Archives

আমাদের ঘুম ভাঙাবে পরজন্মের পাখিরা!

প্রাক্কথন

অনেক অনেক দিন পর আজ আবার ভাঙাচোরা জ্যোৎস্নার নিচে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মুখরা হয়ে উঠল আমাদের না-বলা কথামালা। সম্মুখে বিশালাকার অশ্বের মতোই কিছু অন্ধকার গাছপালা তারই একান্ত শ্রোতা। বৃষ্টি এইমাত্র ছুঁয়ে গেল আমাদের, আর বলে গেল সে আর কখনও আসবে না এভাবে! আমরা তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। চুপচাপ। সে চলে গেল। আমাদেরও কি দাঁড়িয়ে থাকা উচিত? একটা লুনাটিক অশ্বের খুড়ে এই প্রশ্ন যখন ছটফট করছে ঠিক তখনই দেখি চাঁদও বিদায় নিচ্ছে আকাশের শামিয়ানা থেকে। অতএব আরো কিছুক্ষণ আহাম্মকের মতোই দাঁড়িয়ে থাকা, আর কনফেশন বক্সে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলা একান্ত শিশুর মতো।

এক

কীভাবে এলাম বলা মুশকিল। শুধু এটুকু বলতে পারি, এসেছি। আসলে আসার কথাই যে ছিল না আমাদের। সেই কবে ডুবে যাচ্ছিলাম জলে। সেই কবে ভেসে যাচ্ছিলাম ঝোড়ো হাওয়ায়। সেই কবে ঝুলে পড়েছিলাম মাঝরাতে। তবু আছি। চোখ মেলে দেখছি। নাড়ি টিপে দেখছি। আছি। আর আছি বলেই এত ঝঞ্ঝাট। ঝামেলা। আছি বলেই কেবল ছুটে গেছি তোমার দিকে। আর তুমি সেই সুদূরের পলাশবনে উড়ে যাচ্ছো পাখিদের মতো। অথচ তোমার সাথেই এক পঙক্তিতে উড়ে যাবার কথা ছিল আমারও। তা আর হল না। আমাদের আকাশটাকে খেয়ে নিল ভাটার চিমনিগুলো। আমাদের নীল রঙ আমাদের ভালোবাসার সকল নীল রঙেদের আস্ত খেয়ে নিল কালো ধোঁয়া। তবু আমরা নিরোধের ঘন আঁধার থেকে এসে একে অপরকে খুঁজে বেড়িয়েছি উন্মাদের   মতো। কেবল ব্যর্থতা বারে বারে। ভাবলাম, শেষ করে দেব সব। সব কিছু। কী হবে! কী হবে এভাবে হেঁটে হেঁটে! পায়ের নিচে কাঁটা ফুটেছে বহু আগে। তবু চলা। আর কতটা? ‘আর করদূর গেলে আমাদের বাড়ি?’ কেবল শূন্যতার সাথে এক অদ্ভুত খেলা। কেবল অস্তিত্বহীন মরা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের সকল জামাকাপড় খুলতে খুলতে পেঁয়াজের খোসার মতো শূন্যতায় পৌঁছে যাবো ভাবি নি। তবু মানুষ বাঁচে। বেঁচে থাকে। এভাবেই। তাদের সখ আহ্লাদ নিয়ে। তাদের মৈথুন নিয়ে। এভাবেই হাসে। এভাবেই কাঁদে। এভাবেই চলে যায়। খুব আশ্চর্য লাগে। আমি কেবল চেয়ে থাকি। নীল রোদ্দুরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকি। আর ভাবি মানুষের একদিন পাখি হবার কথা ছিল, অথচ পাখি মানুষ হবার কথা ভাবে না কখনও।

দুই

হেরে গেলাম। আসলে হারার কথা ছিল না। আসলে ভাবি নি শেষমেশ তুমিও এভাবে চলে যাবে ‘ঝোলা গুড় নিয়ে মরিশাসে’! একটা বন্দুক চাই। আর তাই ছুটে গেলাম কারখানায়। ফিরে এলাম। বন্দুক বুকে নিয়ে ফুলশয্যা। কাল সকাল হতেই তুমি আর আমি এক সাথে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাবো। আসলে সবই যখন শূন্য তখন কি হবে এই সব বেঁচে থাকায়! জানো, প্রতিটি রাতে খুব কেঁদেছি। খুব মেরেছি নিজেকে। খুব বমি করেছি। আর এক সকালে তোমার পায়ের সামনে বন্দুক রেখে হারিয়ে গেছি কাপুরুষের মতো। তুমি হেসেছো। তোমার বন্ধুরাও হেসেছে খুব। তোমার কুকুর তোমার প্রিয় কুকুর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে পড়ে গেছে সোফা থেকে। তবু সুখে আছো সুদূরের মায়াবী নগরে শ্রীলা। শেয়াল আর প্রিয় কুকুরদের নিয়ে। আর আমি? বন্দুকহীন সিন্দুকহীন রাতে এক চিরন্তন ক্যাবলার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি নিজ লিঙ্গের দিকে আর জপ করছি তোমার নাম। জানি এভাবে সারে না আমাদের অসুখবিসুখ। জানি এভাবে বাড়ছে হাহাকার। তুমি আমি সে। আছো এবং থাকবো। থাকবেও এই সকাল এই নীল বিকেল এই গোধূলি এই সোনালি দিন রূপালি রাতের মায়াভরা গল্পেরা, এই জোছনার কান্না, হাহাকার, আর ইছামতীর ঋতুহীনতা।

তিন

শূন্যের মাঝে আরো শূন্য হওয়া শ্রীলা। আরো আরো গল্পের মধ্যে নিজেকে বেঁধে ফেলা। কী লিখি এর মাঝে? কী সব ছাইপাঁশ লিখি? কার জন্য লিখি? কার জন্য ঢের ঢের সময় নষ্ট করে এভাবে আরো এক উন্মাদনের দিকে ছুটে যাচ্ছি এই অবেলায়? আত্মার চিৎকার আর হৃদয়ের গোপন হাহাকারের নিচে তুমি আর তোমার ঘরবাড়ি আরো আরো পিনোদ্ধতায় উঠছে বেড়ে ক্রমশ। তবু নির্বিকার তোমার তুমি। তবু অন্য ঠোঁটের নিচে আলো ফেলে মেখে নিচ্ছ আজকের শুভ সকাল কিংবা মখমলের প্রিয় দস্তানা। আমাদের কেউ নেই। আমাদের কিছু নেই। আস্তাকুঁড়ের মতো এদিক সেদিক উড়ে যাবার আগে গলা ছেড়ে দিলাম আর বেরিয়ে এল গতজন্মের রক্তের মতো কিছু বধির শব্দ, যাকে তুমি মায়া বলো, যাকে তুমি প্রতিমা বলো, যাকে তুমি সন্তান বলো, যাকে তুমি দু-দণ্ড শান্তি বলো। আর এরই ফাঁকে ক্রমশ বড়ো হচ্ছে আমাদের গাছপালা। এভাবে চৈত্র দুপুরে বড়ো হচ্ছে আমাদের ছায়া-অপচ্ছায়ারা, যার নিচে তোমার তুমিকে অকস্মাৎ পেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছো বুনোহাঁসের মতো!

চার

সম্পর্ক এক অদ্ভুত ধাঁধা! এই উড়ছে, আবার এই অদৃশ্য আকাশযমুনা থেকে। তারপর বসে থাকা চুপচাপ। তারপর রোমন্থন। তারপর হাহাকারের আলপনা বুকে এঁকে নিয়ে হেঁটে যাওয়া বহুদূর। আমার এক নীলকণ্ঠ পাখি ছিল শ্রীলা। দূর দেশ থেকে তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতো। সেও হারিয়ে গেল এক ঝোড়ো হাওয়ার দিনে। এখন কেবল ভাঙা। নিজেকে। ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যাওয়া ফড়িংয়ের দেশে। এখানে নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হয়। এখানে নিজেকে চিমটি কেটে বেরিয়ে আসি প্রকাশ্য আলোকে। দেখি আরশোলাগুলো খেয়ে ফেলেছে কাঁচামিঠে রোদ্দুর, দেখি কাকের পিঠে চলছে আমাদের দিনযাপনের গীতমালা। অগত্যা নেমে পড়ি। নামতে নামতে লিখে ফেলি নিজেকেই, নিজের হতাশ্বাস, অসম্পূর্ণ মৈথুনরাত্রি, অন্ধ প্রেমিকার চুলের গন্ধ কিংবা কেরোসিনের বাটিতে চোবানো বিবাহবার্ষিক। এভাবেই অসুখবিসুখ এভাবেই মনখারাপ এভাবেই আত্মহত্যার পাঁচালি।

পাঁচ

অগত্যা মুক্তির খোঁজে বেরিয়ে পড়া। কীসে মুক্তি? কেমনে মুক্তি? এ-সব কঠিন প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খায় মাথার মধ্যে তখনই আচম্বিতে দেখি তুমি উড়ছো ফড়িংয়ের মতো আমাদের ঘাসবনে। না, আজ আর আঠা পাটকাঠি নিয়ে নেমে পড়া নয়। আজ কেবল চেয়ে থাকা। আজ কেবল শিশিরের গায়ে লেগে থাকা যত সব ক্ষত আছে তা তুলে নিয়ে নিমেষেই মেখে নেওয়া, আজ জোছনার নিচে যে সকল পরম ব্যাথা আছে তা কেবল তুলে রাখা পরজন্মের পাখিদের জন্য। এখন কেবল অবিরাম সন্তরণ। এখন কেবল ঘুমের খোঁজে নেমে পড়া। এখন কেবল পলাশবনের নিচে শুয়ে শুয়ে এক ঘন স্বপ্নে বিভোর হওয়া। তুমি বোধহয় জান না, এই সব আকাশের কাছে, এইসব বাতাস, রোদ্দুর, এইসব বৃষ্টিকণার কাছে, এইসব গাছপালা-পাতার কাছে কেবল দু-দণ্ড মুক্তি চেয়েছি। আর ফিরে ফিরে গেছি বারে বারে। যেন আমাদের কোনো মুক্তি নেই। যেন আমাদের মুক্তির মুখাগ্নির নিচে সদাহাস্যমান তোমার তুমি। দেখো, কাঁদছি শিশুর মতো, দেখো কাঁদছি বৃষ্টির মতো, দেখো কাঁদতে কাঁদতে একদিন হারিয়ে ফেলেছি আলো আর ঢলে পড়ছি ঘুমের কোলে একটু একটু করে।

ছয়

সন্ধ্যে নামার ঢের আগেই ঘরগোছানো পাখিদের মতো তোমার পদচারণার শব্দে বৃষ্টি নামল। চেয়ে দেখি নীল হতাশার মতো আকাশের বুকে সোনালি আঁচড় কিংবা পুকুরের জলে তোমার প্রতিমা। বোধহয় এখনই ভেঙে পড়বে প্রাসাদ। মনে হয় নদীগুলো আত্মহত্যার বাঁক থেকে ফিরে হাউহাউ করে কাঁদবে দরজা আটকে। এই সব ছোঁয়াচে দৃশ্যের মাঝে লোপাট হয়ে যাওয়া তোমার মুখের মতো যাপন থেকে যাপনে ভেসে বেড়ানো বুনোহাঁসেদের পাখনার নিচে এসো একদিন ঘুমিয়ে পড়ি, আর ডুবে যাই একসাথে।

সাত

হিমেল হাওয়ায় দূরে সরে যাচ্ছে প্রজাপতির আলো। এখন কেবল এক অন্ধকার সম্বল করে শুয়ে থাকা নিজের মৃতদেহের পাশে। নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে হাত মুখ ধোয়া, দুটো পরোটা-লুচি ইত্যাদি। ফর্মালিনের গন্ধে ভরে গেছে সপিং মল, মাল্টিপে¬ক্স আর তোমার বগলের গাঢ় অন্ধকার। তবু লিপ্স্টিকে আঁকছ উত্তরাধুনিক হাসি। আর তাতেই খুশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খাস মালীরা।

মিথ্যের কাঁচুলিতে কেমন মগ্ন দেখো, আমাদের ঘুম ভাঙাবে বোধহয় পরজন্মের পাখিরা! তাই এইসব বসে থাকা। তাই উঁইয়ের ঢিবির নিচে নিজেকে কোনো এক সন্ধ্যায় পাচার করে দিয়ে হারিয়ে যাব ষাট লক্ষ বছর। বোধহয় তখন পাখিদের দেশে সেরে উঠবে আমার অসুখবিসুখ। তার আগে, তার ঢের ঢের আগে আমাকে একটু কাঁদতে দাও, আর আমার কান্নার রঙে ভরে উঠুক ঘাসবন কিংবা আমার মিথ্যে জলসাঘর।