Archives

আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রা [স্মরণ ॥ অভিজিৎ রায়]

আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রা

প্রকৌশলী শব্দটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে যে প্রথাগত ইঞ্জিনিয়ার নামধারীদের চেহারা ভেসে ওঠে অভিজিৎ রায় সেরকম তথাকথিত কোনো প্রকৌশলী ছিলেন না। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের জ্ঞানকে বাস্তবজীবনের সাথে মিলিয়ে তার থেকে তৈরি যুক্তি ও বিজ্ঞানচেতনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তিনি সক্রিয় হয়েছিলেন। এজন্যে লেখাকেই অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বিখ্যাত বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা, মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১’র মুজিবনগর সরকারের প্ল্যানিং সেলের অনারারি সদস্য ও তৎকালীন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি, দক্ষিণ এশীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, এবং ‘মুক্তান্বেষা’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক বাবা ড. অজয় রায়ের মানবতাবাদী আদর্শে গড়ে ওঠা অভিজিৎ গতানুগতিক কোনো লেখক হওয়ার মানসে লেখালিখির জগতে প্রবেশ করেন নি; মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের আলোয় আলোকিত করবার জন্যেই কলম ধরেছিলেন। সকল প্রকার অন্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মানবমনকে মুক্ত করতেই কয়েকজন সমমনা বন্ধুকে সাথে নিয়ে তিনি ২০০১ সালে গঠন করেছিলেন ‘মুক্তমনা’ নামের একটি ওয়েবসাইট, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। ‘মুক্তমনা’র প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান সমন্বয়ক এবং লেখক অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ এবং মানবতাবোধকে জীবনের সারসত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। একক ও যৌথভাবে তাঁর রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১০।
যথা :
১. আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী (২০০৫)
২. মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে (২০০৭); মীজান রহমানের সঙ্গে যৌথভাবে।
৩. স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি (২০০৮); সম্পাদিত গ্রন্থ। প্রধান সম্পাদক- অজয় রায়।
৪. সমকামিতা : বৈজ্ঞানিক সমাজ-মনস্তাত্তিক অনুসন্ধান (২০১০)
৫. অবিশ্বাসের দর্শন (২০১১); সহযোগী লেখক রায়হান আবীর।
৬. বিশ্বাসের ভাইরাস
৭. ভালোবাসা কারে কয় (২০১২)
৮. বিশ্বাস ও বিজ্ঞান (২০১২); সম্পাদিত গ্রন্থ। অভিজিৎ রায়, শহিদুল ইসলাম ও ফরিদ আহমদ সম্পাদিত।
৯. শূন্য থেকে মহাবিশ্ব (২০১৪)
১০. ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো : এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে (২০১৫)
এছাড়া অনেক অগ্রন্থিত রচনাই ছড়িয়ে আছে ‘মুক্তমনা’সহ নানান অন্তর্জালে। এমনকি কবিতাও লিখেছেন অভিজিৎ রায়। নিজের ওয়েব ব্লগ ‘মুক্তমনা’র পাঠকদের জন্যে নিয়মিত লিখতেন নিজের রচনার সমালোচনার জবাব এবং নানারকমের প্রশ্নের উত্তর।
ড. অভিজিৎ রায়ের সকল বইয়ের বিস্তর কিংবা সংক্ষিপ্ত, কোনো আলোচনাই এই গদ্যের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য তাকে স্মরণ করা। শ্রদ্ধা জানানো। এই কাজটি করতে গিয়ে তাঁর রচনাগুলির দিকে কেবল চোখ বুলালেই বোঝা যায়, তাঁর রচনার প্রধান আকর্ষণ বিজ্ঞান। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ আধুনিক বিজ্ঞানের বিশ^ইতিহাসটা অত্যন্ত গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি। আজ আমরা যে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সর্বশক্তিধর মানবসভ্যতা পেয়েছি; অসীম তথ্য ও অগাধ জ্ঞানের আলোয় আগামির পথে অবিরাম এগিয়ে চলেছি; তা খুব সামান্য সময়ে অর্জিত বা সহসা ম্যাজিকের মতো প্রাপ্ত কোনো বিষয় নয়; হাজার হাজার বছর ধরে অগণিত অগ্রসরমনা মানুষের শ্রম সাধনার ফসল। এই মানুষদের ভেতরে আবার এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের স্পর্শ ব্যাতীত আজকের সভ্যতা কল্পনাতীত। যাদের মেধা অধ্যবসায়ের ছোঁয়ায় মানুষের অন্ধকারময় প্রাচীন জীবন আলোয় ভরে উঠেছে; মানবজীবন হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব আবেদনময়; সেইসব মানুষ, বিজ্ঞানের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং আবিষ্কারক ও চিন্তকদের নিয়ে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’। অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোঁড়া সমাজপতিদের হাতে নিগৃহীত বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনো, নিকোলাই কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিও গ্যালিলাই থেকে শুরু করে আইজ্যাক নিউটন, আলবার্ট আইনস্টাইন, সুব্রানিয়াম চন্দ্রশেখর, জোবানিল বেল, এডুইন হাবল, জর্জ গ্যামো, আব্দুস সালাম, ভেরা রুবিন. জর্জ শোয়ার্জ, এডওয়ার্ড উইটেন, স্টিফেন হকিং প্রমুখের সভ্যতার দিকপরিবর্তনকারী অবদান ও ভাবনাগুলোর সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই গ্রন্থখানি। পৃথিবী সূর্যের চারিাদকে ঘোরে; আজকের দিনের ক্ষেত্রে এই সত্যটি অতি সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ সত্যটা প্রমাণ করতে গিয়ে গ্রিক জ্যোতির্বিদ এরিস্টাকাস থেকে কোপার্নিকাস; কোপার্নিকাস থেকে ব্র“নো; অতঃপর গ্যালিলিওকে লেগেছে। কারণ গ্রিক দার্শনিক শিরোমনি প্লেটো, এরিস্টটল এবং মিশরীয় জ্যোতির্বিদ টলেমির ভূকেন্দ্রিক মতবাদ, যেখানে পৃথিবী সমতল এবং পৃথিবীর চারপাশেই সূর্যসহ অন্যান্যরা ঘুরছে বলে বলা হয়েছিলো; সেটাই প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও অন্যান্য বই-পুস্তকে শত শত বছর ধরে জায়গা করে নিয়েছিলো। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচাইতে প্রভাববিস্তারী মাধ্যাকর্ষণসূত্রটির আবিষ্কারের নামে নিউটনের মাথায় যে আপেল পতনের গল্পটি প্রচলিত আছে, এটা যে স্রেফ সহযোগী গল্পই; তা তথ্য-উপাত্তসহ উপস্থাপন করেছেন অভিজিৎ রায়। তিনি লিখেছে, ‘আপেল কাঁঠাল কিছু নয়। নিউটন তখন ছিলেন কেমব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৬৬৫ সালের দিকে প্লেগ মহামারী আকারে দেখা দিলে বিশ^বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়। নিউটনও চলে গিয়েছিলেন তাঁর গাঁয়ে অবসর সময় কাটাতে। সেখানেই মহাকর্ষের ধারণাটি প্রথম তাঁর মাথায় আসে। শুধু মহাকর্ষ নয়, এসময়ই নিউটন প্রিজমের মধ্য দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন।’ উল্লেখ্য, এর প্রায় বিশ বছর পর ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের সূত্রটি সাধারণের সম্মুখে আসে। কেবল ইতিহাস নয়, বিজ্ঞানের অনেক জটিল বিষয়গুলোকেও অত্যন্ত প্রাঞ্জল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় তুলে ধরেছেন অভিজিৎ। যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নন, কিন্তু বিজ্ঞানবিষয়ে কৌতূহলী, তারাও অনেকটা সহজেই বিজ্ঞানের অনেক অজানা বিষয়কে জানতে এবং জীবনে তার প্রয়োগ দেখতে ও দেখাতে পারেন তাঁর রচনাপাঠের মাধ্যমে। মীজান রহমানের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ কিংবা ‘বিশ্বাস ও বিজ্ঞান’, ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ প্রভৃতি গ্রন্থসমূহ একথার সাক্ষ্য দেবে। পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে নানামত প্রচলিত আছে বিভিন্ন সম্পদায়ের মধ্যে। ধর্মগ্রন্থগুলোতেও আছে নানারকমের অলৌকিক ঘটনার কথা। কিন্তু এ সম্বন্ধে বিজ্ঞান যে ভিন্নমত পোষণ করে এবং বিজ্ঞানের মতটাই যে অধিকতর যুক্তিযুক্ত, সে কথাগুলো খুব সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ বইটিতে। মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়েবিজ্ঞানের সর্বশেষ গবেষণালব্ধ নিবেদনের ফসল ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ । অভিজিৎ কেবল বিজ্ঞানলেখক ছিলেন না, ছিলেন মানুষের সকল ধরণের প্রগতিশীল ও যুক্তিসংগত অধিকার আন্দোলনেরও কর্মী। পাশ্চত্যে সমকামীদের অধিকার এর পক্ষে-বিপক্ষে যে দীর্ঘদিনের বচসা চলছে তারই বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা খুঁজবার চেষ্টা থেকে রচিত হয়েছে ‘সমকামিতা : বৈজ্ঞানিক সমাজ-মনস্তাত্তিক অনুসন্ধান’। অনুজ বিজ্ঞানলেখক রায়হান আবীরকে নিয়ে লিখিত ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ অভিজিৎ রায়ের লেখালিখির জীবনের এক অনন্য সংযোজন। কেবল এই একটি বই পাঠের মাধ্যমেও একজন পাঠক পৌঁছে যেতে পারেন বিজ্ঞান, ধর্ম ও বাস্তবতা সম্পর্কিত অসাধারণ অভিজ্ঞতাসমূহের কাছাকাছি। এই বইটির প্রথম ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, ‘সংশয়বাদ, বস্তুবাদ, নিরীশ্বরবাদ এ অঞ্চলের জনমানসে নতুন কোনো দার্শনিক মতবাদ নয়। ভারতবর্ষে সংগঠিত ও প্রচারিত ধর্মগুলোর তুলনায় বস্তুবাদের ভিত্তি বরং অনেক প্রাচীন। চার্বাক দর্শন থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শন, সাংখ্যা দর্শনসহ অনেক কিছুতেই বস্তুবাদী উপাদানের জাজ্জ্বল্যময় সাক্ষ্য বর্তমান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেই বলিষ্ঠ ঐতিহ্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। রাজশক্তি আর ক্ষমতাধরদের প্রাতিষ্ঠানিক চাপে, রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় নিপীড়ন আর নিগ্রহে সেই বস্তুবাদিতার উপাদান অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই ঐতিহ্যের পুনরুত্থান আমরা যেন লক্ষ করছি একবিংশ শতকের নবীন অথচ প্রাজ্ঞ কিছু লেখকের হাত ধরে। তাদের আন্দোলন আজ বহির্বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে নতুন দিনের নাস্তিকতা নামে।’ বলাই বাহুল্য, যে কোনো ধরণের অন্ধ বিশ্বাস ও অপবিশ্বাস থেকে মানুষকে মুক্ত করে কট্টরপন্থী মৌলবাদমুক্ত সমাজ গঠন করবার মানসেই রচিত হয়েছে এই বইটি। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ধরে ধরেই বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবতা নৈতিকতার আলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন সত্য-মিথ্যাগুলো। এমন অকাট্য প্রমাণাদিসহ ধর্ম ও বিজ্ঞানের বৈপরীত্যকে তুলে ধরেছেন যে, অলৌকিক বিশ্বাসের দর্শনে আস্থা রাখা মানুষের পক্ষেও যুক্তিগুলো মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এই বইটিতে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নামে একটি অধ্যায় আছে। আবার একই শিরোনামে অভিজিতের একটি পূর্ণ গ্রন্থও আছে। মানুষের অন্ধবিশ্বাস, বিশেষত ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস কতো ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রমাণসমূহ হাজির করেছেন লেখক। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস তথা মৌলবাদিতার কারণে পৃথিবীর ইতিহাস কতবার যে কলঙ্কিত হয়েছে, রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে সভ্যতা, তার অনেক উদাহরণ তুলে ধরেছেন অভিজিৎ। অনেকে মনে করেন অভিজিৎ রায়ের আক্রমণের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলাম, অভিজিৎ কেবল ইসলামে বিরুদ্ধেই লিখেছেন। কেউ কেউ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে বলতে চেষ্টা করেন অভিজিৎ হিন্দু মৌলবাদী, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখেননি। এটি একেবারে ডাহা মিথ্যে কথা। তাঁর বইগুলি যারা পাঠ করেছেন তারা জানেন, কোনো ধর্মকেই তিনি আক্রমণের কেন্দ্রে স্থাপন করেন নি; সকল ধর্মেরই যেখানে অযৌক্তিকতা, অসারতা, অনৈতিকতা ও অমানবিকতা আছে, তার বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন। অন্য সকল রচনা তো বটেই ‘স্ববিরোধী বিবেকানন্দ’ নামে তাঁর যে দীর্ঘ একটি অগ্রন্থিত গদ্যরচনা আছে সেখানে অনেক শিক্ষিত ও আধুনিক চিন্তার মানুষের কাছেও পরম শ্রদ্ধার বিবেকানন্দ চরিত্রটির মুখোশ উন্মোচন করেছেন লেখক। তথ্য-প্রমাণসহ হাজির করেছেন বিবেকানন্দের কপটতাযুক্ত ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো।
অভিজিৎ কেবল বিশ্বাস ও বিজ্ঞানসম্পর্কিত রচনাতেই যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান নি, তার অকাট্য প্রমাণ ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো : এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে’ গ্রন্থখানি। বইটি এই নিবন্ধকারের হাতে না এলেও ‘মুক্তমনা’তে প্রকাশিত ভিক্টোরিয়া ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক রচনাপাঠে এর উৎকৃষ্টতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। ২০১৫’র বইমেলায় প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে এই বইটিকে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে উল্লেখ করেছেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ। বস্তুতপক্ষে, অভিজিতের লেখাপড়ার পরিধি ছিলো ব্যাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-দর্শন, সমাজ-সভ্যতা প্রভৃতি জ্ঞানরাজ্যের বিবিধস্তরে তাঁর ছিলো মুক্ত বিচরণ। আসলে কোনো মানুষ যদি তার সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসে আস্থা রাখতে চান, তাকে প্রায় কিছুই জানতে হয় না; কিন্তু এই প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বাইরে যেতে চাইলে, সবকিছুকে যাচাই করেই তবে গ্রহণ করতে চাইলে অনেক কিছুই পড়তে হয়, জানতে হয়, জানাতে হয়। যারা কলমের যুক্তির জবাব অস্ত্র দিয়ে দেন বা দিতে চান তারা এই সত্যটি অনুধাবন করতে চান না, বা করলেও সত্যকে চেপে রাখতেই চান। কিন্তু সত্যের দু’একজন প্রকাশক বা প্রচারককে সরিয়ে দিলেই কি পৃথিবী থেকে সত্য মুছে যায়? সত্য বলবার দায়ে গ্যালিলিওকে যখন ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলো, বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিলো; তখনও নাকি আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই গ্যালিলিও বলেছিলে, ‘তারপরও কিন্তু পৃথিবী ঠিকই ঘুরছে।’ অর্থাৎ কেউ বললেই কি আর না বললেই কি, যা সত্য, তার তো কোনো পরিবর্তন হওয়ার নয়। হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশেকুর বাবু কিংবা অনন্ত বিজয় দাসদের মতো কয়েকজনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু যা বাস্তবসত্য, তাকে কি পৃথিবী থেকে মুছে ফ্যালা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই সমাজ-ধর্ম-কাল সবকিছুকে পিছনে রেখে একদিন গ্যালিলিওরাই ইতিহাসের সত্যদ্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন; মৃত্যুর সাড়ে তিনশ’ বছর পরে এসেও ক্ষমা চেয়ে নেন সংশ্লিষ্ট ধর্মবেত্তাদের উত্তরসূরিরা। হয়তো অভিজিৎ রায়দের বেলাতেও এরকমের পরিণতি হবে। না হলেও এগিয়ে যাবে সভ্যতা। মানুষের অনিরুদ্ধ অগ্রগতি। আর এগিয়ে নেওয়ার কাজে আঁধার পথের যাত্রীদের জন্যে আলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন অভিজিৎ রায়ের মতো অমর মানুষেরা।