চিহ্নপুরষ্কার

চিহ্নপুরস্কার ২০১৬

পূর্ববর্তী ধারাবাহিকতায় মোস্তাক আহমাদ দীন ও শরীফ আতিক-উজ-জামান যথাক্রমে সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় ‘চিহ্ন-পুরস্কার ২০১৬’ পেয়েছেন। প্রতি তিন বছর পর পর চিহ্নমেলার সমাপনী পর্বে সাধারণত এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রান্তিক, পরীক্ষাপ্রবণ, কমিটেড এবং মিডিয়া বা কর্পোরেট আওতার বাইরে ধ্রুপদী-শৃঙ্খলার একজন লেখক এ পুরস্কার পেতে পারেন। এ জন্য যে কোনো প্রান্তের বাংলাভাষী বাঙালি লেখক নিম্নোক্ত ঠিকানায় গ্রন্থ বা পাণ্ডুলিপি প্রেরণ করে পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষায় সহায়তা করতে পারেন। [চিপ্র]

চিহ্নপুরস্কার ২০১৬ প্রদান করা হয় ৭ ও ৮ই মার্চ চিহ্নমেলায়

  • সৃজনশীল শাখায় পুরস্কার পেলেন:
                                                                       কবি মোস্তাক আহমাদ দীন
  • মননশীল শাখায় পুরস্কার পেলেন:
                                                                      লেখক শরীফ আতীক উজ জামান
  • এছারাও সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে দুই বাংলার আটটি ছোটকাগজকে।
    [চিহ্নপুরস্কার মূল্যমান প্রত্যেককে ২৫০০০/- (পচিশ হাজার টাকা) ও সম্মাননা ক্রেস্ট]
  • প্রতি তিনবছর পর পর চিহ্ন জুরী বোর্ডের নির্বাচনের মাধ্যমে পুরস্কৃতদের নির্বাচন করা হয়। তার আগে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রান্তিক লেখকগণের কাছে নির্ধারিত ঠিকানায় গ্রন্থ চাওয়া হয়।

আপনি এ’লক্ষ্যে যে কোন সময় নিম্নোক্ত ঠিকানায় গ্রন্থ পাঠাতে পারেন।

চিহ্ন ঠিকানা
শহীদ ইকবাল
১৩০ শহীদুল্লাহ কলা ভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী, বাংলাদেশ
ই-যোগাযোগ: chinnoprokashon@gmail.com
ফোন: ০৭২১-৭১১৮৯০

 

চিহ্নপুরস্কার ২০১৩

মননশীল বিবেচনা ও সৃজনশীল বিবেচনায় চিহ্নপুরস্কার ২০১৩ পেলেন যথাক্রমে মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন ও কথাসাহিত্যিক মাসুদুল হক। তাঁদের দুজনকেই চিহ্নপুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও একটি সম্মাননা সনদপত্র প্রদান করা হয়। চিহ্নমেলা ২০১৩-তে মঞ্চে উপস্থিত থেকে পুরস্কার প্রদান করেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, প্রবন্ধকার সনৎকুমার সাহা, গবেষক খোন্দকার সিরাজুল হক ও কবি জুলফিকার মতিন।

রাজধানীর কেন্দ্রপীড়ন, মিডিয়ার তড়পানি, কর্পোরেট ডুগডুগির বিপরীতে এ পুরস্কার সৃজিত রূপ পেল দুজনের করোটির কর-রেখার ভেতর দিয়ে। দুজনের রচনা ও কর্মপ্রয়াসী বিবরণ এখানে পত্রস্থ হলো। এ পরিসরজুড়ে তাঁদের আরেকটি সম্মাননা স্রোতের বিপরীতে চলা বক্ষ্যমান চিহ্নের এ প্রতীকী পাতাসমূহ। আশা করছি, প্রতি তিনবছর পর পর চিহ্নের পাতায় এরকম দুজন কৃতীকে পাওয়া যাবে। লেখক (সৃজনশীল ও মননশীল) কী, কেমন তার কাজ, এ পুরস্কার কতোদিন চলবেÑ এসব উত্তর এখানে না দিয়ে আমরা বলতে চাই চিহ্নকেন্দ্র বাংলাভাষা বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ক্রমপ্রসারে দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টায় একটি সাংগঠনিক ভূমি তৈরি করে চলেছে। সেখানে স্ব-সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় এ পুরস্কারের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চা, প্রকাশনা, সেমিনার, প্রান্তিক ভাষাচিত্রির অনুসন্ধান, চিহ্নমেলা আয়োজন ও কাগজ-আন্দোলনের ব্রত নিয়ে কাজ করছে। এ ধারায় আমাদের এ পুরস্কারটি মাতা-মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি নিবেদন এবং একইসঙ্গে উত্তর-প্রজন্মের স্ফটিকস্বপ্নচিন্তার অবিনাশী স্মারক। আমরা প্রতি তিনবছর পর পর এটি ধরিয়ে দেব আমাদের স্বপ্ন-মানুষদের। বাংলাভাষি সকল কলমপেশা স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের প্রতি আমাদের শাশ্বত অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। (সম্পা.)

মননশীল বিবেচনা ।। মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন (১৯৪১- ২০০৬) ।। গ্রাম : মর্তুজাপুর, চুয়াডাঙ্গা ।। গ্রন্থ : নীল বিদ্রোহের নানাকথা

 সম্মাননা সনদপত্র ; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে যখন কোন স্বীকৃতির প্রস্তাবনা উত্থাপিত হয়, যথাযোগ্যতার প্রশ্নে আমরা সংশয়ী হতে পারি। চুয়াডাঙার মর্তুজাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ ইউসুফ হোসেনের ক্ষেত্রেও প্রথমত আমরা এরকমই সন্দিগ্ধ ছিলাম। কিন্তু, তাঁর রচিত গ্রন্থ বলা বাহুল্য একমাত্র গ্রন্থ নীল বিদ্রোহের নানাকথা আমাদের সেই বিভ্রান্তি দূর করে দেয়। বিবিধ বিঘœ ও বাধা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করে মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন নির্মাণ করেন এই গ্রন্থ। ‘নীল বিদ্রোহ কেবল নীলকরদের বিরুদ্ধে অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন এক কৃষক আন্দোলন’Ñআমাদের প্রথাগত এই ধারণা এই গ্রন্থ অবলেপন করে। পারিবারিকভাবে নীল বিদ্রোহের রক্ত ধমনিতে বহন করে, নীল বিদ্রোহের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী দীর্ঘায়ু পিতার কাছে গল্প শুনে মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন রচিত নীল বিদ্রোহের নানাকথা তাই আমাদের বিবেচনায় উত্তীর্ণ হয়। অন্তর্গত অর্থে, নীল বিদ্রোহ যে একটি শ্রেণিযুদ্ধই, যার নেতৃত্বে ছিল কৃষক ও উৎপাদকশ্রেণি; ঘটনার উপস্থাপন, বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, প্রকৃত নায়ক ও শত্র“দের চিহ্নিত করে মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন এটি প্রমাণ করতে সক্ষম হন বলে নীল বিদ্রোহের নানাকথা সমূহ বৈভব ও মৌলিকত্ব নিয়ে চিহ্নপুরস্কার মননশীল শাখার যথার্থ দাবীদার হয়ে ওঠে। আমরা এই দাবীকে স্বীকার করি এবং মুহম্মদ ইউসুফ হোসেনকে চিহ্নপুরস্কার-২০১৩(মননশীল বিবেচনা) দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। কিন্তু আমাদের আনন্দের সঙ্গে বেদনার সংশ্লেষটুকু এইÑচিহ্নপুরস্কারের এই স্বীকৃতির ক্ষেত্রে লেখা হবে মরণোত্তর।

আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন রচিত নীল বিদ্রোহের নানাকথা গ্রন্থের সূচি থেকে

প্রথম অধ্যায় ।। নীল চাষের পটভূমি ॥ ১৭ ।। প্রাচীন ও আধুনিক নীলচাষ/ বাংলাদেশে নীলচাষের প্রসার/ নীল গাছ ও উৎপাদন প্রণালী/ নীলকুঠি ও কারবার পরিচালনা/ নীলচাষের প্রাথমিক অসুবিধা ও প্রতিকার/ ইউরোপীয়দের কুঠিস্থাপন ও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নীলকুঠি

দ্বিতীয় অধ্যায় ।। পীড়ন এবং বিদ্রোহের সূচনা ॥ ৩৬ ।। নীলচাষে শোষণ ও প্রজা পীড়ন/ নীলচাষীর ভূমিদাসত্ব/ নীল বিদ্রোহের সূচনা ও প্রাথমিক পর্যায়/ বিদ্রোহের সংগঠন ও রণ-কৌশল

তৃতীয় অধ্যায় ।। নীল অভ্যুত্থানের কিছু ঘটনা ॥ ৫৮ ।। সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও সম্মুখ-যুদ্ধ/ বাংলার জোয়ান অব আর্ক পিয়ারী সুন্দরী/ ‘বিশে ডাকাত’-এর নেতৃত্বে অভ্যুত্থান/ আরো কিছু লড়াই/ চুয়াডাঙ্গা নীলবিদ্রোহ ও কৃষক-যুদ্ধ

চতুর্থ অধ্যায় ।। নীলচাষের অন্তিমকাল ॥ ৮৭ ।। ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠন ও তদন্ত অনুষ্ঠান/ সর্বশেষ নীলদাঙ্গা (১৮৮৯) ও নীলচাষের অবসান/ নীলকরদের কুঠি বিক্রয় ও স্বদেশ যাত্রা/ নীল বিদ্রোহের নেতৃত্ব ও পরিচালনা

পঞ্চম অধ্যায় ।। বিদ্রোহকালীন সমাজ ও সাহিত্য ॥ ৯৯ ।। নীল বিদ্রোহকালে বাঙালি সমাজের শ্রেণীবিন্যাস/ জমিদার ও তালুকদার শ্রেণী/ গ্রামের মধ্য-শ্রেণী/ শহরের মধ্য-শ্রেণী/ কৃষক বা নিম্নশ্রেণী/ নীল বিদ্রোহের সাহিত্য/ ওহাবী ও হামকল বাহিনী সৃষ্ট সাহিত্য/ মিশনারিদের সৃষ্ট সাহিত্য/ দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল-দর্পণ’/ নীল বিদ্রোহের অন্য কিছু কথা

নীল বিদ্রোহের নানাকথা প্রকাশকের কথা ;  চুয়াডাঙ্গার মর্তুজাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ ইউসুফ হোসেন তাঁর রচিত নীল বিদ্রোহের ইতিহাস গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বিবেচনার জন্য যখন আমাদের দিয়েছিলেন সত্যি বলতে কি আমরা এর গুণাগুণ বিষয়ে নিঃসংশয় ছিলাম না। কিন্তু পাণ্ডুলিপি পাঠান্তে আমরা যে কতটা প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত ও আলোড়িত বোধ করেছি তা ব্যক্ত করার জন্যই এই ভূমিকার অবতারণা। লেখক ইতিহাসের নিষ্ঠাবান ছাত্র, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের কাজ অব্যাহত রেখেছেন এবং তারই প্রতিফল হচ্ছে বর্তমান গ্রন্থ। লেখক একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট ইতিহাস বিষয়ক উপাদানগুলো ঘেঁটেছেন, তেমনি চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে নীল বিদ্রোহের যেসব লোককথা ও কাহিনী ছাড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তা’ পরম যতেœর সঙ্গে সংগ্রহ করেছেন। পারিবারিকভাবে নীল বিদ্রোহের রক্ত তাঁর ধমনীতে প্রবহমান, নীল বিদ্রোহের সক্রিয় শরীক দীর্ঘায়ু পিতার কাছে বিদ্রোহের গল্পকথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছে বাল্যে। তাই লেখকের ইতিহাস রচনায় যেমন আঞ্চলিক ইতিহাসের নানা উপকরণ য্ক্তু হয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত অভিঘাতও দুর্লক্ষ্য নয়। ফলে এই গ্রন্থ ইতিহাসমনস্ক পাঠকদের কাছে ব্যতিক্রমী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে বলেই আমরা মনে করি। এমন একটি গ্রন্থ পাঠক সমাজের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত বোধ করছি এবং আশা করি সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণে তা সমর্থ হবে। ( মফিদুল হক)

নীল বিদ্রোহের নানাকথা থেকে পাঠ

সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও সম্মুখ-যুদ্ধ

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসহযোগ আন্দোলন ১৮৫৯ খৃস্টাব্দের এপ্রিল-মে থেকে অভ্যুত্থানের আকারে প্রকাশ পায় এবং দেখতে না দেখতে ব্যাপক আকার ধারণ করে। যন্ত্রণাজর্জর ও অনাহারক্লিষ্ট কৃষক সমাজ বহু চেষ্টার পরেও যখন নীলকর ও সরকারের সহানুভূতি লাভে ব্যর্থ হয় তখন নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এ-বছর তারা কোন নতুন চুক্তি করবে না এবং আগের বছরে স্বাক্ষরিত চুক্তি মোতাবেক কোন জমিতে নীল রোপণও করবে না। অবশ্য কোন কোন অঞ্চলের কৃষক সমাজের তরফ থেকে এ-দাবি উত্থাপিত হয় যে, তাদের কর্ষিত উৎকৃষ্ট জমির অর্ধাংশে ধান ও পাট চাষ করতে দিলে তবেই তারা বাকি অর্ধাংশে নীলচাষ করবে। কর্তৃপক্ষ নীরবতা অবলম্বন করলে তারা পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটে যায়। নীলচাষে অস্বীকৃতি জানিয়ে হাজার হাজার চুক্তিপত্র পুড়িয়ে ফেলে এবং কুঠি থেকে প্রেরিত নীলবীজ নদীতে নিক্ষেপ করে। এ-অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারের দায়িত্বে নিযুক্ত কুঠিয়ালরা যে-ভুল করে, তা-ই অন্তিমে অভ্যুত্থান ও সশস্ত্র সংগ্রামকে অবধারিত করে তোলে। ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশে পুলিশ হাজার হাজার কৃষককে গ্রেপ্তার ও অবর্ণনীয় উৎপীড়নের পর হাজতে আটক করে। তাদের বাড়িঘর ধূলিসাৎ করা বা জ্বালিয়ে দেয়া হয়। নেমে আসে নির্যাতন তাদের পরিবার-পরিজনের ওপরেও। চুক্তি ভঙ্গ এবং আইন অমান্যের অজুহাতে শত শত ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা দায়ের এবং জেল, জরিমানা, ক্রোক ও ডিক্রির মাধ্যমে কৃষকদেরকে তাদের ভিটেমাটি থেকে করা হয় উৎখাত। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শরৎকালব্যাপী তাদের জীবনের ওপর দিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির ঝড় বয়ে যায়। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে শীতের মধ্যভাগ থেকে শুরু হয় নীলকুঠি ও নীলকরদের ওপর সশস্ত্র পাল্টা আক্রমণ।

১৮৬০ খৃষ্টাব্দের শুরুতেই বা তার কিছু আগ থেকে কৃষকরা সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে এবং সে-বছরেরই মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে সাবেক নদীয়া, যশোর, বারাসাত, পাবনা, রাজশাহী, ফরিদপুর ও অন্যান্য জেলায় এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরই ভয়ঙ্করতায় ভীত হয়ে ইংরেজরা তাদের বৃটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানাতে থাকে। বৃটিশ জমিদার ও বণিক সমিতির সভাপতি ম্যাকিনটে ১৮৬০ খৃস্টাব্দের জুলাই মাসে ইংল্যান্ডে প্রেরিত পত্রে ভারত সচিব চার্লস উডকে জানান, “গ্রামাঞ্চলে অবস্থা বর্তমানে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল। কৃষকরা তাদের ঋণ ও চুক্তিপত্র অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তাদের মহাজন ও মালিক (ইংরেজ)-দেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে তাদের হৃত সম্পত্তি উদ্ধার করা এবং ইউরোপীয়দের কাছ থেকে গৃহীত সকল ঋণ রদ করাই তাদের উদ্দেশ্য।”

দ্বিতীয় বেঙ্গল পুলিশ ব্যাটেলিয়নের প্রধান নায়েক হাবিলদার আবদুস সোবহান খানকে পাবনা জেলার বিদ্রোহ দমনের জন্য এক বিশাল বাহিনীসহ সেখানে প্রেরণ করা হয়। ১৮৬০ খৃস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল তার গ্রামের বাড়িতে প্রেরিত একখানা পত্রে তিনি লেখেন, “সকালবেলায় আমরা প্রস্তুত হইয়া পিয়ারী নামক একটি গ্রামে মার্চ করিয়া গেলাম। সেই গ্রামে পৌঁছিবা মাত্র লাঠি, বল্লম ও তীর-ধনুক সজ্জিত দুই সহস্র লোক আমাদিগকে চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিল। তাহারা ক্রমশ আমাদের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিল। তাহাদের বল্লমের আঘাতে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের অশ্ব আহত হইল। আমরা সংবাদ পাইলাম যে, পার্শ্ববর্তী ৫২খানি গ্রাম হইতে এই বিদ্রোহীরা সমবেত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে একব্যক্তি আমাদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। তাহার দিক হইতে কয়েকটি বন্দুকের গুলির শব্দও আসিয়াছিল।”

বাকল্যান্ড তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছেন–“পাবনা জেলায় একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও একটি সশস্ত্র পুলিশ-দল প্রকাণ্ড একটি লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে পরাজিত ও বিতাড়িত হয়। এই লাঠিয়াল বাহিনী নীলচাষ বন্ধ করবার জন্যই সমবেত হয়েছিল।”

এই সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের পত্রিকা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ নিয়মিতভাবে এ-সব লড়াই ও দাঙ্গার বিবরণ প্রকাশ করতো। যশোর থেকে শিশিরকুমার ঘোষ চিঠি মারফত এ-ধরনের বহু লড়াইয়ের বিবরণ এ-পত্রিকায় প্রেরণ করতেন।

১৮৬০ খৃস্টাব্দের ৫ জুলাই তারিখের এক পত্রে শিশিরকুমার ঘোষ লিখছেন-“নীলকর কেনীর লোকেরা একজন চাষীকে অপহরণ করেছে–এ সংবাদ প্রচারিত হইবামাত্র ২৭টি গ্রামের কৃষক কেনীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করলো।”

“বিজলিয়া কুঠির ওকান সাহেব কিছুসংখ্যক গ্রামের মন্ডলদেরকে গ্রেপ্তার করে তাদেরকে নীলচাষের চুক্তিতে স্বাক্ষরে বাধ্য করে। তারা গ্রামে ফিরে সকল চাষীকে একত্র করে এবং কুঠির আমিন তাগিদদারদের প্রহার করতে করতে গ্রাম থেকে বের করে দেয়।… অবশেষে গ্রামের কৃষকরা তাদের নিজস্ব অধিকার বজায় রাখবার জন্য চূড়ান্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। ২০ জুন তারিখে মল্লিকপুরে মীরগঞ্জ কুঠির জন ম্যাকার্থারের দলের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের একটা বৃহৎ সংঘর্ষ হয়ে গেছে।”

২ আগস্টের এক পত্রে তিনি জানান “২০ জুলাই মল্লিকপুরের কৃষক পাঁচু শেখকে নীলকরের ২৫ জন লাঠিয়াল গ্রেপ্তার করতে গেলে তাদের সাথে ২৫ জন কৃষকের এক সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষেই বহু লোক আহত হয় এবং পাঁচু শেখ লাঠির আঘাতে মারা যায়।”

৮ আগস্টে লিখিত এক পত্রে অনুরূপ ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো জানান, ‘যশোরের রায়তগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্র ছাগলকোণা।’

এমনি ধরনের কত অসংখ্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও খণ্ডযুদ্ধ যে-সংঘটিত হয়, তার হিসেব কে রেখেছে? তখন না ছিল কোন পথঘাট, যাতায়াত কিংবা পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা সংবাদ আদান-প্রদানের কোন সুমাধ্যম। শত শত লড়াই ও প্রতিরোধ যুদ্ধের ঘটনার দু’একটির খবর কোলকাতায় পৌঁছুত মাত্র। তাও যারা প্রকাশ করতো, তারাও নিজেদের শ্রেণীস্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখেই তা করতো। এখানে কিছুসংখ্যক উল্লেখযোগ্য নীলদাঙ্গা ও কৃষকযুদ্ধের বিবরণ সংক্ষিপ্তভাবে বিবৃত হলো।

বাংলার জোয়ান অব আর্ক পিয়ারী স্ন্দুরী

টমাস আইভান কেনীর নীল ব্যবসা তৎকালীন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার ভেতরে বৃহত্তম ছিল বলা যায়। শুধু কারবারী হিসেবেই নয়, অতিশয় অত্যাচারীদের ভেতরেও তার নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। তার ৩/৪টি কনসার্নের অধীন অর্ধশতাধিক কুঠিতে নীলচাষ হতো। প্রধান কুঠি শালঘর মধুরায় অবস্থিত ছিল। দুর্ধর্ষ এই কুঠিয়াল জবরদস্তিমূলকভাবে বহু জমিদারকে জমিদারী থেকে উৎখাত এবং অনেকের জমিদারীতে পত্তনি বা বন্দোবস্ত ছাড়াই জোরপূর্বক নীলকুঠি স্থাপন করে। আমলা-সদরপুরের মহিলা জমিদার পিয়ারী সুন্দরীর জমিদারীর ভেতরেও কেনী এমন কয়েকটি নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা করে। বলপূর্বক নীলচাষে বাধ্য করবার জন্য প্রজাদের ওপর উৎপীড়ন শুরু করলে প্রজা ও তাদের জমিদারবৃন্দ অত্যাচার বন্ধের জন্য সরকার ও এই নীলকরের সাথে বহু দেন-দরবার করেন। কিন্তু সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে ১৮৫০ খৃস্টাব্দে নীলচাষীরা ধর্মঘটে যায়। কেনী তার বাগদী সম্প্রদায়ের সমবায়ে গঠিত লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে অত্যাচার শুরু করলে প্রজারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রায় ১০ বছর ধরে নেতৃত্বহীন কৃষকরা লড়াই চালিয়ে বরণ করলে কেনী এমন নির্যাতন আরম্ভ করে যে, প্রজারা তাদের গ্রাম বা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। শালঘরের মৃধা ও শেখ পরিবার তার ভয়ঙ্কর অত্যাচারে টিকতে না পেরে দেশত্যাগ করে চলে যায়। ‘বিষাদ সিন্ধু’র লেখক মীর মোশাররফ হোসেনের আত্মীয় সাঁওতা নিবাসী গোলাম আজমের সঙ্গে হামকল বাহিনীর গোপন যোগাযোগ ছিল। তাঁর অনুরোধে চাঁদুড়িয়া ঘাঁটির হামকল সেনাপতি আলিজান মুন্শী মধুয়ায় পৌঁছুলে মধুয়ার শেখ আমির আলী এবং আহম্মদ আলী মৃধার নেতৃত্বে একটি বাহিনী গঠিত হয়। মহিলা জমিদার পিয়ারী সুন্দরী আপন প্রজাবৃন্দকে রক্ষার জন্য এবং নিজের জমিদারী উদ্ধারের জন্য এ-বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করেন। পরাজিত কৃষক যোদ্ধারা ১৮৬০ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পুনরায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। কেনীর লাঠিয়াল বাহিনীর অবস্থান গ্রহণ ও পরিবেষ্টন সত্ত্বেও বিদ্রোহীরা আমলা-কুঠি আক্রমণ করে তা ধ্বংস্তূপে পরিণত করে। এই আক্রমণ-অভিযানে কেনীর পক্ষের বহু লোক হতাহত হয়। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কেনী পিয়ারী সুন্দরীর ভাড়ল কাছারিবাটি লুট ও অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করে। এই সময় পাংশার জমিদার ভৈরব বাবু এবং পিয়ারীর জমিদারী এস্টেটের ম্যানেজার রামলোচন কৃষকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। অসমসাহসিকা পিয়ারী সুন্দরী কুঠিয়ালের মূল ব্যবসা কেন্দ্র ধ্বংস এবং কেনীকে হত্যার পরিকল্পনা করে এপ্রিলের মাঝামাঝি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিয়ে তার সদর কুঠি শালঘর মধুয়া আক্রমণ করেন। কেনী গোপনে সংবাদ পেয়ে পালিয়ে প্রাণরক্ষা করে। তার আবেদনে সরকার পাবনার ম্যাজিস্ট্রেট হ্যামডেনের নেতৃত্বে দারোগা মাহমুদ বখ্শের অধীনে একটি পুলিশ বাহিনী প্রেরণ করে। এ-বাহিনী প্রায় ১৫ দিন আগ থেকে কুঠি রক্ষায় নিযুক্ত ছিল। গড়খাই এবং দ্বিতল অট্টালিকা থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ সত্ত্বেও বিদ্রোহীরা কুঠির ওপর সফর আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম হন। সিভিলিয়ান হ্যামডেন আহত হয়ে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করলেও দারোগা মাহমুদ বখ্শ সড়কির আঘাতে নিহত হন। কুঠিয়ালের বাসভবনসহ প্রায় সমগ্র কুঠিবাড়ি বিদ্রোহীদের অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত ও বিধ্বস্ত হয়।

নীলকুঠি আক্রমণ ও দারোগা হত্যার মামলায় পিয়ারী সুন্দরী, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, অধীনস্থ কর্মচারী, তাঁর সহযোগী জমিদার, মহাজন এবং আরও অসংখ্য কৃষক প্রজাকে আসামী করা হয়। এই মামলা চালাতে গিয়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে যান। কুঠিয়াল এবং ইংরেজ সিভিলিয়ানদের চক্রান্তে তাঁর জমিদারী নিলামে ওঠে এবং সরকার পক্ষ থেকে জমিাদারী পরিচালনার জন্য অছি নিযুক্ত ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। পিয়ারীর নেতৃত্বে কৃষকযুদ্ধ ইংল্যান্ডের ওয়াট টিলার ও পীম হ্যামডেনের ভূমিদাস বিদ্রোহের চেয়েও প্রলয়ঙ্করী ও বৈশিষ্ট্যময় ঘটনা। তাঁর আত্মত্যাগ ও শোষিত মানুষের প্রতি সংগ্রামী সহানুভূতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বাংলার এই কৃষক বিদ্রোহের জোয়ান অব আর্ক।

প্রথম অভ্যুত্থান ও দাঙ্গার সময় কৃষকরা ধর্মঘটে গেলে কেনী ইংল্যান্ড থেকে কলের লাঙল এনে নীলচাষের ব্যর্থ চেষ্টা করে বিদ্রƒপের পাত্র হন। লোক ঠাট্টা করে তার কলের লাঙলের নাম রাখে‘গোলাম শাহ’। গোলাম শাহ অত্যাচারী কুঠিয়ালের জুলুমের একজন সঙ্গী। প্রতিশোধপ্রবণ কেনী তার হাতির নাম রাখে ‘পিয়ারী সুন্দরী’। কেনীর অত্যাচারে সাহায্যকারীদের ভেতর তার দেওয়ান বসন্তকুমার মিত্র উল্লেখযোগ্য। সুসাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেনের পিতা মীর মোয়াজ্জম হোসেনও এই কুঠিয়ালের অন্যতম সাহায্যকারী ছিলেন। কুষ্টিয়া শহরের কেনী রোড এই অত্যাচারী কুঠিয়ালের নামে পরিচিত। অস্ত্রক্ষতে আক্রান্ত হয়ে টি. আই. কেনী কলকাতা হাসপাতালে প্রাণত্যাগ করেন।

‘বিশে ডাকাত’এর নেতৃত্বে অভ্যুত্থান

নদীয়া জেলার চৌগাছা গ্রামের নীলচাষী বিশ্বনাথ সর্দার ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতেই যে নীল বিদ্রোহ শুরু করেন, তাই সম্ভবত সারা বাংলাদেশের ভেতরে সর্বপ্রথম কৃষকযুদ্ধ। তখন মোল্লাহাটি কনসার্নের কুঠিয়াল স্যামুয়েল ফেডি গোয়াড়ি-কৃষ্ণনগর অঞ্চলে নীল ব্যবসার নামে শোষণ ও নির্যাতনের তাণ্ডব শুরু করেন। নদীয়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ইলিয়ট ছিলেন তার পৃষ্ঠপোষক। তার বাংলোর পাশেই ছিল ফেডির নীলকুঠি। পৃথিবীর এমন হীন ও নৃশংসতম কাজ ছিল না ফেডি যার আশ্রয় নেয়নি। তার অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে কৃষক-প্রজাকুল যখন তার প্রতিকারের পন্থাঅšে¦ষণ করছিল, তখন দেবতার মত আবির্ভূত হন এই কৃষক বীর বিশ্বনাথ সর্দার ওরফে বিশে ডাকাত। দক্ষিণে গঙ্গা থেকে শুরু করে উত্তরে ভৈরব পর্যন্ত চূর্ণী নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহের বিদ্রোহী নীলচাষী ও যোদ্ধাবৃন্দের তিনি ছিলেন নেতা। চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের খাল বোয়ালিয়া কনসার্নের সকল কুঠি, হাঁসখালি, মন্নুরহাট, কৃষ্ণপুর, বাবলাবন, রানীনগর, চন্দননগর, চৌগাছা, গোবিন্দপুর, আসাননগর প্রভৃতি অসংখ্য নীলকুঠি ছিল তাঁর অভ্যুত্থান ও যুদ্ধক্ষেত্র। তিতুমীরের হামকল বাহিনীর যোদ্ধা জামালউদ্দীন আহমদ ছিলেন তাঁর উপদেষ্টা ও পরিচালক। ১৮০১ খৃস্টাব্দের ফেব্র“য়ারি মাসে নীলকুঠি লুণ্ঠনের ভেতর দিয়ে বিশ্বনাথ নীল বিদ্রোহ শুরু করেন।

নদীয়া জেলার চাপড়া থানার গাদড়া-ভাতছালা গ্রামে বিশ্বনাথের জন্ম। তিনি জাতিতে ব্যগ্র ক্ষত্রিয় বা বাগদী ছিলেন। পিতা, পিতামহ ছিলেন কৃষক। পিতার কৃষিকার্যের সহযোগী এককালের সুবোধ বালক স্বজাতি ও কৃষকদের ওপরে কুঠিয়ালদের অত্যাচার দেখে যৌবনেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। বুদ্ধি ও দৈহিক শক্তিতে এই বীর যুবক যখন নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চিন্তায় ব্যাপৃত, তখন ওহাবী বিদ্রোহী চাপড়ার ইসমাইল হোসেন তাঁকে তিতুমীরের হামকল বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। দেশপ্রেমিক হামকল বাহিনীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ অন্তে বিশ্বনাথ স্বগ্রামে ফিরে বেশ কিছুকাল মজলুম কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে ব্যাপৃত থাকেন। যুবকদের একটি দলকে তিনি এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন যাতে করে যে-কোন আক্রমণ ও পরিস্থিতির মোকাবেলায় জয়লাভ করা যায়। হামকল বাহিনীর মত তারও একমাত্র লক্ষ্য ছিল নীলকুঠি ও নীলকর জমিদার গোষ্ঠীর ধন-সম্পদের ভাণ্ডার ও গোলাবাড়ি দখল, ধ্বংস সাধন কিংবা লুট করা। নদীয়া জেলার কুনিয়ার জঙ্গলে ছিল তাঁর গোপন ঘাঁটি। তিনি আক্রমণের পর আক্রমণ রচনা করে অসংখ্য নীলকুঠি ও নীল বাজার ধ্বংস করে দেন।

তাঁর বিপ্লবী ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জেলা প্রশাসক ইলিয়ট এবং নীলকর ফেডি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার ঘোষনা করা এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা লেলিয়ে দেয়া হয়। বিপ্লবী বিশ্বনাথকে সরকার ও নীলকররা ‘বিশে ডাকাত’ নামে অভিহিত করে। স্বগ্রাম ও স্বজাতির ওপর নৃশংস অত্যাচারের জন্য ফেডির প্রতি বিশ্বনাথ যারপরনাই ক্ষুব্ধ ছিলেন। এরই পরিণামে দীপালির এক রাতে বিশ্বনাথ আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত তাঁর বাহিনী নিয়ে ফেডির কুঠি ও বাসভবন আক্রমণ করেন। উভয় পক্ষে তুমুল গোলাগুলি বিনিময় হয়। ফেডির অনেক অনুচর নিহত হয় এই সংঘর্ষে এবং জীবিতদের প্রায় সকলেই ক্ষত-বিক্ষত দেহে পলায়ন করে। ফেডির স্ত্রী পুুকুরে ডুব দিয়ে মাথায় কালো হাঁড়ি চাপিয়ে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যান। বিশ্বনাথের মুসলমান অনুচর ও প্রধান সেনাপতি মেঘাই সর্দার ফেডিকে বন্দী করে বাগদেবী খালের তীরে নিয়ে আসে। বিচারে তাঁর প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। ফেডি সেদিন সকাতর প্রার্থনায় প্রাণভিক্ষা চান এবং যীশুর নামে শপথ করে প্রতিশ্র“তি দেন যে, তিনি কোন মামলার আশ্রয় গ্রহণ কিংবা এসব ঘটনা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ফেডি মুক্তিলাভ করেই বিশ্বনাথকে ধরিয়ে দেন। তাঁকে দিনাজপুর জেলে আটক রাখা হয়।

কিন্তু অমিত তেজী বিশ্বনাথ জেলখানা থেকে পলায়ন করেন এবং পলায়নের মাত্র চারদিন পরেই তাঁর বাহিনী নিয়ে ১৮০৮ খৃস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে তিনটার সময় ফেডির গৃহ পুনরায় আক্রমণ করেন। ফেডি ও মিঃ লেডিয়ার্ড বন্দুকের গর্জনে জেগে উঠে দেখতে পান যে, তাদের বাংলো বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলেছে। লেডিয়ার্ড এবং অন্য আর একজন অনুচর অবিরাম গুলিবর্ষণ করলেও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন। লেডিয়ার্ড বল্লমের আঘাতে ধরাশায়ী হন। ফেডিকে বন্দী করে বিশ্বনাথ তাঁর প্রধান পাইককে বিদ্রোহীদের হাতে সমর্পণ ও কোষাগার দেখিয়ে দেয়ার জন্য আদেশ দান করেন। বিদ্রোহীরা বন্দী ফেডি ও তার পাইককে টেনে মাঠে নিয়ে আসেন। এবারও ফেডি নীলচাষ তুলে দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিলে এবং দিনের আলো ফুটে ওঠায় বিশ্বনাথ তাকে হত্যা না করে অর্থকড়ি ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পালিয়ে আসেন।

নীলকরদের জুলুমের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ বিশ্বনাথ ব্যক্তিগত জীবনে নির্লোভ, দয়া ও ক্ষমার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। অত্যাচারী ফেডির প্রতি ব্যবহারই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্ত্রীলোক, শিশু, বৃদ্ধ ও পশুপাখির ওপর আক্রমণ তার আদেশে নিষিদ্ধ ছিল। শ্রীমোহিত রায় বলেন, “ধনী ব্যতীত দরিদ্র গৃহী বা পথচারীর কোন ক্ষতি তাহার দ্বারা হয় নাই। কোন গৃহে ডাকাতি করিবার পূর্বে বিশ্বনাথ তাহার বাড়িতে রাত্রে অতিথি হইবে বলিয়া জানাইয়া দিত। গৃহী নির্বিবাদে তাহার প্রাপ্য প্রদান করিলে সে নিরুপদ্রবে চলিয়া যাইত। গৃহ বা গৃহীর কেশাগ্রও স্পর্শ করিত না লুন্ঠিত অর্থে বিশ্বনাথ তাহার সম্প্রদায়, স্থবির, পঙ্গু, বৃদ্ধ, শিশু ও দুর্গতগণকে বস্ত্র ও অন্ন বিতরণ করিত।”

এহেন বিশ্বনাথকে ধরবার জন্য পুলিশের চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর সেনাবাহিনী প্রেরিত হয় এবং এ-কাজে নিযুক্ত হন সেনাপতি ব্ল্যাকওয়ার। নীলকরদের এক সহযোগীর বাড়িতে ডাকাতির সময় তার কয়েকজন অনুচর ধৃত হয়। তার মধ্যে তাঁর পালক পুত্র পঞ্চাননও ছিলেন। পঞ্চানন পুরস্কারের লোভে তাঁর গোপন ঘাঁটি ও বাসস্থানের কথা ফাঁস করে দেয়। সেনাবাহিনী কুনিয়ার জঙ্গল অবরোধ করে অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণ শুরু করলে অনুচরদের জীবন রক্ষার জন্য বিশ্বনাথ ধরা দেন এবং সমস্ত ঘটনার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন। ফেডির সামনে মুখোমুখি হয়ে বিশ্বনাথ তাঁর বিশ্বাসঘাতকতা ও অপকর্মের জন্য ভর্ৎসনা করেন। ব্ল্যাকওয়ারের এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বনাথ বলেন,– “নীলকর, জমিদার, মহাজনের জুলুম বন্ধ হলে আমি সংসার জীবনে ফিরে যেতে পারি।” …ধৃত বিশ্বনাথকে “গঙ্গার তীরভূমিতে প্রকাশ্যভাবে….ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃতদেহ লোহার খাঁচায় পুরিয়া একটি অশ্বত্থ গাছে ঝুলাইয়া রাখা হয়। উন্মাদিনী জননী কঙ্কালটি ভিক্ষা চাহেন। কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করে নাই।”

সেকালে ‘বিশে ডাকাতে’র নামে যে-কত কিংবদন্তী ও উপাখ্যানের জন্ম হয়েছিল, তার ইয়ত্তা নেই। শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে বিশ্বনাথ বিপ্লবী বীর সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরের মতই ছিলেন মহান সৈনিক।

সৃজনশীল বিবেচনা ; মাসুদুল হক ।। জন্ম : ১৯৭০ ।। দিনাজপুর

সম্মাননা সনদপত্র  ।। দশক হিসেবে বললে, নব্বুই দশকের লেখক মাসুদুল হক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁর বহুমাত্রিকতা দিয়ে। দর্শনের শিক্ষক মাসুদুল হক একদিকে যেমন রচনা করেন দর্শন গবেষণাগ্রন্থ, তেমনি লেখেনÑকবিতা, কবিতার নন্দনতত্ত্ব, কবিতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং প্রধানত বাংলা ছোটগল্প। প্রথম গল্পগ্রন্থ তামাকবাড়িতে তাঁর অমিত গল্পসম্ভাবনা আমাদের আকাক্সক্ষাকে প্ররোচিত ও বর্ধিষ্ণু করে। দীর্ঘ বিরতির পর সম্প্রতি প্রকাশিত ঢুলকিপুরাণ ও আবার কাৎলাহার নামের গল্পগ্রন্থ দুটি আমাদের অন্তর্লীন প্রত্যাশাকে স্বস্তি দেয় এবং আরও উচ্চকিত করে।

উত্তর বাংলাদেশের দিনাজপুর অঞ্চলের আদিবাসী সাওতাঁল নৃ-গোষ্ঠীর লোক-বিশ্বাস, লোকাচার ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গল্পে, আনন্দ-বেদনার এক কাব্যই রচনা করেন মাসুদুল হক। নিজস্ব গদ্যভাষা ও শৈলীর যৌথতায় আমরা লক্ষ করিÑপ্রথমত, গভীর অন্বেষা ও সংহতি। গল্পসমূহে শ্রমী মানুষের অন্তর্ভুত অধ্যাত্ম শক্তিকে মাসুদুল উন্মোচন করেন অস্তিত্ববাদী করণকুশলতায়। ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু মানবজীবনের বাস্তবতা, হতাশা-নৈরাশ্য ও স্বপ্নকল্পনার সার্থক শিল্পকাঠামো সৃজনে চিহ্ন মনে করে, মাসুদুল হকের যে অনন্য গল্পভুবন নির্মিত হয় তাতে ভূমিকা পালন করে তাঁর অভিজ্ঞতা ও কবিসত্তাও। কিন্তু, কবিসত্তা স্বীকার করেও আমরা প্রধানত গল্পকার মাসুদুল হককেই চিহ্নপুরস্কার-২০১৩ এর সৃজনশীল শাখার জন্য বিবেচনা করতে চাই। তাঁকে চিহ্নপুরস্কার-২০১৩ (সৃজনশীল বিবেচনা) দেওয়া হল। গল্পকার মাসুদুল হককে চিহ্নপুরস্কার-২০১৩ দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। তাঁকে অভিনন্দিত করি।

মাসুদুল হকের গল্প থেকে পাঠ

তামাকবাড়ি (১৯৯৯)

চৈত্রের শুরু। এমন এক সন্ধ্যায়। তিনি তামাকের জন্য বাঁশের কাঠি তৈরি করছেন তার অবচেতন নন্দনে। বাঁশের ঘর। বাইরে ও ভেতরে নক্সা কাটা। সমস্ত বাড়িটার টেক্চারই বাঁশের। ঘর দিয়ে চারিদিকে ঘিরে নিয়ে বাড়ির উঠান। আর যে জায়গাগুলো খোলা থাকে গার্হস্থ্য প্রাণী, রাতের নিশাচর ইঁদুর আর ছুঁচকো চোরের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য, বিশেষ করে বাড়ির আব্র“ নির্মাণে বাঁশের বেড়া দিয়ে অন্য এক সুন্দর তৈরি হয়েছে।

দোল পূর্ণিমার তিন রাত পর। আরেকটু সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্য এক রহস্যময় চাঁদ তার শরীর নিয়ে যেন রূপালী রং গলে গলে পড়ছে আজÑবাড়ির সাথের বাঁশের বনের আড়াল থেকে। এমনও রাত হয়। তামাকের ঘ্রাণে অন্য এক অর্থ নিয়েÑচাঁদ আরো রহস্যময় হয়ে ওঠে বাঁশের বনে। তিনি ধ্যানমগ্ন প্রৌঢ় ঋষি, ফর্সা, অভিজ্ঞ বিশ্বাসের হাতে বাঁশের কাঠি ইস্পাতের কাটাইর দিয়ে ঠিক ঠাক করে নিচ্ছেন, বারবার ঘঁষে-মেজে।

বাইরে লক্ষ্মীপেঁচার কণ্ঠ। রাত যেনবা শরীর থেকে আরেকটি পর্দা সরিয়ে নিলো। সমস্ত দিন চৈত্রের গরম, বালি, মাটি, ঘর, উঠান, গাছ-পালা, আনাজ, মানুষের গায়ে গায়ে। আর রাত গভীর হতে হতে শীতল হয়ে ওঠে দিন ও একই প্রকৃতি, সূর্য হারানো চন্দ্রের কলায়, হাজার বছরের চন্দ্র তারার নিয়মে।

বাঁশের কাঠির স্তুপ বাড়তে থাকলে, এমত সময়ে রহমত এসে দাঁড়ায় ঘরের দাওয়ায়। বাড়ির ছেলে-মেয়ের কণ্ঠে একটা সোরগোল, নতুন কোনো গল্প আছে জেনেÑওরাও ঘরটাতে জটলা পাকায়। বৃদ্ধ এবার বাক মেলায় কণ্ঠেÑ

: তোমার টে নতুন কিচ্ছা আছে কি?

: মোক একনা নাশা দেনতো মামু।

: তাংকুর দর কি?

: বইসু বাহে আগত একনা গল্প করং তার পরে এলা কইম।

: এ মছিরন একনা নাশা দিয়া যা। সাতে আগুনও দিয়া যাইস।

ভেতর থেকে অষ্টাদশীর কণ্ঠ ভাসে।

: নিয়া যাংচল দাদা।

বালিকা তামাকের গুড়ো দিয়ে পরম আদরের হাতে খবরের কাগজ কেটে নিয়ে বিড়ির মত মুড়তে থাকে তামাকের গুড়ো। এদিকে রহমত তার স্বভাবসিদ্ধ যেনবা কোনো এক কল্পনাপ্রবণ মানসিক যন্ত্রণা কাতর কবিস্রষ্টা, একটা নতুন গল্প, তামাক ক্ষেতের গল্প নির্মাণ করে ফেলে রহস্য আবৃত শব্দ অভিক্ষেপণে।

: একদিন জ্যোৎস্না আইতে, মুই হাটু থাকি আইসন চল। এমন সময় মোর উত্তর পাশের তামাক বাড়ি খানত দেখং চল-আট-নওটা উপসী পরী তামাক বাড়ি খানত উঠে চল আর বইসে চল। মুই ভালো করি দেকনু পরীগুলা তামাক বাড়ির যতœ করে চল। এই ঘটনা দেখি মুই খুব ভয় পানু। তারপর মুই সাহস করি আর একনা আগানু। আল্লা অচুলের নাম নিয়া বুকত ফুক দিনু। মরং কি বাচং একতা চিন্তা না করিয়া মোর পরীগুলার সাথে কতা কবার ইচ্ছে হইল। এত সুন্দর পরী মুই জীবনে কোনো দিন দেকং নাই। খালি গল্প-শুনচুং। আল্লা-আল্লা করি, পরীগুলার সামনত যেয়া খাড়া হুনু। দেকনু মুই একটা ছোট ছাওয়ার মত হচুং। পরীগুলা মোক দেকি হাসা-হাসি শুরু করিল্। এত জোরে হাসা-হাসি দেকি মোক খুব ভয় নাকব্যার ধরিল। হঠাৎ একনা পরী মোর বগলত আসি খাড়া হইল। মোর হাতত একনা পাতর দিল। মুই কনু এটা দিয়া মুই কি করিম। পরীটা কইল এবার কুব পাতর পড়বে আর ঝড়ি হইবে, সউগ তামাক নষ্ট হবার পায়। এই জন্যে দেখেন চল না হামরা গুলা তামাকের যতœ করি চল। তোমরা এটা নিয়া যাও। যকন খুব পাতর পইরবার ধরবে তকন এটা দিয়া আকাশত্ ঢেলাইলে পাতর পরা বন্ধ হইবে।

মোর আর কোনো হুস আচলো না। মুই তামান আইত তামাক বাড়িত পরি আসনু। সকালে যকন বেলা উঠপার ধরচে তকন হঠাৎ দেকং মোর মুকে বেলার তাপ নাগে চল। চোখ খুলি দেকং মোর চাইর পাশে মেলা মানুষ খাড়া হয়া মুক দেখে চল। মোর কোনো হুস নাই। টপ করি উটি খাড়া হনু। হাতের মুট খুলি দেকনু, হাতে কোনো পাতর নাই। এমনি হাত মুট করি আসনু তামান আইত। মুই সবাকে পরী আর পাতরের গল্প কনু। মোর কতা কাও বিশ্বাস করে না। ছোট ছোট ছাওয়াগুলা মোক পাগল কয়া চিক্রা চিক্রি করে চল।

এতক্ষণে বৃদ্ধ মুখ খোলে। আর প্রাজ্ঞের দৃষ্টি নিয়ে পান খাওয়া ঠোঁটে মুখে দাঁত চিপে চিপে হাসতে থাকেÑ

: কি রে অহমত তোর কিচ্ছা শেষ হইল। নাকি নাশার নিশা ধচ্ছে।

: না বাহে এটা কিচ্ছা নয়, সত্য ঘটনা। কাও বিশ্বাস করে না। সেই জন্যে তোমাক গল্পটা কনু।

: সিলাই এর ধারা কত? মুই তো বিষপাতা বিশ টাকা ধারা বেচাচুং।

: মুই পাগলা মানুষ। তামাকের দাম জানো না। খুব কষ্টে আচুং। মোর পরী আর পাতরের কতা কাও বিশ্বাস করে না। সেই জন্য তোমাক কনু। তোমরাও বিশ্বাস কন্নেন না। মুই কি মানুষ নোয়াং। মোর কি চোক নাই। মুই কি সত্য কতা কই না। দেখমেন হারকাট ভাংগার আগত কেমন পাতর পড়ে। তকন মোর কতা মনে করেন।

রাত তখন মধ্য যামে। সকল বুদ্ধিমানের করোটিতে ঘুমের তন্দ্রা ক্লান্তির অলসতায় এলিয়ে গেছে বহুদূর। অহমত যে কিনা রহমত। যে পাগল, যে কিনা তামাক শিল্পের স্বপ্নমান। যে পরী আর পাথরের গল্প বুনে চলে-এই তল্লাটে। রহমত এগিয়ে যাচ্ছে তার ডেরার দিকে ডুবে যাবার চন্দ্র আলোক স্থানের ভিতর দিয়ে। পাশে তামাক চাষীর জনপদ পেরিয়ে। ঘরগুলো সব তামাক পাতার পোশাক পরে আছে যেনবা। চাষীরা তামাক শুকোবার জন্যে কাঠিতে তামাক পাতা গেঁথে গেঁথে সে বাঁশের কাঠিগুলোই আবার সারি সারি করে ঘরের বেড়াতে টাংগিয়ে দিয়েছে-চন্দ্র-সূর্যের দিকে, উত্তাপ আর বাতাসের প্রার্থনায়। যেনবা ঘরগুলো আদিম মানুষের মতো তামাকের পোশাক জড়িয়ে আছে জীবন আর শিল্পের অহংকারে, রহস্যময় চাঁদ-সূর্যের সাথে তালে তাল রেখে।

বৃদ্ধ একটি স্বপ্ন বোনে। অষ্টাদশী মছিরনের বিবাহ। দশ গ্রাম ঢোল পিটিয়ে বিয়ে হবে। পালকিতে তার নাতনী যাবে শ্বশুরবাড়ি। মা-বাবা হারা সেই নাতনী। বৃদ্ধের এক স্বপ্ন। এই বৈশাখের পর আগামী বৈশাখে ধানের প্রাচুর্যে আর তামাক বেচা টাকায় বাড়িতে তার বিবাহের উৎসব জেগে উঠবে। দিন-রাত হারাবে তার প্রভেদ সীমা। হলুদ মাঞ্জন আর সুরভিত তেলে সুবাসেÑবাজবে বিয়ের বাদ্য আর গীত। বৃদ্ধ একটা স্বপ্ন বোনেÑচালসে চোখের গভীর দৃষ্টির তলে। আগামী বৈশাখে বিবাহ। তাই এত কষ্ট, এত শ্রম আর ধৈর্যের হাতে তামাকের পরিচর্যা। এই হবে তার শেষ আবাদ, শেষ তামাকবাড়ির শিল্প পরিচর্যা।

রাত ভোর হবার প্রায় আগেই চাষীরা তামাক বাড়িতে চলে যায়। চলে পরিচর্যা আর তামাক কাটার পালা। তামাক কাটার কিছু নিয়ম তারা তৈরি করে নিয়েছে, তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞানেÑতাদের জীবন, তাদের স্বপ্ন-যাপনে। পৌষ, মাঘে যে বীজ ছিটিয়ে চারা হয়, সেই চারা সারিবদ্ধ করে নিয়ে ক্ষেতে লাগিয়ে নেয়। তারপর শুরু হয় লালন-পালন। দেড়-দু মাসে বিষপাতা কাটার উপযুক্ত হয়ে ওঠে তামাক গাছ। গাঢ় সবুজ আর কাঁচা তামাকের ঘ্রাণে মাঠ, ঘর-বাড়ি একাকার। ধীরে ধীরে তামাকের মাছি বাড়তে থাকে। শীতের শিশির তামাক পাতার কানে কানে ধুয়োর গল্প বলতে বলতেÑবিষপাতা কাটা হয়ে যায়। ফালগুনের মাঝেই আবার দ্বিতীয়বার পাতা কাটার সময় হয়ে ওঠে। সেই সিলাই পাতাও শুকিয়ে চাষীরা হাটে বিক্রি করে নেয়। চলে তৃতীয় আর শেষ বারের মত হারকাট পাতা কাটার প্রস্তুতি।

এমনি হারকাট কাটার মৌসুমে বৃদ্ধ আর অন্যসব তামাকচাষীরা যে যার ক্ষেতে নিড়ানী চালিয়ে আগাছা নির্মূল করছে। ধীরে ধীরে চৈত্রের তাপ থিতিয়ে দিচ্ছে শরীর। তামাকের ঘ্রাণ, আমের বোল যেন প্রকৃতির বনজ গন্ধ, তার যৌবন ঘ্রাণ বাতাসের গায়ে গায়ে উড়ে বেড়াচ্ছে সমস্ত জনপদ।

বৃদ্ধ কাজ করতে করতেই কছিমউদ্দির দিকে দৃষ্টি রাখেÑ

: বাহে কছিমউদ্দি ডেমাগুলা ঠিক মত ভাংগেন। কাইল তামাক বাড়িত পানি দেওয়া নাকবে।

: চাচা তোমার চিন্তা কইরবার দরকার নাই। হামরা ডেমা ঠিক মতন ভাংগি চল। কছিমউদ্দি এবার তার পাশের ক্ষেতের হালিমের দিকে কণ্ঠ ও দৃষ্টি প্রসারিত করে-

: হালিম তুই কি দো-কাটা থুইচ চল।

: তাংকুর যে দর। তায় পোষায় না আর দোকাটা থুইয়া কি করিম।

: এ হালিম সে দিন আইতত তোর তামাক বাড়িত কি হোচলো।

: আর কননা বাহে জ্বিন পরী দেখা গেইচে।

: ঘটনাটা কি মোক ভাল করি খুলি কতো।

এক চোখে মার্বেল বসানো কালো কুচকুচে। সমস্ত মুখে বসন্তের দাগ। হালিম বৃদ্ধের পাশের তামাক বাড়িতেই কাজ করছে অন্যসব কৃষকদের সাথে। হালিমের মার্বেল চোখটা মাঝে মাঝে দুই একবার নড়ে চড়ে ওঠে। ওর চোখের দিকে তাকালেÑমার্বেলটা চকচক করে, যেনবা জ্বলে। সঙ্গে একটু গাঢ় করে হেসে দিলে ফালগুন-চৈত্রের রোদ-ফাটা বেলাতেই ভয়ংকর শিব রাতের কালো নেমে আসে যেন।

হালিম একটা গল্প শোনায়। আর অন্যদিকে রোদের তাপ শরীরে দৈত্য-দানবের মতো এসে কামড়ে দিচ্ছে। সংগে বাতাসে ধুলোবালি পেচিয়ে তামাক পাতার র্চ-র্চ শব্দ দিগন্তের শেষ সীমায় উড়ে যাচ্ছে। কানা হালিম গল্প শুরু করে।

: আইতত তো খুব চোরের জব্দ। সেই জন্যে মোক শুকান তামাকগুলা পাহারা দেওন নাগে। সারা আইত মুই বাড়ির কাইনচাত ঘুরি বেড়াং। কয়দিন চান্ন ভালো করি উটে নাই। চাইরো পাশে ঘুচঘুচা আন্দার। মুই চিকরা-চিকরি করি হাটাহাটি করং। সেদিন আইতত দেকং মোর তামাক বাড়ি খানত দুইটা মানুষ। মনে হইল যেন একটা চেংরা একটা চেংরি। মুই ডাকপার যাইম তকনে দেকং নাই। মুই ভয় পানু খুব। বাতাসত হারে গেল। ফির মনে কননং চোকত ভেলকি দেইল নাকি মোক। অন্যদিন আবার দেকিম। সে দিন ডাকাইতে আর ওমরা দুইজন কোন পাশে বা দোওড়াইল। দুই-তিন দিন দেকনু না। তারপর একদিন ফের দেকং। সেদিন আকাশত চাঁদনী আছে। ধপধপা দেখা যায়। দেকং ওমরা দুইজন একটা গাছের নীচত খাড়া হয়া। মোর ফির সন্দেহ হইল ও দুটা জ্বিন-পরী নাকি! তাং সাহস করি ওমার পাছ পাছে যেয়া খাড়া হনু। ওমা যারা দেকং হাজরার বেটি কমলা। মোক দেকিয়া অয় খুব ভয় পাইল। কিন্তু চেংরাটাক চিননু না। মুই পুচ কন্নুÑএ ব্যাটা তুই কায়? অয় তকন মোর পাত পরি কইলÑহামাক মাপ করি দেন চাচা। মুই ফির কনু তোর বাপের নাম কি? চেংরা কইলÑআবদার আলী। মুই ফির কনু-তোর বাড়ি কোনটে। চেংরা কান্দি কইলÑমোর বাড়ি বাহাদুর সিং। মুই কমলাক ভালবাসং। মুই উআক বিয়াও করিম। তারপর তোমরা তো জানেন সবায় গত শোকরবার কমলা আর মুকুলের বিআও হইল। আবদার আলীতো কোনো অকমেই আজী হবার নয়। কিন্তু মুই উআক মান-সম্মানের ভয় দেকানু। শেষত অয় আজী হইল। বিয়াও হয়া গেল। এইটা হইল জ্বীন-পরীর কিচ্ছা। হায়রে কলিকাল! আর কি দেকমু হামরা। মুই দেং চোর পাহারা, শেষত দেকনু মানুষেই যেন জ্বিন-পরী।

এমত কথা আর কাজের ভেতর দিয়ে সময় গড়িয়ে চলে। সয়ফুল একটা বিড়ি ধরায়। বিড়িটা একটু বিশেষ কায়দায় নির্মিত। বিড়িতে কোনো কাগজ ব্যবহার হয়নি। কাগজের বদলে তামাকের শুকনো পাতা আর ভেতর থাকে তামাকের গুড়ো। বিড়িতে তৃপ্তির টান রেখেই ক্ষেতের আল পেরিয়ে রাস্তা। লোকজন ফিরছে হাট থেকে। কেউ কেউ যাচ্ছে হাটে। সয়ফুল এর ভেতরে থেকেই পরিচিত জনকে পেয়ে যায়।

: কিরে কেন্দ্রা হাট থাকি আসলু।

: হয় হয় হাট থাকি আসনুং, ডাকাইচ চল ক্যানে, বাড়িত য্যায়ে কাম করিম। দেরী করবার পাবার ন্যাং।

: হাটত হারকাট আর সিলাইর ধারা কত?

: ও এই কতা শুনবার চান চন। সিলাই চল্লিশ টাকা ধারা, হারকাট ষাইট টাকা ধারা।

বৃদ্ধ এবার চোখ ফেরায়। উঠে দাঁড়ায়, বসে বসে কাজ করার জড়তা ভেঙ্গেÑ

: এত কেমন কম দাম বাহে। ইয়াতে পোষায় কেমন করি।

: শুনংচল এণ্ডিয়া থাকি হামার দেশত তামাক আইসে চোল বেলে। ঐ জন্যে তামাকের দাম কমি যাই চল।

বৃদ্ধ এবার প্রশ্ন রাখেÑ

: কেন্দ্রা তুই তামাক ব্যাচে কি করিম।

: আর কননা বাহে, এবার ইরির আবাদ করিয়া নাকলাম দেখনু। উরিয়া সারের যে দাম তার জন্যে তামাক বেচপার গেছনু।

সয়ফুল হা-হুতাশের বুক ফুলায়। মাথায় হাত বুলায়। তারপর আবার তামাক পাতাগুলো হাতিয়ে হাতিয়ে দূরে কোথায় যেন দৃষ্টি রাখে। তারপর বলেÑ

: আর কইম না বাহে, মোর ছোট ব্যাটাটার দুই দিন থাকি প্যাটের বিষ। ঐ জন্যে ওষুধ কিনার দরকার। তার জন্যে তামাক বেচানু।

এতক্ষণ বৃদ্ধ চুপ করে ছিলেন। গভীর ভাবনা আর ধ্যান তার সমগ্র মুখের ব্যক্তিত্বে। বৃদ্ধ এবার তার স্বপ্নের কথা সবাইকে শোনায়Ñ

: সামনের বৈশাকে নাতনীটার বিআও দিবার চাসনু। ঐ জন্যে তামাকগুলো বেচপার থুছনু। যে দাম তাতে কি করি বিআও দিম নাতনীটার। তাতে ফির এণ্ডিয়া থাকি তামাক আইসে চল। ইয়াক কি বন্ধ করা যায় না।

কেন্দ্রা এবার যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়।

: বাহে মুই যাং চল। ও আর একটা কতা অহমতের মাতাটা বেলে আরো খারাপ হইচে। একপার যাবার নাকবে।

একথা বলেই কেন্দ্রা কাঁচা পাকা রাস্তা ধরে গ্রামের দিকে হাঁটতে থাকে। বেলা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। সবাই বাড়ি যাবার আয়োজন করতে থাকে। সয়ফুল একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে চায়।

: মুই বাড়ি যাংচল।

: যাইচ চল যা। আইতত একনা আসিস। গোঞ্জা বানা নাকবে। তামাকগুলো নাড়ি দেওয়ার জন্যে।

: ঠিক আছে বাহে আসিম এলা।

বৃদ্ধ তবুও বলে শান্ত আর একটু প্রতিশ্র“তির কণ্ঠে। হাসতে হাসতেÑ

একনা তাড়াতাড়ি আসিস। তামাক খামু আর একনা গল্প করমু এলা।

সয়ফুল ওর তামাক পাতা বয়ে নেবার ভার বাকখানি কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করে।

তখন রোদ খুবই উজ্জ্বল। তাপের প্রচণ্ডতা ভীষণ। আকাশে মেঘের লক্ষণ নেই কোনো।

শিলা বৃষ্টির কোনোই সম্ভাবনা নেই। স্বচ্ছ-নির্মল তামাক পরিবেশ।

রহমতের ডেরার বাইরে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের ভিড়। ওরা আরেক রহস্যের সন্ধান পায়। রহমত আবার তৈরি করেছে আরেকটি গল্প। তার নিজস্ব এক পদ্ধতি। এবার তার বিয়ে। রূপসী পরীর কন্যার সাথে বিয়ে।

বৃদ্ধের অষ্টাদশী নাতনী মছিরন প্রথম প্রশ্ন রাখেÑ

: মামু শুননু তোমার বেলে বিআও পরীর সাতে।

রহমত একটু রাগত কণ্ঠেÑ

: কায়ে কইছে তোক।

: কোবারু পাড়ার পাটান বুড়ার বেটা কইল।

এবার রহমত সবাইকে চুপ চুপ হাতের ইশারা দেখিয়ে পরিবেশটা গম্ভীর করে নিয়ে কাছে ডাকে।

: চুপ কর। এইললা কতা বেশি কইলে পরী আগ করবে। উয়ার বেটীর সাতে মোর বিআও দিবার নয়।

ঝন্টু খুব আশ্চর্য হয়ে যায়। একরকম বিশ্বাস নিয়ে ওর চোখ মুখ আশ্চর্যের বর্ণে রঙিন হয়ে ওঠে। ওর বাসনা হয় একবার পরী দেখার।

: মামু মোর পরী দেইকপার খুব সাধ, তোমার বিআর আগত পরীটাক মোক একনা দেকান।

: তোমারা পরী দেইকপার পাবার ন্যান। তোমার আসপাকে আইসপারও নয়। আইসলেও তোমরা দেকপার পাবার ন্যান।

সয়ফুলের ছোট ছেলে আবুল। একবার রহমতের ঘরের ভিতর উঁকি মারে। চেয়ে দেখে ভিতরে সমস্ত ঘর তামাক পাতায় একাকার। সমস্ত ঘর সাজানো হয়েছে তামাক পাতা দিয়ে।

চকির চারপাশে বাঁশ গেঁড়ে-খাটের মত করে তামাক পাতা দিয়ে সাজানো তার শয্যা। যেন বাসর রাতের খাট। বাঁশের ছাদের সব দিকটা নকসা করে সাজানো হয়েছে তামাক পাতায়।আবুল সবাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। সমস্ত ঘরটা কপিশ বর্ণ তামাকের ঘ্রাণে একাকার। রহমত এবার ওঠে ওদের বলে-

: তোমরা গুলা আইসো, মোর ঘরটা একনা দেকি যাও। মোর বাসর আইতের জন্যে সাজা চুং কিন্তু পরী দেকপার চাবার ন্যান।

জরিনা আর মরিয়মের জানতে খুব ইচ্ছে হয় পরীরা কি রকম জামা-কাপড় অংগে জড়ায়। কিন্তু এই কথা কিভাবে তারা রহমতের কাছ থেকে জানবে। এই নিয়ে ওরা দুজনে দোনমনা আর হাত দিয়ে চিমটি কাটাকাটি করতে থাকে। এতে মছিরন ওদের দিকে ভ্রুটাকে প্রশ্নের মতো বাঁকা করে দৃষ্টি রাখে।

: কিরে জরিনা তোমরা ধাক্কা-ধাক্কি করেন চল ক্যানে।

: হামার খুব জানার ইচ্ছা পরীগুলা কেমন কেমন কাপড়া পরে। তুই একনা অহমত মামুর কাছ থাকি শুনি হামাক’ক।

: মামু দেক কি কয়।

রহমত অহংকারে একটু শরীর ঘুরিয়ে গলা কেশে গাঢ় স্বরে ওদের জানায়Ñ

: পরীগুলা কাপড়া পরে জোছনার মত ফর্সা। খুউব নরম খুবউ পাতলা। তোমরা এ’লা যাও মুই পরীর সাতে কতা কইম। উআর আইসপার সময় হইচে। যাও যাও এলা তোমরা। সকলে চলে যায়। রহমত ঘরের দরজা দিয়ে পুরোনো টিনের সুটকেসটা বের করে আনে। মাজায় সুতো বাঁধানো চাবিটি খুলে এনে বংশীয় মালের হেফাজতকারী টিনের বাক্সটি খোলার চেষ্টা করে। তালাটি বহুদিনের পুরোনো। জং পড়ে গেছে প্রায়। বহুদিন চাবি ঘোরানো হয় না এমনিভাবে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে তালাটি খটাং করে খুলে যায়। খুলে যায় ভিন্ন এক জগত। রহমতের হাতের আঙুলে এক ভিন্ন শিহরণ। দৃষ্টি যেনবা আরো নির্মল, স্বচ্ছ-বৃষ্টির পর প্রকৃতি যেমন চোখে স্বচ্ছ কাচের মত স্পষ্ট হয়। তেমনি চোখ স্বচ্ছতায় আর মুগ্ধ মোহের নিঃশব্দের একাকিত্ব আর রূপ আর রূপের রূপকথার গন্ধ নিয়ে হৃদস্পন্দনের কাছে বন্দি হয়। রহমত ওর মায়ের বিবাহের লাল শাড়িখানি বের করে আনে। পরম আদরের হাতে তাকে বুকে চেপে ধরে। সমস্ত ঘর আর বাসর ঘরের দৃশ্যপট যেন রঙিন হয়ে উঠে। পাকা তামাকের ঘ্রাণ যেন আরো মৌতাত সুরভি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় ঘরখানিতে। বর্ণের সমারোহ আর আলোকরেখার কুয়াশায় সত্যিই যেন দূর স্বপ্নের পরীগুলো এসে ডানার ক্লান্তি স্থির করে নিয়ে দাঁড়িয়েছে রহমতের ঘরে।

চৈত্র পূর্ণিমার রাত। চাঁদের আলোয় শরীর ভিজিয়ে নিয়ে পথ পেরিয়ে ধুলো উড়িয়ে গ্রামের দশজনে এসে উপস্থিত বৃদ্ধের উঠানে। হুকো আর তামাকের আড্ডা। গান গল্প চলবে। সঙ্গে হাটে তামাকের দর। সবার ব্যক্তিগত তামাক চাষের গল্প। কে কত দোন জমি চাষ করলো। ভারজেনিয়া, মতিহার, বার্লি আর গোদরা তামাক কোন কোন পাইকার আর মহাজন গুদামে স্টক করছে বেশি বেশি করে। এবার বুঝি আর শিলাবৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। ভাগ্য ভালো। লক্ষ্মী পেয়েছে লগ্ন। সবার, এই জনপদের চাষাদের হৃদয়ের ফাঁক ফোঁকরের স্বপ্নগুলো শরীরী হয়ে উঠবে। ইউরিয়া, পটাশ, আর লাঙল, মই চাষে ওরা আবার ফিরে যাবে মাঠে; ইরির ফলনে কোথাও কোনো অভিযোগ নেই; নেই কোনো গণ্ডগোল। কেবল অস্পষ্ট শুনতে পায় ভারতের তামাক আসছে এ দেশে। তবুও তা বিশ্বাস হবার নয় এইসব। এইসব গল্পের সংগে ভাটিয়ালী গানের টানে আসর সাজিয়েছে বৃদ্ধ। গ্রামের সবাই ওকে মানে, ওকে চেনে। আজ চৈত্র পূর্ণিমার জ্যোৎস্না, দুধ-পাউডারের গুড়োর মতোন মিহি হয়ে ঝরে পড়ছে লোকালয়ে, সকল মাঠ, বৃক্ষের অন্তর আত্মায়, বাঁশের বনে যেনবা মসলিন কাপড়ের নরম কোমলতা নিয়ে জ্যোৎস্না আজ জড়িয়ে গেছে বৃদ্ধের উঠানে উপস্থিত সুধীর অঙ্গে অঙ্গে।

উঠানের অন্যপাশে বাঁশের চালার চারিদিকে খোলা ভিটিতে আইতেনদাররা শুকনো তামাক পাতা বাঁধার কাজ করছে। তারা খুব সযতেœ আড়াই সের করে এক একটি তামাকের ধারা সাজাচ্ছে। এই তল্লাটে তামাক পাতার বাঁধার জন্যে আলাদা দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়। যাদেরকে আইতেনদার বলে। যারা প্রতিমণ তামাক বাঁধতে ১৫ থেকে ২০ টাকা মজুরি নেয়। তাদের কর্ম-কুশলতার গুণেই সেই তামাক পাতা হাটে উঁচু দরে বিক্রি হবার সম্ভাবনা রাখে।

রাত একটু গভীর হতে থাকলো। সয়ফুল, কেন্দ্রা, হরিপদ, ভবেশ, রামচরণ, জয়নাল, হোসেন মিয়া, দয়মুজদ্দি, করিম শেখ এরা সবাই বৃদ্ধের বাড়িতে উপস্থিত। বৃদ্ধ একটা ভাওয়াইয়া গান শেষ করে আরেকটা ধরলেনÑ

: ওকি গাড়িয়াল ভাই

হাকাও গাড়ি তুই

চিলমারীর পন্থে …

তার গানের সুর, ছন্দ আর বাণীতে মোষের গাড়ি আর উঁচু নিচু পথে চলার ঢেউ যেনবা শরীরের তাল আর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে এই দুঃখের জীবনের চালচিত্র আরেক অর্থ নিয়ে আসে জীবনের ভেতরে ও বাইরে।

: তোর আইসপার এত দেরী হইল ক্যানে হরিহর।

: শোনেন নাই বাহে হামার উত্তি খুব চোরের উৎপাত শুরু হইচে। ঐ জন্যে তামাকগুলা ঘরত থুইয়া আসতে দেরী হইল। তা তোমার তামাক বাড়ির খবর কী?

: তামাক তো ভালোই হইচে কিন্তু খুব পোকা ধচ্চে।

রামচরণ একটা নাসাবাড়ি জয়নালের হাত থেকে নিতে নিতে বৃদ্ধকে আরেকটি গানের ফরমাইস জানায়। জয়নাল পান সুপুরি মুখে তার প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানায়।

: কী আর গান কইম বাহে। আইজ কাইল বয়স হইচে মোর গান বান্দিবার পাংনা, করারও পাংনা।

করিম শেখ তার স্মৃতি ঘেটে বৃদ্ধের কণ্ঠে সেই ‘ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে’ গানটি শুনতে চান। তখন বৃদ্ধ একটু সময় নিয়ে, ভেবে চিন্তে গান শুরু করেন-

ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে

কোন দিন আসিমেন বন্ধু

কয়া যাও, কয়া যাওরে …

গানের মাঝেই কেন্দ্রা ভবেশকে জানায়।

: শুনছিসরে ভবেস আকিজ বিড়ি বেলে এণ্ডিয়া থাকি তামাক আনচে। থাইলে হামার তামাকের কি হইবে।

: সেটা বড় লোকের কাজ। মুই ইয়ার কি জানং। বৃদ্ধ গান শেষ করে মুখে একটি পান পুরে নিয়ে হরিপদকে গান শুরু করতে বলে। হরিপদ গান শুরু করে-

নয়া সাগই আচ্ছে বাড়িতে

আর দুই মুঠ চাউল দাও হাড়িতে …

এভাবে গানে, গানে. তামাকে আসর আরো ভারী হয়ে উঠলে ধীর পায়ে রহমত জ্যোৎস্না উঠানে দাঁড়ায়। কোনো গল্প নয়। নতুন বরের মৌনতা নিয়ে এসে দাঁড়ায়। কেন্দ্রা একটু ঠেস মারার মতো করেই রহমতকে বলেÑ

: কিরে অহমত তুই বেলে পরীক বিআও করিচ চল।

রহমত রেগে বলেÑ

: মুই কি করং না করং, তাতে তোর কী? মোর বাপ-মাও কাও নাই। মোর বিআর চিন্তা কাও করে না। সেজন্যে মোর বিআর চিন্তা মোকে করা নাগে। সেই জন্যে পরীর বেটী মোক বিয়াও করবার আজী হইচে। মুই বিয়াও করিম। তাতে মাইনষের কি?

বৃদ্ধ এবার এদিকে মনোযোগ দেয় একটু বিরক্তির চোখে।

: মানুষ তামাক বাড়ির চিন্তাতে বাঁচে চল না। আর তুই বিআও নিয়া পাগলা হচিস। তোর মনত কি ফাগুন ধচ্চে। যা জ্বালাইস না আর মোক।

রহমত রাগে-দুঃখে-অভিমানে, আসর রেখে উঠে দাঁড়ায়। খুব দ্রুত হেঁটে বৃদ্ধের বাড়ি পেরিয়ে যায় প্রলাপ বকতে বকতে। জগতের সকল মানুষ আর তাদের আচরণ, জীবন প্রণালীর প্রতি রহমতের এক চাপা বিদ্রোহ যেন ওর চলে যাবার সমস্ত অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে জ্যোৎস্না রাতের দূরের পথ আর সমস্ত আকাশ আর মহাকাশের চন্দ্র তারায়। পেছন থেকে কারা যেন বলতে থাকে শ্লেষের কণ্ঠেÑ

: ইতা হতিত হামরা বাঁচি চল্ না তামাকত পোকা ধচ্চে আর অয় শুরু কচ্ছে পাগলামী। উআর মনত বিআর পোকা ধচ্চে।

সেবার অনেক শিলাবৃষ্টি হলো। হঠাৎ করে শিলাবৃষ্টি পাথরের মতো গুড়িয়ে দিয়ে গেছে তামাকের পাতা-সমস্ত তামাক বাড়িগুলোতে। শিলার স্তূপে সাদা হয়ে উঠলো তামাকবাড়ি। বাইরে থেকে সাদা বরফের সৌন্দর্যে হয়তো প্রকৃতি শান্ত, নিটোল আর কোমল দেখায়; কিন্তু জীবন! যেখানে অসংখ্য জীবন তামাক পাতার উপর সময়ের প্রহর গোনে। তারা সব একাকার। তাদের হৃদয়ের মন্দির ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে। এমনি এক শিলাবৃষ্টির পর আমি সেই তামাক জনপদে গিয়ে উঠি। সেই বৃদ্ধের সাথে দেখা হয়েছে দুই একবার। তার কণ্ঠে কোনো গান নেই। কোনো স্বপ্ন নেই, ছিল না কোনো কালে। অষ্টাদশীর বিবাহের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে হাতের তস্বিদানা গুণে গুণে।

জাতীয় দৈনিকে সংবাদ এলো এরকমÑ

“শিলাবৃষ্টির কারণে ভূমিহীন কৃষকের আত্মহত্যা।”

চব্বিশহাজারী গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছিল। বৃদ্ধ দয়মুজদ্দি এই ঘটনার গল্প বর্ণনা করে, সঙ্গে পরবর্তী ঘটনার ব্যাখ্যাসহ। দয়মুজদ্দি সুইচা বানানোর ফাঁকে ফাঁকে গল্প শুরু করে। বাঁশের কঞ্চি কেটে তার এক প্রান্ত ধারালো সুচের মতো করে সুইচা নির্মাণ করা হয়। যাতে তামাকের পাতা গেঁথে নিয়ে শুকোনোর জন্যে ঘরের বেড়ায় গুঁজে দেয়া যায়। গল্প শুরু হয় এভাবে। সুইচাগুলোর ¯তূপে আরেকটি সুইচা কাজের তালে ছুঁড়ে দিলেই ছরাত করে শব্দ উঠে। আর সংগে ইস্পাতের কাটাইর দিয়ে কঞ্চি ঘষার সুরত সুরত শব্দ, যেনবা গল্পের পরিবেশ, তামাক জীবনের আরেক অর্থের কাছে নিয়ে যায়।

: মানুষটা খুব ভাল আচল। ভূই একনাও আচল না, ভূই আদি নিআ তাংকু আবাদ কচ্ছে। উআর অনেক গুলা দেনা আচল। মনে কচ্ছে তামাক বাচে দেনা শোদ করবে। ভূই কিনবে। আরো দেনা করে তাংকু চাষ করে। হায়রে কপাল পাতর আর ঝরি উআর ভাগ্য ভাঙ্গি দেয়। আল্লার নিয়ম ভাংগা যায় না, কপালে আছে ফ্যার কি করবে চাচা খাদেমদার। তুই হয়তো উআর মরার কতা খবরের কাগজত পচ্চিস। অয় তো মরি বাচিল। উআর বউ কাজলরেখা এলা পাগলি হয়া গেইচে। ওয়ার দুইটা ব্যাটা না খায়া আচে। উআর কেউ কোনো খবর নেয় না কাউ। সরকারওতো কোনো খোজ নেইল না। কী লাভ হইল উআর মরার কতা খবরের কাগজত ছাপে সাদে। কী আর মানুষ কয় গরীব কী আর মরে বাহে, গরিব খালি চোক মুন্দি থাকে। উআর পাগলি বউ গ্রামের আস্তাত যকন দৌড়ায় তকন বাতাসের আগত পরীর মতো দেকায়। আউলা কাপড়াখান বাতাসত উড়ে চলে। মনে হয় চল যেনো ঐখান পরীর পাকনা। উআয় উড়ি যাইবে পরীর দেশত। থাউক এলা কাজলরেখার কতা। পাতর ঝরিতে আরো ঐরকম কতো কতোগুলা সংসার নষ্ট হয়া যায় প্রত্যেক বছর, কতগুলা তাংকু নষ্ট হয়া যায়, কায় থোয় কার খবর। এই হাজরা গ্রামের অহমত পাতর আর পরীর গল্প কয়া বেড়াইল হামাক গুলাক। হামরাতো কাও বিশ্বাস কন্নো না উআর কতা। ঠিককেই পাতর ঝরি হইল। তামাকের ক্ষতি হইল অনেক। কি করমু কপাল খারাপ। তাংকু আবাদী গুলার কপালত সুখ নাই। তামাকের সউগ লাব পায় মহাজনের ঘর। তুই নতুন আচ্চিস সউগ আস্তে আস্তে জানছু। হয়তো কোনো হাটত অহমতের সাতে তোর দেকা হইবি। দেখপু উআর হাতত পাতর আছে। আকাশত ঢেলায় চল উআয়।

এমনি ভাবে তামাকের গল্প নিয়ে সময় এগিয়ে যায় মহাকালের কোলে। চৈত্র-বৈশাখে হাট তামাক পাতায় ভরে উঠে। আর রহমতকে দেখা যায় প্রত্যেক হাটের দিন। সমস্ত অঙ্গে পাথরের মালা জড়িয়ে নিয়ে বুড়ো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে। আর কণ্ঠের উন্মাদনায় চিৎকার করে করে বলতে থাকেÑ

: আরো পাতর ঝড়ি হইবে, মুই অহমত কংচল তোমরা গুলা সাবধান বাহে সাবধান ॥

আবার কাৎলাহার (২০১০)

আমাদের রওনা দিতে একটু বেশি সময় লেগে যায়। ততোক্ষণে পথে চৈত্রের ধুলো, শুকনো পাতা বাতাসের সঙ্গে পেঁচিয়ে উড়তে থাকে। আমরা দক্ষিণ বরাবর খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকি। বেশ কিছুদূর যেতেই আমাদের সমস্ত শরীর, বিশেষ করে শরীরের অনাবৃত অংশগুলো ধূলি-ধূসর হয়ে ওঠে। তারপর আমরা একটা মোচড় দিয়ে সূর্যকে ডান বরাবর রেখে চলতে থাকি। রাস্তার দু’পাশে ততোক্ষণে সবুজ ধানক্ষেত একটু নিচু জলাজমির দিকে নামতে থাকে; যদিও আমাদের রাস্তা সমান তালে উঁচু হয়েই ধুনট পৌরসভা বরাবর চলছে।

আমরা অনেকক্ষণ কিছুই বলছি না। চলতে চলতেই মোস্তফা, হঠাৎ উল্লসিত হয়ে দেখায়, ‘দেখ দেখ ভস্তার বিল।’ অনেকক্ষণ কোনো সাড়া শব্দ, অন্তত আমাদের কোনো কথাবার্তা না-থাকাতে ওর এই বাক্যটি ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে বেমানান মনে হলেও সহসাই সুবোধ লাহেড়ীর প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেয়। মনে পড়ে যায় এই ভস্তার বিলকে কেন্দ্র করে জেলেদের জীবন, বিল দখলের নেপথ্য ঘটনা, জমিদারের প্রজা শোষণ। কিন্তু মরা বিলের দিকে তাকিয়ে ভাবনার সঙ্গে বাস্তবের কোনোই মিল খুঁজে পাই না। তবুও আমরা একটু থামি।

রাস্তা থেকে নিচে নেমে বিলের খুব কাছে চলে যাই। কাদা না-থাকলে আরো কাছে যেতে পারতাম। অবশ্য জুতো কিংবা স্যান্ডেলের কিছুই খুলতে ইচ্ছে হয় নি আমাদের। কাদা থেকে একটু দূরে শণ-ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে বিলের একটা স্ন্যাপ নেয় মোস্তফা। স্ন্যাপ নিতেই একটা বক উঠে আসে জল থেকে। বুঝতে পারি না ক্যামেরায় ওটা উঠেছে কি-না। পাশেই মুখে জলবসন্তের দাগওয়ালা একটা কৃষক ক্ষেতে বিষ দিচ্ছিল। সে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়।

‘আপনেরা কুথ্থেকা আচ্ছেন?’

মোস্তফা ওর স্বভাবসুলভ ভঙ্গি নিয়ে জানায়, ‘এই তো ফুলবাড়ি।’

‘কী করিচ্ছেন?’

আমার একটু বিরক্ত বোধ হয়, সঙ্গে ভয়ও কাজ করে। বিদেশী মানুষ, কী আবার ভুল করে ফেলি। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। মোস্তফাই কথাবার্তা বলতে থাকে।

‘এই আর কি, একটা ছবি নিলাম।’

‘কী করিববেন?’

‘কিছু না! ছোটবেলায় দেখা বিল মরে যাচ্ছে, তাই আর-কি একটা ছবি তুলে রাখলাম।’