Archives

আসমানী বিরিক্ষের ফল

আসমানী বিরিক্ষের ফল

১.
সেইসব দিন কই গেল বললে, হতাশাভরা বাতাসে বেরিয়ে আসে— গরমের মাঝদুপুরে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে দম ধরে ডুবে থাকার কাল। তারপর আবার দিঘির তলে মাথাটা নিয়ে পা দুটো জলের উপর ভাসিয়ে তুলে সেলাই মেশিনের মাথায় যে নিবটা সেলাইয়ের সময় উঠানামা করে তেমন করে পা দুটো উঠানামা করার নামে সুঁই-সুতা, সুঁই-সুতা খেলা। তখন কি আর জানতাম, দম ধরে ডুবে থাকার দল থাকি একজন সত্যি সত্যি এই সুঁই-সুতার কারবারি হবে। তখন কি এ-ও জানতাম যে— এই সুঁই-সুতার কারবার করতে করতে তার মউত হবে। তখন ভাবি, কতোকিছুই জানি না। তারপরও এই অজানা-আকাম্মা বডি আর ব্রেইনটারে নিয়া কতো বাজি ধরি। কতোক জিতি তো কতোক হারি। তো আমাদের মধ্য থাকি মাঝদুপুরের যে ডুবুরিটা সুঁই-সুতার কারবারি হয়, সে জীবনের বাজিটা জিতে নাই। বাজি হারার পর সে আমাদের সামনে কিছু প্রশ্ন খাড়া করে হাওয়া হয়ে যায়। তার আকাম্মা বডি আর ব্রেইন হাওয়া হওয়ার পরেও এত পেইন দিবে তা কে জানত! তাইলে তো আর তার এমনে এমনে মউত হয় না। তখন আবার ভাবি, এই মরার দেশে কতো মানুষ মরার পর যাদুকর হয়! বাঁইচা থাকতে সেই যাদুর খোঁজ পাবলিকে পায় না। এই সুঁই-সুতার কারবারি যারে নিয়া কাহিনি আগাইতেছে সে বাঁইচা থাকতেও কোনো যাদু দেখায় নাই। সুঁইয়ের মুখে সুতা লাগানো আর ঘট ঘট আওয়াজে সেলাই মেশিন চালানো ছাড়া জিন্দেগি থাকতে আর কোনো কাম সে করে নাই।
২.
এমন তার কোনোদিন হয় নাই। স্বামী মরে তার সেই অবেলায়। তারপর নিজের পেটে ধরা পোলা মাইয়ারে নিজের কান্ধে নিয়া সে জগৎ সংসারের পাঠ নিতে থাকে। তার সেই পাঠ আজ হোঁচট খায়। মাঘের এই দিন শুরুর বেলায় তার হাতের সোনামুখি সুঁইটা পরপর একবার, দুইবার, তিনবার আঙুলের একই জায়গায় ফোঁড় দিলে ওই জায়গাটায় অণু না হয় পরমাণু সমান রক্ত জমা হয়। তখন তার মাথাটা টলে উঠলেও বুকের ভেতরে ছ্যাৎ করার অনুভূতিটা বেশি আওয়াজ তোলে। যদিও এই আওয়াজ তার ভেতরে পাক খায়। এই আওয়াজ তো তার আজ থেকে পাক খাওয়া শুরু করেছে এমন নয়। সেই যে স্বামী মরে গেল বড়ো অবেলায় তখন ছোট ছোট নাড়ি ছেঁড়া ধন নিয়ে তার জিন্দেগি পাক খেতে শুরু করে।
নাড়ি ছেঁড়া ধন। বিধবা জীবন। জোটেনা ভাত। কাঙাল বরাত। এই পাকচক্রে সে দিন কাটায়, রাত কাটায়। তার নাড়ি ছেঁড়া ধন বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে গায়ে গতরে তার সমান হয়। ততদিনে তার চুলে পাক ধরেছে। তার চুলে পাক ধরার বয়স তো হয় নাই। তখন আবার মনে করতে হয়, স্বামী মরে তার বড়ো অবেলায়। ভাত কাপড়ের চিন্তায় চুলও পাকে তার বড়ো অবেলায়। সেই সব অবেলার ফিরিস্তি এখন আর মনে করার দরকার নাই। কারণ সেইসব দিন সেইসব রাত পার হয়ে গেছে অনেক আগে। ততদিনে তার নাড়ি ছেঁড়া ধনেরা ধনের সন্ধান করে। তারপর একদিন মাঘের সকাল আসে, যখন সে নকশি কাঁথায় সোনামুখি সুঁইয়ের ফোঁড় তুলে। কিন্তু সে ফোঁড় তার আঙুলের মাথায় চুয়ে পড়া পরমাণুবৎ না হয় অণুবৎ রক্ত হাজির করে। তখন আবার মনে পড়ে এমন তার কোনোদিন হয় নাই।
পর পর তিনবার একই আঙুলের একই জায়গায় সুঁইয়ের খোঁচার ইঙ্গিতটা অন্যরকম লাগে তার কাছে। তার ফ্যাকাশে মুখ, ভাজপড়া চামড়া, আর নিমীলিত চাহনি ভেদ করা কোনো সহজ কারবার নয়। এ জীবন তো আমরা পাইনি। ফ্যাকাশে মুখ ধরার মতো তীব্র কিংবা তীর্যক চাহনি না থাকায় সরল আখ্যানে কতোটাই বা ধরা যায় তার জীবন। সেই জীবনের খোঁজ তাই আর করা হয় না। বরং যে মৃত্যু চোখের সামনে দেখেছি তার খোঁজ করার হাউশ করতে পারি।
সেই দিন তার আর নকশি কাঁথার কাজ করা হয় নাই। নকশি কাঁথায় অণু কি পরমাণুবৎ রক্ত কাঁথার ফুল-লতা-পাতার নকশার সাথে মিশে না জানি কোন অজানা কাহিনি তৈয়ার করে আর সেইসব কাহিনি বুক-পিঠ-মাজায় নিয়ে ওম নেয় একদল দেবদূত।
পানা দিঘির জলের মতো স্থির যার ভেতরটা আজ আবার তাতে বলক ওঠে। তখন সেই শীতের সকালে বাড়ি থেকে দূরে অনেক দূরে তার এক নাড়ি ছেঁড়া ধনের খবর সবাই পায়। সেই খবর সে-ও পায় তখন দিন গড়িয়ে বিকাল পেরিয়ে সাঁঝ ফুরোনো আন্ধার নামে।
সাঁঝের আন্ধার ঘুটঘুট হলে বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা মরা পাতা আর ধুলা হালকা শিশির আর কুয়াশায় ভিজে উশখুশ করতে করতে কথা কয়। ঝাড়–ও কথা কয়। ঝাড়–র সে কথা মরা পাতা শোনে। মরা পাতার গতরে লেপ্টানো ধুলা সে কথা শোনে। মানুষের কানে সে কথা যায় না।
চারজনে খুঁজে
দুইজনে ধরে
একজনে মারে
এখন চিন্তা করো ধীরে।
ঝাড়–র এই সওয়াল নিয়ে পাতা আর ধুলা কচলাকচলি করতে থাকে। তখন ধুলা লেগে মরা পাতার শরীল কুটকুট করা শুরু হলে মরাপাতা তার মুখ না খুলে শরীল চুলকায়।
৩.
সেই সুঁই-সুতার কারবারিরে নিয়া সওয়ালটা আসে। এই সওয়াল ঝাড়–, মরাপাতা, ধুলার মধ্যে হতে পারে কিন্তু মানুষের মধ্যে না। রাস্তায় খাড়া হয়ে থাকা কতো মানুষের চোখ সেই সওয়াল নিরিখ করে সে খবর আজ আর অজানা নাই। সেইসব মানুষের মধ্যে কালা, খাকি, নীল, চেক কত মানুষ না আছিল। কারো হাতে ক্যামেরা নামের এক চিজও ছিল। আর তারা সেই ক্যামেরার ভেল্্কিতে ধরে এক সুঁই-সুতার কারবারির দৌড়, তারা আরও তুলে কীভাবে সুঁই সুতার কারবারির পেছনে আরও কয়েকজন দৌড়ায়। যারা দৌড়াচ্ছিল তাদের হাতের চাপাতি, রড, কিরিচও ক্যামেরায় আসে। তখন দৌড়াতে থাকা সুঁই-সুতার কারবারির শরীলে যখন চাপাতির প্রথম কোপটা পড়ে তখন রাজধানী থেকে দূরের, অনেক দূরের এক গাঁয়ে বসে সোনামুখি সুঁই আর সুতা নিয়ে নকশা করতে বসা এক মায়ের আঙুলে সুঁইয়ের ফোঁড় লাগে। সুঁই-সুতার কারবারির শরীলে যখন আবার কিরিচের কোপ পড়ে তখন আবার সোনামুখি সুঁই মায়ের ওই আঙুলের ওই জায়গাটাতে ফোঁড় দেয়। জীবনের মায়া বড়ো মায়া। এইটা কি এতো সহজে ছাড়া যায়! এটা ভেবে যখন সুঁই-সুতার কারবারিটা কাকুতি মিনতি করতে থাকে তখন ওই মায়ের মুখ দিয়া অস্ফুট স্বরে আওয়াজ বেরোয়। এরপর মায়ের নাড়ি ছেঁড়া ধন ওই সুঁই সুতার কারবারির ওপর রড, চাপাতি, কিরিচ সব একসাথে হামলে পড়লে সে যখন নিস্তেজ হয়ে আসে তখন মায়ের মাথাটা ঝিমঝিম করে। সুঁই-সুতার কারবারির এই নিস্তেজ হয়ে পড়া ক্যামেরায় ধরা পড়ে। তারপর খবরে খবরে তা সারা দেশে রটে। তখন ঘরে বসে এক সুঁই-সুতার কারবারির মরণ দশায় সবাই ভুগে। কেবল পারে না তার মা। ঘটনাটা এইখানে শেষ হলে একটা কথা ছিল। যেহেতু হয় নাই তখন আরও কথা থাকে। ওর নিস্তেজ হওয়া শরীল কালা, খাকি, নীল, চেক সবাই দেখে। তারপর না দেখার ভান করে আবার নিজ নিজ কামে ফিরে। কামে ফিরিতে পারে না কেবল এক রিক্সাঅলা। তখন সেই রিক্সাঅলা ওই সুঁই-সুতার কারবারির সেই নিস্তেজ দেহখানা তুলে ধরে তার রিক্সায় আর ঘুরাতে থাকে প্যাডেল। রাজধানীর মেডিকেল। নাই। তার দেহে প্রাণ নাই।
৪.
এই মরার দেশে কতো মানুষ মরার পরে যাদুকর হয়। এইবার পাওয়া যায় সুঁই-সুতার কারবারির যাদুর খবর। ধুলিধূসর মলিন এই শহরের যারা তার মরণ দেখেছিল তারা সবাই অভিশপ্ত হয়। এই অভিশাপটা এত নীরবে আসে যে— তারা তখন পর্যন্ত বুঝতে পারে নাই তাদের জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে। এত এত মানুষের এই শহর থেকে যখন একজন মানুষ হারিয়ে যায় তখন সেটার কোনো হদিশ থাকে না। সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটা নিয়ে যখন তার পরিবার জল্পনা কল্পনা করে তখন সেটা অনেকের বিশ্বাস হয় না। এই অবিশ্বাসের মাত্রা যখন জারি থাকে তখন দিনকে দিন হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শহরটা দিনকে দিন আতঙ্কের কূপে রূপ নেয়। তখন হারিয়ে যাওয়া এবং পুড়তে থাকা দুটাই চলতে থাকে। দিনে দুপুরে কিংবা রাতের আন্ধারে মানুষ নিখোঁজ হয় আর পুড়ে যায়। তখন কামে বের হওয়া গৃহত্যাগী মানুষেরা বউ কি বাচ্চা কি নিজের কাছে নিজেই বিদায় নেয়। গুমোট এক মৃত্যুর আতঙ্ক মনে মনে ফেরি করতে করতে তারা পথ চলে। হয়ত-বা কখনো গন্তব্যে পৌঁছে আর না হয় নিখোঁজ হয় আর না পুড়ে যায়। দিনকাল তখন এমন হয় যে— নিখোঁজ কিংবা পুড়ে যাওয়ার ব্যাপারে কেউ আর কোনো কথা বলে না। তারা নিজেরা ব্যাপারটা ভুলে থাকতে চায় আর না হয় জেনেও না জানার ভান করে। তখন এটাও জানা যায় যে— এসব নিয়ে কথা বলে নিজেদের জীবন অনিরাপদ করতে তারা রাজী নয়। ফলে যে মানুষটি নিখোঁজ হয় কিংবা পুড়ে যায় শুধু তার পরিবারের মধ্যে আহাজারি চলে। তবে ওইসব মানুষ যারা নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে সব ভুলে থাকত তারা জানত না যে— তারা নিজেরাও এক অভিশাপে বন্দী হয়ে আছে। কারণ ওই সুঁই-সুতার কারবারি মরার সময় তার তপ্ত নিঃশ্বাস আর আহাজারিতে শহরের বাতাস দূষিত করেছিল। এই দূষিত বাতাস মোকাবিলা করে বাঁচার প্রাণশক্তি অনেক আগেই হারায় ওই শহর। এটা ওই মানুষগুলো বুঝে নাই। তারা মাথা গুজে জীবন চালাতে থাকে। ওইসব দিনে তাদের মাথা ভার হয়ে ওঠে, ঠোটের চামড়া পুরু হয়। দিনকে দিন এভাবে চলতে চলতে তাদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শহরের সব নতুন সন্তান বোবা হয়ে জন্মে। এই বোবা সন্তানদের মধ্যে দু-একজন কথা বলা শেখে। তাতে তাদের অনেক সময় লাগে। এই বোবা প্রজন্ম নিয়ে শহরে শুরুর দিকে একটা উৎকন্ঠা থাকলেও পরে এটাকে সবাই স্বাভাবিক ধরে নেয়। আর যে দু-একজন কথা বলা শেখে তাদেরকে অস্বাভাবিক ধরা হয়। ফলে ওই অস্বাভাবিক শিশুদের কথা বন্ধ করার জন্য শহরের সবাই জল্পনা শুরু করে।
৫.
সুঁই-সুতার কারবারির লাশ যখন রাজধানী থেকে দূর গাঁয়ে তার মায়ের কাছে পৌঁছায় তখন আন্ধার। আলো ক্রমে আসার কোনো উপায় নাই। তারও আগে যখন তার ব্যাটা মরার খবর আসে তখন কে যেন তারে কয়, তার ব্যাটার সাদা শার্ট রক্তে লাল হয়। যেইখানে তার ব্যাটাক মারা হয় ওইখানে কোনো পুকুর আছিল না। থাকিলে সে ডুব দিয়া দম ধরে জীবনটা বাঁচাইতে পারত। ওইখানে ইট আছে, কাঠ আছে, পাত্থর আছে। মানুষের সিনায় পাত্থরের মতন দিল আছে। মায়ের কানে এইসব কথা যখন আহাজারির বান ডাকে তখন রাতের আন্ধারে আঙিনায় পড়ে থাকা মরাপাতা, ঝাড়–, কোদাল কথা কয়। তাদের কথায় সেই সওয়ালটা আবার ফিরে আসে।
চারজনে খুঁজে
দুইজনে ধরে
একজনে মারে
এখন চিন্তা করো ধীরে।
সেই আন্ধারের কিছু কথোপকথন :
মরা পাতা : কি এক জমানা, মায়ে পাইলা মানুষ করে মাইনষে জীবন রাখে না।
ঝাড়– : কলিকাল কলিকাল ঘোর কলিকাল, মানুষে মানুষ মারে মানুষের আকাল।
কোদাল : মায়ে কান্দে বোইনে কান্দে কান্দে সকল অবলা, চোক্ষের সামনে জীবন যায় জীবনরে ভাই নিস্ফলা।
মরা পাতা : দেখো তোমরা মায়ের মন, ক্যামনে কান্দে এখন।
ঝাড়– : মাইনষের লাইগা দুনিয়া, মানুষ কি-না মানুষ মারে!
কোদাল : তারপর বিষয়টা আরেকভাবে ভাইবা দেখো, যে মানুষটা মরে তার দুনিয়ায় আসার আর কোনো উপায় নাই, সুযোগ নাই।
মরাপাতা : মানুষ দুনিয়ায় একবার-ই আসে গো!
ঝাড়– : ‘এমন মানব জনম আর কি হবে!’
কোদাল : মানুষ কি এই সহজ সত্যটা জানে না!
মরাপাতা : না জানার তো কিছুই নাই। সেরা সৃষ্টি বইলা নিজেরে নিয়া তারা বুক ফুলায়।
ঝাড়– : সেরা সৃষ্টি হইয়া যখন তারা আরেকজনের জীবন নেয় তখনও কি তারা সেরা থাকে?
কোদাল : অপঘাতে মরা মানুষের গোর খুঁড়ার কামে আমার খুব কষ্ট হয়। কেবলই মনে হয় এই মরণ নিয়া দুনিয়ায় আইছিল।
মরাপাতা : আমরা মরার পরও বাঁইচা থাকি। বাঁইচা থাকতে মানুষেরে বাতাস দিছি আর মইরা মাথাল হই আর না হয় নিজেরে পোড়াইয়া মানুষের খাবার সেদ্ধ করাই।
ঝাড়– : সব অদস্রে কাম গো!
কোদাল : অদস্রে কাম কী?
মরাপাতা : এর কাছে ভালো মন্দ বইলা কিছু নাই।
ঝাড়– : খালি সুখভোগ।
কোদাল : সুখভোগ ছাড়া কি আর কোনো কাম নাই!
মরাপাতা : মানুষ মানুষের কি কামে লাগে গো!
ঝাড়– : এই ভাবনা মানুষের আমাগো না।
কোদাল : মানুষ কি আর এইসব নিয়া ভাবে!
মরাপাতা : মানুষগুলা কেমন জানি দিনকে দিন বদলায়া যায়।
ঝাড়– : আমার কষ্ট হয় যখন কোনো মানুষ আমারে হাতে নিয়া আরেক মানুষের শরীলে মারে।
কোদাল : আমার শরীলে এত ধার আমি তো মারি না।
মরাপাতা : মানুষ মানুষরে মাইরা কী সুখ পায়!
ঝাড়– : আহা! সুখ, আহা! সুখ
সুখ না দুঃখ, দুঃখ না সুখ
জগত ভরিয়া সবাই উন্মুখ
কোদাল : জীবনে যে একবার সুখী হয় সে তো আর দুঃখী হয় না।
মরাপাতা : মানুষ যে সুখ চায় সেইটা কি আসলেই জগতে আছে !
ঝাড়– : না, নাই।
কোদাল : মানুষের মন নাই!
মরাপাতা : আহা! শিকড় বিনে গাছ
আহা! জল বিনে মাছ
আহা! মন বিনে মানুষ
ঝাড়– : মানুষের মন গেল কই?
কোদাল : পুঁজির জোয়ারে ভাইস্যা গেছে।
মরাপাতা : বাঁধ দিয়া জোয়ার আটকায় না ক্যা?
ঝাড়– : যাগো কাম আছিল আটকানোর তারাই পুঁজিপতি।
কোদাল : তাইলে জোয়ারটা কি তারাই দিতাছে?
মরাপাতা : না তারা জোয়ারের বাঁধ ভাঙতাছে।
ঝাড়– : এইটা কেমন কথা— ‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়!’
কোদাল : যাগোরে মন নাই তাগোরে কি দেবালয় আছে!
মরাপাতা : দেবালয় হইলো মানুষের মন।
ঝাড়– : কিছু মানুষ তো এখনও মানুষ নিয়া স্বপন দেখে।
কোদাল : তারা বাতুল মানুষ আখ্যা পাইছে।
মরাপাতা : এত এত মানুষ এরা সবাই কি করতাছে?
ঝাড়– : পুঁজির জোয়ারে কচলায়া কচলায় গাও পাও ধ্ইুতাছে।
কোদাল : আর?
মরাপাতা : চারজনে খুঁজে
দুইজনে ধরে
একজনে মারে
এখন চিন্তা করো ধীরে।
ঝাড়– : পাইছি মানে ইউরেকা।
কোদাল : সওয়ালের জওয়াব নাকি?
মরাপাতা : কও দেখি।
ঝাড়– : সুঁই-সুতার কারবারিরে যারা মারছে, যেমনে মারছে কোপায়া কোপায়া সেইটা নিয়া এই সওয়াল।
কোদাল : তাইলে একদল মারতাছে।
মরাপাতা : একদল মরতাছে।
ঝাড়– : একদল ফায়দা নিতাছে।
কোদাল : কালো, নীল, খাকি, চেক এরা কারা?
মরাপাতা : এরা দল মতের উর্ধ্বে। এদের নিয়া কথা না কওন ভালা।
ঝাড়– : আর ওই যে রিক্সাঅলা যে রাজধানীর মেডিকেলে সুঁই-সুতার কারবারির নিস্তেজ শরীলখানা একলাই নিয়া গেল এরা কারা?
কোদাল : এরা বেওয়ারিশ।
৬.
মরাপাতা, ঝাড়–, কোদাল সারারাত কথা বলতেই থাকে। ব্যাটার মরার খবর পাবার পর বাড়িতে আর ঝাড়– পড়ে নাই। তাই ওইরাতে আঙিনায় মরাপাতা, ঝাড়–, কোদাল পাশাপাশি থাকে। তাদের মনে আরো কতো আবোল তাবোল কথা, বাহাস হয়— যেমনটা হয় টি স্টলে, লোকাল বাসে, খোলা ময়দানে। তারপর সবাই চুপ হয়ে যায় নিজ নিজ গন্তব্য এলে। সেইসব শোনার মন আমাদের নাই। মন তাইলে গেল কই? মনের খোঁজের চেয়ে গণতন্ত্রের খোঁজ আমাদের কাছে জরুরী হয়ে ওঠে। ফলে আমরা মন বিনে জন হয়ে গণতন্ত্র নামক এক আসমানী বিরিক্ষের ফলের আশায় গুম হই আর পুড়তে থাকি। যদিও এটার জন্য সুঁই-সুতার কারবারিকেও কেউ কেউ হয়ত-বা দায়ী করে হয়ত-বা মনেও রাখে না।
দুঃখিত, এই শহরে মন বিনে মানুষ…