Archives

মুখোশে বিবর্তিত মুখ

…পাশাপাশি কয়েকটি দিঘি। প্রত্যেকটা দিঘিই বেশ বড়ো। আমরা দলবেধে বিকেলে বেড়াতে যেতাম দিঘির পাড়ে। পূর্বে এই দিঘিগুলো ছিলো না। সেখানে ছিলো ছোট্ট একটা বিল। সেই বিল কেটে বানানো হয়েছে দিঘিগুলো। বিলটির সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব সেখানে প্রচুর পদ্মফুল ফুটতো। সেজন্য কিছুকিছু দিঘিতে অনেক পরেও পদ্মফুল ফুটতে দেখা যেত। কালক্রমে মাছ ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে ফুলগুলো বিলীন হয়েছে। আমরা তখন ছোট। বিশ্বজোড়া আজব সব রঙের দোলাচল বোঝার ফুরসৎ তখনো হয়নি আমাদের। আমাদের শরীরে রক্তের খেলা কেবল জমতে শুরু করেছে। উন্মাদ দুরন্ত শৈশব। যেন কোনো বাঁধই মানতে চায় না। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে তরুণ তরুণীরা গোপনে সেখানে মিলিত হতো। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম সেসব দৃশ্য আর ফাটিয়ে হাসতাম। গোপন প্রণয়স্থল হিসেবে পরিচিতি ঘটলে জনমানবহীন স্থানটির নামের রদবদল ঘটে যায়। জায়গাটির পরিবর্তিত নাম রটে গেল- ‘প্রেমদিঘি’ বলে। প্রেমদিঘিতে এসে যুবক-যুবতী পরস্পরের হাত ধরে, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুম্বন করে। আরো নাম না জানা কতো বিস্ময়কর রহস্য সেখানে ঘটে চলে। এসব বিষয়ে আমাদের আগ্রহ থাকলেও খুব বেশি ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। এও যেন এক রহস্য। ক্রমে আমাদের যাতায়াত বিকেল গড়িয়ে রাতে পোঁছালো। আমাদের রক্তে তখন কিসের যেন নেশা। রক্তপিয়াসী ড্রাকুলার মতো সে যেন কোন্ রক্তের শরীর খোঁজে। আমরা বুঝতে পারি না কিছু। কেবল খুঁজতে থাকি। অবশেষে পেয়ে যাই। আমাদের নির্ধারিত গন্তব্য তখন গভীর রাতে গড়ায়। দিঘি থেকে সামান্য পেছিয়ে আসলে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘরবাড়ি। সেই বাড়ির পাড় ঘেঁষে দিঘির মুখোমুখি কয়েকটা নারকেল গাছ। দিঘি থেকে একদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের চোখ পড়ে নারকেল গাছের দিকে। গাছগুলো কচি ডাবে টইটম্বুর। দেখামাত্রই সিদ্ধান্ত হলো- আজ রাতে ডাব চুরি করে খাবো। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো গাছে উঠতে পারতো বেলাল। সময় নির্ধারিত হলো রাত একটা। সবাইকে বলা হলো আইচনের পাহাড়িতে এসে এক হতে। নির্জন অন্ধকার সেই জায়গায় সন্ধ্যার পর মানুষ যেতে ভয় পায়। গোলের মা নিজ হাতে তার স্বামীকে কুপিয়ে কেটেছে। তারই কবর আছে ঐ জায়গাতে। তা ছাড়াও সেই জায়গার এমন কিছু কিংবদন্তী আছে যা শুনলে মানুষ সেখানে যেতে ভয় পাবে। যেমন, পায়ের সাথে কালো বিড়াল জড়িয়ে পড়া আর সেই বিড়ালেরই এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণের গল্প। কিন্তু কিসের সেই কিংবদন্তী, কিসের সেই ভয়। একটা বাজতে না বাজতেই আমরা সব্বাই সেখানে এসে উপস্থিত হলাম। হই হই রৈ রৈ করে ডাব পেড়ে আইচনের পাহাড়িতেই নিয়ে আসলাম। ইচ্ছেমতো ডাব খেয়ে খোলগুলো পাড়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত নালার মধ্যে ফেলে বাড়ি গেলাম। এমনিভাবে চলতে লাগলো আমাদের ডাবচুরির পর্ব। ধরতে পারা তো দূরের কথা আমাদের কিংবা ডাবের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি কখনো। গ্রামের এক কোনাচে জায়গায় বিলের ধার ঘেঁষে মুহুরীদের বাগান। বাগানের সাথেই লাগোয়া বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের নিচেই বিশাল পুকুর। সেই পুকুরে নাকি অনেকে রাতে চৌকি ভেসে থাকতে দেখেছে। আর বাঁশঝাড়ের বাঁশগুলো নাকি রাতে মাটির সাথে হেলে থাকতো। তার নিচ দিয়ে কেউ গেলে চাপা দিতো, ওপর দিয়ে যেতে ধরলে তুলে আছাড় দিতো। মুহুরী বাড়ির পাশেই দুলাল ভাইদের বাড়ি। ছোট বেলা হাগতে গিয়ে মুহুরীদের বাগানে সে নাকি ঘোড়া দৌঁড়াতে দেখতো। মাকে জিজ্ঞেস করলে মা থামিয়ে দিয়ে বলতো- ‘চুপ মারি থাক, কথা বুলিস নি।’ এসব কথা দুলাল ভাইয়ের মুখে শুনতাম। তখন আমরা অনেক ছোট। দুলাল ভাইদের বাড়ির সাথেই এ্যানা মামাদের বাড়ি। এ্যানা মামার বৌ, তাকে সবাই আলালের মা বলে ডাকতো। আলালের মা মামী ধান ওঠার সময় আমাদের বাড়িতে ধান সেরে দেবার কাজ করে। মামীর পাশের বাড়িতে থাকে ইসোফ ধড়–। ইসোফ ধড়–র বাড়ির পাশেই মুহুরীদের বাগান সংলগ্ন বাঁশঝাড়। ইসোফ ধড়–র বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নালা। নালার চারপাশ জঙ্গলে আকীর্ণ। তারই মধ্যে একসারিতে কয়েকটা নারকেলগাছ। হঠাৎ একদিন আমাদের দৃষ্টি পড়ে সেই নারকেলগাছের দিকে। তখন ধানের মৌসুম। আলালের মা মামী আমাদের বাড়িতে ধান সারার কাজে নিয়োজিত। আমরা একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম ইসোফ ধড়–র গাছের ডাব খাবো। বেলালের হদিস পাওয়া গেল না। আমাদের অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে রিপন আর সেলিম গাছে উঠতে পারতো। রিপনকে বললে সে ব্যক্তিগত সমস্যার অজুহাতে আসতে রাজি হলো না। তাই সিদ্ধান্ত হলো সেলিমই গাছে উঠবে। আমাদের মধ্যে সেলিম ছিলো কিছুটা স্বাস্থ্যবান আর লাজুক প্রকৃতির ছেলে। এজন্য আমরা তাকে ‘ধপা’ বলতাম। সেদিন খুব গভীর রাতে তিন রাস্তার মোড়ে এসে আমরা উপস্থিত হলাম। রতন বাড়ি থেকে ডাবের বাদা কাটবার জন্য ছোট দা আর ডাব নামিয়ে দেওয়ার জন্য তারের গোছা নিয়ে বেরিয়ে আসলো। আমরা একযোগে বেরিয়ে পড়লাম। যাত্রাপথেই ভীতিকর সব কিংবদন্তী এক এক করে মনে পড়তে লাগলো। মনে আছে, সামান্য পাখির ডাকেও সেদিন আমরা সচকিত হয়েছি। কিন্তু, আমাদের দুরন্ত তারুণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিংবদন্তীগুলো শেষে পরাজিত হয়েছিলো। অবশেষে আমরা পৌঁছে যাই ইসোফ ধড়–র বাড়ির কাছে। জঙ্গল ফুড়ে সেলিম নালার গা ঘেষে দাঁড়ানো নারকেল গাছ বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। একটু স্বাস্থ্যবান বলে গাছে উঠতে তার দেরিই হয়েছিলো। তাছাড়া কাছে তারের গোছা আর দা থাকায় বোধহয় কিছুটা সমস্যা হচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পরে সে পৌঁছে যায় একেবারে ডাবের বাদার কাছে। দা দিয়ে সে বাদাটি কাটতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ তার হাত থেকে দা নিচে পড়ে যায়। আমরা যারা নিচে ছিলাম তারা বুঝতে পারলাম ওপর থেকে কিছু একটা পড়েছে। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে ঠিক কোথায় পড়লো তা আর বুঝে উঠতে পারি নি। সেলিম আস্তে করে বললো- দা পড়ে গেছে। আমরা জঙ্গলের মধ্যে কিছুক্ষণ খুঁজে দা আর পেলাম না। সেলিমকে ‘ধপা’ …ইত্যাদি বলে গালমন্দ করতে লাগলাম। অবশেষে নিরাশ হয়ে তাকে গাছ থেকে নেমে আসতে বললাম। সেলিম গাছ থেকে নামতে শুরু করলো। এমন সময় আমাদের কথা আর পায়ের খসখস আওয়াজে হয়তো পাশের বাড়ির আলালের মা সচকিত হয়েছে। জঙ্গলের দিকে টর্চ ধরে সে বার দুই-তিনেক হাক দিলো- ‘ক্যাডা ঔগিল? ক্যাডা ঐজাগাত?’ আমরা সাবধান হয়ে চুপচাপ জঙ্গলে লুকিয়ে রইলাম। সেলিম গাছের মাঝখানে আটকে রইলো। এ্যানা মামার বাড়ির পরিবেশ শান্ত হলে সেলিম খুব সাবধানে নিঃশব্দে গাছ থেকে নেমে এলো। আমরাও শব্দ না করে সেখান থেকে চলে আসলাম। আমাদের আর সেদিন ডাব খাওয়া হলো না। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়। উঠে বাইরে হাঁটতে বের হই। বাড়ি ফিরে দেখি আলালের মা মামী ধান সারার কাজে বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাকে ঘিরে কয়েকজন গোল হয়ে বসে আছে। মামীকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম- ‘মামী কেমন আছেন? সবাই এমন গোল হয়ে বসে আছে কেন? ’মামী আমাকেও বসে পড়তে বললো। ছোট টুলটা নিয়ে আমিও বসে পড়লাম। মামী বলতে লাগলেন- ‘কাল রাইতে একটা জব্বর ঘটনা ঘটিছে।’ ভীষণ কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘মামী কী ঘটনা?’ মামী বলতে লাগলো- ‘কাল রাইতে আমার বাড়ির ধাইরে বাপজানেরা আসছলো (বাপজান বলতে তিনি যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তার অর্থ হচ্ছে- ভুতপ্রেত)। গরম লাগছোল বুলি আমি বাহিরে শুই ছিনু। দেখি কি, ইসোফের বাড়ির নিচে উনারা খুসখুস, ফুসফাস করছে। আমি প্রথমে বুইচতে না পারি জিজ্ঞাস করনু, ক্যাডা? উনারা কুনো কথা না বুলি নিচে ডাড়ার (নালা বিশেষ) পানির দিক নামি গেলো।’ এতটুকু বলে মামী একটু থামলো। সবাই বলতে লাগলো- `তারপর, তারপর? আমার যে তখন কী ভীষণ হাসি পাচ্ছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। মামী উত্তর দিলেন- `তারপর আর কী! আমি ভয় প্যা পাশ ফিরি শুই থাকনু। খানিকক্ষুণ পর ফসসা হলে উঠি পড়নু।‘ তখন উঠান থেকে অন্য বাড়ির মহিলা ডাক দিলো- ‘কই আলালের মা, মেলা বেলা হে গেল, তাড়াতাড়ি ধানে হাত দ্যাও।‘ আলালের মা মামী উঠে গিয়ে ধান গোছাতে লাগলো। আমাদের উঠান ঘেষেই মেম্বার চাচার বাড়ি। উঠানের দিকে মুখ করেই মেম্বার চাচার ঘরের দাওয়া। দাওয়া থেকে উঠান স্পষ্ট দেখা যায়। ঘরের ভেতর হাসফাস লাগায় আমি বের হয়ে উঠানে গেলাম। আলালের মা মামীসহ আরো দু-তিনজন মহিলা ধান সারার কাজ করছিলো। হঠাৎ করে মেম্বার চাচার ঘর থেকে ডাক আসলো- ‘আলালের মা, কই, এদিক শুনি যাও।’ আলালের মা মামী ধুলো গায়ে উঠে গিয়ে ডাকার কারণ জিজ্ঞেস করলো। মেম্বার চাচা একখিলি পান মুখে দিয়ে বললেন- ‘মেলাই তো কামকাজ কইরলে, এবের ফ্যানের বাতাসে বসি দুডি গান শুনি যাও।’ আলালের মা মামী দরজায় হেলান দিয়ে বসে পড়লো। একটু পরেই মেম্বার চাচার সিডিতে বেজে উঠলো- ‘গম দিবার কথা কইয়া ডাইকা আনলেন ক্যান, ও চেয়ারম্যান/ আচল ধইরা টান দিলেন ক্যান?’ ওমনি আলালের মা মামীর ভরাট শরীর ডাঙায় তোলা চিতল মাছের মতো তড়বড় করতে লাগলো। গানের কথাগুলোর সাথে মেম্বার চাচার ইঙ্গিতময় হাসিতে আলালের মা মামীর ভরাট কালো মুখ লজ্জায় মুহূর্তেই একেবারে লালচে হয়ে গেল। তড়াৎ করে লাফিয়ে উঠে ‘আমি এহুন যাই’ বলে সে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করলো। এমন দৃশ্য এখন হয়তো খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হবে। কিংবা হয়তো এমন অনেক দৃশ্য এখন ভ্রুক্ষেপ না করেই ফিরে আসি। কিন্তু প্রথম দিনের সেই দৃশ্য আর সেই কথোপকথনে কেমন একটা গা শীতল করা অনুভূতি হয়েছিলো। এরপর কী অপেক্ষা করছে ইত্যাদি কেমন এক অচেনা কৌতুহল। আর শরীরটাও যেন নিজের অজান্তেই সাড়া দিচ্ছিলো। এরপর মনে পড়ে বন্ধুদের সাথে প্রথম ব্লু ফিল্ম দেখার ঘটনা। তখন কিছুটা বড়ো হয়েছি। তবে শরীরিক অনুভূতি অপেক্ষা কৌতুহলই সম্ভবত অধিক ছিলো। সেজন্য শরীর অপেক্ষা মনই অধিক সাড়া যুগিয়েছে। তারপরও যে দৃশ্যগুলো দেখেছিলাম তা এখনো চোখে ভাসে। এরপর আরও কিছুটা বড়ো হলে শহরে যাতায়াত শুরু হয়। শহুরে কিছু বন্ধু হয়েছিলো। রাহী নামের এক ছেলে একদিন ব্যাগের ভিতর একটি চটি সেক্সের বই ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। বাড়ি ফিরে রাতে পাঠ্যবইয়ের মাঝখানে রেখে রাতভর সেটি পড়েছিলাম। মৈথুনের অভ্যাস তখনো হয়নি। সেদিন প্রথম কাকে কল্পনা করেছিলাম মনে নেই। হতে পারে কোনো কল্পিত নারী কিংবা সেই আলালের মা মামী। সঠিক মনে পড়ে না। ঘুম থেকে উঠে সম্ভবত সেদিনই প্রথম অনুভব করেছিলাম লুঙ্গিটা আঠালো জমাট তরলে ভেজা। সেদিন সমস্ত দিন অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করেছিলো। সে অনুভূতি বোঝাবার ভাষা জানা নেই। তবে প্রথম কবে কার চোখ মনে ধরেছিলো তা বলার জন্য আজ এক প্রহর ভাবতে হয়। অথবা, কখনো সে কথা ভাবারও আর অবসর হয় না। তবে মনে পড়ে, সেই নারী, নাম তার- ফাবিহা খানম। বন্ধুরা অনেক বলতো সেই মেয়ের কথা। বিশেষ আগ্রহ না দেখালেও নিজের অজান্তেই হয়তো সেই নারীকেই প্রথম মনে ধরেছিলো। আজ সে কোথায় তার কোনো হদিস নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। সেই সময়ই বা কোথায়? সময় কষে আজ আমরা সাবধান হয়েছি। অনুভূতিগুলোও যেন হিসেব কষা। তাই আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। কখনো কখনো ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে। রাতে নিঃসঙ্গতাগুলো বালিশে, বিছানায় মাখামাখি করে। দিনে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। তখন ঘন সাদা জমাট মেঘপুঞ্জকে মনে হয় আবির্ভুত কোনো এক নারীমুর্তি। সেখানে লেখা নাম- দোয়েল, নীলা, …। এদের মধ্যে এমনও একজন আছে যে ছিলো সবার থেকে আলাদা। তার কথা না হয় থাক। আমার অন্তর্গত মুখোশেই সে ঢাকা পড়ে থাক। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না কোথাও। নিঃসঙ্গতা, শহুরে নান্দনিকতাগুলো সঙ্গী করে সারাজীবন থেকে যেতে ইচ্ছে করে দ্বন্দ্বজটিল এই নাগরিক সভ্যতায়। তবু ভীষণ মনে পড়ে শৈশবের কিছু স্মৃতি যখনও পর্যন্ত মুখোশ কেটে মুখ দেখার খেলাটি জমে ওঠেনি আমাদের। সভ্যতা বোঝার এতো টানাপোড়েন সেখানে ছিলো না। আমাদের সেই বিরাট গ্রামটিতে। কতো মানুষ, কতো বৈচিত্র্য, কতো রঙ, কতো রূপ ছিলো সেই গ্রামের। দল বেধে আমরা কজন সব্বাই একসাথে ডোবা নালায় স্নান করেছি। বিলে শাপলা তুলেছি। কখনোবা ভাট তুলতে গিয়ে সাপ দেখে ভয়ে পালিয়েছি। আমাদের তৈমুর মামার পায়ে একবার ঢোড়া সাপে কামড় দিলে তার মুখে কোনো ভয় বা দুঃশ্চিন্তার কোনো ছায়া একেবারেই দেখিনি। বরং রাতে আগুনে ব্লেড তাতিয়ে পায়ে বিদ্ধ সাপের দাঁত নিজে কেটে বের করেছেন। মানিক ভাইকে দেখেছিলাম এক গুখরো সাপ গর্ত থেকে হাত দিয়ে টেনে বের করে নিয়ে আসতে। কী দুঃসাহসিক ব্যাপার! সে কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাটা দেয়। কখনো গভীর রাতে ভূতের গল্প হতো। মানুষ মরে গেলে কবরে গিয়ে কী হয় এমন নানা কিংবদন্তি তৈরি করতাম। কতো রাতে গিয়েছি দল বেঁধে দিঘির পাড়ে ডাব চুরি করে খেতে তার সঠিক হিসেব নেই। কবে কার গাছের ডাব বড়ো হয়েছে, কার গাছের বোরই পেকেছে কিংবা কার গাছের কলার কাই পরিণত হয়েছে- এসব দেখার বিষয়ে আমরা থাকতাম সচকিত। শীতের দিনে দল বেঁধে বিলে যেতাম খেজুর রস চুরি করে খেতে। বর্ষাকালে বাধতো মাছ মারার ধুম। কখনো কাদা ঘেটে, কখনো ছিপ দিয়ে বা কখনো জাল দিয়ে মাছ ধরা হতো। বৃষ্টি এলে আমরা কাদামাটিতে ফুটবল খেলতাম। কখনো বাবার পকেট থেকে একটা ৫৫৫ চুরি করতে পারলে তো আর কি চাই? সন্ধ্যা হলে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরতাম। দুপুরে না খেয়ে থাকার জন্য পাছে মায়ের বকুনি খেতে হয় সেজন্য। গরমের দিন পুকুরে নামতে পারলেই হয় আর ওঠার নামই নেই। কতোদিন মা লাঠি হাতে পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে তা বলতে পারবো না। রাতে মার ভয়ে বই নিয়ে বসতে হতো। সারাদিনের দুরন্তপনায় শ্রান্ত হয়ে অল্প একটু পড়তে না পড়তেই ঘুমে ঢলে পড়তাম। বেগতিক দেখে মা তাড়াতাড়ি করে খাইয়ে দিতেন। অমনি এক ঘুম। সে কী ঘুম! এমন প্রশান্তির ঘুম যেন পৃথিবীর আর কোথাও নাই। সেই দিনগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে। সে কী রোমান্স! সে যে কী আনন্দ তা বলে বোঝানো মুশকিল। এমনি করেই দেখতে দেখতে কয়েকটি বছর পার হয়ে গেল। আমাদের আচরণে কতটুকু সভ্যতা ছিলো বা আমরা কতোটা সভ্য ছিলাম তা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন উঠতেও পারে। কখনো ওঠে নি তাও নয়। একবার কার হাঁস ধরে জবাই করে খেয়েছিলাম এজন্য অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। তবে একথা বলতে পারি এবং নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি- আমরা পুরোপুরি সভ্য না থাকলেও কোনো মুখোশ সভ্যতা আমাদের মধ্যে ছিলো না। হঠাৎ একদিন আমাদের কজনকে নিয়ে যাওয়া হলো গ্রাম থেকে দূরে আজব এক রঙের জগতে। সেখানে নিত্য রঙের খেলা চলে। সে রঙ গ্রামের সাদামাটা ঝলমলে রৌদ্ররঙ নয়, সে এক মোহিনী রঙ। সেখানকার পাঠশালায় মুখোশ তৈরির খেলা চলে। আমরা ক’জন এমন ছিলাম মুখোশে যাদের অরুচি। আমরা তখন মুখোশ কেটে মুখ দেখার খেলায় মেতে গেলাম। এই নিয়ে শুরু হলো নাগরিক জীবন। এখানে স্বপ্ন আছে, বাস্তবতা আছে। স্বপ্ন ও কল্পনার সাথে জগতের অনিত্যতা আছে, স্বপ্নভঙ্গ আছে। এই সমস্ত নিয়ে জীবনের কবিতা আর কবিতার জীবন। এ জীবন কখনো রোমান্টিক, কখনো স্বপ্নময়, কখনো প্রেমময় কখনো বাস্তব। এখানে মোহকাতরতা আর নির্মোহ হওয়া উভয়ের সংঘর্ষ আছে। মুখ আছে আবার মুখোশও আছে। মুখ কেটে মুখোশ দেখার খেলাও আছে। এই সবকিছু নিয়ে জীবনের জটিলতা, বাস্তবতা, নান্দনিক জীবন।

আর এদিকে যারা দণ্ড ধরে রঙের খেলায় মেতেছে তাদের মুখে রঙ মেখেছে মুখের মুখোশ। আর আমরা যারা মুখোশ কেটে মুখ দেখার খেলায় নিয়োজিত ছিলাম সময়ের দীর্ঘরথ পেরিয়ে তাদের মুখেও কখনো লাগে মুখোশের রঙ। আবার এই মুখোশের গভীরেই সূর্যরৌদ্রের নিষ্পাপ দীপ্তির মতো ফুটে ওঠে মুখোশিত মুখ। জমে ওঠে মুখ ও মুখোশের খেলা। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িঙের সে জীবন তো আর মানুষের নয়। মুখ ও মুখোশের নিদারুণ লীলা, মায়াজাল উপচিয়ে আজ সে মানুষ হয়েছে। তাই সবই শোভনীয়, সবই স্বপ্ন লাগে। হায়! সে যে মানুষ, সে যে মানুষ। মানুষের জয়।