Archives

ক বি তা

প্রবালকুমার বসুর কবিতা

হয়ত অকাতরেই

কী দিয়েছি? দিয়েছি কি কিছু তোমাকে
তাৎক্ষণিকের চিহ্ন বিহিত জলও
অকারণে শুধু দিয়েছি অবিশ্বাস
আর অন্ধকার, ঢেকে দিতে চেয়ে আলো

অক্ষম নাকি, এমন ভেবেছে যে নিন্দুকে
তুমিতো গ্রহণে কোথাও কৃপণ হও নি
আজ ফেরাবার কথা কেন তবে বলছ
হয়ত অকাতরেই দিয়েছি, যেমন ফুল ফুটে ওঠে মৌন

 

শোনো

পরিণতি কিছু নেই জেনে তবু অহেতুক সম্পর্ক গড়েছি
বৃষ্টির আগে ও পরে জেনে গেছি সুনিপুণ ছাতার ব্যবহার
এক অতি অনিবার্য স্থিতি তার ক্রমান্বয় নিবিড় প্রশ্রয়ে
উপেক্ষা করেছি যত ভালো থাকবার মত মেধাহীন সরল প্রস্তাব
অকারণে বারবার বিভ্রান্ত করেছি তবু সেই
সকলে চেয়েছে দিতে আনুগত্য কিছুটা বা নিয়মমাফিক
চেয়েছে একান্ত হতে, প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে খালি
ভেঙে ভেঙে খ- খ- আরো খ- হতে হতে শেষে
সম্ভাবনা কিছু আর অবশিষ্ট নেই জেনে সমীকরণের মত হয়ে
নির্দিষ্ট থেকে গেছি, যদিও তা আংশিক প্রতিশ্রুতিহীন

উন্মোচন

দিতেই কষ্ট বুঝি, নিতে কষ্ট নেই?
এত যে নিয়েছি তবু হাত কেন তালি
দেবার পরেও পরিপূর্ণ যেই তালু
অসফল প্রয়াস যেন, অযথার্থ সেই উন্মোচন
প্রকারান্তরে সেই কষ্ট রাখা জেনে
আমি তো দিই নি কখনো
নিয়ে যদি থাকি নেহাতই কৌতুহল বশে

 

কাকে চাইব?

কাকে চাইব? চাওয়ার ঠিক আগে করতে হবে তাকেই তো নির্বাচন
ছেনি কর্ণিক নিয়ে বসে আছি, সঙ্গে বালি মাটি জল
নির্ধারিত করতে হবে, কতটা তাৎক্ষণিক এই চাওয়া
নাকি দীর্ঘ হবে উদ্যাপন, চাওয়ার চতুর অছিলায়
স্পর্শও করব তাকে, যেভাবে বালি মাটি জল ধরেছি গড়তে
তাকেই গড়েছি, যেন নিখুঁত নির্মাণ
অথচ এমনই কি চেয়েছি আমি? গড়ার পরেও কেন দ্বিধা?
ত্রুটিহীন নির্মাণ দেখে মনে হয় অসম্পূর্ণ গড়েছি
বারবার ভেঙেছি তাই নির্মাণ, যা মনোমত নয়
বালি মাটি জল শুধু অপচয়ই করেছি
কাকে চাইব? সমস্ত চাওয়াই দেখেছি শেষমেষ অন্যায্যই হয়

*****************************************************

 

মাহবুব বারীর কবিতা

নাসরীনের বাড়ি

‘যাও পাখি বলো তারে সে যেন ভোলে না মোরে’

এই রাস্তায় সোজা যেতে হবে একদম, যতদূর যাওয়া যায়
গত বছর পিচ ঢেলে দিয়ে এই রাস্তায় মসৃণ করা হয়েছিল
আর এই বর্ষায়— মনে পড়ল, এক বর্ষায় দেখা হয়েছিল দুজনে—
এই বর্ষায় পিচ উঠে গিয়ে খোয়া উঠে গিয়ে খানাখন্দ, পানি—
তবুও এই রাস্তায়ই যেতে হবে, যেতে যেতে, যেতে যেতে পড়বে
চার রাস্তার মোড়, এটা একটা গোলকধাঁধা, থামতে হবে একটু
তবে শুনেছি পাঁচ রাস্তার মোড়ও আছে, তা থাক, চিহ্ন ধরে ধরে
চিহ্ন ধরে ধরে এগোতে হবে, এই যে ক্লিনিক, এই ক্লিনিকের রাস্তা ধরে
তারপর গার্লস স্কুল, বয়েজ স্কুল, পুলিশ ফাঁড়ি, মসজিদ মন্দির
তারপর একটি বাজার, তারপর আঁকাবাঁকা পথ—
এই আঁকাবাঁকা পথ যায় সুদূরে- পরের লাইন মনে নেই,
সুদূর না, তবে দূর তো বটে, দূরে একটি কলেজ সেই কলেজ
ভাগ করে যে রাস্তা গেল, সেই রাস্তায়ই যেতে হবে
আবাসিক এলাকা, আবাসিক এলাকার সব রাস্তা বাদ দিয়ে
যেখানে একটি কোচিং সেন্টার আছে ছাত্রদের ছাত্রীদের
তার পাশ দিয়ে যে রাস্তা আটকে গেল শেষ প্রান্তে
সেই বাড়ি— কার বাড়ি?

নাসরীনের।

 

মন পবনের ঢেউ¬ ৩

আমার তুমি কী হাল করেছ
একবার এসে দেখে যাও
না আছি ডাঙ্গায় না আছি জলে
শুধু শূন্যে ভাসি।


আমি কোনো ছান্দসিকের মতো ছন্দ জানি না
এমনকি সাধারণ ছন্দজ্ঞানও নেই
আমার মন কখনো মাত্রা মানে না
আমার তোমার ব্যাপার তো মাত্রা ছাড়া।


প্রশান্ত, তোমাকে কতবার বলেছি তার আর পর নেই
প্রশান্ত তার পরও কেন বলো— তারপর তারপর!
অনেক তারপর আছে যার পরে তারপর নেই—
যে নদী মরুপথে হারায়
যে নদী সাগরে হারায়
যে আকাশ নীলে, যে বৃক্ষ বনে, যে পথ পথে
আর যে হৃদয় হারায় আর এক হৃদয়ে তার আর পর কী?
তারপর?
তারপর এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার
চার থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে ছয়, ছয় থেকে সাত
সাত থেকে আট, আট থেকে নয়— তারপর শূন্য।


যতদূর সামনে যাই
ততদূর পেছনে,
পেছনে কী? পেছনে মায়া
আর সামনে? সামনে মরিচীকা।


অন্ধকার গভীর হলে
আর কোলাহল স্তব্ধ
তখন সমস্ত দেহ বিন্দুর মতো
মনের গভীরে ডুব দেয়,
জানতে চাই, জানতে চাই
আমি কে? কেউ বলেনা কিছু
নিরুত্তর এসে উত্তর দিয়ে যায়।

*****************************************************

কুমার দীপের কবিতা

পুরাণের নারীরা ফিরে এলে
[বাল্মিকী-ব্যাসদেবকে স্মরণপূর্বক]

আমি সীতা
খেটে খাওয়া কিষাণী-কন্যা
পিতৃসত্য পালনের জন্য
রাম বনে যেতে চায়, যাক
তিনি হীনবল হলে আমিই বসবো সিংহাসনে
আমি হবো রানি।

আমি শূর্পণখা
রাবণের বোন;
ঘরে বধূ রেখে
রাম এসেছেন পঞ্চবটি
সঙ্গে লক্ষণও
কীভাবে দু-ভাইয়ের সঙ্গে ডেটিং করতে হয়
আমি জানি।

শকুন্তলা আমি
মেনকার মেয়ে
এখন অঙ্গুরীয় লাগে না
ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়েছি ঘরে
প্রণয় পিয়াসী দুষ্মন্তরা–

এসো
আমি পৃথা
কুন্তী নামে খ্যাত
স্বামী নির্বীর্য হলে কী হবে !
ফার্টিলিটি সেন্টার আছে তো
প্রিয়, দুঃখ নিও না, একটিবার শুধু —
হেসো।

নামটা- দ্রৌপদী
পাঞ্চালিও বলে কেউ কেউ
একজন এসে আমাকে জয় করবে
পাঁচজনের মনোরঞ্জনে যেতে হবে
এ নিয়ম মানি না;
পারো যদি, ভারতীয় সিরিয়ালে এসো
জনে জনে প্রেম বিলাবো, কাটিয়ে দেবো
প্রণয়ের  দৈন্য

বেহুলা সুন্দরী
চাঁদ বণিকের বৌমা আমি;
আমার দুঃখে কাঁদতে হবে না কাউকে
বিশ্বকর্মাকে এবার ছুটি দিয়ে দাও
কার্বলিক এসিড রেখেছি
কুঁড়েঘরেও আর ঢুকবে না

মনসার সৈন্য।

*****************************************************

শামীম সাঈদের কবিতা

সংসার

আর নিরালোক নক্ষত্রের প্রসঙ্গ যখন এলো,
তোমরা বললে—কৃষ্ণ কৃষ্ণ, রাধে রাধে, রাধে কৃষ্ণ!
আর রাধার রন্ধন শৈলীর কথা তো তোমরা জানতে,
অশৈলী সংসার, হা-ঘর, একটা দরজা ঘরের ভিতর,
দরজাটা উন্মূল, দরজার বাহির ঘর, এই অভ্যন্তর ব্যঞ্জনা…
আর শিকড়, মূলত অবতার, কালে কালে ডুকরে ওঠে লোকালয়ে,
মুক্তির কথা বলে; আর প্রেমে প্রেমে বেলা ডুবে গেলে তোমরা বলো—
এ মূলত চেনা চাঁদের দাসত্ব যার নিজের কোনো আলো নেই,
আর নক্ষত্র যখন নিরালোক, চাঁদের অন্ধকার তখন মর্মর,
আর তোমাদের মর্মের ভিতর সতত রাধা খেলা করে—
ফলে, তোমরা বলে ওঠো—কৃষ্ণ কৃষ্ণ, রাধে রাধে, রাধে কৃষ্ণ!
সমোচ্চারে, নিরালোক চাঁদ ডুবে গেলে পর…

*****************************************************

 

সৈয়দ তৌফিক জুহরীর কবিতা

ঘুরছে মানুষ, ঘুরছে চাকা

একটি আধুলি কুড়িয়ে পেয়েছিলো এক ভিক্ষুক
শৌচকাজের সময় তা ছিটকে পড়ল ড্রেনে
প্রস্রাবের ছাঁট ভিজিয়ে দিচ্ছিল সেটার দেহ, তবে
পথ-চলতি কেউ টের পায়নি একদম
এক ভিখিরি বালকও এলো একই কাজে
তারপর এলো বাস ড্রাইভার, চা-অলা এবং ফুলপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক
আধুলি লুকিয়ে গেলো নোংরা জলের আড়ালে; দেখে মনে হলো
যেন মুখ লুকিয়ে সে নিভিয়ে দেবে তার আধুলি-কথা
সেই ভিক্ষুক এবার ভিখিরি বালককে ডেকে বলল, ‘নিবি না-কি,
নে কুড়ায়া নে!’ আধুলি তখন ড্রেনের জলে ডুবে আছে।
বালকটি কিছুক্ষণ সেই আধুলির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর
বলল, ‘ছিহ্!’
তাতে কী হলো? কেবল ফুলপ্যান্ট পরা ভদ্রলোকটি
প্যান্টের জিপার লাগাতে ভুলে গেলেন!

*****************************************************

 

মাওলা প্রিন্সের কবিতা

সবুজ শৈশব সহজ খেলনা

শীর্ণ চাঁদের মতো ক্ষয়ে গেছে কি তোমার শৈশবের সবুজ রোদ—
হঠাৎ বন্যার মতো ধুয়ে গেছে কি তোমার কৈশোরের কমলা কবিতা—
মৃদু স্মৃতির মতো মুছে গেছে কি তোমার যৌবনের প্রাণপ্রপাত জলরাশি—
সবার ভেতরে একটি যুবক লাটাই হাতে ঘুড়ি উড়ায়—
সবার ভেতরে একটি কিশোর রঙিন কাগজ হাতে ড্রয়ার সাজায়—
সবার ভেতরে একটি শিশু খেলনা হাতে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়—
যতোই তুমি অস্ত্র বানাও— যুদ্ধ বাঁধাও— বিদ্যা শেখাও অভিনব—
সবুজ শৈশবের সহজ খেলনাগুলো অস্বীকার করবে কীভাবে;
তোমার ভেতরের সবুজ শৈশব কমলা কৈশোর হয়ে
জ্যোতিষ্মান যৌবন হয়ে জয় করে চলেছে
তোমার পৌঢ়ত্বের পতন!
শিশুর ছায়ায় পৌঢ় পৃথিবীতে ফিরে আসে সবুজ শৈশব সহজ খেলনা।

*****************************************************