Archives

অযৌক্তিক অধিবিদ্যা মূলত কবির মাতৃভাষা

কথা

শব্দের কোনো দাগকাটা মাঠ নেই, ধ্বনিগুঞ্জনমালার ভাব বিকাশের সংরূপে তা লুকায়িত। তাহলে কবিতা কি? কবিতা মূলত বাক্যের অযৌক্তিক প্রকাশ, যা বিমূর্ত অভিজ্ঞতা আর কল্পনার ধমণীতে মিশে অধিবিদ্যায় রক্তসঞ্চাচালন ঘটায়। এক্ষেত্রে, কার্যকরণ-এর দিক থেকে কবিতা প্রয়োজনহীন, সে অর্থে অর্থহীন, অকেজো বিষয়ের অন্তরে ডুবে থাকে। ফলে, কবিতার ঘরবাড়ি কবির একান্ত অধিজগৎ দ্বারা নির্মিত।

একদিন আমারও খুলে যায় সেই জালানা, দেখি শব্দের আগুন কেমন পুড়িয়ে মারছে মানুষগুলোকে। দেখি দুনিয়াটা বেড়ালের চোখ, যেদিকে তাকাই মানুষ আর অধিবিদ্যা ঝুলে আছে। সবকিছু যেন উল্টো পৃষ্ঠার গল্প। শরীরের ভেতর ছটফটানি জাগে, কবিতার বিস্ময়কর পৃথিবীতে উঁকি মেরে দেখি সব জগৎ ভুলের কারখানা। এই জগতে হাত মসকরা হয়েছিল ‘স্বপ্ন’ নামক পদ্য রচনা দিয়ে। ৮৮-৮৯-এ যার সূচনাবিন্দু। কবিতা এসেছে আরো পরে ৯০-৯১-এ। অবশ্য ঘোরের টেবিল নির্মাণ হয়েছিল আরো আগে, ৮১-তে। ফিরোজা বেগম ছবি এইনাম অদ্ভুতভাবে জন্মদিল ঘোরের পাঁজড়। তখন ভালোলাগা এই অভিশাপগুলো জেগে থাকতো মনে; দুপুরগুলো বিক্রি হয়ে যেত সস্তায়, আত্মার ঘুড়িগুলি সাপের চোখের মতো শীতল। ভেবেছি, সেই শব্দটির নাম কি? তা কি ছাতিমের গাছ, শুকনো পাতার স্তূপ, নাকি কুহকী অস্তিত্ব; যাকে কবিতা বলে ভুল করি আমরা?

কবিতার নাম তাই ধ্বনির-বাক্স, নারীর বুক দেখা, ঘোরের অদ্ভুত ফাঁক-ফোঁকর, জ্যামিতির কাঁটা কম্পাস, শরীরের পরা-ঘ্রাণ, মুহূর্তের বুনোফুল ছড়ানো স্পর্শ, গলাকাটা মোরগ, আর অযথা শব্দের ব্যথা ঢুকে যাওয়া বুক। এগুলি লিখে ফেললে শরীর হালকা হয়। তাই আমি সমস্ত ব্যর্থতাকে, ভুল আর উল্টোপৃথিবীকে লোটকে দেই কবিতায়।

কেন লিখতে এসেছিলাম কবিতা, সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নিরর্থক, জীবনের নানা পীড়ন আমাকে বিস্মিত করে, অক্ষরের আগুনে পুড়িয়ে মারে। ফলে, চুমুকেও পুড়িতে খেতে শিখেছি; চুমুর এই ছোলাহুড়া আমার কবিতার শব্দ-রান্নাঘর।

বেশ কয়েক বছর; অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত হবার পর— আমার বাপজান আর মা, স্বজনরা চেয়েছেন উত্তরাধিকারের চারাগাছ। ভাবি, ওরকম শান্ত জীবন যদি পেতাম! বউ, বাচ্চা, কফির পেয়ালা, বেনসনের ধোঁয়া উড়িয়ে ঘুম— ওঁম শান্তি, ওঁম শান্তি।

আমার জন্য সাধারণ জীবন নয়, মাথার ভিতর শব্দের ঘুণপোকা। আমার জন্য ওরকম সাধারণ সুন্দরজীবন নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তার বদলে আমার ভাষা তৈরি হয় সেই জায়গায়, যেখানে সার্কাসের স্টেজে জোকার-রা খেলা করে কিংবা মনের প্রশ্নরা যেখানে আমাকে আটকে রাখে সেই ধ্বনির জেলখানায়। অথচ বাপজান ভেবেছিল প্রাইমারী ও হাইস্কুলে বৃত্তি পাওয়া ছেলে হয়তো তার সংসারের দারিদ্র্যটাকে ঘাড় ধাক্কা দেবে। আর সহপাঠিরা আমাকে বলতো হিনো ব্রেন, অথচ আমার থেকে কম দামী ছাত্রবন্ধুরা যখন কেউ প্রশাসনের কর্মকর্তা, কেউ আমেরিকা গিয়ে পারিপার্শ্বকে পাল্টেছিলো, আমি তখন অনবরত টীকাটিপ্পনীর ভাষা ও ছবি বেগমের ত্রিশূলে বিদ্ধ হয়ে কবিতার নামে ইঁদুরের মতো কান্নার গল্পটা লিখতে শুরু করেছি। সমস্ত বিস্বাদকে আনন্দের-বাক্সে পুরার এই মন্ত্র আমি কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে পেয়েছি আর ব্যথার কনুই দিয়ে হেঁটে গেছি অধিবিদ্যার মহাজগতে।

কবিতা অর্থাৎ ভুলমাটির ভূখণ্ডের সাথে এরকমভাবে অলৌকিক জীবন শুরু হয় আমার। আমার বউ চাই খ্যাতির জীবন, ওর কথাশুনে একসময় হালকা লাগতো নিজেকে। কিন্তু আজ বিস্বাদকে ঢোক গিলে এইসব কিছুকে জীবন থেকে তাড়িয়েছি। তারপরও খ্যাতি মূলত অশ্লীলতার অন্যপীঠ এই কথাটা কবিতাকে বুঝাতে গিয়ে কবিতার সঙ্গে থেকে যাওয়া এই ২৫টি বছর।

জনতার সঙ্গে জনতা হয়ে মিশে যাওয়া হলো না আমার, বরং তার থেকে লিখি ডুমুরের রতিহর্ষ সংলাপ। লোকে বলে তোমার পরিচয়পত্র কোথায়, আমি শুনি, না বোঝার ভান করে— শুধু শোকাকূল পৃষ্ঠা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার শুধু ভালোলাগে ইউক্লিডের উপপাদ্যগুলো; ভালোলাগে সুখ্যাতির ধুলোমাখা নারী। যে আমার ঘুমের মধ্যে পুঁতে রাখে জাগরণ ঘণ্টাধ্বনি। জগতের রংপেন্সিল হারানো যুবকের মতো আমি হাতড়ে ফিরি সেই স্মৃতি; শব্দের বক্ষে।

এর মধ্যে দেখা হয় লাল পিঁপড়ের সঙ্গে, কথাবলি আরেক ভাষায়। সেখানেও মেয়েমানুষ আর চি‎হ্নবিজ্ঞান চিন্তার মধ্যে ডিগবাজি খায়। হাজির করি ডোরাকাটা-জগাখেচুড়ি, আর বর্ণের রাশিফল। এরকম এলোমেলো কথা অর্থাৎ অধিবিদ্যা যেমন কবিতায় লিখি, তেমনি জীবনেও চালু রেখেছি সেই অসুখী আয়নায় মুখ দেখা।

বউকে শোনায় অনেক খ্যাতিতে পৌঁছাতে পারবো আমি, কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে তাই বাজি ধরি এই ক্ষ্যাপারজীবন। সাতছন্দে এই দুনিয়াদারী থেকে অতিরিক্ত কিছু চাইনা আমি শুধু আরেক পৃথিবীতে পৌঁছে দিতে চাই গল্প বিক্রেতার কবিতার খাতা।

কবিতা নিয়ে এইতো অভিসন্ধি, এইতো জীবনকে কাটানোর অস্ত্র যার নাম দিয়েছি ‘বজ্র’ ও ‘তুমি’। যার নাম দিয়েছি উল্কা ও তান্ত্রিক বৃদ্ধাঙ্গুল।

কবিতা লিখতে গিয়ে ব্যথাকে ফিরে পাই আবার, পুনর্বার; সেই সাথে দুপুরের ঘুঘুদের। তারপরও যে সব নারীদের পেতে পারতাম তাদের নাম ভুলে যাই আমি, তবু তাদের নিঃশ্বাস আটকা পড়ে থাকে আমার কবিতার মধ্যে। এখন ভাবি, সুখী শান্ত জীবনে কি এই অসুখের আনন্দ থাকতো?

কবিতাতো অধিবিদ্যার ভাষা, তাকে আর বিষণ্নতাকে বজ্রমেঘের মতো মাথায় বসিয়ে ঘুরি। জানি না কবিতা লিখে কি হয়, কি না হয়? তারপরও জীবনের ছোটখাট বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, দেখি পথে ঘাটে লাশের মতো পড়ে থাকে সর্বনাশ।

এসব ক্ষেত্রে কবিতা কি নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও এসিডের স্মৃতি ধরে রাখে? সমাজের জন্য না হলেও, হয়তো কবিতা অনেক কিছুই আমার জন্য— এই বোধ থেকে কবিতার অহিফেন খেয়ে চলেছি।

কথাগুলো সব কবিতার মতো হয়ে যাচ্ছে— আচ্ছা পরিষ্কার করে বলি। আমার কবিতা সেই অধিবিদ্যা যা শব্দ দিয়ে তৈরি করি আমি। এই শব্দগুলির গায়ে মেখে থাকে আমার বিষণ্নতা, জুয়া প্রেমিকের রাশিচক্র, শব্দবাক্সের ভেতর লুকানো খুলির পাহাড়, বাক্যবিহঙ্গের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যথা, তত্ত্বঘুড়িতে উড়া আমার আতাগাছের স্বপ্ন, আমার ভুল পৃষ্ঠার গল্প।

পৃথিবী যেমন পদার্থ দ্বারা তৈরি কিন্তু তা হয়ে ওঠে ভিন্ন এক মায়ারজগৎ। কবিতা তেমন স্পর্শ, ঘ্রাণ, গন্ধ, ছবি, মনোবিকোলন, বিষণ্নতা, ভুল, সর্বনাশ নানাকিছু দিয়ে জন্ম— কিন্তু এই বস্তুগুলির সমন্বয়ে তা হয়ে ওঠে ভাব ও আধারের অন্য এক জগৎ। কবিতার যে জগৎ তৈরি হয়— তাতে তা থাকে না; ঐ বর্ণ, শব্দ, ধ্বনি কিংবা বিষণ্নতা, সর্বনাশ, ঘ্রাণ স্পর্শ— এই ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে মিশে তৈরি করে সিন্ধুস্বরলিপি। আর এভাবেই সে কবিতা তৈরি করে এক কসাইয়ের স্কুল, পরাবাস্তব জামার বোতামের জগৎ।

কবিতা নিয়ে, অধিবিদ্যা নিয়ে শব্দ আগুন নিয়ে বেঁচে থাকি। নিঃসঙ্গতার হাত ধরে বুঝি কবিতা ছাড়া মুক্তি ছিল না আমার। অস্তিত্বের এই স্তদ্ধতার ভাষা কবিতা ছাড়া কে দিতে পারে, কে বুক-কে বানাতে পারে ম্যাচকাটি। কতলোক টাকা-পয়সা সোনা-দানা কুড়িয়ে পায়, আমি কুড়িয়ে পেয়েছি বিষণ্নতার ঝুনঝুনিবাদক, উদ্ভ্রান্তের ভাষা, ক্ষুধার্ত পাঠিকার হাত, বাঘিনীর দুধ, চি‎হ্নবিজ্ঞানের দীর্ঘতম পঙ্ক্তি। আর যা প্রত্যাখান করেছি তা টাকার গাছের নগ্নতা, পেঁপো গাছের মালিক হওয়া, বারান্দায় বসে চাঁদ দেখা, ফ্রিজের মাংস খাওয়া, বন্ধুদের পিঠচুলকানি আর ন্যায়বিচারের নামে বানরের পিঠে ভাগ করা।

বরং কবিতার কাছ থেকে আমি পেয়েছি অসুখের স্বাধীনতা, রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের আনন্দ, বিস্ময়কে বিস্বাদ দিয়ে ছুঁবার অধিবিদ্যাজল। এইসব কিছু আর আমার সবকিছু কিছু, আমি ভালোবাসার নামে নিঙড়ে দিতে চাই। এই ভালোবাসা আমার দুই প্রান্তের একই উৎসারণ। তা কবিতা আর নারী। শব্দ আর বিস্বাদ। ধ্বনির নিতম্ব। বুক দেখা আর আপ্তবাক্য লেখা।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি ক্ষ্যাপামি, ভূতগ্রস্থতাও উদ্ভ্রান্তি না থাকলে কবিতা আসে না? অন্তত আমার কবিতায় এগুলি জরুরি হয়ে উঠেছে।

আমার কবিতায় জোড়া দেয় সেই ডুমুর আর কূটশ্লোক, ‘ঃ’ আর আত্মপ্রতারণা। কবিতায় শব্দরা এভাবে হয়ে ওঠে একটা দেশ যার নাম ‘ং’। আর একজন কবি হন, একটা মহাদেশ আর তার বক্ষ মহাজাগতিক পেণ্ডুলাম।

কথা হলো এই মহা তাৎপর্যের কথা বলার অনেকেই তো আছেন? আমি এরকম হঠাৎ এর ভিতরে বগের মতো লম্বা গলা বাড়ালেম কেন? আমার মনে হয়, হয়তো আমার মনটা একটা অধিবিন্দু লুকিয়ে রেখেছে। সেই বিন্দু থেকে অনবরত আমার কবিতার বর্ণমালাগুলি জন্ম দিচ্ছে হিব্র“ভাষায় কথা বলার জগৎ, আমার ধ্বনিগুলি আজব কথা কানে কানে ফিসফিসিয়ে যাচ্ছে আর অহেতু-গুঞ্জনমালা আমার মাথাকে ঘোরে ঘুলিয়ে, বিষণ্নতার জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে— ফলে আমার এইকথা আমার মতো করে বলার আর কেউ নেই, কেউ নেই বাওড়ের পাশের ফড়িং যুবার ছেলে খেলা দেখার, পৃথিবীর চতুর্থ হিমযুগে ফিরে যাবার, কেউ নেই আমার অর্ধলগ্ন বনমানুষী নিয়ে ভাবার, সম্পর্কের ল এন্ড অর্ডারের মধ্যে যৌনঅঙ্গগুলো তাক করার, অদ্ভুত ছাতা কুড়িয়ে পাবার, অথবা তোমার বুক দেখার নাম করে আমাদের দিনগুরির অন্তর্দাহ দেখার, লোককাহিনির সবুজপাতা চুরি করার; দৈব্যবাণী দিয়ে পিঁপড়ার ভাষা বুঝবার, মেষ শাবককে জড়িয়ে ধরে হিব্রু ভাষায় কথা বলার, বিস্মরণের ভূগোলের ভিতর চাবি হয়ে ওঠার, পৃথিবীতে পাগলই একমাত্র সুস্থ মানুষ বুঝার অথবা বুঝা ছাতিগাছের তপস্যা, বুঝা হাওয়া বিবির রাশিচক্রের বই। ফলে আমার পুরোনো বন্ধু হয়ে উঠলো ‘আর্তনাদ’ আর নতুন বন্ধুর নাম হলো ‘বিস্মৃতি’— এইসব ডাকবাক্সের অন্তর পুড়িয়ে আমাকেই লিখতে হলো পৃথিবীর উল্টো পৃষ্ঠার গল্প। ফলে আমার পক্ষেই সম্ভব হলো মোজার ভেতরে লাল পিঁপড়ের সাথে দুপুর কাটানো, অথবা লেখা— আগুন নিজেই এক হতভাগ্য ভুলের নাম— এইকথাগুলির।

এইসব নিয়ে আমার ভাবতে ভালোলাগে— আর চরিত্রগুলি, চিত্রগুলি অধ্যাসগুলি ঠিক ঠিক গন্তব্য চিনে ঢুকে পড়ে আমার কবিতায়, বসে যায় মশগুল গল্পে, তর্ক করে। কাঁদে বিষণ্ন ঝুলা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চৌরাস্তায়, অথবা প্রেমিক হয়ে পাগলের উন্মত্ততা পেয়ে বসে তাদের। এইসব কিছু জোড়া দিয়ে, ছেঁড়া কাঁথার মতো সেলাই করে চলেছি আমি।

এখন কবিতার কোনো ব্যাকরণ, কোনো ছন্দে অথবা জ্যান্তেমরা এইসব অনুভবমালা মালা পরিয়ে দেয় আমার শব্দের গলায়। এইসব দিকে তাকালে আমার কবিতা বুঝা যাবে।

আমি কবিতা লিখি জগতের ছবি বেগমদের বুকে খোঁচা দেবার জন্য। বঙ্গকবিতাবিদ্যার এইসব প্রবণতা আমি জুড়ে দিতে চেয়েছিলাম। জীবন ও কবিতার মধ্যে সাঁকো নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। আসলে কবিতার মধ্যে বিস্বাদের আনন্দ খুঁজতে বেরিয়ে ছিলাম আমি। অনেক ভাঁজ করা স্মৃতি, অনেক দুঃখপোড়াজীবন, অনেক অতৃপ্ত চোরাটান আমার অন্তরে টোকা দিয়ে যেত— হয়তো সেই সবকিছুই আমার কবিতা। এই ঘোরগুলিকে আমি নানা, বাক প্রতঙ্গে, স্বরে ব্যঞ্জনে তুলে আনতে চেয়েছি।

নিজেকে পোড়াবার জন্য বিষণ্নতার আগুন প্রয়োজন, শব্দ সেই বিপদজ্জনক আগুন, যে নিজে পিঁপীলিকার ডানায় উড়ে, আমাকে পুড়ায় কূপের আগুনে। সে অর্থে আমি কোনোদিন কবিতা লিখিনি, যা লিখেছি তা আমার চারদিক থেকে পুড়ে আসা স্মৃতিকথা, যা লিখেছি তা পাকস্থলীর ভেতরে পড়ে থাকা সমুদ্রপঙ্ক্তি।

এই ভাবে কোনো একদিন ঢুকে পড়ি চিন্তায় লতিয়ে ওঠা মৃণালের ভেতর, অসংখ্য শব্দের পাতা পড়ে আছে অন্তরে, সেই সংকীর্ণ পথে ঢুকে প’ড়ে। চমকিত হই, হা-হুতাশ করি; তারপরও মুক্তি নেই কবিতা ছাড়া। এ আমার মুক্তির বিস্মরণ চুল্লি।

আমার শরীর আমার দেখা শুনা করে না, আমার চিন্তা আমার শরীরের মাথায় বসে থাকে। কাগজের নৌকা বানানোর মতো করে আমি কবিতাকে সাজিয়ে তুলেছি সেখানে, শব্দ ভাঁজ করি, কালির নৌকা ভাসায়। বিরক্তি, বিচ্ছিন্নতা, পরাজয়, লজ্জা, কাম, অনুরাগ কতনা ক্ষুদ্র আর হিজিবিজি বিষয়ের ভীড় জমে হয় আমার কবিতা। আমি তাদেরকে সমাজের বিদ্রুপে গেঁথে তুলি নির্মাণ করি ভাষাদৈত্যেরবাড়ি। ক্ষুধার্ত পাঠিকার বুক কেটে কেটে বানায় তিন তাসের ঘর, চীনাপুতুলের মতো শব্দের মঠমন্দির। আমার কবিতা এইসব নিয়েই— ফলে, যে সময়ই আসুক তার মধ্যে জায়গা করে নেবে, তার মতো করে পাঠকের মাথায় চড়ে মগজ চিবাবে।

কবিতা

 দেহ স্টেশন

দেহকে নিয়ে এখন আর কোনো চিন্তা করিনা বরং শার্টেও প্রকাশ নিয়ে

জগতকে জুতোর ফিতের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে বলি। যদিও ছেঁড়া ফ্রকে,

পোকা ও নুন-এ চেখে দেখি— শৈশবের ওপারের কোনো ব্যুৎপত্তি লেখা

আছে কিনা? ঝিনুক বেলা থেকে মেঘের মতো যত ব্যথার বেণী আছড়াতে

আছড়াতে বড় হয় স্মৃতি। এভাবেই আমার হারানো দিনের সব মানুষেরা

ঈশ্বরের মেয়ে হয়ে ওঠে— তাদের জামার আস্তিনে লুকানো থাকে আকাশ রংয়ের টিয়ে।

এরা সবটাই দুঃখ নয়— কিছুটা ডুমুর, কিছুটা কার্বণ; বাড়ির পেছনে

জামগাছতলায় পড়ে থাকা মনপোড়াগল্প। যেখানে ধূসর শরীরের গাছে

ঝুলে থাকে স্তনেরটব; তারপরও প্রেমহারা মানুষের আদি কষ্ট বলে কিছু

নেই— আছে বক্ষে জমে থাকা কার্নিসের ফুটো।

এসব জেনেও আজকাল প্রকাশ চিন্তা বিষয়ক রেডিও অনুষ্ঠান শুনি;

উল্টো করে খুলি গতজন্মের জট। অথচ পোকাদের সংগম দেখে

মনে পড়ে— আমারও আছে আটচল্লিশ বছর আগের— অনেকগুলি অতৃপ্ত দুপুর।