বিশ শতকের রূপকথার নায়কেরা : শহীদ ইকবাল

তখন হিম-হাওয়ার ওসে ওসরাখানা ভরিয়া গিয়াছে। কুয়াশাছায়ায় বিহানবেলার বাড়ির দেউড়ির উন্মুক্ত রাস্তায় চক্ষু তাক কইরা দেখি অনেক মোটা মোটা চুনঅক্ষরে লেখা : ‘…জেনারেলকে ভোট দিন’। তখন আমাদের সবুজপান্নায় কিশলয় রঙ ধইরেছেজ্জদোয়েল-ফড়িংয়ের গন্ধমাখা প্রকৃতি অপার রঙে মুকুলিত হইয়াছে, পরিজনের ভিতর ঠাসা গমোকে বিলাপ ওঠেজ্জ‘ভোটে ওই জেনারেল না জিতিলে অবশ্যি অবশ্যি যুদ্ধ নাগিয়া যাইবে। যুদ্ধ নাগলেই তামান শ্যাষ!’ অনতি কয় বচ্ছর হইলো যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আবার আর একটা যুদ্ধ নাগিয়া গেলে তার হিস…হিস… আওয়াজ… কেউই য্যান আর মানিয়া লইতে চায় না, এক্কেবারেই অসম্ভব অবাস্তবজ্জঅবাস্তবমান্য সব মনোলীলা। ভয়কাতুরে মাহবুব আজ সবাই। ঝড়ঝরানো বৃষ্টিব্যাকুল সময়ে পুরনো পানদোকানি আজিজের বাপের বটতলার টংয়ে কয়জন বইসে কয় : ‘এবার যুদ্ধ নাগলে সোগ্গ শ্যাষ, কী যে হওচে বাহে দ্যাশটাত… শ্যাখ সায়েব যায়্যা তামান য্যান আউলি গ্যালো’জ্জএসব একাত্তর-ধরা বীরময় দুর্মর কাহিনী কী প্রকারে প্রচারিতজ্জতাহা শোনা যায় মায়ের কাছে, বয়সী নানীর কাছে, আর সক্কলের গুজব-কেচ্চায়। অনেক প্রকারে, অনেক সত্যমিথ্যার কুহকে তা আটকানো, বাস্তব-অবাস্তবের জারিজুরিতে অপাররূপে মাখানো। সে যুদ্ধ কার কাছে ক্যামনে ছায়া পায়, কে কোথায় পালাইয়া যায়, কে ক্যামনে লূট করে, কাহারে মেলেটারিতে লাইনে দাঁড় কইরা মারে, কাহারে বা মৃত্যুমুখে ছাইরা দেয়, কাহারে আবার গোর খুঁড়ে মৃত্যুকূপে নামাইয়া কল্মা পড়ায়জ্জকব্বরে নামায়-ওঠায় আবার ওঠায়জ্জবহুত তামশার করুণ বিবরণ বসিয়া যায়, সে সব বিবরণে কাণ্ডে-শাখায়-শিখরে স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হইলে আমরা নদী আর কাশফুলের হাওয়ায় হাঁটিয়া যাই। কাহিনীকথা বুইনা চলি। কাহিনীকথার মধ্যে একাধিক উস্কানিতে এবারের ‘যদি-যুদ্ধ নাগে’র আশঙ্কা-ভাপ ওঠে। আর ওই জেনারেলকে নিয়া রাজকীয় সরমের কান্কানাকান্ কথা বাতাসে ওড়ে। সরল মানুষ, জটিল সময় পার করতাছে, সদ্যযুদ্ধ শেষ হইবার গন্ধ তাতে; মাত্র পাঁচ-সাত বচ্ছরের ফারাক তাতেই। লাঠি-লজেন, ভাগার বিল-মাখনা আর সিংগোর খাওয়ার অলসদুপুর, আহা কি আনন্দের ভয়-ভীতির জ্যোৎ¯œাদিন; যেখানে মানুষের রাজনীতির য-ফলা আয়ত্ত করিবার আর কিচ্ছু রহিল না। তখন দূর গ্রামের স্কুল হইতে বৃত্তি দেবার জন্য লোটাকম্বল লইয়া আসিয়াছে মেধাবী অনেকেই। খুব ভোরে সুর করিয়া তাহারা পড়ে পালআমল সেনআমল মোঘলআমলের বিবরণ। নতুন বইয়ের ভেতরে শহীদুল্ল¬াহ্র ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’ আর হ্যামিলনের বাঁশীঅলার ‘হাবা’ রূপকথার কেচ্ছা। সে চন্দ্রিমাগল্পের মৃদু আহুতি অতলের। তখন আমরা জানিয়া চলি সেইসব দেশসেরা সন্তানদের। রাস্তাঘাট নাই, কুপি জ্বালিয়া নাড়া দিয়া গদি বানাইয়া গরুরগাড়ীতে আসন পাতিয়া তাহারা পশ্চিম হইতে পুবে-উত্তরে-দক্ষিণে আসে; সঙ্গে তাহাদের এক বা দুইজন বড়ো শিক্ষক। সন্ততুল্য এ শিক্ষকগণ তাহাদের সন্তানের ন্যায় ভালোবাসিয়া চলেন। নিরিবিলি, যতœ করা এসব ছাত্রের গর্ব আলাদা, তাহারা অনেক দূর হইতে এখানে পড়িতে আসিয়াছে। করুণাময়ের দয়া-দাক্ষিণ্য তাহাদের মনমগজে তুফান ওঠে। আকুল করা সে পরিবেশের আহ্বান অপরূপ। সোনালী, সেলিম, সবুজ ভালোছাত্রজ্জকী চমৎকার তাহাদের হাতের লেখা, উচ্চারণের কী স্পষ্টতা, দার্শনিক মনে বিপুল আয়োজন যেন ছড়াইয়া পড়ে। নিদয়া সময়ে তাহাদের ভেতরে আশ্রমের মায়ার মতোন আচ্ছন্নতা; ছায়ায়-লতায়-পাতায় আবেগের ব্যাকুল উচ্ছ্বাস। সে মন্দ্রিত উচ্ছ্বাসে ধাইয়া আসে স্বপ্নসকল আর অবচেতনে সাঁতরাইয়া যায় সাদাঘোড়ার পাল, হাঁক দিয়া কয় ‘ও তোর পরণবাণী’। বাণী না বুঝিয়া কাক-চিলের পাখনায় ভাসিয়া দাঁড়ায় তামাম কিছু আমাদের সম্মুখে। সেইসব ভবিষ্যতের মাথায় পা-দিয়া নিধুয়া চৈত্রের এক দুপুরে ভাপিয়া আসে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। তার জন্য শ্লে¬াগান আসে, মুষ্টিমেয় টগবগে তরুণগণ মুখরিত হইয়া ওঠে। চকচকে পোস্টার আর সাবেক মন্ত্রীমিনিস্টার-মার্কা তেলতেলে চকচকি ছবি ‘ভূম’ দোদুল্যমান হইয়া পত পত করিয়া উড়িতে থাকে। চিক্কনসুতায় তা নির্ভুল প্রান্তরে দোলেজ্জপুরানা ঘরে দোলে, দেয়ালে দেয়ালে দোলে, হাটের বটে দোলে আর তার লাগি পনর-বিশ করিয়া হাঁটিয়া চলে সবাই, ক্যানভাস-প্রক্রিয়ায় একটা সাইকেলে মাইক লাগাইয়া মারকুটে শক্তবাঁধনে বাতাসফাঁটা চিক্কুরে বায়না তুল্ল্যা কয় ‘ভোট চাই’, ‘ভোট দিন’। ব্যাটারী বা অন্যান্য সংলগ্ন তারে দ্বিচক্রযানে প্যাঁচিয়া হাঁটিয়া হাঁটিয়া একসঙ্গী পতঙ্গের দল বালুডোবানো পথে বইলা চলে : ‘জনসেবার সুযোগ দিন’। পুকুরের ধার দিয়া, কলার প্রাচীর পার হইয়া, ড্রেন-নর্দমা ছাপিয়া, কোটাঘরের পাশ দিয়া, বন-বাদারের ভেতরের চিক্কনরাস্তা ছাড়িয়া, পাথার পার হইয়া অনেকদূরের বিন্দুবিলীন পথে তখন চলিয়া যায়। সে অনেক সময়ের প্রচার-পরিদৃশ্যমান। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নাই। দল-মার্কা চিনিলেও কেমন-কী কারণে তাহা অনায়ত্ত। মাঝে মাঝে মন্ত্রীগণ সোরগোল তুলিয়া মিটিং করে, কী য্যান কখন কি হয় তাতে, কেমন পোচপাচ, বড়োলোকভরা বাস্না তাতে। সুং সুং গন্ধ আরও মজিয়া উঠিলে বাতাসমাখা মাভৈঃ শিহরণ চাপিয়া আসে। এক সময় তিনমিনিটের জন্যে পেরসিডেন আসিলে কী য্যান সাজ সাজ রব পইড়া যায়! ঝুঁকি নিয়া ভাঙা-ইটের দরদলানের ওপর উইঠা দেখিয়া চলা একজন লোকের জন্য কত্তো গাড়ির বহর, চলিছে তো চলিছেই, চলিতেছে মেলাজ্জঅনেক মেলা য্যান অনিঃশেষ সে মেলা। এই গর্বে-আনন্দে মিইশা নিরাকপড়া ভরদুপুরে এক সময় অনেক মানুষ জড়ো হয়। তখন হৈ দিয়া কই ‘চলো তুফান তুলিয়া দেই’। আহা আনন্দখেলায় তাহাতে জোয়ার ওঠে। আনন্দ বাড়িয়া যায়। নিশ্চুপ সময়ের অরুণিমারা স্নিগ্ধ আবেশে ভইরা তোলে স্কুলমাঠের সবুজঘাসে কাঁপুনি দোলার দুলুনিতে। ওইকালে মেলা দূর আকাশ-নামানো মাঠ গমগম কইরা ওঠে, কাঁপে অনভিজ্ঞ আহাজারিতে। প্রকৃতি সেখানে চঞ্চল হইয়া ওঠে, তরতর কাঁপিয়া দুলি আনন্দের কোণায় কামিনীকে, পলাশকে ডাকিয়া তোলে। ফোটা সকালকে আমন্ত্রণে তুলিয়া লয়। চল্ প্রভাতফেরিতে, বিজয়ের ৩৩ তোপধ্বনিতে। শিশুকুচকাওয়াজ, ২২ শ্রাবণ আর ১১ জৈষ্ঠ্যের জন্য আবৃত্তি-গান, স্কুল পুরস্কার বিতরণ মায়াঅঞ্জন মাইখা যায়। ৯৯ পাওয়া বন্ধু সঞ্জীব সুরকী মেশানো পুরাণপথে বিরাট রহস্যময় গল্প ফাঁদিয়া ধুলিধূসরিত মায়ার আজব গল্প বলিয়া চলে ‘এককালে এইহানে তলোয়ারের যুদ্ধ হইছিলো, ত্বরা তহন মায়ের পেডে’। কীসের তলোয়ার যুদ্ধ! জানা যায় না, ভঙ্গিতে বোঝা যায় না। সে হাঁটা পথে তখন মানুষ নাই, বিজনভূমে চারিপাশে উন্নাসিক ঊর্ধ্বমুখি কলাই সারির হুল্লোড় হিমালয় আঘাতপ্রাপ্ত মৌসুমীবায়ুতে দুলিয়া চলে, বাঁশঝাড় আর রূপময় জীবনানন্দ পল্ল¬ী তখন সব থরেবিথরে ঘুমন্তরূপে বশীভূতজ্জতাহাতে তলোয়ার কথা কয়, জয়-পরাজয়ের কাহিনী শোনায়। ওঁর তাতে কী-যে অপার আকর্ষণ আর মুগ্ধ করা সান্ত¦নাজ্জস্বপ্নদোলা বাজ্জ্যা ওঠে। সপ্তাহ পার হইলে শুক্কুরবারে বিরসবদনে কয়, ‘ছুটির দিন ভালো লয়’। স্কুল বন্ধের কারণে কান্দিয়া ওঠে; বেঘোরে দুঃস্বপ্ন গাঁথেজ্জ‘ক্যান তুই আজ ছুটিতে! ছুটিরঘণ্টা কী বাজে নাই! তুই কেন ওটা খাস্। শ্যাষকালে কী সেনেমার নাকান মরবু? আয় ভেলা ভাসানো ছুটি, তর লাগি মা কান্দে, বুবু কান্দে! হ, এরপর হবিবরস্যার-মৌলবিস্যার-হেডস্যার-নূরুস্যার-লুৎফরস্যার সড়কি নিয়া ডাকে : পড়া ক।’ মনভারী স্যার সব তখন আইস্যা পড়ে। চুপসানো ম্ল¬ানমুখ, অনতিআগের সব আনন্দে চুন পড়ে। বড়ফুপু ডাকে, হাট বেইড়া আসি। তর বাপে ট্যার পাইবো না। কিন্তুক হঠাৎ বাপের শাসন ঝুইলা গেলে তাও চুবকাইয়া যায়। হাওয়ায় হাওয়ায় নব নব স্বপ্নসকল তখন রোদতাপবাতাসে পল্লবিয়া ওঠে। বাঁশবাতাসের ভেতরে গাড়োয়া কুলকুল করে, তার পাশে বেড়–য়াসাপ ঘুমায়। সাপে পাপ, সে পাপে শাপজ্জতখন ওই হাওয়া ঘুরবাতাসে ভাইসা আসে। সব পার হইয়া সবুজ বিলি হাওয়ার ভিতর দিয়া হেরিংরাস্তায় শুরু হইছে কঠোর বারিবরষণ। মুষলধারায় তাহাতে ঠাণ্ডা বায়ু মাখানো। তবুও স্যার আসিয়া গিয়াছেন, না হলে জানালার পাশে-চাপা ওঁরা নাই কেন? ক্লাসরুমে আইস্যা তখন আসন্ন শিক্ষকের ক্লাসপড়ার হৈচৈ। অতঃপর পিনপতন নীরবতা। বিদ্যুৎবিহীন পৃথিবীতে জীর্ণ-দুস্থ পরিবার নিয়া বিন্যস্ত সমগ্র দ্যাশ, হারকেন-আলোয় সান্ধ্যাদীপ আর মাদুর পাতা কড়া শাসনে ধারাপাতমুখরিত পড়ালেখা। পড়িবার শুরুতেই হুকুমজারি, ছোট্ট সে স্টেশনারি দোকানে তখন আমাদের সদ্য-সমুজ্জ্বল হ্যাঁ-না ভোটের বড় ব্যবধানে জেতার মতো দস্যিপনা চলিতেছেজ্জযাচ্ছেতাই করিবার অফুরন্ত সুযোগ। পোস্টাপিসের বিনাবেতনের বই তুইলা দোকানে বেচিয়া দেবার সুবিধা আদায় চলে। মানসাঙ্কর প্রশ্নসমূহ অন্যকে দিয়া দেওয়া বা পুরোসেট কোনো বন্ধুকে দিয়া অকাল-হিরো হইবার আত্মঘাতি চেষ্টায় মাতিয়া ওঠাজ্জসে সব বেশুমার চলে। মতিচা’র ছেলে, রিফিউজির ছেলে হামেশাই এ লক্ষ্যে বোকা বানাইয়া দেয়। তবে তখনও কোনো আলো আসে নাই, রোরুদ্যমান টিমটিমে কুপি-আলোর বাইরে হ্যাজাগ মুগ্ধময় আলোর বস্তু। ওটি আমাদের বাড়িয়া ওঠার চাইতে আরও বেশি আকর্ষণীয়। আলোর ছলে তার উজ্জ্বলতা দ্যুতিময়। উহাতে পোকা আসে, কুয়াশা পড়ে, রমণীয় ফর্সাস্বাদ তুমুলতর হইয়া ওঠে, গা ধুইয়া যায়, বর্ষামুখরিত হইয়া ওঠে। কবে তাকে আরও দেখিয়াছিলাম মনে পড়ে, আহা! হালিমাখালার বিয়াতে। বর বিরাট হ্যাজাগধোয়া রাস্তায় গরুরগাড়িতে চইড়া আসিয়াছেন। ষাঁড়বাহিত সে গাড়ী সারবাধা আরও হ্যাজাগ ছিল ট্রুপ-তাগাদার ন্যায়। আমরা গেট সাজাইয়া নতুন খালুর উদ্দেশে কবিতা পড়িয়া যাই। নতুন খালুর মাথায় সিরাজ-টুপি, আর তার গাড়ীর তাজা ষাঁড় ভারী দুরন্তময়। ভয়ে পালাইয়া পেরেসান তখন দরদর ঘামে বাৎচিতে তালামার্কা ধানেরশীসের প্রার্থীর প্রসঙ্গ চইলা এলে, বঙ্গবন্ধু-ভক্ত নতুন খালু ক্ষমতাসীন সেনাশাসক আর পা-চাটা গংদের উদ্দেশে কী য্যান স্ল্যাং বলিয়া যান। আমরা তখন নব-খালুকে বাচাল বলি আর প্রশ্ন তুলি : ‘তার মুখে রুমাল নাই কেন’। তারপর ক্রমশ বিয়েবাড়ির হল্লারোলে একসময় নব-খালুর পরিচয় মেলে তিনি গুলাম মুস্তাফা। বাড়ি তার কিছু দূর মাদারগঞ্জে। মাদারগঞ্জ বিরাট হাট। সে কেন্দ্রে প্রধানত পাটের ব্যবসা। মুস্তাফা খালু জানানজ্জগৌতম বুদ্ধ আর তার নির্বাণ নিয়া। এলাকার পুতুলনাচ বা যাত্রা তার অন্তঃপ্রাণ : ত্বরা আগামী আশ্বিনে একটা বই ধর। আমিও পাঠ করুম। কী বই খালু? জল্লাদের দরবার। নাম শুইনা আমরা কাঁপিয়া উঠি, কিন্তু টাউন হইতে বই আনার পর তা আর কার্যকর হয় না, এলেকশান উপলক্ষে তখন রেড এলার্ট, এসব যাবতীয় কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রকর্তৃক বিস্তর রকমে নিষিদ্ধ। মুস্তাফা খালু হঠাৎ একরাত্রিতে এ্যারেস্ট হন কি য্যান রাষ্ট্রদ্রোহী হইবার কারণে, আমরা আর মাদারগঞ্জ যাই নাই। খুব মারপিঠ নাকি হইয়াছিলজ্জসমাজতন্ত্র বলা লোকেদের। কিন্তু মুস্তাফা খালু তো খারাপ মানুষ নন! তার কি পাট্টি আমরা জানি না, কান্দিয়া আমরা ফিইরা চাই তাকে, তার মুক্তি চাই। নিঃশর্ত মুক্তি, নির্জলা মুক্তি, অবিলম্বে মুক্তি চাই! আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, নিজের থেকে মুক্তি, জীবনের জন্য মুক্তি, মুস্তাফা খালুর মুক্তি, সাতবছর আগের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্ত করো হে প্রাণ, পাণ্ডবপরিবারের মুক্তি, ভীম-অর্জুনের মুক্তি, ভীষ্মদেবের মুক্তি, একলব্যের গুরুমুক্তি, কর্ণর বঞ্চনামুক্তি, তৎ ও এ-সামাজ মুক্তিজ্জরাজনৈতিক মুক্তি, ওহে মুক্তি তুমি কোথায় কাহার তরে তোমার এন্তার মুক্তির নাম ছড়াইয়া আছ, কবে তাহা ঘটিবে! তার পর বিস্তর শুনিয়া আসি আর প্রত্যহ শুইনা যাই, রক্তকরবীধ্যেয় রাজার ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’, অতঃপর তোমার-আমার নেতার ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’।

এইভাবে মুক্তিচিন্তায় পড়িবার কালে মুস্তাফা খালু অকালে হারাইয়া স্মৃতিতে দ্রবীভূত হইলে মনোযোগের জন্য আলমাহমুদের ‘নোলক’ বা জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা ঢের উঁচুগলায় ছায়া ছড়ায়। জীবনানন্দের ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’জ্জপড়িতে পড়িতে জল আসা বিস্ময় ছাইয়া যায়। প্রকৃতির চলতি হাওয়া কালবিনাশী আকুল চেতনাজগতে বিচ্যুত হয় না। কবিরাই অধিকাংশ ঐরূপ অধিকৃত করিয়া চলেন। প্রকৃতির সঙ্গে পাল্ল¬া দিয়া এসব কবিদের জয়জয়ন্তী উৎসব আসিয়া পড়িলেজ্জগুরু গুরু দেয়া ডাক কিংবা প্রচণ্ড দাবদাহে কবিদের কবিতা বা নাটক-নৃত্য দিকপ্লাবী বন্দনা বাজায়। মুস্তাফা খালু তাহাতে হারাইয়া গেলেও তার প্রভাব কাতরময়। রাত্রি ১০টার পরে অনেকরাতে মঞ্চে তখনও নাটক পরিবেশিত হয়। ঠাসা হলরুমে তখন নিদান-উৎকণ্ঠা-উত্তেজনা রাতের পর রাত বাড়িয়া চলেজ্জআকাশে তখনও কালো মেঘ ধাইয়া মরমী প্রকৃতি বুইনা চলে : ‘কারো লাগি সজল আঁখি ওগো সুহাসিনী’। এরূপ বন্ধনহীন প্রকৃতির ভিতর ঝরাশেফালির পথ বাহিয়া ‘নাট্যসপ্তাহ’ আসিলে কেন্দ্রে মুস্তাফা খালু দাঁড়াইয়া যান। সাতদিনে সেখানে সাতটা নাটক মঞ্চস্থ হইবে। থানা সদরের বাহিরের সাতটি সংগঠন এবার নাটক লইয়া আসিবে। তখন মজার উৎফুল্ল¬মুখর বিরামহীন পরিবেশে তোড়জোড় তার প্যান্ডেল লইয়া, বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন উৎসুক ভরে চরমমাত্রায় সবকিছু পাইয়া বসে। দেখা যায়, গাছের ডালে মন্দিরের ওপরে কিংবা কখনোও হুড়াহুড়ির গেট ভাঙিয়া মঞ্চস্থলে ঢুকিয়া পড়িয়াছে কতো রকমের মানুষ। স্ক্রীন সরিয়া পিনপতন স্তব্ধতায় মুস্তাফা খালুকে পল্লবিত উৎসবে সময়হীন অনুপস্থিত মনে হয়। আমাদের স্মৃতিবহ অন্তর্গত রক্তখেলা তাকে পুনর্বার পরিদৃশ্যমান কইরা তোলে। তিনি নাই, কিন্তু কেমন করিয়া ‘আছেন’ হইয়া ওঠেন? যেন তাহা নির্মিত শ্লোগানের মতো : ‘যতোবার হত্যা করো আবার জন্মাব কালের পাতায় লিখব বিপ্লবের ইতিহাস’। বস্তুত তিনি কি মরিয়া গিয়াছেন! মাদারগঞ্জের পথে আমাদের তো চলা হয় নাই কতোকাল! আমরা শেষাবধি সে সব শূন্যহাতেই ফিরিয়া যাই। পৌষরাতের যাত্রাও তখন তিনি ছাড়াই মঞ্চস্থ হইয়া চলে। পুতুলনাচ, পীরেরবান্নি, রাস, দোল ধারাবাহিক সংঘটিত হয়। কিন্তু হায়! কালবিনাশী যে মানুষটি প্রজাপতি ভালোবাসিতেন, ফড়িং আর নির্নিমেষ মেষ পছন্দ করিতেন তিনি ‘নাই’ হইয়া চলিয়া যান। তাহাই সর্ব-বাস্তবে পরিণতজ্জতবে কতোকাল, তাহা আর জানি না! সে সব বারিপাতে, প্রষণœকায়ার বিলুপ্তিতে, ধূলিঝড়ের করাল রেখাপাতে, সবকিছু যেন হারিয়া গিয়াছে। চোখের নিশায় সবই হইয়াছে অপসৃত। কত্তো ডামাডোলের অনেককাল তার ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’তত্ত্ব ভাসিয়া গিয়াছে, বেভুলা হইয়াছে, মনুষ্যসমুদ্রে ঊর্ব্বশীনৃত্যের সংজ্ঞার্থ। শুধু অনুভবে জানিয়া যাই, এসব অমরত্বে অমলিন অফুরন্ত গল্পমালা প্রভূত ঝড়বৃষ্টিবন্দনায় তিনি দেবতায় সমর্পিত হইয়াছেন। বাড়ির কড়া শাসন ভাঙিয়া তখন মেঠোপথ ধইরা ভাঙা পথে গ্রামছায়া হাওয়ার অন্যদেশে চইলা যাই। কী আনন্দে তখন অন্তর্লীন ছায়াঘেরা শিশিরগাছ নাচিয়া ওঠে, অফুরন্ত উৎসবে কলাছতর আনন্দগাড়িতে পরিণত হয়, খালে-পুকুরে ভেলা ভাসিয়া চলে, কিংবা তাহাতে উঠিয়া পড়ে চঞ্চলমাছ, চিল্কার ছায়া পানিতে আছড়াইয়া পড়ে, প্রান্তরের ডুবরিরা দূরপ্রান্তে জাগিয়া প্রণয়পন্থী হইয়া ওঠে। মরণ সাগরপাড়ে তুমি অমর বলিয়া আকাশকে সাক্ষ্য করে। সবুজ ঘেরা পৃথিবী তাহাতে অমল হইয়া কয় : ‘নির্জন খড়ের মাঠে পৌষসন্ধ্যার/ আবার আসিও তুমি’। উড়ালপঙ্খির ইমেজে ভাসিয়া চলে মনমাতানো পতঙ্গসব। তখন অভিজ্ঞতার আসরে যুক্ত হইয়া যায় রক্তদোলার তাবৎ সমুদ্র-উৎসব। চোখের তরঙ্গে কল্পনার রঙধনুতে লম্বা ধানক্ষেতে চওড়া আইলের ওপর দিয়া ঘাসফড়িংয়ের ছায়ায় সক্কলেই ছুটিয়া চলে। আর ওপারে খালের পুকুরে একপায়ে দাঁড়ানো অলস বক আমাদের রঙের মিছিলে শামিল হয়। ছায়াশ্যামলীন পাড়ে তখন ডাক ওঠে, ‘নাইমা আয় বাবা, ওইহানে কোণার গর্তে পুঁইয়া জাগচে’ জ্যোৎ¯œানকশায় বিলি কেটে তখন হাঁটা দেয় আম্বরি বু’র ছেলে। গোরস্থানের কোণায় আধো-অন্ধকারের বাঁশঝাড়ে সমতল জলরেখার উড়ন্ত মাছরাঙায় পাখাঝাপটানি ভাইসা ওঠে, ফিসফাস ঘুঘু-শালিকের চঞ্চল দৃষ্টি আমাদের অগণ্য উদাসীন করে। আম্বরি বু’র ছেলে গোছা ভরে চকচকে পুঁইয়া ঢাইলা কয় ‘ত্বরা আজ তল্লার পারে পুঞ্জের কোণায় পুষনায় আয়’। গভীর নলকূপের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার দুলাইয়া ওঠে, জলের যাত্রাপথের শেষ নালায় খুঁজিয়া পাওয়া যায় রুবিনারে। হায়! কত্তোকালের সে রুবিনা! ক্যামন বদলাইয়া গিয়াছে, সে পানি লইতে আসিয়াছে, তার স্বামী এখন শয্যাশায়ী। জীবনের দুঃসহ দ্বন্দ্বে চূর্ণ হইয়া গিয়াছে সবকিছু। আমারে চিনিয়া কয় : ‘তুই কত্তোবড় হইচস। জানিস না কত্তোকাল হইল মুস্তাফাখালুরে কেডা ব্যান ধরি নিয়া গেছে, কিছু ত্বরা কবার পাস?’ হু হু কইরা কইন্দা ওঠে, কই তখন ‘ক্যান সে ডুকরানো ডাক আবার মুখে আনলি’। ক্ষণিক স্থির হয়্যা ওরে তহন বুইঝে আনা দায়। তারপর আবার হেথা নয় অন্য কোথা ছুইটা চলার ডাক। বিষাদ ¯্রােতে দুলদুল জাগ্গা ওঠে। ঊর্ধ্বশ্বাসে তামাম দুর্বিপাক ধ্বনিয়া আসে। কান্নার ধারা ওরালে বয়। নিরাপরাধ বাতাসে তখন মন্দ হাহাকার। তিনি আর ফিইরা আসেন না, না-আসার উত্তর দিনমান মিলাইয়া যায়জ্জতখন ওসব কাক্সিক্ষত চিত্রে আর যেন মানুষ থাকে না, বৃক্ষ-পক্ষী-ময়ূরাক্ষী-অরণ্য আর উদার নক্সী-ছামিয়ানায় আকাশ আকাশলীনায় পৌঁছায়। হারাইয়া যাওয়া শোকে-উপাদানে আছড়ায়, কূলহারা তট শ্মশানে মিলায়, এক হয় ভোরবাঁশি মিছিলের বজ্রমুষ্ঠিতে, হত্যার পরে নতুন কইরা জন্মাবার ঘোষণা আসে, সত্যানন্দে জীবনানন্দে বাঁচা মুস্তাফাখালুজ্জআহা কত্তোকালের শর্ষেবনে বিরান পাথারে বিলীন হন। গভীর রাত্রিপাশের মিশকালো আঁধারে বাঁশবাঁধা সাঁকোর তলে ঘূর্ণিপানির নিচ থাইক্যা ভাইসা উঠ্যা কন, ‘ক্যারে কাল বোলে বউলতলার মিটিংগোত পুলিশ গ্যাস মারছে’জ্জও রাস্তায় বাঁশের ওপর রাতে কেউ আছিল না, মরা-মুস্তাফা না-কি দলা-দফাদার না কয়জন চেয়ারম্যানের লোক গোল কইরে নৌকায় চুরমুর খসখস করে, পথ তো শ্যাষ হয় না, বালুর পর বালু ওড়ে নদীর দূর পাড়েজ্জসে বালু তো কাছে আসে না। হাতে সাইকেল লইয়া তল্লাবাঁশের ওপর দিয়া নদী পার হইয়া আমলি বা শিরিষের তলে কেউবা আন্ধার ঘরে বাঘ-বকরি খেলে আর কয় ‘দেউলা মিঠিপুর মোড়ের কানিত পুলের তলে খালি অক্ত…’, তখন কেউবা দেশলাইয়ের বাক্সে মূল্য-নির্ধারিত হারজিতের খেলায় মাইতা ওঠে। হ, অলস আড্ডায় একদিকে সুর বাধিয়াছে পালের নাইয়া অন্যদিকে বিশাল ইঁদারায় অনেকজন মিইলা স্নানগল্প শুরু করছে। শীতের খুলিরোদ তখন উপভোগের ক্ষণ ঘনেয়া আসছে। খাঙ্গাঘরে মাস্টারমশাই আইসা কন, ‘তল্লাবাঁশের তলাত ক্যান’জ্জহ রুবিনা তখন ওইপাড়ে পুঞ্জের কোণে পুষনায় ডাকছেজ্জকান্না কর‌্যা কয়, মুস্তাফারে আর পামু না, নাই সেজ্জনাই হইয়া গেছে। তারপর সেখানে রসনা-ডুবানোর পরে এক বিকালের পরিবেশ আরও দুর্বিনীত হয়জ্জহা-ডু-ডু আর ফুটবল খেলায় তখন পাড়ায় হস্তীদেখার বাজিমাত। এপাড়া-ওপাড়ার কতোজন তাহাতে আসিয়াছে তার ইয়াত্তা নাই। পানা-ফুটবলে দুর্দান্ত সব খেলা শুরু হয়্যে গেছে। ছায়াঘেরা, আম্রবকুলবিছানো তলে সে রাজকীয় ব্যাপ্তি শুধু সবার মনে-মেজাজে নয় তামাম আভিজাত্যে অপার আকুল। কাছারিঘর, খাঙ্গাঘর বা দলানবাড়ির স্থাপত্যময় আবেশে প্রকৃতি প্রখর হইয়া ওঠে; চৌচালা টিনের ঘর যেমন উঁচু তেমনি তাহাতে নিষ্পাপ নক্শায় উল্কি মাখানো। ইটমাটির গাঁথুনি হলেও বাইরের মসৃণ দেয়াল ঘিরিয়া গম্ভীর পিলারে মনস্কামনার প্রলেপ জমে। বারান্দার সম্মুখভাগ প্রসারিত করিয়া খোলাবারান্দার প্রকাশে জল-আরতি অসীম। অতঃপর আঁধার ঘনানো সময়ে জসীমউদ্দীন আর আসমানীর সুখদুঃখে কেমন একটা ভালো লাগায় রুবিনার প্রতিমূর্তি ধইরা আসে। মাত্রাবৃত্তের দুল-সম্মোহনী মুগ্ধতায় তখন আচ্ছন্ন অশ্র“সিক্ত শরবিরহ। ফড়িঙের ঘন শিহরণ অপরূপ রূপালী কাঁচাগন্ধময়, রূপালী অনুভবে পুরো প্রহর প্রতœময় ছানিয়া ওঠে। গেটিসবার্গ এ্যাড্রেস, সিন্দু-হিন্দোল বড়োদের আর আমাদের কাজলাদিদি, পল্ল¬ীস্মৃতি, জন্মেছি এই দেশে। কোনো সময় তা ফজলল করিমের পাখির মায়ের মতো স্বর্গ-নরকগুচ্ছ। ধুন্দুমার মুখস্থপড়ায় কতোসময় যে গড়িয়া গিয়াছে জানি না। তবে আনচানময় বাইরের ডাক হুহু করিয়া ডাকিয়া ওঠে। মুস্তাফা-স্মৃতি মুছিয়া জাগিয়া ওঠে প্রহররাঙা মেটো গন্ধে। তখনও কোনো প্রাণী ছোঁয়না কেউজ্জপায়না রুবিনাদের বা কোনো পক্ষীছাওয়া বিরল প্রজাতিকে। ভুবনডাঙায় আলোর ডাক বা জ্যোৎ¯œা¯œœানে সে গ্রাম সমবায়ী দুলকী চালে চলে। ঈষৎ প্রবাহিত বিদ্যুৎ তখনও প্রধান শহরের অফিসে। বাইরের ধনাঢ্যরা ব্যাটারীচালিত টিভিতে যাদুস্পর্ধী মুগ্ধতা দেখায়া চলেন। দল বাধিয়া কাতারে কাতারে মানুষ তাহাতে চক্ষু ডুবিয়া দেয়। অশেষ ইচ্ছার অনেকমুখী মুগ্ধতায় ইচ্ছা হলেই যাদুবাক্স বন্ধ হয় না। উচ্চবিত্তের বাহারি পোদ্দারি আর নববুলির কথকতায় দণ্ডমুণ্ডের কর্তার কাছে থাকার সৌজন্যে কেউ জানিলেও কারো কিছু বলা চলে না। অসহায় চাঁদমুখ নিভন্ত। হিড়হিড় করিয়া বড়বাড়ির আঙিনা ফাঁকা হইয়া যায়। বাইরে বইসে অনেকরকম গল্পে সময় কাটানোর তুমুল অপেক্ষাজ্জআবার যদি চালু হয় ওই মনকাড়া ম্যাজিকবাক্স! ব্যর্থ মনোরথে কোণাবাড়ির পথ দিয়া উঁচু দেয়ালের পাশের চিকন রাস্তা দিয়া, পুকুর পাড় হইয়া পাছভিটা দিয়া নিজের ওসরায় আবার প্রত্যাবর্তন। তখন পুকুরপাড় হইতে তীক্ষè আওয়াজ ওঠে ‘ওই… আয় ফির দিচে…’ ততক্ষণে পৌঁছানোর বিলম্বে মাটিতে ছড়ানো নাড়াগুলো অন্যদের দখলে; এখন কাছে নয় দূরে, পাছায় ইট দিয়া কোনোমতে অনেক মাথার পাশে একটু আলোর ঝিলিক। রাত অনেকজ্জবলতে প্রায় ন’টা, তাতেই তীক্ষè কুচকুচে অন্ধকার; জোনাকীর মেলা, আড়ার ভিতর হইতে ঝিঁঝিঁ আর কীসব পতঙ্গ-পোকার বুনবুন আওয়াজ। গা ছমছম করা রাতে সহযাত্রীর শক্ত হাতে পা টিপ্পা অন্য চওড়া পথে আবার ফিইরা আসা।

এরপর জানিয়াছি অনেক দুর্বোধ্য সব গল্পজ্জআমলির পাথার আর স্বরে-ভিটার আড়ার পাঁচটি বড় জামগাছের বুনোহাওয়ায় অলৌকিক সব ভয়ধরা ছমছমাময়। এখানে গাছ কাটিয়া অনেকেই ফিরিতে পারে নাই কিংবা গাছ কাটিলে ফিন্কিরক্ত ছড়ায়। জগত্তারিণী মা’র উক্তি এমনসব গাছের কথায়। যতোজন কুড়ালে কুপিয়াছে তাহারা ততোজনই আর ফিরিবে না। একরাত্রির মসজিদ, বড় মসজিদের বিরাট পুকুর আর বড়বিলার মধ্যিখানে গাছপালাবেষ্টিত স্থলচরজ্জঅনেক পবিত্র-ভয়কাঁপা। নিষেধাজ্ঞার জ্ঞানে সেটার অতিরিক্ত মর্যাদা আরও রোশনাই। হরিণসিংদিঘি, মানিকপুরের পাথার, কাঁটাদুয়ার, হাতীবান্দা মসজিদ, কাউয়াপুকুর মায়া-আশ্রিত অলৌকিক সব প্রাণকেন্দ্রজ্জ নিত্যসাধনায় তাহাতে লেখা থাকে অপার মানুষের প্রতœমন্দিরগাথা। পুরনোদিনের পুরনোদালান শ্র“তিতে ঢাকা; গায়ে গায়ে লেখা থাকে পাষাণপ্রাণের মর্মরূপ। দূরের শহরের নির্মাণ ঐতিহ্য আইসা বিলোড়ন তোলে। সেই র‌্যাফেলাইট বা মুঘল দরদালানের রাস্তার বনানী পার হইয়া অমল-ধবল পালে এক বৃষ্টিসন্ধ্যায় আমরা পাইয়া যাই শতাব্দীকরুণ দিব্যলোক। ছায়াসুনিবিড় কারমাইকেল কলেজ। সেই কুঞ্জবীথিবন। তাহাদের উচ্চবিদ্যাপীঠ। এখানে পড়িতে গেলে দেশবরেণ্য হওয়া যায়জ্জতবে সে মসনদে বসিবার সবার অধিকার নাই।


কবে কোন্ দাগী আমের ভিটায় ঘুমায় পূর্বজন, ম্রিয়মান সবুজ ঘাসের সমভূমে গোরের মাপে উঁচু নিচু চোখে পড়লেই ধরে আসে ‘এইখানে তোর দাদীর কবর’। কী গভীরতা মগ্নতা ছড়ায় চৈত্রের তপ্ত দুপুরের সে কবরস্থানে, আলোআঁধারের খেলায় নেশা জাগ্গ্যা ওটে। মৃত্যুপুরী য্যান ছড়ায়্যা পড়ে অনেক কাহিনীর মতো আর অনেক অচেনা মেঠোসুরের কান্নার মতো। গোপাল আর যামিনীর মৃত্যুর মতোই গড়ে সে মার্গপট :
‘আঁধার রাইতে আশমান জমিন ফারাক কইরা থোও
বন্ধু কত ঘুমাইবা।
বাঁয়ে বিবি ডাইনে পোলা আকাল ফসল রোও
মিয়া কত ঘুমাইবা।
মানের পাতে রাইতের পানি হইল রূপার কুপি,
উঠ্যা দেখবা না।’
তারপর পরথম যৌবনের লাজরক্ত চোরাবালিতে মুখ গোঁজে। দাগী আমের ভিটায় নানী সজ্জা পাতেন। কত্তোকালের দুধধোয়া সেই পল্লীবালা। গন্ধমাখা আঁচলে তিনি ঘুমাইয়া দিন, আড়াল করেন সব মায়াকে, গুছাইয়া দিন জীবনের রঙমাখা সুখের আনন্দকে। কত্তো ভালোবাইসা তিনি স্মৃতি আওড়ায়া চলেন : ‘ত্বর মুস্তাফার কতা মোনো আছে’জ্জনানী তার পাড়ার সকলের মহাজন। মহিরের ভিটা, গোলজানের স্বামী, ফয়জার বাপ, মোছকেদের দোকান, পালানু সাহাপুর গ্রামের কাদের মাস্টার, মাখনুনের মাও, পোলো হাতে দৌড়ানো সালাম-সফিউল, বড়বাড়ির আম্মা, বড় ভাইজান সক্কলের জন্য একভাবে বলেন : ‘এইটা মোর বেটা’জ্জকইয়া কইয়া বেল গইড়া গেলে গুড়ের জেলাপি, আটার খুর্মা আর বাতেসা কোছায় করে‌্য লইয়ে বিরাট শীতল ঠাণ্ডা কোটাঘরে আসেন। সেখানে মৃত নানার স্মৃতিতে আটকানো আছে তার দেওয়া বিশাল সাববাস্ক, ঝুলানো কাপড়হীন মজবুত কাঠের আলনা আর কোন্ পীরের বান্নি থেকে আনা প্লাস্টিকের ঝুড়ি। এ ঝুড়িতেই নানীর সারা জেবন চইলা যায়। একখান চিকনপাড় সাদাকাপড়, খুব প্রয়োজনে কয়েক বছরের পুরানা সাদা ব্লাউজ-সায়াজ্জএতেই আঁটিয়া যায়। উহারা এখন বিধ্বস্ত মৃত নানীর অপচ্ছায়া তোস্তরী কিংখাব। কত্তোদিনের এ ঝুড়ি তাহা আমরা কেউ জানি না। এ ঘরের বাঁশের তৈরি ছাদ অপরূপ নক্সা কাটা, নিকানো দেওয়ালে উৎসবের ছবিজ্জসেখানে গজ হাঁটিয়া চলে, সাঁজোয়া অনেক মানুষকে লইয়াজ্জনানী কহেন, ‘ওটা মোর বিয়ার ছবি’জ্জতার বিয়ে হইয়াছিল যখন সাত বচ্ছর, কোলে করিয়া এ বাড়িতে তার পরথম আগমন। তখন কেবল হায়দরের মায়ের হায়দর ছয় মাসের প্যাডে। এভাবে জীবনের সব আবহ এক শরীরে গ্রহণ করে অনেককাল তিনি আমাদের সময়কে বাধিয়া দিন। ওই কিংখাব বাওয়া বাড়ি থাইকাই কাউয়াপুকুর বাজারে যাওয়া, সেখানে সার করা মাছদোকানীর অনেক কুপির আলোয় তরতাজা মাছ দেখা আর ভয়ে চাদরমোড়ানো কঠিন মুখমণ্ডলে রাতবিরাতে বাড়িতে ফিইরে আসাজ্জসে সব অনেককাল ঝড়বৃষ্টিহাওয়া মাখান জীবনের গল্প।

কাউয়াপুকুর বা নালদীঘি বাজারে সওদা ক্রয়ের পর কিছু খৈমুড়ির লোভ বেশি-রাত না-করার কারণ ওই গর্ত রাস্তা, দেখা গিয়াছিল সাদাচাদর পরিহিত ভয়ঙ্কর জীব যে কখনো দাদার পিছ ছাড়ে নাই। যতই আগিয়া চলে, পালানোর চেষ্টা করে ততোই সে রাস্তা আগলাইয়া আসে। তারপর বেহুঁশ হয়্যা পড়ে। আমৃত্যু আজীবন সে অসুখ যায় নাই কখনো আর। এ ভয়ে দলছুট না হইয়া দ্রুত ঐ অশত্থ মাঠ পার হইয়া চলা। তারপর ভয়হীন। তখন নির্ভেজাল মনে দুগ্ধ নিঃসৃত জ্যোৎ¯œা দেখায়। আঁকাবাঁকা ধূলিমাখা রাস্তায় চাঁদজোছনার মায়ায় কাতর সবকিছু। বানানো গল্পে তখন চিল্কে উঠে মন। চাঁদের গায়ে চাঁদ লাইগাছে তুমি ভাইবা করবা কী-র লয়হীন উচ্চারণ য্যান অনেক আগেই পৌঁছাইয়া দেয় বাড়িতে। তারপর অন্ধকারের নাড়ার আগুন জ্বালিয়া যায় নানান হাটগল্প, আর রূপকথার অমিত বয়ান। আগুন ছাইয়া ভুট্টা বা গড়গড়ার স্বাদ নিয়া অনর্গল চলে টকির গল্প। রাত বাড়ে আর অন্ধকারে জইমে ওঠে রূপকথা মেশানো নিরাকপড়া গল্প। টকির নেশা ছড়িয়া যায় ঘুটঘুটে আঁধার রাতের সীমানায়। মিশকালো অন্ধকারে পাছবারান্দায় আমরা ফন্দি আঁটি। কবে কার কখন কোন্ শোজ্জতার কানগুজব। খুব বড়ো পর্দায় স্বপ্নের সব নায়ক যেন অন্ধকারের ভিতর আলো হইয়া ফুট্টা আছে। সুন্দরী মাইয়ারা কাজলকালো রাতের পরী। কবে-কখনওই যেন তা শেষ হয় না। আমরা চলেছি টকিপাড়ায় ধবল জ্যোৎ¯œাস্রোতে, ফুরফুরে মন্দমধুর পালে হাওয়া লাইগা; নিশ্চিন্ত প-াবন উপচানো ওম্মাখা সে সব গল্প। নতুন ‘বই’ আসিলে বা হিট করা কোনো নায়িকার ছবি হলে সে গল্পের উত্তাপ বাড়িয়া যায়। চকচকে ঘোড়ায় বিশেষ ভঙ্গিতে গোছগাছ ধবল এক পিচ্চি স্ফূর্তিময় উচ্চারণে সুঠাম নায়িকার অভিনয় বইলা যায়। সে ব্যক্তিত্বময় খাড়া দৃষ্টিতে বীর্যবান নায়কের জয়-আশঙ্কা বলিয়া চলে। আসুন আজই… তারপর ভঙ্গিমায় আরেক উপচার, তখন টকটক অশ্বক্ষুরে সহিস বাইয়া যায় কোনো রোমান্টিক গানের অপরূপ সুর। পরে বিরাট সিদ্ধান্ত এ বই না দেখিলে চলিবে না, কাল রাতেই টকির উদ্দেশে যাত্রা, কোনো বিশাল ছায়ায়, কাল সিদ্ধান্ত। তবে সারাক্ষণ সবার টান থাকে শ্রমার্জিত ট্র্যাজিক ছবিতে। বেদনার মাত্রায় যতো ধক্, ততো ঠাঁট। তাৎপর্যময় হয় ভিলেনের মারকুটে বীর চেহারা। তবে এসব সিনেমাপাড়ার গল্প অনেক পরের। বিদ্যুৎ আলো বা লাল-কাদার পিছল রাস্তার পীঠে তখন পিচ গলানো শ্যাষ। ততোদিনে রূপকথা মাখা ‘হেরিংবোনে’র দুর্বাঘাস আচ্ছাদিত মনুষ্যসমাগমশূন্য রাস্তাটা নাই হইয়া গিয়াছে। নগরে শরীর ছুঁইয়াছে। সিনেমা-নায়িকারা তখন আমাদের মনসার স্বামী পুনরুদ্ধারের মতো সাহস-শক্তি-সতীত্বের পরীক্ষাধৃত পুরাণকন্যার মায়ায় প্রচারিত। তারা সব অধরামাধুরী। আজীবনের তপস্যাধীর প্রকৃতিবালিকা। তারা দামোদর নদী মায়ার মতো, তুমুল ¯িœগ্ধতায় আকুল। অশেষ বনরূপায় ¯েœহকরুণাশ্রিত।

তবে বায়োস্কোপ আসে একদিন। তার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা মানুষের প্রাণপাত দশা। স্কুলমাঠে পেরসিডেন আসিলে জনতার ঢল নামে। বিরাট কাফনকাপড় দিয়া বরফসাদা চতুষ্কোণ পর্দায় কয়েক ফুট উঁচুতে তার রোশনাই প্রদর্শনী। গমগম শব্দের সাদাকালো ছবিতে কী ঘোষণা হয় জানা যায় না। এ বায়োস্কোপ দেখিলেই সিনেমার কাম সম্পন্ন হইয়া যায়। কিন্তু আমরা অভ্রান্ত মনে তাহা পরিহাস বানাইয়া ফেলি। অযৌক্তিক আখ্যা দিন। সেখানে বান্ধবকুলের কাহিনী ছবিতে মুখ ডুবায়্যা স্বপ্নবিনুনিতে গাঁথিয়া ফেলি। তারপর হ্যাচকা ঠেলাঠেলিতে সঙ্গী হারাইয়া বলবান মানুষের মহড়া দেখিয়া পথ হারানোর ভয়ে ভীত হইয়া স্কুলমাঠটার দূরে ফাঁকা জায়গায় একাকী অবলম্বনহীন দাঁড়াইয়া থাকি। জানিতাম কোনোদিন আমরা মাঠের এ প্রান্তে আর আসিতে পারিব না। এমন বহুদূরে দাঁড়াইয়া একসময় অকারণ কাঁদিয়া ফেলি। সে কান্নার শেষ পরিণতি কী হইয়াছিল কাকপক্ষী জানে নাই। লোকারণ্য প্রতিবেশে নিথর দাঁড়াইয়া গুণিয়াছি ক্ষমতার অসংখ্য ঢেউ। সেখানে প্রচুর সম্মান, আমাদের কপালে বুঝি তাহা জুটিবে না কোনোকালে আর। আমরা অনেক জলপাই গাড়ি দেখিয়া ভয় পাইয়া যাই, কঠিন কালো মিলিটারী দেখিয়া পেছনে গা-ঢাকা দিন, চুপিসারে কালো দোনলা আর স্টেনটার দিকে তাকাই। এসবের কাজ কী, কেন ইহা আনা হইয়াছেজ্জকাহাকে জিগাইব! তবে এমন রোমাঞ্চকর মুহূর্তের যবনিকায় আমরা ছাড়িয়া চলি অনেক কিছু। এক সময় মানিয়া লই বারোইঞ্চি টিভিপর্দারজ্জপলাতক জীবনের ছায়াভরা গল্পসমূহ। নির্বাসনের কৈশোর তখন শুধুই ‘কবেকার কথা’র মুগ্ধতায় আটকানো। জন্মকালের পরিবেশ ছড়াইয়া স্মৃতি যতোই মায়াহারানো হোক খুব শুদ্ধস্বর আর নির্মম মোহিনীমায়ার জড়াইয়া থাকা সে সব দিনের স্মৃতিতে, কৈশোরআবেশ তখন প্রতœমদির মেঠো দৃষ্টি ছাড়াইয়া মনে করিয়া দেয়জ্জদুর্মর সময়ের সব রূপালী রূপচ্ছবিলিপি। চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় কিংবা নিরাকপড়া দুপুরে শনশন হাওয়ায় অনেক রকম ধূসরিত বোটা খসান পাতা হিড়হিড় করিয়া পায়ে জড়াইয়া যায়। চোখেমুখে ধূলায় আচ্ছাদিত হইয়া আসেজ্জসেই বন্ধু পিকে, মিলন, রিপন, সঞ্জীব, মুকুলজ্জএ পরিবেশে কী-সব স্ল¬্যাং আর দুরন্তপনার বাহাদুরির কথা বলিয়া চলে। সে গল্পের আনন্দ-উৎসব গাঁথিয়া তোলে ভবিতব্যের ইশারাকে। অনেক কাল্পনিক আর রূপান্তরিত গল্পে চৈত্র-সংক্রান্তির খর্বাকৃতি রুক্ষ্ম দুপুরসমূহ নিরন্তর পার হইয়া যায়। জীবনানন্দ তাঁর ধ্বনিত সুর ও স্বরে চৈত্রসংক্রান্তির দুপুর কিংবা ভরসন্ধ্যাকেই অপূর্ব করিয়া তোলেন। সন্ধ্যাহাওয়ার নীরববীণায় আকাশের আবাহন ওঠে। গহনযামিনী বলিয়া দেয়, সুপ্ত কোমলচিত্তের সহজ গানের বন্দিশ। ছিন্নবাধা পলাতক বালক ছুট্টা চলে শ্যামল প্রান্তরে। দুর্বার সপ্তসিন্ধুর ঝংকার বাজিয়া যায়। চৈত্রসংক্রান্তির সে মেলায় কী যে মর্মপ্রোথিত কাম-প্রেম-ধ্যান জড়ানো মুগ্ধতা; সে বর্ণনার তো নিপুণচিত্র মেলে না। ঐ যেখানটায় মেলা বসিত তার ভূমি অনেকখানি ঢালু আর উঁচু-নিচু চিক চিক। ঢালু জায়গার সতেজ ঘাসে বসিয়া চলো লালসাদা রংয়ের বাতেসা খাওয়া আর এপার-ঐপারের ঘটনা নিয়া মশগুল মনোদেহের ¯েœহাশিস আড্ডা। বিলের স্রোত, ডোবা, নালায় হাওয়ায় দূরে ওড়ে তিনকোণা চারকোণা আকৃতির বর্ণিল ঘুড়ি। ক্ষীণতারার আকাশ ছড়ানো মেঘের কোল থাইকা যেন বহুদূরে ওসব নামিত, তখন অনেক বড় ও প্রশস্ত আকৃতিতেজ্জতাহা দেখিয়া বিস্ময় জাগে। জিজ্ঞাসা আসে এতো পুঁচকে জিনিসের বৃহৎ হওয়ার ফ্যান্টাসী! অতঃপর যাহারা ঘুড়ি ওড়ায়, আড্ডা ভাঙিয়া তাহাদের পিছু পিছু ছুটিয়া চলাজ্জসে দিগি¦জয়ী আনন্দ তো গতিহারা। সন্ধ্যারাতের কুপি আলোয় পরের মেলার আসরের পরিকল্পনাটা জানিয়া নেওয়া মুখস্থ পাঠের চেয়েও যেন নিবিড় হইয়া ওঠা। কিন্তু আপাতত কখন ওসব আবার ওড়ানোর ব্যবস্থা হইবে তাহা দেখিবার জন্য অপেক্ষা চলে। এরপর একসময় পীরের মাজার ঘিরিয়া মেলা বসে, সেখানে নিশান উড়িয়া দ্রুততালে ঘুর্ণিময় ঘুরিতেছে একদল লোক, আর কী যেন বন্দনা করিয়া চলে। চক্রব্যূহ করে। উড়ন্ত নিশানসমূহ ফুলেল আর গোলাপী। দণ্ড সূচ্যগ্র, আকাশস্পর্ধী। তারপর তাহাদের বন্দেগী সমাপন এবং দ্রুত গাত্রোত্থান। চক্ষুপলকে স্থিরদৃষ্টিতে এসব দেখিবার পর পেঁজাতুলার ফিরোজা আকাশ আর দূরে নুয়ে পড়া অসীম ছাদ দেখিয়া কেমন বিহ্বলতা পাইয়া আসে। মেলা শেষ হলে বছরকাল অপেক্ষা, হায় তাহা কতোকাল জন্মমৃত্যুর তরে বাধিয়া যায়। বিমূঢ় বালকের অপেক্ষা আর আবার ফিরে আসার আনন্দের কাতর প্রার্থনাজ্জবাণী বহিয়া চলে। পেয়ে হারানোর বা পাবার অপেক্ষা রচে অরুণিমা সান্যাল আর রাঙা রাজহংসের মাঝে। শতাব্দীর দীর্ঘ হাতে কার কাছে জীবনানন্দ বাতিল হয় জানি না, অপার সন্দিগ্ধতায় মুগ্ধতা ছাড়া যদি মানুষের বাড়িয়া ওঠা না থাকে তবে কে তাহা এড়াইবে? জানি ওই কবিকর্তৃক প্রবাহিত মত্তমায়া স্মৃতি আর মায়ার পটে সবকিছু বড় করিয়া তোলেন; বিষাদ ছোঁয় সেই বন্ধুসকল। ভাঙা দরোজায় ছুটে আসা বিরান পাথারের বিলি কাটা মৃদুমন্দ বায়ুতে তখন আমাদের পাঠ দিন মৌলবি স্যার। পাশে তখন ফর্সা-নধরকান্তিবন্ধু মাহবুব ভয়-আনন্দে আর বাইরের পাগল হাওয়ায় দৃষ্টিকে একরোখা করিয়া তোলে। গুরুজনকে ফাঁকি দিয়া বড় ভাইদের ক্লাস অবসরের সে সব খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের খেলা দেখা চলে নানাধরনের অপরাধদুষ্ট পরিবেশে। কিন্তু বন্ধু মাহবুবের চলিয়া যাওয়ার কষ্টে কালান্তরের কান্নারোল ওঠে, কত জীবনের দুঃখবেদনা বরফ-গলা নদীর মত হুহু করিয়া ভাসিয়া আসে আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসের দমকা হাওয়া জাগে। নিরিবিলি মায়াকাতর বন্ধু নির্বিরোধী নম্র মুখচোরা লাজুক। চলিয়া যাবার সময় বলিয়াছিল ‘মনে রাখিস রে’। সে অনন্তকাল নাই হইয়া গিয়াছে। কেমন যেন ডুকরানো কান্না চতুর্দিক ছাপিয়া যায়। মেরুন রংয়ের হাফশার্ট পরা, গোলাকার মুখমণ্ডল, বিড়ালের মতো চোখ, নিবের ডগায় কলম ধরাজ্জএই সেই মাহবুব। একটু লিখিয়া নাক ছুঁইয়া সে সর্দি টানে, সর্দি আক্রান্ত সে স্কুলে আসিয়া খুঁজিয়া চলে সকলকে, লাল প্ল-াস্টিকের গাঁথা ডোরাকাটা ফিতের ব্যাগে তার থাকে বইপুস্তকজ্জকাঁধে ঝুলানো ব্যাগজ্জতাহাতে গর্ব নাই। এমন ব্যাগ যেন মনে বাধা পড়ে। বায়না ওঠে মাহবুবের মতো ব্যাগ না লইলে স্কুল বন্ধ। রূঢ় মেজাজে বাবা শ্রেণীপার্থক্যের কথাটা বলিয়া চলেন। ভালো পড়িলে আর নব্বুই পাইলেই ওসব পাওয়া যায়। তবুও একবার দেখি প্রখর রৌদ্রতপ্ত দুপুরে শহর হইতে এক নতুন ব্যাগ আসিয়াছে। আমাদের প্রাণের চাইতেও প্রিয় সে সব জিনিস চাঁদতুল্য। নতুন কলম, কাপড়, স্যান্ডেল পুরান হয় না কখনও আমাদের। বিলাসবিপণীর দোকান হইতে আনা নতুন ঝর্ণাকলমটাও পুরান হওয়ার ভয়ে বহুদিন ব্যবহার হয় না। ইউনেসেফের দাগটানা খাতাগুলোয় এমন কলমে মন খুলিয়া লেখা যায়। লাইনের পর লাইন হাতের লেখায় স্যাররা স্বাক্ষর করিলে মন ভরিয়া যায়। ক্লাসে নতুন আসা মওলা স্যার লেখার ডিকটেশান দেন। ভাঙা দরজা-জানালার পাকা স্কুলঘরটা তখন অনেক বড়। চোর-ডাকাত দেখা যায় না। এ ভয়ার্ত জিনিস একরকম অপরিচিতই রহিয়া যায়। স্কুলঘরের পেছনে বিরান সবুজক্ষেত। বর্ষায় সে রঙ আরও অবাক করা। সামনের জামগাছটি আমাদের সবকিছুর সীমানা। বড়দের মান্য পরিবেশে সবকিছু একসঙ্গে আটকানো। রঙ করা একটি পাকা কাঠের চেয়ার ওটা চতুর্থশ্রেণীর; ওখানে টেবিল নাই। আমাদের তৃতীয়শ্রেণীতে শুধু একটা নড়বড়ে ধন্য চেয়ার। কারণ ক্লাসশিক্ষকের বসিবার জায়গা নাইজ্জসে দৈন্য তো ঘুচিবে না কোনোদিন। তবে একসময় ভাবনায় আসে স্কুল ছাড়িয়া সবাই চলিয়া গেলে আমরা দ্বিতীয়শ্রেণীর টেবিলটা আমাদের ক্লাসে আনিব। কারণ, আমাদের ক্লাসের শিক্ষকগণ যদি চেয়ার-টেবিল পায় তাহাদের সম্মান বাড়িবে। সবার নিকট তখন মর্যাদাও তার উঁচু। দুষ্টুবুদ্ধির চাইতে সম্মানিত হওয়ার লোভ ও মর্যাদার বেশি পুষ্টতা পায়। ছুটির পর সুনসান স্কুলঘরে আমরা জনাকয়েক এমন দুঃসাহসী কাজটিতে নামিয়া পড়ি। অতঃপর দুর্ভাবনার প্রহরকাল। রাতি পোহাইলে প্রতিক্রিয়ার আসামী কে হইবেজ্জকপালে তার কি পরিণতি-কে জানে! কিন্তু দেখা যায়, সবকিছু আবার আগের অবস্থায়। ভয়ে কোনো জিজ্ঞাসা নাইজ্জউত্তরের আকাক্সক্ষাও নিশ্চুপ। কিন্তু ক্রমশ বঞ্চিত ক্লাসের ছাত্রদের সতর্কতা বাড়িয়া চলে। শোনা যায় কয়েকজন বলপূর্বক টেবিল বাহির করিয়া লইয়া গিয়াছে। তখন ওইক্ষণে আমাদের ক্লাসে সদস্য কম থাকায় কেউ পারিয়া ওঠে নাই। তবে প্রায়ই এসব মর্যাদার লড়াই বাড়িয়া যায়। কখনও এসব নিয়া বিচার বসে। হেডস্যার সে বিচারে মোড়লের ভূমিকায় থাকেন। পরম দুঃসময়ে চলা ওসব বন্ধুদের বাড়ি পঞ্চকান্দর, সোনাকান্দর, ওসমানপুর, মকিমপুর, গঙ্গারামপুর এলাকায়। খুব বেশি বয়সে ওরা সহপাঠী হইয়া ওঠে। বিপরীত লিঙ্গের ধারণায় ওরা সবজান্তা। ওই গল্পের ভেতরেই আমরা সেয়ানা হইয়া উঠি। কল্পভূমে গল্পের সত্যতায় জেন্ডার ধারণা গাথিয়া বসে। আগ্রহ ছড়াইয়া পড়ে সর্বশরীরে। অনুরাগের ছোঁয়া তখনও অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ-কল্পনার বাসভূমে সীমায়িত। আনকোরা অভিজ্ঞতায় সে সব ‘খারাপ’ বলিয়া জ্ঞান হয়। বান্ধবদের রটনামুখর এসব গল্পে সেক্স-যৌনতা, ‘কুৎসিত’, ‘খারাপ’জ্জএসব বিশে-ষণে ভরপুর। বন্ধুমহলের বিপরীতে মুরব্বীমণ্ডলীর কাছে আমাদের বিন্যাস অন্যরকম। অনেকটা শোভিত, শিলীত, শুদ্ধতম, পাকপবিত্রের মধ্যে সবাই বিরাজমান। লক্ষ শুধুই বড়ো হওয়া। সেজন্য ‘ভালো’ থাকিতে হইবে। যে স্কুলঘরে অনেক সময় চলিয়া যায়, সেখানে দূর হইতে আসা বয়সী মেয়েরা কোনো আলোড়ন তোলে না। সহাবস্থানে তুমুল স্বাভাবিকতা। লজ্জা কিংবা ঠাট্টা-মস্করায় নিছক পড়া করা না-করার মধ্যেই সময় বহিয়া যায়। বৈশাখী ঝড়ে উড়ে যাওয়া স্কুলঘরে স্যার না আসা পর্যন্ত নির্জন সময়গুলো কোনো আপত্তিকর বৃত্ত পায় না। বোধ হয় তখনও উত্তম-সুচিত্রা, রাজ্জাক-শাবানা আমাদের কাছে খুব পবিত্র মানুষ। হিন্দি ছবি নাই, সিনেমা হল নাই, শুধুমাত্র ক’বাড়ির রেডিও আওয়াজ ভ্রামণিক আনন্দের কথা শোনা যায়। রাত্রি দশটার অনুরোধের আসর তখনও চালু নাই। ‘রূপে আমার আগুন জ্বলে’ গান মোড়ের হোটেল বয় খুব রসময় ভঙ্গিতে গাহিয়া চলে; ছোট্ট পান-দোকানী শখের ছোট্ট রেডিওতে এ গানের রেকর্ড শুনিয়া চলে। মোড় হইতে জামতলা পর্যন্ত রাস্তা আর সিও অফিসের পরিমণ্ডলটুকু আমরা চিইনা চলি। কারণ স্কুলের বার্ষিক প্রতিযোগিতায় ওখানে যাইতে হয়। টিডিসি হল তো বিরাট। ওখানে বিতর্ক, দেশাত্মবোধক গান, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী হয়। দিনভর আমরা ওসব শুনিতে থাকি। সেখানে অংশ নিতে আসে পরশুরামপুর, চাঁদেরবাজার, কাদিরাবাদ এমন সব স্কুলের শিক্ষার্থীরা। রনজু ভাই ভালো তার্কিক, প্রায় সময়ই বিতর্কে তার প্রথম পুরস্কার বরাদ্দ থাকে। ক্লাসেও তিনি বরাবর প্রথম কিংবা দ্বিতীয়। আমরা পরথম যৌবনে হঠাৎ একদিন শুনি রনজু ভাই বাসচাপায় মরিয়া গিয়াছেন। কয়েক মাইল পশ্চিমে দূরে কোথাও বাঁশবাগানের ছায়া মাড়িয়া, সর্পিল পথ বাহিয়া তার লাশ বাড়িতে দেখিতে যাই। ডুকরিয়া কান্নার রোল শোককাতর করিয়া ফেলে। আমরা পৌঁছাতেইজ্জততক্ষণে তার লাশ দাফন হইয়া গিয়াছে। চোখের জলে ভাসমান রনজু ভাই দাফনস্থলে বিরাট চিত্রকল্পে মুরতি হইয়া ওঠেন। কতো যে সে দুঃস্বপ্ন! বিভীষিকাময় সে মৃত্যু। বিচ্ছেদ আর মরাকান্নায় আমরা পলাতক রহিয়া যাই। সবকিছু ছাড়িয়া পালাইয়া আসি। রনজু ভাই বিলীন হন পঞ্চভূতে। অত্যাশ্চর্যই তখন সুনিশ্চিত। তারপর বাৎসরিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনেকবার ঘুরিয়া আসিলে রনজু ভাই আর আসেন নাই। স্মৃতিভারে আমরা আড়চোখে জল ফেলি, তার ললাটলিপির জন্য শোক করি। অথচ ভারমুক্ত তিনি, কত্তোকাল আমাদের মাঝে আর নাই! নাই রনজু ভাই। তুমি কোথায় রনজু ভাই! আকাশ প্রলাপে তোমার জন্য আমরা শোকগাথা রচনা করি। মুহ্যমান শোক ছড়িয়া পড়েজ্জটিডিসি হলের বারান্দায়, জেলাপ্রশাসকের পুষ্পমাল্যে কিংবা ঝড়ো-বিতর্কের ডায়াসে। শূন্যতায় তাহা ভাসে, অশ্র“বাষ্পে তাহা স্তব্ধ হইয়া পড়ে, ব্যাকুল হইয়া রয় রাজপথের শিমুল-পলাশ-বকুল প্রকৃতি। তারা কাঁদিয়া কয়, রাজা নাই রাজসভা শূন্য হইয়া আছে, এ মসনদে কে বসিবে, শান্ত্রী-সেপাই নিরস্ত্র-ত্রস্তহীন বর্ণহীন। তবে কিছুই থামিয়া থাকে না। কুলীনকন্যারা গায় : ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তে তুমি’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা …’। নজরুলের ‘লিচু চোর’ রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’; ‘কারার ওই লৌহকপাট’, ‘শিকল পরা ছল’ অনেককিছু। তখন টিডিসি হলে ডিসি আসেন। খুব মহড়ায় অনেক গাড়িবহরে তিনি আসিয়া পৌঁছান। বক্তৃতা হয় খুব। সাঁজোয়া বৈভবে ব্যাকুল আমরা। তখন মনে মনে তাঁর মতো হওয়ার বাসনা জাগে। পদ-পদবীর লোভে উত্তেজনার প্রহর রচিয়া ওঠে। শহরে গেলে আমরা জেলা প্রশাসন বাংলোর দিকে তাকাই, কাছারীর পাশে তার অফিসের রাস্তার দিকে একপ্রকার স্বপ্নমুখে গা-ভাসাইয়া দেই।

নৈমিত্তিক ধারায় বিদ্যমান অলৌকিক আনন্দ আকাশে এক সকালে খুব ঝড় উঠিয়া আসে। দুর্দান্ত সে ঝড়ে প্লাবন নামে। স্কুল মাঠে পা ডুবিয়া পানিছড়ানো খেলা চলে। স্বচ্ছতোয়া পানিতে পাখা ওড়ায় টলমলে সবুজঘাস। অপার বৃষ্টি ভালোবাসায় আমরা দূর আকাশ গায়ে পাখির মিতালী করি। আনন্দ উপশিরায় গাহিয়া যাইজ্জ‘নীল আকাশের অসীম ছায়ে ছড়িয়ে গেল চাঁদের আলো’। ও বাড়ির খালাম্মা আমাদের বকিয়া চলেন। অধিকারের ধারাবাহিকতায় মোটাসোটা দরাজ দিলে কর্তৃত্ব করিয়া চলেন। আমাদের কোনো কাজে তার সদরঅন্দর থাকে না। অনেক ছেলেমেয়ে তার। ছোটছেলে রেজ্জাকুল পড়িত ক্যাডেটকলেজে। তার জন্য খালাম্মার গর্ব কেমন তা তখনও জানা যায় না। কিন্তু দেখা যায় রেজ্জাকুল আসার সংবাদে উপাদেয় খাবারের মনোযোগী আয়োজন। বিরাট ফর্সা আঙিনায়, কুলগাছের তলায় মাটির চুলায় গরম তেলের ভাজাভাজির শব্দ। গল্পের অজুহাতে কিংবা বিয়েবিষয়ক ব্রীড়ার আড়ালে খুব যতেœ খাওয়ান তিনি। খালাম্মার স্পন্দন ছড়িয়া পড়ে আমাদের মেধায়-বুদ্ধিতে। আমরা কুয়াশার ধোঁয়ায় নীল চাঁদোয়া দেখি, কমলা সূর্যটাকে সাক্ষ্য মানি, হিমাদ্রিত সন্ধ্যার আগেই সব চুকাইয়া ফেলি। ঐ কুলগাছটার পাশে গভীর কুয়ার টলমল পানিতে ধুইয়া যায় সব। সেখানে কুয়া মেঝেতে পানিভর্তি বালতির হাতসাঁতারে প্রাঞ্জলতার স্বাদ আসে। জলধারার পাশে বুনানো শীতসব্জির আইলে আবার কতকিছু খেলা আর আনন্দে মাতিয়া চলা। কিন্তু তার আগেই মুন্সীর সন্ধ্যাআযান। সে শীতের মনোহারী পরিবেশ, কাঁঠালছায়ার অন্ধকার আচ্ছন্নতা এক এক কইরা ঘুম নাইমে আসে তামাম দুনিয়া জুড়ে। বিজলী-বেতার-টিভি ছাড়া তখন নাড়ার আগুনে জ্বলে কুমোরের গড়া হাড়ির ভাত, কচুভর্তা আর বত্থের মাছের মিষ্টিগন্ধ। চোখে তখন খাবারের প্রত্যাশা উপচিয়া পড়ে, চতুর্দিকে পড়িবার বদলে তখন আমাদের অনন্ত ঘুম চলিয়া আসে। তিলদুপুর নাগাদ খালাম্মার ফর্সা-লাল নীলমণি সন্তান মাথাভরা ছোট্ট চুলে মেলেটারী পোশাকে পৌঁছুতে দেখা যায়। পলকবিহীন চোখে চিড়িয়াখানার অদ্ভুত জন্তুদর্শনের চেয়েও আমরা নিবিড় হইয়া সে দেউড়িতে ধ্যানমান থাকি। রাজ্জাকুল ভাইয়ের বইখাতার মনোরম টান আর আকর্ষণীয় অনেকগুলো কলমজ্জকী সুন্দর! আমাদের ওতে চুরির লোভ জাগে। একটা বড়ো আয়তাকার টেবিলে জানালার পাশে তিনি বিদ্যাধ্যানে ব্যস্ত। সারাক্ষণ কী যে পড়াশোনাজ্জএকদম একমনে। গলার স্বর মিহি, আস্তে কথা বলেন। শরীর জুড়িয়া শুদ্ধতার ছাপ। কাছে গেলে কেমন যেন মৃদু গন্ধ পাল তুইলা ওঠে। কেমন করা ওই মানুষের শরীরে কেন গন্ধজ্জজানিতে মন চায়। তখন আমরা গায়ের গন্ধে জানিতে পারি কে কেমন বড়লোক আর কার কি ক্ষমতা। জানালার পাশে দাঁড়াইলে কী সব ভারী ভারী কথায় সে আমাদের দিকে তাকায়। অনেক বেশি মর্যাদার হইয়া ওঠেন তিনি। চলনে-বলনে কখন যেন তিনি আমাদের মনে আদর্শ হন। সে রূপে তার সামনে আমরা কুর্নিশে দাঁড়াই, কাঁঠাল পাতার পথ পরিস্কার করিয়া দেই, ম্যাটম্যাটে ছায়ায় তার ছড়ানো পথে পুষ্পবৃষ্টি ছাইয়া দেই। দূর হইতে দুটো কামিনী গাছের গন্ধ তার প্রভাতকে রাঙিয়া দেয়, বাবা বলেন : ও কামিনীর পুত্র। সারাজীবন মানুষকে সেবা দিবে। সত্যিই রাজ্জাকুল ভাই সেবা দেন, বড় কী যেন হন তিনি, বহুকাল সে সব জানি না। কত্তোকালের জগত মায়ায় তিনি কাটাইয়া যান, আর খবর পাওয়া যায় না। মাটির ঘরে চলতে ফিরতেই তিনি মিলিয়া যান, আর এ বাড়িতে আসেন না। কালচিহ্নে একদিন আমাদের মিষ্টি কাঁঠাল গাছটাও মরিয়া গিয়াছিল। কোন্ অকাল বার্ধক্যেজ্জকে জানে! তবে এমনই আরেক ক্যাডেট সন্তান আমাদের ছিলেন। তিনি হাইস্কুলের বাংলা ব্যাকরণের শিক্ষক কাদের স্যারের সন্তান। কোন্ দূরে এক ক্যাডেট কলেজে তিনি পড়িতেন। হঠাৎ তিনি মারা যান। সে শোক-লান্নত সর্বত্র ছড়িয়া যায়। ছোটমামা কাদের স্যারের কর্তব্যবুদ্ধি আর দায়িত্বজ্ঞানের কথা প্রচার করিয়া চলেন। সেই মহীরুহ স্যারের ক্যাডেট সন্তানজ্জআর তার মৃত্যু! লাশ আসিতেছে বহুদূর থিকা; অপেক্ষা করো এলাকাবাসী। কাঁদো তারস্বরে। সুর করিয়া কাঁদো, বিমর্ষে ভর করিয়া তোলো সবকিছু। যান নাই, জন নাই। কীভাবে আসিবে সে লাশ! ইথারের আওয়াজে যা রটে তার অবসান হয় অনেক রাতেজ্জত্রিচক্রযানে লাশ আসিলে হামলে পড়ে সবাই। টেম্পোর শব্দটিই সর্বোচ্চ বনেদী। ভট্ভট্ আওয়াজে আমাদের কান্না হারাইয়া যায়। ভাবিতে থাকি কী অসাধারণ এ ‘রাজপুত্রে’র কেন মৃত্যু হয়! কোথায় যায় মৃত সন্তানসমূহ। শয়ানে তাহাদের অনুভূতি কি! বাতাস চিরে, বুকফাঁটা হাহাকারে উথালপাতাল করিয়া ওঠে ধরণী; ঠাণ্ডাবাতাসে ছুঁইয়া যায় চোখের কান্না। সব্বাইকে হারাইয়া গগনবিদীর্ণ করিয়া চলে ত্রিচক্রযান। আমাদের স্কুলঘরের পাশ দিয়া, হেরিংবোনের লালসুরকি করা রাস্তায় ধূলি উড়াইয়া কতদূর সে রাস্তায় হাঁটিয়া চলি! আমাদের কাছে তা স্কুলঘর পর্যন্ত পরিচিতজ্জতারপর চলিতেই থাকি, অনেকদূর পর্যন্ত। শেষবিদায়ের হাহাকার ধূলোবালির শেষকণার প্রান্তটুকু হৃদয়ে স্থান নেয়। অনায়াসে আমরা কাঁদিতে থাকি; কখনো আবডালে, কখনোবা মুখ লুকাইয়া। ওভাবেই বিদায়ী হইয়া যান তিনি। আমরা অনেক রাত অবধি সে অন্ধকার রাস্তার পানে তাকাইয়া থাকি। জপমালা পড়ি। মৃত্যকে সন্ধান করিতে থাকি, তার ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া যাই। অতঃপর খালাম্মার বাড়ির বাইরের বারান্দা দিয়া ভিতরে চইলা আসি। যেন বুকজোড়া আর্তির আঘাতে সবকিছু শ্যাষ হইয়া গিয়াছে। দুর্গতিনাশিনী বিসর্জিত হইয়াছে। আখিরার জলে রাজার বাদ্যিতে সে বিসর্জন নিয়াছে। আর আমরা ফিরিব না কোনোদিন, কোনোকালে যেমন আর ফিরিবেন না আমাদের শোকবিপুল ওই হারানো মানুষ। পরক্ষণের ঝড়ে অন্ধপ্রলয়ে অনেক কিছুর প্রবাহ ঘনঘোরে ছাইয়া আসেজ্জমনে পড়ে সেই মুস্তাফা খালুর স্মৃতি, তার নাটক করার মুখচ্ছবি, কমিনী-বকুলের গন্ধভোরের রাঙা গল্প, আর নিথর শুইয়া থাকা নানীর কান্নাদৃশ্য। সেবার খালাম্মার বড় উঠানের পাশে অনেক সাইকেল ছিল। করুণমুখে তখন নানী কন : ক্যা সন্দীন তোমার বড় ব্যাটার বৌয়ের খবর কী! খালাম্মার সর্দারনীতে সাড়া দিয়া নানী গালভরা হাসিতে কীসব আনন্দ গল্প বলিয়া যান। সময়ের পর সময় গড়িয়া যায়, নামাজের সময় পার হয়, একের পর এক মাটির চুলায় অনেক রান্না শ্যাষ হইয়া যায়জ্জনানীর সন্দিনের গল্প শ্যাষ হয় নাই। আমরা তার চিকনপাড়ের ধূতিশাড়িতে লম্ফ দেই, মুখ লুকাই, গন্ধ শুঁকি, তারপর অফিসফেরত ময়নার বাপ আসিয়া পড়িলে নানী ঘোমটা দিয়া পিছন ফিইরা হাঁটা দিয়া কাঁঠালতলায় পৌঁছান। সেখানে আমাদের দোয়েল শ্যামা আর দূর তালগাছে বাবুই পাখির বাসার দিকে হাতছানি দিয়া কন ‘দ্যাখ মানুষের নাকান বাবুইয়ের কী বুদ্দি’। এ বুদ্ধি আমরা রপ্ত করি, বৃষ্টিতে জানালার ফাঁকে বসিয়া বা পড়তে বসার বারান্দা থেকে দূরে ভরকুয়াশায় দোদুল দুল নাচনে পাখিতামাশা দেখিয়া। আমরা পাখি হইয়া যাই, উইড়া যাই ফিরিয়া আসি, বসি আহার করি আবার দূরদেশে চলিয়া যাই। এ রকম হামেশাই চলে। কেন নীল আকাশে ওই পাখি হইয়া চলি, কালো পাখিজ্জচিক্কন লেজ উচানো পাখি, ফুড়–ৎ পাখিজ্জআবেদালীর পুকুর ওড়া পাখি, বৃষ্টিতে ভেজা পাখি, কাঁঠালতলার নির্বোধ পাখি, জামগাছের পাখিজ্জআমাদের পাখিস্বপ্ন পাখি। নানীই সে পাখির রঙে সঙ্গী হইয়া যান।

একদিন মাধ্যমিক পরীক্ষা আসিয়া গেলে কিংবা সভা-সমিতিতে, প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী আসিলে খালাম্মার বড় উঠান সাইকেলে ভরিয়া যায়। আব্বার স্কুল মাস্টার প্রতিনিধির ভোট আসিলে সে এন্তেজাম আরও বড় হয়। বড় পাত্রে নাস্তা আর কী কী সব। খাবার-দাবার কিংবা ভোটারদের আরজি পার করিতে খালাম্মার ঘর-উঠানে অনেক হৈচৈ। আয়োজন-আত্তির বাহিরে আর কি কিছু ছিল! খেলাঘরে কেরাম-নেশা থানামাঠে বা কাছারীতে ফুটবলের নেশা আমাদের মশগুল করিয়া রাখে। সম্মান-মর্যাদা কিংবা একক্লাস ওপরে পড়িলে তিনি বড়র মাপেই সম্মান পান। এসবের বাইরে বিপদ আসিলে খালাম্মাই সব সামলিয়া লন। মাতৃস্বরূপার প্রতিকৃতিতে থাকে তার অপ্রতিরোধ্য শাসন। কিন্তু সন্ধ্যা অতিক্রম করার কালে আব্বার শাসনে খড়্গ ছায়াপাত করিলে খালাম্মা আসিয়া বর্ম রচনা করেন। পৃথিবীবিরল এ মাতৃময়ীর গা-ঘিরে তখন সুপারির গন্ধের প্রহরা, সে আঁচলেই আমরা ঠাঁই পাই। সুদৃশ্য তরুবিস্তৃত ছায়াশ্যামলীন ঘন মায়াময় বাড়ির পথকে আমরা বিসর্জন দিয়া চলি তাহাতে একসময় মনে থাকে না। মনের অগোচরেই কখন যেন দৃশ্যপট থেকে অবসিত হন ‘ময়নার মা খালাম্মা’। কতোদিন জানি না! শুধু ছবির মতো হানা দেন তিনি অপার ভালোবাসার জগতে। সেই মাটির ঘর, টুনটুনে রান্নাঘর, দিগন্তমাখানো ঊষালোক, বাদলাদুপুর, শীতার্তসন্ধ্যা, মন্দমধুর হাওয়া লাগানো বসন্ত সবকিছুতেই স্মৃতিজাগানিয়ারূপে মিইশ্যা থাকেনজ্জমায়াময় পৃথিবীর এক মাঘ-নিশীথের কোকিল হইয়া। জীবনের ওতপ্রোত সব মুহূর্তে ভিজে মেঘ বা পূর্ণিমার চাঁদ কখনও কি নিবিয়া যায়! কতো বিচ্ছেদ কতো আনন্দ প্রাত্যহিক নিয়মে বিসর্জনপ্রাপ্ত হইতেছে। সবকিছুতেই থাকে প্রকৃতি। আর প্রকিৃতিই বারবার কোমল মোহিনীময়তায় বার বার ফিইরা আনে। একরূপে আমরা বদলাইয়া গেলেও একইরূপে থাকি। প্রকৃতির ঐক্যসূত্র আমাদের জীবনেরই লেখাচিত্র। আমরা চোখে দেখি স্বপ্নভরা মানুষদের; আয়ত্তে জড়ো করিতে থাকি আমাদের অফুরান করালরেখা। শীতদুপুরে কেউ মরিয়া গেলে পাড়া জুড়িয়া সুর করিয়া বলোক ওঠে কান্নার রোলে। অগুনতি মানুষদের ভিড়ে ছাইয়া যায় ঘর-বারান্দা। বড়ো বড়ো মাছি ওড়া হাওয়ায় চৌকিতে কিংবা কোনো কড়িবরগার দালানে লাল-নীল বর্ণের চৌকোণা রঙচটা সিমেন্টের মেঝের ওপর রঙবেরঙের নানাশ্রেণীর মানুষ হুমড়ি খাইয়া পড়ে। মৃতদেহ তখনও কোণার ঘরে উপুড় হইয়া পড়িয়া থাকে। মৃতদেহের অনাবলি প্রশংসা আর আফসোস। তারপর মাগরেবে, কলাপাতা ফাঁকের ভিতর দিয়া, কমলা সূর্য ডুবিয়া গেলে দূর-গোরস্থানে নীরবতার শান্ত শব্দস্বরে চলে গোরের কাজ। কীভাবে পাঁচন দিয়া নিখুঁত সমান করিয়া মৃতদেহের আবাস রচনার কাজ চইলা যায়; ভয় আর তৃপ্তিমিশ্রিত আমেজে কজন মানুষ তখন কাজে লিপ্ত। মরাবাড়ির থাইকা গোরখোঁড়ার কাজের অগ্রগতি দেখিতে গেলে দূরে হ্যাজাগের আলো, বাঁশকাটার শব্দ, কলারপাতা সংগ্রহের তৎপরতা ভাইসা ওঠে। আর নিধুঁয়া আঁধারে তখন কোণার কলাগাছটায় পৌরাণিক নায়কের ভূমিকা, শ্মশানের নিমগাছটার একাকী দাঁড়াইয়া থাকার আবহ ভুইলা দেয় পাপবিদ্ধ বাঁচার সব বাসনাসমূহ। আমরা তখন থেকে যাই পুণ্যকামী, নিষেধমান্য, গুরুমান্য, উপাসনাগামী সব ভালো মানুষদের ছবির ঘরে। যেখানে শুধু সংযম আর ভালোর চর্চাবিন্দুতে নিরন্তর ঘুরঘুর করিবার চেষ্টা। সমষ্টির দর্পিত দৃষ্টিতে আমাদের ভালো মানুষ হইবার সমস্ত চেষ্টা কাটে দিনান্তে। ধাইয়া আসে কঠিন সব বার্তা; অদ্রুত, অভয়ের রথে। পার্কেরদিঘি, তালেরদিঘি, বড়বিল, আঙরারবিল, ঈদগামাঠ, কলেজমাঠ খুব তুখোড় গরমপড়া টানা নির্ঘুম দুপুরগুলা শুধু দুর্বিষহ টানে টানিয়া চলে। বখে যাওয়া অসহ্য সময় বাধা পড়ে অলৌকিক আনন্দে। শেয়ার করা সে বন্ধুগণ মাতিয়া তোলে আগ্রহের সব মুহূর্ত। কিন্তু এক সময় এমন উত্তাল প্রবাহেই কালোমেঘের আকাশ আর আলোর নাচন মিইয়া আসে। শ্রাবণের বৃষ্টি, ভেঙে পড়া কৃষ্ণচূড়ার নষ্টহানি দৃষ্টি কিংবা ঝড়োবেগের বৈরি হাওয়া চিইনা যায় সবাই। আমরা উপাসনালয় ছাড়ি। আমাদের চিত্ত আকাশচুম্বী জয়জয়কার। স্কুলঘরের ছায়ার মায়া কিংবা পাশাপাশি দাঁড়ানো একজোড়া পাকুড়গাছে প্রখর রৌদ্রে ছায়া দেয়, শিরশির করা হাওয়ায় তার শীর্ণ কচি-সবুজ পাতাগুলা দুলিয়া ওঠেজ্জক্লাস অবসরে আমরা ওখানে দাঁড়াইয়া মজার মজার কথা শুনি। এর মাঝেই বেত হাতে স্যাররা শ্রেণীকক্ষমুখে আগাইয়া আইলে সক্কলে হুড়মুড় ছুইটা চলি ক্লাসে। ওসব আড্ডাস্থল তখন তামান দোকানদারের নিয়ন্ত্রণে। দূর-দূরান্তের মাঠে বেড়ানো কীসব অমোঘ গল্পে মাতোয়ারা আজগুবি কথামালা একসময় নিজেদের ডুবাইয়া দেয়। একবার স্কুল পালাইয়া অন্য আয়োজন। বাসভ্রমণের জন্য বাহির হওয়া। বাসের ছাদে ওঠা। যখন হাফ ভাড়ার বিনিময়ে গাড়ী ছাড়িল তখন বীরত্বের মাঝে ছাদের রেলিং ধইরা সন্ত্রস্ত বইস্যে থাকা। ভেতরে ভয় বাইরে বীরত্ব দেখানো। দেখা যায় রাস্তার দুধারে সারবাধা আমজামশিরিষ গাছের ফাঁক দিয়া এক দৈত্য য্যান ছুইটা চলছে আর আমরা তার সওয়ার হইয়া বইসা আছি। বাসের ছাদে ওঠাটা বীরত্বের বা আনন্দের তা আমরা কেউ জানি না তবে ভয়ঙ্কর রাত নাইমা আসে আটটার মধ্যেই। রাতে অবসর পাইলেই পানের দোকানে আড্ডা। শোনা হয় বাংলা সিনেমার গান। সে সব লেইখ্যা মুখস্থ করা আর তার সুর রপ্ত করিয়া চলা।

বড়ো ফুফুর শরীর সেঁধিয়ে কেমন য্যান কটা ভারি গন্ধ। নিষ্ঠুর আনন্দই তা, এতো ভালোবাসিতেন তিনিজ্জকিন্তু কাছে যাইবার উপায় নাই। আমাদের বাড়িতে আসিলে একমতো জোর করিয়াই মাসাধিক থাকিতেন, কিন্তু কেউ তাকে মানে না। তার যাবার বেলা আমাদের খারাপ লাগে। ফুপুর বাড়ি ছিল বিল সংলগ্ন আখিরার ওপারে। সেজন্য কেউ তার ওখানে বেড়াতে যায় না। নদী পারাপারের ভয় তখন ভীষণ। নাড়ীর টানে এরকম একতরফা যোগাযোগের মধ্যেই তিনি টুপ করিয়া মরিয়া যান। ঘরবারান্দায় সর্বত্র তখন বুড়ির স্মৃতি জ্বলজ্বল। তার গোর, লাশ, মৃত্যুভয় নিয়া আমাদের মনোলোক খুব ব্যতিব্যস্ত। ভাবনায় ভিড় কইরে‌্য আসেজ্জযে পরিবেশ-আলোহাওয়ায় তিনি মানুষগুলা ছবির নাকান ভালোবাসিয়াছিলেন।
বড়ো এক কাঁঠালের মগডালে তাকিয়া শুভ্রশাড়ি পরা নানী বলিয়া যান মৌমাছির মৌচাক তৈরি ও মধু বানানোর গপ্পো। খুব পরিচিত সে উঁচু ডালগুলা যেন মনমাতানো ছায়ায় ব্যাপক আশ্রয়ের। আমরা নানীর গপ্পের মাঝে স্বপ্ন দেইখা চলি কবে সে ছায়ায় মায়া লাগানো ডালে উইঠা বসি, ঝুলানো খেলায় গা ভাসাই, পাখির স্বপ্নে জাগি। নানী ভালোবাসিয়া চলেনজ্জতার শাড়ির আর গায়ের গন্ধ বেশ মজার। বড় ফুফুর মতো নয়। নানীর সুপুরি খাওয়া, ময়দানের গল্প বলা, জ্যোৎস্না জাগানিয়া রাইতে মৃত মানুষের গল্প বলা আর ভালো ভালো খাবার আয়োজন করাজ্জএইতো নানীর কাজ! সেজন্য নানী কবে আসিবেন তার অপেক্ষা। নানীর মতো আমাদের কেউ প্রিয় নাই। তার পরিবেশে ফাঁকা উদাসী হাওয়ায় কাঁঠালের ফাঁকে অনেক সময় চইলা যায়। গোড়ায় তার অনেক মুচি। সেগুলি ইচ্ছা করিয়াই নষ্ট করা আর খেলার উপকরণ তৈরি করা। এ কাঁঠাল বড়ো হইলে যাকে-তাকে বিলাইয়া দেওয়া যায়। কত্তো মানুষ যে যত্রতত্র ইচ্ছা কইরাই এর কাঁঠাল লইয়া যায়। কিন্তু তবুও গাছ খালি হয় না। মিষ্টি আর পরিচ্ছন্ন সে রোয়া খুব কাঁঠালী আমেজের। আমরা কাঁঠাল পাড়ি, খাই, উৎসব করি। একদিন আসিল তুফান। রুদ্রদেবতাকে অস্বীকার করিয়া সে চড়াও হয় বর্ষিয়ান কাঁঠালগাছে। তার মোটা শাখা ভাঙিয়া যায়। তখন মনঃকষ্টের বদলে তাহা কাটিয়া ফেলার আনন্দ। এক রকম আনন্দেরই সাথী হইয়া যাই। পাখির ডানা নাই কিন্তু নির্মল নীল অসহ্য সুন্দর আকাশ খুব ডাক দিয়া চলে। আমরা সাড়া দিলে আকাশ আরও বর্ণিল হইয়া যায়। ফিরোজা আকাশ সমস্ত সময়কে বাধিয়া ফেলে। মাঝে সাদা মেঘের পাল ছুইটা যায়। ছায়াসুনিবিড় প্রখর রৌদ্রতাপে দুপুরগাছের পাতার কিনারা করিয়াছে লুকোচুরি খেলা। শিরশিরে হাওয়াও তাহাদের সঙ্গী। কবেই এক সময় দুড়দাড় ছুইটা আসে বৃষ্টি। গাছের গা বাহিয়া সড়সড় নামিয়া যায় বৃষ্টিপানি। মুহূর্তে গাছভেজা পাতার নরম মাথা দোলানোর শব্দ। দোলানোর ভঙ্গিতে রসিক ব্যঙ্গ। তখন ঝিলমিলিয়া ওঠা রোদ ছাড়িয়া ওপারে স্কুল মাঠে পল্ল¬ব-জোহা-হাসু-মানু-তিতাস ফুটবল লইয়া আসিয়াছে। তখন পানির মজা ছড়াইয়া পড়ে। বল পিছনে ছোটার আগেই মাঠভর্তি পানিতে সবই কাদাজলে একাকার। পড়িয়া গেলেই দুহাত সামনে চলিয়া যাওয়া বীর। নির্জনে নিরাপদে সোনারোদ পড়া স্কুল দেওয়ালে তারপর আরও মুখ কালো করিয়া বৃষ্টির আনাগোনা। সে বৃষ্টি আগের চেয়ে আরো মুখরা। সুঁচহানা বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়াই খেলা চলে। সেখানে খোলতাই দুরন্তপনা। কুয়াশা ঘেরা হইয়া যায় সমস্ত প্রকৃতি। বৃষ্টির ছাঁট আর ফুটবলের গতি কেদোমাটিতে থেতো আওয়াজ তোলে। তারপর দামাল দলের পেরেশান। তবে ওখানকার কৃষ্ণচূড়া খুব মনোময় আভা ছড়ায়। মসৃণ শরীর দিয়া স্কুলবারান্দার ছাদে পৌঁছান যায়। ওখানে পৌঁছালে আকাশ নামিয়া আসে। প্রকৃতি নব-আনন্দে সাজিয়া ওঠে।
সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা-রাত খেলা চলে। বড়দের মতো হইব কবে! এতেই পার হইয়া যায় উপেক্ষিত সময়। স্কুল ক্রীড়াবার্ষিকীতে একবার দল বাঁধিয়া হাঁটিয়া বাজিতপুর যাওয়া হইয়াছিল। হাঁটিয়া চলিয়া বিরামহীন পথে তখন দিনমান হৈচৈ। কষ্ট হইলেও সে আনন্দ-গল্প অনেকদিন চলিয়াছে। স্মৃতিতে আটকায় সে সমস্ত হাঁটা পথ। ও পথেই নানাবাড়ি। সেজন্য বারবার তার ডাক পড়ে। চিক্কন রাস্তা। পার্শ্বে পেরসিডেন জিয়ার খালকাটা প্রজেক্ট। সেজন্য রাস্তার পাশে তুমুল গর্ত। পাশের ধূলিধূসরিত পায়েচলা পথ। ওখান থাইক্যা দেখা যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙা দরজার সে বিদ্যালয়ের ছবিতে মনে হয় চৌধুরী স্যারের কথা। মোটা আর ভয়ার্ত স্যার। স্কুলের প্রতিমূর্তিতেই তার অবয়ব। কী পড়াতেন তিনি মনে নাই কিন্তু কেউ তাকে চাইতাম না। বড়ভাইরা তাকে মানিতেন। এমন স্যারকে উচ্চতর পঞ্চম শ্রেণীরাই কব্জা করে। ওরা তখন অনেক বড়। তারাতো পারিবেই। বড়রা খুব সম্মানীয়; স্বপ্নময় হইয়া ওঠেন সব পদক্ষেপে। স্কুলের পেছনটায় একসময় লঙ ও হাইজাম্প হইয়াছিল। বড়ক্লাসের ভাইরাই প্রথম; স্যাররাও তাহাদের সমীহ করেন। খুব গর্ব ওদের জন্য। এ অঞ্চলে যেন ওরাই প্রখর। অনেকবার হাইজাম্প লংজাম্পের আয়োজন হয়। আমরা দেখার আনন্দে নিজেদের গড়িয়া চলি। হইয়া উঠি তাহাদের মতো। সে সব আয়োজন এক সময় শ্যাষ হইয়াও যায়। তারপর স্কুলের পেছনটার ফাঁকা জমিটায় আসে যাত্রার দল। বিরাট প্যান্ডেলে মনটা ভাঙিয়া যায়। আহা! কবে উহার সুখ পাইব, রাতের সে নর্তকীদের কবে দেখিব, কবে সে আলোঝলোমল মঞ্চের সুখ উপভোগ করিব। ইদ্রিস-মিসু-ফারুকের ভাগ্যকে ঈর্ষা করিয়া চলি। এক সময় ক্লাসের ফাঁকে ওরাই ছেলেমেয়ে সম্পর্কে আমাদের কীসব ধারণা দেয়। সেলিম-মাহবুব আমরা হাসিতাম ওসব শুনিয়া। যাত্রাগান দেখিতে ওরা দক্ষ। যাত্রার অভিজ্ঞতায় ওরা এ দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষ, অনেককিছু ওরা জানে, অনেক তাদের কালবেলার মনোহারী গল্প। স্কুলমাঠে ক্ষুদ্র যে জামগাছটায় অনেক জাম থাকিত তাহাতেও ওরা তরতর উইঠে পড়ে। স্কুল গেটে চিকন পেয়ারা গাছের সব পেয়ারা ওদের। দাড়িয়াবান্ধা, গোল্ল-াছুটে তারাই প্রথম। যাত্রা প্যান্ডেল চলিত তাহাদের কী সব ব্যাটারীতে। অনেক রঙের বাতিতে বড় একটা টাওয়ারজ্জসেটা খুব দূর হইতে দেখা যায়। বিদ্যুৎ আসে নাই কিন্তু বিদ্যুতের রোশনাই থাকে। বড়মামা নানাবাড়ি থাইক্যা একরাতে অনেক আমজামখেজুরের তলা পার করিয়া আমাকে হাঁটিয়া যখন পিতৃশালায় আনেন তখন বলিতেন যাত্রাগানের কাহিনী আর নায়িকাদের গল্প। দূরের কর্নিশে টাওয়ার দেইখা বলেন : ‘আর একটু হলেই তোর বাড়ি। ওই দেখা যায় টাওয়ার আর তোর স্কুলঘর।’ তারপর বাড়ি পৌঁছাইলে মামা বলিয়া যান নানাবাড়ি না-থাকার জবর কাহিনী। তাই বাধ্য হইয়াই এই ভর রাতেই দুবরাজপুর হইয়া ফাঁড়াপথে ভাগিনাকে লইয়া আসিয়াছেন। জ্যোৎ¯œালোকিত রাত্রিতে সে মেঠোপথ, নিধুয়া পাথার, তুলারামপুর, বাজিতপুর, লালদিঘি হইয়া মূলরাস্তায় আসা। কী যে নির্জন স্থির পথ! ঘুমন্ত বাড়ির উঠোন, গোয়ালে গরুর খসখসানি, গোঁ গোঁ আওয়াজ, বটপাকুড় তলা দিয়া দুধঝরা জ্যো¯œা পান করিতে করিতে এগুনো। ভয় হয় ডাকাতের। কিন্তু কে কার! ধূলোপথ মাড়িয়া নির্জনতা এড়াইয়া দ্রুতই পৌঁছানোর উদ্যোগ। গোবর্ধনপুরের রাস্তার মোড়ের খেজুর গাছটা তো তখনকার অনেকদিনের সাক্ষী। আর শুখানচৌকির পরে শিমুলতলার দিঘিটাজ্জতাও বোধ হয় চিরকালের। এমন আবহাওয়ায় পা ডুবাইবার সাধ্য কার!


শেখ সাহেবের মৃত্যুর খবর জানা যায় না। তিনি কতো বড়ো কে ছিলেন বোঝাও যায় না। তবে শেখ সাহেব যে একজনজ্জসেটা কেমন করা শিহরণ জাগায়। পানদোকানে, চা-স্টলে, মোড়ের বটগাছের নিচে শেখ সাহেবের চরিত্রগুণ নিয়া কথা হয়। আমরা জানিয়া যাই ঐদিনই আমাদের হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক রুস্তম হেডমাস্টার অকাল মৃত্যুবরণ করেন। সেটা না-কি শেখ সাহেবেরই মৃত্যুশোক। তার অবয়ব ঠিক কেমন ছিল মনে পড়ে না। তবে ‘নোয়াখালি স্যার’ সে সম্পর্কে অনেক খবর দিতেন। স্কুলে নোয়াখালি স্যার আর রুস্তম মাস্টারের সম্পর্ক ভালো নয়। কি-সব নিয়া তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হতো। তবে সবকিছুর কোনোটাই লোককথায় বোঝা যায় না। নোয়াখালি মৌলভী স্যার যে দুর্দান্ত ও বদমেজাজী তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। শ্বেতশুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবীতে কৃষ্ণকালো গোলগাল বেটেখাটো মানুষ তিনি। সারাক্ষণ চোখেমুখ যেন বিষণœ আর যমঅন্ধকারে ভরা। খুব রাগওয়ালা তিনি। আমাদের অগোচরে জাগিয়া ওঠে এমন কর্তৃত্বের চরিত্র। কিন্তু আমরা তার ছাত্র নই অথচ গল্পে তিনি থাকেন শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। কোথাও কিছু শৃঙ্খলাভঙ্গ হইলেই শাসনের জুজুতে নোয়াখালি উইঠা আসেন। আমরা শিহরিয়া উঠি। ভীত হই তার উত্তাপে। শাসনের জন্যই কি তবে সবাই তাহাকে সমীহ করিত? তিনমাথার মোড়ের মিশুদের হোটেল থাইকা নিয়ম করে চা খাইয়া বেরুতেন নোয়াখলি স্যার। সে চায়ের দোকানে তার জন্য নির্দিষ্ট সিট বরাদ্দ থাকিত। একাকী খাওয়ার পর ধীরলয়ে তিনি রাস্তায় নাইমা আসেন। স্যাঁতসেতে সে রাস্তার পাশে মৌন বটগাছতলার নিবিড়তা ভাঙিয়া ক্রমশ হাঁটা শুরু করেন। আমরা তখনও ট্রেন দেখি নাই, তার হুইসিল চিনি না কিন্তু অনুমানে সত্য হইয়া ওঠে তার ধীর লয়ে চলার ভঙ্গি। অনেকটা হুইসিল বাজিয়া ট্রেন চলা শুরুর মতো হাঁটার বেগ বাড়াতে থাকেন তিনি। তখন দেখিতে পাই বয়স্থ ভারী লোকেরাই শুধু তাকে সমীহ করিতেছেজ্জসালাম দিতাছে। ব্যাস, ঐ পর্যন্তই। হাঁটার বেগ বাড়িলে কেউ সালামেরও সুযোগ পায় না। তখন হিসাব করিয়া, প্রয়োজনমাফিক সমাদরের প্রশ্নটা আসে। কেউবা এড়িয়াই চলেন তাকে। তবে নোয়াখালি স্যার আমাদের চেতনায় রাগী ও শ্রদ্ধেয়ই রহিয়া যান; কারণ আমরা কখনও তাহার সঙ্গে কথা কহি নাই, কোনোকালে সালাম দেই নাই। আর সে সবের রেশ ধরিয়া এক সময় জানিতে পারি; কোনো এক বর্ষামেঘের দুপুরে, সুরভিত সমীরণে ভর করিয়া তিনি নোয়াখালি চইলা গেছেন। শোনা যায় ধেয়ানের আলোকরেখায়, নয়নের আঁধারে তিনি নিপতিত। তার এমন ছেড়ে যাওয়ার কারণ আমরা আর জানিতে পারি না, সে চেতনা তখনও প্রশ্নহীন; তবে আমরা বিষণœবাতাসে মুখ লুকাইজ্জঅজান্তে জলভারানত হইয়া পড়ি। বেদনা জাগানো কষ্টের কারণ খুঁজিতে থাকি। তবে হয়তো এ কষ্ট ছাড়িয়া যাওয়ার কিংবা স্যারের কঠোর-কঠিন মুখচিত্র না দেখিতে পাওয়ার। অনেকদিন তিনি অনন্তের মতো হারাইয়া যান। কোনোদিন তাহার মৃত্যুর খবর আমরা জানিতে পারি না। মৃত্যুর অবহেলা কতো করুণ তার উদাহরণ ঐ নোয়াখালি স্যার। তবে সেজন্য আমাদের বিলাপ নাই কিন্তু একরকমের নিস্তব্ধতা থাকে। তারপর তিনি বিলীন হইয়া যান বিশ্বমায়ের আঁচলে। অপসৃত অপহরণের চিরন্তন পথে আর ফেরেন না নিঃসন্তান নোয়াখালি স্যার। একটা চিত্রকল্পের আভাসে নির্মিত হন তিনি : এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না। … প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তার ললাটে পৌঁছেজ্জযেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে। বছর ঘুরিয়া ক্লাসে ক্লাসে প্রজন্মরা আসে আর স্যারকে ভুইলা যায় । সমাজ-সংসার-জীবনের কলরবে হারাইয়া যান তিনি। তবে আমাদের যে গল্পগুজবে শেখ সাহেব থাকিতেন তার বাইরে কি হতো বা তার দলের লোকদের কি হলো সে সব আমরা জানি না। স্মৃতি হাতড়াইয়া এমনটা আয়ত্তে ফেলা যায়জ্জএ জাতির পিতা নোয়াখালী স্যারের মতো তখন সবকিছু হইতে বিলীন। কারণ, তখন তার দল নাই, সমর্থন নাই। দল এবং তাকে আড়াল করিয়া সবকিছুর রটনা চলে। নির্মমভাবে তিনি হারাইয়া যান সময়ের চরিত্র থাইক্যে। শেখ সাহেবের নাম মুখে না-আনা উচিৎজ্জএমন রহস্যভয় থাকে সবার মাঝে। যেন আসন্ন বিপদ বা বিপজ্জনক কিছু এড়াইবার আকুল প্রচেষ্টা। যে নির্বাচন বা ভোটগুঞ্জনজ্জসেখানে আছে দাঁড় করানো কিছু স্বতন্ত্র মানুষ আর সরকারি দল। তবে সরকারি-বেসরকারি এসব প্রক্রিয়া কেউ-ই তেমন বোঝে নাজ্জআমরা শুধু শোভাযাত্রা দেখি, রাত অব্দি গুজবের নানা বার্তা কান পাতিয়া শুনি আর মিনিস্টারদের আসার খবর পাই। পতাকাশোভিত গাড়ি, নিরাপত্তাপ্রহরীদের তৎপরতা সবকিছুর তোড়জোড় হৃদয়-তরঙ্গে শঙ্কার ঝঙ্কার তোলে। মনে মনে চোখের তারায় বড় হওয়ার সুখস্বপ্ন পাইয়া বসে আমাদের। মুক্তবেগের পাখায় কতো যে স্বপ্ন ভর করে, উতোল হাওয়ায় শরৎমেঘের মতোই তা এলেবেলে। তবে ‘নাদের আলী’ নাই আমাদের। আমরা ভিখিরির মতোই থাকিয়া যাই সে স্বপ্নদৃশ্যের দর্শক হইয়া। আমাদের এলাকায় মিনিস্টারের বিরাট এলাকা জুড়িয়া ‘থানা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্স’ গইড়া ওঠে। সে কারণে প্রচার-স্তুতি তার বাড়িতে থাকে। স্তাবকদল তৈরি হয়। নিবিড় পল্ল¬ীর মানমাতানো সে সব দৃশ্যপটে রাজনীতি য্যান উল্ল¬াসের বার্তা ছড়ায়। প্রার্থীর পক্ষে নানারকম ভোটপ্রচার চলিতে থাকে। যেদিন তিনি আসিতেন তার প্রস্তুতিতে থাকে নানা তোড়জোড়। তবে সে সবে কে কোন্ দল বা কে কার আনুকূল্যেরজ্জআমাদের মাথায় খেলে না। স্কুলঘরের দেওয়ালে বড় হরফে লেখা থাকে অমুক দল চোর, অমুক দল ভালো ইত্যাদি…জ্জএসবের কি গুরুত্ব, কেন কে লিখিয়াছে কেন লেখে তাহা বোধগম্য নহে। তবে মিনিস্টাররা আসিতেন নানা বর্ণে, নানা রটনায় খচিত হইয়া। বড়ো গাড়ীতে, অনেক পুলিশ সঙ্গে লইয়া। সে সব নিরাপত্তাবাহিনীর বজ্রকঠিন মুখাবয়বে আমাদের দৃষ্টিদৃশ্য হিম হইয়া যায়। ভয়ার্ত আবর্ত ঘিরিয়া ধরে আমাদের। এর মধ্যে নেতাদের শরীরের জেল্ল¬া আর সুবাস ছড়ানো বাতাসে আমাদের নাসারন্ধ্র বিপুল নেশায় পাইয়া বসে। দরোজার কোণা বা জানালার ফাঁক গলিয়া কোটাঘরের ভেতরে কী হচ্ছে বা কী করছে তা শোনার ব্যগ্র প্রচেষ্টা থাকে। তখন বর্ণাঢ্য সবকিছুতেই আমাদের মনোযোগ অবিচল। অনেক সময়ের ব্যবধানে সবকিছু শ্যাষ হইলে ভারী খাবারদাবারের পরিবেশনের পর সভাসমিতির সমাপ্তি। পার্টির লোকদের হাতে তখন তিনচারদিনের পুরানো নিউজপ্রিন্টের কাগজ। সে সব কাগজে থাকে ঢাকার খবর। ঢাকা তখন অনেকদূর। কুয়াশাঘেরা শীতে ঢাকার স্বপ্ন চোখেমুখে। ইলেকট্রিক বাতিতে চকচক করা বিড়ালচোখের দৃষ্টিতে সন্ধ্যারাগে হনহন করিয়া চলা ঢাকাকোচ আর চিকন সিমেন্টবাধা রাস্তার অনিঃশেষ পথে আমাদের ঘোর লাগাইয়া দেয়। অনায়াসে পুলকিত হই বহুদূরের পথে, কুটকুটে অন্ধকারের আমেজে, সুদৃশ্য স্টীমারের কল্পিত বর্ণনায়, যমুনার ধ্বনি-কলোতানে আর তীব্রতর শীতের নগরবাড়ি আর আরিচাঘাটের বিবরণে। লেটার প্রিন্টের তিনদিনের বাসি সে সব খবরের কাগজ হাতে থাকা মানেতারা রাজনীতিবিদ। দেশ সম্পর্কে খুব ভালো জানে বলিয়াই তাহাদের এতো পরিচিতি। মন্ত্রীর সঙ্গে তাহারা মিটিং করে। তারস্বরে দলের হইয়া আওয়াজ তোলে। আমরা এসব উপলব্ধিতে নিরহঙ্কার ও মায়াবী রহিয়া যাই। প্রকৃতি খুব যেন মানিয়া নেয় আমাদের। কোষ্টার ক্ষেত, ভেলায় ভাসানো মজা পুকুর, উঁচু আখের ছায়াঘন প্রলম্বিত প্রশাখা, আলুক্ষেত, কলাবাগান, শিমুল-অশোক ফোটা বিরাট বৃক্ষ, দাগী আমের ভিটা আমাদের সঙ্গ দেয় নিরন্তর। আলো হাওয়ায় বড়ো কইরা তোলে। কী সুনসান পটের কচিপাতার ভেতরের সারবাধা ঊর্ধ্বমুখি সতেজ, ঋজু, দণ্ডায়মান চারাজ্জসে সবে সময় কাটিতে থাকে। একসময় সর্ষের হলুদবোনা মালায় আমরা স্নান করি। নাসারন্ধ্রের তাপ অনুভব করি। মন্দমধুর হাওয়ায় পাল তুইলা দেই। দিগন্তের তারে ওঠে উলুধ্বনির কম্পন। ভাসিয়া যায় কাঁপুনি মায়া। হলুদ মদে মত্ত। ওই যে ‘ঘাস হইয়া জন্মানো’ শিখে চলা; অবচেতনে, প্রতœ-পুরাণের ধ্যেয় ধ্বজচিহ্নে। কুসারের (ইক্ষু) ক্ষেতে ভুঁই উপড়িয়া আপ্যায়ন। ধ্বস্তবিধ্বস্তের মধ্যেই তাহা চলিতে থাকে। স্বাদ যেমনই হোক মত্ততার প্রয়োগ আর আস্ফালন ছাড়ি না আমরা কেউই।

দাদাবাড়ীর সেত্তার মারা গিয়াছিল এক রুক্ষ্ম প্রকৃতির অসুন্দর আর্তিতে; ফাঁসি দিয়া। কেউ বলে ফাঁসি নয় ওকে মারিয়া ফেলা হইয়াছে। মোটা গাছের বড়ো গুঁড়িঅলা ডালের সঙ্গে মৃতদেহটি দণ্ডায়মান অবস্থায় রাখা ছিল। আমরা দেখি, সত্যিই সে মর্মজ্ঞ মরদেহ। মালকোচা করে নিচুমাথায় বাধা, মূর্তিমান শরীরী দাঁড়াইয়া। নিষ্ঠুরতার নিঃশেষ বলি। ওই মৃতদেহ আমাদের কালোরাত্রি হইয়া যায়। নেওরপড়া রাতে সেত্তার দুয়ারে দাঁড়ানো। আমাদের মধ্যরাতের হিসু ভর্তুকি চায়। ভরনিশি সে সঙ্গছাড়া হয় না। কতোদিন সে ফেরত যায় নাই; ‘কতোকাল ডিঙ্গা বেয়ে রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে’ আসিয়াছে; ‘অন্ধকারে মৃত্যুর আহ্বান’ নিয়া। ছানাবড়া হওয়া চোখটাকে আর স্বাভাবিকে ফিইরা আনিতে পারা যায় না। বননীলিমার মধ্যে সে বীভৎস দৃশ্য। আমরা ও রাস্তায় আর বহুকাল হাঁটি না। শিউরে ওঠা ভয়াকুল ভগ্নকণ্ঠে আমাদের দুরন্তপনা নিবৃত্ত হই। খুব কৌতূহল হলেও কি পরিণতি এবং কেন তার এমন দশা কোনোদিনই আমাদের তা আর জানা হয় না। তবে আমরা মনিকোঠায় ঠাঁই দিই ওই দৃশ্যকল্পের সেত্তারকে। আমাদের বনশ্রী অঞ্চলের পাখ-পাখালীর আওয়াজে আমরা ‘রাঙা-রাজকন্যাদের’ স্বপ্ন দেখিয়া চলি। তখনও পিদিম জ্বলে কুপিতে, অন্ধকার বিদূরিত হয় মশালে আর খুব বড়ো আলোর ন্যায় মিঞাবাড়িতে জ্বলে হ্যাজাগ লাইট। মহাসড়কের ধারে লালমাটির ঘরবারান্দায় প্রাণের আহ্লাদে মাতি আমরা। কলাপাতার ছায়া আর সবুজ ঘাসপাতায় মোড়ানো প্রান্তর পথে মাটির গন্ধ শরীরে মাইখা একত্রে উনুনমাটি খেলিতে থাকি। ‘অরুণিমা’রা তখন অচেতন চেতনে গাথা পড়ে। বিরাট পগারপার হইয়া চলিয়া যাই হাওয়ায় ওড়ানো ধূ-ধূ মাঠে। চৈত্রের লু-হাওয়ায় প্রান্তরের বিভূতি-উচ্ছ্বাসকে আমরা যেন স্বপনরূপে পাইয়া যাই। কর্ষণফলায় উপড়ানো মাটি, বাঁশবন ধোয়া নিবিড়নিকুঞ্জ আর বিবিধ বর্ণিল ফসলি ক্ষেত সে চৈত্র হাওয়ায় আমাদের বানাইয়া দেয় মঙ্গললগনের পুণ্যপথিক। আমরা হইয়া উঠি গগনস্পর্শী। ফসলি প্রকৃতি আমাদের প্রব্রজ্যা মগ্নতায় ফেলে। তখন দেখি গোবৎসকুল মুখ ডুইবা ঘাস খায়, বাঁশবাগানের ছায়ায় লাঙলফলার কর্ষিত মাটি উষর থাকিয়া যায়। আমাদের সেখানে আশ্রয় নাই, স্নিগ্ধতার অচেনা মায়ায় আঁকড়াইয়া থাকি। আসে বক্কর আর তার বন্ধুরা। সেখানে অপরূপ তন্ত্রে বাজিয়া উঠি আমরা। অনেকরকমের খেলার রঙিন পালের তরীতে ভাসিতে থাকি। তখন রোদেলা প্রকৃতিও হইয়া ওঠে আমাদের মিত্র-সহোচর। প্রান্তরের পর প্রান্তর হাতছানি দিয়া সে উপায়হীন ডাকে। আমরা তখন সমীর দিগঙ্গণে বাবুইছাওয়া তিনতালগাছকে সাক্ষ্য মানি; যে পুকুরের ছায়া আরও ভুবনভোলান, মনোমোহিনী। পুকুরের ওপর সারবাধা তালগাছের স্বপনরূপ কী-যে অসহ্যতায় পাইয়া বসে আমাদেরজ্জসেটা দিনান্তে বোঝা যায়; যখন তার অবয়ব পুরাণের মতো। পুকুর আর তালগাছের মেলবন্ধন আমাদের গোপন অন্তরের বাসনাকে জাগাইয়া তোলে। তালপাতার বাবুই আশ্রয় তার বিচিত্র কুহু-তান; মোটা গুঁড়িতে বসিয়া পুকুর-জলে আত্মমগ্ন হওয়া, মাছের আহরণে রহস্য খোঁজা, সুগন্ধহিল্লে¬াল উথলানো রোমাঞ্চকর বিশ্বজ্জআর কি কোথাও ছিল! পাড়ে তখন মাছরাঙা আর মাছবসতির ঝিঁকের মধ্যে আনন্দরেখা। ক্রমশ জন্মমৃত্যু আর পরপারের খেলায় মশগুল হওয়া। কোন্ ফাঁকে আমাদের চোখে উঠানের বেড়া দেওয়া অংশে রসুন-পেঁয়াজের চারা খুঁইজা চলেজ্জইচ্ছেকাজে লিপ্ত হই। কিছুক্ষণ পর নিরিবিলি আমছায়ার রাস্তায় হাঁটিয়া স্পট বানাইয়া অন্যখেলায় আত্মনিয়াাগ। সে সময়টাতে আমরা আকাশকেও সাক্ষ্য মানি। ফিরোজা আকাশ আমাদের মাতৃদুগ্ধস্তন্যরত গোবৎসের চাঞ্চল্য দান করে। চৈত্রবাতাসের সুরে জীবনকে আমরা বাধিয়া ফেলি। তখনও কোনো শহর, রাজনীতি বা প্রতিযোগিতা আমাদের স্পর্শ করে না। আমরা জানি না স্বার্থপরতার সূত্র কিংবা কিছুকে চ্যালেঞ্জ করিবার কোনো কারণ। তখন শুধুই নদীমেখলা হাওয়ায় কাতর করা শীতল সুর আর নীলআকাশ ছামিয়ানার বাৎসল্য আতিথেয়তা দুর্মর হইয়া ওঠে। খুব আয়েশ-আনন্দ থাকে বাঁশঝাড়ের ছায়াঘেরা নন্দনকানন লাগোয়া শুকনো বাঁশপাতা বিছান পরিসরে। সেখানে কান্নাহাসির দোল দুলিতে থাকে। দূর-দিগন্তের হাতছানি আবছায়ায় পড়িলে ভাইসা আসে আযানের ধ্বনি। তখন বাজে বিদায়বেলার ভৈরবী। এরপর আঁধার নামিলে শতরঞ্জিতে বসিয়া অন্য গল্পকথা বুনিতে থাকি। একমাত্র কোঠাঘরের সামনে নতুনকেনা স্পঞ্জের দাগ ওঠা পায়ে ‘আগডুম বাগডুমে’র নতুন বইগুলা। তখন কুপির আলোয় গোলা বসায় প্রতিফলিত আলোছায়ার কল্পছবিতে ঘুমকাতর বা খাদ্যকাতর বনিয়া যাই। সন্ধ্যার মধ্যেই মিশমিশে অন্ধকারে ছাইয়া যায় কালিমাখা প্রকৃতি। দেউড়ি তখন ‘ভূতের গলি’ কিংবা ‘দক্ষিণ মৈশুন্দি’। চাঁদোয়া আকাশের নিচে একপাশে মাটির উনানে ‘প্যাল্যা’ (হাড়ি)তে রান্না চলে; আর অনতিদূরত্বে আমরা পড়ার ভান করিয়া চলি। সুর করিয়া পড়া ‘কাজলা দিদি’, সুফিয়া কামাল কিংবা সুকুমার রায়। কী সে মুখস্থ বাণীবন্দনা! তখনও স্কুল জানিনা; আহা আনন্দের ভেতরে সুখসময় পার করিয়া নিমিষেই রাজকন্যার ঘুমে জড়াইয়া যাই। জীবনকে নিধুয়ারাতের বিসর্জনে আমাদের ক্লান্তি নাই। শুধুই একটু নতুন কিছুর তীব্রতা আর আগ্রহ-আকাক্সক্ষা। দূরে কুয়োতলায় দাদী ছিলেন স্নানরত; বার্ধক্যে পাইয়া বসিয়াছিল তাহাকে। গাঢ় নীলশাড়িতে ন্যূব্জ হইয়া থাকিতেন, হাতে লাঠি, পায়ে পুরানা স্যান্ডেলজ্জলোলচর্ম এ মানুষটির স্নেহভালোবাসার খবর আমরা পাই নাই; তবে জানিতে পাই, প্রাণজুড়িয়া ভালোবাসা ছিল তার। আমৃত্যু যাবতীয় কুসংস্কারে আর ধর্মের লালিত্যে তার ‘নিমজ্জন’ কাউকে পীড়িত করে নাই। তবে তার যে ছায়ামূর্তিটি আমরা পাই সেটা ক্ষণিকের স্মৃতিগোচরে বাধা। এরপর কবে কোন্ অন্ধকারের বাঁশতলায় তিনি সমাহিত হন; আর তখন প্রিয়জনের কান্নাটা কতোদূর গগনবিদারী হইয়াছিল সে সব আমাদের কিছুই স্পর্শ করে না; বলিতে গেলে ভুলিয়াই যাই সবকিছু। পরে দেখিতে যাই দাদীর গোর; ওই এককোণায়জ্জলতাগুল্মে আচ্ছাদিত, আটাষ্যড়ির গাছে, প্যাচানো চোতরা আর বেটে খেজুর গাছ দ্বারা নিবেদিত। এর পাশেই বিরাট পগার, সেখানে দিনান্তের অন্ধকার নয়; মধ্যগগনের সূর্যের স্পর্ধা ঢাকা থাকে, বস্তুজগতের বিলক্ষণ সবকিছু সরিয়া যেন আঁধারেরই উৎসারণ তাহাতে। কিন্তু আমরা দাদীকে দেখি ওই ঘননীল বসনে, ইন্দারাপাড়ের স্মৃতিতে ওরকমইঝাপসা চোখে। গোরের মধ্যিখানে তিনি চিত্রকল্পের মুরতি বাজাতে থাকেনওই পুরনো ও বিদীর্ণ মনোদর্পণে।
একটা সময়ে আমাদের ভেতরে এপাড়া-ওপাড়া, এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত প্রকৃতিগতই থাকিয়া যায়; বারবার, পুনর্বার, অহরহ সে আত্মীয়তা। খড়ছাওয়া প্রাচীর লাগোয়া বিরাট লম্বা অজগরের আদলে কলার মোচার সাঁকোর ড্রেনটার সামর্থ্যটা পার হইয়া এপার-ওপার করা। ওটা ড্রেন নয় পগার। তার তলটা খুব আলো-আঁধারময়। অনেককালের আবর্জনা আর মশামাকড়সায় ছাওয়া। পগারের দুধারের গাছালিময় মৃদুমন্দ পরিবেশে তা হইয়া ওঠে আচ্ছন্ন, ভয়ঙ্কর আর অতল দুর্গম। সে সব পার হইয়া বিস্তীর্ণ মাঠ। সে তেপান্তর আমাদের ডাকে। আমরা লম্ফ দিতে শিখি, ফুলের গন্ধকে ভালোবাসিতে শিখি, চাষকারা ঠাণ্ডা মাটিতে পা ডুবাইয়া অনুভূতি নেই। ছায়া আর কায়ার পিঠমাখা সে অনুভব আমাদের উদাত্ত হইতে শেখায়। আনন্দগুলা উইঠ্যা আসে চিরলপাতার কাঁপুনিতে, চকচকে লাঙ্গলের ফলার সূচ্যগ্রে আর অনিমেষ উতল হাওয়ায়। সে সব পার হইয়া এপার-ওপার করাটা আমাদের সারাক্ষণ, দিনভর; অমলিন অবিচ্ছিন্ন। যেন একাত্মার গর্বে স্ফীত; তবে গর্বটা জানা যায় না। দর্পিত দৃষ্টিতে এরকম অনেকটা এলাকা পার হইয়া চইলা যাই আমরা। বিরাট গর্ত-পগার-জমিন-কানছির পাছ-খুলির ভিতর-পাছকা বারান্দা দিয়া খোলা হাওয়ার মাঠে। তখনও সম্প্রীতি মাপা যায় না! কিন্তু লোকায়ত তানের ব্যবহারে কখনও পরাস্ত হই না। পানাবলে আমরা মাইতা উঠি, টিকটিক, মার্বেল কিংবা বাটুলে পাখিশিকার একধরনের মত্ততা। অচঞ্চল ‘অবাস্তব এক শিশুকালের জীবন ছিল তার, খড়ের কাকতাড়–য়া পুতুলের মত ছিল ভেঙে পড়ার, বাতাসে উড়ায়া নিয়া যাওয়ার শঙ্কা এবং ভয়’ এমনটা প্রাত্যহিক চলমানতায় একদিন বাদ সাধেজ্জতড়াসে খবর আসে মস্তান (মহাস্থান) থাইকা মামা আসিয়াছেন। এটা তখন বাড়তি আনন্দ; বহুদূর মস্তান, সেখান হইতে তিনি কী নিয়া আসিবেন, আমরা জানি না। শুধু বুকভরা আশাবাদ আর আনন্দ। দৌড়াইয়া চলি বাজারের দিকে; ফটফটা ঘুড়ি ওড়ানো আকাশের বিকেলবেলায়। ওটা লৌকালগাড়ির বাসটপেজ। তখন দেখিয়া যাই জনাকীর্ণ পথঘাট, সদ্য পোতা উঁচু উঁচু বিদ্যুৎ টাওয়ার, মাত্র কয়দিনে তারটানা পোলগুলাতে মরাবাদুড় চিৎ হইয়া ঝুইলে আছে কিংবা উড়িয়া আসে কাক-চিল নানা রকমের পক্ষীকুল। পাশে লালমাটির ভাঙা দেওয়ালের স্কুলঘর আর কিঞ্চিৎ প্রসারিত খেলার মাঠে দুরন্ত ছেলেগুলার কীসব খেলাধুলা। জানা থাকে উহারা বয়সে বড়। তবে ক্রমশ হৈচৈ বাড়ে। সন্ধ্যের আগে বাজারের পসার জমিয়া ওঠে। ইহাই তখন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের খ্যাতিমান স্থান। দেখিতে থাকি সেখানে কতো লোকজন আর কতো তাদের ব্যস্ততা! চিনিয়া লই শহর না-জানি কী বিরাট! ছোটমামা যেখান থাকিয়া আসিতেছেন। আমাদের আবেগ উথলিয়া ওঠে, বলকে ওঠা দুধের শুভ্রফেনার মতো। অতঃপর অপেক্ষার প্রহর পার হইয়া মামা আসিয়া যান। হাতে প্যাকেটমোড়া অনেক ধানচালের কটকটি। কী রকম যেন গন্ধমাখা। মুখে আনার আগেই লালা জইমে যায়। চারকোণা, লালগুড়ে আটকানো ঠুমা ঠুমা কটকটি। ময়লাহাতে সে সব গলা দিয়া চালান করা যায় দ্রুত। কারণ, যে কোনো সময় ‘ভাগের মা’ হাজির হলেই সব শ্যাষ। দূরান্তের সে যাত্রাপথে মামার যাত্রাবিরতি বেশিক্ষণ স্থির হয় না। মার আতিথেয়তা না নিয়াই তিনি আবার রওনা দিয়া দেন নিজ বাড়ির উদ্দেশে। চিকন সিমেন্ট বাঁধানো সে মহাসড়কে গাড়ি চলিত ‘দিনাজপুর হইতে বগুড়া’ কখনও ‘পঁচাগড় হইতে নগরবড়ি’অনেক বড় বড় লম্বা সে গাড়ি। আমরা আনন্দে থাকিতাম তাহাতে চড়িবার বাসনায়। মামার কাছে অনেক বায়নার একটা অংশ ছিল এমন গাড়িতে চড়ার। কিন্তু তখনও আমরা গাড়িতে তেমন উঠি না। বেশির ভাগ যাতায়াতই আমাদের নির্ধারিত দ্বিচক্রযান বা গরু-মহিষের গাড়িতে। ধুলা উড়িয়া গড়গড় চলিত ঐসব গাড়ি। উপরে টাবর ছাওয়া, খড় বিছানো, তার ওপর মোটা কাঁথা আর চাদর পাতা। দুলিতে দুলিতে চলা আর হাঁকাও গাড়ি চিলমারির বন্দরের সুর মেলানো চাকার গতি। তবে এ গাড়িগুলা পাকারাস্তায় ওঠে না। কারণ গাড়িচলা চিকন রাস্তার পাশে অনেক চওড়া ধুলোকাঁদার মধ্যে গরুরগাড়ি সহজলয়ে চলিতে পারে। তখন গাড়োয়ানরা আমাদের দৃষ্টি কাড়ে। ওর বাহাদুরি আমাদের টানে। তবে সিমেন্ট বাধানো চিকন রাস্তায় মোটরগাড়ির কাটাকাটিটা (ক্রসিং) হইত ধীর লয়ে। ধুলার অন্ধকারে তখন ডুইবা যায় চারিদিক। আমরা হীনম্মন্যতায় চোখমুখ ডুইবা রাখি আর স্বপ্নাপ্লুত হইয়া পাথারে ভাসি। কিন্তু আমাদের চোখে অদৃশ্য হওয়া গাড়ির মতো আকাক্সক্ষাগুলাও হইয়া ওঠে মরীচিকাময়। মামা সবকিছু বাঞ্চাল করিয়া ফিইরা যান নানাবাড়িতে। আমরা কষ্ট পাই তাকে সংক্ষিপ্ত সময়ে পাইবার জন্য। তালতলায় রাঙামাটির রাস্তায়, পলকহীন জলচোখে তাহাকে বিদায় জানাই। একসময় হারাইয়া যান তিনি বহুদূরে। আমরা শঙ্কিত হই নিশ্চিত গন্তব্যের নিশ্চয়তার সন্দেহে। জানি নানাবাড়ির আমলিতলায় সব গাড়ি থামে না। সেজন্য অনেকবার আমাদের গাড়ির লোকেদের তোষামোদ করিতে হয়। তবুও নাজেহাল আর ঝক্কি কম কিসে! ভাবনাগাথার এসবের ভেতরেই আমরা আবার পূর্বতন হইয়া যাই। আবার নিজ নিমগ্নতায় স্থির হই। আমাদের বাড়ন্তকাল বাড়িতে থাকে। তবে এক ঝড়-দুপুরে মা-সহ আমরা সবাই গ্রামভিটা ছাইড়া যাই। হই শহুরে, বন্দরবাসী। মায়ামাখা সে সব বাড়িতে আমাদের আর কোনোকালেই ফেরা হয় না। কোনোকালেই বাবা আর ফেরেন না। এক সার্কাসমুখরিত গ্রাম ছাড়িয়া যাওয়ার দুঃখও আমাদের কাতর করে না। কারণ তখন তো আমাদের অভিজাত অর্জন বা মর্যাদার জন্যই শহরে আসা। আমরা স্বল্পসময়ে নতুন বান্ধবদের ডামাডোলে থাকি। একেবারে অন্য পরিবেশ, অন্যরকম সব বন্ধু। ওরা তাচ্ছিল্য করে, গ্রহণ করিতে চায় না। ‘নতুন’ বলে দূরে রাখে। সর্বদা কম মর্যাদা দেয়। আমরা ‘ফটিকে’র বন্দিদশায় সেঁধিয়া যাই। সব যেন দমবন্ধ ভ্যাপসা আওয়াজ। আলাদা করা, প্রাধান্য নেওয়া; ছোট-বড় ভাবাজ্জএসব। হারিয়া যাওয়া কূলকিনারাহীন জীবনে আবার ফিরিতে চায় মন। বারবার হাতছানি দেয় পাকাসড়কের তালতলা আর সিঁদুররাঙা সোঁদা গন্ধের গোধুলিলগ্নগুলা। কিন্তু কোনোদিন আমাদের আর ফেরা হয় নাই। হীনম্মন্যতার ভিতর দিয়া বড় হওয়া চলিতে থাকে। থানার মাঠে, তালের দিঘিতে বা কাছারি মাঠের আয়োজনে আমরা তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ। কবে কর্তৃত্ব পাইব, কবে নির্দেশছাড়া হইব; সে সকল চিন্তায় আমাদের বিষাদ ছুঁইতে থাকে। তবে স্কুলদেয়ালের সীমানায় আমরা মুক্ত থাইকা যাই। এবং একরকম সেখান থাইকাই বন্দরবাসীদের নাগালে পড়িয়া যাই। খেলার মাঠে কেমন করিয়া তখন যেন রাশেদ-পুটু-মকিদরা ডাকে। পজিশান করিয়া দেয়। মল্ল-ারমন্দ্রিততানে তাহাতে এক হইয়া যাওয়া। স্বপ্নলোকের দুয়ার ঘিরিয়া আমরা একাকার হইয়া যাই। তখন তো ওই পুরনো হাওয়ায় ফেরার মুগ্ধরাগিণী আর নবীন থাকে না। অতীতের অলিখিত সবকিছু হইয়া যায় বেমানান। বিস্মৃত বেদনরেখার খোলামকুচিতে উড়িয়া যায়। আমরা শহরকে পাই; মনমাখানো গ্রাম অন্ধকারের শিরে বাধা পড়ে। বিজলীবাতি আর পানদোকানদারের ক্যাসেটের আওয়াজ কিংবা ইলেকশানের মিটিংমিছিলে আমরা কুলমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হই। তবে একরকম কৃত্রিমতায় সময় গড়াইলে আমাদের মনজুড়িয়া থাকে অনেকরকমের অনুচ্চ ভাব। কারণ, ওরা এই তরফের সন্তান। তবে বাপের পরের তরফের (ছোট মার) সন্তান হইবার জন্যে আমরা অমুকের ছোটভাই, পরের তরফজ্জএসব শোনা চলিতে থাকে। সর্বক্ষণ মনে হয় বিচ্যুত আর মনোচাপে অচেনা-অপরিচিত মানুষ আমরা। সবার থেকে পৃথক। নিজেকে মেলাতে চাইলেও আসে নিয়তিরুদ্ধ বিভৎস আঁধার। কেন এসব; কেমন পাপে আমরা জর্জরিত সে খবর জানা থাকে না। কিন্তু পাপকেই লালন করিতে থাকি। চেতনায় বড় করি। সমস্ত তন্ত্রীতে দাঁড়ায় বিরূপচিহ্ন। বাইরের এসব কু-ইন্ধনযুক্ত ঘটনায় বাবা কিংবা মার কোনো অংশীদারিত্ব থাকে না। আড়ালেই আমরা আমাদের মধ্যে কুঁকড়াইয়া যাই। স্কুল জামগাছের মগডালে, মোটা শিরিষশাখে, পিচ্ছিল ঊধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার ডালে কিংবা বাড়ির পাছদিকের মিষ্টি আমগাছটার তলে আমাদের নিকুঞ্জবাস গইড়া ওঠে। কৈশোর উন্মত্ত সে ক্রিয়াকর্মে থাকে নির্লিপ্ততা। স্কুলমাঠের খেলায় কিংবা দুর্গোৎসবের মেলায় আমরা কিছু আনাড়ি বন্ধু পাইয়া যাই। যাহারা আমাদের পরিবারের কোনো ইতিহাস জানে না। ওই অন্যতর গ্রাম ছাইড়া তাহারাও অল্পদিন হইল এ শহরে আসিয়াছে। এ শহর দোকানপাট, স্কুলকলেজ, থানা-কাছারি-তহশীল অফিস মিলিয়া। নামমাত্র রাস্তাঘাট, যেখানে একটু বর্ষাতেই হাঁটুপানি জমিয়া যায়। ইলেকট্রিক পোল ঊর্ধ্বমুখি ও প্রাথমিক; ওতে লাইন ঝোলান হয় নাই। ওসব বন্ধুরা খুবই জ্যাঠামি, ওদের কৌমার্য নষ্ট হয় নাই। তাহাদের হাতে হই সমর্পিত। বাগানবাড়ি, থানামাঠ, আখিরানদী, নিমতলার শ্মশানঘাট, বড়বিল, পীরের মেলা সর্বত্র চলিতে থাকে সাড়ম্বর আনাগোনা। দিন গড়িয়া রাত অবধি। প্রকৃতি তখন উদাত্ত, অবারিত। বিপরীতে বাবা রক্ষণশীল, বড় প্রাচীর নিয়া থাকেন তাতে বাইরের আলো কম। তার সবকিছু অন্দরের উত্তাপে গোপনেই রহিয়া যায়। অস্বীকারের অবিনশ্বর পথে সে সব জলাঞ্জলি দিনে আমরা বৃত্ত থেকে বেরুনোর প্রচেষ্টায় কাল গড়াইলেও আমাদের হীনম্মন্যতায় স্থায়িত্ব অর্জন করে। তবে একদিন প্রতিষ্ঠার-প্রতিপত্তির স্বপ্নে যে তা ভাঙিবে, তার প্রত্যাশাও ‘নিদ্রাবিহীন গগনতলে’ স্থির থাকে।

বাতাস আর জোছনার মেশামেশি রাত পার হইয়া এক ভোরে আমাদের স্কুলে যাইতে হয়। অন্তর্মুখি অবগুণ্ঠন ছাইড়া বাহিরে আসা। চিল্কায় রোদ্দুর। বাহিরের উঠানে শিশিরের শব্দমাখা ঘাসফুল স্কুলের যাত্রাপথ বইলা দিয়াছিল। বাসার সামনের অঙ্গহানি হওয়া আমগাছ, পাশের ঝুরি নামানো খাটো বটগাছের ছায়া বাইয়া, সরু চিকন স্যাঁতসেঁতে রাস্তায় আমরা স্কুলমুখা হইয়া যাই। জীবনের বদল ঘটিয়াছে, টের পাওয়া যায়। স্কুলক্লাশে মিঠু আর মিলন নবাগতদের পিছনে লাগিয়াছে। একবার ওরা অভিযোগ করে মৌলভি স্যারের কাছে : ‘সে কোন্ সাহসে স্যারের চেয়ারে বসিয়াছে?’ জানা ছিল না বলেই বসা কিন্তু তাতে পার পাওয়া যায় না, বেত পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করে। এর আগে মিঠুর নেতৃত্বে অনেকেই এই চেয়ারে বসা নিয়া অনেক হাসাহাসি করিতে থাকে। ওদের হাসির অর্থ বোঝা যায় না। এসব চিনি না, জানি না-র মধ্যেই তামান রহিয়া যায়। ছেলেমেয়ের ভেদও চোখে পড়ে না। আমাদের মেশামেশি তো একরকমই। কিন্তু মাঝে মাঝে ওরা বান্ধবীর বুক নিয়া কীসব বলে। সে সব প্রশ্নজিজ্ঞাসা মনের অজান্তেই বিলুপ্ত হয়। তবে একবার বালিকাস্কুলে বার্ষিক নাটক হইয়াছিল, সেখানে উপচাইয়া পড়া ভীড়, আর মানুষের ছিল বিপুল কলরব। মেয়েদের নাটক বলে কি-না জানি না তবে খুব উঁচু পাঁচিলের মাথায় উঠে আমাদের আলোঝলমল মঞ্চ দেখিতে হইয়াছিল। নাটক মঞ্চস্থ হইয়াছিল। তবে ওই স্কুলমাঠে পরে আর নাটক হয় নাই। সেবার গুণী মেয়েরা, বিশাল কেশগুচ্ছের লম্বা শাড়ি পরিহিত, সাজুগুজু করিয়া মেয়েরা ওসব বিচিত্র অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। আমাদের পাশের বাড়ির রৌশন আপাও ছিল তাহাদের মধ্যে। কতোদিন সে অনুষ্ঠানের রেশ আমাদের মনে ফিরিত! সবুজঘাসের সতেজ মসৃণ মাঠের কোণায় লালকৃষ্ণচূড়া ভর্তি পিচ্ছিল স্কুলবারান্দায় অনুষ্ঠানের বিবিধ বিষয়ক আয়োজনে আমরা প্রবল কৌতূহলে গা ভাসাইয়া দেই। দেখা যায় তখন বিকেল নাগাদ জমিয়া ওঠে আকাশভর্তি মেঘ, ঈশান কোণের সূচালো বাতাস আর সবার হা-পিত্যেস; কিন্তু তা ক্রমশ কাটিয়া যায় দমকা দৈত্যনৃত্যে। নামিয়া আসে ঘনায়মান আঁধার। সাঁঝ আকাশের সিঁদূররাঙা রূপ বিলীন হয়। শিরশির ঝিঁঝিঁ নামিতে থাকে, স্কুল ঘরের পেছন প্রান্তে। ওদিকে তখন ড্রামবিট। কিছু ছেলেমেয়ের জটলা। কানাঘুষা আছে। কিন্তু সে সব মধ্যরাত বারোটায় শেষ হইলে ধনশালা, কুতুবপুর, মকিমপুর, মিলনপুর চইলা যায়। বিনিদ্ররাতে আবার পরের অনুষ্ঠানের জন্য চঞ্চলমন আনচান কইরা ওঠে। রাতের প্রহরা পার করিয়া আমরা পরেরদিনের স্কুলের জন্য তৈরি হই। স্কুলআনন্দ তখন আমাদের একধরনের ঐক্যআনন্দের সুর তোলে। কখন যেন বাইরে সব থাইমে গিয়াছে। তখন কোন্ ফাঁকে ঘুমাইয়া পড়ি। তবে মনে আছে, সেবার বৃষ্টি নমিয়াছিল, কদিনের অবিরাম বৃষ্টি। স্কুলমাঠে হাঁটু পানি। আমরা কাগজের নৌকা ভাসাইয়া দেই। পরদিন ভোরনাগাদ ঝিমঝিম বৃষ্টিবাতাসের ভেতরে এক আগন্তুকের ডাকে আব্বা বড়ির পাছ-দরোজা কোনোমতে খুলিয়া দেনজ্জঅতঃপর এক মর্মান্তিক মৃত্যুশোকের সম্বাদ আছড়াইয়া পড়ে। ভারী করা শীর্ণবাতাসে আমরা জানি, সোনাকন্দরের মোজাম্মেল চাচা মইরা গিয়াছেন। তিনি আব্বার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নির্বিরোধী, ম্রিয়মান, বিনীত, সুদর্শন মানুষ। ছত্রধারী জবাব দেয়, এশার পরে তাঁর চার বছরের সন্তানকে বুকে করিয়া চিৎ হয়া শুলে ঘুইমে যান। পরে আর চেতনা ফিরা পান নাই। তখনও বৃষ্টি চলিতেছে, এমন খবরের পর চলিয়া গেলেন ‘মরার বাড়ি’। ঘোলা আবহাওয়ায়, আমাদের খুব মনমরা চলিতে থাকি। কালকের মোজাম্মেল চাচা আজিকে বিগত। কোথায় যান তিনি, সত্যিই কি আর ফেরেন না! কেন নয়, কী দুরন্ত এসব প্রশ্নমায়ার পেছনে আমরা একাকার হইয়ে যাই। আড়ালে অশ্র“সিক্ত হই, অন্ননালী যেন অনলে পুড়িতে থাকে। সে দিনের চলমান বৃষ্টিতে আর নৌকা ভাসানো হয় না, বৃষ্টিমজা বিকেলে ভাসিতে থাকে চাচার মুখচ্ছবি, একসময় শিমুল-শিরিষতলার রাস্তায় হাঁটিতে গেলে নজরে আসেজ্জসন্ধ্যার আরতিধোঁয়া বাতাসে ভর কইরা আব্বা ফিইরা আসিতেছেন। তারপর শুনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলা কবর-দাফন পর্বের বিবরণ। সত্যিই তো মোর্দা হইয়া গিয়াছেন মোজাম্মেল চাচা। এরপর অন্ধকার কবরে হালখাতার দর চলিবে। এসবে দ্রুত প্রতিমূর্তি পান তিনি। মঙ্গলবারের মৃত্যুতে ঐ লাশের পাহারা ছিল অনেকেই। রাতের গোরে বাতি জ্বালাইয়া চলে পাহারা। আরমান, রাশেদ, নক্ষু, গণেশ, কার্তক, পবিত্র খুব গর্বে এ গোর পাহারার সংবাদ জানায়। ভীত হইয়া তাহাদের শ্রদ্ধা জানাইজ্জএমন দুর্মর সাহসের জন্য। মৃত্যুকে ভয়ঙ্কর তথ্যে আরও জানিতে থাকি, বড়আব্বা মরিয়া গেলে, শ্বেতশুভ্র লাশটা মাটিতে রাখিয়া ঢাকিয়া দেওয়া, কোন্ কোণায় রাইখে সব্বাই চল্লা আসে, তারপর হিসাব চলে। মোজাম্মেল চাচা এখন সে সবে বন্দী। এজন্যই আমাদের খারাপ লাগে। আরও বেশি খারাপ লাগে, চিরন্তন অদৃশ্য হওয়ার আর হারানো মায়ার জন্যে।
আখিরা তখন বড় বেশ। বর্ষা নামিলে তলপেট ভরা। ঘোড়ামারা পুল হইতে সে একটু বাঁক লইয়াছে দক্ষিণমুখে। তাহাতে স্রোতের টান তীব্র। ওসবে সে বয়ে আনে কীসব ময়লা আবর্জনা। বেয়ে চলা সে নদীর ভাঙন তেমন নাই। সে সবে মনোযোগ নাই। আমাদের এ নদী অনেক কাজের কাজী। কালো মেষশাবক, তাজা গরুর স্নান, দুর্গার বিসর্জন, মরা পোড়ার কাজ সবকিছু এ পানিতে। কিছুদূর চলার পর পুবে বাঁক নিয়া আবার উত্তরে চলে সে, নিজেকে বিলীন করে বড়বিলের মধ্যে। সেখানে অফুরন্ত কতোমাছ! কতোজনের জীবিকা। সে সব শুধুই বাইরের অবলোকন। কিন্তু প্রশান্তির ঘাটতি অনেক রহিয়া যায়। কারণ, আমরা সাঁতার জানিতাম না। সাঁতারের সুখ পাওয়া যায় না; অন্যের সুখেই নিজের আস্বাদ খোঁজা আর কৌতূহল অনুবর্তী হওয়া। এসব না পাওয়া আনন্দের সঙ্গসুখ আমাদের আখিরাকে চরিত্র করিয়া রাখে অনেকদিন, অনেকভাবে। আখিরাকে আমরা চিনি উত্তরে ঘোড়ামারা ব্রিজ পর্যন্ত। অজগরের মতো সে পড়িয়া থাকে। আখিরা আমাদের পূর্ব-পশ্চিমের বিভক্তরেখা। এর সংযোগ রক্ষা হয় কাঠের সেতু দিয়া। যুদ্ধের সময় তা ভাঙিয়া যায়। এরপর স্বাধীনের পর তার ওপর হয় কনক্রিট সেতু। এটাই তো বিরাট সেতু। তার কিনারা ধইরা চইলা যাওয়া উত্তরে, ঘোড়ামারা ব্রিজ পর্যন্ত। ওখানটার সাক্ষী একটি ঘটনায় থাকে জীবন্ত। আমাদের বন্ধু ইয়াসিন মাস্টারের ছেলে হুমায়ুন তার সখের কলমটি এইখানে হারাইয়া ফেলে। এরপর বার্ষিক পরীক্ষার হলে এসে সে অনেক সময় ধইরা কান্দে। কলম হারানোর ভয়ের চাইতে তার বেশি চিন্তা ছিল পিতা-ভয়ের। ভয়কাতর আনতচোখে পরে সে বাড়িতে ফিইরা যায়। ফেরার পথে ঘোড়ামারা সেতুর নিচে হামাগুড়ি দিয়া অনেকক্ষণ কলম খুঁজিতে থাকে। কিন্তু তা বিফলে যায়। তখন বন্ধুর ক্রন্দনধ্বনি আমাদের স্মৃতিপটে আটকায়। ঘোড়ামারা তখন সার্থক। তবে আখিরার উৎপত্তিও আমাদের ঘোড়ামারাকে চিইনা দেয়। অনেকক্ষণ আখিরা লাগোয়া এ নালাব্রীজে, তার শ্যওলা জমা ইটগাঁথুনি আর স্বচ্ছতোয়া টলমল জলরাশি দেখিয়া আমরা হুমায়ুনের সেই ক্রন্দনকে স্মরণ করি। তারপর ভরাবর্ষায় আখিরা ক্রমশ আরও পরিচিতি পায়। নদীর বুকফোলানো স্রোত, ঢেউ তোলা দ্বেষ, বাঁকের স্রোতে পাড়ভাঙার আওয়াজ দুর্দান্ত মনে হয়। একসময় চওড়া নদীর ওপারে দেইখা ফেলি কাজীর দেউড়ি। মানুষ আমাদের বলে, ‘তোরা কাজীর বেটির ক্লাসোত পড়িস’। সেই কাজীর বাড়ি দেইখা আমরা পলক জুড়াই। বিরাট খুলিবারান্দা, অনেক গরুছাগল, উঁচু জুম্মাঘর, পঁয়ত্রিশ হাত লম্বা কোটাঘর আর মস্ত সানবাঁধানো ইঁদারা। এমন প্রভুত্বমান্য বাড়ি আমরা দেখি নাই। কাজীর বেটি ‘জুঁই’ ক্লাসেও বাড়তি সম্মান পায়। দামি ফ্রকপড়া, পরিচ্ছন্ন মেজাজে খুব ব্যক্তিত্ব নিয়া তার চলাফেরা। অনেক নম্বর পাইয়া সে ক্লাস-উত্তীর্ণ হয়। কাজীর মেয়ে বলিলে কেউ অনীহা করে না। স্যাররাও সেভাবেই মূল্যায়ন করেন। সেই কাজীর বাড়ি কাছে পাইলে আমরা নুইয়া পড়ি, অনুরাগে সবুজ ঘাসে ঢাকা সেই বাড়িপথে হৃতোচ্ছ্বাস ফেলি। ইচ্ছা জাগে একবার বাড়ির প্রাঙ্গনে পৌঁছাইয়া দেখিজ্জসে আছে কি-না! কিন্তু তা হয় না। আমরা ভারী গন্ধ বুকে নেই। মুখচোরারূপে ফিরিয়া আসি। সে বাড়ির মেধাবী ছেলে লুমুম্বা এসএসসি পাশ দিয়া খুব নাম করে। সে সব জানিয়া পথের পাশে তাকানো আর স্বপ্নবোনা তত্ত্ব তৈরিতে বিভোর হইয়া চলি। আখিরার ওপরে বিরাট হাট। রবিবার বুধবার। বহু কাঁচারাস্তার মিলনকেন্দ্র এই হাট। অনেক দূর হইতে দিনান্তে হাটুয়ারা হাটে আসিতে থাকে। ক্রোশের পর ক্রোশ হাঁটিয়া, সাইকেলে বা গরু-মহিষের গাড়িতে। হাটে কী নাই! যেন আনন্দমেলার হৈচৈ। অনেকের আলাপ-পরামর্শ বিয়ে হত্যা খুন মামলা-মোকদ্দমা পকেটমারা চুরি-ডাকাতি এমনসব অনেক কেচ্ছায় ভরপুর সে হাট। হাট ঘিরিয়াই শীতকালে যাত্রা আর সার্কাস বসিয়া যায়। তখন পৃথিবীর সব মানুষ ভীড় করিয়া আসে সেখানে। আমরা কোনোকাজে হাটে গেলে অবাক ‘হাবা’র মতো তাকিয়া থাকি। হাটমাঝে শতবর্ষের পাকুড়গাছের শিরশির হাওয়ায় পরশ বুলাই। সেখানে কত-কির ঘোর ছাড়ে না আমাদের। সমস্ত মানুষের সুখদুঃখ কিনারা বহিয়া এ হাটের পাশেই বহিয়া চলে আখিরা। আর আখিরার পানিতে সব চলে। আখিরাই হাটের প্রাণ। সেই যেন আমাদের দায়িত্ব পালন করে। ধুইয়া দেয় জঞ্জাল, দুর্গোৎসবে প্রতিমা বিসর্জনের কম্ম, শ্মশানঘাটে মানুষ পোড়ানোর ছাই গ্রহণ, গরুবাছুর ধোয়ার কাজজ্জকত কি! এর মাথার দিকে আমাদের বিলটা তো আরও মহান। শিংগোড়, মাখনা, কলমি, ভেঁট এসবে চলে কতো মানুষের জীবন-জীবিকা। পাঁচদশ পয়সার লাঠিলজেন্সের চেয়েও তার দাম অনেক কম। সুস্বাদু এসব খাবার অনেকের টিফিন। স্কুলপড়া আনকোরা ছাত্রদের অনেকেই নানা রকম পয়সায় রাস্তার পাশে আমতলা বা বটতলায় এসব খাবার কেনে। বাইরে থেকে আসা সুন্দর গন্ধপোশাকের সি-ও সাহেব, রেজিস্ট্রার বা ফুড অফিসারের ছেলেরাও আমাদের সাথে ওসব কিনে কিনে রসনা নিবৃত্ত করিয়া চলে। কলাপাতা বিছাইয়া এক-দু-পাঁচ পয়সার ভাগা ওসব। পাশে বাঁশের ডালিতে শতচ্ছিন্ন সুতির কাপড়ে আরও প্যাঁচানো-জড়ানো থাকে অনেক শিংগোড়, মাখনা। ভরবেলা ওসব বেচাবিক্রি চলে। আমরা একভাগ খাইলে আবার অন্যভাগের লোভ উস্কাইয়া ওঠে। চুরি করিয়া কিনিয়া ধুলিধূসরিত সুরকি বিছানো শিমুলতলা দিয়া উত্তরদিকের পথে স্কুলঘরের কোণায় কলেজ লাগোয়া মোটা শিরিসতলের ছায়ায় দুই-ইটের জোড়ায় ঠেক দিয়া বইসা খাওয়া সম্পন্ন চলে। ওখানে তখন তুষারশীতল ছায়া। বাইরের দাবদাহ। ঢং ঢং ঘণ্টার আওয়াজে পরের ক্লাসের আহ্বান। সমাজ স্যারের পড়া। লুঙ্গি পরিহিত সাদা পাঞ্জাবী পরা বিরাট বপুর নূরু স্যার। চোখ আগুনগোলা, লাল লাল। কেমন যেন ইস্পাতকঠিন, ছায়াচ্ছন্ন মুখ। আমরা ক্লাসে ঢুকি, গুণগুণিয়া পড়িতে থাকি, স্যাররা না আসা পর্যন্ত। তখন ইউনিসেফের গন্ধমাখা নতুন সবুজ বোর্ডে লেখার ইচ্ছা জাগে, ঝুলানো চিকন নাইলনের সুতায় খুব যতেœ টানানো সে বোর্ড বেশ উঁচুতে, সেখানে শুধু স্যারদেরই হাত পৌঁছায়। দ্রুতলয়ে নূরু স্যার এসেই চক দিয়া লেখেন ‘প্রসিদ্ধ স্থানকেন, কোথায়’ ‘ঘোড়াশাল’, ‘দর্শনা’…। আমাদের উত্তর উল্টেরাখা বইয়ের পাতায়, কোনোভাবে দেখিয়া সবকিছু সামাল দিয়া পিছনমুখা স্যারের মুখ ফেরানোর অপেক্ষায় বসিয়া থাকি। ফাঁকা প্রান্তরের সারিবদ্ধ ধানের মাথায় বিলি কাটিয়া ছুটিয়া আসা হুড়হুড় করা বাতাস পেছনের হাট করা ভাঙা স্কুলদরোজা দিয়া সটান ঢুইকা পড়ে। দুমদাম আওয়াজে সীমানাপ্রাচীরছাড়া স্কুলগৃহের পেছন বাতায়ন তখন আছড়াইয়া পড়ে। শিরশির শিউরে ওঠা হেমন্তবাতাস আমাদের শরীর ছুঁইয়া দেয়। তখন নূরু স্যারের ভয়ের কাঁপন না শিরশিরে হাওয়ার ডানা ঝাপটানোর তাণ্ডব আমাদের শরীরে লাগে ঠিক বোঝা যায় না। ছোট্ট স্কুলপ্রাঙ্গনে রৌদ্রছায়া সাঁতার দিয়া চলে। আলোহাওয়ার সে সব সমীরসন্ধানী চোখ আমাদের ভয় বা পুলক জাগায় নাতবে পড়ালেখার শাসনের ভয়ার্ত স্বর এসবের মাঝেই বিরাজমান থাকে। কারণ, তখন নূরু স্যারের পড়া নিয়া আমরা খুব ব্যস্ত। লম্বা বেত ছাড়া তিনি চলেন না। বোর্ডের কাজ শেষ কইরা বেত হাতে ঢুকিয়া পড়াতে থাকেন সারিবাধা বেঞ্চের ভিতরে। একে একে উত্তর চান। তখন গা-জমানো গরম তাপমাত্রা প্রতিটি মুহুর্তকে কয়েক শতাব্দী বানাইয়া দেয়। কালোকঠিন শ্মশ্রƒমণ্ডিত মুখাবয়ব দেখে সাইফুল কাঁপিতে কাঁপিতে হিস্যু ছাড়িয়া দেয়। স্যার তখন নরম গলায় সান্ত¡না দিন। কেমন হইয়া যায় সে পরিবেশ। মনের অজান্তে হাসিয়া ফেলেন স্যার। তখন পরিবেশ হাল্কা। পড়ার গুরুত্ব আর ভবিষ্যতে এর মূল্য নিয়া তিনি কথা বলেন। এর ফাঁকে ঘণ্টা পড়িলে ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়ার দশা হয়। মঞ্জু, সাজু, শিরিণ সেবার খুব মার খাইয়াছিল। তাতে মেশানো ছিল লজ্জা আর অপমান। পার্টিশন ছাড়া ক্লাসের অনতিদূরে নিচের ক্লাসে ছাত্ররা নূরু স্যারের এ ‘ফাটানো’ দৃশ্য দেখিয়াছে। তা নিয়া আলোচনা চলে। পরের দিনগুলাতে এর চাইতে উন্নত কোনো চিত্রনাট্য পরিবেশিত না-হওয়া পর্যন্ত তা বিরামহীন গল্পে রূপ নেয়। এরপর প্রতিদিন এসব স্যারের এক একটা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আমরা জড়াইয়া যাই। স্কুলগৃহের রীতিবৈশিষ্ট্যে আমাদের পক্বতা আসে। হীনম্মন্যতা কাটে। বিকালের খেলার মাঠে বড়ছোট সবাই দাঁড়াইয়া একখেলায় অংশ নেই। বড়ো ভাইদের বিশেষ বিদ্বান মনে হয়। ওরা নোয়াখালি স্যারের ছাত্র। অনেক অভিজ্ঞতায় স্যারদের উত্তাপ তাহাদের মুখে শুনি। মনে হয়, ওসব অতিক্রম করা কাহার কাম্য নয়, আর কোনোকালেই তা হইবে না। কলেজ পড়ুয়া কোনো ছাত্র আমাদের চোখে পড়ে না। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট মানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ওজনদার আর সম্মানের পরীক্ষা। ও পরীক্ষা যাহারা দেয় তাহারা খুব উঁচুস্তরের জ্ঞানী মানুষ। কলেজ বা ইন্টারমেডিয়েট বোঝা যায় না। আমাদের স্কুল লাগোয়া যে কলেজঘর সেখানে মাঝেমধ্যে কয়েকজন বয়স্ক লোককে দিনদুপুরে ভলিবল খেলিতে দেখি। ওরা আনন্দ করে কিন্তু স্যারদের ভয় বা পরীক্ষার পড়া ওদের কিছুই নাই। আহা কতোকাল এ জীবন আমাদের ফিরিয়া আসিবেজ্জজানি না। কলেজটা একটা ভূতুড়ে জায়গায়। অল্পকিছু লোক সেখান দিয়া হাঁটাচলা করে। ওদের কারণ বা উদ্দেশ্য কি, জানা যায় না। এসব প্রশ্ন দূরের, কেউ সে স্তরের খবর জানায় না কিংবা বিন্দুমাত্র তাহাতে আগ্রহও নাই কারো। কলেজের পড়াশোনাকে আমরা আমাদের আয়ত্তের বাইরের বলেই মানিজ্জসেজন্য ওসবে কারো কথা নাই। কলেজের বারান্দা, ল্যাবরুম, অন্য উঁচু বারান্দা লোকচলাচলরহিত। ভয় জাগে। যেন মানিয়া নেই প্রবেশাধিকার। কলেজফিল্ড আসিলে আমাদের চেতনায় বিরাট ও প্রচণ্ডমূর্তি নিয়া চিরদিনের অবিচলতায় তা প্রতিষ্ঠিত থাকে। আমরা জানিয়া যাই, কলেজস্পর্শ করা বড়ো ব্যাপার। ওখানকার স্যার কারা হয় কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কে সে খবর জানার আগ্রহ বা জিজ্ঞাসার পরিবেশ নাই। স্কুললাগোয়া বলেই হয়তো এ কলেজ সম্পর্কে আমরা নির্বাক প্রহেলিকাময় বোঝাপড়ার মধ্যেই আপ্লুত থাকি।

গঙ্গারামপুর গ্রাম থেকে আঙুরআপা আসেন বিকালবেলা। পরদিন তার এসএসসি পরীক্ষা। আমাদের বাসার উল্টাদিকে এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র। চিকনরাস্তার পাশে বিরাট ড্রেন, তার উপর কয়েকটা আমগাছ, পাশে শেওলাপড়া উঁচুপ্রাচীর। মাঝখানে লোহার গেট। ভিতরে পরীক্ষা। কদিন সকালবিকাল দূরদূরান্ত থাকিয়া মানুষের বহর আসিতে থাকে। দুচারজন জেলাশহরের মানুষও মনে হয় পরীক্ষার জন্য আনাগোনা করে। তখন রমরমা আমাদের এলাকাটা। অনেকটা উৎসবমুখর। আমাদের আনন্দ পরীক্ষার জন্য যতোটা তার চেয়ে বেশি বাড়িতে এ উপলক্ষে অনেক লোকের আনাগোনা। কেন আসে এতো লোক, একজনের পেছনে অষ্টজন কেন তা জানা যায়; মামা বলিতেন ভালো রেজাল্টের জন্য ‘সাপ্লাই’ না দিলে চলে না। সে সব সাপ্লাইয়ের কাজে কিছু লোক আসে। তবে পরীক্ষার্থীর মানসিক শক্তি বা সাহস যোগাইবার জন্য কেউ আসিত না তা নয়। অনেককেই বলিতে শোনা যায় ওসব চুরির কাজ পারি না; কিন্তু অভিভাবক ভালো রেজাল্টের জন্য এটুকু করার সাহস পরীক্ষার্থীদের যোগানোয় রত থাকেন। সবকিছু গুঁড়েবালি হয়, যখন শোনা যায় ম্যাজিস্ট্রেট আসিয়াছেন দূর জেলা শহর হইতে। ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ও শক্তি দুর্বার। গাড়িতে করিয়া এলে তার প্রভাবে পরীক্ষাকেন্দ্র নিশ্চুপ হইয়া যায়, ভারাক্রান্ত হয় গোটা পরিবেশ। কোনো পরীক্ষার্থী বেরুলে জানা যায় নকলের দায়ে বহিষ্কার হওয়ার সংবাদ। একবার স্কুলে তুমুল আর্তনাদ, ১৪৪-এর বাইরেও সে দৃশ্য অনুমান করা যায়, বেহুঁশ-দাঁতলাগার দশা, তাতে বারিপাত করা হচ্ছে চাপকলের নিচে, কিছুতেই কথা ফোটে না মুখে, ডাক্তার আসিলেন, শুইয়া রাখা হলো অনেকক্ষণ, তখনও সে বোবাজ্জকারণ সে এক্সপেল্ড হইয়াছে। দূর প্রাচীরহীন স্কুলঘরের বারান্দায় পরীক্ষাকালীন এ দৃশ্য দেখা চলিতে থাকে। অনেক রটনা, পর্যালোচনা আর গুঞ্জন; উদ্ধার হইয়া যান ম্যাজিস্ট্রেট। তবে এতো কষ্টের পরীক্ষা, সেখানে পাশ করে কজন! খবর মেলে না। ফল বাহির হইলে অল্প কয়েকটা রোল পাওয়া যায়। আমরা জানি এটি বোর্ড পরীক্ষা। যে কেউ পাশ করিতে পারে না। তবে আমাদের বাড়িতে আনাগোনা করা পরীক্ষার্থীদের তৃতীয় বিভাগ পাওয়াও দুঃসাধ্য থাকিয়া যায়। একাধিকবার তাহাদের পরীক্ষা দিতে হয়, কেউবা পাশ হবে না ভেবে পরীক্ষা বাদ দিয়া চলিয়া যায়। এসব বড় বড় লম্বা-দাড়িগোঁফযুক্ত পরীক্ষাব্যর্থ ‘মানুষ’দের তিরোহিত স্বপ্ন আমাদের মনে রেখাপাত করে। তবে কালেভদ্রে কেউ পাস পাইলে হইয়া ওঠেন হিরো। তখন প্রস্তাব, শাপলা সিনেমা হলে চল্ সবাই। যেন টকির আনন্দ মানে পরীক্ষা পাসের আশির্বাদ।

আমাদের বাসার পাশের কোণা গলির পথে বিপ্লবদের বাসা। ওর বাবলু ভাই বয়সে বড়। ওদের বাসার সামনে ফাঁকা একটা বেড়ার স্পেস। ওটার ফাঁক দিয়া রাস্তার লোকসমাগম আবছায়া দেখা যায়। ওখানে কীসব খেলা চলিত। মোটরগাড়ী, মাস্টারী, রান্নাখাবার, বাসের ড্রাইভারী আবার কখনও শরীরবৃত্তিয় গোপন ক্রিয়াকর্ম। ওসবে স্রেফ আগ্রহ হয়, গোপনীয়তা থাকে। অনুভবের বার্তা আমাদের শরীরে নাই, তবুও বিপ্লব, ইদ্রিস, ওবায়েদ, মিশুর মুরুব্বিয়ানা থাকে। লজ্জা হলেও অপার আগ্রহ জীবিত থাকে এমনসব গোপন ক্রিয়াকর্ম। তবে সেসবে যে কোনো রূপসীর স্থান ছিল, তা নয়। বিপরীত লিঙ্গ-সম্পর্ক আমাদের অনুভব তখনও তেমন কাজ করে না। শীতে আমাদের স্কুলে ধানের গুদাম আর সারের বস্তার মধ্যে লুকাচুরি চলে। ওর ফাঁকে বসন্ত-চৈত্রের হাওয়া আমাদের অবুঝ মনকে তাড়া করে। তখন কামিনী আর বকুলগন্ধে ভোর আসিয়া পড়ে। ভর্তি ডালায় কিংবা আজলাভরা ফুলের সুতায় গাঁথিয়া ওঠে কল্পনার জগত। বাসার বাইরে দুটো কামিনীগাছ ভোরের হাওয়ায় বইয়া আনে সুরভী বাতাস। এ সময় পলি, শিল্পী, সুপ্তারা সকালে ফ্রোক পইরা পরীর মতোন বাতায়নপাশে দাঁড়াইয়া থাকে। ওরা কুদ্দুসস্যারের অঙ্ক জিজ্ঞাসা করে। খিলখিল হাসিতে সে সব সোজা সরল জবাব নিয়া নিজের পথে চইলা যাই। তারপর আমাদের মনোযোগ একরকমই থাকে। শুধু আনন্দ-অহংকার তৈরি হয়, ওরা যে পড়া শুনিতে আসিয়াছে! ব্যাস এটুকুই। একুশের ভোরে কুয়াশাঘেরা ঘোলা বিদ্যুৎ আলোয় আমরা বাইরে এলে ওরা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গাহিয়া চলে; তখন নেতৃত্ব দেন রিনাআপা। পাতাভাই, ভূষণস্যার, মঞ্জুভাই, টুকুভাই সবাই চলেন। আমাদের বন্ধুরা একটু পরে আলো ফুটিলে যোগ দিন। এ সবে ছেলেমেয়ে দল একাকার কিন্তু আবৃত্তি-গান-র‌্যালি-তোপধ্বনি-কুচকাওয়াজ এমনটাই সর্বোচ্চ এবং শেষ কথা। অসততা, কোনোও সংসর্গ বা তার জন্য ফন্দি-পাঁয়তারা আমরা জানি না; এমনকি বড়োদের মাঝেও তা দেখিবার সুযোগ হয় না। একুশের ভোর বারবার প্রলুব্ধ করে নাইজ্জপ্রভাতফেরির জন্য। বছরান্তের এ সময়ের অপেক্ষায় প্রহর গোনা! আলতাফ মাহমুদের সুরের কথা বলেন বড়োরা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তখনই স্বকপোলকল্পিত হইয়া দাঁড়ান আমাদের কাছে। মিষ্টিরোদ উঠিয়া আসিলে এসব দিনে উৎসবের হুল্লোড় ভাসিয়া ওঠে মাঠ-প্রান্তরে। লাল-নীল-সবুজ কাগজের বাঁশঘেরা মঞ্চ, পুষ্পরাজীর ব্যবহার, বেদীর চতুর্দিকে মালা, দুর্বৃত্তপনা জাগিয়া ওঠে! কিছু প্রভাবশালী বালক মধ্যগগনে সূর্য উঠিলেই ওসব বাড়ির গৃহসজ্জার জন্য লইয়া যায়। আমরা অবহেলিত হইয়া প্রতিবাদহীন রহিয়া যাই। জানা থাকে, ওরাই এসবের কর্তাভজা; সমীহটা তো ওদেরই! দিনগুলা স্বপ্নের মতোন ভাসিয়া চলে। শহীদ মিনার তখন এলাকাজুড়ে একটাই, আমাদের বাসার সামনের স্কুলমাঠটায়, ওটা বানানোর প্রক্রিয়াটাও খুব আবছা মনে হয়। তখন বৃত্তাকার লালরঙটা কেন দিয়াছিল সে জন্য খুব আগ্রহ ছিল। তবে বিশেষ দিনেই এটার মর্যাদা বাড়িত। বক্তৃতা করতেন প্রায়শই ন্যাপনেতা কাজী আবদুল হালিম। তার প্রবল প্রতাপ, মন্ত্রমুগ্ধের মতো বক্তৃতা। খুব আস্তে বলেন, কিন্তু উপমা আর যুক্তিতে হাসির রোল পড়িয়া যায় দিগি¦দিক। উনিই সব অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় বক্তা। কলেজ গড়েন উনি, স্কুল গড়েন উনি; আধভাঙা পায়ে ফিফটি হোন্ডায় কর্মযোগী হইয়া চলেন সর্বত্র। রাজনীতির ছক জানেন; সোভিয়েত রাশিয়া, চে’ তাঁর আদর্শ। আমাদের ভাড়া দোকানটায় তখন প্রগতির বই, সোভিয়েত নারী, সোভিয়েত ইউনিয়ন গাদাগাদি। কাজী সাহেবের জন্যই আমাদের দৃশ্যপটে সারাক্ষণ ‘সোভিয়েত’ ‘সোভিয়েত’ ভাব চলে। মস্কোগামী নেতাদেরও চোখে পড়ে হরহামেশা। ন্যাপ-কম্যুনিস্ট এসবের রাজনীতি স্থানীয় পর্যায়ে তখন খুব জোরাল। একবার কুঁড়েঘর নিয়া মোজাফ্ফর আহমদসহ বিরাট সমাবেশ মিছিল হয়। আমরা খোলাজীপে হাফহাতাশার্ট পরিহিত, ফর্সা এ নেতাকে নিয়া বেশ পুলকিত হই। অনেকটা এলাকা হাঁটিয়া তার মিছিলের সঙ্গে চলি। মনে হয় না কেউ এসব রাজনীতির বাইরে অন্যদলের সমর্থক। প্রতিবেশী-পরিচিত সকলকেই এমন দলেই থাকিতে দেখা যায়। কেন তা জানি না। মন্ত্রীর সংস্পর্শে বা সভায় বেশির ভাগ সময় গ্রামের লোকদেরই দেখা যায়, প্রধানত তারাই রাতবিরেত পর্যন্ত ‘বন্দর’ মাতায়। আমাদের মামা-খালুরা তিনব্যাটারীর লম্বা টর্চ আর ঘিইয়া রঙের সাড়ে তিনহাত লম্বা চাঁদর জড়াইয়া গ্রাম থেকে আসেন, দলের মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার জন্যে। তবে আনাগোনা কম হয় না। অনেক লোকসমাগমের কারণ, ওই মন্ত্রীদর্শনের লোভ। চতুষ্কোণ বিরাট মঞ্চে চার হ্যাজাগের আলোয় অন্ধকার স্কুলমাঠের ফর্সা প্রান্তরে তাদের জনসভা চলে। বিকাল থেকেই সেখানে জমায়েত হন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষজন। গেট, লাল ব্যানার; লেখা থাকে মাননীয় অমুকের শুভাগমন, অমুক দল জিন্দাবাদ। ত্রিকোণাকার কালার কাগজে গেট থেকে সুতা টেনে সদ্য সাদা চুনকামের বারান্দা দিয়া অভ্যর্থনা মঞ্চে আনা হয়। তাতে বনেদিয়ানা অনেক। তবে সে সব জায়গায় আমরা কাজী সাহেবকে পাই না। কিছু কমবয়স্ক বেলবটম স্যুট পরা যুবক এখানে নেতৃত্বে থাকে। মন্ত্রী আসিলে তখন বেশ তোড়জোড় শুরু হয়। বগলদাবা পরিবেষ্টন করে ‘মান্যবর’কে মঞ্চে তোলা হয়, তখন বাতাস শ্লোগানে মুখরিত। বেলা তিনটার জনসভা রাত নটায় গড়াইলেও হ্যাজাগের আলো সে সব মানে না। প্রচুর পোকার উৎপাত চলিতে থাকে, তবুও কীসব কথায় বক্তৃতার রাত গড়িয়া চলে। তবে সে রাতে আমাদের পড়াশোনা চলে না। নানারকমের লোক আইসা বাসায় বাহন বা বহন করা জিনিসপত্র রেখে নিরন্তর যাওয়া-আসায় গিজগিজ করে। এমন উৎসবে পড়ার ফাঁকিটা বজায় থাকে, আর আব্বার জবাবদিহিতাও তখন অনেকটা শিথিল। সুযোগ নিয়া রাতের স্কুলমাঠে চলিয়া যাওয়া। নিবিড় হইয়া ব্যরিস্টার-মন্ত্রীর বক্তৃতা শোনা। বন্দরের হোটেলগুলা তখন গিজগিজ, কসাইয়ের পানের দোকানে ভীড়, ‘গাবি বেড়ানো’ মানুষের মাঝে মেলে নেতার টাকাপয়সার হিসাব; আমরা ওসবের অংশীদার। রাত পেরুলে ভোরের মধ্যেই স্কুলঘরের দেওয়ালে অভ্যাগতদের সম্মানে আগমবার্তা পড়িতে থাকি। ওসব চলুক প্রতিদিন। ন্যায্যমূল্যের দোকানটার পাশেই ছিল ওদের অফিস। তার আশেপাশেও নানরকম লেখাজোখা। তবে এসব ডামাডোলে আমাদের একদিন স্কুল-পরীক্ষার জন্য ফি-র কথা বলা হয়। আঁতকিয়া উঠি; এসব আবার কী! তবে হাফপ্যান্টে নতুন পঞ্জে, আব্বার তোলা লাল ইয়থকলমে প্রথম পরীক্ষা দিতে গিয়া সবটাই সোজা মনে হয়। নতুন প্রশ্নে দাগভাজ না করিয়া সারবাধা বেঞ্চের সারি থেকে বাহির হই। খুব নির্ভুল তখন সবার পরীক্ষা। খাতা-প্রশ্ন নিরঙ্কুশ যতœ ও মনোযোগ পায় আমাদের নিকট। অন্ধকার মতো ঘরে পরীক্ষার খাতা দিতেন শিক্ষকরা। গরমশীতবৃষ্টি সবই একভাবে চলিতে থাকে। রাস্তা জুড়িয়া রাতে কসাইচাচার একলাইটের টোলঘরে শুধু বিদ্যুৎ আলোটি চোখে পড়ে। ওখানে সব আড্ডা আর সদ্যমুক্তি পাওয়া সিনেমার গানের ক্যাসেট বাজিয়া চলে। গোটা এলাকার মানুষ যেন ঐ এক দোকানে সমর্পিত। তবে একদিন ভয় পাইয়া যাই মানসাঙ্ক পরীক্ষায়। মুখের হিসাবে না পারায় কেমন কম্পন মনে হয়, যেন গা গুলাইয়া আসে। হাফইয়ারলি অঙ্কখাতায় জিরো পাওয়ার সম্বাদ আসে। এরপর বইয়ের দোকানে মানসাঙ্ক মুখস্থ চলে। ক্রমশ একদিন অঙ্কভীতি দানা বাধিয়া যায় মনে। দিনান্তের সময়ে অঙ্কদিশা আর ইহজীবনে মেলে নাই। আব্বা ক্রুদ্ধ হইয়া যান, যতœবান হন এ কাজে, কিন্তু কাজ হয় না। কান ধরিয়া লম্বা চুল ছাঁটার জন্য নিয়া যান থানার সামনে বর্ষজীবী বটতলায়। মেছের নাপিত তখন নিয়ম করিয়া বসেন খদ্দেরের আশায়। কী উগ্র, বীভৎস, লৌহকঠিন চেহারার‘সাঁওতালভূত’ এ নরসুন্দর দুহাঁটুর ফাঁকে মাথা ডুবিয়া যতো ক্ষুদ্র রাখা যায় ততোদূর কাঁচি-কর্তন চালাইতে থাকেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে আব্বার এ শাস্তি আসলে মানসাঙ্ক না-পারার ক্ষেদ। নিঃসঙ্গ বটতলাকে সঙ্গ দিতেন এ নরসুন্দর। পাশেই ক্ষুদ্র মাটির ঘর তার। শোনা যায় ওটা নিজের বাড়ি নয়। পোস্টাপিস সংলগ্ন সরকারী পরিত্যক্ত ভিটায় দখল নিয়াছিলেন তিনি। পরে একসময় সব গুঁড়িয়া দিয়া পাকা পোস্টাপিস বসানো হলে এ নরসুন্দর কোথায় যান জানা যায় না। তবে দীর্ঘদিন একটা সময় এ ব্রাত্য পেশাজীবী আমাদের নিকট বিদ্রƒপাত্মক বিরক্তির লোক হিসাবে রহিয়া যান। সেটা শুধুই তার পেশার কারণে। তখন তার সঙ্গে থাকিতেন রানার ডাকুও। প্রাত্যহিক খাকি পোশাকে বল্লমহাতে রোদবৃষ্টিঝড় মাতাইয়া চলেন তিনি। বল্লমটি অনিবার্য। পিচ্ছিল এঁটেলমাটির বাড়ির উঁচু দাওয়ায় বল্লম ছাড়া ডাকুকে দেখি নাই কোনোদিন। ডাকঅফিসের পশ্চিমকোণায় বটগাছের ঝুরি নামিয়া অপর বটগাছ গাছটাও অনেক বড়। রাত্রিতে নাইমা আসে শ্মশান-নিস্তব্ধতা। আমাদের ভ্রম হয়, এ অন্ধকারের ডাকু রাত পার করে কী করে! কী মানবেতর সে জীবনযাপন। বল্লমসঙ্গী এ ডাকু কবে মৃত্যুমুখে পতিত হন জানা যায় না, তবে এক আষাঢ়স্য দিবসে, বৃষ্টিমুখরিত পানিডোবা রাস্তায় নজরে পড়ে এক তরুণ ও নতুন ডাকুকে, পরে জানা যায় তিনিই নিয়োগ পাইয়াছেন এ পদে। তবে পূবাকাশে সূর্য উঠিলেই ক্ষুরকাঁচি নিয়া মেছের নাপিত বসিয়া যান। সেখানে এক পর্যায়ে ছোট্ট আড্ডারও পরিসর থাকে। বেলা গড়াইলেই তার ব্যবসা শেষ। তার কাছেই খবর থাকিত কে নতুন পোস্টমাস্টার আসিবেন আর নতুন দারোগা কবে আসিবেন। তিনি কতোটা সৎ বা অসৎ ইত্যাকার সব তথ্য। তবে কথা তার কম কিন্তু ভাবে তিনি অভিজ্ঞ। আমাদের তাড়া করে ধরে এনে চুল কাটাতেও তিনি অভ্যস্ত, উপস্থিত গার্জেনদের সঙ্গে তার বয়ান থাকিত আত্মবিশ্বাসের। আমাদের বাসা হইতে ওই এলাকা বেশ দূরই মনে হইতো তবে একবার চুলকাটার পাল্লায় পড়িলে তখন কী হতো কে জানে! একবার ওখানে থেকেই থানার ভিতর আমতলায় চোর পেটানোর চিৎকার শুনিতে পাই। সদ্য গ্রাম ফেরা কৈশোর-মুগ্ধতায় থানা তখন ভয়ের বস্তু। থানামাঠে খেলাধুলা চলিলেও ভেতরে আমতলায় চোর পেটানো, বাঁশচাপা দেওয়া, আসামীর সাক্ষীজেরা করা এসব দেখিলেই মন পানসে হইয়া যায়। থানার ভিতর গেলেই গা ছমছম। রাস্তার নিকটে যে পুলিশ ব্যারাক, সেখানে পুলিশ গার্ডও থাকে। থানা আমাদের কোনো শুভস্মৃতি তৈরি করিতে পারে না, কারণ চিরদিন সে ভয়ের আবর্তেই থাকিয়া যায়। থানার পুলিশ একবার নানাবাড়ির চৌধুরীবাড়িতে গেল। এক নরওয়ে নাগরিককে গাড়ি থামাইয়া ওই এলাকার ডাকাতরা রাতের আঁধারে সব ছিনাইয়া নেয়। ইসলাম ডাকাত, মসু ডাকাত, জলিল ডাকাত, বারী ডাকাত এদের নামে বড়ো রাস্তা কাঁপে। তাদের নির্দেশেই চলে সব ধরনের ডাকাতি। সেই ডাকাতদলকে ধরা হয় ঐ অঞ্চলেই। তারপর থানার বড়োবাবু জেরার জন্য বাছিয়া লন বনেদীওয়ালা চৌধুরীবাড়ির ঘাসডুবানো ময়দানকে।


মোরগভোরে পুরানো জুম্মাঘরের সামনে গোল করিয়া চেয়ার পাতা ছিল। সেখানে ম্যাজিক দেখানোর ভীড়। ফর্সা আকাশ, স্যাঁওলাপড়া চৌধুরীবাড়ির উঁচু দেওয়ালে তখনও আলো-আঁধারী। গোরস্থানের শ্বেতপাথরে ছোপ-অন্ধকার। মেঘধোয়া শিশিরশিহর কুয়াশাশীত। দাগী আমের গাছে সড়াৎ আওয়াজ। এর মাঝে লালচৌধুরী হাঁক মারিলেন। সে হাঁকে স্তব্ধ আমজনতা। অধিক নীরব চাঁদোয়া প্রকৃতি। হ্যাজাগের শোঁ শোঁ শুভ্র-আলোয় ভয়ে থরথর কাঁপিতেছে ধৃতচোর। থানার ওসি পাশে বসা। বেশ মোটাসোটা দারোগাবাবু। তার চলনে বনেদীভাব। বাংলা বলিলে মনে হয় তা ইংরেজী। হাতে তেলচকচকে ডান্ডি। কী ভঙ্গিতে তা ঘোরাচ্ছেন! এ পারের চেয়ারে চৌধুরীবাড়ির মেজছেলে। তিনি খুব ঠাণ্ডা, লালমিয়ার মতো নন। আস্তে কথা বলিয়া চোরের কাছে সবকথা পাড়িয়া নেন। কিন্তু ওতে চোরের কিছু হয় না। জেরা শুরু করেন ওসিসাব। খুব প্যাঁচানো সে জেরা। তাৎক্ষণিক বলিতে বলিতে ডান্ডা নিয়া দুমদাম মারিতে থাকেন। গগনবিদারী আওয়াজে সব্বাই ছোটাছুটি। নিস্তব্ধ ঘুমের পাড়া সড়্কে ওঠে। আমরা ভয়ে পলাইয়া যাই। ধুক-পুকুনিতে ছোটপুলের ওপর বসিয়া দূরদৃশ্য দেখিতে থাকি। চীৎকারের ভেতরে দূরে তখনও মার চলিতেছে অকাতরে। ঘুমতাড়ানো মানুষ দিগি¦দিক। অনেকক্ষণ সে বিচার চলিতে থাকে। দুদিন পরে আমরা দেখি নরওয়ে নাগরিকের উদ্ধার করা দামী ছাতা ও পার্স। ফোল্ডার ছাতার ব্যবহার আমরা কখনো দেখি নাই, চোখেও পড়ে নাই, কিন্তু এবার সেটি ঘটিল। নওশামিয়া ছাতার সৌকর্যে চিৎকার করিয়া ওঠেন। স্টীলের ফ্রেমের ¯িপ্রংয়ে আটকানো মনোরম ছাতায় ঝড়বৃষ্টিরোদের ব্যবহার যাই হোক ওটার জন্য লোভ যে-চোরের ছিল সেটির তারিফ না করিয়া পারা যায় না। এমন দামী ছাতাটা আমাদের চোখের পর্দায় অনেকদিন আটকানো থাকে। তবে শুধু ছাতাই নয় অন্যান্য অনেক দামী জিনিসও ছিল। সেগুলা খুবই লোভনীয়। এসব দেখিয়া অনেকদিন আমরা চৌধুরীবাড়িকে সমীহ করি। কৈশোরখেলায় এ ঘটনা উপাদানস্বরূপ হাজির হয়। সকালবেলার আলোয় আমরা ওরকম ওসি হইয়া বসি, কেউবা চোর বা ডাকাত। তবে চৌধুরীবাড়িতে শুধু বিচার নয়, সবার ভাগ্যবিধাতা হিসাবেই সে বাড়ি পরিগণিত হয়। সবরকমের সমস্যার সমাধান সেখানে। সবার সমর্থনে-সমীহে, আর তা আদায়ে-বিদায়ে মনেও একপ্রকার স্বস্তি। আমরা বড় হই চৌধুরীবাড়ির ছেলেদের স্বপ্নে। দেশবিদেশ ফেরত এ বাড়ির কতো কি যে আদর্শ! পোষা কুকুরবিড়াল হইতে শুরু করিয়া তৈজসপত্র ও সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি পর্যন্ত। ভেতরে ঢুকিলেই বিচিত্রখাবার। ম ম সে খাবারের গন্ধ। লম্বা দরদালানে সবাই আলাদা। টানাপাখার বাতাস। ফাইফরমাস খাটার লোকের অভাব নাই। সামনের ঘনসবুজ পানিপুকুর বিক্রি করিলে অনেক মাছ। কৈ, মাগুর, শিং, রুই, কাতল, পাবদা কতো কি? এমন কাজকে ‘কিনে নেওয়া’ বলে। সারাদিন মাছধরার উল্লাস। বিক্রি হলেও দুচার ডালি মাছ প্রায় সববাড়িতেই পৌঁছায়। যেদিন বিক্রি সেদিন সারাদিনের কর্মযজ্ঞ। গর্তে মাছ, ঝিকে মাছ, বহির্গমনের নালায় মাছ সর্বত্র মাছের মেলা। যেদিন এ কাজ শুরু, তখন একাগ্র সবাই। মাছউৎসবে জড়িয়া থাকি নোফফার, ফয়জার বাপ, জোব্বার, আকবরসহ অনেকেই। এদের মধ্যে ফয়জার বাপের সবচেয়ে যোগ্যতা। কণ্ঠধ্বনি তার ফ্যাসফেসে, চেহারা আলকাতরা রঙের। ধুতিরঙের মালকোচা সেটে কাঁদাপানিতে, মুখ নিচু কইরে, হাঁটু ডুবিয়া মাছের সন্ধান করে। গর্তে হাত ঢুকাইয়া দুহাতি লম্বা গুইসাপ সে ধরে ফেলে। তখন গুচি মাছ হইয়া যায় লম্বা সাপ। সাপের লেজ ধরে ফয়জার বাপ অনায়াসে মাথার ওপর দিয়া বনবন করিয়া ঘোরায়, তারপর দূরে ছিটকাইয়া দেয়। ওসব দুঃসাহসের কারণে তিনি শ্রদ্ধা অর্জন করেন আমাদের। এ ছাড়া মাছের খলাইয়ে বিচিত্র মাছ সংগ্রহে কারো কোনো বাধা থাকে না। তবে সকলেই শান্ত হয়, যখন দরদালানের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া পুকুরপাড় হইতে আওয়াজ পৌঁছায়। চৌধুরীর উমেদার তাগড়া শরীরের ম্যানেজার রাঙা এসে যখন বলেন, তোরা সবাই পুকুর থাক্যা ওঠ্। নিমিষেই থামিয়া যায় কোলাহল, মুহূর্তে নির্ধারিত লোক ছাড়া পুকুর ফাঁকা। আমরা তখন পুকুর ছাড়িয়া বড় পুলের দিকে হাঁটা দেই। দূরে চৌধুরীবাড়ির কোনো কর্তার ছায়া আমরা কখনও দেখি নাই। কালেভদ্রে ছাড়া তাদের মুখোমুখি অনেক দূরের কথা। পুলের ঢালু অংশে দেখা যায় পয়সা খেলা চলিতেছে শফিউল, হীরু, মৌলবীর ব্যাটাসহ কয়েকজনের। খুব টানটান সে খেলা। অনেক টাকা মারার (উপার্জনের) খেলা। দিনমান সে সব দেখিয়া আমরা উপভোগে মাতিয়া চলি। তখন ধানের শীষে ঢেউ ওঠে, দূরের বড় বড় বিদ্যুৎতারে পাখির আনাগোনা চলে, গোমরা আকাশে বাউল বাতাস চরিয়া বেড়ায়। বড়রাস্তায় তখন অনেক গাড়ী, সে সব গাড়ীর মধ্যে কোনোটা লালচৌধুরী বহনকারী। এক সময় আমরা দেখি হর্ন বাজাইয়া ধুলা উড়াইয়া রাস্তা দিয়া পূর্বমুখো নামিয়া আসিতেছে। পিতপিত আওয়াজে ক্রমশ তা কাছে এলে পয়সা খেলা কজন ক্ষণিকের জন্য সব বন্ধ কইরা পুলের নিচে গা-ঢাকা দেয়। গাড়ি পার হলে আবার পূর্বকাজে মনোনিবেশ। কারণ, চৌধুরীর চোখে ওসব ধরা পড়িলে জীবন্ত জবাই। শুধু এসবই নয়, স্কুলমাঠেও তখন অনেকরকমের খেলা। তবে লালচৌধুরী সর্বক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি সম্মান পান। ইয়া মোটা, আর তৈলাক্ত গায়ে তার তর্জন-গর্জন সারাক্ষণ বজায় থাকে। গল্পে শুনি, তিনি আইয়ুব আমলের বড় নেতা। তিনথানা লইয়া বাঘমার্কায় তার প্রার্থীতা ছিল, জীপে চড়িয়া চলিতেন উঁচু-নিচু-বন্ধুর গোটা অঞ্চলে। বন্দুক নিয়া পাখি-বক শিকারে যাইতেন। দোনলা বন্দুকে কতোবার আমরা গিয়াছি তাহার সঙ্গে এখানে-ওখানে মাছ শিকারে। বকুলবাড়ির জঙ্গল, আমলিপাথার, চিরাততলের ভিটা আরও অনেক দূর দূর। বন্দুক ছুঁইয়া দেখা কিংবা পিছে ঘোরায় তখন অপার আনন্দ। সে সব স্মৃতি আমাদের রাতের ঘুমকে বাতিল করিয়া দেয়। রাত জাগাটা যেন ছালামের মাছধরা নেশার মতো। পানমুখভর্তি, ক্লিনশেভ আর জুলজুল চোখে লাল চৌধুরী তাকান তার দিকে। খোশমেজাজে থাকিলে মস্তমার্কা হাসি। গোটা অঞ্চলের মানুষের পিতৃপুরুষের পরিচয় নখদর্পণে। মেজাজ বিগড়ালে অনর্গল অশ্লীল আর স্ল্যাং উক্তি। লালচৌধুরীর খোলা জীপে একবার উঠিয়া আমরা কয়েক ক্রোশ ঘুরিয়া বেড়াই। তখন সে অমিয়আনন্দের শেষটা দেখি না, অনেকদিন মনে রেখাপাত থাকেন। তবে অনেক সময় জুড়ে চৌধুরীবাড়ির বাইরে ছোটবাড়ি, মধ্যিবাড়ির ঘটনা নিয়া আলাপ হয়। খুব মৌলিক সে আলোচনা। ঘনঅন্ধকারে ম্যাটমেটে টর্চের আলোয় আমরা গোয়ালঘরের পাশে অনেক রাত অব্দি চৌধুরীবাড়ির ঐসব পাতানো গল্প শুনিতে থাকি।

তবে দোয়েলখঞ্জনার দেশে অনেক মৃত্যু আসে। জন্মের চেয়ে মৃত্যুই বেশি স্মরণীয়তা পায়। ন্যান্দা মোয়াজ্জেনের মৃত্যুর ছবিটা তখন জীবনের অংশ হইয়া দাঁড়ায়। কারণ, তার বাড়িতেই আমরা প্রথম বারোইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনটা দেখি। আবার তোরা মানুষ হ কিংবা বিনিময় ধরনের ছবি হলে তাদের বাড়ির ব্যারেলের বন্ধগেটটার ওপর দিয়া, হাতের কনুই, হাঁটুর চাকতিতে ঘষিয়া, টিভি থেকে অন্তত পনের হাত দূরে চপল জোড়া পাছায় ঠেকাইয়া, চুপচাপ বসিয়া তার বাড়িতে সেনেমা দেখার আয়োজন চলিতেছিল। অনেকের কাঁধের পাশ দিয়া, মাথার পাশ দিয়া আমরা ওসব দেখিয়াছিলাম। চটাচটি, ঠ্যালাপ্যালা যে হয় না তা নয়, তবে তুলনায় খুব কম। কারণ, হৈচৈ হইলে বাড়ির কর্তার ঘুম নষ্টপরে তাকেসহ সবাই ছাটাই। অতঃপর হুড়ুম শব্দে দরজা বন্ধ। কেউ অনুরোধ করিলেও চলিত না। রাজ্যের সব কষ্ট তখন আমরা অভিশাপে ঝুলাইয়া রাখি। জানি না সেনেমায় ‘বোবা মাছুমা’র চরিত্রের শেষ পরিণতি কী হইয়াছিল! তাদের প্রেমের শেষ মিলনের অবস্থাই বা কি হয়! তবে ওসব বাড়িতে আমরা যতোই অধিকার আরোপ করি না কেন, যে কারো মাতব্বরিতেই হইয়া যায় সব কুপোকাত। কতোসব কষ্টের জায়গার এ বাড়ি। সেখানে একদিন এ মোয়জ্জেমের মৃত্যু লইয়া আমরা ব্যথিত হই। ঘরে ঢুকিয়া দেখি, খয়েরি চাদরে উপুড় হইয়া আছেন তিনি। তৈজসপত্র, বিছানা চাদর এলোমেলো। বড় একটা লাশ সেই এলোমেলো আচ্ছাদনে নিঃসাড়। কিছুক্ষণ সময় পেরুলে কয়েকজন সঙ্গীসহ আমরা মৃত্যু-পরবর্তী আলোচনায় অধিষ্ঠান পাই। তখন হার্টএ্যাটাক বা ডায়াবেটিস বুঝি না, কেউ এসব রোগের নামও বলেন না, রোগাক্রান্ত হইবার কারণ নাই তবে সবই ওই আল্লার নির্দেশে সীমিত। আমরা এরপর ক্রমশ দাফন স্থলের দিকে আগাইয়া যাই। উঁচু লম্বা কলাসারের ভিতর, ঝোঁপঝাড় এড়াইয়া চতুষ্কোণ করিয়া গোরখোদকের আয়োজন। সিঁদূররাঙা বিকেলের আবছা আলোয় অন্ধকার তখনও গাঢ়তর হয় নাই। দূর চোখ পড়ে শ্মশানের ঘাট। আত্মহত্যার পর শীর্ণ নদীতে নবোদার ছাইভস্ম ছড়ানোর দৃশ্য আমাদের হতাশ করে। ভীত পরিবেশে আমরা চিন্তালগ্ন হই। সমস্ত শরীরমন গুটাইয়া বসি। অন্ধকারের গা ছুঁইয়া গোঁ গোঁ ডাক আসে, নিমতলায় ঘনসাড়াশিঅন্ধকার, শকুনের কুটকুট আওয়াজ আর নদীর শ্বেতকুহক আচ্ছাদনের পানিস্বরে সড়াৎ সরীসৃপ চলা আর কুকুরকান্নার ক্ষীণস্বর আমাদের ক্লান্ত করে। তবে ক্রমশ সবটুকু আলো অন্ধকার শুষিয়া নেয় দুটো হ্যাজাগ চলিয়া আসিলে। অন্ধকারের মাঝে তা যেন তারকাআলো। তখনও পাসুন কুঁদিয়া শৈল্পিক কায়দায় মোর্দার মসৃণ আসন পাতার কাজ চলিতেছে। ওপারের গাঢ় অন্ধকারে দূরের শ্মশানঘাট তখন অপসৃত। পুরনো রেজিস্ট্রি আপিসের পেছনে ঝাড়ের ভেতরে ঝিঁঝিঁ ডাকিয়া চলিতেছে অবিরাম। ওপরের ছাদটায় দূরের হ্যাজাগের নরম আলো। কতোকালের পুরনো সেসব, আমরা কেউ জানি না। টেরাকোটায় নিপুণ করিয়া আঁকা অনেক পুরনো রেজিস্ট্রিআপিসের ছাদটা। সেখানে খসখসে সবুজরঙের পাতারা ঊর্ধ্বমুখি, এক দেড়হাত উচ্চতায় বিরাজমান। কীসের শেকড় যেন দরদালানের গা বহিয়া ক্রমশ নিচের দিকে নাইমা আসে। রটনা থাকে সেসবের খোপে খোপে আছে বিষকীট। তারপরে জ্যোৎস্নাধোয়া আকাশ উজ্জ্বলতর হলে পুরনো বিল্ডিংটার ছাদের ওপরের পাকুড়গাছের শিকড় বিস্তারী লতাটা নিজের চারপাশের অন্ধকারে জাপটিয়া ধরে থাকে। ওইটার মধ্যেই প্রেতপতœীর গল্প রচিত হয়। শিরশির করিয়া রক্তপ্রবাহ ম্যারাথন করিলে, শিউরে ওঠে লোমকূপ। মনে হয় অজগর আসিয়াছে তেড়ে, কে যেন ব্যারিকেড দেয়, পিছমোড়া দিয়া ধরিবার জন্য তাড়া করে। তখন দেখা যায় একদল পাগড়ি পরিহিত ইমাম সমারোহে আসিতেছে রেজিস্ট্রি অপিসের মাঠের দিকে। তখন আমাদের পরনে হাফপ্যান্ট, সেখানে হিস্যুর গন্ধ, ময়লাওয়ালা হাফহাতা শার্ট, তেলছাড়া উস্কোখুশকো চুল, হাঁটুর ওপর লালধুলোর প্রলেপ, তালুতে সোঁদামাটির গন্ধ। সবকিছু ছাপাইয়া ভেসে আসে গোলাবজল আর ধূপের ধোঁয়ার মৌতাত। সে গন্ধে আমরা অপরাধী হইয়া যাই, লম্বাবারান্দা দিয়া অন্ধকারে আড়াল হই, সেখানে নিস্তব্ধতার ভিতর হাইমাউ আওয়াজ ওঠে। প্রিয়জনের কান্নাশোকে মুষড়িয়া পড়ি, অন্ধকারে সম্মুখে বিড়ালচোখ উঁচু করিয়া পাহারার ভঙ্গি করি, শ্মশানের ওপার দিয়া ঘনতর লম্বা কুকুরকান্না, পেছনের দিঘীটায় টুপটুপ নেওর পড়িয়া চলে বেলগাছ থেকে, পোকনের বাপ ছুইটা আসে জানাজায় লাইন নেয়, তারাভরা আকাশের সংসারে তখন আমরা নির্বিকার নরম ব্যাকুল। কান্না স্তব্ধতায় পরিণত হলে হুজুর চীৎকার ছাড়েন ‘আল্লাহুআকবার’। খুব দ্রুত সে সব কর্ম সমাপন হইলে পেছন পেছন চুপি চুপি কবরের কাণ্ড দহের বাতাসে একাকার হইয়া যায়। তখন ক্লাসের মৌলভী স্যারের মুখস্থ কবিতাটা গুমরানিতে ভাসে ‘আবার আসিব ফিরে’। মিনহা খালাকনাকুম… আওয়াজে যতেœধোয়া বিশাল ওজনের শবদেহ দুড়দাড় মাটিতে চাপা পড়িয়া যায়। অশত্থপাতা, বঁইচি, শেয়ালকাটায় সবকিছু আটকাইয়া যায়। মায়া অতিক্রমণের জন্য দ্রুত স্থানত্যাগের আহ্বান। সে আহ্বান কার? আমরা কাঁদিয়া ফেলি ওই শবাত্মার জন্য। যেমনটা হারানোর অভিজ্ঞতা মোজাম্মেল চাচার। সে সব যেন ক্রমশ অতীতে মুখ ডুবায়, একে একে সব মৃত্যুর সাক্ষী হইয়া যাই আমরা।

কুয়াশাভোরে একটি নতুন গাড়ী আসিয়াছিল স্যানিটারী মাঠে। মাঠটা সবুজঘাসে মোড়ানো। ঘাসডগায় শিশির জমা। একটা লালরঙা বড় ঘর। সেখানে সরকারি ডাক্তারের কম্পাউন্ডারের কর্ম-সম্পাদনের অফিস। ওখানেই চীৎকার আর হাকাহাকির স্থান। কেবল তখন তাহা সিঁদূররাঙা সূর্যপটে উদীয়মান। রোদের শীর্ণরশ্মি ঢুকাইয়া পড়িছে পাঁকুড়গাছের পাতার ফাঁক দিয়া। বাবুই পাখি নাচিয়া চলিছে একপায়ে নিথর দাঁড়ানো তালগাছের মাথায়। শোনা গেল এ গাড়ির মালিক শাহানশাহ, যিনি আমাদের বন্ধুপিতা। তখন একটু গর্বে বুক ফোলাইয়া ভাব তৈরি হয়। বলেও ফেলি চাটুকারিতায় নানা রকমের উন্মুখ সুবর্ণসুখের স্বপ্ন। তবে ‘হাওয়া মে ওড়তা যায়ে’র দিনগুলাতে আমরা ভালোবাসিয়াছিলাম বটছায়াঘেরা রইচচাচার পান দোকানকে, সেখানে বসে থাকা রাজ্যের নানা মানুষদের। টপটপ করিয়া পানধোয়া পানি পড়িতেছে নিচে, নির্দিষ্ট গর্তে। ছোট্ট টোলঘরে মেরুনরঙা গ্লুকোজের প্যাকেট আর সাজানো আনসার বিড়ির লম্বা লম্বা প্যাকেট। খুব কম করিয়া গোছানো স্টার-ব্রিস্টল-ক্যাপস্টেন সিগারেটের বাক্স। ওসব প্যান্টশার্ট পরা সুগন্ধিমাখা সয়েবরা কেনে। এ বন্দরে শ্রেণীভেদ খুব সহজেই চোখে পড়ে। যারা ভদ্রবেশধারীতারা অধিকাংশই সরকারি চাকুরে বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের ওঠাবসা আলাদা। কথার ঢং মার্জিত, পরিচ্ছন্ন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুচারজন থাকে আর না থাকিলে অপলক তাকাইয়া তাদের নিরীক্ষণ করে কেউ কেউ। তাতেই বোঝা যায় একটু আলাদা সামাজিক মর্যাদার লোক তাহারা। খুব সন্তর্পনে তারা রইচচাচার দোকানে আসিলে সাধারণরা একটু সরে প্রসারিত পরিসরে জায়গা দেয়। দোকানিও দ্রুত বিদায় করে তাকে। টাকাপয়সা মামুলি। ওসব নিয়া কোনো বাতচিৎ নাই। তখন দোকানের পাশেই পিয়ারী মুচি নিবিড়মনে জুতা সেলাই করে। বেটেখাটো স্বল্পভাষী নির্বিরোধী কর্মনিষ্ঠ মানুষ। সাতদিনে একবার কামানো দাড়ি, পরনে রঙজ্বলা লুঙ্গি, মাঝে মাঝে তার ছেঁড়াক্ষত সুঁচ পেচিয়া সেলাই করা। কেমন যেন আলাভোলা হাসি। তেলহীন, উস্কোখুসকো, এলোমেলো চুল। বিরতিহীন তার কর্মকাণ্ড। ঈদে অপরিষ্কার চিমনিতে মুখ ডুবিয়ে অনেক কাজের আসর তার। তবে প্রধানত বটতলাতেই নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে মুখ উঁচিয়া আসে কারো কথার জওয়াব। নিরর্থক সে সবের পরোয়ানা। তবে অজান্তেই এ মানুষের কাজের ভক্ত আমরা। আব্বার কোনো কাজে শক্তকণ্ঠ হলেও তাতে তার মিনতি। কিছু হলেই আব্বা বলেন পিয়ারীর কাছে যা। তবে কোনোদিন পিয়ারী না আসিলে বটের পাদদেশ ভরিয়া থাকে উচ্চস্থানটি। স্মৃতিভারে তখন তা নানা প্রশ্নে বর্তায়। আব্বার আর একজন প্রিয়মানুষ গোলজার চাচা। যিনি আমতলায় হোটেল চালান। মাছ-মাংসের সাথে ভাপ উড়ানো ভাত অর্থের বিনিময়ে খাওয়া চলে। ঘড়ির কাটায় যখন রাত আটটা তখন হোটেল বন্ধ। তারপর হাড়িপাতিলগ্লাসবাটি সব নিয়া কড়া নাড়েন আমাদের বাসার গেটে। সেগুলা স্তুপাকারে ঘরের এককোণায় রাখিয়া অন্ধকার বালুমথিত পথ হাঁটিয়া দূর গলিতে বিস্মৃত হন তিনি। মোড়ের রাস্তার আলোটা নটার পর বাড়িতে থাকে, রইচচাচার দোকানের সৌজন্যে। গোলজার চাচা বাসনকোসন রাখিয়া মোড় পেরুলেই অন্ধকারে সোজা উত্তরে নির্বিকার হাঁটা দিন। আমরা একটু সম্মুখপানে তাকাইলে দেখি একতাল অন্ধকারের অবয়বে তিনি বিলীন হচ্ছেন। আর দূরে আরও দূরে রইচচাচার ল্যাণ্টার্নটা তার কাছে তারকা হতে হতে জুনিপোকায় শেষ হইয়া যায়। একবার পুলের ওপর কোনো যুবকদলের বিড়িফোঁকা দেখিলে কৃত্রিমভাবে লম্বা কাশি দিয়া চেঁচিয়া বলেন ‘কেটারে ওটি’। উত্তরে সাড়া না পাইলে আর কিছু না বলিয়া চল্ছেন, আগাইয়া চল্ছেন। নিঃশত্র“ সে জীবনের ছায়াপথ যেন এক বিরান প্রান্তর। তখন উত্তর-পশ্চিম কোণে টিয়েরাঙা ধানক্ষেতে আঁধার আবরিত নিবিড় নীরবতা। বিপুল বিশ্রামে অবসিত আহ্লাদি হাওয়া। বিরান পাথারের অন্ধকারে সরুরাস্তায় হনহন হাঁটিয়া বাড়িতে পৌঁছান গোলজারচাচা। শেষরাস্তার মাথায় তার বাবার কবর। সেখানে একটু থামিয়া তিনবার দরুদ পড়িয়া বাড়িতে ঢোকেন। কবরের পাড়ে অন্ধকার আরও প্রকট। সড়সড় পোকার আঁধি-আওয়াজ, ডাহুক ডাকে ধীললয়ে, ছোট্ট খেঁজুরতলে দুচারটি জোনাকী নেভে আর জ্বলে। বাষ্পারুদ্ধ হইয়া ঘরে ফেরেন তিনি। তখনও টিমটিম আলোতে রইচচাচা আছেন। ক্রমশ সব দূরে সরিতে থাকে। এক সময় চাঁদও ডুবিয়া যায়। সপ্তর্ষির আগুনআলো নিইভা যায়। তখন তারে বাজিয়া চলে কষ্টসুখের আরতি।

স্যানিটারী মাঠের অচল চলাফেরার রাস্তাকে, আমবাগানের অন্ধকার পরিবেশকে, বড়রাস্তার বিশাল জামগাছকে আমরা রূপকথার নায়ক করিয়া ফেলি। পাচিলঘেরার ওপাশে খুব ঘন সবুজের বিচিত্র লতাগুল্মে ছাওয়া অন্ধকারে গাছপ্যাচানো সাপ আর কুকুরশেয়ালের আড্ডাখানায় জমজমাট বাগানবাড়ি। বাগানবাড়ির পাশে বড় পুকুর। পুকুরের পাড় ধরে, কাঁটাগাছের ডালে, সতর্ক ভর করিয়া আমরা সরু সাপরাস্তায় কাচামিঠা আমের সন্ধানে হাঁটতে থাকি। হাঁটাপথে তখন সড়সড়ে আওয়াজ। নিচে তাকাইলে চিক্কন জিহ্বাআগার গোমাদাড়াস। দ্রুত সড়কে আগাইলে দেখা যায় দীপকদা সব ভয়ডর বাতিল করিয়া দ্রুত মগডালে পৌঁছাইয়া গেছেন। কষে মালকোচা মারা, ঘন লোমশ রানে তাতে পৌরুষত্বের তীক্ষè প্রকাশ। ওসব দেখিয়া আমরা মুচকে হাসি দেই। কানে কানে সেয়ানাপাগলের কেচ্ছা বলিতে থাকি। তখনও সিঁদূররাঙারঙ পশ্চিম আকাশে বলক দিচ্ছে, তড়তড় আম পড়িতে থাকে জঙ্গলের নানান প্রান্তে। সে সব লোভনীয় আম আমাদের ভয়কে বিতাড়িত করে। চিক্কনছুরিতে কাইটা লবণ লাগাইলে জিভায় জল আসে। দীপকদা নাইমা আসেন কিন্তু তার আগেই দক্ষিণপ্রান্ত থেকে কর্কশ হাঁক : ‘আমের গাছোত কেটা রে …’ তারপর নিশ্চুপ, গাত্রোত্থানের বেকায়দা চেষ্টা। তখন সন্ধ্যেনামা অন্ধকার অব্দি অপেক্ষা। বিড়বিড় করিয়া বকিতে থাকেন ইরানফু। ঘন চাপদাড়িওয়ালা, স্বচ্ছকান্তি চেহারা। খুব বলিয়ান আর নিশ্চিত স্বেচ্ছাচারী সাহসী ভয়ার্ত ব্যক্তি। বেটেখাটো আকারের লম্বা লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডোগ্যাঞ্জিতেই তার গলা বেশি ভারিক্কী মনে হয়। সন্ধ্যাডোবার পথে পুকুরপাড়ের ঢালুরাস্তা ধরে স্যানিটারী মাঠ হইয়া সরকারি হাসপাতালের শ্বেতপাথরে মোড়া বারান্দায় পৌঁছাইয়া যাই। দ্রুতই পাল্টে যায় গোটা পরিবেশ। জলভারানত হইয়া পড়ে আকাশ। আকাশগঙ্গা হারাইয়া যায়। ক্রমশ অন্ধকারে নিপতিত হয় চারিদিক। তখন ঝড়কাতুরে হইয়া পড়ি। আকাশ ধেয়ে নাইমা আসে তুমুলবৃষ্টি। বৃষ্টিমাখা পুকুর তখন আরও সমৃদ্ধ। ক্রমেই কুয়াশায় ফ্যাকাশে হইয়া যায় সবকিছু। দূরে টারজান জানালা দেখিতে পাই। ভাবতে থাকি ঢালু সে জানালায় মাটি লেপ্টে কীভাবে ধুলোবালিতে মাখামাখি ঘটিয়া চলে। বৃৃষ্টি ধরিয়া আসিলে এ দৃশ্যপটে আমরাই বেশি মুগ্ধ হইয়া পড়ি। তখন সিনেমা বা নাটকের মুগ্ধতা আমাদের ছিল। তবে সে সব জায়গায় কোনো সিনেমা হল নাই, সিনেমা কেমন বা সেটা দেখার বা জানার কি পদ্ধতি জানি না। তবে আগ্রহ থাকে অব্যক্ত। বড় বন্ধুদের বা আত্মীয়দের মুখে সিনেমার নায়কদের গল্প শুইনা ফেলি, মুখে মুখে ফেরা সে সব গল্প আমাদের মগজে বসিয়া যায়। অপেক্ষার প্রহর থাকে সিনেমার জন্য। তবে তা দেখা হয় না। সে জন্য টেলিভিশনে মাসে একবার যে ছবি শো হয়, তার জন্য মাসব্যাপী অপেক্ষা। ছুইটা যাই স্কুলমাঠে, হাসপাতাল গ্রাউন্ডে বা পাবলিক লাইব্রেরিতে। কখনোবা আবেদালি, সাজুরাজু বা মজ্জেনচাচার বাড়িতে। সেখানে যে সিনেমা দেখি তার সঙ্গে পর্দাকাঁপানো কল্পনার সিনেমা কেমনতা মেলাতে পারা যায় না। তবে ভাবতে চাই কেমন সে ছবি, সেখানে জীবন কেমন, কথা বলে কারা, কীভাবে তা চলে সে সব নানা কিছু। সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ঔষধের ম্যাড়মেড়ে গন্ধ থাকিত সারাক্ষণ, বড় বড় বোতলে মিক্সচার দেওয়া হয়, সেখানে ব্যান্ডেড অনেক, চিক্কন স্টেইনলেস কাঁচি, বড় জার, বাঁকানো কাঁচি ইত্যাদি যন্ত্রপাতি। লাল ইটের গাঁথুনির গৃহের পূর্ব-পশ্চিম দুপাশেই বিরাটাকৃতির সিঁড়ি পাতা ছিল। ওসব সিঁড়িতে আমরা গোসিপিং করি আর দূরে উইড়া যাইতে দেখি ধীরলয়ের প্রসারিত ডানার চিল, কখনোবা মাছরাঙা টুপ কইরে ছুইয়া দেয় সামনের পুকুরের জল, তখনও আমাদের নির্বাক তাকাইয়া থাকা। অদূরে জারুলগাছে আমরা পাখি উড়তে দেখি, ক্রমশ ঘনীভূত অন্ধকারে অনেক পাখি এক হইয়া ঝাঁকে ঝাঁকে আসে কিচিরমিচির কলোতানে মুখর হইয়া ওঠে পরিবেশকিন্তু আমরা পাখি হতে পারি না, পাখির উঁচুতে উঠিতে পারি না, মগডালে বসিয়া শিস কাটিতে পারি না, তবে সে পরিবেশের আমাদের আত্মা প্রবল হইয়া ওঠে। ওসব হবার টান অনেক কিন্তু অন্ধকারে সবকিছু মিলাইয়া যায়। কখন যেন তালা পড়িয়া যায় সরকারি ডাক্তারখানায়। এখানে প্রধান অপ্রধান কে, কে প্রহরী সে সব দেখা যায় না, কোনো চুরি বা চোরের আনাগোনা সেখানে নাই। দিনের বেলা ডাক্তারখানা খোলা পড়িয়া থাকিলেও রোগী আসে না। কেউ অনাহুত সেখানে আনাগোনা করে না। কতো নিরিবিলি আর জনমনিষ্যিশূন্য সে হাসপাতাল। একবার স্কুলঘরে পায়ে পেরেক ঢুকলে তখন সরকারি হাসপাতালে পৌঁছালে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। ডাক্তারের শুশ্রƒষা বজায় থাকে, সজ্ঞানেই দ্রুত গৃহে পৌঁছালেও সদালাপী ডাক্তারের মুখ ও মন চিত্তে বজায় থাকে। তবে হাসপাতালের পাশে যে স্যানিটারীর বাসা ছিল সেটা কতোকালের পুরনো তাহা জানা যায় না। কিন্তু পরিবেশটি মনোরম। পেছনে সবুজ ছাওয়া ধানক্ষেত, পাশে বাগানবন, পুকুর আর সামনে অবারিত প্রান্তর। কিন্তু তাল বা পামগাছের সারবাধা বাবুইদোলানো বাসা, পুকুরের স্বচ্ছতোয়া জলে তার নিমীলিত ছায়া আমাদের মুগ্ধতা দেয়। সে সবে আমাদের সময় কাটে, জীবনের গল্প রচিত হয়, অনুরাগের শিহরণগুলা স্মৃতিমর্মে গাথা থাকে।

রহিমউল্ল্যাহ ক্যাশিয়ার পাগলাটে ছিলেন, কাজের পাগল, একসঙ্গে অনেক টাকা দ্রুত গনিয়া ফেলেন তিনি। বেশিক্ষণ তার সম্মুখে টাকার জন্য দাঁড়াইতে হয় না। এতো কর্মপাগল, বিনয়ী, নির্বিরোধী মানুষ কম দেখা মেলে। স্বর তার বেশ নিচু, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী আর চটি সার্বক্ষণিক। তবে মাঝেমধ্যে প্যান্টশার্ট পরেন না, তা নয়। তখন বেমানান লাগে। প্রাত্যহিক সাড়ে আটটায় ব্যাংকে পৌঁছান, ক্লান্তিবিহীন। তার জন্য গর্ব আমাদের। কেননা ব্যাংক-বিষয়ক কোনো কাজ আমাদের নিজেদের করিতে হয় না। খুব তাজ্জব হতে হয় অনেক ভীড়েও কাউকে ফেরান না তিনি। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে একটু অগোছালো কিন্তু কর্মপটু সদ্ভাবে সাদামনের নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব। অথচ কী দুর্বহ নিয়তি! খুব দ্রুত জীবনবাণিজ্য শেষ করেন তিনি। কবে কোন্ ফাঁকে তিনি মারা যান, কীভাবে তার কবর রচিত হয় সে সব ভুইলা যাই আমরা। চিরন্তন একটা ছবিতে তিনি জীবিত থাকেন আমাদের সামনে। হারানতবে হারান না, মনতাড়া করেন সারাক্ষণ আমাদের। আমরা দেখিয়া চলি সারাক্ষণতখনও-এখনও…, রিফিউজিচাচার বাড়ির পাশ দিয়া, বিশাল পুকুরের চিক্কন রাস্তার সতর্ক পাড় ধরিয়া, নিচু দার্শনিক-মাথায় হাঁটিয়া যাইতেছেন। চুলগুলা উস্কো মার্কা আর সাদা কোয়ার্টার হাত গুটানো পাঞ্জাবী। সম্মুখে এগিয়া যান কিন্তু যেন তাকান না কোনোদিকে! অদ্ভুত মনে উদ্ভট হইয়া চলাফেরা। অথচ ব্যাংক-বাণিজ্যে কী প্রখর তিনি। আমরা অনাহুত মায়া করি তাকে। হায়, ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারেপায় নাকো আর’। এ রকম আয়োজনে আমরা আরেকজনকে পাই। তিনি মহিরবুড়া। মহিরের ফ্যাক্টরি, সেখানে ব্রেড তৈরি হয়, গনগনে আগুনের লেলিহান লোলজিহ্বা বুড়োর দোকানে পাতানো থাকে। তার নিকানো মাটির উঁচু তোরণ, সেখানে ভেতরে কতো যে সুস্বাদু খাবার বানানো হচ্ছে, একটা মৌতাত সারাক্ষণওই দূর রাস্তা পর্যন্ত। আমরা সেদিকে তাকাই প্রতিদিন, যতোবার যাই ততোবার। বর্ষায় প্রায় দশইটের ওপর পা ফেলিয়া তার দোকানের রাস্তা আর যাওয়া-আসার সেতু। বাইরে কাঁচভাঙা মিটসেফে তার সাজানো নানা সাইজের ব্রেড আর কেকজাতীয় কতোকিছু! কার্যত সেটিই তার শোরুম। এ ছাড়া অনেকদিনের মরচেপড়া চৌকোণ টিনের ভিতরে টোস্ট বা নোনতা বানানোবিস্কুট থাকে। মহিরচাচা একটু ঝুঁকে ওসব সারাক্ষণ সাজানো-গুছানোর কাজ করেন। সাথে তার দুচারজন কর্মচারি। তারা মহিরের আদেশ-হুকুমের দাস। আমরা স্কুলপথে ওসবে চোখ দিন, টাটকা রুটির মৌতাতে আমাদের হাঁটার গতি কইমা আসে, কখনোবা কাছে যাই, খুব নিবিড় হইয়া নানা কাজকর্ম দেখি, জিহ্বা তরল হয়, দেখার চোখ তাতে আটকাইয়া থাকে, তবে বন্ধু রমজান আমাদের সেদিনের সে বাজিতে জিতিয়া গিয়াছিল। ষোলরুটি খাইয়া ফেলিয়াছিল, তারপর অনেকদিন সে অসুস্থতার জন্য স্কুলে আসিতে পারে নাই। তবে রমজান আমাদের নজরবন্দি থাকে বহুদিন, ‘সিক্সটিন ব্রেড’ নাম ধারণ করিয়া। স্কুলের সিঁড়ির মতোন মাঠের ছায়ায় বসা প্রতিযোগিতামুখর রমজান আমাদের নিরন্তর জীবনের চিরন্তন সঙ্গী হইয়া যায়। কেন্দ্র হয় সব গল্পগুজবের। যে কোনো কাজে বা স্কুলমাঠের শত ঘনঘটায় ওই সময় আর ছায়ায় আমাদের মাঝে বন্দি থাকে রমজান। অনেকদিন আমরা সে সব মনে রাখি। সূর্য পশ্চিমে দুলিয়া গেলে ওই মাপের ছায়ায় বসে আমরা রমজানকে স্মরণ করি। রমজান ভালো ছাত্র হইতে চাহিয়াছিল, রমজান স্কলারশিপ দিতে চাহিয়াছিল, অজপাড়া নীরব অন্ধকার গাঁয়ের দিনমজুরের সন্তান হইয়াও রমজান ভালোছাত্রের সারিতে আসার প্রতিযোগিতা করিতে চাহিয়াছিল, আলাদা মর্যাদা চাহিয়াছিল, অনেক রঙিন স্বপ্ন দেখিয়াছিল কিন্তু পারে নাই। মহাসড়ক ধরে সাইকেল-চড়িয়া বাড়ি ফিরিবার পথে গাড়ির চাপায় সে প্রাণ হারায়। হলুদরাঙা বিকেলে আজিজচাচার পানদোকানের সামনে দাঁড়াইয়া আমরা দেখি, দুই মানুষের চারপায়ে ভর করিয়া চওড়া কাঠের তক্তায় অনেক ব্যান্ডেজে মোড়ানো রমজান অন্তিম সজ্জায় শায়িত। সে অনন্ত ঘুমের দেশে সোজা পশ্চিমে হাঁটিয়া চলিয়াছে। আমরা হু-হু কান্নায় ভাসিয়া যাই, সাক্ষী মানি মহিরের দোকানকে, স্কুলের ছায়া অবলম্বী স্মৃতিকে আর নীরব কোণায় অঙ্ক পর্যালোচনার স্থানটিতে। হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, মাথায় ব্যান্ডেজ, বুকের পাজর শক্ত করে বাধা ব্যান্ডেজ; ব্যান্ডেজে ব্যন্ডেজে তুলকালাম এক নি®প্রাণ লাশ। কান্নাচোখে খুব দ্রুত আমরা আখিরা পার হইয়া চলি। নরম এঁটেল রাস্তায় কুঁড়েঘরের বারান্দায় পৌঁছাই। সেখানে কান্না ওঠে জীবনের সব ব্যর্থতার বাতিল রঙে, ডুকরে ওঠে নির্মমতার সমস্ত সঞ্চয় অনিবার্য করে, পলাতকা ছায়া আমাদের হাতছানি দিয়া ডাকে, প্রাচীন অশত্থতলার কর্কশ ঘ্রাণে, শ্মশানের টক গন্ধে আর লোপাট হইয়া যাওয়া গুঞ্জরনের শোককাতর বিস্মৃতির রঙে। তবে রমজানকে আমরা ভালোবাইসা ফেলি, মৃত্যুকে অস্বীকার করিয়া জীবিত রাখি, ছায়ার মাপে বা আমকুড়ানোর স্মৃতিতে। কতোদিন সে ডিঙা বাওয়া রাখাল বালক রহিয়া যায় আমাদের কাছে। ময়লা জামা, রঙজ্বলা লুঙ্গি, হাতগুটানো পুরনো শার্টে দুর্বল মায়ায় তার ফর্সা গোলগাল শরীরকে আমরা পুজা দেই, গোপন ক্রন্দনে ভালোবাসি, নীরবে বিচ্ছন্নতার কবলে পড়িয়া যাই। তবে আকাশে-বাতাসে রমজানের প্রতিকৃতি প্রলম্বিত হয়, মূর্তিমান হইয়া ধরা দেয় বাত্যাতাড়িত ঝঞ্ঝায়, সদ্য স্বাচ্ছন্দ আনন্দময় জীবনে একাকী হই আমরা প্রত্যেককেই, সেখানে গ্রহনক্ষত্রপুঞ্জের দিব্য হইয়া আসে সে। গভীরতর অসুখ যেন পাইয়া বসে আমাদের। পলাতকা ছায়ায় লাশ হওয়া রমজানকে আমরা খুঁজিতে থাকি, দৃশ্যপটের ছায়ায় বাস্তব ছবি খুঁজিয়া চলি, কিন্তু স্বপ্নলোকের চাবির মতো সে হারাইয়া যায়, কখনো তারে আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
একদিন দুপুরে প্রবল ঝড় ওঠে, সে ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির সীমাসংখ্যা নাই, মেরুনরঙের থানাভবনটি উড়িয়া যায়, বাড়ির পাশের মিষ্টিকাঁঠাল গাছটার একটা বিশাল গুঁড়ি আমাদের টিনের চালের ওপর হুমড়িয়া পড়েদুপুরঝড়ে এসব হুড়মুড় করিয়া সম্পন্ন হলে পুবাকাশে রঙধনু দেখিতে পাই। আমরা তখন বাড়ির বাইরে। সিদূঁররাঙা আকাশে তখন রাজ্যের উল্লাস। কমলারোদ পীঠে নিয়া সোজা পূর্ব-পশ্চিম হাঁটিতে গিয়া আমরা দেখি বহুপুরনো বিরাটকায়ায় কৃষ্ণচূড়া গাছটা সার করা অনেকগুলা টোলদোকানের ওপর ভাঙিয়া পড়িয়াছে। তখন আমাদের একমাত্র পিচবিছানো রাস্তাটা অবরুদ্ধ হইয়া পড়ে। ওরাল দিয়া আজগার রিফুউজি কাঁদিতে থাকেন। খালেক ভাই, জ্যোতিন দা, নির্মলী অঝোরে কান্নায় পাথরমূর্তিমান। এক্কেবারে গাছের গোড়ায় ছিল হাফিজারের মাইকের দোকানতা দুমড়াইয়া যায়। কিন্তু অলৌকিকভাবে সবাই অক্ষত। তবে আমাদের ওসবে তেমন সহানুভূতি জাগে না। আমরা শুইয়া পড়ি গাছের ভঙ্গুর শাখাপ্রশাখায়। অনেকগুলা টাটকা আগুনরঙ কৃষ্ণচূড়া আমাদের আয়ত্তে চলিয়া আসে। ভেতরে ভেতরে ঘনসবুজ ফুলকলির কোনোটা বিকাশোন্মুখ আবার কোনোটা মুকুরবন্দি। পাতাগুলা শিরশির শিহরনে মাতানো। আমরা শাখে শাখে নানাসংগ্রহে মাতি। তখন রঙধনুটা মিলাইতেছে দিগন্তগাত্রে, এক-আধটু আঁধাররেখা তার আকাশকে অধিকারে নিয়া ফেলিয়াছে। কান্নাপথিকদের পুনর্বাসন প্রচেষ্টা তখন অব্যাহত। ক্রমশ আঁধার ঘনাইয়া আসিলে মুষড়িয়া পড়া গাছটার সবুজ পাতা কালোছায়ায় আচ্ছন্ন হয়। রাজ্যের বাবুই-শালিক আসিয়া ভর করে প্রশাখার ফোঁকড়ে। বিদ্যুহীনতার অন্তরালে পথপরিস্কারের ক্ষেত্র রচিত হয়। তবে চিন্তিত নিরীক্ষার শেষ হয় না কাহারো। ব্যাংক দারোয়ান খালেক ভাই পেছনের কৃষিব্যাংকের পাশেই একটা ডেরায় আশ্রিত থাকেন। তিনি মূলত ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী। সুঠাম দেহে, ইস্পাতকঠিনচোখে এক বন্দুক হাতে সারাক্ষণ উঁচু ব্যাংকবারান্দাটায় দণ্ডায়মান থাকেন। একটা বিশেষ সময়ে তার বাড়তি রোজগারের অবলম্বন এই দোকান। তার দুই মেয়ের একমেয়ে আমাদের সহপাঠি হিসাবে থাকে। গুঞ্জরনে তখন সে মেয়ের সঙ্গে আমাদের এক বন্ধুর কীসব যোগাযোগের কথা শোনা যায়। তবে ওই উঁচু ব্যাংকাবারান্দা আর পেছনের বেড়াআড়ালের কর্মকাণ্ড অনেকদিন মন ছুঁইয়া থাকে। আমরা শুঁকিয়া চলি গন্ধরাজ আর গন্ধহারা কলাবতী বা কড়িফুলের আসঙ্গলিপ্সায়। আরও অনেক নাম না জানা ফুলগাছে ভর্তি এ ব্যাংকবারান্দার পেছনটা। জনশূন্য নি®প্রাণ এ প্রান্তে কেউ আসে না। অবারিত দিগন্তজুড়ানো মাঠে রোদবৃষ্টিঝড়ের নির্বিকার ছায়াসঙ্গিরূপে আমরা ‘সিরিয়াস’ সব কর্মকাণ্ড করিয়া চলি।
তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমাদের জ্যোতিনদার বাড়ি উচ্ছেদ হইলে। আমাদের জ্যোতিনদাকে আমরা দেখি কখনো বন্ধু বা কাকাদের মতো। তাকে কেউ বলে জ্যোতিনদা কেউবা জ্যোতিনকাকাআপাদমস্তক শিহরিত, প্লাবিত-উচ্ছল জ্যোতিনদা, হাসিতেন মাপাঠোঁটে, রঙ্গরসের আলাপ জমাতেন মার্জিত স্ল্যাং শব্দে। জ্যোতিনদার শাদালুঙ্গি, হাফহাতা গেঞ্জী পরিতেন, পইতা রাখিতেন। কোনো উৎসবে ধবধবে ধূতি পরিতেন। মিষ্টির দোকানের মালিক-কাম ম্যানেজার তিনি। ফাঁকফোকড়ে ছেলেরা দোকান সামলায়। দোকানের পেছনে ঘনপরিবেশে তার বাড়ি। পূজার মেলা হইলে বা খেলাঘরের কোনো অনুষ্ঠান হইলে জ্যোতিনদার বাড়ির আড্ডা আরও ফলপ্রসূ হয়। নাট্যসপ্তাহে বা নাট্যানুষ্ঠান, বিচিত্রানুষ্ঠানে ভরামাঠের আয়োজন থাকে তার বাড়ির পাশের মাঠটা। এটাকে আমরা জানি কাচারি মাঠ বলিয়া। সে মাঠে খুব আকর্ষণীয় উল্লাস থাকে দুর্গাপূজায়। শারদীয়া মানে সারাবছরের আয়োজন। সে সময় আখিরারও আলাদা রূপ রচিত হয়। জ্যোতিনদা বাড়ির রাস্তাটা চিকন অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো। সেখানে সেধিয়া গেলে একচিলতে উঠোন। গোল হইয়া বৌদির সঙ্গে বসিয়া শৃঙ্গার কথালাপ শুরু হয়। আঞ্চলিক এ কথালাপে রমনরস, নতুনবিয়ে, ‘কার কি খবর’ জানার উদগ্র আগ্রহ পাইয়া বসে আমাদের। এইসব আলাপে জ্যোতিনদা কম থাকেন। সেটা মুডের ওপর নির্ভর করে। তবে এমন রকম পরিবেশে প্রায়শই তিনি ব্যক্তিত্বে ভারী। বৌদির সামনে গম্ভীর হইয়া ঘরদোরউঠান কইরা চইলা যান বাইরে। আমরা তখন মত্তরসে দিকপ্লাবী। আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টার এ আলাপে জ্যোতিনদার সমর্থন সর্বাত্মক কিন্তু ভাবে-আচরণে একেবারে বিপরীত। আবার বাহিরের পরিবেশে তিনি ভেতরের বৌদির মতোন। অদ্ভুত জ্যোতিনদা। এতো সরল, আন্তরিক, ভালোমানুষ কতোকাল আমরা দেখি নাই, পাই নাই আহা… ! তবে বৌদিকে ডাকা, সহায় হিসাবে গ্রহণে খুব স্বাভাবিক তিনি। আড়ালে তার প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ। আমরা কোনো অনুষ্ঠানের রাতে এলোমেলা ঘুরিতে থাকিলে বলিতেন ‘ভেতরে যা, তোর বৌদি বড়া ভাজছে’। আমরা তখন লোভী এবং রোমাঞ্চিত তারপর ওই অন্ধকার পার হইয়া সুড়ঙ্গপথে
সুড়–ৎ। তবে সেই সব পরিবেশ ‘মেঘ না চাইতে জল’ আকস্মিকতায় উন্মত্ত। একদিন জ্যোতিদাকে হানা দেয় বুলডোজার, সরলস্নিগ্ধ আত্মায় ‘শকুন আর শব’ আছর করে। ষড়যন্ত্রের ফাঁদে সবকিছু হারান। দোকান যায়, সুড়ঙ্গরাস্তা যায়, উঠান যায়, বৃষ্টিধোয়া খড়ের চাল কিংবা বসতভিটা সব সবছিঁড়ে শূন্যশ্মশান পড়িয়া থাকে। জ্যোতিনদা স্বরহীন কাঁদেন, শিশুর মতোন। গড়িয়া যায় গণ্ড বহিয়া স্বচ্ছধোয়া অশ্র“, পলকহীন নিরাপত্তাহীন ধর্ষিত দেহের শূন্যতায়। নির্জন খড়ের মাঠের পউস সন্ধ্যায় আমরা নির্বাক। জ্যোতিনদা হুমড়িয়া পড়েন ভাঙা উঠানে, জ্ঞান হারান সম্বলহীনতায়, বাঁচার জন্য বাধতে চান ‘বন্ধনহীন মায়া’র নিঃসাড় বাধনে। জ্যেতিনদার খুব ফর্সা রূপটা উজ্জ্বলতা পায় চুনপান খাইলে। ঠোঁটের কোষা হইয়া সে লালিমা দিগি¦দিক ছড়াইতো। খোশমেজাজে তখন হাসিলে সেটি শিশুহাসি হইয়া যায়। মৃদুলপায়ে তার হাঁটাচলা। জ্যোতিনদা জমানো কিছু টাকায় আবার ঘর তোলেন, অন্য ভিটায়। পাড়ার বাবুদেরই কোনো পতিত ভিটায়। তখন তার আর হাসি থাকে না। ম্লান, অন্ধকার আর আচ্ছন্ন সে রূপ। শুধুই প্রশ্ন দুচোখে থানাপ্রশাসন কেন তাকে ভিটা ছাড়া করিল? সে প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই না কেননা দুতিনমাসের মধ্যেই আমরা দেখিতে পাই জ্যোতিনদার পরিত্যক্ত ভিটায় টাকাপয়সাওয়ালা কাজী একরাতেই টিনের চালা দিয়া স্মার্ট একটা ঘর তুলিয়া ফেলিয়াছে। কানকথায় জানা যায় এই জায়গার মালিক এখন সেই। এইসব নিরর্থক অর্থ জ্যোতিনদা বোঝেন না, তবে তিনি নির্বাক হইয়া যান। শারিরীকভাবে অসাড় হন। অনেকদিন খাইয়া না খাইয়া চরম মনঃকষ্টে আঁধারভোরে টুপ কইরে পৃথিবী-পরিত্যক্ত হন। দূর ফাঁকা এক ডেরায় হুহু করিয়া বেয়ে আসে সূঁচালো বাতাস। সে বাতাসে ভর করিয়া, ডুকরিয়া ওঠা কান্নায় হাহাকার আসে কিন্তু আমরা যারা এসবের মধ্যে নাই তাহারা কেউ তা শুনিতে পাই না। আলোয় ভরা দিগন্তে কুঞ্জে পাখি ডাকিলে শোনা যায় জ্যোতিনদা নিহত, আরও একটু পরেই তার শ্মশানযাত্রা শুরু হইবে। হরিবোলের ধূপে নিরন্ন, কষ্টসহিষ্ণু, ওজনহীন জ্যোতিনদা পঞ্চভূতে বিলীন হন। কোনো মেধা মস্তিষ্ক ধরা পণ্ডিত তিনি নন, অনেক অনুসারী রাখিয়া যাওয়া বোদ্ধাগুরু ননতাই গৎবাধা রীতিতে শ্মশান তাকে গ্রহণ করে। তবে জনরোলে ওসব জীবনের কান্না কেউ জানে না; হারিয়া যায় সবকিছু। কাঁদেন পরিজন, নিরিবিলি দুএকজন, তারপর দেহান্ত। নিমতলা বা অমাবস্যা-পূর্ণিমায় নদীস্রোতে মিশিয়া যায় তার দেহভষ্ম, কখনো তা মিলায় সমুদ্রে কিন্তু সবই তো বহুদূর। আমরা ভাবি, জ্যোতিনদা কি ভষ্মে ভর করিয়া সমুদ্রে যাইতে পারিয়াছেন? নওলি হাসি, ফর্সা টোলপড়া মুখ কোথায় তিনি! আহা… কতোদিন, কতোকাল দেখা হয় নাই? আর যেন দেখা নাই, আয়োজন নাই, আমন্ত্রণ নাই। মনে হয়, বিরাট অভিমানে কোনো অন্ধকারে ভর করিয়া আসিয়া বলিয়া চলিয়াছেন তিনি, কী-রে! কবে শ্মশানে দিয়া গেলি, আর খোঁজ নেস না, এখানে তো আমি একাকাজী কি এখনও আমার ভিটাতে ঘর তুলিয়া আছে? তবে আমরা স্মৃতিগন্ধা যারা তারা এসব শুনি কি জানি বুঝি নাএখনও দেখি জ্যোতিনদা পানমুখে ক্যাশে বসিয়া আছেন, ভুলকি দিয়া বলিতেছেন ভেতরে যা তোর বৌদি চুলার জ্বালে আটা ভাজিতেছে। আমরা তখন সে সুড়ঙ্গ খুঁজিয়া পাই না, জ্যোতিনদার বাড়ি পাই নাশুধু দেখি বার হাত চকচকা দখলি টিনের ঘর; কালীমূর্তি নিয়া সে উপহাস করিয়া চলিয়াছে। ওর ভিতরে কি হয় কেউ ওসব জানে না। তবে বকুলগাছ সাক্ষী, ফুল আসা বকুলবৃক্ষ সাক্ষী, এখনও সে ভোরে ফুল ঝরিয়া রাস্তার পশ্চিমমুখা মানুষদের আমন্ত্রণ জানায়। ঝড় আসিলে সে বকুলগাছের উন্মত্ত পাতায় সুখস্মৃতি ধুইয়া পড়ে আর খবর দেয়, জ্যোতিনদার চিরকালীন ভস্মীভূত স্মৃতির। আমরা বুঝিয়া ফেলি তিনি আজন্মের টানে নিরস্ত, পরাভূত।

ফাগুনের সঙ্গে আমরা খুব সহজে সমর্পিত হই, বুনো হইয়া যাই। নুটুদের বাড়ির পেয়ারা গাছটায় ভরদুপুরে আমরা চড়িয়া বসি। খুব পিচ্ছিল সে গাছটার শরীর, সুমিষ্ট পেয়ারায় আমরা অভিভূত হই; মধুসঞ্চারী আনন্দে ডানাপাখা অর্জন করিয়া ফেলি। গাছের ডালে যে সবুজাভ নিষ্পন্নতা অঙ্গীকৃত তা পুলকানন্দে পৌঁছালে আকাশমেঘ সাড়া দেয়। কাছে আসে উদার বায়ুভুবন। সড়াৎ সরে পড়ে পক্ষীকীটকুল। ভরহীন ভরে ইচ্ছাআকুল হইয়া বাত্যাতাড়িত ডমরুকাণ্ড তৈরি হয়। এসব বন্ধনহীন গ্রন্থিতে, কাকা-দাদারা ভরিয়া থাকেন। কিছুই বলেন না। দুপুরসন্ধ্যা কিচ্ছু নাই। ডাসা পেয়ারা পাড়িয়া কাছারির ভিতরে বসিয়া একা ধুমসে আপ্যায়ন। তখন ভেতরের বিরাট অশোকগাছটা কী যে আগুন নিয়া সুধারস ঢালিয়া দেয়! তার পাতাগুলা কালোসবুজ, বেখাপ্পাগোছের। তবে অশোক শুধু পাতায় নয়, ডালেও ঝোলে, পঠনে বুঝিয়া ফেলি। উদাস আকাশে শ্যামছায়াঘন নিভৃতকুঞ্জের দাওয়ায় আমরা বৈঠা চালাই। ওখানে তখন অন্য আনন্দবাসর রচনার প্রয়াস চলিতেছে। নাটকের মঞ্চ তৈরির কাজ। ‘আসামী হাজির’ মঞ্চস্থ হইবে কাল। বড়-ছোট সবাই মিলিয়া মঞ্চ আয়োজনে ব্যস্ত। উনিশটি চৌকি (খাট) কোথায় পাওয়া যাইবে সে সলাপরামর্শ। মাকে বলিলে রাগিয়া গেলেন, অনেক বোঝানোর পর বলিলেন বারান্দায় যেটা পড়িয়া থাকে ওটা নিয়া যা। আমাদের বাড়িতে ওটা পড়িয়াই থাকে, সাধারণত বড়ফুপু আসিলে তার থাকার জায়গা হয় সেখানে। মঞ্চের ওপরে ত্রিপল টানা হইলো, তার ওপর বিরাট কাঁঠাল গাছ, সে গাছের ডাল ঢেউ খেলানো। তার কয়েকটি ডাল বেশ প্রলম্বিত। অনেক দূরে তা প্রসারিত। সে প্রসারিত ডাল বাহিয়া ত্রিপল টানানো হইলো। ব্যাক স্ক্রীন, সাইড স্ক্রীন ঘাড়ে করিয়া আনা হয় টিডিসি হল থাইকা। সেবার অভিনয় করিয়াছিল অসহায় নিরিহ পঞ্চাননের চরিত্রে ইদ্রিস, জমিদার পুত্রের বখাটে ছেলে নিকুঞ্জের চরিত্রে পিকে আর জ্যোতিষের চরিত্রে আবু সুফিয়ান। কিন্তু নাটক মঞ্চে যখন জমিয়া উঠিল তখন আকাশঅন্ধকারে মেঘ ছাইয়া ফেলিল গোটা পরিবেশকে। ঈশানকোণে জমিয়া ওঠে কৃষ্ণমেঘ, ফ্যাকাশে আকাশ জুড়িয়া প্রলয়নৃত্য শুরু হয়, দিগি¦দিক ছুটিতে থাকে সবাই, অন্ধকারে পড়িয়া যায় সবকিছু। রাতের হাটফেরত মানুষ শশব্যস্ত পা চালাইয়া এলাকা ছাড়ে। জমায়েত পণ্ড হয়। এর ফাঁকে ধুলিমিশ্রিত ঘূর্ণিবায়ু টর্ণেডোর মূর্তি নেয়। ক্ষণিক পরেই প্রবল বর্ষণ। ত্রিপলজুড়িয়া পানি জমিয়া গেলে নীচ থেকে লম্বা বাঁশ উঁচিয়া তার নির্গমন রেখা তৈরির চেষ্টা চলে। কাচারীমাঠে তখন পানি জমিয়া যায়, প্রকৃতিধোয়া সবুজ কেমন মৌতাত ছড়ায়, স্যানিটারী মাঠের দুটো শিরীষগাছ পূর্ণআকাশে ফুলেল গন্ধরেণু ছড়ায়। আমরা ওসবের স্নিগ্ধতায় সিক্ত হই, অভিনেতারা স্ল্যাং শব্দে লণ্ডভণ্ডের প্রতিক্রিয়া জানায়। ঠাণ্ডা হাওয়ায় মৃদুমন্দ বায়ু কষ্টব্যথার শরীরে হানা দিলে আমরা নতুন দিনের নতুন নাটকের কথা বলি। ঋতুর পছন্দে তখন শীত তালিকা করিয়া লয়। যে কারণে আমরা জানি যাত্রা বা সার্কাস শীতেই সর্বাধিক জইমে ওঠে। অনেকরাত আমরা জাগিয়া রই। নাটক পণ্ড করা ‘ভিলেন আকাশটা’য় এক সময় তারা জ্বলে, জ্যোৎস্না ওঠে, পূর্বকোণের লম্বা দিঘীটায় শান্তরূপে ভরপূর্ণিমা স্থির থাকে, দূর গোয়ালঘরে জাবরকাটা বাছুরটা একটানা হাম্বারব দিয়া চলে ক্রমাগত অগোচরে চইলা যায় কর্মক্লান্ত সব মানুষ। আমরা তখনও গোল হইয়া রমণরতির আলাপে নিজেদের সেধিয়া দেই। কাহারও শরীর কিংবা সজ্জা নিয়া আগ্রহ-আস্থার বিচিত্রসব বানানো গল্প বলিয়া চলি। যৌবন আগমন বা উত্তীর্ণ পর্যালোচনায় আমরা তখন প্রেম বলিতে শরীর চিনি, জীবন বলিতে জৈবিকতা বুঝি আর স্খলিত শুক্রানুর সময়কে জানি। রহস্যময় নারীর অন্তর্ভেদী অবয়ব ‘আবরণ’ আর ‘আভরণ’, ‘কপাল’ বা ‘কপোলে’র শব্দার্থের মতোই উল্টাপাল্টা আর বিদ্রƒপাত্মক অস্পষ্টতায় আচ্ছন্ন হইয়া পড়ি।
আশরাফ চাচা শীতকাঁথা নিয়া চলিতেন ওয়াজে-মাহফিলে। বিরাট প্যান্ডেল, মাঝে মাঝে প্যাচানো কাপড়ের উঁচু লম্বা খুঁটি। চাঁদোয়ার নিচে, কয়েক ইঞ্চি পুরু নাড়ার ওপর হাঁটু গাড়িয়া বইসে আধ্যাত্মিক ধেয়ানে পর্যবসিত হইতে থাকেন তিনি। সে সময়টায় রাত গভীর হয় আর ভিতরমহলে গরম বাড়ে। বাইরে নেওরজমা শীত ইস্পাততুল্য ঠাণ্ডায় জড়ায়। আধাচাঁদ তখন তিরতির কইরা তিমির আকাশে জ্বলে। ওয়াজের প্যান্ডেলের বাহিরের পরিবেশটা তখন আরও খরস্রোতা। লালবালু রাস্তার পথটা এক্কেবারে গুমোট, শীষবাঁকানো সবুজ ক্ষেত কালসে, পাথারে পাথারে থোকা জোনাকিমিছিল, আঁধার কালভার্টে নালোর বাপ আর কিছু দুষ্টলোক গড়গড় কইরে হুকা টানে, গুড়–ক গুড়–ক টানে একপ্রকার কটাগন্ধে ভারি হয় বাতাস, রাস্তার দুই পাড়ের বিজনপ্রান্তরে ক্ষীণতোয়া ডোবার ভিতর তখন ব্যঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাকতবুও সব ছাপাইয়া ফরিদপুরী ক্বারীর টানা সুর সতেজ মগজে বিদ্ধ করে। দূরে থাইকাই দেখা যায় বড় বড় দুটা হ্যাজাগে ঝুঁকে আছেন হুজুর, শ্বেত শুভ্র জোব্বা, আতরমাখা গুলজার করা শ্যামল দরবেশমুখ, লম্বা পাগড়ি আর পায়ের টাকলুর ওপর স্যালোয়ার। বেশ মানসম্মত মর্জিমাফিক সবকিছু। বর্ণনার সুরে কখনো কাঁদেন আবার কখনো হাসেন। ওয়াজে বৈচিত্র্য আসে। মাঝে মাঝে ওরাল ওঠে, তখন বিশ্বআঁধার যেন বজ্রে চেরা। আশরাফ চাচা মাতম শুনিয়া কাঁদেন, হাশরের কথা ভাবেন, খুব তৃপ্তির সঙ্গে শোনেন কারবালার কাহিনী, বদর আর ওহুদের যুদ্ধের গল্প। হুজুর দম পেড়ে বাক্য ছাড়েন ধরেন, দরুদ পড়েন ‘বালাগালউলা বিকামালিহি…’। তখন শোরগোল ওঠে বর্ণিল সামিয়ানা জুড়িয়া। সামিয়ানার কার্ণিশে তখন পাতলা বাতাস ঢেউ খেইলা যায়, মনে হয় এক একটা ওড়ালচিল স্যালুট দিয়া যাইতেছে গোটা ময়দান জুড়িয়া, চৌথা আসমান হইতে নাইমা আসিয়াছে সব ওলিদরবেশমোত্তাকিরা। হুজুর শরবতে চুমুক দিন, কণ্ঠনালী পরিস্কার কইরা সুর মেলান তারপর প্রসঙ্গান্তরে চলিয়া যান। বাইরে তখন ময়দানের কোণের ঝুপড়ি আমগাছটায় পেঁচা ডাকে, চারলাইনের বিজলীতারের ওপর দিয়া সড়াক শব্দে বাদুড় উড়িয়া যায়। আমরা অন্ধকার কালো শব্দে তাকাইয়া থাকি। বিচিত্র বার্তায় সে কালোর ভেতরে গোমড়া আকাশ দেখি, কালোর প্রতিকৃতি বড় হইয়া কখনো গুলাম মুস্তাফা বা কবরভূমির নানী বা আস্থাহীন গমকে ওঠা আশীর্বাদ ঢেউ খেইলা যায়। তবে ওসব বহুকাল আমাদের কাঁথার ওম বহন করে, ঘুমের প্রহরায় শিওরে থাকেন সে হুজুর, তখন সবকিছু স্বায়ত্ত-উৎসব। উতরোল হাওয়ায় দোয়েল খঞ্জনার ডাকের মতো ওই সুর, ওই কান্নাজারানো আহ্বান আমাদের আরেক পউষসন্ধ্যার অপেক্ষার কথা বলিয়া চলে। সে সব উৎসবে বড় হাড়িতে রেজেক মাপা হয়, উল্লাসে উল্লাসে গরু মারা চলে, রান্নার মৌতাতে হুজুর হইয়া ওঠেন ফূর্তিবান, মঞ্চের পেছনে তখন কলেজ মাঠের অন্ধকারে আমরা রঙ্গরসে মাইতা উঠি, খাবারের অপেক্ষায় জাগিয়া থাকি অনেক রাত, একসময় সবকিছু নাগালে চলিয়া এলেঠুমা ঠুমা মাংসের নাকডুবানো আহারে সমর্পিত হই। কিন্তু তখনও প্রকৃতি বিরামহীন। আবছা হ্যাজাগেই আমরা আহার করি, নাড়ার ভেতরের উষ্ণ-ওমে আত্মা রঙিনরূপে পুলকিত। মুসলিমপরানির এমত উৎসবের বছরঘুরানো চিত্তরস আকুল করিয়া থাকে। শব-ই-বরাত, শব-ই-কদর, ঈদ-ই-মিলাদুন্নবীর আয়োজনে সে সব হুজুর বয়ান আর খাবারের মৌতাত আমাদের খোঁয়ারিখোর তন্দ্রায় ডুইবে রাখে। মসজিদে বয়ান হইলেও খাবারের আয়োজনটা খোলা ময়দানে, রাইতে জাবাই করা গরু-খাসির জন্য দামী বাবুর্চিদের ডাকা হইলে আমরাও অনধিকারে ওইসবে শামিল হই। আগুনের আঁচে সে সব পরিপাক হইলে বর্ণিল কাগজে সাজানো ওয়াজস্থল চকচকাইয়া ওঠে। গোটা স্কুলবারান্দাজুড়ে কলাপাতা সরবরাহ করে খাদ্য পরিবেশন আয়োজন শুরু হয়। স্বল্প নিমআলোয় আমরা কলাপাতায় মাংসভাতে হাত ডুবাই। পশ্যহাতে সড়াক কইরা ডাবু থেকে কদুডাল পাতে পড়ে, ভেসে যায় পলান্ন। জিহ্বাস্বাদে তৃপ্তির ঢেকুর ওঠে। আমরা অনেকক্ষণ ধরে সে সব টানিতে থাকি। কী অকৃত্রিম প্রাণভোলানো আত্মার উল্লাস। তিমিরের বহ্নিচক্ষুতে তখন আমরা উদ্ধত। কতোকাল সে সব আনন্দ হাওয়ায় ভাইসা চলি জানি না, তবে কুয়াশাশীতল শিশিরদূর্বার কজ্জ্বলমায়ার কোনো প্রতিচ্ছবি হারায় না। জানা থাকে ওই স্কুলমাঠেরই পূর্বপ্রান্তের সিঁড়িতে কচিঘাসসবুজে আমরা পা বিছাইয়া গোসিপ করি, রমনীস্বাদ খুঁজি, পুরুষ হইয়া উঠি। জানিয়া যাই তিমিরে অদৃশ্য স্বাতী রমনীদের, যাহারা তখনও করুণ শঙ্খ নয়, নির্লিপ্ত শরীরে বাড়িয়া ওঠে তাদের স্তনপিণ্ড, কষাজুড়ে পেলবরূপ আর ঘলোমের নগ্নপদযুগলছায়ায় তারা সন্ন্যস্ত হৃদয়ে হৃতা বন্যা। তবে ওসব স্থান কালে-কালোত্তরে বদলাইয়া যায়, হয় নিশ্চিহ্ন, কিন্তু অচিন হয় না নক্ষত্রজলসারাতের গর্ভদীর্ণ উৎসব। আলোকদেহী সে সন্তসময় গভীর ও হীরন্ময়, হায়! সে রমনী কেন হইয়াছিল ভাগ্যাহত, কেন সে ঘর কইরাছিল অন্য পুরুষের, বিনিদ্র কালের ভেলায় সে কেন ভাসাইয়াছিল ভেলা!
‘হওয়া মে ওড়তা যায়ে’র সে সব দিনে খুব বেশি আনন্দ আসে খাজাবাবা ফরিদপুরির ওরস থাইকে। হাজার গরু আর কয়েক গণ্ডা উটসমাহার তখন বিআরডিসির মাঠে। ওখানে বিশাল সামিয়ানার নিচে কতো নধরকান্তি গরু প্রত্যেক খুঁটি অবলম্বন করিয়া দাঁড়ানো থাকে। সে বিরাট সমারোহ, একরাতেই তক্ষুণি সাবাড়। লাইন ধরিয়া হাঁটিয়া যায় সব মুরিদান ফরিদপুরের দিকে। কিন্তু কী লাভ ওতে! আমরা জানি না। ওসব কোরবানীর পশু কোথায় যায়, কেন যায়, কী দরকার, পীরেরই বা মুরিদান কেন বুঝি না। আমরা দৃশ্যান্তর হই। গরু দেখি, ঈর্ষা করি, অংশীদার হইতে চাই। ভাবি ফরিদপুর কতোদূর! কিন্তু তখনও তো কিছু নই আমরা, প্রলম্বিত লইনে গলায় ঘুঙুর, গলকম্বল জুড়িয়া লালকাপড় প্যাচানো, হাতেপায়ে কমলা কাপড় আর তিনহাত মোটা দড়িদ্রুতলয়ে হাঁটা পথে চলিতেছে সব। যাত্রায় নাই ক্লান্তি। অনেক মিথ স্টোরি শোনা যায়, ওগুলা সবই পীরবাবা জাবাই দিন, পীরবাবা নিজে খান, পীরবাবা রাখিয়া দেনমানত হিসাবে; এরূপ কতো কি? একবার ওরস উপলক্ষে গাড়ি বোঝাই হইয়া লোকজন যায় পীরের কাছে, শোনা যায় লক্ষ লক্ষ গরু জবাই হয়, খাবার আয়োজনও বিরাট, অনেক ছওয়াবের নিশ্চিন্তি, আর কামেলবাবার নির্দেশে কতোসব তৃপ্তিমাখা গল্প। আমরা গরু জমা হওয়া স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ পাই, অনেকজন একত্রে বসিয়া অসার গল্পে জাগিয়া উঠি, রাতের এসব এলাকা জোনাকীআলো পায়, রাত্রিভোরেই চলিয়া যাওয়ার প্রস্ততি, নিমিষেই য্যান সব ফাঁকা। ‘ভারমুক্ত সে এখানে নাই’রূপে গোটা পরিবেশে আমরা অক্ষয় অবিনাশী জীবনের স্বপ্ন আঁকি। তবে আমরা জীবনকে ভালবাসতে শিখিয়া যাই দূর্বাঘাসে পার্কের পুকুরে, চাঁদের কিনারায় সাদা মেঘের ভেলায় কিংবা সার্কাস মুখরিত দিনের উৎসবে। সে দিনগুলাতে আমরা জ্যোৎস্না দেখি, অপরূপ সে জ্যোৎস্না, জ্যোৎস্নাডানায় ভর কইরা পরীরা সব আসে, অপরূপ সব পরী, যাদেরকে ভালবাসিতে চাই, দূরদেশের স্বপ্নে ভাসাইতে চাই, এক-একটা জীবনের বিরাট পুরাণকথা রচনা করিয়া ফেলি তাহাদের নিয়া। তখনও আমাদের পাড়ায় স্বপ্নকাতর কোনো বস্তুবাস্তবতা রচিত হয় নাই, সিনেমা নাই, স্টুডিও নাই, বিদ্যুৎবাতি নাই। খুঁটি লাগানোর পর স্বল্পপরিসরে বিদ্যুত আসিলে, একবার পাড়ায় ভিনদেশী এক ঝাঁকড়াচুলওয়ালা মানুষ স্টুডিও ব্যবসা খুলিয়া বসেন। আমাদের চেতনায় তিনি গুণ্ডা, মদখোর-মাতাল। কারণ, তিনি সবসময় লালচক্ষু আর ঝাকড়াচুলে মূর্তমান। মুরুব্বীরা বলেন মেয়েদের অনুকরণে চুল রাখিলে পাপ, তারা মাতাল। চিরদিনের নরকবাসী। কিন্তু বড় লেন্সের ক্যামেরা হাতে ওই লোকটা আমাদের আকর্ষণীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। আমরা তার সঙ্গ চাই, সময় দিতে চাই কিন্তু বেশি পাত্তা দেন না তিনি। ভেতরে পর্দাবেষ্টিতরূপে আমরা পরিপাটি করিয়া স্থিরচিত্রের ফ্লাশের জন্য অপেক্ষা করি। সবচেয়ে সুন্দর সাদাশার্টে উঁচু বুটজুতা আর সাদামোজায় ব্রাশকরা চুলে আমরা সর্বোচ্চ কারুকাজে সিদ্ধিতে পৌঁছাতে চাই। সে সব খুব প্রাণবন্ত ছবি, পেতে অনেক সময় লাগে। একমাস অপেক্ষার পর সাদাকালো ঐ সব ছবি অনেকদিন আমাদের স্মৃতিভোলানো হইয়া ওঠে। এসব ছবির জন্য মফস্বল থেকে কেউ আসিলে আমরা নেতৃত্ব নেই। সিনেমার মতো ছবি তোলাতেও আমরা চৌর্য বা চোখফাঁকির আশ্রয় নেই। স্টিল ফটোগ্রাফির এসব কর্মকাণ্ড আধুনিক যন্ত্রপাতির উৎসকেন্দ্র হইলেও ক্রমশ সে সবের প্রতি আগ্রহ দুর্বল হইয়া আসে। বড়ো বড়ো ছবি তোলা, অন্ধকারে আলোর উৎসব খুব বিস্ময়বোধ জন্মে। প্রশ্ন তৈরি হয় নিরন্তর, কীভাবে ওতে ছবি হয়, কেন তা এমন বাস্তব! এসবের উত্তর আমরা কোনোদিন পাই নাই। তবে স্টুডিওওয়ালা আমাদের কাছে স্বপ্নপুরুষ হইয়া রহিয়া যান। সে স্টুডিওতে কতো মানুষ আসে, সাজুগুজু স্বরে আসে আদিমসব রমনীরাআমরা তাকাইয়া থাকি বৈমাত্রেয়রূপে। কবে সে সব চোরদৃষ্টি লুপ্ত হয় জানি না তবে একদিন দুরন্ত হাওয়ায় সব স্বপ্নসুখ ধুলিরৌদ্রে বাতিল হইয়া যায় তখন লোভনীয় বস্তু চুরি কমিয়া আসে, বিপরীতে অন্য কাজের সংযুক্তি বাড়ে। তবে খুব লোভ থাকে আমাদের নতুন কলমের জন্য। বড় অফিসারদের ছেলেরা সহপাঠি হিসাবে আসিলে তাহাদের হাতে বিচিত্র সুন্দর কলম দেখিতে পাওয়া যায়। সে সব পাইতে গেলে কী করিতে হইবে বা কি করা উচিত তার ফন্দি চলে। ফাউন্টেন পেনের নান্দনিক রূপ শুধু কলমেই নয় কালিতেও থাকিত। চড়াদামের কালিতে দামী কলমে যে অফিসারপুত্ররা লিখিয়া চলেন তারা আমাদের বন্ধু কিন্তু কলমভাগ্যে আমরা হীন, অভাগ্যবান। পাইলট, হোয়াইট ফেদার, শেফার্স, উইংসান এসব দামী কলমের বদলে আমাদের হাতে খুব স্বল্পদামের কলমই ওঠে। পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে ওসব দামী কলম বাকিতে কিনিয়া রাতেরবেলা সবার চোখ ফাঁকি দিয়া তাহাতে লেখা যাইত। লেখায় মৃসন বা আরামপ্রিয়তা কি, তাতে কী সুবিধা সে সব জানার বাইরে দামী কলম হাতে থাকাটাই তখন মুখ্য থাকে। তবে এস.এসসি পাশ করা বড়দের কলমে এ্যালজাবরা কষা হাতে যে কোনো কলমই দ্রুত লিখিলে সেটি আমাদের বেশি পছন্দ হয়। কলমখাতায় বড়রা ব্যক্তিত্ব ও পারদর্শিতার গুণে উদাহরণ হইয়া যান। অনেক দিস্তা কাগজে ইংরেজী অংকগুলা তারা কলমে উগরে দিলে, চোখেমুখে এক একজন আমাদের নিকট খুব বিশ্বাসী ব্যক্তিতে পরিণত হন। সে সব ব্যক্তিদের অনুকরণ আমাদের পাইয়া বসে, লোভ আর ভঙ্গিতে আমরা সারাজীবন দেখিতে পাই তাহাদের। কলমের লোভ শুধু নয় নতুন বইয়ের প্রতিও আকর্ষণ কম নয়। একটি নতুন বই হাতে আসিলে সেটির গন্ধ-রূপ-সৌন্দর্য আমাদের নাসারন্ধ্র স্পর্শ করিতে থাকে। সুযোগমতো তা বইয়ের দোকান থেকে পাল্টানোরও চেষ্টা চলিতে থাকে। নতুন ছাপার পাতা, কাগজের মৌতাত, কিশলয় স্বপ্নকে রূপকথায় নিয়া যায়। তখন বর্ষা আসিয়া যায়। টুপটাপ বৃষ্টির পর হনহনিয়া আমকাঁঠালের পাতায় চোট তোলে। দড়দড় আওয়াজ ওঠে। খুব তাড়াতাড়ি সবুজ পাতা গড়াইয়া ময়লা বুকে টপটপ জল পড়ে। অনেক মোটা পৃষ্ঠার জুনিয়র বৃত্তির বই তখন বগলের নিচে। খুলিয়া পড়িতে চাই আর গন্ধ শুঁকি। কী সে মজার গল্প। সুফিয়া কামালের পল্লীস্মৃতি, শেখ ফজলল করিমের স্বর্গ-নরক, জসীমউদ্দীনের আসমানী আমাদের খুব প্রিয় কবিতা। এর নানামুখী প্রশ্ন ও উত্তরও আছে এ বইয়ে। গন্ধের সঙ্গে অদ্ভুত এক আমোদ লুকাইয়া থাকে, ক্রমশ বইয়ের দাগ হইয়া ওঠে মলিন, তখন দোকানের অনেক বইয়ের গাদা থেকে পুরাতন বই চালান দিয়া নতুন বই চুরির চেষ্টা। সে বইয়ে আবার সমান যতœআত্তি চলে। আব্বার বই বিক্রির সময় এসব বই ‘দ্বিতীয় শ্রেণী’তে পরিগণিত হইলে তিনি আপাত গ্রাহকের সম্মুখে কিছু না বলিয়া পাল্টাইয়া দেন তারপর সন্ধান নাই কে যেন ফেরত দিয়া বই পুরানো করিয়াছে! কোনোদিন আসামীকে পাওয়া যাইবে না। তার উত্তরও মেলে নাই। এসব কর্মে আমাদের নেশা থাকে, যেমনটা ‘কবর’ কবিতা বা ‘রূপসী বাংলা’র প্রতি। তবে পড়ার গতিতে কবিতাই আমাদের খুব বেশি প্রিয়। আমরা চিনিয়া ফেলি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গোলাম মোস্তফাদের। বাংলা আমাদের শখের পুস্তক। আহ্লাদের জন্যও ছিল বাংলা। আমাদের প্রেম জন্মে যায় ওই বাংলার ভিতর দিয়াই। সুপ্তা, পলি, জুঁই, শিরিণ, বুদি, শিল্পী, হেলেনারা আটকাইয়া থাকে ওসব পঠনের ভিতরে। মায়াবী প্রহরে আমাদের শকট পাশ ফেরায়, তিমির পার হইয়া সকাল আসিলে সবুজ হাফপ্যান্ট আর সাদা হাফহাতা শার্টে দেউড়ি পার হইয়া, আইসক্রিমওয়ালার পাশ দিয়া, ধুলোরাস্তা পার হইয়া, সোজা উত্তরে হাঁটিতে থাকি। তখন পলিদের বাড়ির বাইরে ধানকলে চলিতেছে ধানবানা, ওদের হোটেলের ড্রেনে মুখ গুঁজে প্যাঁক প্যাঁক করিয়া চলিতেছে ডানাকাটাহাঁস-পাতিহাঁস, মুরগি ব্যস্ত খড়কুটোর অšে¦ষণে আর আমরা তখন পেয়ারা গাছের তলা দিয়া স্কুলগমন করিয়া চলি। তখন সবই কোলাহলে নিপতিত, প্রেমে প্রসিদ্ধ। নতুন জামগাছের তলায় তখন লাইন করিয়া ধারাপাত পড়াইতেছেন বন্ধু মালেক। আর সবাই তা সুর করিয়া পড়িতেছে। মালেক পরে বাসের ছাদে কন্ডাক্টরি করে। একবার দেখা হইলে ভাড়া ছাড়াই সে বাসে ওঠায়। আমরা গদগদ হইয়া যাই ওসব কৃতজ্ঞতায়।
এছাড়া সে সব দিনের কোনো এক সময় রাত্রি জুড়িয়া  ৩৯০ গরম নামিয়া আসিলে ফজলুর গল্পের সূত্র ধরিয়া বাইরের প্রাচীরের পাশ দিয়া আমরা আনমনে হাঁটিতে থাকি। আর প্রাচীরের ওপাশের জানালার দিকে এক মেয়েবন্ধুর অপেক্ষার প্রহর গুণিয়া চলি। সেখানে কী আছে জানি না। তবে ডগমগে মেয়েদের শরীর নিয়া যে গল্প ওবায়েদ, মিঠু বা হীরারা জানাইয়াছিল বোধকরি সে সবই সংকোচভরে খুঁজিতে চাই। কারণ, জানিতাম সে বান্ধবী বড় খোলামেলা ও দিলদরাজ। এসব লোভনীয় প্রস্তাবে আমরা শরীক হইতে পারি কিনা সেজন্য বয়সের একটা তাগাদা ছিল। তবে কোনো গহীন আঁধার জঙ্গলে, বিচিত্র তরুবিথীতলে সমকামী হইতে চাইলে আমাদের বন্ধু জোটে। সেটা উভয়ে উভয়ের অদ্ভুত আমুদে প্রলুব্ধরঞ্জিত। এ কৈশোরবন্ধুরা সবাই একরকম সেক্সী নয়, বনমর্মরতলে বনগাত্রে শীৎকারের ধরনেও তাহাদের মাত্রাগত পার্থক্য থাকে। প্রণয়পাপী হই বলিয়া সবকিছুই ঘটে দিবান্ধকারের প্রশ্রয়ে। কীট-সাপ-জোঁক তুচ্ছ করে পরস্পর সুখসন্ধানী হলে স্খলিত বীর্যে জমে ওঠে যাবতীয় পাপময় নিষ্পত্তি। অপাপবিদ্ধ শরীরে আমরা কি সত্যিই পাপী হইয়াছিলামজানি না, তবে পুরুষবীজে প্রজন্মশিকারের তত্ত্বটি আমরা শিইখা ফেলি। স্কুলপালানো মধ্যাহ্নদুপুর বা বিকেলপর্বের অনেকগুলা সময়ে আমরা প্রণয়পাপী। সিও অফিসের নির্জন দোতলা, জনমনিষ্যিহীন টিডিসি হলের ছাদের শেষ প্রান্তে, তালপুকুরের গাছছায়ায়, বিলের মুখোমুখি পলিপড়া ধানক্ষেতের আইলে, সন্ধ্যাবেলায় স্কুলঘরের খোলারুমের কোণায়, প্রজাপাড়ার শেষপ্রান্তে অন্ধকার আড়ার ভেতরে আমরা নগ্নজীবনকে চুম্বন করিয়া চলি। অপার আস্বাদে এক পার্থিব জীবনের অপূর্ব অভিজ্ঞতায় আমরা ‘হইয়া উঠি’। কিন্তু অ-সুখ থাকে। কারণ, তাবৎ নারীরা থাকে অধরা। প্রশ্নাতীত প্রশ্নে নারীরা জর্জরিত কিন্তু ক্রণিক-কীটে ভয়-সংস্কার আর লজ্জা হয় না পরাস্ত। কবেকার পাড়াগাঁর ভেতরেই সে সব বন্দী হইয়া যায়। সত্যিকার অর্থে, আমরা বয়সের ফাঁদে পড়িয়াছিলাম। জীবনের উত্তেজনার জন্য অনেক কিছু করিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু শেষাবধি হয় নাই কিছুই। তখন চলচ্চিত্রের নায়িকারা আমাদের সম্মুখে আসে। তারাই হইয়া ওঠে মডেল। যৌনতাকে তখন প্রেমে পর্যবসিত হইতে দেখি। সঙ্গীতের ভেতরেই তা তখন সবচেয়ে অমলিন হইয়া যায়। সুচিত্রা সেনের নামসুনাম জানিলেও আমরা তখনও তার প্রতি অপরিচিতই রহিয়া যাই। উত্তমকুমারের মৃত্যুসংবাদও আসে আমাদের কাছে অনেক পরে। ‘পথে হলো দেরী’ বা ‘সবার উপরে’ ছবিতে আমরা মুখ ডুবাই অনেক পরে। কিন্তু বাংলাদেশের ‘আসামী’, ‘পুত্রবধূ’, ‘অবুঝ মন’ ছবিতে আমরা অবুঝ হইয়া যাই। কতোকাল আমরা দেখি একজন ভিলেনের কারণে সুশৃঙ্খল প্রেমের সংসার তছনছ হইয়া যাওয়ার সংবাদ। অসহায় প্রেমিকের নিষ্পাপ আকুলতা। প্রথম দর্শনে, না-জানিয়া প্রেমে পড়া নায়িকা, সে ফিরে আসিতে বলিয়াছে তার প্রেমিককে বেদনাভরা- বিষাদকাতর ভালোবাসায়। গীতল আবেগে নায়কের নির্মম বাস্তবতাও যেন হার মানিয়াছে নায়িকার নিষ্পাপ মুখশ্রীর কাছে। আমরা তখন যৌনতার বিষয়কে অতিক্রম করি। একপ্রকার অপার্থিব শিহরণের সন্ধান পাই, গাঁথা হইয়া যায় আমাদের জীবনের প্যানোরামা। রমনীশরীর বা স্তনবিষয়ক কল্পকথা বাস্তবের মুখামুখি হইতে চায়, অনেকরকম ফন্দি-ফিকিরের চেষ্টায়। অনেক আজগুবি গল্প রচিত হয়। সে সব গল্পে হসির খোরাক যেমন হয় তেমনি আনন্দময় সুখী-সুন্দর সময় আমাদের ছাড়িয়া যায়। একদিন পেছনে তাকিয়া দেখি, সত্যমিথ্যা-বাস্তবকল্পনার ভিতর দিয়া আমরা অনেকটা বয়স্থ হইয়া পড়িয়াছি। অনেকবার জুলুম চালাই নিজের ওপর, কখনোবা অন্যের সহযোগিতায় কিন্তু সব অতিক্রম কইরা এককালে আমরা পড়াশোনায় ফিরি। প্রতিযোগিতায় মাতি। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে ‘প্রথম’ হওয়ার প্রতিযোগিতায়, রাত জাগার গল্পে বা অনুকরণে পৌঁছাই। কারণ প্রথম হওয়ার লোভটা তখন আকাশচুম্বী। ভালোছাত্র হওয়া চাই। কুকাজ বা পাপপুণ্য ছাড়িয়া একটাই গন্তব্য হইয়া ওঠে, পড়াশোনা করা। রমজান পড়াশোনায় ফেল করিয়াছিল কিন্তু আমরা স্থানীয় হিসাবে শিক্ষকদের সহায়তায় বেশি নম্বর পাইয়া যাই। সততার শক্ত দায়িত্ব তখনও আমাদের কাছে পরাভূত। তবে আমরা অনেককেই পার হইয়া যাই। নকল করা বা ভালো রেজাল্ট করা তখন দুটাই যোগ্যতা। কিন্তু এক্সপেল হইলে জনতার মুখে ‘হতভাগা’ নাম ওঠে। গোটা অঞ্চলে তার নামে দুর্নাম ছড়াইয়া পড়ে। নিজের নামের সঙ্গে তা যুক্ত হয় চিরকালের জন্য। মাধ্যমিক পরীক্ষার গুরুত্ব তো তখন অনেক উঁচুতে। কতোদূর থেকে ওরা আসিতো? বহুমুখি, দ্বিমুখি উচ্চ বিদ্যালয় হইতে পরীক্ষা দিতে আসে, সে অনেক দূর! বড় বড় লম্বা প্যাচানোমার্কা চুল, পাতলা গোঁফ আর স্যুট-বুট পরিয়া। কী দাম তখন ওসব ছেলেদের? উচ্চমাধ্যমিক বা অনার্সমাস্টার্স এসব পড়াশোনার নাম আমরা জানি না, তবে এসএসসি পাশ মানে অনেক বড় কিছু। কয়েক পাড়া-গ্রাম জুড়িয়া একজন কি দুজন তা পাশ করে। তারা শিক্ষিত, তাদের পড়াশোনা ও মর্যাদাও অনেক বেশি।

গঙ্গারামপুর গ্রামে খুব কম সংখ্যক মানুষ বাস করে। উত্তর দিকে খালুবাড়ির ভিটের পরে ফাঁকা, দক্ষিণে খুব বেশি হইলে অর্ধকিলোমিটার, পশ্চিমে নবুয়াত খলিফার বাড়ি আর পুবে একটা ছোট্ট শাখানদী যেটি শীর্ণস্রোতে পৌঁছাইয়া গেছে বড়বিলের পুবকোণায়। এ নদীটা আমরা একবার পার হইয়াছিলাম বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়া। আর ঘাড়ে ছিল সাইকেল। রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ আঙুর’পার বিয়েকর্ম শেষ হইলে আব্বার সঙ্গে আমাদের এ পথেই বাড়ি আসিতে হয়। কারণ, অন্যরাস্তায় নাকি ডাকাতের ভয় বেশি। আবার বাড়িতে তেমন কোনো পাহারাদার কেউ ছিল না, তাই না-ফেরার কোনো বিকল্প নাই। খাড়া জোৎস্নার সমারোহে সবকিছু তখন নির্মল শুচিস্নাত। দেখা যায়, বিজন পথে, সড়সড় শব্দে সাইকেল চালাইয়া আব্বা আগাইয়া চলিতেছেন সম্মুখপানে। সামনে জুতাপরা অবস্থায় তখন লোহার ডান্ডিতে বসিয়া থাকা। মৃদু ভয়ে বুক কাঁপিতেছে। যদি ডাকাত আইসাই যায় তবে কী-বা করা আমাদের? ঘুমন্তপাড়ার নির্ঘুম আমরা দুজন নিছক কথা বলি গল্প বলি ভূত তাড়াবার জন্যে। তবে সে যাত্রাই আমাদের শেষ যাত্রা হইয়াছিল। সে খালুর বাড়ির রাস্তায় আমরা গেছি বহুবার। তাহাতে যাতায়াতে কতো কষ্ট, বিশেষ করে ওই বড় পুলটার কাছে। বাঁশ দিয়া বানানো সে পুল। অনেক উঁচু। দক্ষ সাইকেল চালক হইলেই ভয়ঙ্কর পুলটা পার হওয়া সম্ভব। আমরা পুল থাইকে দশহাত দূরেই নাইমা পড়ি। তারপর সতর্ক সাইকেল ঠেলা। তখন ভরা বর্ষা। থৈ থৈ পানিতে সবদিক যখন টইটুম্বুর তখন দেখা যায় গ্রীবা উঁচু কইরা একপায়ে দাঁড়াইয়া আছে সাদাবক। আকাশজুড়ে ওড়াওড়ি করিতেছে বলাকারা। মিহি আলোয় কোনোমতে জাগিয়া আছে সরু রাস্তা আর পীঠউঁচু বাঁশের সাঁকো। সে পানিতে চলে তখন বিচিত্র রঙা পাখির ফুড়–ৎ আওয়াজ আর ঘননীল আকাশধোয়া শুভ্রশান্ত নুয়ে পড়া প্রকৃতির বর্ণিল সমারোহ। কতোকালের যেন সে সন্ধিউৎসব। উদাস বকের নিশ্চুপ গুণ্ঠনবার্তা আর মায়াজড়ানো সন্তাপ আমাদের করিয়া তোলে খেয়ালী। সকালের জলগর্ভ প্রান্তর সূর্যডোবা বিকালে ঘাসের কচিডগায় পরাস্ত হয়। সন্ধ্যপথে বর্ষাবিধৌত প্রান্তরে সমস্বরে বেঙ ডাকে, আইলের কোণায় বেঙ আর সাপের টানাটানিতে পানি-আওয়াজ ওঠে। শিউরে ওঠা হাতলোমে তখন বিরান হয় অন্ধকার আর ভীরু হাওয়ার চুম্বন। তখন ঢেউ তোলে বুক ঠেলে বাঁশপুলের তল দিয়া সাঁতরায় মোটা দশহাত ডারাসসাপ। মাথা তুলে ত্রস্ত ঢেউয়ে সাঁই করে ঢুইকা পড়ে পানিভূমে। ঘাসডগার পাশ দিয়া সাঁতরাইয়া কোথায় দূর অঞ্চলে চলে যায় সাপটি। তখন চতুর্দিকে সাড়া জাগে বিচিত্র সব ধ্বনি আর বিপরীতে হিমঠাণ্ডায় সবকিছু দ্রবীভূত। দূরে দেখা যায় মশালের আলো, কখনো তারা কখনোবা জোনাকীপোকার মতো। মাতম করে সব ঝিঁঝিঁ একত্রে। আমরা সড়কে পড়ি, নির্জনে বিপদগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে। তখন পাথার জুড়িয়া ডাকাত-ভয়, তাদের বিভিন্ন এজেন্টদের ভয় ও শঙ্কা নানামুখী। কোটাঘর আর আলোর পথে আমরা রাতে হাঁটিয়া যাই। উপরে খোলা আকাশ তখন আঁধার-গম্ভীর। দূরে বড়োরাস্তায় গাড়ীর আলো মিটিমিটি জ্বলে আর নেভে, কতোকালের নিশ্চুপ ভয়ার্ত সমীরণ গ্রাস করে আমাদের, আমরা পান করি সে সব তিমিরসন্ধ্যার আর্তি, হাঁটি-হাঁটি আবার দ্বিচক্রজানে উইঠা বসি। গঙ্গারামপুরের রাস্তাটা বেশ চওড়া, কখনো তাতে সাদাধুলোমাটির পাতলা বালুকণা কখনোবা স্যাঁতসেঁতে। বাঁক ঘুরাইয়া সারিলম্বা পুরনো নোনাধরা ইটের দেওয়ালের পাশ দিয়া বামপাশে হলদেগাছের সারি আর ঊর্ধ্বাকাশের শিমুলগাছের ফুল মাড়াইয়া আমরা গর্তপাড়ি দিন অতঃপর খালাবাড়ির উদাস করা আঙিনায় পৌঁছানো। বিরাট সমতলে ঘাসবিছানো সে আঙিনা, সেটির উত্তর দিকটা আরও মায়াবী অপরূপ-সুন্দর। ঢালু তার বিস্তার এবং দখিনা হাওয়ার সারাক্ষণ খোলামেলা খেলা সেখানে। সেটি পার হইয়া আমরা চলিয়া যাই এক সময় জাম গাছে জাম খেতে, আম গাছে আম খাইতে। সরু আইল হাঁটিয়া কতোদূর যেন চলিয়া যাওয়া! কতো রকমের ফুল আর ফলের বনবাদাড় আর আড়া। তবে ফিরিতাম আঙিনার কোণার বড়ো শিমুল গাছটাকে সাক্ষী রাখিয়া। সে সব পার হইয়া কাছারি বারান্দা, আর তার পাশে বিরাট লম্বা উঁচু কোটা ঘর। কতোগুলা যে ঘর আর এপার-ওপার করে চলাফেরাচেনা মুশকিল। চওড়া বিছানায় বসে বিরাট চালায় ধানের আটায় পিঠা নিয়া বসিয়া আছেন খালা। আমরা হাতে নেই আর কাছারি বারান্দায় চইলা যাই, কতোরকম খেলা আর দুষ্টুমি, বর্গাওয়ালা বারান্দা আর উচুঁ করে বনেদী রীতিতে আটকানো সব ঘুরানি বারান্দা, উপরে কেমন যেন নকশা কাটা, ওগুলাকে আমরা সাক্ষ্য মানি। পাশের ডালিম গাছে বড় বড় ডালিম হইলে সে সব দেইখা সুর কইরা ছাড়া কাটেন আব্বা, ‘ডালিম ফল পাকিলে নিজেই ফেটে যায়/ ছোটলোক বড় হলে বন্ধুকে কাঁদায়’। ডালিমের সঙ্গে মিল রাখিয়া এসব ছড়া আমরা স্কুলবন্ধুদেরও শোনাই, মর্মকথা উদ্ধার করি তবে কিছুই বোঝা হয় না।
সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক নামে গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবী চাপানো, মুখলাল পানে উজ্জীবিত এক নেতাকে প্রথম দেখা যায় আমাদের স্কুল মাঠে। তবে নিশ্চয়ই তিনি মোজাফ্ফর আহমদের চেয়ে বড় নেতা নন। মোজাফ্ফর আহমেদকেই আমাদের বেশি ভালো লাগে। তিনি হাফহাতা স্যুটপরা ফর্সা মানুষ আর মানিক সাহেব একটু সাধারণ, আর জনসভাতেও লোকজন কয়েকজন, শ’খানেক হলেও হইতে পারে। স্কুলমাঠের রাস্তার দিকের ছাদপেটা সাদা বিল্ডিংয়ের ছায়াটা তখন একটু লম্বা হইতে শুরু করিয়াছে, লালপতাকা হাতে সবাই ক্লান্তিতে অবশ। চলিতেছে পদযাত্রা, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ । ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’ শ্লোগান কাঁধে নিয়া। খুব গুরুত্বপূর্ণ এ শ্লোগানটি আমরা গাঁথিয়া ফেলি এবং প্রথম শুনি। লালকালো পোস্টারে গোটা বাংলাদেশের চিত্র, পদযাত্রা যাবে কোন্ পথে তার মাইলপোস্ট চিত্রিত সেখানে। আমাদের লোভ হয় এতে অংশ নেবার, পথচলার আনন্দ উপভোগের। বারমাইল পর পর যাত্রাবিরতি, সুতরাং কষ্ট কী? তবে একদিন কমরেড ফরহাদের মিটিংও হয় এ মাঠে, সেখানে বেশি লোক ছিল না, সাধারণ মানুষ এসব বক্তৃতার তেমন গুরুত্ব বোঝে না। অথচ অনেক পরে আমরা জানি, তিনি কতো বড়োমাপের নেতা। তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রীর জনসভায় এমনিতেই খুব বেশি লোক আসিয়া পড়ে। গাড়িবহরে চড়িয়া প্রশাসনের কর্মকর্তারা তখন বিচিত্র ভঙ্গিতে মহড়া দেন, তাদের সিকিউরিটি থেকেই তৈরি হয় ভিন্ন পরিবেশ। সাবেকমন্ত্রীদেরও গুরুত্ব তখন অনেক। হাকে-ডাকে তারা ‘মিনিস্টার’ নামেই পরিচিত থাকেন।


আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নেতার অবয়বে বড় হন। অশিক্ষা আর অশুদ্ধ উচ্চারণে তাদের মুখ ভর্তি। ভাইবোন হোটেলের আড্ডায় অনেকেই কর্ণেল ওসমানীকে গালাগাল করিতে থাকেন। হাফপ্যান্ট আর স্যন্ডোগ্যাঞ্জিতে আমরা তখন সবদিক চরিয়া বেড়াই। এক সময় লোকমুখে জানিয়া যাই ডাকবাংলা মাঠে কর্ণেল ওসমানী আসিবেন। কেন বা কি কারণে তা বোঝা যায় না। তার দলই বা কি সেটাও জানা যায় না। তবে ছবিতে কোকড়ানো গোঁফের কারণে তিনি আমাদের নিকট অন্যরকমে পরিচিত হন। পোস্টারে আমরা তার ছবি দেখি। গোটা মুখ জুড়ে পোস্টার। সাদা মুখাবয়বে লাল পোস্টারে উজ্জ্বল মুখচ্ছবি। খুব মাতোয়ারা গোঁফ। ‘ওসমানীকে ভোট দিন’এমন লেখা থাকিত। তবে ছবির মানুষ যখন বাস্তব হইয়া আসেন তখন তার গুরুত্ব অনেক আলাদা। উপরের পোস্টার ছাড়িয়া তিনি যেন নামিয়া আসিয়াছেন মাটিতে। অনেকটা প্রভুতুল্য ব্যাপার। শুধুই গোঁফের কারণে তিনি আমাদের নিকট দেবদূত। তৃতীয় শ্রেণীর পরিবেশ পরিচিতি সেবার প্রথম স্কুলে আসিয়াছে। ভাগ্যগুণে আমরা দ্বিতীয় ব্যাচে তা পড়িতে বাধ্য হই। সেখানে ওসমানী সাহেবের ছবি ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। আমরা নেতা বা অন্যকিছুর বাহিরে এ ছবির দেবতাকে নতুন করিয়া পাইব সেটাই তখন গুরুত্বপূর্ণ। ডাকবাংলা মাঠের দিকে দ্রুত সবাই রওনা হই। কেন যেন তখন হঠাৎ চিকন দেউড়ি দিয়া মামা আসিয়া বলিলেন ‘কর্ণেল ওসমানী ফির নেতা হলো?’ আমরা এসবে কান দেই না। ডাকবাংলা মাঠে তখন কেবল লোকসমাগম হইতে শুরু করিয়াছে। রাস্তার পাশে গাড়িচলাচল হইতেছে হরদম। খুব পুরনো এ ডাকবাংলা ঘরে চেয়ার পাতা হইয়াছে। মাইকে গমগম আওয়াজ তুলিয়া তরুণ বক্তারা মারকুটে বক্তৃতা করিয়া চলিতেছেন। একে একে অনেকেই আসিলে জনসভার পরিবেশ প্রগাঢ় হইয়া ওঠে। রাস্তার ধারে তখন অনেক ছায়াশীতল গাছ। সে সব গাছের গুঁড়িতে আমরা স্থানুর মতো দাঁড়াইয়া থাকি। মোটা তেঁতুলবৃক্ষ, জামবৃক্ষের মগডাল আমাদের হাতছানি দিয়া ডাকে। গ্রীষ্মের দাবদাহে তারা ছড়াইয়া দেয় সুশীতল হাওয়া। ওই বৃক্ষকুলই তখন মাইলপোস্টরূপে পরিগণিত। এসব বৃক্ষপানে তাকাইয়া আমরা মুগ্ধ হই, অসংলগ্ন ত্রস্ততায় অবারিত আনন্দে মুখর হইয়া উঠি। তখন হঠাৎ হুইসিল। সামনে পিছনে কয়েকটা গাড়িসহ বাড়ো টয়োটাগাড়িতে কর্ণেল ওসমানী আইসা হাজির হন। উজ্জ্বল ফটফটে চেহারা। সত্যিই কী বিরল শুভ্রগুম্ফর অধিকারী তিনি! বিস্মিত, হতভম্ব, দ্রুততার সে দৃশ্য। ফতুয়া গায়ে, ঘিইয়া রঙের প্যান্ট, পায়ে বেলওয়ালা চামড়ার সেন্ডেল পরিহিত তিনি খুব দ্রুত গাড়ি থেকে নাইমা মঞ্চের দিকে আগাইয়া যান। ঋজু, প্রাণবন্ত, শীর্ণ, একহারা গড়নের চেহারা তার। ঠোঁটজুড়িয়া গোঁফ, যা নির্দিষ্ট অঞ্চল পার হইয়া একটু উপরে উঠেই অনেকদিকে প্রসারিত। নিমীলিত চোখে আমরা সকলেই তাকাইয়া দেখিতে থাকি। জেনে যাই তিনি চিরকুমার। সেজন্য ‘পাপী’ অভিব্যক্তি তার! হাতের চামড়া একটু কুঁচকানো, মেরুদণ্ড সোজা, দৃষ্টি তার সম্মুখপানে প্রসারিত। কী বলিয়াছিলেন ঠিক জানা থাকে না, তবে বেশিক্ষণ নয়। মিনিট পাঁচেক বক্তৃতা করে একইভাবে মঞ্চ থেকে বিদ্যুতগতিতে নামিয়া গাড়িতে উঠিয়াÑ ছুট্। তবে প্রত্যেককেই তাকে মনে রাখেন ওই গোঁফের আকর্ষণে। অনেকদিন এ ঝটিকা সফর নিয়া আমরা নানা গল্পগুজবে সেঁধিয়া যাই। গোঁফ রাখার এ রকম ব্যতিক্রমের কারণে ধর্ম বা সমাজবিধি নিয়া আমাদের মধ্যে প্রশ্ন হয়। কিন্তু তার সর্বাধিনায়কত্ব আমাদের মন থেকে দূরীভূত হয় না। খুব ইস্পাতকঠিন ভঙ্গিটি খারাপ লাগে না। অনেকটা জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবেই তিনি তখন প্রতিষ্ঠিত। সে সব জনসভার দিনে যে কারো সফর বা আগমন আমাদের কাছে খুব উপভোগ্য ও আনন্দদায়ী মনে হয়। ক্রোশের পর ক্রোশ পথ হাঁটিয়া আমরা জায়গায় পৌঁছি। নেতাদের আড়ম্বর আয়োজনে অংশ নেই। দীর্ঘপথের জন্য আমরা তখনও আমাদের গ্রাম ছাড়া রাঙা মাটির পথ চিনি না। ঢাকা তখন অনেকদূর, তাই আগ্রহেরও বড় কেন্দ্র। আব্বা কী কাজে ঢাকা গেলেন। আমরা সন্ধ্যায় তাকে বাসে উঠাইয়া দেই, রাত এগারোটার ট্রেনের জন্য। সেবার ঢাকা থেকে ফিরিয়া অনেকসব কি কি আনিয়াছিলেন আমাদের জন্য। আব্বার প্রতি অমোঘ আমোদ আমরা টের পাই সে সব দিনগুলাতে। তবে তিনি কয়েকবার শিক্ষক প্রতিনিধির ভোট করেন। ভোটে একাধিকবার হাইরা গেলেও শেষবার জিতিয়া যান। সেজন্য আব্বা অনেক শিক্ষককে মাত্রাতিরিক্ত যতœ করিয়াছিলেন। খাবার-থাকার বা বিবিধ বিষয়ক দাবি-দাওয়ার কোনো কিছুই অগ্রাহ্য করেন নাই। দূরান্ত থেকে আগন্তুকদের রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। খালাসপীরের মনির মাস্টার, চত্রার জলিল মাস্টার, লাঠমিঠিপুরের মোজাহার মাস্টার, পঁচাকন্দরের আফের মাস্টারসহ অনেকেই আব্বার প্রিয়জন। তারা সার্বক্ষণিক আড্ডা বা আলাপে মশগুল। কিন্তু সারা জীবনে আব্বা কখনো স্ল্যাং শব্দ ব্যবহার করেন নাই। প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হইলেও না। তা ছাড়া নিয়মমাফিক সম্পন্ন সমস্ত কিছু। দূর যাতায়াতে এসব শিক্ষকরা বিব্রত হন। লালমাটির কাদারাস্তায় সাইকেল বা অন্য কোনো যানবাহন চলে না। চুরি-ডাকাতি-রাহাজানির ভয়ে আব্বার আশ্রয়ে রাতে সাইকেল রাখিয়া চলিয়া যান অনেক দূর। সে সব জায়গায় তাদের বাড়ি, বউসন্তানদের ঠিকানা। কোনো কোনো সময় থেকে যান, মার গালাগাল উপেক্ষা করিয়া আব্বা তাদের জায়গা দেন, যতœআত্তি করেন। পরস্পরের সৌহার্দ ও সম্প্রীতির মাত্রা অনেক বেশি। কখনো তারা আমাদের বাড়িকে অপর মনে করেন না। একবার আব্বার ভোট নিতে যাওয়ার সময় আসিল। আমরা রাতে কোনোদিন একা থাকি নাই, তাই আব্বার কথা খুব মনে আসিলো। রাত পোহালেই ভোট, কাদিরাবাদে। আগের দিন সাইকেল নিয়া বড়দরগা হইয়া কাদিরাবাদ যান। রাতে কোথায় যেন আশ্রয় নেন, পরে ভোট নিয়া বাড়ি ফিরিলে আমরা দেখিতে পাই আব্বার সাইকেল ভাঙা। তিনি ফিরিয়াছিলেন খুব ভোরে, আঁধার-অন্ধকারে। কেন এ সাইকেল ভাঙা, কে ভাঙিল তেমন কিছু জানা যায় না। তবে সে ইলেকশানে আব্বার কষ্ট অনেক। তবুও তার ভোটযাত্রা আর ভোরে ফেরা বেশ আনন্দদায়ী মনে হয় আমাদের কাছে। বৃষ্টি হওয়া বকুল আচ্ছাদিত রাস্তায় একাকী ফেরেন আব্বা, কয়েকদিন পর আমাদের হতাশারও অবসান হয়। বৃষ্টিবিধৌত সে সব দিনে আমরা দূর্বাঘাসগন্ধের প্রকৃতিতে আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠি। উদার আলোকিত আকাশ আমাদের মন ভইরা দেয়, তালপুকুরের কাঁটাগাছের পাতা ওড়ানো হাওয়া তাণ্ডবে আমরা সব প্রিয়কে ধরিয়া ফেলি।
শামসুল বিএসসি তখনও আমাদের শিক্ষক হন নাই। সবাই ‘অঙ্কের জাহাজ’ বলে তাকে। আমরা খুব বেশি সময় তার কাছে পড়ি না। তবে যেটুকু পড়ি এক্কেবারে খাঁটি। তার কাছেই ওয়াজেদ মিয়ার বিজ্ঞানী হবার সংবাদ শুনি। ইলেকট্রন-প্রটন-নিউক্লিয়াস এসব পড়াইতে গিয়া তার গবেষণার ক্ষেত্র নিয়া তিনি বলিয়া ফেলেন। জেনে যাই ওয়াজেদ মিয়ার নামই সুধা মিয়া। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়া তার পড়াশোনা। অনেক কিছু অনাবি®কৃত জিনিস তিনি নিজেই আবিষ্কার করিয়া ফেলেন। মেধাবী বিজ্ঞানী হিসাবে পরিচিতি আসে আমাদের নিকট। তখন স্কুলবারান্দা ছুঁইয়া মুষলধারে বৃষ্টি নামে। বেঞ্চে বইসা জানলা দিয়া দূরে ঝমঝম বৃষ্টি-আওয়াজ শুনিতে থাকি। সমস্ত সতেজ ঘাসে তখন ঘনকুয়াশা জমে। হেডস্যারের অফিসটা অদৃশ্য হইয়া পড়ে। দুটো কামিনীগাছ পাশাপাশি বিমূঢ় হইয়া দাঁড়িইয়া থাকে। শামসুল স্যার নির্বিচারে তখনও সুধা মিয়ার গল্প করিয়া চলেন। মেধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া ফিজিক্সের কীসব জটিল থিওরীর কথা বলেন। আমরা ওসবে আগ্রহ পাই না। বৃষ্টিধারায় তখন আমরা শায়িত। স্যার বারবার ভালো করিয়া পড়িতে বলেন। সুধা মিয়ার মতো হতে বলেন। তাঁর কৃতিত্বের কথা শোনান। তবে সুধা মিয়াকে কখনো আমাদের দেখা হয় নাই। তাঁর পরিবারের লোকজনদের আমরা নিজের করিয়াই পাই। কী করে তার বিয়েটা হলো তা একসময় নিতাই দার কাছে শোনা যায়। এ অঞ্চলের মন্ত্রী মতিউর তিনিই নাকি এসব বিয়ের মধ্যমণি ছিলেন। তবে সুধা মিয়া আমাদের স্মৃতিতে থাকেন অনেক বড় মানুষের মহিমায়। এমন নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানীর জন্য আমরা গর্বিত হই। ধন্য হয় ফতেহপুর গ্রাম। আর এ গ্রামেই টুকুদের বাড়ি। টুকুরও কথার মাঝে খুব গর্ব, ওয়াজেদ মিয়ার জন্য। একবার ফতেহপুর স্কুলমাঠে খেলা হলে টুকুদের বাড়িতেও যাওয়া হয়। বড়রাস্তা ছাড়িয়া ঢোপ দোকানের পাশ দিয়া ধানভানা কলকে পেছনে ফেলিয়া লালমাটির রাস্তায় ছায়াঘন আমগাছ পেরিয়া মোটা সাপরাস্তায় ওয়াজেদ মিয়ার বাড়ি দেখি। বাইরের দর্শন কিন্তু প্রাণরূপে অন্য গর্ব। সেবার আমাদের খুব ইচ্ছা হয় ভালো ছাত্র হবার, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, গ্রামজোড়া নাম কুড়াবার। টুকুরও তাই। সেজন্য আমরা রেশারেশি পড়াশোনা করি। পরস্পরের দিকে তাকাইয়া কে বেশি পড়ার টেবিলে থাকে তার প্রতিযোগিতা করি। কার পড়ার রাত বড় তা নিয়া পরের দিনে গল্পে রত হই। সে সব গল্পের মাঝে ঊর্ধ্বাকাশে তাকানো শিমুলরাঙা বৃক্ষে রৌদ্রআগুন জ্বলে, কুঁচকানো ফুলের পতনে ধুলোমাটির খেলায় তখন তর্ক থাকেকে যাবে কার আগে তার প্রতিযোগিতা বাড়ে। টুকু অনেক নম্বর পায় একটু বড় হলে সে আমাদের ছেড়ে বড় জেলা শহরে পড়িতে যায়। আমরা বন্ধু হারাই আর মনে মনে ভাবি টুকু সত্যিই ওয়াজেদ মিয়া হতে পারবে! আমরা ছোট হইয়া যাই। তখন শিমুলগাছের মোটা শাখা বেয়ে বৃষ্টিপানি নাইমা আসে, দড়দড় বৃষ্টিতে ছুটির ঘণ্টাও বাইজা ওঠে কিন্তু মুখচিত্রের হতাশা কাটে না। আমরা স্কুলপ্রাঙ্গণে আটকা পড়ি। বৃষ্টিমাতমে পৃথিবী কাঁপিয়া ওঠে, জামগাছ বহিয়া হুড়হুড় করিয়া পানি নামিয়া আসে, তরতাজা ঘাসে স্কুলমাঠ স্বচ্ছ হয় আর আমরা স্কুলঘরের এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত করি। পেছন দরোজায় দেখা যায় শুভ্রনীল আকাশ, কুয়াশাধোঁয়া বিরল মগ্ন প্রকৃতি। কী সুন্দর শীতমাখা বাতাস। নরম মৌনব্রত শান্তিস্বাদ সবকিছুকে ছাইপা যায়। তবে তখনও নুরুস্যার পঞ্চম শ্রেণীর নিখুঁত পাঠ দিতে থাকেন। মনোযোগী হইয়া সবাই তা শুনিতে থাকে সমীহের সঙ্গে, অঙ্কের ক্লাশে তিনি আঠারই ডিসেম্বর বৃত্তির জন্য পাঠ দিন। এ আঠারো তারিখ আমাদের কাছে মিথরূপে আসে। ছড়ায়-ছন্দে আঠারো আমাদের নতুন জীবনের কথা বলে। শয়নে-স্বপনে আঠারোর স্বপ্ন দেখি আমরা। সুন্দর শীতপ্রাতে ‘পল্লীনদীর জলে ভাসাইয়া’ আমরা আঠারোর অপেক্ষা শেষ করি। এ দিনটি আমাদের সব থেকে আলাদা। স্যাররাও সে তারিখের আবেগে অংশ নেন। সমস্ত প্রকৃতি, দিনমান, বহমান হাওয়া, বিধৃত দিনকাল সর্বত্র একটা সুখ লাগিয়া থাকে এ দিনের জন্য। আমরা চিরদিনের জন্য ভালোবাসি এ দিনকে। কতোকালের প্রকৃতিগন্ধ যেন মিইশা আছে এ দিনে। তবে সত্যে মিলিলে বলা যায়, আমরা ওয়াজেদ মিয়া কেউই হতে পারি নাই, সম্ভাবনা সুদূরপ্রাতেই মিলায় কামরাঙা দৃশ্যে। বাড়তে পারে না আমাদের সে সব স্বপ্ন বেশিদিন। আমরা স্বপ্নে দেখা মানুষ আর স্বপ্নের রাজকন্যা ছন্দে-আনন্দে খুঁজিতে থাকি সারাক্ষণ।

‘কুড়াল কোম্পানী’ প্রায়ই আসিতেন আমাদের এলাকায়। বেটেখাটো, উঁচুলুঙ্গিপরা, কোয়ার্টার স্লিভ পাতলা গেঞ্জীর ভাসমান মানুষ। কেন তার নাম কুড়াল কোম্পানী তা জানা হয় না। তিনি বিচিত্র সব ম্যাজিক দেখান। খুব ভয়ঙ্কর সব ক্যারদানি। মহিরের বেকারীর দোকানের পাশে বটতলার ফাঁকা জায়গায় হুড়মুড় কইরা সব বাক্সপেটরা রাইখা কবর খোঁড়া শুরু করেন কুড়াল কোম্পানী। চিকন, লম্বা সে কবর। খুব দ্রুত রোমশ বাহুতে কোদাল উঁচু কইরা তুমুল শক্তি খরচ করিয়া তাহা খুঁড়িয়া ফেলেন। এর মাঝেই মানুষ জড়ো হইতে থাকে। বিশেষ করে স্কুলযাত্রী শিক্ষার্থীরা। প্রায়ই তার আগমন সকাল দশটা নাগাদ। এরপর ওখানে নিজের দাফন, নাক দিয়া বিশালাকৃতি লোহা ঢুকিয়া মুখ দিয়া বাহির করা, বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়া মানুষ কাটিয়া ফেলা, ফিনকি দিয়া রক্ত ছুইটে চলার দৃশ্য প্রভৃতি রোমহর্ষক কর্মকাণ্ডে তিনি সমস্ত দর্শকের মন জয় করিয়া ফেলেন। অনেক সাহায্য পান, একের পর এক নানা রঙের খেলা দেখিয়া। কুড়াল কোম্পানীর এসব খেলায় আমরাও আত্মনিয়াাগ করি। মাসাধিককাল গত না হইতেই তিনি আবার আসেন অন্যরকমের খেলার পয়গাম নিয়া। অনেকরকম বাক্সপেটরা তার। সাথে একটা পিচ্চি বাচ্চা। ও সব কাজে তার সহযোগী। অনেক লোক ঘিরিয়া তার ডুগডুগি শুনিতে থাকে। ডুগডুগির লয় ছন্দোময়। যতো ছন্দ ছাড়তে থাকে ততোই হুমড়ি খাইয়া পড়িতে থাকে মানুষ। এক সময় বটপাকুড়বৃক্ষে উইঠা পড়ে মানুষ। ডালের আগায় পৌঁছাইয়া সে অবাক দৃশ্য দেখে বিরু, জোহা, লেপনসহ অনেকেই। তবে কুড়াল কোম্পানী এক সময় খেলো হন, যেমনটা স্বাভাবিক হইয়া যান মাধবের চানাচুর বিক্রেতাওয়ালা কিংবা রহমান হকার। মাধবের চানাচুর বিক্রেতার কোঁকড়ানোচুল, পরনে ময়লা ঢোলা প্যান্ট আর হাফ সাফারী পরা জামা এক সময় বিরক্তির উদ্রেক করে আমাদের। এক বেশে এক কাজে কতোদিন তাকে দেখা যায়? তার স্বাদযোগ্য চানাচু আর দ্বিতীয়টি ছিল না। কী করিয়া হাঁটিতেন সারাদিন এই বয়স্ক ভদ্রলোক জানি না। তবে বিরামহীন প্রাত্যহিক তার সে সব চলাফেরা। ঠিক সূর্যসময় ধরে ধরে। আর রহমান হকার আব্বার খুব প্রিয় মানুষ হইয়া যান। একগাদা নিউজপেপার বগলে নিয়া ছুটছেন। এসেই দুটো চকচকে পেপার ফেইলা দিয়া বলেন ‘জিয়ারে মাইরা ফেলাইছে, সব এক লাইনে, শেখ সাহেবরে মাইরা এমন কাম শুরু করচে এটা আর শ্যাষ হবো না।’ বলিতে বলিতে মুখে ফ্যানা আর তীব্র শ্লেষ ঝরিয়া পড়ে তাহার। কী অদ্ভুত মানুষ! কতোকাল তিনি হারাইয়া গিয়াছেন আমাদের দৃশ্যপট থেকে? খাটো পাঞ্জাবী আর লুঙ্গির সঙ্গে কালো জুতা, ঘাড়ে বিভিন্ন সাপ্তাহিক-পাক্ষিক নিয়া হাঁটেন তিনি অবিরত। প্রতিদিন তিনটি থানায় তিনি পেপার দেন। আমজনতা তার পরিচিত। কোথায় কি সব খবর তা তক্কে তক্কে জানান। রহমান ভাই হাসেন কম, পঁচাত্তর পয়সার পেপার দিয়া খুচরাটা নিজেই ফেরত দিন। আমরা তখন পরিচিত হই ‘অবজারভার’, ‘ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’ এসব পত্রিকার সঙ্গে। সবকিছুর মধ্যে ‘ইত্তেফাকে’র গ্রাহকই বেশি। ফেরীর সঙ্গে তাল মিলাইয়া পেপার আসার বিষয়টি নির্ধারিত হয়। পেপার না আসিলে রহমান ভাই বলেন, আজ আসে নাই, কাল দুইটা পাইবেন। মুক্তিযোদ্ধা আর মুজিবভক্ত রহমান ভাই চলিতে চলিতেই হঠাৎ প্রয়াত হন। আমরা কষ্ট পাই, গোপনে কাঁদি, মসজিদে সিন্নি দেই। তিরতির করা নিস্তব্ধ শূন্য আকাশচাঁদে আমরা তাহাকে খুঁজে ফিরি বহুদিন বহুবার। কখনো ব্যঙডাকা জ্যোৎস্না মোঠোপথে, কখনো শরণার্থী মহিরের ফেলে যাওয়া শূন্য ভিটায়, কখনোবা নিস্তব্ধডোবায় শীস বেরুনো খররৌদ্রে। আহা! সমস্ত স্বীকারে-অস্বীকারে রহমান ভাই আর ফেরেন না। কিন্তু আমাদের ভেতরে তিনি বারবার ফেরেন, ছায়াপথ হইয়া, দৃশ্যপথের ছবিরূপে কিংবা দূর থেকে নির্বিকার হাঁটিয়া আসা এক পথিকনবী হইয়া। একই রকমে একসময় কুড়াল কোম্পানীও আর আসেন না। অনেকদিন… অনেকদিন… করে আর আসেন না তিনি। শীলামুখ কর্মঠ এ মানুষ কবে বিস্মৃত হন, আমাদের আড়াল হইয়া যান জানি না। দোকানদারদের বা এলাকাবাসীর মুখে কুড়াল কোম্পানী থাকেন অনেকদিন। তারপর নাই আর! তবে ইলেকট্রিক বাতির পোল পোতা হলে, ক্রমশ এলাকায় বিদ্যুত আসিলে আর পাল্লা দিয়া অনেককিছু হইলে কুড়াল কোম্পানী তখন আমাদের এলাকা ছাড়িয়া গ্রামে যান। রামনাথপুর, শুখানচৌকি, হরিরামপুর, মদনখালি, কুতুবপুর এসবে তার পসার ভালো জমে। এবং সে সব অঞ্চল থাইকা কখন যেন তিনি মিলাইয়া যান। পরে এক সময় তাকে আর দেখা যায় না। ফিরিয়া আসেন না। তবে কুড়াল কোম্পানীর সেই রড ঢোকানো হাঁ-করা মুখ অনেকদিন আমাদের চোখে ভাসে। কতো কষ্ট করে তিনি সেই বাঁকানো রডটা নাকমুখ দিয়া বাহির করিয়া কয়েকবার নাক পরিস্কার করে স্বাভাবিক হন তা আমরা বুঝিতে চেষ্টা করি। মনে মনে কষ্ট পাই, বেশি পয়সা দেই। মনে মনে একসময় কুড়াল কোম্পানী হবারও স্বপ্ন জাগে কারণ সে ম্যাজিকে অনেকের হাততালি পাওয়া যায়, নতুন কিছু দেইখা বাহবা পাওয়া যায়। কিন্তু তা আর হয় না। কারণ, কুড়াল কোম্পানী আর ছায়া পান না আমাদের। আমরা তখন বড় হইয়া কৈশোর ছাড়িয়াছি, জীবনের অনেকটা হারাইয়া ফেলিয়াছি, বেদনার রঙ তখন অনেক গাঢ় ও ত্রস্ত। তবে কেন যেন সে সব খুব সিজনাল থাকে। আমরা প্রকৃতি দেইখা খুব মজা পাই, উল্লাস করি। বর্ষা নামিয়া গেলে আখিরার ওপার জুড়িয়া অস্তরাগে রাঙায় সিঁদূররাঙা আকাশ, কালো মেঘের ভেলায় ভাসাইয়া বেড়ায় আকাশ কিংবা কোনো সবুজ ক্ষেত্রের আইল বেয়ে কলকল শব্দে উঁচু থেকে নীচুতে নামিয়া যায় স্বচ্ছতোয়া জলের স্রোত। আমরা তাহাতে দলবেধে পা ধুই, পা ডুবাই, পানিস্রোতে নিজেরা হাঁটি, গড়িয়া পড়া জলে নিজেরাও গড়িয়া পড়ি। প্রকৃতি তখন রোদহীন, শান্ত-মুখচোরা। সবগুলা মানুষ ছুটিতেছে তখন দিনান্তের কর্ম সারিয়া কোনো মফস্বল এলাকায় নিজের আস্তানায়। আমরা ত্রস্ত-কম্পমান মানুষদের দেখি, পিছু হাঁটা দিন, চলে যাই অনেক দূরে। নখারপাড়া, ধূলগাড়ী চলিয়া গেলে দেখি সে সব বাড়িতে গরুর হাম্বারব, বস্ত্রহীন শিশুদের উল্লাসমাখা আনন্দ শোরগোল, নির্বাক দৃষ্টিঢেউয়ে তাকাইয়া থাকা মুখশ্রী, কোটাবাড়ির ভেতরে বিরাট উঠানে কোনো পারাবানা ঢেকিতে জননীকণ্ঠ, মাত্র উনুন জ্বালানো লালশাড়ির নতুন বউ আর ভীরুশান্তপ্রকৃতিফেরত কোনো গৃহস্থের ঘরে ফেরা। অনেকগুলা ঘর, সবই কাঁচা মাটির কারসাজিতে রচিত। জানিয়া যাই ওসব মানুষের মনও কাঁচামাটিতে তৈরি। নূরুর মা হাঁকাহাকি করিয়া কাঁসার থালে দুধমুড়ি আর টাক থেকে গলে যাওয়া চিনির বয়েম নামাইয়া সকলকে সামাল করে। কাজে নাইমা যায় ঘোমটা দেওয়া কে কে সব। তখন বাইরে কালোমুখ অন্ধকার ঘনাইয়া আসে। আমরা ফেরার প্রস্তুতি নেই। বৃষ্টিমাখা প্রকৃতি তখন ধুইয়া দিয়াছে সমস্ত রাস্তা-ঘাট-নদী-পুকুর-জলাশয়। নূরুদের বাড়ির বাইরে তখন গাছজুড়ে পাখিদের মেলা, কিচিরমিচির শব্দ, স্তব্ধ পুকুরের শান্তভাব উপচাইয়া ঋষিবেশ তড়াসধ্যান আর একপায়ের তালগাছে বাবুইবাসা দোলান কলরব। আমরা অতিক্রম করি সবকিছু, সান্নিধ্যে থাকে আমাদের পেছনপরিবেশের জায়গা হরণকারী ওই ধ্যানীপুকুর। কুলগাছের ডাল নুইয়া পড়া পুকুরে তখন আমরা নার্সিসাস, সারবাধা কলাগাছের পাড়ে ঊর্ধ্বাকাশের নীলচাঁদোয়া রূপ, হেলানো পেয়ারা গাছের লম্বাডালের মাথায় কুটকুট কামড়ানো কাঠ্ঠোকরা জলবিম্ব পায়। সে পুকুরের পাশ দিয়া প্রস্থান হইলে ছিপছিপে কাঁদায় পা আটকায়। চলতিপথে তখন ওপারে দাঁড়ানো পুরনো বিশইঞ্চি চওড়ার লম্বা দেওয়াল। কার্ণিশ ছুঁইয়া সরুরাস্তায় পা টিপাইয়া আগাইতে থাকিলে পুকুরপানিতে গুঁইসাপ সাঁতার দেয়, পাড় ঘেষে সোনাব্যঙ বইসা থাকে আর পনপন আওয়াজে পানিপোকা স্কেচ আঁকে। জানা যায় এই পুুকুর এজমালি। এখানে পুকুর ডাক উঠিলে সবাই লাভবান হয়। কৈ-শিং-মাগুরের মেলার এ পুকুর অনেক প্রাচীন। কয়েক একরের এ পুকুরের পর কাঁচারাস্তায় পৌঁছান নূরুর প্রতিবেশি সকলেই। তবে কিছুদূর পরে চৌরাস্তার মোড়ে বিরাট পানির শব্দে ধানকলের আওয়াজ আসিলে বিচলিত হই বুঝি আবার ধরিয়া আসিয়াছে পশ্চিমাপ্রকৃতি। ভেজা হাওয়ায় ঠাণ্ডা কাঁপুনিতে তখন টিমটিমে আলো ঘনাইয়া আসিছে আমাদের কাছাকাছি, স্তব্ধতাও হইতেছে প্রসারিত। নদীর কলকল আওয়াজ আরও বাড়িতেছে, দ্রততর তার স্রোত, বড়বিল তার পরিবেশ যেন নতুন করে পাইতেছে। বুঝি ভাসছে মাঝবিলের দরগাহ্। কবে এখানে বত্থ নামিয়াছিল, কতো মাঝির তা জানা যায় না। তবে প্রচার আছে গুলিতে প্রাণবধ হইয়াছিল অনেকের। সেখান থাইকাই পীরবাবার নাখোশে একরাতে প্রলয় নামে। তখন থেকেই এ অঞ্চল পবিত্র হইয়া যায়। একরাতে বিরাট পুকুর সৃষ্টি বা মসজিদ সৃষ্টির কাহিনী শুনিয়া চলি আমরা। ওসব পুকুর পাড়ে সাঁঝবেলা হাঁটাহাঁটি করি। কেমন নিস্তব্ধ, সুনসান এলাকা। জ্বীন-পরী-দৈত্য-দানবে ভরপুর এসব এলাকার মুরুব্বীরা নানামাপের গল্প বলেন। এ পুকুরে পানি খরচ করা নিষেধ। এ মসজিদে অপবিত্র শরীরে ঢোকা নিষেধ। কেমন ঢোপা সে সব মসজিদের দরওয়াজা। মাথা নীচু কইরা কালো অন্ধকারে ভিতরে পৌঁছাতে হয়। সারাদিনমান অন্ধকার, ভয়ার্ত পরিবেশ। মোমবাতি জ্বালানো থাকে সারাক্ষণ। তিনগম্বুজের মাথায় ত্রিকোণাকার লালপতাকা। বৃষ্টিতে-ঝড়ে সে পতাকা শোভমান। বছরে ওরস হইলে এসব এলাকায় হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তখন গ্রাম মেলার আনন্দ পরিবেশ রচিত হয়। তবে পুকুর নিয়া অনেককালের কাহিনীতে নিমচাঁদ, রফিক বুড়া, কল্যাণীদের নাম প্রচার পাইতে থাকে। সে সব প্রচার ভয়ঙ্কর ও গা-কাঁপানো। কাঁটাগায়ে ভয়সমূহ সর সর নাইমা যায় মাটিতে। আলিমুদ্দি চাচা ওসব বলার মধ্যে নিজেই ডুইবা যান। তখন ঘনাইয়া আসে মুখকালো আঁধার। ক্রমশ তিনগম্বুজ মসজিদটা আঁধারের ¯তূপে পরিণত হয়। গম্বুজের ওপর সবুজ শিরিষ গাছটার মৌনতাও মিলাইয়া যায়। চতুর্দিকের মিনতিপরিবেশ ঘিরিয়া আলিমুদ্দি নিজে অব্যাহতি নেয়। মসজিদের দিকে দরুদ পড়িতে পড়িতে এগোন। আমরা পুকুরপাড়ে কয়েকজন গোল হইয়া বসি। সেখানে সবাই সবার ভরসা। এপাড় ওপাড় নাই, কতো গভীর সে একরাতের পুকুর! কেউ ওতে যায় না, স্নান দেয় না, মাছ ধরে না, প্রয়োজনের নিমিত্ত মনে করে না। বিস্তৃত সে পুকুর ছাপাইয়া মাঠ-মাঠান্তর অরণ্য, ভাঙা স্কুলঘর, খড়ের চাল, অব্যবহৃত পাতকুয়া সব অন্ধকারে আটকা পড়ে। আমরা প্রত্যেকেই তখন রমনীমোহন হইয়া উঠিতে চাই। অন্ধকার সহযোগে সে পরিবেশ আরও বাড়তি সুখের। কিন্তু আলিমুদ্দি চাচার গল্প আর গম্বুজের শিরশিরে হওয়া আমাদের ভয় পাইয়া দেয়। আসঙ্গক্রিয়াসমূহ চাপা পড়ে। সতর্ক হইয়া শয়তানীসব চাপা দিন। ক্রন্দন আসে দূরের, নিবিড় হাওয়ার। তারকা কুপি জ্বলে উদোম আকাশছাদ গৃহের। গমগম আলো জ্বলে উনুনে। সিঁদূরমুখে কষ্টার্জিত তরুণীমুখ, দূর থাইকে আমরা দেখি। সে তো কতোদূর পুকুর ছাড়িয়া। পাপভয়ে হাফ ছাইড়ে ওঠা। কারো বুক-মুখ হাওয়া তোলে আমাদের মনে। কিন্তু গওসুল আজম তো পূণ্যি ছাড়া কিছুতে যান না। এলোমেলো চিন্তাস্রোতে তলপেটে ব্যথা ওঠে। হিস্যুর চাপ বাড়ে, অণ্ডকোষের বিষথলির জন্য গাত্রোত্থান। তবে তখনও দ্বীপ জ্বেলে যায় কুমারী বধূ, তার ল্যাংটো ছেলে পাশে দাঁড়াইয়া শীতে কাঁপে আর গৃহস্থ কৃষক বিড়ির আগুনে আঙ্গুল চেপে ঘামজর্জর কর্মক্লান্তি নিয়া ঘরে ফেরে। এক সময় পেরুনো পথে বিশাল বাঁশঝাড়ের পাশে এলোমেলো কঞ্চির ভিতর দিয়া চাঁদের টর্চ আলো ভিজাইয়া দেয় আমাদের শরীর। চিইনা ফেলি আমরা সবার মুখ, সবাই একে অপরকে আকৃষ্ট করি। তবে মসজিদের ওদিকটায় আর যাওয়া হয় না আমাদের। তখন আমরা হাফপ্যান্টের পাপী, ওজুছাড়া মানুষ, অপবিত্র দেহমানব। ‘মানুষ আর জ্বীনের বিচার হবে’ এ বাণীভয়ে পুণ্যপ্যান্ডেল থেকে বিতাড়িত। কিন্তু ভয় উপচাইয়া বারবার কেন কামমুখ ঘিইরা থাকে আমাদেরসে সব প্রশ্ন তখন জবাবহীন হইয়া যায়। জ্বীন আছর আর ওই মনির মাস্টারের ছেলের ছবি ভাইসা ওঠে মনে। শমসের ভাইয়ের ছেলেরও একই পরিণতি মনে আসে। শোকে আর বাঁচেন নাই শমসের ভাই, বলিয়াছিলেন তিনি ‘সবই আল্লার কুদরত’। কিন্তু নদীপেরুনো সেই চিক্কন রাস্তায়, আমসারির ধূলিধূসরিত লালপথে কতোকাল আর যাওয়া হয় নাই, পাই নাই তার খেজুরগাড়া গোর, পাকাপাতা জমাপড়া বাঁশবাতির ঘের আর পর্বতউঁচু সমান ইটসীমানার আসন। অনেকেই বলেন, শমসের ভাই মাটি পান নাই কারণ সেদিন ঘোরবরষায় নীচ থেকে পানি উইঠা আসিলে ইট গাঁথিয়া তার সমাধি সম্পন্ন হয়। মার্কিনকাপড়ে মোড়া দেহ তখন দ্রুত উপরে রাইখা ঢাকিয়া দেওয়া গোরে ফেলানো হয় মাটি। কী নির্মম সে বিসর্জন কিন্তু সকলেই তা মান্য মনে করেন। ধর্মের আখ্যান আছে কিন্তু আখ্যা নাই। তবে প্রচলিত জনমতে মাটি না পাওয়ার আখ্যা যেমনই হোক, আমরা শমসের ভাইয়ের মতো দিলদরাজ সহজ মানুষ কোনোকালে পাই নাই। সে স্থানটিতে হাঁটাপথে পৌঁছালে আমাদের ভেতরের সব পাপ মীমাংসিত হয়, সিদ্ধিতে নিপুণ হওয়ার পরিবেশ আসে। ভালোবাসি তখন দোয়েল খঞ্জনার দেশকে, কত্তোকালের মতো করে।
মোকছেদের দোকান কিংবা বোবার দোকান তখন আমাদের বেশ পরিচিত। কারণ, বিদ্যুতবিহীন রাতের অন্ধকারে হারিকেন বা কুপি ছাড়া সবই নিরূপায়। যখন বেলডুবিতে থাকে তখন আমাদের সেক্সীমন শান্ত হইয়া যায়। দুর্বল হইয়া যায় নাড়ীর সমস্ত স্পন্দন। লজ্জাবতী লতা, শেয়ালকাঁটা, পাকুড় বন, চোতরার লতা, বাঁশঝাড়ের ঘুপচি অন্ধকার সব নির্বাসনে যায়। মাদুর পাতিয়া এবার পড়িতে বসার প্রস্তুতি। কিংবা পড়ার জন্য হারিকেন নিয়া পৌঁছাইতে হবে মোকছেদের দোকানে। একপোয়া কেরোসিন ভইরা ঘরে ফেরা, হয়তো বাকিতে বা নগদ পয়সায়। বাকিতে হইলে মোকছেদের বউয়ের অনেক জেরা, পাই পাই হিসাব, আগের কিছু আছে কি-না আর পরে কতো হলো নানাসব। তবে যাই হোক এতে পড়িতে বসিতে দেরি হইলে আমাদের আনন্দ বাইড়া যায়। মোকছেদের দোকানে সিরিয়াল নেওয়া তারপর দুফিতার সেন্ডেলে ভর করিয়া গুণে গুণে হেঁটেচলা বা তক্ষুণি কারো সঙ্গে দেখা হইলে কালকের কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিয়া মতবিনিময় করা ইত্যাদি সারিয়া পুকুরের কিনারের তালগাছ হইয়া মাটির প্রাচীর ঘেইষা সন্তর্পণে মনমরা গৃহে প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন। অনেকটা সেই ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ বলে জাইনা যাই অনেক পরে। হায়! কী আশ্চর্য মিল ওসব গল্পের জীবনে। তবে কলিমাখা অন্ধকারে মোকছেদের দোকান অনেক রাত অবধি সেবা দেয়। এ দোকানে আনসার আর গফুর বিড়ি খুব বেশি বিক্রি হয়। পাশাপাশি চলে তেলনুনচাল হরদম। কতো মানুষের রাতবিরেতের উপকার এসব কে-না জানে! দোকান মোকছেদের হইলেও ওর বউ হর্তাকর্তা। শাড়ি প্যাঁচাইয়া, কালোকিষ্টি মুখে, উপচে পড়া গতরে, আধখোলা নমিত বুকে সমর্পিত দায়িত্বে সে কাজ কইরা চলে। বেশি কথা নাই শুধু অর্থহিসাব নিয়া আদায়বিদায়। জনপ্রিয় এ মহিলাকে তেমন একটা বাইরে দেখা যায় না। ওই চারকোণা টোলঘরের ভিতর দিনমান-রাতভর একাকার। সামনের টোঙে বিচিত্র মানুষের গালগল্প কিন্তু সে সবে তার কোনো অংশগ্রহণ নাই। চারিদিকে শুনশান নীরবতা নাইমা এলেও দূর থেকেও লালটিপ আলো চোখে পড়ে। দেখা যায় নিরলস পরিচর্যার মহারণ। তবে মোকছেদ কেন দোকানে বসে না তা আমরা জানি অনেক পরে। সারা পাড়া জুইড়া মুরগী সংগ্রহ কইরা সে ঢাকার লোকের সঙ্গে ব্যবসা করে। দুতিনদিনের ঢাকাযাত্রায় সে বড় ব্যাপারী হইয়া ওঠে। সরিষার তেল মাথায় মোটা চিরুনির ব্যাকব্রাশ চুল, কোমরে গামছা, পরণে প্লেকার্ড লুঙ্গি, গায়ে হাতা মোড়ানো রঙজ্বলা নীলশার্ট নিয়া মোকছেদ অর্থশালী দাপুটে পাড়ামোড়ল। কোমরের খুতিতে টাকার তোড়া, ভেতরের জাঙিয়ার বিশাল পকেটে নম্বরী নোট। যখনতখন লুঙ্গি তুইলা হাতড়াইয়া বাহির করে তাড়া তাড়া নোট। কিন্তু হঠাৎ এক ভোরবেলা আমরা অশনি কিছু শুনিয়া ফেলি। কদিনের ব্যবধানে মোকছেদ নিখোঁজ। কানকথা ক্রমশ ভারি হইতে থাকে। যে মোকছেদ ফিরিবার কথা দুই দিন আগে সে আর ফেরে না! পাড়া জুড়িয়া কথার নায়ক হইয়া ওঠেন মোকছেদ। মোকছেদের দোকান বন্ধ হইয়া যায়। বিলাপ করিয়া কান্দেন অনেকেই। হঠাৎ ডুকরিয়া ওঠে মোকছেদের বউ, মূর্ছা যায়। কেনাবেচা বন্ধ। জীবনযাত্রা অচল। ঢাকাফেরত মানুষ ফিরিলেও কেউ মোকছেদের খবর জানে না। আমাদের উঁকি দেওয়া দিগন্তে তখন সবকিছু বাতিল কইরা দেই। মনমরা জীবন চলে। হিন্দু-মুসলমান সকলেই সিন্নি মান্নত করে। জনরবশূন্য হইয়া পড়ে মোকছেদের দোকান। অবশেষে দূত হিসাবে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন একজন। সমস্ত আশার-সিন্ধুতে ভাসিতে থাকেন দূত। একদা অপেক্ষার প্রহর পার হইলে জানা যায় মোকছেদ ঢাকা পৌঁছান নাই। সে নিরুদ্দেশ। নিরুদ্দেশ সত্তাটি স্বপ্নে দেখায় নিদ্রাগতপ্রাণে। নিদ্রাহারা রাতে মোকসেদ আসে অনেকের কাছে। বাস্তব মানুষ হইয়া নয় কায়াহীন মায়া বা নিদ্রভঙ্গের দুঃস্বপ্ন হইয়া। যে রাতের আলো ছিল মোকছেদের দোকানে সেখানে তা ক্রমশ ভূতপুরিতে পরিণত। ভূতের দিন অশেষরূপে আসীন হন আমাদের মাঝে। আমরা আলোহীন বাইরে আসি না। সর্বত্র নিঝুম নিঃশব্দে দুর্বিষহ অনিশ্চয়তায় পড়ি। পরে শিবালয় থানা হইতে এক রবাহুতের হাতে খবর আসে বেওয়ারিশ লাশের। আরিচা পার হইলে গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে ছাদ হতে পড়িয়া মরিয়া গিয়াছে মোকছেদ। কোন্ রাস্তার ধারে, ডোবার কিনারে, থুবড়ে পড়া মনুষ্যপুটুলি বস্তু মেলে কদিন পরে। সেটি চটজড়াইয়া চাটাই মোড়া হইয়া আসে শিবালয় থানায়। পরের খবর আর অজানা। আমরা দুর্গন্ধযুক্ত ওসবের চাইতে ভয়ে বেশি মুষড়িয়া পড়ি। খুব তাড়াতাড়ি গোর বানানো হয়। তবে সে সব দিনে আর মোকছেদের পরিবার দোকান খোলে না। ক্রমশ ব্যবসা বন্ধ হইয়া যায়। স্বচ্ছলতা উবে যায়। আড্ডা শেষ হয়। ছিন্নভিন্ন সব আবার অভিন্নতা পায়। তখন সময়ের ফেরে আরেক দোকানী আমাদের অভাব মেটায়। পরিবর্তনে আবার নতুন জীবনের স্বাক্ষর গইড়া ওঠে। জীবন কি বদলায় এভাবেইকবে কোন্কালের পরে অন্যকালে। তবে মোকছেদের প্রথম জীবনের পারিবারিক দুর্ভোগ বা কষ্টকর জীবন সংগ্রামের কথা আমাদের চোখে আবছা জমিয়া থাকে। খুব বৃষ্টিমুখর এক সকালে এ পাড়ায় মনোরমা এন্ড্রিন পানে আত্মহত্যা করিলে বা কেউ সাপে কাটার পর ওঝা আনার প্রয়োজন পড়িলে মোকছেদ উদ্ধারের দায়িত্ব নিতে থাকে। ক্রমশ মোকছেদ দাঁড়ি-গোফের অধিকারী হলে তার ভেতরে এক ধরনের ব্যক্তিত্ব জন্মায়। আষাঢ়ের বৃষ্টিতে সব সয়লাব হইলে, পুকুর ছাপাইয়া জল উপচাইয়া পড়িলে একা জাল নিয়া বাহির হয় মোকছেদ। তখন সবার উপরে হাঁটু ডুবাইয়া চলিয়া যায় ওপ্রান্তে। আমরা সড়কে দাঁড়াইয়া মোকছেদের দৃশ্যান্তর দেখি, ভীত হই, সময়ের অপেক্ষায় সেঁধিয়া থাকি।
শিরিষ গাছের তলায় ভিজা মাটিতে তখন আমরা ঘর কাটিয়া বাঘ-বকরি খেলা শুরু করি। অনেক সময় গত হইলে পায়ে জোঁকের আঁচড় নিয়া, কাঁপা শীতে জর্জর হইয়া মোকছেদ ফেরে। তখন তার খলুই ভর্তি মাছ, খুব দ্রুত সে সব মাছের বেশির ভাগই চালান হইয়া যায় আমেনাদের বাড়িতে। আমরা অবাক হই সে সব দেইখা। শুধু সেদিন নয় এর আগেও দেখা গেছে কোনো ভাগ-বিভাজনের প্রয়োজন হইলে আগেই তা আমেনাদের বাড়িতে যায়। একবার আমরা তার এ সম্পর্কের উৎস পাইয়া যাই। ভিটেমাঠের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আলের পাশে সবে জ্যোৎস্নাজাগা রাতে পাশাপাশি তাহাদের দেখা যায়, আমরা এর কারণ বুঝি না। তবে রাতের বেলা ছেলেমেয়ের এ সাক্ষাত যে বেঠিক তা আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকে না। অনেক পরে জানা যায় সমস্ত নিষেধ অমান্য কইরা মোকছেদ একবারই আমেনাকে ভালোবাসিয়াছিল। যে দোকান এখন মানুষশূন্য, যে এখন সব হারাইয়া নির্বাক, যার চিকনপাড় শাড়ি এখন যৌবনে আটকায় নাসে এখন বিধবা আমেনা। আমরা শোকে পাথর আমেনাকে চল্লিশ দিন পর দেখিতে যাই। ঘরের দেয়ালে টানানো দুই পাখি ঠোঁটের নক্সীসুতা একটু ডানে বাঁকিয়া গিয়াছে। তিনইট উঁচুতে যে খাট বসানো আছে সেখানে এখন বিছানা নাই, পাতা আছে বাঁশের পাতলা চাটাই। কেমন একটা কষ্ট-বিরূপ নিরানন্দ শোক মাতমের গন্ধ। বাতাসে ভরপুর শুধু বিলাপ আর ডোকরা আওয়াজ। রেহেলে রাখা কোরানে মুখ ডুবাইয়া মোতোয়াল্লি বিড়বিড় করিতেছে, দূরে দেওয়ালে মোকছেদের পুরনো জামাকাপড়লুঙ্গি ঝুলবাতাসে কাঁপিতেছে। অধিকাংশগুলা এলোমেলো বুকে জড়াইয়া কাঁদিয়া চলে আমেনা। জগতের সব সে হারাইয়া ফেলিয়াছে। এ দুনিয়া অসাড় হইয়া গিয়াছে। বৃক্ষ-বাসনা, গৃহ-গহনা সবই যেন অচল হইয়া গিয়াছে। হিক্-পাড়া কান্নায় বাড়ির প্রাচীরের সীমানায় নির্বাক দাঁড়ানো কলাগাছ কাঁপে, হাতে রোপিত শিরিস গাছ দুলদুল পাতায় ভাসে, পাশের মাছহীন নালায় জুঁইপোকা শুঁকিয়া বেড়ায়নির্মম প্রকৃতি কিছুই ছাড়িয়া দেয় না। সত্য জানিয়া কান্দিয়া ওঠে আমেনা, এ পৃথিবী তার কাছে বিস্বাদ হইয়া গিয়াছে। যাহাকে জীবনের সব মূল্য দিয়াছে, গৃহকোণের সমস্ত সুখনিদ্রা যাহার জন্য বিছাইয়া আছিলসে কি-না অনাদরে গাড়িত থ্যাকা নিচোত পড়ি যায়! রাস্তায় পড়ে, গড়াইয়া যায় ধুলায়, ঢালু কচি ঘাস বহিয়া গাছের শিকড়ের পাশে ডোবায় পড়ে। মিনিটঘণ্টা পর তাহাতে মাছি বসে, মশা আসে, কুকুর শোকে, শকুন খোঁজে, ঘোলা হইয়া যায় ক্ষেতের আধডোবা পানি। পচা মাংস গলিতে শুরু করিলে গন্ধ তৈরি হয় তখন মানুষ আসিয়া মানুষকে উদ্ধার করে। যে উদ্ধারে এ গ্রামে মোকছেদের বিকল্প নাই সেই এক সময় অন্যের উদ্ধারে পরিণত হইলো। কতো পরিজন কান্দে কতোদূর আর মোকছেদ প্রাণহীন দেহ নিয়া একাকী নিরস্ত। আমরা ফিইরা যাই, একটি সংসারের অভিজ্ঞানে জানিয়া লই আর কারো যেন এমন না হয়! দীর্ঘশ্বাসে অপরাধী হইলে রাত ঘনাইয়া আসে। কবরস্থানে ঘোর বর্ষা নামে, কখন সে লাশ আবার পুনরুত্থিত হয় কার ইঙ্গিতে কে জানে! জানা যায় কে বা কারা গোর খুঁড়িয়া মোকছেদের মাথা নিয়া গেছে। অমাবস্যার মঙ্গলবার রাতে এ মাথার দাম অনেক। যাদু টোনা পাতাচালা বশ করা এমন অনেক কাজে এ মাথার খুব মূল্য। কোন্ কবিরাজ এ রাতে এমন সুযোগ নেয় আমরা জানি না। তবে মোকছেদ যে মৃত্যুর পরও মানুষের কাছে মূল্যহীন হইয়া যান নাই তাহা পরিস্কার হয়। আমরা এরপর বহুদিন ওদিকটায় যাই নাই। শুধু পাশের তাল বা আমলকি গাছের দিকে তাকাই আর সাবধান হইওখানে জ্বীন বা ভূত বাসা বাঁধিয়াছে কিনা। কারণ, রাতে পা-টানা স্বভাব বলতে যা বোঝায় তা ওই ভূতের কারণেই। অপবিত্র শরীরে যে ওখানে গিয়াছে তার এমনটা ঘটিয়াছে। তবে মোকছেদের পাড়ায় সবকিছু অতলে হারাইয়া গেলে ওখানে ডোকরা, ফয়জার বাপ, সেত্তার, ছালাম, আতিকুররা থাকিয়া যায়। ফ্যাসফেসে গলায় কালোকিষ্টিমার্কা ফয়জার বাপ পুটলি হাতে লাঠিতে ভর কইরা পাড়ার রাস্তায় নিজের জীবনের কথা বলিয়া বেড়ায়। ডোকরা এক আঙুলে ভর করিয়া খাটো লুঙ্গিতে খালি গায়ে জমিতে খাটিয়া চলে। ওরা প্রায়ই গল্প জমায় ভাঙ্গা কবরস্থানের পাশে। এ কবরস্থানে মরা বাঁশপাতায় তখন সরসর আওয়াজে কোনো সরীসৃপ বুকটানিয়া চলে, বেজী বা শেয়াল গর্তে মুখ ডুবায়, এক নম্বর ইট ঘেরা কবরের ফাঁকে বড় বড় বিষপিঁপড়া ভুর ভুর কইরা ঘুরিয়া বেড়ায় আর তার দুএকটা ফয়জার বাপ বা ডোকরার পায়ে কামড়াইয়া দিলে তেমন কিছু হয় না কিন্তু অবচেতনে হাতচাপায় মারা পড়িলে চিরন্তন গল্পবলার লয় নিরত হয় না। ল্যাংটি মারা বসনে সর্বোচ্চ ময়লায় কোনো দুঃখ বা কষ্ট তাতে আটকায় না। নিজের যুদ্ধকাহিনী আর মোকছেদের মৃত্যু কোন্ যুক্তিতে তাহারা একরেখায় মিলাতে থাকেন তা ঠিক বোঝা যায় না। তবে উদাসী হাওয়ার পথে পথে নাইওরজান নামে এক বালিকা আমাদের কুল পাইড়া খাওয়ায়, পেয়ারার মিষ্টিস্বাদের কথা বলে, ভোরবেলা বড় পুকুরের পাশের তালগাছ থাকি তাল পাড়ার খবর দেয়। তালগাছের পাশেই পানাতি বুড়ির বাড়ি। বুড়ি সারাক্ষণ উগ্র মেজাজে সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে। স্বামীহীন এ বুড়ির জীবনকাল বহুকালের। সারারাত বুড়ি টিমটিম কুপির মধ্যে জাইগা থাকেন। তার অনেক সোনাদানা গয়না জায়গা সম্পত্তি আছিল। ওসবের ভয়ে দুই ছেলে পৃথকঅন্ন হইলেও কিছু বলে না। বুড়ি বড়বাড়ি যায় সন্ধ্যার পর ওষুধ আনিতে। তখন তাল পাড়িলে সেটি যে হাতে পাইবে তাহারই। পুকুরের পাড় জুড়িয়া বিরাট উঁচু এ তালগাছ থাইকে তাল পড়িলে তখন বিরাট পতনের শব্দ। বুড়ি তক্ষণই বাহির হইয়া আসিয়া  তা দখল করেন। পরে সেটি সোয়া তিন টাকায় বিক্রি হয়। আর তা না হইলে যে-পাবে সবটি তারই। আমরা তালগাছের পানে তাকাই বুড়ির অনুপস্থিতিতে। তখন মুখচেনা অন্ধকার। নাইওরজান তাল তুলিয়া আনে। কিন্তু মোকছেদ প্রেতাত্মার ভয় তখনও আমাদের হাতছাড়া হয় নাই। বিশাল বপুর মোকছেদ মুখচেনা অন্ধকারে পুকুরে সাঁতরাইয়া আসিতেছেন। রোমশ বুক আর শক্তিশালী পায়ের গোছায় ভর দিয়া ভিজা চুলে পানি ফেলিতে ফেলিতে চলেন তালতলায়, ক্যাঁ রে! বুড়ি নাই তো কি পঙ্গোরের পর পঙ্গোর, তমন ধোয়া জলে সাপের নাহান পঁই পঁই করে তালের দিকে কেডা আসে আর নিশ্চিত আগাইলে চিক্কুর পাড়ে নাইওরজান। আমরা হই তুলিয়া ওদিকে তাকাই। বুঝি বুড়ির ভয়ে কিছু ঘটিয়াছে। নাইওরজান আমাদের নিকটজন হইয়া যান এ চিৎকারের ভিতর দিয়া। কারণ, আমরা জানি তালপাড়ে যাওয়ার সবটাই আমাদের কারণে। তবে কিছুই না পাইলে সে রাতে নাইওরজানের মূর্ছার কারণ কি তা ঝাড়ফুঁক আর তেলমালিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হইয়া পড়ে। সে তখন অন্যরকম মেয়েমানুষ বইলা সবার গোচরে আসে। পাড়ার মেয়েমহলে অনেক প্রশ্নের মধ্যে জোরাল হয় কেন সে তালতলায় গিয়াছিল। কী জন্য মেয়েমানুষ রাইতে বাইরে বাহির হইলো নিশ্চয়ই ওতে কোনো ফন্দি আছে। অপয়া বা শনিতাড়িত এ মেয়ের ভবিষ্যত কালা। বাজা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পাড়ায় এমন কানকথা সপ্তাহ ধইরা চলিলে নাইওরজানের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। সে আমাদের সহানুভূতি পায়। মানুষের হীনন্মন্যতায় সে আর আমাদের ডাকে না। বাড়ির পাশে পেয়ারা গাছে কাক আসে, ঝড়জলরোদে ঘূর্ণি হাওয়ায় ধুলাবালি শুকনা পাতা দৌড়ায়, সর্ষের হলুদ সমারোহে জীবনের পাল বাইয়া চলে, আত্মহারা মৌ-সুবাস আমাদের দৃষ্টি কাড়িয়া নেয়, তখন নাইওরজানের কলার মোচার বেড়া উঠান ভাঙ্গিয়া, পলাশ-শিমুল পার হইয়া সুপুরি বাগানের ভিতর দিয়া উঁচু উঁইভিটা মাড়াইয়া চিপা কোটা দেওয়ালের ভিতর দিয়া সহিদুল-মহকবুরদের উঠানে পৌঁছাইলে অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে পুরনো উঁচু খাটে বইসা সিনেমা হলের গল্প তৈরি শুরু হয়। পৃথিবীর সমস্ত দগ্ধ বা তাপিত হাওয়ায় সে সব কাল্পনিক গল্প আমাদের চোখের পাতায় ঝুলিতে থাকে। ছবির গল্প, সুন্দরী নায়িকাদের মুখচ্ছবি, বলশালী নায়কের সঙ্গে নিজেদের মেলাবার চেষ্টা অনেককাল ভাবিতে থাকি আমরা। পথে হলো দেরী, পুত্রবধূ, সারেং বৌ, গোলাপী এখন ট্রেনে কীসব মজার গল্পকাহিনী, কখনো স্কুলমাঠের নতুন টিভি পর্দায় কখনোবা পাড়ায় আসা সদ্যনির্মিত সিনেমা হলের বড়ো পর্দায়। অভয়রাঙা বর্ণিল আকাশে আমরা স্বপ্নের পাল তুইলা দেই। জীবনের আলোকরেখায় সমস্ত পৌষপ্রেম যেন আসিয়া পড়িয়াছে কোনো নির্জন অন্ধকারের প্রতœবাতাসে। বড়ো পর্দার আনন্দ আমাদের ছাড়িয়া যায় না। আকুল করা অন্ধকারের ভিতরে টক্ টক্ অশ্বক্ষুরের উজ্জ্বল আলোর কাঁপুনিতে কতোকাল আমরা উত্তম কুমার, জমিদার বা বিশ্বস্ত ভৃত্যের মুখচ্ছবিতে আটকাইয়া যাই। আমরা অভিজাত হইয়া উঠি। খেলার ঘরে আমরা উত্তম কুমারের অভিনয়ে নিজেদের বড় করিয়া তুলি। তবে সে মিথ্য খেলাঘর মিথ্যে কল্পনায় খুব দ্রুত ভাঙিয়া যায়। বাড়ির কড়া শাসনের বেড়াজালে তা বাস্তবের ভূমিতে স্থির সোপর্দ হয়। মহকবুর বা সহিদুলরা হরহামেশা বড়ো পর্দার সিনেমা দেখে আর সব মনোহারি বৃত্তান্ত আমাদের শোনাইতে থাকে। দিনের বেলা সিনেমাভবনের দোতলায় নায়ক বা নায়িকাদের পোর্ট্রটে কিংবা রাজমহলে ঘোড়া দৌড়ানোর অদক্ষ হাতে-করা পেইন্টিং ঝুলান থাকিলে কয়েক মিনিট পলকহীন তাকাইয়া চোখের সুধা মিটাইয়া চলি। তবে রাতের সিনেমা হল মনমাতানো সুন্দর। অনেক লাইট জ্বলিতে থাকে, শোর পর শো শেষ হয়আর টিকিট-ভীড়ে জনজমায়েত চলে গভীর রাত পর্যন্ত। প্রতি শোতেই দূর দূরান্তের গণ্যমান্যরা থাকেন। তখন সিনেমা ভবনের ব্যবস্থাপকের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা মহকবুরের কথায় সিনেমার নায়িকা খুঁজি বহুকাল। সেসবের লোভে আমাদের চোখ টলমল। তবে সুন্দরী নায়িকাদেরই জানতাম, তখনও সেক্স বিষয়ক রকমারি চিন্তা আমাদের প্রভাবিত করে না। সিনেমা হলের জন্য আমরা সময় ব্যয় করি, কখন কোন্ ছবি আসিল আর গেল তা মুখস্থ করি, নোটখাতায় টুইকা রাখি। আর কোন্ সিনেমা দেখা হয় নাই, কখন কোন্ স্থানে কার সঙ্গে তা দেখা হইতে পারে তা লিখিয়া রাখি। স্কুল পালাইয়া বাসের ছাদে উঠিয়া দূরে কোনো সিনেমা হলে নির্ধারিত ছবি দেখিতে গেলে বাড়িতে ‘ছেলে হারানো’র ক্রন্দন বা শাস্তি অমোঘ হইয়া যায়। দুপুরের বাসে বগুড়াগামী রমজান ট্রাভেলস-এ ছাদে উঠিয়া ‘বই’ দেখিতে যাই মিঠু, ইদ্রিস, ওবায়দুর, মঞ্জুসহ কজনা। ওরা পরামর্শ দেয়, অনুগত করে রাখে, হড়হড় করিয়া পেছনের রেলিং দিয়া ছাদ থেকে নামিয়া দ্রুত পায়ে চলার পথ তৈরি করিয়া দ্রুতলয়ে প্রশস্ত কালিগোলা রাস্তা পার হইয়া, কমলা-কলার ফেরিওয়ালাদের এড়াইয়া, সারবাধা টোলদোকান ছাড়িয়া, সন্তর্পণে ত্রিরাস্তার মোড় অতিক্রম করিয়া একদলে দামাল হইয়া উঠি আমরা। পকেটে তখন সাড়েতিন বা চার টাকা। আগে থেকেই জানা ছিল বাসের ছাদে উঠিলে যাতায়াত ফ্রি। শক্তিপ্রয়োগে মিঠু-ইদ্রিস তৃতীয় শ্রেণীর লাইনে দাঁড়াইয়া টিকিট সংগ্রহ করে। হতবিহ্বল আমরা সিনেমার জন্য প্রহর গুইণা চলি। গুমোট গরমে নিস্তব্ধ ঘন সবুজ আমপাতার নিথর-নিস্তব্ধ নিরাকপড়া, পাশের বিদ্যুততারে মরা বাদুড়ঝোলায় বিরহী পাখির উড়ন্ত পাখার ঝাপটানি, নিস্তেজ তপ্তবালুর সুপ্ত চিকমিক আর আলোছাড়া হইতে থাকা প্রকৃতির আতঙ্কেছবির অপেক্ষার প্রহরে ক্রমশ হাওয়া বদলাইয়া ওরাল ওঠেবুঝি পাওয়া গিয়াছে টিকিট। এরপর অন্ধ হলঘরের ভিতরে পদধ্বনি। অতিকায় সাদাপর্দার তলে বিরাট আলোকরশ্মিতে কীসব ঘোড়া দৌড়ানো শুরু হয়। সহিসের অশ্বধ্বনিতে জলদগম্ভীর আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয় নায়কের মুখপটে। কে নায়ক বা কীসের কাহিনী সেসবের ধারাবাহিকতা আমরা জানিতে পারি না। তবে কোনো দ্বন্দ্ব লড়াই হইবে মনে করিয়া চুপ থাকা। কে কার পক্ষ বা প্রতিপক্ষ কিছুই জানা যায় না। ঊর্ধ্বমুখি অপলক চোখে এমন বিরাট পর্দার বড় বড় ছবির মর্মার্থ বুঝিতে পারি না। হলঘরে কোনো চরিত্রের বিজয় ঘোষিত হইলে ওরাল ওঠে, মুখে শিষ্টি ফোটে, অশিষ্ট উচ্চারণে পরিবেশ তরঙ্গিত হইয়া ওঠে। এসবে আমরা বিজয়ী হই। বহুবারের উতরোল আমেজে সেধিয়া গেলে মিঠু সিটবেঞ্চে উঠে খেমটা নৃত্য শুরু করিয়া দেয়। তাতে করে তার কতো নিনামা বন্ধু জোটেএকই রঙে তাদের দেখা যায়। অনেক অপর বন্ধুকে সে আপন করে। যখনই সাদাপর্দায় বিজয়ীনিরা আসে তখনই একসঙ্গে একতানে দল নিয়া সে সেক্স-উন্মুখ হইয়া ওঠে। তবে কি মিঠু আমাদের হাতছাড়া হইয়া গেল? মনে ধন্দ আসে। কিন্তু ক্ষণেক পরে পর্দায় কাঁচা অক্ষরে ‘বিরতি’ কথাটা ভাইসা উঠলে পর্দার আলো বন্ধ হইয়া যায়। তখন জ্বলে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। আমরা আবার সকলের মুখচেনা হইয়া যাই। কেমন যেন ভয় আর আড়ষ্টতা জমিয়া ওঠে অন্তর জুড়িয়া। সিনেমার ভিলেন দেখিলে আমরা ভয় পাই। সে নায়কের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা পৈশাচিকতায় মাতিয়া উঠিলে প্রেক্ষাগৃহ পালাইয়া আসি। অনেকবার এরকম ঘটনা ঘটিতে থাকিলে ভিলেন চরিত্ররা আমাদের স্বভাবের বিপরীতে দাঁড়াইয়া যায়। কখনো এসব প্রদর্শিত চরিত্র আমাদের বাস্তবের অংশীদার হইয়া যায়। ভয়ে আমাদের হিস্যু চাপিয়া আসে, সবুজ হাফপ্যান্ট ভিইজা যায়। জ্বলজ্বলে চোখে অন্ধকারে রোমহর্ষক সব তলোয়ারযুদ্ধ দেখিতে থাকি আমরা। তবে প্রেম বা সামাজিক দুঃখকষ্ট চিত্রিত কাহিনী আমাদেও স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নের অংশ হইয়া যায়। কতোকাল আমরা ভুলি না সে সব। কাহিনীর পরিণতি ঘনাইয়া আসিলে আমরা আবার পূর্বতন সুখীসময়কে পাইতে চাই। ছিন্নভিন্ন বা ক্লিষ্টকান্না আমাদের পোড়াতে থাকে সারাক্ষণ। এক সিনেমা দ্বিতীয়বার দেখিলে কষ্টপর্বগুলো ভিতরে রাইখা বাইরে আসিয়া দিনের চিকচিকরোদ্দুরে বা রাতের লাইটে প্রহর গুণিতে থাকি। তবে কোনো প্রযোজনার প্রথম দর্শন আমাদের কাছে প্রধানত রিস্কিই থাকে। একাধিকবার দেখিলে ভয়কষ্টসমূহ টুটিয়া যায়। কবে যেন সে সব ভয় কখনো পলাতকা হয় না আমাদের। সব ক্লাসপালানো সময়গুলি এরূপে গত হলে কুদ্দুস মৌলভী তা ধরিয়া ফেলেন। ক্লাসে এসব দেখাকে ‘পাপ’ বলেন তিনি। ‘বই দেখা’কে খারাপ চোখে দেখেন। বলেন, সিনেমার নায়ক-নায়িকারা কখনো বেহেশ্ত পাইবে না। ওরা অপবিত্র, বেশ্যা। প্রচলিত সমাজে গানবাজনা, সিনেমা, যাত্রা সবকিছু মনোরঞ্জনের জন্য থাকিলেও ধর্মীয় চিন্তায় কেউই এসবে তেমন প্রশ্রয় পায় না। সিনেমার গানে বা দৈনিকের পোস্টারে আমাদের যৌবন সেঁধিয়া যায়। তখন সাদাকালো ছবির যুগ। দুএকটাতে বলা থাকে ‘অর্ধেক রঙীন’ বা ‘সম্পূর্ণ রঙীন’। তবে সেসব ছবি ‘উন্নত’ বলে জেলা শহরেই সীমিত থাকে। আমরা যা দেখিতাম তা সাদাকালোর ভেতরেই সীমিত। রাজপুত্র রাজপ্রাসাদ আর রাজকন্যাদের পুরনোসব কাহিনী প্রায় ছবিরই প্রধান উপজীব্য। অলৌকিক রোমান্স আর বিভসরঙ্গে মাতোয়ারা আমাদের মন সর্বত্রচারদিকে। উৎসবের আয়োজন থাকে তখন চাঁদরাতে বা কোনো পরীক্ষা সমাপ্ত হলে। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ যেন উপচাইয়া পড়ে সেখানে। নিঝুম রাতে সর্বত্র সাড়া পড়িয়া যায় ‘বই-ভাঙলে’। আমরা দেখি তখন আজিজ আর আবুলচাচার দোকানে পানবিড়ির জন্য উপচে পড়া ভীড়। দূর থেকে কার যেন ডাক ওঠে ‘এ বাজনার জাগাখানোত হায়রে ঝাকি…’। দুদ্দাড় তখন উচ্চৈঃস্বরে ক্যাসেটের বোল ওঠে, ভীড় কইমা গেলে তা ছড়াইয়া পড়ে রাস্তা ছাড়িয়া অনেকদূর। নেওরপড়া রাত অন্ধচাদরে ঢাকিয়া দিলে জনশূন্য প্রান্তরে সে সুরের ধারা পৌঁছায়। আমরা গাঁথিয়া ফেলি ওসব প্রলুব্ধ কম্পোজিশান। রাত ঘনীভূত হলে দূরের নেড়ীকুত্তার শীতকাতর কণ্ঠ করাল আওয়াজ তোলে। আর তাতে শীর্ণ ঠাণ্ডা বাতাস বাড়তি রঙ মেশায়। ক্যাসেটের কোকিলকণ্ঠ সমস্ত কর্কশধ্বনিকে পরাস্ত করিয়া বিরতিহীন মায়ার রাগ ফোটায়, ইথারে দ্রুত রাতস্নিগ্ধার পাশে ভৈরবী বোল তোলে। চারপাশে তখন স্বপ্নলোকের বিজয় ঘোষিত। রাত্রিদিনের এসবে একসময় লাউডগার মতো আমরা শরীরে বাড়িতে থাকিলে রোমাঞ্চ-উৎসবে প্লাবন ওঠে। স্কুলভবনের ছাদে ওঠা, বৃষ্টিধোয়া কৃষ্ণচূড়ার ডালে উঠিয়া ওম নেওয়া, বাড়ির পেছনের প্রিয় আমগাছটায় আমগন্ধ নেওয়া, জামগাছের তলায় জামখোঁজা, হঠাৎ হঠাৎ স্কুল পালাইয়া কোনো ফজল-সমীরদের বাসায় মেয়েবিষয়ক গপ্পে মাতিয়া ওঠা কখনোবা ফন্দি কইরা কালকের কর্মদিবসে কোমরপুর বা হরিণমারির হাটে টকি দেখিবার পরিকল্পনা করা। তবে সবকিছুর বাস্তবায়ন সহজ না হইলেও রফি মামা বারবার জেলাশহরের অভিজ্ঞতা বলিলে, নিজেই বলিয়া ওঠেননিয়া যাবেন ওরিয়েন্টাল সেনেমা হলে। সে সব হলের নিপাট বর্ণনায় মামা নিজেই রাজ্জাক বা ফারুক হইয়া বীরোচিত আখ্যান ঘোষণা করেন। গমগম করা শব্দে সামাজিক সে সব আখ্যান সোনাঝরা সঞ্চয়ে লুকায়, কোকড়াচুলে বা ফতুয়া পাঞ্জাবীতে গ্রামীণ পটচিত্রের অসহ্য বৃত্তান্তে আমরা কাঁদিয়া ফেলি, খলনায়কদের কূটচালে নিজেরা অনিশ্চিত হইয়া পড়ি, কতোকালের মুদ্রিত দুঃস্বপ্ন যেন পুনর্বার শোকঘণ্টা বাজাইতে থাকে। সমীর চিক্কুর দিয়া কাঁদিতে থাকে, জালাল হিস্যু করিয়া দেয়, ভীত হইয়া সে শুনশান নীরবে গরম নিঃশ্বাস ফেলে, কখনো কানচিমটায় বলে আর কখনো সেনেমা দেখিবে না। মামা সহায় হইয়া বলিয়া ওঠেন, ওসব নিছকই ছবি, সত্য তো কিছু নয়! তবে তখন ভয় কমিতে শুরু করিলে হঠাৎ পর্দায় ওঠে ‘বিরতি’, সত্যিই বাস্তবে ফিরিয়া আসি আমরা। রাতের স্বপ্নে বা দিনের কর্মকাণ্ডে আমরা নায়ক থাকিয়া যাই। তবে রাতের অনেক স্বপ্নেই তারা বার বার পরিবার-সমাজের সুখদুঃখের ভিতরে নিপতিত হন। এমন ছবি-অভিজ্ঞতায় আমাদের নিকট নতুন শহরগুলা পুরানা হইয়া যায়। শহরের রাস্তাগুলা চিনিয়া ফেলি, সিঙ্গাড়া হোটেল বা মালদহ হোটেলে আমাদের যাতায়াত বাড়ে আর বাড়ি ফিরিলে সেয়ানামূলক সে সব গল্পে স্কুলমাঠের সবুজঘাসকে আমরা সাক্ষী মানিয়া ফেলি। তখন বেলা গড়াইয়া স্কুলপাশের কাঁঠালছায়া লম্বা হইলে শোনা যায় আজ দুই দলের ফুটবল খেলা আছে। চাঁদের বাজার আর সয়েকপুরের মধ্যে সেমিতে ওঠার হাড্ডাহাড্ডি খেলা। সেরূপে মাঝপথেই ওসব গল্প থামিয়া যায়, খেলার মাঠে ফেরার আর লাইন্সম্যানের পাশ ধরে জায়গা নির্বাচনের ব্যাপারটাও তখন জরুরি হইয়া পড়ে। তবে সব জরুরি বাতিল করিয়া সমীর প্রস্তাব দেয় কাঁঠালগাছ ধরিয়া ছাদে ওঠার। কারণ মাঠের খেলা দেখার মজা ওখানেই বেশি। সমীরসহ আমরা ছাদে উঠিয়া কে ‘ছেকারেটে’ টান দিতে পারে কিংবা কার শরীরে কোথায় লোম উঠিয়াছে কার কতো নারীঅভিজ্ঞতা সে সব গুরুত্ববহ হইয়া ওঠে। মাঠের খেলা মাঠে গড়ায়, আমরা ছাদে নিজেদের গোপন বাধা উন্মোচনে উন্মাদ হইয়া উঠি। তখন অগ্রহায়ণ শীত গায়ে লাগে, শীতে ভর করিয়া পেছনের বৈরাগীপাড়ার বাঁশবনে উদাস-শ্যামা ডাকে, কাঠবেরালি গাছ থেকে নিচে শুকনা পাতায় সরসর কইরা লতাগুল্মের ভেতরে ঘন অন্ধকারে হারাইয়া যায়। তখন হঠাৎ শোনা যায় কার কোঁকানির শব্দ! কারও আগ্রহ না থাকিলেও সমীর চওড়া ছাদের পাশে গাবগাছের মাধ্যমে সে রহস্য উদ্ঘাটনে আগ্রহী হইয়া ওঠে। ‘ফটিক কাক যানি লাগায় …’ দৌড়ায় এবং পালাইয়া গেলে সবকিছুর ক্ষণিক অবসান ঘটে। অপরাধী হইয়া দুরুদুরু বক্ষে খেলা শেষের টাইব্রেকারে মনযোগী হইলে কানখবরে বৈরাগীপাড়ার সক্কলে কার বিরুদ্ধে যেন বিচার বসায়। ফটিক তখন উধাও। সমীর বুঝিলেও আমরা ফটিকগল্পে কোনো আনন্দ পাই না, কেননা কিছু বুঝে ওঠার সময়ও তখন ছিল না, প্রকৃতগল্পটা আমাদের কাছে অপরিস্কার থাকিয়া যায়। তবে অনেক পরে ফটিকের বাস্তবগল্পটা আমরা বুঝিয়া উঠি, লম্বাফটিক তখনও আমাদের প্রিয় চরিত্র, কারণ সে-নাকি দিনে ঘুমায় রাতে বিচিত্রবাসে থাকে। ফটিক রাস্তায় হাঁটিলে সমীর দমফাটা হাসে, অনেকক্ষণ লম্বাপায়ের পদচারণা উপভোগ করি আমরা, কেন যেন ধীরলয়ে সম্মুখছোঁড়া পায়ের বেস্টনীতে উঁচুকরা রঙজ্বলা লুঙ্গি বা তার নিচে কুঁকড়ে যাওয়া অস্পষ্ট শিশ্নের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করি। হাফহাতা ছেঁড়াগেঞ্জী বা উস্কোচুলের ভিতর থেকে শ্যামবর্ণ শীর্ণ ঠাণ্ডা স্বল্পবাকের মুখাবয়ব নিয়া আমরা হাসিতে থাকলে সে অশ্লীল বাক্যে তাকায়। তখন ‘অফ’ হইয়া যায় সবকিছু। মহির চাচা ব্রেড ফ্যাক্টরীর দোকানে বসিয়া ফিকফিক শব্দে হাসেন। তার দোকানের মিষ্টিগন্ধ তখন আমাদের তাড়া করে। খুব দ্রুত কেন যানি তাচ্ছিল্য হইয়া ওঠে সবকিছু। তারপর ফটিক আমাদের আর তেমন আগ্রহ সৃষ্টি করে না। এক সময় অনেকদিনের ব্যবধানে ফটিককে অনুপস্থিত মনে হয়। আমরা ভুলিতে বসি তাহাকে, কিন্তু যেন অস্বীকার করিতে পারি না। এইসব আলাপচারিতার বেশে নয়, লজ্জাস্থানগুলার প্রস্ফুটনের মতো অনেকের দিনরাত্রির লজ্জা আমাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠে। দুটো বকুলতলার মধ্যিখানে হাঁটা দিয়া ভাঙা কাচারিঘর। সেখানে একমাত্র উঠতি মেয়েকে নিয়া রাত পার করে রাহেলাপাগলি। মাঝে মধ্যে রাহেলাপাগলি না থাকিলে দীপক, ফারুক, রুহুল ওখানে আঁধারে শরীর হাস্তায়। কিন্তু সে আঁধার কর্মকাণ্ডের সমর্থন না দিলে রাহেলাপাগলি চলিয়া আসে। তখন ওরা বাঁকা কাঁচা সড়কে চইলা যায়। ঝিঁঝিঁ ডাকা বাঁশঝাড়ের গোড়া ঘেসে, লক্ষèণদের নাড়া ছাওয়া মাটির প্রাচীরের পাশ দিয়া, বিরুদের গোয়াল ঘরের গরু ঘসঘসানি দমন কইরা আল বেয়ে ভিটার কাণিতে পৌঁছায়। তারপর ডিপটিউবওয়েলের পাইপের ওপর দিয়া উঁচু চৌকোণা তালদিঘীর পাড়ে যায়। তালদিঘীর দক্ষিণপাড়ে একটু ঢালু স্থানে ছিন্নপাতায় ঘেরা ছোট্ট ঘরে পালাক্রমে ওরা ঢোকে। তখন দূরে মাঝরাতস্তব্ধ নীরবতা ভাঙিয়া ধাইয়া আসে কোনো গোয়ালঘরের অবলা ষাঁড়ের চীৎকার, বনবন আওয়াজে কালো কীসব গাছপোকার ডাক কিংবা আফতাব মাস্টারের একটিয়া বাড়ি থেকে শিকারী কুকুরের থামা থামা রবএ নির্জন কুটিরে আইসা পড়ে। তখন বুঝি স্তনমথিত হাতমুখে একাকার-এক হইয়া যায়, তড়িৎ সর্প-আওয়াজে কিছু টাকা ফেইলা দীপক বাইরে আসিলে, অন্যজনতারপর অন্যজন এবং অতঃপর পরের সময়ের চুক্তি এবং আগাম অর্থে তার নিশ্চিত নিষ্পত্তি। চাঁদ তখন ডুবন্ত, পৃথিবী তখন শ্মশান, যৌবনবতীসব হাওয়া অপাপবিদ্ধ হইয়া বারেক হাই তোলে, গা-মোচড়ায়-কাতরায়। এমনসব হাওয়ায় আমরা ডুবিলে, ফটিক-দীপকরা কতো না আনন্দময় হয় সবকিছুতে, আমরা জানিয়া যাই কোনোকিছুতেই ওইসবের তুলনা হয় না, সমস্ত স্বাদে সব যেন আনন্দে খুন। কবে তখন হাওয়া আসে, কড়াৎ আওয়াজে মেঘ ডাইকা যায়, ছায়াসূর্যের খেলায় ডিগবাজী দেয় পুকুরের ক্ষীণতোয়া ভাসমান ঢেউ, তার মধ্যেই মৃত্যু আসে মরিয়া যায় রাহেলাপাগলি বা বোকাবুড়িটা। আর এক সময় টাকা-বিক্রির গতরে স্বামী-সন্তান কাঁধে চাপিয়া নাথবতীদের রাখিয়া যায় অনাথরূপে, জীবন তখন বিস্বাদ-আনমনা-দেহসর্বস্ব। তবুও জীবন জয়ী হইয়া ওঠে সবারই।

আমাদের কলেজমাঠটা তেমন বড় না হলেও আদিম চোখে তা বড়ই লাগে। উপরে ঢেউটিনের চালা কিন্তু কোনো ছাদ নাই। শীতরাতে টিনের তলায় কুয়াশা জমিলে পরে তা টপটপ করিয়া বেঞ্চে পড়ে। বেঞ্চের নিচে বালু ফেলানো। কতোদিন যেন এভাবেই। কবে পাকা হবে কেউ এসব জানে না। পঁচিশ-ত্রিশ হাত লম্বা কলেজ বারান্দার সামনে উঁচু ইটখোয়ার স্তূপ। পাশে বিশাল শিরিষগাছ। কী অপার সবুজ আর দীঘল হাতছানি তার! মাঝেমধ্যেই আমরা এর কচিপাতাডাল ভাঙি, মোচড়াই, নাকে শুঁকি। একবার প্লান হইলো এখানে নাটক হইবে। আর এ মাঠ তো অভিনয়েরই আশ্রম। আমরা বারবার দেখি গভীর রাত অবধি বড়রা ওই শুঁড়আঁকা সিঁড়িতে বইসা নাটকের রিহার্সেল চলে। আর যারা রিহার্সেলে নাই তারা একটু দূরে মঞ্চ-পরিকল্পনা করে। কাকে দিয়া কী অভিনয় করানো যায় তা চিন্তা করে। আমরা পাশ দিয়া হাঁটি, ঘুরি। তখন হুংকার দিয়া বলে ‘ছোলপোল ক্যাঁরে এতো রাতে’। আমরা সইরে যাই কিন্তু চিনে নাই কতো সরল ও স্বার্থহীন সে ভাবনাগুলা। অন্যদিকে অন্য রিহার্সেল। সেখানে যুবকদের আনাগোনা। তাদের নাটক ‘স্পার্টাকার্স বিষয়ক জটিলতা’। তখন আমরা স্পার্টাকার্স বুঝি না চিনি না, কিন্তু কোন্ অচেনা কারণে নামটি গাঁথিয়া যায়। মানিক ভাই দুর্দান্ত উচ্চারণে কতো কি বলেন, প্যালেস্টাইন জ্বলছে তার হাহাকার যেন তাকে কাঁদায়। সোবহান ভাই খুব শুদ্ধ বাংলায় চিক্কনগলায় রুশ, গোর্কি, চে সম্পর্কে বলেন। লম্বা, চিকন গোঁফ, শ্যমবর্ণের সোবহান ভাই প্যান্ট পরে নতুন হোন্ডায় প্রতিদিন নাটকের জন্য বিকালেই কলেজ মাঠে আসিয়া পড়েন। বাড়ি ফেরেন অনেক রাতে, বহুদূর কুতুবপুর গ্রামেনির্ভয়ে। তবে মঞ্চ তৈরি হইলে, সাইড স্ক্রীন নিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা হইলে মঞ্চের সামনে কে-কোথায় বসার আয়োজন হইলে আমরা পুলকিত হই। কী যে আনন্দে আকাশ-বাতাস ছুঁইয়া যায়! একসময় লাইটম্যান আসেন জেলা থেকে। সে লাইটিংস রঙবেরঙের কাগজে চলে অনেক সময় ধইরা। তারপর অনেক রাতে স্টেজ রিহার্সেল শুরু হয়। কিন্তু সে রাতে আর তা নাগালে থাকে না। তবে ফাইনাল মঞ্চের অপেক্ষায় আমাদের নিশি-নিপাত যায়। স্কুলছাড়া হইয়া যাই, শৃঙ্খলাকে অস্বীকার কইরা ফেলি। তবে চরিত্রসমূহ আমাদের জীবনসাক্ষ্য হইয়া যায়, নাটকের রাতে মেঘ করিয়া আসিলে দিগি¦দিক পালাইয়া যায় অনেকেই, হামলে আসে বৃষ্টি, ঈশান কোণ থেকে ধেয়ে আসে পাগলাঝড়। সব স্বপ্ন ভাঙিয়া যায়, নাটুকে লোকরা গ্রীনরুম ছেড়ে শেল্টার নেয়, বৃষ্টিধোয়া পানি আর বিজলীচিহ্নে সবকিছুর পরাজয় ঘটে। অবসান ঘটে জীবনের সবচাইতে বড় আকাক্সক্ষার। আমরা সে বৃষ্টির পৃথিবীকে অস্বীকার করিয়া ফেলি। কবে সে সব নাটকের জীবন শেষ হইয়া যায়, ঝড়জলরোদে কবে আমরা বিতাড়িত হই, কবে সোবহানভাই হঠাৎ হার্ট এ্যাটাকে মারা যান, কবে মানিক ভাইয়ের বিপ্লবী শ্লোগান বদলাইয়া যায় আমরা জানি না। তবে নাটক আর কখনো ফিরিয়া আসে না। ওই নাটকের আয়োজন আমরা আর চোখে দেখি নাই। সৌভাগ্য হয় না আমাদের স্পার্টাকার্সের বিজয় দেখার। তখন স্মৃতিরেখায় জানিয়া যাই, হায় কবে কোথায় ফেলিয়া আসিয়াছি আমাদের জীবনের সাম্পান! তবে কলেজমাঠকে আমরা খুব ভালোবাসিয়াছিলাম, ফুটবল ম্যাচ হইলে, ভলিবল-ব্যাডমিন্টন হইলে সেখানে জমায় ভালো। সীমিত দর্শকে এখানে সবকিছু মানিয়া যায়। একসময় এ কলেজের বাঁশের দেওয়াল উইয়া যায়, সেখানে শিলান্যাস স্তম্ভ করে নতুন বিল্ডিংয়ের ঘোষণা আসে। তারপর ঐদিন দীর্ঘসময় আমরা সার্কেল অফিসারের বক্তব্য শুনি। তেমন সুধী-সমাবেশ আর আগে হয় নাই। কলেজের গুণাগুণ শুধু নয়, গড়ার প্রক্রিয়া বা মানবসম্পদের উন্নয়ন নিয়া অনেক কথা হয়। সে বক্তৃতার ধরণ আমাদের অনেককাল স্মরণে থাকে। আমরাও তখন তেমন অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখানোর জিনিসতাই অনেককাল তা আমাদের আপন হইয়া থাকে। অনেকেই বক্তব্য দিলেও মোটাসোটা সার্কেল অফিসার সাহেবের বক্তব্যই চিত্তাকর্ষক। সৎ-নিষ্ঠাবান হিসাবে তার খ্যাতি শোনা যায়। কলেজের পেছনটায় বিশাল বাংলোয় তাহার থাকার ব্যবস্থা। পরীক্ষায় তখন নকলের মহোৎসব। বৃদ্ধ বাবা ও শিক্ষক এক পরীক্ষার্থীর পেছনে দৌড়ায়। মশগুল মাস্টার, ওয়াদুদ মাস্টার, দুলাল মাস্টাররা তখন নকল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। মশগুল মাস্টার পুলিশি গুঁতায় সাদা পাঞ্জাবী ছিঁইড়া ফেলেন, কেউবা ফন্দি-ফিকির করে এমন নাটকে নামে। সার্কেল অফিসাররা থাকিলেও দূর শহর হইতে ম্যাজিস্ট্রেট আসেন, তখন এসব নিয়া ভিন্ন নিরীক্ষা হয়। দুর্নীতি করিলেই তখন তার পুরস্কার ও বাহবা চলে। এমনটা রীতি হইয়া যায়। বাংলা ইংরেজি সব পরীক্ষায় তখন নকলের পারদর্শিতা।

স্কুলকলেজের পাঠে গান্ধী-নেহেরু বা লালবাহাদুর শাস্ত্রী যেমন শুনি তেমনি সুহরাওয়ার্দী বা শেরে বাংলার গল্পও কম নয়। গালগল্পে আব্বা বলেন শেরে বাংলা চল্লিশটা ফজলি আম একসঙ্গে খাইতে পারিতেন। যেমন খাওয়া তেমনি তার মেধা। হড়হড় করিয়া সব মুখস্থ বলিতে পারেন তিনি। একটা পড়া একবারের বেশি পড়িতেন না। এটাই হলো মেধা। তোরা পারবি! তিনি আরও বারবার নেহেরু-গান্ধীর গুণগান করেন। ভুট্টোর জমি-জায়গা কতো জানিস? সকালে ট্রেনে উঠিলে তাতে রাতে পৌঁছাইলে তার জমি শ্যাষ হয় না। এ রাজনীতিবিদের জমির দরকার আছে? লোভ-লালসা কী আর থাক্বে! আর এখনকার রাজনীতিবিদরা হলো সব চুদিবল্লব। ওই যে আকবর সর্দার ক্লাশ থ্রি পাস রাজনীতির নামে সে সেদিন প্রিন্সিপালকে পিটাইল? এই হলো দ্যাশ! তার কথায় আমরা মূল্যবোধে আক্রান্ত হই। কিন্তু এ মাপের নেতাদের আমরা কখনও চোখে দেখি নাই। তবে ইন্দিরা গান্ধীর প্রচার লোকমুখে খুব বেশি শোনা হয়। তিনি স্কুলে শিক্ষায়তনে বা বন্ধুদের ভিতরে কেমন করিয়া খুব পরিচিত হইয়া যান। ছবি দেইখা তার প্রতি আকৃষ্ট বাড়ে। আমাদের বন্ধু পিকে প্রায়ই নেহেরু-গান্ধীর কথা বলেন। কি কারণ জানি না। তবে বনেদী রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এসব মিলিয়া তার গুরুত্বপূর্ণ তখন ছিলেন। মকবুল ভাই আমাদের বাসার নতুন থ্রি-ব্যান্ড রেডিওতে প্রতিদিন রাত পৌনে আটটায় সর্টওয়েভ ধরাইয়া বিবিসি শোনার ব্যবস্থা করেন। এ কাজ ছিল তাহার প্রাত্যহিক কর্মের একটি। একদিন স্কুলে শোনা গেল ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে মরিয়া গিয়াছেন। তখন আততায়ী শব্দের অর্থ জানি না। এ শব্দটির প্রতি আকর্ষণ যেমন তেমনি স্মৃতিময় কষ্টগন্ধও জড়াইয়া যায়। সন্ধ্যার আগেই মকবুল ভাই দুটি নতুন ব্যাটারী কিনিয়া আমাদের রেডিওর সামনে আসিয়া বসিয়া পড়েন। আজ বিবিসির খুব গুরুত্বপূর্ণ খবর। তখন প্রায় সব সময়ই আবুল চাচা বা আজিজের দোকানে এমন বিবিসি শোনা মানুষের ভীড় থাকে। সে সব খবর লইয়া আলোচনাও চলে অনেক রাত পর্যন্ত। তখন অনেক সময় ভোয়ার খবরও চইলা আসে। অনেক কষ্টে আমাদের রেডিওতে সেদিন বিবিসির খবর ধরা যায়। শিখ দেহরক্ষী কর্তৃক ইন্দিরার ওপর গুলিবর্ষন, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সংবাদ পাঠক গম্ভীর কণ্ঠে এ খবর শোনাইলে আমরা চিন্তিত হই, মৃত্যুকে অস্বীকার করিতে চাই। ভারতের বা বিশ্বরাজনীতির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ প্রচার শুনিয়া বুক ভইরা কষ্ট জাগে। স্কুলে পরদিন কাদের স্যার মান্নান স্যার কি কি যেন বলেন। ওসব আমরা বুঝি না। তবে ইন্দিরার মৃত্যু আমাদের কষ্ট দেয়, রাতে দুঃস্বপ্ন আনে। অসুখী পৃথিবীকে মনে করাইয়া দেয়। আমতলায় আসা পেপারের হেডলাইন মোটা হরফ পায়। তারপর একদিন ক্যারোকামারও বলেন,  দুনিয়াত মানুষ নাই। গান্ধীক মাললো ইন্দিরাকও মাললো, দ্যাশোত আপন আর কেডা আচে। অনেকবার পান দোকানের আড্ডায় বা ক্যারোকামারের দোকানে তার স্তুতি চলতে থাকে। রাস্তার পাশে হাড়জিরজিরে শীর্ণ ক্যারোকামার তখন অনেক কষ্টে হাঁপর টানিয়া চলেন, এ্যাজমার কারণে ঘননিঃশ্বাসে একাত্তরের যুদ্ধচিত্রে তাকে স্থাপন করেন। গান্ধী পরিবারের প্রতি তার অজানা ভক্তি আজন্ম। খুব ফর্সা ঢিলে চামড়ার বয়স্থ ক্যারোকামার গৎবাঁধা দা-বটি-চাকু-ছুরি বানান। কথা কম, মাঝেমধ্যে হাসিলে ফোকলাদাঁত বাহির হইয়া পড়ে। বেশি সময় তিনি তার খড়ের দোকানে থাকিতেন না। হাওয়া উড়িলে বা ঝড় হইলে তাহার দোকান আগেই শূন্য হইয়া যায়। চারিদিকে ঘুপঘুপে অন্ধকার নামিয়া আসে। সে অন্ধকারে তারার আলোয় জাইগা থাকেন ক্যারোকামার। পাশের কয়লার ঢিবিটা অতিক্রম কইরা চারবাঁশের খুঁটিতে আটকানো চালার দোকানটায় ধুতির ল্যাংটি পইরা কামার ধীরচালে একসময় আগাইয়া যান বাড়ির দিকে। শিরশিরে হাওয়ার শীত রাতে তীরহানা কনকনা বাতাস পুরানা হাড়ে লাগে, ল্যাংটির আঁচলমাথা পতপত কইরা ওড়ে, খোয়াসিমেন্টের পুরানা রাস্তায় না উইঠা একটাকোর নিচে পাতলাধুলার রাস্তায় সতর্ক পা ফেইলা আগাইতে থাকেন তিনি। অরণ্যময় এলাকা ছাইড়া কাঁচা রাস্তায় তিনি যখন পৌঁছান তখন পাকুড়গাছের পাতার কাঁপুনি আরও বাড়িয়াছে। আকাশ কালো গম্ভীরনিনাদে মুখরিত। দলবদ্ধ হৈ দিয়া শত্র“-আক্রমণের মতো নাইমা আসে কুলপ্লাবী বরিষণ। ক্যারোকামার তবুও একলয়ে আগাইয়া যান। বৃষ্টিতে ভিইজা ভগবানে আস্বস্ত হন। স্বর্ণের দোকানের পাশ ঘেইষে পুরানা কোটাঘরের পিড়ালী ধইরা কম্পমান গলায় কানাইকে ডাকিতে ডাকিতে খোলা প্রাচীরের মাথার ফাঁকা অংশ ধরিয়া আঙিনায় ঢোকেন। আমরা তারপরের খবর আর জানি না। তবে রাগতস্বরে চীৎকার শোনা যায়। তার ক্লান্তিকর সুখ-অসুখ সে সব নিয়া তখন শোরগোল। বাড়ির সীমানা পার হইয়া তা অনেকদূর পৌঁছায়। বড়স্কুলঘরের পেছনটায় ক্যারোকামারের বাড়ি। এ ঋষিবন্য ছিমছাম বাড়ির পেছনে বাঁশবাগান, লতাগুল্ম, কালীমন্দির, আটাষ্যড়ির গাছ, লজ্জাবতীর ঘাসনোয়ানো মুখর বিস্তৃতিপট, দূর্বাবিছানো খুনঝরা সবুজঘাস আর বিচিত্রবয়সী বেড়ে ওঠা অনেক খেজুরগাছ। কালীমন্দির ঘিরিয়া এ জায়গার একটা পবিত্র পরিবেশও বিরাজমান। কালীজিহ্বায় শিউরিয়া ওঠার আবহ। ফটিককে মনে পইড়া যায়। তার কী সাহস, এখানেই সে ধরা পড়িয়াছিল। অমাবস্যারাতে চোরডাকাতের সাইত আর ফাল্গুনের সেই শীতসকালেই কালীর উপাসনা। মরাকলাপাতায় গাছবাধিয়া চোরের সাইতকে ভুণ্ডুলের বিশ্বাস রোপন কিংবা রাতের হিস্যুর ডাক আসিলেও ঘরের চৌকাঠ না মাড়াইয়া জড়োসড়ো থাকা আমাদের আদর্শ। আর ফটিক এসব মানে না! বছর ঘুইরা এ ভয়াল কালোরাতে সে আমাদের তাড়িয়া বেড়ায় অনেককাল। অন্ধকারের ভয়ার্তরূপ আমরা উপভোগ করি এ রাতকে ঘিইরা। বিশেষ করে গোরস্থান বা শ্মশানের পরিবেশ বা যাদুকরদের যাদু-উপাদান সংগ্রহের এ রাত আমাদের দুঃস্বপ্নকাতর করিয়া তোলে। কতোকাল আমরা ওই বৃষ্টিভেজা রাতে তুফান সাঁতার দেই, কলরোল তুলি, মনের মাটিতে বাইয়া চলি যৌবনভোলা তরী, খুইজা পাই ওহাবচাচার মাথার খুলি, জ্যোতিনদার ছাইভষ্ম বা মোটরসাইকেলে নিহত মুকুল ভাইয়ের মৃত্যুমুহূর্তের আহত চোয়ালসমূহ। ওসব এ অমাবস্যারাতে এতো তরতাজা কেন? যে মুকুলভাই লম্বাপায়ে রাত ভইরা হাঁটিয়া চলেন তার বাড়ির দিকে তিনি কেন এখন এ গোরস্থানে? পতিত দুর্ঘটনায় ওই বীভৎস মুখে দাঁত উঁচু কইরা, চোখ রাঙাইয়া এদিকে আগাইয়া আসিতেছেনকী চান তিনি আমাদের কাছে! ‘কী কইছিলাম না দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। রুশ-মার্কিন শক্তি কার কেমন বেশি আর কেন বেশি! তোর মনে আছে। ক্যারে স্কুলঘরের ওপাকে সোনামিয়া খেলাঘরের ট্যাকাগুলা দিয়া কী করলো খোঁজ নিছিস!’ ধরপড় করিয়া তখন শৃগাল দৌড়ায় নাকি গাড়োয়া মুখ গোজে আজগার মিঞার কব্বরের ভিতর টের পাওয়া যায় না। সরসর কইয়া বাঁশপাতালী সাপ বাঁশের আগায় পৌঁছায়, কোণার শিমুল গাছটা থেকে ঘাসদেহে টপটপ মোটা শিশির পড়ে, দূরে ঝিঁঝিঁর গাঢ় কম্পোজিশন গাঢ়তর কখনো চেরা বেসুরো, সড়াৎ করে বাদুড় কলাপাতায় ডানা তোলে, দৌড়াই আমরা ভয়ে, গা-পা কাঁপে ওখানেই ওই কলাতলায় শুইয়া আছেন মোটাদেহের মোয়জ্জেন সাহেব। তিনি উপুড় হইয়া বিছানায় মরিয়াছিলেন। তার দেহ সাদাকাপড়ে মোড়ানো হইলেও কিচ্ছু তো নাই, টুকরা-টাকরিও পাওয়া যায় না। ভেতরে খালি কিশকিশা আন্ধার। অমাবস্যার রাতের চেয়েও স্তনী অন্ধকার। কেডা বইসা আছে ওখানে? মোটাশরীরের মোয়জ্জেম কি ওখানে তোষক পাতছে। না কেরামুন-কাতেবীনের হিসাবের পর শাস্তি পাইতাছে। নাহ্ মনে হয় এখন গোছলে আছে। গোছলপাড় জ্বলে, চিকচিক তারার মতোন, তিনি মোয়াজ্জেম তো! বিচার বুঝি কম। এতো খারাপ হইয়া গেছে তার চেহারা। কী গোদগোদা মানুষ ছিলেনআর তার এ পরিণতি! আরে ওখানে যে প্যাচ্চা আছে মোটা দাড়াস। কার সাথে প্যাঁচানো, কি য্যান কামড়ে আছে। এ কামড় কি ছাড়িবে না! শালার সাপেরও দেখছি মহড়া। এতো ঠাণ্ডা কেন! ঘুমের ভিতর জোর মারে প্যান্টের তলের নুনুটা। টনটন করে। তখন পদ্মগন্ধা আরামে ভিজিয়া যায় বিছানা, লেপ, তোষক। ছলছলে করে বিছানা। দুনিয়ার সব টেনশন নামিয়া যায়। অন্ধকার মধ্যদিনের বৃষ্টি পড়ে মনের মাটিতে। নিঝুম শন্তি ঝুলিয়া থাকে সবদিকে। জগাতিক সীমানায় চলিয়া আসে সবকিছু। চকচকে রোদে মা শুকান লেপতোষক। আর অমাবস্যার পরের রাতে সব আতঙ্ক দূর হইলেও আরেকটি রাত স্বপ্নে বাঁচিয়া থাকে। তখনও কামধেনুর রাত ডাকিয়া যায় আয় আয়! হাসু-জাহানারা-পলি ও অন্য কেউ মদিরেক্ষণার ওম নিবার জন্য ডাকে । রাত হয় অন্যরকম চাঁদোয়া মাখানো নরম পৌষসন্ধ্যার। সব স্তব্ধতা অতিক্রম করিয়া রামধনু সুখ ঘিরিয়া ধরে সবকিছুকে। শিরীষ-পলাশে তখন কুয়াশা। ওপারে বাতাসে ভর কইরা আসে শিল্পীর নরম শরীরের ঠোঁটে। ক্রমশ তা কুয়াশায় আস্তরিত হইলেও হিহি কইরা কাঁপে। চুমায় দোলায় হাতড়ায় সব তুলতুলে কিছু। তখন ঝরঝর করিয়া গা ঘামে আর ভয় আসিয়া তাড়া করে। ক্যারে চৌধরি স্যার ক্যামা নাঠি নিয়া এদিক আসোচে। আজ মারি ফেলাইবে। তখন শিল্পী সরিয়া নেয় শরীর আর ভেতরের ভয়ে তখন গা গুলিয়া ওঠে। কী যেন হয়। বোঝা যায় না। তবে শিশ্ন আগায় এক ধরনের তাপ জমিয়া থাকে এবং ক্ষণেক পরে তা কুঁকড়ে চামড়ার ওপারে সেঁধিয়া যায়। তবে তাও বাইরের ভয় আর ঘুমের চৌধরি স্যারের ভয় কয়েক রাত একইরকম রাখে আমাদের। তবে কেমন সুখ বজায় থাকে এ ভয়ের ভিতরেও। বিশেষ করিয়া শিল্পীর জন্যে। ও তখন ফ্রক পরা, কুচি দেওয়া হাফপ্যান্ট পরা আর পায়ে একটু উঁচা ফিতেওয়ালা পঞ্জ পরা। গোলগাল মুখ হইলেও ততোটা পুষ্ট নয় কিছু। বুক পেটে জমে নাই। তবুও রাতের কাহিনীতে তার শারীরিক ক্রিয়াসমূহে মন আনচান করে। পরের দিন স্কুলে আসিলে তাকাইলে তেমন কিছু হয় না যেন। তবে সে সব দিনে ঝড়ের মাহবুবে মধুগন্ধভরা স্কুলকোণার পাশের কালীমন্দির পার হইয়া জ্বলন্ত আগুনের উত্তাপের নেশায় কোনো দুপুরে ক্যারোকামারের কাছে আসিয়া দেখা যায় এককভাবে আনমনে তিনি স্বীয় কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। খরিদ্দার আসিলে বসিতে বলিতেছেন না, দাঁড়াইয়া বা পাশে কোথাও ইচ্ছামতো বসিয়া নিজের কর্মকাজ সারিয়া গ্রাহকগণ তাহাকে ছাড়িয়া যান। ক্যারোকামারই এ পাড়ায় বয়স্থ লোক। অনেক সন্তানের জনক তিনি। ছেলেরা বখাটে, ভবঘুরে। কিন্তু পাড়ার নেতৃত্বে ক্যারোকামারের ছেলেরাই সব কর্মকাণ্ডের শিরোমণি। গলাবাজীর কারণে তারা প্রভাবশালী। একরকম পসারও তাদের। সোনাকন্দরে একজন, বন্দরে একজন, বালুয়াহাটে একজন। তাতে করিয়া পাড়ায় পাড়ায় ঝগড়াঝাটির উত্তেজনা ছিল। সে উত্তেজনা কখনোও বিষফোঁড়া হইয়া দেখা দিলে রাস্তায় হৈচৈ শুরু হয়। ধাওয়া-পল্টাধাওয়া চলে। রাস্তার এ-প্রান্ত ও-প্রান্ত ইট-লাঠি-সড়কি নিয়া একেকজন প্রস্তুত। তখন মৃত্যু তো তুচ্ছ। ভয়ঙ্কর সে পরিবেশ যেন পৃথিবীকে পাল্টাইয়া দেয়। ওসবের দর্শক হিসাবে থাকিলে তখন প্রত্যক্ষ দেখা যায় হবিবপ্রধান দৌড়াইয়া আসিয়া সরাসরি চাক্কু বসিয়া দেন আনিসের কাঁধে, একাধিকবার চাক্কু বসানোয় সে সীমার-কায়দা শিক্ষক। তখন ফিনকি দিয়া রক্ত ছোটে। বিরাট স্কুলঘরের কাঁচা টিউবওয়েলের পাশে পড়িয়া যায় আনিসুর। ক্যারোকামারের দোকানের বাঁশ উপড়াইয়া জনতা একহতে শুরু করিলে চাক্কু হাতে লোকালয় ছাইড়া পলায় হবিব। পেছনে আনিসের অনুসারীরা ধাওয়া করিলে বিপরীত পক্ষের লোকজন চতুর্দিক থাইকে ঘিইরা ফেলে। বেটেখাটো হবিব তখন সীমারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। আরও উত্তেজনায় রামদা বা অন্য কোনো অস্ত্রসাজের জন্য দৌড়াইয়া কোঠাবাড়িতে ঢোকেন। নিয়া আসেন বিশাল শুল্পি। সেটি নিয়া একভাবে তাড়া করেন উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে। তখন ত্রস্ত চারদিক। পশ্চিমে সূর্য যতোই হেলিতে থাকে ততোই আতঙ্ক বাড়িয়া যায়। তবে ভোররাতে শোনা যায় হবিবের পরিবারের বড় ভাইয়ের ডানহাত কে যেন এক চোটে কাটিয়া আলাদা করিয়া ফেলাইয়াছে। হাতবিহীন সে মানুষকে রাতেই পাঠানো হয় সদর হাসপাতালে। রক্তক্ষরণের চিহ্নরাস্তায় ভোরের আলো পড়িলে কতো লোক একত্রিত হয়, থানা-পুলিশ আসে, কান্নার রোল ওঠে, সুর করিয়া ভাসিয়া আসে উতরোল বিলাপ। সে কি বাঁচিবে? কতো রক্তপাতএবার পরের টার্গেট কে! এসব আতঙ্কে অনেকদিন আমরা রাতে বাহির হই না। কসাইচাচা বা রইচচাচার পান দোকানের আলাপ-আড্ডাও সীমিত হইয়া পড়ে। কতো রকমের গল্পকারবারে ভাসিতে থাকে মুখরিত ভয়ার্ত প্রকৃতি। তবে ত্রস্ত ওইসব এলাকায় আমরা আর যাই না। লোকালয়হীন থাকে সেসব পরিবেশে হাসি থামিয়া যায়। পরস্পরের আলাপ-আলোচনায় আসে নীরবতা। পরে অনেক সময় পার হইলে প্রতিবেশী হিসেবে হবিব স্বাভাবিক হয় কিন্তু তার প্রতি আমাদের দৃষ্টি থাকে না। উপাংশুঘাতকরূপ বহন করে সে। কোনোকালেই অর দিকে আমরা তাকাই না। পৃথিবীর সব নির্মমতাগুলার দৃষ্টান্ত হিসাবে রইয়া যায় সে। লেবুনচুষ চকলেট বা লাঠি লজেন কিংবা কাঁধে চড়া ডুগডুগি নিয়া তখন আইসক্রিম বাজনেওয়ালার আনন্দও পরাজিত আমাদের নিকট। আমরা পরাজয়ের রাস্তায় হাঁটি। রইচচাচার দোকানে তখন লাঠিলজেনে ছাতা পড়ে, কৃষাণ-কৃষাণীর চাওয়া আনসার বিড়ির প্যাকেটে তখন নোনা জমে, রাখী-সেতারা-খালেদারা স্কুলবার্ষিকীতে নাটক করা ছাড়িয়া দেয়, মশিউর-বকুল ভাইরা আর ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ পড়িতে বলেন না, লুৎফর স্যার মাসান্তের ত্রিশ হাতলেখা আর গ্রহণ করেন না। সব পরাজয়ে আমরা তখন পালাইয়া বেড়াইতালামার্কার পুরানা ইলেকশন ক্যাম্পে নিছক বসিয়া থাকি। কখনো কিছু মিষ্টিমুখ করি। সাদাকাগজের লালকালো পোস্টারের জন্য অপেক্ষা করি কিংবা বৃষ্টি আসিলে পা ডুবাইয়া কাগজের নৌকা ভাসাই। এভাবে দিনগত হইলে কখনো পরাজিত হই বা হই না কিংবা আমাদের বিবেক পাতকী পরনিন্দার পৈঠায় বিসর্জন থাকে কিন্তু যখন জানিয়া যাই মানিকপুরের পাথারে কোনো সময় পাওয়া গেছে মকবুল ডাকাতের খণ্ডিত মস্তক, বাকী ডাকাতকে কয়েকটুকরা করিয়া ফেলিয়া রাখা হইয়াছে, খুন করিয়া আজগারের মৃতদেহ রাখা হইয়াছে আজিজের বাড়ির খুলিতে তখন রাতভীতি ছাড়ে না। থাকে না তা অমাবস্যায় বা কালীমন্দিরে সীমিত। তবে নির্মম মৃত্যুর ভিতর দিয়া সমস্ত কেচ্ছা আমাদের নিকট পরিস্কার হয় প্রাত্যহিক পর্বে থানার মাঠে খেলিতে গেলে। ওখানে কাঁটাতারের বেড়া ঘিইরা উন্মুখ জনতা দেখিতে পায় লাশকাটা ঘরের আঙিনা বা দারোগাবাবুর অফিসের সামনে খেজুরপাতার শতরঞ্জি মোড়া মাছি ওড়া লাশ। কোথায় বা কী কারণে এসব আসিলো তার শেষউত্তর আমরা শুনিতে চাই। আসামীর তখন মারপিটের চীৎকার চলে। বিশাল পুরানা আমগাছে হাতঝুলাইয়া পিটুনির সঙ্গে সঙ্গে জবাব আদায়ের চেষ্টা চলে। খুনের রাজত্বের গা-শিহরণ করা ইতিহাস বলিতে থাকে মিঠু ও মফিজ চাচা। বক্তাভঙ্গিতে মফিজচাচা বলিয়া চলেন, শোনান আমাদের হরিণসিংদীঘি, মদনপুরের মোড়, জলতলী পাথারের ডাকাত হত্যার রোমহর্ষক কাহিনী। রাতডাকাতির পন্থা আর নির্মম রাহাজানির দৃশ্য তার অতি পরিচিত। রাতগুলা তখন নেওর পড়া, মিশুর হোটেল ফাঁকা করে অধিকাংশ মানুষ তখন চলিয়া গিয়াছে উত্তরের রাস্তা ধরিয়া অনেকদূর। মফিজচাচার কম্পিত উচ্চারণ তখন আরও প্রবল। ওসব বলকানো কাহিনীতে আতঙ্কের ঢেউ ওঠে, কালিগোলা অন্ধকার আরও কালী-শরীর ধারণ করিয়া, সব ফাঁকা রাস্তা দস্যুহানা মনে হতে থাকে। তবে হিলিগামী ভারতসীমান্ত অবধি রাস্তার কীর্তি আমাদের বেশি মনোমুগ্ধ করে। ওপথে যেমন বস্তাবোঝাই রহস্যজনক কি কি সব ‘মাল’ আসে। জলবায়ুর স্নিগ্ধতা চমৎকৃত তখন এসব অঞ্চল। শান্ত-নিরীহ প্রকৃতি। ধুলাওড়ানো সে সব লালারাস্তা আর মোড়ের বাঁকে বাঁকে টোলঘরে কীসব বিক্রির কাহিনী। ডুগডুগি হাট, বারোকান্দি, ওসমানপুর, রাণিগঞ্জ, পাঁচবিবি একরথের শবযাত্রা যেন। অনেক দূরের এসব পথে সাইকেল একমাত্র বাহন। ক্রোশের পর ক্রোশ পাড়ি দিয়া চলে আমাদের যাত্রা। কখনো রাস্তাঘাট জনমানবহীন, ডাকাতভয়ে লজ্জিত সব রাতজাগা নাড়াভূঁই। বাতাসস্রোতে সাঁতার কাটিয়া মিষ্টিরোদে আমরা পৌঁছাই ডুগডুগি বা অন্যসব অঞ্চলে।


‘কইতরের চেংনা’ ছাড়া ছোটফুপু আর খাওয়াতেন না কিছু, কারণ তখন তাদের সংসার মৃতপ্রায়। আমাদের ভালোবাসেন নিজের সন্তানের চাইয়া বেশি। বড়ফুপুর ঠিক উল্টা। সারাক্ষণ নীলশাড়ি পড়েন, শুধু যখন বেড়াইতে যান তখন চিকনপাড়ের সাদাশাড়ি। ফুপা আমাদের বেশি তোয়াক্কা করেন না। তিনি নিজেকে নিয়াই ব্যস্ত। তার কাজ মেলায় মেলায় ঘোরা, আর বড় বড় হাটে কার কার সাথে হাঁটিয়া বেড়ানো। অধিকাংশ সময়ই তাকে বাড়িতে পাওয়া যায় না। শোনা যায়, তিনি খুব বড় ঘরের সন্তানসে কারণে তার কি কি সব নেশা আছে। তবে দুজনের এ সংসারে দুজনই আলাদা। প্রয়োজনে ছাড়া উভয়ের কোনো কথা নাই। আমরা সুখে-দুঃখে ফুপুর কাছে যাই। তাকে আমাদের খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে, চাঁদরাতে উপচে পড়া জোছনায় আমাদের কোলে নিয়া বিলম্বিত লয়ে ডুকরিয়া ওঠা গীতে আমাদের তিনি শোকাহত করেন, আমরা তাকে কাছে পাই, শোনান তিনি চরকা বুড়ির গল্প। বাইরে হাঁটেন আর কি কি সব কেচ্ছা শোনান। বাড়ির বাইরে খড় দেওয়া প্রাচীরের পাশ ঘেসিয়া একটা নামা গর্ত দিয়া হাঁটিয়া উঁচু ভিটায় ওঠেন। সমস্ত প্রকৃতি তখন মরালাশে সাদাচাঁদরে ঢাকা। পরিবেশটা যেমন শান্ত তেমনি স্তব্ধ। ফুপু তার মায়ের গল্প বলেন আড়াবাঁশের আগায় চাঁদের দিকে তাকাইয়া। শিউরে ওঠা শরীরে আমরা সব বিশ্বাস করি, কখনো মন খারাপ বা আনন্দ লাগে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উজাড় করা চাঁদজোছনা যখন গোটা আকাশকে দখল করিয়া রাখিয়াছে তখন মাঠের পর মাঠ ফাঁকা ভিটায় স্তব্ধতার অঞ্জলি মাখিয়া রেডিওতে কোনো কুটির থেকে ধাইয়া আসে পরদেশীর বিদায়ে প্রেয়সীর অনুরাগের বিরহবিছানো লোকসুর‘এমনই আগুন জ্বেলে বুকে/ অশ্র“ দিয়া দুটি চোখে/ ভালোবাসার স্বপ্ন আমার ভেঙ্গে দিও না…’ কেমন করা বাতাসী সুরগুলা মগজে কলরোল তোলে, কতোকাল আমরা ওসব গুণগুণ কইরা গাই, মুখস্থ করি কাগজে লিখি। চিরসবুজ নায়কদের তখন আমরা খুঁজিয়া ফিরি নিঝুম প্রকৃতির বৈরী হাওয়ায়। বেতার-বিচ্ছুরিত সে সব গানে অঙ্গে-বিহঙ্গে ঝড় ওঠে ঝঙ্কারে। তালতলায়, রোদেলা দুপুরে কিংবা মেঠো রাখালের কণ্ঠধ্বনিতে অনেক গানে আমরা যুক্তিহীন রহিয়া যাই। সুরসৃজিত সে সব নায়কেরা আমাদের স্বপ্নতুল্য হইয়া উঠিলে তারা শতাব্দীর সৌগন্ধে পরিণত হন। নব নব আবিষ্কারে পৃথিবী প্রকৃতি আস্বাদিত হইয়া ওঠে। শিমুলকদমের কাকবসা ডালে উন্মুখ হইয়া মনভেলা ভাসাইয়া দেই। মেটেরঙা ডালের মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ শিমুল হৃদয়খোলা দুলিতে থাকিলে ওর তলায় আমরা বইসা পড়ি। অনেক ফুল কুড়াইয়া নেই। ব্যবচ্ছেদ ঘটাই। কী ওর মর্ম বুঝিতে চাই। ওসব কুড়ানো ফুলকে একসময় জীবনপুটে বাধিয়া ফেলি। কতোবড় সে শিমুলগাছ, কবেকার তা জানা থাকে না। তবে চৈতীবাতাসে দূর পগার পার হইয়া আসে বিলুপ্তস্তূপের রাজাবাড়ির প্রতœহাওয়া, শিরীষ কাঁপানো প্রশাখায় পাওয়া কল্যাণী যুবতীর মনভারী কারুপ্রণয়কথা। সে সব না বুঝিতে চাইলেও বহতা হাওয়া আমাদের বুঝাইয়া দেয় ‘পথ যদি শেষ না হয়’ রূপকথাকে। চিনিয়া দেয় ওই দূর বাঁশঝাড়ের ওপারে রেবা-হাসুর প্রেমকাহিনী, কতোক্ষণ ওরা এক হইয়া আছে, কখন সে স্বপনসুর শেষ হইবে জানা যায় না। আমরা জানি নাই ওদের শেষ পরিণতি কি হইয়াছিল। কবে ওরা শেষ প্রান্তে পৌঁছিয়াছিল। তবে ওসব ভাবিতে ভাবিতে গরুরগাড়িতে চড়িয়া করিমন বু’র বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব আসে। গরুর গাড়ীর ভিতরে নাড়ার ওপর বিছানাবালিশ পাতানো। সেখানে বসিবার আনন্দ নাই। তাই বলিয়া বহুদূর পথ-প্রস্তুতি থাকিলেও যাওয়া হয় না। তা ছাড়া পানিভয় কম নয়। স্রোতস্বিনী নদী পার হওয়া, নাও নাই, বাঁশে করে বা ভেলায় অনেক সাহসে পার হইতে হয়। সাঁতার না-জানা মানুষের তা করবার কোনো সাধ্য নাই। তবে ফুপুদের অরণ্যময় গ্রামে ঘনান্ধকার আকাশমুখী বাঁশবন, কবরঘেরা লালমাটির ঢিপি, কালছোয়া অশোক-আম্রকুঞ্জ লাজনম্র অশোক-পাকুড়বৃক্ষ কতো কি আমাদের গ্রাস করে! সে সব বনে তখন শেয়াল আর অজগরের বসতি লুপ্ত নয়, কঠিন শীতে কিংবা গরমে রৌদ্রজাগর প্রলেপে চলিতে থাকে আনন্দবসতিকোনো গাছডালে বা অন্ধকারময় নীরব-নিঃশব্দ বনপাড়ায়। সেখানে তখন শিশ্নখেলার শীৎকার ধরে বনবিড়ালেরা আসা-যাওয়া করে, রমণীমুখী উপভোগের জন্য ফন্দি আঁটে, কোনো অবিধবা অবলার উদ্দেশে শরীরী আহ্বান বা মৈথুনে বিকার মেটানোর চেষ্টা করে। নাওয়া-খাওয়া ভুইলা গাছডালে ওসব ঘটিয়া চলিলে একসময় পুরানো মিনার ঘেষিয়া ঘোড়ানিমের গাছ ধইরে ঈষৎ সাদাকুয়াশায় ঘনীভূত হয়কানাই-গোলান কিংবা হাসু-সেলিম আলাদা হইয়া আরও আড়ালে কিছুটা বস্ত্রহীন অবস্থায় ওদের দেখা যায়। বেশকিছু সময় নিয়া ওরা শীৎকারে বিপর্যস্ত হইলে আমরা দূরে সরিয়া যাই। এক ধরনের ভয় কিংবা অনাস্থা তখন আমাদের ঘিইরা ধরি। বাতাসে তখন খারাপ হাওয়া, বিরূপ মেজাজে ওদের শরীরে তখন ধরা পড়ে কেমন আঁশটে গন্ধ, সর্বাঙ্গ জুড়িয়া। কালোশরীর আর উদাম গায়ের সফিকুল একদিন নিজে নিজেই জীবনের গল্প বলা শুরু করে। সে আমাদের বড় সড়ক দেখিতে চায়, বড় বাসে চইড়া দূর দূরান্ত যাওয়ার স্বপ্নের কথা বলে। শীষবাঁকানো সোনাধানের ক্ষেত পার হইয়া, বিভিন্ন আইল মাড়াইয়া একধরনের ঠাণ্ডাজলমেশা উজানবাতাস ঠেইলা লক্ষ্যহীন হাঁটাদৌড় দিতে থাকে। পথের সুধায় মেঠেরোদ্দুর হানা নি®প্রভ বাতাসে আকাশনামা মেঘের আলিঙ্গনে আমরা তখন ছুটিয়া চলি। তখনও লাঙ্গল মাড়ে নাই ওসব জায়গায়, মইয়ে ওঠেনি কৃষক, জোয়াল ছাড়িয়া আলের কোণে হুঁকা ধরায় নাই বরজাহান-রাঙ্গারা। সফিকুল অনেক পথ মাড়াইয়া বিরাট ইলেকট্রিক পোলের খুঁটিতে গিয়া দাঁড়ায়। চার পায়ের সুউচ্চ এসব পোলে পনর/বিশ ফুট পরেই লেখা‘বিপজ্জনক’। কাঁটাতারের নিষেধাজ্ঞাও তাহাতে আছে। কিন্তু ও সবকিছু অমান্য করিয়া বাজি ধরে সফিকুলকে কত উপরে উঠিতে পারে? সেবার সত্যিই সে অনেক উপরে উঠিয়া গেলে দূরপথের মানুষ এ বীভৎসতায় দৌড়াইয়া আসিয়া ভয়কাতর হয়, পাড়ায় তখন এসব অপকর্ম করা ছেলেদের সাজার জন্য বিচার বসাইবার প্রস্তাব ওঠে। লিকলিকে কালচে চেহারার রহিমউদ্দিনচাচা ছেলের হইয়া ক্ষমা চান অনেকের নিকট। নিজে বুড়া হইলেও তরতাজা এক স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে অস্তাচল-জীবনের সময়গুলা অতিবাহিত করেন তিনি। সফিকুলকে চাচী কড়া শাসনে মারিতে থাকেন। ওই পোলে উঠিবার পর আর সফিকুলের আনন্দজীবন থাকে না। কিছুদিন কৃষ্ণচূড়া তলায় এক ঘড়ির দোকানে তাকে কাজ করিতে দেখা যায়। তারপর আবার মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কালিঝুলা হইয়াও থাকে সে। আমাদের সুখমাতানো সে সব দিনে তখন এক উচ্ছল বালককে নির্বাপিত হইতে দেখা যায়। শোনা যায় খুব দ্রুত প্রয়াত হইয়াছেন রহিমুদ্দিচাচা। সংসারের কণ্টক পথ অতিক্রমণের ছবিতে সে তখন ব্যস্ত-ত্রস্ত। তবে আমরা ওসব দিনে তখনও ধানক্ষেতে শীষ কুড়াই, শীষে শীষে বস্তা ভরি তারপর একসময় ফয়জার বাপের কাছে যাই তাবৎ জমা দিয়া গুড়ের জিলিপি বা চালের কটকটি কিনিবার জন্য। ফয়জার বাপ ফ্যাসফেসে গলায় হাপানিস্বরে বলেন ‘তামান তো পাতান, অত কোটে ধান হে! তাও ফির ধুলা আচে গোচ্চারিক’। লম্বাখুলির প্রান্ত ছুঁইয়া বিশইঞ্চি পুরনো ইটপ্রাচীরে ঘেরা ওসরা থেকে তখন বারার শব্দ, ঢেঁকির পাদানিতে কচাৎ-কচাৎ আওয়াজ আর শীত-আসন্ন হেমন্তের পেছন বারান্দায় দল বাঁধিয়া চলিছে হা-ডু-ডু খেলার জয়চিৎকার। পেছনের বারান্দাটা কয়েক শরীকের জন্য বলিয়াই এ এক দারুণ প্লে-গ্রাউন্ড। বেশ উঁচু কইরা করা এ বারান্দা, উত্তরকোণ ঘেঁসিয়া যুঁথিদের বেডরুমের বারান্দা, আমরা ওখানে মুখ ফেলি, তাকাই। কিছু দেখার ছলে। বুড়িমা তখন বেশ লম্বা, মোটাতাজা, ঘাড়ছোয়া পক্বকেশযেন কতোকাল তাহাতে তেল পড়ে নাই। দাপটের সঙ্গে হুকুম করিতেছেন কাজের বুয়াকে। বারান্দায় তখন ভুলু ভুট্টু সুইট লেপন মিলন সবাই আসিয়া পড়িয়াছে। পয়সা খেলার জন্য সবাই প্রস্তুত। পাকিস্তানী চাঁদতারামার্কা কাঁচা টাকায় ভালো খেলা হয়। ওটা কিনিতে হয় বেশি দামে। অনেক দোকান ঘুরিতে হয়। আমরা মন ঢালিয়া ওসব চোখে আটকাই। দ্রুত কাউকে অনেক পয়সার মালিক হইতে দেখি, পয়সা বেশি হইলেই লালসা ছড়ায়, হাত ডুবিয়া তখন জিলিপি-কটকটি-ভাজার হাতছানি। পলিথিন মোড়া সে সব মিষ্টি আর নবান্ন মৌগন্ধ আমাদের পুঞ্জঘেরা নাড়ায় নৈঃশব্দ্য তোলে। জানিয়া যাই, তখন ঝিঁঝিঁ ডাকার আহাজারি, খবর আসে কাল থেকে শুরু হওয়া সুখনগর হাইস্কুলের সিরাজদৌলা যাত্রার ধ্বনিরোল। পুলক ছাইয়া যায় সর্বাঙ্গে। সিরাজের মুখচ্ছবি আমরা প্রথম দেখি সমাজ বইয়ে। বিরাট মুকুটের সৌম্য-বীরোচিত তার মুখশ্রী। মাওলা স্যার সিরাজের কাহিনী শোনান। হস্তীপিঠে সিরাজের টুকরা দেহ, নৌকায় লুৎফা-সিরাজের ধৃত হওয়ার ট্র্যাজেডি, পলাশীর আম্রকুঞ্জে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার পটচিত্রআমরা নিশ্চিন্ত অপার করুণাগাথায় মর্মমুদ্রায় সব বন্দি কইরা ফেলি। সিরাজ তখন আমাদের অনন্ত প্রেমময়ী দুলদুল। আমরা ভাসিয়া যাই, প্রতিশোধপ্রবণ হইয়া উঠি, ফণীনির মতো ফুঁসিয়া উঠি। বইয়ের সে কাহিনীতে আটকাইয়া থাকে কতোকালের অশ্র“নিচয় হইয়া আমরা জানি না। ভাঙাস্কুলের পেছন দরোজা হাঁকাইয়া তখন হুড়মুড় তরঙ্গবাতাস ক্লাশরুমে ঢুইকা পড়ে। মাওলা স্যার সিরাজগাথায় ইস্তফা দিন। কতোকাল ওসব আমাদের বাণীবাহিত থাকে, কতোকালের বকুলবাতাস ওতে প্রলুব্ধ থাকে কে জানে, তবে পুনর্বার ওই কষ্টস্মৃতি আমাদের মাতাইয়া রাখেসিরাজ অভিনয়ের মিথ-সংবাদে। সুন্দরপুরের আলোঝলোমল মঞ্চের জন্য আমরা একত্রিত হই। সেই সিরাজ, সেই গোলাম হোসেন কিংবা লুৎফার জন্য আমরা দুরন্ত হইয়া উঠি। প্রেম-সারবত্তার চিত্রিত গহ্বরে মুখ লুকাই, ক্রন্দনে আপ্লুত হই, বেদনবাঁশীতে হিম হইয়া উঠি। তখন সিরাজহরণের দৃশ্যপটে নিজেদের অংশীদার ঘোষণা করি। তবে বিপরীত ধিক্কারও কম যায় নামীরজাফরকুলের ষড়যন্ত্রে। যশোর হইতে আগত ওই যাত্রাপ্যান্ডেলে ভোরের আলোকরশ্মি দ্রবীভূত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের অমোঘ অদ্ভুত রোমাঞ্চ তপ্ত কড়াইয়ে ফুটিতে থাকে। সিরাজের আর এক রূপ আমাদের মন-অতিথি হইয়া যায়। কতোকাল সে সিরাজ-অভিনেতা আমাদের প্রিয় থাকেন, চিরকালীন হইয়া যান জানি না তবে আলোঝলোমল সিরাজমঞ্চে বজ্রমেঘেরবাদলায় আর শেষ দৃশ্য মঞ্চস্থ হয় নাই। তার আগেই ত্রিপলজুড়িয়া পানি উঠিয়া আমাদের অনুভূতিকে তরল করিয়া দিয়াছে। ভোরের আগেই আমরা টর্চআলোয় পঞ্জ হাতে, পাজামা গুটাইয়া কাঁচারাস্তা দমাইয়া ত্রস্তপথে বাড়িমুখা হই। সিরাজের দেশপ্রেম আর আমাদের ‘সূর্যাস্ত-স্বাধীনতা’ কেমন অবুঝ মুখস্থ সমর্থন পাইতে থাকে তখন থেকেই। একটু বড় হলে করিম স্যারের ক্লাশেও একই  সমর্থন পাইতে থাকি। ওসব ধন্যপ্রেম আমাদের জীবনে চির-অঙ্গীভূত হতে থাকে। জনতার আদালতেও সিরাজ চিরকালীন নায়করূপে আসীন। জীবনের স্বপ্ন-সান্ত¡নায় সিরাজ প্রবাদপ্রতিম। বহুবর্ষী হইতে থাকেন তিনি সবকিছুর মাঝে। তখন যাত্রাপ্যান্ডেলের যে ভোরবর্ষা আমাদের গোলাম হোসেনের হাহাকার শুনিতে দেয় নাই সে বর্ষা এক্কেবারে আকাশভাঙা। সিরাজদৌলা দেখিয়া ফিরিবার পর সাতদিন আমরা ওসরায় নামি নাই। বর্ষণে ডুবিয়া যায় সব। মহিরের ভিটায় পানি ওঠে, ডুবিয়া যায় দাদার কবর।
তাল-শিরিসতলার বিরাট পুকুরটা জলে হইয়া ওঠে টইটুম্বুর। খড়ম পায়ে বাড়ির বুড়ারা ইতিউতি হাঁটেন। পিছল মাটিতে হাঁটিলেও তাদের পা স্থির। খড়মের মাথায় শুধু পিলারের মতো গ্রাম্য ডিজাইন করা নাক। সোনাপীরের বান্নি থেকে কেনা ওসব খড়ম। সেটিতে আঙুল ঢুকাইয়া দিনরাত বৃষ্টিমাথায় চলেন বৃদ্ধকুল। কীসব করেন, অকাজ বা অকর্ম সবকিছু। মনে মনে বা উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া অশ্লীল শব্দে কাকে কাকে গালি দেন তারা। বলিয়া বেড়ান ছোট্টকালের সোনারঙ দিনের কাহিনীকথা। তবে পুরুষপ্রভাবে যৌনতা বিষয়ক গল্পই তাদের বেশি। চুম্বন-আলিঙ্গন আর স্তনবিষয়ক সব ঠাট্টা আর রঙ্গরসিকতা থাকে তাদের বানানো কেচ্ছায়। সবকিছুতেই তারা পারদর্শী আর নিজের জন্যই সবকিছুএমন বহিঃপ্রকাশে আমরা ‘খারাপ বুড়া’ বা ভয়ভীতির লজ্জাহার আমাদের তাড়াইয়া বেড়ায়। কারো উপকার করিলে তারা বলিয়া বেড়ান বহুদিন। টাকাপয়সাআহারে ওরা উদার। ভালোবাসা অগাধ। পঞ্জিকা পড়া বড় অভ্যাস তাদের। পাড়ার সক্কলের জন্মতারিখ ছোট্ট ডায়েরীতে লেখা থাকে। কতো অমোঘ আমোদে তারা এসব কাজ করেন বলা যায় না। আপন-পর নাই কেউ, কার কখন কতোটায় জন্ম তা যতœ করিয়া লিখিয়া রাখেন। কোনো খবর আসিলে লিখিয়া রাখেন, পরে লেখা থেকে তার বিবরণ দিয়া চলেন। লোকনাথ না পড়িয়া মোহাম্মদী পঞ্জিকায় তারা আস্থাশীল। বৈশাখ আসার আগেই পঞ্জিকার নেশায় ছোটেন জেলাশহরে। গাছবিদ্যা কিংবা ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে মিলিয়া ফসল তোলা বা খাবার-দাবারের পরিকল্পনা তাদের। কুয়াতলায় গোছলে নামিলে এক হইয়া নিতে থাকেন দীর্ঘসময়। এসব ক্রিয়াকর্মে নারীদের উপস্থিতি বিরল, অন্দরমহলই তাদের প্রধান ঠিকানা। সেখানে তাদের পড়ালোখা ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত। আমাদের পাড়ার বড়পা বা খালা-ফুপুরা স্কুলে যান নীরবে, যথাযথ মান-মর্যাদা ও পর্দা বজায় রাখিয়া। কোনো দ্রোহ অপবিত্রতা ছিল না তাদের। বড়পা স্কুলে যান সময় ধরিয়া। বাড়ির পাশের কছিমন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে সময়মতো এক বুড়ি ঘণ্টা বাজান। তখন চারিদিক থেকে একরঙা জামা পরা সব মেয়েরা পড়িতে আসে। মকিমপুরের বা বাজিতপুরের সড়করাস্তা পার হইয়া বিষণœ প্রকৃতি দেখিতে আমরা যখন সাইকেল চালাইয়া নিরুদ্দেশে যাই তখন দেখি সেই পড়–য়া মেয়েরা দলগত হইয়া মাথা নিচু কইরা ক্লান্তিমুখে বাড়ি ফিরছে। তাহাদের হাসিও খুব মাত্রামাফিক। শরীরের ভাঁজে কোনো আকর্ষণ নাই। দ্বিধা থরথর অচঞ্চলাও নয় তারা। টিয়ারঙা জামায় যখন হাঁটিয়া চলি তখন তাহাদের কলরোল ওঠে, অফুরন্ত রৌদ্রের অনন্ত তিমিরের মধ্যে তাহারা মিলিয়া যায় ক্রমশ। কতোকালের মতো সে সব স্বপ্নের ধ্বনিরা অপার উল্লাসে অনন্ত জাগানিয়া হইয়া ওঠেন জানি না। কতোকালের মতো তারা ছবি হইয়া যায়, স্মৃতি হইয়া যায়ছবির পৃথিবীতে তাহারা বাইচা থাকেন কতোকাল। আমদের চোখক্যামেরা ওদের বাঁচাইয়া রাখে। বালিকা বিদ্যালয়ের বড়পা’রা দিনভর ক্লাস করেন কিন্তু টিফিন থাকে, জানে না ওসব, শুধু পড়াশুনা আর চারঘণ্টা পর কানামাছি, দাঁড়িবাধা, সিবুড়ি এসব খেলায় মাতাইতে থাকে। ক্লাসে ছজনার এক এক বেঞ্চে বইয়ের ভাগ থেকে সংখ্যা গোণা যায়। পড়ার বইয়ের ওপর নিষ্পাপ মাছি ঘোরাফেরা করে, বাতাসে মলাটপৃষ্টা ওড়ে, গরমের তাপে সবুজ ফড়িং, মৌমাছি উইড়া যায়আর ভয় পায় ওরা, আকস্মিক পরে তা আবার উপায়হীন স্বাভাবিক। প্রকৃতি বৈশাখের তাপ ছড়ায়, হানা দেয় শিরশিরে হাওয়ায় কিন্তু খুনসুটিতেই সব সমাপ্ত। পড়ার পর পড়া, রাজ্জাকস্যার লিলি আপা লুৎফর স্যার পড়ানতারপর বড় আমগাছটার পাশের গেট দিয়া পিপীলিকার মতো সার বাধিয়া ক্রমশ বাহির হইয়া পড়ে, আজ ছুটি। তখনও ওসব কিশোরী উঠতি যুবতীরা প্রেম বোঝে না, চুম্বন বোঝে না, নিজে ইচ্ছামতো কারো সঙ্গসুখ পাইতে চায় না, ইশারায় কেউ ডাকিলে নিশ্চুপ অনুত্তরে চলিয়া যায়, পৃথীবিতে যেন তারা কৃষ্ণচূড়া দেখে নাই, জারুল-জামরুল চেনে না। কত্তোকালের দীর্ঘ শিমুল গাছটা বুড়িয়া গেলেও ওরা ফুল স্পর্শ করে না, কোকিলডাক ওদের টানে না, বাবুই-তোতা-ফিঙ্গে-দোয়েল-শালিক সব চঞ্চলতা জড়ো করে কিন্তু কিছুই বালিকাদের দেয় না। হঠাৎ করিয়াই এইসব অচেনা পরিবেশের মধ্যে খুব লম্বা সুশ্রী চিকন-মোটার মাঝামঝি গড়নের পেটা শরীরের তানজিনা আপাকে চিনিয়া ফেলি। আমাদের নজরলাগা চোখ ঠিকরাইয়া পড়ে তার মুখশ্রীতে। স্বল্প ঘামার্ত মুখে, পীঠমোড়া লম্বাচুলে, সাদা-সবুজের স্কুল ড্রেসে তিনি দল বাঁধিয়া এক্ষুণি স্কুলগ্রাউন্ড ছাইড়া রাস্তায় উঠিয়াছেন। খুব কম, প্রার্থিত-নমিত তার দৃষ্টি। কেন তাকে সুন্দরী বলি, কেন তিনি মন কাড়েন জানি না। আমরা ওসব বুঝি না। কোন্কালে এক পুরনো র‌্যালে সাইকেলে চড়িয়া মেজমামা কলেজে যখন পড়েন তখন তাকে কে যেন ‘লাব ম্যারেজ’ কথাটা বলিয়াছিল। তখন মাপা হাসিতে মামা কী ইঙ্গিত করেন তাহা মনে নাই, তবে খারাপ-খারাপ গন্ধই তার সঙ্গে যুক্ত থাকে। তারপর মাঠে এক সময় নিরক্ষর বয়স্থ এক গ্রামবাসী ‘লাব করি বিয়া করা’ নিয়া এক মুখ-চিবানী গল্প করিয়া সকলকে জানিয়া দিন ‘দ্বীন-দুনিয়া শ্যাষ’-হওয়ার ব্যাখ্যা। তাতে জরিনা আর সফির দিনরাত নাড়ার আগুন পোহানোর পরে কালোরাতে বাহিরে যাওয়া কিংবা পরভাতে দরোজা খুইলা ঘরে ঢুইকা তাদের নিঃশব্দ গপ্পোগুজবের আওয়াজ। ভুট্টুর নিজকানে কানপাতিয়া শোনা কিংবা ফুটা দিয়া সাক্ষাত দেখার সংবাদ সর্বত্র প্রচারিত থাকে। দিনের পর দিন সে সব প্রেমকাহিনী আমরা শুনি বয়স্থদের তেতে ওঠা গলায়। সত্যিই তার প্রমাণও মেলে কারণ শুধু জরিনা বা সফিই নয় ওপাড়ার রমুজ আর ময়নার চোখাচোখি অতঃপর ভরদুপুরে চালাঘরের পাশ দিয়া নিকানো উঁচু উঠানের সিঁড়ির রানা ডিঙাইয়া কয়েকঘণ্টা হুড়কা লাগাইয়া গল্প বা কীসব করিতে সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাতে। তাছাড়া গোধূলীবেলায় দূরের সবুজপ্রান্তর ছাপাইয়া ভরা গরমে ডিপের পাড়ের প্রবহমান জলরাস্তায় ধানগোছা খুঁিজতে খুঁজিতে জানা যায় ডেরার ভিতর জুলেখা শুধু তার জন্য খাবারই নিয়া যায় নাই তারা একসঙ্গে জীবনের গল্পও জুড়িয়া দিয়াছে। তবে ওসব কাহিনীতে আমাদের যৌবন-পূর্ব কৈশোর আটকানো থাকে, সে সবে তোলপাড় উঠিলেও আমাদের আগ্রহ থাকে না কারণ কলার মোচায় মাছভেলা রচনা কিংবা কোনো ধানক্ষেতের আইলে ইঁদুরের গর্ত খোড়া, আর বড়পীরের মেলা বা যাত্রাগানের সংবাদ পাইলে তাতে মুখ লুকানোতেই আমাদের অনিবার্য আগ্রহ। তবে ‘লাব’ বা নারী-পুরুষ এক মাচায় শয়নে আমাদের ‘খারাপ’ বা কখনো নিষেধপ্রসূত ধারণায় আটকানো থাকে। তানজিনা আপাকে সুন্দরী জানিয়া ফেলি, সমীহ করি, শ্রদ্ধাবনত হই। ক্রমশ সময়সমূহেএইসব সুন্দর চিন্তাপ্রবাহে একসময় হওয়া ওঠে, সময় গড়াইয়া যায়, কানকথা রটে। দলবাধা যেসব বালিকাদের জীবন দোয়েলের-খঞ্জনারতারা একসময় অনিঃশেষ রৌদ্রের অনন্ত তিমিরে নিপতিত হয়, স্বপ্নের ধ্বনিরা হারাইয়া যাইতে থাকেশোনা যায় যাতা আমাদের নিকট পাথরের মতো ভারবাহী, অবোধ্য মনে হয়। সুশ্রী সমীহপ্রাপ্ত তানজিনা আপা ‘লাব’ করে। কোথায় কোথায় যায়, কোন্ কোন্ সময় স্কুলফাঁকে কি সব করে। আমরা তাকে আর চিনিতে পারি না। কেন যেন পিঞ্জরছাড়া উড়ানো পাখির জন্য সুখছাড়া কষ্ট কপালে বলিরেখার জন্ম দেয়। একই ভঙ্গিতে তনিজিনা আপা হাঁটিলেও আমাদের সমীহ নষ্ট হয়, তখন ভুট্টোর ফুটা দেখার ‘খারাপ’ অভিজ্ঞতা কিংবা জুলেখার ডেরা অভিজ্ঞতা এক হইয়া যায়। তবে সে সব বিশ্বাস যতই ভাঙ্গিয়া যাক, ভঙ্গুর মনে হোক সুশ্রী মনকে তবুও তার বাড়ির সীমানায় বা হাঁটাপথের চিরন্তন রাস্তায় অনেককাল আমদের আবদ্ধ রাখে। অপার বিষণœতায় কিংবা বেদনার উল্লাসে আমরা তানজিনা আপার মতো মেয়ে আর কখনো দেখি নাই। জীবনের সমস্ত সুখ তার করে নিয়াছিলেন সেই একজনের জন্য। তবে সে সবের পরিণতির আমাদের আর দরকার হয় না। কারণ, আমাদের শাখায় তখন কুঁড়ি থেকে প্রস্ফুটিত ফুল, আর মনোযোগী আমরা পৃথিবীর সেরা ছাত্র হইবার জন্য। কোথায় পড়িতে যাইব, কি হবো সে সবে জীবনের পাল উড়াইয়াছি। সীমাবদ্ধ সংক্ষিপ্ত হইয়া হাতের লেখার দিকে মনোযোগী হইয়াছি। অক্ষরসমুদ্রের ভিতর সারাক্ষণ অবগাহন। স্টার পাওয়া বা স্ট্যান্ড পাওয়ার জন্য নির্ধারিত হইয়া পড়িয়াছি। তবে শুধু তানজিনা আপাই নন, রওশন বা বেদৌরা আপারা আমাদের জন্মদাতার স্নেহে রাখেন! স্কুল পুরস্কার বিতরণীতে নাটক হইলে আমাদের সামনের বেঞ্চে বসিবার জায়গা করিয়া দিন, বিদায়ীদের জন্য কাগজের ফুলমালা বানাইয়া দিন, বকুলফুলের মালা বানাইয়া দিন, স্কুল নাটকের রিহার্সেল দেখিবার জন্য সুযোগ করিয়া দেনতাহারা তখন স্কুলের বড়’পা, নেতৃস্থানীয়। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবেন বইলা সবার মুরুব্বী তারা। এমন আপাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের শ্লাঘা থাকে। তবে এককালে ওইসব ময়ূরাক্ষী হারাইয়া যায়। স্কুলমাঠের বেঞ্চে, অভিনয় মঞ্চের স্ক্রীনের পাশে, টিডিসি হলের অনুষ্ঠানে, খেলাঘরের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে, বর্ষাভরা কালোমেঘে ‘আসামী হাজির’ নাটকের মঞ্চায়নের সময়ে তারা অপত্য হইয়া ওঠেন, তারপর আর ফেরা যায় না। কবে তাহারা আমাদের ছাড়িয়াছে তাও আমরা জানি না। একুশের ভোরে শাদাশাড়ি কালোটিপে লালপায়ে শহীদমিনারে আসিতেন তানজিনা আপা। মিসট্রেস আপার সঙ্গে তিনি ফুল দেন। শাড়িতে তার রূপ অপরূপ। কেন তিনি কালোটিপ পরিতেন জানি না, বুঝি কালোচুলে কালোটিপসে কারণে। তারপর বেদীপ্রাঙ্গণে আবৃত্তি, ছড়া বলিতেন। উচ্ছলতা বহিয়া পড়িত গণ্ডদেশ বাহিয়া, বুকভরা আনন্দ কুলছাপাইয়া পৌঁছাইত কতোদূর কে জানে! তার শরীরের কলোতান সব মেয়েদের পুলকিত করে। ভাসাইয়া নেয় দূর অবধিপেছনের কলাবাগান, বিশাল বপুর জামতলায় কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ঝর্ণাতলায়। কাঁটাভাসা কুলতলা পর্যন্ত। তানজিনা আপাকে পাইয়া বসে প্রকৃতি, মানুষকুল, প্রিয়বান্ধবীরা। তারা সকলেই শকুন্তলা-আদুরে, সীতাবান্ধব, দ্রৌপদীদুষ্ট। কতোশত অর্জুন তারা, দুঃস্বপ্ন দেখে তাকে নিয়া, হেলেনহারা হইয়া উন্মাদ হয়, ভাসানপ্রতিমায় জীবনের সব উৎসব হারাইয়া ফেলিলেও কতোসব রঙিনকে যেন ভরান তানজিনা আপা। আমরা হাঁটি, হাঁটিয়া যাই শতকভরা কতো নায়কদের সঙ্গ পাই, নিঃশ্বাস ফেলি দ্রুততায়, বুকভরিয়া নাইমা আসি শকুন্তক্রান্তির কলোরোলেতখন তাপ-দ্বিধার তাণ্ডবে শরীর ভিজিয়া যায়, ক্লান্তিগ্রাস করে, ঘুমাইয়া যাই। কচিপত্রের আম্রিকাজুড়ে তখন বৃষ্টি, শীর্ণকাঁপা সতেজ ডগায় পল্কা হাওয়ার নাচন, দূর্বাদলে আলমাড়ানো কচিপা, রাতকাঁপা অন্ধকার সাঁতরাইয়া তখন তানজিনা আপা আর ‘লাব করা’ কে যেন একসঙ্গে হাঁটে, বিচিত্র ফোয়ারা তোলে, উড়াল দেয়, কালোটিপ আরও কালো হইয়া আলো তোলে। কাঁপাইয়া দেয় সব উচ্ছলতা, গ্রীবাদুলাইয়া হাসেন হাঁসাহাঁসির মতো, কাছাকাছি, আরও কাছে, ঘনিষ্ঠ ও ওতপ্রোত হইয়া। এই হাওয়ায় ভর করিয়া কোকিল ডাকে, বাদুড় ওড়ে, বৃষ্টিপাতার গন্ধ জানায়। কান্না হইয়া ঝরে শব-অবোধ সবকিছু। তানজিনা আপার সাদাশাড়িটা আর পায় নাই, সে সব মেঘমালার মতো ভাসিতে থাকে, গুরুগম্ভীর একটু ভারও তাহাতে ছায়া পড়ে। তারপর আমরা আম্রিকা পার হইয়া আলুবীজের সারিতে পা মাড়াইয়া, বড় পুকুরের পাড়ে আরামহাগা সারিয়া শিরিষগাছের তলে কাকে দেখিতে পাইয়া দৌড়াই। ভয়ে-আশঙ্কায় পড়ি, তারপর উঁচুভিটার পাশে সার করা কলাগাছ আড়ালে যখন দাঁড়াই তখন বড় সাপখোলসে পা দেই। ভয় জাগে, শীত ছাইয়া যায়, কেমন জানি ঠাণ্ডা সবকিছুতখন কুত্তাডাকে সজাগ হয় সাদাশব। পৃথিবী তখন সব খোলা। ওহ্ তবে কী দুঃস্বপ্ন! কালই তো হইয়া গেল একুশ, ওঁরা আবার কখন আসিল। ঘুমভাঙা আশার আলোয় নিজেকে গুটানো যায়। ওহ্ এখন তো সকাল। উইঠা পড়ি, ডাক তখন জীবনের।
তবে একসময় তানজিনা আপা মরিয়া যান, কেন মারা যান জানি না। আত্মহত্যার মৃত্যুগল্পগুলা তখন আমাদের টানে। তার সব চরিত্র আমাদের আর তানজিনা আপার। এতো সুন্দরী তানজিনা আপা কেন আত্মহত্যার অধিকারে নিজেকে নিঃশেষ করেন জানি না তবে তার মুখ-চুল-চিক্কন ঠোঁট আমাদের খুব কষ্ট দিয়াছিল। আমরা ওতে সাঁতার দেই, ছায়াসঙ্গম করি, শিলপাথরের রাস্তায় নিষ্পাপ খেলায় মাতিয়া উঠি। খেলার আবহে তিনি থাকেন ছায়ামূর্তি ধরিয়া, অনিঃশেষ হইয়া। সে অনিঃশেষ রথে নিধূয়া পাথারের দূর শিরিষে অবিরত কোকিল ডাকিয়া চলে, কুকুরসঙ্গম করে, কুড়েকুঠুরীতে অনৈতিক সংসর্গে লিপ্ত হয় কোনো বাড়ির বড়মিঞা। নীলআকাশে ছড়াইয়া দেওয়া চাঁদের আলোয় বিরহকান্না বাতাস ছুইলে আমরা ধুলোমাখা মাতাল হাওয়ায় হাঁটিতে থাকি, শিমুল-পারুল বন ডাকে গন্ধউৎসবে, ভেঙে পড়া সজনে ডাল ধইরা একসময় খুব দ্রুত বৃষ্টি নাইমা আসে, হিহি কম্পমান আমরা তখন টুপটুপ চালচোয়ানো বারান্দায় দাঁড়াইয়া বৃষ্টিগান শুনিনির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। মাটির দেওয়ালের ওপর ছাওয়া নাড়াচালায় কোনো বৃষ্টিশব্দ নাই কিন্তু পতনশীল টাপটুপ বৃষ্টি কেমন যেন মৃদুমন্দ, আয়েশী উন্মাদের মতো। চালচোয়ানো বৃষ্টির পতনশীল রূপ ছঞ্চায় সঙ্গমী হইয়া ওঠে, দাগ পড়ে ঠিক বারান্দার কার্ণিশ ছুইয়া। তখন তাতে হাত ডুবাইলে, পা নামাইলে সরীসৃপঠাণ্ডা শিহরণ ওঠে, শিউরে ওঠে প্রেমছোঁয়া শরীরলোম। কে জানে তানজিনা আপার নরম শরীর ছুঁইয়া দিলে কেমন লাগে! তার জামার গন্ধ, বুকের গন্ধ কেমন করুণ আর কোমল উষ্ণতায় ভরা। সে উষ্ণতার ভার খুব বেশি ধারাল, মুগ্ধকর। ঠিক টলমল ছঞ্চার আরাম-বৃষ্টির পানির মতো। তানজিনা আপা বৃষ্টিপানিতে ভর করিয়া আসেন, কছিমন্নেছার গা জুড়িয়া তখন প্রবল বৃষ্টিপ্রলেপ। কী উচ্ছলতারে ওড়না ছাড়িয়া সবুজ ঘাসমাঠে সদ্য লোম ওঠা পা ডুবাইয়া নিষ্পাপ চিৎকারে সক্কলকে ডাকিয়া শানবাঁধানো উঁচু বারান্দা থাইক্যে মাঠে নামিয়াছিলেন। অনেকক্ষণ সে পানিতে থৈথৈ করে স্যালোয়ারের কিয়দংশ ভিজিয়ে ফেলে শ্বেতশুভ্র চকচক পায়ে শহীদ মিনারের বেদীতে দাঁড়াইয়া থাকেন। ওপাশের জারুল গাছের আড়ালে গিয়া তিনি কি যেন ঠিক করে আবার ডাক পাড়েন। মুক্তাসাজানো দাঁতে তখনও চিবান, উন্নত স্যাঁতসেঁতে বুকের ভেতরে আমরা নির্বোধ তাকাই, তখন তাকেই আবিষ্কার করি। এককালের সব স্বপ্নসাধ হারাইয়া কেন তিনি মারা যান জানা যায় নাতবে রেখে যান ছঞ্চাগড়ানো বৃষ্টির পানি আর বিশাল নাড়াছাওয়া ঘরের নীরব রতিশব্দ।


ধান বিক্রির মৌসুমে বা মাঠজুড়িয়া ধানের খেয়া ভাসাইলে খেলা জইমা ওঠে। আগমনী শীতের কম্পনে এক ধরনের হৃৎকম্প থাকে সবার মনে। ম ম গন্ধে দূরের হাওয়া বাদ্যি বাজাইয়া আনে পিঠে খাওয়া আর ধানকুড়োনোর পয়গাম। তা বিক্রি করিয়া চলে ‘পয়সা খেলা’। পয়সায় পয়সা বাড়ে সে ঝোঁকে কামাই রোজগার মেলে একটা পুরুষালী মেজাজ তৈরি হয়। তবে ততো গভীর গরিবও চায় নাঘরের কোণে, বাঁশের আড়ার ভিতর, আবুলের বাড়ির পেছন দরোজার কোণায়, আমলিপাথারের ভিটার বটতলায়, বড়পুলের তলে কেউ এ জুয়াতুল্য লাভের অকম্মটি করুক। শীতের পরিবেশে এর মাত্রা আবার বাড়িতেই থাকে। তখন সিকি-আধুলি-কাঁচা টাকা পাড়াজুড়ে উধাও। চাঁনমার্কা যে কোনো মুদ্রা পাঁচদশ পয়সা বেশি দিয়া কিনিতেও বাধা নাই, বাধা কিবলি রীতিমতো রেওয়াজে পরিণত। চাঁনমার্কা হইলেই তার দাম প্রায় দ্বিগুণ। দোকানদাররাও তা ব্যবসাসূত্রে কালেকশানে নামে। গ্রামজুড়ে যখন এসব আনন্দ-মচ্ছব চলিতেছে তখন চৌধুরীবাড়ির সর্বোচ্চ শক্তির মুরুব্বী মুসলিম খবরদারিতে এক আওয়াজ তোলে, ‘কোন্ বেজন্মার বাচ্চারা এসব নাফারমানির কাম শুরু কচ্চে, সবগুলাক বান্দ্যা একরাতের মদ্দ্যে খানকার মুখোত হাজির র্ক। এ লুৎফর, খয়বার, কাছের… বার হ, শুয়ারেরবাচ্চারা সব এদিকে আয়!’ শীতার্ত রাতেই এলান ছড়াইয়া পড়ে যখন সবদিক তখন দপ্ করিয়া রাতের কুপির আলোগুলা নিইভা যায়। দুঃসংবাদ বাতাসকে পেরিয়া যায়। থমথম জোনাকীতে তা আটকায়, শিমুল-হরিতকীতলায় সড়কিহাতে তিনব্যাটারী টর্চ নিয়া দৌড়ায় লুৎফর-কাছের। কিন্তু অগম্য সবকিছু থামিয়া যায়। কিন্তু গর্জিত গর্জনশীলা তার স্বভাব বদলায় না। পাড় ভাঙিয়া আবার আওয়াজ ওঠে, ক্যারে পুকুরের ওপারে অতোবড় গলা কর‌্যা হাসে কার বউ? আচরণ বোঝে না! তারপর শীত মরিয়া যায়। তারার আলো ডুইবা যায়। কদিন পালাইয়া থাকিবার পর গার্জেনদের ওয়াদায় ফিরিয়া আসে ছেলের দল। এবার আর ওসব নয়। সময় চলে পুলের জটলায়, ফাঁকা স্কুলমাঠে, তেমাথার মোড়ে, শিরিষতলায়, বাগবকরি বা পলপানাবলে। সে এক ধুমসে আয়োজন। কত্তো সিরিয়াস তাতে সে সকল বালক। মনোযোগে হানি নাই, কানাকড়ি নাই কোন ছলনা বা অবিশ্বাস। সে সবটাই জীবনের গল্প। ধানের বদলে ফয়জার বাপ বা নালোর কাছে কটকটি-খোরমা-জিলিপি কেনা আমাদের এসব বাঙাল-বিলাসী শীতউপহার। বড় ডালায় পলিথিনে মোড়ানো সে সব মিষ্টিদ্রব্য মনভরা ও সুস্বাদু। যতোবার খাওয়া যায় ততোবারই তাহাতে জিহ্বার টান গিয়া পড়ে। ওসব মিষ্টিওয়ালাদের সঙ্গে খাতির জমানো, সহানুভূতির সঙ্গে আলাপ জমানো আমাদের নিকট খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। রোদেপোড়া ধানমাঠে শিরিসসংগ্রহের অর্থে মিষ্টি কেনা কতোকাল আমাদের জীবনের অংশ থাকে জানি না। তবে গোলজানের বাড়ির সামনে, বড়বাড়ির মাঠে, কাচারিঘরের সামনে, মহকবুরের দোকানে, মিঠুদের বাড়ির পিছনে, গোরস্থানের পাশে, বড়জামগাছের তলায় ওসব মিষ্টির আসর বসে। কারো কিছু না থাকিলেও দুচারিটি সবার মুখেই পড়ে। বিশেষ করে বিকেল-সন্ধ্যায় এমন পসরা ভালো জমে। ক্রমশ ছায়া তখন রোদে মিলায়। স্বচ্ছতোয়া আকাশে অন্ধকার বড় হতে থাকে। উঁচু নাড়ার পালায় তখন নেওর জমিতে শুরু করে। অন্যদিকে শ্যাষ হইয়া যায় মাড়ামারা। লম্বা বাঁশলাঠিকে কেন্দ্র করিয়া নাড়াপুঞ্জ নির্মাণের কাজ চলে। ফসলি কর্মকাণ্ড গুছাইয়া ফেলা হচ্ছে তখন। জমে আসা অন্ধকারকে ধরে একরকমের আঁধার বিস্তৃত হতে থাকে। কেমন করা এসেন্সের গন্ধে হাওয়ায় ভাসিতে থাকে সবকিছু। জাপটে ধরা শীতে হাঁক ওঠে মোটাকাপড়ের জন্য, চাদ্দরের জন্য। জুবুথুবু শীতের আদরে কুঁকড়ে যাওয়া কষ্টক্লান্ত মানুষের ওম্ আমরা একপ্রকার উপভোগ করিয়া চলি। কবে সেই ডাকু উন্মুক্ত উঠানে চাদর মুড়াইয়া ঠিকরে পড়া ভোর রোদে পান করিয়া চলেন মিষ্টি ওম্ আর কতোকাল পাগলিবুড়ি এক দুর্গন্ধ শরীরে উন্মুক্তরোদে তহসিল বারান্দায় পড়িয়া থাকেন জানা যায় না তবে তারা নিহত হলে কোনো দাতব্যমনে দোকান থেকে কেউ মার্কিন কাপড় কিনিয়া আনিয়া দেয়। আতর গোলাপ মাইখা নিয়মকানুন মানিয়াই তাদের দাফন হয়। দাফন শেষে বিরাট বটতলায় বসে আমরা জিরাতে থাকি। গোল হইয়া বসে কেরামন কাতেবিনের কেচ্চা শুরু করি। উল্টোদিকে থানার মাঠে তখন ঠাণ্ডা আমগাছতলায় কার যেন বিচারকাজ চলে। খাঁকি পোনশোকে কঠোর মুখে পুলিশরা তখন পাহারা দিন। বিশাল থানামাঠজুড়ে তখন তরঙ্গবোল বাতাস। সে বাতাসে শুকনো পাতা ওড়ে, গোলাপী লাল সূর্য ডোবে। মোটা আমগাছের ছায়া হইয়া দূরে কোনো কনে-আলোয় বাদুড়ঝোলা তার দেখা যায়, সেখানে কিছু পোকা ওড়ে, মাছি ওড়ে, চিকচিক করা ওসব তারের ভিতরে কি আছে কেন বাদুড়কুল আটকায় তারউত্তর অনুত্তর থাকে। তবে মশাও পড়ে কিবা পড়ে না, পোলের পাশে এক সময় এক বাড়িতে বিয়ে বিদায়ের কান্না আসে। সে কান্নায় কেউবা মাল দেখে, ঘোরে, টেপার চেষ্টা করে। কেউবা মনে মনে বাসর রচনা করে কল্পনাবাত্তি লাগায়। তবে একপ্রকার সুখের সমাচার থাকিলেও আমাদের খারাপ লাগে সেই মেয়েটির জন্য, যে আমাদের জ্বালায়-ঘুরায় অনেকদিন। সে মুখ মায়াবী, ব্রনযুক্ত, ঘোলাটে চোখ আর চুল নি¤œগামী। কেমন যেন ফ্যাকাশে ফ্রকই সে বেশি পরে। সে নেত্রীর ভূমিকায় থাকে, মাঝে মাঝে আমাদের উৎসবী করিয়া তোলে। সে আলোড়নে কি আছে জানি না। তবে ঘোর আছে, রূপ আছে মায়াবীমতোন। কী দুরন্ত সে চেহারা, কতোকাল সে মুখে আমরা কাল্পনিক সেক্স করি। ভীরুভয়ে ভালোবাসি। ওর কথা শুনি, ভাঁজলাগা শরীরে হাওয়াবৃষ্টি ঝরাই, শিলপড়া বৃষ্টিতে মুখউপচে পড়া বৃষ্টিচুলের ডগায় ধীরপতনের ফোটা গুণি, জলকামানের বোলে সে ব্রণমুখ আরও নিষ্পাপ হলে নরম হাতের আঙুল স্পর্শে সুখ জমে, বর্ষণবৃষ্টির ছাঁটে কুয়াশা নামিলে আমরা ওর ভেজা শরীর নিয়া বারান্দায় দাঁড়াই, দ্রুতলয়ের হাওয়া মেদুর বৃষ্টিকে তির্যকতুল্য গতি দিলে আমরা একাকী হইয়া যাই। তখন গোছাপায়ের ভরে সে হাঁটিয়া যায়, ভর করে বৃষ্টিআলোর বাতাসে, উড়ন্ত হইয়া ভাসিতে থাকে আখিরার তটরেখায়, তারও বেশি সবুজচাঁদোয়া আখিরাপানিতে অপরূপ হইয়া উঠলে ব্রণমুখ তরঙ্গায়িত হয়, অশান্ত হইয়া ওঠে, চায় সে বাবুইপাখির আস্থা ও অস্থায়ী সঙ্গম। যেরূপে কুলসুম ছাড়িয়া যায় তার মাতৃত্ব বিসর্জিত দুসন্তানের ঘর। ক্যান সে চলিয়া গিয়াছিল তা ওই ভরাযৌবনা ব্রণমুখা না জানিলেও জেনে যাওয়া যায় সে ভালোবাসে এ পৃথিবী আর চায় এক অমানিষা বৃষ্টিরাত্রি, যে বৃষ্টিরাত্রি তার একার, প্রভুতরূপে যেখানে ঢুকিয়া পড়ে শুধু জ্যোৎ¯œাআলোর মুখদেখা বলকানি আর সব সুখ এক করিয়া ফেলা উত্তীর্ণ নদীযৌবনার বারামসুর। সেখানে সবুজতালমাথার চঞ্চল বাবুইআত্মা আর বনদুপুরের হাহাকার কোকিলের আর্তিতে ডুবিয়া যায়। ফোয়ারানদী তখন আগ্রাসী, পাঁকে ঘুরায়, সেখানে পানাপাক পায়, খড়কুটোও পাঁকে পড়ে, বোল ওঠে, আর ওই আব-মূর্তি বয়ে আনে বিচিত্র হাওয়া। সে ব্রনমুখ সেখানে ভানে ভাসে, হু হু তানে হাহাকার ওড়ে, তখন সে যায়, অপরের দিকে অন্যের জন্য। গাড়ি ছাড়ার মুহুর্তে তখন লকেট বালতিভর্তিা রঙে ভাসায় সব্বাইকে, খুব দ্রুত কোন্ ফুকার দিয়া বাহির হইয়া আসিয়া একলয়ে ভাগাইয়া দেয় ওই চলতি বিয়েগাড়িটি, কোনো এক বরযাত্রী রঙচুবে তড়িৎ দৌড়ে ওঠেন গাড়িতে। আরও কজন রঙে ভাসে, জামাকাপড় কারবালালালে ডুবু হয়! গাড়ির ভিতরে সবাই ভাসন্ত। কাঁটাতারের বেড়ার একটু উপরে গোমরামুখো আমগাছটার মোটাডালশাখার নিচ দিয়া তখন দিগন্তলাল সূর্যকিরণ ধাইয়া আসে, ইস্তরি সাদাকাপড় তখন কিরণমাখা কমলা আর লালে হৈ হৈ হলে বাসপিছু আমরা দৌড়াই আর ব্রণমেয়ের বিয়েউৎসব নিয়া আরেক হুল্লোড়ে পড়ি, লকেট তখন ভিতর বাড়িতে চওড়া দাঁতে হুঙ্কার হাসি ছাড়ে, ‘শালার চুদির ব্যাটা গেটোত ট্যাকা দিতে তোর গাও কামড়ায়, বিয়া জেবনে কয়বার করবু’তখনই অকর্ম্মের প্রতিবাদে সাঁড়াশি হয় বিয়েবাড়ির কত্তামশায়, এটা তুই কি কল্লু… এসবের ভিতর দিয়া প্রতিবেশির সম্পর্ক খারাপ হলে আমরা সে রাতে ওই ব্রণঅলা মেয়ের জন্য ঘুমাইতে পারি না। আমাদের কষ্ট কণ্টকিত হয়, কেমন করিয়া একটা নগ্ন নির্জন হাত ছাইয়া ফেলে আমাদের। সাঁতরাইয়া, ঢেউ তুলিয়া, সাতরঙা সাজ পইরা অপার আনন্দ কলরোলে পৃথিবীর মায়াসমুদ্রে ভাসায় সবকিছু। কছিমন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়, শাহ আবদুর রৌফ কলেজ, জামতৈল হাট, বাহাদুরপুর, মথুরাপুর সব একস্মৃতি নৌকায় তুলিয়া বলে ওই কাঁটাদুয়ার ইসমাইল গাজীর দেহপোতা কব্বরে দোয়া নিতে চল, বড়দরগায় গাজীর মাথা পড়িছে ওখানে এখন মেলা বড় মসজিদ সেখানে মিসকিন খাওয়াতে হবি আর হাতিবান্দার ওখানে হাতপোতা আছে, কত্তো মানুষ ওখানে শুক্কুরবার যা চায় তাই পায়। সেখানে গিয়া পীরের কাম না করিলে কিচ্ছু হবো না। এ বাড়ির ভিতর বড় বড় বরগা, উপরে বাঁক দেওয়া টিনের ঘর, সেখানে মেলা কইতর, আমোর মিঞা তারে খাবার দেয়। সকল জায়গা ফাঁকা ফাঁকা লাগিলেও সুখ আছে, আল্লা দুজনার জেবনের মধ্যে সুখ দিয়া দিছে। তোরা চিন্তা করিস না, খালি লকেট ভাইজান ওই কামডা না করলেও পারত। অনেকের চোখে, দামী কাপড়ে রঙ লাগিছে, গোটা রাস্তায় খারাপ কথা বলিয়া গেছে সবাই। এরপর ব্রণমুখা বুলবুলি, শালিক হইয়া যায়। ফরিদের ফুড়ুৎ পাখি। সেই ফুড়ুৎ পাখি! অন্ধকার আরও প্রগাঢ় হয়, নগ্ন নির্জন হাত হাওয়ায় ওড়ে, টিনের চালে ঝমঝম করিয়া বৃষ্টি নামে, চালার গোয়ালঘরে গরুর হাম্বারব ওঠে, আঁশটে ঘরে ছাগলগুলা নোলায়, মুরগীরা হঠাৎ কেমন হইয়া যায়। অনেক কিছুর মধ্যেও ব্রণমুখা আবার বলে বলতো জ্যোৎ¯œা ভালো না বৃষ্টি ভালো। বৃষ্টিভেজা জারুল ফুলের চেয়ে কৃষ্ণচুড়া কেন বেশি প্রিয়। তখন আবার টানা শব্দ আসে জ্বীনঘরখ্যাত কছিমন্নেসার পেছনের গোডাইন থাইকা। সেখানে নির্ভয়ে ঘুমায় হালিম দারোয়ান, অথচ নিশ্চিত করিয়া বলিয়াছিল তবারকের বাপপুরা আগুনের রঙ দিয়া গাও ধোয়া ছাপড়া বরাবর লম্বা চেকন ফিনফিনা কটকটা মানুষ। আগুনের জেল্লায় সে তখন অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরিলেও সাতদিন সে নির্বাক ছিল। সে রকম আগুনের জেল্লা নিয়া ব্রণমুখা সম্মুখে থাকে, ভয় নয় কেমন জানি আরাম আরাম লাগে। স্তনজোড়া দেখা না গেলেও আকর্ষণ তোলে। হাত দিলে শিহরণ ওঠে, ব্রণমুখা ফিকা হইয়া যায়, সব ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে, বেশ তাড়া দিয়া বলে ওসব তোদের করিতে নাই, বাঁচিয়া থাকা মানুষের অনেককিছু লাগে পীরপয়গাম্বরের দিকে তাকাস না! কতোকাল তো ওই আখিরায়, পানির পাঁকে, লম্বাব্রীজের নীচের খুপরিতে খেলাইছি না, তখন কিছু বোঝস না। এখন আছে সুখ, পাইছি সে সুখের নাগাল, সেটা হাতড়াস ক্যান। ঘরের সুখের বাইরে আর যামু না। এক্কেবারে এই আগুন দিয়া সব নাশ কইরা দিমু। কুত্তা এদ্দিন পর গোশের নাগাল পাইছে। কোন্ লকেটের বাচ্চা আমার সুখ নিয়া তামশা করে, ওরে পোড়ামু পয়গাম্বর দিয়া, রাতোত প্যাশাব করবা নয়, ওর মাগি বাইরোত বারায় না? হঠাৎ লিঙ্গসুখে বিছানা ভিজলে জ্বীন নাকি ব্রণমুখা ঠিক বোঝা যায় না, যেন খুব শীতে কুসুম কুসুম গরম পানি কে জানি ঝম ঝম কইরা গায়ে ঢালে। কিছুটা রাস্তার পাশে কুত্তা-কুত্তির সঙ্গম দেখারও টান-সুখের মতো। না তখন ভাঙ্গা ঘুমে ওসার হয়। ব্রণমুখা আসলে ভালো আছে। তখন আমরা স্কুল সময়ে স্যারের অনুপস্থিতে থানাবাড়ির পাশের বিয়ের অনুষ্ঠান আর লকেটের রঙ দেওয়ার গল্প করি। সুখ পাই রাতের জ্বীন, আরও অন্যসব বানিয়া একমাত্র ঘনিষ্ঠ সঞ্জীবকে বলিলে, ও আমাদের সাবাসি দেয়। ঠিক করে নাই আজ বিকালে ওই রাস্তায় যাওয়া হইবে। কিন্তু বিয়ের ধ্বংসস্তূপে আমরা বেশিক্ষণ থাকি না। পাখি কখন জানি উইড়া যায়। ওড়ার বেদনা শূন্যে হাহাকার তোলে। তখন পাড়াজুড়িয়া দিন থাকতেই কেমন অন্ধকার হইয়া আসে চারিদিক। তখন আমলিগাছটা আরও শোককাতর হইয়া পড়ে, ভেতরে মোটা ডালে প্যাঁচানো অজগর লাশ হইয়া থাকে, কচি গাঢ় সবুজ চিক্কন পাতা নিবিড় আলিঙ্গনে ঊধ্বমুখা একাকার হইলে তাতে জ্বীন আসে, প্যাঁচাডাকা আওয়াজ গাঢ়তর হয়, মোটা আইবুড়া সে গাছটা তখন শত্র“ মনে হয়। কিন্তু ওকে ছাড়া যায় না। ও আমাদের মাইলস্টোন, বর্ষার ছাতা বা এরূপ অন্ধকারের বন্ধুআড্ডার পুরানো বাণী। কর্মহীন, যোগ্যহীনের আশ্রয়-প্রশ্রয়। দিনরাতের বা আলোঅন্ধকারের অরুণিমা। আমাদের শান্ত-দুরন্ত দিনের অপার অন্বেষা। ব্র“ণমুখার চাইতেও সে আমাদের নিকট অতি প্রার্থনার। নমিত দেহে সে আমলি কতোজনের স্বাদ মেটায় বা সন্ধান দেয়, একমালায় ভূষিত করে কে জানে! তবে সে রাতে আমলিগাছ বাইয়া তুখোর বৃষ্টি নামিলে করিমন বু আর তার কোলের সন্তান কোলে রাখিয়াই অজ্ঞান হইয়া পড়ে। ওই গাছের তলায় দেখা মেলে তখন ঘননীল আঁধার করা ঝুমুরবৃষ্টির আথালি-পাথালি। তার ঝাপটায় কান্দে নয়মাসি মুদিত নয়ানের অবোধশিশু। সে ফেরেশতা আওয়াজে দৌড়ায় হিক্কা পাড়ি কান্দে, মায়ের হিমস্তনের কাপড় ধরে হাঁচড়া-পাঁচড়া করে। ক্যাম্বা কইরা হামাগুড়ি দেওনের আন্দাজি চেষ্টা করে। হাছের-নাজির হোসেন তেঁতুলতলার আন্ধারে ব্যাশকম কাবরায়, তারপর থামে। ক্যাডা, ওটি কান্দোচে ক্যাডা; কারো কি জারোজ ছল হচে নি বা…। তারপর এক্কেবারে চুপ। শালা তরতাজা মাগি চিৎ হয়া আছে, বুকের ওলান উদাম করা। দুজনেই আন্ধারমতো তাকায়, ক্যারে হাছেরমোর ক্যামা গাও কাঁপোচে, পাছ পাক থাকি কেটা তমন টানি ধরে, তুই সড়কের ওপারোত খ্যাল থুস্। তখন কান্না মুখ্য নয়, সে আওয়াজ সুরেলা বিলাপ হইয়া ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া পড়িছে, বোধ হয় তা শিশুবৃত্ত পার হইয়া বাইরের ফিনফিনে পাতলা হাওয়ায় ভাগ-বিভক্তির কবলে পড়িয়া মিহি হইয়া পড়ে, ইথার প্রবাহে আরও মিহি মসলিনতুল্য, আংটিতে আটকানোর মূল্যে দামী তবে বায়ুবয় হয় বলিয়াতাই তার অমূল্যে ধর্ষণ, মসলিন ধর্ষণ চিক্কন কোমরে-কটিবন্ধে-পায়েলগোছায়-জঘন নিতম্বে-উরুতরুতে, ওই কোনো এক প্রভুতে, তার বহুত ট্যাকায়, পুঁজিতে পুঁজিপতি, মালে হালে, হামার মাল পাচার ওই বিদ্যাশ বন্ধুর কাছে। মসলিন আরামের আর জৈবিক দোহনের, দোজাহানের-বাগিচার-বাগানের, ওই বেহেশতের হুরের আনন্দের, রুহের আয়েশের। মৈথুনের, সঙ্গমের, পরকীয়া সুখের, মজমার আর হুরানন্দের নহরে, প্রভুদের-পুরুষের-হাছেরের। ক্যাডা জানি মসলিন সুখ ভুণ্ডুল কইরা, ক্যা অহনও তো অজগর প্যাচায়া ধরে নাই, ধরবো না পারবো না…। জ্বীন নাই, তেঁতুলতলায়। মসলিন তো বহু আগে গিয়াছে, বিদেশ যাইয়া ভুইলা  গেছে। মসলিন আর ফিরে নাই, ঝড় গেছে, পুরুষ গেছে, জামিদার গেছে, হাছের গেছে, নাজির দুয়ারে প্রস্তুত দাঁড়াইয়া, আরও আইবো। কিন্তু আসলজন ফিরে নাই। কী জান ঠাণ্ডা দেয় কিন্তু তামান শরীর কড়া হীট, তয় কি করিমনের বেহুঁশ সেয়ানা স্তনমাখা শরীর বাইয়া শালা ঝিপঝিপ মুতমতো বর্ষা নামে না ফাঁড়াকাটা বাতাস বিলি দেয় নাকি সত্যিই ওই লেপ্টে থাকা অজগরটা বুকহাঁটা দিয়া এগুচ্ছে। কিন্তু করিমনের শরীর তো ঠাণ্ডা না, সে হুঁশ ফিরায়ে পাইছে, সে সুখ পাইছে বুঝি! আহা সুখ, কত্তেকালের সুখ। সুখপাখি কই, সুখের তাপ কই, কত্তোকাল পুরুষসুখ ছাইড়া গেছে করিমনরে মসলিনরে, তাই তো মসলিন কিচ্ছু কয় না। আরামের কথা কেউ মুখ ফুইট্যা কয় না, স্বামী কয়না স্ত্রীরে আর স্ত্রী কয় না অন্যরে এমনকি পরকীয়ারাও কইতে চায় না। তবে এহন আল্লা দিয়া সুখ, হাছেরের সুখ আর করিমনের সুখ কিংবা মরা করিমনের রক্তবহা সুখে হাছের নিজের সুখের সংবাদ দেয়, ন-মজা করে, মজা মারে, ইন্দ্রিয় কাঁইপা সে মজায়। আর তার ভাগ পায় মরা করিমন মসলিন। অজগর বয়া গেলে, ঝড় থামিলে, মিহি কান্না মোটা হলে, হারকেন তারায় গান ভেসে কানের পটহে আঘাত লাগিলে সুখটা হ্যাচকা টানে ছিঁইড়া যায়। রঙজ্বলা শাড়িতে সুখের আঁচ পাওয়া ছোপ রক্তের জ্যাবজেবে অংশ হতে কান্না গাঢ় হয়। তারপর আবার দাবড়ানো বৃষ্টি, এটা জ্বীন তাড়ানো বৃষ্টি। তখন আশেকী আরাম শ্যাষ। নাজির চিক্কুর পাড়ে, ওঠ হে শালা বকরিচোদা। ওটাক জ্বীন ধচ্চে হে, মুকোত পানি ছেটা দে। তাড়াতাড়ি নামা থেকে পানি আনিলে এবং তার গায়েবী প্রয়োগ হইলে শিশুর কান্নার সুরে সে জাইগা ওঠে, তখন হাছের পালায়, দৌড়ায় ইরির ক্ষেত দিয়া আলের বাতা দিয়া ডিপের ছাপড়ার পাশ দিয়া উঁচা ডাবরির ভিটের ওপারে। মৌলবীর বাঁশঝাড়ের ফাঁকে কাঁচাগুর ওপর বসে জিরাতে থাকে। আমলিতলায় তখন পেট্রল পুলিশের স্ট্যান্ড করা মোটরসাইকেল। আমরা ওই রাস্তায় আর আমলিতলায় পুলিশের কাগজের বিবরণে তাকাই। বুঝি না ওসব ইংরেজি, ইনভেস্টিগেশন।

কদিনের মাথায় এইসব গিজগিজ কর্মকাণ্ড মাথায় নিয়া কয়েকজন মিলা এক অনুষ্ঠানরাতে হাওয়াভরা জ্যোৎ¯œার কামনায় পাল ওড়ালে কোন্ কোণা থাকিলে যেন এক ধরনের নিথর-আরাম-আযান-আওয়াজ ভাইসা আসে। সুর করা সে আওয়াজে ঘুমপোড়া মৌলবীর বিবিবিচ্ছেদ চোখে পড়ে। আস্সালাতো খায়রুমিনান্নাউম বলিবার পর কেমন মানভাঙা অসহায়ত্ব উইঠা আসে। গোয়ালঘরে তখন বাওয়ানো স্ত্রীগরুর বিরহহাওয়ায় কুলসুমের বাপের মনে জ্যোৎ¯œাফাটা সুবেহ্ সাদেক এক ধরনের মরমী ইশারা পয়দা করে। য্যামনে ভোরের আলো বার হওচে ত্যামন আল্লারসুলের দুনিয়ায় তামাম জীব ওই বাওয়ানো গরুর ন্যায় যোনীউষ্ণতার আকাক্সক্ষা খোঁজেসে ম্যায়্য হোক আর জোয়ান হোক। তারই মধ্যে পাগল করা স্বভাব গুমরিয়া ওঠে জন্মবীজ পুঁতনের লাইগ্যা, বাওয়ানো গরু আরও জোরে হাম্বা দেয়। চাদরছাওয়া জ্যোৎ¯œায় তখন গমের ভিটা, বক্কর মৌলবীর বাঁশঝাড়, অমাবস্যার রাতে সাদাভেড়ার স্রোতচলা মস্তদীঘির পাড় ধইরা উঁচু আইল আর ধানকাটা মাঠের প্রান্তর জুইড়া ফটফটা আলোয় আলোমতির রোশনাই তোলে। আমরা নির্দেশ খুঁজি, দয়ালের ডাক শুনিতে পাই। একই সুর একই ধ্বনি আলো ফোটা কামনায় আমাদের প্রলুব্ধ করে। কুলসুমের বাপ বার হইয়া পড়ার আগে ফরজ গোছল সারোনের কথা ভাবে, এটা ভূত তাড়ানি গোছল, নাপাক গায়ে বাইরে যাওয়া চলে না, তাইলে রুহুসকল ঘির‌্যা ধরে আর পাপের বোঝায় সামনে আসিয়া চিক্কুর পাড়ে। তখন তারামুখ অন্ধকার, চাঁদ ম্যাঘ খাইয়া লয়, একাকী পড়ে ওই নাপাক মানুষ। যেদিকে পালাবার চায় খালি বড় বড় ঢ্যাল আর গত্তো। এ গত্তো নামানি গত্তো, গোপন কিশকিশ্যা ক্যাশের ন্যায় আন্ধার, সেটি ফ্যালেয়া বুকের ওপর নাপ পাড়ে আর খালি হিসহিস হাসি দেয়। বেটি ছোলের নাকান তামানখান দেখিতে। ক্যমবা যান ওলান ওঠা বেটিছোল। বেচ্ছোল তো এমন হইবার নয়। কতোদিন তার যৌনজীবন, আজকাল কোটে, তখন তো স্বাদীনেরও আগে। অথচ এরকম সে দেখে নাই। বিদঘুটা আর বীভৎস এসব কথা শুনতেছে কুলসুমের বাপ খোকা, খয়বার আর হেলেনার কাছে। তারা আজ নাই, কিন্তু কিচ্চু হারায় নাই। সে আজও একলা হাসে, সে বয়সে হেলেনা কি করিয়া পুরুষের সঙ্গমসামর্থ্য খবর জানিত। সে উড়ানো গল্প কতো সত্য আর সদ্য, বুঝিয়া ওঠা কঠিন। এটা এ রাতে তো হেলেনারই মূর্তি। তবে স্তন এতো বেঢপ কেন? ওতে তো জন্ম-যৌবন কিচ্ছু নাই। হেলেনা দৌড়ায়, স্তন আলুথালু হইয়া পড়ে, চোখ পেতœীর মতোন, কপালে বড্ডো বাজে টিপ, শাড়ী নাই, কাপড় নাই খালি গূঢ় অন্ধকার। যোনীদেশ রক্তাক্ত আর চিকচিক অমোচনীয় দাগ। গাটা শরীরে কাঁটায় আকীর্ণ। সে ছায়ার মতো ওই গত্তোর কাছে আসে, এবার চেনে না, ক্যাডা তুই ক্যাডা কিয়ের কুলসুমের বাপ, হালা এবার চুদনে পড়ছো, খাড়াও মজা দ্যাখাচ্ছি। ওহন হ্যালেনার লগে খাতির জমাইচ। বিবির লগে রঙ্গরস কইর‌্যা এখন আমাকে কলা দ্যাহাও। এই আমিই তো কদিন আগে ওই আমলিগাছোত ঠাঁই নিছিলাম। সেখানে এক জ্বীনের লগে থাকার জন্যে আমার লগে কত্তো কতা। ছাতিমতলা ছাইয়া তখন ফুঁড়া উঠিছে সিঁদূররাঙা সূর্য। হালা গোছল ক্বাযা নামাজ ক্বাযা কী এক তামশার ভিতরে রক্তমাখা হ্যালেনার ছন্দ আউলাইয়া যায়, নিঃশ্বাস পাতলা হয়, মনে হয় নিজের মদ্যেই বাওয়ানোর ডাক উটিছে। সুবেহ সাদেকে এ আরামটা আরও গড়ে ওঠে, চূড়ার টান বাড়ে। সব কাম পরে তার আগে বিবির গতর হানা গায়েবী কেৎলীবুদবুদ উষ্ণতা। আমরাও ওরকম হইয়া যাই কখন জানি না। কতো নিষ্পাপ, আজগুবি আর রহস্যঘেরা বাতাসসুরের বীণা বাজানো গল্প। মানুষ খেকোর গল্প, কল্লাকাটা মানুষের গল্প, কোনো বেশ্যা মাগির ভালোবাসার গল্প। তবে পাতনার বিলে গজে ওঠা বিধবা নারীর উৎপত্তি আর তার অপরিসীম দৈবশক্তি অর্জনের গল্প তাবৎআঁকাআহুতি। সে নারীর সংসার-সন্তান আছিল না কিন্তু অপার শক্তি অর্জন করেন তিনি না-জন্ম নেওয়া ওই সন্তানের কল্যাণে। প্রকাশ থাকে, একবার এ অঞ্চলে প্রতিটি মেয়ের গর্ভজাত সন্তানের মৃত্যু হলে পাড়া তারপর গ্রাম জুড়িয়া হাহাকার ওঠে। বিচিত্র স্বপ্নে তখন মানুষের জীবন অচল। ডাক্তার-কবিরাজ এর মর্মার্থ বুঝিতে পারে না। যেথায় যে ডাক আসে, যে মীমাংসার সংবাদ আসে হু-হু করে বাতাস কাইট সেথায় পাড়ি দেয় মানুষ। কিন্তু মুক্তি নাই। থৈ থৈ করে একবার কোন্বুদ্ধিতে সক্কলে গেল মৈষালবাড়ির পুকুরের পানি খেতে। এখানে শ্র“তপীরের দৌলতে একরাতের তপস্যায় সৃষ্ট এ মসজিদটি অনেক আসানস্বরূপ। তবে সবকিছুর নিষ্পত্তি দেয় পাতনাবুড়ি। পাতনাবুড়ি বড় তান্ত্রিক। রক্তের দরকার তার। কি করে সব নিঃসন্তান নিপয়া, নিদানপথযাত্রী। আর সে কেচ্ছা শেষ হয় নাই, ততক্ষণে থিতিয়া আসিছে কান্নারোল। বিদায়লগ্ন অত্যাসন্ন। আমাদের আহ্বানের আর দাঁড়ায় নাই সে মায়াবীমুখ। কার ডাকে সে দ্রুত চইলা যায়, তারপর শেষ দেখা হয় নাই। আমরা অনেককাল তাকে জড়াই, ঘুমে-স্বপনে-জাগরণে। সবুজ ঘাসের সরু রাস্তার দুপাশে পগার, কোষ্টা ক্ষেত, তার পাশে ঘাসবিহিন রাস্তা, রাস্তার ওপারের বিরাট ডোবাপুকুরে। ঘাসছাড়ানো ছাল ওঠা রাস্তায় একটু আগাইলে শিরিসগাছের নিচে গোটা তিন পুরনো গোরস্তান আরও একটু আগাইলে রাস্তার বাঁক। সেখানেই দণ্ডায়মান মহিরের ভিটা। ও ভিটা খুব লোভনীয়, কলাগাছ দিয়া ঘেরা একটিয়া বাড়ি।

মৃত্যুপুরী উপচিয়া, মহিরের ভিটা হাতড়াইয়া গোপন আওয়াজ ওঠে। সে আওয়াজে ভোর হয় না, বৃষ্টিঝড় ওঠে না। তবে কদ্দুস মৌলবী ওস্ পড়ার ন্যায় বিলবিল ঝালোর কান্দোন পাড়ে। তার বউ মরচে পয়লা আষাঢ়। সে মোর্দা গোর পায় নাই। খালি হুলহুল পাতাল ফুট্টা পানি উট্তাছিল। সে পানি থামে নাবালু দেও, মাটি ন্যাপ্পা দেও, টপ্ করি থোও, তাও হয় না। থোওয়ার আগেই মোর্দা পানিগোছল নিয়া নেয়। ফির তোল, চপচপ করি বালু দেও, ফির থোও তাও কিচ্চু হয় না। তখন আফের হাজী চিক্কুর পাইরা আওয়াজ দেয়, নাউজুবিল্লাহ। এ মোর্দার ফেরত নাই। কুদ্দুস মৌলবী তখন হজ্জব্রত পালনের ওয়াদায় দিলখুশ শপথ নেয়। এ আজাব সে সইবে ক্যামনে। আখেরাত পার হওয়া তার জন্য যে বড় কঠিন সেটি বিবি তক্কে প্রমাণ দিয়া গেল্। নাফারমানির শ্যাষ কোথায়? আর নয় এ দুনিয়ার লীলা সব মিছা মিথ্যার হাহাকার। তারপর অপেক্ষার প্রহর গুণিলেও জীবন পাল্টায়া যায়, এক স্বপ্নের রাতে মুহুর্মুহুু ছায়ার সন্ন্যাসে তাড়া খান বিবি আসিয়া দাঁড়ান কিম্ভূত মূর্তিতে। তোমার হাতের আঙুলে কীসের দাগ! ক্যামনে তুমি ওই দাগের পশ্চাত-কথন আমার নিকট অস্বীকার করছ। আমি তোমার জীবনে অসুখী না হইলেও চেষ্টা করিয়াছি বালামুসিবত আগলাইয়া তোমারে কোলে তুইল্যা রাখতে। কিন্তু তোমার ওই দাগ এখন দাহ। আমার নিকট তুমি সব অস্বীকার করছ। ছিল্যা তো কম্যুনিষ্ট, আল্লা যেমন মানো নাই তেমনি আমারেও মানো নাই। কত্তো আকাম করছ, কত্তোজনের নিকট হুনছি, নিজের কাছে নিজেই লুকাইছি। গোপনে তোমার কাছে কিছ্ছু শুনিতে চাই নাই। চান্নির চাঁন মনে করছি তোমাক্ব। ফর্সা জ্যোৎ¯œায় আরও ফর্সা মনে করছি তোমাকে। তুমি তার মূল্য কী দিছ, কী অপূর্ণতায় তুমি আমারে যান্ত্রিক যৌনকার্য চালাইছ তা আমারে বুঝতে দাও নাই। যখন হকারের কাম করতা তহন আমার বাপ তোমারে তুইল্যা আনে, অনেক পরে বিয়্যা দেয়। তহন তুমি আমার বান্দা নও, তার ইতিহাস ওই দাগে বিদ্যমান। এইসব আমার আজাবের কথা। আরও অনেককিছু আছে, সব কমু দিনে দিনে। এইসব রাতকথনের পর পৃথিবীর প্রতি বিস্বাদ সৃষ্টি হয় কদ্দুস মৌলবীর। তখন এক বিয়ানরাইতে কদ্দুস মৌলবীকে আমরা গোপনে বিড়বিড় কইরা এসব এলোমেলো কথা যত্রতত্র বল্লা বেড়াইতে শুনি। এভাবে আউলাইয়া লোক হওয়ায় ক্রমশ তিনি আমাদের নিকট থেকে অস্তাচলে চলিয়া যান। আর রূপান্তরের সাক্ষ্যরূপে আমরা দেখি তিনি হজ্জে যান, এবং বিশাল হজ্জ গ্র“পের নেতৃত্ব দিন। তিনি জীবদ্দশাতেই অনেকটা কামেল লোক হিসাবে পরিচিতি পান। তখন হজ্জের কাফেলায় সব যুক্ত হইলে তিনি মধ্যমণি। সক্কলেই তার মনের মতো কথা শোনে। সে মতে আওয়াজ দেয়। বিবির মৃত্যুর পর একজন মানুষ কামেলরূপে পরিগণিত পাইলে আমরা ‘না হাসি না কান্দির’ মতো করি। খালি এ গাঁয়ের বেনামাজি মোড়ল এসব অগ্রাহ্য কইরা ক্রদ্ধরোশে সবকিছু অবলোকন করে এবং কালেভদ্রে বিষোদ্গার করে, উদ্যত হইয়া কিছু করিতে চায়। কিন্তু পারে না। কদ্দুস মৌলবী পাকাচুলে, গিরার ওপর পাজামা পরে, সাদা পাঞ্জাবীতে ইসলামী জোশ চালাইতে চান সর্বত্র। গ্র“পের সক্কলকে একত্রিত করেন সমস্বরে নারায়ে তকবীর তুইলা মসজিদের দিকে যখন ধাবিত হন তিনি তখন তার পিছু পিছু জামাত চলে; এক হইয়া রব ওঠে সক্কল আল্লার বান্দা আহো, এদিকে আহো। দু রাকায়াত নফল আদায় করে শোকরানা আদায় কর। এসব জোশে কারো পিছু চলার সুযোগ না থাকিলেও এক নেতৃত্বই কায়েম করেন তিনি। তবে এইসব যাত্রারথে খুব ব্যতিক্রমী জোশ দৃশ্যপটে ভাসমান হইলেও ভিতরে এক অন্তরকাপা ক্রন্দন তাকে বিরামহীন পেটায়। দ্রুত পেটায়। দাগের ইতিহাস তাহাকে ফাসায়। কেন যে ওই রূপসীর পরকীয়া তাহাকে এইভাবে বহুকাল করালবন্দী কইরা রাখিয়াছিল। বহুদিনের সে সম্পর্ক চূর্ণ হয় ওই দাগে। এরপরও তো কতোকিছু! কিছুরই তো শেষ হয় না। আরও এক কুসুমকুমারী তার প্রণয়অর্গল বাধিলে সে এড়ায় নাই। বিবি তো এর জন্যই আরবার এখন মৃত্যুর পরও আষ্টেপৃষ্টে। এসব পূর্বাভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি সে চায় না। এমনকি আজ এ হজ্জযাত্রার নেতৃত্বের পরও তিনি যেন সব বিষয়ে একটা অমূলক হইয়া কীসের এক নাটক কইরা চলেন তিনি। এভাবে তো চলে না। এই নফল এবাদতের সময়ও তো তার শেষ কিছু নাই। তাই হরহামেশাই একটা অনুপস্থিতি কাজ করে তার মধ্যে। আমরা এক অপয়া বা নির্বান্ধব ব্যক্তিকে আলেম বইলা ভাবি বা কেউবা তা খণ্ডন কইরা চলি। এক বেশধারী ব্যক্তির প্রণতি আমাদের নজর না এড়াইলে এক সত্যিকার বান্ধবরূপেই তিনি চিরকাল বিরাজ করেন, পরে এক কুঁকড়ে যাওয়া শীতরাতে তার মহাপ্রয়াণ ঘটিলে আমরা ওই বিড়বিড় গল্পের বিবিধ স্বর চেখে দেখি। পাতনা বুড়ির আওয়াজ হয়তো মৃত্যুর পর পাওয়া যায় না কিন্তু কুদ্দুস মৌলবীর সন্ধান হারায় না। কারণ, সব ফুইরা গেলেও একজন মানুষের অবশিষ্টাংশ কিছু থাকে যা কতোকাল মানুষকে কুড়িয়া খায় তা জানা যায় না। অনেককাল তিনি কোটরে আক্ষেপ তোলেন। দ্রুতলয়ের এশকমিছিলে থাকেন, বিয়ানবেলার তাবৎ ন-মিছিলে কাটান আর বইয়া বেড়ান আলাবোলার দাগ-ইতিহাস। তবে তা অস্পষ্ট অ-দাগরূপ আরও ছড়ায় অনেকদূর, বহুদূর আমাদের কৌতুহল আর কল্পনার রাশিমালারূপে আলোকচ্ছ্বটার বিক্ষেপে।

মহিরচাচা কোন্ কারণে বাঁক নেওয়া রাস্তার মোড়ে একটুকরা ভিটার মালিক হইয়াছিলেন জানা যায় না। শূন্য পাথারের মাঝে কলাছাওয়া ঘেরে দুটা মুখোমুখি মাটির ঘরে নিরুপদ্রƒপ বাস করিতেন তিনি। বাড়ির পরিবেশ খুব ছায়াঘন, পাখিডাকা। কাকওড়া আকাশ, ডানামেলা চিলের প্রান্তর আর পুব হাওয়ার আলিঙ্গনে সব সুখ যেন নাইমা আসে তার চৌকোণা উঠানে। এর বিপরীত দিকের রাস্তা সোজা বড়রাস্তার দিকে। শীত-আাঁচড়ে সবকিছু যখন মিইয়া আসিতে থাকে তখন গোটা এলাকা জুইড়া নাইমা আসে নীরব অন্ধকার। অন্ধকার ঘিইরা তখন জ্বলিয়া ওঠে নাড়ার আগুন। সে আগুনে উদামগায়ে চলিতে থাকে উত্তাপ নেওয়ার আয়েশী আয়োজন। কখনো লম্বা আগুনশিখায় ছাইয়া যায় দিগন্তবিস্তারী আকাশ। লালিমা আকাশে তখন আমরা সাজাইয়া দেই স্বপ্নভেলা। নরম গড়গড়া চালপিঠা নাড়ার আগুনে পুইড়া দাঁতের স্বাদ মিটাই। জমে ওঠা অন্ধকার তখন আরও গাঢ় হয়। তিন গোরস্থানের এলাকা থেকে নেড়ীকুত্তার বেসুরা ডাক ভাইসা আসে। সে ডাক মহিরের বাড়ির পাশের লম্বা পুকুরপানিতে সাঁতার দেয়, ছিপছিপে সরীসৃপের লেজে নাকি জিহ্বায় লাগে বোঝা যায় না তবে দেখা যায় দলাপাকা অন্ধকারের মধ্য থেকে পানিখরচ কইরা বাহির হইয়া আসিতেছে দুঃসাহসী সফিউল ভাই, গাঢ় ঠাণ্ডায়ও তার হাতখানেক ওপরে ওঠানো। হাতে তার আনসারবিড়ির আগুন আর কোমরে গোঁজা সদ্য ধানবিক্রির খুঁতি। অন্ধকারের বিড়ির তারাআগুনে তিনি পথ নিশানা পান, একসময় লম্বা গলায় ছাড়েন সদ্য দেখা ছবির বিরহী নায়িকার গান। সে গানের নির্ভয় পথ বাইয়া একসময় পৌঁছাইয়া যান নিঃশেষ নাড়ার আগুনের পাড়ে। চটি নাগরার পা ঠেলিয়া তুষানল খোঁজেন উত্তাপ নেওয়ার জন্যে। অতঃপর জমিয়া ফেলেন দিনশেষের কীসব গপ্পো। কতো রাত সে আড্ডা চলে জানি না, তবে তখন ক্রমশ রাতের খাওয়ার আয়োজন চলে কুপির আলো ঘিইরা। চকচকে প্লেটে পুকুরের খলসে মাছের চচ্চড়ি কিংবা রুই-মাগুরের বাগুন মেশানো পাতলা ঝোলের তরকারি। মেম্বার বা চেয়ারম্যানের ভোট শুরু হইলে বাড়তি প্রসাদ তখন যুক্ত হয় সবকিছুতে। কার এলাকা কার কে ভোট কোথায় পাবেন কারা কাকে ভোট দেয় সবকিছু কেন্দ্রে আসীন হয়। জোয়ার ওঠে মানুষের ভোট-উৎসবের দিনে। বর্ণ, গোত্র, ধনি-দরিদ্র একাকার, যেন দুধআমে মেশানো উপভোগ। ইউনিয়ন জুড়ে মাটিসড়কের ধুলি উড়ে সয়েকপুর, হরিরামপুর, পালানু সাহাপুর থেকে লোকজন আসিয়াছে দল বাধিয়াহুল্লোড় করিতে করিতে। তাদের পথ শেষ হয় প্রার্থীর বাড়িতে আসিয়া। তখন বড় বড় গামলায় নামান হইতেছে ভাত-মাংসডাল আর কদুর তরকারি। যেথা যেমন চাওয়ায় তেমন ইচ্ছামতো পূর্তি। আঙিনা-খুলিতে হাঁটাহাঁটি চলাচলি আর ভোট দরকষাকষি। রুক্ষ্ম সে সব দিনের প্রণালী আঁকা থাকে ঊর্ধ্বমুখী পলাশ-শিমুলের ডালে, পালতোলা আকাশে আর লালমোরগের পাখার রঙে। সাঁজোয়া শর্ষেক্ষেতের হাওয়ার দুলুনিতে মৌ মৌ গন্ধে ছাইয়া যায় দিকপ্লাবী যৌবনদিন। আমরা উৎসবে আটকাই সড়কের ত্রিমোহনার নিমতলে, স্বচ্ছতোয়া পুকুরবাতাসে, ঘনঘাসে মোড়ান মেঝেতে আর দূরদিগন্তের অরুনাভ অরুনিমা রঞ্জনে। কত্তোকালের পুণ্যগাথায় আলো-অন্ধকারের ভয়মায়ায় আটকান মকবুলার, রুহুল মৃতদের কথাও ওঠে। কতো মৃত্যু, কতো জীবন যেন হারানোর সংবাদ আসে জানা যায় না। সব যেন বিগত শতাব্দীর অন্ধকারে হারাইয়া যায়। ভোটউৎসবে তখনও সব রমরমা। লোকারণ্য জনপদে আমরা অপেক্ষার প্রহর গুণি, বসে যাই আলোআঁধারে, কতোসব গল্পের প্রয়োজনে। সে সব বেশির ভাগ জীবন ও যৌনতার গল্প। কেন সে গল্প, আর সে সব নিষিদ্ধ গল্প কেন ভালো লাগে জানি না, তবে সবচেয়ে হাসিতে কুটিকুটি মিশুর ছাগলধরার গল্পটি। তখন অন্ধকার ছাইয়া আছেরুহুনীরব পল্লী। হুশ হুশ আওয়াজে ছুইটা চলে ফেরীর নাগাল ধরার তিন/দুই সিটের ঢাকাগামী মেল, সর সর টানে সইরা যায় শিমুল-পিয়াল-আমের ঊর্ধ্বমুখি নিশ্চুপ ভূতবৃক্ষসমূহ। ঠিকরাইয়া পড়িছে সব নিরেট-নৈঃশব্দিক জ্যোৎ¯œাআলো। চিক্কন সরুরাস্তায় ধুলোবালিকালি গায়ে মাখিয়া সাইকেল ঠেলিয়া চলে মিশু। কোথায় যাইবে, কেন যাইবে, কেউ জানে না। কতোকালের ওসব চলাফেরা কারো কথায় কাটে নাই কোনোকালেই। সবকিছু আড়ালে-আবডালে-অনায়াসে গতিময়। দূর থাইকা কোথায় তখন পুতুলনাচ শুরুর ঘোষণা শোনা যায় মাইকে। যেন পুরনরীর সামষ্টিক শোকআওয়াজ। জাঁকিয়া বসা শীত তখন প্রভুরপ্রয়াসে চাইপা আছে। সাইকেল বাইয়া ঠাণ্ডার বিপরীতে একলুঙ্গিতে কশকশা মিশু তাড়ায়-দৌঁড়ায়, নাড়াছাওয়া পল্লীতে, মা নাই যার, বাপ যার অকালপ্রয়াত, ভাইবোন ছিটকাইয়া পড়া ভুঁইফোঁড় বেপরোয়া। সবকিছু সুখছাড়া। সে বাড়িতে মিশুর কী! শোনা যায়, কে বা কারা প্রতিনিয়ত যায়, কেন যায় সে উত্তর নিরুত্তর। রাস্তা পার হইয়া উপরাস্তার মোড়ে সাক্ষাৎ আলাপ ময়েজ কালার। সে এ এলাকার প্রভাবশালী। রাতে এ পরিণতি দেখে, দূরে পেঁচা ডাকে ধীরলয়ে, চিল-শকুন তড়পায়, আর অশনি ডাকে বাদুড়। মাগি বোলে আজ আর দিবাল্লয়শুনছিস্ কিছু। কি যেন আস্তে আওড়ায়, তখন একটা বকরি ডাকে, দুটা বকরি ভ্যাবায়, মাও বকরিটা নোলায়, পাঠাটির মস্ত ঘুম, সদ্য হালোন একটু পাশমুড়িয়ে হামলায়, মায়ের ওলান চাটে-বোলায়। ¯েœহের যে কি হরবোলা, বোঝা যায় না। মিশু হামলিয়া পড়ে, পাঠাগন্ধ ঘরের পাশেই তারে চায়, চিনিতে চায়, প্রবঞ্চক-প্রেমিকের মিনতি তার বেসুরো গলায়। অতঃপর কী যে দুর্গন্ধে সে তলাইয়া যায়, তারপর আবার বিনিময়ে ফেরে, বিফলে ছাগল টানিলে কেউবা তার প্রেতাত্মা হইয়া দেখিয়া ফেলে, তখন সে হইয়া যায় ‘বকরি মিশু’ বা ‘ছাগ-মিশু’। সেটি মহলবিশেষে প্রচারিত থাকে। বিশেষত, তার সঙ্গীদের কাছে, যারাও হতে পারত এমন নামের বহনকারি। আশ্চর্য হলেও সত্য এরূপ এ সকল নাম কখনও তলাইয়া যায় না। বিলীন হয় না। আবহও পাল্টায় না, স্মৃতিবহ হইয়া মনে রইয়া যায় অনেককাল, কতোকাল! সমাজ নীতিনিয়ম কী বা কেমন তার চাইতেও বড় জীবনের ভেতরের জন্ম। পাঠাগন্ধের এ কাহিনী মিসুর মুখে আমরা প্রথম শুনি, সে জীবনের গল্পকে দমাতে পারে নাই, যখন বান্নি আসে উৎসব হইয়া, দীপক দাদাও তখন এ রকম গন্ধ পাঠার গল্প শুনাইয়াছিল। সে গল্পের কাহিনী অন্য, আরেকরকমের। কি যেন কারণে এক্কেবারে বিবস্ত্র অবস্থায় আলের পাশ দিয়া আমরা দৌড়াইতে দেখি তাকে। কেন দৌড়ান জানি না, এটা বুঝি তার পুরুষোত্তম অহংকার। দীপক দাদা পরে বলিয়াছিলেন, পাঠার বিনিময়ে বয়সী এক যুবতী মহিলার প্রস্তাব প্রসঙ্গে। তিনি সে কর্ম্মে ব্যর্থ হওয়ায় তার লুঙ্গি আর ফেরত দিন নাই, তখন নিরুপায় উপদ্রুব থেকে বাঁচার জন্য জনসমক্ষে লাজলজ্জা ছাড়িয়া দৌড় দিতে বাধ্য হন। এ বাধ্যতার পশ্চাত ইতিহাস আরও প্রখর ও মরমিয়া। ব্যর্থ যৌবনের অনস্বীকার্য আহরণ ছাড়ে না কেউ, ছাড়ে নাই সেই দরিয়া, আর তা দিতে ব্যর্থ হইলে দরিয়া শুধু অর্থে তৃপ্ত হয় নাই, ব্যর্থ পুরুষত্বকেও সে জনসমক্ষে আনিতে বাধ্য হয়। দীপক দা তাতেও সেক্স লাগান। আগুনের ওপর বইসা বিড়িতে সুখটান মারিয়া বলেন, ‘মাগির ত্যাজ কী, পাছড়াপাছড়িত কুলব্যার পান্নুনা’। তারপর আরও গঠিত শরীরের বাঁক আর অনিবার্য নির্বন্ধ ধরিয়া বলেন, এক জীবনে এ্যার শ্যাষ নাই। তবে ফের যাইম। ওক মুই আর সরম দিবান্নাও। তবে শেষ পর্বের চ্যালেঞ্জের এ গল্পের কি পরিণতি হইয়াছিল তা আর জানা হয় নাই, তবে তিনি হারেন নাই, বা এরূপ পৌরুষদীপ্ত কাজে তিনি হারবার পাত্র নন।


আমরা দীপক দা বা মিশুর গল্পভঙ্গি আরামসুখে পান করি। সেখানে আবার তাদের দ্বিতীয় মিশনের অপেক্ষায় থাকি। নির্ণিমেষ তাকাইয়া থাকি ওদের সাহস আর শক্তির সামর্থ্য দেইখা। মিলনভুক ওদের আরামে আমরা শীৎকার তুলি, বাতাসে আলোর নাচন দেখি, পেছন দরোজা পার হইয়া প্রাচীরের উপর চোখ ফেলিয়া উঁকি দেন, কোথায় আলোর পরে অন্ধকারকে চোখে দেখি, শব্দ শুনি, বিড়ালের মিঞ শব্দ তাড়া করে, হুশ কইরা শিমুল ডাল দুইলা উঠিলে শীতপ্রবাহ ছাইয়া যায় তামাটে শরীরে, ঘুমায় সে কোন্ নারী, কেমন তার গঠন, কোন্কালে স্কুলঘরের কোণাপেয়ারা গাছে সে বলেছিল, ‘তরে দুধ খাওয়ামু’জ্জতুই ওহনও বড় হস নাই, আয় বোকা কোনেকার। সেকালে ওই উষ্ণতায় পুকুরঠাণ্ডা পাইলেও ওই শিমুলডাল এখন যে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে আনে তা আমাদের ভেতরে-বাহিরে বিপুল অনাকাক্সিক্ষত কলরোল তোলে। সেই গরম কিন্তু পুকুরঠাণ্ডা সুখ এখন বিপরীত দিকে তাড়া করে, শিমুলের গুচ্ছে তা সশব্দ হইয়া ওঠে এবং আমরা আবার ওই বইঘরে পাশের টেবিলে এবং খাটের উপর অনুভবে তাকাই, হামাগুড়ি দিন, ঠুক্ আওয়াজে সুডৌল কিছুর আঁচ শরীরে বহন করি। সে আঁচে দুধরঙা দেহে আর অঙ্কিত কমন-ললন-পীতাভ সানুতে সাঁই-সাদা-তুলতুলরূপ ফিইরা আসে। না-বোঝা ভীষণ অপবিত্রবিদ্ধ টানে হানা চোখে একবার গাওয়া যায় মোস্তা বা মতলুর চিক্কন শীৎকার। সে সবে আমরাও ডুবিয়া যাই বা হাঁটি, বা নিদ্তুল্য নিদ্রাহরিত থাকি। চোখে যাদুকরদের দেখি, কেমন এক পোশাকে এ যাদুকর যাদু দেখান। পেছনে কে যেন দাঁড়ায়, সে আগাইয়া দেয়, স্টেজে নানা জিনিস বানাইয়া দেখান, সুমিষ্ট-সুশান্ত-পেলব-অনন্ত ওসব খুব মজার মনোহারি। বান্নিমেলার বায়নার মতো তা আকর্ষণীয়। ধন্দে পড়া সুখে আগুন জ্বইলা ওঠে মনে। বৃষ্টি আসে ঢেউ হইয়া, ভরে যায় পার্কের দিঘি, মতিমিয়ার পুকুর, সোনামুখ ভাইসা ওঠে তালপুকুরে। সর্ষে ক্ষেতের ওপারে বিরাট রঙধনু ওঠে। তার ওপারে কেমন শাদামেঘ উৎসব করে। মন্দাভাব কাটিয়া যায়। বিরাট প্যান্ডেল ঢাকা পড়ে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো দীপক দা পাঠ করেন একদিনের  বউয়ের উক্তি। হ্যাচাগের আলোয় সে সব কান্নাহাসি ফুটিয়া উঠিলে একসময় বাদল হাওয়া আসিয়া আমাদের ঋতুঋদ্ধ শীতার্ত করিয়া তোলে, কাঁঠালপাতা বহিয়া তখন কাঠবেরালি আড়ালে চইলা যায়। ত্রিপল বাইয়া ভুর ভুর জল মাটিমুখা হইলে ‘একদিনেরবৌ’-পাঠ শেষ হয়।
তবে প্রকৃতি বিষম হইয়া ওঠে, যে আনন্দে দীপক দা সারাজীবন আমাদের স্বর্গখণ্ডের সুখ দিয়াছিলেন, তাহা করুণ হইয়া আসে, কেমন করা কান্নায় হু-হু হাওয়া বাজিয়া যায়, বুকের ভিতর চাপা-শোকস্মৃতি বিঁধিয়া বসে, ব্যথাতরঙ্গ ধেয়ে আসে সর্বাঙ্গ বহিয়া, লক্ষ্মীদিঘির পাড়টা খুব বিতৃষ্ণা লাগে, ওখানের বাতাস দুর্বহ হইয়া ওঠে। আমাদের জ্বর বোধ হয়, সবুজ হাওয়া বিষণœ হাহাকারকে বাড়িয়া দেয়। সদাপ্রস্তুত দীপক দাজ্জতখন আখিরা তীরের নিমতলার দিকে, কত্তোকালের শ্মশান ওটা, মনে নাই, তবে ওখানে আমরা একবার ডুবসাঁতারে চইলা যাই, বিদ্যাসাগরের মায়ের আহ্বানের তাড়ায় তখন সব্বাই অনুরাগী হইয়া উঠি। খর¯্রােতে বিদ্যাসাগর মাকে মনে করেন। মা বুঝি অকূল পাথারে চক্ষুপ্লাবী, উপলখণ্ডে তা ঢেউয়ে-বাতাসে-ঝঞ্ঝায় দণ্ডায়মান, দূর থেকে তিনি ছবিচিহ্নে হাঁটিয়া আসেন, কী অমোঘ স্বরূপে মেঘকালো চুলে বুকউঁচু লেপ্টে যাওয়া মৃদুকোমল আঁচলছাড়া শাড়িতে মূর্তিময় নির্মোঘ পাথারীদৃষ্টিতে ঋজুময় পরাকাষ্ঠায় দৃঢ়মান। জনমনিষ্যিহীন শ্বেত¯িœগ্ধ হাড়ুসা তীরে নীরবনিশ্চুপ মা-বাণী নিরাকার হলে কোন প্রান্ত হইতে হইয়্যেরকম মেঘনাদশব্দ চুল্লীতলাফাটাশব্দে কানে শিরাচ্ছেদনকারীরূপে বাজিয়া যায়। মা আবার করুণ আওয়াজে ডাকিয়া যান, ‘কখন আইবি বাবা!’জ্জ সে সব কানে বাজিলে বিদ্যাসাগর তড়িৎ হতে চান, কূল দেখেন, মাঝিমল্লাহীন উল্লাসতরঙ্গে নিজে অপচিত হন, সেঁধিয়া দিন, প্রতিরোধী প্রতিজ্ঞা ভীমভার পায়, দামোদর তখন আরও মুখরিত হইয়া ওঠে। তারপর ধেয়ান ছলকে গেলে কে যেন কার চুল-নাভি পাইয়া যায়। তখন ভরানদী, কূলছাপানো তীর আর ব্রীজের ওপার হতে আগত উল্টালম্ফে আছড়ে-পড়া জলে দীপক দা কার্তিকমূর্তিতে বুদ্ধহাসিতে চিক্কর দিয়া কয়েন : শ্মশানের চুল-নাভি যে হাতে তুল্লা পঙ্গর দেবে সে আজ বাতেসা পুরস্কার পাইবে। মিষ্টি বাতেসা ভরাপুন্নির বান্নিতেই মেলে। সাতদিন পরের বান্নিধ্বনি সকলের কানে মিঠা লাগিলে তড়পানি ওঠে। অর্জুনসাহসে গোঁয়াড় হয় সবকিছু। মনে হয় দীপক দা কি যে পাণ্ডবপুত্রের আশীর্ব্বাদ পাইয়া গেলেন! ওসব উতরাইয়া একমাত্র তিনিই ডুবসাঁতারে শ্মশানে যাইতে সক্ষম হন, বীরের মতো আঙুরির সামনে দাঁড়াইয়া বলেন, দেখ্ মরা মানুষের চুল, তবুও একবার ‘লাভ’ কস্না ক্যা। একবার কাছে আসিলে দেখিস কত্তো মজা! দীপক দার এসব এখন নিমতলায় আর আমাদের নিষ্ঠুর আকস্মিক কান্নার কলরোলে। তবে সে বিকালে শ্মশানশেষ হইলে বৃষ্টি নাইমা আসে, আমরা নিধুয়া মাঠে অপলক বৃষ্টিতে বনবাসি ভিজিয়া যাই, তুমুল বৃষ্টিমিথে নাগ-ইরা দেখি। অনন্তনাগে শুইয়া আছেন বিষ্ণু। পাশে দাঁড়াইয়া পঞ্চপাণ্ডব। প্রতিবেশি পক্ষীদের ডাক আসে, শোভাময় প্রকৃতিনাথ স্মরণযোগ্য হয়। আহা আর কোনোদিন যেন বৃষ্টি না আসে। তারপর হঠাৎ উদার ডাকে দীপক দা এনড্রিন পানে ওপার নিষ্ঠুর যাত্রা করিলে আমাদের সব মায়া ছড়াইয়া যায়। দিগন্তবসতি নেয় সবকিছু। মুখলাগা ভোরবেলায় কান্নারোল নামা বারান্দায় তাহাকে দেইখা ফেলি আর তার তালদিঘির পাশের লাল উঁচুঢিবির ওপরের দৌড়ের কথা মনে আসে, তখন প্রাণকোকিল তারস্বরে ডাইকা যায়, তহবন ভেজা বিশু আসে, বিপিন বাবু আসে আর মন্ত্র বলে। বিলিকাটা ইরিক্ষেতে দিগন্তকে ডাকিয়া তখন আমরা দুর্মর প্রেমে মিটাইয়া ফেলি।
তবে দীপক দার মৃত্যুর পর বনবাসী সীতার জীবনে ছোট করিয়া ফেলি সব, পাখি তার ডাকে পরিবর্তন আনে, নর-নারীর সংসর্গ বিলুপ্ত হইয়া যায়, পাখিকুল অলখ অসুন্দর হইয়া ওঠে, নিশিডাকা কোকিল অসুস্থ হইয়া পড়ে, শিশুগণ ঘুমাইয়া পড়ে, বৃষ্টির কুয়াশা-রঙ ফ্যাকাশে হইয়া যায়। তবে আবার প্রশ্ন ওঠে দীপক দা কি এতোই রঙিন ছিলেন? আমাদের এতোই রাঙাতেন তিনি? আমাদের মৌলবি মোহাম্মদ সৈয়দ আলী স্যার খুব কষ্টে বলিয়াছিলেন, তুই তো চলিয়া যাচ্ছিস, বড় হইলে ভুলিস না, আর আল্লার দুনিয়ায় কখনো নাফারমানি করিস না। খুব বড় হবি জীবনেজ্জতখন তোর বটতলার টঙের বুড়াকে দাফনের দায়িত্ব নিস্। আল্লাহ হাফিজ…। বোঝা যায় না এইসব কথা। তারপর অনেককাল পার হইয়া যায়, সিক্সটিন ব্রেডের রমজান, যে ভালো ছাত্র ভাবিয়া স্কলারশিপ দিতে চাহিয়াছিল, সে এখন লাঙলের ফলা ধরা কৃষক, কালোক্ষতে মুখ ব্যাদান তার, আবুবক্কর বেনোজলে বুইড়া গিয়াছে, এই বয়েসে সে সন্তানের রোজগার খায়, জেলারের পিওন জামাই নিয়া গর্ব্ব করে আর আব্দুল কুদ্দুস যে বরাবর প্রথম ছিল সে মসুরের ডালের ভালো ব্যবসায়ী হইয়াছে। আর আমেনা-বুদি-শিরিণ-সেবুর-সুপ্তাসকল কেউ আর নাই, ওরা জীবনের উৎসবে বিলীন হইয়া গিয়াছে। দীপক দার মতো কষ্টশরীকের তরে বিসর্জিত যৌবনে তারা নিপতিত। তাহাদের চিরকালের হস্তাক্ষর মুছিয়া গিয়াছে। স্লেটে-ধারাপাতে আর মানসাঙ্কের গন্ধে তারা অন্তহীন চিরন্তন দ্রৌপদী। কতোবার তার ওপর হাত চালাইয়াছি আমরা, কতোজন কতোবারজ্জশুধুই হাতের লেখার জন্য, সে আজ ঘোমটা পরা কুসিমনের মা, ধানচালডালপটলবেগুনের সব আয় তার, স্বামীর বশীভূত তপ্ত গৃহীনি। তবে এইসব আমাদের ঐপারের অপদার্থ কথা, কিন্তু দীপক দা ছায়াচিত্রে হারাইলেও এক সময় রীতিকে অতিক্রম কইরা আমরা সব ভুইলা যাই। বেভুলা মনে দিগন্তের বর্ণিল হাতছানি আমাদের পাইয়া বসে। ঈশাণকোণের ঝড়ে আমাদের প্রিয় বকুলগাছের বড় ডাল ভাঙ্গিয়া পড়ে। তখন বকুল বিছানো পথ কর্দমাক্ত, গন্ধসমূহ সোঁদাময়, ভারি ভারাক্রান্ত সে মেঘডোবা বাতাস। কাছারির বারান্দায় তখন পলি আর সুপ্তা আসিয়া দাঁড়াইয়া রয়। ওরাও বকুলভেজা শরীরে নিষ্পলক দাঁড়াইয়া আমাদের পুরুষালি দুরন্তপনা দেখে। আস্তে আস্তে কাছারিবাড়ির চতুর্দিকে ভূতআঁধার ঘনীভূত হয়। দুইজনই বারান্দা ছাড়িয়া কামিনীগাছের কালোতে দাঁড়ায়। আমাদের ইশারা করে, মায়াবি মুখে নিষ্পাপ উচ্চারণে কাছে আসিতে বলে, কী সব সৌন্দর্য বুনিয়া চলে। সে সৌন্দর্যে, ছেঁড়া চুল পাল তুলিয়া নামিয়া আসিয়াছে ওদের চোখে, লম্বা নরম নরম আঙুলে কামিনীপাতা কাটিয়াছিল, সুযোগ পাইলেই উজালা হাসিতে ঢল নামিয়া বান ভাসায়, আহা কতোকালের সে শিরিণরাগের মোহনী বন্দিস, কাল পার হইয়া যায়, চলতি মায়া হারাইয়া যায়, বকুলগাছে প্রশাখা গজায়, আবার সে প্রশাখা কাইটা বিজয়দিবসের তোরণ বানানো হয়, সেখানে তোপধ্বনি আর মার্চপাস্ট চলিলে, তবুও ওরা নিইভা যায় না, চিরসমুজ্জ্বল সচিত্র রহিয়া যায়, আমরা আর জানি না সেদিনের সংবাদজ্জসুপ্তারা সে গ্রাম ছাড়িয়া গিয়াছে, ওপারে। সেও কি নির্মলেন্দুর ডাকাইত সোয়ামীর ঘর করে! আর কতোডি সন্তান বিয়াইছে ক্যাডা জানে। গৃহের শান্তি, সৌন্দর্য, কল্যাণ, ধর্মরক্ষা, প্রজননধর্ম, ঐতিহ্য বা সামাজিক গতি এমন জীবনের সবকিছুর জন্যই তো নারীর দায়িত্ব নীতিশাস্ত্রে রহিয়াছে। তাই তাহারা তাহাই করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু সে তো শেফালিকা, কষ্টানন্দের, অপরূপ প্রভাতছায়ার মায়া। কোনোদিন তো তার হার নাই। বকুলতলায় এখন ভোরে শুধু গন্ধ আর গন্ধ, কিন্তু মানুষের দল নাই, সুবাসহারা মানুষ সুবাসিত নয়, ডাকুবাবাও মইরা গিয়াছেন কত্তোকালজ্জ। তিনি যতো ব্যস্তই থাকেন বকুল হাতে নিয়া দৌড়ান, কই আর তো আসেন না! বকুল বুঝি আর মানুষ নিতে পারে না, সে এখন একাকী। সুপ্তারা বড় হইয়া গেলে বকুল লজ্জানত হয়, সে সংবাদ দেয়, এখন সন্ধ্যা নয়জ্জকালসন্ধ্যা নাইমা আসিয়াছে দীপক তো মরিয়াই বাঁচিয়াছে, কিন্তু সুপ্তারা বেঁচে আছে তবে কত্তোদিনের অরুণিমায় পরিণত হইয়াছে, বকুলবিনাশী হইয়া গিয়াছে আর তুমি যে গিয়াছ চলেজ্জসমর্পিত। সিক্সটিন ব্রেড, বক্কর, নুরুরা হাটেবাজারে ব্যস্ত, পলিরা নাই আর মেঘডাকা ঝড়ে শুকনো পাতার নির্দয় হাহাকার পরাজিত :
তখন পুন্নিমামান দুনিয়া জ্যেৎস্নায় নুইয়া যায়
কপাল খুইলা যায় ভাঙা পালের
পেরিয়া যায় নদীজ্জবৃষ্টিপথ আর মেঘধোয়া বাতাস
দিগন্ত-বসন পাল্টায়
সুপ্তাদের বাড়িতে তখন চান্নিমান আলো,
নির্বাক বকুলগাছটায় ফাঁকজোড়া আলোপ্রণয় দুল্ছে
বেলায়ারি হাত বাড়াইয়া বলিছে ‘তোর কালবেলা মনে আছে!’
বকুলের কথা বলে
নীলধোয়া জারুলকে বলেজ্জ
কত্তোকাল শিশিরআদর পাই নাই
আসিসনি আর, মৃত্যুদিশায় কেন পালাইয়াছিস তুই
আবার আর এক মৃত্যুর জন্য?
দ্রুত চইলা যায় সে রকমারিজ্জবাসনামাখা ভোর;
আর নাই সেজ্জ
আসে নাই আর
সত্যিই সে বকুলবাণীর প্রণয়বাদ্য
আসার যে নাই তার সাধ্য
রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল যেমনই হোন এককালে ওসব আমাদের আবেগমাখা অপ্রতুল মানুষ। খেলাঘরের কোণায় রীণা আপার নেতৃত্বে আবৃত্তি শুরু করিলে, বাইরে খুব বৃষ্টি নামে। ভূষণ দা বলেন : আবৃত্তি চলবে। ঝনঝন ছাদ-আওয়াজে কেন যেন সব গোল পাকাইয়া যায়, বৃষ্টিছাটে শীত শীত লাগে, হাওয়া পাঁকে বিলোড়িত করে সব, মেঘডম্বুর আওয়াজে ভয় পায় সবাই, তখন দেখা যায় ধূতিপরা বিশুদা সাইকেল চালাইতেছেন, ভেজাবৃষ্টিতে, ঝাকড়াচুল সাদা হইয়া গিয়াছে, গলার সুতাটা বাহির হইয়া গিয়াছে, উজ্জ্বল-আতা দৌড়াইয়া ওই সাইকেলের পেছনে-সামনে ওঠেজ্জচইলা যায় আখিরার দিকে, চড়াৎ করিয়া আওয়াজে কানে বাজ পড়ে, সোঁতা হইয়া যায় সবকিছু, কাঁদিতে থাকে বড় বড় মেয়েরা, খুব পরে বৃষ্টি থামিয়া গেলে হুড়হাড় দৌড় চলে, কাঁদাজলধোঁয়া রাস্তায় কান্নার রোল নাইমা আসেজ্জআমরা বুঝি না কিছু। প্রলয়মেশা নজরুলের গান তখন মনে, আজ আমাদের ছুটি বলে মেঘের কোলে রবীন্দ্রনাথকে দেখি। অতঃপর জানা যায়, বিশুদা বিদ্যুতে হত হইয়াছেন। অন্যদুজন মুমূর্ষু হইয়া হাসপাতালে, জানা যায়; তারপর বিশুদা আর ফেরেন নাই, বিকৃত শরীরে সোজা শ্মশানভূমিতে। তারপর থেকে আর আকাশচেরা তড়িৎরেখা আমাদের ভাল্লাগে না, সে সব গর্জালে স্বপ্নদোষ হয়, ভুখাভয় কাজ করে, কচিকলাপাতার মোচড়কষ্ট জাগিয়া ওঠে। কচুরঙা বুকপিঠ দেখানো কচিপাতাডগা ফিরোজা আকাশে পাল তুলিলে আমরা তাতে চোখ রাখিজ্জকোণাবর্ণের রূপালি সূর্য দেখি, ওই কষ্টভুলানো পাতায় আমরা মনকেলি খেলি, মোচাদোলানো থোপে চড়িতে চাইজ্জকিন্তু ভোরবৃষ্টি নাইমা আসে, যৌনগন্ধী ফুল ঝরিয়া পড়েজ্জতড়াক-বাতাসে। মোচড়ানো কচিকলাপাতাগুলা কষ্টরাঙা হইয়া ওঠে, সে কষ্টে আমরা দুলদুল রক্ত দেখি, ভয় পাইয়া দিগন্তের দিকে কমলারঙ আঘাতে ডুকরিয়া ওঠে ধুন্দল-পৃথিবী, সৈয়দ আলী স্যারকে মনে পড়ে, তার আদর বুকদোলা হুকুম স্নেহভুলা করিয়া তোলেজ্জআর বিশুদা আসিলেন না, এসব কেন যেন এলোমেলো কইরা দেয়। দীপক দার পরে এসব চলিছেই, রীনাআপা বিকালে খেলাঘরে আসিলে ‘পলাশীর যুদ্ধ’ নাটক করার বায়না ধরে। তিনি লুৎফা হতে চান, মনে মনে আমি সিরাজ বা সিনফ্রে হতে চাই। কে কোন্ পাঠ নেবে তার পরীক্ষা চলে। ভূষণ দা, রশীদ ভাই, ইদ্রিচ মিয়া এক এক পাঠ নিয়া নেয়। আমাদের তখন চলিবে না, বয়স হয় নাইজ্জ‘বড় হলে করিস’জ্জসিরাজ হওয়া হয় নাই আর, সেই হাতির পীঠের লাশ, নৌকায় পালায়ন লুৎফা-সিরাজ, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজ আর হওয়া হয় নাই, সিরাজের সেই পাখাওড়ানো মুকুট আমরা কবেই হারাইয়া ফেলিয়াছিজ্জবিশুদা, দীপকদার মতো হারাইয়া গেছে তারা, আহা! তাহারা আর আসিবে না কোনোদিন। ‘পলাশীর যুদ্ধ’ নবীন সেন থেকে পড়েন বিপিন ডাক্তার, জলদকণ্ঠেজ্জবিহ্বল হইয়া, আলেয়া জ্বলন্ত হইয়া ওঠেজ্জপুরনো কৃষিব্যাংক চত্বরে। সাদারঙের ধূতিতে, লোলচর্মচক্ষে হাঁটাপাঠ দিন বিপিনবাবু। আমরা আঁকি, তাকাইয়া কাঁদি-হাসিজ্জকী সে ওয়াজ! নয়ন ভইরা ওসব দেখিবার কালে রাত নাইমা আসিলে, হাটুয়া হাশেম বলে ‘অটি কীসের পাট রে বা’! প্রতিদিন হলে শ্রোতা হওয়ার আকাক্সক্ষা শোনায়। বিপিনবাবু পাড়ায় সবার বড়। সারাদিন পড়েন আর কবিরাজি ওষুধ দেন, রুগি আসে তামাম এলাকা থিকা, রাত-সন্ধ্যা-সকাল বিরাম নাই, একবার পাশের বাড়ির নিশোর বাপের মরণদশা, বাইরে তখন মুষলবর্ষন, কে কোথায় যায়জ্জকোথাও কেউ নাই, কালোআকাশ ভিজা জখম, মরণাপন্নকে ছেঁড়াছাতা মাথায় তুইলা বাঁচাইতে আসেন বিপিনবাবু। ফ্যাঁসফ্যাঁসাইয়া বলেন, নিশো তর বাপ বাঁইচা যাইবে, বিপিন-অবতার তারে বাঁচাইবে, কান্দিস নারে মা! তবে সে যাত্রায় নিশোর বাবা অলৌকিকভাবে বাঁচিলেও দুমাস পরে হঠাৎ সুস্থশয়ানে নিথর হইয়া যান, তার কারণ যাই হোক, বিপিনবাবু এরপর আর তেমন রুগি দেখেন না, ছাড়িয়া দিন সবকিছু, ওষুধগৃহে বইসা খালি বই পড়েন, মহাভারতের উপাখ্যান আওড়ান, ভীম-অর্জুনের গপ্পো বলেন, বাচ্চাদের শোনান। আর রাতে প’ড়ো শতবর্ষের বটতলায় সলতে জ্বালাইয়া নাটকপাঠ করেন, শ্রোতা অনেক, অনেক মানুষ, রঙবেরঙের মানুষজ্জখেলাঘরেও এসে সিরাজপাঠের কৌশল ধরাইয়া দিন। কবিরাজ বিপিনবাবু ওষুধ ছাড়িলেও পরামর্শ দিন, নিজে প্রাণহত্যা করিতেন না, প্রাণিবধ আর তার মাংস অভক্ষনেয় তার কাছে, তুচ্ছ তার খাওয়া, টাকাপয়সায় স্বচ্ছলজ্জকারো ভয় ডরে নাই, তবে একবার বড় আয়োজন হইলে বিপিনবাবু নিজে ঐতিহাসিক নাটকের পাঠ নেন, ভরা প্রাঙ্গণে ডিরেকশানের দায়িত্ব নেন, অদ্ভুত তার চোখআলো। সাজাহান সেজে হুহুকান্নায় বুক ভাসান, দারার মৃত্যুর সংবাদ তাকে পাগল কইরা দেয়, সত্যিই কি তিনি সাজাহান? অভিনয়বোধে কিছুই আরোপিত মনে হয় না। তবে এ বিপিণবাবুকে কেন যেন ভুইলা যায় সবাইজ্জচিনিয়া ফেলে মোঘলস¤্রাট সাজাহানকে, ‘এ কথা জানিতে তুমি ভারতঈশ্বর সাজাহান’জ্জরশীদ আর হারুন মাস্টর বলে, ‘দাদা সাজাহানোক তোরা চোখে দ্যাখচেন ব্যান’। বিপিনবাবু সেবার সাড়া ফেইলা দিলে প্রচলিত নাম পাল্টাইয়া যায়, বহুকাল তাহা ফেরে লোকমুখে। হাঁটিয়া গেলে সক্কলেই উঁচিয়া বলে, সাজাহান ডাক্তর গেল, ঐটা সাজাহান ডাক্তারের বাড়ি, চলোজ্জসেখানে যাইয়া পাঠ শুইনা আসি। সবাই তখন সেখানে পাঠ শুনিতে যায়, শোনান তিনিজ্জ‘সত্যি সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ! দিনে প্রচণ্ড সূর্য্য এর গাঢ় নীল আকাশ পুড়াইয়া দিয়া যায়; আর রাত্রিকালে শুভ্র চন্দ্রমা এসে তাকে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় স্নান করাইয়া দেয়। তামসি রাত্রে অগণ্য উজ্জ্বল জ্যোতিঃপুঞ্জ যখন এর আকাশ ঝলমল করে, আমি বিস্মিত আতঙ্কে চাইয়া থাকি…’জ্জদাদা কয় কি? শুনিয়া যা, সেকেন্দারকে কয় সেলুকাসরে, সে গ্রীকসেনাজ্জ, ভারতে আইস্যা মুগ্ধ হইচেজ্জইহা এমন দ্যাশ যেই দেখে সেই মুগ্ধ হইয়া বেসামাল হইয়া যায়। বুঝিয়া বলেন, বিপিনবাবুঅদ্য যাহার ডাকনাম সাজাহান।

বিপিন বাবু কীভাবে জনপ্রিয় হন, কতোদিন তাহা বজায় থাকে সে সব একপ্রকার লোকপ্রচার। শতবর্ষের বটগাছ কাটা পড়ে, ম্যাজিস্ট্রেট আসিয়া বিপিন বাবুর পাঠচর্চার বিশাল বটপাড়ার জায়গাটা ‘খাস’ বলিয়া ঘোষণা দেন, ক্রমশ সে স্থানের আলো নিইভা যায়, সলতে জলে না, জলদগম্ভীর আওয়াজ ধ্বনিয়া ওঠে না। টুকটাক টোল বসে ওসব জায়গায়, কী বটগাছ ছিলজ্জএককালের সাক্ষী এটা, কেন ওকে কাট্টা ফেলা হলো বোজা গেল না। বিপিন বাবু সঙ্গহীন হতে হতে শয্যাশায়ী, ক্রমশ নিভিয়া যাওয়া দীপ, ঠিক শেষ সলতে যেন। আমাদের যোগাযোগটাও ক্ষীণ হইয়া যায়জ্জবছরে মাসকেতে পৌঁছায়, সাজাহান-সিকান্দার আলোচনায় আসে, তবে যেন ফুরাইয়া যায় সব। কবিকণ্ঠের বোলে হারানো সুর বাজিয়া চলে :
সে সব দিনের
হাওয়ায়
মন-মানুষের মেয়ে ঘরে আসে,
বাঁশির কথা বলে, কবিতার কথা বলে,
বৃষ্টিভেজা কৃষ্ণচূড়ার কথা বলে।
তারপর একদিন, ছলনাময়ী ছলনা ভুইল্যা যায়জ্জ
বুকে বাধে তালছায়ার বাবুই বাসা, সেই বৃষ্টিঝড় থাইমা যায়
আর তাকানো হয় না,
নোলক পরা মেয়ে তখন হিক্ পাড়্যা কান্দে
কাজরি কাছে আসেজ্জশোনায় গায়ের গামছার গান
কানচুমায়-চুম্বনে স্বননে সব স্তব্ধ হইয়া যায়,
আকাশীগান আর তার শোশানো সন্তান ব্যাবাক বিরান হইয়া যায়।
তবে,
মন-মানুষ কোনো কালেই আর ঘর ছাড়ে নাই,
কোনো কথাই রাখে নাই,
ফেরাতে পারে নাই জীবনে।
আহা… সে মোর সারাকালের সোনার যৈবন।
তবুও বিপিন বাবুর মায়া শেষ হয় না, মুস্তাফা খালুর গত মতো অবসিত সব শকুন্তক্রান্তির কলরোলে। তবে আমরা তার মতো হতে চাই, নিজেরা সিরাজ বা সাজাহান করিতে চাই, কিন্তু তাকে ছাড়া হয় না। দীপকদা বা বিশুদার মতো বিপিন বাবু অক্রিয় হইয়া গেলে মনভোলা প্রকৃতি অসহায় হইয়া শয়ানে পড়ে, কয় ‘তেনারে আর জাগাইও না’জ্জতার কাল শ্যাষ হইয়া গেছে, কেন এসব ‘এরাম’ হয়, জানি না, তবে কলেজ মাঠে কাঞ্চন দা ‘এক পয়সার বাঁশি’ করিতে চান, পুরো পাঠ তার আগেই মুখস্থ, রসিকতার রস কতো গাম্ভীর্যে তা প্রকাশ করে, দাঁড়াইয়া কয়, আজ নাটকের রেহার্সেল হোক কাল হবি যাত্রার, শালাক দুটাই করা হোক, বিপিন বাবু দরকার হলে শুইয়ে থাক্যা দেখবি…। কাঞ্চনদা, শান্তিকাকা, রশীদ মিঞা, আবু বিএসসি, সুবহান ভাই এইসবের যোগানদাতা। নির্দেশনা বলিতে যা বোঝায় বিপিনবাবু তাই। কত্তোকালের সে সব কথা, তখন বিপিনবাবু কাঞ্চনদার মতো জোয়ান, এক্কেবারে সাধু উচ্চারণে বলিলেন, পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ মইরে গেছে, হাসানহোসেন কারবালায় গেছে, আর তর নবীজীর দানদান মোবারক শহীদ হইচেজ্জসক্কলের বিচার এবার নতুন নাটকে হবো, ত্বরা রেডি থাকোস। কইতে কইতে ভোজবাজির মতো বিষাদ-সিন্ধু আওড়ান। রে পামর!!! বইল্যা চিক্কুর দিয়া ওঠেন। দুলদুল কান্দন চোক্ষু ভইরা আসে। এসব কি বলেন বিপিনবাবু! হিন্দুঘরের মানুষ অথচ সবচরিত্র নেছে মোছলমান থাক্যা, মন্দিরে কানকথায় ভুরভুর করে গরম বাতাস, শালা হেন্দুর বাচ্চা কি পরিমাণ বেঈমান, জাতচ্যুত হচে ওই! বিপিনবাবু মন্দিরে পৌঁছান, কানকথার জবাব নাই, দেবীর সাষ্ঠাঙ্গে প্রণতি করেন, ধোঁয়া দেন, দীর্ঘ সময় নিয়া গীতার চরণ বলিতে থাকেন, মা তুই বিশ্বলীলার দহন, প্রভুর মতোন ছাইয়া থাক দিনমান, মানুষরে পৃথিবীর পথ দেখাইচছ্, জীবনের সন্ধান দিচস, কল্যাণে বাঁচাইয়া রাখ সক্কলকে। তোর বোধীজ্ঞান সকলেই য্যান বুঝিতে পারে। এইভাবে প্রাত্যহিক জীবনের আশীর্বাদ নিতে থাকেন বিপিনবাবু। পুরাতন মন্দিরে অপার বিস্ময়ে তাকাইয়া থাকেন, নমিত লিচুগাছটার দিকেজ্জঅনেকক্ষণ, নীলাকাশের দিগন্ত ছাড়াইয়া যায় তার দৃষ্টি, পুরানা রেজিষ্ট্রি আপিসের ওপরে গজানো পাকুড় মাথা পার হইয়া ব্যাকব্রাশ গোলাপী বর্ণচোরা পটে, কাঁদেনও কি? বোঝা যায় না, কী এক অধ্যাত্ম পাইয়া বসে তাকে, ধূতি পরিয়া হাঁটেনজ্জফিরে চলেন করতোয়ার শাখানদীর দিকে কী নাম ও নদীর? করতোয়া-মহানন্দা-পুনর্ভবা, সেথায় তো মা-লক্ষ্মীর বাণিজ্যপথ। জান চিরা বয়া চলে ঝুমঝুম। জলভারানত তার পক্ষপুট। সে সব এখন শীর্ণ-সংকীর্ণ, সেবার যুদ্দের সময় সেটি সাঁতরানো খুব মুশকিল আছিল, কীভরা তখন তার রূপ, ডুবডুব হইয়া চল্যা যান ওইপার সাথে দছিজল-মতি-সুলেমান আর ছোট্ট বিশু। ফেরেন সে সব দিনে, পশ্চাতে তাকান, মন্দিরের দিকে আসিয়া দাঁড়ান, বাবারে কইছিলাম মন্দিরে তোমার কাম নাই ঘরের ভিতরের মনসারে পূজা দাওজ্জসেই তো সব, বাবা মানেন নাইজ্জবিপিনবাবু এর অর্থ খুঁজিয়া পান নাই, ওখানে শুধু মা’ই যেত। আহা! মার সেই প্রসাদ, দিদির বিয়া, জামাইবাবুর আগমন, রাত্রিদিন সানাইসমুদ্রজ্জসে সব কি বিলীন হইয়া গেল! সব মানুষ তো এখন পর হইয়া গিয়াছে। বিপিনবাবু মানেন না কিছু এ বয়সে, এখন তার মগজজুড়িয়া খালি রূপালী চান্নি, গিরিশ-সচীন-দ্বিজেন চরিত্রালাপে মাথা গজগজ। কাঞ্চন দা মুখস্থ বলেন কিছু বানাইয়া বলেন, বিপিনবাবু বলেন বড় নাট্যকারের কথা পাল্টাসনাজ্জওইটা বেইদবাক্য। ত্বর বাপেও পাল্টাতে পারবো না, গুনার চাইয়া বেশি গুনাহ। বিপদে পড়েন কাঞ্চনদা। এক সময় ছাইড়া আসেন, ওই বুড়ার কাছে লাটক হবান্নায়। কিন্তু তা আর কদ্দিন! বিপিন বাবুর পরে কাঞ্চন দাই এখন একালের নেতা, সক্কলে তার কথাই শোনেজ্জহ, এবার যাত্রা হবি, লাটকও হবি, কল্যাণমিত্রের ‘জল্লাদের দরবারে’। আর যাত্রা, মোগলেআজম। ফাটাও বাঙ্গী… হাঃ… হাঃ… হাঃ…। সোল্লাসে প্রস্তাব ওঠে, বই কোন্টে, কালি-ই শহর যামো, সোবহানভাই যামেন, তারপর কলেজের বারান্দাত, হাজাগের তলে, সব রাতে হাজির, বিপিনবাবু না থাকায় এবার এ এলাকায় যাত্রা-নাটকের প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হইল।
কাঞ্চন দা নাটক যাই করার চেষ্টা করুন, কেন যেন আর মঞ্চে উঠিতে পারেন না। বিপিন বাবু খুব বুড়িয়া যান, দিনগুলা পাল্টাইয়া যায় কেমন করিয়া, বিপিন বাবু খুব মুখ উঁচু কইরা হেমন্তের গলায় ‘নব আনন্দে জাগো আজি’ গাইয়া যান। তখন তিনি পাথরউঁচু আটাষ্যড়ি বনের ঝোপে বসা। গুমোট প্রকৃতি আর পাকুড়পাতা কম্পমান তুরতুর বাতাসদুলুনি। বিশ্লিষ্ট হাওয়া তেরচা পেরিয়া যায় পুকুরউঁচা দূর্বাফুল আর দূরের বস্তিমতো পরিবুড়ির খড়ছাওয়া বাড়ির কার্ণিশ ছাড়িয়া দূরে। দারোগাবাড়ির কোণায় তাতে একটুকু ছোঁওয়া লাগে। ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়া ‘নবরবিকিরণে’তে খুব বড় টান দেন বিপিন বাবু। তিনি কি স্বরগ্রাম জানিতেন? তবে ‘নবরবিকিরণে’র লম্বা টানে এতো ভরা সুর সবকিছুকে জাগাইয়া তোলে কি করিয়া। তার মুখে শুনেই এক সময় নিতাই দাকে বলি, ‘দাদা, একটা হেমন্তের ক্যাসেট কিন্যা দ্যান’ নিতাইদা হাসিয়া বুক চাপড়াইয়া বলেন, ওই ক্যাসেট পাওয়া কঠিন। আমরা বায়না ধরিলে নিজেই একদিন হারমোনিয়াম নিয়া ‘নব আনন্দে জাগো আজি’ গাইয়া শোনান, চোখের কোণে তখন পানি জমে, ‘নবরবিকিরণে’ টানা সুরে বহাইয়া দিলে আমরা অপলক হইয়া যাই। বিপিন বাবু বলেন, রবীন্দ্রনাথ এ গানে কি বল্ছে তোরা জানোস? রবীন্দ্রমৃত্যুবছরে, সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল, এক সুরে সোনাদিয়া অডিটরিয়ামের সামনের কমিনী-বারান্দায় সক্কলেই এক সুরে ‘নব আনন্দে জাগো আজি’ গাওয়া শুরু করে। ভোরকেঁপে বর্ষণ নাইমা আসে। হাওয়া উড়িয়া যায় পাখ-পাখালি ছাড়িয়া। পরে ঝুরঝুর বৃষ্টি নামে। তড়িৎরেখায়  বিপিন বাবু ভেজাগলার কাহিনী শোনান। এক সময় কাঁদেন, ‘নব আনন্দে জাগো আজি’র আনন্দে। কেমনকরা সব বিদেহীসুরে গোটা পৃথিবী কাইন্দা ওঠে, মাতম ওঠে, প্রকৃতি ছাইয়া যায়, খালামনির বিদায় দৃশ্য মনে আসে, মুস্তাফা খালুকে মনে পড়ে, আমাদের আমতলার পুকুরপাড়ের আনন্দে ছেঁড়াপাল ওড়ে। বিপিন বাবু সবকিছু ভীরুগলায় তোলেন। কেন যেন তখন সেলিম, হায়দার, মাহবুব ওরা প্রেতাত্মা হইয়া সম্মুখে দাঁড়ায়। মাঠ পার হইয়া দূরের দেশের হাতছানি-ডাক তাড়া করে। ঘাসবিচালী, বৃক্ষ, স্থির আলোছাওয়া গাছ, ফুলহীন কৃষ্ণচূড়া ঘিরিয়া দাঁড়ায় বিপিন বাবুর চারপাশে।

বিপিনবাবু এরপর আর বেশিদিন জীবিত ছিলেন না। ধূতি-পাঞ্জাবী পরিহিত লোলচর্মের নিখুঁত পরিপাটি এ মানুষ পরে নির্বিকার নিস্তেজ হন, অনেক মানুষের চিকিৎসা দিয়া তিনি ডাক্তার উপাধি পাইয়াছেলেন, দেখা যায় তিনি আছেন ভগ্নস্তূপের বিরাট বাড়ির সামনে শতবর্ষী বটগাছের নীচে প্রায় বিচ্ছিন্ন হইয়া। এ রকম নাটকের যাত্রার অনেক মানুষ কালরেখার ¯্রােতে অপসৃত হন, সোবহান ভাই, কাঞ্চন দা হঠাৎ অল্প বয়সেই মরিয়া যান। একইভাবে কেউবা বয়ঃপ্রাপ্ত হন, সন্তানের পিতা বা মাতা হন, জীবন-জীবিকায় থাইমা যান, রাজনীতির ঐসব মানুষসকল আর নাই, সবকিছুর সঙ্গে তাও পরিবর্তিত। জীবনের যাত্রারথে রহিমুল্ল্যা ক্যাশিয়ার, ক্যারোকামার, মুস্তাফা খালু কবেই নাই হইয়া গিয়াছেন। মহিরের ভিটায় এখন কেউ নাইজ্জকে যেন জবরদখলি নিয়া তাহাতে আবাদ করিয়া খায়, জ্যোতিন দার পরিবার কোথায় কেউ জানে না; চৌধুরী বাড়িতে এখন কেউ নাই, আছে শুধু গারোয়া আর সারি সারি কবর, সব বিল্ডিং ধ্বসিয়া গিয়াছে, ধানের গোলায় কিচ্ছু নাই, সবাই ‘যার যার তার তার’ হইয়া শহুরে হইয়াছেন। গ্রামের মোকছেদ বা অন্যান্যদের কবরের কোনো চিহ্ন নাই, পাশেই এখন শরীকরা ঘর তুলিয়াছে, সেই নদী-পুকুর-পুল ঠনঠনে সমান ইউ.পি. বোর্ডের রাস্তায় পরিণত, মিশু বহুকাল আগে হোটেল ছাড়িয়া বিদেশ গিয়াছিল, কাজী হালিমসহ তাবৎ রাজনৈতিক নেতাদের নাম সক্কলেই ভুলিয়া গিয়াছে, তাহাদের স্মৃতিও বাসি হইয়া গিয়াছে বহুকাল আগে। এরূপে পৃথিবীর সব তাপ বদলাইয়া গেলেজ্জঅনিঃশেষ ইত্যাকার চরিত্রের ভিতরে কালমুদ্রিত যে বিন্দুবিসর্গ মেলে তা কোনো জ্ঞান বা লেখাপড়া নয়। এক্কেবারে মুদ্রিত জীবনরূপের বাসনা ছানিয়া মুগ্ধ ও অপাপবিদ্ধ প্রণয়ের নির্ভুল বাণীবিন্যাস। এতে কি কেউ থমকাইয়া যায়? কেউ কি ফিইরা পায় কিছু? বা পাইলেও তার স্বাদ-গন্ধ কি আগের মতোন থাকেজ্জজীবনের এই তো ট্র্যাজেডি, ইহাই তো পূর্ণ পাঠ, তবে কেন মানুষ ভুইলা যায়! নাকি সে ভুলও তাহার অনিবার্য নিয়তিজ্জআর তার কথাই কী বলে সবার ভেতরে গড়ে ওঠা ওই রূপকথার নায়কেরা!