Archives

আবুবকর সিদ্দিকের কবিতা

অঙ্গারজ্বলন

তুমি কি অশরীরী?

পেছনদুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে আছো সে কবে থেকে,
পদশব্দ পাইনি তো! নামে হিম, ঝরে পাতা।
তুমি কি অশরীরী? কোথায় ছিলে দিনভর? কেন
দ্বিধা দিবালোকে দেখা দিতে? শুনশান সন্ধে নেমে
আসবে এখুনি। আঁধারমৃত্যুর গরল জরানো
নিকষ আঁধার। নিশাচরী! রাতই তোমার তবে
পর্যটনবেলা! ভেবেছি নৈবেদ্য দেবো রক্তনালে,
পশ্চিমদিগন্ত হতে ধেয়ে আসে কালো ধূলিঝড়।
তোমার দেহের ঠাম পটভূমি সব মুছে গেছে।
শুধু ধূলোর আস্তর। আমার রৌদ্রবেলা অনেক
স্বচ্ছ ছিল! নামফলক পড়া যেত সড়কের। তুমি
কোথায় কোন্ কটোরায় লুকিয়ে ছিলে কায়াহীন?

গলিমুখে উন্মাদের অট্টহাসি। ন্যাড়া শালগাছ।
মাদীশকুনেরা লাশ ঘিরে মাথা চাপড়ায়।
অরোধ্য বমনোদ্রেক। এ সব কিসের লক্ষণ গো?
ঝেঁপে আসে কালিমেঘ। কেন ওবেলায় আসোনি যখন
দিনের আলোয় পড়া যেত প্রতিটি করের রেখা?
যারা আজন্ম ঘরউদাসী ঠাঁইনাড়া, জানতাম,
কবরের তাম্বুতেও সেবাআত্তি জোটে না তাদের।
২২.৪.২০০৭

হে সধবা!

বারাণসীধামে বিধবারা সূর্যমন্ত্র জপে ভোরে দশাশ্বমেধ ঘাটে!
তুমি কি আমাকে জপো রাতভোরের সূর্যকে সাক্ষী রেখে?
জানি তুমি এখনো সধবা। আমিষবিলাসী বটে। বিধবারা
নিষ্ঠুর নিরামিষাশী প্রাণী। কেউ কেউ ব্রত ভাঙে
হবিষ্যআড়ালে, প্রকৃত জীবনধর্মী তারা সব।
হে সধবা! চর্বচুষ্য-জপতপ সব শুধু আমার উদ্দেশে।
একটিমাত্র শর্তে আমি বর দিতে পারি আমাকে
ভজো। যেমন নিশিন্দাতরু ভজে বরুণদেবকে।
যেমন প্রেমের মড়া গাঙুড়ের ঘাটে ঘাটে স্বর্গের ইন্দ্রকে
ভজে। যেমন মৃত্যু ও মনীষার সন্তানেরা ভজে
পুনর্জন্ম প্রবাদপ্রতীম। তুমি সধবা এখনো।
হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত করে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স।
তোমার আদিত্যসত্য কোন্ মন্ত্রে সূর্যমুখী হবে,
তুমি জানো। সে তোমার পাঁজরপ্রতিমা মন্ত্রগুপ্তি।
২৪.০৫.২০০৭

 

রক্তখেলা

ঠোঁটে ঠোঁটে একদিন রক্তহোলি খেলব দুজনে,
ঠোঁটে ঠোঁটে মৃত্যুপণ রক্তাক্ত দ্বৈরথ।
গোরা চাঁদ ডুবে যাবে লজ্জাভয়সহ
শশকেরা পালাবে বিবরে,
তুমিআমি রতিরঙ্গে খুন হয়ে যাবো।
লগ্নের অপেক্ষাটুকু শুধু,
রক্তের নহর বেয়ে ভেসে চলে যাবো,
মৃত্যুখেলা খেলে খেলে ভেসে চলে যাবো।
মুখে মুখ বুকে বুক দীর্ঘ প্রাণায়াম,
আমাদের স্মরণীয় ক্ষুধিত দ্বৈরথ।
১২.৫.২০০৭

পিঁপড়েজীবন

জলের বৃত্তবন্দি পিঁপড়ে
করজোড়;
মনে হলে নিঃসঙ্গতা নিজের কাছেই
নিজে বৈরী।
জমে আছে ঢের ঢের ক্ষমাপ্রার্থনা
তোমার কাছে,
চেয়ে নেবো নতজানু হয়ে যদি
অভয় যোগাও।
ঘড়ির কাঁটার মত কাঁপে বুক
অপরাধবোধ,
উদিত সূর্যের মত কাঁপে কালচক্র,
ক্ষয়দোষ।
তুমি ভেসে যাচ্ছো দূরে ঘূর্ণীস্রোতে,
বিচ্ছিন্ন মান্দাস,
আমি জলবন্দি নিঃসঙ্গ মাস্তুল
দিকশূন্য দশা,
পারিনে তোমায় তুলে নিতে
জীবনে জীবন যোগ
এ সময়ে নয়,
পৃথিবীর মনস্তাপ বাড়ে দিনে দিনে,
আমরা কারুর জন্যে
কিছুই করতে পারিনে যে।
২৫.০৫.২০০৭

 

অলিখিত অঙ্গীকারনামা

এসো হাত ধরো
পার হও এই মরা নদী,
এ নদী ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত
ভুলে গেছে বেদিয়ার বহরভাসান।

নদী নয় এ তো
নদীর   কঙ্কাল
নদীর জলীয় মিথস্ক্রিয়া।

নিচে বালিচূর
আঁশগন্ধ বাসি
ধীবরনারীর কান্নারোল
ইলশাজালের ছেঁড়া ত্যানা

বাতাসে লবণক্ষার ঘাম
আকাশে উধাও মেঘহরকরা
ধুলট ধূসর ধূম্রজাল

যেন গোমাগোক্ষুর ঝিমায় অবসাদে
তাকিয়ো না মাথার উপর
চর্কি দিয়ে ওড়ে শঙ্খচিল
চোখ গেলে দেবে।

শক্ত করে হাত ধরে ধরে
নির্বাসন পার হয়ে এসো।
উড়ে উড়ে সঙ্গ নেয় কে ও?
বটপাতা পারিযায়ী?
ভালো থেকো সুভালাভালি।
পোড়ামাটি পাড়ি দিয়ে দিয়ে   মরা নদী ঘেঁষে এই চলা
সঙ্গে সঙ্গে থেকো ঝরা পাতা।
কোশানৌকা চোরাবালিপোঁতা   গুণ টানা রশি ধরে চলা
সঙ্গে থেকো ছিন্ন বটপাতা।

কোনো তৈজস এনো না সাথে     ওজন বাড়বে
পিছুটান পিছনেই থাক।
পা ফেলো দেখেশুনে             এ নদী
ব্যাদান মেলে শুয়ে আছে ঐ
সুন্দরের উপর তার ঈর্ষাকূটৈষা।
ছিল যৌবনবেগ     সর্বস্বান্ত অধুনা
দুহাতে কপাল চাপড়ায়
ছুঁড়ে দেয় বিষাক্ত গজব।

এসো হাত ধরো
আজ কারামোচন আমারো
ভাঙাপাঁজর কাটাকলজে জখমকিডনিএই
পুঁজিপাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে।

শিরদাঁড়া ঝুঁকে নুয়ে যাবে
গৌরবরণ চামড়া তামা হয়ে যাবে
হাঁটুর চাকতি খসে যাবে।

আকাশে উধাও মেঘপরম্পরা
এ জীবন ধোঁয়াশাকুণ্ডলী,
রোদপোড়া ভূশণ্ডির লাশ
ঝরে পড়ে বাদামী প্রান্তরে।

আর
শুয়ে শুয়ে কলিক পেনে নদী গোঙায়,
প্যারালাইজ্ড্।

ওকে ডিঙিয়ে আসার কথা
মনে নেই?
আমাদের অলিখিত অঙ্গীকারনামা
মনে নেই?
২৪.০৪.২০০৭

মনোমিতা

মন! মন আমার!
তোমার গন্তব্য যথেচ্ছ, যত্রতত্র,
দিগন্তছিলা ছিন্ন করে তুমি উড়ে যাও
পেঁজা পেঁজা নীল উৎসের খোঁজে।
আমাকেও নিয়ে চলো না এই
জটিল জাঙাল ছিন্ন করে।
তোমার স্ফুরিত ঠোঁটে এখনো পার্থিব মধু।
অমিতযৌবনা বায়ুযানী তুমি মনপবন।
আমি মৌয়ালি পর্যটনপ্রিয়।
মাথায় মঙ্গলঘট,
রোজ সন্ধ্যায় কোথায় যাও ধানীমেয়ে?
পিছুডাকে ফেরো না। কোনো পিছুটান
থাকতে নেই বীজধানের সূক্ষ্ম শিকড়ে?
তচনচ জীবনযৌবন, তবু
বয়ে যেতে চাই, উৎসর্গিতা গোমতী যেমন।
মন! তুমি প্রমীলা নাগলতা।
উৎখাত ভদ্রাসন ছাড়িয়ে খোলামকুচি মাড়িয়ে
বেয়ে যাও মৃত্যুছিলা ছিন্ন করে করে।
মন! মনোমিতা!
আমাকেও নিয়ে চলো চুম্বনের টানে।
কে যেন বসে আছে শৈশবকৈশোর থেকে!
এই লোহাপাশ আঃ!
মুক্ত করো বাঁজা শয্যার হতমান থেকে।
৬.৬.২০০৭

ঝুঁঝকোবেলা

এই দুহাজার সাতে আমি ইষ্ট খুঁজে ফিরি এখনো। সময় কি এত নয়ছয়? না হয় অঢেল আছে তোমার হে বিধায়ক! আমাকে কেন দাগা দিয়ে ঘুরিয়ে মারছ? ১৯৬০ সালসেই নওল যৌবন থেকে নাকের ডগায় নেড়ে নেড়ে মাংসটুকরো, ওঃ!, পারোও বটে তুমি! ৪৭টা কিম্মতী বছর গচ্চায় চলে গেল।

জীবনভর বাসা বুনে ছেড়েছুঁড়ে উড়ে যায় বাবুই। বলিহারি বাস্তুবোধ ওর! আমি পারিনে। চাই আষ্টেপৃষ্টে সেঁটে থাকতে, গাদ কাটা গাঁজলার মত টুসকি মেরে মুছে ফেলে দেয়। ব্যর্থতাই আঠা। ধুলোপুঁজক্লেদ ক্রিস্ট্যাল ত্রিশিরা হয়ে জমে আছে। প্রেমী মানুষের একজীবনের এই পর্যটন। কথা ছিল ধানীরঙ ভেঙে ভেঙে চলে যাবো। পায়ে পায়ে বাগড়া। অতিধূসর মফস্বল। বনপথ ব্যর্থপাড়ি শাপগ্রস্ত জ্ঞাতিসূত্রইঁদুরবন বাঁদরবন ভামবন। বাগবন গজায়নিকো আর। খোজা শতাব্দীতে দৈবে এসে পড়েছি। চলে যাচ্ছিস্বর্ণপ্রতিমা না ছুঁয়েই চলে যাচ্ছি।

এরই নাম ইষ্টদর্শন? হাঃ! জলডুবি মানুষের তেষ্টামৃত্যু। ধারা জারী করে আয়ু ছাঁটাকাটা যায় বটে। স্বর্ণকীট মথ? গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যায় চাঁদের চূড়ায়। পর্যটনের এটাই দ্বিতীয় ভাগ আসলে। প্রথম ভাগ ৯৯% কেঁচে যায়। হাত চিতিয়ে ধরে বসে আছি, উত্তানপাণি। মঙ্গলসূত্রটা ফেলে দিয়ে যাও হে বখিল নাঙ্গাবাবা! কবর উদোম হয়ে ডাক দিচ্ছে। ঝুঁঝকোবেলা। আর কবে দেবে?
১৬.৬.২০০৭