Archives

  প্র ব ন্ধ

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় : হায়, উড়ে গেছে নীলপাখি
কানাই সেন

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যমনন বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে কবি সমালোচক বুদ্ধদেব বসু কালের পুতুল বইয়ে লিখেছেন- ‘….তিনি বোধহয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে কাব্যজীবন আরম্ভ করলেন না। এমনকি, প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাও তিনি  লিখলেন না; কোনো অস্পষ্ট, মধুর সৌরভ তাঁর রচনায় নেই।’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। বাঙলা কাব্যজগতে কবির পদসঞ্চারের মধ্যেই সমালোচক বুদ্ধদেব বসু চিনে নিয়েছিলেন তাঁর ব্যতিক্রমী ভাবনার অভিজ্ঞান। এই বইয়ের বহু পঠিত, বহু চর্চিত কবিতা ‘মে-দিনের কবিতা’। কবিতায় শোনা গেছে বিপ্লব প্রস্তুতির আহ্বান। যা বাঙলা কবিতায় অভিনব না হলেও অনেকটাই ব্যতিক্রমী, প্রথম স্তবকেই কবির আদর্শ ভাবনার দিকটি উঠে এসেছে-যেখানে যৌবনের দীপ্তির সঙ্গে মিশেছে বিপ্লবের স্বপ্ন। প্রিয় সম্ভাষণের এ এক নতুন আঙ্গিক। নতুন আদর্শ আর বিশ্বাসের উচ্চারণ— ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,/ চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/ কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’ কবিতাটি নিঃসন্দেহে শ্লোগানধর্মী। সে সময়ে সুভাষের জীবন ও মনন বিশ্লেষণে দেখা যাবে কবিতা, আদর্শ ভাবনা আর জীবন এখানে বেজেছে একই সুরে- ‘শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না/ প্রতি নিশ্বাসে আনে লজ্জা।/মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না-/ পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।’ কবিতাটি লেখা হয়েছে বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর আত্মদানের রক্তাক্ত চিরন্তন দলিল মে-দিন স্মরণে। স্বপ্ন বিলাসের সুখশয্যা ছেড়ে কবি এসে দাঁড়িয়েছেন ধ্বংসের মুখোমুখি। ধ্বংসের পর নতুন পৃথিবী গড়ে উঠবে, শোষণহীন, শ্রেণিহীন সমাজ। সংগ্রামের দাব-দগ্ধ পথে কবির যাত্রা। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই প্রত্যাশিত নতুন জীবনকে তিনি ভালোবাসতে চান। বাংলা প্রেমের কবিতার প্রচলিত ধ্যান ধারণার সঙ্গে এর অনেকটাই দূরত্ব। ‘সৈনিক কবি’ রূপেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রকাশ। কলেজে আই.এ. পড়ার সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় সমর সেনের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে পান ‘হ্যান্ডবুক অফ্ মার্কসিজম’ বইটি। মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন কবি। মার্কসীয় চিন্তা চেতনা ক্রমে জীবন ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে নেন। ১৯৩৯ সালে যোগ দেন লেবার পার্টিতে। সেবছরই যুক্ত হন কমিউনিস্ট পাটির সঙ্গে। পাটির সদস্যপদ ১৯৪২-এ। সর্বক্ষণের কর্মী। ১৯৪৬-এ ‘দৈনিক স্বাধীনতা’য় সাংবাদিকতা। দেশ স্বাধীন হবার অব্যবহিত পরে ১৯৪৮ সালে বেআইনি ঘোষিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি। আরও অনেক নেতা কর্মীর সঙ্গে কারারুদ্ধ হন সুভাষ। মুক্তি পান ১৯৫০ সালে। কারার অন্তরালে তাঁর যাপিত জীবনের পরিচয় পাওয়া যায় ‘চিঠির দর্পণ’-এর মধ্যে। সেখানে তিনি জানিয়েছেন : ‘জেলে গিয়ে লেখালেখির কোন ব্যাপারই ছিল না। বাইরে ভেতরে সমান ভাবে তখন লড়াই করার কথা। কিছু দিনের মধ্যেই দমদম সেন্ট্রাল জেল বিনা বিচারের আর  বিচারাধীন বন্দীতে উপচে পড়ল।’

‘কিছু অনুবাদ আর অনশনের ধর্মঘটের ছাড়া জেলে ব’সে কিছুই আর লেখা হয়নি। পড়বারও কি তেমন সময় পেয়েছি? দু’বেলা কেবল এ-মিটিং সে-মিটিং, ছুতোয় নাতায় জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদ-বিসম্বাদ, বিচারাধীন বন্দীদের নিয়ে এ-প্ল্যান সে-প্ল্যান আর থেকে থেকে অনশন ধর্মঘট। সশস্ত্র সংগ্রাম আর মুক্তাঞ্চলের স্বপ্নে আমরা তখন মশগুল। বিপ্লবটা জেনে নেওয়ার পরই লেখাপড়ার ব্যাপারগুলো আসবে। বিপ্লবের আগে সংস্কৃতি নয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি নয়।’

এসময় সুভাষ সর্বান্তকরণে একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী। তাঁর আদর্শ আর মননের একই সুর। জেল থেকে মুক্তির পর ১৯৫১ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পান। ওই বছরই বিয়ে গীতা বন্দ্যোাপাধ্যায়ের সঙ্গে। গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় কবির সঙ্গে পরিচিত হবার রোমাঞ্চকর অনুভূতির বর্ণনায় বলেছেন— ‘তারপর যেতে যেতে এক কবির সঙ্গে দেখা। সেই কবির দু’ দিকে দুটো মুখ। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের সেøাগান। সেই সেøাগানের সুর ধরে ধরে মিছিল থেকে কবিকে পাকড়ানো গেল। কেননা, সত্য বলতে কী, কবিতার দিকের মুখটা – যারা জানে তারাই জানে -একেবারে বদ্ধ উম¥াদের এবং কোনো চিকিৎসা নেই।’ এই উম¥াদনা একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান রাজনীতিকের এবং আত্মমগ্ন কবির। এই ‘বদ্ধ উম¥াদ’কেই নির্দি¦ধায় জীবনসঙ্গী করেছিলেন গীতা। তারপর  দীর্ঘ জীবনপথ- অনেক চড়াই উৎরাই, সম্পদে বিপদে ছায়া সঙ্গিনী। প্রসঙ্গত মনে পড়ে কবির ‘যত দূরেই যাই’ কাব্যগ্রন্থের ‘যেতে যেতে’ কবিতাটি। যেখানে কবি বলেন- ‘তারপর যে-তে যে-তে/ এক নদীর সঙ্গে দেখা’ এবং ‘সে  নদীর দুদিকে দুটো মুখ’। ১৯৫১ সালের ১৭ই আগাষ্ট সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিয়ে গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। প্রচলিত প্রথা, বিয়েতে নতুন পাঞ্জাবী পরতে হয়। কিন্তু কেনার পয়সা নেই। ধুতির সঙ্গে শার্ট- এটাই  সুভাষের রোজকার পোষাক। সেদিন শার্টের অবস্থাও ভালো নয়। বন্ধু রমাকৃষ্ণের  কাছ থেকে ধার করলেন একটা ডোরাকাটা শার্ট। ধুতির উপর সেই শার্ট চাপিয়ে সারাদিন কাজের পর বিকালে হাঁটতে হাঁটতে হাজির রেজিস্ট্রি অফিসে। সেখানকার কাজকর্মের শেষে গীতার ছোট অনাড়ম্বর ঘরে নবদম্পতির বিবাহিত জীবন শুরু। ১৯৫২ তে স্বামী-স্ত্রী চলে যান বজবজে। শ্রমিক সংগঠনের কাজে ‘বজবজের ব্যঞ্জনহোড়িয়া গ্রামের এঁদো পুকুরের ধারে এক মুসলমানের কুঁড়ে বাড়ি’ তাদের ঠিকানা। জীবনের এই সংকটকে সুভাষ দম্পতির দেখেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ প্রসন্নতায়। সংসারের অভাব অনটন দারিদ্র্য তাঁদের সদা প্রসন্ন মনে কোন বিরূপ ছায়া ফেলেনি। গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এই অবস্থার মধ্যেই কবি লিখে ফেললেন ‘এক ঝুড়ি কবিতা’। পার্টির প্রতি নিবিড় আনুগত্য ও মার্কসীয় আদর্শবাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল সুভাষের জীবন-ভাবনা তথা জীবনাদর্শন। তাঁর কাব্যভাবনার উৎসও এরই মধ্যে নিহিত। রাজনীতি বাদ দিয়ে তাঁর জীবন নয়। রাজনীতি বাদ দিয়ে কবিতাও নয়। বরং লেখক হওয়ার চেয়ে একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার ইচ্ছেটাই সে সময়ে প্রবল। জীবনের উত্তর-পর্বে লোথার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে এক সাক্ষাৎকারে সুভাষ বলেছিলেন— ‘আমি যখন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিই তখনও ঠিক এইভাবে প্রশ্নটা এসছিলো যে আমি লেখক থাকবো না কর্মী হবো। আমি এই সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম যে— না, আমি লেখক থাকবো না, আমি কর্মীই হবো।’ —এই দ্বিধাহীন ভাবনা নিয়েই শুরু হলো কবির পথ চলা। হেঁটেছিলেন অনেকটা পথ। নিজের অভিজ্ঞতার নিরিখে পরবর্তীতে কবি উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর জীবনে লেখার কাজটাও কম গুরুত্বের নয়। জেলে বন্দী থাকাকালীন বন্ধু, অনুগামীরাও তাঁকে লেখা বন্ধ না-করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এসময় জীবন, পার্টি, আদর্শ ও কবিতা প্রবাহিত একই অবিচ্ছিন্ন ধারায়। তাঁর সংসার, দাম্পত্য জীবনেও পার্টির আদর্শবাদের দীর্ঘ ছায়া।

সুভাষের কবিতার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে দীন-দরিদ্র, সর্বহারা মানুষ এবং কৃষক শ্রমিকের কথা। তাদের সার্বিক মুক্তি ভাবনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কবির উদার অসাম্প্রদায়িক মন। যার শুরু একেবারে ছেলেবেলায়। তাঁর আত্ম-প্রক্ষেপণধর্মী লেখা ‘ঢোলগোবিন্দর জীবনদর্শনে’ বিভিন্ন প্রসঙ্গে এর উল্লেখ আছে—

‘জাতপাত, ঘটি বাঙাল, মেঘনার এপার-ওপার, এ জেলা সে জেলা অঞ্চলে ভাগাভাগি দেখে ঢোল গোবিন্দ কেমন যেন কুঁচকে যেত। ছেলেবেলা থেকেই কামারের ছেলে, মালির ছেলে, মুসলমানের ছেলেরা ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। সব জাতে আর সব অঞ্চলেই যে তাঁর পড়ার আর খেলার সাথি ছড়ানো।’ বাবা ক্ষিতিশচন্দ্র ছিলেন আবগারি বিভাগের পদস্থ কর্মচারী। বদলির চাকরি। সেই সূত্রে ছেলেবেলার অনেকটা সময় তাঁর কেটেছে নওগাঁয়, সরকারী কোয়ার্টারে। সে সময়ের অভিজ্ঞতার স্মৃতি— ‘মফস্বল শহরে ছত্রিশ জাতের সঙ্গে সরকারী কোয়ার্টারে বাস করার ফলে জাতের বালাইটা কখনোই আমাদের মনে তেমন চেপে বসতে পারেনি। তাছাড়া প্রতিবেশী পরিবারগুলোতে আমাদের ছোটদের ছিল অবাধ প্রবেশাধিকার। ঈদ, বকরীঈদ, মিলাদশরীফে আমরাও উৎসবে মেতে উঠতাম।’

শ্রমিক সংগঠনের কাজে বিয়ের পর পরেই সস্ত্রীক সুভাষকে কিছুদিন বজবজে থাকতে হয়েছিল ব্যঞ্জনহোড়িয়ার এক মুসলমান বাড়িতে। অল্প দিনের মধ্যেই এই ব্রাহ্মণ দম্পতি হয়ে উঠেছিলেন এই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র নিরক্ষর মানুষদের একান্ত আপনজন। বজবজ ছেড়ে আসার পরও এদের সঙ্গে সম্পর্কে ভাটা পড়েনি। সেখানকার ‘সালেমনের মা’র সঙ্গে আরও অনেকে অমর হয়ে আছে সুভাষের বিভিন্ন লেখায়। ১৯৩৩-৩৪ সাল কলকাতার সত্যভামা ইনস্টিটিউশনের ছাত্র সুভাষ। স্কুল ম্যাগাজিন ‘ফল্গু’তে প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম লেখা ‘কথিকা’। কবিতা নয়, গদ্য। ১৯৪০-এ ‘কবিতা ভবন’ থেকে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ পদাতিক। কবি হিসেবে পরিচিতির সফল সূচনা। এরপর চিরকূট, অগ্নিকোণ, ফুল ফুটুক প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫৭ সালের মধ্যে। এই পর্যায়ের কবিতা আদর্শ ভাবনায় উচ্চকণ্ঠ। মার্কসবাদে দীক্ষিত, অনুপ্রাণিত কবির দু’চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন। কণ্ঠে প্রতিবাদী শ্লোগান। নতুন শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সৈনিক তিনি। সেই আদর্শই তাঁর কবিতার বিষয়। শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষের কথা সেখানে বার বার উচ্চারিত। সুভাষ তখন স্থির লক্ষ্য কমিউনিস্ট কর্মী। এই পরিচয়ে তাঁর গৌরব। তিনি সংগঠনের গুরু দায়িত্বে। খিদিরপুর ডকমজুর ইউনিয়ন, বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়ন, ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ, স্বাধীনতা পত্রিকার সাংবাদিকতা, সর্বভারতীয় রেল ধর্মঘটের প্রস্তুতি, সর্বোপরি জেলে যাওয়া-পার্টির অনুগত কর্মীরূপে বিরাট কর্মযজ্ঞে সুভাষ তখন আত্মনিবেদিত। এ সময়ের কবিতা সংগ্রাম, বিপ্লব আর সাম্যবাদী ভাবনার কথায় মুখর। কয়েকটি কবিতার অংশ— ‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না/ কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে/ লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা’ —(সকলের গান)। ‘জীবনকে পেয়েছি আমরা, বিদ্যুৎ জীবনকে/ উজ্জ্বল রৌদ্রের দিন কাটুক যৌথকর্যণায়/ আর ক্ষুরধার প্রত্যঙ্গ তরঙ্গ তুলুক কারখানায়’। (পদাতিক)। ‘একলা নই, মিলিত হাত/ আজ আঘাত হানবে।/ মুক্তিদাতা মজুরচাষা-/নতুন আশা সামনে।/ আমরা দেব বোবাকে ধ্বনি,/ খোঁড়াকে দ্রুত ছন্দ/ লক্ষ বুকে রয়েছে খনি, কুঁড়িতে ঢাকা গন্ধ।/ আমরা নই প্রলয়ঝড়ে অন্ধ’। (কাব্যজিজ্ঞাসা)। ‘শতকোটি প্রণামান্তে/ হুজুরে নিবেদন এই-/মাপ করবেন খাজনা এ সন/ ছিটেফোঁটাও ধান নেই’। (প্রথম স্তবক, চিরকূট)। ‘পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে/হুজুর, জেনে রাখুন/খাজনা এবার মাপ না হলে/জ্বলে উঠবে আগুন’। (শেষ স্তবক, চিরকূট)। ‘লক্ষ লক্ষ হাতে/ অন্ধকারকে দু-টুকরো ক’রে,/ অগ্নিকোণের মানুষ/সূর্যকে ছিঁড়ে আনে।? কোটি কণ্ঠের হুঙ্কারে লাগে/বজ্রের কানে তালা।/ পোড়া মাঠে মাঠে বসন্ত ওঠে জেগে।’ (অগ্নিকোণ)। এবং ‘মিছিলের মুখ’ কবিতার ‘আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত’, ‘মুষ্টিবদ্ধ একটি শাণিত হাত’, ‘আগুনের শিখার মত হাওয়ায় কম্পমান’, ‘বি¯্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র’, ‘ফস্ফরাসের মত জ্বলজ্বল’। (মিছিলের মুখ)। ‘সুন্দর’ কবিতার সুন্দর ভাবনায়, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্তে’র অনুভবের’, ‘লাল টুকটুকে দিন’- এর প্রত্যাশার মধ্যেও রাজনৈতিক ভাবনার ছায়া। প্রখ্যাত সমালোচক অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে— ‘কবি সুভাষের মনোভঙ্গির পরিবর্তন সূচিত হয়েছে ‘ফুল ফুটুক’ কাব্যগ্রন্থের পর্বে। তিনি বলেছেন ‘ফুল ফুটুক’ কাব্যে কবির পদসঞ্চার রাজনীতির গ-ির বাইরে মুক্ত পৃথিবীতে। সংগ্রামী সৈনিক দেখা দিলেন কবি-শিল্পীর অপূর্ব রূপ-লাবণ্যে।’ কিন্তু সময় এবং পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে এই মন্তব্যের সঙ্গে সহমত হওয়া যায় না। বরং ফুল ফুটুক-এর পাঁচ বছর পর ১৯৬২-তে প্রকাশিত কাব্য যত দূরেই যাই এবং তার পরবর্তী কাল মধুমাস (১৯৬৬), এস ভাই (১৯৭১) এবং ছেলে গেছে বনে (১৯৭২)- কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে সুভাষ-মননের ক্রম সূচনা অনেক বেশি সুস্পষ্ট। ১৯৬২ থেকে ১৯৭২ এই এক দশকে স্বদেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ঘটনার তরঙ্গ বিক্ষোভে আলোড়িত হয়েছে কবির সংবেদনশীল অন্তর। এই ঘটনাগুলির মধ্যে উল্লেখনীয় হলো চীন ভারত সীমান্ত বিরোধ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন, নকশাল আন্দোলন, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, সেখানকার মুক্তি যুদ্ধ-এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ার ছায়া কবির পরবর্তী এক দশকের কাব্যে। এ সব ঘটনা ‘ফুল ফুটুক’ কাব্যের পরবর্তী সময়ের। সেখানে অনেক টানাপোড়েন আর দ্বিধা দ্বন্দ্বের ছায়া। এই পর্যায়ে শুরু রাজনীতির বৃত্তের বাইরে বন্ধনহীন কবি মনের যাত্রা। তত্ত্ব-শাসন থেকে কবিতাকে মুক্ত করার ভাবনা। এ সময়ের কবিতায় লেগেছে মুক্ত পৃথিবীর আলো বাতাস। শোনা গেছে উন্মুক্ত হৃদয়ের কলতান। কবিতার বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের চিহ্ন স্পষ্ট হয়েছে লেখার ধরণ তথা আঙ্গিকেও। কবিতার মন এবং শরীর দুয়েতেই এই পরিবর্তনের চিহ্ন প্রবল। এসময়ের কবিতার আঙ্গিকে অনেক ক্ষেত্রেই গল্প বলার বা কথোপকথনের ভঙ্গি। সংগ্রামী সৈনিকের কবিতায় লেগেছে মুক্ত কবি শিল্পীর অপূর্ব রূপলাবণ্য। ধীরে ধীরে পার্টির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়েছে। পার্টির অনেক সিদ্ধান্তে তিনি সহমত হতে পারেননি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিবাদী ভূমিকাও দল ভালোভাবে নেয়নি। বিভিন্ন কবিতায় পার্টির প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ‘দলছুট’ তকমাও তাঁর জুটেছে। প্রিয় বন্ধু, সহযোগী, সহমর্মিরাও সরে গেছেন। সুভাষ নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছেদ ১৯৮১ সালে। এখানেও তাঁর ভূমিকা প্রতিবাদীর। পার্টির কিছু নেতা কর্মীর সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ কবির মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে সে এসময়ের কবিতায় ‘বিকেলে মিছিল থাকলে আজ/ ছোকরাদের সঙ্গে যাব পাল্লা দিয়ে হেঁটে/ সারিবদ্ধ দুটো হাত দোলাতে দোলাতে/ পরদিন প’ড়ে নেব, এই যুক্তি এঁটে-/ সভায় যা বলা হবে না-শুনে সাক্ষাতে/ দল বেঁধে দোকানে চা খাব। / আর যদি সেই সঙ্গে ভাগ্যে যায় জুটে/ তবে বাড়ি গাড়িও হাঁকাবো।’ (কাল মধুমাস)। পার্টির নেতাদের আদর্শ বিচ্যুতির প্রতি ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। ‘আমার খেলাটা, দোহাই/ এখন থেকে আমাকেই খেলতে দিন।” (ফড়েদের প্রতি)। ‘সামনের স্টপেই আমি নেবে যাব।/হয়ত তারপর/ এ-বাস আলো করে কেউ উঠবে।/.. তখন হাতের টিকিটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে/ আমি বলতে চাই না,/ তবু আমাকে বলতেই হবে, ‘বাঁচলাম’। (সামনের স্টপে)। ‘ইনাম পেয়ে  জাহান্নামে/ গেছেন, বলব কী আর-/ প্রগতির লোক ছিলেন আগে/ এখন প্রতিক্রিয়ার।/ ফুলকি ছেড়ে ফুল ধরেছেন/ মিছিল ছেড়ে মেলা/ দিন থাকতে মানে মানে/ কাটুন এইবেলা।’ (ল্যাং)। ‘আমি তো আর ফটোয় তোলা ছবি নাই/ যে, / সারাক্ষণ হাসতেই থাকব।/ আমার মুখে তো চোঙ লাগানো নেই/যে,/ সারাক্ষণ গাঁ গাঁক করব।/ আমার তো হাতে কুষ্ঠ হয় নি/ যে, / সারাক্ষণ হাত মুঠো করে রাখবো।’ (দুয়ো/এক)। সুভাষের কবিতার দুটি পর্ব সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম পর্বে তিনি সৈনিক কবি। মার্কসীয় ভাবনায় দীক্ষিত কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শবাদী একনিষ্ঠ কর্মী। এই পর্বের কবিতা উচ্চকিত-বিপ্লবের আবহ, শ্লোগান ধর্মী। পার্টির আদর্শবাদের উচ্চারণই এখানে প্রধান। তাঁর ভূমিকা প্রতিবাদীর। রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। উত্তর পর্বের কবিতায় মননের প্রাধান্য। হৃদয় অনুসন্ধানেই তিনি মগ্ন। এখানে তিনি শুধুই কবি। মানুষের কবি। তাঁর কবিতার মানুষকে সহজে চেনা যায়। আপন বলে ভাবা যায়। এখানে কবির কোনো জাত নেই, দল নেই, কোনো তাত্ত্বিকতার শাসন নেই, বন্ধন নেই। রাজনৈতিক শক্তিমানের কাছে, সমালোচকের কাছে কৈফিয়ত দেবার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁর দায়বদ্ধতা শুধু সত্যের কাছে, সহৃদয় পাঠকের কাছে। হৃদয় আর ভালোবাসা ছাড়া তাঁর কিছুই চাওয়ার নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের মঙ্গল সাধনার এক পথ রাজনীতি এবং অন্য পথ কবিতা। দুই পর্বে দেখা যায় দুটি পথের অনুসন্ধান। একটিতে কবিতার উৎস রাজনৈতিক মতাদর্শ-সেই পথে কারখানার চিমনির ধোঁয়া কবিতার উৎস মুক্ত হৃদয়। আকাশ, ধূলো, সাইরেনের শব্দ, কাস্তে হাতুড়ির গান, যুদ্ধের সজ্জা, মিছিলের মুখ, সালেমনের মা’র বারান্দা। পরবর্তীতে তাঁর কবিতার উৎস মুক্ত হৃদয়। আকাশ, ধুলো, ঘাস, নীল পাখি, লক্ষ্মীর পা আঁকা নিকোনো উঠোন, ভানুমতির খেলা, রূপকথার রাজ্য, নিটোল সৌন্দর্য ভাবনা। সর্বোপরি মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার উপাচার। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, কেবল কবিতার অন্তর্ভাবনায় নয়, বিষয়বস্তু এবং ফর্মের দিকেও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে উত্তর পর্বে। তিনি নিজেই তৈরী করেছেন স্বতন্ত্র কাব্য ভাষা। ছন্দ নির্মাণেও অভিনবত্বের ব্যাপারটা বার বার এসেছে। এখানে কবিতার পথ চলা জটিলতাহীন, অবাধ। তাৎক্ষণিক দেখা ঘটনাকে কবি স্থাপন করেছেন কবিতার ক্যানভাসে। তারপর খামখেয়ালি রঙে, বুঝিবা কিছুটা অসতর্কতায় বর্ণময় করে তুলেছেন সে-সব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা। আপাতভাবে মনে হতে পারে, এ যেন শিশু সুলভ খেলা। তবে শেষ পর্যন্ত এই খামখেয়ালি ছেলেমানুষী আশ্চর্য অর্থবহ আর জীবনবোধের বিষয় হয়ে ওঠে। পাঠকের চেতনাকে গভীর ভাবে নাড়া দেয়-ভাবিয়ে তোলে। অনায়াস, জটিলতাহীন, স্বচ্ছন্দ কবিতার বিষয় হিসেবে আসে কাঁচালঙ্কা, গন্ধরাজ লেবু, হাজিরার খাতা। এসব সমন্বিত হয়ে তৈরী হয় নতুন কাব্য ভাবনার ইমারত- এ সুভাষ অচেনা। শিল্পী অবনীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দ্রব্য সম্ভারে তৈরী বৈচিত্র্যময় ‘কাটুন-কুটুমে’র শিল্পকে মনে করায়।

হৃদয় অনুসন্ধানের কথা বিভিন্ন ভাবে এসেছে সুভাষের কবিতায়। তিনি জানেন ভালোবাসার উৎস এবং আশ্রয় হৃদয়। কবির হৃদয় সেই দিকদর্শন যন্ত্র যার চিরন্তন অভিমুখ সত্যের দিকে। এর মধ্যেই নিহিত কবিতার অন্তর সত্য। ‘যত দূরেই যাই’ কাব্যগ্রন্থের ‘লোকটা জানলই না’ কবিতায় রয়েছে কবির যথার্থ হৃদয় অন্বেষণের সংবাদ। ‘বাঁ দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে’ যে ‘লোকটার ইহকাল পরকাল গেল’ তার জন্য কবির বড় আক্ষেপ। কবি জানেন— ‘অথচ/ আর একটু নিচে/হাত দিলেই সে পেত/ আলাদিনের আশ্চর্য-প্রদীপ/ তার হৃদয়-/ লোকটা জানলই না’। ‘একটু পা চালিয়ে, ভাই’ কবিতা বইয়ের নাম কবিতায় কবির কণ্ঠে এই হৃদয় সংবাদেরই উচ্চারণ— ‘আকাশে মেঘ করেছে।/ধ্রুবতারা না দেখতে পেয়ে কেউ কেউ ভরসা করছে না/ ঘরের বাইরে পা দিতে।/ আমার কাছে অনেকদিনের পুরনো এক দিকদর্শন যন্ত্র/ আমার হৃদয়।/ আমি সেটা কোনো আগন্তুককে দেব বলে/ কেবলই ঘর-বার করছি।’ কাল মধুমাস বইয়ের ‘রোদে দেব’ কবিতায়ও হৃদয়ের কথা— ‘বর্ষা গেলে/ কাঠকুটো, ভিজে সব কিছু/ রোদে দেব/ রোদে দেব/ এমন-কি হৃদয়ও।’ দীর্ঘ জীবন পথে অনেক অনুকূল-প্রতিকূল অভিজ্ঞতায় সুভাষ জেনেছেন, ‘মালা/ জমে জমে পাহাড় হয়/ ফুল/ জমতে জমতে পাথর’। এবং অসংকোচে তিনি বলতে পারেন- ‘ফুলকে দিয়ে/ মানুষ বড় বেশি মিথ্যে বলায় বলেই/ ফুলের ওপর কোনোদিনই আমার টান নেই।’ তিনি ফুলের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন আগুন। তিনি এও জানেন মানুষ মুখোশধারী। তাকে চেনা বড়ো শক্ত। তারা সুযোগমতো রঙ বদলায়। তাই কবি বলেন- ‘তার চেয়ে আমার পছন্দ/ আগুনের ফুলকি-/ যা দিয়ে কোনোদিন কারো মুখোশ হয় না।’ (পাথরের ফুল)। তিনি জানেন হৃদয়বৃত্তির মধ্যেই মানুষের যথার্থ পরিচয়। তাঁর হৃদয় অপার ভালোবাসার উৎস। সে ভালোবাসা আত্মীয়-অনাত্মীয়, কাছে দূরের সবার জন্য। বিশ্বজনীন- সার্বজনীন। কবিতার ভাষায় তিনি বলেছেন পরিপূর্ণ মানুষে কথা। কবির নিশ্চিত বিশ্বাস মানুষ একদিন বুঝবে, সে ‘আস্ত একটা মানুষ’। সে আবিষ্কার করবে তাঁর আত্মশক্তি। ‘পৃথিবীর/ জীবনের/ সমস্ত শূন্যতা ভরিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে/ যে দুটো হাত/ কী আশ্চর্য, সে হাত দুটো/ সমস্তক্ষণ তো তার পাশাপাশিই ছিল।’ (পা রাখার জায়গা)। একথা সে নতুন করে জানবে। ‘আমার কাজ’ কবিতায় কবি বলেছেন— ‘আমি চাই কথাগুলোকে/ পায়ের উপর দাঁড় করাতে/ আমি চাই যেন চোখ ফোটে/ প্রত্যেকটি ছায়ার।/ স্থির ছবিকে আমি চাই হাঁটাতে।’ নিজের অভীপ্সা তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন- ‘চাই আস্ত মানুষের জীবনের সবটুকু’ এবং ‘মানুষের প্রতি চাই নাড়ীর টান।’ এটাই তাঁর কাব্যাদর্শ এবং জীবনাদর্শও। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক। ‘আমার কাজ’ কবিতার শেষ স্তবক-‘আমি যেন আমার কলমটা/ ট্রাক্টরের পাশে/ নামিয়ে রেখে বলতে পারি-/ এই আমার ছুটি-/ভাই, আমাকে একটু আগুন দাও।’ দ্বিধাহীন কণ্ঠে আদর্শবাদের অকপট উচ্চারণ-এখানেই সুভাষের স্বাতন্ত্র্য। কবি-অন্তর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে কবি সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলেছেন)— ‘তিনি (সুভাষ মুখোপাধ্যায়) ব্যক্তিবাদের বিরোধী। তাঁর মুক্তি কামনা একার জন্য নয়, সমগ্র মানুষ সমাজেরই জন্য। সাম্য ও সংহতি ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো সংজ্ঞার্থ তাঁর মনে নেই।’

সুভাষের আত্মদর্শন তথা জীবনদর্শন বিম্বিত হয়েছে ‘আজ আছি কাল নেই’ কবিতায়। এখানে টুকরো টুকরো ভাবে ধরা আছে কবির ব্যক্তি জীবন এবং উপলব্ধি। অনেক প্রতিকূলতা, আঘাত যন্ত্রণা অপমান, অনেক আশা ও আশাভঙ্গের কথা, ব্যথা-বেদনা, তিক্ত অভিজ্ঞতার ছবি এখানে আঁকা হয়েছে সহজ চেনা রঙে। দীর্ঘ কবিতার প্রথম দিকে কবি মুখোমুখি এক চিরন্তন জিজ্ঞাসার। যার উত্তর আজো অজানা। মানুষ এই পৃথিবীতে যথার্থই আসে, না যায়! তিনি গভীর বিস্ময়ে দেখেছেন ‘আসছি ব’লে/ স্বচ্ছন্দে চলে যাওয়া যায়।/ নাকি আমরা আদতে যাই না/ আসি/ নদী যেমন আসছি ব’লে/ নাচতে নাচতে/ মোহানায় ছুটে যায়।/ আবার বৃষ্টির জল হয়ে/ চক্রাকারে ফিরে আসে উৎসে/ তেমন কি? কী জানি।’ কবি তাই নির্মোহ কণ্ঠে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি/ আমার সামনে-/ শুধু আজ আছে, / কাল বলে কিছু নেই।’ এই কবিতায় নিজের ইচ্ছেটা কবি অপরূপ প্রসন্নতায় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন- ‘কখনও ভিড়াক্রান্ত শহরের রাস্তায়/ কখনও গ্রামগঞ্জের ধূধূ করা মাঠে।/ মাটির পাশে মাটি/ মুখের পাশে মুখ রেখে রেখে/ মনে মনে হিসেব করি/ কী করলে কী হয় /কী ক’রে ফোটাতে হয়/ বাগানে বাগানে ফুল/ আর মুখে মুখে হাসি/ লোভের আগাছাগুলোকে কেমন ক’রে/ উপরে ফেলতে হয়।/ আমি তাই যাই/ আমি তাই আসি।’ এই কবিতা সুভাষের জীবন অভিজ্ঞতার ছবি। পাশাপাশি জীবন ভাষ্যও। তাঁর অন্তরের কথা কবিতার ভাষায় এখানে আশ্চর্য প্রসন্ন। যথার্থই সুভাষিত। তাঁর জীবন বিশ্ব মানবের জন্য উৎসর্গীকৃত। তাই এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে পৃথিবীর বাগানে ফুল ফোটানো, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর নিরন্তর সাধনায় তিনি মগ্ন থাকতে চেয়েছেন।

তাঁর দীর্ঘ জীবনপথ শ্লোগান আর মননের মেলবন্ধনের ইতিহাস। মননের পরিবর্তনে কবিতার ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু শ্লোগান থেমে থাকেনি। তাঁর কবিতায় শ্লোগান কখনও রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত। আবার কখনও বিশ্বমানবতা, সৌভ্রাতৃত্বের বাণীতে অভিসিঞ্চিত। হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় সংযোগের বাণী উচ্চরণই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার যথার্থ অভিমুখ। সুভাষের কবিতায় বার বার ফিরে এসছে ছেলেবেলার ছবি। শুধু কবিতা কেন তাঁর গদ্য লেখাতেও ছেলেবেলা বর্ণময় স্মৃতিতে ধরা দেয়। নস্টালজিক অনুভবে পুরনো জায়গায়, ছেলেবেলায় দিনগুলোতে ফিরে যাবার জন্য তাঁর দুর্বার আকুলতা। হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা, যা তাঁর বুকের ভেতর অবিরাম ঢেউ তোলে, জীবনের শত সহ¯্র দুঃখ, যন্ত্রণা, অপমান, অভিমানের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বার বার উঠে আসে সান্ত¡নার আশ্রয় হয়ে, কবি তাকে দু’হাত বাড়িয়ে বুকের মধ্যে চান। বাঁধতে চান ¯েœহ ভালোবাসার বাঁধনে। পুরনো পৃথিবীর পথে হাঁটার তাঁর বড়ো সাধ। জীবনের প্রান্ত বেলায় সে সাধ আরও বেশি গভীর, আর বেশি প্রবল-দুর্বার। কবি বিশ্বাস করেন কোন কিছুই হারায় না। চোখের সামনে না থাকলেও তার অস্তিত্বে বেঁচে থাকে। শুধু জায়গা বদল হয়, চেহারা বদলায়।

সুভাষ ছেলেবেলার দিনগুলোতে ফিরে যেতে চান— ‘সাদা চুলে/ শেষবারের মতো একবার/ মিলিয়ে নিতে/ ছেলেবেলার ছবিগুলো’। (কে যায়)। কবির অনুভবে চোখের সামনে সব কিছুই আছে, শুধু বদল হয়েছে জায়গা। পরিবর্তিত হয়েছে চেহারা। হয়তো চেনা পুরনো বাড়ির সিঁড়িটা এখনও ছাদ ছুঁয়ে আছে। ‘যেখানে পায়রার খোপ,/ যেখানে তুলসির টব।’ ডাকতে গিয়েও পরিচিতদের দরজা থেকে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। কারণ পুরনো বন্ধুদের নাম এখন আর কিছুতেই মনে পড়ে না। সব কিছু পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কবির অভিজ্ঞতা— ‘ঘড়ি ঘড়ি বদলাচ্ছে হে দুনিয়া।’ তাঁর উপলব্ধি, পরিবর্তিত সময়ের আলো মাখা চোখে সব কিছু তিনি দেখছেন নতুন ভাবে। তিনি বুঝেছেন হারিয়ে যাওয়া অতীতের ছবি প্রখর বাস্তবের আলোতে পুরনো চেহারায় আর দেখা সম্ভব নয়। তাঁকে দেখা যাবে ‘নিষ্প্রদীপ নৈঃশব্দ্যে।’ স্মৃতির বর্ণময় প্রদীপ জ্বেলে। স্থির বিশ্বাসে তিনি বলেছেন- ‘একটু আগে এলে এক নিষ্প্রদীপ নৈঃশব্দ্যে আমি দেখতে পেতাম/মাথার ওপর অনন্তনীলচক্র/ কান পাতলে শুনতে পেতাম/ উৎসে ফিরে যাবার/ ছলাৎছল শব্দ।’ নস্টালজিক কবির চোখে নীল মায়াঞ্জন। তাই তিনি একপটে বলেন- ‘ফিরে পেতে চাই সেই বাল্যের বিস্ময়/ যে রোমাঞ্চ অন্ধকারে যেতে হাতে-ঝোলানো লণ্ঠনে”। (ছেলে গেছে বনে)। রোমান্টিক মননের এ এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ‘কে যায়’ কবিতায় গভীর ব্যথায় কবির অনুভব ছেলেবেলার স্বপ্নে পাখিটা উড়ে গেছে। পড়ে আছে ‘মরচে ধরা লতাপাতায়/ লোহার বাসরে / শূন্য খাঁচা।’ কবিতায় পাখি উড়ে যাবার কথা তিনবার উল্লেখিত হয়েছে। ‘পাখি উড়ে গেছে’, উড়ে গেছে আলোর নীড় পাখিটা’ এবং ‘হায়, উড়ে গেছে নীল পাখিটা’। এর মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে কবির হারিয়ে যাওয়া অতীতের জন্য দীর্ঘশ্বাস। দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের দিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়াবার আবহমান কালের সংস্কারটাকে সম্ভবত কবি এখানে ধরতে চেয়েছেন। এবং রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকের নীলকণ্ঠ পাখির ঝরা পালকের বিষণœতা ছুঁতে চেয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর জন্য কবির বিষণœতা গভীর, অতলস্পর্শী। ‘যারে কাগজের নৌকো’য় একই বেদনার সুর— ‘রওনা হয়ে/ কাগজের নৌকো আর ফেরেনি/ বাড়ি মুখো/ ভেসে গিয়েছে/ আমার সৃষ্টি/ চোখের কোণে/ নামিয়ে বৃষ্টি।’ রাজনীতির অনেক রং সুভাষ দেখেছেন। দেখেছেন অনেক ওঠা-পড়া, ভাঙা-গড়া, অবক্ষয়, লোভ-লালসা নীতিহীনতা। দেখেছেন মিথ্যা প্রলোভনে বিভ্রান্ত, পথ হারানো নতুন প্রজন্মের হতাশা আর অবক্ষয়। কৈশোর যৌবনের ভয়াবহ অপচয়। তিনি দেখেছেন, সামনের পথ এখন রুদ্ধ। সে পথ ‘অন্ধ গলিতে এসে গেছে ঠেকে’। ‘মৃত্যুর সওদাগর’রা ‘পাখির পড়ার মত’ এখনও বুঝিয়ে চলেছে ‘খুনের বদলে খুন’, ‘হয় মারো নয় মরো’। যারা ‘শহীদের স্মৃতি রাখতে শহীদ হওয়া’র মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছে। ‘যারা শত্রুকে একঘরে না ক’রে/ বন্ধুকে শত্রু করেছে/ যারা সংগ্রামের সাথিদের/ আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়ে মৃত্যুর গুণগান গাইছে।’ এবং  ‘ঘড়ির কাঁটায়’ কবিতায় কবি বলেছেন’ ‘ঘড়ি কাঁটায় ছিন্নভিন্ন/ এক রক্তাক্ত সময়-‘এখন কোলাকুলির আড়ালে বাঘ নখ মুখিয়ে থাকে। কথার আড়ালে ‘হিস্ হিস্’ করে চোখটাটানো হিংসে। সলতে জ্বালানো বিস্ফোরণের ভয়ে শঙ্কিত থাকতে হয় প্রতিক্ষণ। প্রতিবাদী কবির দৃঢ় সংকল্প— ‘তার বিষদাঁত না ভেঙে/ আমার মুক্তি নেই।’ সেই শয়তান চক্রটাকে খুঁজে বের করার জন্য কবি দৃপ্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন। ‘কাঁধের গামছা কোমরে বেঁধে/ শ্মশান থেকে উঠে এসো/ ভালবাসায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে/ জীবনটাকে ধরো/যৌবনের ফেরাই দিয়ে/ হারিয়ে-যাওয়া নতুন বন্ধুরা আমার/ সমানে জিতে নাও সৃষ্টির পিঠ/ যাবার আগে যেন দেখে যাই/ মেঘভাঙা রামধনু/ ঢেলে সাজা পৃথিবীর বুকে/ যেন শুনতে পাই ভোরবেলার আজান’। (ফেরাই)। তিনি আরও বলেছেন-‘হেকে বলুক সবাই/ মানুষ আমার ভাই। বন্ধ করো ভ্রাতৃযুদ্ধ/ যেন কেউ মানুষ মারে না-/ ঘরে না, বাইরে না।’ (ঘরে না, বাইরে না) স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর অস্থিরতা বুকে নিয়েও অবিরাম খুঁজেছেন নতুন স্বপ্ন। নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাস, অবিচল আস্থা। ধ্বংসের পর নতুন পৃথিবীরতারাই যথার্থ ঋত্বিক। দুঃখ পরাজয় হতাশার সব বিষ আকণ্ঠ পান করে সুভাষ অপরাজেয় নীলকণ্ঠ।

অন্যের ভালোর জন্যই তাঁর আজীবন সাধনা-তপস্যা।

‘জল সইতে’ কবিতায় গভীর প্রত্যয়ে কবি বলেন-‘আমার বুকে-বেঁধানো সমস্ত কাটায়/ আমি গুঁজে দিয়েছি/ একটি ক’রে ফুল-তোমরা হাসো/… আমার বুক-ভাসানো সমস্ত কান্নায়/ আমি জুড়ে দিয়েছি একটি ক’রে সুর-/ তোমরা হাসো গো/আনন্দ করো।’ তাঁর কোনো প্রাপ্তির কামনাই নিজের জন্য নয়। সবার জন্য। তিনি বলেন- ‘সব-পেয়েছির নয়/ সবাই পেয়েছির দেশ গো’। এই দেশই তাঁর কাম্য। তিনি নিশ্চিত জানেন ‘দুনিয়া ছিল কাল যেখানে,/ আজ আর-/সেখানে নেই…/ সামনেই/ ভেসে যাচ্ছে রক্তে জমাট/ নিষ্ঠুরতার জবরদস্ত স্মৃতি।/ খুলে যাচ্ছে দরজা জানালা/ বন্ধ কপাট/ সবার জন্যে শুভেচ্ছা-সম্প্রীতি।/ .. বদলে যাচ্ছে দিন। জানে না সে, এক নদীতে দুবার/ দেওয়া যায় না ডুব।’ (বদলাচ্ছে দিন)।

কবি তাঁর বিশ্বাস, ভালোবাসা আর উত্তরাধিকারের পতাকা তুলে দিতে চেয়েছেন নতুন প্রজন্মের হাতে। ‘ছেলে গেছে বনে’ কবিতায় তারই প্রস্তাবনা— ‘ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে/ ছেলে গেছে বনে।/ অথচ তারই হাতে দেখেছি মুক্তপাখা/ যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত/ আমারই পতাকা।’ এবং ‘উড়ো চিঠি’ কবিতায় কবি সুভাষের কণ্ঠে বিশ্বাসের অমৃত উচ্চারণ—- ‘সে রয়েছি কালবোশেখি/ ঝড়ের আশায়/ ভালোবাসা বাড়াচ্ছে হাত/ নীলকণ্ঠ পাখির বাসায়।’

*************************************************

 

 

ঊনিশ শতকে বাংলায় ইংরেজি শিক্ষা : সমকালীন প্রতিক্রিয়া
মহীবুল আজিজ

ঊনিশ শতকে উপনিবেশিত বাংলায় কোন রাজনীতি ছিল না একথা ভাবা ঠিক নয়। সবচেয়ে বড় রাজনীতি ছিল স্বার্থের রাজনীতি। সেই শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশরা বাংলায় প্রথমে যে পরীক্ষামূলক স্কুলগুলো চালু করে সেগুলোর অন্তিম উদ্দেশ্য ছিল ধর্মান্তর— জোর প্রয়োগে নয়, তাদের ধারণা ছিল, একবার ইংরেজি শিখলে স্থানীয়রা বিদেশিদের ধর্মকেও আস্তে-আস্তে গ্রহণ করতে শুরু করবে। তাদের সে আশা অবশ্য পূরণ হয় না। কিন্তু একটা নতুন দরজা ঠিকই খুলে যায়— ইংরেজির দরজা।

রাজা রামমোহন রায় ছিলেন ব্রাহ্ম। স্থানীয়রা ইংরেজি শিখলে তাঁর কী লাভ! অথচ তিনি সেই ওকালতিই করেন সেই ১৮২৩ সালে। ভারতবর্ষ থেকে পত্র লেখেন ইংল্যান্ডের প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রেভারেন্ড উইলিয়ম এ্যাডামকে। সেই চিঠিতে রামমোহন এ্যাডামকে ঔৎসুক্যের সঙ্গে জানান যে ব্রিটিশদের উচিৎ যত দ্রুত সম্ভব বাংলায় এবং ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষার বিকাশ ঘটানো। রেভারেন্ড এ্যাডাম যে রাজা রামমোহনের ডাকে সাড়া দেন তা-ই নয়, তৎকালীন গভর্নর উইলিয়ম বেন্টিংক পর্যন্ত এতে দারুণ উৎসাহে সাড়া দেন এবং কৃতজ্ঞ চিত্তে তাঁরা স্মরণ করেন রামমোহনকে। এর দুই বৎসর পরেই আমরা দেখবো বিলাতের পার্লামেন্টে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং ভারতীয়দের ব্যাপারে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে হাজির টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে।

রাজা রামমোহন রায় জানতেন, স্থানীয়রা যে-পরিমাণে ইংরেজি শিখবে ঠিক সে-পরিমাণে তারা খৃস্টধর্ম গ্রহণ করবে না। ১৭৫৭-১৮২৩ এই ছয় দশকাধিক কালের অভিজ্ঞতাই রামমোহনের ধারণার জন্যে যথেষ্ট ছিল। এসময়ের মধ্যে যে বাংলায় খুব উলে¬খযোগ্য সংখ্যক লোক খৃস্টধর্মে অন্তরিত হয়েছিল তা কিন্তু নয়। তবু কেন রামমোহন রায়ের এমন উৎসাহ! তাঁর ধারণা ছিল ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে স্থানীয় মানসে যে-পরিবর্তনের সংস্কৃতি বিকশিত হবে তার ফল দ্বারা উপকৃত হবে তাঁর প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্ম। ব্রাহ্মধর্ম ছিল সকল ধর্মের সমন্বয়ে এবং সব ধর্মের নির্যাসে গড়া এক নতুন ধর্ম যাকে গ্রহণ করবার জন্যে প্রয়োজন প্রচলবিরোধী ও যুক্তিবাদী মন। ইংরেজি শিক্ষার ফলে স্থানীয় মনে যে আলোর প্রক্ষেপণ সম্ভব বলে মনে করতেন রাজা রায় তার দ্বারা উপকৃত হতো ব্রাহ্মধর্ম-ই। এই অনুমানের পেছনে অন্য যুক্তিও আছে। ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরা ছিল কলকাতার শিক্ষিত ও রুচিশীল সনাতন বাঙ্গালিরাই মূলত। কাজেই শিক্ষা, বিশেষত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মন-মানস রুচি-আভিজাত্যের দিকেই উৎসাহী হবে এবং সেই রুচিবোধ হয়তো যাবে ব্রাহ্মধর্মেরই পক্ষে— এমন ভাবনা রাজা রামমোহনের মনে থাকাটা ছিল বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত।

এরপরের ইতিহাস আমাদের জানা। আনুষ্টানিকভাবে বিকাশ ঘটতে লগল ইংরেজি শিক্ষার। ফার্সি ভাষা বাতিল হয়ে গেল। শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির বিকাশ হয়ে উঠলো অবশ্যম্ভাবী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গিয়ে উঠলো ব্রিটিশ সরকারের হাতে। এরিমধ্যে শিক্ষার প্রচার-প্রসারের প্রশ্নে বেশ কিছু ঝগড়াঝাটিও হলো মিশনারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার শিক্ষার প্রশ্নে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিজেদের নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণাতেই অনড় থেকে যায়। ফলত শিক্ষা ক্রমশ শেকড় ছড়াতে থাকে। আর বাস্তবতা হলো, শিক্ষা হয়ে রইল শ্রেণিশিক্ষা-ই। জোতদার-মহাজনের সন্তানেরাই প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হলো ইংরেজি শিক্ষায়। কৃষিজীবী চাষাভুষোর সন্তানেরা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারলো না।

১৮৮৫ সালে (ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে) ব্রিটিশ শিক্ষা কমিশন স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তিত্বকে বেছে নেয় এবং তাঁদের সামনে শিক্ষাসম্পর্কিত একটি প্রশ্নাবলী উত্থাপন করা হয়। এতে সর্বমোট ৭০টি প্রশ্ন ছিল। প্রশ্নগুলোকে সারমর্ম করলে যা দাঁড়ায় তা এমন : ভারতে শিক্ষার প্রশ্নে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব মতামত। প্রাথমিক শিক্ষা স্থানীয়দের উন্নয়ন-সহায়ক কিনা। কারা উৎসাহী প্রাথমিক শিক্ষায়— জনসাধারণ না বিশেষ কোন শ্রেণি। সামগ্রিকভাবে, প্রচলিত শিক্ষার ভবিষ্যৎ। গৃহশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার  মধ্যে পার্থক্য। কারা এসব স্কুলে শিক্ষকতা করবার পক্ষে উপযোগী। বিদ্যালয়ে প্রচলিত শিক্ষাব্যয় সম্পর্কে মতামত। এরকম বহুমুখি প্রশ্ন। এছাড়া নারীশিক্ষার উৎসাহ, সম্ভাবনা ও উপায়। নারীশিক্ষার ব্যাপারে পাশ্চাত্য মহিলাদের উদ্যোগ এবং সে-উদ্যোগাদির ফল। শিক্ষিত লোক শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে কিনা। ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে জনমত। স্কুলগুলোকে অনুদানের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ব্যাপারে সরকারি ভূমিকার ধরন এবং যৌক্তিকতা ইত্যাদি।

পরবর্তীকালে এসব প্রশ্নের উত্তর সংবলিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় স্যার আলফ্রেড ক্রফট্-এর সম্পাদনায়। ১৮৮৮ সালে কলকাতা থেকে এটি প্রকাশ পায় ‘রিভ্যু অব এডুকেশন ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে। এতে উত্তরদাতাদের নির্বাচিত উত্তর ছাপা হয়। অবশ্য সবাই সব প্রশ্নের উত্তর দেন নি। এই প্রকাশনাটি ঐতিহাসিক কারণে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষে শিক্ষা-প্রসারে পাশ্চাত্য প্রশাসকের ভূমিকা ও তার প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয় মানসের মুদ্রিত প্রতিক্রিয়া সেটাই প্রথম। তাছাড়া এতে বাংলার সমাজ-প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন পদমর্যাদার ব্যক্তির শিক্ষা-সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনার পরিচয়ও মেলে। এই প্রশ্ন-উত্তর প্রক্রিয়াটি প্রশাসক এবং শাসিতদের মধ্যকার একটি যোগাযোগের সূত্রও বটে যে-যোগসূত্রটি একটি ঐতিহাসিককালের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে।

খান বাহাদুর নবাব আবদুল লতিফ মনে করেন যে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষানীতি পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষক সন্তানদের জন্যে উপকারী হয় নি। তিনি বলেন, প্রচলিত ধর্মনির্ভর মক্তবেও একেবারে নি¤œবিত্ত মানুষের শিক্ষার সুযোগ কম। নবাব আবদুল লতিফ সুপারিশ করেন যাতে সরকার নি¤œবিত্ত মুসলমান প্রজাদের জন্যে ভর্তুকির মাধ্যমে তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেন। এখানে উলে¬খ অপ্রাসঙ্গিক নয়, নবাব সাহেব গুরু পরিচালিত প্রচলিত পাঠশালাকেও মুসলমানদের জন্যে উপযোগী মনে করেন নি। কারণ, তাঁর দৃষ্টিতে, সেখানে মুসলমানদের হিন্দু-প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও তাঁর ধারণা, পাঠশালায় আরবি-ফার্সিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হলে মুসলমানদের শিক্ষার কাজে লাগবে সেটি। আরেকটি উলে¬খযোগ্য মূল্যায়ন নবাব আবদুল লতিফের দৃষ্টিতে ছিল— মুসলমানদের শিক্ষার উন্নতি ত্বরান্বিত হবে তখনই যখন একটি মুসলমান শিক্ষক-শ্রেণি দ্বারা মুসলমানদের শিক্ষা-কর্মকা- পরিচালিত হবে। কেননা, প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রভাব যথেষ্ট কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। নবাব আবদুল লতিফ স্পষ্টই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতায় হতাশা ব্যক্ত করেন। এর কারণও চিহ্নিত করেন তিনি। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি মূলত কলকাতায় অবস্থিত। সেখানে থাকা-খাওয়ার খরচ এবং শিক্ষার খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে তাদের পক্ষে কুলিয়ে ওঠা মুশকিল। এমনকি হাজি মুহম্মদ মহসিন ফান্ডের অনুদানের অর্থও তাদের সম্পূর্ণ ব্যয় নির্বাহে সম্ভবপর হয় না। শেষ পর্যন্ত শিক্ষা গিয়ে ঠেকে সমাজের সম্পন্ন মানুষদের নিকটেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার প্রশ্নে খান বাহাদুর আবদুল লতিফ মনে করেন, সমাজের নিঃস্ব-দরিদ্র মানুষের শিক্ষায় বাংলার দাবি অধিক। যারা খানিকটা মধ্যম শ্রেণির তাদের জন্যে উর্দু অধিকতর প্রাসঙ্গিক। নবাব সাহেবের ধারণা, ঐ শ্রেণির লোকেদের পূর্বপুরুষেরা আরব-পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত বলে উর্দু তাদের পক্ষে মানানসই।

ব্যারিস্টার আমির আলীর মতে, ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে বাংলা ও বিহারের মুসলমানেরা পিছিয়ে যদিও বিদ্যায় উৎসাহী লোকের অভাব সেখানে নেই। আমির আলী বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মসজিদসংলগ্ন মক্তবের ওপর। তাঁর মতে নি¤œশ্রেণির লোকদের শিক্ষার জন্যে মক্তবগুলোকে আরও উপযোগী করে তোলা যায়। আমির আলীর ধারণা ছিল প্রচলিত মক্তবভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার দ্বারাই মুসলমানদের শিক্ষার একটা পর্যায় অতিক্রমণ সম্ভব। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মক্তবের ভূমিকাকে তিনি অপ্রতুল বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে সরকারের সুদূরপ্রসারী কর্মসূচীর ওপর তিনি জোর দেন। শিক্ষাবিভাগে অধিকসংখ্যক শিক্ষিত মুসলমান জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও মতামত দেন আমির আলী।

শিক্ষা সম্পর্কিত প্রতিবেদনটিতে প্রকাশিত রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ বিশে¬ষণ করা যাক। প্রথমত তিনি একজন ধর্মান্তরিত দেশীয় খৃস্টান। দ্বিতীয়ত, খৃস্টান হলেও তিনি মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার ওপর জোর দিতেন সর্বদাই। তিনি বাংলা ভাষায় পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং বাইবেলের নির্বাচিত অংশের বঙ্গানুবাদ করেন। নিজের দেশের মানুষের হিতসাধনের চিন্তায় এতই মগ্ন ছিলেন তিনি, ব্রিটিশ প্রদত্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা-উদ্যোগ এবং আয়োজনের সমর্থক ছিলেন। ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাধ্যয়নের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খানিকটা ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি একজন বিশ্বাসী খৃস্টান ছিলেন। কাজেই শিক্ষায়তনে খৃস্টধর্মের সচেতন রীতিনীতি পালনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন এক অর্থে রক্ষণশীল। এ-প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য থেকে উদ্ধৃতি— ‘পদার্থবিজ্ঞানের উদাহরণই ধরুন। আজকের দিনে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি যদি ফ্রেডেরিক লাফোঁ’র মত অধ্যাপকের কথা বলেন তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যদি সেসব অজ্ঞাত অধ্যাপকদের কথা বলেন যারা ঈশ্বরকে অবহেলা করেন, যাদের ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই কিংবা পৃথিবীর কোন সৃষ্টিকর্তারই প্রয়োজন নেই এবং বিশ্বের সূত্রসমূহ বোঝাবার জন্যে যারা কোন অলৌকিকতাকেই মেনে নেন না, আমাকে বলতে হচ্ছে তাদের দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’ কৃষ্ণমোহনের মন্তব্য থেকে এটা বুঝতে পারা যাবে যে তখনকার শিক্ষায়তনে ধর্মবিশ্বাসী এবং ধর্ম বিষয়ে উদাসীন এই দুই ধরনের শিক্ষকেরাই কর্মরত ছিলেন। অধ্যাপক লাফোঁ ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। শিক্ষা-কমিশন থেকে কৃষ্ণমোহনকে এমন প্রশ্নও করা হয়, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষকেরাই মূলত ধর্মচর্চা-সম্পর্কিত প্রতিকূলতার হেতু কিনা। কৃষ্ণমোহনের জবাব, সরকারের উচিৎ যেসব শিক্ষক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হবেন তাদের ঈশ্বর বিশ্বাসের ব্যাপারে একটা পরীক্ষা নেওয়া যেখানে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় তাঁদের একেশ্বরে বিশ্বাসের কথা স্বীকার করেন।

কলকাতার হেয়ার স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বাবু ভোলানাথ পালের দৃষ্টিভঙ্গি বিচার্য। কলকাতা, ঢাকা, বহরমপুর, রানাঘাট ইত্যাদি নানা স্থানে প্রায় পঁচিশ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভোলানাথ পাল শিক্ষাসম্পর্কিত যে-মূল্যায়ন করেন তাকে তাঁর শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাজাত বলে মেনে নিতে হয়। তাঁর মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয়নির্বাহ অভিভাবকদের পক্ষে প্রায়শ দুর্বহ। তাছাড়া স্কুলে প্রচলিত ‘টেক্সট’-বইয়ের ব্যাপারে সরকারকে আরও সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। যেমন, কোন-কোন পাঠ্যবইয়ের প্রণেতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁদের রচনা স্কুলছাত্রদের পক্ষে সহজপাচ্য নয়। ভোলানাথ পালের সাক্ষ্য থেকে দেখা যায়, হেয়ার স্কুল এবং হিন্দু স্কুলের ছাত্ররা সমাজের উচ্চ ও মধ্যশ্রেণির। কাজেই তাদের শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষকদের বাড়তি সচেতনতার প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি ঐ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের উন্মুক্ত রাস্তায় নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ও মারপিটে লিপ্ত হওয়ার মত ঘটনার বিবরণ দেন। তবে, পরবর্তীকালে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এবং শিক্ষাদানে সরকারি সচেতনতার ফলে এসব ঘটনা আর ঘটে না বলে তিনি জানান।

ঊনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষা প্রসঙ্গে সমকালীন প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বও বিবেচ্য। স্থানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সরকারি কর্মচারি এবং অন্যান্যর মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রতিক্রিয়া স্ব-স্ব শ্রেণি-অবস্থানের মানদ-ে বিচার্য। পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত একজন মিশনারি শিক্ষকের প্রতিক্রিয়ায় উদ্ঘাটিত হয় উৎসাহব্যঞ্জক তথ্য। মিস গুড ছিলেন চার্চ অব ইংল্যান্ড-এর জেনানা মিশনারি সোসাইটির পরিচালনায় ব্যারাকপুরে কর্মরত একজন সুপারিন্টেন্ডেন্ট। তাঁর সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে তিনি কলকাতা শহরে ৮টি এবং গ্রামাঞ্চলে ৮০টি স্কুলের তত্ত্বাবধায়ক। এসব স্কুল শুধুমাত্র মেয়েদের জন্যে। মিস গুডের মূল্যায়ন থেকে দেখা যাচ্ছে যে না-সরকারি না-ব্যক্তিগত উদ্যোাগ কিছুই বস্তুত নারীশিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। সরকারি বলতে একমাত্র বেথুন স্কুল— বাকি সবটাই মিশনারি তৎপরতানির্ভর। মিস গুড-এর প্রস্তাব, একমাত্র সহশিক্ষাই হতে পারে শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের একটি প্রয়োজনীয় পদ্ধতি। এটি খুব কৌতূহলোদ্দীপক, এতকাল আগে মিস গুড বলছেন যে মেয়েরা ছেলেদের স্কুলে পড়লে সমস্যা নেই। তবে এই সহশিক্ষাকে তিনি কেবলমাত্র প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখবার পক্ষপাতী। বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের শিক্ষাদানে কেবলমাত্র খৃস্টান শিক্ষকদের উপস্থিতিতেও মিস গুডের নিরুৎসাহ। একই সঙ্গে শিক্ষাদানে সনাতন বিধবা নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তাদের শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে, স্ব-স্ব এলাকায় শিক্ষকতার মাধ্যমে একদিকে তারা হবে স্বাবলম্বী, অন্যদিকে শিক্ষার উদ্দেশ্যও হবে সাধিত। এক্ষেত্রে নিজের কর্মাভিজ্ঞতার কথা শোনান মিস গুড। তিনি নিজে দুজন বিধবাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁর বিদ্যালয়ে। মেয়েদের স্কুলে পুরুষ শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আপত্তি মিস গুডের। যেখানে নারী শিক্ষকের একান্ত অভাব কেবল সেখানেই পুরুষ শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব করেন তিনি। এখানে উলে¬খ  অপ্রাসঙ্গিক  নয়, শিক্ষাদানের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের শিক্ষকদের তিনি স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানার ওপর বিশেষ জোর দেন। এমনকি প্রয়োজনে তাদেরকে স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষাও শিখতে বলেন। মিস গুড জানান, শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্বয়ং বিহারি, মৈথিলি এসব ভাষা শিখেছেন এবং চর্চা করেছেন। তাঁর সেই গবেষণা ও চর্চার ফল মৈথিলি ও বিহারি ব্যাকরণ ও শব্দকোষ পরবর্তীতে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়। মিস গুড এ-ও বলেন যে, শিক্ষার প্রয়োজনে আঞ্চলিক ভাষায়ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা যেতে পারে। বিহারের তিনটি প্রধান উপভাষা— ভোজপুরি, মৈথিলি (বা তিরহুতি) এবং মাগধী। তিনটিকেই শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভাষিক বাহন বলে মত দেন তিনি। কেননা, তিনটিতেই ভাষাভাষী প্রচুর।

রায়বাহাদুর কৃষ্টদাস পাল সি. আই. ই. ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হিসেবে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সংশি¬ষ্টতা এবং নানামুখী কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা ট্রেনিং স্কুলের (পরবর্তীকালে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন) তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। এছাড়া শিক্ষা সম্পর্কিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকা-ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্রের মতন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। ১৮৭৭ সালে গঠিত টেক্সট বুক কমিটি’র (সভাপতি স্যার এডওয়ার্ড ক্লাইভ বেইলি) অন্যতম সদস্য ছিলেন কৃষ্টদাস পাল। তাঁর মতে বাংলা অঞ্চলের শিক্ষা মূলত প্রচলিত গুরুমহাশয় পদ্ধতি ও ব্রিটিশ পদ্ধতির সংমিশ্রণ। তাঁর দৃষ্টিতে, প্রচলিত পদ্ধতি ছিল বাস্তবিক এবং যার প্রায়োগিক-ব্যবহারিক মূল্য ছিল। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি জ্ঞানমূলক হলেও এর ব্যবহারিক দিকগুলো তত বাস্তবসম্মত নয়। বাংলা অঞ্চলে শিক্ষাক্ষেত্রে নিযোজিত সংস্থাগুলোর শ্রেণিকরণ করেন কৃষ্টদাস পাল। তাঁর মতে, চার ধরনের তৎপরতা বাংলায় ইংরেজি বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিয়োজিত— (ক) জোতদার, জমিদার, শিকদার, তালুকদার প্রভৃতি জমির মালিকশ্রেণি দ্বারা পরিচালিত পাঠশালা, (খ) শিক্ষিত বাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত গ্রাম্য বিদ্যালয়, (গ) ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং গ্রামবাসীদের সহায়তায় পরিচালিত বিদ্যালয় এবং (ঘ) মিশনারি সংস্থাসমূহ পরিচালিত শিক্ষায়তন। কাজেই সমগ্র বাংলায় সম্পূর্ণ এক ধরনের পরিবর্তে বিচিত্র শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলিত। স্থানীয় শিক্ষিত যুবকেরা পরীক্ষায় পাশ করে চাকরি পায় কিনা সে-প্রশ্নে কৃষ্টদাস পাল জানান, চাকরি তারা হয়তো পাচ্ছে কিন্তু চাকরির ক্ষেত্র সীমিত। তাদের জন্যে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে প্রযুক্তিগত বিদ্যার বেশি প্রয়োজন, কেননা, সমাজে-জীবনে কৃৎপ্রকৌশল ও প্রযুক্তির চাহিদা অধিক। রেভারেন্ড ই. লাফোঁ এস. জে. সি. আই. ই.’র মতামত এজন্যে গুরুত্বপূর্ণ যে তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও বিজ্ঞানশিক্ষায় ধর্মবিশ্বাসকে সংলগ্ন রাখবার পক্ষে। তখনকার কলকাতায় যেসব বিজ্ঞান-শিক্ষক ধর্মবিষয়ে নিরুৎসাহী ছিলেন লাফোঁ’র সঙ্গে তাদের সদ্ভাব ছিল না এবং সুযোগ পেলে তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেন। ১৮৬৯ সালে লাফোঁ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। ১৮৭১ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন একই কলেজের রেক্টর। ১৮৭৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮৭৫ সালে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর কালটিভেশন অব সায়েন্স-এর তিনি সহ-সভাপতি ও প্রভাষক নিযুক্ত হন। তাঁর দৃষ্টিতে, সমাজের সর্বস্তরেই শিক্ষার প্রতি উৎসাহ ক্রমবর্ধমান। তবে যারা অতি নিঃস্ব তাদের মধ্যে শিক্ষাগ্রহ জিঁইয়ে রাখা মুশকিল। কারণ তাদের নিকটে শিক্ষার চাইতেও শ্রম অনেক গুরুত্বপূর্ণ। লাফোঁ শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের সংশি¬ষ্টতা ও ভূমিকাকে সমাজের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকনিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করেন লাফোঁ। গ্রামবাসীরা স্ব-স্ব পছন্দমত বাছাই করে নেয় নিয়োগ দেয় শিক্ষকদের। লাফোঁ শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সম্মানজনক বেতনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিবিধার্থ সংগ্রহ-খ্যাত রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র বাহাদুর এল. এল. ডি., সি. আই. ই. ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির কর্মকর্তা। ইংরেজি, বাংলা, ল্যাটিন, গ্রিক, ফার্সি, হিন্দি, ওড়িয়া ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। তাঁর ভারতীয় আর্য গ্রন্থে মেলে তাঁর পা-িত্যের ছাপ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘকালীন ফেলো রাজেন্দ্রলাল কেন্দ্রীয় টেক্সট বুক কমিটি’র সভাপতি ছিলেন। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে তাত্ত্বিকভাবে উপযোগী বললেও এর মধ্যে সৃজনশীলতার অনুপস্থিতি লক্ষ করেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় সংশি¬ষ্ট মানুষদের ওপর সরকারের আস্থা পোষণ করা এবং তাদেরকে আরও স্বাধীনতা দেওয়া উচিৎ। এছাড়া বাংলা অঞ্চলের প্রচুর সংখ্যক নি¤œবর্গ এবং আদিবাসীদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থাকাটাকে তিনি বিশেষভাবে চিহ্নিত  করেন। এ-অবস্থা  বিদ্যমান  থাকলে  তাদের জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ। সমাজের আর্থিক শ্রেণিবিভক্তি যে শিক্ষার ক্ষেত্রেও মানদন্ড হিসেবে সক্রিয় সে-বিষয়ে তিনি সচেতনতার ইঙ্গিত দেন। বাংলা অঞ্চলে বসবাসকারী মেথর, চাঁড়াল, বাগদি প্রভৃতি নি¤œজীবী মানুষদের দৃষ্টান্ত প্রসঙ্গত তুলে ধরেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র।

ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব এবং এর পরিণতি বিষয়ে সমাজে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইংরেজি শিক্ষার ইতিবাচক দিককেই তুলে ধরা হয়। ইংরেজি শিখলে চাকুরির সুযোগের সম্ভাবনা ছিল। একই সঙ্গে থাকে শিক্ষকতার পেশায় দেশীয়দের নিযুক্তির প্রত্যাশাও। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের ধর্মীয় নিরপেক্ষতার দিকটিও সাধারণ্যে প্রশংসিত হয়। যদিও রক্ষণশীল এবং ধর্মচেতন ব্যক্তিরা মিশনারি শিক্ষার ঈশ্বর ও বাইবেলকেন্দ্রিকতায় অধিক আস্থাবান ছিলেন। প্রায় সব সচেতন মানুষই শিক্ষায় নারীর পশ্চাদপদতাকে একটি জরুরি ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত করেন। আমরা জানি ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তিত শিক্ষাভাষ্যে শিক্ষাবিস্তারে সরকারের এবং মিশনারিদের সংশি¬ষ্টতার ওপর যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮৮৩ সালের শিক্ষাভাষ্যে আরও অধিক সংখ্যক ব্যক্তি-উদ্যোগী এবং বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। বস্তুত ঊনিশ শতকের শেষ দিকে একদিকে বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক শ্রেণিরূপে বিকশিত হতে শুরু করে। বাঙালি জোতদার-মহাজন শ্রেণিটিও ক্রমশ প্রভূত পরিমাণে বিত্তবান হয়ে ওঠে। তারা যে কেবল জমি ও ব্যবসার মালিক তা নয় তারা এসময়ে বেশ কয়েকটি পত্র-পত্রিকারও মালিক। তাদের উদ্যোগে ব্রিটিশ মালিকানাধীন সংবাদপত্রের সমান্তরালে স্থানীয় মালিকানাধীন একটি সংবাদপত্র-গোষ্ঠির উদ্ভব সম্ভব হয়।

বঙ্গভঙ্গ-আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন শ্রেণির মুখপত্র পত্র-পত্রিকার পারস্পরিক দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির ইতিহাস আমাদের জানা। একদিকে কলকাতায় বসবাসকারী ব্রিটিশদের স্বার্থসংরক্ষণকারী পত্রিকা ইংলিশম্যান স্টেটসম্যান ডেইলি নিউজ প্রভৃতি পত্রিকা। অন্যদিকে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি সম্পাদিত বাঙালিদের স্বার্থসচেতন পত্রিকা বেঙ্গলি। উভয় পত্রিকাই নিজ-নিজ গোষ্ঠির স্বার্থে নিজেদের যুক্তির সপক্ষে প্রচারণা চালায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিষয়ে লর্ড কার্জন প্রশাসনকে প্রচ- আলোড়নের সম্মুখীন করেছিল সুরেন্দ্রনাথের বেঙ্গলি পত্রিকা।

কাজেই বলা যায়, ইংরেজি শিক্ষা ব্রিটিশ প্রবর্তনার ফল হলেও এর বিকাশে এবং প্রাতিষ্ঠানিকতায় শেষ পর্যন্ত আর একরৈখিকতা বজায় থাকে নি। বিচিত্র ও বহুবাচনিক মতের অনুসারীরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক গোষ্ঠির জন্ম দেন। সমকালীন পত্র-পত্রিকা তাদের সেই মতবিভিন্নতার অব্যবহিত প্রতিফলন। পরবর্তীকালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলন হয়ে লাহোর-প্রস্তাব এবং দেশবিভাগ তারই ফলিত রূপ। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষাভাষ্যের সমকালীন ব্রিটিশ শিক্ষাকমিশনের এই শিক্ষা-প্রতিবেদনে ১৯০৫-১৯৪৭ কালপরিধির শিক্ষা-অবস্থার তাত্ত্বিক বা আদি অবস্থানটির একটি অবভাস মিলবে। সেদিক থেকে এই প্রতিবেদনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানসাধিত হলেও একে সমকালীন বিদ্বৎমনসের একটি প্রায়োগিক প্রতিরূপ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

*************************************************

 

জন্মাষ্টমীর দিনে
অরুণ কুমার বসাক

খ্রিস্ট ধর্মের ‘ট্রিনিটি’ মতবাদ অনুসারে, God the father, the Creator; God the son (Jesus Christ, the Saviour) and God the Holy Spirit (Resurrected Jesus, the Sanctifier) – God in three forms। হিন্দু ধর্মেরও ‘ত্রিমুর্ত্তি’ মতবাদে, ঈশ্বরের তিনটি স্বরূপ : ব্রহ্মা (¯্রষ্টা), বিষ্ণু (রক্ষাকারী) এবং শিব (সংহারকারী)। তবে নৃতত্ত্ববিদদের মতে ব্রহ্মা আর্যদের ঈশ্বর, শিব দ্রাবিড়দের ঈশ্বর এবং বিষ্ণু ভারতবর্ষে আর্য ও অনার্যদের ‘আপষমূলক ঈশ্বর’। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন সোয়া পাঁচ হাজার বছর পূর্বে (৫২২০ বছর পূর্বে) : ‘যখনই ধর্মে গ্লানি এবং অধর্ম বিরাজমান হয়, তখনই আমি প্রকাশ করি। ধর্মকে রক্ষা করতে ও দুষ্টদের দমন করতে শ্রীবিষ্ণু যুগে যুগে অবতীর্ণ হন।’ অধর্ম বিরাজমান হলে তার লক্ষণ সম্পর্কে হয়রত আলী (রা) ১২৫০ বছর আগে বলেছিলেন, ‘যখন দেখবে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে, মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে এবং জ্ঞানীরা দেশে ছেড়ে পালাচ্ছে।’

আজ আমরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিবস পালন করছি। শ্রীকৃষ্ণের জীবন-আলেখ্য সম্পর্কিত ইতিহাস পুরাণ এবং মহাভারত-ভিত্তিক। মূল ঘটনা বোধ করি একই, পরিবেশনায় পার্থক্য আছে। মহাভারত বৈশ্বিকভাবে এক সাফল্যজনক মহাকাব্য, রচনার আকারে নয়, ঘটনাসমূহ মহাকালজয়ী। মহাভারত সম্পর্কিত ভাল আলোচনা রয়েছে প্রফেসর শহীদ ইকবাল সম্পাদিত ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র ‘চিহ্ন’র ৩৪তম প্রকাশে। এতে কথাসাহিত্যিক প্রফেসর হাসান আজিজুল হক, রবীন্দ্রগবেষক প্রফেসর সনৎকুমার সাহাসহ বিদগ্ধ প-িতদের আলোচনা আছে। তাঁরা কাব্যিক ছাড়াও আমাদের বর্তমান সামাজিক, ঐতিহাসিক, প্রতœতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে মহাভারতের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে বলব, পূজা-পার্বনের উদ্দেশ্য বহুমুখী এবং দর্শন, ধর্ম ও সাহিত্যের হাত ধরে বিজ্ঞান জন্মলাভ করেছে।

শ্রীকৃষ্ণ শ্রীবিষ্ণুর ৮ম অবতাররূপে ‘দ্বাপরযুগ’র শেষে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। তখনকার সময়ে যদু বংশের সব রাজা ও রাণীরা দেবতাদের ঔরসজাত ছিলেন। এসব রাজা-রাণী প্রজা-হিতকর কাজ করতেন। আর অসুরদের কাজ ছিল ছলে-বলে-কৌশলে দেবতা-গুণশূন্য প্রজন্ম সৃষ্টি করা। শ্রীকৃষ্ণের মা দেবকীর পিতা উগ্রসেন এবং মা পদ্মাবতী। দেবকীর বৈপিতৃক ভাই কংস ধ্রুমিলা অসুরজাত সন্তান। ধ্রুমিলা অসুর কংসের পিতা উগ্রসেনের ছদ্মবেশে এসে পদ্মাবতীর গর্ভে কংসের জন্ম দেয়। কংস তাঁর শ্বশুর মগধের রাজা জরাসন্ধের সহায়তায় পিতা উগ্রসেন ও মাতা পদ্মাবতীকে কারাগারে নিক্ষেপ করে মথুরার রাজা হন।

শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেব যাদব রাজা সুরসেনার পুত্র। বসুদেবের সঙ্গে দেবকীর বিবাহের পর পরই শ্রীকৃষ্ণের মামা কংস দৈববাণীতে জানতে পারেন যে, দেবকীর ৮ম সন্তান তাঁকে নিধন করবে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজা কংস তখন বসুদেব ও দেবকীকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কংস দেবকীর প্রথম ৬টা সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। ৭ম সন্তান দেবকীর গর্ভস্রাব হয়ে অলৌকিকভাবে সতীন রাণী রোহিনীর গর্ভে সঞ্চারিত হয়। এর ফলে রোহিনী বলরামের জৈবিক (নরড়ষড়মরপধষ) মা না হয়ে শুধুমাত্র গর্ভধারিণী (ংঁৎৎড়মধঃব) মা হয়েছিলেন [বর্তমান যুগে এটা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে]। শ্রীকৃষ্ণ খ্রি.পূ. ৩২২৮ অব্দে মথুরার কারাগারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জন্মের সময় অলৌকিকভাবে প্রহরীরা ঘুমিয়ে গেল, বাসুদেব শৃঙ্খলমুক্ত হলেন, কারাগারের তালা খুলে গেল, দৈববাণী অনুসারে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে বাসুদেব সদ্যজাত শ্রীকৃষ্ণকে গোকুলে নন্দ রাজা ও রাণী যশোদার একই সময়ে জাত বালিকা শিশুর সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ এর সঙ্গে বদলী করে আবার কারাগারে ফিরে আসেন। কথিত আছে যে, যমুনা নদীর জল সরে গিয়ে বাসুদেবকে পার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। মথুরার কারাগারে ফিরে আসার সাথে সাথে বাসুদেব আবার শৃঙ্খলিত হন, কারাগার তালাবদ্ধ হয়, প্রহরীরা জেগে রাজা কংসকে খবর দেয়। কংস হত্যা করার আগেই শিশুটি মহামায়ার রূপ নিয়ে আকাশে বিলীন হন এবং দৈববাণী করেন, ‘তোরে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’।

কংস এবার বিভিন্ন দানব ও অসুরদেরকে গোকুলে পাঠান শিশু শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য পাঠান। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সবাইকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এদের মধ্যে পূতনা রাক্ষসী ও তৃণাবর্ত অসুর বধ উল্লেখযোগ্য। গোকুলবাসী সবাই ভীত হলেন শ্রীকৃষ্ণের নিরাপত্তা নিয়ে। তাঁরা বুঝতে পারেন নি শ্রীকৃষ্ণই আসলে সবাইকে রক্ষা করছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরামকে নিয়ে বৃন্দাবনে চলে গেলেন। কথিত আছে, বৃন্দাবনে মহারাজা বৃষভানু ও তাঁর স্ত্রী খুব চিন্তিত ছিলেন যে কন্যা রাধারাণী বেশ কয়েকমাস বয়সেও চোখ খোলেন না এবং শব্দ করেন না। তাঁদের শঙ্কা রাধারাণী অন্ধ এবং বোবা। কিন্তু পালিত পিতামাতার সঙ্গে গিয়ে ১ বছরের শ্রীকৃষ্ণ হামাগুড়ি দিয়ে স্পর্শ করা মাত্র, রাধারাণী চোখ উন্মীলন করেন এবং আনন্দে শব্দ করেন। বৈষ্ণবদের এবং রাধাকৃষ্ণ উপাসকদের ধারণা শ্রীকৃষ্ণ যেমন শ্রীবিষ্ণুর অবতার রাধারাণী তেমন লক্ষীদেবীর মত শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গী। রাধাকৃষ্ণ সম্পর্ক বিশ্বে গবেষকদের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে গর্ভাবস্থার ও জন্মশেষে শিশু একই পরিবেশ না পেলে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর মনস্তাত্বিক রোগ দেখা দেয়। রাধারাণীকে তাঁর পালিত পিতামাতা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণের জীবন-কর্মকা- পাঁচটি প্রধান পর্বে ভাগ করা যায়। প্রতিটি পর্ব ‘লীলা’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। এগুলি নি¤œরূপ :

(ক)        বৃন্দাবন লীলা, (খ) মথুরা পর্ব (গ) দ্বারকা লীলা-১, (ঘ) মহাভারত লীলা এবং (ঙ) দ্বারকা লীলা-২।

(ক) বৃন্দাবন পর্বে সখা, রাধারাণীসহ গোপীদের সঙ্গে মধুর মিলামেশা এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর (ঢ়ুুঁষরহম) হল, একই সময়ে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন স্থানে সঙ্গ দেয়া। এটা এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

(খ) ১৬ বছর বয়সে বড়ভাই বলরাম সহ দলবল নিয়ে মথুরা গমন করেন। অত্যাচারী কংস অসুর ও দানবদের পাঠিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে মোকাবিলা করার বহু চেষ্টা করেন। কিন্তু সবাইকে হত্যা করে দুই ভাই রাজপ্রাসাদে গমন করেন। লক্ষ্য অনুযায়ী, কংসকে হত্যা করেন, কংসের পিতা উগ্রসেন ও মাতা পদ্মাবতীকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং উগ্রসেনকে পুণরায় মথুরার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। মগধের রাজা জরাসন্ধ জামাতার মৃত্যুতে শ্রীকৃষ্ণের উপর প্রচ- ক্ষিপ্ত হন। শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য তিনি ১৭ (সতের) বার মথুলা আক্রমণ করেন। কিন্তু বিফল হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। বারবার আক্রমণ প্রতিহত করতে মথুরার উন্নয়ন কর্মকা- ব্যাহত হচ্ছিল। মথুরাতে শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান জরাসন্ধকে আরও আক্রমণে প্রলুব্ধ করবে, এই আশঙ্কাতে শ্রীকৃষ্ণ মথুরা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

(গ) এরপর দাদু উগ্রসেন শ্রীকৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে তাঁর রাজ্য দ্বারকা পর্যন্ত বিস্তৃত ও উন্নয়নসহ প্রজাদের মঙ্গল সাধন করেন। এতে প্রজারা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর জ্ঞানে ভালবাসতে ও ভক্তি করতে শুরু করে। জনগণের ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম দ্বারকাতে অবস্থান করেন। কচ্ছ উপসাগরের শঙ্খোধন দ্বীপে দুই ভাই পরিবারসহ বসবাস করতেন এবং রাজ্য পরিচালনা করতেন।

(ঘ) শ্রীকৃষ্ণের মহাভারত পর্বে হস্তিনাপুরের রাজা ছিলেন ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুরের উপাখ্যান কুরু রাজবংশের দুই ভাই এর জ্যেষ্ঠ হয়েও অন্ধ হওয়ার কারণে ধৃতরাষ্ট্রের আগে ছোট ভাই পান্ডু প্রথম হস্তিনাপুরের রাজা হন। রাজা পা-ুর মৃত্যুর পর ধৃতরাষ্ট্র রাজা হন। পা-ুর প্রথম স্ত্রীর মাতৃত্বে ৩ পুত্র, যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রীর মাতৃতে ২ পুত্র, নকুল ও সহদেব, পঞ্চ-পা-ব নামে পরিচিত। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের এক শত পুত্র ও এক কন্যা। দুর্যোধন সহোদর ভ্রাতাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হলেও যুধিষ্ঠিরের বয়ঃকনিষ্ঠ। জ্যেষ্ঠতা, গুণাবলী ও শৌর্যবীর্যে শ্রেয় বিবেচনায় যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের যুবরাজ হবেন, এটাই ছিল সবার বিশ্বাস। কিন্তু দুর্যোধনের আকাশচুম্বী লোভ, তাঁর মামা শকুনির কুপরামর্শ এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রের উপর অতি¯েœহ হস্তিনাপুরের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের জন্ম দেয়, কৌরবদের নির্মম অত্যাচারের ইন্ধন জোগায় এবং পা-বদের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এর পরিণতি, যা কৌরবদের ধ্বংস এনে দেয়। যুধিষ্ঠির যাতে যুবরাজ না হতে পারে তজ্জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কৌবরগণ এগোতে থাকে :

(১)          প্রথমে দুর্যোধন পা-বদের বিপৈর্তৃক কুন্তীপুত্র (সম্পর্ক তখনও সবার কাছে অজ্ঞাত) কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজত্ব উপহার দিয়ে বশীভূত করেন।

(২)         প্রয়াগের কাছে বারণাবত নগরে পশুপতি উৎসবে অংশগ্রহণকারী পা-বদেরকে জতু ঘরে থাকতে দিয়ে তাঁদেরকে হত্যা করার জন্য রাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু পিতৃব্য বিদুরের সঙ্কেত পেয়ে পা-বরা সময়মত পালিয়ে যান এবং গভীর অরণ্যে ব্রাহ্মণ পরিচয়ে গা ঢাকা দেন। অজ্ঞাতবাসের সময় পা-বগণ ব্রহ্মচারীর বেশে পাঞ্চাল রাজ্যে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হন এবং ব্রাহ্মণদের মধ্যে উপবেশন করলেন। সময়মত দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যু¤œ, সভায় সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই ধনু, পাঁচটি বাণ, উপরে ছিদ্রসমন্বিত যন্ত্র এবং লক্ষ্যবস্তু। উচ্চকুলজাত বলবান ও রূপবান ব্যক্তি যিনি ধনুতে গুণ পরিয়ে বাণ সাহায্যে লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন, আমার ভগ্নি তাঁর ভার্যা হবেন’। রাজারা ধনু গুণ পড়াতে ব্যর্থ হলেন। কর্ণ চেষ্টা করতে গেলে বাধা আসল তাঁর কুল পরিচয়ে। তারপর ব্রাহ্মণদের মধ্য হতে ছদ্মবেশী অর্জুন লক্ষ্য ভেদ করে দৌপদীকে জয় করলেন। ঘটনাচক্রে মা কুন্তীর নির্দেশে শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে পঞ্চ-পা-বের সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহ হয়।

পাঞ্চালরাজ বহু উপঢৌকনসহ দ্রৌপদী ও পা-বদেরকে মহাসমারোহে ইন্দ্রপ্রস্থে পাঠিয়ে দেন। পা-বদের যশ-খ্যাতি বেড়ে যায়। দেবর্ষি নারদের মাধ্যমে পরিবেশিত পা-বদের স্বর্গীয় পিতার আদেশে যুধিষ্ঠির রাজসুয় যজ্ঞ আয়োজনে ব্রতী হন। রাজসুয় যজ্ঞে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বিধায় শ্রীকৃষ্ণ পরামর্শ দেন যে দুর্যোধনের বন্ধু মহাপরাক্রমশালী মগধরাজ জরাসন্ধকে হত্যা করা প্রয়োজন। জরাসন্ধ তখন মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য প্রজাবৎসল অনেক রাজাকে পশুবলী দেবার মনস্থ করছিলেন। ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য শ্রীকৃষ্ণ, ভীমসেন ও অর্জুন ব্রাহ্মণবেশে জরাসন্ধ সম্মুখে উপস্থিত হন। সফরের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে রাজা জরাসন্ধকে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘হয় বন্দী রাজাদের মুক্তি দাও, না হয় যমালয়ে যাও। তোমাকে যুদ্ধে আহ্বান করছি’। জরাসন্ধের পছন্দমত ভীমসেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে মগধরাজ নিহত হন। এর পর শ্রীকৃষ্ণ, জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকে মগধের রাজপদে অভিষিক্ত করেন, বন্দী রাজাদেরকে মুক্ত করেন এবং দ্বারকায় ফিরে যান। এরপর ভীমসেন, অর্জুন, নকুল ও সহদেব দিগ্বিজয় করে রাজসুয় যজ্ঞের প্রভূত অর্থ সংগ্রহ করেন। রাজসূয় যজ্ঞের প্রারম্ভে জরাসন্ধের মিত্র চেদিরাজ শিশুপাল উপস্থিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করার আহ্বান জানান। শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্রদ্বারা শিশুপালকে দ্বিখ-িত করেন। এরপর মহাসমারোহে রাজসূয় যজ্ঞ সমাপ্তির পর যুধিষ্ঠির ‘মহারাজ’-এর সম্মানে ভূষিত হলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কৃতজ্ঞতা ও সম্মানযোগ্য অর্ঘসহ শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে গেলেন।

(৩)         শকুনির মন্ত্রণায় দুর্যোধন এবার মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র্রের আমন্ত্রণ পাঠান যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরে পাশা খেলার আসরে। প্রত্যাখান করা অসম্মানজনক ও শত্রুতার সামিল। তাই রাজার আমন্ত্রণ রক্ষার্থে পঞ্চপা-র ও দ্রৌপদী হস্তিনাপুরে গেলেন। দুর্যোধনের পক্ষে দক্ষ পাশারু শকুনি খেললেন সরল যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে। খেলাতে যুধিষ্ঠির ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেবকে, নিজেকে এবং দ্রৌপদীকে পণ রেখে হেরেছেন। এর ফলে পা-বদেরকে রাজ্যসহ সমস্ত সম্পদ হারতে হয়েছে, কৌরবদের দাস হতে হয়েছে এবং উন্মুক্ত সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণসহ অপমান করা হয়েছে। দ্রৌপদীর প্রশ্ন ছিল, মহারাজ যুধিষ্ঠির আগে কাকে পণ রেখেছিলেন নিজেকে না দ্রৌপদীকে? এর অর্থ সবার বোধগম্য হয়েছিল মন্ত্রী বিদুরের সমালোচনাতে, মহারাজ যুধিষ্ঠির আগে বিজিত হলে তিনি দ্রৌপদীকে পণ রাখতে পারেন না। এর পর দ্রৌপদীর অপমান নিয়ে সভাতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশ করে পা-বদেরকে রাজ্য ও সমস্ত সম্পত্তিসহ মুক্ত করে দেন। [দৌপদী একজন অসাধারণ মহিলা।]

কিন্তু দুর্যোধন ও শকুনি কুমন্ত্রণাতে রাণী গান্ধারীর আপত্তি সত্ত্বেও মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র্র যুধিষ্ঠিরকে ২য় বার পাশা খেলাতে আমন্ত্রণ জানান। এবার পণের শর্ত অনুযায়ী পা-বদেরকে ১২ বছরের বনবাস এবং শেষের ১ বছর অজ্ঞাতবাসে যেতে হল।

পা-বদের ১২ বছরের বনবাসের পর ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাস শেষ হয় বিরাটরাজের রাজপ্রাসাদে। বিরাটরাজের অজ্ঞাতে পা-বগণ ও দ্রৌপদী সবাই তাঁদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন। কৌরবদের আক্রমণ থেকে বিরাট রাজ্যের সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। প্রকৃত পরিচয়ের পর বিরাটরাজের কন্যা উত্তরার সঙ্গে অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর বিবাহ হয়। এই অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম, দ্রুপদরাজসহ অনেক রাজা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই একমত যে পা-বদেরকে যথেষ্ট নিগৃহীত করা হয়েছে, এখন তাঁদের রাজ্য ফিরিয়ে দেয়া উচিত। নতুবা কৌরব-পা-ব যুদ্ধে পা-বদেরকে সহায়তা দিতে হবে সবার। এতে সমস্য হল, শ্রীবলরাম দুর্যোধনের গুরু হওয়াতে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর অপছন্দ। আপোষের জন্য বহু রকম আলোচনা চলল। দুর্যোধন শান্তির পক্ষে, কিন্তু পা-বদেরকে রাজ্য দিবেন না। অবশেষে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষ আলোচনার জন্য শান্তিদ্যূত হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরে গেলেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাব পা-বদেরকে ইন্দ্রপ্রস্থসহ পাঁচটি গ্রাম দিলেই তাঁরা যুদ্ধ করবেন না। দুর্যোধনের শেষ কথা ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী’। ধৃতরাষ্ট্র মৌনব্রত অবলম্বন করলেন। কর্ণের শক্তিতে ও শকুনির কুমন্ত্রণাতে দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে অপমান করার সাহস পর্যন্ত পেলেন। শ্রীকৃষ্ণ ঠা-া মাথায় তাঁর বিশ্বরূপ প্রদর্শন করাতে দুর্যোধন ভয় পেলেন। শ্রীকৃষ্ণের দ্যূতকর্ম ব্যর্থ হল। ফলাফল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। লোভ মানুষের গুণাবলীকে আছন্ন রাখে। এছাড়াও মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অতিরিক্ত অপত্য ¯েœহ, মাতুল শকুনির কুমন্ত্রণা ও বাধাবিহীন অসীম ক্ষমতা দুর্যোধনের পর্বতসম স্পর্ধা জাগিয়েছিল।

যুদ্ধে শ্রীবলরাম অংশগ্রহণ করেন নি। শ্রীকৃষ্ণও যুদ্ধ করেন নি, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন অর্জুনের সারথী হিসেবে। মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য প্রভৃতি কর্তব্যের টানে কুরুরাজের পক্ষে থাকলেন। ১৮দিন তুমুল যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের ১০০ পুত্রসহ ৩৯ লক্ষেরও বেশী যোদ্ধা নিহত হলেন। পঞ্চপা-বসহ এবং দুর্যোধনের বৈমাত্রেয় ভাই যুযুৎসুসহ মাত্র ১২ জন যোদ্ধা বেঁচেছিলেন। যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, কৌরবরা পরাজিত, সবাইকে হারিয়ে পা-বরাও হেরেছেন। যুদ্ধে আকাশ পথ এবং শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলি বর্তমানের যুদ্ধবিমান, ব্যালিসটিক ক্ষেপনাস্ত্র ও পছন্দমত লক্ষ্যবস্তু আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে জানি। আণবিক বোমার মত ব্রহ্মাস্ত্র তখনও ছিল। কিন্তু অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞানীরা এখনও অসমর্থ। সবার অনুরোধে যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের রাজাপালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাতে প্রত্যাবর্তনের ফিরে পূর্বে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে কুরুক্ষেত্রে নিয়ে গেলেন। চোখবাধা গান্ধারী দিব্যদৃষ্টিতে সব মৃতদেহ দর্শন করে মর্মান্তিক পরিস্থিতির জন্য শ্রীকৃষ্ণকে দায়ী করে, তাঁর নির্বংশ হওয়ার ও অপঘাতে মৃত্যুর অভিশাপ দিলেন। বিনয়ের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ এটা অবশ্যম্ভাবী বলে স্বীকার করলেন। এরপর সবার কাছে বিদায় নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার পথে রওনা হলেন।

যুধিষ্ঠির কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে পিতামাতার মত সেবাযতেœর ব্যবস্থা করেছিলেন। পা-বদের উপর সন্তুষ্টি নিয়েই ১৫ বছর পর ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী স্বেচ্ছায় গভীর বনে চলে গেলেন, সঙ্গে গেলেন মাতা কুন্তী ও পিতৃব্য বিদুর। বিদুর আগে স্বাভাবিকভাবে এবং পরে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তী দাবানলে স্বর্গবাসী হন।

(ঙ) দ্বারকালীলা-২

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দ্বারকাতে ফিরে শ্রীকৃষ্ণ গান্ধারীর অভিশাপের প্রারম্ভিক আলামত দেখতে পেলেন। যুদ্ধে যদুবংশের যোদ্ধাদের নিহত হওয়ার সংবাদে দ্বারকাতে শোকের ছায়া নেমে এল। শ্রীকৃষ্ণের অবর্তমানে দ্বারকাতে অবস্থানরত যাদব-সন্তানগণ আরাম-আয়েশ করে অলস হয়েছে, বিলাসিতা শিখেছে, মুনিঋষিদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করে তাঁদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছে, যথেচ্ছ খাবার খেয়ে মেয়েদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করছে, এবং উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পরস্পর হানাহানি করে মরছে। শ্রীকৃষ্ণ ও রূ´িণীর পুত্র প্রদ্যু¤œও উচ্ছৃঙ্খলতার শিকার হয়ে নিহত হলেন। দীর্ঘদিন বহু চেষ্টা করেও শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় শৃঙ্খলা আনতে ব্যর্থ হলেন। অর্জুনকে সত্বর আসার জন্য হস্তিনাপুরে খরব পাঠালেন। শ্রীবলরাম কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের করুণ পরিণতিতে মনের দুঃখে নির্জন বনে আগেই চলে গেছেন। অর্জুন না আসা পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতা বসুদেবকে নারীদের রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে শ্রীবলরামের সঙ্গে তপস্যা করার জন্য বনে চলে গেলেন। বনে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীবলরামকে মৃত দেখতে পেয়ে উ™£ান্তের ন্যায় বনের মধ্যে বিচরণ করে শায়িত হলেন। এ সময়ে জরা নামে এক ব্যাধ মৃগ মনে তাঁর পদতল শরবিদ্ধ করেন। কাছে ব্যাধ মার্জনা ভিক্ষা করলে শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশ্বস্ত করে ১২৫ বছর বয়সে দিব্যলোকে প্রয়াণ করলেন। এর পর কলিযুগের আরম্ভ হল।

দ্বারকাতে পৌঁছে অর্জুন মাতুল বসুদেবকে পুত্রশোকে কাতর হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। দেবকী ও রেহিণীসহ চার স্ত্রী বসুদেবের চিতায় সহমরণে গেলেন। শ্রীবলরাম ও শ্রীকৃষ্ণের দেহ অন্বেষণ করে এনেও অর্জুন সৎকার করলেন। সপ্তম দিনে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের ষোল হাজার পতœী, প্রপৌত্র বজ্র, ধনরতœ ও প্রাসাদের সবাইকে নিয়ে প্রস্থান করলেন। তৎক্ষণাৎ শ্রীকৃষ্ণের রাজপ্রসাদ সমুদ্রজলে তলিয়ে গেল। পৌরাণিকভাবে কথিত আছে, দ্বারকার এই অংশ শ্রীকৃষ্ণ আরবসাগরের ৩৭ বর্গমাইল এলাকা উদ্ধার করে নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

যুধিষ্ঠির ৩৬ বছর রাজত্ব করার পর পা-বদের একমাত্র বংশধর অর্জুনের পৌত্র (অভিমন্যুর পুত্র) পরীক্ষিৎকে হস্তিনাপুরের রাজ্যভার অর্পণ করেন। যুযুৎসুকে (দুর্যোধনের বৈমাত্রেয় ভাই) রাজ্যপালনের ভার, ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার যাদব বংশের একমাত্র বংশধর কৃষ্ণ-রু´িণীর প্রপৌত্র বজ্রকে দেওয়া হল। এরপর যুধিষ্ঠির, তাঁর ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদী মহাপ্রস্থানের জন্য হিমালয়ের দিকে রওনা হলেন। যুধিষ্ঠির সশরীরে এবং অন্যরা পথিমধ্যে মৃত্যুর পর স্বর্গে গেলেন।

দ্বারকা শ্রীকৃষ্ণ-বংশের যাদবশূন্য হলেও, শ্রীকৃষ্ণের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবপ্রেমের আদর্শ অনেক মনীষীকে উদ্ভাসিত করেছে। আমার জানা মতে, এঁদের মধ্যে আছেন জৈনধর্মের প্রবর্তক প্রভু বর্ধমান মহাবীর (খৃ.পূ. ৬০০-৫২৮ অব্দ), বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ (খৃ.পূ. ৫৬৩/৪৮০-৪৮৩/৪০০ অব্দ), শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু (খৃ. ১৪৮৬-১৫৩৪ অব্দ), বাবা লোকনাথ (খৃ. ১৭৩০-১৮৯০ অব্দ), রামকৃষ্ণ পরমহংস (খৃ. ১৭৩০-১৮৯০ অব্দ), স্বামী প্রভুপাদ (খৃ. ১৮৯৬-১৯৭৭ অব্দ)। ২৫০০ বছর পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ ও রাণী রু´িণীর স্মরণে দ্বারকা মন্দির ও রু´িণী মন্দির নির্মিত হয়েছে। গুজরাটে পুলিতান মন্দিরে রক্ষিত খৃ. ৫৭৪ অব্দের দ্বারকার রাজা বরাহ দাসের পুত্র সিংহাদিত্য-আমলের তা¤্রলিপিতে শ্রীকৃষ্ণ ও দ্বারক এক সঙ্গে উৎকীর্ণ আছে। ১২৪১ সালে মোহাম্মদ শাহ এবং ১৪৭৩ সালে সুলতান মাহমুদ বেগাটার আক্রমণে মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১২৪১ সালের আক্রমণ প্রতিরোধকারী নিহত পাঁচ ব্রাহ্মণের সম্মানে মন্দির প্রাঙ্গনে ‘পাঁচ পীর’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত আছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে চৌলুক্য রাজবংশের শাসন আমলে দ্বারকা মন্দিরকে পুণর্নিমাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে ভারত সরকারের অৎপযধবষড়মরপধষ ঝঁৎাবু ড়ভ ওহফরধর দায়িত্বে আরবসাগর উপকুলের স্থলে ও সমুদ্রতলে দ্বারকার প্রাচীন ঐতিহ্যের অনুসন্ধান বিশদভাবে করা হয়। এই অনুসন্ধানে সমুদ্রতলে শ্রীকৃষ্ণের রাজপ্রসাদের নিদর্শন পাওয়া গেছে। বর্তমানে জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দুরের মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীবলরাম সম্পর্কিত মুর্তি স্থাপন করা আছে। দ্বারকা উপদ্বীপে অবস্থিত গোপী চন্দন জলাশয়ে সুগন্ধ সাদা মাটি পাওয়া যেত। বৈষ্ণবগণ এই মাটি তিলক হিসেবে ব্যবহার করেন।

আইনস্টাইন বলেছেন, ‘ঈশ্বরকে বুঝতে হলে তাঁর সৃষ্টির গূঢ়রহস্য বিজ্ঞানে উন্মোচন করতে হবে।’ বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বিজ্ঞানের সমস্ত জ্ঞান শ্রীকৃষ্ণের করায়ত্ব থাকার কথা। বর্তমানের ঃবষবংুংঃবস বা আরও আধুনিক কিন্তু এখনও অসম্পূর্ণ ঃবষবঢ়ড়ৎঃ ব্যবহার করে সম্ভবত শ্রীকৃষ্ণ একই সময়ে ষোল হাজার পতœীর সঙ্গে কথা বলতেন। এখনও অনেক দৈব ঘটনার ব্যাখ্যা বর্তমান বিজ্ঞান দিতে অসমর্থ। তবে শ্রীকৃষ্ণের মানবপ্রেমের আদর্শ বিশ্বশান্তির পথ প্রদর্শক।

*************************************************