Archives

স্বরূপের সন্ধানে…

স্বরূপের সন্ধানে…

মামুন মুস্তাফা

এক.

আরব সাগর। ক্লিফটন সী বিচ। সন্ধ্যার মন্দ্রগাঢ় নিষাদে সমুদ্রগর্জন। রাতের সমুদ্র দর্শন কী ভয়ঙ্কর! কারো মুখ কেউ চেনে না। আমাকেই কী আমি দেখি? অক্টোবরের হিমবাতাস, লোনা ভিজে হাওয়া, আমার মুঠোয় ধরা সতীর্থের হাত একটু একটু করে খসে যাচ্ছে। আরব সাগর কূলে পা ভিজিয়ে ও কার ছায়া? দূর থেকে ভেসে আসছে সাইরেন। সবাই কেন দিগি¦দিক ছুটছে? আমি তখনও অন্ধকারের মায়ায় জড়িয়ে আমাকেই খুঁড়ে তুলি! ‘কে আমি? কী আমি? কেন আমি?’ ঘরে ঘরে এখনও যুদ্ধের দামামা বাজছে। পরাজিত সৈনিক ত্রাণ চায়, রাজার বিলাসিতা তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ছিন্ন মুণ্ডু নিয়ে। অথচ ৪৯ নং বাঙালি পল্টন ভেঙে গেছে। ফিরে গেছেন ঝাঁকড়া চুলের সফল সৈনিক। বাউণ্ডলের আত্মকাহিনী’র সেই ‘বাওয়াটে যুবক’, ঝিলাম নদীর তীরের ‘মেহের নিগার’ কিংবা রিক্তের বেদন’র বেদুঈন যুবতী ‘গুল’— তারা আজ কোথায়? তবে কী আমার মুঠো থেকে খসে যাওয়া হাতটি ছিল ওদেরই কারো? ওইসব যূথবদ্ধ রাগ-রাগিণীর ভেতরে আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ, পিপাসার্ত মন আরব সাগরের অতলে ডুব দেয়, আবার ভেসে ওঠে সিন্ধু নগরের প্রাচীন সভ্যতায়। আলোআঁধারে ঘেরা তক্ষশীলায় পা দিয়ে দেখি, ‘কী বিচিত্র এই দেশ!’

অথচ আমি আলো চাই, আলো, ভোরের অপেক্ষায় আমি ধ্যানস্থ। কেননা নিজের চেহারাই ভুলে গেছি। সিন্ধু নদের অববাহিকায় খুঁজে ফিরি বন্ধু সেলিমকে। ‘রওশন আরা’ কোথায় জিজ্ঞেস করবো তাকে। অথচ শালিমার গার্ডেন জীবনমৃতের ছায়া নিয়ে ঘুমিয়ে আছে এই আঁধারে। জীবনের মহাকাব্য রচনা করে রওশন আরা ‘আনারকলি’ হয়ে ফুটে আছে। ঢাকা বেতার থেকে ভেসে আসে বন্ধু সেলিমের কণ্ঠ— ‘তব জীবন্ত সমাধির বিগলিত পাষাণে/ আজিও প্রেম-যমুনার ঢেউ ওঠে উতলি/ আনার কলি, আনার কলি’।

অক্টোবরের হিম আরও জেঁকে বসেছে। তবু দূর হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা তার পরিচয় মেলে ধরে কলকল শব্দে। এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের আমি এক অন্ত্যজ। নিজেকে খুঁজতে গিয়ে দেখি যুগে যুগে শোষক আর শোষিতের

দ্বন্দ্বে পরাজিত সাধারণ মানুষ— তাদেরই অংশ আমি। ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি, গঙ্গোত্রীর বুকে নিকষ কালো আঁধার! ভাগীরথীর জল কেন এত লাল? মোহম্মদী বেগের দুশমনি ছুরি খুন ঝরিয়েছে ভাগীরথীর তীরে। খোশবাগের লাল গোলাপের নিচে ছোপ ছোপ রক্ত। আলেয়ার চিরন্তনী হাসি মুর্শিদাবাদের বাতাসকে ভারী করে তোলে। তারও আগে গিরিয়ায় ডুবে গেছে নীরব সূর্য। আলিবর্দী প্রজাহিতৈষী কর্মসূচির মধ্যে মুছে দিলেন প্রভু হত্যার ভুল স্বপ্ন। তারই খেসারত নবাব সিরাজের ছিন্নভিন্ন দেহ। ‘নেমকহারাম দেউরি’ কোনো উপকারেই আসেনি ভারতবাসীর। শুধু যুগে যুগে যুদ্ধ, পতন, ক্ষয়, প্রেম আর বিচিত্ররন্ধনশালার ভেতরে ডুবে গেছে মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, ফুল ও গানেরা। সাধারণ মানুষের ভবিষ্যতের কোনো পথ আঁকেনি স¤্রাট ও নর্তকী।

আমি আজও আলো খুঁজতে খুঁজতে অন্ধকারেই ডুবে আছি। সেই আলোর সন্ধানে হিমালয়ের কাছে হাত পেতে দাঁড়াই। ‘আমিত্ব’কে ছুঁতে গিয়ে স্পর্শ পেলাম— মেহের নিগার, আনারকলি, আলেয়া কিংবা মায়ার। ‘মায়া কা হোটেল’— হিমালয়ের পাদদেশে যে মেয়ে ট্যুরিস্টদের গাইড হয়ে জীবনসংসার বয়ে নিয়ে যেত— তার চোখে কোনো স্বপ্ন ছিল না। রওশন আরার কী ছিল, অথবা আলেয়ার? রওশন আরা ঘর আর সংসার চাইতে গিয়ে জীবন্ত সমাধি ললাটে লিখে নিল, আলেয়া দেশকে ভালবেসে জীবন দিল। আর মায়া? তাদের উত্তরসূরি হয়ে জীবনের দেনাগুলো শুধে যাচ্ছে অনেক সহযাত্রী মনের স্বপ্নের অঞ্জলি হয়ে। জানি না সে আজ কোথায়? পোখারার বাতাসে মায়ার নিঃশ্বাস হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়েছে কী?

এ-সবই রাজ-রাজড়ার কাহিনি। শোষক আর শোষিতের পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব, সাধারণ মানুষ সেই রেসের ঘোড়া। দ্বি-জাতিতত্ত্বের শিকার তারা। ধর্মে যদিও মুসলমান। কিন্তু আমার সে ধর্ম ছিল সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে। আমি সেই উদার মানবিকতা নিয়ে যতই দাঁড়াতে চাই, আমাকে খণ্ডিত করে দ্বি-জাতিতত্ত্ব, ভৌগলিক সীমানা, পরাক্রান্ত বিশ্ব রাজনীতি। তখন বিবেকের কাছে এসে কথা বলে আজন্ম ইতিহাস— ’৪৭-এর দেশভাগ শুধু ভারতবর্ষকে ভারত ও পাকিস্তান এই দুটি দেশে ভাগ করেনি, বাংলাদেশকেও করেছে বিভক্ত। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও বিভক্ত করলো পাঞ্জাবকে। অনেক সুকৌশলে কাশ্মীরকে করলো দ্বিখণ্ডিত। আর এর ভিতর দিয়েই এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে রাখলো অনির্বাণ। তাই তো স্বাধীন কাশ্মীর আন্দোলনের সাথে যুক্ত যুবশ্রেণী কাঠমন্ডুর পথে পথে সাজিয়ে বসেছে পসরা আন্দোলনের অর্থ যোগাতে।

আজ এই ‘মগের মুলুকে’ দাঁড়িয়ে বিপরীত স্রোতে ভেসে চলি আমি ও আমার সত্তা। কিন্তু এই তমস আঁধারে কী করে বাড়ি ফিরবো। আলোর সুলুক সন্ধান আজও শেষ হয়নি আমার। তবু সাগরের লোনাজল থেকে ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আগামী বুঝি এবার সামনে দাঁড়িয়ে। মনে মনে আশার সঞ্চার হয়। নতুন আলোয় নিজেকে চিনবো তো? ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলায় চোখ মেলে দেখি কীর্তনখোলায় ভেসে চলে আমার ‘মন পবনের নাও’। আরব সাগর থেকে কীর্তনখোলা— সবখানে এক সূর্য আলো দেয়, এক দেশ। মানুষও কী এক?

ওই প্রশ্নের সন্ধানে দেখি তথ্য প্রযুক্তির যুগে দেশে দেশে রাজা-বাদশা এবং তাদের আমাত্যবর্গ জেঁকে বসছে কুয়াশার শরীরে, ধোঁয়াশায় ঘেরা সেই প্রাসাদ। একুশ শতকের মানুষ ক্রমশ হয়ে যাচ্ছে নাম-ঠিকানাহীন, দেশে দেশে যাযাবর। ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুরি হয় প্রজাবর্গের মনের অধিকার— তাদের বেদনা, দুঃখ, কষ্ট, এমনকি স্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে আমার স্বপ্নকে হারিয়ে নতুন সূর্যের আলোয় যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াই— দেখি একটাই পৃথিবী— সে আজ ‘হীরক রাজার দেশ’। আন্দামান নিকোবার, ময়না দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ— সবখানে ছায়া দীর্ঘ হয়। ‘আশা ও স্বপ্ন’ এবং ‘বিপ্লব ও বিপ্লবী’র সকল গল্প শেষে ওই প্রলম্বিত ছায়ার ভেতরে বেড়ে ওঠে যে মুখ, সে এক সম্পূর্ণ মানুষ। তখন কবির সাথে সাথে পৃথিবীর সকল মানব-অন্তর গেয়ে ওঠে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।

২.

‘মানুষ’— নতুন এ প্রশ্নের সন্ধানে এবার আমার ‘যাত্রাভাসান’! চারদিকের হলাহল আর কোপানলের ভেতরে মৃত্যুর ঘন স্বাদ চেখে নিতে নিতে মনে পড়ে, ‘জরায়ু আমি জরায়ু ছিলাম, …/ মায়ের ভ্রƒণে গর্ভাশয়ে ফুলের মতো/ অমল ধবল ফুটতে ছিলাম’; সেই তো ভালো! মানুষের ভেতরে মানবিকতার অধঃপতনে মানুষ কী হবে আত্মমুখী, আত্মবিনাশী? তবু মানুষই তো আশা জাগিয়ে রাখে, স্বপ্নভরা দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় বিশ্বসমাজে। উত্তরণের এ এক আশ্চর্য শক্তি। আর তাই হাজারো দহনের মধ্যে, উজ্জীবনের আর বিষের মধ্যে প্রবাহিত আমার অমৃতের স্রোতস্বতী। দাহ, ব্যথা, অগ্নিদগ্ধ— সভ্যতার এই সমস্ত গরল ও যন্ত্রণার নিবিড় উপলব্ধি আমি পাঠ করি নিঃসঙ্গ মহাসড়কের জীবন অনুধ্যানে।

এত কোলাহল, যন্ত্রচালিত যানের দৌরাত্ম্য, শশব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি, হকারের চিৎকার, হাজারো মানুষের শোরগোল— তবু মহাসড়ক একা শূন্য! তাকে ব্যবহার করে ঘটে নগর উন্নয়ন, সমাজপতির উত্থান; তার বুকেই আবার দুর্ঘটনা। রক্তপাত, বিভীষিকাময় মৃত্যুর মতো নির্জনতা— এসবই তো নীরবে দাঁড়িয়ে দেখে মানুষ। মধ্যদুপুরে চিরধরা রোদের হলকা নিয়ে একা রাজপথ, আবার মধ্যরজনীতে আলোআঁধারে নির্জন সড়ক মৌনকাতর। আমার গমনেচ্ছু পা থমকে যায়। গন্তব্যে পৌঁছুতে পৌঁছুতে মনে হয় আগামীকালের উদিত সূর্যের মধ্য দিয়ে যে সমাজ জেগে উঠবে তার সাথে একুশ শতকের মানুষের সম্পর্ক কতটুকু? স্বার্থপরতার দলিল লেখা ছাড়া আর কোনো উইল নেই জাগতিক সংসারে। আর তাই রতনকে একা করে ফিরে যায় পোস্টমাস্টার, কুসুম নিঃস্ব শূন্য হয়ে ফেরে পিতৃভিটায়।

সমাজ অভ্যন্তরে সংঘটিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদমন, মানবিক শূন্যতার বিপর্যয় সৃষ্টি করে স্বকাল-সংকট। তখন লোকাচার, রীতি-নীতি, প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনুভব করি এক মানুষের স্বরূপ, তার বিচিত্র চেহারা। সে কী আমারই? নিবিড় নিঃসঙ্গতা, প্রকট শূন্যতা জেঁকে বসে অহোরাত্র। ইচ্ছে জাগে এই মানবিক বিপর্যয়ে কলমকেই অস্ত্র করে তুলি। এই পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া রুশ বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব, এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তারই ফলশ্র“তি। যে ক্ষোভ আর যন্ত্রণার ভেতরে রচিত হয়েছে ওয়্যার এন্ড পীস, লা মিজারেবল, হ্যামলেট এবং এই বাংলায় গোরা কিংবা মৃত্যুক্ষুধা— তার প্রধান উপাদান মানুষ। মানুষেরই চাওয়া-পাওয়া, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, হাহাকার, শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতার চিত্ররূপ।

আর তাই বর্তমান মানুষের দিনলিপির ভেতরে আমি খুঁজে পেলাম আত্মজীবনী, প্রতœতত্ত্ব, পুরাণ ও ধর্মের কোলাজ। নৃতত্ত্ব ও ঐতিহ্যকে স্বীকার করে নিয়েই প্রকৃতির জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের ছন্দ। আর প্রকৃতির অন্ধ অনুসরণে মানুষের ঐতিহাসিক চেতনার উপলব্ধি ঘটে। মানুষের সেই ঐতিহাসিক চেতনার অনুষঙ্গে ঠাঁই করে নিয়েছে স্মৃতি ও বর্ণনা, চেতন ও অবচেতন, বর্তমান ও অতীত; আর এসবের মধ্যে অবিরত ও দ্রুত চলেছে মানব-অস্তিত্বের যাতায়াত।

কাল পরিক্রমায় এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিক বিশ্ব-মানুষ তার জাতিগত ও পরিবারগত ঐতিহ্য অর্থাৎ তার মূলের সঙ্গে যোগ হারিয়েছে, সে কোনো রাষ্ট্রিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব মানতে প্রস্তুত নয়। তাই বারবার নিজেরই কামনা-বাসনার ক্লেদাক্ত নাগপাশে সে জড়িয়ে পড়ে। সেই নিরাসক্ত গ্লানিকর জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় এক বিশ্বাসহীন ছন্নছাড়ার উগ্র ব্যক্তিত্ববাদী জীবনে নিমজ্জিত একুশ শতকের মানুষ। আমি সেই বিপর্যস্ত মানুষের অলিন্দে খুঁজেছি মনুষ্যত্ব। এক জীবনের এটিই হলো সমগ্রতাবোধ, মৌলিকত্ব এবং প্রাণবিন্দু।

এখন আমি সেই অঙ্গীকারে সিদ্ধ এক স্বতন্ত্র জীবনলোকের স্রষ্টাকে খুঁজি। যে কিনা চেতনার গভীরে চিত্রধর্মী, মূলের গহীনে রঙধর্মী আর অন্তরে সুরধর্মী। গভীরভাবে আত্মিকতা অনুভব করি আমি তার। প্রাণীজগত এবং প্রকৃতিজগতের আলোআঁধার, আকাশনদী, পাহাড়সমুদ্র, নিস্তব্ধ জলাশয়, কাক-কোকিলের কোলাহল ছায়া প্রলম্বিত বিশ্বচরাচরে সেই মানুষ কোথায়? আমি তাকে জেনেছি ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সময়-চেতনার প্রগাঢ় অনুরণনে। আমাদের উত্তরাধিকার, ভাবনার মিনার, স্মৃতি-সত্তার সা¤্রাজ্যের ভেতরে সেই মানুষের নিগূঢ় অস্তিত্ব সম্পর্ক।

ওই সম্পর্ক নির্ণয়ে যাপিত জীবনের আয়নায় যে মুখ ও মুখশ্রী ভেসে ওঠে সেও যেন এক খণ্ডিত মানুষ। তবু তাকে ছুঁয়ে যায় সকালের উদিত সূর্য, অলস দুপুর, চিরধরা রোদ, বিকালের মৌনতা, আঁধারের চিবুক, এমনকি রাত্রির শরীর। এ কথা সত্য যে, কাল নিত্য পরিবর্তনশীল। কিন্তু শত পরিবর্তনশীলতার মাঝেও থাকে শৃঙ্খলা ও ছন্দ, যার মধ্যে সমস্ত বিপরীতই সঙ্গতি লাভ করে থাকে। সুতরাং বর্তমান সমাজ ও সময়ের অবক্ষয়িত মূল্যবোধ, নৈরাশ্য, একাকীত্ব, যন্ত্রণা, অস্তিত্বহীনতা এবং সম্ভাবনাহীন সম্মুখযাত্রার ইঙ্গিতের মধ্যেই মানুষ তার স্বরূপেই ফিরে আসে বারবার। এভাবেই বিনাশের অতল থেকে উঠে আসে এক পরিপূর্ণ মানুষ। সেখানে স্বপ্ন আকাক্সক্ষা শান্তি ও কল্যাণের আহ্বান ছাড়া আত্মহননের জটিল শব্দবন্ধ থাকে না। সেখানে এই মানুষের সাথেই পুনর্মিলন ঘটে তারই ভেতরের সত্ত্বাসন্ধানী মানুষের। সেই মিলনে কোনো বিষাদ নেই। তাই রাত্রির ব্যুহ ভেদ করে উদিত সূর্যের উঠোনে আমি অন্য জীবনের এপিটাফ লিখি। জাতিসত্তার খণ্ড-বিখণ্ডতার মধ্যে আমার ভেতরের সেই এক সম্পন্ন মানুষ কথা কয়—

যতদূর থাকো ফের দেখা হবে। কেননা মানুষ

যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক

মিলে যায়— পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে!

কবিতা, আরোগ্য হাসপাতাল

কথা

কবিতা কী প্রার্থনার সঙ্গীত? এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার থেকে বরং এটাই মেনে নেয়া শ্রেয় যে, মানুষের মনের ভেতরে আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের না বলা গুমরে ওঠা কথার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হলো কবিতা। মূলত সমাজ, রাষ্ট্র এবং এর চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ আর মনোজাগতিক ক্রিয়া থেকেই কবিতার উদ্ভব। বলা যায়, কবি তাঁর অন্তর্গত তাগিদ থেকে কবিতা লেখেন। আর কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে কবিতাই যথেষ্ট। এতে কবির কোনো দায়বোধ থাকে না। কেননা পূর্বেই বলেছি কবিতা গড়ে ওঠে চারপাশের আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাযুজ্যে।

তবে এ কথা সত্য যে, কবিতা আমাকে শুশ্রƒষা দেয়। সকল প্রকার অবসাদ, হতাশা আর বেদনা থেকে সে আমাকে মুক্তি দেয়। সেরকম একটি কবিতা লেখার পর সংসারযাত্রার সমস্ত গ্লানি থেকে যেন অবমুক্ত হই, এমনকি জীবনের ভার থেকেও। আসলে কবিতা বিমূর্ত, তাকে মূর্ত করতেই কবির যত প্রচেষ্টা। একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিতার অধিবাস। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের না বলা অংশটুকুই কাব্যভাষায় প্রতিফলিত হয় সনতারিখের নির্দিষ্ট সীমারেখায়। সৃষ্টিশীল মানুষ তার মৌলিকত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কবিও তার ব্যতিক্রম নয়। তেমনই আমার কবিতার পশ্চাতে কাজ করে মৌলিকত্ব। আর তাই প্রচলিত রীতিনীতি, আচার-প্রথা, বিশ্বাসকে অস্বীকার করে নয় বরং এগুলোর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সাক্ষী করেই গড়ে ওঠে আমার কবিতা। সর্বোপরি ব্যক্তি আবেগ, উত্তাপ, অনুভূতি-বোধ থেকে কবিতা জন্ম নিলেও সৃষ্টিশীল কবিতা চিরকাল মুক্ত মানবতার সপক্ষে, এ এক আরোগ্য হাসপাতাল।

কবিতা

বিষাদের আঙুলগুলো

                তখনো তুমি ঘুমোচ্ছো

অথচ জাগরণে শিথিল হলো ঘুমের বালিশ।

কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই

না ছিল নাইটগার্ডের বাঁশি;

ওরা কী তবে চোলাই মদে চূর!

জানালার কাঁচ সরিয়ে দেখি— দুর্ধর্ষ

ডাকাতের পায়ের ছাপে শীতরাত্রির

মাটি কাঁপে। ভাঙা দেয়ালের পাশে

উচ্চকিত মাতাল গণিকা রাত্রি।

এভাবেই নেমে গেছে ঘুমের শহর

ঘুমের ভেতরে তুমিও ক্রমেই হয়ে গেছ অন্ধকার,

ওই আঁধারের পাশে উঁকি দেয় আমারই পরাজয় স্তম্ভ

ও ধূসর, ও রাত্রির ক্যাম্প,

এখন কীভাবে মেলে ধরবো বিষাদের আঙুলগুলো?