Archives

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

ধা রা বা হি ক   র চ না             

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

সংগীতের সমাজতত্ত্ব-৩

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

————————————————————————————-

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ্য করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। — চিহ্ন সম্পাদক]

হার্বাট স্পেনসার (১৮২০-১৯০৩)

ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে বিবর্তন তত্ত্বের প্রাধান্য লক্ষণীয়। ডারউইনের ঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ ঝঢ়বপরবং প্রকাশিত হলো ১৮৫৯ সালে। জীব-জগতের বিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর এই তত্ত্ব প্রচলিত সমস্ত জ্ঞানের ধারণা বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসলো। হার্বাট স্পেনসার তার বিবর্তনবাদের দ্বারা প্রভাবিত কিনা সে প্রশ্নে না গিয়েও এ ধারণা করা সম্ভব যে, স্পেন্সারের চিন্তা সামজিক বিবর্তনবাদের সূচনা করে। তিনি বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারকে সংযুক্ত করে ক্রমান্বয়ে সামাজিক বিকাশের তত্ত্ব প্রদান করেন।  এক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে দেখা যায় দশ ভলিউমের System of Synthetic Philosophy (1862-1896) (১৮৬২-১৮৯৬)।  এছাড়াও তিনি লেখেন Social Statics (১৮৫১), Principle of  Sociology (১৮৬১)  Study of Sociology (১৮৭৩), এবং Facts and Comments (1902)|

বস্তুর বিকাশ ও বিনাশের উত্তর তিনি খুঁজে পান পদার্থবিজ্ঞানের যে তিনটি সূত্রের মাঝে, তারই আলোকে তিনি প্রয়াসী হন সমাজ বিবর্তনের প্রক্রিয়া উপস্থাপনে। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র হচ্ছে : (ক) বস্তুর অবিনাশিতা (indestructibility of matter); (খ) গতির অবিচ্ছেদ্যতা (continuity of motion); (গ) শক্তির অক্ষুণতা (persistence of force)। স্পেনসারের মতে এ তিনটি মৌলিক সূত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে :

১) শক্তিসমূহের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বিরাজমান থাকে, কেননা শক্তির উদ্ভবের জন্য যেমন অস্তিত্বশীল বস্তুর প্রয়োজন, সেরূপ শক্তি কখনো অস্তিত্বহীনরূপে বিনষ্ট হয় না।

২) শক্তির রূপান্তর ঘটে মাত্র, কিন্তু বিলুপ্তি ঘটে না।

৩) বস্তুর গতি প্রতিবন্ধকতার পথ পরিহারে সক্রিয় থাকে।

৪) গতির মাঝে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল থাকে, যা তাদের মধ্যকার শৃঙ্খলা সুসংহত রাখে।

স্পেনসার সমাজ বিকাশের কতগুলো ধাপ উল্লেখ করেছেন যা তাঁর সামাজিক ডারউইনবাদ বোঝার জন্য জরুরি। যেমন :

১. পরিধির বিস্তার : প্রথমে মানুষের ভুবন ছিল নিজেকে কেন্দ্র করে। ক্রমান্বয়ে এই আত্মকেন্দ্রিক জগৎ বিস্তারলাভ করে। ধীরে ধীরে পত্তন ঘটায় জনবসতির, গোষ্ঠী চেতনার, গোত্র চেতনার এবং জাতীয়তাবোধের, রাষ্ট্রের এবং বিশ্বভাতৃত্বের।

২. সংবদ্ধতা : বৈসাদৃশ্য ধীরে ধীরে পরিবৃদ্ধি ও সংবদ্ধতা বয়ে আনে। আদিম যাযাবর গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্ধন তেমন ছিল না। পরে বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠীসমূহ একত্রিত হয়ে সংবদ্ধ গোত্রে পরিণত হলো, রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটলো এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠলো। এভাবেই পারষ্পরিক নিরাপত্তার বেষ্টনী, পারষ্পরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধন সার্বিকভাবে সংবদ্ধতার সৃষ্টি করলো।

৩. সুনির্দিষ্টতা : খাদ্য সংগ্রহ অর্থনীতি থেকে খাদ্য উৎপাদনের অর্থনীতিতে উত্থান ঘটে। মানুষ যাযাবরী মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ধীরে ধীরে প্রতিটি সমাজ সুস্থির ও সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। অস্পষ্ট বিধি-বিধানের মধ্য থেকে বের হয়ে এসে আইনের আশ্রয় নেয়। যদিও আইন প্রণয়নের আগে দীর্ঘ দিন ‘প্রথা’ চালু ছিল। এখনও আইনের পাশাপাশি ‘প্রথা’র প্রচলন দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। এই স্বরূপে অধিষ্ঠিত হওয়াকেই সুনির্দিষ্টতা বলা হয়েছে।

৪. বহুরূপতা : বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তির সাথে সাথে জীবন যাপনের ও পেশাগত জীবনের বিভিন্নতা আসে। এই বহুরূপতা তাত্ত্বিকভাবে বিশৃঙ্খল ধারণা দিলেও আদতে তা সমাজের স্বার্থকেই কাজ করে।

বস্তু, গতি, ও শক্তির সমন্বয়ে সৃষ্ট বস্তু জগতের মতো উপরিউক্ত ধারণাগুলো অতিক্রমণের মধ্য দিয়ে সমাজ সাদৃশ্যের বিলুপ্তি ঘটায়  উপাদানসমুহের পরিবৃদ্ধি ঘটায়  বিভিন্ন উপাদানসমুহের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অর্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি করে  এতে করে অন্তর্গত শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য শক্তিশালী হয়। যেমন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী, শ্রেণী, নিজস্ব কার্যকলাপ সম্পাদনে ও সার্বিক ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, স্পেনসারের মতে, এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে একত্রকরণ (integration),পৃথকীকরণ (differentiation)), নিয়মানুগ নিয়ন্ত্রণ (determination)  বলা যায়।

সংগীত সম্পর্কীয় তার চিন্তা ও রচনা সংক্ষিপ্ত হলেও তাৎপর্যহীন নয়। Undoubtedly, Spencer’s major sociological interests in music were its origin,… and its evolution since its origin. Both were to prove to be influential. Spencer’s 1857 essay on the origin of music also initiated a debate that is not unimportant in the history of aesthetics, for its claims were, as we shall see, inly countered by, amongst others, Darwin, Edmund Gurney, Ernest Newman and Richard Wallaschek.[i]

দি ইকোনমিষ্ট পত্রিকায় কাজ করবার সময় তিনি অপেরা, প্রদর্শনী ও কনসার্টগুলোতে যেতেন এবং বলতে গেলে এসময়েই সংগীত সম্পর্কে তার আগ্রহ জন্মায়। এসময় তিনি লেখক হিসেবেও নিজেকে তৈরি করার সুযোগ খোঁজেন। সংগীতের প্রশ্নে যদিও তার আগ্রহ আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা থেকে উদ্বুদ্ধ নয়, বরং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে পরিপুষ্ট। সুতরাং সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পেনসার খুব গভীরে যাবার সুযোগ পাননি। তবে বিষয়গুলি সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময় বক্তব্য রাখেন। যেমন, সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি Fraser’s Magazine[ii]– -এ নিয়মিত লেখালেখি করেন। এছাড়া, ফ্যাক্টস এন্ড কমেন্টস গ্রন্থেও কিছু প্রান্তিক মন্তব্য করেন। ১৮৫৭ সালের Fraser’s Magazine[iii]– রচনায় তিনি এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সংগীত উৎপত্তিগতভাবে এবং স্বকীয়ভাবে কন্ঠ-নিঃসৃত এবং সেকারণেই স্বরযন্ত্রের ব্যবহার এখানে অত্যন্ত মৌলিক অবদান রাখে।  তিনি বলেন, Vocal sounds are produced by the agency of certain muscles. These muscles, in common with those of the body at large, are excited to contraction by measurable and painful feelings. And therefore it is that feelings demonstrate themselves in sounds as well as in movement.[iv]

স্পেন্সারের কাছে কন্ঠের বৈচিত্র্য হলো অনুভূতির পার্থক্যের শারীরিক ফলাফল। সুতরাং মৌখিক অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই মানসিক ও মাংসপেশীর উদ্দীপনার মধ্যকার সম্পর্ক জানতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি কন্ঠস্বরকে গুণাগুণ, উচ্চগ্রাম-লঘুগ্রাম, বিরতি এবং পরিবর্তনের হার হিসেবে পার্থক্য করেছেন। পরবর্তীকালে স্পেনসার মনে করেন, সংগীতের উৎপত্তি সংক্রান্ত তত্ত্ব প্রদানের মতো যথেষ্ঠ উপাত্ত তার কাছে আছে। তিনি মনে করেন Vocal peculiarities which indicate excited feelings are those which especially distinguished song from ordinary speech. Every one of the alterations of voice which we have found to be a physiological result of pain or pleasure is carried to an extreme in vocal music.[i]

এই ‘এক্সট্রিম ফিলিংস’র ভুমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, In respect allied of loudness, timbre, pitch, intervals, and rate of variation, song employs and exaggerates the natural language of the emotions; it arises from a systematic combination of those vocal peculiarities which are physiological effects of acute pleasure and pain.[ii]  পরবর্তীতে স্পেনসার তার এধরনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, উচ্চকিত উচ্চারণ থেকেই সংগীতের জন্ম। তিনি বলেন, The whole argument of the essay is to show that it from this emotional element of speech that music is evolved.[iii] Spencer would say that the creative energy of the primitive man is paralled with the noisy activity of children and animas, and with the instinctive habit people have of humming or singing when at work. It is “the raised feeling” that “prompts vocal movements of any and every kind, just as, when very strong, it promts irregular dancing about”.[iv]

স্পেনসার একথাও বলেন যে, কন্ঠসংগীত আবেগাপ্লুত বক্তব্যের চেয়ে আলাদা। এটি ক্রমবিকশিত ও সন্তর্পনে বিকশিত। তবে কিছুটা হেয়ালীপূর্ণ হয়ে দাড়ায় যখন স্পেনসার আবার বলেন, সংগীত আবেগাপ্লুত মানবীয় কন্ঠস্বরে ধ্বনির পর্দার পরিবর্তন আনা (modulation)থেকে উত্থিত। অফার অবশ্য স্পেন্সারের প্রথম লেখাটি আরো গভীরভাবে বিবেচনার যুক্তি দেখান। তিনি বলেন, সংগীত বিশেষভাবে একটি মানবীয় প্রপঞ্চ। স্পেন্সারের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, That music is a product of civilization is manifest: for though some of the lowest savages have their dance-chants, these are of a kind scarcely to be signified by the title musical: at most they supply but the vaguest rudiment of music properly so called.[v]

ডারউইন এবং গারনি’র বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্পেনসার বিস্তৃতভাবে সংগীতের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার বিবর্তনতত্ত্বের আলোকে সংগীতের সাধারণ বিবর্তন সূত্রকে ক্রমাগত বৈসাদৃশ্যের দিকে ধাবমান। আবেগ সাধারণত মাংসপেশী সংকোচন ঘটায়। এটি শ্বাসক্রিয়া ও স্বরযন্ত্রের সংকোচনও ঘটায়। এভাবে আবেগÑ সঞ্চারিত শব্দের উচ্চারণ স্বরযন্ত্র ও কন্ঠসংগীকে বিশিষ্টতা প্রদান করে। বিবর্তনের ধারা যেহেতু সরল থেকে জটিলতার দিকে ধাবমান এবং সমসত্ততা (homogeneity) থেকে অসমসত্ততা (heterogeneity) দিকে ধাবমান, সেকারণে আদিম বাদ্যসংগীত থেকে আজকের সংগীত অনেক সূক্ষ্ম ও  বৈচিত্র্যপূর্ণ। এসময় ডারউইন সংগীত সম্পর্কে তার বক্তব্য উত্থাপন করে আসছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে সংগীতের পেছনে ক্রিয়াশীল আবেগকে সাধারণ না বলে যৌনতাধর্মী বলছেন। অবশ্য স্পেনসার পাশবিক ইন্দ্রীয়জ শব্দ থেকে মানবীয় আবেগ-নিসৃত শব্দকে আলাদা করতে গিয়ে ডারউইনের এমন সাধারণ মত গ্রহণ করতে পারেননি।

সংগীতের সাথে সাথে হারমোনি সম্পর্কেও তিনি আলোকপাত করেন। তার মতে হারমোনি বিবর্তনের ফলাফল নয়। আবেগের প্রাকৃতিক ভাষার সঙ্গে একে সংযুক্ত করা ঠিক হবে না। হারমনির মধ্যে একাধিক সুরের সংমিশ্রণ ঘটে। সুতরাং, একে মেলোডির বিবর্তিত ফলাফল বলা যায় না। বিবর্তনের প্রতিটি ধারার মধ্যে অতিক্রমনের সুনির্দিষ্ট স্তর থাকে। হারমোনি পর্যবেক্ষণ করলে তার বিবর্তনের কোন স্তর-অতিক্রমণের ধারা লক্ষ করা যায় না। মেলোডির সাথে হারমোনিকে তাই এক করে ভাবার তেমন কোনো কারণ নেই।

সংগীতের ক্রিয়া এবং শতাব্দিব্যাপী এর প্রবণতা এবং সংগীত সংকলনের সমালোচনাও স্পেন্সারের আলোচনায় এসেছে। সংগীতের ক্রিয়া বলতে তিনি সংগীত-নিসৃত আনন্দের গভীরে প্রবেশ করেন। সাধারণভাবে সংগীত আমাদের বক্তব্যকে আশ্রয় করে আবেগকে ত্বরান্বিত করে। সেদিক থেকে সংগীতকে সমবেদনার আধার বলা যায়। সংগীতকে তিনি শিল্পের অত্যুঙ্গমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেন, যে পর্যায়ে শিল্পের অন্যান্য শাখার উত্থান সম্ভব হয়নি। তার মতে, The primary purpose of music is neither instruction nor culture but pleasure; and this is an all-sufficient purpose.[vi]

তিনি সংগীতের অনেকগুলো বিভক্তির উল্লেখ করেন। যেমন, কন্ঠ সংগীত, যন্ত্র সংগীত এবং কন্ঠ সংগীতের অনুবিভাগ (চ্যান্ট, মোটেট, এবং এনথেম)। এখানে উল্লেখ্য যে, বিবর্তন হলো বস্তুর সংহতি এবং একই সাথে গতির স্তিমিতি; এসময় বস্তু আপেক্ষিকভাবে অনির্দিষ্ট, অসংবদ্ধ, ও সমসত্ততা থেকে অপেক্ষাকৃত সুনির্দিষ্ট, সুসংবদ্ধ অসমসত্ততার দিকে অগ্রসরমান; এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি গতিরও একটি সমান্তরাল রূপান্তর ঘটে। [Evolution is an integration of matter and concomitant dissipation of motion; during which the matter passes from a relatively indefinite, incoherent homogeneity to a relatively definite, coherent, hitaroginity; and during which the retained motion undergoes a parallel transformation.][vii]

সংগীত সমালোচনার ক্ষেত্রে স্পেন্সারের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ববাহী। যদিও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পত্রিকার জন্য সে অপেরা ও সংগীতায়োজনসমূহে উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু অতিমাত্রায় প্রত্যক্ষবাদী দর্শন, বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা ও নিজস্ব ভাষাশৈলীর কারণে সে সব সমালোচনাসমূহ তেমন সমাদর পায়নি। এসব কারণে স্পেন্সারের সংগীত সমালোচনা সংগীতায়োজনসমূহের সরলীকৃত সমাজপাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনৈক উইলিয়াম জেমস তার সংগীত সমালোচনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন : In all his dealings with the art products of mankind he manifests the same curious dryness and mechanical literality of judgement.[viii]

আসলে ঊনিশ শতকে বিবর্তনবাদী চিন্তা তিনভাবে সংগীতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। এর একটি হলো সংগীত সংকলকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা, সংগীতের বিকাশে বিবর্তনধারার ব্যাখ্যা এবং সংগীতের প্রশ্নে স্পেনসারীয় বিবর্তনবাদের প্রভাব। বৃটেনের সংগীতের বিকাশের ঐতিহাসিকতার বিচারে স্পেন্সারের প্রভাব নিঃসন্দেহে ব্যাপক। তবে অন্যান্য লেখকদের প্রভাব স্পেন্সারের তত্ত্বকে অনেকটা খাটো করে দেয়। ১৮৭০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে স্পেন্সারের বিবর্তন তত্ত্ব যথেষ্ট উচ্চতা অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীতে তা ক্রমাগত নিম্নগামী হতে থাকে। পরবর্তীতে অনেক তাত্ত্বিক আসেন যাদের অবদান নিঃসন্দেহে স্পেন্সারের তুলনায় সুসংহত। যেমন, ঞযব ঊাড়ষঁঃরড়হ ড়ভ ঃযব অৎঃ ড়ভ গঁংরপ এমন একটি গ্রন্থ যা ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এই গ্রন্থে প্যারি যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন। প্যারি তার গ্রন্থে স্পেন্সারের সংগীত বিষয়ক বিবর্তন তত্ত্বের আলোচনা করেন। তিনি বলেন, স্পেন্সারের প্রগতি ও বিবর্তন সম্পর্কীয় তত্ত্ব সংগীতের ইতিহাসকারদের কিছুটা সমাধান দিলেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হবার মতো যথেষ্ট যুক্তি সেখানে ছিল না।

তিনি সরাসরি স্পেন্সারের এমন ধারণা নাকচ করে দেন যে, সংগীত উজ্জীবিত বক্তব্য থেকে উৎসারিত। তিনি অবশ্য মনে করেন বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে সংগীতকে একটি জীবদেহ হিসেবে ভাবতে হবে। তিনি স্পেন্সারের বিবর্তনবাদের সরলতা থেকে জটিলতার দিকে অগ্রসর হবার বিষয়টি প্রশংসা সহকারে উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অপরিপক্ব অবস্থায় কোনো জিনিস সমধর্মী হয় এবং ক্রমাগত বৈচিত্র্য ও নির্দিষ্টতার দিকে অগ্রসর হয়। সুতরাং সংগীতও সেরকম ক্রমাগত বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত হয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে নিজ নিজ শাখায় সংগীত সুনির্দিষ্ট ও সংহত হয়েছে। সংক্ষেপে প্যারির মূল্যায়নকে এভাবে উল্লেখ করা যায় যে,

১. সংগীত অন্যান্য জীবদেহের মতোই নিজেকে সৃষ্টি করে, ২. সংগীতের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন ধারাগুলো প্রথমে সংবদ্ধ থাকে, ৩. এই সংবদ্ধ বা একত্রিত রূপকে অবিকশিত সমধর্মিতা বলা যায়, ৪. প্রগতিশীল বিবর্তন

সংগীতসহ সমস্ত শিল্পকলাকে ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্ট ও পরিচ্ছন্ন রূপ প্রদান করে। পার্সি কার্টার বাক তার ঞযব ঝপড়ঢ়ব ড়ভ গঁংরপ (১৯২৪) গ্রন্থে বলেন, ডারউইন যেখানে শিল্পের উৎপত্তির সাথে যৌনতাকে সংশ্লিষ্ট করেছেন, স্পেনসার সেখানে বাক্যের স্বতঃস্ফুর্ত নতুনতর পুনরুৎপাদনকে দায়ী করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হার্বাট স্পেনসারের সংগীত বিষয়ক চিন্তাধারা প্রসঙ্গে তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন – ‘হার্বাট স্পেন্সরের একটা লেখার মধ্যে পড়িয়াছিলাম যে, সচরাচর কথার মধ্যে যেখানে একটু হৃদয়াবেগের সঞ্চার হয় সেখানে আপনিই কিছু না কিছু সুর লাগিয়া যায়। বস্তুত, রাগ দুঃখ আনন্দ বিষ্ময় আমরা কেবলমাত্র কথা দিয়া প্রকাশ করি না, কথার সঙ্গে সুর থাকে। এই কথাবার্তার আনুষাঙ্গিক সুরটারই উৎকর্ষসাধন করিয়া মানুষ সংগীত পাইয়াছে। স্পেন্সরের এই কথাটা মনে লাগিয়াছিল। ভাবিয়াছিলাম এই মত অনুসারে আগাগোড়া সুর করিয়া নানা ভাবকে গানের ভিতর দিয়া প্রকাশ করিয়া অভিনয় করিয়া গেলে চলিবে না কেন। আমাদের দেশে কথকতায় কতকটা এই চেষ্টা আছে; তাহাতে বাক্য মাঝে মাঝে সুরকে আশ্রয় করে, অথচ তাহা তালমানসংগত রীতিমত সংগীত নহে। ছন্দ হিসাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ যেমন, গান হিসাবে এও সেইরূপ; ইহাতে তালের কড়াক্কড় বাঁধন নাই, একটা লয়ের মাত্রা আছে; ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য, কথার ভিতরকার ভাবাবেগকে পরিস্ফুট করিয়া তোলা, কোনো বিশেষ রাগিনী বা তালকে বিশুদ্ধ করিয়া প্রকাশ করা নহে।’

১) মহাযুদ্ধদ্বয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে স্পেন্সার ও অন্য লেখকদের সংগীত সম্পর্কীয় উৎপত্তিতত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে তাদের আলোচনা সংগীতবিষয়ক অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করেছে নিঃসন্দেহে।

২) পঞ্চাশের দশকে এমন ধারণা পোষণ করা হয় যে, সংগীত বিবর্তিত হয়নি বরং মানুষ বিভিন্ন ধরনের সংগীত তৈরী করেছে।

৩) তবে সমাজবিজ্ঞানে সংগীতের বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা আজও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়।

৪) হারমোনির উৎপত্তি সংক্রান্ত স্পেন্সারের ধারণা তার সংগীতের উৎপত্তিসংক্রান্ত বিবর্তন তত্ত্বকে খাটো করেছে।

৫) স্পেন্সারের বক্তব্য সংগীতের সমাজতত্ত্ব ও সংগীতের জীবতত্ত্বের মধ্যে একধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, যার কারণে কন্ঠস্বরের জীবতাত্ত্বিক বিকাশ ও সংস্কৃতিগত উৎকর্ষ অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট হয়েছে।

৬) তবে কেউ কেউ মনে করেন কন্ঠস্বরের বিকাশের ব্যাপারটি মূলতঃ ভাষা ও শারীরতত্ত্ব ও পদাথবিজ্ঞানের বিষয়। শিল্পের এখানে তেমন কোন ভূমিকা নেই।

৭) সংগীতের উৎপত্তিকে সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিচার করার ক্ষেত্রে সামাজিক বিভিন্ন উপাদানকে সন্নিহিত করার প্রশ্নে স্পেনসার সরলীকরণের আশ্রয় নেন। সে কারণে স্পেন্সারের শিল্প বিষয়ক রচনা একপেশে, শুষ্ক ও যান্ত্রিক হয়ে দাড়িয়েছে।

৮) ‘মানবিক সংগীত’ প্রত্যয়টি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অন্য ধরনের সংগীতের অস্তিত্বের দিকে ইংগিত করা হয়েছে। এমন ধারণা বা ইংগিত স্পেন্সারের বক্তব্যকে জটিল করে। বরং সংগীত বলতে এমন ধারণাই যুক্তিযুক্ত : By ‘music’, we always understand a musical composition or at least its reproduction, that is to say, a consciously designed and constructed work of art.[i] But more than that, he [Spencer] he extended its meaning and application beyond the ream of the organic to all aspects of nature, from the formation of crystals to the birth of stars. Indeed, Darwin himself called Spencer “the great expounder of of the principle of Evolution”[ii] “Relational” and “Sensational” are the terms he (Spencer) uses whenever music is his subject. The sentaional is the purely tonal—the impression made by the sounds as sounds. The relational is the impression made by the composition itself. All Spencer’s complaints and adverse criticisms appear to arise from his objection to the relational being predominant among musicians.

কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩)

মার্কসীয় চিন্তা ও তত্ত্ব শুরু থেকেই সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে একত্রে বিবেচনায় এনেছে। সে কারণেই সংস্কৃতিমনা যে কোন লেখক বা পাঠককে মার্কসীয় বীক্ষণ আকর্ষণ করে। মার্কসের মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ভিত্তিতে সমাজকাঠামোর বিচার শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, আইন, মতাদর্শ বিষয়ক যাবতীয় চিন্তন ক্ষমতাকে উপরিকাঠামোর ভেতর ফেলেছে। মৌল কাঠামো মূলত উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সমাজের ভিত্তিভূমি। এই ভিত্তিভূমির সাথে উপরি-কাঠামোর সম্পর্ক তাঁর আলোচনায় চমকপ্রদ এক দিকদর্শন প্রদান করে। যে কারণে, সম্ভবত সমাজদর্শনের আলোচনায় মার্কস চির-অপরিত্যাজ্য এক চিন্তাধারার সূচনা করেছে। উপরিকাঠামো এমনটাই আদর্শিক পরিকাঠামো সৃষ্টি করে বা সৃষ্টি হয় যা মৌল কাঠামোকে স্থিরতা দেবার জন্য সবসময়ই সাহায্য করে। তবে এই সহযোগিতার মধ্যেও এক ধরনের দ্বন্দ্বের উপস্থিতি তিনি আবিষ্কার করেন। যার ফলে মৌলকাঠামোর পরিবর্তন উপরিকাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর মৌলকাঠামোর মধ্যে উৎপাদন শক্তির বিকাশ উৎপাদন সম্পর্ককে পুনর্বিন্যস্ত করে। যার কারণে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।

সামাজিক বিবর্তনে মৌলকাঠামো বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উপরিকাঠামোর মধ্যেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তন কতটা ব্যাপক ও শ্রেণীচরিত্র-নির্ভর তা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও মার্কসের কাছে উপরিকাঠামো সমাজের অভিজন শ্রেণী হাতিয়ার হিসেবেই গণ্য হয়। যে হাতিয়ার অভিজন শ্রেণী সমাজ-শাসনে ও অর্থনৈতিক শোষণে ব্যবহার করে।

এ পর্যায়ে এসে, একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তা হলো, শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের মতো বিষয়গুলো আদৌ কোনো স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও স্বয়ম্ভরতা উপভোগ করে কিনা। এক্ষণে একটি বক্তব্য স্মরণযোগ্য, Marx’s analyses of the commodity and modes of production forms a crucial basis of much recent critical theory, yet music scholars who have increasingly taken an interest in that theory as a means of exploring the cultural role of music at worked with Marx’s ideas primarily in derivative forms. Studies of art music in particular ab retained a humanist suspicion of materialist treatment. But if Marxist perspectives have rarely found their way into music studies, music, too, has figured only marginally in Marxist socialist analyses, even though the first work explicitly linking music and political economy comes from an economist.[i]

তবে একথা সত্য যে মার্কসের আলোচনায় সরাসরি সংগীত সম্পর্কে বিশ্লেষণ পাওয়া না গেলেও তার দর্শন এতটাই সূক্ষèদর্শী যে শিল্পকলার বিশ্লেষণের জন্য একটি পরিক্ষেপ লাভ করা এখানে সম্ভব। উল্লেখ্য যে, অনেকের প্রত্যক্ষ সংগীত বিষয়ক আলোচনা পাওয়া যায় কিন্তু একটি সামগ্রিক পরিক্ষেপ পাওয়া দুষ্কর; সেখানে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায় পরিক্ষেপ থেকে অগ্রসর হলে সংগীতের উপর আলোকপাত করা কঠিন হয় না। উপরের উদ্ধৃতির মধ্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে।

Marx and Music (2002)গ্রন্থটির উপযোগিতা সম্পর্কে এর সম্পাদক কোরেশী বলেছেন যে, এ গ্রন্থ সংগীতের মধ্যে সামাজিক, অথবা সামাজিকের মধ্যে সংগীতকে আবিষ্কারের সহায়ক হবে। আজকের দিনে পশ্চিমা সংগীত-বিজ্ঞানীদের মধ্যে জেন্ডার, নরগোষ্ঠী ও শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত করে সাংগীতিক পাণ্ডিত্য বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিক ভাবে এধরনের বিশ্লেষণ সংগীতের উপর বিশ্ব পুঁজিবাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিস্তারকে পরিস্ফুটিত করেছে। কোরেশী তার সম্পাদিত গ্রন্থে চারটি বিশ্লেষণী নির্দেশনার উল্লেখ করেছেন, যা মার্কসীয় সংগীত নির্দেশক অনুসন্ধানের পথ করে দিতে পারে :

১) পণ্যায়ন ও পণ্যপূজার (ফেটিসিজম) সাথে সম্পর্কিত করে সংগীত চিন্তার ভিতর থেকে ‘গবেষণা সমস্যা‘ নির্ধারণ করা।

২)  সংগীতের গীতিময়তা, কাব্যিকতা ও শৈলীপনাকে পুঁজিবাদ কর্তৃক সামাজিকভাবে মোথিত ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে দাঁড় করানো।

৩)  সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সংগীত সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে নির্ধারণ করা।

৪)   সংগীতবিজ্ঞান (musicology) ও সংগীত অনুশীলনের সাথে মার্কসবাদী রাষ্ট্রনীতিকে সম্পর্কিত করে গবেষণা সমস্যা প্রণয়ন।

প্রথমটির ব্যাপারে আলোচনা করতে যেয়ে ডেভিড গ্রামিট  বলেছেন, সংগীত বিষয়ে একাডেমিক মননশীলতা বলতে কি বুঝায়? সংগীতবিজ্ঞানে সংগীত কিভাবে নির্মিত তা জানা আদৌ সম্ভব কি? এ ব্যাপারে একটি উপায় হতে পারে সংগীত শ্রবণ। আসলে সংগীতবিজ্ঞান সংগীতের শ্রবণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সংগীতের অন্য দিকগুলো যেন অদেখা থেকে যায়। এক্ষেত্রে মার্কসের পণ্যের কথা বলা যায়, যা এই পণ্য তৈরীর পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ককে অবগুন্ঠিত করে রাখে। সংগীতের একাডেমিক পর্যালোচনা সংগীতকে বস্তুনিষ্ঠ সত্তা হিসেবে পাণ্ডিত্যপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয় করতে যেয়ে ক্রিয়াশীল মানবীয় ও সামাজিক তাৎপর্যের কথা ভুলে যায়।

তবে মার্কসীয় প্রত্যয়, যেমন, পুনরুৎপাদন, শ্রেণী সম্পর্ক প্রভৃতি ব্যতীত সংগীতের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সংগীতবিজ্ঞানের শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায় অনেক সময় সংগীতের বিদ্যায়তনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যেয়ে সংগীত সৃষ্টির সামাজিক উপাদানকে লঘু করতে পারে। সংগীতের মননশীল বিশ্লেষণ বিশ্লেষকের আবেগমূলক সংযুক্তি, ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও বিষয়ীমূলক উপাদানকে প্রশ্রয় দেবে এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে বলা যায় সংগীতের সাধারণ শ্রবণ ও বিদ্যায়তনিক সমীক্ষায় নন্দনতত্ত্বকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রকারান্তরে এরকমটি হলেই কেবল তা শ্রোতা, বোদ্ধা, শিক্ষিত এবং পরিশীলিতের পক্ষে সংগীতের সার্বিক প্রকাশযজ্ঞকে বোঝা সম্ভব।

মোটকথা সঙ্গীতকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে বলার মধ্যে যেমন নতুনত্ব নেই, সেরকম সাংগীতিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে, অনেক সময়, এই সামাজিকতাকে দেখতে পায় না। মার্কস তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তত্ত্বায়নে সংগীতকর্মকে সংযুক্ত করেননি।  The piano maker reproduces capital; the pianist only exchanges his labour for revenue. But doesn’t the pianist produce music and satisfy our musical car. Does he not even to certain extent produce the latter? He does indeed; his labour produces something; but that does not make it productive labour in the economic sense; …[ii]

মার্কস পণ্য এবং বিনিময়ের বিশ্লেষণের সাথে নন্দনতত্ত্বের পিছনে অপসৃয়মান সাংগীতিক কর্মকাণ্ডকে তুলনা করবার প্রবণতা তাঁর এই আলোচনায় আনবার প্রয়োজন আছে। এখানে আমরা আবার একবার দেখে নিতে পারি পণ্য বলতে মার্কস কি বুঝিয়েছেন : পণ্য হলো প্রথমত একটি বাহ্যিক বস্তু যা তার গুণাবলী দিয়ে মানুষের প্রয়োজন পরিপূরণ করে। এই প্রয়োজনের প্রকৃতি ক্ষুধা বা কল্পনা যাই হোক না কেন, তা খুব ব্যবধান বুঝায় না। তাছাড়া, কিভাবে প্রয়োজন পরিপূরণ হয়— সরাসরি পরিপোষণের উপায় বা ভোগের সামগ্রী পরোক্ষভাবে উৎপাদনের উপায় হিসেবে।

কিন্তু প্রয়োজন পরিপূরণের ক্ষেত্রে পণ্যের এই ব্যবহার মূল্য মোটকথা একটি দিক। পণ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গুণটি হলো, এটি বিমূর্ত মূল্য ধারণ করে যা অন্য পণ্যের সাথে বিনিময়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। বিনিময় কালে গুণাত্মক মূল্য অদেখা থাকে এবং বিনিময় মূল্য আসলে সব পণ্যের সাধারণ মূল্যকে প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রমের দ্বারা তৈরি উৎপন্ন হিসেবেই পণ্যটি প্রতিভাত হয়। কিন্তু বিনিময় মূল্য বিশেষ কোন ধরনের শ্রমকে নির্ণয় করতে পারে না, যদিও বিভিন্ন পণ্য বিভিন্ন ধরনের শ্রমে উৎপাদিত হয়। সুতরাং মূল্য নির্ধারণে মানবীয় শ্রমের বিমূর্ত রূপটি গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য বিষয়ক মার্কসের আলোচনায় গভীরভাবে যে জিনিসটি আসে তা হলো, বস্তুর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের পুঁজিবাদী বিমূর্তায়ন। পরিমাণের বিমূর্ত শ্রম-মূল্য হিসেবে যখন পণ্যের বিনিময় ঘটে তখন সেই পণ্যের পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ক প্রতিভাত হয় না।

মোটকথা, পণ্য নিজেই একটি মূল্যে পরিণত হয় না, বরং একটি ব্যবহার মূল্য বিনিময় মূল্য অর্জন করে। এ প্রসঙ্গে মার্কসের বক্তব্য : Since the producers do not come into social contact untill they exchange the products of their labour, the specific social characteristics of their private labours appear only within this exchange…. To the producers, therefore, the social relations between their private labours appear as what they are, i.e., they do not appear as direct social relations between persons in their work, but rather as material relations between persons and social relations between things.[i]

গ্রামিট পণ্যের এই চরিত্র বিষয়ক বিশ্লেষণকে আরও সম্প্রসারিত করে সংগীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। যেহেতু সামাজিক সম্পর্কের অর্থটি পণ্যের চরিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেহেতু অর্থের (সবধহরহম) ব্যাপারটি মননশীল গভীর অনুশীলনে প্রয়োগ করা যায়। সংগীত সম্পাদনের বিষয়টি মার্কসীয় বিবেচনায় উৎপাদনী শ্রম না হলেও সমাজে মানুষ সংগীতকে পণ্যের মতই ভোগ করে আসছে। রেকর্ডকৃত সংগীততো বটেই ‘লাইভ পারফর্মার’-গণ বিভিন্ন অবস্থায় মজুরি শ্রমিক হিসেবেই কাজ করে। বেতনভোগী একাডেমিক ব্যক্তিত্ব একই কায়দায় মজুরি-গ্রহীতা। সংগীত বিষয়ক প্রকাশনা পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার জন্য রসদ বা উপকরণ হিসেবে কাজ করে। সুতরাং, সরাসরি আর্থিক লাভ না হলেও পেশাগত স্বীকৃতির আদলে এইসব অর্জনকে ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও মননশীল উৎপাদনের চাহিদা যে সাংগীতিক বস্তুকে চায় তার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক উঠে আসে না। অর্থাৎ, যে সামাজিক সম্পর্কের মধ্য থেকে পণ্য হিসেবে সংগীতের উৎপাদন হয়, সেই পণ্যের চাহিদা থাকলেও তার পিছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্কের কোন মূল্য থাকে না। এভাবে আমরা সংগীতের সমাজিক সত্তাকে স্বীকৃতি দিতে ভুলে যাই।

যখন শ্রবণের দৃষ্টিকোণ থেকে নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয় তখন সংগীতকে আমরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলি। যেমন, বিমূর্ত সংগীতকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্থান দিয়ে থাকি এবং দক্ষতা অনুসারে অন্যগুলোকে এর পরের পর্যায়গুলোতে বিবেচনা করি। এভাবেই আমরা শিল্প থেকে শিল্পের দক্ষতা অর্জনকে নিচু স্তরে স্থান দেই। এভাবেই সমাজে সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষার্থীর মর্যাদাগত ব্যবধান স্বীকৃতি পায়। সংগীতের মূল্যায়নে শ্রবণের বহুমুখী সংযুক্তি লক্ষ করা যায়। এক অর্থে সংগীতকারের কাজÑ গুরুত্বপূর্ণ তেমন শ্রবণ ও শ্রোতৃমণ্ডলীও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামিট অবশেষে বলেন, সংগীতবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সংগীত এবং শিক্ষার্থী। যদি বলা হয় সংগীতবিজ্ঞান অবজেক্ট (সংগীত) এবং সাবজেক্ট (পরিশীলিত শ্রোতা) তৈরি করে। এভাবে সংজ্ঞায়িত করার সমস্যা হলো, বস্তুগত পণ্যের বিপরীতে সংগীতকে উপস্থাপন করা। সংগীতবিজ্ঞান উচ্চাঙ্গীয় সংগীত-সংস্কৃতিকে ব্যক্তির ভাবের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। গ্রামিট পরিশেষে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত বিভাগসমূহে নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগীত চর্চার ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে, যদিও সেসব বিভাগে পণ্ডিতজন ও অনুশীলনকারীদের অংশগ্রহণের দক্ষতা সমান নাও হতে পারে।

ক্লাপেনহাওয়ার  তাঁর প্রবন্ধ বলেন, ক্যাপিটাল গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদে কতিপয় বিশেষ ধরনের পণ্যকে ফেটিশিজম হিসাবে উল্লেখ করেন। এটি সহজেই বোধগম্য যে, একটি পণ্যকেন্দ্রিক শাস্ত্র হিসাবে সমকালীন সংগীত-তত্ত্ব এমন কিছু প্রক্রিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাকে মার্কসের ভাষায় ফেটিশিজম বলা যায়। সংগীতের উপর এই ফেটিশের প্রভাব মতাদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক হতে পারে। একারণে ফেটিশের প্রভাব আলোচনার জন্য সমকালীন সংগীতের মতাদর্শিক পরিবেশ জানা দরকার। সংগীতের মধ্যে একে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। মার্কস এবং ফ্রয়েড উভয়ে এই ফেটিশিজম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ক্লাপেনহাওয়ার তাঁর আলোচনা সংগীত-তত্ত্ব, পণ্য, ও ফেটিশিজমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। যেমন, কমোডিটি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সমাজের সম্পদের মধ্যেই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় বলে মার্কস উল্লেখ করেন।

মার্কস পণ্যের দুটি ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা পুঁজিবাদী সমাজে পণ্যের প্রকৃতিকে বুঝতে সাহায্য করে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই ধরন পণ্য ভেদে সাধারণ, কিন্তু এর দুটি পরষ্পর দ্বান্দ্বিক দিক রয়েছে। প্রথম দিকটি হলো পণ্যের ব্যবহার মূল্য যা পণ্যের গুণাগুণের উপর নির্ভর করে এবং ভোগের উপযোগিতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এই গুণাগুণের উপর নির্ভরশীল। পণ্যের এই ব্যবহার মূল্য প্রাকৃতিক। তবে এটি পণ্য ও পণ্যের ক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এই সম্পর্ককে জানতে হলেও পণ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলী জানা দরকার। অনেক আলোচক ব্যবহার মূল্যের প্রাকৃতিক-ভৌত গুণাবলীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচারে পণ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।

যাহোক, আমরা এই ‘ব্যবহার মূল্যের’ সামাজিক চরিত্র সম্পর্কে প্রথমে জানার চেষ্টা করি। প্রথমেই যা উল্লেখযোগ্য তা হলো ব্যবহার মূল্যগুণেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও ভোগ্য হয়ে থাকে। সুতরাং ব্যবহার মূল্যের উৎপাদন সমসময় পণ্যের জন্য উৎপাদন হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি পণ্য যখন বিভিন্ন শ্রেণীর লোক ভোগ করে তখন তা পণ্যের মধ্যে ক্রিয়াশীল সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলীকে দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে দেয় না। দ্বিতীয়ত, ব্যবহার মূল্য অবশ্যই এককের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়, বিশেষত, যখন তা অন্য পণ্যের সাথে বিনিময় করা হয়। দেখা যায় একই পণ্যের ব্যবহার মূল্যই সবসময় তার চাহিদা ও ব্যবহারকে নির্ধারন করে না। সুতরাং, এ অর্থে ব্যবহার মূল্য যেমন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলী ধারণ করে সেরকম সামাজিকও বটে। তবে পণ্য সমাজের মানুষকে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক প্রদান করে।

পণ্যের দ্বিতীয় যে ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বিনিময় মূল্য। বিনিময়মূল্যের মাধ্যমেই পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয়, যেহেতু ব্যবহার মূল্য নিয়েই পণ্যের জন্ম। সুতরাং বিনিময় মূল্যকে বাজার ব্যবহার প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত মূল্য বলে ধরা যায়। (অসমাপ্ত )

টীকা ও তথ্যনির্দেশ

[1]    John Offer, “An Examination of Spencer’s Sociology of Music and its Impact on Music Historiography in Britain”, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, V-14, No-1 (June 1983), pp. 33-52.

[1]    October 1857.

[1]    October 1857.

[1]    Literary Style and Music, p. 49.

[1]    Ibid; p. 49.

[1]    Ibid; p. 50.

[1]    ‘On the Origin of Music’, Mind, Vol.16, 1891, pp. 535-537.

[1]    Eva Mary Grew, Herbert Spencer and Music, The Musical Quarterly, Vol. 14, No. 1 (Jan, 1928) pp. 127-142.

[1]    Literary Style and Music, Watts, London 1950, p. 68.

[1]    Herbert Spencer, ‘The purpose of art’, Facts and Comments, William and Norgate, London, 1902, pp. 31-34.

[1]    Herbart Spencer, First Principles, London; William and Norgate, 1861, p. 358.

[1]    Cited in W Elton edited, ‘Feelings’ in Aesthetics and Language, Basil Blackwell, Oxford, 1954, pp. 56-72.

[1]    Wallaschek 1891

[1]    Cited in Robert L Carneiro, The Influence of Herbert Spencer on the World of Letters, Histories of Anthropologies Annual, Vol 1, 2005, pp. 246-270.

[1]    Allali 1987, cited in R.B. Qureshi, ‘Introduction: Thinking Music Thinking Marx’, Qureshi, Music and Marx: Ideas Practice Politics, Routledge, New York, 2002, P.[GB MÖš’wU †_‡K Avgiv wek`fv‡e mvnvh¨ wb‡qwQ]

[1]    Ibid, pp. 66.

[1]    Ibid pp. 125

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব–সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব [ধারাবাহিক]

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির বিষয়ের মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটিতে এমন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— যা ইতিমধ্যেই পাঠকের আগ্রহবিদুতে পরিণত হয়েছে। — চিহ্নসম্পাদক]

জর্জ সিমেল
সিমেলের প্রথম প্রকাশিত গবেষণা সংগীতের সমাজতত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময়। যদিও সংগীতের সমাজতত্ত্ব সম্পর্ক একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংবদ্ধ তত্ত্ব এখানে পাওয়া যায় না, কিন্তু সংগীতে তার অভিজ্ঞতা-লব্ধ গবেষণা বলতে চেষ্টা করে যে, সংগীতে কিভাবে সামাজিক অর্থ ব্যক্ত হয় এবং সমাজে সংগীতের অবস্থান ও ক্রিয়া কিভাবে চিহ্নিত করা যায়।
সিমেল ১৮৫৮ সনে জার্মানীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে তার রচনার নতুন করে মূল্যায়ন হয়েছে। তবে তাঁর প্রথম দিকের লেখাগুলোর মধ্যে মানবজীবনের শিল্পসত্তা, সংগীত ও লোকসংগীততত্ত্বের যে সম্ভার লক্ষ্য করা যায় তা এখনও যথেষ্ট মূল্যায়নের অপেক্ষা রাখে। জীবন সম্পর্কে সিমেলের শিল্পও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক দার্শনিক ভাবনা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
১৮৮২ সনে প্রকাশিত “Psycholgiche and Ethnologische e Studien iither Musik” প্রবন্ধ সংগীতের সমাজতত্ত্বের জগতে একটি উল্লেখ্যযোগ্য সংযোজন হিসেবে চিহ্নিত আছে। সিমেলের সংগীত বিষয়ক আলোচনা সমকালীন লেখকরা অবহেলা করার একটি প্রধান কারণ হলো তিনি মনে করতেন জনতাত্ত্বিক লোকসংগীতের সাথে সামাজিক গোষ্ঠী-মনস্তত্ত্বের সংযোগ রয়েছে। এছাড়া সমষ্টিগত সচেতনার ধারণা জার্মানীতে দেরিতে আসে। ১৯০৯ সালে ডব্লিউ. আই. টমাস প্রথম সিমেলের প্রসঙ্গ প্রকাশ করেন তার Seven Book for Social Order গ্রন্থে। সিমেলের আলোচনার যেটি উল্লেখযোগ্য দিক তাহলো ব্যক্তির যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংগীতের তাৎপর্য উপস্থাপন। তিনি মানবীয় সম্পর্কের কাঠামো তৈরি ও সংগীতের গুরুত্বসহ সর্বোপরি সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিধিতে এর নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
তিনি সংগীতকে সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করেছেন যা আবার নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। সে কারণে সিমেলের আদি রচনা বিশেষত তাঁর প্রবন্ধটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সংগীত ও শিল্পের আওতাভুক্ত প্রথমে দেখা যাক সিমেল সংগীত সম্পর্কে কি ভাবেন। সিমেল তাঁর বক্তব্যের শুরুতে সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে ডারউইনের তত্ত্ব আলোচনা করেন। ডারউইনের মতে মানুষ বাচন ও তাল উন্নয়নের আগে কণ্ঠ-সংগীতের উন্নতি ঘটায়। সিমেল বিশ্বাস করতেন কণ্ঠ-সংগীতের বা কণ্ঠ-নিসৃত যেকোন কৌশলের শারীরিক ভত্তি কাজ করে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবেএটি যতটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসন্দিগ্ধ হতে পারেন না। তিনি কণ্ঠের শারীরিক ভিত্তি স্বীকার করলেও কণ্ঠ-প্রতিভার ক্ষেত্রে জেনেটিক গুণাবলী স্বীকার করেনা। He views music as an acoustic medium of communication which conveys feelings of the performer. তিনি বারবার বিভিন্ন তথ্য সহকারে বুঝাতে চেয়েছেন যে, সংগীত ভাষা বিবর্তনের একটি উন্নত ধাপ যা ভাষানির্ভর যোগাযোগের বিশেষ পর্যায় নির্দেশ করে, ভাষানির্ভর যোগাযোগের উৎপত্তিকে নয়। মানুষের বাক্য বিনিময় সব সময় আবেগকে যথার্থভাবে প্রকাশ করতে পারে না। আর সেক্ষেত্রে সংগীতের প্রয়োজনীয়তা প্রতিভাত হয়। এছাড়া, ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের আবেগাপ্লুত প্রকাশ সংগীতে সম্ভব হয়েছে। মানুষের কথা থেকেই চিন্তার জন্ম আর কণ্ঠসংগীত থেকে ভাষার উৎপত্তি হয়নি। বরং বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা, শ্রুতিমাধুর্য্য ও ছন্দময়তা বৃদ্ধির পেছনে সংগীতের প্রভাব অনস্বীকার্য। সংগীত হলো যোগাযোগের মাধ্যম যার সাথে ব্যক্তির আবেগ জড়িত থাকে। স্পেনসার যেমন বলেন, Language is related to concrete throught so is music related to feelings which are somewhat less precise. The first (language) creates the second (thought) since the second created the first. সিমেল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে প্রচুর পরিমাণ জাতিতাত্ত্বিক উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
সিমেলের সংগীততত্ত্ব ক্রিয়াবাদী, বিবর্তনবাদী নয়। তাঁর কাছে কণ্ঠসংগীত ছন্দ-আরোপিত ও কণ্ঠস্বর-সমৃদ্ধ বক্তব্য। অন্যদিকে যন্ত্রসংগীত বা যন্ত্রের সাংগীতিক ব্যবহার হলো কণ্ঠসংগীত চর্চার বিস্তৃত রূপ। স্বাভাবিকভাবেই যন্ত্রসংগীত কণ্ঠসংগীতকে সুমধুর করে এবং শ্রুতিমধুর করে। তবে যন্ত্রসংগীতকে আবেগহীন বলা যাবে না। যা আবেগের অর্থ ও বহিঃপ্রকাশকে বাক্সময় করে, –তাকে নিছক যন্ত্রের ঝনঝনানী ভাবা ঠিক নয়। যন্ত্রসংগীত সময়ের সাথে সাথে নিজস্বতায় সমৃদ্ধ হয়েছে এবং পরিশীলনের উপযুক্ত শিল্প হিসাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যদিও যোগাযোগের ক্ষেত্রে যন্ত্রসংগীতের মূল্য রয়েছে এবং এক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনেক অপ্রত্যক্ষ। কণ্ঠসংগীতের ভূমিকা যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক প্রত্যক্ষ। যাহোক, সিমেলের শিল্পতত্ত্ব ও সমাজকাঠামোর সম্পর্কের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত কৌশল ও বিভিন্ন সামাজিক অনুসঙ্গ যা এর সাথে জড়িত তা সমাজতাত্ত্বিক শিল্প-মূল্যায়নের জন্য জরুরী। মানুষ কিভাবে সামাজিক উদ্গাতা হিসেবে সাংগীতিক গুণাবলী ধারণ করলেন; কিভাবে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মকান্ড হিসেবে স্বীকৃত হলো এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সংগীতের আয়োজন দেখা যায় তা জানা প্রয়োজনীয়। সংগীতের সামাজিক সম্পাদন ও গ্রহণ আবার সংগীতকে আরো সংহত ও সুচারু করে।
সিমেল শেষ বয়সে শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যা তাঁর প্রথম জীবনের সংগীত বিষয়ক লেখার পরিপূরক বটে। ১৯১১ সনে প্রকাশিত গ্রন্থ (Philosophe Kulture) ও ১৯১৭ সনে লিখিত গ্রন্থটি (Grandfragen der Soziolagic) এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে সিমেল বলেন, শিল্প তার নিজস্ব গুণেই শিল্প এবং এক্ষেত্রে শিল্পের স্বায়ত্ত্বশাসিত জগৎ আছে বলে তিনি মনে করেন। চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত শিল্প মানবীয় জীবনাশ্রয়ী হলেও জীবনমুক্ত অস্তিত্বের অধিকারী। উপকরণ হিসেবে যা গ্রহণের দরকার তা জীবন থেকে গ্রহণ করে, কিন্তু পরিণতি ও পরিপক্কতা লাভ করার সাথে সাথে তা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। জীবন থেকে শিল্প সেটুকুই গ্রহণ করে যা তার স্বভাবের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। তবে অনেকটা দুরখার মতো বলতে চেয়েছেন এই শিল্পের একটা সামাজিক পরিণতি ও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ মানুষের কর্মকান্ডের উপর নির্ভরশীল না হয়েও সামাজিক ফলশ্রুতি বয়ে আসে। দুরখার ’সামামজিক ঘটনা’ প্রত্যয়টি এক্ষেত্রে স্মরণীয়। অন্যদিক থেকে বলা যায় শিল্পও নন্দনতত্ত্বের স্বাধীনতাকে বুঝাতে যেয়ে সিমেল কিছুটা দার্শনিকতার আলোকে শিল্পের স্বয়ম্ভু সত্তার কথা বলেছেন। তবে এটি সত্য যে শিল্পের বিচারে অগ্রসর হলে তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে বাদ দেয়া যায় না। তাছাড়া, শিল্পের উপকরণ ও ফলাফলকে সামাজিকভাবে অনুসন্ধানের মধ্যে শিল্পের সমাজতত্ত্ব নিহিত। প্রাথমিক দিকের রচনা সংগীতের সামাজিক যোগাযোগ ক্রিয়াকে দেখার ও বোঝার চেষ্টা করে। কোন বিশেষ সংগীত অনপেক্ষ (absolutistic) আনুষঙ্গিক (referentialistic) অভিধা ব্যক্ত করে।
সিমেল আনুষঙ্গিক অর্থকেই প্রথম জীবনে গুরুত্ব দিতেন। এক্ষেত্রে সংগীত-বর্হির্ভূত জগতের ধারণা, ক্রিয়া, ও আবেগ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মধ্যেই গীতিকার ও সংগীতশিল্পী বসবাস করেন। এ বিশেষ সাংগীতিক কর্মকান্ড ও সংগীতের বিষয়বস্তু সমাজ-নির্ধারিত পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে দিয়েই পল্লবিত হয়। শেষ জীবনে সিমেল অনপেক্ষ বা সংগীতের মূলার্থ নিয়েই ব্যাপৃত থেকেছেন বেশি। সংগীতের উপাদানসমূহের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই এখানে গুরুত্ব পায় কারণ সংগীত-রচনার কাঠামো নির্মাণে এসব সম্পর্ক নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সংগীতের সংজ্ঞায় আবেগের সঞ্চারণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তাই সিমেল জানতে চান ‘সামাজিক যোগাযোগের কাঠামো’ আসলে কি?
এখানে সিমেলের আগের কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে, যন্ত্রসংগীত, কণ্ঠসংগীতের মতো আবেদনশীল ও যথার্থ নয়। এজকোর্ন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, যদি শ্রোতামন্ডলী যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে তবে তাঁরা যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সমান মনোযোগী হবে। যেমন, সিনেমায় দৃশ্যে যন্ত্রসংগীত এমন দক্ষতার পরিচয় দেয় যে দর্শকবৃন্দ ঘটনার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। যন্ত্রসংগীত এখানে কণ্ঠসংগীতের চেয়ে কোন অংশ কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
সার্বিক বিচারে সিমেলের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো:
১) শব্দযোজনা মূলত অর্থহীন থাকে যদি না তাকে আবেগময় ভাষার জন্য শ্রোতামন্ডলী শিক্ষণ লাভ করে।
২) সংগীত মানুষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী বিভিন্ন সাংগীতিক শৈলী পছন্দ করে।
৩) বড় শিল্প হবার জন্য সংগীতকে অবশ্যই সামাজিক বা জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করতে হবে। এভাবেই তা সকলের জন্য আবেদনশীল শিল্প হয়ে উঠতে পারে।
৪) সংগীতকে তাই বলে দেশপ্রেমভিত্তিক হতেই হবে এমন নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল সমাজ সবচেয়ে সুন্দর সংগীত উপহার দিয়েছে।
৫) শিল্পীকে বড় হতে হলে তাঁকে একটি শিল্প-ঐতিহ্যের মধ্যে গড়ে উঠতে হবে যা প্রকারান্তরে তার অন্তর্গত প্রতিভার বিকাশকে সহজসাধ্য করবে।
ম্যাকস্ ওয়েবার
ওয়েবারের সংগীত বিষয়ক চিন্তা খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর Economy and Society (1921) শীর্ষক গ্রন্থে। ওয়েবার পুঁজিবাদের উৎস নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন ধর্ম, নৈতিকতা, ও কাজের যৌক্তিকীকরণ কিভাবে পুঁজিবাদী সমাজকে সম্প্রসারণ করেছে। Weber saw the rationalization of the Western cultures as the unique element that led to capitalist rise in the West. Part of this nationalization process was the growth of bureaucracies, as the increasing capitalistic division of labor compartmentalized and structured traditional organizations, like education and government, into bureaucracies. ওয়েবার মনে করেন চার্চের ক্ষেত্রে যেভাবে আমলাতন্ত্র বিকশিত হয়েছে সেভাবে অন্যত্র দেখা যায় না। রোমান ক্যাথলিক চার্চের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত্যন্ত সত্য। চার্চের গানের একটি ব্যাপার আছে। চার্চের জন্য গানের আয়োজন, প্রস্তুতকরণ ও সদস্যদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মকানুনের মধ্যে দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চে সংগীতের নোটেশন সংরক্ষণ করা হয়। আর এই নোটেশন উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ব্যাপারটিকে ওয়েবার তার পদ্ধতিতাত্ত্বিক বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, চার্চের পুরোহিত নোটেশনের পরিশীলন ও শিক্ষাদানেই কাজটি করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এই দালিলিক প্রমিতকরণ ও যৌক্তিকীকরণকে ওয়েবার তার গবেষণামূলক ফোকাস হিসেবে গ্রহন করেন। তিনি ইউরোপকেন্দ্রিক ও আন্তঃসাংস্কৃতিক তুলনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, সংগীতের ক্ষেত্রে যৌক্তিকীকরণ হয় এবং চার্চের বৃহত্তর আমলাতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে তা বেড়ে ওঠে।
সংগীত সম্পর্কে ওয়েবারের অনুরাগ ছিল বিচিত্র। তিনি যেমন দীর্ঘ পরিসরে সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশ দেখেছেন, তেমন ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব নিয়েও ভেবেছেন। ওয়েবারের সময়টি ছিল পাণ্ডিত্বের সাথে শিল্পের সংযোগের সময়। অর্থাৎ যেকোন বড় মাপের মানুষ শিল্পবোদ্ধা ও সংগীত-চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল। ওয়েবারের শিল্পবোধ ও সংগীত ভাবনা সেকারণে ঐতিহ্যলালিত ও জর্মন সংস্কৃতি-সঞ্জাত।
যৌক্তিকীকরণ ওয়েবারের সকল রচনার প্রাণপাখি। তিনি ঐতিহাসিকতার দিক থেকে বলতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সংগীত আধুনিক সংগীতের রূপ নিয়েছে ক্রমাগত অযৌক্তিক গুণাগুণের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। কর্ডভিত্তিক হারমনির বিকাশ এই সময়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সংগীতকার বা শিল্পী আগে তাদের ইচ্ছামাফিক তরঙ্গ সৃষ্টি করতেন, আর বর্তমানে সুসংগঠিত, পরিমিত ও করডাল হারমনির যৌক্তিক নীতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
রোমান ক্যাথলিক যাজকতন্ত্র, মধ্যযুগের সামন্তকাঠামো, স্বরলিপি, গিল্ড কর্তৃক সংগীত যন্ত্রের উদ্ভাবন, সংগীতে সুরেলা কথ্যভাষার ব্যবহার ইত্যাদি করেছেন এগুলোর সম্পর্ক ও পারম্পর্য অনুধাবনের জন্য। সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে দুটি মুহূর্তের কথা গুরুত্ব সহকারে তিনি উল্লেখ করেন। আর তা হলো যন্ত্রের আবিষ্কার ও স্থায়ীভাবে একটি কারিগর শ্রেণীর উৎপত্তি এবং দ্বিতীয়ত শিল্পীর অধিষ্ঠান। কারিগর শ্রেণীর কাছ ছিল সংগীত যন্ত্রের ক্রমাগত উৎকর্ষসাধন এবং যন্ত্রীর কাজ ছিল যন্ত্রের চাহিদা ও বাজার সৃষ্টি করা। সংগীত যন্ত্রের প্রমিতকরণ ও লিখিত স্বরলিপি একটি সংগঠিত আধুনিক সমাজের যৌক্তিক কর্মকান্ড। সেই তেরো শতকেই বিভিন্ন সামন্ত সভাকেন্দ্রগুলো নতুন নতুন যন্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি করে এবং জটিল সংগীত-উপযোগী সূক্ষ্মতা দাবি করে। এমন চাহিদা সংগীত-শিল্পী ও সংগীত সংকলকদের অনুপ্রাণিত করে।
অর্কেস্ট্রা ও তারযন্ত্রসমূহের উত্থান মধ্যযুগের পরেই সাধিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে ওয়েবার তাঁর ঐতিহাসিক যৌক্তিকীকরণের মধ্যে সংগীতকে সংযুক্ত করেন সংগীত-যন্ত্রের অর্থনৈতিক মূল্য যাচাইয়ের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে, শুধু অর্থনীতি নয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, কৃৎকৌশলগত, এমন কি জলবায়ুগত ফ্যাক্টর সংগীত-যন্ত্রের যৌক্তিক উৎভাষণে যুক্ত হয়েছে। যেহেতু জলবায়ুগত কারণে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের মানুষকে ঘরাবদ্ধ ও ঘরকেন্দ্রিক করে রেখেছিল সেকারণে পিয়ানো দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংগীতচর্চা ও মর্যাদার সূচক হিসেবে পিয়ানোকে গণ্য করা হতো। ভোগ ও উৎপাদনের পুঁজিবাদ প্রসার হওয়ার সাথে সাথে যন্ত্রচালিত পিয়ানোর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সমস্ত পশ্চিমা দেশে এবং তাদের উপনিবেশসমূহে উনিশ শতক থেকে সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণবস্তু হিসেবে পিয়ানোর ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পিয়ানোর বিবর্তন, ব্যবহার ও বিস্তারকে ওয়েবার পুঁজিবাদী সমাজের যৌক্তিকীকরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করেছেন।
এক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতিতাত্ত্বিক পরিমাপের গভীরতা লক্ষ্য করা যায় যা সংগীতের সমাজতত্ত্ব অধ্যয়নে অপার কৌশলিক অবদান হিসেবে অনস্বীকার্য। টারলির ভাষায়, In Weber’s case his goal was to examine music as an example of irrational culture, production being organized and made rational by the rationalization process. As a society becomes increasingly organized in a rational manner, rather than a society organized by strict kin or clan groupings, rationalized production of goods will become so prevalent that the culture itself will be produced according to rational values. টারলির মূল্যায়নে ওয়েবারের সংগীত সম্পর্কীয় বক্তব্যের আরো বিস্তারিত সমালোচনা পাওয়া যায় যা এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না। যেমন, ওয়েবারের পদ্ধতিকে শুধু যৌক্তিকীকরণ প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে না নিয়ে, ‘সংগীতের সত্যিকার অধ্যায়নের’ কাজে লাগানো যায়। স্বরলিপি, ছন্দ, লয়, প্রভৃতির আনুষ্ঠানিকতা সংগীতের সঞ্চরণকে স্বাধীন শিল্পের রূপ পরিগ্রহ করতে সাহায্য করে। এমন স্বমহিমা সহজেই সংগীতকে প্রকাশনের উপযুক্ত পণ্যে পরিণত করে। পুঁজিবাদে সংগীতের এই বাজারীকরণ পরবর্তীতে আরো জটিল পথ অতিক্রম করে।
টারলি মনে করেন, শিল্প ও সংস্কৃতি সমাজের শেষ প্রান্তিক উপাদান যা পুঁজিবাদী যৌক্তিকীকরণের শিকার হলো। অবশ্য বিষয়টি আরো গভীর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। কারণ সমাজতাত্ত্বিক অর্থে সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। আমাদের প্রতিটি কাজ, স্থাপনা, বিশ্বাস, আইন ও প্রথা-প্রতিষ্ঠানই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। যদিও আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে পণ্যায়ন সহজ-লক্ষণীয়, শিল্পের পণ্যায়ন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নয়। কারিগর ও শিল্পকর্ম অনেক আগে থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে আসছে। এব্যাপারে অন্যত্র ব্যাপক আলোচনার সুযোগ আসবে। কিছু ক্ষেত্রে যেমন লোকসংগীত, আধ্যাত্মিক সংগীত, ও ধর্মীয় সংগীত অনেক পরে বাজার পেয়েছে। একথাও সত্যই যে ধর্মীয় সংগীত হয়েও পশ্চিমে তা অগ্রণী পণ্যায়নের শিকার হলেও পূর্বে তেমনটি হয়তো হয়নি। কিন্তু পশ্চিমের বাইরে সংগীতের বিকাশও যে কত বিচিত্র ও চমকপ্রদ বিশেষায়ণের দৃষ্টান্ত রেখেছে তা ওয়েবারের যৌক্তিকীকরণের সমতুল্যতো বটেই, বেশি কিছুও বটে। যেমন, ভারতে সংগীত চর্চার ইতিহাস নিঃসন্দেহে দীর্ঘ ও বিচিত্র। উল্লেখ্য যে,
১) ইউরোকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ওয়েবারের সংগীতের সমাজতত্ত্বের প্রাথমিক ত্রুটি।
২) যৌক্তিকীকরণকে ব্যাখ্যার জন্য আমলাতন্ত্র ও সংগীতের বিকাশকে ব্যবহার করা অনেকটা মনগড়া মনে হতে পারে।
৩) চীন, জাপান, মিশর ও ভারতের মতো দেশে সংগীতের দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী বিকাশধারা ওয়েবার না দেখার চেষ্টা করেছেন।
৪) ইউরোপের বাইরের সমাজজীবনকে ও ক্ষমতার বলয়ে সংগীত ও সংগীতকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে মনে হয় ওয়েবার তাঁর তত্ত্বকে আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলেছে।
৫) হ্যাবারমাসের মতে সংগীতের প্রতীকী ব্যঞ্জনা এমন একটি উৎকর্ষ-মাত্রা লাভ করে যা সাধারণ পুঁজিবাদী যৌক্তিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
৬) হ্যাবারমাস মনে করেন সাংগীতিক স্বরলিপি ও মানুষের অন্যান্য সংগীত বিষয়ক অবদান সংগীতকে যতটা গণমাধ্যমের সাথে সস্পৃক্ত করে, পুঁজিবাদী উদ্যোগ ততটা পারেনি।
৭) হ্যাবারমাস Theory of Communicative Action প্রকাশের মাধ্যমে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, মার্কস শ্রমের উপর যেভাবে এবং যতটা গুরুত্ব আরোপ করেছেন সেভাবে মানুষের আন্তঃক্রিয়া বা ভাবনা-চিন্তার লেনদেনকে মূল্যায়ন করেননি। সেকারণে যোগাযোগমূলক ক্রিয়া নতুনভাবে মূল্যায়িত হওয়া দরকার।
৮) যৌক্তিক ক্রিয়া, স্বরলিপি, যাজকতন্ত্র ও গিল্ড পশ্চিমা সংগীতের বিকাশের প্রধান কারণ নাও হতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে নগরায়ন নাগরিক সংস্কৃতির উৎপাদনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সম্প্রদায়, গতিময়তা ও সংস্কৃতি নগরায়নকে পরিপুর্ণতা দিয়ে থাকতে পারে, যৌক্তিকীকরণ নয়। অবশ্য, নগরের বিকাশ ও নগরের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি এক অর্থে যৌক্তিকীকরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
৯) সংগীতকারদের সম্প্রদায়, অঞ্চল, সংগীতকেন্দ্রিক ব্যবসা, সংগীতের উৎপাদন ও প্রসিদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা প্রাপ্ত বিভিন্ন সংগীত দলের বিকাশ বিশ্লেষণ করলে অনেক নতুন উপাদান খুঁজে পাওয়া যায় যা ওয়েবারের ব্যাখ্যাকে নিতান্ত ক্ষদ্রপরিসর গবেষণা হিসেবে নির্দিষ্টতা দেয়।
১০) আজকের পুঁজিবাদী সংগীত আয়োজন, উৎপাদন ও বিতরণের সাথে কতিপয় কোম্পানীর সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়। এরা শুধু সংগীতকে পণ্যে পরিণত করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে তাই না, শ্রোতাদের স্বাদকেও নির্মাণ করছে। সুতরাং যৌক্তিকীকরণের মাত্রা, পরিধি ও গুণাগুণ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ এসে যাচ্ছে।
১১) ওয়েবার সমাজবিজ্ঞানী হলেও সংগীতকার ও সংগীতের উপর সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নগরায়ন, নরগোষ্ঠী, সংগঠন ও সম্প্রদায়গত কাঠামোর প্রভাব যথেষ্টভাবে আসেনি। সুতরাং সংগীতের সমাজতত্ত্ব বিবেচিত হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদানও সন্নিবেশিত হয়নি।
১২) তবে ওয়েবারের পদ্ধতিতাত্ত্বিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আজকের সংগীতভিত্তিক ব্যবসা ও তার ঐতিহাসিক প্রবণতাকে বোঝার জন্য সহায়ক হতে পারে।
যে কাঠামোগত অধিষ্ঠান সংগীত সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে তার অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ সত্যই দুরূহ ব্যাপার। ওয়েবার এ কাজে কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছেন বলা যায়। ওয়েবার সংগীতের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আজকের সমাজবিজ্ঞানীদেরকে সে কাজটি করার জন্য ওয়েবারীয় যৌক্তিকতা, পুঁজিবাদ, ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত উপাদান উৎসাহিত করতে পারে। মারটিন মনে করে অ্যাডার্নো মূলতঃ ওয়েবারের পথেই অগ্রসর হয়েছিলেন সংগীত গবেষণার ক্ষেত্রে। সার্বিক বিচারে বলা যায় ওয়েবার সংগীতের সমাজতত্ত্বের পুরোধা-পুরুষ।

ধারাবাহিক রচনা– বিচিত্র সমাজতত্ত্ব সংগীতের সমাজতত্ত্ব

মিউজিকোলজি সীমা থেকে অসীমের প্রতি ধাবমান এক শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পূর্বে বিখ্যাত কম্পোজার, তাঁদের সাধনা, হস্তলিপি থেকে বর্ণ, যৌনতা, জ্যাজ বা রকের উৎপত্তি ও সম্পৃক্ততা নিয়ে আজ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংগীতের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে পাঠ্য-সমালোচনা, আনুষ্ঠানিক বিশ্লেষণ, প্যালিওগ্রাফি, বর্ণনার ইতিহাস বা আর্কাইভিভিত্তিক গবেষণা থেকে বর্তমানে ডিকনস্ট্রাকশন, উত্তর-উপনেবিশক বিশ্লেষণ; অবভাসতত্ত্ব ও পারফরম্যান্স পাঠের বিষয়গুলো চলে এসেছে। অর্থাৎ দার্শনিকতা, সমালোচনাতত্ত্বের বিতর্ক ও সাক্ষ্যপ্রমাণের নতুনতর পদ্ধতিতত্ত্বের হাওয়া মিউজিকোলজির সমগ্র পরিমণ্ডলকে প্রসারিত করেছে। নতুনভাবে সাংগীতিক টেক্সের ধারণা, নতুন বিশ্লেষণী কৌশল ও বিষয়ী-সম্পর্কিত নতুন ভাবনা-চিন্তা একত্রিত হচ্ছে।১ আর সংগীতের সমাজতত্ত্ব সমাজ পরিসরে সংগীতের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাবের দিকটি গভীরভাবে জানতে চায়। সংগতি নিঃসন্দেহে হৃদয়গ্রাহী, সংহতি-শক্তির আধার। মানুষকে এবং মানুষের আন্তঃক্রিয়াকে বহুমুখী করতে প্রভাব রাখে। আবার সংগীতের আবহে মানুষ উন্মনা, স্থির ও আধ্যাত্মিক ভাবে নিমজ্জিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সংগীত কথার চেয়ে বেশি অর্থপূর্ণ। কবে কখন সংগীত কি আকারে আবির্ভূত হয়েছে তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে মানুষের ভাষার আগে শব্দের বা ইংগিতের যে ব্যবহার শুরু হয়েছিল তাতেও সংগীত লুকিয়ে ছিল। আমরা যাকে বাজনা বলি সংগীতের এই অনিবার্য উপাদানটি পূর্ণাঙ্গ সংগীতের পূর্বসূরী বলা যায়। মানুষ যখন ভাষা শিখলো, অর্থময়তায় আবদ্ধ হলো, বাণীর সৃষ্টি হলো, তখন পূর্ব থেকে চর্চিত বাজনার তালে তালে সেই বাণী উচ্চারিত হতে থাকলো। এই উচ্চারণ ক্রমাগত পরিশীলিত হতে হতে সুসংবদ্ধ সুরের সৃষ্টি করলো। এর সাথে রাগ-তাল যুক্ত হয়ে সংগীতকে সর্বোৎকৃষ্ট একটি শিল্প হিসেবে মানবীয় সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করলো বয়েমারের মতে ‘সোসিওলজি অব মিউজিক’ হলো: A discipline that examines the interrelations of music and society. Properly speaking it is neither musicology nor sociology, but may borrow from both, whatever tools and technique its requires to establish and implement the conceptual framework and methodology that is musicology, that is peculiar to itself.৮

সংগীতের সমাজতত্ত্ব দেখতে চায় সমাজের উৎসমুখগুলো কিভাবে সংগীত-সৃষ্টি, অনুশীলন ও সম্পাদনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। যদিও ক্ষেত্র বিশেষে আত্মসুখ লাভের জন্য সংগীত সাধনা করা হয়ে থাকে, কিন্তু সে-সংগীতের বাণী অনেক ক্ষেত্রে সমাজসঞ্জাত। সংগীতের শ্রবণ, শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে এক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্ক যে একমুখী তা নয় শ্রোতা তার শ্রবণের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভাষায়, আচরণে, কখনো সমাজে কখনো শিল্পীর উদ্দেশ্যে। শ্রবণ একটি অনিঃশেষ ক্রিয়া; কোথায় কখন যে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে বলা কঠিন। তাছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে সংগীত-সৃষ্টি ও সম্পাদন একটি দলীয় তথা সামাজিক ব্যাপার। শুরু থেকেই সংগীতের দলীয় অভিব্যক্তি-আয়োজন সংগীতের সামাজিকতাকেই প্রকাশ করে।

আমরা জানি সংগীতের ধরনগত পার্থক্য রয়েছে। দেশে দেশে সংগীত তার নিজস্ব মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষত উচ্চাংগ সংগীত, আধুনিক সংগীত ও জনপ্রিয় সংগীতের ধারা যেনো অনেকটা সাধারণ। সংগীতের উৎপত্তি যে-জঙ্গলেই হোক, রাজদরবারে স্থান ও পৃষ্ঠপোষকতা পাবার গৌরব সে পেয়েছে। আবার গণমানুষের সংগীত হিসেবে ঈশ্বরবাদী, আধ্যাত্মবাদী, দেহতাত্ত্বিক, প্রভৃতি সংগীতের স্বসৃষ্ট জগত লক্ষ্য করা যায়। এদের শ্রোতাকেও আলাদা করা যায়। যদিও শ্রোতাদের স্থান পরিবর্তন হয়েছে, সময়ের সাথে সংশ্লিষ্টতার তারতম্য ঘটেছে, তবে একটি শ্রেণীচরিত্র পাওয়া যায়। অর্থাৎ শ্রেণীভিত্তিক সংগীত-শ্রোতাদের একটা বিভাজন লক্ষণীয়।৩ ব্ল্যাকস্টোন বলেন, The abstract, ethereal and fleeting nature of music has after been construed as a bridge, a mediator between the earthly and the heavenward. … I am talking of histories of sound that come down to us as whispers of which we are dimly aware: whether from ancient, mystical tradition or, from analysis that posit the act of listening as socially constructed or, turn the true in cultural studies that redefined listening as active act.

আজকের দিনে সংগীত অনেক স্থায়ী ও সহজলভ্য হয়েছে রেকডিং ও ইলেকট্রনিক-ব্যবস্থার সুযোগে। এতে করে সংগীত শুধু শিল্প হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করেছে তাই নয়। পণ্য হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। এই পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যারা সংযুক্ত তাদের সংখ্যা অজস্র। এসব কারণে সংগীতের সমাজতত্ত্ব ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে, তরান্বিত হচ্ছে, প্রতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাধারণভাবে বলা যায়, সামাজিক ক্রিয়া হিসেবে সংগীতের সৃষ্টি ও শ্রবণ সততঃ মতৈক্যের ও পুনর্গঠনের বিষয়বস্তু রয়ে গেছে। শ্রোতার কাছে সংগীত স্বীকৃত হয় প্রথাগত ধারা ও অনুশীলনের ধরন ও নিয়মনীতির কারণে। সুতরাং অপ্রথাগত ও অসংগত সংগীতকে শ্রোতৃমন্ডলী প্রত্যাখ্যান করে। শ্রোতার এই প্রত্যাখ্যানের একটি বড় কারণ হলো প্রজন্ম পরম্পরায় এক ধরনের সংগীত চেতনার সাথে বসবাস করে আসছে। কোন সংগীত যখন তার অন্তর্নিহিত সংগীত-চেতনার সাথে মিলে না তখন তা পরিতাজ্য হতে পারে। তবে এখানে আরেকটি বিষয় চলে আসে তা হলো যারা কম সংগীত শুনেছে, বা যাদের মধ্যে সংগীতের ঐতিহ্য সৃষ্টি হতে পারেনি, তারা যা কিছু নতুন শুনবে তাকেই গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালাবে। দলগত হলে এটি আরো সহজেই লক্ষণীয় হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, দলগত একাত্মতা দৃষ্টিগ্রাহ্য সংগীতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহজ-অনুধাবনীয় একটি দিক। আমরা জনপ্রিয় সংগীত বা ভাব-সংগীতের ক্ষেত্রে এই দলগত শ্রবণ ও পরিবেশন লক্ষ্য করলেও অন্যান্য সংগীতের ক্ষেত্রেও এলাকা, দেশ এমনকি জাতিগত একাত্মতা আবিষ্কার করা সম্ভব। যেমন রবীন্দ্র সংগীতের শ্রোতামন্ডল অনেক বেশি একাত্ম ও সংগঠিত। আবার লালন-ভক্তদের একাত্মতা ও নিবিড় বন্ধন তাঁদের শ্রবণের একটি বিশেষ প্রলক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত এমনকি নিরক্ষর জনগণ সমানভাবে পল্লীগীতির পিপাসু।

ল্যাস্ক বলেন I attempt … to elucidate why sociological interpretation of music can become a reality only once the experimental verification procedures I call psycho-musicological are fully operative. On the basis of this things I propose three model of sociological inquiry into music, called the first, second and third sociological interpretation. While the first sociological interpretation concerns the cognitive basis of music making, the second refers to the developmental basis of musical functioning. The third sociological interpretation of music concerns the environmental conditions of music acquisition to the extent that they are determined by the sonic habitat in which humans live. ৪ তাঁর শেষ কথা হলো সিস্টেমেটিক মিউজিকোলজি একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান হতে পারে যা মনোসংগীততত্ত্ব, সমাজসংগীততত্ত্ব ও সংগীত বিশ্লেষণের তিনটি ধারাকে সম্মুন্নত রাখবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ নয় বরং ‘সিস্টেমেটিক মিউজিকোলজি’ গুরুত্ব পেয়েছে।

সংগীতের সমাজতত্ত্ব এখনো সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরকম সমস্যা অন্যান্য শাস্ত্রীয় শাখায়ও রয়েছে। এছাড়া সংগীতের মতো একটি বহুমুখী মানবীয় শাখার সমাজতাত্ত্বিক অনুধাবন এখনও ব্যাপক নয়। ক্যাডি (১৯৬৩) অনেক আগে বলেছিলেন The new area of emerging knowledge is still embryonic in the state of differentiation and organization|৫ তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত, সংগীত থেরাপি, সংগীতের ইতিহাস, গণযোগাযোগ, সংগীত শিল্পীর পরিবেশন, সংগীত শিক্ষার প্রভৃতি বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন যেগুলো সম্পর্কে গবেষণা ও আলোকপাত সমাজবিজ্ঞানের এই নতুন শাখাকে করতে হবে।

যদিও সমাজতত্ত্ব-অনুরাগী বিশ্লেষকরা সংগীতের মধ্যে ও বাইরে আন্তঃক্রিয়াশীল মানুষকে খুঁজেছেন, আলোচক-সমালোচক কিন্তু ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ বিষয়টিকে বাঁকাভাবেই দেখেছেন। যাহোক, অ্যাডোর্নোর একটি কথা আমাদের আস্থাকে সমুন্নত রাখার জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয়। আর তা হলো: All music – even which in terms of struggle is the most highly individualistic is in disputably vested into a collective content: every single sound sage ‘we’৬ এই যৌথতার কথা আমরা ভুলে যাই বলেই সমাজ-উদ্ভূত বিষয়কে সমাজবিচ্যুত ভাবি। সমাজের বিমূর্ততা আমাদেরকে তার অস্তিত্বহীনতার কথা ভাবতে শেখায়। সংগীতের মধ্যে সমাজ-অনুসন্ধান সেকারণে দৃষ্টিকটু মনে হয়।

বলিং ‘দি সোসিওলজি অব মিউজিক’ (১৯৮৪) গ্রন্থের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, Rather than a sociology of music, this is a sociological exposition of the social surrounds of music. The authors give general evidence that people involved in music are social beings: they organize, interact through institution, are affected by social changes and social prejudice, communicate with words, actions and convention of clothing, they associate musical style with classes, types and races of people. But the ideas are not structured, analysed or presented here in any consistent way৭

গ্রিন (১৯৯৭) পিটার মারটিনের গ্রন্থ (১৯৯৫) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন, People sometimes use the expression ‘the sociology of music’ when it might be more accurate to use ‘the social history’ or ‘the social context’ of music. the ‘logy’ bit of sociology – that which indicates a discipline of study – can seem to get lost. Even those theorists most traditionally and functionally identified as sociologists of music, such as Silberman, Adorno and Supicic, have tended to employ music in the service of broad, not musically sociological concerns; and as Peter Martin says, a recognized, coherent sociological perspective on music has yet to emerge. The most helpful aspect of their excellent book is precisely its insistence on identifying principles which are fundamentally sociological, and employing them with relation to music৮

অর্থাৎ অনেকের মূল্যায়নে এটি স্পষ্ট যে, সংগীতকে বিশ্লেষণ করার মতো সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত আয়োজন সমাজবিজ্ঞানের নেই। মারটিন সঠিকভাবেই বলেছেন যে, A key position of the book is that the task of sociologists of music is not to make judgment about the nature of music, about musical meaning or musical values, but rather to examine the processes by which music, its meanings and values come to be produced, accepted, maintained and contested by particular social groups in particular times and places.৯ যাহোক, পর্যালোচকদের অনেকে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ তেমন অযৌক্তিকতা আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। বরং সার্বিকভাবে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ মৌলিকত্ব ও গ্রাহ্যতা স্বীকৃত হয়েছে।

থিওডর অ্যাডোর্নোর Introduction to the Sociology of Music (ইংরেজি অনুবাদ) বেরুলো ১৯৭৬ সনে। ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের এই বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী প্রথম সংগীতের সমাজতত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছেন বললে ভুল হবে না। সংগীতের সমাজ ঘনিষ্টতা বুঝতে ও তুলে ধরতেও তিনি ১৯৬১-৬২ সালে বারোটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ফ্রাঙ্কফুট স্কুল ফর স্যোসাল রিসার্চের অফিসিয়াল জার্নালের শুরু-সংখ্যায় তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি ছাপা হয় ’On the Social Situation of Music’ নামে। তারপর অনেক সময় কেটে গেলেও অ্যাডার্নোর সংগীত বিষয়ক অনুরাগ, সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও একটি প্রধান তাত্ত্বিক ধারা এখনো অব্যাহত আছে। অ্যাডর্নো ১৯৬১-৬২ সময়-পরিসরে ইউনিভারসিটি অব ফ্র্যাঙ্কফুটে মিউজিক মোসিওলজির উপর অনেকগুলো বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারপর তাঁর এ বিষয়ে প্রকাশিত রচনাসমূহ তাকে বিশেষ স্থান প্রদান করে দিয়েছে।

কার্ল মার্কস, রবার্ট স্পেন্সার, জর্জ সিমেল, এমিল দুরখা, ম্যাক্স ওয়েবারসহ অনেক আদি সমাজবিজ্ঞানীদের সংগীতের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সেগুলো পরবর্তী আলোচনায় আসবে। বলাবাহুল্য মার্কস শুধু দার্শনিক নন, পরিবর্তনের স্বপক্ষে উচ্চারিত কণ্ঠস্বর যা সামাজিক বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে।১০

টীকা

১. Martha Feldman, ‘General Introduction To Critical Musicology’, Music and Marx: Ideas, Practice, Politics, New York: Routledge, 2002, vii.

২.            উদ্ধৃত, Anthony Seeger, 1985, “General Articles on Ethnomusicology and Related Discipline”, Ethnomusicology, 29:2, pp. 345-351.

৩              Lee Blackstone, Remixing the Music of the Spheres: Listening to the Relevance of an Ancient Doctrine for the Sociology of Music, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, 2011, 42:1, pp. 3-31.

  1. 4. Otto E Laske, 1997, “Verification and Sociological Interpretation in Musicology”, International Review of the Aesthetics and Sociology of Music, 8:2, pp. 211-236.
  2. 5. Cady, 1963:25.
  3. 6. Theodor Adorno, 1976, Introduction to the Sociology of Music, New York: Seabury.
  4. 7. Madelon Bolling, . Review of The Sociology of Music by Fablio Desilva; Anthony Blashi, David Dees, (Notre-Dame IN: University of Notre-Dame Press, 1984), Ethnomusicology, 30:2, 1986, pp. 348-349.
  5. 8. Lucy Green 1997, Review of Sounds and Society: Thames in the Sociology of Music by Peter Martin, Manchester University Press, Manchester, 1995), Popular Music, 16:21, pp. 229-231.

৯.            প্রাগুক্ত।

১০.         যেমন Marx’s analyses of the commodity and of modes of producing form a crucial basis of much recent critical theory, yet music scholars who have increasingly taken an interact in that theory as a means of exploring the cultural role of music have worked with Mark’s ideas primarily in derivative form দেখুন: R.B. Qureshi, 2002, Introduction to R.B. Qureshi (ed), Music and Marx,, প্রাগুক্ত।

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব লজ্জার সমাজতত্ত্ব

 

 

[মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক বিষয়ের মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যাপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো।– সম্পাদক]

It highlight she most valuable core of all people who desperately want acceptance, respect and love from other which continually fearing rejection and negative of self. (Scott 2007:5)

Shy people, you might think, can be identified by this visible discomfort in social situations and their inability (or it is unwillingness?) to interact with other people. (Scott 2007:1)

The Oxford English Dictionary (2005) defined shyness as being Easily frightened away; difficult of approach owing to timidity, caution or destruct underlines  the point that this is a society oriented state of mind (cited in Scott 2007:1)
লজ্জাশীলতার সমাজতত্ত্ব লজ্জার মনকেন্দ্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী তত্ত্ব ও প্রয়োগের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের উপর গুরুত্ব দিতে চায়। আমরা লাজুকতাকে ব্যক্তিক সমস্যা হিসেবে দেখে একে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখতে চাই। ম্যাক্রো পর্যায়ের রুটিন আন্তঃক্রিয়ার বদলে ম্যক্রো পর্যায়ের সামাজিক স্থিতির সাথে মিলাতে চাই।
মনোবিজ্ঞানে যেসব অনুমানের উপর নির্ভর করে লজ্জা নিয়ে গবেষণা করা যায়। সেগুলো হলো লজ্জা নিতান্তই একটি মানসিক ধর্ম যা নিয়ে একজন ব্যক্তির যখন তার মধ্যে কিছু দর্শনযোগ্য প্রলক্ষণ দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যক্তির প্রলক্ষণ, আচরণগত দক্ষতার অভাব বা ভ্রান্তিমূলক প্রজ্ঞার বিষয়গুলো জরুরি বিবেচিত হওয়ায় লজ্জাকে একটি ব্যক্তিক আচরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ও সংশোধনের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আর এমন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে লজ্জার সামাজিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনাকে সামাজিকভাবে দেখার উৎসাহ জোগায় না। আরেকটি ব্যাপার হলো মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এমন অনুমান খুবই স্বাভাবিক যে ‘লাজুক’ এবং ‘লাজুক-নয়’ এ’দুয়ে বিভক্ত করার প্রবণতা। এক্ষেত্রে তাঁরা বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপক স্কেল ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া, অন্যান্য কৌশলসমূহও যথেষ্ট উন্নত।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বলে মনে করেন। যাকম্যানের নাটকীয়তা তত্ত্বটি প্রয়োগ করে স্কট দেখাতে চেয়েছেন কখন আমরা লাজুক-ভূমিকা গ্রহণে আগ্রহী হই এবং কখন হই না। আমরা বিশ্বাস করি যে লজ্জাশীলতা একটি অপ্রত্যাশিত ও নেতিবাচক দিক যা পরিহার করে চলা উচিত। ব্যক্তির হতাশা, মনোমালিন্য ও অতিমাত্রায় আত্মমুখীনতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলোকে সমস্যা হিসেবে বিবেচিত করে এর সামাজিক দায়কে জানার চেষ্টা করা। শুধুমাত্র ব্যক্তি প্রকৃতি (nurture), লালনপালন (nurture) ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে জ্ঞাত হওয়াই তো আমাদের শেষ লক্ষ হতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও তত্ত্বে লজ্জাশীলতা একটি অন্তর্গত গুণাগুণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এমন কথাও তাঁরা বলেছেন যে, এটি একটি আয়ত্তকৃত বা শিক্ষণকৃত অভ্যেস যার জন্য বিশেষ পরিবেশ দায়ী। হতে পারে বাবা-মার ভূমিকা এর জন্য দায়ী। যেমন, আমাদের দেশে মেয়েদেরকে লজ্জাশীল ও নমনীয় হবার উপদেশ ছোটবেলা থেকে দেয়া হলেও ছেলেদের দেয়া হয় না। বরং ছেলেরা বেশি বেশি মিশুক হোক, বহির্মুখি হোক, কিছুটা ডানপিটে হোক এমনটিও আশা করা হয়। স্বাভাবিকভাবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে স্কুল জীবনে, খেলার মাঠে, পারিবারিক আয়োজন-উৎসবে, এমনকি নিজের জন্মদিনেও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের এই মনোভাব ও আচরণ ক্রমাগতভাবে স্থায়িত্ব লাভ করে।
সামাজিক কগনিশন তত্ত্ব এখন মনোবিজ্ঞানে বেশ শক্তিশালী ধারা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ ধরনের অভিগম মনে করে লজ্জা পাওয়ার পেছনে অন্যদের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে দেখতে চায় মুখোমুখি সম্পর্ক ও আন্তঃক্রিয়া কিভাবে আমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণে সহায়তা করে বা করে না। ‘আত্মপরিবীক্ষণ’ ও ‘আত্মসচেতন আবেগ’ মনোবিজ্ঞানীদের কগনিটিভ তত্ত্বে দুটি বিশেষ আবিষ্কার যা লজ্জাশীল ব্যক্তিকে সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সর্বোপরি মনোবিজ্ঞানের সামাজিক কগনিটিভ তত্ত্ব ব্যক্তিমানসকে লজ্জা উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্র মনে করে। যারা লাজুক তারা স্বাভাবিক কগনিটিভ স্টাইলের একটি ভ্রমাত্মক ধারা যা সামাজিক পরিস্থিতিতে সহায়তা পায়। এতে করে সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি দেখা যায়। অন্য গবেষকদের মতে এটি অদ্ভুত এক আত্মকেন্দ্রিক দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়। লজ্জাকাতর ব্যক্তিবর্গের ধোয়াশে আচরণ, অপদস্তমন্যতা, সামাজিক প্রস্থান, এবং দক্ষতার দুর্বিসহ নি¤œগামিতাকে প্রতিভাত করে। অনেকে নিজের ও অন্যের যাবতীয় করুণ অভিজ্ঞতা, নেতিবাচক অনুভূতি ও অবাস্তব কম্পনাকে একীভূত করে সামাজিক ভীতির অচলায়তন সৃষ্টি করে। এমনও দেখা যায় এসব লাজুক ব্যক্তিত্ব নিজের অন্তরালে রাখার জন্য অনাকর্ষণীয় পোষাক পরিধান করে, ছদ্মবেশ ধারণ করে অথবা লুক্কায়িত থাকে। আত্ম-উপস্থাপনার কোন সুযোগ গ্রহণ না করে বরং তা থেকে পলায়নপর থাকে। অনেকে নিজের ব্যর্থতার জন্য অপরকে অথবা বাইরের পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করায়। অথচ যারা লাজুক নয় তাদের মধ্যে এমনটি দেখা যায় না। বরং অনেকে অনেক বেশি সপ্রতিভ ও আত্মপরিবেশ ব্যবস্থাপনায় পরিপক্বতার পরিচয় দেয়।
প্রায় ১০০ বৎসরের বেশি সময় আগে থেকে এ ব্যাপারে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী কুলি, পিয়াগেট ও মিডের নাম এ প্রসঙ্গে করা যায়। মিডের অহম সংক্রান্ত গবেষণা ও লেখার মূল্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে তার একটি বড় কারণ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের গোড়ায় সমাজের ভূমিকাকে তুলে ধরা। তাদের আলোচনা মূলত আন্তঃক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। পরবর্তীতে সখ্য সম্পর্কের উপর আলোচনা হয় যা আজও শিশুদের উপর পরিচালিত গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে সময়ের শিশুদের উপর গবেষণায় তাদের সামাজিক অংশগ্রহণ গুরুত্ব পায় কারণ, দেখা যায় সবাই সমান অংশগ্রহণে পারদর্শী বা ইচ্ছুক নয়। স্বাভাবিকভাবেই ক্রমান্বয়ে বেশ কিছু শব্দের সন্নিবেশ ঘটে যেগুলো যেমন আলাদা অর্থ বহন করে তেমন সমার্থকও বটে। যেমন, নিঃসঙ্গ খেলা, সামাজিক খেলা, সামাজিক ক্ষেত্রে প্রত্যাহারমূলক আচরণ, অনিয়োজিত থাকা, দর্শক-মনোভাবাপন্নতা, লাজুক শিশু, সমস্যাআক্রান্ত শিশু, ভীতু চরিত্র, নেতিবাচক আত্মমূল্যায়ন, নির্জনতা অবসন্নমন্যতা, বন্ধ বিসর্জন প্রভৃতি। তবে লজ্জাশীলতার এই যে মাত্রা ও অর্থের ভার প্রত্যয়গত জটিলতা সৃষ্টি করাটাই স্বাভাবিক। বিশেষত গবেষণায় প্রত্যয়গত পরিচ্ছন্নতাই অপরিহার্য। ব্যক্তির প্রলক্ষণ, প্রেষণাগত প্রক্রিয়া, ও পর্যবেক্ষণমূলক আচরণ নির্দেশ করে এমন শব্দসমূহের সংমিশ্রণ গবেষণার জন্য উপযোগী নয়। রুবিন ও কপলান (২০১০) একাকিত্বের সাথে সম্পর্কিত ও ব্যবহৃত শব্দসমূহ হতে পারে একটি শ্রেণীবিন্যাস করেছেন যা নিঃসন্দেহে আমাদের অভিধার ব্যাপকতা নির্দেশ করে। যেমন, একাকিত্বের কারণ এতে এমন শব্দগুলো হলো: সক্রিয় একাকিত্ব, নিষ্ক্রিয় প্রত্যাহার, সাথীদের পরিত্যাগ, সাথীদের অবহেলা, সাথীদের বর্জন, সামাজিক প্রত্যাহার; আপত্তি, লজ্জা ও উৎকণ্ঠার সাথে জড়িত শব্দসমূহ: (ক) আচরণগত আপত্তি, সামাজিক আপত্তি; (খ) নিচু মাত্রার অভিগম, সংঘাতপূর্ণ লজ্জা, ভীতিপূর্ণ লজ্জা, আত্মসচেতন লজ্জা, সামাজিক ভীতি, শ্লথ-অভিগম; (গ) উৎকণ্ঠিত প্রত্যাহার, উৎকণ্ঠিত নিঃসঙ্গতা, রিটিসেন্স, সামাজিক উৎকণ্ঠা, সামাজিক পরিহার, সামাজিক ভীতি, সমস্যা। নিঃসঙ্গ শব্দাবলী: অন্তর্মুখি, নিঃসঙ্গ নিষ্ক্রিয়, কম সামাজিক, সামাজিকতায় অনাগ্রহ, কম অসামাজিক ভাবনা এখানে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শব্দগুলো ব্যক্তি থেকে সমাজলগ্নতার দিকে তাড়িত হয়েছে। যাহোক মনোবিজ্ঞানী রুবিন ও কপলান এক্ষেত্রে সংখ্যা কমিয়ে পরস্পর সম্পৃক্ততা পরিহারের উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন।
আন্তঃক্রিয়াবাদী সমাজতাত্ত্বিক পরিক্ষেপ মনে করে যে লজ্জাশীল মন একটি সামাজিক নির্মাণ। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন কিছুটা হলেও লজ্জামনস্কতা অন্তর্গত এবং জন্মগত যা শিশুকাল থেকেই পর্যবেক্ষণযোগ্য। যদিও লজ্জাবোধের প্রজ্ঞাগত, আবেগগত ও আরচণগত উপাদানা রয়েছে এবং সে কারণে এই ব্যক্তিগত বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু। তবে সামাজিক পরিস্থিতি ও তার ফলশ্র“তি অনেক সময় লজ্জাবোধ লালিত ও স্থায়ী করে। বলা হয়েছে Insofar as shyness is a socially oriented state of mind, we can only understand and interpret the meaning of these thoughts and feelings in relation to our perceptions of other and our awareness of the social rules governing interaction (Scott 2007:8).

লজ্জাকে একটি সচেতন আত্মপরিচয়মূলক (আইডেন্টিটি) ক্রিয়া মনে করা যায় যা কল্পিত দর্শক-শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে সম্পাদন করা হয়। এখানে নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে একটি স্বনির্মিত অবয়ব ধরে নেয়া হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ভাবমূর্তির অপূর্ণতাকে মেনে নেয়া হয়। একজন লাজুক ব্যক্তি সচেতন থাকে যে তার আচরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া আছে। সে কারণেই সমাজ-সচেতন লাজুক সত্তার অন্তর্নিহিত দিকটি সমাজবিজ্ঞানীরা জানতে চায়। তার দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ সম্পর্কে যে প্রেষণা ও অর্থ ধারণ করা হয় তা অত্যন্ত মূল্যবান। সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাস ও অনুমান এবং এরকম বিশ্বাস ও অনুমানের বিকাশ কেন হয় তা জানা জরুরি। তারা যেভাবে দায় সম্পন্ন করতে চায় বা তা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিভাবে মূল্যায়িত হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর আমরা যারা তার আন্তঃক্রিয়ার অসম্পূর্ণতাকে আবিষ্কার করি এবং তার স্বাভাবিক আচরণে বাধার সৃষ্টি করি সেটিও দেখা দরকার। তাছাড়া, লাজুক আইডেন্টিটি যদি দীর্ঘদিনের আন্তঃক্রিয়ার ফসল হয় তবে যে সমস্ত ব্যক্তি এই আন্তঃক্রিয়ায় নিয়োজিত ছিল বা আছে তাদের অধ্যয়ন জরুরি। লাজুক ব্যক্তিরা তাদের সামাজিক দক্ষতার অভাবের দিকটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ। তাঁরা প্রত্যক্ষ করতে পারে যে কিভাবে অন্যেরা তাকে প্রত্যক্ষ করছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সামাজিকভাবে নির্মিত লাজুক আইডেন্টিটির অস্তিত্ব লক্ষণীয়। আমরা কিছু আদর্শ-মূল্যবোধ-প্রথানিষ্ট চরিত্রকে স্বাভাবিক এবং তা থেকে স্বভাবকে লাজুক বলতে আগ্রহী। আমরা তাদের মনের খবর রাখিনা তার নয়; কিন্তু সামাজিক জগতে তারা কিভাবে আচরণ করছে সেটিই মূল পর্যবেক্ষণের ব্যাপার হয়েছে। যেমন, মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি যতটা যতœ ও সহানুভূতি সমাজের কাছে প্রত্যাশা করতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি অপদস্থ করা আমাদের একধরনের মজা করার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ কোন্ সমাজে কোন্ কালে কে লাজুক হিসেবে পরিগণিত হলো তা সংস্কৃতিগতভাবে নির্ধারিত হয়। অপরদিকে লাজুক ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করতে পারবেন সমাজ তাকে কিভাবে দেখছে। তারা সহজেই বোঝে যে তাদের সংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ অ-লাজুকদের চেয়ে কম। এবং তাদের মূল সমস্যা হলো তারা ভয় পায়, অন্তর্মুখি এবং একাকী।

লজ্জাশীলতার সাথে জেন্ডারের সম্পর্ক সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত। অনেক দেশে একেক সময় নারীদের একেকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাহীনতা, সম্পদহীনতা, নির্যাতন, হেয় প্রতিপন্নকরণ, অবরুদ্ধকরণ, পর্দা, শারীরিক দুর্বল ভাবা, সন্তান উৎপাদনের নামে ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে ধাবমান করা, চিকিৎসাহীনতা, নিরক্ষর রাখা, জনসমক্ষে আসতে না দেয়া, রাজনীতি থেকে দূরে রাখা, অধঃস্তনতা প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা যায়। ‘আর লজ্জা নারীর ভূষণ’ Ñ এ প্রবাদটিতো আমাদের মতো দেশে আপ্তবাক্যের মতো মনে করা হয়। কি ধর্মীয়, কি সামাজিক, কি পারিবারিক, কি রাষ্ট্রীয়, কি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীর অনুপস্থিতি ও লজ্জাশীলতাজনিত কারণে নীরবতা পালন করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নারীকণ্ঠ বাড়ির বাইরে শোনা না যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। সুতরাং পুরুষ ছেলেদের লজ্জা ও সংকোচ কিছুটা গণ্য করা হলেও কন্যা শিশুদের এমন স্বভাব অনেকটা গুণের মধ্যেই পড়ে। পিতার অবর্তমানে কন্যারা সম্পত্তির প্রশ্নে চুপ থাকবে এটিই বাঞ্ছনীয়। বিবাহিত বোনেরা ভাইয়ের কাছে পিতার সম্পত্তির অংশ দাবি করবে এটা আকাক্সিক্ষত নয়। ভাই যেখানে নেই সেখানে বোন পিতাকে জীবিতকালে সম্পত্তি লিখে দিতে বললে পিতা নারাজ হয়ে থাকেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাই ভর্তি হবার অনুপ্রেরণা পেলেও বোন ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও অনুপ্রাণিত হয় না। এমন হাজারো দৃষ্টান্ত আমরা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছি। এসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনাপত্তি নিঃসন্দেহে মেয়েদের অগ্রসরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লজ্জাশীলতা এসব অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির সহজাত গুণ না হয়ে সামাজিকভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
সুতরাং লাজুক আইডেন্টিটিকে শুধু নিষ্ক্রিয় কার্যসম্পাদনকারী হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তারা বাস্তব দর্শক-শ্রোতামণ্ডলীর সামনে সচেতনভাবে কৌশলসহ আত্মরক্ষায় নামে বা নামার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন তার মনে দর্শক-শ্রোতাদের মূল্যায়নের ধরনটি যথেষ্ট মনে থাকে এবং সে কারণে তার উপস্থিতি একটি সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সম্পন্ন হয়। সে শুধু ভূমিকা গ্রহণ করে না; নিজস্ব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিকা তৈরি করে। সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি অনুধাবনের অনেক অবকাশ রয়েছে।
[চলবে]