Archives

অনিঃশেষ রিলে-দৌড়

‘জল ছিল আকাশ ছুঁয়ে

ভূমি ছিল আগুন

পীত রঙ শরীর ধুয়ে

কেন এলে ফাগুন?’

কেন যে আসে জানা হল না আজও। শুধু এটুকু বুঝি তুষার যুগ যখন মানুষকে ধ্বংস করে ফেলতে পারেনি তখন আমূল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত মানুষ এক পরিব্রাজকের ভূমিকা পালন করেই যাবে। যুগ শতাব্দী সহস্রাব্দী জুড়ে ঘটে চলবে তার পদসঞ্চার। ‘মানুষের ফসিল থেকে উঠে আসবে মানুষ’। জীবন এক আশ্চর্য প্রদীপ নিয়ে তরঙ্গে ভেসে চলবে। আর জীবন নিয়ত বহমান হলে আগুন ফাগুন যৌবন অবধারিত। আগুনের কথা হোক তবে। আগুন পোড়ায়, দহনে দহনে সোনা ঝরায়। একটু সাহস নিয়ে বলে ফেলি ‘আমার আগুন’। তাতে পুড়তে পুড়তে দেখি কোথায় দাঁড়াতে পারি।

‘যৌবন’, ‘প্রেম’, ‘ঝড়’ শব্দ তিনটিকে আলাদা করলাম এবং পরপর লিখলাম। কোনও আলাদা তাৎপর্য আছে কি এর? কখনও হয়ত আছে, কখনও হয়ত নেই। এই লেখার ক্ষেত্রে প্রথমটি প্রযোজ্য। কেননা উদ্দীপক আমাকে সে কথাই জ্ঞাপন করছে। তাতেই উদ্দীপনা।

জন্মালেই যৌবন আসবে এমনটি নয়। আবার না জন্মালে যৌবন কোনোমতেই আসতে পারে না। তাই প্রথম শর্ত জন্মানো। জন্ম আর যৌবনের মাঝে পড়ে থাকে মাঠ মাঠ নানা পর্ব। শৈশব, কৈশোর, কৈশোরোত্তীর্ন যন্ত্রণা। জন্মের পর থেকে নানাভাবে সলতে পাকানো চলতেই থাকে। যৌবন গড়ে উঠতে থাকে শৈশব-কৈশোরের গর্ভগৃহে।

কেমন ছিল এ বান্দার শৈশব? দু-চার কথায়। ক্ষয়াটে রোগা ভোগা, দারিদ্র্য আর না-পাওয়া। ওপার থেকে ছিন্নমূল বাবা এপারে অথৈ জলে। এক উপার্জনে একান্নবর্তী পরিবারে দিনেই পান্তা ফুরায়। দুই মৃত সন্তানসহ মার অষ্টম গর্ভ আমি। কী দেবেন ছেলেমেয়েদের মুখে সে চিন্তায় কৃশা তিনি। এরই মধ্যে দাদুর মৃত্যু। বলহরি হরিবোল। চোখে জল সবার। আমার চোখেও। অকারণে। দেখে দেখে হয়ত। কারণ বোঝে না এমনই শৈশব। সেই কান্নার শুরু। পরেও কারণে অকারণে চোখে জল। কবিতার পাণ্ডুলিপি। অভাবের সংসারে হঠাৎই একদিন মা হাতে তুলে দেন পাঁচ পয়সা। হাতে পয়সা, দিন দুনিয়ার মালিক, এক ছুট্টে মাইলটাক পেরিয়ে হাজারীবাগান প্রাইমারি স্কুলে। পাঁচ পয়সার দুটো আইস্ক্রিম দু-হাতে। একবার এ হাতের টা আরেকবার ওই হাতের টা চুষে নেওয়া। আহা জিভের সেই স্বাদ। প্রথম আস্বাদ। প্রথম উদ্দাম ছুট। আহ্লাদ। ৬-৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীতে বাড়ির এক অনুষ্ঠানে আধো বলে হাত-পা নাড়িয়ে রবীন্দ্র ছড়া আবৃত্তি। দুলকি চালটা কানে এসে মাথায় ঢুকে শরীর নাড়িয়ে দেওয়ার শুরু তখন থেকেই। সবিতা দিদিমনি খাতায় পদ্মফুল হাঁস পাখি এঁকে বলতেন… এ রকম এঁকে আনবি। অসম্ভব সুন্দরী সবিতা দিদিমনির চোখের মনি হতে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের কী রেষারেষি। সবিতা দিদিমনিকে স্কুলের বাইরেও আড়াল থেকে দেখার অদম্য লোভ। দিদিমনি হয়ত কোনোদিন জানতেও পারেননি এই বালক শিশুর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কথা। স্কুলে পড়তেই সেই দিদিমনির বিয়ে চোখে জল নিয়ে এসেছিল। মনখারাপ করা বোধহয় সেই প্রথম। খুব ভোরে মাঝেমধ্যে ঘুম ভেঙে যেত যৌথগানে। ভোরের টহলে বোষ্টম আর বোষ্টমী গান গেয়ে যেত কর্তাল বাজিয়ে। ঘুম রেশে পাখির কাকলির মধ্যে সে গান কেমন স্বর্গীয় মনে হত। পরে, মাধুকরি সংগ্রহে এলে ওদের ধামায় আমিই দৌড়ে গিয়ে চাল-আলু-মুলো-কাঁচকলা। এক ধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ। প্রতি বছর কালী পুজোর পরের ক’দিন গ্রামে পালাকীর্তন, কবিগান ইত্যাদির আসর বসত জাঁকিয়ে। কবিগান শুনতে শুনতে শুধু লড়াই-এর মজা পেতাম না, একটা রোমাঞ্চে ওদের অনুকরণ করতাম। কবিয়াল হতে বড় সাধ হতো। পরিপাট্যহীন শৈশব এভাবেই গড়িয়ে গেল পর্বান্তরে।

বয়সের মধ্যে দাগ কেটে শৈশব কৈশোর ভাগ করা যায় না। আমাদের শৈশব কৈশোর দুই-ই কিঞ্চিত বড়। জীবন ছিল বড় সরল একরৈখিক একস্থানিক এবং ছোট্ট। অভিজ্ঞতা, সে নেহাৎই সামান্য। শুধু টুকরো-টাকরা সঞ্চয়। পঞ্চাশ-চোর খেলায় সামান্য ভুলচুকে শিখা নামে মেয়েটির পিঠে দুমদুম কিল মেরে অভিভাবকের ভয়ে চৌকির নিচে সেঁধিয়ে থাকা কয়েক ঘণ্টা আমার মন খারাপ করে দিত। শিখার কথা ভেবে খারাপ লাগত। শিখা এসব পাত্তাই দিত না। ডানপিটে। অবশ্য ঘুরিয়ে মারত না। হেসে হাত ধরে মিটমাট করে নিত। দিদির পুরস্কার পাওয়া বই শিবরাম চক্রবর্তীর নিখরচায় জলযোগ আমায় উদোম হাসির ¯্রােতে ভাসাত। আবার বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী আমার মনের শুভ্র কাশের ওপর একটা ঝোড়ো ট্রেন চালিয়ে দিত। দুর্গার মৃত্যুতে অঝোর কান্না লুকোনো যেত না। এক ধরনের অদ্ভুত মন খারাপ। ছড়া কবিতার বইও পাঁপড়ি মেলল। মজাদার সুকুমার, দুলকি সত্যেন্দ্রনাথ, বুঝি না বুঝি রবীন্দ্রনাথ, তেজী নজরুল, আর সপ্রশ্ন সুকান্ত। আবৃত্তির জন্য, আবার কখনও হার্দিকভাবে নিভৃতে। মৃত্যুভয়ও এসময়। ভাগিরথীর জলে সপরিবার নৌকাডুবি। তাতে আশ্চর্যরকমভাবে বেঁচে ফেরা। ভয় সেঁধিয়ে যাওয়া মনে। আবার গরুরগাড়ি থেকে পড়ে তারই চাকা পেটের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ায় ক্ষণিকের দমবন্ধ হয়ে আসা। মৃত্যুভয় জাগিয়ে রাখল। আরও নানা ভয়। সঙ্গে কুহক। কিছু রহস্যের হাতছানি। অবাধ ছিল না কৈশোর। কিন্তু বাধা ছিল কম। সুযোগ পেলেই বন্ধুরা মিলে জেলেদের নৌকা বেয়ে চলে যেতাম কাটিগঙ্গায়। জলে ভেসে থাকা পানিফলের জংলা। প্রায় স্বাদহীন পানিফল অমৃত মনে হত। মোষের পিঠে চড়ে ঘুরি ঘাসের মাঠ। দুলে দুলে চলি। কখনও দুলকি চালের সঙ্গে মুখস্ত কবিতা আওড়াই। হাফ-প্যান্টের ডোরে বাঁশের বাতার তরবারি বেঁধে ঝুলিয়ে দিই, মাথায় আমপাতার মুকুট। রাজা-বাদশাদের ডায়লগ মুখে। এক শীত-সরস্বতীর সকালে সামনে থেকে মোষের বাচ্চা হতে দেখি। বন্ধুরা মিলে এক সময় শরীর সম্বন্ধীয় কিছু রহস্য উন্মোচনের চেষ্টায় মাতি। খেলাচ্ছলেই সমবয়সিনীদের শরীর দেখা ও বোঝার আকূতির মধ্যে কিংবা নারী শরীরের অপার রহস্য আলোচনাতে নিজেদের সাবালক ভাবতে শিখে যাই। একদিন কয়েক বন্ধু মিলে পেয়ে যাই এক অনাস্বাদিত স্পর্শকাতরতা, যা আনন্দে উদ্বেল করে তোলে শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা, সহস্র রসের ধারা এ শরীর থেকে অসহ্য স্ফুর্তির ঝলক ক্ষরণের মধ্যে পেতে চায় পূর্ণতা। রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে যায় যখন এই শরীরের সঙ্গে মনের মধ্যে কবিতার শরীর তার ডালপালা মেলতে শুরু করে। কৈশোরোত্তীর্ণ যন্ত্রণার মধ্যে কবিতা আশ্রয় হয়ে উঠতে লাগল। কী যেন চাই, কী যেন পাই না, রহস্যের মোচড়, পেয়ে হারাই, কষ্টানুভূতির মধ্যে কবিতাই প্রিয় হয়ে উঠল। কবিতার জন্য আবেগের তাড়নাতে লম্বা পাটক্ষেতের আলে আলে, ফাঁকা মাঠে, বাড়ির ছাদে, স্কুলের লম্বা করিডোরে, নদীর ধারে, জোনাক সন্ধ্যার গাবতলায়, কিংবা হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া নিজস্ব কুঠুরীতে জোরে বা আস্তে কবিতা আওড়ে যাই। কৈশোরে কুহক যেমন, সবকিছুকে প্রশ্নে যাচাই করার প্রবণতাও তেমন। প্রশ্ন আর প্রশ্ন। অধিকাংশের উত্তর অজানা। তবু প্রশ্ন। প্রশ্নই বড় করে তুলল, অনেকটা পৌঁছে দিল পরবর্তী স্তরের দোরগোড়ায়।

‘ঝড়’ উঠেছিল। প্রশ্নের ঝড়, আবেগের ঝড়, যৌবনের ঝড়। এ তো আভ্যন্তরীণ। বাইরেও প্রবল ঝড়। যৌবনের শুরুয়াৎ-এর সময়টায় বারুদের গন্ধ ছিল। মৃত্যু আর হত্যা। কারা যেন স্কুল বিল্ডিং-এ লিখেছিল ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। কারা যেন মেতেছিল একটা আমূল পালটে দেওয়ার ইচ্ছায়। রাষ্ট্র বনাম কিছু মানুষের বিপব চেতনার সংঘর্ষ। কত কত হত্যা আর যুবকের জীবন দান। পুলিশের গুলি বেয়নেট আর ধর-পাকড়। জেলের পাগলাঘণ্টি আর সার সার মৃতদেহ। উত্তাল হয়ে যাওয়া সময়ের তাল ধরে না রাখতে পারার বেদনা। একটু কমে আসতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। পড়শি দেশ হিসেবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। সেখানেও হত্যা আর সারি সারি মৃতদেহ। গণকবর। সীমান্তে আছড়ে পড়া মানুষের ভিড়। শিবির। পথে পথে স্কোয়াডিং করে ত্রাণ সংগ্রহ আর পাঠিয়ে দেওয়া শিবিরগুলিতে। শেষে যুদ্ধজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরি বাংলা। এই দুয়ে মিলে এক উত্তেজনার আগুন, এক বেদনার আশঙ্কা, এক দ্রোহকাল, এক কথা বলিয়ে নেবার পলাশ সময়, লেখা লিখিয়ে নেবার স্পর্শকাতর স্বপ্ন সময়। এ সময়েই আমার মধ্যে জারণ, বিজারণ, স্বতঃজারণ।

‘ঝড়’ উঠেছিল লাল কৃষ্ণচূঁড়া প্রেমে আর অবিচ্ছেদি কবিতায়। কেমন ছিল তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ? কেমন ছিল সেই কল্পপ্রেমিকা ওরফে কন্যা? কী নিবেদন তাকে ঘিরে? একদিকে— ‘বুকের মধ্যে উঠে আসে তেরফলা ট্রাক্টর’। একটা রাগ একটা ক্ষোভ আর একটা কষ্ট কেমন দলামুচড়ে থাকে ভেতরে। অন্যদিকে—‘আগুনে পোড়ানো ভুট্টা খেলে তোমার মুখের ভৌগলিক পরিবর্তন/ আমি বলে দিতে পারি ঠিকঠাক/ কিন্তু তখন কি এক ঐন্দ্রজালিক সময়… আমি নির্বাক থেকে যাই।’ কিংবা প্রেমিকার কাছে জলসত্র চেয়ে বসা। ‘ছাব্বিশ, এবার জন্মদিনে আমাকে একটা কির্লোস্কার / পাম্পসেট উপহার দিও, অনন্যা!’ চাই, কাউকে চাই গভীর এবং নিবিড়ভাবে। ‘অনেকেই আসে অনেকেই যায়, কেউ কেউ দাগ রেখে যায়’। ভালোবাসার গভীরতার মধ্যে যেমন আক্ষরিক অর্থে কবিতা লুকিয়ে থাকে, তেমনি কবিতার গভীরে আক্ষরিক অর্থে নর-নারীর অপার ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। সে আমার স্পষ্ট অনুভবে এসেছিল, তার ঘ্রাণ টেনেছিলাম, তার সুষমায় মুগ্ধতা ঢেকেছিল আমার বোধ। সেও এক প্রেরণা, এক টান, এক নেশা, এক অমোঘ ঘোর, ভালোবাসা শব্দ ছাড়া আর কিছু দিয়ে যাকে বোঝানো যায় না। পাওয়ার মধ্যে মাঝেমধ্যেই না-পাওয়ার বেদনা বড় বেশি মূর্ত হয়ে পড়ে। সেই কল্প প্রেমিকা কি আসে?

‘কেউ কি সারারাত দরজার ওপারে স্বপ্নের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে?

যে আসে সে কড়া নাড়ে না

যে আসে সে পায়ের শব্দ তোলে না

যে আসে সে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে… আমি ভেতরে প্রতীক্ষায়।’

কিন্তু চাই, এক রহস্যের আবরণ সরাতে চাই, একটা হাত চাই, চাই লগ্ন হতে। ‘আমাদের প্রত্যেকের একজন নার্স চাই/ অসুস্থ বিছানায় থার্মোমিটার ভাঙা জ্বরে/ ঘনঘন জলপটি বদলাবে… একজন নার্স চাই।’ সেই কল্পকন্যারও কি এক অদ্ভুত কষ্ট ছিল? নাকি সে কষ্ট আমার কল্পনা, আমারই কষ্টের রেশ।

ঈপ্সিতার ঈপ্সিত কিছু ছিল না

সে ঘর সাজাতো, বাগান করত

মৃদুস্বরে রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি করত

অন্ধকার রাতে অপলক চেয়ে থাকত আকাশের দিকে।

……………

ঈপ্সিতা ঘর সাজাতো, বাগান করত

কিন্তু নিজেকে সাজাতো না…

আমি ক্ষুদ্র, আমার প্রাণ অসীম বড়। নিষ্প্রাণ আমি জড়, আমার জীবন জড়তার প্রতি ক্রমাগত বিরুদ্ধাচরণ এবং অসম্ভব সজীব। বিচিত্র বহুধামুখী অভিজ্ঞতা, কিন্তু আহ্লাদ করে কনসেন্ট্রেটেড করতে চায় এক মুখে। কিছুতেই ফোকাস সরাতে দেয় না, মুক্তি দেয় না যন্ত্রণা থেকে বেদনা আর ভালোবাসা থেকে। সব কিছুর সংশেষণে যে জীবন, তার যাপন থেকে যা কিছু উপলব্ধি আর অনুসন্ধান কেন যে অন্যকেও তাতে জারিত করতে চাওয়া, সেও তো এক সত্যানুসন্ধানই। কিছু কথা বলতে চাই, এও তো এক পীড়ন। অনেক কথা বলতে চাইলেও বলতে না পারা সেও এক অবদমন। সেই পীড়ন থেকে অবদমন থেকে রিলিজ খুঁজে নিতে চাওয়া। অগত্যা কলম এবং সাদা কাগজের মধ্যে গুঁজে দেওয়া নিজের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ।

‘ঝড়’ উঠেছিল মনের আরও নানাদিকে। ফলশ্রুতি কবিতার ছোট্ট কাগজ, দুই বন্ধু মিলে। ‘শ্রাবস্তী’। কী উন্মাদনা আর আবেগ। অর্থ নেই, বন্ধুরা সবাই মিলে এগিয়ে এল দু-চার টাকা করে। লেখাপত্র সংগ্রহ, প্রেস, প্র“ফ, ব্লক, ছাপা কাগজে কালির অদ্ভুত গন্ধ। একটা ঘোর, একটা বন্ধন। দু-তিন বছরে ৭-৮ টা সংখ্যা প্রকাশ পেয়ে দম ফুরোলো ‘শ্রাবস্তী’র। সেই যে জড়িয়ে যাওয়া তার বাঁধন মাঝেমধ্যে আলগা হলেও খুলে পড়ল না আজও।

কল্পকন্যা কখনও কখনও রূপ পরিগ্রহ করে। তার রহস্য কুহক কবিতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। হা-হা করে ওঠে মনটা। একটা ছারখার করে দেবার বাসনা কেমন উগ্র হয়ে ওঠে। যেন ইচ্ছে করেই ভেঙে দিতে চাই, হারাতে চাই। ‘উনুন সাঁজছে উপোসী/ বিনুনী বাঁধছে রূপোসী/ ওর উনুনে আগুন দে/ ওর রূপেতে আগুন দে।’ আবার আলো এসে সবকিছু শান্ত সমাহিত করে দেয়। এক অজানা আনন্দে তখন ‘তুমি’কে বন্দনা করে ফেলতে হয়। অসীম মনে হয় তাকে।

মৌসুমী বাতাসে চোখ ধুয়ে ভোরবেলা

প্রথম তোমাকেই দেখলাম

মৃত নদীখাতে এত আলো আগে দেখিনি

তুমি আলো হলে সূর্যও চন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়।

অথৈ ভালোবাসায় থই না পাওয়া এক যুবক শরীরের ওমটুকু লবণের স্বাদে শরীরের ব্যঞ্জনায় মেশাতে চায়। হয়ত সাময়িক পারে, আবার পারেও না। কিন্তু থই মেলে না।

আমাকে যারা আঘাত করে

তাদের কব্জির ক্ষমতা আমি জানি

আমার নিখাদ ঘুমে যারা ব্যাঘাত ঘটায়

তাদের চঞ্চলতার অর্থটুকু বুঝি

কিন্তু ভালোবাসে যে চোখ

তার কোনো থই পাই না কেনো?

একটু কথা বলার চেয়ে জমে যাওয়া কথাই বেশি। একটু আলতো ছোঁয়া পাওয়ার নাছোড় বাসনা। একটু সান্নিধ্য। একটু তার কাছে হিরো বনে যাওয়া। ভালোবাসার মহিমা।

যৌবনের এই ঝড়োয়া সময়ে আমি প্রেমে-কবিতায় মিলেমিশে। এর আলাদা কোনও রূপ নেই, রস নেই। নেই বিচ্ছিন্ন করার উপায়। বাইরের ঝড় ভেতরের ঝড় একাকার। তাই আলাদা করে আমার কোনো কবিজন্ম নেই। যেমন অন্য দু-চারটে কাজ করি, যেমন হাসি কাঁদি, নাচি, কুঁদি, খাইদাই, দাবা খেলি, অফিস করি, বাবার মৃত্যুতে হবিষ্যি করি, কলেজ পালাই, সিনেমা দেখি, প্রেম করি রসিয়ে, কাউকে শেষ করি কষিয়ে, আনন্দ হুল্লোড়ে মাতি, দশে মিলে পিকনিকে বেরিয়ে পড়ি, হেঁটে যাই একাকী আদিগন্ত মাঠ, ঘুমাই, স্বপ্ন দেখি, অসুখে যন্ত্রণায় কাতরাই, পড়ি বই— গড়ি মূর্তি— ছুঁড়ি ক্রিকেট বল, তেমনি কবিতা লিখি, এই মাত্র… কী এমন গূঢ় রস যা আমায় ঠেলেছিল! কী সেই ঘর্ষণ সংঘর্ষ যা আমাকে ভেঙেছিল! শত টুকরোয় আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাপনের ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে, তবু কেন এই কেন্দ্রমুখটিই কেড়ে নিল সব টান সব রক্ত সব আনন্দ-বেদন? সে এক বিমূর্ত কলাবউ দেখার রহস্য, একতারা খসে পড়ার রিন্ঝিন্-রিন্ঝিন্ শব্দানুভূতি, এক জেলি ত্বক কঠিন শরীরে স্পর্শানুভূতি আর বিষম শূন্যতায় আবেগী মনখারাপের সানাই। প্রেম যেমন এক আশা আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলল জীবনে, কবিতা তেমনি এক আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ালো।

প্রেমের যেমন বহু রূপ তেমনি প্রেমিকারও বহু আধার। সবকিছুতেই প্রেমের আবিষ্কার এই মহাসময়ে। কিন্তু বাস্তবে এসে অসীমের মধ্যে সীমা খুঁজে নিতে হয়, বহুর মাঝে এককে। ভালোবাসার গভীরতাই বলি আর অমোঘতারই দাবি হোক ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেই ঘরকন্যা শুরু। সেও এক প্রেম বহিঃপ্রকাশের প্রথম পাঠ। এক ভয়ের, অজানার, আশঙ্কার অথচ কিছুতেই এড়ানো না যাওয়াকে অভিবাদন জানানো। এক ধরনের দায়, একটা টান, একটা বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া। যৌথ সৃষ্টি সন্তান। কবিতা এসব থেকে দূরে নয় কখনও। সংসার থেকে কবিতার জন্য প্রশ্রয় পেয়ে যাওয়া ক্রমাগত। প্রকৃত অর্থে ঘরনীর সতীনের প্রতি ভালোবাসা আমার থেকে কম নয় কখনওই। এ বড় কম পাওয়া নয়।

আর স্বপ্ন। সে তো দু-রকমের। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন, আর জেগে থেকে স্বপ্ন। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন কিছু কম নয়। কিন্তু জেগে থেকে স্বপ্ন তার থেকেও বেশি। কত তার রূপ কত তার ভাবনা। কত কত পাল্টে ফেলার অভীপ্সা। যৌবন স্বপ্নময়। সমস্ত স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে সে দাঁড়িয়ে। সমস্ত প্রচল থেকে তার মুক্তি বাসনা। সমাজ সংসার রাজনীতি অর্থনীতি সব কিছুর আমূল বদল। প্র্রেমকে মহিমাময় করে তোলার নিরন্তর বাসনা। পুড়ে যাওয়ার ইচ্ছে। ইচ্ছে সোনা হওয়ার। আনন্দ। আনন্দের ফোয়ারায় নিজেকে ভাসিয়ে তোলা। আনন্দের সন্তান আমরা। সেই আনন্দেই বিলীন হয়ে থাকার স্বপ্ন। অনেক সময়ই সে স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগে না। মুহূর্তে পাল্টে এক অসহায় অবস্থা। হয়ত একটা গভীর খাদ, অন্ধকার, কিচ্ছু দেখা যায় না, এক হাতে খাদের কিনারা ধরে ঝুলছি অনাদি কাল থেকে, হাতের শিরা ফুলে উঠেছে, যেকোনো মুহূর্তে ছুটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে, উদ্ধারের আশায় পা ছোঁড়া অনর্গল, এক সময় তারও ক্ষমতা লুপ্ত। হয়ত একটা সাপ সে মুহূর্তেই উঠে আসছে সেই হাত বেয়ে, যে হাত ধরে আছে খাদের কিনারা। ঝটপট দেখার চেষ্টা সত্যিই সাপটা ঠিক কোথায় উঠে এল! এ সব স্বপ্নকাণ্ডের থিম তো একটাই— একটা পৌঁছুতে না পারা, শত চেষ্টাতেও নাগাল না পাওয়া, একটা অতৃপ্তি, অসহায়তা, ক্ষমতা থাকলেও শেষ করতে না পারা। এও তো জীবনেরই অঙ্গ।

যৌবন যেমন একদিকে স্বপ্ন তৈরি হতে দেখে তেমনি স্বপ্নভঙ্গও তার অভিজ্ঞতা। আমারই চোখের সামনে আবেগী অথচ আদর্শপূর্ণ কত স্বপ্ন গড়ে উঠল, আবার আমার সামনেই সে স্বপ্নসৌধ ভেঙে পড়ল। কিন্তু যৌবনের এমনই আউল-বাউল বাতাস, এমনই তাপ, এমনই নির্মাণক্ষমতা সে আবারও কোনো স্বপ্ন গড়ে নেয়। স্বপ্ন ছাড়া সে বাঁচে না, বাঁচতে পারে না। একদিকে স্বপ্ন গড়ার আবেগ উত্তাপ অন্যদিকে স্বপ্নভঙ্গের ব্যথা কষ্ট যন্ত্রণা। আর সব কিছুকে ছাপিয়ে প্রেমের মত্ততা ঝড় হয়ে দেখা দেয়। নিজেকে সেই বন্যায় ভাসিয়ে নিতে যে আনন্দ, তাই যৌবনের সঞ্চয়, যা বাকি জীবনের রসদ গড়ে তোলে। প্রেম একদিকে উন্মত্ততায় আবেগে যুক্তিহীনতায় ভাসিয়ে নেয়। আবার অন্যদিকে এক সূক্ষ্ম বেদনার অনুভূতি এক বিষাদভরা অতৃপ্তির কষ্টানুভূতি জাগিয়ে তোলে। আর দুই-এ মিলে জীবন তরীটি টলমল করলেও এক লক্ষ্যের দিকে এগুতে থাকে। জীবন-তরী। সময়ের ঢেউ-এ এগিয়ে যাওয়া। টলমল তো করবেই। ‘রিদমিক’ এই টলমলেই দুলকি চালটা। আর তরীর সঙ্গে ঢেউ-এর ছোট্ট মোলায়েম বা কর্কশ সংঘর্ষে অ্যাকশান, রিয়্যাকশান, ইনটার্যাকশান। অভিজ্ঞতা। অগ্রসরমানতাই অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতাই অগ্রসরমানতার বিছন। ইনপুট, শুধুই ইনপুট। নিরত-নিরন্তর। জারণ বিজারণ জীবন নামক এক আশ্চর্য মননে। গ্রহণ আর উদ্গীরণ। আউটপুট। গ্রহণের পুনরালোচনা। কবিতা যার আধার। সে আমাকে দিওয়ানা করেছে, করেছে কাঙাল। সেই যৌবনেই কাঙাল। দ্রোহে কাঙাল, প্রেমে কাঙাল। আলো অন্ধকারের খেলায় সাত রঙের স্পেকট্রাম মুহূর্তে যা খুলেছিল তার জন্য কাঙাল। রঙের কাঙাল। অরূপের বিশাল সম্ভার যা রূপের মধ্যে সহসাই ধরা দিয়েছিল, সেই রূপের কাঙাল। স্পর্শাতীতও কখনও কোনোসময়ে তার স্পর্শ বুলিয়ে চলে যায় এই চড়া বালির শরীর, সেই স্পর্শের কাঙাল। গন্ধের কাঙাল। এই কাঙালেপনা যে ঝড় তোলে ভেতরে, বাইরের ঝড় তাকে প্রশমিত করতে পারে না। তখনই সূচীমুখ খুলে নিজেকে আরেকটু ব্যাখ্যান, নিজেকে সবার মধ্যে পড়তে চাওয়া।

কাঙাল শুধু চায়। আবার চায়ও না। চাওয়া না-চাওয়া দুয়েতেই তার আনন্দ। তার এক হাত বলেÑ দ্যাখো, এই করপুটে অঢেল ভাঁড়ার, সব কিছু ভরা, না চাইতেই এত যার, তার কী প্রয়োজন, কী চাইবে সে, আর কেনই বা? অন্যহাত বলেÑ শূন্য করতল। শূন্যের সব কিছু চাই। শূন্যের সঙ্গে যা কিছু যোগ হোক, শূন্য বেড়ে চলে। কিন্তু শেষাবধি কাঙাল চাইতে পারে না। কাঙালেপনার নমুনা ঝোলাভর্তি পথশশ্রম, একতারাময় বেভুল বাতাস, আর পারানির জন্য জমানো খুদকুঁড়ো নিঃশেষে তুলে দেওয়া। তখন বসে থাকা, ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায়। আবার ভরা যখন তখনও চাই। তখন কাঙালেপনা আসে না। দস্যুবৃত্তি ভালো বোঝে। ‘আরো চাই আরো চাই’ এর ডুগডুগি বাজিয়ে ত্রিশুল নাচিয়ে রণস্থল করে তোলে প্রলয় নাচনে। কোনও বেছেবুছে চাওয়া নয়, সমূল চাওয়া, চাওয়া আদিগন্ত। নিত্য নিত্য শৃঙ্গ জয়ে চোখে খুশির ঝিলিক। চাওয়া আর না-চাওয়া কখনও সমার্থক হয়ে পড়লে উল্লাস কমে আসে, আনন্দ খরচ হয়ে যায় বেহিসেবি পথচলার ঔদ্ধত্যে। কাঙালের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায় বসে থাকা আর দস্যুর অশ্বারোহিত গতির মাঝখানে এক চেনা আধচেনা, ভোলা-খ্যাপা নয়, উদ্দেশ্যকে প্রধান করে প্রাণপাতী নয়, কিন্তু আবার উদ্দেশ্যহীনও নয়, কী চায় কী চায় উগ্রতা নেই, কিন্তু কিছু তো চায়। কী চায়?

চায় ভালোবাসা, প্রেম। কেউ যেন না জানে, প্রেমিকা নামক এক রমনী চাই। একটু আড়াল চাই, একা একা দুজন হওয়া চাই, চাই অন্যস্বাদের এক পৃথিবী। একটা আকাশ পাতা চাই, মনুষ্য-হাড়ের কলম চাই, রক্ত ভরে দাও কলমে। উড়ু উড়ু বাতাসে মনে একটা বসন্ত চাই, দুকলি গাইতে চাই, পাঁচটা পঙক্তি লিখতে চাই ওই আকাশী পাতায়। একটু ভালোবাসা চাই যাতে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে পাথর বুক, একটু দহন চাই যাতে ক্রোধে শুধুই বাতাস না লাগে, একটা মানসী চাই যেখানে সব দিয়ে নিঃশেষে শূন্য হতে পারি। একটা মানুষ যা চায়, চাইতে পারে, তার সবই চায় যৌবন। একটা মানুষ যা চায় না, চাইতে পারে না, তাও চায় যৌবন। এই চাওয়ার নাম যৌবন। এই চাওয়াই ঝড় তোলে। এলোমেলো করে দেয় সবকিছু।

চাইলেও অনেক সময়ই মেলে না। মিলবে কেনো? চাওয়ার মত চাইতে হবে তো? মিনমিন করে কাকে যে চাইলাম, সে নেমে গেল দূর অবগাহে। কাঙালের মত অন্য তোমাকে চাইলাম, অন্য সে তুমি ধূ-ধূ মাঠের জ্যোৎস্নায় মিশে গেলে। দস্যুর মত দাবড়ে চাইলাম, কর্পূর হয়ে গেল সব, মরিচীকা। মন প্রাণ হৃদয় দিয়ে চাওয়া হয়নি কি তবে? চাওয়ার ওপরেও কিছু চাওয়া বাকি রয়ে গেছে, রয়ে যায়। সব কিছু দিয়ে, নিজেকে শূন্য করে আহা যদি একবার চাইতে পারতাম!

শৈশব থেকে কৈশোর এমনই নানা উপাদান আর নানা অভিঘাতে আমার যৌবনকে ঋদ্ধ করেছে। আমাকে নষ্টও করেছে স্বাভাবিক সরল যাপনে। সময়ের ঢেউ আমাকে নানান অভিজ্ঞতা আর বোধের আত্তীকরণ ঘটানোর একটা ছোট্ট দায় চাপিয়ে পীড়িতও করেছে। সেই পীড়ন আর অপ্রকাশজনিত অবদমনই যৌবনে আমার কলমের সূচীমুখে। এ একই জীবনের মূর্ততা, যার কিঞ্চিৎ প্রকাশ ঘটেছে বলেই আমি মোক্ষতার দিকে দশ ধাপ এগিয়ে আর নয়ত সব কিছু ব্যর্থ হয়ে যেত এমনও নয়। তবু একটা চাহিদা, প্রকাশের চেয়ে অপ্রকাশের মাত্রা বেশি বলেই। যে পঙক্তিটি সেই কৈশোর থেকে লিখতে চাই, তা যৌবনেও লেখা হয়ে উঠল না। অতৃপ্তির কলম তাই চলতেই থাকল। তাই ছুটে চলা কিংবা অভিনিবেশ। বারবারই মনে হয়, এইতো কলমের ডগায়, মনের গোল্লাছুটে, মস্তিষ্কের ছাকনায় আটকে পড়েছে। পরক্ষণেই বুঝি, না এ সে নয়। হয়ত প্রেম আর কবিতার রহস্যের খোঁজ আমাকে সহস্র জন্ম আর যৌবনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবে। আমি যাব। অনিঃশেষ রিলে-দৌড়ের ফিতের দিকে আমার অভিসার চলতেই থাকবে। ঝড়ের পূর্বাভাস সে কথাই বলছে। তারপর কখনও অন্ধকার জড়িয়ে ধরলে কোনো দুঃখ বা বিষাদ নেই।

তোমার ছাতার নিচে চল এই বৃষ্টিটুকু পার হয়ে যাই

‘আয় বৃষ্টি ঝেপে’ কারা যেন জন্মান্তর থেকে গেয়ে চলেছে

কাণ্ডজ্ঞান নেই কোনো, তুমি আর কত গা ঘেষে চলতে পারো?

‘ধান দেব মেপে’ কোথাও প্রতিশ্র“তিটুকু গাইছে না দোহারেরা।

ঝেপে ছাড়, বৃষ্টিই আসে না, ছাতা বন্ধ করতেই

আমাদের ব্যবধান দেখে আকাশও হেসে ওঠে।

কেনো বা এলাম, কেনোই বা চলে যাচ্ছি

শুধু এক মৃত্যুপ্রবণ নদীর কাছে গয়নাগুলো খুলি

বিন্দু থেকে কোথায় যেতে পারি। শূন্য হতে পারি সীমান্ত মেঘ।

লতাবাকল ছুঁড়ে বিমল শরীর পালকে পোশাকে ঢাকি।

শূন্য থেকে কোথায় ভেসে চলি অন্যঘাট, কলমিশাক,

মাটি পায় না শেকড়Ñ তবু জন্ম, তবু যৌবন, বিচিত্র বাঁচার সাধ

আর শুধু আরোহণের মাইলপোস্ট গুনে যাওয়া উৎকণ্ঠায়

হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে সবার নজর উথলে ওঠে, বলে ‘আহ্লাদ আহ্লাদ’।

আসলে,

তীব্র হুইসেলে একটা সত্যি ট্রেন চলে না গেলে বুঝতেই পারতাম না

কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি আর কিসের অপেক্ষায়

[গদ্যে ব্যবহৃত সমস্ত কবিতা আর কবিতাংশ লেখকের কৈশোরোত্তীর্ণ বা যৌবন বয়সের।]