Archives

মেহেদী ধ্রুবর গল্প

মেহেদী ধ্রুবর গল্প
কাঁটাতারে প্রজাপতি

হুতুম!
হুতুম!
হুতুম!
রাইত তখন দুপুর। ল্যাংড়া সজনে গাছের মইধ্যে বইস্যা একটানা অভিশাপ দিয়া যাইতাছে কুলক্ষ্যইন্যার ঘরের কুলক্ষ্যইন্যাটা। ছিপঝাড় থেইক্যা একটা মস্ত জিনিপোকা প্যাটমোটা তাল গাছের দিকে আগাইলে গায়ে কাঁটা ফুটে বড় ছেলের। এবং কব্বরওয়ালার তেতুল গাছে ধরাম কইর‌্যা একটা শব্দ হইলে হাগা-মুতা ফেইল্যা কুত্তাদৌড়ে ঘরে ঢুইক্যা কপাট লাগাইয়্যা দ্যায় সে; আর পাছার কাপড় উদাম কইর‌্যা বাম হাত ঢুকাইয়্যা দ্যায় ভিতরে। দিয়া ছাও কুত্তার মতন নাক বলাইয়্যা কুঁ কুঁ করে। এবং আরেক বার নাকের কাছে হাত নিয়া আবার মুখ ভ্যাটকাইয়্যা দিয়া বউরে ডাকে। মরার বউ ত উঠে না। কচমা বউ কী অত সহজে উঠে নি? তখন কী আর করবো বউ চাডুইন্যা জামাই? না বেশি কিচ্ছু না; আলনার পিছের আড়া থেইক্যা একটা পুরান কাপড় আনে। মনে হয় একটা লুঙ্গি হইবো; হ, ছিঁড়া লুঙ্গিতে গুয়ে ভরা আঙ্গুল পোছতে পোছতে চেঙরা বউয়ের কোমরের কাছে শুইয়্যা পরে বলদা জামাই। কিন্তু হালার ঘুম ত আইয়ে না, লিইল্ল্যার চোখ ত চাইয়্যা থাকে; ঐ দিকে ত টিনের চাল মটমট কইর‌্যা ওঠে। থরথর কইর‌্যা কাঁপতে থাকে সে আর ব্যাঙ বাজুইন্যা গলায় চেও চেও কইর‌্যা বউরে ডাকে। কিন্তু পাওয়ের গোছা মোটা, হাতের কব্জি মোটা, চওড়া পাছাওয়ালা ধামরি বউ কী অত তাড়াতাড়ি উঠে নি? তয় বৌয়ের দাঁতানিতে কাঁপুনিটা আরো বাড়ে তার। মরার জবান বন্ধ হইয়্যা আইতাছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, জানালার পাশে ঘোঙ্গাইতাছে ক্যাডা? গায়ের লোম খেজুর কাঁটা হইয়্যা গেলেও সঙ্গীকে ডাকার হিম্মৎ ধরে না তখন। সূরা-কেরাত সব ভুইল্যা খাইয়্যা ফালায় তখন, যখন খটখট কইর‌্যা খাটটা নড়তে থাকে। আর কিচ্ছু মনে থাকে না তার। থাকবো কী কইর‌্যা? মা মরলে বালামসিবৎ পায়ে পায়ে আর বাপ মরলে গায়ে গায়ে।
পায়ে পায়েরটা পার করছে সে, কিন্তু গায়ে গায়েরটা তো কাল থেইক্যা হইলো শুরু।
সেদিন হুতুম হুতুম, ঘেউ ঘেউ, ঝিঁ ঝিঁ আর হুঁক্কাহুঁয়ায় রাইত বড় হইছিলজ্জতখন পাতালপুরীর পরীরা অথবা রূপকথার দৈত্যরা অথবা স্বর্গের দেবতারা ঢইল্যা পড়ছিল। ফজরের আজানের একটু আগে আগে কালি অন্ধারের কালে দক্ষিণের ঘর থেইক্যা মোহাম্মাদ আবদুল সোজা উদ্দিন মাদ্রাসা হুজরের মানে বলদা জামাইয়ের বাপের চেঁচামেচির শব্দ কানে তালা মারেজ্জও বাবাগো আল্লাগো লা ইলাহা ইলল্লালাহু … পারতি না তুই আমারে নিতে পারতি না।
হাঁপাইতে হাঁপাইতে কয়তেছিলেন তিনি। সদ্য পতœীহারা স্বামীর বিলাপের টানে সারা বাড়ি মাথায় ওঠে। জ্ঞান হারালেও হুরাহুরি করার কেউ নাই। ছোট ছেলের কান্নার ভান বন্ধ হইয়্যা যায় বড় ভাইয়ের ধমকে। ব্যস্ততা নাই, আছে চোখাচোখি; দুঃখ নাই, আছে অপেক্ষার কষ্ট।
দৌড়াদৌড়ি কইর‌্যা মাদ্রাসা হুজুরের বাবা জেহাদি মুন্সি বাইর হয়। তার চোখেমুখে শঙ্কা।
কী হয়ছে? কী হয়ছে রে? মরার রাইত বিরাইতে আবার কী অইলো?
ছোট ছেলে দাদাকে জড়াইর‌্যা ধইর‌্যা ঢুকরে কাঁইন্দা ওঠে। বড় ছেলের বউ নাক চাইপ্যা ধরে শ্বশুরের। ছোট ছেলে মাথায় পানি ঢালতে থাকে। বড় ছেলে খাড়াইয়্যা থাকে। বাবা ঝাড়ফুক করলে জ্ঞান ফিইর‌্যা আসে সোজা হুজুরের। জ্যান্ত ভূমিষ্ট শিশুর চোখে পিট পিট কইর‌্যা তাকান তিনি।
মেঝো ছেলের ঘরের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া যায় তখন।
বাবার দেওয়া পানি পড়া খাইয়্যা আরো সুস্থ হইলে তার গলা ছোটেজ্জঐ কানা প্যাচাডা হযরতের মারে খাইছে, আমারেও খাইতে আইছে; বাজান আমি এই ঘরে একলা থাকতে পারতাম না।
সোজা হুজুরের সোজা বয়ানের অন্তরবয়ান বুঝতে কারো অঙ্ক কষতে হয় না। ছেলের কথার জবাবে বাবা আশ্বাসবাণী দিলে বড় ও মেঝো ছেলের মাথায় যেন বাঁশ পড়ে। নাকটাক ফুলাইয়া ভ্রƒকুঁচকাইয়্যা পিঁপড়া চোখে চইল্যা যায় তারা। মেঝো বউ নাক ছিটকাইয়্যা কইয়্যা যায়জ্জ
ওঁজ্জঢং দেইখ্যা আর বাঁচি না, এই বয়সেও … চিজ্জচিজ্জচি।
একলা ঘরে একলা ভাবে মাদ্রাসা হুজুর। মাথা ঘুরে। বুক কাঁপে। চোখজোড়া ছাদে। একটা ছায়া। একটা হাতছানি। একটা ঘর। সঙ্গী। সুখ। শান্তি।
তারপরজ্জ
তারপরে স্তব্ধতা ভাঙ্গে। মাথা খোলে। গভীর সংকল্প আঁটেন তিনি। ঘর থেইক্যা বারোইয়্যা দুয়ারে দাঁড়াইয়্যা থাকেন। বাবার সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেন। কিছুক্ষণ পরে বাপ-ছেলে বারোইয়্যা পড়ে। সারা দিন পরে বাতির আজানের আগে আগে ঘরে ফিইর‌্যা আসেন তারা। কিন্তু দুই জন নয়, তিন জন।
চারদিকে হইচইজ্জ
এই বয়সে সোজা হুজুর কামডা করলো কী ? মাইয়ার বয়সের ছেরি নিকা করলো। তার উপর ফহিন্নি ডেহুন্নিরে ঘরে জাগা দিল। চিজ্জচিজ্জচি।
বড় ছেলে মেঝো ছেলে এবং তাদের বউদের মুখে চাওয়াই যায় না। তারা ভাবে বাবা খাচ্চরটা করলো কী? দাদা হালায়ও বদের শ্যাষ। এই শয়তানডার আস্কারায় ছুডু শয়তানডা কামটা করার সাহস পায়ছে। হালার বুইড়্যার কপালে চ্যালা কাঠ ভাঙতে পারলে জেদটা ফুরায়। হেই একটা লুচ্চা আর জন্ম দিছে আরেকটা লুচ্চা; লুচ্চার ঘরের লুচ্চারা পুলাপালের কথা না ভাইব্যা একটা ড্যাঙ্গা মাগি ধইর‌্যা লইয়া আইছে।
জুম্মাওয়ালা বাড়ির পরিবেশে পরিবর্তন আসে; টান টান ভাব সবখানে।
নতুন বিবির টানে নতুন সাজে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিইর‌্যা আসে মাদ্রাসা হুজুর। দাড়ি কামাইয়্যা গোঁফে কালি করার পর ছেলেদেরকে তার ছোট ভাই মনে হয়। তিনি এখন গদগদে অবস্থায়, টলমলে মজায়; মখমলের বিছানায়। আনন্দে তার গা সয় না। তার ঘরে চলে নানা আড্ডাজ্জমাছ মাংস দুধ কলার পসরা বসে। বাবা খায়, ছোট ছেলে খায়, তারা খায়। আরো অনেক কিছু খায়! বিভিন্ন প্রকার শক্তিবর্ধক ঔষধ খায়। কোনটা দুধ দিয়া, কোনটা পান দিয়া, কোনটা গরম পানি কইর‌্যা খাইতে হয়। ঔষধের গুণে তার  মনের চাইতে মেরুদ- শক্ত হয় বেশি, চালচলনেও আসে চনমনে ভাব, হইছে বীর্যবান, গালদুটো টুসটুসে; সঙ্গে মিষ্টি জর্দার পানে আলতা রাঙা ঠোঁটজ্জ জাফরানি রঙের পাঞ্জাবিতে মৃগনাভির খুশবু। আরো অনেক … লাল। নীল। সবুজ।
ছেলেদের গা জ্বইল্যা যায়। বউরা পাড়া ব্যাড়ায় আর কয়জ্জ
এরুম ব্যাসরম বেডি জীবনে দেহি নাই। মাথার কাপড় ফালায়া বুনি উদাম কইর‌্যা ঘুইর‌্যা ব্যাড়ায়, ছ্যারা শ্বশুর মানে না।
মাদ্রাসা হুজুরের দেহ কাঁচা সোনার মতন কচকচ করে; কিন্তু মনটার মইধ্যে ব্যাবাগ ওলটপালট হইয়্যা যায়।জ্জকলেজ পড়ুয়া ছেলেকে দিয়া আর বিয়োগ করানো চলে না; যোগ করানোটাই মুনাফাজনক। অর্থাৎ ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন এখন কম্পাউন্ডার পযর্ন্ত টিকে না। শ্বশুরের কদরও কইম্যা যাইতে থাকে। মাছের মাথাটা এখন বেডিই খায়। খাইয়্যা কী করে? রাস্তার মানুষ গনে। আতালে পাতালে বইস্যা থাকে।
প্যাটমোটা তাল গাছের গোড়ায় ল্যাডা মাইর‌্যা বইস্যা পান চিবায় আর খড়ি চিরা দ্যাখে। নেঙটি মারা কালামের উরুর মাংস থরথর কইর‌্যা কাঁপতে থাকে। বিবি সাব দ্যাখে। কিছু একটা ভাবে; হয়তো ভাবে না। একটা নসিমন চিৎকার করতে করতে আইস্যা থামে। বড় ছেলে একটা পাঙ্গাস মাছ ঝুলাইয়্যা বিবি সাবের নাকে ঘষা মাইর‌্যা নিয়া যায়। বিবি সাবের পিত্তি যায় জ্বইল্যা। এমন সময় সে চিল্যানির শব্দ পায়। জামায়ের খারিসতাপনা আর ভাল লাগে না; দিনেদিনে ক্যামন চামারের লাহাইন হইতাছে। ঠ্যাকায় পইর‌্যা যেন সে ঘরে যায়। তার চোখ রাঙানিতে থাইম্যা যায় চিৎকার। মায়ের মাইর খাইয়্যা শিশু যেমন কান্দন আটকাইয়্যা রাখে তেমনি সোজা হুজুরের অবস্থা। পাঁচ ফুইট্যা জামাইয়ের বউ সাড়ে পাঁচ ফ্ইুট্যা হইলে এমনই হয়।
রাইতে আবার শুরু হয় মাদ্রাসা হুজরের ঘোঙানি। ভয়ে হাত পা ঠা-া হইয়্যা আসে। দম আটকাইয়্যা যায়। হাঁপাইতে হাঁপাইতে ধনুকের মতন বাইক্যা যায়। ভাঙা কণ্ঠের অস্পষ্ট স্বর ঘর থেইক্যা বাইর হইতে পারে নাজ্জ
লিইল্যার প্যাচা, তর বুহে ঠাডা পরে না ক্যায়া? মরার খদা, দুই চোইখ্যা খদা, তর নাম আর না, আমার সুখ তর কপালে সয় না।
ঠাসা বিবি চেঁচাইয়্যা ওঠেজ্জকুনু কাম কাজ নাই, ঘরে বইয়্যা খালি প্যাচাল আর প্যাচাল। ঘরে বাজার সদাই কিচ্চু নাই। আরেকটা ডিঙ্গি ছ্যারা সারা দুনিয়া ঘুইর‌্যা ব্যাড়ায় আর কতক্ষণ পরে পরে খালি খাওন। এত খাওয়ায়তাসি তবু উদ্দর ভরাইতারি না।
চুলাচুলির তালে ছোট ছেলে ধড়ফরাইয়্যা ঘরে ঢোকে। ছেলেকে দেইখ্যা ঝাল মিটাইবার সুযোগ পাইয়্যা যায় বাবাজ্জ
হালার পু তুমার পাছায় ত্যাল বাইন্দা গ্যাছে। না? অসুখে আমি মরি আর তুমি ক্যালাব ঘরে থাহ। বান্দি মাগির পুত বাজারে গ্যাসস না ক্যায়া?
এইভাবে আরো শ্রাব্য অশ্রাব্য বইক্যা যায়। ছেলে দাঁড়াইয়্যা থাকে। কিছু কওয়ার সাহস তার থাকে না। অপ্রস্তুত আঘাতে থ বইন্যা যায় সে।
চিল্লাচিল্লির শব্দে সোজা হুজুরের বাপ জেহাদি মুন্সি বাইর হইয়্যা আসে; কিন্তু কিছু কওয়ার ফুসুরৎই পান না তিনি। ছেলের মুখের গাইল খাইয়্যা বিচলিত হইয়্যা ফিইর‌্যা যাইতে হয় তাকেও।
এইভাবে হাঁপানি-কুঁতানি-কাঁদুনি-খাকাড়ির মইধ্যে সময় যাইতে থাকে। ঠাসা বিবির ঠ্যালায় কবিরাজের ম্যালায় মাদ্রাসা হুজুরের হাঁপানির সুরাহা হয় না। বাবার ঝাড়ফুক আর পানি পড়া কিংবা ডাক্তারের ঔষধেও ঠ্যালা মানে না।
মানবো ক্যামনে? প্রত্যেক রাইতে দুধের সঙ্গে একটা কইর‌্যা শক্তিবর্ধক বড়ি খায়লে কি আত টাত কইলজ্যা ফ্যাপরা ভালা থাকে নি?
দুপুর রাইতে ঘোঙ্গাইতে থাকে সোজা হুজুর। কোরবানির জবাই করা পশুর মতন গর গর কইর‌্যা জ্ঞান হারাইয়্যা ফালান তিনি। ছেলের বউয়ের নাকানি কিংবা বাবার ঝাড়ফুঁকে কাজ হয় না। এই জ্ঞান আর ফিইর‌্যা আসে না। জেহাদি মুন্সি যেন কাঠ হইয়্যা যায়। ছোট ছেলের কান্না বাতাসে মিলাইয়্যা যায়। বড় ও মেঝো ছেলের কান্নার ভান বন্ধ হইয়্যা যায়। ছেলের বউরা দাঁড়াইয়্যা থাকে। বিবি সাব নির্বাক। আশপাশের মানুষ আসতে থাকে। আস্তে আস্তে নীরব হয় সব। সারা বাড়ি সজাগ; কিন্তু শোকধ্বনি নাই। হুতুম। হুতুম। ঘেউ। ঘেউ। হুক্কা হুঁয়া। হুক্কা হুঁয়া। বাদুরের ডানা ঝাপ্টা।  অন্ধকার। অজানা যাত্রা। দূরের আহ্বান।
ফরযে কেফায়ার কাজ শ্যাষ হয়। আকাশে বাতাশে সস্তিশ্বাস কিন্তু বিবির যেন নাভিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের খ্যালা। চোখ মুখে শঙ্কা আর দৃঢ়তার লুকোচুরি। তাই মানুষ বুইঝ্যা কান্নার বাজার বসান কিংবা সহজ হাইস্যা কুটি কুটি হন। আবার নাকের পানি চোখের পানি এক কইর‌্যা কনজ্জ
আমি কারে নিয়া থাকুমগো, বড় ছ্যারাগুলান ত আলাদা খায়তাছে, নিজের কুনু পুলাপান নাই, কারে নিয়া থাকুম গো।
ভদ্রতা কইর‌্যা অনেকে কয়জ্জ
ক্যান ছুডু ছ্যারাটা ত আপনের লগেই আছে। শ্বশুর অহনো মরে নাই। হুনছি আপনার লগেই নাকি খা। দ্যাহেন ওগো নিয়া চল্লিশাডা কাডান, পরে যুদি বালা না লাগে ত্যা ফয়সাল্যা কইরালায়েন। তাছাড়া বাড়ির লগেই মিল-ফেকটরি কত্তগুলা একট্টাতে ঢুইক্যা গেলেইতো অয়।
চল্লিশা আসতে আরো ঊনচল্লিশ রাইত বাকি। আইজ প্রথম রাইত। শ্যাষ রাইতে দামরা বড় ছেলের জ্ঞান ফিইর‌্যা আসে; তখনজ্জহুতুম। হুতুম। ঘেউ। ঘেউ। হুক্কা হুঁয়া। হুক্কা হুঁয়া। বাদুরের ডানা ঝাপ্টা। আবার হাত পা ঠা-া হইয়্যা আসে তার। বউকে জরাইয়্যা ধরলে বউ ছ্যাং ছ্যাং কইর‌্যা ওঠে। কী আর করার? সে গিয়া একলা দলামলা হইয়্যা শুইয়্যা থাকে। আস্তে আস্তে ডর কমে। কী আর করবো হে? হয়তো বউরে আবার জড়াইয়্যা ধরবার চায়বো; হয়তো ধরতে পারবো হয়তো পারবো না। তখন হয়তো সে ভাববো; হয়তো পুরানা চিন্তারা জাবর কাটবোজ্জ
ব্যাডাডা ত ক্ষয় লইছে, এহন বেডিডারে খ্যাদায়তে পারলেই হয়।
আবার হয়তো তার দুশ্চিন্তা জাইগ্যা ওঠেজ্জমনে অয় দাদা হালা আর শিক্ষিত বদমাইসটা ঝামেলা করতারে। বুইড়্যা হালারে বেডি মনে হয় বশ কইর‌্যালাইবো। আইচ্ছা দ্যাহা যাক কী অয় !
জুম্মাওয়ালা বাড়ির পরিবেশে আবার খুব দ্রুত পরিবর্তন আসে। আস্তে আস্তে বিবিসাবের মুখে হাসি খ্যালা করে। ব্যস্ততার দিক পরিবর্তন হয়। সুফিয়া কটন মিলে সাতাইশ টাকার চাকরি নেয় সে। তাছাড়া শ্বশুরের প্রতি সেবার হাত লম্বা হইতে থাকে বিবিসাবের। যে ছেলের কলেজ যাওয়া নিয়া সে তেলেবেগুনে জইল্যা ওঠতো সেই ছেলের কলেজ যাত্রায় তার চিন্তার শ্যাষ নাই। মরার দিন তরতর কইর‌্যা চইল্যা যায়। বউ-দাদা-নাতির আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্ত বড় ও মেঝো ছেলে এবং তাদের বউদের গরম ভাতে যেন ছাই পড়ে। আর তাদের মুখের দিকে চাওয়াই যায় না। ক্যামনে যাইবো? জেহাদি মুন্সির ভিডায় বুক টান কইর‌্যা হাইট্যা ব্যাড়ায় বেডি। মাথায় ত্যারসা কইর‌্যা ফিতা বাইন্ধ্যা ঘুইর‌্যা ব্যাড়ায়। ড্রেস দিয়া কাপড় পইড়্যা আচলডারে মাটি দিয়া হ্যাচরায়া হ্যাচরায়া নিলেও শ্বশুর কয় নাজ্জ
ও বেডি বেপর্দায় চইল্যো না; খদায় গজব ঢাইল্যা দিবো।
কিংবা কয় নাজ্জ
হাইট্যা হাইট্যা দাঁত মাইজ্যো না বেডি; লক্ষ্মী  উইড়্যা যাইবো।
কিংবা কয় নাজ্জ
এত জুরে হাইস্যো না; জবান বন্ধ হইয়া যাইবো।
ত্রিনয়নের ত্রিভুবনের সুখ তাদের মাঝে চলতে থাকে। শ্বশুর বউরে নিয়ম কইর‌্যা নামাজ কালাম শেখায়। বউ ফেকটরি থেইক্যা ফিরলে শ্বশুর আলিফ বে তে সে পড়ায়। মাঝে মাঝে নামাজের ফজিলৎ, আখিরাতের নসিয়ৎ করে। কিংবা কারবালার বুক ফাটা ঘটনা, ইউনুস নবির মাছের প্যাটে যাওয়ার কাহিনি শোনায়। হয়তো হাসাহাসির শব্দও শোনা যায় কোনদিন। হয়তো কোন শব্দও পাওয়া যায় না সময় সময়।
বউ রান্ধে। বাড়ে। খায়। তারাও খায়। আর কী করবো বিবিসাব? হয়তো ছুটির কিংবা ধর্মঘটের দিন কিংবা যেদিন নাইট ডিউটি থাকে তার পরের দিন কিংবা অন্য যেকোন দিন প্যাট বাইর কইর‌্যা মাটি কাঁপাইয়্যা দপদপ কইর‌্যা হাঁইট্যা গিয়া বুজানগোর বারান্দায় বসবো। বুজানের লাইগ্যা মিষ্টি জর্দার পান নিয়া যাইবো। গপ্প করবো ভর দুপুর পর্যন্ত কিংবা শ্যাষ বেইল পযর্ন্ত, কিংবা রাইত দশটা পর্যন্ত; হয়তো ফিইর‌্যা আসার সময় জেঠির লগে আসবো প্রায় সমবয়সী শিউলি। জামায়ের ঘর থেইক্যা ফেরত আসা শিউলির লগে আলাপ করবো আর রাস্তার মানুষ গনবো কিংবা সিনেমা দেখবো। হাসাহাসি ডলাডলি করবো। হয়তো কোন একদিন বাড়িতেই থাকবো। ঘরে বইস্যা বইস্যা বাংলা সিনেমা দেইখ্যা কাইন্ধ্যা রাইন্ধ্যা বাড়ি ভাসাইবো।
তখন হয়তো জেহাদি মুন্সি বাইর হয়। তিনি হয়তো যাইবেন মসজিদ ঘরের মোড়ে। জ্ঞান দিবেন মাইনষ্যেরে। হয়তো সামনে পাইয়্যা যাইবেন পাতি নেতা কিংবা নেতাগোছের নাতি লাল্লুকে কিংবা কাল্লুকে। আর তখন ছলছল কইর‌্যা বাইর হইবো শ্লেষবাইক্যজ্জকিরে কই গেল তগোর সরকার? দ্যাশটা ত অঙ্গার হইয়্যা যায়তাসে। মানুষ খুন হইতাসে! আর তরা কী করতাসস? কী আর করতারবি তরা? পদ্মাসেতু বেইচ্যা বিদেশ যা। তহন নাতিরা কিছু কয় না? কিছু কয়ার থাকে? আরেকটু সামনে গিয়া তিনি হয়তো পাইয়্যা যাইবেন সালেহার বাপেরে। দুজনে গিয়া বসবেন কিনু বেপারির চাস্টলে। তারপর আইস্যা যোগ দিবো মসজিদের ইমাম সাব; হয়তো সাথে থাকবো পেট মোটা মোয়াজ্জিনটা। আরো আসবো খুড়া সোলেমান, জব্বারের বাপ, সইল্যা কাকু, মেন্দি হুজুর। তারা কী করবো তখন? হয়তো চেঙরা চেঙরা মরদদের দেইখ্যা সমালোচনার ঝড় তুলবো। আইজকালের ডিস টিভি আর তাগোর আতালপাতাল চলাফেরা নিয়া নইলে তাগোর এইরকম নাফরমানি আর কুফরি কীর্তিকলাপ শোইন্যা জেহাদি বাণী আউরাইবো। তখন হয়তো এক জন কইয়্যা ফালাইবোজ্জক্যায়ামতের বেশি দেরি নাই। আরেক জন হয়তো কইবোজ্জহ কুরআন হাদিসে উল্লেখ আছে দজ্জালের কথা। এরাই হেই দজ্জাল। শ্যাষমেশে গিয়া এই সাব্যস্ত হইবো যেজ্জএ গুলা কাফের ইহুদিদের কাম। শয়তানের হাতে দ্যাশ রসাতলে যাইতাছে। জেহাদ ছাড়া কুনু উপায় নাই। এমন সময় তারা হয়তো স্মৃতিচারণ করবো। আফসোস করবো। কেউ একজন হয়তো কইয়্যা ফেলাইবোজ্জকত্ত শান্তিতে ছিলাম আমরা। দুই ভাই মিইল্লামিইশ্যা ছিলাম, কুনু বালমসিবৎ, শয়তানি, কুফরি আছিন না। আমাগোর শক্তিরে বিনাশ করার লাইগ্যা মালায়নরা উইঠ্যা পইর‌্যা লাগছিল। একাত্তরে ভারতের ষড়যন্ত্র মূর্খ পূর্ব পাকিস্তানিরা বুঝলনা। পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লাইগ্যা মালায়নের বচ্চাগর ত্যালেসমাতি পূর্ব পাকিস্তানির কিছু শিক্ষিত ছুকরা বুঝল না।
তখন একজন প্রতিবাদ করবোজ্জনা মিয়ার ঠিক কও নাই; হেরা কি কম অত্যাচার করছে আমগোর উপর। আরে কি দরকার আছিন দেশভাগের। দেশ ভাগ না হইলে আমেরিকা না ভারতবর্ষ দুনিয়া শাসন করতো। অন্যরা চুপ কইরা থাকে। তাদের মইধ্যে আরেক জন লাল চায়ে চুমুক দিয়া হাঁকাইয়্যা উঠবোজ্জতয় পাকিস্তানি ভায়েরা কি খারাপ আছিন নাহি?
আরেক জন হয়তো তার মুখ থেইক্যা কথা কাইড়্যা নিয়া হুঙ্কার দিয়া উঠবোজ্জহ একাত্তর সালে হ্যারা কি এমনি এমনি আয়ছিল নাকি বিবি বাচ্চা ফালাইয়্যা? দ্বীনের কামে আয়ছিল।
এবার হয়তো জেহাদি মুন্সি দাঁড়াইয়্যা যাইবেনজ্জহ্যা, ইস্কুল ঘরে পাকিস্তানি ভায়েরা ক্যাম্প করলো। কই আমগো ত কুনো ক্ষতি করলো না। আমরা অবাধে গেছি তাগোর হ্যানে। তাগোর খ্যাদমত করছি। তাগোর লগে খাওয়া দাওয়া করছি, নামাজ কালাম পড়ছি।
আরেক জন দাঁড়াইয়্যা যাইবোজ্জতারা ইসলামের জন্য এত দূরে আয়ছিল। তারা ত তহন খাঁটি ইমানদার মুসলমানেরে কিছু করে নাই। কাফের নাজায়েলদের বিচার করার লাইগ্যাই না তাগোর এই দ্যাশে আসতে হইছিল। তহন তাগো লগে আমরাও ইসলাম রক্ষায় কাম করছি। এবার চেঙরা মোয়াজ্জিনেরও জবান খুইল্যা যাইবোজ্জ হুজুর সাব ঠিক কয়ছেন, আমি হুনছি গ্যারামের পুলাপাইন ধইর‌্যা নিয়া গ্যালে আপনেরা নাকি তাগরে ছাড়াইয়্যা আনতেনজ্জহ ত, আনতামই ত, কী আনতাম না ইমাম সাব? সবাই এক বাইক্যে কইবোজ্জহ, হাচা কতা। আমগর একটা দায়িত্ব আছে না! এমন সময় এই রাস্তা দিয়া হয়তো মুহম্মদ আব্দুল গফুর ওরফে গফা খলিফা যায়। তারে দেইখ্যা হয়তো তারা কথা থামাইয়্যা দ্যায়। কারণজ্জগফা খলিফা একাত্তরে মুক্তিবাহিনীদের সঙ্গে ছিল। ক্যাম্পে রাইন্ধ্যা খাওয়াইত, খোঁজ খবর আইন্যা দিত বিহারিগর। পাড়ার মাইনষ্যে কয় নৌকা ডুবাইতে, ব্রিজ ভাঙতে গফা খলিফাই নাকি সবার আগে আগাইয়্যা গেছিল।  তারপরেজ্জতারপর আর কী? গফা খলিফা চইল্যা গ্যালেগা হয়তো তারা বলাবলি করবো। তারা মায়া করবো গফা খলিফার জন্য। কারণজ্জগফা খলিফার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নাই। এই কথাই জেহাদি মুন্সিরা বলাবলি করবো? কারণজ্জএই গ্রামে তিন জন নতুন মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পায়ছে। পাড়ার মাইনষ্যে কয় সংগ্রামের সময় হেরা নাকি নেঙটা আছিন। পাড়ার মাইনষ্যে কইয়্যা ব্যাড়ায় গফা খলিফা নাকি কয়জ্জসার্টিফিকেটের লাইগ্যা যুদ্ধ করি নাই, দ্যাশের লাইগ্যা যুদ্ধ করছি। এ জন্যই জেহাদি মুন্সিরা লোকটার জন্য আফসোস কইর‌্যা কয়জ্জয্যাতা পোলাপাইনরে দ্যাখছি ন্যাঙটা হইয়্যা ঘুরতে হেরা নাকি মুক্তিযোদ্ধা। হেরা সরকারি টিভিতে ইনটারভিউ দ্যায় হেরা নাকি মুক্তিযোদ্ধা আর আমরা নাকি রাজাকার। কেউ কি কয়তে পারবো আমরা পাড়ার কারো কুনু ক্ষতি করছি কিনা? করে নাই? পাড়ার মাইনষ্যে কয়; হেরা বিহারিগর লগে ঘুরলেও পাড়ার কারো ক্ষতি করে নাই। তারা আরো কয়, জেহাদি মুন্সি নাকি পাড়ার কোন ছ্যারারে বিহারিগর ক্যাম্প থেইক্যা ছুটাইয়্যা আনছিল। তারা এও কয়, জেহাদি মুন্সি নাকি ঐ ছ্যারাগর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং হেই বাড়িতে একটা বিধবা চেঙরা বউও আছিল। তারপরজ্জতারপর আর কী ? আলাপ চলতে থাকবো। এশার সালাত আদায় কইর‌্যা তারা ঘরে ফিরবো। জেহাদি মুন্সিও ঘরে ফিরেন। তখন বউ শ্বশুর নাতি রাইতের খাবার খায়। নাতি তাড়াহুরু করে। সে এখন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের উঠতি নেতা। এত উরুউরু ভাব ক্যান?  দাদার প্রশ্নের জবাবে সে নানা প্রসঙ্গ টাইন্যা আনে। দাদা কিছু বোঝে কিছু বোঝে না। নাতির মধ্যে পরিবর্তনের একটা ছাপ হয়তো দাদা খেয়াল করে। সে এখন দাড়ি কেটে গোঁফ রাখছে। লম্বা লম্বা চুল কেটে ভদ্র ছাট দিয়েছে। রঙব্যারঙের প্যান্টের বদলে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে। ব্লাউজকাটিং শার্টের বদলে প্রায়ই মুজিবকোর্ট পরে। জমি না বেইচ্যাই হোন্ডা কিনছে। আরো। নানান মিটিং-মিছিল করে। দাদা বাধা দিলেও কাজ হয় না। বরং আরো বাড়ে। প্রত্যেক দিন হোন্ডা নিয়া কলেজে যায়। কলেজ থেইক্যা নানান জায়গায়। বিভিন্ন মিল ফেকটরিতে। টেরডার মেনডার, কনডাকটরি, কমিশন চান্দা ইত্যাদি কামে নাকি সেই ওস্তাত। এমপি সাবের লগেও নাকি দহরমমহরম সম্পর্ক। তাছাড়া সেরিগর লগেও নাকি ডলাডলি করে। হয়তো কোন সেরিরে হোন্ডারের পাছায় তুইল্যা সিগাল পার্কে লইয়্যা যায়। মাঝেমইধ্যে ঘরে ফিইর‌্যা খাওয়া-দাওয়া কইর‌্যা যায় ক্যালাবের দিকে। সেখানে হয়তো তাস খ্যালে নইলে ক্যারামে টুকাটুকি করে। রেললাইনে বইস্যা সমাইন্যা সমাইন্যা পুলাগর লগে চুরট খায় আর গাইল পারে। রাস্তা দিয়া সেরি গ্যালে হয়তো টিটকারি মারে। রাইত বারটার ম্যালা পরে বাড়ি আসে। তখন সরকারি দলের উঠতি নেতার মনে হয় আসমানে সূর্যের লাহান ফইকফইক্যা চান ওঠে ক্যান। অন্ধকার কতো মজার; কতো সুবিধার। মরার চান তর মরণ নাই নাকি? আছে হয়তো। আর থাকবো না ক্যায়া? তর চেয়ে বেশ্যাদের কপালের লাল টিপ বেশি ভালা। এমন কোন এক দিন হয়তো ঘরের ভিতর শ্বশুর বউকে সূরাক্বেরাত শেখায়, নামাজ কালামের তালিম দ্যায়। দ্বিনীকামে ব্যস্ত থাকে। তথন হয়তো তারা চান্দের কথা ভুইল্যা যায়। আর কলঙ্কিনী চান দেখার টাইম কই? ঘেউ ঘেউ শব্দ শোইন্যা মুন্সি নইড়্যাচাইড়্যা বসে। কুত্তাকুত্তির সাথে মাইনষ্যের ধাওয়াধাওয়ির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তালিম দেওয়া নেওয়ার কামে তখন ব্যঘাত ঘটে। হ্যাইত কুত্তা হ্যাইত। ধুচ্চেজ্জধুচ্চে। হ্যাইতজ্জহ্যাইত। হারামজাদা কুত্তা খায়াল্যোগো। কইগো বউ; তুমগো কুত্তা সামলাও। ও বাবাগো খাইয়ালছেরেজ্জখাইয়ালছে। ও বাবাজ্জবাজ্জবা। ক্যাওয়াট খুলো। আমি লালাজিৎ ম্যাম্বর। এই এলাকার ম্যাম্বর। তিনবার ফেইল মারার পর গত ইলেকশনে পাত্তি পাত্তি ট্যাকা খরচ্যা কইর‌্যা তিন ভোটে পাস করছে সে। মাদবর মাদবর ভাব তার চলাফেরায় সবসময়। তবে লালাজিৎ ম্যাম্বর ইদানীং খুব বেশি ঘোড়াঘুড়ি করে এইদিকে। রাইত দুপুরে নইলে দিনের মধ্যে দুই তিন ঘোরান পযর্ন্ত দ্যায়।  ঘর থেইক্যা বাইর হয় অপ্রস্তুত শ্বশুরজ্জকী ম্যায়া, এত্ত রাইত্যে কইথ্যে? কোন কথা কওয়ার আগেই আগুন্তুক লাফ দিয়া ঘরে ঢুকে। টপটপ করে রক্ত ঝরতে থাকে তার পা বাইয়্যা। বউ বিচলিত হয়জ্জদেহি দেহি কই কামড়াইছে? লালাজিৎ ম্যাম্বর হাঁটুর উপর লুঙ্গি উঠাইয়্যা দ্যায়। উড়– থেইক্যা এক খাবলা মাংস নিয়া গ্যাছে জান্নারটা। বউ হাত দিয়া ধরতে চায়; কিন্তু পারে না। শ্যাষম্যাশে একটা ন্যাকড়া দিয়া ক্ষতস্থানটা বাইন্ধ্যা দ্যায় বউ। শ্বশুরের গায়ে যেন চুতরা পাতা খাব্লাইয়্যা ধরে। কতক্ষণ পরে আগায়াও দিতে হয় অনেকটা লালাজিৎ ম্যাম্বরকে। শালার ম্যাম্বরের বাচ্চা ম্যাম্বন আসার আর সময় পায় না। ঘরে ফিরার জন্য তারা হাঁটে। শ্বশুর পিসলা খাইয়্যা পইর‌্যা যাইবার চায়; কিন্ত বউ ধইর‌্যা ফালায়। আন্ধার রাইতে যখন মুন্সি হাইট্যা হাইট্যা তাওরায় তখন বেডি হাত ধইর‌্যা আনে। খুব ঘন হইয়্যা আগায় তারা। আবার শুরু হয় জ্ঞানীকাম। জলচৌকিতে বইস্যা জেহাদি মুন্সি লুঙ্গিটা বাজ কইর‌্যা ভিতরে হাত ঢুকাইয়্যা দ্যায় আর রানের চিপা খাজ্জাইয়্যা খাজ্জাইয়্যা বিবি সাবকে কয়জ্জআমারে কাবাব বানাইয়্যা খাওয়াইতা যুদি বউ। বউ শোইন্যা চাইয়্যা থাকে এক ধ্যানে; শ্বশুর এবার পাটা খাড়া কইর‌্যা হুক্কুর হুক্কুর কাশতে থাকলে কুত্তার জিব্বার মতন লরলর করে হোলের বিচি। বউ তাকাইয়্যা থাকে। দ্যাখে; হয়তো দ্যাখে না। তখন হয়তো সে এট্টু গলা খাকাড়ি দ্যায় হয়তো দ্যায় না। তার মনে তখন কী বোধ হয় কেডা জানে ? এক সময় তারা ঘুমাইয়্যা যায়।
বেডি আর ফেকটরিতে চাকরি করে না। জেহাদি মুন্সি আর উঠতি নেতার সৎ মায়ের ফেকটরিতে চাকরি করা চলে না। অবশ্য বেডি কাজটা ছাড়তে চায় নাই। পরে অবশ্য হাসিখুশি মুখেই সে রাজি হয়। সে এখন সব সময় বাড়িতেই থাকে। তাই পরের দিন জেহাদি মুন্সি বাজার নিয়া আইস্যা হাঁপাইতে থাকে। বেডি দৌড়াইয়্যা যায়। ব্যাগটা হাত থেইক্যা নিয়া যায়। গরুর একটা আস্ত রান দেইখ্যা তার ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। শ্বশুর পিঁড়িতে বইস্যা থাকে। তার ঘামের গন্ধে জিম মারে বউ। বউয়ের ভাল লাগে না মন্দ লাগে ঠাউরানো যায় না; কিন্তু তাদের আলাপ চলতে থাকে। দক্ষিণের ভিডা বেচার আলাপ। কারণ, তের হাত লম্বা জিব্বা আর ঢুলির মতন পেট ভরনের জন্য জমি বেচা ছাড়া আর কোন উপায় আছে নাকি? ছেলে আইস্যা খাড়ায়। সে বাধা দিয়া কয়জ্জটেকার দরকার তুমি আমারে কইবানা। জমি বেচনের কী দরকার? জমি আমি আরো কিনুম! কথা বইল্ল্যাই ঘর থেইক্যা পাঁচশ টেকার নোটের একটা বানডেল হাতে ধরাইয়্যা দেয়। দিয়া দৈত্যের মতন হাসে। পরেজ্জপরে বেডি গিয়া চুলায় গোস্ত বসাইয়্যা কষাইতে থাকে; দাদা ও নাতির জিব্বায় পানি আসতে থাকে। আম কাঠের আগুনে গোস্ত পুড়তে থাকে আর হাঁচি দিতে দিতে বেডি কুইকড়্যা পরে, জোঁকের মতন গুটাইয়্যা নিচু হইয়্যা জুুবুথুবু হইয়্যা যায়। শ্বশুর-ছেলে দ্যাখে কিনা বোঝা যায় না। বেডি এক পলকে দ্যাখে ছেলেকে; কিন্তু আবার হাঁচি দিতে থাকে। দরদী শ্বশুর আর সইতে পারে না; আগাইয়্যা যায়জ্জদেহি বউ আমি একটু লাড়া দেই। বউ হাঁচি দিতে থাকে। শ্বশুর ভাপের চুটে ছ্যাকা খাইয়্যা সইর‌্যা আসে; কিন্তু দোইম্যা যায় না; নাড়তে থাকে এক টানা; এবং চামুচ দিয়া একটা গোস্তের টুকরা তুলতে গ্যালে চিও কইর‌্যা এক ছিলিম লালা পরে ডেকচির মইধ্যে। বউ নাতি দ্যাখে না। এমন সময় নাতির মোবাইল বাজতে থাকে। সে চইল্যা যায়। এবং দাদা খুশি হয়। তারপরে জেহাদি মুন্সি গোস্তের টুকরাটা খায় আর বউয়ের দিকে চাইয়্যা থাকে। এবং কয়জ্জকাবাব বানাইতানা বউ? বউ কয়জ্জরাইত্যে খাওয়াইমুনে। বউ হাসে। শ্বশুর হাসে। কলপাড় থেইক্যা মেঝো ছেলে দ্যাখে। দুয়ারে দাঁড়াইয়্যা বড় বউ দ্যাখে। বউ শ্বশুরের হাসাহাসি বাড়তে থাকে। খায়তে বসে দাদা-নাতি-বউ। চ্যাপার ভর্তা কিংবা শাক কিংবা আলুর ভর্তা কিংবা এই রকম খাওনগুলা ছেলের পছন্দ না কোন দিন। কিন্তু আজ দাদারও ভলো লাগে না। বউ একটু পাতে তুইল্যা দিলে শ্বশুর কয়জ্জনুন মরিচে অয় নাই বেডি। ভাল লাগে না। তুমার শ্বাশুরি কয়তোজ্জনুন মরিচে চর্তা, ত্যা খাও ভর্তা। বউ সহজে বুঝতে পারে আজকের ভর্তার অসারতার কারণ। তাই পাঁচ ছয়টা গোস্তের টুকরা পাতে তুইল্যা দিলে শ্বশুর টুসটুসে গালে হাসে। এই হাসি দুনিয়ার সব জায়গায় মিশে যায়।

দুপুরের পরে বারান্দার খুঁটাতে হেলান দিয়া বুকের কাপড় ফালাইয়্যা বইস্যা থাকে বেডি। লালাজিৎ ম্যাম্বর পিছে দাঁড়াইয়্যা থাকে। চোখমুখে টনটনে ভাব। বেডি দ্যাখে এক সময়। কাপড় সামলাইয়্যা নেয়। চোখে চোখ পরে। লালাজিৎ ম্যাম্বর চাইয়্যা থাকে, বেডি মুচকি হাইস্যা চইল্যা যায় বুজানগর ঘরের দিকে। লালাজিৎ ম্যাম্বর তখন কী করে? কী আর করবো? হয়তো এখন যাইবো গোলাঘাট বাজারে। সেখানে গিয়া বসবো পার্টিকেলাব ঘরে। হয়তো সেখানে যোগ দিবো চান্দু কাঠের ব্যাপারি, মোশারফ খলিফা, রশীদ চকিদার আর গেরাম সরকার সুলু। কথার তোপ ধ্বনি তুইল্যা গাঙ্গের পানি সাগরের পানি এক করবো। প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ইউরোপ-আমেরিকা, সিরিয়া-মিসর, ফিলিস্তিন-ইসরাইল ঘুইর‌্যা আসবো। আর তখন হয়তো তারা কার বউয়ের জামাই বিদেশ যাওয়ার পরে আরেক ব্যাডা নিয়া ভাইঙ্গা গ্যাছেগা, নইলে কার বউ বাশুরের লগে ধরা খাইছে, নইলে কার মাইয়া বিয়ার আগে প্যাট ফালাইছে, নইলে কার মাইয়ার দেহের গড়ন ভাল এইসব নিয়া আলাপ করবো। রাইত এট্টু বাড়লে তারা হয়তো গিয়া বসবো জামতলায় নইলে আনু দর্জির দোকানে; সারা রাইত প্যাকেটের পর প্যাকেট চুরট শ্যাষ করবো আর জুয়া খ্যালায় মাতবো। মাঝে মাঝে মুচার বাড়ি থেইক্যা মদ নিয়া আইবো; তখন হয়তো বাজারের ফাটকান্নিরে দুইশ ট্যাকার বিনিময়ে নিয়া আসবো সারা রাইতের জন্য। তাগোরে কিছু কওয়ার কেউ নাই। কারণ তারা সরকারি দলের লোক। তখন তাগোর মজা দেহে ক্যাডা ? কেউ না; এমন কি আল্লাহও না। পরেজ্জ
বইকালের নুনতা রোইদে পশ্চিমের ক্ষ্যাতে ফুটবল খ্যালে মরদা মরদা পোলারা। সখ কইর‌্যা আজইকা ছেলেটাও যোগ দিছে। বেডি আর শিউলি বইস্যা বইস্যা পান চিবায় আর চাইয়্যা থাকে। তখন গুনগুন কইর‌্যা গীত ধরে তারা। এমন সময় হয়তো কালুদের শিক্ষত লম্বা ছ্যামরাটা শিউলিদের বাড়ির দিকে তিরতির কইর‌্যা আগায়। তখন শিউলিকে কাছি দিয়া বাইন্ধ্যা রাখা যায় না। বেডির আর কী করার থাকে ? কিছুই করার থাকে না। তখন সে হয় অনেক কিছু ভাবে, হয়তো ভাবে না। হয়তো তার অন্তরে টান পরে; অজানা টান। বাতির আজানের পরে পরে বারান্দায় হাঁস মুরগির খোয়ারে হাঁস-মুরগি ঢুকাইবার জন্য বেডি দৌড়াদৌড়ি করে। খুপরির মুখ লাগায়ইতে গিয়া সে উপুর হয়। এমন সময় লালাজিৎ ম্যাম্বর আবার আইস্যা খাড়াইয়্যা থাকে। খাড়াইয়্যা কী করে? খাড়াইয়্যা এক ঠ্যাঙ মুরগির খোয়ারে উপর তুইল্যা হাটুর উপর লুঙ্গি উঠাইয়্যা উরু খামচায় আর কাতি মায়া কুত্তার মতন হাঁপায়। হন্তদন্ত হইয়্যা আইলে হাঁপানো ছাড়া কোন উপায় আছে নাকি? পরে সচকিত হইয়্যা মুচকি হাসে বেডি। এবার ঘরে ডাইক্যা নিয়া বসায় তাকে। চৌকির কোণায় গাইড়্যা বইস্যা থাকে লালাজিৎ ম্যাম্বর। কথা চলে তাদের মইধ্যে; আর লালাজিৎ ম্যাম্বরের চোখ গিয়া পরে বেডির ডাইন আচলের নিচে। বেডি দ্যাখে, হয়তো দ্যাখে না। পান খাওয়া চলে আর চলে গপ্পসপ্পজ্জবউ শরীল বালানি? ছ্যারাডা গ্যাছে কই? ক্যাডা জানে? কত্ত কামকাজ তার, কত্ত দৌড়াদৌড়ি, সামনে ইলেকশন, আমার চে ত আপনেই ভালা জানেন। ম্যাম্বর কয়জ্জঅকালে ব্যাডা গ্যালোগা মইর‌্যা, তা কিচু ভাবছো টাপছো নাহি? কী আর ভাববো ভাইজান? শ্বশুর আছে, প্যাটের না ওক একটা ছ্যারা আছে, বাড়ি ভরা মাইনষ্যে। হ তা ত আছেই। হ আপনারা আছেন। এবার তার মুখের তলে একটা খুশি খুশি ভাব বোঝা যায়। তার মনে তখন কি, কেডা জানে? অনেক কিছু ভাবে, হয়তো ভাবে না। হঠাৎ মানুষের রা। অপ্রতিভ হয় লালাজিৎ ম্যাম্বর। হালার বুইড়্যা আসার আর সময় পাইলো না। বদের বাচ্চা বদ।  শ্বশুরের অচেনা আগমন আজ। ঘরে ঢুইক্যা তার পিত্তি যায় পুইড়্যা। এই বেইমানের বাচ্চাডা যে কী চায়? বউডাও জানি ক্যামন। কী ম্যাম্বর? কী হাল আলামত? যখন তখন তুমার দেহা পাই। কী ! খরব টবর কী?
বালাই। আপনে ক্যামন?
এই আছি। বউডার দ্যাকভালে বালাই চলতাছে। তা তুমি ত ম্যায়া বয়স্ক ভাতায় আমার নামটা ঢুকাইয়্যা দিলা না য্যা।
কী যে কইন ম্যাসাব? আমনেগর আবার অ্যাগুলার দরকার আছে ? এত্ত জমিজমা ক্যাডা খাইবো?
হ ম্যায়া। সব ত তুমরাই খায়ালতাছো। গরিবরে আর কয় দানা দেও। এইতা আমরা সবই জানি।
ম্যাম্বরসাব ঢেকুর খায়। কথা বাইর হইতে চায় না। জোর কইর‌্যা হাইস্যা কয়জ্জপঞ্চাশ লাখ ট্যাকা খরচ্যা কইর‌্যা ম্যাম্বরি পাস করছি, ট্যাহাডা ত উডান লাগবো। না কি কইন?
হ তা ঠিক আচে কিন্তুক এত্ত ট্যাকাতো খরচ কর নাই ম্যাম্বর।
পঞ্চাশ না গ্যালেও চল্লিশ ত গ্যাছে ঐ।
তাও যায় নাই। ধর গ্যাছে’ কিন্তুক এই-সেই ত কম খাও নাই। হুনছি বিচার শালিসেও নাকি পকেট ভারী কর। এট্টু দ্বীনের রাস্তায় আহ ম্যায়া, আল্লায় ত সইবো না।
লালাজিৎ ম্যাম্বর কথা খোঁইজ্যা পায় না। নয় ছয় করে ওইঠ্যা পরে।
জেহাদি মুন্সি বিড়বিড় করেজ্জশালার ম্যাম্বর যহন তহন আহে, এমনকি রাইত বিরাইতেও মাইনষ্যের বাড়িতে আইয়্যা বইয়্যা থাকে। জালিমডার কুত্তার কামুড় খায়াও লাল্লৎ অয় না। হাজার রাগ ওঠলেও বেডিরে কথা শোনানোর ক্ষমতা যেন জেহাদি মুন্সির নাই। ভরা রাইত্যে ছেলে ঘরে ফিইর‌্যা বেডিরে ডাকতে ডাকতে বিছানায় ঢইল্যা পড়ে। কী আর? শুকনার বদলি মনে হয় বিজা খাইয়্যা আইছে। হ ছেলের মুখ থেইক্যা পঁচা ভাতের গন্ধ বাইর হইতাছে। ওকাক ওকাক কইর‌্যা বমি করতে করতে আত বাইর হইয়্যা যায় যায় তার। ব্যথার যন্ত্রণায় মাথাটা ছিঁইড়্যা যায়বো যেন। কাঁপুনি দিয়া জ্বর আসে। জেহাদি মুন্সি পানি পড়া দ্যায়, ঝাড়ফুক করে। বেডি মাথায় পানি ঢালে, মাথা টিপে; ভেজা গামছা দিয়া সমস্ত গা পোছে পরেজ্জরাইত গভীর হয়। জেহাদির মুন্সির চোখ লাইগ্যা আসে ; কিন্তু সারারাত বেডির সেবার হাত বন্ধ থাকে না। ভোরের মধ্যে ছেলের অসুখ কইম্যা যায়তে থাকে। এরপর প্রায়ই ছেলের অসুখ করে। সেবাযতেœ বিবিসাব। কোন এদিকসেদিক হয় না। সকাল হইতে না হইতে লালাজিৎ ম্যাম্বর আইস্যা উপস্থিত হয়। বেডিরে বিচরায়। কিন্তু বেডি কই? বেডি ত নাই, এইখানেও নাই সেইখানেই নাই, কোনখানে নাই। এক কথা দুই কথা কইতে কইতে সময় গড়াইয়্যা যায় মরার বউ ত অহনো আয়ে না। লালাজিৎ ম্যাম্বর কথা খোঁইজ্যা পায় না। তাই সে খাজইর‌্যা আলাপ করে জেহাদি মুন্সির সাথে। কী আর? সামনে নির্বাচন আসতাছে। বহু আগেই দল পাল্টাইয়্যা সরকারি দলে আইস্যা যোগ দিছে সে। এখন তার কোন ডর আছে নাকি? সে এখন সরকারি দলের লোক ! পরে আবার সে কথা খোঁইজ্যা পায় না। কই যে গেল বউডা? আবার আলাপ শুরু হয়। দ্যাশ বিদ্যাশের আলাপ। আবার লালাজিৎ ম্যাম্বরের মন ভাইঙ্গা যায়। তাই সে কয়জ্জত যাইগা ম্যাসাব বহুত কাম আছে। কাঁঠালিতে একটা শালিসে যাওন লাগবো। আর কয়েন না পাপে দ্যাশটা ভইর‌্যা গ্যাছে। বাওরের লগে ছুডু ভাইয়ের বউ ধরা খায়ছে। ওয়াস্তাফিরুল্লা… এমন নাফরমানি কাম মাইনষ্যে করে নাহি? জেহাদি মুন্সিও ওয়াস্তাগফিরুল্লা পইড়্যা নাক ফুলাইয়্যা রাখে। বামে ঘুইর‌্যা তাকাইয়্যা এইবার ম্যাম্বরসাব মুচকি হাসেজ্জযাইগা বউ, এট্টু দরকার আছে।
বউ এক গালে হাইস্যা তাচ্ছিল্যের ভাব ছড়াইয়্যা দ্যায় দুনিয়া জুড়ে।
কুত্তার কামুড়ের ঘাও ভালা হইছে নি আমনের ম্যাম্বরসাব?
এই রকম ব্যঙ্গাত্মক কথায় না টিকতে পাইর্যাা লালাজিৎ ম্যাম্বর আর বেশি কথা না বাড়াইয়্যা চইল্যা যায়। শ্বশুর ছোট চোখে তাকাইয়্যা থাকে। তার মনের অবস্থা উদ্ধার কার যায় না।
হুতুম। হুতুম। ঘেউ। ঘেউ। পাড়ায় একটা দুর্ঘটনা ঘইট্যা যায়। আর ঘটবো ক্যায়া? তিন চার দিনে এক একটা দালান খাড়ায়া গেলে ধসবনা? ব্যাঙের ছাতির মতন যেমনে মিল ফেকটরি হইতাছে! যেমনে গ্রামের ফসলি জমি গাছ কাটা হইতাছে! তার একটা ওসল দেওন লাগবো না? হালার ডাকাইতের বাচ্চারা খালি লাভ আর আর লাভ খোঁজে! তয় সমস্যা হইলো সবচে বড় বিল্ডিংটা ধইস্যা গেল গতকাল। কিন্তু সবচে কম সময় লাগছিল বানাইতে! কত মানুষ মরছে তা জানার কোন রাস্তা নাই। নয় তলা বিল্ডিং। তার মইধ্যে আবার ফেকটরি, মার্কেট, কতো কী! বিল্ডিংঅলা শালারা সব মরে না ক্যায়া?  না। দুনিয়া জুইড়্যা খবর হইয়্যা গেছে। হাজার হাজার  মানুষ আইস্যা গ্রামের মইধ্যে জরো হইছে। কিন্তু এতো মাইনষ্যের মইধ্যে ছোটছেলে মানে সরকারি দলের উঠতি নেতা ওধাও। বিল্ডিং ধসের পরে পাড়ার কেউ তাকে দেখে নাই। পাড়ার লোকে কয়; এই বিল্ডিং করার সময় কনডাকটরি না ফনডাকটরি করছিল হে। এত্তো বড়ো দালানের দিকে চাওয়াই যায় না। ইট-বালুর পরতে পরতে লাশ, ছেঁড়া, কাটা, ন্যাংটা, অর্ধেক ন্যাংটা। মালিক পক্ষ কই? কেউ জানে না। আল্লাও না; কিন্তু তার জমিনে খালি লাশ আর লাশ। এরা যেন মানুষ না, হেয়াল, কুত্তা এক একটা। ১০০…. ২০০…১১০০… যে উঠতি নেতারা এইসব বিল্ডিং থেইকা এইসব ফেকটরি থেইক্যা কমিশন নিতো, চান্দা নিতো হেরা কই? কই আর! হেরা নাকি এখন শ্রমিক নেতা !
এই রকম একটা ভেবাচেকা সময়ে জুম্মাওয়ালা বাড়ির পরিবেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে। হুক্কা হুঁয়া। হুক্কা হুঁয়া। বাদুরের ডানা ঝাপ্টায় রাইত বড়ো হয়, অনেক বড়ো। ঐদিকে উঠতি নেতাও উধাও! বেডির মুখে হাসি নাই। থুম মাইর‌্যা বইস্যা থাকে সে। মাথা ঘুরে। চোখ বন্ধ হইয়া আসে। থমথম করে আত্মা। খাওয়ায় অরুচি। চোখে যেন অমাবস্যা নাইমা আইছে। মাথার জিমজিমানি বাড়তে থাকে; লুকিয়ে লুকিয়ে বমিও করে সে। রাইত বাড়তে থাকে। সময় ঘনীভূত, প্রগাঢ় হয় মুহূর্ত; যখন তখন বমি ঢাকার উপায় থাকে না। প্যাটের জ্বলাপোড়া বাড়তে থাকে কিংবা হাচড়পাচড় করে ভিতরে। বাড়ন্ত পেট ঢাকবার উপায় বেডির জানা নাই।
একদিন পৌনে দুপুর হইয়া যায়। বেডি তো ঘুম থেইক্যা উঠে না। কেউ জানে না। আকাশ জানে না। বাতাস জানে না। বনের পক্ষি জানে না। হালের বলদাও জানে না। মনে হয় ফেরেশতারাও জানে না। পরেজ্জকই, আজ তো শ্বশুর কিংবা ছেলে কিংবা লালাজিৎ ম্যাম্বর খোঁজ করে না। এক সময় পাশের বাড়ির শিউলি আসে। জেডি জেডি বইল্যা চিল্যায়। মরার জেডি ত খিল খোলে না। এবার তার গা জ্বইল্যা গ্যালে সে গিয়া দরজায় ধাক্কা দ্যায়। ধপাস কইর‌্যা কপাট খোইল্যা যায়। কিন্তু ডরে চিৎকার দিয়া সে দৌড়ায় আর লাফায়জ্জও বাবাগো ও আল্লাগো ও মায়াগো কই গ্যালাইন সবাই? জেডি ত ফাঁস লইছে। নতুন সিলিঙ ফ্যানের লগে বেডি বাদুর ঝুলায় ঝুইল্যা থাকে। তার পেটিকোড শক্ত কইর‌্যা কোমরে বাঁন্ধ্যা থাকে। আর ব্লাউজের বোতামগুলো এলোমেলোভাবে লাগানো থাকে। তার জিব্বা এট্টু হয়তো বাইর হইছে; কিন্ত মলমূত্রের চিহ্নটুকু নাই। ঠোঁটের কোণায় থোকা থোকা রক্ত। চোখ আধা মেলানো। দ্যাহে ভনভন করছে মাছি।
ভটভট শব্দ কইর‌্যা পুলিশ আসেজ্জসাথে থাকে লালাজিৎ ম্যাম্বর আর রশীদ চৌকিদার।
সকলেরই এক দফা এক দাবিজ্জ
মা-বাপ নাই, স্বামী-সন্তান নাই; তাই দুঃখে গলায় দড়ি দিছে।
সবাই আরো কয়জ্জ
মাথায় গ-গোল আছিন, কারো লগে রাও করত না। একলা একলা বিড়বিড় কইর‌্যা কথা কইত।
এবং আরো অনেক কিছু কয়।
চান্দিসিলা প্যাট মোটা দারোগা এবার হাঁক দিয়া ওঠেজ্জহুঁওঁ। একটা মানুষ এমনি এমনি আত্মহত্যা করে নাকি? পোস্টমর্টেম করলেই সব ফাস হইয়্যা যাইবো। আর কয়েকটারে ধইর‌্যা নিয়া হুগাডার মইধ্যে দুইডা গরম ডিম হানদাইয়া দিলে ফরফর কইর‌্যা সব বাইর হইয়্যা যাইবো।
উপস্থিত সকলের থরথর কইর‌্যা হাত পা কাঁপতে থাকে। জেহাদি মুন্সি ডরে কুইকড়্যা যায়; দমটম বন্ধ হইয়্যা আসে তার। এবার তিনি তার সুযোগ্য নাতির অভাব বোধ করেন। আর মনে মনে আল্লাহর চেয়ে যেন তার নাতির কথা বেশি স্মরণ করেন ভীতু জেহাদি মুন্সি লালাজিৎ ম্যাম্বরকে ডাইক্যা নিয়া আলাপ করে। জেহাদি মুন্সির মুখের কথা শোইন্যা তো তার সুখের সীমা থাকে না। এবং সে কয়জ্জকুনু চিন্তা নাই ম্যাসাব। আমি বাইচ্যা থাকতে লাশ নিতে দিতাম না। আপনে মাল রেডি করেন।  ম্যাম্বরসাব এবার দারোগার কানে কানে কথা কয়।
দারোগার মনে এট্টু মায়া জন্ম নেয় এবার; দারুণ মায়াজ্জআচ্ছা ঠিক আছে। আপনারা যেহেতু কয়তাছেন। মৃত নারীর মাথায় গ-গোল আছে, তাছাড়া আত্মীস্বজন বলতে কেউ নাই। এক শ্বশুর আর ছেলে ছাড়া তেমন কেউ নাই। কী আর করার? আপনাদের দিকে চাইয়্যা লাশ আর নিয়া গ্যালাম না। কিন্তু বেশি জানাজানি জানি না হয়। তাইলে আবার আমাদের সমস্যা হইবো।
অবশ্য সমস্যা হওনের কথা নয়। কারণ, দেশ তখন ধইস্যা যাওয়া দালান ও তার মৃত মানুষ নিয়া মাতামাতি করতাছে। অন্যকিছুর দিকে নজর দেওনের সময় কই?
এমন সময় মুন্সির ঘরে দ্বিতীয় বার সিন্দুক খোলার শব্দ হয়।
অনেক মানুষের সামনে তড়িগড়ি কইর‌্যা উত্তরের টেকের জঙ্গলে মাটি চাপা দেওয়া হয় লাশটা। তখন শ্বশুর উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দ্যায়জ্জএই বেডির লগে পিশাচ ভর করছে, শয়তান হইয়্যা গ্যাছে এইডা। কুনু গুরুস্থানে এরে কবর দিলে হেই গুরুস্থান নাপাক হইয়্যা যাইবো। হ্যার জানাজা গুসল দ্যাওয়ার বিধান নাই।
ম্যাম্বরসাব মাথা নাড়াইয়্যা হা বলে।
এবার মসজিদের ইমাম সাব কয়জ্জ
মুরদা ব্যক্তি জানাজা গুসল না পাইল্যেও কুনু সমস্যা নাই। তিন দিনের মাথায় একটা মিল্লাত মাহফিল অ্যাবং দোয়া দুরুদ পাঠ করলে ঐ ব্যক্তির আত্মা শান্তি পাইবো জেহাদিসাব ঘুষণা দিছেন যে, উনা যেহেতু উনার ছেলের বউকে আপন মেয়ের মতন ¯েœহ করতেন সেহেতু আগামী বাদ জুম্মা উনি মিলাতমাহফিলের আয়োজন করবেন অ্যাবং আপনাদের সবার দাওয়াত রইল।
সবাই জেহাদি মুন্সিকে বাহবা দ্যায়। জয় হোক জেহাদির মুন্সির। মহান এই জেহাদি মুন্সি।
সন্ধ্যার আগে আগে একটা দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার আসলে জেহাদি মুন্সিকে আবার সিন্দুক খোলতে হয়।
ম্যাম্বরসাবের চোখেমুখেও খইফুটা আনন্দ খ্যালা করে। বড় ছেলে মেঝো ছেলে বাঁকাভাবে হাসে। তাদের বউরা নতুন নতুন তথ্য জাহির করে।
জুম্মার আগেই মুন্সির ঘরে মুন্সিদের আড্ডা জমে। তখন সুর কইর‌্যা আল্লাহুম্মা সল্লিয়ালা পড়ে তারা। গোস্তের গন্ধ তাদের পরকালের কামে বাধা দ্যায়। সময় গড়াইতে থাকলে তাদের আমলের গতি বাড়তে থাকে। তারা তখন বারবার থুথু ফেলায় অথবা ঢেঁকুর তুলে কিংবা ঢুক গিলে। জুম্মা নামাজের খোদবা ক্ষুদ্র হইতে থাকে। সংক্ষিপ্ত সূরাকেরাতে নামাজ পড়ায় ইমামসাব। মোনাজাত করার সময় কইম্যা আসে আজ। এক সময় গরুর গোস্তের টুকরায় তারা কামড় দ্যায় আর তাদের চোখ গিয়া ত্যারস্যা কইর‌্যা পড়ে।
তখন বেডির পোষা খরগোশের বাচ্চাটাকে নিয়া টানাহ্যাচড়া করে কয়েকটা কুত্তা।