স বু জ আ গা ছা কি ছু

শেখ নাজমুল হাছান

অপ্রতিবিম্বিত ছবি

আঁধারে নিমজ্জিত হলো ঘর! দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্রতম; এটা তাই প্রাত্যহিক ঘটনা। নসিহত আছে অবশ্য, উন্নয়ন-জোয়ারজনিত জটিলতায় আঁধারে একটু-আধটু বুঁদ থাকতে হয়! নাহ্, আজ আর মোম জ্বেলে কিছু করব না। মনটা যেহেতু বড় পরিশ্রান্ত। ঘুমিয়েই বরং পড়ি। সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিছানা হাতড়ে দেহ সমর্পণ করি তার কাছে। বিছানায় অবাঞ্চিত কিছু ছিল না, সম্পূর্ণ ফাঁকা। যদিও সর্বত্র অন্ধকারের অনৈতিক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এমনকি আমাকেও জড়িয়ে ধরেছে নিñিদ্র ঘন আঁধার। তার সাথে জড়াজড়ি হয়েই শুয়ে পড়লাম।
গা এলানো মাত্র দেহটা আমার বিছানা চাদরে লেপ্টালেপ্টি হয়ে গেল। শবাসন নেওয়ায় খুব সুখবোধ করলাম, দেহে এত ক্লান্তি কখন এলো! আবহটাও অনুকূল, শান্ত, নিস্তব্ধ ভালো লাগার। চোখের পাতা অনায়াসে মণি দুইটিকে আবৃত করে ঢেকে দিল। ঘরের ভিতরকার অন্ধকার পাতলা হবার আর কোন সম্ভাবনা থাকল না। এই প্রেক্ষিতে কোন অপরূপ ও অভূতপূর্ব দৃশ্যকল্পনার একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মনোযোগ স্থাপন করবার প্রয়াস চালাই। এটা এক ধরনের গেম, মনোযোগ সুসংগঠিত করবার। এবং সুস্থিত মনে নির্দিষ্ট কোন বিষয়ের গভীর উপলব্ধি ক্ষমতা অর্জনের; দক্ষতার সাথে। তেমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য খুঁজি যার কল্পনা করা যায় সার্থকতার সাথে। কী দৃশ্য, কেমন দৃশ্য, কোন্ দৃশ্যকোনকিছুই নয়। বাস্তবিক অভিজ্ঞতার বাইরে কিছু কি ভাবা যায়? এমনই নিষ্ফল টলায়মান দৃশ্য খোঁজার অভিযান শেষ হতে না হতেই গাঢ় ক্লান্তিতে ঘুমঘুম ভাব আসে। অনেক মূল্যের বিনিময়ে আসে শান্তির নিবিড় ঘুম। আসবে বুঝি আমার এখন সেই ঘুম, তেমন প্রত্যাশিত ঘুম, যা মানুষ সর্বান্তকরণে চায়, আমৃত্যু আশা করে।
এই ফাঁকে ভেবে নেয়া যাক আগামী দিনের কর্মপ্রবাহ অথবা ঝুটঝামেলাহীন যৌন সঙ্গমের রোমাঞ্চকর ফিলিংস। পরিশীলিত আবহাওয়াটা আর রইলো না। অতর্কিত, অনাহূত এক শব্দ ভেসে এলো ‘চটটচ’! একবার, তারপর আবার, এভাবে মোট দুইবার শব্দ পাওয়া যায়। এবং পুনরায় সবকিছু আগের মত নিঃশব্দবোধ হলো! টিনের চাল দিয়ে যেন বিড়াল হাঁটে। কিন্তু এখানে টিনের চাল কোথায়! শবাসন গেমের একাগ্রতা চটে যেতে এইরকম আকস্মিক দুইটি শব্দই এনাফ। তা মোটামুটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অস্বাস্থ্যকরও বটে। ঘুমঘুম ভাব ও খেলার নিবিষ্টতা দখল করে হালকা বিরক্তি। প্লেন দুই ভ্রƒর মাঝে এক ভাঁজের উদয় হয়।
‘চটটচ’আবার এলো সেই! অনিয়মিত বিরতিতে হাঁটা অব্যাহত চলল, এবার আমার খুব নিকটে বোধ হয়, আর থামবে মনে হয় না। কষে একটা ধমক লাগাব ঐ শব্দের উদ্দেশ্যে, না উঠে টর্চ মেরে মেরে পরখ করব ঘরের ভিতর এবং ঘরের বাইরে, কিসের শব্দ। বিরক্তির মাত্রাটা যেহেতু চরম আকার পায়! টর্চলাইটটা যে থাকল কোথায়? শিথানে বালিশের কাছে নাই। তবে কোথায় থাকল? টেবিলে। না, টেবিলে রেখেছি বা দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। ঘরে টেবিল আর বিছানা ছাড়া অন্য কোন আসবাব নাই। ধ্যাত! একটা নিয়মসিদ্ধ ব্যাপারযখন যার প্রয়োজন হাতের কাছে সেই জিনিস পাওয়া যাবে না! বিরক্তি ছাপিয়ে রাগরাগ মত হয় আমার। আর একটু সন্দেহ মিশ্রিত ভয়। ফলে ভাবলাম চোখটা খোলা রাখি। খোলা চোখ সতর্ক অবস্থান নিশ্চিত করে। ভাবনার সাথে সাথেই চোখের পাতা উঠে যায়, মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে। চোখ খোলার পর মন খারাপের অনুষঙ্গ হাজির হয়। চোখ, চক্ষুপাতার বন্ধন মুক্ত হলেও দৃষ্টি আবৃত হয় ঘন সুতোয় বুনট দুর্ভেদ্য কালো পর্দায়। ঘরের অন্ধকার একটুকুও কমে নি। মনটা সত্যি সত্যি খারাপ হতে চায়। বিষণœ দৃষ্টি খুঁজে ফেরে অন্তত একটি আলোক রশ্মি, হোক বহুদূর হতে আগত ক্লান্ত, ম্রিয়মাণ। এই প্রত্যাশা মনের গহীনে নিষ্ফল গুমরে কাঁদে, কেঁদেই চলেপ্রত্যাশার সশরীর আগমন ঘটে না। এবার আমিও চৌকিতে হাত-পা আছড়ে শব্দ করি। চকিতে ফল হয়! অপ্রত্যাশিত শব্দটা থেমে যায়। ঘটনাটা কী, বুঝার চেষ্টা করি। কিছুই বুঝা হয় না; তারপরও মজা লাগে। বিনা উস্কানিতে ফুঁসফুঁস ভরে উঠে বাতাস! সুদক্ষ কবিরাজি ভাব এসে যায় বুকের মধ্যে! আমি তখন এমন ভাব তাড়াতে নিজের গায়ে নিজেই লম্বা করে ফুঁ দেই ফুঁ.উ.উ…’। আর অজান্তেই, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ শেষ হলো নাকি, মুখে এমন কিছু শব্দ করি যেন অশরীরী কিছুকে তাড়াচ্ছি। ‘হেই, হেঠ!’
আশ্চর্য! আশ্চর্য না হয়ে আমি আর কীই বা হতে পারি! আমি দেখলাম অদ্ভুত আঁধার, অদ্ভুতভাবেই দুলে উঠলো; অতঃপর স্থির! আমার মনে হলো, আমার মনে হলো স্থির জল আঁধার পুকুরের মাঝে ছোট্ট কোন ঢিল পড়ায় উপরি জলে মৃদু ঢেউ খেলে আবার ঠিক আগের মতই শান্ত হলো। ভাবনাজনিত জটিলতা নতুবা চোখের এই দৃষ্টিমায়ায় বশ হই নি, হওয়ার সময়ও মেলে নি তার আগেই আমি শুনতে পেলাম: আমি আইছি আপনে তাইলে টের পাইছেন; চিনছেন না আমারে?
একটা ভাঙা কণ্ঠ। এখনও বয়সের সাথে এডজাস্ট করেছে বলে মনে হলো না। কিশোরোত্তীর্ণকালে যেমনটা ঘটে থাকে। আমি যেমন কিছু টের পাই নি, আর কিছু দেখছিও না; চিনবটা কোন কচু! আমার শরীর একবারমাত্র কেঁপে উঠেই লোমগুলো সব দাঁড়িয়ে যায়। এত সহজইে ভয় পেতে আমার প্রেস্টিজবোধ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং লোমের গোড়ায় শিরশিরানির পর স্বাভাবিক নেতিয়ে আসে। আর মনুষ্যকণ্ঠ নিঃসৃত কথা আমি যেহেতু নিশ্চিত শুনেছি, তাই কে বা কার কণ্ঠ কনফার্ম হতে গলা সাফ করি, শব্দ করে কথা বলব বলে।
: আমি কিছু দেখতে পারতাছি না। কে তুমি? সামনে আসো।
: দ্যাখতাছেনই, কিছু বুঝতাছেন না। এইরকম উত্তর আসে আমার কথার পরিপ্রেক্ষিতে। আপনের চোখ সুজা শিনা বরাবর আমি ঝুলতাছি। বালা কইরে দ্যাহেন বালা।
এই পর্যায়ে আমার অন্যধারার, মানে জাগতিক ধারা নিয়ে সন্দেহ হয়। কেউ আবার আমার সাথে ইয়ার্কি মারছে না তো! যেহেতু মেসবাড়ি থাকি; গাঁইয়া বর্ডারও আছে। অতএব তাই যদি হয়, আমি মানসিকভাবে আরও সতর্ক অবস্থানে তুলনামূলক দৃঢ় হতে চেষ্টা করি। নইলে এইসব দুর্বলতায় হাসি-ঠাট্টার শিকার হতে হয় না?
: আরে বাপ, তোমার নামটা কওনা; বুঝতাছ না ঘরে আন্ধারকিছু দ্যাখা যায় নাকি?
: আমারও কুনো রঙ নাই, আলো নাই। মুন করেন এই আন্ধারটাই আমি।
: তাই নাকি? তো? আমি বিদ্রুপ করতে চাই। কিন্তু সে এইসবের কোন তোয়াক্কা না কওে বলা অব্যাহত রাখে।
: আমার ভিতরের বেবাক আলো চুইষে চুইষে খায়ে ফালাইছে দুনিয়াত থাকতেই। আন্ধার তনে আল্দা কইওে আমাওে দ্যাখপেন কিবেই?
স্ট্রেঞ্জ! কথার ছিরিটা খেয়াল করেছেন, কেমন ধারার। কিরকম অশরীরী লাগছে না পুরো বিষয়টাই। তদুপরি কেন জানি আমি কনফিডেন্স হারা হই না। ভয়-টয় তো নয়ই, কথায় রহস্যময়তার গন্ধ থাকায় আমার এক ধরনের মজা বরং লাগে। এর সাথে খেলা জমানো যাবে হয়তো।
: ঠিক আছে, তোমার নামটা বলো। কণ্ঠস্বরে তো মনে হয় না যে তোমার সাথে কোনদিন আমার কথা হইছে, কি তোমাকে চিনি। কথায় বিনয়ভাব এনে রহস্যভেদ করার নতুন কৌশল নেব বলে ঠিক করি। রহস্যভেদ কিন্তু হয় না। ও, ওর গতিতেই কথা বলে।
: আমার নাম পরিবর্তনশীল। এহন আমার নাম ত্রিশঙ্কু। আগে একবার নাম বদলিছিল। ভবিষ্যতে কী নাম অবো, না আর কুনো পরিবর্তন অবো না, জানি না।
: অ্যাই, তুমি কোন ত্রিশঙ্কুুর কথা বলছ? এ্যাই, সত্যি করে কও কে তুমি? আমি যারপর নাই বিস্মিত হই!
: পৌরাণিক রাজা ত্রিশঙ্কু। আপনে তার কথা জানেন, আমিই আগে চিনি নাই। মুন্ত্রের জুরে স্বর্গ পাইতে যে ব্যর্থ অইছে; এহন শূন্যে ঝুইলে আছে। আমি এহনকার দিনের বাস্তব ত্রিশঙ্কু।
দ্যাখছেন তাহলে অবস্থাটা কী! আমি তালাস করি কোন ‘গাঁইয়া’, আর সে কিনা আমার মনে হলো তখন, এ ভিন্ন ধারার মাল! তাচ্ছিল্য করে দূরে ঠেললে হয়তো কিছু মিস্ করতে পারি। অতএব আমাকে বিচক্ষণতার সাথে কথা বলতে হবে। কিন্তু আমি ঠিক কোন প্রসেসে ওর সাথে তাল মিলাব বুঝে উঠতে পারি না। মনে হচ্ছে ঠিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে আমার শবাসন গেম নিষ্পন্ন হয় না। আমি আমতা আমতা করি অটোমেটিক্যালি!
: কিন্তু তুমি কোন্ দুঃখে মানে বলতে চাইতাছি কেন, কীভাবে…?
কী কাণ্ড! অশরীরী ছায়া না ত্রিশঙ্কু সরাসরি এবার আমার উপর বিরক্ত হয়। এবং অবলীলায় বিরক্তি প্রকাশ করে; নাহ্, এ্যাত পশ্ন করেন ক্যা? আপনের কাছে কতা আজরাবার জন্যেই ত আইছি, নাকি? কতার মদ্যে বারাবারই এত হাত চালাইলে কতা কওন যায়!
লে ঠ্যালা, এখন তবে আমি কি করি! নিষ্ক্রিয় শ্রোতা হয়ে বসে থাকার পরিবেশ যে এটা নয়,তা কী দিয়ে বুঝাই ওকে। তাছাড়া কৌতূহল হলে সেটাকে চেপে রাখাই কি সহজ ব্যাপার হয়! আর দুনিয়ার এত মানুষ থাকতে আমার কাছেই বা আসা কেন? এইসব বিরুদ্ধ ব্যাপার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন জানি আমি কৌতুকবোধ করি। সত্যি বলতে কি, শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিত্ববোধের বিনা বাঁধাতেই আমি তার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসি। সে, অশরীরী ছায়া কিংবা ত্রিশঙ্কু নির্ভার কথা শুরুকরে।
: কিছু মুন কইরেন না, কতা কইতে আমার মেলা কষ্ট অয়তাছে যে। পানি তিয়েশে আমি ফাইটে যামু কহন ম্যান! শাহাদাত বরণ কইরে দুনিয়া ত্যাগের ঠিক আগে আগে আমার এইরম তিয়েশ নাগছে। শাহাদাতবরণকারী আত্মার কুনো কষ্ট অবার কতা না, আমার অয়তাছে। খাবার পানি পাইছিলামই, ডাইন হাতডা না থাহায় বাও হাতে পানি খাই নাই; বে-নামাজী সন্দেহে অন্য কারো হাতেও না। মুন করলাম, খানিক বাদেই স্বর্গসুধা যা শহীদেরা পান করে তাই দিয়ে তিয়েশ মিটামু। কর্মদোষে স্বর্গে যাওয়া ত অইলো না, পিপাসাও মিটল না। এইরম পানি তিয়েশ আমার দুনিয়ায় থাকাকালীন আর একবার অইছিল, মরণ দশা অইছিলামআপনে জানেন, সবাই জানে।
আমার স্মৃতিশক্তি সচল করার প্রয়োজনবোধ করি। আমি জানি, কোন্ ঘটনার কথা বলে ও? আমি জানি কোন ঘটনা এটা? স্মৃতিরা নিশ্চল, নিষ্পন্দ! মগজের কোথাও কিছু কাজ করে না। ওকে প্রশ্ন-ট্রশ্ন করেও কিছু জেনে নেয়া যাবে না। ধ্যাৎতিরি! চোখ বন্ধ করে ধ্যান-মগ্ন হওয়ার ভান করে ঘুমিয়ে পড়লে কাজটা কেমন হয়? অশরীরী বা ত্রিশঙ্কু পারুক প্যাঁচাল, একা একাই। চোখ বন্ধ করতে গিয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। আমার ভয় পেল। এক্ষেত্রেও আর প্রেস্টিজবোধ বাঁধ সাধতে পারল না। যদি ওর প্যাঁচাল বা গল্প না শুনে ঘুমিয়ে পড়ার অপরাধে আমার শিনার উপর চেপে বসে, শ্বাসরোধ করে? আমি নিশ্চিত, মারা যাব। আর সকালবেলা চাউর হবে আমি হার্ট অ্যাটাকেনা, ঘুমিয়ে পড়া যাবে না। যেকোন মূল্যে সজাগ থাকতে হবে। আমি নিজেকে সাধ্যমত সজাগ রাখি। ক্লান্তি ভুলে যাই। আমার দেহ শীত স্পর্শে হিমভিজে উঠছে।
অশরীরী হয়তো আমার এমন নিস্পন্দ ভাবনার অপেক্ষাতেই ছিল। দ্বিতীয় কোন নতুন ভাবনার সুযোগ না দিয়ে সে সরাসরি আমাকে বলে বসল: দ্যাহেন, আপনের ডাইন হাতডা একটু তুলেন।
আমি হাতটা তুলতে গেলাম, ও হুকুম করা মাত্র। কোন প্রকার বিবেচনা ছাড়া, যন্ত্রবৎ! সম্পূর্ণ হাত উঠিয়ে সোজা করার আগেই কিসের সাথে যেন তাল খায়; শক্ত কোনকিছু। ধাক্কার সাথে সাথে মৃদু ও ছোট্ট শব্দের‘ঠট’ তৈরি হলো। তার চেয়েও অবাক ব্যাপার, আঁধারের ভিতর কী যেন আমার বুকের উপর একবার বামে একবার ডানে; একবার ডানে একবার বামে; এইরকম আড়াআড়ি ঝুলা শুরুকরে। আমি আঁধার কণার কাঁপন টের পাই। কয় মুহূর্ত হাতড়ানোর পর আমি বস্তুটা ধরতে সক্ষম হই। আঁধার-শরীর স্থির হয়। হাত ঠাওরে বুঝিএটি একটি খাতা। আচ্ছা, হচ্ছেটা কী এইসব? আস্ত একটা খাতা সুতাবিহীন দোলনার মত ঝুলে কী করে? অতল ঘোরে আমি ঘুরপাক খেতে থাকি! তখনও আমি খাতাটা যেমন ধরেছিলাম, ধরেই আছিঅদৃশ্য, সে কথা বলে; হয়তো অশরীরী, দৃশ্যমান নয় কখনো।
: খাতাডা চোখের কাছে ন্যান, ইল্ল্যে সব আমার কতা। একসাথে দলা পাকায়ে দিলাম। দৃষ্টির সামনে ধইরে মেল করেন। খুঁইজে দ্যাহেন কিছু পান কিনা।
বিনা বাক্য ব্যয়ে আদেশ পালনে এরই মধ্যে আমি প্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি! তথাপি, খাতাটা চোখের কাছে আনতে গিয়ে থেমে যাই। এ কার পাল্লায় পড়া গেল; কঠিন ঠাট্টায় মেতেছে দেখছি আমার সাথে। আমি ইতস্তত বোধ করি: অন্ধকারেও কিছু পড়া যায় বুঝি! আমাকে দিয়ে এইসব কেন করানো হচ্ছেপ্রশ্নটা চাপা রইল। আমি বরাবর সন্দেহবাদী। ‘যুক্তি, যুক্তি’ বলে গলা ফাটাই তাই আমাকে এই নিষ্ঠুর অযৌক্তিকতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো কিনা ভাবি। সমস্ত বিষয়টাই অমীমাংসিত থেকে গেল। অথচ সে আমাকে আশ্বস্ত করেপড়া যাবে। কোন প্রকার যুক্তি-তর্কে না গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ পাওয়ার সুযোগ যখন এলো, তবে আর হাতছাড়া করি কেন? খাতা দৃষ্টির সীমানায় আনি। দেখি, বাস্তবিক কী ঘটে?
যা অবিশ্বাস্য, আপাতভাবে কিংবা প্রকৃতপক্ষে যা মনে হবে অযৌক্তিক, তাই ঘটে গেল বাস্তবে! আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আমার সামনে উদ্ভাসিত হলো লাল ফিতায় বাঁধা একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আঁকা প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা। ধুলো-বালি পড়ে মলিন! ফুলের ঠিক মাথার উপর দিয়ে লাল অক্ষরে লেখা ‘ঘঙঞঊ ইঙঙক’।
ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি হয়তো! এই প্রকার সন্দেহ মনে দানা বাঁধলে বাম হাত দিয়ে শরীরে চিমটি কাটি। মাপের বাইরে চিমটি পড়ায় জ্বালা শুর “হয় তৎক্ষণাৎ। সুতরাং আমি জেগে আছি এবং আলোর উৎস খুঁজি। না, উৎস নাই, পাওয়া যাবে কোত্থেকে? খাতা ধরে রাখা হাতটাই যখন দেখতে পাচ্ছি না! দুই হাত সক্রিয় করে প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা উল্টালে ফুটে উঠে একটি নাম ‘মোঃ গেন্দা মিয়া’। আরও কয়টি পাতা, সম্ভবত ক্যালেন্ডার প্রভৃতি ছাপা পৃষ্ঠা কয় অনুরূপ উল্টিয়ে দিলে, দৃষ্টিতে ধরা দেয় চার ভাঁজ কাগজ আঠা দিয়ে সাঁটা। আঠামুক্ত করে ভাঁজ খোলার পর জানা যায় মায়ের কাছে লিখিত চিঠি।
এই পর্যায়ে এসে আমি সম্মোহিত! কাজে কাজেই, অন্যবিধ পরিস্থিতি ভুলে যাওয়া আমার জন্য স্বাভাবিক। অর্থাৎ আমি ভুলে গেছি, অথবা ভুলে যেতে বাধ্য হই। আমার একটাই বোধ জাগে, অন্ধকার কণারা বস্তুত অটোমেটিক্যালি সুসংগঠিত ও পরে সুশৃঙ্খলিতভাবে প্রথমে অক্ষর, তারপর শব্দ, তারপর বাক্য হয়ে আমার দৃষ্টিতে ফুটে উঠছে। তারা কেউই স্থির নয়, চলমান।
অতএব, চোখের পলক ফেলা যাবে নাআমি ঊর্ধ্বশ্বাসে চিঠি পড়া শুরু করি।
‘বিসমিল্লাাহির রাহ্মানীর রাহীম’
হইতে
পাখিডুবি কওমী মাদ্রাসা
তারিখ: ২৪/০৪/০০
শ্রদ্ধেয় আম্মা,
তুমি বালো আছো? আল্লাহর রহমতে আমিও আছি। পরসুমাচার এই যে, আব্বার ইচ্চে পূরণ করিবার লাইগে তুমি আমারে মাদ্রাসায় পাডাইলা। আব্বা গত অওয়ার সুময় বইলে গেছে। মৃত মাইনষের ইচ্চে। আমি মইল্ল্যে, তাছাড়া আমার ছোট সুময় মাদ্রাসায় দেওয়ার মান্সিক করছ যেন বালা-মুসিবত না ধরে। কিন্তু আম্মাগো, তুমি আমারে কৈ পাডাইলা। জাগাডা যেন কীবা। আমার বালো লাগতাছে না কিছু।
আমার দিক কেমুন কইরে তাকায় সবাই! এইখানের বেবাকেই যেন কীবা! আমার খুব ফাফুর লাগে আম্মা। বাড়ি থেকে আসার সাথেই আমারে যি ১২৪০/= দিয়ে দিছিলা হুজুর নিয়া নিছে। এক ট্যাকাও আমারে দিল না। জান আম্মা, ঠিকমুতন খাবারও দেয় না দিনে দেড়বার কি দুইবার। নঙ্গরখানায় মাটির কাদা হাতে ফকিরের নাহাল লাইন ধরন নাগে। আমি খাবার চাইতে পারি না, শরম লাগে। যাও দেয়, অন্য ছাত্ররা তার অদ্দেকই আবার কাইড়ে নেয়। হুজুর ডেচকীর পাশে দাঁড়ায়ে মুচকে মুচকে হাসে, কিছু কয়না ত আরও চায়ে চায়ে দ্যাহে। আমারে তুমি উপেসি রাখছ কুনোদিন। আমি খিদে সইতে পারি না। আমাদের বাড়িত কি ভাতের অভাব! খাবার নিয়ে কাড়াকড়ি, খামখাম করা, ইল্ল্যে শরমের কতা না কওছেন! মানুষ হুনলে কি কবো!
আম্মাগো, মুনে কয় যেন জেলখানাত বন্দি আছি। চারপাশ দিয়ে টিনের বেড়া, একপাশে ছোট্ট টিনের এডা ঘরএডা দরজা ছাড়া আর এডা জানালাও নাই। কুনো সুময় বাইরে যাবার দেয় না। ৩০-৩৫ হাতের ঐটুকু ঘরের মদ্যে পরায় ১০০ জুন ছাত্রের থাকা খাওয়া! ঘরের ছক্কল দেখলে, তার তনে আমাদের গৈল ঘরে গরুগুলা সুখে থাহে! আমরা যে কি ঘরে থাহি! আমরা কুনো অন্যায় করছি কি! মানুষ যেন ছাগল-গরু! আমাদের খোঁয়ারে বন্ধ কইরে রাখছে।
আমার শরীলে আন্ধারে এডা হাত যেনবর খালি বিড়বিড় করে, আমি একটু ঘুমান ধরলেই। আমি ঘুমাইতে পারি না। কয়ডা বড় বড় ছাত্র আছে। আমার খারাপ সন্দেহ লাগে। আমার দম বন্ধ অয়ে যায়। ইচ্ছে করে পলায়ে যাই। আবার ভয় করে যুদিল ধরা খাই। তোমার মান্সিক, মরা বাপের ইচ্ছে তাও মুনে পড়ে। আমাদের ঘরের সামনে বাইর অওনের গেটের সাথে দুইতলা এডা বিল্ডিং। ঐডের নিচতলায় ছালার চট বিছায়ে লম্বা দুই সারি দিয়ে আমরা পড়তে বহি। দ্যাহ আম্মা আমি ক্লাস সেবেনে উঠছিলাম না; ঐডে বলে কুফরি পড়া! আমারে এহন উর্দু-জামাত ক্লাস তনে পড়ন নাগতাছে! হুজুর যুবক মানুষ, উঁচা-লম্বা, ফর্সা-সুন্দর, শিল্ল্যে মারা স্বাস্থ্য, মাথাত সাদা পাগড়ি, গতরে থাহে ফুল হাতা সাদা পাঞ্জাবি, হাতের উপর নীল রগগুলা দ্যাহা যায় মোটামোটা, ভাসাভাসা  দুই হাতি বেত নিয়া বসে দুই সারির মাঝ বরাবর, এক মাথায়। তাজুন, ছামারূন, রুম্মানুন এইসব উর্দু-আরবি জিকির পড়তে আমার বালো লাগে না। হুজুরের হাতে বেত, নীল রগ তাকায়ে দেহি। ডরে আমার হাত-পাও বরফ অয়ে যায়। বিল্ডিং এর উপরে তলায় এক ঘরে হুজুর থাহে। বড় হুজুর, আমি এহনও দেহি নাই, মদ্যে মদ্যে নাহি আহে, অন্য আর এক ঘরে থাহে। আরও নাহি এডা বিশেষ ঘর আছে, যেহানে মাঝে-মদ্যে কাউরে কাউরে নিয়ে হেদায়েত করে। কি হেদায়েত করে আমারে কেউ কয় নাই। আমারে সবাই পর পর ভাবে, দূরে দূরে রাহে!
আম্মাগো, আমার না কেমুন জানি সারাক্ষণ খালি ভয় ভয় ঠেহে! দুই ঘরের মাঝে খানিক খালি জাগা আছে। ফজরের পর উন্তি পাণ্ঠি-বাড়ি টেনিং অয়। হুজুর, দুই হাতে যহন দুই লাঠি নিয়ে ঘুরায়লাঠি, হাত, হুজুর, কোনকিছুই যেন আর চিনন যায় না। তিনি শিখায় পাণ্ঠি-বাড়ি। কেমুন আগুনের হল্কার মুত লাগে তারে তহন। আমার ডর লাগে। কওছেন তুমি, আমি কি এইসব মারামারি পীড়ে-পীড়ির মদ্যে গেছি কুনোসুম! আমার বালো লাগে না। আমি ফাঁকে ফাঁকে থাহি, ঠিকমুত টেনিং নিবের চাই না।
গতকাল সকালে কি অইছে জান আম্মা, আমারে ফাঁকে ফাঁকে থাহা দেইহে ত হুজুর ডাক দিল। আমি বলি: আমার ডর লাগে। হুজুরের হাত, তার হাতও গো আম্মা খসখসা, শক্ত, কব্জি পর্যন্ত বাল্লুকের মুত পশমআমার ডেনা ধইরে ঝাঁকা দেয়। তারপর গর্জে গর্জে বয়ান করেএতহন পাণ্ঠি-বাড়ি খেলায়েও এ্যাল্লা হাঁপায় নাই, গর্জনে যুদ্ধের মাঠ ঠা-া মাইরে যায়: মরদে মুজাহিদের শিনায় ডর শয়তানি আছর। আল্লাহর রাহে ক্কিতাল ফি সাবিলিল্লাহর প্রস্তুতিকালে ডরের বে-এখতিয়ারি প্রবেশ বরদাস্ত করন যাবো না। কারণ প্রত্যেক ঈমানদার মুসুল্লির জন্য ক্কিতাল ফরয করা হইয়াছে। আল্লাহ বলেছেন তোমাদের যার যার সামর্থ অনুযায়ী ক্কিতালের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমারও কি সাহস, আমি বইলে ফেললাম: আমার এইসব বালো লাগে না। সবাই এই কতা হুইনে আমারে যেনবর চোখ দিয়ে গিলে খাব, এ্যাবাহা কইরে চায়ে থাহে আমার দিহি।
হুজুর তহন কওয়া শুরু করে, আমি আর তার মেজাজ বুঝবের পারি না। তার বলকানো চোখের ধোঁয়ায় আমার চোখ ঝাপ্সা। আল-কুরানে আদেশ আছে তোমাদের উপর ক্কিতাল ফরয করা অইছে। যুদিও তা তুমগরে কাছে অপছন্দনীয়। তোমাদের নিকট কুনো একটি বিষয় হয়তো পছন্দনীয় নয় কিন্তু তা তুমগরে জন্য কল্যাণকর। তুমি জান না, আল্লাহ বালো-মুন্দ সব জানেন  বলতে বলতেই হুজুর, শরমের কতা আম্মা, আমার শরীল নিয়ে খেলা শুরু করে! সবার সামনেই তিনি আমার পাছা টিপে, বুকের দুধ টিপে ধরে! আমার শরীল-গাও বালো, সুন্দর থলথলা স্বাস্থ্য; তাই দেইহেইআমি যেন পুরুষ মানুষ না! কয় কি হুনছনূরানি বালক, তুমি ত বেহেশ্তী হুরের মুত নরম। এমুন শরীলে ত শয়তান বাসা বাঁধবই। তোমার হেদায়েত দরকার বালক, হেদায়েত দরকার।
হুজুরের মেসট করা দাঁত ঝকঝকা তরতরা লাগে। আমার ফর্সা মুখ রাগে-দুক্কে-শরমে লাল অয়ে যায়; চাকা চাকা জেদের মুত দর উঠে। আমার কি জেদ উইঠে যাব আম্মা, পুরুষ মাইনষের জেদ। আমার কান্দন আহে। আমি কান্দিতে পারি না। আমার শরম লাগেছোট থাইকেই এত গোশত আমার গতরে! আম্মা তোমার মইল্ল্যে পোলার কপালে কাজল টিপ দেও নাই! তোমার আদরে বাইড়ে উঠা নাদুস-নুদুস শরীলডের উপরে মানুষ নজর নাগাইতাছে যে!
আম্মাগো, মেল্লা সুময় অইলো পেচাল পারতাছি, মেল্লা কতা লেহা অয়ে গেলগাকেউ দেইহে ফালাইলে বিপদ অবো। কাইলকে নাহি বড় হুজুর আইবো। আমারে হেদায়েত করব। পয়লাবার নাহি তিনিই সবাইরে হেদায়েত করেসবাই কয়তাছে। আমার খুব ডর লাগতাছে। আমারে ম্যান কি করব গো আম্মা! তুমি আমার জন্যে দোয়া কইরো। আল্লাহ জানে আমি কোন বালার মদ্যে পড়ছি।
তোমার সাথে বোধয় আর যোগাযোগ করবের পামুই না। বাংলা-ইংরেজি বাঁও দিক থাইকে লেখাপড়া শুরু অয় যে, তাই এডে কুফরি। আমারে এইসব কুফরি লেখা-পড়া ভুলবের কইছে! বাংলা ছাড়া আর তোমার সাথে কেমনে যোগাযোগ করমু! ক্যারা জানে, কবে ম্যান আবার তোমারেই ভুলবের কবো! এহন পলায়ে লেখতাছি। বেবাকেই ঘুমাইছে ত।
থাইক আম্মা, তুমি আবার এইসব ভাইবে আমার জন্যে দুক্কু কইরো না। আব্বা মরার পর আমি কান্দিলে তুমি না আমারে বুকে টাইনে নিয়ে কইছ ধৈর্য ধরতে, কান্দাকাটি না করতে। ধৈর্যই ধরতাছি, দেহি! তুমি কুনো দুশ্চিন্তা করবা না কইলাম। বাড়িত আমারে ছাড়া তোমার কি একলা একলা লাগে আম্মা, ফাফুর লাগে, না? ছোট বুবুও শ্বশুর বাড়ি গেলে তুমি থাকপা কেমনে? আমার না খুব ফাফুর লাগে। একলা ঠেহে, খুব একলা। আমি একটু তোমার কাছে যামু আম্মা। সবশেষে আমার কোটি কোটি কদমবুসি গ্রহণ কর আর দোয়া কর আমার জন্যে।
ইতি
তোমার স্নেহের পুত্র
গেন্দা
[বি. দ্র. চিঠি পাওয়া মাত্র আমারে বাড়িত নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবা। আমি আর থাকপের পাইতাছি না। দম বন্ধ অয়ে আসতাছে। না নিয়ে গেলে আমি কিন্তু মারা যামু, আম্মা।]
চিঠি শেষ হলেও ‘নোটবুক’ আমার দৃষ্টির নিকটতম সীমায় এখনও দুহাতে ধরা। ঠেলে সরিয়ে দেই নি। আর পর্দা কালো কালির শূন্যতায় ঠাসা পুনরায়। এর বুকে ভাসে না কোন প্রকার ছবি। আমি বিমোহিত এবং মোহাবিষ্ট। এমতাবস্থায় কালিঠাসা শূন্য পর্দা আমার সহ্য হয় কী করে? আমি কালিঠাসা শূন্য পর্দাটাকে সহ্য করতে পারি না। খুব অসহ্য ঠেকল যখন; তাই ছিঁড়ে-ফেঁড়ে উল্টিয়ে দিতে চাইলাম শূন্যতাকে। উল্টিয়ে দিলামও বটে! আঙুল দু’টি এখন আমার কত সচল!
অতঃপর আবার দর্পণসম আঁধারের বুকে পূর্বের মত ভেসে উঠে একের পর এক বাক্যবন্ধ ছবি। এই সবই আমাকে পড়তে হবে। একটা শব্দবন্ধও যেন ছুটে যেতে না পারে। আমি সংকল্পবদ্ধ হই এবং মনোনিবেশ করি এবং তদানুযায়ী নিশ্বাস বন্ধ করে দৌড় আরম্ভ করি।
২৭ এপ্রিল ২০০০
আমার বুকটা ফাইটে যায়। আম্মা আমি কান্দিতে পারতাছি না তাও। আমার ম্যান একটু কান্দন দরকার। গত রাইতে আমি চিক্কির মারবের পারি নাই, খালি গোঙ্গানি বারাইছে। আমার শরীলে একফোঁটা শক্তিও আছিল না। হাঁ করা মুখটার মইদ্যেও গুঞ্জা দেওয়া আছিল। আমি শব্দ করতে পারি নাই। তুমি ম্যান ভাবতাছ আমি স্বপ্নের কতা কইতাছি। নাগো আম্মা, না, আমি জাগনাই আছিলাম। আমার শরীলে দুক্কু টের পাইছি। আইজও বেদনা করতেই আছে। কি জানি ঘটনাডা ঘটল! কিবেই ম্যান ঘটল! আমি হাছাই কি জাগনা আছিলাম! আমার জিব্বায় চটের ফেইসা ফেইসা স্বাদ এহনও। ঠোঁটের কোণ ফাটফাট করতাছে। আমি নিশ্চিত অনেক জোরে জোরে গোঙ্গাইছি। তুমি ম্যান টের পাও নাই কাইল; না? আগে যেমুন পাইতা! আমি বোধয় দম বন্ধ অয়েই মারা পড়মু! আম্মা, তুমি আর আমারে শেষ দ্যাহা দেখপের পাবা না, কয়ে রাখলাম কিন্তু!
ঐ রাইতে আমার চক্কে ঘুম আছিল না। খালি আন্ধার আর আন্ধার! ঘরের মাইঝেত ছালার চটে যার যার মুত খেতা বিছায়ে সার ধইরে ঘুমাইতাছে সব। নিশুতি রাইতের আন্ধারে আমি ঝিঞ্জি পোকার ডাক হুনতাছি। ঝিঞ্জি পোকা কি খায়? কেমুন কইরে চ্যাচায়, খালি চ্যাচায় আর চ্যাচায়। আমার পেটের মদ্যে কাঁইপে কাঁইপে উঠে। ঝিঞ্জি পোকায় আমারে ডাকে, না কে যেন আমারে ডাকল! এত রাইতে! ষণ্ডামার্কা ছাত্র কয়ডা আইজ ঘরে আসে নাই এহনও। বড় হুজুর নাকি আইছে, তিনি সবার সাথেই দ্যাহা দেন না, অগর সাথে মিটিং না টেনিং কি এডা করব।
দেহি দরজাডা খুলা! কি থেকে কি ম্যান অইলো আমি ঠিক মুন করবের পারতাছি না! বিছানা ছাইড়ে দরজার চৌকাঠে দাঁড়াইলাম। কোথাও কিছু নাই। আন্ধারে কিছু দ্যাহা যায় না। আমি ধান্দা লাইগে আছি ক্যারা ডাহে! আমাদের ঘরের সামনে দোতলা বিল্ডিং-এ এডা বাতি দ্যাহা যায়। আমার মুনে কইলো গায়েবী কুনো আওয়াজ ডাহে। ‘আসো, আসো, আসো বীর মোহাম্মদ বিন কাসেম’এইরম আবার ডাহে দরাজ মধুর কণ্ঠে। এইহানে কাসেম কার নাম? কেউই ত জাগনা নাই। আমি জানি নাকাসেম ক্যারা। কণ্ঠডা অচেনা। আর কুনো সাড়া-শব্দও মেলে না। তাইলে কি আমার ডর লাগার কতা না? আমার পেটের কাঁপ আর থামে না। আমি শক্ত কইরে চৌকাঠ ধরি। বিশ্বেস করবা না আম্মা, আমি চৌকাঠ ধইরেই আছি, কিন্তু দেহি কি আমি দোতলা বিল্ডিং এর একডা রুমের সামনে। এডা বাতি যে দেখলাম দোতলায় তাও ত নাই! কিচ্ছুই নাই আন্ধার ছাড়া। কেমনে আইলাম ইন্তি? আমারে বুঝি তাইলে জিন-পরী আছর করছে! আম্মাগো, আমার আত্মাডা একবারে আট্টাশ মাইরে উইড়ে গেল গা। দিশকূল না পায়ে মাওগো, ডরের চুটে দরজায় ধাক্কা লাগাই। দরজা ম্যান খিল আটা আছিল নাক্যাচ কইরে খোলা মাত্র চটকানা খাইয়ে আমি ঘরের মাইঝেত যায়ে পড়ি। ঠাস কইরে দরজাডা বন্ধ অয়ে যায় আবার। তহন আমার কাছে এইরম ঠেহে মাওগো, আমি ম্যান এই এহন্ই অজ্ঞান অয়ে যামু। আমি চার হাত-পাও চারদিক দিয়ে মাইঝেত শরীল ছাইড়ে দেই। শরীলে কি আর কুনো বল-শক্তি থাহে তহন! মরা ব্যাঙ যেন আমি পইড়ে আছি! বেবাক ভয় থাইকে মুক্তির জন্যে দুইচোখ বন্ধ রাখি। আন্ধার ঘরকে চির আন্ধার কইরে অজ্ঞান অওয়ার প্রতীক্ষা করি। আমি জ্ঞান হারাই না!
আমার শরীলে বুঝি জ্বর আইসে গেছিল। এইরম আত্মা চমকে ডরাইলে ত হতে হতেই জ্বর আইসে পড়ে, না আম্মা? হাতের তালু কপালে ঠেহাইলেই বুঝা যাব জ্বর উঠছে। কিন্তু আমার হাতে যে শক্তি নাই। হাত তুলি কিবেই? এই ডরেই আর হাত তোলার সাহস অয় না আমার। তাও কইলে আমি ঠিকই বুঝতাছি আমার শরীলে জ্বর আছে। আমার বন্ধ চোখের পাতার উপর আন্ধারে লাল-নীল ঝিঞ্জি পোকারা গিজগিজ করতাছে। জ্বর না আইলে চোখের সামনে এইরম দেখমু ক্যা! আমি ভাবলাম চোখটা খুলি, খুললেই ত যন্ত্রণাডা কমে। ক্যারা কবো হাছা কতাআমার চোখ খুলা আর অবেই রক্তে ভাইসে যায় দুই চোখ। মুন অইলো চানাচানা রক্তের মদ্যে আমি ভাসতাছি। চোখডা খানিক সাফ অইলে দেহি, আমি মাইঝেত পইড়েই আছি, তবে ঘরের চার দেয়াললাল রঙ্গা দেয়ালে চারটা বড় বড় লাল বাতি জ্বলতাছে। মাইঝের উপর কম্বলের মুত নরম, লাল টকটকা চট বিছাইনে। ঘরের ভিতর আর কিছু নাই। ঘরডার ভিতর তনে তহন খালি গরম বাড়ায়তাছে। আমার শরীল ঘাইমে পানি, তাও যেন আমি জারে বাঁচি না। কুরবেনি গরুর নাহাল শরীলডা খালি কাঁপে আর কাঁপে। যন্ত্রণাডা আরও যেন বাড়ল। চোখের নাটায় ব্যথা শুরু অয়। আমি আর তাকায় থাকপের পাই না। ফলে আবার চোখ বন্ধ করি।
‘গোলাপ বালক’এইরম আবার সেই মিঠা কণ্ঠের ডাক, আামি চোখ বন্ধ করতে না করতেই। আম্মাগো, ডাক হুইনে চোখের নাটা গেল উল্টেআমি আর দেখমু কি, আমার চোখ ভর্তি জমা রক্ত! বলদের মুত বড় বড় লাল চোখ আমার উল্টায় থাহে, কিছু দেহি না! গোলাপ বালক, তোমারে আমার পছন্দ অইছে। তুমি এহনও অজ্ঞান হও নাই, যুদিও তুমি খোদার খাস অলৌকিক জগতে, শহীদের পবিত্র লাল-উষ্ণ ঘরে অবস্থান করতাছ। তোমার তাগত আছে! আমি স্পষ্ট দেখতে পাইতাছি তোমার প্রতি অঙ্গে ছাই চাপা নূর জিহাদের ময়দানে স্ফুলিঙ্গ অওয়ার জন্য ছটফট ছটফট করতে আছে।
আম্মাগো, আমি না কান দিয়ে ঠিকঠাক মুত বেবাক কতাই হুনতে থাহি। দ্যাহছেন আম্মা, কানডা আমার এহনও সজাগই থাকল কিবেই! বন্ধ অয়ে যাবার পায় না। কানডা সজাগই থাহে!
নূরানি বালক, আমি জানি তুমিই অবা এ যুগের মোহাম্মদ বিন কাসেম। তোমার ক্কলব কাঁপতাছে। কারণ মুশরিকদের পাপস্পর্শে তোমার ক্কলবে কালিমা জমছে। তোমার দিলে কিছু কুফরি জ্ঞান ঢুইকে পড়ছে। তাই তোমার ক্কলব শহীদী রক্তস্পর্শে ভীত অইছে আর পবিত্র রূহ ব্যাকুল অয়তাছে আল্লাহর খাস রহমতের হেদায়েতে সিক্ত অবার জন্য। তিনি তোমার প্রতি নেক নজর দিছেন এবং রাজি অইছে তাঁর কুদরতি শিনার সাথে তোমার শিরদাঁড়ার মিলন ঘটাইতে। বালক, তুমি ভাগ্যবান, এই মিলনে তোমার আত্মা শহীদী জোশে মাতাল অয়ে যাব। পবিত্র শাহাদাত পেয়ালা তোমার কাছে মুন অবো মধুর চাইতে মিষ্টি! আজ তোমার নবজন্ম অবো বিশেষ কুদরতি ইশারায়। তুমি অবা বীর মোহাম্মদ বিন কাসেম; বাতিল শক্তির জানি দুশমন। নির্ভীক বালক, তৈরি হও নবজন্মের জন্য!
আম্মাগো, কতা না কান দিয়ে ঢুইকে সাথে সাথে রক্তে মিশা যায়, নাচানাচি করে? আমার তাইলে এ্যাবাহা ঠেকতাছে ক্যা! কতাগুলান কিবাহা ম্যান আঠাআঠা ঠেহে আমার কাছে! ঘাইমে চুপচুপ করতাছে আমার শরীল। ভিজে চামড়ায় তাজা মাছের টুকরার উপরে চাপড়া চাপড়া মশলার নাহাল লেপ্টায় যায় কতা। মুনে কয় এই এহনই গরম তেলে আমারে ছাইড়ে দিব। আমি ছ্যাঁৎছ্যাঁৎ কইরে পুইড়ে কুকড়া-বুকড়া কালা ভাজা মাছ অয়ে যামু! আমি তাইলে কি করমুমুন অইতেই দুমড়ায়ে আহে শরীল! কিন্তু আমার ভাবনা-চিন্তার সুময় নাই। টুপ কইরে লাল বাতিগুলা বন্ধ অয়ে যায়। আমার বলদা লাল চোখের গর্তে তহন রক্ত নাই খালি আন্ধা: কানে কুনো শব্দও!
কতহন আমি ঠাওরই পাই নাই যে, কি ঘটনাডা ঘটল। তারপরে আমার এইরম ঠেকল, আমি বোধয় স্বপ্ন দ্যাহার পর ঘুম থাইকে উঠলাম। কান পাতার চেষ্টা করি, ঝিঞ্জি পোকারা এহনও চেতনই আছে নাকিরাইত ম্যান কত অইলো? এরই মদ্যে, যতহন কইতে নাগল এতহন সুময়ও কইলে পার অয় নাই, দেহি দূরতনে ভাইসে আহে কুরান তেলাতের সুর। গতরে গুঞ্জিডা ঘাইমে ভিজে গেছে একবারে! তাই উইঠে বয়ে টান দিয়ে গুঞ্জিডে খুইলে ফালাই। কিন্তু পিন্দনে হাত লাগায় দেহি তবন নাই! তবন কই গেল? তাইলে শরমের কতা নাক্যারা নিল, এহন আমি কিবেই কি করি! শরমে ত আমার শরীল আবার অস্থির দশা। ঘটনাডা ত এইরমই ঘটল, নাকি?
আমি কি ঠিকঠাক মুত কবার পাইতাছি, ঠিক এইরমই না, না, এইরমই অবোকুরান তেলাতের সুরডা হুনতে না হুনতেই আমারে ঘিরে নিল! এত সুন্দর তেলাত মানুষ কুনোদিন করবের পাব! সুর আমারে এইরমই ধান্দা লাগায়দিল আমি যে আন্ধারে উলঙ্গ, আমার মুনই নাই।
ঘরডার মদ্যে কুনো বাস্না আছিল কিনা আমার স্মরণে আসে নাই। ওম্মা, হঠাৎ কইরেই দেহি সুবাসে ঘরডা ভইরে গেল। আতর, সুরমা আগরবাতি না কিয়ের সেন্ট আমি কবার পামু না। আর তহন ঘরে আলো ফুটে; নীল নীল, সাদা সাদা আলো! এই আলোয় আমার চোক্কের সামনে নামে, আসমান থাইকে নামে এডা সাদা মেঘ! ধুঁয়ের নাহাল নীল আলো ঘিরে থাহে ঐ মেঘ না মানুষ না জিনেরে! পাও-মাথা কিছু আছে কিনা আমি দেহি নাই। দ্যাহার হুঁশ থাকলে ছেন। দেয়াল আর লাল নাই; মুনে কয় কালা বোরখা পইরে ইট, বালু, সিমেন্ট বেবাকেই একসাথে এক সুরে কুরান পড়তাছে! আমি আট্টাস নাইগে যিবাহা বইস্টে আছিলাম, ঐ বইস্টেতেই চোখ উল্টায়ে মেঘ-মানুষ-জিনের দিক চায়ে থাহি। মেঘ না মানুষ না জিন ফর্সা দুই আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখের পাতা বুলাইলে চোখডা আন্ধার অয়ে আহে! চোখের পাতা দুইডে তাই বন্ধ কইরে দিলে ঐ জিনিসডা আমারে কম্বলের চামড়ার নাহাল নরম পশমের চটের উপরে উবুত কইরে হুতায় দেয়। আমার চাইরপাশে তহন গরম বালুতে খালি খই ফুটে, না সাথে কুরান পড়া চলে, আমি বুঝবের পাই না। আমার কিছু বুঝার সুযোগ অয় না। বুঝি, একসাথে তুমুল ফুটফুট আওয়াজ ফাটতাছে!
তারপরে, তারপরে যা ঘটেআসলে সেরম কি সত্যি ঘটে? মানুষ কি জিন কি ফেরেশতা, কেউ কি ছেলে মাইনষের সাথে সেরম করে; হাছা হাছাই কি করে? আমারই বোধয় বুঝার ভুল; না?
কি কই মাও গো, আমার আসলে কুনো তাল ঠিক নাই! আসলেমেঘ না মানুষ, মানুষ না জিন, জিন না মানুষ, মানুষ না ফেরেশতা আমার উপরে হুতে। আমি কোমরে খোঁচা খোঁচা পশমের গুতা টের পাই। আম্মাগো, বুঝতাছ ত ঘটনাডা কি? না বুঝলেএডে কি খুইলে কওন যায়। ইল্ল্যে কি ভাইঙ্গে কওনের কতা!
আমার শরীল ঝাঁকি মাইরে উঠে। তহন আর কিয়ের আট্টাস নাগা কিয়ের কি; আমি হাত দিয়ে বাঁধা দিবের যাই। কৈতনে ম্যান দুইডে থাবা, হাতির থাবা আয়ে আমার হাতের উপরে পড়ল। আমি ত দূরের কতা, আমার হাত দুইডেও তহন আর নড়াচড়া করাবার সাধ্যি থাকে না। ইদিহি পিছন দিয়ে এডা শক্ত কিছু একতালে উঠানামা শুরু করে। দুক্কে মাও গো আমার সারা শরীল তহন বিদ্রোহ করবের চায়। গাও গুলায়ে উঠে, গলা দিয়ে চিল্লানি বারায়। চাইরপাশে অবিরাম খই ফুটতাছে, অর মদ্যে কি আর এক গলার চিল্লাচিল্লির শব্দ পাওয়া যায়? পাওয়া যায় না গো মাও, পাওয়া যায় না। চিল্লানির শব্দ পাওয়া না গেলেও খই ভাজা খোলার নিচে বুঝি ছেদ অয়। ছেদ দিয়ে হিসহিস বালু ঝরে। বালু ঝরার শব্দ আমারে কয়: নূরানি বালক, তোমার নবজন্ম ঘটতাছে! তুমি হবা বীর মোহাম্মদ বিন কাসেম। ধৈর্য ধরো বালক, সংযমী  হওসংযমকারীকে খোদা পছন্দ করে।
: আমি কাসেম না, আমি গেন্দা। আমারে ছাইড়ে দেও, আমি আম্মার কাছে যামু। আমি কান্দন শুরু করি। খুব শক্তি কইরে নিজেরে ছাড়াবার চাই। তাও আমারে ছাড়ে না, আমি ছাড়াবার পাই না। আমি কুনো জানোয়ারের তলে যাতা খাইতে থাহি।
আর কেউ কুনো কতা কয় না। খই ফুটে আরও জোরে জোরে। কান তালা নাইগে যায়। আর আমার মুখে আমারই ঘামে ভেজা গুঞ্জি দিয়ে গুঞ্জা দেয়। তারপর চট বলায়ে। কুরবেনি বলদের নাহাল আমার গলায় তহন খালি ঘরঘর শব্দ। দেহডা থাইকে থাইকে কাঁইপে উঠে। চোখের কোণ দিয়ে কষ পড়ে। নীল কষ পইড়ে মাথার নিচে চট ভিজে। তারপর শরীলডেও অবশ। কতক্ষণ যায় এইভাবে ক্যারা জানে! কষ পড়া শেষে চোখে রক্ত উইঠে গেছে তাই নাকি আবার লাল বাতিগুলা জ্বইলে উঠছে দেইহে ঘরডা আর নীল নাই; লাল অয়ে গেছে। আমার মুখ থাইকে গুঞ্জা খয়ে যায়। দিশকূল না পায়ে, অবশেষে জীবনের অকুলান যহন আমি, চিক্কির মারিআমি গেন্দা না গো, আমি মোহাম্মদ কাসেমই, আমারে ছাইড়ে দেওগো, আমি মইরে গেলাম ত!
বিশ্বেসের কতা না আম্মা, কুদরতি খেলা যেনবর। ঘরে তহন কুরান পড়া না খই ফুটার শব্দ আর হুনা যায় না। ঘরের মদ্যে খালি ঘুরতাছেআমি মোহাম্মদ কাসেম, আমি মোহাম্মদ কাসেম। মেঘ না জিন, জিন না ফেরেশতা, ফেরেশতা না মানুষ, সেও নাই!
শরীলডা হালকা লাগে। মাথা সোজা কইরে বইতে যামু তহনই ঘরের মদ্যে পুষ্ট কিছু আওয়াজ, গায়েবি আওয়াজ গমগম কইরে উঠে। লাল টকটকা আলোয় ভরা ফাঁকা ঘর। আল্লাহর খাস রহমতের সাথে এই মাত্র তোমার দিদার অয়ে গেছে। তাঁর কুদরতি শিনার সহবতে তোমার নবজন্ম হলো, তুমি আজ থাইকে মোহাম্মদ বিন কাসেম। আল্লাহর রাহে শহীদী জোশে যার প্রাণ পাগলা! তবে মুন রাইখো হে নবজন্মপ্রাপ্ত মুজাহিদ, আল্লাহপাক বলেন: আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষে করমু, তোমাদের মদ্যে কারা মুজাহিদ এবং কারা সবরকারি এবং যতক্ষণ নাকতার মাঝ দিয়ে আওজান পাছ অয়। আমি শরীলডা সোজা কইরে বহাবার পাই না। পাছার উপরে চটচট করে, গুয়ার মদ্যে ছ্যাপছ্যাপ করে। হাত লাগায়ে দেহি গুয়ার গর্তে জইমে আহা জাল করা গুড়ের রস, তাঁতানো, আঠাআঠা শিয়েলে রঙ। এরপর বোধয় আমি সত্যি সত্যি অজ্ঞান অয়ে গেছিলাম! আর ত কিছু মুন অয়তাছে না।
যহন সজাগ অইছি তহন আমার শরীলে বিরাট জ্বর। চোখের পাতা দুইডে খুলবের ইচ্চে অয় নাই। কিন্তু মুনে কয় ঢাকনা দিয়ে ঢাকা চোখের নিচে আমের ডাল দিয়ে কেউ জ্বাল পারতাছে। আর তাপে ফুটা পানি যেমুন লাফায় ঐরম চোখের মণি দুইডে লাফায়। তার জন্যে এহন আর কী করমুমুন করলাম চোখ দুইডে মেল করি। যুদিল এল্লা আরাম পাই-ই। তা চোখ দুইডে খুলছি আর বেগে বাতাস ঢুইকে আগুনডা বুঝি নিভায়ে দেয়। একপাশ দিয়ে শিরশির কইরে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে, অন্য কোণ দিয়ে গরম ধুঁয়ে বাইর অয়। চোখের মণিতে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপ্টায় আমার পুরাপুরি আরাম অয় না। মণি কি আর মণি আছে এহনও। আঙরা অয়ে গেছে না! একবারে জ্বালা তাই কমে না। আমি নাটা উল্টায়ে মণি ঘুরায়ে ঘুরায়ে বাতাস খাওয়ার চেষ্টা করি। বেশিক্ষণ খাইতে পারি না, নাটা ব্যথা করে। তবে দেখতে পারি দুধের সরের মুত লাল রঙের কম্বল দিয়ে আমারে ঢাইকে শুয়ায় রাখছে ঘরের এক কানিত। কতদিন দুধই দেহি না, দুধের সর দেখমু কইতনে। হেই কবে ইন্তি আহার সুময় দুধের সর দিয়ে ভাত দিয়ে নুন দিয়ে গুড় দিয়ে আঠাআঠা কইরে মাইখে মুখে তুইলে খাওয়ায় দিছ। তোমার হাতেমাখা দুধভাতের লালস্বাদ ভুইলে যাইতাছি গে।
বেলা দুপুর। আমার পাশে বহা আমারই এক হুমাইজে ছাত্র। অর নামডা ম্যান কিকি ম্যান বাড়া মুন নাই। দেখতে আমার নাখলাই সুন্দর, টসটসা স্বাস্থ্য। ইন্তি আহার পর মুনে কয় একটু মলিন পড়ছে। ও না, খালি একলা একলা মনমরা বিষ অয়ে বয়ে থাহে! ওর কুনো অসুখ-বিসুখ আছে কিনা! আমার চোখের নাটা-মণি এইসব ঘুরান দেইহে, ও নিজেও খানিক চোখ উল্টায়ে চায়ে থাহে। তারপরে আমার দৃষ্টি যহন স্থির, তহন ও মোলায়েমভাবে কয়: মোহাম্মদ কাসেম এহন তোমার কেমুন লাগতাছে? আমার কেমুন লাগতাছে আমি তা কবার জন্যেই তার দিক তাকাই। বলার চেষ্টা নিয়ে দেহি আমার গলা, জিব্বা, বেবাক হুগায়ে কাঠ, জোড়া লাগা ঠোঁট। কাজে কাজেই জিব্বা নড়ায়ে নড়ায়ে ঠোঁট চোকা কইরে আওয়াজ দেওয়ার পিছলা ভেজা শক্তির যোগান পাই না। এইজন্যে চোখের নাটা আবার এট্টু বড় হয় কি? নইলে আমার চোখে অবাক অওয়ার মুতন কুনো ভাষা ‘মোহাম্মদ কাসেম নাম তুমি কই পাইলা?’ফুটতে পারে যার জবাব দেয় ও। আর আমার কাছে মুন অইলো ছাত্রডা তহন কাঁপে। তাই ওর কতাগুলাও অয় কাঁপাকাঁপা।
: হুজুর কয়ে গেছে তোমারে মোহাম্মদ কাসেম নামের জিনে আছর করছে। সবাইরে কয়ে দিছে তোমারে এহন তনে আমরা মোহাম্মদ কাসেম নামেই যেন ডাহি। অন্য নামে ডাকলে, তোমার আর যেই ডাকপ হের অমুঙ্গল অবো। গত মাসে, তুমি জান না, আমারেও ইউসুফ নামের জিনে আছর করছে। তুমি তহনও আহ নাই, আমার জিনডাওতো এত কতা কুনোসুম কয় না! হঠাৎ কইরে আমার সামনে মেলা কতা কয়ে ফালাইল ভাইবেই, না কুনো গোপন কতা মুহ আয়ে পড়ন ধরছিল দেইহেই কতা বন্ধ কইরে একদম চুপসে যায়। ওর ফর্সা মুখটা অসহায় ফ্যাসফ্যাসা লাগে। আমার মুহের উপরে চোখ পড়ার কারণেও এমুন অবার পায়। কিয়েরে না আমার কাঠকাঠ বুকডা পানি তিয়েশে ত ফাইটে যাবার জো। পানি খামু এই কতাও কবার পাইতাছি না। তাইলে আমি অর হতে জিন, মোহাম্মদ কাসেম অগরে নিয়ে কি গপ্প জমামু! আমি তাই কবার চেষ্টা করি: ভাই আগে আমারে এট্টু পানি খাওয়াও, নইলে আমি বাঁচমু না ত। এইবারই কি আর কুনো আওয়াজ বারায়; ঠোঁট দুইডে থরথরি কাঁপা ছাড়া! ছাত্রডা না আমার ভাবগতিক দেইহে, আমার বুগল তনে উইঠে খাড়ায়আমি হুজুররে সোম্বাদ দিয়ে আহি যে তুমি সজাগ অইছো। তুমি চেতন পাইলে খরব দিবের কইছে।
হুজুর আহে। হুজুরের ফর্সা, পুরুষ্ঠ, শক্ত খসখসা আঙ্গুলে মুঠ দিয়ে চাপা ঝকঝকা কাঁচের গিলেস। গিলেসে পানি আছে কি নাই ঠাওরই পাওয়া যায় না। কি গিলেস তোমারে কই: একবার তুমি বাড়িত ছান্দানির কাছ তনে ছয়ডা নিলা না; মালয়েশিয়ান না থাইল্যান্ডের? ছান্দানি কইল পড়লেও ভাঙব না! আর আমি সত্যি সত্যিই এডা গিলেস উপরে তনে মাটিত ছাইড়ে দিলাম। মাটির মদ্যে হান্দায় গেল তাও ভাঙল না! তলাত ঝকঝকা ফুলের নকশা কাটাঐরম। হুজুরের সাথে হুমাইজে ছাত্রডাও আইছে, আধ হাত পিছনে কোনাকুনি দাঁড়ানো। আর বাহি ছাত্ররা যে কই গেছেকারোরেই দেহি না। হুজুর হাঁটু ভাইঙ্গে আমার কোলের কাছে বিছানায় বইসে গিলেস থাইকে একটু পানি হাতের তালুত ঢালে। হাতডা উবুত করে, পানি আঙ্গুলের মাথাত গড়ায়ে গড়ায়ে আহে। তহন আঙ্গুল চটকায়ে গড়াইনে ফোঁটা পানির ছিটা দেয় আমার চোখে। গরম লোহার কড়ায়ে পানির ফোঁটা পড়লে যিরম ছ্যাঁৎ কইরে উঠে, তেমুন নাগে আমার। আরও কয়বার এইরম দিলে আমার বালো লাগে। আজকে বোধয় হুজুর আদর করব এ্যাবাহা ভাব বুঝা যায়। তিনি কয়, কিন্তু হুজুরের কতা বেজায় খরখরা লাগে: হুন, উইঠে বহো। এই পানি পড়াডা খাও। বড় হুজুর, বুযুর্গ মানুষ, পানি পইড়ে দিছে। খাও, বিসমিল্লাহর সহিত খাও, কষ্ট থাইকে নাজাত পাবা।
আমি বাঁয়ে কনুইত ভর দিয়ে বালিশ তনে মাথাডা এট্টু তুলি। পুরা শরীল তোলার সাধ্যি কি আমার আছে! গতরে বুঝি আমার হাতুড় দিয়ে পিটেইছে, হাড়-গুড় ভাঙ্গা; এইরম ব্যথা। ডান হাতডা কম্বলের ভিতর তনে বাইর কইরে হুজুরের হাত থাইকে গিলেসডা নিয়ে ঢকঢক কইরে একদুমে এক গিলেস পানি ধরি খায়ে ফালাই। হুজুর কহন যে আমার দিক বড় বড় চোখ কইরে চাইছে, আমি টের পাই নাই। গিলেসডা ঠোঁট তনে ছাতির কাছেও আনি নাই, তহনই তার চোখে চোখ পড়ায় আমি ছবি অয়ে যাই। না জানি কি ভুল করলাম আবার? তিনি ধমক মারলে শরীলের ঝুঁকি সামলাইতে বালিশে মাথা ছাইড়ে দেই। ঐ ছাত্রডা হাত তনে গিলেসডা তাত্তাড়ি ধরে।
একদম ইনসাফ নাই, খোদায়ী দানের প্রতি শুকরিয়া নাই; যত্তসব নাফরমানী! হুন, জানোয়ারের মুতো খাবা না। পান করতে অয় ধীরে ধীরে, দুই বিরতি দিয়ে। বল, সহীহ্।  দ্যাহছেন আম্মা, আমি ইদিহি পানি তিয়েশে মরি; কিবেই পানি খাওন নাগব আমার কি হেই হুঁশ আছে! তাও আমি বুদ্ধি কইরে, ই-বুদ্ধিডে যেনবর কেউ আমারে যোগান দেয়, তার সাথে সাথে আমিও ‘সহীহ্’ কইলে তিনি হাঁটু দুইডে ঠিকমুত জড়ায়ে মুরাকাবায় বসে। চোখ দুইডে বন্ধ করে, গলা খেঁকুর দেয়। ইউসুফ, হুমাইজে ছাত্রডা তহনও গিলেস হাতে হুজুরের পাশে খাড়ানো। আমি চায়ে আছি। কি করন নাগব কিছু বুঝি না। আমার জার জার করে। হাত দুইডে তাই আস্তে আস্তে কম্বলের মদ্যে ঢুকাই। একবার ভাবি চোখ দুইডেও বন্ধ কইরে ফালাই। কিন্তু চোখ বন্ধ করার বল পাই না। কি করতে কি করি, আবার ম্যান কোন দোষ অয়! হুজুর এরই মদ্যে ধ্যানমগ্ন বুযুর্গ মানুষের মুত চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ধীর লয়ে জিব্বা নাড়ায়, ঠোঁট বাঁকায়। আর তার গলা দিয়ে কাটাকাটা কিছু কতার আওয়াজ অয়। কতাগুলান কওয়ার সাইজ দেইহে মুন অইলো হুজুরের উপরে নাজিল অয়তাছে। তিনি খালি আমার উদ্দেশ্যে প্রচার করতাছে এই যা। তুমি উন্তি থাকলেতুমি ক্যা, কেউই এই ঘটনা অবিশ্বেস করবের পাব না। উগলান আমার কান দিয়ে ঢুইকে যেন একপাল ঘোড়া সার অয়ে টাকটাক দাবড়ায়তাছে মাথার মদ্যে।
এক নম্বর ঘোড়া সামনে: তুমি সৌভাগ্যবান। তোমার ক্কলবে কাসেমের শহীদী আত্মা আস্তানা গাড়ছে। যুদিও তোমার উপরে পাপাত্মার আনাগোনা আছিল, যার ধ্বংস অনিবার্য।
দুই নম্বর ঘোড়া এক নম্বর ঘোড়ার পেছনে: জেনে রাখ, তোমার শরীলে প্রতিডা রক্তকণা আজ বারুদের আকার নিতে, কাফেরদের খুনে রঞ্জিত অওয়ার নেক বাসনায় আকুল অয়ে আছে। অথচ তোমার ক্কলব, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শেরেকি জ্ঞান ও মুনাফেকিতে অভ্যস্ত। অর্থাৎ তোমাকে খাঁটি মুসলমান অওন নাগব। সহীহ্ ইসলামি জ্ঞান নেওন নাগব। তা না অইলে তোমার করুণ পরিণতি কেউ ঠেহাবার পাব না। কারণ, কাফের-মুশরিক-মুনাফেকদের জন্য এডেই নির্ধারিত।
তিন নম্বর ঘোড়া দুই নম্বর ঘোড়ার পাশে: সুতরাং খাঁটি মুমিন ছাড়া তুমি কারও সাথে মিশবা না। কিয়েরে না অগর অন্তরে আছে বিষ, যা তোমার জন্যে করুণ পরিণতি ডাইকে আনব। তোমার এহন একমাত্র সঙ্গী হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, দুইজুনই ফি সাবিলিল্লাহর পথিক।
চার নম্বর ঘোড়া তিন নম্বর ঘোড়ার পরে: প্রতিমাসে একবার শহীদের আত্মা খোদার সাথে দিদার লাভের চেষ্টায় ব্যাকুল থাহে। তারা তহন নিজ আশ্রিত দেহের সাথে কুদরতি কায়দায় সহবতে লিপ্ত অয়। আর যেহেতু তোমাদের ক্কলব পরিষ্কার অবার দরকার।
তারপরে আরও এডা বারায়। আরও এডা। এইভাবে প্রতিডে শব্দ তারপর প্রতিডে অক্ষর ঘোড়ার মুতো ছুটে। মাথা মদ্যে টাকটাক দাবড়ায় আর দাবড়ায়। তাও ঘোড়ার দৌড়ানি শেষ অয় না। কিন্তু শেষের ঘোড়াডা যহন শেষপন্ত আহেই, তহন মাথার বেবাক কিছু আওলায় দিয়ে নি¹ুম কইরে দেয় সব।
সবশেষ ঘোড়া: আল্লাহর রাহে জান কুরবানের প্রস্তুতিকালে ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফলকাম অও। পরে অবশ্যই আবার তোমাদের অবস্থানসমূহ যাচাই করা হবে।
ইল্ল্যেসব ঘোড়ার সওয়ার এক ঘোড়া: হুজুর পাক (সা.) বলেনযে আমার দীনের বিরোধিতা করব তার জন্যে অপমান-অপদস্ততা অবধারিত।
আম্মাগো, তোমারে আমি আগাড়-নিগাড় সব কতা কইলাম। বেবাক কতা ঠিকঠাকমুত বলা অইলো কিনা বুঝতাছি না। তা অইলেও এহন তোমার ঠোঁট মদ্যে ঠোঁট দিয়ে পেটের যত কতা উগলাবার না পাইলে পেট ফিক্কে মরণ দশা অয় না আমার! আর কুনো মাইনষের সাথে কুনোদিন আমি কুনো গপ্প করবের পাইছি? ইল্ল্যে কতা কি আর কওনই যায় অন্য কুনো মাইনষের কাছে? ইদিহি আম্মা আমার পেট মদ্যে আঁটে না এত কতা। না পারি সইতে, না পারি কইতে, না পারি কান্দিতে। আম্মাগো, আমার এই মুখডা মাইনষেরে দূরের কতা, তোমারেই কিবেই দেহামু! এই মুখ আর কারোরে আমি দেহাবার পামু না। দেহামু না। একসুম মুন করি কি আম্মা জানমুন করি জীবনডা ছাইড়ে দেই; ফাঁসি নেই কি বিষ খাই। আবার চিন্তে করি, আমি মরলে তুমি বাঁচবা কিবেই? আমি না থাকলে তোমারে ক্যারা দেখপ? তুমি না তাইলে চিরদুক্কী অবা! আমারও না ইহকাল-পরকাল দুইডেই যাব। আমি কোন পথে যামু আম্মা; কুনো কূলই ত জাগনা দেহি না। এই জীবনডা আমার এহন অকুলান আম্মা।
আমি খালি হাঁসফাঁস করি। হাত-পাও ছুড়াছুড়ি কইরে দিশকূল খুঁজি। ছন্তাই আমার কাটে না। এই অবস্থা না দেইহে, ইউসুফ আমারে নিজে নিজে কিবেই তোমার সাথে গপ্প করন যায় হেই বুদ্ধি দিল। বোধয় পোলাডা বালা। মুশকিল অইলো আমি এইরম কুনোদিন লেখছি কি! খালি তাই না ত, ইল্ল্যে লেহা আবার ধরা পড়লে কোন আযাব দিব ক্যারা জানে। জান আম্মা রাইতে আমার ঘুম হারাম অয়ে গেছে। এ্যাবাহা ঠেহে, চোখ বন্ধ করলে বুঝি ঐরম ঘটনা আবার ঘটব। জোর কইরে চোখ বন্ধ অবার দেই না; মেল রাহি। কয় রাত ধইরে সবাই ঘুমাইলে তোমারে এট্টু এট্টু কইরে কওয়ার নাখলা পুরা ঘটনাডা খাতায় লেখলাম। ডর-ভয় খায়ে ফালায় থুয়েই কামডা করলাম। মাওগো, আমি আর কি করমু, কি আর করার আছে আমার! তোমার কাছে এডা চিঠি লেখছিলাম, উডাও পাঠাবার পাইলাম নাথাকলই এহানে, এই ডায়েরীর মদ্যে। এডেই বুঝি আমার মাও এহন। তাই কি, এই মাওডারেই আর পলায়ে কয়দিন ধইরে রাখপের পামু। শেষপন্ত রাখপের বোধয় পামুই না।
আম্মা, তোমার কি মুন অয় এডে সত্যিই আল্লাহর কুনো পরীক্ষে। আমি কিছু জানি না; কিছু বুঝতাছি না। আল্লাহ কি মাইনষেরে এইরম বিচ্ছিরি পরীক্ষে করে! আমরা কি তস্কিল করছি না জানিতুমি আমার জন্যে দোয়া কইরো আম্মা। আমি যেন ধৈর্য রাখতে পারি। সত্যিই যুদিল এডে আল্লাহর দেয়া পরীক্ষে অয় তাইলে যেন আমি পাশ করবের পারি। কিয়েরে না আর যাই কিছু হইকআল্লাহর আদেশ পালন না করলে গুণাহগার অমু না! তুমি কি কও?
আমার আজকে বেশ আরাম লাগতাছে। শরীলে জ্বর-টরও কিছু নাই। পেটডা আজার অইলো যে!
‘পেটডা আজার অইলো যে!’ বাক্যে এসে পর্দা স্থির হয়। নড়াচড়া করে না বা করবে না ভেবে, আমি একটু অবসর করি। চোখের পলক পড়ে। দম নিই; দম ফেলি। দম ফেলতে গিয়ে আশ্চর্যরকম দীর্ঘশ্বাস তৈরি হয়! হবে কি গেন্দার জন্য, অথবা অনেকক্ষণ দম আটকেছিলাম? এই দীর্ঘশ্বাস কিন্তু আমাকে আরাম দেয় না, কিংবা স্বস্তি। বুক থেকে ভারমুক্তির পরিবর্তে পাথর চাপিয়ে দেয় উল্টো। আমার সামনে থেকে পর্দাটা মনে হলো অনেকখানি দূরে সরে যায়। সশব্দে, জানান দিয়ে। একেবারে দৃষ্টিদেশ সীমানার বাইরে। আমরা প্রকৃতপক্ষে জেনে থাকি, দীর্ঘশ্বাস কিছু নাড়ায় না বা নাড়াতে জানে না। তার নিকট আমাদের প্রত্যাশারা যদিও পৌঁছতে চায়; অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি কাছে! এখানেও নাড়িয়ে দিল অপ্রত্যাশিত।
আমাকে গন্ধ নেশায় পেয়ে বসে কোন গোপন ফুলের। মনে হয় না যদিও পূর্ণাঙ্গ ফুটন্ত কোন ফুল। হয়তো একটিমাত্র ফুলকলির ঝরে পড়ার পূর্বাভাস। আমি পূর্বাভাস ধরে উদ্দাম ছুটে চলি পিছুপিছু। সমুখে অপার শূন্য আঁধার! না আছে ফুল, না আছে ঝরা পাপড়ি, না আছে কাক্সিক্ষত ভরাট পর্দা। আমি তবু আশাহত হবার কারণ দেখি না। আর তাছাড়া যেহেতু আমাকে ঘিরে আছে মায়াবী সম্মোহন! সুতরাং আমি পর্দার কাছাকাছি পৌঁছার জন্য আপ্রাণ ছুটি। ফুলকলির ফোটা ও ঝরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি। এবং অনেকটা কাল, অনেকটা পথ আমি দৃপ্ত কঠিন সংকল্পে অবলীলায় মাড়িয়ে যাই।
পাথর হৃদয় পথের সীমানা পেরিয়ে গেলে আমার পায়ের তলা একসময় ভেজা, নরোম অনুভব পায়। পাথর খোয়ার ঘষায় পা ফেটে রক্ত ঝরছে কি! তাকিয়ে পরখ করবার প্রয়োজনীয় সময় কিংবা দক্ষতা পাওয়া যায় না। আরও কয় কদম এগিয় গেলে যখন সারা গায়ে স্যাঁতস্যাঁতে অনুভূতি ছড়িয়ে পা দুইটি আকণ্ঠ ডুবে যায়, তখন বুঝা গেল পা ফাটার ধারণা ভুল। এবং আবর্জনা পঁচা দুর্গন্ধ পেটে জায়গা করতে চাইলে, পাকস্থলির অন্য বাসিন্দারা পরস্পর সহাবস্থানে থাকতে আপত্তি জানায়। এর প্রভাব শরীর মন দুইটিতেই পড়ে।
এইখানে পৌঁছে আমি আশাহত হবার কারণ খুঁজে পাই। এবং যথেষ্ট কারণ আছে বলে মনে করতে থাকি। অতএব, যার প্রভাবে এতদূর ছুটেছি তাকে স্মরণ করি। আমার কাছে এতক্ষণ যে বিস্মৃত ছিল। আরও আগেই ওকে স্মরণ করলে হতো, করি নি। এতদ্সত্ত্বেও আমি তার উপর রাগান্বিত হলাম: ত্রিশঙ্কু তুমি কোথায়? আমাকে কোথায় নিয়া আসলা এটা? আমি রাগত স্বরে চিৎকার মত করি। আসলে ও আমাকে যদিও ছেড়ে যায় নি; সাথেই ছিল, এখনও আছে। আমি বুঝতে পারি নি।
: আপনে না ভদ্রতা বুঝেন? চিল্লায়তাছেন ক্যা? চিল্লায়েন না। আপনের ধমক হুনার জন্যে কেউ বয়ে নাই।
ত্রিশঙ্কু আমাকে এইভাবে জবাব দেয়। অধিকার সীমা ছাড়িয়ে যাবার একদম উচিত প্রাপ্য জবাব। আমি না হয় এখন কোন কিছু বুঝতে পাচ্ছি না; না বুঝেই রেগে গেছি! তাই বলে কেউ কি এইভাবে কারও মুখে ঠোসকা পাতা ঘষে! ত্রিশঙ্কু না অশরীরী আমার মুখে ঘষল। সম্ভবত এতক্ষণ ওকে বিস্মৃত হয়ে থাকার প্রতিশোধ নিল।
: আপনের দিলে যি খায়েশ করছিলেন, উন্তি এহন আছেন। আপনের পায়ের নিচে,
আপনের মুন অওয়া ফুলকলির গইলে যাওয়া পাপড়ির ঢিবি।
অতঃপর অশরীরী না ত্রিশঙ্কু আমাকে এই তথ্য জানায়। ও আমার দিলের খবর রাখে! আমি আর কী কথা বলি এখন! ওর কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলার উৎসাহ জুটে না; বলার কিছু নাইও। সুতরাং নীরবে মুখের জ্বালা হজম করতে সচেষ্ট হওয়াই শ্রেয়তর বোধ করি।
নীরবতা খানখান করে সে আবার কথা শুরু করে: ভাই মুন দুক্কু নিয়েন না; আমার আসলেও আমাকে এইভাবে সান্ত্বনা দিতে শুরুকরলে, আমার জ্বালা অনুভবে কোন প্রলেপ হয়তো পড়ে না; কিন্তু আমি ভাবেত চাইআসলে কার সাথে কথা বলছি? মূলত কারও সাথেই না হয়তো; নিতান্তই এ আমার মনোভ্রমণ! এই ব্যাখ্যাটাকে যৌক্তিক ধরা যায় ভাবলে প্রেস্টিজবোধ তুলনামূলক আরাম পায়। আরাম, অশরীরী না ত্রিশঙ্কুর প্রতি মনোযোগী হতে সাহায্য করে, নতুনভাবে।
: আপনের কৌতূহলের সাইজ দেখলেযাইক গে, দ্যাহেনছেন এতে আপনের মুনের খায়েশ মিটে কিনা?
আমার চোখ খোলা ছিল এবং আমি আগের চেয়ে স্থিতধি; সুতরাং ও বলল আর অমনি আমি আবার আগের মত দৃষ্টির সমুখে দেখলাম লিখিত কথা ছবি! বাস্তবতা এইখানে ম্যাজিকের মত মনে হয়। এই ছবিগুলো আমি পড়তে পারি না। কারণ এগুলো বাংলায় লিখিত নয়আমি আরবি বলে সাব্যস্ত করলে, ত্রিশঙ্কু জানিয়ে দেয় ‘উর্দু’। মোহাম্মদ বিন কাসেমের লেখা। আমার অনুভবে কিছু আগে পাওয়া দুর্গন্ধের তীব্রতা কমে আসছে। শরীরের সাথে এডজাস্ট হয়ে গেল? এইভাবে সবই এডজাস্ট হয়ে যায়? জটিল খুব মানুষের ফিলিংস! পঁচা আবর্জনার স্তূপ অথবা ত্রিশঙ্কুর দেয়া তথ্য মতে ফুলকলির গলে যাওয়া দেহের ঢিবির ভিতর পা ডুবিয়ে আমি উর্দু অক্ষরে আঁকা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। এই ছবির ভাষা বুঝা আমার সাধ্যের বাইরে। আমি কিছু বুঝি না বলে শুধু তাই ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকি। এমন পরিস্থিতির দায় সম্ভবত এইটিরবাংলাদেশের মানুষ উর্দু ভাষা শিখবে না বলে, এই ভাষার খবরদারিত্ব সহ্য করবে না বলে, একে বাংলার বুক থেকে বিতাড়িত করতে বাঙালি বুকের রক্ত ঢেলেছে। সেও তো ৫৪ বছর হলো। এবং জানা আছে আরও নদী-নদী রক্ত দিয়ে বিতাড়িত করেছে, তাও ৩৫ বছর। তো, এত বছর পর আবার এই ভাষার মুখোমুখি বাংলাদেশের কাউকে কখনো কোনদিন দাঁড়াতে হবে, এটা নিশ্চয়ই অপ্রত্যাশিত ছিল; সম্পূর্ণভাবেই।
আমি ত্রিশঙ্কুর প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাই, যেহেতু আমি এই উর্দু ছবিটার মর্মোদ্ধার করতে চাইবাংলায় অনুবাদ করে দিতে। ত্রিশঙ্কু কোন প্রকার খেদোক্তি ছাড়াই আমাকে সহযোগিতা করে। আমি এক পলক পর ভিজে দৃষ্টিতে দেখি, দৃষ্টি আমার কী প্রকারে যেন ভিজে উঠছে। এবং ভিজে আছে। আবর্জনা পঁচা স্তূপ থেকে কোন গ্যাস চোখে এমন ধোঁয়ার জাল বিস্তার করে থাকবে। আমি বুঝি তবু বাঙলায় অনূদিত ছবিভাষা।
এখনও আমি গন্ধভরা স্যাঁতস্যাঁতে স্তুপে দাঁড়িয়ে, এখান থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ হলো না। ধরে নিচ্ছি, মোহাম্মদ বিন কাসেমকে বুঝতে হলে এই গন্ধস্তুপের উপর দাঁড়িয়েই বুঝতে হবে! তাই এখান থেকে আমাকে সরতে দেয়া হলো না। পা তুলে সরে দাঁড়াবার সাধ্যি আমার নাই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি আবার পড়তে শুরু করি, অবশ্য এবার তাড়াহুড়ো ছাড়া। কুয়াশা পড়ে ছবিটা যদিও ভিজে যাচ্ছে অথবা ধোঁয়ায় ঝাপ্সা হয়ে যাচ্ছে কেবলি।
০৩ নভেম্বর ২০০৩
প্রায় প্রতিনিয়ত ক্ষুধার জ্বালা সই আর ভাবি মহান আল্লাহ করুণা করছেন না। আমরা তাঁর করুণার প্রত্যাশায় মগ্ন থাকি, অপেক্ষা করি। পালনকর্তা, তাঁর মুমিন বান্দাদের দুঃখকষ্টে রেখে নানাভাবে পরীক্ষা করেন, মনে করেছি। একবারও ভাবি নি তাঁর রাস্তায় জীবন উৎসর্গীকৃত বান্দাদের প্রতি সত্যিই তিনি কৃপণ কিনা। আজ বড় হুজুরের বয়ান থেকে জেনেছি, তিনি নিয়মিত আমাদের মাঝে জগতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ইসলামি সহীহ্ জ্ঞান বণ্টন করে থাকেনআমাদের কষ্টের মূল কারণ। এই দুনিয়ার সমস্তকিছু মুসলমানদের কল্যাণের জন্য, সেবাদানের জন্য। মুমিনদের হাতেই থাকবে রাজত্ব, আর সমস্ত জাহানে উড়বে ইসলামি ঝাণ্ডা। কিন্তু শান্তিপ্রিয় মুসলিম জাতির সহনশীলতা ও উদারতার সুযোগ নিয়ে ইহুদি-খ্রিস্টানরা মুসলমানদের পদদলিত করে, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে! ইসসাফপূর্ণ ইসলামি আইনীব্যবস্থা আল-কুরআনকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে (নাউজুবিল্লাহ!) বে-ইনসাফি বিচার চালু করেছে। বে-ইনসাফ চালু আছে আজও! ৮৮ ভাগ মুসলিম উম্মাহর এই দেশেও সেইসব শেরেকি আইন চালু করেছে; চালু রেখেছে একদল মুসলমান লেবাসি, বেঈমান, মালাওনদের সহচর।
আমি দেখেছি, যখন মুসাফির হয়েছি কিংবা কোন মিলাদ অনুষ্ঠানে দাওয়াত নিয়েছি, আমার চোখে স্পষ্ট ভাসে বে-ইনসাফের ছবি। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের অকথ্য জীবন, পাশেই সুরম্য অট্টালিকার ভিতর সুস্বাদু আহার, সুমিষ্ট ফলমূল ও সুন্দর সুন্দর মেয়ে-মানুষের বেপর্দা ঢলাঢলি! যে ব্যক্তি প্রতিবেশীকে অনাহারে রেখে নিজে পেটপুরে খায় সে তো প্রকৃতপক্ষে মুসলমান নয়। অনাহারীদের কষ্ট মনে আসায় আমার আঁখি অশ্র“সজল হয়।
হুজুর আরও বলেন: আমাদের দুর্দশার জন্য আমরাই দায়ী। কেননা আমরা ভুলে গেছি পবিত্র হাদীস শরীফের কথা। যেখানে হুজুর পাক (স.) বলেছেনআমাকে, আমার রিযিক, বর্শার ছায়ার নিচে রাখা হয়েছে। এছাড়াও তিনি আরও বলেন: যখন তোমরা জিহাদ পরিত্যাগ করবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর অপমান অপদস্ততা চাপিয়ে দিবেন। যতক্ষণ না তোমরা পুনরায় জিহাদকে আঁকড়ে ধরবে।
তাঁর বয়ান শেষে আমাদের অন্তরে অনুতাপ আসে এবং আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। সত্যি, বাইরের আলো-বাতাস গায়ে লাগলে ফোসকা উঠে, জ্বালা ধরে। চোখে পড়লে দৃষ্টিতে লালচ আসে, চরিত্র টালমাটাল হয়! কারণ বাইরের আলো বাতাস পরিপূর্ণ ব্যাভিচারে! ইসলামের সর্বত্র চরম অবমাননা ও অপমান দেখে-শুনে নিজেকে অবিচল রাখা বাস্তবিক কঠিন।
০৭ নভেম্বর ২০০৩
এ যাবত তাঁর অন্তর উজ্জ্বলকারী বক্তৃতায় আমাদের গোপন মনের আয়না স্বচ্ছ ও দীপ্তিমান হয়ে উঠলো। আমরা আল্লাহর রাহে এমনতর অনুপ্রাণিত হয়ে উঠলাম যে, বে-এখতিয়ার আমাদের দিলে আকাক্সক্ষা জাগলো যেন আমাদের মস্তক খোদার রাহে কোরবান হয়ে যায়। মোহাম্মদী ঝাণ্ডা উঁচু করে ধরার কাজে ব্যয়িত হয়ে যায় আমাদের জান।
কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি সর্বাত্মক জিহাদ ঘোষণার জন্য যথেষ্ট নয়; শারীরিক কিংবা মানিসক কোনভাবেই। অতএব, আমরা হুজুরের হাতে হাত রেখে বায়াত নিয়েছি, এখন থেকে ইসলামের ঝাণ্ডা উঁচু করতে, জিহাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি এবং জিহাদই হবে আমাদের ধ্যান-জ্ঞান। এই দেশে অবশ্যই ইসলামি আইন চালু করব। সকল বে-ইসসাফ তথা বাতিলের মোকাবেলা করবই করব। মুমিন-মুসলমানের দুঃখ-দুর্দশা, অপমান-অপদস্ততা লাঘব করব। আর আমি যেন আমার শহীদী আত্মা, মোহাম্মদ বিন কাসেমের সম্মান অটুট রাখতে পারি। আমিন।
২৩ ফেব্র“য়ারি ২০০৪
গত তিন মাস তিনি, আমার উপর আছরকারী শহীদী আত্মা ভর করে না। আমি তাঁর অপেক্ষা করি। তাঁর অপেক্ষা করে করে আমার আজ মনে হয়, তিনি আমাকে ছেড়ে গেছেন। হয়তো আর আসবেনই না। আমার শরীরও তাই বলে। সম্ভবত ক্কলব আমার পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঘোর অন্ধকারেও আমার ফর্সা দেহ জ্বলজ্বল করে। ধারালো ছুরির মতন পাতলা ফিনফিনা লাগে। তবে এখন বোধকরি আমার ছুটি! ছুটিতে আমার কী কাজ? আমি তো কোথাও যাব না। বাইরের আলো বাতাস, বাইরের কারও সাহচর্য তো আমার ভালো লাগে না। অনেক আগেই এইসব ত্যাগ করেছি। ঘরের মাঝে একা একা প্রভুর অথবা শহীদী আত্মার নৈকট্য কামনা, কল্পনা আমার বরং আরও অত্যধিক ভালো লাগে। তাই তিনি তবু যেন আবার আসেন, ছেড়ে গিয়ে থাকলেও নিয়মিতভাবেই যেন আসেন আগের মত; আমি সেই সাধনায় লিপ্ত হই।
০২ মার্চ ২০০৪
অনেকদিন পর আম্মাকে মনে পড়ছে খুব। কতদিন আম্মার সাথে কোন সাক্ষাত নাই; তার কোন খবর জানি না। আল্লাহর রহমতে নিশ্চয়ই ভালো আছেন। তার জন্য তবু মনটা বড় ছটফট করছে। আম্মাকে একবার দেখে এলে কেমন হয়? এক নজর দেখে আসব আসব ভাবছি। মনটা একটু ভালো হলেও হতে পারে। আর যেহেতু এখন কিছুদিন ছুটিও পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কবে যে বে-ইনসাফে ভরা ফ্যাসাদময় এই দুনিয়া থেকে ছুটি পাব, জাহেলি আযাব থেকে নাজাত পাব। আর ভালো লাগে না।
০৯ মার্চ ২০০৪
রাত গভীর হলে আমি খুব ছটফট করি। দেহের অভ্যন্তরে রক্তকণারা চনমন করে, অবিরাম অস্থির দৌড়ায়। প্রকৃতপক্ষে আমার খুব নেশা জাগে। শহীদী আত্মার শিনার সাথে আমার শিরদাঁড়ার মিলনের নেশা। তাঁর সাথে আসা হুর, যে সর্বশেষ যখন আত্মা পরপর তিনদিন এসেছিল, ওকে সাথে নিয়ে এসেছিলপ্রথম ও শেষবারের মত হয়তো। হুরের সাথে সহবতের তৃষ্ণায় আমি ব্যাকুল আছি। ও, আমাকে সঙ্গমের আনন্দ দিয়েছে, যা আত্মার বলিষ্ঠ শিনায় শিরদাঁড়ার মিলনের চাইতে মধুর; খুব বেশি সুখের! আমি মৈথুন শিখেছি ওর কাছে। উহহ্, কত সুখী হয়েছি আমি! কিন্তু সেই যে সে গেল; আর আসে না কেন? আসে না কেন-আমার যে আর ভালো লাগে না কিছু। কিচ্ছু না!
০৫ এপ্রিল ২০০৪
একটা স্বপ্নাবিষ্ট ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে যদিও পূর্ণ বাস্তব। নিয়মিত বিরতিতে ফিরে ফিরে আসত আমার কাছে। পৌনঃপুনিক আনন্দ স্বাদ! যার নেশা আমার আম্মাকে ভুলে থাকতে সাহায্য করেছিল। এবং যাকে আমি আঁকড়ে ধরেছিলাম; অবশেষে ভালোবেসেই। আর যেহেতু আমাকে খাঁটি মুসলমানের ঈমানি শক্তি পেতে পবিত্র ইসলামি জ্ঞানের হেদায়েতে একনিষ্ঠ মনোযোগী হবার দরকার। আমি অতএব প্রায় চার বছর পর আম্মার সাক্ষাত লাভের সুযোগ পাই। বিগত বছরের দিনগুলোতে হেদায়েত লাভের জন্য বিভিন্ন স্থানে হিজরতসহ পবিত্র শহীদী আত্মার সান্নিধ্য ও সহবত পেয়ালায় নিজেকে ডুবিয়ে ক্কলবের কালিমা ধৌত করে স্বর্গীয় সুখানুভব পেতে নিবিষ্ট থেকেছি। যখন ছুটি হলো, আমি মোটামুটি উল্লসিতচিত্তে ফিরে আসি মাতৃপ্রেম ও মাতৃস্নেহ ভালোবাসার কাছে। দীর্ঘ বিচ্ছেদ বেদনার পর, মাতৃসাক্ষাত আমার এইরকম বিষময় হবে জানলে কস্মিনকালেও আমি আসতাম না। মাত্র সাতটি দিনের ভিতর মাতৃপ্রেম আমার উদর হতে গলগল করে উগলে এলো! অতঃপর পাকস্থলী নিগড়ে পিত্ত বমির মত এলো নীল মাতৃস্নেহ আদর। এবং আমার মুখ হয় প্রচণ্ড তিত্তা বিষ!
আমি সব সম্পর্ক ছিন্ন করে এলাম; কোনভাবেই বিনা কারণে নয়। বে-নামাজী, বে-পর্দা মহিলা আমার আম্মাবিধবা। হাদীস মতে বিধবার শরীর হবে রুক্ষ্ম শীর্ণ। অথচ শরীর তার দেখ, এখনও টসটসে যুবতী! কেন? কেন? তিনি কি তবে ব্যভিচারী? (নাউজুবিল্লাহ!) আমার বিবাহযোগ্য বোনের বিয়ে না দিয়ে স্কুল, কলেজে বে-পর্দা বিচরণের সুযোগ দিয়েছেন! তার সুশ্রী দেহের উপর না জানি কত যুবক পুরুষের বে-এখতিয়ার লালচ ঝরে! ছিঃ! ধিক! শত ধিক তাদের! আমি আজ বুঝেছি আমার ঈমানি জীবনের শুরুতে কষ্টের হেতু। এই মহিলার পাপস্পর্শ মুক্ত হবার প্রয়োজন ছিল আমার; এখনও আছে।
আল্লাহ, তুমি ওদের হেদায়েত করো, হেফাজতে রেখো। ওদের জন্য আর কী? আল্লাহর কাছে আমার লাখ লাখ শুকরিয়া, তাঁর রাহে জীবন উৎসর্গে আমার আর কোন পিছুটান রইলো না। আলহামদুলিল্লাহ্!
১৭ মে ২০০৪
আমি তো দিন-রাত ঘর অন্ধকার রাখছি ধ্যানমগ্ন থেকে, চক্ষু বন্ধ রেখে। ও যদি স্বপ্নেও অন্তত আর একবার আসে। আর একটিবার আসে। অন্তত আর একবার তাঁর উষ্ণ পরশ আমার চাই। সে আসে না! সত্যি, আমি খুব দুখী! হতভাগ্য!
আমি কিন্তু নিশ্চিতভাবেই জানি, ও আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। কারণ আমি শহীদ হতেই জন্মেছি। এবং ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার জিহাদে আমি শহীদ হবোই। শহীদের মর্যাদা আমার জানা। আর তাদের সাথে তো হুররা থাকবেই। ইস, কেন যে তবু এত অস্থির অস্থির লাগে! সহবতের সুখময় সেই স্মৃতি মনে এলে তো নিজেকে অবিচল রাখা সত্যি খুব কঠিন! আহ্, আমি এখন কি করি; কী করব? মৈথুন! ভালো লাগে না, ভালো লাগে না এইসব! উহ! আমি আর পারি না থাকতে! আহ্! উম!
১১ সেপ্টেম্বর ২০০৪
আমার অশ্র“সজল আঁখি টলমল সারাক্ষণ। বসনিয়ায় অসহায় মায়ের করুণ কাহিনিছবি যখন চোখে ভাসে, বিদীর্ণ অন্তর তখন জারেজারে কান্দে। রক্তাক্ত গুজরাট কিংবা আরাকানিদের আর্তনাদ কানে বাজলে, একজন মুসলমান হিসেবে নিজেকে স্থির রাখা দুঃসাধ্য। রক্তের ভিতর বারুদ জ্বলে। বস্তুত আমাদের দিল জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহর দিকে মশগুল। আমাদের সকল কাজ সকল ধ্যান-ধারণা তাই জিহাদের অনুবর্তী। আমাদের প্রেরণা সৈয়দ আহমেদ বেরেলভীর ঐতিহাসিক বাণী: যদি কোন ব্যক্তি তামাম দিন রোযা রাখে, তামাম রাত ইবাদতে অতিবাহিত করে; এমনকি নফল পড়তে পড়তে পা ফুলে যায় এবং অপর এক ব্যক্তি জিহাদের সংকল্প নিয়ে দিনে বা রাতে এক ঘণ্টা কাল বারুদ পোড়ায়, যাতে কাফিরের মোকাবেলা করতে গিয়ে, বন্দুক চালাতে গিয়ে তার চোখ একটুও না কাঁপে, সেরূপ ক্ষেত্রে সেই আবেদ কখনো এ মুজাহিদের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারবে না।
অথচ আমার যে কি হলো! আমি আজও মরদে মুজাহিদের যথার্থ ট্রেনিং গ্রহণ করতে সক্ষম হলাম না। অস্ত্রহাতে আমার নিশানা একদমই ঠিক হয় না, হাত কাঁপে থরথর! বারুদ পুড়িয়ে শক্তিশালী বোমা বানাতেও আমি সিদ্ধহস্ত নই। জিহাদের কঠিন প্রশিক্ষণ নিতে গেলেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। এহেন জিন্দেগি তো আমি চাই না। আমি আমার অসহায় মুসলিম ভাইদের জন্য কিছু করতে ব্যাকুল আছি। কিন্তু কি সেই সহজ পথ বাতিলকে খতমের এবং নিজে নিশ্চিত শহীদ হবার। আমি জানি না! আমার মন বিষণœতায় ছেয়ে আছে এবং ছেয়ে থাকে সারাক্ষণ।
২৯ অক্টোবর ২০০৪
নিজেকে অবিচ্ছেদ্য অন্ধকারে মিশিয়ে দেবার পরও একফোঁটা ঘুম হয় না আমার আর। তবে আমি কী করতে পারি। ঘুমও আমাকে ছেড়ে গেল! ওর শেখানো পদ্ধতিতে যদিও মৈথুন করছি কমসে কম দিনে তিনবার; সেই কবে থেকেই! এতে আর সুখ নাই এখন! অর্থাৎ সঙ্গম শেষের শান্তিময় নিবিড় ঘুম পাওয়ার কোন সহায়ক অনুপস্থিত।
শরীরটা দুর্বল হয়ে আসছে কেবলি! আজকাল মুখে কিছু রুচে না। সারাক্ষণ বমিবমি পায়, জোর করে খেলে সরাসরি বমি। এটা নতুন উপসর্গ। আলোতে আমি একদম তাকাতে পারি না; ইচ্ছে করে না। নির্জন আঁধার আমার বেশি প্রিয়। সে অর্থাৎ হুর, এলেই আমি সুখী হবো, সুস্থ হবো। অন্যকিছুতে নয়। সে আসে না, অথচ আমি আজও জানতে পারি নি, আমার শাহাদাতবরণের দিনটি কত দূরে! শহীদী আত্মা আমাকে ছেড়ে গেছে! ক্ষণেক শান্তি দিল যে, আমাকে পাগল বানাল যে, সেও আসে না! খাওয়া, ঘুম, তাও প্রয়োজনীয় নয় আর; মনে হয়! এই দুনিয়ায় তবে আমার আনন্দ বলে অবশিষ্ট আর কি আছে! কিছু নাই! তবে কেন পড়ে আছি আজও এখানে? কেন?
১৬ ডিসেম্বর ২০০৪
ইদানিং আমার শুধু কান্না পায়; শরীরটাও একটু বেশি দুর্বল দুর্বল ঠেকে। আমি এখন যদিও পরিমিত আহার করতে পারি। অল্প পরিশ্রমেই চোখটা ঝাপ্সা হয়ে আসে; নিজেকে ঘন অন্ধকারে খাবি খেতে দেখি। সেদিন হলো কি, বড় হুজুরের কাছে জিহাদের ট্রেনিং নিতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। দেহ আমার এত দুর্বল হলো কখনকেন? ট্রেনিংটাও যদিও অত সহজ ছিল না! কিন্তু মনে তো আমার ঈমানি শক্তির কমতি নাই। এই জিহাদের জন্য পেয়ারা নবী (স.) নামাজ কাযা করেছেন; নিজে পেটে পাথর বেঁধেনা, এইসব মনে করব না; আমার কান্না পায়। নিজের উপর ঘেন্না ধরে অধিক। আমি কোনভাবেই অঝরে ঝরা অশ্র“, সংবরণ করতে পারি না!
ভোরবেলায় ফজরের পর হুজুর আসেন। আমাকে অনেক আদর করেন, সান্ত্বনা দেন। পিতৃস্নেহ দিয়ে বলেন: বাবা বিষণœ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। তাঁর সস্নেহ পরশে আমি শান্তিবোধ করি। তবু তাঁর চোখে চোখ পড়লে আবার আমার আঁখি বে-এখতিয়ার অশ্র“সজল হয়। তিনি আমার গোপন মনের আয়না পড়তে পারেন, বুযুর্গ ব্যক্তিরা এমন পারে। এবং তিনিও আকুল কাঁদেন। আমাকে তাঁর কোলে তুলে নিয়ে বলেন: বাবা, তুমি শাহাদাতবরণকে এত ভালোবেসেছ, তোমার উপর থেকে কি আল্লাহ রহমত সরিয়ে রাখতে পারেন। তোমার মত বান্দাদের জন্যই তিনি রেখেছেন নিশ্চিত শহীদের পথ। অত্যন্ত সহজ পথ। তোমার প্রতিটি রক্তকণা, আমি দেখছি বারুদ মিশ্রিত ¯িপ্রন্টার, পুরো দেহ এক শক্তিশালী বোমা! তোমার কিসের দুঃখ বেটা, তুমি খোদার খাস রহমত পেয়েছ। তুমি ‘আত্মঘাতি’ হবার দুর্লভ নেয়ামত পেয়েছ।
অতএব, আজ থেকে আমার প্রস্তুতি বাতিলের মোকাবেলায় আত্মঘাতি হামলার।
১৫ আগস্ট ২০০৫
অনেকদিন পর আবার হুজুর এলেন। তিনি আসা মানে আনন্দ সংবাদ। এবং এর চেয়েও আনন্দ সংবাদ আমাকে জানান। আজকে আমার নতুন করে অনেক কথা স্মরণে আসছে। অনেক আগেই আমি পবিত্র শহীদী আত্মার বর পেয়েছি। এবং অনেকদিন হলো তিনি আমার কাছে আসছেন না। হুজুর আমাকে বলেন: মোহাম্মদ বিন কাশেম, মানে তোমার পবিত্র আত্মা, হুজুরের কণ্ঠটা হঠাৎ ভিজে উঠে, তাঁর সজল চাহনি আমাকে বরাবরের মতই অসহায় বিহ্বল করে দেয়। একদলা কান্না আমি গলায় আটকে রেখে তাঁর নূরানি মুখের দিক চেয়ে থাকি। তোমার পবিত্র আত্মা, হুজুরের রূদ্ধশ্বাস কণ্ঠ আবেগঘন হয়ে উঠেবীর মুজাহিদ, জিহাদের ময়দানে লাখ লাখ কাফের ক্কতল করেছেন, তাদের খুনে বদন মেখে খোদার দিদার লাভ করেছেন! আবার দুনিয়ায় এসেছেন কাফের হত্যা করে শহীদ হতে, তোমার উছিলায়। আজ সেহুজুর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন! আমি বুঝি না কান্নার কি হলো!
আমি, আমার আত্মার বীরত্বে আনন্দিত হই। আর গর্বিত চেয়ে দেখি হুজুর আকুল কাঁদেন। তাঁর কান্নাও কত সুন্দর পুণ্যময়; সুবাসিত বার্তার প্রতীক! কচি আমপাতা রঙের মেহেদি করা দাড়ি বেয়ে অশ্র“ফোঁটা পাঞ্জাবির কোলে গড়িয়ে পড়লে আমার নাকে গোলাপজলের গন্ধ আসে। অশ্র“র যেন মরণ হয়! তিনি তখন শেষ বার্তাটি পরিবেশন করেনকিন্তু সে আজ দূরদেশ ইরাকের ময়দানে বাতিলের হাতে শহীদ হয়েছে। হুজুরের বাম চোখ থেকে আর একটি অশ্র“কণা অনুরূপ দাড়ি বেয়ে কোলের উপর পড়ে; আগেরটা এসেছিল ডানচোখ থেকে। বাকি জলকণারা হয়তো গোঁফ-দাড়ির ঘন আমপাতা বনে আটকে গেল! আমার একটুও খারাপ লাগে না। গোলাপজলের গন্ধে ঘরটা মৌ মৌ করে। স্বচ্ছ চোখে আমি বুঁদ তাকিয়ে হুজুরের চোখে। তাঁর জলধোয়া চোখ চকচকে; কণ্ঠ তাই অবিচলিত, স্থির। সে, পবিত্র আত্মা তোমার সাথে আবার মিলিত হবে। তবে এবার সে চায় এই দেশে ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠায় তোমার এই দেহবোমাকে ফাটিয়ে দিয়ে তারপর যাও তার কাছে। ধ্বংস হোক যতসব মুরতাদ-বেঈমান-কাফের, উকিল-ম্যাজিস্ট্রেট-জজ।
এই শুভ সংবাদের প্রতীক্ষা আমার অনেক দিনের। আমি অস্থিরতায় কেঁপেকেঁপে উঠি। কী করতে হবে বুঝে উঠতে পারি না; বিচলিতবোধ করি খুব। বুযুর্গ আলেম মানুষ হুজুর আমার অস্থিরতা বুঝেন, আশ্বস্ত করেনতুমি ধ্যানমগ্ন থেকে আত্মশুদ্ধি কর, অস্থিরতা রোধ কর, আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা কর। সময়মত প্রস্তুত করে তোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।  আমার এখন শুধুই প্রার্থনা আর প্রতীক্ষার পালা; প্রতিটি প্রহর, প্রতিটি মুহূর্ত।
২০ সেপ্টেম্বর ২০০৫
আলহামদুলিল্লাহ্! শেষ পর্যন্ত আমি জীবনের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাওয়ার টিকিট পেয়েছি! অতুলনীয় বুযুর্গ ব্যক্তির স্নেহ ও পবিত্র শহীদী আত্মার সহবতনিশ্চিত জানি, আমার পলক পড়ে নি; পড়া অব্যাহত রেখেছি অপলক। ত্রিশঙ্কু অনুবাদ বন্ধ করে দেয় তবু। অথবা ওর অশরীরী ছায়া দিয়ে পর্দার ছবিগুলো গিলে খায়। একটু পর অবশ্য বুঝি, আমার হাতে পর্দার মত খাতাটি নাই। শূন্য হাত বুকের উপর নিথর পড়ে আছে এলোমেলো। কেড়ে নিল কি? হয়তো সবশুদ্ধ গিলে খায়। যাই করুক, এইসবের মানে একটাই হতে পারে: আমাকে শেষ দেখতে দিবে না! না দিক! আমার কোন চুল ছিঁড়া পড়ব? অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক আচরণ এইসব। কেন জানি হঠাৎ করেই আমি রেগে উঠতে চাই। কিন্তু রাগ ছাপিয়ে আসে অভিমান। হারানো অথবা চাপা ব্যক্তিত্ববোধ চাঙ্গা হয়ে উঠে। এইসব ঘটনাকে আমার অপমান হিসেবে চিহ্নিত করি নির্দ্বিধায়। না, এভাবে বারবার অপমান সহ্য করার কোন মানে হয় না। আমি নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে অর্থাৎ নিজের মনে আসা অপমানবিষয়ক ভাবানগুলো চেপে রেখে শুধুমাত্র কিঞ্চিৎ অভিমান প্রকাশ করি।
: হাত থাইকা খাতাটা কাইড়া নিলা!
এবারও যে সে অনুতাপবোধ করল তা নয়। বরাবরের মতই ও নির্বিকার রইল এবং নির্বিকার অকপট বললওর কি আসলে আমার কিংবা মানুষের প্রত্যাশা উপলব্ধি করার জ্ঞান জিরোতে?
: এডে দিয়ে আপনে আর কী করবেন? গপ্পর শ্যাষ পরিণতি আমি। এহন আমারে দ্যাহেন।
দেখলেন বিদ্রুপ কাকে বলে, কীভাবে করে! আচ্ছা এইসব যে ও না বুঝে বলছেএটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? ওকে দেখার এমন কি আছে! আমি, তাছাড়া আবার কিছুই দেখতে পাচ্ছি না তা কি আর ও বুঝে নি? আবার দেখ, ওর কথার ভিতর কোন কথা বলা যাবে না, এমনকি যৌক্তিক প্রশ্নের উদ্রেক হলেও। ওর প্রতি মনটা যেভাবে বিষিয়ে উঠছে এখন তাতে আমি কথা বলতে গেলে তেঁতো বেরিয়ে নির্ঘাত ঝগড়া বেঁধে যাবে। সুতরাং ওর উক্ত আচরণের প্রেক্ষিতে আমার কী করণীয় তাও আর ভেবে দেখার চেষ্টা করি না। এক্ষেত্রে নীরবতা আমার ব্রত। ত্রিশঙ্কু না মোহাম্মদ বিন কাসেম না গেন্দা সময়ক্ষেপণ করে না আমার কুনো মতামতের প্রতীক্ষায়। হঠাৎ করে গল্প আরম্ভ করে এইভাবে, সরাসরি এখান থেকেশাহাদাত বরণ শ্যাষে, আমি ছুটছি শহীদের মর্যাদা নিতে; সাত আসমান কাইটে। আমার আর দেরি সয় না। কয় আসমান পার অইছি চায়ে দেহি নাই। হঠাৎ দেহি দ্ইুডে ফেরেশতা, নূরের তৈরি, নূর ছড়ায়ে পথ আগলায়ে দাঁড়ায় আছে। আমি কাছে যাবার পাইলাম না; থামলাম। দূরতনেই আগুনের তাপে আমার ফোসকা পড়া অবস্থা! ঘটনা কী! ফেরেশতাগরে শইল্লের আগুনতাপ সবার পাই না তা খোদার নূর সমু কিবেই? এক সুইতেও আইগেন যাব মুন অয় না। তাই এত ফাঁকে থাকতেই আমি ফেরেশতাগরে হতে কতা কওয়ার প্রস্তুতি নেই। আমি কিছু কই নেই, তার আগেই ডাইন পাশের ফেরেশতা কতা কয়। সুজাসুজি বাংলায় আমারে জিজ্ঞেস করে: কই যাবার চাও তুমি? অগর মুহে বাঙলা কতা হুইনে আট্টাস নাইগে গেলাম আমি! ফেরেশতারা বাংলা ভাষাও জানে! আমি বুদাই আরো কত কষ্টে উর্দু আরবি হিগলাম, বাংলা ভুইলে থাকলাম! অগর হতে কতা কওয়ার মিছিল আমার উলট-পালট অয়ে যায়। ইদিহি বাংলাও তহন আর আমার মুখ দিয়ে আইবের চায় না। খানিক সুময় জবান বন্ধ অয়ে খাড়ায় থাকলাম। তারপরে কুঁৎ দিয়ে দিয়ে কইলাম, মায়ের ভাষাতেই কইলাম: আমি শহীদ অইছি। অগরে পশ্ন ইডে না। তারপরও আমার মুখ তনে এই কতাডা কিবেই ম্যান আয়ে পড়ল। পরছে পরছেই কি আর করন যাব। এরপরে বাহিজুন মানে বায়ের ফেরেশতাডা, চন্নত কইরে কতা কয়: তোমার আমলনামাত দ্যাখতাছি কয়জন নিরীহ মানুষ খুন কইরে আইছ! তাও আবার আত্মঘাতি উপায়ে!
: জিহাদের ময়দানে সব রকমের মানুষই ক্কিতাল হয়। আমি বুকে একটু বল ফিরে পাই। এই বলের উপর ভর কইরে জবান আইবের চায়আমি কিভাবে শহীদ। আমি কবার চাই: আমি খোদার কাছে যাইতাছি, কুন্ পথে যামু দ্যাহাই দাও। তয় আমার এই জবান ফুটার আগেই ডাইন পাশের ফেরেশতা কয়: তোমারে নিয়ম অনুসারে কিছু পশ্নের জবাব দেওন লাগব যে। আমরা এইসব পশ্নের সঠিক জবাব নেওনের জন্যে দাঁড়ায় থাহি। আইচ্ছা, আগে কও তুমি তোমার নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করছ কুনোসুম? যারে কয় নিজের হাতে নিজের যুদ্ধ। বাঁয়ের ফেরেশতা: তোমার আমলনামা সাক্ষী দেয়, তুমি কামোন্মত্ত, মোহগ্রস্ত, হিংসায়এই বাঁওয়া না, বেজায় ফাতরামি শুরু করে। খালি আড় বাজায় বাজায় কতা কয়, কলকল কইরে উঠে এহাবারে। আমলনামা চুদাইছে। ইল্ল্যে ভেজাল আমার অসহ্য ঠেহে। মেজাজ খিঁচড়ে যায়।
: আপনেরা এত কতা কইতাছেন ক্যা? শহীদেরা বিনা হিসেবে বেহেশত পায়। আপনেরা ক্যারাপথ ছাড়েন দেহি, আমি যাই। আমার ভিতরে মুজাহিদি জোস আয়ে পড়লেও আসলে আমি তাগরে কতার কুনো জবাব খুইজে পাই না। সত্যি কতা অইলো নিজের হতে নিজের যুদ্ধ করার কতা হুনি নাই আগে কুনোদিন। তাইলে এহন রাগটা কার না উঠে! ফেরেশতারা আমার মেজাজ দেইহে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তারপর দুইজুনে একসাথে গলা মিলায়ে কয়: ঠিক আছে তুমি কই যাবা যাও। আর কুনো পশ্ন করে না। চোখের পলকে মিলে যায়।
তারা মিল্ল্যে গেলে পর চাইর পাশ থাইকে আন্ধার আইসে আমারে চাইপে ধরে। ঐ আন্ধারডা থাইকে আমি বারাবার আর কুনো পথ পাইলাম না। আমার দেহের আকার নিল! দ্যাহেন না, আমি আহার পরই আপনের ঘরডা আন্ধার অয়ে গেছে! আমি যার উপরে ভর করমু ও আর দেখপ না কিছু! ফলে সাধের বেহেশতে যাবার আমার আর সাধ্যি থাকল না।
এতক্ষণ নিজেকে চেপেচুপে রাখতে পারলেও এই পর্যায়ে এসে পারি না। রূদ্ধশ্বাসে প্রশ্নটা বেরিয়ে যায়।
: কেন? তা হবে কেন? আমার ঘর সত্যিই ওর আগমনে অন্ধকার হলো কিনা এই বিবেচনাবোধ তৈরি হয় না।
: কারণ ঐ দুর্লভ জিনিসডা আছে আমার মায়ের পায়ের নিচে। আমি আত্মঘাতি অইছি, আসলে শহীদ অই নাই। আম্মা আমারে অস্বীগের করছে, আমি তার পোলা পরিচয় দিতে শরম পায়। একফোঁটা চোখের পানি ফালায় তাও মুখ ঢাইকে মাইনষের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে। আমিও ত মায়ের পোলা গেন্দা আর আছিলাম না। তিনি ত এইরম আন্ধার পোলা জন্ম দেয় নাই।
এতক্ষণ আমি কি ঠিকমত শ্বাস নিয়েছি? বোধহয় নেই নি, তাই অনেকক্ষণ হয় আর কোন গন্ধ অনুভব করি নি। এখন শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতির কারণে পঁচা রক্তের তীব্র গন্ধ আঁচ করছি। সুতরাং আমি আবার ভাবতে শুরু করি ব্যাপারটা কী ঘটছে বা কী ঘটতে যাচ্ছে। আদৌ কি লোডশেডিং হয় নি! ঘরের এই অন্ধকার ওর কথা মত ওরই অশরীরী আত্মার ছায়া? আর গন্ধটাএইসব ভাবনার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি কোন গন্তব্যে পৌঁছার আগেই ওর প্রতি আকস্মিকভাবে দ্বিগুণ সহানুভূতি ফিল করি। এমনিতেই মনে হলো যেন ওর প্রতি সিমপেথি ফিল না করে অন্যায় করছি। তাই আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সৎ পরামর্শ আকারে : তুমি তোমার আম্মার কাছে ফিরে যাও, ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তোমাকে বুকে টেনে নিবেন, আবার। অশরীরী ছায়া না ত্রিশঙ্কু না গেন্দা ‘উহহ্’ আর্তনাদ করে উঠে।
: ভাই মায়ের বুকে ত যাইতেই চাই। জালিমরা মিছে মুন্তর দিয়ে পাহারা বহাইছে যে। আমি ত যাবার পাইতাছি না। তাছাড়া রক্তের দলা ছাড়া ত জগতে আমার কুনো অস্তিত্ব নাই। দেহডা ছিঁড়ে-চিমটে গেছে না! কেউ কি আর এ জিনিস দেখলে ঠিক থাকপের পাব! দেশের মানুষ আমারে ঘৃণা করা শুরু করছে। আমি মানেই দুনিয়ায় অমুঙ্গলের ছায়া! কী কমু ভাই, আমি আসলে ইহকাল পরকাল দুইডেই হারাইছি। ত্রিশঙ্কু অওয়া ছাড়া আমার আরবলতে বলতেই অশরীরী ছায়া না ত্রিশঙ্কু না গেন্দা আবার আর্তনাদ করে ‘ইস’।
আমি বিচলিতবোধ করি। ওকে বলি : কী হলো, তুমি আর্তনাদ করছ কেন? তোমার কষ্টটা কী খুব বাড়ছে? আমি মনে-প্রাণে তোমাকে উপলব্ধি করতে পারছি, করছি। তুমি বল তোমার দুঃখ অভিজ্ঞতার কথা। বলে যাও ভুল জ্ঞানে প্রতারিত হবার করুণ কাহিনি।
: কইছিলাম না, পানি তিয়েশ এইমাত্র পানির অভাবে ফাইটে চৌচির অয়ে গেলাম। মেল্লা কতা হুনলেন; না? উগলেন আসলে কি কতা! আমি কতা কই পামুগলগল কইরে রক্ত পড়ল! রক্তের হাহাকার; বুঝেন না? আহারে, আপনেও দেখছি রক্তে ভিজে যাইতাছেন গা!
টিউব লাইটের সুইচটা বন্ধ করা হয় নি তাই মধ্যরাতে ইলেকট্রিসিটি চলে আসায় মিটিমিটি হেসে জ্বলে উঠে, অথবা অশরীরী ছায়া কেটে পড়েছে! কোথাও কেউ নাই! কিছু নাই! অথচ আমার চোখ, আমার পোশাক, আমার আপাদ-মস্তক, আমার বিছানা তাজা রক্তে ভেজা! রক্তভেজা চেটচেটে বিছানায় খোলাচোখে সারারাত পড়ে রইলাম! একফোঁটা ঘুমও কি আমার আর হলো; কখনো হবে না?
পুনশ্চ : এই গল্পে উল্লিখিত একটি বর্ণও বানোয়াট কিংবা অসত্য নয়। বিশ্বাস করেন বা নাই করেন, মানুষ কি কিছু বানাতে পারে; কখনো!

কার্তিক ১৪১৩

পথ দেখানো পথিক

দম আটকে আসে, চোখ জ্বলে
এখনকার এই অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ আবহ আমাদের ভালো লাগছে না। বৈদ্যজনেরা বলে থাকেন যদিও সময়টা নাকি স্বাস্থ্যকর। তা আমাদের ভালো লাগে না। অস্বচ্ছতায় বিশুদ্ধ অক্সিজেনের অভাব বোধ করি। খোলামেলা আলো-বাতাসের নিমিত্তে হাঁসফাঁস করা অবস্থা হয়। স্পট সাপেক্ষে আমরা অবশ্য পলায়নপর হতে পারি। কোন মহল থেকে কোন বাধা আসবে না, উৎসাহ বরং পাওয়া যাবে। তবু পালানো যায় না। এখানে বাধা হয় কৌতূহল। এক মন হাই তুলে: এই অস্পষ্টতায় নিজেদের জড়িয়ে রেখে কী লাভ? সাথে সাথে অন্য অংশ নড়েচড়ে: দেখি না বাবা কী ঘটে; লাভ-লোকসান হিসেবে কি প্রয়োজন! আমরা নিজেদের ভিতর মৃদু মুখরিত দ্বন্দ্বে দুলতে থাকি। এবং পুরো বিষয় অনুভবের নেশা জাগে। আমাদের আর অন্য কোথাও সরে যাওয়া হয় না। অস্বচ্ছ আবহে, অস্পষ্ট দৃশ্যে, কার্যত আঁধার ও আলোর মিশেলে অথবা পরস্পরের অসম্পূর্ণ লড়ায়ে যে রহস্য কি ধোঁয়া কি ঘোমটার তৈরি হয়েছে; যা অস্পষ্টতা বলি আর কুয়াশাঘেরা অস্বচ্ছতা বলি তৈরির জন্য দায়ী, তার উপর পাতলা শিশিরের মত, হয়তো ঘোরেই আটকে থাকি। সতর্কও থাকতে হয় অবশ্য। কারণ ভারী হয়ে গেলে গড়িয়ে লুটিয়ে যাব না! দৃশ্যে জীবন্ত কুশীলবও সক্রিয় যেহেতু আছে!
বুঝা যায়, সময়টা সুবহে-সাদেকের অব্যাবহিত পরভোর। এই সময় দু’প্রকার মানুষ বিছানা ছাড়ে। এক. ধর্মপ্রাণ মানুষ, এবাদত-বন্দেগি করে। দুই. চাষিরামৌসুমে কাজের চাপ থাকে বেশি, ক্লান্তিবশে বিছানা আঁকড়ে থাকা তাদের চলে না। দরোজা খুলে ঘরে ঢুকতে দিতে হয় ভোরের মায়া। আশা যদিও থাকে আলোর, আসে আঁধার ক্রমশ! আর নিস্তব্ধ আঁধার ভোরে বাজার সরব করে তুলে পাখিরা। পাখি কিচির-মিচির করে স্বভাবে নয়, স্তব্ধ সময় সদ্ব্যবহারে কোন দূরভিসন্ধিও তাদের থাকে না। শুধু তারা এই ম্যাসেজ দিতে চায়: সময় মৃত পড়ে আছে ভাবার কোন কারণ নাই। রাতভর আমরা, প্রাণিরা সময় বহমান রেখেছি বিবিধ প্রকারে। এবার মানব, তোমরা বহতা স্রোতে যুক্ত হও পুনর্বার নির্মাণে।
আজকাল দেখানো এবাদতের হিড়িক পড়লেও চাষির কাজ, বনের পাখি-গান সীমিত- ক্ষেত্রবিশেষে উজাড় বলা চলে! এখানে যে খ-িতকালের বয়ান চলছে সেটি শীতের মৌসুম। সুতরাং শিশিরের নিঃশব্দ পতন ছাড়াও আছে অচৈতন্যবোধের অজগর আঁধার, কুয়াশার জালে আটকা; শীতল অত্যাধিক! নড়াচড়া করে কীভাবে? এমন নিশ্চিত সুখ পরিবেশ বোধে আবিষ্ট ঘরের মানুষগুলো লেপকম্বলের তলায় শুয়ে উম করে। উম করা ছাড়া অন্যকিছু করার তাগদ বস্তুত থাকে না তাদের। আলো-আঁধারের নির্মিত মোহ ভেঙে নব আনন্দ উত্তাপ সময় নির্মাণের প্রত্যয় নিশ্চিতভাবেই আসার কথা নয়। আসেও না। কুসুম কুসুম উমে তারা ঘুমিয়ে থাকে অথবা ঘুম ও সুখের ভান করে!
তবে একজন জাগতে চায় এবং জাগে। সমস্ত কিছুর পিছুটান উপেক্ষার স্পর্ধা নিয়েই সে জাগে। বলাই বাহুল্য, বাবার রক্তচক্ষু পর্যন্ত থোড়াই কেয়ার! ওর নাম সুরু, মিল্লাত উদ্দিনের মেয়ে, যার ঘরে আমাদের বর্তমান অস্তিত্ব দোলায়মান। সুরু এখনও শিশু। দিন হিসাবে যে বয়স তা পাঁচ ছুঁয়েছে কি ছুঁই নি। অথচ দেখ, কাজে-কর্মে কথায় যা প্রকাশিতআমাদের মনে হবে পরিণত!
সুবহে-সাদেকে শিশুরা জাগে। শিশু আত্মা নাকি পবিত্র ফেরেশতার মত! পবিত্র ‘ফেরেশাত্মারা’ সুবহে-সাদেক হয়ে গেলে, কথিত আছে ঘুমাতে পারে না আর। তা তুমি যতই কম্বল চাপা উম দাও কিংবা বাইরে ঠাণ্ডার ভয় দেখাও না কেন! উমটাই বরং মৌমাছির মত ওদের গায়ে হুল ফুটায় অহর্নিশি! অর্থাৎ ওরা ছটফটায় এবং ঠাণ্ডা বরণে ঠাণ্ডাকে গরম করে তোলাই বুঝি একমাত্র লক্ষ্য হয়!
সুরু এতক্ষণ খুনখুনিয়ে জানাচ্ছিল: ও যেহেতু জেগেছে, আর তাছাড়া ঘরের ভিতরেও অন্ধকার নিজেকে পাতলা করে দিয়েছে অথবা আগমন-পিয়াসি ভোরের রঙ প্রলেপ দিয়েছে মায়ার মত: অতএব সকাল হয়েছে। এখন ও উঠবে। এইসব জানাতে হচ্ছিল কারণ: সুরুর বাবা, মিল্লাত উদ্দিন, সুরুকে সহ শুয়ে আছেন লেপ জড়িয়ে। সুরুতো ছোট মানুষ। তাহলে উঠবে কী করে! বাহু, লেপ উল্টে দিয়ে উঠার মত তত শক্তি বুঝি ওর আছে! থাকলেই বা কোন গাছের মোতা উগলাবে! জড়িয়ে আছেন বাবা যে। সেখানে বুঝি শক্তি প্রয়োগ করবার উপায় আছে! ফলত উঠলে সম্মতি নিয়েই উঠতে হবে। সুরু সম্মতি চায়। সুরু খুনখুনিয়ে কাঁদে; সম্মতি আদায়ের নিমিত্তেই কাঁদে। এটা ছোটদের জোরালো দাবি প্রকাশের কৌশল। মিল্লাত উদ্দিন ঘুম জড়ানো কথায় বাহিরে ঠাণ্ডা, অন্ধকার প্রভৃতি ভীতির কথা বুঝান একনিষ্ঠ ধৈর্যে। মোটকথা উঠা যাবে না। সুরু সব শুনে, বুঝে এবং তালগাছটা চায় আবারও।
: হুঙ, হুঙ… আমি উঠমু… আব্বা উঠি?
ধৈর্য তো আর চলে না। পথ পাল্টাতে হবে মিল্লাত উদ্দিনের । এছাড়াও আমরা জানব, তিনি কখনোই প্রকৃতপক্ষে কোন সহনশীল মানুষ নন। তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ, তাঁর কথার সমালোচনা কিংবা বাড়াবাড়ির মত স্পর্ধা দেখালে নিশ্চিত খবর হবে তার। তা তুমি যতবড় বা যত ক্ষুদ্র, যেই হও না কেন। উনার আবার আত্মসম্মানজ্ঞান সব সময় মাত্রাতিরিক্ত টনটনে। এসব ক্ষেত্রে অত ধৈর্য-ফৈর্যের আর সুযোগটাই বা কৈ? তার মধ্যে আবার শরীরে যদি থাকে ঘুম-ক্লান্তি, লেপের আরামদায়ক উম। অতএব আমরা অনিবার্যভাবে ধরে নিতে পারি, তাঁর কথা উপেক্ষা করে সুরু যখন ওর দাবিতে অনড়, তিনি খুব স্বাভাবিক রেগে যাবেন এবং যেহেতু পরিবেশ উত্তপ্ত হবার প্রত্যক্ষ কারণ হাজির। মিল্লাত উদ্দিন রেগে যান। তাঁর শব্দচয়ন তপ্ত, এমনকি কণ্ঠ উদারা থেকে মুদারায় স্থানান্তরিত হয়।
: পুনাই বেশি জিদ করবি না কইতাছি। না করতাছি হুনিশ, বেশি জিদ করবি তে মুদারাতেই শেষ করা সম্ভব হলো না বাক্য তারায় উঠে যায়আন্ধারের মদ্যে তর কুন কামডা ভাইসে যায় হুনি? কণ্ঠ আবার মুদারায় নেমে আসে ঠিক তবে দৃঢ়তা বাড়ে অধিকআন্তাজে আন্তাজে জিদ করবি তে জিদ ছাড়ায় ফালামু এক্কেবারে, সুজাভাবে কইলে যুদি না হুনবি।
না শুনলে কিংবা গোঁ ছাড়াতে কী করতে হয় মিল্লাত উদ্দিনের তা জানা আছে। চটকা-চটকির মত নাকাল বিষয়ের অবতারণা হতে যাচ্ছে বলে আমাদের শঙ্কা হবে। এইরকম বোধে মুহূর্ত সময় কাটবে আমাদের রুদ্ধশ্বাসে। ওইটুকুন মেয়ে জেদের জন্য চটকানা বুঝি খাবেই শেষতক! আমাদের পক্ষে অনুমান করা মুশকিল হবে: কেন সুরু গোঁ ছাড়ছে না? মিল্লাত উদ্দিনেরটা আমরা কিছু আঁচ করতে পারি। তাঁর স্বৈরাচারী স্বভাবের কথা মাথায় রেখেও আমরা বলব: তাঁর বাবা হিসেবে উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। ঘন শীতল কুয়াশার জালে একটা শিশু ছেড়ে দেবার সমূহ বিপদগুলো স্মরণে এলে কার না গা শিউরে উঠবে! আশ্চর্য, সুরু যে কেন না বুঝে অমন করছে?
কিন্তু না, সমস্যা সম্ভবত অন্য রকম। সুরুর শোনা-বুঝা জনিত নয় মোটেও। সুরু কান্না জড়ানো ফাটা কণ্ঠ সত্ত্বেও এইমাত্র স্পষ্ট করে যে প্রশ্ন উত্থাপন করে তা নতুন ভাবনা জোগাতে সহায়ক হয় : তাইলে আম্মা উঠছে ক্যা?
এখানে আমাদের বুঝতে হবে সুরু সব শুনে-বুঝে মেনে নিয়েছে। তথাপি প্রশ্ন কিন্তু থাকে: আম্মা যেহেতু আঁধার প্রভৃতি উপেক্ষা করে উঠতে পেরেছে, তাহলে সুরুর উঠায় আপত্তি থাকবে কেন? আম্মা উঠেছে তার প্রমাণ: ওর একপাশ ফাঁকা। যেখানে ঘুমানোর কালে ছিল মা। ওকে এখন জড়িয়ে আছে বাবার শক্ত বাহু আর নাক-মুখ ডুবিয়ে লেপ। লেপের নিচে দম বন্ধ করা হাঁসফাঁস অবস্থা ও বাহুবন্ধ থেকে সুরু মুক্তি চায়। উপরন্তু মা যদি আঁধারের বুকে পা ডুবিয়ে চলতে পারেন তবে সুরুও পারবে। আম্মার মতই! এবং সুরুর উঠতে চাওয়ার দাবি ন্যায্য; অতি অবশ্যি।
আমরা মনে করব মিল্লাত উদ্দিনের কাছে দাবির ন্যায্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অথবা সুরুকে নিয়ন্ত্রণের মোক্ষম কৈফিয়ৎটি তিনি পেয়ে যাবেন। আমরা দেখি তিনি অনেক নরোম হয়ে গেছেন। এবং নরোম সুরেই সুরুর কাছে আম্মা বিষয়ক কৈফিয়ৎ হাজির করতে প্রবৃত্ত হন।
: তোমার আম্মা উঠছে ক্যারা কইলো?
পরিবর্তিত সুরের প্রেক্ষিতে, নিয়ন্ত্রণ কিন্তু সাথে সাথে চলে যায় সুরুর হাতে। নিয়ন্ত্রক সুরু মিল্লাত উদ্দিনের কৈফিয়ৎ শেষ হবার আগেই জোরালো প্রতিবাদ করে বসে। ফাটা কণ্ঠ দৃঢ়তায় স্পষ্ট করতে গেলে কান্নাটাই বেশি জোরে ঠেলে আসতে চায়। কিছু অভিমানও যে চেগে উঠছে না তাই বা কি করে বলা সম্ভব!
: এ্যাই মিছে কতা কস ক্যা? আম্মা উঠে নাই তে কি!
না, কান্না আর চেপে-চুপে রাখা সম্ভবই না। অর্থাৎ সুরুর ফুঁপানো কান্নার শব্দ ঘর ভরে দেয়। অনেকক্ষণের চাপা কান্না তো, হলকা দিয়ে একবারে বের হতে চায়। তবে মিল্লাত উদ্দিন রাগ ভুলে হেসে দিবেন। আর ঘরের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে কুসুম কুসম ইমেজ ফিরে আসবে, লগে লগে থাকেই স্বস্তি-স্বস্তি ভাব।
: মিছে কতা কইলাম কীবেই! তর আম্মা ত উঠেই নাই।
: আবার মিছে কস! উঠে নাই তাইলে গ্যাছে কই?
সুরুর কান্নায় অবশিষ্ট বাধাটুকুও আর থাকল না। ও এখন গলা ছেড়ে কাঁদতে পারে। বিজয়ীর কান্না! মিল্লাত উদ্দিন তখন সুরুকে বুকে চেপে ধরেন আরও নিবিড়ভাবে। যেন তিনি কখনো রাগেন নি এবং আর কখনো রাগবেন না শুধু আদর স্নেহ আর আদর দিবেন?
: কান্দস ক্যা খালি খালি!…আপনে না আমার আম্মা হন। আম্মারা কুনোদিন ফ্যাৎফ্যাৎ কইরে কান্দে!
: তাইলে তুই খালি আমারে ধমকাস ক্যা, মারবের চাস ক্যা? এ্যা…এ্যা… আবার মিছে কতাও কয়তাছস!
না, আর পারা যায় না। সুরুর অভিমান ও অভিযোগ সবই যদি অবিভাজ্য যুক্তিতে বুঝা গেল তখন মিল্লাত উদ্দিন আর কী করবেন?
পূর্ণাঙ্গ কৈফিয়ৎ প্রদানেই মনঃস্থির করেন একান্ত অনুগতভাবে, সবটুকু আদর মিশ্রণে।
: মিছে কই নাই গোতোমার আম্মা শ্যামার কাছে যায়ে হুতিছে। দুফুর আইতের সুময় ডরায়ছিল ত, তাই।
: ক্যা ডরায়ছে ক্যা? ভাইয়ার কী জ্বর আইছে?
এই কথার ভিতর সুরুর কান্নার আর লেশমাত্র পাওয়া গেল না। আচমকা কান্না উধাও! বড় ভায়ের কান্নার কারণ অনুসন্ধানে কৌতূহল ও শঙ্কাটাই বড় বিষয় হয়ে দেখা দেয়? রাতদুপুরে ভয়ে কান্না, শিশুদের মনে কৌতূহল জাগানিয়া ঘটনা হিসেবে দারুণ। তবে সুরুর কণ্ঠে যে আন্তরিকতা বাজে, সেটা বড় ভাই শ্যামার জন্য দরদ।
: না, জ্বর আহে নাই। স্বপ্নে চিক্কির পারতাছিল! চেতন পাইলে পরে ঘরো একলা একলা থাকতে ডরায়!
: ভাইয়া তাইলে কি স্বপ্ন দেইহে চিক্কির পারছে, আব্বা?
: মারামারি দেইহে। ও বলে সড়কের মুড়িত খাড়ায় থাইহে মিছিল দেখতাছিল, তহনই মিছিলের মদ্যে না কুন্তি ম্যান কী বলে এডা শব্দ অয়েই ধুঁয়ে ময় অয়ে যায় ব্যাবাক এলাকা। তোমার ভাইয়া আর কিছু চোহে দ্যাহে না, খালি চোখ জ্বালা করে, চোখ দিয়ে পানি পড়ে। উল্ল্যে ত আগুনের ধুঁয়ে না, কান্দানি গ্যাস। চোখ ত জ্বলবই। ইদিহি পুলিশ কি কাম করে, কতা নাই বার্তা নাই মিছিলের মদ্যে মাইনষেরে পিটানি শুরু করে। মানুষগিল্ল্যে ছিট্টিছান অয়ে দৌড়াদৌড়ি, অপ্টাঅপ্টি পাড়ে। তোমার ভাইয়াও দেয় দৌড়। চাইরমুহি মানুষ দৌড় পাড়ে; তোমার ভাইয়াও দৌড় থামায় না। স্বপ্নে দৌড় আইগেলে ছেন। যতই জোরে দৌড় পারে ততই আরও পাছায়! আর পুলিশ পাছে পাছে দাবড়ায়ে মানুষ ধরে আর পিটায়! এ্যাবো করতে করতে কিবেই ম্যান উইষ্টে খায়েই নাকি শ্যামা চইটকে সড়কো মদ্যে পুলিশের একবারে সামনে পইড়ে যায়। পুলিশ অবেই অরে পইড়ে থাহা অবস্থাতেই খালি বলে লাত্থি মারে আর পিটান ধরে! তোমার ভাইয়া যতই চিক্কির পাইরে কয় আমি কিছু করি নাই, ততই আরও পিটায়! এরই মদ্যে আবার এডা জদ্দার কৈটে কুনতনে ম্যান, কারও পায়ের চটকানা নাইগেই নাকি গইড়ে গইড়ে অর হাতের কাছে আয়ে থামে! তোমার ভাইয়া ত কৈটের কতা কিছু কবারই পাব না, কইতনে আইলো তাই ঠাওর পায় নাই, তাও বলে পুলিশ ঐডে দেহায় আর কয় ‘শালা অর মদ্যে কী নিয়ে আইছিলি, শালা বোমা ফাটাবার চাইছিলি, না?’ দেখতে না দেখতেই মেল্লাডি পুলিশ অরে ঘিরে ধরে। সড়ক ভরা মানুষের এডা মানুষও তহন আর নাই। খালি মাইনষের স্যান্ডেল পইরে আছে! ইদিহি অর বাঁয়ে পাওডা আবার কিবেই বলে এক পুলিশের পায়ে বাড়ি খায়। আর যাস কুঠাইপুলিশ বলে বন্দুক দিয়ে তহনই অর হাঁটুর উপরে গুলি করে! আরেক পুলিশ শিনের কাছে নল ঠেহায়আমি আর তোমার আম্মা তহনই উইঠে গেছি ঐপাশে। যায়ে দেহি তোমার ভাইয়া খালি গ্যাঙড়াইতাছে আর হাত-পাও আছড়াইতাছে খাটের উপরে! গতরে লেপ নাই! শরীল ঘাইমে, এত জারের মদ্যেও দেহি দরদরি পানি পড়তাছে! ডাহি, শরীল ধইরে জাহি দেই, পুনাই তাও চেতন পায় না! ডাকতে ডাকতে চেতন পাইলে পাগলার নাখলা চায়ে থাহে, আও করবের পায় না! বাতাস করতে করতে পরে হুঁশ অয়। হুঁশ অইলে স্বপ্নের কতা মুন কইরে ডরান ধরে, আর শরীলে কাঁপ উঠে ডরের চুটে! তাই তোমার আম্মা অর কাছতনে ই-ঘরো আর আহে নাই।
: আব্বা 
: কী 
সুরুর ছোট্ট গতর লেপের তলায় নড়ে উঠলে লেপ ও লেপের উপর আঁধার কাঁপে মৃদুমৃদু। সুরুর কণ্ঠ স্পষ্ট।
: ভাইয়া না এর আগেও সড়ক দিয়ে হাঁটতেই বাসের নিচে পইড়ে মাথা গইলে গেছে দেইহে ডরাইছিল!
: হু 
সুরু এইবার স্বেচ্ছায় গুটিসুঁটি মেরে মুখ গুঁজে বাবার লোমশ বুকে। সেখানে মুখ লুকিয়ে যা বলে সেই কথার ভাপ প্রতি লোমের গোড়ায় অস্বস্তিকর শিরশিরানি তুললে মিল্লাত উদ্দিনের পুরো অস্তিত্ব নড়ে এবং হাত-পায়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঝাপটা মারে। তিনি তখন সুরুকেই, কী মনে করে ওর উষ্ণ কচি মুখ বুকে চেপে ধরে রাখেন।
: আব্বাগো, পুলিশ দেইহে ডরায়ে দৌড় মারলে ছোট্ট মাইনষেরেও গুলি মারে?! আর আব্বা, ভাইয়া খালি এইরম স্বপ্ন দ্যাহে ক্যা?
আর অবাক বিস্ময়ে দ্রবীভূত হবো আমরা! এই বিস্ময়ানুভব ছোট্ট শিশুমুখে শক্ত প্রশ্ন শুনে যতটা, তার চেয়ে বেশিঘর কখন, কীভাবে অন্ধকারময় হয়ে গেল ভাবনায়। এতক্ষণ আঁধার আলোয় আমরা তবু কিছু অবলোকন করছিলাম। অথচ এখন, এই মুহূর্তে আঁধারে নিমজ্জিত আমাদের দৃষ্টি এবং আপাদমস্তক!
আমাদের ভিতর বিপন্নতাবোধ জাগে। আমরা সম্পূর্ণরূপে বিচলিত হবো। তাই এমন ভাবব: এ আর কিছু নয়, আঁধারক্রান্তি। নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ পরই সূঁচের মত অন্ধকার ফুঁড়ে আসবে ভোরের আলো। যা আমাদের বিশ্বাস, যেহেতু আমরা মুক্তি চাই; বিপন্ন আঁধার থেকে।
আমরা অস্পষ্টতার ভিতর অনুসরণ করছিলাম সুরুকেঅপ্রতিরোধ্য এক টুকরো আলোর মুখ? তাকেই অনুভবে আনব আবার। একের ঘাটতি যদিও আলপিনস্বরূপ খোঁচায়। আমরা সাধ্যমত পঞ্চইন্দ্রিয় বিয়োগ দর্শনইন্দ্রিয় সমান চার ইন্দ্রিয় সজাগ রাখব। আমরা অপেক্ষা করব মিল্লাত উদ্দিন কী জবাব দিবেন, তার। এমতাবস্থায় কতগুলো লম্বা শ্বাসের শব্দ পাই। শ্বাসজনিত গন্ধ ও গন্ধপরশ অতিশয় ধূসর এবং শীতল! শ্বাসগুলো বুকের মধ্যিখানে গরমই থাকার কথা; তাহলে বাহিরে উঠে আসা মাত্র আঁধারে জড়াজড়ি হওয়ায় ও শীত ছোঁয়ায় এমন নির্জীব; উত্তাপরহিত? আমরা স্পর্শেন্দ্রিয় ও শ্রবণ অনুভবকে আরও তীক্ষ্মভাবে মেলে ধরার প্রয়াশ চালাব। বুঝতে চাইব: শ্বাসগুলো ঘুমজনিত না দুঃখবোধে উঠে আসাদীর্ঘশ্বাস!
আমরা প্রকৃতপক্ষে বা আপাত অর্থে শ্বাসবিষয়ক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব না। কিন্তু এইরূপ সিদ্ধান্ত জটিলতায় ভুগতে ভুগতে আমরা আবিষ্কার করি কে যেন বার বার বলছে ‘ঠিক, ঠিক, ঠিক…’ আমাদের ধন্দ বাড়ে, কমে না। কে ঠিক; কী ঠিক? অন্ধকার, ঘুমশ্বাস, দীর্ঘশ্বাস, মিল্লাত উদ্দিন, সুরুকে; কী? আমরা বুঝব কয়েক মুহূর্ত ব্যবধানেআমাদের যদিও মনে হবে বহুকাল পরএকজনের কাছেই সর্বকাল ও কালজনিত বিষয়াদি ঠিক! সে সচল কোন ঘড়ি। এই ঘরেই কোথাও যার অস্তিত্ব ঝুলে আছে। কোথায়-সে অনুসন্ধান নি®প্রয়োজন বোধ করব। মূলত সে ঐ একটি শব্দের অধিক কোন শব্দজ্ঞান আয়ত্ব করে নি। আমরা, অতএব আর আশ্বস্তবোধ করব না তার জপমালায়। বিপন্নবোধে বিচলিত অস্তিত্ব আমাদের সোয়াস্তি অনুভব করবে বরং নীরব অপেক্ষায়। যদিও এখন মনে হবে, সত্যি বলতে কি, আমরা স্পষ্ট জানি নাকী বা কার জন্য এই অপেক্ষা। কুয়াশাঘেরা অন্ধকারে জমাট অনুভব শীতে কাঁপে অল্পঅল্প। এমন কাঁপুনির সাথে অন্য শব্দতরঙ্গ কানের পর্দায় কাঁপন তুলে। মিষ্টি সোহাগমাখা কণ্ঠ আমাদের জানান দেয় এই শব্দতরঙ্গ সুরুর কণ্ঠ নিঃসৃত। মিল্লাত উদ্দিন নীরবই ছিলেন। কিছু বলেন নি।
: আব্বা
: কী কন? ডাকের অনুরূপ সাড়া দেন মিল্লাত উদ্দিন। কিন্তু এরপর সুরু যে শব্দ আওড়াবে তাতে মিল্লাত উদ্দিনের মেজাজ যে খিঁচড়ে উঠবে না, তা আমরা হলফ করে বলতে পারব না। যেহেতু সুরুর ভাবগতিক বুঝাও কঠিন।
: আব্বা, আমি ভাইয়ার ঘরে আম্মার কাছে যামু… যাই?
: আবার ঐ কতা নিয়ে আইছস; পুনাই-আমার হাতের পিটন ত খাওয়া ধরস নাই-যা ইন্তনে, হর
আমরা কেঁপে উঠি। বোধকরি পুরো ঘর, আঁধারসহ কেঁপে উঠে মিল্লাত উদ্দিনের হুঙ্কারে। তিনি সুরুকে ঠেলে সরিয়ে দেন। অনেকক্ষণের ভীত-বিচলিত-বিপন্ন-বিহ্বল উৎকণ্ঠায় আমরা এইবার শুধু একটু কাঁপবই। অন্যকোন অনুভূতি সাড়া দিবে না সুরুর নিকটতম ভবিষ্যৎ ভাবনায়। অবশ্য একটি স্নেহার্দ্র মিষ্টি কণ্ঠের সাড়া আমরা শুনতে পাব, যা অন্য কামরা থেকে ভেসে আসে।
: থাইক, মারামারি ধমকা-ধমকির কাম নাই। অরে ছাইড়ে দেও, আয়ে পড়–ক এই পাশে।…সুরু, আম্মা আহ, এই যে আমি ইন্তি।
ইতোমধ্যে বহতা সময়ের স্রোতের তোড়ে কিংবা সুরুও মিল্লাত উদ্দিনের কণ্ঠযন্ত্রে উদ্ভাসিত তরঙ্গের ধাক্কায় ঘরময় আঁধার ঈষৎ পাতলা হয়েছে, আবার আগের মত। সুতরাং আমরা যেদিক থেকে স্নেহার্দ্র কণ্ঠধ্বনি ভেসে আসে সেদিকে দৃষ্টি চালনা করতে প্রয়াস পাব। আমাদের দৃষ্টি সেদিকে প্রসারিত হবে। কিন্তু উৎসে পৌঁছতে সমর্থ হব না। একরাশ ঢেউ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হই। বুঝা হয়ে যায় তখন দৃষ্টি সমুখে আছে ঢেউটিনের বেড়া। বেড়ার ওপারে কাক্সিক্ষত উৎস। তাঁর কাছে এ যাত্রায় পৌঁছা গেল না। অথচ আমরা যেতে চাই, যাব। ফলত পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আমরা বুঝব: শুধুমাত্র সুরুকে অনুসরণ দ্বারা আমাদের পক্ষে স্নেহের উৎসে পৌঁছা সম্ভব।
আমরা সুরুর গতি-পা-ছন্দ অনুসরণ করব।
আনন্দ ছুঁয়ে যায়, এবং
সুরুর পা মাটি স্পর্শ করে। আমাদের কানে শক্ত ঘোষণায় নরোম সঙ্গীত দোলা দেয়:
-সকলের পায়ের শব্দের
সুর গেছে অন্ধকারে থেমে;
তারপর আসিয়াছি নেমে
আমি;
আমার পায়ের শব্দ শোনো-
নতুন এ- আর সব হারানো-পুরনো।
আমরা মুগ্ধতায় অথবা হতে পারে পুরনো মোসাহেবি স্বভাবে জয়স্তুতি গেয়ে উঠব! ‘মারহাবা! মারহাবা! সাবাস বাপের বেটি! জয় হোক…’ সুরুর গতি যেহেতু ক্ষীপ্র; সুতরাং আমাদের শথ চিন্তার বহিঃপ্রকাশের কোন সুযোগই ঘটে না। মনে আসা স্লোগান অনুচ্চারিত থাকে। আমরা যেটা দেখব; সুর আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে এবং দৃষ্টি আটকে দেওয়া ঢেউগুলোর একস্থানে পর্দামত কিছু নড়ে উঠে। অর্থাৎ সুরু চলে গেছে আমাদের অবলোকন সীমানার বাইরে; মায়ের কাছে। স্নেহের আহ্বান নাকি সুরুর পায়ে পায়ে ছোটা সুরধ্বনি নয়তো একটুকু আলো চাওয়ার যে আন্তরিকতা; তা আমাদের পরিপূর্ণ আশাবাদী করে তোলে। আমরা ঝেঁকে বসা নিরাশা ঝেড়ে ফেলি। অতএব এই মুহূর্তে সুরুকে হারানো কিংবা ওর থেকে দূরে অবস্থান করা আমাদের পক্ষে আর সম্ভবপর নয়। আমাদের তাছাড়া সিদ্ধান্ত আছে, আমরা সুরুর পিছু ছাড়ব না। তো আর কী, আমাদের বর্তমান অবস্থান চেঞ্জ করতে হবে দ্রুত।
পরিবর্তিত অবস্থান থেকে আমরা সুরুকে প্রথমে মায়ের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে দেখব।
: আম্মা আমার বরই কী অইলো? লাউপাতা দিয়ে বরই ভর্তা বানামু দেইহে কত্তুড়ি বরই জড়ো কইরে থুইছিলাম না ইন্তিঅনুযোগের পর সুরুবিছানার পাশে থাকা টেবিল থেকে, টেবিলে একগাদা পাঠ্যবই এলোমেলো, ছড়ানো বইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রায় নিভন্ত হারিকেন, কালি জমে জমে হারিকেন চিমনির আন্ধামত অবস্থা। এককোণে চিপায় পড়ে নেতিয়ে যাওয়া লাউপাতা, গভীর সবুজ লাউপাতার কিয়দংশের উপর হারিকেনের মৃতপ্রায় লাল আলোটুকু শেষ আশ্রয় পেতে প্রাণান্তকর চেষ্টায় মেতেছে বলেই হয়তো ওটিকে কিঞ্চিত সোনালি লাগে। লাউপাতা হাতে তুলে বিছানায় মায়ের বুকের কাছাকাছি পৌঁছে সুরু মাকে তা দেখায়।
: দ্যাহছেন, এডের মদ্যেই ত আছিল!
উত্তর শিথানে শায়িত মায়ের গলা অবধি জড়ানো-প্যাঁচানো কাফন অথবা শিউলি সাদা কভারের লেপ। মুখমণ্ডল এখনও মুক্ত এবং জীবন্ত। যদিও অসহায়, ক্লান্ত দেখায় ভীষণ! তাঁর বামপাশে শায়িত কঙ্কালসার দেহ এক উন্মুক্তনিথর পড়ে আছে। মুখ তার শান্ত, নিষ্পাপ ছবি। অথচ স্বপ্ন-ত্রাস-ভয়ের রেশ এখনও জমা আছে কপালের তিলক হয়ে, চোখের নিচে কালি হয়ে! অবশ্য এই ভয়চিহ্ন আমাদের চিনিয়ে দেয়, ও শ্যামা। সম্ভবত ঘুমের ঘোরেই শ্যামা কাত হয়ে ধনুকের মত বেঁকে গেল। অথবা ওর ঘুম হালকা হয়ে আসায় শীত অনুভব ওকে গুটিশুঁটি হবার দিকে ঠেলে দেয়। তথাপি মায়ের শরীর জড়ানো লেপের অংশ টেনে নিজ দেহে জড়ায় না! লেপ বুঝি জগদ্দল পাথরের মত ভারী; যার ভর শ্যামার হাড় গুঁড়ো করে ফেলতে সক্ষম! কিংবা মায়ের উপর চেপে বসা ও পাথর কি লেপ টেনে নামানোর শক্তি বুঝি ওর নাই! ফলত শ্যামা উদোমই থাকে! শীত অথচ উপেক্ষা করা যায় না কোনভাবেই।
মায়ের চোখ খোলা নয়। চক্ষুপাতায় আবৃত। যেহেতু ঘুম ও ক্লান্তি কেউই তাঁকে ছাড়ে নি। সহসাই ছাড়বে কিনা তাও বোধগম্য হয় না। মা’র চোখের পাতায় টান লাগে। কপাল কুঁচকে যায়। বার দুয়েক চক্ষুপাতা পিটপিট করে। এই সবই চোখ খোলার প্রচেষ্টা। কিন্তু এ যাত্রায় চোখ আর খোলা গেল না, বন্ধই থাকে। ক্লান্তির দাপটে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো চোখ খোলার। অতঃপর মা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে চোখ বন্ধ রেখেই সুরুকে বলেন: টেবিলের উপরে বালা কইরে দ্যাহআইতের মদ্যেই কী অবো! সুরুকোন জিনিসের ভিতর বরইগুলো রেখেছিল সেটা আর তিনি দেখেন না।
সুরুর ডান কনুই মা’র বুকের উপর স্থাপিত। হাতে ধরা প্রমাণ সাইজ একটি লাউপাতা। আচমকা লাউপাতাসমেত সুরুর হাত লেপজড়ানো শায়িত মায়ের দেহ জড়িয়ে ধরে। মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে যায় এবং ওর কোমল ঠোঁট মা’র কপাল অতঃপর চক্ষুপাতা প্রথমে বামটা পরে ডানটা, আলতোভাবে ছুঁয়ে দেয়। এবং দুষ্টুমি শেষে সুরু আবার মাথা সোজা করে পূর্বের মত ডান কনুই মায়ের বুকে স্থাপন করে লাউপাতা ধরা হাত মা’র চোখের সামনে বরাবর তুলে রেখে মিটিমিটি হাসে। চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসিটা ঝুলেই থাকে। মা’র কী আর এখনও ক্লান্তি, ঘুম, এইসব থাকে? তাঁর মুখের উপর থেকে ঐসব চিহ্নগুলো মিলে যায়। আনন্দে তাঁর ঠোঁট প্রশস্ত ও অল্প ফাঁক হয় একফালি সৌন্দর্য হয়ে। লেপের তল থেকে মা’র ডান হাত বেরিয়ে এসে সুরুকে জড়িয়ে ধরতে উদ্যত হয়। এবং আমরা শুনব আবার এক মিষ্টি সুর।
: দ্যাখছেন পাজির কাম!
সুরু খলখলিয়ে হাসে। ঘর ভরে উঠে সুখে ও আনন্দে। আবহাওয়া কত সুন্দর হয়। উহ! আমাদের কি যে ভালো লাগে! অথচ এর মাঝেও ঝনঝন টিনের থালা বাজে! আমরা তো বিবেচনাবিহনে ভেবে বসি, কেউ বুঝি আনন্দের আতিশয্যে টিনের থালা পিটায়। অনেক রুচিবিকারগ্রস্ত মানুষ আছে না, যারা এভাবে আনন্দ প্রকাশ করে থাকে! আমাদের ভুল ভাঙতে কিন্তু সময় লাগে না। ভুল ভাঙার পর আমরা বুঝব: ওপাশ থেকে বাবা, মিল্লাত উদ্দিন, বস্তুত কর্কশ ধমকে উঠেছেন।
: এ্যাই, বরবিয়ানাই কী নাগায় দিলি তরামুনের  মদ্যে এত সঙ কইতনে আহে?
এমনতর কর্কশতা প্রকৃতপক্ষে আনন্দ অনুভবে শব্দদূষণ ঘটায়। যা মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে বাধ্য। চাপা পড়তে থাকে ঘরময় করা উচ্ছ্বলতা। আমরা উসখুস করি। শ্যামা নড়াচড়া করে এবং ধনুকাবস্থা থেকে চিৎ হয়। ওকেও নাড়িয়ে দিল সুখহাস্য অথবা থালা পিটানোর কর্কশতা? শ্যামা চোখ খুলে। চোখ তার লাল। বুঝা গেল, আসলে শান্তিময় নিবিড় ঘুমের সাথে কত দূরত্ববাচক সম্পর্ক ওর। এবং চাপা স্বরে সুরুকে বলে, প্রকৃতপক্ষে তা দমন কিংবা ধমক নয়; সতর্ক মতামত: অত শব্দ না করলে কী অয়, আস্তে হাসিবের পাস না! এরপর ডান কাত ঘুরে সরে আসে মায়ের কাছাকাছি।
মা তাকিয়ে আছেন। খোলা দৃষ্টি তাঁর আটকে আছে লাউপাতায়। ডান হাত সুরুর দেহে স্পর্শ করা, বাম হাতে শ্যামার উপর লেপ জড়িয়ে শ্যামাকে আরও বুকের কাছাকাছি আসতে সহযোগিতা করেন। কেউ আর দ্বিতীয় কোন শব্দ না করায় ঘরে স্তব্ধতা নেমে আসবে আবার। মা’র চোখ তখনও লাউপাতায় নিবিষ্ট থাকবে। সুতরাং আমরাও সেখানে দৃষ্টি স্থাপন করব। অতঃপর যা দেখতে পাব, এতক্ষণ তুলনায় গুরুত্ব কম দেওয়ায় মূলত তদ্সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয় নি। লাউপাতার বোঁটায়, আগেই বলা হয়েছেধরা আছে সুরুর হাতমনে হবে সোনালি ফুলতোড়া! বাড়তি তথ্য হলো: গভীর সবুজ প্রমাণসাইজ পাতার ঠিক মাঝখানে, বুটজুতাখুরের আঘাতে যেখানে গর্ত। ঐ চিহ্ন আমাদের বিস্মিত করবে। সন্নিকট সময়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আরো বিস্ময়। মা’র হাতে ধরা লাউপাতা ক্রমশ মনে হবে নির্জীব হৃদয়। প্রাণবন্ত হৃৎপিণ্ড বুটজুতাখুরের আঘাতে আঘাতে বিশুদ্ধ রক্ত হারিয়ে এখন চুপসানো, শুকিয়ে কালো অন্ধকার। উক্ত লাউপাতা কি হৃদয়ে টগবগে উষ্ণ স্বপ্নের বদলে এখন শুধুই হতাশার আবাস।
প্রকৃতপক্ষে বুটজুতাখুর ছাপ কী অথবা কোথা হতে কীভাবে হৃদয় কি লাউপাতায় পড়ল এমন জিজ্ঞাসা আমাদের ভাবিত করবে। আমরা আরও আগ বাড়িয়ে এমনও ভাবতে বসব: সমস্ত ঘরজুড়ে আজকের এই আঁধারময়তা সেখান থেকেই উৎসারিত কিনা? এবং সুরুর প্রত্যাশিত ফলগুলো নিশ্চিয়ই ঐ গর্ত ও গর্তের আঁধারে হারিয়ে গেছে বা লুকানো আছে। যা সুরুর সংক্ষিপ্ত হাত নাগাল পাচ্ছে না। এবং আমাদের মনে হতে থাকবে: যেহেতু মা এখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বিমর্ষ তাকিয়ে আছেন ও তাঁর মুখ বিষণœতায় ছেয়ে যাচ্ছে; সুতরাং তিনি আমাদের এই বিষয়ক কোন দিশা দেখাতে সক্ষম হবেন। অবশ্যই পাবেন।
উল্লেখ্য, বলতে দ্বিধা নাই, আমরা এইসব ভাবনার আগে যখন মা সুরুকে ছুঁয়ে থাকা তাঁর ডান হাতে লাউপাতা তুলে নেন এবং উল্টে-পাল্টে দেখেন; তখন কিন্তু আমরা পাটিগণিতের সরল হিসাবই মিলিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এই যেমন, মা নিজেও হয়তো লাউপাতা দিয়ে ঢেঁকিপিষা বরইভর্তা খেতে খুব পছন্দ করেন, কি পরিবেশ-পরিস্থিতি আবার কী প্রকারে স্বাভাবিক করা যায়, সেই উপায় খুঁজছেন লাউপাতা নেড়েচেড়ে। অপ্রস্তুত মুহূর্তগুলোতে আমরা কিন্তু হাতের কাছে কিছু পেলে অযথা নেড়ে থাকি। সরল আমরা খুব পছন্দ করি বলেই যে এই প্রকার ভেবেছিলাম, তা নয়। সরলীকরণের আরও কারণ: এক. লাউপাতা, ধনেপাতা, কড়াকাঁচা-ঝাল, লবণ, বরই একত্রে ঢেঁকিতে পিষে যে ভর্তা বানানো হয় তা সম্ভবত কমবেশি আমাদের সবার প্রিয়। বলি কি, মনে হতেই জিভের আঠালো লালা কেমন পাতলা রস ছাড়ছে না! খাওয়া শেষে খসখসে জিহ্বা মুখে কেমন শিহরণ দেয় একবার ভাবুন তো এবং বাতাস স্পর্শে দাঁত! দুই. বলেছি না আমরা উসখুস করছিলাম। তখন তো আসলে আমরাও চাচ্ছিলাম পরিবেশ পূর্বমুহূর্তের মত সহজ স্বাভাবিক হোক।
এইসব ছাপিয়ে আমরা যখন খেয়াল করলাম মা লাউপাতা আবার তাঁর দুই হাতে ধরে চোখের সামনে স্থির করেছেন এবং উদ্বিগ্নতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন ও তাঁর মুখ বিষণœতায় ছেয়ে যাচ্ছে ও তাঁর হাত কাঁপছে, তখন আর আমাদের সরল অঙ্ক সরল রইলো না। জটিলতায় জটিলতর মনে হবে! অতঃপর আমরা এটি উচ্চতর বীজগণিতীয় সমস্যা বলেই স্থির করব এবং সমস্যা সমাধানের আশায় মা’র দ্বারস্থ হব।
আমরা লাউপাতা কি রক্তহীন কালো হৃদয়ের প্রতিকৃতি থেকে মা’র চোখে চোখ রাখব। প্রথম যাত্রায় সাড়ে তিন কি চার পলকের বেশি সময় দৃষ্টি বিনিময় স্থায়ী হয় না। এত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আমাদের কতগুলো ক্ষুদ্র দৃশ্য বা দৃশ্যাংশের সাথে পরিচিত করেন। দৃষ্টিবিনিময়ের সময় যেহেতু অতি অল্প, আমাদের মনে হবে একমাত্র দৃশ্য বুঝি। আর ঝটিকা দৃষ্টিসফর হেতু তা স্মৃতিতে ভাসাভাসা ছবির আভাস দেয়। যা কোন সরলরৈখিক বা জ্যামিতিক ফরমেট তৈরি করতে সক্ষম হয় না। তবু দৃশ্যাংশগুলো যদি আমরা জোড়াতালি দিয়ে গল্পাকৃতিতে ফরমুলেট করতে চাই তবে রূপটা হয় এমন:
‘হয়ে উঠা পরিণত বয়সী লাউগাছে দুধসাদা ফুলের দেখা মিললেও পাওয়া যায় না ফলের পূর্বাভাস। যদিবা পাওয়া গেল ফলবতী হবার লক্ষণ, উৎকণ্ঠা বাড়ায় তা আরও। ফলের আকার পেয়ে উঠা ভ্রুণ অগ্রে ফোটা ফুলেল স্তনের সুবজ রগ দিয়ে দুধ টেনে টেনে পুষ্ট হতে পারবে তো। পুষ্ট হবার আগেই আসবে কি মড়ক-কীটের আক্রমণ? সইতে পারবে তো, যদি আসে!
অবশেষে এক রাতে, রাতভর বৃষ্টির পর সব সন্দেহের অবসান ঘটে। বৃষ্টি প্রকৃতি প্রদত্ত জল পতন নয়; যুদ্ধে শত্র“পক্ষ হটাতে মনুষ্যসৃষ্ট গুলি বিনিময়ের আবহ। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষগুলো নিজ নিজ ঘরে আলো নিভিয়ে বসে থাকে সারারাত। সুবহে-সাদেকের পর আকাশ ঠাণ্ডা হলে নির্ঘুম মানুষেরা বেরিয়ে আসে বাইরে। এবং গাছে সবুজ লাউপাতা ও লাউ দেখে, পুব আকাশে টকটকে পূর্ণ লাল সূর্য দেখে আশ্বস্ত হয়, এখানে কীট পরাস্ত। বিজয়ের আনন্দে ওরা ফলের স্বাদ নেবার আয়োজনে ব্যস্ত হয়। একবারও সংশয়গ্রস্ত হয় না তাদের মন; অদৃশ্য মড়কের গোপন চক্রান্ত বিস্বাদ করে দিতে পারে ফলের স্বাদ! কিংবা উৎপাদকের জিভ বর্ণিল আস্বাদ আদৌ পাবে কিনা। গৃহকর্ত্রী নিশ্চিতভাবে গৃহকর্তাকে মনে করিয়ে দেয়, পোলা আমার বাড়িত আইবো। আপনে মাঝিরে কয়ে আইবেন বড় বোয়াল ধরা পড়লে যেন পাঠায় দেয়। পুনাইরে লাউ দিয়ে আইন্দে দিমু।
গৃহকর্ত্রী লাউয়ের গঠন পরীক্ষা দ্বারা উত্তম চারটি লাউ নির্বাচিত করে সুযতœ আসন দেয় বীজ সংগ্রহের নিমিত্তে।
গৃহকর্ত্রীর ছেলে ফিরে না আসায় লাউ কি লাউপাতা কি লাউডগা কোনটার স্বাদই তাদের গ্রহণ করা হয় না। বিভিন্ন উচ্ছিষ্টভোগীরা যদিও নানান পদে চেটেপুটে খায়! এমতাবস্থায় গাছে আর পরিস্ফুট হয় না নতুন ফলের সম্ভাবনা। গাছের ডগা, পাতা কুঁকড়ে আসে, স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। ধূলি মলিন হয়। অথচ গৃহকর্ত্রী মেয়ের সাহায্যে নিয়মিত পরিচর্যা দেয় গাছে। তাঁর তখন একটাই আশা: নির্বাচিত লাউ হতে সংগৃহীত বীজ রোপন করে সে আবার টগবগে ফলবতী গাছ পাবে। তার বাড়িতে সবজির বাগান হবে, আঙ্গিনা-মন ভরে উঠবে শীতল-সবুজ সমারোহে। তিনি পাখার আড়াল দিতে সচেষ্ট হন নির্বাচিত লাউ চারে।
অতঃপর দেখা যায় আগ্রাসী বন্যার জল গাছের গোড়া চাটে। সবার মনে তখন সন্দেহ দানা বাঁধে, চারপাশ থেকে শোরগোল উঠে, এ যাত্রায় লাউগাছ আর টিকবে না। না, লাউগাছ সে যাত্রায় মরে না, টিকেই থাকে। যদিও গাছ রোগ জর্জরিত মুমূর্ষু হয়, অসংখ্য সজীব পাতা হারায়, বাকিরাও শিকার হয় অপুষ্টির।
পরবর্তী এক কাকডাকা ভোরে গৃহকর্ত্রী গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে গিয়ে বিস্ময়কর পরিস্থিতি অবলোকন করেন। সব লাউডগার মাথা ভাঙা। আহত ডগা থেকে দরদর কষ পড়ছে। আর গাছভরা প্রতিটি পাতার মাঝখানে ছেঁড়া। মনে হয় বুটজুতায় পিষা। এবং হেমন্তের রোদ ঝলমল সকালে আচমকা বিজলী আগুন সদৃশ কিছু লাউমাচার উপর চারটি ঘূর্ণিপাক খেয়ে হারিয়ে যায়। তারপর দেখা গেল সেই লাউ চারের দুটি অদৃশ্য, একটি বীজশূন্য বিকৃত খোল, অন্যটি মাটিতে পড়ে ফেটে চৌচির। বীজগুলো তার তখনও অপরিপক্ক। প্রশ্ন আসবে: এটা ম্যাজিক দৃশ্য কিনা? তখন ঘটনার ব্যাখ্যা আসবে প্রপাগান্ডা আকারে। এ কোন জাদুকরের ম্যাজিক ম্যাজিক খেলা নয়। তাঁর (সৃষ্টিকর্তার) খেলা! এ সেই অলৌকিক প্রক্রিয়া যার ভিতর দিয়ে এ রাজ্যে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’… পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। যা সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং রাজ্যিক ক্রান্তিলগ্নে তাঁর বিশেষ দূত, বুটজুতা বাহিনী বা ফেরেশতা প্রতিনিধি পাঠিয়ে সমাধা করেছেন। স্মরণ করো, তিনি (সৃষ্টিকর্তা) কেন যুগে যুগে স্থানে স্থানে দূত পাঠিয়েছেন; প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন।’
আমাদের কৌতূহল এখানেই নিবৃত করা গেলে বোধকরি ভালো হত। মানসিক ক্লান্তির শঙ্কা যেহেতু আছে। কিন্তু প্রাপ্ত ছবি থেকে কিছু সঙ্গত প্রশ্ন বোধের দরোজায় তীব্র কড়া নাড়লে ক্লান্তি, শঙ্কা উড়ে যায় সব। মুখোমুখি সাংঘর্ষিক দাঁড়িয়ে যায় গুরুতর জিজ্ঞাসা। মানুষের রাজ্যে বুটজুতা ফেরেশতাবাহিনী নষ্ট করল কেন মাতার আগলে রাখা ধন প্রত্যাশিত বীজ! সংঘটিত ক্রিয়া সত্যি কথিত আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক কিনা, কিংবা উক্ত ফল কোন আস্থাহীনতা প্রস্তাব বা প্রকাশ করছিল কিনা? আমরা এমন আন্ত-জটিল ও দুরূহ প্রশ্নের মুখোমুখি হলে, আমাদের সন্দেহ হবেলাউগাছ শুধুমাত্র লাউগাছ নয়। বস্তুত কোন স্বপ্নের নাম ও বাস্তব চিহ্ন। যা নস্যাৎ করতে অলক্ষ্যে সার্বক্ষণিক তৎপরতা ছিল দৃশ্যের ভিতর ও বাইরে। লালিত স্বপ্ন বাস্তব আকার লাভ করল অথচ স্বাপ্নিক ফল ভোগ করতে পারল না; নিদেনপক্ষে নিরাপদে আগলে রাখতেও ব্যর্থ হলো! বিষয়টা ভাবতেই আমাদের খারাপ লাগবে। তথাপি আমাদের কৌতূহল গৃহকর্ত্রীর ছেলে ও তার ফিরে আসা না আসার সাথে লাউগাছের কার্যকারণ সম্পর্ক; সর্বোপরি একটি স্বপ্ন কিংবা লাউগাছ কী প্রক্রিয়ায় ভূ-দুনিয়ায় মাথা তুলে দাঁড়ায়সামনে রেখে এগোতে চাইবে। যা আমাদের প্রেরণা হয়ে উঠবে অস্বস্তিকর সময় মোকাবেলা করবার। এটা আমাদের বিশ্বাস হয়।
অতএব আমরা মা’র চোখে চোখ রাখব আবার। তিনিও দৃষ্টি মেলে ধরেন অবিরত আমাদের দৃষ্টির ভিতর।
ততক্ষণে সুরু বিছানা থেকে মাটিতে নেমে পড়বে। ওর সোনালি কাঁচা হাত টেবিলে খচখচ শব্দ করে কিছু খুঁজবে। খুঁজে কিছু পায় কি পায় না আমরা অত কিছু আর খেয়াল করব না। এমনকি ওকে টেবিলের নিচে খাটের নিচে অন্ধকার ঠাসা মাটি হাতড়াতে দেখেও না। কেননা আমরা মা’র চোখে এক বিস্ময়ের সন্ধান পেয়েছি। এবং আরও পাব বলে! মা’র চোখ আমাদের কাছে কোন চোখ মনে হয় না। বিষয়টা শুনতে যত অস্বাভাবিকই শোনাক না কেনমা’র চোখ আমাদের কাছে মনে হয় ‘ওয়ার্মহোল’! সেই ওয়ার্মহোল, যেমনটি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারের কথা ভাবছেন। যার ভিতর দিয়ে কোন মহাকাশযান যাত্রী একই সাথে তাঁর অতীত ও বর্তমান দেখতে পাবেন। এবং এটা কোন স্বপ্ন বা অলৌকিক বিষয়ও না। মা’র চোখের দৃষ্টিপথে আমাদের দৃষ্টি ছুটে অতীত পানে। আমরা কালদর্শন যাত্রী! আমাদের কৌতূহল মেটাতে কালদর্শন ভিন্ন কোন পদ্ধতি নাই। যা বাস্তবায়িত হচ্ছে মা’র চোখের দৃষ্টি অথবা কথিত ওয়ার্মহোলের ভিতর দিয়ে। আমাদের কানে আসে সুরুর গীত-ছন্দ-গুনগুনিয়ে গাইছে। স্পষ্ট নয় তাই কথাগুলো। আমরা সুরুর সুর কিংবা কথা কোনটাই বুঝার চেষ্টা করব না। কেননা আমাদের দৃষ্টি এবার ওয়ার্মহোল পেরিয়ে খোলা জমিন ও আলোর সন্ধান পায়। আমাদের সামনে এক এক করে উদ্ভাসিত হবে এবার জীবন্ত অতীত সত্যদৃশ্য।
অতএব, সুরুকে আমরা আপাতত বিস্মৃত হব।
দাগ নিয়ে আসে
ইস্ কত আলো চোখ অন্ধ হয়ে যায়; কত রোদ চোখের পাতা পুড়ে যায়। আবহ যদি এমন চক্ষু মেলে তাকানো যায় না সোজাসুজি। প্রায় বুঁজে আসা আঁখির নিম্নদেখা দৃষ্টি দেখে পায়ের তলায় এঁটেল মাটিতে সদ্য লেপা ফর্সা উঠোন, পাকা ফসলের তরে প্রতীক্ষারত। খাঁ খাঁ ফর্সা উঠোনে দুপুরের তেজী রোদ আহ্লাদিত বেজায়। এত চমৎকার মসৃণ মাঠ অথচ প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় নাই? কপালে হাতের শেড তৈরি করলে দৃষ্টি প্রসারিত হয়। অদূর সমুখে পথ। পথপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরি। তাঁরও বুঝি আছে কোন প্রতীক্ষা!
কিশোরি আমাদের ইশারায় কাছে ডাকবে। কাছে যেতে গভীর দেখায় চিনবরেখে আসা সুরুর মা, ১০-১১ বছর বয়সে। মাথার উপর তার ফলবতী আমগাছ। হাতে লম্বা আম পাড়া কুটা। আমাদের আনন্দ হবে আম কুড়োবার সুখ ভাবনায়। যদিও পাকা নয়, সবুজ আম। সাবধানে কুড়োতে হবে, কাঁচা আমের কষ শরীরে কোথাও লাগলে ঘায়ের দাগ বয়ে বেড়াতে হয় না? আমাদের ভাবনা এমন অথচ সে আমগাছে কুটা লাগায় না। ফলত সবুজ সবুজ আমের বোটা চুঁয়ে ক্ষরণ হয় না। অবান্তর হয় আমাদের ভাবনা। আম লাল হয়ে উঠার অপেক্ষায় পতিত টানে ঝুলে থাকে। কিশোরি উদাস চোখে উৎকণ্ঠা! উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি আমাদের পথদৃশ্য দেখতে ইঙ্গিত করে। আমরা জানাব, পথ দিয়ে পথিকের চলা বৈচিত্র্যময় বা বৈচিত্র্যহীন মনে হয় না আমাদের। ওখানে দেখার কী আছে! আমরা বরং কিশোরি পিঠের সাথে লাগানো সদ্য স্থাপিত গোরস্থানের পবিত্র আবহে ভীত, রোমাঞ্চিত হতে পারি। কবরস্থানের আলাদা গন্ধ-পরশ-হাতছানি আছে। কিন্তু কিশোরি আমাদের বলবেÑই-পথ দিয়ে এত মানুষ যাওয়া আহা করে না কুনোদিন। কয়দিন অইলো করতাছে! দ্যাহ না, মানুষগিল্ল্যে মুন অয়অতঃপর আমরা পথ ও পথিক পানে দৃষ্টি স্থির রাখব। এবং পর্যবেক্ষণে যেসব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে; প্রথমত, পথিকের গতি পূর্ব-পশ্চিমমুখো সড়কের পশ্চিম দিকে। কোন বিচ্ছিন্ন একক পথিকের দেখা মিলে না। প্রত্যেকে ছোট ছোট দল উপদলের সদস্য। অধিকাংশ দলের বৈশিষ্ট্য (১) নারী-পুরুষ-যুবক-শিশু-কিশোর-বৃদ্ধের সম্মিলনে গঠিত। সম্ভবত দলে এক বা একাধিক পরিবারের সদস্য বিদ্যমান থাকবে। (২) দলের প্রত্যেক সদস্যের হাতে- শিশু ব্যতিরেখে, কারণ সে নিজেই অন্যের উপর নির্ভরশীলকিছু না কিছু পোটলা আকারে আছেই। দলের কোন কোন সদস্যের কাঁধে, এমন চিত্রও দেখা গেল, পুরো সংসার একাই বহন করছে। ৩। দলের ভিতর প্রত্যেকে নিশ্চুপ। এলোমেলো। অর্থাৎ এইসব কোন প্রকার সুশৃঙ্খলিত আনন্দ বা শোকর‌্যালির বার্তা বহন করছে না।
দ্বিতীয়ত, এদের প্রত্যেকের চলার গতি পলায়নপর। হাতে-পায়ে ক্লান্তি, অসহায়ত্ব; চোখে-মুখে উদ্বিগ্ন আঁধার; সর্বোপরি গন্তব্যহীনতার দোলাচলে আড়ষ্ট নিরাপত্তাশূন্য অস্তিত্ব একেকটা। আমরা যখন ছিন্নমূল যাত্রী দলের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত তখন কিশোরির সামনে এসে দাঁড়ায়এই প্রথম, আগে আর কেউ দাঁড়ায় নিগরুর গাড়ি এক। গাড়ির ছৈয়ের সামনে পিছনে শাড়িকাপড় মোড়া। গাড়ি থেকে পিছন পাশের শাড়ি তুলে নামে এক যুবক। সে কিশোরির কাছে জানতে চায় পাশের বাড়ি শেখ আয়াতউল্লাহর কিনা। কিশোরি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লে গরুগাড়ি বলদের খুরের ছাপ ও কাঠের শক্ত চাকার দাগ ফেলে সড়ক ছেড়ে নেমে আসে ফর্সা উঠোনে। মাটি বলি আর ফর্সা মসৃণ উঠোন বলি তারা জানোয়ার পা কি যন্ত্রের আঘাত সইতে পারে না। আঘাত চিহ্ন বুকে ধরে রাখে। গাড়ির পিছে হেঁটে আসে যুবক ও কিশোরি। সামনে দুটি ঘরএকটি শনে ছাওয়া, অন্যটি চৌচালা টিনের বড় ঘরঘরের সামনে গাড়োয়ান গাড়ি থামায়।
গাড়ি থামতে না থামতে উঠোনের উত্তর দিক থেকে উদয় হয় মধ্যবয়সী একজন। সে মাথায় বাঁধা গামছা খুলে মুখ ও লোমশ বুকের ঘাম মুছে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা জানব, তিনি শেখ আয়াতউল্লাহ। তখন গাড়ির ছৈয়ের পর্দা তুলে উঠোনে পা রাখেন আরও একজন। শেখ আয়াতউল্লাহ বিনয়ে ঋজু হয়ে আসবে। এবং ভাবে গদগদ হয়ে বলবে: মাই মাই, ভাবীসাব কীবেই আইলো আমার বাড়িকি ভাগ্যি আমার, গরীবের বাড়ি হাতির পাও! তিনি উচ্ছ্বাসে অস্থির হয়ে উঠবেন। এ্যাই হুনছ, কই গেলাবাইরে আহ তাত্তাড়ি-দ্যাহ ক্যারা আইছে আমার বাড়িত! অন্দরমহলের উদ্দেশ্যে হাঁকাহাঁকি করেন শেখ আয়াতউল্লাহ । ভিতর বাড়ি থেকে কারও সাড়া পাবার আগেই পাশে দাঁড়ানো কিশোরিকে বলেনদ্যাহছেন তোমার মাও কই গেলতোমার জেঠি আইছেডাক দিয়ে আন। কিশোরি অন্দরমহল ঢুকে। শেখ আয়াতউল্লাহর গদগদ কমে নাইআমার মেয়া ও; কল্পনা।
এত বিনয়ী উষ্ণ অভ্যর্থনা সত্ত্বেও ভাবীসাব কিছু না বলে নীরবে দাঁড়িয়ে। কেন? আমরা তা বুঝতে চাইব। আমরা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাঁর মুখে আলো ফেলব। ভাবীসাবের মাথায় ঘোমটা থাকলেও মুখ খোলা। অনুসন্ধান শেষে আমরা প্রথমে বিস্মিত ও পরে স্তম্ভিত হব। বিস্মিত কারণ: ভাবীসাবের মুখ ফ্যাকাশে রক্তশূন্য লাগে। আর তাঁর ভাষাশূন্য দৃষ্টি প্রখর রোদের ভিতর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম আকাশকোণে নিবদ্ধ। এবং ক্রমে মুখ আরও ফ্যাকাশে কাগজ হয়ে উঠে! ফলত আমরা সন্ধিগ্ধ হব। তিনি তাঁর চারপাশে ভাসমান বিনয় ও উষ্ণ সম্বর্ধনা আদৌ অনুভব করেছেন কি? যখন আমরা তাঁর দৃষ্টির লক্ষ্যবিন্দুতে দৃষ্টি রাখি ও দেখি ভয়ঙ্কর কালো মেঘ; কালো মেঘ দ্রুত ধাবমান মাথার উপর রোদেলা আকাশ গ্রাস করতে, তখন আমাদের স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া কী করণীয় থাকতে পারে? কৃষ্ণমেঘ দেখেন আর ভাবীসাব বিড়বিড় করেনভাইসাব, আসমানের দিকে চায়ে দেখছেন? ঝড় দেহি পাছ ছাড়ব না। পিছন পিছন ইন্তিও আয়ে পড়লো।
শেখ আয়াতউল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে বিমর্ষ হয়, মুহূর্ত পর উদ্বিগ্ন। আর যুবক আসা অবধি নির্বিকারউদাস দাঁড়িয়ে। কল্পনা চৌচালা ঘরের দরোজা খুলে দিলে শেখ আয়াতউল্লাহ গাড়োয়ানকে গাড়ির জিনিসপত্র নামাতে বলেন এবং মেহমান নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।
আমরা অবশ্য জানবপরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে শেখ আয়াতউল্লাহ কখনোই রোদতপ্ত গরমে প্রথমেই ঘরে বদ্ধতায় অতিথি টেনে নেন না। লিচুতলায় যে খোলা হাওয়া ও বসার মাচাং আছে সেখানেই গিয়ে বসেন। ভালো-মন্দ খোঁজ খবর জানা হয়ে গেলে, শরীরে ঠাণ্ডা প্রশান্তি ফিরে এলে, অন্দরমহলে গাছপাকা তাজা নেবুর শরবত ও ঠাণ্ডা পানি এবং মুড়ি মাখানো হলে, সর্বোপরি বিছানাপাতি বসার ঠিক করে তবেই না ঘরে ঢুকেন। কিন্তু আজ সেই সুযোগ পাওয়া যায় না। যেহেতু আকাশে আকাশে ভীতিকর মেঘ ছেয়ে যাচ্ছে।
আমরা ঝাঁঝালো রোদ থেকে ঘরে প্রবেশ করেছি। সুতরাং আমাদের মনে হবে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। কোথাও কিছু দেখতে পাব না। কিছু অপেক্ষা শেষে চোখ অভ্যস্ত হয়ে উঠলে দেখবঘরের দক্ষিণ-পশ্চিমকোণ হতে একটি হাতল চেয়ার টেনে যুবকের দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন শেখ আয়াতউল্লাহ। ঘাড়ের গামছায় পাকা পিতরাজ কাঠের চেয়ার মুছতে মুছতে সরল স্বীকারোক্তি করেন: বাবা আমরা গাঁও গেরামের মানুষ। ববার-ঠবার নাই, একটু কষ্ট কইরে বহ।
এই সময় ঘরের ভিতর চোখ বুলিয়ে নিতে ইচ্ছে করবে আমাদের। কিন্তু আবছায়ায় কোনকিছ্ইু ভালো দেখা যাবে না এবং আমরা তাই চোখে ক্লান্তিবোধ করব। ঘরে দুই পাশে দুটি দরোজা আর সামনের দিকে ছ্যাঁচা বাঁশের বেড়ায় ছোট্ট খোঁপ কাটা ছাড়া আলো প্রবেশের কোন রাস্তা নাই। এখানে সেখানে তাই গাঢ় আঁধার আবছায়া আঁধার ঘাপটি দিয়ে বসেই থাকে। আমরা ফলত শেখ আয়াতউল্লাহর মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকব। শেখ আয়াতউল্লাহ চৌকির নিচ থেকে চারপায়া নিচু টুল বের করে আসন নেয় নিজে। তাঁর মুখোমুখি যুবক এবং যুবকের মা, কেউ চেয়ারে না বসে-বিছানাহীন চৌকিতে বসে। বেড়ায় গুঁজে রাখা পাখা উদ্ধার করে কল্পনা অতিথিদের হাওয়া দেয়। গল্প শুরু করেন শেখ আয়াতউল্লাহ: ভাবীসাব বালাই আছিলেন তাইলে? কীবেই যে আল্লাহ আপনেরে নিয়ে আইলো আমার বাড়িতআমার ত বিশ্বেসই অয়তাছে না।
: আর ভাই কিয়ের বালা থাহা, মুন্দ থাহা! জীবন নিয়ে যহন…
ভাবীসাবের দীর্ঘশ্বাস অথবা বাইরে শুকনো পাতা ও ধূলি উড়ার শব্দ বাজে। দরোজার ফাঁক দিয়ে প্রত্যেকে বাহির দেখেন। বাইরে খাঁ খাঁ ফর্সা আঙ্গিনায় এখন রোদের আভাসমাত্র নাই। আবাছায়ায় ঢাকা উঠোন ধূসর। অথচ এখনও সন্ধ্যা হয় নি, রাত তো অনেক দেরি। বুঝি সন্ধ্যা, রাত কাছে সরে আসছে, আর দিন ক্রমাগত সংক্ষিপ্ত! উঠোন থেকে চোখ সরিয়ে শেখ আয়াতউল্লাহ আবার গল্পের প্রস্তুতি নেয়।
: বাবাজীরে ত আমি চিনবেরি পাই নাই, কতদিন আগে, উডি ছোট থাকতে দেখছি যুবক বাবাজী তখন চোখ নিচু করে কোলের উপর নিশ্চল ফেলে রাখা হাতের রেখা গুণতে শুরু করে। জ্যোতিষশাস্ত্রে হয়তো তাঁর কোন জ্ঞান নাই, তাই আবার হাতের উল্টাপিঠে ফুলে উঠা রগ দেখা শুরু করে। রগগুলো এভাবে জেগে উঠছে কেন। মোটা মোটা কালচে রগ, নীল নীল সরু রগ, সব চামড়ার উপর দিয়ে জ্বলজ্বল করছে। সে গৃহকর্তার কথা শুনছে কিনা মালুম হয় না। তাই বলে শেখ আয়াতউল্লাহ থেমে নাই বুঝলেন বাবাজী, আগে আপনের বাপের দোহানে মাল করতাম। ঐ যে সড়কের মুড়িত, উন্তি আমার দোহান আছিল। তহন আপনেগরে টাউনের বাসাত পরায় পরায় গেছি। আমি একলা মানুষ, বড় পোলাডারে পড়বের দিছি, এই বছর মেট্টিক দিব। সংসার সামলানই ঝামেলা, আপনের বাপটাও গত অইলো, দুই এডা সালিশ দরবারেও যাওন নাগে। ঝামেলা সামলাবার না পায়ে দোহানডা ছাইড়ে দিলাম। আপনেগরে বাসাত গেলে ভাবীসাব, আপনের মাও খুব আদর যতœ করত। যুবক চোখ তুলে। ভাবীসাব সেই কখন থেকেই কোলের উপর একবার আঁচল ভাঁজ করছেন আবার খুলছেন আবার দড়ি পাকাচ্ছেন, এইসব করছেন আর কি। যুবক শেখ আয়াতউল্লাহর চোখে চোখ রাখে। কী যেন খোঁজে সে, কী যেন পড়তে চায়, রক্তশূন্য সাদা চোখে। চোখে চোখ রেখে কথা বলে যুবক।
: চাচা, আব্বার মহাজনি গদিতে আগুন জ্বলছে। বিহারিরা আগুন দিছে, এখনও বোধহয় পুরোপুরি ছাই হয়ে আগুন নিভে নাই।
শেখ আয়াতউল্লাহর ঠোঁট অল্প কেঁপে হাঁ হয়ে থাকে; ইস্, কন কি! যে স্তব্ধতা এতক্ষণ ঠেকানো ছিল এবার তা চেপে বসে। শেখ আয়াতউল্লাহর ফ্যাকাশে চোখ যুবকের মুখের উপর চঞ্চল হয়। স্তব্ধতায় গতি সঞ্চালন করে যুবক: চাচা, আপনের কাছে একটা বড় আবদার নিয়ে মানেসেকি, ওর বুক ফুটো বেলুনের মত একবারে বাতাস বের করে দেয় কেন! আহারে, কথা কাক্সিক্ষত পরিণতি পেল না। সে আবার দম নিয়ে শুরু করে: চাচা আমরা আসলে খুব বিপদে পড়ে আপনের বাড়ি এসেছি। আপনে যদি একটুনা, এইবারও শেষ করা গেল না। যুবক তাই দুই হাতের উপর ভর দিয়ে শেখ আয়াতউল্লাহর দিকে ঝুঁকে আসে। অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করে। যদি খানিক শক্তি পাওয়া যায়। তাঁর অস্বস্তি কাটে না তবু। বলা হয় না যা বলতে চায়। বলতে পারে না। বিচলিতবোধ করে ভীষণ। সে মাথা তুলে সোজা হয় আবার। শেখ আয়াতউল্লাহ বাইরে দেখেন স্পষ্ট ঝড়ের আলামত। দোয়ার বন্ধ না করলে আর চলে না। ঘর টিকে থাকবে না অন্যথা। তিনি দাঁড়িয়ে দোর লাগান। কল্পনা ঝাপ লাগায় জানালা নামক খোপে। সামনের দরোজা দিয়ে ঘোমটা টানা এক মহিলা ঢুকে শিশু কোলে। সেও আর দরোজা খোলা রাখে না। শেখ আয়াতউল্লাহ সাবধানী হয়ে উঠে। সে ভয় লুকাতে পারে না। অন্ধকারে কারও মুখ ঠাওর করা যায় না। শেখ আয়াতউল্লাহর মন থেকে সন্দেহ কাটতেই চায় না। অবশেষে সে জিজ্ঞেস করেবাবাজী শহরে তাইলে হাছাই খানসেনারা ঢুকছে? যুদ্ধ কি তাইলে নাগলই!
যুবক এবার উত্তেজিত। সে উঠে শিনা টানটান করে দাঁড়ায়। চোখ তার জ্বলন্ত আঙরার মত টকটকে হয়ে উঠলেও সম্ভবত কিছু দেখতে পায় না। আন্ধারে হাতড়াতে থাকে। এবং হাতড়িয়ে অন্ধের লাঠি পায় যেন। যুবক শেখ আয়াতউল্লাহর হাত চেপে ধরে অকস্মাৎ শক্ত করে। হড়বড় কথা বলে: চাচা আমার মাওটা আপনের হিল্লায় রেখে যাব। চাচা আমার মাকে একটু দেখবেন। আগে আল্লাহ পরেবাতাসের তোড়ে ঘর মড়মড় করে, দোলে উঠে। এই বুঝি ভাঙে। ঘর জুড়ে আঁধার। ছয় দুগুণে বারটি ভয়ার্ত জ্বলজ্বলে চোখ ছাড়া কিছু আর দেখা যায় না। ঝড় শুরু হয়ে গেছে, কালবোশেখী ঝড়। ঝড়ের তাণ্ডবের ভিতর কে যেন ডুকরে কেঁদে উঠে। ডুকরে ডুকরে কাঁদে।
আমরা ঝড় ও কান্নার শব্দ শুনি।
অবস্থাদৃষ্টে আমাদের মনে হবে আমরা এক অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে অধিকতর বিপন্ন পরিবেশে ঢুকে পড়েছি। যদিও আমাদের বর্তমান অবস্থান কি ভ্রমণের প্রতি আমরা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণক্ষমতাশূন্য। এই বিবেচনার আওতায় আমরা সকলপ্রকার ভাবনা ভাবা অহেতুক ও নিরর্থক মনে করব। আর আমরা তো সবেমাত্র ঘটনার ভিতর প্রবিষ্ট হচ্ছি। সুতরাং ভবিষ্যৎ ঘটনা সমষ্টির জন্য আমরা অপেক্ষা করব। অতঃপর কার্যকারণ সূত্র নির্ণয়ের চেষ্টা উত্তম ও বিজ্ঞানসম্মত হবে, বিশ্বাস করব।
বিয়োগে বিয়োগে যোগ
সময়টা সকাল। সকালের চনমনে রোদ আঙ্গিনাজুড়ে লেপ্টে থাকা ঘরের ছায়া সরাতে তৎপর ভীষণ। সেই ছায়া ঘেঁষে বসা ভাবীসাব আঁচলে চোখ মুছেন। তাঁর চোখ-মুখের গভীর বেদনার ছাপ উপচে পড়ছে লজ্জা, অপমান। তিনি চোখের জল আটকাতে পারেন না। নিঃশব্দে অশ্র“ ঝরে। ভাবীসাব বাম হাতে নাক সাফ করে আঁচলে নাক ও চোখ মুছেন। এবং কথা বলেনভাইসাব আমারে এডা গাড়ি ঠিক কইরে দেন। আল্লাহ কপালে যা থুইছে তাই ত অবো। যাই, নিজের বাড়ি ঘরোই যায়ে পইড়ে থাহি গে। বুঁজে আসে ভাবীসাবের কণ্ঠ। নাক সাফ করতে হবে।
ভাবীসাবের বাম পাশে পিঁড়িতে নিতম্ব চেপে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছেন শেখ আয়াতউল্লাহ। ডানদিকে নিকটতম দূরে শনে ছাওয়া চালের নিচে রান্নার প্রস্তুতির নামে থালা-বাসন পিটাচ্ছেন আর অনুচ্চস্বরে বকবক করছেন যে মহিলা, উনি কল্পনার আম্মা। চালার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে শিশু কোলে কল্পনা পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি খুঁড়ে। শেখ আয়াতউল্লাহর সদ্য টাক মাথায় এক ফালি রোদ পড়ায় চিকচিক করে। উত্তপ্তও হয়তো হয়ে পড়ছে। তিনি ডান হাতে মাটিতে দাগ কাটেন খড় দিয়ে। দাগ না বলে বলা ভালো ছক কাটেন। ঘাড় সোজা করে না, গুঁজে রেখেই কথা বলেন: ভাবীসাব মুনে কষ্ট নিয়েন না।…বাড়িত গেলেই কী আর শান্তিতে থাকপের পাবেন? তার তনে ইন্তি-ই তিন দুক্কী এক হতে সুখে-দুহে মিলেজিলে থাহি।..একটু সামাই করেন ভাবীকী করমু কন, পুনাইর মাও অইলে কী অবো; মেডার যে এহনও কোন বিবেচনা বুদ্ধি-সুদ্ধিকল্পনার আম্মার থাল-বাসন আছড়ানো পিটানোর শব্দ কান সহা হয়ে উঠলেও যখন কণ্ঠনিঃসৃত শব্দমিশ্রণ কর্ণগোচর হয় তখন আর সহ্য করা যায় না। বিশেষত শেখ আয়াতউল্লাহর মগজের কোষগুলি বুঝি ছিন্ন-ভিন্ন হবে। যেহেতু কল্পনার আম্মা এবার তারই কথার উপর সাইকেল চালিয়েছে।
: হ, এহন ত সুয়েতা আইবোইমাগী, মাগীরে আমি ঘরো উঠপের দিয়েই ভুল করছি। সুজা মাগী নাহি গো, নিজের সোয়ামীরে খাইছে; পোলা দিয়ে আমার পোলারে বাড়ির বাইর করছে। এহন আমার কইলজে-শিনে-মাথা চাবায়ে খাব হেই তাল খাড়া করাইছে ছিলেইনে মাগীশেখ আয়াতউল্লাহ আর স্থির থাকে কীভাবে? সে শান্ত থাকে না। তাঁর অস্থির ডান হাত পাছার নিচ থেকে কাঁঠালের পিঁড়ি টেনে, ভাবীসাবের নাকের খুব কাছ দিয়ে ছুঁড়ে মারে কল্পনার মায়ের দিকে। খুব তাড়াহুড়া করে ফেলায় হয়তো লক্ষ্যবস্তু ঠিকমত তাক করা যায় নি, অথবা খুব বেশি রাগের কারণে হাত কাঁপছিল, বলা যায় নাএমনও হতে পারে শেখ আয়াতউল্লাহর টিপ কখনোই ভালো না, তাই পিঁড়ি কল্পনার মায়ের শরীরে লাগে না। হয়তো উদ্দেশ্যও সরাসরি গায়ে লাগানো না, ভয় দেখানো। তবে পিঁড়ি খানিক মাটি থেঁতলে নিয়ে কল্পনার আম্মার ডান পায়ের কাছে থাকা মাটির হাড়ি ভেঙে দিলে পিঁড়ির গতিরোধ হয়। এবং তাতে যে শব্দ তৈরি হয়, তজ্জন্য চালার পাশে যে খইরঙা কালা মুরগিটা তার ৯টা বাচ্চা নিয়ে আহার বা পোকা সন্ধান করছিল ওটি কলকল কর উঠে। এবং দৌড়ে হাত দশেক পশ্চিমে ঝোপের কাছে সরে ব্রেক কষে গলা উঁচু করে চারপাশ দেখার চেষ্টা করে ও বাচ্চাদের নিজের পাখার আড়াল দেয়।
মুরগির কোলাহল কি আক্রমণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার ব্যর্থতা শেখ আয়াতউল্লাহর ক্রোধ বাড়িয়ে দেয়। উপরন্তু কল্পনার আম্মার কচকচানিও তো থামে নাই। অতএব সে প্রায় পিঁড়ির সাথেই কল্পনার আম্মার কাছে পৌঁছে। তার বাম হাতে ধরা একগোছা চুল, কল্পনার আম্মার মাথার চুল। চুলের গোছা হাতে পেঁচিয়ে হেঁচকা টান দিলে প্রথমে ঘাড় থেকে মাথা হেলে আসে। তারপর কল্পনার মায়ের গোটা শরীর পাক খেয়ে ভাঙা হাড়ির উপর পড়ে যায়। এবার শেখ আয়াতউল্লাহ তিড়িং বিড়িং লাফায়; শালী তরেই আগে বাড়িত তনে বাইর করমু। চুতমারানী মাগী, বুইড়ে অই-ই নাই, এহনই আমার মুহের উপরে কতা কস। এ্যাত্ত বাড় বাড়ছস তুইআমার ইষ্টিরে বে-ইজ্জত করস। তাঁর মুখ ও হাত দুটোই ক্ষীপ্র হয়ে উঠে। এমতাবস্থায়, ভাবীসাব তো আর নিশ্চল বসে থাকতে পারে না। সঙ্গত নয় বসে থাকা, যত দ্বন্দ্বই তার সাথে লাগুক না কেন। ভাবীসাব, শেখ আয়াতউল্লাহর ক্ষীপ্রতা থামাতে সচেষ্ট হন। তাতে করে, শেখ আয়াতউল্লাহর হাত থামলে কী হবে তখন পা সচল হতে উদ্যত হয়।
: বাইর অ তুই আমার বাড়িত তনে, তরে আর আমি আখমু নাএইসব মারামারি ধস্তাধস্তি দেখে কল্পনা ও কোলের শিশু চিৎকার শুরু করে ও শেখ আয়াতউল্লাহর কথা ছাপিয়ে উঠে তাদের চিৎকার। অতঃপর ভাবীসাবের কয়েক পরস্ত ধস্তাধস্তিতে শেখ আয়াতউল্লাহর বিক্রম যদি বা একটু থামে, পরক্ষণেই চেগে উঠে দ্বিগুণ বেগে। তখন ভাবীসাব ফের মাখামাখি হন নাকের পানিতে, চোখের পানিতে।
: ভাইডে-রে না আমার, দুইডে পাও ধইরে কই আর মাইরেন না। গুইদে পুনাইর মাও, বুঝেন না
কল্পনার আম্মা এই অবসরে ফোঁস করে উঠেআহারে… মাইর খিলায়ে মাগীর এহন সুয়েতা দ্যাহ। নটী মাগীর এহন কইলজে ঠাণ্ডা অইছে যে
শেখ আয়াতউল্লাহর মাথায় কমে আসা আগুনের আঁচ খোঁচা পেয়ে আবার বাড়ে; হরেনছেন দেহি ভাবী, চুতমারানি শালীরে আমি আগে আক্কেল হিগেই।
ভাবীসাব বাধার দেয়াল সরিয়ে নেন না। বরং ঝাঁঝের সাথে অন্য পরামর্শ দেন : আপনে ইন্তনে যানছেন দেহি। কারোরেই কিছু হিগেন নাগব না। কুনোহান্তি কারোরে পাঠান নাগব নাআমিই যামুগা।
শেখ আয়াতউলল্লাহ প্রতিরোধ ভাঙার আর কোন চেষ্টা না করে, খ্যাট করে ঘুরে থমথম পা ফেলে হাঁটা দেয় বিপরীত দিক। ভাবীসাব চোখ পেতে রাখেন তাঁর পিঠের উপর। খরখরা লাগে দৃষ্টি। এক পলকে ঐ দৃষ্টি দেখলে ভ্রম হতে পারে বুঝি তিনিও ক্রুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। অনেকক্ষণ কান্নাকাটিতে এমন হয়েছে। এটা নিবিড় পর্যবেক্ষণে ধরা যায়।
তারপর তিনি চোখ ফিরিয়ে প্রথমে কল্পনার আম্মাকে দেখেন। দৃষ্টির খরখরা ভাব কেটে গিয়ে মনে হবে এখন ভেজাভেজা। মাটির হাড়ি ভেঙে চাল ধোয়া পানি পড়ায় মাটি কাদা হয়েছে। কল্পনার আম্মার চোখের পানি হয়তো এখনও সেখানে মিশে নাই। মিশলে জল কাদা রঙে কি পরিবর্তন হতো না! কাদায় কল্পনার আম্মার কনুই ও আঁচল লেপ্টে গেছে। তিনি বসেও আছেন কাদার উপর, পা ছড়িয়ে, নিশ্চুপ। উল্টোদিকে তাই মুখচ্ছবি দৃষ্টিগোচর হয় না, দেখা যায় আউলা-ঝাউলা চুল। এবং কল্পনার উপর চোখ বুলিয়ে ভাবীসাব তাকান আকাশের দিকে। কল্পনার গালে তাজা অশ্র“ গড়িয়ে পড়ার দাগমুখটা স্যাঁতস্যাঁতে লাগে। ওর কোলের শিশু ঠোঁট ভেঙে ভেঙে হিক্ তুলছে। আর আকাশ নীল। নীলের উপর অস্বচ্ছ সাদা মেঘ। না, নীল আকাশের উপর মেঘ-টেঘ কিছু না। চোখ আবার ঝাপসা হয়ে এলো তো, তাই! ভাবীসাব ঘাড় ঘুরিয়ে আবার ঐদিকে তাকান যেদিকে প্রস্থান করেছেন শেখ আয়াতউল্লাহ। সে অদৃশ্য; ভাবীসাব মাথা তুলে সোজা করতেই চোখ থেকে টপটপ করে বৃষ্টির ফোটা নামে। তখন তিনি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন না। বড় ঘরের দক্ষিণে খানকা ঘরে ছুটে যান। ঐ ঘরে শেখ আয়াতউল্লাহর ছেলের সাথে তার ছেলে ঘুমাতে গিয়েছিল গত রাতে। উঠোনে কল্পনা, কল্পনার কাঁখে ওর শিশু ভাই এবং মা ছাড়া আর কেউ নাই। শিশুর ফুঁপানো কান্না ছাড়া কোন শব্দও। কল্পনার মা হঠাৎ বাচ্চার উপর ক্ষেপে যান। এবং তার প্রতি অসংলগ্ন প্রশ্ন‘ঐ মর্দা, তুই কান্দস ক্যা? বউ মরছে’ ছুঁড়ে এবং বিপরীতপক্ষ থেকে কোন উত্তর দেওয়ার সময়টুকু না দিয়েই, প্রতুত্তর মিলবে না জানা আছে বলেই হয়তোকল্পনার দিকে দু’বাহু প্রসারিত করেন। ছেলেকে কোলের উপর আড়াআড়ি শুইয়ে দিয়ে মুখে তুলে দেন স্তন। পরক্ষণেই গলা ঝনঝন করে বাজে।
: তর নাঙ্গের পোলারে যায়ে কগা বার ভাতাইরে মাগীর হতে এক বাড়িত এক ঘরত আমি থাকমু না। আমি আইজই এহনই বাড়ি ছাড়মু। আমারে মিল-জিল কইরে বিদেয় কইরে দিবের ক। আমার সিদে-সাঙ্গাল অবুঝ পোলাডারে ফুইসলায়ে বাড়ির বাইর করছে। এহন একলা একলা বাড়িত মজা মারব আর খাবএতই সুজা, সুজাভাবেই ছাইড়ে দিমু। পোলা বিয়েইতে ঠেলা নাগে না, সুংসার করতে কইলজে গিলে বাড়ায় যায় না? মাগী পোলা বিয়েইছে ঠাওর পায় নাই; জানে না?! আমার বাজানরে
না, কল্পনার আম্মা আর নির্জলা কথার তীর নিক্ষেপ করতে পারে না। এমনিতেই তীরগুলো সরাসরি সামনে কোন প্রতিপক্ষ না থাকায় শূন্যে ঘুরপাক খায়। তার উপর আবার উগলে উঠা কান্নার ঢেউ তীরের গতি ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেয়। অবশেষে কান্নার কাছে আত্মসমর্পণ করে কল্পনার আম্মা। কান্নার কারণ: একটু আগের মারের আঘাত ও অবচেতন মনের অপমানবোধ অথবা ছেলে বিয়োনোর কষ্ট মনে আসে অথবা ছেলে যে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গৃহত্যাগ করেছে, মায়ের কথা ভাবে নাই একবারও অথবা এইসবই তার বুকে দুখের দরিয়া বানিয়ে দিয়েছে। এখন সে কান্না ছাড়া আর কী করবে? কী করতে পারে! কল্পনার আম্মা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে থাকে।
কল্পনা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, ভাষাশূন্য। বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। আম্মাকে সান্ত্বনা দিবে বা কাঁদতে বারণ করবে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে? তা কীভাবে, কী করে! না, কল্পনার এখানে কিচ্ছুটি করার নাই। সম্ভবত এই কারণে নয়তো কান্না ছোঁয়াচে বেজায় তাই ওর চোখ জলে ভরে উঠে। আম্মা কাঁদছে যে। শুধু কি তাই ভায়ের জন্য ওর কি মমতা কারও চেয়ে কম! কিন্তু কান্না-কাটিতে কী হবে? ভাই কি আর ফিরে আসবে? এতক্ষণে কোথায় চলে গেছে! হয়তো বর্ডার পার হয়েবর্ডার কী, কতদূর! ওখানে গিয়ে কীভাবে কী করবে! ও তার কী জানে! কিছুই না! শুধু শুধু মাথা ব্যথা হবে কাঁদলে। কল্পনার চোখ থেকে একটু পানি পড়লেই মাথা ধরে, ব্যাপক ঘুম পায়। এমনিতেই সকাল থেকে কয় পশলা কান্না ঝরে গেছে। কল্পনার আরও কাঁদতে ভয় করে। আসলে ওর কাঁদতে আর ভালোই লাগছে না; একঘেঁয়েমি চলে এসেছে। বস্তুত কল্পনা আর না কেঁদে পা বাড়ায় খানকা ঘরের দিকে। তবে কী কারণে ওমুখো হয় তা বোধগম্য হয় না। ধরা যেতে পারে কান্না চাপতে। কি জানি, আম্মা আদেশ না করলেও একবার জেঠির খোঁজ নেওয়া দরকার না। তিনি যদি আবার চলে যান!
খানকা ঘরে জেঠি কি ভাবীসাব একাই চৌকির এক কোণে বসে। ভাবীসাব বা জেঠির যুবক পোলা কিংবা শেখ আয়াতউল্লাহর সিদা-সাঙ্গাল অবুঝ পোলা কেউই ঘরে নাই। রাতেও ছিল না। রাতের আঁধারে দুজনেই গৃহত্যাগ করেছে। যাবার আগে কাগজে লিপিবদ্ধ করে গেছে গৃহত্যাগের সংবাদ ও তদ্জনিত উদ্দেশ্য। ভাবীসাব কাগজটি পড়ছেন। আগেও পড়েছেন নিশ্চয়ই। নইলে এত যে হাঙ্গামা তার ভিত্তিটা কী? কাগজ থেকে পাওয়া তথ্যাদিই তো। তথাপি আবার পড়ছেন। অথচ তাঁর দ্বিধা-ভয়-শঙ্কা কিছুই কাটে না যেন। লিখিত বিষয়ের পাঠোদ্ধার এইরূপ:
আম্মা,
আর তো দেরি করা যায় না। আজই রওয়ানা দেওয়া লাগে। আজ রাতেই। এমনিতেই মেলা সময় নষ্ট হয়ে গেল। অবশ্য লাভও কিছু কম হয় নি। এই বাড়িতেই একজন যোদ্ধা, আমার সশস্ত্র ময়দানের বন্ধু পেয়ে গেলাম। ফকির আমার সঙ্গে যাবে। ছোট মানুষ, তাই রেখে যেতে অনেক বুঝাচ্ছিলাম। কিন্তু ওর আবেগ, ওর সাহস, ওর উদ্দীপনা, উৎসাহ দমিয়ে দিয়েছে আমাকে। আমার বুক ফুলে হয়েছেও বিশাল। এবার আমাদের মুক্তি ঠেকায় কে! আরও তিন-চারজন ছেলে আমাদের সাথে যাবে। ওরা ফকিরের বন্ধু।
আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি আম্মা, স্বাধীনতা ঘোষণা হয়ে গেছে। মানুষ বর্ডারের ওপার ভারতে জড়ো হচ্ছে দলে দলে। ওখানে যুদ্ধের ট্রেনিং শুরু হয়েছে। আমরাও যাব ট্রেনিং নিতে। ফকিরকে সাথে নিচ্ছি বলে, আমি জানি এই বাড়িতে তোমাকে কিছু অসুবিধায় পড়তে হবে। অনেক বাঁকা-চোরা কথা ও অপমান সহ্য করতে হতে পারে। সবাই, অন্তত চাচি বলবেআমি ফুঁসলিয়ে তার ছেলেকে নিয়ে গেছি। আর সেই ক্রোধ তোমার উপর ঢেলে কিছু শান্তি খুঁজবে। আমাদের তো হাতের কাছে পাবে না। তবু তুমি এই বাড়ি ছেড়ে যাও না যেন। তাহলে আমি আর তোমাকে চিঠি লিখতে পারব না। তাছাড়া তুমি কাছে থাকলেও বিরক্তি সত্ত্বেও চাচা-চাচি একটি সান্ত্বনাও হয়তো পাবে। হাজার হোক, তাদের তো আরও দু’টি সন্তান অন্তত কাছে থাকছেই। তোমারও মোটামুটি নির্ভরযোগ্য অবলম্বনটা থাকে।
সরাসরি তোমাদের কাছ থেকে বিদায় আর আশীর্বাদ নিতে মন খুব চাইছিল। কিন্তু ভয়ও কম হয় নাই। যদি যেতে দিতে না চাও কিংবা কান্নাকাটি শুরু কর ভীষণতবে তো যাওয়া খুব মুশকিল হবে। অথচ না গেলে তো চলবে না। এবার দেশ স্বাধীন করাই লাগবে। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছে মনে নাই ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। তাই তোমাদের কাছ থেকে এইভাবে গোপনে বিদায় নিলাম। কোন চিন্তা করবে না, চাচা-চাচিকেও বুঝাবে। মনে কর, চাচা-চাচিকে বুঝানো ও সামলে রাখা তোমার যুদ্ধ।
আমরা প্রথমে বক্শীগঞ্জ যাব। বক্শীগঞ্জে বর্ডার ক্রস করতে না পারলে, শেরপুর গারো পাহাড় দিয়ে বর্ডার ক্রস করব। বর্ডার ক্রস করতে পারলে আর কোন চিন্তা নাই। তারপর সেখানে ট্রেনিং নিয়ে হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে, দখলদার পাকবাহিনী হটিয়ে, দেশ স্বাধীন করে, ফিরে আসব।
আমাদের জন্য দোয়া কর আম্মা। চাচা-চাচিকেও দোয়া করতে বল। রাগ কর না। ধৈর্য নিয়ে সাবধানে থেক। তোমাদের পায়ে আমাদের সহস্র কোটি সালাম। জয় বাংলা।
ইতি
তোমার ছেলে
খায়রুল
২১ এপ্রিল, ১৯৭১
কল্পনা চিঠি ধরা জেঠির হাতের সামনে মুখোমুখি দাঁড়ায়। জেঠির নাক দিয়ে বের হওয়া জলীয় বাষ্পের ধাক্কায় কাগজ কাঁপে মৃদু। চোখ থেকে ঝরা অশ্র“ বুকের উপর একরঙা নীল শাড়ির ভাঁজে পড়ে পড়ে কালো করে ফেলেছে বুকের আঁচল। পড়া হয়ে গেলে তিনি চিঠি সরল ভাঁজ করায় মনোযোগী হতে চান। ইতোমধ্যে ভিতরে কল্পনার আম্মার আহাজারি বাড়ি মাথায় তুলে। তখন শেখ আয়াতউল্লাহর থপথপ পা ফেলার শব্দ পাওয়া যায়। তিনি ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে সাঁট পারে।
: এ্যাই তর কান্দন থামাবি না? সঙের প্যানপ্যানানি কইলে সহ্যি অয়তাছে না আর। চিক্কির থামাইস কইলে কয়লাম। না, কল্পনার আম্মার কান্না থামার কোন লক্ষণ অনুপস্থিত। বরং আহাজারিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তাঁর পা দুটি সামনে ছড়িয়ে যায়। ডান হাত মাটিতে পড়াই ছিল, সেটি আরও আধহাত খানেক সামনে এগিয়ে গিয়ে ডানে-বাঁয়ে ঘর লেপার মত পুছ দিতে শুরু করে ও কণ্ঠে আসে নতুন ছন্দ।
: ওরে আমার বাজান গো… ওরে আমার ফকির রে… আমারে থুয়ে কুঠায় গেলা গো… কুন আজরাইলরেই না বাড়িত জাগা দিছিলামরে… বাপ আমার নাড়ু খাবার চাইছিল গো… ওরে আমার আল্লারে… আমার বাজানরে তুমি
শেখ আয়াতউল্লাহ দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দাঁত কিড়মিড় করেন। কিন্তু কল্পনার আম্মা কিড়মিড়ানি দেখলে তো। আর কোলের শিশু, মা পা ছড়িয়ে দেওয়ায় মুখ থেকে মাই খসে যায়, তাই নয়তো মাকে নতুন স্টাইলে কাঁদতে দেখে নিজেও বিকৃত মুখভঙ্গি করে, ঠোঁট ভাঙে এবং চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। শেখ আয়াতউল্লাহ এখন কী করে! তাঁর রাগ উবে যায়। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন উঠোনে কেউ নাই। তিনি এগিয়ে যান কল্পনার আম্মার কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে নিচু স্বরে বুঝাতে চেষ্টা করেন, দ্যাহ না, তুমি কান্দিলে কোল মদ্যে গ্যান্দা কান্দে। একটু সেমায় কর। ছোট পুনাইর মুহের দিক চাও, চায়ে ধৈর্য ধর।… পুনাই বাড়িত নাই, যুদ্ধে গেছে মাইনষে জানলে বিপদ অবো না। বিহারিরে জানলে কিছু থুব, বাড়ি-ঘর জ্বালায় দিয়ে যাবো না আয়ে। আঙ্গরে কারোরে বাঁচাব। বাহি যে দুইডে পুনাই আছে, ও দুইডেরে বাঁচান নাগব না।
এ্যাল্লা বুঝÑ
আদরের আকস্মিকতায় কল্পনার আম্মা কান্না ভুলে যায়। কয় মুহূর্ত ভুলে থাকে। শেখ আয়াতউল্লাহর দিকে ভেজা চোখে ঢুলুঢুলু তাকায়। বাম হাতে নাক ঝাড়ে। নাক ঝেড়ে শাড়ির আঁচল টেনে মুখে চাপা দিতে গেলেই কান্নার দলা দ্বিগুণ বেগে উগলেআসে।
: আমারে তুমি পাষাণ বান্দিবের কও… ওরে সব্বোনাইশে মানুষরে… তোমার নাখলা আমি পাষাণ বান্দিবের পাইতাছি না ত গো.. আবার আহাজারি শুরুহলে শেখ আয়াতউল্লাহ খামের মত দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। তারপর ধরা গলায় ক্রোধ আনার চেষ্টা করেন।
: শালা, তুই তর কান্দাকাটি নিয়েই থাক, জিদ নিয়েই থাক। শালা আমিও বাড়ি ছাড়মু দেহিতিনি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন না। খানকা ঘরে যান। সেখানে ভাবীসাব যেমন বসা ছিল তেমনি বসে হাতের কাগজ একবার ভাঁজ খুলছেন আবার ভাঁজ করছেন। এইমাত্র তাঁর চোখ থেকে আরও এক ফোটা জল বুকের উপর নীল কাপড়ের আর্দ্রতা ও গাঢ়তা বাড়িয়ে দিল। ঠিক সাথে সাথেই শেখ আয়াতউল্লাহ এসে চেপে ধরেন ভাবীসাবের হাত। কল্পনা তখন ভাবীসাবের পাশে চৌকিতে বসে ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে মেঝের মাটি টিপছে।
: ভাবীসাব, আঙ্গরে মাপ করেন। আর আমারে কতা দেনইন্তনে যাবার কতা মুহে আনবেন না, আঙ্গরে হতেই থাকপেন। এবার শেখ আয়াতউল্লাহ নিজেই হামলে কেঁদে উঠেন। এবং মেঝেতে দুই পায়ের পাতায় ভর করে বসতে গেলে মাটিতে পড়ে যান। অতঃপর এই মানুষগুলোর কান্নার সামিল হয় আকাশ। প্রকৃতির চোখের জল ভরিয়ে দেয় বাঙলার নদী-নালা-খাল-বিল-ডোবা সব। ফলত শেখ আয়াতউল্লাহ, কল্পনার আম্মা, কি ভাবীসাব, কেউই জলশূন্যতায়কত কান্নায় কত জল ঝরে গেল তবু, বুক ফেটে চৌচির হয়ে মৃত্যুবরণ করেন না। বরং লাভ করেন এক আশ্চর্য স্থিরতা ও ভারত্ব।
মুঠোর ভিতর এসেছে পাখি
এখন এই বাড়ির সবার বুকের একেবারে গহীনে কতগুলো কাঁটা যদিও খচখচ করে। বিশেষত কল্পনার আম্মার ও ভাবীসাবের।
‘পোলা দুইডে হেই কবে গেল আর নাহি কুনো খবরপাতি দিল। এডা চিঠিও নাহি পাঠাইলো কতদিন অয়ে গেল তাও। হাত-পাও ডাঙ্গর অইছে, পাইলে-নাইলে বড় করছি, নিজে নিজে চলবের ফিরবের পায়এহন আর মাও-বাপের কতা মুন করার কোন দরকার আছে! মাওডারে চিঠি দেওয়ার লোভ দেহায়ে ফালায় থুয়ে গেলি, তাইলে আর মায়ের কুনো খোঁজ নেওন নাগে না! মাওডা কিবা থাকল না থাকল, থাকপের ইন্তি পাইলই কি না পাইল; বিহারিরে ধইরে নিয়ে মাইরেই ফালাইলো না বাঁচায় থুইলো একবার জানবের মুন চায় না! নিজেরা কই কিবেই আছস হেই খবরডা ত অন্তত দিবি! দেস না, না দিলি! যিন্তিই থাহস আল্লাহর আশীর্বাদে বালা থাহিস। আঙ্গরে দিন আর কয়দিন! এই আইজ আছি কাইল নাই!…’
কাঁটাগুলোএইরূপ আত্মকথন ও আত্মাভিমানকখনো বা; না, কখনো কখনো নয় প্রতি রাতের তামস ঘরে আঁধারে মিশে থাকার কালে বুকের গভীর হতে উপরে উঠে আসতে চায়। গুমোট অন্ধকারে খলবল সাঁতরাতে চায়। অথচ সাঁতরাতে দেওয়া যাবে না, সমস্যা আছে। তখন ঢোক গিলে গিলে তাদের আবার অতলে পাঠাতে গেলে নাক দিয়ে এক থোকা বাতাস, নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও, সুতোর মত বেরিয়ে আঁধারে মেশে। এবং গুমোট ভাব প্রকটিত করে আরও। আর কাঁটাগুলো যেহেতু গলা, নাড়ি চিড়ে নিচে নামে তাই ব্যথায় চোখের পাতা ভারী হয়। টুপ করে দু’এক ফোটা জলের পতন হলে চক্ষুপাতা হালকা হয়। আরাম লাগে। আবার ভারী হয়ে আসে, হালকা হয় এবং ঘুম আসে। এমন হয় প্রতি রাতেইনিঃশব্দে!
কিন্তু দিনের আলোয় এইরূপ ঘটে না। আসলে ঘটতে দেওয়া হয় না, দেওয়া যায় না। এটা আর এক জেল। অন্তরে জেগে উঠা আগুন, উথাল-পাথাল ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস অনিচ্ছায় চেপে রাখা! কি রাতে কি দিনে। সব সময় নিজের মাঝে নিজেকে সেঁধিয়ে রাখতে হয়! নিজেকে আড়ালে রেখেই দৈনন্দিন কাজ চালাতে হয় স্বাভাবিকতার ভানে। চলছেও তাই, প্রতিদিন। ঘর-দোর হঠাৎ দেখলে কিংবা ওদের মুখমনে হতে পারে, এখানে কোন শোক কি ব্যথার আঘাত নাই! তবে যদি কাছে এসে কিঞ্চিৎ বেশি মনোযোগ লাগানো যায়, তবে ধরা পড়বে চোখের নিচে জমাট কালি ও ক্রমশ ভেঙে আসা শরীর। যাই বলি না কেন, বৃষ্টির আঘাত মাটিতে থাকেই এবং লুকানো যায় না কিছুতেই তার ক্ষয়চিহ্ন!
কত কষ্টে রাখা স্বাভাবিকতা, তবু যদি পড়শির কৌতূহল কি অযাচিত সমবেদনা এড়ানো যেত! এটা আবার কেমন? এইতো যেমন, কছিরের বউ কালি এসে বলছে আ চাচী আম্মা, আপনেগরে ফকির ছেঁড়াডা কোন খবর-পাতি দিল? কতদিন অইলো ছেড়াডারে দেহিনে। আঙ্গরে উদিহি আগে বাড়িত থাকতে ইসুম-উসুম গেল। কী সুন্দর হাস মসকারি করলো। বাড়িত আর আহে নাই না? ছেড়াডার জন্যে মুন পুড়ায় গো, কি বালা ছেড়াডাকই আছে কুনো খবরপাতি দেয় না, না!
ফকির ও কল্পনার আম্মা এইসবের পরিপ্রেক্ষিতে কী বলতে পারেন? কী-ই বা বলার থাকতে পারে তাঁদের! কিছু বলা যায় না। তিনি অতএব কাজের মাঝে, তা হাতে যেই কাজই থাকুকঅতি মাত্রায় নিবিষ্ট হন। আর সম্ভবত নীরবে ভাবতে থাকেন-আমার ফকির এই কাইলেনির কাছে গেছে, হাছাই গেছে! কী জন্যে গেছে? হাস-মসকারি করবের! ওর হতে ফকির হাস-মসকারি করছে! কহন গেল, কবে গেল? কি জানি, যাবারও পায়! পুনাইরে কি আর হারাদিনই চোহে চোহে রাহে! ভাবী অয়। অই হিসেবে এহাতসুম ম্যান গেছেই। তা এডে এহন আমার সামনে আয়ে কবার কী অইলো? বেহায়া মাগী কুইঠকের ম্যান! আমার ফকির অবাহা পুলাই নে যে এইরম ছিলেইনে মাগীর হতে ছিলেনিপনা কইরে বেড়াব। কল্পনার আম্মার গা জ্বালা শুরুহয়। এবং যন্ত্রণায় ছটফটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু অসহিষ্ণু হওয়া ঠিক হবে? হয়তো ঠিক মনে হয় না। ফলত তাঁর হাত দ্রুত নড়ে, হাতের আসবাব ঝনঝন বাজে। তখন বাজনার তলে প্যানপ্যানানি চাপা পড়ে।
অথবা, চরপাড়া থেকে চৌদ্দ ভাইদের মা, বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে এসেই বড় ঘরের দরোজার চৌকাঠে পা ছড়িয়ে বসে হাঁক ছাড়বে। কইগো মেডা, ও বউই-বাড়িরে বাড়িত নাই কেউ, কই গেছে! ক্যা গো আম্মাজান, কই গেলা! বেটাবউ যাইচে বাড়িত আয়ে উঠছে দেইহে ঘরো নিবা না, চৌকাঠো বহায় থুবা! হাতের শিকশিকে লাঠি পাশের বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে দিলে ওর দুটি হাত আজার হয়। সে দুই হাতের সহযোগিতায় পিঠের উপর ঝুলে থাকা আঁচল সরিয়ে পোড়া পিঠ অবমুক্ত করে। সারা পিঠে পোড়া মাংস শুকিয়ে চাকাচাকা, বিচ্ছিরিরকম ভয়ঙ্কর। দেখলে একটু গা গোলায়। গেল বছরের আগের বছর, চৈত মাসে, বুড়ির বেটাদের ঘরে আগুন লাগলে বুড়ি নিজের খুপড়িতে লুকিয়ে রাখা সোনা-রূপা না কাঁচা টাকা না ছেঁড়া ন্যাকড়া কাঁথার পোটলা না কোন অমূল্য সম্পদ উদ্ধার করতে ঢুকে! আর সাথে সাথে ঢুকে আগুনও! তা বুড়ি আর বের হতে পারে নি। আগুন নিভলে ওর অর্ধগলিত দেহ উদ্ধার করা হয়। বুড়ির কিন্তু বাঁচার কোন কথাই ছিল না। ওর পোড়া শরীর মাছিদের খুব প্রিয় আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল! তাই মশারির বেষ্টনিতে ফেলে রাখা হয় রাত-দিন। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষাতেই রাখা ছিল। তবু কীভাবে যেন বেঁচে উঠে! মরে না! সেই থেকেই বুড়ি, ওর শরীর যতটুকু সম্ভব খোলা রাখতে পছন্দ করে! কাপড় থাকলে জ্বালা হয়-মানুষকে বলতে ও বুঝাতে ও বিশ্বাস করাতে পারলে আরাম পায়, বিশেষত গরম কালে, বেশি বেশি।
কল্পনার আম্মা বসে থাকার মানুষ না। হাতে কোন কাজ না থাকলেও কাজ খুঁজে বের করা তাঁর অভ্যাস। ইদানিং আবার কাজেই তাঁর স্বস্তি। তিনি হাতের কাজ ফেলে স্বঘোষিত দেহপোড়া পুত্রবধূ দর্শন করতে সামনে আসবেন। বুড়ির মুখে কথা তৈরিই ছিল-আমরা পুড়া-দুড়া মানুষ, বুইড়ে অয়ে গেছিগেআঙ্গরে কি আর উডির বেটা পছন্দ করব; বউ বানাব? তা তোমার বেটা-বেটি কই গেছে? ছেড়া-ছেড়ি গিল্ল্যেরে যে দেহিনে বড়! এমন ভাব নিবে যেন ওদের দেখতে না পাওয়ায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে। ঢঙ দেখলে না বাঁ পায়ের গোড়া লাফ পারে। বুড়ি নানান-বিনান গল্প শুরু করে। কাজের কথা কিছু না, শুধুই ফ্যাদা প্যাঁচাল। কল্পনার আম্মার তো এইসব ভালো লাগার কথা নয়। তিনি অস্বস্তিতে ভুগবেন। দিনকাল ভালো না। ওদের জন্য বিশেষভাবে খারাপ। সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে মনের ভিতর অশান্তি নিয়ে ওদের দিন যাপন চলছে। মসজিদে মসজিদে শান্তি কমিটির চিঠি এসেছে, শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছেওরা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান, নাম-ঠিকানা, পরিবারের পরিচয় ইত্যাদি জানাতে বলেছে। কয়েকদিন হলো গুজব লটকে আছে, নদী পার হয়ে হানাদার বাহিনী আসছে গ্রাম আক্রমণ করতে! সত্যি কখন এসে যাবে কে জানে? এমতাবস্থায় ঠিক কাকে বিশ্বাস করা যায়? কাউকেই আপন ভাবা যায় না! আপন ভাবতে ভয় হয়! এই যে, কছিরের বউ কালি কিংবা পোড়া বুড়ি কিংবা অন্য আরও যারা ফকিরের কথা জানতে আসে, তাদের দ্বারা প্রত্যক্ষ কোন ক্ষতি হয়তো হবে নাতাদের কৌতূহল প্রকাশ ভঙ্গি যেমনই হোক, মূলত সূক্ষ্ম আন্তরিকতাবোধ থেকেই ওরা আসে! তবু উড়িয়ে দেওয়া যায় না পরোক্ষ ক্ষতির সম্ভাবনা! এদের পেটে কথা জমা থাকে না! ডালপালাসহ
বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হয়! নাহ্ আপদ বিদায় করতে পারলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচা যায়। পান দিয়ে কল্পনার আম্মা কাজের অজুহাত তুলে আপদ বিদায় করার ফন্দি আঁটবে। যথারীতি কল্পনার আম্মা পান তৈয়ার করতে বসলে, বুড়ি ছানিপড়া পাংশুটে চোখে ঘরের ঘন ছায়ার ভিতর অত্যন্ত গভীর তাকায়। বুড়ির কণ্ঠ আর স্বাভাবিক থাকবে না! অন্তরঙ্গতার আবেগে কেঁপেকেঁপে উঠবে। কোন গোপন কি সিরিয়াস কথা বলার, সম্ভবত সে মনে করে, এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। যার জন্য ও সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে।
: ও বউ, ফকিরের বাপ যে টাউনের মাগীরে বাড়িত জাগা দিছে, তা মাগী কি এহনও আছে, না গেছে গা? মাগীর ছৈল-পৈল নাই, সোয়ামি সুংসার নাই! আল্লাহ-উদ্দিশ্যে এবাহা মাইনষের বাড়িত কিবেই পইড়ে থাহে গো, শরম করে না! তুমি ঝাটা মাইরে খেদাবার পাও না, ডাইনী মাগীরে?
বুড়ি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঘরের ভিতর। বোধকরি কল্পনার আম্মার কোন প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশা করে। কিন্তু ওর ঘোলাচোখে ঘনছায়াঘরে কল্পনার আম্মার পানসাজা ভঙ্গিমার ভাসা ভাসা অবয়ব ছাড়া কিছুই মালুম হয় না। তখন সে কণ্ঠ আর একটু খাদে নামিয়ে অনেকটা ফিসফিস করে বলে: ফকিরের বাপের মতি-গতি কিছু টের পাও? ঐ মাগীরে আবার!…কল্পনার আম্মা ততক্ষণে বুড়িকে সাজা পান দিতে প্রস্তুত। বুড়ির কথায় তার মেজাজ খারাপের দিকে। ফলত তিনি সুপারিবিহীন চিবানো পানের ঝাঁঝ প্রকাশ করবেন।
: চাচী আম্মা, আপনের এক পাও কব্বরের মদ্যে গেছে গা, এহনও মাইনষের গুয়ার গু খুচানের অভ্যেস বাদ দিবের পান না। এডা মানুষ বিপদে পইড়ে আমার বাড়ি আয়ে আছেসোয়ামি মরা বিবধে মানুষ। ইদিহি পোলাডা আবারকল্পনার আম্মা কথা আর বাড়ান না। বুড়ির কাছে পানের খিলি হস্তান্তর করে তার চোখে চোখ রাখেন। বুড়ি কল্পনার আম্মার প্রতিক্রিয়া দেখে থ’ বনে যায়। তাকিয়ে থাকে অবাক। ‘বউডা বলে কি! যার জন্যে করি চুরি, হেই কয় চোর!’ বুড়ি পানের খিলি মুখে পুড়ে কটমট শব্দে সুপারি ভাঙে। আশি কালের বুড়ি অথচ দাঁত নষ্ট হয় নাই একটাও! অল্প চিবোলে পানের রস গাঢ় হয়ে উঠে না। পাতলাই থাকে। বুড়ি পাতলা পিক পঁচ করে উঠোনে ফেলে। কল্পনার আম্মাকে অনেকটা ধমকের সুরেই বলে-এ্যা মেডা, নিজের বালাডা বুঝিস! আমারে কব্বরের খোটা দেস! পুরুষ মাইনষেরে তর তনে আমি কম চিনি? তর দুধের পোলাডারে যে নিজের পোলার হতে বাঘের মুহে পাঠাইছে যুদ্ধ করবেরকই, তর সোয়ামি ঐ মাগীরে কিছু কইছে? মুন করছস আমি কিছু জানিনে, না! আমারে কবার কস? না, কল্পনার আম্মা ওকে আর কিছু বলার সুযোগ দিবেন না। তিনি বুড়ির চেয়ে অধিক দৃঢ়তার পরিচয় দিবেন। দ্যাহেন, আপনেরে বালামুত আইজ কয়ে দিতাছিইল্ল্যে আজাইরে প্যাঁচাল নিয়ে আমার বাড়িত আর আইবের পাবেন না। না কইরে দিলাম। আমার মুন অত সুখ নাগে নাই যে, দুনিয়ার মাগীগরে হতে আজাইরে গান গামু। বুড়ি কটকট করে মুখের ভিতর অবশিষ্ট শুকনো সুপারি ভাঙে অথবা দাঁতে দাঁত পিষে। হাতে লাঠি তুলে নেয়। থপথপ করে হাঁটা ধরে, নীরবে নয় সরবে। মেডা গলা করস, গৈরব দেহাস, তর নাঙ্গেরা আয়তাছে, মেলেটারি আয়তাছে। মেলেটারি আয়ে যহন পুটকি মাইরে বাতরো তুলব, তহনছেন ঠাওর পাবি আমি তগর বালা করবের আইছিলাম না মুন্দ করবের।
এই রকম অযাচিত পরিস্থিতির জন্য কল্পনার আম্মা তো মোটেই প্রস্তুত থাকেন না। বুড়ি চলে যাবার পরও তিনি একা একাই গজগজ করবেন-এহাক বার ভাতাইরে গাঁও বেড়ানি মাগীরে পাওয়ের উপর পাও দিয়ে আয়ে ঝগড়া বাজাব! ক্যা, আমি মাইনষের বাড়ি মাইনষের পাছা হুঙ্গিবের যাই? আমার সোয়ামি, আমার বাড়িত যারে খুশি তারে জাগা দিব, মাইনষের কি! মাইনষেরডা আমি খাবার যাই, না পিন্দিবের যাই? মাগীগরে কুনো কাম নাই, কাজ নাই…
ইদানিং সমস্যাটা অর্থাৎ মানুষের যখন তখন কৌতূহল-উপদ্রব বেড়েছে। আর কল্পনার আম্মার মনের দুশ্চিন্তা, অশান্তি, অপ্রকাশের হাঁসফাঁস যন্ত্রণা। এই তো কিছুকাল আগে বিষ্টি-বাদলার দিনে সমস্যা এইভাবে ছিল না। প্রতিবেশীর আনাগোনা কম ছিল। যদিও অন্য বর্ষায় বাড়িতে পড়শিদের অনেক আড্ডা হতো। আড্ডা, গান-বাজনার কেন্দ্রই হলো এ বাড়ি। খানকা ঘরে দিনরাত কামলা-গেরস্ত সবাই বত্রিশ গুটি খেলত, বাঘ-ছাগল খেলত, কেউ দড়ি পাকাত আর নানান পদের গল্প বানায় বানায় করত। পুবপাড়া থেকে বয়াতি এসে সারিন্দা বাজায়ে মুনসুর হেল্লাল, লালচাঁন বাদশার কিচ্ছা শোনাত। চরপাড়ার পবন বেকরা পড়ত পুঁথি। এছাড়াও সারি গানের রিহার্সেল ইত্যাদিতে গমগম করত সারা বর্ষা।
কিন্তু এবারের বিষয় আলাদা। কোন প্রকার আনন্দেরই অনুকূল নয় বর্তমান সময়। বয়াতির কোন খোঁজ নাই। শেখ আয়াতউল্লাহ নিজে সারি গানের ওস্তাদ। তাঁরও তো মনে সেই জোশ আছে বলে বোধ হয় না। প্রভৃতি কারণেই উৎসবের আমেজ অনুপস্থিত ছিল। যদিও কল্পনার আম্মা, ভাবীসাব যৎসামান্য হলেও কর্মমুখী ছিল। মনে আনন্দ না থাকুক, বিষাদ তাদের ততটা গ্রাস করতে পারে নি তখনও। বরং কাজের ভিতর হঠাৎ হঠাৎ আনন্দের ঝলক দেখা দিয়েছে। কল্পনার আম্মা বসে গিয়েছিল নকশী শিঁকা বুনতে। তিনি বরাবরই সুন্দর শিঁকা বুনেন। প্রমাণ তাঁর ঘরে ঝুলানো আছে। আর ভাবীসাব সাথে করে নিয়ে আসা পুঁটলা থেকে একটা সবুজ লুঙ্গি বের করে জায়নামায সেলাই করতে লেগে যান। সেখানে আকাশ রঙের শাড়িও ছিল। কিন্তু মেয়েদের কাপড়ে জায়নামায সেলাই নাকি জায়েজ নয়। সুতরাং তাঁর স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্নে হাত দেন। এবং বর্ষা শেষ হবার আগেই সোনামুখী সুঁই দিয়ে লাল-সাদা সুতোয় সেলাই করেন সুন্দর জায়নামায। জমিনে আহামরি কোন নকশা নাই, এই সেজদার স্থানে লাল সুতায় বুনা গম্বুজ, বাকি অংশে সাধারণ সাদা সুতোর সেলাই। এত চমৎকার মাপে মাপা ফোঁড় যেন একঝাঁক সমান্তরাল ঢেউ হাসতে হাসতে উঠে আসবে সবুজ জমিন থেকে। কল্পনার আম্মা সেলাই জানে না। ভাবীসাবের সেলাই তার এত বেশি মনে ধরবে যে, সে একটা নকশী-কাঁথা সেলাই করে দেবার আবদার জানাবে। ভাবীসাব শুধু রাজিই হবেন না, তাঁরই আকাশ রঙের শাড়িতে ইতোমধ্যে সেই কাঁথার কাজ শুরু করে দিবেন।
যে মানুষের জন্য এই বাড়ি ঘিরে গাঁসুদ্ধ মানুষের এত এত কৌতূহল, সেই মানুষের খবরটা কী? প্রকৃতপক্ষে কিংবা আপাতভাবে কোন খবরই তো কারও কাছে নাই। সবার জানা শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধফকির বাড়ি নাই। তাদের আশ্রিতার ছেলে খায়রুলের সাথে কোথায় যেন গেছে। যদিও সবাই জানে যুদ্ধেই গেছে। ফলত কল্পনার আম্মা, খায়রুলের আম্মা কি ভাবীসাব কি শেখ আয়াতউল্লাহ, প্রত্যেকেরই উৎকণ্ঠা বাড়ে। প্রতিদিন, প্রতিদিন বলি কেনপ্রতি মুহূর্তে যুক্ত হয় উদ্বেগাকুল ভাবনা এবং শেষতক ভাবনা গিয়ে স্থির হয় এই মাত্রায়-
‘পোলাডা বাঁইচে আছে কি? মেলেটারির হাতে ধরা পড়ে নাই ত? ধরা পড়লে কি আর বাঁচায় থুইছে, মাইরেই ম্যান ফালাইছে! বাঁইচে থাকলে কি এ্যাল্লাও খবরপাতি দিলনিনে! বাড়ির কতা কি অগরে মুন অয় না। আইজে কয়ডা মাস অয়ে গেলনাগো না, ইল্ল্যে আজাইরে ভাবনা ত বালা লক্ষণ না। ইল্ল্যে কী অলুক্ষইণে কতা মুন অয়! পুলাগিল্ল্যের সত্যি কুনো বিপদ অয় নাই ত? এডা খতম মান্সিক না করলেই না। আল্লাহ গো আল্লাহ, তুমি আমার পুনাইর মরা মুখ দেহাইও না। বালাই বালাই মায়ের পোলা মায়ের কোলে ফিরায়ে দেও।’
কল্পনার আম্মা শেখ আয়াতউল্লাহর কাছে মনের বাসনা ‘এডা খতম মান্সিক করছি’ প্রকাশ করলে, তিনি পরদিনই নয়জন মুন্সি দাওয়াত করেন। তাঁরা দিনভর আগর বাতির সুবাস নিতে নিতে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার বার দরুদ পাঠ করেন। এবং মিলাদ পড়ে, দোয়া শেষে, পেট পুরে গোশতর মিল্লি দিয়ে ভাত খেয়ে, মোট ৭ টাকা হাদিয়া গ্রহণ করে, নিঃশব্দে বাড়ি ফিরে যান।
নাহ, ভালো লাগে না তবু কিছু! কিসের কাজ, কিসের কি! যদি একবার জানা যেত ছেলে কোথায় আছেপাখি হয়ে উড়ে গিয়ে এক নজর দেখে আসা যায় ছেলের মুখ। প্রাণটা জুড়ায় তবে।
হ্যাঁ, ছেলেগুলো এখনো মরে নাই, বেঁচেই আছে। অবশেষে এই আভাসটুকু অন্তত পাওয়া গেল। এক পাখি, না এক ছেলে হঠাৎ কোথা থেকে যেন সাইকেলে ভর করে উদয় হয়। কল্পনা তখন ওর ছোট ভাইকে কাঁখে নিয়ে রাস্তার পাশে সেই আমগাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পথের পাশে আনমনে দাঁড়িয়ে থাকা কল্পনার অভ্যাস মত হয়ে উঠেছে। তো ছেলেটি এসে ওকে জিজ্ঞেস করবে: ও পুনাই, এডে শেখ আয়াতউল্লাহর বাড়ি না? কল্পনা ছেলেটির মুখের দিক তাকিয়ে হা! ক্যারা ইডে, কুনমুখ তনে আয়ে সামনে খাড়াইলো? তাও আবার সাইকেল দিয়ে! সে তখন দুই হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে মাটিতে দাঁড়ানো। কল্পনা কিছু বলার আগেই ছেলেটি চারপাশ সতর্ক দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করে। আশেপাশে কেউ নাই। ভর দুপুরবেলা সাধারণত রাস্তা-ঘাটে থাকে না কেউ খুব একটা। তথাপি সে চটপট কাজ সমাধা করতে চায়।
তোমার নাম কল্পনা? ওমা, লোকটা দেখি কল্পনাকে চিনে! কল্পনার তো নিশ্চুপ ড্যাবড্যাব তাকিয়ে থাকার উপায় থাকে না। সে মাথা নাড়বে ‘হ’। ইতোমধ্যে ছেলেটি সাইকেল কোমরে ঠেস দিয়ে লুঙ্গির কোচড় থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে ফেলবে। কাগজখান কল্পনার দিকে বাড়িয়ে দিয়েএডে তোমার জেঠিরে নিয়ে দেওগা। কবা, তোমার ভাইজান পাঠাইছে।
কল্পনা ভাঁজ করা কাগজ টুকরো হাতে নেয়। ভাইজানের পাঠানো বার্তা। কী যে হয় কল্পনার! ওর মুঠোভরা হাত, ডানা ভরে উঠে পালকে পালকে! পাতলা হয়ে যায় শরীর! কল্পনা উড়তে শুরুকরে। ও কি আর জানে নাএই রকম একটি বার্তার জন্য আম্মা, জেঠি, আব্বা কতদিন ধরে কী রকম হাঁসফাঁস করছেন। ও আম্মাগো ও জেঠি গো, দ্যাহগো কি! কল্পনা ফুরুৎ করে ঘরে ঢুকে। কেউ নাই! রান্না ঘরে উঁকি দেয়। কেউ নাই। নাহ্, কই যে থাকে না আম্মা, জেঠি! আবার বড় ঘরে এসে মনে পড়ে কল্পনার আরে, জেঠি বোধহয় খানকা ঘরে কাঁথা সেলাই করে। ও জেঠি গো, দ্যাহেন ভাইজানের চিঠি! ভাইজান চিঠি দিছে! হ্যাঁ, জেঠি খানকা ঘরের মেঝেতে বাঁশের চাটাই বিছিয়ে নকশী কাঁথা সেলাই করছেন। তিনি কাঁথা থেকে চোখ তুলে অবাক তাকাবেন কল্পনার মুখে। কি বলে, ভাইজানের চিঠি! তাঁর তো বিশ্বাসই হবে না। এমনকি চিঠি মুঠোয় ধরার পরও না। তবে মুঠোগত হবার পর পরই প্রথমে তাঁর মুখ উজ্জ্বল এবং পরে তিনি বিচলিত বোধ করেন এবং থ’ মেরে বসে থাকেন কিছুক্ষণ! তাঁর বুঝি মনে হয়-কোন এক নরোম উষ্ণ পাখি মুঠোবন্দি! চিপে ধরলে মরে যাবে। আবার আলগা করলে যদি উড়ে যায়! তাহলে কিভাবে ধরবে! তিনি চিঠির ভাঁজ খুলবেন না, হয়ত সাহস হবে না খোলার! বলা যায় না, যদি ভাঁজ কিংবা পালক কিংবা মুঠোবন্ধন খোলামাত্র প্রাণপাখি উড়ে যায়! তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় বসে থাকবেন, নিঃশব্দ, নিস্পন্দ!
কল্পনার আম্মার কানে কল্পনার ডাক পৌঁছলেও কোন সাড়া দেন নি। উপরন্তু রাগ হয়েছিল ধাড়ি মেয়ের চেঁচামেচিতে। পর মুহূর্তেই চেঁচামেচির যথার্থ কারণ বোধগম্য হলে তিনিও উড়তে উড়তে খানকা ঘরে চলে আসেন। কল্পনার দিকে পর পর দুটো প্রশ্ন ছুঁড়েন এক সাথে। ক্যারা দিয়ে গেল? কই পাইলি? কল্পনার উত্তর তো একদম ঠোঁটের উপর তৈরি। ঐ যে সড়কের মুড়িত আমি খাড়ায় আছিলাম, উন্তি এডা বেটা সাইকেল দিয়ে আইলো কইতনে ম্যান, সাইকেল তনে নাইমে কুচতনে চিঠিডে বাইর কইরে জেঠিরে দিবের কইলো।
কল্পনা বাচ্চা কোলে দৌড়িয়েছে। তাছাড়া মানসিক উত্তেজনা তো আছেই। বস্তুত তাই সে হাঁপাবে। বাম কাঁখে ছোট ভাই। কল্পনা বাম পা সামনের দিকে একটু বাড়িয়ে দুই হাতে সে ভাইকে বেষ্টন করে কিঞ্চিৎ ডানে বাঁক নিয়ে জেঠির মুখোমুখি দাঁড়াবে। কল্পনার আম্মা পায়ের পাতায় ভর করে জেঠি বা ভাবীসাবের গা ঘেঁষে বসবেন।
: ভাবীসাব, পুনাই কী লেইখে পাঠাইলো এ্যাল্লা পইড়ে হুনেইন।
ততক্ষণে শেখ আয়াতউল্লাহ ছুটে এসেছেন, কিভাবে যেন গন্ধ পেয়ে। তিনি দরোজার চৌকাঠ ধরে নিঃশব্দে দাঁড়াবেন। আজকাল তিনি খুব একটা বাড়ির সীমানায় থাকেন না, ঘুরে বেড়ান কোথায় কোথায়। তাঁর কৌতূহলী চোখ ঘরের ভিতর, ভাবীর মুখের উপর। ভাবীর শঙ্কা যেন কাটে নি এখনও! তিনি কম্পিত হাতে চিঠির ভাঁজ খুলবেন। তাঁর অন্তর, চোখের পাতা, চিঠি ধরা হাত, সবই কাঁপে। এবং ভাঁজের মাঝ থেকে কালোকালির অক্ষরগুলো উদ্ভাসিত হলে চক্ষু স্থির হয় শুধু। তিনি স্থির নিশ্বাসে পত্র পাঠ শুরু করবেন।
শ্রদ্ধেয় আম্মা,
আমরা ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরেছি সাতদিন। আমি ভালো আছি। কোথাও কোন বিপদ হয় নি তোমাদের দোয়ায়। আমরা ষোলজনের একটি দল এক গ্রামে আশ্রয় নিয়েছি। এখনও সেখানেই অবস্থান করছি, আরও কিছুদিন করতে হতে পারে। কৌশলগত কারণে গ্রামের নাম বলা যাচ্ছে না।
গ্রামের মানুষ আমাদের বুক দিয়ে আগলে রাখছে। কোন সমস্যা হচ্ছে না। এক বুড়ি, তিনকূলে তার কেউ নাইএকমাত্র নাতি ছাড়া। সেই নাতিও আমাদের মত যুদ্ধে নিয়োজিত। বুড়ি আমাদের রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। আমরা তাঁকে দাদি বলে ডাকি। পুঁটি মাছে পুঁই শাক রান্না করেছিলেন গতকাল। খুব স্বাদের তরকারি হয়েছিল। খেতে খেতে আমার চোখ থেকে টুপটুপ পানি ঝরছিল। খাবারটা নোনা হয় নি তবু! হলেও বুঝতে পারি নি! নানা কারণে কয়দিন তো প্রায় খেতেই পাই নি। তাছাড়া এত দরদ করে আমাদের পাতে নিজ হাতে তুলে দিচ্ছিলেন খাবারচোখের জল আটকানো দায় ছিল। তোমার কথা খুব করে মনে পড়ে তখন। ঠিক এভাবেই লাউডাঁটা আর পুঁটি মাছের চচ্চড়ি রান্না করে আমাকে খাওয়াও তুমি। খাবারটা আমার খুব প্রিয়, তাই! আমি দাদিকে তখন আরও একটি প্রিয় খাবার রান্না করতে বলেছিলামশাক ভর্তা। দাদী চোখে আঁচল চেপে ডুকরে উঠেছিলেন। তাঁর নাতিও শাক খুব পছন্দ করে। অথচ খুনি ইয়াহিয়ার শিষ্যরা, জানোয়ারের দল, পাক-হানাদার বাহিনী শাক-সবজির বাগানগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা যে গ্রামে আছি, গ্রাম আর গ্রাম নাই আম্মা, বিরান মাঠ হয়ে গেছে! ঐ ইবলিশের দল সারা গাঁ জ্বালিয়ে গেছে, সারা দেশ জ্বালিয়ে দিচ্ছে! আমার শ্যামলা মায়ের সবুজ আঁচলে আগুন দিয়ে আমারই বোনের পোড়া মাংস ওরা উল্লাস করে খায়! এই জুলুম সৃষ্টিকর্তা যেমন আর সহ্য করবে না, আমরাও রুখে দাঁড়িয়েছি। আমরা দাদিকে বলেছি- আবার সবজির বাগান করতে। আমরা বিরান ভূমি আবার সবুজে ভরিয়ে তুলব।
এখানে পৌঁছার পরই তোমাদের খবর জানার চেষ্টা করছিলাম, আম্মা। যতদূর জানতে পেরেছি, তোমাদের এখনও তেমন কিছু সমস্যা হয় নি। ও গ্রামে হানাদার বাহিনীর পা পড়ে নি আজ অবধি। তবে পড়তে কতক্ষণ! দু’দুটো নদী পেরোনোর ভয়ে হয়তো এতদিন তারা ওমুখো হয় নি। এখনতো নদীর পানি কমে এসেছে। আমার তোমাদের জন্য বেশি দুশ্চিন্তার কারণ অন্য। কাক কাকের মাংস না খেলেও আমাদের দেশের রাজাকাররা নিজের ভায়ের মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে! তোমরা সতর্ক থেকো। আমার জন্যে দুশ্চিন্তা করো না, মন খারাপ করবে না একদম। দেশকে শত্র“মুক্ত করতে যদি আমি শহীদও হই, তবে জেনো সেটা তোমার গর্বের ধন। আম্মাগো, বর্বর পাকসেনা, জল্লাদের দল আমার এই বাঙলা মা’র বুকের উপর বুট পায়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইস্, পাঁজর ভাঙার মুহুর্মুহু আর্তনাদ আমাদের পাগল বানিয়ে দিল। প্রতি ইঞ্চি মাটিতে শয়তানের পায়ের ছাপ দগদগ করছে। আমরা এই মাটি ছুঁয়েই কসম করেছিআমার মায়ের আর একটি পাঁজরও ভাঙতে দিব না। তোমার বুকের উপর বুটজুতা খুরের যে আঘাত চিহ্ন পড়েছে তা আমরা ধুয়ে দিব, প্রয়োজনে বুকের রক্তে। আর কোন বুটজুতাখুর ছাপ পড়বে না এখানে। জান আম্মা, দেশের মাটিতে পা দেওয়া মাত্র মনে হচ্ছেএকদম তোমার পাঁজরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। সারাক্ষণ অনুভব করি তোমার বুকের উম। এবার যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র মুখোমুখি হব। শত্র“র মোকাবিলা করা ও দেশকে মুক্ত স্বাধীন করতে আমরা প্রস্তুত।
বিজয়ীর বেশে যদি আম্মা বাড়ি ফিরতে পারি, তুমি আমাকে শাকভর্তা লাউডাঁটা পুঁটি মাছের চচ্চড়ি দিয়ে ভাত দিও। আমি পেট ভরে খেয়ে তোমার কোলে ঘুমাব। বহুকাল ভরাপেটে শান্তির ঘুম ঘুমাই নি। সেই শান্তিময় ঘুমরাতের জন্য লড়ছি। আমাদের জন্য দোয়া কর। আম্মা তোমার পায়ে সালাম। জয় বাংলা।
ইতি
তোমার ছেলে
খায়রুল
১৯ আগস্ট ১৯৭১
বি.দ্র. ফকিরের বর্তমান অবস্থান আমি ঠিক জানি না। ট্রেনিং শেষে দুইজনকে ভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়েছে। সম্ভবত ভালো আছে। ওকে আমি বলে দিয়েছি, বাড়িতে চিঠি দিতে। ওর খবর না পৌঁছলেও শিগগিরি জানবে। ওর বাকি বন্ধুদেরটাও। চাচা চাচিকে বুঝিয়ে বল, বুঝিয়ে রেখো। কোন অবস্থাতেই ধৈর্যহারা হবে না। জয় আমাদের হবেই।
ভাবীসাবের ঠোঁট কাঁপে, অস্ফুট উচ্চারিত হয়শেষ। অথচ তাঁর ওষ্ঠের কাঁপন থামবে না। চক্ষুদৃষ্টি চিঠির উপর স্থির। চিঠি দুহাতের আঙুলের চিপায় তেমনি খোলা থাকবে চোখের সামনে। আবার পড়বেন তিনি চিঠি? তাঁর হয়তো আবার পড়তে ইচ্ছে করে; বারবার। চোখের পাতা সেভাবেই ফেলে রাখা। চক্ষুপাতার পিছনে যদিও তৈরি হয় গভীর কালো দীঘি। দীঘির উপরস্তরের জলপর্দা কাঁপে তিরতির। অক্ষরবিম্ব ফলত আকৃতি পায় ভাঙাচোরা। বুঝা যায় না কিছুই স্পষ্ট। ঘরের আর শ্রোতারা নীরব। ওদের কোন জিজ্ঞাসা নাই? ভাবীসাব চক্ষুপাতা নাড়ালে কিংবা গলা দিয়ে কোন প্রকার স্বর বের করার চেষ্টা মাত্র হাওয়ার দোলায় দীঘির জল কেঁপে, দীঘির পক্ষে আর সম্ভব থাকবে না জলধারণ। পাড় উপচে গড়িয়ে যাবে বড় বড় জলফোঁটা। আরও জল ব্যয় কি অপচয় হবে না? কিন্তু অন্তত দুই ফোঁটা অশ্র“ এই মুহূর্তেই বিসর্জন দিতে না পারলে অক্ষর-ছবি উদ্ধার করা অসম্ভব। ¯তূপীকৃত কান্না উগলে এসে গলায় আটকে গেলে ভাবীসাবের দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়। এই বুঝি কলিজা ফেটে প্রাণ যায়! ঘরে নিঃশব্দ, নির্বিরোধ স্তব্ধতা বিরাজমান, তা ভাঙলে যদি প্রাণটা বাঁচে।
ভাবীসাবের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নয়, কল্পনার আম্মার গলাতেও কিছু একটা বুঝি আটকে যায়তার নির্গমন প্রয়োজন, অর্থাৎ তাদের দুজনেরই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে কল্পনার আম্মার কণ্ঠস্বর সংক্ষিপ্ত ও খুবই ক্ষীণ স্বর সৃষ্টি করবে। এত বেশি ক্ষীণস্বর যে স্তব্ধতা ভেঙে খান খান করার মত অত বল পাবে না। যদিও নিঃশব্দতা কাঁপে ও বাজে। ‘আর কিছু নাই!…’
কাঁধের সন্নিকটে দীর্ঘশ্বাসের গরম ছোঁয়ায় ভাবীসাবের গা শিরশির করে। উপরে তোলার প্রয়োজন পড়ে তাঁর চোখ। বিষণœ দীঘির জল কি চোক্ষাশ্র“ শেষ রক্ষা হয় না। আঁখিপাতার কাঁপুনিতে টুপ করে দুফোঁটা জল ঝরে বুকের আঁচলে আশ্রয় নেয়। ভাবীসাব যখন সম্পূর্ণভাবে কল্পনার আম্মার চোখে চোখ রাখবেন, তখন তাঁর চোখে দীর্ঘশ্বাসজনিত বাতাস অথবা মধ্য ভাদ্র দুপুরের আর্দ্র হাওয়ার ঝাপ্টা লাগে, দৃষ্টি ঝরঝরা হয়। ঠা-া আরাম দেয়। হালকা ঠেকে। অথচ কল্পনার আম্মার চোখ শুকনো। খরখরে শূন্যদৃষ্টি। মনে হবে গরম ভাঁপ বেরুচ্ছে। ভাবীসাবও চোখের উত্তাপ নিয়ে নিজেও তপ্ত স্থিরতা লাভ করতে চান? নইলে কোন কথা না বলে ওভাবে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকবেন কেন, ধীরস্থির! নিঃশব্দ ভাব বিনিময় ও স্তব্ধতা ভাঙবেন শেখ আয়াতউল্লাহ। পুনাইডেরে কিছু খাবার দিছিলা? কল্পনার আম্মা কিছু বলেন নি ঠিক তবে তাঁর চোখে প্রশ্ন যেন ভাসে ‘কারে খাবার দিমু!’ যা শেখ আয়াতউল্লাহ পলকে পড়তে পারেন। এবং তিনি প্রশ্ন স্বচ্ছ করবেনযাঁই চিঠি দিয়ে গেল তার কতা কই ঘরো ডাক দেও নাই, ববার কও নাই?
যেহেতু কল্পনার আম্মার সাথে সেই লোকের দেখা হয় নাই, সেহেতু প্রশ্ন বর্তায় কল্পনার উপর। ইস্, কল্পনার তো লোকটিকে ঘরে ডেকে আনার কথা মনে আসে নি একদম। আহারে এটা কোন কাজ হলো! তার কাছে নিশ্চয়ই ফকিরের খবর ছিলআফসোস হবে! এখন কী করা যায়? এখনও সেখানে আছে লোকটি? থাকলে তো দরোজা দিয়ে দেখাই যেত। দেখা যাচ্ছেনাই। তবু এগিয়ে দেখা যাক নাকোনদিকে গেল? আশেপাশে যদি পাওয়া যায়। কল্পনা ছোট ভাই কাঁখে দরোজায় বসা বাবাকে ডিঙিয়ে আবার দৌড়ায় আমতলায়। শেখ আয়াতউল্লাহ আবার বলেতুমি দ্যাহ নাই, কই যাওগা এহাবারে? ডাক দিয়ে হুনন-মিলন নাগে না, কইতনে কিবেই আইলো, কবে কহন চিঠি পাঠাইলো কি সুমাচার!
কল্পনার আম্মা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোন প্রতিক্রিয়া দাঁড় করাবেন না। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করবেন সামনের দরোজা দিয়ে।
শেখ আয়াতউল্লাহ দুপায়ের পাতায় ভর করে বসেন। লুঙ্গির কোচড় থেকে একটি বিড়ি বের করেন। মোহিনী বিড়ি। কাছে দেশলাই না থাকায় বিড়িতে আগুন ধরানো যায় না। তিনি উসখুস করবেন। হয়তো কল্পনার আম্মাকে হাঁক দিয়ে একটু আগুন দিয়ে যেতে বলতে চান। শেষপর্যন্ত তিনি কানের চিপায় গুঁজে রাখবেন বিড়ি। ভাবীসাবকে বলেন, ভাবীসাব চিঠি ভাঁজ করায় মগ্নআঙ্গরে গাঁয়েও মুক্তি ঢুকছে ভাবী। অরা ফাইটে ফাইটে থাইহে নানান জায়গায় ঘুরতাছে। টাউনে মেলেটারি কুনো কিবেই কী করে হেই খবর টানতাছে। তাঁর কণ্ঠে উত্তেজনা ভর করলে, সেটাকে প্রশমিত করতে থামাতে হয় কথা।
অতঃপর কথা বলেন ফিসফিসিয়েহেগরে খাবার দাবারের ব্যবস্থাডা করন নাগে ভাবী। কিবেই যে মেয়-মিছিল করমু বুঝতাছিনে।
শেখ আয়াতউল্লাহ উঠোনের দিকে তাকাবেন। কিছুক্ষণ পরে আনমনা হন। অজান্তেই বুকের শ্বাস দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে। আঙ্গরে পুনাইগিল্ল্যেও কই কই ম্যান ঘুরে। কহন, কার বাড়িত আল্লাহ কীবেই রেযিক মাপায়আল্লাহ তোমার খেইল!…
ভাবীসাব কোলের উপর দুটি হাত ফেলে রেখে শান্ত চোখে বাইরের রোদ দেখবেন। এখানে তাঁর কোন মন্তব্য নি®প্রয়োজন। ভাববেন। ভাদ্রের চনমনে রোদ চোখে লাগলে চিকচিক করে চোখ। সেই রোদে ক্রিয়ারত দেখা যায় কল্পনার আম্মাকে। কল্পনার আম্মা উঠোনের পূর্ব দিকটায় মাঝামাঝি পজিশনে গর্ত খুঁড়ায় মগ্ন। একটানা প্রায় এক কোমর গর্ত খুঁড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে দরদর ও নাক দিয়ে ঘনঘন শ্বাস। ঘাম মুছেন আঁচলে। এবং কল্পনাকে ডাকেন। ক্যালো ছেড়ি, এ্যাঠাই আয়। উন্তি আর স্যাঁটা কেলায়ে খাড়য় থাহন নাগব না।
কল্পনা তখনও আমতলায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান থেকে মায়ের কাছে এসে ভাই কাঁখে থাকা অবস্থায় পূর্বচেনা ভঙ্গিতে দাঁড়াবে। এবং কৌতূহল প্রকাশ করবে গর্ত বিষয়ক। আম্মা অবশ্য তদ্সম্পর্কীয় কিছু না বলে বলবেনগ্যান্দারে তর জেঠির কাছে দিয়ে এডা গামলা আর হুচা নিয়ে ভিটেত আহইছেন দেহি।
অতঃপর দেখা যাবে, মা-মেয়ে মিলে পচা মরগোবর ও মাটির চমৎকার মিশ্রণ তৈরি করে, উক্ত মিশ্রণে গর্ত ভরাট করবেন। এবং তার ঠিক পাঁচদিন পর, অপরাহ্নে কল্পনার আম্মা গুনে গুনে সাতটি লাউ বীজ তুলে দেন ভাবীসাবের হাতে। অত্যন্ত বিনয় ও ভক্তিসহযোগে বলেনভাবীসাব, লাউ-এর বিচি কয়ডা আজিবেন, চলেন। আমার হাতের গাছ বালা অয় না। ফল-ফলান্তি কম ধরে।
এবং এক বদনা পানি, পাছুন ও একমুঠো পাটখড়িসহ তাঁরা পূর্ব নির্ধারিত স্থান, তৈরি বীজতলায় আসেন। বসে যাওয়া মাটি নিড়ানি যন্ত্রে আলগা করে অত্যন্ত যতেœ বীজগুলো আকাশমুখো পুঁতে দেন ভাবীসাব।
কল্পনার আম্মা গর্তের চারপাশে একটা একটা করে পাটখড়ি গুঁজে দিয়ে বৃত্তাকার বেড়া তৈরি করেন। এটা নিরাপত্তা বেষ্টনি, যেন চড়–ই পাখি কিংবা অন্যকিছু বীজ, চারাগাছ নষ্ট করতে না পারে। অবশ্য এটা লাউগাছ মাচায় উঠার সোপান হিসেবেও কাজ করবে। হালকা পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেন মাটি। তাঁরা দুজন, কল্পনার আম্মা ও ভাবীসাব, মুখোমুখি দাঁড়াবেন। সূর্যের সোনালি তীর্যক রশ্মি তখন তাদের মুখে চমৎকার আভা দেয়। স্বপ্নবীজ রোপনের সুখ! কল্পনার আম্মা ভাবীসাবকে বলবেন, বলার আবেগ স্বাভাবিক, শীতলজানেন, আমার ফকিরেরে লাউ আর বড় বোয়াল মাছ আইন্দে দিলে আর কিছু নাগব না। পেট ভইরে ভাত খায়ে উঠপ।
সে বড় দারুণ প্রাণদায়িনী
কল্পনা একদমই নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান থেকে জিজ্ঞেস করে, ওর ভাবনায় আদতে আগেপিছে কিছু থাকে না। আম্মা, আবারই এত ভাত চড়াইতাছ ক্যা? প্রশ্ন শুনে আম্মা ক্ষেপতে পারেন, তা ও বুঝতেই পারে নি। মা যদিও স্বভাবত আচমকা রাগেন। অনুমান করা যায় না কখনোই তাঁর সঠিক নার্ভ। কিন্তু মায়ের জবাব শুনে কল্পনার ঠিকই মন খারাপ হয়।
: আমি খামু, আমার পাঁচসেরি গাড়া অইছে না। কম-জমে পেট ভরে না। তাই আবার আন্দি।… আমি ত ই-বাড়ি বান্দী-দাসী অয়ে আইছি, পেটের পুনাইর কাছেও আমার কামের জবাবদিহি করন নাগে।
দেখলা কাণ্ড! ও বুঝি তাই ইঙ্গিত করেছে! যদিও প্রায়দিনই কল্পনাদের বাড়ি রান্নার হিড়িক পড়ে ইদানিং এবং ভাতের হাড়ি, তরকারি-ডালের হাড়ি তুলনায় আগের চেয়ে বড় বৈকি। মা, জেঠি বিপরীতে কম খান, অনেক সময় কিছু খায়-ই না। যা কল্পনা তো নিজ চোখেই দেখে। ‘এ বেলা কিছু খাব না, পেট ফেঁপে আছে কি খিদে নাই!’ জাতীয় কথা বলা তাদের অভ্যাসমত হয়ে যাচ্ছে। তাদের শরীরও কেমন শুকিয়ে কাঠকাঠ হয়ে গেছে না! এইসব বুঝি বেশি বেশি খাবার লক্ষণ। বাড়িতে কামলা নেয়াও কমেছে। তাহলে খাবার যায় কোথায়? প্রকৃত ব্যাপার কল্পনাকে জানালে কী ক্ষতি! তাছাড়া এইভাবে বেশি বেশি রান্না হলে কয়েকদিন পর কল্পনাদের আধপেটা অথবা একবেলা যে না খেয়ে থাকতে হবে না, তা নয়। আর্থিক স্বচ্ছলতার বর্তমান চিত্র বিবেচনার প্রেক্ষিতে ধরে নেয়া যেতে পারে নিশ্চিত থাকতে হবে। কল্পনা যে এইসব সম্ভাবনা ভেবে উদ্বিগ্ন ও উদ্বিগ্নতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে বিষয়টা সেরকমও না। ওটা ছিল নিছক নির্বিরোধী কৌতূহল। একটু আগেই দুপুরের রান্না-খাওয়া দুইই সম্পন্ন হয়েছে। বাবা খেয়ে বের হলেন। রাতের রান্নার তো সময় হয় নি। তা ভেবেই কল্পনাকে কখন, কী এসে বলে মেজাজ খারাপ করে দিয়ে গেছেএখন সেই রাগ ঢালবে কল্পনার উপর! কল্পনার দুচোখ অশ্র“সজল হয়। মা কি বাবা কি যে কেউ ওকে বকলে ভীষণ কান্না পায় ওর। ভ্যাঁ ভ্যাঁ কাঁদতে ইচ্ছে হলেও চেপে চেপে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বাড়ির কেউ যেন শুনতে না পায়। তার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাক, কার কি! কান্নার স্থান নির্ধারিত আছে, বাড়ির কেউ যেন দেখতে না পায়। কল্পনা এখন সেখানে যাবে যদিও একাকীত্বে বিঘœ ঘটেছে। ওর ছোট ভাই, গ্যান্দা, একটু আগেই কাঁখে চেপে বসেছে। উহ্, ন্যাংটো ভাই কাঁখে বইতে বইতে ওর কোমরে চাপড়া ঘা হবার জোগাড়। জলভরা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কল্পনা কী খুঁজে? জেঠিকে বুঝি! ওর হাত-পা মুক্ত হবার প্রয়োজন। খুঁজতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে অবাধ্য এক ফোঁটা জল। জেঠির অবয়ব দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে না। আজকাল জেঠি মায়ের মতই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে খুটখুটে কাজে! যদি থ্যাংনা দিয়ে মাটিতে ফেলা যেত কোমরের বেড়ি। না, কল্পনা করতে পারবে না তা। সে ন্যাংটো ভাই কোলে ওর প্রিয় স্থান রাস্তার পাশে আমতলার উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে। কল্পনা যখন দুই ঘরের গলির মুখে পৌঁছবে তখন ওর মনে পড়বে ভাই তো বাড়ি নাই। আজ আমতলায় বসে সারাদিন কাঁদলেই কে তাকে বাড়ি নিয়ে আসবে কাঁধে তুলে? আগে ওখানে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকলে ভাই স্কুল থেকে ফেরার সময় অথবা কোথা থেকে উড়ে এসে ঠিক ঠিক চোখ মুছে‘এই পাগুনি ক্যারা কী কইছে, কান্দস ক্যা? আইছেন বাড়ি মদ্যে যাই।’ বলেই ঘাড়ে বা পাথাল কোলে ঘরে নিয়ে আসত। কদমা কিংবা বিলাতি দুধ দেওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়ে কান্না থামাত। কিন্তু আজ কোথা থেকে কিভাবে আসবে ভাই! আসবে নাগো আসবে না। আমতলায় গিয়ে তবে কি লাভ! ভাই গোনা, কল্পনা আমতলায় যাবে না। কল্পনা ভায়ের থাকার ঘরের শোলার বেড়ায় হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে। মড়মড় করে শোলার বেড়া। ভাই তার কয় মাস হলো বাড়ি নাইসে কথাই জানায়, সেও। ভায়ের জন্য মা-বাবাকে নিভৃতে কাঁদতে দেখেছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখেছে, হাঁসফাঁস করতে দেখেছে। ওর নিজেরও হঠাৎ হঠাৎ ফাঁকা ফাঁকা লেগেছে ভায়ের ঘর, উঠোন, বুকের ভিতর, সবখানে, সবকিছু। আজকের মত এত বেশি অভাববোধ কিন্তু কখনোই করে নাই। কল্পনার এই মুহূর্তে কেন কান্না পাচ্ছেভায়ের অভাববোধ না মায়ের বকা? কারণ আর স্পষ্ট থাকে না ওর কাছে। কল্পনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে বেড়ায় ঠেস দিয়ে। কোমর জড়িয়ে থাকা ন্যাংটো ভাই, গ্যান্দা তখন ওর গলা জড়িয়ে ধরে। বাম হাতে কল্পনার মুখ খামচায়, মুখ ঘুরিয়ে নিজের দিকে আনার চেষ্টা করে। কল্পনার গালে চুমো খায় গ্যান্দা। আর অস্পষ্ট কথার ইঙ্গিতে কাঁদতে বারণ করে। ছোট্ট ভায়ের কান্না থামাবার প্রচেষ্টা অসম্ভব করে তোলে কল্পনার ঠোঁট চেপে চেপে ফুঁপিয়ে কান্না। অতএব কল্পনা ঠোঁট খুলে হা হবে এবং শব্দ করে কেঁদে উঠবে। ভাই গো, তুমি কই গোগ্যান্দা আর কি করবে! ঠোঁট ভাঙে, এটা তার চিৎকার করে কেঁদে উঠার পূর্বমুহূর্ত। ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত হবেন শেখ আয়াতউল্লাহ। তিনি বাম হাতে কল্পনার হা মুখে চাপা দেন, ডান হাতে গ্যান্দাকে টানেন। দুজনকে একরকম শূন্যে তুলে বাড়ির ভিতর ঢুকেন। কল্পনার কান্না ছুটে যায় ঘটনার আকস্মিকতায়। সে কোনমতে দৌড়ায় বাবার পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে। কল্পনার আম্মা চুলাপাড়ে তখনও ভাত রান্না করছেন। তটস্থ শেখ আয়াতউল্লাহ বলেনউঠো শিগগির, ভাবী কই গেলডাক দেও, বাড়িত তনে পলাও তাত্তাড়িমেলেটারি আইছে। শেখ আয়াতউল্লাহর সন্ত্রস্ততা দেখে, মেলেটারির কথা শুনে, ভ্যাবাচেকা খায় কল্পনার আম্মা। দাঁড়িয়ে থাকে আড়ষ্ট! উত্তর দিক হতে বালতি হাতে আসেন ভাবীসাব। তিনি বালতি ছুঁড়ে কল্পনার আম্মার হাত ধরেন এবং তাকে টানতে টানতে অনুসরণ করেন শেখ আয়াতউল্লাহর পথ। শেখ আয়াতউল্লাহর বাড়ির পশ্চিমপাশে নানান জাতের লতাগাছ, পানিছিটকি গাছের জঙ্গলে ঢাকা ডোবা। ডোবার পাড় দিয়ে অস্পষ্ট পথরেখা। সেখানে উপস্থিত হলে দেখা যাবে; বড়বাড়ির মানুষ ছুটছে পশ্চিমপাড়া বড় জঙ্গলের দিকে। স্বাভাবিক দিনে ওমুখো হবার বুকের পাটা এই গাঁয়ে কারও নাই বললেই চলে, ব্যতিক্রম দুএকজনের কথা আলাদা। সেখানে সাপ-পোকা-মাকড়ের জ্বালায় পা ফেলা দায়। এমনকি কথা আছে মানুষ খেকো প্রাণির আবাসিকতা নিয়েও। তথাপি এমন সময় যখন হানাদার বাহিনী পেছনে তখন সাপ-পোকা-মাকড়ের জঙ্গল ছাড়া নিরাপদ স্থান আর কোথায়!
শেখ আয়াতউল্লাহ সেদিকেই ছুটছিল পরিবার নিয়ে। অথবা গন্তব্যস্থল তখনও ঠিক করে উঠতে পারে নি সে। ঝোঁকের বশে ছুটছিল। তিনি ডোবার পাড়ে দাঁড়িয়ে ছুটন্ত মানুষদের দেখবেন ও এক মুহূর্ত ভাববেন। এবং বাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়াবেন। বুঝা যায়, তিনি সবার মত ভাবনাহীন জঙ্গলপানে ছুটতে নারাজ। তার সাথে যেহেতু শিশু আছে, তাই ভয়ানক জঙ্গলে পলায়ন কতটা সমীচীন ভাবেন। অথবা নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালানো কাপুরুষোচিত বিবেচনা করেন, আরে তিনি তো সাহসী মুক্তিযোদ্ধার বাপ। তবে তিনি ঘর পর্যন্ত ফিরে যাবেন না। মাপা নয় কদম পূর্বদিকে হাঁটলে যে পানিছিটকির ঝোঁপ, সেখানে কয়টি ডাল শূন্যে তুলে ধরেন। ডালের তলে আবিষ্কৃত হয় এক গুহামুখ। গুহামুখ ধরে একে একে প্রবেশ করবেন ভাবীসাব, কল্পনা, কল্পনার আম্মা ও কোলের শিশু এবং শেষে শেখ আয়াতউল্লাহ নিজে ঢুকে ডালগুলো গুহামুখে ছেড়ে দেন। এই গুহা শেখ আয়াতউল্লাহ তৈরি করেছেন প্রায় মাসখানেক হলো, যে সময় তিনি লাউগাছের মাচা বানিয়েছেন। গুহায় বাহ্যত মানুষ ঢুকে পাঁচ অথচ ভিতরে মানুষ সংখ্যা হয় এগার। অর্থাৎ সেখানে আগে থেকেই ছয়জন ছিল। ওরা সবাই যুবক। কল্পনা এদের কাউকেই জানে না। ওর চোখ যদিও আঁধারে কতগুলো আবছায়া ছাড়া দেখে না মনুষ্যবৎ কিছু। আবছায়ার এক  শেখ আয়াতউল্লাহর সাথে বিচলিত কথা বলে: চাচামিয়া মানুষের এত ছোটাছুটি, পাক বাহিনী গ্রাম আক্রমণ করেছে?
: বাবাজী আমিও আগে কিছু ঠাওর পাই নাই। আপনের চাচীরে ভাত চড়াবার কয়ে বাডিগে গেছি, যায়েই দেহি মাঝিপাড়ার ইদ্রিস। ইদ্রিস শালা রাজাকার অইছে আমি জানি ত। শালা হারামখোর আমার কাছে পানি চাইলো। আমি সড়কের পুবমুহি চায়ে দেহি, আর্মি-মেলেটারি ঝাঁক বাইন্দে আয়তাছে।
: চাচা, আমরা এখানে আছি, আপনে আমাদের রেখেছেন, কেউ আবার ওদের ইনফর্ম করে নি তো? অন্য আবছায়া প্রশ্ন করে ও আবছায়াগুলো শিনা টানটান করে, চেষ্টা করে চঞ্চলতা দূর করার। শেখ আয়াতউল্লাহ ঘনচোখে টানটান উত্তেজিত শিনাগুলো দেখে, শান্ত-দৃঢ় কণ্ঠে তাদের ভরসা দেন।
: বাবাজীরে, চিন্তে কইরেন না। আমি এহনও বাঁইচে আছি, মরি নাই। আমার জান থাকতে আমার বাড়িত আমার মেহমানের কোন ক্ষতি অবো না। বাপের সামনে পোলার ক্ষতি করব এবাহা বুকের পাটা কোন জল্লাদের!  শেখ আয়াতউল্লাহ পায়ের পাতায় ভর রেখে গুহামুখে পিঠ চাপা দিয়ে আটসাঁট বসেন আবছায়াগুলির মুখোমুখি। এবার অনুমান করা যায়, শেখ আয়াতউল্লাহর ভরসা দেবার দৃঢ়তা থেকেতিনি ডোবাপাড়ে কী ভেবেছিলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজে নিরাপদ হতে চান নি তার বাড়ির আঙ্গিনায় অরক্ষিত ছয়জন মানুষ রেখে। কল্পনার আম্মা গুহার একপাশে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে ভালোভাবে পিঠ-মাথা ঢাকেন। এবং কোলের বাচ্চার মুখে মাই পুরে দেন। যেন অনাহুত কেঁদে বিপদ ডেকে আনতে না পারে। মায়ের পাশে দাঁড়ানো ভাবীসাবের কোমর জড়িয়ে আছে কল্পনা। কল্পনার চোখের সামনে পাতলা আঁধারে আবছায়াগুলো মানুষের কিংবা ভায়ের আকৃতি পেতে শুরু করবে। ‘চোখের সামনে এ কার হাত ঝুলে? আঙুলগুলো ঠিক ভায়ের আঙুলের মত মিহি, লম্বা। এই আঙুল ধরে ও কত হেঁটেছে সরিষার ফুল দেখতে গিয়ে, নানীর বাড়ি যাবার সময়। পায়ে ক্লান্তি এলে আঙুল ধরে ঝুল দাও। ব্যাস, আর হাঁটতে হবে না। পালকি হবে ভায়ের কাঁধ। এই হাতের তালু দিয়েই তো ভাই কল্পনার চোখের জল মুছে গালে গড়িয়ে পড়ার আগেই। একটু ফাঁকে উঁচুতে ঘাড়ের আভাস। খাঁটো মোটা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে আছে কুঁকড়ানো চুল। কল্পনা কাঁধে উঠলে তো ঘাড়ের চুলই ওকে ভারসাম্য রাখতে সহায়তা দেয়। ইস্, কতদিন ভায়ের তুলতুলে কাঁধে চাপা হয় নাই। ভাই কাঁধে নিবে না ওকে এখন! একটু আগেই না ও ভায়ের জন্য কত কেঁদেছে। গালে জলের দাগ অবিকল আছে। মুছে দেয় নি কেউ! ভাই তো দেখছে না! তবে একবার ডাকুক কল্পনাভাই! আহ্, মাথার ভিতর দুম দুম করে কেন! কি হলো! শব্দ কিসের! ভায়ের আঙুল ধরে ঝুল দেব। তবে যদি ভাই কাঁধে নেয়। আহারে, ইস্, ভাঙা আঙুল যে! আঙুল তো ভাঙা ছিল না ভায়ের! তবে এটা কে, কার আঙুল! নখ বড় হয়ে গেছে। কতদিন কাটা হয় নি কে জানে! ভাই না নিয়মিত নখ কাটত, কল্পনাকে কেটে দিত। ইস্, উহ্, মাথার মধ্যে এত শব্দ কেন? এত শব্দ কেন! মাথার উপর আকাশ ভেঙে না মাটি ভেঙে পড়ে বুজি! কল্পনার ভয় করে। জেঠিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কল্পনা। কল্পনাকে এবার দেখেছে ভাই। ঐতো ভাই তাকিয়ে আছে। ওমা, রেগে কেন? জ্বলে কেন ভায়ের চোখ? এমন রাগী জ্বলন্ত চোখ তো কখনো দেখে নাই কল্পনা। ভাঙা আঙুল ধরে ঝুল দিয়েছিল, তাই বুঝি এত রাগ হয়েছে। সে কি জানে যে তোমার আঙুল ভেঙেছে। তা কীভাবে ভাঙল গো অত সুন্দর আঙুল! দাঁড়াও জলপট্টি করে দিলে আরাম লাগবে। ওমা, সে কি! তোমার আঙুল আবার এত শক্ত হয়ে গেল কী করে! বাবারে বাবা, টেনে তো সোজাই করা যাচ্ছে না! ইস্, কি শক্ত! কেমন খসখসে! ভাই তোমার হাত বেটা মানুষের মত হয়ে উঠেছে। তোমার নরোম তুলতুলে গদির মত কাঁধেরও বুঝি একই অবস্থা। বসো না একটু চড়ে দেখি। আল্লাহরে আল্লাহ, তোমার কনুইতে এত কিসের দাগ।’ ধোঁয়ায় কল্পনার দম বন্ধ হয়ে আসবে, চোখ জ্বলবে, হারিয়ে যাবে ভায়ের অঙ্গাবয়ব। ধোঁয়ার ভিতর সত্য হয়, চেনাচেনা লাগা, ছায়াছায়া মানুষগুলো। পোড়া গন্ধ ও ধোঁয়া শেখ আয়াতউল্লাহকে অস্থির করবে। বাবাজীরে আপনেরা কেউ বাইরে বারাবেন না। মেলেটারিরে মুন অয় বাড়িত আগুন নাগায় দিছে। আমি দেহি আগে।
শেখ আয়াতউল্লাহ বেরিয়ে পড়লে বারণ সত্ত্বেও গুহার ভিতরে কেউ-ই থাকে না। ক্ষীপ্র গতিতে বেরিয়ে আসে। দখলদার বাহিনীর বুটের শব্দ মিলায়ে গেছে। তবে চিহ্ন রেখে গেছে। ঘরে আগুন দেয় নি। চুলার আগুন হাওয়ার কাতুকুতু ও প্ররোচনায় স্বতঃপ্রণোদিত জিভ প্রসারিত করে। অথবা হানাদার বাহিনী চুলার উপর ভাতের হাড়ি ভেঙে দেওয়ায় হয়ে আসা ভাত ও ভাতের মাড় চুলায় অগ্নির মৃত্যু নিশ্চিত করতে মরিয়া ছিল। অবশেষে জান বাঁচানোর তাগিদে বাইরে এসে আগুন প্রথমে স্তূপীকৃত শুকনো পাতা গিলে খায়। পরে জিহ্বা দিয়ে খড়িঘরের বেড়া চাটতে শুরু করে। বেড়ার সাথে লাগানো তুসের ডোল থাকায় ধোঁয়ার সৃষ্টি। শেখ আয়াতউল্লাহ যুবকদের সহায়তায় প্রায় নিঃশব্দে ও দক্ষতার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। শেখ আয়াতউল্লাহর থাকার ঘরেও দখলদার বাহিনী ঢুকেছিল। ঘরে মাচার বেড়া টেনে মেঝেয় ফেলে বুট দিয়ে মাড়িয়েছে। মাথার উপর শিলিঙে বন্দুকের নল দিয়ে খ^ুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঝাঁঝরা করেছে। হয়তো ভেবেছে ওখানে মুক্তিফৌজ লুকায়িত। যুবকদের একজন ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইলে থামিয়ে দেন শেখ আয়াতউল্লাহ।
: বাবাজীরে, আপনেরা আর বাইরে থাইহেন না। মেলেটারি গেছে গা। মানুষজুন আয়ে আপনেগরে দেইহে ফালাইলে আবারকোন ঝামেলার দরকার নাই। আপনেরা যান, আমি ইদিহি সামলাইতাছি।
কল্পনার আম্মা চুলার পাড় থেকে আদেশ আকারে অনুরোধ জানানবাবারা, আগেই কিন্তুক কুনোমুহি নিরুদ্দেশ অবার পাবেন না, কইলাম। আল্লাহই মাপাইলে আমি দুইডে ডাইল ভাত আন্দিতাছি, যিন্তিই যানদুইডে খাবার না খায়ে  যাবার পাবেন না, কইলাম। কল্পনাকে নির্দেশ দেন চুলার মাঝে পড়ে থাকা না ভাত না চাল তুলে ভালো পানিতে ধুয়ে, আগুন জ্বালাতে। কল্পনার আম্মা ভাবীসাবের হাত ধরে গিয়ে দাঁড়ান লিচুতলায়। সেখানে পড়া আছে তিনটি মৃতদেহ। দুইটি ছাগ-শিশু ও তাদের মাতা। সেখানে আরও এক প্রাণি ছিল ফকিরের প্রিয় খাসী। ওটি নেই। খানসেনারা হয়তো ধরে নিয়ে গেছে ভূরিভোজনের জন্য। অথচ বাকি তিনকে নিয়ে যায় নি, বাঁচিয়েও রাখে নি। হত্যা করেছে। কেন? হবে কি যখন ওদের দল থেকে খাসীকে খুলে নিচ্ছিল, মাতা ছাগ তার প্রতিবাদ জানিয়েছিল? জল্লাদ বাহিনী প্রতিবাদ সহ্য করে নি। উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে। অথবা, এমনও হতে পারেমাতা ছাগের ওলান শয়তানের মনে পাপ বাসনা জাগিয়েছিল। মাতা ছাগের টসটসে সোনালি রঙের ওলান। নিচের দিকে ঝুলে থাকত শবরী কলার মত দুটি দুধের বাট। সব সময় টানটান, দুধে টইটুম্বুর যেন ফেটে পড়বে টোকা দিলে। শয়তানি বাসনা চরিতার্থ করতে উন্মত্ত পিশাচ মাতার মাতৃদ্বারে ঢুকিয়েছে আস্ত কঞ্চি। পিশাচ এত অল্পে পৈশাচিক আনন্দ পায় না। ওলানে পর পর দুটি গুলি করে মাতার মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার আনন্দ পূর্ণতা পায়। মাতার অপমান নিশ্চিয়ই সন্তান সহ্য করবে না। ছাগশিশুও বোধকরি ব্যতিক্রম ছিল না এই নিয়মের। তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে, গলার ক্ষুদ্র ও সংক্ষিপ্ত স্বর সম্ভব উঁচু ও বড় করে, পিশাচের হাঁটুতে তাল ঠুকেছিল মাথা দিয়ে, সর্বশক্তি প্রয়োগে। বর্বর পিশাচ ছাগ-শিশুদ্বয়ের মাথা বরাবর গুলি ছুঁড়ে নিশ্চিত করে মৃত্যু।
তিনটি দেহ লুটিয়ে আছে প্রাণহীন। তাদের দেহ চুঁয়ে পড়া রক্ত মাটি ভিজিয়ে জমা হয়েছে ভূ-ত্বকের উপর। সমস্ত রক্ত শুষে নেওয়া ভূমির পক্ষে সম্ভব হয় নি। সঞ্চিত রক্ত রোদে শুকিয়ে কড়কড়ে হয় নি। চাকা চাকা হয়েছে বাতাস আর্দ্রতা শুষে নেওয়ায়। বাতাসে উড়ে রক্ত বারুদ? কল্পনার আম্মা ছেলেকে হস্তান্তর করেন ভাবীসাবের কাছে নীরবে। এবং মাতৃছাগের মাতৃদ্বার থেকে টেনে বের করেন কঞ্চি। রক্তে মাখামাখি কঞ্চি দেখেন পলকহীন। হাত বুলান ছাগশিশুদ্বয়ের ফুটো মাথায়। তারপর কঞ্চি হাতে এসে দাঁড়ান একটু দক্ষিণে লাউগাছের সামনে। লাউগাছের পাতাগুলো সব নুয়ে আছে লজ্জায়। মাচার উপর ছড়িয়ে থাকা ডগাগুলো পড়ে আছে শরীর ছেড়ে। লাউগাছ পাতার লজ্জা কেন? কারণ অনুমান করা যায় গাছের গোড়ায় তাকালে। গোড়ায় অল্প পানি জমা। ঝাঁঝালো গন্ধ জানান দেয়, ও পানি নয় প্রস্রাব। গোড়ার দিকে তিনটা পাতায় পেশাবের ছিটা লেগে আছে এখনও। বেজন্মা, বেশরম, জানোয়ারগুলো যুবতী গাছের সামনে দাঁড়িয়ে লিঙ্গ বের করে পেশাব ছুঁড়েছে সবুজ পাতায়, সবুজ অঙ্গে। গাছ লজ্জায় নুয়ে যাবে না তো কি! মাচার উপরের অংশ যে অবশ তার কারণ আরও আছে। ইবলিশগুলো সম্ভবত হাতের টিপ কত সূক্ষ্ম তা পরখ করতে নয়তো হাত নিশপিশ করছিল নতুবা টগবগে সবুজ প্রাণ তাদের অসহ্য কিংবা ভয় উদ্রেককারী, তাই গুলি ছুঁড়েছে লাউগাছের মাজা বরাবর। গুলি ডগার কোন গিঁটে লাগে নি, তবে তো ভেঙেই যেত। লেগেছে দুই গিঁটের মাঝে। ফলত ডাটা থেঁতলে বেরিয়ে গেছে পিছনে এক পাতার বুক ফুঁড়ে। এখন লাউগাছ বেঁচে থাকবে তো? গোড়ায় জমানো মুত যদি পঁচিয়ে দেয় গাছটাই! কল্পনার আম্মা সমস্ত নিরীক্ষণ করে, এক বালতি পানি আনতে আদেশ করবেন কল্পনাকে ডেকে। কল্পনার আম্মা আনিয়ে নেওয়া পানিতে ধুয়ে ভাসিয়ে দেন পাতায় লেগে থাকা পেশাবের দাগ, গোড়ার জমা প্রস্রাব, সব বিষ। খড়ের গাদার কাছ থেকে সংগৃহীত কাঁচা গোবর ও ছেঁড়া আঁচল সহযোগে পট্টি বেঁধে দেন লাউডগার থ্যাঁতলানো অংশে। এতসব আয়োজন দেখে মৃদু সন্দেহ প্রকাশ করবেন ভাবীসাব। গাছটা কি আর বাঁচবে এত ধকলের পর। খালি খালি কষ্ট। কল্পনার আম্মার কোন প্রতিক্রিয়া বুঝা যাবে না। কাজ অব্যাহত রাখবেন মাথা গুঁজে। ছাগমাতার মাতৃদ্বার হতে উদ্ধারকৃত কঞ্চি গাছের গোড়ায় পুঁতে, লতার সাথে জড়িয়ে দেন রক্তসহ অবিকল। আরও এক কাজ করবেন। ছাগলের দেহ চুঁয়ে পড়া রক্ত, রক্তভেজা মাটি তুলে এনে ফেলেন গাছের গোড়ায়। এবং ভাবীর উদ্দেশ্যে বলেন, বলায় আত্মবিশ্বাস আছে, সংকল্প আছে, দৃঢ়তা আছে  দেইহেন, এই অক্ত-মাটিই গাছেরে বর্তাবো। অক্ত এ্যাল্ল্যা কইঞ্চে বায়েই আবার জাংলা ছায়ে নিব। কল্পনার আম্মা ভাবীসাবের চোখে চোখ রাখেন। পুনাই গাছ আজিবের কইছে, হেই গাছ আজিছি আমি। আইজ এই গাছ মরলে আমি আর গাছ তুলবের পামু! এতই সুজা গাছ মরবের দিমু মুন করছেন। এর শ্যাষ আমি দেইহে ছাড়মু না।
ভাবীসাবের চোখের পাতা, চোখের ভ্রƒ যেন পুড়ে যায়। কল্পনার আম্মার চোখ আর চোখ নাইগনগনে চুলা, গরম ভাঁপ দিচ্ছে। ভাবীসাব বুঝতেই পারেন নিও চোখে এত আগুন কখন এলো! আর তখন সুরুর মা কি ৩৭ বছর আগেকার কিশোরি কল্পনার চোখের পাতা পিটপিট করবে। আগুনের আঁচে আজকের ৪৮ বছরের কল্পনার শীতল চোখ উষ্ণ আরাম পায় অথবা আগুনের আঁচে নয় ফেলে যাওয়া বর্তমান সময়ের কোন প্রতিবন্ধকতায় তাঁর দৃষ্টি কাঁপে, পথ হারায়। যার অর্থ আমরা চক্ষুদৃষ্টি বা ওয়ার্মহোলের ভিতর দিয়ে যে অতীতে অবস্থান করছিলাম সেখান থেকে ছিটকে বর্তমানে নিপতিত হওয়া। বর্তমানে ফিরে এলে আমরা শুনব: ওপাশ থেকে ভেসে আসবে মিল্লাত উদ্দিনের গোঙড়ানি: উঁ… উঁ… ক্যারে কই গেলি… এবং দেখব শ্যামা মাকে আস্তে ঠেলছে আর বলছেআম্মা, হুন নাআব্বা ডাকতাছে। অন্য সময় হলে শ্যামা ও সুরুর মা, মিল্লাত উদ্দিনের ডাকে সাড়া দিতে উঠে চলে যেতেন ত্রস্থ। আজ, এখন, তেমন হয় না। ধীরে-সুস্থে উঠে মা শ্যামার গায়ে ভালোভাবে লেপ জড়িয়ে দেন। শ্যামা টানটান শুয়েছে। তবু কি জানি কেন মুহূর্তের আনমনায়, কিছুটা বে-খেয়ালে আঁচল ঠিক করতে যান মা। ভুলটা তখনই হয়। এতক্ষণ ধরে আন্ধারে হাতড়ে বরই খুঁজে পেতে সুরু মায়ের আঁচলে জমা করছিল। বে-খেয়ালে মা আঁচল টানতেই এক এক করে সবগুলো ফল আবার মাটিতে পতিত হয়। পতিত ফল একস্থানে থাকে না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। যদিও তিনি দ্রুত আঁচল স্থির করেছিলেন। ঘরে এখনও ভোরের আলো স্পষ্ট হয় নাই। বাইরে হিম-কুয়াশা অবিচল। দুঃখিত হন মা নিজ অসাবধানতায় এবং বিচলিত। ‘আহারে…দেখলি কী কাম করলাম।’ আমরা ভাবব, এই বুজি সুরু রেগে-মেগে কান্না জুড়বে। অথচ দেখ সুরু কাঁদে না, রাগেও না। মাকে মৃদু ভর্ৎসনা করে: তুমি না, কত কষ্ট কইরে বরইগিল্ল্যে জড়ো করলাম!
এবং সুরু ফল পেতে অনুসন্ধিৎসু হয় আবার…

পৌষ ১৪১৪

প্রহরে প্রহরে গল্প

রাতের নির্জন পথের ’পর জোছনা একা। এবং একদম একা! বয়ে যায় জোছনা নদী, ওরই আঁকা গতিপথ ধরেআঁকাবাঁকা। কোন শান্ত নির্জন গাঁয়ের লক্ষ্যে অথবা অন্ধকার সাগরে? অস্থির চিত্তটা নিয়ে যেন অর্থহীন ছুটে চলা মরীচিকার পিছে। অতঃপর নিভে যাওয়া কিংবা গতিহারা শুকনো চরের বুকে!
চলার জন্যই যেন এই অবিরাম পথ চলার প্রেম; নয়তো চলার কোন বিকল্প নাই তাই! জোছনা চলে পুরান রাস্তা ধরে কোন এক ঐতিহ্যের কাছে, ঐতিহ্যের দাবি নিয়ে, দাবি পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে। স্বপ্নহারা স্বপ্নের বেদনায় ডুবেডুবে অবশেষে জোছনা বেরিয়ে আসে মফঃস্বল শহর হতে?
আকাশে নবমী চাঁদ একা, তার নিচে ধরণী, ধরণীর বুক চিড়ে বয়ে চলে নদী. নদীর উপর ইস্পাত সেতুএপাড় ওপাড়ের মেলবন্ধকতার উপর এসে জোছনা টাল খায়। পেডেলের পর পেডেল ঘুরিয়ে উঁচু ঠেলে উঠার পর সাইকেল আরোহী যেমন হাঁপায় জোছনা তেমনি হাঁপায়। জোছনার ক্লান্ত চোখ চাঁদের আলোয় বয়ে চলা নদীর জলে দেখে ছুরির পাতে বিচ্ছুরিত তেজের উঁকিঝুঁকিরূপালি জোছনার মাঝে জেগে আছে নদীর কিনার, পানির ধারে জ্বলন্ত হারিকেনের গোধূলিরাঙা আলোয় অপেক্ষমাণ শিকারির ধূর্ত চোখ। জোছনার চোখ ভাষা খোঁজে শিকারির চোখে, খুঁজে বুলেটের গতিপথ কিংবা রক্তনদীর বুকে ভাসমান অভ্যস্ত মৃত শরীর। কোনকিছু মালুম হয় না! জোছনার মনে জাগে দ্বিধাইস্পাত সেতু পার হওয়া না হওয়া নিয়ে। এখন কী করবে, সেতু গড়িয়ে চলে যাবে ঐ পাড়? যেখানে হেমন্তের প্রথম কুয়াশার হাতছানি! হালকা শিশিরের আদর আর তাপ বিকিরণের পর ইস্পাত সেতু হিম। হিমপথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে আরও ১০৮ ফুট, তারপর কুয়াশা ঘেরা প্রান্তর। কী আছে ঐ প্রান্তরে? সুখ-সমৃদ্ধি-শান্তি-ছায়া অথবা আরও অন্যকিছু! কী সেই অন্যকিছু? সেতু দিয়ে কী গড়িয়ে যায়-আসে এপাড়-ওপাড়? মানুষ, সময়, উন্নয়ন, আধুনিকতা, আর, আর…?
সেতুর নিচে ধাবমান রক্তজল অথবা জোছনা গলা পুঁজের নদী? সেতো সীমারেখা বিভেদের। জোছনা এই স্পষ্ট বিভেদ অস্বীকার করে এগিয়ে যাবে ঐ পাড়? কীভাবে! সেতুপথ ধরে? সেতু! সেতুর অপর নাম সমঝোতা। সমঝোতা! কার সাথে কার? সময়ের সাথে সময়ের; ইতিহাসের সাথে ইতিহাসের; মনের সাথে মানুষের; নয়তো… নয়তো? জোছনা সমঝোতার হেতু পায় না নদী আর সেতুর সাথে। পায় নি বুঝি নদীও! তাই নদী সেতুর নিচে এত বেপরোয়া? বেপরোয়া নদী সেতুর সিনার নিচে করেছে দও। আর দওয়ের কিনারে অস্ত্রহাতে অপেক্ষমাণ শিকারি ও শিকারির নিদ্রাহীন লালচোখ। জোছনার এইখানে থমকে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়। ওর মনের দ্বিধা সরে না। ও কাউকে অস্বীকার করে আপন নিয়মে চলার উৎসাহ পায় না। খুঁজে পায় না সমঝোতার কোন পথ অথবা আশ্রয়!
জোছনা নিজেই নিজের কাছে আশ্রয়হীন এখন! এই আশ্রয়হীনতা আজ জোছনাকে টেনে এনেছে পথে। যদিও ভাবখানা এইপথ চলাতেই আমার অবিরাম প্রেমের স্বপ্ন! ছাই স্বপ্ন! ভণিতা বাদ দিয়ে বললে কথা দাঁড়ায় জোছনা শহর থেকে পথে নেমেছে। ওর পথ চলার বর্তমান গতি গ্রামাভিমুখে। ‘চলো গ্রামে ফিরে যাই ’; ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে’;‘ গ্রামের উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন হবে নাআগে গ্রাম উন্নয়ন করতে হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি আপ্ত-মুখস্থ-তত্ত্ব-নীতিবাক্য আছে নাএইসব কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে বা ওসব লক্ষ্য সামনে নিয়ে গ্রামাভিমুখী হয় নি জোছনা। জোছনা এই পথ ধরেছে কোন পথ না পেয়ে, শেষাবধি কোন উপায় পায় নি বলে। সোজাসাপ্টা কথায় শহর থেকে বিতাড়ন জোছনার অনিবার্য নিয়তি!
শহর মফঃস্বল। তাতে কী! এমন একটু স্থান নাই যেখানে জোছনা গা এলিয়ে দিতে পারে। জোছনাকে আশ্রয়হীন করার আয়োজন ওই ছোট্ট শহরটিতেও কম নয়! ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে টিউব লাইটঅত ঢঙের বাতিগুলোর নাম জানা না জানায় কী এসে যায়মোটকথা হলো বিভিন্ন প্রকারের বৈদ্যুতিক বাতির আনাগোনায় অস্থির শহর। নিদেনপক্ষে যেখানে আর কোন বাতি না আছে সেখানে ল্যাম্পপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে টিমটিমে হলুদ আলো নিয়ে! মানুষের চোখ খারাপ করতে বড় ওস্তাদ ও আলো। ওমা, বিদ্যুৎ নাই তো কিতখন কান ফাটানো ও অকেজো আলোর জাল ছড়ানো দুটোই চলে একসাথে ডায়নামোয় কি জেনারেটরে।
এতসব বলিহারি আয়োজনের ভিতর জোছনার প্রয়োজন কই? প্রয়োজন নাই। জোছনার আশ্রয়ের ব্যবস্থাও  তাই আর হয় না। প্রশ্ন জাগে, জোছনা এতদিন তবে শহরে ছিল কীভাবে? শহরে দুই একটা কানাগলির অভাব হয় কখনো! তেমনি কিছু অন্ধকার গলিতে জোছনা দেহ টুকরো করে, গুটি বানিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিল নিজেকে। দিনরাত কোনটাই থামে না। দিব্যি সব ঠিকমত চলে। নাইবা পারা গেল গতর টান করে শোয়া অথবা দেহটা জমিনের উপর নিরবচ্ছিন্নভাবে বিছিয়ে দেয়া! থাকাতো যায় নাকি? অত আরামের দরকার আছে! আসলে সমস্যা হলো…
না বাবা, এইসব যত সোজাসুজি কম কথায় বলা যায় ততই মঙ্গল। বেশি টালবাহানা না করাই ভালো। টালবাহানার আর আছেই বা কী এমন? জোছনা যে সমস্যায় ভীত হয়েছে তা অতি সাধারণ ঘটনা। অন্তত এই সময় বিবেচনায়! সবারই জানা ঘটনা, চমক বলে কিছু নাই। বলার পর মনে হবে এ আর নতুন কী! কিন্তু জোছনা সইতে পারল না! কীভাবে পারা যায়? একেবারে নিজের শরীরের উপর ঘটা ব্যাপার যে! একটা প্রাণ যত নিরীহই হোক, কেউ যদি ড্রেন থেকে পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত কাদা নিয়ে দেহে জমা করতে শুরু করেতখন কেমন লাগবে? আচ্ছা রাগ লাগবে না! অপমান? তাই কি লাগে না! কিন্তু যদি প্রতিহত নিদেনে প্রতিবাদটুকুও জানাবার ক্ষমতা বা উপায় না থাকে, তখন কী করা যাবে? গায়ের উপর ডাস্টবিন হতে দেওয়া চলে বুঝি! তো, যেভাবে পারা যায় সেখান থেকে ছুটে পালানো ছাড়া আর গত্যন্তর কী! জোছনার ক্ষেত্রে ঘটনা বেশ ভয়াবহ, অনেক বেশি নোংরা, আরও বেশি কুৎসিত, তারচেয়েও ততোধিক দুর্গন্ধময়! ঘটনা যত কান সহা হয়ে উঠুক না কেন; তবু!
একদিন, ধ্যাত ছাইদিন নয়, এক রাতসেই রাতে জোছনার শরীর ততটা ফর্সা হয় নাই; যতটা ফর্সা হলে বলা হয় কাকজোছনা। সেইরকম সাদা আলো ঝরে নাই অথচ নেমে আসে সাতটি কাক! লাগে ধন্দ, সত্যি কাক নাকি? ভোরের শরীর ভেবে ভুল করার মত আলো যদি না হয় তবে কাকের পা কীভাবে জোছনায় ডোবে! তথাপি এখানে কোন ভুল নাই যে, কাকের মতই কুচকুচে কালো সাত দুগুণে চৌদ্দটি পা নিশ্চিত কাকের পা শক্ত, কঠিন, নির্মমদাঁড়ায়। ভোঁ… করে এসে দাঁড়ায় বুঝিবা মূর্তিমান যম কি বিভীষিকা, হাতে নিয়ে চাঁদনী মায়ায় মুড়ানো কাফন! জোছনার চোখের সামনে মায়াবী পর্দার সাদা ঘোর আটকে থাকে। আর কালো দেহ ছুঁয়ে জোছনা অনুভব করতে চায়ও কী! মানব না কাক না যম? উত্তর আবিষ্কৃত হতে না হতেই আরও এক পা বড় অসহায় স্পর্শ করে এবং আরও এক! পরিচিত ছোঁয়া অথচ যেন পরিচিত নয় এমন দুর্বল আর অসহায় আর আশঙ্কায় থরোথরো! স্পর্শানুভূতি বলে শেষোক্ত পাদ্বয় কসাই গোত্রের কারওএকদা, মাশাল্লাহ উদ্যত ছিল বড়। এই যাহ, ওদের কথা তো বলা হয় নি এখনো! জোছনার আবাসস্থল, বোধকরি সঙ্গত নয় এই প্রত্যয়আশ্রয়স্থল যে গলি, সেখানে কিছু প্রাণের আনাগোনা শুরু হয় সহসা। প্রাণ বলতে মানুষের প্রাণের কথাই বলা হচ্ছে। দেখতে মানুষের মত দুইপেয়ে জানোয়ার যেহেতু! আনাগোনা উৎরে উঠে যায় উৎপাতে। মানুষের মধ্যে এক প্রকার মানুষ আছে যাদের কাজ শুধু জবাই দেওয়া আর মাংসের ভাগা দেওয়া, বিক্রিবাট্টা করা। এক কথায় যাদের বলা হয় কসাই। পূর্বোক্ত মানুষেরা কসাইদের মত চাক্কু, ছুরি, চাপাতি, প্রভৃতি নিয়ে চলাফেরা করে!  বুঝা যায় কাদের কথা বলা হচ্ছে? এইসব সবারই জানা, সবারই দেখা। আমরা যদিও শব্দ করে ওদের কথা বলে অভ্যস্ত না। গোপনে ফিসফাস নয়তো চোখঠারে বলে পাই স্বস্তি! ঠারেঠুরে বলার চেষ্টা তাই আমারও।
বাস্তবিক কসাই আর এদের কাজের মাঝে আছে মজার তফাত! এরা কসাইদের মত জবাই দিয়ে ছাল ছাড়িয়ে মাংস ভাগারে বিক্রিবাট্টার ঝামেলায় যায় না! জ্যান্ত শরীর তবে কেন যে অমন এলোপাতাড়ি কোপায়! এলোপাতাড়ি রান-মগজ-কাঁধ-সিনা কোপায় কিন্তু সুন্দর করে বানায় না কোন গোশত! কোপানো প্রাণটা তারপর অবশেষে যখন তড়পানো শুরু করে, তখন জোছনার কুণ্ঠিত দেহের উপর ফেলে করে পলায়ন! প্রায়শ মৃত্যু নিশ্চিত হবার আগেই। তবে কোপাতে শক্তি খরচা হয় প্রচুর আর উত্তেজনার জোশ এসে যায় অনাহুত; এমনকি মৃত্যুর দরোজা ঘুরে আহতের জীবনে ফিরে আসার মত দুর্ঘটনাও ঘটে যায় কদাচিৎ! সাম্প্রতিক কালে তাই নতুন পদ্ধতি হয় অবলম্বনস্রেফ ছুরির এক টান, গলাটা দুই ফাঁক ও মরণ নিশ্চিত।
জোছনার মসৃণ ফর্সা শরীরের উপর আহত প্রাণের সেকি দাপাদাপি! বেরিয়ে গেলে প্রাণ নিঃসাড় পরে থাকে দেহ। আর জোছনার সারা গায়ে লেপ্টে যায় চানাচানা রক্তদিনের আলোয় দেখতে লাগে যা কালো! ভীষণ গরম লাল ফেনার বুদবুদ মিশে যায় অস্পষ্ট হিমেল হাওয়ায়! নোনতা স্বাদে তেতো হয় জিভ। এবং পাকপ্রণালী ফুলে উঠে আমিষের আঁশটে গন্ধে! মাঝেমধ্যে তাছাড়া আরো যা ঘটে সেতো মুখে আনা যায় না কোনভাবেই। মেয়েছেলে নিয়ে যেইসব নাফরমানি হয় সেইসব কি মুখে উচ্চারিত হবার মত বিষয়!
কসাইদের পায়ের স্পর্শের সাথে জোছনার পরিচয়সূত্র এই-ই। এবং ক্রমে জোছনার আশ্চর্য, একদিন অনুভব করে উঠে ও, এইসব গা সওয়া হয়ে উঠছে! জগতের আরও অনেক অপ্রিয়, ঘৃণিত সত্যি যেমন গা সহা হয়, মানিয়ে নিতে হয়; অপরিমেয় ঘৃণা বুকে করে! এও জগতের সেই সত্যিমানুষে মানুষে ভালোবাসার ঠিক অপর পিঠ, যার বীজ মানবের রক্তে পোঁতা হয়ে যায় সৃষ্টিমুহূর্তে! এবং হীন এই কাজে আর যাই হোক কোন মিথ্যে লুকায়িত থাকে না। না, বলা হয় নি যে এইসবের দায় মেনে কেউ কখনো কোনদিন প্রায়শ্চিত্ত করে। তবু, কৃতব্যক্তিরা যখন গা ঢাকা দেয় কোনপ্রকার অভিযোগ দায়েরের আগেই, আর গা বাঁচাতে তদবিরে খোঁজে আশ্রয় বিনা প্ররোচনায়এটা কী নয় এক অর্থে সত্যতা স্বীকার? এমনকি নিজেদের কাজের বৈধতা দিতে তাঁরা কোনরূপ গল্প ফেঁদে বসে নাসেও কী পরিচায়ক নয় সততার?
সে রাতের পর বড় অসহ্য লাগে খুনের তাপস্রোত, লোহিত কণার আহাজারিতে ভ্যাপসা হয় বাতাস আর আমিষ গন্ধের উৎপাতে বিশ্রী বমিভাব আসে জোছনার। এবং হত্যার সাথে যুক্ত হয় মিথ্যাগল্পের কোমল ইমেজ নিয়ে দাপ্তরিক ভাষণ!
জোছনার চোখের সামনে শিউলির বিষণœ বৈধব্য নিয়ে ঝুলে আছে কুয়াশাময় চাঁদনী। অথবা তাই মগজের নিকট ইঙ্গিত আসে এ নয় কোন চাঁদনী রাতের বিমূর্ত সৌন্দর্যএ সমূহ কোন মৃতের শেষ বসন! এবং অতঃপর ঘি রঙ সাদা বসন ছিঁড়ে বিমূর্ত কুয়াশাময় চাঁদনী রাত কেটে কেটে কয় মুহূর্ত আওয়াজের নৃশংস খেলা হয়।
শালা বাঞ্চোতের বাচ্চা বাঞ্চোৎ, দৌড়া!
জোছনার শরীরে পূর্বচেনা পায়ের হয় উত্থান-পতন। এক কদম দুই কদম তিন কদম চার কদম পাঁচ ক… গুলির শব্দ আর পঁচাত্তর কেজি ওজনের ঢাউস শরীরের ধপাস পড়ে যাওয়া জোছনারই দেহের উপর। তারপর আরও গুলির শব্দ তিন তিনটি!
তিন পোয়া মগজ ছিটকে পড়ে জোছনার মুখের উপর। ঘেন্নায় কেঁপে উঠে দেহযেন কেউ থুথু ছিটিয়ে দিল মুখের উপর! কোমল শরীর বহে যায় জোছনার লাল জলে! বড্ড গরম সে খুন ঠাণ্ডা করে দেয় জোছনার প্রাণ। ছিন্ন পাপড়ি শিউলির, বিভীষিকার ত্রাসে হাওয়ায় ভাসে সমরাস্ত্র হাতে দাঁড়ানো সাত কাকের মাথার উপর। শিউলি মাটিতে রাখে না পা, ভয়ে। কাকেদের মুখ তৃপ্ত ও কৃতিত্বে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে জোছনার বিস্মিত ভীত উল্টানো চোখের সমুখে।
ইতঃপূর্বে কাক গোত্রের কাউকে এমন কর্মে লিপ্ত হতে দেখে নাই কেউ কখনো। দেখে নাই জোছনাও। মৃত পঁচা শরীর ঠুকরিয়ে খেতে দেখা যায় কাকেদের, দেখা যায় আবর্জনা ঘাটতে, পরিত্যক্ত ঠোঙা নিয়ে রেলিঙে দেয়ালের কার্নিশে কিংবা বৈদ্যুতিক তার থেকে তারে লাফিয়ে বেড়াতে। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুন! আবার তাজা শরীর ছুঁতে, যদিও মৃতকাকের কী অনীহা আর ঘৃণা! চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলা যায় এমন কেউ দেখে নাই কোনদিন। জোছনা বিস্মিত, সন্ত্রস্ত, ভীত ও হতভম্ব। কাগজের মত ফর্সা দেহ জোছনার, এখন হলুদাভ! হলুদ আলোয় তাকিয়ে দেখে কাক অথবা নব্য-যম ও তার করিৎকর্ম! তাকিয়ে থাকে জোছনা ভাষাশূন্য! এভাবে স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া গেলে ভালো হতো! কিন্তু কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা স্থায়ী থাকে না বেশিক্ষণ। অবসন্ন ঘোর কেটে গেলে প্রথমে ভাবনা আসে ঘটনাপ্রবাহের যোগসূত্র তালাসে। ভাবনায় যখন পাওয়া যায় না থৈ শারীরিক উপসর্গ শুরু হতে আর সময় নেয় না। জোছনাও প্রথমে ভাবতেই চায় নতুন এই কাক প্রজাতি সম্বন্ধে। ততক্ষণে নাকের উপর লেগে থাকা মগজের গন্ধে বমিবমি ভাব শুরুহয়ে যায় কিন্তু। পেটের ভিতর পাকযন্ত্র উজান ঠেলে গলার কাছে এসে আটকে যায়। এ তো ভয়ানক অস্বস্তির কাল। হলুদ বমিতে শহর ভাসিয়ে গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে জোছনার। তবে যদি আরাম হয়! কিন্তু বমি তো আসে না! জোছনার অস্বস্তি কাটে না। সারা রাত ধরে হাঁসফাঁস করে জোছনা গলায় আটকানো বমির দলা নিয়ে।
ভোরের হাওয়া বহে কিছু আলো আর ঠাণ্ডাঠাণ্ডা পরশ নিয়ে। রাত শেষ? জোছনার মনে, দেহে নয় তখনোস্বস্তি আসে। দিনের আলো ও তাপে যদি বমি হয় কিংবা নিপাত যায় গন্ধ, রক্ত আর মগজের! আর এমন ঠাণ্ডা আবহে পত্রিকা-বেতার-টেলিভিশনে এক বিষম গরম খবর তখন আসে। খবরের রচয়িতা গত রাতে দেখা নতুন প্রজাতির সাত কাক অথবা তাদের সদর দপ্তর! প্রকৃত পক্ষে এ কোন খবর নয়, নিকৃষ্ট রুচির গল্প এক হতে পারে। এবং জানা যায় ওদের, কাকদের পরিচয়ওরা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকারের সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় আজরাঈল! গল্পটি সবার উদরস্থ এবং অতঃপর মুখস্থ-ঠুটস্থ হওয়ায় বিবৃত করার প্রয়োজন হয় না আর!
গল্পের রোমাঞ্চে তিড়িং-বিড়িং বহে যায় দিন। রাত আসে আবার, একই রকম রাত। আর আসে কাক। অতঃপর দিন ও একই গপ্প এবং একই গপ্প একইভাবে বারবার। বহু ব্যবহৃত খবর তো হয়ে যায় গা সহা! কিন্তু জীর্ণ এ খবর জোছনা কেন উঠতে পারে না সয়ে? বরং এ মিথ্যে ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে হয়ে জীর্ণ হতে হতে গন্ধে গন্ধে দুর্গন্ধময় হয়ে উঠে। জোছনার আর ভালো লাগে না কিছু। দলবদ্ধ কাকের দেহ জোছনার শরীরের উপর মেঘের মত ঘোরে, ঋতু রেওয়াজ ভেঙে, প্রতি প্রহরে। আর জোছনা আশঙ্কায়, অস্থিরতায় অসহ্য হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে ও কাঁপে। এবং যে রাতে নিরীহ মানুষ খুন করা হয় ও দিনে মানুষটির কপালে কলঙ্ক তিলক সেঁটে একই গপ্প ছড়ানো হয়; সেইদিন নাকে-মুখে বমি উঠে জোছনার। এতদিনের জমানো ক্রোধ ঘৃণা হয়ে বেরিয়ে আসে কলকল, হলুদ টক গন্ধের বমি বুঝিবা! সারা শহর ভেসে যায় হলুদ বমি আর টক গন্ধে। এইসব বমি বন্যায় জ্যান্ত ও মৃত কৃমির ন্যায় ভাসে স্বস্তি, উন্নয়ন, প্রশংসা, আইন, বিচার ও নজিরবিহীন নিরাপত্তার ফিরিস্তি আর শান্তি!
এবং জোছনার সেই শহরে থাকার আর কোন রুচি অবশিষ্ট থাকে না।
জোছনা টুকরো টুকরো খসে পড়া শরীর জড়ো করে নামে পথের সন্ধানে।
মেঘমুক্ত আকাশে নবমী চাঁদ, নিচে শহরতলী। শহরতলীর ক্ষুদ্র জমিনের বুক চিরে বয়ে গেছে এক রাস্তাগ্রামাভিমুখী রাস্তা? পথে এসে আছড়ে পড়ে এক প্রকার বিতাড়িত হওয়া অসহায়, উ™£ান্ত জোছনা। পথ ছুটে চলে জোছনাকে পিঠে জড়িয়ে। চলতে চলতে জোছনা দেহ টানটান করে ছড়িয়ে দেয়। ভালো লাগছে আজ? ওর দেহ-মনে ফিরে আসে স্বস্তি ভাব। অনেক দিন পর জোছনা-বৃষ্টি ঝরিয়ে চাঁদের মুখ ঝলমল করে? পথের ধারে সার দিয়ে থাকা গাছের পাতায় জোছনা খেলে। আর রাস্তায় লুুটিয়ে পড়ে গাছের প্রতিবিম্ব। সাইকেল আরোহী, পথচারী মাড়িয়ে যায় গাছের ছায়া। মর্মর শব্দ হয়? মট্মট্ ভাঙে যেন কী! কী ভাঙে? টনক নড়ে জোছনার। সচকিত জোছনা দেখে পথচারী যান্ত্রিকতায় মাড়িয়ে দেয় হাড়। মৃতদেহের নীরব সাক্ষী অস্থিহীন কঙ্কাল গুড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় কে! কেউ যেন ধ্বংস করতে উদ্যত, ইতিহাস আর ইতিহাসের জ্বলজ্বলে সাক্ষী! চাঁদের মুখে আর জোছনার শরীরে আবার বমি আর বমিরঙের ঝাপ্টা লাগে। বমিময় হয়ে পড়বে বুঝি জোছনার দেহ! এবং নদীর  উপর ইস্পাত সেতুতে এসে জোছনা হাঁপিয়ে উঠে। শিকারীর লাল চোখ তাকে চমকে দেয়। হতবিহ্বল জোছনার দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়। একটু বিশ্রাম না হলে বুঝি আর চলে না! কিন্তু কি আশঙ্কায় টাল খায় ও; কেঁপেকেঁপে উঠে ওর  নরোম  শরীর। নদীর জলে দেখা যায় জোছনার মুখ। ও মুখ গভীরে আরও গভীরে লুকাতে চায় কী? কিনারে দাঁড়ানো শিকারি সতর্ক প্রহরায়ঢেউ দেয় জলে। জোছনার প্রতিবিম্ব ভেঙে হয় খানখান। এখন আলোর বলের মত চারদিক ছড়িয়ে নিঃশেষ হবে! জোছনার আর দাঁড়িয়ে থাকা হয় না। অবকাশ সে পায় না দাঁড়ানোর! সেতুর উপর দিয়ে গড়িয়ে চলে যায় ঐ প্রান্তে । অবচেতন মনের শরীর হয়তো প্রয়োজনে নয়তো নিয়মের টানে, এমনকি সন্দেহ জাগা স্বাভাবিকশিকারির তোলা ঢেউয়ের দোলায় কি শাসনে জোছনার দেহ গড়িয়ে গড়িয়ে আসে এই পাড়। জোছনার দেহ এই পাড় পৌঁছেই সঙ্কুচিত হতে থাকে আবার কী ভেবে! সঙ্কুচিত হয়ে হয়ে সে এক ডিমের খোলসের ভিতর আটকে যায়! পৃথিবী হয় যেন এক ডিম কিংবা ঐ নিষ্প্রাণ চাঁদ! আবারও চমকে উঠার পালা। চমকে উঠতে হয় এক শব্দে। শব্দ নয় ঠিক, আর্তনাদ। আর্তনাদের সাথে সাথে আর ডিমের খোলসটাও ভেঙে যায়! বিশাল ময়দানে পিছলে পড়ে টলটলে শ্লেষ্মায় আবৃত কটকটে হলুদ কুসুম অথবা মৃতপ্রায় চাঁদ। ফুটে এক চিত্র ময়দানে। মৃতচিত্র  কিংবা বোবাছবি দৃশ্য সে নয়। জীবন্ত ছায়াছবি চলমান! চারটি ভাল্লুকের ছায়া কামড়ে খাচ্ছে মাটি, আন্দোলিত হচ্ছে ভূমির উপর। ভূমির উপর নয় বত সেখানে শায়িত আছে মাটির তৈরি পুতুল। পুতুল নি®প্রাণ নয় যদিও! মূলত সে জীবন্ত চন্দ্রমুখী নারী অসহায়! বাতাসে তখনো ভাসে অসুখী শীৎকার-প্রতিবাদের, ঘৃণার। তাঁর, নারীর পায়ের নিচে বহে যায় রক্ত ও পুঁজের নদী।
জোছনানদী বাধাপ্রাপ্ত হয় এইবার। তার বাঁক নেবার প্রয়োজন পড়ে তাই। ফলে নদী বাঁক নিতে চায় এবং বাঁক নিতে শুরু করে। তখন যা হয়-অনেকখানি ফসলি জমি ভেঙে নদী তার পথ করে নেয়। আর সেখানে তীব্র, তীক্ষè উছলানো স্রোতধারার তৈরি হয়। মাথার উপর সোজা হয়ে দাঁড়ায় নবমী চাঁদ। স্রোতের উপর ভাসমান জোছনা এগিয়ে যায়। এগিয়ে যায় সহজ জনমানবের গাঁয়ের দিকে। ভূতুড়ে ময়দান পিছনে ফেলে। জনমানবের চিহ্ন হয়ে প্রথম ধরা পড়ে যা, সে এক গ্রামীণ বাজার। বাজারে ঢোকা মাত্র জোছনার দেহে বিষণœতার ছায়া ফেলে সেতু দিয়ে গড়িয়ে আসা হলুদ উন্নয়ন-একশ ওয়াট বাল্ব! জোছনার মনের পানে আবার ছুটে আসতে চায় সব দ্বিধা? টালমাটাল জোছনা স্তম্ভিত হয়ে যায় ঘুমন্ত বাজারে উত্তেজিত মনুষ্যকণ্ঠে।
১ম কণ্ঠ: আমি শালা তুঙ্গরে অত বালের প্যাচমোচড় বুঝি না! ঐ শালারে একবারে মাইরে ফালাইলে কুন বালডা ছিঁড়া পড়ব আমার?
২য় কণ্ঠ: নবী তর সিডিডে অফ করছেন দেহি-শালার ভিলেনি পাঠটা মেজাজ খারাপ কইরে দিতাছে।
এবং হাসির কী হলো-হাসাহাসি হয় কিছু! আর একটি উদ্বিগ্ন কণ্ঠ সবাইকে থামায়।
৩য় কণ্ঠ: আহ্ আইতের আওয়াজ মেলাদূর তনে হুনা যায়-কী শুরু করলা! এ ডাক্তর-মাস্টর, হুন পোলাপানের কতা নিয়ে অত মাথা ঘামাইয়ো না ত। ঐ অবি, মাস্টর যিবেই কয় হেবেই কাম কর।
কয়মুহূর্ত নীরবতার পর ২য় কণ্ঠ সংযতভাবে বুঝাতে থাকেহুন, শেখের ঘরত যায়ে মোটর সাইকেল থাইহে শুরু কইরে যা পাবি হাইপটে জড়ায়ে আনবি। আর মুন রাহিস, শালার কইলে ডর-ভয় এক ফোটাও নাই! ঠাওর পাইলে কিন্তুক-ধরা যেন পড়স না কইলাম-যুদিও আমগরে আসল কতা শালা শেখের চুদারে হেনস্তা করা। তাও যুদি কোন ঝামেলা অয়ে যায়-বুঝস নাই! মুট কতা ধরা পড়বি না, দরকার অইলে লাশ ফালাবি?
নমবী চাঁদ পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে হঠাৎই! এই ঢলে পড়া মৃত্যুর আগে ঘাড় ভেঙে এলিয়ে পড়ার মত। বুঝি চাঁদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে এখনি আর আঁধারে বিলীন হবে জোছনা! চাঁদের চোখ হলুদ হয়ে উঠে বিষম কঠিন রোগে? আর বিন্দু ধকলে বুঝি রক্ত উঠে মারা যাবে!
বাজার পেরুলে আবার ফসলি মাঠ। মাঠজুড়ে গর্ভবতী ধানগাছ। ধানের শীষে, পাতার ডগায় নিপুণ হাতে জাল বিছিয়ে আছে মাকড়সা। হেমন্তের শিশির যে কিনা মাটির প্রেমে পতনমুখী, সে আটকে গেছে মাকড়সার জালে। জালে বন্দি ধানের শীষে অশ্র“র মত টলমল শিশির। অশ্র“ ও জালের ফাঁক গলে ঢলে পড়া জোছনা এগিয়ে চলে স্বপ্নের তালাসে।
সামনেই, অদূরে দাঁড়িয়ে পাহাড়। দেখতে পাহাড়ের মত হলেও ওটি গ্রামের রেখা। নির্জন রাতে দূর থেকে ঘুমন্ত গ্রাম দেখতে এমনি হয়। গ্রাম থেকে ভেসে আসে অপরূপ গন্ধমিশ্রিত বাঁশির সুর। উহ; কে বাজায় অমন! মনে হয় জোছনার, কতকাল পর দেহ আজ ওর ফুরফুরে বেজায়। কেমন লাগে যেন মাতাল মাতাল! সুর-গন্ধে মাতোয়ারা জোছনা ছুটে চলে সুরের উৎস সন্ধানে। খুঁজে পেতে উৎস, কষ্ট হয় না খুব। পথের ধারেই দেখা মেলে প্রাণ মাতানো উৎসের। তবে এখানে আলো নাই! আছে ঘন ছায়া অনড়! আবার মনে হবে, আলো আছে! নইলে ছায়া যে দেহের তাঁর অবয়ব অত স্পষ্ট কেন বুঝা যায়? জোছনার অনুভবে ধরা পড়ে এক ‘অতএব’ চিহ্ন! এই গাণিতিক সঙ্কেত করে কোন বিশুদ্ধ বাগানের বার্তা বহন? ক্ষুদ্র চিহ্নে আছে সূক্ষ্ম অথচ ইঙ্গিত গভীর সংবাদের! অনমনীয় চোখে তীক্ষè অনুসন্ধান আর দৃষ্টির স্বচ্ছতায় উপভোগ্য হয় এমন আলো আঁধারের মোহ। আছে যখন এখানে আলো-ছায়ার বাগান, তবে নিশ্চয়ই মগ্ন মালী আছে বাঁশরি হাতে। বুঝা যায় ‘অতএব’ চিহ্নের গঠন যেমন: ভূমির দুই বিন্দুর ডানে কামিনীর ঝোপ, বামে হাস্নাহেনা আর শীর্ষে বাঁশঝাড় এক। এমনও হয় বাগানের আঙ্গিক! ও চিহ্নের ঠিক মাঝখানে বসা এক যুবাপুরুষ। সে বাজায় বাঁশি। বাঁশিতে মোহনীয় সুর তোলে আর বাতাসে ছড়ায়; বহে যায় সুর দূর দেশে বেদনার আকর্ষণে হারাতে হারাতে! ও বাঁশিওয়ালার রূপ দেখার লোভ মন থেকে মুছে ফেলা যায় না! জোছনার জাগে বড় ইচ্ছা তাঁর রূপে রূপ মেলাবার। এবং সচেষ্ট হয় জোছনা যুবকের দেহে মোড়ানো সাঙ্কেতিক ছায়ার মোড়ক উন্মোচনে। জোছনার অনেক চেষ্টা তদ্বীর সত্ত্বেও যুবকের উপর থেকে সরে না ত্রিঝোপের ছায়া! ভুল কী তখন কিছু হয়-জোছনার ছায়া সরাবার তাড়না থেকে? প্রেমিক প্রাণ যুবকের উদার মনে ভালোবাসার কড়া নাড়ায় ভক্তের সাধ? তাই কি আবছায়ার ভিতর স্বতঃপ্রণোদিত কথা বলে যুবক, জোছনার উদ্দেশ্যে অথবা নিজেরই জন্যআমি এই শ্যামল গাঁয়ের ছেলে। আমি মাটি ভালোবাসি, ভালোবাসি ফুল, ফুলের সুবাস, সুর… জোছনার দেহ দুলিয়ে অপরূপ সুর ঝংকৃত হয়ে উঠে চারিপাশে! এবং তারপর কোথাও আর কোন শব্দ নাই। অথচ মধু-সঙ্গীত গলে চুঁইয়ে ভিজিয়ে দেয় চাঁদনী রাত। যুবকের উচ্চারণে কি হতে পারে কারও কোন ক্রোধ! তবে কামিনী-হাস্না ঝোপ থেকে কেন দুইটি অভিন্ন অগ্নিজিভ যুবকের বুকে প্রবেশ করে তীব্র বিদ্যুৎ ফলার মত, অন্যবিধ কিছু ঘটে উঠার আগেই! এমনকি শেষ হবার আগেই যুবকের ভাষণ! ছটফট করতে করতে মাটিতে শুয়ে পড়ে যুবক। আহত হয় জোছনা। অপরাধবোধে পীড়িত হয়ে জোছনার মুখ ফ্যাকাশে হয়। তখন জগৎ নিস্তব্ধ; নিঃসাড়! আহত জোছনা অপরাধীর মত তাকায় চাঁদের দিকে। চাঁদের চোখে রক্ত! তাছাড়া যুবকের মুখ বিষে নীল হতে হতে কালো হয়ে যায়। এমন বিজন রাতে যুবকের কীভাবে হয় তবে চিকিৎসা! আর জোছনা, ওর শেষ লাবণ্যটুকু হারিয়ে ফেলে ঐ কালোতে!
এইখানে এসে জোছনানদী মিলিত হয় সাগরে। অন্ধকার সাগরে? যেখানে আলাদা করে নদীর গতিপথ খুঁজে পাওয়া যায় না আর!
যখন জোছনা আর কামিনী ঝোপের নিচে ঘাপটি মেরে থাকা আঁধারকে আলাদা করে সনাক্ত করা যায় না, তখন বাতাস উঠে! বাতাসের প্রেমে বাঁশঝাড়ে বাজনা বাজে। বাঁশপাতার ন্যায় মুদ্রা ঝরে আসমান থেকে। আর মুদ্রার নিচে হারিয়ে যায় যুবকের দেহ।

জাল

তোমারে আমি কখনো চিনি নাকো,
লুকানো নহ, তবু লুকানো থাকো।
[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]
শাশুড়ি-বউ ঘুমের উদ্যোগ করে। বৃদ্ধা হাতের খসখসে তালুর বাতাস কুপির লাল শিখা নিভিয়ে দেয়। ঘরময় ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁধার। ঘন অন্ধকারে টকটকে দুটি আঙরা জেগে থাকে। মালশার কালো ছাইয়ের গভীরে যেন জ্বলন্ত চোখ। উদরে আগুন-তাপ জমিয়ে ভেজা মাটির উপর বসে আছে নিরীহ মালশা। ঝড় বাদলার রাত। আগুন পুষে না রাখলে চলে না। কখন দরকার হয় আলো, উত্তাপ।
মালশায় জমানো আগুন থেকে দুই ফুট উঁচুতে বাঁশের মাচায়, জমে ওঠা রাতে শাশুড়ি-বউ ঘুমের আয়োজন করে। ঘুম আসে না সহসা। সারাদিনের ক্লান্তি জড়িয়ে আছে অঙ্গে অঙ্গে। তবু হয় না এক দুই চোখের পাতা। ঘরের ভিতর এত ঠাসবুনোট আঁধার সহ্য হয় না বেশিক্ষণ। হাঁপ ধরে আসে।
: বউ, ঝাঁপ খোল। এল্লা বাতাস আহুক।
বাইরের আকাশে আজ রাতে জোছনার নহর বয়। অনেক অনেক জোছনার কণা ছড়িয়ে আসমান জুড়ে। আর ছোপ ছোপ মেঘের দাগ। কালো মেঘের, সাদা মেঘের। কিছু আছে জীবন্ত। ওরা রূপার লোভে চাঁদের কছে ভিড়তেই সোনালি হয়ে যায়। জোছনা তখন নির্মল থাকে না। ঘোলা হয়ে উঠে। ঘোলা চাঁদনীর তলে বহমান ঘোলা বানের পানি। এই রাতে হাওয়া বহে না। নীরবে বহে শুধু থকথকে পলিমাখা জল। অস্বচ্ছ জোছনা আর জলের সঙ্গমে শীৎকার উঠে। এবং পরিবেশ কুহকী আবহে করে ছমছম।
বউ ঝাঁপ খোলে। পাটখড়ির বেড়ায় খোপ কেটে বানানো জানালায় ঝাঁপ লাগানো থাকে। খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতর জোছনা। ছয় খোপ দিয়ে ঢুকে পড়া ছয়টি চাঁদনী টুকরো আছড়ে পড়ে বধূর উপর। বধূর দেহ হয় জোছনায় আঁকা খাঁজকাটা নকশা। ঢুকে না যদিও ক্লান্তিহরা ঝিরিঝিরি বাতাস। ঢুকে তবে জলজোছনার অদ্ভুত শীৎকার। আর থাকে হাঁপ ধরানো অসহ্য ভ্যাপসা আঁধার।
: এবাহা নি¹ুম মাইরে আছে ক্যা! পাথারের মুহে বাড়ি। দুইডে মেয়া মানুষ, হউড়ি বউয়ে পাথারের মদ্যে কীবেই রাইত কাটাই! শাশুড়ি কথা বলে। বধূ নিশ্চুপ। শব্দ করে না কোন সে!
: আ বউ, ঘুমাইলা! যুদি তুফান উঠে, বাওরের মুহে কী ইবার ঘরডা টিকপ? ঘরের এডা খুটি যুদিল বালা থাকলনি! বউটা যেন কেমন! নড়ে না চড়ে না। নিঃশ্বাসও নেয় না কি? বউ-শাশুড়ির সিঁথানে বাধা ছাগল ও ছাগলের আহার কাঁঠাল পাতা। ছাগলের পাতা খাওয়ার শব্দ ঘরময় ঘুরপাক খায়।
: জান বউ, মোল্লার বড় বেটা আমারে আইজ কী জিগাইলো? কয়: তোমার বেটার কতা কী কী যে হুনতাছি, হাছাই নাকি? তোমার বউ বেটা করোরেই যে দেহি না!
: আপনে কী কইলেন? জিঙ্গেস করে বধূ।
: মোল্লার বেটার চাইল চলন আমার বালা ঠেহে না। উডি নাহি পাকিগরে হতে! ফিসফাস হুনি কতকিছুর। উডির কতা হুইনে আমার পাঁচটা আত্মা উইড়ে গেল গা সুজা কতা! কী জবাব দেই, কোন মেন নাঠা বাজে! তা আমি বুদ্ধি কইরে কইলাম- পোলাডা অর বউ নিয়ে হউড় বাড়ি বেরাবার গেছে। নয়া নয়া বিয়ে করাইছি- কাম কাইজও নেই। উডির বেটা তহন কয়: দিনকাল বালা না। নানান জাগাতনে গ-গোলের খবর পাইতাছি! খবর পাঠায়ে দেও, আয়ে পড়–ক। আঙ্গরে বড়িত আয়ে কাম করবের কও। ইন্তি থাকলে হেফাজতে থাকপ। চিন্তেয় ত আমার আর বালা ঠেহে না কিছু। কীয়ের কাম করি, কীয়ের কী!
বধূ আবার চুপ। এখন এই রাতে, পুরোপুরি আন্ধার নয়খোপ খোপ জোছনার মায়ায়, অস্থিরতায়, সংশয়ে, শঙ্কায় জমাট রাত গভীর ঝুলে থাকে। ঘুমহীন চোখে যেন কালো পাহাড়।
: বউ, পোলাডার ঠেঙ্গের ঘাও কী হুগেইলো? আমার ত দিন যায় পরের ঢেকির উপরে! খোঁজ নিবের পাই নে; এল্লা হাটপের চলবের পায়?
বউ-শাশুড়ির সিঁথানে কিঞ্চিত ফাঁকায় বাঁধা ছাগল। তারপর পাটখড়ির বেড়া। বেড়ার ওপারে খোপরি সমান কামড়া। সেখানে বাঁশের মাচায় শায়িত আছে এক লোক।
দিনবিশেক আগের এক ভোরে বউ অভ্যাসমত বাড়ির দক্ষিণে ঘাটে যায়। নির্জন ঘাটে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। ধীরে ধীরে ফুটে উঠে স্নিগ্ধ আলো। নানান বরণ পাখি উড়ে যায়। ওর স্বামী একদিন সুবহে সাদেকের পর এমনি ভোরে এই ঘাটে দাঁড়িয়ে বিদায় নেয়। পাখিরা তো সন্ধ্যায় ফিরে আসে। ওর স্বামী আজও আসে নি ফিরে! ভোরের আলো সহসা থমকে যায়। বিষণœ হয়ে উঠে। ভাসান জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বউ। বউয়ের দেহের ক্লান্তি, গন্ধ ধুয়ে নিয়ে বয়ে যায় বোহেমিয়ান জল। রিক্ত, সিক্ত বধূ প্রাত্যহিক কাজে ফিরে।
সেদিনও সে নির্জন ঘাটে দাঁড়িয়ে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে। ঝাঁক ঝাঁক পাখি যায় উড়ে কোথাও। বানের পানি নেমে গিয়ে একবার, ফুলে উঠছে প্রতিদিন আবার। তিন আঙ্গুল, পাঁচ আঙ্গুল, আষ্ট আঙ্গুল করে। দূর দিয়ে স্রোতের টানে ভেসে যায় পানা। দল বেঁধে। দলছুট একাকী পানাও দেখা যায় কখনো! নিঃসঙ্গ এক কাক বধূর মাথার উপর উড়াউড়ি করে। ঘুরপাক খেয়ে তারপর বসে ঘরের চালের চূড়ায়। ডাকে কা কা। তখনি আবার উড়াল দেয়। এবং বধূর মাথার উপর তিনটি পাক খেয়ে হারিয়ে যায়! এ কোন্ অশুভ ভোরে বউ দাঁড়িয়ে একাকী ঘাটে! সকালবেলায় কাকদর্শন; কী অলক্ষণ। মানুষটার কোন বিপদ? বউ পায়ের আঘাতে আঘাতে জলের মসৃণ তল ভাঙে। আওয়াজ উঠে খলবল। ভোরের স্তব্ধ নীরবতা ভেঙে হয় খানখান। ঘোলা হয় জল। পানিতে আর ঝাঁপ দেয় না বধূ। তাকায় পুব আকাশে। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আভার রূপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই থালা ভর্তি লাল জেগে উঠবে। অশুভ দিনের কোন আভাস ওখানে আঁকা নেই।
ওই সোনালি আভাতেই বধূ কিন্তু স্পষ্ট দেখে সমুখে এক দেহ মানুষের। আটকে আছে ঘাটে। কাক দিতে এসেছিল তবে এই মৃত মনুষের সংবাদ! বধূর নজরে আগেও পড়েছিল শরীরের মত স্ফীত কিছু এক! সে ঠাহর করতে পরে নি অতটা! এখন এই ঊষালগ্নে একটি দেহের অবয়ব স্পষ্ট ধরা পড়ে। মনুষেরই শরীর এ। বধূ দেহের কাছে যায় না। চিৎকার কলরবে সচকিত করে না ভোর। উঠোনে ফিরে শান্ত সে। এখানে কেউ নেই। ফাঁকা উঠোন। ঘরে উঁকি দেয়। ঘরের ভিতর আধো আলোয় শাশুড়ি ছাগলের দড়ি খোলে। ভোর থাকতেই ছাগল ঘরের বার না করলে মুতে ভাসায় ঘর। বউ দরোজায় দাঁড়িয়ে ডাকে শাশুড়িকে।
: মাজান এঠাই এল্লা আহেনছেন। দ্যাহেন ঘাটো এডা মড়া আয়ে ঠেকছে!
পাথারের মুখে ছোট্ট দ্বীপ বাড়ি এটি। ভাসতে ভাসতে ঠেকবে এসে এখানে মৃত মানুষ, পশুর দেহ, জানোয়ারের লাশ, প্রভৃতি ঝঞ্জাট। কিন্তু সেদিন ও কোন মৃত মানুষের লাশ ছিল না। ছিল বেড়ার ওপাশে শায়িত লোকটির আহত অচেতন দেহ। সে দেহ ঘরে নিয়ে শাশুড়ি পশ্চিমমুখো হয়। দুই হাতে আঁচল তুলে ধরে শূন্যে। আল্লাহ তুমি কোন মায়ের পুত আইন্যা আমার কোলে ফালাইলা। তুমি কোন কোল খালি কইরো না। পোলাডারে তুমি বালা কইরে দেও।
বধূর হাতে হয় পরিচর্যা নিবিড়।
: আ মেডা, আও কর না ক্যা! পোলাডার কুঠায় বাড়ি কিছু কইছে? কুঠায় কী অইছিল! কোন মায়ের পুতমায়ের অন্তরায় মেন কীবাহা ঠেকতাছে!
: মাজান, এহন ঘুম আহেন। আইত-বিরেত ইল্ল্যে প্যাঁচাল বাদ দেন। ডানপাশে শাশুড়িকে রেখে বামদিকে পাশ ফিরে বউ। কিন্তু ঘুম আসে না কারও।
লোকটার চেতনা আসে। কিন্তু উরুতে বিঁধেছিল বাঁশের টুকরো। সেটি টেনে বার করা হয়। অনেক রক্ত ঝরে। দুবলা ঘাস চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেয় বধূ। রক্ত পড়া থামে। তারপর শাড়ি ডোরায় ব্যান্ডেজ বাঁধে। বাম পা ফুলে ঢোল হয়। আর বাড়ে শরীরের উত্তাপ। কী সময় গেছে কয়দিন! জ্বরের ঘোরে তড়পায় জোয়ান মানুষ। ছয় দিনের মাথায় দেহের উত্তাপ তার নামে। পায়ের অবস্থার যদিও উন্নতি হয় না মোটে।
এক সন্ধ্যায় সান্ধ্যবাতি জ্বেলে আঁধার তাড়াবার সময় বউকে ডাকে লোকটি। পাশে বসিয়ে বিছানায়, জানতে চায়: কীভাবে পেলে আমাকে?
মেঝের ঠিক মাঝখানে রাখা মাটির গাছা খাঁটো, তার উপর কেরোসিন বাতি। আগুনের লাল শিখা হেলেদুলে। যতবড় শিখা, তারচেয়ে বড় ধোঁয়ার কালো শিষ। শিখার উপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি, শিখার নিচে ঘাপটি মেরে থাকে অন্ধকার ছায়া। বধূ লাল শিখার দুলুনি দেখে।
: সহালে ঘাটো গেছি। আপনের গতরে এডা পিরাণ আছিল। আমি পিরাণ দেহি। পিরাণের ভিতর শরীর দেহি। মানুষটারে দেহি না। আপনের মুখ উপুড় করা আছিল। আমার হওড়িরে ডাইহে আনি। মুন অইলে শইল্ল কাটা দিয়ে উঠে। পিরানের নিচে দেহি জোঁকে চাপড়া বাইন্ধে আছে। কহন মেন ধরছে জোঁক। অক্ত খায়ে ডোমের নাহাল ফুইলে ট্যাপট্যাপা অয়ে আছে একেকটা।
: সেদিন কী হয়কয়েকদিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। মনটাও খারাপ। আম্মার কথা মনে পড়ে খালি। ছোট বোনটার কথা। আব্বার শরীরও ভালো না, জানি। ওরা যে কোথায় আছে, কীভাবে আছে? খুব ভাবনা হয়। আর মন খারাপ লাগে। চিঠি লিখব লিখব করি; লেখা আর হয়ে উঠে না। কী লিখব! বিমর্ষ হতে থাকি ক্রমশ। আমরা পাঁচজন অপারেশনে বেরিয়েছি, নৌকা করে। অমাবস্যার রাত। আকাশে বোধ হয় মেঘও ছিল। নিজের শরীর ঠাহর করা যায় না এমন আন্ধার।
লোকটা চুপ মেরে যায় সহসা। দৃষ্টি তাঁর বধূ-মুখে স্থির। বউয়ের মুখে আলোর আভা লাল। আলো-আঁধার ভরা ঘরে কী এক মোহনীয় আবহ তৈরি হয়। খাঁটো হয় ক্রমশ দোয়াতের লালশিখা। পাটের সলতেয় কয়লা জমে উঠছে। ধোঁয়া উঠছে আরো মোটা।
: তুমি কী যুদ্ধ বুঝযুদ্ধে তোমার ভয় নেই?
পিপীলিকা উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আগুনে। পোকা কত আরও উড়ে আসে আগুনের চারপাশে। বেড়ার উপর দুটি মানুষের ছায়া মুখোমুখি। বউ লাল শিখা থেকে সরিয়ে চোখ লোকটার মুখে রাখে। বলে: জানি না!
: তোমার স্বামী কেমন পুরুষ বল তো! ঘরে এমন বউ রেখে দিনের পর দিন বাইরে থাকে! মধুভরা ফুল এভাবে শুকাতে দেয় কেউ; শুকায়!
বউ লোকের মুখ থেকে নামিয়ে চোখ আবার দোয়াতের শিখায় রাখে। বড় বড় কয়লা জমে নি®প্রভ করে শিখা। কয়লামুক্ত না করলে নিভে যাবে যে কোন সময়। আর দেখ, দোয়াত জ্বাললেই কত পোকা। কোত্থেকে যে এইসব আসে।
: আমি হলাম গেরিলা, গেরিলা যোদ্ধা। গেরিলা মানে বোঝ, মানেযেখানে সুঁই ঢোকে না, সেখানে কুড়াল ঢোকাতে ওস্তাদ। আবার দেখ, সুঁচ হয়ে ঢুকবে তো ফাল হয়ে বেরোবে। আসলে ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। লোকটা হাসতে শুরু করে। হাসির দমকে লোকের ছায়া অতিকায় হয়। বধূর ছায়া খুঁজে পাওয়া যায় না আর।
: একটা রকেট নেই, জাহাজ নেই, মেশিনগান নেই, একটা রাইফেল পর্যন্ত নেই। এভাবে মানুষ যুদ্ধ করে। পাকসেনাদের সব আছে। দুনিয়া-সেরা জোয়ান তারা। তাদের সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করবে!- দেশের মানুষগুলো একটা কঠিন চালে পড়েছে। কঠিন চালে! কার স্বার্থে এই গণ্ডগোল?নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। কই আমার বিপদে আমার সহযোদ্ধা কে এগিয়ে এলো? নিজে বাঁচলে বাপের নাম।
একটি কুনো ব্যাঙ নিভুনিভু বাতির কাছে আসে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর। বন্ধ হয়ে আসে দম। ব্যাঙ এখন দস্তুর শিকারি। শিকার ধরার জন্য টানটান দেহ তার।
শাশুড়ি বধূর দিকে পাশ ফিরে। বাহুতে জড়িয়ে বুকের কাছে টানে বউকে। নিবিড় করতে চায়।
: অ বউ, তুমার কী মুন অয়আমার বাজান হাছা হাছাই যুদ্ধ করবের গেছে ! আমার এক মুনে কয় গেছে। আবার কই পোলা আমার এইরম এডা কামে যাবো আমারে না কয়েই! আমার মুন মদ্যে কুনো বুঝ আহে না। ও বাড়িত আহে না ক্যা!
: আইত অইলেই ইল্ল্যে কী প্যাঁচাল জোড়া দেন পত্যিক দিনই। ঘুম আইবের পান না! ঘুম আইলে কী অয়।
: শইল্ল মদ্যে ছন্তাই করে গো মাই, ছন্তাই করে। ঘুম ধরে না। বুইড়ে হাড়ে যে এত ছন্তাই কী জন্যে করে। আজরাঈল আমারে চোহে দ্যাহে না। মরণের ঘুম ত আমি আইবের পাই নে।
বউ চিৎ হয়। জোছনার দুটি খোপ বউয়ের দুই চোখে আছড়ে পড়ে।
: মাজান, হুনেনদিনকাল বালা না। অন্য এডা মাইনষেরে বাড়িতে ঠাঁই দিছি। দেয়ালেরও কান আছে। আপনে বুঝেন নাকেউ যুদি হুনে তাইলে গাঁয়ে টিকপের পামু। বদনামের একশেষ অবো না। আর যুদি পাকিগরে উন্তি কুনোভাবে খবর যায়মাজান, আপনে ভুলেও ইসব আলাপ তুলবেন না। আপনের পোলার কতা জিগেইলে কেউ, কবেন বাড়িতি আছে। অসুখ। ঘরতনে বারাবার চলবের পাইতাছে না। মানুষটা কই আছে, কীবাহা আছে…
আচানক জোছনা বধূর চুলে জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে যায়! শাশুড়ি দেখে কচি লাউপাতার উপর জোছনার খেল। সে বুকে টেনে নেয় বউকে। মুখের উপর হাত বুলায়। কুঁচকানো চামড়ার শক্ত হাতে বৃদ্ধা চুল আর জোছনার ঝট ছাড়াতে ব্যস্ত হয়।
পুষ্ট লাউচারা বয়স বধূর। টগবগে সবুজ মনে প্লাবন ছোঁয়া ভেজা বাতাসের দোলা। অল্পকাল আগে স্বামী সোহাগ প্রাপ্তি। অল্পকালবুঝিবা স্বপ্নেই।
বিলিকাটা চুলের আরও গভীরে প্রবেশ করে জোছনা। শুধু মাথার ভিতর নয় বধূর দেহের ভাঁজে ভাঁজে গর্ত হয়ে রক্তের ভিতর ঢুকে যায় চান্নি। শাশুড়ি দুই হাতে চাঁদনীর আক্রমণ ঠেকাতে মরিয়া হয়। জোছনা সরে না। আরও জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে যায়।
তারপর কতদিন গত হলো। ফসলের ঘ্রাণ ধুয়ে বিষ্টি এল ঝুম। বিষ্টি বানে ভেজা জবা কতবার নেতিয়ে যায়। এবং মধু-বুকে ডানা মেলে বধূ আবার তাকায় রোদে।
শিহরিত হয় বধূ। শিহরণ কেঁপেকেঁপে উঠে আসে গলা দিয়ে চাপা স্বরের মতন ঘন শ্বাস। নিঃশ্বাসে মিশে কান্না হয়ে উঠে শীৎকার: আহ, আহ, উম…. কাটা কই মাছের মত ছটফট করে বধূ। শাশুড়ি হাত জমে যায় বধূর তলপেটে। ইস…গরমে দেহি শরীলডে পুইড়ে যায়। বধূ দেহে জড়ানো শাড়ির প্যাঁচ খোলে আলগা করে শরীর। পোড়া শইলডেয় যে কীয়ের এত গরম! আর ত কুলেবের পাই না। মরণ আমার! এত জ্বালা আর সহ্য অয় না। বধূ অন্ধকারে শাড়ি ছুঁড়ে মারে। শাশুড়ির হাত স্তব্ধ পড়ে থাকে যেমন ছিল তেমনি বউয়ের তলপেটে।
ফোটার অপেক্ষায় অধীর দুটি পদ্ম জোছনার খোপে মেলে ধরা। একটুকু ছোঁয়ায়, কিছু মর্দনে-চুষণে পুরা ঝিলিক দেখাতে পারে মধুভরা ও ফুল। কিন্তু জোছনা তো আর ভ্রমর নয়। শুভ্র পাতলা পর্দা হয়ে জড়িয়ে থাকে জোছনা বধূ অঙ্গে। তাঁর চোখ বিড়ালের চোখের মত জ্বলজ্বল করে।
জ্বলন্ত চোখের সমুখে জোছনার আলো যখন নেহায়েৎ ফিকে মনে হয় তখন পায়ের নিচে চড়–ইগুলো একসাথে কলরব করে উঠে। পায়ের কাছে মাচার তলে খাঁচায় ধরা থাকে চড়–ই সব। শাশুড়ি কান খাড়া করে। কোন শব্দ আর শোনা যায় না। তখনি আবার পাখা ঝাপ্টায় চড়–ই। কোলাহল নেই এখন কোন। শুধু পাখা ঝাপ্টার শব্দ একটানা কিছুক্ষণ! “ছেই ছেই, হট হট” এবং ততক্ষণে চড়–ইগুলো সব চুপচাপ। আর কোন শব্দ শোনা যায় না। ঘরের ভিতর আঁধারের গভীরে যে ছয়টি আলোর গর্ত ছিল এতক্ষণ, সেগুলো নেই। উধাও হয়ে যায় হঠাৎ! সমস্ত এখন ঢাকা আছে দুর্ভেদ্য আঁধারে।
আকাশে চাঁদ ডোবে নি। ভীষণ কালো কতক পাহাড় মেঘ চাঁদের কোমল শুভ্রতা ক্রমশ গিলে গিলে নিঃশেষ করে দেয়। বাতাস উঠে। ভাসা-জলে ঢেউ উঠে হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে। বাতাস বাড়ে, ঢেউ উচ্চ হয়। অতঃপর নামে বৃষ্টি। বাতাস, ঢেউ আর বৃষ্টির মিলিত উল্লাস তাণ্ডব হয়ে আছড়ে পড়ে বউ-শাশুড়ির, পাথারের মুখে ছোট্ট কুটিরে।
ঝড়ো হাওয়া থামে। বৃষ্টি থামে না। কালো আকাশ ক্রমশ ধূসর। ধূসর আসমানের কোথাও পিঙ্গল, কোথাও বা রূপালি। খাঁচার ভিতর চড়ুই কুমকুম করে। এই যে অঝর বিষ্টি, তার ফাঁকে ফাঁকে স্পষ্ট হয় তবু ভোরের আলো। চড়ুইগুলোকে খাঁচা থেকে মুক্তি দিতে হবে। খাঁচা তুলে নিলেও ঘরের বার হবে না, বাইরে যেহেতু বাদলা। শাশুড়ি বিছানা ছাড়ে। দরোজার ঝাঁপ খোলে। ঘরের ভিতর কিছু আলো কিছু শীতলতা প্রবিষ্ট হয়। এ আলোয় স্পষ্ট রূপ নিয়ে উদ্ভাসিত হয় না কিছুই। ঠাহর করে নেওয়া চলে এই যা সুবিধে। তিনি বিছানা পাতা মাচার নিচে পাশাপাশি দুইটি খাঁচার একটি উঁচু করে ধরেন। আর চড়–ই সব দিগি¦দিক ছুটে বেরোবার প্রচেষ্টা নেয়। সাধারণত এভাবে চড়–ই ভোরবেলা বের হয় না। প্রথমে খাঁচার তল থেকে সরে আসে সাবধানে। পাখা ঝাপ্টা দেয়। গায়ের আড়মোড়া ভাঙে। অতঃপর মুক্তির আনন্দে কলকল শব্দে সচকিত করে ভোর।
চড়ুই এক ক্ষীপ্র গতিতে বেরোতেই মালশার ছাইয়ে পাখার বাড়ি পড়ে। রাতভর মালশা পেয়েছে ঝড়ো বাদলার ঠাণ্ডা পরশ। উদরের আগুন তবু ক্ষয়ে যায় নি। ফুলকি উঠে লাল, কালো ছাইয়ের গহীন থেকে। অল্প উপরে উঠেই অগ্নিকণা ঠাণ্ডায় জমে মাটিতে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়। কতক ছাই উড়ে এসে পড়ে শাশুড়ির চোখে। হাত থেকে তাঁর খসে পড়ে খাঁচা। ঠেলাঠেলির জন্য সব চড়–ই বেরোতে পারে নি তখনো। কলরব লাগিয়ে দেয় আবার আটকে যাওয়া চড়–ই। চড়–ইগুলো এখনো, এই সকালেও আতঙ্কিত এত! শাশুড়ি চোখ চেপে ডান হাতে খাঁচা তুলে ধরেন পুনরায়। আর্তকলরবে চড়–ই খাঁচা ছাড়ে। এবং উড়াল দিয়ে পড়ে বাইরে বৃষ্টি ভরা উঠোনে। কোন চড়–ই আর ঘরে দেখা যায় না। এমন বাদলা ভোরেও। এমনকি বাচ্চাসমেত মুরগিগুলোকেও না।
চোখের ভেতর জলের ছোঁয়ায় ভিজে ছাই নরম মাংস খামচে ধরে। যন্ত্রণা শাশুড়ির চোখে। তিনি আঙ্গুলের ডগায় আঁচল পেঁচিয়ে চোখের আরাম ফেরাতে সচেষ্ট হন। নির্ঘুম বয়সী চোখ কিন্তু এত সহজে স্বস্তি দেয় না। কষ্ট উল্টো বাড়ে। তাই দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ ইচ্ছামত রগড়াতে তখন ভালো লাগে। রগড়ালে জলে ভরে চোখ। আর জল ঝরলে, জল মুছলে ঠাণ্ডাঠাণ্ডা পরশে স্বচ্ছ হয়ে উঠে নয়ন।
: হায় হায়রে…ও বউ উঠো না দ্যাহ না- কী সব্বোনাশ অইছে!
বউ, বাঁশের মাচার উপর মাথা ও হাঁটু এক জায়গায় করে বলের মত গোল হয়ে শুয়ে আছে। অন্যদিন বউ শাশুড়ি একসাথে বিছানা ত্যাগ করে। আজ বউ উঠার লক্ষণ দেখায় না। শাশুড়ির হাহাকার কানে পৌঁছলে মাথা তোলে। সে ঘুমায় নি; জেগে আছে। মাচার উপর থেকে ওভাবে মাথা তুললে নিচে কী ঘটে, তা চোখে ধরা যায় না। তাছাড়া ঘরের ভেতর পাতলা আলো। কিছুই ঠাহর হয় না স্পষ্ট। এবং বধূ তাই আবার বুকের সাথে থুঁতনি বিঁধিয়ে শুয়ে থাকে। বিছানা ছেড়ে শাশুড়ির কাছে আসে না। প্রত্যক্ষ করে না ঘটনাটা কী?
শাশুড়ি উল্টে দেয় খাঁচা। আর এক লাশ মুরগির হাতে ঝুলিয়ে দরোজার সামনে দাঁড়ায়। পাঁচটি সোনালি আলোক রেখা শূন্য মাঠের ধূসর আকাশ ফালাফালা করে। গুমগুম শব্দে কান তালা লাগে। ভারি বর্ষণসিক্ত ভোর স্তব্ধ পাথর। ছাই রঙ আলো ছড়িয়ে তিরস্কার করেজেগে উঠো প্রাণ!
আলোর প্রবেশ মুখে মৃত মুরগির দেহ পরখে ব্যস্ত বৃদ্ধা। বড় বড় পশমের তলে বুকের ভেতর এখনো ওম ধরা আছে! তবে বুঝি মরে নি। খোলা চোখ মুরগির স্থির ভোর দেখে। না, মরে নি। দেহ শুধু চলৎশক্তি হারিয়ে অসাড়! ঘোলা আলোয় ঘোলা দৃষ্টিতে শাশুড়ি মুরগির পশমে বিলি কাটে। না, কোনখানে আঘাতের আভাস কি কোন দংশন চিহ্ন ধরা পড়ে না। ঠোঁট কিন্তু কালচে নীল। এ মুরগির ঠোঁট এমন রঙিন ছিল না। ঘাড়, পা, পাখা সিটকে আছে। বাঁকানো যায় না। দুই আঙুলে গলা টিপে দিলেও ফাঁক হয় না ঠোঁট। আওয়াজ কোত্থেকে হবে। মরে গেছে। কোথাও কোন মরণ চিহ্ন না রেখেই আঁধারে ও হয়েছে লাশ!
যেখানে ছাইরঙ আলোর প্রবেশ মুখ সেখানে দরোজায় বৃদ্ধা পা ছড়িয়ে বসে। কোলের উপর মুরগির লাশ। সমুখে এক টুকরো উঠোন। এক চিলতে খোলা আকাশ। উঠোনের ওপারে কিছু নবীণ ও তরুণ গাছ-গাছালির ঝোপ। কালো কালো স্তূপের মত দেখতে লাগছে এখন। আলাদা করে কোন গাছ আর চেনা যায় না। এবং ঝোপের উপর চোখ আটকে থাকে। তার পরে আর চোখ চলে না। আচানক অন্ধকার স্তূপের নাহাল গাছের ঝোপগুলো দোলে উঠে। কিছু আগেও ওগুলো নেহায়েৎ আঁধারের ঢিবি ছাড়া আর কিছু মনে হয় নি। এখন জীবন্তের মত কীসের নাড়া খেয়ে দুলে দুলে উঠছে। উঠোনের বুকে পড়ন্ত বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও আর ভূমিতে পতিত হয় না। ধোঁয়ার আবহে চোখ ঝাপসা করে দেয় কেবল। আর আওডা-কাওড়া বাতাস শাশুড়ির চোখে লাগে বিষম। পায়ের পাতায় বৃষ্টির আঁচ শীতল।
ঝাঁকুনি পড়ে শাশুড়ির শীর্ণ দেহে। রসালো ঠাণ্ডা মাটির উপর মৃত মুরগিদেহ কোলে বসে বৃদ্ধা। আঙ্গুল তাঁর মুরগির পশমের গভীরে। বাইরের রূপালি ও পিঙ্গল  আকাশের মিশ্রিত আলো, ঘরের মধ্যেকার ছাইরঙ আলো; আবার শুধুই কালো হতে থাকে। দমকে দমকে বাড়ে বাতাসের তড়পানি। একটা ভারী গুড়গুড় শব্দ শোনা যায় একটানা। দূর থেকে ভেসে আসে, দূরে সরে যায় আবার তখুনি। শাশুড়ি বাইরে তাকিয়ে থাকেন নির্নিমেষ। কোন বিদ্যুত চমকে ঝাঁঝালো আলোয় তাঁর চোখ কিন্তু ঝলসে যায় না। ঝুম বিষ্টি স্তব্ধ কালো পর্দার উপর অনবরত পতিত হয়। এই শব্দও শোনা যায়। আর কিছু দেখা যায় না। সেই মুহূর্তে শাশুড়ির  অনুভবে ধরা দেয় মুরগির তলপেটে শক্ত কিছু এক। আঙুলের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে বুঝে দেখেন কী ওটা? এবং নিশ্চিত বুঝেন!
: বউ, আ মেডা এহনও উঠস না, উঠপি নেদ্যাহ, ইডের পেট মদ্যে ডিম!
প্রায় গোল বলাকৃতির শায়িত বউ লাফিয়ে উঠে। এখন আর উদাস থাকে না। মাচা থেকে নেমে শাশুড়ির পাশে এসে দাঁড়ায়। ঘন লোম ঢাকা মৃত মুরগি দেহের উপর ঘন কালোয় বোনা আাঁধার। লোমের রঙ, শাশুড়ির হাতের মুঠো এইসবই সনাক্ত করা যায় নাপশমে ঢাকা তলপেটের গভীরে ডিমের অস্তিত্ব বুঝা যাবে কীভাবে! বউ শাশুড়ির কোলের উপর ঝুঁেক মুরগির তলপেটে হাত চালিয়ে দেয়।
চারপাশ অন্ধকার করে বর্ষণ আরও ভারি হয়। আর আউলা বাতাস। বৃষ্টির শব্দ, কিছু আগে শোনা ভারি গুড়গুড় শব্দ, মেঘে মেঘে ঘর্ষণের শব্দএইসবের কারণে ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস কানে পৌঁছায় না।
: দেশত কী আজরাঈল আইলো কওছেন। এইটুকুন পোয়াতি জীব তারও রেহাই নেই। বিষ ঢাইলে মাইরে থুয়ে গেছে।
শাশুড়ি বুড়ো আঙুলে টিপে, ধাক্কা দিয়ে ডিম খালাস করার চেষ্টা করে। ডিম অথচ বের হয় না। মনে হয় একটু নিচের দিকে নামে তো আবার ততটাই উপরে উঠে আগের স্থলে স্থির হয়।
: মাজান, হাত দিয়ে অইরম টিপেন না। ডিমডে পেটের মদ্যে গইলে যাব।
বউ শাশুড়ির কোল থেকে মুরগির দেহ নিজের হাতে নেয়। বাইরে তাকায়, কিছু দেখা যায় না। শাশুড়ির মুখে তাকায়চোখের গর্তে, মুখমণ্ডলের কুঁচকানো চামড়ার খাঁজে খাঁজে ছায়ার বসত। হাতের মুঠোয় লাশের দিকে দেখে, পোড়া মেটে রঙ পশমের ভিড়ে জেগে আছে একটি দুইটি সাদা ফুটি। সেখান থেকে আলো বেরোয়। বউয়ের চোখ স্বচ্ছ, উজ্জ্বল। সে লাশটা মেঝের ওপর শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিমকোণে পাটখড়ির বেড়ায় গোঁজা বটি খুলে নিয়ে আসে। মুরগির লাশ চিৎ করে শাশুড়িকে বলে: মাজান এই ঠ্যাঙডা একটু ধরেন। এক পা শাশুড়ির হাতে ধরিয়ে নিজের বাম হাতে অন্য পা ধরে। ডান হাতে বটি। ধারালো চকচকে বটি নয়। বটির ভোঁতা ঠোঁট। ভোঁতা ঠোঁট দিয়েই বধূ মুরগির যোনিমুখ থেকে চিড়ে ফেলে শিনা পর্যন্ত। এক ফোঁটা রক্ত বের হয় না। শিনার গভীরে আলোকিত কোন বল ধরা পড়ে না নজরে। ফাঁকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে  বধূ বের করে আনে দেহের সব কলকব্জা। হ্যাঁ, ডিমের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া যায়। ডিম খালাস করে হাতের তালুতে রেখে চোখের কাছে তুলে ধরে। কঠিন খোলস হয় নি ডিমের। পাতলা যদিও শক্ত পর্দায় আবৃত ডিমের টলমল জল। আরও গভীরে কুসুম। দেখা যায়। শাশুড়ির হাতে ডিম সমর্পণ করে বধূ বলে: মানুষটা কতদিন আইছে, এডা বালা কিছু পাতে ছোয়াবার পাই ন্য। আইজ ডিমডে ভাইজে দুইডে ভাত আইন্দে দিয়েরো।
কাটা-ছেঁড়া দেহটা বাইরে ফেলে দেবার দরকার। ভাসান জলে ছুঁড়ে দিলে কোথায় তলিয়ে যাবে। তলিয়ে জলজন্তুর খাবার হবে। বৃষ্টির দাপট, বাতাসের ঝাঁঝ কিছু কমেছে। তবু ঘরের বার হলে ভিজিয়ে দিবে মুহূর্তে সেই তেজ বর্তমান। বধূ ঘরের বার হয় না। দরোজার একপাশে সরিয়ে রাখে কাটা মুরগির লাশ। শনের চাল ধুয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নেয় বধূ নখের জমাট রক্ত।
শাশুড়ি-বউ বসে আছে দরোজায়। নিরবচ্ছিন্ন বিষ্টি এক ধরনের তন্ময়তার যোগান দেয়। দিন আর এখন গোপন নয়। কত বেলা হলো! তাঁরা দুজনেই চুপচাপ। তন্ময় আকাশ থেকে জল পতন দেখছে। কোন কাজের তাড়া নেই! ঝাঁঝালো গন্ধ একে কিন্তু তন্ময়তা ছুটে যায় তাঁদের। দুজনেই পেছন ফেরে। ছাগলটা তখনো পিতরঙা জল ঢালছে। বর্ষা-বাদলার দিনে ছাগল নিয়ে হয় আর এক যন্ত্রণা। ঘরের বার করা যাবে না। এমনই জীব! তার চুনার দেখ কী গন্ধ! ঘরে টেকা দায়। মেঝেটাও বানাবে বোরো ক্ষেত। ভেজা টুপটুপা ঘর, তার উপর ছাগলের চুনা, তার উপর খুরের দাপাদাপি। যদিও ছাগল রাখার স্থানটুকু প্রতিদিন লেপা-মুছা করতে হয়, করা লাগে নইলে দুর্গন্ধে রাতে ঘুমানো যায় না। কিন্তু আজ! দিন যদি ঝরঝরে না হয় তবে!
শাশুড়ি উঠে গিয়ে ছাগলটাকে চুনার উপর থেকে সরিয়ে মাচার মাঝখানের খুঁটিতে বেঁধে ঠিক মেঝের উপর দাঁড় করায়। বউকে আহ্বান জানায়: আওছেন দেহি, দুধফুটি পানেই। বেইল ত কম অয় নেই। ছাওগুইল্লে যেন নেছড়া নেইগে গেল এহাবারে। ছাইড়ে দেওন নাগবো।
তিনি ঘরের দক্ষিণ পাশে ঝুলানো এক শিকা থেকে দুধ দোয়ানো মাটির কাদা আর পশ্চিম পাশে বেড়ায় ঝুলানো কাঠের তক্তা থেকে সরিষার তেলের বোতল খুলে ছিপিতে অল্প তেল নিয়ে শিশিটা আবার ওখানেই রেখে ছাগলের পেট সোজা এসে বসেন। ওলানের বাটে তেল লাগাতে গেলে তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে উঠে ছাগল। তেল না লাগালে পিছল হয় না বাট। দুধ দোয়াতে অসুবিধা হয়। এই ছাগল দুধ দোয়াতে এমন করে না। বৃদ্ধা বাঁ হাতে ছাগলের পিছন দিকের ডান পা ধরে আটকাতে চেষ্টা করে। আটকাতে পারে না। ব্যাপার কি! ছাগলের হলোটা কী! আবার বৃদ্ধা পূর্বোক্ত পা চেপে ধরে। আলতো করে ওলান স্পর্শ করে। দুধের বাট দুটো কীসে কামড়িয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে রেখেছে।
: আ বউ, ইডে কী কারবার দ্যাহ না! ঘরো যেন আমার সাপ হান্ধায় আছে গোওলানডারে এহাবারে ঘাও কইরে ফালাইছে!
বধূ ততক্ষণে ছাগলের বাচ্চাগুলো খাঁচা থেকে ছেড়ে দিয়েছে। বাচ্চাগুলোও কি, তিড়িং-বিড়িং লাফিয়ে ছুটে বেরোয়। সবুর নেই একদম। লাফাতে লাফাতে এসে পড়ে পাত্রের উপর। পাত্রটাও ভেঙে যায়। দেখলি কাণ্ড! এহন ছাগলডা পানায়ে কই থুমু দুধ! ও সব্বোনেইশেরেঅনিষ্টকারী বাচ্চাটার পেটে একটা থুংনা মারে শাশুড়ি। আচ্ছা, ছাগলের বাচ্চা তো তিনটে। দুই বেরিয়েছে! বাকি এক বের হয় না কেন! বধূ এখনও খাঁচার কাছাকাছি মাচার নিচে মাথা ঢুকিয়ে রেখেছে। সে বাকি এক ছাগশিশুটির দেহ হাতে করে এনে মেঝের উপর শুইয়ে দেয়।
: দেখছেন মাজান, ছাওডা মইরে আছে।
শাশুড়ি অভিভূত তাকিয়ে দেখে মৃত ছাগশিশু। মুখে কথা যোগায় না। জীবিত ছাগশিশুদ্বয় মায়ের স্তন মুখে পুরে। মা ছাগল পা ঝাড়ে। শিশুর মুখ থেকে খসে যায় দুধের বাট। শিশুরা তবু লেগে থাকে ওলানে দুগ্ধ প্রত্যাশায়। দুগ্ধবতী ছাগল এবার দাঁড়িয়ে থাকে স্থির। ছাগশিশুদ্বয় প্রবল চুষণে দুধ পান করতে চায়। কিন্তু দুগ্ধফেনায় প্রসন্ন হয় না তাদের মুখ। শাশুড়ি বিমূঢ় বসে থাকে।  অতঃপর ছাগশিশুর পাশে বসে বিলাপ জুড়ে দেয়।
: ওরে আমার আল্লাহরে, এ কোন গজব তুমি আমার মাথায় দিতাছ গো…চেঙরা কালে আমি বিবধে অইছি গো…আমার  কইলজের টুকরা আইজ বাড়িত নেই ত গো …
: কী কান্দন জুড়া দিলেন এই বরবিয়ানেই! কাইন্দে কী অবোকান্দিলেই জিনিস ফিরা আইবো?
: আমার গলা টিপে দে, মাইরে ফালাতর তাইলেই কইলজে ঠাণ্ডা অবো, আপদ আমি ভাতার খাহুইরে মাগী। তুই আহার পরতনেই নক্কী ছাড়া অইছে আমার ঘর… বিচিত্র বিলাপের পথ!
বউ বিচিত্র বিলাপের পথ হাঁটে না। দরোজা দিয়ে বাইরে তাকায়। আউড়া-কাউড়া বাতাস বিষ্টিতে এনেছে মাতলামী। কোন মাতলামীই দীর্ঘ হয় না কভু। বউ, শাশুড়ির মাথায় হাত রাখে। বুকের কাছে টেনে নেয়।
: মাজান গো, কাইন্দেন না। মুনেরে সবুর দেন। আপনের পোলা কতদিন বাড়িত নেই। বাড়িত আহে নানা জানি কুন বালার মদ্যে পইড়ে আছে! আপনের পালের দুইডে জীব তুইলে নিয়ে আল্লাহ আপনের পোলার ফাড়া কাটাইছে। মুনেরে বুঝ দেন। আপনের পোলা সুআলে-সুমতে ফিরে আহুক। আল্লাহ জিনিস ম্যালা দিব। খোদার ভাণ্ডারে কী জিনিস নাজাই পড়ছে।
বৃদ্ধা গোঙায় বধূর বুকে মুখ রেখে। মায়ের বুকে কাঁদে অবুঝ শিশু। বধূ দরোজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির ভেতর আলোর খেলা, ফুটছে। এতক্ষণ তাঁর চোখে ছিল জ্বালা। এখন শীতল অনুভব হয়। বৃষ্টি আর রইবে না বেশি সময়। আকাশ তো নীল রূপার মত হয়ে আছে। বৃদ্ধার ফুঁপানি কমে। থেকে থেকে ফেলে শুধু দীর্ঘশ্বাসআল্লাহরে, আল্লাহ!
: মাজান, দ্যাহেনছেন কুনো গাছে কাঠল পাকছে কিনা! খড়ি-খ্যাড় ত সব ভিজে আছে। চুইলে ধরামু কী দিয়ে, আন্দিমু বাড়িমু কীবেই। বিষ্টি ছাড়লে পরে দেহি আন্দিবের পাই কিনা! এহন কাঠল থাকলে ভাইঙ্গে খাওন যাবনি।
শাশুড়ি বধূর বুক থেকে মুখ তোলে। ঘোলা চোখ এখন লাল টকটকে। চোখের নিচে জল প্রবাহের চিহ্ন। বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর চাপে নাকের স্বচ্ছ ঘন তরল সাফ করে। আঁচলে নাক চোখ মুছে। চোখ জ্বলে। হায়রে খোদা! তোমার কী চোখ, জীবিধরা দুইডে জিনিসবৃদ্ধা দরোজায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে হাত বাড়ায়। আজলা ভরা পানি চোখে দেয়। বৃষ্টিতে নেমে পড়ে না।
বউ হুচাঁর মধ্যে মৃত ছাগশিশু, কাটা মুরগির লাশ উঠায়। ঝাঁটা নিয়ে ছাগলের গু একত্র করতে শুরু করে। শাশুড়িকে বলে: বিষ্টি সাফ অবার আগেই মোল্লা বাড়ি যান গা। কাগজটা মাথাত দিয়ে যান। আবার কেউ ডাকপের জন্যে বাড়িতে আয়ে পড়বো। নেই জুঞ্জাল বাজব!
শাশুড়ি উঠোনে নামে মাথায় বৃষ্টি নিয়ে।
কাকভেজা শাশুড়ি ঘরে ঢোকে হাতে একটি কাঁঠাল। তিনি কাঁঠাল ভাঙা শুরু করলে বউ হুঁচা ভর্তি কাটা মুরগি, ছাগশিশুর লাশ, ছাগলের গু, মুরগির গু প্রভৃতি আবর্জনা কাঁখে ঘরের বার হয়। বাড়ির দক্ষিণ দিকে ভাসান জল। কোন বাড়িঘর, একাকী গাছ খাড়া, কিছুই নেই। ভিটা টুবুটুবু জলের ধারে দাঁড়ায় বধূ। দখিন হাওয়ার টানে ঢেউ উঠছে জলে। ছোট ছোট সোহাগিনী ঢেউ। স্রোত যদিও টানে পূর্বদিকে।
ভাসান জলে বধূ ছুঁড়ে মারে কাঁখের আবর্জনা। কাছেই ছড়ায় প্রভৃতি গু আর মুরগির আলগা পশম। তারপর কাটা মুরগির দেহ। তারপর ছাগশিশু। ছাগশিশু খানিক জল আন্দোলিত করে ডুবে যায় এবং ভেসে উঠে। দখিন হাওয়ায় উঠা ঢেউয়ে কিছুই বধূর দিকে ফিরে আসে না। পূর্বদিকে চলে স্রোতের টানে। তাকিয়ে তাকিয়ে বধূ প্রিয় প্রাণী ও প্রাণীর চিহ্ন ভেসে যেতে দেখে।
শূন্য হয়ে বধূ উঠোনের দিকে ফিরে। তখন তার চোখে ধরা পড়ে মনুষ্য পদছাপ। উঠোন থেকে, মনে হয় এই কেবলি নেমে এসেছে জলের দিকে কেউ। সে হাতের হুঁচা ঘরের বেড়ায় ঠেস দিয়ে রাখে। পদচিহ্নের খোপে নিজের পা ঢোকায়। না এ পা তাঁর নয়। অন্য কারও। যেমন বড় তেমন চওড়া। এত  বড় পা নয় বৃদ্ধারও। বধূ প্রতি পদচিহ্নে পা ঢুকিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। চিহ্ন হারিয়ে গেছে এক দলছুট পানার তলে। স্রোত একাকী পানাকে ভাসিয়ে নেয় নি। ঢেউ অথবা বাতাস এ ছোট্ট দ্বীপ বাড়ির ভিটায় ঠেলে দিয়েছে। বউ দলছুট পানাকে ভেজা ভূমি থেকে উপরে উঠায়। তার তলে কোন চিহ্ন নেই। সামনে এগিয়ে যাবার আর কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। সে পানা গাছটাকে পানিতে ছুঁড়ে মারবে? কিন্তু পানা গাছের ফুল তার ভালো লাগে। নরম সাদা-বেগুনী পাপড়ি। ঘন সবুজ পাতার ভেতর হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়ির ঘাটে আটকে থাকলে পানা ঢেউয়ের তাণ্ডব থেকে নিরাপদ থাকে মাটি। বধূ পানাটি যেমন ছিল বসে তেমনি বসিয়ে দেয়। স্রোতে আর ভাসায় না। এখন দেখা যায় যে পায়ে পায়ে বধূ জলের ধারে এসেছে সেগুলো ঘুরে আছে ঘরের দিকে। ও পা চিহ্ন ধরে আবার বধূ ছুটে উঠোনে। উঠোনে কেউ নেই। ঘরে উঁকি দেয়। ঘরেও মেলে না তৃতীয় কোন মানুষের সাড়া। আবার ছুটে আসে ও জলের ধারে।
সমুখে নিয়ে বানের পানি ঘোলা, বধূ থমকে থাকে। জলের বুকে নীরব গম্ভীর ঢেউ। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ঢেউয়ের নীরব চূড়ায় গভীর ফুটা করে চলছে অবিরাম। বধূ ঢেউয়ের মাথায় পা রাখে। বৃষ্টির পানি মিশে বহুত হিম জল। দেহ তাঁর কেঁপে উঠে না তবু। ঠাণ্ডা জলে তলিয়ে যায় তাঁর বুক অবধি। উন্নত বুকে সাঁটানো ভেজা শাড়ি। ঢেউয়ের হাতে ছেড়ে দিলে দেহ শাড়ির টানে তলিয়ে যেতে চায়। অঙ্গে অঙ্গে সুতোর বাঁধন অসহ্য। অঙ্গ প্যাঁচানো কাপড় থেকে মুক্ত হয় বধূ। আর জলগুলো কী খুশি হয়। ছলকে উঠে। ঢেউগুলো হেসে উঠে। নির্ভার লাগে তার। ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে জলের চলাচল ভালো লাগে। আহ্ শরীর জুড়িয়ে যায়। ধেয়ে আসা ঢেউ সুগোল ভার স্তনে দোলা দেয়। সারা দেহে বধূর কী যে কাঁপন জাগে। সে দুহাতে চেপে ধরে বুক। তৎক্ষণাৎ ঢেউয়ের মুখে ছেড়ে দেয় আবার। প্রস্ফুটিত হয় তার স্তন ও স্তনের বোঁটা। খোলা বুকে আছড়ে পড়ে একের পর এক ঢেউ। এবং বউ অনেক জল নিয়ে লাফিয়ে উঠে, লাফায়। এবং দুহাতে ঠেলে দেয় ঢেউয়ের মুখে ঢেউ। বিপুল আনন্দে কলহাস্যে আন্দোলিত হয় জল। ঘাটে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা বিবসনা বধূর কীর্তি দেখে। তারপর: ক্যা ম্যাডা, ইল্লে কী কারবার! ছি ছি ছি…. শরম-বরম ব্যাবাক খায়ে ফালাইছস। কাপড় পিন্দ শিগগির।
হঠাৎ মনুষ্য কণ্ঠের আওয়াজ পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় বধূ। পানিতে ডুব দেয়। বেশিক্ষণ পানির তলে নিজেকে ধরে রাখা যায় না। এতক্ষণ দাপাদাপিতে হাঁপ ধরে গেছে। মাথা ভাসায়। পুরোপুরি না। শুধু নাক আর চোখ জলের উপর উঠে আসে। বেহায়া জলের জোস থামে নি এরপরও। তবে তারা উচ্ছ্বল যুবতীকে আর পায় না। তাই তারা তখন ভাসমান দীঘল চুল নিয়ে খেলায় মাতে। ভাগ্যক্রমে শাড়ি স্রোতের টানে ভেসে চলে যায় নি। বধূর বাঁ হাতে আঁচলের একপাশ পেঁচিয়ে ছিল তখনো। শাড়িটাকে বধূ আবার দেহে জড়িয়ে নেয়।
: বাড়ির বউ-ঝির এল্ল্যে এডা কারবার অইলো। বরফের নাখলা ঠাণ্ডা পানি, এহন যুদি এডা জ্বর-জারি বান্দে তাইলে বালা অবো। পুনেই মাইনষের নাখলা যে অবাহা বিষ্টি মাথাত নিয়ে জাপুই খেইল শুরু করছ! ঘাটের পশ্চিম পাশে বাঁধা কলার ভেলায় উঠে লগি ঠেলতে ঠেলতে শাশুড়ি ঝনঝন বাজতে থাকে: আল্লাহ আমারে ফালাইছে এক আজাবো। এত মাইনষের মরণ অয় আমার মরণ আহে না। আজরাঈলের চোখ কানা অইছে। পোড়া চোহে আর ইল্ল্যে এত দেখপের পাইনে, সবার পাইনে…
মাথা নিচু বউ ধীর পদক্ষেপে সেই পদচিহ্ন খুঁজতে খুঁজতে বাড়ি প্রবেশ করে।
সবুজ জমিন লাল জরি পাড় এক শাড়ি পরে বধূ দরোজায় বসে আছে। কোন কাজ নেই হাতে! অন্যদিন এমন নির্জন একাকী মুহূর্তগুলোয় শিকা বুনে, নকশীকাঁথা সেলাই করে। আজ করে না। রাতে ঘুম হয় নি মোটে। শীতল জলে ডুব দিয়ে আসার পর চোখে জ্বালা শুরু হয়েছে। খানিক ঘুমিয়ে নিলে আরাম পাওয়া যায়। ঠণ্ডা দিন কাঁথা জড়িয়ে ঘুমুতে ভারি মজা। বিছানায় যেতে ইচ্ছে করে না। দিবানিদ্রার অভ্যেস নেই। ছাগলের সামনে ভাঙা কাঁঠালের উচ্ছিষ্ট। এই প্রাণী দুনিয়ায় এমন কিছু আছে যা খায় না! হলুদ রোয়া টানছে ছাগল। ছাগশিশুদ্বয় কী হয়েছে লাফালাফি করছে না। শুয়ে আছে চুপচাপ। আর বাচ্চা নিয়ে পাখার ওমে নিশ্চুপ মুরগি। শীত লাগছে।
ঝুম বৃষ্টি আবার। বধূ শনের চাল চুঁয়ে পড়া বৃষ্টির জল বহে যেতে দেখে। কোন কাজ করতে ইচ্ছে হয় না। শনের ছাওয়া চাল নতুন নয়। এবার বর্ষার আগে ঘর ছাওয়া হয় নি। শনগুলো পঁচে গেছে মনে হয়। চুয়ে আসা পানি লাল টকটকে। ছাঁেচ একটার পর একটা ফোঁটা পড়ে। ফেনা হয়। রক্তের ফেনা বহে ঘরের ছাঁচে, উঠোনে। বধূ রক্তের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে দেয়। ভেজা তর্জনী জিভে ছোঁয়ায়। না নোনতা নয়। রক্তের স্বাদ নোনতা হয়; উষ্ণ হয়। কিন্তু এ অনেক ঠাণ্ডা। আর স্বাদ পানশে। কিছু তেতোও লাগে যেন!
থুউ থুউ… বউ দাঁত দিয়ে জিভ চেছে রক্তের মত ফেনায়িত জলের স্বাদ ছুঁড়ে ফেলে। পায়ের নিচে বিড়বিড় করে কী! বধূর শরীর  শিরশির করে। এক কেঁচো তাঁর পায়ের তলে ঢুকে পড়েছে কখন। লাল জলের গভীর থেকে উঠে আসা এ কেঁেচা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফ্যাকাশে। বধূ পা সরিয়ে নেয়। কেঁেচা ঘরে উঠে যায় কিন্তু চটকে দেয় না বাইরে। অথচ জলের মত রক্তের ফেনাতার গভীর থেকে উঠে আসা কেঁচো দেখে, রক্তরূপ পানির স্বাদ গ্রহণ করার কথা মনে হলে বমির উদ্রেক হয়। সে উঠে গিয়ে মাটির ঘটি থেকে মুখ ভর্তি সুপেয় পানি নিয়ে কুলি করে। গরগরা করে গলা অবধি ধুয়ে ফেলে। আজ এখনও ওপাশে শুয়ে থাকা রুগ্ন মানুষটির কাছে যাওয়া হয় নি। মানুষটা ডাকে নি তাঁকে। এত বেলা যে হলো, কই কোন সাড়া শব্দও যে করে না। একটু খোঁজ নিতে হয়। খোঁজ নেওয়া দরকার।
লোকটা কাঁথা মুড়ে শুয়ে আছে বেড়ার দিকে মুখ করে। জ্বর বুঝি খুব বেশি উঠেছে আজ মানুষটার। মরার মত পড়ে আছে। কী চাপা স্বভাব। একবার ডাকতে হয় না! দাঁত চেপে কষ্ট নিয়ে পড়ে থাকবে তবু ডাকবে না!
বধূ বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর এত অল্প আলো কিছু ঠাহর করাই মুশকিল। কাঁথা মুড়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে বউ। নাহ, নড়াচড়া করে না কেন? ঘুমিয়ে হয়তো। এ ঘরের মেঝে ঠাণ্ডা কত। পায়ের তলা দিয়ে ঠাণ্ডা ঢুকে ঠাণ্ডা উঠে যাচ্ছে শিরদাঁড়া হাড় বেয়ে। ইস, গা শিরশির করছে। বধূ বিছানায় লোকটির বুকের কাছে বসে। তবুও নাকি মানুষটার ঘুম ভাঙে। নাকি সে জ্বরের ঘোরে অচেতন একদম। কপালে হাত রাখে বউ। মানুষটা হাতের স্পর্শ পেয়ে চিৎ হয়। করুণ দৃষ্টি নিয়ে বউয়ের মুখে তাকিয়ে থাকে। বউয়ের মুখ খোলা। মাথায় ঘোমটার আঁচল নেই। খোলা চুল ভিজে পড়ে আছে পিঠে। বধূ এই বেশে আসে নি কখনো লোকটার সামনে। সে লোকটির দেহের তাপ পরখ করে। জ্বর নেই একটুও। জ্বরতাপ নয় তবুও তাপ আছে।
আর মানুষটা না কী করেআচমকা বউয়ের কোলে মুখ ডুবিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে। পুরুষ মানুষ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে! বেটা মানুষ কাঁদলে শরীরে বলক উঠে কেমন। মানুষটা বউয়ের কোমর জড়িয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। বউ তো এদিকে দিশেহারা। এ আলোড়ন থামায় সে কী করে! বধূ দশ আঙুল লোকটির মাথার চুলে ঢুকিয়ে দেয়। তঁর মাথায় ঘন লম্বা চুল। তবে বড় পিছল। এত চেষ্টা করেও চুলের সাথে আঙুলের গিঁট লাগাতে পারে না। আবার দেখ, মানুষটা তলপেটে নাভির কাছে কেমন ঘষে মুখ! বউয়ের ভেজা ত্বক। কিছু আগেই জলে ভিজেছে। লোকটার নাকের ঘষা যখন ভেজা ত্বকে লাগেইস্, শরীর ঝিম ধরে যায়। বধূ লোকটির চুল খামচে ধরে। বন্ধ হয়ে আসে চোখ। পা দিয়ে চেপে ধরে মাটি। দেহ কুঁকড়ে উঠে। লোকটির মাথা চেপে ধরে নাভীর গভীরে। আবার সামনে ঠেলে দেয়।
: আপনের কী অইছে, এবাহা করতাছেন ক্যা! আহ্, দেহিহুনেনছেন? মানুষটা আর মুখ ঘষে না। কোল থেকে মুখও তুলে না। অল্প অল্প ফুঁপায় তখনো। বউ কোলের উপর থেকে মাথাটা  দুহাতে ধরে বালিশে শুইয়ে দেয়। কিছু খড় আর কিছু পাটের উচ্ছিষ্ট দিয়ে বানানো শক্ত বালিশ কোলের চেয়ে কম আরামপ্রদ। লোকটি তারপরও বালিশেই মাথা রাখে। এবং বধূর মুখে প্রশ্ন ছোঁড়ে
: তুমি এত পরে কেন এলে? জান না, তোমাকে বলি নিআমার কেমন একলা লাগে, উপর-ফাফর করা কী কষ্ট হয়! লোকটির ভেজা চোখ। ভেজা চোখের নিচে কালো নদী বহার দাগ।
বধূ এইসবে রাখে না চোখ। মানুষটার মুখের দিকে দেখতে পারে না। তাঁর চোখে জ্বালা ভীষণ। সে দৃষ্টি ফেলে রাখে ভেজা, হিম কালো মাটির উপর। নয়নে তবু শীতল ছোঁয়া কই! বধূর বুকের আঁচল কিছু এলোমেলো। ঠিক করার তাগিদ নেই। এলোমেলো আঁচলের কোণা আঙুলে পেঁচায় সে।
: আপনে হুনছেনগেল আইতো যে আমার ডেহি চড়–ইডেরে কীয়ে যেন মাইরে ফালাইছে। যিডে আপনের ঠ্যাঙ্গ মদ্যে খামচা পাড়ছিল, চড়ুইডে আমার সহালে দেহি মইরে আছে!
কাল দুপুরবেলা রোদ উঠে চিমসে। তখন আজকের মৃত চড়–ইয়ের কিছু কীর্তি উদ্ভাসিত হয়। ভাদ্র মাসের অস্বচ্ছ আকাশ। কতক মেঘ উড়ে, কিছু বা থমকে থাকে তাঁবুর মত। মেঘের ফাঁক গলে চোরা রোদ পৃথিবীতে আসে।
লোকটি বধূকে ডেকে পাশে বিছানায় বসায়। সে এ বাড়িতে আসার পর বধূর আন্তরিক সেবায় ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। সেবা করার সময় বধূর কখনো অপ্রস্তুত লাগে না। কিন্তু ইদানিং মুখোমুখি বসে কথা বলতে থৈ পায় না। তাই মেঝে দেখে। ঘরের ভেতর আঁধার আঁধার। বাইরে আলো আছে। ঘরেও আসছে, এসেছে আলোর আভা। দেখা যায় সব। আবার চেনা যায় না পষ্টাপষ্টি কিছুই। পর্দার মত ছায়া দোলায় লোকটির কথা।
: সময় কাটতে চায় না আমার একদমই। খুব একলা একলা লাগে। আর উপর ফাঁপর। মাথার মধ্যে নানান চিন্তা ঘোরে। নানান কিসিমের গল্প তৈরি হয়। কত কত নস্টালজিয়া। এইসব তোমার কাছে বলতে আবার ভালোও লাগে। মাঝে মাঝে কী মনে হয় জান!
লোকটি বধূর মুখপানে তাকিয়েই কথা কয়। কিন্তু বউ বাম পায়ে মেঝে চেপে ধরে বসে আছে। ওর পায়ে আছে জ্বালা-পোড়া অসুখ। ঠাণ্ডা রস মাটি থেকে পায়ের গভীরে প্রবেশ করলে আরাম হয়। ও মাটি থেকে রস টানে। ডান উরুর উপর আঁচল পেতে শাড়ির পাড়ের নকশা দেখে। রূপালি সুতোয় বোনা নকশী পাড় নীল জমিন শাড়ির আঁচল। লোকটি বধূর কোলে রাখা ডান হাতে হাত রাখে। বউয়ের শরীরে কাঁপন জাগে। থেমে যায় আবার তখনি। পায়ের তলে পোকা বিড়বিড় করলে কিংবা অতি টক তেঁতুল দাঁতের তলে পড়লে বা বালি কণা, যেমন দেহে সহসা ঝাঁকুনি লেগে সহজ হয় অনুভবতেমন কেঁপে বধূ সহজ হয়। লোকটার মুখের দিক দেখে। চোখে চোখ পড়ে। সদ্য টক খাওয়া দাঁতে আর ভবঘুরে হাওয়ার হালকা পরশ লাগে। আবার শিরশির করে দেহ। তাই চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বধূ রাখে চোখ লোকটির মাথার পেছনে। নাছোড় বাতাস কানের ভিতর ঢুকিয়ে দেয় ফিসফিস।
: এই কথাটা কয়েকদিন হলো ভাবছি। ভাবি: আমার সামনে কিছু আর নেই এখন। ভবিষ্যত ধূসর মনে হয়। কখনো তো একদম ঘুটঘুটে আন্ধার দেখি। পেছন আছে কিছু তাও খুব অস্পষ্ট, মায়ামায়া। আর আছে আমার এই বর্তমান। বর্তমান অবশ্য তোমার সামনেই পড়ে আছে। এ নিয়ে বলবার কী আছে। তোমার ঘাড়েই তো পড়ে আছি। বলবার কী আছে!
বউয়ের চোখে বাস্তুহারা মাকড়সা এক। শীর্ণ পায়ে আঁকড়ে আছে শোলাখড়ির বেড়া। বিষণœ ও ভারী পদক্ষেপে হাঁটে ইতস্তত। পরখ করে নতুন জালের খুঁটি? না জানি কত শ্রম লাগে একবার জাল বুনতে! কত নিখুঁত বুনে ওরা জাল। ভোরবেলা ঘর ঝাঁট দেবার কালে বউ ভেঙেছে কয়েক মাকড়সা বাসা! মাকড়সার ঝুল-কালি ভালো লাগে না বউয়ের। প্রায়ই, যখন চোখে পড়ে ধরা অবাঞ্ছিত বাসাবধূ ভাঙে সহজে। ঝুল-কালি জাল মুক্ত পরিপাটি হয় ঘর। কী কষ্ট হয় মাকড়সার বাসা হারা হলে! মাকড়সার ফ্যাকাশে চোখ থেকে খসে খসে পড়ে হতাশা করুণ।
: তবে কীতোমার সাথে গল্প করা খুব আনন্দের বস্তু হয় আমার কাছে। বর্তমানে এইটুকুই যেন আলোতুমি, তুমি আছ বর্তমান। আমার আনন্দ। আর কী! আমি বাঁচি, বেঁচে আছি। বাকিটুকু শুধুই নিরানন্দে ঠাসা। মৃত হতে থাকা। মরে যাওয়া!
আবছা আবছা দেখা যায় লোকটির চোখে খাঁখাঁ শূন্যতা। আগুনের নদী ধেয়ে চলে পুড়ে পুড়ে। যদি জলের প্লাবন আসে তবে সে বাঁচে। মুঠোয় ধরা আছে বধূহাত। দূরে শোনা যায় জলের ডাক, বান অথচ আসে না।
বউয়ের কোলে পাতা আঁচলে পড়ে এক টিকটিকির কাটা লেজ। ভীত হয় বউ। ভীত হলে দেহে যে ঝাঁকি লাগে তাতে লোকের হাত থেকে বধূহাত মুক্তি পায়। আচঁল থেকে মেঝেয় ছিটকে পড়ে টিকটিকির কাটা লেজ। জীবন এখনো বর্তমান ও লেজে। তাই লাফিয়ে উঠে। আর তখনই সাঁ করে মুরগি এক এসে ঠোকর দিয়ে মুখে তোলে নেয় লেজ। তারপর ঘাড় সোজা টানটান করে, গর্বিত ভঙ্গি তার। ডানে বাঁয়ে কাঁত করে ঘাড় আর উপর নিচ দেখে। এমন স্বাদু খাবার আরও আছে কিনা কোথাও আশেপাশে খোঁজে। অথবা সরু গলা দিয়ে লেজ ঢুকতে চায় না তাই অমন কসরত করতে হয়। খুশিতে ডাকে ক্যা ক্যাক ক্যা…
: খুব ভয় পেয়েছপোকা মাকড়ে তোমার খুব ভয় না?
আঁচল বউয়ের আউলা হয়ে যায়। শরীর ভরা যৌবন ঢাকতে হয় অইটুকু আঁচলে! কোন উদাসীন মুহূর্তের অসতর্কতা পেলেই ফুঁেড় বেরিয়ে আসতে চায়। বধূ আঁচলে যৌবন বাঁধে। লোকটি আঁচল ফুঁড়ে বউয়ের বুকের গভীরে তাকিয়ে থাকে। এবং চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খোঁজে কী! টিকটিকি সঙ্গমে মেতেছে কোথাও। তাদের দেখা যায় না!
কোন ফাঁকে মুরগি লাফিয়ে উঠে বিছানায়। লোকটির পায়ের পাতায় চড়ে বসে। আঙ্গুলের ডগায় ঠোকর দেয়, কাঁথা খামচায়। মুরগিটিকে পায়ে ঠেলে দিতে যায় লোকটি। পারে না। সবল নয় তাঁর পা। বরং ব্যথা পেয়ে নিজে, ভেঙে ভেঙে যায় তার মুখের ছবি। বধূ হাতের ইশারায় মুরগি তাড়ায়।
বিছানা ছাড়ে চড়ুই তবে ঘরের বার হয় না। বিষ্টি-বাদলার দিন চড়ুই-টডুই ঘরের বাইরে যেতে চায় না। মেঝেময় পায়চারি করে। কোন খাদ্যকণা পেলে দ্বিধাহীন ঠুকরায়। চাপা শব্দে ডাকে ক্যা ক্যাক ক্যা…
: আপনের ঘায়ে জ্বালা করতাছে মেলা?
: কাপড়ের বাঁধন ঢিলা করে দাও। জায়গাটায় খুব টনটন করছে। পাশ ফিরে শুতে পারি না। মাঝে মাঝে ব্যথায় মগজ ধরে যায়। ইনফেকশন ধরে গেল কিনা কে জানে?
বধূ লোকটির পায়ের দিক থেকে কাঁথা ভাঁজ করে উপরে উঠায়। উন্মোচিত হয় না তখনো তাঁর উরুর ক্ষত। ছাইরঙা তবনের তলে ঢাকা পড়ে থাকে। যদিও খোলা আছে হাঁটু অবধি। এই তবন বধূর স্বামীর। বিশেষ দিনে পড়ার জন্য তোলা ছিল। তাঁর স্বামী নেই গৃহে। লোকটি গৃহে আশ্রিত হবার পর তারই বসন হিসেবে হয় ব্যবহৃত; অতি  যতেœ রাখা তবন। হাঁটু থেকে আরও আঙুল আষ্টেক উপরের দিকে গুঁটিয়ে নিলে লুঙ্গি বাম উরুতে উদ্ভাসিত  হবে দারুণ ব্যান্ডেজ। শাড়ির ডোরা ছিঁড়ে বাঁধা ব্যান্ডেজে চাপা ভীষণ ঘা। বউ পাকিয়ে পাকিয়ে লুঙ্গি উপরে তুলতে থাকে। তাঁর হাতে ভেজা থিকথিকে শীতলতার অনুভব আসে। তবনের এক জায়গায় ভেজা গোল চিহ্ন। কষ ঝরে নি ক্ষত থেকে। ব্যান্ডেজ শুকনো। বউয়ের গা ঘিনঘিন করে। আঁশটে গন্ধ মরে যায় নি এখনো। বউ এই গন্ধ, এই থিকথিকে অনুভব বিয়ের দিন থেকে চিনে। সে লুঙ্গির শুকনো জমিনে ঘষেঘষে আঙুল মুছে। হাতটা ধোয়া দরকার।
: আইজকে ফুলা মুন অয় এল্লা কমছে। ঘাওতনে কষ পড়ে নেই। আপনে এহন আরাম করেন। পরে আবার দেহিরো। আমি এহন যাই।
ঘরময় চড়–ই ঠোঁটের কঠিন আঘাতের শব্দ। মুরগিটা ওভাবে বেড়া ঠুকরায় কেন। সারাদিন বিষ্টিতে ভিজে শোলাখড়ি নরম ভুঁসভুঁসে হয়েছে। চারদিক থৈ থৈ পানি। আধুলির সমান উঠোন। উঠোনের মাঝে ছোট্ট কুঁড়ে ঘর। টুবুটুবু জেগে আছে বাড়ি। কখন ডুবে কে জানে। শোলাখড়ির বেড়া হয়েছে উঁইপোকার বাসা। চড়–ই উঁইপোকা খায়। বেড়াও যে থাকে না। বাঁধন খসে যায় শোলাখড়ির, চড়ুই ঠোঁটের আঘাতে। ডুবে না যাওয়ায় বাড়ি হয়েছে এইসব যন্ত্রণা। পোকা মাকড়ের বাসা হয়েছে। বিষ্টি হলে তো কেঁচোর ঠেলায় কোথাও পা রাখা যায় না। এইসব মুরগিয়ে খায়, হাঁস থাকলে হাঁসে খেত। কিন্তু ভাসান জলে হাঁস কয়টা কোথায় ভেসে যায়। পথ ভুলে গেছে। আর ফিরে আসে নি। খেলে কী হবেশেষ অবধি টিকবে তো বাড়ি। পোকায় না বাড়ির দখল নেয়। ঝলমলে রোদেলা দিন আসার আগেই না  উঁইপোকার নীরব আক্রমণে ধ্বসে যায় ঘর।
এই মুরগিটা আজ রাতে অপঘাতে হয়েছে লাশ।
লোকটি হাত বাড়িয়ে বধূর ডান হাত নিজের হাতে নেয়। দুমুঠোতে মৃদু চাপে ঢেলে দিতে চায় উষ্ণতা। বউ ডানে ঘুরিয়ে ঘাড় মানুষটার মুখের উপর চোখ রাখে। দৃষ্টির উপর চেপে আছে ঘন জলের পর্দা। জল স্বচ্ছ। যদিও পর্দার ওপারে স্বচ্ছ দেখা যায় না কিছু। পর্দা ছিঁড়ে গোলক ঝরলে চোখ থেকে স্পষ্ট দেখা যাবে সব। পর্দা ছিঁড়ে না, গোলক ঝরে না, স্পষ্ট দেখা যায় না কিছু। চোখের সমুখে বাতাস শুধু কাঁপে তিরতির।
: দুঃস্বপ্ন আজকাল আমাকে কাবু করে দেয় খুব। কাবু রাখে দিন রাত। রাতে দু চোখের পাতা এক করতে পারি না। একটুকু তদ্রা এসেছে কিনা আর হিজিবিজি কীসব ছবি ঘুমের পর্দা ফালাফালা করে ফেলে। আমি আতঙ্কে ছটফট করি। আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারপর সারারাত আর ঘুম আসে না। স্বপ্ন এমন, প্রথম মনে হয় আমার শৈশব ফিরে আসে বুঝি। দুরন্ত শৈশব আমার। তাড়িয়ে তাড়িয়ে মধুস্মৃতি আমার আর উপভোগ করা হয় না। হঠাৎ ভীতি এসে চাকু ঢুকিয়ে দেয় আমার বুকে। স্মৃতিরা রক্তে মাখামাখি হয়। তারপর স্মৃতিছবি শুধুই বীভৎস ভয় হয়ে আমার তন্দ্রালু চোখে লেপ্টে থাকে। আমার আর ঘুম আসে না। ঘুম হয় না সারা রাত। অপরিমেয় আঁধারে শিরশির ভয় আর ঘায়ের টনটন ব্যথা আর মন খারাপ করা একাকিত্বের ছটফটানি নিয়ে বিছানায় জেগে থাকি। কখন ভোর হয়। আলো আসে, তুমি এসে বসো আমার পাশে। আমি অপেক্ষা করি।
: এডা ছাগল পালি, দুইডে চড়ই; মাইনষের বাড়িত কাম করি। এবেই আঙ্গরে দিন যায়। আমরা গরীব মানুষ। গরীবের বাড়িত কপাল দোষে আপনে মেহমান। আমারও কী কপালঅসুইখে মানুষটার সামনে ঠিকমুতে একবেলা ভাত কি এডা পইথ্য ছুঁয়াবার পাইলাম না। আপনের কত কষ্ট অইতাছে। আইতো কোন গজবে চড়ইডে, ছাগলের ছাওডা মরল। মেহমানরে কষ্ট দিতাছি, আমার ঘরো ত ঠাডা পড়বই। ইদিহি মানুষটাও কই নিরুদ্দেশ অইছে, আইজও নাহি এডা কুনো খবর পাইলাম।
বউয়ের গলা ফুঁড়ে চোখ ছিঁড়ে উষ্ণ ও নোনতা জলের গোলক ঝরে। সব স্পষ্ট ধরা পড়ে। লোকটার মুখ, কত শুকনো। ঘরের আলো, কী নিষ্প্রভ। বউ বাঁহাতে চোখ মুছে। ঝিরঝির ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশে অথচ চোখ জুড়ায়। হালকা হয়ে উঠে বুক।
: সারা রাত বৃষ্টির পানি পড়ে কাঁথাটা ভিজে একশেষ। পায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিবে একটু, কাঁথাটা।
ঘরে এত জায়গা থাকতে লোকটার উপরেই পানি পড়ে। সবে ভাদ্র মাস। আরও কমসে কম দেড়-দুই মাস টানা বর্ষণ হবে। চাল চুঁইয়ে পানি পড়া শুরু। বাকি দিন কীভাবে যাবে। বউ ভেজা কাঁথা গুটিয়ে নেয়। একটা শুকনো কাঁথা দেবার দরকার। কিন্তু লোকটি যেতে দেয় না বধূকে।
: শোনভাবছি, আমি বাড়ি ফিরব। তোমার উপর অত্যাচার হয়েছে অনেক। মায়ের ছেলে মায়ের কোলেই ফিরে যাব। তোমাকে জ্বালাতন আর না। …আমার কী আর বাড়ি আছে এখন! এই সময়ে এই অবস্থায় বাড়ি ফেরা আমার জন্য নিরাপদ হবে? আমার ভাবনায় ধরা পড়ে না কিছু। ভালো লাগে না কিছু। খুব ফাফর লাগে আমার। খালি খালি পঙ্গু হলাম।
বউ ভেজা কাঁথা বুকে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মেঝের উপর পায়ের আঙুলের ডগায়। সে ডান পায়ের গোড়ালি কেন্দ্রে রেখে অর্ধবৃত্ত আঁকে। একটা, দুইটা… সাতটা। আর লোকটা স্থির তাকিয়ে আছে বউয়ের মুখে।
: অথর্ব, অর্ধমৃত আমি কোথায় যাব? কে আমাকে নিরাপদ আড়াল, আশ্রয়, সেবা দেবে তোমার মত। এই দুর্বিনীত কালে। যে নিদারুণ সময়অনাহুত ঝঞ্জাট আর তুমিই বা কত সামলাবে! ভাসিয়ে দাও, চুকিয়ে দাও ল্যাটা। ভাসব অকূলে। পঁচে গলে খাবার হয়ে মাছের নিঃশেষ হব। তবু যুদ্ধে আর ফিরে যাব না। এভাবে মানুষ যুদ্ধ করে। দেশ স্বাধীন হবে না কচু! কী হবে এইসব গণ্ডগোল করে?
লোকটির কানের কাছে মিহি পাখা ঝাপ্টার শব্দ। বধূ কাঁথা নিয়ে চলে গেছে বেড়ার ওপাশে। ঘরে এখন সে একা। শব্দ থেমে যায়। অল্পবাদে আবার শোনা যায় ফরর…। লোক ঘাড় ঘুরিয়ে বেড়ার ওপর চোখ ফেরায়। শব্দটা মাথার কাছে বেড়া আর  বিছানা পাতা মাচার কাছ থেকেই আসছে। সেখানে আছে মাকড়সার জাল। জালে আটকা পড়েছে প্রজাপতি। প্রজাপতির মিহি পাখার আর্তি শোনা যায়। মাকড়সা জালের আঠায় আটকা তার পা আর এক পাখা। এক পাখার হাওয়ায় ভর করে সে মুক্তির জন্য ছটফট করে। মুক্তি সে পায় না। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে মাকড়সা। প্রজাপতির পাখায় যেখানে বহুত রঙের ঝিলিক মাকড়সা চুম্বন করে সেখানে। মুক্তির আকাঙ্খা ছাড়ে না প্রজাপতি। সে পাখায় বাতাস টানে। শব্দ হয় ফরর… ফরর..। জাল কাঁপে। জাল ছিন্ন হয় না। প্রজাপতির মুক্তি মেলে না। মাকড়সা আয়েসে চেটে ভক্ষণ করে প্রজাপতির অস্থির দেহ। এ খেলা তরিয়ে তরিয়ে ভোগ করার মত।
শুকনো কাঁথা হাতে ফিরে এসেছে বধূ। সে লোকটির দেহ নতুন কাঁথায় মুড়িয়ে দেয়। সাদা রঙ কাঁথার চার পাড়ে সবুজ লতাপাতা। ফাঁকে ফাঁকে একটি দুটি লাল ফুল। কাঁথার জমিনের ঠিক মাঝখানে একটি বৃত্ত। বৃত্তের ভিতর প্রস্ফুটিত গোলাপ জবার ডালে বসে আছে কোকিল।
বধূ লোকটির বুকের কাছে বিছানায় বসে। হাতের নখ খুঁটে। আঁচলের প্রান্তে বেরিয়ে থাকা সুতোর মুখ টানে। এবং বলে: এই শরীল নিয়ে আপনে কুনো হান্তি যাবার পাবেন না। লোকটি কিছু বলে না। সে মুখ ঘুরিয়ে রাখে মাকড়সার জালে। প্রজাপতি আর পাখা ঝাপ্টায় না। ঘরে নেমে আসে সুমসাম নীরবতা। নৈঃশব্দ ভাঙে বধূ।
: গাঁয়ে মদ্যে বেবাক মাইনষের মুহে মুহে রাওআঙ্গরে উনি কামে যাওয়ার নাম কইরে যুদ্ধে গেছে। কী জানি গেছে কি গেছে না; আল্লাহ মাবুদ জানে। আর জানে মনুষটা। ঠিক ঠিক ঠিক… টিকটিকি জানায়। এই ‘ঠিক’ জানলেওয়ালা সামনে নেই। কোথা থেকে জানায় কে জানে! বউ চমকে উঠে আচানক ‘ঠিক’ আভাসে। নড়েচড়ে বসে; আর হাতের আঙুল, নখ এইসব চিমটায়।
: আপনে যিদিন আইলেন তহন তনে মুন খানিক বল পাইছি। মাজান নুন দিয়ে আপনের পিঠ তনে জোঁক ছাড়ায়। অক্তে ভাইসে যায় পানি! আমার শরীলডেও ঝরঝরা অয়ে উঠে। মুন মদ্যে বুঝ আইছে। আঙ্গরে উনি দিন রাইত পানিত ডুব পাইরে পাট কাটপের পায়। শরীলে জোঁক ধরলে দাও দিয়ে এক ফ্যাসে কাটপের পায়। বেহুঁস অয় না। উনি যুদ্ধে যায়ে থাকলে দাও দিয়ে ফ্যাসায়ে ফ্যাসায়ে জোঁকের অক্তে পানি ভাসায়ে ঠিক ঠিক বাড়িত আয়ে উঠপ। আমার কাছে গরম পানি চাবো। আমি ভাতের ফ্যানে নেবু রস চিপে দিমু শরবতের নাহাল। আমি পথ চায়ে আছি। এই বুঝি উনি বাড়িত পা দিয়েই আমারে ডাক ছাড়েন।
বধূ শায়িত লোকটির মুখের দিকে মুখ ফেরায়। কাঁথায় মুড়ানো লোকটি কাঁথার নকশায় হাত বুলায়। কিছু বলে না। কাঁথায় আঁকা পাখি দেখে। কান পাতে গান কোন ভেসে আসে কিনা! বধূর মুখের দিকে দেখে। বধূর নাকের ডগায় তিনটি মুক্তোদানা টলোমলো করে। নাকের তলে ঠোঁটের খাঁজে আরও কয়েক। বধূর কথার সাথে মুক্তারা আলোর ঝিকিমিকি খেল দেখায়।
লোকটির হাত প্রসারিত হয়ে যায় বধূর নাকের ডগায়। ওখানে ফুটে উঠা মুক্তোয় তর্জনী ছোঁয়ায়। মুক্তো ফেটে হয় চৌচির। তর্জনীর ডগা ভিজে। তারপর ভেজা তর্জনী জিভ দিয়ে চাটে লোকটি। তাঁর হাত আবার প্রসারিত হয় ঠোঁটের খাঁজে। সেখানে বুড়ো আঙ্গুল ঘষে। এবার মুক্তোগুলো গলে পিছলে যায়! আঙুল ভিজে না। যতই ঘষে আঙুল ভিজে না। আবেশে বউয়ের চোখ বন্ধ। মানুষটার হাত দুহাতে চেপে ধরে।
নাহ, ছাগলটা অমন ম্যাঁ ম্যাঁ করছে কেন! কুসিন দেখল! বাইরে বিষ্টি থেমে গেছে। ছাগলগুলো ঘরের বার করতে হবে। মনুষটার হাত ঠেলে দিয়ে বধূ উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু লোকটি তাঁর হাত ধরে রাখে।
: আমাকে তোমার লাজুক জবাটা দেবে? পাপড়ি ছুঁয়ে লাজ ভাঙাব- দাও।
: জবা!
এত তীব্র আকর্ষণ আসে বধূর হাতে!
ভেজা মেঝের উপর লুটোপুটি খায় নকশী কাঁথা। করুণ ও শীতল হয় জবা ও কোকিল!

অগ্রহায়ণ ১৪১৮