Archives

পাঠ : চিহ্ন —২৮

পাঠ : চিহ্ন —২৮
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল

একটা কথা আমরা সকলেই জানি, কোনো লিঙ্গপূর্ণ প্রাণি নিয়ম মেনে মিলিত হয় না। এদের যখনই একে অপরকে কাছে টানতে ইচ্ছে করে বা সমমনে চায় তখনই মিলন সম্ভব। উৎপাদন সম্ভব। আবার কেউ জোরপূর্বক করে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে (শুধুমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, পশুপাখির জন্য নয়)। যারা জোরপূর্বক করে, তারা ধর্ষক। সঙ্গম বা প্রণয় অথবা ঘর করা একটি শর্ত সাপেক্ষ কাজ; সারাজীবনের ব্যাপার। নিয়মমাফিক জন্ম দেওয়া এবং জন্মানো শিশুকে উত্তম স্থানে হস্তান্তর করা কাগজপিতার কাজ।
ধরুণ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যন্ত্রণার নাম গর্ভযন্ত্রণা। যন্ত্রণা খুব অধিক হলে চীৎকার করা যাবে না। যারা চীৎকার করেন তারা অযন্ত্রণার মানুষ। আপনি ধরেই নিন এখানে বিষ ও জামরুল একসাথে হজম করছেন। এক্ষেত্রে গর্ভধারণ করছেন কে? একজন নারী? না একজন পুরুষ? কেউ না। একজন মানুষ। এটার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, মা মাছের স্বভাব তো জানেন? খুব অদ্ভূত, স্বার্থপর। নিজ সুবিধার্থে সবাইকে ছাড়ে। ঘর ছাড়ে, সংসার ছাড়ে; সন্তানও। অন্য মাছের কাছে যায়। আনন্দ-ফূর্তি করে। এই নির্মমতার কারণেই মাছসমাজ টিকে আছে, এদের সভ্যতা বিলীন হয়নি। মাছের মায়েরা যেমন কাগজের লোকেরা তেমন। স্বার্থপর তাঁরাই হন যাঁরা মূল জিনিস ছিনিয়ে আনেন এবং সেটা রক্ষা করেই মূল্যবান আরো কিছু অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধানহীন মানুষ কখনো ‘মানুষ’ হতে পারে না। আগে মানুষ হতে হয়, পরে সম্পাদক।
সন্তানের কপালে টিপ পড়ালে অথবা কানের লতিতে চিমটি কাটলে অথবা থুথু দিয়ে কপোল লেপ্টে দিলে, নজর এড়ায়। সে সন্তান যেমনই হোক। সবকিছু নির্বিশেষে। গ্যেটাপ-মেকাপ। কিন্তু লোকেরা কয় উমুকের বৎস ভালো নাম করেছে। কিসের নাম? সুন্দরের নাম। ভালো পোশাকে বা বিদেশি দোলনায় গতরের চাকচিক্য বাড়ে বৈ অন্যকিছু নয়। এই যে উজ্জ্বলবর্ণের চপ্পল পড়েছেন তা কে দেখতে যায়? কে পোছে? চপ্পল! সে তো পায়ের জিনিস, বুকের নয়।
গর্ভাবস্থায় কারো কারো তলপেট ঢাঊস হয় আবার এমনো ধারক আছেন যাঁদের দেখে বোঝাই মুশকিল যে তিনি কতমাস বা সপ্তাহ পার করছেন। অথচ ঠিক তারিখেই প্রসব করেছেন। যদিও তারিখ অথবা নিয়মের ভেতরে কালি-কাগজ পড়ে না। সময়ের ভেতরে যা/যাঁরা পড়ে/পড়েন তা/তাঁরা কীভাবে নিয়মের মধ্যে পড়ে/পড়বেন? হ্যাঁ, নিয়ম ও সময় দুটোই যদি পরস্পরের পরিপূরক হয়, তাহলে মৃয়মান সরীসৃপও বিপরীতগামী হয়।
গাধারা যেইরূপে ঘোড়া হয় সে কথা ক’ব এবার। বাঘের চোখ দেখেছেন নিশ্চয়? প্রশংসা করতে হয়। কেমন ওঁত পেতে একেকটা শিকার ধরে। দলবল নিয়ে কত্তো উৎফুল্লচেতন থাকে, কেউ বুঝতে পারে? পারে না। যখন পারে তখন আর কিচ্ছু করার থাকে না। সম্পাদকেরা ওঁৎ পেতে থাকেন, বাঘের দৃষ্টিকে অতিক্রম করে একপাল গাধার ভেতর থেকে দু’একটির ঘাঁড় মটকে দেন। তবে ভক্ষণ করেন না। সেই অবস্থায় উহাদের আস্তাবলে আনা হয়। কিছুদিন বাদে উহারা টের পায়, কন্ঠ পরিবর্তন হয় হ্রেষা। এইরূপে।
মোদ্দাকথায় বাংলাদেশের প্রজননে জনক বহুত। সন্তানও প্রচুর। এমন পরম্পরা অনেক আছেন, যাঁরা বলেন এই সন্তানটি আমার খুব ভদ্র, শীতল, অমর-অক্ষয়, আগুন বরাবর, শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। সেটা না হয় বুঝলাম কিন্তু আপনার প্রকাশটা যেনো লোকে করে, পড়ুয়ারা। নিজের ঢোল নিজে পেটায় ঢাকীরা, আপনি সম্পাদক।)

চিহ্ন-২৮
তবে প্রসঙ্গে ফিরি। তারিখটা ১২/০২/২০১৫। প্রতিবারই চিহ্ন পেতাম চিহ্নপ্রধানের হাত থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৩০ নম্বর কক্ষে সে ফূর্তি আলাদা। এবার সে সৌভাগ্য হয়নি। পত্রিকাটি অর্থাৎ চিহ্ন-২৮ সংগ্রহ করেছি ফেব্র“য়ারির বইমেলায়। ঠিক সংগ্রহ নয়, চুরি করেছি। বাংলা একাডেমির লিটলম্যাগ চত্বরের এক কর্ণারে ছিল চিহ্নস্টল। স্টলে ঢুকেই তাক করা পত্রিকাগুলোর উপর নজর গেলো। ট্রাঙ্কের মধ্যে সারিসারি চিহ্ন। লোভ সামলাতে পারিনি সেদিন।
খেচরচণ্ডী স্বভাবের লোক আমি, সবাই জানে, বোঝেও, না মানুক। চিহ্ন অনেকটা আমারই মতোন। একটু নেশাগ্রস্থ-মাতাল-ভণ্ড-এলো। ভুলকথা। একেবারেই উল্টো। সাজানো-গোছানো-পরিপাটি। বাড়িয়ে বলার জন্য বলছি না। যাঁরা চিহ্ন পড়েন, হাতের নাগালে পান, তাঁরা অবগত থাকবেন যে, পত্রিকাটি ভারি সেয়ানা; মুনশিয়ানাতেও কম যায় না। তার উপর এবারের সংখ্যাটি কবিতা ও কবিদের। নিয়মিত বিভাগ তো আছে-ই। বরাবরের মতো এবারের সংখ্যাটি নিয়ে কৌতূহলের কোনো শেষ ছিলো না। পত্রিকাটি খুললাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে। স্মরণ আছে, ঐ দিনই আমি এবং চিহ্নকর্মী দীপ্ত উদাস সিল্কসিটির কৃপায় বইমেলায় পৌঁছেছি। স্টেশনে দেখা হয়েছিলো কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এবং ঊনার সহধর্মীনির সাথে। ট্রেন ছাড়ার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত অনেকক্ষণ গল্পগুজব চললো। দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও ভালো না। যার ভোগান্তিস্বরূপ ঢাকায় পৌঁছাতেও বিলম্ব হলো। যখন পৌঁছুলাম তখন সূর্যি ডুবিডুবি।
হালকা শীতের রাত। কুয়াশা পড়ছে। আমি জানালার পাশে। ঠোঁটে সিগারেট। সম্পাদকীয় বা উৎসর্গ অংশ এসব কিছুই পড়ি নি। আমি শক্তি পাগলা। যেহেতু কবিতা সংখ্যা অবশ্যই শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকবেন। খুঁজলাম। পেলাম। শুরু করলাম পড়তে। চিরপরিচিত কন্ঠ, একই কবিতা যেনো পূর্ণজন্মে পাঠ করছি। প্রচুর আসক্ত অবস্থায় ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ শক্তিকে এভাবেই সবাই জানে, আমিও। কিন্তু তাঁর শব্দ সচেতনতা ও বাক্যগঠন যখন দেখি তখন থমকের স্রেফ থ হয়ে যাই। এটা কোনো নেশাঘোর বা সূরিখানায় পড়ে থাকা মানুষের লেখা হতে পারে না এরকম একটা ব্যাপার। সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ‘পদ্য’ লেখার প্লেয়ার তিনি। তা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন সাহিত্যপাড়ার মানুষগুলোকে। তথাপি লিখেও। কবিতায় যেভাবে এসেছেন তারই দায়বদ্ধতায় দায়ী করেছেন অলোকরঞ্জন, সুনীল ও শঙ্খকে।
অনেকটা কাঠখড় পুঁড়িয়ে কবি হয়েছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তারই কিঞ্চিৎ গল্প করেছেন এখানে। পদ্মার পাড়, সান্তাহার জংশন, ধোপাদের কাপড় ধোলাই ও নওগাঁ’র অলিগলি যা একসময় অস্ত্রে আবর্তন। একধরনের রোমন্থন, কবি হবার পেছনে শ্রম ও মেধা যেভাবে ক্ষয় করা দরকার তা তিনি করেছেন, মাটি ও মানুষের সাথে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সম্পর্কে কিছুই জানি নে। নিতান্তই এ সংখ্যা থেকে যতটুকু। তাঁর নিজস্ব কোনো কবিতা বা লেখা নিয়েও এখানে কোনো মাতামাতি নেই। তবে গদ্য ও আলোচনার জন্য এক্কেবারে মননশীল। পার্থপ্রতিমের কবিতার ছন্দ ও সনেট নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। ‘তানকা সনেট-এর ধরণে’ নামে এক বিশেষ রীতি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমাকে শেখালেন এটা স্বীকার্য। সামনে তাঁর রচনা পড়বার সাধটা থাকলো।
ইচ্ছে করেই আল-মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের কবিতা ও কথায় নজর দিয়েছি অনেক পরে। বাড়িতে এসে। চাষীরা ধান কাটছে আবার গ্রামটাও নগরী হয়ে যাচ্ছে এসময় পড়েছি। আল-মাহমুদের গদ্য আমাকে রীতিমত ভিমরি দিত কবিতার কথা বাদই দিলাম। তাঁর গদ্য পড়লে বোঝাই মুশকিল যে একজন কবির লেখা গদ্য পড়ছি। এতোটাই স্বচ্ছ ও চতুর। তাঁর একটি গদ্যের বই পড়েছিলাম স্নান সম্পাদক মোল্লা মামনের কাছ থেকে ধার করে ‘কবির আত্মবিশ্বাস’। বছর দু’য়েক আগের কথা সেটা। লেখার ভেতরে রাজনীতি আছে তবে প্রবহমান। ঐ একই স্বাদ পেয়েছি এবারেও। ইরাক, ইরান, মার্ক্সবাদ, পেট্রোডলার অথবা কোনটা আধুনিক এবং কোনটা কবিতা এসবই। কোড করার মতোন শ’তিনেক পঙ্তি উল্লেখ করা যাবে এখানে, এমন কবি তিনি। ‘সোনালি কাবিন’ তো এমন একটা কাব্যগ্রন্থ যাকে অতিক্রম করা আগামী একশ বছরেও সম্ভব কি-না বাংলাদেশের কবিতায় সন্দিহান! স্বয়ং শামসুর রাহমান তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘… একজন কবি নানা ভাবে কবিতা লিখতে পারেন। কখনও এরকম হয়, যে একটি শব্দ হয়তো মঞ্জুরিত হচ্ছে কবির মনে, সেই শব্দটি হয়তো তাকে দিয়ে একটি কবিতা লিখিয়ে নিল। হয়তো তিনি অফিসে যাবেন, কিংবা কোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে যাবেন, সেই মুহূর্তে একটি লাইন ঝল্সে উঠলো তার মনে। হয়তো সব মুহূর্তে লেখা হয় না, কিন্তু ঐ পঙ্ক্তিটি তাঁর মনে কাজ করতে থাকে। পরে সেটা কবিতা হিসাবে রূপায়িত হয়। আবার হয়তো একটি নির্ধারিত বিষয়, যেটা তাঁর মনে কাজ করছে, সেটা সম্পূর্ণভাবে এসে যায়, এবং সেটা তখন কবি লিখে ফেলে। আমার বেলায় এই সবগুলো প্রক্রিয়াই কাজ করে। কখনও একটি শব্দ কখনও একটি পঙ্ক্তি, কখনও একটি বিষয়; অনেক সময় প্রথম পঙ্ক্তিটি লেখার পর আমি জানি না কবিতাটি কীভাবে শেষ হবে, আমার মনে হয় এটা প্রায় প্রত্যেক কবির বেলায় খাটে।’ পত্রিকার গদ্যে শামসুর রাহমান যে ঢং দিয়েছেন তা কাব্যিক। বোঝা যায় কবির গদ্য, একদম স্পষ্ট।
প্রথমেই আহমদ ছফার ‘কবিতার কথা’ দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের চিহ্ন। মাত্র ষোল লাইনের একটি লেখা কী তার ভাষা, তেলেসমাতি, যেনো জয়জয়কার। জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা নয় কিন্তু, সেই প্রাঞ্জলতাও নহে। শব্দের জন্মান্তর একজন কবির দ্বারাই সম্ভব এবং কবি বরাবরের মতোই ত্রিকালদর্শী। ‘আমরা তো সর্বক্ষণ নদীর মতো সময় দ্বারা শাসিত হচ্ছি’ তা স্বচ্ছভাবে বলেছেন। শব্দ বেঁচে থাকুক, শব্দের বাচ্চারা কিন্তু পরিবর্তনে হয়তো এটাই বলতে চেয়েছেন তিনি বা আরও অধিক।
নতুন কবিতার (১৯৫০) সম্পাদকীয় অংশে লিখেছেন আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশিদ খান। পুরাতন কবিতার (পঞ্চাশের আগে) সবটা স্বীকার করে নয় আবার অস্বীকার করেও নয়; বাংলাদেশের কবিদের এগিয়ে যেতে বলেছেন। এটা যেনো একটা অতীত সাহিত্যের ক্রমান্বিত খণ্ড। এতে সংকলন, সংগ্রহ ও আধুনিকচেতা কবিতার কিয়ৎ বিবৃতি আছে। যেখানে বলা হয়েছে কবিতার শব্দ ও ছন্দ, তার পুনরাবৃত্তি। সচরাচর ইসলামপন্থী আর বামপন্থীর যুক্তি-তর্ক আছে। কবিদের আলাদা সারির, কে কোন দলের এরূপ। কিন্তু কবিতার কী দোষ-ত্রুটি থাকে? যুদ্ধ, শান্তি, প্রগতি এবং আমাদের স্বাধীনতা সবটা মিলেই তো এখন জয়দ্রথ চলে সাহিত্যে। একটা রমরমা ব্যাপার এখানে প্রত্যক্ষ। তাই সবারই একটা দল থাকে। সার্বজনীনতার আদিখ্যেতা ও বৈচিত্র্যে নজরুল-রবীন্দ্রনাথ বা কোনো আন্দোলনের কল্যাণে নয়, পরিষদের পাতাগুলো হিন্দু অথবা মুসলিম সাহিত্য দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি, না কোনো ধর্ম। এরা আলাদা হয়েছে আপন স্বার্থে। তবে শব্দের কী দল, কী দোষ?
পঞ্চাশের শুরুতে এদেশের সাহিত্যে যেমন কমিউনিজম ভর করেছিলো তেমনি রিলিজিয়ানও। যার ফলপ্রসূ একেকজন কবির কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতেও সময় লেগেছে ঢের, এখনকার সাহিত্যিকেরা যেটাকে কাব্য সাধনার সময় বলে থাকেন। প্রকৃত, তাঁরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন, আসলে কী করবেন? কোনটা সঠিক পন্থা। একসময় পেয়েছেনও। তাই বাংলাদেশের হয়ে লিখেছেন। নইলে সবাই ঐ পশ্চিমপন্থী। বাস্তবতা ও সাধনা দুইটা আলাদা জিনিস, রকমফেরও আছে। পরবর্তীতে যাঁরা এদেশের প্রধান/প্রধানতম কবি হয়েছেন তাঁদের ক্ষেত্রেও কথাটা যুঁৎসই। লিখেছেন অনেকেই, অগণিত কিন্তু টিকেছেন গুটিকয়েক। এর মধ্যে যাঁরা দলপন্থী তাঁরাও নিজ নিজ স্থান গেড়ে ফর্দ পেতেছেন। তা সেটা বামপন্থী হোক অথবা ডানপন্থী। তবে আসর জমেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এঁরা প্রত্যেকেই মধ্যবিত্ত ঘরের ছিলেন। কবিতা এগুতে থাকে এভাবেই।
জন্ম হলো ঢাকার। স্বাধীনতার পরের কথা সেটা। কবিদের কেন্দ্রবিন্দু। কবি হতে হলে ঢাকায় যেতে হয় দেশভাগের আগে যেমন কলকাতায়! যে কারণে দেশভাগ হয়েছিলো ঐ একই কারণে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। আগে হিন্দুদের ছাড়া করেছি পরে মুসলিমদের। হ্যাঁ, মুসলিমদের। আমরা যে বাঙালি। কিন্তু ফলাফল কী হলো? আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃত থেকে এখনো সেই কীটেরা যায় নি বরং তা পুষে রেখেছি। স্বাধীনতাত্তোর এদেশের কবিতায় প্রতিবাদ দেখা গেছে, প্রগতির জন্য লাফালাফি যতোটা হয়েছে তারচেয়েও জমকালো মাতামাতি হয়েছে রক্ত নিয়ে। কে কী ধরনের শ্লোগান দেবে তাই নিয়ে হইচই, রব। কবিমহলে তখন দাপুটে শামসুর রাহমান, সৈয়দ হক এবং আল-মাহমুদ। বিশাল শক্তিতে বলীয়ান। অন্যান্য কবিরাও লিখছেন :
বাহান্নতে ভাষার জন্য রক্ত দিলো ছাত্ররা আর পরে দিচ্ছে সেই ভাষাকে কাগজে লেখার জন্য। রাষ্ট্রের অপশক্তি, সাম্রাজ্যবাদ প্রভূত শব্দের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। তখন কবিতায় ঢুকে গেছে আরবি, ফারসি, উর্দু এবং ইংরেজি শব্দ। এটা একবার হয়েছিলো ভাষা আন্দোলনের আগে এবার দেখা দিলো তার কিছুদিন পর। ষাটের দশকে। তাতেও আপত্তি থাকবার কথা নয়, যে ভাষাতেই কবি লিখুক তা যদি পাঠককে তৃপ্তি দেয় তাতে দোষের কী? বদলে আনন্দটাই বেশি। কিন্তু ব্যতিক্রম বাড়ে অন্যখানে। কবিরা বিক্রি হতে শুরু করে। বিক্রি হয়। বলতে খুব লজ্জা হয়। সত্তর, আশি বা শূণ্য সেটা যে দশকেই হোক। ‘প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না।’
‘পথ চলতি ধূপের গন্ধ এদেশের কবিতা’ উপর্যুক্ত সারমর্মই বহন করে। সত্তর ও আশির দশক ধরে বিশদ বলা আছে সত্য কেবল তা হতাশা, রাজনৈতিক গোলযোগ, নৈঃশব্দের আখড়া নচেৎ আর কী? স্বৈরাচার সরকারের পতন, আন্দোলনের সফলতা বা ব্যর্থতা (যদি থাকে)। এগুলোই কবিতার শব্দ হয়েছে। কবিরা উপমা খুঁজেছেন বারুদে বুলেটে। রুদ্র কিংবা নির্মলেন্দু গুণ অথবা কারো নাম বিশেষ না বললেও দর্জিগিরিটা চোখ এড়ায় না। তবে সাহিত্য দশক মেনে চলে না। কবিরা তো এসবের ধারও ধারে না। নব্বুই ও শূণ্য দশক ধরে এখনো কিছু বলার সময় জ্ঞান কোনটিই হয়নি। এই দশকে কবিদের হিরাহিরি। একটু অপেক্ষা দরকার পাঠক ও সম্পাদকের।
এ অংশে একুশ জন কবির (পঞ্চাশ থেকে শূণ্য দশক পর্যন্ত) একটি করে কবিতা আছে। প্রত্যেকটি কবিতা পড়েছি, একাধিকবার। শুধু অভিভূত হয়েছি, ফিলিংস নিয়েছি। সচরাচর যেটা হয়, যত বড় কবিই হোন কেনো তিনি কোনো না কোনো ভাবে প্রভাবিত হোন এবং সচেতন পাঠক তা ধরতে পারেন সহজেই। মজার ব্যাপার হলো এখানে সেই রোগটা নেই। একদম নীট জিনিসটা সম্পাদক বগলদাবা করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ যে যেমন ঘরানার কবি সেই শেকড়টা। যাঁরা নতুন করে নতুন পাঠকদের সাথে পরিচিত হচ্ছেন সেইসব কবিদের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে আবুল হাসান। পরে পরেই ময়ুখ চৌধুরী, শিহাব সরকার, মাহবুব কবির অন্যতম খতিয়ান রাখবার যোগ্য বলে মনে করি। এক্ষেত্রে আরো বিস্তারিত কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে।
‘কবিতা প্রসঙ্গে কথা ও কবিতা’ খণ্ডে দশজন কবির কবিতা ও কথা আছে। এখানে প্রত্যেকেই মোড়ল, মাতবর। সবাই চেষ্টা করেছেন নিজের কবিতাকে বোঝানোর। সেই মতে প্রত্যেকেই খুব একটা মন্দ লেখেন নি। যদি উল্লেখ করে বলতেই হয় তবে ‘কবিতা ও কথা’ নিয়ে সবচে এগিয়ে আছেন শামীম নওরোজ। মাত্র কয়েক লাইনে সার্বজনীন করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন অনায়াসে। কবিতার পেঁয়াজপরত, শিল্পবীক্ষণ, ভাষা, অসুস্থতা, ভেতর-বাহির অথবা কবিতাকে নিয়ে সহজ কথাবার্তা এমন খেতাব প্রত্যেক কবিই দেন। এই ফিচারে সবাই হোমরা-চোমরা কবি। মাসুদ খান, সৈকত হাবীব, মাসুদার রহমান, কুমার দীপ, মামুন মুস্তাফা পর্যন্ত। গভীর পাঠে ছুঁয়ে যাওয়া কিছু লাইনও আছে যদিও হাতে গোনা কয়েকটি।
‘কুকুরের হিস্যু সহ্য হয়/সংখ্যালঘুর উচিতবচন কখনই নয়!’
‘নিঃসঙ্গ অ্যান্টেনা/কথা বলে/আকাশের সাথে’
‘ও ধূসর, ও রাত্রির ক্যাম্প,/এখন কীভাবে মেলে ধরবো বিষাদের আঙুলগুলো?’
‘জন্ম মৃত্যু যেটাই বাড়ুক/বাণিজ্য বাড়বেই।’
ভালোলাগা তো আছেই। বিশেষ করে কামরুল ইসলাম, মাসুদ খান ও পাবলো শাহি লিখেছেন একটু আলাদা রকমে। কবিতার চিত্রকলা, নিউ ইমেজ, টেক্সচুয়াল, ভাষা ইত্যাকার পাঠককে কিঞ্চিৎ ভাবিয়েছে আশা করি।
সাম্প্রতিক কবিতায় খালেদ হোসাইনের ‘বৃষ্টিভেজা আলো’/আমিনুর রহমান সুলতানের ‘জলের সিঁড়িতে পা’/সজল সমুদ্রের ‘ডালিম যেভাবে ফোটে’/বেনজামিন রিয়াজীর ‘অফুরন্ত পাতার মেলায়’/সৈয়দ তৌফিক জুহুরীর ‘পতঙ্গপর্ব : কানামাছি’ ভালো লাগা সৃষ্টি করেছে।
প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও সর্দিকাশি নিয়ে রাজশাহী ফিরি। সবুজ মতিহারে। চোখে মুখে প্রশান্তি ঝমঝম করে পড়ছে। কয়েকদিন বিশ্রাম। এবার পত্রিকার স্মৃতি রোমন্থন ফিচারটিতে তাকাই। হরণ করে আসাদ সরকারের লেখাটি। লেখাটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায় আবার ভুরিভুরি রোমাঞ্চও দেয়। শিহরিত করে। যাকে বলে পাক্কা কাতরতা— স্মৃতির মতোন স্মৃতি। ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’—এই শিরোনামার পারফেক্ট গদ্য। জানতে ইচ্ছে করে শেষ পরিণতি কী হলো মালটার অথবা পোয়াতিটার? বাকি লেখাগুলোর মাঝে রফিক সানির লেখাটিও এই খণ্ডে পরিপক্বতা আনতে আগ্রহী। তবে একই শব্দ ও কথার পুনরাবৃত্তি সেটাকে লুজ করে দিয়েছে অনেকটা। এটা পদ্যের জন্য খানিকটা ঠিক কিন্তু গদ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অমিতকুমার বিশ্বাস, উমাপদ কর বা সুজন হাজারীর লেখা এই অংশে ছাপানো কতখানি যৌক্তিক তা আমার অলস বোধে আসে না।
পাঠক কহেন …খণ্ডাংশে পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকা ‘মাসিক কবিতাপত্র’ নিয়ে আলোচনা করেছেন শহীদ ইকবাল। এটি আর একটি চমক। পত্রিকার আলোচনা প্রকৃত কী রূপ হতে হয় এবং পত্রিকার পাঠক ক্যামন, তা বোঝা মুশকিল হবে যদি লেখাটা না পড়া হয়। অসম্ভব সৃজনী আর মুক্ত-সরস শব্দমালা অথচ পাঠে অমৃত। ভাষা এতো প্রাঞ্জল ও বোধগম্য যে, পড়তে পড়তে যদি কেউ খুন হতে চান তবে হতে পারবেন। নতুন কাজ, নতুন করে কবিতাপত্রকে চিনিয়ে দিয়েছেন তিনি, সেটা হরেক মেজাজে। অনেক নতুন নতুন কবিদের নাম জানা যায় এই আলোচনা থেকে। গোটা পত্রিকার মধ্যে এই লেখাটি শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে।
এইরকম আরেকটি ভালো লেখার কথা বলি। দিলীপ ফৌজদারের। মান আছে। ব্যবসা হবে কম। কবিতা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, এক জায়গায় স্থির রাখেন নি। প্রথমে কবিতার ধর্ম নিয়ে কথা বলেছেন অর্থাৎ ছন্দমিল। ছন্দমিল আর অন্ত্যমিল আসমান জমিন সমান আলাদা জিনিস তাও কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। স্বাদেও শেষ নেই এরকম লেখায়। কবিতার যোগাযোগটা কার সাথে কার? কেমনতর? ঘটা করে তা কী বলা যায়? সে তর্ক তো থাকবেই, যুক্তিতর্ক! যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন কবি ও কবিতার মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। উদ্ভটরূপে নয় বরং কবিতার আচরণ ও ভাষায় থাকে যেনো সারল্য, বোঝা যায়। তিনি বোধহয় কবিতাকে সর্বস্তরের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছেন যার কল্যাণে পরাবাস্তব, চিত্রকল্প, দৃশ্যকল্প প্রভৃতি এমনকি গান পর্যন্ত সাধারণরূপে প্রার্থনা করেছেন। এসব যুক্তি, তক্কো আর গপ্পে যে মায়াজাল পাঁতা আছে তার ক’জন বোঝে? জানে? তাই, যে লেখায়/কথায় মর্ম উদ্ধার হবেনা সহজ সে লেখা না লেখায় ভালো।
কারান সিং (জন্ম ১৯৩১) এর নাম এর আগে শুনিনি। চিহ্ন চিরকুটে যা পাওয়া, তাই জানা। তাঁর কবিতা ‘দ্য সেমিনার’ অবলম্বনে অনূদিত কবিতা ‘সেমিনার’। অনুবাদ করেছেন মাসউদ আখতার। অনুবাদেও লেখা পড়ে কে কতোটা তৃপ্তি পান, জানি নে। তবে আমি পাই না। এক্ষেত্রে এমনটা হয়নি বা আকাক্সক্ষা কমেনি আমার, সত্য। কিন্তু প্রশান্তিও পাই নি। ‘কী লিখি কেন লিখি’ এ অংশে এবারের হিরো সরকার মাসুদ। মূলত কবি, কবিতার ঘরে দোলনা দোলান। এই অদ্ভূত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু সঠিক কোনো উত্তর দেননি। শেষ পর্যন্ত চালাকি করে গেছেন। একাডেমিক কথাবার্তার সাথে চেষ্টা করেছেন ইমেজিক কথাবার্তা বলার, বলেছেনও চমৎকার করে। তবে নিজের গুনহগানটাই বেশি গেয়েছেন। তাঁর মতে তিনি রবিবাবু টাইপ একজন রাইটার। নাটক ছাড়া সবশাখায় বিচরণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন মহাকাব্য ছাড়া। তথাপি কথা বলতে শুরু করেছেন কবিতা নিয়ে আবার শেষটাও করেছেন কবিতা নিয়ে। এতে করে প্রমাণিত হয় তিনি কবিতা বিষয়ে গদগদ। কিন্তু কেন কবিতা লেখেন সেটার উত্তর এখানে ঝাপসা।
আলোচনার জন্য নয়, পত্রিকাটি পড়ে যে অনুভূতি বা শিহরণ লাগলো তাই জানালাম। হয়তো অনেককিছুই বাদ দিয়েছি। ইচ্ছে করেই। সেটা ইঙ্গিতপূর্ণ ও অর্থবহুল করতে হলে আরো কিছু দিন অপেক্ষার প্রয়োজন, প্রয়োজন সবটুকুর। কাগজের সম্পাদক শুরুতেই কবিতা সংখ্যা ও কবিতাকে একটু নতুন করে চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি এটাকে বলেছেন ‘চেষ্টা’। প্রণতি ও উৎসর্গে স্থান পেয়েছেন কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৪৮। প্রয়াণ ২০১৪)। স্মরণে এবার স্থান করে নিয়েছেন বাঙালিনামার স্রষ্টা ও বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী (প্রয়াণ ২৬ নভেম্বর ২০১৪)। মূলত কবিতার মধ্য দিয়েই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান চান সম্পাদক। সম্পাদকীয় পাতাটা তারই নমিনিস্বরূপ। শেষে সে কথা বলি, প্রাপ্তির খাতায় শূন্য পড়লেও চিহ্ন পড়তে চাই। নিয়মিত। চুরি-চামারি করে হলেও।