Archives

মুখোশের অ-রূপকথা

এটা এক শহর। বহরে কম, আড়ে বেশি। অর্থাৎ কিনা লম্বা ধিঙ্গি এক লোকালয়। বয়স কম হলনা শহরের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছ কমেছে, বেড়েছে মানুষ। ফলত গাছে গাছে, ডালেডালে, পাতায় পাতায় এখন মুখোশ।

তবু নদী এক। তার দুই তিন নেই। এই দ্যাখো তার নির্লিপ্ত জল। ভেসে যাচ্ছে মৃত শরীর, আবর্জনা। একটা কুকুর, মৃত। কাক তার উপরে। মনোযোগী। ফুলের ছিন্ন মালা। কলা গাছের কাণ্ড। বেশ রাত্রি, তাই কিছু অস্পষ্ট। এক পাশের তীর থেকে ফুরিয়ে আসা উৎসবের আলো, সামান্য বিষাদ। কিছু মানুষের সঙ্গে এক প্রতিমা।

নিকটে দ্যাখো। প্রদীপ ভেসে যাচ্ছে। লাল, হলুদ। দশমীর বাতাসে কাঁপছে। ঈষৎ হিমে ভারি। কিছু নিভুনিভু, কিন্তু ডোবেনা। ভেসে যাচ্ছে। পাড়ে এসে জল দূরে যেতে যেতে ফিরে আসছে আবার। কিছু ফেনাসহ। নোনা কি? ঐ পাশে চলো। একটু নির্জনে। বাবলা বনের সামনে। অন্ধকার এখানে একটু ঘন। দশমীর চাঁদে মেঘ। তাই কিছু আঁড়াল। দ্যাখো তাকে, একা। ভুল হল। একা নয়, পাশে মানানসই রমনীয় মুখোশ। একটাই। তার সিঁথি কি নজরে আসছে? অপ্রয়োজনীয়। সাদা। দুইকরতল থেকে তার এখন শেষ প্রদীপ জলে নামবে। স্নানে। বাতাসে হিমে। নেমে গেল প্রদীপ হলুদ আলো নিয়ে সঙ্গীর সন্ধানে। তার এখন জোড়া করতল। মঙ্গল কামনায়। কার? মুখোশে শুক্রের ক্ষীণ আলো। ক্ষীণ হাসি। কালচে লাল।

এখন অন্য এক সময়ে, অন্য রাস্তায় চলো। গলি বলাই শ্রেয়। এক সময়ে ব্ল্যাকটপ ছিল। বয়স ধরেছে তাকে। শুশ্রƒষা না থাকলে যা হয়, সে অবস্থায় এভিনিউ থেকে এক দেয়ালের কাছে এসে থেমেছে। রেল ইয়াডের বেশ উঁচু প্রাচীর। উপরে কাঁটাতার। পুরোটাই এক ঝলকে দেখে নেওয়া যেতে পারে। কত হবে? হাজারফিট। দু পাশেই বাড়ি, নতুন পুরোনো। রাত্রি ঘন হয়ে এসেছে। একটা বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেল কিছু আগে। সামান্য উপর থেকে দেখা যাক। একটা ছেলে দৌড়চ্ছে। বয়স কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে। আতঙ্ক। আর কিচ্ছু নেই ওই খালি পা দৌঁড়ে। পিছনে তিনটে মানুষ। পরিধেয় শহুরে মানুষের মতই। তাঁদের দ্রুত পায়ের শব্দে কামতাড়িত সারমেয়র অনুষঙ্গ। প্রত্যেকের হাতে একটা মুখোশ। দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সব কাঁপছে। ওরা তাড়া করেছে ছেলেটাকে। ছেলেটা বহিরাগত। চেনেনা রাস্তাঘাট। তাই এমন অন্ধ গলিতে এসে পরিত্রাণ চাইছে। প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে ওরা। ঐ প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়েই ছেলেটা বুঝতে পারলো ভুল হয়ে গেছে। ডান দিকে ঘুরে এক বন্ধ দরজার কোলাপসিবল গেট ধরে ঝাঁকাচ্ছে। তিনজন প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর উপরে। একজন মুখটা চেপে ধরলো, একজন পিছ মোড়াকরে দুটোহাত। পকেট থেকে অন্যজন কিছু একটা বের করে ছেলেটার গলার নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে দিল। ও মরবেই। নিশ্চিন্ত তিনজন মুখোশ পরে নিতে নিতে ফিরে চললো। ছেলেটার গলা দিয়ে শুধু ঘড় ঘড় শব্দ। এখন মুখোশের উপরে কোন আলো নেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রত্যেকটি মানুষের চোখে ভেসে উঠল ঘুমন্ত স্ত্রী আর সন্ততির মুখ। বিসর্জনের রাত্রে কোথাও কোন আলো নেই।

বসন্ত আসছে কোকিলের আর্তনাদে। শহরের দ্বিতীয় আবাসনে হিজল আর কৃষ্ণচূড়া একইসঙ্গে ফুরিয়ে আসছে। রাত্রি। দেখা যাচ্ছে না ঐ ক্লান্ত সমাহার। ভেপার আলোয় গাছগুলোর নিচে বিচ্ছিন্ন ফুল কেবল স্পষ্ট। চারতলার এক ফ্ল্যাটে শুধু আলো। বাতাসে উড়ছে মেরুন পর্দা। এক ছেলে শরীর ঝুঁকে আছে ল্যাপটপে। সে মুখোশ ব্যবহার করেছে। ভারি উদ্দীপক এখন তার ঐ মুখোশের মুখ। স্ক্রিনে একটি মেয়ে। চ্যাট করছে একটি সুন্দর মুখ আর এক সুন্দর মুখোশ। অক্ষরে ফুটে উঠছে আকাক্সক্ষা, আবেগ এবং লোভ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মেয়েটি উঠে গেল ল্যাপটপের পিছনে যৌনকাতর মেয়ের ব্লোআপ। ফিরেএল প্রায়- স্বচ্ছ নীল নাইটিতে। বহু শব্দের পর সিদ্ধান্ত দেখা গেল। ওরা আগামীকাল আবার বসবে। পাশের দেয়ালে অকস্মাৎ মেয়েটির রক্তাক্ত মৃত মুখ ভেসে উঠে পুনরায় সাদা হল। ছেলেটি ল্যাপটপ থেকে উঠে এক টানে খুললো মুখোশ। বছর পঞ্চাশের শীতল এক মুখ। পাশের ওয়াশ রুমেপ গেল। মুখোশটি সোফায়। ক্রমশ বর্ণহীন। গলে যাচ্ছে। এত অবধি আমরা দেখেছি।

বিজ্ঞাপন অপ্রতুল নয়, তবু মুখোশে লেন্স ঢেকে যাচ্ছে। মানুষের-ও। মনুষ্যেতর-রনা। বহু একতারা ভেঙ্গে যাচ্ছে, হারিয়েছে, ক’জন যে বসত করে এমন অন্দরে, আজ এই রাত্রি শেষেও জানা হল না! মুখ চাই, মুখ- বলেছিলেন একদা এক শিল্পী। সে বাক্য বুকে নিয়ে শহরের মুখ্য মুখ গুলিতে প্রকান্ড হোর্ডিং আলোয় সেজেছে। চাইনিজ টুনি ঝিলিকঝিলিক। কাপড় ছাড়িয়ে শরীর দেখার হাস্যকর প্রয়াসের মত কিছু মুখোশ-ই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে মুখ। মুখ-বিষয়ে বিশেষ আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে এ শহরে। হয়ত শেষবার। মাতৃসদন, হাসপাতাল, গৃহস্থ বাড়ি, তাবৎ শিক্ষালয়, কর্মস্থল, সমস্ত সদনের ঝোপঝাড়, ব্যবহৃতার ঘর, শ্মশান-দ্রুত সন্ধানী আলোয় কিছুই আর বাকি থাকছে না। বারবার একের মধ্যে উঠে আসছে বহু, কিন্তু ঐ এক বিষয়ে বার বার কালো হয়ে যাচ্ছে পর্দা। হয়তবা একান্তই দুর্লভ হয়ে পড়েছে মুখ। বহু দুর্ভোগ আর হতাশ্বাসের পর সিদ্ধান্ত হল, সম্মেলন নয়, শোকসভা হবে। মুখের স্মরণে। ইতোমধ্যে মেঘ জড়ানো প্রভাত এসে ছুঁয়েছে ক্যাথলিক চার্চের তীক্ষœ চূড়া। খুব নিচুথেকে দেখা যায়, পাঁচটা চিল বসে আছে পাশেই। ওদের ধর্ম ভয় নেই। কোন কৌতুক বোধ-ও নেই। চারপাশের ধাষ্টামি দেখতে দেখতে শুধু ক্লান্ত। নিচের ওইসব ওদের ক্ষিধে কমিয়ে দিচ্ছে না। ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে ক্রমে। চোখ লাল । ডানা ঝাপটাচ্ছে। যে কোন মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে পাওে তাবৎ মুখোশ। চারপাশ থমথমে হয়ে আছে। শেষ অবধি ঝড় একটা উঠলোই। মাটির খুব নিচ থেকে গুমগুম শব্দ। শহর এমন দেখেনি কখনো। শোনেও নি। বড় যতেœ সাজিয়ে তোলা শহর মুহূর্তে ছিন্ন, নষ্ট। একদা শহর এখন ধুলোর, পাখিদের। অনাহারী, ক্রুদ্ধ পাখিদের। এমনকি তারা নিজেদের অবশিষ্ট কাঠ কুটোর বাসাগুলোও ভেঙে ফেললো কি এক ভীষণ কষ্টে। তারপর আকাশ কালো করে উড়ে গেল অন্য কোথাও। নষ্ট শহরটা ছেড়েই।

এসো। এইখানে কিছু স্থির হও। চোখ রাখো ওই দিকে। ওই বালিকার দিকে। তার অগোছালো চুল থেকে জল কানের লতি বেয়ে নেমে আসছে। দু চোখেই কি এক বিষ্ময়! হাতে একটা ছেঁড়া মুখোশ। কত বিচিত্র তার বর্ণ! ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে ওই বিচিত্র বর্ণ সমাহার। দ্যাখো, ও ছিঁড়ে ফেলছে মুখোশটা। ছুঁড়ে ফেলছে। ওর এখনো মুখোশের প্রয়োজন হয়নি। ক্রমে দেখা গেল, ওর চারপাশে এমন অনেক ছিন্ন মুখোশ। তাদের উপর ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলেও ফিরে যাচ্ছে। বোধ হয় ভাঙা ঘরের দিকেই। বৃষ্টি পড়ছে মুখোশের উপর।

অতনু ভট্টাচার্য

মুখ মুখোশ আর রোদ্দুরের স্পর্শ

মুখই হল প্রতিনিধি দেহ আর মনের। তাহলে…তাহলে সব দোষ প্রতিনিধির? সে তো কালেক্টিভ সিদ্ধান্তই জানিয়েছে। তাহলে? তাকেই শুধু ফাঁসিয়ে দেওয়া? সে মুখোশ ধারণ করেছে বলে যত কথা? কথায় কথায় রোদ্দুর বাবাজী হাওয়া। সে কি আর হাঁদারাম নাকি? নিকাজ? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার তার সময় আছে?

… গোটাটার ভেতর একটা তুখোর ফাঁকি টের পাচ্ছি।

ও বাব্বা তুমি তো দ্রষ্টা হয়ে উঠলে দেখছি। এক্কেবারে জড়ভরত। এই তো ঠিক ব্যক্তিগততে নেমে এলেন তো। আমি বলছিলাম রোদ্দুর হাওয়া। আপনি অমনি হাওয়া থেকে গাওয়া ঘি পেড়ে গরম ভাত ভেঙে ভেঙে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে চাইলেন, বেশ তাতে আপত্তি কি, খান না, যত পারুন খান, কিন্তু, আমার ঘিলু চাইলে দিয়ে দেবো ওই ভদ্দোর নোকটি আমি নই :

     খেলা জমে উঠেছে

               জমে উঠেছে খেলা

                       উঠেছে খেলা জমে

দেখুন আমি বলতে চাইছিলাম, ফাঁস করে দিতে চাইছিলাম মুখ মুখোশ আর রোদ্দুরের আন্তসম্পর্ক। বুঝলাম আপনি চান না আমি এটা করি। আপনি ধূপছায়াতেই বেশ মজা পাচ্ছেন। বেশ আরো একটা পথ আছে ধরুন মুখের মুখোমুখি মুখোশ বসিয়ে রোদ্দুরের অপেক্ষা করছি, এই ইন্সটলেশনটা কেমন? ও এটাও চলবে না? ধূপ নিকলা হ্যায় ধূপ নিকলা হায় একঝাঁক পাহাড়ি কিশোর কিশোরী ছুটছে। এই হচ্ছে প্রাণ। প্রাণের প্রকাশ। আর প্রাণের ভেতরে মন। মুখ এদের প্রতিনিধি আগে যেমন বলেছিলাম। কিন্তু উদাসপানা মুখ দেখে ঠকে গিয়েছি আমরা বহুবার। যতই প্রতিনিধি হোক আমরা আরেকটু বুঝে নিই না। এই প্রাণ মনের নানা কম্পোজিশন-এ মুখ ও মুখোশের গতায়াত। আর কান্নাকথা হল ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেনো পাই না’। … হ্যাঁ মুখ এখন মহার্ঘ, সচরাচর দেখা মেলে না। আর রোদ্দুর দেখো মুখোশের ভেতর থেকে কখনো মুখকে উদ্ধার করে আনে। সিনেমার, রূপকথার বা বাস্তবের হিরোদের মত নয় বরং অনুঘটকের মতন। নিজে অপরিবর্তিত থেকে। কবি যখন বলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ তখন তিনি রোদের ভেতর দিয়েই দেখেছিলেন। কারণ হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতে হাঁটতে মানুষের গভীর অসুখ তিনি টের পেয়েছিলেন মর্মে মর্মে। যেই একটু চুপ করেছি-কি লেকচার আর থামানোর নাম নেই দেখছি। না দেখুন আমি চেষ্টা করছিলাম থামো, মুখ হচ্ছে মনের আয়না আর আয়নার হাজার বায়না তখন মুখোশ দিয়ে আয়না সোজা না করতে পারলে আয়না বন্দী হয়ে থাকতে হবে, তখন চাঁদু বুঝবে কত ধানে চাল কত। মুখ ঢেকে আছে মুখোশে। মুখের সয়ে গেছে। সে ভুলে গেছে আত্মপরিচয়। তাকে কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেই বা কই? অমলকান্তি এই কারণেই রোদ্দুর হতে চেয়েছিল হয়তো। আর শোনো অতনু তোমার একটি কবিতা, তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে :

সে মুখ আমার না

আমি আয়নায় রোজ মুখ দেখি

বরং আকাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে জলের দিকে ঝুঁকে

যে মুখের আদল দেখি তার সঙ্গে কিছু

মিল খুঁজে পাই,

একটা সামান্য পুঁটিমাছও আমার এই জলদর্পণকে

খানখান করে দিতে পারে

মাঝেমাঝে তার আকাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে ঝুঁকে দেখি

ছটফটে পুঁটিমাছটার জন্য অপেক্ষা করছি আমি… (আমি / অতনু ভট্টাচার্য)

তুমিতো জানো এক মুখোশবিদ্যার ক্লাস থেকে আরেক মুখোশবিদ্যার ক্লাসে ঘুরে ঘুরে এই দশা। চোখ বুজে নিজের মুখ প্রত্যক্ষ করতে পারা সহজ নয় মধ্যবর্তী তিমির অতিক্রম করেই তার কাছে পৌঁছনো সম্ভব। তুমি কবি ভাই তুমি হয়ত আরো দেখতে পারো। বিষয়টাকে নিয়ে তোমার যাবতীয় প্ল্যান আমি যে ঘেঁটেঘুটে করে দিয়েছি, তাতেও এতটুকু বিরক্তি রেখা ফুটে ওঠে নি তোমার। কোনো জোর নয় সাবলিল সহজতায় তুমি আমাকে শুনছো, রোদ্দুর এসে পড়েছে তোমার মুখে, দেখো আমি কিভাবে দেখছি তোমায়, এতো নিবিড় চোখ মুখোশের হয় কখনো?

গৌতম গুহ রায়

স্মৃতিকষ্টের বর্গী রাত

সে এক মায়াময় উষ্ণ কিশোরী, কষ্টস্মৃতির গোপন কথা তার সাথে ভাগ করে নিলে রোদ্দুর হেসে ওঠে। একলা প্রান্তর, সেখানে সে তার ইচ্ছেদের নিয়ে বাস করে, পুতুল নিয়ে ঘর বসায়। তার এক ইচ্ছের নাম রঙীন সকাল, সে এখন বিবাগি বাউল হয়ে দেশান্তরে ঘোরে। এক ছিলো নিঃসঙ্গ সুখের দুপুর, সে এখন ভোকাট্টা ঘুড়ি হয়ে মেঘের দলে ভাসিয়েছে ডানা। এক ইচ্ছে ছিলো ঘোরমাখা বিকেল, জমাট রক্তের মতো আজ তা কাঁসার বাটি থেকে গড়িয়ে পড়ে এঁটো-কাটার সংসার।

রক্তমাংস নিয়ে সে আমি, জেগে থাকি নিঃস্ব যাপন বেলায়। জেগে থাকি নীল রঙের সাথে, লাল ক্রোধের সাথে, কালো মিথ্যার সাথে। দিন-রাত আমার উপর প্রেমের প্রতœ কঙ্কাল ঝরে পড়ে, শৈশবের ঘুম কেড়ে নিয়ে ছুটে আসে বর্গী রাত, রূপকথার কালো ডাইনির শয়তানি অস্থি। তিস্তার কুয়াশায়, ভোরের ধানসেদ্ধর গন্ধের ভেতর খুঁজি সেই মুখ, আমপাতা জামপাতা খেলার বিকালে সে ছুয়েছিলো ভেজা ঠোঁটে তার কাঁপা কাঁপা সুখ-বোল। আমার ধূসর আলখাল্লা থেকে গড়িয়ে আসে মধ্যরাতের চাঁদ, ঘুমকাতর নিশিযাপনের মাঝে তার সঙ্গে মোলাকাত, দেখা সাক্ষাত হয়। সকালের রোদে ঝুলে থাকে তার বাসীমুখ, সারাদিন শ্লথ পদচারণায় বিরক্ত হতে হতে দিনের ক্যানভাস থেকে মুছে ফেলি তাকে, দুই অক্ষরের শব্দটাকে, তোমরা যাকে দ্রোহ বলো।

আমার যাপনকাতর মার্কসীটে পরাজয়ের যে ধূসর মার্কসগুলো প্রতিবছর জমা হচ্ছে তার গহ্বরের ভেতর প্রতিনিয়ত হাই তোলে স্বপ্নের শূণ্য অভ্যন্তরের বায়ু। বিপ্লব, বিষাদ বরফের ক্লান্তিকর ক্ষরণ, কলহ-দোতরার বিরক্তিকর পুনঃউচ্চারণে আজ দ্রোহহীন আমি। একটা সময় ছিলো, যখন এই ধ্বনিগুলোতে মন্ত্রের মতো ঋজু হয়ে উঠতাম। উজ্জ্বল মুখগুলো পথ দেখাতো, আলোর পথ, যেখানে আজ কেবলই মুখোশ, দিকভ্রষ্ট চন্দ্রযান। মুঠোর রক্তরাঙা ঝণ্ডাটা ক্রমশ হাত থেকে বেড়িয়ে হাওয়াদের কাছে উড়ে গেছে। রঙের ইতিহাসও পাল্টা ইতিহাসের চাপে বেঁকে যাচ্ছে, আতঙ্কে বুঁজে আসছে চোখ। অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠা স্বপ্নের ভাঙ্গা টুকরোরা আলো টিপে টিপে ফুটিয়েছে কালো বিষফুল। ছেলেবেলায় এক ভবঘুরে পাগলকে দেখতাম ঘুরে ঘুরে নুড়ি জোগাড় করে থলেতে রাখতো, তারপর চৌরাস্তায় একের পর এক সেই নুড়িভরা থলে সাজিয়ে রাখতো। জি¹েস করলে বলতো, ‘যুদ্ধ, যুদ্ধ আসছে, ব্যারিকেড তোলো বন্ধু।’ সবাই অট্টহাস্যে উথলে উঠতো, কেউ কেউ দূর থেকে ঢিল ছুঁড়তো। আমি তার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া ভাঙা স্বপ্ন কুচিগুলো জড়ো করছি। যুদ্ধের গান ভুলে গেছি, তাই স্খলনের শব্দ সমর্পনের বোল খুঁজি।

প্রতিদিন সকালে তিনি আসেন, মার্কসবাদি কাগজের সেই বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা। শৈশবে যিনি হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন লি শাও চি-ও কি করে সাচ্চা কমিউনিস্ট হতে হয়; বলতেন, ‘আদর্শ না থাকলে জীবন পশুর হয়ে যায়।’ আমার পড়ার ঘরের দেওয়ালে বড় বড় করে সেটে দিয়েছিলাম ‘যে কাঁদতে পারে না সে কখনো বিপ্লবী হয় না।’ আজ বুকে ওই কান্না ডুকরে ওঠে নিশিদিন। দ্রোহের খুড়ের শব্দ দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় রাইখের পান্ডা হেরম্যান গোয়েরিং বলতেন, ‘কেউ সংস্কৃতির কথা বললে আমার হাতটা আপনিই রিভালভারের দিকে চলে যায়।’ আজও সেই বুলেটের গর্জনের প্রতিধ্বনি বাজে, জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যায় আলো ও আভা, ফণাময় কান্নার বদলে হাস্যরসের ঝর্না নামে বিষাদ পর্বতে। দুঃখজমাট আকাশের দিকে মেঘেদের ভেতর থেকে ঈশারায় তুমি ঈষাণ কোণের দিকে ফুটে থাকা ফুলেদের দেখালে। আমি সেখানে শুধু মাংসের গান শুনি। মৃত্যু শিশিরে মা আমার ধুয়ে দিচ্ছেন তোমার রক্তে ভেজা চুল। ফুলেদের মারিয়ে চলে গেলে আরও পশ্চিমে :

সাত রঙে হেসে ওঠে সহস্র মুখোশ,

মুখোশের আড়ালে বাড়তে থাকে রাত্রি প্রহর।

মাহন্তপাড়া, জলপাইগুড়ি।