রবিবারের আড্ডা

চিহ্ন 
রবিবারের আড্ডা

Untitled-1

 

 

বিষয়***************লেখক/পরিচালক**************তারিখ

তৈল******হরপ্রসাদ শাস্ত্রী******৩০ জুলাই ২০১৭
সাম্য******বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়******৬ আগস্ট ২০১৭
বিশ্বপরিচয়******রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর******১৩ আগস্ট ২০১৭
যে আঁধার আলোর অধিক******বুদ্ধদেব বসু******২০ আগস্ট২০১৭
মাল্যবান******জীবনানন্দ দাশ******১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭
মাটির ময়না******তারেক মাসুদ******১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭
নির্বাচিত কবিতা******সমর সেন******২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
শকুন্তলা******ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর******১ অক্টোবর ২০১৭
ফিরে এসো চাকা******বিনয় মজুমদার******৮ অক্টোবর ২০১৭
অন্তর্জলী যাত্রা******গৌতম ঘোষ******১৫ অক্টোবর
অব্যক্ত******জগদীশ চন্দ্র বসু******২২ অক্টোবর ২০১৭
পুরী সিরিজ******উৎপল কুমার বসু******২৯ অক্টোবর ২০১৭
রাশিয়ার চিঠি******রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর******৫ নভেম্বর ২০১৭
ধর্মে আছো, জিরাফেও আছো******শক্তি চট্টোপাধ্যায়******১২ নভেম্বর ২০১৭
সুখ না দুঃখ******রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী******১৯ নভেম্বর ২০১৭
বাংলার রেনেসাঁস******অন্নদাশঙ্কর রায়******২৬ নভেম্বর ২০১৭

চিহ্ন আড্ডা : কিছু স্মৃতির পাশফেরা

জীবনের মঙ্গলময়তায় যখন ব্যক্তি পেরিয়ে অনেক দূর দূরগামী হয়, মগজের কারফিউ, বোধ, বুদ্ধি, মননশীলাতা, সৃজনের মাত্রা অনন্যচূড়ায় স্পর্শ করে,বহুরৈখিক হয়,বহুঅর্থময়তার নন্দন ভূমি/কানন তৈরি করে ভেদ অভেদের উর্ধ্বে উঠে তৈরি করে মানব প্রাচীর;যেখানে জাত পাত, সাম্প্রদায়িকতা,ধর্মীয় অন্ধগোড়ামীর শিকল ছিঁড়ে গায় গান মানবতার। সে মানবতা হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন, বিশ্বভ্রাতৃত্বের আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর এপ্রান্ত ওপ্রান্ত। যদিও কিছু কুপমু-কসত্তা অন্ধ বিবরবাসী  আলোতে,নুরে, মানবতায় অন্ধকারের ছাপ ফেলে বিরুদ্ধচারিতার আশ্রয় নেয় তবু মানবতা ও আলো এমন এক বোধের গভীরে নাড়া দেয়, তা সেখানে হয়ে উঠে বিশ্বঅসীম। এমনই এক বোধ বুদ্ধির, সৃজনের, অনুভূতির জগত ও পাঠশালাকে মননে মগজে সৃজনে ধারণ করে কতিপয় যুবক (শামীম নওরোজ, শফিক আশরাফ,ফারুক আখন্দ,নিত্য ঘোষ, রহমান রাজু ও তুহিন ওয়াদুদ) সময়ের বিরুদ্ধ স্রোতে উজানের টানে অথবা সেই সব শেয়ালেরা যারা ঠোঁট চেপে কিছুই হচ্ছে না বলে রব তোলে তাদেরকে চিহ্ন  থেকে দূরে থাকতে বলা হচ্ছে। কিন্তু দূরে থাকতে বলা হলেও লেখক, পাঠক, সম্পাদক ও গুনিজনগণ চিহ্নর উদ্ভাবনীতে ও সৃজনশীলতায় “এসো লেখায় লেখায় ভাঙি মগজের  কারফিউ” কারফিউ ভেঙে তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাঙলায়।

২. চিহ্নের প্রাণ রবিবারের চিহ্নের আড্ডা। এতেই জমে যায় নবীন তরুণ কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকারগণ। এ প্রাণবন্ত আড্ডাকে ঘিরে জমে উঠেছে চিহ্ন, চিহ্নের পরিবার। আড্ডার প্রধান আকর্ষক শহীদ ইকবাল।  তাঁর নেতৃত্বের গুণে চিহ্ন হয়ে উঠে সারা বাংলায় ও বিশ্ববাঙলার আলোচিত কেন্দ্র। চিহ্ন ছুটছে তার অশ্বরথে। তার সারথীগণ কম নন। তারা এ বয়সে যে বুৃদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছিল,তা বিষ্ময় কর বটে আর সেটিই হয়েছে সৃজনশীল বিকাশের প্রাণবিন্দু। যারা আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে চিহ্নকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সময়ের হাতে- তুহিন ওয়াদুদ,রহমান রাজু ,কুমার দীপ, ত্রিস্তান আনন্দ,শফিক আশরাফ,সজল সমুদ্র শামীম নওরোজ ,মাওলা প্রিন্স, অনুজ আদিত্য আহমেদ ইউসুফ, বিপন্ন বাউলা (লিটন  মোস্তাফিজ) মাহফুজ রাশেদ,আবুল ফজল,সদ্য সমুজ্জল, গৌতম দত্ত,মিন্টু দে,অনিন্দ্য প্রভাত,খালেক মিঠু, সৈকত আরেফিন,আক্তার বাবুল ও পিয়াল প্রত্যয় উল্লেখযোগ্য। এখন যারা চিহ্নের স্বপ্নকে আরো গতিশীল ও প্রাণময়তার দুয়ারে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দীপ্ত উদাস, রফিক সানি,হাসিব রনি,আহমেদ নীলেরা…

৩. তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। কবিতার স্বপ্নে জীবন স্বপ্নময় ও উন্মাতাল। যেখানে যে বোধের বিকাশ ঘটছে,সেখানে ছুটছি প্রচ- গতিতে। কবিতা হচ্ছে কি হচ্ছে না সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। কোথাও কোথাও লিটল ম্যাগ,ম্যাগাজিন,মাসিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় এবং দৈনিক পত্রিকায় কবিতা ছাপা হচ্ছে। তার মানে অধরা স্বপ্নকে ধরতে পারছি। আর এ স্বপ্নযাত্রার লীলা সংকেত শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। কাঁচা কাঁচা হাতে লিখছি কি সব হিজিবিজি। হয়ত কিছু হচ্ছে অথবা হচ্ছে না। এভাবে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আজকের এই অবস্থানে। তো কাহ্নুপা’য় যাচ্ছি ধ্রবতে যাচ্ছি। মাঝে মধ্যে সাংকৃতিক জোটে যাচ্ছি,যাচ্ছি কখনো ফজলুল হক তুহিন ভাইদের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে । কখনো কখনো বন্ধুরা মিলে পত্রিকা করছি। হ্যাঁ , “সিম্ফনী নামে পত্রিকা করছি সেখানে আমি ও আমিরুল মোমিনীন মানিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। বাংলা বিভাগের বন্ধুদের প্রশংসা করতেই হচ্ছে তারা সকলে আমাদের এই গুরু দায়িত্ব দিয়েছিল। তারপর অনীক মাহমুদ,অমৃতলাল বালা সারদের বোধ,বুদ্ধি প্রেরণা অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে কবিতা গল্প রচনার ক্ষেত্রে। লিখছি কবিতা তুমুল বেগে। প্রচ- সময় যাচ্ছে সাহিত্যর অলিতে গলিতে। পাগলা গারদ” নামে একটি কাব্য গ্রন্থ করবো বলে ভোরের শিশির নামক প্রকাশনীতে যোগাযোগ করে ফেলেছি। কবিতা গ্রন্থ বের হবে এই গভীর উত্তেজনা বুকের স্বপ্নে। সেকি উচ্ছ্বল স্বপ্নময়তা। ঘুম আসছেনা উত্তেজনার পুলকে। তো সেই জন্য একাডেমিক পড়াশুনাতে ডন কেয়ার ভাব। একাডেমিক পড়াশুনাকে মনে হত কি সব ছাই পাশ পড়ছি কিন্তু শহীদ ইকবাল স্যার একাডেমিক বিষয়ে খুব কঠোর ও যতœশীল। নাছোড়বান্দাও বলা যায়। ক্লাশ পরীক্ষায় একাধিক বার ফেল। ডাকা হল ১৩০ নম্বর রুমে। স্যার আসতে পারি? স্বভাবগত জিজ্ঞাসা কে? এসো। আমি ও সাংবাদিক সেলিম সতর্ক পায়ে ঢুকি। তিনি বকছেন। পাঠের প্রতি মনোনিবেশ করতে বলছেন একাডেমিক হতে বলছেন। আমরাও নিষ্ঠার সাথে জি স্যার, জি স্যার করছি। এরই কোন ফাঁকে সাংবাদিক বন্ধু বলে উঠলো। স্যার জানেন আমার এ বন্ধু কবিতা লেখে, এবছর তাঁর কবিতার বই বের হবে। আশ্চর্যনিত বোধ কী ! বই বের হবে কবিতা হচ্ছে!! দেখি দিয়ে যেয়ো ১০টি কবিতা। তার পর চিহ্নর সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে পড়া। পূবেই বলেছি, চিহ্নের প্রাণ ছিল রবিবারের আড্ডা।  শহীদ ইকবাল স্যার প্রতি রবিবারে সাহিত্যর চিত্রচরিত্র আত্মস্ত করবার জন্য একএকদিন এক একটি বিষয় বলে দিতেন। আজ হয়ত মানিক,কাল হয়ত ইলিয়াস। এমনি করেই বিশ্বসাহিত্যর আদ্যপ্রান্ত যুক্তি তর্কের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠত সাহিত্যর বাস্তবতায়। এভাবেই চিহ্নর রবিবারে আড্ডায় বঙ্কিম, শরৎ,রবি,নজরুল,মানিক,বিভূতি, শহিদুল্লাহ কায়সার,শওকত ওসমান,মাইকেল মধুসসূদন দত্ত,বিহারী লাল, তারাশঙ্কর, সুনীল,সমরেশ,শীর্ষেন্দু ,বিনয়,শ্যামল,সুবোধ ঘোষ,অমিয়ভূষণ,সতীনাথ,হাসান আজিজুল হক,শহীদুল জহির,জহির রায়হান,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শামসুর রাহমান,আল মাহমুদ,সৈয়দ শামসুল হক এমন কি জন প্রিয়তার সাহিত্যর নিরিখে হুমায়ূন আহমেদও বাদ থাকে না। বিভিন্ন ইজম  তত্ত্বের উপর ভিক্তি করে আমরা জেনে যায় আধুনিকতা,উত্তরাধুনিকতা,দাদাইজম,পরাবাস্তবতা,সমাজতন্ত্র,যাদুবাস্তবতা,রিয়েলিটি,কালর্ মাকর্স,লেনিন, হেগেল,নিৎশে,এমানুয়েলকান্ট,দান্তে,হোমার,সফোক্লিস,ভার্জিল,প্লেটোর রিপাবলিক,ডায়ালগ,এরিস্টোটলের কাব্যতত্ত্ব,হোরেসর কাব্যতত্ত্ব, শেক্সপিয়ার,রাসেল,ওয়ার্ডসোর্ড, শেলী,কীটস,এলেনগীনসবার্গ,মার্কেজ,আর্নেস্ট হোমিংয়ের জাদু বাস্তবতা,বোদলেয়ার,লুইআরগ,ইমপ্রেশনিস্ট কত যে সাহিত্য ও তত্ত্ব জ্ঞানের সমুদ্রে প্রবেশ করি। আমরা মাতাল হওয়ার মতো করে এই সমস্ত বই লেখক তত্ত্বকে বোধের মননে ধারন করে পরিশীলিত হয়েছি বা হওয়ার চেষ্টা করেছি আর সেইজন্য আমাদের কাছ থেকে বাদ যেত না সমসাময়িক সাহিত্য ও লিটল ম্যাক। আমরা তুমুল তর্কে জড়িয়ে পড়তাম শালুক,লোক,অমিত্রাক্ষর, রুদ্র,কাহ্নুপা,নিসর্গ,পরিচয়,দোঁআশ,সমুজ্জ¦ল সুবাতাস,কন্ঠস্বর,গা-ীব,চার্বাক,আগুন মুখো,ঘুড়ি,দাগ,কালি ও কলম,একবিংশ ও ধ্রব প্রভৃতি লিটল ম্যাগের বিভিন্ন রচনা গুণ ও সাহিত্য গুণ নিয়ে। এভাবে আমরা যখন পরস্পর পরস্পরে তর্কে জড়িয়ে পড়তাম শহীদ ইকবাল স্যার তখন তাঁর নিজস্ব বোধ ও জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে পর্যবেক্ষন করে সাহিত্যর মূল্যে বোধ ও শিল্প গুণের উপর দিতেন। আর বলতেন- হয় তোমরা ফেল করছো অথবা তোমরা সাহিত্যর মানে উন্নীত হতে পারো নি একজন লেখক বা কবি এভাবে ফেল করে না যতটা না তোমরা তাদের উপলব্ধি করতে পারছো। এটা তোদের বুঝতে হবে। পরবর্তীতে আমরা জ্ঞান ও সাহিত্যর চিত্র ও চরিত্র অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে চাইতাম সুদূর অভিসারী লক্ষ্যের দেশে। কেউ পেরেছে কেউ পারেনি। তবে সবসময় আমাদের মধ্যে শিল্পবোধ ও সাহিত্যবোধ তাড়া করছে। জানিনা আমরা কখনও সেই স্বপ্নময়তার শিল্পচূঁড়ায় পৌঁছতে পারবো কি না।

৪. চার পাঁচ বছর যাবৎ চিহ্নের রবিবারের আড্ডায় যাই না। কর্মে ব্যস্ততার কারণে যাওয়ার সুযোগও থাকে না। কিন্তু রবিবারের আড্ডা ভাবায়, ভাবাতে থাকে। মাঝে মধ্যে পোড়ায়। অনুভূতির ভূবনে কড়া নাড়ে। কেউ কেউ যখন ফোন করে চেতনা ও মননের মধ্যে গভীরভাবে উপলদ্ধি করি। আহ,কী হারিয়ে এসেছি!   চিহ্ন আর ১৩০ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর সীমানার দেয়াল বাংলা পেরিয়ে বিশ্ববাংলায় পৌঁছে গেছে।এখন বিভাস জানে,ইমানুল হক জানে, ত্রিপুরা জানে,ওপার বাংলা জানে ইউরোপ জানে, আমেরিকা জানে,এমন কি মধ্য প্রাচ্যও জানে। চিহ্ন এতদুর পৌছে গেছে যে, চিহ্ন তার স্মৃতিচিহ্ন,পদচিহ্ন,হাজার বছর রেখে যাবে। আমরা ক্ষুদ্র কর্মী ছিলাম। কোনদিন দায়ভার অথবা সম্পাদকের পাতায় নাম আসে নি তবুও চিহ্ন আমাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিহ্নের পদছছাপ রেখে গেছে। স্মৃতিকাতরতা ভোগাচ্ছে। সময় পেরিয়ে কুয়াশা আসবে, কুয়াশায় আসবে তীব্র শীত। তবুও আমরা চিহ্ন কর্মী বা গোষ্ঠি বদ্ধতার কূটচালে ছিলাম না। না আমরা প্রাতিষ্ঠানিক না আমরা অবিশ্বাসী না আমরা অশ্লীল না আমরা শীল। আমরা সময়ের ভাঁজে শিল্প সাহিত্যর একনিষ্ঠ কর্মী ও সাহিত্যর সমঝদার । জয়তু চিহ্ন হাজার বছর বাঁচো মানুষের প্রাণে অন্তরে মননে ও সৃজনে….
আহমেদ ইউসুফ

 

রবিবারের আড্ডা : চকিত অবলোকন

‘আড্ডা’ কথাটা বললেই আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের আনন্দের উদয় হয়। আমাদের  চৈতন্যে চিত্রায়িত হয় বিচিত্র চিত্র। যেমন ধরুন-একদল বন্ধু-বান্ধব বাদাম খেতে খেতে মজা করছে, কৃষকেরা কাজের ফাঁকে গাছের ছায়ায় বিড়ি জ্বালিয়ে হাস্যচ্ছলে কিছু বলে শ্রমের ক্লান্তি দূর করছে, নানা-নানি তাদের নাতি-নাতনীর সাথে নিরবে-নিভৃতে নানান গল্পস্বল্প করছে। অর্থাৎ আড্ডার সাথে মজা, হাসি-ঠাট্টা, গল্প ইত্যাদি ওতোপ্রোতভাবে জড়িতো। আবার একার সাথে একা একাও আড্ডা দেওয়া যায়। একলা মানুষ একলা মনে তার স্মৃতিরসাথে আড্ডা দেয়। মাঝে মাঝে কিছু কথাও শব্দের সাথে বলে ফেলে। আমরা যেটাকে বলি ভুল বকা। অর্থাৎ পাগলামী। এ পাগলামী আসলে আড্ডা নয়, স্মৃতিচারণ। তাহলে আড্ডা কি ? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে পারি, দুই বা দুয়ের অধিক মানুষ দলবদ্ধ হয়ে যখন কোনো নির্দিষ্ট অথবা অনির্দিষ্ট বিষয়ে হাসি-ঠাট্টা বা মজার ছলে গল্প করে তখন সেটা ‘আড্ডা’। এটা গেলো এ ধরনের আড্ডার কথা। এ আড্ডার বাইরেও রয়েছে আরেক ধরনের আড্ডা। যাকে বলে প্রকৃত আড্ডা। জ্ঞানের বা ‘সৃজনশীল’ আড্ডা । প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিস- প্লেটোরা আড্ডা দিতেন, ইয়ংবেঙ্গল-এ ডিরোজিওকে কেন্দ্র করে আড্ডা চলতো, শিখাগোষ্ঠীতে আড্ডা হতো; আবার শনিবারের চিঠির সজনীকান্তরাও আড্ডা দিতেন। এঁরা সবাই ‘সাহিত্যের আড্ডা’ করেছেন। আমাদের চিহ্নতেও আড্ডা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলা ভবনে ১৩০ নম্বর কক্ষে । এখানে প্রত্যেক রবিবারে বিকাল ঠিক পাঁচটায় শুরু হয় আড্ডা। এখানকার আড্ডারুরা বয়সে তরুণ। এরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী। এদের মনে নানান চিন্তা। দেশ, ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্য সম্বন্ধে গতানুগতিক চিন্তাধারা বাদ দিয়ে একটু নতুন করে চিন্তা করেন এরা। এরা মুক্ত আড্ডা দেয়। এ আড্ডাকে নদীর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ, নদীর কোনো দুঃখ নেই, শোক নেই, কেবল আনন্দে আত্মহারা হয়ে উদ্দামবেগে ছুটে চলায় তার কাজ। মর্ত্যরে নানা সৃষ্টি-ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে চলায় তার আনন্দ। তার কারণে কোনো আবর্জনা, বদ্ধস্তূপ ও জঞ্জাল চিরতরে জড়ো হতে পারে না। তার জন্যেই ধ্বংসের  পর নবজীবন পত্তন হয়। অর্থাৎ সে ‘আবহমান ধ্বংস ও নির্মাণ’র মধ্যে দিয়েই মুক্তমনে ছুটে চলে উত্তাল সাগরে মেলার আশায়। চিহ্নআড্ডারুরা ঠিক তাই। তারা চায় ভাঙতে ও গড়তে এবং সম্মুখে চলতে মুক্ত মনে। পরীক্ষা ও বিচারের দৃষ্টি দিয়ে দেখার  প্রেরণাই এদের একমাত্র লক্ষ্য।

প্রত্যেক রবিবারে চিহ্নকে ঘিরে আড্ডা হয়। কখনোবা বিষয়ভিত্তিক আবার কখনোবা বিষয় ছাড়াই। কখনো কখনো এক বাক্যের বিষয় দিয়েই আড্ডা শুরু হয়। আড্ডার বিষয় পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে অথবা তাৎক্ষণিকভাবেই যে কোনো একটা বিষয় দিয়েই আড্ডা শুরু হয়। আড্ডারুরা নিজ নিজ মত পোষণ করে নির্ভয়ে। একে অপরের মতামতের পক্ষে-বিপক্ষে শুরু করে তুমুল তর্ক। আবহাওয়া হয়ে ওঠে চরম গরম। চক্কর দিয়ে চারদিক থেকে তুমুল ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। অবশেষে ঠাণ্ডা হাওয়ার সাথে হালকা বৃষ্টিবর্ষণে পুরো পরিবেশটাই শান্ত করেন আড্ডাপ্রধান শহীদ ইকবাল। সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে তাঁর কথা। যার যা জিজ্ঞাসা থাকে তিনি তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করেন। এ পর্যায়েও শুরু হয় আরেকটা আড্ডা। যুক্তি-তর্ক-তত্ত্ব-তথ্যের আড্ডা। কথার পিঠে কথা। তর্কের পিঠে তর্ক। আবহাওয়া আবার গরম হবো হবো অবস্থা। হঠাৎ শীতল পরশ। সেই ঠাণ্ডা হাওয়া। সকলেই চুপচাপ। আড্ডার মোড় নেয় একটু অন্যদিকে। হয়তো আড্ডার মাঝেই আড্ডাপ্রধান বললেন, ‘তোরা রবীন্দ্রনাথকে আজকাল কীভাবে উপলব্ধি করিস?’ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকি আমরা। হাত হাতড়ায় চারদিকে। হয়তো আমরা বলি, ‘রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে প্রতিদিনের সূর্যের মতো।’ আবার কেউবা বলি, ‘রবীন্দ্রনাথ একটা অনির্বাণ আগুন। যে আগুন থেকে একটু একটু করে অনেক আগুন জ্বালানো এবং অন্ধকার দূর করা’। আসলে রবীন্দ্রনাথই তো আড্ডার বিষয় হওয়া উচিৎ। তাকে বাদ দিয়ে কি আড্ডা চলে! শুধু রবীন্দ্রনাথ কেনো? আজকের এই সময়ে যারা কলমসৈনিক, তারাও হয়ে ওঠে আমাদের আড্ডার বিষয়। সময়ের আড্ডা হয়তো শেষ হয় এক সময়। কিন্তু সমাধা কি হয়! মনে হয় না। কারণ, জগতে যতো জিজ্ঞাসা আছে তার শেষ সমাধা বলে কিছুই নেই। আমরা সমাধার শেষ দেওয়ার চেষ্টা করি মাত্র। কিন্তু শেষ হয়েও হয়না শেষ… 
বিরহান্ত কৃষ্ণ

প্রতি রবিবার চিহ্নদপ্তরে বিকেল পাঁচটা ছুঁইছুঁই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাহিত্যপ্রেমী অনেকেই ছুটে আসে। এক সপ্তাহ আগেই জানিয়ে দেয়া হয় সামনের আড্ডার আলোচ্য বিষয়। বহুরৈখিক ভাবনায় বিষয়টি পোস্টমর্টেম হয়। যুক্তি-তর্কযুদ্ধে বিষয়টি সম্পর্কে সবার স্বচ্ছ ধারণা জন্মালে চিহ্নপ্রধান সমাপ্তি টানেন প্রকৃত রূপ-রীতির বর্ণনায়। পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর ওঠে। নির্ধারণ হয় আগামী আড্ডার বিষয়। ষোল বছর চিহ্ন বেঁচে আছে এ-ধারাবাহিক আড্ডায়।

চিহ্নআড্ডায় আসতে পারে  যে কেউ, যে কোনোদিন।