একাত্তরের দিনগুলি : উত্তল লেন্সের ‘নম্র’ পর্যবেক্ষণ

শহীদ ইকবাল

 আমরা একাত্তরের মুহূর্তবাসকে লিটমাস পেপারে জলছুঁয়ে পরখ করে নিই, শীর্ণ হাত আর ঠাণ্ডা ঘোলাটের বায়ুভরা দৃষ্টি সেটুকু বুঝে নেয়, গভীর ঠনঠন কম্পনে চুম্বনধ্বনিত ঈষৎতপ্ত চৈত্রছানিত ঝরাপাতার বাতাস সরসর শব্দের শুকনো মাটিতলার পাতলা ঝনঝন আওয়াজে জানিয়ে নিই ঢাকা বা তার আশপাশের ত্রস্ত জনপদের চিত্র, শিশু বা বৃদ্ধের বা আরও সদ্যবিবাহিত যুবকের বাসর-ছাড়া প্রবাস পলায়ন-জীবন, মা-ছাড়া হওয়ার ক্রন্দন মুখরিত সময়ের, আর বন্ধু বা প্রেমিক পরিজন বাতিল করা প্রভূত শাঁসানো হাওয়ার সময়কাল; আর শুধুমাত্র তাতে পাওয়া ও দেখা একটি মনমাখা ঘনক্রিস্টাল কৌমশব্দ ‘দেশ’, আবার বলি ‘আমার দ্যাশ’ বা ‘নিজের দ্যাশ’ চিনে ফেলার সময়; খুব দাম দিয়ে সেই ভেজানো লিটমাস পেপারটির স্বপ্নের চিরকালীন দাগ ‘বাংলাদেশ’, তার নামের ভূমি-তাৎপর্য কিংবা হয়ে ওঠা মাটি-মানুষের অনুভাবচিত্র। এইসব আরও গভীর থেকে, মনের সর্বোচ্চ প্রান্তকোণে বিবৃত থেকে বলি, একাত্তর ও এই পাওয়া দেশ, যা আমার দেশ, বাংলাদেশ, তার পূর্ণ সাক্ষ্য। লিখেছেন : মা-কবি ও জননী জাহানারা ইমাম। বইটি পড়ে জলে ভরে এই ভবের কী তুমুল পাড়াকাড়া নজরকাড়া ক্বচিৎ-সময়ক্রম ছাড়িয়ে সর্বসময়ে আমাদের চক্ষুজলভয়জ্বালালিপি এই দিনগুলি পেয়ে যাই , যার সবুজ দলিলরূপে সাজানো আমাদের একাত্তর।

ভূমিকার পরে

মার্চ থেকে শুরু বইটি। এতে একে একে লোপাট হয়ে যাচ্ছে আনন্দসুখ ও সচরাচর নৈমিত্তিক সময়।  এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাড়ি শুধু একক নয়, এইটি সব বাড়ির প্রতীকরূপ, প্রতিদিনরূপে পলে পলে গ্রথিত, এন্তার জীবনসমূহ। ঘন ও অরুণমাখা, সবটুকু সময় নিঙরানো, তাবৎ হৈচৈ আর আনন্দ-উল্লাসের গৎবাঁধা দিনজড়ানো সময় কিন্তু তা লোপাট ও বাতিল, সচকিত উচ্চারণের ধারা নেই, চলমান তাল ও লয় ছন্দ হারানো, গতিতে অগতি, স্বরে নিঃস্বর, প্রলাপে কম্পন, হাওয়ায় বিষ, চলায় বন্ধন, গ্রহণে অপারগ আর চাওয়ায় হারানো, এমন ব্যথা ও তাপ নিয়ে গড়া মার্চ; গড়ে ওঠে একাত্তরের দিনগুলির দলিলনামা, এই শুরুতেই। জাহানারা ইমাম, জামী-রুমী একা নন সেখানে, যেমন সবাই তেমন তারাও, যেন একরকম হয়ে উঠছেন, ক্রমাগত যুক্ত হচ্ছেন উদ্বেগের সঙ্গে, বাস্তব ও নিরেট উদ্বেগাকুল মনের প্রতিচিত্র গড়ে উঠছে লিপিমালায়, সজলে নিকানো হচ্ছে বিন্দুবিসর্গ সন্তাপ। বইটি কী ডায়েরি? শুধুই নিজের কথা? তবে যা বললাম তা কেন? অব্যক্ত কথাও কী ওতে নেই? আর বলাই কী যায়, যে এটি নিপাট স্বদেশের স্বরধ্বনিত প্রলাপন এবং আপামর জনতার একাত্তর আলাপন। এবং এ আলাপনের গভীরে আরও নির্মম সমাজ ও সময়চিত্র, একক থেকে বৃহৎ পরিম-লে ছাওয়া সুন্দর ও নৈসর্গিক সবুজ দেশে জলপাই বুটের ঘর্ষণ-ধর্ষণে কঠিন ক্লিষ্ট লৌহমানবের দুর্বিষহ বিবমিষা। নেই কোনো ক্ষান্ত দিন আর অনিমেষ অবসর। প্রার্থনা ও জীবন লোপাট। সত্যিই জান্তব দিনের বাস্তব বুননি একাত্তরের দিনগুলি। সন্দেহাতীতভাবে তা উপাদেয় সাহিত্য। রুচি-চিন্তনে প্রবল মনন যুক্ত, শুধু তাই নয় সৃষ্টির অনুভব প্রকট, অনুনয়-বিনয়ের প্রান্তে সুবেদী-সূক্ষ্ম সুকুমার ব্যক্তিত্ব-নিবেদনপর্ব, আশ্চর্য ওর অভিমুখ! দর্শনও যেন ওতে তৈরি। প্রকৃত সাহিত্য হয়ে ওঠে। অনেক মানুষের কষ্ট বা বেদনার বিপরীতে স্বপ্ন-ত্যাগ-সমষ্টির সংযুক্ত ধ্বনি অপার হয়ে ওঠে নির্বেদ ভাষায়, এটিই এ বইটির জ্ঞান ও চিরপাঠ্যরূপে গণ্য। পক্ষ-বিপক্ষও নয়, ন্যায়যুদ্ধের সকলকে আত্মার অলঙ্করণে আঁকেন, এঁকে এঁকে সহনুভূতি আর ভেতরের শক্তির পরতগুলো পরখ করেন। কী তার দৃষ্টি! আর অমোঘ দৃষ্টিকোণ! আশ্বাস গড়ে ওঠে। স্বপ্নের ধারা নির্মিত হয়। এক একটি ঘটনার ভেতরে।

ঘটনার রূপ ও জনতার অরূপ উত্তাপ

মার্চ সময়-স্থনাঙ্কে তার প্রকল্প গড়িয়ে নেয়; এক, দুই, তিন তারিখ ‘১১০ সম্বর সামরিক আদেশ জারি।’ ৬ মার্চ : ‘ছ’টা-দুটো হরতাল চলছেই’। ৭ মার্চ-এর পর সংঘবদ্ধ জনতার সংবাদ সম্মুখগামী হয়ে উঠছে। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সরকার। রাষ্ট্রটির বিপরীতে দাঁড়াচ্ছে, আপামর মানুষ। শিল্পী জয়নুল, মুনীর চৌধুরী ফিরিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় খেতাব, ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’, ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’-এর মাধ্যমে সকলেই একটি বিশ্বাস নিয়ে একত্রিত হচ্ছে; সময় একাত্তরের দিনগুলি। গোটা চত্বর জুড়ে শুরু হতে থাকা অভিশাপ সরল মানুষের মনে তার ছায়াপাত ঘটে। ছায়া সরে না। আরও প্রলম্বিত হয়। দীর্ঘায়ত হতে থাকে। ভেতরে ভেতরে স্বাভাবিক স্বর পরিবর্তিত হয়। জুড়ে বসে আতঙ্ক। যেন আক্রোশে ফেটে পড়ছে জরাসন্ধ-দাপট। মর্ত্য-েত্রিদিবে তার প্রতাপ ছড়িয়ে পড়ছে অগ্নির নিঃশ্বাসে। ভরে আসছে আঁধার যন্ত্রণা। মার্চ মাসে প্রত্যক্ষদর্শীর এ বিবরণটুকু বাস্তবের প্রান্ত ধরে স্পষ্ট হয়। তাতে ভর করে বসে অসহায় শীতল আবেগ-অনুভূতির আশ্লেষ। মার্চ গণহত্যার তীক্ষè ছবি, গাঢ় রঙে গভীর হয়ে ওঠে। সেখানে শুধু হত্যা নয়, হত্যার পশ্চাৎপট সাক্ষ্য, ভেতরের অন্যায় স্বার্থ, নীতিহীন রাজনীতির প্রলয়কা- উপস্থিত হয়। বিরাট তার দম্ভ। অতিশয় নিষ্ঠুর তার প্রতিবিম্ব। একাত্তরের মার্চ করতলে উঠে আসে। নিষ্ঠুরতার দুন্দুভি বাজায়। মুজিব-ইয়াহিয়ার ঘন ঘন বৈঠক, আলাপচারিতার ফাঁকেই চট্টগ্রাম বন্দর সশস্ত্র সজ্জিত। দিকনির্দেশনার জন্য উচ্চপদস্থ আর্মির ট্রুপ এসেছে, সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক আর মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চলার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে এই সরল নির্ভীক বাঙালিকে। লেখক সুস্পষ্ট করে নয়, দৈনন্দিন কাজটিকে সত্য করে তার ভেতরেই ছেলে-সন্তান-স্বজন-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজন-সম্পর্কিত সকলকে দেখেন। একটি এলাকার জনসকল ডায়েরীর পাতায় যখন গড়ে ওঠে, স্থিরচিত্রে নির্মিতি পায় তখন তার পূর্ণাবয়ব রূপটি দক্ষতার সঙ্গে নির্ধারিত চেতনায় উঠে আসতে থাকে। এক্ষেত্রে রঙ ও রেখার পরিমাপ নির্ধারণ হওয়া থাকে, সেটি চেনা যায়, অন্তরঙ্গ বিবরণে, অভিজ্ঞতার অনুভবে। সমাজ-প্রতিবেশের প্রলেপমাত্রায় মানুষের আবর্তমুখ তৈরি হলেও তাতে প্রবহমান দ্বন্দ্ব ও অভিমুখী সংগ্রামের চিরন্তনরেখা অনেকের ভেতরে মিশে থাকে। অনেক মানুষ এ পরিবেশটুকুতে আটকে যায়। উপরিতলে স্থির হয়ে পড়লেও ভেতরের দ্বান্দ্বিকরেখায় বেভুলা হয়ে পড়ে, কেউবা তরুণ ‘রুমী’তুল্য আবার কেউবা ‘নিয়োগী’র শর্তহীন অসহায় চরিত্র মাপে আটকায়। মার্চেই বহু খুন ঘটে, সেটির মর্মন্তুদ পরিচয় গড়ে ওঠে লেখকের অনুভাব্য কলমে। তাঁর ব্যক্তিত্বও সে উচ্চতায় নির্ণয় করা যায়, সহায়হীন সমাজ ও সময়কেন্দ্রই সেখানে চরিত্র ও তরঙ্গসঙ্কুলরূপে পরিব্যাপ্ত। তেজ ও তাপে বায়ু ওড়ে, আগুনমুখো ক্লান্ত মন ও মানস দৌড়ায়, ঘন ও গাঢ় স্বরে প্রলাপমোড়া সংকেতে হাপিত্যেস জীবন যখন নিভু, তখন আরও ভয়ঙ্কর সময় অপেক্ষা করে, গড়ে শীর্ণ শ্লেষ ও বিদ্রƒপ। খরাদাহে রাষ্ট্রমালিকসকল কড়ে আঙ্গুলে কঠিন হয়ে শাসায়, রাইফেলের নল দেখায়, জলপাই পোশাকে ভয়কে পেশায় পোষে; দ- উঁচিয়ে মুখোমুখি হয়ে ‘কাজে যোগ দেয়া’র কথা বলে। মরণপারে ভাসা লাশ, ভীতু মানুষ, আরও অধিক পিছমোড়া দিয়ে মালতুল্য বোঝাবাহী করে দৌড়ায়, দেখায় না, অসহায় মানুষদের চেনায় না, পাছে ওরা বেরিয়ে পড়ে বা কেউ বিদ্রোহী হয়ে ছিনিয়ে নেয়, পাশে দাঁড়ায়, ওসব সুযোগটুকুও হন্তারকরা ব্যয়ের খাতায় লেখে না, পোরে লোহার ছামিয়ানার ভেতর কঠোর লৌহকপাটের গরাদে-গাড়িতে, কতোজন বা কারা কিছুই জানা যায় না, কম্প্রমানতায়, কঠোর বেড়ায় নিরুত্তর প্রশ্নের ভেতরে ওরা নিশানাহীন হয়ে যায়, পেরিয়ে যায় অনির্দেশ্য অন্ধকার পথ, বিরাট বিরাট অভিঘাত বুকে নিয়ে। শুধু একপলকের দৃশ্যমান আঘাতচিহ্ন রয়ে যায় আমাদের স্মৃতিচিহ্নে, অমোচনীয় করে। কোনোদিন আর পাওয়া যায় না ওই অচেনা মানুষদের! অচেনাই বা কেন, চেনা তো তারা, কিন্তু থেকে যায় অচেনা, মৃত্যুর ভেতর দিয়েও সে অচেনারা আর চিনে রাখার চিহ্নের প্রহরায় আসেন না। তখন জাহানারা ইমাম লেখেন নির্বিকার তৃতীয় নিঃশ্বাসের ছিন্ন পলাতকার নির্ণিমেষ জ্বলন্ত ছবি, ক্যামেরামুখ যেখানে জীবন্ত ও সন্দিগ্ধ :

এখন যেহেতু সরকার সব স্বাভাবিক দেখাতে চায়, তাতে অন্তত এখনই ঘরে ঘরে ছেলেছোকরাদের টানটানি করবে না। তবে রাস্তায় বেরোনো তরুণ ছেলেদের সম্বন্ধে সেসব ভয়াবহ খবর শুনছি, তাতেও তো বুক হিম হয়ে হাত-পা অবশ হয়ে পড়ছে। লুলু-রঞ্জু, আরো কয়েকজনের মুখে শুনলাম, ওরা দেখেছে ত্রিপল ঢাকা ট্রাক, যার পেছনটা খোলা থাকে, সেই ট্রাকে অনেকগুলো জোয়ান ছেলে বসা, তাদের হাত পেছনে বাঁধা, চোখও বাঁধা। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে। এই নিয়ে শহরে ক’দিন হুলস্থুল। যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তার মুখেই এই কথা। … ওদের যতো রাগ উঠতি বয়সের ছেলেদের ওপর। রাস্তার একদিক দিয়ে মাথা নিচু করে চলা নিরীহ পথচারীও যদি অল্পবয়সী হয়, তাহলেও রক্ষে নেই। টহলদার মিলিটারী লাফ দিয়ে তার ঘাড় ধরে হয় ট্রাকে তুলবে, না হয় রাইফেলের দু’ঘা লাগিয়ে দেবে।

মার্চের বিপুল হত্যাযজ্ঞের পর, রুদ্ধ প্রাণের স্বর বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ, আকাশের উড়ন্ত শকুন আর কুকুর-কাকের লাশ পিছমোড়া চোখবাঁধা হত্যার হুড়োহুড়ি দেখে কোণায় কোণায় প্রান্তে প্রান্তে হাহাকারের ঢেউ তোলে। স্তব্ধতার ভেতরে বিপুল আর্তচীৎকার থোকা থোকা হয়ে বিলাপ ভাসায়, কারুণ্য কারুময়তায় কয় : ‘দেখি নাই কভু’ এমন অধম কর্ম।

জনতার অরূপ উত্তাপ গড়ে ওঠে লৌহমানবদের ক্লেশ-ক্রোধ আর অন্যায়ের অন্তর্হিত তল থেকে গড়ে ওঠা অহং-তাড়নার কুৎসিত শক্তিতে। সেটি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের তাপে নিরুদ্যম, পাঞ্জাবী অহংয়ে দম্ভময়। এ ফরমানী গর্বে দুর্মর হত্যা আর জান্তব পুনর্গঠন ক্রিয়া থাকে সক্রিয়। তাতে শুধুই কাঠিন্যই নয়, পাথর-কঠিন পিদিম তড়পায়, ঘিরে ধরে, বিষাক্ত নাগিণীর নিঃশ্বাস ফেলে। ওই মাটি-মানুষ-নিঃশ্বাসের স্বরূপে শুধু শাসনেই নয়, জীবনেও মেলে না। শাসনেরও যদি সোহাগী রূপ থাকে, প্রকৃতি যদি হয় তার মতো মায়াময়, মৃত্তিকাজাত, সেটি অমান্য হয় না। কিন্তু এ শাসনে থাকে প্রভূত বিকার, বিস্রস্ত বেআইনি প্রতাপ আর গণ্ডারের বিকৃত শরীরী লেলিহান দর্প, যা জাতি-মানুষ সকলকে কুষ্ঠ-কষ্টে আকণ্ঠ ও সীমাহীন করে তোলে। এ যেন নির্বিকার দমন আর পীড়নের অপর নাম। সেখানে বিকৃত ক্ষমতাই প্রভূত ও প্রবল হয়ে ওঠে। এরূপ ছিন্ন জীবনের বিপরীতে প্রতিরোধ ছাড়া আর বিকল্প থাকে না। প্রথম প্রতিরোধ অতঃপর তার ক্রমাগত পাহাড় প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি তখন সবার ভেতরে প্রদীপ্তময়, লক্ষ্যটি মাটি-মুক্তির, যেখানে জীবনের মুক্তিও জড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই বলে নিই, এই জীবনমুক্তির স্বরূপ কী? সংস্কৃতি-মৃত্তিকা-নদী-নিসর্গ জীবনবাহিত তাবৎ মুক্তি, খাওয়া-পরা-বলা-চলার মুক্তি। সেটিতেই তো শ্বাস-প্রশ্বাস। ভাষার জন্যও তো তাই ছিল আমাদের। জাহানারা ইমাম সুবেদী চক্ষুতে শুধু দৃশ্যমান ও    বাস্তবটুকুই তলে নেন না, তিনি অন্তরের-ক্রম চিহ্নিত করেন। এ ক্রমে উঠে আসে, উর্দুতে গাড়ীর নেমপ্লেটের প্রতিবাদ, নিরিহ পথচারীর স্বাভাবিক জীবনের ওপর অহেতুক চাপানো শাসনদ-, তরুণদের হেনস্থা করা, হকার-ফেরিওয়ালা-বস্তি-ঘাট-ফুটপাথ থেকে সর্বত্র ছড়ি ঘোরানোর দাপুটে তৎপরতা, খাবার দোকনের ওপর, ছোট বাচ্চাদের ওপর নির্মম ভীতিকর হয়রানি ইত্যাদি। চিনে ফেলা যায় চরম দুর্বার অবস্থাটি। এর মাঝে গুজবও কী কম! অনেক খবর আসছে, বৃক্ষ-নদী-মানুষের হাহাকার একাকার হলেও কে কোথায়, কার কী অবস্থান, কীভাবে মৃত্যু, কখন এ্যাটাক, এ্যাটাকের পরের পরিস্থিতি কী, সেখানে খুন-জখনের প্রকৃতি কেমন, কে কে বেঁচে আছে, কে হাসপাতালে গেল, কোন রাতে তারা বর্ডার পার হলো, নীলিমা ইব্রহীমের খবর কী, সুফিয়া কামাল কী বেঁচে আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন কীভাবে হামলা করলো, রুমী-জামীর প্রতিরোথের ক্রোধ ও ক্রদ্ধ প্রশ্ন প্রভৃতিসমেট কাটে মার্চ। সুনির্দিষ্ট করে বললে একাত্তরের মার্চ। অনেককে হারানোর মার্চ। বাংলাদেশ জন্মের মার্চ। যুদ্ধ শুরুর মার্চ। যুদ্ধ শুরুর ভেতরে আরও জীবনযুদ্ধ শুরুর মার্চ। হয়ে উঠছেন সকলেই সরব। জেনে যাওয়া যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু নেই, তার কী অবস্থান কেউ জানে না, প্রস্তুতিহীন মানুষ অপ্রস্তুত, ঘর-বাড়ি-ভিটে ছাড়া হয়ে এখন কী করবেন! কোথায় যাবেন, কে আশ্রয় দেবেন, কেনইবা এর এমন দশাপ্রাপ্তি! যে আশ্রয় দেবে সেও তো নিরাশ্রয়, তারও তো নানা পরিণতি অপেক্ষমান। এসব পাল্স বুঝে পুনর্গঠিত জীবনের বিরূপ দশায় আক্রান্ত পুরো জনপদ। থমকে যাওয়া সময়ে জানাই যায় না, ইকবাল হলে, জগন্নাথ হলে কী ঘটেছে; সদরঘাটে, বত্রিশ নম্বরে, গুলিস্তানে কে কী হারিয়েছে, আর তার কতোটাইবা সত্য, গল্পকল্পকথাও তৈরি হয়, তা-ই আবার শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। তখন মন হয়ে ওঠে নিরুপায়হীন, দিশেহারাময়। কী পরিণতি কার কেউ জানে না। বা এমনটিও কেউ জানে না, কখন এ দাহ ত্রাস খা-বদাহ কখন থামবে! তখন জীবনের স্বরূপ কী? অপরাধ-নিরাপরাধ প্রশ্নগুলোর পরিণতি কী? ন্যায়-অন্যায়, যুক্তি-অযুক্তির পরিসর কতোটুকু? মার্চের ঘটনার আন্তর-অনুসন্ধান ও বাস্তব গভীরতার স্বরূপ ক্রমশ বাইরে স্পষ্ট হলে এপ্রিল-উত্তর সময়ের বুননি গ্রন্থটিতে যুদ্ধ-সম্মুখ আবর্ত চিহ্নিত হয়। বিবরণের ভেতরে অভিজ্ঞতার পরিপক্বতা নিশ্চিত হয়। মনের প্রান্তসমূহ, বোধের তীক্ষ্মতায় ও গাঢ় অনুভূতিতে হয়ে ওঠে শঙ্খময়-জীবন্ত। দেখার চোখে আসে নৈপুণ্য, এর কারণ আতঙ্ক ও অভিশাপের সময়ের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, প্রলম্বিত হতাশা, জীবনের পলায়নপর ক্রন্দনধ্বনি ছুঁতে পেরেছে মনকে, গড়ে তুলছে বীভৎসতার বিপরীতে অভয় কাঠামোগুলো, নইলে উপায়ান্তর বিদির্ণ ক্ষণ তো ছাড়বে না, মুক্তিও থাকবে না, এসব চেতনে অচেতনে লেখকমনকে যেমন দিচ্ছে ঋজুতা তেমনি কলমের কণিকায় তা দানা বাঁধছে অধিকতর কমিটমেন্টে। জাহানারা ইমাম লেখেন : ‘২৫ মার্চের কালোরাতের পর কয়েকটা দিন রুমী একেবারে থম ধরে ছিল। টেপা ঠোঁট, শক্ত চোয়াল উদ্ভ্রান্ত চোখের দৃষ্টিতে ভেতরের প্রচ- আক্ষেপ যেন জমাট বেঁধে থাকত। এখন একটু সহজ হয়েছে। কথাবার্তা বলে, মন্তব্য করে, রাগ করে, তর্ক করে।’ এরপর আরও প্রতিক্রিয়া দেখে রুমীর : ‘কি সর্বনেশে কথা। রুমী যুদ্ধে যেতে চায়! কিন্তু যুদ্ধটা কোথায়? কেউ তো ঠিক করে বলতে পারছে না। সবখানে শুধু জল্লাদের নৃশংস হত্যার উল্লাস, হাতবাঁধা, চোখবাঁধা অসহায় নিরীহ জনগণের ওপর হায়েনাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নিষ্ঠুর মত্ততা।’ কয়েক পংক্তি পরেই তার পর্যবেক্ষণ : ‘যুদ্ধ হচ্ছে, একথা ধরে নিলেও তা এতই অসম যুদ্ধ যে কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের আধুনিকতম মারণাস্ত্র দিয়ে বিদ্রোহী বাঙালিদের গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেবে।’ পর্যবেক্ষণের সূত্রটি আরও নিকটতম হলে তিনি বলতে পারেন : ‘আজ পহেলা বৈশাখ। সরকারি ছুটি বাতিল হয়ে গেছে। পহেলা বৈশাখের উল্লেখমাত্র না করে কাগজে বক্স করে ছাপানো হয়েছে : আজ বৃহস্পতিবার প্রাদেশিক সরকারের যে ছুটি ছিল, জরুরি অবস্থার দরুণ তা বাতিল করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা শহরে এবং দেশের সর্বত্র বর্ষবরণ অনুষ্ঠানও বন্ধ। কিন্তু সে তো বাইরে। ঘরের ভেতরে, বুকের ভেতরে কে বন্ধ করতে পারে?’

ফিরে আসি এমতো বক্তব্যে, জাহানারা ইমাম শুধু যুদ্ধমুহূর্ত বর্ণনা করছেন না, তিনি চিনিয়ে দেন এ বাংলার মানুষের পত্র-লতা-গুল্মের চিরায়ত সুরের আগুন আর প্রাণমাতানো গহন মত্ত প্রলাপের প্রকৃত সুরটি, সেটি কী কেউ বিনষ্ট করতে পারে। এই আত্মবিশ্বাসের অভাব সেই দুর্যোগেও কী এতোটুকু কমতি ছিল, হয়েছিলেন কী বিপন্ন, মানসিকভাবে সাহস কী হারেিয়ছিলেন? মুহূর্তের বিপন্নতাও কী তাকে বিন্দুমাত্র তাড়া করেছিল? লেখক বাঁচে দর্শনে, দর্শনের উত্তাপে সে পাঠককে করে আলোকিত, মুখরিত, সেইটি পেছনের নয়, সামনের। এই মুহূর্তে গ্লোবাল বিশ্বে আমরা তো আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবাই বিপন্ন, এমনকি ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা পর্যন্ত। অথচ এখন তো কোনো শত্রু বা প্রতিরোধ যুদ্ধ সে অর্থে নেই, তবুও কেন এই চেতনার দারিদ্র্য? যে যুদ্ধ জীবনবাজী রেখে হয়েছিল, জেগে উঠেছিল দেশ, আপামর মানুষ হয়েছিল এক, চেতনারবিন্দু ছিল একটি, শানিয়ে নেওয়া চেতনায় স্বপ্নের ভাস্কর্যে গড়েছিলুম ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের কথা, তাও আজ কীভাবে কলুসিত, বিতাড়িত, ভূলুণ্ঠিত! স্বাধীন দেশে থেকে, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত দেশ নিয়ে দ্বিধাহীন আমরা কেউ কী কিছু বলতে পারছি? তা নয় কেন? অথচ সততা ও সাহসে যুদ্ধবিম্ব যখন সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে, সবাই যখন আলাদা, অনির্দেশ্য তখনও একটি অমর বিশ্বাস, বাঙালি বিশ্বাস, এদেশীয় মানুষের আজন্মের বিশ্বাস জাহানারা ইমাম ভেতরে লালন করেছেন, বলেছেন, জানিয়েছেন। পাপমুক্ত থেকে তা প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে এই স্বাধীন দেশে তেতাল্লিশ বছর পরও বাঙালিত্ব নিয়ে, জাতিসত্তা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, বঙ্গবন্ধু নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে, কে কোন্ কাজ করেছিল তার কৃতিত্ব নিয়ে গোটা জাতি আজ বিভক্ত, বিপন্ন, অসহায়। নিরন্তর ভুগছে বিকারগ্রস্ততায়, অসুস্থতায়। বোধ করি কোনো অসুখে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। ভেঙ্গে পড়ছি। কিন্তু একাত্তরের মতো তো আমরা এখন নয়। তখনই তো সবকিছু মীমাংসা করে লক্ষ্যটি ঠিক করেছিলুম, এখন তার ভেদ-বিভেদে কেন হয়ে পড়ছি অসুস্থ! তবে কী অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তির আকাক্সক্ষাই কী অন্তর্গত রক্তের ভেতর নিরন্তর খেলা করছে? আর তার কাছে বিকিয়ে গেছে রাজনীতি, দেশ-জাতি বা অন্যসব কিছু! সম্মান-অসম্মানের প্রশ্নটিও সেখানে হয়ে পড়েছে ভবঘুরে? একাত্তরের দিনগুলি হাতে নিলে সে প্রশ্নগুলি কী আমাদের সম্মুখে আসে! নাকি সেখানেও চলে দুর্বল মনের অভিনয়! বিশ্বাস কী এতোই ভিখারিপ্রবণ হয়ে গেছে? এপ্রিল একাত্তরে আবার ফিরে আসি, এবং ওইমতো চিনিয়ে নেই নিজেকে : ‘প্রতিটি বিধ্বস্ত ঘরের সামনে একটা করে কাগজ ঝুলছে। কি যেন সব লেখা। কাছে গিয়ে দু’একটা পড়লাম। উর্দুতে লেখা কতগুলো মুসলিম নাম। শুনলাম বিহারীদের এ জায়গাটা ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এসব চিত্র বর্ণনায় নিছক বিবরণ বললে ফুরিয়ে যায় কী? অবশ্যই না, ভেতরের  মেসেজটুকু বুঝে নিলে, বর্তমানের আর্থ-সামাজিক চিত্রটিও আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়।

একলা রাতের অন্ধকারে

এপ্রিলে রুমীর যুদ্ধ যাওয়া, ক্রমশ প্রকাশ হচ্ছে মার্চের কালোরাতের কর্মকা-, এপ্রিল জুড়ে চলছে নিধনের নানাবিধ সংবাদ, অনেকেই নৈমিত্তিক তিমিরের ঘোরে বিপন্ন, গুজব বাড়ছে, চলছে বিস্ময়ের প্রলাপ। রাষ্ট্রও নানাভাবে গোয়েবলসীয় অপপ্রচার আর মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে, গণগত্যার পর একপ্রকার পরশ বুলিয়ে এ অঞ্চলের মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবকিছুর প্রকারে প্রকারান্তরে স্পষ্ট হচ্ছে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে মফস্বলে। দাবানল ধেমে নেই। মানুষ আতঙ্কে অস্থির। বিদেশী সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ করছেন। এদেশীয় সংবাদপত্রগুলোর পক্ষ-বিপক্ষ ও দমন-পীড়ন নিয়ে বিপর্যস্ত :

৫ এপ্রিলের নিউজউইকের প্রবন্ধটার শিরোনাম হলো, পাকিস্তান প্লাঞ্জেস ইন টু সিভিল ওয়ার, পাকিস্তান গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ভেতরে রয়েছে নিউজউইকের সাংবাদিক লোরেন জেংকিন্সের রিপোর্ট। পড়ে অবাক হলাম, হোটেল ইন্টারকনে গৃহবন্দী থাকা অবস্থাতেও লোরেন জেংকিন্স ঢাকার আর্মি ক্র্যাকডাউনের পুরো ঘটনা কি করে জেনে সেগুলো হুবহু তার কাগজে তুলে দিয়েছে সারা বিশ্বকে জানাবার উদ্দেশ্যে। এই ঘটনা জানার আর পর তো আর কোনো দেশের বলা উচিত নয় যে পূর্ব বাংলায় যা ঘটেছে, তা    পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার; কিংবা পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্রদ্রোহী দলকে সামরিক সরকার যোগ্য শাস্তি দিয়েছে?

লাশের শহর ঢাকায়, রুমীর যুদ্ধে গমনে গৃহছাড়া হওয়ার বিষয়, সাধারণ নয়, অনেক অন্তর্বেদনাশ্রয়ী। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তার আমেরিকা যাওয়ার ক্যারিয়ার ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে সবকিছু ছিন্ন করে ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চিত জীবনের দিকে নিজেকে ঠেলে দেওয়া আর সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে কি-না তা না জেনেও যুদ্ধ ও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি, সত্যিকার অর্থে অনেক তরুণের যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতিরই প্রতিনিধিত্ব, বলে মনে হয়। রুমীর জানাশোনার ব্যাপ্তিই তাকে পূর্ণ কমিটমেন্টে সাহসী করে তোলে, ছিন্ন মেঘের ফাঁকেও সে দেখতে পায় অরুণ কিরণ রেখা। সূক্ষতর বিবরণের ভেতর, রুমীর যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তৈরি হলে, সময়ের তীর বেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, শিল্পী-সাহিত্যিক-লেখকগণের যুদ্ধসংহতি, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি গণমানুষের অনাস্থা ও অবিশ্বাস, পাক-আর্মিদের তৎপরতা আর এদেশীয় সহযোগী শক্তির দাপট ক্রমশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তারের সংবাদ ঘনীভূত হতে থাকে। ভারতের সীমানা দিয়ে চলে যাওয়া মানুষের ঢল আর বিভিন্ন পরিবারের উৎকণ্ঠা তীব্রতর হতে থাকে। পারিবারিক জীবনের অস্থিরতা, বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া সংবাদ, ধর্মের নামে নিষ্ঠুরতা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন আর ঘুরেফিরে আসে পঁচিশে মার্চ কালোরাতের ধ্বংসযজ্ঞের নতুন নতুন চিত্র। ক্রমাগত মুক্তিযুদ্ধ ও গেরিলা তৎপরতা বেশ উজ্জীবনী শক্তি নিয়ে তৎপর। রাজশাহী, সাতক্ষীরা, ঝিকরগাছা, বেনাপোলসহ নানা স্থানের সংবাদ আসছে, সূত্র টেলিফোন এবং বন্ধু-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে। জুন মাসে বিভিন্ন এইড সংস্থা বিভিন্ন কলকারখানা, শিল্পএলাকা পরিদর্শন করলেন। সরকার এদের কাছে সাহায্যের জন্য বা চলতি অস্থিরতার কারণ নিজের মতো করে বোঝাবার চেষ্টা করছেন। একশ-পাঁচশ টাকার নোট বাতিল, ব্যাংক ভল্টের খোঁজ-খবর, গেরিলা সহায়তার উপায় ও কর্মপন্থা নির্ধারণ, গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র মজুদ, ঘরের খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রভৃতি নাটকীয় আ্যকশানের  ভেতর দিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ঊর্ধ্বগামী হতে শুরু করেছে। গেরিলাদের খাবার, আর্থিক সমর্থন, অস্ত্র-আশ্রয় নিয়ে নিবিড় পরিকল্পনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শত্রুকে চেনার জন্যও বিভিন্ন রকম প্রণালী উদ্ভাবন দরকার। জুনমাস ধরে ক্রমবর্ধিত অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল গেরিলাদের সহায়তার উপায় ও পরিকল্পনা সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা। বিদেশী মাধ্যমে খবর ছাড়াও, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, চরমপত্রসহ কামাল লোহানী, কর্ণেল নূরুজ্জামান, ফয়েজ আহমদ, কবীর চৌধুরীসহ অনেক কলমযোদ্ধা ও কর্মপরিকল্পক স্বদেশের শ্রেয়োজ্ঞানে যুক্ত হন। তাদের কর্মপ্রণালী ও কর্ম-প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে যুদ্ধকালীন ঘটনার অপরিহার্য চরিত্র। সর্বোচ্চ ঝুঁকি নয়, দেশজ্ঞান ও মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার শপথে তারা সবকিছুকে তুচ্ছ করতে পারেন, এটি প্রাত্যহিকস্বরে প্রত্যক্ষ হতে দেখা যায়। ‘একলা রাতের আঁধার’টুকু তাদেরই আঁধার কাটানোর দুঃসহ প্রচেষ্টা। সেখানে জীবনও হয়ে ওঠে শঙ্কাহীন, দুর্মর। সুদূরের ধনটুকুর তাদের আকাক্সক্ষায় ছিল তীব্রতর, সব চাওয়া পাওয়া ছিন্ন করে একলা হয়ে সমগ্র পথটিই নিজের হতে পারে, যখন একটিই লক্ষ্য ‘দেশ’। আর এটিও লেখকের হাতে প্রকাশ্য হয় যে, দেশ শব্দটি একক বা বিচ্ছিন্ন কোনো অর্থ নয়, এর ভেতরে আছে জাতির ঐতিহ্যিক স্বপ্ন, ইতিহাস, ভৌগোলিক ভূখণ্ডের ভেতরে গড়ে ওঠা দ্বান্দ্বিক কৃষ্টি ও মৃত্তিকাজাত সংস্কৃতির ঈপ্সিত দায়, যা গড়ে ওঠে হাজার বছরের প্রতিরোধী প্রয়াসে, এমনটি মিলেই দেশ। সেই দেশ প্রাপ্তি বা দেওয়া-নেওয়া নয়, আলোহাওয়ার ভেতরে নিজের অধিকার ও স্বপ্ন দেখার জায়গা। সেটি প্রত্যেকটি মানুষের এক একটি জন্ম ও জীবনের ইতিহাস। এ দেশটুকুর জন্যই যুদ্ধ। সেখানে সবকিছু তুচ্ছ করতে পারেন যোদ্ধারা, সে পর্যায়টুকু চেনা যায় একাত্তরের দিনগুলিতে। ডায়েরী নয় এটি দেশ-বৃত্তান্ত, ব্যাপক অর্থে জাতির স্বাবলম্বী স্বপ্নগাথা। আঁধার কেটে স্বপ্নের আঁধার রচনার নিশ্চিন্ত ও নিবিড় পথরেখা।

শতচক্ষু সহস্রপাত 

একাত্তরের দিনগুলির জুন-জুলাই পুরোটাই প্রকৃত ইতিহাস। কার সে ইতিহাস? অনেক ঘটনা, পুনর্ঘটনা, আতঙ্ক, টেনশন প্রভৃতি ফুটিয়ে ওঠে তুলিতে। তারপরে দাঁড়ায় গাঢ় ও পুরা-চিন্তন কাঠামো, বিশেষ করে একালের চোখে দেখলে। আর যদি আরও ভেতরের চোখে, ইতিহাসের চোখে তাকাই সেখানে ধরা পড়ে গেরিলা তৈরির খবর, তরুণদের যুদ্ধযাত্রার আয়োজন, গৃহস্থালীদের সমস্ত জিনিসপত্র শত্রু থেকে লুকিয়ে আড়াল করে রাখার কিম্ভূত প্রচেষ্টা, আর স্বজনদের বুদ্ধিহীন অবাক করা  ছিনতাই হয়ে যাওয়া জীবন নিয়ে তুমুল হা-পিত্যেস। এটি প্রাত্যহিক কিন্তু পুরোটাই এদেশীয় ও সবার পুরা ও প্রত্ন-কাহিনি। গণ-মানসের কেন্দ্রে ঘটে যাওয়া চূর্ণ-অভিজ্ঞতার পূর্ণ সম্পৃক্তি। এটি যুদ্ধমুহূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ তো কখনো এ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়নি, বিশেষ করে এ অঞ্চলের মানুষ, কোনোদিনই তো জড়িয়ে পড়েনি বৃহত্তর গণযুদ্ধে! ফলে তার জয়-পরাজয়, ন্যায়-অন্যায়, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা কতোটুকু প্রসঙ্গ পায়। সেটির ইতিবৃত্ত এইসব অক্ষরের ফাঁদে খোদিত। কোনোক্রমেই নিছক অক্ষর নয়, তা ছড়িয়ে পড়ে চিত্তের অনেক প্রান্তে, গভীর স্বাক্ষরে। প্রসঙ্গত, ঠিক সত্তুরের গোড়ায় বিশ্ব-পরিস্থিতি, মার্কিন-রাশিয়া দুইপক্ষ, চীনা সমাজতন্ত্র, ভিয়েতনামে পরাশক্তির পরাজয়, বিপ্লবীদের অক্ষয় আখ্যান প্রভৃতি নিয়ে গল্প ওঠে, কর্মের সাক্ষ্য জমে ওঠে, নির্ধারিত সত্যে প্রস্তুতি চলে ইতিহাস রচনার। আবালবৃদ্ধবণিতার সংশ্লেষ। শ্রমিক-জনতা-ছাত্র এ স্রোতে একটি অভ্রান্ত লক্ষ্য নিয়ে নট-নটীর চরিত্র নির্ণিত হতে থাকে। গড়ে ওঠে চেতনাভুবনের নতুন অভিপ্রায়।

‘আগস্ট ৭১’ রুমীদের এ্যাকশন। পাকবাহিনি নানাভাবে বিপর্যস্ত। আষাঢ়ে বৃষ্টি চলছে। বিভিন্ন গেরিলা ইউনিট সক্রিয়। ইতিমধ্যেই মেধাবীদের অনেকেই নেমে পড়েছে যুদ্ধে। বৃষ্টিকে আশীর্বাদ এবং ধন্যবাদ। বর্ষায় হানাদাররা সুবিধে করতে পারছে না। কিন্তু হত্যা ও নির্মম অত্যাচারের জুড়ি নেই। বিভিন্ন দিকে বিশেষ করে মফস্বলে ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাত। নানাভাবে এ কর্মগাঁথা রচনা চলছে। ধ্বস্ত সমুদ্রে জেগে আছে স্বপ্ন। গুরুতর বিচ্ছেদকাতর জনস্রোত পাড়ি দিচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। বাংলার মানুষের ঐক্য থেকেই আদায়-বিদায়-আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। ক্রমাগত তা বাড়ছে। টুকরো ও ছড়ানো ছিটানো সে চিত্র আসছে। কার্যত, ঢাকার বিবরণই প্রধান থাকলেও আত্মীয়-বন্ধুবান্ধব বা কর্মসূত্রে কেউ ঢাকার বাইরে থাকলে তার মাধ্যমে কী ঘটছে তা অক্ষরে আবদ্ধ হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর হয়ে উঠলো চলতি দিনলিপি, রুমী-জামীসহ পরিবারের কয়েক সদস্যকে ধরে নিয়ে গেলে। নিরাপরাধ বা অপরাধের ব্যাপার এখানে নেই, রুমীর গেরিলা এ্যাকশনের যে বিবরণ তাতে ওদের রজ্জুতে খুব তাড়তাড়ি বাধা পড়বে এ বাড়ি, সন্দেহ নেই। একজন অফিসারের বাড়ি তল্লাশী অতঃপর ধরে নিয়ে যাওয়া, প্রত্যেককের থেকে রুমী আলাদা করে নেওয়া, দিনভর-রাতভর ক্যাম্পে নির্যাতন, ইন্টাররোগেশন পরে ছেড়ে দেওয়া এবং মর্মন্তুদ বিবরণের পদচিহ্ন একাত্তরের দিনগুলি। বাস্তব বিররণীতে গভীর হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের বেদনার্ত চিহ্ন। রুমীর জন্য মায়ের ও পরিবারের অনুভূতি চিরন্তন কিন্তু তার গুণগত প্রান্ত অনুকরণীয়, সেপ্টেম্বর ২ থেকে পড়ি :

শরীফকে কর্নেল বলেছিল রুমী একদিন ফিরে আসবে। কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমি কি বিশ্বাস করেছিলাম? শরীফের ফিরে আসার খবর পেয়ে পরশু বিকেল থেকে বাসায় আত্মীয় বন্ধুর ঢল নেমেছে। সবাই রুমীর জন্য হায় হায় করছে। হায় হায় করছে কেন? তবে রুমীর কি ছাড়া পাবার কোনো আমা নেই? গতকাল এগারোটায় আমি মঞ্জুরের সঙ্গে আবার এম. পি. এ. হোস্টেলে গিয়েছিলাম। রুমীর কিছু কাপড় চোপড়ের একটা প্যাকেটে করে সেটা তাকে দেবার এবং তার সঙ্গে দেখা করার প্রার্থনা জানিয়ে একটা দরখাস্ত লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যাওয়াই সার। কোনোখানে কোনো সুরাহা করতে পারলাম না। কেউ রুমীর সম্বন্ধে কোনো হদিসই দিতে পারল না। …

এ উদ্বিগ্নতার পরের  ঘটনা :

যে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, সেই সরকারের কাছে মার্সি পিটিশন করলে রুমী সেটা মোটেও পছন্দ করবে না এবং রুমী তাহলে আমাদের কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবে না। বাঁকা ও ফকির অনেকভাবে শরীফকে বুঝিয়েছেন, ছেলেন প্রাণটা আগে। রুমীর মতো এমন অসাধারণ মেধাবী ছেলের প্রাণ বাঁচলে দেশেরও মঙ্গল। কিন্তু শরীফ তবু মত দিতে পারছে না। খুনী সরকারের কাছে রুমীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে দয়াভিক্ষা করা মানেই রুমীর আদর্শকে অপমান করা, রুমীর উঁচু মাথা হেট করা।

আরও পরে :

রুমীর কোনো খবর নেই। প্রতিদিন পাগলা বাবার কাছে যাচ্ছি, তার পায়ের ওপর পড়ে কান্নাকাটি করছি। তিনি বেশির ভাগ সময় চুপ করে ধ্যানে বসে থাকেন, কোন কথা বলেন না। বেশি চাপাচাপি করলে বিরক্ত হন। তবু আমরা সবাই পাগলাপীরের আস্তানায় ধরনা দিয়ে বসে থাকি, আমি, মা, লালু, মোশফেকা মাহমুদ, তার মা, ঝিনু মাহমুদ, শিমুল বিল্লাহ, তাদের চার ভাই। … কিন্তু পাগলা বাবার কথায় ষোল আনা ভরসা করতে মন যেন আর সায় দিতে পারছে না। পাগরা বাবার কাছে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের মনে যেন মাঝে মাঝে কেউ বলছে : রুমী নেই, আলতাফ নেই, জুয়েল নেই, বদি, বাশার, হাফিজ নেই, আজাদ নেই, নেই, নেই, ওরা কেউ নেই।…

পূর্বতন সময়ের হত্যাযজ্ঞ ক্রম-প্রকাশ্য, অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে মেরে ফেলার সংবাদ, তাদের দেশদ্রোহী আখ্যার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আর বিপরীতে কুলাঙ্গাররা খ্যাত হচ্ছে দেশপ্রেমিক আখ্যায়। পক্ষ-বিপক্ষ তো ন্যায়-অন্যায় দিয়েই নির্ধারিত হয়। কীসের ন্যায় ও নীতিধর্মের জন্য ‘দেশদ্রোহী’ আর ‘দেশপ্রেমিক’ নাম পাচ্ছে, রাষ্ট্র কর্তৃক! টিক্কা খানের পর এলেন নতুন গভর্নর, নিয়াজী সামরিক প্রশাসক হয়ে এলেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের বিমান ছিনতাইয়ের দৃপ্ত সাহসের খবর এসে পৌঁছালো। ‘খালেদ মোশাররফ মাথা ঠাণ্ডা রেখে মুক্তিযুদ্ধের কাজ চালিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে দুই নম্বর সেক্টর, মেলাঘর তার হেডকোয়াটার্স। নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিরাট গেরিলা বাহিনী। দেশের অন্য সব জায়গা থেকে তো বটেই, বিশেষ করে ঢাকার যত শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান, টগবগে, বেপরোয়া ছেলে এসে জড়ো হয়েছে এই সেক্টর টু তে।’, অক্টোবরের এই নির্ণয়, কার জয় পরাজয় নিয়ে আসবে সেটি মুখ্য নয়, কারণ ফল কেমন হবে, কার কী পরিণতি হবে কেউ জানে না। কিন্তু কিছু কুলাঙ্গার ছাড়া দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠার জন্য সম্মুখ সমরে প্রস্তুতির এই আদেশে চলতে থাকে, এবং তার ফলেই সম্ভব হয় একটি ভূমিজন্মের। এর ভেতরের দুঃসাহসী কর্মকা-, প্রতিরোধের নীতিমালা প্রণয়ন, অধিকারের ক্ষেত্র প্রস্তুত, দূর্গে আঘাত হেনে তার করায়ত্ত হাতে রাখা, গেরিলার শর্ত ও প্রান্তমুখ প্রস্তুতকরণ, সম্মুখযুদ্ধের শত্রু পরাস্তের কৌশল, সমরের ধরাশায়ী অভিজ্ঞান, অনুমান করে ফেলা যায়। একাত্তরের দিনগুলির কথনে প্রাত্যহিক কৃত্য তৈরি করে সমগ্রতা, সেটি চিরচেনা অর্থময়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্বমুখ ও প্রতিরোধের ভেতরে এগিয়ে চলা ব্যক্তি তা তার সময়-বিবরণী পরিণতিটিও জানায়। এ পরিণতির সবটুকু এতে নাই, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও অনুপস্থিত, সেটি তার বাইরের কহন, নিজের নয়; তাই সততার ও প্রত্যক্ষের নির্বন্ধে তিনি লেখেন, তাতে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিগণও বাদ থাকেন না, যে পক্ষই হোক, রুমী মুক্তির জন্য একজন মা বা বাবা কী করতে পারেন, কিন্তু সবকিছু বিকিয়ে দিয়েও নয়, আবার এটুকু সান্ত¡না যে, রুমী যা চায় তাই করেছে, দেশের জন্যই করেছে, দেশের জন্যই এ আতœবলিদান, সেটি কম কী, ধর্মীয় সান্ত¡না কিংবা অন্যান্য সংস্কারের কাজ এ প্রকৃতির বৃত্তে চেতনে বা অবচেতনে মনকে স্পর্শ করেই, তা করতেও হয়। একটি শিক্ষিত ও মুক্তজ্ঞানের নির্মোহ প্রয়াসে লেখক আগ্রহবিন্দুটি কোনো তুলতুলে বা রগরগে আবেগে আটকায় না, প্রভূত ও স্বতঃশ্চল থাকে, ব্যাপক বৃত্ত পায়, সমাহারে সম্মিলনে পরিমাপে মেলে পরিচ্ছন্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কল্যণময় চেতনার দর্পণ। ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষতও হয় তা, বিদীর্ণ ও চূর্ণও হয় কিন্তু গর্ব ও অহঙ্কারের ব্যক্তিত্বম-িত থাকে। এতটুকু টাল খায় না। দৃঢ়তায় ঊর্ধ্বে থাকে দেশ, এই দেশের মাটি ও মানুষ।

কোন সুদূরেরও ধন

মোনেম মৃত্যুর পর চাঞ্চল্যের রেশ নানা দিকে ছড়ায়। কী সরকারি কী জনতার মধ্যে। গেরিলার শহর হয়ে উঠেছে ঢাকা। দ্রুততায় ঘটতে থাকে অনেকানেক আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণ। কাগজগুলোও সরব। প্রতিক্রিয়ার পরিবেশ বাড়তে থাকে। ঘটনার উত্তপ্ত রূপ প্রত্যন্ত পর্যন্ত পৌঁছয়। রেশ কাটে না, প্রবাহিত হয়, আবালবৃদ্ধবণিতার চেতনায়। অনায়াসে তা কানে কানে আসে, গুঞ্জরণে ছড়ায়, বিচ্ছুর দলের ঘাত-প্রতিঘাত শক্তি সঞ্চয় করছে। মনে হয় ধরাশায়ী হচ্ছে ওই প্রতিপক্ষ, পরিস্রুত আবহাওয়ায়, নিয়তি দুর্যোগে, আঞ্চলিক প্রতিবেশে, ভৌগোলিক গলিঘুপচিতে। দিনগুলি রুক্ষ্ম, ক্লান্তিকর, মৃত্যু বিভীষিকায় কঠোর, গুণাগুণে দৈন্য; অনায়াসে সকলেই ক্রুদ্ধ নিখোঁজ রুমীর জন্য, স্বজনদের শান্ত বিজন ও ক্ষান্ত কূজন ছাড়ার জন্য, ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবার জন্য। কিন্তু আনুকূল্য কী? কার্যত সাহস ও গেরিলা অহংকার, কঠোরে কঠিন জেদ ও অহং মনোবৃত্তি, অনেকদিনের দুঃসহ অত্যাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কণা কণা প্রতিরোধের মহীরূপ অধঃক্ষেপ, অপরাজেয় হওয়ার নিরুপায় উপায়, ন্যায্যতার সর্বশেষ বিন্দুটি পর্যন্ত উদ্ধার, নইলে বারুদের বিপরীতে দাঁড়ানোর সংঘবদ্ধতা হয় কীরূপে? এই আনুকূল্যটুকুই নিরুপায়ের উপায়। সেটিই পৌঁছায় সকলের হয়ে দুরন্তরূপে। অক্টোবরের দিনলিপিতে তারই আওয়াজ মেলে, মনের প্রকোষ্ঠগুলোর কষ্ট-বেদনা বা টুকরো আনন্দ সম্পর্ক উচ্ছ্বাস নিরপেক্ষ সংঘবদ্ধতায় প্রকাশ পায়। সংযমে লেখকের এ অবমুক্তি নিষ্কম্প্র ও অবিনাশী। অটল ও স্বাবলম্বী। পরাণরেখা নানাকৌণিক, বিচ্ছুরণও নির্মোহ। মার্চে যা শুরু হয়েছিল অক্টোবরে তার রূপরেখা রেখাপাত-আশ্রয়ী। অনুভবের পরত ও বিম্বিত সারাৎসার গভীর নিশানামণ্ডিত। ম-নকলায় প্রাত্যহিকতার আড়ালের খবরসমূহ মুখ্য : রুমী, মোনেম মৃত্যু, গেরিলা গঠন, প্রত্যন্ত পর্যন্ত নৃশংসতার সংশ্রব, ক্রমিকস্বরে একত্রিত মুক্তিযোদ্ধা। ওতে নির্বাচন, ভোট, বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তও চিনে নেওয়ার অনায়াস দখল, প্রত্যেককের। এতেই সুদূরের ধনের অপেক্ষা, আর নির্ণিমেষ প্রহর গোণা। নভেম্বরের দিনলিপির স্পর্শকাতর অংশ পড়ে নেওয়া যায় : ঢাকার অলি-গলি রাজপথ, সেখানে গেরিলা আক্রমণ, আঁধার রাতের লক্ষ্য ও আঘাত, রাজনৈতিক দলের বা নেতাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক তরুণের অনায়াস অংশগ্রহণ, ক্রমাগত তাদের বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ, সংঘবদ্ধ প্রয়াস এবং প্রকাশ্য, মুখোমুখি অনেককিছু। সবচেয়ে বিষ্ময়কর আলবদর ও আল-শামস বাহিনির তৎপরতা। ধর্মের নামে তারা ধর্ষণ-লুট ও মানবতার চরমতম অপমান সৃজন করছে। ওরাই সহায়তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারদের সর্বনাশ ঘটাচ্ছে, তাদের ভেতরের কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার নকশা পাকিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এরা নাকি ধর্মের রক্ষাকর্তা। এসব রাজাকারদেরই ছকে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে, বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ। আটকা পড়ছে আস্তানা ও নিরাপরাধ পরিবারগুলো। নভেম্বর চিনে নিই :

চারিদিকে কেমন একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। দৈনিক কাগজগুলো ভারতীয় আগ্রাসন, ভারত কর্তৃক যুদ্ধের হুমকি, সীমান্তে ভারতীয় তৎপরতা ইত্যাকার খবরে সয়লাব। পাঁচ তারিখে হঠাৎ সরকারি আদেশে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে রাত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত ব্ল্যাক আউটের মহড়া হল। আজ আবার কাগজে দেখছি সরকারি-বেসরকারি সব বাড়িঘরের পাশে ট্রেঞ্চ খোঁড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেমের পক্ষে বিশ্ব জনমত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছেন।

দেশের অভ্যন্তরেও লম্ফঝম্ফ কম হচ্ছে না। পি.ডি.পি’র চেয়ারম্যান নুরুল আমিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে আবেদন জানিয়েছেন রাজাকারের সংখ্যা এবং তাদেরকে দেওয়া অস্ত্র, দুই-ই বৃদ্ধি করা হোক। উপনির্বাচন শুরু হবার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে যে হারে ‘ভারতীয়’ ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বেড়ে গেছে, তাতে রাজাকারদের শক্তিশালী করা খুবই প্রয়োজন।

কেরোসিনের দর হঠাৎ করে এক লাফে প্রতি টিন ১১টাকা থেকে ১৮ টাকায় চড়ে গেছে। কি ব্যাপার? সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে বিচ্ছুদের ধাক্কার জের মনে হচ্ছে।

নভেম্বরের মধ্যেই ভারতের সংযুক্তি ঘটে যায়, পূর্ব-বাংলায় চলমান যুদ্ধের সঙ্গে। সেটি ধীরে ধীরে আরও বি¯তৃতি লাভ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘশক্তি শক্ত রেখায় স্পষ্ট হয়, সাহস ও শক্তির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। ডিসেম্বরে ভারতের বিমান আকাশে ওড়া ও স্বীকৃতি খুব প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। ‘বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন জাতি। চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। রুমী এখন কোথায়? তাকে পাক আর্মি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে, এটা সমর্থিত খবর। কিন্তু তাকে মেরে ফেলেছে কি না এটার কোনো সমর্থিত থবর তো আজো পাই নি।’ আতঙ্ক আর ব্ল্যাক আউটের ভেতর পুত্রহারা অসহায় জননীর কান্না দিনলিপির পত্রে অনেক হারানো যোদ্ধারই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ঢাকার অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন থাকে, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্যের চিত্রও আসে। তাদের জয়ের সংবাদ অন্যদের ভেতর উল্লাসের আনন্দও ফুটিয়ে তোলে। ১৬ ডিসেম্বর সেই কাক্সিক্ষত ভোর ফিরে এলো। ‘ জেনারেল নিয়াজী সব্বই হাজার পাকিস্তানী সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে আজ বিকেল তিনটায়।’ এই আনন্দের মাঝে পরের দিন জানা যায় ‘মুনীর স্যার, মোফাজ্জল হায়দার স্যার, ডা. রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার এবং আরো অনেকেরই খোঁজ নেই। গত সাত-আটদিনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কারফিউয়ের মধ্যে এঁদের বাসায় মাইক্রোবাস বা জীপে করে কারা যেন এসে এঁদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে।’ এরপর রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে নৃশংসতার ছবি পাওয়া গেল।

আকালের মৃত্যুকে মুছে      

জাহানারা ইমাম মৃত্যুকে মুছে দেশ ও তার অমর সময়গাথাকে চিরন্তনতা দিয়ে, একাত্তরের দিনগুলিতে। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের ভেতরের বসবাসকে ঘন দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। তাতে তাঁর বর্ণনের শক্তির উৎসটি চিনে নেওয়া যায় কিছু অনুভবের রঙে। সে অনুভবে নিরপেক্ষতা ও নির্মোহ দৃষ্টিপাত ব্যতিক্রমী। কারণ, রুমীকে হারানোর কষ্টটি তিনি সবকিছুকে ছাপিয়ে তোলেননি, একইসঙ্গে অনেক মুক্তিযোদ্ধার হারানোর বেদনার সঙ্গে অকাতরে মিশিয়ে দিয়েছেন তার বেদনা। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যার খবরের পর, স্বাধীনতার আনন্দও ম্লান হয়, বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকা-ে, যা লেখনীতে সামগ্রিক হয়ে উঠেছে। সক্রিয় যুদ্ধের অস্ত্র তুলে না নিলেও, মনে ও মগজে সারাক্ষণ তার যুদ্ধ চলেছে। কষ্টকে, মৃত্যুকে সামলিয়ে মনোযোদ্ধা হিসেবে সবকিছুর সঙ্গে থেকে নিজেকে করে তুলেছেন নিরপেক্ষ ও সামগ্রিক। একাত্তরের দিনগুলি তাই ইতিকথার পরের কথা, নির্ভরযোগ্য সত্যের কথা। জীবন থেকে নেয়া ঘটনাপুঞ্জ, ঢাকা শহরের যুদ্ধের নানা অভিমুখ নৈর্ব্যক্তিকরূপে, কড়া সত্যে লিপিবদ্ধ। তথ্য বা দলিল শুধু নয়, মানবিক সত্যের চিহ্নিত স্বরূপে।

লেখকের মুক্তিযুদ্ধ নিছক তুল্যমূল্য নয়, নিবদ্ধ চোখের অনায়াস প্রয়াসে প্রত্যক্ষ সত্য নির্ণয়ে, জন্মদাগের অবলোকন, এই মমতাময়ী দেশকে আশ্রয় করে। সে রঙ-তুলিতে অন্য কোনো গ্রন্থের তুলনা করা যায় না, বা কিছু গৎবাঁধা উপকরণ বাছাই করেও ভোলান যায় না, শুধু বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অনিঃশেষ পরতটি পাওয়া যায়, যা ইতিহাসের দলিল ও অমোঘ পটচিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বইটির নয় মাস বিবরণীতে মেলে, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর  সমস্ত বাঙালির কষ্টবেদন ও আনন্দের স্বরূপমুখের সন্ধান। এ দলিলটির বিশ্বাস ও সংঘশক্তির নির্মেদ প্রকাশ তাই গুরুত্বপূর্ণ বটে, বিশেষ করে সামনের সময়ের বিভ্রান্তির মীমাংসার ছায়ারূপে, প্রজন্মচেতনার পথরেখায়। এটি অমোচনীয় স্মারক, প্রতিটি বাঙালির নিমিত্ত-মূল্যে। বিশেষ করে, জিহ্বায় উচ্চারিত ভাষার পারিপাট্য ও সন্দেহাতীতরূপে সকলের বিবেচনীয় পাঠ্যে। একাত্তরের দিনগুলি প্রতিনিধিত্বশীল সময়ের শ্রেষ্ঠ ঘটনার সাক্ষ্য, যা অনেককালের ও চিরকালের, যার সংঘটন এই দেশটির কারণে। দেশ তো হঠাৎ পাওয়া বস্তু নয়!