বাংলাদেশের কবিতার সংকেত ও ধারা

শহীদ ইকবাল

উৎসর্গ
রুবাকে
‘কোথাও কেউ নেই, বাতাস ও জ্যোৎস্নার মেশামেশি
পৃথিবী ও পৃথিবী ছাড়িয়ে অশরীরী স্তব্ধতা’

প্রসঙ্গত
এক দশকেরও বেশি কবিতার ক্লাসে আছি। যখন অনতিকিশোর তখন “রূপসী বাংলা”কে অবচেতনে গ্রহণ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কবি-সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ, আর তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি জীবনানন্দকে। এসবের কোনো যৌক্তিক উত্তর নেই। কিন্তু যুক্তিটা তৈরি হয় ক্রমশ পাঠদানের ভেতর দিয়ে। বলতে হয়, কবিতা কী-কেন-কিসে-কীভাবে এর ‘ক্যাজুয়াল’ স্বরূপ, গ্রহণ-বর্জন, সমাজ-সংস্কৃতি-দেশ-মাটি-মানুষ এসবের বাইরে প্রয়োজনীয়তা, আনন্দ, ‘অলৌকিক আনন্দ’, অনির্বচনীয়তা ইত্যাকার অনেকানেক প্রশ্নজিজ্ঞাসাকে আলিঙ্গন করেজ্জএ মন; কখনো পাঠ-অভিজ্ঞতায়, কখনো আবেগের প্রবাহে। এবং এখনও তা চলছে। খুব ভালো লাগে, মুগ্ধ হয়ে যাইজ্জ‘নতুন কবিতা’ বা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলন দেখে। এর গোড়াতেই খোঁজ মেলে বাংলাদেশের কবিতার। পঞ্চাশ-ষাট তো মনোমুগ্ধকর ব্যাপার। আর মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলাদেশে কবিতার তো ‘প্রাণপাত’ দশা। অনেক কবি, কবিতার পারাবাত কতো রকমের! এর মধ্যে আত্মত্যাগী এবং মেধাবী অনেকেই। দীর্ঘ রাস্তায় এ বাংলার কবিদের প্রকরণ-প্রবণতা নিয়ে ভাবতে থাকি। কিন্তু সে অনেক কঠিন কাজ। বাংলাদেশের কবিতা বিষয়ে আশির কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বোধটা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়। এছাড়া যাঁরা এ বিষয়ে গ্রন্থ লিখেছেন প্রবন্ধ লিখেছেন, তাঁদের বোধ-বিবেচনা আমাকে একটা এ-বিষয়ক কিছু করার প্রেরণা যোগায়। সে কারণেই এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী মুখ আমাকে বেশি অনিবার্য করে তুলেছে, এ কাজে। কিছু হয়ে থাকলে সেটা তাঁদের, আর না-হলে অবশ্যই সে ব্যর্থতা আমার।
বাংলাদেশের কবিতার পঞ্চাশ বছরের ধারা নিয়ে এ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ। এমন আলোচনা অনেকের সঙ্গে দ্বিমতের জন্ম দিতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মতানৈক্য। আলোচনাটির সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যুক্তিসঙ্গতভাবেই আলোচনার চেষ্টা আছে। আর চেষ্টার প্রতিকূলতা যে নেই, তা কে অস্বীকার করবে? সেজন্য এখানে এ বিবেচনাটি থাকছে, এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো আলোচনা নয়। সমসাময়িক এমন কোনো বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ আলোচনার জন্য আরও সময়ের অপেক্ষা জরুরি। এটি শুধু সূচনামাত্র। এছাড়া এ পর্যায়ে আর কি বলা যেতে পারে! তবে এ বিষয়ক মতামত ও পরামর্শ আমি সকলের কাছে কামনা করছি। এখানে শুধু কবিরাই নন, কবিতা বিষয়ক যে কেউ এমন মতামত পোষণ করতে পারেন। ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ বিষয়ক পৃথক আলোচনা আছে। বাংলাদেশের কবিতা-অঙ্গনে তাঁরা এখন যে অপ্রতিরোধ্য, এটা স্বীকার্য। সেজন্য একটু পৃথক ব্যবস্থাপনা এখানে রাখার চেষ্টা হয়েছে। এ গ্রন্থে ত্রিশোত্তর কবি জীবনানন্দ-সুধীন-বুদ্ধদেব নিয়ে প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট হয়েছে। আমাদের কবিতাধারাকে চেনার জন্যে এঁদের পঠন-পাঠনের ব্যত্যয় নেই। এছাড়া কবিতা-বিশ্লেষণের পরিধিতে রবীন্দ্র-নজরুলও আছেন। ষাটের কবি সিকান্দার আবু জাফর, সত্তরের কবি আবিদ আজাদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রবন্ধ পূর্বে প্রকাশিত নানা জায়গায়। গ্রন্থভুক্তও ছিল কিছু প্রবন্ধ। এখানে আবার পুনর্মুদ্রিত হওয়ার কারণ, স্রেফ বাংলাদেশের কবিতাধারাকে চেনার স্বার্থে। এ কাজটা সব কবির ভেতর দিয়েই যাতে সম্পন্ন হয়, সে কারণেই। অর্থাৎ এটি ‘আমার’ কবিতাভাবনা। অহংবৃত্তটি আমি ভাঙ্গতে চাই, সেজন্যই মিনতিজ্জএ বিষয়ক মতামতের জন্য।
আমাকে এরকম কাজে সবসময়ই অন্ধ সমর্থন দেন, আমার প্রিয় ছাত্র, সহমর্মী-বন্ধু, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক রহমান রাজুজ্জনশ্বর পৃথিবীর ‘লেনদেন’ কোনো কিছুই চলে না তাঁর সঙ্গে। আমার বিবেচনায় এ পরিসরে তাঁর নাম উচ্চারণ খুবই দুরূহ, হয়তো চিত্তে-বিত্তে সে স্থানটি অনেক উঁচুতে বলেই। অন্যান্য ছাত্রবন্ধুদের আশীর্বাদ গোচরে-অগোচরে আছেই, তাঁরা নক্ষত্রের মতো সমাসীন। দূরে থাকলেও খুব কাছেরজ্জকেন যেন আমার কাছে নানাভাবেই থাকেন তাঁরা। অবশ্য এটা ঠিক ওঁরা সবাই কবিতাপ্রেমী।
যেহেতু ‘চিহ্ন’-প্রকাশন এ বইটি করছে, সে কৃতজ্ঞতা এর সঙ্গে সংশ্লি¬ষ্ট সকলকে।

১৩ আগস্ট, ২০০৮    শহীদ ইকবাল
প/৮০-এফ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
রাজশাহী ৬২০৫

সূচি


বাংলাদেশের কবিতার ধারা (১৯৪৭-২০০০)


ফররুখ আহমদের ‘হেরার রাজতোরণ’
আহসান হাবীবের কবিতা : রক্তবীজের বংশধর
সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার অন্তরিন্দ্রিয় আখ্যান
আল মাহমুদের কবিতা : লোকায়ত শব্দসম্ভারে আধুনিক অস্তিত্বযাপন


সিকান্দার আবু জাফর : বিরূপ বিশ্বের প্রসন্ন চিত্ররূপ
আবদুল গনি হাজারীর কবিতা
শামসুর রাহমানজ্জকাব্যপাঠের সূত্র
বিমুখ প্রান্তর কাব্যে কালান্তরের বার্তা
আবিদ আজাদ কবিতা : সংগুপ্ত কাতরতার অবিনাশী উচ্চারণ
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক


বুদ্ধদেব বসুর যে-আঁধার আলোর অধিক
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাবিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদ
বড় কবি জীবনানন্দ দাশ
বাঙালি কবি নজরুল
সৃষ্টিশীল ভাবুক রবীন্দ্রনাথ

সৃষ্টিশীল ভাবুক রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের পরিক্রমায় কর্মযোগী হিসেবে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছেন। বিপুলায়তন তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে এক পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রভাবনায় রবীন্দ্রনাথ কোনো বিশেষ ধর্মে-মতে-বর্ণে বা দৈশিক আবহে স্থিতু রাখেননি নিজেকেজ্জঅনিবার্যভাবেই মননচর্চার মুক্তির ভেতরে মানবকল্যাণের শর্তের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তিনি; মার্কস-এর মতো তিনিও বিশ্বাস করেছেন, প্রয়োজনকে মান্য করাই স্বাধীনতা। কারণ, ‘Freedom may be attained only through the bonds of discipline, through the sacrifice of personal inclinations. Freedom is a profit which may be gained only if you lay out an adequate capital of self- restriction..’ —এমনটাই শুধু নয়, মানুষের সত্যিকার মুক্তি সম্ভব তার নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই; রবীন্দ্রনাথ তাঁর Religion of Man-এর মধ্যে বলেন, ‘Renounce we must, and through renunciation gain-that is the truth of the inner world…’ রবীন্দ্রনাথ মার্কসকে অতিক্রম করে অবশ্য শুধু প্রয়োজনকে মান্য নয়, মুক্তির অর্থ যে সীমা অতিক্রম করা, আত্মিক আন্বেষার তৃপ্তি খোঁজাতেই তাঁর মাহাত্ম্যজ্জএটা তার বিশ্বাস ও কর্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন তিনি।
উপরিউক্ত প্রস্তাবনা রবীন্দ্রনাথকে মানবসত্যের ধারক, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ কিংবা মনুষ্যসমাজের যা-কিছু ইতিবাচক তার সপক্ষে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত করবার ব্যাপার নয়; গোটা বিংশ শতাব্দী জুড়েই কবি রবীন্দ্রনাথ নানা প্রবণতায়, নানা মূর্তিতে আমাদের সামনে এসেছেনজ্জকিন্তু প্রকৃতঅর্থে কেন রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদী, বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ অনিবার্য কেন কিংবা ২৫ বৈশাখ বা ২২ শ্রাবণ এলেই ভক্তি গদগদ কণ্ঠে কেন রবীন্দ্রনাথ আওড়ানো, আবৃত্তি বা গাওয়া এতেই কি কৃতার্থতার প্রমাণ হয়জ্জএসব প্রসঙ্গ উচ্চারণ একেবারে আত্মশ্লাঘার ব্যাপার নয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভক্তি-আবিষ্ট মন্ত্র নন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের কর্মেরজ্জপ্রেরণার উৎস, রবীন্দ্রনাথ আমাদের নিত্য ব্যবহার্য মন্ত্র; নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে তা প্রত্যন্তে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যজ্জএ প্রজন্মান্তরের রবীন্দ্র্রচর্চা। আর রবীন্দ্রনাথ কেন মানবসত্যের, মানবকল্যাণের, তা আমার ও আমাদের বাস্তবতার সামষ্টিক বাতাবরণে, আত্মিক সম্মিলনে নিত্য-আনন্দের মধ্যেই তার অন্বেষণ ও উৎস পাওয়া যেমন যাবে তেমনি কাজে কর্মে-ব্যক্তিত্বের স্তরান্যাসে প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেওয়াও সম্ভব হবে। এক কথায় আমাদের স্বার্থেই, আমার প্রয়োজনেই নিত্যক্ষণে রবীন্দ্রনাথ জরুরি। কোনো বিশেষক্ষণে তাঁকে ভক্তিমার্গে পূজো দেওয়ার জন্য নয়।
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে শুরুতেই যে প্রস্তাবনা হাজির করেছি স্বল্পকথায় আমাদের নিত্য সৃজনশীলতায় রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করার জন্য আরো কিছু কথা বলা জরুরি। যেমন ‘the truth of the inner world-আত্মার সত্য, আত্মিক অন্বেষা, সৃজনী চৈতন্যের উদ্বোধন এ সকল গরিমা রবীন্দ্রনাথকে কোনো কিছুকেই বিশেষ করে দেখায়নি; অরূপ-অসীম ও নির্বিশেষের জগতে রবীন্দ্রনাথ বস্তুবাদের সারাৎসারকেই তার ভাববাদের নির্মোকে ধারণ করেছেন। বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ পঠন-পাঠনের জন্য মিললেও তিনি উদার-সত্য ও প্রায়োগিক জ্ঞানকেই তাঁর চিত্তে স্থান দিয়েছেন। যে সময়টিতে রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠছেন তখন গোটা বিশ্বই যেন তাঁর নিকট উন্মোচিত হয়েছিল, বিশ্বজগৎ-এর উদাত্ত জ্ঞান রবীন্দ্রনাথ আকণ্ঠ পান করেছেন নিজের মননচিন্তার বৈশিষ্ট্যের পাদপীঠ থেকেজ্জসেজন্য মায়াবাদী শঙ্কর, বিবেকানন্দ, ফ্রয়েডীর মনস্তত্ত্ব, কোনোটাই তাঁকে নির্বিরোধী দখল করতে পারেনি। রবীন্দ্র্র-জীবনী থেকে এটা আমাদের একটা বড় শিক্ষাজ্জরবীন্দ্রনাথ হেঁটেছেন বহুবিধ পথে কিন্তু সবকিছুতেই নিজস্ব সৃজনশীলতার চর্চা করেছেন। শেষদিকে বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ নিজের সংগুপ্ত মননের বহিঃপ্রকাশের উৎস হিসেবে প্রায় তিন হাজার ছবি এঁকেছেন; আর বিজ্ঞানের চর্চায় বেশি আত্মনিবেদিত থেকে জড়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। যান্ত্রিক জড়বাদী হওয়া নয়, নিছক জিজ্ঞাসার সূত্র থেকেই জীবতত্ত্বের রহস্য খুঁজতে গিয়েই তাঁর এমনটা ইচ্ছা-পোষণ। প্রসঙ্গত বলি, রবীন্দ্রনাথের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির এ প্রবণতা শুধু শেষদিকের নয়, প্রথম থেকেই ছিল। “সমুদ্রের প্রতি”, “বসুন্ধরা” ইত্যাদি বিখ্যাত কবিতায় তার প্রমাণ আছে। যা-হোক, বৌদ্ধিক চিন্তার বাইরে রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার পথে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। নিজধর্মে সংস্কারাচ্ছন্নতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেনজ্জ সেজন্য অনেক হিন্দু পুরোহিতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিরোধ ছিল। যৌবনের প্রারম্ভে তাঁর অনেক পরিশুদ্ধ চিন্তা ও মুক্তদৃষ্টির জ্ঞানকে পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ একাধারে যেমন বিস্ময়ের চোখে দেখেছেন তেমনি অনেক কিছুতেই নিজের আড়ষ্টতায় ভিন্নমত পোষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ পিতৃদেবের উপনিষদ মন্ত্র বা প্রাক-মতাদর্শের বিশেষ তোয়াক্কা না করে মূলত নিজের বিশ্বাসের জ্ঞানকেই গ্রহণ করেছেন। বিবেকানন্দের ‘নবীন-ধর্ম’-এর সংজ্ঞায় রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ধর্মমত যেন মিলে যায়। যা হোক, বাঙালির ধর্ম-বিশ্বাস, রাজনীতি ও আধুনিক হওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম আত্মিক উন্নতি এবং ঐক্যসূত্রের মধ্য দিয়ে মানবমিলনকে বড় করে দেখেছেন। মানবসত্যের বিবেচনায় তিনি যেমন চলেছেন, তাঁর তিনটি জন্মভূমি এক : পৃথিবী, দুই: স্মৃতিলোক, তিন : আত্মিকলোকজ্জএই জন্মভূমির আরাধনায় সর্ব মানবচিত্তের জয় ঘোষণা করে রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেন :
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে
…       …       …
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমার পশ্চাতে টানিছে।
আমাদের দুর্বলতার মূল কারণ, বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতা। কাউকে পেছনে ফেলে বা উচ্চ-নীচের ব্যবধান রেখে কোনো জাতি প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের এ নিন্দাবাণী তাদের উদ্দেশে, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের প্রতি যারা রাষ্ট্রব্যবস্থায় থেকে সমাজকে, ও সমাজের শ্রেণিকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। ফলে ক্রমাগত ব্যবধানের পারাবার বেড়েই চলেছে।
রবীন্দ্রচেতনার আরেকটি বড় প্রসঙ্গ প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সম্মিলন, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়। বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতা যেমন দান করেছেন তেমনি তাতে প্রদান করেছেন আন্তর্জাতিক মাত্রা। হুমায়ুন কবির যেমনটা বলেছেন, ‘তাঁর প্রথম ইংল্যান্ড গমনের অনতিকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের সুর-রচনায় পরিবর্তন ও বিকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি যখন ফিরে এলেন তখন পাশ্চাত্য সুরলহরীতে যে-যে সুর তিনি শুনেছিলেন ও গাইতে শিখেছিলেন, সে-সবে তাঁর মন পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাঁর প্রথম সঙ্গীতনাট্য এবং আধুনিক ভারতীয় ভাষায় সম্ভবত প্রথম অপেরা বাল্মীকি প্রতিভায় তিনি বেশ কিছু পশ্চিমী সুর সংযোজন করেছিলেন। এত কম বয়সেও তিনি ধার নিয়েছিলেন কেবল ততটুকুই যেটুকু তাঁর নিজের রচনার বুনোটে তিনি জায়গা দিতে পারবেনজ্জতাঁর প্রতিভার এ এক বিশেষ চারিত্র্য। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে  নীতিগতভাবে ভারতীয় সঙ্গীতে সুরসঙ্গতির বিকাশ ঘটে উঠতে পারে, কিন্তু তাঁর নিকট সুরসঙ্গতিজনিত ব্যবস্থাতন্ত্রের আবেদন ছিল সীমিত। ফলে, তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বের স্পর্শে স্কটীয় ও ইংরেজি সুরকে পরিস্রুত করে নিয়ে ভারতীয় চেহারা দিয়েছিলেন। একটি উপায় যা তিনি প্রয়োগ করেছিলেন তা হল, এই সব পশ্চিমী সুরে প্রথম স্তবকের ওপর জোর দেওয়াজ্জযা ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ধ্র“পদ ঘরানার এক বিশেষ লক্ষণ। এর ফল দাঁড়িয়েছিল এই যে, পাশ্চাত্য সঙ্গীত থেকে রবীন্দ্র গৃহীত গান সনাক্ত করার পরেও দেখা গেল, সে-সবে তাঁর ব্যক্তিত্বের সীলমোহর ভালোই পড়েছে। এবং সেগুলো যে-অবয়ব পরিগ্রহ করেছে তাতে তাদের ভারতীয় মেজাজ অভ্রান্তরূপে চিনে ওঠা যায়। রবীন্দ্রনাথ আসলে কথা ও সুরের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একদিকে যেমন সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের দিকে ফিরে গেছেন তেমনি আবার সমকালীন ঐতিহ্যানুসরণের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহও প্রকাশ করেছেন। প্রমাণটা সত্য, ধ্র“পদী ও লোকজ সুরের একীভবনে রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীতকে জনপ্রিয়তা ও নাগরিক বৈদগ্ধ্য দান করেছিলেন। তাঁর সমস্ত সৃজনশীল চেতনায় এমন বৈশিষ্ট্যের ছাপ নজরে আসে।’
রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়ছে এবং তাঁর উচ্চারণমন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে একদিকে যেমন নানাভাবে দলিত করেছে অন্যদিকে তেমনি মাটির কাছাকাছি মানুষদের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ত দান করেছে।

বাঙালি কবি নজরুল

বাংলা সাহিত্যে নজরুল খাঁটি বাঙালি কবির অহংকার হিসেবে অনিবার্যরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রশ্ন আসে, নজরুল ইসলাম জাতীয় কবি বলেই কি তাঁর এ প্রতিষ্ঠা! কিংবা মুসলমান বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্রে নজরুলকে নিয়ে প্রশ্নাতীত প্রশ্ন করার কার কীই-বা এখতিয়ার আছে?
নজরুল অসম্ভব এক অনিবার্য প্রতিভার কবি : কারণ নজরুল সমস্ত শ্রেণিস্বার্থ, ধর্মস্বার্থ, নিজস্ব জাত-কুল-বর্ণ অতিক্রম করে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি যে কুলে জন্মেছি তা আমার দৈব, আমি তা অতিক্রম করতে পেরেছি বলেই আমি কবি’—নজরুল সাম্প্রতিক বাংলাদেশ দেখেননি, এমন কি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা সম্পর্কে একটা সংবাদ তাঁর নিকট থাকলেও সাতচল্লিশের পাকিস্তান অবলোকন করেননি তিনি। প্রচণ্ড ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তাণ্ডব তাঁর চিত্ত স্পর্শ করেছিল; প্রখর প্রতিভাদীপ্ত মনন বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে নজরুলকে গোটা বাঙালি জাতির সপক্ষে উগ্র করে তুলেছিল। কোনো কিছুতেই তাঁর ধৈর্য না থাকলেও আবেগের উন্মাদনায় তিনি যা কিছু উচ্চারণ করেছেন সেখানে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার পক্ষে নিরঙ্কুশ প্রণোদনায় বাঙালি নেতৃত্ব ও জাতিত্ব প্রতিষ্ঠিত করায় প্রত্যয়ী ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ রাজকে অস্বীকার ও অমূলক জ্ঞান করে লাল কলমে, লাল কালিতে, লাল পোশাকে সমস্ত বাঁধন ছেঁড়ার, শেকল ভাঙার বাণী তিনি উচ্চারণ করেন। যে চিন্তা মানবতার অপমৃত্যু ঘটায়, যা মানুষের সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়, যা মানবসভ্যতার বিপক্ষে, তার বিরুদ্ধেই নজরুল সোচ্চার হয়েছেন। সমস্ত শোষণব্যবস্থার বিপক্ষে, বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা বর্ণের বিপক্ষে যা কিছুই মানবতাবিরোধী সেটাই তিনি নৈরাজ্যের আহ্বানে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় গোটা জাতিকে একত্রিত করেছেন। এ উচ্চারণগুলো নিশ্চয়ই অনেকের জানা এবং এমন প্রশ্নও হয়ত এ প্রসঙ্গে আসেজ্জযে কোনো বড় প্রতিভাই এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যানজ্জএ আর নতুন কি? কিন্তু উপলব্ধির প্রত্যয়ে নজরুলের পুনর্মূল্যায়ন
জরুরি। কেননা নজরুল সুদূরপ্রসারী জ্ঞানে ১৯৪০-এর ‘লাহোর প্রস্তাবে’ উত্থাপিত পাকিস্তানকে শের-ই-বাংলার “নবযুগ” পত্রিকায় ‘ফাঁকিস্তান’ বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান মেনে নেননি নজরুল। ১৯৪২-এর জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর অবস্থার ক্রমাবনতির পর্বে এবং কার্যত সমস্ত চিকিৎসাপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পর নজরুলকে আল্লামা ইকবালের পরে পাকিস্তানের কবি হিসেবে মুসলিম জামানার কবি বলে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলতে থাকে। তাঁকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে প্রতিষ্ঠার হীন তৎপরতা লক্ষ করা যায়। যে রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন নজরুল, যাঁর প্রয়াণদিবসে নজরুল গেয়েছেন আবেগবিহ্বল শ্মশানযাত্রায় ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগাইও না জাগাইও না আর…’ প্রসিদ্ধ সেই গানজ্জ তাঁকে এমন বিকৃত উপস্থাপনের প্রয়াসের অর্থ কী? পাকিস্তানি হওয়ার পর গোলাম মোস্তফা নজরুল-কাব্যের হিন্দু পৌরাণিক শব্দকে বা তাঁর অন্যান্য শ্যামাসঙ্গীতকে কিংবা মুসলিম অনুষঙ্গি শব্দ ও প্রবণতা ছাড়া অন্যান্য বিষয়কে পাকিস্তান রাষ্ট্রবিরোধী বা হিন্দু অনুবর্তী বলে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালান। এছাড়া পাকিস্তান রেডিও থেকে নজরুলের কীর্তন বা শ্যামাসঙ্গীত কখনোই গাওয়া হতো না। এভাবে আমরা দেখতে পাই, নবসৃষ্ট পূর্ব-বাংলায় নজরুলকে খণ্ডিতরূপে জনমানসে উপস্থাপিত করা হয়। যে নজরুলকে আমরা বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে প্রখর অসাম্প্রদায়িক ও জাত-ধর্ম-বর্ণ ঊর্ধ্বের তীব্র মানবতাবাদী কবি হিসেবে সর্বত্র নিরঙ্কুশভাবে সক্রিয় দেখতে পাই, সেই নজরুল সাতচল্লি¬শ-উত্তর পূর্ব-বাংলায় উপস্থাপিত হন খণ্ডিতরূপে আর পশ্চিমবাংলায় অসুস্থ নজরুল নানাভাবে জনচিত্ত থেকে হারিয়ে যান। প্রসঙ্গত এমনটা বলা চলে, ১৯৪২ সালের আগস্টের পরে নজরুল অসুস্থ হলে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেকটা অবহেলার মধ্যেই পড়েন। যদিও দুই বাংলাতেই ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’ গঠন করে তার অর্থ দিয়ে লন্ডনে ভিয়েনায় চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়; কিন্তু তা অনেকটা সময় অতিক্রম হওয়ার পর, যা তাঁর জন্য ফলদায়ক হয়নি। অসুস্থ নজরুল নামমাত্র বেঁচে থাকলেও বিভাগোত্তরকালে পূর্ববাংলায় পঞ্চাশের দশকে যে ‘খণ্ডিত নজরুল’ উপস্থাপিত হয় তা ষাটের দশকের রবীন্দ্র জন্মশত-বার্ষিকীর আন্দোলন এবং ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গরূপে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলতে থাকে। এ সময় পূর্ব-বাংলার জনচিত্তে নজরুল কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, গজল গানসহ ধ্র“পদী গীতিকবি হিসেবে স্থান পান। সন্তোষ সেনগুপ্ত, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ফিরোজা বেগমের গাওয়া লংপ্লে রেকর্ডগুলো বাঙালি প্রাণে নজরুলকে নিজের আসনে যেন আবার প্রতিষ্ঠা দেয়।
নজরুল এ সময় কলকাতায় খুব ভাল এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছিলেন না। পূর্ববাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হওয়ার পর, বলা যায় স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাঙালি নিজের করে আবিষ্কার করে। স্রোতের প্রতিকূলে নিজের অস্তিত্বের প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমান সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে তাদের প্রাণের আত্মীয় বলে দ্বিধাহীনচিত্তে স্বীকার করে নেয়। এ তৎপরতা আরও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি যখন তাদের একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ভূখণ্ডে বাংলাদেশকে অর্জন করে। এ মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিপাগল বাঙালির অনুপ্রেরণার নিশানা ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা-গান। বাংলাদেশ হওয়ার পর নজরুলকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়, এদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সরকার তাঁকে বাড়ি দেয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে যত্নের সঙ্গে অনুকূল পরিবেশে রাখা হয়। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে বাঙালি কবি নজরুলকে তাঁর সাহিত্যে-সঙ্গীতে-গবেষণায় পূর্ণাঙ্গরূপে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হয়। নজরুলচর্চার বিবিধ প্রয়াস চলতে থাকে; বাংলা একাডেমী, কবিভবন (পরবর্তীতে নজরুল ইনস্টিটিউট) হতে নজরুল সম্পর্কিত বই প্রকাশ ও গবেষণা, নজরুলঅভিধান রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ নিশ্চয়ই নজরুল চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বাঙালি চেতনায় ও বাংলা সাহিত্যে নজরুল যে অঙ্গীকারে প্রতিষ্ঠিত প্রধানত সেটাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশে। যে প্রস্তাবিত পাকিস্তানকে নজরুল ‘ফাঁকিস্তান’ বলেছিলেন, যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লুণ্ঠিত করে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নজরুলকে খণ্ডিত করার চেষ্টা চলছে, সেই নজরুলের ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে যেমনটা সত্য হয়েছে তেমনি তিনি ফিরেও পেয়েছেন পূর্ণাঙ্গ কবির মর্যাদা। ’৭২ সালের পর এমন প্রতিরূপেই নজরুলকে চেনা যায়।
বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে নজরুলই এমন বাঙালি কবি যিনি কবিতা লিখে বাঙালিকে রাস্তায় মার্চ করিয়েছেন, শেকল ভাঙার গান গেয়ে একত্রিত করেছেন সমস্ত শ্রেণি-বর্ণ-ধর্মের মানুষকে। কবিতায় নজরুল শরণ নিয়েছিলেন ১৯৩০-৩১ সাল অবধি। এরপর নজরুলের গানের যুগের সূচনা ঘটে। কিন্তু যে নজরুল কল্লোলিত কবিদের যুগে কবিতার আঙ্গিকে আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে কিংবা হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধের ধর্মীয় চেতনাকে একত্রিত করে স্বতন্ত্র এক কাব্যপ্রবণতার জন্ম দেন, সে কবিকে কোনো বিশেষ বৃত্তে আবদ্ধ করে বা স্বীকৃতি দিয়ে শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রতিষ্ঠা করার বা দেখানোর কিছু আছে কি? বাংলা সাহিত্যে নজরুলের যে প্রতিষ্ঠা তা বিশেষ কোনো রাষ্ট্রীয় শ্রেণি-চরিত্রের হাতে যেমন বন্দি নয়, তেমনি অত্যুৎসাহী হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানও জরুরি নয়। নজরুল নানা সময়ে তার প্রমাণ দিয়েছেন এবং স্বতঃস্ফূর্ত ইতিহাসের সত্যে তাঁর পুরনো মর্যাদা তিনি ফিরেও পেয়েছেন। সর্বোপরি, একজন বড় কবির কিছু ফিরে পাওয়া না পাওয়ার বা কিছু প্রদানের স্বীকৃতি অস্বীকৃতিতে কিছুই আসে যায় না। সুতরাং ১৯৭৬-এ নজরুলের দেহান্তরিত হওয়ার পর তাঁর জাতীয় কবির মর্যাদাপ্রাপ্তির বিশেষ কোনো ইঙ্গিতবহ ব্যাপার নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর ছাত্রসমাজ ও যুব সম্প্রদায়ের নিরঙ্কুশ চাপের মুখে রবীন্দ্রনাথের গান জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হলেও এর তিন বছর পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ঠিক একরকম ছিল না। ছিয়াত্তরে নজরুলকে টুপি পরিয়ে একুশের পদক দেওয়া হয়। নজরুল পরিবারের সদস্যদের পুরোপুরি মতামত না নিয়ে অনেকটা তড়িঘড়ি করে মসজিদের পাশে নজরুলকে দাফন করা হয়জ্জএসব প্রসঙ্গ সে সময়ের রাষ্ট্রব্যবস্থার কর্ণধারদের হাত থাকলেও সাধারণ সচেতন নাগরিকদের মনে অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে যায়। নজরুল বেঁচে থাকলে বা সুস্থ মস্তিষ্কে এসব সুযোগ-সুবিধা, পদক বা জাতীয় কবির মর্যাদা তিনি নিতেন কিনা সে প্রশ্ন অন্য; কিন্তু নজরুলের মৃত্যুর সময় যে বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ ছিল সে বাস্তবতা আর সদ্য মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে বাস্তবতা তা নিশ্চয়ই আলাদা। কোনো কবিকে জাতীয় কবি বললেই কেউ বড় বা ছোট যেমন হন না, তেমনি বেশি বা কম মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারটাও থাকে না। নজরুলকে টুপি পরিয়ে তাঁকে যে শ্রদ্ধা ও সম্মানে ভূষিত করা হয় তা তাঁর সারা জীবনের আদর্শের সঙ্গে মেলে না। নজরুল বিশেষ কোনো ধর্মের ছিলেন না, নজরুল হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ফারাক দেখেননি, নজরুল নারী-পুরুষের ভেদকে অস্বীকার করেছেন। সেজন্য তাঁর জীবদ্দশায় মুসলমানরা তাঁকে কাফের বলেছে, হিন্দুরা তাঁকে যবন বলেছে, পুরুষরা তাঁকে অসম্মান করেছে আর নারীরা তাঁকে নারীবিদ্বেষী বলে গাল দিয়েছে। নজরুল তাঁর কবিতায়-গানে-প্রবন্ধে অনিবার্যভাবে এসব প্রসঙ্গ যেমন উত্থাপন করেছেন, তেমনি তার উত্তরও দিয়েছেন। নজরুল সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাকে বড় করে দেখেছেন। এজন্য কোনো গণ্ডিতে তিনি যেমন আবদ্ধ হননি, তেমনি নিজের সাহসিকতায় শোষণমুক্তির মধ্যে প্রত্যেক মানুষের (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) জয়গান গেয়েছেন। সুতরাং কোনো বিশেষ শ্রদ্ধা বা সম্মানের জন্য নজরুল উদ্গ্রীব ছিলেন না। নজরুল তাঁর স্ত্রী প্রমীলার পাশে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। আর জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার জন্য নজরুলকে এদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় (যদিও বধির, পাগল, বোবা, চৈতন্যহীন মানুষকে কোনো দেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার রীতি নেই) তারই বা যৌক্তিকতা কতটুকু ছিল!
এসব প্রসঙ্গের মাঝে এটাও ঠিক নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ বানিয়ে আমরা বিশেষভাবে সম্মানিত করেছি, ঢাকায় মসজিদের পাশে দাফন করে বাংলাদেশের মাটিতে আমরা তাঁকে আমাদের কবি হিসেবে পেয়েছিজ্জএগুলোর ইতিবাচক দিকও অস্বীকার করার নয়। কেননা নজরুলকে চুরুলিয়ায় রাখলে হয়ত এমনটা নিবিড় করে আমরা তাঁকে পেতাম না। প্রতি জন্ম-মৃত্যুদিনে নজরুল যেভাবে আমাদের প্রেরণার উৎস হনজ্জসেটা হতেন না। এগুলো ইতিবাচক দিক, নিশ্চয়ই স্মরণযোগ্য। কিন্তু নজরুলকে যেভাবে তৎকালীন সরকার গ্রহণ করেছেজ্জসেখানে তাদের একটা হীন আদর্শ (যেমন বিশেষ ধর্মের কবি বানানো) কাজ করে থাকতে পারে। যা নজরুল চিন্তাচেতনার পরিপন্থী। সমকালীন বাংলাদেশে নজরুলকে নিয়ে নানারকম রাজনীতি হয়েছে, নজরুলকে নানাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু নজরুল তাঁর প্রাপ্য সম্মান ঠিকই পেয়েছেন। নজরুলকে বাঙালি যেদিন কবি হিসেবে গ্রহণ করেছে সেদিনই তিনি প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেনজ্জএ কথা নজরুল নিজেই বলেছেন। সুতরাং যেভাবেই বা যে অবয়বেই নজরুলকে উপস্থাপন করা হোকজ্জনজরুল তাঁর স্বীয় মর্যাদা ঠিকই ফিরে পাবেন।
নজরুল তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বে কবিতা লিখেছেন। পরে গানের জগতে বিচরণ করে বিস্ময়কর কীর্তি স্থাপন করেছেন। অসাধারণ কল্পনাশক্তিতে নজরুলের গানের কাব্যধর্মীরূপ সুরের ওপর ভর করে মেলোডি তৈরি করেছে। বাংলা গানের জগতে পঞ্চকবির এক কবিতে পরিণত হয়েছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের খেয়াল, অতুলপ্রসাদের ঠুংরি আর রবীন্দ্রনাথের ধ্র“পদী মেজাজ একত্রিত করে নজরুল বাংলা গানে আধুনিকতা এনেছেন। আর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গজলের সুর বাংলা গানে প্রবর্তন করে গীতিকার হিসেবে নিজেকে অসাধারণ করে তুলেছেন। নজরুলের রাগমিশ্রিত অনেক গান এখন অনেক রোম্যান্টিক নায়কের মুখে মুখে। নজরুল রবীন্দ্রনাথের মতো তাঁর গানে সুর দিতে পারেননি; কিন্তু কমল দাশগুপ্ত, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, সুপ্রভা সরকার প্রমুখ গুণী শিল্পীর গায়নরীতি গ্রহণ করে তাঁর সঙ্গীতকে অনেক দূর নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল নজরুলের গানকে নানাভাবে গাওয়া হয়, অপাত্রে পড়ে নজরুলগীতি অনেকটা বিকৃত। নজরুলের বাউণ্ডুলেপনায় আর অবহেলায় অনেক গান সংরক্ষিত হয়নি। হারিয়ে গেছে অনেক রেকর্ড। নজরুলকে নিয়ে শুধু শ্রদ্ধাবনত হয়ে থাকা নয়, প্রকৃত নজরুলকে খুঁজে বের করার যেমন চেষ্টা করতে হবে তেমনি তাঁর প্রকৃত সত্তাকে দৈনন্দিনতায় আমাদের চর্চার মাঝে কাজে লাগাতে হবে।
বাঙালি কবি নজরুল তাঁর সুর ও ছন্দকে একেবারে লৌকিক জীবন থেকে গ্রহণ করেছিলেন। লোকায়ত জীবনকে তিনি নিরঙ্কুশভাবে সাহিত্যে প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। নজরুলের অনেক কবিতা, কবিতা হয়নি, কারণ কাব্যচর্চার জন্য যে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং সংযমের চর্চা দরকার তা নজরুলের ছিল না। নজরুল যা কিছু অবলোকন করেছেন তাই তাঁর কাব্যে রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। কাব্যচর্চার জন্য যে স্থৈর্য্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দরকার তা নজরুলের ভাবে-আচরণে ছিল না। সমসাময়িক সময়কে কাব্যে রূপায়ণ করতে গিয়ে নজরুল অনেক আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা কাব্যের জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রতিভা ও অভাবনীয় মেধার গুণে তাঁর হাতে কাব্য উঠে এসেছে স্ফুলিঙ্গ হিসেবে। উত্তেজনার আবহে, নজরুল কবিতা লিখে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। আবেগপ্রবণ ও বিক্ষুব্ধ বাঙালিকে রাস্তায় নামিয়েছিলেনÑ ‘কারার ওই লৌহকপাট’ ভেঙে মানবচিত্তে ছড়িয়েছিলেন ‘শিখর হিমাদ্রির’ মতো শির উঁচু করা আবাহনী মন্ত্র। নজরুলের এ উচ্চারণ গোটা মানবজাতিকে জাগিয়ে তুলবার জন্য। সেজন্য ঈশান-বিষাণ, কোরান-পুরাণ সব একাকার হয়ে গেছে। নজরুলের এ অসাম্প্রদায়িক ভাবধারা, বাঙালি ঐতিহ্যের প্রাণনায় জাতির দীর্ঘদিনের সংস্কার ভেঙে গিয়েছিল। নজরুলের কবিতা একটি সময়ের আবহে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সমস্ত সাম্প্রদায়িকতা, হানাহানি, মানবতার অপমৃত্যু, শোষণজাল এসব থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের প্রতি আশান্বিত করে তুলেছিল। নজরুলের কবিতার উপযোগিতা এখানেই। শিল্পবোধের মাত্রায় উত্তীর্ণ হওয়া বা না হওয়া নিয়ে নানা রকম তর্ক চলতে পারে। কিন্তু এটা সত্য, তাঁর কবিতার প্রাসঙ্গিকতা এখানো ফুরিয়ে যায়নি। সম্প্রতি হানাহানি বেড়েছে। উগ্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নজরুল আরও প্রাসঙ্গিক। তাঁর কবিতা আরও ঘন ঘন পড়া হচ্ছে। যতদিন পৃথিবীতে মানবমুক্তি না ঘটবে, যতদিন মানবতার জয় না হবে ততদিন নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন, তাঁর প্রয়োজনীয়তা বাড়তেই থাকবে। সুতরাং ‘যবে উৎপীড়েতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’ ততদিন নজরুলের কবিতা পড়া হবে, গান গাওয়া হবে। জয়তু নজরুল?

আগস্ট ২০০৪

 

 

 

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাজ্জবিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদ

বাংলা কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের যে সময়ে আবির্ভাব ঘটে সেটা বাঙালি তথা পৃথিবীর মানুষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, বিশ্ব বাস্তবতায় বিশ্বাস-ভাবনা-মূল্যবোধে তখন তুমুল রদবদল ঘটে চলেছে এবং এই রদবদলের পাদপীঠে জন্ম নিচ্ছে নতুন আবেগ, কখনো আবেগের স্থান দখল করেছে বুদ্ধি আবার বুদ্ধির পরতে জমে উঠছে বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা। কবিতার পাঠক আর লক্ষ নয় যেন কবির; কবির আত্মচেতনা, আত্মউপলব্ধি তথা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে অন্তর্লীন পুরোপুরি কবি- introvert, স্বাচ্ছন্দ্যহীন আঙ্গিক বেছে নিয়ে বুদ্ধি সচেতনতায় হাতড়ে বেড়াচ্ছেন দুর্বোধ্য শব্দ, এ দুর্বোধ্যতাই বুঝিবা কবির অলঙ্কারজ্জউপাসনা। সংবর্ত (১৩৬০) সুধীন্দ্রনাথ দত্তের গুরুত্বপূর্ণ কাব্যজ্জযার ভূমিকায় কবি বলেছেন, ‘মালার্মেজ্জপ্রবর্তিত কাব্যাদর্শই আমার অন্বিষ্ট; আমিও মানি যে কবিতার মুখ্য উপাদান শব্দ; এবং উপস্থিত রচনাসমূহ শব্দপ্রয়োগের পরীক্ষারূপেই বিবেচ্য। ছন্দশৈথিল্যের প্রশ্রয় না দিয়ে, লঘু-গুরু, দেশী-বিদেশী, এমন কি পারিভাষিক শব্দও আচরণীয় কিনা, সে-অনুসন্ধানও হয়তো কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে; এবং শব্দ ও ছন্দ উভয়ই যেহেতু পরজীবী, তাই বর্তমান শব্দবিন্যাস ও ছন্দোব্যবহারের ভূমিকা লেখকের ভাবনাজ্জবেদনা যার বহিরাশ্রয় আবার ইদানীন্তন ঘটনাঘটন।’ অর্কেস্ট্রা (১৯৩৫) থেকে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অভিজ্ঞতায় ক্রম-উত্তরণের পর্বে লক্ষ করা যায় দ্বিতীয় মহাসমর-পরবর্তী সময়ের সন্ধিৎসা, কারণ তাঁর উক্তিতে মেলে ‘আমি যখন পদ্য লিখতে শিখলুম, সে-সময়ে যাঁরা কবিযশঃপ্রার্থীদের অনুকার্য ছিলেন, তাঁরা ভাবতেন সার্থক কাব্যের প্রধান গুণজ্জস্বাচ্ছন্দ্য; এবং সেই জন্যে উচ্ছ্বাসসংবরণ যে সাহিত্য সাধনার আদ্যকৃত, এ-কথা বুঝতে বুঝতে আমার অর্ধেক যৌবন কেটে গিয়েছিল।’ সময়ের পার্থক্যেই কাব্যবোধে উত্তরণের পর্বে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উক্তি ও উপলব্ধিতে ঘটেছিল মৌলিক পরিবর্তন। বৈনাশিক ক্ষণবাদের কবি হিসেবে পৌঁছতে তাঁর সময় লেগেছিল; কবি ও কবিতা সম্পর্কে গৎবাঁধা ধারণা বা আত্মক্ষালনের হাস্যকর প্রয়াসে সমকালীন অনেক কবির মতো তিনি লিপ্ত হননি বলেই তাঁর পারিপার্শ্বিকের পট আর সমসাময়িক ইতিহাসের কার্যকারণ-শৃঙ্খলা অবলম্বনের এ দীর্ঘসূত্রিতা। শতাব্দীর সমান বয়েসী সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মূল প্রসঙ্গ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্স। বাংলা কবিতা একটা পর্যায় অতিক্রম করেছে তাঁর হাতে। কবিতা আলোচনায় যে পদ্ধতিই আমরা গ্রহণ করি, সুধীন্দ্রনাথ দত্তে বুদ্ধিবৃত্তিক কাব্যবৃত্তির গুণে তা একটা গুরুত্বপূর্ণ বোধের মাত্রাকে স্পর্শ করে যায়। বোধকরি, যে কোনো বড় কবির ক্ষেত্রেই তা খাটে। মালার্মে বা বোদলেয়ার যার দ্বারাই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রভাবিত হন কিংবা আদৌ তিনি প্রভাবিত কিনা সে প্রশ্ন অতিযত্নে এড়িয়ে এ কবি সম্পর্কে কবিতা অথবা কাব্যবিচারের সূত্র ধরে একটা অনির্বচনীয়তার (instinct) সীমাকে চিনে নেওয়া যায়। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বড় কবি না দুর্বোধ্য কবি তারও মীমাংসা বেশি দরকার নেই। তাঁর অর্কেস্ট্রা কাব্যের বিখ্যাত কবিতা “শাশ্বতি” থেকে উদ্ধৃত করি:
একদা এমনই বাদল শেষের রাতে—
মনে হয় যেন শত জনমের আগে—
সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;
দীর্ঘ উদ্ধৃতি থেকে সহজেই অনুমেয়, যথেষ্ট কাব্যবোধের মাত্রায় উৎকীর্ণ কবিতাটি একটি প্রেমের কবিতা; যে কোনো কবিতায় প্রেম হয়তো প্রাসঙ্গিক বিষয়জ্জকিংবা বাংলা কবিতায় বৈষ্ণব পদাবলীর রূপময় প্রেম বা রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের কাব্যে প্রেম সূক্ষ্ম ও সংযত আবেগের সংহত প্রকাশজ্জসন্দেহ নেই কিন্তু আধুনিক বাংলা কবিতায় অসাধারণ এ প্রেমের কবিতাটি স্বতন্ত্র জ্জ অবৈকল্য আর অকপটতার গুণে। বিংশ শতাব্দীর মূলমন্ত্র ও অবৈকল্য আর অকপটতা সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কবির এক অকৃত্রিম জীবনভাবনার কথা উচ্চারণ করে; ‘সাহিত্যের অকৃত্রিমতার মানে প্রত্যক্ষ দর্শনের সঙ্গে প্রচ্ছন্ন অভিভাবের পরিণয়। এই কথাকেই আরো সহজ করে বলা যেতে পারে যে, কবি যখন কোনোও দৃষ্ট বস্তু বা অনুভূতির মুখপাত্র, তখন তার কবিতা শুধু সেই বস্তু বা সেই মনোভাবের আধারেই আবদ্ধ থাকবে, লোকাচার হিসাবে তাদের দাম দিতে চাইবে না।’ কবির জন্য দরকার যে লোকোত্তর পটভূমির তাই তাকে মহৎ আর্টিস্ট বানিয়ে ফেলে এবং সেখানে প্রত্যাখ্যানের বাইরে কালজ্ঞান অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি পর্বে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বুদ্ধিবৃত্তি ও চৈতন্যের নিরিখে হয়ে উঠবার কাল-প্রেম-প্রসঙ্গ তখন তাঁর কাছে অতীত ও ভবিষ্যতের মন্থনে নিশাকরোজ্জ্বল ভাবনায় আকীর্ণ। ক্ষণিক, রঙিন, আধুনিক প্রেম অব্যাহত অকপট ভাষণে এক অরূপ স্মৃতি মন্থন করে। যে প্রেয়সী আধুনিকা সে অতীত যেমন অন্য কারো, ভবিষ্যতেও অপরের। শুধু মধ্যবর্তী সময়ে তার প্রতি যে অমোঘ, অচঞ্চল ভালোবাসায় মেতে উঠেছিলেন কবি, তারই স্মৃতিতে আচ্ছন্ন তিনি। শাশ্বতী হয়ে আছে সে প্রেমচিন্তনে। কবি সময়ের সারথি হয়ে সহজভাবে গ্রহণ করেছেন তাঁর প্রেমকে, প্রেয়সীকে, প্রেমের আবেগদীপ্ত প্রচ্ছন্ন মুহূর্তকে। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হয়ে নায়ক-কবি উপলব্ধিতে আনেন; প্রেমিক সত্যিই একদিন চলে যাবে অন্যের কাছে, অতীত-ভবিষ্যৎ কোনোটাই সুখের নয়। আর বর্তমান সেও কি অকপট ভালোবাসায় রিক্ত। “জিজ্ঞাসা”য় কবির উক্তি :
জানি অলজ্জিত রাতে, শ্ল¬থনীবি, কম্প্র আত্মদানে,
দেয়নি সে মোরে অর্ঘ্য, খুঁজেছিল বসন্তসখাকে।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর কাব্য-প্রকরণে বহুস্তরী, সর্বগামী। নিশ্চয়ই ভুলে থাকা সংসারের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো কবি ননজ্জ তাঁর চোখ ‘মঞ্জুল প্রতিমা ভেদ করে ভিতরের কাঠ-খড়-আবর্জনা দেখতে পায়, মোহিনী নারীর ভিতরে দ্যাখে শুধু কংকাল, তাঁর মত অসুখী আর কে আছে?’ তাই কবি অন্ধকার ভবিষ্যৎ ও মৃত অতীতের প্রেম-পর্বের উক্তি উপলব্ধিতে আনেন :
লুপ্ত হল আধারবিন্দু বিশ্ব হতে;
খিল খসাল নাস্তি পুনর্বার;
ভাগ্যরবি চলল ছুটে পাতালপথে
চতুর্দিকে আদিম অন্ধকার।
কবির ব্যক্তিগত বেদনা বিশ্ববেদনায় রূপান্তরিত হয়, যেন একটি ক্রন্দন ব্রহ্মাণ্ডের ক্রন্দনধ্বনি। গতায়ু প্রেমিকের হাত ধরে কবি ব্যক্তিগত মনীষায় অন্বেষণ করে চলেন সমষ্টির মহিমা আর তার সঙ্গে কবির ব্রতধর্মে ‘স্বকীয় চৈতন্যের রসায়নে শুদ্ধ চৈতন্যের’ উদ্ভাসন ঘটিয়ে চলেন। এক্ষেত্রে কবির স্বপ্ন কিংবা অনুপ্রেরণা নিশ্চিতভাবেই অভিজ্ঞতার দ্যোতক হয়ে পড়ে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তীয় কাব্যের উপলব্ধির উচ্চারণ-অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতাই প্রতীকী বিন্যাসে উত্থাপিত হয়। কবির অভিজ্ঞতাই তাঁকে প্রেমিক করে তোলে; একজনের সঙ্গে অনেকজনকে যুক্ত করে পাইয়ে দেয় এক রকমের লোকোত্তর প্রতিভার স্বাদ। অর্কেস্ট্রায় প্রতীক–অবলম্বী হয়ে কবি অনির্ভরতা, অচরিতার্থ প্রেমকে আবিষ্কার করেন। যুগযন্ত্রণায় জীবনের যে ক্ষেত্র এবং প্রচলিত ধর্মের যে বিশ্বাস তা প্রতীকতায় পরীক্ষণীয় হয়ে পড়ে। সেজন্য শাশ্বতীর প্রেম ‘নিষ্ঠার প্রস্তরমূর্তি, অমানুষ, স্থবির, নিষ্প্রাণ, এক প্রেম সেজন্যই পাথুরে মূর্তি, বর্তমান সেজন্য ‘মুগ্ধ নিমেষের দান’ না হয়ে ‘নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপ্ন’ ঘটায়। আধুনিক জীবনব্যাখ্যায় সেজন্যই শূন্যতার তথা নাস্তিবোধের দর্শন কবির বুদ্ধিবৃত্তিতে বৈচিত্র্যময় হয়ে উপস্থাপিত হয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার অবিনাশী উচ্চারণ কোনো সময়ই উপেক্ষিত হয় না। কবির জড়বস্তুর সঙ্গে দ্বন্দ্বময় সে সমস্ত পদাবলী যে ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ পাঠক সমীপে উপস্থাপন করেন সেখানে চতুর্দিকের আদিম অন্ধকারই যেন এক আলোর জগৎ রচনা করে। কবি যে নৈরাশ্যময় তথা বিশৃঙ্খল জগতে প্রতিক্ষণ দ্বান্দ্বিক এক অপরিমেয় বিশ্ব অনুমান করেন; সেখানে সাধারণ মানুষের বিবিধ জাগতিক বোধ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ দারুণ শৃঙ্খলিত। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অনেক সুন্দর কবিতায় যে বিরহিত প্রেমবোধ কিংবা আধুনিক প্রেমভাবনায় তাঁর যে উপলব্ধি সেখানে নিঃসন্দেহে কবি এক ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ই পাঠকের হাতে তুলে দেন। অর্কেস্ট্রার আরেকটি সুন্দর কবিতা “নাম”। উদ্ধৃতি :
জানি সেই বনপথে, চিরাভ্যস্ত প্রেমনিবেদনে
আপনারে ছলি
পশিনি তোমার মর্মে, নিজের গহনে
জমায়েছিলাম শুধু মিথ্যার জঞ্জাল।
স্পষ্ট উচ্চারণে বিরহী কবি সুন্দর তীব্রতায় ছলনার কথা বর্ণনা করেন। কিছু পাওয়ার জন্য, নিবিড় চাওয়ার লোভ কবি এড়াতে পারেননি। দেহের সীমায় তার অধৈর্য, অতৃপ্ত, অলব্ধ বাসনা সব কিছুকে সত্য ভেবে, অনিবার্য ভেবে স্মরণ করেছেন কবি। কিন্তু তাঁর এ নিরঙ্কুশ চাওয়া আর নিবিড় আলিঙ্গন কোনোটাই কখনই স্থায়ী হয় না। বিরূপ বিশ্বে তা স্থায়ী হবার নয়। ‘তাদের পদাঙ্ক মুছে গেছে রৌদ্রে, ধারাপাতে, ঝড়ে, যুগান্তরে’– অনিবার্য অসহ্য সুন্দর এ বিরহবাণী দেহের সীমা অতিক্রম করে এক অপার বেদনার জগৎ তৈরি করে। আধুনিক কবির রচনা শূন্যতার হাহাকার, আর এই হাহাকারের প্রতিরূপ দর্শনে কবি অনেক সময় জড়বস্তুতে প্রিয়ার প্রতিকৃতি নির্মাণে প্রয়াসী হন আবার কখনো ‘নিঃশেষে পিষে, নিশ্চিহ্ন নাস্তিতে’ নির্বাণ লাভ করেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অর্কেস্ট্রা কাব্যের অধিকাংশ কবিতায় কবি অতীতচারী, বিরহবাসী এবং অনিবার্য শরীরী। কবির নাস্তিবোধ তথা শূন্যতাবোধের দর্শন থেকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিবিড়তায় প্রিয়াকে স্থিতিস্থাপক সংজ্ঞায় অর্থারোপিত করে তোলেন। কবির এই অর্থারোপ (meaningful) আসলে আধুনিক সময়ের মানুষের বৈনাশিক বুদ্ধি বা প্রতিকারহীন মুমূর্ষু আত্মার ধিক্কার থেকে উচ্চারিত। এখানে প্রিয়া সময়ে সময়ান্তরে বৈচিত্র্যপিয়াসী, রূপান্তরের পথিক। কখনো তাঁর নিরিখে কবি বিরহী হলেও যৌক্তিক চৈতন্যে আশাবাদী। বুদ্ধিবৃত্তির দ্যোতনায় কবি যখন নিজেকে বিশাল ব্যাপ্তিতে সমর্পিত করেন তাঁর আত্মাকে তখন নির্বিবাদে এক অনিকেত ঈশ্বর তাঁর চিত্তে আরোপিত হয়ে বসে। তখন বিবিক্ত অধ্যাত্ম চেতনায় কবি উচ্চারণ করেন :
ফিরে নাও প্রতিশ্র“ত নন্দনের চাবি।
বজ্রবহ্নি, সংক্ষিপ্ত সংহারে
জাগাক অসহ্য জ্বালা পুনরায় বিক্ষুব্ধ আঁধারে।
ত্রিশোত্তর অন্যান্য কবিদের চাইতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আলাদা হয়ে যান বুদ্ধিবৃত্তিক রোম্যান্টিক উক্তি ও উপলব্ধির গুণে। সেটা বিষয়ে এবং আঙ্গিকে এমন সুদূরের পিয়াসী যা নতুন মাত্রায় আজকের অনুগামী। আধুনিক কবি যে বিরহসন্তপ্ত শূন্যতায় সমস্ত শুচিবায়ুর ঊর্ধ্বে উঠে প্রেমÑপ্রেয়সী ভাবনাকে ভূত-ভবিষ্যতে একাধিক প্রেমিকের নিকট শরীরী ও কামার্ত করে তুলেছেন, তা শুদ্ধ কোটিকণ্ঠ নগরের শ্বাস। অর্কেস্ট্রার “উ™£ান্তি” একটি চমৎকার তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা। বিরহআক্রান্ত কবি এখানে সুচতুর এবং অবিনাশী। শৈথিল্যহীন এক অনিবার্যতা কাজ করে কবিতাটির প্রথম অংশে। সংস্কৃত আভিধানিক শব্দকে এক কম্প্র অনুরাগে সাজান কবি। আবেগ এখানে সমসাময়িকতায় শিকার। বুদ্ধি বশবর্তী হয়েছে উত্তপ্ত-বিনাশী বিশ্বের। কবির রোম্যান্টিক আইডিয়ার ভেতরে এখানে জন্ম নিয়েছে সামগ্রিক মহত্তর এবং সুন্দরতর জীবনের ভাবনা। romanticism এর প্রারম্ভিকতায় যে rational ও realistic ভাবনা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এ পর্বে তার তাৎপর্যপূর্ণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন। কবির বোধে instinct এক নিরঙ্কুশ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জগতে পাঠককে টেনে নিয়ে চলে। বিষয় যেন আত্মসর্বস্ব ঋজুতায় পাঠককে বিরূপ বিশ্বে ভয়ার্ত করে তোলে :
অহেতু সন্ত্রাস
নেমেছিল মোর প্রাণে, হয়েছিল মনে
অনাত্মীয় পরিবেশ ভাষাহীন প্রেতের ক্রন্দনে
উঠিতেছে গুমরি গুমরি।
anti-romantic প্রবর্তনা এক প্রতীকীভাবে উঠে এসেছিল লাফার্গ-এজরা পাউন্ড-এলিয়টের কবিতায়। romanticism-এর আত্মকেন্দ্রিক কল্পনা বা শিল্পসর্বস্বতার বিরুদ্ধে rationalism-এর চর্চায় উঠে আসে জীবন-ঘনিষ্ঠতা তথা জীবনবাদিতার রূপায়ণ। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এ আদলটা নিরঙ্কুশ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাঁর উক্তি ও উপলব্ধিতে এটা নিশ্চিত ছিল, anti- romantic ভাবজগৎ romantic বলয়ের নয়। romantic আত্মসর্বস্বতার বিরুদ্ধ মাত্র হয়ে romantic সুধীন্দ্রনাথ দত্ত realist ভাবে উচ্চারণ করেন, ‘ভয়ার্ত অশ্বের মতো, ছুটেছিল বিলুপ্তির পানে/ আমার উন্মত্ত আত্মা মুমূর্ষার টানে।’ নিশ্চিত, অবক্ষয়িত, রোম্যান্টিকতার উচ্চারণ এটা নয়, রিয়ালিস্ট সৌন্দর্যমন কবির বুদ্ধিবৃত্তিকে স্ফূর্তি দান করে। জীবনবাদি এবং জীবন-ঘনিষ্ঠ প্রণোদনায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রোম্যান্টিকতার ক্ষয়িষ্ণু পুনরাবিষ্কার করতে পারেননি। এমন প্রবণতায় তিরিশের বাংলা কবিতাআন্দোলনে তিনি স্বতন্ত্র হয়ে যান। বুদ্ধিবৃত্তির দ্যোতনায় নিরঙ্কুশ কল্পনায় বিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদী চরিত্র নিরূপণে তার নিরঙ্কুশ ভাবনাকে কাজে লাগানোয় প্রবৃত্ত হন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্য উত্তরণের পর্বে এক্ষেত্রে সংবর্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর চেতনা যে একটা পর্ব অতিক্রম করেছে নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, তা অনুমান করা যায় এমন উচ্চারণ : অন্ততপক্ষে আমার লেখায় আধুনিক যুগের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট; এবং বক্তিগত অভিজ্ঞতা আর যথাশক্তি অনুশীলনের ফলে আজ আমি যে দার্শনিক মতে উপনীত, তা যখন প্রাচীন ক্ষণবাদেরই সাম্প্রতিক সংস্করণ, তখন না মেনে উপায় নেই যে, আমার রচনামাত্রই অতিশয় অস্থায়ী। পুনঃপুনঃ চেতনার স্তর পরিবর্তনে কবি সময়কে অতিক্রম করেছেন, মুখোমুখি হয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। ‘অতিদৈব দেউলের প্রতিধ্বনি’ গুণে কবি স্থির থাকতে পারেন না। এবং পুনরায় ব্যর্থতায়, হতাশায়, বস্তুধর্মিতায় যে যৌক্তিকতার মুখোমুখি হন কবি তা ‘আর্তনাদ ছাড়া আজ নৈবেদ্যের যোগ্য কিছু নেই, পর্যবসিত চৈতন্যে কবি :
আসন্ন প্রলয়;
মৃত্যুভয়
নিতান্তই তুচ্ছ তার কাছে
সর্বস্ব ঘুচিয়ে, যারা ব্যবচ্ছিন্ন দেহে আজও বাঁচে
একমাত্র মুমূর্ষাই তাদের নির্ভর
প্রাণ আর জড়
আবার তাদের মধ্যে আশ্লি¬ষ্ট অশ্ল¬ীল সহবাসে।
প্রলয়বিদ্ধ সময়ে একমাত্র মুমূর্ষাই নির্ভরতাজ্জকবিকে দান করে ‘নৈরাশ্যের নির্বাণী প্রভাব’, যেখানে তিনি আশ্রিত, এই আশ্রয়েই লুক্কায়িত থাকে আশা-আকাক্সক্ষা। দুঃসহ আশ্রয়ে কবি দেখতে পান :
নিশ্চিহ্ন সে-নচিকেতা; নৈরাশ্যের নির্বাণী প্রভাবে
ধূমাঙ্কিত চৈত্যে আজ বীতাগ্নি দেউটি,
আত্মহা অসূর্যলোক, নক্ষত্রের লেগেছে নিদুটি।
কালপেঁচা, বাদুড়, শৃগাল
জাগে শুধু সে-তিমিরে।
জলে-অন্তরীক্ষে, স্থলে-দিগন্তে সর্বত্র কবি দুঃসময়ের হতাশায় এতই মানবেতরজ্জ যেখানে স্বচক্ষে দেখতে পান ‘কম্পিত হাতের দোষে নির্দোষের মুণ্ডপাত করে’ সেখানে শুধু মানুষ নয়, নক্ষত্র, অসূর্যলোক, তিমিরের কালপেঁচা, বাদুড়, শৃগাল কেউ নি®কৃতি পায় না। চতুর্দিকের চক্রব্যূহ কাউকেই মানুষ হতে দেয় না। বিরূপ বিশ্বের ক্রূর-প্রকৃতির ছবি অঙ্কন করেন শতাব্দীর সমান বয়েসী সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। আসলে তার দর্শনচিন্তায় যে শূন্যতা ও ক্ষণবাদ অথবা জড়বাদী ভাবনা উচ্চারিত হয়জ্জতা কখনো স্মৃতিশায়ী প্রেম, কখনো আদিম নৈমিষারণ্যের অন্ধকার, আবার কখনো নির্জিতের নিরুপায় কণ্ঠস্বর। খুব সোজা অর্থে; যে দার্শনিক ভাবেই কবিকে সংজ্ঞায়িত করা হোকজ্জপ্রকৃতির প্রেক্ষাপটে, আর্ত মানবাত্মার পরিত্রাণে আকাশবাণীর আলোকধারায় কবি আসলে ধ্র“ব সত্যের প্রপঞ্চকেই রচনা করেন। মানবতাবাদী বা মানবতন্ত্রী সুধীন্দ্রনাথ ঈশ্বরভাবনা একটি বৃত্তে এঁটে কিংবা অবলম্বী হয়ে নিজস্ব বা বৈশ্বিক যাত্রাপথের দোসর হননি। হিন্দু-বৌদ্ধ বা যে কোনো শাস্ত্রীয় অহংবোধ কবিকে পথ দেখায়নি কিংবা তিনি তার অনুরাগীও হননি; জগতের নিত্যতা নয়, অনিত্যতাকে স্বীকার করে তিনি উক্তিতে আনেনজ্জ‘সর্বম অনিত্যম, সর্বম শূন্যম’। মনোবিশ্বের তথা বস্তুবিশ্বের বেদনা যন্ত্রণাই তাঁকে বিচিত্র দর্শন বা বৌদ্ধিক ভাবের আশ্রয় করেছে। ইন্দ্রিয়যোগের অনুভূতিই তাঁর অভিজ্ঞতাকে ঋজুতা দান করেছে এবং তাই তাঁকে ক্ষণবাদী-নির্বাণতত্ত্ব-জড়বাদ-অদ্বৈতবাদ ইত্যাদি নানা পথে টেনেছে। কবি নৈর্ব্যক্তিক, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ক্ষেত্রে একথা আরো বেশি করে প্রযোজ্যজ্জকিন্তু তাঁর নৈর্ব্যক্তিকতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাহ বা যে মৌহূর্তিক সত্যবোধ স্ফূর্ত হয়েছে তা হল বুদ্ধির যৌক্তিকতা। অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে যে বুদ্ধি তাঁর চৈতন্যে স্তরিত হয় সেখানে প্রচলিত রোম্যান্টিকতা অনেক দূরে সরে গিয়ে anti-romantic দ্যোতনাই পূর্ণ রোম্যান্টিক হয়ে বিরূপ বিশ্বের বীতাগ্নি বেপথু সন্তানকে আলোকিত মাত্রা দান করে। কবির সেখানেই সাফল্য। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত নিজেও বলেছেন, তাঁর কাব্যমাত্রায় যে উল্লম্ফনতা তা আসলে সমকালীন বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়কর মানবতার লেলিহান প্রশ্বাসের অনুশীলন ও উপনীত কদর্যতা। এই বোধের ব্যাপ্তিই তাঁকে তৃষ্ণার্ত করেছিল, প্রণোদনা সৃষ্টি করেছিল, উপলব্ধি ও উক্তির সমন্বয়ে এনেছিল। এখানে কোনো তত্ত্ব বা দর্শন নয় অথবা তত্ত্ব বা দর্শনের মায়া জড়িয়ে থাকলেও কবিভাষ্যে তা আসলে প্রাচীন তথা পরিবর্তিত ভাবনার সাম্প্রতিক সংস্করণ যা কবিকে একটা প্রয়োজনীয়তা থেকে অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য থেকে অতিশয় অস্থায়ী করে তুলেছে। সংবর্ত’র উদ্ধৃতিতে কবির অনিত্যতা—চেতনা বা তাঁর জীবনধর্মের সংস্করণের প্রতিমা একটা সময়ের সাক্ষ্য হয়ে ইঙ্গিতময়তা প্রদান করে :
তখন থাকে না মনে—দিগন্তরে
উচ্ছিষ্ট উঞ্ছের বাঁটোয়ারা,
হিংসার প্রমারা,
স্থগিত মারীর বীজ শস্যশূন্য মাঠে;
চড়ে বসে নিহত বা নির্বাসিত স্বৈরীদের পাঠে
প্রতিদ্বন্দ্বী সর্বেসর্বা যত;
এমন উক্তি আরো স্পষ্ট হয় ‘যখন প্রত্যহ শুনি চার্চিলের স্বেচ্ছাচার বিনা অসাধ্য সাম্রাজ্যরক্ষা, অব্যর্থ প্রলয়,/ এবং যে-ব্যক্তিস্বত্ব সভ্যতার সম্মত আশ্রয়/ তারপরও অব্যাহতি নেই অপঘাত থেকে; একটা হিটলারের নিন্দা সাধে আজ বাধে কি বিবেকে?’ বিবেকের তথা সুকুমারবৃত্তির জয়তী উৎসবে বিশ্বের প্রতিভূদের প্রসঙ্গ সঞ্চালনায় কবি প্রত্যক্ষ নিন্দাবাদ নয়, ‘স্বপ্নাবিষ্ট সভ্যতার নিশ্চিন্ত শিয়রে’ আঘাত বর্ষণ করেন। জাগাতে চান, প্রমত্ত হয়ে ওঠেন। শ্বাপদসংকুল নয় এ কানন, বালখিল্য। নাট্সীদের সংকীর্তনের মুখরতা নয়জ্জমুসোলিনীর যুদ্ধগামী বর্বরতা বা উদ্বাস্তু ট্রটস্কির উত্তরাধিকার নয় এ সভ্যতা। এ সভ্যতার আলো জ্বালায় লাস্যময় লীলায় মুখরিত ‘গ্যেটে, হ্যেল্ডার্লিন, রিল্কে, টমাস মানের উপন্যাস/ দেওয়ালের খোপে খোপে, পথের সনাটা/ ক্লাভিয়েরে, শতায়ু ওকের পাটা।’ সভ্যতা তথা বিশ্বনিন্দাবাদে উচ্চারিত হিটলার, মুসোলিনী ক্লেদ—মেদ আর খেদের আলয় হলেও বিবেকের প্রেতাত্মাকে খুঁজে ফেরেন কবি।
বৈশ্বিক বোধের মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে কবি সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত এসব নিত্য-বিপরীত দ্বন্দ্ব সমাসের প্রজ্ঞায় দুলে এর পরিণামচিন্তায় ব্যাহত হন। কিন্তু কবির শেষ সিদ্ধান্ত কী? বিবেকের জাগরণ কিংবা ইচ্ছার সামর্থ্য প্রসঙ্গ মানি অথবা প্রজ্ঞাবাদী বিশ্বে এক অহংবোধের উল্লম্ফন তাও মানি। কিন্তু সভ্যতায় অসভ্য প্রতিক্রিয়াশীলতার কি শেষ আছে? কবির উচ্চারণ হতাশায় দীর্ণ এবং বাস্তব ইঙ্গিতবাহী :
তথাপি টাকার আজ্ঞা প্রলয়েও লঙ্ঘনীয়
বন্ধকীর নিলামে বিক্রয়
মরোয়াড়ীদের গ্রাসে তুলে দেয় বাঙালীর দায়
বৈশ্বিক আধারে অন্য এক অনুবিশ্বকে তুলে আনেন লেখক। কবি ব্যক্তিক বৈশ্বিক বোধে মেলালেও ব্যক্তিজ্জতার ভূমি কখনই অস্পৃশ্যÑঅনপনেয় থাকে না। ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদী শোষণে স্বদেশের আকর উচ্চারণ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের। মূলত গোটা বিশ্বনিন্দাবাদ, কিংবা বৈশ্বিক চেতনার আড়ালে কবি আসলে ভারতবর্ষের ভূমিকে তুলে ধরতে চান। সংস্কৃত অভিধানী শব্দগুচ্ছের আলিঙ্গনে কবি তুলে আনেন বিরূপ বিশ্বের আধারে ঔপনিবেশিক বাংলাদেশকে। যে বাংলাদেশের সম্ভ্রমহানি ঘটেছে অন্তর্হিত অন্তর্যামীর হাতে। যেখানে স্পেন, ম্রিয়মান চীন আর কবন্ধ ফরাসি দেশ একই আজ্ঞায় উত্তীর্ণ। কবির নেতিবাচকতা নয় কিংবা নেতিবাচক হলেও তা প্রচণ্ড ইতিবাচক উদ্দিষ্ট নিয়ে উত্তীর্ণ পংক্তিমালায়। কবি স্বদেশী প্রসঙ্গকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিদেশী করে তোলেন। আবার বিদেশীকে স্বদেশ করে তুলে কী আশ্চর্য অনুপ্রেরণা তিনি নিজের ঐতিহ্যকে ধরেই মেসেজ প্রদান করেন :
কিন্তু মানবেতিহাসে মাঝে মাঝে আসে মলমাস,
কর্মচ্যুৎ পৃথিবী যখন
উন্মার্গ ঘুমের ঘোরে, নাক্ষত্রিক সহযাত্রীগণ,
সে-অপচারীকে ভুলে, ছোটে লোকাতীতে।
এক সৌন্দর্যমান বিশ্বকেই কবি প্রত্যক্ষ করেন। যেখানে অনির্বাণ জেগে থাকে ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ (!), সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা (!) আর নাক্ষত্রিক সহযাত্রীগণ ঘুমের ঘোরে উন্মার্গ পৃথিবীকে পাশ কেটে ইঙ্গিতবাহী বিবেকে লোকাতীতে যাত্রা করেন। দু’দুটো যুদ্ধে, একাধিক বিপ্লবে অর্ধশতকের যে আয়োজন সেখানে পৃথিবী সত্যিই কর্মচ্যুত, সে এখন উন্মার্গে ঘুমে আহত; তার ভেতরে-বাইরে—‘কোটি কোটি শব পচে অগভীর গোরে’, আর ‘মেদিনী মুখর এক নায়কের স্তবে’।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা অন্য ভাষা পেয়েছে অভিজ্ঞতা ও বিশ্বচৈতন্যের মাত্রিকতার গুণে। বুদ্ধি ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কবি দাঁড়িয়ে যান অন্য আবাহনে। তবু, অতএব, অতঃপর, কিন্তু, অবশ, অথচ ইত্যাদি অব্যয় শব্দের অর্থগুণে মানবেতিহাস যেমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে তেমনি সভ্যতার বাধা ও বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ হয়ে কবি অহং-প্রবণতায় নিজের পরিচয় দেন নিজের ভাষায় :
আমি বিংশ শতাব্দীর
সমান বয়সী; মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে; বীর
নই; তবু জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্ল¬বে বিপ্ল¬বে
বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে
নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে
যত না পশ্চাৎপদ, ততোধিক বিমুখ অতীতে
বিনষ্টের সময়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যে বিনষ্ট জগতের চিত্র এঁকেছেন তা সমকালীন বিশ্বের প্রতি সভ্যতার অঙ্গীকার। অনেকটা সময় অতিক্রম হলেও বাংলা কবিতায় শতাব্দী— সমান সুধীন্দ্রনাথের বিনষ্ট বিশ্বের সামসঙ্গীত শ্রবণ শেষ হয়নি। শাশ্বত প্রেম পৃথিবীতে নানা রঙের মেলায় বৈচিত্র্য নিয়ে বেঁচে থাকে, কখনো তা পর্যবসিত হয় স্মৃতিমালায়, কখনো কম্পমান বসন্তে পায় উজ্জীবনী মন্ত্র, আবার কখনো অতৃপ্ত তৃষা কৌতূহলে অনুপ্রভা ছড়ায়। কবিতা মানবসভ্যতায় হাজার বিষয়বৈচিত্র্যে যেভাবেই সাধের ময়ূরপঙ্খীর বাহন হোক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘অন্যায় রণে বার বার বিধ্বস্ত’ হয়েই মোহিনী মায়ায় তার নির্দ্বন্দ্ব নান্দীপাঠ রচিয়েছেন, অনাদ্যন্ত রাগিণীতে। বোধ করি শতাব্দী শেষ হলেও তার মর্ম শেষ হয়নি। তাঁর শব্দ-ভাষ্যে পাথেয়, স্মৃতি আর অনাদ্যন্ত পন্থার সমাহার এক প্রতীকী দ্যোতনায় কালসীমা অতিক্রম করেছে। কবির এ সাফল্য বিষয় ও আঙ্গিক-অনুষঙ্গি কাব্যবোধে যতোটা তার চেয়ে বেশি শিল্পের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি।
মহাকালের অনিমেষ আকর্ষণে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত গাজনপাগল বৈরাগীর মতো সমস্ত হলাহল পান করে বিশ্ববাস্তবতাকে ইন্দ্রিয়ের আয়ত্তে এনেছেন। এক্ষেত্রে যথেষ্ট নিরাসক্ত হয়ে নৈর্ব্যক্তিক কবির জ্ঞানে তিনি উচ্চারণ করেছেন : ‘যদি বাঁচতে চায়, তবে ধ্বংসাবশিষ্ট পৈতৃক প্রাসাদের অন্তঃপুরে বসে রূপকথার রাজপুতের স্বপ্ন দেখা কাব্যের আর চলবে না; তাকে বেরিয়ে আসতে হবে, পোকায় খাওয়া শিরোপা, মরচে-পড়া সাঁজোয়া, রজ্জুসার জয়মাল্য ফেলে তাকে বেরিয়ে আসতে হবে হাটের মাঝে, যেখানে পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ, দেব-দানব সমস্বরে জটলা পাকাতে ব্যস্ত। কাব্যকে এমন বোধে কবি যুগরূপের ছাঁচে ফেলে সাজিয়েছেন। কবি ব্যক্তিত্বের স্ফুরণে, বিতর্ক-বিচারের মুখাপেক্ষী হয়ে কাব্য যে একজন সনির্বন্ধ মানুষের পাণ্ডুলিপি হয়ে ওঠে, তা বৈদগ্ধ্যেরই নামান্তর। কবিতা সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই উচ্চারণ নির্বিশেষে মানুষের বাস্তবতায় অনাদি-অনন্তের বাণী হয়ে সৌন্দর্যের অভিমুখে কিছু অবিচল সত্যকে প্রকাশ করে। এজন্যই তিনি এলিয়ট-পাউন্ড-ইয়েটস এবং মালার্মে-বোদলেয়ারদের বিষয় ও প্রতীকী আঙ্গিকে আদিষ্ট হয়ে কাব্যের পরিসর গড়ে তোলেন। ভাব-ভাষা ও ছন্দ নিয়েও কবির নিরীক্ষা সুস্পষ্ট : আবেগের সঙ্গে ছন্দের সংমিশ্রণেই কাব্যের উৎপত্তি। ‘ছন্দ আর আবেগ যমজ, তাদের টান নাড়ীর টান, এবং আবেগ আর বেগ বিষমার্থবাচক; আবেগের মধ্যে বেগের চেয়ে বিরামই বেশি।’ সুধীন্দ্রনাথের কাব্য জুড়ে যৌক্তিক রোম্যান্টিকতায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগের পরিমণ্ডল চোখে পড়ে সেখানে কাব্যের উৎপত্তি এবং উৎপত্তির পরতে যে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব কবিকে কাব্যের প্রতি অনিবার্য করে তোলে, সেটা বোঝাই সবচেয়ে বড় কাজ। বোধকরি এমনটা বুঝলে সুধীন্দ্রনাথ যেমন দুর্বোধ্য থাকবেন না তেমনি তিরিশের অন্যান্য কবিদের মাঝেও নিরর্থক হারিয়ে যাবেন না। সত্যিকার অর্থে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসর অনেক বড়জ্জতাছাড়া পাশ্চাত্য প্রভাবনার ঋদ্ধ-আনুগত্যে তিনি যে কাব্যবৃত্ত রচনা করেছেন তা বাংলা কবিতার তথা যে কোনো ভাষার কবিতা-অনুরাগীর জন্য ব্যতিক্রমী পাওয়া।

জানুয়ারি ২০০৪

 

 

 

 

সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা :
বিরূপ স্বদেশের প্রসন্ন চিত্ররূপ

সাহিত্যের প্রাচীন আঙ্গিক কবিতা। কবিতা ব্যক্তিমননের অনির্বচনীয় ইঙ্গিত। কবিতা সময়ের ও সমাজের ইতিহাসকে মর্মে ধারণ করে। সমাজের বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা তার আঙ্গিক বদলায়। প্রবহমান সময়ে সমাজ-সংগঠনের রূপ এবং ‘ব্যক্তি’মানুষের উৎপাদনসম্পর্কের সূত্র ধরে সাহিত্য তার বিবেচনাকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পায়। সমাজের ভেতর থেকেই মূলত এ প্রয়াসী রূপ অর্জিত হয়। কারণ, যে সমাজ-সংগঠনের প্রতিবেশে মানুষ বেড়ে ওঠে কিংবা সমাজ-
স্তরবিন্যাসের যে-প্রক্রিয়া মানুষের জীবনযাপন, স্বপ্ন-সম্ভাবনা বা সমগ্রতার প্রতিভাস-নির্মাণে প্রাণনা জোগায়, তাই সাহিত্যের স্পন্দিত রূপ। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে যে-মানুষ আমরা পাই, তা সমাজ-সংগঠনের পরিকাঠামোয় অপরিমেয় শক্তির ইচ্ছাকামী এবং প্রাণান্ত প্রতিষ্ঠার প্রতিরোধদীপ্ত জীবনবাদী মানুষ। দেব-দেবী কিংবা অলৌকিক শক্তির পুজো কিংবা নিবেদনের মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠা এবং শক্তির আধারকেই সে নিরূপিত করতে চেয়েছে। মধ্যযুগের কবিরা সমাজ-সংশ্লিষ্ট এ-মানুষকে চিত্রায়িত করেছেন—সমাজের পরোক্ষ ইঙ্গিতকে কাব্যের সীমানায় বিশ্লে¬ষিত করেছেন। সে-সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র বা রাজনীতির বৃত্তে তীব্রভাবে আবদ্ধ হয়নি। বাঙালি সমাজে রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভব, বিকাশ ও প্রয়োগ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেজ্জঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে দ্বন্দ্বাত্মক মুক্তিকামী মানুষের চৈতন্যের খণ্ডিত প্রসারণে, জাতীয়তাবাদী চিন্তার নবরূপায়ণে। তবে প্রসঙ্গত সত্য, সমাজের ক্রমপ্রসারিত এ ধারণা আপেক্ষিক এবং সহজ চিন্তায় মোটা দাগে অঙ্কিত। কেননা আধুনিকতা, জাতীয়তাবাদী রূপের সংজ্ঞা ও স্বরূপ একেবারেই subjective (ব্যক্তিবিবেচিত)। যা একেকজনের বিশ্লে¬ষণে একেকরূপে বিবর্ধিত। যা হোক, সাহিত্যের মনস্বীচিন্তার অবভাসিত রূপ প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত হয় আধুনিক সময়ে। আধুনিক যুগে সাহিত্যের অনিবার্য প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও রাজনীতি। কেননা এ-সময়ে স্বাধীনতা বা স্বাজাত্যবোধের সূত্র ধরে রাষ্ট্র, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব—এবং এর ভেতর দিয়ে ব্যক্তিমানুষের সংশ্লিষ্টতা চাওয়া-পাওয়া, আশা-স্বপ্ন, মর্যাদা-আভিজাত্য ইত্যাদি একটা রূপ পেতে থাকে। এর ফলে ক্রমশ জটিলতা বাড়তে থাকে, ব্যক্তিমানুষ প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়। তীব্রতর সচেতনতাবোধে যোগাযোগের তীক্ষ্ণতায় তার পূর্বতর পরিবেশ— মননধর্ম বদলে যায়। শহুরে জীবনে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে আবদ্ধ হয়ে নিজের পথ ও মর্যাদাকে ক্রমবিকশিত করতে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জৌলুস, নানা প্রান্তের যোগাযোগ, প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তির আভাস ইত্যাদি তাকে যেমন নাগরিক বানায়, তেমনি সিভিল সমাজের মানুষ হিসেবে সে প্রতিনিয়ত প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির জ্ঞানে নিরঙ্কুশ হতে থাকে। ব্যক্তিমানুষের এসব প্রবণতার সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রের রাজনীতি। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকর্তাই ব্যক্তির সত্তাকে নিরন্তর সচকিত করে রাখে। উপনিবেশ-আবদ্ধ বঙ্গদেশ এবং উপনিবেশ-উত্তর পূর্ব বাংলা নানাভাবে রাষ্ট্রকে বিশেষ শ্রেণিচরিত্রের প্রতিভূতে পরিণত করে রাখে। কখনো শাসন-শোষণ-বঞ্চনার সাম্রাজ্যবাদী রূপ আবার কখনো একই প্রক্রিয়ার উর্দি-আচ্ছাদিত স্বৈরশাসকের রূপ। সেজন্য সাতচল্লিশ-পূর্ব বা পরবর্তী বাংলাদেশ প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়াশীল এবং ক্ষয়িষ্ণুরূপে উত্থাপিত। এমন অবরুদ্ধ রাষ্ট্র্রÑ কাঠামোয় ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে থাকে ব্যক্তি। এবং একই সঙ্গে ব্যক্তি মুক্তিকামী হয়ে যুদ্ধে নামে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির আকাক্সক্ষায়। বাংলা সাহিত্যে কবিতার ইতিহাসে ত্রিশোত্তর কাল তাৎপর্যপূর্ণ মর্যাদা পায় দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের ব্যক্তিচিত্র নির্মাণ প্রয়াস থেকে। উত্তুঙ্গমুখর সময়তাৎপর্য তৎকালীন কবিদের মননচিন্তার পরত তৈরি করে এবং সৃষ্ট সে-অবক্ষয়ী জীবনরূপ, কেউবা মার্কসবাদী-সাম্যবাদী, কেউবা বুর্জোয়া মানবতাবাদী এবং রাজনৈতিক দর্শনচিন্তায় মানবমুক্তির প্রসঙ্গ থেকে। কবিতা যে-বিষয়কে অবলম্বন করে সেখানে প্রতিমুহূর্তে তার আঙ্গিক বদলায়জ্জভাষা, ছন্দ, অলঙ্কারে আনে বিশেষ মাত্রার পরিবর্তন। কবিতার উল্লিখিত চর্চার এ-বিষয়গুলো নিছক সমাজ-পাদপীঠে বসবাস করা মানুষের ছাপচিত্র নয়জ্জতার মধ্যে লুক্কায়িত আছে পরিবর্তিত জগৎ-জীবন-দর্শনের কাক্সিক্ষত প্রণোদনা। এই প্রণোদনাই সময়ের বিক্ষেপে কাব্যে তৈরি করে নির্ভার শিল্পদ্যোতনা। বাংলাদেশের কবি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) প্রগতিপিয়াসী শিল্পচিন্তায় অনবদ্য এক কাব্যশৈলী নির্মাণ করেছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তাঁর সামনে ছিল ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ। দক্ষ সাংগঠনিক চিন্তায় সিকান্দার আবু জাফর শুধু সময়ের মানুষ নন—সময়ের মধ্য থেকে সমাজ-বিবর্তনের স্বরূপকে চিনেছেন, দায়বদ্ধতার কণ্টকিত উচ্ছ্বাসকে অনিবার্য করে ধারণ করেছেন আর শিল্পকে নির্ভার রেখে অনির্বচনীয় রূপকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কবিতা দেশ-কাল-সমাজমনস্ক জ্ঞানে ক্রমশ পর্যায় অতিক্রম করেছে। অতিক্রান্ত পথে কবির নিজের উচ্চারণ : ‘কি নিয়ে কবিতা লিখব, কিভাবে লিখব, যা লিখব তার আবেদন কতখানি শিল্পায়ত বা লোকায়ত হবে, প্রকাশিত ভাব রসনাভূতিতে উদ্দীপ্ত করবে না বক্রকটাক্ষ চিত্রলোকে বিপ্ল¬ব ঘটাবে, বক্রকটাক্ষ আলংকারিক হবে না নিগূঢ় অর্থবহ হবে, অর্থবহ বক্রকটাক্ষ প্রতীকাশ্রয়ী হবে না সরলপন্থী হবে, পাঠকচিত্তে রসোপলব্ধির প্রতিক্রিয়া আগে থেকে নির্ণয় করে কি ধরনের রস পরিবেশন করা হবে, রসতত্ত্বে কবিরাজ বিশ্বনাথ, আচার্য মন্মট ভট্ট থেকে শুরু করে কান্ট, হিউম, হেগেল, রবীন্দ্রনাথ কাকে অনুসরণ করা যাবে, নির্মিত কবিতা চিরায়ত আবেদনের রাজ্যসীমায় প্রবেশ করতে পারবে কি-না কবিতা লেখার আগে এত কথা আমি কখনও ভাবিনি।’ প্রকৃত অর্থে, কবির শিল্পিত দৃষ্টিই তাঁকে সমস্ত বাসনা ও উচ্ছ্বাস থেকে নিবৃত্তি দান করেছে। এবং এই নিবৃত্তিই তাঁর মৌল শিল্পচেতনা। যার মধ্যে বিপুলভাবে প্রবহমান দেশ-কাল-সমাজচেতনা। লোকায়ত এবং সচেতন জীবনসিদ্ধ এ-কবির প্রসন্ন প্রহর, তিমিরান্তিক ও বৈরী বৃষ্টিতে বের হয় ১৯৬৫-তে। এছাড়া কবিতা ১৩৭২, কবিতা ১৩৭৪, বৃশ্চিক লগ্ন ও বাংলা ছাড়ো—ইত্যাদি তাঁর প্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ। কবির বৃশ্চিক লগ্ন ও বাঙলা ছাড়ো বের হয় মুক্তিযুদ্ধের বছর ১৯৭১-এ। সিকান্দার আবু জাফর পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তনে চল্লিশের দশক থেকে রচিত কবিতাগুলোতে ঋদ্ধ মনন দর্পনে ক্রমাগত সময়-স্বদেশ-সমাজমুক্তির একাত্মতায় নিজের প্রতিকৃতিকেই অঙ্কন করে চলেছেন। এক্ষেত্রে প্রবহমান সময়ে তাঁর পর্বান্তর ঘটেছে এবং সামষ্টিক দর্শনের মধ্যেই নিজের প্রত্যয় ও মুক্তির ক্ষেদ কিংবা আশাবাদ উচ্চারিত হয়েছে। কবিতার বিষয়বস্তুতে তাঁর এ-উচ্চারণ কখনো শান্ত, সংযত, মৌন-সমাহিত কখনো তীক্ষ্ণ ফলার মতো ঝলসিত উচ্চকিত।
কবির প্রথম কাব্য প্রসন্ন প্রহরের কবিতাগুলো বিভাগপূর্ব সময়ের রচনা। বাংলা কবিতার মৌল ধারা থেকেই অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছেন কবি। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে সিকান্দার আবু জাফর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৩-১৯৮৮), বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২), সমর সেন (১৯১৬-১৯৮৭), সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৫) প্রমুখ কবির। নজরুলের (১৮৯৯-১৯৭৬) কবিপ্রাণনা অনেকাংশে প্রণোদনা দিয়েছে সিকান্দার আবু জাফরকে। এমনটা সম্ভব হয়েছিল সিকান্দার আবু জাফরের সমকালীন সমাজমনস্কতা, সাম্রাজ্যবাদী শাসনমুক্তির অভীপ্সা তথা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে নিরবচ্ছিন্ন নিজেকে যুক্ত করার প্রণোদনা— সেখানে দেশ তার মাতা-মাতৃকা প্রতীকে উঠে এসেছে। নজরুলের কাব্যাদর্শ কবির সামনে ছিল। স্বদেশমুক্তির বাসনার সঙ্গে সঙ্গে সমাজমুক্তির প্রসঙ্গটিও অনিবার্যরূপে কবির মধ্যে নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করেছে। সেজন্য অনেক ক্ষেদ, বেদনা, ক্ষোভ কাজ করেছে তাঁর মধ্যে। প্রসন্ন প্রহর কাব্যের শেষ কবিতা “মৃত্যু নেই”-তে উচ্চারণ :
এই ভিড় এই কোলাহল
অবিশ্রান্ত জনতার অচ্ছেদ্য শিকল
আমার চিন্তার ক্লান্ত অগণ্য নিমেষ
ঘিরে আছে নির্মম আক্রোশে।
মৃত্যু নেই অরণ্যধূলিতে;
মুক্তি নেই আকাশে আকাশে।
শুধু দাহ আর্তনাদ,
মৃতশিল্প হৃদয়ের একান্ত দীনতা,
মৃত্যু নেইজ্জমুক্তি নেই তবু।
পঙ্ক্তিগুচ্ছে মাত্রাবৃত্তের স্বচ্ছন্দ ভাবপ্রয়াস চিত্তে সংহত রূপ তৈরি করে। একরকমের আত্ম-উচ্চারণ রচিত হয় প্রবহমান স্বরে, শব্দগুচ্ছ কাতর অনুভবে ক্ষেদ ছড়ায়; স্বদেশের নিরঙ্কুশ আনুগত্য তৈরি করে উচ্ছ্বাসময় গ্লানিতপ্ত আবেগ। সময়-নির্ণয়ে উদ্ধৃত কবিতাগুলো তপ্ত পাকিস্তান আন্দোলনের আবহসিঞ্চিত; যেখানে লুক্কায়িত সামন্ত-উপনিবেশবাদের বিনষ্টির মন্ত্র। ব্যক্তিমানুষ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের খোলস থেকে মুক্তি চায়জ্জএবং তার উপর কবিতা নির্ণীত হয় ক্লেদাক্ত শ্যেন স্বরে :
জীবনের বেড়াজালে
নিপীড়িত মৃত্যু শুধু কাঁদে
প্রতিকারহীন তিক্ত ঘৃণ্য অপবাদে।
(“মৃত্যু নেই”)
প্রসন্ন প্রহর কাব্যের কবিতাগুলো মূলত অসাম্প্রদায়িক বৃত্তবন্ধনে তরল আবেগের সীমানায় বিচ্ছুরিত। কবির উল্লাস বিষয়-নির্বাচনে ব্যক্তি হিসেবে প্রাণবন্ত—কাব্যের উৎসমুখে নজরুল, প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা সুকান্ত দাঁড়িয়ে। অনুমান করা যায়, পাকিস্তানের স্বপ্নের মধ্যে থেকেও গভীর অসাম্প্রদায়িক; দেশ-মাতা-মাতৃকা চিত্ত জুড়ে প্রাচুর্য ছড়াচ্ছে আর মানুষ-মানবতাবাদ মনন জুড়ে আচ্ছন্ন। সিকান্দার আবু জাফর সময়ের স্রোতে গা ভাসালেও সচেতনজ্জকাব্যমূল্যে সেজন্য মৌলিক প্রাণনা অটুট। স্বকাল-স্বসমাজ এই বিষয়ে তাঁর আবেগদীপ্ত মুক্তিমন্ত্র—প্রথম কাব্যে সেজন্য বোধের তারল্য অবসিত নয়। প্রমাণ “ফাল্গুন হত গান”, “অমরত্ব”, “জীবনের স্বাক্ষর”, “রক্তাক্ত রাজপথ”, “দাহ”, “দুই ধারা”, “শীর্ণ পাঁজর”, “আগামী দিনের স্বপ্ন”জ্জএসব কবিতা। প্রচ্ছন্ন শিল্পরূপে বহমান স্বদেশচিন্তা ও আশাবাদ কবির উদ্দিষ্ট—আলেখ্য। প্রসন্ন প্রহর কাব্যে এমন রূপবিন্যাস রচিত হয় বিদ্রুপাত্মক উচ্চারণ নিমিত্তে :
অবারিত হোমাঞ্চল ভ’রে
যেখানে নিস্তব্ধ দিনে সূর্যের সুবর্ণ পড়ে ঝরে,
যেখানে প্রশান্ত রাতে শঙ্কাহীন তারকারা চলে
আকাশের ছায়াপথ তলে।
যেখানে বন্ধন নেই, নেই কোনো পাষাণশৃঙ্খল
শুধু মুক্তি শুধু গান উদ্দাম চঞ্চল।
যেখানে প্রাচীর নেই, আছে শুধু আমন্ত্রণ নীরবে ছড়ানো,
যেখানে আঘাত নেই, আছে শুধু তৃণে তৃণে মমতা জড়ানো।
সেই মন, সে আমার সুন্দরের পুণ্যতীর্থভূমি।
(“দুই ধারা”)
বিদ্রƒপের আধারেই কি উঠে আসে আশাবাদ? তীক্ষ্ণ ও গভীর কাব্যিক উচ্চারণ; নির্ভার ছন্দের বুনুনি, বিষয়বস্তুতে সুন্দরের মমতা ও আবহ জড়ানো। আশাবাদের জন্য রচিত ভূমিতে তৈরি হয় পুরনো ঐতিহ্য, ছড়ানো থাকে পুরাণের (সুঃয) আমেজ। কিন্তু সবকিছুর ভেতরে নিরঙ্কুশ কাজ করে স্বদেশ-মাতৃকা; প্রেরণা কিংবা জনজাগরণের উৎসারণ : ‘শুধু ক্ষমা করে যাব সবই/ বারবার করে লিখেছি যাদের চিনে।/ ভেঙে ভেঙে যাব, নিঃশেষ হবো তবু/ ওপারের কাছে জড়াব না কোনো ঋণে।’ অহং এবং আত্মপ্রত্যয় কম নয় কবির। পক্ষ চিনে নিয়েছেন কবি, সামনে চলার পথকে অবমুক্ত করতে চান। প্রসন্ন প্রহর কাব্যে “আগামী দিনের স্বপ্ন” আছেজ্জজীবনের উদ্বোধনী মন্ত্রে জানিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে : ‘মানবসত্তা এখনও অন্তরীণ।/ এই রাত্রির কোথা অবশেষ তোমাকে জানাতে হবে/ নিশান্ত- দেশে নব পূর্বাশা তোমাকে আনতে হবে।’
কবির মননচিন্তা এভাবেই কল্লোল-উত্তর সময়ের মানবমুক্তির বাসনা দীর্ঘ প্রত্যয় নিয়ে উচ্চারিত হয়। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে দুঃসহ জীবনচিন্তায় আগ্রাসী পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল বাস্তবতায় মানবতার পর্যুদস্ত রূপ, বিরূপ-বৈরী প্রতিবেশ কবিকে অনিবার্য সরল আখ্যানের দিকে ঠেলে দেয়। ব্যক্তিচিন্তায় প্রতিরূপিত স্বদেশ আত্মার নির্মোহ আখ্যান রচনা করতে পারে না। কবিচেতনায় প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদের লোলুপদৃষ্টি, কলুষ কীর্তির হাতছানি অনাসৃষ্টির স্কেচ জমাট বাঁধছে। এ প্রতিবেশে কবি মাঝে মাঝে ছন্দহীন, স্পষ্ট পঙ্ক্তিতে প্রত্যয়ী আবার কখনো বা অমিল-অমিত্র মিলবিন্যাসে আরূঢ় অবসিত। তরুণ কবি যে-বাসনায় শিল্প বানাতে চান কিংবা আহৃত শিল্পরস অনিবার্যরূপে প্রকাশ করতে চান তা আর নির্মোহ-নৈর্ব্যক্তিক কিংবা পরোক্ষ থাকে না। দীপিত আলো অন্যমাত্রায় আত্মপরিচয় ঘোষণা করে—অনেকটা সাম্যবাদের সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের আদলে : ‘আমি আজকের কবি।/ আমার আকাশে যে সবিতা জ্বলে/ তারি রাঙা তুলি দিয়ে/ আমি আঁকি বসে বর্তমানের ছবি।’ নিজের এ নির্ভার উচ্চারণের কারণ কী? বর্তমানের ছবি নির্মাণের অনিবার্যতা কেন? উত্তর কবিবাক্যে নিহিত :
চিত্তহীনের যে অস্থি আজ
হয়েছে দাবার ঘুঁটি
নামবে সে কাল সংহার হয়ে
বজ্র-বাঁধন টুটি।
(“আগামী দিনের স্বপ্ন”)
প্রসন্ন প্রহর কাব্যে কবি সিকান্দার আবু জাফর অনেকটা মৃদু-প্রশান্ত-আবেগী। শিল্পচর্চায় সমাজ ও সমাজপ্রসূত ক্ষুৎকাতর মানুষের অবভাস যে-মাত্রায় সংহতরূপ পাবার কথা তা আর সেভাবে চৈতন্যে ধরা দেয় না। নির্লজ্জ, অক্ষয় সাম্রাজ্য, ‘বিক্ষুব্ধ গর্জন-ঘন-ঝঞ্ঝার নিশ্বাসে’—-বিষণ্ন স্নিগ্ধ পূর্ণিমার মায়া। কবির চিন্তনে প্রসন্ন প্রহর স্পষ্ট উচ্চারণ প্রয়াসে স্বচ্ছ শিল্পরূপ তাৎপর্যপূর্ণ মর্যাদা পায়। সেখানে পরিশীলিত মনন-ভাবনায় স্বকাল ও স্বদেশ অনিবার্য অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু পরবর্তী কাব্যে তিমিরান্তিক অনেকটা কাব্যচিন্তনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা—যেখানে বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে নব-রাষ্ট্রের আশা-প্রচ্ছায়া এবং একই সঙ্গে আশাহীনতা, স্বপ্নভঙ্গ তাৎপর্যপূর্ণ অবভাস তৈরি করে। প্রসঙ্গত, সিকান্দার আবু জাফর তীব্র সমাজ-সচেতন কবি এবং ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাসনা তাঁর সময়ে অনিবার্য হলেও—সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা এবং অসাম্প্রদায়িকতা মানবিকতার প্রধান আদর্শ হিসেবেই চৈতন্যে সক্রিয় থেকেছে। সাতচল্লিশোত্তর সময়ে কবির এ মানবতাবাদী আদর্শের অনুপ্রেরণা আরো সজীব ও প্রাণবন্ত হয়েছে। কিন্তু চারিত্র্য বদলে গেছে, কারণ পাকিস্তান না-হওয়ার আগের আবেগ ও অনুভূতির অকুস্থল আর পরের অনুভূতি এক নয়। বিশেষত বাঙালি মুসলমান এক জায়গায় স্থির থাকতে পারেনি। শিল্পচর্চায় একটি জাতির সংস্কৃতির বিকাশ ও অনুপ্রেরণা কিংবা তার ভেতরের সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো দৈনন্দিনতার মধ্যেই চর্চিত হতে থাকে। সেখানে ন্যায়নিষ্ঠা, দায়বোধ, সুস্থ ও পরিশীলিত জীবনায়ন, আত্মত্যাগী মনোবৃত্তি সমাজ ও সভ্যতার বিনির্মাণে একরকমের সম্ভাব্যতা তৈরি করে। একজন উদ্দিষ্ট ও সচেতন শিল্পী হিসেবে সিকান্দার আবু জাফরের এ-প্রাণনা উপভোগের শক্তি যেমন ছিল, তেমনি তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাসনাও নির্ধারিত ছিল। সেজন্য কবির বঞ্চিত বাঙালি চিত্ত, নিঃশব্দ শব্দশীলনে স্বেচ্ছাচারী শাসকের বিপক্ষে কূটাভাস; শিল্পের সংজ্ঞায়নে তা যে-মাত্রাই পাক—কবির দায়বদ্ধতার জায়গায় নির্বিচার অনুরাগে রোম্যান্টিকতার পরিচ্ছদই রচিত হয় বৈকি :
এখনও হয়ত সকল নিভৃত মর্ম
হয়নি কীটাণুদষ্ট
সে কথাও তবু বারবার মনে ভাবছি
নানান জন্তু অবাধে দলছে
মানুষের অধিকার।
(“দ্বন্দ্ব”)
শ্লেষাত্মক উচ্চারণে এক সময় লিখতে হয় পূর্বসূরিদের কথা, ভাষা-শহীদদের জন্য যেমনটা বলেন :
তাদের রক্তের মূল্য
বছরে একটি দিন
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়ে
একটি যুগের মর্যাদা পেয়েছে।
(“একুশে ফেব্র“য়ারি”)
নজরুল-প্রাণনা কাব্যগ্রন্থিতে ছড়ানো থাকলেও দেশ-কালের নিষ্ঠা রক্ষা করতে পারেন না কবি। দুঃখ-বেদনার প্রতিধ্বনি আছে “নিষ্কর্ষ”, “আকাল”, “তিমির-তিক্ত”, “রাত্রির অসত্র” ইত্যাদি কবিতায়। আবার উচ্ছ্বাস-আশাবাদ কিংবা আনন্দ অনেক সময়েই কবিচিত্রে টঙ্কার দিয়ে উঠেছেজ্জএসব নির্বিকার আত্মজীবনীর খসড়া। আত্মপরিচয় উচ্চারণ করেন স্মৃতিসত্তায় কিংবা বাস্তবের বিষাদ ছায়ার করাল প্রাকারে। এ-কাব্যের প্রথমদিকে কবি প্রসন্ন প্রহরের আভাস ছড়ালেও ক্রমশ তা ছাড়িয়ে গেছে—শিল্প খুঁজে পেয়েছে অন্য এক পদাঙ্ক। স্পষ্টতা কিংবা নিরঙ্কুশ আত্মত্যাগ হয়তো নয়, কিন্তু আকাঙ্ক্ষায় ক্লান্তিহীনতা শরীর জুড়ে সুপরিচিত এক গন্ধ ছড়ায়। এই বিচ্ছুরিত গন্ধই কবির অনেক পঙ্ক্তিকে কাব্যমেধায় রূপান্তরিত করেছে। এক্ষেত্রে কবি বিশেষ কারো প্রণোদনা বা উদ্দেশ্য নয়—নিরন্তর নিজেরই উচ্ছ্বাসে প্রাণবন্ত। কবিতা সেজন্য বিশেষ মুহূর্তের শিল্প হলেও নিরঙ্কুশ মহোৎসবের অঙ্গীকার, সন্দেহ নেই। সিকান্দার আবু জাফর তিমিরান্তিকে অনেকটা নিজেকে কাটিয়ে উঠেছেন—-পূর্বোক্ত কাব্যের আবেগের জায়গা থেকে। উদাহরণ :
রাক্ষসের আবির্ভাবে সন্ত্রস্ত যখন
মানুষ মৃত্তিকা
তীক্ষ্ণধার মারণাস্ত্র সহসা নৃশংস হল
এই দু’টি সাধারণ হাতে
এ-হাতে ঘাতক হয়ে মেনে নিল জীবনের
অনিবার্য দাবী।
(“ভূমিকা”)
অস্পষ্ট নয়, রাজনৈতিক-ইতিহাসও নয়, তবে ‘অনিবার্য দাবী’ অনুমান করা সম্ভব।
কবিতা শিল্প হিসেবে নিছক শব্দকেই অর্থায়িত করবে তা যেমনটা নয়, তেমনি ভাবের প্রবহমানতায় দূরাগত অনির্দেশ ধ্বনিই প্রাণনা সৃষ্টি করবে, তাও বুঝি ঠিক নয়। কেননা কবিতা এমন এক শিল্প, যা তাৎক্ষণিক ভাবনার নিরঙ্কুশ সত্যকে আবেগের আচ্ছাদনে অনির্বচনীয় অনুরাগ তৈরি করে। সিকান্দার আবু জাফর সেজন্যই বলেন, ‘পরিকল্পনার ছক কেটে কবিতা আমি লিখিওনি কখনও। মনের আকাশে ‘কাব্যের সমগ্র ধারণা’ চাঁদোয়া টানিয়ে, তবে চতুর্দিকের ব্যাপ্তি ঘিরে ‘কাব্যলক্ষণের’ বেড়া দিয়ে, ‘কাব্যের বিষয়বস্তু’ বুদ্ধিগ্রাহ্য হবে না ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবে তা নির্ণয় করে এবং সেই নির্ণিত তত্ত্ব আনন্দিত অথবা বেদনার্ত মানসিকতার রসাশ্রয়ে সচেতন কবিসত্তার সঙ্গে একীভূত হচ্ছে কিনা, চৈতন্যের বিশিষ্টতা কাব্য-আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে কিনা, অনুভূতি বোধক্রিয়াকে আশ্রয় করে সক্রিয় কিনা এবং তত্ত্বে ও তথ্যে সম্পৃক্ত থেকে জ্ঞানরাজ্যে তার অভিযাত্রা অবাধ কিনা, এইসব মতবাদের মিছিলে চলতে চলতে কবিতা লেখা কতটা সম্ভব তা নিয়েও আমি কখনও ভাবতে বসিনি।’ পরিকল্পিত শব্দবুনুনি নয়, নিছক উচ্চারণের অনুরাগ এবং করোটির ভেতরের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত অনিবার্যতা তাঁর কবিতার শ্রেয়জ্ঞান। প্রসন্ন প্রহর থেকে তিমিরান্তিকে সে-সত্তা একটা পর্যায়ে উত্তরিত। সেখানে বিরূপ স্বদেশের প্রতিরূপ চিত্রিত হয় বিদীর্ণ অনুভব-যাতনা থেকে। এই অনুভব-যাতনাই তার আঙ্গিক রচনা করে। কখনো স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ উক্তি আর কখনো নিরঙ্কুশ আত্মত্যাগী অভীপ্সা উপলব্ধির আয়ত্তে আসে। সেখানে রোম্যান্টিক চিত্র তৈরি হয়, ঋদ্ধ মনন-মেধার স্বাক্ষরে; প্রেমও একটা প্রতিরূপ সৃষ্টি করে— সে-সৃষ্টি যেন নির্ভার শরীর-মনের-আত্মার গ্রন্থ নয়, শঙ্কিত স্বদেশচিন্তন-সিক্ত আবেগকে উন্মুক্ত করে অভিজ্ঞতালব্ধ ও বিষয়বুদ্ধিতে দীপিত করে :
তোমার রহস্যের কপাট খুলে দাও,
আমাকে দাও সেই গুপ্ত গুহায় ঢোকার অনুমতি।
নইলে জানব না আমি কিছুই
দেশের সমাজের মানুষের,
আমি অসম্পূর্ণ থেকে যাবো।
(“হে রাত্রি কথা কও”)
কবিতার বিষয়বস্তু নির্মাণ হয় এরূপ প্রবহমান স্বদেশ ও সমাজচিন্তনে যেটা আরো তীব্রতর হয়েছে বৈরী বৃষ্টি কাব্যগ্রন্থে। সিকান্দার আবু জাফরের উপভোগ্য রচনা এ- কাব্যগ্রন্থটি। স্থিতু আবেগ রাজনৈতিক চিন্তায় কবি এ-পর্বে অনেকটা দক্ষ-বৈরী সময়ের দক্ষ রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। “এখন তুমি ঘুমাও” নিরন্ন পুত্রের উদ্দেশে পিতার ঘুম-পাড়ানি গান। কবিতার আবহে নস্ট্যালজিয়ার আমেজ পরিলক্ষিত, আছে পৌরাণিক চৈতন্যের মৃদু আচ্ছাদন। সময়-সংক্রান্ত রূপ কবি-চেতনায় দৃঢ়, পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য অন্যরূপে মাত্রা ছড়ায় চরণবিন্যাসে :
বহু বুভুক্ষা ছেয়ে
অনেক নিথর মৃত্যু নামছে
দীর্ঘ ঘুমের মত।
মা মণি আমার
এখন তুমি ঘুমাও
ওরা তো বলেছে, চাউল আসবে।
চাউল আসলে তবে
আজকের মতো ভাতে ভাত রাঁধা হবে।
গল্প বলার আসরে মৃত্যুই স্পষ্ট হয় দীর্ঘ না-খাওয়া ঘুমের মধ্যে অনিবার্য সত্য যখন কবিতার অক্ষরে দায়বদ্ধতার আঁচড় কাটে তখন তৈরি হয় নক্শা (ংশবঃপয)- কবিতার অনির্বচনীয়তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সমাজ-অন্বিষ্ট চিন্তার প্রকোপে কবি-শিল্পকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পর্যবসিত রূপায়ণ ঘটাতে পারেননি। ‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে চাউল এসেছে ঘরে/ … কলাপাতারং শাড়ী ঢাকা গোরা মুখ/ স্বেদ-টলমল/ উনুন/ অথবা হালকা খুশীর তাপে।’—কাহিনী-স্বপ্ন কার? কোন্ মানুষের? অনুমান মেলে, উত্তর মেলে : ‘নদীর মতন/ নেশার মতন’ ঘুমের অন্তঃসলিল চেতনালোকে পরিমণ্ডলে; এখানে কবিতা কাব্য হবার অবসর কোথায়! সুযোগও পায় না—কেননা কবি ব্যাপ্ত বক্তব্য বয়ানে– অনিবার্য আনুগত্য প্রকাশে। এ-কাব্যে অনেক কবিতায় সিকান্দার আবু জাফরের বক্তব্য-বিবৃতি দোষ পরিলক্ষিত—রাজনৈতিক দর্শন, দেশতত্ত্ব, সাম্যচিন্তা, মানবমুক্তির বিক্ষেপ প্রত্যক্ষ প্রভাবনা পেয়েছে; কাব্যশরীর গঠনের চেয়ে স্থূল আবেগ তৈরি হয়ে চরণগুলো মতাদর্র্শের উত্তাপ ছড়ায়। কাব্যরস জমাটবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বাণী নির্মিত হয়—মিইয়ে যায় কাব্যের পরিকাঠামো। জন্তু বা বীভৎস রূপের প্রতীক তৈরি করে কবি নিজের দেশ-আনুগত্যের সপক্ষের উচ্চারণকে যেন জোরালো করেছেন। বৈরী বৃষ্টিতে সেজন্যে গল্পধর্মী গদ্যকাব্য এবং প্যাট্রিস লুমুম্বার মতাদর্শের উচ্চারণ প্রয়াস। কবিবুদ্ধিতে সেখানে সচকিত দুঃসহ ও বিরূপ-বৈরী স্বদেশ-এ স্বদেশমুক্তির জন্য আশা, হতাশা, উত্তরণচিন্তা নির্মিত হয়েছে। এমন কাব্যবিষয় ধরার জন্য গদ্যধর্মী ও গল্পানুবর্তী ভাষা সৃষ্টি হয়েছে এবং সিকান্দার আবু জাফর এ ভাষা নির্মাণে সফল হয়েছেন। গ্লানিকাতর কবির সচকিত উচ্চারণ:
শুধু বেঁচে থাকি
দিনরাত্রি এবং দিন থেকে রাত্রি
নিজেকে ভিজিয়ে নিই
প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতার বৈরী বৃষ্টিতে…
“নিথর”, “নিস্তব্ধ”, “সেখানে আমি”, “কিউবিক স্থাপত্য”, “ক্ষতচিহ্ন”, “অভিব্যক্তি” ইত্যাদি কবিতায় অসাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মননবোধ তীব্রতর ও প্রতীকসাদৃশ্য উচ্চারিত হয়েছে : ঔপনিবেশিকের উপমাবিহীন কালো হৃদয়’, ‘নেকড়ের নখাঘাতে আঁকা ক্ষতচিহ্ন’, ‘বুকে হাঁটি ক্লান্ত সরীসৃৃৃৃপ’ পঙক্তিমালা কবির কাব্যবিষয়কে সাতচল্লিশোত্তর সময়ে। আবদ্ধই শুধু করে না মানবতাকেও ঋদ্ধতা দান করেছে। যে-দায়বোধ নিরন্তর কবিচিত্তে কাজ করেছে সেখানে ইতিহাসের ইঙ্গিত বারবার স্পষ্ট। কবি যেমনটা বলেন :
চিন্তায় ধ্যানে
প্রতিটি দিনের এই অসহ্য সংঘাত
এ কি ইতিহাস হবে?
মেঘভাঙ্গা কোনো ভোরের আলোয়
এ কি ইতিহাস হবে?
(“অভিব্যক্তি”)
আধুনিক কবিচন্তনে রোম্যান্টিক আমেজ ভিন্ন ধ্বনি সৃষ্টি করে, এ-কালস্রোতে অবক্ষয় ও অবসাদই মুখ্য হয়ে ওঠে। ক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তির জীর্ণ স্বপ্ন, আত্মহত্যার প্ররোচনা, দুঃসহ প্রবঞ্চনা, হতাশার দুর্বিষহ বিক্ষেপ ইত্যাদি কবির আধুনিক সময়াঙ্গিক নির্মাণ করেছে। শরীরের প্রত্যঙ্গ সহায়হীন দুঃসহতার প্রতীক হয়ে আসে। রোম্যান্টিকতায় আবিষ্ট যৌবন প্রবহমান সময়বিন্যাসে অবসাদে বিচ্ছিন্ন হয়। কবির কবিতা ১৩৭২ কাব্যে রাজনীতির সত্যাসত্য রূপ-শিল্পে পর্যবসিত হয়েছে। প্রতিরোধী শক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বে সংঘবদ্ধ মুক্তিপিয়াসী মানুষের যুদ্ধ চলে, দুস্তর পারাবার ভেঙে অতিক্রম করে সংগ্রামী শক্তিতে সে সামনে এগিয়ে চলে। কবির খুব দীপ্ত উচ্চারণ: ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই/ আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। দীপ্ত শপথের পরাকাষ্ঠায় জ্বলে ওঠে মানুষ, সেজন্য আশাবাদ :
এই কালো রাত্রির সুুকঠিন অর্গল
কোনোদিন আমরা যে ভাঙবোই
মুক্তি প্রাণের সাড়া জানবোই,
আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে
নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই।
(“সংগ্রাম চলবেই”)
বিজয়োদ্দীপ্ত এ-উচ্চারণে উন্মাদনা আছে, সমষ্টিকে জাগানোর প্রাণনা আছে; নজরুল-প্রভাবনায় এমন ভাববিন্যাসে সিকান্দার আবু জাফর সফল হয়েছেন। ষাটের দশকের বৈরী পরিবেশ, অধিকারমুক্তি আর অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে ভাস্বর কবিতা ১৩৭২ কাব্যগ্রন্থ। “তিমিরান্তিক”, “কত ঈশ্বর”, “দিগন্ত কারাগার” জনতার চিত্ত থেকে যেন উৎসারিত এসব কবিতা। দৃঢ়প্রত্যয়ী, আত্মত্যাগী বাকবিন্যাস রচিত হয়ে মূল পরাধীনতার অবমুক্তির প্রণোদনাই পরিব্যাপ্ত; পাকিস্তানী শাসকের নিগড় থেকে মুক্তি, হত্যাকারী পাঞ্জাবি শোষক প্রতিরোধের শক্তিতে বাঙালি জনতাকে একত্রিত করেন কবি—তাদের পথ দেখান; জন্মভূমির জন্য বলতে শেখান, ‘প্রয়োজন হলে দেবো একনদী রক্ত’। শোষণ-শৃঙ্খলমুক্তির বাসনায় কবি সামন্ততন্ত্র, ঈশ্বরতন্ত্র কিছুই মানেন না—তিনি শুধু বাঙালি জনতার মুক্তি চান।
বৃশ্চিক লগ্ন ও বাঙলা ছাড়ো কাব্যগ্রন্থদ্বয় ১৯৭১-এ রচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এ-কাব্যগ্রন্থে কবির অন্য রূপ প্রত্যক্ষগোচর হয়। সমালোচকের উক্তি, ‘এ দুটি কাব্যের সমস্ত কবিতা বাঙালি জাতির মর্মকে যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি দেখা যাবে এ দুটি কাব্যেই তাঁর কবিত্বশক্তি সহজ স্ফূর্তি লাভ করেছে; ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, উপহাসপ্রিয়তা এবং লোকজ ছন্দের লঘু চাপল্য তাঁর অনায়াসলব্ধ হয়ে উঠেছে।’ কবি যেন এবার বৈরী পরিবেশ থেকে ঘরে ফিরলেন। জনতার কবি যেন জনতার কাঙ্ক্ষিত দরবারে পৌঁছে গেছেন। উল্লি¬খিত কাব্যে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের রূপই বর্ণিত হয়েছেজ্জতবে এ-পর্বে কবির কবিত্বপ্রতিভার যথেষ্ট উত্তরণ ঘটেছে, কাব্যে একরকমের উল্লম্ফনও যেন পরিলক্ষিত। ছন্দেও এসেছে দ্বিধাহীনতা, বৈচিত্র্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এসব কবিতা যেমন উপভোগ্য তেমনি তাৎপর্যমুখর। উদাহরণ :
চোখে ঠুলি এঁটে নাও নইলে ত চিনবে না কিচ্ছু
সাদা চোখে দেখবে না খাড়াদাঁড়া কর্কট বিচ্ছু
(“বৃশ্চিক লগ্ন”)
“হে আমার দেশ”, “আমাকে নির্ভয় করো”, “ইতিহাসচারিণী বাঙলা”, “গরবিনী মা-জননী”, “বাঙলা ছাড়ো”-মুক্তিযুদ্ধে সিকান্দার আবু জাফরের অত্যন্ত সাহসী ও স্বদেশসংলগ্ন বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা। বাঙলা ছাড়ো কাব্যগ্রন্থ সংগ্রামরত বাঙালি জনতার এক অনবদ্য দলিল। শিহরিত উচ্চারণের মুক্তির সনদ। মুক্তিযুদ্ধের বীভৎস প্রতিবেশে কবি তাঁর অভিজ্ঞতায় পাক-হানাদার বাহিনীর পীড়নকে চিত্রিত করেন। কবির মর্মন্তুদ এ-জীবন ব্যাখ্যায়ন কাব্যপরতের আঙ্গিককে বদলে দেয়; সংগ্রামী মন্ত্রের উদ্বোধনের দিশারী হয়ে রচনা করেন “বাঙলা ছাড়ো”র মতো প্রেরণা-উদ্দীপ্ত কবিতা। ‘তুমি আমার আকাশ থেকে/ সরাও তোমার ছায়া,/ তুমি বাঙলা ছাড়ো’—স্পষ্ট চরণপঙ্ক্তি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ‘আমার আকাশ’ উচ্চারণে। দীর্ঘ তেইশ বছরের অধিকার-বঞ্চিত বাঙালি নিজের আকাশ চিনে নিয়েছে আর এ-আকাশের অশনিসংকেত-অমানিশা দূর করার প্রত্যয়ে যুদ্ধে নেমেছে। অপশক্তির শোষণ-জ্বালার কাতর-উক্তিতে কবির বিনয় :
অনেক মাপের অনেক জুতোর দামে
তোমার হাতে দিয়েছি ফুল
হৃদয় সুরভিত
যে-ফুল খুঁজে পায়নি তোমার
চিত্তরসের ছোঁয়া
পেয়েছে শুধু কঠিন জুতোর তলা
(“বাঙলা ছাড়ো”)
অবলুণ্ঠিত আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারে ব্রতী কবি—তুমি আমার বাতাস থেকে মোছো তোমার ধুলো’, … ‘তুমি আমার জলস্থলের মাদুর থেকে নামো’। স্পষ্ট, আত্মসম্মান জড়ানো এ-পঙ্ক্তিমালা লাখো প্রাণকে একত্রিত করে—মরণজয়ী মুক্তিযুদ্ধের পাদপীঠ তৈরি হয়। মুক্তিজনতার সপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চলমান পরিস্থিতি, তার দীর্ঘ সময়পীড়িত মাতৃভূমি কবে অরুণ আলোর রক্তরাগে আপ্লুত হবে—এসব দুঃসহ হৃতোচ্ছ্বাস ও আশাবাদ কবিকে বাঙলা ছাড়োর পঙক্তিমালা তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে। শেষদিকের এ-দুটো কাব্যে (বৃশ্চিক লগ্ন ও বাঙলা ছাড়ো) কবির দ্বিতীয় পর্বের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণাসিঞ্চিত বাণীবিন্যাস। বাংলার মানুষের আশাবাদ এবং মুক্তিস্বপ্নের পথ যেন তৈরি করে দিয়েছেন কবি। দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনা-সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নব্য-উপনিবেশবাদ (সাতচল্লিশ-উত্তর পাকিস্তানে) থেকে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পর্ব চিহ্নিত হয়েছে কবির কাব্যে। মানবমুক্তির এ-পথ একটা সময়ে মুক্ত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে আবার আচ্ছাদিত সেই পুরনো শকুনের অমানিশা লক্ষগোচর। সমসাময়িক বাস্তবতা সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যে বিষয় হয়েছেজ্জঅনেক সময় তার শিল্পাঙ্গিক নানাভাবে বাধাগ্রস্তও; কিন্তু মানবতার জয়গান, শোষণ-শৃঙ্খল ভাঙার পণ, জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ এখনো নিষ্কণ্টক নয়। ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ কিংবা ‘বাঙলা ছাড়ো’ যে-বিষয়বিন্যাসে রচিত তার গুরুত্ব শুধু বিশেষ বা সমসাময়িক সমাজের নয়, সর্বকালের মানবমুক্তির গান। এই মানবমুক্তির প্রণোদনা থেকেই কবির দায়বোধ, অঙ্গীকার। স্বদেশচিন্তা সেখানেই তীব্রতররূপে কাজ করেছে। আর নিরঙ্কুশরূপে তার স্বদেশ পরিচয় ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার। সচেতন মেধা দিয়েই কবির এ আনুগত্য প্রয়াস। যেটি ধর্মান্ধ-পাকিস্তানে অনেক কবির মতো তাঁকে বিব্রতকর বা সংশয়গ্রস্ত করে তুলতে পারেনি। মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা আর সাংগঠনিক চৈতন্য তাঁর তাত্ত্বিক জগৎকে তৈরি করেছে—সেখানে সিকান্দার আবু জাফর শুধু কবি নন, দক্ষ সংগঠক, সাহিত্যসম্পাদক—এমন অনেক কিছু। সর্বোপরি এমনটা প্রতিষ্ঠিত, ষাটের দশকে বোধে-বিশ্বাসে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী কবি সিকান্দার আবু জাফর। বাঙালির যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর এ-পরিচয় আরো সুসংগঠিত, সন্দেহ নেই।

আগস্ট ২০০৫

 

 

 

 

আবিদ আজাদের কবিতা :
সংগুপ্ত কাতরতার অবিনাশী উচ্চারণ

আবিদ আজাদ (১৯৫২-২০০৫)-এর কবিতা সর্বপ্রথম পড়ি তাঁর ১৯৯১-এ বেরুনো কবিতাগ্রন্থ থেকে—সম্ভবত ১৯৯৩ সালে; এক লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করে। এরপর আবিদ আজাদকে পেয়েছি নানাভাবে; টুকরো-টাকরা, ছুট-ছাট সাহিত্যপাতায় বা কোনো সাহিত্যপত্রিকায় কিংবা বইমেলায় বেরুনো কাব্যগ্রন্থে। বুঝতে পারি—এ অভিজ্ঞতায়-সত্তরের এ কবি সন্দেহাতীতভাবে বড় কবি। কবিতা প্রসঙ্গে টি. এস. এলিয়ট, ম্যাথ্যু আর্নল্ড, মালার্মেÑপ্রভৃতি খ্যাতনামারা কিছু স্মরণীয় উক্তি করে গেছেন। ”Poetry is the expression of mysterious feeling of the aspects of existence’ (Mallarme),/ A poetical work, therefore, is not yet justified when it has been shown to be an accurate, and therefore intersting representation; it has to be shown also that it is a representation from which men can derive enjoyment’ (Arnold),/ Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion, it is not the expression of personality, but an escape from personality. But, of course, only those who have personality and emotions know what it means to want to escape from these things’ (Eliot) এ কবিদের কথা এ কারণে বলছি যে, বিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায়—বিশেষত তৃতীয় দশকে (দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে) এঁরা কবিতায় সমাজ ও সময়ের গুরুত্বকে কাঁধে নিয়েছিলেন। কবিতাকে ‘শতাব্দীর সমান বয়েসী’ ভাবনায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। কবিতাকে বহুমাত্রিকতা অর্জন এবং রাজনৈতিক অমানিশার বীক্ষণে চারিত্র্য প্রদানে এ সময় এবং তার পরের সময়গুলো খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। কবিতার মতো শিল্পে অনিবার্যভাবে আবেগ, ব্যক্তিত্ব কিংবা ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ একীভূত হয়ে পড়েছিল। বলা চলে, ব্যক্তির সঙ্গে সময়-চরিত্রের এমন আরূঢ় অভিষেক ঘটেছিল যে, যেখানে শিল্প অন্য প্রবণতার (চিরায়ত ঐতিহ্যের বাইরে নতুন নাগরিক বিশিষ্টতায়) রঙ পেয়ে যায়। এবং তার গ্রহণীয়তাও একটা সমুন্নতির মাত্রা স্পর্শ করে। ব্যক্তিকে এ
বাস্তবতায় এক উৎকট-বিকৃত-ধিকৃত সমাজকে পীঠে ধারণ করতেই হয়। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার মধ্যে এর প্রকোপ উজ্জ্বল-স্পৃষ্ট (জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও অন্যান্যরা উদাহরণ)। ’৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যেও এ ধারা প্রবল বেগে চালিত— বিশেষত আহসান হাবীব, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান প্রমুখের মধ্যে। কবি আবিদ আজাদ মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ’৭৬ থেকে কাব্যাঙ্গনে সক্রিয়। তাঁর কবিতার জগৎ তৈরি হয়েছে মধ্যষাট থেকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা— পরবর্তী কালপরিধিতে। তাঁর চেতনাজগতের ভাষ্য : এই স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আমি উপভোগ করেছি জীবনের গভীর মজার মতো—‘ঠিক তেমনিভাবে, মাঝে মাঝে, মনে হয়েছে, কোথায় স্বাধীনতা-এ যে আত্মনির্মিত আর এক কারাগার। মৃত্যুদণ্ডাদেশ-প্রাপ্তদের মতোই কয়েদ খাটে কবি। এখানে কবিতা পায় না প্রাকৃতিক রৌদ্র ও বৃষ্টির পুষ্টি। আমি তখনই ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছি জীবন ও কবিতার শর্তযুক্ত শৃঙ্খলা এবং যান্ত্রিক বিশৃঙ্খলাও। আর আশ্চর্য হয়ে দেখেছি—কবিতা আর ছাড়ছে না আমাকে।’ আবিদ আজাদকে আমরা ভেতরে গ্রহণ করতে চাই এমন দ্রষ্টব্য থেকে।
গতানুগতিক নন আবিদ, অনেক কবির মাঝেÑঅনেক কবিতার তোড়ে, তুলতুলে আবেগে ভাসানো কবি নন আবিদ; আবিদ প্রেমকে অর্থহীন বা মৃত্যুকে অর্থহীন করে তুলতে পারেন—কিন্তু স্পষ্ট ও পরিষ্কার-জীবন তাঁর আলেখ্য; জীবন তাঁর কাম্য- জীবনকে প্রেমী ও সুখী করে সংগুপ্ত কাতরতায় পলে পলে, বিশ্বাসের বাঁধনে নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা দিতে চান এবং প্রচেষ্টায় স্পর্শ করেনও তা তিনি। তেরটি কাব্যে অনেক রকম প্রবণতায় অভিষিক্ত আবিদ আজাদ। বাঙালি কবিবৈশিষ্ট্যে নষ্ট্যালজিয়া, পুরাণপ্রসঙ্গ, স্মৃতিসন্ন্যাসব্রত, জন্মজিজ্ঞাসা, নিসর্গ-কাতরতা, নদী-নারী সঙ্গসূত্র, সৃষ্টি-সন্ধান তৎপরতা, পঞ্চভূতের জৈবসত্তা, স্বপ্নরহস্য কাঠামো, অতিপ্রাকৃত অবভাস, অমূল প্রত্যক্ষণ ও অধ্যাস, সংগ্রাম-সংক্রম, জৈবিক প্ররোচনা, লোকায়তিক ইমেজ, শাশ্বত মূল্যবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য জিজ্ঞাসা, অধ্যাত্মদৃষ্টি, অবক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা, দেহাত্মবোধ, দেহবাদ, সাম্যবাদ, শোকগাথা, মর্সিয়া, রূপ-অপরূপ তত্ত্ব ইত্যাদি অনেক প্রসঙ্গ কবিভূমে বিরাজিত। উল্লিখিত ‘কমা’র বাইরে আরো অনেক প্রবণতা কবির গোচরে-অগোচরে কাজ করে থাকে। কবি স্বতঃস্ফূর্ততায় কোনো লক্ষ্মীর ইঙ্গিতে তা বয়ান করেন—আবার কখনো সচেতন সঙ্গোপনে অনিবার্য প্রয়াসে ছড়িয়ে যান ধ্বনির মাত্রা। কিন্তু কবিতার নিশ্চিত বা নিশ্চয় কিছু নেই। তবে কী কবিতা কোন্টা কবিতা তা স্পষ্ট। আবিদ আজাদ থেকে উদাহরণ :
স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল
সেই প্রথম আমি যখন আসি
পথের পাশে জিগা-গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠছিল রোদ
কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড খণ্ড রুপালি আগুন
ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য ঝরানো গুচ্ছ গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ
এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিল
(“জন্মস্মর”, ঘাসের ঘটনা)
আবিদের বিখ্যাত এ কবিতাংশে প্রকৃতিমুগ্ধতা চিত্রকল্পের আবরণে অদ্ভুত এক ইমেজ সৃষ্টি করে—জিগা গাছের ডাল বোধের অংশ হয়ে যায়, আর ঘাসের পিচ্ছিল আলজিব, কচুর পাতার কোষের রুপালি রং আগুন কী চমৎকার জন্মআবাহনী সুর ছড়ায়; কবির পুনর্জন্মের কাহিনি শোনান কবি। এরকম করে রোদ্দুর, ভুতুড়ে বাড়ি, লাটিম, নৌকার গলুই, রাজহাঁস, নারকেলের সারি, নীল রঙের ফড়িং, ডালিমের ডাল কবির শৈশব- কৈশোর স্মৃতি হয়ে আসে। গ্রাম, শ্রমিক, ফেলে আসা জলজ বাড়ি, জ্যোত্নার ঝরনা অপূর্ব মুগ্ধতায় নাগরিক কবিকে কাতর করে তোলে। ঘাসের ঘটনা কবির প্রথম ও বিখ্যাত কাব্য—এখানে যথারীতি ষাটের কবিদের অধিকাংশের মধ্যে যেমন পল্লীর রূপমুগ্ধ কাতরতায় শৈশব, যৌবন-মদির আভাসে প্রকৃতি, স্বপ্নমুগ্ধ কৈশোর, হারানো স্কুল, মা বা মায়ের স্নেহদৃষ্টি প্রধান হিসেবে থাকে তেমনি এখানেও একরূপে বিরাজিত। সত্তরের প্রথম কাব্যে আবিদ আজাদ উল্লিখিত প্রস্তাবনায় ঋদ্ধ এবং প্রকাশিত। তবে তাঁর প্রকাশ একটু আলাদা। পঞ্চাশ-ষাটের কবিদের থেকে নিশ্চয়ই তাঁর ভঙ্গি আলাদা এবং স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। কেননা শহীদ কাদরী বা আবুল হাসান কিংবা সে সময়ের উল্লম্ফিত কবিরা যেভাবে লিখেছেন সেভাবে আবিদ লেখেননি কারণ, অন্তত তাঁর সামনে নতুন স্বপ্নাপ্লুত আবেগের একটি দেশ ছিল। এবং সেদেশে কবিরা রাজধানী ঢাকাকে শহর ভেবে তাদের বাস্তু-বসতি মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এক করে মোটামুটি নাগরিক বা সিভিল গণতান্ত্রিক ভেবে ফেলেছেন। তখন তাঁদের চোখে উপর্যুক্ত ভাবনা বিশেষ মর্যাদা পাওয়াই শুধু নয় মর্মর চৈতন্যে সৃষ্টি করেছে কূলপ্লাবী ভালোলাগা আর ভালোবাসার। এখানে আবিদ আজাদ লিখতেই পারেন : রোদ্দুরে দোলে রোদ্দুরে দোলে/ মরিচ গাছের পাতায়/ দু’টি লাল ডেয়োপিঁপড়ের ভাস্কর্য/… চোখের ছিলায় দিন ছলকায় বেলা যায় বেলা যায়…, কিংবা জ্বরতপ্ত সারা বাড়ি, মনমরা ঘুমের জঙ্গল—/ উঠানে কি বৃষ্টি এলো…, খালাম্মা, তোমার গন্ধে ঘুম আসে না যে!/ এখন ওপাশে ফেরো, অন্যদিকে মুখ করে শোও। তোমার ভিতরে কী যে হাওয়া কী যে জ্যোৎøা কী যে নোনা বাদাড়ের ঘ্রাণ!… ইত্যাদি। প্রকৃতির মাঝে প্রেম একটা তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা সৃষ্টি করেছে। আবিদের প্রেম শরীরী, পবিত্র, সুন্দর। স্মৃতিময়তার মধ্যে প্রেম বিরহিক মর্যাদা পেলেও— একটা সামগ্রিক সত্তাজাত মর্যাদা পেয়েছে নানা পরিমাপে। প্রেম মানে তুলতুলে, ভাসানো আবেগ বা কষ্টকাতর যক্ষঅভিব্যক্তি নয়—এখানে প্রেম পরিশুদ্ধ, মায়াবী; কাছে না পেয়েও সুখ আবার কাছে পেলে নিরবধি অপার আনন্দ, শ্লাঘাশ্রিত আত্মার খুনসুটি। নির্বিরোধী এ প্রেম যথেষ্ট ব্যঞ্জনাময়—বহুরৈখিক। ঘাসের ঘটনা কাব্যের নস্ট্যালজিক অধিকাংশ কবিতাগুলোর পরে আবিদের প্রেম অনেকটা পরিপক্ব মাত্রা অর্জন করেছে। তবে ঘাসের ঘটনার কবিতাকে নিছক অতীতকাতর বা ফেলে আসা আশ্রয়ী বলে ভাবলে কবির প্রতি অবিচার করা হবে। অনেকেই এরকম বিষয়কে অবলম্বী করে লিখলেও ঘাসের ঘটনা ব্যতিক্রমী— এ কারণে রোম্যান্টিক গুণবৈচিত্র্যে (দহনøাত করতল, হরিণ-শিঙের মতো মুমূর্ষু আকাশ চিরে-চিরে, জ্যোৎস্না ছিল শুয়ে মলিন ভেজা জলে, লাটিমে-বালকে মেলে স্বপ্নের ভেতরে ইত্যাদি) কবি অনেক প্রাসঙ্গিক। উপমা-অলঙ্কারের আলাদা প্রয়োগে কবিভাব উহ্য থাকতে পারেজ্জতবে এর আলোকে তার ভাবপ্রকাশের শর্তকে স্বল্পপ্রয়াসে চিনে নেওয়া সহজ হয়। তার শরীর সম্ভূত আবেগ প্রকরণ ভাবনাকে অনেক বেশি জীবনবাদী করে তোলে। যদিও আবিদ সমাজের দায় বা কমিটমেন্টকে সেভাবে তাঁর শিল্পের অংশ করেন না কিন্তু নির্বিরোধী মাত্রার দিগন্ত-কম্পিত অবভাস তাঁর কাব্যকে অনেক জীবন্ত এবং রসবোধপূর্ণ করে তোলে। আমার মন কেমন করে (১৯৮০) কিংবা বনতরুদের মর্ম (১৯৮২) কাব্যে কবির চিত্ত নিশ্চয়ই উত্তরিত। ক্রমাগত কবি স্বপ্নমুগ্ধতার ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে এসেছেন। উল্লিখিত কাব্য দুটিতে কবি তার সমসাময়িক সময়কেই বেশি বন্দি করেছেন। সময় এগুনোর সঙ্গে সঙ্গে কবির অভিজ্ঞতা যেমন বেড়েছে তেমনি কবিতার বিষয় বদলে গেছে—প্রকরণেও এসেছে নতুন মাত্রিকতা। ঘাসের ঘটনা থেকে বনতরুদের মর্ম পঠনেই অনুমান হয় কবির শব্দ ও ভাব বদলের ক্ষেত্রগুলো। উত্তরিত আবিদ আজাদ অনেক ব্যবহারিক ইংরেজি শব্দ আনেন কবিতায় এবং কবিতা-পঠনে লক্ষণীয়—প্রায় একদশকের ব্যবধানে মধ্যবিত্ত বাঙালির চলাফেরা, চিন্তাচেতনা, কর্মপরিধি কতোটা বেড়েছে। এবং স্বপ্ন দেখা, কল্পনা করা, উপরে ওঠার চিন্তা কতো দ্রুত ধারণ করে তার প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা চলেছে। ফলত মনস্তাত্ত্বিক পরিকাঠামোও বদলে গেছে—শ্রেণিস্তরেও এসেছে উল্লেখনীয় পরিবর্তন। কবি–অভিজ্ঞতা, চলতি সময়চিত্র নিয়ে আবিদের এ পর্বের কবিতা। ক্রমশ ঘাসের ঘটনার বিষয় থেকে সরে এসেছেন কবি। আমার মন কেমন করের কয়েকটি কবিতার পর কবির যুক্ত হওয়া পথে-প্রান্তরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। কিন্তু এ কাব্যের প্রথম কবিতা “দুঃখ” থেকে একটু উদ্ধৃতি প্রদান করে এর চিত্রলধর্ম আর পূর্বোক্ত প্রাসঙ্গিকের কবিকর্তৃত্বকে একটু চিনে নিলে আবিদের অনির্বচনীয় বোধের মৌলবিন্দুটি স্পর্শ করা যেতে পারে—একথাটি বলছি এ কারণে যে, যতোই আবিদ প্রান্তরের অভিজ্ঞতায় জড়ান তাঁর প্রতিভার অনুস্যূত স্থানটি ঐ রোদেলা দুপুর আর রোদ্দুরের মধ্যেই। এবং মনে করি সে প্যাশনেই তিনি পৌনঃপুনিক ছুটে যান কবিতার কাছে। উদাহরণ :
আজ মনে পড়ে সেইসব মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ
হাওয়ার হাওরে ছইনৌকার মতো একরত্তি পাখি
গলার নিচের দিকে অদ্ভুত নরম নীল রোঁয়া
উঠোনমণির মুখ, ভোরবেলাকার হিমভেজা কার চোখ
আগডুম বাগডুম চারিদিক, বাক দিচ্ছে সুন্দর মোরগ।
… … …
আজ মনে পড়ছে কাঁঠাল পাতার একতাড়া কড়কড়ে নোট
তাই দিয়ে রোজগার করে ফিরতাম রোজ বনজঙ্গলের আবছা-বিরতি
… … … …
আজ মনে পড়ছে হারিকেনের চিমনিতে চোখ রাখা নওল কিশোরী
গরুগাড়ী উঠানে নামিয়ে দিচ্ছে হলুদ খড়ের বোঝা আর সন্ধ্যাবেলার নীলিমা
তারার লটবহর ছড়ানো আকাশ
বালকের গোল হাত–আয়নার পিছনে সুচিত্রা সেন, উত্তম কুমার—
আজ মনে পড়ে সেইসব মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ।
বোধের তাড়না স্পর্শ করে যায় সর্বাধিক অনুভবের আনুগত্যেজ্জপাঠক পৌঁছে যায় ঐ ক্ষেত্রবলয়ে যেখানে পরিশুদ্ধ ভোর আর তার নির্মল প্রবাহ—প্রসঙ্গত সে-তো প্রত্যহ ভোরের প্রকৃতি কিন্তু ‘বালক বেলার কৌশল’ গোল হাত, হারিকেনের চিমনিতে চোখ, কাঁঠাল পাতার কড়কড়ে নোট—সবই পরিচিত; কিন্তু প্রকরণে কী মমতা আর উম্ সেই সঙ্গে তাপিত তেজ, বিস্তীর্ণ প্রান্তরের হাতছানি, ভূত-ভবিষ্যতের অনন্ত বার্তা—মনে হয় কী নেই এ পঙ্ক্তিমালায়। আর সবচেয়ে বেশি ঐ সময়কে আঁকড়ে ধরবার প্রাণান্ত উচ্ছ্বাস—জীবনানন্দের ঘাসের মধ্যে ঘাস হয়ে জন্মানোর আমেজ। আবার ভাবনার দীর্ঘশ্বাসে বলি— ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’ কিন্তু মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ কার না পছন্দের! আমি যেখানেই থাকি যে শহরেই যাই কিংবা আবিদের যে “বিমানবালা” গোটা বিশ্বভ্রমণ করে সেও কি ভুলতে পারে এ দুঃখকে! অন্তত সবারই তো আছে ‘দুঃখ ভোলার দীর্ঘশ্বাস’।
আবিদ আজাদের কবিতার দীর্ঘায়ত পরিক্রমায় বনতরুদের মর্ম-এর মধ্যে “ক্রাইম রিপোর্ট”, “পত্রিকায় বালকের করুণ মৃত্যুসংবাদ পড়ার পর”, “দেখা হবে”, “নির্মিত কহ্লারে যেন পাই আবক্ষ বাংলাদেশ”, “আমি বলছি কিচ্ছু হবে না”, “যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না” কবিতাগুলো অনেকটা নগর-মধ্যবিত্তের চিন্তাজাত—যার মধ্যে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ যেমন শ্রেণিহীন মানুষের ছবি, নিরন্ন-নিপীড়িত মানুষ, গণতন্ত্র, রাজপথ, স্বাধীনতা, পার্লামেন্ট, অতিথিভবন ইত্যাদিতে আকীর্ণ। মনে হয় এমন বোধে কবি একটু দুর্বল। কবিতা যদি চালচিত্র হয়, প্রচ্ছদচিত্র হয়, তখন অনুভব ঘনপিনদ্ধ হয় না—তাৎক্ষণিক প্রয়াসে আতিশয্য আবেগ কামড়ে ধরে নিজেকে। ফলে কবিতা আর ঐ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে না। তাছাড়া ’৭৬ থেকে ’৮২ আবিদ অভ্যস্ত ঢাকায় যে সব প্রাঙ্গণে জড়িয়েছেন সেখানে এক মধ্যবিত্ত অনুভব সরলভাবেই এদিকে প্রণোদিত করতে পারে; বলা যায় করেছেও– ‘এই সাদা ফুল আমার রাজধানী/ এই সাদা ফুল আমাদের স্বাধীনতা/ …এই সাদা ফুল আমাদের ভোর’ কিংবা ‘দেখা হয়ে যাবে ধর্মঘটের আন্দোলনের এই শহরেই আবার/ দেখা হয়ে যাবে তোমার আমার’, কী ছিল পরনে তার? নীল হাফপ্যান্ট? লাল বুশশার্ট? সাদা গেঞ্জী? না জিনসের/ নিঃসঙ্গ পোশাক পরে একা একা ছিল? ডুবুরির পোশাকে বষণ্ন হয়েছিল সারা ক্ষণ?… ‘কিন্তু এ মাপের কিছু কিছু কবিতা উতরেও গেছে—বিশেষত অভ্যস্ত কাব্যপ্রকরণের আমেজে যখন নগরের ক্লেদকে, নৈরাশ্যকে, বিবর্ণতাকে ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে। আবিদ আজাদ এ ক্ষেত্রে অনেকটা লাভবান হয়েছেন বিচিত্র রকমের শব্দকে কাব্যবন্ধে আনতে পেরে। শব্দের ব্যাপারে তাঁর আড়ষ্টতা এ পর্যায়ে বেশ কমেছে। অবশ্য প্রথম থেকেই এগিয়ে তবুও বলবো তৃতীয় কাব্য থেকে একদম অনাবিল তিনি। উল্লেখ করেছি—জীবনবাদী কবি, জঙ্গমতাকে লালন করেন—যার উল্লম্ফন তাঁর প্রথম থেকেই ঘটেছে; এর সত্যতা আরো স্পষ্ট শীতের রচনাবলী (১৯৮৩) থেকে। শ্লীল-অশ্লীল জ্ঞানের ঊর্ধ্বে কবিধর্মে সবকিছু অতিক্রম করে গেছেন তিনি। ফলে কবির কবিতা কিছু হারালেও পাওয়াটাও বোধ করি কম নয়। আমি আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি (১৯৮৭) থেকে এর সত্যতা উদ্ধার করতে পারি :
আমি কবিতার জন্যে তৈরি হচ্ছি
নববিবাহিত দম্পতি যেমন প্রথম সঙ্গমের জন্যে
ক্লান্ত দম্পতি যেমন সঙ্গমোত্তর ঘুমের জন্যে
কুকুর যেমন কুকুরীর জন্যে
বাসকপাতা যেমন হা-ঘরে রোগীর বুকের জন্যে
জরতপ্ত কপাল যেমন জলপটির জন্যে
মেয়েদের স্তন যেমন পুরুষের হাতের আঁজলা এবং শিশুদের আত্মার জন্যে
… … …
(“৫ই মে, ১৯৭৯, মধ্যরাত্রি”, আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি)
কিংবা,
এখন যে কবিতাটি লিখব আমি
তার জন্যে মুহূর্তের মধ্যে ছদ্মবেশে টহল দিতে শুরু করবে পুলিশ ভ্যান
তার জন্যে তছনছ হয়ে যাবে য়্যুনিভার্সিটির হল
তার জন্যে প্রচণ্ড সন্ধ্যেবেলা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের টিভি-রুমের
ভিতর থেকে সন্দেহবশত ধরে নিয়ে যাবে দুজন ছাত্রকে
তার জন্যে বস্তিতে-বস্তিতে আগুনের মতো লেলিয়ে দেয়া হবে গুণ্ডাপাণ্ডাÑ
(“এখন যে কবিতাটি লিখব আমি”, আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি)
প্রচণ্ডতা ছড়িয়ে পড়ে ধ্বনিবিন্যাসে—-ধরা পড়ে প্রথম কাব্য থেকে কবির আলাদা প্রতিকৃতি; কবিতায় গল্পের আবহে সৃষ্ট নাটকীয়তায় তৈরি হয় দুর্বহ সময়। শ্রমিকের চোখ, কৃষকের কোঁচড়, কেরানির খাতা, অধ্যাপকের উড়োচুল, হকারের বগল, ক্যানভাসের গলা প্রতিরোধী প্রস্তাবনা মুখরিত করে তোলে কাব্যাঙ্গন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে উত্তপ্ত স্বদেশ—আবার সেই ‘জেগে ওঠো সাহসী মানুষ’-এর প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা। কবি চয়ন করেন বিচিত্র রকমের মানুষের মুখ; দুঃখকথা, কষ্টকথা—ক্ষয়িষ্ণু, সর্বনাশা, ভূমিহীন, মূল্যহীন মানুষ–‘ডাকে : ওঠ, ওঠ, ওই ছেমড়ি, ওইঠ্যা আয়, দেখ্/ পুলিশের ভ্যানে চইড়া বাপ তর কোর্টে হাজির–/ কেইস উঠছে, মেজিস্ট্যাট দেখবি, আয়…’ ধানকন্যার উপাখ্যান, ছফিনার উপাখ্যান, মহাজন-দালালের শোষণের উপাখ্যান। সময়প্রবাহে আবিদ আজাদ বদলে যান। তীব্র শ্লে¬ষে, ব্যঙ্গে প্রান্তিক মানুষ প্রতিষ্ঠা পায় কাব্যের উঠানে। আধুনিক প্রাণচাঞ্চল্যে সম্পর্কনীতির পাদটীকা তৈরি করেন কবি। যে দায়বোধের অনুপস্থিতি ও নির্বিরোধী আখ্যা দিয়েছি কবিকে তা বাতিল করে দিয়ে সক্রোধে—তীব্রতায় দায়িত্বে শাণিত হন তিনি। এ সময়ে আবিদ কবিধর্মে আকুল, কর্মপ্লাবি; স্বৈরশাসকের যাঁতাকল এক বিশেষ আঙ্গিকে ভর করতে তাঁকে প্রণোদিত করেছে। আশির দশকে অনেক কবিই এ তাণ্ডবে প্লাবিত। তবে এ কাব্যের কবির মধ্যে একটু ভিন্নতা অনেক বড় মাপেরজ্জবলতে হয়। যে ফর্মে এবং ডিসকোর্সে কবি ‘আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি’ কবিতায় উঠে এনেছেন তা প্রজন্মান্তরের দিকনির্দেশক। ইচ্ছে করেই এ পরিবর্তন নয় সময়-সংক্রমকে বাঁধতে গিয়ে কবি পুনরুক্তির ধ্বনির আশ্রয় নিয়েছেন, জিজ্ঞাসার প্রাখর্যে মূর্ত করে তুলেছেন ভুঁইফোঁড় চরিত্রের দুরুদুরু আক্ষেপকে। সেজন্য বর্ণনার রূপ বিভাসিত, দীর্ঘায়ত ও সংলাপযুক্ত। এ পর্যায়ে মনে রাখা প্রয়োজন পঙ্ক্তি এখানে হয়নি শ্লোগান। নন্দন জ্ঞানে, নান্দনিক থেকে কবিতার ভেতরে কাব্য রচিত হয়েছে।
অনেক কবিতা স্বল্প সময়ে লিখলেও কবি কাব্যকে হারাননি– এটা সত্য। কবিতায় আদিষ্ট হয়েই ক্রমাগত লিখে চলেছেন। ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৮৭) পূর্বোক্ত কাব্যের– প্রায় একই সময়ে লেখা। সে কারণে তেমন পার্থক্য চোখে পড়ে না এ কাব্যে। নজরে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত কাব্যবয়ান প্রয়াস “ছন্দের বাড়ি” কবিতায়। ছন্দ জানেন বলেই ছন্দ স্বতোৎসারিত—ছন্দের খেলা আছে এ কবিতায়; দীর্ঘ কবিতা এটি, ছন্দের বসবাস, সংসার, ছন্দের বউ, বউ ছন্দ, বিরহী, প্রেমিক, সমিল-অমিল নানাভাবে ছন্দকাহিনি বয়ান হয়েছে এখানে। আগেই বলেছি, কবির অভিজ্ঞতা কবিতায় কার্যকর। ফলে অনেকের স্মৃতিচারণ (আবুল হাসান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হুমায়ুন কবীর, কায়েস আহমেদ, মাইকেল মধুসূদন, বুদ্ধদেব বসু) এসেছে—এসেছে অনেক বন্ধু শুভার্থীর প্রসঙ্গ। তাঁরা সবাই কবিতা হয়ে উঠেছেন। আক্ষেপ, প্রবঞ্চনা, মূল্যবোধহীনতা থেকে কবিভাবনায় এ প্রসঙ্গগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পরিশুদ্ধ হওয়ার বাসনা, বড় হওয়ার অবলম্বন কী :
রবীন্দ্রনাথ, বড় খারাপ সময় এখন, বড় বেশি অস্থির এই কাল
তাছাড়া এইসব আড়তদারদেরই বা কী দোষ দিই বলুন
জাতব্যবসা ধরে রাখতে পারে কাপুরুষই বা শেষমেষ?
রাতারাতি বদলে যাচ্ছে পণ্যভোগী পাঠক সমাজের মন ও লবণপিপাসু জিহ্বার রুচি ও স্বাদ :
এতদিন যাঁরা পাইকারি ও খুচরা রবীন্দ্রব্যবসা করে মোটামুটি ভালই ছিলেন বলা চলে
(“গুডবাই রবীন্দ্রনাথ”, ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা)
যথারীতি এ পর্বেও কবির বিষয় বদলেছে নগরের পুঁজির প্রকোপ, নেতিবাচক প্রয়োগ, পণ্য বানানোর তৎপরতা, অবাধ বাণিজ্যের প্রসারে– চাকচিক্যের জৌলুসে এখন অনুসরণীয় বা অনুকরণীয় কারা– সে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল পর্বে অবক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা সমাজে বাসরত ব্যক্তিকে দগদগে ক্ষতে পরিণত করেছে; তৈরি হওয়া রুগ্ন ব্যক্তি অসুস্থ মনকে নিয়ে অস্তিত্বহীন বেঁচে আছে—ক্রমাগত বাড়ছে শ্রেণিবৈষম্য। ফলে ঈর্ষা-ক্ষোভ বাড়ছে, জন্ম দিচ্ছে হতাশা; ক্রমশ স্বপ্ন দেখা বা স্বপ্ন তৈরি করতেও যেন ভুলতে বসেছে মানুষ। এমন সমাজে লোভ আর ব্যবসাই মুখ্য-পুঁজি বোধ করি তাই চায়। এ পর্বে কবিতা মুখ খুলেছে; মূলত হতাশাকেই প্রেমের আবরণে বয়ান করছে সে– ‘মিছিল, মানুষ, মুক্তি, মৃত্যু, দাবি–/ পোস্টার আর ফেস্টুনে লেখা কথা সেদিনের সব স্বপ্ন আর্তরব–/ মনে হয় সব ব্যর্থ, অযথা সব।’ সাম্রাজ্যবাদের বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কবির উচ্চারণ আরো তীব্র :
এও কি তথ্য-সাম্রাজ্যবাদের
তথ্য চালাচালি? দেখে আজ
পিঁপড়ে ও পোকারা সমিতির
ছত্রছায়া খুঁজে ফেরে– তাই
পঁয়ষট্টি হাজার গ্রামের
নিরন্ন মিছিল নিয়ে আজ
বাংলাদেশ একটি নির্বাক
গ্রাম।
(“উড়ে যাবে তর্কে বহুদূর”, ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা)
প্রত্যক্ষত রাজনৈতিক পর্বে চিহ্নিত এসব কবিতা। উত্তরিত কবি এসবের মাঝে আশার পদধ্বনিরই সুর তোলেন। মার্কসবাদের প্রভাব কবিতায় কোনো কোনো সময় প্রভা ছড়ালেও তার তত্ত্বগত প্রয়োগ নিশ্চয়ই শিল্পে আনেননি তিনি। সে সম্বন্ধে যে নেই এটা অনেকভাবেই নিশ্চিত। ক্রুদ্ধ সময়ই তাঁর আলেখ্য। সচেতন দৃষ্টির মাত্রায় এ নৈর্ব্যক্তিক সঙ্গসুখ অনেকের মতো এখানেও অমূলক নয়। তবে এটা মান্য কবিতা ও প্রকৃত কবিসত্তা এসব তত্ত্ব-আদর্শ-শ্লোগান পরোক্ষ ইঙ্গিতই করে মাত্র—তার বাইরে বিন্দুমাত্র কিছু নয়।
তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? (১৯৮৮) কাব্যের নামকবিতাটি বেশ আকর্ষণ উদ্দীপক। প্রশ্নের সমাহারে এর প্রকরণ অন্যরূপে প্রকাশিত; তবে আমারও জমাটবদ্ধ প্রশ্ন : আবিদ এ পর্যায়ে বোধ করি একটু থামতে পারতেন। ভিন্ন প্রকরণ হলেও এমনটা বলতেই হয়, এ কাব্যে কবির উত্তরণ-শক্তি উত্থানরহিত। প্রচুর লেখায় এবং ক্রমাগত উৎপাদনে কবির মনন-মেধা আর যেন পাশ বদলায় না। উল্লিখিত কাব্যের নাম-কবিতার বিষয় নিয়েও এ কথাগুলো বলবো। পূর্বোক্ত কাব্যের প্রসঙ্গে যা বলেছি তা পুনর্ব্যক্ত না করে এর নতুনত্ব কতটুকু সেটা বলাই ভালো। প্রশ্নের ভেতরে গল্প, জিজ্ঞাসা, উত্তাপ—শ্যেন ব্যঙ্গ : ‘তোমার পায়ের কাছে শুয়ে সাদা কুকুরের মতো/ ঘুমায় পত্রিকার এলোমেলো পাতা?/ তুমি কি এখনো খুব মানে খোঁজো?/ বলো অবসর পাও? দূরে গিয়ে/ চোখ বোজো?’ কোনো জিজ্ঞাসা প্রকৃতির মাত্রায় সমস্ত সমসাময়িকতাকে আত্মস্থ করে; ছড়িয়ে দেয় প্রশ্নসঙ্কুল বৃষ্টিবাহিত প্রসন্নতা– কিন্তু ক্লান্তি পথ ছাড়ে না, বেপথু-শঙ্কিত-কাতরকম্পিত বারতা আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। অনুমতি হয় অনুভবে হতশ্রী সংসারের কলধ্বনির। আঙ্গিক ইঙ্গিতময় করে ভাষ্য বয়ান করে– মধ্যবিত্ত স্বেচ্ছাচারিতায়, উক্তির উপ্ত ক্লেদ বা অভিমানী শ্ল¬াঘার বিপরীতে একটু সুখ পেতে চায়। এ গ্লানিজর্জর সুখের উপমা বহন করে একফালি চাঁদ, উঠোনে বৃষ্টি, শীতনদী প্রভৃতি। তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? কাব্যের প্রায় সব কবিতারই অর্থ মধ্যবিত্ত আবেগ, ক্ষুণিœবৃত্তি করা মানুষের বিনোদন পাওয়ার, অনাকাক্সিক্ষত কিছুর জন্য বেদনাহত হওয়ার বিপরীতে কষ্টবিলাস আর তার সুর ও তান সৃষ্টি করে বাউল বাতাস, উদাসী বৃষ্টি আর উত্তুরে হাওয়া। এটাই সমাজ-ক্লিষ্ট বার্তার নির্ণীত প্রকরণ। এবার এ কাব্যে আবিদের ব্যর্থতা এটুকু—পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে এখানে কবিমননের কিছুটা লয় ঘটেছে যা অনাহূত, কারণ কবির অগ্রগমন আগামীর ন্যায়, দুই– তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? কাব্যটির মেসেজ নেই বা বলবো নতুন কিছু বলেননি কবি—নিছক প্রকৃতির তরল পিয়াসে আপ্লুত হওয়া ছাড়া। মনে হয়, আবেগের গাঢ়ত্ব তৈরির আগেই, অভিজ্ঞতার জারণ-বিজারণ ঘটার আগেই কবিআত্মার প্রসব ঘটে গেছে। প্রতি বছরই আবিদের কাব্য বেরিয়েছে– বলা চলে কোনো বছর দুটিও। বোধ করি এমনটিই এর কারণ। “রোগশয্যায়”, “জীবন ও কুকুর”, “চারা” এমন কবিতার মেসেজ আমরা আগেই পেয়ে গেছি। আবিদের পরের কাব্য আমার কবিতা (১৯৮৯) ঠিক ছমাসের মাথায় বেরিয়েছে। এ কবিতার ভেতরে রসোদ্দীপ্ত কিছু কবিতা পাই। একটা সময়ে বাংলা কবিতায় অনুপম গতিসৌন্দর্যে, গল্পকথনে কবিতাচর্চা বেশ প্রচল হয়ে পড়ে—এবং তা বিদ্যুৎপ্রভাও ছড়ায়—নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক কিংবা আল মাহমুদ, শামসুর রাহমানরা তো বটেই―সেটা সত্তর-আশিতে আরো বেড়ে যায়। কবিরা ভাবে-চিন্তায়-মননে-অভিজ্ঞতায় এ প্রকরণকে গুরুত্ববহ করে প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত বলি, রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতা প্রসঙ্গে কিন্তু এ কথা বলছি না। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের গদ্যকবিতার যে বিশেষ রূপ (হয়তো তা ভিত্তি পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের মাঝে) তার নিরীক্ষা ও বহুমাত্রিকতা প্রসঙ্গে বলছি। কাব্যভূমিতে এর কর্ষণ বহুধাবিভক্তি পেয়েছে। আবিদ আজাদও তাৎপর্যপূর্ণভাবে এ পর্যায়ের পথিকৃৎ। আমার কবিতা থেকে উদ্ধৃত করলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে পারে :
আমার কবিতা বিষয়ে তুমি আজো কোনো ডিসিশন নিতে পারলে না
পারলে না বলেই অন্যমনস্কভাবে এখন তুমি দাঁতে কাটছ নখ
পারলে না বলেই তোমার আঙুল এমন উদাসীনভাবে এখন বিলি কাটছে চুল
পারলে না বলেই এখন তুমি চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে বসে আছ
আমি তোমার এই অন্যমনস্কতার মানে বুঝি
আমার কবিতার ব্যাপারে তুমি আজো কোনো ডিসিশন নিতে পারছ না
(“আমার কবিতা সম্পর্কে”, আমার কবিতা)
সরল গদ্যে এমন কাব্যপ্রয়াস নতুন কি? হয়তো নয়। কিংবা অভ্যস্ত চোখে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এ পর্ব তৈরি হওয়ার পেছনে বা প্যাটার্নটি আয়ত্তের পেছনে তাঁর উত্তরণের পথটা নিরীক্ষণ জরুরি। আবিদের কাব্যে বেশ সচল ও স্বতঃস্ফূর্ত পথ পেয়েছে এ প্রকরণটি। তুমুল উত্তাপমুখরিত ছন্দসৌন্দর্যে আবিদ উঠিয়ে এনেছেন কবিতার দুঃখ-কষ্ট লাগানো কর্কশ-মর্মরিত খরস্রোতা সময়কে। নগর সমাজে নিত্য ব্যবহার্য বিষয়-আশয় আপাদমস্তক সংসার কর্মকাণ্ডের ব্যবহার্য সামগ্রী কবিমর্মে ছন্দমাত্রা অর্জন করেছে। ‘তোমার কবিতার ভেতরে আমার কিচেন/ গ্যাসবার্নার জ্বেলে দিয়েছি আমি আমার নারীহৃদয়ের/ স্বপ্নের কেতলিতে চাপিয়েছি নক্ষত্রলোকের ঝরনার জল/ ছুরিতে ফালি-ফালি করে কেটেছি শিশিরধোয়া অবুঝ তরকারি/ আমার সস্প্যানে কুসুমসুদ্ধ ভেঙে দিয়েছি ডিম অসীমের’—এমন কবিতায় চমৎকার একটা মাত্রা যুক্ত হয়েছে কাব্যের অন্তর্নিহিত মর্মবিন্দুতে। এখানে বলবো, কবিতার প্রবহমান স্রোতে থাকলেও কবি বেপথু হননি। যে ত্র“টির কথা আমি আগে বলেছি এখানে তা আমি নিজেই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হই যখন এমন যাপিত শব্দ নির্বিচারে কাঁধে বহন করবার শক্তি আবিদ অর্জন করে ফেলেন। কবিতা সমগ্রর মধ্যে আবিদ তাঁর কবিতাচর্চা সম্পর্কে বলেছেন : ‘লিখেছি সবসময়। যখন খুশি তেমন যেমন খুশি তেমন লিখেছি। আনন্দও পেয়েছি। সৃজনের মুখে পাথর-চাপা-পড়া সাময়িক নিরানন্দ বন্ধ্যা সময়ও পার করে এসেছি মাঝে মাঝে। দিন মাস বছরের সে সব দারুন বন্ধ্যাত্বের নিষ্ফলা দিনরাত্রির খর্খরে ভূচিত্রাবলি আবার এক সময় বর্ণে গন্ধে চিত্রে ছন্দে গদ্যে পাগলের মতো মাথার ভিতর প্রবল স্বপ্নের ঝড়ঝাপটা নিয়ে জেগে উঠেছে কবিতারই বসন্তের হাতের দয়ায়। কবিতার নতুন আক্রমণ শেষমেশ ভুলিয়ে দেয় সব আকালের স্মৃতি, পাশবিক অনিদ্রা, স্রোতহীন বোবা ও অপারগতার লোমশ সাহচর্যের দাগ। আমিও ভুলেছি। লিখেছি আবারও।’ এই বর্ণোজ্জ্বল পথে কখনোও ক্লান্তি আসেনি আবিদের। সে কারণেই সময়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়েছেন তিনি। কৈশোর– আবেগ পেরিয়ে যৌবন—আর যৌবনের পরিপক্বতায় দুর্ভার-দুর্মর অভিজ্ঞতা। সেখানেই দ্রুত বেছে নেওয়া সঙ্গিন-প্রকরণ। যেখানে জ্যোৎস্না, বৃষ্টিধোয়া আকাশ এসবের সঙ্গে সুখপ্রদ বস্তুসামগ্রী, নিত্যব্যবহার্য বস্তু যেমন নির্বেদ কবিতাস্পর্শ অনুভব করে তেমনি চিবুক, আঙুল, স্তন, নিতম্ব, পিচ্ছিল পেলব যোনি অনিবার্য কাব্যবোধের অংশ হয়। “আমার কবিতার মধ্যে তোমার ঘর তোমার সংসার”, “তখন তোমাকে দেখে আমার কবিতা”, “আমার কবিতা সম্পর্কে”, “আমার কবিতার ‘তুমি’ শব্দটিকে নিয়ে”– এ কবিতাগুলোতে অস্থিমজ্জার ভেতরে; সমস্ত আড়ষ্টতার ঊর্ধ্বে, শ্লীল-অশ্লীল জ্ঞানের ঊর্ধ্বে অনুভবের প্রতিপাদ্যে দীর্ঘায়ত ও নিশ্চিত এক অনির্বচনীয় বোধে জারিত হয়েছেন কবি। যে প্রসঙ্গে একথাগুলি বললাম—বিপরীতে অনেকেই বলতে পারেন এরকম যে, শ্লীল-অশ্লীল বা আড়ষ্টতা ইত্যাদি কাব্য আলোচনায় বা কবিবোধের মাত্রায় অনেক পুরনো অনুষঙ্গ– কিংবা বলা চলে বুদ্ধদেব বসুরা অনেক আগেই এসবের মীমাংসা দিয়ে ফেলেছেন। আজ একবিংশ শতাব্দীর ক্রিটিক এসবের অনেক বাইরে! ইত্যাদি ইত্যাদি…। হ্যাঁ, তা হয়তো সত্য; কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজবাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কিংবা তাদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে পরিমাপ করলে এর উত্তর অনেকটা উঠে আসবে। বস্তুবাদিতার চর্চা আমাদের কাব্যে অনেক আগে আসলেও লক্ষণীয় মাপে এসেছে ষাটের ভেতর দিয়ে এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু বহু কবিতা ‘কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি’ কিংবা ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’ এমন বিবেচনায় সত্যিই প্রকৃত কবির নির্বাচিত বিষয়ের দায় ও অনিবার্যতা, না-কি সেক্স নিয়ে হৈ চৈ—কবিতা মানেই নারী, সেক্স কিংবা অতিশয় সাম্যবাদী হওয়া ইত্যাদি সীমানা রক্ষা করা আজকাল মুশকিলই বটে। পর্ণোগ্রাফি ও সাহিত্য দুটোর সীমানা বা সঙ্গ-প্রসঙ্গ নির্ধারণ জ্ঞান থাকা চাই। এবং নিশ্চিত যে কোনো লেখকের তা না থাকলে চলে না। কথাগুলো বলছিলাম আবিদ আজাদের কবিতা-নারী-প্রকৃতি-প্রেম বিষয়ের মধ্যে অনিবার্য কাব্যশক্তিতে নিরূপণ চিন্তা থেকে। এটা নিশ্চিত, কবির নির্বাচিত বিষয়ের সীমাজ্ঞান ও বোধচিন্তা প্রথম পর্যায়েই কৃতকার্য হয়েছে। সে কারণে বলতেই হয়, কোনো প্রকৃত কবিসত্তার এ কৃতকার্যতার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। নিশ্চিয়ই পাঠক, এতোক্ষণের আলোচনার পর এ মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের কোনো ব্যাপার নেই। যা হোক, বেশি কবিতা লেখার অপবাদ না দিয়ে বরং সংক্ষিপ্ত সময় ব্যবধানে এ কাব্যের কবিসাফল্য স্বীকার করে পরের কাব্যালোচনায় শরীক হওয়া যেতে পারে।
কবির পরের কাব্য খুচরো কবিতা (১৯৯০), আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে (১৯৯৩), আমার অক্ষমতার গল্প (১৯৯৮) এ পর্বের কবিতাগুলোতে কবি বিষয় ও প্রকরণে পরিবর্তিত। বলা চলে, কাহিনিকাব্যের দিকে কবি ঝুঁকে পড়েছেন বেশি। কবিতানাট্য লিখেছেন কিন্তু তার পর্যায় শুরু হয়েছে একটু আগে থেকে। কবিতানাট্য নিয়ে আমরা এ আলোচনায় কথা বলবো না কারণ, কবিতা-নাটক এবং কাব্যনাট্য ভিন্ন প্রকরণ ভিন্ন বাস্তবতা। বলা চলে, তার ইতিহাসও ভিন্ন। আবিদ আজাদের জন্য কবিতানাট্যের আলোচনা আপাতত তোলা থাক। কিন্তু কবিতার আলোচনায় যতোদূর আমরা এসেছি তা শেষ করবার নিমিত্ত আবিদের কবিতানাটক ও তার পূর্বাপর শিল্পবীক্ষা সম্পর্কে কিছু বলা জরুরি। এটা মূলত কবিতারই আলোচনা। এখানে যে তিনটি কাব্যের কথা আমরা বলেছি তার কথা বলতে গিয়ে হয়তো কবিতানাট্যের বিষয়টির ইঙ্গিত আসতে পারে। এ পর্যায়ে কবি আসলে কবিতানাটকের পথেই এগিয়েছেন। আগেই বলেছি, আবিদ আজাদ দীর্ঘায়ত উত্তরণের পথে বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে কবিতার কাহিনিকে বিশেষ কাঠামোয় দাঁড় করিয়েছেন। পূর্বাপর আলোচনায় তাঁর কবিতায় গাল্পিক ঢংয়ের কথা আমরা বলেছি। এ স্টাইলের পরিপক্ব ও মার্জিত প্রকরণ প্রচেষ্টায় তিনি হয়তো কবিতানাট্যের দিকে এগিয়েছেন ক্রমশ, অনুমান করি। কবিতানাট্যের আগেই এ পর্ব কবিবোধে অনেকটা চিহ্নিত। কিন্তু কবিতা তার সঙ্গে কবিতানাটক একটু আলাদাই বটে। নাট্য-নাটক-কাব্যনাট্য ভিন্ন সংজ্ঞায় ও প্রবণতায় বিশেষিত। যাহোক, আবিদের কবিতা যে পথে এগিয়েছে মূলত সে পথটাই আমরা চিহ্নিত করবো। উল্লি¬খিত তিনটি কাব্যে কাহিনি-কাঠামো বিশেষ রূপে অভিষিক্ত। কবিতার নামগুলো দেখলেও তা অনুমান করা যায়। “ভোরবেলা, ৪ঠা অক্টোবর”, “১৯৮৭ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল”, “একটি গোলাপের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি সেদিন”, “তারা ও মানুষ”, “কিশোরগঞ্জের বিষণ্ন চিবুকের সেই মেয়েটি”, “লতিফ সাহেবের অবসরপ্রাপ্ত জীবনের শেষ দিনগুলি”, “নজরুল এবং একটি লাল চিরুনি”—এসব কবিতায় কাহিনিই মুখ্য। কাহিনিই যেন কবিতার আঙ্গিক নির্মাণ করেছে। উদাহরণ :
কয়েক বছর আগে নজরুলের সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল
প্রচণ্ড ভোরবেলার সাথে যেমন মাঝে মাঝে ঝড়ের দেখা হয়
ঢাকার পিজি হাসপাতালের একটা বিশেষ কেবিনে তখন ছিলেন নজরুল
ডেটল ও ফিনাইলের গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি তাঁকে দেখছিলাম
মনে আছে, তারও আগে, বেঘোরে-পড়া কিশোর আর যৌবনে-পা-রাখা
স্বপ্নগ্রস্ত সব বাঙালি যুবকদের কাছে
(“নজরুল এবং একটি লাল চিরুনি”, আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)
কিংবা,
কিশোরগঞ্জের বিষণ্ন চিবুকের
সেই দোহারা গড়নের মেয়েটির কথা
খুব মনে পড়ে আমার
মনে পড়ে শীতের ভোরের
শিউলি ফুলদের সঙ্গে ছিল তার
ভীষণ মনের মিল
দেখলে মনে হতো হেমন্তের পড়ন্ত বিকেল বেলাটি যেন
তার সবচেয়ে গভীর বান্ধবী।
(“কিশোরগঞ্জের বিষণ্ন চিবুকের সেই মেয়েটি”, আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)
কবিতার মধ্যে অনেকরকম ব্যাপার অনেকভাবেই আসতে পারে কিংবা একজন কবি তাঁর ক্রম-অভিজ্ঞতা বা ‘pure experience’-এর আলোকে তাঁর মাত্রিকতা নানাভাবে পল্লবিত করতে পারেন। তবে লেখকের এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে রাখা জরুরি যে, ‘poetry tends toward a higher degree of formal organization than does prose এ কারণে ‘stuff of poetry’ রচিত হয় ‘human interest’ থেকে। এর ভেতরেই ন্যারেটিভ অবজেক্ট লুক্কায়িত থাকে। আবিদ আজাদের লেখার যে অংশটি নিয়ে আমরা বলতে চাইছি সেখানে এই অবজেক্টকে ধারণ করতে গেলে যে ফ্রেজ দরকার তাই ফর্ম তৈরি করে দেবে। উপাখ্যান বয়ানের জন্য কবি অর্জন করবেন বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ঐতিহ্যিক বিষয়; যেটা ‘accumulation of detail’ এবং ‘by the sharpness of selected detail’. আর কবিতা যেহেতু তাৎক্ষণিক প্রয়াসে বিবৃত সেজন্য ‘the concentration and intensity’র উদ্দেশে ছন্দোময় ভাষা প্রয়োজন। নিশ্চিত অর্থেই কবিদৃষ্টি এসব অর্জন করবে একটা দার্শনিক চিন্তা থেকে। স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়াসে আবিদ আজদ নাগরিক সমাজকে সূক্ষ্মতরভাবে গ্রথিত করেছেন এক ধরনের ফবংপৎরঢ়ঃরাব উপস্থাপনে। সেখানে মানবিক চরিত্রের প্রকাশনা নানাভাবে বিবর্ধিত, নিরীক্ষিত। ভয়, লজ্জা, সংস্কার নানারঙে বিবিধ অনুভবে জড়ায়। ফলে কবিবার্তায় গল্প রচিত হয় মানবিক আবেগ ও মূল্যবোধের নিরিখে :
একদা তোমার রাজভিখিরির মতো গলা শুনে
আমাদের দেশে শুরু হয়ে যেত বসন্ত উৎসব
বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে মেয়েরা গাইত স্তব,
পাড়া বেপাড়ায় ছুটত ফোয়ারা– রাষ্ট্রীয় গুঞ্জন।
(“কৈকিল”, আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)
এবং
যদি শিশির গড়িয়ে পড়ে যায় বাড়িটা তবু টলটল করতে থাকবে
যদি শিশির শুকিয়ে যায় বাড়িটা তবু ঝলমল করতে থাকবে
আর আমি বাষ্পরুদ্ধ চোখে দেখতে পাব দূরে…অনেক দূরে…
জেগে আছে…আমার বাড়ি…
(“আমার বাড়ি” আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)
আবিদের কবিতার যে ত্র“টির কথা আগে বলেছি তার সাপেক্ষে বলতে চাই sights and sounds, smell’-এর জন্য image কবিতায় অনিবার্য। এ পর্যায়ের কবিতায় ইমেজের ব্যবহার নেই তা নয় কিন্তু মন জাগানো বা অর্থাতিরিক্ত ব্যঞ্জনাধর্মী ইমেজ পাওয়া যায় না। অথচ পূর্বেই উল্লেখ করেছি কবির ইমেজ সৃষ্টির দক্ষতার কথা যা প্রথম, দ্বিতীয় বা চতুর্থ পর্বের কাব্যে অবহেলিত নয়। এ প্রসঙ্গটির পুনরুক্তি এ কারণে যে, কবি যেদিকে এগিয়েছেন যেমন কাটপ্রোজ বা চিলতে গদ্য সিরিজের কবিতার মতো কবিতা ঘোষণা দিয়ে যখন লেখেন, তখন কবিতার descriptive পদ্ধতিকে মানতেই হবে। কবির সে বিষয়ে একটু চিন্তাভাবনার অবসর আছে বলে মনে করি। নইলে অনেক উৎকৃষ্ট কবিতা সৃষ্টির ক্ষমতা যেখানে তার আছে, সেখানে সিরিজগদ্য বা কবিতাগদ্য নিয়ে যেটা বলছেন সেদিকে সাবধানে এগুনোই ভালো মনে করি। মন্ময় ভাবনাকে শুধু মুটিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ কম—ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইমেজ তৈরি করে বহুমাত্রিকতার মধ্য দিয়ে না চললে টেক্সচার বা ফ্লেভার যেটাই বলি তা আর মেলে না।
সত্তরের কবি আবিদ আজাদ বাংলাদেশের কবিতাঅঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত এবং সম্ভাবনাময়ী কবির প্রাতিস্বিকতায় সমুজ্জ্বল বলে মনে করি। যে পথে তাঁর দীর্ঘ পথচলা সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তিনি সুদূরের পিয়াসী। কবিতাসমগ্রর মধ্যে অনেক ভালো কবিতার তিনি জন্ম দিয়েছেন। বিশেষত, তাঁর উত্তরণের যে পর্যায় আমি লক্ষ করেছি সেটা অত্যন্ত সামর্থ্য ও প্রতিপত্তিসম্ভূত সন্দেহ নেই। আর একই সঙ্গে কবির উত্তরণের পর্বে আমি কবির কবিপ্রেম ও কবিতার প্রতি যে প্রাণঢালা আকুতি তার মর্মরধ্বনিরও সন্ধান পেয়েছি। এতে করে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে এ প্রবণতার কবিআত্মা মরবার নয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ আলোচনায় আমার সাবধানবাণীও আছে—যেখানে তাঁর সীমাবদ্ধতার সূত্র অঙ্কিত হয়েছে। শিল্প আলোচনায় একটা কথা আছে, ‘যত মত তত পথ’। যে ন্যারেটিভ বা ডেসক্রিপটিভ পদ্ধতির কথা এ কবির ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য করে বলবার চেষ্টা করেছি তা একান্তই আমার নিজের। তবে vivid and recognizable impression of some natural scene or natural object¾a register, rendered as accurately as the poet could manage, of the impression he himself had received through his senses, or had  imagined.’—এমনটা কবি ও কবিতার ক্ষেত্রে সত্য বলেই মানতে হয়। নইলে কবিতার কাছে পাঠক যাবে কী উদ্দেশে! তবে ছন্দে-মাত্রায় আবিদ পরিষ্কার, শত শত কবিতায় ছন্দ তাঁর প্রাণোচ্ছ্বল, বেগবতী, প্রাণপ্রাচুর্যপূর্ণ।

২০০৬