Archives

নন্দিতা খান

নন্দিতা খান

নূরুননবী শান্ত

উপস্থিত দর্শক-স্রোতা, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের প্রিয় শিল্পী নন্দিতা খান মঞ্চে আবির্ভূত হবেন।

নন্দিতা খান সাজঘরের আয়নার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত বসে রইলো। বসে রইলো নগর মিলনায়তনের সাজঘরে। একা।

চায়ের কাপ ঠাণ্ডা হয়ে এলো। মেকাপম্যান দুইবার এসে ঘুরে গেলো। সে হাত ইশারায় ‘না’ করেছে দু’বারই। উদাস মাউথ অর্গান নিয়ে এসে পৌঁছেছে কিনা সেটা একবার জিজ্ঞেস করেছে মেকাপম্যানকে। মেকাপম্যান কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ‘না’ বলেছে। মেয়েটি জানে উদাসের বউয়ের কপালে কি ঘটেছে। শেষবারের মতো উদাস যখন ফোনে মেয়েটির সাথে কথা বলে, তখনই সে সবকিছু জেনে গেছে। একমাস আগের কথা। উদাসের বউয়ের ক্যান্সার বা তারও চেয়ে ভয়াবহ অসুখ হলেও তার এতো কষ্ট হতো না। কিন্তু ইতিমধ্যেই দাফন শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কুলখানিও। উদাস কাউকে জানায়নি। মাসখানেক আগে নীরবে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা এটা। তারপর থেকে মঞ্চের ধারেকাছে আসেনি উদাস। এবার, এই অনুষ্ঠানের বেলায়, নন্দিতা বিশ্বাস করে যে, উদাস আসবে। মাউথ অর্গান বাজাবে। মঞ্চে ওঠার আগে তার ডানহাতের উল্টোপিঠে চুমু খাবে। একবার। তারপর বামহাত ধরে তাকে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেবে। তখন সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে চুমু উড়িয়ে দেবে।

সুধি দর্শক আপনাদের কাছে বিনীতভাবে আর কয়েক মিনিট চেয়ে নিচ্ছি। আমরা এক্ষুণি অনুষ্ঠান শুরু করবো।

সাজঘরের দরোজা খোলা। নন্দিতা খানের আঙুল খোলা দরোজার দিকে ইশারা করলো। অর্থাৎ, এক বা দুই মিনিটের মধ্যে উদাস ঐ দরোজা দিয়ে প্রবেশ করবে, নন্দিতার ডানহাত হাতে নেবে, হাতের উল্টোপিঠে চুমু খাবে, তারপর হাত ধরেই দুই নম্বর দরোজার দিকে এগিয়ে যাবে মঞ্চের পেছনের সিঁড়ি বরাবর, যেমনটা চৌদ্দ বছর ধরে গিয়েছে। চৌদ্দ বছর পর নন্দিতা প্রতিষ্ঠিত, প্রখ্যাত। উদাসের ব্যস্ততার শৃঙ্খলা অনেক শক্ত হয়ে উঠেছে এতদিনে— উদাসের কঠোর তৎপরতাতেই নন্দিতা বড় হয়েছে— গুণে-মানে, বয়সে, আত্মবিশ্বাসে। নন্দিতার দিকে তাকাতে উদাসের চোখের পাতা কাঁপে এখন— নন্দিতার ডানহাতের উল্টেপিঠে চুমু দিতে যথেষ্ট সাহস ধরে রাখতে হয় উদাসের বুকে। নন্দিতাকে আগেভাগে ফোন করে শিডিউল জানিয়ে দিতে— প্রস্তুতিমূলক সভায় আসতে বলতে তাকে একবার হলেও কনটেক্স্ট চিন্তা করতে হয়। আবার হতে পারে যে, উদাসের ভাবনা-চিন্তার দরকার হয় না, এমনিতেই সে স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিকভাবে নন্দিতার যতœ করে। কিন্তু পড়শীদের নিয়েই তো আমাদের সমাজ, এই সমাজের গুরুত্ব আছে ঐতিহাসিকভাবেই। সমাজের ভাবনাটা নন্দিতার চেয়ে ভিন্নরকম। সমাজের ভাবনাকে আপনি চাইলেই উড়িয়ে দিতে পারেন না। সুতরাং, আমরা এই মুহূর্তে সমাজের দূরনিয়ন্ত্রিত চোখ দিয়ে উদাসকে দেখব। উদাস কি করছে? মেয়েটাকে একটা ক্যালেন্ডার উপহার দিচ্ছে। সেই ক্যালেন্ডারে শীতকালের কয়েকটা তারিখে দাগ দিচ্ছে। এই দাগগুলোর মানে হলো সেই সেই দিনে এই শহরে বা কোন বড় বাজারের কেন্দ্রে প্যান্ডেল করে একটা না একটা শো হবে আর সেই শোয়ে নন্দিতা কথা বলতে বলতে গান গাইবে, গান গাইতে গাইতে কথা বলবে। নন্দিতার কাছে এটা গুনগুন করতে করতে দৌড়ে চলার মতো সহজ। উদাসের কাছে এটা নতুন দেশ দখল করার মতো উত্তেজনাকর। সেই দাগ দেওয়া তারিখের সন্ধ্যাগুলোয় সেই দরোজা আলো করে উদাস প্রবেশ করবে, হাতের উল্টোপিঠে চুমু দেবে শব্দ করে, বিস্মিত হবার ভান করবে, যেন এই দরোজার কাছে উদাসের আসার কথাই নয়—এটা একটা ঘটনাচক্র মাত্র এবং দুই নম্বর দরোজার দিয়ে বেরিয়ে নন্দিতাকে নিয়ে মঞ্চের কিনারে দাঁড়াবে।

নন্দিতা এই আনুষ্ঠানিকতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলো ততদিনে, এই নিশ্চয়তার অভ্যাস সে বদলে নেবার কথা একবারের জন্যও মনে আনেনি।

নন্দিতার বুক কেঁপে ওঠে না যে এই এতদিনে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে আমাদের মনে হয় যে, ওঠে। সে স্পষ্ট দেখে অথবা কল্পনা করে যে, উদাস এবার একই দরোজা দিয়ে ভিন্নভাবে আবির্ভূত হবে। অন্য কেউ হয়ে উপস্থিত হবে।

নন্দিতার অনুমান হয় যে, ভিন্ন উদাস সেই একই দরোজা দিয়ে প্রবেশ করবে নতুন কোনো সাজে, হতে পারে যে মুখ ভর্তি দাড়ি থাকবে, চাইনিজ মাউথ অর্গান থাকবে না ঘাড়ে ঝোলানো চামড়ার স্টেনগান আকৃতির ব্যাগে, বরং হাতে থাকবে এক গোছা রজনীগন্ধা, অন্য ধরনের এক হাসি মুখে ঝুলে থাকবে দুর্বোধ্যভাবে।

নন্দিতা কৌতূহল লুকিয়ে রাখে বুকের ভেতরে। বুকের ভেতরে জাঁকিয়ে বসে থাকে কৌতূহল চুপচাপ। সম্ভবত উদাস আলাদা কেউ হয়ে, ভেতরে এসে নন্দিতার পাশে গম্ভীর মুখে বসবে, খানিকক্ষণ চুপ করে থাকবে, তারপর বলবে, ‘সে তো আর নাই। সে চলে গেছে। আসবে না আর ফিরে কোনদিন। এই সময়ে এই কনসার্টটা করার দরকার নাই। মন লাগাতে পারা যাচ্ছে না। এখন, সে যেহেতু নাই, আমার বউ যেহেতু নাই, চৌদ্দ বছরের অভ্যাস এবার বদলায়া যাবে। অতএব, আসো, অভ্যাস বদলায়া যাবার আগেই নিজেদের বদলায়া ফেলি। তো, সে যেহেতু নাই, আর যেহেতু অন্য কিছু অবলম্বন করে আমি আমার বাঁচার পথ খোলা রাখি নাই, পাশে একজন নন্দিতা খান থাকলে আমি অস্থিত্ব নিয়ে টিকে থাকবো। তুমি নিশ্চয় বুঝবে। সেইজন্যে, বলছিলাম আর কি, চলো, আমরা কথা বলি, বসি খানিকক্ষণ নিজেদের মতো করে, চুম্বন করি, বিয়ে করি, তারপর অনেক কনসার্ট করে সংসার নির্বাহ করি। তবে, এটা বলা দরকার যে আমি তাকে কিন্তু ভালোবাসতাম, এখনো বাসি, অবশ্যই। কিন্তু সে তো আর নাই, আমি একা বেঁচে থাকতে চাই না। নিজেকে একলা ভাবলেই আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। জীবন-যাপন করাই তো মানুষের ধর্ম, মানে, যতক্ষণ না মৃত্যু এসে জীবন থামিয়ে দেয় আর কি। তো, জীবন-যাপন করতে করতেই আমি তোমার সাথে যতগুলো বছর পার করলাম ততবছর আয়ু অনেক মানুষেরই হয় না। সুতরাং, তোমার প্রেমে পড়ার জন্য অনেক দীর্ঘ সময় আমি পেয়েছি, এত লম্বা সময়ের সান্নিধ্য আমার জন্য তোমাকে অনিবার্য করে তুলেছে।’

আর এতগুলো বছরের সান্নিধ্য শেষে নন্দিতাকে বলতেই হবে উদাসকে উদ্দেশ্য করে কথা। ‘এতগুলো বছর পর, ভেতরে প্রেম তৈরি হবার পরও, উদাস, আমি ব্যবসাই করেছি। আমার সন্তানের জন্য। দুর্ঘটনায় মৃত স্বামীর দায় মেটাবার জন্য, খ্যাতির পরম পুলক লাভের জন্য। তুমিই বলেছিলে বিয়ে করতে আবার। করিনি। কিন্তু তোমাকে চেয়েছি পাশে। তোমার হাত আমার নির্ভরতা তো বটেই। অবশ্যই আমি আর একজন স্বামী চাইনি, প্রেমও চাইনি। যে চলে গেছে, তার বিকল্প আমি চাইনি। কিন্তু চেয়েছি নিরাপত্তা। অল্প বয়স থেকেই তো প্রোডিউসার, ডিরেক্টর, ওস্তাদদের জিহ্বার লালা দেখে দেখে আজ এই এখানে আমি। আমার প্রেম আমাকে রক্ষা করেছে আগ্রাসী লালসা থেকে। কিন্তু হঠাৎ দুর্ঘটনাটা ঘটলো। ভুল ওষুধ সেবন করার পরের ভোরবেলাতেই সে চলে গেলো। আমার সমস্ত প্রেম ওর জন্য কাঁদে। আজও। সেটাই তো হওয়ার কথা। কী এমন হতাশা ওকে জীবনের প্রতি উদাস করে তুলেছিলো! বউয়ের কামাইয়ের উপর ভর করে সংসার-সন্তানের ভার কাঁধে নিয়ে নেওয়া নিয়ে কোনোদিন তো সংকুচিত হতে দেখিনি তাকে। পার্টিতে সদাহাস্যে নিজের পরিচয় দিতো, আয়াম এন আইডিয়াল হাউজ হাজব্যান্ড। তার চলে যাওয়াটা দুর্ঘটনা ছাড়া অন্যকিছু নয় অবশ্যই, আমার দিক থেকে তা নিশ্চিত। কিন্তু তারপর নিরাপত্তা দরকার হলো আমার। একটা হাত আমার খুব প্রয়োজন হলো। তুমি হয়ে উঠলে আমার সর্বোত নিরাপত্তাব্যুহ। শক্ত হাত। নির্ভরতা। সমাজের কাঠামোর কারণেই এটার প্রয়োজন হলো। কনসার্ট করতেই পারতাম না কোনোদিন, নন্দিতা খানকেও কেউ চিনতো না। আর তুমিও কি বেঁচে নেই এই কনসার্টের রোজগারে? তবে স্পষ্ট করেই তুমি জানো যে কনসার্ট আমার এবাদত, উদাস। ভাবা যায়, এক ঘন্টার একটা কনসার্টে কত আনন্দ আমার, কতো ভক্তের সিটি। মনটাই ভরে যায়। মনে হয়, আমার গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব আছে। সাথে যোগ হয় লক্ষ লক্ষ টাকা, নিউজ কাভারেজ, খ্যাতি, করপোরেট অফার। সবমিলে কোটি টাকার বাজার আমাকে ঘিরে। আমিই সচল রেখেছি এতবড় বাজার, এতগুলো মানুষ আর তাদের পরিবারের আরও কতজনকে। সবকিছু জলে ফেলে দেব! এতগুলো জীবনের এতগুলো দরোজা বন্ধ করে দেব! মানুষের সম্ভাবনা ও ভরসাগুলো কেড়ে নেব! কনসার্ট বন্ধ করতে চাইলেই কি পারি আমি! যারা টিকিট করেছে ওরা ছাড়বে? স্পনসরশিপওয়ালারা ছিড়ে খাবে আমাকে। সত্যি কথা বলতে কি, চৌদ্দ বছর পরেও আমাকে একই রকম সতর্ক থাকতে হয়। একইরকম পেশাদার। তুমিই তো শিখিয়েছ পেশাদারিত্ব কি জিনিস! একবার ফ্লপ মানে পুরো জীবন আমাকে শত প্রোডিউসারের পেছনে ঘুরতে হবে। আমাকে তারা আঙুলের ইশারায় বসাবে, শোয়াবে, নাচাবে। বাজারের এটাই ধর্ম। আমি সইতে পারব? পারবে কি তুমি চেয়ে চেয়ে দেখতে? নো, নেভার। সঙ্গীত আমার জন্য কতই আর গুরুত্বপূর্ণ, তোমার চেয়ে তো অবশ্যই নয়। এটা ঠিক, তোমার জন্য আমার বুকের ভেতরে ভালোবাসা টের পাই। চৌদ্দ বছর কম সময় নয়, উদাস। কিন্তু এটা আমার পেশা। জীবিকা। সমস্ত সুনাম আমি একদিনে কলঙ্কিত করবো! না, এমনকি চৌদ্দ বছরের খ্যাতি সত্ত্বেও এই ঝুঁকিপূর্ণ বিবাহের সুখ আমি গ্রহণ করবো না।’ চৌদ্দ বছর। উদাসের বিবাহিত জীবনের চেয়েও দীর্ঘতর কাল।

সুধিবৃন্দ, আপনারা আমাদের আর দশ মিনিট সময় দিন। আজকের কনসার্ট আর মাত্র দশ মিনিট পরেই শুরু হতে যাচ্ছে।

উদাস একা বোধ করে। কিন্তু মরে যায় না তখুনি। ভুল ওষুধ নেই ওর কাছে। ওষুধ মুখে নেওয়ার প্রতি উদাসের অরুচি আছে। একাকীত্বের গহ্বরে সে পিঠ পেতে শুয়ে পড়তে চাইলো হালকা শরীর বিছিয়ে পাথরের অসমতল মেঝের উপর। কিন্তু উদাসকে বাস্তবে বসেই থাকতে হলো। গম্ভীর হয়ে। বিরাট নির্বুদ্ধিতার অনুতাপের উত্তাপে লাল হয়ে উঠেছে দুইচোখ।

একটা ফোন এলো।

উদাস ভরাট গলায় ফোন ধরলো, ‘আপনি কি নন্দিতাকে বুকিং দিতে চান?’

তারপর অনেকক্ষণ ফোন কানে চেপে থাকলো চুপচাপ।

তারপর বললো, ‘পাগল একটা! বলে কিনা, সবাই চায়। নন্দিতা মানে একটা কম্প্লিট প্যাকেজ। চৌদ্দ বছরেও একইরকম স্ট্যাবল্। বলে কিনা আমাদের কান বধির হয়ে গেছে, কেবলই নন্দিতাকেই শোনে। বলে যে আমাদের চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, নন্দিতা ছাড়া আর কিছুই দেখে না। এতটাই আউটস্পোকেন মহিলা যে বলে কি না সে যখন ক্লায়েন্টদের এন্টারটেইনমেন্ট করে, কখনোই তার অর্গাজম হয় না, অথচ নন্দিতা বাজাতে থাকলে ক্লায়েন্ট ছাড়াই অর্গাজম হয়! উফ্! হোয়াট আ টিউন শি ডাজ, ম্যান।’

নন্দিতা স্তম্ভিত হয়, ‘এইসব প্রশংসা তুমি নীরবে শুনলে!’

উদাস দাঁড়ায়।

দুই নম্বর দরোজার অনতিদূরে বেজে উঠলো মাউথ অর্গানের সিগনেচার নোট। ড্রামে ঝংকার উঠলো সাথে সাথেই। স্যাক্সোফোন সরব হলো। ঝলকে উঠলো হাজারো রঙের আলো। ঘন ধোঁয়া উঠলো মঞ্চের কেন্দ্র থেকে।

নন্দিতা হাঁটু ভাঁজ করে সাজঘরের চেয়ারের উপর গুটিয়ে রইলো ঠোঁটে স্মিতহাসি খেলিয়ে। উদাসের লম্বা চুলের উপর ফুটে থাকা ছড়ানো খুসকির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে ঢেউ খেলে গেলো। একটু কেঁপে উঠলো ওর গলার দুইদিকে ছড়িয়ে থাকা বিকশিত হাড়ের মোটা রেখা। বাদ্যযন্ত্রগুলো আর আলোর উন্মাতাল ঢেউ শরীরের ভেতরের হাড়-রক্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুললো।

উদাসের চোখগুলো ভারী হয়ে ঝুলে যাচ্ছে, এতটাই যে কোটরের পক্ষে সেগুলো আটকে রাখাই যেন দায়। চোখ দুটো টুপ করে কোটর থেকে খসে পড়ার ভঙ্গিতে আটকে আছে। নন্দিতা চোখ ফিরিয়ে নেয়। এক হাজার, পাঁচ হাজার, দশ হাজার… সব শ্রেণির টিকেট বিক্রিত। হাউসফুল। নন্দিতা দাঁড়ায়। ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে উদাসের সামনে আসে। রাত শেষ হয়ে আসবে এক সময়। কনসার্ট শেষ হবে তারও আগে। তারও আগে ফুল পেমেন্ট হবে। নন্দিতা দীর্ঘতর শ্বাস নেয়। দাঁড়িয়ে থাকে দুই পায়ের উপর সমান ভর দিয়ে।

হাল্লো বন্ধুরা, আর পাঁচ মিনিট পরেই কনসার্ট শুরু হচ্ছে। আপনারা আসন গ্রহণ করুন।

নন্দিতা এভাবেও ভেবেছিলো যে, উদাসের আবির্ভাবের সাথে সাথেই সবকিছু নব উদ্দীপনা পাবে। ভেবেছিলো চৌদ্দ বছর আগেও একবার। চৌদ্দ বছর আগে ভেবেছিলো যে উদাস বিয়ে করে ফেললে নন্দিতার কোনো কমúে­ক্সিটি থাকবে না। নন্দিতা নিশ্চিত হয়েছিলো উদাসের বিয়ের পরই যে, উদাস নন্দিতাকে পেশাগত কারণেই নিবিড় যতœ করবে, শুধুই পেশাগত কারণে, করতেই হবে। আর নন্দিতার নিজের বিয়ে, সন্তান, তারপর যদি তালাক-টালাকের ব্যাপারও ঘটে— মানে একের পর এক জীবনে নানা ঘটনা ঘটবে আর উদাস নন্দিতাকে যতœ করবে আর কোনদিন নন্দিতাকে বিয়ে করতে চাইবে না— তারপর একদিন বয়স হবে— যথেষ্ট ইন্সুরেন্স জমে যাবে জীবনের জন্য — তখনো উদাস তাকে বিয়ের প্রস্তাবনা করবে না। একবার, নন্দিতার শততম কনসার্টে, সন্ধ্যার অন্ধকারে উদাস বলেছিলো, ‘আমাকে তো আর তোমার দরকার নাই, কেন তোমার বর এইসব ব্যবস্থাপনা করতে পারে না?’ ‘হাহ্’, নন্দিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেছিলো, ‘ওর কনসার্ট টনসার্টে ইনটারেস্ট নেই, ওর ইনটারেস্ট কেবলই টাকায়, ওর মালকড়ি চাই, মাল’।

— ওহ্

— ওর কথা হলো যে আমি নিজেই এতদূর এসেছি, সে অবশ্য যদিও সরাসরি আমাকে একথা বলেনি, আমি মনে করি সে এটাই ভাবে।

— যাক, বরকে নিয়ে কথা থাক, এসব কথা আমিও আমার বউকে বলবো না। উই আর প্রফেশনাল, রাইট?

— ওহ্ ।

এবং চৌদ্দ বছর তো পেরিয়ে যায়।

চৌদ্দ বছর ধরে নাচতে ভালো লাগে নন্দিতার, গাইতে তো বটেই, কো-ড্যান্সারদেও উপর খবরদারি করার প্রবণতাও নন্দিতার একইরকমভাবে অব্যাহত, ড্রাম, কঙ্গো, কি-বোর্ড, ঢোল, করতাল, আলো, ধোঁয়া, লেজার ব্যাকগ্রাউন্ড সবকিছুর পরে চৌদ্দ বছর আগের সেই চাইনিজ মাউথ অর্গান ভালো লাগে, ভালো লাগে, ভালো লাগে।

লেডিস এন্ড জেন্টস্, আপনারা আসন গ্রহণ করন। এক্ষুণি পর্দা উঠবে আজকের মহাকনসার্টের। আসছেন নন্দিতা খান!

মঞ্চের উপর হ্যাভি মেটাল মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়েছে। আলো নিভে গেলো। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। তারপর ঝপ করে নেমে এলা নীরবতা। মাউথ অর্গানে বেজে উঠলো দেশের গানের সুর। নন্দিতা হেসে উঠলো।

কিন্তু সে কোথায়? উদাস? ট্র্যাক বাজছে কেন?

কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো নন্দিতা। চৌদ্দ বছরের আদ্যোপান্ত একবার দেখে নিলো চোখ বন্ধ করে। সময়টাকে পিছনদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাওয়ার মানেই হয় না। কনসার্টের বাজারে ঠিক সময়ে ঠিক অবস্থানেই নিজেকে দেখতে পাচ্ছে সে।

কনসার্টের সিগনেচার নোটের ভেতর থেকে মাউথ অর্গানের ট্র্যাক চিনে নেওয়া যাচ্ছে আলাদা করে।

ট্র্যাক কেন? উদাস কোথায়?

তীব্র ধ্বনিমূর্চ্ছনার আড়ালের নৈঃশব্দ্য মিলনায়তন ঘিরে আছে।

একজন রাজনৈতিক নেতা শুভেচ্ছা জানালেন মঞ্চ কাঁপিয়ে। মিলনায়তন উপচে হাততালি আর হল্লা। উপস্থাপক চিৎকার করে চলেছে একটানা।

মঞ্চের ডানদিক থেকে তারপরই ভেসে এলো বিষণœ বাঁশি। বিষণœতা হামাগুড়ি দিয়ে নন্দিতার কণ্ঠ পর্যন্ত উঠে এসে থেমে গেলো। দর্শকসারিতে নীরবতা। নন্দিতার কনসার্টে এ ধরনের প্রিলিউড দর্শককের জন্য নতুন।

নন্দিতার পাশে কনসার্ট ম্যানেজার ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। একটাই পূর্ণ গ্লাস। রেড ওয়াইন গ্লাসের গলা চক চক করে উঠলো বহুবর্ণের ছটায়। এক চুমুকে গ্লাস খালি করে ফেললো নন্দিতা।

একবার চিরুনি হাতে নিলো সে। আয়না আরেকবার। চিরুনিতে চুমু খেলো নন্দিতা। একটা খুসকির দানা ঠোঁটের উপরের লিপস্টিকের গাঢ় প্রলেপে আটকে গেলো।

বন্ধুরা, মঞ্চে আসছেন, দ্যা স্টার অফ দ্যা কান্ট্রি, নন্দিতা খান

সহস্র সিটি বেজে উঠলো। হল্লা।

নৃত্যশিল্পীরা মঞ্চে সাদা কস্টিউমের দ্যুতি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিষন্ন লেজার রশ্মি মিলনায়তন জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

শুন্য গ্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। কিছুতেই মাথায় আনতে পারলো না, বাঁশিতে কিসের সুর। কোন্ গান গাইবে সে। সে তো বিষন্ন বোধ করে নাই। বাঁশির হৃদয়ে এতো বেদনা কিসের! চোখের সামনে কেবলই কোটর থেকে টুপ করে খসে না পড়ে আটকে থাকা একজোড়া চোখ। একটা ভারী মুখ। একটা মৃতদেহ। এক শিশুর হাসি। চৌদ্দ বছর সংসার করার পর একজন স্বামীর অসহনীয় বাক্যের বিষক্রিয়ায় একজন স্ত্রীর মৃত্যু। চৌদ্দ বছর পরে হলেও একজন পুরুষ বন্ধু একজন নারী বন্ধু পরস্পরকে বিয়ে করা না-করা নিয়ে আশ্চর্য অনতিক্রম্য ডিসকোর্সে বন্দী।

নন্দিতা খান মঞ্চে নিজের পা এগিয়ে দেয়। মাইক্রোফোন ঠোঁটে তুলে নেয়। বাঁশিকে অনুসরণ করে একটানা হামিং দিতে থাকে।

আআআআআআআআআআ…।

হুমমমমমমমমমমমমমমম…।

It’s life we pass

Ridiculous ridiculous ridiculous…

হাআআআআআআআআ…

দর্শকশ্রোতার চোখে জল।

নন্দিতা একবারও চোখ খোলেনি এই সময়। অন্তত, এখন সে আর কাউকে খুঁজতে চায় না।

বিরাট মনিটরে ভেজা ভেজা শেডের আই শ্যাডো ফ্রিজ হয়ে থাকে।

ঠোঁট থেকে মাইক্রেফোন সরিয়ে হাত ইশারা করে নন্দিতা।

নীরবতা।

মিউজিক ট্র্যাকস, অন।

হুউউ লা লা লা

দর্শকদের হাততালির আগেই নন্দিতা নেচে ওঠে।

কী লিখি কেন লিখি ৫

নূরুননবী শান্ত

পৃথিবীর বিশাল বৈচিত্র্যের কোনো এক নির্দিষ্ট দিকে চোখ রেখে তাকাবার সাহস তৈরি হয় নি বেড়ে ওঠার স্বর্ণসময়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য টেনে টেনে মাটির দিকে তাকিয়ে গুবরে পোকার মতো হাঁটি। সমবয়সীদের টিটকারি এক কান দিয়ে মাথার ভেতরে ঢুকে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে নিস্তেজ অসাড় ভাব হয়ে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওরা সবাই অব্যাহতভাবে দুদ্দার হাঁটে। খইয়ের মতো কথা ফোটে ওদের বাকযন্ত্রের পরতে পরতে। কোন স্বপ্ন ছিল না মনে, ছিল না তথাকথিত ভবিষ্যৎ ভাবনা, না কোনো আমার জীবনের লক্ষ্য। শুধু আমার কানে আন্দোলিত হতে থাকতো ওয়ালমেছ মামার কেচ্ছা বয়ানের ঘটনা পরম্পরাÑএইতো রাজকন্যা। এইতো কী তার রূপ! রাজবাড়ির ঘরের সাথে লাগানো দিঘির ঘাটের সিঁড়ি আলো করে বসে আছে চান্নিরাতে, পাইক-পেয়াদার বারণ উপেক্ষা করে। এইতো, দানব রাক্ষস তাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ির দিঘির ঘাট থেকে। রাজকন্যার তাতে ডর-ভয় নাই। আঁচলের মাথায় তার বাধা আছে, এইতো, কুদরতি সরিষার দানা। কোত্থেকে এলো যে সরিষার দানা! (ওয়ালমেছ মামাকে আবার বায়না করতে হবে কেচ্ছাটা জোরার জন্য।) এইতো রাক্ষসের দৈত্যাকার ঘোড়ার লেজে সেই সরিষার দানা বেঁধে দিচ্ছে অপহৃত রাজকন্যা! কী সাহস! সেই সরিষা দানা পথে পথে ছড়িয়ে যাচ্ছে পথ নির্দেশক হয়ে। জাতশিকারী কোটালপুত্র তাই দেখে রাক্ষসের গুহা চিনে নিচ্ছে অনায়াসে। রাক্ষসের আস্তানায় যাওয়া তবু কী যে-সে কর্ম। শেষে তো সব ভয় জয় করে রাজকন্যা উদ্ধার হয়। রাজার মনে শান্তি আসে। রাণীমার চোখে নামে আনন্দাশ্র“! রাজ্যে বেজে ওঠে আনন্দ-ধ্বনি। অথচ, তারপরই তো হরিষে বিষাদ। রাজসভায় প্রশ্ন ওঠে, কোটালপুত্র কেন যাবে রাজকন্যা উদ্ধারিতে! কেন সে রাজপুত্র হলো না, হোক না তা ভিন্ন রাজ্যের! কোটালপুত্রের মর্যাদা সমান হয় নাকি রাজকন্যার মানের?
রূপকথার জগৎ আর চারদিকের বস্তুজগতের স্বভাব-চরিত্র খুব কি আলাদা? কোন্ জগতটা যেন আমার, আমাদের? বৈপরীত্যে ভরপুর মানুষের অমানবিক জগত। আমি সেই কেচ্ছার জগতে বাস করি। বস্তুজগতের ভেতরে গড়ে ওঠা মনুষ্যসভ্যতার ভাবজগত ও রীতিনীতির কঠোর অনুশাসনের মধ্যে থাকি। এতো বিধি-বিধান, বিবেকের রক্তচক্ষুর সামনে তবু অস্তিত্বশীল থাকতে হয় প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তিকে। নিজের শরীর পাটকাঠির মতো সরু হলেও, পাটকাঠিকে তরোয়াল বানায়ে বাতাসে ঘোরাই। একটার পর একটা রাক্ষস কতল করি। ডানাভাঙা প্রজাপতি না ধরে দূরে উড়ায়ে দেওয়ার অপরাধে যে ছেলেটি আমার কানের উপর চাপড় মারে, চোখ বন্ধ করে তাকে হত্যা করতে থাকি বাতাসে সিন্টার বল্লম খুঁচিয়ে! সেই লড়াই আমার আচমকা থেমে যায় কারো নিন্দুক-পায়ের আওয়াজে। আমি মাথা নিচু করে আমার তরোয়াল দিয়ে মাটিতে কাটিকুটি করতে থাকি। চোখ তুলে দেখতেও ইচ্ছে করে না, কার পা’জোড়া থপ থপ শব্দে আমার অস্তিত্বকে কটাক্ষ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। কেবল তার মুখ কল্পনা করি। এ হয়তো সেই লোক, যে তার হালের গরুটাকে খৈল খাওয়ানোর সময় চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়, আর প্রতিবেশির গরুটা তার ধানক্ষেতে ঢুকেছে বলে হালুয়া পেন্টি দিয়ে পেটাতে পেটাতে মাটিতে শোয়ায়ে ফেলে! এই লোকের দিকে তাকাতে আমার দ্বিধা করে। আবার মনে হয়, সমাজে সবরকম মানুষ না থাকলে চলে না। দ্বন্দ্ব, দ্বিমত, তর্ক ও যুদ্ধের ভেতর দিয়ে মানুষ, প্রকৃতি, সভ্যতা, অসভ্যতার ক্রমবিবর্তন। দ্বন্দ্বে থাকাই মানুষের নিয়তি। দ্বিধাকে পাকিয়ে তুলি সুতরাং। পায়ের শব্দ সৃষ্টিকারী সম্পর্কে অন্য ভাবনা উপস্থিত হয় মনে। হঠাৎ হয়তো বুঝে ফেলি, অথবা মনে করি যে, আরে না, এ তো পূবপাড়ার সেই বুজান। আরে, সেই সেয়ানা মেয়েটা। তার নাম বলবো না। একদিন বৃষ্টির দিনে নানীর ঘরের মেঝেতে পালা করে রাখা সোনারঙের পাটের নরমের মধ্যে দেহ গুঁজে দিয়ে টিনের উপর বাজতে থাকা মল্লারে মশগুল ছিলাম। বুজান কখন আমার পাশে এসে শুয়েছে টের পাই নি। তাঁর ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে বিলি কাটতে শুরু করেছে বুঝতেই পারি নি। বোঝার কী দরকার! হাত-পা ঝিম ঝিম করছিলো যে আমার। সুখ সুখ ¯্রােত একটা আমার অবশ দেহের পায়ের পাতা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিলো যে তখন। অতশত বুঝে কাজ কী আমার! বুজানের বুকের গভীরে মুখ রেখে খানিকটা কাতরভাব প্রকাশ করতেই সে কী চোখ-রাঙানি তার! কেন তার বুকের হুক খুলতে গেছি! সবকথা আম্মাকে বলে দেবে যে! আমি কি বলতে পারতাম, আম্মাকে? আমার ঠোঁট কেন থুতু দিয়ে ভেজাইলা? আমিও আম্মাকে কয়ে দেব? কওয়া কি যায় আসলে সবকথা সবাইকে? কেবলি মাথা নিচু করে থাকা। কেবলি দ্বিধার ভারে নূয়ে পড়তে পড়তে মাটিতে লীন হয়ে যাওয়া! তখন তো নানির বাড়িতে থাকি। নানির চূলা থেকে দুধের সর চুরি করে খাই। আবার সর পড়ে। এবার মামা খায়। ছোট মামা। আমি বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি। কাউকে বলি না। রাত হলে ছোট মামার সাথে সাতনাপাড়া যাবো যে! কীর্তন শুনবো। মন্দিরার বাজনাটা এতো নেশা জাগায়! ঢোলের বাজনাটা বুকের ভেতরে কম্পন তোলে। তারপর বড়িয়াহাটে যাত্রা আসছে আবার। তো কথা নাই। দুপুরে ঘুমিয়ে নাও। রাতে দি বাসন্তি অপেরা। ট্রাম্পেট! ড্রাম। পালার নাম গুনাই বিবি। আর মাখনের তৈরি মেয়েগুলো, ক্ষীরের তৈরি ডানাকাটা প্রিন্সেসরাÑআলো-আঁধারিতে আনন্দ-কামনার ঝড় তোলে। বুকের ভেতরে একইসাথে কনকনে শীতে নাড়া পোড়ানোর উত্তাপ আর কাঠফাটা গরমের দুপুরে বড় দিঘির পাড়ের আমগাছের তলার শীতল হাওয়ার তোলপাড়।
আমার মাথায় কি ঢুকবে স্কুলের অংক! না, বাংলা ভালো। দ্রুতপঠন আরো ভালো! তবু ঠিক গুনাই বিবির পরদিন যখন শাকপালা বিলে মাছ ধরা নিয়ে কাজিয়া লাগে দুই পাড়ায়, একটা খুন হয়, কুকিকালিদাশে আমরা ঘুমাতে পারি না। আতঙ্ক! যদি আমিও একদিন খুন হয়ে যাই। আহা! জীবন, পাগলামিভরা প্রেম আমার, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে অজানা নিস্তব্ধতার দিকে! ভয়! একা লাগে! শূন্য মনে হয়! গুটিয়ে নেতিয়ে পড়ি মাটির বুকে। মাটি নীরবে স্থান দেয় আমার দেহকে। বিলের দিঘির পাড়ের শিমুল গাছের শিকড়ে মাথা দিয়ে, কাত হয়ে, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ঢেউ খেলানো সবুজের দিকে চোখ রেখে বাতাস বয়ে যাওয়ার মৃদু শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনতে থাকি।
নাহ! এবার মায়ের কাছে যেতে হবে। কুকিকালিদাশে, নানির কাছে থাকলে চলবে না আর। আমডারা গ্রাম। সেখানে আম্মা থাকে। আর থাকে রাজ্যের যতো অভাব, দারিদ্র্য, অন্ধকার, অশ¬ীলতা। ঘরের পেছনে মানুষের গু পড়ে থাকে বলে ঘর থেকে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। সে গাঁয়ের কেউ স্কুলে যায় না। কেবল আমি যাই। আর যায় আলাল। আলাল তো আমার বড়। খালি মারে। দেমাগ দেখায়। আমার সাথে ওর পোষায় না। তাতে কী? দশগাঁয়ে আমার মায়ের নামডাক। পাড়ার নানা বয়সী মেয়েরা আমাদের আঙিনায় হেলে পড়া কাঁঠাল গাছের নিচে ভিড় করে। কল কল করে কত কথা কয়। হাসে। কাঁদে। পরচর্চা করে। ফায়সা বকে। পান চাবায়। আমি মাটির বারান্দায় বসে মাটিতে দাগ কাটার ছলে সেইসব ধ্বনি-সর্বস্বতার দিকে কান পেতে থাকি। কেউ আদর করে কথা বলতে এলে পালিয়ে যাই। আলালকে আমার কী দরকার!
খালি হালি বু’কে এড়াতে পারি না। হালি বু’ অনেক মোটাসোটা। ভারী তার পাছা আর বিরাট তার বুক। কোমর দোলায়ে দোলায়ে নাচে আর গীতের বোল তোলে হাফাতে হাফাতে। বুকের ভেতরে কেমন একটা করে ওঠে। টানা টানা সুর। নির্দিষ্ট দুই তিনটা মাত্রার প্রয়োগে দুলে দুলে ওঠা মানবদেহের বিচিত্র ভঙ্গিমার মাতাল ঢেউ। এরকম সবাই হয় না কেন? কেন গাঁয়ের মেয়েদের মুখে শুধু ক্ষুধা আর না-পাওয়ার গল্প! আমডারায়। আর হালি বু’র নামে ছড়ান কুকথা! গীতের সুর আর নাচের ঠাট তার দেহে ঝলকে ওঠে বলেই তাকে কেন গাঁয়ের বিচ্ছিরি দেঁতো মানুষেরা নটী বলবে! কুকিকালিদাশের ওয়ালমেছ মামাও কিন্তু আমনের ক্ষেত নিড়াতে নিড়াতে  হঠাৎ উঠে কোমরের গামছা দিয়ে ঘোমটা বানিয়ে, আঁচল বানিয়ে নেচে ওঠে। তার নামের আগে কোনোদিন নটী বলা হয় নাই। হালি বু’র নামে কথা বলা তাহলে কী রীতি? প্রথা? মেয়েরা নাচলেই যত দুন্নাম হবে? লোকেরা জমি-জিরাতের আইল ঠেলে ঠেলে পরের জাগায় ঢুকে গেলে ‘ক্ষ্যামতাআলা’ হয়ে ওঠে! একটু নাচ দেখাও তো দেখি কেমন মরদ তুমি, শোনাও একটা গীত দেখি কেমন ক্ষ্যামতা তোমার ধানের ভাতের! এইসব কথা জমা থেকে যায় বুকের ভেতরে। কেন জমা করে রাখতাম, জানি না। আলালের দেখাদেখি, আমিও গাঁও থেকে হেঁটে হেঁটে তিন মাইল দূরের শহরের স্কুলে যাই। শহরের ছেলে-মেয়েগুলোর চেহারা সুন্দর! কথা বলে স্টাইল করে। জামা-প্যান্ট পড়ে বাহারি ডিজাইনের। আমি পারি না। নতুন জামা অলৌকিকভাবে পেয়ে গেলে গায়ে চাপাতেই শরমে গুটিয়ে যাই। আব্বার ফুলপ্যান্ট কেটে হাফপ্যান্ট বানায়ে নেই। সবাই হাসে। আমি শুনি না তোদের হাসি হে! যত পারিস হাসাহাসি করে নে। আমার তাতে বাল হইল। আমি স্কাউট করব। তোরা হাসতে থাক। আমি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতা পড়ে নিজেই একটা কবিতা লেখছি, তোদের দেখাব না। সিদ্দিক স্যারকে চুপ করে দেব। আরে কী কাণ্ড! সিদ্দিক স্যার তো সেইটা ছাপায়ে দিল। আমি লেখলাম আমার কথা আর কী বলবো/ যখন বুকের ভেতরে বাজতে থাকা কথা/ শুনতে শুনতেই দিন চলে যায়… হা হা হা, এমনভাবে নকল করলাম কবিতায় আর কী লিখবো/যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম…। সিদ্দিক স্যারও বোঝে নাই আমার নকলবাজি। ছাপায়া দিছে। আর আমার নাম ছড়ায়ে গেল স্কুলে। ঠিক তখনই আমার আমডারা গাঁয়ে অগ্নিকাণ্ড হলো। ছাই হয়ে গেল উঁচু বারান্দাওয়ালা আমার কাঠের বেড়ার স্নিগ্ধ বাড়িটা। কাঁঠাল গাছের ছায়াটা ছাই হলো।
আমি আবার কুকিকালিদাশ গাঁয়ে। আমার কী মজা! কুকিকালিদাশে প্রত্যেক সন্ধ্যায় কীর্তন শোনা যায়। যাত্রা-সার্কাস হয় গাঙনগরের মেলাতেও। কুকিকালিদাশের ছেলেরা সুন্দর করে কথা বলে। মেয়েরা পয়-পরিষ্কার থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার আবছা আলোয় আব্বা এসে আমাকে নিয়ে চলে যায় উত্তর সীমান্তের বন্দর রাণীশংকৈলে।
আমি পাল্টে যেতে থাকি সেখানে। হাতের কাছেই পত্রিকার দোকান। সেখানে নবারুণ, সচিত্র বাংলাদেশ, রহস্য পত্রিকা, শিশু শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, রোমেনা আফাজ, মাসুদ রানা, অনুবাদ, বিজ্ঞান না কোরান আরো কত কী! আমি পড়ি। আব্বার কষ্টের টাকা নষ্ট করি বই কিনে। সীমান্ত ঘেঁষা নেকমরদ হাট থেকে ভারতের অ্যাভন সাইকেল একটা কিনি একদিন। তাতে চড়ে সাাঁওয়াল পল্লি, ওরাঁও পল্লি, মালদইয়া পাড়া, রামরাই দিঘি, শালবন চষে বেড়াই। বন্দরের যুবসংঘে নাটক করি। আর প্রেমে পড়ে যাই বেলি আন্টির! একই বিল্ডিংয়ের বেলি আন্টি। তিনি আমায় আদর করেন আর আমি গলে গলে তছনছ হয়ে যাই। কাউকে বলা যায় না সে কথা। তাই লিখি। লিখে লিখে সরকারি কোয়ার্টারের পেছনের শিবদিঘির জলে ভাসিয়ে দিই। একদিন আমার লেখা একটা পাতা দিঘির জলে না গিয়ে উড়তে উড়তে পড়ে মুনসেফ আঙ্কেলের বাবরি চুলের উপর। হাত দিয়ে মাথার ছাদ থেকে নামিয়ে সেটা পড়ে তিনি মুচকি হাসেন। বলেন, ‘লেখ বেটা, ভালোই হচ্ছে’। আমি লজ্জায় আর কোনোদিন লিখি না। আবারও তো উড়ে উড়ে কারো হাতে পড়বে। হায় হায় আমার গভীর গোপন জীবন তো জেনে যাবে মহাবিশ্ব! সমাজ আমাকে শিখিয়েছে সত্য প্রকাশ না করতে। আমার খাতার ছেঁড়া পাতাগুলোতে আমি যে বানিয়ে লিখি না। রবীন্দ্রনাথ কি বানিয়ে লিখতেন? রবীন্দ্রনাথের কী কপাল যে ‘পোস্টমাস্টার’ লিখে তাকে লজ্জা পেতে হয় নি। চিঠিপত্তরগুলোতে কত সুন্দর করে মনের কথা বলেছেন তিনি। লজ্জা তো দেয় নি কেউ তাঁকে। সেগুলো পড়তেও তো কেউ লজ্জা পায় না। মুনসেফ আঙ্কেলের রঙিন টেলিভিশনে রেখা যখন নাচে নাভীতে ঢেউ তুলে, কেউ আমরা সে নাচ দেখতে তার ঘরে গেলে তিনি লজ্জা পান না। কিন্তু আমি যে তুচ্ছ বালক, মনের কথা প্রকাশ করতে শরম পাই; আমি আর লিখব না তাই। রবীন্দ্রনাথকে কেই বা সামনা-সামনি চেনে! কাজী আনোয়ার হোসেন রানা-সোহানার যে বিবরণ দেন তাতে তাকে কেই বা দোষ দেবে, তিনি তো লেখক। আমি কি করে এসব লিখব! আব্বা জানলে মারবে! আর লিখব না তাই। না, লিখি নি। যতদিন না রংপুরের লিজি আপা আমাকে একদিন অভিযাত্রিক্ল-এ নিয়ে যায়। সেখানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতোই একজন আছে। নাম তাঁর শহীদুর রহমান বিশু। তিনি আমাকে প্রতি শুক্কুরবার দাওয়াত দেন। লিজি যদি না-ও যায় তবু যেন আমি যাইজ্জএইসব বলেন। সেখানে আরজু যায়, ইঝন যায়, জিপশি যায়, রুবি যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকতে হয় না সেখানে আমডারার মতো। মনে তখন মাসুদ রানা হওয়ার স্বপ্ন। রানা মাসুদকে একদিন সে কথা বলি। জিমনেশিয়ামে যাই। জুডো-কারাত করি। জেড.এইচ.খান টিপু তো আমার কাছে মাসুদ রানাই। তার বান্ধবী রুনিই তো আমার দেখা বাস্তব সোহানা। তাদের নিয়ে পদ্য লিখে বিশুদা’কে দেখাই। তিনি আবার সেটা আসরে পাঠ করতে বলেন। তাই নিয়ে বিজ্ঞ লোকের মতো আলোচনা করেন জুয়েল মমতাজ (হায় এই লোকটা এখন নানান কোম্পানির হিসাব পর্যবেক্ষণ করতে করতে অন্ধ হয়ে গেছে!) আমার কালো মুখটাও শরমে লাল হয়ে ওঠে। কবিতাচর্চা কম হয় নি। কিন্তু একটাও কবিতা লিখতে পারি নি আমি। অলঙ্কার, উপমা, মেটাফোর, চিত্রকল্পজ্জসব ছুঁয়ে দেখি, কিন্তু কবিতার মায়াবী শরীর ছোঁয়া হয়ে ওঠে না। ছুঁতে চাইও না। আমি বড়বেশি সরাসরি বলতে চাই। কিন্তু ক্যামনে? বললেই কে শুনবে? পড়বেই বা কেন আমাকে? আমি কি আর ইলিয়াস নাকি যে আমার লেখা ছাপবে? হাসান আজিজুল হককে যেদিন প্রথম দেখলাম মনে হলো, আরে, কী আশ্চর্য, কালো, কৃষকের মতো সরলমুখের সাদামাটা পোশাকের এই লোকটাই এত বড় লেখক! কথাশিল্পী! তাইলে যেকেউ লিখতে পারে! লিখতে গেলে নাম লাগে না, চেহারা লাগে না, বংশশক্তি লাগে না, পলিটিক্যাল পাওয়ার লাগে না, জমিদারি লাগে না, দারিদ্র্য দ্বারা মহান হওয়া লাগে না, শোষিত, শোষক কোনো পরিচয়ই তো লাগে না! লিখলেই কেউ এসে পড়বে এমনটাও তো সবসময় লাগে না। বাহ! বাহ! ওয়ালমেছ মামাও আসলে লেখক। হালি বু’ও লেখক। কেউ তাদের জানুক আর না জানুক। তুলোট কাগজের উপর যারা মন্ত্র লিখে দশগাঁয়ে পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত ছিলেন তারাও তো বড় বড় লেখক। আমিও লিখবো। কিন্তু কাউকে কবো না। নিজে থেকে দেখাবো না। কেউ বললে অবশ্য…
রাশেদ কাঞ্চন হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন আমার ভেতরের অস্থিরতা। বলে¬ন একটা গল্প লিখতে। লিখলাম। গল্পের নাম তিনিই ঠিক করলেন। ‘সুখলোকে যাত্রা’। তাদের পত্রিকার নাম শাশ্বতিক। পত্রিকাটা বেরোনোর পর আমি একদিন সম্পাদক আমিরুল ইসলামের (রাবি-র সেকশন অফিসার ছিলেন) টেবিলে গেছি। দেখি কবি আবুবকর সিদ্দিক তার সামনে। কবিকন্যা তৃষা আর বিপাশাকে আমি তখন পড়াই। তো কবিকে দেখে আমি দরোজার আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকি। কান খাড়া করে শুনি, আবুবকর সিদ্দিক বলছেন, এই নূরুননবী শান্তটা কে? গল্পটা অন্যরকম লাগলো! ভাষাটা তো নতুন! তবে শেষটা নিয়ে সে আরেকটু ভাবতে পারে, ওকে বলবেন তো, আমীরুল। ততদিনে আবুবকর সিদ্দিকের কুয়ো থেকে বেরিয়ে আমি কয়েকবার পড়ে ফেলেছি। তাঁর প্রবন্ধের ভাষায় আমি কুপোকাত। জলরাক্ষস কেমনে লেখা সম্ভব হলো সেসব প্রশ্ন নিজের কাছেই তুলতে শুরু করেছি। এরকম একজন মহান ¯্রষ্টা বলছেন আমার গল্পটা নাকি অন্যরকম হয়েছে। ভাষাটা নতুন নতুন লাগে। আমি আর আমীর ভাইয়ের টেবিলে যাই না। শরম লাগে। কবি যদি বুঝে যান যে, ওনার মেয়েদের হাউস টিউটরটাই সেই লেখক, সেই ভয়। কিন্তু বেশ একটা রোখ চেপে বসে। এই গল্পটা আমি অনেকবার লিখি। শেষটা নানা রকম করি। আরো কয়েক জায়গায় ছাপতে দেই। সবশেষে সমকালের কালের খেয়াতেও দেই। সে অনেক আগের কথা। কালের খেয়ায় ছিলো রংপুর অঞ্চলের ভাষায় লেখা সংস্করণ। তবু শেষাবধি সে গল্পটিকে আমি ঠিক বইয়ে ছাপানোর উপযুক্ত ভাবতে পারি নি। কেমন করে এই ঘটনা ঘটলো? লিখলাম, সেটা নিয়ে স্বনামধন্য সৃষ্টিশীল একজনের মন্তব্য আড়ি পেতে শুনলাম, তারপর সেটা আবার করতে চাইলাম। এমন একটা কাজ যা করে টাকা হয় না, ভাত হয় না, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার মতো কিছু একটা পাওয়া পর্যন্ত যায় না!
কিন্তু, তবু, কেন যেন, কীভাবে যেন, আমি লিখে চলেছি। নিয়মিত যে খুব তাও নয়। তবে লিখতেই হয় মাঝে মাঝে। কে যেন বলে ভেতর থেকেজ্জএই লেখ্; যতো তাগিদ থাকে থাকুক রুটি-রুজির, লিখতে বস্। কে যে মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে মাঝে মাঝে, চিনিও না তাকে! কিন্তু আমি হন্যে হয়ে বসি। না লিখলে যেন গা-হাত-পা চিড়বিড় করে। এসবের মানে কী, সত্যিই আছে কি কোনো গুরুত্ব? আমি কি ছাই জানি নাকি অতশত! আমার রূপকথাগুলো, আমার বস্তুজগৎ, আমার স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা, কাম, ক্রোধ, একাকিত্ব, পরিবেষ্টন, সাহস, দুর্বলতা, ক্ষুধা, রসনা, বাসনা, ভঙ্গি, ভয় সবকিছু একসাথে প্রদর্শন করতেই কি লিখি? বিশেষ কোনো ইচ্ছাপূরণের জন্য? খ্যাতি? অমরত্ব? নাকি নিজের সদাপরিবর্তনশীল ক্ষণস্থায়ী জীবনের সংকট ও সম্ভাবনা মানুষের সাথে ভাগাভাগি করার বাসনা? কেউ কি এইসব অবৈষয়িক আপাত অলাভজনক কারবারের ভাগ নিয়ে কাজের সময় নষ্ট করে আসলে? দুনিয়া তো কেজো লোকে ভর্তি! রবীন্দ্রনাথের ভুলস্বর্গে প্রবেশ করার বাসনা তাহলে কেন হলো? এইসব বাসনা মনুষ্যসমাজে, ক্রমবিবর্তমান সভ্যতার কিংবা অসভ্যতার নানান কালপর্বে কিছুই কি অর্থ বহন করে? টিকে যায় কি কি? মহাকালে কিছুই কি টেকসই? কতটা সময়কালের জন্য? টেকসই না হলেই কি সেটা ভঙ্গুর, ক্ষণস্থায়ী? এ জীবনের মতো? ঠিক জানি না! সম্ভবত জানার চেষ্টা হিসেবে আমি লেখাকে বেছে নিয়েছি! ‘সম্ভবত’ বলতে হচ্ছে, কেননা, আসলেই তো জানি না কেন লিখি!
কী লিখি তা হয়তো একরকম চিহ্নিত করা যায়। সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় কী না সে প্রশ্ন তুলছি না নিজের কাছে। তবে যায় বটে একরকম। আমার লেখালেখির মধ্যে কতটা আমার নিজের কথা? সাধারণত নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যাওয়ারই তো চেষ্টা করি বলে বোধহয়। তবে চেষ্টা করে কি সাহিত্য তৈরি হয়? হয় কখনোসখনো। বেশিরভাগ সময় লিখতে লিখতে মনে হয় একটা কিছু পাচ্ছি। তারপর বিচার করো, আগেও কি এরকম কেউ লিখেছে? হুম, লিখেছে, দেখতে পাচ্ছি। শুনতেও পাচ্ছি। তবে ওটা বাতিল। রিপিটিশন। বাদ দিই। বই পড়ে লেখা কঠিন। আগেরকালের লেখা আবার লিখিত হয়ে যায়। তখন মানুষের কাছে শোনা গল্পগুলো লিখি। জীবন-যাপন, স্বপ্ন কল্পনা, আনন্দ, উল্লাস এই তো। এই বিষয়গুলোর পেছনের যুক্তি বেশি জানি না। যখন বুঝতে পারি মন এইরকম করতে চাচ্ছে। মানে লিখে একটা কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছে। মনকে কষ্ট দিই না তখন। মনের ইচ্ছাটা অবদমিত না রেখে সাধারণ একজন খামখেয়ালি মানুষের মতো ইচ্ছাপূরণ করে ফেলি। বিষয়টা কার কাছে কেমন লাগবে না ভেবেই করি। অথচ এই আমি কী না গুটিপোকার মতো নিজের ভেতরে গুটিশুটি মেরে দুমড়ে-মুচড়ে গড়াতে গড়াতে চলেছি, বাল্যে! কিন্তু ঠিকঠাক স্বপ্নটা, মনের ইচ্ছেটা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে এমনটা মনে করার সময়ে আমি উপনীত হই নি একবারও। মনের রঙ শব্দ দিয়ে ফুটিয়ে তোলার প্রাণান্ত ক্লেশ শেষে ছোটগল্পের শরীরে, আখ্যানে বেজায় খুঁত ধরা পড়ে। ফলে আর লিখতে ইচ্ছে করে না। শব্দ দিয়ে যে ছবি আঁকতে চাই, যে চিন্তা উগরে দিতে চাই, যে গল্পটা তৈরি করতে চাই বা বলতে চাই, তা হয়ে ওঠে না বলে দিনের পর দিন চুপচাপ বসে থাকি। তারপর হঠাৎ কে যেন মাথায় হাতুরি পেটাতে থাকে। আবার লিখি আচমকা। আবার একই অপূর্ণতা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে থাকে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। কিন্তু পূর্ণতায় একবার অন্তত অবগাহনের অদমনীয় ইচ্ছেটা লাফালাফি করে, একই গ্লানি-বেদনার জগতে আমাকে আহ্বান করে। মনে হয়, কী করেই বা কী হয়? লিখে কিছু না হলেই বিশ্বজগতের এমন কী আসে যায়? কিন্তু পারি না আর দূরে সরে থাকতে। এও এক প্রকার প্রেম। কামও। অতএব ফিরে ফিরে আসি লেখার চেষ্টার কাছে। ভয়ে ভয়ে থাকি লেখা হওয়া-না-হওয়া নিয়ে। ভয়কে জয় করা হয়ে ওঠে না। জয় করতে চাইও না আসলে। তাই, নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে দাবা খেলে চলেছি যেন।
আমার তো দুই রকম লেখা। সাহিত্য আর অসাহিত্য। অসাহিত্য লিখি সোজা করে সমাজটাকে, দেশটাকে, দেশের মানুষকে, মাটিকে, মানুষের সামাজিক ভিত্তিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা বয়ান করার জন্য। আর ঐ যে স্বপ্ন, আহা! পরিচিত মানুষগুলো এমন হলে হতো, তেমন চর্চায় লিপ্ত থাকলে হতো; সংবিধানটা অন্যরকম হতে পারতো; কৃষক আর কৃষিমন্ত্রীর একই রকম বাড়ি থাকলে হতো, সাদা-কালো-ধর্ম-অধর্মের অসাড় তর্ক বন্ধ হতো যদিজ্জএইসব প্রকাশের উৎসাহ চরিতার্থ করতে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতাগুলোর উপর ভর করি। বন্ধুরা এই প্রবণতার নিন্দায় মুখর। তবু মনের বিরুদ্ধে যাই না। মনকে বলি, তোমার কথাই শেষ পর্যন্ত রাখবো। তোমারই চেতনার রঙে নিজের রূপ বিসদৃশ হয়ে উঠলেও আক্ষেপ নেই। মন, তুমিই আমার একমাত্র সর্বময় নিয়ন্ত্রক। কিন্তু এই যে কিঞ্চিত সাহিত্য করি, এর উপরে মনের নিয়ন্ত্রণ সবসময় খাটেও না ছাই। শব্দ আর বাক্য নিজেরাই খানিকটা অটোক্র্যাট আচরণ করে। আমিও মেনে নিই শব্দে নির্মিত আখ্যানের আচরণ। একটা জিনিস লক্ষ্য করি, ক্রমাগত বিশেষণ আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। খুব চাছাছোলা বাক্য তৈরি হচ্ছে। হোক, জোর করে কিছু আরোপ করতে চাই না। শব্দেরা স্বাধীনভাবে সজ্জিত হয়ে যা দাঁড়ায় তা যেমনই হোক, সেটাই আমার লেখালেখি। তাতে কী থাকে আর কী থাকে না তা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না। প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিতদের ছক তাতে না থাকলে আমি কি আর জোর করে ছক বানাতে পারি! মানুষের ভাষা ও চিন্তা কাঠামোর মধ্যে পড়ে কি সীমাবদ্ধ হয়ে হাসফাঁস করে না? আমার তো মনে হয়, করে। প্রমিত, অপ্রমিত, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, শ্লীল, অশ্লীল, সমাজ-স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা বর্জিত, ব্যাকরণ সিদ্ধ বা বিশৃঙ্খল, শেষ হয়েও শেষ না হওয়া বা এভাবেও বলা যেত ধরনের কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। মানুষে-মানুষে সম্পর্কের স্বাভাবিক ধরনের ভেতরেও অসমর্থিত অসহ্য এক ধরন যদি এসে পড়ে, তাতে যা কিছুই আহত হোক, যেই নাক সিটকাক, আমি এর বাইরে যেতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি জ্ঞানী মানুষ নই। সূত্র, সংজ্ঞা, দর্শন, তত্ত্ব, ধর্ম ইত্যাদি জ্ঞান আমার নাই। তাই তা ফলানোও হয় না। কোনো কিছুতে বিশ্বাস যেমন পাই না, ঘোর অবিশ্বাসও পাই না। দ্বিধা আমাকে ঘিরে রাখে। দ্বিধার কোনো পিঠ কোনো এক গল্পে যদি দেখাই তো অন্য কোনো রচনায় অন্যপিঠ ভেসে ওঠে। আমি নিশ্চিত নই কোনো কিছু সম্পর্কেই। এমনকি আমি কেন লিখি, কী লিখি তাও ঠিকঠাক জানি না। তবু লিখি। হয়তো লেখালেখি আমার দ্বিধার আধার। পাঠক আমাকে মন্দ কিংবা ভালো বললেই আমি দ্বিধাহীন হয়ে উঠতে পারি না। শরীরের ভেতরে একইসাথে আমি টের পাই উত্তেজনা ও অসাড়তা, আশার আগুন ও হতাশার গ্লানি, পরিতৃপ্তি ও পিপাসা। সংসার, সমাজের হিসেব, রুটির ধান্দা, রাজনীতির নির্লিপ্ততা ইত্যাদি মাড়িয়ে আমার চেতনার বৈপরিত্যগুলো আমাকে কোথাও তো রাখতে হবে! এগুলো আমি গল্পের ভাঁজে, অগল্পের তলায়, গদ্যের তাকে, অগদ্যের বগলের নিচে রেখে দেই। কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না। কাউকে ডেকে এনে দেখানোর স্পৃহাও জাগে না। কেউ তা তলিয়ে দেখার গরজ বোধ করুক তেমন প্রত্যাশাও করি না। হঠাৎ কেউ আমার লেখায় থুতু দিলে আহত হই না, আমার লেখায় চুমু দিলে শিহরিতও হই না। কেবল নিজের দ্বিধাগুলো নানানভাবে লেখার মধ্যে রেখে দিই, হারিয়ে ফেলি, আবার রাখি, ফেলে দিই, আবার তুলে নেই, আবার…
আমি কি আসলে আমাকেই লিখি? আর নানান জীবনের ফাঁক গলিয়ে খুঁজতে থাকি নিজেকেই? আমার সমগ্র শরীরে লেপ্টে থাকা ত্বকের কৃত্রিম রঙ মেলে ধরি, রাজকন্যার অপার্থিব রূপের ভেতরে মানুষের সমতার প্রতি বিরূপ মনোভাব আবিষ্কার করি, শহর আর গাঁয়ের ব্যবধান উপরে ফেলে হাসি, নারী আর পুরুষের ভিন্নতা অস্বীকার করে চিৎকার করতে থাকি, হালি বু’ আর ঐশ্বরিয়া রাইকে একই আসনে নাচাই, বলি, দেখুন, বিশুদা আর শরৎচন্দ্রে কোনো তফাৎ নাই, মনিরুজ্জামান আর সিদ্দিক স্যার তো আসলে একই ব্যক্তির দুইরূপ প্রকাশ, জীবন সত্য, মৃত্যুও সত্য ইত্যাদি ইত্যাদি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থেকেই যাপিত হোক লেখক জীবন। কিন্তু আসলে এইসবই আমি বলতে চাই কী না, স্পষ্ট জানি না। আমডারা আর কুকিকালিদাশ ভিন্ন দুটি গ্রাম কী না সন্দেহ হয়। দ্বিধা আমাকে তছনছ করতে থাকে। সুতরাং উদ্ধার পেতে লিখি। কেউ বাধ্য করে না, উৎসাহ দেয় না, নিরুৎসাহিতও করে না। জীবন এরকমই প্রবহমান অজ্ঞতার অশেষ অন্ধকার সুরঙ্গপথ; যার কোনো চূড়ান্ত রেখা নেই; আছে অসীমের দিকে যাত্রা। আসলেই জানি না, কেন জন্মালাম, কেন রিপুতাড়িত হয়ে ক্ষয় মেনে নিয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে চলেছি আর মাঝে মাঝে লিখছি।