Archives

তসলিম খান রানার গল্প

তসলিম খান রানার গল্প
কবিরাজ

পারভেজ ও তার দুই প্রেমিকা প্রেমা ও পারমিতা, আজ চলন বিলে নৌকা নিয়ে ঘুরবে। দুই প্রেমিকা বলায় গল্পের শুরুতেই নাভিশ্বাস তোলার কিছু নেই। যথাস্থানে এর শানে নজুল পেশ করা হবে।
ব্যাগপত্র বেঁধে তারা ঘাটে এলো নৌকা ভাড়া করতে। কিছু কাজ আমাদের আধুনিক মন আজো ‘ছেলেদের’ কিংবা ‘মেয়েদের’ বলে মেনে নেয়। যেমন, বাড়ি গেলে লেবুর শরবত সবসময় মা অথবা বড় বোন বানাবে; বাড়িতে শুধু বাবা কিংবা বড় ভাই থাকলেও শরবত পাওয়া যায়, কিন্তু নিজেকে বানিয়ে নিতে হয়। সেই সনাতন কিংবা পুরাতন রীতি অনুসারে তিনজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া জিগরি দোস্তের মধ্য থেকে পারভেজ এগিয়ে গেলো মাঝির সাথে কথা বলতে।
সারাদিন চলন বিলে ঘুরতে কত টাকা নিবেন?
যা মন চায় দিয়েন?
না না… আপনাদের এইসব পাঁয়তারা আমি বুঝি। প্রথমে এমন ভাব করবেন যে, ভাড়া একটা হলেই হলো! আর ঘুরে আসার পর গলাকাটা ভাড়া চাইবেন। ঠিক করে বলেন কত নিবেন?
বাবাজী, ইনসাফ মতো দিয়েন। বুঝোতি পারিছি?
আমার ইনসাফ মতো সারাদিন ঘোরার জন্য পাঁচশো টাকা যথেষ্ট। পোষায় আপনার?
ঠিক আছে, আসেন… সাবধানে উঠেন।
যেহেতু মাঝি ঠিক হয়ে গেছে, এবার মাঝির কিছুটা বর্ণনা আবশ্যক।
চিরাচরিত বাঙালি মাঝিদের সাথে এই মাঝির ‘নৌকা চালানো’ ছাড়া আর কোন মিল নেই। যেমন, এনার চেহারা বেশ নূরানি, কাঁধ সমান কালো চিকচিকে চুল, মুখভর্তি চাপদাঁড়ি আর পরনে সবুজ ফতুয়া। নৌকায় বসার পর প্রেমা সবার আগে মাঝির পরনে সবুজ ব্যাপারি ফতুয়ার বুক পকেটের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
বুক পকেটে ৭৮৬ সেলাই করা কেন?
৭৮৬ মানে জানেন না?
জ্বি না। এইজন্যই তো জিজ্ঞেস করছি।
৭৮৬ মানে হইলো কলেমায় তৈয়্যব। কখন কোন অবস্থায় আজরাইল আইসপে তো ঠিক নাই। যাতে কালেমা লিয়ে দুনিয়া থেকি যেতে পারি এইজন্যি সিনার কাছে সিলাই কইরে লিছি।
এমনিতে প্রেমিকারা সাথে থাকলে পারভেজের কোন কাজে উদ্দীপনার অভাব হয় না, কিন্তু আজ চলন বিলের টিকি স্পর্শ করতেই অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তার ওপরে নৌকাটা যেন পুঠিয়ার রাজাদের হাওয়া মহল।
বাতাসে শান্তির নীড়। চারিদিকের বাতাস যেনো লাইনে দাঁড়িয়ে নৌকার ছইয়ের একপাশ দিয়ে ঢুকে এই এলাকার নতুন অতিথিদের দেখে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর ছইটা যেনো গতানুগতিক উপাদানের সাথে বিশেষ কিছু দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। নৌকায় বসার পর থেকে এ পর্যন্ত পারভেজ সাড়ে ১৪টা হাই তুলেছে। শেষ হাইটা অর্ধেক তোলার পর মাঝির গান শুনে নেমে গেলো, Ñআমার এই দেহতরী, কি দিয়ে বানালে গুরুধন ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে পারভেজের মনে হলো, এই গানটির ওপর কি যেন একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত আছে…! মনে করার চেষ্টায় ঘুম হারাতে বসেছিলো। তবে শেষ রক্ষা হলো, গানটি মনে পড়লো।
যে তোরে পাগল বলে, তারে তুই বলিসনে কিছু।


পারভেজের জীবনে স্বপ্ন দেখা ব্যাপারটা শেক্সপীয়রের নাটকে মেঘের গর্জনের মতো; যখন আসে, বুঝতে হবে-ঈশ্বর মুচকি হেসেছেন, মানে আনকোরা কিছু ঘটতে চলেছে। এই কারণে, বুদ্ধির বয়স থেকে তার প্রতিটি স্বপ্ন মনে আছে। যেমন, শেষবার স্বপ্ন দেখেছিলো এইচ.এস.সি পাশের পর।
সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় নিজের নাম খুঁজে না পেয়ে, ভেতরের যাবতীয় উৎকণ্ঠা যেনো কণ্ঠে জমা হলো। বাকি ছিলো বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগের ফলাফল। পরীক্ষা ভালো হয়েছিলো। কিন্তু, আধা ঘন্টা পরে পরীক্ষার হলে ঢোকার ব্যাপারটা মনে হলেই কেমন ভয় ভয় করতো।
দেরি করার কথা ছিলো না, কারণ এই বিষয়টি সে ছোটবেলা থেকে পছন্দ করে। তাছাড়া এলাকার যে বড় ভাইয়ের হলের রুমে সে উঠেছে তা পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছেই; কোথায় সিট পড়েছে, কয়টায় বেরোতে হবে, কোথায় নাস্তা করবে সব কিছুই ঠিকঠাক ছিলো। হঠাৎ করে রাত দেড়টার সময় এক বন্ধু এসে বললো-চল একটু টিভি রুম থেকে মাথাটা ঠা-া করে আসি। তারা টিভি রুমে ঢুকতেই দেখে এক থমথমে পরিবেশ। সব দরজা ভেজানো, জানালাগুলো বন্ধ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, তার ওপরে ভর্তি পরীক্ষা চলছে। এই সময় সবাই একটু ভাব দেখাতে পছন্দ করে। কোন গ্যাঞ্জাম হলো নাকি? পারভেজ রুমে ফিরে আসতে চাচ্ছিলো, কিন্তু বন্ধুর চাপাচাপিতে চেপে গেলো। বিশাল টিভি রুমে মানুষ গিজগিজ করছে। এক কোণায় তারা দুজন বসে পড়লো। পারভেজ ভাবছে এতো রাতে এতো লোক টিভি রুমে কেন? সবাই তো আর তার মতো ‘মাথা ঠাণ্ডা’ করতে আসেনি। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো আসল কাহিনি, যখন একটি অচেনা চ্যানেলে ‘শারীরিক শিক্ষামূলক’ ছবি শুরু হলো। লোকজন ঘনঘন মুখাগ্নি শুরু করলো, বিভিন্ন ব্রান্ডের সিগারেটের ধোঁয়া আর ছবির পাত্র-পাত্রীদের শীৎকারে পুরো রুমে যেনো সাইকেডেলিক মিউজিকের মতো ইউফোবিক আবেশ ছড়িয়ে পড়লো।
মাথা ও শরীর দুটোই ঠা-া করে ফজরের আযান শুনতে শুনতে পারভেজ ঘুমাতে গেলো। যথারীতি উঠলো দেরি করে, সবকিছু শর্টকাটে সেরেও আধাঘন্টা পরে পরীক্ষা দিতে ঢুকলো। সিট নম্বর মিলিয়ে যখন নির্ধারিত সিটে বসলো-নিজেকে মনে হলো বৃন্দাবনের কৃষ্ণ। তার চারপাশ লাস্যময়ী-গোপী-পরীক্ষার্থিনী দিয়ে ভরা। ভর্তি পরীক্ষায় কেউ আধাঘন্টা পরে আসতে পারে-তারা হয়তো ভাবেনি। তাই, আশপাশের গোপীরা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। অন্য সময় হলে এই অযাচিত গুরুত্বের ফায়দা সে উঠাতই। তার ওপরে আজ একজন ম্যাডাম গার্ডে পড়েছেন, চোখের কোণ দিয়ে এক ঝলক দেখেই পারভেজ বুঝতে পারলো এই মেডুসা ম্যাডামের দিকে ঠিকভাবে একবার তাকালে, তার আর পরীক্ষা দেয়া হবে না; গিজা’র স্ফিংকস্-এর মতো পাথর হয়ে বাকী জীবন মরুভূমির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তার অবস্থা অনেকটা বন্ধু নাসিমের আফসোসের মতো। নাসিম যখন সুন্দরী কোন মেয়েকে দেখতো, আফসোস করে বলতো, ‘ধুর শালা, এতো সুন্দর মেয়ে হয় নাকি!’ এই ম্যাডামকে দেখে কয়েক মিলিসেকেন্ডের মাঝে তার কলেজের পরিসংখ্যানের ম্যাডামের কথা মনে হলো। পারভেজ সায়েন্স গ্রুপে থাকলেও শুধুমাত্র এই ম্যাডামকে কাছ থেকে ৪৫ মিনিট ধরে দেখা ও তার কথা শোনার জন্য ম্যাডামের ক্লাস করতো। এজন্য ম্যাডামের কাছ থেকে কায়দা করে অনুমতিও নেয়া ছিলো।
কায়দাটা তেমন কিছু না। একদিন খুব মন খারাপ করে টিচার্স লাউঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে দপ্তরিকে দিয়ে ম্যাডামকে ডাকালো। ম্যাডাম আসতেই সে তার চোখের পানি মুছে বললো, তার খুব ইচ্ছা পরিসংখ্যান পড়ার, কিন্তু তার বাবা চান সে ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে। তাই, তাকে পরিসংখ্যান নিতে দেয়নি, বলেই সে শরীর কাঁপিয়ে কেঁদে ফেললো। ম্যাডাম সান্ত¡নার জন্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই পারভেজের শরীরে যেনো ৪৪০ ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেলো। মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী মোবাইলের মতো সাইলেন্ট মোডে চলে গেলো। তার মাথায় হাত বোলানোর সময় ম্যাডামের কাঁচের চুড়িগুলো যখন একে-অপরকে স্পর্শ করা মাত্র পারভেজের পুরো শরীরের মতো বেজে উঠেছিলো, সেই রিনরিনে শব্দ যেনো পুরো বিশ্বজগতে অনুরণিত হতে লাগলো। বাকি সব নিস্তব্ধ।
আজকের পরীক্ষার হলে এই ম্যাডামকে দেখে আবার নিস্তব্ধতায় তলিয়ে যাবার আগেই পারভেজ নিজেকে সামলে নিলো। নিয়্যাত করলো আজ অর্জুনের লক্ষ্যভেদের মতো একাগ্রচিত্তে পরীক্ষা দেবে। কোনভাবেই এই ম্যাডামের দিকে সে তাকাবে না। ধুর শালা, এতো সুন্দর ম্যাডাম হয় নাকি!
লক্ষ্যভেদ হবার মতো পরীক্ষা দিলেও রেজাল্টের আগের রাতে কণ্ঠভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘুমাতে গেলো। সেইরাতে সে শেষ স্বপ্নটি দেখেছিলো। স্বপ্নটি ছিলো বেশ মজার। কোন এক বন্ধুর ভাই কি বোনের বিয়েতে পারভেজ আর তার বন্ধুরা মিলে কব্জি ডুবিয়ে খাচ্ছে। চারিদিকে গান-বাজনা চলছে, বিভিন্ন ধরনের পটকা, আতশবাজি, তারাবাজি পোড়ানো হচ্ছেÑযাকে বলে উৎসব চলছে।


মোদ্দা কথাটা হলো, আজ পারভেজ আবারো স্বপ্ন দেখেছে এবং যাকে দেখেছে, তাকে কখনো স্বপ্নে দেখবে-স্বপ্নেও ভাবেনি। কারণ, কবিগুরুর সাথে তার সম্পর্কটা কবিগানের তর্কযুদ্ধের মতো। বিভিন্ন সময় তার লেখা পড়তে পড়তে, কিংবা তাঁর গান শুনতে শুনতে সে মনে মনে বহুবার কবিগুরুর সাথে তর্ক করেছে। অনেক সময় হেরে গেছে, আবার অনেক সময় জিতেছে। এমনিতে কবিগুরুকে সে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে; তাঁর লেখা, বিশেষ করে গানগুলো তাকে আলোড়িত করে-সেসব ঠিক আছে। কিন্তু স্বপ্নে দেখার মতো ভক্তচিত প্রেম তাঁর প্রতি পারভেজের কখনোই ছিলো না।
প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি কবিগুরুর উপস্থিতি। সে একটা সমুদ্রের পাড়ে হাঁটছে, ঝিনুক কুড়াচ্ছে, আবার ছুঁড়ে মারছে সমুদ্রে, চারপাশের লোকজনের দিকে তাকাচ্ছে, একটা গাছের ডাল দিয়ে বালিতে প্রিয় কোন কবিতার লাইন লিখছে এমন সব আপাত অর্থহীন কাজ করতে করতে হঠাৎ দেখলো সমুদ্রের পাড় খালি হয়ে গেছে। কোথাও কেউ নেই। সে খানিকটা অবাক হলো। মনে মনে ভাবলো, ফেরা যাক। সমুদ্রের পাড়ে গেলে, সেখান থেকে ফেরার আগে সমুদ্র স্পর্শ করে আসতে হয়-কোথায় যেনো পড়েছিলো! সে কথা মনে হতে পানির দিকে এগোতেই চোখে পড়লো এক দীর্ঘ মানব মূর্তি, দুইহাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সমুদ্রের দিকে মুখ করে। পরনে ধুতি আর একটি সাদা চাদর উত্তরীয়র মতো গলায় পেঁচানো, যার দুইপ্রান্ত সমুদ্রের বাতাসে উড়ছে। তাঁর শরীর-জড়ানো কাপড়ের প্রতিটি ভাঁজ যেনো প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের মতো-একই সাথে স্থির এবং গতিশীল।
ধীরপায়ে কবিগুরুর ডানদিকে সে দাঁড়ালো। তিনি চোখ বন্ধ করে থাকলেও, এক অপার শান্তি ছড়িয়ে আছে পুরো মুখে; ঠোঁটের কোণে একবিন্দু প্রেমময় হাসি। কিন্তু কতক্ষণ আর এমন একজনের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়, যিনি তাকাচ্ছেন না, কথাও বলছেন না! বাধ্য হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে পারভেজ সামনের দৃশ্য দেখতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যে সে পরিষ্কার বুঝতে পারলো, এই সমুদ্রের পাড়ে সে এতক্ষণ ছিলো না!
কারণ, এখানে ঢেউয়ের সাথে সাথে গান ভেসে আসছে। গানের কথা-সুর-ছন্দ-লয় অনুসারে ঢেউগুলো উঠছে-নামছে, ছোট-বড় হচ্ছে, কখনো মাঝপথে থেমে যাচ্ছে তো কখনো গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে; সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা হলো ঢেউয়ের রং বদলানোর খেলা। একেকটা গানের ঢেউ একেক-রং-এর, কোনটা গাঢ় নীল, কোনটা টকটকে লাল, কোনটা মাটির রং, কোনটা বৃষ্টিভেজা নতুন দেবদারু পাতার মতো। পারভেজ অবাক হয়ে দেখতে লাগলো যে-এতো রং এর মাঝে অনেকগুলো ঢেউয়ের রং আবার কাছাকাছি এবং তারা বিভিন্ন দিকে থেকে আসলেও কিভাবে যেনো একসাথে জড়ো হয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে। অবশ্য ‘তীরে আছড়ে পড়ছে’ বলাটা ঠিক হলো না, কারণ অনেকক্ষণ থেকে পারভেজ লক্ষ করেছে যে, তার দু’পায়ের গোড়ালি জলে ডুবে গেলেও, জলে ‘জল’ ভাবটা নেই। ঢেউগুলো যেনো জলের মতো, তবে অন্য কিছু দিয়ে গড়া।
অনেকক্ষণ ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে! তাই, একবার কবিগুরুর দিকে তাকালো। কিন্তু, তিনি সেই একই বুদ্ধমূর্তি। স্থির, আনন্দময়, প্রেমময় ও মৌন।
এবার তার চোখ গেল আকাশের দিকে। এতোক্ষণে সূর্য ডুবে যাবার কথা, মনে হয় ডুবে গেছেও; কিন্তু, অদ্ভুতভাবে আলোর কোন কমতি নেই! ঝকঝকে আকাশ, সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কেবল সূর্যটা অনুপস্থিত। এতো আলো তাহলে আসছে কোথা থেকে! কানের কাছে কে যেনো বলে উঠলো-এ হলো সঙ্গীতের আলো। সাথে সাথে বামদিকে ঘুরে দেখে কবিগুরু সেখানে নেই। পারভেজের মনে খচ্খচ্ করতে লাগলো। কতো কি জিজ্ঞেস করার ছিলো, কতো অমীমাংসিত ব্যাপারে আলাপ করার ছিলো-কিছুই হলো না। কিন্তু, এই না হবার জন্য কোন বেদনা তাকে এই মুহূর্তে স্পর্শ করছে না। ক্ষুধা-তৃষ্ণার অতীত কোন প্রেমানন্দ যেনো তাকে ঘিরে আছে। শরীরের প্রতিটি রক্তকনিকা সেই আনন্দে গান গেয়ে চলেছে। তবে কি গানগুলো স্রোতের থেকে তার শরীরে ঢুকে গেছে! তার শরীরে কি এখন আর রক্ত-মাংস নেই। পুরোটাই কি তবে রবীন্দ্র সঙ্গীতময় হয়ে গেছে! ভাবতে ভাবতে সামনে তাকিয়ে দেখে দুরে আকাশে একটি নীল আলোকরেখা বিভিন্ন দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।


ঘুম ভাঙতেই পারভেজ দেখলো তার সামনে পারমিতার হাত। সাথে সাথে মনে হলো আবারো স্বপ্নের দেশে হারিয়ে যাবে। কারণ, পারমিতা’র হাত অনেকটা নাটোর রাজবাড়ীর দিঘির টলটলে জলের মতোÑওপর থেকে নিচের নীল শিরাগুলো দেখা যায়। পারমিতা যখন ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দেয়, তার মাঝে অনেকে অনেক কিছু খোঁজে; কিন্তু পারভেজ শুধু খুঁজে পায় ‘নীল নাগ’।
শব্দ দুটো এক বেদে সর্দারনীর কাছ থেকে ধার করা, যার দলের সাথে পারভেজ এক বছর ঘুরে বেড়িয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, ঘুমিয়েছে তার নৌকায়। বেদের দলের সাথে থাকার পেছনে পারভেজের ৩টি উদ্দেশ্য ছিলো। প্রথমত, ছোটবেলা থেকে সাপ তার অসম্ভব ভালো লাগে। তার দাদুবাড়িতে একটা মজা পুকুর আছে। সেখানে ছোটবেলায় জলে নামা তো দূরের কথা, পাড়ে যাওয়াই তার জন্য বারণ ছিলো। তারপরও বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই সে দাদুবাড়ী যাবার জন্য অস্থির হয়ে যেতো। কারণ, শীতকালে ঢোঁড়া সাপের বাচ্চাগুলো যখন জলের ওপর এঁকেবেঁকে চলতো, পারভেজ তার নিজের শরীরে এক ধরনের শিহরণ অনুভব করতো; যেনো বাচ্চাগুলো তার মেরুদ- বেয়ে চলে যাচ্ছে! দ্বিতীয়ত, পারভেজ এমন একটি দলের সাথে থাকতে চাইতো-যাদের কোন বসত ভিটা নেই। ১০০% যাযাবর। আর বাংলাদেশে এমন জনগোষ্ঠী হাতে গোনা যায়, যাদের মাঝে বেদেরা অন্যতম।
আর তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো, সত্যানুসন্ধান। ব্যাপারটা এমন, সে যখন মাত্র বয়োঃসন্ধিকাল পার করছে, তাদের এলাকায় এক দাদু ছিলো। পারভেজের বন্ধুরা দাদুর পেছনে তাকে ‘ঘোড়া’ বলে ডাকতো। তিনি হঠাৎ একদিন পারভেজকে ধরে বলেছিলেন, ‘শোন নাতি। যৌবনটা হাতে-হাতে পার করিস না।’ শোনামাত্রই পারভেজের কান গরম হয়ে গেলো! কিন্তু দাদু থামলেন না। উদ্দেশ্যমূলক হাসি মুখে ধরে রেখে বলে চললেন, ‘জীবনে একবার হইলেও কোন বাইদানীর সাথে প্রেম করবি। বুঝছোস কি কইছি? আরে মাডির দিকে না, আমার দিকে তাকা।’ এবার গলা নামিয়ে বললেন, ‘ওরাই জানে আসল কামের গোপন টেকনিক। বুঝছোস কি কইছি? ওগো কাছে গাছ দিয়া বানাইন্যা তাবিজ থাকে। হেই তাবিজ মাজায় বাইন্ধা কমলাপুর থেইকা একবার ইঞ্জিন স্টার্ট দিলে এক্কেবারে ননস্টপ যায়া পৌঁছাইবি সিলেট। বুঝছোস কি কইছি? তয় খালি তাবিজের ভরসা করিস না, মাজডাও লাড়িস’Ñবলেই তিনি পারভেজের হাত ছেড়ে দিয়ে পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে হাসতে লাগলেন।
বেদে দলে যেদিন সে প্রথম আসে, সর্দারনী অনেকক্ষণ তার কপাল আর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন যে, পারভেজ তার সাথে একই নৌকায় থাকবে। পারভেজকে কেন জানি সর্দারনী খুব পছন্দ করতেন! তার নাম দিয়েছিলেন পাঁকাল মাছ। এক জোছনার রাতে সবাই যখন চুয়ানি, গাঁজা খেয়ে গান গাচ্ছে, হাসাহাসি করছে, তখন হঠাৎ করে পারভেজের পাশে বসে থাকা সর্দারনী ‘জয় মনসা, জয় তার’ বলে হুংকার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সব চুপচাপ হয়ে গেলো মুহূর্তেই। জোছনার আলোতে তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো গ্রীক দেবী মিউজ-এর বেদে সংস্করণ; পরনে লাল পেড়ে সাদা শাড়ী, অবিন্যস্ত চুল আর হাতে পাঁচ পুরুষের নিদর্শন-সর্দারের বীণ। সর্দারনীর বুক যেনো স্টিফানি মেয়ার-এর টোয়ালাইট সাগা’য় বর্ণিত ভ্যাম্পায়ারদের মতো, কোন ওঠা-নামা নেই! একেবারে বরফ-শীতল-শান্ত। সেই শান্ত বুক ধপ ধপ করে চাপরে মাতাল-ভারী কণ্ঠে তিনি বললেন-Ñ‘আমার কথা শুইনা রাখ, এই যে পোলাডা আমাগো লগে ঘুরতাছে, এ কিন্তু খুব সেয়ান; জাতে মাতাল, তালে একের বেশি সোয়া ঠিক! পাঁকাল মাছ, বুঝছোস? একটা জাত পাঁকাল মাছ। আমার কথা শুইনা হাসছ, মাদারীর ছাও! এতোদিন যে এয় আমাগো লগে চুয়ানী, গাঁজা খাইলো, কোনো মাগি তার বীণ ছুইয়া কইতে পারবো যে, ওরে জানুর মইধ্যে নিতে পারছে? পারবো না।’ তার দিকে বাড়িয়ে ধরা কলকিতে কষে একটা টান দিয়ে বাষ্পচালিত রেলের মতো ভেতরের সব আগুন আকাশে মিলিয়ে দিয়ে আবার শুরু করলো ‘তোরা তো রোইদে পুইড়া কালা কেউট্টার মতো হইছোস। আরে শঙ্খীনি সাপের মতো লিকলিকা, সুন্দর চামড়ার হাজারটা মাগীরে ওর কোলে ছাইড়া দে! একদিন, দুইদিন-তিন দিনের দিন দেখবি ওয় পাঁকাল মাছের মতো কাদা-কুদা ঝাইড়া সাফ হইয়া ঘুরতাছে। বুঝছোস-পাকাল মাছ, পাঁকাল মাছ।’
সেই রাতে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়লো, হঠাৎ সর্দারনী তার পাশে শুয়ে থাকা পারভেজকে ডাক দিলেন। পারভেজ চোখ খুলে দেখে সর্দারনী তার সিথানের থেকে একটু দূরে পদ্মাসনে বসে আছেন। ডান হাতটা ডান উরুর ওপরে, আর বাম হাতটা বাম বাহুর নিচে খাড়া করে রাখা বীনের ওপরে ভর করে আছে। চোখ বোজা দেখে পারভেজ ভাবলো-হয়তো সে ভুল শুনেছে। সর্দারনীর থেকে চোখ সরিয়ে আবার ঘুমাতে যাবে এমন সময় আবার সর্দারনী তাঁকে পাঁকাল বলে ডাকলেন। পারভেজ স্পষ্ট শুনলো, যদিও সর্দারনীর মুখ নড়তে দেখেনি! পারভেজ হতভম্ব হয়ে ঘুমভাঙ্গা চোখে তাকিয়ে রইলো। এবার বাইরে না, নাভির কাছটায় কে যেন বলে উঠলো, ‘আমার কোলে আইসা বয়।’ শব্দগুলো বড়শির মতো তাকে টেনে নিলো সর্দারনীর কাছে। ছইয়ের বাইরে পুরো প্রকৃতি ভেসে যাচ্ছে জোছনার আলোয়। সর্দারনী মাঝে বসে থাকায় তার শরীরের চারপাশে এক মায়াবী আলোর রেখা তৈরী হয়েছে। বেদের নৌকায় কখনোই সে ধুপকাঠী জ্বলতে দেখেনি। তবুও সর্দারনীর সারা শরীরে এক অননুভূতপূর্ব সুগন্ধ। তার শরীরের সাথে নিজের শরীর স্পর্শ করা মাত্রই মিলনের আগমুহূর্তে সাপের শরীরের মতো উষ্ণ-শীতল অনুভূতি হতে লাগলো পারভেজের পুরো অস্তিত্ব জুড়ে। দুই পা দিয়ে একজন স্বাস্থ্যবতী, প্রায় প্রৌঢ় সর্দারনীর কোমর পেঁচিয়ে তার কোলে বসে আছে, কিন্তু পারভেজ কোন যৌন আকাক্সক্ষা অনুভব করছে না! বরং শরীরের যে অংশে সর্বপ্রথম আকাক্সক্ষাগুলো জমে শক্ত হয়, সেখানে অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে যেতে লাগলো। এতোটা শান্তি পারভেজ কখনো পায়নি। যেনো নাভিমূল থেকে উরুসন্ধি পর্যন্ত অংশটা চারদিকে ফেটে বড় হয়ে গেছে, আর সেখানে শীতকালে নৈশকোচের জানালার ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঠা-া বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। সর্দারনীর কণ্ঠদেশ দেখে পারভেজ কিছুটা চমকে উঠলো। সেখানে যেন ময়ূরের কণ্ঠের মতো নীল রঙ মাখা হয়েছে! সেই নীলের মাঝ থেকে চোখ ঝলসানো সাদা আলোর দ্যুতি বেরোচ্ছে খানিক পর পর। আলোর দ্যুতির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের পাতা কেমন ভারী হয়ে এলো।
চোখ বোজার পর পারভেজ যেন সত্যিকারের দেখা শুরু করলো। দেখলো-অতলান্তিক এক গহবর থেকে একটা হলদে-সাদা আলোর স্তম্ভ ধীরে ওপরে উঠে আসছে এবং তাকে ঘিরে রক্তলাল আরেকটি সর্পিল আলোর রেখা বনবন করে ঘুরছে। স্তম্ভটি যখন তাকে অতিক্রম করলো, পারভেজ স্পষ্ট দেখলো যে সে নিজেও এর সাথে ওপরে উঠছে। যত ওপরে উঠছে, তার শরীর বেলুনের মতো ফুলে উঠছে; আর তার চারদিকে ঘুরতে থাকা লাল আলোর রেখাটি ধীরে ধীরে সোনালি রং ধারণ করছে এবং তার ঘোরার গতিও বাড়ছে। এতোদিন বিভিন্ন পেইন্টিং-এ দেবতারূপে দেখে এসেছে এমন নাম জানা-অজানা অনেকের সাথে তার দেখা হলো। তাঁরাও তার সাথে ওপরে উঠছেন; যেনো একটা লিফটে সে যাচ্ছিলো, সেটা বিভিন্ন তলায় থামছে আর এক বা দুইজন লিফটে উঠে একসাথে ওপরে যাচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ ওঠার পর একপর্যায়ে পারভেজ দেখলো তার সাথে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কেউ নেই-সে একা দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রাচীন উদ্যানের মাঝে। কিছুদূরে একটা বিশাল অগ্নিকু- জ্বলছে। তার বিস্তার খুব বেশি না হলেও, আগুনের শিখা যেন লকলক করে আকাশ স্পর্শ করেছে। সে আগুন লক্ষ করে প্রথম ধাপটি দিতেই নাভির নিচে একটা প্রচ- ঝাঁকি অনুভব করলো। হঠাৎ করে তার চারপাশ ছোট ছোট অদ্ভুত প্রাণীতে ভরে গেলো। তাদের দেখে মনে হচ্ছে হাজারের ওপরে বয়স, রঙ ঘুটঘুটে কালো, স্বচ্ছ, আর শরীর থেকে বিকট দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। পারভেজ দ্রুত আগুনের কাছে যেতে চাইলো কিন্তু পা যেন পাথর হয়ে গেছে। নিচে তাকিয়ে দেখে তার দুই পা আঁকড়ে আছে সেই বদখত প্রাণীগুলো। কয়েকজন পারভেজের দুই হাত বেয়ে ওপরে ওঠা শুরু করতেই সে ভয়ে দুই হাত ঝাঁকি দিলো; কিন্তু তারা এক ইঞ্চিও নড়লো না; যেন ভেলক্রো দিয়ে হাতের সাথে তারা আটকে আছে। এবার পারভেজের গভীর থেকে করাল ভয় উঠে এলো। মনে হচ্ছে এখানেই সবকিছু শেষ হবে, আর মনে হয় উদ্ধার পাওয়া গেলো না!
কিন্তু, যদি দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলেও তো মুক্তি নেই! কেন যেন মনে হচ্ছে-অগ্নিকু-ের কাছে কোনভাবে যেতে পারলেই সে বেঁচে যাবে। ডুবন্ত লোকের শেষ চেষ্টা করার মতো শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান করে সে সামনে ধাপ দেয়ার চেষ্টা করলো। অনেক কষ্টে ধাপ দিলো একটা… দুটা… তিনটা… এমন সময় সেই নর্দমার কীট সদৃশ ঘৃণ্য একটি প্রাণী তার রাস্তা আগলে দাঁড়ালো। প্রাণীটিকে দেখে পারভেজ আরো ঘাবড়ে গেলো।
মানুষের চেহারা যেমনই হোক না কেন, ভেতরের লোকটি যদি ভালো হয়, তাহলে বাইরের জনকে দেখে কারো অন্তত ঘৃণা জন্মাবে না। যে প্রাণীটি এক্ষণে পারভেজের সামনে এসে দাঁড়ালো সেটি অবিকল পারভেজের মতো দেখতে, কিন্তু তার ঘৃণ্য সংস্করণ। তার নিজের চেহারা যে এতোটা কুৎসিত হতে পারে, পারভেজের ধারণা ছিলো না। সে প্রাণিটি তার সামনে এসে, কুকুরছানার মতো মুখ করে অনুরোধ করলো, ‘আমাকে খেতে দাও, আমাকে খেতে দাও…।’ পারভেজ বুঝতে পারলো না, একে কি খেতে দেবে! আদৌ কি একে খেতে দেয়া উচিত! হঠাৎ প্রাণীটি পারভেজকে রেখে তার পেছনে দৌড় দিলো। পারভেজ বুঝতে পারলো এটাই সুযোগ। আর থামা যাবে না, যেভাবেই হোক কু-ের কাছে পৌঁছাতেই হবে। কিছুদূর এগিয়ে পেছন ফিরে দেখে একটি ফুলশয্যায় নব্য পরিণীত যুগল সঙ্গম করছে, তাদের শীৎকারের শব্দ শুনে সেই প্রাণীটি দলবল নিয়ে বিছানা ঘিরে লাফালাফি করছে; অথচ যুগলটি এই অস্পৃশ্য প্রাণীগুলোকে লক্ষ করছে না, হয়তো দেখছেও না! তারা আদিম তৃষ্ণা নিবারণে মত্ত। কামারের হাপর থেকে যেমনি লাল আগুনের ফুলকি বেরিয়ে চারদিকে উড়তে থাকে, তেমনি তাদের সঙ্গমের সাথে সাথে ফুলশয্যা থেকে লাল আভা বের হচ্ছে, আর প্রাণীগুলো সেই আভা খপখপ করে খাচ্ছে। যত খাচ্ছে, তত রাপানজেলার ডাইনীর মতো তাদের রঙ উজ্জ্বলতর হচ্ছে। পারভেজ সবচেয়ে অবাক হলো যে, একটু আগেই প্রাণীগুলো তার জানের ওপর উঠে যাচ্ছিলো, অথচ যুগলকে কিছুই বলছে না! এবার আর ডানে-বায়ে কোনদিকে না তাকিয়ে, দুই হাত ও পা ভারি হয়ে এলেও প্রবল চেষ্টা করলো এগিয়ে যাবার। গলার কাছে সবগুলো রগ টানটান হয়ে এলো… চোখ-মুখ আক্রোশে ফেটে পড়ছে… আর মাত্র কয়েকটা ধাপ… আগুনের হালকা আঁচ এসে লাগছে তার মুখে, প্রায় পৌঁছে গেছে-এমন সময় একটা প্রাণী তার হাত ছেড়ে মাথায় উঠে চোখ চেপে ধরলো। তাল রাখতে না পেরে পারভেজ ধপাস করে মাটিতে পড়লো। উপুড় হয়ে পড়ে থেকেই সে শুনতে পেলো তার চারপাশে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে, যেনো কেউ সামুরাই দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে কচুকাটা করছে। একটা করে কোপ পড়ে আর বিকট-অতিপ্রাকৃত চিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত হয়। ভয়ে পারভেজ আর মাথা তোলে না।
কিছুক্ষণ পর যখন চিৎকার থামলো, তার ঠিক মাথার কাছে বিশাল ধাতব কিছু ঠং করে পড়ার শব্দ হলো। দ্রুত সে মাটি থেকে উঠে দেখে, তার সামনে সর্দারনী দাঁড়িয়ে আছেন। সোনালি পাড়ের রক্তলাল শাড়ি পরা, বুকের ওপরে পেটা লোহার বর্ম-যার ঠিক মাঝখানে বৃত্তের ভেতরে একটি গোখরা সাপ ফণা তুলে আছে। খোদাই করা সাপটা দেখতে এতোটাই জীবন্ত যে, সেটি যেন এখনই বর্ম থেকে বেরিয়ে ছোবল দিতে পারে। সর্দারনীর উঁচু করা বাম হাতে যেন একটি অদৃশ্য বাটি ধরে আছেন, আর ডান হাতে একটি বিশাল নাঙ্গা তলোয়ার যার শেষপ্রান্ত মাটি স্পর্শ করে আছে। তলোয়ারটির বিশাল বাঁটের একপ্রান্তে একটি লালের ওপরে হলুদ-কালো ডোরাকাটা দুধ সাপ হা করে আছে, আর তার শরীরের বাকি অংশ দিয়ে পুরো বাঁট পেঁচিয়ে ধরেছে। তলোয়ারের ওপর আগুনের শিখার প্রতিফলনে মনে হচ্ছে, এর সোনালী ফলাটিও জ্বলছে। পারভেজ উঠে দাঁড়াতেই সর্দারনী বললেন, ‘কাটা দেহগুলো আগুনে দে।’ পারভেজ একে-একে সেই কিম্ভূত প্রাণীদের দুর্গন্ধয্ক্তু কাটা শরীর অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করছে, আর ডিনামাইটের মতো সেগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছে। আগে হলে বিস্ফোরণের শব্দে পারভেজ ভয় পেতো, কিন্তু সর্দারনীর উপস্থিতিতে তার আর ভয় লাগছে না। মনে হচ্ছে-ইনি যতক্ষণ এখানে আছেন, সৃষ্টিজগতের কারো সাধ্য নেই তার কেশাগ্র স্পর্শ করে।
সবগুলো কাটা দেহ আগুনে নিক্ষেপ করার পর সর্দারনী তার তলোয়ারটি মাথার ওপরে দুহাতে উঁচু করে ধরে থাকলেন কিছুক্ষণ, তারপর সোজা নামিয়ে আনলেন পারভেজের নাভি ও যৌনাঙ্গের মাঝামাঝি জায়গায়। হালকা করে একটু খোঁচা দিতেই পারভেজ উহ্ করে উঠলো। তার শরীর থেকে একফোঁটা কালচে রক্ত তলোয়ারের ফলায় লাগার সাথে সাথে বাটের শেষপ্রান্তে হা করে থাকা দুধ সাপটি মাথা ঘুরিয়ে রক্তবিন্দুটির দিকে তাকালো। রক্তবিন্দুটি যেনো আলোর দিকে ছুটে চলা পতঙ্গের মতো সাপের দিকে এগোচ্ছে আর সাপটি মাথা নেড়ে, জিহবা বের করে বিন্দুটিকে গ্রহণ করার জন্য তৈরি হচ্ছে। সর্দারনী তখনো তলোয়ারের ফলা লাগিয়ে রেখেছেন পারভেজের শরীরে, আর এদিকে কালচে রক্তবিন্দুটি কাছাকাছি আসতেই সাপটি সেটা জিহবা দিয়ে টেনে নিয়ে মুখে দিতেই তার মুখ থেকে লেজ পর্যন্ত ক্রমশ নীল হয়ে এলো। এসময় সাপটির চোখের দিকে তাকিয়ে পারভেজের কেন জানি ভেতরে প্রচ- কষ্ট হতে লাগলো। যেন তাকে বাঁচাতে কেউ সাঁতার না জেনেই জলে ঝাঁপ দিয়েছে! পারভেজ নিজেও বাঁচতে পারছে না, তার উদ্ধারকারীর মৃত্যুও মেনে নিতে পারছে না। তার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।
অশ্রুফোঁটাটি তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আর সে দেখছে, সাপটির লেজের অংশ হঠাৎ করে রঙ ফিরে পেতে শুরু করছে। প্রথমে লেজ, তারপর শরীরের মাঝের অংশ, এরপর গলার কাছে স্বাভাবিক রঙ ফিরে আসতেই সাপটি প্রচ- ঝাঁকিতে মুখ দিয়ে কিছু একটা ছুঁড়ে মারলো। পারভেজ দেখছে লালচে-সোনালি একটি ফোঁটা তার দিকে তলোয়ার বেয়ে এগিয়ে প্রচ- বেগে এগিয়ে আসতে আসতে তার শরীরে ঢুকে গেলো। ছোট্ট একটি ফোঁটা তার শরীরে প্রবেশ করলো, কিন্তু তার ঝাঁকি পারভেজ সহ্য করতে পারলো না। অগ্নিকু-ের ভেতরে যেয়ে পড়লো। পড়তে পড়তে একবার সর্দারনীর দিকে তাকাতে দেখলো, বাতাসে তার চুল উড়ছে, আর তিনি যুদ্ধজয়ের হাসি মুখে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘আইজকার পর, তোর আর কারো লগে শুইতে হইবো না। কিন্তু চুলকানি সহজে যাইবো না। ওইডা সারবো কবিরাজ আইলে!’ তার কথা শেষ না হতেই পারভেজের নাভিমূল থেকে একটা তপ্ত স্রোত বন্দুকের গুলির মতো দ্রুতগতিতে সোজা উপরে উঠে গেলো। জ্ঞান ফিরলে দেখে মুখের ওপর সর্দারনীর সেই হাসিমুখে বলছেন ‘ভয়ের কিছু নাই। ওইডা হইলো নীল নাগ! ময়ূর যখন সাপ ধরে, তখন তারো গলা এরম হয়…’ বলেই তিনি হাসতে লাগলেন।


পারমিতার শরীরের নীল রেখাগুলো নীল নাগের মতোই তাকে সম্মোহিত করে রাখে। যখন পারমিতা পাশে বসে পারভেজ অবাক হয়ে দেখতে থাকে গ্রীবার নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া রেখাগুলো। কী যেনো আছে ঐ নীলের মাঝে! পারমিতার স্পর্শের চেয়েও যার মাদকতা বেশি। পারভেজ একবার, না পেরে বলেছিলো ‘তোর শরীরে মনে হয় নীল রক্ত!’ শুনে সে মুচকি হেসেছিলো।
পারমিতা আসলে এমনই। লক্ষ্মী আর সরস্বতী যদি এক দেহে জন্ম নেন, তাহলে নির্দ্বিধায় তাঁর নাম হবেÑপারমিতা। প্রতিটি কাজ যথার্থভাবে করতে যেয়ে সারাদিনে খুব বেশি কাজ তার করা হয় না। তার কথা হলো-বর্তমান সংখ্যানির্ভর কচুরিপানা সভ্যতায় নিজের কীর্তির বোঝা বাড়িয়ে লাভ নেই, সে বোঝার মর্ম কেবল গরুই বোঝে-যখন তার খাবারের চাড়িতে পরিবেশন করা হয়। তার চেয়ে বরং গভীর তল থেকে উঠে আসা পদ্ম হওয়া অনেক ভালো। একটা পদ্ম ফুটলে, বিশাল দিঘির যেকোন প্রান্ত থেকে মানুষ তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। তার এই নিখুঁত-বাতিক এর যন্ত্রণা পারভেজ মেনে নেয়, কারণ এর জন্য পারমিতা যাই রান্না করে তাই অতুলনীয় হয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে-তাদের প্রেমের শুরু হয়েছে পারমিতার হাতের রান্নার মাধ্যমে! ঘটনার শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে। পারভেজের তৎকালীন প্রেমিকা বাড়ী চলে গেলেও পারভেজের কেন জানি বাড়ি যেতে ইচ্ছে করলো না! একদিকে এই ছুটিতে মেসে রান্না করার খালা আসেন না, আরেক দিকে হোটেলগুলোতে একদিন রান্না করে, আর ৩ দিন বিক্রি করে। ছুটির আগের দিন এক শুভক্ষণে পারমিতা আফসোস করে বলেছিলো, ‘৪৫ দিন প্যারিস রোড দেখবো না! আমবাগানের ছায়ায় বসবো না!’ সাথে-সাথে পারভেজ বলেছিলো, ‘আমি সেই ব্যবস্থা করতে পারি যদি তুই দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করিস।’ ‘যা আমি বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসবো, শুক্রবার বাদে।’ ‘ঠিক আছে।’
প্রতিদিন তারা নির্জন ক্যাফেটেরিয়ার বারান্দায় বসতো, পারভেজ তার প্রেমিকার নানা গল্প করতো, পারমিতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ পড়–য়া তার প্রেমিকের নামে বিভিন্ন নালিশ জানাতো। দুএক দিন পারভেজ ইচ্ছে করে ডানহাতের আঙুলে ব্যান্ড-এইড লাগিয়ে রাখতো, যাতে পারমিতার হাতে খেতে পারে।
ক্যাম্পাসের হেন রাস্তা নেই, তারা চষে বেড়ায়নি। মাঝে মাঝে দুপুরের প্রচন্ড গরমে তারা পারভেজের মেসরুমে যেতো। ফ্যান ছেড়ে আড্ডা চলতো। মেস মালিকের চোখ ফাঁকি দিয়ে ওয়াটার হিটার চালিয়ে চা বানিয়ে খেতো। ফাঁকা মেসের ঘরে বিছানায় পারমিতার পাশে বসে গল্প করতে করতে অনেকবার পারভেজের শরীর গরম হয়ে উঠতো। দুএকবার বুঝতে পারতো না পারমিতার চোখের ভাষা। সেই চোখ কি কিছু চায়? নাকি তার নিজের চাওয়া প্রতিফলিত হয় ঐ চোখে! মাঝে মাঝে মনে হতো, দরজা লাগিয়ে…
দরজা আর লাগানো হয় না। সর্দারনীর কথা পারভেজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারবার সত্যি হয়। আরো অনেক কিছু ইচ্ছের বিরুদ্ধে সত্যি হলো। ছুটির পর পারভেজ ও পারমিতা তাদের প্রেমিক-প্রেমিকাকে ছেড়ে একা কিছুদিন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ায়, তারপর ঝড়ে পথভ্রষ্ট পাখির নীড়ে ফেরার মতো, একে-অপরের কাছে ফিরে এলো।


নীল নাগ দেখতে দেখতে জেগে উঠে পারভেজ বুঝতে পারলো, পারমিতা তাকে বিলের পদ্ম দেখাতে ডেকে তুলেছে। চারদিকে পানির মাঝে চলনবিলের এই অংশটা হঠাৎ করে ভরে গেছে লাল পদ্মে। নৌকার সবাই কেমন যেনো সৌন্দর্যের আঘাতে উদাস হয়ে গেলো। মাঝি কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় পারমিতা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো। কারণ, প্রেমা চোখ বুজে আছে। পারভেজ একবার পারমিতার সাথে চোখাচোখি করে আবার পদ্মে ধ্যান দিলো। কিছুক্ষণ পর প্রেমার খোলা গলার গান ভাসতে থাকলো পদ্মবনে, ‘জলে ভাসা পদ্ম আমি/শুধুই পেলাম ছলনা…। গান শুনতে শুনতে আর পদ্মবনের দিকে একভাবে তাকিয়ে থেকে পারভেজ কেমন ধ্যানস্থ হয়ে গেলো। যেনো আসলে শত শত পদ্ম না, সে দেখছে সবগুলো পদ্ম মিলে একটা বিশাল পদ্ম, যা এখনো প্রস্ফুটিত হয়নি। সেই বিশাল পদ্মকুঁড়িটি আবার স্রোতের তালে নড়ছে আর কুঁড়ির দলগুলো ভেদ করে সোনালি আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। ক্রমশ স্রোতের দোল বাড়ছে আর দলগুলো একটু একটু করে খুলছে। যখন পুরোটা খুললো, পারভেজ দেখে সেখান থেকে জোনাকীর মতো ৪টি সোনালী আলোর বিন্দু একে-অপরকে ঘিরে ঘুরছে। কখনো তারা একটি পাঁপড়িতে বসছে, কখনো তার নিচে লুকোচ্ছে! দেখতে দেখতে এক অপার্থিব আনন্দের ধাক্কা এসে লাগলো পারভেজের বুকের কাছে! যেনো বুকের ঠিক মাঝখানে একটা দরজা আছে, যা ভেঙ্গে আনন্দের ঢেউ বাইরের পৃথিবীকে প্লাবিত করার জন্য এগিয়ে আসছে। দরজাটা ভেঙে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পারমিতার ডাকে সে ঘুরে বুঝতে পারলো, প্রেমার গান অনেকক্ষণ হলো শেষ হয়েছে। পদ্মবনের দিকে তাকিয়ে থেকেই পারভেজ বললো,
প্রেমা, তুই কি লক্ষ করেছিস-আমাদের শিল্প ও সাহিত্যের বেশিরভাগ জুড়ে কেবলই করুণ রসের ছড়াছড়ি!
তো?
আমার প্রশ্ন হলো-কেন?
বাংলায় বল…
আমার ধারণা হলো-যেহেতু মানুষের জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই দুঃখ, তাই, সে করুণ রসের সাথেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আনন্দকে সে ভয় পায়।’
কেমন?
যেমন ধর আমার বড় বোন। ভাগ্নিটা যখন রোদে খেলতে থাকে, তখন বলে-এই রোদে খেললে জ্বর হবে; যখন পানি নিয়ে খেলে, তখন বলে-সর্দি লাগবে; যখন ঘরের ভেতরে খেলে তখন বলে-স্যান্ডেল পর, মানে সবসময় তার মাথায় যেনো হাওয়াই মিঠাই তৈরীর মতো দুশ্চিন্তার চাকতি ঘুরতেই থাকে! আরো অদ্ভুত হলো-যখন নিজের কিছু পায়না, তখন অন্যের সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু করে!’ ‘এতো গেল দুশ্চিন্তা-বিলাস, তার সাথে করুণ রসের কি সম্পর্ক?’
এতোক্ষণ বাংলায় বললাম, তাও বুঝলি না? আমাদের জীবনে যখন দুশ্চিন্তা, দুর্ভোগ. বিপদ ইত্যাদি থাকে না-তখন নিজেদের মৃত মনে হয়। আমাদের কাছে মৃত্যুই একমাত্র ধ্রুব-সনাতন সত্য। তাই, যখন আমরা বিরহের করুণ রসে সিক্ত-জবজবে কোন গান শুনি বা সিনেমা দেখি-তখন খুব সহজেই তার সাথে নিজের জীবন মিলিয়ে ফেলি। তাই নয় কি?’ ‘তুই তো প্রশ্ন করেই উত্তর দিয়ে দিলি। মৃত্যুই একমাত্র ধ্রুবসত্য!’ ‘আমার কেন জানি মনে হয়-মৃত্যুই একমাত্র ধ্রুবসত্য হতে পারে না। হয়তো আমরা আর কোন সত্য আছে কিনা-ঠিকভাবে খুঁজিনি! পূর্ববর্তী মহাত্মারা যখন খুঁজেছেন, তখন হয়তো খুঁজে পাওয়ার সময় হয়নি! বুঝলি না-কালে নাত্মনি বিন্দতি। হয়তো কাল পুরো হয়নি, তাই পায়নি। আমার বিশ্বাস-মৃত্যু এবং একে ধ্রুব ধরে গড়ে ওঠা-স্বরূপী দুঃখ, সুখরূপী দুঃখ কিংবা করুণ রস কখনোই আমাদের জীবনের গোড়ার কথা হতে পারে না। আমার কথা বিশ্বাস না হলে, একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকে হাত দিয়ে বল তো-আমার জীবনে মৃত্যুই একমাত্র ধ্রুবসত্য। পারবি না! ভেতরে কোথায় যেন খচ্খচ্ করে, কেবলই মনে হয়-এ সত্য না! মৃত্যুই শেষ কথা হতে পারে না! নিশ্চয়ই কোথাও একটা ছোট্ট ফাঁক দিয়ে পুরো সত্যটা বারবার হারিয়ে যাচ্ছে।’
তোর সত্যানুসন্ধান তো দেখি ‘হয়তো-আক্রান্ত’!
অনুসন্ধানের শুরু তো সেখান থেকেই আজীবন হয়ে এসেছে বন্ধু।
দেখেছিস্-আরেকটি ধ্রুবসত্য পেয়ে গেলি!
প্রেমার এই ব্যাপারটা পারভেজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে। তীক্ষèধী। দারুণ স্মার্ট। বাড়ি থেকে মাসোহারা নিলে হাজারো অর্থহীন উপদেশ শুনতে হয়, তাই কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে নিজের খরচ নিজেই চালায় প্রেমা। প্রতিদিন যেন জীবনের তলানিশুদ্ধ উপভোগ করে চলেছে। তার জীবন দর্শন সেই বিজ্ঞাপনের মতো-জীবন একটাই, বাঁচবো ভরপুর।
প্রেমার আরেকটি দিক পারভেজের কাছে অনুকরণযোগ্য মনে হয়-সে ব্যক্তিনিষ্ঠ না, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করতে পারে। দীর্ঘদিন থেকে পারভেজ দেখেছে যে, বাঙালী যে কোন আলোচনাই গায়ে মেখে উত্তেজিত হয়ে যায়। হয়তো সে বললো-বন্ধু, আমি তোর চেয়ে আলাদা। মুহূর্তেই যাদের সাথে আড্ডা চলছিলো, তারা ক্ষেপে যাবে এবং বলবে-তুই কিভাবে আমাদের চেয়ে ভালো, বোঝা আমাকে!
‘আমি কিন্তু ‘ভালো’ বলিনি, বলেছি আলাদা। একটা মানুষ আলাদা হলে কি তোর চেয়ে ভালো বা খারাপ হয়ে গেলো? দু’জনই আলাদাভাবে এবং সমানভাবে ভালো হতে পারে না?’
বাঙালীর এই ‘বাঁশ ছিলো ঝাড়ে, টেনে নিলো ঘাড়ে’ স্বভাবের জন্য পারভেজ ইদানিং আড্ডা দেয় কম, তর্ক তো দূরের কথা! একমাত্র প্রেমার সাথে সে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করতে পারে। অদ্ভুতভাবে, প্রেমা সামনের জনের চোখে চোখে রেখে বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে কিংবা গায়ে না মেখে, তার যুক্তি তুলে ধরতে পারে। তাদের এসব তর্ককে পারভেজ নাম দিয়েছে সূফিবাদের আদলে-বাহাস।


পারভেজের প্রেমের ক্ষেত্রে পারমিতার সাথে যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকে প্রেমার সাথে শুরু হয়। তাকে কখনো মেসরুমের দরজা লাগানোর জন্য প্রেমার চোখের ভাষা পড়তে হয়নি! কারণ, যেসব দিনে দরজা বন্ধ হবে, সেদিনগুলো প্রেমা ঘরে ঢুকে নিজেই দরজা লাগিয়ে দেয়। খুব বেশি কিছু কখনোই করা হয় না। তার কারণ অবশ্য পারভেজ নিজেই। বহুদিন তারা একে-অপরের মাঝে পুরোপুরি লীন হবার চেষ্টা করেছে-কিন্তু এক পর্যায়ে এসে পারভেজের মনে হয়-আর কত? সব তো একই-নিঃশ্বাসের উষ্ণতা, শরীরে ঘামের সোঁদা গন্ধ, হঠাৎ কাঁধের ওপরে দু’একটি ছেঁড়া চুলের শিরশিরে অনুভূতি, আর সবশেষে ফিরে আসা উত্তরহীন প্রশ্ন-এর পর কি?
এমন না যে পারভেজ এসব উপভোগ করে না; বরং বারবার করতে চায়। কিন্তু, প্রচ- ভোজনরসিক ব্যক্তির যেমন জ্বর এলে প্রিয় খাবারগুলো বিস্বাদ হয়ে যায়, তেমনি পারভেজের পছন্দের অনেক কিছু এখন তার কাছে স্বাদহীন মনে হয়। সে নিজেও জানে না-কবে জ্বর সারবে, আর তার মুখে স্বাদ ফিরে আসবে!
তাদের বাহাস-এর মাঝেই পারমিতা হঠাৎ মাঝিকে বললো নৌকা থামাতে। পারভেজ ভাবতে ভাবতে প্রেমা বলে উঠলো, ‘ভালোই করেছিস। আমারো যাওয়া দরকার।’
প্রেমা আর পারমিতার চলে যাওয়ার দিকে পারভেজ তাকিয়ে আছে। এমন সময় মাঝি গান ধরলো- ‘মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন।’ পারভেজ না পেরে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কিভাবে ঠিক মন বুঝে গান ধরেন? বুঝেনই-বা কিভাবে?’
বাবাজী, নিজের মন বুইঝলে পরে অন্যের মনের দরজা এমনিই খুইলি যাবি।
আমি তো নিজেরটা বুঝি। কৈ অন্যেরটা তো পারি না!
বইলতে পাইরবেন কি-আপনার মন কি চাইছে?
একজনকেই চায়…
কাকে?
‘যে সাথে থাকলে মনে হবে পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেও ক্ষতি নেই, কারণ তার বুকে গিয়েই পড়বো, যার হাতের স্পর্শে আছে চৈত্র মাসে কুয়ার জলে স্নান করার শান্তি, যার চোখের অতলে নিজের তল পাওয়া যায়, যখন বাসে সবুজ ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে যাবো, মাইলের পর মাইল শুধু সেই দাঁড়িয়ে থাকবে; যমুনা সেতুর উপর যখন সূর্যাস্ত হয়, তখন পুরো দিগন্ত জুড়ে তাকেই দেখা যাবে, সে পাশে বসলে এমনিতেই মন ভালো হয়ে যায়, সারাদিন তার কথা শোনা যায়। আবার দিনের পর দিন কথা না বলেও থাকা যায়, সে হাসলে, মনে হবে শরীরের প্রতিটি কোষ রঙিন প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলবে, যার কথা ভাবলে মনে হয় সে আমাকে সর্বদা-সর্বত্র জড়িয়ে আছে পোষাকের মতো…
পায়েছেন কি এরম কাকে?
তাহলে কি আর পাখির মতো মন নিয়ে ঘুরতাম! একেকজনের একেকটা বিষয় ভালো লাগে, বুঝলেন!
দ্যাখেন একটা কথা বইলছি, কিছু মনে লিয়েন না। এইডা মহাভারতের যুগ না, আর আপনে ব্রহ্মাও না যে, বিশ্বকর্মা আপনের লাইগে আরেকখান তিলোত্তমা তৈরী কইরে দিবে।
উপায় কি বলেন? মনের অস্থিরতা তো যায় না! আবার মাঝে মাঝে পুরো উল্টোটা মনে হয়। মনে হয়-আমার চারপাশে যদি শত শত যুবতী থাকতো! আরব শেখদের মতো যখন যাকে খুশি ভোগ করতাম!
এবার মাঝি হো হো করে হেসে উঠলেন। কিছুক্ষণ পর হাসি সামলে বললেনÑখাঁটি বাঙলায় একে বলে গিয়ে-চুলকানি। কবিরাজ আইসলে পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কবে?
মাঝি গান ধরলেন, ইতরপনা কার্য আমার ঘটে অহর্নিশি, গুরু আমারে কি রাখবেন করে চরণদাসী?  পারভেজ ছইয়ের উপর শুয়ে চোখ বন্ধ করে মধ্যআকাশের সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকলো।


পারমিতার খাবারের বাক্সগুলো এতোক্ষণ নৌকার এককোণে পড়ে থাকলেও বোঝা যায়নি, তাতে এতোসব খাবার লুকিয়ে ছিলো। খাবার সামনে নিয়ে মাঝি খানিকক্ষণ চোখ বুজে থাকলেন, চোখ খুলতেই দেখেন সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু যেন লজ্জা পেয়ে বললেন, যার দয়ায় আমার মতো অধম তিনবেলা খাওয়া পায়, তাকে একটু ধন্যবাদ দিয়ে লিলাম।
যথারীতি খাবার বেরে দিলো পারমিতা, প্রথমে সরু চালের ভাত, তার ওপরে ছোট আলু-করলা ভাজি। মাঝি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো অদ্দুর থেইকে কইল্লা ভাজি আনিছেন? পারমিতা কিছু বলার আগেই পারভেজ জবাবটা দিলো ‘আগে তিতা পরে ঝাল, সুস্থ্য থাকে তিন কাল…’
একে একে সব খাবার বের হলো এবং শেষ হতে থাকলো। অদ্ভুতভাবে এতোক্ষণ পরেও খাবারগুলো যতটুকু গরম থাকলে খেয়ে উপভোগ করা যায়, ঠিক ততটুকু গরম আছে! কিন্তু সবার এতো ক্ষুধা লেগেছে যে, ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্টের সময় কারো নেই।
খাবার শেষে পায়েস হাতে নিয়ে প্রেমা হঠাৎ কি মনে করে বললোÑ‘আপনার নৌকায় কোন সাগরেদ নেই কেন?’ পারভেজেরও মনে হলো-তাইতো! প্রায় সবগুলো নৌকাতেই সে একজন মাঝি আর একজন-দুইজন সাগরেদকে দেখেছে। ইনি একাই সব করছেন!
মাঝি বিলের জলে হাত ধুয়ে, দুই হাত দিয়ে মুনাজাত শেষ করার মতো করে পুরোটা মুখ মুছে নিলেন। তারপর বললেনÑ‘আম্মাজি, ছুটুবেলায় এক ফকিরের কাছে শুইনছিলাম; সেখন বুঝিনি, এখন বুঝি-গুরু মিলে যত্রতত্র, শিষ্য মিলে পুণ্যে। সাইরগেদ জুটানোর মতো সোয়াব এখনো কইরতে পারিনি!’
পারভেজ পায়েস শেষ করতেই পারমিতা মুচকি হেসে বললো ‘তোর তো খাবার পর পরই হাজিরা দিতে হয়! যা ঐ বাড়ি থেকে ঘুরে আয়। আর শোন, নতুন বৌটার দিকে একদম তাকাবি না।’
ইউনিফর্মে টাই না থাকলেও, ক্লাসের কিছু ছেলে কলারের বোতাম লাগিয়ে আসে। পারভেজ ঠিক তাদের মতো মাটির দিকে তাকিয়ে বাড়ি থেকে কাজ সেরে আসলো। এসে দেখে তাদের কিছু দূর দিয়ে একটা বিয়ের নৌকা যাচ্ছে। তেমন কোন ঢঙের নৌকা না, কিন্তু মাঝে বসে থাকা জামাই-বৌকে ঘিরে কিশোর-কিশোরীদের আনন্দ দেখে পারভেজের মনে চেইন রিঅ্যাকশনটা ধরা পড়লো। একটা নতুন সংসার, হাজারো স্বপ্ন, নতুন আত্মীয়-স্বজন, বিভিন্ন বাড়িতে দাওয়াত, ভেজা চুলে দেবীর মতো টুকটুকে বৌ-এর মুখ দেখে ঘুম থেকে ওঠা, কিছু সময় পর প্রথম ‘বাবা’ ডাক শুনে চমকে ওঠা, সন্তান মানুষ করা, সঞ্চয়ের টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখা, বুড়ো হয়ে কিছুদিন যে কোন একটি রোগে ভুগে মারা যাওয়া। পারভেজ জানে-এই ছকের জন্য আজ সে পৃথিবীতে, সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পড়ছে, বাড়ী গিয়ে মা ড্রিপ ফ্রিজে ‘ছেলে আসলে খাবো’ বলে যা জমিয়ে রেখেছেন, তার মজা নিচ্ছে। এসবই পারভেজ খুব ভালো করে জানে এবং ছকটিকে নিয়ে তার কোন অভিযোগও নেই। কিন্তু তাকে এই ছক মেনে চলতে হবে-এটা সে মানতে পারে না। ভেতরে কে যেন সবসময় বলতে থাকে, ‘এই ছক তোর জন্য না, তোর জীবনের উদ্দেশ্য ভিন্ন।’ কিন্তু সেটি কি? সামনে না হোক কখনো ঘুমের মাঝেও তো কেউ বলে যেতে পারে তার কানে!
পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের আলো দেখতে-দেখতে প্রেমা গান শুরু করলো, ‘কোলাহল তো বারণ হলো, এবার কথা কানে-কানে, এখন হবে প্রাণের আলাপ, কেবলমাত্র গানে-গানে…।”’


অনেক জোরাজুরির পর পারমিতার শান্তি হলো। সে সাধারণত জোর খাটানো পছন্দ করে না, কিন্তু ভেতর থেকে এলো বলে, স্বভাবের বিরুদ্ধে যেয়ে কাজটি করলো-বিকালে খাবে বলে কিছু নারকেলের নাড়– বানিয়ে এনেছিলো, সেগুলো সে মাঝিকে দিয়ে এলো। নৌকায় ওঠার আগে পারভেজের মাঝি সম্পর্কে যে ধারণা ছিলো, তাকে ভুল প্রমাণ করে মাঝি বাড়তি ভাড়া বা বকশিশ সংক্রান্ত কোন জটিলতা তৈরি করেন নি। নামতে নামতে পারমিতা বারবার দেখলো, কিছু ফেলে যাচ্ছে কি-না। তারা ঘাটের থেকে একটু দূরে যেখানে ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে আসতেই পাশ থেকে এক লোক হঠাৎ পারভেজের হাত চেপে ধরলো। সে কিছু বলার আগে লোকটি তাকে সরিয়ে একটু দূরে নিয়ে গেলো। তাকে দেখে ছিনতাইকারী মনে হচ্ছে না, বেশ নধরকান্তি গৃহস্থের চেহারা, কিন্তু চোখ দুটি উদভ্রান্তের মতো। সে হাত চেপে রেখেই পারভেজকে বললো ‘কি বললেন মাঝি সাঁই?’
সেটা আবার কে?
যাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরলেন তার নামও জানেন না!
পারভেজ অবাক হলো, কিন্তু লোকটিকে তা বুঝতে না দিয়ে বললোÑ‘কি ব্যাপারে?’
যে কোন ব্যাপারে-কি বলেছেন তাই বলেন।
এবার পারভেজের ব্যক্তিত্বে একটু আঘাত লাগলো। মনে হলো কেউ জানালা দিয়ে হঠাৎ ঘরে উঁকি দিয়ে বলছেÑ‘কি করেন?’ সে শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলোÑ‘ওনাকে জিজ্ঞেস করুন?’
পাগল? উনি তো আমাকে ওনার নৌকার কাছেই ভিড়তে দেন না।
আমার তো মনে হয়, আপনার মাথায় গ-গোলটা বেশি। এতো নৌকা থাকতে ওনার নৌকাতেই কেন উঠতে হবে?
আপনি কি সত্যিই বুঝতে পারেন নাই উনি কে?
নাহ্, কে?
উনি অত্র অঞ্চলের মাঝি সাঁই। এককালে তাঁর সাঁইজির সাথে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, বহু দেশ ঘুরেছেন। তারপর ওনার সাঁইজি সুনামগঞ্জে আখড়া করেন। সেখানে তিনি একটানা ১২ বছর খাদেমদারি করেন। এরপর তার সাঁইজির নির্দেশে মানুষকে পানি পান করান। একেক সময় একেক নদী, বিল, হাওড়ে নৌকা চালান।
আখড়ায় না থেকে মাঝিগিরি করার মানে কি?
গুরুর আদেশ-পানি পার করাতে হবে, এটাই তাঁর সাধনা। এই জন্য মানুষ ডাকে-মাঝি সাঁই।
কিন্তু, আমরা তো পার হইনি, বরং ঘুরে এসে একই জায়গায় নামলাম! তাহলে আমাদের নৌকায় নিলেন কেন?
সেটা বোঝার জন্যই তো আপনাকে আড়ালে নিয়ে আসছি।
কি জানি! তবে, ওনাকে তো আমার যথেষ্ট ভালো মানুষ মনে হলো; আপনাকে নৌকায় নিতে চান না কেন?
বুঝবেন না! আমার নাকি সময় হয় নাই…। বলেই লোকটি দ্রুত উল্টোদিকের রাস্তায় হাঁটা শুরু করলেন। পারভেজ সত্যিই অনেক কিছু বুঝতে পারছে না! শরীরটাও কেমন খারাপ খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে শরীরের মধ্যে জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ আর শ্বাসকষ্ট একসাথে চলছে। মাথাটাও পুরো খালি। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছে না, আজ যে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে, কাল কি সে-ই আসবে, নাকি আসবে নতুন কোন সূর্য? সে আলোর পথে কি কবিরাজের সাথে তার দেখা হবে?