Archives

‘ঘুটে’ পাওয়া একখণ্ড শীতল জল

‘ঘুটে’ পাওয়া একখণ্ড শীতল জল

দীপ্ত উদাস

বাম-বুকের জমাট ‘ব্যথা’টি একান্ত ইচ্ছাকৃত, কিংবা কখনো সখনো মনে হয় নিবিড় অবহেলা, অনুমান গঠনের পরিসংখ্যানে বেশি ভোট পড়ে সঙ্গ নির্বাচনে, নিকোটিন, হাইড্রোক্যাফেইন অনেককাল যাবৎ বুকে বাসা বাঁধতে আরম্ভ করে— নিপুণ করে, এমন আপন কারুকার্যময়তা কেবল প্রত্যাশাহীন প্রেমিকের প্রতিশোধ ছাড়া কখনো ভিন্ন কিছু মনে হয়নি, নাকের নিচের আন্ডার লাইনের রেশ যখন বেশ ঘনো হতে আরম্ভ করে তখন থেকেই নানা উন্মাদনায় পাশে থেকেছে জাজ্বল্যমান দ্যুতি নিয়ে, নিজেকে বিলিয়ে নিজেই উজার হয়েছে, নিষ্পেষিত হয়েছে পায়ের নীচে, এ এক সুখ, বিকৃত উচ্ছ্বাস, পিসাচের অট্টহাসি, অবহেলায় হয়তো ভুলে থাকা যায়- ক্ষণিক সময়, তা-র-প-র রাত হলে, কিংবা রাতের গায়ে জোনাকির পঙ্গর দেখলে আবার ইচ্ছে করে সেখানে ফিরতে, তাদের কাছে যেতে, ঋণবোধ হয়, দিন গড়িয়ে গেলেও অপেক্ষা আর প্রেরণা গলাকাটা গরুর মতোন তরপায়, আর সামনে ছুটতে, এক ছুটে তেপান্তর পার হয়ে আকাশের ওই পাড়ের আকাশ দেখার অনুভূতিতে বারবার হর্ণ করে

ইংরেজি লাইনটানা খাতায় ইংরেজি একটি বর্ণ লেখার বদলে একই সংকুলানে বাংলা শব্দ বিন্যাসে দু’টি লাইন লেখার ঘটনা দুই ক্লাসে থাকতেই সম্পন্ন করার আদেশ যখন পাই তখন সাথে সাথে আজাহার আলী স্যরের পোর্টেট ভাবনায় মূর্ত হয়, দশ নম্বরের পরীক্ষায় আটের নীচে নম্বর পেলে প্যান্টের উপরেই শাস্তি সম্পন্ন হওয়ার বিধান স্বস্তিদায়ক মনে হলেও ছয়ের নীচে নম্বর পেলে প্যান্টের জিপার খুলে প্যান্ট নিচে নামিয়ে তেল চিটচিটে পাছায় বেত্রাঘাতে অপমান ও লজ্জার মিশেলে লাল ডিপডিপে মুখমণ্ডল বন্ধুমহলে বেশ টিটকারির খোরাক হতো, বিষয়টি অর্থাৎ টিউশনি পড়তে যাওয়া যতোটা ভীতির তার চেয়ে দাঁড়িয়ে মুখস্ত বলা ততোধিক সংকোচের, যেনো দণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামির সামনে বেহালা বাজানো জল্লাদ, টান-উচাটন-অপ্রেম

থাকলেও বাধ্য হয়েই হাজিরা খাতা পূর্ণগর্ভবতী করতে হতো, নতুবা শাস্তি হতো ভিন্ন আঙ্গিকে— একান্তে, এই বিপদাপন্ন পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন আমার ঈশ্বর, আমার পিতা, যাঁকে আমি আব্বা ডাকি

নানা মতের মিশেলে খাতায় ঝুঁকি নিয়ে উঁকি দেয়া-নেয়ার চুক্তিতে আপন আপন পৃষ্ঠদেশ অন্যদের কাছে রহস্য গল্পের অসমাপ্ত কাহিনি করে রাখতে পাঠ্যতথ্য আদান প্রদানের সমঝোতায় ‘মন’ বিনিময় ঘটে নাজিউল হাসান পিয়ালের সাথে, যাওয়া আসা চলতে থাকে আর আমাদের মনোজগত ‘আমাদের মতো’ গড়িয়ে গড়িয়ে সামনে এগুতে থাকে, পারস্পারিক পড়ার টেবিল থেকে মনের অলিগলি পর্যন্ত, প্রথম দিনই চোখে পড়েছিলো নাজিউলের বাড়ির তিন ফিট আলমারি ভর্তি নজরুলভক্ত সমবয়সী বড় হিমেল ভাইয়ের সংগ্রহের নানা মলাটের বই, হিমেল ভাইয়ের সাথে পরিচিত হবার আকাক্সক্ষা জমিয়ে রেখেছিলাম বহুদিন, নাজিউলের মামাতো ভাই সম্পর্কিত হিমেল ভাই একদিন দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটালেন, শোনালেন কবিতা, তার নিজের লেখা, অবাক করার মতো ভাঙচুরের গর্জন অনুভব করেছিলাম সেদিন, তার উপর কারো নিজের লেখা অর্থাৎ জীবিত মানুষের স্বপঠিত কবিতা, তখন ভবনার জগতে ঘুরপাক খেতো— কেবল মৃত ব্যাক্তিরাই কবি হন, যারা কবিতা লেখেন তারা লিখে মারা না যাওয়া পর্যন্ত সেগুলো দিয়ে বই করা হয় না, সেদিন হিমেল ভাই সময়ের জাগরণী সিম্ফোনি বাজিয়েছিলেন কর্ণকুহরে, আরো কী কী সব বই পড়তে বলেছিলেন, ওটা পড়লে সেটা জানতে পারবা, অমুক লেখকের ঘটনার বর্ণনায় কী যে মহুয়া মাতানো ফ্লেবার যার কিছুই তখন জানা হয়নি, হা করে কেবল শব্দ গেলা ছাড়া কিছুই তেমন হয়নি, হ্যাঁ, তবে পরে অনেক আড্ডা হয়েছে, তার সাথেই, তরোর ভিটায়, বাঁশঝাড়ের পাশে কিছু অংশে ছায়া-প্রচ্ছদ বিস্তৃত, তার পরেই পুকুর, তিন মানুষ সমান গর্ত, সারা পাথারের যাবতীয় মাছের আশ্রয়স্থল যেমন ছিল তেমনি ছেলেছোকরাদের মাছশিকারের অভয়ারণ্যও সেটিই ছিল, বন্যার পানি কমে মানুষের অবসরের কাল আসলে তখন মাঝে মাঝে ডাক পড়তো হিমেল ভাইয়ের, এরই মধ্যে টুকটাক বঙ্কিম, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীম উদ্দীন, আহসান হাবীব পড়া হতো সেই তিন ফিট লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়ে নিয়ে, ‘বসো, আজ কবিতা লিখছি পাঁচটা, এ্যাকটা এ্যাকটা করে শোনাবো, তার আগে কও তুমি কিছু লিখচো কি না,’ তখন আমার চাচাতো ভাই কাম বেডমেটের কথা তাকে শোনাই, বলি আলমগীর ভাইও তো কবিতা ল্যাখে, হিমেল ভাই তখন বলে, ‘তুমি তো কবির সাথে থাকো তুমিও এ্যাকদিন কবিতা লিখতে পারবা, আচ্ছা কবিতা শোনো’ শুরু হয় কবিতাময় দুপুর, আর সেনর গোল্ডের ধোঁয়ার ঊর্ধ্বমুখী ছুট, মাঝে মাঝে অফার আসলেও স্বসংকোচে ফিরিয়ে দিয়েছি, কখনো স্বাদও নিয়েছি, ওদিকে পাশে বসে থাকা মাছশিকারীরা উসখুশ করে, না সহ্য করতে পেরে একসময় বলেই বসে, ‘ভাই, এ্যাকনা দুরোত য্যায়া আও করো, তোমার কতার চোটোতে মাছ টোপ গেলোচে না,’ তখন হিমেল ভাই আমাকে বলতো, ‘দেখেচো, মাছসকল কবিতা শুনতে আসচে, যা যা মাছ টোপ গেল, কবিতা গিললে তোর জন্ম ব্যর্থ হয়ে যাবে, টোপ গিলে মানুষের টোপে পরিণত হ’

চলতে থাকে ১৮৩২-এ প্রতিষ্ঠা পাওয়া রংপুর জিলা স্কুলে যাবার পাশাপাশি কিছু কিছু গল্প, কবিতা পড়া কিন্তু তা পরিমাণের তুলনায় অনেক অনেক কম, হয়তো পত্রিকার সাপ্তাহিক সাহিত্যিক অংশ কিংবা বড় ক্লাসের বাংলা বই, তারপর একসময় বন্ধুমহল মিলে একপ্রকার বিকৃত উত্তেজনার সাহিত্য-সংবাদ পাই, এক আসঙ্গহীন-সঙ্গ খুঁজতে থাকি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হাতে আসে রসময় গুপ্ত, মোহনীয় পাঠক আকৃষ্টকরণ ক্ষমতাধর ও রগরগে স্ক্যান্ডাল বর্ণনা করার পাশাপাশি পড়ার নিবিড়তায় মনোনিবেশ করার পারঙ্গমতায় বিশিষ্ট এই সাহিত্য তখন আমাদের আবৃতি যোগ্য পাঠ্য, ডুয়েট আবৃতি হতো তানভীর ইসলাম সারভী আর আমার, দর্শক থাকতো ক্লাস বিরতিতে অবসর কাটানো বেশিরভাগ বন্ধু, যাত্রার টোনে, ‘তুমি ভূমি আমি বীর্যদাতা চাষী, তোমার দেহ মনে আমার বারি বীর্য ঢালি’র মতো ডায়লোগে ক্লাসময় হাততালি পড়তো, সেই বালিশের নিচে লুকানো সাহিত্য ‘এক সময়’ ফিকশনের দিকে আগ্রহী করে তোলে, তখন মাসুদ রানা কিংবা সায়েন্স ফিকশনের জন্যও আমরা চাঁদা তুলি, ঠিক যেমন চাঁদা তুলে যেতাম জাহাজ কোম্পানীর মোড়ের ফুটপাতের দোকানে রসময় গুপ্তকে খুঁজতে অথবা গুপ্তপাড়ার সাইবার ক্যাফেতে নীল চলচ্চিত্র দেখতে

চাচাতো ভাই কাম বেডমেট আলমগীর ভাই, দর্শনের ছাত্র হয়ে এক ডায়রি ভর্তি কবিতা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললো, ‘পড়, তুই আমার একমাত্র পাঠক, আর একজন ছিল, সে আর এখন নাই,’ কী বিস্ময়মাখা বেদনা তার কবিতায়, আরো পরে তার লেখা গল্প পড়েছি, কী বাউণ্ডুলে তার গল্পের চরিত্রগুলো, আলমগীর ভাইয়ের বইয়ের তাকে থাকতো নজরুল, শরৎচন্দ্র, শামসুর রাহমানের বই, সেগুলোর মলাটে আমার আগ্রহ ছিল তীব্র, ভেবেছি যারা বড় ক্লাসে পড়ে তারা কবিতা পড়ে, পড়তে হয় উপন্যাস

বক্র-জটিল সময় কচ্ছপ গতিতে পার হলেও বুকে জমিয়ে রেখেছি কিছু অলস স্মৃতি, যে আজাহার স্যরের টিউশনিতে ‘ষড়যন্ত্র’ করে ভর্তি করাতে পারে সেই  আব্বা কখনো ক্যানো বাউণ্ডুলে হিমেল ভাইয়ের সঙ্গ ছাড়তে বলেননি, তার উত্তর আজও মেলাতে পারিনি, মাংসের দেয়ালে সোঁদামাটির সুবাস নেওয়ার আগ্রহ ওই প্রচ্ছদ ভালোলাগা থেকেই, কামিজ-কাঁচুলি সাঁটা স্তনের বহিরাবরণের বিপরীতে রহস্যঘেরা সৌন্দর্য অবলোকনে কী যে বিস্ময়, ওই প্রতীক্ষাটুকুন জিইয়ে রেখে বইয়ের মলাট খোলার ধুম, বেড়ে ওঠার মহাবিশ্বে মেঠো আলপথ অতিক্রমকালে হচকিয়ে হোঁচট সামলে ঘুপচি গলিপথ পার হলে বাইপাসের মুখে এসে হাঁটা থেমে যায়নি, হায় পথ, তুমি যার অপেক্ষায় দিন গোনো সে তো আজ সঙ্গ পেয়েছে, কিছুদূর এগুলে পেয়েছি ‘পা’ ও ‘পায়ের চিহ্ন’, হাতে তুলে নিয়েছি, বুকে যতœ করে সাজিয়ে রেখেছি, ‘গুরু’কে পেয়েছি, বহু পথ চলা এখনো বকেয়া থাকলেও ‘ভালবাসা’ হয়েছে, ‘প্রেম’টা এখনো বোঝা হয়নি, হয়তো সেটা আমি বুঝি না তাই বলা হয়নি কখনো, ভেবেছি বলবো-

‘তোমায় যে ভালোবাসি তার/ চিহ্ন তুমি কখনোই খুঁজে পাবে না প্রথাসিদ্ধ নিয়মে’

পাঠ : চিহ্ন ¬২৭

পরিবর্তনই সাহিত্যের ধারা। সংখ্যা তেরো পর্যন্ত ছোটকাগজের মেজাজ তারপর এখন পর্যন্ত সাহিত্যের কাগজ-মেজাজে প্রকাশ পাচ্ছে চিহ্ন। পরিবর্তন, পরিবর্ধনে হয়তো বেশি সময় অতিবাহিত হয় নি তবে এই পনের বছরে সাতাশটি সংখ্যার প্রকাশ সাহিত্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা হয়তো সময়ই বিচার করবে। ধারাবাহিক বিভাগ, পাশাপাশি পঁচিশ সংখ্যা থেকে বিশেষ বিষয়ের উপর সাজানো হচ্ছে চিহ্ন। ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’ আর এবার অর্থাৎ সাতাশে এসে ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ হাতে পেয়ে অবাকই হতে হয় যেমনটা অবাক করে চিহ্নর প্রতিটি সংখ্যা। অন্যান্যের মতো এবারো আছে বিশেষ গল্প ফিচার ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’ সাথে নিয়মিত বিভাগÑ‘কী লিখি কেনো লিখি’, তিন গল্প, গুণীজনস্মরণ এবং অন্যান্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টার বিভাগসমূহ। পত্রিকাটির খণ্ডবিভাগের প্রথম খণ্ডটুকু উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত কবি আবুল হোসেনকে আর দ্বিতীয় খণ্ডাংশ উৎসর্গিত হয়েছে বিরল উজ্জ্বল বাতিঘর সরদার ফজলুল করিমের নামে। সম্পাদকীয়তে আগামী সংখ্যার কবিতার আহ্বান ও শেষ পাতার সংবাদÑ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস…’ হয়তো বিশেষ একটি সংখ্যার ইঙ্গিত অথবা পরিবর্তনের আশ^াস দেয়।
বড়োদের বেড়ে ওঠা কিংবা তাদের কিশোরবেলার স্মৃতিকে সাহিত্যিক রূপ দিয়ে সাজানো ‘আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল’। আলফ্রেড খোকন, অলোক বিশ^াস, সৈয়দ তৌফিক জুহুরী, মর্মরিত ঊষাপুরুষ, নূর-ই আলম সিদ্দিকী, মৌসুমী জাহান নিশাÑস্মৃতিকাতরতায় হয়তো কখনো প্রথম ভালোবাসা অথবা ছুঁইছুঁই রিরংসা অথবা পাখি হত্যায় হৃদয়কাঁপার মতোই আনন্দের বেশি অংশ জুড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন। মনের আক্ষেপ সমবয়সী বন্ধু না পাওয়ার। আর পাবেই বা কেমনে? যদি বোধের শুরু হয় বই পড়ার অভ্যাস দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা যা নিজের জীবনকে বদলে দিয়েছে। কাদা মাখামাখিতে বেড়ে ওঠার মাঝেও কারো হৃদয়ের কোণার দুঃখ হয়তো মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। নতুবা কখনো তা চোখের কোণায় জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। একাকীত্বই হয়তো অনেকের জীবনের সঙ্গী হয়, আর নব্বই দশকে হয়তো একাই বাস করতে হচ্ছে ছোট্ট ক্লাসেÑমহাভারতের অর্জুনকে উপস্থাপন করার কারণে। মৃত্যু; যদি তা স্বেচ্ছায় হয়, তার কারণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো অনেকেই প্রেফার করে, অনেকেই ঘেন্না করে, তবে ওই যে ওই ছেলেটাÑযার মনের সামান্য ইচ্ছা, যদি পূর্ণ না হয় তবে? মরণকামীদের দল অবশ্যই সংগঠিত হবে। নিরাশা নয় ভরসা নিয়ে। এমনই ভরসায় কল্পরথের লাগাম ধরে হয়তো কবিই হয়ে ওঠে অনেকেই কিংবা উপন্যাসের চরিত্রে নানা এ্যাঙ্গেল থেকে নিজেকে মেলাবার চেষ্টা চলে এই অংশে। বড়োদের কাছে নস্টালজিয়া শুনতে হয়তো রূপকথার কথাই মনে পড়ে যায়। তবে এই অংশে প্রণোদিত হবার আকাক্সক্ষা বড্ড বেশি।
এই যে এতো লেখা-লেখি এটা কেনো? লেখক কি নিজের কথাই লেখেন না কি নিজের অভিজ্ঞতার কথা কলম-খাতায় উঠিয়ে আনেন। নাকি লেখার জন্য ভেতরের কোনো সত্তা এসে যাতনার সৃষ্টি করে? শেষমেষ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লিখতে বসে যাওয়া। লেখা হয়ে যাবার পর যদি তা ভালো না লাগে অথবা কেউ প্রশংসা না করে তাতে ক্ষতি থাকে না। যদি কেউ অনুপস্থিতিতে অথবা উপস্থিতিতে প্রশংসা করে বসেন তা ফুয়েলের কাজ করে। কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিকীর কাছে এমনই ফুয়েল পেয়ে যান নূরুননবী শান্ত। লেখা ছাড়তে পারেন নি তিনি। লিখছেন, লিখবেন। কী লিখছেন, কেনো লিখছেন তা হয়তো তিনি জানেন না, কিন্তু যা তিনি লিখছেন তা তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যের পরিক্রমায় ‘নিম সাহিত্য’ সাহিত্যের আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। বারীন ঘোষালের উপস্থাপনায় উঠে আসে রবীন্দ্র গুহ। রবীন্দ্র গুহ জন্মগ্রহণ করেন বরিশালে ১৯৪৩ সালে। তবে ১৯৭০-এ দূর্গাপুরে তিনি আরো কয়েকজনকে পেয়ে যান, যাঁদের দ্বারা উত্থান ঘটে নিম সাহিত্যের। নিম সাহিত্যের ভাবনা-ভবিষ্যৎ নিয়ে পথ চলা শুরু হলেও তা অতি অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। তার আগের হাংরির রেশ তারা ধারণ হয়তো করে নি তবে কমিটমেন্ট ছিলো দৃঢ়। আত্মপ্রতিষ্ঠা নয় বরং সাহিতকে নতুন মাত্রা উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ছিলো রবীন্দ্র গুহর। নিমরা টেনশন পোষে, স্ত্রীর সাথে বিছানায় হয়তো অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে তবে স্ত্রীকে বুঝতে দেয় না, গল্পের নীচে আগুনের তাপ দেয়, তারা সমাজের মাথা হতে চায় তবে মাথায় বসতে চায় না, যৌনতাকে তারা আদর বলে না, রাজা ও প্রজার ক্ষুধা তাদের কাছে সমান, অলস সময় কাটানোতে এদের এ্যালার্জি, নার্সিসাস-কমপ্লেক্সকে তারা পজেটিভ করে দেখে। নিম সাহিত্য ম্যানিফেস্টোÑ১৯৭০ ঈড়সসবহঃ ধং ঃড়ফধু’ং ৎবষবাধহপব-
Ñ সাহিত্য অভিজ্ঞতার ফল নয়, অবিকৃত অভিজ্ঞতাই সাহিত্য
Ñ জীবনের কোনো ব্যথা নেই, কার্যকারণের ভবিষ্যৎ নেই
Ñ শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে
Ñ বোধের মূলে নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন
Ñ ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ চাই, সূর্যের দিকে সরাসরি তাকান।
রবীন্দ্র গুহ অথবা নিম সাহিত্যের সমৃদ্ধ উপস্থাপন করেছেন বারীন ঘোষাল। চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। যদিও নিম সাহিত্য তিন/চার মাসের বেশি টেকে নি তবুও সাহিত্য গদ্যের গতিদানে সময় ও সাহিত্যটি গুরুত্বের দাবি রাখে ।
রকিবুল হাসানের তিতাস-এর শেকড় ও কারুণ্যশ্র“তি সাদামাটা ধারাবাহিক উপস্থাপন। বয়ে যাওয়া নদীর ধর্ম। বহমান অঞ্চলের রাণি হয়ে থাকে নদী। যেমনটা তিতাস। ধারণ করে যাপিত জীবনের চিত্র; মুর্শিদি, বাউল, মারফতি, পদ্মাপুরাণ, পুঁথি; গ্রামবাংলার প্রেম, রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিবতার গণ্ডি না পেরোনোর বার্তা, নদী ভাঙনের দুর্দশা। বাসন্তীরও সারাজীবনের পরিক্রমা মূলত তিতাসের মতোই। হয়তো ভালোবাসা সে পায়, মানসিক তৃপ্তির অনুভব তার জাগে তবে তা অন্যের প্রয়োজনে। নিজেকে অন্যের করে বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রবন্ধটির শেষের বার্তায় হতবাকই হতে হয়।
নিঃসঙ্গতার কবি ও কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুকে ‘বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য: ভাষার ভেলায় ভাসাই তরী’ আত্মপক্ষ সমর্পণ করে তারেক রেজা নানা যুক্তির মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন। যদিও দশভূজার শক্তি ছিলো এক হাতেই তবুও বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তুলনীয় নন। তবে কবিতার জগত তাঁকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। কিন্তু অনেক গদ্য কবিতার চেয়ে বুদ্ধদেব বসুর কথাসাহিত্য উচ্চমান ধারণ করে তারেক রেজার মত তেমনই। তিনি আশিস কুমার দে’র ‘আবর্ষক গদ্যশৈলী : অব্যর্থ তীরন্দাজ’ গৌতম কুমার দাসের বুদ্ধদেব বসুর গদ্যরীতি’ বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ প্রবহমানতা, গদ্যে ইংরেজি পদান্বয়ের প্রভাব, বিশেষ যুক্তির প্রভাব এবং গদ্যভাষার নবীনতাÑপ্রভাবগুলোর উপস্থিতি তুলে ধরেছেন। তাছাড়া তার কথাসাহিত্যে যে বুদ্ধদেব বসুরই জীবন-ছাপ প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট তার উল্লেখ করেছেন। তবে উদাহরণস্বরূপ ড্যাস (Ñ) এর ব্যবহারের কথা তুলে এনেছেন। গদ্যে কি পদ্যে বুদ্ধদেব বসুর রাসায়নিক বিশেষণ তাঁকে মহিমান্বিত করে।
সজল বিশ^াস, সোলায়মান সুমন ও মূর্তালা রামাতের ‘শর্ষে ফুল ও কর্পোরেট ভালোবাসা’, ‘দলিত চাঁদ’ ‘একদিন রক্তের দিন’ গল্প তিনটিতে ইনার ইমোশন ও ভালোলাগার বিষয় থাকলেও গদ্যের ভাষা কিংবা কাহিনি তেমনটা আন্দোলিত করে না। তবে ভাবনার জায়গার স্থিতি কিংবা একই বই বিশেষ কাউকে উৎসর্গ করার আনন্দ, কিংবা তোরাবের মৃত্যু, বা মতির হাতেই মতির মায়ের স্বেচ্ছামৃত্যুর কারণটা কেবল হৃদয় দিয়েই অনুভব করার বিষয়।
এ পর্বে সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যশিল্পী-সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকীর স্মরণে তাঁরই সাথে কবিতাকথনের সাক্ষাৎকারটি পুনঃপত্রস্থ হয়েছে। কথা বলেছেন কবিতার আত্মা ও শরীর নিয়ে। কবিতার শব্দ নির্বাচন, মেনে অথবা না মেনে কিংবা অবচেতনায় ছন্দের ব্যবহার, বিশ^ামিত্রের ধ্যান ভাঙাতে মেনকার দেহ-ভাঙ সেটা প্রথম নৃত্য তবে মনোমুগ্ধকর। কবিতা তেমনি। আজন্ম মনোমুগ্ধকর। তবে অনূদিত কবিতা নিয়ে তাঁর আপত্তি অথবা কবিতার মূল ইমোশনের অগ্রিম বিপত্তি ঘটার ব্যপারে তিনি সন্দিহান। মূল ইমোশনের জায়গা রক্ষা করা কতোটা শক্ত এ ব্যপারে বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে অনুবাদের ঝঞ্ঝার কথা তুলে ধরেছেন।
‘একবিংশর সাহসী মাঝি খোন্দকার আশরাফ হোসেন’ স্মরণে কামরুল ইসলাম একজন মাঝি নয় পাঞ্জেরিকেই তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সাতাশ বছর একবিংশ লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে অতিক্রম করেছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের তত্ত্বাবধানে। ছোটকাগজের নানামুখী বিতর্ক চক্রের বাইরে এসে একবিংশ পত্রিকাটিকে সাহিত্যের পত্রিকা ভেবে তার মান নির্ণয়ই করার চেষ্টা এখানে করা হয়েছে। কবিতা, কবিতাভাবনায় তরুণদের যোগ করা; তবে পরবর্তীতে তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কখনো সময়, কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা হয়েছে একবিংশ। এই প্রাণপুরুষ শেষজীবন কাটান নিঃসঙ্গতায়। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছেন। গিয়েছেনও আমাদের ছেড়ে তবে সাহিত্য-সময় তাকে ছাড়ে নি।
‘ভারতীয় নারীবাদ ও যৌনতার ডিসকোর্স’ সরোজিনী সাহু অনুবাদ করেছেন মাহবুব অনিন্দ্য। ব্যতিক্রমী নারীবাদী লেখিকা সরোজিনী সাহু। অনুবাদে আক্ষরিকতার ভীতি থাকলেও তা কাটিয়ে অনুবাদের নির্যাস দিতে সক্ষম হয়েছেন অনুবাদক। তবে সরোজিনী সাহুর লেখায় খাপছাড়া বিষয়টি কিছুটা লক্ষণীয়। হয়তো তা প্রবন্ধের অনুবাদ সে কারণে এমনটা। নারীরা আজন্ম ব্যবহৃত হচ্ছে পুরুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে। সরোজিনী সাহু তাঁর লেখনীতে নারীর স্বাধীনতা এবং তাঁর চরিত্রগুলোকে স্বাধীন করে দেখানোর চেষ্টায় সফল হয়েছেন। যা নারীদের মনোজগতের চেতনার জাগরণ ঘটাতে সক্ষম।
চিহ্নর ধারাবাহিক বিভাগগুলোর মধ্যে ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাÑ ১১’ শিরোনামে এসেছে স্বননÑ একটি আবৃত্তি নির্ভর সংগঠন। তবে চিহ্ন কি কেবল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্যের ধারাবাহিক উপস্থাপন করবে নাকি দেশের অন্যান্য যারা বা যে সংগঠনগুলো শিল্পে-সাহিত্যে শ্রম বিনিয়োগ করছে তাদের নিয়েও কাজ করবে? এ জিজ্ঞাসাটি থেকেই যায়।
মুহাম্মদ হাসান ইমাম সমাজবিজ্ঞানের মানুষ। সমাজবিজ্ঞানের কগনিশন তত্ত্বকে প্রভাবক করে মানুষ তার দ্বারা কীভাবে আবর্তিত হয় অথবা মানুষের লাজুক ও চঞ্চল হবার প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের গবেষণার বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেছেন। মানুষের সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক এবং যাবতীয় পারিপার্শ্বিকতার কারণে মেয়ে ও ছেলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন। আর মনোবিজ্ঞানের নানারকম টার্মের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মিথ থেকে বেরুতে যেমন একই ধারণা ৪৬ প্রজন্মকে লালন করতে হবে তেমনই আমাদের এই প্রক্রিয়াটি থেকে বের হতে সময় লাগবে। লেখাটি ধারাবাহিক। অপেক্ষায় থাকা যায় পরবর্তী সংখ্যার জন্যÑনতুন কোনো সমাজতত্ত্বের জন্য।
চিহ্ন-২৭ এর বিশেষ ক্রোড়পত্রে বিশেষ ভাবনা ছিলো ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে ভাষার মোড় নেবার ক্ষেত্রে সবুজপত্রের ভূমিকা উজ্জ্বল। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে ( ১৩২১-এর ২৫শে বৈশাখ) সাহিত্যের আর এক গতির জন্ম নেয় সবুজপত্র। বর্তমানে দাঁড়িয়ে পেছনে একশ বছরের ব্যবধান লক্ষণীয় তবে এই একশ বছরে আমরা বিচ্ছিন্ন হই নি সাহিত্য থেকে আরেকভাবে বললে হয়তো এভাবে বলতে হবে যে, সবুজপত্রের ভাষা থেকে আমরা বেরুতে পারি নি। রবীন্দ্রনাথের গদ্যে চলিত প্রমিত ভাষার প্রবেশ বলি আর অন্যান্যদের কলমে বাতাস লেগে এক বাঁকে চলার কথাই যদি বলি তাহলে কিন্তু সমস্ত প্রশংসা সবুজপত্রেরই প্রাপ্য। চলিত ভাষাই চলছে বর্তমান সাহিত্যে। প্রমথ চৌধুরীকে নানাভাবে অনেকেই সম্পাদনায় সাহায্য করেছেন। তবে হতাশার কথা সবুজপত্রকালীন লেখা পাওয়া বা চলিত ভাষায় লেখার লেখক তেমন পাওয়া যায় না। গেলেও বর্তমানে কিন্তু পরিস্থিতি আরও বিপরীত। ঐ সব সংখ্যার কথা যে সব সংখ্যায় মূলত সম্পাদকীয় ব্যতীত সমস্ত লেখাই রবীন্দ্রনাথের, অথবা সম্পাদক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলে সংখ্যাগুলোর উপযোগ কিন্তু আজও ফুরায় নি। কিন্তু অনেকেই লিখেছেন সে সময়ে। সংকটের কথা তুলে ধরতে উদাহরণটি দেয়া মাত্র। নন্দলাল বসুর তালপাতার প্রচ্ছদটি এখনো চিরসবুজের বিজয় কেতনের সিম্বল বহন করে।
প্রাতিষ্ঠানিক কথা। সাহিত্যে একশ বছর হয়তো তেমন সময় নয়। ফল ভোগের ব্যাপারটি হয়তো আরও পরের বিবেচ্য বিষয়। তবে সবুজপত্রকে সবার নমস্কার জানানোই (সবুজপত্রবিষয়ক মতামতধর্মী লেখাগুলোতে) কী দায়িত্ব? আর যাঁরা বলতে চাইলেনও তাঁরা কিছু জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়ে কলম থামালেন। একটি ভাষার পরিবর্তন হলোÑতা কি নিয়ম মেনে? অবশ্যই। সেটাই প্রমাণ করেছে সবুজপত্র। তবে সে নিয়মগুলো আসলে কী? ভবিষ্যৎ! একশো বছরের পরিবর্তন কতোটা। সেটা হয়তো সাহিত্যের সময়ই বিবেচনা করবে। তবে যা বর্তমানে হচ্ছে তার সঠিক প্রভাব প্রয়োগ কী ঘটছে? নাকি অন্য কোনো দিকে চলে যাচ্ছে? উত্তর মেলে নি।
রাজধর্ম থেকে গণধর্মে নেমে আসা ভাষা তেরোটি বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে। আমরা উপকৃত সবুজপত্র-এ প্রকাশিত লেখার তালিকার মাধ্যমে।
নিয়মিত-অনিয়মিত বিভাগ, ধারাবাহিক বিভাগ, বিশেষ বিভাগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে চিহ্ন। হয়তো এটাই তার বৈশিষ্ট্য রূপ নিতে যাচ্ছে। ভিন্ন ভাবনার মিশেল হয়তো পাঠককে সমৃদ্ধ করে। তবে বিশেষের প্রতি নজর সবার ‘বিশেষ’ই থাকে সেই কারণেই সে বিষয়ের প্রাচুর্য অনুমেয় হয়। চিহ্ন কবিতার অনুপস্থিতি টিপ ছাড়া প্রিয়তমার মতোই মনে হয়। যদিও পরবর্তী বিষয়টি কবি ও কবিতা বলেই ঘোষিত। সাহিত্যের প্রয়োজনে যে বিষয়গুলো এসেছে তা হয়তো কিছুটা পরিপাটের প্রয়োজন ছিলো। গল্প মন মাতাতে না পারলেও প্রবন্ধগুলো ছিলো বেশ সময়োপযোগী। স্মরণে এসেছেন যাঁরা তাঁদের প্রণিপাত। যাঁরা জীবন থেকে তিল তিল করে সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে ডিপোজিট করেছেন সাহিত্যে। চিহ্ন তেমনই ডিপোজিটর। সাহিত্যের সময়, শ্রম, মেধার ডিপোজিটর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য
ও সংস্কৃতিচর্চা-১১

কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তিই দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।
-হেলাল হাফিজ
সেপ্টেম্বরের শরতের আকাশে এমনই তৃষ্ণার সন্ধান পেয়েছিলেন মনিরুজ্জামান। শব্দকে কণ্ঠে ধারণ করে আরো তৃষ্ণার্ত হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে; সময়টা ১৯৮১ সাল, ২০ সেপ্টেম্বর। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক সেই অনুষ্ঠানে সংশয়যুক্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- ‘স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল ছন্দ/ উড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল এই তার আনন্দ’ লাইন দুটো উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু মনিরুজ্জামান (প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক) ও শেরিফা নার্গিস আখতার রেখা (প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক) কণ্ঠ-শানানোর যে দায়িত্ব নেন, হাসান আজিজুল হকের নাম দেয়া সেই স্বননর বয়স এখন তেত্রিশ। চিহ্নর ধারাবাহিক আয়োজনের এবারে থাকছে শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি সংগঠন স্বনন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন স্বনন জন্মলগ্ন থেকে উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও আবৃত্তি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে মতিহার সবুজ প্রাঙ্গনে, কলাভবনের বিভিন্ন কক্ষে, নাজিম মাহমুদের কক্ষে, হাসান আজিজুল হকের কক্ষে ও বর্তমানে মমতাজউদ্দিন কলাভবনের ১৪০ নম্বর কক্ষ-খ্যাত ক্লাপসেবল গেটের ফাঁকা জায়গাতেই বিশোর্ধ কর্মীর মহড়া চলে দিন-দিন বিকাল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত। তবে স্টেডিয়াম মার্কেটে তাদের নিজস্ব অফিস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প সময়ের জন্য আসা (পাঁচ বছর, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে কখনো আরো বেশি) শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও অডিশনের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে থাকে স্বনন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংগঠনের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে স্বননর গঠনতন্ত্র নির্মিত। ‘যতদূরে যাই/ আমরা সবাই/ স্বনন পরিবার’- এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহই স্বননর মূলমন্ত্র। যাঁদের একান্ত ভালোবাসা- অনুপ্রেরণা- পরামর্শে স্বনন শিশু থেকে বলিষ্ঠরূপে উপস্থাপিত হচ্ছে তাঁরা হলেন- নাজিম মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার, আবুবকর সিদ্দিক, গোলাম মুরশিদ, আতাউর রহমান, শহীদুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, আব্দুল খালেক, শিশির কুমার ভট্টাচার্য, জাহেদুল হক টুকু, সুব্রত মজুমদার, ওয়াহিদুল হক, অসিত বরণ ঘোষ প্রমুখ। তবে, সার্বিক প্রেরণার মূলে কাজ করেছেন নাজিম মাহমুদ। সুধীজনদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেও রংপুরে ও ঢাকায় স্বননর দুটি শাখা রয়েছে। চিরসবুজ স্বনন সারা বছর ধরে মতিহার চত্বরকে দিয়ে এসেছে একটি ছন্দ, লয়, নির্দিষ্ট ঘরানায় চলার গতি। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক জটিলতা তাদের কার্যক্রমে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে নি। স্বনন বর্ষাকে সম্ভাষণ জানায় শব্দে, বাসন্তি পরিবেশকে সুললিত করে কণ্ঠে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপন করে হাওয়ার অনুরণনে কিংবা তাঁরই প্রয়াণের দিনে বেদনার গুমোট পরিবেশ জানান দেয় শব্দের গুরুত্ব। এছাড়াও জাতীয় দিবসগুলোতে এবং বাঙালির একান্ত গৌরবের দিনগুলোতে স্বনন কবিতার ঝুড়ি নিয়ে বসে মতিহার চত্বরে। এ কার্যক্রমের ধারা প্রতি বছর অব্যাহত থাকে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে প্রধান আবৃত্তিকার করে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান। এরপর হাজার বছরের কবিতা, বিভিন্ন কবিকে কেন্দ্র করে (সমর সেন, আহসান হাবীব-এর প্রয়াণে, জীবনানন্দ, আবুল হাসান স্মরণ ইত্যাদি) অনুষ্ঠান, গুণিজন সংবর্ধনা, ছড়া-নাটক-গদ্য পাঠ, কর্মশালা এমইতর বিভিন্ন উপলক্ষ ও সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়াও স্বনন আয়োজন করেছে আবৃত্তি অনুষ্ঠানের। এছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত মেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আবৃত্তি অনুষ্ঠানে স্বননর উপস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। কবি কামাল, জয়ন্ত রায়, মাসকুর-এ-সাত্তার এবং নিশাত জাহান রানার সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বনন প্রতিনিধি দলও ১৯৮৬ সালে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে স্বনন উপস্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। জাতীয় আবৃত্তি উৎসবে স্বননর সরব উপস্থিতি চোখে পড়বার মতো। ‘রক্ত বিচ্ছুরিত সূর্য কবিতার বাংলাদেশ’- এই স্লোগানে ‘৯০-এর গণ-আন্দোলনের সমর্থন জানায় স্বনন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে ‘চিত্তে যবে মত্ত আশা’- স্লোগানে আবৃত্তি উপস্থাপন করে স্বনন। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদ স্বর্গের সাথে মতিহার সবুজ চত্বরকে তুলনা করেছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত স্বননর সদস্যরা ফি-বছর তাঁর প্রয়াণের দিনে কবিতার মাধ্যমে তাঁকে এভাবেই স্মরণ করেন। ১৯৮৪ সালে বৈশাখ উদ্যাপনের মাধ্যমে প্রথম কর্মশালার আয়োজন করে স্বনন। তাছাড়া দশ বছর পূর্তি, তিন বছর পূর্তি, ছয় বছর পূর্তি, আট বছর পূর্তি, যুগ পূর্তি, ষোল বছর পূর্তি, তেইশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ও কর্মশালাগুলোতে সৈয়দ শামসুল হক, হায়াৎ সাইফ, কবি কামাল, হাসান আজিজুল হক, আলী আনোয়ার, কামরুল হাসান, জামিল চৌধুরী, কবি পূণেন্দু পাত্রী, নাজিম মাহমুদ প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থেকেছেন এবং তাঁদের সম্মাননা প্রদান করেছে স্বনন। ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিল স্বনন। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২১মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ ও ‘ফাল্গুন’ উপলক্ষে ‘এতো ফুল ফোটে এতো পাখি গায়’- স্লোগানে পুরাতন ফোকলোর চত্বর বিকাল ৫.৩০টায় প্রেম, প্রকৃতি ও দেশ কবিতায় মুখরিত ছিলো। কবিতার গুরুত্ব ও ফাল্গুনের আগমন ধ্বনি উচ্চারিত হয় স্বনন শিশুদের কণ্ঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রধানতম অর্জন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’- স্লোগানে বিকাল ৪.০০ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সিকান্দার আবু জাফর, সানাউল হক প্রমুখের কবিতায় আরও একবার স্বাধীনতার গৌরব ও ত্যাগের মহিমা কীর্তনে সিক্ত হয় মঞ্চ। বাংলাদেশ ও বাঙালির উৎসবের ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ‘পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ’- স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন বিকাল ৩.৪০ টায় আমচত্বরে (কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনে) হরেক রকম কবিতার পশরায় মুখরিত হয় বৈশাখ উদ্যাপন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবর্ষ উদ্যাপনে ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’- স্লোগানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে বিকাল ৫.০০ টায় স্মরণ করা হয় রবীন্দ্রনাথকে। স্বননর প্রাণপুরুষ নাজিম মাহমুদের প্রয়াণ দিবস ও আলী আনোয়ার স্মরণে ফি-বছরের ন্যায় ১৭ মে শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের ১৫০ নম্বর কক্ষে কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করে স্বনন। স্মরণ অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন- হাসান আজিজুল হক, বেগম হোসনে আরা, সনৎকুমার সাহা, কবি আরিফুল হক কুমার, রাশেদা খানম প্রমুখ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে অলংকৃত করেছিলেন- শিশির কুমার ভট্টাচার্য, সুব্রত মজুমদার, শুভ্রা রাণী, তাপস মজুমদার, রকিবুল হাসান রবিন, কবি কামাল প্রমুখ। যখন স্বননর এই কার্যক্রমের কথাগুলো লিখিত হচ্ছে বাহিরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, হয়তো স্বনন সদস্যরাও প্রস্তুত হচ্ছে তাদের পরবর্তী আয়োজন বৃষ্টির কবিতা নিয়ে। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিক্রমায় সংশয়, নৈরাজ্য ও হতাশা মোকাবিলা করতে প্রত্যেক সময়ে শক্তভাবে হাল ধরেছিলেন স্বননর সদস্যরা। তাছাড়াও যার ডানার তলে স্বনন শিশুরা আগলে রয়েছে তাঁরা হচ্ছেন কবি কামাল ও মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। ঝড় কেটে গেছে, স্বনন তরী নির্বিঘেœ ভাসুক সাংস্কৃতিক সমুদ্রে…।