Archives

কবিতার ভেতর-বাহির

কথা

কবিতার বাহিরে কী থাকে— শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প, ছন্দ কিংবা অন্যান্য অলংকার আর একটি অলৌকিক মুখোশ। ভেতরে বহুবিস্তৃত রহস্য, আলো-অন্ধকার কিংবা অনন্ত আলোড়ন— সেই আলোড়নে লেগে থাকে জীবন ও জগতের বহুবর্ণিল বোধ ও চিন্তনের রঙ ও রেখা , সে-সব পেরিয়ে এক মায়াবী অরণ্যের জনান্তিকে বহমান সংবেদ ও নির্বেদে আঁকা বৈতালিক সময় যা শব্দকে অতিক্রম করে দূর সমুদ্রের গান শোনাতে শোনাতে ফুল ও পাখিদের অন্য কোনো ভুবনে জেগে ওঠে কিংবা জাগাতে চায়। এই মহা-সৌন্দর্য অবলোকনের দৃষ্টি সবাইকে দেন না ঈশ্বর।

ভাষার ঐশ্বর্যেই লুকিয়ে থাকে কবিতার সমূহ সম্ভাবনা, অর্থ কিংবা অনর্থ। ভাব ও ভাষার নিমজ্জনে যে ভাবকল্প কবিতা হয়ে ওঠে, তা নিয়ে অনেক অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। নিরন্তর চলাপথের লতাগুল্ম, চিহ্ন ও চারপাশে ভেসে-বেড়ানো অনেক ধ্বনি ও কল্পতরঙ্গের সাথে একাত্ম হয়ে কবিতাযাত্রার যে আয়োজন কালে কালে, সে বিষয়ে উপলব্ধির জগতে একটি বিশ্বস্ত আসন না পেতে রাখলে এই অধরা মাধুরীর সহজ সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। ভাষার রোদন-ক্লান্ত অবয়বে সোনালি সাহস ছড়িয়ে তাকে নতুন ঘরের সন্ধান দেবার ক্ষেত্রে সব কবির ক্ষমতা সমান থাকে না। র‌্যাঁবো কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার আগে বলেছিলেন যে, তার অনুভূতিগুলো প্রকাশের ক্ষমতা তার ভাষার আর নেই। অনুভূতির সেই চরম পর্যায়ের কথা বাদ দিয়েও বলা যায় যে, কবিতা তো সেইখানে থাকে যেখানে কোনো শব্দ নেই, উপমা নেই, রূপক নেই অনুপ্রাস নেই; কখনো মনে হয় কবিতা কি কেবল এক মহাহাহাকারের মধ্যে রক্তাক্ত হৃদয়ের গভীর থেকে উড়ে আসা কোনো এক মায়াবী পাখির আর্তনাদ, যা বিধ্বস্ত গোধূলির অভিজ্ঞান হয়ে জেগে থাকে কালের চৌকাঠে। কখনো এক অভিনব তুমুল ভর্টেক্স-এ পড়ে কবি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেই ক্লান্তির উপান্তে তখন কেবল এক রক্তাক্ত কবির অবয়বই মুখরিত হয়। কবিতা কি তাহলে সত্তার করুণ গোধূলি— চেতনার অবাধ সন্তরণে ছুটে যাওয়া?

কোনো পরাক্রমশালী মানুষ ভাষাকে একান্ত নিজের করে খেলতে জানেন কিংবা ভাষার মধ্যে জাগাতে পারেন জীবনের বহুমাত্রিক স্পন্দন। জেমস জয়েসের ভাষাকে কেউ অনুকরণ করেনি সত্যি, কিন্তু তিনি ভাষার মধ্যে যেসব মালমশলা ঢুকিয়ে তাকে তার মতো করে লাক্জারিয়াস করে তুলেছিলেন— সেই ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই থাকে। একজন পদ্যকার কিংবা গদ্যকারকে সেই জায়গায় যেতে হয়, যেখানে ভাষা একান্তই তারই হাতের ছোঁয়ায় পাখি হয়, ফুল হয়, জীবনের জাগরণ হয়, রোদ-বৃষ্টির খেলা হয়। ভাষার জরায়ু ফুঁড়ে কবিতা বেরিয়ে আসে সত্যি, কিন্তু এও সত্যি যে, ভাষা ও কবিতার অন্তর্লীন সহবাস ও মিথস্ক্রিয়ায়ও আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। তাই, ভাষা একইসাথে কবিতার ভেতর ও বাহির। কবিতার বাহির বা অবয়ব দেখে খুব সহজেই তার ভেতরের পরিব্যাপ্ত জগৎকে আন্দাজ করা কঠিন, যদিও কবিতার অবয়বেই কিছু কী-ওয়ার্ডস থাকে যা কেবল কবিতা বোঝার ব্যাপারে সহায়তা করে মাত্র।

কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ বাইরের ব্যাপারই বটে। যিনি কবিতা লিখতে চান তাকে ছন্দ বিষয়ে জানতে হয়। অনেক কবিই ছন্দ নিয়ে বেশি বেশি মাতামাতি করতে গিয়ে শুধু ছন্দই লিখে যান, তাতে আর কবিতা থাকে না। ছন্দ কবিতার কাঠামোকে শাসন করে, শব্দ ও কল্পনার অন্তর্যাত্রাকে সংহত করে; কিন্তু পাশাপাশি এটাও বলতে হয় যে, ছন্দের ভলকেনিক ইরাপশন কবিতার মৌলিক অভিগমনকে অনেক সময়ই দুর্বল করে ফেলে। বুদ্ধদেব বসু এক সময় বলেছিলেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা থেকে ছন্দ উঠিয়ে নিলে তা আর কবিতা থাকে না। যিনি মৌলিক কবি হতে চান তাকে ছন্দ বিষয়ে বিশদে প্রবেশ করতে হবে। গদ্য ছন্দ বলি আর মিশ্র ছন্দ বলি — সবখানেই ছন্দের ব্যাপারটা রয়ে যায়, কারণ, বিশ্ব-প্রকৃতি যে এক মহামহিম ছন্দেরই বহিঃপ্রকাশ।

কবিতার ভেতরের রহস্য-গুঞ্জন, আলো-আঁধারীর যে বহুবিস্তৃত খেলা তা কেবল সেই কী-ওয়ার্ডস দিয়ে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। এজন্য পাঠককে মেঘমন্দ্রিত আড়ালের খেয়ায় ভেসে ভেসে শুনতে হয় অবিনশ্বর সেইসব কুয়াশা-ভেজা অনিঃশেষ মন্ত্র যা আলোড়িত হয় সমুজ্জ্বল বোধের তৃষ্ণায়। কবিতার ভেতরে, অনেক গভীরে, স্তরে স্তরে সাজানো চিন্তা ও ভাবের জটিল রসায়ন কোনো মৌলিক কবিতাকে অদৃশ্য অজস্র তন্তুতে বেঁধে রাখে। ভাষার মহাসংশ্লেষী প্রশ্রয়ে কবিতার ভেতর কাঠামোয় জেগে থাকে এক সুসম ইশারাময় আলোর সংসার— প্রকৃত কবিকে সেই সংসারের জল-হাওয়া বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। আমরা আগেই বলেছি কবিতার বাইরে থাকে এক অলৌকিক মুখোশ। সেই মুখোশের অজস্র ছিদ্রপথ দিয়ে কবি বহুবর্ণিল চড়বঃরপ-জধু চালিত করেন সুনিপুণ কৌশলে। এইসব বহুবিধ কৌশলের মধ্যে কবির দিন-রাত একাকার হয়ে যায়। কবি সেই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে এমন এক অতিবর্তী ম্যাজিশিয়ান হয়ে যান যে সেই ঘর্মাক্ত সময়ে, সেই কবিতার মুহূর্তে, মেতে ওঠেন অতিক্রমণের খেলায়। সেই খেলা ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ যেতে থাকে ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে…’

কবিতার ভেতর-বাহির নিয়ে আর কিছু বলার নেই আমার। শুধু সুতোয় বাঁধা একটি ম্যাজিক-ওয়ান্ডকে বাতাসে একটু দুলিয়ে আমি কূল-কিনারাহীন ঘোরের মধ্যে ডুব দিয়ে রূপালি মৎস্যের খোঁজে চলে যাচ্ছি এই…

কবিতার ভেতর-বাহির নিয়ে আর কিছু বলার নেই আমার। শুধু সুতোয় বাঁধা একটি ম্যাজিক-ওয়ান্ডকে বাতাসে একটু দুলিয়ে আমি কূল-কিনারাহীন ঘোরের মধ্যে ডুব দিয়ে রূপালি মৎস্যের খোঁজে চলে যাচ্ছি এই…

কবিতা

কুটুম্ব তালিকার হাতপাখার মেয়েটি

পথগুলো অসমাপ্ত বাঁক নিয়েই ভাবুক

মেঘের কিচেনে তুমি উনুন জ্বালিয়ে কাঁদ, আর রাঁধ সব

                                    লণ্ডভণ্ড স্মৃতি

চারদিকে কারা পোয়াতি পতঙ্গদের ডানা ছিঁড়ে

বয়াতি বাড়ির সাঁঝবাতি ধরে টেনে আনছে পেছনের কাল

সেই নির্বাণ চাতালের খোয়াব থেকে নেমে

ভাবনারা কতদিন হারানো মেধার মাংস হয়ে শুনেছে চার্বাক —

কুটুম্ব তালিকার হাতপাখার মেয়েটি এখন মেঘ ও উনুনের

শৈশব নিয়ে ভাবে আর সমূহ আদরে

পথের বাঁকগুলো বুকে তুলে

চুমুতে চুমুতে ভরে দেয় রক্তস্নাত ঠোঁট—

আর দ্যাখো নেমেছে কত গাংপাখি সময়ের ঘেরে

ওরা মাস্তুলে ডুব দিয়ে তুলে আনছে চরের গন্ধ

বিবিধ রক্তের নেশা মিশে আছে বালির গভীরে…

একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন

একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন

কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি (খোন্দকার আশরাফ হোসেন) একদিন লিখেছিলেন, সেদিন ট্রামের নিচে থেমে গিয়েছিল বাংলা আধুনিক কবিতার অনিরুদ্ধ গতি। তাঁর যেদিন মৃত্যু হলো সেদিন হয়তো অতোখানি না ভাবলেও এটুকু অন্তত আমার মনে হয়েছিল যে, শুধু কবিতার জন্য এমন করে ভাবার মানুষ খুব কম রয়েছে জগতে। আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে, কবি বুদ্ধদেব বসু যদি অন্য কিছু না লিখে শুধুই কবিতা লিখতেন, তাহলে বুদ্ধদেবের কবিতায় অন্য কোনো রূপের দেখা আমরা পেতেও পারতাম। খোন্দকার আশরাফ হোসেন তার নিরন্তর কবিতা-ভাবনার সাথে আরো অনেক কিছুর মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন। অনন্ত জীবন-অন্বেষার মধ্যে কোনো লেখক নানাভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করতে চান আর সেটা করতে গিয়ে অনেক সময়ই তার মৌলিক কাজটির ব্যাঘাত ঘটে থাকে। তবে প্রতিভারও রকমফের রয়েছে। অনেক কিছুর মধ্যে ডুবে থাকলেও নিরন্তর কবিতা-ভাবনা থেকে তিনি দূরে সরে যান নি কখনো, কিংবা বলা যায়, নতুন কবিতা লেখার কিংবা নতুন কবিদের উৎসাহ দেবার বিষয়ে তার আগ্রহে কখনো ভাটা পড়েছে বলে আমার মনে হয়নি।
১৬ জুন ২০১৩, মৃত্যুর গহীন আড়ালে চলে গেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক খোন্দকার আশরাফ হোসেন। চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তার কথা মনে হলে একজন আপদমস্তক ভদ্র মানুষের প্রতিকৃতিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। একজন শক্তিমান কবি ছিলেন তিনি। তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে :
তার আগমন ছিল একটি নীরব দ্রোহের মতো। ঐতিহ্যসূত্রকে ছিন্ন না করেও আশির দশকে তিনি বাংলা কবিতার মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন নন্দনের নতুন অভিমুখে; কালের সমূহ কলাপ কণ্ঠে ধারণ করেও উচ্চারণ করেছেন চিরকালীনতার শব্দমালা; দর্শন ও জীবনের নানা মাত্রিকতার সমীকরণ তাঁর কবিতাকে করেছে গভীর ও তীক্ষèধার; নিরন্তর পথ পরিক্রমায় পেরিয়ে এসেছেন অনুভবের নানা উত্তাপ ও হিম; কবিতার শৈলী নির্মাণ হয়েছে তার নিরন্তর অভিনিবেশে। [কবিতা সংগ্রহের ফ্ল্যাপ থেকে]
একজন প্রকৃত কবি কিংবা শিল্পী রাষ্ট্রের কিংবা অন্য কারো অনুকম্পায় বেঁচে থাকেন না। প্রকৃত কবিরা চিরকালই নিঃসঙ্গ থেকেছেন। এরা রাষ্ট্র কিংবা সমাজের ধার ধারে না। বরং এটা রাষ্ট্রেরই দায় কবি ও কবিতার দিকে নেক নজরে তাকানো। কারণ, যে দেশে একজন অন্ধ হোমার থাকে সেই দেশ চিরকালই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কবিতার সাথে আমার অনেক কালের বসবাস। ঢাকার কোনো পত্রিকা সম্পাদক কিংবা কবির সাথেও আমার সে সময়ে কোনো পরিচয় হয়নি। ফলে কবিতা প্রকাশের ব্যাপারে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি ভেবেছিÑ রাইটিং পোয়েট্রি ইজ আ সর্ট অব পে¬জার অ্যান্ড আই নিড দিস পে¬জার ফর মাই ওন সারভাইভাল। আমার এ সামান্য কবিকৃতির মূলে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা যারা ‘একবিংশে’ লিখতাম, আমরা যেন অবিভাবকশূন্য হয়ে পড়লাম। ‘একবিংশ’ পত্রিকার এতগুলো সংখ্যায় দুইবাংলার যে শত শত লেখকের মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে তার মূল্য অপরিসীম। ‘একবিংশ’ পত্রিকার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের শিল্পসাহিত্য কিংবা সাহিত্যতত্ত্বের ওপর যত আলোচনা হয়েছে তা যেমন আমাদের শিল্পচেতনাকে শাণিত করেছে, তেমনি বাংলা কবিতার পরিবর্তনে এই পত্রিকার ভূমিকা অসামান্য। বিশ্বসাহিত্যের সোনালি শস্য তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। নানা বিষয়ে অনেকগুলো মননশীল প্রবন্ধ লিখে তিনি আমাদের প্রবন্ধসাহিত্যকে উর্বর করেছেন।
লিটল ম্যাগাজিনকে অনেকেই ছোটকাগজ বলে থাকেন। ‘ছোটকাগজ’ লিটল ম্যাগাজিনকে ধারণ করে কিনা জানি না, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে লিটল ম্যাগাজিনকে ছোট কাগজ বলতে অনাগ্রহী। লিটল ম্যাগাজিন একটি বিশেষ ধাঁচের সাহিত্য পত্রিকা, যার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। সে সব বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে, লিটল ম্যাগাজিন পরিবর্তনের, পালাবদলের, নতুনত্বের অঙ্গীকারে ঋদ্ধ। লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে প্রয়াত কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ সাতাশ বছর অতিক্রান্ত করেছে। একটি লিটল ম্যাগাজিন-এর সাতাশ বছর পূর্তি একটি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, যখন কাগজ কিংবা ছাপা খরচের কথা আমাদের ভাবতে হয়। লিটল ম্যাগের সাথে অকালমৃত্যৃর একটি সম্পর্ক রয়েছে। আবার অনেক লিটল ম্যাগ অনেককাল টিকেও থাকে। অনেক পত্রিকাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাত্রা শুরু করে অকালেই ঝড়ে পড়ে। এই ঝরে পড়ার মধ্যে কোন গ্ল¬¬ানি আছে বলেও আমার মনে হয় না। একটি/দুটি সংখ্যাও যদি শিল্পসাহিত্যের কোনো এক ক্ষেত্রে একটু ঝাঁকি দিয়ে নিভে যায়, তাহলেও তার সেইটুকু প্রাপ্তিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশই নেই। একথা বলাই বাহুল্য যে, সব পত্রিকাই প্রকৃত সাহিত্যপত্রিকা হয়ে ওঠে না। শিল্পসাহিত্যের মতোই সাহিত্যপত্রিকা বা লিটলম্যাগকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। সৃষ্টিশীল সাহিত্যপত্রিকার একটি দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু বাজারী সাহিত্যপত্রিকার তা থাকে না। এখানে বলে নেওয়া ভালো যে, সব সাহিত্যপত্রিকাকে লিটলম্যাগ বলা যাবে না, সব লিটলম্যাগকে সাহিত্যপত্রিকা বলা যাবে। লিটলম্যাগের চরিত্র সাধারণ সাহিত্যপত্রিকার মতো নয়। এ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার নানা কথা রয়েছে। সে বিষয়ে না গিয়ে আজকে লিটল ম্যাগ হিসেবে ‘একবিংশ’-র দায় ও কৃতির কিছু চিত্র তুলে ধরতে চাই।
বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা বাংলা কবিতার পালাবদলে যে ভূমিকা রেখেছিল তাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে আমাদের। বিস্ময়করভাবেই পত্রিকাটি অনেককাল টিকে ছিল এবং বাংলা কবিতার আধুনিকায়নে এর ভূমিকা ছিল অনন্য, তিরিশের প্রধান কবিরা চিহ্নিত ও বিকশিত হয়েছে এই পত্রিকার মাধ্যমে। তবে কোনো পত্রিকার টিকে থাকার ব্যাপারে পেছনের মানুষটির ভূমিকা ও যোগ্যতা বিশেষভাবে কাজ করে। শুধু কবিতা নিয়ে, আধুনিক কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর ভাবনা ও শ্রম, তার অভিভাবকত্ব কিংবা শিক্ষকতা আমাদের কাছে তাকে বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছে। বাংলা আধুনিক কবিতার বিকাশে ‘কবিতা’ পত্রিকাটি ছিল তার সকল স্বপ্নের উৎস। এ বিষয়ে ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন :
সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গ থেকে বিছিন্ন করে শুধুমাত্র কবিতার উপর এই জোর দেবার প্রয়োজন ছিলো। নয়তো সেই উঁচু জায়গাটি পাওয়া যেতো না, সেখান থেকে উপেক্ষিতা কাব্যকলা লোকচক্ষের গোচর হতে পারে। ‘কবিতা’ যখন যাত্রা করেছিল, সেই সময়কার সঙ্গে আজকের দিনের তুলনা করলে, একথা মানতেই হয় যে, কবিতা নামক একটি পদার্থের অস্তিত্বের বিষয়ে পাঠকসমাজ অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন, সম্পাদকরাও একটু বেশি অবহিত এমনকি সে এতদূর জাতে উঠেছে যে, কবিতার জন্য অর্থ মূল্যও আজকের দিনে কল্পনার অতীত হয়ে নেই।
‘একবিংশ’-র ২৭ বছর টিকে থাকা এবং কবিতা নিয়ে, কবিতার নতুন দিকবলয়ের অনুসন্ধানে, কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার মাধ্যমে যে বিচিত্র সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়েছে, তার মূল্যায়ন যথাযথভাবে হওয়া উচিত।
খুব নির্মোহভাবে আমরা অনেকেই সেই ঔদার্যের জায়গাটায় পৌঁছতে পারি না বলেই হয়তো অনেককিছুর সঠিক মূল্যায়নে কার্পণ্য দেখাই। ‘একবিংশ’-র মূল্যায়নেও সেরকম বিষয় মাঝে মাঝে লক্ষ করা গেছে এবং তা কোনো শুভত্বের লক্ষণ নয়। খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে এক নিঃসঙ্গ কর্ণধার, যিনি অনেকটা একাকীই তার ‘একবিংশ’ নামের তরণীটি বেয়ে চলেছেন বিষম স্রোতধারায়। সাতাশ বছর ধরেই চলেছেন। মাঝে মাঝে থেমে গেলেও একবারে থেমে যান নি। অনেকেই এসেছে এই তরণীর যাত্রী হয়ে। চলেও গেছেন। অনেক নতুন নতুন যাত্রীর কোলাহলে কখনো কখনো নতুন ও পুরানোর মিশ্রণে তার চলার গতি থেকেছে স্বচ্ছন্দ।
লিটলম্যাগই মূলত সৃষ্টিশীল শিল্প সাহিত্যের জায়গা। ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর যে আলোরেখায় তার সমূহ অবয়ব আচ্ছন্ন ছিল তাতে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি যে, এটি বাংলা কবিতার পালাবদলের অঙ্গীকার নিয়ে আবির্ভূত। আমরা আগেই বলেছি কোন লিটলম্যাগ কিংবা সাহিত্যপত্রিকার সৌন্দর্য-সৌকর্য কিংবা সৃষ্টিশীলতার কিংবা বেঁচে থাকার বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করে সেই পত্রিকাটির পেছনের মানুষটির ওপর, যিনি সেই পত্রিকার সম্পাদক। খোন্দকার আশরাফ হোসেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং আশির দশকের একজন উল্লে¬¬খযোগ্য কবি হিসেবে যে দায়িত্ব নিয়ে ‘একবিংশ’ বের করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সেটি ছিল কবিতাকে প্রকৃত কবিতা করে তোলার অঙ্গীকার।
সত্তরের দশকের কবিদের কবিতা যে তরলীকৃত শদ্বাচার, দ্রোহ, অকাব্যিক ন্যারেটিভ কিংবা সস্তা বাকবিন্যাসের স্রোতধারায় আচ্ছন্ন ছিল, সেটি বাংলা কবিতার জন্যে মোটেই শুভকর কোনো বিষয় ছিল না। জনপ্রিয় কবিদের একটা সময় গেছে তখন। তবে একথা মানতেই হয় যে, সেই জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের কবিতাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আশির দশকে বাংলা কবিতার একটি পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। এ সময়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের উপলব্ধিতে আসে কবিতাচর্চায় শুভত্বের, সৃষ্টিশীলতার বিষয়টি। নিজে একজন সৎ কবি হিসাবে যে দায়িত্ব তিনি ‘একবিংশ’-র মাধ্যমে নিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে কিংবা নির্ভীক ঔদার্যেÑ সে-বিষয়ে যে যা-ই ভাবুক না কেন, তার এই নিরন্তর প্রকাশনা এবং কবিতার নানা দিক নিয়ে, সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা এবং বিশেষভাবে তরুণ কিংবা উদীয়মান প্রতিশ্র“তিশীল কবিদের তুলে ধরার বিষয়গুলো আলাদাভাবে দেখতে হবে। এটি একটি দুরূহ কাজই বটে।
‘একবিংশ’ অনেক কবির জন্ম দিয়েছে। অনেক কবিই ‘একবিংশে’র মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন, তাদের অনেকেই হয়তো আজ আর লিখছেন না, কিংবা দূরে সরে গেছেন, কিন্তু ‘একবিংশ’-র পালে হাওয়া লাগা থেমে যায়নি। নবীন-প্রবীণের সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে ‘একবিংশ’ প্রতিটি প্রকাশনায় আলাদাভাবে আবির্ভূত হয়েছে। আর এসব আলাদা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ‘একবিংশ’ তৈরি করেছে রুচিশীল পাঠক। ‘একবিংশ’-র প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক লিখেছিলেন ‘… ভবিষ্যবাদী নামকরণের মধ্যে উপর্যুক্ত বোধটি কাজ করলেও স্বীকার করতে হবে, দৈশিক কবিতার হতাশাপূর্ণ বর্তমানই পত্রিকা প্রকাশের পেছনে মূল নিয়ামক ছিল। মনকে চোখ ঠেরে লাভ নেই; বাংলা কবিতার এখন প্রখর দুঃসময়। প্রতিভাদীপ্ত ঘোরসওয়ারগণ বহু আগে নিস্ক্রান্ত; সুখী-জীবন-বুদ্ধের তিরিশি ত্র্যহস্পর্শ থেকে জেগে উঠলো না আর বাংলা কবিতা। কেউ কেউ বলেন, বাংলা কবিতার অনৈসর্গিক মৃত্যু ঘটেছিল কলকাতার ট্রামলাইনের উপর। অন্যরা, তুলনায় আশাবাদী, ঐ মৃত্যুর দিনক্ষণ সামনে ঠেলে কোনোক্রমে পঞ্চাশ দশক পার করে দেন। সে যাই হোক, বাংলার কাব্য ক্ষেত্রটি বহুদিন প্রতিভারিক্ত আধিয়াদের দ্বারা অপকর্ষিত হচ্ছে। অন্তর্গত শ্রীহীনতাকে ঢেকে রাখছে রাজনীতির শিল্পবোধহীন চিৎকার। আমরা একটি হট্টোগোলের হাটে আছি। আত্মকণ্ডূয়নের অসম্ভব যোগাভ্যাস, বামনাবতারদের কলহ, দলবাজি এবং স্বৈরাচারে অবরুদ্ধ প্রাণের স্ফূর্তি আবেগের আন্দোলন। …‘একবিংশ’র প্রকাশ অপক্ষমতা ও স্বৈরাচারের শালীন জবাব; দেয়াল দ্বারা পথ বন্ধ দেখে তা ডিঙিয়ে যাবার স্পর্ধিত উল্লম্ফন বলুন আর প্রতিক্রমণ বলুন, ‘একবিংশ’র অভীপ্সা তা-ই। ‘একবিংশ’ কেবল নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকদের জন্য নির্দিষ্ট। যারা অপ্রতিষ্ঠিত, যৌবনাবেগ টলমল, প্রতিভাবান, উদার, অভিনিবিষ্ট, শ্রমী এবং নির্ভয়, আমরা তাদের জন্য পাটাতন নির্মাণ করতে চাই…।’
তরুণদের জন্য একটি মুখপত্রের অনুভব থেকে তিনি ‘একবিংশ’ বের করেছিলেন এবং সুস্থ্যধারার কবিতাচর্চার একটি পথ তৈরিতে নিজেকে অন্বিষ্ট রেখেছিলেন এই পত্রিকার প্রকাশনার সাথে বলতে গেলে দীর্ঘকালই। বাংলা কবিতার একটি বিশেষ সময়ের ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ‘একবিংশ’-র ভূমিকাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।
‘একবিংশ’ শুধু বাংলাদেশের লেখকদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেনি, ওপার বাংলার অনেক লেখকদেরও লেখা ছেপেছে। আমরা অনেকেই আগে আসাম কিংবা ত্রিপুরার বাংলা ভাষাভাষীদের লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম না। ঐ অঞ্চলের লেখকরা এমনকি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কাছেও অবহেলিত, উপেক্ষিত ছিল। ‘একবিংশ’ই প্রথম আসাম-ত্রিপুরার কবিদের কবিতা ছাপিয়ে এবং ঐ অঞ্চলের পণ্ডিতদের তথ্যসমৃদ্ধ লেখা প্রকাশ করে তাদের বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে এসেছে। বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষাভাষীদের সাহিত্যচর্চার বিষয়টি আমাদের নতুন ভাবনার ক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করেছে বলে আমার বিশ্বাস। ঐ অঞ্চলে একদা যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এবং এগারটি তাজা প্রাণ যে আত্মাহুতি দিয়েছিল, সে খবর আমরা একবিংশ-র মাধ্যমে আরো ব্যাপকভাবে জানতে পারি। আসামের কাছাড় জেলায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে সংঘটিত ঘটনাটি তাই বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ‘একবিংশ’ এক্ষেত্রে যে দায়িত্বটি পালন করেছে, বাংলাদেশে প্রকাশিত আর কোনো লিটল ম্যাগাজিন সেটা করেছে বলে আমার জানা নেই। ‘বরাক উপত্যকার কবিতা : অতন্দ্র গোষ্ঠী’ নামক প্রবন্ধের গোড়াতেই তপোধীর ভট্টাচার্য বরাক উপত্যকাবাসী বাঙালির দুর্নিবার নিয়তিকে তুলে ধরেছেন :
বাঙালির উত্তাপবলয় থেকে সুদূরতম প্রান্তে বরাক উপত্যকার বঙ্গভাষীজনেরা যতটা তিনদিক ঘেরা পাহাড়ের পাহারায় বন্দী, তার চেয়ে ঢের বেশি নিমজ্জিত তারা স্বখাত সলিলে। মমতাবিহীন কালস্রোতে নির্বাসিত শ্রীভূমির কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ঐ ভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার পরে ছিন্নমূল মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তাহীনতা ও তজ্জনিত হীনন্মন্যতা হয়ে উঠলো বরাক উপত্যকাবাসী বাঙালির দুর্নিবার নিয়তি। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এগারটি প্রাণ আহুতি দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। এরা আরম্ভ জানেন কিন্তু সমাপ্তিটা জানেন না। উনিশ-এ মে তাই চৌত্রিশ বছর পরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাতপরিচয়, আর তেতাল্লি¬¬শ বছর আগের একুশে ফেব্র“য়ারি প্রতিবেশী সমভাষীদের মধ্যে আজো জ্বলন্ত অগ্নিবলয়। (একবিংশ, দশবছরপূর্তিসংখ্যা, নভেম্বর ১৯৯৬)।
বাংলা সাহিত্যের রথি-মহারথিদের নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে ‘একবিংশ’ একদিকে তাদের যেমন সম্মানিত করেছে, তেমনি তাদেরকে নতুনভাবে মূল্যায়নেরও ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। তত্ত্ববিশ্বের নানা দিক ঠাঁই পেয়েছে ‘একবিংশ’-র বহুতল বুকে এবং এক্ষেত্রে এদেশের পণ্ডিতদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ কিংবা আসাম ত্রিপুরার প্রাজ্ঞজনরোও লিখেছেন ব্যাপক পরিসরে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তপোধীর ভট্টাচার্য, অঞ্জন সেন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আফজালুল বাসার, মঈন চৌধুরী প্রমুখের লেখার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তত্ত্ববিশ্বের নানা কথা। রোমান্টিক কবিতা ও রোমান্টিক আন্দোলন, উত্তর আধুনিকতা কিংবা আধুনিকবাদ নিয়ে সম্পাদক নিজে লিখেছেন বিস্তৃত তথ্যসমৃদ্ধ দীর্ঘ প্রবন্ধ। এছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিক আফ্রিকার কবিদের কবিতার অনুবাদ ও আলোচনা পাঠককে দিয়েছে আলাদা তৃপ্তি। সব মিলিয়ে ‘একবিংশ’ তার রন্ধনশালার ঔদার্যে রসনাতৃপ্তির নব নব আয়োজন পাঠককুলকে যে পুষ্টিতে সমৃদ্ধ করেছে, সেই বিষয়টি আমাদের অনুভবের জগতে একধরনের আনন্দের সঞ্চার করে। এই আনন্দই শিল্পের নিভৃত সত্যকে জীবনের চারপাশে দাঁড়াতে সাহায্য করে। ‘একবিংশ’র সফলতা এইখানে, এই আলোকিত অবগুন্ঠনে, এই বিভাসিত বিনম্র গুঞ্জনে, সমূহ সূর্যালোকে স্নাত এই শ্রেয়োবোধে।
১৯৯০ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে প্রকাশিত ‘একবিংশ’-র ক্রোড়পত্র ধারণ করে আশির দশকের কবিদের কবিতা। ঐ ক্রোড়পত্রটি সম্পাদনা করেছিলেন সৈয়দ তারিক। ক্রোড়পত্রের শিরোনাম ছিল ‘অনিরুদ্ধ আশি : এক দশকের কবিতা’। ঐ ক্রোড়পত্রে ২৪ জন কবির প্রায় সকলেরই একাধিক কবিতা স্থান পেয়েছিল। এই কবিদের মধ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, মোহাম্মদ সাদিক, সরকার মাসুদ, শান্তনু চৌধুরী, মারুফ রায়হান, সুহিতা সুলতানা, মাসুদ খান সক্রিয় থাকলেও বাকিরা বেশ ম্রিয়মান এবং কেউ কেউ একেবারেই নিঃশব্দ। আশির দশকের কিছু সংখ্যক কবির কবিতায় পালাবদলের ঈঙ্গিত ছিল এবং পরবর্তীতে আশি ও নব্বইয়ের দশকের বেশ কিছু কবির কবিতায় জীবনানন্দ-উত্তর নতুন কবিতাচর্চার যে প্রণোদনা দেখা গেল তা আজকে নানাভাবে বিস্তৃত ও বিকশিত হয়েছে। আমরা আবারো বলতে চাই, বাংলা কবিতার পালাবদলে কিংবা সুস্থ ধারার কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে ‘একবিংশ’-র ভূমিকাকে আলাদাভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘একবিংশ’-র প্রথম সংখ্যাটি শুরু হয়েছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রবন্ধ দিয়ে। ঐ সংখ্যায় সাজ্জাদ শরীফ এবং সৈয়দ তারিকেরও প্রবন্ধ ছিল। খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ইকবাল আজিজ এবং রেজাউদ্দিন স্টালিনের ছিল দীর্ঘকবিতা। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন যথাক্রমে সৈয়দ তারিক, আহমদ মাযহার এবং আব্দুল্লাহ সাদী। ‘একবিংশ’-র ২৪তম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯-এর ফেব্র“য়ারীতে। এই সংখ্যাটি নানা দিক থেকেই গুরুত্বের দাবিদার। সম্পাদকের ভাষায় ‘একবিংশ’-র বর্তমান সংখ্যাটির মূল প্রক্ষেপণ আধুনিকবাদ ও বুদ্ধদেব বসুর ওপর। আধুনিকবাদ নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধে খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্পষ্ট করেছেন আধুনিকবাদী নানা আন্দোলন ও সেই কালখণ্ডের সামূহিক বিষয়কে। আলোচনার সাথে বেশ কিছু আধুনিক ফরাসি কবির কবিতার অনুবাদ পাঠকের কাছে বাড়তি পাওনা হিসেবে মনে হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে তাকে নিয়ে রয়েছে ১১টি সুখপাঠ্য প্রবন্ধ। এই সংখ্যার সম্পাদকীয়-র বেশির অংশ জুড়েই রয়েছে আসামের কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যতত্ত্ববিদ তপোধীর ভট্টাচার্যকে নিয়ে আলোচনা, যাঁকে তিনি বলেছেন ‘তপস্যায় ধীর এক আচার্য’। এছাড়াও এ সংখ্যায় শূন্যের দশকের উল্লে¬খযোগ্য কয়েকজন কবির কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ফেব্র“য়ারিতে প্রকাশিত হয় ‘একবিংশ’-র ২৭ তম সংখ্যা। এই সংখ্যার পরে ‘একবিংশ’ হয়তো আর কবিতা ও নন্দনভাবনার কাগজ হিসেবে বেরুবে না, সেটি ধরেই নেওয়া যায়। এই শেষ সংখ্যাটি শুরু হয়েছে হাসান আজিজুল হকের ‘ভাষা, দর্শন, মানবজীবন’ নামক প্রবন্ধ দিয়ে। এই সংখ্যায় খোন্দকার আশরাফ হোসেনের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার নাম ‘কবিতার রাহসিকতা এবং আকবর আলি খানের বনলতা সেন’। তাঁর ব্যবহৃত এই ‘রাহসিকতা’ শব্দটি তাঁর আগে কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর অনেক প্রবন্ধ এবং কবিতার মধ্যে এমন সব শব্দের খোঁজ পাওয়া যায় যা তাঁর আগে কেউ ব্যবহার করে নি।
‘একবিংশ’-র কৃতি তার অসংখ্য সাহিত্যপ্রেমী পাঠক, যারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে পত্রিকাটির পরবর্তী সংখ্যার জন্য। ২০১৩ সালের ১৬ জুন সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। তথাপি প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন কালের দুয়ারে একটি সম্মানের আসন নিয়েই বেঁচে থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অবহেলা-অবমূল্যায়নের এক অনিদ্র দ্রোহ তার ভেতরে সদা জাগ্রত ছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যান। কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেনÑআপটার জইনিং আই কেম ব্যাক ফ্রম ত্রিশাল। মৃত্যুর দুই সপ্তাহ আগে জুনের ১ তারিখ রাতে তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয় এবং আমি হঠাৎ করে বলে ফেলি- ভাবীর মৃত্যুর বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তিনি মৃত্যুর তারিখটি বললেন এবং কেঁদে ফেললেন, আমি কিছুটা বিব্র্রত হয়ে ‘ভালো থাকবেন স্যার’ বলে বিদায় নিলাম। রাষ্ট্রও তার বৈরি আচরণে কখনো কখনো মানুষকে নিঃসঙ্গ, একা করে দেয়। সম্মিলিত নৈঃসঙ্গ্যের মধ্যে বেঁচে থাকা বড়ই দুরূহ। তখন ছুটে যেতে ইচ্ছে করে জন্মভিটায়, মায়ের আঁচলের নিচে। তিনি ঝিনাই নদীর জল হাঁটুতে কাপড় তুলে পার হয়ে বাড়ি ফিরতে চানÑ তিনি বাড়ি ফিরেছেন, ফিরেছেন স্নেহময়ীী মায়ের কাছে :
ঝিনাই নদীর জল হাঁটুতে কাপড় তুলে পার হবো,
মধ্যরাতে ডাক দেবো
মা মাগো এসেছি আমি! সেই কবে গভীর নিশিথে
তোমার নিমাইপুত্র ঘর ছেড়েছিল,আজ কাশী বৃন্দাবন
তুলোধুনো করে ফের তোর দীর্ণ চৌকাঠে এসেছি।
Ñবাড়ি যাবো: খোন্দকার আশরাফ হোসেন