Archives

পাঠ : এ্যালবাম সম্পাদক : মনজু রহমান : রাজশাহী

শরতের দরজায় হেমন্ত শিশির ভেজা পায়ে কিছুটা আগেই কড়া নাড়ে। এই শরৎ হেমন্তের মধ্যলগ্নে বিশ শতকের সত্তর দশকে পথে নামে এবারের এ্যালবাম। মনজু রহমানের (জ. ১৯৫৬) সম্পাদনায় কবিতার ছোটকাগজ এ্যালবাম। প্রাচীন কাল থেকে কবিতার যে পথ চলা তার; আধুনিককালে এসেও অনেক দীর্ঘ। আর এই দীর্ঘ পথের সঙ্গী হয়েছে এ্যালবাম। আধুনিক কালে ফেসবুক, টুইটারে যখন একদল আসক্ত ঠিক অপরদিকে মনের কল্পনা ভাবনা চিন্তাকে আরেকদল কবিতা, গল্পে ভরে তুলছে। তরুণদের প্রেরণা উচ্ছ্বাস ও লেখালেখিতে আজও বেঁচে আছে অনেক ছোটকাগজ। বয়সের তারুণ্য নয় মনের তারুণ্যই বাঁচিয়ে রাখে ছোটকাগজকে। শিল্প সহিত্যের ছোটকাগজ এ্যালবামের প্রচ্ছদে যেন এক কাগজের তৈরি প্রাচীন স্থাপত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন খালিদ আহসান। এ সংখ্যাই ষাট দশকের কবি ও সাড়া জাগানো লিটলম্যাগ বিপ্রতীক (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৭) এর সম্পাদক প্রয়াত ফারুক সিদ্দিকীর (১৯৪১-২০১৪) স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। আলোচ্য সংখ্যাটিতে কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলি, তার নির্বাচিত কবিতা, কবির চিঠিপত্র, বিপ্রতীক-এ প্রকাশিত লেখা পুনঃমুদ্রণ, পাঁচ দশকের পঞ্চাশজন কবির গদ্য-পদ্য এবং সর্বশেষে গ্রস্থালোচনা স্থান পেয়েছে।
কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে উঠে এসেছে অনেক কথা। ফারুক সিদ্দিকীর জীবনের ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র, লিটলম্যাগ সর্ম্পকে নানা কথা উঠে এসেছে এখানে। ৬৭-এর বিপ্রতীক শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজে এক জ্বলন্ত শিখা। ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে জোয়ার শুরু হয় তার অগ্রভাগে ছিলেন কবি ফারুক সিদ্দিকী। সুদীর্ঘকাল সম্পাদনা করে গেছেন বিপ্রতীক। তবে বিপ্রতীক, এর প্রথম সংখ্যাটির যৌথ সম্পাদক ছিলেন, মহাদেব সাহা ও কাজী রব। প্রকাশক ছিলেন ফারুক সিদ্দিকী। বাংলার কাব্যাঙ্গনে এক আলাদা মাত্রার লিটল ম্যাগাজিন বিপ্রতীক। ফারুক সিদ্দিকী বগুড়ায় জন্ম নিয়ে জন্ম দেন ছোটকাগজের। তিনি একাধারে কবি ও সম্পাদক হিসেবেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। তিনি মাত্র দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। একটি কাব্যগ্রস্থ স্বরচিহ্নে ফুলের শব অপরটি প্রবন্ধগ্রন্থ তামসিক নিসর্গে ঈশ্বরনামা ও অন্যান্য। তিনি সবসময় প্রতিষ্ঠা-বিরোধী চেতনা আমৃত্যু লালন করে গেছেন। তার লেখার মধ্যে এক ধরনের ভিন্ন ভাব, ভাষা, ছন্দ ছিল। শব্দকে তিনি ভালোবাসতেন তাই তাঁর কবিতা মানেই শব্দময়-‘আনন্দ, চিরায়ু রৌদ্রে পৃথিবীর রূপরেখাময় মৃগনাভিরাঙ্গা। ক্রমভয়াল পথ মোচনের উঠে আসা বেপুথপদ আশ্বাস’ (কৃষ্টিতে মৌমাছির চিত্র) ফারুক সিদ্দিকী ছিলেন সহজ, সরল ও শিশুসুলভ। তিনি শুধু কবিতাই লেখেন নি, কবিতা বিষয়ক গদ্যও লিখেছেন অনেক। তিনি কবিতাকে ঐতিহ্যাশ্রিত শিল্পরীতিতে সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহ্যের গণ্ডি পার হতে চাননি। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেনÑ ‘বাস্তবতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের কষ্টকর গ্লানির একরৈখিক দৈর্ঘ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ কবিদের বিষয়বস্তু আজও হতে পারেনি। ফলে কবিতা অনেকাংশে হৃদয়-সংবেদী হয় না, ‘ভুঁইফোঁড়া, মর্মহীন মনে হয়’। কবি ফারুক সিদ্দিকী জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন ছোটকাগজের প্রতি। আর কবিতা যেনো তার জীবনেরই একটি অংশ। ফারুক সিদ্দিকীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চারজনের কথায় এসবই উঠে এসেছে। সত্তর দশকের কবি মনজু রহমানের সঙ্গে ষাটের দশকের কবি ফারুক সিদ্দিকীর একটা ভালো যোগাযোগ ছিল। আলোচ্য সংখ্যাটিতে ফারুক সিদ্দিকীর লেখা নয়টি পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। পত্রগুলোর প্রাপক মনজু রহমান। অধিকাংশ পত্রে প্রেরক মনজু রহমানের কাছ থেকে ভালো প্রবন্ধ লেখা চেয়েছেন সেটিই তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতা এক বিশাল সমুদ্র। অনন্ত, অসীম। আর এই বিশাল সমুদ্রে কবি খালিদ আহসনের যাত্রা শুরু দেশ স্বাধীনতার সময় থেকে। নিজের অনুভূতি ছাড়াও অন্যের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তার কবিতায়। প্রত্যেক কবিরই একজন প্রিয় কবি থাকে, তেমনি খালিদ আহসানের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ। তার মতে, ‘রবীন্দ্রনাথ যেন বাঙালির এক পরম আশ্রয়, আত্মার অনাবিল শান্তি’। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, সামাজিক ঘটনা সবই যেন কবিতায় তুলে ধরেন কবি খালিদ আহসান। তার নদী নেমে এলো কবিতায় দেখিÑ ‘নদী তুমি কোথা থেকে এলে/ পাহাড় গড়িয়ে নামলে/ পাহাড়ের বুক চিরে ফিরে এসে/ আমার সাদা কাগজের উপর থামলে/ কলমের পাশে দাঁড়ালে’। দৃশ্যরূপ, কল্পনা এবং নিরাশ্রয় অশরীর ভাবরূপগুলোকে একত্রিত করে অপরূপ মূর্র্তিতে বচন শিল্প, শব্দশিল্প ও বাক্যশিল্পের দ্বারা কাব্যকে সম্পূর্ণতা দান করে নাজমীন মর্তুজা। নারী, চাওয়া পাওয়া, সতী, বাঁদরামি খেলা, ব্রজধাম এই পাঁচটি কবিতার বেশিরভাগ স্থানেই তিনি নারীকেন্দ্রিক কথা বলেছেন। নারীরা প্রেমে পড়লে কত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়েও পাথরের মত শক্ত হতে পারেন তা তিনি নারী, কবিতার মধ্যে দিয়ে বুঝিয়েছেন। ‘তৃপ্ত প্রেমে পড়া নারী/ যমুনা সেতুর মত শক্ত/ তক্তার উপরে সানন্দে শুয়ে থাকে/ প্রেমে পড়া মেয়ে।’ তার কবিতার মধ্যে দুঃখ, কান্না, রাগ অভিমান, প্রেম-বিরহ, আনন্দ, শূন্যতা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তার কবিতার মধ্যে ছন্দের গঠনগতরূপ তেমনভাবে প্রকাশ পায়নি। কাব্যিক ভাব, ভাষা, ছন্দ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন কবি শামীম হোসেন। তার কবিতার মধ্যে প্রকৃতির চিত্রই বেশি চোখে পড়ে। কবিতার লাইনে তিনি যেন এক মহুয়া নারী। আত্মকেন্দ্রিক কবিতায়Ñ ‘আমাকে বাঁধার আগে বেঁধো তুমি স্বরের কুসুম/ এই মাটিগন্ধী মন প্রজাপতি হবে-/ নৌকার গলুই ধরে পাড়ি দেবে সমুদ্রের পথ।’
বেদনার রং কি তা হয়তো না জানলেও একটা ধারণা যে তা নীল। আর এই নীল যে শুধু বেদনা, কষ্টের প্রতীক তা নয়। নীল যে ব্রহ্ম, নীল যে আকাশ, নীল কৃষ্ণ-জনার্দন হতে পারে তা বুঝিয়েছেন কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী, তাঁর নীলাভিলাষ কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন নীলের জয়গান গেয়েছেনÑ ‘নীলের মধুতে তুমি শ্রীমধুসূদন/ নীলের যাতনা জ্যোতি কৃষ্ণ-জনার্দন।’ শাসক কবিতায় তিনি কবিতার নামকরণের যে সার্থকতা তা তিনি অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। শাসকের রূপ তুলে ধরেছেন। কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কলম হাতে সৃষ্টি করেছেন কবিতার।
প্রেমের বিরহে কেউ হয়েছে সন্ন্যাসী, কেউ হয়েছে পাগল আর কেউ হয়েছে কবি। কবি তৌহিদ ইমামের কবিতার জন্ম বিষণœতা থেকে। আর এ বিষণœতা প্রেমের। সংরক্ত, পরকীয়া, রাত্রিপুরাণ-১, রাত্রিপুরাণ-২, লোনা জোয়ার, সংগীতিকতায় এই পাঁচটি কবিতার প্রত্যেকটি কবিতায় ধরা দিয়েছে প্রেম, বিষণœতা। সংরক্ত কবিতায় দেখিÑ ‘মাঝে মাঝে মনে হয়/ আমিই কেন হলাম না তোমার প্রথম প্রেম?/ কেন আমার জন্যই ফুটল না তোমার আদিম হৃৎপদ্ম?’ কবিতার ভাষার মধ্যে এক ধরনের কামনা ভাব জাগ্রত করেছে কবি এবং কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও ধরা পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে।
কবি প্রত্যয় হামিদের কবিতার মধ্যে পরিচিত শব্দের নতুন করে ব্যবহার এবং ভাবনার দিকগুলো ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে। নারীকে স্পর্শ করার আকাক্সক্ষা প্রত্যেক মানবেরই থাকে। আর এই স্পর্শ ১ থেকে ৫ সংখ্যক কবিতায় এই ধারণাগুলোই কাব্যিক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রেম, ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে স্পর্শ করার যে অনুভূতি তা তিনি বুছিয়েছেন এই ভাবেÑ ‘এই ঠোঁট, এই হাতের তালু-/ এগুলো আমি, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম।’
মাহমুদ হাসানের মুক্ত গদ্য সাতমাথার স্বপ্নের ফেরিওয়ালা-তে বগুড়া শহরের সাতমাথার মোড়ে তার যে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে তা তিনি উপস্থাপন করেছেন। নিজের জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে তুলে ধরেছেন এখানে। কবি হওয়ার স্বপ্ন, কবিতা প্রকাশের ইচ্ছা, লিটন ম্যাগাজিনের সাথে সম্পর্ক সব রকম কথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। মৃত্যুর কাছাকাছি এসেও তিনি আজও কবিতা লেখেন। কবির জীবনে নানা কবি চলে গেছেন না ফেরার দেশে, কেউ হয়তো কবিতা ছেড়ে দিয়েছেন আবার কেউ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন কবিতাকে এসব কথায় ভরে তুলেছেন মুক্তগদ্যটিকে।
রৌদ্রবঞ্চিতলোক শিবলী মোকতাদির রচিত মুক্তগদ্য। এই মুক্তগদ্যে তিনি কাব্যিক রূপ, ভাষা, ছন্দ প্রয়োগ করে লিখেছেন। তবে এটির ভাব জানা একটু কষ্টকরই বটে। কবিতাকে নিয়ে লেখা এই মুক্তগদ্যটি এক নতুন আঙ্গিকে লেখা। এবং তা কিছুটা হলেও দুর্বোধ্য। এই মুক্তগদ্যটিতে বারবার একটি চরিত্রেরই সন্ধান পাই তা হল ইমারত আলী।
মনজু রহমানের কবিতায় রাজনীতি, সমাজ, অবক্ষয় ও কাল উদ্ভাসিত হয়ে নারীর মুখ ও অনুভবের চিত্ররূপে। এক আলাদা শব্দ ও প্রতীকের ব্যঞ্জনায় অনুরণিত হয়েছে তার কবিতায়। আর অনেক শব্দ কবিতার অলঙ্কার হয়েছে। কবিতার গাঁথুনি, ভাষার প্রয়োগ, ছন্দ, উপমা সবকিছুই যেনো ধরা দিয়েছে তার কবিতার মধ্যে। ‘আমি কেন নতজানু হবো চপল কৃষ্ণ তোর মোহনী রূপে!/ যদি নত হই, চলে যাবো বনলতার চোখের উঠোনে।’
সর্বশেষে মনজু রহমানের কাব্য জয়তি নিয়ে আলোচনা করেছেন অনুপম হাসান। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জয়তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার প্রেক্ষাপট আর প্রতিচিত্র। জয়তু মাতৃভূমি। আর এই মাতৃভূমিকে কীভাবে লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে তারই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র এক নারীকে প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হয়েছে জয়তি কাব্যে।
ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা থেকেই হয়তো কবিতার সৃষ্টি, আর এই সৃষ্টির স্রষ্টা হলেন কবিরা। আধুনিককালের যে কবিতা এর সাথে জড়িয়ে আছে মুখশ্রী। কবিতায় শব্দ প্রয়োগ একটি বড় বাহক এ সম্পর্কে ঝ.ঞ. ঈড়ষবৎরফমব বলেছেন ইবংঃ ড়িৎফ রং ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ আলোচ্য সংখ্যাটিতে অনেক তরুণ, প্রবীন কবির কবিতা পাই। প্রত্যেকের লেখার ধরন ভিন্ন ভিন্ন, তবে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্বল। সবই যে কবিতার গাঁথুনিতে এ্যালবাম আরও বড় হোক, সর্বত্র বিস্তার করুক। এ্যালবামের প্রতিটি পাতায় এক একটি কবিতা চিত্র হয়ে উঠুক। নবীন-প্রবীন লেখকদের দীপ্ত লেখায় এটি শাণিত হোক নিয়ত।