শহীদ ইকবাল

চিহ্নপ্রধান
############
অধ্যাপক ।। বাংলা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী ৬২০৫
বাংলাদেশ

প্রফেসর শহীদ ইকবাল

ই মেইল : shiqbal70@gmail.com,, ফোন : ০৭২১-৭১১৮৯০

 

নাম : শহীদ ইকবাল [Shahid Iqbal]
মাতা : মোকছেদা বেগম

পিতা : আবু তৈয়ব
স্থায়ী ঠিকানা : রোড # ০১, বাসা # ০১, মৌজা + গ্রাম : পীরগঞ্জ,
ডাক +থানা ও পৌরসভা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর

বর্তমান ঠিকানা : ‘যোজকবাড়ি’,  ফ্ল্যাট ২বি-২, ধরমপুর, কাজলা, রাজশাহী

লেখাপড়া
এস.এসসি : পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৮৬, প্রথম বিভাগ, বিজ্ঞান শাখা
এইচ.এসসি : শাহ আব্দুর রউফ কলেজ, ১৯৮৮, দ্বিতীয় বিভাগ, বিজ্ঞান শাখা
বি. এ. (সম্মান) বাংলা : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯২, (অনুষ্ঠিত ১৯৯৫) উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম
এম. এ. বাংলা : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৩, (অনুষ্ঠিত ১৯৯৭) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম
পিএইচ. ডি. : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০২ [বিষয় শিরোনাম : বাংলাদেশের উপন্যাসে রাজনৈতিক চেতনা (১৯৪৭-১৯৯৫)]
গবেষণার তত্ত্বাবধান করেছেন : প্রফেসর জুলফিকার মতিন, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

কর্মজীবন
১৯৯৮ সালের ০১লা এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে যোগদান, পদোন্নতি পেয়ে ২০১০ সালের ১৯ জুলাই থেকে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত।

২০০০ সাল থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগ চিহ্ন-র সম্পাদক। এ পর্যন্ত পত্রিকাটির ৩১টি সংখ্যা বেরিয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে পরিকল্পনাভিত্তিক পরবর্তী সংখ্যা সম্পাদনার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

প্রকাশিত গ্রন্থ 
প্রবন্ধ-গবেষণা ও সাহিত্যের ইতিহাসধর্মী গ্রন্থ

১. কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৯৯) [এম. এ. ডিসার্টেশন], প্রকাশক : জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন ॥ ঢাকা
২. কালান্তরের উক্তি ও উপলব্ধি (২০০৩) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : চিহ্ন ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 
৩. রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস (২০০৩) [পিএইচ. ডি. গবেষণা], প্রকাশক : জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন ॥ ঢাকা
৪. সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র (২০০৭) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : ইমন প্রকাশন ॥ ঢাকা
৫. মুখশ্রীর পটে (২০০৮) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : চিহ্ন ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৬. বাংলাদেশের কবিতার সংকেত ও ধারা (২০০৮) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : চিহ্ন ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৭. বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস (২০০৮) [ইতিহাসধর্মী], প্রকাশক : আলেয়া বুক ডিপো, ঢাকা
৮. রবীন্দ্রনাথ : ভারতচন্দ্র ও বিহারীলাল (২০১১) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : মুর্ধাহ্ন, ঢাকা
৯. বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস (২০১৩) [গবেষণা], প্রকাশক : রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা
১০. কবিতা : মনন ও মনীষা (২০১৩) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : রাঁচী গ্রন্থনিকেতন, ঢাকা
১১. কথাশিল্প : ঈষৎ বীক্ষণ (২০১৪) [প্রবন্ধ], প্রকাশক : অক্ষর প্রকাশনী, ঢাকা
১২. বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাস (২০১৫) [ইতিহাসধর্মী], প্রকাশক : গ্রাফোসম্যান পাবলিকেশন্স, ঢাকা
১৩. বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত (২০১৬) [ইতিহাসধর্মী], প্রকাশক : কথাপ্রকাশ, ঢাকা
১৪. উজান স্বপ্নের স্রোতে (২০১৬) [গদ্যরচনা], প্রকাশক : বটেশ্বর বর্মন, ঢাকা

উপন্যাস
১. হয়নাকো দেখা (২০১৫), প্রকাশক : অনুপ্রাণন প্রকাশন, ঢাকা
২. নশ্বর নিয়তির মুদ্রা (২০১৬), প্রকাশক : চিহ্ন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আত্মদর্শনমূলক রচনা
বিশ শতকের রূপকথার নায়কেরা (২০১২), প্রকাশক : চিহ্ন ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদনা
নয়নে তোমার বিশ্বছবি (২০১১) [শহীদ হবিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ]
প্রকাশক : শহীদ হবিবুর রহমান হল ॥ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

গ্রন্থকারের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সূচি, ভূমিকা (প্রসঙ্গ-কথা) ও প্রারম্ভিক অংশের নমুনা

#################################################
বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস (১৯৪৭-২০০০)
প্রকাশক : রোদেলা প্রকাশনী, ২০১৩, ঢাকা

গ্রন্থসূচি
প্রথম অধ্যায় (১৯৪৭-১৯৭০)
প্রথম পরিচ্ছেদ : সুপ্রভাত সুনিশ্চয়
১ উপক্রম; ২ নতুন কবিতা ও একুশে ফেব্রুয়ারী; ৩ সম্ভাবিত প্রাণভোমরা

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পাকিস্তানের একধ্বনিতে গোলাম মোস্তফা, তালিম হোসেন, রওশন্ ইজদানী, মুফাখ্খারুল ইসলাম ও  অন্যান্য কবি

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : সচিত্র-বিচিত্র
১. শাহাদাৎ হোসেন  ২. সুফিয়া কামাল  ৩. আবদুল কাদির  ৪.অপরাপর

চতুর্থ পরিচ্ছেদ : ফররুখ আহমদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ : নববসন্ত
১. আবুল হোসেন ২. সৈয়দ আলী আহসান ৩. আহসান হাবীব

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : পরিশুদ্ধ প্রত্যাবর্তন
১. উপক্রম ২. সানাউল হক  ৩. হাবীবুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুর রশীদ খান, মোহাম্মদ মামুন, মুয্হারুল ইস্লাম ৪. মাহবুব উল আলম চৌধুরী, বেলাল মোহাম্মদ ৫. সৈয়দ শামসুল হক ৬. মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবদুস্ সাত্তার

সপ্তম পরিচ্ছেদ : বিশীর্ণ নাগরিক নক্ষত্র
১. আবদুল গনি হাজারী ২. শহীদ কাদরী ৩. সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্

অষ্টম পরিচ্ছেদ : শামসুর রাহমান

নবম পরিচ্ছেদ : নষ্টস্বপ্নের বিষাদগাথা
১. উপক্রম ২. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ফজল শাহাবুদ্দিন, বেলাল চৌধুরী, শামসুল ইসলাম  ৩. আজীজুল হক  ৪. আলাউদ্দিন আল আজাদ  ৫. মোহাম্মদ রফিক  ৬. মহাদেব সাহা  ৭. আবুল হাসান ৮. হুমায়ুন কবির ৯. ফরহাদ মজহার

দশম পরিচ্ছেদ : উৎসের টানে
১. আল মাহমুদ  ২. ওমর আলী  ৩. মুহম্মদ নূরুল হুদা  ৪. আসাদ চৌধুরী

একাদশ পরিচ্ছেদ : মানুষের মানচিত্র
১. সিকান্দার আবু জাফর ২. আতাউর রহমান ৩. হাসান হাফিজুর রহমান ৪. আবুবকর সিদ্দিক ৫. নির্মলেন্দু গুণ

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ : প্রতীকী সীবন
১. আবদুল মান্নান সৈয়দ ২. রফিক আজাদ ৩. সিকদার আমিনুল হক ৪. হুমায়ুন আজাদ

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ : এ পর্যায়ের অন্যান্য কবি

দ্বিতীয় অধ্যায় (১৯৭১-২০০০
প্রথম পরিচ্ছেদ : যুদ্ধ-প্রজন্মের কবিতা
১. উপক্রম; ২. সমুদ্র গুপ্ত ৩. আবিদ আনোয়ার ৪. সৈয়দ হায়দার ৫. দাউদ হায়দার ৬. আবিদ আজাদ ৭. ত্রিদিব দস্তিদার ৮. শিহাব সরকার  ৯. রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১০. মোহন রায়হান ১১. নাসিমা সুলতানা, ময়ুখ চৌধুরী, আবু হাসান শাহরিয়ার ও অন্যান্য

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : আশি-উত্তর কবিতার নির্মাণচিন্তা ও প্রতিষ্ঠিত সঞ্চয়

#################################################

বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত
প্রকাশক : কথাপ্রকাশ, ২০১৬, ঢাকা

গ্রন্থসূচি ও ভূমিকা

ভূমিকা
প্রথম অধ্যায়
কবিতা
দ্বিতীয় অধ্যায়
উপন্যাস
তৃতীয় অধ্যায়
ছোটগল্প
চতুর্থ অধ্যায়
নাটক
পঞ্চম অধ্যায়
প্রবন্ধ
ষষ্ঠ অধ্যায়
অনুবাদ
সপ্তম অধ্যায়
শিশুসাহিত্য
অষ্টম অধ্যায়
স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী ও ভ্রমণ সাহিত্য
পরিশিষ্ট
নির্ঘণ্ট

ভূমিকা
১৯৪৭ সালে বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের সাহিত্যের বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো সাহিত্য শুরু হয় না। তবে সময়খ-ই মূল কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জকার্যত দ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। সেটি চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় ¯স্নাত এবং ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশ। বস্তুত, ত্রিশোত্তর বাংলা সাহিত্যের অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারা। বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচর্চায় এ ধারাটির পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান মসৃন নয়। কবিতার সার্বভৌম শক্তি, কথাসাহিত্যের সংস্কারমুক্ত চিন্তা, নাটকের নিরীক্ষা ও পরিচর্যা সাহিত্যিকের কল্পনা ও প্রেরণার প্রতিশ্রুতি অর্জন করে। কিন্তু তা মোটেই সহজ ছিল না। বিভাগোত্তর সময়ে কবিতা-কথাসাহিত্য-নাটক-প্রবন্ধে বাঙালি মুসলমানদের ভাষা-সংস্কৃতিচর্চায় দ্বিধা ও আড়ষ্টতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতাও অনুল্লেখ্য নয়। এ পর্যায়ে ১৯৫২ সালে রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের পর ভাষার অধিকার, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার অধিকার, বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ রচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়। ক্রমাগত আর্থ-রাজনীতিক সচেতনতাও সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে সমাজ গভীরে প্রোথিত করে, চিনিয়ে দেয় আত্মসত্তার বিচিত্র অভিমুখ। বিপরীতে রাষ্ট্রের স্বার্থ-তৎপরতা, স্বেচ্ছাচারি সামরিক শাসন, ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম প্রভৃতি নব্য-উপনিবেশ মনস্ক (neo-colonial mentality) চিন্তা আগ্রাসী রাজনীতির চাদরে বিস্তৃত হতে থাকলে, সদ্য গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত মুসলিম বাঙালি সংঘবদ্ধ শক্তিতে তার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ শক্তির অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তৎকালীন পুর্ব-বাংলার সাহিত্য। যা বাংলাদেশের সাহিত্য নামে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত সংশ্লিষ্ট। প্রসঙ্গত, এ সংশ্লিষ্টতা আরোপিত নয়, লোকায়ত ও সমন্বিত ধর্ম-সংস্কৃতিচেতনার কেলাসিত রূপ। যার পরিচয় বাংলাদেশের ভৌগোলিক ভূখণ্ডের কৃষ্টি ও প্রবাহিত দ্বান্দ্বিক নৃ-জীবনের ভেতরে সংস্থিত। ১৯৬১ তে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের আড়ম্বর আয়োজন বা শিক্ষা ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে মধ্যবিত্তের মুখরিত আন্দোলন বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্বের শক্তিকে দৃঢ়তর করে। সাহিত্য এক্ষেত্রে প্রস্তুতকৃত পরিবেশটি গ্রহণে সামর্থ্য হয়। কবিতার ভেতরে উঠে আসে জীবনের প্রভূত মন্ত্রণা। আহসান হাবীব ১৯৪৭ সালে রাত্রি শেষ কাব্যগ্রন্থে যে রাষ্ট্রের স্বপ্নচালিত হয়ে তার প্রেরণাটুকু যুক্ত করেন কথা ও কবিতায় পরবর্তীতে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় ছায়াহরিণ কাব্যের ভেতরে শাশ্বত ও সমন্বিত চেতনাধারাটি অন্বিষ্ট করতে সামর্থ হন। প্রায় একই সময়ে শামসুর রাহমান প্রথম কাব্যে ত্রিশ-অনুবর্তী বাংলা কবিতার চেতনাধারায় স্বীয় শক্তির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ‘নতুন কবিতা’ সংকলনের পরিস্রুত চেতনারই বিপুল বিস্তার ঘটে এ কাব্যে। স্মর্তব্য, বুদ্ধদেব বসুর শার্ল বোদলেয়ার চর্চা কিংবা লোকনাথ ভট্টাচার্যের আঁতুর র‌্যাবোর অনুবাদ এ পর্যায়ের কবিদের আরাধ্য হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকের বাসি, পচা, কর্কশ শূন্যতার মরুভূমিতে ষাটের দশক প্রাচুর্যময়তা পায়। শুধু কবিতায় নয়, কথাসাহিত্যে আবুল ফজল, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবু ইসহাক, শওকত ওসমান প্রভূত হয়ে ওঠেন। নাটকে মুনীর চৌধুরীর পর শীর্ণ ধারাটি প্রস্তুত হতে থাকে পাশ্চাত্য ভাবধারা গ্রহণের অপেক্ষায়। একই সঙ্গে মননশীলতার উৎকর্ষও ঘটতে থাকে। ষাট-উত্তর সময়খণ্ডে যা নির্দিষ্ট অবয়ব পায়। কৃতী ও কুশলতায় তা যে মানেরই হোক, বাংলাদেশের সাহিত্যের রূপরেখাটি জনমানসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রঙে-বর্ণে-রূপে ফুটে ওঠে আস্থাশীল ও পূর্ণাঙ্গ জীবনের অধঃক্ষেপ। প্রসঙ্গত, বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতা যেমন দুর্ভিক্ষ, বিচ্ছিন্নতা, নৈরাশ্য, বহির্মুখি টান, অন্তরের জটিলতা, সংক্ষোভ, বেকারত্ব সাহিত্যের বিষয়কে অধিকার করে। এক্ষেত্রে ত্রিশোত্তর পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের অনুকরণ বা শক্তির তুলনা নয়, স্বতন্ত্র ও স্বদীক্ষিত কল্পনা-অভিজ্ঞতাকেই তারা কাজে লাগান। পূর্ব-বাংলার ঢাকা আলাদারূপে আলাদা বাস্তবতায় চিহ্নিত হয়, এই বাংলার লেখকদের কাছে। বিভাগপূর্ব কলকাতা তাদের কাছে কর্ম-অভিজ্ঞতা আর পাশ্চাত্য-প্রভাবিত লেখকতীর্থের স্বপ্ন-অনুপ্রেরণা। কিন্তু বিভাগ-পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র বাস্তবতায় গড়ে ওঠা ঢাকার জীবনসংগ্রাম ও রাজনীতি তাদের দিতে থাকে স্বনিয়ন্ত্রিত আত্মপরিচয়ের নিশানা। পঞ্চাশের দশক থেকে ক্রমশ আলাদা হতে থাকা জীবনের প্রসূন, দ্বন্দ্ব-বিক্ষেপ আর লোকায়ত জীবনাচারণের প্রক্রিয়া ভাষায় প্রতিচিহ্নিত হয়। ষাট-উত্তর অনেক লেখক নিযুক্ত হন, বিচিত্র নিরীক্ষায়, নদী-নক্ষত্রের প্রতিজ্ঞায়। ধ্যানে ও অনুরক্তিতে জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব-বিষ্ণু-বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিক থাকলেও প্রত্যয়টিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে এদেশের বাউল-বীক্ষণ ফেলা আসা গ্রামীণ নিসর্গ নীলিমা আর বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর কূলুধ্বনি কিংবা প্রান্তিক কিশোর-কৈশোর। ষাটের এরূপ সাংস্কৃতিক প্রতিজ্ঞা রৌদ্রছায়ায় মিশে রাজনৈতিক প্রবাহে ঊনসত্তর পেরিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছয়। সাহিত্যে রাজনীতি যুক্ত হয়, পরিণতি ও মীমাংসায় ধৃত হয় নারীর স্বর, মানবতাসম্পৃক্তি সংহতি, শ্রেণিচেতনার আদর্শ ও প্রান্তিক কণ্ঠস্বরের অপরিমেয়তায়। প্রায় দুই যুগের অভিজ্ঞতা, পাঠচিন্তা, কল্পনাকারুণ্য বাংলাদেশ ভূমিতে, বাংলাদেশের সাহিত্যরূপে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। কলকাতার বিপরীত পীঠে ঢাকা নবরাষ্ট্রের কেন্দ্র হতে চাইলে সাহিত্যধারাটিও যেন তার অঙ্গে বিহঙ্গ পায়।

দুই.
মুক্তিযুদ্ধের পর বিভাগোত্তর সাহিত্যধারা অনর্গল অবিচ্ছিন্নরূপে সম্মুখে ধেয়ে চলে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে কবি-কথাকার-নাট্যকার পেয়ে যায় প্রভূত প্রতিবেশ। প্রেরণার স্মারকপুচ্ছটি প্রগাঢ় হয়। ৪৭-এর পরে বেড়ে ওঠা প্রতিরোধের কিনারাসমূহ প্রেরণার দর্পণে আভাসিত হয়। যুদ্ধ-প্রজন্মের লেখকবৃন্দ নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠেন ভাষায়, ভাবনার কল্পকুঠিরে। স্বদেশের ভূমে গড়ে ওঠে রোম্যান্টিক প্রহরাসমূহ। একই সঙ্গে সমাজ বদলের চিন্তাও চেতনাশাসিত হতে থাকে। দুই মেরুর বিশ্বে তাদের আস্থা ও অনুরক্তি শ্রেণিশাসনের বিপক্ষে। সাহিত্যের বিষয়-ব্যক্তি আধুনিক গড়ন পায়। লেখকগণের কল্পনা-স্ফূর্তির পাশাপাশি নবরাষ্ট্রের ভেতরে ক্রমঘনায়মান দীর্ঘশ্বাস বাড়ে। সাতের দশকের শেষার্ধ্বে স্বপ্নাশ্রিত নবরাষ্ট্র বিক্ষতরূপে পরিদৃশ্যমান হলে অবক্ষয়-বিচ্ছিন্নতার ভেতরের রূপ স্বার্থ ও পুঁজির বলয়ে আটকে যায়। ক্ষমতার মৌরসিপাট্টায় ব্যক্তির অনিকেত সত্তা তল খুঁজতে ব্যর্থ হয়, উন্মূল-শেকড়হীন উঞ্ছবৃত্তির অবলুপ্ত অব্যর্থ রূপ মোটা দাগে স্পষ্ট হয়ে পড়ে। সাহিত্যের ভেতরে একদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষত ও ক্ষেদ জমাটবদ্ধ হয় অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অবগাহনে বিষয়ের উপকরণে আলোছায়ার শিল্প-আত্মা গোপন-সন্ধানী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাহিত্য নিজস্ব পথে এগিয়ে চলে, প্রবহমান প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের আত্মা স্বচিত্রিত করে। পর্যবেক্ষণে মানে হয়, প্রতিকূলতা সাঁতরে ষাটের উপকূলে যে স্বপ্নতরী ভিড়েছিল— তা তুলনায় অনেক পরিশুদ্ধ, শৈলিসিদ্ধিগত। অপরদিকে, স্বাধীন দেশে সত্তরে-আশি-নব্বুই-শূন্যে এক গরল-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিতাপিত জীবন একপ্রকার নিরীক্ষায় রূপায়িত হয়। এ পথটুকু ক্রমাগত সম্মুখগামি। একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না—কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। স্বাধীন বাংলাদেশে সে পরিচর্যা তেমন পরিলক্ষিত হয় না। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল— এই স্বাধীন দেশে।
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়ে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, ছোটগল্প নেই, উপন্যাসের বদলে উপন্যাসিকা, প্রবন্ধ সংকুচিত, নাটক বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় ভাষা-সাহিত্য নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে।

তিন.
শিল্পে নাটক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভরতমুণির কাল থেকেই নাটকের চর্চা হয়েছে। নাটক ও অভিনয় মানুষের জীবনাচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাচীনযুগে গৎবাধা জীবনের বাইরে এক-আধটু শিল্পসৌন্দর্যের চর্চা হতো। মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদ পরবর্তীতে কালিদাস, কৌটিল্য রচনা সবই প্রাচীন নিদর্শন। এসব নিদর্শনের পরতে নাটক ছিল। নাট্যরস ছিল। প্রকাশভঙ্গির গড়নে-গঠনেও নাটকীয়তা কম ছিল না। পরে ইউরোপীয় রেনেসাঁ, এদেশীয় আধুনিক সমাজের অভিমুখ রচিত হলে নাটক একাডেমিক বিষয়ই শুধু নয়, সমাজপরিবর্তনের এবং জীবনাচরণের বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আধুনিক বাংলা নাটকে শেক্সপীয়ার প্রভাবিত নাট্যকার। বাংলা নাটকে তাঁর প্রভাব উচ্চস্পর্শী। বঙ্গীয় অঞ্চলে নাটকের বীজ রোপিত হয় বস্তুত গদ্যরচনা ও নগর-নাগরিক জীবনের স্পর্শে। তখন সাহিত্যের ভাষা সর্বগামী নয়, প্রয়োগও সর্বশ্রেণি-আশ্রিত নয়। একটা আভিজাত্যপূর্ণ ভাষায় নাটকের যেমন চর্চা হয়, তেমনি সাধারণ মানুষও পাওয়া যায় নি সেখানে। এ পর্যায়ে সংস্কার ছিল প্রচ- রকমের। কিন্তু উনিশ শতকের বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ঐতিহাসিক চরিত্র পরে দ্বন্দ্বমুখর শ্রেণিচরিত্র নাটকে উঠে আসে। প্রমাণ বিশ শতকের তৃতীয় দশকে স্বাধীনতা-উন্মুখ জাতির সম্মুখে নাটকের চরিত্র ও অভিনয়রীতির মাত্রিক উদ্ভাসন। বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, স্বাধীনতা সমন্বয়ে ব্যক্তির আত্ম-জাগরণের মুখে নাটক বিস্তৃত পরিসর পায়। শিশিরকুমার ভাদুড়ী, শম্ভূ মিত্র, উৎপল দত্ত, তুলসি লাহিড়ী এ পর্যায়ে উল্লেখনীয় নাট্য ও মঞ্চদ্রষ্টা। এর বাইরেও অনেক নাট্যকার আছেন, বাংলা সাহিত্যে ত্রিশোত্তর ঘরানার নাট্যকারগণ তো ছিলেনই। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এক বিরাট সাংস্কৃতিক প্রতীভূ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকের শাখায় বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে উদ্ভাসিত হন। শুধু সদম্ভ উপস্থিতিই নয়, বলয়ও সৃষ্টি করেন। ফলে বাংলা নাটক বিশের প্রথমার্ধে অনেকদূর সম্প্রসারিত হয় এবং বলা যায় আন্তর্জাতিক মাত্রাও লাভ করে। প্রসঙ্গত, বলা চলে নাটকে প্রতিরোধী বিবেচনা প্রকাশ্য হয়ে উঠতে থাকে। তবে তুঙ্গস্পর্শী শিল্পধারণাও তাতে ব্যহত হয় না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম বা বাঙালি মুসলমান নাট্যকারগণ ইতিহাসগত নিয়তির নির্বন্ধে পিছিয়ে পড়েন। শিল্প-সংস্কৃতি ভাবনা দুর্বল ও পশ্চাৎ-অনুগামী হওয়ায় নাটকের মতো অন্যান্য লিখনশৈলির প্রগতির বাহিত চিন্তাও তাদের ভেতরে তেমন ছায়াপাত ফেলেনি। ফলে নাটক-চর্চা তেমন হয় না। হলেও তা ধর্মীয় প্রচার আর মধ্যযুগীয় ভক্তির রসনায় বায়বীয়। কিন্তু গ্রন্থিমুখ খুলে যায় ভারত স্বাধীন হলে। বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় অনেকের মধ্যে মুনীর চৌধুরী বেশ সাফল্যের সঙ্গেই পদচারণা শুরু করেন। যদিও পূর্ব-পাকিস্তানে বাঙালি লেখকদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ মুখ্য ছিল। কিন্তু সদ্য-গড়া মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সৃজনশীলতায় নিজস্বতা অর্জনের পথ খুঁজে পায়। যা প্রভূত হয়ে উঠেছে একাত্তর-পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের নাটক সাতচল্লিশ থেকেই সৃজ্যমান। কারণ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনও পরবর্তী আর্থ-রাজনীতির স্বাধীকার মূলত বাংলাদেশ নামক ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রেরই জন্মের সূতিকাগার। গ্রন্থটি ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত নাটক ও নাট্যকারগণের সালতামামি। কোনো প্রবণতা ধরা হয়নি, নাট্যকারের ভেতর দিয়েই প্রবণতা ও স্বরূপ জানা সম্ভব। এখানে কার্যত একটি খসড়া প্রতিলিপির পরিকল্পনা অঙ্কিত হয়েছে।

চার.
সৃজিত বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত গ্রন্থটিতে প্রবন্ধ-অনুবাদ-শিশুসাহিত্য-আত্মজীবনী-স্মৃতিকথা-ভ্রমণসাহিত্যের ইঙ্গিতটুকুও গৃহীত হয়েছে। এতে করে ষাটোর্ধ্ব বয়সী সাহিত্যের চকিত পদচিহ্ন এতে অবয়ব পেয়েছে। ধারণাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলেও গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা তো মিলবেই। স্মর্তব্য, এটি পূর্ববর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থটির সম্প্রসারিত রূপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবর্ধন পরিমার্জন চলবে। এ সময়ের অনেক লেখকই এতে যুক্ত হয়েছেন। ক্রমশ আরও যুক্ত হবেন। সৈকত হাবিব ও মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে অশেষ কৃতজ্ঞতা। কথাপ্রকাশের সাফল্য কামনা করি।
আটই ফাল্গুন ॥ ১৪২১
শহীদ ইকবাল [shiqbal70@gmail.com]

#################################################

বিশ শতকের রূপকথার নায়কেরা
প্রকাশক : চিহ্ন ॥ ২০১২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১ম অংশ
তখন হিম-হাওয়ার ওসে ওসরাখানা ভরিয়া গিয়াছে। কুয়াশাছায়ায় বিহানবেলার বাড়ির দেউড়ির উন্মুক্ত রাস্তায় চক্ষু তাক কইরা দেখি অনেক মোটা মোটা চুনঅক্ষরে লেখা : ‘…জেনারেলকে ভোট দিন’। তখন আমাদের সবুজপান্নায় কিশলয় রঙ ধইরেছে— দোয়েল-ফড়িংয়ের গন্ধমাখা প্রকৃতি অপার রঙে মুকুলিত হইয়াছে, পরিজনের ভিতর ঠাসা গমোকে বিলাপ ওঠে— ভোটে ওই জেনারেল না জিতিলে অবশ্যি অবশ্যি যুদ্ধ নাগিয়া যাইবে। যুদ্ধ নাগলেই তামান শ্যাষ!’ অনতি কয় বচ্ছর হইলো যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আবার আর একটা যুদ্ধ নাগিয়া গেলে তার হিস…হিস… আওয়াজ… কেউই য্যান আর মানিয়া লইতে চায় না, এক্কেবারেই অসম্ভব অবাস্তব—অবাস্তবমান্য সব মনোলীলা। ভয়কাতুরে মাহবুব আজ সবাই। ঝড়ঝরানো বৃষ্টিব্যাকুল সময়ে পুরনো পানদোকানি আজিজের বাপের বটতলার টংয়ে কয়জন বইসে কয় : ‘এবার যুদ্ধ নাগলে সোগ্গ শ্যাষ, কী যে হওচে বাহে দ্যাশটাত… শ্যাখ সায়েব যায়্যা তামান য্যান আউলি গ্যালো’—এসব একাত্তর-ধরা বীরময় দুর্মর কাহিনী কী প্রকারে প্রচারিত—তাহা শোনা যায় মায়ের কাছে, বয়সী নানীর কাছে, আর সক্কলের গুজব-কেচ্চায়। অনেক প্রকারে, অনেক সত্যমিথ্যার কুহকে তা আটকানো, বাস্তব-অবাস্তবের জারিজুরিতে অপাররূপে মাখানো। সে যুদ্ধ কার কাছে ক্যামনে ছায়া পায়, কে কোথায় পালাইয়া যায়, কে ক্যামনে লূট করে, কাহারে মেলেটারিতে লাইনে দাঁড় কইরা মারে, কাহারে বা মৃত্যুমুখে ছাইরা দেয়, কাহারে আবার গোর খুঁড়ে মৃত্যুকূপে নামাইয়া কল্মা পড়ায়—কব্বরে নামায়-ওঠায় আবার ওঠায়—বহুত তামশার করুণ বিবরণ বসিয়া যায়, সে সব বিবরণে কাণ্ডে-শাখায়-শিখরে স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হইলে আমরা নদী আর কাশফুলের হাওয়ায় হাঁটিয়া যাই। কাহিনীকথা বুইনা চলি। কাহিনীকথার মধ্যে একাধিক উস্কানিতে এবারের ‘যদি-যুদ্ধ নাগে’র আশঙ্কা-ভাপ ওঠে। আর ওই জেনারেলকে নিয়া রাজকীয় সরমের কান্কানাকান্ কথা বাতাসে ওড়ে। সরল মানুষ, জটিল সময় পার করতাছে, সদ্যযুদ্ধ শেষ হইবার গন্ধ তাতে; মাত্র পাঁচ-সাত বচ্ছরের ফারাক তাতেই। লাঠি-লজেন, ভাগার বিল-মাখনা আর সিংগোর খাওয়ার অলসদুপুর, আহা কি আনন্দের ভয়-ভীতির জ্যোৎস্না; যেখানে মানুষের রাজনীতির য-ফলা আয়ত্ত করিবার আর কিচ্ছু রহিল না। তখন দূর গ্রামের স্কুল হইতে বৃত্তি দেবার জন্য লোটাকম্বল লইয়া আসিয়াছে মেধাবী অনেকেই। খুব ভোরে সুর করিয়া তাহারা পড়ে পালআমল সেনআমল মোঘলআমলের বিবরণ। নতুন বইয়ের ভেতরে শহীদুল্লাহর ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’ আর হ্যামিলনের বাঁশীঅলার ‘হাবা’ রূপকথার কেচ্ছা। সে চন্দ্রিমাগল্পের মৃদু আহুতি অতলের। তখন আমরা জানিয়া চলি সেইসব দেশসেরা সন্তানদের। রাস্তাঘাট নাই, কুপি জ্বালিয়া নাড়া দিয়া গদি বানাইয়া গরুরগাড়ীতে আসন পাতিয়া তাহারা পশ্চিম হইতে পুবে-উত্তরে-দক্ষিণে আসে; সঙ্গে তাহাদের এক বা দুইজন বড়ো শিক্ষক। সন্ততুল্য এ শিক্ষকগণ তাহাদের সন্তানের ন্যায় ভালোবাসিয়া চলেন। নিরিবিলি, যত্ন করা এসব ছাত্রের গর্ব আলাদা, তাহারা অনেক দূর হইতে এখানে পড়িতে আসিয়াছে। করুণাময়ের দয়া-দাক্ষিণ্য তাহাদের মনমগজে তুফান ওঠে। আকুল করা সে পরিবেশের আহ্বান অপরূপ। সোনালী, সেলিম, সবুজ ভালোছাত্র—-কী চমৎকার তাহাদের হাতের লেখা, উচ্চারণের কী স্পষ্টতা, দার্শনিক মনে বিপুল আয়োজন যেন ছড়াইয়া পড়ে। নিদয়া সময়ে তাহাদের ভেতরে আশ্রমের মায়ার মতোন আচ্ছন্নতা; ছায়ায়-লতায়-পাতায় আবেগের ব্যাকুল উচ্ছ্বাস। সে মন্দ্রিত উচ্ছ্বাসে ধাইয়া আসে স্বপ্নসকল আর অবচেতনে সাঁতরাইয়া যায় সাদাঘোড়ার পাল, হাঁক দিয়া কয় ‘ও তোর পরণবাণী’। বাণী না বুঝিয়া কাক-চিলের পাখনায় ভাসিয়া দাঁড়ায় তামাম কিছু আমাদের সম্মুখে। সেইসব ভবিষ্যতের মাথায় পা-দিয়া নিধুয়া চৈত্রের এক দুপুরে ভাপিয়া আসে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। তার জন্য স্লোগান আসে, মুষ্টিমেয় টগবগে তরুণগণ মুখরিত হইয়া ওঠে। চকচকে পোস্টার আর সাবেক মন্ত্রীমিনিস্টার-মার্কা তেলতেলে চকচকি ছবি ‘ভূম’ দোদুল্যমান হইয়া পত পত করিয়া উড়িতে থাকে। চিক্কনসুতায় তা নির্ভুল প্রান্তরে দোলে—পুরানা ঘরে দোলে, দেয়ালে দেয়ালে দোলে, হাটের বটে দোলে আর তার লাগি পনর-বিশ করিয়া হাঁটিয়া চলে সবাই, ক্যানভাস-প্রক্রিয়ায় একটা সাইকেলে মাইক লাগাইয়া মারকুটে শক্তবাঁধনে বাতাসফাঁটা চিক্কুরে বায়না তুল্য কয় ‘ভোট চাই’, ‘ভোট দিন’। ব্যাটারী বা অন্যান্য সংলগ্ন তারে দ্বিচক্রযানে প্যাঁচিয়া হাঁটিয়া হাঁটিয়া একসঙ্গী পতঙ্গের দল বালুডোবানো পথে বইলা চলে : ‘জনসেবার সুযোগ দিন’। পুকুরের ধার দিয়া, কলার প্রাচীর পার হইয়া, ড্রেন-নর্দমা ছাপিয়া, কোটাঘরের পাশ দিয়া, বন-বাদারের ভেতরের চিক্কনরাস্তা ছাড়িয়া, পাথার পার হইয়া অনেকদূরের বিন্দুবিলীন পথে তখন চলিয়া যায়। সে অনেক সময়ের প্রচার-পরিদৃশ্যমান। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নাই। দল-মার্কা চিনিলেও কেমন-কী কারণে তাহা অনায়ত্ত। মাঝে মাঝে মন্ত্রীগণ সোরগোল তুলিয়া মিটিং করে, কী য্যান কখন কি হয় তাতে, কেমন পোচপাচ, বড়োলোকভরা বাস্না তাতে। সুং সুং গন্ধ আরও মজিয়া উঠিলে বাতাসমাখা মাভৈঃ শিহরণ চাপিয়া আসে। এক সময় তিনমিনিটের জন্যে পেরসিডেন আসিলে কী য্যান সাজ সাজ রব পইড়া যায়! ঝুঁকি নিয়া ভাঙা-ইটের দরদলানের ওপর উইঠা দেখিয়া চলা একজন লোকের জন্য কত্তো গাড়ির বহর, চলিছে তো চলিছেই, চলিতেছে মেলা— অনেক মেলা য্যান অনিঃশেষ সে মেলা। এই গর্বে-আনন্দে মিইশা নিরাকপড়া ভরদুপুরে এক সময় অনেক মানুষ জড়ো হয়। তখন হৈ দিয়া কই ‘চলো তুফান তুলিয়া দেই’। আহা আনন্দখেলায় তাহাতে জোয়ার ওঠে। আনন্দ বাড়িয়া যায়। নিশ্চুপ সময়ের অরুণিমারা স্নিগ্ধ আবেশে ভইরা তোলে স্কুলমাঠের সবুজঘাসে কাঁপুনি দোলার দুলুনিতে। ওইকালে মেলা দূর আকাশ-নামানো মাঠ গমগম কইরা ওঠে, কাঁপে অনভিজ্ঞ আহাজারিতে। প্রকৃতি সেখানে চঞ্চল হইয়া ওঠে, তরতর কাঁপিয়া দুলি আনন্দের কোণায় কামিনীকে, পলাশকে ডাকিয়া তোলে। ফোটা সকালকে আমন্ত্রণে তুলিয়া লয়। চল্ প্রভাতফেরিতে, বিজয়ের ৩৩ তোপধ্বনিতে। শিশুকুচকাওয়াজ, ২২ শ্রাবণ আর ১১ জৈষ্ঠ্যের জন্য আবৃত্তি-গান, স্কুল পুরস্কার বিতরণ মায়াঅঞ্জন মাইখা যায়। ৯৯ পাওয়া বন্ধু সঞ্জীব সুরকী মেশানো পুরাণপথে বিরাট রহস্যময় গল্প ফাঁদিয়া ধুলিধূসরিত মায়ার আজব গল্প বলিয়া চলে ‘এককালে এইহানে তলোয়ারের যুদ্ধ হইছিলো, ত্বরা তহন মায়ের পেডে’। কীসের তলোয়ার যুদ্ধ! জানা যায় না, ভঙ্গিতে বোঝা যায় না। সে হাঁটা পথে তখন মানুষ নাই, বিজনভূমে চারিপাশে উন্নাসিক ঊর্ধ্বমুখি কলাই সারির হুল্লোড় হিমালয় আঘাতপ্রাপ্ত মৌসুমীবায়ুতে দুলিয়া চলে, বাঁশঝাড় আর রূপময় জীবনানন্দ পল্লী তখন সব থরেবিথরে ঘুমন্তরূপে বশীভূত— তাহাতে তলোয়ার কথা কয়, জয়-পরাজয়ের কাহিনী শোনায়। ওঁর তাতে কী-যে অপার আকর্ষণ আর মুগ্ধ করা সান্ত্বনা—স্বপ্নদোলা বাজ্জ্যা ওঠে। সপ্তাহ পার হইলে শুক্কুরবারে বিরসবদনে কয়, ‘ছুটির দিন ভালো লয়’। স্কুল বন্ধের কারণে কান্দিয়া ওঠে; বেঘোরে দুঃস্বপ্ন গাঁথে— ‘ক্যান তুই আজ ছুটিতে! ছুটিরঘণ্টা কী বাজে নাই! তুই কেন ওটা খাস্। শ্যাষকালে কী সেনেমার নাকান মরবু? আয় ভেলা ভাসানো ছুটি, তর লাগি মা কান্দে, বুবু কান্দে! হ, এরপর হবিবরস্যার-মৌলবিস্যার-হেডস্যার-নূরুস্যার-লুৎফরস্যার সড়কি নিয়া ডাকে : পড়া ক।’ মনভারী স্যার সব তখন আইস্যা পড়ে। চুপসানো স্নানমুখ, অনতিআগের সব আনন্দে চুন পড়ে। বড়ফুপু ডাকে, হাট বেইড়া আসি। তর বাপে ট্যার পাইবো না। কিন্তুক হঠাৎ বাপের শাসন ঝুইলা গেলে তাও চুবকাইয়া যায়। হাওয়ায় হাওয়ায় নব নব স্বপ্নসকল তখন রোদতাপবাতাসে পল¬বিয়া ওঠে। বাঁশবাতাসের ভেতরে গাড়োয়া কুলকুল করে, তার পাশে বেড়ুয়াসাপ ঘুমায়। সাপে পাপ, সে পাপে শাপ—তখন ওই হাওয়া ঘুরবাতাসে ভাইসা আসে। সব পার হইয়া সবুজ বিলি হাওয়ার ভিতর দিয়া হেরিংরাস্তায় শুরু হইছে কঠোর বারিবরষণ। মুষলধারায় তাহাতে ঠাণ্ডা বায়ু মাখানো। তবুও স্যার আসিয়া গিয়াছেন, না হলে জানালার পাশে-চাপা ওঁরা নাই কেন? ক্লাসরুমে আইস্যা তখন আসন্ন শিক্ষকের ক্লাসপড়ার হৈচৈ। অতঃপর পিনপতন নীরবতা। বিদ্যুৎবিহীন পৃথিবীতে জীর্ণ-দুস্থ পরিবার নিয়া বিন্যস্ত সমগ্র দ্যাশ, হারকেন-আলোয় সান্ধ্যাদীপ আর মাদুর পাতা কড়া শাসনে ধারাপাতমুখরিত পড়ালেখা। পড়িবার শুরুতেই হুকুমজারি, ছোট্ট সে স্টেশনারি দোকানে তখন আমাদের সদ্য-সমুজ্জ্বল হ্যাঁ-না ভোটের বড় ব্যবধানে জেতার মতো দস্যিপনা চলিতেছে—যাচ্ছেতাই করিবার অফুরন্ত সুযোগ। পোস্টাপিসের বিনাবেতনের বই তুইলা দোকানে বেচিয়া দেবার সুবিধা আদায় চলে। মানসাঙ্কর প্রশ্নসমূহ অন্যকে দিয়া দেওয়া বা পুরোসেট কোনো বন্ধুকে দিয়া অকাল-হিরো হইবার আত্মঘাতি চেষ্টায় মাতিয়া ওঠা— সে সব বেশুমার চলে। মতিচা’র ছেলে, রিফিউজির ছেলে হামেশাই এ লক্ষ্যে বোকা বানাইয়া দেয়। তবে তখনও কোনো আলো আসে নাই, রোরুদ্যমান টিমটিমে কুপি-আলোর বাইরে হ্যাজাগ মুগ্ধময় আলোর বস্তু। ওটি আমাদের বাড়িয়া ওঠার চাইতে আরও বেশি আকর্ষণীয়। আলোর ছলে তার উজ্জ্বলতা দ্যুতিময়। উহাতে পোকা আসে, কুয়াশা পড়ে, রমণীয় ফর্সাস্বাদ তুমুলতর হইয়া ওঠে, গা ধুইয়া যায়, বর্ষামুখরিত হইয়া ওঠে। কবে তাকে আরও দেখিয়াছিলাম মনে পড়ে, আহা! হালিমাখালার বিয়াতে। বর বিরাট হ্যাজাগধোয়া রাস্তায় গরুরগাড়িতে চইড়া আসিয়াছেন। ষাঁড়বাহিত সে গাড়ী সারবাধা আরও হ্যাজাগ ছিল ট্রুপ-তাগাদার ন্যায়। আমরা গেট সাজাইয়া নতুন খালুর উদ্দেশে কবিতা পড়িয়া যাই। নতুন খালুর মাথায় সিরাজ-টুপি, আর তার গাড়ীর তাজা ষাঁড় ভারী দুরন্তময়। ভয়ে পালাইয়া পেরেসান তখন দরদর ঘামে বাৎচিতে তালামার্কা ধানেরশীসের প্রার্থীর প্রসঙ্গ চইলা এলে, বঙ্গবন্ধু-ভক্ত নতুন খালু ক্ষমতাসীন সেনাশাসক আর পা-চাটা গংদের উদ্দেশে কী য্যান স্ব যাং বলিয়া যান। আমরা তখন নব-খালুকে বাচাল বলি আর প্রশ্ন তুলি : ‘তার মুখে রুমাল নাই কেন’। তারপর ক্রমশ বিয়েবাড়ির হলারোলে একসময় নব-খালুর পরিচয় মেলে তিনি গুলাম মুস্তাফা। বাড়ি তার কিছু দূর মাদারগঞ্জে। মাদারগঞ্জ বিরাট হাট। সে কেন্দ্রে প্রধানত পাটের ব্যবসা। মুস্তাফা খালু জানান—গৌতম বুদ্ধ আর তার নির্বাণ নিয়া। এলাকার পুতুলনাচ বা যাত্রা তার অন্তঃপ্রাণ : ত্বরা আগামী আশ্বিনে একটা বই ধর। আমিও পাঠ করুম। কী বই খালু? জল্লাদের দরবার। নাম শুইনা আমরা কাঁপিয়া উঠি, কিন্তু টাউন হইতে বই আনার পর তা আর কার্যকর হয় না, এলেকশান উপলক্ষে তখন রেড এলার্ট, এসব যাবতীয় কর্মকা- রাষ্ট্রকর্তৃক বিস্তর রকমে নিষিদ্ধ। মুস্তাফা খালু হঠাৎ একরাত্রিতে এ্যারেস্ট হন কি য্যান রাষ্ট্রদ্রোহী হইবার কারণে, আমরা আর মাদারগঞ্জ যাই নাই। খুব মারপিঠ নাকি হইয়াছিল— সমাজতন্ত্র বলা লোকেদের। কিন্তু মুস্তাফা খালু তো খারাপ মানুষ নন! তার কি পাট্টি আমরা জানি না, কান্দিয়া আমরা ফিইরা চাই তাকে, তার মুক্তি চাই। নিঃশর্ত মুক্তি, নির্জলা মুক্তি, অবিলম্বে মুক্তি চাই! আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, নিজের থেকে মুক্তি, জীবনের জন্য মুক্তি, মুস্তাফা খালুর মুক্তি, সাতবছর আগের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্ত করো হে প্রাণ, পাণ্ডবপরিবারের মুক্তি, ভীম-অর্জুনের মুক্তি, ভীষ্মদেবের মুক্তি, একলব্যের গুরুমুক্তি, কর্ণর বঞ্চনামুক্তি, তৎ ও এ-সামাজ মুক্তি—রাজনৈতিক মুক্তি, ওহে মুক্তি তুমি কোথায় কাহার তরে তোমার এন্তার মুক্তির নাম ছড়াইয়া আছ, কবে তাহা ঘটিবে! তার পর বিস্তর শুনিয়া আসি আর প্রত্যহ শুইনা যাই, রক্তকরবীধ্যেয় রাজার ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’, অতঃপর তোমার-আমার নেতার ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’।…

###########################################

হয়নাকো দেখা
প্রকাশক : অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৫, ঢাকা

মৌলবীসাব খুব সুর করে কীসব গপ্পো পাড়েন ‘ত্বরা জ্বীন দেখচোস? আল্লাতালা মানুষ আর জ্বীনের সম্মান দেছেন, তার বিচার হইবো, কাল কেয়ামতের ময়দানে।’ কপাল ভেতোরে ভেতোরে জপ করে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে’—মানে কী? গা শিউরে ওঠে, কয় কি হুজুর! কাল কেয়ামত পুন্নি, মানে তো সব শ্যাষ। হুজুর কঠোর চাবালিতে কন, ‘মানুষ তোমার হুস হয় না?’ কাল আর বেশি দূরে নাই। এই পুলসেরাত, গরম পানি, দেড়হাত মাতার ওপর সূর্য, হু হু করে কান্দি বেড়ানো মানুষের প্রলাপ, এ ওর দ্বারে, সে আরেকজনের দ্বারে ঘুরছে তো ঘুরছে, কোনো ফায়দা পাচ্ছে না। হে মানুষ দুনিয়ায় যদি ঠিকঠাক চলতিস তবে কী আজ এই দশা হয়! —কিন্তু সবই কী কালকের ব্যাপার! হিসাব মেলে না কপালের। তার কানে বার বার ফুইটে ওঠে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ মারাত্মক ধ্বনি। কী ভয়ঙ্কর কথা! এর মধ্যেই বুঝি পুন্নির পুনর্জন্ম হইছে। ভাবতে ভাবতে কুঁকড়ে যায়। ক্লান্তি কামড়ায়। কী এক কুৎসিত ক্রোধ তাকে চেপে ধরে। স্বস্তি দেয় না। খড়ের মাঠে দাবড়ায়। আর চিক্কন হিহি আওয়াজে তাড়া করে। পুন্নি পুন্নি… ছাইড়ে দেয়, আর ভাল্লাগে না। বাপ-মাও, পুন্নি আর এই তামান মানুষ তাইলে কোথায় যায়! কী হয় সবার। নাকি ভূমিকম্প হবে, কড়া কথাবার্তার পর হুজুর থামলে বাইরে সক্কলে কয়, একনা গোরজিয়ারত করা নাগে, সব্বাই হাটো। ভাগে ভাগে হাঁটো। থোকা থোকা হয়া চলো। গায়ে গায়ে। হাঁটাহাঁটি ভাগে ভাগে চলো। তখনও বেল ফোটে নাই। এ পাড়ায় লোকচলাচল এক্ষুণি শুরু হবে। ছুটবে সাইকেলে, ভ্যানে বা তরিকামতো যার যা বাহনে। এ সময়টা বেশ ঠাণ্ডা, বেশি পরিমাণ সুনসানও। কোথাও কেউ নাই, ঘুপঘুপ্যা আন্ধার, টাটির ভেতোর ক্যাৎ-কুত আওয়াজ। ধরপড় হয়। দৌড়ায় আর তাড়ায়। সর্বদিকে কৃপণ আওয়াজ। বাঁচোনের মইদ্যে হড়হড় কোপানি। দূরে ব্যাঙ ডাকে। ক্যান ব্যাঙ ডাকে, ও কারে ডাকে, ও-কি জানে না কাল কেয়ামত পুন্নি! পন্নি ভাসিবে। সে ভয় নাই? ক্যান এই তো কদিন আগে ওই পুকুর পাড়ের গোরের পাশে গরু বান্ধা আছিল, তাই অবলা বলি কার যেন জান আজাবের আওয়াজ পাইছে। হায়রে কোপাওচে! মাইনসের হাতে খুন হওয়া মরা ব্যান আরও তেজী। মাইয়া মানুষ ক্যাং করি কোপায়, হাঁটুর ওপর সপাং সপাং আর ওই খালি ওল্টোচে। না না ওটা আবেদ দর্জিই হবি। পুন্নি তো মরিছে অন্যের হাতে, তার পাপ নাই। সব পাপ নেছে নিজে। কেন সে মরি যায়! মরণের ওপারে সে কী হাঁটিয়া বেড়ায়। তাড়ায়… রাতে-আন্ধারে, পুকুরে, কেমন একটা বিস্ময়কর বেশে সে সেদিন রাতে আসিয়া দাঁড়ায়। সে আসিয়া কয়, আড়ার ওপারের মসজিদের কোণার পুকুরে রাইতে অনেক মুসল্লি আসে। সেখানে আপনে যান। কাম করেন। নিয়ত করেন এবারের দুইখন্দের এস্তেমার অন্তত এক খন্দে যাইয়েন। সেখানে মেলা মানুষ। তাদের লগে সময় পার করাটা ফরজ বইলে মনে করেন। এরপর ঘুমটা কার ডাকে ছুটে যায়। তারপর থেকে মাথায় খুব চাপ কপালের। সারা দেহ ছম ছম করে। বাতাসে কান্না ওড়ে। হায় পুন্নি কেন মইরে যায়। সে কি আবেদ দর্জির পাশে নাই। নাকি সকলে এক হইয়া ওরশ করে। কী মজার সে ওরশ। গরুর পাল একের পর এক জমা হয় ওরস ময়দানে। কী সুন্দর নাদুস-নুদুস সেখানকার গরু। নধরকান্তি এসব গরুর রঙবেরঙ-এর পোশাক কতো আকর্ষণীয়। নানা রঙের গরু। গরুর গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্লাগ টানানো। চোখের ঠুলির উপরে লাল নীল চশমা। শিঙে ওড়ানো পতাকা। পায়ে ঘুঙুর। নালে পেতলের বেড়। গলায় রঙীন কাগজের কথামার্কা মালা। দয়াল বাবা আর নকশাবান্দা মোজাদ্দেীর জয়গান। গরুই বান্দার জান। সে তার সেবা করে, মায়ার চোখে দেখে। আদর দেয়। সেই ওরশে এক হয় পুন্নি আরও অনেকেই। এখানে আজ অনেক জান কোরবানী হইবে। জানের বদলে জান। পুন্নির জান কী নতুন করিয়া পয়দা হয়! তাও হোক! তাহলে এখানে ব্যাঙ ডাকার কি হলো। ওইটাও তো অবলা, হে বোঝে না। কিছুকাল আগের কথা, পুন্নির পরেই আবেদ দর্জি মারা গেছেন এখানে। তার ওপর বিরাট জামের গাছ। গাছটা ফলে টুসটুস। ছায়া দেয়, পাহারা দেয়, আর ঘিরিয়া ধরে থাকে দর্জি। লোকমুখে শোনা যায় তিনি খুব ভালো মানুষ আছিলেন। এলাকায় তখন যেমন সুনাম এখনও তা বহাল আছে। তিনি কাঁচা বাড়িতে বইসে দর্জিগিরি করেন। আসলে নামে তিনি দর্জি কিন্তু কাজ করতো তার ছেলেরা আর পোষ্য কর্মচারিরা। এলাকায় তিনি সকলের হইয়া থাকিতেন, দল বাইন্ধা সকলকে কীসব শেখাতেন। কপালের সেয়ান মনটা কিচ্ছু ভোলে নাই, সব মনে আছে। তিনি সক্কলকে পুকুর পাড়ে বইসে কন, ওই দেখ মেঠো চাঁদ, ওইহানে কয়দিন আগে মানুষ বেড়াইয়া আসচে। দুধের মতোন চান্দ, চন্দ্রকারিগর কে? ভাবিতে ভাবিতে তখন চোখে পানি আসে, আবেদ দর্জি চইলে আসেন না, ভয়ে সবাই একে একে সইরে পড়ে, শুধু তিনি বইসে থাকেন। দোয়া পড়েন, সুরা ইয়াসিন পড়েন। আল্লা-নবী-চৌথা আসমান তামান বিল যেন বিলবিল করে। কী সে পুন্নি রোশনাই! এ মাঠের চতুর্দিকে ফটফটা আলো। আলো তো নয়, পুন্নির নাহান দুধের নহর। এই গ্রামটা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আইলের ওপর বসলে বিল পর্যন্ত রাতের চাদ্দোর বিছানো। কী মজার সে চাদ্দোর। জ্যোৎস্না রাতে তার আরও বাহার রঙ। মনে হয় ধারালো কুয়াশার ভেতর কেউ যেন পালের নৌকা ভাসাইয়া দিছে। বাইয়া যাও মাঝি নাকি সোহাগ চান্দ বদনী ধ্বনি— ভাবতে পারে না দর্জি। দর্জির চোখ কী শাদা! পুন্নি শাদা, পাঞ্জাবী শাদা, পায়জামা শাদা, বকলেসঅলা শাদা জামা বানাইতে বানাইতে তার চোখ শাদা হইয়া উঠছে। শাদা কইতর কত্তো প্রিয় তার। দাদায় কইতেন আবেদ শাদা কইতর মারিস না, ওই কইতরের রক্তে যাদু-টোনার কাম হয়। কোন কালে চতুর্দিকে বাড়ি বন্ধ করে নিয়াছিলেন তিনি। কিন্তু শাদা কইতর বাকবাকুম করে আর দুলে দুলে পা হাটিয়ে চললে ভেতরটা দুপ দুপ করে। পুন্নি না শাদা কইতর। পুন্নির বৃদ্ধি, ষোলকলা পূর্ণ, তার আগেই মইরে যায়। সে মরে গিয়ে শাদা হাঁস হইছে, কইতর হইছে। তাইতো সে আলাদা সমীহ পায়। কপালের চোখে এসব দুললে তা হঠাৎ করে তামাদি হইয়ে যায়। কিন্তু কপালের বিশ্বাসে আবেদ দর্জি ছিলেন অন্য মানুষ। ভাবের ঘোরে এক মত্ত বাউল, ফর্সা ধবধবে দর্জি। আবেদ দর্জির তখন পাকুর পাড়ে বইসে মনে করে পুরান কথা। এই শাদা নহর কী সব কথা তার মনে কইরা দিল। মনের ভেতরে কাফনের জ্বর ওঠে। মনটা বেসুরো হয়ে ওঠে। ফিরে আসেন বাড়ি। নাতনিকে কোলে করে ঝুম বৃষ্টিটা ধরে গেলে কোটার ঘরে ঢোকেন। বাসনে ওঠানো আলু দিয়া রাঁধা মুরগির মাংস তোলা ছিল। কেউ ছিল না। যে যার কাজে ব্যস্ত। পুকুর পাড়ের ভয় কাটে না। শাদা আলেয়া ঘিরিয়া ধরে তাকে। ক্রমশ কঠিন হচ্ছে তার শাদা ভীতি। পুন্নির ভয়? তিনি দাঁড়ান। নাতিকে কোলে তুলে অবলম্বন করেন। বাইরে মেঘলা রাতের অন্ধকার, জোনাকী নাই। কেন যেন একা হয়ে যান দর্জি। নাতিকে নামিয়ে দিয়ে কাঁসার থালায় মাংসের ভাতটুকু নিয়ে নেন। খুব তৃপ্তি মেখে খুওয়ার পর এলাকার নেভানো আলোয় স্বস্তি পান। এ তো সাদা নয়। কালো। মরণসুখ এখন আলাদা লাগে। কী যে এক মরণের খেলা। এশার নামাজ পড়ার আগেই পাতানো তোশকের চৌকিতে একটু শুইয়ে নেন। টুকটাক ঝিরঝির আলো এ ঘরে আসে আর চলে যায়। বাড়ির গৃহিনী বুঝি ফিরে আসছে। সেই গৃহস্থ গৃহিনীর কাজে আলোর পায়চারি তোলেন। কাঁচা দেয়ালে আলোক নকশা আঁকে, উল্কি হেঁটে বেড়ায়, দানা দানা ছায়া ঘোরে, সাঁতার তোলে মাটির দেওয়ালে। দর্জি আলো-আন্ধারী চোখে এইসব আলোর রেখাপাত আরও গাঢ় করে তোলেন। ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে চিক্কন রেখার কণিকা। নিকানো দেয়ালে শুষে নেয় আলো। শোষণের প্রক্রিয়াটি ধারালো। গৃহিনীর কাজের ছন্দে নির্মিত পদশব্দের ভেতরে সে আলোর রেখা কেঁপে কেঁপে উজানভাটি করে, আবার সরে যায়, চলে আসে। নিকানো দেয়াল আরও ভাস্করময় হয়ে ওঠে। কত্তোকাল আগের এই ঘরের কড়িবর্গার ওপরে কোণাকুণি বাঁশের ছাওয়া ছাদের চিত্রপট আরও মিইয়ে আসে। আলোর অধিকার খুব প্রচ-তর হলে দর্জি ঝিমিয়ে পড়ে। ঘুমায়। কিন্তু ঘুমটা ঠিক কম্পমান। আলোটা কী খুব তাড়া করে তাকে। একি আলোর তাড়া নাকি জীবনের পালানো কুত্তার বহুমুখি শ্লেষ। না এসব চান না তিনি। একপর্যায়ে আলোর দেয়ালিই তার মস্তিষ্কের ভেতর প্রবেশ করে। খুব হাঁপিয়ে ওঠেন। চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িবর্গার ভেতর থেকে টেনে তোলেন অনেককালের সময় সাক্ষ্যের ইতিহাস। যথোচিত উপায়ে সব কাজ চলে। একসময় রাত গাঢ়তর হয়। শান্ত হয়ে আসে পাড়া। কালি সরে গিয়ে আবার এক ফর্সা প্রকৃতি উন্মুখ হতে চায়। তবে সে ফর্সা ‘শাদা’ নয়। চলাচল থেমে গেলে বাড়ি জুড়ে কনকন সুর আর দুদ্দাড় আওয়াজের তোড় ওঠে। কেউ খোঁজ নেয় না আবেদ দর্জির। সে চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমায়। ঘুম তো শন্তির শাসন। আর মগজে যে আলোর মায়াজাল নিয়ে তিনি শুয়ে আছেন তা তো প্রশান্তিরই। মুরগির ঝোল আর আউশধানের মোটা চালের ভাত ঘুমকে আরও নীচের দিকে টানে। তলিয়ে যায়। এ ঘরের সামনে দুইঘর উঠান। সেখানে ধীরে ধীরে হাটফেরত মানুষরা ভীড় করে। বিভিন্ন জিনিসের দর নিয়ে শলাপরামর্শ করে। কেউবা রাতে মাছ মারার জন্য জাল, হেংগা, ডারকি ঠিক করে। টিপ টিপ আলো জ্বলে। সে আলো কম কী বেশি তা কারো খেয়াল নেই। আলোর কাজও এখন কম। মুখ দেখাটাই আসল। ফলত তারও খুব দরকার নয়। পায়ের শব্দে মানুষ চেনা যায়, ঘুঘুর ডাকে অবস্থা বোঝা যায়। গলার শব্দে আহ্বান জানা যায়। আশ্চর্য ধ্বনি আর কানের অনুভূতি। প্রখর তার শব্দটান। কান থাকলে আলোর প্রয়োজন পড়ে না। তাই এ রাতে একে একে একটু ঢেউ খেলানো উঠানে বিভিন্ন বাহনে মানুষ এলে বা আলাপ আলোচনা হলে আলোর চেয়ে কানের কাজ আর মুখের বাক্য বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সেভাবেই একে একে উঁচু শান বাঁধানো বারান্দায় খাওয়া-দাওয়া চলে। উঠানে চলে আলাপ, আর বাইরে বিশাল খুলিতে গভীর ফর্শা। এর রূপ রাত বাড়ার সাথে সাথে একটু একটু করে বাড়তে থাকলে কাছারির পাশবারান্দায় আর একটি বৈঠক শুরু হয়। ভেতরের উঠানের আলোচনা আর এখানকার বৈঠকী আলোচনার মধ্যে অনেক ফারাক। সাধারণত বিড়ি বা কনডম বা দুধ টেপার বিষয়ে প্রাধান্য বেশি। মেয়েলি আলোচনাটাই নয় শুধু রাতের অপারেশানের নানা পরিকল্পনা থাকে তাতে। তবে বিশ্রম্ভালাপের সবচেয়ে উচ্চতর পর্যায়টি সিনেমার নায়ক ও নায়িকাদের নিয়ে। বিপরীতে খোলা প্রান্তরের হাওয়া উঁচিয়ে কাঁচা কাছারির অন্য বারান্দা। এ কাছারির জৌলুস নাই। এর সাথে লাগোয়া গোয়াল ঘর। সেটি খেড় দিয়ে ছাওয়া। চৌকোণ গোয়ালঘরের পিড়ালিটা সাধারণত শীতের রোদের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফর্সা রাতের কানসোনা আলোতে যখন দলবদ্ধ হয়ে এসব আলাপ চলে তখন কারো চোখ একটু প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দিলে চোখে পড়বে সবুজ কচি কোষ্টার ক্ষেত, বিশাল ইন্দিরার শান আর পাশ দিয়ে কাঁচা সবুজ রাস্তা। সেদিক দিয়েই আরোহীরা বাড়ির উঠানে পা রাখছে। কাজের লোকরা ফিরতে ফিরতে হাঁক দেয়, কোনো বিশেষ ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। এই যখন রাতের অবস্থা আবেদ দর্জি তখন এক হয়ে অন্ধকারের ভেতরে চিৎপাতই আছেন। কোনো সাড়া নেই। স্বাভাবিক মানুষজন কিছু মনেও করে না। বিশেষ করে ঘুমন্ত মানুষের প্রতি কারো আগ্রহ থাকার কথাও নয়। গৃহিনী অজুর পর এশা শেষ করে, সকল কাজের ইতি টানবেন, নাতির ঘুমানোর জায়গা পরিবর্তন করবেন, তখন একটু ডাক পাড়েন। ‘কী হলো!’ ক্যা গো! নড়েন না। চিৎ মানুষের তখনও বুঝি আলোর রেখাসমুদ্র পাঠ করা হয় নাই। এসব কী তিনি পাড়ি দিচ্ছিলেন না ‘শাদা’র অর্থ খুঁজছিলেন? দর্জির জীবনে কোনো পাপ নেই। একটু বেশিই বেঁচেছেন, তার রেস্ট আরাম বা উৎপাতের বাইরেই তিনি থাকেন। যে শাদা তার চোখের সামনে ঝুলে থাকে, পলকের পর পলক যেভাবে মাঠ-তালদিঘি পেরোয়, বিলের বাতা পর্যন্ত ঠেলে নেয় সেখানে শাদা কাফনও কী এক হয়। শাদাতত্ত্বের ভেতরে নিজের মনের ধারাবিবরণী যখন আলোর রেখায় অভিষিক্ত হতে থাকে তখন কী হিক্কা ওঠে! কষ্ট হয়! বেলা পড়ে যায়। টুপ করে ফুটফুটে চাঁদ ডুবে যায়। সত্যিই গৃহিনী আর কোনো সাড়া পান না। ঠাণ্ডার ভেতর চাপ বাড়ে। অন্যরকম তার ঠাসা স্বাদ। এক্কেবারে নরোম ও নেওর নেওয়া। এমনটা তো সাপের গাও-ও নয়। চিক্কুর পাড়েন। চট করে গৃহিণীর আওয়াজ কাঁচা দেওয়ালে হোঁচট খায়। অনেক পুরনো কাঠের জানালার পাল্লায় আটকে যায়। কোনো  পর্দা থাকে না এ জানালায়। ছিলও না কোনোদিন। বাইরের জটলা তখনও একই গতির। আরও বাইরে যারা বিশ্রম্ভালাপে মাহেল তারা বেশ জমিয়ে বসেছে। গল্প চালিয়ে যাচ্ছে গানের দৃশ্যের বিচিত্র কাহিনির। এখানে সকলেই মত্ত মাতোয়ারা। একটু পরেই তারা বন্দরের দিকে হাঁটা দেবে। আজ শিষকাটার ধানের টাকার মজমা অনেক। কিন্তু মুহূর্তেই বিপরীত হাওয়া তৈরি হয়। ভেতর থেকে খবর আসে আবেদ দর্জি আর নাই। সকলেই ভাইঙা পড়েন। মুহূর্তের টর্নেডো যেন অনেক কিছুই ছিনতাই করে নিয়া গেছে। পুন্নি তখন ভাইস্যা ওঠে। তড়পায় এবং আরও পরিষ্কার হয়। গড়ে ওঠে নতুন ভাবমূর্তি। কেন সে এমন কইরা জাপটে ধরে তাকে। ওর তো বুনি ওঠে নাই। খুব নরোম নরোম আদরে সে কয়, কপাল তুই তো কপাইল্যা। তোর লগে চইলে যাম। মিষ্টি হাসিতে তার দম ফাটে। কদুর তেলে ভেজা জবজবে পাতলা চুলের লম্বা বিনুনি। সেটি দুইলা ওঠে। সাপের মতো গোটা পীঠ জুড়ে হাটে। ইঙ্গিত করে। ছন্দে দোলায়। উঁচু জামবৃক্ষের প্রশাখার ন্যায় আস্তে আসে বেণী দোলায়। তার ফাঁক দিয়া আলোর কিরণ নাকি যৌবনের ধূপ বিলায় বোঝা যায় না। হতে পারে কটাক্ষের ত্রপামাখা নিক্ষিপ্ত তীর। সরমে ছিন্ন সে। জামপ্রশাখা ফলবান কিন্তু ছুঁইতে দেয় না সে ফল, পুন্নিও ছুঁইতে পায় না, অপাঙ্গে তাকায়। ইঙ্গিতে ডাক দেয়। সে এবার নতুর রূপে কপালের সম্মুখে আনে। আবেদ দর্জির সঙ্গে। সে কী দর্জির প্রতিবিম্ব নাকি! কপাল ভয় পায়। আবেদ দর্জির মৃত্যু নিয়া যখন সবাই ব্যস্ত কপাল তখন পুন্নির ছায়ায় কম্পমান। বেঁধে নেয় সে তারে কঠোর বিহনে। হ, কত্তোকাল আমারে মাইরা খুব আরামে আছ। বিরহে পুড়মু কতোকাল। অন্যায় না কইরাই মারলা আমারে ডাক্তারের অবহেলার করো নাই প্রতিকার। আর কাউরে এ অবহেলার শিকার কইরো না। কী যে বিরহের জ্বালা। খুন করছো তুমি। খুনী হইয়াও তুমি আমার— চিরকালের আমার। এখনও তুমি তেমনিই আছ। এই মরাবাড়িতে করো কী! যে মানুষটার অস্তিত্বের কোনো জায়গায় নাই, সে হঠাৎ করে নায়কের আসনে আসীন হয়। পরের ঘটনা গুরুত্বহীন। সেই আবেদ দর্জির গোরজিয়ারত পর্ব নিয়া সকলে ব্যস্ত থাকলেও ‘কাল কেয়ামতের ময়দান’ কথাটা কপালের ভেতর থেকে নামে না। পুন্নির অবলা মন আর অবলা পশুর আওয়াজ আর লোকমুখে শোনা কাতর কথার ভেতর সে নিজেকে বুলায়, আদর করে মৈথুন করে। ক্যান ওই পশুটা কব্বরের পাশে বিরান পাথারে লেজ উঁচিয়া এতো উন্মত্ত হইছিল। বাওয়ানো এঁড়ে পশু তো ও নয়। কিন্তু কেন সে এরাম হইলো। হুজুর কয় গোর আজাবের তাপ ওই অবোলা বুঝতে পারছে। এই মাঘ-পৌষসন্ধ্যায় যখন নেতিয়া পড়িছে সবুজ আলো, পশ্চিমে গোধূলীর আলো বিলীন হচ্ছিল তখন ওই পশুটা জানতে পারে এই গোরে শব্দ হইতাছে। শুধু একটি নয় কয়েকটি পশু আশেপাশে একই প্রকৃতির আওয়াজে রোরুদ্যমান। সকলের ভেতরেই তখন একই উত্তেজনা দেখা গেছে। এবং সময়টাও একই। হুজুর এই দৃষ্টান্ত দেখিয়া বলেন, আবেদ দর্জির মতো পুণ্যবান মানুষের যদি এই অবস্থা হয় তবে ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ তোমার কী সাক্ষ্য চায়! হে মানুষ তোমরা বুঝিয়া লও। সেই ঘটনার পর নানাভাবে আবেদ দর্জির বাড়িতে ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। শুক্রবার, রবিউল আউয়াল কিংবা শবেবরাত, রমজান পূণ্যবান সময়ে আয়োজন চলে জেয়ারতসহ সাধ্যমতো মিস্কিন খাওয়ানোর কাজ। কপাল সুবেহ সাদেকে আজকের জেয়ারত শেষে এই পুণ্যবান মানুষটার পক্ষে নিজেও কিছু কাজ করে। কিন্তু হুজুরের ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ শব্দটা কপালের ভয় ভয় ঠেকে। কানের ভেতর দিয়া মরমে পশে। সেখানে যেন সে বসে পড়ে। বার বার হন্ট করে। কতো মানুষ মইরা গেল মরিয়া পচিয়া হাজিয়া গেল কিন্তু ‘কাল কেয়ামত… পুন্নি’ শ্যাষ হয় না। উদাসীন হয়ে সে সাঁতরায়, চিক্কুর দেয়, ইশারায় সেই শ্বেত জোব্বা পরিহিত ব্যক্তি তার কাছে আইসা কয় ‘এই বরফ চাঁদ আর জ্যোৎস্না তামাম আসমানে যিনি ছড়াইয়া দেছেন তরতর কইরা জমিনে সাজাইয়া দেছেন তার লাগে ত্বর মন কান্দে, শিশুমনে তুই জপ কর, কাল কেয়মতে ত্বর আসান হইবে, মানুষকে শেখা, মনকে ভেজা, পাগল মনের হাহাকারকে নিষ্ঠুরতায় বাইন্ধে রাখ’—এমন আলাবোলা আওয়াজের পর সব ফর্সা হইয়া যায়, জ্যোৎস্না আর চাঁদ তখনও দূরে হাসে, সোনালী সিংহের গল্পে ডাক পাড়ে আয়-আয়…, আয়-আয়…! আবেদ দর্জির তারপর চাঁদের পাল্কীনায়ে ভাসেন, চাঁন্দের কারিগর খোঁজেন, চাঁন্দবদনী চান, মাইনসে মাইনসে চাঁন্দের ফেরী করেন আর কন ‘আইসো চান্দের পাল্কীতে/ ভাইসো সোনার পঙ্খীতে, যা আমার যামিনী/ চইড়া চল কামিনী’। সেই আবেদ দর্জি জ্যোৎস্না নিয়া কতো গপ্পো বানান, সকলকে ঠেইলে লইয়া যান চান্দের দ্যাশে। এসব গল্প এখনও আওয়াজ তোলে এই চান্দনিভা সুবেহ সাদেকে। কপাল সেই অবলার তরে জাম গাছের কথা পাড়েন, সত্যিই আবেদ দর্জির তো এমন গোরআজাব হওয়ার কথা নয়। শোনা যায় সত্যিই তিনি জ্যোৎস্নাপাগল মানুষ আছিলেন। মানুষের লগে চন্দ্রকারিগরের কাহিনি বলা, আর ওই পুকুরপাড়ের সাদা মানুষের বাণী প্রচারই তার কাজ ছিল। তার সুনামও বয় তাতে। শোনা যায় দেখতেও তিনি ছিলেন জ্যোৎস্নার মতোই। হাহাকারের পানশালায় তার ভোজ নিত্যদিন। সেই হাহাকার ছইড়ে পড়ে মনের স্বাস্থ্যে। সেভাবেই তিনি গত হন। তার ভক্তকুল এমন মৃত্যুতে বেহুঁশ হইয়া কান্দে। অনেক মানুষের ভেতরে সে মৃত্যুকাফেলায় ব্যতিক্রমী ছিল পাড়ার সকল শিশুর আগমন ঘটে। শিশু তো নয় পুন্নির চেহারা। পুন্নির ভরে কপাল তাকায়। শিশু নাকি পুন্নি, পুন্নি নাকি শিশু সব পুন্নিই তার শবকে ঘিইরা রাখে, চিইনা কয় ইনিই সেই চান্দবুড়া। চান্নিতেই তার গোসল হবে। অদ্ভুত সব আলোমাখা আয়োজন। সে আলোতে বর্ণালী বয়, হাওয়া বন্দ হয়। গোলাপজল ছিটায়। কাপড়ায় পড়্ পড়্ শব্দ করে। টস্স্যা নাগা টরটরা চোখে কোঁকড়া কোঁকড়া হাতপায়ে ঝ্যালঝ্যালা চামড়া সাট্ হয়্যা থাকে। গোছল দেও, কাপড়া পরাও, কাফেলায় তোল। সেই তোলা মানুষটার কাল কেয়ামতের বিচার শুরু হলে— সে নাকি ঘ্যাঙগায়। পুন্নির লগে আসপি। পরে দেখা হবি। ভুল বকে। কপাল কব্বরের পাশে গিয়া জল ফেলে। কেটা যে কয় ওটি গোরআযাব হওচে। কিন্তু কপাল খুঁজে পায় না কিছু। খালি হাতড়ায়, আর হুলহুল করে কান্দে। টপটপ করে জল পড়ে, হায়রে সেইসব মানুষ! যখন তোকে ওখানে রাখি তখন তুই আগামী কঙ্কাল, আর কত্তোদিন কপাল তার লগে পইড়ে আছে।…

.

ভূমিকা : বাংলাদেশের উপন্যাসের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য (২০১০)    [‘রাজনৈতিক চেতনা : বাংলাদেশের উপন্যাস’ (২০০৩) গ্রন্থের পরিবর্ধিত অন্বেষা সংস্করণ]
সাহিত্যের নবীন শাখা উপন্যাস, উপন্যাস মানুষের জীবন সমগ্রতার রূপায়ণ। উপন্যাস মহাকাব্যের পটভূমি তৈরি করে। সাহিত্যের যে আঙ্গিকে উপন্যাসের জন্ম সেখানে একথাগুলো নির্বিচারভাবে সত্য। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সাহিত্যে উপন্যাসের আবির্ভাব দেরিতে; বাংলা সাহিত্যেও তাই। কারণ, বোধ করি, উপন্যাসের জন্মের সময়ের সমাজবাস্তবতা। সমাজস্তবিন্যাসে সৃষ্ট পুঁজিবাদই উপন্যাসের ব্যক্তিকে তৈরি করে। ব্যক্তির আত্মমুক্তি, তার সমাজ সংশ্লি¬ষ্টতা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ পরিকাঠামোয় তার জীবন সম্ভাব্যতা যাচাই ইত্যাদি উপন্যাসের একটা বিবর্তনশীল সময়কে ধরে। আর সেই সময়ের সূত্রই উপন্যাস তার আঙ্গিককে নির্মাণ করে। কথাগুলো বলার অর্থ, উপন্যাসের জন্য নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া নয়। ব্যক্তি মানুষের রাজনীতি চেতনার সংশ্লি¬ষ্টতা যাচাই এবং অনিবার্যভাবে সময়বাস্তবতায় রাজনীতি অনুষঙ্গি মানুষটি কিভাবে উপন্যাসের আঙ্গিকে বাণীবদ্ধ হয় তা নিরূপণ করবার প্রচেষ্টা। এ গ্রন্থে অনেকবার বলা আছে, আধুনিক গণতন্ত্রের ফসল উপন্যাস। সুতরাং তার অন্বিষ্ট যে ব্যক্তিমানুষ এবং আধুনিক সময়ের যে ক্ষয়িষ্ণু , রোগজর্জর, অস্তিত্বে সংকটাপন্ন ব্যক্তিমানুষ; সে নিত্যদিনের জটিলতা এবং ব্যাপকভাবে তার এ আচ্ছন্নতা, বিপর্যস্ততার কেন্দ্রভূমিতে বসে আছে যে রাজনীতি— এ রাজনীতিই তাকে চালাচ্ছে, গঠন করছে, পাদপীঠ তৈরি করছে, হুংকার দিচ্ছে স্বেচ্ছাচারী বানাচ্ছে, স্বার্থপর করে তুলছে ইত্যাদি। কিংবা শুধু নেতিবাচক নয় ইতিবাচক ভঙ্গিতে কখনো তাকে মানবতাবাদী স্লোগানে উদ্দীপ্ত করছে, কখনো সাম্যবাদের পথে ইঙ্গিত দিচ্ছে আবার কখনোবা ব্যক্তির পরিশীলিত মননধর্মকে উস্কে দিয়ে শুদ্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব বিচিত্র জগৎ জীবন ভাবনায় তার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে এক বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি। জীবনবাদী হয়ে ইহলৌকিক জ্ঞানকে বড় করে নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছে সে। সর্বসাকুল্যে কোনো বিশেষ প্রথাবদ্ধ ও ধর্মবুদ্ধির জ্ঞানে নয় মননঋদ্ধতায় সভ্যতা ও প্রগতির অংশীদার যেমন সে হতে চায় তেমনি বৃহত্তর অঙ্গনে ছড়িয়ে ত্যাগে-অনুসন্ধানে নিজের অস্তিত্বকে মহীয়ান করে তুলতে চায়। এটা নিশ্চয়ই, তার ব্যক্তির সমষ্টিতে বিলীন হওয়া কিংবা ব্যক্তির নিজেকে বড় করে তোলার সচেষ্টতা। এ সমস্ত জীবন ভাবনা কিংবা তার সাহিত্য উৎপ্রেক্ষার নাভিমূলে রয়েছে রাজনীতি। সুতরাং এটা স্পষ্ট, আধুনিক সমাজে রাজনীতি চেতনা ব্যক্তিমানুষের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে প্রচণ্ডরূপে স্পৃষ্ট। আর ব্যক্তিমানুষের বৃহত্তর যাপিত জীবনের তৎপরতায় এ সৃষ্ট চেতনা দারুণরকম সক্রিয় এবং প্রাখর্যতায় পূর্ণ। এ সমস্ত বিষয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত সম্পর্কিত রয়েছে উপন্যাসের। তার জন্মের পটভূমিতেই এ ইঙ্গিত স্পষ্ট। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিমানুষ রাজনীতি জানেনা বা তার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বসতি নেই এমনটা কেউ মনে করবে না। কারণ, ব্যঙ্গ বা পরিহাসপ্রিয়তা যা-ই বলি যারা বিত্তহীন, বস্তিবাসী কিংবা বিচিত্র পেশার শ্রমজীবী আজকাল পার্টি বা ভোট বোঝে না এমন কেউ নেই। মন্ত্রী-সরকার-ক্ষমতা এবং তার অবহিতি, শ্রেণীচরিত্রের খবর সবাই রাখে। উপন্যাস কমিটেড হয়ে বৃহত্তর জীবনকে তার আঙ্গিকে ধরে। সেজন্যই বুঝি উপন্যাস জনপ্রিয় এবং সিরিয়াস দুরকম ধারায় গৃহীত।
বাংলা উপন্যাস দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ অনেক বড় বড় প্রতিভা তাদের চর্চায় উপন্যাসকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছেন। এবং তাদের চর্চার মধ্য দিয়েই এটা অনুমান মেলে, উপন্যাসের রাজনীতি অনুষঙ্গ কিংবা ব্যক্তিচেতনায় রাজনীতি কতো অনিবার্য ও গুরুত্ববহ বিষয়। এ গুরুত্ব কালে কালে বেড়েছে, কারণ উপন্যাসই সে পথ এগিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের উপন্যাস সময়ের ইতিহাসে বা ধারায় সাতচল্লি¬শ বা দেশভাগ-পরবর্তী সময়। এ গ্রন্থটি এ সময়ের উপন্যাসের রাজনীতি চেতনার বয়ান। উপন্যাসালোচনায় সরাসরি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, রাজনৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ উপন্যাসগুলো এসেছে। এক্ষেত্রে বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও পৌরাণিক ভাবনায় রাজনৈতিক চেতনা এবং তার মাত্রিকতা বিশ্লেষণের চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের উপন্যাসগুলোর একটি বিষয় লক্ষণীয়, সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে বসে লেখকরা ফিরে যাচ্ছে প্রদোষে প্রাকৃতজনের শ্রেণীচেতনা বয়ানে কিংবা কালকেতু ফুল্লরা, ভুসুক্কু-কাহ্নপাদের কালে। আবার কোনো উপন্যাসকার বৈষম্যের অবগুণ্ঠনে কৈবর্তদের কাল, ইহুদিপুরাণ, কালের পাপের সন্তানদের পুনর্গঠন (reconstruct)  করেছেন। রাজনৈতিক চেতনার ধারণায় চরিত্র গঠন তার মনোস্তত্ত্ব বিধৃত হয়েছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। তবে এমনটা সিদ্ধান্ত আসে, গ্রন্থের বিবৃত উপন্যাসের সময়কাল খুব উত্তঙ্গমুখর কিন্তু যথার্থ শিল্পসফল উপন্যাসের সংখ্যা নিতান্তই স্বল্প। পরিপক্ব শিল্পচেতনার অভাব এবং সচেতন দূরত্ব অনেকেই অনুসরণ না করায় উপন্যাসগুলো হয়ে উঠেছে কখনো আবেগের বুদবুদ কখনো সময়ের চালচিত্র, কখনো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সেজন্য দেখা গেছে একজন ঔপন্যাসিক অনেকগুলো উপন্যাস লিখেও কৃতি উপন্যাসকার হিসেবে স্বীকৃতি পান না। অনেক ক্ষেত্রেই চরিত্রের স্বাভাবিক বিকাশ, বিশ্বস্ততা খর্ব হয়ে উদ্দেশ্য সাধনই যেন চরম বলে গৃহীত হয়েছে। সেক্ষেত্রে এখানে প্রতিনিধিত্বমূলক উপন্যাসগুলো এনে কিংবা কালের ধারায় লেখকদের চিহ্নিত করে তাদের ইতিবাচক দৃষ্টি মূল্যায়নের প্রয়াস রয়েছে। তবে এমনটাও সত্য, হয়তো অনেকের বিবেচনায় মনে হতে পারে আরো কিছু রাজনৈতিক চেতনাধর্মী উপন্যাস সংযোজন হতে পারত।
গবেষণা গ্রন্থটি সাতটি অধ্যায়ে বিভাজিত। প্রথম অধ্যায়ে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের পূর্বাপর রাজনৈতিক ইতিহাস এবং তার বিস্তৃতি ঘটেছে ১৯৯৫ পর্যন্ত। এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দ্বিজাতিতত্ত্ব; ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং সেক্ষেত্রে বাঙালির রাজনীতি সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস এ অধ্যায়টি। বাংলাদেশের উপন্যাসে রাজনৈতিক চেতনার পটভূমি বিশ্লেষণই এ তাত্ত্বিক অংশটি গুরুত্ব। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিবৃত হয়েছে সাতচল্লিশ-পূর্ববর্তী সময়কালের রাজনৈতিক চেতনার বিবর্তিত রূপ। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বাংলা উপন্যাস কী ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনাকে গ্রহণ করেছে এবং তার রূপায়ণ কেমন সেটা অনুসন্ধান করা হয়েছে। এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য বিভাগোত্তর কালের রাজনৈতিক চেতনানুষঙ্গকে একটা ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দেখানো। তৃতীয় অধ্যায় দেশভাগ বাস্তবতার বিষয়ানুগ উপন্যাসগুলো। এরপর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস নিয়ে চতুর্থ অধ্যায়। হয়তো এমন উপন্যাস আরও ছিলো এবং এর আলোচনার পরিধি আরো বাড়ানো যেতো, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই চর্বিতচর্বনের আর প্রয়োজন মনে হয়নি। তবুও কিছু উপন্যাস যে বাদ যায়নি সেটা বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা যেমন খুব বিশাল তেমনি তার তাৎপর্যও বহুমুখী। এমন উপন্যাস লেখা হবে একদিন তখন এ অধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাসগুলোও হয়তো নেহাৎ উপন্যাসই মনে হবে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য শিল্পসফল উপন্যাস যেহেতু এখনো লেখা হয়নি সেজন্য এ অধ্যায় যাঁদের আলোচনা এসেছে তারাই আমাদের বিবেচনা, অনুমনি করি। পঞ্চম অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার স্বরূপ উন্মোচনের প্রচেষ্টা। ছোট্ট এ অংশে সত্তর-আশি-নব্বুইয়ের লেখকদের রাজনীতিচেতনা বিশ্লেষণের প্রয়াস। তবে এ অংশটি পূর্ণাঙ্গ নয়; কারণ বোধ করি যথার্থ উপন্যাস খুঁজে না পাওয়া। পরবর্তী অধ্যায়ে উপন্যাসে ইতিহাসে-ঐতিহ্য-পুরাণ পুনর্গঠনের কথা আগেই বলেছি। এ অধ্যায়টি রাজনৈতিক চেতনার বিশ্লেষণে খুব গুরুত্ববহ। উপন্যাসের আঙ্গিক নিয়ে বলা হয়েছে সপ্তম অধ্যায়ে। বিষয় অনুষঙ্গি আঙ্গিক নির্মাণ বা আঙ্গিকের সফলতা ব্যর্থতা উপন্যাসে সময় প্রসঙ্গ ও চেতনাকে তুলে আনে। এ জন্যই এর বিশ্লেষণ জরুরি। তবে অনেকগুলো উপন্যাসের আঙ্গিকের নিরীক্ষা করা সমস্যাসংকুল বটে। সেজন্য বিষয়ভিত্তিক বিবেচনায় সময়ের সঙ্গে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎকেই মূলত মূল্যায়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে খুব অনিবার্যভাবেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম এসে পড়েছে।
আমার এ গ্রন্থটি রাজনৈতিক চেতনা বিশ্লেষণের সময়কাল (১৯৪৭-৯৫)। এ সময়ের মধ্যে লিখিত রাজনৈতিক চেতনাধর্মী উপন্যাসগুলো নিয়েই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। গ্রন্থটি রচনার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ২০০২ সালে আমাকে পিএইড. ডি. ডিগ্রি প্রদান করে সম্মানিত করেছে। ১৯৯৭র জুলাই মাসে এটির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। আমি ২০০১ সালে কাজ শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেই। আমার অভিসন্দর্ভের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর চৌধুরী জুলফিকার মতিন। বিষয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে পুঙ্খানুপুঙ্খ পাণ্ডুলিপি পর্যবেক্ষণ করে, পরামর্শ দিয়ে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন। অভিসন্দর্ভটির পরীক্ষক ছিলেন ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগের বিদ্যাসাগর প্রফেসর ড. পল্লব সেনগুপ্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর রফিকউল্লাহ খান। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে আমার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকের কাছে পেয়েছি সার্বক্ষণিক সহযোগিতা ও কাজের অনুপ্রেরণা। অভিসন্দর্ভটি রচনার কালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা পেয়েছি প্রফেসর সফিকুন্নবী সামাদীর নিকট। এছাড়া গবেষণাটি গ্রন্থে রূপ দিতে তাঁর আগ্রহ ও সহযোগিতার কথা ভুলবার নয়। গ্রন্থটির সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই স্বীকারযোগ্য। রাজশাহীতে বসে উপন্যাস সংগ্রহ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এসব সমস্যা উত্তরণে যথাসাধ্য চেষ্টার মাঝেও বলতে হয় সমস্ত ব্যর্থতার দায়ভার আমার নিজের। শেষে জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশনের কমল কান্তি দাস ও মোরশেদ আলমকে ধন্যবাদ জানাই এমন কাজ হাতে নেবার জন্য।

.

প্রস্তাবনা : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মানুষ ও কথাশিল্প (২০১০) [কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস  গ্রন্থের পরিবর্তিত  রূপ]
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জীবনবাদী ধারার কথাশিল্পী। তাঁর রচনা স্বল্প। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যে তিনি ভিন্ন প্রবণতার পথিকৃৎ। ইলিয়াস লিখেছেন ষাটের দশক থেকে। ১৯৭৬ এ তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ বের হয়। অন্য ঘরে অন্য স্বর। তাঁর উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই লেখা শুরু ঊনসত্তরে; পরে পঁচাত্তরে এসে ‘দৈনিক সংবাদে’ ধারাবাহিক বের হয়, ছিয়াত্তরে রাজনৈতিক কারণে তা বন্ধ হয়, পরে ‘সাপ্তাহিক রোববার’ দীর্ঘদিন ধরে তা ছাপে। অন্য উপন্যাস খোয়াবনামা বের হয় ১৯৯৬-এ। আমাদের এ আলোচনায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মানুষ-শিল্পের পরিধি বিচার, প্রকৃতি নির্ণয়, এবং এতদ্সংক্রান্ত প্রকরণ আলোচনা গৃহীত। এখানে লেখকের চারটি গল্পগ্রন্থ ও দুটো উপন্যাস নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্যের বিবর্তনশীল ইতিহাসকে বিবেচনায় এনে সমাজের ভিত রচনায় প্রবৃত্ত হন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এক্ষেত্রে তিনি সফল পথপ্রদর্শক বলা চলে। বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল সমাজে রাজনীতি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে, শোষকদের খোলস এখন নানামাত্রিক, কখনো সামরিক-আধাসামরিক-বেসামরিক, কখনোবা মৌলবাদী তাণ্ডবে। এ অপ-প্রক্রিয়ার সমাজে ব্যক্তি ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে ‘গুবরে পোকায়’ পরিণত। গ্রাম-শহর পর্যায়ে বৈষম্য আকাশচুম্বী, নিরাপত্তহীনতা নানামুখি, সমাজ-শ্রেণিস্তরে হতাশার ভেতরে এক রকমের সংস্কার-কুসংস্কার-দ্বিধা-বিজ্ঞানহীনতা গ্রাস করেছে। বেড়েছে ভোগবাদ, অবাধ প্রযুক্তির পণ্যবিলাসিতা। এ অনিবার্য তৎপরতার জাদুখেলায় ক্ষমতা আর স্বার্থবুদ্ধির চক্রান্ত শাসক সম্প্রদায়ে নানামুখি। প্রতারণা আর বঞ্চনার এ ক্রম-ব্যাপ্তির মুখে একজন সাহিত্যিকের দায় কি? কী-বা তাঁর প্রকরণ?  এ প্রবণতায় বাণিজ্যমুখি অলেখকের মাঝে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পরিশ্রম সমীপে প্রকরণে প্রয়াসে অবতীর্ণ হন। প্রদান করেন দ্বান্দ্বিক সময়ের মেসেজ। তাঁর সমগ্র রচনার আঙ্গিক, এ সময়ের স্পন্দনশীল চরিত্র। যারা অবিকৃতরূপে নিজস্ব ভূমিতে তাৎপর্যপূর্ণ বেড়ে ওঠে। এখানে গল্প-উপন্যাসের বিষয়ের পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা রয়েছে কয়েকটি অধ্যায়ে। প্রথমে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এরপর সমাজ-অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে। ব্যক্তিমানুষের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতির অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা এখানে রয়েছে। পারিবারিক মূল্যবোধ এবং কথাশিল্প বিষয়ক পৃথক আলোচনাও এ পাঠে রয়েছে।

প্রসঙ্গকথা : বাংলাদেশের  কবিতার  সংকেত  ও  ধারা
এক দশকেরও বেশি কবিতার ক্লাসে আছি। যখন অনতিকিশোর তখন “রূপসী বাংলা”কে অবচেতনে গ্রহণ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কবি-সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ, আর তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি জীবনানন্দকে। এসবের কোনো যৌক্তিক উত্তর নেই। কিন্তু যুক্তিটা তৈরি হয় ক্রমশ পাঠদানের ভেতর দিয়ে। বলতে হয়, কবিতা কী-কেন-কিসে-কীভাবে এর ‘ক্যাজুয়াল’ স্বরূপ, গ্রহণ-বর্জন, সমাজ-সংস্কৃতি-দেশ-মাটি-মানুষ এসবের বাইরে প্রয়োজনীয়তা, আনন্দ, ‘অলৌকিক আনন্দ’, অনির্বচনীয়তা ইত্যাকার অনেকানেক প্রশ্নজিজ্ঞাসাকে আলিঙ্গন করেজ্জএ মন; কখনো পাঠ-অভিজ্ঞতায়, কখনো আবেগের প্রবাহে। এবং এখনও তা চলছে। খুব ভালো লাগে, মুগ্ধ হয়ে যাইজ্জ‘নতুন কবিতা’ বা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলন দেখে। এর গোড়াতেই খোঁজ মেলে বাংলাদেশের কবিতার। পঞ্চাশ-ষাট তো মনোমুগ্ধকর ব্যাপার। আর মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলাদেশে কবিতার তো ‘প্রাণপাত’ দশা। অনেক কবি, কবিতার পারাবাত কতো রকমের! এর মধ্যে আত্মত্যাগী এবং মেধাবী অনেকেই। দীর্ঘ রাস্তায় এ বাংলার কবিদের প্রকরণ-প্রবণতা নিয়ে ভাবতে থাকি। কিন্তু সে অনেক কঠিন কাজ। বাংলাদেশের কবিতা বিষয়ে আশির কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বোধটা আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়। এছাড়া যাঁরা এ বিষয়ে গ্রন্থ লিখেছেন প্রবন্ধ লিখেছেন, তাঁদের বোধ-বিবেচনা আমাকে একটা এ-বিষয়ক কিছু করার প্রেরণা যোগায়। সে কারণেই এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী মুখ আমাকে বেশি অনিবার্য করে তুলেছে, এ কাজে। কিছু হয়ে থাকলে সেটা তাঁদের, আর না-হলে অবশ্যই সে ব্যর্থতা আমার।
বাংলাদেশের কবিতার পঞ্চাশ বছরের ধারা নিয়ে এ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ। এমন আলোচনা অনেকের সঙ্গে দ্বিমতের জন্ম দিতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মতানৈক্য। আলোচনাটির সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যুক্তিসঙ্গতভাবেই আলোচনার চেষ্টা আছে। আর চেষ্টার প্রতিকূলতা যে নেই, তা কে অস্বীকার করবে? সেজন্য এখানে এ বিবেচনাটি থাকছে, এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো আলোচনা নয়। সমসাময়িক এমন কোনো বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ আলোচনার জন্য আরও সময়ের অপেক্ষা জরুরি। এটি শুধু সূচনামাত্র। এছাড়া এ পর্যায়ে আর কি বলা যেতে পারে! তবে এ বিষয়ক মতামত ও পরামর্শ আমি সকলের কাছে কামনা করছি। এখানে শুধু কবিরাই নন, কবিতা বিষয়ক যে কেউ এমন মতামত পোষণ করতে পারেন। ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ বিষয়ক পৃথক আলোচনা আছে। বাংলাদেশের কবিতা-অঙ্গনে তাঁরা এখন যে অপ্রতিরোধ্য, এটা স্বীকার্য। সেজন্য একটু পৃথক ব্যবস্থাপনা এখানে রাখার চেষ্টা হয়েছে। এ গ্রন্থে ত্রিশোত্তর কবি জীবনানন্দ-সুধীন-বুদ্ধদেব নিয়ে প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট হয়েছে। আমাদের কবিতাধারাকে চেনার জন্যে এঁদের পঠন-পাঠনের ব্যত্যয় নেই। এছাড়া কবিতা-বিশ্লেষণের পরিধিতে রবীন্দ্র-নজরুলও আছেন। ষাটের কবি সিকান্দার আবু জাফর, সত্তরের কবি আবিদ আজাদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রবন্ধ পূর্বে প্রকাশিত নানা জায়গায়। গ্রন্থভুক্তও ছিল কিছু প্রবন্ধ। এখানে আবার পুনর্মুদ্রিত হওয়ার কারণ, স্রেফ বাংলাদেশের কবিতাধারাকে চেনার স্বার্থে। এ কাজটা সব কবির ভেতর দিয়েই যাতে সম্পন্ন হয়, সে কারণেই। অর্থাৎ এটি ‘আমার’ কবিতাভাবনা। অহংবৃত্তটি আমি ভাঙ্গতে চাই, সেজন্যই মিনতি—এ বিষয়ক মতামতের জন্য।
আমাকে এরকম কাজে সবসময়ই অন্ধ সমর্থন দেন, আমার প্রিয় ছাত্র, সহমর্মী-বন্ধু, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক রহমান রাজু—নশ্বর পৃথিবীর ‘লেনদেন’ কোনো কিছুই চলে না তাঁর সঙ্গে। আমার বিবেচনায় এ পরিসরে তাঁর নাম উচ্চারণ খুবই দুরূহ, হয়তো চিত্তে-বিত্তে— সে স্থানটি অনেক উঁচুতে বলেই। অন্যান্য ছাত্রবন্ধুদের আশীর্বাদ গোচরে-অগোচরে আছে, তাঁরা নক্ষত্রের মতো সমাসীন। দূরে থাকলেও খুব কাছের—কেন যেন আমার কাছে নানাভাবেই থাকেন তাঁরা। অবশ্য এটা ঠিক ওঁরা সবাই কবিতাপ্রেমী।
যেহেতু ‘চিহ্ন’-প্রকাশন এ বইটি করছে, সে কৃতজ্ঞতা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে।