Archives

ক বি তা

প্রবালকুমার বসুর কবিতা

হয়ত অকাতরেই

কী দিয়েছি? দিয়েছি কি কিছু তোমাকে
তাৎক্ষণিকের চিহ্ন বিহিত জলও
অকারণে শুধু দিয়েছি অবিশ্বাস
আর অন্ধকার, ঢেকে দিতে চেয়ে আলো

অক্ষম নাকি, এমন ভেবেছে যে নিন্দুকে
তুমিতো গ্রহণে কোথাও কৃপণ হও নি
আজ ফেরাবার কথা কেন তবে বলছ
হয়ত অকাতরেই দিয়েছি, যেমন ফুল ফুটে ওঠে মৌন

 

শোনো

পরিণতি কিছু নেই জেনে তবু অহেতুক সম্পর্ক গড়েছি
বৃষ্টির আগে ও পরে জেনে গেছি সুনিপুণ ছাতার ব্যবহার
এক অতি অনিবার্য স্থিতি তার ক্রমান্বয় নিবিড় প্রশ্রয়ে
উপেক্ষা করেছি যত ভালো থাকবার মত মেধাহীন সরল প্রস্তাব
অকারণে বারবার বিভ্রান্ত করেছি তবু সেই
সকলে চেয়েছে দিতে আনুগত্য কিছুটা বা নিয়মমাফিক
চেয়েছে একান্ত হতে, প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে খালি
ভেঙে ভেঙে খ- খ- আরো খ- হতে হতে শেষে
সম্ভাবনা কিছু আর অবশিষ্ট নেই জেনে সমীকরণের মত হয়ে
নির্দিষ্ট থেকে গেছি, যদিও তা আংশিক প্রতিশ্রুতিহীন

উন্মোচন

দিতেই কষ্ট বুঝি, নিতে কষ্ট নেই?
এত যে নিয়েছি তবু হাত কেন তালি
দেবার পরেও পরিপূর্ণ যেই তালু
অসফল প্রয়াস যেন, অযথার্থ সেই উন্মোচন
প্রকারান্তরে সেই কষ্ট রাখা জেনে
আমি তো দিই নি কখনো
নিয়ে যদি থাকি নেহাতই কৌতুহল বশে

 

কাকে চাইব?

কাকে চাইব? চাওয়ার ঠিক আগে করতে হবে তাকেই তো নির্বাচন
ছেনি কর্ণিক নিয়ে বসে আছি, সঙ্গে বালি মাটি জল
নির্ধারিত করতে হবে, কতটা তাৎক্ষণিক এই চাওয়া
নাকি দীর্ঘ হবে উদ্যাপন, চাওয়ার চতুর অছিলায়
স্পর্শও করব তাকে, যেভাবে বালি মাটি জল ধরেছি গড়তে
তাকেই গড়েছি, যেন নিখুঁত নির্মাণ
অথচ এমনই কি চেয়েছি আমি? গড়ার পরেও কেন দ্বিধা?
ত্রুটিহীন নির্মাণ দেখে মনে হয় অসম্পূর্ণ গড়েছি
বারবার ভেঙেছি তাই নির্মাণ, যা মনোমত নয়
বালি মাটি জল শুধু অপচয়ই করেছি
কাকে চাইব? সমস্ত চাওয়াই দেখেছি শেষমেষ অন্যায্যই হয়

*****************************************************

 

মাহবুব বারীর কবিতা

নাসরীনের বাড়ি

‘যাও পাখি বলো তারে সে যেন ভোলে না মোরে’

এই রাস্তায় সোজা যেতে হবে একদম, যতদূর যাওয়া যায়
গত বছর পিচ ঢেলে দিয়ে এই রাস্তায় মসৃণ করা হয়েছিল
আর এই বর্ষায়— মনে পড়ল, এক বর্ষায় দেখা হয়েছিল দুজনে—
এই বর্ষায় পিচ উঠে গিয়ে খোয়া উঠে গিয়ে খানাখন্দ, পানি—
তবুও এই রাস্তায়ই যেতে হবে, যেতে যেতে, যেতে যেতে পড়বে
চার রাস্তার মোড়, এটা একটা গোলকধাঁধা, থামতে হবে একটু
তবে শুনেছি পাঁচ রাস্তার মোড়ও আছে, তা থাক, চিহ্ন ধরে ধরে
চিহ্ন ধরে ধরে এগোতে হবে, এই যে ক্লিনিক, এই ক্লিনিকের রাস্তা ধরে
তারপর গার্লস স্কুল, বয়েজ স্কুল, পুলিশ ফাঁড়ি, মসজিদ মন্দির
তারপর একটি বাজার, তারপর আঁকাবাঁকা পথ—
এই আঁকাবাঁকা পথ যায় সুদূরে- পরের লাইন মনে নেই,
সুদূর না, তবে দূর তো বটে, দূরে একটি কলেজ সেই কলেজ
ভাগ করে যে রাস্তা গেল, সেই রাস্তায়ই যেতে হবে
আবাসিক এলাকা, আবাসিক এলাকার সব রাস্তা বাদ দিয়ে
যেখানে একটি কোচিং সেন্টার আছে ছাত্রদের ছাত্রীদের
তার পাশ দিয়ে যে রাস্তা আটকে গেল শেষ প্রান্তে
সেই বাড়ি— কার বাড়ি?

নাসরীনের।

 

মন পবনের ঢেউ¬ ৩

আমার তুমি কী হাল করেছ
একবার এসে দেখে যাও
না আছি ডাঙ্গায় না আছি জলে
শুধু শূন্যে ভাসি।


আমি কোনো ছান্দসিকের মতো ছন্দ জানি না
এমনকি সাধারণ ছন্দজ্ঞানও নেই
আমার মন কখনো মাত্রা মানে না
আমার তোমার ব্যাপার তো মাত্রা ছাড়া।


প্রশান্ত, তোমাকে কতবার বলেছি তার আর পর নেই
প্রশান্ত তার পরও কেন বলো— তারপর তারপর!
অনেক তারপর আছে যার পরে তারপর নেই—
যে নদী মরুপথে হারায়
যে নদী সাগরে হারায়
যে আকাশ নীলে, যে বৃক্ষ বনে, যে পথ পথে
আর যে হৃদয় হারায় আর এক হৃদয়ে তার আর পর কী?
তারপর?
তারপর এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার
চার থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে ছয়, ছয় থেকে সাত
সাত থেকে আট, আট থেকে নয়— তারপর শূন্য।


যতদূর সামনে যাই
ততদূর পেছনে,
পেছনে কী? পেছনে মায়া
আর সামনে? সামনে মরিচীকা।


অন্ধকার গভীর হলে
আর কোলাহল স্তব্ধ
তখন সমস্ত দেহ বিন্দুর মতো
মনের গভীরে ডুব দেয়,
জানতে চাই, জানতে চাই
আমি কে? কেউ বলেনা কিছু
নিরুত্তর এসে উত্তর দিয়ে যায়।

*****************************************************

কুমার দীপের কবিতা

পুরাণের নারীরা ফিরে এলে
[বাল্মিকী-ব্যাসদেবকে স্মরণপূর্বক]

আমি সীতা
খেটে খাওয়া কিষাণী-কন্যা
পিতৃসত্য পালনের জন্য
রাম বনে যেতে চায়, যাক
তিনি হীনবল হলে আমিই বসবো সিংহাসনে
আমি হবো রানি।

আমি শূর্পণখা
রাবণের বোন;
ঘরে বধূ রেখে
রাম এসেছেন পঞ্চবটি
সঙ্গে লক্ষণও
কীভাবে দু-ভাইয়ের সঙ্গে ডেটিং করতে হয়
আমি জানি।

শকুন্তলা আমি
মেনকার মেয়ে
এখন অঙ্গুরীয় লাগে না
ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়েছি ঘরে
প্রণয় পিয়াসী দুষ্মন্তরা–

এসো
আমি পৃথা
কুন্তী নামে খ্যাত
স্বামী নির্বীর্য হলে কী হবে !
ফার্টিলিটি সেন্টার আছে তো
প্রিয়, দুঃখ নিও না, একটিবার শুধু —
হেসো।

নামটা- দ্রৌপদী
পাঞ্চালিও বলে কেউ কেউ
একজন এসে আমাকে জয় করবে
পাঁচজনের মনোরঞ্জনে যেতে হবে
এ নিয়ম মানি না;
পারো যদি, ভারতীয় সিরিয়ালে এসো
জনে জনে প্রেম বিলাবো, কাটিয়ে দেবো
প্রণয়ের  দৈন্য

বেহুলা সুন্দরী
চাঁদ বণিকের বৌমা আমি;
আমার দুঃখে কাঁদতে হবে না কাউকে
বিশ্বকর্মাকে এবার ছুটি দিয়ে দাও
কার্বলিক এসিড রেখেছি
কুঁড়েঘরেও আর ঢুকবে না

মনসার সৈন্য।

*****************************************************

শামীম সাঈদের কবিতা

সংসার

আর নিরালোক নক্ষত্রের প্রসঙ্গ যখন এলো,
তোমরা বললে—কৃষ্ণ কৃষ্ণ, রাধে রাধে, রাধে কৃষ্ণ!
আর রাধার রন্ধন শৈলীর কথা তো তোমরা জানতে,
অশৈলী সংসার, হা-ঘর, একটা দরজা ঘরের ভিতর,
দরজাটা উন্মূল, দরজার বাহির ঘর, এই অভ্যন্তর ব্যঞ্জনা…
আর শিকড়, মূলত অবতার, কালে কালে ডুকরে ওঠে লোকালয়ে,
মুক্তির কথা বলে; আর প্রেমে প্রেমে বেলা ডুবে গেলে তোমরা বলো—
এ মূলত চেনা চাঁদের দাসত্ব যার নিজের কোনো আলো নেই,
আর নক্ষত্র যখন নিরালোক, চাঁদের অন্ধকার তখন মর্মর,
আর তোমাদের মর্মের ভিতর সতত রাধা খেলা করে—
ফলে, তোমরা বলে ওঠো—কৃষ্ণ কৃষ্ণ, রাধে রাধে, রাধে কৃষ্ণ!
সমোচ্চারে, নিরালোক চাঁদ ডুবে গেলে পর…

*****************************************************

 

সৈয়দ তৌফিক জুহরীর কবিতা

ঘুরছে মানুষ, ঘুরছে চাকা

একটি আধুলি কুড়িয়ে পেয়েছিলো এক ভিক্ষুক
শৌচকাজের সময় তা ছিটকে পড়ল ড্রেনে
প্রস্রাবের ছাঁট ভিজিয়ে দিচ্ছিল সেটার দেহ, তবে
পথ-চলতি কেউ টের পায়নি একদম
এক ভিখিরি বালকও এলো একই কাজে
তারপর এলো বাস ড্রাইভার, চা-অলা এবং ফুলপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক
আধুলি লুকিয়ে গেলো নোংরা জলের আড়ালে; দেখে মনে হলো
যেন মুখ লুকিয়ে সে নিভিয়ে দেবে তার আধুলি-কথা
সেই ভিক্ষুক এবার ভিখিরি বালককে ডেকে বলল, ‘নিবি না-কি,
নে কুড়ায়া নে!’ আধুলি তখন ড্রেনের জলে ডুবে আছে।
বালকটি কিছুক্ষণ সেই আধুলির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর
বলল, ‘ছিহ্!’
তাতে কী হলো? কেবল ফুলপ্যান্ট পরা ভদ্রলোকটি
প্যান্টের জিপার লাগাতে ভুলে গেলেন!

*****************************************************

 

মাওলা প্রিন্সের কবিতা

সবুজ শৈশব সহজ খেলনা

শীর্ণ চাঁদের মতো ক্ষয়ে গেছে কি তোমার শৈশবের সবুজ রোদ—
হঠাৎ বন্যার মতো ধুয়ে গেছে কি তোমার কৈশোরের কমলা কবিতা—
মৃদু স্মৃতির মতো মুছে গেছে কি তোমার যৌবনের প্রাণপ্রপাত জলরাশি—
সবার ভেতরে একটি যুবক লাটাই হাতে ঘুড়ি উড়ায়—
সবার ভেতরে একটি কিশোর রঙিন কাগজ হাতে ড্রয়ার সাজায়—
সবার ভেতরে একটি শিশু খেলনা হাতে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়—
যতোই তুমি অস্ত্র বানাও— যুদ্ধ বাঁধাও— বিদ্যা শেখাও অভিনব—
সবুজ শৈশবের সহজ খেলনাগুলো অস্বীকার করবে কীভাবে;
তোমার ভেতরের সবুজ শৈশব কমলা কৈশোর হয়ে
জ্যোতিষ্মান যৌবন হয়ে জয় করে চলেছে
তোমার পৌঢ়ত্বের পতন!
শিশুর ছায়ায় পৌঢ় পৃথিবীতে ফিরে আসে সবুজ শৈশব সহজ খেলনা।

*****************************************************

কদলি ও কবিতা

কথা

এক.

খুব প্রিয় ও পুষ্টিকর বিধায় জনৈক ভদ্দরলোক বাজার থেকে এক হালি সুদৃশ্য পাকা কলা কিনে আনলেন। কিন্তু খাওয়ার সময় মনে হলো : অপোক্ত, কৃত্রিম উপায়ে পাকানো; খাওয়ার পর : বিস্বাদ, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, অস্বস্তির এক ছার। ফলটির প্রতি বিতৃষ্ণায় বুক ভরে গ্যালো তার।

দুই.

কলা’র লা-টাকে ফেলে দিয়ে যদি ‘বিতা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়, তাহলে ক্যামন হয় ? ভাবছেন তাই আবার হয় নাকি? বিস্বাদ, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব…এর সাথে কবিতার আবার কী সম্পর্ক? আছে। বাজারে য্যামন রাশি রাশি কদলি ফলের অধিকাংশই অকালপক্ব ও বিবিধ পার্শ¦প্রতিক্রিয়াশীল; তেমনি ভরি ভরি কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে, যার একটা বিরাট অংশ আবাল হাতের, কৃত্রিম ভাবযুক্ত এবং পাঠোত্তর অনুভূতিতে আবর্জনাস্বরূপা।

তিন.

কলার য্যামন ভেতর-বাইরেই কলা হতে হয়, তেমনি কবিতারও হতে হয় ঘরে-বাইরে কবিতা। নামে বা বাইরের চেহারায় কবিতা হলেও ভেতরে কবিতার কোনো সুর যদি না থাকে, প্রকৃত পাঠকের অন্তরে যদি অপরূপ অনুভূতিতে ব্যঞ্জিত না হয়; তবে সে কোনো প্রেমিকাই নয়; শরীরসর্বস্ব নিশিরঙ্গিনীর চাইতেও খেলো, অপাঙ্ক্তেয়। আবার শরীর ছাড়া প্রেম য্যামন অনেকটা কাল্পনিক, অপূর্ণ অনুভবসদৃশ; তেমনি কবিতারও কবিতার মতো শরীর থাকতে হয়। কখনও কখনও প্রথাগত ছন্দ, অলঙ্কার বা অন্য কোনো শৃঙ্খলার বাইরেও কবিতা হতে পারে, কিন্তু অন্তরে একটা অকপট গতিসৌন্দর্য, বক্তব্যভাষার একটা অমোচনীয় অনিন্দ্য আবেদন না থাকলে কবিতা শিল্পিত সুন্দর হতে পারে না। অমরত্ব লাভ করেছে অথচ ছন্দ ও অন্যান্য শরীরী সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে, এমন কোনো কবিতা : আমাদের সাহিত্যে আছে কি ?

কবিতা

ট্রেনে যেতে যেতে

হোক সে রাত্রি ভ্রমণ, শীতরতি, মিতরব আঁধারের সাঁই

তা’বলে, জানালারহিত রেল ! নৈব নৈব চ, ভাই!

‘এটা চেয়ার কোচ, জানালা চাইলে সুলভে যান।’

সুলভেই ! দুর্লভদিগের বুঝি নেই চোখ-কান!

চোখ আছে, দৃষ্টি নেই; সেই চোখ, চোখে রাখো ক্যানো ?

জানালার অনালাপে ভ্রমণ ভিখিরি হয়, জেনো

সুতরাং,

কোনো অনাগত যাত্রীর জানালা লাগোয়া আসনে

বসলাম চুপে, আনমনে।

ভেতরের আলো ভুলে অন্ধকার ধরণীতে রাখলাম চোখ

অনুভবে জ্বললো আলোক;

ধানের ক্ষেত, গানের চাষা

সীমাহর সবুজের সুকুমার ভাষা

শীর্ণ শিশুদল, জীর্ণ জনপদ; কদাচিত জীবনের ঘনো মূলতবি

আগেকার সেইসব চিরায়ত ছবি

আজ নেই,

দৃষ্টি তবু ছুটে চলে ওই আঁধারেই!

পৃথিবীটা আজ আঁধার ভেলায় ভাসে

চোখ দুটো থেমে গ্যালো পচিম আকাশে

আশে-পাশে আগুন নেই; তবু কী সবিস্ময়ে পুড়ে যাচ্ছে চাঁন্!

আমাগো নারান কামার কি তার দা’য়ে দিচ্ছে শান!

তাই ক্যানো হবে?

সে তো মরেই গিয়েছে ক’বে!

মেয়ের ইজ্জত গেলে, থাকে কোনো বাপ?

তা’বলে মালাউন ! মালাউনের ঠাপ!

কুকুরের হিস্যু সহ্য সয়

সংখ্যালঘুর উচিতবচন কখনই নয়!

ঘর গ্যালো, মণ্ডপের মূর্তিগুলো পুড়ে হলো ছাই

নারানের জীর্ণ খুড়ো কেঁদে বলে, ‘ঠাকুর! তুমি আছো? না কি নাই?’

সন্তানেরা নারানের খুনের বিচার চেয়ে, শেষে

নিজেরাই গিয়েছে যে ভেসে!

নারান কামার আর হারুন মোড়ল এক নয়, আইনের বাঁধা চোখে

এমনই জেনেছে লতিকা; ধর্ষিতা নারানকন্যা; আরও ক’জন লোকে।

তাই,

ভিটে-মাটি পড়ে আছে, সুখেনেরা নাই।

পড়ে আছে ! নাকি হারুন কিংবা করিমেরা গড়েছে নতুন কোনো বাড়ি?

আজও জানিনা, জননীর মতো সেই গ্রামখানি কতো দিন, আমিও এসেছি ছাড়ি!

পশ্চিম আকাশে নেই মাজাভাঙা চাঁদ; কোথা গ্যালো, মুখপোড়া?

নারানের দা’য়ের মতন জ্বলে যার চোখজোড়া!

চোখ ঘষে বার বার, তাকাই আকাশে; দা নয়, চাঁদও নয়

দানব আগুনে পোড়ে মানব হৃদয়!

কুমার দীপ’র প্রবন্ধ

সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র : প্রতিদর্পণে চিহ্নিত রূপ

বাংলা সাহিত্যের সমালোচনামূলক গদ্যে যাঁদের কলম, এই সময়ে স্বচ্ছলতার নিরিখে অনিন্দ্য; শহীদ ইকবাল তাঁদের অন্যতম। ছোটকাগজ চিহ্ন (অতি সম্প্রতি, ১৪তম সংখ্যা থেকে এটি কেবল সাহিত্যের কাগজ) সম্পাদক, তারুণ্যদীপ্তি অধ্যাপক, মুক্তপ্রাণ ড. ইকবালের চতুর্থ গ্রন্থ সাহিত্যের চিত্র চরিত্র (বইমেলা : ২০০৭), একজন সংস্কৃতিবান বোদ্ধা পাঠকের সমাজদর্শনাশ্রয়ী নিবিড় পর্যালোচনা। মহীরূহ রবীন্দ্রনাথ থেকে মুকুলিত বিষ্ণুবিশ্বাসও তাঁর আলোচনায় সানন্দে দীপ্যমান।
যতদূর জানি, শহীদ ইকবাল রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ নন, রবীন্দ্রধ্যানে সদামগ্নও নন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথে তাঁর আকুলতা কিংবা আবিষ্টতার কমতি নেই। ‘সৃষ্টিশীল ভাবুক’-এ তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন, অনেকের কাছে অমার্কসীয় বলে গৃহীত, অথচ সর্বপিপাসী রবীন্দ্রনাথকে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যাঁর সৃজিত বারিবিশ্বে বাঙালির মন্ত্রমুগ্ধ অবগাহন; সেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ড. ইকবালের অভিনব উচ্চারণ, ‘রবীন্দ্রনাথ পিতৃদেবের উপনিষদ বা প্রাক্-মতাদর্শের বিশ্বে তোয়াক্কা না করে মূলত নিজের
বিশ্বাসের জ্ঞানকেই গ্রহণ করেছেন।’ অথচ আমরা তাঁকে উপনিষদের সন্তান বলেই জানি– রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞগণ তাই-ই জানিয়েছেন। কিন্তু আজকের এই সাইবার পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ কতোটা প্রাসঙ্গিক? ইকবাল বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়ছে এবং তাঁর উচ্চারণমন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে একদিকে যেমন নানাভাবে দলিত করেছে অন্যদিকে তেমনি মাটির কাছাকাছি মানুষদের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ত দান করেছে।’ বহুকথিত এই কথাটির সাথে ঈষৎ দ্বিমত পোষণের সুযোগ আছে বৈকি। কেননা, রবীন্দ্রসাহিত্যে মাটির কাছাকাটি মানুষের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ততার কমতি নেই একথা সত্য, কিন্তু উদ্দিষ্টদের রবীন্দ্রচর্চা কিংবা রবীন্দ্রজ্ঞান যেহেতু প্রশ্নাতীত নয়, সেহেতু দান করার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ হতে পারে।
আর অতুল্য অসাম্প্রদায়িক কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে শহীদ ইকবালের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ, তবে তর্কাতীত নয়; বিশেষত, প্রতিক্রিয়াশীলতার কাছে। একথা সত্য যে, নজরুলের যে চেতনা তা ভারত কিংবা পাকিস্তান (তাঁর ভাষায় ‘ফাঁকিস্তান’) নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু একথাওতো সত্য স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলকে রাষ্ট্রায়িত করার প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নপ্রদায়ী! অসুস্থ বধির বোবা কবিকে নাগরিকত্ব দেওয়া, টুপি পরিয়ে (টুপিত্ব আর টিকিত্ব দুটোই কবির অপছন্দ ছিলো) একুশে পদক প্রদান, কিংবা মৃত্যুর পর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দানসুস্থ, যথার্থ নজরুলের কাছে এগুলো অকল্পিত। জীবন্মৃত বা মৃত মানুষকে নিয়ে এমন টানাটানিও যেমন অমর্যাদাপ্রসূত তেমনি এতদ্সংক্রান্ত কর্মপ্রক্রিয়াও প্রশ্নসাপেক্ষ। তবু যশীর জন্ম যেমন গো-শালে হলেও জগতে তাঁর মহত্ত্ব স্বীকৃত, তেমনি প্রদানক্রিয়া যেমনই হোত কোটি কোটি বাঙালির কাছে নজরুল প্রাসঙ্গিক আদ্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কবি রূপে গর্বিত।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতোই কংক্রিটপ্রতীম গদ্য ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা– বিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদ’। যিনি শহীদ ইকবালের গদ্য সম্পর্কে একেবারেই অবিদিত, তাঁর কাছেও আর সন্দেহ থাকে না লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কে। নিখিল অনিত্যের কবি সুধীন দত্ত, যাঁর কবিতা পাঠের জন্য অভিধান পাশে রাখতে হয়, পাঠোত্তর ভাবনার জন্য বোদ্ধা হতে হয়, দুর্বোধ্যতার কাঠগড়ায় যাঁর কবিতা দূরপ্রাচ্য, সেই শব্দব্রহ্মা সম্পর্কে শহীদ ইকবালের মূল্যায়ন, ‘সুধীন্দ্রনাথের কাব্য জুড়ে যৌক্তিক রোমান্টিকতায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগের পরিমণ্ডল চোখে পড়ে সেখানে কাব্যের উৎপত্তি এবং উৎপত্তির পরতে যে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব কবিকে কাব্যের প্রতি অনিবার্য করে তোলে, সেটা বোঝাই সবচেয়ে বড় কাজ। বোধকরি এমনটা বুঝলে সুধীন্দ্রনাথ যেমন দুর্বোধ্য থাকবেন না তেমনি তিরিশের অন্যান্য কবিদের মাঝেও নিরর্থক হারিয়ে যাবেন না।’
জসীমউদ্দীনকে নিয়ে লেখা অনুল্লেখ্য গদ্যটির (জসীমউদ্দীন : কবি) পর পুনরায় ইকবালের প্রেক্ষণীয়তাকে চিহ্নিত করা যায় ‘সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা : বিরূপ স্বদেশের প্রসন্ন চিত্ররূপ’ পাঠে। বলতে দ্বিধা নেই, এলেখা পড়তে পড়তে আমার পূর্ব ধারণা; যাতে কেবল কথাসাহিত্যালোচনাতেই ইকবালকে স্বচ্ছন্দ জানতাম–তা পাল্টে গেল। কবি ও কবিতার আন্তর্জগতে প্রবেশের অনিরুদ্ধ অধিকার তিনি আদায় করে নিয়েছেন যেন। বিখ্যাত ‘সমকাল’ সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সম্পর্কে শহীদ ইকবালের প্রত্যয়ী উচ্চারণ, ‘পরিকল্পিত শব্দবুনুনি নয়, নিছক উচ্চারণের অনুরাগ এবং করোটির ভেতরের অভিজ্ঞতাসজ্ঞাত অনিবার্যতা তাঁর কবিতার শ্রেয়জ্ঞান।’ গ্রন্থস্থ শেষ কবিতাগদ্য ‘আবিদ আজাদের কবিতা : সংগুপ্ত কাতরতার অবিনাশী উচ্চারণ’ আবিদের কবিতার ন্যায় মুগ্ধবৎ পড়ে ফেলা যায়। অকালপ্রয়াত আবিদ আজাদ বিষয়ে ইকবালের যথার্থ মূল্যায়ন, ‘গতানুগতিক নন আবিদ, অনেক কবির মাঝে-অনেক কবিতার তোড়ে, তুলতুলে আবেগে ভাসানো কবি নন আবিদ; আবিদ প্রেমকে অর্থহীন বা মৃত্যুকে অর্থহীন করে তুলতে পারেনকিন্তু স্পষ্ট ও পরিষ্কার-জীবন তাঁর আলেখ্য; জীবন তাঁর কাম্য-জীবনকে প্রেমী ও সুখী করে সংগুপ্ত কাতরতার পলে পলে বিশ্বাসের বাঁধনে নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা দিতে চান এবং প্রচেষ্টায় স্পর্শ করেনও তা তিনি।’ অবশ্য আবিদকে ‘বড় কবি’ বললেও তাঁর দিকগুলোও তুলে ধরতে ভোলেননি। যেমন, ষষ্ঠ কাব্য ‘তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?’ (১৯৯৯) তে ‘নিছক প্রকৃতির তরল পিয়াসে আপ্লুত হওয়া ছাড়া’ কোনো নতুন মেসেজ নেই স্পষ্টতই বলেছেন ইকবাল।
কথাসাহিত্য বিশেষত, উপন্যাস বিষয়ক গদ্যরচনায় শহীদ ইকবাল পূর্ব পরীক্ষিত। প্রথম প্রকাশিত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৯৯)-এ তার প্রমাণ মেলে। একচল্লিশ পৃষ্ঠার গদ্য ‘শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে’ ইকবালের এম.এ ফল প্রকাশের পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল রাজশাহীর প্রধান দৈনিক ‘দৈনিক বার্তা’য় শুক্রবাসরীয় সাহিত্য পাতায়; ২৯ মার্চ থেকে ১৪ জুন ১৯৯৬ পরিসরে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি; সুবোধ-শ্রীকুমার থেকে কবির-সামাদীসহ অনেকেই অনেক মৌলিক কথাবার্তা বলেছেন, তাই বলে কি বলার কিছুই নেই? আছে। আছে বলেই আলোচ্য প্রবন্ধের অবতারণা। ইকবাল কেবল কাহিনী ভোজনে তৃপ্ত নন; সমাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, বুর্জোয়াবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতিপ্রভৃতি সমাজবীক্ষণের আলোতে কাহিনীর কুশীলবগুলোকে ছিঁড়ে-ফুঁড়ে পরিচয় করিয়ে দেন পাঠকের সামনে। শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী থেকে সতীশ-সাবিত্রী-সকলেই শানিত ব্যবচ্ছেদে দীপ্তমান। গদ্যটির দু’একটি চরণ তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা যায় না। যেমন, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম শতক সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আমাদের নিদ্রার ঘোরে সাদা মেধাবীরা গড়ে দিয়েছে তাদের সভ্যতা।’
আর শরৎচন্দ্রনির্মিত চরিত্র সম্পর্কে কয়েকটি আচমৎকার উচ্চারণ–যদিও তাঁর হৃদয়বৃত্তির আতিশয্য কিংবা আবেগবহুল সমাজসংস্কার, ন্যূব্জ সমাজনীতি, দুর্বল কমিটমেন্ট নিয়ে সমালোচকদের নানা মত প্রচলিত আছে, তার সত্যতা স্কন্ধে ধারণ করেই বলব–তিনি গণতান্ত্রিক চরিত্রকে প্রমাণ করেছেন।’
শ্রীকান্ত চরিত্রাঙ্কনে লেখকের কৃতিত্বের কথা বলেছিলেন; এ প্রতিভা ‘বাংলা উপন্যাসে খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হল।’ শেষাবধি শরৎচন্দ্রকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, ‘শরৎচন্দ্র বড় মাপের সাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা উপন্যাসে অবক্ষয়ী সামন্তবাদ, ক্ষয়িষ্ণু সমাজবাস্তবতা, চলমান ব্যক্তির আত্মব্যবচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ মাত্রিকতা পায়। শরৎচন্দ্র এ সময়েরই প্রতিনিধিত্বকারী। তাঁর উপন্যাসে সমাজ এসেছে, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত নির্মিতি পেয়েছে, ব্যক্তির স্পন্দন ও চলিষ্ণুমানতা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে, সহজেই ধরা পড়ে তাঁর এ চিত্রায়ন খণ্ড খণ্ড ছাড়া ছাড়া গোছের। সামাজিক অবয়ব অসংগঠিত, ব্যক্তি সেখানে স্থবির গতিহীন।’
বিরল কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিষয়ক গদ্যচর্চায় ড. শহীদ ইকবাল অগ্রগণ্যদের অন্যতম; ইলিয়াস স্পেশালিস্ট। তাঁর প্রথম এবং ইলিয়াস বিষয়ে বাংলার প্রথম একক গ্রন্থ কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর পাতায় পাতায় ইলিয়াসের গল্পোপন্যাস নিয়ে সূচালো ব্যবচ্ছেদের নমুনা পূর্বলক্ষিত। আলোচিতব্য চিলেকোঠার সেপাই : উপন্যাসের আঙ্গিকে ক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তি মানুষ’ ও ‘আখতরুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা : স্বপ্নবাস্তবতার চিত্ররূপ’ গদ্যদ্বৈত্যেও মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। প্রমাণত, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রূপদক্ষ কারিগরের মতো ভাষায় সৃষ্টি করেন প্রাণনা, প্রাণসৃষ্টি এবং তাঁর গ্রন্থপরিকল্পনায় দান করেন জৈবিক জীবনায়নের অনুভূতি। আধুনিক প্রকরণের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বসে ঊনসত্তর-সময় এবং হাজার বছরের বাঙালির প্রত্নজীবনাভিজ্ঞতা সাধ ও সাধ্যের সম্ভাব্য বাতাবরণে নির্মাণে প্রয়াস পান।’ কিংবা বাংলা সাহিত্যের অতুলনীয় উপন্যাস খেয়াবনামার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, চরিত্রসমূহের মাটিলগ্নতা, ঔপন্যাসিকের উদ্দেশ্য ও শিল্প নিপুণতা সম্পর্কে ইকবাল বলেন, ‘তাঁর কোন বিষয় উদ্দেশ্য নির্ভর না; কাহিনীর গতিময়তায় সমাজ সুন্দরের প্রেক্ষণ একটা অনিবার্য তাগিদেই যেন চলচ্চিত্রায়ন ঘটে, দৃশ্যপট বদলায়। Anti-Romantic  ভাবনায় ভাষার নিপুণ প্রয়োগে এমন পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করেন, যেখানে আগ্রাসী পুঁজিবাদে ক্লিন্ন ব্যক্তি খোলস ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে। Expressionist, Surrealist Impressionist ভাবনায়; সংক্ষুব্ধ জীবনজটিলতার মনস্তাত্ত্বিক ইমেজ ব্যাখ্যা হয়। কখনো হ্যালুসিনেশন কিংবা ইল্যুশনের আওতায় ব্যক্তিসত্তার ভিন্নস্বর বেরিয়ে আসে।’
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে শওকত আলীর স্থান শীর্ষসারিতেই। ইতিহাসের এক জটিল সময়কে আরো জটিল প্রকরণে পরিস্ফুটনের যে প্রয়াস শিল্পী করেছেনতাকেই বিশেষায়িত করতে ইকবালের ‘শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন’। উপন্যাসবিষয়ক আরো দু’টি গদ্য-‘রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি : ব্যক্তি মনস্তত্বের নিরীক্ষা’ ও ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাস’। দুটোই সুখপাঠ্য কিন্তু দ্বিতীয়টি গ্রন্থানুসারে অনেকটা বেমানান।
‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অবাস্তব’এই অবিস্মরণীয় শ্লোগানে মুখর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পৌরহিত্যকারী, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এর প্রবাদপুরুষ কাজী আবদুল ওদুদ সম্পর্কে কাজী মোতাহার হোসেন, অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, আবদুল হক, আনিসুজ্জামান, খোন্দকার সিরাজুল হক–এঁদের মূল্যবান রচনা রয়েছে। শহীদ ইকবালের ‘কাজী আবদুল ওদুদ : প্রসঙ্গ ও পর্যালোচনা’ আমাদেরকে আরো আধুনিকভাবে, প্রগতিশীলতার সাথে ওদুদকে অনুধাবন করতে সহায়তা করে।
একেবারে শেকড়সন্ধানী, সমাজপ্রত্যয়ী শিল্পজিজ্ঞাসামূলক অনুপম গদ্য ‘আমাদের সাহিত্যের জিজ্ঞাসা সূত্র’। সাহিত্যের যারা লেখক, পাঠকসকলকেই জানতে হবে, সাহিত্য কী? সাহিত্য কেন? একটা জাতির জন্যে সাহিত্যের স্থান কোথায়? যাচিতভাবেই ইকবাল বিশ্বাস করেন, সাহিত্যরচনার সূত্রটা আমাদের জীবনের নিরঙ্কুশ বাস্তবতা থেকেই সরাসরি উঠে আসা উচিত, আমদানিকৃত কোনো যাদুপ্রবণতা থেকে নয়। দৈনিক, মাসিক বা মেলাভিত্তিক, জনপ্রিয় বা ফরমায়েশি রচনা শিল্পসার্থকতা তো নয়ই, সমাজের জন্যও মঙ্গলার্থক নয়এ বিষয়ে ইকবাল দ্বিধাহীন। কেননা, ‘অধিকাংশগুলোরই পরিপ্রেক্ষিত নায়ক-নায়িকার শরীর-ছোঁয়া রোমান্টিক প্রেম কিংবা চুমুর গল্প। বর্তমান বেপথু আগ্রাসী ইলেকট্রনিক্স-এর সমাজে মধ্যবিত্ত পরিবারের টিন এজারদের সুড়সুড়ি দিয়ে আঠালো বিকৃত হৃদ্কম্পন ঘটিয়ে কিছু সময় সেন্সশূন্য করে রাখার প্রয়াস।’ কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার যে জটিলতা, নৈরাশ্যবোধ কিংবা আত্মপরিচয়ের যে সংকটতারই উত্তরণে যেখানে সাহিত্যের কাছে যাওয়া, ‘সেখানে আন্তরসঞ্জাত জীবন চেতনায় শিল্পীর দৃষ্টি যদি নতুন মাত্রিকতা না পায়, অনন্ত জীবনের পথে উৎসাহ না সৃষ্টি করে, প্রকৃত সমাজস্তরের ভিত না কাঁপায়, তবে কিসের সাহিত্য, আর কিসের বা জীবনের সার্থকতা?’
বহু বছরের বহু মনীষীর চিন্তা-চৈতন্যের দ্বারা, মননের বিবর্তন ঘটেছে আমাদের। ঐতিহাসিক কিংবা ঐতিহ্যিক সব বিচারেই আমরা বাঙালি। তবুও বৈপরীত্যের বিষ ছিটাতে চায় যারা, তাদের উদ্দেশ্যে ইকবালের উক্তি, ‘যে অর্জনে অর্জিত হয়েছে আমার দেশ, ভাষা–তা আমার হৃদয় নিঃসৃতি আকুতি, সেখানে মিশে আছে আমার চৈতন্যের, প্রাণনার উৎসের ফুলেল পটভূমিসেটাই আমার জাতি পরিচয় আর বাঙালিত্ব।’
কিন্তু এ নিয়ে এতো দ্বিধা কেন এখন? হাজার বছরের অর্জনকে বা দীর্ঘ শ্রমে-ত্যাগে অর্জিত মননবৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার অর্থ কী? (মনন চিন্তার বিবর্তনবাঙালি ও বাংলাদেশ)। গ্রন্থের শেষ গদ্য ‘একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য : বিবেচনার ইঙ্গিত-এর সূত্রবিন্দু উনবিংশ শতাব্দী; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য নিয়ে সত্যই বোধ হয় বলার সময় আসেনি। শহীদ ইকবালও স্বীকার করেন। কিন্তু হতাশাও লুকিয়ে রাখতে পারেন না। বলেন, এখনকার সাহিত্যে যা রচিত তার অধিকাংশ সত্য নয়সত্য পাই না। আমরা উদ্ধৃত পংক্তিমালা চাই যা আমাদের সত্যকে বলবে, আমাদের অন্তরের সত্যকে স্পর্শ করবে; নইলে সাহিত্যের চলে কী করে সাহিত্যই বা বলবো কাকে? তথাপি ঈষৎ বিচ্যুতি সাহিত্যের চিত্র-চরিত্রকে কিঞ্চিৎ নমিত করেছে মাঝে মধ্যে। যেমন, প্রবন্ধানুক্রমে প্রকাশকালিক কিংবা লেখাভিত্তিক কোনো ধারাবাহিকতাই সুলক্ষ নয়। উপন্যাসগদ্যে শরৎ-রবীন্দ্র-ইলিয়াস-শওকত-ইলিয়াস-টলস্টয় কোনো ক্রমিকতা বিধান করে কি? দ্বিতীয়ত, প্রায় সব গদ্যের শুরুই প্রাক্-ভূমিকা সজ্জিত; যা প্রায় একই কিংবা গতানুগতিক, কখনো বা বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! ‘শতাব্দীর সমান বয়েসী সুধীন্দ্রনাথ’ কিংবা ‘উপন্যাস শিল্প সামন্তবাদ থেকে বুর্জোয়া উত্তরণের ফসল’এ জাতীয় কথামালা হাজির হয় বারবার। তৃতীয়ত, বাংলা সাহিত্য সমালোচনার অন্দরমহলে ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাসকে বৈমাত্রেয় মেনে নিলেও ‘থিয়েটার চর্চা এবং তার দায়বদ্ধতা’ গদ্যটি একেবারেই অনাত্মিক মনে হয়। চতুর্থত, ১৯৯৬ থেকে ২০০৫, দশ বছরব্যাপী প্রকাশিত গদ্যগুলো বৈবর্তনিক প্রক্রিয়াতে ভিন্ন ভাষা বৈশিষ্ট্যে উপস্থিত।
এতদ্সংক্রান্ত নেতিবাচকতা সত্ত্বেও সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র গভীরে অনুধ্যানের দাবি রাখে। বিশেষত, ‘মার্কসবাদী ক্রিটিসিজমকে আয়ত্ত করবার প্রাণান্ত চেষ্টা’য় নৃতাত্ত্বিক সমাজবীক্ষণের প্রেক্ষাপটে, যুক্তিপূর্ণ শিল্পপ্রেক্ষণের পূর্ণতটে, শহীদ ইকবারের গদ্য স্বচ্ছতোয়া নদীর মতো; পিয়াসী পথিক সেখানে সহজেই হতে পারে অপ্লুত, তৃপ্ত অতঃপর পরিণত। সমাজকে ধারণ করে সাহিত্য; যাকে আমরা দর্পণ বলি– সেই দর্পণেরই প্রতিদর্পণ রচনা করেন ইকবাল। তাঁর গদ্য শুকনো খটখটে নয়, রস আছে সেখানে। গদ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কবিতা, বিশেষত রবীন্দ্রকবিতার সুর, ঝংকৃত হয় কৃতবিদ্য ইকবালের কলমে। যদিও একই গ্রন্থে ভিন্ন সুরের দ্যোতনা মেলে, কিন্তু তা কেবল রচনাকালিক ব্যাবধানের কারণে। এবং এই ভিন্নতা লেখকের ক্রমবিবর্তনের পরিচায়কও। এ যদি ব্যাহত না হয়, একজন ঋদ্ধ গবেষক অধ্যাপকই শুধু নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অবারিত এক গদ্যশিল্পীকেও শিরধি করবো নিশ্চয়।