Archives

ডাকবাংলো

ডাকবাংলো

ক.১

দোলনাটি দুলে যাচ্ছে । নিঃসঙ্গ ।

অদ্ভুত কেয়ারটেকার বিশাল গাছের নিচে

দড়ির খাটিয়া পেতে ঘুমিয়েছে

নিচে ওর কুকুর ভুলুয়া

অচমকা মাথা টেনে উঠে বসে কুকুরটি তাকিয়ে আছে

দূর সড়কের দিকে । কিছু রহস্যের দিকে…

ক.২

পথের দু’পাশে ঘনগাছপালা । তার পাশ দিয়ে যেতে

মনে হলো- একেই তাহলে বলে

সবুজ ইশারা?

অথবা অরণ্যের জাদু ? কিংবা দূরের মায়া !

আরও পরে স্পষ্ট হবে; বনের গভীরে গোপনক্ষত এবং যা অনিরাময়যোগ্য

সেই ডাকবাংলো

আমাদের গাড়ির গতির সঙ্গে উড়তে থাকা ধুলো ও শব্দে

খুলে যাচ্ছে তার প্রতিটি দরজা-জানালা

জেগে উঠছে কেয়ারটেকার ও তার চঞ্চলতা

অভ্যর্থনায় নড়ে উঠছে কুকুরের লেজ

 

ক.৩

পাকশালা । উনুনে আগুন জ্বলছে । দুপুরের ভুড়িভোজ

মন্দ হবে না

কাটা মুরগির পাশে ইস্পাতের ছুরি; তার রক্তমাখা জিহবার দিকে

তাকিয়ে রয়েছে দাঁড়কাক

কাক বলতেই তা টেড হিউজের

হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথ তাহাদের মধুচন্দ্রিমায়

এই ডাকবাংলোয় এসেছিল কি না আজ আমরা জানি না

আমরা জেনেছি; স্টোভের আগুনে যদি কবির শরীরও পোড়ে

কবিতা পোড়ে না

[ক্রমশ]

সরলকবিতা নিয়ে সহজ কথাবার্তা

কথা

নিজের কবিতা নিয়ে কথা বলাতে যাওয়া ‘কিছুটা অশোভন এবং অনেকটা বিপদজ্জনক’ এই লেখাটি লিখতে বসে এ রকম একটি আশঙ্কা আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। মনে করি কবিতার পাঠোদ্ধার পাঠক ভেদে ভিন্ন হতে পারে। যে ভিন্নতা অনেক ক্ষেত্রেই পজেটিভ। কিন্তু কবি যখন নিজের কবিতা সম্পর্কে কিছু বলতে যান, পাঠক তাকেই নিরেট ও নির্দিষ্ট বলে ধরে নেন। তাতে করে কবিতার বহুরৈখিক পাঠ একরৈখিকতায় নির্দিষ্ট হতে পারে। আবার নিজের কবিতা নিয়ে বলা এই প্রক্রিয়াটি স্থূল আত্মপ্রচার বলেও ভাবতে পারেন কেউ। কিন্তু এসবের পাশে এমনও একটি যুক্তি দাঁড়াতে চায়- ‘অন্তত কবিতার অপব্যাখ্যাকারী কিংবা নির্বোধ সমালোচকের থেকে এই প্রক্রিয়াটি শ্রেয়’। কবিকে সে কারণে তার কবিতা নিয়ে কিছু বলতে দেওয়া উচিত।

’দাম্পত্য’ কবিতাটি নিয়ে এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখনকার সময় থেকে দু’মাস পূর্বে লেখা এই কবিতাটি। মনে করার চেষ্টা করছি শেষ শ্রাবণে খুব মেঘ করে আসা একাকী দুপুরটির কথা। আমার অবচেতনে সক্রিয় কিছু চিন্তা ও অভিজ্ঞতা। অবচেতনের আকাশ ভেঙে নেমে এলো সাদা কাগজের মাঠে। খুব স্বল্পায়তনের মাত্র ছয়পঙক্তির বেশ সরল এবং একটি সাদামাটা কবিতা হিসেবে তাকে শনাক্ত করি। প্রায়শ যা হয় লেখার পরে সহোদর কিংবা স্ত্রীর পাঠ আওতায় আসে আমার সদ্যলেখা কবিতা। এই কবিতাটি পাঠের পরে আমার স্ত্রী কপোট রাগ দেখিয়ে বলে- ‘এসব কি হচ্ছে?’ (হয়তো এটি ছিলো তার কবিতাটি সম্পর্কে পাঠপ্রতিক্রিয়া)। এরপর কবিতাটি অনলাইন প্রকাশে এলে বেশ আলোচনায় আসে। হাংরি আন্দোলনের পুরোধা প্রখ্যাত কবি মলয় রায়চৌধুরী কবিতাটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ‘ডিভাসটেটিং’ বলে একটি মন্তব্য লেখেন। পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান কবি বিভাস রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে অনেক বিদগ্ধজন কবিতাটি সম্পর্কে বলতে থাকেন। বাঙ্গালি বংশোদ্ভুত সম্প্রতি সময়ের ইংরেজি সাহিত্যে বেশ পরিচিতি পাওয়া কবি ও অনুবাদক কিরীটী সেনগুপ্তের অনুবাদে কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ একটি আন্তর্জাতিক ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং তা আবারও ভিন্নমাত্রায় আলোচনায় আসে, কবিতাটির পক্ষে এমন কি বিপক্ষেও কথা চলতে থাকে এবারও। কিছুটা আশ্চর্যবোধ করি একটি সরল কবিতা এভাবে পাঠকের নজরে পড়তে পারে! ভাবি, পাঠকের অন্তর্দৃষ্টি হয়তো কিছু খুঁজে পেয়েছে এই সারল্যের মধ্যেও। কবি সবসময় নিজের কবিতার শ্রেষ্ঠ বিচারক না-ও হতে পারেন।

কি আছে ‘দাম্পত্য’ নামে এই ছোট কবিতাটির মধ্যে? কেবলমাত্র দু’জন মানুষের উপস্থিতি। কবি ও তার স্ত্রী। কবির স্ত্রী; যিনি কিনা ঘুমের মধ্যে তার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম আউড়ে চলেন। যেমনটি দেখা যায় মানুষকে ঘুমের মধ্যে নানা প্রকার সংলগ্ন কিংবা অসংলগ্ন কথা বলতে। এর বিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক নিশ্চয় কোন ব্যাখ্যা আছে। আমরা সে প্রশ্নে যাচ্ছি না। জানি ঘুমের ঘোরে এসব কথার সত্যাসত্য কোন ভিত্তি নেই। কিন্তু কবিতায় যে ‘ঘুম’ সে ঘুম যদি আক্ষরিক ঘুম না হয়ে অবচেতন হয়, তন্দ্রা হয়, তাহলে বিষয়টি কোথায় দাঁড়াচ্ছে? কবি ও তার স্ত্রীর যুগল যাপনের মধ্যে তৃতীয়জনের উপস্থিতি। দাম্পত্য জীবনে যে উপস্থিতি একেবারেই স্বস্তিযোগ্য নয়। এতে হয়তো এই দাম্পত্য-যাপিত দু’টি মানুষেরও হাত নেই। এখানেই প্রকাশ পায় মানুষের সম্পর্ক ও যাপনের অসহায়ত্ব এবং অবদমন। কবিতার নারীটি যে স্ত্রী হিসেবে একজন পুরুষের ঘর করতে এসে তার পূর্বজীবনের প্রাক্তন পুরুষটির কথা ভুলে যেতে পারেনি। কিন্তু তা প্রকাশের বৈধতাও হয়তো নেই নারীটির বর্তমান জীবনে। জীবনে এই যে অবদমন সেখানেও জীবনের এক অসহায়তা ফুটে ওঠে। আর পুরুষটি সেও কত অসহায় তার স্ত্রীর জীবনকে ‘ঘুম’ ও ‘জেগে থাকা’ দু’ভাগে বিভক্ত করে কেবলমাত্র জেগে থাকাটুকু নিয়ে সুখী হবার চেষ্টা করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। আসলে এই ‘জেগে থাকা’টুকু নিয়েই আমাদের প্রতিটি দাম্পত্য।

কবিতাটির গঠন প্রকৌশল সরল তবে ‘ঘুম’ এবং ‘জেগে থাকা’ দু’টি শব্দের ব্যবহার ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। কবিতায় অনেক ক্ষেত্রে যা ঘটে; শব্দের আভিধানিক মুক্তি। ‘দাম্পত্য’ কবিতাটির ক্ষেত্রে এখানে ‘ঘুম’ এবং ‘জেগে থাকা’ শব্দ দু’টি আক্ষরিক বা আভিধানিকতা থেকে মুক্ত হয়ে অপর অর্থদ্যোতনায় ধরা দিয়েছে। কবিতা নানামুখী হতেই পারে, তবে তার মধ্যে বোধকরি সৃষ্টি ও আনন্দময়তা সন্ধান। কবির মেধা বোধ ও শব্দের রসায়ন একটি সেতু নির্মাণ সূচনা করে, তবে তা অর্ধসমাপ্ত। পাঠক যখন বিপরীত দিক থেকে এই রস সংকেত ধরে বাকি অর্ধপথ অতিক্রম করে আসে তখন দুই প্রান্তের সংযোগ ঘটে। প্রাপ্তি লাভ হয় আনন্দমতার। পাঠক সহায় হোন।

কবিতা

দাম্পত্য

ঘুমের মধ্যে কথা বলছে বউ

ঘুরেফিরে বলছে ওর ছেড়ে আসা প্রেমিকের নাম

বলুক না

সে না হয় ঘুমের মধ্যে

আমি তো কেবল ওর জেগে থাকাটুকু

নিয়ে সুখী হতে চেয়েছি