Archives

লেখা না-লেখার মৌন অন্বেষা

লেখা না-লেখার মৌন অন্বেষা

হয়তো অনুসন্ধিৎসা, হয়তো নির্দোষ কৌতূহলই,— আশেপাশের মানুষের এরকম জিজ্ঞাস্যে শেষমেষ লেখককেও হাতড়ে বেড়াতে হয় এই প্রশ্নের উত্তর, কেন লেখেন তিনি। এমন তো নয়, লেখালেখিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বা মহৎ পেশা, কিংবা তা বেশ অর্থকরী। বাস্তবে যে-কোনো কাজই মানুষকে অপরিহার্য করে তুলতে পারে, আবার এমন কোনো কাজই নেই যা মানুষকে দিতে পারে অমরত্বের নিশ্চয়তা। লেখালেখিও পারে না বিশেষ কারো উপস্থিতিকে চিরকালীন করে তুলতে। চোখের সামনেই তো আমাদের দেখা হয়ে গেল, চর্যাপদ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে যুক্তপ্রয়াস, শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয়েছে গবেষণাঘরে। তেমনি নামহীন হয়ে পড়েছেন মানবসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম আবিষ্কার চাকার উদ্ভাবক, বিনয় মজুমদারের আকুল আহ্বান ‘ফিরে এসো চাকা’ও পারে নি তার ঘুম ভাঙাতে। এমনকি আমাদের চেনাজানা জগতটাকে আমাদের সামনেই বদলে দিল যে মোবাইল ফোন, কার বা কাদের কল্যাণে তা এমন হয়ে উঠল জানা নেই আমাদেরই অনেকের! কাজেই লেখালেখি করে জায়গা করে নেয়া যাবে চিরকালের খাতায়, এরকম আশাও নিশ্চয়ই করেন না কোনো লেখক। তা হলে কেন লেখেন তিনি! কোন কুহক বার বার ডাকে তাকে, নিয়ে যায় লেখালেখির কাছে? শোভন এই প্রশ্নকে তীব্র বিরক্তি মিশিয়েও করা যায় বৈকি। পাঠক হিসেবে আমরা নিজেরাও সেরকম করি মাঝেমধ্যে, কোনো লেখা পড়ার পরে তুমুল আড্ডায় একরাশ বিরক্তি আর উত্তেজনাময় হতাশ্বাস ঝরে পড়ে আমাদের কণ্ঠ থেকে, ‘ওনার লেখার দরকার কী? কেন লেখেন তিনি? এখনো কেন লেখেন?’ বিস্তর পরিতৃপ্তি নিয়ে কেউ তখন লম্বা করে হাসে, ‘আমি তো আর পড়িই না তার লেখা। লেখার কী দরকার তার?’
দুঃস্বপ্নের মতো এই দৃশ্যকল্পটি : লেখক তার উপান্তে পৌঁছে গেছেন, ট্রেডমার্ক হয়ে গেছেন, তার লেখা ছাপা হয় নিয়মিত, দীর্ঘ সময় ধরে লিখে চলেছেন তিনি, কিন্তু কেউ হয়তো তা আর পড়ে দেখে না, নির্লিপ্ত উপেক্ষায় নাম দেখে পৃষ্ঠা উল্টে যায়, মুখোমুখি হলে অবশ্য হাসতে হাসতে বলে, লেখা দেখেছি; তাকে নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু তাতে পুনর্পাঠ ও পুনরাবিষ্কারের ছাপ থাকে না। অমরত্ব নয়, এই অনিঃশেষ নির্লিপ্তিই বোধহয় লেখকের শেষ প্রাপ্তি। তারপরও লিখে চলেন তিনি। হয়তো ছাপতে দেন, হয়তো ছাপেন না, হয়তো কোনো সম্পাদক তার কাছে লেখা চায়, হয়তো নতুন কারো অভ্যুদয়ে তার জন্যে বরাদ্দ করা পৃষ্ঠা বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও লেখেন তিনি। কেউ কেউ আবার জানার চেষ্টা করেন, এখন কী লিখছেন তিনি, কেন লেখেন তিনি।
সত্যিই তো কেন লেখেন তিনি! আমিই বা কেন লিখি?
অন্তত আমার ক্ষেত্রে এমন কোনো বিশেষ কারণ নেই, যা আমার তুরুপের তাস হতে পারে, যা সবাইকে চমৎকৃত করতে পারে। ‘কেন লিখি’ মানুষের এই জিজ্ঞাসাকে বিশেষভাবে মহিমান্বিত করতে পারে। একেক মানুষ একেক ভবিতব্য নিয়ে একেক কাজে জড়িয়ে পড়ে। কাজেই কী ভাবে মানুষ কোনো কাজে জড়িয়ে পড়ে, সেটি বোধহয় তার ওই কাজটি ক্রমাগত করে চলার কারণ জানার একটি উপায় হতে পারে। যেমন, লু স্যূন চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে, কিন্তু পরে সরে এসেছিলেন সে পথ থেকে। কেননা তার মনে হয়েছিল, একটি রুগ্ন, ক্ষতবিক্ষত, সা¤্রাজ্যবাদের কামড়ে ধ্বস্তবিধ্বস্ত দেশের মানুষদের শরীরের অসুখ সারানোর চেয়ে মনের দিক থেকে এগিয়ে নেয়া অনেকÑঅনেক বেশি জরুরি। আর সেটা সম্ভব কেবল লেখালেখির মধ্যে দিয়ে। কিন্তু সবাই কি সেরকমই ভাববেন? না ভাবা উচিত? আমি নিজেও ভেবেচিন্তে ঠিক করি নি যে, লেখালেখি করব। অবশ্য আমার পারিবারিক আবহে সাহিত্যচর্চার ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই ছিল। সাহিত্যচর্চা বলতে আমি শুধু লেখালেখিই বোঝাচ্ছি না, সাহিত্যপাঠও সাহিত্যচর্চার অংশ, যা আমাদের শৈশবে কৈশোরে আমাদের আশেপাশে আমরা সহজেই পেয়েছি। পেয়েছি এমন অনেক মানুষ, পৃথিবী যাদের ক্লান্ত ও পরাস্ত করে ফেললেও যাদের স্মৃতিতে ছিল সাহিত্য থেকে নিঃশ্বাস নেয়ার কথা। আমার বেশ মনে আছে, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় এক বিয়ের অনুষ্ঠানে সাদাসিধে এক বরযাত্রী আমাকে ভীষণ অবাক করে দিয়েছিল অকস্মাৎ বিশেষ ভঙ্গীতে ‘ভেংচি খাবে, ভেংচি?’ বলে। আমি ভেবে পাই নি, আহসান হাবীবের লেখা কিশোরদের ওই কবিতা তার স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছে কেমন করে।
বালককালে দেখেছিলাম আমাদের গ্রামের সেরাজুল ইসলাম দাদামিয়াকে দরবেশ হয়ে যেতে। অনেকে বলত, সংসারের ধকল থেকে বাঁচতে তিনি এই পথ ধরেছেন। দাদীকে দেখতাম ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, রাস্তার ধার থেকে কচুলতা তুলছেন, ওল তুলে আনছেন মাটির নিচে থেকে, এর-ওর বাড়ি যাচ্ছেন চালের সন্ধানে, কুড়িয়ে নিচ্ছেন গাছ থেকে পড়া আম, মুরগির ডিম বিক্রি করছেন গ্রামের কারো কাছে, কাসার গ্লাস বন্ধক রাখছেন। আর দাদা সংসার ছেড়ে মসজিদে বসবাস করছেন, রমযান মাস না হলেও অবিরাম রোজা রাখছেন, সহানুভূতিশীল গ্রামবাসীরা সেহরি, ইফতারি আর রাতের খাওয়া পাঠাচ্ছে তাকে। তাদের অনেকেও হয়তো বেশ অভাবী, তবে অত সাহস নেই যে খোদার ধ্যানে বসে পড়বেন সংসার ত্যাগ করে। সেরাজুল দাদার প্রকাশ্যে বুক চিতিয়ে পলাতক হওয়ার এই সাহসিকতায় মুগ্ধ তারা তাই আপ্রাণ চেষ্টা করে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। তবু কখনো কখনো তাকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না, চিন্তিত দাদী কাতরস্বরে এরওর কাছে খুঁজে ফেরেন তাকে। হঠাৎ এক ভয়ার্ত রাখালের মুখ থেকে শোনা যায়, গরু খুঁজতে গিয়ে সে দেখতে পেয়েছে দরবেশ সাহেব গোরস্থানের জঙ্গলে বসে আল্লাহ্র নাম জপ করছে। আরেকবার তাকে খুঁজে পাওয়া গেল গ্রামের অন্ধপুকুরের জঙ্গলে, যেখানে ছিল এককালে পূর্ববঙ্গের সান্যাল জমিদারদের বসতভিটা। অবশ্য হঠাৎ করেই তিনি আবার ফিরে আসতেন বসতভিটায়। যদিও হাতছাড়া করতেন না তসবিহ্টাকে। এ হেন দরবেশ সাহেব একবার আমাকে পাকড়াও করলেন, তার লেখা বেশ কয়েকটি নাটকের খাতা আছে, সেগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অতএব আমাকে সেসব নতুন করে কপি করে দিতে হবে। পুরোটাই ঝামেলার কাজ। কিন্তু মুরুব্বি মানুষ, না করি কেমন করে, রাজি হলাম আমি। তিনি পড়তে থাকেন। নতুন বাইন্ডিং খাতা কেনা হয়েছে, আমি তাতে লিখতে থাকি। তিনি বার বার ঝুঁকে পড়ে দেখেন ঠিকমতো লিখছি কি না। যখনই কথা বলেন তখনই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধ। এ এমন এক রোগ, রোগী তার অস্তিত্ব টের পায় না, কিন্তু অতিষ্ট হয়ে ওঠে আশপাশের মানুষ। আমিও অতিষ্ট হয়ে উঠি, বার বার মুখ সরিয়ে নেই। একদিন লেখার পরেই তাকে প্রস্তাব দেই আমি, খাতাগুলো দিয়ে দিতে, যাতে আমি আমার সুবিধামতো কপি করে দিতে পারি। কিন্তু তিনি মোটেও রাজি নন নাটকের খাতাগুলো হাতছাড়া করতে। অতএব আমি দু’চারদিন পর থেকে পালিয়ে বেড়াই। আমার জন্যে বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল, তার ওই অতীতকাল এবং সেই অতীতের জন্যে তীব্র মায়াÑ নাটক লিখতেন, নাটক করতেন তিনি তার যৌবনকালে। আর ধর্মের কাছে শর্তহীনভাবে সমর্পিত হওয়ার পরও তিনি তার সেই স্বর্ণোজ্জ্বল যৌবনকালকে ধরে রাখতে চাইছেন, নাটকগুলোকে চাইছেন সংরক্ষণ করতে।
আমার হাতের লেখা অনেকের কাছেই ভাল মনে হত। আর তাই অনেক লেখাই আমাকে কপি করে দিতে হত। আমার বাবার হৃদরোগ হয়েছিল, হাত কাঁপত, তার হয়ে চিঠি লিখে দেয়া থেকে শুরু করে পুরনো লেখা কপি করে রাখতে হত। আমার এক ভাই লেখালেখি শুরু করলেন, কপি করে দিতে হত তার খসড়া লেখা। তখনো তো ফটোকপি আসে নি, কার্বনকপি করা যেতো অবশ্য, কিন্তু তা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যেত আর ডাকযোগে কোথাও পাঠালে শেষ পর্যন্ত পাঠোদ্ধার করা যেত না। অপ্রকাশিত লেখার প্রথম পাঠক হওয়ার গৌরবে সানন্দেই লেখা কপি করার কাজটি করতাম আমি। আমাদের এক ফুফাতো ভাই, ফরহাদ আহমেদ, প্রায়ই ঢাকা থেকে গ্রামে এসে থাকতেন। ডাকনাম তার খোকন, কিন্তু ওই নামে আরো একজন আছে, আমরা তাই বলতাম ঢাকার খোকন ভাই। ভাল গানের গলা, ছায়ানটের প্রথম দিকের ছাত্র ছিলেন, শিল্পী জাহিদুর রহিম খুব পছন্দ করতেন তাকে, কিন্তু মঞ্চে কখনো উঠলেন না, ঘরোয়া পরিবেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে চলেছেন আজ অবধি। তখনো তিনি বিয়ে করেন নি। গ্রামের ছেলেদের নিয়ে তিনি শরীরচর্চা করেন, মাছ ধরে বেড়ান, গান গেয়ে বেড়ান। তার প্রভাবে তখন আমাদের গ্রামের কৃষকরাও ক্ষেতে হালচাষ করতে করতে গান গাইত, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’। ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ’ না হয় কমবেশি সকলেই গায়, কিন্তু ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’র মতো গান মানুষের কণ্ঠে… বিস্ময়কর ঘটনাই ঘটিয়েছিলেন তিনি। এই ঢাকার খোকন ভাইও লেখালেখি করতেন একসময়ে। তার কী ইচ্ছে হল, আমাকে দিয়ে তার পুরনো সব লেখা এলোমেলো কাগজ আর ছড়ানোছিটানো খাতা থেকে নতুন বাইন্ডিং খাতায় কপি করে নিতে লাগলেন। হোমিওপ্যাথির মিষ্টি ডোজ পাওয়ার প্রলোভনে প্রায়ই আমি যেতাম জেঠামিয়ার কাছে। শখের বশে হোমিওপ্যাথ চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ধূসর অতীতমাখা ধূসর এক্সারসাইজ খাতা নামাতেন তিনি তাকের ওপর থেকে। তার প্রতি পাতায় মিশে ছিল সেইসব আবেগ, মমতা আর উত্তেজনা, যেসব দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম একসময় উজ্জীবিত করেছিলেন বাঙালি মুসলমান তরুণসমাজকে। তারুণ্যের সেই বৈভব তিনি খুলে দিতেন আমার কাছে। হোমিওপ্যাথির মিষ্টি ডোজের লোভে তা অতুলনীয় মনে হতো আমার কাছে। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আধমাইল হেঁটে বাজারের ডাকঘরে নিয়মিত যেতাম আমি খবরের কাগজ নিয়ে আসতে। পোস্টমাস্টার বাবলু ভাই কখনো কখনো তার সামনের চেয়ারে বসিয়ে বিশ্বরাজনীতি থেকে শুরু করে সাহিত্যের জ্ঞান উজাড় করে দিতেন আমার কাছে। বলতেন, পড়বি— বার বার পড়বি রবীন্দ্রনাথ… একটু থেমে হয়তো যোগ করতেন, আর শরৎচন্দ্র। তারপরই আধুনিক সব লেখককে দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নাকচ করে দিয়ে বলতেন, আর কারো বই পড়ার দরকার নেই। নিঃসন্দেহে সাহিত্যের সঙ্গে তার নিবিড় কোনো যোগ ছিল না। তবুও এখনো ভাবি, ওয়াহিদুল হকরা না হয় বুজুর্গ মানুষ, কিন্তু কী করে রবীন্দ্রনাথ এই প্রত্যন্ত জনপদের মানুষদের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছেন! বুজুর্গ মানুষরা কি তার ব্যাখ্যা আদৌ দিতে পারবেন? যাই হোক, এতসব লেখক আর সাহিত্যপাঠকের উত্তাপে বালকবয়সে সমবয়সীদের কাছে আমি প্রথম যে লেখাটি নিজের বলে দাবি করলাম, সেটি আসলে আমার বড়ভাইয়ের লেখা, খুচরা একটি পাতায় লেখা হয়েছিল সেই কবিতা। প্রথম লাইনটি ছিল যতদূর মনে পড়ে, ‘রূপালী নদীর তীরে বসে জাল বোনা’। কোথাও সেটি ছাপা হয় নি জানতাম আমি, কেননা আমার বাবা ও ভাইরা পাণ্ডুলিপিতে কোথায় তা ছাপা হয়েছে, তাও পরে লিখে রাখতেন। কবিতাটি আমি নিজের হাতে কপি করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলি মূল কাগজটি। কিন্তু অচিরেই অপরাধবোধে ভুগতে থাকি এবং কালক্রমে নকল কবিতাটিও চিরতরে লোপাট করে ফেলি। এইভাবে আমার বড়ভাইয়ের একটি অপ্রকাশিত কবিতা চিরদিনের জন্যে অপ্রকাশিত লেখা হিসেবে পুনরাবিষ্কারের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়।
তবে বোধহয় ওই অপরাধবোধই আমাকে নিজে থেকে একটা কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। এবং কী আশ্চর্য, আমার বাবার উৎসাহে সেগুলো ডাকযোগে পাঠানোর ফলে ছাপা হতে থাকে। এখন এসব লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, নিজের কোনো লেখা ছাপা হওয়ার আগেই আমি একটি বই পড়েছিলাম, যার বিষয় ছিল লেখালেখি। আমি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, বাবা বইটা এনে দিয়েছিলেন হাইস্কুলের লাইব্রেরি থেকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে প্রকাশিত বই, সম্পাদনা করেছিলেন রোকনুজ্জামান খান। নাম মনে নেই, সম্ভবত ‘আমার প্রথম লেখা’। দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে কিশোর পাঠকদের জন্যে একসময় তখনকার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকরা লিখেছিলেন, কী করে তারা এলেন লেখালেখিতে। ওই লেখকদের দলে আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিলেন শওকত ওসমান। অকপট সারল্যে লিখেছিলেন, কী করে স্কুলে মওলানা স্যারকে প্রশ্ন করলেন, খোদাকে তা হলে সৃষ্টি করেছে কে। ফলে শুরু হয়েছিল তার স্কুলপালানো বাড়িপালানো জীবন। যে জীবন থেকে তিনি পৌঁছেছিলেন লেখালেখির কাছে। এতদিন পড়ে মনে হয়, লেখালেখি সম্পর্কে একটি স্বপ্নের জগত বোধহয় ওই বইটিই প্রথম সৃষ্টি করে। পরে দু’একটা লেখা যখন প্রকাশিত হল (হোক না তা ছোটদের পত্রিকাতে বা দৈনিকের ছোটদের পাতাতে, ছাপার হরফে তো), এদিকে গ্রামের ও স্কুলের বড়দের নাটকে বালক বয়সী চরিত্রে কয়েকবার অভিনয়ও করতে হল, অনেকেই আমাকে বাড়তি স্নেহ দিতে লাগলেন। এক রাতে সেই দরবেশ দাদার ছেলে, আমার ৩/৪ বছরের বড় এক ভাইয়ের বন্ধু সে, আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার জন্যে নিয়ে গেলেন তাদের বাড়ি। স্টার সিগারেট খাওয়াতে খাওয়াতে তিনি তার জীবনের বিভিন্ন কথা শোনাতে আরম্ভ করলেন। তার মধ্যে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কুষ্টিয়া ভ্রমণের স্মৃতি। কুষ্টিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি বন্ধুর বাড়িতে, বন্ধু ছিল না সেই সময়ে, বন্ধুর বোন এসে কী ভাবে তাকে খাওয়াদাওয়া করাল, রাতে বিছানাটা পেতে দিল, মশারি গুঁজে দিল — ধীরে ধীরে তিনি দিতে লাগলেন সেসবের নিখুঁত বর্ণণা। কথাগুলো এখনো আমার দু’ কানে ভাসে, মৃদুস্বরে বলছেন, ‘তুমি অন্য কিছু মনে করো না, (তারপর খুশ খুশ করে কাঁশলেন) মশারীটা গুঁজে দিয়ে গেল।’ অথচ মনে না করার কথা বলার মধ্যে দিয়েই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অন্য কিছু মনে করে নাও তুমি। এমন কিছু যার অধরা বিহ্বল অনুভব তাকে তাড়িয়ে ফিরছে সর্বক্ষণ। এবং তারপরই সবিনয় অনুরোধ করলেন তিনি, ‘তুমি এসব নিয়ে একটা বই লেখো ভাতিজা। একেবারে অমর হয়ে যাবে।’ উপন্যাস অবশ্য আমার আজো লেখা হয় নি, অমরও হতে পারি নি; তবে ওই রাতের কল্যাণে তার সঙ্গে বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এরকম বয়সেরই কোনো এক সময়ে আমাকে আমার স্কুলের এক শিক্ষক তার লেখা উপন্যাস পড়ে শোনান। তখনকার জ্ঞানেই আমি বুঝতে পারছিলাম, চূড়ান্ত বিরক্তিকর লেখা সেটা; কিন্তু আমি নিশ্চিত, আমার আগে বা পরে এত ধৈর্যশীল কোনো শ্রোতা কখনোই পান নি তিনি। সেই স্যার মারা গেছেন অনেক আগেই, কিন্তু তার স্নেহশীল চোখগুলো এখনো অনুভব করি আমি এবং এ-ও চিন্তা করি, তিনি জানতেন লেখক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নন, হতে পারবেন না, তার লেখা ছাপা হবে না, তার এই হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিও হয়তো তার উত্তরাধিকারদের কাছে মনে হবে অপ্রয়োজনীয়, অথচ তিনি আশ্রয় নিতেন কাগজ আর কলমের! কেন নিতেন? কেন লিখতেন তিনি?
এইসব মানুষের সান্নিধ্যে লেখালেখির যে সূত্রপাত ঘটেছে, ক্রমশ তাতে আমি নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছি। অথচ বালককালে এমনকি মাধ্যমিকে পড়ার সময়েও একেকসময় আমার ইচ্ছে হতো একেকরকম হওয়ার। তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল প্রাইভেট ডিটেকটিভ কিংবা স্পাই হওয়া, নিদেনপক্ষে চলচ্চিত্রপরিচালক হওয়া। স্কুলে জীবনের লক্ষ্য রচনা লিখে আমি এক শিক্ষককে ভড়কে দিয়েছিলাম। লেখক হওয়াটা তেমন আকর্ষণীয় ছিল না আমার কাছে। আমার বাবার অবশ্য খুব আগ্রহ ছিল আমার এই লেখালেখিতে। আর আমার শিক্ষক কিংবা ভাইদের বন্ধুদেরও সমর্থন ছিল তাতে। এর ওপর ছিল ক্লাসের সহপাঠী রিশিত খানÑ গল্প লেখা তাকে দেখেই শুরু করি আমি।
কিন্তু আমাদের সময়টা একেবারেই অন্যরকম ছিল। আর কম দামের রুশ বইয়ের সংস্পর্শে, ছোট লাল রঙের মাও-বইয়ের সংস্পর্শে দ্রুতই আমি পাল্টে যেতে থাকি। তাই লেখালেখি শুরু করলেও রাজনীতি ক্রমশঃ আমার আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই আমাদের অঞ্চলের মানুষদের নায়ক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা তরুণ মির্জ্জা আবদুল লতিফ। আমার দু ভাইও যুদ্ধ করেছেন তার সঙ্গে। যুদ্ধের পর লতিফ ভাইকে পালিয়ে থাকতে হতো সরকার বিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ায়। আমাদের বাড়িতে এক-দুইদিন লুকিয়ে থেকে লতিফ ভাই হয়তো রাতের অন্ধকারে চলে গেলেন অন্য কোনোখানে, পরের দিন রাতেই দেখা গেল বাবার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন সরকারি দলের দবির উদ্দিন উকিল। রাজ্যের অভিযোগ তার তরুণদের সম্পর্কে, শুধু অভিযোগ নয়Ñ ক্রোধ আর হাহাকারও বটে, উচ্ছন্নে যাচ্ছে যুদ্ধ করে ফেরা তরুণ-যুবকরা, বুঝতে চাইছে না দেশের পরিস্থিতি, অযথাই সমাজতন্ত্রের মোহে মৃত্যু ডেকে আনছে… ইত্যাদি, ইত্যাদি। রাজনীতি মানুষকে কী করে ক্ষতবিক্ষত করে, সহনশীলও করে, বুনো করে তোলে, কান্নাকাতরও করে, একটু একটু করে জেনেছি আমি। আমরা গ্রামের বালক আর তরুণেরা যাকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত আড্ডায় অভ্যস্ত ছিলাম, সেই সেলিম ভাই ছিলেন ছাত্র-রাজনীতির মানুষ। তার সান্নিধ্যে আমিও ক্রমশ ঝুঁকে পড়েছি রাজনীতির দিকে। কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল ছাত্র রাজনীতিতে। যদিও লেখালেখির সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছেদ কখনোই ঘটে নি। আমি নিশ্চিত, পুরনো কোনো স্মরণিকা কিংবা ছোট কাগজ খুঁজলে আমার এমন কোনো লেখাও পাওয়া যাবে, যাতে আমি জোর গলায় মত দিয়েছি, সাহিত্য রচিত হওয়া উচিত রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকেই; যেমন আমার এক বন্ধুও তখন কবিতা লিখেছিলেন, ‘এখন কবিতা লেখা হবে প্রতিবাদের ভাষায়’। কিন্তু লেখালেখিই যে করব, এমন কোনো দিব্যি তখনও ছিল না আমার। যদিও মনে আছে, সচিত্র সন্ধানীতে গল্প ছাপা হওয়ার পর পোস্টকার্ডে লেখা সুশান্ত মজুমদারের চিঠি পেয়ে আপ্লুত হয়েছিলাম ভীষণরকম। ভাল লেগেছিল কবি ও সম্পাদক আবুল হাসনাতের চিঠি পেয়ে। মনে হয়েছিল, লেখালেখি করা যায় তা হলে। অনেক তরুণ যেমন ভাবেন, সম্পাদকরা অপরিচিতদের লেখা পড়েই দেখেন না, পরিচিত ছাড়া কারো লেখাই ছাপেন না, তা নিশ্চয়ই ঠিক নয় সব ক্ষেত্রে। তবে সেই সময় লেখালেখি ছিল আমার কাছে গৌণ বিষয়। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমি নই, বরং আমার ব্যক্তিগত বন্ধুরাই রাজনীতির দিনগুলোতে সাহিত্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও যোগাযোগকে জীবন্ত রেখেছিল।
এখনো আমি মনে করি, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারলেই বেশি ভাল লাগত আমার। কিন্তু সামরিক জান্তা এরশাদের পতন হওয়ার মধ্যে দিয়ে দেখা দেয় অদ্ভূত এক পরিস্থিতি। কি রাজনীতি, কি ছাত্র রাজনীতি তার এস্টাবলিশমেন্টবিরোধী চরিত্র হারিয়ে ফেলে। তাসের ঘরের মতো হঠাৎ ভেঙে পড়ে রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতির মেরুদণ্ড। রোগটা আগেই দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তা আমাদের অনুভবে আসে নি। আশি ও নব্বই দশকের ছাত্র-রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নিজের মৃত্যু ডেকে আনে, পুরানো ছাত্ররাজনীতিকদের অনেককেই ঠেলে দেয় বুর্জোয়া রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার দিকে, কাউকে আবার ঠেলে দেয় যান্ত্রিক রাজনৈতিক আনুগত্যের দিকে, কাউকে ঠেলে দেয় ক্ষিপ্ত হতাশার মধ্যে দিয়ে নব্য দখলদার হওয়ার দিকে, কিন্তু কেউ কেউ আবার স্বপ্নহীন নির্লিপ্ত নিস্ক্রীয়তার দিকে এগিয়ে যায়। আমি বোধহয় এদের মধ্যে শেষ কাতারের মানুষ, নিজের অক্ষমতাকে ঢাকবার জন্যে লেখালেখিতে সমর্পিত হওয়া ছাড়া যার অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। জীবিকার তাগিদে এমন একটি পেশায় আমি জড়িয়ে পড়ি, যার সঙ্গেও লেখালেখির খানিকটা যোগ রয়েছে। এইভাবে লেখালেখির সঙ্গে আমার পুরনো অন্তরঙ্গতা জীবন্ত হয়ে ওঠে। মহৎ কোনো লক্ষ্য নয়, লেখালেখি আমার ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পাওয়ার নিজস্ব এক ভুবন হয়ে ওঠে, নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে। আমাদের অগ্রজ সাহিত্যিক বন্ধু মামুন হুসাইনের লেখায় আমি এর লাগসই একটি প্রত্যয় খুঁজে পেয়েছি — সেক্যুলার মেডিটেশন। ঠিকই লিখেছেন তিনি, ‘দুর্বল ব্যক্তিত্বের লক্ষণ আড়াল করতে, নিজেকে তীব্র প্রকাশ করার ঝুঁকি এড়াতে লেখা শেষ পর্যন্ত আমার কাছে এক ধরণের সেক্যুলার মেডিটেশন হয়ে যায়।’
লেখার সময় লেখক বোঝাপড়া করেন নিজের সাথেই, পাঠকের কথা তখন তিনি চিন্তা করেন না; কিন্তু আজ পর্যন্ত এমন কোনো লেখককে কি পাওয়া গেছে, যিনি মরে গেছেন তার সমস্ত লেখাই অপ্রকাশিত রেখে, অথচ মৃত্যুর পর সেসব নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে? না, সেরকম কেউ নেই। কেননা নিজের লেখা নিয়ে লেখক যত নির্মোহই হোন না কেন, তিনিও চান, পাঠক তার সঙ্গে কম্যুনিকেট করুক, অনুভব করুক তার ভেতরের ট্রমাকে, তার ‘দুর্বল ব্যক্তিত্বের লক্ষণ’গুলো খুঁজে বের করে আনুক, উন্মোচন করুক তাকে। লেখকের সঙ্গে নিশ্চয়ই সম্পর্ক থাকে সমকালীনতার, হোক না তার লেখা অতীতের কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে। লেখকের দুর্ভাগ্যই এই, কথিত ব্যর্থ বা সফল যা-ই তিনি হোন না কেন, প্রকাশ্যে তাকে আসতে হয় সমসময়েই। একবার প্রকাশ্যে আসার পর তিনি তার পরবর্তী সব লেখা হয়তো অপ্রকাশিত রাখতে পারেন। কিন্তু সব কিছু অপ্রকাশিত রেখে তার পক্ষে ক্রমাগত লিখে যাওয়ার শক্তি ও প্রেরণা পাওয়া সম্ভব নয়। জীবিকা হিসেবে নেয়া ছাড়াও, জর্জ অরওয়েল না কি চার রকম কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন লেখালেখি করার। তার প্রথম দুটিই ছিল নির্ভেজাল আত্মকেন্দ্রিকতা আর সৌন্দর্যপিপাসা। পেঙ্গুইনের এক চটি বই বইয়ে পড়া তার কথাগুলো বোধকরি এরকম ছিল, সত্যিকারের লেখকরা অযথাই আত্মকেন্দ্রিক ভীষণভাবে, যদিও উদাসীন অর্থের ব্যাপারে। কিন্তু যা লেখেন নি তিনি তা হলো, লেখকদের এই আত্মকেন্দ্রিকতা ও সৌন্দর্যবোধকে নিছক শাব্দিক অর্থেই বিবেচনা করা ঠিক হবে কি না। অমিয়ভূষণ মজুমদারের কিছু অনুভূতি আছে, তা বোধহয় এই আত্মকেন্দ্রিকতার রূপটাকে বিস্তৃত করতে পারে, ‘আমি লিখি জীবনের জন্য। আমি জীবনে স্যাটিসফায়েড নই। আমি যে-জীবন দেখি, তাতে যেন কোথায় তৃপ্তি পাচ্ছি না। জীবন আমাকে জাগিয়ে রেখেছে এবং জাগতে আমার ভালো লাগছে না। এই জাগরণে আমার বৃদ্ধি নেই। এই জাগরণ আমাকে খর্ব করে দিচ্ছে। আমি ঐ পার্টিকুলার ধরনের এস্কেপ চাচ্ছি। … দূর! এ আমি এ পৃথিবীতে কিছুই পাচ্ছি না, আমার নিজস্ব একটা পৃথিবী দরকার, যেখানে আমি আনন্দ পেতে পারি। যে-মন নিয়ে আমি লিখতে বসি, সে-মন তো আমার পাঠকেরও থাকতে পারে। সে তো অন্বেষণ করছে আমাকে। সেই অন্বেষণকারীর জন্য লিখি।’ দেখা যাচ্ছে, লিখতে বসে আত্মকেন্দ্রিক থাকলেও শেষ পর্যন্ত লেখক আর আত্মকেন্দ্রিক থাকতে পারছেন না, তার ভাবনার সহোদর খুঁজছেন। জর্জ অরওয়েলের বিবেচনায় লেখার আর যে দুটো কারণ আছে, তা অবশ্য কম-বেশি সব অন্বেষণকারীই চিহ্নিত করতে পারেÑ এর একটি ইতিহাস লিখে রাখার প্রেরণা, আরেকটি রাজনৈতিক লক্ষ্য। তিনি নিজে চেয়েছিলেন রাজনৈতিক লেখালেখিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে। এ দেশের জর্জ অরওয়েলমুগ্ধ পাঠকরা অবশ্য এ কথাটি বেমালুম চেপে যান। ‘মানুষ সব কিছুই সহ্য করতে পারে’ ফকনারের এই কথাটিকে অবলম্বন করে কার্লোস ফুয়েন্তেস একদা মন্তব্য করেছিলেন, এটাই উপন্যাসের গূঢ় সত্য। একটু এগিয়ে বিষয়টিকে প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। এবং লেখক হয়তো লেখার মধ্যে দিয়ে তার সেই সহ্যশক্তিরই প্রকাশ ঘটিয়ে চলেন। আমরা দেখি, কী ভীষণ সহিষ্ণুতার সঙ্গে তিনি শ্বাস নিচ্ছেন।
কিন্তু প্রতিটি লেখাই আবার একেকটি ব্যর্থতা— কেননা লেখা থেকে বাস্তব জগতে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লেখক তার নিজস্ব পৃথিবী হারিয়ে ফেলেন, ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে তাকে তাই আবারো ফিরে যেতে হয় লেখালেখির কাছে। এইভাবে প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে ঠেলে দেয় নতুন আরেকটি ব্যর্থতার দিকে। ‘আমি নিঃশেষ হয়ে যাই নি’ বলার জন্যে নয়, বরং বার বার মুক্তির স্বাদ নেয়ার জন্যেই লেখক তার লেখালেখি অব্যাহত রাখেন। যারা অন্য কোনো পথ খুঁজে পান, তারা লেখালেখি ছেড়ে দেন। অবশ্য সেরকম একজনকেই দেখেছি আমিÑ মাহমুদুল হক তিনি। একসময় আমি থাকতাম এলিফ্যান্ট রোডের দিকে, তিনিও সেদিকেই থাকতেন। অনেক পরে আমি থাকতাম জিগাতলার দিকে। তিনিও তখন সেদিকেই থাকতেন। প্রতিদিন সকালে নাস্তা করতাম মোড়ে গিয়ে ভোজনবিলাস নামের এক দোকানে— যেখান থেকে খানিকটা এগিয়ে গেলেই পাওয়া যেত তার বাসা। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায গেলেও আমার অবশ্য তার জিগাতলার বাসায় যাওয়া হয় নি। ‘কালো বরফ’ বই আকারে ছাপা হওয়ার অনেক আগেই উপন্যাসটিকে নিয়ে ছাত্রাবস্থায় আমাদের একটি ছোট কাগজ বৈশম্পায়নে একটি গদ্য লিখেছিলাম আমি। লেখাটি তার খুব ভাল লেগেছিল এবং এই সুবাদে তার সঙ্গে আমার অপ্রকাশ্য সখ্য গড়ে উঠেছিল। লেখালেখি দূরে থাক, শেষের দিকে এমনকি সাক্ষাৎকারও দিতেন না তিনি। এক তরুণ সাহিত্যিক আড্ডা দেয়ার নামে নাকি গোপনে তার কথাবার্তা রেকর্ড করে পত্রিকায় প্রকাশ করেছিল সাক্ষাৎকার হিসেবে। তারপর থেকে তিনি আর আড্ডার জন্যেও প্রশ্রয় দিতেন না তরুণ লেখকদের। এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত কী করে নিলেন তিনি? তা হলে কি ধীরে ধীরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক চিন্তার পৃথিবী, কেন আর লেখেন না লেখকেরা! যদিও অত কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের অনেকের পক্ষেই বোধহয় সম্ভব নয়। যদিও ক্রমশ আমি উপলব্ধি করতে থাকে, প্রতিটি লেখাই ব্যর্থতায় নিমজ্জিত, ভালো হয় প্রতিটি লেখাই ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারলে। কিন্তু একবার প্রকাশের পর তার দায় আর অস্বীকার করা যায় না। তার প্রতিটি অপূর্ণতা আমাকে কখনো উদ্বিগ্ন করে, কখনো ক্ষুব্ধ করে, তারপরও সেই ব্যর্থতাকে ঘিরে দুলে চলে আমার আবেগ। যেমন প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে অপত্য স্নেহ ছড়াতে থাকেন পিতা-মাতারা। ঠিক তেমনি সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা, সমালোচকের তীব্র নিন্দা, পাঠকের তীব্র উপেক্ষা, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ লেখকদের বাকা মন্তব্য, কোনটাই কোনো ছায়া ফেলতে পারে না লেখকের ওপরে। কম হোক, বেশি হোক লিখে চলেন তিনি। ক্রমশই এই ঘোর নতুন এক অবয়ব পায় : কেন লিখি বা কী লিখি সেটা বড় কথা নয়, বড় ব্যাপার হলো, যা লিখছি তার দায় নিতে আমি রাজি আছি কি না।
আমার ক্ষেত্রে ওরকম ঘটনাটি ঘটে ২০০৬ সালের শুরুর দিকে। মুন্সীগঞ্জের এক ছোট কাগজ কর্মী আমাকে বলেন, আপনি কি জানেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজি জুট মিলের এক শ্রমিক আছে, তার সংগ্রহে আপনার সবগুলো বই আছে, সে আপনার লেখা পেলেই পড়ে? আমি কথা খুঁজে পাই না। রবীন্দ্রনাথের সেই কথা মনে পড়ে : বিশ্বে থাক সহজ সুখে, সরল আনন্দে। এর ফল হয় এই, এরপর থেকে লেখার কারণ নিয়ে আমি একদমই ভাবি না।

উপন্যাসের কল্পলোকে শ্যামলের কিছু শ্যামলিমা

উপন্যাসের কল্পলোকে শ্যামলের কিছু শ্যামলিমা
ইমতিয়ার শামীম

‘ঘাম ঝরিয়ে’ নিজেকে ক্ষয় করে’ কী পায় মানুষ? কী পায় মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা লেখক কিংবা পাঠক? শ্রমের ওই বিস্তারে কতটুকু পাওয়া যায় জীবনের বৈভব, হৃদয়ের বৈভব? শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়তে পড়তে এই প্রশ্ন আসে। আর দেখি, গতানুগতিক পাঠ থেকে নয়, শ্যামলের সাহিত্যকে অনুভব করা যায় কেবল প্রাত্যহিক পাঠাভ্যাসের বাইরে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে পড়তে পারার মধ্যে দিয়ে, বোধগম্যতার সঙ্গে হৃদয়ের সংশে¬ষ ঘটিয়ে। কেননা তিনি জানেন এবং পাঠককেও জানাতে চান ‘ঘাম ঝরিয়ে, নিজেকে ক্ষয় করে’ পাওয়া ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় তার শিল্পের বিষয়আশয়। তাই গতানুগতিক পাঠ্যাভাসে তাঁকে স্পর্শ করা যায়Ñকিন্তু অনুভব করা সম্ভব নয় অত সহজে। শ্যামলের ভাষা আর ব্যবহৃত শব্দ আমাদের অপরিচিত নয়; কিন্তু পরিচিত ও ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে থেকেও তিনি এমন এক জীবনপ্রবাহে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকেন যে, পরিচিত ও ব্যবহৃত শব্দের সমবায়ে গড়ে ওঠা বাক্যের অর্থও পাল্টে যেতে থাকে। জীবনপ্রবাহের ওই ধারায় যুক্ত করে তিনি আমাদের প্রাণিত করেন শব্দ ও বাক্যের প্রচলিত অর্থবোধকতার বাইরে দাঁড়াতে এবং সহজের মধ্যে থেকেও দুর্বোধ্যতার আরোহী হতে। তখন আমরা অনুভব করি, নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করছেন তিনি, যেমন করেছিলেন কৃত্তিবাসের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। কৃত্তিবাস তখন মধ্যগগণের গণগণে সূর্য, আর সুনীল তার নিজের বিবেচনাতেই ‘বেশ কঠোর সম্পাদক’। ২০০১ সালে ‘বিভাব’-এ ছাপা হওয়া ‘অতিজীবিত শ্যামল’ নামের এক নিবন্ধে সুনীল লিখেছিলেন, প্রবন্ধ ছাড়া গল্প কিংবা অন্য কোনও ধরণের গদ্য ছাপানোর ক্ষেত্রে খুব কঠোর ছিলেন তিনি, কৃত্তিবাসের প্রথম দিকে কখনও এ নিয়মের ব্যতিক্রম হতো না। ওই সিদ্ধান্ত ভাঙতে নারাজ ছিলেন তিনি। কিন্তু সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে। সুনীল বাধ্য হয়েছিলেন নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে, যেমন পাঠক হিসেবে আমরাও বাধ্য হই ব্যতিক্রম ঘটাতে, আমাদের ধরাবাধা জীবনের বাইরে অপর এক জীবনপ্রবাহের উল্ল¬াস ও টানাপোড়েনকে নিজেদেরই ভাবতে এবং সেই জীবনে ভেসে যেতে। শ্যামলের বেশ কয়েকটি লেখা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সুনীল। লেখার দুর্বলতার কারণে নয়, নিয়ম মেনে চলার তাগিদ থেকে তা করতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু তারপরও শ্যামল অভাবনীয় চমৎকার এমন সব গদ্য সুনীলকে শোনাতে থাকেন যে শেষ পর্যন্ত সুনীল প্রলুব্ধ হন সেরকম গদ্য ছাপানোর কৃতিত্বের ভাগীদার হতে। এরকম প্রকাশনায় বন্ধুদের আপত্তি থাকলেও নিয়ম তাই চুলোয় যায় এবং কৃত্তিবাসে ছাপা হয় রম্য রচনা, ছাপা হয় গল্প, যেসবের শুরু শ্যামলকে দিয়ে।
‘বিদ্যুৎচন্দ্র পাল সম্পর্কে কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয়’ সেই গল্প, যা দিয়ে কৃত্তিবাসের ওই নিয়ম ভাঙার শুরু। কিংবা আমাদেরও শুরু নিয়ম ভেঙে পড়ার, প্রাত্যহিক পাঠাভ্যাসের বাইরে গিয়ে পড়ার। ডায়েরির এলোমেলো পাতা থেকে, টাটার সাফল্যের কাহিনী আর চিত্রিত পৃষ্ঠার পাশে উদ্বাস্তু অথচ লম্বা কাপড়ের গাজিয়াভর্তি ১০ টাকার নোট নিয়ে যাওয়া মানুষের হিজিবিজি লেখা থেকে আমরা বিদ্যুৎচন্দ্র পালকে উদ্ধার করতে থাকি বিবিধ সংকেতের মধ্যে দিয়ে। আর দেখি, কী করে একজন মালিক হয়ে পড়ে কর্মচারী। দেশবিভাগ যাকে উদ্বাস্তু করতে পারেনি, দেখি, নতুন স্বাধীন একটি রাষ্ট্র কী করে তাকে ছত্রভঙ্গ করে ফেলে।
একেবারে কম লেখেননি শ্যামল। উপন্যাসই আছে তার প্রায় ৭৫টি, গল্প আছে আড়াইশ’রও বেশি। প্রতিদিন কতকিছুই তো পড়া সম্ভব, কিন্তু শ্যামল তার লেখার মধ্যে দিয়ে আমাদের ক্রমাগত হাতছানি দেন সেই জীবনের দিকে, যা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে, কিন্তু তারপরও আমরা অপরিচিত সেসব জীবনের সঙ্গে, অপরিচিত সে জীবনের অভিজ্ঞতা ও দিনযাপনের সঙ্গে। সর্পবিষের বিচ্ছুরণে তিক্ত থেকে তিক্ততর হতে হতে রহস্যময় শ্যাওলা পড়েছে সেই জীবনের গায়ে। দিব্যজ্ঞানীর মতো শ্যামল সেই শ্যাওলার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া আনন্দ আর নিরেট তিক্ততা তুলে এনেছেন। অনেক চড়াইউৎরাই পেরুনোর মধ্যে দিয়ে তিনি তার আস্বাদ পেয়েছেন, তাই তার লেখাতে উঠে এসেছে বন্ধুর পথপরিক্রমার ছাপ, উঠে এসেছে পথচলার অভিজ্ঞতার নির্যাতন। উদ্বাস্তু হওয়ার কষ্ট, তারও বেশি জন্মভূমিতে অধিকার হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে তিনি থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছেন পশ্চিম বঙ্গে। তখন যে কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্স পড়তে গিয়েছিলেন, সেই আশুতোষ কলেজ থেকেও তাকে বিতাড়িত হতে হয় ছাত্র রাজনীতি করার ‘অপরাধে’। তারপর দিনের পর দিন ইস্পাতের এক কারখানাতে ইস্পাত গলানোর কাজ করেছেন তিনি। এইভাবে আড়াই বছর পর তিনি আবারও সক্ষম হন লেখাপড়া শুরু করতে। কিন্তু জীবন তো কেবল লেখাপড়ার নয়, জীবন এমন যেখানে হঠাৎ হাওয়ায় হ্যারিকেনের আলো নিভে যায় গাঁয়ের ঘরের বারান্দাতে পাতা টেবিলচেয়ারে বসে পাওনাদারের জন্যে চেক লিখতে গিয়ে। তারপর জীবনভর শুধু মনে হয়, মা এসে কি ফুঁ দিয়ে হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিয়েছিলেন!
এই স্মৃতি, এই মনে হওয়া কোনও কল্পলোকের কল্পনা নয়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বোধহয় চম্পাহাটি পর্বের ঘটনা এটি। কলকাতার কাছে গাঁয়ের দিকে বাড়ি করেছেন তিনি। তখনও বিদ্যুৎ যায়নি সেখানে। সন্ধ্যার পর এই ঘটনা ঘটে, পাওনাদার আসে, সামনের বারান্দায় বসে হ্যারিকেনের আলোয় তার জন্যে চেক লিখতে বসেন শ্যামল, হঠাৎ হাওয়ায় হ্যারিকেন নিভে যাওয়ার আগে তিনি ঘড়িতে দেখেন সোওয়া আটটা বাজে। ঢলেপড়া অন্ধকারে কিছুক্ষণের জন্যে শ্যামলও ঘুমিয়ে পড়েন টেবিলে মাথাটা রেখে। ওদিকে তখন বৃষ্টিও নামছে। মিনিটপাঁচেক পর তার ঘুম ভেঙে যায়, তিনি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে আবারও চেক লিখতে বসেন। পরদিন সকালে তিনি খবর পান, আগের রাত সওয়া আটটার দিকে আচমকা সেরিব্রাল থ্রম্বসিসে তাঁর মা মারা গেছেন।
সেই থেকে বাকি জীবন শ্যামলের মনে হয়েছে, মা এসেই হয়তো ফুঁ দিয়ে হ্যারিকেনটা নিভিয়ে দিয়েছিলেন।
এরকম অনেকরকম মনে হওয়া, মনে হওয়ার মতো সত্যকথা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে সারা জীবন তাড়িয়ে ফিরেছে। আর কেবল শ্যামল তো নয়, তার পাঠক হওয়ার যোগসূত্রে এখন আমাদেরও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। দরিদ্রতারই চালচিত্র আঁকেন তিনি, কিন্তু দরিদ্রতা নয়, দরিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগ্রামও নয়, মানুষের জীবনের ঐশ্বর্য যে অন্য কোনওখানে, মানুষের জীবনের সেই ঐশ্বর্য যে বার বার অবসাদের মধ্যে দিয়ে ফিরে ফিরে আসে, সে কথাই জানান তিনি নানা রূপে, নব নব রূপে। কখনও নিজস্ব জীবনের আখ্যান দিয়ে, কখনো বা তার সাহিত্য দিয়ে। জীবনের নির্জন হয়ে পড়া, রাতের নীরবতা মাখা পথগুলোর ছায়াচ্ছন্নতা খুঁজতে খুঁজতে শ্যামলের গল্পের মানুষগুলো মরবিড হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও সেই মানুষগুলোর দিকে আমাদের তিনি ফিরে তাকাতে বাধ্য করেন রুদ্ধশ্বাস, সহজ আঁকুতি দিয়ে। তিনি আমাদের ওপর জোর করেন না, তিনি আমাদের তাকাতে বাধ্য করেন উদ্বেগ জড়ো করে। বন্ধুদের মধ্যে থেকেও বন্ধুহীন হয়ে পড়ার কথা, পৃথিবীতে থেকেও অন্য এক পৃথিবীর গভীর গহনে বাস করার কথা শোনান তিনি, যেমন শুনিয়েছেন তিনি তার উপন্যাস ‘নির্বান্ধব’-এ। ইস্পাত কারখানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা এখানে আছে অবশ্য, কিন্তু তারপরও ‘নির্বান্ধব’ অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখা নয়, অভিজ্ঞতা এ উপন্যাসে এসেছে অতৃপ্তির অনুষঙ্গ হয়ে, অভিজ্ঞতা ও সাফল্য শ্যামলের মানুষদের পরিতৃপ্ত করে না, বরং আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে। ‘নির্বান্ধব’ সেই নিঃসঙ্গতার কাহন। যদিও উপন্যাসের শুরুতেই তিনি লেখেন, ‘সব চরিত্রই কাল্পনিক’, কিন্তু তা হয়ে ওঠে চোরের সাক্ষী গাঁটকাটার মতো, আর সেটিকে তিনি আরও পাকাপোক্ত করেন তারপরেই এইসব বাক্যগুলি লিখে, ‘একদিন গভীররাতে সুনীলেরÑসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গলায় ‘…আতর গোলাপ/সাবান খরচ প্রত্যহ’ শুনেছিলাম।’
বুকের দু ইঞ্চি নিচেই আত্মার নীলচে আলো জ্বলতে দেখা নিবারণ পাকড়াশি অনেককেই চেনে, জানে; কিন্তু তাদের কেউই বন্ধু নয় তার। স্ত্রীর মধ্যে সে বন্ধুকে খুঁজে ফেরে, কিন্তু স্ত্রী বার বার কেবলই স্ত্রী হয়ে যায়। আর নিবারণ মনে মনে নিজেকেই বলে চলে, ‘আমার যে আর ভালো লাগে না। ছেলেমেয়ে, বাড়িঘর, বউÑসব নিয়ে যে আমি নগর বসিয়েছি। আমাদের গরম কাপড়ের ট্রাংকে তুমি ন্যাপথালিন রাখো ফি’বছরে। এর পর আর পারা যায়?’ নিবারণ মদ খায় নিরুপায় হয়ে, পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে বন্ধুতা খুঁজে পেতে। কিন্তু বন্ধুরাও তার আর বন্ধু হয় না। ‘নির্বান্ধব’কে কি তা হলে বিচ্ছিন্নতার গল্পই বলব, যেখানে অবসাদগ্রস্ত নিবারণ একা একা ভেবে চলে, স্ত্রী রেবাকে সে একটা অনুরোধ কোনওদিনও করতে পারে নি, ‘একখানা স্টেনলেস স্টিলের চামচ ওর বুকের ভেতর বসিয়ে দিয়ে সুধা, ভালোবাসা বা আত্মা অর সোল, যাই হোকÑতাই খানিকটা আমি ওপরে আলোয় তুলে এনে দেখার ইচ্ছে রাখি। মানে রাখতাম। কিন্তু কোনওদিন তা করা হয়নি।’ নিজের কাছে স্বীকৃতি দিয়েছে সে, বউকে তার ‘…গলা টিপে মেরে ফেলার ইচ্ছে হয়েছে। পরে আবার ভীষণ কষ্টও হয়েছে। অথচ তুমি কিছুতেই আমার বন্ধু হলে না। হবার কোনও চেষ্টাই ছিল না তোমার। কেবল বউ হয়েই থাকতে ভালোবাসলে। তোমার সঙ্গে মেশা গেল না। আমি মেশামেশির জন্য এক একদিন পঁচাশিটাকার ট্যাক্সি দাবড়ে কলকাতা চষে ফেলেছিÑযদি কোনও বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। প্রায় দিনই হয়নি। সেসব দিন ডবল বিষণœ হয়ে বাড়ি ফিরে দেখেছিÑতখনও তুমি পুরনো কথা বলে আমাকে খুঁচিয়ে আনন্দ পাচ্ছ। আমি হুইস্কি খাই না। খেতে ভালোবাসি না। যেটুকু খেয়েছি, তার জন্য তুমি দায়ী। ইচ্ছে করলেই তুমি আমার বন্ধু হতে পারতে।’
কিন্তু রেবা বন্ধু হবে কেমন করে, যে-রেবার মনে হয়, নিবারণ দুঃখ খুঁজে বেড়াতেন। রেবার বুকের মধ্যে একটা স্টেনলেস স্টিলের চামচ বসিয়ে দিয়ে নিবারণ সুধা, ভালোবাসা বা আত্মা তুলে আনতে পারে নি, কিন্তু ঠিকই নিখুঁতভাবে টেবল্ ফর্ক বসিয়ে দিয়েছে তাকে সাফল্যের মুখ দেখানো কলিগ-বস অনিল দত্তের বুক বরাবর। কেন দিয়েছে? কেবল লতাই কি খানিকটা বুঝতে পেরেছিল? আর তাই সে বলে, ‘নিবারণের তো কোনও বন্ধু নেই। ও তো সারাজীবন এ টেবিলে সে টেবিলে বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেÑকোথাও ওর হয় না।’ লতা যে তাকে খানিকটা উপলব্ধি করে, কিন্তু তারপরও নিবারণের কাছ থেকে সরে যেতে হয়েছে অনিল দত্তের কাছেÑসেটা কি নিবারণও অনুভব করেছিল? আর তাই সে শেষ পর্যন্ত হন্তারক হয়ে ওঠে তার শুভানুধ্যায়ী কলিগ-বসের? কিংবা রেবাও কি বুঝতে পেরেছিল নিবারণের সঙ্গে তার দূরত্ব আর লতার সঙ্গে নৈকট্য, তাই লতাকে সে পাঠায় নিবারণের সঙ্গে দেখা করতে ‘উইথ দি ইনটেনশনÑযদি লতা আমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরাতে পারে।’ কাঠগড়ায় লতা বলতে পারে বটে, ‘তুমি তো কাউকে কোনওদিন খুন করার লোক নও।’ কিন্তু যা সে বলতে পারে না, তাও লিখে দিয়েছেন শ্যামল, ‘আমি মেয়েছেলে। আমাদের পুরুষমানুষের সঙ্গে অমন এক আধবার হয়। আমরা ঘাটের জল। ফিরে ফিরে বদল হয়ে আসি। তুমি কেন অনিল দত্তের জন্যে বরবাদ হবে। টেক ইট ইজি।’ এইখানে এসে টলোমলো জলরেখা কি খানিকটা স্থির হতে থাকে, তাই খানিকটা স্পষ্ট আভা ফুটে ওঠেÑযে বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল, তার হাতবদল হয়েছিল! কিন্তু তাই কি সব? তা হলে কেন নিবারণের মনে হবে যে, ‘শরীর ধরে এগোলে তবে ভালোবাসাবাসি হয়। তাই তা এত ঠুনকো। অথচ শেষ অব্দি ভালোবাসাবাসির পথে এই শরীরখানাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ তা হলে নিবারণের কেন মনে হবে, যে বিরাট তুঁতে গাছের ছায়ায় সে আর মৃত অনিল দত্ত বসে আছে তার পত্রস্পন্দন, তার ছায়াচ্ছন্ন নিবিড়তার মধ্যে সে খুব মূল্যবান একটা চাবি খুইয়ে বসে আছে, যে চাবি থাকলে মৃত অনিল দত্ত আজই এখনই নিবারণের হাত ধরে লোকালয়ে চলে যেতো।
‘নির্বান্ধব’-এর লেখক হিসেবে যদি ‘আলব্যেয়ার কামু’ বা এরকম কোনও নাম লেখা থাকত, তা হলে তা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা হতো, চায়ের কাপে ঝড় উঠতো এবং সংস্করণের পর সংস্করণ হতো। কিন্তু লেখক তো শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তাই ‘নির্বান্ধব’ নিয়ে আলোচনা হয় না! অবশ্য আমাদের রশীদ করিম এ বইটি নিয়ে অক্টোবর ১৯৭৩-এ দৈনিক বাংলায় একটি আলোচনা লিখেছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, ‘উপন্যাসটিতে কামুর দি আউটসাইডার-এর প্রভাব আছে, এবং ‘নির্বান্ধব’ নামেই বোঝা যায়, লেখকের তা গোপন করবার এতটুকু ইচ্ছে নেই। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু এইটুকুই দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, কিভাবে সম্পূর্ণ মৌলিক উপন্যাস রচনা করতে হয়।’ এই আলোচনা যত প্রশংসাময়ই মনে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ‘নির্বান্ধব’-এর জন্যে ভালো হয় নি। তাতে অবশ্য শ্যামলের কিছু আসে যায়নি। তিনি নিজে বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদের নির্মেদ একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করতে পেরেছেন তার বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্পের মধ্যে দিয়ে। অবশ্য ‘নির্বান্ধব’-এরও অনেক আগেই ‘কুবেরের বিষয়আশয়’ থেকে শুরু হয়েছে ওই বিচ্ছিন্নতা। এবং ‘কুবেরের বিষয়আশয়’ বেশ স্পষ্টই বলে দেয়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্তর্লীন বিচ্ছিন্নতা কাম্যুপ্রভাবিত হওয়ার চাইতে নিজস্ব অর্জন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ‘স্বর্গে তিন পাপী’ বলি আর ‘হিম পড়ে গেল’ যেটার কথাই বলি না কেন, তাতেও রয়েছে বিচ্ছিন্নতার ওই ধারাবাহিকতা। এমনকি ‘পরস্ত্রী’র শেষ মুহূর্তে আমাদের চোখের নিচের ভাগে আশার সামান্য আলো জ্বললেও পুরো উপন্যাসে দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতাই খেলা করে। ‘ফিরোজা’ তার সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের আখ্যান, যেখানে পাওয়া যায় স্বাধীনতাউত্তর টাটকা বাংলাদেশকে। কিন্তু সেখানেও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে আমরা যে ভবিষ্যৎ জেগে উঠতে দেখি, লেখক হিসেবে তা শ্যামলের শক্তিমত্তার পরিচয় দিলেও রাষ্ট্রের নাজুক উত্তরকালেরও ইঙ্গিত দিতে থাকে। রশিদকে বাঁচানোর জন্যে যে আয়োজন মুক্তিযোদ্ধার সংগঠক, আওয়ামী লীগের এম এল এ লতিফের স্ত্রী ফিরোজা করতে থাকে, ভারতবিভক্তির কারণে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যাওয়া খোকনের সঙ্গে অন্তরঙ্গতার কিংবা বিধ্বস্ত দেশের চেহারার আন্তরিক বয়ানও তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে না। লতিফ বাসায় নেই, রাজাকার রশিদকে বাঁচানোর জন্যে গভীর রাতে খোকনকে নিয়ে ফিরোজা চলে যায় গল্লামারির খাল পেরিয়ে হাড়গোড় ছড়ানো মাঠে। তখন মুক্তিযোদ্ধা ছেলে কয়েকজনকে দেখে খোকনের অনুভূতি চিন্তা করার মতো, ‘আস্তে আস্তে মনও খারাপ হয়ে উঠল। এদের কি হবে? এই এরা? কে সামলাবে? মুজিবের কোনো খবর নেই এখনো।’ এদের দেখে তার মন খারাপ হলেও এমএলএ লতিফের স্ত্রী হওয়ার অধিকারে ফিরোজার আবেগি গলার জেরাকে অবশ্য অসঙ্গত মনে হয় না তার।
‘তাই বলে অজ্ঞান মানুষটাকে সারা মাঠ ছেচড়ে টেনে যাবে জীপে বসে বসে, তোমরা কি? তোমরা কি? ফিরুর গলা বুজে এল।
জাফর টং করে লাফিয়ে উঠল, শেফালির দিদিকে কি করেছিল ওরা? জিজ্ঞেস করুন না। ভাদ্দর মাসের দুপুর বেলায়, ঠিক বারোটায় ডাকবাংলোর মোড় থেকে বিমলাদিকে লরির পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে স্টেশন অব্দি ফুলস্পীডে চালায়নি, আমি রাইফেলটা কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এটা এখন অর্থহীন বোঝা মাত্র।
ফিরু দেখলাম জাফরদের বাড়ির সবাইকে চেনে, তোর বাপকে গিয়ে সব বলছি।
তেনারে পাবেন কোথায়! নভেম্বরের বারো তারিখ ওই রশিদের খালু আর ফুপারা সবাই মিলে চাঁদমারি করিছিল,
এখান থেকেই দেখলাম, ফিরু ছোট করে ওঃ! বলেই ঢোঁক গিলল।’
তারপরও সেই রশিদকে আর মারা হয় না, মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মারতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, যুদ্ধের ঘোরে থাকা প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি মানুষ এখন জেগে উঠতে শুরু করেছে নিজস্ব আকাক্সক্ষা নিয়ে, সেই আকাক্সক্ষার কাছে দেশের কোনও গুরুত্ব নেই, আছে কেবল অবনত হওয়ার অধিকার। ‘যদি বেঁচে ওঠে আমরা আবার তুলে আনব’ বলে চলে যেতে হয় জাফরদের। ফিরোজাদের বাঁচিয়ে রাখা সেই রাজাকারদের এখনও টানতে হচ্ছে বাংলাদেশকে, আর জাফররা দূরে সরে যাচ্ছে, ফের চেষ্টা করছে তাদের তুলে আনতে।
সুখি কোনও মানুষের কথা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের কখনো শোনাতে পারেননি তার গল্পের মধ্যে দিয়ে। শোনাতে চেয়েছিলেন কি? তাও তো মনে হয় না। তিনি শুনিয়েছেন তেমন সব মানুষের কথা যারা অতৃপ্তির মধ্যে দিয়ে জীবনের গভীর এক আস্বাদ নিতে থাকেÑযেমন নিয়েছে কুবের, শ্যামলের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘কুবেরের বিষয়আশয়’-এ। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আর ‘আলো নেই’ লেখার মধ্যে দিয়ে শ্যামল চেষ্টা করেছেন বৃহৎ এক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে পুনর্নিমাণ করতে, সেদিক থেকে ও দুটো অবশ্যই বড় উপন্যাস। কিন্তু তার একটিমাত্র উপন্যাসের কথা তুললে মানুষ বোধহয় ‘কুবেরের বিষয়আশয়’কেই বেছে নেবে। দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও মানুষ কীভাবে তার স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় কুবের তার দৃষ্টান্ত। কিন্তু তারপরও আমরা দেখি, ‘কুবেরের বিষয়আশায়’ আসলে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আখ্যান নয়, দারিদ্র্য এখানে কুবেরের প্রধান শত্র“ নয়, তারও বড় শত্র“ কুবেরের নিয়তিÑঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের রাতে জন্ম নিয়েছে সে, তাই মৃত্যুর গায়ে মাথা রেখে শোয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকে তাড়িয়ে ফেরে নানা বিপর্যয়। দেবেন্দ্র লাল সাধু খাঁর পারিবারিক বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র এক কুবেরকে জেগে উঠতে দেখি আমরা। আভা আর বুলুর চেয়েও বড় তার অন্য কোনও টানাপড়েনÑ পুরুষের নিজস্ব স্বপ্নই কি তৈরি করে সেই টানাপড়েন? দ্বীপের যে স্বপ্ন কুবের দেখে, তা কি তাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারে? যদিও মনে হয়, ওই স্বপ্নের আবেগেই সে কেড়ে নিয়েছিল আভাকে ব্রজের কাছ থেকে আর তাকে রেখে দিয়েছিল তার স্বপ্নের দ্বীপে। যেখানে শুধু স্বপ্ন নয়, গোখরোও আছে। আভাকে সে হত্যা করে, কিন্তু তাকেও মরে যেতে হয় ওই উদ্যত গোখরোর ছোবলে। কুবের মরে যায়, মৃত্যুর আগে ব্রজকে ফিরিয়ে দিয়ে যায় রেলেশ্বরের শিব। কিন্তু সে কি নিজেও প্রস্তুত ছিল সেই মৃত্যুর জন্যে? না আভাকে হত্যা করা থেকে শুরু করে শিব ফিরিয়ে দেয়ার আয়োজন, সবই সেই মৃত্যুকে পরাস্ত করবার জন্যে? কুবেরের ছায়াই কি পড়ে না নির্বান্ধব-এর নিবারণ পাকড়াশির মধ্যে? তিলে তিলে তারা দু জনেই অর্জন করেছে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বাতন্ত্র্য ও ঔদার্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কুবেরকে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। ঘুমিয়ে পড়ার আগে বিভ্রমের এক জগতে ঘুরতেই থাকে সে। নস্টালজিয়া, অবসাদ, সম্পর্কের গভীর আস্বাদ সব কিছুই ভিড় করে তার উপন্যাসে। বুলু ছুটতে থাকে কুবেরের পিছু পিছু যেন বা রক্তগলিত পুঁজের মধ্যে দিয়ে, আগলে রাখার পরম সুপ্ত ইচ্ছে নিয়ে। কুবের যখন তার স্বপ্নের দ্বীপে ঘুরে বেড়ায়, বুলু যখন স্নান করতে থাকা কুবেরকে দেখতে দেখতে ভাবে, ‘চাষবাসে এত বড় একটা মার খেয়েও লেকাটা গান গায়’ তখন আপনাআপনিই আমাদের মনে পড়ে যায় শ্যামলের জীবনের চম্পাহাটি পর্ব। কি উপন্যাস, কি আত্মস্মৃতি সবখানেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জড়িয়ে থাকেন নস্টালজিয়ার ফাঁদেÑজীবনের যাবতীয় তিক্ততা মহৎ মাত্রা পায় তার ওই নস্টালজিয়ার গুণে, আর আচানক বেরিয়ে আসা এক সাপের বিষের বিচ্ছুরণে।
জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে লেখার বিষয়আশয়ের এইসব যোগ ও রূপান্তরযজ্ঞ আত্মস্থ করেই বোধহয় শ্যামল লিখেছিলেন,
‘নিজের জীবন, শরীর, সম্মান, অস্তিত্ব, নিরাপত্তা বার বার নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মত বিপজ্জনক জুয়ায় তলিয়ে যেতে যেতে ভেসে উঠে ঢেউয়ের ফেনায় যেটুকু খড়কুটো ধরা যায়, সেটুকুই শিল্প। নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে যা জানা যায়Ñতা শুধুই জানা যায়Ñবোধিও বটে। এই বোধিকে আমি এভাবে বলি যে চিন্তা ঘাম দিয়ে আয় না হয়Ñসে চিন্তার কোনও দাম নেই।
ঘাম ঝরিয়েÑনিজেকে ক্ষয় করে যে ভাবনাকে পাই তাই হোক শিল্পের বিষয়।’
এবং সারা জীবন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সে চেষ্টাই করে গেছেন। নিজেকে ক্ষয় করে করে চারপাশের জীবনকে গ্রন্থিত করেছেন তিনি। আবার পরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ-ও লিখেছেন, ‘আমাকে আমার পাঠক তৈরি করতে করতে এগোতে হয়েছে। তাঁরা আমাকে চেনেন। আমিও তাঁদের চিনি। গল্পের বেলপানা দিলে তাঁরা ওয়াক থু করে ফেলে দেবেন। আমাকে তাই মাঝে মাঝে এক চামচ মহাকালের জিজ্ঞাসা, দু চামচ জীবনরহস্য, কে যেন সাতসকালে যেকে ছিলÑইত্যাদি জিনিস লেখার ভেতর গুঁজে দিতে হয়। এই মিশেল গোজামিল হয়ে দাঁড়াতে পারে-যদি না তা আমার শরীর ও মনের ভেতর দিয়ে চোলাই হয়ে আসে।
নিজেকে বারবার বকযন্ত্রের ভেতর তরল করে ঢালি। বাষ্পে, অশ্রুতে একাকার হয়ে পরিণামে গিয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পড়ি। এই পাতন প্রণালী আমার সারা লেখায় ছড়িয়ে আছে।
এরকম লেখা বেশি লেখা যায় না। সেই কম-লেখাও আমি লিখে উঠতে পারছি না।…’
আত্মজীবনকেন্দ্রিক লেখা ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’র এক স্থানে শ্যামল লিখেছিলেন, ‘সময়ের দূরত্বে সাধারণ কথাই রূপকথা হয়ে যায়। জীবনে কেউ তো আর বিশিষ্ট হওয়ার জন্য গুছিয়ে ঘটনা ঘটায় না। বহতা নদীর মতই জীবনটা নাচতে নাচতে ঢেউ তুলে কালের তীর ধরে কথা-কাহিনী ছড়াতে ছড়াতে বয়ে যায়।’
আমাদেরও তাই মনে হয়, আমরাও তাই ভাবি। কিন্তু শাদা চোখে আরও যা দেখি, তা হলো সময়ের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার আগেই আমাদের চারপাশের সাধারণ কথাগুলোকে, সাধারণ জীবনগুলোকে তিনি রূপকথা করে তুলেছেন। এইখানে তিনি ত্রিকালদর্শী। কুবের থেকে শুরু করে নিবারণ পাকড়াশি, বিপিনচন্দ্র পাল, সন্তোষ, আশু, দাক্ষী কিংবা তার গল্পে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা আরও সব জীবনজাগানিয়া সাধারণ জীবনগুলো সেই রূপকথার জনক। মা যাকে কিছুক্ষণের জন্যে অন্ধকারে ঘুম পাড়িয়ে দেন মৃত্যুর আগে ফুঁ দিয়ে হ্যারিকেন নিভিয়ে, সেই শ্যামল জীবনের এ গলি ও গলি মাড়াতে মাড়াতে যেসব জীবন কুড়িয়ে পান, কুড়িয়ে নেন তার সবই কেমন স্বল্প সময়ের দূরত্বেও রূপকথা হয়ে যায়।
আর আমরা সেই রূপকথার সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকি, শুনতে থাকি।