Archives

আমিন মল্লিক’র প্রবন্ধ

কবন্ধ কালের সাক্ষী জাহিদ হায়দারের কবিতা

সত্তর দশকের অন্যতম কবি জাহিদ হায়দার (জ. ১৯৬৫)। ‘স্বাগত কালের পর্যটক’ (১৯৮২) কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ‘খোলা দরোজায় দিন (১৯৮৫), ‘অগ্নিগণ সখা আমার’ (১৯৯২), ‘বলো দূত, অভিসার তিথি’ (১৯৯৬), ব‘ন্দনা করি অপেক্ষার’ (১৯৯৭), ‘রূপকথা এঁকেছিলো ক’জন’ (২০০৬) প্রভৃতি কাব্যে তাঁর কবি সত্তার বহুমুখী বিকাশ এবং কবিতার শিল্পপ্রকরণে সর্বাধিক প্রযতেœর মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্য জগতে দৃঢ় অবস্থানের প্রয়াসী হয়েছেন কবি। জাহিদ হায়দারের ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৬) কাব্যসমগ্রের কবিতাগুলোর আলোকে বাংলা কবিতায় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে এই প্রবন্ধে আলোকপাত করা হলো।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কাব্যবৈশিষ্ট্য সত্তর দশকের কবি মানসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করলেও প্রতিষ্ঠিত অনেক কবির অনুবর্তন, অনুসরণ এবং শিল্পবোধের সব-নির্মাণ প্রত্যেক যুগেই দেখা যায়। আশির দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা স্বৈরশাসকের প্রত্যক্ষ ছোঁয়ায় লণ্ডভণ্ড এবং দলিত-মথিত হতে থাকে। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর বাঙালি প্রত্যাশিত স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, হতাশা, নৈরাশ্য, মানবতা ভূ-লুণ্ঠিত হওয়ার কারণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে বিশৃঙ্খলা, ভয়-ভীতি, আতঙ্কের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে আসে নস্টালজিয়া, অস্তিত্ব-সংকট, বিপন্ন-মানুষ, সামরিক স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের স্বপ্ন ‘জীবন মৃত্যুর সিম্ফনী’ প্রভৃতি।
‘সংক্রান্তি আমার জন্ম সময়’ কবি স্বীকার করে নিয়েই আত্ম-অভিজ্ঞতার নিষ্ঠুর বাস্তবতা প্রত্যক্ষ এবং নিরীক্ষণ করে উপড়ানো স্বপ্নকে বাস্তবের খামারে এনে রোপণ করেছেন। ‘ব্যাণ্ডের তালে তালে দারিদ্র্যের কুচকাওয়াজ না দেখার জন্য’, নিজেকে একটি সার্থক জাগরণের মধ্যে আশ্রয় দেবার জন্য কবি হাতে তুলে নিয়েছেন কলম। যখন প্রতিবাদী মানুষগুলোকে ধ্বংসের বাঁধ ঘিরে ধরেছে, করেছে সজীব শব। ভয়াবহ ঋণ ঘাড়ে নিয়ে ক্ষত-টাটায়, শোকে কাতরায় তবু জ্বলে ওঠে না মানুষগুলো। আদি জন্মে ভুল করে শিশু হেঁটে চলে নদীর সাথে। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-শহীদ মিনার বাংলার মানুষ বিপুল অর্জনে অর্জন করলেও অঙ্কুরিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি স্বার্থলোভী শাসকের নিষ্ঠুর শোষণের ফলে। ‘পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার জন্য’ কবিতায় বাংলার মানুষের নিঃশেষিত স্বপ্নের হাহাকার প্রকাশ করেছেন :
মিনারেরা বিশ্বাস করে না
বাংলাদেশ বসে আছে হুইলচেয়ারে
নিচে স্বদেশ প্রেমিক জনতার ভেতর
বিশ্বাসী শব্দের অপেক্ষায়
আমাদের প্রিয় অপূর্ব স্বপ্নেরা বসে আছে হুইলচেয়ারে।
(পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার জন্য)
৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতার প্রসঙ্গ বারবার চেতনার একান্ত উদ্বোধন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কাব্য। বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে ‘শাদা দুধ দেখে আতঙ্কে কাঁপে দেশ’ কবিতায়। ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫’ কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার নির্মম ভোরের মর্মস্পর্শী কাব্যিক প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে স্বাধীনতার সূর্য সামরিক অভ্যুত্থানের কালো ছায়ায় ঢেকে যায় গণমানুষের স্বপ্ন-আশা-আকাক্সক্ষা।
সামরিকজান্তার হস্তক্ষেপে শিল্প-সৌন্দর্যের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, যখন রাজনীতি, ধ্বংসময় যুদ্ধ, উদ্ভট সিনেমার সংবাদের ভিড়ে কবিতা প্রকাশিত হওয়ার জন্য স্পেস পাচ্ছে না। তখন কবি ঘোষণা করেছেন :
কোন এক ভেতর মহলে বিষণ্ন সংবাদ
কিছু শব্দ গেরিলার মতো ঢুকে গেছে প্রধান নগরে
নগরবাসীরা জেগে আছে তীব্র প্রতীক্ষায়,
শোনা গেছে
নিষেধ অমান্য করে কবি আসছে প্রধান নগরে।
(কবির প্রবেশ নিষেধ)
বাস্তবিক যা ঘটেছে তার নির্মম বর্ণনা দিতে কবি পিছপা হননি। শাসকের দাঁতল দাঁত, বিষাক্ত নখর, নিষ্ঠুর অবিবেচক বিবেকের কঠোর ব্যবহারের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলছেন ‘আমি নই শেষ মানুষ’ এবং ‘অর্জিত হলো কষ্ট’ কবিতায়।
‘পরাশক্তির জেনারেল এবং একটি পিঁপড়ে’ কবিতায় কবি বাংলাদেশের সামরিক শাসনের কলঙ্কময় ইতিহাস এবং অসহায় মানুষকে পিঁপড়ের মতো হত্যা করার দৃশ্য এবং বুভুক্ষায় মৃতপ্রায় গণতন্ত্রের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। ক্ষুধার্ত পিঁপড়ের বেশে এসেছে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী মানুষ। সামরিক হুকুমে অস্ত্রের খোকায় ভরেছে ইতিহাস। সামরিক অভ্যুত্থানে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে দেশের নিরীহ মানুষ। লোভী রাজনীতিবিদগণ নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে গণতন্ত্রের কবর রচনায় তারাও সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে :
কানের কাছে তাক করে সামরিক গলায় হুকুম করলেন
: পিঁপড়ে, শেষবারের মতো বলছি
বেরিয়ে এসো
না হলে এক গুলিতে মাথা উড়িয়ে দেব।
(পরাশক্তির জেনারেল এবং একটি পিঁপড়ে)
‘হেলমেট পরা ছায়া’ প্রগতিশীল মানুষকে করেছে ছায়ার মতো অনুসরণ। বাংলার মানুষের স্বপ্নের খুলিকে গুলি করে উড়িয়ে দিয়েছে। তার বিস্তারিত বিবরণ জাহিদ হায়দারের কবিতায় উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে।
আমার স্বপ্নগুলোকে
আক্রমণ করে হেলমেট পরা ছায়া
বহুযোজন দূরে আমার শৈশব, সারল্য-আমার
তৃতীয় মানুষের সবগুলো হাত একসাথে করে
সেই দূরকে স্পর্শ করতে যেয়ে
দেখলাম তাকে রক্তাক্ত করে
পা নাচিয়ে হাসছে হেলমেট পরা ছায়া।
আমরা সময়ের সাথে মাথা নিচু করে কথা বলি,
আমার পেছন মাথা উঁচু করে কথা বলে আমার সাথে;
(হেলমেট পরা ছায়া)
বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস মাথা উঁচু করে স্বপ্ন পূরণের মিছিলে আহবান করে। কিন্তু মানুষগুলো সহসা সন্দিহান ভবিষ্যতে কি আশা জেগে আছে? ‘শান্তি রক্ষার নামে যুদ্ধ’? সবুজ বনভূমি ধ্বংসের উল্লাস?
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার কোন নিশ্চয়তা নেই জীবনে। ‘হাজার হাজার দগদগে দুর্দশা’ আশাশুনি গ্রামের মানুষের জন্য বয়ে নিয়ে আসে এই সময়। ধুধয়ে কুঁকড়ে যাওয়া দেহ, কোঠরগত চক্ষু শুধু জ্বলে, কারণ সামরিক চোখ তাদের মনকে শাসনে রাখে। ‘পরাধীন শব্দমালা অভিধান থেকে তুলে’ দিলেও স্বাধীনতার প্রকৃত সুখের বৃষ্টি তাদের সিক্ত করতে পারেনি :
আমাদের অভিশপ্ত দিন
কষ্টের মাটি গর্ভে দেয় ঢেউ
মানুষের সংহতি ভেঙ্গে পড়ে
জীবনের আর্তনাদে বন্ধু নেই কেউ।
(কবিতার জন্য অরণ্য)
তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশ। এদেশের মানুষের ভাগ্যাকাশে কখনো উদিত হয়নি সোনালী স্বপ্নের ভোর ‘স্বৈরশাসনের ব্যাভীচারী শাসন শোষণে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ; অভাব-অনটন। অন্ধ ভিখারী শুন্য থালা হাতে ঘুরে ফেরে দুয়ারে দুয়ারে। অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত মানুষের জীবন। তীব্র আলো চোখের উপর ধরে আলোর বর্ণনা দেবার মতো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তাদের প্রতিরোধের ভাষা। উদ্ধত রাইফেল তাক করে আছে তাদের বুকে। শরীর ছিবড়ে রক্ত ঝরে মাটিতে। ধূলো আর রক্ত ওড়ে বাংলার বাতাসে। বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা করোটি ভেদ করে ফোটে বনফুল। সেই ধ্বংসস্তূপে দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে বন্দি মানুষ শুধু চেয়ে দেখে :
তিন ভিখারী আবার থেমে পড়ে
গতির উকুন রক্ত চুয়ে খায়,
তিন ভিখারী পরস্পরে বলে
দেশ থেকে কি ভিক্ষে উঠে গেলো?
(গতিশীল একটি উন্নয়ন চিত্র)
আশাগুলো চলে যায়
আমাদের স্বপ্নের শবযাত্রায়
অদ্ভুদ এক গোলাক ধাঁধা আমাদের নিয়ে কানামাছি খেলে
হাতের চাওয়ায় বাধে শূন্যতার চড়াই উৎরাই,
পায়ের তলায় উপড়ানো জন্মের হাহাকার।
(উপড়ানো স্বপ্নের সংলাপ)
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বেড়েছে সন্ত্রাসের ত্রাস। ‘কিসের সন্ত্রাস’ কবিতায় কবি সেই বহুমুখী সন্ত্রাসের ভাজ খুলে দেখিয়েছেন। ‘চাকার সন্ত্রাস, ছিনতাই সন্ত্রাস, ফতোয়ার সন্ত্রাস, মুক্তবাজার সন্ত্রাস, কথার সন্ত্রাস’ প্রভৃতি নির্মম সন্ত্রাসের কুফল তুলে ধরেছেন।
সন্ত্রাসের ফলে অপমৃত্যুর হার আজকাল জ্যামিতিক হারে বেড়েছে না বলে কবি বলেছেন, ‘আজকাল মৃত্যু নিয়ে বেড়ে’ গেছে অনেক আলাপ/তুমি কি উঠবে বেঁচে কালকে সকালে? ‘মৃত্যুবিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ’ কবিতায় কবি হরেকরকম মৃত্যুর নাম প্রকাশ করেছেন: ‘সরকারি মৃত্যু, রাজনৈতিক মৃত্যু, পরিচয়ের মৃত্যু, পারিবারিক মৃত্যু, বনভূমির মৃত্যু, খ্যাতির মৃত্যু, কথার মৃত্যু, নদীর মৃত্যু, প্রেমের মৃত্যু, দেখা হওয়ার মৃত্যু, দরজা বন্ধ-প্রবেশের মৃত্যু; চলে গেল একজন-ঠিকানার মৃত্যু, রাত্রির মৃত্যু, দিবসের মৃত্যু, চুম্বনের মৃত্যু, বিচ্ছেদের মৃত্যু, উত্থানের মৃত্যু, সমতলের মৃত্যু, হাতের উপরে হাত নিঃসাল-স্পর্শের মৃত্যু। এতসব মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে কবি ‘কেউ আছো, উত্তর দাও’ কবিতায় বলেছেন :
আচ্ছা,
আমরা কি শবযাত্রা ছাড়া
অন্য কোনো যাত্রা করব না?
বিচার বহির্ভূত এইসব হত্যা দেখেও শহরের ভদ্রলোকগণের টনক নড়ে দেয় কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। আসলে যাদের আছে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ সমাজের সেই সব উচ্চবিত্তরা কখনো আন্দোলনরত মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত শ্রেণীর পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
এত খারাপের কোলাহলেও কবি উত্তরণের জন্য নবজাতকের কাছে হাজির হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশুতীর্থ’ কবিতার মতোই নবজাতকের কাছেই এর উত্তরণ প্রত্যাশা করেছেন। কোন শিশু যেমন বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না সমাজের প্রচলিত পরিবেশ তাদের তৈরি করে। তাই কবি এসব মৃত্যুর উৎসব থামিয়ে বলেছেন:
থামো, পাশের বাড়িতে একটি শিশু জন্ম হলো,
তোমাকে জানতে হবে কবরখানার ভেতর দিয়ে
হেঁটে যাবার কৌশল।
(মৃত্যু বিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ)
‘আমাদের গ্রামগুলো শহরের সৎভাই’ বলেই ‘লক্ষ্মীর পা লাঙলের ফলায়’ এঁকে শুভরঞ্জন সূর্যোদয়ের আগেই চলে যায় মাঠে। তারা অল্প জমি চাষ করে, সেথায় তাদের বসবাস। বিজ্ঞান মানুষকে চাঁদে নিয়ে গেছে কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে আসেনি কলের লাঙল, চাষের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। জমি জিরাত সব দখল করে নিয়েছে সামাদ মোল্লার মতো জোতদার। উপরন্তু তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে :
মাঠভরা সর্ষে ফুলের জোস্না
কখনো দেখনি তুমি
পাকা আমনের পূর্ণিমা
কখনো জানোনি
সর্ষে ফুল আর পাকা আমনের জোস্নার গন্ধ কেমন
একবার যদি,
মাঠভরা ফসলের জোস্না দেখতে তুমি?
(তা মানুষ যেখানেই যাক)
ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধার ভানে তেমনি তারা যেখানেই যাক তাদের চাষ করে খেতে হবে। রাত্রি-দিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর তাদের স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় দু’বেলা দু’মুঠো ভাত আর বৌয়ের জন্য মোটা তাঁতের শাড়ির ব্যবস্থা করে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছোট সুখের সংসারের। কারণ :
ক. নদীগর্ভে গ্রামগুলি বিলীন,
গোধূলি ধূসর ডাকঘর বিলীন।
গ্রামগুলি লাশ, চিঠিদের বিতরণ শেষ।…
… ইলিশের পচন পদ্মার তীর
মাছিদের গানে জেলেরা নির্বাক।
(কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে আলো)
খ. আমাদের মধ্যে আছে নদীবোধ, পাড়ভাঙা বোধ;
কারো মধ্যে কেবল আঁধার নামে জাগে দুঃখবোধ
কেউ যায় পড়শীর ঘরে দিতে পুষ্পবোধ
(বোধগুলি)
কিন্তু অপরদিকে আমাদের শোষকেরা কখনো নেয়নি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মাফিক ব্যবস্থা। তাদের আছে বাগান বাড়ি, পরিপুষ্ট ব্যাংকের ব্যালান্স, ঋণে কেনা গাড়ি আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বাগান আসছে বাড়ি ফিরে
আছে গান, ঋণে কেনা গাড়ি
আর বিয়ার মধ্যপান।
আমাদের বাবু কারকার বিবি সাথে নৌকা চড়ে মধ্যরাতে;
(অদূরে বাগান বাড়ি)
ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ শাসকের কর্ণ-কুহরে পৌঁছায় না। কারণ তোষামদকারী সভাসদ শাসকের চোখে-কর্ণে সপ্ত-পর্দা মেলে ধরে :
বললো সভাসদ : খুব ভালো, খুব ভালো
শান্তি সবদিকে
বইছে সুখধারা
সঙ্গা নেই কোনো
কোথায় সন্ত্রাস?
মিথ্যে বলে ওরা।
(আবার তোতার গল্প)
‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’ এবং ‘অন্ধ ধাইমা’ কবিতা দু’টিতে গ্রাম-বাংলার অস্তি-সজ্জায় নিমজ্জিত কুসংস্কারকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছেন। অন্ধকার আচ্ছন্ন নিরক্ষর সমাজে জীন-ভূত ছাড়ানোর নিমিত্তে আল-খাল্লা পরা শাদা মৌলবীর ভণ্ডামী ও নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’ কবিতায়। বিজ্ঞানের স্বর্ণ-যুগে চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি ঘটলেও কুসংস্কারাচ্ছন্ন শিক্ষার আলো বঞ্চিত গ্রামের মানুষের কাছে রোগ-ব্যাধিতে পথ্য, ডাক্তার না পেয়ে এইসব কাঠ মৌলবীদের শরণাপন্ন হয়। ধর্মের লেবাস পরে ‘অদৃশ্য দেশে ফু’ দিয়ে অনেক মেয়েকে নির্যাতনের বৈধতা আদায় করতে কসুর করে না সেই সব মৌলবী। অষ্টাদশী সরল মেয়েকে অকস্মাৎ থাপ্পড় খেতে হয়। আজও আমাদের সমাজে অষ্টাদশী স্বর্ণাকে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজের নামে প্রতারিত হতে হয় :
অষ্টাদশী আবার চুপচাপ। ক্লান্ত চোখ। রাজ্যের ঘুম তার দুই চোখে আলখাল্লা পরা মানুষ লাল চোখ খুলে আবার মন্ত্র আওড়ায়। এবং এক লোমশ হাত কন্যার নাকের সামনে হঠাৎ তুলে ধরে আগুনের শিখা।
(‘ভূতের নাম স্বপনকুমার’)
শিশু মৃত্যুর হার এ সমাজে কম নয়। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ প্রসূতির যতœ ও পরিচর্চা সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকারে বাস করে। দারিদ্র্যের কারণে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোটে না কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে তাদের গর্ভধারণ থাকে অব্যাহত। অর্থাভাবে হয়ে ওঠে না প্রসূতি মাতার চিকিৎসা। গ্রামের অন্ধ ধাইমার হাতে মৃত্যুবরণ করে অজস্র নবজাতক। পোয়াতী বৌ আঁচি ঘরে বিয়ানোর পরিবর্তে গণনা করে মৃত্যুর প্রহর :
ছ’দিন ছিল ব্যথা
কত পানি পড়া
কত গাছের রস
জন্মাতে চায়নি
ঝড়ের রাতে হলো;
অই হাতের পর গাঁয়ের চার ভাগ
কেউ বা বেশ ভালো, কেউবা বদমাশ
(অন্ধা ধাইমা)
বাঙালি জাতির ঐতিহ্য-প্রকৃতি-প্রেম মিলেমিশে চিত্রকল্প তৈরি করেছেন জাহিদ হায়দার তার কবিতায়। মহাস্থান, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, জাঞ্জিরা গ্রাম, আশাশুনি, ইছামতি প্রভৃতির মধ্যে প্রাণসঞ্চার করেছেন কবি। মানব জীবনের শাশ্বত জীবন প্রবাহে চেতন-অচেতন মনের নিগূঢ় রহস্য, জৈবিক জীবন তাড়নার অনিবার্য ভাব প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতায়।
গ্রীবার নিচে পিঠ যমুনার চর
বপন করি আমি চুমুর বীজ
ফসল গেলো তুমি নৌকা শরীর
হালের কর্ষণে জীবন-গান।
(মহাস্থানগড় যাত্রা)
প্রেমের দুর্দান্ত আবেগ সময়ের নির্মম কষাঘাতে চুপসে গেছে। হৃদয়ের উদ্বেলিত প্রেমের ডাকগুড়গুড় যেন ভূতের ঢিলের মতো এসে পড়ে হৃদয় ছাউনির চালে এসে। প্রিয়া আসবে বলবে ভালোবাসি বলাটা স্বাভাবিক; কিন্তু দু’জনে হেরে যাব বিষয় স্বাভাবিক? কবি অক্রিয় নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায় প্রেমের আবেগকে প্রকাশ করেছেন। ‘বলো দূত, অভিসার তিথি’ কাব্যগ্রন্থে কবি হাজির হয়েছেন একঝাঁক প্রেমিক-প্রেমিকা, তাদের দূত এবং অভিসার তিথির অনুষদ নিয়ে। কথোপকথন ভঙ্গিতে হালকা চালে, মনোভাব প্রকাশে ইঙ্গিতময়তা পাঠক চৈতন্যে সচেতনভাবেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পোশাকী প্রেমের নারীর হৃদয় আজ কাঠ। ‘যেন বোঝে না মৌলিক’, ‘অ সধফবষ ড়হ ঃযব পধঃধিষশ’, ‘ভালোবাসি ঐ মিথ্যে’, ‘টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের দাঁতগুলো’, ‘শাদা পাতার সঙ্গে একরাত্রি’, ‘দহন, নিঃসঙ্গের গান’ প্রভৃতি কবিতায় কবি প্রেমের বিচিত্র রূপ-চিত্রিত করেছেন :
ক. কোন এক রাতে
মেয়ে তোমাকেও নগ্ন হতে হবে,
এবং আনন্দেই নীল আলোর মধ্যে
নগ্ন হতে হবে নিজ হাতে
অথবা অন্য কারো হাতে।
(যেন বোঝে না মৌলিক)
খ. নারীর হৃদয়ে কাঠের কষ্ট
সবুজ পাতারা এখন মাঠ
দুষ্টু হাওয়া এক
স্তনের কাঠামোয়
সহসা পেয়ে যায় রাধার সঙ্গ।
(অ সধফবষ ড়হ ঃযব পধঃধিষশ)
গ. শাদা পাতা রাত্রি কত বলে দাও মন্ত্র তোমার,
তুমি তো সেই কুমারী যে-মেয়ের শুচির কথা
তৃষিত কবিই জানে
(শাদা পাতার সঙ্গে একরাত্রি)
গ. রাত্রিতে মাজাঘসা করে
দাঁতগুলি আনন্দে কামড়ে দেয় ঠোঁট স্তনে
শিৎকার ধ্বনি সমেত উরুতে যোনিতে শিন্নে।
(টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের দাঁতগুলি)
‘জন্মান্ধের সৌন্দর্য বর্ণনা’ কবিতায় কবি কথোপকথন ভঙ্গিতে ব্যতিক্রম প্রকরণে রবি-রূপার প্রেমের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের উত্তপ্ত সংলাপের ফুল্কি শৈল্পিক মাত্রায় প্রকাশ করেছেন। ‘পানপাতা সুখ, টিয়া পাখি নাক, সুন্দর চাঁদের মতন’ প্রভৃতি প্রচলিত উজ্জ্বল বর্ণনা থাকলেও বিক্ষিপ্ত প্রশ্নবান আর উত্তরে এসেছে নতুনত্ব। ‘গন্ধরাজ ফুল, গোলাপ, ময়ূর পালক’এর বিপরীতে উপমা হিসেবে এসেছে ‘বিষফুল রক্তকরবী’।
‘আঙুল মাথায় জড়াতে জড়াতে চুল
শুধায় যুবক
দিয়েছ চুলেতে বুঝি সুগন্ধি তেল?
হাকি একা একা হেসে গেলো
সে নারীর ঠোঁটের উপর;
: বা! কী সুন্দর চাঁদ উঠলো এখন।’…
… যেন অকস্মাৎ
যুবক কেঁপে ওঠে শীতের হাওয়ায়
নারীর শরীর থেকে সরে আসে হাত,
অনাশ্রিত আঙুল কামড়ে ধরে শূন্য করতাল।…
… হাতের আকাক্সক্ষা তোমাকে যদি পায়
আনন্দ প্রতিমা নাচে হাতের ভেতর;
(জন্মান্ধের সৌন্দর্য বর্ণনা)
‘ভালোবাসি ঐ মিথ্যে’ কাবিতায় প্রিয়ার মিথ্যা রচনকে দৃঢ় প্রত্যয়ে সমর্থন করেছেন।
বিশ্বাস করে ভেবেছি
বলবোই, আমি রাধা তার
তোমাকে ছাড়া বেড়ি নেই
তুমিই বিশ্বে বাঁচাবার।
(ভালোবাসি ঐ মিথ্যে)
গদ্য-কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই বাংলা কাব্য জগতে প্রবেশ করে। সেই থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা গদ্য কবিতা কাব্য জগতে স্বতন্ত্র আসন লাভ করে। জাহিদ হায়দারের গদ্যাত্মক গদ্য কবিতা কখনো সামাজিক বিষয়; কখনো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, কখনো রাজনৈতিক ইস্তেহার হয়ে নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায় মৃদু ছন্দের স্পন্দন সৃষ্টি করেছেন। ‘জীবন মৃত্যুর সিম্ফনী’, ‘ঘুম বিষয়ে গবেষণার রিপোর্ট’, জরিপ, ‘গরুর হাটে পাউডার মাখা গাভী’, ‘কথাটি কবিতার মতো’প্রভৃতি গদ্য কবিতার কবির গদ্য কবিতা রচনায় দক্ষতা ও শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষকে মাঠে, ঘাটে হত্যার চিত্র গদ্যের হালকা চালে ফুটে উঠেছে। ‘তিনজন কালো মাছি নাচিছে কথক বেচারার রক্তমাখা চোখে’… হঠাৎ পুলিশ এসে ভেঙ্গে দিলো মাছিদের নাচ’। মানুষের গতিময় জীবন সাঁকোর উপরে মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু বিবেকের কাছে প্রশ্ন হলো মানুষটি যেতে চেয়েছিল কোন পাড়ে?
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের শাসন ব্যবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থান মানবতাকে বুটের তলায় রক্তাক্ত করেছে বারবার। বৃষ্টির শব্দের মতো গুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। শাসকেরা তখন নিশ্চিত মনে ঘুমায়। কিন্তু সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মনে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় ভয় আর আতঙ্ক। মৃত্যু এসে করাঘাত করে দরজায়। ‘শব্দহীন শব্দ কেবল মৃত্যুমুখী মানুষেরা শোনে।’ শ্রমজীবী মানুষের কাছে ধ্র“ব সত্য কেবল শ্রম। তাদের ‘জীবন গিয়েছে ফেঁসে বাজারের পুরাতন ঝোলার ভিতর?
‘জরিপ’ কবিতায় কবি মানব মনের নিগূঢ় রহস্য নিয়ে জরিপ করে ফলাফল প্রদান করেছেন:
“মানুষের ভেতর-গভীরে আছে নগ্নবোধ, দেখা গেছে পুরুষেরা খুব দ্রুত নগ্ন হতে চায়; নারীরা অশ্লীল গল্প বলে বেশি।
বোঝা গেছে, পশুদের হিংসা, লোভ মানুষের থেকে কম, গোলাপ আর টাকা পাশাপাশি রেখে দেখা গেছে, মানুষেরা টাকার দিক তাকায় বারবার।
বাজার জরিপে দেখা গেছে, নারীগণ ভায়াগ্রার বিপণন সমর্থন করে; আর পুরুষেরা কামসূত্র পড়েছে বেশি।…
…জরিপের ফলাফল : মানুষেরা আজও ততটা সভ্য নয়।
‘গরুর হাটে পাউডার মাখা গাভী’ কবিতায় কুরবানির হাটে টেলকম পাউডার মেখে গরুর হাটে হাজির হয়েছে মীরকাদিমের গাভী।’
গদ্য-কবিতায় শব্দ উপমা, প্রবাদ আর অলংকারের ব্যবহার কবিতার শিল্পপ্রকরণে এনেছে নতুনত্বের আভাস :
ক. দুনিয়া কো লাথ মারো দুনিয়া তুমহারী হায়।
খ. ‘দিল ওহি মেরা ফাঁসগায়ি’।
গ. পাউডার মাখা গরু হাগে সাবলীল, শব্দ করে মোতে।
ঘ. ঘুমের চেহারা কুমারীর চোখে নীল জামা পরা তরুণের চোখের মতন।
কবির প্রথম অন্বেষণ শব্দ জাহিদ হায়দার কবিতায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাছাই বাছাই কিছু শব্দকে অনিবার্যভাবে ব্যবহার করে কবিতাকে করেছে রসোত্তীর্ণ। সনাতন-গ্রামীণ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিদেশী শব্দের। চক্ষু, ঊর্ণা, সেলোফেন (এক প্রকার স্বচ্ছ কাগজ) স্পেস, ফেস্টুন, আঁজলা, পরচা, দাগ, দাখিলা, সিম্ফনী, টুংটাং, চলিষ্ণু, ঘোড়াবিক, ঊর্মিশর্ত দ্বিধা, ঊর্মিস্বর, ঔরস, শৈলচুড়া, উল্কি, তওবা, রাজসিক, মাফিক, জিষ্ণু, আঁচি, ধাইমা, শালা, হাগা, মোতা, কলোনিয়াল, ল্যাংগোট, বুবি ট্রাপ প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার কবিকে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জ্বল করেছে। ‘হেলমেট পরা ছায়া’ যে শব্দ দিলাম রেখেছ কোথায়?’ ‘সেই সন্ধ্য সেই রাত্রি’ ‘আকাট শুভার্থী’ প্রভৃতি কবিতায় শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে কবির অভিমত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত :
ক. আত্মীয় কাকেরা হাত তুলে ডেকেছে বারবার,
শব্দে কত ব্যথা
আমি চেয়েছি কেবল অবহেলা করার যোগ্যতা।
খ. কি সম্পাদনা করো?
রাত্রি? নাকি দিন, নাকি রজনীর ভাষা?
কেয়া আজ প্রেমশব্দ। জিষ্ণু রাজনীতিশব্দ
তুমি আমি অভিধানের খণ্ডৎ
শব্দেরা উদ্বাস্তু, শব্দেরা গৃহবাসী
দুদিকেই দুঃখ রাশি রাশি।
গ. সব মানুষের থাকে যে খতিয়ান
তাদের ছিল না পরচা কোনো দাগ
ভুল রাজস্ব তোমাকে দেয়া যারা
বাচাল কোকিল প্রেমের দাখিলায়।
কবিতার নামকরণএবং কবিতায় বাংলা ইংরেজি শব্দের সার্থক ব্যবহার করে ব্যতিক্রমী কাব্য-প্রকরণের সৃষ্টি করেছেন জাহিদ হায়দার তাঁর ‘নদী বিধৌত দেশ, মানে Riverine country’ কবিতায় :
নদীতে নৌকায় একা মানুষ, মনে পড়ে

Hermann Hesse Siddhartha এখনো দেখনি?

কিছু adult. Scene  আছে
তবে Phylosophical..
বেশ কিছু কবিতায় ধুয়ার সার্থক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হিসেবী শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন, বিভিন্ন মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এবং গদ্য ছন্দের প্রবহমানতা এবং মুক্তক ছন্দের ব্যবহার কবিতার প্রকরণকে করেছে সমৃদ্ধ। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সার্থক ব্যবহার :
মাতালের মুখে মত্ত
বিবরের সুখ শূন্য হৃদয়ে
মরা ঘাসে করে নৃত্য।
প্রতীক এবং রূপক-সাংকেতিক ভঙ্গিতে কবিতায় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন জাহিদ হায়দার। পরাশক্তির জেনালের এবং একটি ‘পিঁপড়ে’ কবিতাটিতে একটি বাহিনীর আড়ালে অন্য একটি কাহিনীকে রূপকভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘উপড়ানো স্বপ্নের সংলাপ’ কবিতায় ‘কবর’কে বিশেষ প্রতীকে ব্যবহার করেছেন কবি।
হেঁটে যায় কবরগুলো
চোখেরা খাদ্য খোঁজে
বসে পড়ে কবরগুলো
হতাশায় ডুকরে কাঁদে।
কবি শব্দালংকার এবং অর্থালংকারের বিবিধ শ্রেণীবিভাগের সার্থক এবং শিল্পসম্মত ব্যবহার করে চমক সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রে বাংলা কাব্যে ব্যবহৃত অনেক বোধ-উপমাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। ব্যবহার করেছেন উত্তম পুরুষের।
উপামা: ক. তোমার নারীদের হৃদয়ে শুধু কাঠ
খ. আমার শরীর ভিজে যায় ইতিবাচক স্বপ্নের ঘামে
গ. মুঠিভরা শিউলী ফুলের মতো ভাতের মহিমা চাই
মৃত্যু চাই প্রতিটি অস্ত্রের
ঘ. পাখা ঝাপটায় কী ব্যর্থ আক্রোশে
চঞ্চুতে গাঁথে চৌচির শাদা মেঘ।
ইন্দ্রিয় উপামা: ক. সর্ষে ফুল আর পাকা আমনের জোস্নার গন্ধ কেমন।
খ. তুমি মেয়ে রসুন পোড়া সুগন্ধী আঁচি ঘরে
আনন্দে তা দিতে ভালোবাসো চক্ষুঅলা ডিম
অনুপ্রাস: ক. মেঘেরা মেঘের নিঃশব্দ মিছিলে
অন্ধকার করে দিলো পৃথিবী।
খ. চোখে অনন্ত অন্বেষণ
আরো হেঁটে চল ক্ষয়িষ্ণু পা।
জাহিদ হায়দারের ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করলে সময়ের সাথে সাথে তাঁর কবি মন ও মানস উত্তর উত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে গেছে একথা দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায়। কখনো কখনো বিষয়বস্তু এবং প্রকরণে সাযুজ্য না হওয়ার কারণে কবিতা রসোত্তীর্ণ হয়নি মনে হলেও শিল্পসার্থক কবিতার সংখ্যাই সর্বাধিক।
জাহিদ হায়দার তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু এবং প্রকরণের ক্ষেত্রে চৌকষ মানসস্বরূপ ও মনোভঙ্গিক পরিচয় দিয়েছেন কবিতার বিষয় ‘জীবন ও জগৎ চেতনা; আত্মসমিধ ও উপজীব্য সংবিধান? ‘সত্য-অন্বেষা, বোধের গভীরতা ও ভঙ্গির বিশিষ্টতা এবং রুচি মেজাজ তথা স্টাইল-লাবণ্য’, সহজাত প্রবৃত্তির মতোই প্রকাশ পেয়েছে কবিতায়। ‘শিকড়গন্থি দেশজ ও মানবিক সংযোগ তথা আন্তরিকতা, ঐকান্তিকতা, অকৃত্রিমতা, সারল্য এবং আত্মপ্রকাশের অনিবার্যতা’ তাঁর কবিসত্তাকে করেছে উচ্চকিত। জাহিদ হায়দারের কবিতা সমাজ ও মানুষের উন্নত চাহিদা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিটিয়ে চিরন্তন শিল্প সাফল্য অর্জন করবে এটাই প্রত্যাশা।