরা পুন্নিমার প্রেমিকারে। তখনও চাঁদ চন্দ্রকলায় সাজে নাই।
গোলে কাজ সারে নাই। সে তবুও দৈনন্দিন হয়ে ওঠে। কাছে আসে। তীব্রভাবে নয়, সংযতই তার অঙ্গের সুররেখা। কপাল পুনরায় তাহার উপর উপগত হইতে চাইলে এবার নিজের মূর্তি প্রকাশিত হয়। পুন্নির জমাট চোখ তাকে ফেলিয়া দেয়। সে রক্তে তখন পশ্চিমাকাশ রঞ্জিত। দ্বিধাথরথর রূপে আবার ধরে, ছাড়ে, ধরে। কিন্তু তাপ ওঠে না। পুন্নি কী সবকিছু শোষণ করিয়া লইয়া গেছে। গোলের এবার বেশি প্রতিরোধ নাই। কিন্তু নিষ্কর্মার মতোই শরীর দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। গোলে সহ্য করে। এবার সে না পারায় একটু হতাশাই হয়। সারারাত ঘুমহীন চলে। পুন্নি কী তার কেউ নয়! সে কেন তার জায়গাটা এমন কালোয় মুখর করছে। দুঃস্বপ্ন জাকিয়া বসে। রক্ত আর রক্ত, বজ্রপাত, ওপেন হার্ড খুব প্রদীপ্ত। রঙধনুও বিলীন! এইরূপেরও তো ব্যর্থ রূপ আছে। সেটি আরও অনুপস্থিত হয়। প্রথম দিনের তেজ কেন নাই আর। গোলেটাও যা! কিন্তু সে আবার ফিরতে চায়। কারাগার নয়, এক পুলকময় শাশ্বত জীবন সে পেতে আগ্রহী। এ কয়েকদিনে গোলের স্বাস্থ্যও বিরূপ। কাছাকাছির বিবরণ আর নয়। আশ্চর্য গোলে খুব সুন্দর করে সেঁধিয়ে যায় ওর বুকে। কিন্তু সেদিন তবে কী হইছিল? এভাবেই এক সময় ঘুমন্ত রাত্রিতে কাজের চাপের পরই সে কাছে ডাকে। ক্রমশ একাত্ম হলে- সমস্ত কুকুর এক হয়। এক ডাকে এগোয়। মানুষের প্রয়োজন মানুষের। তখন তামসী রাত্রের ভারে গড়ে ওঠা দৃঢ়তায় সে চিপা পরে। পৌঁছায় ১২ টায়। তাহার দলের অঙ্গগীকৃত করে ফেলে! নির্বিকার গোলে! সব কাজের আকর্ষণ ওখানেই। আর পেছন নয়। এইতো সম্মুখের জীবনের সুখ। এসবের ভেতর গোলে কী পুনর্বাসিত হইলো? মাস্টোর কী জানে!
সংসারের চাপা কথা নয়। যে নারী এখানে আসিয়াছে কাজে তাহার জীবন নিম্নমুখী। সে স্থলব্যঞ্জন উপভোগ করে। একে একে অধিকার করে, তৈজস ও বস্তুনিচয়সমূহ। কর্মযোগীর মিল খোঁজে। ক্রমশ সে অধিকার করে। এগিয়ে চলে। এই একটিয়্যা ঘরের কেন্দ্রে তিনি রন। ক্রমশ বাতিল হন তিনি উপেক্ষিত হন, অলস মস্তিষ্কের কপাল সেখানে আরও আলস্য হওয়ার পথ খুঁজিয়া পায়। কেন্দ্রে বুঝি অনেকজন মানুষ আসিয়াছে? সে কেন্দ্র বৃত্তকে বাজায়। ক্ষমতাবান হন। সবকিছুর মালিক গড়িয়া ওঠেন। পেছনের প্রতিপত্তি ক্রমশ তার দখলে যায়। সে কী বিক্রীত হইলো। এভাবে ক্ষমতা বদল হইল। একটি বাড়িও সেখানে রাষ্ট্ররূপে পুনর্গঠিত হইল বুঝি। কপাল এখন আবার আরেক কারাগারে বন্দী। গোলের কাছে তাহার কী চাইবার আছে! একদিনের শরীরী তৃপ্তির পর আরও আগ্রহ বাড়ে। দ্বিতীয়বার সে মায়ায় জড়াইয়া যায়। গোলের সমস্ত শরীরকে সে দেবতা বলিয়া তৈরি করে। মহার্ঘ্য তাহা। এই নারী শরীরের সংশ্রবে সে অনেক পথ পেরিয়া আসিয়াছে। এ জীবনের অনেক প্রবাহকে যেন গুলির আঘাতে গুড়াইয়া দিয়াছে। সে গুলি কীভাবে ভেদ করিল, কার প্রশ্রয়ে এরূপ আদেশে গাঁথিয়া গেল- জানে না। গোলেই কী তাহার সব! সেই কী পরবর্তী জীবনের নিশ্চয়তা-নির্ভরতা। তবে এই ক্ষণে এতো কীসের আকর্ষণ- তাহার প্রতি। যৌনজীবনই কী আকর্ষণ তৈরি করিয়া দেয়! কপালের সমস্ত স্বেদ বুঝি ঘুচাইয়া গিয়াছে। গোলের জন্যই পুঁইছেনার প্রকৃতি পাল্টাইয়া গিয়াছে। যে শিরিষ গাছে আল্লাওয়ালা বিল্ডিং ভাঙ্গার আর লুটপাঠের কাহিনি দিনে দিনে মশারীর মতো ফুলিয়া উঠিতেছে- সেখানে এখন কেউ নাই। শুধু একটি দোয়েল আর শালিখ নিবিড়ভাবে ঘুরিয়া বেড়ায়। খুঁদকুটা খায় আর গ্রীবা নাচাইয়া প্রণয় জানায়। এত আশ্চর্য হয় বিস্তর গম্ভীর মেঘাকাশ। গোলে এই জন্যই কী এ বাড়িতে আসিয়াছে। সত্যিই বাউল মাস্টোরের দুরভিসন্ধি কী তাই ছিল! কপাল এক একটি দিনে আনন্দের ধারায় বহিয়া চলে। সে গোলেকে এখন মর্যাদা দিয়া কথা কয়। সেটি এখন আগের চাইতে অনেক অন্যরকমের। সে যে তাহার শয্যাসঙ্গিনী! তাই জীবনের অন্যান্য পর্বও বদলে যায়। এইটিই এক অফুরন্ত মায়ার মুকুর।
তৈজসপত্র অধিকার শুধু নয়, হইবে সে সন্তানের জনয়িতা। তাই দৈন্যজ্বালা জয় পরাজয় ছাড়িয়া চুরমার হইয়া যায় তাহার বেলোয়ারি বাতি। হা-হা করা পুবের বাতাসে এই বাড়ির তালাচাবি বা সুখ তৃপ্তি বিজয়াস্বাদ অরূপের ছবি ধইরা আসে। কপাল পাল্টিয়া গেল। বহমান জীবন কী তাহার এই স্থানেই স্থির হইল! মানব খঁচিত সাঁকোর ইহাই বুঝি শেষ প্রান্ত।


এসব পরিবর্তন নিয়া মানুষ পাল্টাইলেও অনেক ক্ষেত্রে সে মানব থাকিয়া যায়। হেই জিনিসটা মেলাকাল মনে রাখছি, বুইঝে নিছি। কিন্তু অনন্তময় মানুষ। কপাল নিজের প্রতি আস্থা ফিরিয়া আনে। এ আস্থা কী জীবনের প্রতি আস্থা? সে ফিরে চায় রশীদ মাস্টোরের দিকে। তোস্তরি কিংখাব মার্কা এই মানুষটার কিনারা করবার পারেনি এখনও। সে তাহাকে ভালোবাসে। জীবনের অনেককিছু সে তাহাকে দিয়াছে। আশার মোড় ঘুরাইয়া দিয়াছে। কিন্তু অসুখ তো যায় নাই। ক্যামনে সে এ জীবনের ভেতরের আস্বাদ লালন করিবে। একদিন সে মুখোমুখি হয় রশীদ মাস্টোরের। ‘কী কস! কোনো সমেস্যা?’ আঞ্চলিক ভাষায় তীব্র ব্যক্তিত্ব নিয়া কথা কওনের সময় যেন যমুনার পাড় ভাঙার আওয়াজ। ঝপ কইরা নদী টানিয়া লয় মাটি। সেখানে এক ফাটল আরেক ফাটলকে টানে, পানির টানে তা গড়াইয়া পড়ে। এ নেশা তো মানুষেরও। কূলহীন সমুদ্র দেইখ্যা কে দাঁড়াইয়া থাকে! নীল আকাশ জুড়ে গড়াইয়া পড়া আকাশ আর দিশাহীন সমুদ্র দিকচিহ্নহীন তরঙ্গমালার হাতছানি দেওয়া টান- মানুষ কখোনোই ভোলে নাই। সমুদ্রের এ আওয়াজ কী ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি। এতো কেন তাপ তাহার। একদিন স্বপ্নাইছিল তার মন- সে বইসা আছে দিশেহারাময় এক দ্বীপে। সেখানে নৌকা ভিড়াইয়া সে নামিয়াছে। জোয়ারের সময় ছোট্ট ছোট্ট কী এক গুল্ম আর প্রবালময় বালুর স্তূপে পা ঠেকাইয়া সে নখ দিয়া আঁচড়ায়। আর চোখ দিয়া তাকাইয়া দেখে ছোট্ট ছোট্ট কীটের এতো কান্না কেন। তাহারা বিরাট জোয়ার ধারণ করিয়া কীরূপে বাইচে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের তীব্রতা বা তাদের বসতিতে এতো আনন্দ কেন। মানুষের জীবনের চেয়েও তো তা মহৎ মনে হয়। তখন গাঢ় ঘুমে চেপে আসা বৃষ্টি আর জোয়ারের জলকেলী ঘন হয়, নরোম নেওরগুলাও যেন যুক্ত হয়। তাহাতে গড়ে ওঠে জনমানুষের ভীড়। অনেক মানুষ আর প্রবালের ভেতরে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীট, জমে থাকে- একাকার হয়। স্তূপময়তার আলিঙ্গনে তার প্রেম যখন স্ফটিক দানাদার হয় তখন আবার তাহাতে পা চিমটায়। মনে মনে কয়, কতোদিনের সাধনায় পানির উজানভাটিতে তা তৈরি হইচে আর তুমি পা চিমটাইয়া তাহতে হিংসার উৎপাত করে। এইটা কী মহতত্ত্বের লক্ষণ হইলো। মানুষ এতো কেন মহত্ত্ব-বিনাশী হইলো। এরপর সুনীল ঢেউয়ে সে পা সান্ধাইয়া দেয়। টলটলা পায়ে আর নীল পানিতে যখন অনুভবের গাঢ়তা জমে ওঠে, তখন তাকাইয়া দেখে নীল আকাশ অসীমরূপে ছায়া দিচ্ছে। এর অসীমরূপ তাহাকে মুগ্ধ করে। কোনো পাড় ভাঙ্গার আওয়াজ নাই। কুলু কুলু রব নাই। সমারোহময় তীক্ষ্ণ মায়াবী বাতাস ছুঁয়া দেয় নিষ্পাপ চোখ আর চোখের পাতা। ঠোঁটে তখন শুকনা হাওয়ায় গালচুম্বন, চুলের গান আর পাঁজরের পাশে অমোঘ আলোহাওয়ার রূপ কাতর ও করুণ করিয়া তোলে। মর্মভেদীও তা তখন অনেকগুণ। এই আশ্চর্য অভিপ্রায়ের পেছনে তখন আরও পুকুরসদৃশ পানিতে প্রবাল, কিচিরমিচিরহীন দু একটা বর্ণাভাযুক্ত পাখি আর অনেক ধবল বক ভুলিয়া দেয় সমস্ত জীবনের আস্বাদ। ভোলামন শুধু আস্বাদহীন হইলে সে ঢুকে যায় অনেককাল আগে এখানে জন্মানো উঁচু বুনো পরিবেশের ভেতর। সেখানে থোকা থোকা ফাঁকা জায়গা। উপরে পাতাছাওয়া দিন। আকাশ বাসর নয় কিন্তু ঘিরিয়া ধরিয়াছে লতাগুল্ম আর অনেককাল আগে হওয়া খ্যাল। তাহাতে কারো পা পড়িয়াছে বলিয়া মনে হয় না। সে এই নির্জন ছাওয়ায় খুব আরাম করে পেচ্ছাব ছাড়ে, তারপর হাঁটে আর চলে, মনে মনে বলে এইখানে একটুখানি পাখির মতোন থাকি। ওম নেই। জড়াইয়া ধরি। কিন্তু পুন্নি তো নাই। এমনকি সেইদিন যে মাইয়াটাকে সে স্বপ্নাইছিল সেও নাই। সে আবার আকাশের দিক তাকাইয়া আলোর বর্ষণ দেখে। বার হয়- সেই বুনো হাওয়ার এলাকা থেকে। এখানে কী মানুষ ছিল কোনোদিন? মানুষ না থাকাটাই স্বাভাবিক হইলে এখানে দিনের শান্ত পরিবেশটা রাতে কেমন হয়? সেখানে রাতটা আলোছাড়া উপভোগ করিলে কেমন হয়। এই বিশাল সমুদ্র, তার অন্ধকার উদার উন্মুক্ত আকাশ আর তুচ্ছ তুচ্ছ পানিচিহ্নের গর্ত, ঢেউতোলা রাতের রূপ, কিংবা বহুদূরের বয়ে আসা ধ্বনি আর এই বুনোবাড়ির পরিবেশ, রাতটাকে কীভাবে তাৎপর্য দেবে! ভাবতে ভাবতে সে বাহিরের দিকে তাকায়, তখন সক্কলে ডাকে, চিক্কুর দেয়, হালায় ওট, আল্লাঅলা বিল্ডিংয়ের নাকান তোর স্কুলঘরও ভাঙছে। উড়ি নিয়া গেছে। ওটি কাত হয়া পড়া দেওয়ালের ওপর লেখা আছে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। ঘুমটা ভাঙিলে তার টনক নড়ে। ‘কিচু কবু?’ আফনে আমারে গোলের লগে ক্যান বিয়া দেলেন। এসব কথার অর্থ কী। গোলের লগে ঘর করা, কী অকাম করার সময় ধরা পড়া এসব নিয়া অনেক শুনছি তারপর কী কথা? হ, কিন্তু আপনের এতে কাম কী? আসেন। মাস্টোরের দিকে সে আবার সাহস নিয়া তাকায়। গা ভারি হয়া ওঠে। ভারিক্কি গায়ে ছমছম করা তাপ ছুয়ে যায়। সে মাস্টোরের খাঙ্গায় ঢোকে। দেখে অনেকগুলা ছবি। ম্যালা ন্যাংটা ছবি। ওসবের দাম নাকি অনেক। সেগুলো সে নানা স্থান থেকে নিয়া আসছে। মাস্টোর এসব ছবির ভেতর দিয়া কীসব জ্ঞানের কথা কয়। প্রক্সিতেলাসের ভুবনমোহিনি ভেনাস, অজান্তার মারকন্যা, দা ভিঞ্চির মোনালিসা, দ্বারপাল মূর্তি আর শতদলবাসিনী পদ্মা। চেনোস! অনেককালের ইতিহাস নিয়া এইসব ছবি তৈরি হইছে। তখন গোলে নয় পুন্নির কথা মনে আসে। কী এক মুখশ্রীর প্রতীক সে। সে তার দেহ দেখে নাই দেখিয়াছে সৌষম্য-সরলতা আর পরিমিতি। ইহার ভেতরে চরম অজ্ঞতা আর সরল নিষ্পাপের মূর্তি আছে। শীতল ও নিশ্চল মর্মর যৌবন ছিল তার। সে মনোহর। সে ভাসিয়া ওঠে। তাহার শ্রোণীতে আভা আছে, উত্তাপের সৌন্দর্যে সে আছিল মুখর, জীবন্ত মাংসের মতো গোলাপী তার গায়ের রঙ, চক্ষুদ্বয় রত্নখচিত বলিয়া তাকানো কঠিন। এইঘরে মাস্টোর একি শিখাইল তাহাকে। আফ্রোদিতির সমুদ্র থেকে ওঠা আর তার নিরাভরণ রূপ কিন্তু যোনীদেশ লুক্কায়িত, রশ্মিবসনায় প্রভাময়। আবার সে কয়, এইটা এখন নয় আগেকার কালে তাহাদের অন্য অভিধা আছিল। তাহাতে লিঙ্গ আর যোনী গহ্বরের চিত্রের তাকা, এর রঙ আর বর্ণবিভায় খালি বিয়ানোর কথা আছে। প্রক্সিতেলাস আর নিকোলাসে তাহা অন্য দৃষ্টির। ঝট করিয়া সে গোলেকে আবিষ্কার করে। সে তাহার গত রাত্রির অভিজ্ঞতায় স্তনযুগের দিকে তাকায়। এর ভারিরূপ, উন্নত কুচ আর জঙ্ঘায় সে ছিল কৃশ-কান্তিময়। দূর থেকে নয়, মনের কাছেই সে দাঁড়াইয়া থাকে। মগজে এক ঘোর ধ্যান পর্যাবৃত্ত তাহাকে আটকায়। সে চুষতে থাকে ওষ্ঠাধর, কপোল-চিবুক-উরু-জঙ্ঘায় কী সব শোঁকে, প্রয়োজন ও কামনাকে দলে ফেলতে চায়। ভোরের দিকে শিরশির হাওয়ায় তখন সাংসারিক রূপই তাকে নটরাজ করে তোলে। একি গোলে না পুন্নি? নাকি মাস্টোরের ঘরে রাখা কী যেন একটা ল্যাংটা ছবি। মাস্টোর কী বিদেশি ভাষা দিয়া বুঝান। কী কয় মাস্টোর। নাভি আর আবৃত নিঃসঙ্গতাকে তখন স্যাঁতসেতে ভাবের তারল্যে নিপুণ। গাঢ় পেলবতায় এক লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়। উন্মত্ত নেশার ভার তাহাকে পাইয়া বসে। গোলে কিংবা পুন্নি যাই হোক এক প্রবল সৌষম্যে তাহারা উভয়ে উভয়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ভেনাস নাকি নাকি কী কইলো বাল মাস্টোর, সে যে আঙুল দিয়া দিয়া বুঝাইল! অপাররূপে তাহার ক্ষেদ বর্ষণমুখররূপে শীতল প্রবাহে তাণ্ডব তোলে। সে গড়াইয়া যায় বিছানায়। খাওনের সুখ আর জমির সুখ একরকম মনে হয়। বাঁচনের নতুন প্রক্রিয়ায় জীবনের কিশলয়ে যেন নতুন রঙ ধরিয়াছে। সে এখন কী দেখে, ফুলে ওঠা রমণঠোঁট, উঁচু বুক, নাভির উপরের ঈষৎ চর্বির ভেতরে সে হস্তমৈথুনে নামলে মাস্টোরের ধমকানি নাইমা আসে- তখন সে অসীম উপভোগের ভেতরে কী এক তপ্ত সৌন্দর্যের কথা পাড়ে, তাতে পেখম নাচনে গূঢ়তার দ্বার খুলে যায়। বোঝে না কিছুই তার কাছে পূর্ণাঙ্গ হইয়া ওঠে রমণীর শরীরে যত্রতত্র চুম্বনের রশ্মি। কে যেন কোন কার্ণিশ থেকে তখন কয়, এ্যাহন ত্বর চিন্তা নাই। খালি পেট বাধা আর পিতৃসুখ পয়দা কর ওই মাগির গহ্বরে। কান্দিস না! কান্দনের কাম কী। ঈশ্বরকাকা, দর্জির কোনো বাধা নাই। তাহারা সীমানা পার হইয়া গেছে। সীমান্তের ওপারে অবলা প্রাণীর নাকান তাহাদের চলাফেরা। একপ্রকার শ্বাস ফেরে শান্তিতে। ফিরাইয়া দাঁড়ায়। শাপে নয় কান্দনে নয় হতাশায় নয় প্রফুল্ল বদনে কপাল যেন কপালের মালিক হইয়া গেছে। সে আর ফেরে না। সম্বিতের পরে তখন হাতের মধ্যে মাস্টোরের ক্ষুধার কথা শোনে। কীয়ের ক্ষুধা! এই যে ছবি দ্যাখচোস এর ভেতরের মজা আর দুনিয়ার মানুষের সৃষ্টিকৌশল কতোভাবে তাহারা জীবনকে দেখিয়াছে। এই সৃষ্টিই তো ঈশ্বরের কৃপা। ঈশ্বরের কোনো এলাকা নাই। সে বিরচন করে কী চতুর্দিকে! নাহ তাহার কোনো অস্তিত্ব নাই। এইডা কী কয় মাস্টোর? সে কি পাগলা নাকি। নাউজুবিল্লাহ। এক্কেবারে সোজাসুজি গাও ভারি করা সমায়ে মনে আছে লাশ কাটা ঘরোত পুন্নির চোখ উল্টানোর ঘটনা। জ্যান্ত হয়া উঠছিলো। এগলা কার কাম? আল্লার ইচ্চা না হলে তা হয় ক্যামনে। মাস্টোর শালা মাগি মানষের পাল্লাত পড়ি আবোর তাবোল বকোচে। এক ঠেলায় সে তাকায়। কী প্রসন্ন সে মুখ। জ্বলে ওঠা আলো। গভীর তার দৃষ্টি। প্রখর আত্মবিশ্বাস। এইসব না শিখলে তুই তো লাটকের কিচ্ছু বুঝবু না। প্রতিদিন এটি আসিস। কপাল একপ্রকার বিপদেই পড়ে। সে ঠাই দাঁড়াইয়া কঠিন মানুষটার কথা শোনে। মানুষের ভেতরের হাক কানে আসে না। এক মোহ তাকে আটকাইয়া রাখে। সম্মোহনী শক্তি কী এটা! ঠিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোলের কণ্ঠ তাকে গ্রাস করে। সে চিক্কুর পাইড়া কয়, কেডা! কোডে তুমি?’, ‘কাম আছে না’। খারাপ লাগে না কপালের। কয় বউ ডাকচে। যা আবার আসিস। সামনের বছর তোরে যাত্রা করামু। শালা খালি টুপির তলে থাকিস। এসব কথার অর্থ না বুঝেই সে গোলের দিকে তাকায়। পরে সরে আসে। আইজ তার অনেক কাম। কিন্তু কিছুই তার ভালো লাগে না। সে ক্ষুধার্ত। চতুষ্পার্শ্বের পৃথিবীতে ক্ষুধা আশ্রিত মানুষ সে। সে জানে না কীসের ক্ষিদা তাহার।
কপাল একপ্রকার কর্মনাশা মন নিয়া অতিবাহিত জীবনে ক্রমাগত গোলের জীবনের গোলমালে পড়ে। গোলের সঙ্গে সে দাম্পত্য জীবন শুরু করিয়াছে। সেখানে কী সুখ তাহা সে জানে না। কিন্তু মাস্টোরের ওইসব ছবির ভেতর দিয়া সে যখন তাহাকে আকড়াইয়া ধরে, কী সব সুন্দর খুঁজতে চায় তখন একপ্রকার বেকায়দায় পড়ে। গোলে কয়, মাস্টোর তোমাক ঘরোত নিয়া কী শিখাইছে। কিছু না। অগলা কথা বুঝবু না। হ তুমি খুব বোঝ। এর লাইগাই তুমি এরাম করতাছ। কপাল সংকোচে পড়ে। এসব বোঝার তারও সাধ্য নাই। কিন্তু পুরুষ হিসেবে সে তার বিবিরে আর কী কইতে পারে। কিন্তু সে খুব জান্নেঅলা ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করে। দুর্দান্ত হইয়া সে পৌরুষশক্তি প্রয়োগ করে। গোলেকে তার নির্দেশমতো সক্রিয় হতে বলে। আলিঙ্গনে আদেশ দেয়। যদিও নিরঙ্কুশ আত্মা নিয়া সেও শামিল হতে পারে না এরূপ সঙ্গেমে। এভাবে একপ্রকার দাম্পত্য সময়ের গতিশীল মুহূর্ত পার হইলে দিন মাস ছাড়িয়া সময় গেলে কপাল একদিন বশীভূত নিজেকে ছাড়ানোর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে মাস্টোরের নিকট। সে কি এই গৃহ ছাড়তে চায়। গোলেকেও। নাকি সব ছাড়িয়া আবার একক জীবনের কথা ভাবছে। একক জীবনের ফেরারি তো সে চিরকালই। সেটা তো শ্যাষ করিয়া এক গৃহী এখন সে। এরূপ যুযুধান কারবারে যখন কূল কিনারা হারাইয়া সে দিশাহারা তখন গোলেকে বলে তোর কী পোয়া হইবো না! জাউরার জমিত কী কিছুই ফলবার নয়! খুব কর্কশ হইয়া সে হঠাৎ একরাত্রিতে নিজেকে জিজ্ঞেস করে। তার একটু আগেই সে খুব আদরের সঙ্গে গোলেকে জীবনের করুণ আস্বদের কথা বলিয়াছিল। আরও বলিয়াছিল ফেলে আসা জেবনের না বলা অনেক কেচ্ছা। এই কেচ্ছার তল দিয়া সে আবার যখন জাউরা কয়্যা এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে তখন গোলে একটু বিব্রত হয়। বুঝতে পারে না কিছুই। এলোমেলো হইয়া সে বলে ক্যান হবার নয়, কোন ধাতের মানুষ তুমি, তুমি জান না, সিজে কিছু করতে পারো কিনা। এসব হৈচৈ আজকাল নানাভাবে ঘরের কোণায় চললেও পৃথিবীর কেউ তার খোঁজ রাখে না। নদীর কল্লোল বা পাখির ডাক কিংবা নিশিরাইতে চন্দ্র-সূর্যের আহ্বান, সেই সুপ্তোত্থিত সমুদ্রের কোলাহল কিছুই তাহার খবর রাখে না। কিন্তু জীবনের ভেতরে গ্লানি ঢুকিয়া পাড়ে। পানসে হয়ে যায় জীবনের আহ্বান। তুরুক তুরুক তারে তুর্কীর দোলা পরাহত হয়। ক্লান্ত হয়ে পড়ে কালস্রোতে বহমান সময়। মাস্টোর এসব ঠিক জানে না। সে জানে এক স্বচ্ছন্দ্যময় জীবন কুলু কুলু রণে বহিয়া যাইতেছে। সবই যখন তাহার তখন কার কী! একদিন তো এই কপালই তাহার ইচ্ছার অনুকূলে আসিয়া দাঁড়ায়। সে কীসের অনুকূল সেটি তো নিজের প্রশ্ন! কী তাহার উদ্দেশ্য তাও। কিন্তু এইটিই তো সত্য, সে তাহার মনের ভরসার কেন্দ্র এবং অবসরের প্রলাপের অংশ। সেটির প্রকৃতি বোঝান দায় কিন্তু তাহার দায়িত্ব সে লইয়াছে। সংসার গড়িয়া দিয়াছে। কোনো স্বার্থে সে তা করে নাই। একদিন ভোর রাতে পুঁইছেনায় পুলিশ আসিল। তখনও ছিপছিপ পরিবেশ, মোরগভোর বললে ভুল হয় না। পুলিশের সময় ও তৎপরতা কোন প্রয়োজন মানে না। সেভাবেই এ গ্রামে পুলিশ ঢোকে। অনেকেই এটাকে বিস্ময়কর ও আশ্চর্য মনে করে। মানহানিও বটে। যে গ্রামে কখনোই পুলিশ আসে নাই, কাহারও নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয় নাই, হয় নাই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি- সেখানে ভোরে যখন পুলিশ ঢুকিয়া পড়ে ফজরের বাতিটুকু তাহাতে ফুৎকারে নিবিয়া যায়। তেলাওয়াৎ থামিয়া যায়। কর্ণে ত্রাস ঢুকিয়া পড়ে। ভয় আসিয়া নিষ্পাপ শরীরকে ভারী করিয়া দেয়। ক্রমে সে উত্তাপ সকলের মাঝে ঘন হইয়া ওঠে। ছড়ায়। সংক্রামকরূপে। সকলেই স্তম্ভিত হয়। কাঁচা ঘুমে কারও কারও বিরক্তি আসে কেউবা কাঁচা-পাকা ঘুম ভুলিয়া গিয়া কারণের উৎস নিয়া কানাকানি করে। বেল ওঠার আগেই একগ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়াইয়া পড়ে। মাস্টোরের বাড়িতে এডা কোন ঘটনা? চিয়ারম্যান সাব হুংকার দেন। তার কাছেই আগে পুলিশ চা-নাস্তা করে। পরে মাস্টোরকে ডাকেন। চিয়ারম্যান একটু ত্রাসিত হন। ত্রস্ত স্তব্ধতায় বলেন, কী হইছে মাস্টোর। গ্রামডা কী এমন আছিল? মাস্টোর বেশি তোয়াক্কা করেন না। জীবনের কতো ওসিএসপি সারিছেন তিনি এটা নিয়া ভয় কী! রাজনীতি করেননি। সম্প্রতি স্বৈরাচার তাড়নো নিয়া দ্যাশে একটা ভিন্ন পরিবেশ আসিছে, এডা নিয়া এ গাঁয়ে চিয়ারম্যানের নেতৃত্বে মিটিং মিছিলও কমবেশি হইছে। আমরা সরকারি দলের মানুষ। পুলিশগণ কপালের নাম কয়। মাস্টোর চিক্কুর পাইরা কন ও সিনহা? কী হইছে? ওয়ারেন্ট আছে। মাস্টোর বেশ বিচলিত হয় কিন্তু ঠিক বোঝা যায় না। ঝানু লোকের মতো তিনি টানটান শরীরে কারণডা জিজ্ঞাসা করেন। এর মাঝে চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে সব রকম সংবাদ। গুজবে, রটনায় ভরে ওঠে বাতাস। আকাশে ওঠে কালো কোকিল। চক্কর মারে শকুন। দোয়েল ক্ষুদ্র হলুদ পায়ে হাঁহাটি করে। কৃষক বৃদ্ধের বুনো শরীরে প্রচুর লোম বাহির হইয়া পড়ে। সে লোমের ভেতর আসে হাহাকার। দোলা দেয় তা বাতাসে ওড়ে মর্মন্তুদরূপে। পাড়ার কয়েকটা কুকুর আর চিয়ারম্যানের বউয়ের পোষা বিড়াল লেজ নাড়ায়। এতো মানুষের ভীড়ে তাহারা ত্রসিত ও বিচলিত। নিমগাছের পাতার দুলুনিতে বাতাস প্রচুর অক্সিজেন আহরণ করলেও খুব গাঢ় টকটকে সবুজ একটু লয়ছাড়া হয়। পাশের স্টেশনে বুঝি কেউ ট্রেন মিস করিয়া মাতৃমৃত্যুর মতো কাঁদছে। সে ক্রন্দনধ্বনি দূর থেকে এই গ্রামে আসিয়া পড়িয়াছে। খণ্ড হিম ফাঁকা মাঠ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর গারোয়া হাতড়াচ্ছে কোনো গৃহে কচি মুরগি। এসব পরিবেশবায়ু সবার শরীরে ছন্দ তুললে বাতাসটুকু আর অনুকূল থাকে না। তখন মনে হয় এ গাঁয়ের মানুষগুলো কী দড়িছেঁড়া বাছুর হইয়া গেছে! উল্লসিত কণ্ঠটি তখন কুণ্ঠিত। রমণীদের নুনমাখা ঘামের গন্ধ বা মিথুনরত স্তনযুগলের অভাবনীয় আকর্ষণ খুব দুর্লভ হয়ে ওঠে। আয়নার মুখও বলে চলে বিদীর্ণতার কথা। ভর করে তপ্ত প্রকৃতির অবিচল স্বর। পুলিশ সমানের উঁচু দাত বের করে বলে, মাস্টার সব আপনি তারে কেন ঠাঁই দেছেন। অন্য পুলিশ ছড়ির মাথায় হাত বুলায় আর শব্দ করে ঢেউ তোলা চায়ে চুমুক তোলে। আরেকজন পুলিশ কপাল পর্যন্ত টুপি নামিয়ে নীচু স্বরে তীর নিক্ষেপ করে মাস্টোরের দিকে। একজন সেকেন্ড অফিসার সে গম্ভীরভাবে র‌্যাংকিংয়ের আস্থায় হাতলযুক্ত চেয়ারে চিয়ারমেনের কাছে বসে। তাতে সে কিছু বলে না। পাশের চামচারাই তার কাজ চালিয়ে নেয়। মাস্টোর যে ভাবমূর্তিতে আসীন তাতে বাধ্য হয়ে সেকেন্ড অফিসার কথা বলতে বাধ্য হন। ‘আপনি যান। মাস্টার সাহেব আসামীকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন।’ কপাল নৌকার ছইয়ের ভেতর থাকার মতো বসে থাকেন। স্থির তো বটেই স্থানুও। গোলে সুর করে কাঁপিয়ে তুলছে ঘরের ছাদ। লোকরণ্য বাড়ির বাহির। পুত্রহারা রমণীর শোক নিয়া নিজের নিয়তির উদ্দেশে দোষারোপ চালান। গড়ে ওঠে তাতে মৃত্যুর আকাক্সক্ষা। সমস্ত শরীর যেন তাহার দুষিত। মাস্টোর কিছু প্রতি-উত্তর করার আগে পুলিশগণ চিয়ারমেনের বাড়ির বাইরের প্রান্তর ছাড়িয়ে মাস্টোরের একটিয়া বাড়িটির দিকে হাঁটা দেন, ফেরারি আসামী ধরিবার উদ্দেশে।


মাস্টোরের সিনহা নামের আশ্রিত মানুষটি এখন শহরে জেলবন্দি। মাস্টোরের নির্ভরতাও ছিল তার ওপর। এখন এ পাড়া এখন বিরান। শোরগোল থামিয়া গিয়াছে। পাড়ে পাড়ে স্মৃতির ম্লানিমা পড়ে আছে। বুকভারা হাহাকারে গোলে বাড়ির বাইরে নাই। এ গ্রাম এখন যেন শূন্য। কপাল তো গ্রামের কেউ নয় কিন্তু যাহা কিছু ঘটনা ঘটিয়া গেল সে তো চিরায়ত ইতিহাসের কেন্দ্র। কপালই তার কেন্দ্র। এই গ্রামের ভেতরেই সে ইতিহাস গড়িয়া উঠেছে- কোনো এক মোরগভোরে। কিন্তু এ অপরাধ কার! এ লজ্জা কী গ্রামের! খুনসুটির প্রবাহে সময় কহিয়া যায়। গ্রামের কলঙ্কের তীর মাস্টোরের দিকে। এ বোঝা সে বহিবে ক্যমনে। সত্যিই সে কি খুনি? সে কারে খুন করিয়াছে। কেন খুন করিয়াছিল। খুনের রক্তে রঞ্জিত এক মানুষকে সে কেন এতো কাছে নিয়াছিল। এ ভুল সে করতে পারে। জীবনের বিচিত্র গতিপথ কী তবে ধুলায় ধূসরিত। এক সময় চিয়ারম্যানকে বলে, ঘটনার কারণ কী জানা গেল? গ্রামের রিরি পড়ার ঘটনায় গোলেও কুণ্ঠিত। তাহাকে ছাড়াইয়া আনার বদলে এই কলঙ্কের রেশ আর অবজ্ঞাই তাহাকে চিন্তায় ফেলিয়া দেয়। এ গ্রামে আর কি বসত হইবে। এই ভাঙা সংসারে আর সে থাকিবে না। সিনহা নামের কাউকে সে ভুলিয়া যাইবে।
কপাল সত্যিই কারাবন্দি হয়। সে তো জেলেই ছিল। কিন্তু পুন্নির জন্য জেল একপ্রকার এই সাজাতেই তার আনন্দ লাগে। বোধ হয়, এ জেলের জন্যই সে প্রস্তুত ছিল। প্রতি সকালে ফাইলবন্দি হলে তার আনন্দ আর ধরে না। অন্য কয়েদিরা এখন তার বেস্ট ফ্রেন্ড। একটা নতুন জীবন তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। এই পুন্নির জন্যই সে বাইচা আছে। তার অমোঘ আকাঙ্ক্ষা এখন পূর্ণ।

[ ০৫ আষাঢ় ॥ ১৪২১]

2

আলোচনা