চিহ্নমেলা

চিহ্নমেলা  চিরায়তবাঙলা ২০১৯

‘সৃজনশীল’ ও ‘মননশীল’ লেখক পুরস্কার প্রদানে বই অথবা পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হচ্ছে।
যোগাযোগ
মুঠোফোন ০১৫২১২৪১৯৯৩
Email: shiqbal70@gmail.com
chinnoprokashan@gmail.com

চিহ্নমেলা-২০১৬

Suvenir-2016

চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা

তারিখ : ৭ মার্চ ২০১৬ ॥ সোমবার
সকাল ১০:০০ ॥ চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা শুভউদ্বোধন
উদ্বোধক ॥ আনিসুজ্জামান
॥ সেলিনা হোসেন
 হাসান আজিজুল হক
সনৎকুমার সাহা
ড. মু. মিজানউদ্দিন
উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
চৌধুরী সারওয়ার জাহান
উপ-উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শহীদ ইকবাল
রহমান রাজু
সৈকত আরেফিন
বেলা ১১:০০ ॥ আড্ডা
বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠবাঙালি
আড্ডারু ॥ আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, ইমানুল হক
সঞ্চালক : হাসান আজিজুল হক
দুপুর ১.০০ ॥ মধ্যাহ্নভোজ বিরতি
বিকাল ৩:০০ ॥ কবিতা
মার্চের কবিতা (ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্মরণে)
পরিবেশনা : স্বনন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সঞ্চালক : তুহিন ওয়াদুদ
বিকাল ৪:০০ ॥ শিরোনামহীন আড্ডা-১
লেখক-পাঠক-সম্পাদক
সঞ্চালক : জাকির তালুকদার
বিকাল ৫:৩০ ॥ কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ-১
সঞ্চালক : শিবলি মুক্তাদির
সন্ধ্যা ৭:৩০ ॥ গান-আড্ডা
কাজী মামুন হায়দার রানা (বাউল গান)
কাঞ্চন রায় (ভাওয়াইয়া গান)
তারিখ : ৮ মার্চ ২০১৬ ॥ মঙ্গলবার
সকাল ৯:৩০ ॥ কথা প্রসঙ্গে
লেখক-সম্পাদকের অভিব্যক্তি
সঞ্চালক : আমিনুর রহমান সুলতান
দুপুর ১২:৩০ ॥ কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ-২
সঞ্চালক : শামীম নওরোজ
দুপুর ১.০০ ॥ মধ্যাহ্নভোজ বিরতি
বিকাল ৩:০০ ॥ শিরোনামহীন আড্ডা-২
সঞ্চালক : আরিফুল হক কুমার
বিকাল ৪:০০ ॥ কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ-৩
সঞ্চালক : গাজী লতিফ
গোধূলীবেলা ৬:৩০ ॥ চিহ্নপুরস্কার ও ছোটকাগজ সম্মাননা
অতিথি : নূহ-উল আলম লেনিন
হাসান আজিজুল হক
সনৎকুমার সাহা
জুলফিকার মতিন
ইমানুল হক
ড. মু. মিজানউদ্দিন
উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
চৌধুরী সারওয়ার জাহান
উপ-উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সঞ্চালক : রহমান রাজু
সন্ধ্যা ৭:৩০ ॥ আনন্দ সন্ধ্যা
মীরাক্কেল রনি ও খুদে গানরাজ পায়েল

চিহ্নমেলা-২০১৩

এপার বাঙলা-ওপার বাঙলা(লেখক-সম্পাদক সম্মিলন)

১৩ মার্চ ২০১৩ বুধবার

সকাল ০৮.০০টা  : রিপোর্টিং
সকাল ১০.০০টা  : উদ্বোধন
সকাল ১১.০০টা  : সেমিনার (বাংলাদেশের ছোটকাগজ/সাহিত্যবিষয়ক)
দুপুর  ১২.০০টা  : কবিকণ্ঠে দুই বাংলার কবিতা পাঠ
বিকাল ০৩.০০টা : সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
বিকাল ০৫.০০টা : লেখক-পাঠক-সম্পাদকের আড্ডা (দুই বাংলা)
সন্ধ্যা  ০৬.০০টা  : গম্ভীরা
১৪ মার্চ ২০১৩ বৃহস্পতিবার 
সকাল ০৯.০০টা  : জেলা/অঞ্চলভিত্তিক ছোটকাগজের চালচিত্র
সকাল ১০.০০টা  : দুই বাংলার কবিতাপাঠ
সকাল ১১.০০টা  : সেমিনার (ওপার বাংলার ছোটকাগজ/সাহিত্যবিষয়ক)
দুপুর  ১২.০০টা  : আড্ডা
বিকাল ০৩.০০টা : বাঁশি ও নাচ
বিকাল ০৪.০০টা : চিহ্নকে ফিরে দেখা
বিকাল ০৫.০০টা : চিহ্নপুরস্কার
সন্ধ্যা  ০৬.০০টা  : সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

 চিহ্নমেলা-২০১১ ।। চিহ্নর যুগবর্ষযাপন  উৎসব

[জানুয়ারির ষোল, পনেরোতে হাজারো সাহিত্যানুরাগির মিলনমেলা বসেছিল শহীদুল্লাহ্ চত্বরকে ঘিরে। উপলক্ষ ‘ছোটকাগজ মেলা ও চিহ্নসম্মাননা’। আয়োজক : চিহ্ন। প্রায় অর্ধশতাধিক ছোটকাগজ সম্পাদক ও লেখক সেদিন চিহ্নকে কেন্দ্র করে নিজেদের যতটুকু আবেগবুদ্ধির বিনিময় করে গেলেন, তারই কিয়দংশের পরিচয় পাওয়া যাবে এখানে…]

১৫ জানুয়ারি ২০১১
আজ যেন অর্ধসত্যে কামাচ্ছন্ন ইতিহাস, এসে দাঁড়িয়েছিল কালের কিনারায়। ওম ধরা ভোরের স্বপ্নকে উপেক্ষা করে, ঊষার আগেই ভেজা চুলগুলো কাঁধের উপর মেলে দিয়ে দ্রৌপদীসব সমবেত হয়েছিল শহীদুল্লাহর মিলন মেলায়। ঊষার প্রথম উষ্ণ আহ্বানে―রোদ প্রান্তরের দুচারটা শালিকের মতোই ত্রস্ত ও দম্ভ সহকারে তাদের সাথে মিলিত হয়েছিল ‘ঈষাণ-বিষাণে ওঙ্কার তুলে’ ছুটে আসা সব শ্রীমানকুল। কুয়াশা নির্মিত আকাশকে তারা ভরিয়ে দিয়েছিল চুমুর তারায়। শিল্প-সাহিত্যের সুবাসমুখর তাদের সেই গর্ভগৃহের আনন্দ আহ্বান যেন অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। জানালার সোনালী নীল কমলা সবুজ কাঁচের দিগন্তে উকি দিয়ে কারা যেন বলে গেল কানে কানে―শোনো, ‘পরিপ্লুত রক্ত ও শুদ্ধ ঘামের ইচ্ছে বিনিয়োগ করে একদিন যুগবর্ষ আগে জ্বলন্ত সূর্যকে পিঠে রেখে আমরা নিজেদের দেখার জন্য মানুষকে অনুসরণ করতে শুরু করেছিলাম; এ স্বপ্নশীল আকাক্সক্ষার মগ্ন অভীপ্সায় আমাদের অনুভূতির কেন্দ্র হয়েছিল চি‎হ্ন (সময়ের বিরুদ্ধস্রোতে উজানের টানে)। চেতনার উত্থান, উন্মীলন ও নির্মাণে এতোদিন আমরা যেমন চি‎হ্নকে গড়েছি তেমনি চি‎হ্নও আমাদের গঠন করেছে প্রগতিপ্রবণ অবগঠনে। চি‎হ্ন আমাদের শিখিয়েছে সময়ের স্রোত বিরুদ্ধ জেনেও কীভাবে উজানে বাইতে হয়; আর শিখিয়েছে কীভাবে ভালবাসতে হয় এবং  ভালবাসতে না জানলে সর্বোপরি দেশমাতার বদনখানি মলিনতর হয়। আমাদের সকলের বুকের ভেতর ইচ্ছে, প্রগতি ও প্রেম ঠেসে দিয়ে চি‎হ্ন এক যুগ পার করছে। বিহ্বল আনন্দ ও উত্তেজনা নিয়ে আপনাকে জানাতে চাই চি‎হ্নর যুগবর্ষযাপনে আমরা দুদিনব্যাপী ছোটকাগজ মেলা ও চি‎হ্ন সম্মাননার আয়োজন করেছি। আমাদের এ হার্দ্য সম্মিলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের সবুজ ক্যাম্পাসে আপনাকে আমন্ত্রণ। প্যারিসরোডে গগণশিরীষের পাদভূমে আমরা আপনার জন্য প্রতীক্ষা করব। আপনি আসবেন।’ তাদের এই আহ্বানে, সাহিত্যের প্রতি দায় আর প্রতিশ্রুতিশীল আত্মার তাড়নায়  বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছিল কারো কারো, কয়েক জন মাত্র ভাবলেন―Show must go on. অথবা কে বলতে পারে তাদের মনে এই বোধ জেগে উঠেছিল কি-না―‘I have promise to keep/ and miles to go before I sleep/ and miles to go before I sleep.’ সে কারণেই বুঝি, মাঘের শীতকে উপেক্ষা করে আসাদ চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, পৌঁছে গিয়েছিলেন রাত তিনটার পর। ভয়ঙ্কর শীতে তাঁরা ঠক ঠক করে কাঁপছিলেন, আমার বেশ মনে আছে। অথচ পথের দূরত্ব একই হলেও, বয়সে অনেক জওয়ান হয়েও, হরিশংকর জলদাস এলেন না। তাঁর নাকি জ্বর। প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়াটাই এ জ্বরের কারণ। যদিও অনেক আগেই তিনি  আসবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। এ রকম দুএকটা পুরষ্কার পেলে ‘কথা দিয়ে কথা রাখতে হয়’ এই ন্যুনতম বোধটিও বোধহয় মানুষ হারিয়ে ফেলে! এই ক্যাম্পাসেরই একটি অনুষ্ঠানে, লোকজনহীন ফাঁকা মাঠে দুঘণ্টা বসে থেকে পুরষ্কার নিয়ে গেছেন হাসান আজিজুল হক, এই তো সেদিনের কথা। এদিন তিনি আসেন নি। চিহ্ন তাঁর জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে পারেনি বলে, তার আসা সম্ভব হয়নি। হরিপদ দত্ত কার কাছে কানপড়া পেয়েছিলেন বলতে পারবো না। শুধু জানিয়ে রাখি, চিহ্নর কিছুই থেমে থাকেনি। কারো জন্যই কোনো কিছু থেমে থাকে না।
গোটা অনুষ্ঠানেই প্রণের ছোঁয়া দেন সাত বিভাগ থেকে আসা যে অর্ধশতাধিক ছোটকাগজ সেগুলো হলো―ধমনি কিশোরগঞ্জ,  শিকড় ঝিনাইদহ,  অরনি টাঙ্গাইল,  ধূলিচিত্র ঢাকা,  সমুজ্জ্বল সুবাতাস বান্দরবান,  দোআঁশ বগুড়া, দ্যুতি বগুড়া,  ঈক্ষণ বগুড়া,  দুই বাংলার থিয়েটার/নাট্য বগুড়া,  পড়শী যশোর,  অরনি টাঙ্গাইল,  ভাস্কর সিলেট,  আবহ নাটোর,  হস্তাক্ষর নারায়নগঞ্জ,  অদ্রি বগুড়া,  শব্দ গাইবান্ধা,  আরণ্যক বরিশাল,  অপর জয়পুর হাট,  অনুভূতি ঢাকা,  বেগবতী ঝিনাইদহ,   কুসুম্বি রাজশাহী,  অভিজন বগুড়া,  চৈতন্য সুনামগঞ্জ,  থার্ডম্যাগ বগুড়া,  ক্রম রাজশাহী,  অতএব আমরা বগুড়া,  জমিন সাতক্ষীরা,  ঠিকানা নারায়নগঞ্জ,  মাদুলি ফরিদপুর,  সংজ্ঞা দিনাজপুর,  শেকড় বরিশাল,  চালচিত্র ঠাকুরগাঁও,  শাশ্বতিকী রাজশাহী,  জলযুদ্ধ পাবনা,  ছলাৎ পাবনা,  ধ্রুব রাজশাহী,  রুদ্র রাজশাহী,  নিরিখ রাজশাহী,  মৃদঙ্গ রাজশাহী,  ব্রাত্য রাজশাহী,  স্নান রাজশাহী,  যাত্রী যশোর,  পুনশ্চ নওগাঁ,  কাশপাতা গাজীপুর,  জংশন যশোর,  কহন ঝিনাইদহ,  অমিত্রাক্ষর ঢাকা,  অ যশোর  মরাল যশোর, ওঙ্কার সহ আরো বেশ কয়েকটি।
সকাল দশটায় শুভ উদ্বোধন হয়। সাদা এক ঝাঁক পায়রা চিহ্নর পক্ষ থেকে শান্তির বাণী নিয়ে উড়াল দেয় অজানার উদ্দেশ্যে। চিহ্নপতাকা পত পত করে উড়ে উড়ে পুনর্বার জানিয়ে দেয়, ‘সেই সব শেয়ালেরা যারা ঠোঁট চেটে কিছুই হচ্ছে না রব তোলে, তাদের চিহ্ন থেকে দূরে থাকতে বলা হলো।’ অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন, কবি জুলফিকার মতিন, সফিকুন্নবি সামাদী, সরোজ দেব শহীদ ইকবাল, মামুন মুস্তাফা, শামীম নওরোজ, শফিক আশরাফ, রহমান রাজু সহ অনেকেই। আবেগে ভাসছিল সেদিন সারা ক্যাম্পাস, সকলের চোখেই তখন কি যেন পারাবার তৃষা। সে তৃষাই বুঝি সাড়ে দশটার র‌্যালিকে করেছিল স্মরণকালের সবচেয়ে দীর্ঘায়ত। মতিহারের সবুজ চত্বরে বান ডেকেছিল, ছোটকাগজের জোয়ারে প্লাবিত হয়েছিল অগণিত কচি প্রাণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে ছোটকাগজের তীর্থভূম। তা-ই হয়, ‘যখন সে সমুদ্রে নামে, লাল।/ সমুদ্রও কবি হয়ে যায়।/ সুন্দরের ছটা দেখে ছুটে এসে/ সমুদ্র লুটায় তার পায়।/ যেন সর্বস্ব হারিয়ে পাওয়া/ এ-ই তার সর্বশেষ ধন।/ অনন্ত আপন।’ উদ্বোধনি আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন চিহ্নপ্রধান। তারপর আসাদ চৌধুরী ও আনোয়ারা সৈয়দ হক তাদের আলোচনায় সাহিত্যের প্রচলিত আপ্তকথার উত্তরণ ঘটিয়ে যান। এখানে সময় থমকে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায় বহির্মেয় মন। নেমে আসে পিনপতন নিরবতা। লেখক-পাঠক-সম্পাদক মিলিয়ে হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা মুগ্ধতার আবেশে দুর্ভিক্ষের ক্ষুধার আগ্রহে গোগ্রাসে গিলে যায় তাদের কথা। আবৃত্তিতে অংশ নেয় সুমি ও তারেক। ভরাট তাদের গলা, সুমিষ্ট কণ্ঠ, পেলব উচ্চারণ। মুহূর্তেই ভেতরকে টেনে বের করে আনে। অনন্ত রহস্যের যেখানে মূল, তারও মর্মমূলে গিয়ে আঘাত করে। দুটি ঘণ্টা শুধুই কবিতার হয়ে রয়। বিকেল তিনটায় ভয়ানক এক আবহের সৃষ্টি হয়। লেখক-পাঠক-সম্পাদক বসেন মুখোমুখি। শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে ত্রিমুখি বিত-ায় মেতে ওঠেন তারা। সম্পাদকদের প্রতিনিধিত্ব করেন, চৌধুরী বাবুল বড়–য়া, জয়ন্ত দেব, ইসলাম রফিক, রবু শেঠ, পুলিন রায়, মোজাফ্ফর হোসেন সহ অনেকেই; লেখকের দলে ছিলেন আসাদ চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাকির তালুকদার, সুজন হাজারী, পাপড়ি রহমান প্রমুখ। সামনে উপবিষ্ট ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বোদ্ধা পাঠকগণ। তাদের কেউ বা সম্পাদক, কেউ অধ্যাপক, নবীন-প্রবীন মিলিয়ে লেখক ছিলেন শতাধিক। এতোসব বোদ্ধা পাঠকের সামনে যেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন লেখক-সম্পাদক। কেউই কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না। দ্বিধা দ্বন্দ্ব ক্ষোভ যার যত ছিল সবই বেরিয়ে আসে একে একে। তেলবাজি, স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীবদ্ধতা, সাহিত্য নিয়ে নোংরা রাজনীতি, ব্যাবস্যানীতি সহ এরকম আরো অনেক বিষয়েই অসংখ্য অপ্রিয় সত্য সেদিন লোকসম্মুখে বেরিয়ে আসে। সন্ধায় বাঁশি হতে বাজিমাত করেন হাসান রাজা। হাজার হাজার দর্শক স্তব্ধ হয়ে, মুগ্ধ হয়ে শুনে যায় কেষ্ট ঠাকুরের মধুর সুর। বাঁশি হাতে সেদিন সন্ধার আঁধারের গাঢ়ত্ব বাড়িয়ে তোলেন হাসান। বাঙালির হৃদয়ের ধ্রুপদি বোধগুলো রক্ত মাংসের বাঁধন খুলে বেরিয়ে আসে। চাপাই নবাবগঞ্জের ফোক থিয়েটার গম্ভীরার মাধ্যমে তুলে আনে বাংলাদেশে ছোটকাগজচর্চার একাল সেকাল। গম্ভীরার আড়ালে উঠে আসে ছোটকাগজ সাধনার নিরন্তর পাঠ। সেদিনের মতো সেখানেই সমাপ্তি। সারাদিনের কর্মক্লান্তির পর শুদ্ধ রুচি ও ঋদ্ধ মননের মিশেলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঘরে ফিরে সবাই।

১৬ জানুয়ারি ২০১১
সকাল এগারোটার সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কবি জুলফিকার মতিন। আলোচনায় অংশ নেন, আনোয়ারা সৈয়দ হক, হোসেন উদ্দিন হোসেন, সরোজ দেব, জাকির তালুকদার প্রমুখ। আলোচনার বিষয়―আজকের সাহিত্য : সংকট ও উত্তরণ। শুরুতেই বিষয়টাকে ভালোভাবে উসকে দেন চিহ্নসম্পাদক শহীদ ইকবাল। সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা, সংকট, সম্ভাবনা ও সংকট থেকে উত্তরণের নানা বিষয় নিয়ে লেখক-সম্পাদক-অধ্যাপক যে যার দৃষ্টিকোন থেকে কথা বলেন দীর্ঘক্ষণ। তাদের আলোচনায় নিরাশ হবার মতো অনেক বিষয় যেমন উঠে আসে, তেমনি আশা করবার ভালোবাসবার মতো প্রেরণারও অভাব হয় না। সভাপতির শেষ ভাষণে জুলফিকার মতিন যেন এই বোঝাতে চাইলেন―দলাদলি, দ্বন্দ্ব-দ্বৈরথ যাই হোক না কেন, যারা এসব করছে তারা তাদের স্থুল স্বার্থে কতোটা করছে সেটি ছাড়াও বিবেচ্য হতে পারে সাহিত্যটাকে সবাই খুব ভালোবাসেন। সাহিত্য এমন এক জিনিস তাকে ভালো না বাসলে দলাদলিটাও ঠিক মতো করা যায় না। কথাটা প্রাসঙ্গিক, কেননা―শুধু স্বার্থের কথা ভাবলে মানুষ সাহিত্য না করে অন্য বেশি লাভজনক কিছু করতে পারতো। তাই, বরং যুক্তি-বুদ্ধির পার্থক্যটাই এ ক্ষেত্রে অধিক বিবেচনার দাবি রাখে। বিকেল তিনটায় শুরু হয় কবি-কথাসাহিত্যিক-পাঠক-সম্পাদকের মুক্ত আড্ডা। আড্ডা পরিচালনা করেন কবি শামীম নওরোজ। আড্ডায় অংশ নেন মেলায় আসা সকলেই। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আড্ডাটা বেশ জমে ওঠে। ব্যাক্তিআক্রমন বা প্রতিআক্রমনও হয়েছে বারবার। লেখকের কারণে সম্পাদকদের কি কি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তারা তা তুলে ধরেন। লেখকগণও জানান সম্পাদকদের আদিক্ষেতায় তাদের বিরক্তির কথা। পাঠক ছাপ জানিয়ে দেন তারা এসব জানতে চান না, তাদের চাওয়া শুধু সাহিত্য। ঢাকার আগ্রাসী মনোভাব, সহিত্য নিয়ে বানিজ্য করা বা দলাদলিতে যে সবাই বেশ বিরক্ত সে কথা আর অগোচরে থাকে না। থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। আলোচনায় যখন ঢাকার নোংরামির চিত্র প্রকট ও স্পষ্টরূপে প্রতিভাত, তখন প্রতিবাদ করলেন একজন। তিনি ঢাকার আদি বাসিন্দা। ঢাকায় তার নাড়ি পোতা, ঢাকাকে তিনি ভালোবাসেন মায়ের মতো। তিনি জানিয়ে দিলেন ঢাকায় যারা সাহিত্যটাকে অবলম্বন করে নোংরামীর চুড়ান্ত করছে, তারা কেউই ঢাকার নন। বরং বিভিন্ন জায়গা থেকে উড়ে গিয়ে জুড়ে বসে ঢাকাকে তারা কলুসিত করেছেন। তাদের নোংরামীর মাত্রা এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, ঢাকারও বেশ মন খরাপ। ঢাকা আর ভালো নেই।
দীর্ঘ প্রতিক্ষিত সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান শুরু হয় বিকেল সাড়ে চারটায়। সভাপতিত্ব করেন নিরিখ সম্পাদক সফিকুন্নবি সামাদী। উপস্থিত ছিলেন পথরেখা সম্পাদক নুহ উল আলম লেনিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপউপাচার্য সহ অনেকেই। সাতটি বিভাগ থেকে সাতটি ছোটকাগজ, সারা দেশ থেকে সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় একজন করে মোট নয় জনকে সম্মানিত করে চিহ্ন। চিহ্ননির্বাহী সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একজন একজন করে মনোনিত ব্যক্তির নাম ঘোষণা করেন, মনোনিতজন উঠে আসেন মঞ্চে। নেপথ্যে সংক্ষেপে পাঠ হয় তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যব্রতের সাতকাহন। মনোনিতজন পুরষ্কার তুলে নেন মাননীয় অতিথিবৃন্দের হাত থেকে। সেই সাথে চলে ফটোশেসন। সমস্ত দর্শকের মাঝে তখন অশরীরি স্তব্ধতা, উৎকণ্ঠা―এরপরে কার নাম ঘোষণা হবে তাই নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা। অবাক হতে হয় যিনি পুরষ্কারে ভূষিত হচ্ছেন তিনিও নাম ঘোষণার এক সেকেন্ড আগেও তা জানেন না। নাম ঘোষণার পর তার বিস্ময় আর চাপা থাকে না। চোখে মুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। আর একটি বিষয় জানিয়ে দেয় চিহ্নপরিবার, তা হলো, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে যারা তাদের কাগজ বা গ্রন্থ চিহ্নদপ্তরে জমা করেছিলেন কেবল তাদের মধ্য থেকেই নির্বচিত করা হয়েছে এই নয় জনকে। সেদিন চিহ্নর বিবেচনায় যারা এ দেশের সবচেয়ে কমিটেড সম্পাদক ও লেখকের স্বীকৃতি পেলেন তাদের কর্মযজ্ঞের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে এভাবে…

ধূলিচিত্র। সম্পাদক : পাপড়ি রহমান। ঢাকা বিভাগ
বাংলাদেশের প্রতিটি ধুলিকণার প্রতি প্রবল ভালোবাসাই ধূলিচিত্রর জন্মের পটভূমি গড়ে দেয়। কেননা বিন্দু বিন্দু জলের সমষ্টি যেমন সমুদ্র তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণা মিলে তৈরি হয় একটি বৃহৎ ভূগোল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের জীবনকে সাহিত্যে তুলে এনে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবার একটা প্রয়াসই ধূলিচিত্রে লক্ষণীয়। যা কিছু সুন্দর, সৎ তার প্রতি আকর্ষণ দেখিয়ে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান সম্পাদিত ছোটকাগজ ধূলিচিত্রর জন্ম। জন্মসংখ্যা থেকেই ধূলিচিত্র সাহিত্যের স্বাভাবিক আভিজাত্য ফিরিয়ে আনবার গোপন আকাক্সক্ষা পোষণ করে। সমস্ত রকম ফতোয়াবাজি, ঘরাণা ও বাগাড়ম্বরকে আলগোছে সরিয়ে রেখে ধূলিচিত্র এতোদিন শুধু শুদ্ধ সাহিত্যেই নিবেদিত থেকেছে। সৎসাহিত্যের প্রতি তার এই কমিটমেন্ট সত্যিই অতুলনীয়।

দোআঁশ। সম্পাদক : ইসলাম রফিক। রাজশাহী বিভাগ
বাংলাদেশের শ্যামল নৈসর্গের ভিত্তিমূলে মাটির ভূমিকাকে আমরা স্বীকার করি; দোআঁশ মাটির উর্বরতায় প্রকৃতি যেমন এখানে অপরূপ হয়ে থাকে তেমনি ফসলসম্ভারে ভরে ওঠে কৃষকের উঠোন। তাই এদেশে দোআঁশ নামে সাহিত্যের ছোটকাগজও হয়। আমি ইসলাম রফিক সম্পাদিত দোআঁশ ছোটকাগজটির কথা বলতে চাই, যেটি পদক্ষেপের অনিবার্য পরিণতি মেনে নিয়ে উত্তর বাংলাদেশের বগুড়া থেকে প্রকাশিত হয়। যুগবর্ষকালের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় দোআঁশ এটা প্রমাণ করতে পেরেছে তারা সাফল্য বা ব্যর্থতার চেয়ে দায়বদ্ধতাকেই অঙ্গীকার করে। এজন্য তরুণদের লেখালেখিকে পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার দায়িত্বটি ছোটকাগজ দোআঁশ খুব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছে।

সমুজ্জ্বল সুবাতাস । সম্পাদক : হাফিজ রশিদ খান। চট্টগ্রাম বিভাগ
সম্বুদ্ধ চেতনা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতের আলো বাতাস সঙ্গী করে নব্বুই দশকের প্রথমদিকে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানামাত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি অনুধাবন ও তা চর্চার মাধ্যমে বিকশিত করার ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল শৈলশহর বান্দরবান থেকে প্রকাশিত, হাফিজ রশিদ খান ও চৌধুরী বাবুল বড়–য়া সম্পাদিত পাহাড়ি ও সমতলি সংস্কৃতিচর্চার ছোটকাগজ সমুজ্জ্বল সুবাতাস। প্রকাশকাল  থেকেই সমুজ্জ্বল সুবাতাস দাঁড়াতে চেয়েছে পাহাড়ি জীবনের সেই শেঁকড়মূলে, যা কালের থাবায় ক্রমে লুপ্তির দিকে গড়িয়েছে; যা প্রজন্মগত ব্যবধানের কারণে পাহাড়ি মানুষের কাছে বিস্মৃত হয়েছে। তারপরও সমুজ্জ্বল সুবাতাস প্রবল সৃজনশীল আকাক্সক্ষা ও মুক্ত অবলোকেনের প্রয়াসে নিরন্তর থাকতে চেয়েছে প্রতœ ও জায়মান জুমিয়া জীবনধারার দিকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ও একমাত্র লিটলম্যাগাজিন হিসেবে যাত্রা শুরু করে সমুজ্জ্বল সুবাতাস অনুপ্রেরণা হয়েছে অন্যদের; একসময় তাই সমুজ্জ্বল সুবাতাসকে তুলে নিতে হয়েছে তাদের প্রথম ঘোষণা; ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ও একমাত্র লিটলম্যাগাজিনের স্থলে আনন্দের সঙ্গে বলতে পেরেছে যে, তারাই পার্বত্য চট্ট্রগ্রামের প্রথম সমন্বয়বাদি লিটলম্যাগাজিন। দীর্ঘ পথচলায় সমুজ্জ্বল সুবাতাস নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাদের লক্ষ্য থেকে কখনও বিচ্যূত হয় নি; পাহাড়ের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে সমতলের একটা যুগসূত্র নির্মাণে সমুজ্জ্বল সুবাতাস পালন করেছে সঞ্চালকের ভূমিকা।

পড়শি । সম্পাদক : সফিয়ার রহমান। খুলনা বিভাগ
ছোটকাগজ পড়শি প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে লালন শাহের বিখ্যাত সঙ্গীত ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর/ সেথায় এক পড়শি বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’―বস্তুত আমরা জেনেছি পাশের বাড়ির আঙিনায় সাহিত্য প্রতিভা অšে¦ষণের প্রণোদনাই, যশোরের ঝিকরগাছা থেকে প্রকাশিত, সফিয়ার রহমান সম্পাদিত ছোটকাগজ পড়শির জন্মকে সম্ভব করে তুলেছে। ছোটকাগজ পড়শি বিশ্বাস করে, তেলা মাথায় তেল দিতে নয় বরং যার মাথায় একটুও তেল নেই তাকে যতটুকু সম্ভব তেল দিতে; অর্থাৎ পড়শি বলতে চায়, প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অপরিচিত, অবহেলিত লেখকদেরই তারা প্রাধান্য দেয়। পড়শি মনে করে, পৃথিবীতে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব অনেক আছে, তবে আরও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তুলে আনতে হবে তৃণমূল থেকে; সৃষ্টিশীল মন নিয়ে পড়শি আন্তরিকতার সঙ্গে এই অন্বেষণের কাজটি করে যাচ্ছে।

আরণ্যক । সম্পাদক, তুহিন দাস। বরিশাল বিভাগ
নিঃসঙ্গচেতনার কবি জীবনানন্দ দাশকে উৎসর্গ করে ২০০০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে  আত্মপ্রকাশ করেছিল সমকালীন কবিতার কণ্ঠস্বর, তুহিন দাস সম্পাদিত ছোটকাগজ আরণ্যক। পরবর্তীকালে আরণ্যক বারবার নিজেকে ভেঙে উতরে যেতে চেয়েছে বলে, কেন্দ্রীয় প্রণোদনা বক্তব্যে কখনও যুগচিন্তার কবিতাপত্র, কখনও কবি ও কবিতার কাগজ, কখনও কবিতা ও চিত্রভাষার কাগজ বা কখনও একটি সৃজনশীল ছোটকাগজ হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে চেয়েছে। আরণ্যক পাঠে আমরা জেনেছি, পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই অস্থিরতার পটভূমে সংলগ্ন হয়ে আছে আমাদের সমকালীন বাস্তবজীবনের অস্থিরতাও। কিন্তু একথা স্বীকার করতে একটুও দ্বিধা নেই যে, আরণ্যক প্রতিটি সংখ্যায় বিশেষ চিন্তা ও মননের প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছে; জীবনানন্দের শহর বরিশালে জন্ম বলেই হয়তো আরণ্যকও পেয়েছে জীবননান্দীয় আবহ। ধর্ম রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে আরণ্যক সবসময় দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ভাস্কর । সম্পাদক : পুলিন রায়। সিলেট বিভাগ
ফেব্রুয়ারি ঊনিশশ নব্বুই খ্রিস্টাব্দে একটি ভাঁজপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়ে নানামুখী টানাপোড়েন ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে পুলিন রায় সম্পাদিত সাহিত্যের ছোটকাগজ ভাস্কর আজ একটি অবিকল্প সাহিত্য ছোটকাগজে পরিণত হয়েছে। সম্পাদক পুলিন রায়ের ব্যক্তিজীবনের উত্থান-পতন সত্ত্বেও ভাস্কর প্রকাশে তার কোন প্রভাব পড়ে নি। প্রথম সংখ্যা থেকে সপ্তম সংখ্যা পর্যন্ত লেটার প্রেসে ছেপে ভাস্কর প্রকাশের সপ্রাণতা একদিকে এর সম্পাদক, প্রকাশককে দিয়েছে অনন্যতা অন্যদিকে অগ্রজ ও তরুণ লেখকদের লেখা ধারণ করে ভাস্করও হয়ে উঠেছে শিল্পের শহর। ইতোমধ্যে ছোটকাগজটি পার করেছে প্রকাশের বিশতম বর্ষ এবং ঊনিশটি সংখ্যা; এ সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমণে যেসকল তরুণ লিখিয়েদেরকে ভাস্কর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তারা আজ তুমুলভাবে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত।

শব্দ। সম্পাদক : সরোজ দেব। রংপুর বিভাগ
একটি শারদ প্রকাশনা হিসেবে প্রকাশিত হলেও সরোজ দেব সম্পদিত ছোটকাগজ শব্দ সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর যাবৎ মূলত ছাইয়ের স্তুপে সাহিত্য প্রতিভাই অন্বেষণ করছে। যখন তারুণ্যের প্রাণান্তশ্রম, নিষ্ঠা ও আক্লান্ত সাধনায় নানা প্রতিকুলতাকে জয় করে শব্দ প্রতিবার আলোর মুখ দেখেছে তখনই তাতে মলাটবন্দী হয়েছে একঝাঁক তরুণের নতুন চিন্তার ও চেতনার স্ফূরণ। শুধু প্রীতি ও বন্ধুত্বের শক্তিতে দীর্ঘ বছর ধরে গাইবান্ধার মতো মঙ্গা কবলিত মফস্বল থেকে একটি সাহিত্যের ছোটকাগজ শব্দ করে যাওয়া এবং নিরন্তর সাহিত্যপ্রেমী সমস্ত মানুষকে মৈত্রীবন্ধনে যুক্ত করা নিঃসন্দেহে শ্লাঘা। আমরা শব্দ ছোটকাগজটির এই সপ্রাণতাকে অঙ্গীকার করি এবং শব্দর মতোই বিশ্বাস করি যে, সকল হৃদয়বান মানুষের আন্তরিকতায় সংবদ্ধ হয়ে দৃঢ়তা আর এই সংবন্ধনে আমরা খুঁজে পাবো কবিতার পবিত্রতা ও প্রকৃতির সারল্য। দীর্ঘ বছর ধরে ছোটকাগজ শব্দ যে অতুলনীয় ধৈর্য, স্থিতি ও উদ্যম নিয়ে নবপর্যায়ে এসে গতিশীল হয়েছে তাতে অনুপ্রাণিত হবে আগামীর অঙ্কুরসম্ভাবি শব্দশিল্পিরা।

মুসলমানমঙ্গল : জাকির তালুকদার
একদিন স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ দিয়ে সাহিত্যের বিসর্পিল পথে যে যাত্রা সূচনা করেছিলেন জাকির তালুকদার আক্ষরিক অর্থেই তা স্বপ্নযাত্রার মাত্রা গ্রহন করেছে; কন্যা ও জলকন্যারা, বিশ্বাসের আগুনর আগুন ছুঁয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শুদ্ধ শিল্পজন। মুসলমানমঙ্গল শিল্পমানুষ জাকির তালুকদারের এক অনবদ্য সৃষ্টি। পীর-কেবলা দাদিমা উম্মে ছাবিরন নেছাকে উৎসর্গিত মুসলমানমঙ্গলএ জাকির তালুকদার উপন্যাস বানিয়েছেন এমন এক বিষয়কে, যার জন্য বইয়ের ফ্ল্যাপে বিনিত অহংকারের সঙ্গে বলতে হয়েছে ‘এই ধরনের উপন্যাস বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম।’ আত্মসমালোচনাপর্ব ও মোকাবিলাপর্ব নামে দুটি খ-ের মুসলমানমঙ্গলএ কেন্দ্রীয় চরিত্র ইউসুফের মাধ্যমে জাকির তালুকদার গ্রন্থন করেছেন এ কালের তথ্য ও বিগত কালের ইতিহাসকে। গ্রাম্য পরিবেশে ফতোয়ার আগ্রাসন দেখে পার্শ্বচরিত্রের সঙ্গে মুক্তমনা ইউসুফের আলাপে উঠে আসে যে ইসলামের প্রাথমিক ঘটনাসমূহ তাতে আমাদের চোখে জমে থাকা ধুলোর প্রলেপনে প্রাচীন আরবের সকলকেই দেবদূত মনে হতো, সে প্রলেপন মুছে যায়; আমরা জেনে যাই তখনও মানুষ ছিল মর্তের সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়ে। মানবীয় ভুলে মুহম্মদের দেখানো পথ থেকে অনেকের বিচ্যূতির ফলে ইসলামে সূচিত হয় অবিশ্বাস, ভুল ও বিভ্রান্তির, যার দায় এখনও বহন বহন করতে হচ্ছে মুসলমানদের। এভাবে মুসলমানমঙ্গলএ সমকালের গল্পের সমান্তরালে এগিয়েছে ইতিহাসের পাঠ এবং কখনো কখনো মূল গল্পকে ছাপিয়ে পাঠককে টেনে নিয়ে গেছে ইতিহাসের ঐন্দ্রজালিক ভূবনে। চলনবিলের গ্রামীন পটভূমিকায় ইউসুফের আগমনের মধ্য দিয়ে যে আখ্যানের প্রারাম্ভনা, মফস্বল শহরের আড্ডায় ইউসুফের উপস্থিতি, মার্কিন তরুণী লিসবেথের আগমন ও তার সঙ্গে ইউসুফের কথোপকথনের সূত্র ধরে ইতিহাস আর গল্পের সম্মিলনে মুসলমানমঙ্গল বিবরণী না হয়ে, হয়ে উঠতে পেরেছে চিরায়ত শিল্প। বস্তুত মুসলমানমঙ্গলএর মধ্যে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে অগ্রগামী চিন্তার কথাসাহিত্যকে। সমকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজ ও মননকে ইসলামের ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের মধ্যে প্রক্ষিপ্ত করে বিরচিত এই শিল্পসৃষ্টিকে অনন্য সাধারণ বললে অত্যুক্তি হবে না।

এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি : মামুন মুস্তাফা
এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি গ্রন্থখানির জন্য মামুন মুস্তাফাকে মননশীল শাখায় চিহ্নসম্মাননায় ভূষিত করে চিহ্নপরিবার। মামুম মুস্তাফার প্রতিভার যথার্থ স্ফূরণ যেমন আছে এই বইটিতে, তেমনি চিহ্নর এই মনোনয়নকেউ যথার্থ বিবেচনা করি। মামুন মুস্তাফার সামনে আরো অনেক পথ বাঁকি। এটি তাঁর এই পর্যায়ের স্বীকৃতিমাত্র।
সম্মাননা পর্বের ঠিক পরপরই কাজি মামুন হায়দারের কণ্ঠে লালন সঙ্গীত শুনে ভাবলোকে হারিয়ে যায় সকলের মন। এতো দরদ দিয়ে লালন গাইতে আর কখনো কাউকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। যাহোক, সাঁইজির ভাবের ভেলায় ভাসতে ভাসতে যখন উন্মুন শ্রোতাদের মন আর কুলের দিশা করে উঠতে পারছে না কিছুতেই, তখন মঞ্চে এলো কুড়িগ্রামের বিখ্যাত ভাওয়াইয়া একাডেমি। ভূপতিভূষণ বর্মা ও তাঁর দল ভাওয়াইয়া দিয়ে মাত করে গেলেন হাজার হাজার দর্শককে। ভূপতিশিষ্য সাজুর চারটি গান দিয়ে শেষ হয় এ দিনের আয়োজন।
ছোটকাগজ মেলা বাংলাদেশে এই প্রথম নয়, কিন্তু অর্ধশতাধিক ছোটকাগজ ও তার সম্পাদকের সম্মিলন এই প্রথম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন আয়োজনও আগে কখনো হয়নি, এসব কথাই বলছিলেন সবাই। এমন আয়োজন যেন বারবার করে চিহ্ন এমনই প্রত্যাশা সকলের। চিহ্নকে উপলক্ষ করে সবাই মিলিত হতে চায় বারবার। কিন্তু যতদূর জানি উপলক্ষ যেন লক্ষকে ছাড়িয়ে না যায় এ বিষয়ে চিহ্নও বেশ সচেতন। সেই যে দুই হাজারের এপ্রিলে তথাকথিত এক বোকা দিবসে জ্বলন্ত সূর্যের দিকে পিঠ রেখে শুরু হয়েছিল ওর যাত্রা, তারই সামূহিক পরিণতি এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে। যে যাই বলে বলুক, আমি তো চাই, আর কখনও যেন এমন নয় বরং একে অতিক্রম করে, নিজের সময়সীমার উত্তরণ ঘটিয়ে চলুক চিহ্ন। ওর কর্মযজ্ঞের পরিসীমা সীমাকে ছাড়িয়ে যাক। শিল্প-সাহিত্যের তূর্য বিন্দুতে ওর সাথে দেখা হবে, এই আশা জ্বালিয়ে রাখলাম মনে। জয়তু চিহ্ন…

[পুলিন রায় সম্পাদিত ভাস্কর  পত্রিকার ‘মর্মরিত ঊষাপুরুষের ডায়েরি থেকে’ শীর্ষক রচনা থেকে মুদ্রিত]