Archives

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র : একটি পাঠকৃতি

কৌটিল্য কে ছিলেন? যীশুর জন্মের ৩০০ বছর আগে মৌর্য রাজবংশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর অন্য দুটি নাম চাণক্য ও বিষ্ণুগুপ্ত। প্রায় ২৪০০ বছর আগে এই ব্রাহ্মণ প-িত (তখন ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কোন বর্ণের বই পড়ার অধিকার ছিল না) কূটনীতিক হিসেবে এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন যে আজও তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে স্মরণীয় ও জনপ্রিয়। তাঁর রচিত অর্থশাস্ত্রর বয়স প্রায় ২৪০০ বছর হলেও, ভাবনা-চিন্তায় তিনি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ছিলেন আধুনিক। পরিবেশ ও ইকোলজি নিয়ে, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কৌটিল্যের ভাবনা-চিন্তা যুগের প্রেক্ষিতে ছিল উত্তর-আধুনিক। অর্থনীতি, কৃষি নীতি, জমি নীতি, কুটির শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তিনি অর্থশাস্ত্রে যেসব কথা লিখে গেছেন, তা পাঠ করে আমরা বিস্মিত হই, কেননা আজকের শিল্প বিপ্লব সম্পৃক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও পরিবেশ নিয়ে, নগরায়ণ যেসব নির্দেশ দিয়েছিলেন তা আজও প্রাসঙ্গিক।

সম্প্রতি বিশ্বায়ন, লিবারেল অর্থনীতি ও ফ্রি-মার্কেটের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে বিতর্ক, প্রতর্ক চলছে; বিশেষত ২০০৮-এ এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে পুঁজির ধস নামে। ভারতেরও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে নানামুনির নানা মত। রাষ্ট্রও বুঝতে পারছে লিবারেল অর্থনীতি, মুক্ত বাজার, ক্রোনি-পুঁজিবাদ ও ডাভোস শিল্পপতিদের হাতে চলে গেলে দেশের মানুষের মঙ্গলের বদলে কিছু শিল্পপতির লোভী কামনা বাসনা পূরণ হবে, মানুষের কোনো উপকার হবে না। মানুষ নতুন পথ বিকল্প পথ খুঁজছে। এ-সময় পথহারা রাষ্ট্র নেতাদের, রাজনীতিকদের, অর্থনীতিকদের বিকল্প পথের সন্ধান দিতে পারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি, মানব উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা কি হওয়া উচিত— তা এই শাস্ত্রে আছে। আমার তো মনে হয় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের কথা শুধুমাত্র দু-তিনটি শব্দে ইতিহাস বইয়ের পাতায় না রেখে, এ দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বইটির নির্যাস পাঠ্য তালিকায় রাখা উচিত। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র শুধুমাত্র অর্থশাস্ত্র না, তা মানব উন্নয়নে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সাহায্য করবে। আমরা কেউ কি ভাবতে পারি? সেই সুদূর অতীতে কৌটিল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রাণী ও অরণ্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন; ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশ-বাণিজ্য ব্যবসায়ীদের হাতে বা প্রাইভেট সেক্টরে নামমাত্র নিয়ন্ত্রণ রেখে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে দেশের ভালো ভালো খনিজ সম্পদের অধিকার রেখে, প্রাইভেট ব্যবসায়ীদের হাতে বিপজ্জনক খনিজ সম্পদ তোলার অধিকার লীজে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লবণ খনিতে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার রাখতে চেয়েছিলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতির রাশ রাষ্ট্রের হাতেই রাখতে চেয়েছিলেন : খনিজ বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, ট্রান্সপোর্ট, নৌকা ও জাহাজ উৎপাদন, গাড়িঘোড়া (বিশেষত রথ), মুদ্রা ও লবণ মন্ত্রক কৌটিল্যে ব্যক্তিগত মালিকানায় দিতে রাজী ছিলেন না। যদিও তাঁর সময় কৃষি অর্থনীতিতে প্রাইভেট ব্যবসায়ীরাও অংশগ্রহণ করতে পারত, কিন্তু সামগ্রিক সমস্ত সম্পদ রাষ্ট্রের অধিকারে থাকবে এই ছিল তাঁর মত।

রাষ্ট্র যাতে মসৃণ একটি যন্ত্রের মতো চলে, কৌটিল্য রাষ্ট্র সেক্টরে নানা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক বা বিভাগ তৈরী করেছিলেন। যেমন :

১.            রেভেনিউ মন্ত্রক

২.           অডিট ও অ্যাকাউন্ট মন্ত্রক

৩.           ট্রেজারি বা কোষাগার মন্ত্রক

৪.           সোর বা গোডাউন মন্ত্রক

৫.           খনি বা ফ্যাক্টরি মন্ত্রক

৬.           সোনা মন্ত্রক

৭.           শস্যভা-ার মন্ত্রক

৮.           ব্যবসা-বাণিজ্য মন্ত্রক

৯.           অরণ্য মন্ত্রক

১০.         অস্ত্রাগার মন্ত্রক

১১.         ওজন ও পরিমাপ মন্ত্রক

১২.         স্পেস ও সময় মন্ত্রক

১৩.         কাস্টমস্ মন্ত্রক

১৪.         নৌ মন্ত্রক

১৫.        কৃষি মন্ত্রক

১৬.        কোহল বা সুরা মন্ত্রক

১৭.         পশুবধ্ (খাবারের জন্য) মন্ত্রক

১৮.         বারাঙ্গনা (বেশ্যা, সুভাসুন্দরী, রাজনর্তকী) মন্ত্রক

১৯.         জাহাজ মন্ত্রক

২০.        প্রাণী মন্ত্রক

২১.         অশ্ব মন্ত্রক

২২.        হাতি মন্ত্রক

২৩.        রথ মন্ত্রক

২৪.        পদাতিক বাহিনী মন্ত্রক

২৫.        সেনাবাহিনী মন্ত্রক

২৬.       পাসপোর্ট ও তৃণভূতি মন্ত্রক

২৭.        গ্রামশাসন মন্ত্রক (বর্তমানে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা)

২৮.        গুপ্তচর বিভাগ

২৯.        শহরশাসন মন্ত্রক (পৌরসভা বা কর্পোরেশন)

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে উল্লিখিত এইসব বিভাগ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সবচেয়ে যেটা বিস্ময়কর মৌর্যবংশের বিশাল সা¤্রাজ্য তো শুধুমাত্র ভারত ছিল না, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে এক উপমহাদেশীয় ভারতবর্ষ ছিল। আর এই বিশাল সা¤্রাজ্য পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল তা শুধু কর আদায়ে সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রের অন্যান্য মন্ত্রকের আয় থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান আসত। রাষ্ট্রের হাতে যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল, সেখান থেকেও আয় হত। রাষ্ট্র (মৌর্য রাষ্ট্র) তখন প্রাকৃতিক সম্পদের উৎসগুলি যেমন অরণ্য, পাহাড়, নদী, লেক ও জলাশয়, খনিজ সম্পদ, জলসম্পদ বর্তমানকালের রাষ্ট্রগুলির মতো শিল্পপতি বা বহুজাতিক কর্পোরেটের হাতে তুলে দেয় নি। ফলে এইসব ক্ষেত্রের থেকে রাষ্ট্রের একচেটিয়া আয় হতো। অর্থশাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী প্রযুক্তির উন্নতিকল্পে ও উৎপাদন বাড়াতে রাষ্ট্র-ই দায় দায়িত্ব নিত, তা কোনো ব্যক্তিগত মালিকানায় তুলে দিত না। বর্তমানে আমরা দেখি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে রাষ্ট্র পরিকাঠামো করে দিচ্ছে। সস্তায় বা বিনে পয়সায় রাষ্ট্রের সম্পত্তি লীজ দিচ্ছে। আর যা কিছু বিজ্ঞান প্রযুক্তির পরিকাঠামোর মুনাফা বেশি যা বিদেশী কর্পোরেট হাউসের ঘরে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্র সবসময়ই নির্ভর করেছে শেয়ার বাজারে জুয়াবোর্ডের ওপর। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে কিন্তু এই পরনির্ভরশীলতার ব্যাপারটিকে মূলেই কুঠারাঘাত করা হয়েছে। সেখানে জোড় দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের সক্রিয়তা ও রাষ্ট্রীয় মুনাফার ওপর। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রায় সর্বত্রই জনস্বার্থে যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে তা আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি, বা পোস্ট মডার্নিজমের প্রবক্তারা কখনও মেনে নেবেন না, বিশেষত এই বিশ্বায়ন সম্পৃক্ত লিবারেল অর্থনীতির যুগে, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ শিথিল করে মুক্তবাজারের হাতে (যদিও প্রকৃত অর্থে বাজারটি মুক্তবাজার না, মার্কিন কর্পোরেট হাউজ নিয়ন্ত্রিত বাজার) দেশের অর্থনীতিতে ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে। লিবারেল অর্থনীতিতে পুঁজিপতি স্বার্থের কথা বলা হচ্ছে, এর মধ্যে কোন জনস্বার্থ নেই। অন্যদিকে উত্তর-আধুনিকরা সবসময়ই বৃহৎ কোনো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, কেননা তাঁরা মনে করেন রাষ্ট্র মানেই শোষক ও শাসকের প্রতিনিধিত্ব করে জনগণকে শোষণ ও নিপীড়ন করা। উত্তর-আধুনিকরা অন্য অর্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হ্রাস চান এবং তাঁরা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরোধী। সাম্প্রতিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির তাঁরা তীব্র সমালোচক। দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুঁজিপতিদের লক্ষ্য ও অভিমুখ এক এবং  উত্তর-আধুনিকতার লক্ষ্য ও অভিমুখ অন্য।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রের অডিট ও অ্যাকাউন্টিং নিয়ে যেসব পদ্ধতির কথা বলা আছে, তা আমাদের সময়ের উত্তর-আধুনিক উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বিস্ময়কর! কিভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগে আয়-ব্যায়ের হিসাব হবে, কিভাবে সে সব হিসাবের রেকর্ড রাখা হবে, অফিসারদের ও কর্মচারীদের দায়-দায়িত্ব কি কি, কিভাবে আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এসব হিসেবের ক্ষেত্রে গরমিল করলে অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি কি হবে তা তিনি অর্থশাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

আমরা অনেকেই ভাবি, আধুনিককালে বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উত্তর-আধুনিককালে নানা লোক হিতকর, জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়েছে— কিন্তু সুদূর সেই  মৌর্যযুগে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে জনকল্যাণমূলক কাজে রাষ্ট্র যাতে মনযোগ দেয় তার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। প্রজাদের সুখেই রাজা সুখী হতে পারবেন। প্রজাদের কল্যাণে তাঁর কল্যাণ হবে এবং রাষ্ট্র শাসনে লাভ হবে। নিজের উন্নতি রাজার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, জনগণের উন্নতিই রাজার লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রে আমার কি দেখি? ধরা যাক, এই গণতান্ত্রিক ভারত নামক রাষ্ট্রেযেখানে রাষ্ট্র চালান যেসব জনপ্রতিনিধিরা, তাঁরা দুর্নীতিপরায়ণ, বাহুবলী, নিজেদের উন্নতিতেই মন দেন, জনগণের কথা বিন্দুমাত্র ভাবেন না।

দেশের অর্থনীতর নিয়ন্ত্রণে ও সমৃদ্ধিতে কর আদায়ে কি নীতি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করা উচিত তা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আছে। অবশ্য কৌটিল্যের সময় অর্থনীতি আজকের মতো জটিল ছিলো না। ফলে তাঁর নীতির সুফল সে সময় মৌর্য রাষ্ট্র পেয়েছে। সে সময়েও কেউ কর ফাঁকি দিলে তার শাস্তি হত। যিনি ট্যাক্স আদায় করতেন, তাঁর অফিসে বণিকদের সব নথিপত্রের রেকর্ড থাকত। সে সব জিনিস বিদেশে রপ্তনি করা যাবে না, তার মধ্যে ছিল: সামরিক অস্ত্রশস্ত্র, নানা ধাতব পদার্থ, রথ, গয়না বা অলঙ্কার, শস্য ও কোনো প্রাণী। এ ধরনের জিনিস কেউ পাচার করলে তার ফাইন ও অন্যান্য শাস্তি হত। পাচার করা জিনিস বাজেয়াপ্ত হত। অন্যদিকে রাষ্ট্রে কোন ক্ষতিকর বস্তু আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ধর্মীয় পুজো পার্বনের দ্রব্যসমূহে, বিয়ের সাজপোশাক ও অন্যান্য সামাজিক উৎসবে ব্যবহৃত দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে কোন ট্যাক্স লাগত না। আমাদের পোস্টমডার্ন সমাজেও এরকম ব্যবস্থা নেই। যদিও এরকম ব্যবস্থা দেখা দিচ্ছে তা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বার্থে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসার নিরাপত্তা ও রাস্তাঘাট ভালো রাখার স্বার্থে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে যুগেও ট্যাক্স আদায় করা হত। বর্তমান আধুনিক ব্যবস্থার মতোই  মৌর্যযুগে যেসব বিদেশী পণ্য দেশের পক্ষে উপকারী সেসবের ক্ষেত্রে নামমাত্র কর লাগত। করের নানা স্তর ভাগ করেছিলেন কৌটিল্যে। কৌটিল্যে সবসময়ে সারপ্লাস বাজেটের পক্ষপাতি ছিলেন কিন্তু এই আধুনিক সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আমরা ডেফিসিট বাজেট পাশ করতে দেখি। শ্রমবিভাজন থেকে যে ভারতে বর্ণপ্রথার উদ্ভব তার পরিচয় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও আছে। পোস্টমডার্ন পৃথিবীতে বিভিন্ন প্লানে, কারখানায় বা ক্যাম্পাসে যাই উৎপন্ন হোক তাতে সমগ্র শ্রমজীবী সমাজের কিছু না কিছু অংশগ্রহণ থাকে, মৌর্যযুগে শ্রম বিভাজন আজকের মতো জটিল না, ফলে শ্রম বিভাজন জাত-বর্ণ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হত। আধুনিক সময়ে জাত বর্ণপ্রথা লোপ পেতে চলেছে। মানব প্রকৃতিতে ও সমাজে নানা গুণগত পরিবর্তন এসেছে। ফলে জাতিভেদ প্রথা ফেরার সম্ভাবনা এ যুগে নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির ফলে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে এক দেশের মানুষ অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, কোন অর্থনীতিতে এদের আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এক জটিল পদ্ধতি, যা আজ থেকে প্রায় ২৪০০ বছর আগে ভাবা যেত না। কিন্তু একটু নজর করলে, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের প্রভাবের নির্যাস এসব ক্ষেত্রেও চোখে পড়বে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র শ্রম বিভাজিত সমাজের বর্ণভেদ প্রথা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হত। এখন তা আর হয় না। আঠারো, উনিশ বিশ শতকে শিল্প বিপ্লব যে আধুনিক পৃথিবী তৈরী করেছে সেখানে বৃহদায়তন কলকারখানার ওপর জোর দেওয়া হত, সেখানে এক একটা কারখানায় হাজার হাজার মানুষ কাজ পেতেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে পোস্টমডার্ন পৃথিবী তৈরী হতে শুরু করল, সেখানে দেখা গেল (বিশেষত ম্যানুফ্যকচারিং শিল্পে) বড় বড় কলকারখানা পোস্টমডার্ন পৃথিবীর পণ্য চাহিদার বাজারে ক্রমশ সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে; নতুন নতুন প্রযুক্তি এসে যাওয়ায় এবং তা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ছোট ছোট কারখানা বা ক্যাম্পাসের প্রতি শিল্পপতিদের ঝোঁক বাড়ছে। আগে কোন কারখানায় ১৬০০০ মানুষ যে পণ্য উৎপাদন করতেন, তা ৪০ জন মানুষই বর্তমানে করে নেওয়া যাচ্ছে। পোস্টমর্ডানদের মতো পোস্টমডার্ন শিল্পপতিরাও দেখা দিলেন। বর্তমানে বিভিন্ন আধুনিক রাষ্ট্রও মনে করছে পুরোনো দিনের কলকারখানা বাতিল। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ যে বেকার হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য এবং নতুন যে যুবসমাজ কাজের বাজারে কাজ খুঁজছে তাদের জন্য তো কাজ চাই। এ জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা হল ছোট ছোট বৈচিত্র্যময় শিল্প তৈরী করা, যা প্রচুর মানুষকে কাজ দিতে পারবে; পোস্টমডার্ন বড় বড় কারখানার পক্ষে যা সম্ভব না। পোস্টমডার্ন এই ভাবনার খোঁজ কিন্তু আমরা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পাচ্ছি। যদিও তিনি যা কিছু শিল্পায়ন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছেন। বিগত শতকের আট ও নয়ের দশক থেকে বিশ্বায়ন ও লিবারেল অর্থনীতি প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীজুড়ে বেকারত্বের সমস্যা ভয়ঙ্করভাবে দেখা দিল। মডার্ন ও পোস্টমডার্ন শিল্প সমাহার লোক বেশি লাগে না, ফলে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে যারা শিক্ষিত বের হচ্ছেন, হাত থেকেও কাজ পাচ্ছেন না, ডিগ্রি থেকেও কাজ পাচ্ছেন না, কেননা নতুন প্রযুক্তি  দ্রুত বদলে যাচ্ছে, দক্ষ কর্মীর অভাব দেখা যাচ্ছে, আধুনিক সময়ের শিল্পায়নে এ সমস্যা ছিল না। একটা কারখানা হওয়া মানে হাজার হাজার লোকের কাজ। উত্তর-আধুনিক সময়ে সে সম্ভাবনা নেই। কম্পিউটার প্রযুক্তি নির্ভর সাইবার ক্যাম্পাসে যারা কাজ পাচ্ছেন, সেখানে কাজের কোনো নিরাপত্তা নেই। লিবারেল অর্থনীতি মালিক ও শিল্পপতিদের স্বার্থে এমন আইন করেছে যেখানে যে কোন কর্মকে অনায়াসে হায়ার ও ফায়ার করা যায়। ফলে জনসংখ্যা হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে না। লিবারেল অর্থনীতিতে যেসব কলকারখানা বা সাইবার ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছে তা কখনই কোন দেশের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, বরং বাড়াবে। যার ফলে ইউরোপ আমেরিকার মতো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তেও কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ও বিক্ষোভ বাড়ছে। ভারতের মত কৃষিপ্রধান দেশেও কৃষকের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে, চাষ করবার মতো চাষযোগ্য জমির অভাব।  কৃষি প্রযুক্তি উন্নত করতে হলে বড় বড় জমির প্রয়োজন তা নেই। যার ফলে নানা সংকট ও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে হস্তশিল্প বা কুটিরশিল্পে জোর দিয়ে। কৌটিল্যের সময় কুটিরশিল্প মানুষের বেকারত্ব ঘোচানোর ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করত। ফলে আমাদের লিবারেল অর্থনীতির বিকল্প তৈরী করতে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, রাষ্ট্র পরিচালকদের হার্ভার্ড-অক্সফোর্ড ডিগ্রির বদলে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পাঠ নিতে হবে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রকে যুগের উপর্যুক্ত করে নিলে ভারতের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের যে দুটি বিষয় ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে পোস্টমডার্ন চিন্তা মনে হয়েছে, তা হল পরিবেশ ও ইকোলজি ভাবনা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে চিন্তা। আজ থেকে ২৪০০ বছরের পেছনের পৃথিবীতে বসে কৌটিল্য পরিবেশ ও ইকোলজি নিয়ে আধুনিক পরিবেশবিদদের মতো ভেবেছেনে। বেশ বিস্ময়কর অগ্রবর্তী চিন্তা। ভারতে যখন বিশ্বায়নের হাওয়া বিগত শতকের নয়ের দশকে লিবারেল অর্থনীতির অনুপ্রবেশ ঘটল, তখনও এদেশের বেশির ভাগ রাষ্ট্র নায়ক, রাজনীতিকরা ইকোলজি সমস্যা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেছেন। বলেছেন পরিবেশের কথা ভাবলে দেশের উন্নয়ন হবে না। অথচ চাণক্য বা কৌটিল্য মৌর্য রাজবংশ চালাতে গিয়ে সুদূর অতীত পরিবেশ ও ইকোলজি নিয়ে ভেবেছেন এবং রাষ্ট্রের আইনে পরিণত করেছেন। আর আমরা পরিবেশ ও ইকোলজি নিয়ে ভাবতে শুরু করি বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে ১. মানুষের বৈরী পরিবেশের বিপদ ২. প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিপদ ৩. আগুন থেকে বিপদ ৪. বন্যা থেকে পরিবেশ দূষণ ৫. দুর্ভিক্ষ মহামারি থেকে পরিবেশ দূষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তা থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে, তারও পথ বাতলে দিয়েছেন। কৌটিল্যের নির্দেশ এই উত্তর-আধুনিক একুশ শতকে প্রাসঙ্গিক। যেমন ১ নম্বর ক্ষেত্রে তিনি বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন অরণ্য ধ্বংস করলে হবে না, অরণ্য সৃজনও করতে হবে। রুখু বা টাঁড় জমিতে বন সৃজনের কথা যেমন বলেছেন, তেমনই তৃণভূমি পশুচারণের জন্য সংরক্ষণ করতে বলেছেন। কৌটিল্যের মতে রাজা ও রাষ্ট্রকেই এ ব্যাপারে আইন করতে হবে, তা যাতে ঠিকভাবে কার্যকরী হয় তার দেখভাল করতে হবে। আমলাদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে হবে। অরণ্য সম্পদ, জল সম্পদ, খনিজ সম্পদ রাষ্ট্রকেই রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রে বেসরকারি বাতিঘর যত্রতত্র করা চলবে না, রাস্তাঘাট, শ্মশান তৈরীর সময় পরিবেশ  দূষণ যাতে না ঘটে তা দেখতে হবে। রাষ্ট্রের আমলাদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি বাড়ি তৈরীর সময় আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। যারা এ ব্যাপারে আইন মানবে না তাদের শাস্তি পেতে হবে। প্রতিটি বাড়ি তৈরীর সময় বাড়ি থেকে জল ও নোংরা বেরিয়ে যাওয়ার নালা নর্দমা রাখতে হবে। এসব ব্যবস্থা না রেখে বাড়ি করলে ফাইন ও শাস্তি। মৌর্য সা¤্রাজ্যের নাগরিকদের ইকোফ্রেন্ডলি করার ব্যাপরে কৌটিল্যের ভাবনা চিন্তা ছিল। পথের যেখানে সেখানে পায়খানা পেচ্ছাব করা চলবে না, কোন পাবলিক প্লেসে বা হাইওয়েতে পায়খানা, পেচ্ছাবের মতো অপকর্ম চলবে না। কিন্তু বুদ্ধিমান কৌটিল্য এইসব অপরাধে শাস্তিতে ছাড় দিয়েছিলেন রোগী ও অসুস্থ মানুষদের। নগরের যেখানে সেখানে মৃতদেহ ফেলা বা পোড়ানো ছিল অপরাধ। নির্দিষ্ট শ্মশানে মৃতদেহ পোড়াতে হবে। জনগণের ব্যবহারের স্থানগুলি যেমন পানীয় জলাধার, জলাধার ঘিরে বাঁধ, বা সামাজিক অনুষ্ঠানের স্থান কেউ যাতে না দূষিত করে সে ব্যাপারে আইন ছিল- যা এই একুশ শতকে নানা আইন থাকলেও, আমরা পালন করি না। আর যারা ক্ষমতাবান তারা তো কোন আইনের তোয়াক্কা করে না, পরিবেশ ও ইকোলজি নিয়ে ভাবনা চিন্তা তাদের কাছে হাস্যকর ব্যাপার। ২ নম্বর ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রকৃতিক বিপর্যয় তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলো ছার, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো উত্তর-আধুনিক রাষ্ট্রগুলিও মোকাবেলা করতে পারে না। কৌটিল্য কিন্তু ডিজাস্টার ম্যানেজম্যান্টের কথা ভেবেছিলেন। কোন স্থানে কি ধরনের প্রাকৃতিক  বিপর্যয় ঘটতে পারে তা পূর্বাহ্নে অনুমান করে, রাষ্ট্রকে বিপর্যয় মোকাবেলার ব্যবস্থা নিতে বলেছেন, যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয় বলতে তিনি মনে করতেন আগুন লাগা, বন্যা, মহামারি, দুর্ভিক্ষ. ইঁদুরের দৌরাত্ম্য (বিশেষত ফসলের ক্ষেতে), বুনো প্রাণির আক্রমণ, সর্প দংশন এবং ভূতপ্রেতের দৌরাত্ম! এই ভূতপ্রেত বিশ্বাস, বা অন্ধ বিশ্বাস আজও মানুষের আছে, চাণ্যক্যের যুগে তো ছিলই। চাণক্য নিজে এসবে বিশ্বাস না করলেও জনগণের বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়ে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

নগরে যাতে আগুন না লাগে, সে ব্যাপারে নাগরিকরা কি কি ব্যবস্থা রাখবেন তা আগেই বলেছি। এ ব্যাপারে নগরপালের দায়িত্ব নাগরিকদের ওপর নজর রাখা। বিশেষত গ্রীষ্মকালে কারো থেকে নগরে যাতে আগুন না লাগে, সে ব্যাপারে নাগরিকরা কি রকম উপাদানে বাড়িঘর করবেন, আগুন নেভানোর কি কি ব্যবস্থা রাখবেন, রান্নাঘর কোথায় করবেন, কি কি জিনিস আগুন নেভাতে মজুত রাখবেন তার সমূহ নির্দেশ অর্থশাস্ত্রে দেওয়া আছে। এক্ষেত্রে নগরপালের দায়িত্ব নজরদারি রাখা। কেউ নিয়ম না মানলে শাস্তি দেওয়া। আগুন নিভানোর ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেও রাখতে হবে।

বন্যা থেকে বাঁচার নানা উপায় কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে বলেছেন। বর্ষাকালে গ্রামের লোকদের নিচু জলাজমি থেকে উঁচুস্থানে চলে যেতে বলেছেন। হাতের সামনে কাঠের তক্তা, বাঁশ ও নৌকা মজুত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। বন্যার মোকাবিলার দলবেঁধে কাজ করতে বলেছেন। বন্যা দুর্গত মানুষদের সাহায্য করার কথা নীতিগতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে বলেছেন।

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কি করা কর্তব্য তারও নির্দেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রকেই আগে ভাগে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। যাতে দুর্ভিক্ষের দেখা দিলেই রাজা বা রাষ্ট্র দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। তাহলে দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি কমবে। দুর্ভিক্ষ নিয়ে চাণক্য এমন একটি নির্দেশ দিয়েছেন, যা কোন আধুনিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্র পরিচালকরা মানবেন না। কোন রাষ্ট্র যদি দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে না পারে রাজার পদত্যাগ করা উচিত তিনি বলেছেন। একুশ শতকে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এরকম বিধান থাকলে ভালো হতো। রাষ্ট্রপ্রধানরা মানুষকে অনাহারে রেখে গুদামে টনটন খাবার নষ্ট করার ব্যাপারে দশবার ভাবতেন। কৌটিল্য মনে করতেন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশ ও ইকোলািজ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের আরো একটি উল্লেখযোগ্য অবদান নারীর ক্ষমতায়ন। এ বিষয় নিয়েও আমরা আধুনিক মানুষ সবে মাত্র বিশ শতকের সত্তরদশক থেকে ভাবতে শুরু করেছে। অথচ কৌটিল্য ভেবেছিলেন ২৪০০ বছর আগে! নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি যেসব কথা বলেছেন তা এই একুশ শতকেও কার্যকর করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অথচ মৌর্যসাম্রাজ্যের চাণক্যের প্রধানমন্ত্রীত্বে সম্ভব ছিল। নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের কিছু কিছু তথ্য আমারা প্রাচীন ভারতের সাহিত্যে পেয়েছি। আমাদের দেশের নারীরা মার্কিন নারীদের আগেই ভোটের অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে ঢোকার অধিকার পেয়েছেন। নানা কাজের ক্ষেত্রেও আইন তৈরীর ক্ষেত্রে তাঁদের রিজারভেশান রয়েছে। কিন্তু নারীরা এখনও এদেশে অর্থনীতিক নিরাপত্তা বা যৌন হয়রানি থেকে নিরাপত্তা পান নি। খাপ-পঞ্চায়েত থেকে উদ্ধার পাননি। নারী ধর্ষণ করেও ধর্ষকরা দিব্যি জনপ্রতিনিধি হয়ে পার্লামেন্ট আলো করে বসে আছেন। নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের একই রায়। ভোটের রাজনীতির প্রয়োজনে তাঁরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেন, কিন্তু তা কার্যকরী করেন না। নারীর সম্পদের অধিকার, যৌন নিরাপত্তা, মর্যাদার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি নিয়ে কৌটিল্য ভেবেছিলেন এবং মৌর্য সা¤্রাজ্যের আইনে পরিণত হয়েছিল। নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে কৌটিল্য যে বিষয়গুলো অর্থশাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক :

১.            অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

২.           বিধবার সম্পত্তির অধিকার

৩.           স্বামীর কিছুদিনের অনুপস্থিতিতে পুনর্বিবাহ

৪.           স্বামীর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির কারণে বিবাহ

৫.           স্বামী নির্দিষ্ট সময়ে না ফিরলে পুনর্বিবাহের শর্ত

৬.           নারীর সম্পত্তির অধিকার

৭.           নারীর উপর পুত্র/ কন্যা নির্ভরশীল থাকলে … পুরুষের অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতীয় বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাহিত্যে আমরা স্ত্রী-ধনের উল্লেখ দেখি। কিন্তু স্ত্রী-ধন বলতে সাধারণত বোঝায় সম্পত্তি, গয়নাগাটি, টাকা পয়সা যা দিয়ে নারী তার ছেলে-মেয়েকে প্রতিপালন করতে পারে। বিয়ের সময় স্বামী, বা তার বাড়ির লোকজন কনেকে স্ত্রী-ধন অর্পণ করত। সমাজে স্বামীর ক্ষমতা ও আইন অনুযায়ী এই স্ত্রী-ধন নির্ধারণ করা হত। সব ক্ষেত্রেই দেখা হত স্বামী স্ত্রীকে ছেড়ে গেলে, বা অন্য কোন নারীকে বিয়ে করলে, বা মারা গেলে স্ত্রী যাতে স্ত্রী-ধনের জোরে সন্তানদের ও নিজেকে রক্ষা করতে পারে। স্ত্রী-ধন রক্ষা আইন বাধ্যতামূলক ছিল, যা নষ্ট করলে শাস্তি ছিল। স্ত্রী বা স্বামী যে কেউ জীবিতকালে এই স্ত্রী-ধন ব্যবহার করতে পারত বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে। যেমন : স্বামীর অনুপস্থিতিতে ছেলেমেয়েকে প্রতিপালন, কোন দুর্যোগ দুর্বিপাকে বা কোন ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। শিশু জন্মের পর সামাজিক পুজোপার্বণে ও রীতিনীতি পালনের উৎসবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই স্ত্রী-ধন খরচ করতে পারেন।

কোন বিধবা যদি দ্বিতীবার বিয়ে না করেন, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি স্ত্রী-ধন নিয়ে বেঁেচে থাকতে পারেন অর্থাৎ সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারেন। নতুন কাউকে বিয়ে করলে নারী স্ত্রী-ধনের অধিকার হারান কিন্তু কোন ধর্মীয় কাজে তা তিনি ব্যবহার করতে পারেন যদি পূর্বপক্ষের সন্তান না থাকে। পূর্বপক্ষের সন্তান থাকলে একমাত্র সেই সন্তানের জন্য স্ত্রী-ধন ব্যবহার করতে পারেন। সন্তান নেই এমন কোন বিধবা যদি পুনর্বিবাহ করেন পরিবার ও সন্তানের কামনায়, সেক্ষেত্রে তিনি স্ত্রী-ধন ব্যবহারের অনুমতি পাবেন যদি স্বামীর বাড়ির কাউকে বিয়ে করেন। স্বামী পরিত্যাগ করেও কোন নারীর স্ত্রী-ধন ব্যবহার করতে পারেন যদি স্বামী বিদেশে থেকে না ফেরে, সমাজ থেকে বিতাড়িত হয় বা যৌন ক্ষমতায় অক্ষম হয়। সুদূর মৌর্যযুগে কৌটিল্য এসব নিয়ে লিখেছিলেন ভাবতে বিস্ময় লাগে।

নারীর পুনরায় বিয়ের ব্যাপারে কৌটিল্যের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, কোন কোন পরিস্থিতিতে নারী কতদিন স্বামীর ফেরার জন্য জন্য অপেক্ষা করবে, স্বামী না ফিরলে অন্য কাউকে বিয়ে করবে। কিছুদিনের মধ্যে ফিরবে বলে স্বামী হয়তো অন্যত্র চলে গেছে, ফিরল না। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্রদের ক্ষেত্রে আইন ছিল— সন্তান নেই এরকম নারী একবছর অপেক্ষা করবে, সন্তান থাকলে দুবছর অপেক্ষা করবে (দু ক্ষেত্রেই স্বামী যদি না তাদের ভরণপোষণ করে)। ভরণপোষণ করলে যা বলা হয়েছে তার দ্বিগুণ সময় অপেক্ষা করবে। স্ত্রী-ধনেই সন্তান পালন করে জীবন চালাতে হবে।

দীর্ঘদিন স্বামী যদি প্রবাসে থাকে কোন ব্যবসায়িক বা অন্য কারণে, নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে না আসে, স্ত্রী তার জন্য অপেক্ষা করবে সেই নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত ও তার সাতবার ঋতু¯্রাব পর্যন্ত যদি সন্তান না থাকে। আর সন্তান থাকলে নির্দিষ্ট দিন ও একবছর অপেক্ষা করার পর স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করতে পারে। তবে স্বামীর বাড়ির কোন আত্মীয়কে বিয়ে করতে হবে। তা না হলে স্ত্রী-ধনের অধিকার হারাবে, আইন তার বিয়েকে স্বীকৃতি দিবে না, তাকে ব্যাভিচারিণী বলা হবে।

নারীর মৃত্যু হলে স্ত্রীধনে পুত্র/কন্যার অধিকার জন্মাবে (স্বামী মৃত বা জীবিত যাই হোক)। সন্তান না থাকলে স্ত্রী-ধনের একটা অংশ স্বামী পাবে (যদি স্বামী জীবিত থাকে), বাকী ধন অন্যান্যরা ভাগ করে নেবে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, পালাতক ভাই/বোন, অবিবাহিত বা বিধবা বোনকে প্রতিপালনের দায়িত্ব স্বামীর। তবে এদের মধ্যে কেউ সমাজ থেকে নির্বাসিত হলে, তার দায়িত্ব পালন করতে হবে না! কিন্তু মা সমাজ থেকে নির্বাসিত হলেও, তাঁকে প্রতিপালন করতে হবে। কেউ যদি সমাজ ধর্ম ছেড়ে মুনি/ঋষি হতে চায়, স্ত্রী ও সন্তানের প্রতিপালনের সমস্ত ব্যবস্থা করে তবেই সংসার সে সংসার ছেড়ে যেতে পারে। তা না হলে তার ফাইন ও শাস্তি হবে। নারীর ক্ষমতায়নের যে চিত্র আমরা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পাই, তা যেন এই চলমান আধুনিক সমাজের চিত্র। আমাদের পোস্টমডার্ন সমাজ ব্যবস্থাতেও নারী কৌটিল্যের সময়কালের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাও নারীর ক্ষমতায়নের অনেক পরিসর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নারীকে অর্ধেক আকাশ বলা হলেও সেই অর্ধেক আকাশকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পাথরযুগে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে।

আমরা বড় বড় মেগাপোলিসে বাস করতে পারি, গ্ল্যামারস নিওন আলোর জগতে ভেসে যেতে পারি, স্কাইস্পারে বদলে যেতে পারে আকাশরেখা; বড় বড় মিডিয়া, কর্পোরেট হাউসের পাশেই কিন্তু আছে ধারাভির মতো বস্তি, ভয়াবহ দারিদ্র্য, গৃহহীন মানুষ, নানা সমস্যা, যা প্রতি মুহূর্তে নিওন আলোর ঢেউয়ে মুছে যাচ্ছে। কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে, পরিবেশ ও ইকোলজি সমস্যা নিয়ে কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে যেভাবে ভেবেছিলেন, ইতিহাসে নারীদের যে একটা বিশিষ্ট স্থান দিয়েছিলেন, তা অবাক করে। আমরা নানা তত্ত্বের আলোতে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু ২৪০০ বছর আগে নারী যে ক্ষমতায়নের স্বাদ পেয়েছিল তা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রতিফলিত। তা এই একুশ শতকে আজও অধরা।