Archives

জুলফিকার নিউটন’র অনুবাদ

ওলে সোয়িংকা : ক্যামউড অন দ্য লীভস্

[ক্যামউড অন দ্য লীভস্ (Camwood on the Leves) নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। এটি একটি বেতার নাটক। ১৯৬০ সনের নভেম্বরে লাইজেরিয়া ব্রডকাস্টিং করপোরেশন নাটকটি প্রচার করে। ১৯৭৫ সালে-তে প্রচারিত হয় বি.বি.সি. থেকে। এটি একটি বেতার নাটক হলেও মঞ্চনাটকেও রূপান্তরিত হতে পারে বলে মনে করা হয়। পশ্চিম আফ্রিকার য়ুরুবা সভ্যতার সঙ্গে পাশ্চাত্য সভ্যতার টানাপোড়েন নিয়ে গড়ে উঠেছে এ নাটক। যুক্ত হয়েছে প্যাগান ও খ্রিস্টানদের দ্বন্ধ। ঐতিহ্যের উৎসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন নাট্যকার। এ সমস্যাকে অবশ্য আড়ালে রেখে তিনি দুটি প্রজন্মের সংঘাতকে তুলে ধরেছেন। সে হিসেবে এ নাটক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
Camwood শব্দটি বেশ অপ্রচলিত। সাধারণ ইংরেজি অভিধানে নেই এ শব্দ। যাইহোক, অভিধানে এর অর্থ পাওয়া যাচ্ছে The red wood of Basita Millida imported the Gaboon used chiefly for dyeing purpose, also for violtin bowls.রঙ করার উপযোগী একধরনের গাছের রস যা বেহালার ছড় ঘষতেও লাগে। এটি একেবারেই আফ্রিকার স্থানীয় কোনো গাছের রস। আমাদের দেশেও অবশ্য এ ধরনের গাছের রস আছে। নাটকের প্রথম গানটির মধ্যে ( যা আবার শেষ গানও বটে) শব্দটি রয়েছে।
এ নাটকের লেখক ওলে সোয়িংকা আধুনিক আফ্রিকার উল্লেখযোগ্য লেখক। নাইজেরিয়ায় তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালে। গোড়ায় গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তিনি খ্যাতিমান নাট্যকার বলেই। তারঁ প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয় ১৯৫৯ সালে। তারপর ‘এ ড্যান্স অব দ্য ফরেস্টস’, ‘দ্য লায়ন অ্যান্ড দ্য জুয়েল’, ‘বিফোর দ্য ব্ল্যাকআউট’, ‘কংগোস হারভেস্ট’, ‘ডেথ অ্যান্ড দ্য কিংস হর্সম্যান’, প্রভৃতি নাটক তার খ্যাতিকে পৃথিবী ব্যাপী করে তুলেছে। তাঁর এ খ্যাতি তাঁকে দিয়েছে নানাধরনের পুরস্কার। অবশেষে তিনি পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার ১৯৮৬ সালে।]
চরিত্রলিপি
মোযি রেভারেন্ড এরিনযোবি: ইসোলা: মোর্যুনকে॥ মি. ওলুমোরিন।
মিসেস ওলুমোরিন। শিশুর দল, মানুষ, জনতা প্রভৃতি
ঘটনাস্থল পশ্চিম আফ্রিকার একটি ইউরোবা শহর:
‘অগবে’ গান : ১
শিশুর জন্য শোকে ‘অগবে’ তাকে মুড়ে রেখেছিল নীলে
শিশুর জন্য শোকে ‘অলকে’ ক্যামউড রঙ করেছিল মাটি
শোকার্ত বাবা পেতলের ঘণ্টা এনেছিল জোর করে
কিন্তু আমরা বাস করতে পারি না বেশি করে এসব নিয়ে
তাহলে আমরা জড়িয়ে পড়ি ঈশ্বরের সঙ্গে নিয়তির খেলায়।

(প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দে শুরু।)
মোযি : দরজা খোল! ইসোলা দরজা খোল। (দরজায় আবার ধাক্কা দেয় সে) ইসোলা, তোর মায়ের দোহাই, মিনতি করছি বাপ আমার, দরজা খুলে দে আমাকে… আমাকে কথা বলতে দে তোর সঙ্গে, দোহাই….. বাপ আমার…. দরজা খোল। (আরো মরিয়া হয়ে) ইসোলা, তোকে আমি কি করেছি? আমাকে বদ্ধ দরজার বাইরে রেখেছিস কেন? বাবা আমার, ঈশ্বরের ক্রোধ আমাদের বাড়ির ওপর নেমে আসবার আগেই খুলে দে দরজটা। (তাঁর ধাক্কা আরো মরিয়া হতে থাকে একটি শিশু কাঁদতে শুরু করে, বাচ্চাদের ক্ষীন পায়ের আওয়াজ বেশ কাছেই, তাদের একজন শিশুটিকে থামাবার চেষ্টা করছে।) ইসোলা, আমাকে কি শুনতে পাচ্ছিস না? আজকের দিনটিতে আমাকে লজ্জা দিতে চাইছিস? শোন বাপ তোর ভাই বোনগুলোর কথা ভাব…ইসোলা আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না? আমি হাঁটু গেড়ে বসে আছি। তোর ভাই বোন সব্বাই মিলে তোকে মিনতি করছে। আমার জন্যে একটু দোহাই তোর। আমি কথা বলব ওনার সঙ্গে। তুই দরজা খোল। তোর অনুতাপ হয়নি এমন কথা ভাবতে দিস না ওনাকে। দোহাই তোর দোহাই…. দরজা খোল….
এরিনযোবি : (নিচ থেকে) কোথায় সে? মোযি? কোথায় ওটা?
মোযি : স্ স্ … বাচ্চাটাকে সরিয়ে নিয়ে যা। জলদি… পাশের ঘরে নিয়ে যা, দরজায় তালা লাগিয়ে দে…জলদি…হায় ঈশ্বর, এখন করি কি…আমি এখন কি করব? (ভারি পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে।) (মরিয়া হয়ে ফিস্ফিসে স্বরে) ইসোলা, এখনো উনি এসে পৌঁছোননি, এখনো পৌঁছোননি। এখনো আসেননি, এখনো, বাবা আমার…এখনো বেরিয়ে আসতে পারিস…কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিস… যা তোর মন চায়… আমি তোর কেনা হয়ে থাকব, শুধু দরজাটা খোল বাপ আমার…
এরিনযোবি : (উঠতে উঠতে) মোযি!
মোযি : হায় আমি শেষ হয়ে গেলাম…হে ঈশ্বর আমার শেষ।
এরিনযোবি : মোযি নিচে যাও।
মোযি : রেভারেন্ড…
এরিনযোবি : নিচে যাও, মোযি।
মোযি : রেভারেন্ড, ও তোমারই ছেলে…যাই করে থাক না কেন ও তোমারই ছেলে…
এরিনযোবি : নিচে, নিচে, নিচে যাও! বাচ্চাগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে যাও।
মোযি : ও তো একগুঁয়ে নয়, রেভারেন্ড। তুমি ভেবো না ওর অনুতাপ হয়নি। ও নিজের ঘরে বসে প্রার্থনা করছে। প্রার্থনা করছে মার্জনার জন্য। (এরিনযোবি নড়ে, পাশের ঘরটি খোলে, শিশুটির কষ্টের কান্না সহসা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। )
এরিনযোবি : নিচে যাও, তোমরা সবাই। সব্বাই মায়ের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে থাক। কারুর কোনো আওয়াজ শুনতে চাই না আমি, শুনতে পাচ্ছ তো সাফ কথা? একটু আওয়াজও নয়। (ছোটদের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় দ্রুত। মোজি ফুঁপিয়ে যেতেই থাকে, বিড়বিড় করে বলে।)
মোযি : এ দিনটা দেখার জন্য আমি বেঁচে আছি…এ আমারই পাপের শাস্তি কিন্তু হে মহান প্রভু, আমাকে কি শাস্তি দিতে পারতে না অন্য কোনো ভাবে? আমার ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে নয়, হে প্রভু, আমার ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে নয়…(নিচে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।)
এরিনযোবি : মোযি!
মোযি : এ এক কঠিন বিচার প্রভু…আমার শক্তি নেই…সইবার শক্তি আমার নেই…আমার পাপের শাস্তি আমাকে দাও…কিন্তু এভাবে নয়, প্রভু, এভাবে নয়…
এরিনযোবি : মোযি, এমন ব্যবহার করতে তোমাকে বারণ করছি আমি…
মোযি : রেভারেন্ড, আমি দুর্বল মেয়েমানুষ, তোমার মত শক্তি আমার নেই।
এরিনযোবি : তাহলে শক্তির জন্য প্রার্থনা করো। কিন্তু আমার কানের কাছে গোঙাবে না।
মোযি : সে তোমার ছেলে, রেবারেন্ড…
এরিনযোবি : আমার ছেলে? আমি ওকে ত্যাজ্য করেছি। সে আমার ছেলে নয়… তোমারও নয়!
মোযি : না না, আমাকে দাবী জানাতে দাও। আমাকে কথা বলতে দাও ওর সঙ্গে। আমি ওর মা।
এরিনযোবি : ঈশ্বরের অসন্তোষকে তুমি ভয় পাও না? আমি বলছি, এ প্রাণীটিকে নিয়তির হাতে সমর্পণ করো।
মোযি : কেমন করে করি? না, আমি পারব না রেভারেন্ড, পারব না। ঈশ্বর দয়ালু। ও আমার ছেলে-।
এরিনযোবি : বলছি তো, ও তোমার ছেলে নয়। ওলুমোরিনের মেয়ের অসম্মান করেছে ও…আমাকে ফেলেছে লজ্জায়…ও তোমার ছেলে নয়…
মোযি : না, ও আমারই ছেলে। আমি ত্যাগ করতে পারি না ওকে। ও তোমার ছেলেও রেভারেন্ড, তুমি ত্যাজ্য করতে পার না ওকে।
এরিনযোবি : মোযি! শয়তানের ঐ সৃষ্টিটাকে যতবার নিজের ছেলে বলে ঘোষণা করছ ততবার তুমি পাপ করছ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে।
মোযি : রেভারেন্ড।
এরিনযোবি : আমার বিচারে ন্যায্যতা প্রমাণ করবার জন্য আমি সাক্ষী মানব ঈশ্বরকে। (স্তব্ধতা) নিচে যাও, মোযি। তোমার হৃদয় যদি চায় তাহলে প্রার্থনা করো ওর জন্য। কিন্তু ভয় হচ্ছে ওর উদ্ধারের আশা আর নেই।
মোযি : (আবেগমুক্ত থাকার চেষ্টা চালিয়ে) তোমার হাতেই ওকে সমর্পণ করে যাচ্ছি রেভারেন্ড, ছেড়ে যাচ্ছি ঈশ্বরেরও হাতে। রেভারেন্ড যদি দেখতে চাইতে তাহলে দেখতে ও প্রার্থনা করছে নতজানু হয়ে। ও জানে ও পাপ করেছে, ও জানে তা। তাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে নিজের হৃদয় নরম করবার জন্য। সামান্য একটু সময় দাও ওকে, রেভারেন্ড, অল্প একটু সময়।
এরিনযোবি : আমি অপেক্ষা করছি। ঈশ্বরের বিচার দ্রুত নেমে আসে না।
মোযি : দয়ালু হও।
এরিনযোবি : ঈশ্বর দয়ালু। নিচে বাচ্চাদের কাছে যাও, তুমি। দরজায় তালা দিয়ে দাও। (মোযির ক্লান্ত পদধ্বনি সিঁড়িতে ধীরে মিলিয়ে যায়। একটি দরজা খোলে এবং বন্ধ হয় ধীরে, তালায় চাবি পড়ে। এরিনযোবি একটি চেয়ার টানে, বসে।)
এরিনযোবি : আমি অপেক্ষা করছি।
স্তব্ধতা। তারপর গান:
আমি আনন্দ পাই খামারের মানুষের মতো রাঙা আলুর টুকরোয়
আমার ভোজ ভুট্টা দিয়ে ‘সাঙ্গো’ উপাসকের মতো
আমার পিঠ শিশুটির আশ্রয় পবিত্রতম মায়ের মতো
এ শিশু তোমাকে -তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
এ যমজ তোমাকে-তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
এবং যমজের একটি তোমার নিজেরই রক্ত আর মাংস
(গোধূলির শব্দের সঙ্গে গান মিলিয়ে যায়। দৃশ্যান্তর। রাত-পেঁচা, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁর আওয়াজ। দুটি মানুষ ঝোপের মধ্যে শব্দ করে চলেছে।)
মোর্যুনকে : এর চাইতে মশাল ভাল ছিল না কি? হেই? ইসোলা?
ইসোলা : অ্যাঁ, কি বলছ?
মোর্যুনকে : আমার কথা শুনছ না। আমার কথা তুমি শুনছ না।
ইসোলা : শুনছি তো!
মোর্যুনকে : না, শুনছ না। এখনো কি তোমার বাবার কথাই ভেবে যাচ্ছ? আজ যা ঘটল সেই সব?
ইসোলা : না না। সেসব মন থেকে আমি ঝেড়ে ফেলেছি। হ্যাঁ কি বলছিলে বলো।
মোর্যুনকে : বলছিলাম একটা মশাল থাকলে ভালো হত।
ইসোলা : আমি তো বরাবর লন্ঠন দিয়েই কাজ সারি।
মোর্যুনকে : কিন্তু এখন কি তুমি খুশি হওনি মশালটা আমি চুরি করে এনেছি বলে? আমার উপর রেগে গিয়েছিলে তুমি, কিন্তু এখন কি তোমার মনে হচ্ছে না ওটাই দরকারি ছিল বেশি?
ইসোলা : আমি লন্ঠনই পছন্দ করে এসেছি কেননা কাজে লাগানো যায় সহজে। যাকগে, বল তোমার কেমন লাগছে? কিছু যে বদলে গেছে লক্ষ্য করছ না?
মোর্যুনকে : কিসের বদল?
ইসোলা : মাটির দিকে তাকাও। আজ রাতে কোনো ছায়া পড়েনি আমাদের। গাছেদের ছায়া পড়েনি একটুও।
মোর্যুনকে : আহ, ছায়া আমার ভাল্লাগে না। এতে বরং ভয় করছে কম।
ইসোলা : সত্যি কথা বল। বল ভয় পেতে তুমি ভালবাসো। ভালবাসো যখন ছায়া থাকে আমাদের।
মোর্যুনকে : (হাসছে) পা-গুলো বেশ মজার। পথ চেয়ে অর্ধেক ওঠে তারা, তারপর কাঁপতে থাকে ঝোপে এসে…লাঙ্গা…লাঙ্গা…লাঙ্গা… লাঙ্গা…আগেরের মত।
ইসোলা : জোলির পা-ওয়ালা আগেরে। (মোর্যুনকে হাসে) দেখছ, তুমি নিজেই পছন্দ করছ লন্ঠন।
মোর্যুনকে : না না একটা মশাল অনেক কাণ্ডজ্ঞানের।
ইসোলা : ঠিক আছে, এই নাও একটা, বেশ বড়সড়ো। এনেছি সঙ্গে করে। ঝোলার মধ্য থেকে বার করে নাও। (শামুকদের ঘষাঘষির আওয়াজ) আর কটা আছে আমাদের?
মোর্যুনকে : না না, গুনবে না। বিমপে বলেছে শামুক গুনলে ভাগ্য খারাপ হয়।
ইসোলা : হুম, তোমার সেই আয়া। কত কথাই না বলে তোমাকে।
মোর্যুনকে : খুব জ্ঞানী মহিলাতা জানো। তার কথা মেনে চলা ভাল।
ইসোলা : বেশ ভাল কথা! মহিলাটি যদি না-ই গোনেন তাহলে আমাদের কাছে বিক্রি করেন কেমন করে?
মোর্যুনকে : আহ্-হা, তিনি বলেন বাজারে গুনলে দোষ নেই কোনো।
ইসোলা : কিন্তু শামুক যখন কুড়িয়ে বেড়ায়। এই তো পেলাম আরো দুটো…
মোর্যুনকে : আরে, মশাল বার করতেই তো বেরিয়ে এলো ওগুলো।
ইসোলা : ঠিক আছে, ঠিক আছে, মেনে নিচ্ছি আমি। ভাগ্যিস মশালটা এনেছিলে, খুব খুশি হয়েছি। তবে এটা আনা উচিত হয়নি তোমার। এটার মালিক তোমার বাবা। (ঝোপ সরানো ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ নেই।)
মোর্যুনকে : বল।
ইসোলা : ভাবতেই পারিনি, আজ তুমি বেরিয়ে আসবে।
মোর্যুনকে : কেন পারব না?
ইসোলা : ভেবেছিলাম ভয় পাবে।
মোর্যুনকে : কিসের ভয়? ওহ্, বুঝেছি। না, আমি তৈরি হয়েই এসেছি।
ইসোলা : তৈরি? কিসের জন্য?
মোর্যুনকে : এই দেখ। আলোটা এদিকে ঘোরাও।
ইসোলা : কি এটা? একটা বোনার কাঁটা?
মোর্যুনকে : হ্যাঁ। আর একটা ছোট্ট পাথর…এই যে।
ইসোলা : কি বলতে চাইছ তুমি
মোর্যুনকে : রাতের বদ আত্মাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায়।
ইসোলা : কি বললে?
মোর্যুনকে : বিমপে বলেছে আমাকে। যখন জানল আমি পোয়াতি, এসে বলল আমি যেন একটা পাথর আর তীক্ষè কোনো জিনিস নিয়ে বেরোই। বিশেষ করে রাতের বেলা। (ইসোলা হাসিতে বিস্ফোরিত) সত্যি কিন্তু একথা। কাকাকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি, তিনিও সায় দিয়েছেন।
ইসোলা : ঠিক আছে বাবা। আমিও বরং বিমপের কাছ থেকে শিখে নেব এসব। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব বাড়ির আয়ার মধ্যে ইনিই সব চাইতে জ্ঞানী।
মোর্যুনকে : ঠিক তাই।
ইসোলা : যাই হোক, শামুকগুলোর জন্য আমার কাছ থেকে দাম নিয়েছে বড্ড বেশি…তবে এ নিয়ে কিছু বলিনি আমি। শুধু ভেবেছিলাম, বিকেলের ঐ মারদাঙ্গার পর, বেরিয়ে আসার আর সাহস পাবে না তুমি।
মোর্যুনকে : কিন্তু সত্যি বলতে এ নিয়ে মাথা ঘামাইনি আমি।
ইসোলা : ঘামাওনি। ঘামাতে হয়ওনি। শুধু খবর পেয়েছিলাম তোমার মা বাবা মোড়ল মশায়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে খুন করার ধান্দা করছেন। মোটের উপর তোমাকে তাঁরা হিসেবের মধ্যেই আনেননি। ভয় পেয়েছিলে তুমি?
মোর্যুনকে : না, বেশির ভাগ ব্যাপারই ঠিক বুঝতে পারিনি। তোমার বাবা তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন কেন?
ইসোলা : জানি না। সম্ভবত নিজেকেই জানে না তিনি। ব্যাঙের ছাতাও কিছু কুড়িয়ে নেব নাকি?
মোর্যুনকে : না…না. রাতের বেলায় নয়।
ইসোলা : কিন্তু দেখ অঢেল জন্মে আছে এখানে। দেখ দেখ, সবগুলোর দিকে তাকাও।
মোর্যুনকে : খুব ভোরে এসে কুড়িয়ে নিয়ে যাব আমরা। বিমপে বলে খুব ভোরই হল এসব কাজ করার সময়। সকাল বেলার প্রথম কাজ। তখনই ওগুলো ডাগর হয় কেননা সারারাত ধরে তারা পান করে শিশির।
ইসোলা : আচ্ছা বল তো, তোমার আয়া জানে না এমন কিছু আছে কিনা?
মোর্যুনকে অল্পই তার অজানা।
ইসোলা : আচ্ছা, শামুক শিকার নিয়ে আরো কিছু নিষেধ আছে নাকি তার?
মোর্যুনকে : মধ্যরাত হল শামুক কুড়োনোর সেরা সময়। কেননা তখনই ত বাজারে যাবার সময়।
ইসোলা : সামনের বার তাকে নিয়ে এলেই হবে, আমরা তাহলে দোষের কিছু আর করব না। (ঝোপের মধ্যে খোঁজার আওয়াজ)
মোর্যুনকে : আমার মনে হয় ইসোলা, তোমার একটা লাঠি ব্যবহার করা এখানে ভাল। হাত দিয়ে এভাবে লাঠির কাজ করে ঝোপ ঠ্যাঙানো তোমার উচিত হচ্ছে না। যদি সাপ থাকে ওর মধ্যে?
ইসোলা : সাপ তো থাকতেই পারে।
মোর্যুনকে : তবে? তোমাকে যদি কামড়ায়?
ইসোলা : কামড়াবে না।
মোর্যুনকে : তাই নাকি? তোমার বন্ধু নাকি তারা?
ইসোলা : ঠিক বন্ধু নয়। তবু কামড়াবে না। তারা জানে আমি তাদের কামড়াতে পারি আরো জোরে।
মোর্যুনকে : কিন্তু দাঁতে তো তোমার বিষ নেই। ওদের আছে।
ইসোলা : কেমন করে জানলে? আমারও তো থাকতে পারে বিষদাঁত…জানো না আমি একজন পাদ্রীর সন্তান?
মোর্যুনকে : বেশ তো, তুমি না হয় চৌকস। আমি কিন্তু সাপকে কামড়াতে পারি না। আমাকে যদি কামড়ে দেয়?
ইসোলা : ঠিক আছে, বিমপেই না হয় তোমার হয়ে কামড়ে দেবে।
মোর্যুনকে : আহা-দেখো, বিমপেকে বলে দেব তুমি পছন্দ কর না তাকে।
ইসোলা : তোমার কথা বিশ্বাসই করবে না। (সামান্য বিরতি।)
মোর্যুনকে : ব্যথা পাচ্ছ না তো?
ইসোলা : কি বললে?
মোর্যুনকে : আমার হাত তোমার পিঠে। ব্যথা লাগছে না তো?
ইসোলা : না, কেন? (মোর্যুনকে আঘাত করে তাকে)
মোর্যুনকে : এবার? ব্যথা লাগছে না এখনো?
ইসোলা : কি হল? (মের্যুনকে আঘাত করে তাকে)
মোর্যুনকে : এবার? ব্যথা লাগছে না এখনো?
ইসোলা : কি হল? (মোর্যুনকে আবার আঘাত করে তাকে? আমাকে আঘাত করা থামাও।
মোর্যুনকে : দেখছিলাম তোমার পিঠে ব্যথা লাগে কিনা। উনি কি তোমাকে মারেননি? তোমার বাবা?
ইসোলা : না।
মোর্যুনকে : সত্যি বলছ তো? তোমাকে মেরেছিলেন উনি? বাড়ি ফেরার পর কি ঘটেছিল? তোমার মা কি বলেছিলেন? তুমি কিচ্ছু বলনি আমাকে।
ইসোলা : বেশি কিছু বলার যে ছিলই না। বাড়ি ফিরলাম, আমার দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম। তারপর বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন, জানালা দিয়ে পালিয়ে এলাম।
মোর্যুনকে : তোমার ঘর থেকে? কিন্তু সে তো দোতলায়।
ইসোলা : বাবা যে দরজা চেপে বসে রইলেন। পাহারা দিচ্ছিলেন। বাধ্য হয়ে লাফালাম জানালা ভেদ করে।
মোর্যুনকে : মরেও তো যেতে পারতে?
ইসোলা : না, পারতাম না। যাই হোক, লাফিয়ে পালিয়েছি, মরিনি।
মোর্যুনকে : কিন্তু এমনটি আর কক্ষনো কোর না। শপথ কর।
ইসোলা : ঘাবড়িও না। এমন করবার দরকার আমার আর হবে না।
মোর্যুনকে : কিন্তু উনি কি বলবেন যখন দেখবেন তুমি পালিয়েছ?
ইসোলা : মনে হয় আবার শাপমন্যি করবেন আমাকে। আবার শাপমন্যি করবেন, কেননা তাছাড়া তাঁর যে আর কিছু করবার নেই।
মোর্যুনকে : কেন? কেন করবেন? আমার বাবা মা তো শাপ দেননি আমাকে? দিয়েছেন কি? বুঝতে পারছি না। সব্বাই এমন শোরগোল করছে কেন? আর তোমার বাবা। তিনি তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে তোমাকে পিটতে চাইছেন। তোমাকে কি ঘৃণা করেন তিনি?
ইসোলা : (ব্যঙ্গ ভরে) কে জানে? …ছেড়ে দাও এসব। অনেক কুড়িয়েছি। তোমার জন্য একটা চমক জমিয়ে রেখেছি।
মোর্যুনকে : কই দেখি।
ইসোলা : অনুসরণ কর আমাকে।
মোর্যুনকে : খুব দূরে যেতে হবে।
ইসোলা : খানিকটা!
মোর্যুনকে : যদি হারিয়ে যাই আমরা?
ইসোলা : হারাব না। ভাল কথা, বিমপেকে বলো এসবের দাম আরেকটু বেশি করে ধরতে। এখন থেকে আমার টাকার দরকার আরো বেশি হবে। কিছু জিনিস জোগাড় করতে হবে আমাকে।
মোর্যুনকে : ইসোলা, তোমার জন্য কিছু নিতে দেবে না আমাকে? কক্ষনো খুঁজে পাবেন না তাঁরা। আমার বাবা টাকাপয়সা ছড়িয়ে রাখেন যেখানে সেখানে।
ইসোলা : না। বলেছি তো তোমাকে। তোমার বাপ মা’র টাকা আমি চাই না।
মোর্যুনকে : কিন্তু এ টাকা তো আমারো, তাই না? (সামান্য বিরতি) ইসোলা, তুমি আবার রাগ করলে?
ইসোলা : না। তুমি কিন্তু শপথ করেছিলে এসব কথা আর তুলবে না।
মোর্যুনকে : দু:খিত। দোহাই রাগ করো না।
ইসোলা : রাগ করিনি…চিনতে পারছ এ জায়গাটা?
মোর্যুনকে : না, একেবারেই না।
ইসোলা : এখন খুব সাবধান। আমার জামাটা খুব কষে ধরো। পথ এখানে ফুরোল।
মোর্যুনকে : কোথায় যাচ্ছি আমরা?
ইসোলা : গির্জায়। মনে পড়ছে না তোমার? গির্জার কথা!
মোর্যুনকে : গির্জা?
ইসোলা : অনেকদিন আগে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম একবার । বড় পাহাড়ের পাশে জায়গাটা। কতদিন হয়ে গেল…তখন খুব ছোট ছিলাম আমরা। আসলে তুমিই কিন্তু গির্জা নাম দিয়েছিলে ওটার।
মোর্যুনকে : একটা …পাহাড়…ওখানে?
ইসোলা : হ্যাঁ, বাঁশঝাড়ে ভরা।
মোর্যুনকে : ছোট্ট, একটা ঝোরা আছে ওখানে-তাই না?
ইসোলা : ছোট্টটি আর নেই এখন। পরিষ্কার একটা ছোট পুকুর বানিয়েছি আমি নিজে। অবশ্য এখন বলছি না, আগে দেখ।
মোর্যুনকে তুমি ঠিক জান পথ হারাইনি আমরা? কোনো পথের রেখা দেখতে পাচ্ছি না আমি।
ইসোলা : ভুল যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেছি সাবধান। প্রায় এসে গেছি আমরা।
মোর্যুনকে : (উত্তেজিত) ঐ যে পাহাড়টা।
ইসোলা : হ্যাঁ, কিন্তু যেটা দেখাতে চাই তোমাকে …সেটা ওটার ওদিকে। এবার চোখ বন্ধ কর…ঠিক আছে। সব…আমি তোমাকে ধরছি সাবধানে।
মোর্যুনকে : ওহ্…
ইসোলা : ঠিক আছো তুমি। পাহাড়ের দরিপথ ভেদ করে যাচ্ছ তুমি। মনে পড়ছে তোমার?
মোর্যুনকে : মনে পড়ছে। কত ছোট ছিলাম আমরা তখন।
ইসোলা : (হাসছে) এখনো কিন্তু খুব একটা বড় নও তুমি। ভয় পেয়ো না। এমনকি আমিও উঠে যেতে পারি কিছু না ধরেই। ঠিক আছে…না, এখনো হয়নি। একটু দাঁড়াও, আলোটা জ্বালি। (দেশলাই জ্বালার আওয়াজ।) ঠিক আছে, এবার চোখ খুলতে পার।
মোর্যুনকে : ইসোলা…এটা তৈরি করেছ তুমি!
ইসোলা : দেখ…এখানে এসো…ঐ যে তোমার ছোট্ট ঝোরা। মনে পড়ছে এখন? এই যে সেই বাঁশঝাড়…এই যে এদিকে। ওখানেই আমরা পেয়েছিলাম কচ্ছপের ডিম।
মোর্যুনকে : হ্যাঁ, মনে পড়ছে। ফিরে এসে লক্ষ্য করেছিলাম কি করে বাচ্চা বেরোয় ডিম ফুটে।
ইসোলা : দেখ দেখ…তাকিয়ে দেখ…মোযি মোযি…
মোর্যুনকে : মোযি? তোমার মা এখানে নাকি? ইসোলা, ওখানে কিছু একটা আছে… কিছু একটা নড়াচড়া করছে।
ইসোলা : হ্যাঁ একটা কিছু আছে নিশ্চয়ই। ভয় দেখিয়োনা ওকে…ঐ আসছে সে..তোমার এখনো মনে আছে ওকে?
মোর্যুনকে : (উত্তেজিত) তিনি এখনো এখানে? মা…এখনো এখানে…(ক্রমশ আরো উত্তেজিত) ইসোলা, সেই একই মানুষ তাই না? সেই এক মা। বলতে চাও তিনি চলে যাননি কখনো? এই পুরোটা সময়ে?
ইসোলা : তুমি ভয় পাইয়ে দিলে, তাই আবার গর্তে ঢুকে গেলেন উনি।
মোর্যুনকে : দু:খিত, সত্যি দু:খিত। আবার কি উনি বাইরে আসবেন না?
ইসোলা : হয়ত আসবেন আরো পরে। অচেনাদের ভয় পান উনি, আর এতদিনে ভুলে গেছেন তোমাকে। এখন শুধু চেনেন আমাকে। আমার স্বর শুনলেই বেরিয়ে আসেন।
মোর্যুনকে : চেষ্টা করো তাহলে । ডাক তাঁকে, হয়ত এখন আর ভয় পাচ্ছেন না।
ইসোলা : দেখছি চেষ্টা করে। মোযি …মোযি…
মোর্যুনকে : এটাই কি তাঁর নাম?
ইসোলা : ভুলে গেছ তুমি? প্রথম যখন তাঁকে পেয়েছিলাম, এ নামই তো দিয়েছিলাম।
মোর্যুনকে : কিন্তু এ তো তোমার মায়ের নাম।
ইসোলা : মা কিছু মনে করবে না। এতে দুজনকেই মনে পড়ে আমার, দু’জনেই ঝুঁকে পড়েছে ভারে, তাদের বয়স বলতে পারি না আমি।
মোর্যুনকে : মোযি…মোযি…বেরিয়ে এসো বাইরে, আমি এসেছি। বেরিয়ে এসো, দোহাই তোমার।
ইসোলা : কাজ দিচ্ছে না।
মোর্যুনকে : ওহ্ ইসোলা, কেন তুমি আমাকে দেখালে এ জায়গাটা। এখানে আমি বাস করতে চাই। চিরকালের জন্য।
ইসোলা : এমন কাজ এখন তুমি করতে যাচ্ছ না। চলে এসো, আমাদের বাড়ি ফিরে যাবার সময় হয়েছে। শুধু ভাবছি তোমার মা হয়ত এখন তোমাকে খুঁজে মরছেন।
মোর্যুনকে : মরবেন কেন? আমার জন্য তার ভারি ভাবনা।
ইসোলা : কিন্তু এটাও তো ঠিক যে তুমি তাঁর চোখের আড়ালে যাবে না।
মোর্যুনকে : শুতে যাবার আগে আমাকে তালাবন্ধ করে রাখে আমার মা। কাজেই আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাবার কারণ তার নেই। (কুটিরের মধ্যে ঢোকে) ওটা কি?
ইসোলা : কোথায়?
মোর্যুনকে : ঐ যে। বন্দুক নাকি?
ইসোলা : সেই রকমই তো দেখাচ্ছে, নাকি? আমি জানি ওটা পুরোনো আর মরচে ধরা।
মোর্যুনকে : কোথায় পেয়েছ ওটা?
ইসোলা : মোড়ল মশাইয়ের বন্ধুক। শিকারের জন্য এটা আমার দরকার।
মোর্যুনকে : (হেসে) শামুক শিকারের জন্য?
ইসোলা : হতেও পারে। যাই বল, ঝোপের গভীরে গেলে অনেক…অনেক শিকার মেলে। মোড়লমশাই যখন শিকারে যেতেন সঙ্গে যেতাম আমি। বেশির ভাগ সময়েই পাখিশিকার। তিনি মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাণী মারা পছন্দ করতেন না।
মোর্যুনকে : কেন?
ইসোলা : ভয় পেতেন তিনি; ভাবতেন শিকারটা হয়ত রূপ নেবে মানুষের। তরুণ বয়সে তাঁর এক বন্ধু মারা পড়েছিলেন এভাবে। এ নিয়ে বলায় তাঁর ক্ষান্তি ছিল না।
মোর্যুনকে : কোন পশু তুমি মারবে?
ইসোলা : মানে, প্রথমে …ধর না, ছুঁয়ো না ওটাকে! (বন্দুকের গুলি ছোটে। মোর্যুনকের আর্তনাদ)। মোর্যুনকে। মোর্যুনকে। চিৎকার গলে মিশে যায় গানের মধ্যে।
গান: ৩
বেজায় ভারি, বেজায় ভারি এটি তোলার পক্ষে
বেজায় ভারি, বেজায় ভারি এটি তোলার পক্ষে
যদি হত আর একটু হাল্কা, আমি তাহলে বইতাম নিজেই
আর যখন এটা মনে হবে হাল্কা বলে
হাতিটা মরেছিল ঝোপের মধ্যে, পর্বতকে আমরা এনেছিলাম বাড়িতে
বুনো ষাঁড় মরেছিল ঝোপের মধ্যে, পর্বতকে আমরা এনেছিলাম বাড়িতে
ইঁদুরটা মরেছিল বাড়ির মধ্যে, পর্বতকে আমরা
নিয়েছিলাম ঝোপের মধ্যে
চিতাবাঘের চোখ, অন্ধকারে জ্বলে
চিতাবাঘের লেজ আন্দোলিত পাশে
চিতাবাঘের থাবা, দুদিকে ধারালো ক্ষুর
মদ্দা রাঙা আলুর যদি আকাল পড়ে, তাহলে ঝাঁপাতাম নরম ওল
কনে যদি পালায় তাহলে বিয়ে করব আমাদের শালীদের
ব্যাপারটা যদি বিরক্ত কর আমাদের, আমরা নতজানু হয়ে নালিশ জানাব
আর তা যদি না করে, তাহলে চালিয়ে যাব আর্তনাদ…
গালের উপর ক্ষতচিহ্ন যেন জ্বলজ্বল যাত্রাপথ
(গান মিলিয়ে গেলে গির্জার ঘণ্টায় দুটো বাজে। মোযি দোতলায় আসে। যে চেয়ারে এরিনযোবি ঘুমিয়ে পড়েছে তার হাতলে টোকা মারে।)
মোযি : রেভারেন্ড, রেভারেন্ড। বিছানায় আসবে না?
এরিনযোবি : (জাগে, চমকে ওঠে) উ-হুম্? কে? মোযি?
মোযি : অনেক দেরি হয়েছে। বিছানায় আসবে না?
এরিনযোবি : কটা বেজেছে?
মোযি : এইমাত্তর দুটো বাজল।
এরিনযোবি : দুটো? মাঝরাত পেরিয়ে গেছে? বলতে চাও আমাকে এতটা সময় ঘুমিয়ে থাকতে দিয়েছ?
মোযি : তুমি ক্লান্ত ছিলে। ভাবলাম ঘুমোলে তোমার ভালই হবে।
এরিনযোবি : ইসোলা? কোথায় সে? (দরজা খুলতে চেষ্টা করে।) ওহ্হো, মনে হচ্ছে এখনো যেন প্রার্থনা করে যাচ্ছে।
মোযি : জানি না, রেভারেন্ড, শুধু বলছি সকাল হোক। রাগ সত্ত্বেও ঘুমিয়ে পড়েছিলে তুমি। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে ইসোলাও।
এরিনযোবি : ওকে উঠতে হবে। প্রতিজ্ঞা করেছি আমার ছাদের তলায় আর একটি রাতও থাকতে পারবে না সে।
মোযি : দোহাই তোমার রেভারেন্ড, শুধু সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলছি। রাগ সত্ত্বেও ঘুমিয়ে পড়েছিলে তুমি। হয়ত ঈশ্বরের ইচ্ছাই এটা। বিচার যাতে বিলম্বিত হয়। (বিরতি)
এরিনযোবি : ঠিক আছে। তোমার এ কথা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আর একটা রাতও তার সঙ্গে এক ছাদের তলায় কাটাব না আমি।
মোযি : কোথায় যাচ্ছ
এরিনযোবি : গির্জায়। গির্জার ঘরে গিয়ে ঘুমবো। কিন্তু সূর্য ওঠার পরেও যদি বাড়িতে থাকে সে তাহলে তাকে তাড়াব চোরের মতো, ব্যভিচারী বলে।
মোযি : সঙ্গে আমিও আসব কি?
এরিনযোবি : কিসের জন্য?
মোযি : তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তোমার সব কথা মেনে চলব। কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারি আমি?
এরিনযোবি : বলার মত কিছু নেই।
মোযি : কিছু সময়ের শান্তি যে আমরা পেয়েছি তার মধ্যে ঈশ্বরের হাত আমি দেখতে পাচ্ছি। যদি আমরা কথা বলতে পারি খানিক.?
এরিনযোবি : এখনো ওর হয়ে ওকালতি চালাবে?
মোযি : না, না। আমি শুধু চাইছি কিছু বোঝাপড়া। ওরা দুটিতে বড় হয়ে উঠেছে একসঙ্গে। ইসোলা আর মোর্যুনকে একই মায়ের সন্তানের মতো বেড়ে উঠেছে।
এরিনযোবি : এর থেকে কি শিক্ষা নিতে পারি আমি?
মোযি : একটু ধৈর্য ধরো রেভারেন্ড। একটু শুধু বোঝাপড়া চাইছি। ওরা একসঙ্গে খেলেছে, ঝগড়া করেছে, মারামারি করেছে। মোর্যুনকে কতবার তোমার কোলের উপর বসে থেকেছে, কত জিনিস কিনেছে তার?
এরিনযোবি : এক বছর আগে, এই বাড়িতে, ওলুমোরিন এসে নালিস জানিয়েছে ইসোলা খুশি মত তাঁর মেয়েকে নিয়ে দূরে দূরে টেনে নিয়ে গেছে। বলেছে, দুজনে নাকি সব সময়েই ঘুরে বেড়ায় গভীর বনের মধ্যে। তার ফলে আসতে পারে পাপের প্ররোচনা।
মোযি : খাঁটি কথা, খুব খাঁটি কথা, কিন্তু…
এরিনযোবি : আমি ওকে ধমকে দিইনি, সাবধান করে দিইনি? বলিনি ওর এই বাউণ্ডুলেপনা অন্যের ঘরে গিয়ে না ঢোকে? আমাকে না লজ্জায় ফেলে?
মোযি : হক কথা, কিন্তু বাচ্চাদের বন্ধুত্ব কেউ কি থামাতে পারে শুধু হুকুম করে?
এরিনযোবি : বাচ্চা? ওকে বাচ্চা বল তুমি? বাচ্চা, অথচ যৌনপাপের অপরাধী? কতবার ধমক দিয়েছি? কঠোরভাবে? ঠ্যাঙাতে ছাড়িনি কখনো। তারপরেও যখন এসব ভয়ংকর গুজব আমার কানে এসেছে, তাকে ডেকেছি, জিজ্ঞেস করেছি তাকে সতর্ক করার কথা মনে আছে কিনা। তার কাছ থেকে কথা আদায় করেছি যাতে ওলুমোরিনের মেয়ের সঙ্গে কখনো সে দেখা না করে। আমাকে কথা দিয়েছে আর ভেঙেছে। এধরনের অপরাধ…আমারই বাড়িতে, আমার নিজেরই বাড়ির মধ্যে।
মোযি : আমরা ওকে উদ্ধার করব, তাড়িয়ে দেব না লজ্জার মধ্যে।
এরিনযোবি : আমার বাড়ির মধ্যে আমি এমন কিছু হতে দিতে পারি না যা আমি অন্যকে না করার উপদেশ দিয়ে থাকি। এখন কি তবে আমি পিছিয়ে আসব যখন আমার বাড়ির একজন, তাই বা কেন, আমায় রক্তেরই একজন ঈশ্বরের বিধানকে লঙ্ঘন করেছে? তুমি কি চাও আমার মাথা নত হয়ে পড়–ক দ্বিগুণ ভাবে? (মোযি নীরব) শান্ত হও, নারী। শক্তি যখন কমে আসে, ঈশ্বরই তখন যোগান শক্তি। (তিনি সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকেন। সামনের দরজায় সহসা আঘাত। এরিনযোবি থামেন।) রাতের এসময়? কি হল? আবার কোন কৌতুক শুরু হল আমার জীবনে? (আবার ধাক্কা, আরো মরিয়া বিরতি: দৃশ্যান্তর :)
ইসোলা : খুব শস্তায় পেলে শিক্ষাটা । জানো না বন্দুক নিয়ে এমনটা কক্ষনো করতে নেই?
মোর্যুনকে : বুঝতে পারিনি ভেতরে গুলি ভরা আছে।
ইসোলা : সব সময়েই কিছু বোঝো না। তুমি কি ভাবছ তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি শুধু এভাবে মরবে বলে? খুব বেঁচে গেছ, অবশ্য আমার একটা মাত্র গুলি তাও খরচ করে ফেললে।
মোর্যুনকে : গুলি ভরে রাখা উচিত হয়নি তোমার।
ইসোলা : ভরে রাখতেই হয়। ঝোরাটার ওপারেই দানবের মত একটা সাপ বসবাস করে…ঐ ওখানে…ঐ বাঁশঝাড়ের ভেতর। মনে হয় একটা অজগর। সত্যি বিশাল বড়। যাকগে আমাকে মারতেই হবে ওটাকে। ওটাকে না মারলে এখানে বাস করা আমার পক্ষে সম্ভবই হবে না।
মোর্যুনকে : এখানেই বাস করবে নাকি তুমি?
ইসোলা : আমি এখানেই বাস করি। এটাই আমার বাড়ি।
মোর্যুনকে : এখানেই ঘুমোবে, একেবারে একা?
ইসোলা : এর আগেও এখানে বাস করেছি আমি, মাঝে মাঝেই, বাবা যখন বেরিয়ে গেছেন যজনের কাজে দূরের কোনো গির্জায়। একবার প্রায় এক সপ্তাহের মত বাইরে ছিলেন তিনি, আর আমি পুরো সময়টা কাটিয়েছিলাম এখানে। শুধু একথা ভেবে যে এরিনযোবি অসুখী রাখেন আমাকে।
মোর্যুনকে : তোমার বাবা? তাঁর ভাবনা কি তুমি একবারও থামাতে পার না?
ইসোলা : ওহ্, বাবার কথা বলিনি। অজগরটার কথা বলছিলাম। আমি ওটাকে ডাকি এরিনযোবি বলে।
মোর্যুনকে : ইসোলা, তুমি কি একটা দুর্বৃত্ত সন্তান হতে চাও।
ইসোলা : না, কিন্তু সাপটা যে দুর্বৃত্ত। কচ্ছপের ডিমগুলোর কথা মনে পড়ে? মোযি ওগুলো ফুটিয়ে সব বাচ্চা বার করত, বাচ্চাগুলো কখনো সখনো সাঁতরে চলে যেত ঝোরার ওপারে। সাপটা গিলতে পারত না ওদের, তাই সে ওগুলোকে মুখে তুলে নিয়ে পাথরে আছড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলত।
মোর্যুনকে : ওটা কি সাঁতরে চলে আসতে পারে এপারে।
ইসোলা : ঠিক জানি না। যদ্দুর দেখি বাঁশঝাড় ছেড়ে কক্ষনো বেরোয় না ওটা। তাই বন্দুকে গুলি ভরা থাকলে মনে স্বস্তি পাই।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে, কাল কিছু বারুদ এনে দেব তোমাকে।
ইসোলা : না, বরং বিমপেকে বলো আনতে। বিমপে যে বাজারে শামুক বিক্রি করে সেখানেই পাওয়া যায় বারুদ। ওটাকে মরতেই হবে, সাপটাকে।
মোর্যুনকে : তোমার সঙ্গে আমি এখানেই থাকব, এখানেই বাস করব।
ইসোলা : না, তোমার ভালো লাগবে না। তবে যখনই তোমাকে অসুখী করে তুলবে তারা, চলে আসবে এখানে।
মোর্যুনকে : তুমি কি অসুখী?
ইসোলা : চল, এখন যাই। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকলে ভোর হয়ে যাবে। তাছাড়া আজ রাতে এখানে আমি থাকছিও না- গুলিভরা বন্দুক ছাড়া থাকা যাবেও না। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব, তারপর চলে যাব। গির্জার চত্বরে গিয়ে ঘুমোব।
মোর্যুনকে : না, তুমি শপথ করেছিলে। শপথ করেছিলে কবরের চাতালের মধ্যখানে তুমি ঘুমোবে না। ভূতের ভয়ও কি নেই তোমার?
ইসোলা : আরে, ভূতেরা খুব ব্যস্ত মানুষ, আমার মত। আমরা কেউ কারুকে বিরক্ত করি না।
মোর্যুনকে : না, তুমি যাবে না ওখানে। যাকগে, আমি এখানেই থাকছি। একটা রাত আমাকে থাকতেই হবে। আসলে আমরা দুজনেই তো আবিষ্কার করেছিলাম জায়গাটা।
ইসোলা : না, আমরা দুজনে নয়। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম। যাকগে, সে তো অনেক দিন আগের কথা। আমরা তখন বাচ্চা ছিলাম। এই তো খানিক আগেই জায়গাটা মনেই করতে পারছিলে না তুমি। (বিরতি)
মোর্যুনকে : বিমপে বলে আমাদের দুজনের বিয়ে করে ফেলা উচিত। তোমার কি মনে হয় ঠিক বলেছে সে?
ইসোলা : কত বয়স তোমার?
মোর্যুনকে : তোমারই সমান। প্রায় পনের।
ইসোলা : যা, আমার বয়স ষোল বছর দুমাস। তা, তোমার কি মত? বিয়ে করতে চাও আমাকে?
মোর্যুনকে : এ নিয়ে ভাবিনি। তোমার কি মনে হয় আমাদের করা উচিত?
ইসোলা : আমার সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছ বলে তুমি কি অসুখী?
মোর্যুনকে : না। আসলে এটা সকলকেই ঝাঁকিয়ে দিয়ে। আর সেজন্যে তোমার বাবাও তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছেন।
ইসোলা : তুমি কি অসুখী?
মোর্যুনকে : না। না, আমি অসুখী নই। কিন্তু আমি ঘাবড়ে গেছি খানিক। আজ বিকেলে মা এ ব্যাপারে কিছু বলার আগে আমার ধারণাই ছিল না কোনো। মা আমাকে এক ঝুড়ি প্রশ্ন করার আগে আমি কিছু বুঝতেই পারিনি। তারপর আজ বিকেলে মা আবার আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন তোমার কথা।
ইসোলা : তুমি বললে নাকি যে তুমি কোনো অন্যায় করেছ?
মোর্যুনকে : না। কিন্তু তিনি তোমাকে গাল পাড়তে লাগলেন। বাবাও ভয় দেখিয়ে বললেন তোমাকে জেলে পাঠাবেন তিনি। তারপর ডেকে পাঠালেন তোমার বাবাকে। তিনি বললেন তোমাদের পরিবারকে তিনি আদালতে পাঠাবেন।
ইসোলা : তোমার বাবা প্রভাবশালী মানুষ। অনেক বন্ধু তাঁর।
মোর্যুনকে : ভয় পাচ্ছ নাকি তাঁকে?
ইসোলা : ভয়? তোমার কি মনে হচ্ছে তাঁকে আমার ভয় পাওয়া উচিত? আসলে মোড়ল মশাই-ই শক্তি জোগাচ্ছেন আমার।
মোর্যুনকে : তোমার বাবা বল, ইসোলা, তোমার বাবা।
ইসোলা : মোড়লমশাই।
মোর্যুনকে : তাঁকেই তোমার বাবা বল। যখন তুমি কঠোর হও তোমাকে ভয় লাগে আমার…এত একগুঁয়ে কেন তুমি? ইসোলা…দোহাই তোমার…এমন করো না…আমার দিকে তাকিও না ওভাবে।
ইসোলা : (স্বল্প নীরবতা) এদিকটায় এসো, মোর্যুনকে, এখানে দাঁড়াও…এখানে এ আলোর নিচে।
মোর্যুনকে : কেন? আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছো কেন?
ইসোলা : তোমাকে ঠিক অন্যরকম লাগছে? তুমি এখন পরিপূর্ণ নারী, এটা অনুভব করতে পারছ কি তুমি?
মোর্যুনকে : জানি না।
ইসোলা : কাছে এসো…শুনতে দাও আমাকে। এখানেই ত থাকার কথা বাচ্চাটার। (বিরতি) কেন আওয়াজ নেই।
মোর্যুনকে : আমার মা-ও শুনতে চেষ্টা করেছিলেন।
ইসোলা : (ক্ষিপ্ত) আর কখনো তাঁকে করতে দেবে না এমনটা।
মোর্যুনকে : কি হল, ইসোলা, কি ব্যাপার?
ইসোলা : দু:খিত কিছু মনে করো না। কিছু নয় এটা …তুমি বলছ তুমি থাকবে এখানে?
মোর্যুনকে : আজ রাতে আমি যাচ্ছি না। এ জায়গা ছাড়ার মত শক্তি আমার নেই। তোমার সঙ্গে থাকতেই হবে আমাকে।
ইসোলা : এটা আমার বাচ্চা। তুমি নিজেই যে এখনো বাচ্চা, তা জানো তুমি? (বিরতি)
মোর্যুনকে : ইসোলা।
ইসোলা : বল।
মোর্যুনকে : শহরের সব্বাই তোমার মিথ্যে রটাচ্ছে। বিমপেতো আমাকে বলছিল। তারা বলাবলি করছে-। তুমি নাকি ঠেঙিয়েছ তোমার বাবাকে। সারা শহরের লোক তোমাকে সমোলোচনা করছে।
ইসোলা : সত্যি কি তাকে আমি ঠেঙিয়েছি?
মোর্যুনকে : জানি না।
ইসোলা : কিন্তু তুমি তো ছিলে ওখানে; ছিলে না?
মোর্যুনকে : আমি তো পালিয়ে গিয়েছিলাম। তোমার বাবাকে আমি ভয় পেয়েছিলাম ইসোলা। কী ভয়ংকর তিনি। তিনি যখন তুলে নিলেন লাঠিটা, আমি পালিয়ে গেলাম। ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। পালিয়ে গিয়েছিলাম বিমপের কাছে।
ইসোলা : পালিয়ে গিয়েছিলাম আমিও। শুধু মনে আছে আমাকে মারবার জন্য লাঠিটা তুলতেই আমি তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেললাম সেটা। তিনি কাড়াকাড়ি করছিলেন। তারপর চলে গেলাম বাড়ি। যারা জমা হয়েছিল সেই ভিড়ের কথা মনে আছে আমার। আমি যেন কুষ্ঠ রোগী, সেভাবেই পথ করে দিয়েছিল আমার। কুঁকড়ে পালিয়ে গিয়েছিল তারা। তখনই হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলাম একঘরে হলে কেমন লাগে। আমি বাড়ি পৌঁছোনোর আগেই মা কেমন করে যেন জানতে পেরেছিলেন সব। ছান্নর মত চ্যাঁচাচ্ছিলেন তিনি, বুক চাপড়াচ্ছিলেন যেন পুরো পরিবারের উপর নেমে এসেছে একটা বিপর্যয়। বাচ্চারা সব জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়েছিল এক জায়গায়। পরস্পরকে আঁকড়ে ছিল তারা প্রচণ্ড ভয়ে। (নীরবতা)
মোর্যুনকে : রাতে কি ঠাণ্ডা পড়ে এখানে?
ইসোলা : পড়ে। তবে চাদর আছে আমার। তুমি ওটা নিতে পার। চলে এসো, এবার ঘুমোতে দাও। ক্ষিদে পেয়েছে তোমার? খাবারও আছে।
মোর্যুনকে : খাবারের দরকার নেই। তবে ঘুম পেয়েছে। এসো, দুজনে মিলে প্রার্থনা করি আমরা।
ইসোলা : তার মানে?
মোর্যুনকে : একসঙ্গে প্রার্থনা করি।
ইসোলা : হ্যাঁ, তাই তো বললে শুনলাম।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে, আর দাঁড়িয়ে থেকো না ওখানে। আমার পাশে এসে নতজানু হয়ে বসো।
ইসোলা : না। ইচ্ছে হলে তুমি করতে পার নিজের মত।
মোর্যুনকে : কি হল? বাড়িতে কি তোমরা সবাই মিলে একসঙ্গে প্রার্থনা কর না?
ইসোলা : করি বৈকি।
মোর্যুনকে : তাহলে কি প্রার্থনা করতে চাইছ না আমার সঙ্গে?
ইসোলা : (দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ে।) আমার ঘুম পেয়েছে। খুব শিগগিরই, বুঝতে পারবে তুমি।
মোর্যুনকে : কি বুঝতে পারব?
ইসোলা : এছাড়া আমি কিছুই করি না। সারা জীবনটাই একটা দীর্ঘ প্রার্থনা, কিন্তু কার কাছে জানি না সঠিক।
মোর্যুনকে : তোমাকে বুঝতে পারি না আমি।
ইসোলা : না, তোমাকে বুঝতে হবে না। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় তোমাকে থাকতে বলি তুমি থাকবে?
মোর্যুনকে : যদি থাকতে দাও আমাকে…? কেন? আমাকে কি ফিরিয়ে দেবে?
ইসোলা : সেটা নির্ভর করছে তোমার উপর।
মোর্যুনকে : এভাবে যদি বলে চল আমি কিন্তু ভয় পাব তোমাকে।
ইসোলা : আমি ভাবলাম তুমি প্রার্থনা শুরু করতে যাচ্ছ।
মোর্যুনকে : না করব না। একা আমি প্রার্থনা করব না…ইসোলা।
ইসোলা : আবার কি হল?
মোর্যুনকে : আগেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, উত্তর দিতে রাজি হওনি। তুমি অসুখী?
ইসোলা : না। অসুখী নই। কিন্তু আামার ইচ্ছে করে আমি যেন বিষণœ না হই। নাও, এবার ঘুমোতে যাও। (এরিনযোবির বাড়ি। প্রচণ্ড ধাক্কার আওয়াজ।)
এরিনযোবি : আহ্ থামুন না। আপনি যেই হোন না, পুরো বাড়িটাকে যে ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন। আসছি রে বাপু, আসছি (দরজা খোলেন) মিস্টার ওলুমোরিন! আরে মিসেসকেও দেখছি যে! কি ব্যাপার? আপনারা এখানে?
ওলুমোরিন : আপনার ছেলে কোথায়? আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মিসেস ওলুমোরিন: (আর্তনাদ করে) সামনে আনুন ছেলেকে, এক্ষুনি। সব নষ্টের গোড়া সে-ই। আমার মেয়েকে কি করেছে সে?
এরিনযোবি : আমার ছেলে? সে তো বাড়ি ছেড়ে বেরোয়নি তারপর-।
মিসেস : আপনি নিজেও জড়িয়ে আছেন তার সঙ্গে, তাই না? আপনি রক্ষা করছেন তাকে। আপনার ছেলের জেলে যাওয়া আটকাতে পারবে না আর কেউ এখন।
এরিনযোবি : আমি ত্যাজ্য করেছি ওকে।
ওলুমোরিন : সেটা প্রকাশ্যে। গোপনে অন্য ব্যাপার। আমার চোখে ধুলো দিতে পারবেন না আপনি। পাদ্রীসাহেব, বহুবার বলেছি আপনার ছেলে যেন আমার মেয়ের কাছে না ঘেঁষে। তবু মেয়েটাকে আমার ফুঁসলেছে ছোঁড়া, তার পেট বানিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে নিয়ে ভেগে পড়েছে আপনার ছেলে আর আপনি বলছেন কিচ্ছু জানেন না আপনি।
এরিনযোবি : ঈশ্বরের সামনে শপথ করে বলতে পারি এসব কাণ্ডই বাবা হিসেবে সুখকর নয় আমার কাছে। ইসোলা আমার নামের উপর লজ্জা আর অসম্মান ছাড়া কিছুই আনেনি।
মিসেস : সময় নষ্ট করছি আমরা হয়ত দুটোতেই এখানে রয়েছে আর আপনি ওদের সময় দিচ্ছেন লুকোবার পাদ্রীসাহেব, আপনার ছেলেকে ডাকুন। তাকে ডেকে পাঠাচ্ছেন না কেন? ডাকুন তাকে। ডেকে বলুন আমার মেয়েকে যেন ফেরত দেয়, আদালতে যাবার আগে।
এরিনযোবি : আসুন আমার সঙ্গে, নিজেরাই দেখুন খুঁজে। ঈশ্বর আমার সাক্ষী। আমি তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার হুকুম দিয়েছি…অস্বীকার করেছি তাকে, আমার ছেলে বলে…শয়তানের এ সন্তানটির জন্য সারাটা জীবন আমার টকে গেল…কিন্তু এ ছাড়া আর কিই বা করতে পারি আমি? (সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে তারা।)
মিসেস : সব কেত্তনই শোনা হয়ে গেছে আমার। এখন শুধু চাই মোর্যুনকেকে ফেরত। মেয়েটা আমার কি দোষ করল যে আপনার বদমাস ছেলেটার খপ্পরে পড়ল? সারাটা জীবনে মোর্যুনকে অবাধ্য হয়নি আমার…তার বাপমায়ের কাছে কক্ষনো পাপ করেনি যতক্ষণে না আপনার ছেলে এসে নষ্ট করেছে তাকে। আর এখন মেয়েটাকে আমার ভাগিয়ে নিয়ে গেছে…আপনার ছেলের আমরা কি করেছি যে সে আমাদের মেয়েটাকে ছাড়ল না? তার পছন্দসই মেয়ে তো অনেক ছিল, তার এই কি লুচ্চামির সঙ্গী হবার যোগ্য, কিন্তু আমাদের মেয়েটাকে কেন সে…(দোতলায় চাতালে পা দেন।)
এরিনযোবি : এই আমার চেয়ার। এ চেয়ারে বসেই অপেক্ষা করছিলাম কখন সে বেরিয়ে আসে তার ঘর থেকে যাতে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারি চিরকালের মতো। কথাটা যে মিথ্যে নয় আমার স্ত্রীও তার সাক্ষী দেবেন। খানিক আগে তিনি আমাকে জাগিয়ে দিয়েছেন। পাহারায় আমি ঢিলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। (দরজায় ধাক্কা দেয়।) কথা দিতে পারি আপনাদের মেয়ে এখানে ছিল না কখনো। (আবার ধাক্কা দেয়, আরো জোরে।) দরজা খোল, ইসোলা। দরজা খোল, নইলে লোক ডাকিয়ে দরজা ভাঙাব। (আবার ধাক্কা দেয়।) ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি আমি। তোর কপালে খারাপ কিছু ঘটার আগে খুলে দে দরজাটা। (নীরবতা)
মোযি : ইসোলা, আর কতক্ষণ মিনতি করব তোর কাছে? দরজা খুলে দে। (উদ্বিগ্ন স্বরে।) রেভারেন্ড, একথা বলা আমার ঠিক নয়…কোনো খারাপ চিন্তা মনে ঢুকতে দিতে নেই আমি জানি, কিন্তু রেভারেন্ড (ক্রমশ আরো উদ্বিগ্ন) ইসোলা একটু বিগড়ে যাওয়া ছেলে, কিন্তু ছ’ঘণ্টারও বেশি হয়ে গেল দরজায় তালা এঁটে বসে আছে। একটু শব্দও শোনা যাচ্ছে না।
এরিনযোবি : বাজে কথা। যখন এলাম তখনো তার আওয়াজ শুনেছি। (প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে) ইসোলা, দরজা খোল। খোল দরজাটা। কারুকে ঠকাতে পারবি না।
মোযি : রেভারেন্ড, আমরা ওকে মেরে ফেলিনি তো? আমরা হয়ত ওকে মরার দিকে ঠেলে দিয়েছি।
এরিনযোবি : (ক্ষিপ্ত) চুপ, একদম চুপ। তোমার ছেলে এমন নয় যে নিজের ক্ষতি করবে।
মিসেস : ভেঙে ফেলুন দরজা। আমি জানতে চাই কোথায় আমার মেয়ে। ওহ্, মোর্যুনকে মোর্যুনকে…(দুহাত দিয়েই ধাক্কা মারতে থাকে দরজায়।)
খুনি কোথাকার, শিগগির দরজা খোল। যে অসভ্যতা তুই করেছিস তাতে তোর উপর ঈশ্বরের অভিশাপ নেমে আসার আগেই আমার মোর্যুনকেকে ফিরিয়ে দে আমার কাছে। খোল দরজা, বলছি তোকে, দরজা খোল। মোর্যুনকে।! মোর্যুনকে! যদি ভেতরে থেকে থাকিস বেরিয়ে আয় মায়ের কাছে।
ওলুমোরিন : সোনা আমার…নিজেকে সংযত কর…দোহাই তোমার, শান্ত হও। আমরা তাকে পাবই। আমরা মেয়েটাকে পাবই, তারপর ছেলেটার হাত থেকে এ শহরকে বাঁচাব বরাবরের মত। রেভারেন্ড, এখানে অপেক্ষা করছেন কেন? দরজাটা আমাদের ভেঙে ফেলতে হবে। আপনার ছেলে যদি বেরিয়ে না আসে ভাঙতেই হবে দরজা। আপনি না ভাঙলে কাজটা করতে হবে আমাকেই।
এরিনযোবি : না, আমি নিজেই ভাঙব। এবাড়ি এখানো আমার; মিস্টার ওলুমোরিন। মোযি, চেষ্টা করে দেখবে নাকি আরেকবার?
মোযি : (নি:শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে) আমি আর কিচ্ছু পারছি না। ছেলে আর আমাকে চিনছেই না।
এরিনযোবি : তাহলে এভাবেই হোক। ওই ডাণ্ডাটা দাও আমাকে। (শাবলের আঘাতের শব্দ। তারপর কাঠ ভাঙ্গার আওয়াজ।) দেখি কোথায়…? একি, কেউ নেই!
ওলুমোরিন : পালিয়েছে নাকি?
মোযি : কোথায় পালাবে? নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করেছে। ইসোলা! ইসোলা।
এরিনযোবি : ঐ যে জানালাটা …দেখছি খোলা!
মোযি : আমরা ওকে মেরে ফেলেছি। ইসোলা, বাপ আমার…
এরিনযোবি : ঈশ্বরের দোহাই নিজের আত্মাকে যেন এতটা নষ্ট সে না করে। (দ্রুত বেরিয়ে যান ঘর থেকে) না, নিচেও নেই দেখছি।
ওলুমোরিন : নিচে নেই অবশ্যই। মাটিতে দেখা যাচ্ছে না কারুকেই। তার মানে পালিয়ে গেছে। আর পালাতে সাহায্য করেছেন আপনারাই।
মিসেস : মোর্যুনকে..আহ্, কি করেছে আমার মেয়েটিকে নিয়ে রেভারেন্ড, অন্তত এটুকু বলুন আমার মেয়েটাকে নিয়ে কী করেছে সে। কোথায় নিয়ে পালিয়েছে? মোর্যুনকে …মোর্যুনকে…(ফোঁপায়)
এরিনযোবি : কিছুই বুঝতে পারছি না। নিশ্চয়ই পালিয়েছে যখন ঘুমোচ্ছিলাম।
ওলুমোরিন : আর কিছু বলার নেই আপনার। আমার লোকজনদের গিয়ে আমি খেপিয়ে তুলছি, শহর ছেড়ে পালিয়ে যাবার আগেই ধরতে হবে তাকে। তারপর ফয়সালা হবে আইনের কাছে-অবশ্য আমার জ্ঞাতিরা তার উপর রাগ ঝাড়বার পর। এ শহরের কেউ পছন্দ করে না তাকে, তারা একবার তাকে ধরতে পারলে তারপর ঈশ্বরের দয়া-।
মোযি : কি করবেন আপনারা? পশুকে শিকার করবার মতো ছুটে যাবেন আপনারা? আমার ছেলে কখন কি করেছে আপনাদের? বলছেন, আপনাদের মেয়েকে চুরি করেছে সে। আমি বলছি, গোল্লায় পাঠিয়েছে তাকে!
ওলুমোরিন : কি বললেন? ঠিক এটাই ভেবেছিলাম যে আপনারা দুজনেই ওকে আড়াল করবেন । অথচ আজ বিকালেই ও ঠেঙিয়েছে নিজের বাবাকে। আপনার হাত থেকেই লাঠি ছিনিয়ে নিয়েই আপনাকে আঘাত করেছে।
এরিনযোবি : একথা যারা বলছে তারা পাপ করছে ওর বিরুদ্ধে..অবশ্য তার বিদ্রোহ ঈশ্বরের চোখে আমাকে আঘাত করারই সমান।
মোযি : সে করেনি, রেভারেন্ড, করেনি সে। সবাই মিলে তার পেছনে লেগেছে কেন?
এরিনযোবি : শান্ত হও মোযি!
মোযি : ছেলেটা শুধু ভুল করেছে, সবাই তাকে দানব বানাতে চাইছে কেন?
মিসেস : ভুল করেছে? কচি খোকা! আমার মেয়েটাকে প্রথমে নষ্ট করেছে, তারপর পালিয়েছে-নাকি?
মোযি : মিসেস ওলুমোরিন, আপনি তো আছেন এখানে, আপনার জ্ঞাতি গোষ্ঠীদের বলছেন না কেন তারা মিছে কথা বলছে? আপনারা জানেন আমার ছেলে নিজেকে নষ্ট করবে না এভাবে..নিজের আত্মাকে ধ্বংস করবে না কক্ষনো।
এরিনযোবি : ধ্বংস করেছে। সে কি যৌন পাপ করেনি?
মোযি : একটা শিশুর ভুল। কিন্তু সে কখনো মারেনি তার বাবাকে না, তাকে অভিশাপ দেবার দরকার নেই, তার দরকার শোধন।
এরিনযোবি : অনেক হয়েছে। ঈশ্বরের হাতেই তাকে ছেড়ে দিয়েছি আমি। গির্জায় যাচ্ছি প্রার্থনা করবার জন্য। হায়, অভিশপ্ত সেই দিন যখন এ শিশুকে গ্রহণ করেছিলাম আমার সন্তান বলে। (সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পায়ের শব্দ। দরজা বন্ধ হবার আওয়াজ।)
ওলুমোরিন : চলো যাই। গিয়ে আমাদের লোকজনদের খেপিয়ে তুলি।
মোযি : আমার ছেলেকে যদি মারেন…যদি মারেন আমার ছেলেকে তবে প্রভু আপনাদের বিচার করবেন!
মিসেস : ও একটা বাচ্চাচোর। ছেলেধরা । আমার মেয়েকে যে কী করেছে!
মোযি : বলে দিচ্ছি, আমার ছেলেকে যেন আঘাত না করেন। ঈশ্বরের দোহাই, আমার ছেলেকে ছোঁবেন না…আহত করবেন না তাকে। তার কেশস্পর্শ করলেই স্বর্গ বিচার করবে আপনাদের। স্বর্গ বিচার করুন…যদি পাশে দাঁড়িয়েও তাকে মারধোর করতে দেখেন..স্বর্গ বিচার করুন আপনাদের -(কান্নায় ভেঙে পড়ে।)
গান : ৪
তুললাম আমি ‘গ্বেগবে’ পাতা
নইলে ভুলে যেতাম আমি
তুললাম আমি ‘তেতে’ পাতা
নইলে চাপা পড়তাম নিচে
দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, যাক আমাদের ভালোয় রেখে
চোখগুলো হোক আলোময়, তারা ভোলে না ঘর
এভাবেই চলে যায় এটা…এভাবে হোক শুভ বিদায়
এভাবেই চলে যায় এটা…এভাবে হোক শুভ বিদায়
(দৃশ্যান্তর)
মোযি : (অভিযোগের স্বরে) ইসোলা!
ইসোলা : (একটু যেন ছোট ইসোলা) মা?
মোযি : তুই আবার ঐ গানটা গাইছিস?
ইসোলা : মা?
মোযি : হ্যাঁ, ঠিক এইরকম। তার ব্যবহারটা এমনই। হঠাৎ যেন নিজেকে কালা হিসেবে দেখিস। আর তখন শুধু ‘মা’? বলছিলাম আবার তুই ঐ গানটা গাইছিস?
ইসোলা : কোন গানটা মা?
মোযি : কোন গান? কোন গানের কথা বলছি বেশ ভালোই জানিস, তোর বাবা যেটা গাইতে বারণ করে দিয়েছেন। গানটা এভাবে গাইবার জন্য কতবার তিনি শাস্তি দিয়েছেন তোকে?
ইসোলা : কিন্তু মা, বাবা তো এখন এখানে নেই।
মোযি : এটা তো আরো খারাপ। তোর বাপ দূরে থাকলে তুই যদি তাঁকে অমান্য করিস তাহলে তো তুই বেশ মন্দ ছেলে। হঠাৎ যদি ফিরে আসেন তাহলে কি হবে? এভাবে কথা বলতে লজ্জা করে না তোর?
ইসোলা : মাগো, বাবাকে আমি অমান্য করিনি গো। তিনি বলেছেন এ গানটা তিনি আর কখনো শুনতে চান না। তাই তিনি বাড়িতে থাকলে কখনো তো গাই না গানটা।
মোযি : ইসোলা! এটাই তো মন্দ ছেলের কথা । এভাবে তোকে কথা বলতে যেন আর কখনো না শুনি। শুনতে পাচ্ছিস?
ইসোলা : ঠিক আছে, মা।
মোযি : আচ্ছা ইসোলা, তোর বাবাকে কেন সব সময়েই অসন্তুষ্ট করিস? তোর উপর তিনি রেগে থাকলে আমার কত কষ্ট হয়-তুই কি দেখতে পাস না? তোকে শাস্তি দিলে? কিন্তু তাঁরও ত তোর উপর শক্ত হওয়া দরকারতুই তাঁর প্রথম সন্তান। এ কথাটা মনে রাখিস কখনো? প্রথম সন্তান। তুই পরিবারের বড়। বাবার আদলে যদি গড়ে তুলিস নিজেকে, তাহলে তোকে যারা অনুসরণ করবে তাকিয়ে থাকবে তোর দিকেই।
ইসোলা : মা-।
মোযি : তুই কি তাঁর হতাশার কারণ হতে চাস? তুই, তাঁর প্রথম সন্তান?
ইসোলা : আমি শিগগিরই ফিরে আসছি মা, আমাকে এখন একজায়গায় যেতে হবে।
মোযি : দাঁড়া। যখনই তোকে কিছু বলতে চাই অমনি পালিয়ে যেতে চেষ্টা করিস।
ইসোলা : আমাকে যেতেই হবে। গির্জার ঐকতান গানের রেয়াজে যোগ দিতে অনেকটাই দেরি করে ফেলেছি।
মোযি : গির্জার ঐকতান? বলিসনি তো কখনো তুই যোগ দিয়েছিস তাতে! কবে থেকে? তোর বাবা জানেন তো?
ইসোলা : না। বাবাকে বলব কি?
মোযি : ‘বলব কি’ মানে? কী বিদঘুটে ছেলে রে বাবা তুই? কত মাস ধরে তোর বাবা তোকে গির্জার ঐকতানে যোগ দিতে বলছেন- আর এখন তাঁর কথা মানতে রাজি হয়েছিস অথচ কিচ্ছু বলিসনি তাঁকে? তাঁকে খুশি করবার জন্য কাজটা করলি অথচ বললি না!! ওহ্, তুই তাঁকে অবাক করে দিতে চাস?
ইসোলা : কিন্তু এটা যে বাবার ঐকতান দল নয়।
মোযি : আবার একটা নতুন ছুঁতো খুঁজে বার করছিস। এসব শুনতে চাই না আমি। খালি ছুঁতো, খালি ছুঁতো। যা ভাগ। জলদি যা, নইলে দেরি হয়ে যাবে।
ইসোলা : মা, আমি গির্জায় যাচ্ছি না। আমাকে ভুল বুঝো না।
মোযি : প্রথমে বললি, যাচ্ছিস-আবার বলছিস, যাচ্ছিস না। এবার সুবোধ ছেলের মত জলদি যা তো। এ রোববারে তোকে হয়ত ঐকতান দলের সঙ্গে তাঁরা গাইতেও দিতে পারেন। এটা তোর বাবাকে কত খুশি করবে! এর ফলে হয়ত তোর ঐ পছন্দসই পৌত্তলিক গান গাওয়া বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ইসোলা : মাগো, দুজনের কিন্তু একই ঐকতান গানের কথা ভাবছি না আমরা। আমরা এটাকে ঐকতান গান বলি শুধু মজা করে।
মোযি : ছোকরা কিসের কথা বলছে? (ইসোলা ‘এগুনগুন’ গোল শুরু করে।)
ইসোলা : থামা এ গোল। নাচও থামা। এদিকে আয়, বল কি বলতে চাইছিস? (একই ধরণের গোল, গায় ‘এগুনগুন’ গান।) ইসোলা, আয় এখানে এক্ষুনি। আহ্, ক্ষুদে শয়তান…একবার যদি ধরতে পারি তোকে…ওহ্, তুই কি চাস আমি আছাড় খাই…দাঁড়া না একবার যদি তোকে ধরি…
ইসোলা : (হাসছে, একই ধরণের ‘এগুনগুন’ স্বরে।) আইয়া মোড়লমশাই …মিসেস এরিনযোবি, ও মিসেস এরিনযোবি…ও মি ফ্’ওমোলোক্ষে লে…[মিসেস এরিনযোবি, মোড়ল মশাইয়ের বউ, তুমি ছেড়ে দেবে কি এ বেচারী বালকটিকে?]
মোযি : (ভীত চকিত ফিসফিসে স্বরে।) তুই দুষ্টু ছেলে, আমি যা ভাবছি তাই যদি হয়…
ইসোলা : চলি মা। মোড়লমশাইকে বলো আমি চলে গেছি ঐকতান গানের রেয়াজে…
মোযি : আর শয়তান ছেলে, আরো ভালো কিছু খেলা খুঁজে পাস না তুই?…কি? আয় এদিকে, ইসোলা। তোকে আমি পই পই করে বলিনি যাতে তোর বাবাকে তুই মোড়লমশাই বলে না ডাকিস। আমাকে বিরক্ত করার জন্য সব সময়েই তুই এটা করিস।
ইসোলা : কিন্তু তিনি মোড়লমশাই তো বটেই।
মোযি : এটা তুই করিস শুধু আমাকে অসুখী করার জন্য। কেন বাপ বলে ডাকিস না ওনাকে? ইসোলা, এ নতুন অভ্যাস তুই শুরু করলি কবে থেকে? তুই একটা বাচ্চা ছেলে অথচ মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছিস বুড়োদের মতো। বড় হলে তখন যে কি করবি!
ইসোলা : কিন্তু তিনি মোড়লমশাই তো বটেই।
মোযি : কোথাও যাস নে। যদি যাস আমি কিন্তু তোর বাবাকে বলে দেব কোথায় গিয়েছিলি তুই। শপথ করবি কি করবি না বল?
ইসোলা : কিসের শপথ বলো?
মোযি : সব সময়ে ‘বাবা’ বলবি ওঁকে, বিশেষ করে যখন কথা বলবি আমার সঙ্গে। (দরজা খোলার রুক্ষ শব্দ।)
এরিনযোবি : ইসোলা।
ইসোলা : আজ্ঞে!
এরিনযোবি : আমার লাঠিটা নিয়ে আয়। জলদি, আমার সময় নষ্ট করিস না।
ইসোলা : আজ্ঞে?
এরিনযোবি : এখানে আয় আমার কাছে। (হিঁচড়ে নিজের কাছে এনে, লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে।) তুই দু:খের সন্তান, শুনতে পাচ্ছিস? দু:খের সন্তান। তুই নষ্ট হয়ে গেছিস, শোধরানোর অতীত। আমি ভাবি এটা একটা খ্রিস্টান বাড়ি, কিন্তু তুই এটাকে করে তুলতে চাইছিস পৌত্তলিক নিবাস। আমার বাড়িতে লজ্জা বয়ে আনবি না তুই। যদি তোকে মেরেও ফেলি আমি, তবু দেখব আমার বাড়িতে লজ্জা বয়ে আনিসনি তুই। (নামিয়ে রাখে লাঠি, একটু ভারি নিশ্বাস ফেলতে থাকেন।) চোখে পানি নেই এক ফোঁটা, অ্যাঁ। তাকিয়ে দেখ ওর দিকে। কোনো ভুল নেই, আত্মাটাকে বিক্রি করে দিয়েছিস শয়তানের কাছে। তাকিয়ে দেখ ওটাকে। চোখ দুটো ওর একেবারে শুকনো…এইমাত্র যে শাস্তি পেল তার কোনোই চিহ্ন নেই। (চেঁচিয়ে) হাত তোল! (চড় মারে তাকে।) এর পরে থেকে যখন বলব হাত তোল সুবোধ ছেলের মতো হাত তুলবি সঠিক ভাবে । এবারে যাতে আরো খারাপ কিছু না ঘটে তোর কপালে-সত্যি কথা বল। মোর্যুনকেকে কি বলেছিস? কি বলেছিস তাকে?
ইসোলা : আজ্ঞে…আমি জানি না আজ্ঞে।
এরিনযোবি : মিথ্যে বলতে চাইছিস আমাকে? জিজ্ঞেস করছি, ওলুমোরিনের মেয়েকে গোপনে কি বলেছিস তুই? (নীরবতা) একগুঁয়ে হতে চাইছিস? বল কি বলেছিস তাকে? কি বলেছিস তাকে? (আবার মারতে থাকেন।) হাত নামাবি না। তুলে রাখ হাত দুটো যেখানে আছে। এবার বল, কি বলেছিস তাকে? নিজে থেকে বলবি, নাকি ঠেঙিয়ে বার করব তোর থেকে?
ইসোলা : বুঝতে পারছি না ঠিক কোন কথাটার কথা বলছেন আপনি-।
এরিনযোবি : মিথ্যেবাদী! তোর এ বাচ্চা বয়সেই পাক্কা উকিলের মতো যুক্তি বার করছিস? বলিসনি গতকাল তুই মুখোশ নাচের দলের সঙ্গে শহরে গিয়েছিলি? গিয়েছিলি, না যাসনি?
ইসোলা : (ঘাবড়ে) আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেছিলাম ওকে।
এরিনযোবি : ঠিক আছে বলে যা। বল শুধু খেলার ছলে তুই বলেছিলি এটা, বানিয়ে বলেছিলি। তুই কখনোই যাসনি মুখোশ নাচের দলের সঙ্গে রাস্তায়।
ইসোলা : আমি…আমি ঠিক…অস্বীকার করতে চাইছি না, আজ্ঞে।
এরিনযোবি : ঠিক যেন তোরই যোগ্য কাজ! একটু আগে এ গুনগনির পোশাকে সেজে রাস্তায় নেচেছিস পৌত্তলিকের মত। বল, এটা খ্রিস্টানের বাড়ি, কি বাড়ি নয়? তোকে কি আমি বড় করে তুলিনি খ্রিস্টান হিসেবে..মোযি! মোযি!
মোযি : (নেপথ্যে) বলুন, রেভারেন্ড।
এরিনযোবি : এসো, এসে শুনে যাও তোমার পুত্রটি তোমার বাড়িতে সাম্প্রতিক কি সম্মান বয়ে এনেছে?
মোযি : কি হয়েছে, রেভারেন্ড?
এরিনযোবি : এগুনগুন…তার সাম্প্রতিক চাকরি। মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই এক ভোরে জেগে উঠে দেখব আমাদের দরজায় পশুবলি হয়েছে.. একটা কুকুরের দু-টুকরো দেহ অথবা আরো কিছু ঘৃণার দৃশ্য। তোর জন্যেই আমার বাড়ির হাল আজ এই দাঁড়িয়েছে, শয়তানের বাচ্চা! (সংলাপ সহ ঘুষি)
মোযি : ইসোলা, তুই কি জানিস না, এটা খারাপ। তুই একজন খ্রিস্টান। এ ধরনের ব্যবহার তোর বাবাকে শুধু অসন্তুষ্টই করবে!
এরিনযোবি : জানো কি, কেমন করে একথা শুনলাম আমি? ছেলেটা লজ্জাকরভাবে শুধু পালিয়েই যায়নি, গিয়ে আবার মোর্যুনকে কাছে বাহাদুরি নিয়েছে। মেয়েটা আবার বলছে ওর বাপ মাকে। আর জানোই তো ওলুমোরিন পরিবারটা কোন ধাঁচের। সকাল হবার আগেই সারা শহর জেনে যাবে কেচ্ছাটা। পাদ্রীর ছেলে পৌত্তলিকদের সঙ্গে ভিড়ে খানাপিনা করছে…(আবার মারেন) অপদার্থ ছেলে, এভাবেই তুই আমার নামের ওপর কলঙ্ক চাপাতে চাস? (মারতে থাকেন বার বার।) তাই না? তাই না? (‘তাই না’ তাই না’ ধ্বনিত হতে থাকে কিল চড়ের আওয়াজের সঙ্গে, পুনরাবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে ঘনতা বাড়তে থাকে তার। ইসোলা অস্থির হতে থাকে যাবো, মারো, গোঙ্গাতে থাকে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা! কি হয়েছে? ইসোলা, জাগ, জেগে ওঠ ইসোলা…
ইসোলা : অ্যাঁ? কি …কে এটা?
মোর্যুনকে : আমি, আমি মোর্যুনকে। আজি জেগে উঠেছ কি এখন, ইসোলা?
ইসোলা : কি ব্যাপার? ওহ্ আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম?
মোর্যুনকে : হ্যাঁ, কিন্তু কিসের স্পপ্ন? এমন ছটফট করছিলে কেন?
ইসোলা : দু:খিত। ঘুমের ঘোরে কথা বলছিলাম নাকি আমি?
মোর্যুনকে : না। তবে উথাল-পাথাল করছিলে। গোঙাচ্ছিলেও তুমি ব্যথা করছিল নাকি তোমার?
ইসোলা : না, না। ঠিক আছি আমি। আমি দু:খিত তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম।
মোর্যুনকে : ঠিক জান, তুমি অসুস্থ নও?
ইসোলা : হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক জানি। মোর্যুনকে আমি শুধু স্বপ্ন দেখছিলাম। যাও আবার ঘুমোও গিয়ে।
মোর্যুনকে : ঠিক আছে। শুভরাত্রি, ইসোলা!
ইসোলা : শুভরাত্রি!
ইসোলা : (ঘুমের ঘোরে) কি হয়েছে মোর্যুনকে?
এরিনযোবি : মোর্যুনকে? পাগল হলি নাকি তুই? আমি ডাকলাম তোকে আর তুই উত্তর দিচ্ছিস মোর্যুনকে কে? এটা কোন ধরনের পাগলামি? ঐ মেয়েকে কি তোর মগজে পুরে রেখেছিস?
ইসোলা : (ছোট ইসোলা।) আজ্ঞে? আমি…আমি…
এরিনযোবি : ওলুমোরিনের মেয়ের ব্যাপারে তোকে কি আমি সাবধান করে দিইনি? সাবধান করে দিয়ে বলিনি কি ওর সঙ্গে তোকে যেন আর না দেখি?
ইসোলা : আজ্ঞে, হ্যাঁ।
এরিনযোবি : তাহলে তোরা দুজনে মিলে গির্জার চত্বরে আজ বিকেলে কি করছিলি? তার সঙ্গে দেখা গেছে তোকে..না, আমার কাছে মিথ্যে বলবি না তুই। তোকে দেখা গেছে ওর সঙ্গে। কি করছিলি ওকে নিয়ে? সাবধান করে বলিনি তোকে আর দেখা করবি না ওর সঙ্গে।
ইসোলা : আমরা শুধু দেখছিলাম কবরের ফলকগুলিকে।
এরিনযোবি : কবরের ফলক দেখবার জন্য গিয়েছিলি তোরা দুজনে? সতর্ক করে দিইনি উপাসনার পর গির্জার চত্বরে আর থাকবি না? ভদ্র বাড়ির ছেলে মেয়েরা উপাসনার পর সোজা ফিরে যায় যার বাড়ি, আর তোরা ঘুরে বেড়াস গির্জার চত্বরে। কবরের ফলক দেখে? (তাকে মারেন।) এই কি শিক্ষা তোকে দিয়েছি আমি? (পুনরায় মার) এভাবেই কি তোকে বড় করে তুলছি আমি? আমার প্রত্যেকটি আদর্শ যাতে তুই লঙ্ঘন করিস? কতবার বলেছি মেয়েটার কাছ থেকে তুই দূরে থাক? কতবার? বল, কতবার… কতবার…কতবার! কতবার…!কতবার! কতবার।
ইসোলা : (অস্বস্তিভরে গোঙায়। একটা আচমকা গোঙানির চিৎকার এবং সে জেগে ওঠে) মোর্যুনকে…ভাল, ওকে জাগিয়ে দিইনি। (দেশলাই ঠুকে লন্ঠন জ্বালায়)।
মোর্যুনকে : (জেগে ওঠে।) কে? ওহ, ইসোলা, কি করছ?
ইসোলা : কিছু না। শুধু একটা আলো চাইছিলাম।
মোর্যুনকে : কিসের জন্য।
ইসোলা : খারাপ খারাপ স্বপ্ন খালি। যাও ঘুমিয়ে পড়, আলোটা জ্বালা থাকলে হয়ত আমার ঘুম ভালো হবে।
মোর্যুনকে : ও হ্যাঁ, বিমপে বলে…এখন আমরা আবার ঘুমোতে যাব কি-না?
মোর্যুনকে : এটা সত্য বিমপে বলে তোমার বগলের নিচে যদি একটা টাটকা পাতা রাখতে পার অথবা পার…(সরাসরি দৃশ্যান্তর)
এরিনযোবি : ইসোলা।
ইসোলা : আজ্ঞে।
এরিনযোবি : মোযি! তুমি কোথায়? মোযি?
মোযি : (আসতে আসতে) রেভারেন্ড, কি হয়েছে? কি ঘটল?
এরিনযোবি : এ বিচারই মহৎ প্রভু ন্যস্ত করা ভাল ভেবেছেন। (ইসোলাকে মারেন।) ঈশ্বরবিহীন বালক, একটার পর একটা লজ্জা বয়ে আনছিস আমার বাড়িতে। চল দেখি (সহসা ধরে টানতেই ইসোলা পড়ে যায়।) ওঠ! হিঁচড়ে টেনে তোলেন তাকে।) ওঠ…ওঠ বলছি!
মোযি : (ভীত, আর্তনাদ করে) রেভারেন্ড, দোহাই তোমায়, দোহাই..লাথি মেরো না ওকে।
এরিনযোবি : ওঠ। আয়, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ কত ক্ষতি করেছিস তার। দেখি, মুখ তুলে তুই তাকাতে পারিস কিনা সরাসরি তার চোখের দিকে…(টানেন, প্রায় হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকেন দরজার দিকে।)
মোযি : রেভারেন্ড, দোহাই তোমার …আস্তে টান। রেভারেন্ড, দোহাই..হও, তুমি মেরে ফেলবে ওকে। রেভারেন্ড …আমিও যাব ওদের সঙ্গে…আমার মাথার ওড়না…কোথায় আমার মাথার ওড়না…(দৃশ্যান্তর। এরিনযোবি রাস্তার উপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে ইসোলাকে। রাস্তায় নানাধরনের আওয়াজ-মানুষ, ছাগল, বাই-সাইকেল এবং মাঝে মাঝে মোটরের হর্নের আওয়াজ। মিশে যায় ‘ওমো যোভিয়া’-র প্রস্তাবনার সঙ্গে।)
গান : ৫
বাচ্চা আমি মিনতি করছি তোকে
মিনতি করছি তোকে
নতজানু হয়ে মিনতি করছি তোকে
মিনতি করছি তোকে
বরবটির দই নিয়ে মিনতি করছি তোকে
তৃপ্ত হ তোকে মিনতি করছি আমি
মিনতি করছি তোকে
তৃপ্ত হ তোকে মিনতি করছি আমি মিনতি করছি আমি
এরিনযোবি : নষ্ট ছেলের ক্রমোন্নতি দেখছি তোর মধ্যে…তোর জন্মের পর থেকে এটাই তোর ধরন, লক্ষভ্রষ্ট না হয়ে এ পথই অনুসরণ করছিস তুই। মুখোশ নাচে যোগ দেবার মুহূর্ত থেকেই তুই যে ভ্রষ্ট হতে শুরু করেছিস আমি জানি। আমার ছেলে …একটা এগুনগুন। পাদ্রীমহলে আমাকে হাসির খোরাক করে তুলেছিস তুই। যখন আমি পবিত্র প্রার্থনা পরিচালনা করি, প্রত্যেকটি ভালোমানুষ নিশ্চয়ই হাসতে থাকেন, বলতে থাকেন আমি কেন নিজের ছেলেকে এগুনগুন ঝড়ের মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত করে আনতে পারি না। ওহ্, গোড়া থেকেই তুই ভ্রষ্ট…মেলামেশা করিস বস্তির বাচ্চাদের সঙ্গে… গান করিস বুনোদের…রাতের বেলা বেরিয়ে যাস, কেউ জানে না ভোর হবার আগে কত ধরনের নোংরা কাজ করিস! এখন তোর সব খেল খতম… তোর পাপের হাঁড়ি সূর্য ভেঙে দিয়েছে…কি হল? এটার মানে কি? মোযি, এটার মানে কি?
মোযি : রেভারেন্ড, আমি….
এরিনযোবি : ফিরে যাও, মোযি ফিরে যাও এক্ষুনি।
মোযি : রেভারেন্ড আমার ওখানে থাকার দরকার আছে।
এরিনযোবি : তুমি সেখানেই থাকবে, যেখানে থাকবার নির্দেশ দেব আমি, বুঝলে। এখন তোমাকে মায়ের দাতাগিরি দেখাতে হবে না।
মোযি : কিন্তু রেভারেন্ড…(ভিড় জমার আওয়াজ।)
এরিনযোবি : তোমার যদি এখন দয়া দেখাতে হয়, তাহলে তার দাবীদার ঐ বেচারা মেয়েটি। তার জীবনটাই ধ্বংস হয়ে গেছে পুরোপুরি, ধ্বংস হয়েছে তোমার ছেলেকে দিয়ে। যৌনপাপীকে দয়া দেখাবার কি পাপ তা কি দেখতে পাচ্ছ না? বাড়ি যাও, মোযি..ফিরে যাও বাচ্চাগুলোর কাছে…(জনতাকে ক্রোধের স্বরে।) কি ব্যাপার? আপনাদের সকলেরই কারুর কোনো কাজ নেই? এধরনের হল্লা নাচ দেখাবার স্বাধীনতা আপনারা পেয়েছেন বলে ভাবছেন? যান, আগে নিজেদের পাপের দিকে তাকান। চলে যান, সব ভণ্ডের দল, ভেগে পড়–ন, চলে যান-। নিজেদের গোপন পাপগুলো উন্মোচিত হবার আগেই তাদের প্রচণ্ড আঘাত করুন। (তিনি চলে যেতে থাকেন। তাঁর চলে যাবার সময় ‘ওমো যোউয়ো’ গানটি শোনা যায়।) মনে হয় আপনারা অহংকারী…অহংকারী হতে ভালোবাসেন আপনারা, তাই না? বলুন তো কেন আপনারা যান মুখোশ নাচের আসরে, শুধু আপনাদের পেছনে ভিড় জোগাড় করবার জন্যই তো। চিৎকার করে গালিগালাজ করেন, ভিক্ষে করেন পয়সা। অভিশাপ দেন, চেঁচান, ঈশ্বরের মুখের উপর করেন তাঁর নিন্দা। কিন্তু সেই ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত আপনাদের আঘাত করবেনই, ধন্যবাদ দিন এখনো আঘাত দিয়ে আপনাদের মেরে ফেলেননি তিনি। (সহসা গর্জন করে) মোযি এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন ওখানে? কিসের অপেক্ষা করছ? ফিরে যাও, ফিরে যাও এক্ষুনি। বাড়ি ফিরে অপেক্ষা কর আমার জন্য। (আবার যেতে থাকেন) দুর্বল। কী দুর্বল! আমার বিপদের সময় যার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথা…আহ্, নিজের হাতে নৈপুণ্য দেখার জন্য প্রস্তুত হও। (তাঁরা কয়েক ধাপ উপরে ওঠেন। দরজায় ধাক্কার শব্দ।) এবারে দেখব কতটা কঠিন তুমি।
মিসেস : রেভারেন্ড…আমার স্বামী অপেক্ষা করছেন। আপনি। আমার মেয়েকে কি করেছেন আপনি? ওকে ধ্বংস করেছেন, জানেন কি সেটা? ওকে ধ্বংস করেছেন।
ওলুমোরিন : ইসোলা, আমার পক্ষে দুঃখের দিন এটা। আমার মেয়ে তোর কোন ক্ষতি করেছিল যে শহরের সব মেয়ের মধ্যে তুই তাকেই তুলে নিলি?
মিসেস : মোর্যুনকে…মোর্যুনকে…
মোর্যুনকে : মা!
মিসেস : শুরু কর। বল আবার আজ সকালে কি বলেছিলি আমাকে?
মোর্যুনকে : আমি জানি না…ইসোলা…
ওলুমোরিন : ওর সঙ্গে কথা বলিস না…তোর মায়ের কথার জবাব দে।
মিসেস : ইসোলা দায়ী কি দায়ী নয়?
এরিনযোবি : অবশ্যই ইসোলা দায়ী। মনে হয় না ছোঁড়া এতটাই বখে গেছে যে সব অস্বীকার করবে।
মিসেস : তাছাড়া, আমার মেয়ে কিছু বুঝতেই পারেনি। ওকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। বিমপেকে মেয়ে তাই বলেছে। ছোঁড়া তোর সঙ্গে চালাকি করেছে, তাই না? ঠকিয়েছে তোকে। এসব বোঝার পক্ষে তুই একবারেই সরল।
ইসোলা : মিসেস ওলুমোরিন..
এরিনযোবি : চুপ! তোকে কিছু বলতে বলা হয়েছে কি?
মিসেস : দেখছেন তো রেভারেন্ড, ব্যাপারটা পরিষ্কার। আমার মেয়ে একেবারেই শিশু। কিছু সে বুঝবে কেমন করে? তার অজ্ঞানতায় পাপী সুযোগ নিয়েছে আপনার ছেলে।
ইসোলা : মিসেস ওলুমোরিন, আমার মনে হয়-
এরিনযোবি : শুনতে পাচ্ছিস না তোকে চুপ করে থাকতে বলছি আমি?
ওলুমোরিন : না না, শুনি কি বলার আছে ওর। ইসোলা, তুই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাস, তাই না? বেশ, বলতে থাক। শুনি সে কথাই যদি অস্বীকারই করতে চাস।
ইসোলা : আমি শুধু…আমি ঠিক…জিজ্ঞেস করতে চাই যদি…খানিক সময়ের জন্য মোর্যুনকের সঙ্গে কথা- (বেজায় হট্টগোল।)
ওলুমোরিন : তোর ইচ্ছে কথা বলার?
এরিনযোবি : ছোকরা পাগল হয়ে গেল নাকি?
মিসেস : ঠিক শুনছি তো আমি? ঈশ্বর সহায় হোন আমার। এরমধ্যেই কি অনেক ক্ষতি করিসনি তুই? মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে চায়!
এরিনযোবি : ইসোলা, বুদ্ধিভ্রংশ হয়নি নিশ্চয়ই?
ইসোলা : মোর্যুনকে, আমি জানতে চাই…আমাকে বলনি তুমি…সত্যি কি সন্তান হবে তোমার?
এরিনযোবি : ছেলেটার মাথা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে? ইসোলা, তোকে কি বলিনি একেবারে কথা বলবি না বাচ্চাটার সঙ্গে? সরে আয় ওর কাছ থেকে..
মিসেস : হে ভগবান, মেয়েটার হাত ধরেছে ও! দেখতে পাচ্ছেন…দেখতে পাচ্ছেন… আমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যাচ্ছি!
ওলুমোরিন : আমার মেয়েকে ছেড়ে দে বলছি।
ইসোলা : মোর্যুনকে, তাহলে আমার সন্তান তোমার গর্ভে, আমার নিজের সন্তান?
মিসেস : বাঁচাও! বাঁচাও! কি সাহস আমার মেয়েকে ছুঁচ্ছে। ভাগ, ভাগ, বেহায়া ছেলে। মেয়েটার থেকে দূরে দাঁড়া।
এরিনযোবি : আমার লাঠিটা নিয়ে আয়। কোথায় আমার লাঠি?
মোর্যুনকে : ছেড়ে দিন…ছেড়ে দিন ওকে। ওকে মারবেন না। ইসোলা পালিয়ে যাও।
ওলুমোরিন : আমার সামনে, আমার সামনে মেয়ের হাত ধরছে। মেয়েটাকে এতসব করার পরেও? শয়তানের নিজের বাচ্চা… শয়তানের আপন জারজ ফল!
মোর্যুনকে : পারছি না…আমি আর পারছি না…(পায়ের আওয়াজ ধাবমান।)
মিসেস : মোর্যুনকে, ফিরে আয়, ফিরে আয় এখানে। বিমপে! বিমপে! আয়াটা গেল কোথায়? বিমপে…মেয়েটাকে ফিরিয়ে আন। ফিরিয়ে আন বলছি।
ইসোলা : বাবা, আমি…
এরিনযোবি : বাবা বলে ডাকবি না আমাকে… (লাঠিটা নামিয়ে আনেন তিনি।)
ইসোলা : না!
মিসেস : বাঁচাও! বাঁচাও! ছেলেটা ওর বাপকে মারছে। বাঁচাও! পড়শীর দল! বাঁচাও!
এরিনযোবি : (কঠিনভাবে) ইসোলা।
ইসোলা : না! না! (কিছু সময়ের ধস্তাধস্তি। বেতের বাড়ির আওয়াজ। জেগে ওঠে ইসোলা, লাফিয়ে ওঠে, শ্বাস ফেলতে থাকে জোরে জোরে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা কি ব্যাপার?
ইসোলা : মানুষটা কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না?
মোর্যুনকে : আবার তাঁর স্বপ্ন দেখছ? ইসোলা, ওঁকে কি তুমি ভুলতে পার না?
ইসোলা : আমাকে একা থাকতে দিচ্ছে না কেন?
মোর্যুনকে : ইসোলা! (অকস্মাৎ ভীত) কোথায় যাচ্ছ তুমি?
ইসোলা : বাইরে। চাঁদ উঠেছে।
মোর্যুনকে : থাম। আমাকে একা ফেলে যেও না এখানে।
ইসোলা : বেশ, চলে এস যদি তোমার ভাল লাগে।
মোর্যুনকে : আহ্, পূর্ণিমার চাঁদ। দেখ, দেখ…ঐ যে মোযি, চাঁদের আলোর উত্তাপ নিচ্ছে।
ইসোলা : কী শান্তিময় দেখাচ্ছে ওকে। সাবধান, ওকে চমকে দিও না।
মোর্যুনকে : ইসোলা, দেখ!
ইসোলা : কি হল?
মোর্যুনকে : বাঁশঝাড়ের পাশে…ঐ যে আবার…ইসোলা, হে ঈশ্বর, কি বিশাল ওটা…কি বিশাল..
ইসোলা : আমার বন্ধুকটা নিয়ে এসো…জলদি! ঐ ত এরিনযোবি! আজ রাতে পেড়ে ফেলবে ওটাকে। আবার পালিয়ে যাবার আগে নিয়ে এস জলদি। চট করে। (নড়া চড়ার দ্রুত আওয়াজ।)
মোর্যুনকে : এই নাও, ইসোলা। ধর যদি তোমার ফসকায়, অথবা শুধু আহত কর ওটাকে…খুব বিপদের হবে না?
ইসোলা : আমি ফসকাবো না।
মোর্যুনকে : ওহ্, কি ভয়ংকর দেখতে ওটাকে। গুলি করছ না কেন? এক্ষুনি ওটাকে মেরে ফেল ইসোলা।
ইসোলা : আমি শুধু অপেক্ষা করছি কখন মাথাটা বেরোয়। এ আলোতে ওকে নিশানা করা খুব কঠিন। চাঁদের আলো পাতার রঙের মতো এক দেখাচ্ছে। আর এভাবে এত চেঁচিও না। শুধু মাথাটার দিকে নজর রাখ, পাতাগুলো মাঝখানে।
মোর্যুনকে : ঐ তো! ঐ তো ওটা ওখানে! কি কুৎসিত দেখতে…ইসোলা। আমার ভয় করছে।
ইসোলা : আমাকে ছুঁয়ো না, আমি ফসকাবো…ঐ বেরিয়ে আসছে আবার। (বন্ধুকের ঘোড়া টেপে, শুধু খট করে একটা শব্দ হয়।)
মোর্যুনকে : কি হল? ছুটল না যে।
ইসোলা : (নিজের কপালে আঘাত করে) বোকা! বোকা! কি বোকা আমরা! এটাতে বারুদ ভরা দরকার ছিল। বন্দুকটা যখন হাতে নিয়েছিলে এটা ছুটে গিয়েছিল মনে নেই?
মোর্যুনকে : ওহ্…ওহ্ ইসোলা, খুবই দু:খিত আমি…বাস্তবিক আমি খুবই দু:খিত… কোথায় যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ তুমি?
ইসোলা : বাড়ি।
মোর্যুনকে : বাড়ি? মানে, তোমার বাবার বাড়ি?
ইসোলা : হ্যাঁ, আমাকে কিছু বারুদ আনতেই হবে। আমি জানি তিনি বারুদ রাখেন কোথায়। তারপর গুলি করব।
মোর্যুনকে : এখুনি কেন? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হয় না? (মেতা মেতা ল্’ওরে’ গানটি শুরু হয় এবং দৃশ্যটির শেষ পর্যন্ত প্রবাহিত হতে থাকে)
গান : ৬
বন্ধু আসছে তিনজন করে
বন্ধু আসছে তিনজন করে
প্রথমজন দিতে চাইল মাদুর ঘুমোবার জন্য
পরের জন দিতে চাইল মেঝে ঘুমোবার জন্য
তৃতীয়জন দিতে চাইল তার বক্ষ
একবারও পিটপিট করিনি আমি, গ্রহণ করলাম বক্ষ-উপহার
আমি জেনেছি নদীকে, জেনেছি আমি সমুদ্রকে
স্রোতদের পিতার পথ আমি জানি
ছোট পর্ণও বয়ে আনতে পারে মৃত্যু স্তন্তুদের উপর
একজন সোমত্ত মানুষও মরে যায় অবসাদ-ভরা শ্রমে
ইবাদানের ষড়যন্ত্র যুদ্ধকে বয়ে এনেছিল শহরে
সুন্দর পালক দিয়ে তোতা বানায় আবোল তাবোল
বন্ধুত্ব শুধু ভুলে-ভরা, শুধুই অন্ত:সারহীন।
ইসোলা : না। আজ রাতেই মারতে হবে ওটাকে। আজ রাতে। আর অপেক্ষা করতে পারছি না আমি।
মোর্যুনকে : ইসোলা, এটা বোকামি। কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক।
ইসোলা : না, আজ রাতে। এটার জন্যই যত দু:স্বপ্ন দেখা দিচ্ছে। দেখতে পাচ্ছ না? মারতেই হবে ওটাকে।
মোর্যুনকে : অপেক্ষা কর আমার জন্য…ছেড়ে যেও না আমাকে …ইসোলা, আমাকে একা ফেলে যাও সব সময়। অপেক্ষা কর, দোহাই তোমার…
ইসোলা : ঠিক আছে, জলদি কর।
মোর্যুনকে : চলে গেছে এর মধ্যেই। সাপটা চলে গেছে। তাহলে অপেক্ষা করছ না কেন সকালের জন্য?
ইসোলা : যদি পালিয়েই থাকে তবু ঢুঁড়ে বার করব ওটাকে। আজ রাতেই ওটাকে শিকার করে ফেলতে চাইছি আমি।
মোর্যুনকে : (ব্যাকুল আর্তনাদে) ইসোলা, বড্ড দ্রুত ছুটছ তুমি। দাঁড়াও, দোহাই তোমার…অপেক্ষা কর কাল পর্যন্ত…ইসোলা, ঐ দানোটাকে আজ রাতে শিকার করতে যেতে তুমি পারো না…ইসোলা; পারতেই হবে..পারতেই হবে আমাকে, নইলে ঘুম হবে না আমার। মোড়ল মশাইয়ের ঘরে লুকিয়ে আমি ঢুকব, তারপর বারুদ হাতাব।
মোর্যুনকে : তাহলে এটা সত্যিই। বিমপে আমাকে বলেছিল তুমি বদ্ধ পাগল, একেবারে বদ্ধ পাগল। এখন বুঝতে পারছি সত্যিকথাই বলেছিল সে…তুমি পাগল, ইসোলা…তুমি পাগল হয়ে গেছ।
ইসোলা : ঐ জিনিসটা আমাকে পাক দিয়ে ঘুরলে আমি ঘুমুতে পারব না। দেখনি তুমি, আর তোমাকে দেখাতেও চাই না আমি…আরেকটা ভাঙা খোলা আমি দেখেছি ঝোরার ওপরে…পাহাড়ে আছড়ে ভেসেছে অন্যগুলি মতো…কি লাভ যদি তারা যেতে আসতে না পারে নিজেদের ইচ্ছেমতো। আজ রাতেই আমি মারব ওটাকে…(গান জোরে হয়। তারপর দৃশ্যান্তর। একটি জানলা ভাঙ্গার শব্দ।)
মোযি : কে ওখানে? কে? কে ওখানে? যেই হও না কেন, বেরিয়ে এসো, শুনতে পাচ্ছ? খিড়কির দোর দিয়ে আমায় বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকো না…আমার ছেলে এখানে নেই আর তাই তুমি হাতড়ে বেড়াতে পার সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত। সে নেই এখানে, তাই ভাগো এখান থেকে, শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে। ভাগো! শুনতে পাচ্ছ? আমি জানি ওখানে আছ তুমি। আমি কালা নই। বেরিয়ে এসো, যেই তোমাকে পাঠাক না কেন। অথবা ফিরে যেতে পার, গিয়ে বলতে পার তার মেয়েকে পাইনি আমি, আমার ছেলেকেও পাইনি আমি। যাও, গিয়ে বলো তাকে। ঈশ্বর তাকে অভিশাপ দেবে যদি আমার ছেলেকে সে ছোঁয়….(নীরবতা। ধীর পায়ের আওয়াজ দরজার কাছে, তারপর হঠাৎ দড়াম করে খুলে যায়।)
ইসোলা : মা, দোহাই তোমার…বন্ধ করো দরজাটা।
মোযি : ইসোলা! বাবা আমার, কোথায় ছিলি তুই? কি করছিলি? (ইসোলা বাক্সগুলো হাতড়ায়, খ্যাপার মতো খুঁজতে থাকে।) ওহ্, ইসোলা, আমাকে এমন ভেঙে টুকরো টুকরো করছিস কেন? তার চাইতে ঘুঁষি মেরে এক্ষুনি আমাকে মেরে ফেলছিস না কেন? আমি কি তোর মা নই? ইসোলা, মোর্যুনকে কোথায়? কোথায় হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা? ইসোলা, জবাব দিচ্ছিস না কেন? তার বাবা মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সারা শহরের লোকদের খেপিয়ে তুলেছে তোর বিরুদ্ধে। সে বলছে তুই নাকি চুরি করেছিস তার মেয়েকে…ইসোলা, তোর মায়ের কথার জবাব দে…কি করছিস তুই? ইসোলা। ওগুলো তোর বাবার জিনিস …বাপ আমার…তোকে আমরা কি করেছি? তুই যে বিপদের মধ্যে আছিস বাবা…তোকে লুকোতে হবে!
ইসোলা : আহ্…এই যে।
মোযি : কি ওটা? (ইসোলা বন্দুকটা তুলে নেয়) আরে এটা? নামিয়ে রাখ। এটা তোর বাবার বন্দুক না? (জানালা খোলা হয়) ইসোলা, চোরের মত জানালাটা ব্যবহার করবি এখন? কোথায় যাচ্ছিস তুই? না, তুই যেতে পারবি না। এখানেই থাকবি।
ইসোলা : মা, আমাকে যেতে দাও। (খানিক ধস্তাধস্তি।)
মোযি : তোকে এখানে থাকতেই হবে। তোর কি একেবারেই ভয়ডর নেই? বলছি, সারাটা শহর তোর বিপক্ষে। তারা তোকে বলছে ছেলেধরা… তার মানে জানিস তুই? ছেলেধরা। এ গল্পটাই তোর সম্পর্কে চালু করেছে ওলুমোরিন।
ইসোলা : মা, যেতে দাও আমাকে…এখানে থাকা আমার চলবে না।
মোযি : তোর মনটাকে কি আমার বিরুদ্ধে একেবারে পাথর করে রেখেছিস, তুই? বলছি তোকে, সারা শহরের সম্পত্তি এখন তোর জীবন। ছেলেধরা। তারা সবাই বলছে তুই ওলুমোরিনদের বাড়িতে গিয়ে মেয়েটাকে নষ্ট করেছিস।
ইসোলা : আমি করিনি, ব্যস ফুরিয়ে গেল।
মোযি : ফুরোল কি? তাহলে মেয়েটা কোথায়? কোথায় মেয়েটা? ইসোলা, আজ রাতে তুই কোথায় ছিলি? এমন কঠিন ব্যবহার বুড়োদেরই মানায়। বাবা আমার, তুই আমার মধ্যে ভয় ভরে দিচ্ছিস। তুই কি সত্যিই আমার ছেলে? আমি যেন তোকে আর চিনতে পারছি না।
ইসোলা : (আরো হিংস্রভাবে) মা, কি করছ তুমি? যেতে দাও আমাকে। যেতে দাও বলছি। (নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে)
মোযি : (ফোঁপায়) আমাকে মেরে ফেল। বন্দুকের আর কি কাজ? তোর বাবার ঘরে কি পাবার জন্য এসেছিস? মোর্যুনকে কোথায়? আমার বিরুদ্ধে নিজেকে এত কঠোর করে রেখেছিস কেন তুই? তোর মধ্যে কি ঘটেছে? ইসোলা? বাচ্চা বয়স থেকে তোর মধ্যে আমি কি পুষেছি যা আমি জানি না?
ইসোলা : কিছু না, কিছু না। আমাকে যেতেই হবে।
মোযি : যেতেই হবে? কোথায় যেতে হবে? এটা ছাড়া কি তোর আর কোন বাড়ি আছে? ভাবছিস বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারবি আমাকে ভয় আর প্রশ্নের মধ্যে রেখে? মোর্যুনকে কোথায়?
ইসোলা : তুমি যদি জানতে…তার নিজের বাড়িতেই।
মোযি : আমাকে মিথ্যে বলো না বাবা। এর আগে তো কখনো এমন করিসনি, মিথ্যে বলিসনি আমার কাছে।
ইসোলা : আমি ওকে নিয়ে গেছি ওখানে…এই মাত্তর। সে যেতে চায়নি কিন্তু আমি তাকে রেখে এসেছি ওখানে।
মোযি : আর ওলুমোরিন? সে কি বাড়িতে আছে? বাপ মা কি জানেন মেয়েটা তাদের ফিরেছে?
ইসোলা : তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই আমার। বাড়ির দরজাটা ছিল খোলা, জায়গাটা মনে হচ্ছিল ফাঁকা। এবার আমাকে যেতে দেবে কি?
মোযি : তারা যখন জানতে পারবে তাদের মেয়ে ফিরেছে তখন তুই যেতে পারবি যেখানে খুশি। তার আগে নয়। এখানে তোকে ওরা নিয়ে যেতে পারবে আমার মরা শরীরের উপর দিয়ে।
ইসোলা : না মা। আমাকে যেতেই হবে এখন। আমাকে এখন ছেড়ে দাও মা।
মোযি : মেয়েটাকে ফিরে পাক, তার আগে নয়।
মোর্যুনকে : (বাইরে থেকে) ইসোলা। ইসোলা।
মোযি : কে? মোর্যুনকে গলা না? (পদধ্বনি বাড়ির ভেতরে আসে।)
মোর্যুনকে : ইসোলা…তুমি ফিরে গেলে না?
মোযি : কি ব্যাপার? কোথায় ফিরে যাবি মেয়েটার জন্য?
ইসোলা : এটাই একমাত্র উপায় যাতে আমি ওকে নিয়ে ওখানে থাকতে পারি। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম আমি ফিরে যাব।
মোর্যুনকে : বাড়িটা একেবারে ফাঁকা..কেউ নেই…এমনকি বিমপেও নেই কোথাও। কেমন করে থাকি আমি? মা, সবাই মিলে কোথায় গেছে?
মোযি : তোকে খুঁজতে।
মোর্যুনকে : কত ভিড় দেখলাম…মশাল হাতে, অস্ত্র হাতে…কিছু গন্ডগোল হয়েছে নাকি?
মোযি : ওরা সবাই তোর বাবার বন্ধু….তারা বলছে আমার ছেলে তোকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। দেখতে পাচ্ছিস আমার ছেলের উপর কত ঝামেলা তুই এনেছিস?
ইসোলা : মা, ওকে দেখ-। আমি যাচ্ছি।
মোযি : না! আমি তোদের দুজনকেই লুকিয়ে রাখব বাড়ির মধ্যে। তারা আসুক, এসে এখানে তোদের খুঁজে পাক। বুঝলে মেয়ে, ওরা কিন্তু এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করবে ইসোলা তোমাকে নষ্ট করেছে কিনা। তোমার বাপকে বলো কিছুটি করেনি ও। নাকি করেছে? তুইও কি ওকে দোষী বলবি? নাকি ওকে বাঁচাবি ওদের রক্তপিপাসার হাত থেকে?
মোর্যুনকে : আমি ইসোলার সঙ্গে যাবই, আমি যাবই… (জানালা সহজে খুলে যায়। জনতার প্রবল কোলাহল। ইসোলা লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।)
মোযি : ইসোলা! ইসোলা!…ফিরে আয়। ফিরে আয়!
স্বর : ঐ তো ছোকরা।
..ঐ ওই যে। জানালার ফোকর দিয়ে। তাড়া কর…তাড়া কর! জঙ্গলে পালিয়ে যেতে দিয়ো না ওকে। কেটে ফেল! চিরে ফেল ওকে! ঝোপের মধ্যে যেন যেতে না পারে।
ওলুমোরিন : (চেঁচিয়ে) যে ওকে ধরতে পারবে আমার বাড়িতে তার অবাধ গতি। সে যা চাইবে দিয়ে দেব।
স্বর : ওটাকে ঝোপ ঘাসের মধ্যে পালাতে দিয়ো না। কেটে টুকরো করে ফেল ওটাকে। কেটে টুকরো করে ফেল ওর যাবার আগেই লম্বাঘাসের কাছে পৌঁছে যাই।
মোযি : ওলুমোরিন..ওদের ফিরতে বলুন। ওলুমোরিন, আপনার মেয়ে এখানে নিরাপদ আর সুস্থ।
মিসেস : কি বলছেন? মোর্যুনকে?
ওলুমোরিন : মোর্যুনকে? কোথায়?
মিসেস : মোর্যুনকে…মোর্যুনকে…
মোযি : ওলুমোরিন, আপনার মানুষ কুত্তাগুলোকে ফেরত আনুন…আপনার মেয়ে এখানে, এই যে ও! আমার ছেলের ক্ষতি করার আগে আপনার খ্যাঁকশেয়াল-গুলোকে ফিরিয়ে আনুন। রেভারেন্ড! রেভারেন্ড! ওহ্…উনি তো গির্জায়। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে ডেকে আনছি। ওলুমোরিন, আপনার মেয়েকে ফিরে পাচ্ছেন। আমার ছেলের যদি কোনো ক্ষতি হয়, আমার ছেলের যদি ক্ষতি হয়, তাহলে…তাহলে ঈশ্বর তাঁর খুশিমতো বিচার করুন। (তাঁর স্বর দূরে মিলিয়ে যায়।)
ওলুমোরিন : মোর্যুনকে, মা আমার, ভালো আছিস তো?
মিসেস : এদিকে আয়, তোকে ধরতে দে। তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো ছেলেটা?
মোর্যুনকে : আমাকে ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও আমাকে। (প্রচণ্ড হিংস্রভাবে) আমাকে যেতে দাও, ডাইনি ডাইনি কোথাকার।
মিসেস : কি বললি?
ওলুমোরিন : কি বললি মেয়ে? এদিকে আয়, এদিকে আয় বলছি!
মিসেস : শুনলে কি বলে ডাকল আমাকে?
মোর্যুনকে : আমি ওর কাছে যাব। আমাকে ছেড়ে দাও। আমি ইসোলাকে চাই।
ওলুমোরিন : চুপ্ ।
মিসেস : ছেলেটা ওকে তুক করেছে। নিজের মধ্যে আর নেই মেয়েটা শুনছ কি বলছে মেয়ে?
ওলুমোরিন : আমার হাতে ছেড়ে দাও ওকে, তারপর ওকে শুধরে দিচ্ছি বরাবরের মতো। আহ্ আমাকে মারছে মেয়েটা! (দ্রুত পদধ্বনি মিলিয়ে যায়।)
মিসেস : থামাও! থামাও মেয়েটাকে। ওর মায়ের দোহাই হারিয়ে যাবার আগে মেয়েটাকে আটকে দাও।
ওলুমোরিন : আমাকে মেরেছে! আমাকে মারল মেয়েটা! পুরো পাগল হয়ে গেছে। থামাও… আটকাও ও মেয়েকে। কিছু মানুষ: পেয়েছি, পেয়েছি ইসোলাকে। ছোট্টো ঐ ঝোপের মধ্যে… আমরা ঘিরে ফেলেছিলাম, তাই পালাতে পারেনি।
ওলুমোরিন : আমার মেয়ে…আমার মেয়ের কি হল?
মানুষ : সবাই বলছে ওর হাতে নাকি একটা বন্দুক রয়েছে। কেউ কেউ দেখেছে। সেজন্যেই আমরা ধরে আনতে পারিনি।
ওলুমোরিন : তাহলে আগুন লাগাও ঝোপে। যাও…তোমরা মানুষ নাকি? ঝোপে আগুন লাগাও, বেরিয়ে আসুক তাপের জ্বালায়। (পদধ্বনি মিলিয়ে যায়।)
অন্য একজন : কর্তা…আপনার মেয়ে, আজ্ঞে…
ওলুমোরিন : ধরতে পারোনি তাকে? (পদধ্বনির কঠিন আওয়াজ।)
মানুষ : না, কর্তা। সেও লুকিয়েছে ঝোপে।
মিসেস : নিজেদের মানুষ বল তোমরা? তাকিয়ে দেখছ কি? মেয়েটাও যে ঝোপের মধ্যে রয়েছে ওর সঙ্গে। এখন কি করবে তুমি? কি করতে চাইছ?
এরিনযোবি : (প্রবেশ করে) কিছু না। আপনাদের আর কিছু করার নেই। (পশ্চাদ্পটে মোযির কান্না।)
ওলুমোরিন : রেভারেন্ড এরিনযোবি, আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন।
এরিনযোবি : তাই বোধহয়। ব্যাপার কি? একজন মানুষ কি শান্তি পেতে পারে না ঈশ্বরের আবাসেও। আপনার লোকজনের চিৎকার আমাকে কালা করে দিয়েছে। তারপর আমার স্ত্রী ছুটে গিয়ে বললেন আপনার মেয়েকে আপনারা ফিরে পেয়েছেন। এর পরেও আপনারা ছুটে এসেছেন আমার ছেলের উপর প্রতিশোধ নিতে?
ওলুমোরিন : কোন্ মেয়ে? সেও পালিয়েছে ওখানে…ছেলেটার সঙ্গে…ঝোপের মধ্যে।
মোযি : মেয়েটা তো এখানেই। এ বাড়িতে। আপনাদের হাতে ওকে তুলে দিয়ে মিনতি করলাম যাতে আপনার লোকজনকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু ছেলে কোণঠাসা হয়ে রয়েছে ওখানে এখনো। আপনারা সবাই জন্তু হয়ে গেছেন।
মিসেস : আর আপনার ছেলে? আপনার ছেলে জন্মেছেই জন্তু হয়ে। ওকে কিন্তু অন্য কেউ জন্তু বানায়নি।
মোযি : আপনি কি মা নন? আমার ছেলের বিরুদ্ধে কি ঘৃণা আপনি পুষে রেখেছেন?
মিসেস : না, তা নয়। মোর্যুনকে আপনাদের বলবে সত্যি কথাটা। আমার ছেলে ওকে চুরি করেনি।
এরিনযোবি : খুব হয়েছে। ইসোলা কোথায়? এখন সে কোথায়?
মোযি : ঐ যে ওখানে। ঠিক যেখানে মানুষগুলি ভিড় করেছে।
এরিনযোবি : আপনারা থামুন। আমি ওকে বার করে আনছি। আপনাদের মেয়েকেও।
মোযি : (তার পেছনে চিৎকার করে) রেভারেন্ড, ওকে জানতে দিয়ো যে তুমিই গিয়েছ। ওর হাতে তোমার বন্দুক। জানতে দিয়ো ওর বাবা যাচ্ছেন-মৃদু গানের মধ্য দিয়ে দৃশ্যান্তর শিশুর জন্য শোকে ‘অগবে’ তাকে মুড়ে রেখেছিল নীলে শিশুর জন্য শোকে ‘অলুকে’ ক্যামউড রঙ করেছিল মাটি শোকার্ত বাবা পেতলের ঘণ্টা এনেছিল জোর করে কিন্ত আমরা বাস করতে পারি না বেশি করে এসব নিয়ে তাহলে আমরা জড়িয়ে পড়ি ঈশ্বরের সঙ্গে নিয়তির খেলায়Ñ
এরিনযোবি : (দূর থেকে) পথ ছাড়–ন। নিজেদের মান সম্মানও খুইয়েছেন আপনারা। পালান সব। যান, চলে যান এখন। নিজেদের বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করুন। আপনারা সবাই। আমি বলছি-যান আপনারা। আপনারা কি জানোয়ার যে রক্ত খাবার জন্য জিভ চাটছেন? আপনাদের মাথার উপর আমি ঈশ্বরের অভিশাপ ডেকে আনার আগেই আপনারা পালান। যান সবাই। (সকলে গজগজ করতে করতে সরে যায়।) ইসোলা, আমি যখন গির্জায় ছিলাম, তোর মা আমার কাছে গিয়েছিল, সব বলেছে। তুই পাপ করেছিস, আমি জানি…
ইসোলা : আমি পাপ করিনি।
এরিনযোবি : অনুতপ্ত হ। আমি তোর কাছে এসেছি কেননা আমিও পাপ করেছি। ঈশ্বরের কাছে হৃদয় খুলে দিয়ে জানলাম একমাত্র তিনিই ছেড়ে দিতে পারেন সন্তানদের, কিন্তু তা করেন না কখনো তিনি। আমার কি অধিকার আছে, তাঁর সামান্য সেবক, এত অহংকারী হবার? কি আমার স্বর আছে যাতে আমি তোকে গালাগাল দিতে পারি ঈশ্বরের সামনে মানুষের সামনে? আমার পাপও তখন তোর মতোই বিশাল হয়ে উঠল। বাড়ি ফিরে চল, তাঁর ক্ষমা পেতে আমায় প্রার্থনায় সাহায্য কর।
ইসোলা : এরিনযোবি আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।
এরিনযোবি : এরিনযোবি? বাছা, এ যে তোর বাবার নাম!
ইসোলা : এরিনযোবি, আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।
এরিনযোবি : এভাবেই কি আবার আমাকে বাইরে আটকে রাখতে চাস? দীর্ঘ রাত কেটেছে, আমার থেকে তোর কঠিন মুখ আর ফিরিয়ে নিস না। নিজের পাপের জন্য অনুতাপ কর, বাবা আবার…
ইসোলা : পাপ আমি করিনি।
এরিনযোবি : হ্যাঁ করেছিস। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে আমরা সকলেই পাপী; তাঁর দয়ার উপরেই শুধু আমাদের নির্ভর। তোর মা আমাকে ডেকে এনেছে একথা সত্যি, তিনি তোর জীবন নিয়ে ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমি আমার উপাসনা সেজন্যে ভাঙ্গিনি। মঙ্গলময় ঈশ্বর রক্ষা করেন তাঁর সন্তানদের, তাই তোর জীবন নিয়ে কোনো ভয় ছিল না আমার। তোকে আমি তাঁর হাতেই সমর্পণ করেছি…
ইসোলা : না, ওলুমোরিনের হাতে।
এরিনযোবি : বাবা আমার। আমি তোকে ঈশ্বরের হাতেই সমর্পণ করেছি। গির্জায় গেলাম শুধু প্রার্থনা করতে যেন তোর মধ্যে দিয়েই প্রভু তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন…
ইসোলা : আর ওলুমোরিন তার নিজের ইচ্ছা…এটাকে ভুলে যেয়ো না এরিনযোবি।
এরিনযোবি : বাবা আমার, এটা কি এগুনগুন ঝোপ যার ভেতর থেকে অন্ধকারের মধ্যে তিনবার চেঁচিয়ে বললি নিজের বাবার নাম। মেয়েটাকে পাঠিয়ে দে। ওর মা-বাবা অপেক্ষা করছেন।
ইসোলা : মোর্যুনকে আমার পাশেই রয়েছে। বেঁধে রাখিনি ওকে। ওকেই বল, ওর যা ইচ্ছা তাই করুক।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে বাড়ি ফিরে চলো। তোমার বাবা মা উদ্বিগ্ন। তাঁদের কাছে ফিরে এসো। (নীরবতা। শুধু গান শোনা যাচ্ছে।)কন্যা ফিরে এস মা বাবার কাছে। তুমি নিতান্ত শিশু, তবু বিপথে চলে গিয়েছ। তুমি বেরিয়ে এসো। আমি একা বোঝাপড়া করি আমার ছেলের বিবেকের সঙ্গে। (বিরতি। শুধু গান।) ইসোলা, তুই কি আটকে রেখেছিস ওকে?
ইসোলা : এরিনযোবি, তুমিই ওকে আটকে রেখেছ।
এরিনযোবি : আবার? বাবা আমার, আমাদের সমাজ বলে ছেলে বাবাকে নাম ধরে ডাকলে সেটা খুবই খারাপ সময়। মেয়েটাকে পাঠিয়ে দে। ওকে বল বাড়ি ফিরে যেতে।
ইসোলা : আসা আর যাওয়া তার নিজেরই ইচ্ছের উপর। আমার কাছে চাইবে না কিছু।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে। (‘ওমো যোউয়া’ চলতে থাকে।) তাহলে আমিই আসছি, ওকে নিয়ে আসতে।
ইসোলা : (যেন গর্জন করে) আসবে না। (ঝোপের মধ্যে পায়ের শব্দ)।
এরিনযোবি : মোর্যুনকে, আমি আসছি, তোমার মা বাবার কাছে ফেরত দেব তোকে।
ইসোলা : এরিনযোবি, এসো না এখানে! ফিরে যাও তোমার গির্জায়। (ঝোপের মধ্যে দৃঢ় গতি।) তফাতে থাক এরিনযোবি, তফাতে থাক…যদি দেখা দেয় তোমার মাথা, এরিনযোবি। তোমার মাথা যদি একবারও দেখা দেয় পাতাগুলোর মধ্যে। এরিনযোবি। সে বন্দুক ছোড়ে। মোর্যুনকে আর্তনাদ করে ওঠে, কাঁদতে শুরু করে। ধেয়ে আসা পায়ের আওয়াজ ছুটছে।
ইসোলা : চুপ মেরে, চুপ…কেন, এ তো শুধু এরিনযোবি…ভয় পেয়েছ তুমি? (প্রচণ্ড আলোড়ন ঝোপের মধ্যে।)
মোযি : (চিৎকার করে) ইসোলা। ইসোলা! রেভারেন্ড! ইসোলা! তোমরা কোথায়? কোথায় তোমরা? ইসোলা! (সহসা চুপ) ন্গ্হ? রেভারেন্ড। রেভারেন্ড! রেভারেন্ড! (কান্নাায় ভেঙে পড়েন তিনি) (‘আগবে’ গান)
ইসোলা : মোযি…তুমিও? কেন, মোযি, তুমি কাঁদবে না…চুপ, মেয়েমানুষ, চুপ এখন…চুপ….চুপ…(গান জোরে হয়, পূর্ণ দমে)