Archives

আড়ালের কৌতুক

নিজেকে নিদ্রিত দেখে/মৃদুল দাশগুপ্ত :

নিজেকে নিদ্রিত দেখে আকস্মিক মনোবেদনায় শিয়রে বসেছি ঝুঁকে

কোনও কোনও রাত্রিকালে একাকী নিশ্চুপে

হয়তো দু-এক ফোঁটা অশ্রুপতনের ফলে আধো চোখ মেলে

আবার নিদ্রায় ডুবে যেতে যেতে সে ভেবেছে, স্বপ্ন দেখা যায়

মৃদুল দাশগুপ্তের এই কবিতাটি অনেক দিন থেকেই আমার প্রিয়, পরে কবিতার জন্মমুহূর্ত পড়েও জানলাম, এটি পড়ে কবিকন্যা ঘ্যাংঘুংও নাকি তার নয় বছর বয়সে এই মত দিয়েছিল যে, সে সময় পর্যন্ত লিখিত সকল কবিতার মধ্যে সেটিই নাকি তাঁর বাবার শ্রেষ্ঠ কবিতা। আসলে যে-লেখা যুগজয়ের দাবি নিয়ে দাঁড়ায়, তাকে তো প্রথমে পরিজনের সীমাই ডিঙাতে হয়, এরপরেই না সমাজ-রাষ্ট্র ও দেশকালের প্রশ্ন।

কোনো কবিতাই কখনো এমনি-এমনি কারো প্রিয় হয় না, সেটা, অর্থাৎ এমনি-এমনি পছন্দ [অল্পসংখ্যক ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে] শুধু ফেসবুকেই সম্ভব; অন্যত্র, এর পেছনে নানা কারণÑজীবনানন্দের ভাষায় ‘সারবত্তা’Ñথাকে। তবে এই কারণও যে সবসময় যুক্তিশৃঙ্খলায় বাঁধা থাকে তা নয়, এতে থাকে সত্যমিথ্যার দ্বন্দ্ব, নানা এলোমেলোমি, আনন্দ-বেদনার রহস্য এবং কখনোসখনো বেদনাজড়িত কৌতুকও। আমার ধারণা, এই কবিতায় শেষোক্ত কৌতুকী প্রবণতাটি বর্তমান, এবং বলাই বাহুল্য, আমার ভালোলাগার কারণও সেটি।

কবি অবশ্য সে-কবিতার জন্মমুহূর্তের উল্লেখ করতে গিয়ে জানিয়েছেন তিনি ‘ঘোর নিশাকর’ অর্থাৎ নিশাচরÑরাত যত গভীর হয় তিনি উড়ে বেড়ান, ঘুরে, উড়ে বেড়িয়ে শেষরাতে আস্তানায় ফিরে বিকল্প চাবি দিয়ে গ্রিলের দরজা খুলে, ভেতরের ভেজানো দরজা ঠেলে, ঘুরে ঢুকে, একা-একা রাতের খাবার খেয়ে চুপিসারে বউ-মেয়ের পাশে শুয়ে পড়েন, কিন্তু প্রতিবারই কী ভাবে যেন ঘুমঘোরের মধ্যেও তাঁর ছোট্ট মেয়ে ঘ্যাংঘুং উপস্থিতি টের পেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু এই প্রাত্যহিকতার মধ্যেই একদিন এই কবির যে-প্রতিক্রিয়া হলো সেটিই এই কবিতার জন্মমুহূর্তÑতাঁর কথায় :

একদিন, ওই ভোররাতে ফিরে খেতে খেতে ভাবলাম…পাশের ঘরে ঢুকে নীল আলোয় আমি দেখব… আমার জায়গাটিতে আমি শুয়ে আছি, ঘুমোচ্ছি মেয়ে-বউয়ের পাশে!… নিজেকে নিদ্রিত দেখে কেমন লাগবে আমার? খুব কষ্ট হবে, করুণায় মন ভরে যাবে এই ভেবে যে, এই যে মানুষটি সারাদিন কত না রোদে রোদে পুড়েছে, আঘাত সয়েছে, অপমান সহ্য করেছে, ক্ষত বিক্ষত হয়ে আজ ঘুমোচ্ছে। মাথার কাছে ঝুঁকে বসব। দু-ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়বে আমার, নিজেরই ঘুমন্ত মুখের ওপর।

এই ভাবে কষ্ট ও করুণায় আর্দ্র হয়ে কবি লিখে ফেললেন চার পঙ্ক্তির এই চমৎকার কবিতাটি। কষ্ট-করুণা-সংবেদনা কি আত্মবেদনা যাই বলি না কেন, আমার ধারণা এর মধ্যে রয়েছে এক সূক্ষ্ম-গভীর কৌতুক এবং বিহ্বলতা, কারণ কবিতার মূলবক্তব্যে বাস্তবসম্ভব বেদনার সত্য ব্যক্ত হলেও এতে রয়েছে এক অবাস্তব ও অসম্ভব অভিজ্ঞতার/ক্রিয়ার বয়ান।

অবাস্তব এজন্য যে, বাস্তবে কারো পক্ষে তার নিজের নিদ্রিত রূপ দেখা সম্ভব নয়, আর এখানে অন্য কাউকে নিদ্রিত দেখার মধ্যে যেমন কবিতাত্ব নেই, তেমনি কৌতুকও নেই, এখানে কৌতুক সৃষ্টি হয়েছে দ্রষ্টা ও দৃশ্য/নিদ্রিত দু-জনেই একই ব্যক্তি বলে। একে ঠিক কৌতুক না বলে কৌতুকী বিহ্বলতা বলা ভালোÑঅঁরি বেয়র্গসোঁ তাঁর বিখ্যাত খব খরৎব বইয়ে কাক্সিক্ষত কৌতুকহাস্য সৃষ্টির পক্ষে একজন সাংবাদিককে দেওয়া মার্ক টোয়েনের একটি সাক্ষাৎকারের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এমনটিই বলতে চেয়েছিলেন। এই কবিতাটির নিজেকে নিজের নিদ্রা দেখার তথ্য অথবা অদ্বৈত চেতনার কৌতুককর বেদনা আমাকে আলোড়িত করে নিয়ে গেল একশ চোদ্দো বছর আগে-বলা অঁরি বেয়র্গসোঁর কথাগুলোর কাছে; শুধু শত বছর আগের কথাই বা বলছি না কেন, মনে পড়ছে সদ্যপঠিত ওরহান পামুকের ইস্তাম্বুল বইটির ‘আর এক ওরহান’ শিরোনামের প্রথম অনুচ্ছেদটির কথাও : ‘খুব ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম যে, আমার এই পৃথিবীতে যা দেখতে পাই, তার চেয়েও বেশি কিছু আছে। ইস্তাম্বুলের রাস্তায় কোথাও আমাদের বাড়ির মতোই দেখতে অন্য কোনো বাড়িতে আর এক ওরহান থাকে যে কি না হুবহু আমারই মতো দেখতে আর ওকে আমার যমজ ভাই কিংবা দ্বিতীয় আমি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।’

ওরহান পামুক লিখেছেন গুজব, ভুল বোঝাবুঝি, কল্পনা এবং ভয় থেকেই তাঁর এই ধারণার উৎপত্তি, মার্ক টোয়েনের ধারণায় রয়েছে ‘আত্ম’-‘পর’তার দ্বন্দ্ব, কিন্তু মৃদুল কোন অনুভব থেকে নিজেকে নিদ্রিত দেখার ধারণায় পৌঁছেছিলেন তাঁর লেখায় এ-বিষয়ে অল্পই বলেছেন, বলেননি ঠিক কোন প্রবণতা থেকে তিনি এই কবিতার মূলাধারে পৌঁছেছেন। ভয় না কি সেই আত্মকরুণা, যা আসলে আত্মপ্রেমেরই নামান্তর?

তবে বই করার আগে ১৯৯৮ সালে এবং মুশায়েরার কবি ও কবিতা বিশেষ সংখ্যায় কবিতাভাবনার শেষে এই কবিতাটি যখন ছাপতে দিয়েছিলেন, তখন, দেখতে পাচ্ছি সেই কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘মূর্খ’, সেখানে কি কোনো বিশেষ ইশারা ছিল? নিজেকে নিদ্রিত-দেখার মধ্যে নিশ্চয়ই ‘মূর্খ’তার পরিচয় পেয়েছিলেন? তবে, শেষমেশ তিনি নামটি প্রত্যাহার করে নেন। সেটি ছিল এক অতি উত্তম সিদ্ধান্ত, তা করে কবিতাটিকে মঞ্জিলে যাওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন।

উল্লেখ করা জরুরি, এই কবিতা ভালোলাগার আরেক কারণ, আমি নিজেও একসময় এই অভিজ্ঞতা যাপন করেছি [এখনো একটু অন্যভাবে তা করে চলেছি], মৃদুলেরই মতোই প্রায় এরকমই আমারও প্রাত্যহিকতা। আমি মৃদুলের মতো ঠিক ‘নিশাকর’ নই, তবে রাতে মাঝেসাঝে একা-একা ফিরি, গেট খুলি, বাইরে থেকে দরজা খুলি, চুপিসারে স্ত্রীপুত্রের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি, কখনোসখনো ঘুংঘুং-এর মতো আমার ছেলেটিও জেগে ওঠে; অথবা, কখনো একসঙ্গে শুয়ে, স্ত্রী-পুত্র ঘুমিয়ে পড়লে, উজাগরির কারণে অসুস্থতাবৃদ্ধির উদ্বেগ না-বাড়ানোর জন্য, চুপে চুপে শয্যা ছেড়ে পড়ার ঘরে এসে অল্প আলোয় সময় কাটিয়ে আবার চুপে-চুপে ভোররাতে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ি। তবু ভয়ে কি আত্মকরুণায়/আত্মপ্রেমে এরকম কবিতা লিখিনি, তবে, মাঝেসাঝে এমন আচরণে নিজেই আচ্ছন্ন ও বিহ্বল হই, আর আমার নিজের প্রতি স্ত্রী-পুত্রের স্বাস্থ্যহানির আন্তরগত কাতরতা সত্ত্বেও, কখনো নিজের প্রতি নিজেরও মায়া হয়, মিথ্যে অভিমান হয় এবং নিজেকেও যেন কীরকম অপরিচিত ও অবাস্তব মনে হয়।

এই সকল সূত্রে, এই কবিতার মুখোমুখি হয়ে আমি যে-কথাটি বলতে বাধ্য যে, এমন কবিতা বাংলা কবিতার জগতে মোটেই সুলভ নয়। আমরা এখন খুব সচেতন, সতর্ক ও গাণিতিক; বুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর; কিন্তু এই কবিতায় অবাস্তব ক্রিয়াকে আমলে এনে অন্তরিত মনোবেদনাকে প্রধান করা হয়নি, বরং স্বপ্ন দেখার কথায় ব্যক্ত হতে পেরেছে অবাস্তব/অস্বাভাবিক ক্রিয়ারই স্বাভাবিকতা এবং এতেই মুদ্রিত হতে পেরেছে তাঁর ভারী গম্ভীর গোঁফের আড়ালের কৌতুক : কৌতুকী বিহ্বলতা ও দ্বন্দ্বের ব্যঞ্জনা।

ক্রোড়পত্র: বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন

ক্রোড়পত্র: বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন

বাঙালী মুসলমান ও তার মন

জুলফিকার মতিন

১. প্রথম কথা বাঙালী। দ্বিতীয় কথা মুসলমান। না কি প্রথমটি মুসলমান, দ্বিতীয়টি বাঙালী। একটি জাতিত্বসূচক, আরেকটি ধর্মীয় পরিচয়মূলক। জাতিত্বের কথাটি আগে বলছি এ কারণে যে, একটি জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে। সেই ভূখণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, তার প্রকৃতি, তার জীবনযাত্রার ধরন ইত্যাদি বিষয়গুলো অস্তিত্বের আদি উপাদান। এ সবের কারণেই জনগোষ্ঠী থেকে জনগোষ্ঠী আলাদা হয়ে যায়। পরিচিত হয় ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে। আর অন্যান্য অনেক কিছুর মতই ধর্ম হল একটি আহরিত বিষয়। সামাজিক বিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষ তা গ্রহণ করে। তাই আবার প্রবাহিত হতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বাঙালী জনগোষ্ঠীতে ইসলাম ধর্মের বেলাতেও তাই ঘটেছে। কিন্তু সমস্যা হল, এই ধর্মীয় পরিচয়কে আবার জাতিত্বসূচক ভাবার চল আমাদের দেশে দীর্ঘ দিন ধরেই চলে আসছে। বিশেষ করে ইংরেজী ভাষাবাহিত শিক্ষা শুরু হবার পর থেকেই, কি হিন্দুদের মধ্যে, কি মুসলমানদের মধ্যে, যখন স্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাবের প্রকাশ ঘটতে থাকে, তখন থেকেই আইডেন্টিটিটিটা হতে থাকে হিন্দু জাতি—মুসলমান জাতি হিসেবে। এখন কথা হল, আমরা যতটা ইতিহাস তৈরী করতে পেরেছি, তাতে দেখা যায়, এই ভারতবর্ষ, যার ভেতরে আমরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান—এই তিনটা দেশ বানিয়েছি, তার সাধারণ পরিচয় ছিল ‘হিন্দ’। আবার এটা ধরে নেয়া, বোধ করি, অন্যায় নয় যে ইংরেজী ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটিও এসেছে এখান থেকেই। সুতরাং দেশের নাম ‘হিন্দ’ থেকে অধিবাসীদের নাম ‘হিন্দু’ হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। বোধ করি হয়েছেও তাই। আর এতে ধর্মের কোন যোগ ছিল না বলেই মনে হয়। আবার আর্যরা জনগোষ্ঠীকে যে ভাবে ভাগ করেছিল, সেখানে ধর্ম-কর্ম করাটাও সব মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ছিল না। তাদের সামাজিক ভাগটা ছিল পেশাভিত্তিক। একেক শ্রেণীর জন্য একেক ধরনের কাজ। কেউ তলোয়ার ঘোরাবে—ক্ষত্রিয়; কেউ হুকুম পালনের জন্য তটস্থ হয়ে থাকবে— বৈশ্য। আর যারা উৎপাদনের চাকা ঘোরালে অর্থাৎ হাল-চাষ করবে, কাপড় বোনাবে কিংবা করবে আরও আরও শ্রমসাধ্য কাজ, ঘামই যাদের এক মাত্র মূলধন, তারা তো নি¤œবর্ণ—শুদ্র! এই আর্য সমাজে ধর্ম পালনের অধিকার ছিল এক মাত্র ব্রা‏হ্মণদের—যারা সবার ওপরে। তারা ছাড়া অন্যদের নিষিদ্ধ ছিল দেবমন্দিরে প্রবেশের অধিকার। সংস্কৃত ভাষায় লেখা শাস্ত্রগ্রন্থ অন্যরা পাঠ করলে নির্ধারিত ছিল ঊর্ধতন ও অধঃস্তন চতুর্দশ পুরুষসহ রৌরব নামক ভয়াবহ নরক। এ থেকে এটা তো স্পষ্ট বোঝা যায়, ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কারও কোন ধর্মীয় পরিচয় ছিল না। যা ছিল, তা পেশাগত। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে, বাংলাদেশে অন্তত, ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর থেকে এতটা বাড়াবাড়ি থাকে না। রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে দাঁড়িয়ে যেমন লৌকিক দেব-দেবীরা পূজা পেতে থাকেন, তেমনই যাদেরকে ‘নি¤œবর্ণ’ বানিয়ে রাখা হয়েছে, কাছে টেনে নেবার দরকার পড়ে তাদেরকেও। পূজা-অর্চনার ব্যাপারটা হয়ে পড়ে বারোয়ারী। এ ভাবে অধঃপতিত মানুষেরাও হয় ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অংশীদার। এটাকে ‘আর্য-অনার্য’ সংস্কৃতির মিলন বলে ঐতিহাসিকেরা আত্মতৃপ্তিও পান অনেক। তবে যেটাকে কৌলীন্য ও অস্পৃশ্যতা বলা হয়, ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্তও তার অমানবিকতা ছিল তীব্র। তারপরও যেটাকে যৌক্তিক বলে ধরা যেতে পারে, তা হল, ‘হিন্দু’ শব্দটা ধর্মীয় পরিচয়জ্ঞাপক হবার কথা নয়। কিন্তু তা যে কেবল হয়েছে, তাই নয়, হয়েছে প্রবলভাবে। এই ভ্রান্তিকে বিদূরিত করার কোন প্রয়াসও লক্ষ্যগোচর নয়।

পাশাপাশি একই রকম স্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভাবের প্রকাশ থেকে, বিশেষ করে, ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সামাজিক আধিপত্যের প্রতিক্রিয়ার যখন মুসলমানদের সংগঠিত হবার প্রশ্ন আসে, তাতে মুসলিম জাতিত্বের ব্যানারটাই লাগসই বলে বিবেচিত হয়। একসময় দিল্লির মসনদে, ইংরেজদের পূর্বে, জাতিত্ব যার যাই হোক, যারা আসীন ছিল, তাদের ধর্মীয় পরিচয় ছিল মুসলমান, সেটাই দেখা দেয় বড় হয়ে। প্যান-ইসলামিজমের একটা জোয়ারও আসে। মওলানা জামালুদ্দিন আফগানি আফগানিস্তান থেকে এটা নিয়ে আসেন। আফগানিস্তান থেকে অবশ্য অনেক কিছুই ভারতবর্ষে এসেছে। সুলতান মাহমুদ এসেছেন লুণ্ঠন করতে। তার বীরত্বে আমরা মুগ্ধ! মোহাম্মদ ঘোরী এসেছিলেন রাজ্য বিস্তার করতে। সেটাও গর্বের বিষয়! বাবরও তাই করেছেন। কেবল রাজ্য দখল করে ফিরে যান নি। দিল্লির সিংহাসনই ছিল তার জন্য যথোপযুক্ত। কেবল নাদির শাহই সমস্যা সৃষ্টি করেছিলেন। কেন না, তার দিল্লি লুণ্ঠনের সময় স¤্রাট ছিলেন এক জন মুসলমান। এখনকার তালেবানেরাও তো সেখানকার। দ্বিজাতি-তত্ত্বের মুসাবিদা করে জিন্নাহ সাহেব এই জাতিত্বকেই করেন পাকাপোক্ত। অনেকটা এভাবেই ভারতবর্ষের মুসলমানেরা নিজেরাও হয়ে যেতে চায় একটা জাতি।

কিন্তু এটা নিতান্তই অকরুণ সত্য যে, আর যাই হোক, ধর্ম দিয়ে জাতিত্ব নির্ণয় করা যায় না। এটি মানুষের একটি অবস্থানগত পরিচয়—যা তার ভৌগোলিক প্রভাবজাত দেহ গঠনের বৈশিষ্ট্যসূচক। সব মানুষের শরীরেই রক্ত আছে, কিন্তু তার রঙ লাল। এর কি কোন ব্যতিক্রম আছে? কিন্তু তার নাক কিংবা চুল কিংবা চোখ কিংবা দেহের এই রকম সব কিছু—সবই কি এক রকম? এই ভিন্নতাগুলোই তাকে দিয়েছে আলাদা জাতিত্ব। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে, শব্দের একটা আভিধানিক অর্থ আছে, যা দ্বারা অনেক কিছুই বোঝানো যায়। কিন্তু ব্যবহারের ভেতর দিয়ে তার একটি নির্দিষ্ট বোধগম্যতা তৈরী হয়। জাতিও এখন তাই। একই নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত জনগোষ্ঠীকে একটি জাতি বলা হয়। এখানে আর যেটা বলা দরকার, তা হল, মানুষের দেহ আর অঙ্গসংস্থান প্রকৃতিজাত—বায়োলজিক্যাল, বাদবাকী সবই আহরিত। তার ভাষাই বলি আর ধর্মই বলি, কোনটাই জন্মের ভেতর দিয়ে দেহগঠনের মত নিয়ে আসে নি। তার অনুকরণ প্রবৃত্তি দ্বারা কিংবা বুদ্ধি বিকাশের ফল হিসেবে কিংবা অনুভূতিজাত বিষয়রূপে অর্জিত হয়েছে। এগুলোকে আরোপিত বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সে এগুলি দিয়েই গড়ে তুলেছে পরিবার, সমাজ ও সভ্যতা। আর এটা তো দেখাই যাচ্ছে যে এ রকম একই জাতির ভেতরে যেমন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ আছে, তেমনই একই ধর্মের অনুসারী ভিন্ন ভিন্ন জাতিও রয়েছে। এই সঙ্গে এ কথাটাও মনে রাখা দরকার যে একই রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষেরাও এক জাতির না-ও হতে পারে, যদিও তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় এক।

১.১. যেভাবে কথাটা বলা যায়, তা হল, বর্তমান সময়ে যাদেরকে জাতি হিসেবে বাঙালী বলে অভিহিত করা হয়, প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাদের বাস। বাংলাদেশে যারা বসবাস করে রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা বাংলাদেশী। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা ভারতীয়। এ ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় যে সব বাঙালী থাকে, তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ও ভিন্ন। তবে এ কথা সত্য যে গঙ্গা অববাহিকার সমতল ভূখণ্ড, যা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত, সেখানেই বাঙালী জাতির সূচনা ও বিকাশ। তবে আজকের দিনে এই ভূখণ্ডকে যেমন করে চি‎িহ্নত করা হয়, বিশেষ করে বৃটিশ আমল থেকে, প্রাচীন কালে তেমনটি দেখা যায় নি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে বৃটিশ রাজত্বের ‘বেঙ্গল’—যার সাথে উড়িষ্যারও অংশ ছিল, তা তখন বিভক্ত ছিল নানা জনপদে। বঙ্গ ও বঙ্গাল নামের দুটো জনপদও ছিল তার অন্তর্ভুক্ত। খ্রিস্টপূর্ব যুগে রচিত বৈদিক গ্রন্থাদিতে উল্লেখও আছে তার। মৌর্যযুগ কিংবা গুপ্তযুগ কিংবা পালযুগ কিংবা সেনযুগে তার রাজনৈতিক সীমানাও বদলেছে নানাভাবে। বঙ্গ, কিংবা বাঙ্গাল নামের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ও ঘটে নি। তুর্কি বিজয়ের ভেতর দিয়ে এই ভূখণ্ডে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত ঘটে। অতঃপর চতুর্দশ শতকে এসে এক জন বহিরাগত মুলসমান শাসক  শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ দিল্লীর তুঘলক বংশীয় মুসলিম স¤্রাটের অধীনতা অস্বীকার করে নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন। আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে যে ভূখণ্ড, তার প্রায় সবটাই দখলে আসে। তাকে বলা হয়েছে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’। সুতরাং এটা অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙ্গালাহ কিংবা বাঙ্গালা শব্দের চলও শুরু হয় তখন থেকে। মুঘল আমলে এই ভূখণ্ডেরই প্রশাসনিক নামকরণ হয় সুবে-বাঙ্গালা। এর পর তো ইংরেজ আমলে এটা হয় বেঙ্গল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হবার পর যে অংশ পাকিস্তানের প্রদেশ হয়, তার নাম প্রথমে দেয়া হয়েছিল পূর্ববঙ্গ, পরে পূর্ব পাকিস্তান। আর ভারতের অংশ অভিহিত হয় পশ্চিমবঙ্গ নামে। আরও পরে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’—যাকে ‘বাংলাদেশ’ বলা হয়,—একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী, যারা নৃতাত্ত্বিক ও ভূখণ্ডগত সূত্রে বাঙালী ও ধর্ম সূত্রে মুসলমান, তাদেরকে নিয়েই এই অকিঞ্চিৎকর নিবন্ধটি রচনার উদ্যোগ।

১.২. বাংলাদেশের ব্যাপারটি তো গেল। এ বার বাঙালী কাদেরকে বলা হয়, তারও একটি কুল-ঠিকুজী তো দরকার। সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকেই এ দেশে জনবসতি ছিল, এ রকম একটি মত প্রচলিত আছে। একটি সমৃদ্ধ সভ্যতারও সৃষ্টি তাদের হাতে হয়েছিল বলে উক্ত হয়। আবার আদি অধিবাসী বলতে শবর, কোল, পুলিন্দ হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল প্রভৃতিদের কথা এসেছে। সামাজিক ভাবে নিগৃহীত এদের অস্তিত্ব এখনও অলক্ষ্যগোচর নয়। তবে নৃগোষ্ঠী হিসেবে এদের পরিচয় কি, তা উদ্ধারের কোন প্রচেষ্টা হয়েছে বলে মনে হয় না। কারও মতে সাধারণ ভাবে বাঙালীরা নেগ্রিটো, আদি-অষ্ট্রেলীয় ও মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর মিশ্রণ। এ ছাড়া, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, অ্যালপাইন, নর্ডিক প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর কথাও বলা হয়েছে। হয়ত এ সব মতামত ঠিকই আছে। কিন্তু এগুলো পেপার ওয়ার্ক না ল্যাবরোটারীজাত, সে সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়া যায় কি? কথাটা বলছি এ জন্যই যে, বিষয়টা শারীরবিদ্যার। যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সম্পর্কে যথোচিত জ্ঞানার্জন সম্ভব, সে ধরনের উদ্যোগের যথেষ্ট অভাব আছে বলেই মনে হয়। জীন-ডি.এন.এ. — বা এতৎ-সম্পর্কিত নানা উপাদানের পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আছে কি? সুতরাং বাঙালী মিশ্র নৃ-গোষ্ঠী, আপাতত এটুকুই বলেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

আবার আদি অধিবাসী যারাই থাক, নিয়মিতভাবে মাইগ্রেশনের কাজটাও থেমে থাকে নি। আমরা যাদেরকে ‘আর্য’ বলি, তারাও যে একই নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যৌক্তিকভাবেই তা মনে করার কোন কারণ আছে বলে বোধ হয় না। না হলে এত নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের আগমন এখানে ঘটে কি করে? আর তাদের আসার কারণটাও, বোধ করি, একই ভাবেই নির্দেশ করা যেতে পারে। এ কথা তো ঠিক যে যাযাবর আর্যরা ভারতবর্ষে এসে পরিণত হয় কৃষিজীবীতে। কেন না, তত দিনে কৃষিজাত দ্রব্যই জীবনধারণের প্রধান সামগ্রীতে রূপ নিয়েছে। কৃষিকাজের শর্তই হল নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করা। জমি চাষ, বীজ বোনা, ফসল কাটা—এগুলো করতে গেলে তো ঘুরে বেড়ানো চলে না। আর এটাও স্মরণ করা দরকার যে  স্থায়ীভাবে বসবাসের সূত্রেই সে ব্যবস্থা করেছে ব্যক্তিগত সম্পত্তির। সামাজিক জীবন ও তার শ্রেণী বৈষম্যও গড়ে উঠেছে এ ভাবে। আর একটা যেটা কথা, তা হল, ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উর্বরা জমির। আর কে না জানে, গঙ্গা অববাহিকার নদীমাতৃক সমতল ভূমির এই অঞ্চলটি সবার সেরা। এ কারণেই, সম্ভবত, ব্রাত্য কিংবা পতিত হবার অপবাদ স্বীকার করেও বহিরাগতরা ঘাঁটি গেড়েছে। তবে ইউরোপীয়ানদের মত রেড ইণ্ডিয়ান উৎখাতের অমানবিক ব্যাপার এ দেশের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে কতটা ঘটেছে, সেটা জানার অবশ্য কোন উপায় নেই।

বৈদিক ভাষ্য অনুযায়ী সাধারণ ভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদেরকেই ব্রাত্য কিংবা পতিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি। বঙ্গ-বাঙ্গাল কিংবা রাঢ়-সমতট-পাট্টিকেরা—এসব জনপদের লোকেরাও তো তা থেকে বাদ যায় না। এটা ছিল এ অঞ্চলে আর্য বসতি হবার পূর্বাবস্থা। আর্যবসতি শুরু হবার পর, নানা নৃ-গোষ্ঠীর যারা বহিরাগত, তারা প্রধানত ভূমির কারণেই ছিল কৃষিজীবী। কেন না, ইতিহাস এটা প্রমাণ করে যে, বাইরে থেকে এসে রাজ্য সংস্থাপন একাদশ শতাব্দীতে সেনদের আগে কেউ করে নি। কাজেই, কালে কালে যে মিশ্রিত জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, তাদের মৌলিক মূলধন ছিল শ্রম। আর এখন পর্যন্ত উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে যে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাস, তাতে শ্রমজীবীদের মর্যাদা নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে সর্বনি¤েœ। সুতরাং, বোঝাই যায় আর্য সংস্কৃতির মাপকাঠিতে এ অঞ্চলের মানুষের সে অর্থে কোন কৌলীন্য ছিল না। জাতিত্বের বিষয়টিও স্পষ্ট ওঠে নি তেমন করে।

চর্যাপদে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ভুসুকু-পাদের এ রকম একটি পদ আছে, ‘আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভৈলী’। এই উক্তি গৌরবের না সামাজিক বাস্তবতার নিদর্শন, তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। চর্যাপদের পদগুলির রচনাকাল নিয়ে সমস্যা আছে। শহীদুল্লাহ সাহেবের যে মতটাকে আমরা গ্রহণ করেছি, তাতে খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দীর মধ্য ভাগ থেকে তার শুরু। সময়কালের হিসেবে তখন পাল রাজাদের শাসন। সন্দেহ নেই, তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তবে সে সময় এ দেশে বৌদ্ধ ধর্মের স্বর্ণযুগ যে শেষ হয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে বোধ করি খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। প্রাচীন যুগে উত্তর ভারতের শেষ পরাক্রান্ত স¤্রাট হর্ষবর্ধনের সময়েও বৌদ্ধদের একটা অনুকূল পরিবেশ ছিল। কিন্তু তার পূর্ববর্তী গুপ্ত স¤্রাটদের আমলে বৈদিক অনুশাসনের যে পুনরুত্থান ঘটে, তাতে বিপর্যয় নেমে আসে বৌদ্ধদের ওপর। হর্ষবর্ধনের সময়কার রাজ-অনুকূল্যও তাকে রোধ করতে পারে নাই। হীনযান মহাযানদের তাত্ত্বিক বিভাজন তো একটি পরিচিত ঘটনা। এর বাইরেও নানা পথ ও মতে বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা। তাদের ভেতর তৈরীও হয় একাধিক প্রকাশ্য ও গুপ্ত সম্প্রদায়ের। আর্য সমাজের নি¤œবর্ণের লোকেরা যারা সামাজিক সুবিধা পাবার জন্য বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল, তাদের পুনরায় স্ববর্ণে ফিরে আসার প্রক্রিয়াও দেখা যায়। হর্ষবর্ধনের শাসনকাল যে এ অবস্থা ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিল, পরবর্তী বাস্তবতা সেটা প্রমাণ করে না। চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা ছিলেন বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের লোক। আজকালকার আউল-বাউলদের মত বৃহত্তর জনজীবনের মূলধারার সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা না থাকারই কথা। চর্যাপদেও তাদের বসবাস  কিংবা সাধনসঙ্গিনীদের যে পরিচয় পাওয়া যায়, সে সবও তাই প্রমাণ করে। তবে যেটা তাদের পরিচর্যার ভেতর দিয়ে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়, তা হল, তাদের মুখের ভাষার ব্যবহার। সে সময় একেক অঞ্চলের মুখের ভাষা একেক রকম ছিল। সে সময়ের এই অঞ্চল ভিত্তিক ভাষাগুলোই পরে ওড়িয়া, অসমীয়া, মৈথিলী—এই সব হয়েছে। বাংলা ভাষার ব্যাপারটিও তাই। জীবনযাপনের সংস্কৃতি তো প্রকৃতি-পরিবেশ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ধরন ও উপাদান নির্ভর। সুতরাং জীবন ধারণের গতিধারা এ সব অঞ্চলে প্রায় এক রকম হলেও ভাষার স্বতন্ত্র রূপই তাদের জাতিত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। ওড়িয়া ভাষার লোকেরা ওড়িয়া, অসমীয়া ভাষার লোকেরা অসমীয়া। আর বাংলা ভাষার লোকেরা বাঙালী। এই, আমাদের আজকের বানানে লেখা বাঙালী শব্দটাই ভুসুকু-পাদের ‘বাঙ্গালী’। প্রথম ব্যবহার ঘটেছে তারই দ্বারা। আবার বাংলা ভাষা চর্চার ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে বাঙালী জাতি। ভিন্ন ভিন্ন

নৃ-গোষ্ঠীর সংমিশ্রণ যেমন ঘটেছে সমান তালে, কিন্তু তার আবর্তন হয়েছে বাংলা ভাষাকে ঘিরে। এটা ঠিক যে, চর্যাপদের পর দীঘদিন ভাষাচর্চার তেমন নিদর্শন আমাদের হাতে নেই। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে পাওয়া বড়– চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে’ যে ভাষারীতি, তা যে পরিচর্যার ফল নয়, এটা অস্বীকার করারও কিছু নেই। কিংবা ঐ সময়েরই শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ তারও ভাষা এত পরিণত হয় কি করে? তার পরের ইতিহাসও ঐ ভাষা কেন্দ্রিক। কি হিন্দু কি মুসলমান— তলোয়ার ঘোরানোর সেপাই তেমন পাওয়া না গেলেও, কলম-সৈনিকের কোন ঘাটতি পড়ে নি। একবারে পাকিস্তান আমলে এসেও যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত ভিত্তি হয়ে দাঁড়াল, তারও শক্তি ঐ বাংলাভাষা। কাজেই নৃ-গোষ্ঠীগত উপাদান যেখানে যেমনই থাক, বংশানুক্রমিক—ঐতিহ্য সূত্রে বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরাই আজ বাঙালী। তারা বাংলাদেশে বসবাসরত হোক, কিংবা পশ্চিমবঙ্গে, কিংবা ইউরোপ—আমেরিকা, কিংবা পৃথিবীর যেখানকারই হোক। রাষ্ট্রীয় জাতীয়তা এই জাতিত্বের জন্য কোন হিসেবের বিষয় নয়।

১.৩. পূর্বেই বলেছি, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা একই জাতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ কথার জন্য অন্য অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু প্রাসঙ্গিকভাবে বাঙালীরাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানেরা যেমন আছে, মুসলমানেরাও আছে তেমন করে। আর কেবল আছে নয়, বাঙালী জনগোষ্ঠীতে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাজেই যেটা দেখার বিষয়, তা হল, ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কোন প্রশ্ন অথবা সংশয় নয়, তার আচার-আচরণের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাঙালীত্বের স্বরূপকে তারা কতটুকু ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।

সপ্তম শতাব্দীতে আরব দেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন ঘটে। বহিরাগত মুসলমানেরাই এই নতুন ধর্মকে বহন করে নিয়ে আসে ভারতবর্ষে। সূফী-আউলিয়া-দরবেশেরা যেমন এটা করেছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার ব্যাপারটিও একই সঙ্গে প্রবল ভাবে কাজ করেছে অনুঘটকের। এখন প্রশ্ন হল, কারা ছিলেন এই সূফী-আউলিয়া-দরবেশ?  তারা কি একই জাতির কিংবা একই দেশের? কিংবা স¤্রাট-সুলতান-নবাব—যারা রাজ্যশাসন করেছেন, তাদের সম্পর্কেও জিজ্ঞাস্য একই। বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের প্রচলন হয়েছে তুলনামূলকভাবে পরে। তারও আগে, আজকের দিনে, দেশগুলিকে আমরা যে ভাবে জানি, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্থান কিংবা মধ্য এশিয়ায় এবং আফ্রিকা ও স্পেনেও বিস্তৃতি ঘটেছে তার। বহিরাগত যারা—তাদের মধ্যে আর কজন ছিল খোদ আরব ভূখণ্ডের লোক? সবই তো প্রায় ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান কিংবা মধ্য এশিয়ার।

মুহম্মদ বিন কাসিমই প্রথম মুসলিম সেনাপতি যিনি অষ্টম শতাব্দীতে ভারত ভূখণ্ডের সিন্ধু দেশে পরিচালনা করেছিলেন বিজয় অভিযানের। তিনি ছিলেন ইরাকের শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জামাতা। তবে এই বিজয়ের ফলাফল যে সিন্ধু দেশের সীমা অতিক্রম করেনি এ নিয়ে, বোধ করি তর্ক-বিতর্কের কিছু নেই। একাদশ শতাব্দীতে আফগানিস্থানের গজনীর শাসক সুলতান মাহমুদ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তবে এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষে স্থায়ী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা নয়, লুণ্ঠন। এখানকার ধনরতœাদি নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে তাকে সাজানো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ঐ আফগানিস্থানেরই ঘোর রাজ্যের অধিপতি মোহাম্মদ ঘোরীই প্রথম ভারতবর্ষে তার অধিকৃত অঞ্চলসমূহ শাসনের জন্য নিযুক্ত করেন প্রতিনিধি। দিল্লিতে তার ক্রীতদাস কুতুবউদ্দিন আইবেকও ছিলেন এ রকম একজন। মুহম্মদ ঘোরীর মৃত্যু (১২০৬)-র পর তিনি যে স্বাধীন শাসনকার্যের সূচনা ঘটান, সেটাই ছিল মুসলিম আধিপত্যের মাইল স্টোন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের নাম ইতিহাসে আখ্যাত হয়েছে দাসবংশ নামে। ধরে নেয়া যায়, এই নামকরণের কৃতিত্ব ইংরেজ ঐতিহাসিকদেরই! এর পর বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর পূর্ব পর্যন্ত ক্রমাগত দিল্লিতে যে মুসলিম রাজবংশগুলি রাজত্ব করে সেগুলি হল, খিলজী বংশ, তুঘলোক বংশ, লোদী বংশ ও মুঘল বংশ। ১২০৬ সাল থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই শাসনের ধারা অব্যাহত ছিল।

এরই পাশাপাশি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ভূখণ্ডে মুসলিম আধিপত্যের যে রাজনৈতিক ধারা লক্ষ্য করা যায়, তা হল, ইলিয়াস শাহী বংশ, হোসেন শাহী বংশ, মুঘল সুবাদারদের আমল ও নবাবী আমল। এগুলিও অব্যাহত ছিল একেবারে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিমের পরাজয় পর্যন্ত।

যৌক্তিক কারণেই মনে করা যেতে পারে যে মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম আধিপত্যের এই কালটাই ছিল বহিরাগত মুসলমান, তারা জাতিগতভাবে যে জনগোষ্ঠীরই অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন, তাদের ভারতবর্ষে আগমনের অনুকূল সময়। এটা ব্যবসা—বাণিজ্যের জন্য যতটা না হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি হয়েছিল সামরিক কারণে। কেন না, আগের দিনে যখনই নতুন দেশ দখল করার প্রয়োজন পড়ত কিংবা অভিযান পরিচালনা করার ব্যাপার আসত, তখন সৈন্যবাহিনী সম্প্রসারণের তাগিদটা দেখা দিত বেশী করে। অভিযান পরিচালনা কালে, সৈন্যবাহিনীর অগ্রগমনের পথে উচ্চাভিলাষী ভাগ্যান্বেষী লোকজনও এসে জুটত। এর অর্থও ছিল একটাই,— নতুন দেশ দখল করা মানেই লুণ্ঠনের অবারিত সুযোগ। সম্পদশালী হবার উপায়। কাজেই, এ রকম বহিরাগত যারা এসেছে, তারা সবাই যে রাজা-রাজরা কিংবা সেখানকার সমাজের অভিজাত মানুষ, তা তো নয়। বরং উল্টোটাই বেশি সত্য। অথচ এ দেশে এসে তারাই হয়ে গেছে আশরাফ শ্রেণীভুক্ত। ধর্মকে তারাই বহন করে এনেছে, অতএব তারাই উচ্চশ্রেণীর—এই রকম মানসিকতা কাজ করেছে ধর্মান্তরিতদের মনে। বিশেষ করে ধর্মান্তরিত বাঙালী জনগোষ্ঠী ও তাদের বংশধরদের বেলাতে এই হীনমন্যতাবোধের পরিচয় খুব কি অসত্য?

২. আরেকটি বিষয় বিবেচনা করাটাও আবশ্যক বলে বোধ করছি। তা হল, ধর্ম বিশ্বাসের মৌলিক উপাদান কখনও বদলায় না। কিন্তু পালনগত বিভিন্নতা কাল প্রবাহের ধারায় পরিবর্তিত হতে থাকে। কেন না, মানুষের জীবনধারণ বস্তুনির্ভর। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে খেতে হয়। অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা হবার জন্য পরিচ্ছদের প্রয়োজন পড়ে। নিরাপত্তার জন্য বাসস্থান গড়ে তুলতে হয়। জীবন যাপনকে ঝামেলামুক্ত করার জন্য এই রকম আরও আরও অনেক কিছুই অত্যাবশ্যকীয় হতে থাকে। অর্থাৎ পালটে যায় উৎপাদনের ধরন। এ সবের সাথে তার জীবন দর্শনেও আসে পরিবর্তন। ধর্মের আচরণগত বিষয়গুলিকেও করে তুলতে হয় যুগোপযোগী। তখনই প্রয়োজন পড়ে ধর্মব্যাখ্যার। এ কারণে সৃষ্টি হতে থাকে নানা মতের। গড় ভাবে বলতে গেলে বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে—হীনযান ও মহাযান মতে। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টানদের ভাগাভাগি রয়েছে খ্রিস্টান ধর্মে। এর বাইরেও আরও নানা ভাগ আছে ও দুটো ধর্মে। হিন্দুদের কথা আর কি বলব? বৌদ্ধ ও খ্রীস্টানদের যেমন নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ আছে, তাদের তো তেমন কিছু নাই। একেক জায়গায় তো পূজাই পেয়ে আসছেন একেক দেবদেবী। আছেন গৃহদেবতারাও ঘরে ঘরে। ইসলাম ধর্মের বেলাতেও প্রায় একই রকম পরিদৃষ্ট হয়। শিয়া ও সুন্নীদের বিভাজন চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। ইরানিদের সাথে জাতিগত পৃথকতাও যে এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেনি, নিশ্চয় করে তা বলা যায় না। অতীতের বিষয়টি বিবেচনাতে যদি নাও আনি, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানিদের সাথে আরবিয়দের যে রাজনৈতিক বিরোধ, তাও এই ধর্মীয় তত্ত্বগত ব্যাখ্যারই ফলাফল। সুন্নী সাদ্দাম প্রশাসনের সাথে গত শতাব্দীর আশীর দশকে ইরানের যে যুদ্ধ, তারও ধর্মীয় ভাগটা এ ভাবেই করা যায়। বর্তমান সময়ের আইএস কিংবা বোকা হারাম—এরাও শিয়া উচ্ছেদেরই পক্ষে। পাকিস্তানেও প্রায় প্রায়ই শিয়াদের মসজিদে বোমা ফুটানোসহ নানা রকম হামলা চলছে। সউদী আরবে ও ইয়েমেনেও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে একই ঘটনা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে তাজিয়ার মিছিল প্রস্তুতিকালে ঘটেছে আক্রমণ। বগুড়াতে আক্রান্ত হয়েছে শিয়া মসজিদ। একই ধর্ম সম্প্রদায়ের হওয়া সত্ত্বেও শিয়া ও সুন্নীদের এই সহিং¯্রতা বিস্তৃত হয়ে চলেছে সারা পৃথিবীময়। আবার মজহাবের কথাটি তো আমরা সবাই জানি। হানাফী, সাফী, মালেকী ও হাম্বলী—এই নামকরণ হয়েছে চার ইমামের নামে। নানা সময়ে তারা ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যে নতুন তত্ত্ব নিয়ে এসেছেন, সেই তত্ত্বের অনুসারীরাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে এ সব নামে। যেটাকে সূফীতত্ত্ব বলা হয়, তারও একটি বেগবান ধারারও ঘটেছে বিকাশ। এ ছাড়া, ওহাবী আন্দোলনের প্রভাবে ভারতবর্ষে যে ধর্মীয় সংস্কার শুরু হয়, তার ফলে আহলে হাদীস কিংবা মোহাম্মদী নামে সৃষ্টি হয় একটি নতুন সম্প্রদায়ের। যেহেতু এরা চার মজহাবের মধ্যে নেই, এ কারণে তাদেরকে অনেকে লা মজহাবও বলে থাকেন। ধর্মের আদি রূপে ফিরে যাওয়ার বাসনা থেকে এ সব উদ্যোগ নেয়া হলেও, তা ঐক্য স্থাপনের পরিবর্তে বাস্তবতঃ জন্ম দিয়েছে নতুন ভাগের।

২.১. বাঙালী মুসলমানদের জীবনে এই ব্যাপারগুলো কীভাবে প্রযুক্ত হয়েছে, তা এক বার জরিপ করে দেখা যেতে পারে। প্রথমত যেটা বলে নেয়া ভাল, তা হল, ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে ব্যাপক ভাবে ইসলামের প্রচলন ভারতের পূর্বাঞ্চলের এই জনগোষ্ঠীর জীবনে হয়নি—যার প্রবর্তন হয়েছিল প্রথম—আগেই বলেছি সপ্তম শতাব্দীতে। ডিফারেন্সটা প্রায় ছয়শত বছর। ওহাবী আন্দোলন ছাড়া তাত্ত্বিক বিভক্তির ঘটনাগুলো এর মধ্যে, বলা যায়, সম্পন্ন হয়েছে। কাজেই, ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য যারা এসেছিলেন, তারা এই বিভক্তিগুলো নিয়েই এসেছিলেন। যারা রাজা-বাদশাহ-স¤্রাট-সুলতান-নবাব ছিলেন, তারাও ছিলেন এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত। শিয়াই বলি আর সুন্নীই বলি, বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে যেখানে যে কালচার গড়ে উঠেছে, তা-ও এদেরই প্রভাবে কারণে। যেমন ঢাকাতে। ঢাকা ছিল মুঘল সুবাদারদের রাজধানী। এর পূর্বে রাজা শশাঙ্কের সময় থেকেই উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলই ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভূমি। সেন রাজাদের সময়ই প্রথম পূর্ব বাংলায় তার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী পুনরায় তার রাজধানী স্থাপন করেন লখনৌতিতে। জায়গাটা বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়। এর পর পরবর্তী মুসলমান সুলতানদেরও অধিষ্ঠানও অত্র অঞ্চলেই থেকে যায়। মুঘল বিজয়াভিযান শুরু হবার পর সুবাদার ইসলাম খান নদীমাতৃক দেশে নিরাপত্তার কথাটি বিবেচনা করে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী ঢাকাতে রাজধানী নিয়ে আসেন। পরে অবশ্যি নবাবদের সময়ে এই রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করা হয়। যতটুকু জানা যায়, বাবর যখন আফগানিস্থানের শাসক ছিলেন, তখন থেকেই পারস্য স¤্রাটের সাথে সম্পর্কের সূত্রে শিয়া মতবাদের প্রভাব তাদের ওপর বর্তাতে থাকে। ভারতবর্ষে আসার পর বাবর পুত্র হুমায়ুন শের শাহ কর্তৃক দিল্লির সিংহাসন থেকে উৎখাত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন ঐ পারস্যেরই রাজ দরবারে। পরে তো পারস্য-স¤্রাটেরই সহযোগিতায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হন। হয়ত এ সমস্ত কারণেই মুঘল রাজত্ব কালে শিয়াদের সংখ্যাধিক্য ঘটতে থাকে। ঢাকাতেও এ ভাবেই শিয়া মতের প্রসার ঘটে।

নবাবদের বেলাতেও একই অভিমত পোষণ করা যেতে পারে। মুর্শিদকুলী খাঁ— যেটা তার উপাধি, তিনি দরিদ্র ব্রা‏হ্মণ সন্তান হলেও বাল্যকালে যিনি তাকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন, তিনি শিয়া অধ্যুষিত পারস্য থেকে এ দেশে আসেন। পরবর্তী নবাব সুজাউদ্দিন তো ছিলেন মুরশিদ কুলী খাঁর জামাতা। তার পরবর্তী নবাব আলীবর্দী খানও ছিলেন শিয়া মুসলমান। আর নবাব সিরাজউদ্দোলা তো ছিলেন তার দৌহিত্র। আবার বাস্তবতঃ এই নবাবেরা কার্যত স্বাধীন হলেও তারা কাগজে কলমে ছিলেন মুঘল স¤্রাটদেরই প্রতিনিধি। এ থেকে মনে করা যেতে পারে, বাংলার তৎকালীন রাজনীতিতে শিয়া মতাবলম্বীদের প্রাধান্যই ছিল বেশি।

তবে এ কথা ঠিক যে, সাধারণ ভাবে বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে সুন্নী মতাবলম্বীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা হানাফী মতের। উমাইয়া খলীফাদের সময় ইমাম আবু হানিফা (রা.) এই মত প্রচার করেন। এ কারণে অবশ্য তাকে নানা নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কারারুদ্ধ হয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এই মতের বাঙালী মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণ, বোধ করি, এটা হতে পারে যে, তখন মুসলমান হবার যে গড় ব্যাপার দাঁড়িয়েছিল, সেখানে হানাফীপন্থী ইসলাম ধর্ম প্রচারকদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। ধর্মান্তরিত করার দায়িত্বটা পালন করতেন তারাই। এই প্রচারকেরা কোন রাজকার্যের সাথে জড়িত ছিলেন না। আমরা যাদেরকে পীর-ফকির-আউলিয়া—দরবেশ বলে থাকি, তারাও হতে পারেন। কারণ তাদের অবস্থান ছিল জনজীবনের সামীপ্যে। আর গ্রাম-বাংলার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যারা ছিল সামাজিক ভাবে নিগৃহীত—হিন্দু সমাজের বর্ণকাঠামোতে যাদের স্থান ছিল নীচে, তাদের ধর্মান্তরিত হবার সুযোগ এনে দিয়েছিল মানুষ হিসেবে সমতা লাভ করার। ইসলামের সাম্যের বাণী তাদেরকে আকৃষ্ট করেছিল দারুণ ভাবে। কেন না, আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলে, যখনই কোন সামাজিক পরিবর্তনের ব্যাপার আসে, সামাজিক সুবিধা ভোগীরা তা গ্রহণ  করতে ভয় পায়, পাছে তাদের কায়েমী স্বার্থবাদের অবসান ঘটে। কিন্তু যারা অধিকার বঞ্চিত, তারা, হারাবার কিছু নেই বলে, এগিয়ে আসে। তৎকালীন বর্ণবাদী হিন্দু সমাজের বেলাতে এটাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত, সন্দেহ নেই।

বৃটিশ আমলে এসে আরেকটি ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা হয়। সেটি ওহাবী আন্দোলন। বিশেষ করে, বাংলাদেশে তা ছিল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনও বটে। হাজী শরীয়তউল্লাহ্ ও তৎপুত্র দুদু মিয়া ছিলেন তার সংগঠক। জমিদার, যারা হিন্দু, তাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবার বিষয়টিও যুক্ত ছিল তার সাথে। সমস্যাটি ছিল অত্যাচারী বনাম অত্যাচারিতের। কিন্তু অধিকাংশ জমিদার যেহেতু ছিল হিন্দু আর আর অধিকাংশ কৃষক ছিল মুসলমান, এ কারণে বিষয় থেকে বিষয়ীতে দৃষ্টি হয় স্থিত। তার ফলে ধর্মীয় ভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা দেয়াটা হয়ে পড়ে সহজ। এক জন মুসলমান জমিদারও যে হিন্দু জমিদারের চেয়ে কম নিপীড়ক নয়, তা তো মীর মশাররফ হোসেনই প্রমাণ করেছেন জমিদার দর্পণ লিখে। আর জমিদারেরা যে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নিজেদেরকে জমিদার হিসেবেই দেখে, তার নমুনা তো পাওয়া গিয়েছিল, আরও পরবর্তী কালে, এই আন্দোলনের প্রায় একশ বছর পর, ফজলুল হক যখন মুখ্যমন্ত্রী, যখন আসেম্বিলীতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের বিল আনা হয়েছিল। ওহাবী আন্দোলন ছিল সশস্ত্র। তিতুমীরের বিদ্রোহও এর বাইরে নয়। এর ভেতর দিয়ে আমার মনে হয়, প্রথম মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী চেহারার প্রকাশ ঘটে। এ রকম ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম আগেও হয়েছে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও ফকির বিদ্রোহের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেখানে ইংরেজ বিরোধিতার প্রশ্নে একটা ঐক্যমত ছিল। ওহাবী আন্দোলনের পরবর্তী সারা ভারতবর্ষব্যাপী সিপাহী বিদ্রোহ তো  ছিল হিন্দু- মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম। আলীগড়ের সৈয়দ আহমদ খানও সিপাহী বিদ্রোহের পরে হিন্দু বিরোধিতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসে সারা ভারতের মুসলমানদের ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানান। এগুলি তো গেল ওহাবী আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক। তবে এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে চার মজহাবের বাইরে নতুন একটি সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়, যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত।

অন্য দিকে বাঙালী মুসলমানদের ভেতর পীরবাদ ও মাজার সংস্কৃতির একটি বড় প্রভাব গড়ে উঠেছে। একেক পীরের শিষ্যরা যেমন একেক ভাগে সংগঠিত হয়ে রয়েছে, তেমনই মাজারকে কেন্দ্র করেও ভক্তবৃন্দরা তাদের আলাদা আলাদা স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করে চলেছে। এ ছাড়া, নানা রকম লোকধর্ম প্রভাবিত গোষ্ঠীও রয়েছে, যারা ইসলাম ধর্ম অনুসারী বলে প্রতীয়মান।

২.২. আরেকটি বিষয় হল, আল্লাহ, রাসুল্লাহ (সা.), কোরান শরীফ—এগুলো তো ইসলামের মৌলিক ভিত্তি। আধ্যাত্মিকতার সাথে যুক্ত। কিন্তু ব্যাখ্যার বিভিন্নতার কারণে ধর্ম পালনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য পরিদৃষ্টমান। যেমন ফরজ ছাড়া সুন্নত নামাজ পড়ার ব্যাপার কিংবা তারাবীর নামাজ কয় রাকাত, কিংবা হাত কোথায় বাঁধতে হবে? কয় তকবীর দেয়া হবে? জুম্মার নামাজ শেষে মোনাজাত করা হবে কি না? মিলাদ পড়া যায় কি না?—এই রকম আর কি? ভিন্ন ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষদের জন্য আলাদা মসজিদের ব্যবস্থা তো রয়েছেই। এক সময় তো আহলে হাদিস পরিবারের ছেলে হানাফী পরিবারের শ্বশুর বাড়ীতে খেলে কি কাফফারা দিতে হবে, তারও বিধান দেয়া ছিল। তবে এটা মনে করা অসঙ্গত ছিল না যে, শিক্ষার বিস্তার ও আলোকপ্রাপ্ত সমাজে গড়ে ওঠার সাথে উদার দৃষ্টিভঙ্গির সম্প্রসারণ ঘটবে। যার ফলে এই বিভিন্নতা সীমাবদ্ধ থাকবে ধর্ম পালনের মধ্যে। কিন্তু প্রত্যেকরই স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের ব্যাপারটা যে ভাবে উৎকট হয়ে উঠছে, তাতে পরিণাম বিষময় হওয়াটা বিচিত্র কি?

২.৩. এরই পাশাপাশি বস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তন কি ঘটেছিল, সেটিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার। আধ্যাত্মিক মুক্তি ছাড়াও সামাজিক ভাবে অবহেলিত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির ব্যাপারটিও জড়িত ছিল এই নতুন ধর্ম প্রবর্তনের ভেতর দিয়ে। একটি অনুর্বর মরুভূমির দেশের মানুষদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল, তাও সহজেই অনুমেয়। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলেই তাদের জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। বিলাসব্যসনেরও কমতি ছিল না। হজরত ওমর (রা.) এর কালে বিশেষ করে, আরবিয় মুসলমানেরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলি নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে। বিজিত রাজ্যগুলি থেকে প্রচুর ধনসম্পদ অর্জন করা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের এই ভোগবাদের বিরুদ্ধে হজরত ওসমান (রা.) এর খেলাফতের সময়ে আবু-আল জার গিফারী এতটাই প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছিলেন যে তাকে পাঠানো হয়েছিল নির্বাসনে। এই ভোগবিলাসের ধারা উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলীফাদের সময়ে বাড়ে বৈ, কমে না। খলীফা হারুন-অর-রশীদের রাজধানী বাগদাদের প্রাচুর্যের কথা তো রূপান্তরিত হয়েছে মিথে। হেরেম প্রতিপালন করাটাও হয়ে রয়েছে ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত। এই সব চালচিত্র ধনী ও দরিদ্রের মাঝে যে বৈষম্য সৃষ্টি করে, তা মানবিকতাকেই করে তোলে প্রশ্নসংকুল।

এ ছাড়া, জাগতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোও আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার ধার খুব ধরেছে বলে মনে হয় না। বনি হাশেমী ও বনি উমাইয়া গোত্রের সম্পর্ক ইসলামের প্রথম থেকেই ছিল সমস্যাপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর পরলোকগমনের পর খলীফা নির্বাচনের বেলাতেও এসেছে জটিলতা। মোহাজের ও আনসার—কাদের দাবী বেশি, তাও চলে এসেছিল সামনে। খলীফা হিসেবে হজরত আবু বকর (রা.)-এর মত একজন বয়োবৃদ্ধ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এই সংকট মোচনে সবার সম্মতি পেয়েছিলেন। তার পরও নবীত্বের প্রশ্নেই যুদ্ধ হয়েছিল তালহা ও যোবায়েরের সাথে। হজরত ওমর (রা.)-কে তো খলীফা মনোনীত করেছিলেন হজরত আবু বকর (রা.)। কিন্তু তিনি ঘোষণা পত্র লিখিয়েছিলেন হজরত ওসমান (রা.)-এর দ্বারা, যিনি ছিলেন উমাইয়া গোত্রের। দ্বন্ধ ছিল তৃতীয় খলীফা নির্বাচনেও। হজরত ওসমান (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-এ মধ্যে। দুজনেই ছিলেন মহানবী (সা.)-এর জামাতা। হজরত আলীর সঙ্গে হজরত আয়েশার যে যুদ্ধ, তাতে প্রাণহানি হয়েছিল দশ হাজার মানুষের। তখনকার দিনের জনসংখ্যার তুলনায় এটাকে বেশি বলে মনে হয় না কি? এর পরের ঘটনা তো আরও চমকপ্রদ। মাবিয়া খলীফা হয়ে শুধু যে রাজধানী সিরিয়াতে নিয়ে গেলেন, তাই নয়, খেলাফতকেও করে ফেললেন একবারে বংশানুক্রমিক। হজরত আলী (রা.)-ও অবশ্য রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন কুফাতে। উমাইয়া খেলাফত উচ্ছেদের পর প্রথম আব্বাসীয় খলীফা যে নির্মমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তাতে তার নাম হয়েছে, আল সাফফা—যার বাংলা অর্থ রক্তপিপাসু। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, আব্বাসীয় খেলাফতের অন্তিম দশার সময়, বাংলা দেশে বহিরাগত মুসলমানদের আধিপত্য শুরু হয়। তত দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নানা মুসলিম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাও ঘটে। আবার এটা করতে গিয়ে যত যুদ্ধ, খুন-জখম, হানাহানি ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটে, তাতে ধর্মের পবিত্রতা কিছু যে থাকে নি, সেটা নিয়ে কি কোন প্রশ্ন করা যায়? ক্ষমতার একটা নিজস্ব ভাষা আছে, ধর্মকে সামনে রেখে সেটাকে জাস্টিফাই করা যায় কি?

তবে এটাও, বোধ করি, ঠিক যে. ধর্মের তাত্ত্বিক বিভাজন যেমনই হোক, তার অনুসারীদের বস্তুগত ও রাজনৈতিক কালচার যেমনই হোক, ইসলাম যে সাম্যের বাণী নিয়ে এসেছিল. সামাজিক সমতার যে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল, তা এ দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অধঃপতিত মানুষের কাছে বিবেচিত হয়েছিল মুক্তি সনদ বলেই।

২.৪. এতক্ষণ বাঙালীত্ব ও মুসলমানত্ব নিয়ে কথা বলেছি। আসলে, এ সব কথা বলার উদ্দেশ্য হল, এই বিষয়গুলি সামনে নিয়ে আসা। এ নিয়ে, যারা যথার্থ পণ্ডিত, তারা আমাদেরকে জানার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণতা দিতে আগ্রহী হবেন, এ আশা করাটা নিশ্চয়ই অন্যায় নয়।

৩. এবার মনে হয়, বাঙালীত্ব ও মুসলমানত্বের সমীকরণ কি ভাবে হয়েছে, তা বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। এ কথা ঠিক যে, প্রত্যেক জনগোষ্ঠীরই একটা নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। যেটাকে লৌকিক কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতি রূপে আখ্যায়িত করা চলে। ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বে এই লৌকিক কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতি বাঙালীদেরও ছিল। এটার একটা যেমন ধর্মীয় সংস্কৃতি,—পূজা-অর্চনা—পালা-পার্বণ—এমত সব কিছু। আবার ধর্মীয় সংস্কৃতির বাইরে অনেক জিনিস রয়েছে, যেগুলি ব্যবহারিক সংস্কৃতি—যা জীবন যাপনের সাথে যুক্ত। যেমন, ঘরবাড়ী, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যবস্তু, ভাষা ইত্যাদি। নতুন ধর্ম গ্রহণের সাথে পূর্বতন ধর্মীয় সংস্কৃতি পরিত্যাগ করাটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্যান্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও কি তাই? কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এখানেই। হিন্দুদের যা কিছু তা মুসলমানদের নয়, এটাও যেন হয়ে পড়ে ধর্ম বিশ্বাসেরই অঙ্গীভূত। কোরাণ শরীফের ভাষা আরবি। এই আরবি ভাষাকে পরিগণনা করা হতে থাকে ধর্মীয় ভাষা রূপে। তবে যেটা ভেবে দেখার বিষয়, তা হল, আরবি ভাষা ইসলাম পূর্ব কাল থেকেই আরব দেশে প্রচলিত ছিল। তখনকার মানুষদের পূজা-অর্চনাও হত সে ভাষায়। ইমরুল কায়েসের মত কবির কাব্যভাষাও সেটা। একটি সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে তখন থেকেই তার খ্যাতি। কোরান শরীফ নাজিল হয়েছে ঐ ভাষাতেই। মুসলমান হিসেবে এ ভাষার গুরুত্বও অপরিসীম। কিন্তু আরবি ভাষায় তো কেবল আরব দেশের মুসলমানেরাই কথা বলে না। অমুসলিম যারা, তখনও ছিল এবং এখনও আছে, তাদের ভাষাও তো আরবি।  সুতরাং এটাকে শুধু মুসলমানের ভাষা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কি? কাজেই আরবি ভাষাটা এখানে কোরান শরীফ প্রচারের মাধ্যম হিসেবেই কাজ করেছে। তবে এটা শুধু আরবি ভাষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মানুষেরা, বিশেষ করে পারসিকেরা এদেশে যখন এসেছে, তখন নিজেদের ভাষাই নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে। সে ভাষার নাম ফারসি। সমগ্র মধ্যযুগ জুড়ে ফারসিই ছিল রাজদরবারের ভাষা— সংস্কৃতির ভাষা। আরবির সঙ্গে ফারসি র এই ব্যবহারও অঙ্গীভূত হয়েছে ধর্মের সাথে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, খোদা, নামাজ—এগুলো তো সব ফারসি শব্দ। বছরের পর বছর তো বাঙালী মুসলমানেরা এ সব শব্দ ব্যবহার করে আসছে। ইদানীং অবশ্য পরিকল্পিত ভাবে খোদার বদলে আল্লাহ কিংবা নামাজের বদলে সালাত প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। দাঁড়াচ্ছে বিষয় হয়ে রাজনৈতিক বিভাজনেরও।

বাঙালীদের ভেতর ইসলাম প্রবর্তনের পর শুধু আরবি নয়, অন্যান্য জাতির বহিরাগত মুসলমানদের ভাষাও ইসলামিক বলে মনে করা হতে থাকে। এসব কি, উর্দু ভাষা—যার উৎপত্তিস্থল ভারতবর্ষ, সে ভাষাকেও ইসলামিক বিবেচনা করেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল। আর এটা যে শুধু তখনকার ব্যাপার, তাই নয়। এখনকারও অনেক বুদ্ধিজীবী চিন্তা করেন এভাবেই। আবার শুধু ভাষাই নয়, বহিরাগত অবাঙালী অমুসলিম অর্থাৎ পশ্চিম দিক থেকে যারাই এসেছে, তাদের সংস্কৃতিকেও ইসলামী বলে গণ্য করার সবক দেয়া হয়েছে। কালক্রমে তা তাদের বিশ্বাসেরও অঙ্গীভূত হয়ে পড়েছে। এর একটি, যেমন খাদ্যাভ্যাস। এখানে হালাল আর হারামের বিষয়টি তো ধর্মীয় অনুশাসনের বিধান। কিন্তু খেজুর কিংবা রুটি? এগুলোকেও তো সে ভাবেই দেখা হয়। পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাই, কাবাব ইত্যাদিও বাদ যাচ্ছে না। ইফতারের সময় খেজুর রাখাটাও প্রায় বাধ্যতামূলকই হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক কারণেই খাদ্য দ্রব্যের উৎপাদন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আগে ঊষর মরুর দেশে যে খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যেত,  নদী অববাহিকার সমতল ভূমির উর্বরা পলিমাটির ভৌগলিক অবস্থানে তো তা হবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, খাদ্যদ্রব্যকে শুধু খাদ্যদ্রব্য হিসেবে না দেখা। না হলে যে খাবারগুলোর কথা বললাম, তা যে কম লোভনীয় কিংবা খাদ্যগুণ তার যে কম, তা তো নয়। পোষাক পরিচ্ছদের বিষয়টাও তাই। পাজামা, লম্বা বিশেষ ধরনের জামা, টুিপ কিংবা গলায় ঝোলানো কাপড়—এগুলিকে তো ধর্মীয় পোষাক হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদের দিনে কিংবা মিলাদ পড়তে গেলে কিংবা ধর্মীয় অন্য কোন বিশেষ সময়ে পাজামাপাঞ্জাবি পরতে হবে, বিয়ে করতে শেরোয়ানি-পাগড়ি লাগবে—এ জাতীয় সংস্কারের পেছনেও ঐ একই মানসিকতা কাজ করে থাকে। এ কথা ঠিক যে বহিরাগত মুসলমানেরাই, বলা যেতে পারে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এই নদীমাতৃক দেশের লোকজনকে জামাকাপড় পরতে শিখিয়েছে! তাপমাত্রার জন্যই এখানকার মানুষদের বেশি আবরণ শরীরে জড়িয়ে রাখার দরকার পড়ে না। আবার খাল-বিল পার হওয়ার জন্য যখন তখন সেটাকে খুলেও ফেলতে হত। আবার এটাকে যেভাবেই দেখি না কেন, কাপড়-চোপড় পরাটা লজ্জা নিবারণের জন্য যেমন প্রয়োজন, নান্দনিক বোধের প্রকাশ ঘটানোর জন্যও তা আবশ্যকীয়। কিন্তু ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য দেখানোর উপায় হিসেবে তা অবলম্বিত হচ্ছে।

সব চেয়ে অঘটন বোধ হয় ঘটেছে নামকরণের ক্ষেত্রে। একবারে ধর্মান্তরকরণের প্রাথমিক অবস্থাতে, মুসলমানত্ব জারী করার জন্যই বহিরাগত অবাঙালী মুসলমানদের নাম গ্রহণ করাটা, সন্দেহ নেই, আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। সাধারণ ভাবে এই নাম রাখার জন্য যে শব্দগুলিকে ব্যবহার করা হয়, সেগুলিকে আরবি ভাষার বলে বিবেচনা করে থাকি। কিন্তু এর ভেতর আরবি শব্দ যেমন আছে, তেমনই ভাবে অন্যান্য বহিরাগত জাতির ব্যবহৃত শব্দও রয়েছে। কিন্তু বর্জন করা হয়েছে বাংলাকে। এখনও অন্য ধর্মের কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে, প্রথমেই পালটিয়ে দেওয়া হয় তার আগের নাম। রাখা হয় আরবি-ফারসি নাম। এই মানসিকতাকে অবশ্য যৌক্তিক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, আরবের পৌত্তলিক সমাজে মানুষের যে নাম ছিল, ধর্মান্তরিত হবার পরেও কিন্তু সে নাম পরিবর্তিত হয় নি। বিষয়টা আসলে ভাষার। বাঙালী ছাড়া অন্যান্য জাতির ক্ষেত্রেও তাই দেখা যায়। এটা ঠিক, বাঙালী হিন্দুরা দেবদেবীদের নামেও নামকরণ করে। এটা  ধর্মসম্পৃক্ত।

কিন্তু অন্যান্য বাংলা শব্দের ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা তা নয়। দেবদেবী কিংবা ধর্মীয় অনুসঙ্গের বাইরে যে শব্দগুলি রয়েছে, অনায়াসেই সেগুলি ব্যবহার করা যেত। বর্তমানে অবশ্য এই রক্ষণশীল মনোভাবের পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক বাঙালী মুসলিম পরিবারে বাংলা নামের  প্রচলন দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার ডাক নাম হয়ত বাংলাতে রাখা হচ্ছে, কিন্তু আমরা যেটাকে ভাল নাম বলি. তা রাখা হচ্ছে আরবি কিংবা ফারসিতে। তবে পূর্বে ও এখনও যে আরবি-ফাসীতে নাম রাখার সংস্কৃতি, বলা যেতে পারে, তা অবাঙালী মুসলমানদের প্রত্যক্ষ প্রভাবজাত।

৩.১. বাংলা ভাষাতে শুধু নামকরণের ব্যাপারই নয়, বাংলা ভাষা বনাম বাঙালী মুসলমান প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা যেমন বাংলা, অনুরূপ ভাবে বহিরাগত মুসলমান যারা বাংলাদেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেছে, তাদের বংশধরদেরও মাতৃভাষা বাংলাই হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে অন্তত দুজন কবির কথা উদাহরণস্বরূপ আনা যেতে পারে। এদের এক জন হলেন শাহ মুহাম্মদ সগীর। তার লেখা ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যকে অনেকে ‘শ্রীকৃঞ্চকীর্তন কাব্যের’-ও আগে লেখা বলে মত প্রকাশ করেছেন। আরেক জন বাহরাম খান। তিনি লিখেছেন ‘লায়লী মজনু’ কাব্য। মধ্যযুগের এ কাব্য দুটি নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত ‘শাহ’ কিংবা ‘খান’ উপাধি তাদেরকে বহিরাগতদের বংশধর বলেই নির্দেশ করে। এ ছাড়া বাঙালী মুসলমানদের নামের সঙ্গে সৈয়দ, কাজী, শেখ, খন্দকার, বেগ, মীর, হাওলাদার, চাকলাদার, লোহানী, লোদী, মির্জা, দেওয়ান, খান—এ রকম পদবীগুলো যে এ দেশের নয়, তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। তাছাড়া এসব পদবীধারীদের বৃত্তিগত ব্যাপার অর্থাৎ তারা কি কাজ করত, তাও পরিষ্কার নয়। কিন্তু ক্রমে ক্রমে তারা বাঙালী হয়ে গেছে, তাও সত্যি। আবার সবার অর্থনৈতিক অবস্থা এক রকম থাকেনি।  জীবনযাপনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের শিকার হওয়াটাও বিচিত্র নয়। জীবিকার জন্য শ্রমসাধ্য কাজও করতে হয়েছে অনেককে। এটা হয়তো হয়েছে, তাদের বাঙালী হওয়ারই কারণে। যে হায়ারার্কির মধ্যে তারা একসময় ছিল, সেখান থেকে হয়েছে নিপতিত। বিশেষ করে মুঘল সুবাদারদের কালে ও নবাবী আমলে রাজনৈতিক ও সামরিক পদস্থতা থেকে ছিটকে পড়েছে দূরে। কিন্তু তাদের জীবন প্রবাহ থেমে থাকে নি। তাদের সন্তানেরা বাঙালী হয়ে কালক্রমে বাংলা ও বাঙালীর আর্থ-সামাজিক-রাজনীতিতে পালন করেছে বৈপ্লবিক ভূমিকা। এ রকম শেখেরই এক উত্তরপুরুষ—মুজিবুর রহমান বাঙালী জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা ও তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্থপতি। খান উপাধিধারী মওলানা ভাসানীও মজলুম নেতা হয়ে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ রূপে বিরাজমান। প্রকৃত পক্ষে দেশের জমিদার-সামন্ত-ভূস্বামী নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক বলয়কে সাধারণ মানুষের দখলে নিয়ে আসাটা সম্ভব হয়েছে এদেরই অবদানে। ‘সন অব দি সয়েল’ বলতে যাদের বোঝায়, এরা ছিলেন তাই।

অনুরূপ ভাবে মধ্যযুগের শেষ ভাগে বাংলা ও আরবি ফারসির মিশ্রণে রচিত যে পুঁথিগুলিকে ‘দোভাষী পুঁথি’ বলা হয়েছে, এর রচয়িতাদেরও বহিরাগত অবাঙালী মুসলমানদের বাঙালী উত্তরপুরুষ হিসেবেই গণ্য করা যেতে পারে। আরাকান রাজসভাতেও বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিল, তাদের কতজন বাঙালী আর হয়ে যাওয়া বাঙালী, এ নিয়েও পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের গবেষকেরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয় না।

তবে বাংলা ভাষার চর্চা যে নিরুপদ্রব ছিল, সেটা মনে করবারও কোন কারণ নেই। বহিরাগত অবাঙালী মুসলমানদের সংস্কৃতিকে ইসলামী বলে গণ্য করার মানসিকতা গড়ে তোলার পেছনে তারা সামাজিক ভাবেই প্রভাব বলয় তৈরী করে। এ ক্ষেত্রে ইরানীদের মত বাঙালীরা স্থানীয় সংস্কৃতি নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ইরানীরা এটা করতে পেরেছিল, তার প্রধান কারণ হল, তারা আরবিয়দের চেয়েও অধিকারী ছিল উন্নততর সভ্যতার। শিল্প-সাহিত্য ও অন্যান্য নান্দনিক কর্মে ছিল অনেক পারদর্শী। এ কারণে তারা ধর্ম নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিজস্ব সভ্যতার শক্তিতে তারা এতটা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে নিজেদের শিকড়কে উপড়ে ফেলার কোন প্রশ্ন আসেনি। তারই প্রথম অনারব জাতির মানুষ— যারা নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে কোরান শরীফ। তাতে যুক্ত করে অলঙ্করণ সৌকর্য। ইসলাম যেহেতু পৌত্তলিকতা-বিরোধী ধর্ম, তাই মানুষ কিংবা যার প্রাণ আছে, তার প্রতিকৃতি, তা সে যে কোন ফর্মেই হোক, তৈরী করাটা ছিল নিষিদ্ধ। তাই বস্তুনির্ভর ডিজাইন করতে তারা এগিয়ে এসেছিল। আজকের দিনেও কোরান শরীফের যে সুশোভন, তারা ছিল এরই পথিকৃৎ।

বাঙালীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক এ রকম ছিল বলে মনে হয় না। ভারতবর্ষও ছিল সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ। ইসলাম প্রবর্তনের বহু আগে থেকেই সমৃদ্ধশালী সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল এখানে। তবে আর্যদের কাল থেকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীরা হীনবল হয়ে পড়ে। আর বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে যে বাঙালী জাতির সূচনা হতে থাকে, হরোপ্পা-মহেঞ্জোদারোর কথা বাদই দিলাম, বৈদিক সভ্যতার তুলনায়ও তা ছিল নবীন। এ কারণে মনে হয়, বাঙালীদের মধ্যে যখন ইসলাম ধর্মের প্রচলন শুরু হয়, সেটা ছিল জাতি হিসেবে তাদেরও বিকশিত হবার কাল। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত দর্শনের সূত্রপাত ঘটছে কেবল। কেন না, এটা মনে রাখতে হবে যে, তখনকার দিনে সংস্কৃত ভাষাই ছিল জ্ঞানচর্চার বাহন। আর সেটা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দখলে। মুসলমান সুলতানেরা এসে স্থানীয় লোকায়ত বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে নিয়ে গেলেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই রামায়ণ-মহাভারত’র অনুবাদ হল। শ্রীমদ্ভগবতগীতা কিংবা অন্যান্য ধর্ম-সংশ্লিষ্ট পুস্তকাদিরও বাংলা ভাষায় রূপান্তর ঘটতে থাকল। মঙ্গল কাব্যের ধারা কিংবা বৈষ্ণব পদাবলির সৃষ্টিও এই বাংলা ভাষাবিস্তারের ফল। এ সবই হতে থাকল হিন্দু কিংবা হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া বৈষ্ণবদের দ্বারা। এর মধ্যে বাঙালী মুসলমানের স্থান কোথায়? যতটুকু দেখা গেছে, সে কথা তো আগেই বলেছি। তারা কতটুকু বহিরাগত অবাঙালী থেকে বাঙালী হয়ে যাওয়া, না এ দেশের, সে প্রশ্নেরও মীমাংসা হওয়া খুবই মুশকিল। তাই ইরানীদের ক্ষেত্রে নিজস্ব সভ্যতার শক্তি যে ভাবে দেখা গেছে, বাঙালী মুসলমানদের কাছে তা আশা করা যায় না।

এ জন্য মুসলমানদের দ্বারা বাংলা ভাষার চর্চাকে ধর্মের জিগির তুলে বাধাগ্রস্ত করাটা অস্বাভাবিক নয়। মধ্যযুগের একজন কবি তো দোজখের আগুনে পোড়ার ভয় উপেক্ষা করে বাংলা ভাষায় সাহিত্য করার ঝুঁকি নেয়ার কথাটা বলেছেন। তার মানে নিশ্চয়ই তাকে বলা হয়েছিল, এ ভাষাতে লিখলে যেতে হবে জাহান্নামে। আবদুল হাকিমের কবিতার কয়টি লাইন তো আধুনিক কালে বাঙালী জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি তো পরিষ্কার বলেছেন, বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে যে ‘হিংসে বঙ্গবাণী’, সে কেন নিজ দেশ ছেড়ে যায় না? এ থেকে বোঝা যায়, বাংলা ভাষাকে নিরুৎসাহিত করার একটা ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করার ব্যাপার ছিল। এ দ্বারা যেটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা হল, বাঙালী মুসলমানদের ভাষা বাংলা না, আরবি-ফারসি। এ কাজটি ছিল যে অবাঙালী মুসলমানদের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার চেষ্টা, তা কি অবোধগম্য?

৩.২. বাংলা ভাষা নিয়ে বাঙালী মুসলমানের দ্বিধাগ্রস্ততা, একবারে পাকিস্তানি আমল পর্যন্ত বর্তমান ছিল। এই দ্বিধা আসলে বাঙালীত্বকেও করেছিল প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানেরাই ছিল তার খলনায়ক। আবদুল লতিফ, যিনি ইংরেজদের দ্বারা ভূষিত হয়েছিলেন ‘নবাব’ উপাধিতে, তিনি তো বলেই দেন নি¤œ শ্রেণীর মুসলমানদের ভাষা হল বাংলা। অবশ্য শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানদের এই মানসিকতা তৈরীর পেছনে উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের প্ররোচনা কম দায়ী নয়। শুধু বাঙালী মুসলমান নয়, সারা ভারতের মুসলমানদের নেতারূপে তাদের আবির্ভাব একধরনের ঐতিহাসিক নেতিবাচকতার ফল। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজদের সাথে মুসলমানদের সহযোগিতার ক্ষেত্র কর্ষণ করেন খুবই সফলতার সাথে। ইংরেজী শিক্ষা করে চাকরী-বাকরী ব্যবসা বাণিজ্য —সব হাতিয়ে নিতে হবে,—না হলে প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগিতায় মার খেতে হবে,—এটা ছিল তার কর্মকাণ্ডের মূল। এই কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতারও সূচনা ঘটতে থাকে। এ ছাড়া, উত্তর প্রদেশের উর্দুভাষী মুসলমানেরা অন্যান্য মুসলমানদের চেয়ে যে কতটা এগিয়ে ছিল, প্রকারান্তরে প্রভাবসম্পন্ন ছিল, একটি পরিসংখ্যান থেকেই তা বোঝা যেতে পারে। ১৮৬১ সালের পূর্ব পর্যন্ত দেখা যায় উত্তর প্রদেশের মুসলমানেরা মোট জনসংখ্যার ১/৭ অংশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারী কর্মচারীরূপে নিয়োজিত ছিল ১৮২ জন। সেখানে হিন্দু ছিল ১৭৮ জন ও ইউরোপীয় ছিল ৬০৬ জন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে মুসলমান ছিল মাত্র ৯২ জন, যেখানে হিন্দুর সংখ্যা ছিল ৬৮১ ও ইউরোপীয় ছিল ১৩৪৮ জন। তবে এই ৯২ জন মুসলমানের মধ্যে বাঙালী কজন ছিল, তা পরিষ্কার নয়।

সাধারণভাবে বাঙালী মুসলমান সমাজে বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তৃতীয়ভাগে এসে। মীর মশাররফ হোসেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে তার এই বাংলা গদ্যভাষার চর্চার প্রতিক্রিয়া বাঙালী হিন্দু সমাজে যেভাবে হয়েছিল, তাতে মনে হয়, বাংলা যে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা, তারাও যে তার চর্চা করতে পারে, তা ছিল ধারণারও বাইরে। এক জন মুসলমান এত ভাল গদ্য লিখতে পারে যেন তা মহা আশ্চর্যের! এই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে যখন সুকুমার সেন মধ্যযুগের মুসলমানদের সাহিত্যকীর্তি নিয়ে ইসলামী বাংলা সাহিত্য নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ করে মুসলমানদের বাংলা ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির বিষয়টি মূলধারা থেকে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করা হয়। গ্রন্থটির নামকরণের বেলাতে ইসলামী শব্দের প্রয়োগ তাদের রচিত সাহিত্যের বিষয়বস্তু সম্পর্কেও বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সহায়তা করে। কেন না, এই রচনাগুলোতে ধর্মীয় তাত্ত্বিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয় নি। বরং মধ্যযুগে অ-মুসলিমদের দেবনির্ভর সাহিত্য সৃষ্টির বিপরীতে রক্ত-মাংসের মানুষের প্রবৃত্তিগত উপাদানগুলির প্রাধান্যই এতে ছিল বেশি। মানুষের ইন্দ্রিয়নির্ভর আচরণের সমাহার ঘটে সেখানে। এগুলি ছিল একান্তভাবেই মানবিক—এতে দেবদেবী স্তুতি নয়, মানবমহিমাই হয়েছে প্রকাশিত। মধ্যযুগেও, অদৃষ্টবাদী জীবন দর্শন প্রত্যাখ্যান করে, মানুষেরই জয়গান ধ্বনিত হয়েছে তাতে। এবং এটা বলতে, বোধ হয়, কোন দ্বিধা উচিত নয় যে, এই বাঙালী মুসলমান লেখকেরা কথা বলেছেন অগ্রবর্তী সময়ের।

তবে এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মনোভঙ্গি অন্যরকম ছিল বলেই বলেই প্রতীয়মান হয়। তার একটি কবিতাতে তো এ রকম আছে :

                সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধা জননী

                রেখেছ বাঙালি করে মানুষ কর নি।

এতে হয় তো বাঙালী চরিত্রের সীমাবদ্ধতার কথাটা উঠে এসেছে, কিন্তু আমি দেখতে বলছি সংখ্যার হিসাবটা। তখন যা জনসংখ্যা, তাতে বাঙালী মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত না করলে সাতকোটি তো হবার নয়। আবার তার হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে যে প্রবন্ধটি আছে সেখানেও নি¤œবিত্ত শ্রমজীবী বাঙালী মুসলমানদের সাথে উচ্চবিত্ত হিন্দুদের অমর্যাদা ও অসম্মানের কথাটাই বলা হয়েছে। কাজেই তিনি যে বাঙালী মুসলমানদের বাঙালী ভেবেছেন, সেটা পরিষ্কার। আর ধর্মের নিরিখে বিচার করলে তিনি নিজেও তো হিন্দু সমাজের নয়, ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের মানুষ  —যারা পৌত্তলিকতাকে বর্জন করেছে।

মশাররফ হোসেন ছিলেন প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ। তাকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরে নিলেও, মওলানা-মৌলভী-মুনশী—এই জাতীয় ধর্মীয় লোকেরাই ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষা চর্চার সূত্রপাত করেন। খ্রিস্টিয় মিশনারিদের ধর্মপ্রচারের মোকাবেলা করাটাই ছিল তাদের বাংলাভাষা চর্চার প্রধান কারণ। ধর্মান্তরকরণের হাত থেকে স্বধর্মীয় লোকদের রক্ষা করতে হবে, যথোপযুক্ত প্রচারের ব্যবস্থা না করতে পারলে সেটা সম্ভব নয়। এজন্য পত্র-পত্রিকা, বইপত্র প্রকাশ করাটা হয়ে পড়ে আবশ্যকীয় সহজ সরল বোধগম্য ভাষায় তা না করলে, একেবারে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। তাই মাতৃভাষা বাংলাকেই করা হয় তার বাহন। এজন্যই দেখা যায়, মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘আজিজন নাহার’ প্রকাশের পর পত্রপত্রিকা বের করার যেন হিড়িক পড়ে যায়। ‘মিহির ও সুধাকর’, ‘ইসলাম প্রচারক’, ‘কোহিনূর’, ‘হানাফী’, ‘মোহাম্মদী’—এই রকম পত্রপত্রিকার আত্মপ্রকাশ দেখা যায় একবারে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। এ থেকে এটা বলা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না যে, এভাবেই বাঙালী মুসলমান সমাজে বাংলা ভাষা চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয়। আর তারই পরিপূর্ণতা ঘটতে থাকে মহীয়সী রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম, এয়াকুব আলী চেীধুরী, ইসমাঈল হোসেন শিরাজী প্রমুখের লেখায়। তবে যেটা লক্ষ্য করবার যেটা বিষয়, তা হল, বাংলা মুসলমানের ভাষা কি না, সে বিতর্কও থেমে থাকে না।

মধ্যযুগে ধ্যানধারণা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। উৎপাদন ছিল সামন্ততান্ত্রিক কৃষিভিত্তিক। ভূমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বই ছিল অর্থনীতির উৎস। অদৃষ্টবাদ ছিল সান্ত্বনাস্থল। রাজত্ব পরিবারতান্ত্রিক। রাজা কিংবা রাজদরবারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ছিল ক্ষীণ। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির ওপরও ছিল না কোন অযথা পীড়ন। কিন্তু বৃটিশদের এ দেশে আসার অনিবার্যতা ছিল নতুন উৎপাদন পদ্ধতির বিস্ফোরণের ফলাফল। শিল্পকলকারখানায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য বাজার অনুসন্ধান। আর সেটা করতে যেয়ে ঔপনিবেশিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক পরিণতি। কাজেই, মূল ব্যাপারটা ছিল শোষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির উদ্ভব ও বিকাশের জন্য  সমাজ রূপান্তরের যে ধারা, তাতো আর অমানবিক কিংবা অবৈজ্ঞানিক নয়। যুক্তিবাদ, ইহজাগতিকতা, মানবিকতা, বস্তুবাদিতা—এগুলি তো ছিল ধর্ম ও সমাজ নিয়ন্ত্রিত মানুষের মুক্তি সনদ। ব্যক্তির স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার, জাতিসত্তার অনুসন্ধান, দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা, পরাধীনতার বোধ, রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কিংবা গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশ—এগুলি সবই ছিল সেই সময়ের অর্জন। আর সবচেয়ে যেটা বড় হয়ে দেখা দেয়, তা হল, পরাধীন ভারতবর্ষে পুঁজি সম্প্রসারণের সমস্যা থেকে জাতীয়তাবোধের অনুসন্ধান। আবার এই অনুসন্ধানের প্রয়াস থেকেই সৃষ্টি হতে থাকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধের উগ্রতা। শিক্ষিত বাঙালী হিন্দুর কাছে মুসলমানেরা প্রতীয়মান হয় বহিরাগত বলে, যাদের দ্বারা শাসিত হয়েছে শত শত বছর। এটা দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায় যে, বহিরাগত হয়ে এলেও তারা আর ফিরে যায় নি। এ দেশেই প্রোথিত করেছে তাদের শিকড়—ছড়িয়েছে ডালপালা। আর এভাবেই ব্যর্থ হতে থাকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা :

                হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন

                শকহুনদল মোগল পাঠান এক দেহে হল লীন।

জাতিসত্তার ভিত্তি স্থাপনের জন্য বাঙালী বঙ্কিমচন্দ্র আমদানী করেন রাজপুত বীর। বাঙালী মুসলমানেরাও এরকম বীর খুঁজতে থাকে মুঘল পাঠানদের ভেতরে। বাংলা ভাষা চর্চা করার পরও এক শ্রেণীর বাঙালী মুসলমানের প্রত্যয় জন্মাতে থাকে যে বাংলা তাদের ভাষা নয়। জাতি হিসেবে মুসলমান হলে বাঙালীত্ব আর কী করে থাকে তাদের কাছে?

৩.৩. এটা ঠিক যে, মধ্যযুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বাঙালী মুসলমানের কোন অংশ গ্রহণ ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্য ভাগেও নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজদরবারে কি কোন বাঙালী মুসলমান খুঁজে পাওয়া যায়? কবিতা-টবিতা যাদের লেখার, তারা লিখেছেন। কিন্তু ভূমির মালিকানা—জায়গীরদারী-মনসবদারী, তা করারও কোন সুযোগ বাঙালী মুসলমানের ছিল কি না, সন্দেহ! সৈনিক বৃত্তিতেও তাদের কোথাও স্থান ছিল না। সুতরাং সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান ছিল, মনে হয়, সর্বনিম্নে। শ্রমজীবী হওয়াটাই ছিল তাদের নিয়তি! সুতরাং ইংরেজদের আগমনে মুসলমানেরা রাজ্যহারা হয়ে পড়ল, যারা ছিল রাজার জাত তারা পরিণত হল ভিখিরিতে —বাঙালী মুসলমানদের সামনে রেখে এ কথা বলার কি কোন অর্থ আছে? ভিখিরি হলে মোঘল-পাঠানেরা হয়েছে। বাঙালীরা আর নতুন করে কি ভাবে ভিখিরি হবে? আশ্চর্যের বিষয় হল, বাঙালী মুসলমানদের মনেও এই রাজ্য হারানোর দীর্ঘশ্বাস হাহাকার ঢুিকয়ে দেয়া হয়েছে। জিন্নাহ সাহেব দ্বিজাতি তত্ত্ব তো নিয়ে এলেন মুসলমানদের এক জাতি প্রমাণ করার জন্য অনেক পরে। কিন্তু শোকের সাগরে চুবিয়ে রেখে হিন্দুদের প্রতিপক্ষ করে এক জাতি বানানোর মনস্তাত্ত্বিক প্রেসক্রিপসন শুরু করা হয় এভাবেই। রাজ্য যারা কেড়ে নিল, তারাই আবার হান্টার সাহেবকে দিয়ে বই লেখাল—দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস।

বৃটিশ রাজত্বের সূচনাতে তাদের শিক্ষানীতি ছিল এদেশের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে আঘাত না করা। এজন্য হিন্দুদের বেলাতে টোল-চতুষ্পাঠীর ও মুসলমানদের জন্য মাদ্রাসা-মক্তবের শিক্ষাকেই উৎসাহিত করে। বিচার ব্যবস্থাতেও হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা করে রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত মনীষারা আলোকপ্রাপ্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ কারণে পৃথক হতে থাকে ধর্মীয় শিক্ষানীতি। কলিকাতাতে এটাও দেখা গেছে, আধুনিক শিক্ষা প্রদানের জন্য হিন্দু কলেজ ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য সংস্কৃত কলেজ পাশাপাশি কাজ করছে। এ রকম একটা পটভূমিকাতেই ১৯৩৫ সালে ইংরেজ প্রণীত শিক্ষা নীতিতে লর্ড মেকলে ঘোষণা করেন, তারা ভারতবর্ষে এমন একটি শ্রেণী তৈরী করতে চান, যারা রঙ ও রক্তে হবে ভারতীয় কিন্তু শিক্ষা ও রুচিতে হবে ইউরোপীয় এবং তারাই তাদের ও শাসিত ভারতীয়দের মধ্যে যোগসূত্র রূপে কাজ করবে।  এই ঘোষণার সরল অর্থ অবশ্য এটাই দাঁড়ায় যে এ দেশে একটি শিক্ষিত দালাল শ্রেণী তৈরী করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবত সেটা হয় না। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই  ইংরেজী ভাষা বাহিত শিক্ষিত এক বিপুল সংখ্যক মানুষের মনে পরাধীনতার বোধ থেকে সা¤্রাজ্যবিরোধী মনোভাব সংগঠিত হতে থাকে। এই মনোভাবকেই মোকবেলা করার জন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই সৃষ্টি হয় কংগ্রেসের। এই রক্ষা কবচ কতটা কাজ করবে, তার অনিশ্চয়তা থেকেই তারা হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা করার জন্য অবলম্বন করতে থাকে ‘ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল’ নীতি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই তারা মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতেও গ্রহণ করে মুখ্য ভূমিকা।

এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা বলাও প্রয়োজন মনে করি। সেটা হল, বঙ্গভঙ্গ। ১৯০৫ সালে এটি ঘটানো হয়।  সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবকে কার্যকরভাবে দমিত রাখার জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের পদক্ষেপ ছিল এটা। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ ও তার বাইরের অবাঙালী বসবাসরত কিছু অংশ নিয়ে একটি প্রদেশ গঠন করা হয়। অনুরূপভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের সাথে অসমীয়াদের বাসস্থান আসাম যুক্ত করে গঠিত হয় আরেকটি প্রদেশ। এটা লক্ষ্য করবার বিষয় যে দুই প্রদেশের সঙ্গেই অবাঙালী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুই হোক, আর মুসলমানই হোক, বাঙালী জনগোষ্ঠীকে ভাঙতে হবে। এটা যেমন সত্য, তেমনই আরেকটি সত্য হল, অ-বাংলাভাষী মানুষদের সাথে বাংলাভাষী মানুষদের সংঘাত সৃষ্টি করা। বাস্তব কারণেই এটা হত। কেন না, সুযোগ-সুবিধা নানারকম ভাগাভাগির প্রশ্ন থেকেই বিবাদ হয়ে উঠত অনিবার্য। এই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। নেতৃত্ব দেন হিন্দু নেতারা। সে সময়ের অনেক মুসলমান নেতা, যেমন বগুড়ার নবাব আবদুস সোবহান চৌধুরী, দেলদুয়ারের গজনবী সাহেব, করটিয়ার ওয়াজেদ আলী খাঁ, আবুল হোসেন কিংবা আবদুর রহিম—এই বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করেন নি। যা হোক, শেষপর্যন্ত রদ হয় বঙ্গভঙ্গ। কিন্তু তখনও যেমন এখনও এটা একটা মিথের মত হয়ে হয়েছে যে বঙ্গভঙ্গ হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা কত যে লাভবান হত, তার সীমাসংখ্যা নেই । বস্তুগত বিষয় নিয়ে এ রকম ভাবাটা কখনই ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার একটি আদর্শগত ভিত্তি থাকে। বর্তমান সময়ে আবার এটাও বলার চেষ্টা চলছে যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে পূরণ হয়েছে সেই স্বপ্নের! এর জবাবে বোধ করি, একটা কথাই বলা যায়, তা হল, বর্তমান বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার শিখা প্রজ্জ্বলিত করে, কোন ধর্মীয় বিবেচনায় নয়।

৩.৪. যা হোক, ঊনবিংশ শতকের এই সময়টা থেকেই বাঙালী মুসলমানদের সামাজিকভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার ঊচ্চাভিলাষ বাস্তবত রূপ পেতে থাকে। এটাও দেখা যায়, তারা বাঙালী না মুসলমান—এই দোটানাও ক্রিয়াশীল রয়েছে তাদের মধ্যে। এর কারণও অবাঙালী মুসলমানদের সামাজিক নেতৃত্ব। এই ক্রান্তিকালে একটা হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে বসবাসরত উর্দুভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭,৮০০০০। আর বাঙালী মুসলমানের সংখ্যা ছিল ন্যূন্যাধিক ২,২২,৪৫,০০০। অবশ্য উত্তর প্রদেশের উর্দুভাষী মুসলমান বাড়ার একটা কারণ হল, অযোধ্যার নবাবকে যখন ইংরেজেরা কলিকাতায় নিয়ে আসে, তখন তার বহরে প্রচুর লোকজনকেও আনা হয়। নবাবের খেদমতে যেন কোন সমস্যা না হয়, এটা ছিল তার কারণ। সেবাদানকারী লোকজনের বাইরেও তার গুণগ্রাহীরা তো বটেই, কবি-শিল্পী-গায়ক-বাদকেরাও বাদ যান না। এ রকম সেটলাররাই গড়ে তোলে একটি মুসলিম জোন। বাঙালী মুসলমানদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ঐ অবাঙালী মুসলমানদের ভাষা-সংস্কৃতিকেই জ্ঞান করত ইসলামী বলে। এবং এটা মনে করত যে এহেন আচরণের দ্বারা তারা অবাঙালী মুসলমানদের মত শরীফ শ্রেণীভুক্ত হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যে আদমসুমারী হয়, তাতে বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলমানদের দুশ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছিল—আশরাফ ও আতরাফ। এটাও দেখা গেছে আতরাফ শ্রেণীভুক্ত মুসলমানেরা আশরাফ দাবী করে দরখাস্ত পর্যন্ত করে। অহেতুক জাত্যাভিমানের ব্যাপারটা ছিল, বৈদিক সমাজের বর্ণপ্রথার প্রভাব। বৃটিশ আমলে তো বটেই, পাকিস্তান আমলেও ‘ক্যারেকটার সার্টিফিকেট’ কিংবা টেস্টিমোনিয়ালে লেখা হত, ‘হি কামস অব এ রেসপেক্টফুল ফ্যামিলি’—যার বাংলা ছিল ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম’। সম্ভ্রান্ত পরিবার না হয় বোঝা গেল, কিন্তু বাদবাকী মানুষেরা কী বিভ্রান্ত!

অবশ্য আরব-ইরান থেকে আসা মানুষদের বংশধর ভেবে গর্ব বোধ করা আর আত্মপ্রসাদ পাবার একটি পার্সেন্টেজ বাঙালী মুসলমানের মধ্যে আছে বৈ কি? এখন এ কথা তাদের বলবে যে, সে সব দেশে কেবল আমীর-ওমরাহরাই বসবাস করত না, তাদের সেবা করার লোক ছিল। এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। জুতা কালি করা, চুল কাটা থেকে শুরু করে মোট বওয়া মানে সমস্ত শারীরিক পরিশ্রমের কাজটা করতে হত তাদেরকেই। আর এখন যেমন আমাদের দেশের শ্রমজীবীরাই অধিক সংখ্যায় ভাগ্যোন্নয়নের জন্য দুবাই-কাতার মানে বাইরের দেশ, যেখানে যেমন সুবিধা, যাচ্ছে—তাদের বেলাতেও এ দেশে আসার সময় তাই হয়েছে। তাদের গায়ে তো আর কৌলীন্যের ছাপ ছিল না।

বিদায় হজের বাণীতে মহানবী (সা.)-এর কিছু কথার অনুবাদ আবুল হাশেম তার একটি কবিতায়, বোধ করি, এভাবে করেছেন :

                নহে আশরাফ আছে শুধু যার বংশের পরিচয়

                সেই আশরাফ জীবন যাহার পুণ্য কর্মময়।

কর্মের কথা বাদই দিলাম, ইসলামের সাম্যের বাণীর তাৎপর্যকে কিভাবে বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে, সেটিও একটি ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়। এ থেকে এটা নিশ্চয়ই অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, এ রকম আশরাফ শ্রেণীভুক্ত মুসলমান, প্রধানত যারা অবাঙালী ছিল, তারা কি হীন চোখে বাঙালী মুসলমানদের পরিমাপ করত। আর এটা যে শুধু তখনকার ব্যাপার ছিল, তা নয়। পাকিস্তান আমলে এসেও আইয়ুব খান তার ‘প্রভু নয় বন্ধু’ গ্রন্থে বাঙালী মুসলমানদের প্রায় হিন্দু শ্রেণীভুক্তই করে ফেলেছেন।

আরেকটি ব্যাপার হল, ইসলাম ধর্ম আবির্ভূত হয়েছিল আরব দেশে। কিন্তু আরব দেশ ছাড়াও ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের, বলা যায়, আফগানিস্থান পর্যন্ত যে সমস্ত ধর্মীয় পীঠস্থান কিংবা পীর-ফকির-আউলিয়া-দরবেশগণের কর্মভূমি রয়েছে, সেই স্থান সম্পর্কে এক ধরনের আবেগ কাজ করেছে বাঙালী মুসলমানের মনে। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে এটা সত্য। এই ধর্মীয় পুণ্যভূমির প্রশ্নেই ইহুদীরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে প্যালেস্টাইনে। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু, এ রকমও দেখেছি, এই কয়েক বছর আগেও, হজ করে ফিরে এসে যে টুপি পুণ্যভূমির বিশ্বাস করে শিরে তুলে রাখা হয়েছে, তা মেড ইন চায়না। এখন কথা হল, আবেগ যদি ছেলেমানুষির হয়, তাতে কি আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ সম্ভব? আমি ছেলেমানুষি শব্দটা ব্যবহার করলাম। আপনারা যদি অন্য কিছু বলতে চান, বলতে পারেন। এ রকম উদাহরণ কি আরও নেই?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাফত নিয়ে একটা আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে। তাতে যোগ দিয়েছিল বাঙালী মুসলমানও। খেলাফতের পর্যায়গুলো নিয়ে পূর্বেই কথা বলেছি। খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় খেলাফত ছিল এক রকম। সেখানে ছিল না কোন বংশানুক্রমিকতার ধারা। কিন্তু উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানীয়া খেলাফতের ক্ষেত্রে আর সে কথা খাটে না। রাজার ছেলে রাজা হয়। এখানে খলীফার ছেলে খলীফা হয়েছে। তার মানে আর খলীফা থাকে নি। রাজাই হয়েছে। হতে পারে, মিসরে যেমন শাসনকর্তাদের উপাধিই ছিল ফারাও বা ফেরাউন। এক সময় রাশিয়াতে, যেই সিংহাসনে বসত, সেই হত জার। আমি যখনকার কথা বলছি, তখন আরব কিংবা তৎপার্শ্ববতী অঞ্চলে, হয়ত খলীফা শব্দই ছিল প্রযুক্ত। কিন্তু প্রথমাবধিই এর সঙ্গে যে আবেগগত ব্যাপারটি সংযুক্ত হয়ে গিয়েছিল, তা হল, খলীফা হলেন আমীরুল মোমেনীন অর্থাৎ বিশ্বাসীদের নেতা। আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তিনি লা শরীক, মোহাম্মদ হলেন তার বসুল—এই বিশ্বাসের অনুবর্তীদেরকেই বলা হয় বিশ্বাসী। আর খলীফা হলেন তাদের নেতা। নামাজে ইমামতি করার অধিকার তার। ভিন্ন ভিন্ন মসজিদে যে জামাত হয়, তার ইমামেরা খোৎবা পাঠ করে থাকেন তার নামে। খেলাফতের নিয়ন্ত্রণ কালক্রমে দুর্বল হয়ে এলেও তার একটা প্রতীকী আনুগত্য ছিল সারা মুসলিম জাহানে। এই প্রতীকী আনুগত্য তুরস্কের ওসমানিয়া বংশের খলীফারাও লাভ করতেন। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তুরস্কের খলীফা ছিলেন জার্মানির পক্ষে। যুদ্ধে পরাজয় ঘটে জার্মানির। এর ফলে তুরস্ক পড়ে ইংরেজদের উদ্যত থাবার মুখে। খেলাফতের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে বিপন্ন— উচ্ছেদের মুখোমুখী। তখন এই খেলাফত রক্ষার জন্য ভারতবর্ষের মুসলমানেরা শুরু করে আন্দোলন। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যেও তার একটা বড় প্রভাব অনুভূত হয়। এই ভাবে বিশ্ব মুসলিম উম্মার একীভূত চেতনা প্রজ্জ্বলিত হয় তাদের মধ্যে। সেটা ছিল অসহযোগ আন্দোলনেরও অগ্নিগর্ভ কাল। তখন কিছু সময়ের জন্যে হলেও হিন্দু ও মুসলমানেরা এক হয়ে অবতীর্ণ হয় বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে। এই সংগ্রামে সাধারণ মানুষের অংশ গ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এমন কথা শোনা যায় যে, ইংরেজদের জেল কত বড়, সেটা দেখার জন্য লাইন দিয়ে লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকত, কখন তাদেরকে ধরে নিয়ে ভরবে সেখানে। কিন্তু সহিংস ঘটনার কারণে মাঝ পথে বন্ধ করে দেয়া হয় অসহযোগ আন্দোলন। খেলাফত আন্দোলনও অকার্যকর হয়ে পড়ে খোদ তুরস্কে যা ঘটে, তার জন্যে। মোস্তফা কামাল পাশা খেলাফত উৎখাত করে দেশটিকে রূপান্তরিত করেন প্রজাতন্ত্রে। একটি তথ্য, বোধ করি দেয়া যেতে পারে, তা হল, খেলাফত উচ্ছেদকারী কামাল পাশার কৃতিত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে নজরুল একটি দীর্ঘ কবিতাও লিখেছিলেন। সেই কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনানোর জন্য কবিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে পাগড়ি পড়িয়ে কলিকাতার রাস্তায় রাস্তায় এক দল উৎসাহী বাঙালী মুসলমান যুবক ঘুরে বেড়িয়েছিল। এখন কথা হল, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধের আসলেই কোন বিকল্প নেই। সেখানে স্বধর্মীয় মানুষের মাঝে আত্মীয়তা খোঁজা কিংবা মানবিক বন্ধন রচনা করাটা মানবতাবোধেরই একটা অংশ। কিন্তু সমস্যা হল, সংস্কার বা কুপমাণ্ডুক্য থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেয়া কিংবা অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়াটা কোন কাজের কথা নয়। বাঙালী মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রায়শই তাই ঘটেছে।

৩.৫. ১৯৩৫ সালে ইংরেজ সরকার নতুন ভারত শাসন আইন প্রবর্তনের পর বাঙালী মুসলমানদের ওপর যার প্রভাব প্রবলতম হতে থাকে, সেটি হল, মুসলিম লীগের  রাজনীতি। ততদিনে জিন্নাহ সাহেব লন্ডনের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষ করে পুনরায় ভারতে ফিরে এসেছেন এবং মুসলিম লীগের হাল ধরার কাজটি হাতে নিয়েছেন। এক সময় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে কোন বৈরীতা ছিল না। বরং একই সাথে দুসংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করা যেত। জিন্নাহ সাহেব তো কংগ্রেসেই ছিলেন। ইতিমধ্যে পূর্ববঙ্গের বাঙালী মুসলমানদের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারাও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বাঙালী মুসলমান কৃষকদের জন্য পাট চাষ পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যাপার। তাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার একটা কারণ ছিল যথামত অর্থের যোগান না থাকা। অর্থাৎ দরিদ্রতা। কৃষিকাজ থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ তখন সেই অভাব দূরীকরণে সমর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাও হয়ে দাঁড়িয়েছে সোনায় সোহাগা। যার ফলে শিক্ষিত বাঙালী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটছে দ্রুতগতিতে। পিতৃপুরুষের বৃত্তিতে তারা আবদ্ধ না থেকে গ্রহণ করেছে যুগোপযোগী পেশা। উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষক, দারোগা-পুলিশ, কেরানি-পিওন কিংবা এই রকম অফিস-আদালতের নানা চাকরিজীবীর তকমা এটে নিচ্ছে গায়ে। এরই সাথে সাথে বাঙালী মুসলিম পুঁজির বিনিয়োগটাও হয়ে উঠছে জরুরি। এধরনেরই একটা আর্থসামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৭ সালে যে নির্বাচন হয়, তাতে মুসলিম লীগ অবিভক্ত বাংলাদেশে কোয়লিশন করে মন্ত্রীসভার অংশীদারীত্ব পায়। মুখ্যমন্ত্রীও হন একজন বাঙালী মুসলমান— শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। এর আগে ‘সন অব দি সয়েল’ বলতে যা বুঝিয়েছি, তিনিও ছিলেন তাই। তিনি অবশ্য যুক্ত ছিলেন না মুসলিম লীগ রাজনীতির সাথে। ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনের সময় তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুসলীম লীগে। কিন্তু তার আয়ু ছিল স্বল্প। পরে তাকে আর রাখা হয়নি। তার সংগঠনের নাম ছিল কৃষকপ্রজা পার্টি। সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী বাঙালী মুসলমানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি এ জন্ম দিয়েছিলেন এ সংগঠনটির। বলা যেতে পারে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ইতিহাসে বাঙালী মুসলমানের এটাই ছিল প্রথম পদক্ষেপ। ঐ নির্বাচনে নেতৃত্ব যারাই দিক, শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের অংশ গ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এবং তারাই আপামর গ্রামবাংলার কৃষিজীবী-শ্রমজীবী মানুষদের সামনে প্রতীয়মান হয়েছিল দিকনির্দেশক হিসেবে। এ কারণেই মনে হয়, লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সমূহ নিয়ে যে ফেডারেল ধাঁচের রাষ্ট্রগঠনের কথা বলা হয়েছিল, তাতে তাদের সমর্থনও ছিল অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত। কথাটা বলছি এ জন্যই যে, পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন হয়, তাতে মুসলিম লীগের নির্বাচনী ইস্যু ছিল পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠা। ঐ নির্বাচনে একমাত্র বাংলা ছাড়া অন্যান্য সংখ্যগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলে মুসলিম লীগ জিততে পারে নি। পাঞ্জাব বলি, আর সিন্ধুই কিংবা উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর বেলুচিস্তানের কথাই বলি—পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সুযোগ-সুবিধা যারা বেশিই পেয়েছে, তাদের তখন সাড়া মেলে নি। এর যেটা কারণ হতে পারে, তা হল, ঐ সমস্ত অঞ্চলের সামাজিক নেতৃত্ব ছিল প্রধানত সামন্ত-ভূস্বামীদের হাতে। ইংরেজদের সাথে যাদের তেমন কোন স্বার্থের সংঘাত ছিল না। তারা আপামর মানুষদের সচেতন করে তোলার ব্যাপারে কোন উৎসাহই পায় নি। তুলনায় বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ছিল বেশি। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে নিজেদের পাওনাই বলি আর উচ্চাকাক্সক্ষাই বলি, তা পূরণ করাটাকেই তারা প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করেছে। আর এই বিবেচনা থেকেই দরিদ্র, নিরক্ষর ও শ্রমজীবী মানুষদেরও করেছে সংগঠিত।

৪. এতক্ষণ তো অবাঙালী মুসলমানদের যে সব সংস্কৃতি ধর্মীয় নয়, সেগুলিকেও ইসলামী বিবেচনা এবং একই ধর্মের হবার কারণে অভিন্নতা বোধ করার ফলে বাঙালীত্বের চেতনা কি ভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে যৎকিঞ্চিত আলোকপাত করার প্রয়াস পেয়েছি। একই সাথে উচ্চ শ্রেণীর জ্ঞান করার কারণে সমপর্যায়ভুক্ত হবার জন্য তাদের অনুসরণ ও অনুকরণও কি ভাবে বাঙালী মুসলমান—এর জীবনে প্রতিভাত হয়েছে, চেষ্টা করেছি তা-ও তুলে ধরার। পাশাপশি বাঙালী মুসলমানদের বাঙালী ভাবার ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর বাঙালী হিন্দুদের উন্নাসিক মনোভাবও নিজেদেরকে বাঙালী মনে করার ক্ষেত্রে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করে এসেছে, তাও বলেছি। তবে এত সব ঘাত প্রতিঘাত সত্ত্বেও বাঙালীত্বের চেতনা তাদের মধ্যে কিভাবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে, সে ইতিহাসও, বোধ করি, কম বিস্ময়কর নয়।

এ প্রসঙ্গে, বোধ করি, আরেকটি কথাও বলে নেয়া ভাল। আমাদের দেশে জনগোষ্ঠীর বিভাজন এভাবেও করা যায়। যেমন কিছু মানুষ শিক্ষিত। অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন এই মানুষগুলো কেবল মাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করে নি, জীবনের পাঠ নিয়েছে প্রকৃতি থেকে—চার পাশের পরিমণ্ডল থেকে। অভিজ্ঞতার আলোকে চেষ্টা করেছে সেই শিক্ষা সম্পূর্ণ করার। আবার অধিকাংশ মানুষ যারা নিরক্ষর কিংবা তেমন সুযোগ পায় নি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার, আশ্চর্য হলেও সত্য যে তারা জীবনের পাঠ গ্রহণ করেছে আগের বলা মানুষগুলোর মত। প্রকৃতি থেকে—চার পাশ থেকে—ঠেকে ঠেকে শিখে নিয়েছে অনেক কিছু। এই মানুষগুলোকে নিরক্ষর বলা যেতে পারে—বলা যেতে পারে স্বল্প অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন। কিন্তু তারা অশিক্ষিত নয়। আর এই দুয়ের মাঝে আছে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী অনেক মানুষ যারা গ্রহণ করে নি জীবনের পাঠ, তারা প্রকৃত পক্ষেই অশিক্ষিত। বাঙালী মুসলমান সমাজের বেলাতেও এই ভাগ সত্য নয় কি? বাঙালী মুসলমানের মুসলমান হয়ে ওঠাতেও নানা যে বিঘœ, তা যেমন ঘটেছে এদের দ্বারা, তেমনই ভাবে বাঙালীত্বের বোধকেও ধর্মবিরুদ্ধ প্রমাণ করার কাজে তারা ছিল তৎপর।

বাঙালী মুসলমানের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ব্যাপারটি প্রথম থেকেই ছিল। উনিশ শতকে এসে, বলা যায়, সমগ্র ভারতবর্ষীয় জীবনে যে ভাঙচুর শুরু হয়, নিছক তার দর্শক হওয়াটা কোন বাস্তব বিষয় ছিল না। জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, তার সুফল থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখাটাও কাজের কথা নয়। সমাজবিন্যাসের নতুন চেহারায় প্রতিবেশীদের যে উজ্জ্বলতা, চোখ ঝলসিয়ে দিচ্ছে তাও। অতীতচারিতা করে আর মুঘল-পাঠান রাজা-বাদশাহদের আত্মীয় ভেবে সান্ত্বনাই বা পাওয়া যায় কতটুকু? নতুন গড়ে ওঠা কলিকাতা শহরও বুঝি দুচোখে মুগ্ধতা ছড়ায়! ব্যর্থ হয়ে গেছে হাজী শরীয়তুল্লার ফরায়েজী আন্দোলন। দমিত সিপাহী বিদ্রোহ। ওহাবীদের বিচারও শেষ। প্রতিকার পাবার সশস্ত্র পথ সংকুচিত হতে হতে বিলীন হয়ে গেছে দিগন্তের ধূসরতায়। তার বদলে এসেছে মুদ্রণ যন্ত্র। সত্যিই কি পেন ইজ মাইটার দ্যান সোর্ড? কথাটা যেমনই শোনা যাক, পত্র-পত্রিকার প্রকাশ দিয়েই বাঙালী মুসলমানের আত্মজাগরণের শুরু। কারণ, বিষয়, বিতর্ক—এ নিয়ে কথা যা বলার আগেই বলেছি। কিন্তু আধুনিক মননের ক্ষেত্রটা কি ভাবে তৈরী হল, সে চিত্রটাও তো দেখা দরকার।

বাঙালী মুসলিম সমাজে তখন অনেক কিছুই নিষিদ্ধ। ফটো তোলা—হারাম। নৃত্যগীত —হারাম। ছবি আঁকা তা-ও হারাম। চারদিকে হারামের ছড়াছড়ি। মেয়েরা অবরোধবাসিনী। এতসব  নিষেধাজ্ঞা বাঙালী মুসলিম সমাজে কী করে প্রযুক্ত হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কেন না, গান-বাজনা—নৃত্য-গীতের কথা যদি বলেন, তবে তা তো, এই ভারতবর্ষেই ছিল স¤্রাট-সুলতান-নবাব-আমীরদের একচেটিয়া। যেটাকে বাইজী কালচার বলা যায়, সেটাও তো উত্তর প্রদেশের রইস-খানদান মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষণা। আর বাঙালী মুসলমান, কম মুসলমান, তাই তাদের জন্য—না। আবার ইরানী চিত্রকলা—মুঘল চিত্রকলা গর্বের-গৌরবের। কিন্তু বাঙালী মুসলমান আঁকতে গেলেই—না। খোদ আরবের মেয়েরাও যুদ্ধক্ষেত্রে পর্যন্ত থেকেছে পুরুষের পাশে, আর এদের মেয়েদের বের হতে দেয়া যাবে না ঘর থেকেও। এখন এই সব কুপমণ্ডুকতা, কুসংস্কার, জাঢ্যতা ইত্যাদি থেকে উত্তরণের সূচনা কি ভাবে ঘটল, তার পরিচয় নেয়া যেতে পারে।

আগেই বলেছি, তত দিনে ঢাল-তলোয়ার—গুলি-বন্দুক অকার্যকর হয়ে গেছে, কিন্তু হাতে এসেছে নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্রের নাম পত্র-পত্রিকা। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষ দিকে মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন নামে এক ভদ্রলোক কলিকাতায় এসে একটি মাসিক পত্রিকা বের করলেন। নাম সওগাত। নামটা বাংলা নয়, কিন্তু অর্থ উপহার। তিনি কি উপহার দিলেন? আধুনিক মননের বীজমন্ত্র। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকের পত্র-পত্রিকার কথা তো বলেছি। বাংলা ভাষা চর্চার ভিত্তি এগুলিতে হলেও বিষয় ছিল প্রধানত ধর্মীয় তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু সওগাতের কাজ হল বাঙালী মুসলমানের মননের ফাউন্ডেশন দেয়া। এই মনন আধুনিকতার—এই মনন অসাম্প্রদায়িকতার। বিশ্বমানবতার। আন্তর্জাতিকতার। নারীমুক্তির। প্রথম সংখ্যার প্রথম লেখাটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের। নজরুলেরও আত্মপ্রকাশ ঘটল সেখানে। তত দিনে সমাজে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছেন মহীয়সী রোকেয়া। তারও লেখা প্রকাশিত হতে থাকল। বাদ গেল না সুফিয়া এন. হোসেন নামে এক মহিলার কবিতা, যিনি পরবর্তী কালে বিখ্যাত হয়েছেন সুফিয়া কামাল বলে। কার কার কথা বলব আর? নিজেদের বাঙালী বলে ভাবার প্রথম যে অচলায়তন—ধর্মীয় সংস্কার, তা কাটিয়ে, পরবর্তী কালে যারা বিখ্যাত হয়েছেন, এমন সব কবি লেখকেরাই ঘিরে ছিলেন পত্রিকাটি।

এই সময় থেকে বাঙালী মুসলমান মননে সাংগঠনিক ভাবে শুরু হয় যুক্তিরও পরিচর্যা। ১৯২৬ সালে ঢাকাতে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। এর প্রায় একশরও কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলিকাতাতে হিন্দু কলেজ। কিন্তু বাস্তবত যা ঘটেছিল, তা হল, নামের সাথে ধর্মীয় পরিচয়জ্ঞাপক হিন্দু শব্দ থাকলেও, এই কলেজের ছাত্ররা, যাদেরকে ইয়ং বেঙ্গল বলা হয়ে থাকে, তারা লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যাবতীয় অহিন্দুজনোচিত কর্মকাণ্ডে। প্রধানত শতাব্দীর পর শতাব্দী লালিত ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধেই ছিল তাদের এই বিপ্লব। ঢাকাতে গঠিত সাহিত্য সমাজের সাথে মুসলিম শব্দের যোগটাও ছিল সে রকমই। বরং মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, কুপ্রথা কিংবা অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের দূরীকরণার্থে সেখানে কাজ হত বলে শব্দটাও হয়ে পড়েছিল প্রাসঙ্গিক। ‘শিখা’ ছিল তাদের পত্রিকার নাম। শিখা তো আগুনের। আর আগুন দিয়ে সব কিছু পুড়িয়ে করে দেয়া যায় ছারখার। এ জন্য নামটাও ছিল প্রতীকী ব্যঞ্জনাময়। পত্রিকাটির মলাটে লেখা থাকত জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব। একটা খুব সাধারণ উদাহরণ দিয়েই এই উক্তির তাৎপর্য বোঝা যেতে পারে। যেমন, এক সময় এবং এখনও বাঙালী মুসলমানেরা পানি শব্দ ব্যবহার করত। আর হিন্দুরা করে জল। হিন্দুরা এটা করছে বলে মুসলমানদের ওটা করতে হবে—ঘটনাটা ছিল এই রকম। এখন উত্তর প্রদেশের হিন্দুরাও সেখানকার মুসলমানদের সাথে কোন পার্থক্য না করে সমানে পানি বলে যাচ্ছে, সে খবরটাও ছিলনা জানা। অনেক সম্বোধনের বেলাতেও তাই ঘটেছে । ভাবী-বৌদি, কাকা-চাচা—এ রকম আর কি?

৪.১. যৌক্তিক ভাবে, বোধ করি, এটা মেনে নেয়া যেতে পারে যে, বাঙালী মনের পরিপূর্ণতা আসতে থাকে ভারত বিভক্ত হয়ে গঠিত ধর্মীয় রাষ্ট্র পকিস্তানের পূর্ববঙ্গ প্রদেশের অধিবাসী হবার পর থেকে। দালিলিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমানদের বসবাসের জন্য। কিন্তু রাষ্ট্র যে বিশেষ কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়, জিন্নাহ সাহেব এটা ভাল করেই জানতেন। এ জন্যই তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই ঘোষণা দেন, নব গঠিত এ রাষ্ট্রের কেউ-ই আর হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ইত্যাদি নয়, সবাই পকিস্তানি। কেন না, এটাই সত্য যে, একটি দেশ পরিচালনার জন্য জাতিত্বের একত্ব বোধ, ইংরেজীতে যেটা বলা হয়, ফিলিং অব ওয়াননেস—টাই বেশ জরুরি। তাই ধর্মের নামে সেই দেশের জনগোষ্ঠীকে যদি আলাদা করে ফেলা হয়, তবে তো আর তা সম্ভব নয়। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত দেশের রাষ্ট্রভাষার জন্য তিনি জেনেশুনেই যে কাজটি করলেন, তা হল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে। সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ নয়, তবে সংসদীয় গণতন্ত্র হল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। নব গঠিত দেশে বাঙালী মুসলমানেরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলা তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু তার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণাটা ছিল আধিপত্যমূলক। উর্দু ছিল উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের ভাষা। তখন তাদেরকেই মনে করা হত ভারতবর্ষে অন্যান্য মুসলমানদের প্রতিনিধি। সে কারণে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল সবার আদর্শ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে বাঙালী মুসলমানের মুসলমানত্বকেও করে তোলা হয়েছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। আর বিষয়টা যে কত সত্য, তা তো বোঝা যায় একুশে ফেব্র“য়ারির বিস্ফোরণের সময়। এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে হিন্দুদের দ্বারা-এটাই সরকারি প্রচারণা। যাদের এ বিষয়ে সন্দেহ আছে, তারা সে সময় পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন সাহেব প্রাদেশিক পরিষদে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা পড়ে দেখতে পারেন। ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে উর্দুর সাথে বাংলার সাংবিধানিক স্বীকৃতি মিললেও শুধু ভাষা কেন, ভাষা তো আছেই, এ ছাড়াও, প্রশাসনিক, সামরিক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গবাসীর স্থান ছিল না আনুপাতিক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেও তাকে স্বাভাবিক গতিতে বিবর্তিত হতে না দিয়ে কৃত্রিম ভাবে আরবি-উর্দু-ফারসি  মিশিয়ে চেষ্টা চলে কিম্ভূতকিমাকার এক রূপ দেবার। চেষ্টা চলে রবীন্দ্র সাহিত্য নিষিদ্ধ করার। নজরুল সাহিত্যের যে অংশে ভারতীয় পৌরাণিক উপাদান রয়েছে, সবক আসে সেগুলি বাদ দেবার। অথচ পুরাণ এমন একটা জিনিস, তার উৎস যেটাই থাকুক না কেন, পরবর্তী কালে, তা পুনর্ব্যাখ্যাত হয়। ধর্মীয় উপাদানও আর ধর্মীয় থাকে না। নজরুলেও কিন্তু তাই হয়েছে। শুধু একটা উদাহরণই দেই। তিনি যে আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা লিখে জেল খাটলেন, তা কি কোন ধর্মীয় বিষয়? না কি বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্তির আবাহন জানাতে। দেবী দুর্গার উপস্থাপনা তো প্রতীকী। কি সুন্দর এই লাইনগুলো :

বৃথাই গেল সিরাজ টিপু মীর কাসিমের প্রাণ বলিদান

চণ্ডী নিলি যোগমায়া রূপ বলল সবাই বিধির বিধান

হঠাৎ কখন উঠল ক্ষেপে উঠল ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসির রাণী

ক্ষ্যাপা মেয়ের অভিমানেও এলি না তুই মা ভবানী।

এখন কথা হল, হিন্দু ধর্ম প্রচারের জন্য কি তার কারাবাস হয়েছিল? ধর্মকে মেলাতে গেলে  কি কবিতা লেখা যায়? সাহিত্য সৃষ্টি হয়?

এ প্রসঙ্গে আরও যেটা বড় কথা, অর্থনৈতিক শোষণের লীলভূমিতে পরিণত হয় এই অঞ্চল। সব কিছু মিলিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে জাতিগত নিপীড়ন ছাড়া অন্য কোনভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। এই জাতিগত নিপীড়নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের বাঙালী ছাড়া আর কিছু ভাবার উপায় থাকে না বাঙালী মুসলমানের। এর ফলে অসাম্প্রাদায়িক চেতনার অনির্বাণ শিখা প্রজ্জ্বলিত হয় তাদের মনে। মুসলিম পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করা মুসলিম লীগ বিরোধী দল আওয়ামী লীগও এ কারণেই ঝেড়ে ফেলে তার ধর্মীয় পরিচয়।

৪.২. বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রথম পরীক্ষা হয় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার সাত বছরের মাথায় সেটাই ছিল নির্বাচন হিসেবেও প্রথম। শুরু থেকেই ক্ষমতায় ছিল মুসলিম লীগ। এই নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তাদের। ভরাডুবি তো ভরাডুবি—শুধু ভরাডুবি বললে বোধ করি, যথেষ্ট হয় না। আওয়ামী লীগ, কৃষক-প্রজা পার্টিসহ নানা দল নিয়ে গঠিত নির্বাচনী জোট যুক্তফ্রণ্টের নির্বাচনী মেনিফেষ্ট ছিল ২১-দফা। এর দফাগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে বাঙালীদের আশা-আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটানো হয়েছিল। দেশের শিক্ষিত মানুষ আর কজন? বাকী সবই তো গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করা গড় হিসেবে নিরক্ষর শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। ভোটার হিসেবে তাদের অনুপাত ন্যূন্যাধিক আশি পার্সেন্ট বটেই। তারাই ভোট দিয়ে জিতিয়েছিল যুক্তফ্রন্টকে। তাদের এই সমর্থনকে আমি মনে করি বাঙালী মনের প্রথম রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।

আর হবেই বা না কেন? গ্রামের সরল সাধারণ মানুষ। তারা তো, আগে যে বলেছি, অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন অশিক্ষিত— নানা ফন্দিফিকিরে ঘোরা মানুষের কথা, তাদের মত তো নয়। মুসলমান হলেও আবহমান কাল ধরে বসবাস করে আসছে তাদেরই মত, যারা মুসলমান নয়, কিন্তু স্বসমাজেই তারা অধঃপতিত-অস্পৃশ্য। নিয়তি তো উভয়েরই এক। সুখে দুখে কাঁধ মিলিয়েছে একই সাথে। পালা-পার্বনে— যাত্রা-কবি গানের আসরে কাটিয়েছে মুগ্ধ রাত। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে হাজির হয়েছে কখনও পীর-মুর্শিদের মাজারে। কখনও দ্বারস্থ হয়েছে সাধু-সন্ন্যাসীর আখড়ার। রোগে-মহামারিতে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছে ওলা বিবি—শীতলা দেবীকে। হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তো প্রথম হয় কলিকাতাতে। সম্ভবত ১৯২৬ সালে। দেশবিভাগের আগে পরেও হয়েছে। কিন্তু ছিল প্রধানত শহরকেন্দ্রিক। সাক্ষ্যপ্রমাণের কোন ধার না ধরেই বলা যায়, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্ম ব্যবহার শিক্ষিত মানুষেরাই তা করেছে। কিন্তু গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ, হিন্দু কী মুসলমান, তাদেরকে বানানো হয়েছে বলির পাঁঠা। তাই বলে তারা ধর্ম যে পালন করে নি তা নয়। মসজিদে আজান হয়েছে। মন্দিরে বেজেছে কাঁসর ঘণ্টা। এটা আমার-ওটা তোমার। ঝগড়া বিবাদের কি আছে? কাজেই এটা ভেবে নেয়া অসঙ্গত নয় যে, ধর্মীয় বিভাজনকে আলাদা গুরুত্ব না দিয়ে ভাষা-সংস্কৃতির এই বন্ধনটাই দেখা দিয়েছে বড় হয়ে। তারা মিলেছে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যা ধরে রাখে বাঙালীত্বকে। কাজেই, রাজনৈতিক ভাবে বিষয়টা যখন এসেছে, তারা কোন ভুল করে নি। ১৯৫৭ সালে যে কাগমারী সম্মেলন হয়, সেখানেও প্রতিধ্বনিত হয় অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা গঠনের সুর।

এই রকমই ঐক্যমত অবিচ্ছেদ্য হয় ১৯৭১ সালের নির্বাচনের সময়। তত দিনে তো গঙ্গা-যমুনা দিয়ে গড়িয়ে গেছে অনেক জল। দেশে সামরিক শাসন এসেছে। কেড়ে নেয়া হয়েছে সার্বজনীন ভোটাধিকার। তত দিনে প্রদেশের নাম দেয়া হয়েছে পূর্ব পাকিস্তান। আন্দোলন-সংগ্রাম-আত্মদান—বুঝি তার শেষ নাই! ঘটে গেছে গণঅভ্যূত্থান। এ রকম একটা অগ্নিগর্ভ পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয় ঐ নির্বাচন। সেটা আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার তেইশ বছর পর সারা দেশব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এতে আওয়ামী লীগ ঐ যুক্তফ্রন্টের মতই অভূতপূর্ব সফলতা নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই নির্বাচনে তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো ছিল ৬-দফা। পাকিস্তানি শোষণ থেকে বাঙালীদের বাঁচানোর দাবী সম্বলিত ইশতেহার।

৬-দফা দাবীতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে ফেডারেশন। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে তার প্রশাসন। আইনসভাসমূহ হবে সার্বভৌম। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে— প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক মুদ্রা চালু করতে হবে। একই মুদ্রা থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করা যাবে না। সকল প্রকার ট্যাক্স ও খাজনা ধার্যের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ের এখতিয়ার আঞ্চলিক সরকারের হাত থাকবে। এমন কি বিদেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তি, ট্রেড মিশন স্থাপন ও আমদানী-রপ্তানীর অধিকারও হবে আঞ্চলিক সরকারের। বাংলাদেশের জন্য মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি রক্ষী বাহিনী গঠন করা হবে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার কথাটিও বলা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হল, ৬-দফা বাস্তবায়িত হলে কী হত? পাকিস্তান কী থাকত? না কি পর্যায়ক্রমে সাংবিধানিকভাবেই ভেঙে বাংলাদেশ আলাদা হয়ে যেত? আওয়ামী লীগ তো আন্দোলন করেছিল ৬-দফা দাবীর জন্য। ভোটও চেয়েছিল। জিতেও গিয়েছিল। নির্বাচন করা তো ক্ষমতাতেই যাবার জন্য। জেতা পার্টিরই তো যাবার কথা ক্ষমতায়। পাকিস্তানি শাসকেরা প্রথম থেকেই এই দাবীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে করেছিল অভিহিত। ক্ষমতা হস্তান্তর না করারও কারণ ছিল এটিই। তা হলে যে পাকিস্তান থাকবে না। বন্ধ হয়ে যাবে তাদের শোষণ। এ জন্য বাঙালীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল যুদ্ধ। বলা হয়েছিল হিন্দুদের ষড়যন্ত্র। রূপ দিয়েছিল ধর্মীয় যুদ্ধে। বার বার বলা হচ্ছিল এ যুদ্ধ তাদের ইসলাম বাঁচানোর। মুসলমান হয়েও মুসলমান মারার জন্য শুরু করেছিল গণহত্যা। আর তাদের এই অন্যায় যুদ্ধকে প্রতিরোধে গিয়েই শুরু হয়েছিল বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ। আর এই মুক্তিযুদ্ধকে যদি বাঙালী মনের ক্লাইম্যাক্স বলি, তবে কি কারও আপত্তি আছে?

৪.৩. জাতিত্বের সাথে ধর্মের কোন বিরোধ নেই। এক জন মানুষ তার আধ্যাত্মিক মুক্তির জন্য, ইহলৌকিক জীবনের কল্যাণের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেই পারে। পবিত্রতা ও শুদ্ধতার জন্য মনোঃসংযোগ তৈরী করতে পরতে পারে নামাজ। সংযমের জন্য রাখতে পারে রোযা। ধর্ম তো আর তাকে চুরি করতে বলছে না, মানুষ খুন করতে পাঠাচ্ছে না, মিথ্যা কথা বলতেও করছে না উৎসাহিত। অন্যান্য ধর্মের বিষয়গুলিও একই রকম। কেউ মন্দিরে যাচ্ছে, কেউ গীর্জায়, কেউ প্যাগোডাতে। এভাবেই তারা পরিচর্যা করছে মানবিক গুণগুলির। কিন্তু জাতিত্বের বিষয়টি যখন আসছে, তখন তারা মিলে যাচ্ছে একই সাথে। যেমন বর্ষবরণ। বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের লোকেরা এসে যোগ দিচ্ছে এই চিরায়ত উৎসবে। ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলিও তাই। বসন্তবরণ কিংবা বর্ষা মঙ্গল কিংবা পৌষ মেলা। জীবিকাকেন্দ্রিক উৎসব সম্পর্কেও বলা যায় ঐ একই কথা। যেমন নবান্ন কিংবা হালখাতা। জাতীয় জীবনে যারা মনীষার দীপ্তি ছড়িয়েছেন, কবি-লেখকেরা তো আছেনই, জাতীয় জীবনের সব গুরুত্বপূর্র্ণ দিন—এগুলিও পালিত হচ্ছে সার্বজনীনভাবে। ধর্মীয় উৎসবগুলিও পরিণত হয়ে গেছে সামাজিক মিলন কেন্দ্রে। বাঙালী মুসলমানদের উৎসব বলতে আগে তো ছিল দুটো ঈদ। আর হিন্দুদের পূজা। ঈদে তাই হিন্দুরা দাওয়াত পাচ্ছে। মুসলমানেরা পূজাতে নিমন্ত্রণ। এখন কথা হল, হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, মানুষ তো মিলতে চায়, আনন্দকে নিতে চায় ভাগ করে। উৎসব না হলে তো আর তা হয় না। আবার কথায় আছে, হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পার্বণ। হতে পারে, হিন্দুদের এত পার্বণ দেখে বাঙালী মুসলমানেরাও ধর্মীয় বিশেষ বিশেষ দিনে শুরু করেছিল উৎসব আয়োজনের। এভাবে শবে বরাত, শবে কদর, আখেরি-চাহার সম্বা, ঈদে মিলাদুন্নবি কিংবা জুমাতুল-বিদাও সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে। মিলাদ তো আছেই। তারপর বিয়ের অনুষ্ঠান? একবার ছেলেকে, একবার মেয়েকে আশীর্বাদ, একবার মেয়ের গায়ে হলুদ, একবার ছেলের গায়ে হলুদ। তারপর মেয়ের বাড়ীতে বিবাহ—তার পর ছেলের বাড়ীতে বৌভাত। গুণে দেখুন, মোট ক’টা হল? এসব বলছি এজন্যই যে একটি উৎসবমুখর জাতির জীবনে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির ক্ষেত্র নিরুপদ্রব হবারই কথা।

ধর্মের থাকে অনুশাসন। জাতির থাকে মানস সম্পদ। জাতিত্বের সাথে তখনই বিরোধ বাধে, যখন ধর্মকে উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণ কিংবা আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই ধরনের প্রক্রিয়াকেই, বলা হয়, সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের জন্য নানাভাবে চেষ্টা চলে— রাজনৈতিক প্লাটফরম বানানো হয়। তবে সাধারণভাবে বাঙালী মুসলমান, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর, এ দ্বারা আচ্ছন্ন হয় নি বলেই দেখা যাচ্ছে। কেন না, ধর্মীয় দলগুলি আলাদাভাবে, এখনও, অন্তত জন সমর্থন পেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করতে পারে নি। এবং এটাও বোধ করি খুবই সত্য যে মুসলিম লীগ ধর্মের কথা বলেছে বটে, কিন্তু তার নেতারা কতটা সেকুলার ছিলেন, তা তো জিন্নাহ সাহেবকে দেখলেই বোঝা যায়। আর তার চেয়েও যেটা বড় কথা, তা হল, সব কিছুতেই সময়ের কিছু দাবী থাকে—ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থাকে—সেটাকে কখনও সরলরেখায় বিচার করা চলে না। আর এগুলোতো বস্তুগত চাওয়া না চাওয়ার ব্যাপার। কিন্তু যেটা জাতির মানস সম্পদ—তার শিল্প, তার সাহিত্য, তার সঙ্গীত, তার দর্শন, তার চিন্তন—সেটা তো জড়িয়ে থাকে অস্তিত্বের সাথে। সম্প্রসারিত করতে থাকে অস্তিত্বকেই। হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক—সব বাঙালীর জীবনকেই ঘিরে রেখেছে এই মানসসম্পদ।

৪.৪. আঘাত রবীন্দ্রনাথের ওপরও এসেছে। তার জন্মশতবার্ষিকী পালনের ভেতর দিয়ে হয়েছে বাঙালীরও নবজন্ম। আর তার সার্ধশত জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়েছে নিজেদেরকে নতুন করে চেনার জন্য। আঘাত নজরুলের ওপরও এসেছে। তার স্বধর্মেরই এক দল মানুষ, তাকে বানিয়েছিল কাফের। অন্য প্রেক্ষাপটেও এই কাফের শব্দটি এক শ্রেণীর মওলানা-মৌলভীদের দ্বারা কম ব্যবহৃত হয় নি। সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সিপাহী বিদ্রোহের অবসানের পর ইংরেজ সরকার সৈয়দ আহমদ খানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সেই রিপোর্ট মোতাবেক যারা প্রকৃত মুসলমান, তারা কেউ-ই এই বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিল না। অধিকন্তু দিল্লির শেষ মুঘল স¤্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ, যাকে সিপাহীরা বরণ করেছিল নেতৃপদে, তাঁকেও আখ্যা দেয়া হয়েছিল কাফের। নজরুলকেও ধর্মান্ধ বাঙালী মুসলমানরা যাই বলুক, তিনিও প্রতিনিয়ত বাঙালী চেতনাকে রেখেছেন প্রজ্জ্বলিত করে। তাঁর এই প্রভাবের বিষয়টা স্পষ্ট হতে পারে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে লেখা, লেখা এই কবিতাটির কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে, তিনি তখন নির্বাক :

তোমার মৌন মুখের রেখায় এখনো নেভেনি ঝড়ের আবেগ

চলার পথের সর্পিল বাঁকে তাই ফিরে পাই দৃঢ় গতিবেগ।

তাই ফিরে পাই মনের আকাশে চেতনার গাঢ় নতুন প্রভাত

নয়া সড়কের রোমাঞ্চ মাখা আমাদের চোখে মুক্তির স্বাদ।

                নজরুল : চৌধুরী ওসমান।

নজরুলের এই কথাগুলোও মনে না রাখার কারণ নেই :

‘বাঙালীকে, বাঙালীর ছেলেেেময়েকে ছোট বেলা থেকে শুধু এই কথা শেখাও :

                এই পবিত্র বাংলাদেশ

                                বাঙালীর—আমাদের

                দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

                তাড়াব আমরা করি না ভয়

                যত পরদেশী দস্যু ডাকাত

                ‘রামাদের গামাদের।’

বাঙলা বাঙালীর হোক। বাঙলার জয় হোক। বাঙালীর জয় হোক।’

                (নবযুগ : ৩রা বৈশাখ, ১৩৪৯)।

এ প্রসঙ্গে আরও দুজন মনীষীর কথা উল্লেখ করতে চাই, তাঁরা হলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আর মুহম্মদ এনামুল হক। প্রথম জন এ রকম একটি কথা বলেছিলেন যে, আমরা ধুতিই পরি আর লুঙ্গিই পরি, টিকিই রাখি আর দাড়িই রাখি, আমাদের চেহারায় বাঙালীত্বকে অস্বীকার করার উপায় নাই। আর দ্বিতীয়জনও নিয়ে এসেছিলেন অকাট্য যুক্তি। তা হল পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মুসলমানেরা কথা বলে তাদের মাতৃভাষাতেই। সেটা কোন ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে নি। তেমনই ভাবে বাংলাও বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা। এটাকেও অনৈসলামিক বলার কোন যুক্তি নাই। আসলে উদাহরণ বেশি বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করি না। কেন না, বাঙালী মুসলমানের সৃজনশীল মানুষেরা তাদের রচনায়, গানে কিংবা অন্যান্য শিল্পকর্মে প্রতি নিয়তই দেশের প্রতি অনুরাগের বাণী ফুটিয়ে তুলছেন জাতির প্রতি তাদের কমিটমেণ্টের বিষয়টি নিয়ে আসছেন। আর এভাবেই তারা বিস্তার ঘটাচ্ছেন মানস সম্পদের, যাকে যক্ষের মত আগলে রাখছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল বাঙালী। তাকে ঘিরে পরিবৃদ্ধির সুবাতাসও জড়িয়ে নিচ্ছেন শরীরে।

৫. এবার একটি আশঙ্কার কথা বলি। বিশ্বপুঁজিই হোক আর সা¤্রাজ্যবাদী পুঁজিই হোক কিংবা নয়া উপনিবেশবাদী পুঁজি বলে তাকে নতুন করে আখ্যা দেই, পুঁজি আসলে পুঁজিই। নয়া উপনিবেশবাদ একটি নতুন মোড়ক। বাস্তবত এই নয়া উপনিবেশবাদকে না দেখার ভান করে উত্তর ঔপনিবেশিক বলে অনেকে স্ফূর্তি পেতে চান। শিল্প-সাহিত্যে এই ব্যাপারগুলি বেশ আরোপিত হচ্ছে। নানারকম তত্ত্বেরও আমদানি করা হচ্ছে। আগের সব কিছু ভেঙেচুরে খান খান করে দেয়ার উচ্চকিত ঘোষণাও আসছে। নতুন নতুন পরিভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে সে জন্য। যেন ও সব জিনিস পূর্বে আর কেউ ভাঙেন নি। তবে স্বস্তির কথা যেটা, তা হল, জনজীবনের মূলধারার সাথে আগেও যেমন তার যোগ ছিল না, তেমনি স্বাভাবিক নিয়মেই তা হবে না। কিন্তু সমস্যাটা তৈরী হয়েছে অন্য জায়গায়। বর্তমানে যে পুঁজি শাসন করছে, তার সিংহভাগ দখল করে আছে মারণাস্ত্রের উৎপাদন। ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার জীবন যাপনের। আর অস্ত্রের ব্যবহার জীবন হননের। আর এই হনন প্রক্রিয়াটা বাজারজাত করার জন্য হানাহানি সৃষ্টি করাটা আবশ্যক। বিশ্বপুঁজির মালিকেরা এখন তাই করছে। সেজন্য ধর্মই হয়েছে প্রধান উপাদান। তবে আগে দেখেছি ধর্মযুদ্ধ হত মুসলমান-খ্রিস্টানে। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গাও দেখে গেছে মধ্যযুগীয়ভাবে। কিন্তু এখন একবার তাকান তো পাকিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে—আফ্রিকার দিকে। কী হচ্ছে সেখানকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলিতে? মুসলমানেরা কি আর মুসলমান আছে? হয়ে গেছে সুন্নী—হয়ে গেছে শিয়া। এ রকম আরও ভাগ যে নেই, তাও তো নয়। স্বধর্মের লোকেরাই মারছে স্বধর্মীকে। বারুদের ধোঁয়ায় ভরছে আকাশ। নীচের পৃথিবীতে মানুষের লাশ। কেবল একটি নয়—দুটি নয়—গুণলে, হয়ত, একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে। কিন্তু মানবতার এই ভয়াবহ পতন কি কেবল সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে?

এবার একটি আশঙ্কার কথা বলি। আশঙ্কা যে কারণে, তা হল, বাংলাদেশের বাঙালী মুসলমানেরাও যে এর টার্গেট হবে না, কে জানে? এ দেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় দলও যেমন রয়েছে, তেমনই অনেক গুপ্ত সংগঠনের কার্যকলাপও থেমে নেই। অর্থ প্রবাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। সুতরাং মুসলমান হয়েও যে উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনা অর্জন করে তারা বাঙালী হয়েছে, সেটাকে ধরে রাখাটা জরুরি নয় কি? আর ধর্মই বলি আর জাতিত্বই বলি, মানুষের কল্যাণের দিকটিই সেখানে প্রধান বিবেচ্য। সুতরাং এ সব বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনই বিকল্পহীন কাজ। কেন না, স্বাস্থ্য নয়, ব্যাধিই সংক্রামক।*

*তথ্যগত কোন ভুল থাকলে, তা সংশোধনযোগ্য।

বাঙালি মুসলমান সমাজ : ইতিহাসের ঘুমভাঙা

হাবিব আর রহমান

বাঙালি মুসলমান সমাজের, বিশেষত জাগরণ-পর্ব সম্পর্কে কথা বলার আগে এই সমাজের ইতিহাস প্রক্রিয়ার ইতিহাস সম্বন্ধে মোটামুটি একটা পরিষ্কার ধারণা করে নিলে ভালো হয়। কারা বাঙালি মুসলমান? কী তাদের জন্মগত উৎস? ১৮৭২ সালে সরকারিভাবে বাংলায় প্রথম লোকগণনা হলে দেখা যায় মুসলমানের সংখ্যা বিপুল, শতকরা ৪৮ ভাগ। এই পরিসংখ্যান এতদিনকার ধারণা উল্টে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয় এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্ক। সে-সবের বিবরণ দেওয়ার অবকাশ এখানে নেই। আপাতত এটুকু বললে চলবে যে কেউ বলেন এরা নি¤œশ্রেণির হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত, কারো মতে তলোয়ারের ভয়ে এরা মুসলমান হয়েছে, আবার এই দুই মতে অস্বীকার করে কেউ অভিমত দেন যে এরা বহিরাগত মুসলমানের বংশধর, অন্তত অধিকাংশ। এগুলোর মুসলিম-শাসনের কেন্দ্রস্থলগুলোতে—আগ্রা, দিল্লি, এলাহাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হতেন। তা না হয়ে গরিষ্ঠ হলেন বাংলায়, তাও আবার পূর্ব বাংলায় অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনে নতুন নতুন ভূমি জেগে-ওঠা, খুলনা-বরিশাল জেলার নি¤œাঞ্চলে বন কেটে বসত ও আবাদ এর একটা বড় কারণ। সপ্তদশ শতকে লেখা কৃষ্ণরাম দাসের রায় মঙ্গল কাব্যে এর চমৎকৃত হওয়ার মতো বিবরণ আছে।

নানা দিক বিবেচনা করে যুক্তিসঙ্গতভাবে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় যে বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিম্নবর্ণের হিন্দু ও অবক্ষয়িত বৌদ্ধসমাজ থেকে ধর্মান্তরিত। ভারতে উচ্ছেদ হওয়ার পর অবক্ষয়িত এক বৌদ্ধ সম্প্রদায় পূর্বাঞ্চলের বাংলা এলাকায় বিদ্যমান ছিলেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ মত প্রকাশ করেছেন। বর্ণহিন্দু যারা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। মুসলমান সমাজের বাকি অংশ বহির্বাংলা ও বহির্ভারত থেকে আগত মুসলমানদের বংশধর। মুসলিম শাসনের অবসানের অভিঘাতে প্রশাসনিক, সামরিক ও অন্যান্য বৃত্তিজীবী বহির্বাংলা থেকে আগত মুসলমানদের একটা অংশ বাংলা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। যারা এখানে বসতি গড়েছিলেন ও অন্য কোথাও যাওয়ার সাধ্য যাদের ছিল না, তারা এদেশেই রয়ে গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখনীয়। নিম্নবিত্ত যারা এসেছিলেন, যেমন সাধারণ সৈন্য এবং অন্যরাও অনেকে পরিবার-পরিজন বিশেষ করে স্ত্রী নিয়ে ভারতে বা বাংলায় আসেন নি। এরা স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এদেশে বসতি গড়েছিলেন। প্রচলিত ধারায় এদের সন্ততিরা পিতার বংশগত বিদেশি পদবীতে পরিচিত হয়েছেন। এদেরও শরাফতির ভিত্তি পিতার বৈদেশিক সূত্র। মুহম্মদ এনামুল হক তাঁর মুসলিম বাংলা সাহিত্য  গ্রন্থে লিখেছেন এরা দুই/তিন পুরুষে বাঙালি ব’নে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন কি না তা যথাস্থানে বলা যাবে।

সমাজতান্ত্রিক সাধারণ নিয়মে কী না বলতে পারব না, কিন্তু বাংলায় যা ঘটেছিল বিত্ত ও এতজ্জনিত কারণে সামাজিক স্তরভেদ হেতু দেশীয় অনেক মুসলমান বিদেশি পদবি গ্রহণ করেছিলেন। বাংলা ও ফারসিতে এ সম্পর্কিত কিছু প্রবাদ-প্রবচন পাওয়া গেছে। দুটো বাংলা প্রবাদ আমরা উল্লেখ করছি—প্রথমটি পদ্য, দ্বিতীয়টি গদ্য।

১. আগে ছিল উল্লা-তুল্লা

     মাঝে হলো উদ্দিন

     তলার মামুদ উপরে যায়

     কপাল ফেরে যদ্দিন।

২. গত বছর আমি জোলা ছিলাম, এ বছর শেখ হয়েছি, ফসলের ভালো দাম পেলে আসছে বছর আমি সৈয়দ হবো। শরাফতির বড়াই যারা করতেন, এরা তাদেরই দলের।

বাংলায় ব্রিটিশ-অধিকারের ফলে মুসলমানেরা শোচনীয় দুর্দশায় পতিত হন বলে আমাদের শিক্ষিত সমাজে এখনো সাধারণভাবে ধারণা প্রচলিত আছে। ইতিহাসের অনেক বইতেও তা লেখা হয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে পতিত হিন্দুরাও হয়েছিলেন। তফাত হচ্ছে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে হিন্দুরা নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিচ্ছিলেন, যা মুসলমানরা করেন নি। তাছাড়া এ তথ্যও মনে রাখা দরকার যে নবাবি আমলে জমিদার, ব্যবসায়ী, মহাজন, প্রশাসনিক বিভিন্ন পদাধিকারী সিংহভাগ ছিলেন হিন্দু। কেবল বিচার ও সৈন্যবিভাগে মুসলমানদের প্রাধান্য ছিল। তাও বড় বড় পদের অধিকারী ছিলেন অবাঙালি মুসলমান। শিক্ষার ক্ষেত্রেও হিন্দুরা অগ্রগামী ছিলেন, এমনকি আরবি-ফারসি শিক্ষাতেও। মোটকথা নবাবি আমলেই হিন্দু সমাজে ক্ষুদ্রাকারে হলেও কিন্তু দৃশ্যমানভাবে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। ইংরেজ আমলে এরা দ্রুত নতুন শাসনব্যবস্থা ও ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারি কিনতে পেরেছিলেন তারাই যাদের হাতে নগদ টাকা ছিল। ওই সৌভাগ্যের অধিকারী বেশিরভাগ যে হিন্দুই হবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পরবর্তী আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি তথ্য স্মরণ রাখতে বলি। বিশ শতকের গোড়ার দিককার সেন্সাস রিপোর্টেও দেখা যাচ্ছে মুসলিম জনসংখ্যার ৮৫% ভাগ গ্রামের বাসিন্দা এবং মুখ্যত শ্রমজীবী। এদের বেশির ভাগই কৃষক ও তাঁতি। শাসক পরিবর্তনে প্রথম দিকে এদের জীবনযাত্রায় ইতর-বিশেষ তেমন ঘটেনি, তবে তা ঘটতে থাকে ক্রমশ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (এর শিকার হিন্দু কৃষকও), ১৮২৮ সালে লাখেরাজ সম্পত্তির বাজেয়াপ্তি, বিদেশি বস্ত্রের প্রতিযোগিতায় দেশীয় তাঁতশিল্পের প্রায় ধ্বংস হওয়া (তাঁতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মুসলমান), ১৮৩৭ সাল থেকে অফিস-আদালতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার বিধিবদ্ধ হওয়ায় বিচার বিভাগ ও তৎসংশ্লিষ্ট পদ থেকে ইংরেজি না-জানা মুসলমানদের বেকার হয়ে যাওয়া প্রভৃতি ঘটনা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলমান যারা ছিলেন তাদেরও আর্থিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটায়।

একটি বহুল প্রচলিত মত এই যে ইংরেজি শিক্ষায় অনীহা মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ। এটি সত্য কেবল স্বল্পসংখ্যক সেই মুসলমানদের জন্য যারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে এই শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করেননি। সে আমলে ইংরেজি শিক্ষা খুবই ব্যয়বহুল ছিল। কিন্তু এ-ও তো সত্য যে দরিদ্র হিন্দু সন্তান কাউকে কাউকে প্রতিকূলতার মধ্যেও ওই শিক্ষা লাভ করতে দেখা গেছে। আপাতত এ প্রসঙ্গ রেখে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। সত্য এই যে মুসলমান সমাজের সিংহভাগ অধঃপতিত আগে থেকেই ছিলেন। নতুন ব্যবস্থায় সেটা আরো পতনের দিকে গেছে।

তথ্য ও বিচার-বুদ্ধি সজাগ রেখে পুরো পরিস্থিতি অনুধাবন না করলে সত্যে পৌঁছানো যাবে না। মনে রাখতে হবে ১৮৩৭ পর্যন্ত ফারসি-জানা যে-সকল মুসলমান বিচার বিভাগের নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন তাদের অনেকেরই কি সন্তানকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না! যুক্তি হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবের কথা বলা হতে পারে। কিন্তু এমন তথ্য তো আমাদের হাতে রয়েছে যে প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজের তাগিদে হিন্দু সমাজের কেউ কেউ ভালো ইংরেজি শিখেছিলেন। সমর্থদের কথা বাদ দিয়েও  দরিদ্রের সন্তান কিংবা ব্যক্তি-প্রচেষ্টায় ইংরেজি শিখেছেন এমন দৃষ্টান্ত মুসলমান সমাজে দেখা যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে হিন্দু যা পারেন, মুসলমান তা পারেন না কেন? সমস্যাটা ঠিক কোথায়?

উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও সামাজিক ইতিহাসের দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালে প্রশ্নটির কিছু উত্তর মিলবে। এই সময়পর্বে হিন্দু সমাজ নানাভাবে নিজেদের নবচেতনায় নির্মাণ করে নিচ্ছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, সামাজিক বিভিন্ন আন্দোলন ইত্যাদি ক্ষেত্রে। যদি খানিকটা সীমিত অর্থেও ধরি তবু এই নবচেতনার উদ্ভাসনকে রেনেসাঁ বলতে কুণ্ঠা থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী মুসলমান সমাজে ঘটেছে ধর্মশুদ্ধি আন্দোলন—তরিকা-ই মুহাম্মদিয়া ও ফরায়েজি আন্দোলন। প্রথমটির উদ্ভব দিল্লিতে, দ্বিতীয়টির বাংলার ফরিদপুরে। দুটি আন্দোলনেরই লক্ষ্য এক—ইসলামের আদি বিশুদ্ধতায় ফিরে যাওয়া। বাংলা তথা ভারতে মুসলিম-জীবন থেকে অনৈসলামিক তথা হিন্দুয়ানি ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ দূর করে সেখানে ইসলামের খাঁটি ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল আন্দোলন দুটি। বাংলায়, বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল।

খুবই সঙ্গতভাবে বলা যায় এসব আন্দোলন অতীতে ফেরার প্রচেষ্টা, বর্তমান এদের ভাবনার মধ্যে ছিল না। রক্ষণশীলদের দৃষ্টিতে ব্রিটিশ-সৃষ্ট বর্তমানের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ইসলামের প্রতি শৈথিল্য দেখানো। বলা হতে লাগল মুসলমানদের দুর্দশার মূল কারণ ‘প্রকৃত’ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া। সেজন্য উন্নতি করতে হলে খুব দৃঢ়ভাবে ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে হবে। প্রথমদিকে আন্দোলন দুটির সাথে ব্রিটিশ-বিরোধী চেতনা সংশ্লিষ্ট ছিল না, কিন্তু পরে ঘটনাচক্রে ব্রিটিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর একটা সদর্থক ফল এই দাঁড়ায় যে ভারতীয় মুসলিম-মনে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনা জন্মলাভ করে। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর দুটি ধারণার জন্ম হয়। একটি হচ্ছে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা, যা দেশ ও ভাষাগত জাতীয়তাবাদী ধারণা সৃষ্টিতে বাধা দেয়। এ ব্যাপারে হিন্দু সমাজের দায়িত্বের কথা স্মরণে রেখেও ইতিহাসের বস্তুবাদী পাঠে মন্তব্যটি না করে উপায় নেই। অন্য চেতনাটি হচ্ছে আধুনিক জীবন চেতনা থেকে দূরে থাকা।

আনিসুজ্জামান, ওয়াকিল আহমদ প্রমুখ গবেষকের মতে বাঙালি মুসলমানের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না-করার মূল কারণ অনীহা বা বিরূপতা নয়, তাদের অর্থনৈতিক দূরবস্থা। মতটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলার সকল মুসলমানই কি এতটা দরিদ্র ছিলেন যে তাদের সন্তানদের ওই শিক্ষা দেওয়ার খরচ যোগানো সম্ভব ছিল না? সামর্থ্য যাদের ছিল তারাও কেন উদ্যোগী হন নি? দুটি কারণ ধারণা করা যায়। একটা, ইংরেজকে তার সবকিছুসহ ভালো চোখে না দেখা এবং অন্যটা, ‘বেদীন’ শিক্ষার পাপ-চেতনা। পাপ-চেতনা সৃষ্টিতে বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে আলেম-মৌলানা-মোল্লা শ্রেণির ভূমিকা যতটা ব্যাপক ছিল তার প্রমাণ সমকালীন পত্র-পত্রিকার পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। সুতরাং দারিদ্র্য যেমন ছিল, তেমনি অনীহাও ছিল, কিন্তু অনীহার চেয়ে বেশি ছিল বিরূপতা।

এই অবস্থার খুব ধীরে হলেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে সত্তরের দশকের পর থেকে। উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদের আলীগড় আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ-শাসনের সঙ্গে সহযোগিতা স্থাপন ও পাশ্চাত্য বিদ্যার্জনের প্রাণনা সৃষ্টি। বাংলাদেশের নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমির আলি মূলত স্যার সৈয়দের পথ অনুসরণ করে তাঁদের নিজের প্রদেশের মুসলিম সমাজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। এঁদের, বিশেষ করে আবদুল লতিফের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেও বলতে হবে সৈয়দ আহমদের মতো র‌্যাডিক্যাল তিনি ছিলেন না। মুসলমান সমাজকে তিনি ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন ওই শিক্ষার প্রাণ-চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার জন্য নয়, চাকরি-বাকরি পাওয়ার সুবিধা লাভের জন্য। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা বহমান রাখার তিনি পক্ষপাতি ছিলেন। নিজে যেমন বাংলা জানতেন না, তেমনি বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়ারও বিরোধী ছিলেন। তবে এই বিবেচনাটুকু তিনি করেছিলেন যে নিম্নশ্রেণির মুসলিম সন্তানকে বিদ্যালয়ে বাংলা শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে, তবে সে বাংলা হবে ‘মুসলমানি’ বাংলা। সৈয়দ আমির আলি মাদ্রাসা শিক্ষা সমর্থন করেন নি, কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনিও কিছু বলেন নি।

উল্লিখিত দুজনের প্রচেষ্টা এবং এই সময়ে বিশ্ব বাজারে পাটের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষকদের একাংশের হাতে নগদ অর্থের আগম পরিস্থিতি পাল্টে দিতে থাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের তালিকা থেকে দেখা যায় ১৮৮৫ সাল থেকে প্রেসিডেন্সি , হুগলি ও ঢাকা কলেজ-এর গ্রাজুয়েটদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ঠিক এই সময়ে কয়েকজন সমাজহিতৈষী মুসলিম সাহিত্যিককে কলকাতায় সমবেত হতে দেখা যায়। তাঁরা হলেন শেখ আবদুর রহিম, রেযাজ-আল-দীন মাশহাদী, মুন্সি রেয়াজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। শুধাকর নামের এক পত্রিকাকে জড়িত করে সাহিত্যের ইতিহাসকার এঁদের ‘সুধাকর দল’ নামে চিহ্নিত করেছেন। এঁরা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না বটে  কিন্তু নিজেদের সমাজের দূরবস্থা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এই সচেতনতাই তাঁদের কলকাতায় সমবেত করেছিল।

সুধাকর দলের নামের পরিচয় পত্রিকার নামের সঙ্গে যুক্ত হলেও দলটি একটি বিশেষ জীবন-দর্শনের ধারক বাহকও বটে। তাঁরা মনে করতেন অধঃপতিত মুসলমান সমাজকে পুনর্জীবিত করতে হলে মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই। ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের গৌরবান্বিত অতীত ইতিহাস নানাভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে সমকালীনদের সামনে তুলে ধরতে হবে। বোঝা যায় প্রচলিতভাবে সৃজনশীল রসসৃষ্টি অর্থে এঁরা সাহিত্যকে বোঝেননি, বুঝেছেন একটি বিশেষ অর্থে। সেটি হলো ধর্মীয় বীর-পুরুষদের কাহিনি রচনা ও ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যান। এক বলা হতে থাকে ইসলামি বা মুসলিম সাহিত্য বা মুসলমানের জাতীয় সাহিত্য। কেবল সেদিন নয়, আজও তা বলা হচ্ছে। তাও শুুধু বাংলাভাষী অঞ্চলে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে সমগ্র মুসলিম সমাজে। কিন্তু ইসলামি বা মুসলিম সাহিত্য বস্তুত কী, তা সেদিনও যেমন কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারেননি, আজও তেমনি পারছেন না।

এই মতানুসারীরা উপন্যাস, নাটক, গল্প রচনা সমর্থন করেন নি। এমনকি দু’একজন কবিতা লেখারও বিরোধিতা করেছেন। জনৈক নজির আহমদের বিবেচনায় উপন্যাস পড়া মাদকদ্রব্যের নেশার মতো ক্ষতিকর। আর ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতে উপন্যাস পড়া হচ্ছে গাঁজায় দম দিয়ে একটা গল্পের ¯্রােত বইয়ে দেওয়া, যা সমাজের জন্য অকল্যাণকর। অথচ হিন্দু রচিত ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ উপন্যাসের দাঁতভাঙা জবাব দিতে গিয়ে তিনি কিন্তু ওই কাজই করেছেন অর্থাৎ উপন্যাস লিখেছেন। নাটক-বিরোধীরাও ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টি দ্বারা চালিত হয়েছেন। অবশ্য তাদের বিরোধিতার আরেকটি কারণ এই যে মঞ্চে হিন্দুরচিত এমন নাটকের প্রদর্শন যাতে মুসলমানদের আহত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান ছিল। কবিতার বিরোধিতা করতে গিয়ে বলা হয়েছে কবিতার উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘বাতিল’ পথে আকর্ষণ করা; এর রচয়িতা একজন মিথ্যাবাদী, কামাসক্ত ও পাপাত্মা মানুষ মাত্র।

যাদের কথা বলা হলো, বোঝা যায়, তারা এক স্বতন্ত্র পথের অধিকারী। সে-পথের নিয়ন্ত্রক একান্তভাবে ধর্মীয় চেতনা। কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতি নয়—রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষা প্রভৃতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে এদের ভাবনা ওই চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ও চালিত। এরা স্বাতন্ত্র্যবাদী ও স্বাতন্ত্র্যপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। চেতনে-অবচেতনে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এরা পুনরুত্থানবাদী (জরারাধষরংঃ)। কিন্তু সাহিত্যে ও সমাজে এদের পাশাপাশি সমন্বয়বাদী একটি ধারাও ছিল। প্রথম গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেনের প্রথম জীবনের সাহিত্যকর্মে—বিষাদ-সিন্ধু, গাজি মিঞার বস্তানী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, জমীদার দর্পণ—এ এই ধারার প্রকাশ সুচিহ্নিত। তাঁর ‘গো-জীবন’ প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলমানদের গরুর মাংস খাওয়া ত্যাগ করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন। রক্ষণশীলরা তাঁর বক্তব্যের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে মুসলমানদের আবেগ উস্কে দিয়েছিলেন। ফলে সারা বাংলা ও আসামের মুসলিম প্রধান অঞ্চলে এ নিয়ে তুলকালাম হয়েছিল। লেখককে কাফের ও স্ত্রী তালাকের ফতোয়া দেওয়া হয়। মামলা-মোকদ্দমার পরিণামে এবং হয়ত আরও কিছু কারণে মশাররফ নিজের সমাজ-বৃত্তে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর যা তিনি রচনা করেছিলেন সেগুলো স্বাতন্ত্র্যবাদী ধারাতেই অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।

নারী মুক্তির অদম্য আকাক্সক্ষায় বিশ শতকের প্রথম দশকে কলকাতায় ও বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের। যৌক্তিকতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তিনি উন্মোচিত করতে থাকেন নারী সম্পর্কে শাস্ত্রীয় ও সামাজিক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির অযথার্থতাকে। নারী যোগ্য, কী অযোগ্য, তা প্রমাণের কোনো সুযোগ কি তাকে দেওয়া হয়েছে? ফলে এতদিনকার যা নিয়ম, তা-ই দেখা গেল পুরুষের কলমে। বলা হল সমাজের উন্নতি করা আর তাকে চাবকানো কি এক কথা? তবে স্বীকারও কিন্তু করা হলো সমাজের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে নারীরও এগিয়ে আসা দরকার। এদের সংখ্যা তখন নগণ্য, কিন্তু মনোভাবের পরিবর্তনটা সত্য। রোকেয়া উপলব্ধি করলেন, তাঁর মূল লক্ষ্য— মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা—বাস্তবায়িত করতে হলে সমাজের সঙ্গে আপোষ না করে উপায় নেই। লক্ষ্য সফল হলে তখন একজন রোকেয়ার স্থলে বহু রোকেয়ার জন্ম হবে। ফলে কলম নিয়ন্ত্রণ করতে হলো। রোকেয়া নিঃসন্দেহে তীক্ষè দূরদর্শী।

১৯১১ সালে কলকাতায় দুটো ঘটনা ঘটে, যা বাঙালি মুসলমানের জীবনে মাইল ফলকের মতো—সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের প্রতিষ্ঠা ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি স্থাপন। সমিতি মুসলমানদের প্রথম উল্লেখযোগ্য সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। তখনকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মূলধারায় প্রবাহিত থেকেই স্ব-সমাজের জাগরণ ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনবোধ থেকে স্বতন্ত্রভাবে এই সংগঠনটি গড়েছিলেন। মধ্য বয়স থেকে তাজা যুবক—নানা বয়সী ব্যক্তি এর জন্ম ও পুষ্টিদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্ত হবেন এবং যে-ইতিহাসের সবে খোঁয়াবি ভাঙতে শুরু করেছে তাকে কম-বেশি ধাক্কা মেরে জাগিয়ে তুলবেন, সেই সব কুশীলব তখন বঙ্গভূমিতে আবির্ভূত হয়ে গেছেন। এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট হচ্ছেন এস ওয়াজেদ আলি (১৮৯০-১৮৫১), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) প্রমুখ। এঁদের অনেকের চিন্তাচর্চা ও তা প্রকাশের সহযোগী হিসেবে যে-নামটি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য, তিনি মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন (১৮৮৮-১৯৯৪)।

বাঙালি মুসলমানের সম্পাদনায় ১৯১৮ সালে দুটি উচ্চাঙ্গের বিশুদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। একটি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির মুখপত্র ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা ও অন্যটি নাসিরউদ্দীনের মাসিক সওগাত। এর আগে স্বল্পস্থায়ী নবনূর (১৯০৩) ছাড়া মানসম্পন্ন সাহিত্য পত্রিকা দেখা যায় নি। সাহিত্য সমিতিকে নানাবিধ সমস্যার মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছিল। তার প্রমাণ রয়েছে সমিতির একটি মুখপত্র প্রকাশ করতে প্রায় আট বছর (১৯১১-১৯১৮) অপেক্ষা করার মধ্যে। পত্রিকাটিও তেমন বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে নি। সওগাত এর অবস্থাও ছিল প্রায় অনুরূপ। ১৯২৬ সালে নবপর্যায়ের সওগাত যে-পাঠকসমাদর পেয়েছিল প্রথম পর্যায়ে তা পাওয়া যায় নি। তার একটা কারণ অন্তত এই যে যাদের ধারালো নব্যচিন্তা ও সাহিত্যসৃষ্টি পাঠককে আকৃষ্ট করেছিল তাদের বয়স সে-সময় মোটামুটিভাবেও পরিণত হয় নি। এবং তাদের মধ্যে একাধিকজন এখনো কলকাতায় যান নি। তবুও সমিতি-পত্রিকা ও প্রথম পর্যায়ের সওগাত বাঙালি বিদ্বজনদের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

১৯২৬ সালে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসে আরেকটি মাইল ফলক— উজ্জ্বল ও কালান্তরের চিহ্নবাহী। কলকাতা নবপর্যায়ের সওগাত ও ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’—কে কেন্দ্র করে আর ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ সংগঠনের মাধ্যমে কল্যাণ পিপাসু মুসলিম তরুণদের প্রাণ-চঞ্চল অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে গেছে আগেই—কলকাতা ও ঢাকা দু’জায়গাতেই। তবে ঢাকা অপেক্ষাকৃত বেশি নজর কাড়ে, অন্তত দুটি কারণে। কলকাতা ততদিনে রাজধানীর গৌরব হারালেও সারা ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধিস্থানীয়; নব্যচিন্তার ধারক-বাহক ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান। অন্যদিকে ঢাকা একটি প্রান্তীয় শহর—এরকম অবহেলিত ও জৌলুসহীন। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি সবে তাকে জাতে তুলতে শুরু করেছে। মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাকে কেন্দ্র করে কেবল স্বপ্ন দেখতে লেগেছে। সেই স্বপ্ন অধ্যাপকদের চোখেও। সকলেই স্ব-সমাজের কল্যাণকাক্সক্ষী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বছর তিরিশেক বয়সী আবুল হুসেনের চরিত্রে উদ্যম ও সংগঠনী শক্তির একটা সম্মিলন ঘটেছিল। সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু হওয়ার আগের বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠন ‘আল-মামুন ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার অদ্যাবধি সর্বশ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক খলিফা আল মামুনের নামে ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য খুব সহজে অনুধাবন করা যায়। একই বছরের জুনে তাঁর উদ্দ্যোগে প্রকাশিত তরুণ পত্র নামাঙ্কিত পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকে ক্লাব ও পত্রিকা দুয়েরই চারিত্র্য উপলব্ধি করা যায়। সম্পাদকীয়তে বলা হয় : ‘মানুষের যথার্থ কল্যাণ হয় জ্ঞানে। কেহ কেহ বলিবেন ধর্মে। কিন্তু জ্ঞানহীন ধর্ম অর্থবিহীন। সুতরাং বলিব, মানুষের মুক্তি হয় জ্ঞানে।’ এ কেবল তরুণ পত্র বা আবুল হুসেনের কথা নয়, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনেরও মর্মবাণী। সাহিত্য-সমাজের বার্ষিক মুখপত্র শিখার প্রতিটি সংখ্যায় মুখবাণী হিসেবে মুুদ্রিত হতো এই কথাগুলো : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ উক্তিটির যৌক্তিক পরম্পরা লক্ষ্যণীয় : জ্ঞান—বুদ্ধি—মুক্তি। অর্থাৎ সর্বধিক গুরুত্ব রয়েছে জ্ঞানচর্চায়। জ্ঞানই শক্তি।

সম্পাদক হিসেবে অন্যের নাম থাকলেও মূলত আবুল হুসেনেরই উদ্যোগে ও অর্থায়নে কাছাকাছি সময়ে অভিযান ও জাগরণ নামে আরও দু’টি পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছিল। সবগুলো পত্রিকাই ছিল স্বল্পস্থায়ী কিন্তু দ্যুতিময়। উল্লেখ্য যে কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের যে সব লেখা ঢাকা ও কলকাতার রক্ষণশীল মুসলমানদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল ও সে কারণে তাঁদের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল সে-সব লেখা অভিযান ও জাগরণ-এ মুদ্রিত হয়েছিল। তরুণপত্রসহ এ দু’টি পত্রিকাও ছিল শিখার সহযোগী।

কলকাতার সওগাত¬ও ছিল প্রগতির ধ্বজাবাহী। শিখা-ও মুখবাণীতে যে— জীবনদর্শন উদ্ভাসিত তার সঙ্গে সওগাত-এর গৃহীত নীতির মৌলিক কোনো পার্থক্য ছিল না, যদিও এতে ঢাকার তরুণদের মতো ‘গরম গরম’ লেখার প্রকাশ দেখা যায় না। নব্যচিন্তায় উৎসাহী যে সকল তরুণ অন্য পত্রিকায় কাজ করতেন কিন্তু সেখানে তাদের অন্তরের কথা প্রকাশের সুযোগ ছিল না, তাঁরাও সন্ধ্যায় নিজেদের চাকরিগত দায়িত্ব সেরে সওগাত সাহিত্য মজলিসের আড্ডায় যোগ দিতেন। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আয়নুল হক, হাবীবুল্লাহ বাহার, কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ সাংবাদিক ও অন্য যাঁরা আসতেন তাঁরা সকলেই দৈন্যগ্রস্থ নিজেদের সম্প্রদায়ের মুক্তির আকাক্সক্ষায় উদগ্রীব ছিলেন। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘…প্রত্যহ সন্ধ্যা হইতে অনেক রাত পর্যন্ত যে কাজটি হইত, সেটা ছিল মুসলিম সমাজ সম্পর্কে বিপ্লবী চিন্তার আদান-প্রদান।’ তাঁর লেখা থেকে আরও জানা যায় যাচ্ছে তাঁদের মাথায় তখন এত চিন্তা ‘গজগজ’ করছে যে সম্পাদক নাসিরউদ্দীন তাঁদের জন্য সাপ্তাহিক সওগাত প্রকাশ করলেন—মুসলিম সম্পাদিত প্রথম সচিত্র সাপ্তাহিক।

মাসিক সওগাত—এর কথা অনেকের জানা থাকলেও সাপ্তাহিকের খবর খুব কম লোক জানেন। মাসিকেরই পরিপূরক এটি, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে— বিশেষত প্রগতিশীলতা ও রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্বজনিত ঘটনাচিত্র ধারণে সাপ্তাহিকটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৮ সালের ১১ মে প্রথম সংখ্যার প্রকাশ ঘটে। অচিরে পত্রিকাটি এতখানি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে প্রকাশের দিন অফিসের সামনে হকারদের ভিড় লেগে যেত।

১৯২৭ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত মোহাম্মদ পত্রিকারও প্রগতির ধারায় একটা ভূমিকা আছে। চরিত্র বিচারে পত্রিকাটি ছিল মধ্যপন্থী। মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য ইসলামের সঙ্গে আধুনিক পন্থার সমন্বয় সাধনকে তিনি বাঞ্ছিত ও সঠিক পথ বলে মনে করেন। প্রথম সংখ্যার ‘আত্ম-নিবেদন’—এ বর্মপন্থীদের লক্ষ্য করে তিনি বলেন—‘দ্বার খোল!’, আর আধুনিকপন্থীদের বলেন— ‘চোখ মেল!’

আকরাম খাঁ উপলব্ধি করেন এক শ্রেণির শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মওলানা মৌলবির (সওগাত-এ এদের বলা হতো মোল্লা) গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতা থেকে ইসলামকে বিচার-বুদ্ধির আলোয় না আনতে পারলে সমাজকে গতিশীল করা যাবে না। দেশ-কালের পরিবর্তিত অবস্থাকে তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন। সাধারণ মওলানার চেয়ে তাঁর পড়াশোনাও ব্যাপক ছিল। এর ফলে মোহাম্মাদী-তে ‘সমস্যা ও সমাধান’ নামে ধারাবাহিক নামে ব্যাঙ্কিং সুদ, ছবি আঁকা, গান গাওয়া ইত্যাদি যে ইসলামে ‘নাজাএজ’ নয়, তা প্রচুর যুক্তি-প্রমাণ সহযোগে প্রতিপন্ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। নবি মুহম্মদ (সা.)—এর জীবনীর সঙ্গে যুক্ত অলৌকিক ঘটনাবলিকে যুক্তি-বিচারের আলোকে যথাসম্ভব পরিহার করে লেখা মোস্তফাচরিত ওই একই মনোভঙ্গিজাত। এ সবের ফলে অন্ধ গোঁড়াদের সঙ্গে তাঁর মতভেদ ঘটেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বহু বিষোদ্গার করা হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ তাঁকে ‘কাফের’ আখ্যা দিতেও কুণ্ঠিত হন নি।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে সওগাত ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের লেখকেরাও আকরাম খাঁর মতোই ইসলাম ধর্মকে বিচার-বুদ্ধির আলোয় দেখাতে চেয়েছিলেন। তাঁরাও মনে করতেন এ না হলে মুসলমান সমাজকে গতিশীল করা যাবে না। সওগাত-এ এমন একটি লেখাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যাতে ইসলামের প্রতি বিরূপতা আছে। শিখা গোষ্ঠীর লেখকেরাও ধর্ম-বিরোধী ছিলেন না। তবে তাঁদের কারো কারো কোনো কোনো লেখায় ঝাঁঝ একটু বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এ হয়ত অস্বাভাবিক ছিল না। যেহেতু তাঁরা ছিলেন খোলা চোখ, সেহেতু নগ্ন বাস্তবতার প্রতি চোখ ঠারেন নি। আবুল ফজল লিখেছেন প্রায় সর্বাংশে পতিত নিজেদের সমাজের দুঃখ ও লজ্জাজনক চালচিত্র তাঁদের মনে এতটা ক্ষোভের জন্ম দিত যে সে-কারণে তাঁদের হয়ত না চটে উপায় ছিল না। উদার দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যাবে যে তাঁরাও কল্যাণকামী ছিলেন। তবে একথা সত্য যে ধর্মের বাহ্যিক আচরণের চেয়ে তার মর্মার্থের প্রতি তাঁরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন।

মুসলমান সমাজের বৃহদংশের এ এক গেরো যে গোঁড়াদের কাছে সমন্বয়পন্থা ইসলাম-বিচ্যুতি, আবার সমন্বয়বাদীদের কাছে আধুনিকপন্থা ইসলাম-দ্রোহ। অর্থাৎ আধুনিকতা গোঁড়া ও সমন্বয়পন্থী দুই শ্রেণির কাছেই শত্র“ভাবাপন্ন, এ জায়গায় এরা একটা। বাংলায় মুসলমান সমাজের তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। সেজন্য গোঁড়াদের দৃষ্টিতে আকরাম খাঁ কাফের, আবার গোঁড়া ও আকরাম খাঁ তথা মোহাম্মাদী-র কাছে ‘সওগাতী দল’ ও ‘শিখাপন্থী’রা (মোহাম্মাদী-র দেওয়া নাম) কাফের, মুরতাদ, ইবলিস ইত্যাদি। মোহাম্মদী গর্বের সঙ্গে ইসলাম-প্রদত্ত নারী-অধিকারের ফিরিস্তি দিতে পারে, কিন্তু সওগাত-এর মতো ‘নারী না জাগলে জাতি জাগবে না’ এই বাণী লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। কিংবা মেয়েদের ছবিসহ বিশেষ নারী সংখ্যাও (ভাদ্র ১৩৩৬) প্রকাশ করতে পারে না। কেবল এ-ই নয়, উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ড গমন উপলক্ষে সওগাত-অফিসে আয়োজিত ফজিলাতুন নেসার সংবর্ধনা-অনুষ্ঠান বানচাল করতে নাসিরউদ্দীনের উপর গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়ে আহত করা এবং তাঁর নামে চরিত্রহননকারী বাজে খবর প্রকাশ করতেও মোহাম্মাদী-র বাধে নি। এসব বিচারে নয়, আনিসুজ্জামান যেমন বলেছেন, এই সিদ্ধান্তে না এসে উপায় থাকে না যে ‘… প্রাচীনপন্থীদের তুলনায় মওলানা আকরাম খাঁর ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল; আর আধুনিকদের তুলনায় তিনি ছিলেন রক্ষণশীল।’

এনামুল হকের মন্তব্যের দিকে এবার ফিরে তাকানো যাক। বাংলার বাইরে ভারতের অন্য অঞ্চল ও বিদেশ থেকে যে-সকল মুসলমান এ দেশে থিতু হয়েছিলেন তাদের বংশধররা দু-তিন পুরুষে বাঙালি ব’নে গিয়েছিলেন বলে যে-মত তিনি প্রকাশ করেছেন তাকে আংশিক সত্য না বলে উপায় নেই। তাঁর মত পুরো সত্য হলে বাঙালি মুসলমানের একটা অংশ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের (পঁষঃঁৎধষ রফবহঃরঃু) সংকটে ভুগত না। বাংলার অন্নে প্রতিপালিত ও তার ভূমিতে বসবাস করে আরব-ইরান-তুরানের স্বপ্ন দেখে, মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও তাকে স্বীকার না করা বা করলেও তাকে পুরোদস্তুর ‘মুসলমানি’ রূপ দেওয়া, সন্তানের নামকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাকে কোনো সমস্যায় ভুগতে হতো না। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় স্ববিরোধ। কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো জাতীয়তাবাদী লেখককে বলতে শোনা যায়, কোমল বাংলা ভাষাকে ‘উর্দুর তাজি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার’ করিয়ে ‘বলিষ্ঠ ও দ্রঢ়িষ্ঠ’ করার আবশ্যকতার কথা। মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে নিঃসংশয় ও সুদৃঢ় রায় ঘোষণা করেও আকরাম খাঁ তাকে বাঙালি মুসলামানের ‘জাতীয়’ ভাষা বলতে নারাজ। কেননা মুসলমানের জাতীয় ভাষা তাঁর মতে আরবি এবং এ সত্য ভুলে যাওয়া হবে মুসলমানের জন্য সমূহ সর্বনাশের। সেদিনও যেমন, তেমনি আজও বহু বাঙালি মুসলমানের কাছে সন্তানের বাংলা শব্দে নামকরণ হিন্দু নাম বলে বিবেচিত। এমনকি বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি বা ফারসি শব্দ মিলিয়ে নামকরণেও তাদের আপত্তি। সন্দেহ নেই এরা ধর্মীয় ভাবাবেগ দ্বারা চালিত বলে নিজের দেশ ও ভাষাগত জাতিত্ব-চেতনাকে গুরুত্ব দেয় না।

একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, মশাররফ হোসেন থেকে শুরু করে ইতিহাসের ঘুম-ভাঙানিয়া নেতা-কর্মী-লেখকদের বেশির ভাগেরই পদবি বিদেশি। এদের মধ্যে ‘কাজী’ পদবি নয়, পদ, কিন্তু পরবর্তীকালে পদবি। এই পদ বহিরাগত মুসলমানেরাই পেতেন। আবুল হুসেনের পদবি সৈয়দ, যদিও তিনি তা ছেটে ফেলেছেন। মোতাহের হোসেন আগে নাম লিখতেন সৈয়দ মোতাহের হোসেন চৌধুরী। বাংলার চালচিত্র-খ্যাত আবদুল জব্বার তাঁকে লিখেছিলেন তিনি সৈয়দ হলে চৌধুরী হন কী করে? এর পর থেকে মোতাহের হোসেন বিদেশি সৈয়দ বর্জন করে দেশীয় পদবি কেবল ব্যবহার করতেন। তাহলে কি এই সিদ্ধান্তে যেতে হবে যে আমাদের এই বিশিষ্ট লেখকেরা সবাই যদি নাও হন, তবুও অধিকাংশই বহিরাগত মুসলমানের বংশধর? বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ নেই, কিন্তু মানতেই হয় যে এঁদের অধিকাংশই বহিরাগতদের অধস্তন।

ইতিহাসের ঘুম ভাঙা বলতে এই আলোচনায় যা বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, তার শ্রেষ্ঠ কুশীলবরা তাঁদের আগের প্রজন্মের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মতো সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের সংকটে ভোগেন নি। তাঁরা ধর্মীয় ভাবাবেগ দ্বারাও চালিত হন নি, প্রায় সর্বত্র আশ্রয় করেছেন যুক্তি ও চির-বুদ্ধিকে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে কী করে এটা সম্ভব হলো? আমাদের বিচারে এর একটা বড় কারণ এই যে এঁরা প্রায় সবাই আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং রেনেসাঁসের প্রাণ-চেতনায় উজ্জীবিত। এঁদের সকলে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন নি বটে, কিন্তু নিজেরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছেন। পৃথিবীর সর্বত্র ইতিহাসের ঘুম ভাঙাতে এঁরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এ. এফ. পোলার্ডের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে : ‘যিবৎব ুড়ঁ যধফ হড় সরফফষব পষধংং, ুড়ঁ যধফ হড় ৎবহধরংংধহপব ধহফ ৎবভড়ৎসধঃরড়হ.’ বাংলায় হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের আগে-পরের জাগরণেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি।

জীবনকে এখন, জাগরণপর্বের মুসলিম লেখকেরা, বাস্তবতার নিরিখে কীভাবে খোলাচোখে দেখতে চাইলেন তা আগের আলোচনার কিছুটা সূত্র ধরে কয়েকটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে।

প্রথমে রস-সাহিত্য সৃষ্টির কথা বলা যাক। আগে দেখেছি স্বাতন্ত্র্যবাদীরা উপন্যাস, নাটক ও কবিতা লেখার বিরোধিতা করেছেন। সমন্বয়পন্থীরা যুক্তি দেখিয়ে বললেন উপন্যাস রচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী হিন্দু সমাজ ও রাশিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সুতরাং সমাজ-গতির প্রয়োজনে উপন্যাস লেখা দরকার। এমন কথাও বলা হলো যে ধর্মের বিধান অভিনয়ের বিরুদ্ধে থাকতে পারে, কিন্তু সমাজের উন্নতির স্বার্থে অভিনয় করা দরকার। আবুল ফজল ‘পর্দাপ্রথার সাহিত্যিক অসুবিধা’ শীর্ষক এক অচিন্ত্যপূর্ব প্রবন্ধে বললেন মেয়েদের যদি ঘেরাটোপে বন্দি করে রাখা হয় তাহলে নারী-বর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহিত্য রচনা সম্ভব হবে কী করে? বাদ গেল না ভাষাপ্রসঙ্গও। সমন্বয়পন্থীরা আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের অযথা ব্যবহারের বিরোধিতা করলেন। সাহিত্য সৃষ্টিতে ভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার সম্পর্কে এঁরা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘প্রয়োজনে তাহাতেও আপত্তি নাই নিষ্প্রয়োজনেই আপত্তি’ তত্ত্বের অনুসারী অর্থাৎ উপযোগিতাবাদী।

শিল্পসৃষ্টির মানুষের যে-সহজাত আকাক্সক্ষা ও ক্ষমতা আনন্দময় জীবন যাপনের অন্যতম মাধ্যম, মুসলমান সমাজে প্রায় সার্বিকভাবে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা। বাঙালি মুসলমান সমাজেও একই চিত্র। এখানে তা দুর্লক্ষ নয়। ইতিহাসের ঘুমভাঙার কালে আবুল হুসেনের ‘আদেশের নিগ্রহ’, ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘আদেশপন্থী ও অনুপ্রেরণাপন্থী’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রভৃতি ওই নিষেধাজ্ঞার ফলাফল নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে আলোচনা করা হতে লাগল। খুব স্বল্পমাত্রায় হলেও সমাজে গান-বাজনা, চিত্রকলাচর্চাসহ অন্যান্য কলাবিদ্যার অনুশীলন হতে লাগল। চলচ্চিত্রকে কেবল শিল্প হিসেবে নয়, ব্যবসায়ের একটা মাধ্যম হিসেবেও কেউ কেউ বিবেচনা করলেন। অর্থনৈতিক ভিত্তি রচনার জন্য সৎভাবে যে-কোনো পেশা বা কর্মোদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেয়া হলো। কাজী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ উপন্যাসের জনৈক পীরের উক্তি—‘দুনিয়াদারি মামলাতছে হাম লোগ ফারেগ রহ্না চাহ্তে হ্যায়’—গুরুত্ব হারিয়ে দুনিয়ার ওপর দৃষ্টি নিপতিত হতে লাগল। এমন হলে একটা সমাজের গতিহীন চাকা কীভাবে গতিপ্রাপ্ত হতে পারে, ওই উপন্যাসে তার ঐতিহাসিক চালচিত্র চমৎকার বাস্তবতায় বিধৃত আছে।

খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি বাঙালি মুসলমানের ঘুমভাঙার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে প্রায় একই কালে, বাংলার সমাজ ইতিহাসের দুই প্রধান শহর কলকাতা ও ঢাকা উভয়ত। এই প্রক্রিয়া দু’জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি গতিপ্রাপ্ত হতে থেকেছে ১৯২৬ সাল থেকে। হতে পারে এটি কাকতালীয়, কিন্তু এও বিবেচ্য যে সময়ের জাগরণী গান অন্তত শিক্ষিত শহরবাসীর শ্র“তিতে একই বা কাছাকাছি কালে ধ্বনিত হয়।

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী নানাবিধ বাধা ডিঙিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজ প্রগতির অভিমুখে যে এগিয়ে যাচ্ছিল তাতে সন্দেহের কারণ আছে বলে মনে হয় না। বহু তথ্য ও যুক্তি এই মন্তব্যের সত্যতা নিরূপণ করা যায়। এই আলোচনার সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার কিছু পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মুসলিম মানসের এই প্রাগ্রসর চিন্তা অব্যাহত থাকলে নানা জনের চেষ্টায় তাদের এবং সমগ্র বাংলার ভবিষ্যৎ ইতিহাস কী রূপ নিতে পারত তার উত্তর দেওয়া সহজ নয়। তবে ধারণা করি যা ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে, তার চেয়ে শুভদায়ক ফল লাভ করা সম্ভব হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, ইতিহাসের গতিপথকে বক্র-জটিল করে তোলা হয়েছে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী এই অবস্থাকে চিহ্নিত করেছেন ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আবির্ভাব’—এই ক্ষুদ্র কথাটির দ্বারা। কথাটির নিহিতার্থ বিস্তারে ও গভীরতায় অনেক। এর জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। এর দায়ভাগ সকলের। রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি দিয়ে এ আলোচনা শেষ করি : ‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি মাথা করো নত/ এ আমার এ তোমার পাপ।’

বাঙালির মননচিন্তা

মোস্তাক আহমাদ দীন

শেষপর্যন্ত যা সাহিত্য-পদবাচ্য, তা ধর্ম/মতবাদপুষ্ট হলেও তাতে নানা উদারতা লক্ষ করা যায় এবং সেই ঔদার্যে কাক্সিক্ষত (প্র)গতির লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না সত্য, তবু তাতে পথ-পেরুনোর গতি থাকে—বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগে, মধ্যযুগ শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত, সেটাই লক্ষ করা গেছে। তা অনেকটা সমাজ(চিত্র)-ভাষারই অভিব্যক্তি—বলার অপেক্ষা রাখে না এই দৃষ্টিভঙ্গি শিল্প-অচেতন প্রয়াসেরই উদাহরণ, তত্ত্বগতভাবে বললে, এতে রয়েছে শিল্পীর ঔদাসীন্যের দ্বন্দ্বগত উপাদান। (নানা বিতর্ক সত্ত্বেও) চর্যাপদকে বাঙালির আপন কীর্তি হিসেবে ধরে নিয়েই বলছি, সৃষ্টি হিসেবে এগুলোকে বাংলা ভাষার বিচারপদ্ধতি, এমনকি সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র দিয়েও তার মূল্য নিরূপণ করা যায়, কিন্তু চিন্তা হিসেবে সেটা তো শেষমেশ ধর্মই। এজন্য চর্যাপদগুলো সাহিত্যগত কারণে যতটা গুরুত্বের, চিন্তা-প্রগতির ক্ষেত্রে ততটা নয়।

মধ্যযুগে এসে এই দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমেছে, ঔদাস্য কেটেছে, স্বর আরও সহজ ও জোরালো হয়েছে, কিন্তু গতি কি ক্ষুরধার হয়েছে?

একথা মনে রাখবার একাধিক কারণ রয়েছে যে, আদিমধ্যযুগে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ বহু জায়গায় মানবিক দোষগুণের সশরীর উপস্থিতি দৈব/দেবায়ত লক্ষ্যকে আচ্ছন্ন করে রচকের কারুকীতির্কে গরীয়ান করেছে, তবু সে-লক্ষ্য আদিরস ও আদিভাবের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে নি :

তীন ভুবন জন মোহিনী

রতি রস কাম দোহনী ॥

শিরীষ কুসুম কোঁঅলী

অদভূত কনক পুতলী ॥

এ চর্যাপদের আদিমতার দৃষ্টান্ত নয়, চর্যার নানা পদে যে-শারীরিক বর্ণনা, তাতে রয়েছে নিরলংকার সারল্য, আর এখানে আদিরসের তাড়না; শ্রীকৃষ্ণকীর্তনর আরও বহু স্থানে এমন উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে।

এরপর চৈতন্য-পূর্ব যুগের অবস্থা যেভাবে চৈতন্যভাগবত-এ বিবৃত, তাতে বোঝা যায় কীভাবে আচারসর্বস্ব হয়ে পড়েছিল তৎকালীন সমাজ :

যেবা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী মিশ্র সব।

তারাও না জানে সব গ্রন্থ-অনুভব ॥

কিন্তু চৈতন্য যুগের অবস্থা? এই যুগকে নঞর্থ রূপে দেখার লোক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে খুবই কম। সেই যুগের পূর্বকাল ও সমকালের যে-অবস্থা, তাতে নঞর্থ বিবেচনার কোনো সুযোগও নেই। এমনিতে চৈতন্য যুগের ভাব-বিপ্লবকে অন্য ধর্ম/সুফি মতের প্রতিক্রিয়া বলে যুক্তি দেখিয়ে যারা একে কিছুটা খাটো করে দেখতে আগ্রহী, তাদের প্রতি সহমত হতে না পারলেও তা বিলকুল অস্বীকারের উপায় নেই। কারণ চৈতন্যমঙ্গল-এ জগাই মাধাইয়ের মসনবি-পাঠের দৃষ্টান্ত ছাড়াও তার পক্ষে আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। তারপরও এই মতকে অস্বীকার না করেও বলা যায় : সেই ভাব-বিপ্লব যদি প্রতিক্রিয়াও হয়, তবু সেই প্রতিক্রিয়াজাত লক্ষ্যকে ছাপিয়ে অনেক ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পেরেছে এর প্রেমধর্ম। এখানে যে-সামান্য আচারের বেড়া, তার চেয়ে শতগুণে বিস্তারিত হয়েছে এর অসীমতা। তবে চৈতন্য যুগের সকল সদর্থ বৈশিষ্ট্যের আড়ালে রয়েছে যে-ঔদার্য, তার মহত্ত্ব স্বীকার করেও বলতে হয়, এই ঔদার্যই পরে শাস্ত্রীদের ঔদ্ধত্য বাড়াতে সাহসী করেছে। হতাশার কথা এই যে, একসময় যাদের কারণে এই ভাব-বিপ্লবের সূত্রপাত, তারাই যখন পরে সামান্য ফাঁক পেয়ে ধার ঘেঁষে নিজেদেরকে তার অংশী বলে দাবি করে, তখন থেকেই পরবর্তী কালের নঞর্থ বিচারের পথ প্রশস্ত হয়েছে। তাতে মত-পথ কিছুটা দায়গ্রস্ত হয় বটে, কিন্তু এতে মহাজন বা মহাপথিকের গুরুত্ব কমে না, কারণ এর প্রভাব এখনো চলমান।

বলছি, চৈতন্য-পূর্বযুগের সুফি ভাব, চৈতন্য ভাব, প্রতিটি অঞ্চলের লোকভাব এবং লোককবিদের আন্তঃপ্রাকৃতিক দর্শন মিলে যে-সংগীতধারা পরে বাংলায় প্রবাহিত হয়েছে তার কথা, যার নজির পৃথিবীর যে-কোনো দেশেই বিরল। বৈষ্ণব পদাবলির সংগ্রহ এবং ধর্ম-মত নির্বিশেষে লোককবিরা সেই মহাজনের ভাবপরিমণ্ডলকে উপজীব্য করে, কখনো তাঁকে রূপক-প্রতীক করে যে-ধারা সৃষ্টি করেছেন, সেটি আজও নানা ধর্মের শাস্ত্রী ও রক্ষণশীলদের বিব্রত ও তটস্থ করছে এবং অন্যদিকে মানবতাবাদীদের কিছুটা হলেও শুশ্রƒষা দিচ্ছে। বৈষ্ণব পদাবলির সংগ্রহ সকলেরই গোচরে, লোককবিদের সংগ্রহগুলোও ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে, কিন্তু অনেকের আলোচনায় অনুল্লিখিত থাকায় ধারণা করি যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের বাঙ্গালার বৈষ্ণবভাবাপন্ন মুসলমান কবিদের পদমঞ্জুষা এখনো অনেকের অগোচরে। মহাজনের মর্মে গভীরতা থাকলে সেটা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে এবং আজকে আমরা ধর্ম-সম্মোহনগত যে-সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তার কোনো প্রকার প্রতিকারের সূত্র-উৎস রয়েছে কি না, তার উদারপ্রকৃতি দৃষ্টান্ত খুঁজে দেখা যেতে পারে বাঙ্গালার বৈষ্ণবভাবাপন্ন মুসলমান কবিদের পদমঞ্জুষায়।

এই সকল সৎ দৃষ্টান্ত সম্বন্ধে এটুকুই বলা যায় যে, কিছু ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে, মতপথচিন্তার বহুত্ব সত্ত্বেও এগুলো শেষমেশ পরমের আরাধনায় কাতর, এতে শিল্পীর মুক্ত চেতনা কম, এর সকল চিন্তাই ‘আসল’ চিনে পথ চেনা এবং পথ চিনবার জন্য চিন্তা করবার কথা বলে।

তবে সেই ব্যতিক্রমই তো পরবর্তী কালের পথ চলার উদাহরণ হওয়ার কথা। মধ্যযুগে চণ্ডীদাসের মুখে আমরা শুনেছি :

‘শুনহ মানুষ ভাই,/সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই’, আর  ভারতচন্দ্রের মুখে শুনেছি : ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।/বিস্তর ধার্মিক লোক ঠেকে গেল তায়॥’, কিংবা ‘বেদেতে মহিমা তব পরম নিগূঢ়।/সেই বেদ পড়ি মোর পতি হৈল মূঢ়॥’ প্রভৃতি উদাহরণ। এমন দৃষ্টান্ত শুধু মধ্যযুগেই নয়, প্রাচীন যুগেও রয়েছে, কিন্তু এই সকল ব্যতিক্রম উদাহরণই কি আধুনিক যুগের সূত্রপাতে ভূমিকা রেখেছে? অমর্ত্য সেন সানন্দে স্মরণ করেছেন শৈশবে ‘মননগত উদ্দীপনা ও নিছক আনন্দ পাওয়ার জন্য’ রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্য দুটি পড়ার পর তাঁর কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল :

মূল গল্পকে কেন্দ্র করে এগুলি কিন্তু এগিয়ে গেছে কাহিনির পর কাহিনিতে। নানান আলাপ আলোচনা, সংকট ও বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে ভরা সেই কাহিনির পর কাহিনিগুলি। সেই সঙ্গে এগুলিতে আমরা সম্মুখীন হই বিরামহীন বিতর্ক ও মতবিরোধের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির প্রয়োগের।

বিমলকৃষ্ণ মতিলাল তাঁর লেখাপত্রে, বিশেষত নীতি, যুক্তি ও ধর্ম : কাহিনী সাহিত্যে রাম ও কৃষ্ণ  বইয়ের একাধিক প্রবন্ধে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালির মননচর্চার নানা দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, কিন্তু এগুলি পরবর্তী কালের (আধুনিক যুগের/উনিশ শতকের) বাঙালিদের মননচিন্তায়, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি ও পরমত সহিষ্ণুতায় কতটা প্রভাবশীল হতে পেরেছে তা আজো এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।

উনিশ শতকে বাঙালির (মনন)চিন্তায় যে-পরিবর্তন এসেছে তাতে কারও দ্বিমত নেই, কিন্তু তার অভিঘাত অভ্যন্তর্গত না বহির্গত, সে-বিষয়ে দ্বিমত আছে। এই তর্কের পক্ষে-বিপক্ষে নির্দ্বন্দ্ব ও জোরালো অবস্থান গ্রহণ যে অত্যন্ত কঠিন, সে-বিষয়ে মূল্যবান দৃষ্টান্ত হলো তপন রায়চৌধুরীর মূল্যবান সন্দর্ভ ইউরোপ পুনর্দর্শন বইটি। তিনি উল্লেখ করেছেন ডিরোজিওপন্থী দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ভারতে বিদেশি শাসনকে ক্ষতিকর মনে করতেন, তবু প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে তাদের প্রতি তাঁর কোনো শত্র“তা নেই; আবার পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি রামগোপাল ঘোষ বিদেশিদের অধীনে চাকরি গ্রহণে অস্বীকার করার পরও তাদের শাসনের চিরস্থায়িত্ব কামনা করেছিলেন। তারপরও এই প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের ‘উনিশশতকী বাঙালির পুনরুজ্জীবন’ প্রবন্ধ থেকে দুটি মন্তব্য পড়া যেতে পারে :

উনিশ শতকে বঙ্গভূমে ও ভারতবর্ষে যা ঘটেছিল তাকে বাঙালি ও  ভারতীয় সমাজ-বিবর্তনের কার্যকারণশৃঙ্খলাগত পরিণতি বলা যায় না; সমাজের ভেতর থেকে তা উদ্ভূত হয় নি।

অন্যত্র বলছেন :

আমাদের উনিশ শতকী পুনরুজ্জীবন কিন্তু শুরুই হল ধর্মকে ও ধর্মাশ্রিত সমাজকে কেন্দ্র করে, এবং এমন একটি ভাষা ও একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে যে দুটি পরদেশি শাসক গোষ্ঠীর নিজেদের বাসভূমে জাত, পালিত ও বর্ধিত, সে দেশ থেকে আনীত ও প্রবর্তিত।

বোঝাই যাচ্ছে পুনরুজ্জীবনের অভিঘাত যে বহির্গত, সেকথা বলাই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি একই মন্তব্য করেছেন রাজা রামমোহন রায় বিষয়েও, বলেছেন, রামমোহন আমাদের সমাজের ‘শ্যাওলা-ঢাকা, বদ্ধ জলাশয়ে যে-আলোড়ন’ তুলেছিলেন তা এই ভারতীয় সমাজ থেকে উদ্ভুত হয়নি, এখানে বাঙালির সমাজবিকাশের

অন্তর্নিহিত কার্যকারণশৃঙ্খলাগত কোনো প্রেরণা সক্রিয় ছিল না। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় সমাজ-পরিবর্তন সবসময়ই যেন গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে!

এমনিতে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাইরের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত না হলে উনিশ শতকের চিন্তাবিদদের  চিন্তায় নতুনত্ব আসত না, হয়তো আশানুরূপ পরিবর্তনও হতো না, কিন্তু এরপরও এই সবকিছুর মূলে যে রয়েছে ভারতীয় ঐতিহ্যেরই প্রণোদনা ও পরম্পরা, তার বড় প্রমাণ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রমুখের জীবন ও রচনা। এঁরা পশ্চিমের চিন্তা ও অভিজ্ঞান অঙ্গীকার করার পরও পূর্ব-অভিজ্ঞতা যে ভুলতে পারেন নি, তাতেই পরবর্তী সময়ে জাগরণের নানা পরিণতি-প্রসঙ্গে উপনিবেশের প্রশ্ন উঠেছে, এটাই হলো তাঁদের জীবনব্যাপারের সমালোচনাযোগ্য দিক; কিন্তু তাঁদের বহুমুখী মননচিন্তা এই প্রমাণই দেয় যে, তা থেকে উদ্ধার পেতে গেলে তাঁদের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রামমোহনকে বলা হতো ‘আধুনিক ভারতের জনক’, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘ভারতপথিক’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন, যে জেরেমি বেন্থাম ১৮৭০ সালে প্রথম ওহঃবৎহধঃরড়হধষ’ শব্দটির উল্লেখ করেছিলেন, তিনি একটি চিঠিতে রামমোহনকে বলেছিলেন : দগু রহঃবহংবষু ধফসরৎবফ ধহফ ফবধৎষু নবষড়াবফ পড়ষষধনড়ৎধঃরড়হ রহ ঃযব ংবৎারপব ড়ভ সধহশরহফ’—এমন সম্মান ভারতীয়দের অল্প ক-জনই অর্জন করেছিলেন। নীহাররঞ্জন রায় আন্দাজ করেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান-পারসি-ইহুদি বিচিত্র ধর্মাবলম্বী এই বৃহৎ মানবসমাজকে এক ধর্মপাশে বেঁধে সমসাময়িক অগ্রসরমান পৃথিবীর সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে চলতে হলে একেশ্বরবাদ ব্রহ্মবাদের পড়সসড়হ ফবহড়সরহধঃড়ৎ  ও ঁহরভরবৎ আর কী হতে পারে’, এমন ভাবনা রামমোহনের মনে থাকতে পারে; তাঁর এই আন্দাজ একদম ঠিক, কারণ তৎকালীন ভারতীয় সমাজের পরিপ্রেক্ষিত ও বাস্তবতায় এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাসঙ্গিক মনে করেছিলেন রামমোহন। এ-কথা ঠিক যে রামমোহনের এই স্বপ্ন ও চেষ্টার কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে নি এবং আসে নি বলেই পরবর্তী কালে নবজাগরণে হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষের ও তাঁদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটে নি বলে প্রশ্ন উঠেছে। রামমোহন-সম্পর্কে শেষ কথা এই বলা যায় যে, ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতীয় ঐতিহ্যের অনেক কিছুই বর্জন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ভারতে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন বিষয়ে ১৮২৩ সালের ১১ ডিসেম্বরে লর্ড আর্মহাস্টকে সংস্কৃত শাস্ত্র অধ্যয়ন এখন স্থগিত থাকতে পারে এই মর্মে চিঠি লেখেন, ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার যে আইন করে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে, তার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে রামমোহন রায়ের বাংলা ও ইংরেজি রচনা। এই সবকিছুর কথা বাদ দিলেও পরবর্তীকালের এমন চিন্তাবিদ পাওয়া মুশকিল যার উপরে কোনো-না-কোনো ভাবে রামমোহনের  প্রভাব পড়ে নি।

বিদ্যাসাগর জ্ঞানজগতের কিছু-কিছু ক্ষেত্রে রামমোহনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন আর মহত্ত্ব ও ঔদার্যের ক্ষেত্রে তাঁর তুল্য ব্যক্তিত্ব ভারতে বিরল। বিধবা বিবাহ ও অন্যান্য সৎকর্ম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন আর বাঙালির আদর্শ শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে, চিন্তা ও প্রয়োগে, তিনি ছিলেন অক্লান্ত। বেশভূষায় তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মতো, কিন্তু সংস্কৃতকে দেবভাষা জ্ঞানে মান্য করাকে তাঁর কাছে মনে হতো মুর্খতা। সাংখ্য ও বেদান্ত সম্পর্কে লিখলেন : ঞযব  াবফধহঃধ ধহফ ঝধহশযুধ ধৎব ভধষংব ংুংঃবস ড়ভ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু, চিন্তাক্ষেত্রে এমন বৈপ্লবিক মন্তব্য করা সত্ত্বেও রামমোহনকে গ্রহণে বাঙালি যতটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে, অপরিসীম দরদি মনোভাবের কারণে বিদ্যাসাগরকে গ্রহণে ততটা দ্বিধাগ্রস্ত হয় নি।

ধর্ম-মোহ ছিল না অক্ষয়কুমার দত্তেরও, তিনি ছিলেন যুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর জীবনে অভ্যস্ত, মত ও আদর্শের ক্ষেত্রে অনমনীয়। তাঁর মত গ্রহণ করার মতো মন তখনকার মানুষের তো ছিলই না, এখনো সে মন তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ ছিল এরকম :

                প্রার্থনা+পরিশ্রম = শস্য

                         পরিশ্রম = শস্য

                          প্রার্থনা = ০

উনিশ শতকের চিন্তাবিদদের লক্ষ্য ছিল এক, কিন্তু চিন্তা ছিল ভিন্ন; তাঁদের আগ্রহও ছিল নানাদিকে, এই কারণে বহু কিছুর প্রতি তাঁদের মনন আকৃষ্ট হয়েছে এবং সেইসব বিষয় নিয়ে তাঁদেরকে লিখতেও হয়েছে প্রচুর—তৎকালীন সাময়িক পত্রগুলোর দিকে তাকালে এই কথার সত্যতা পাওয়া যাবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এরকমই ব্যক্তি : আনন্দমঠ এর কারণে পাঠকের কাছে তিনি অতিমাত্রায় স্বাজাত্যবাদী, সে-কারণে বিতর্কিতও; আবার ‘বঙ্গদেশের কৃষক’-এ যখন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তকে একসঙ্গে উল্লেখ করেন তখন তাঁর ধর্ম/ জাতি-নিরপেক্ষ বিচারে আকৃষ্ট না হয়ে পারা যায় না। যে-ইংরাজিকে বঙ্কিম ‘অনন্তরতœপ্রসূতি’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তার প্রসঙ্গেই তিনি বলেছিলেন ‘আমরা যত ইংরাজি পড়ি, যত ইংরাজি কহি বা যত ইংরাজি লিখি না কেন, ইংরাজি কেবল আমাদিগের মৃত সিংহের চর্ম্মস্বরূপ হইবে মাত্র।’ এছাড়াও মননচিন্তায় বঙ্কিম যে-কারণে বাঙালিদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার, সেটি হচ্ছে তাঁর সাহিত্য-সমালোচনা। সংস্কৃত রসশাস্ত্র ও সমালোচনার ঐতিহ্য আত্মস্থ করে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের, বিশেষত তুলনামূলক আলোচনার, প্রবর্তন করেন।

শুধু উনিশ শতকই নয়, প্রাচীন ও মধ্যযুগের শুভ চেতনা মর্মে ধারণ করে বাঙালির মননভূমির সীমানা বাড়িয়ে একে পরিণত করে তোলেন রবীন্দ্রনাথ। একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথ প্রধানত কবি, কিন্তু চলার পথে যখনই যে-সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, তাকে গভীর মননদৃষ্টি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন, মন্তব্য করেছেন, তার মোকাবেলা করেছেন—এইভাবে সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্ম তাঁর ভাবনায় বিস্তারিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যচিন্তায় ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের মর্ম গ্রহণ করলেও  মননচিন্তার ক্ষেত্রে উনিশ শতকের মহাজনদের বহুমুখী আগ্রহকে মনে রেখেছেন, তাঁর সুগভীর সাহিত্য-সমালোচনা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কিন্তু দুঃখের কথা এই যে, তাঁর সমকালীন ও অনুজ হাতে-গোনা দু-একজন সমালোচকের কথা বাদ দিলে পরবর্তী কালের ভাবুকেরা বহুমুখী চিন্তার এই পরম্পরা রক্ষা করেন নি।

তিরিশের দশকের কবিরা তাঁর চিন্তাজগৎকে বহুভাবে সমৃদ্ধ করলেও লেখার ক্ষেত্রে, বিশেষত সাহিত্য-সমালোচনাকে, সাহিত্যপরিমণ্ডলের বাইরে নিয়ে যেতে চাননি। এই দশকের জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সমর সেন, এঁদের সকলের গদ্যভাষা আপনাপন কারুকৃতিতে অনন্য; তাঁদের লেখার বিষয় হিসেবে কবিতা, চিত্রকলা, সংগীত, দর্শন, পুরাণ প্রভৃতি এসেছে এবং এই সবকিছুই সাহিত্যের তুল্যমুল্য ও পরিপূরণের অনুরোধে বিবেচিত, একজন সাহিত্যপাঠকের কাছে এই লেখাগুলো বিষয় ও উপস্থাপনার গুণে ইন্দ্রিয়সুখকরও বটে; শিল্পের (বহু অমীমাংসিত) দাবির কারণেই এতে সমাজচিন্তা স্পষ্ট হয় নি, তবে এ-বিষয়ে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন। তাঁদের এই প্রকার দৃষ্টিভঙ্গিকে বাঁকা চোখে না দেখার পক্ষে যেমন যুক্তি আছে, আবার যারা সমাজবাদী—সমাজেরর দ্রুত সংগতি সাধনে তৎপর, তাদের সপক্ষ যুক্তিও রয়েছে অনেক।

দ্বিতীয় পক্ষের নজির হিসেবে উল্লেখ করা যায় ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বুুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে, যাকে অন্নদাশংকর রায়, শিবনারায়ণ রায় থেকে শুরু করে হায়াৎ মামুদ পর্যন্ত অনেকেই খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। উনিশ শতকে জাগরণকে অনেকেই বিশেষ সমাজের জাগরণ বলে অভিহিত করে তাতে মুসলিম সমাজের জাগরণ ঘটেনি বলে উল্লেখ করেছেন—কথাটি অসত্য নয়। রামমোহনের চিন্তায় মুসলিম সমাজ সবসময়েই স্থান পেয়েছিল, তিনি তাদের জাগরণের চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু মুসলমানদের মনে তখনো রাজ্যহারানোর ক্ষোভ, ফলে সে-চেষ্টা সফল হয় নি। এই বিষয়টি মাথায় রেখে বুদ্ধির মুক্তির মুক্তি আন্দোলনকে কেউ-কেউ মুসলিম সমাজের (বিলম্বিত) জাগরণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর ভাবযোগী কাজী আবদুল ওদুদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সৃজনশীল সাহিত্যকে কেন্দ্র করে, কিন্তু ধর্ম-শাস্ত্রীদের উস্কানি ও সমাজ-অসংগতির চাপে তিনি মননশীল ক্ষেত্রে ধাবিত হতে বাধ্য হন; এর কর্মযোগী আবুল হুসেন ছিলেন ধর্ম-অর্থনীতি-ইতিহাস প্রভৃতিতে আগ্রহী; সহযোগীরাও সৃজন-মনন উভয় ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন। এঁরা রামমোহনের মতো ধর্মকে যুক্তি ও মানবাতাবাদী দৃষ্টিতে বিবেচনা করতে চেয়েছেন বলে তৎকালীন ধর্ম-সমাজ পঞ্চায়েত বসিয়েছে এবং লাঞ্ছিত করেছে। তাঁদের মুখপত্র শিখার সংখ্যাগুলো বাঙালির মননচিন্তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

সাতচল্লিশের বিভাজনের পর থেকে বাঙালির মননচিন্তায় একপ্রকার অস্থিরতা দেখা য়ায়—বিশেষত হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের অনুসারীদের স্বার্থগত বিরোধ চরমে উঠলে এর নানামুখী প্রভাব দেখা গেল। সিপাহি বিদ্রোহের সময় থেকে মুসলমানদের মধ্যে যে-সচেতনতা সৃষ্টি হলো, তাতে কখনো-কখনো প্রকট স্বাতন্ত্র্য-বোধের পরিচয় পাওয়া গেলেও তা অন্যভাবে মুসলমানদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ, আধুনিক চেতনা ও ইহজাগতিক আত্মোন্নয়ন-চেষ্টারও জন্ম দেয়, কিন্তু দেশভাগ-উত্তর মুসলিম সমাজের এক বিশেষ গোষ্ঠীর সচেতনতা, বাংলাদেশে, সরাসরি সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণার জন্ম দেয়। এখানে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রভাব তো পড়েই নি, বরং তাদের বিরুদ্ধ চিন্তার পথে অনেকের তৎপরতা দেখা গেল। মোরশেদ শফিউল হাসান উল্লেখ করেছেন : ‘কাজী আবদুুল ওদুদ, হুমায়ুন কবির প্রমুখের মতো অঙ্গুলিমেয় ব্যতিক্রমের বাদ দিলে, ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বাঙালি মুসলমান লেখকদের সকলেই ছিলেন পাকিস্তানি আন্দোলনের সমর্থক বা তার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন।’ তবে একই সঙ্গে দুই বাংলার কিছু সাহিত্যিক তাঁদের মনে দেশভাগের যন্ত্রণাকে ধারণ করেও মুক্তভাবে সৃজন-মনন উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয় রইলেন, যার ফলে ১৯৬১ সালে এদেশে অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও সফলভাবে রবীন্দ্র্রজন্মশতবর্ষ পালিত হলো। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনের বিষয়টি এখানে একারণেই উল্লেখের দাবিদার যে, এর একদশক আগে ১৯৫১ সালেই সেই গোষ্ঠীরই প্রতিভূ বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আলী আহসান ঘোষণা করেছিলেন : ‘আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি।’ অথচ এই দশকের অর্থাৎ পঞ্চাশের কবিরা প্রাণিত হলেন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতার আদর্শে, ফলে বিশুদ্ধ সাহিত্যপাঠ ও চর্চা ছিল তাঁদের ধ্যানজ্ঞান। অন্য মাধ্যমের লেখকেরা চেতনায় ধারণ করলেন দুই দেশের এক অখণ্ড চেতনা, পাশাপাশি কেউ-কেউ ভাষা-আন্দোলনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হলেন, পরবতী কালের প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় এর স্বার্থ প্রভাব লক্ষ করা যায়। দুই একজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে ষাটের দশকের লেখকদের মননচিন্তায় আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তিরিশের দশকের লেখকদের প্রসঙ্গ। কবিতার বাইরে তাঁদের মননচর্চা শিল্প-সাহিত্য সমালোচনার মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থেকে গেল। সেই তুলনায় কথাসাহিত্যিকরা সৃজনশীল সাহিত্য ও সাহিত্য-সমালোচনার পাশাপাশি সমাজ-রাষ্ট্রের নানা সংকট নিয়ে লিখে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরবর্তী সময় থেকে আজও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত, তবে এতে কোনো সম্মেলক চেষ্টার পরিচয় নেই, থাকতে হবে এমন কোনো কথাও নেই, তবে এককভাবেও কারও কোনো সার্বভৌম প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। এমনিতে বিচ্ছিন্নভাবে, বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে, অনেকেই মননচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। সাহিত্য-সমালোচনার পাশাপাশি সমাজ-রাষ্ট্রের নানা সংকট নিয়ে লিখছেন অনেকেই, নানা তত্ত্ব ও তথ্যের আলোকে তার বিচারও চলছে, তবু সৃজনশীল সাহিত্যে যেমন আমরা ইতোমধ্যে অনেক বড় প্রতিভার পরিচয় পেয়েছি, মননশীল ক্ষেত্রে সেরকম কাউকে কি পাচ্ছি? নাকি তথ্য, তত্ত্ব ও প্রাযুক্তিক অস্থিরতার মধ্যে কারও নিবিড় চর্চাই আর এককভাবে বড় হয়ে ধরা দিচ্ছে না?

হয়তো এখানেও রয়েছে ক্ষমতা ও সুযোগের প্রশ্ন, স্থানের প্রশ্ন; নাকি উপনিবেশের জোয়ালের চাপে শেষমেশ সবকিছুই অমূল/দিশেহারা মানুষের কৃত্রিম বয়ানে পরিণত হচ্ছে, কে জানে; কিন্তু এই জোয়াল না চাপালে, লর্ড টমাস মেকলের চাপানো একহাজার নম্বরের ইংরেজি বা ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য-এর ভার বহন না করলে আজ এই চিন্তাটাও যে করছি, তা করা কি সম্ভব হতো? আমাদের আজকের যে ঔপনিবেশিক চেতনা, তা সেই উপনিবেশেরই দান—এটি আমার বক্তব্য নয়, গুরুজনদেরই কথা।

অখণ্ড উত্তরবাংলার মুসলমান জনসমাজ : এক অভিন্ন উ

গৌতম গুহ রায়

‘কিরীট তোমার হীরা হিমালয়ের জিম্মাতে/তোর কোহিনুর কাড়বে কে বল? নাগাল না পায় কেউ হাতে/তিস্তা তোমার ঝাপ্টা সীথি—যে দেখাচ্ছে সেই জানে…’ (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)

অখণ্ড বাংলার মানচিত্রের সামনে দাঁড়ালে তার কপালের ঐ তিস্তা নদীটার দিকে নজর যায় আমার। বাংলামায়ের ঐ ‘ঝাপ্টা সীথি’-র মুখমণ্ডলটাই আমার উত্তরবাংলা। হিমালয় সন্নিহিত অঞ্চল, ২৪ থেকে ২৭ উত্তর অক্ষাংশ (খধঃরঃঁফব) এবং ৮৮ থেকে ৯০ দ্রাঘিমাংশ (খড়হমরঃঁফব) এর মধ্যে এর অবস্থান। সুদূর অতীতে ‘পুণ্ড্র’ ও বরেন্দ্র নামেও চিহ্নিত করা হতো এ অঞ্চলকে। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক দ্বিতীয় শতকের মহাস্থানগর ব্রাহ্মলিপিতে ‘পুন্দকাল’ বা পুণ্ড্রগড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে এটি গুপ্ত রাষ্ট্রের এলাকাভুক্তিতে আসে। ইতিহাসের ঐ আঁধো আলো আঁধো অন্ধকারের সময়ে পরিভ্রমণ এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমরা ফিরে দেখবো এই অঞ্চলের জনসমাজ গড়ে ওঠার পর্ব ও মুসলিম সমাজ।

১৮৭২-এর অবিভক্ত রাজশাহী বিভাগের আয়তন ছিলো ১৭৬৯৪ বর্গমাইল। ১৯৪৭-এর দেশবিভাগ পরবর্তীতে আয়তন দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গের অংশের এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ১৪৭৫৭০ বর্গ কি.মি.-র মধ্যে ৩৬৩৬৯ বর্গ কিমি। দেশ বিভাগের পরের এপারের ৫টি ওপারের ৫টি জেলাকে নিয়ে এক অখণ্ড উত্তরবাংলা কল্পনা করে নিতে পারি। এপারের দার্জিলিং জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, পশ্চিম দিনাজপুর পেয়ে (পরে ২টি পৃথক জেলা হয়) এবং মালদহ। ওপারের রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর ও রংপুর।

একটা রহস্যের গোলকধাঁধার সামনে ইতিহাসের যারা চর্চা করেন তারা অসহায় হয়ে যান। আরব সেনানায়ক মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু জয় করেন আট শতকের দ্বিতীয় দশকে আর বখতিয়ার খিলজি বাংলায় আসেন তেরো শতকের প্রথম দশকে। মাঝে পঁচিশ বছরের ফাঁক, অথচ গোটা দেশের মধ্যে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে মুসলিম অনুপাত সবচেয়ে বেশি বাংলায়। কেনো এই অস্বাভাবিক স্ফিতি? নানাজনের নানা ব্যাখ্যা, কেউ সুফি সাধকদের প্রভাবের কথা বলেন, কেউ রাজদরবারের উচ্চপদের লাভের কথা বলেছেন, কেউ হিন্দু উচ্চবর্ণের অত্যাচারের কারণে ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা বলেছেন, কেউ আবার বলপ্রয়োগের তত্ত্ব দিয়েছেন। কিন্তু জোড় দিয়ে কোনোটিকেই তথ্যভিত্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। অথচ ইংরেজদের ইতিহাসচর্চার নিরিখে এই ‘মধ্যযুগ’র ঐতিহাসিক চর্চা ব্যাপকভাবে হয়েছে। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মত ঐতিহাসিকরা বলেছেন ‘বখতিয়ার খিলজীর একজন মেচ জাতীয় অনুচর গৌড়ের স¤্রাট হয়েছিলেন। এই সকল দৃষ্টান্ত উৎসাহিত হইয়া যে নি¤œশ্রেণির হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত ইহাতে আশ্চর্য বোধ করিবার কিছু নাই।’ তবে এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে একজনের প্রাপ্তির উদাহরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়ে গেল। সাম্প্রতিককালের সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক নজরুল ইসলাম তাঁর হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক গ্রন্থে অভিমত দিয়েছেন যে ‘কয়েকশ বছর এই সব ধর্মপ্রাণ সুফিদের প্রচারের ফলে দলে দলে লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে’। সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষ’ ও ‘ইসলাম’ বইতে উল্লিখিত অভিমতসমূহকে নস্যাৎ করে বিশেষ কোনো কারণের তত্ত্বকে উড়িয়ে এক বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হাজির করতে চেয়েছেন। আমরা জানি বহুরৈখিক ঘটনাপ্রবাহের চাপে ইতিহাসের মুখ ঘুরে যায়, এরসঙ্গে যুক্ত থাকে সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, জনজীবন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্রভৃতি। কোনো ঘটনার স্বরূপ জানতে হলে সমস্তটা নিয়েই দেখতে হয়। ভারতে মৌর্য শাসনের সময়ে বাংলাতেও বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল। চার ও পাঁচশতক গুপ্ত রাজত্বের সময় রাজ-আনুকূল্য পেয়েছে ব্রাহ্মণ্যধর্ম, কিন্তু বৌদ্ধদের ধর্মপালনে কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু গুপ্ত সা¤্রাজ্যের পতনের পর সাত শতকে শশাঙ্কের রাজত্বে এই ধর্মীয় উদারতা বজায় থাকে নি। দীনেশচন্দ্র সেন জানিয়েছেন, শশাঙ্ক আদেশ জারি করেছিলেন বৌদ্ধদের দেখামাত্র হত্যার। তিনি লিখেছেন, ‘বৌদ্ধধর্মকে পরাভূত করিয়া হিন্দুরা যেভাবে বৌদ্ধ ইতিহাস লোপ করিয়াছিল, তাহা অকথ্য অত্যাচার লজ্জিত।’ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তথ্যসহ জানিয়েছেন যে ‘জনপদ (পূর্ববঙ্গ) এককোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১১৫০০ ভিক্ষু বাস করিত সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই।’ বৌদ্ধসন্ন্যাসীদের বাধ্য করা হয়েছিল সমাজের নি¤œস্তরের অবস্থানে। এরপরও আশার কথা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালরা আট শতক থেকে চারশত বছর বাংলা শাসন করেছিলেন। বারোশতকে পাল রাজত্বের অবনতি হওয়ার সুযোগে দক্ষিণভারতের সেন বংশ প্রথমে পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গ, পরবর্তীতে শাসন এলাকা বিস্তার করে। তবে একটা কথা মনে করা দরকার যে সে সময় কিন্তু গোটা বাংলা কোনো অখণ্ড বাংলা রাজনৈতিক ভূখণ্ড বলে চিহ্নিত হতো না। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সেই পর্ব বেশ নড়বড়ে।

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি ‘নদীয়া’ দখল করে এবং বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে ‘এসময় থেকেই বাংলায় ব্যাপক সংখ্যায় মুসলমানের প্রবেশ ঘটে’। এম.এ রহিম মনে করেন যে, ‘মুসলমানদের বাংলা জয়ের প্রচুর সংখ্যক ইরানি ব্যবসায়ী, সাধু পুরুষ, ধর্ম প্রচারক, শিক্ষক ও ভাগ্যান্বেষণকারী বাংলায় আগমন করেন ও বসতি স্থাপন করেন।’ মীনহাজ-ই-সিরাজের তবকৎ-ই নাসারীতে বখতিয়ারের উত্তরমুখী অভিযানের যে বর্ণনা পাই : ‘কয়েকবছর অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি লখনৌতির পাশ্ববর্তী অঞ্চলগুলির খবর পেলেন এবং তিব্বত ও তুর্কিস্থান দখলের ইচ্ছাপোষণ করতে লাগলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় দশহাজার ঘোড়সওয়ারের এক বাহিনী গঠন করেন। তিব্বত ও লখনৌতি রাজ্যের মাঝখানে যে পর্বতমালা রয়েছে, তাতে তিন জাতের মানুষ বাস করে। একজাতকে বলা হয় কোচ, দ্বিতীয়কে মেচ ও তৃতীয়কে থারু। তাদের সবার চেহারা তুর্কিদের মত, কিন্তু তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে—অনেকটা হিন্দুস্থান ও তিব্বতের ভাষার মাঝামাঝি। কোচ ও মেচ উপজাতিদের অন্যতম সর্দার আলী মেচ নামে অভিহিত একজন লোক মুহম্মদ বখতিয়ারের দ্বারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল; এই লোকটি তাঁকে পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চালনা করে নিয়ে যেতে রাজী হলো।’ এরপরের ইতিহাস বখতিয়ারের দিগি¦জয়ের ইচ্ছার করুণ পরিণতির ও ধ্বংসের। কামরূপ থেকে ফেরার পথে নদীর সেতু ধ্বংসের ফলে নদী পার হতে গিয়ে তার অধিকাংশ সৈন্য জলে ডুবে মারা যায়। শ’খানেক সৈন্যসহ বখতিয়ার কোনোক্রমে বেঁচে নদী পার হন। আলী মেচের আত্মীয়রা বিধ্বস্ত বখতিয়ারের সেবা করেন। এবং অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। লক্ষণাবতী থেকে রওনা হয়ে বখতিয়ার যে বর্ধনকোট শহরে পৌঁছেছিলেন তার আধুনিক নাম বর্ধনকুটি। স্থানটি রংপুর জেলার মধ্যে বগুড়া জেলার সীমান্তে। বখতিয়ারের অভিযানের ফলস্বরূপ মুসলিম ধর্মের সূচনা হয় একথা অনেকেই বলেছেন। বখতিয়ারের অভিযানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এই উত্তরবাংলা। তবে তার আগমনের আগেও মুসলমান ধর্মীয়দের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ ছিল, উত্তরবঙ্গেই পাহাড়পুরে আব্বাসীয় খলিফাদের প্রাচীন মুদ্রা পাওয়া গেছে, ৭৮৮ খ্রি.র মুদ্রাটি। ১২০৪-এ বখতিয়ার খিলজি ‘নোদীরহ্’ অধিকার করেন। তার সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে তিনি কিছু মসজিদ, মাদ্রাসা এবং খানকাহও স্থাপন করেছিলেন। খানকাহ্র প্রসঙ্গে সুখময় মুখোপাধ্যায়, এম.এ রহিমরা মনে করেন যে পির-দরবেশরা বখতিয়ারের আগেই এদেশে ছিলেন নাহলে পিরের আস্থানার দরকার কেনো হবে? বাংলায় আদি সুফি সাধকদের মধ্যে কাজি রুকমুদ্দিন সমরকন্দি, মৌলানা তফি-উদ্দিন আরধি, শেখ শরফুদ্দিন আবু তওয়াসাহ্, বাবা আদম শাহিদ প্রভৃতির নাম পাওয়া যায়, যার আদিতে বাংলায় মুসলিম ধর্ম বিস্তারে ভূমিকা নিয়েছিলেন।

তেরো শতকের পর থেকে উত্তরবঙ্গে ক্রমাগত মুসলিম আগমন ও বসতি অব্যাহত থেকেছে। তুরস্ক, আরব, ইরান, খোরসান, আফগানিস্থান, আবিসিনিয়া প্রভৃতি জায়গা থেকে নানা জাতি ও বর্ণের মানুষ এই বাংলায় এসেছেন এবং আত্মস্থ করে মিশে গেছেন। বহিরাগত মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের সংমিশ্রণ মুসলিম জনসংখ্যাধিক্যের বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই বিতর্ক রয়েছে। মুর্শিদাবাদ এস্টেটের দেওয়াল খন্দকার ফজলে রাব্বি তার হকিকতে মুসলমান-ই-বাঙ্গালা গ্রন্থে তেরো শতকের প্রারম্ভে মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির থেকে পরবর্তী সাড়ে ছয়শ বছরের মুসলিম শাসনকালের ৭৬ জন সুবেদার, রাজা নামিজ এর পুনঃক্রমিক শাসনকাল উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে রাজা কয়্স, জলালউদ্দিন শাহ আহমদশাহ, রাজা তোজরমল এবং রাজা মানসিংহ ব্যাতীত সকলেই ছিলেন আফগান, মোগল, তুর্কি, পারসিক বা আরবদেশের। এদের সাথে ছিল স্বধর্মীয় ও স্বদেশীয় বহু সৈন্যসামন্ত, প্রশাসনিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যে সব মুসলমান এদেশে এসেছেন তারা একাত্ম হয়ে থেকে গেছেন। গৌর বাংলার মুসলিম শাসকরাও এদের সাদরে আপ্যায়ন করেছেন, চাকরি দিয়েছেন, দান করেছেন নিষ্কর ভূমি। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর এবং মালদহে এ ধরনের ‘মদদ-ই-মআশ’ বা আয়মা সাহায্যের অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়।

১৮৭২-এর এইচ রিভারলি বা ১৯০১-এর রিজলির মন্তব্য ছিল যে এই অঞ্চলের মুসলিমরা নি¤œবর্ণের হিন্দুদের থেকে ধর্মান্তরিত, কিন্তু আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানীদের অনেকেই এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। রিজলী দেহ বৈশিষ্ট্যের গভীর সাদৃশ্যের কথা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল আর হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী দাপট ততটা তীব্র থাকার সম্ভাবনা ছিল না বলেই অনেকে মনে করেন। জহর সরকারের মত ঐতিহাসিকরা এই অভিমত দিয়েছেন মার্ক পোলো এই অঞ্চলে প্রচুর মূর্তিপূজার উল্লেখ করেছিলেন। এই মূর্তিপূজারকরা ‘হিন্দু ছিলেন কি না তা নিয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। এই পূজা অর্চনা ছিল অন্ত্যজ জাতির মানুষের। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিশ্বাস করতেন ধর্মপূজা বৌদ্ধ ধর্মীয়দের থেকে এসেছে। উল্লেখ করা যায় যে এই অঞ্চলে মহাযানতন্ত্র সাধনা অনুযায়ী তন্ত্র চর্চায় ও দেবদেবীর পূজা অর্চনার ছাপ আজও লোকাচারে লক্ষ করা যায়। প্রাচীন তুক্ষ্যা গানে আজও তন্ত্র প্রভাব দেখা যায়। সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত ধর্মপূজা একটি অনার্য অনুষ্ঠান, অস্ট্রিক জাতীয় আদিবাসী সমাজ থেকে তা উদ্ভূত। জহর সরকারের মতে ধর্ম উপাসকরা ছিলেন ‘অন্ত্যজ সমাজের মানুষ’। এরা সত্যিকারের হিন্দু হয়েছেন বা এদের আর্য্যায়ন ঘটেছে মধ্যযুগে। অর্থাৎ বাংলার অন্য অঞ্চলগুলোতে যখন ইসলামের প্রসার হচ্ছে। বাংলার মুসলমান আগমনের আগে হিন্দু ধর্মও অত প্রবল ছিল না, তিনি এর স্বপক্ষে দেখিয়েছেন যে প্রাকমুসলমান সময়ের মন্দির বা তর অবশেষে বাংলায় বিরল। মন্দির তৈরি হয় মধ্যযুগেরও পরে। তিনি জোড়ের সঙ্গে তার ‘দ্য কনস্ট্রাকশন অব দ্য হিন্দু আইডেনটিটি হল মেডিয়াভ্যাল ওয়েস্টার্ন বেঙ্গল-দ্য রোল আ পপুলার কান্টস্’—গ্রন্থে লিখেছেন যে ‘শুরুতে মুসলমানরা যখন এদিকে আসেন তখন কোনো মন্দির ধ্বংসের প্রমাণ নেই। বহু মানুষেই এই অনৈতিহাসিক বিশ্বাসে বড় হয়েছেন যে, ভারতের বাকি অংশের মতোই বাংলায়ও ইসলামের প্রবেশের আগে সমৃদ্ধ হিন্দু ধর্মের এক শান্ত সোনালি যুগ ছিল।’ বস্তুত উত্তরবঙ্গ ছিলো পুণ্ড্র, শবর, কোচ, মেচ, রাজবংশীয় বাসস্থান, যারা ধর্মীয়ভাবে সর্বপ্রাণবাদী বা অহরসরংঃ ছিলেন। এ অঞ্চলে হিন্দুধর্ম বা বৈদিক রীতিকরণ খুব সামান্যই গৃহীত হয়েছিল। ড. নীহাররঞ্জন রায়ও মনে করেন যে সে সময় অর্থাৎ মুসলমানদের আগমনের পূর্বে বাঙালি সমাজের অধিকাংশ ছিলো বর্ণাশ্রম বর্হিভূত।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে উত্তরবঙ্গে বিপুল সংখ্যক ‘আগন্তুক মুসলমান’ স্থায়ী বসতি গড়ে তুললেও এই শ্রেণীর সংখ্যা মূল জনপ্রবাহকে কখনও সংখ্যায় অতিক্রম করে যেতে পারে না। এদেশের ধর্মান্তরিত জনগণেই মুসলিম সমাজের গঠন ও বিকাশে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। এই ধর্মান্তরিতের অধিকাংশই বৌদ্ধধর্মীয়দের থেকে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনেক প্রভাব এই অঞ্চলের লোকাচারে বর্তমান। অনেকেই জল্পেশ মন্দিরের শিবলিঙ্গকে বজ্রযান বৌদ্ধতন্ত্রের নিদর্শন বলে চিহ্নিত করেন। খান চৌধুরী আমানত উল্লাহ আহমদ তাঁর কোচবিহারের ইতিহাস-এ ‘ইসলামের প্রচারক’ অংশে লিখেছেন : ‘আনুমানিক খ্রীস্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যে পশ্চিম কামরূপে ইসলাম ধর্মের প্রচার আরম্ভ হইয়াছিল এবং পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বহু সাধু-সন্ন্যাসী যে এতদঞ্চলে আগমন করিয়াছিলেন, তাহা বলা যাইতে পারে।’ এই পশ্চিম কামরূপে বৌদ্ধধর্ম ও তন্ত্র চর্চার প্রসার ছিলো অতীতে।

ড. মেকফেরলেনের মতে বর্ণ, বর্ণোত্তর ও অদৃশ্য বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে যে রক্তের বৈশিষ্ট্য ধরা পরে, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে যে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান সমস্যা জাতি। বুকানন হ্যামিল্টনও মনে করেন যে উত্তরবঙ্গের মুসলমানরা ধর্মান্তরিত দেশজ মুসলমান। উত্তরবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মুসলমান মুসলিম শাসকদের বলপ্রয়োগের কারণে এই ধর্ম গ্রহণ করেছে এটি ঠিক নয়। আবার হিন্দুধর্মের ভিতর থেকে তারা দলে দলে মুসলমান হয়ে গেছে এটাও ঠিক নয়। এ অঞ্চলের মুসলমানেরা কোনো এককভাবে কোনো আগন্তুক বা সম্প্রদায় নয়। বস্তুত, উত্তরবঙ্গের বর্তমান হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ অভিন্ন জৈব উৎস থেকেই উদ্ভূত। তবে হিমালয় সন্নিহিত বাংলায় মুসলমানদের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী বিষয় লক্ষ করা যায়। এখানকার মুসলমানদের দৈহিক বৈশিষ্ট্য রাজবংশীদের সাথে অভিন্ন। আসলে এটাই মনে হয় মানব সংস্কৃতির প্রধান শক্তি যে মিশ্র সংস্কৃতির নির্মাণের মধ্য দিয়েই তার সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দেয়। উত্তরের গ্রাম সমাজের ভিত যে লোকজীবন সেখানকার লৌকিক খেলাধূলা, পালা-পার্বণ, উৎস নাটক সংগীতের মুক্ত অঙ্গনে ধর্মীয় বন্ধনের বেড়া ভেঙে সবাই একাকার।

কোচবিহার ও সন্নিহিত অঞ্চলের সমাজের এক সময়ের ‘যুগীর গান’ বা ‘চারযুগের গান’-এ মুসলমান গায়েনের সঙ্গে হিন্দুরাও সমানভাবে অংশ নিয়েছেন। দেহতত্ত্বমূলক এই গানের পদে ইন্দ্র, আল্লা, মহাদেব বা ফতিসার উল্লেখ পাওয়া যায়। বিয়ের লোকাচারেও দুই সম্প্রদায়ের একইরকম আচার লক্ষ করা যায়, ফলে দেখা যাবে গায়ে হলুদ, চাউলন বাতি থেকে লাল শাড়ি, প্রভৃতিতে সাযুজ্যকে প্রতিষ্ঠা করে দৃঢ়ভাবে। অন্যান্য লোকঅনুষ্ঠানও দেখা যায় এমনই একাকার হয়ে যাওয়া। গোরক্ষনাথের গানে পিরদের অভ্যর্থনার কথা রয়েছে :

উত্তর হতে আসিল পির মুখে চম্পাবাড়ি

দুধ মাঙ্গিতে গেলাম নন্দ গোয়ালের বাড়ি।

হিন্দু রাজবংশীদেব চৈত্রসংক্রান্তির দিনের ‘বিশুয়া’ বা রকমের খাওয়ার সঙ্গে মুসলমান সমাজের ‘বিপাসা’-র মিল লক্ষণীয়। হিমালয় সন্নিহিত বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের যাবতীয় আচার বিচার যেন মিলেমিশে একাকার। এমনকি মৃতের অশৌচ পালনের ক্ষেত্রেও আচার পালনে নানারকম সাযুজ্য রয়েছে। দুই সম্প্রদায়েই ‘বাৎসরিকী’ পালন করে থাকে। মাটির ঘোড়া নিবেদন করে পিরের কাছে মানত করা বা বড় অশ্বত্থগাছে ঢিল বেঁধে বা কানিপিরের কাছে মানত করা গ্রামীণ হিন্দু-মুসলমান সমাজের প্রচলিত প্রথা। জলপড়া, তাবিজ নেওয়ার মত অনেক সংস্কারের মধ্যেও উৎসগত ও সহাবস্থানগত মিলের লক্ষণ লক্ষ করা যায়।

আসলে উত্তরবাংলার জনসমাজের গঠন ধীরে ধীরে নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিশ্রণে ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। এখানে তাই এইসময়ে বিচ্ছিন্নভাবে মুসলমানদের সংস্কৃতি ও উৎসের বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিতকরণ দুষ্কর; এদের বহিরাগত বলাও অনৈতিহাসিক। এক্ষেত্রেও তাই বলা যায় উত্তর তার চিরাচরিত মিলনবার্তা উত্তরের জন্য উত্তরের কাছে রেখে চলেছে।

তথ্যসূত্র

১.         আবদুর রহমান সিদ্দিকী : বরেন্দ্রভূমির চিরায়ত বাসিন্দা, বাংলাদেশ।

২.         নীহাররঞ্জন রায় : বাঙালির ইতিহাস, আদিপর্ব, কলকাতা।

৩.        রমেশচন্দ্র মজুমদার : বাংলাদেশের ইতিহাস  (১ম পর্ব, প্রাচীন যুগ), কলকাতা।

৪.         অতল সুর : বাঙলা ও বাঙালির বিবর্তন, সাহিত্যলোক, কলকাতা।

৫.         মিনহাজ, তবকাত-ই নাসিরি (অনুবাদ : একে এফ জাকারিয়া) বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৬.         ঈষবধৎধহপব গধষড়হবু : ঞৎরনবং ড়ভ ইধহমষধফবংয ধহফ ঝুহঃযবৎং ড়ভ ইধহমধষর পঁষঃঁৎব

৭.         রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় : বাংলার ইতিহাস, প্রথমপর্ব, কলকাতা।

৮.         গল্পকার ফজলে রাব্বি : বাংলার মুসলমান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৯.         সুখময় মুখোপাধ্যায় : বাংলায় মুসলিম অধিকারের আদিপর্ব, সাহিত্যলোক, কলকাতা।

১০.       নাজমুল হক, উত্তরবঙ্গের লোকসাহিত্যের নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

১১.       জাহিরুল হাসান : বাংলায় মুসলমানদের আটশো বছর, কলকাতা।

১২.       মধ্যযুগে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি : সম্পাদক : অনিরুদ্ধ রায় ও রতœাবলী চট্টোপাধ্যায়, কে.পি.বাগচী, কলকাতা।

১৩.      পশ্চিমবঙ্গ : কোচবিহার জেলাসংখ্যা : তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ।

মুক্তবুদ্ধির উপাসক আবুল হুসেন

শরীফ আতিক-উজ-জামান

মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতাদের মাঝে কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল ফজল, আব্দুল কাদিরের নাম পাঠক সমাজের কাছে যতটা পরিচিত ততটাই স্বল্পোচ্চারিত আবুল হুসেনের নাম। অথচ তিনিই ছিলেন এই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রগামী সৈনিক। এদেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে যারা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন আবুল হুসেন তাদের অন্যতম। এই শতাব্দীর সূচনালগ্নে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদিতার চর্চায় মুসলমান সমাজের অনীহা ও পশ্চাৎপদতা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল। শুধুমাত্র ধর্মশিক্ষা যুগের চাহিদা মেটাতে পারে না, বরং পরিণামে তা আকাট মূর্খতা, পশ্চাৎপদতা, কূপমণ্ডূকতা, যুক্তিহীনতা, মনুষ্যত্বহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদিতার জন্ম দেয় এবং ব্যক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে—এই উপলব্ধি থেকেই ১৯২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিলো ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জ্ঞানচক্ষু ফোটানো, কোনো ইসলামি সাহিত্যচর্চা নয়। আধুনিক যুগে বসবাস করে হাজার বছর পিছনের চিন্তা-চেতনা লালনের ফল যে কত ভয়াবহ হতে পারে এই মুক্তবুদ্ধির উপাসক তখনই তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তার প্রচেষ্টা ছিল এই পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের চিন্তায়, মননে যুক্তিবাদিতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার বীজ বপন করা। ‘…আমাদের চোখে যে ১০০০ বছরের পুরাতন ধর্মের ঠুলি লাগানো আছে, সেটা খুলে ফেলে খোদার দেয়া চক্ষু দিয়ে সমস্ত দুনিয়াটাকে একবার ভালো করে দেখা’র তাগিদ দিয়েছেন তিনি তার ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ প্রবন্ধে। এই গোষ্ঠীর পত্রিকা ‘শিখা’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। তার দুই বছর আগেই আবুল হুসেনের তত্ত্বাবধায়নে প্রকাশিত হয় ‘তরুণ পত্র’ যার উদ্দেশ্যও ছিলো যুক্তিবাদী জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করা।

‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি আক্ষেপ করেছেন, ‘বাঙালি মুসলমানের জীবনের দিকে যখন দৃষ্টিপাত করি তখন দেখি, সে জীবন নিতান্ত হীন, নিতান্ত দরিদ্র, নিতান্ত সংকীর্ণ। অর্থ বলুন, রুচি বলুন, আনন্দ বলুন, কিছুই সে জীবনে নাই। …আজ বাঙালি মুসলমান দর্শন, বিজ্ঞান, আর্ট কোনোটিতেই নেই।… কেন মুসলমানের এ দুর্গতি? এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দিতে গেলে বলতে হবে। আমাদের শিক্ষা নাই— আমরা জ্ঞানের সঙ্গে বহু দিন হতে বিরোধ করে বসে আছি এবং দর্শন, বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষাকেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি এই ভয়ে পাছে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক!’

আবুল হুসেন যুগ-সচেতন মানুষ ছিলেন। সেই সচেতনতার ফলেই তৈরি হয়েছিল তার পূর্ণ যুক্তিবাদী মন। যে যুগে আমরা বসবাস করি তার সমস্যার সমাধান সেই যুগে থেকেই করতে হবে। হাজার বছর পিছনে গেলে সমাধান মিলবে না। মানুষের প্রয়োজনে ধর্ম সৃষ্টি হয়েছিল, মানুষের প্রয়োজনেই তার পরিবর্তন আবশ্যক, ধর্মের জন্যে মানুষ নয়। ধর্ম সম্পর্কে এদেশের অশিক্ষিত মানুষের রয়েছে অলৌকিক ভীতি, আর জিগির তোলা ভণ্ড রাজনীতিবিদদের কাছে তা প্রতারণার অস্ত্র। অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে অসার-আস্ফালন ভবিষ্যতের কী ভালো করতে পারে বারংবার তিনি সেই প্রশ্ন করেছেন। তার আকাক্সক্ষা ছিল সকল কূপমণ্ডূকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মুক্তি লাভ করুক। তাই ‘শিখা’র  মুখবাণী ছিলো— ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’

বাঙালি মুসলমানের আড়ষ্ট বুদ্ধির জন্যে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী মনে করেছেন। তাই অবিভক্ত ভারতে যখন ‘নিউ স্কীম মাদ্রাসা পদ্ধতি’ চালু হলো তিনি তার কঠোর সমালোচনা করলেন, ‘আজ আমাদের সকল দুর্গতির কারণ হচ্ছে আমাদের আড়ষ্টবুদ্ধি, অন্ধবিশ্বাস, বর্তমান জীবন সম্পর্কে ঔদাসীন্য এবং বর্তমান জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কহীনতা। তার জন্যে মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি অনেকখানি দায়ী।’ ইতিহাস টেনে তিনি প্রসঙ্গকে দীর্ঘ করে আরো বলেছেন, ‘১৭৮৪ সাল হতে আমাদের বাংলার মুসলমান মাদ্রাসা শিক্ষা লাভ করে আসছে।…এই দীর্ঘ দেড়শ’ বছরের মধ্যে বাংলার মাদ্রাসা একজনও বৈজ্ঞানিক, একজনও ঐতিহাসিক, একজনও সাহিত্যিক, একজনও শিল্পী তৈরি করতে পারেনি— বিশ্বের দরবারে যার কদর হয়েছে। জাতির ইতিহাসে এর চেয়ে লজ্জাকর আর কী হতে পারে। এই দেড়শ’ বছর একেবারে ফাঁকি। তার মধ্যে শিক্ষার চেয়ে কু-শিক্ষাই বেশি হয়েছে, তাই আজ আমাদের এই দুর্গতি। …এতোদিন ধরে হিন্দু বাংলা যখন বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, শিল্পী প্রভৃতি নানা গুণী সৃষ্টি করেছে, তখন মুসলিম-বাংলা শুধু মুন্সী-মোল্লা তৈরি করেছে।’

আজ এদেশে যে মাদ্রাসা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা কতখানি যুগোপযোগী? আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তার কীভাবে সমন্বয় হবে? আর তা না হলে যে আড়ষ্ট বুদ্ধির মানুষ তৈরি হবে এতে আর বিতর্ক কী? তার লক্ষণ কি প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে না? এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মানবসম্পদ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণতর হয়ে উঠছে। তারা জড়বুদ্ধির মানুষ ও রাষ্ট্রের কাঁধে বোঝা হয়ে উঠবে—এ সত্য তিনি তখনই উপলব্ধি করেছিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী করে তোলার মাধ্যমে আধুনিক ও পশ্চাৎমুখী শিক্ষার দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারলে সমাজ এগোতে পারবে—এ বিশ্বাস তার ছিল। এ দেশের ধর্মচর্চার মধ্যে আবুল হুসেন কল্যাণকামিতা, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা, আত্মনিবেদন, সততা যতখানি না দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি দেখেছেন ভণ্ডামি, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি, শঠতা, সাম্প্রদায়িকতা আর ভয়ঙ্কর উগ্রবাদিতা যা বিভিন্ন সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের মাঝে শুধু দূরত্ব, ঝগড়া-ফ্যাসাদই নয়, চরম হানাহানি ও রক্তারক্তির কারণ ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। ‘সত্য’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘হাদীস-কোরান এলহান দুরস্ত করে ক্বিরাত ঠিক করে আবৃত্তি কর, তোমার অন্তর খাঁ খাঁ করবে। তাতে তোমার জিহ্বা ও কান তুষ্ট হবে, কিন্তু অন্তর ভুখা থাকবে। শুধু আবৃত্তিতে আত্মার ক্ষুধা নিবৃত হয় না, সত্য প্রতিভাত হয় না, কেবল সত্যের ভান করতে ইচ্ছা বেড়ে ওঠে এবং খুব ধার্মিক হয়েছি বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে লোকসমাজে নিজের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ করে তুলি।’

আজ যারা ‘ধর্ম গেল ধর্ম গেল’ বলে চিৎকার করছে, ধর্ম কিন্তু মারা পড়ছে তাদের হাতেই। বিপুল অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মূর্খতা পুঁজি করে পরকালের ভয় দেখিয়ে নিজেদের ইহজাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানোর কাজে তারা সর্বদা ব্যস্ত রয়েছেন। নদীর স্রোত বহমান, জীবন বহমান, তাহলে চিন্তা কেন স্থবির হবে? যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কেন পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে এদের এত কুণ্ঠা? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত সুবিধা গ্রহণে এদের আপত্তি না থাকলেও তার সাথে একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরির প্রয়োজনীয়তা কী? বিজ্ঞান-মনস্ক মানুষের স্বপ্ন তাই অধরাই থেকে যায়। মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার চর্চা মুখ থুবড়ে পড়ে। ধর্মের দোহাই দিয়ে চলে সম্প্রদায়িকতা আর উগ্রবাদিতার চর্চা। জীবনধর্মিতা থাকে না বলে মানুষ পরকালমুখী হয়ে যায়। এদের উদ্দ্যেশ্য করেই ‘তরুণ মুসলিম’ প্রবন্ধে তিনি তরুণদের সতর্ক করেছেন, ‘মুসলিম যুবকদের প্রতিও আমার এই একই উপদেশ। তোমরা যেন অনর্থক মৌলভী-মৌলানাদের বক্তৃতা শুনে হিন্দুকে কাফের বলে তার মনে আঘাত দিও না।’

তখনো যেমন এখনো তেমনি ধর্মের বেশিটুকুই সাম্প্রদায়িকতা। নিজ ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা অবচেতন মনে হলেও অন্য ধর্মের প্রতি নিস্পৃহ ও ঘৃণার ভাব জাগিয়ে তোলে। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের অসম্প্রীতি তাকে বেদনাহত করত প্রতিনিয়ত। তাই তিনি এক সাহিত্য সমাবেশে বলেছিলেন :

ভারতের তথা বাংলার অনেক দুঃখ-দৈন্য আছে, তার মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব দ্বেষাদ্বেষি সব চেয়ে বড় দুঃখ। হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান নাম দিলে বড়জোর সে মানুষ পুষ্পের রং-এর পার্থক্য দেখান হয় মাত্র। রং পুষ্পের প্রকৃত স্বরূপ নয়—তার সত্ত্বা রং-এর অন্তরে। সুতরাং বিভিন্ন ধর্ম-পরিচ্ছদ পরিহিত মানুষের আসল সত্ত্বা তার অন্তরে – যেখানে পৃথক করার কিছুই নাই।

তৎকালীন হিন্দু ও মুসলমান একে অন্যকে নানাভাবে অভিযুক্ত করত। আবুল হুসেন ভারতে সাম্প্রদায়িকতার জন্যে উভয় সম্প্রদায়কেই দায়ী করেছেন। হিন্দু সমাজ অভিযোগ করত মুসলমানরা ভারতের দিকে না তাকিয়ে তাকায় ইরান-তুরান-তুরস্কের দিকে। মুসলমানের এই মনোভাবের সবটুকু ধর্মীয় চেতনাজাত নয়। হিন্দু-সাম্প্রদায়িকেরা স্বপ্ন দেখে দুই হাজার বছর আগের আর্য সমাজের পুনঃপ্রতিষ্ঠার (এখন রামরাজ্য)। ফলে অনেক হিন্দু পণ্ডিত ‘অতীতকালে হিন্দু-ভারতে বর্তমানের সমস্ত সৃষ্টির রূপই বিদ্যমান ছিল’ এই ধরনের অবাস্তব ও অসম্ভব কথা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগেন। কিন্তু এই অতীতমুখিনতার সবটুকুই আবেগসর্বস্ব। অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকলে যে বর্তমানে বসবাস তার কী হবে? আর ভবিষ্যৎ নিয়েই বা কে চিন্তা করবে?

একজন গণতন্ত্রী আবুল হুসেন ভারতের অখণ্ডতায় বিশ্বাস করতেন, ‘রাষ্ট্রের দিক দিয়ে ভারতবাসীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে আজ দেখা যেতে পারে না। ভারতবর্ষ ও ভারতবাসী মিলে এক অখণ্ড রাষ্ট্র গঠন হয়েছে।’ এই ছিল তার স্পষ্ট বক্তব্য। ১৯৩১ সালে মুসলিম লীগ নেতারা যখন স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবি করেন তখন তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। মুসলমানদের জ্ঞানচর্চার প্রতি অনীহা ও পশ্চাৎপদতার কারণে প্রত্যেক জায়গায় পিছিয়ে পড়ে ধর্মগত প্রতিনিধিত্ব দাবির মাধ্যমে কিছু কিছু সুবিধা আদায় করে নেওয়াকে তিনি ভিক্ষুকের মানসিকতা বলেছেন :

…ব্রিটিশ বণিকেরা মুসলমানদের বদান্যতা ও উদারতার সুযোগ নিয়ে প্রতিপত্তি লাভ করতে করতে রাজত্ব লাভ করলেন। আর মুসলমান ক্ষোভে-অভিমানে বহুদিন নতুন রাজশক্তির সঙ্গে সাহচর্য না করে দূরে সরে রইল, কিন্তু দুনিয়া এগিয়ে চলল। তারপর যখন হঠাৎ জেগে উঠল তখন সে দেখে হিন্দু সমাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তখন সে অনুকরণে প্রবৃত্ত হলো। সে তখন হিন্দুর মতো চাকরি করতে চাইল, কিন্তু বিদ্যা-বুদ্ধিতে হিন্দুর থেকে পিছনে থাকায় তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে সরকারের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাজির হলো।

ভারত বিভাগও সেই ভিক্ষুকসুলভ মানসিকতার ফল। ভাগ্যিস এই বিপর্যয় তাকে দেখে যেতে হয়নি। তবে এর বিষফল এই উপমহাদেশের মানুষেরা এখনো ভোগ করছে। দেশ ভাগ করে সমস্যা সমাধানের নামে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সমস্যা—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যাদের ওপর চলছে নীরব অত্যাচার, আর মাশাল্লাহ তা ধর্মের নামে জাতিসত্তার জিগির তুলে। আর এ সবের যোগান দিয়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো। তাই আবুল হুসেন সংস্কার মুক্তির কথা বলেছেন। সব সাম্প্রদায়িক পরিচয় ভুলে সে পরিচিত হবে মানুষ হিসেবে। কা’নান্নাসো উম্মাতাওঁ ওয়াহেদাতান্্—সমস্ত মানুষ এক জাতি। ‘অতীত সংস্কারকে ভুলে যেতে পারলেই আমাদের মিলন সম্ভব হবে। সংস্কারাসক্ত হিন্দু ও সংস্কারাসক্ত মুসলমান চিরদিনই বিরোধ করবে, কিন্তু সংস্কারমুক্ত হিন্দু ও সংস্কারমুক্ত মুসলমানই মিলতে পারবে।’ অর্থনীতির ছাত্র পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হুসেন অর্থনীতির আধুনিকীকরণ সম্পর্কে মত রেখেছিলেন। ইসলামের দৃষ্টিতে ‘সুদ’ হারাম। ঈধষপঁঃঃধ জবারবি পত্রিকায় এক নিবন্ধে তিনি ঐতিহাসিক সামাজিক পটভূমিতে কেন ইসলাম সুদ ‘হারাম’ ঘোষণা করছিল তা দেখিয়ে বর্তমান যুগের চাহিদার নিরিখে কেন তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তার ব্যাখ্যা দিয়ে ‘ওহঃবৎবংঃ’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘ধনজ’ রাখার পক্ষে মত দেন। তখনকার কূপমণ্ডূকরা তার এই বক্তব্যকে ধর্মদ্রোহিতার সামিল বিবেচনা করে হইচই করেছিল। কিন্তু আজকের বাস্তবতার নিরিখে সুদ ছাড়া কি ব্যাংক চলে? তাইতো দেখা যায় কতিপয় ব্যাংক ‘সুদ’কে ‘লভ্যাংশ’ নামে চিহ্নিত করে আমানতকারিদের সঙ্গে ধর্মীয় লেবাসে এক ধরনের শাব্দিক প্রতারণা করছে।

‘ব্রিটিশ ভারতে মুসলমান আইন’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন—‘হজরত মুহম্মদের (সঃ) যুগে আরব দেশের প্রয়োজন অনুসারে যে আইন রচিত হয়েছিল সে আইন জগতের সর্বত্র সর্ব অবস্থাতেই প্রযোজ্য বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সে বিশ্বাস মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস সমর্থন করতে পারে না। সেই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে এ দেশের মুসলমানদের জন্যে ব্রিটিশ প্রভু যে মুসলমান আইনের প্রচলন করেছেন তার জন্মভূমি ছিলো আরব-মরু, বোখারা, খোরাসান ও সমরকন্দ—যার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে আধুনিক ভারতীয় মুসলমানের পরিপার্শ্বের আদৌ কোনো মিল নেই। এই জীবন্ত পরিপার্শ্বকে তুচ্ছ করে জোরজবরদস্তী খোরাসান-বোখারার আইন হুবহু প্রবর্তন করবার চেষ্টা করা হয়েছে।’

আজ বেঁচে থাকলে আবুল হুসেন নিশ্চিত ধর্মান্ধদের দ্বারা মুরতাদ ঘোষিত হতেন। তার ফাঁসির দাবি উঠত। কিন্তু যে সত্য তিনি তর্জনী উচিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন পাল্টা কোনো যুক্তি দিয়ে কেউ তা খণ্ডনের চেষ্টা করেননি। তিনি দেখিয়েছেন যে, মুসলমানরা আজ ধর্মের অনুশাসনের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, কিন্তু একটুও মেনে চলে না। হজরত মুহম্মদ (সঃ)— এর নিষেধের মধ্যে বিশেষ বিশেষ নিষেধাজ্ঞা এই, ‘খোদা ছাড়া কাহারো নিকটা মাথা নত কোরো না, পুত্র-কন্যাকে মূর্খ রেখ না, ধর্মের জন্যে জুলুম কোরো না। অন্যের অধিকার নষ্ট কোরো না।’ কিন্তু তারা আজ কী করছে ? মুসলমানদের পৌত্তলিক হিসেবে চিহ্নিত করে আবুল হুসেন বলেছেন :

মুসলমান আজ ঘোর পৌত্তলিক। সে খোদাকে চিনে না—সে চিনে তার পীর এবং তার দাদাপীরের কবর। কবর আজ মুসলমানের সর্বশ্রেষ্ঠ দরগা হয়েছে—তার সর্ব কামনার আখড়া সেখানে। দরগাকে শ্রদ্ধা করতে গিয়ে সে মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয় কেমন করে তা ভুলে গেছে। …নিজের অক্ষমতা দূর করার একমাত্র উপায় হয়েছে তার দরগায় মানত। তারা দুরভিসন্ধি হাসিল করতে হলে দৌড়ায় দরগায়, স্ত্রী-পুত্রের অসুখের জন্যে ওষুধ ও পরিচর্যা ফেলে আনে দরগার মাটি কিংবা দরগা সেবকের তাম্বুর-তাম্বাকু মিশ্রিত সুগন্ধি ফুকোর। দরগায় মাথা ঠুকে সেলাম দিয়ে সে যায় জুয়া খেলায় ও ঘোড়দৌড়ে। খোদার নাম মুখে নিয়ে সে আরম্ভ করে মদ খেতে। আল্লার নাম নিয়ে যায় পরের স্ত্রী অপহরণ করতে। খোদার নামের কী চমৎকার ব্যবহার! সে নিঃস্ব হয়ে বারাঙ্গনার পদলেহন করে ফিরছে। কোথায় গেল সে নিষেধ? ‘…ধর্মের জন্যে জুলুম করা অনেকটা মুসলমানদের স্বভাবগত হয়ে গেছে, সে কথা বললে সমাজ অতিমাত্রায় চটে উঠবেন। আমি যেটা অনুভব করি সেটা তো না বলে পারি না। পরধর্মীদের উপর জুলুম করার কথা বাদ দিলেও স্বধর্মীদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদের অন্ত নেই।’

ধর্মশাস্ত্র ও ধর্মজীবন যে এক নয় তা এ দেশের মানুষের অপরাধ প্রবণতার দিকে তাকালে বোঝা যাবে। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবন ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় তা যত গলাবাজিই করুন না কেন। অবলীলায় অন্যায় করে তাকে ধর্মের আপ্তবাক্যে যৌক্তিকতা দানের প্রচেষ্টা নতুন নয়। এদের উদ্দেশ্য করেই আবুল হুসেন বলেছেন : ‘কুকর্মের চূড়ান্ত করো কিন্তু মসজিদে এসে মাথা ঠুকে যাও, তোমার সমস্ত পাপ ধুয়ে যাবে। কি চমৎকার ধর্ম! এই রূপ নামাজের দোহাই দিয়েই মুসলমান আজ নানা প্রকার অনাচার, অপকর্মে নিপুণ হয়ে উঠছে।’ রেনান সাহেব যে বলেছিলেন, ওংষধস ংযধষষ ঢ়বৎরংয তা বোধ হয় এ জন্যেই যে, বুদ্ধির ঘরে তালা ঝুলিয়ে মুসলমান শাস্ত্রের দোহাই পেড়ে চলতে চাইছে। আবুল হুসেনের সমস্ত রচনায় সমাজের মঙ্গল চিন্তাই গুরুত্ব পেয়েছে। সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় সংস্কার, ধর্মকে তিনি ‘সনাতন’ মনে করতে পারেননি, তাই ধর্মের অপ্রয়োজনীয় দিকগুলোর দিকে তর্জনী উঠাতে দ্বিধাবোধ করেননি। তাতে উগ্র ধর্মপন্থী সমাজপতিরা অখুশী হয়েছেন। তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। আহসান মঞ্জিলে তাকে বিচারে বসতে বাধ্য করা হয়েছে, জোর করে অপরাধ স্বীকার করিয়ে মুচলেকা আদায় করা হয়েছে। সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি দমবার পাত্র ছিলেন না। যা সত্য বলে জেনেছেন তা অকপটে নির্ভয়ে বলেছেন। ‘শিখা’র গড়ঃঃড় তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। ‘যদি সত্যের থাকে বল তবে নির্ভয় চিত্তে চল।’

আজও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ধর্ম ও গোঁড়ামি যেন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তিবাদিতার উত্তর দেওয়া হচ্ছে গায়ের জোরে। আমাদের মাঝে ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা একেবারেই লোপ পেয়েছে। উগ্রতাই সবকিছুর জবাব হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্বাসীরা এতটা নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে উঠলেন কেন? ধর্ম মানুষকে দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালাতে উৎসাহ যোগায়—এমন দৃষ্টান্ত কি খুব কম? সেইসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবা করে যাচ্ছে, মানবতার মহান বাণী প্রচার করে যাচ্ছে। ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে সংস্কার ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠারও অনেক নজীর রয়েছে। মার্টিন লুথার কিং, মহাত্মা গান্ধী ও উইলিয়াম উইলবারফোর্স, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু কি সে প্রমাণ দেন নি? কিন্তু আজকের দিনে ধর্ম হয়ে উঠেছে ফসিলসর্বস্ব কিছু গোঁড়া আদর্শের সমষ্টি যা মৌলবাদের শ্বাসরোধকারী অন্ধকার, ধর্মযুদ্ধের হুঙ্কার দেওয়া রক্তপিপাসু উগ্রবাদী এবং মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠী ছাড়া আর কিছু সৃষ্টি করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। তবে সবকিছুই যে ধর্মের অপব্যাখ্যাজাত তা ভাববার কারণ নেই। প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই অবিশ্বাসীদের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার কিছু ইন্ধন রয়েছে। উগ্রবাদীরা আর সব ফেলে এটাকেই ধর্মের মূল বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে এবং দ্রুতই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। কিন্তু ধর্মের সাথে মুক্তবুদ্ধির বিরোধিতার মাধ্যমেই সভ্যতা আজ এতদূর এসেছে। সেখান থেকে পিছনে ফেরার সুযোগ নেই। আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা থেকে একটি প্রশ্ন জাগে যে ধর্ম কি নিজের জীবনকে মূল্যহীন মনে করতে শেখায়? সেখানে কি জীবনবাদী হওয়ার শিক্ষা নেই? সমাজের একটি অদ্ভুত বিষয় আমরা লক্ষ করি। বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাসী হলেও উগ্রবাদী নয়, বরং তারা সাধারণ কোমল মনের মানুষ যাদের কোনো কাজের জন্যই ধর্মের দোহাই দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু উগ্রবাদীদের পড়ে। ভালো মানুষেরা স্বীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াই ভালো কাজ করতে পারেন। ধর্মীয় নৈতিকতার মূল সমস্যা হলো যে তা যতটা মানুষের চাহিদার ভিত্তিতে নির্ধারিত তার চেয়ে বেশি স্রষ্টার ইচ্ছা মান্য করার প্রবণতা ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে স্রষ্টার ইচ্ছা সম্পর্কে সে পরিপূর্ণরূপে অবগত তখন সে যুক্তির বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। আর এর কারণ, প্রতিটি ধর্মই বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা দেয়, আর বিশ্বাস মেনে নেওয়ার বিষয় নয়, মুগ্ধচিত্তে প্রশংসার বিষয় এবং সেটাই বিশ্বাসী মানুষের লক্ষণ। এখানেই বিশ্বাস বিপদজনক। পৃথিবীর ইতিহাস বলছে যে বিশ্বাসীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি মানবতা লাঞ্ছিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে গোঁড়ামি এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে তার উগ্রতার শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। ধর্মীয় বিশ্বাস যখন অন্ধভাবে মেনে চলার বিষয় হয়ে ওঠে তা হয় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আর তা সব ধর্মের বেলায়ই সত্য। মুসলিমরাই শুধু সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় আদর্শ ফলাও করে তা নয়, প্রাচ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধদেরও যথেষ্ট সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। ইসলামের পরই খ্রিস্ট মৌলবাদ সারাবিশ্বে গ্যাট হয়ে বসে আছে তা অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, কারণ তারা সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ক্ষমতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে বলে এতটা আলোচিত নয়। আর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মানুষেরা জীবন বিপন্নকারী সহিংসতায় খুব লিপ্ত হয় না। স্বচ্ছলতা মানুষের বঞ্চনা অনুভূতি জাগায় না আর ভোগবাদী সমাজে ভোগাকাক্সক্ষার কারণে মানুষ সংঘাত থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা সচেতন-অবচেতন মনে সংস্কারাসক্ত নয়। ২০০২ সালে আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে যে ৫৯ শতাংশ খ্রিস্টান বিশ্বাস করে যে নিউ টেস্টামেন্টর শেষ গ্রন্থ ‘ঞযব জবাবষধঃরড়হ ড়ভ ঝঃ. ঔড়যহ ঃযব উরারহব’-এ বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ ভবিষ্যতে ঘটবে। প্রতি ১০ জনের ৬ জন আমেরিকান বিশ্বাস করে যে আগামীতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে অর্থাৎ খ্রিস্টের পুনরাবির্ভাবে আস্থা রয়েছে তাদের। খ্রিস্ট মৌলবাদীর সংখ্যা কম না হলেও তারা সেভাবে উগ্রবাদী নয়। সহনশীলতার দিক দিয়ে তারা এই সময়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে। আর তাই হয়ত তাদের রক্ষণশীল চেহারা সেভাবে প্রকাশিত নয়। ইতিহাস আরো বলছে যে বেশিরভাগ গণহত্যার ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে, তাকে প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে নয়। কিন্তু যৌক্তিক ভাবনা, প্রায়োগিক বিজ্ঞান, নৈতিকতা, পরিতৃপ্ত জীবন কি কোনো বিশ্বাসের ধার ধারে?  আর বিশ্বাস কোনো কিছুকে মানসিকভাবে স্বীকার বা গ্রহণ করে একটি জেদি ও একগুঁয়ে মনোভাব তৈরি করে। বিশ্বাসের অন্ধত্ব, বিশেষ করে ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষকে যুক্তির চোখ মেলে সত্য দেখতে বাধা দেয়।

আবুল হুসেন তার নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের এই মানসিকতা কাটিয়ে ওঠার জন্যই মূলত কলম ধরেছিলেন। ‘শিখা’ একটি প্রতীক। জ্ঞানকে সারাবিশ্বের মানুষ আলোর সাথে তুলনা করে থাকেন। শিখা প্রজ্বলিত থাকলে তার আভায় মানুষের দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। ‘শিখা’ গোষ্ঠীর একজন প্রবক্তা হিসেবে আবুল হুসেন সেই আলোই জ্বালতে চেয়েছেন। তার লক্ষ্য ছিল অচলায়তন ভেঙে সামনে এগুনো। তাই ধর্মব্যবসায়ী কূপমণ্ডূকেরা তাকে চাঁদমারী করে ব্যঙ্গ ও অশ্লীল বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে। একটি সুন্দর ‘সেক্যুলার’ সমাজ ছাড়া যে দেশ ও দশের মঙ্গল হতে পারে না তা শতাব্দির শুরুতেই আবুল হুসেন বুঝেছিলেন। তাই সবরকম সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা-কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। কিন্তু কতটুকু মর্যাদা পেয়েছে তার সদিচ্ছা। আজও তার সব রচনা বাজারে দুষ্প্রাপ্য। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী থেকে বের হয়নি তার কোনো সংকলন বা জীবনীগ্রন্থ। পরিশেষে আব্দুল কাদিরের একটি উক্তি দিয়ে এ লেখার সমাপ্তি টানছি :

আবুল হুসেন সাহেবের গুণাবলী ও কৃতিত্ব উপলব্ধি করার তাগিদ যদি তরুণদের অন্তরে না জাগে তবে বুঝতে হবে যে, এ দেশের ভাগ্য প্রসন্ন হতে এখনো অনেক দেরী।

বাঙালি মুসলমান পর্যবেক্ষণ : আহমদ ছফার আতশ কাচ দিয়ে

জাকির তালুকদার

প্রস্তাবনা

ধর্মায়ন সব সময়ই একটি বিপজ্জনক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে রাষ্ট্র যখন সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মিলন ঘটিয়ে কোনো সমাজের চরিত্র ও লক্ষ্যকে পাল্টে দেওয়া সম্ভব। পুরোপুরি উল্টোপথে পরিচালনা করা সম্ভব। ইতালিতে যেভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, আন্তোনিও গ্রামসি তার পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে—ফ্যাসিবাদ ইতালিতে কায়েম হয়েছিল শুধুমাত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি ও বল প্রয়োগ করে নয়, অত্যন্ত সুকৌশলে সাধারণ মানুষের চিন্তার অনগ্রসরতা, বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের ধর্মভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে, ক্যাথলিক চার্চের সমর্থন আদায় করে, সর্বোপরি শ্রমিকদের মধ্যে বামপন্থী, বিশেষত কমিউনিস্টদের প্রভাবের অভাবকে ব্যবহার করে। এক কথায় ইতালিতে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল নিছক রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাস ও নিপীড়নকে আশ্রয় করে নয়, এই সাফল্যের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল জনমানসের এক ব্যাপকতম অংশের মনন ও সংস্কৃতিকে ফ্যাসিস্ত ভাবাদর্শের অভিমুখী করে তুলতে পারার ক্ষেত্রে সাফল্য।

গ্রামসি কথিত ইতালির সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির অদ্ভুত মিল। এই পরিস্থিতিকে দেশের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান সমাজের মানস বিশ্লেষণ না করে কোনো কর্মসূচিই গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের সেক্যুলার বুদ্ধিজীবদের স্পষ্টতই অনাগ্রহ রয়েছে এই কাজে। তাই তাদেরকে এই কাজে তেমনটা অগ্রসর হতে দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম অবশ্যই আহমদ ছফা।

১.

যা হবার কথা ছিল পরিপূর্ণ স্বাভাবিক, নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অপরিহার্য-অচেতন প্রক্রিয়া, সেটি নিয়েও দ্বিধাগ্রস্ত আমরা। আমরা, মানে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মীমাংসিত বিষয় নিয়েও জট তৈরি করে আমাদের ফেলে দেওয়া হয় ঘূর্ণাবর্তে। বাঙালিত্ব বা বাংলাদেশিত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী রাজনীতি-ব্যবসায়ী ছাড়া আর কারো যে কোনো লাভ হয় না, এই ধারণাটুকুও আমাদের নাই। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট আজকের নয়। বাঙালি হলে মুসলমান হওয়া যায় কিনা কিংবা মুসলমান হলে বাঙালিত্ব আদৌ অবশিষ্ট থাকে কি না, এই চিন্তা নিয়েও কেটে গেছে দশকের পর দশক। শুনতে অবাক মনে হলেও, শুনতে হাসি পেলেও, এমন প্রশ্নও একসময় উত্থাপিত হয়েছে যে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না হয়ে উর্দু, ফারসি কিংবা আরবিও হতে পারে—এমনটি ভাবার মতো বুদ্ধিজীবী ও সমাজনেতার অভাব ঘটে নি এই বিচিত্র দেশে। এত শতাব্দীর পরেও কেন এই ধরনের মীমাংসিত বিষয় নিয়ে ফের জল ঘোলা করা? কেন বাঙালি মুসলমানের জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপরিসীম পশ্চাৎপদতা? আহমদ ছফা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তাঁর অনুসন্ধানের উপসংহারে তিনি জানাচ্ছেন যে এই পশ্চাৎপদতার কারণ হচ্ছে বাঙালি মুসলমান মানসের অপ্রাপ্তবয়স্কতা। এই সমাজটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, মৌলবাদীও নয়, বরং অপরিণত, অবিকশিত একটি সমাজ।

কোনো সমাজের সবশ্রেণির বিকাশ সমভাবে হয় না। বাঙালি হিন্দু সমাজেও তা হয় নি। বরং বিকাশ-বৈষম্য সে সমাজে আরো বেশি। কেননা বর্ণাশ্রমভিত্তিক ব্রাহ্মণ্যপ্রাধান্য হিন্দু সমাজের অসম বিকাশকে বাধ্য করেছে। আমাদের এই উপমহাদেশে যে রেনেসাঁ বা নবজাগরণকে নিয়ে গর্ব করা হয়, তা মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের জাগরণ। তবুও বলা যায়, চুঁইয়ে পড়ে হলেও এই জাগরণ-চিন্তার ছিটেফোঁটা হয়তো হিন্দু সমাজের আরো কিছুটা গভীরেও প্রবেশ করেছিল। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজে এর কোনো রেখাপাতই ঘটেনি। অভিঘাত তো আরো পরের কথা। আর বাঙালি মুসলমান বলতে আহমদ ছফা যে অন্ত্যজ হিন্দু আদিবাসী গোষ্ঠি থেকে ধর্মান্তরিত মূলত কৃষিজীবী অন্ধকার জীবনে আবদ্ধ কৃষি ও তুল্যজীবী মুসলমানদের বুঝিয়েছেন, তাঁদের জীবনে রেনেসাঁর অভিঘাত বলতে ঘটেছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অভিশাপ, রেনেসাঁগর্বী হিন্দু জমিদারশ্রেণি-প্রদত্ত খাজনার বোঝা টানার ঘানির বলদত্ব এবং নিজেদের রক্ত-মাংস নিংড়ে কলকাতার আলোকৎসবের জ্বালানি সরবরাহের রাষ্ট্রপ্রদত্ত দায়িত্ব।

শোষণের সকল মাত্রার চূড়ান্ত শিকার হতে হয়েছে বাঙালি মুসলমান সমাজকে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বাঙ্গালার কৃষক’ লেখাটিই এই বিষয়ে প্রমাণ হিসাবে যথেষ্ট। আর শোষণকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য যতগুলি উপায় প্রয়োগ করা দরকার, সেগুলি সবই প্রয়োগ করা হয়েছে ভূমিলগ্ন বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজের উপর। প্রয়োগ করেছে বিদেশী ইংরেজ, হিন্দু রাজা-জমিদার, বৈশ্য মারোয়াড়ি-গুজরাতি মধ্যস্বত্ত্বভোগী, উর্দুগর্বী মুসলমান আশরাফ শ্রেণি—প্রত্যেকেই। এদের মধ্যে ইংরেজদের ব্যাপারটা আমরা কম-বেশি জানি। কিন্তু মারোয়াড়ি-গুজরাতি বৈশ্যশ্রেণির যে অমানবিক শোষণের শিকার আমাদের হতে হয়েছে সে ইতিহাস খুব একটা পাদপ্রদীপের আলোয় আসে নি। এরা শুধু ঔপনিবেশিক আমলেই শোষণ চালিয়ে ক্ষান্ত হয় নি, বরং রাজনীতিবিদদের বাধ্য করেছে বাংলাবিভক্ত করতে। কেননা আজকের পশ্চিমবঙ্গে তারা যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা সেই বিনিয়োগকৃত অর্থের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা অন্ত্যজ, প্রান্তবাসী ও মুসলমান আতরাফ জনগোষ্ঠিকে মুক্তির একটি দিশা দিতে পারত। কিন্তু সেই সম্ভাবনা থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হলো ১৯৪৭ সালে।

সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস লিখেছেন আহমদ ছফা। শাহীবংশ-রাজবংশের বাইরে থেকে নায়ক খুঁজেছেন সেই বিদ্রোহের। পেয়েওছিলেন। অর্থাৎ ইতিহাসের তন্নিষ্ট পাঠক ছিলেন ছফা। যে সমাজে তিনি জন্মলাভ করেছেন, সেই বাঙালি মুসলমান সমাজের ইতিহাস অনুসন্ধানে তিনি আগ্রহী হবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। সেই ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে হয় ১৯৪৭ এর বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস সন্ধানে। তথ্যের যত গভীরে প্রবেশ করা যায়, দেখা যায় প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরা দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন আসামীর কাঠগড়ায়, নমস্য ব্যক্তি বিক্রিত হচ্ছেন মারোয়াড়ি-গুজরাতি বণিকের টাকার কাছে, মুষ্টিমেয় ব্যক্তির স্বার্থে কোটি কোটি মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে দুর্বিপাকের মধ্যে। দেখা যাবে বাঙালি নেতৃত্ব দোদুল্যমান, সর্বভারতীয় নেতৃত্ব বাংলাকে ছেড়ে দিচ্ছেন বিড়লা-বাজাজ-কানেরিয়া- গোয়েংকাদের হাতে—যাদের কাছে বাংলা একটি কামধেনু। দেখা যাবে বাংলার নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা বাংলার স্বার্থে উচ্চকিত ছিলেন, তারা সবাই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। বাংলার অসহায় মানুষ রাজনীতির পাশা খেলায় নিতান্তই ঘুঁটি ছাড়া কিছুই নয়।

মনে রাখা প্রয়োজন আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমান ভাবনা’ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত নয়। বরং এই সমাজটির মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছেন হাজার বছরের অত্যাচারিত, বঞ্চিত, ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় অশ্র“সিক্ত, ধর্মের নামে-সম্প্রদায়ের নামে-গোষ্ঠির নামে স্বপ্ন-অপহৃত একটি জনগোষ্ঠিকে। তাই আহমদ ছফার কথিত ‘বাঙালি মুসলমান’ সমাজের সাথে একপাল্লায় দাঁড়িয়ে যায় নিম্নশ্রেণির অন্ত্যজ হিন্দু জনগোষ্ঠিও। দুজনেই যুগপৎ ব্রাহ্মণ্যবাদের শিকার। যেমনটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাসিম শেখ এবং রামা কৈবর্ত।

ইতিহাস থেকে আমরা জানি, হিন্দু বাঙালি মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠেছিল জমিদারতন্ত্র ও ইংরেজদের বেনিয়াবৃত্তির মাধ্যমে। অনেক পরে যে বাঙালি মধ্যশ্রেণি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এরা এসেছিল একেবারে কৃষকের ঘর থেকে। হিন্দু মধ্যশ্রেণি এই নব-বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ন্যূনতম স্বীকৃতি ও অবস্থানে ছাড় দিতে অস্বীকার করায় দ্বন্দ্বের সূচনা। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিবিদ বুদ্ধিজীবী ড. অশোক মিত্র বলেছিলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটত এবং বিকশিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের সাথে একটা সমঝোতা করে নিতে পারত। ফলে ১৯৪৭ এর দেশভাগের প্রয়োজন পড়ত না। এতো গেল মধ্যবিত্তের কথা। কৃষক-প্রজার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গই ওঠে নি। ১৯৩৬ সালেই অমৃতবাজার পত্রিকায় ফজলুল হক লিখেছিলেন— ‘যে চাষীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমি চষে যাতে অন্যেরা তাদের শ্রমের ফল ভোগ করতে পারে সেই প্রজা ও কৃষকদের স্বার্থের স্থুল প্রশ্নে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই।’

প্রভেদ সেকালেও ছিল না, একালেও নেই। আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমান সেই ভেদচিন্তাহীন বাঙালি মুসলমান, যাদের কখনোই ইতিহাসের চালিকাশক্তি হতে দেওয়া হয় নি।

১৯০৫ সালে যে হিন্দু নেতা, কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং মারোয়াড়ি-গুজরাতি বণিকরা বঙ্গভঙ্গ রদ করার সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং বঙ্গভঙ্গ রোধ করেছিল, তারাই আবার ১৯৪৭ সালে বঙ্গবিভাগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করল। না করে উপায় ছিল না। কারণ তখন গান্ধী-নেহরু সহ কংগ্রেসের সব বড় বড় নেতা মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদের টাকার পুতুল। আর বাংলা বিভাগ না হলে পশ্চিমবঙ্গে গোয়েঙ্কা, বিড়লা, বাঙুর, বাজেরিয়া, জালান, কানেরিয়া, খৈতান প্রভৃতি মারোয়াড়িদের লগ্নিকৃত অর্থ বেহাত হয়ে যেত। কংগ্রেস যে তাদের কথায় উঠবে-বসবে এতে আর বিচিত্র কী! কারণ গান্ধীকে দেশে আনা, তাঁকে মহাত্মা বানানো, তাঁর আশ্রম, কংগ্রেস সংগঠন এবং তাঁর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গান্ধী সেবা সংঘ, চরকা সংঘ, গ্রামোদ্যোগ সংঘ প্রভৃতি নিখিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির রসদ যুগিয়েছে মারোয়াড়িরাই। নেহরুর জীবনীলেখক সর্বেপল্লী গোপাল জানিয়েছেন, বিড়লা পরিবার কংগ্রেসের অনেক নেতাকে মাসিক মোটা মাসোহারা দিত। জহরলালও নিতেন, তবে গান্ধীর হাত থেকে, সরাসরি বিড়লাদের হাত থেকে নয়। এই টাকা খরচ করার পেছনে মারোয়াড়ি মুৎসুদ্দিদের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রিত করার মাধ্যমে ভারতবর্ষের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।

১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটি এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং বিড়লাদের প্ররোচনায় এক সময় এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। গান্ধীর এককালীন সহকর্মী মাওলানা মহম্মদ আলী বিক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলেন—‘একচেটিয়া ক্ষমতার অভিলাষী ক্ষুদ্্র একটি বেনিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তার মাধ্যমে সমগ্র ভারতীয় জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা হতে চায়। …আমার মনে হয় বম্বে ও গুজরাতের বেনিয়াদের টাকাতেই অধিকাংশ আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।’

বাংলাকে ভাগ হতেই হলো। কারণ সাধারণ বাঙালি হিন্দু-মুসলমান না চাইলেও সর্বভারতীয় নেতারা চাইছিলেন। আর বাঙালি মুসলমানের দুর্ভাগ্য যে সর্বভারতীয় পর্যায়ে তাদের কোনো বাঙালি নেতা ছিল না। যদিও বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের কর্মকর্তা কিরণশঙ্কর রায় স্পষ্ট করে জানিয়েছেন গান্ধীকে যে বাংলাকে বিভক্ত করার চাইতে তাঁরা বরং অখণ্ড বাংলা নিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকতে রাজি আছেন। আবুল হাশিম, শরৎ বোস প্রমুখ অখণ্ড বাংলার ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সংবিধানের রূপ পেতে পারত।

কিন্তু ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে দুই মুৎসুদ্দির লড়াই। মারোয়ারি-গুজরাতি ছিল আগে থেকেই, এখন বাজারের দখল নিতে তাদের সাথে প্রতিযোগিতায়  নেমেছে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আগত মুসলমান আদমজী-বাওয়ানী-ইস্পাহানি-লতিফ-হাবিবদের দল। দুই পক্ষই বাংলাভাগ চায়। চায় পরস্পরের বাজারের নিরংকুশ দখলিসত্ত্ব বজায় রাখার স্বার্থে।

জিন্নাহ যে দ্বিজাতি-তত্ত্বের বিষাক্ত অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন গান্ধীর হাতে, গান্ধী-নেহরু তা লুফে নিলেন। জিন্নাহ সম্ভবত জানতেন না যে দ্বিজাতি-তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা তিনি নন। ঊনবিংশ শতকে স্যার সৈয়দ আহমেদ এবং পরবর্তীতে লালা রাজপত রায় ও বীর সাভারকর দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রস্তাব করেছিলেন। গান্ধী নিজেও একসময় ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমানকে দুটি রেস হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ফলে জিন্নাহ প্রস্তাব করার সঙ্গে সঙ্গে মারোয়াড়িদের চাপে গান্ধী-নেহরু তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানালেন ভারত ও বাংলাবিভক্তিতে।

১৯৪৭ সালের ৩০শে এপ্রিল কলকাতায় বড় হিন্দু মুৎসুদ্দিদের একটি সভাতে নলিনী সরকার বাংলাভাগের দাবি করে একটি প্রস্তাব আনলেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এই সভায় অন্যদের ছাড়া বি এম বিড়লা, স্যার বদ্রিদাস গোয়েঙ্কা, বি এল জালান, ডি সি ড্রাইভার, এম এল শা ও নলিনী সরকারকে নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হলো।

ইতোমধ্যে এই মর্মে লেখা চিঠিতে নেহরু লর্ড ওয়াডেলের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে ভারতবর্ষ যদি অবিভক্ত থাকে তাহলেও বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ করা হোক। হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদের কণ্ঠেও একই দাবি—পাকিস্তান হোক বা না হোক, বাংলাকে ভাগ করতেই হবে।

অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দাবি করলেন যে, বাংলার ভাগ্য কী হবে তা ঠিক করার আগে, সাধারণ নির্বাচন করে বাংলার জনগণের মত নিতে হবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাগ হলো। কোনো গণতান্ত্রিকতা নয়, কোনো ঐকমত্য নয়—ভাগ হলো শুধু বেনিয়া মুৎসুদ্দির শোষণের অবাধ ক্ষেত্রে পরিণত হবার জন্য। রেনেসাঁগর্বিত, উচ্চশিক্ষাগর্বিত, আভিজাত্যগর্বিত হিন্দু ভদ্রজনদের পশ্চিমবঙ্গ মিলিত হলো ভারতবর্ষের সাথে। তারা বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে এখন ভারতীয় হবার প্রাণপণ চেষ্টায় মগ্ন। আবুল হাশিম যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা আজ সত্যে পরিণত—‘একশো ভাগ বিদেশী-ভারতীয় ও ইঙ্গমার্কিন পুঁজি যা বাংলাকে শোষণ করছে তা পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি হয়েছে। …মুক্ত ঐক্যবদ্ধ বাংলায় তাদের যে অসুবিধা হবে তা উপলব্ধি করার মতো বিচক্ষণতা তাদের আছে। বিদেশী পুঁজির স্বার্থে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে হবে, পঙ্গু করতে হবে এবং ক্ষমতাবিহীন করতে হবে যাতে শোষণকে প্রতিহত করার শক্তি বাংলার কোনো অংশের না থাকে। …বিভক্ত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ অবশ্যই বিদেশী ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের একটি দূরপ্রান্তবর্তী প্রদেশ, সম্ভবত উপনিবেশ রূপে গণ্য হবে।’

২.

যেহেতু নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশীর ভাগই ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্যসংস্কৃতিরও যে একটি বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুন ইসলাম কিংবা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধেও তাঁদের মনে কোনো ধারণা জন্মাতে পারেনি। পাশাপাশি ইসলামও যে একটা উন্নততরো দীপ্ত ধারার সভ্যতা এবং মহীয়ান সংস্কৃতির বাহন হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সামাজিক বিপ্লব সংশোধন করেছিলো, বাঙালী মুসলমানের মনে তার কোনো গভীরাশ্রয়ী প্রভাবও পড়েনি বললেও চলে। প্রথমত, ভারতে ইসলাম প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের সুফী দরবেশদের একটি গৌণ ভূমিকা ছিলো বটে, কিন্তু লোদী, খিলজী এবং চেঙ্গিস খানের বংশধরদের সাম্রাজ্য বিস্তারই ইসলাম ধর্মের প্রসারের যে মুখ্য কারণ, তাতে কোনো সংশয় নেই। এই পাঠান মোঘলদের ইসলাম এবং আরবদের ইসলাম ঠিক একবস্তু ছিলো না। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে বাগদাদে, ফাতেমীয় খলিফাদের আমলে উত্তর আফ্রিকায় এবং উমাইয়া খলিফাদের আমলে স্পেনে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়েছিলো, ভারতবর্ষে তা কোনোদিন প্রবেশাধিকার লাভ করেনি। [বাঙালি মুসলমানের মন// আহমদ ছফা]

আমরা এর চাইতেও পেছনে যাব। তবে মনে রাখতে হবে আহমদ ছফার সত্তার সবচেয়ে জটিলতম প্রসঙ্গ হচ্ছে ‘বাঙালি মুসলমান’ প্রপঞ্চ। নিদারুণ বিরক্তি, অপরিণত মানসিকতার জন্য অবজ্ঞা প্রকাশ সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে তাঁর সীমাহীন দুশ্চিন্তাও প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তিনি তন্ন-তন্ন করে সন্ধান করেছেন এই সমাজের ত্র“টি এবং গুণগুলোকে। ত্র“টি সনাক্তের উদ্দেশ্য সংশোধনী পন্থা আবিষ্কার আর গুণের সন্ধান ছিল সম্ভাবনার সূত্র আবিষ্কারের। নিজে জন্ম নিয়েছেন এই সমাজে। ফলে ভালোবাসাও ছিল পর্যাপ্ত। তবে এই ভালোবাসা তাঁকে সাম্প্রদায়িক হতে উদ্বুদ্ধ করেনি। লক্ষণীয়, তিনি ‘বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়’ না বলে বলতেন ‘বাঙালি মুসলমান সমাজ’। আর শুধু  জন্মের কারণেই নয়, অত্যাচারিত এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির প্রতি তাঁর যে আন্তরিক সাড়া দেবার অভ্যেস, সেই অভ্যেসবশতই যেমন দাঁড়াতেন এই ভূখণ্ডের যে কোনো নিগৃহীত সংখ্যালঘুর পাশে, তেমনি দাঁড়াতেন আদিবাসী-উপজাতির পাশে। কেননা নৃতাত্ত্বিক-ভৌগলিক দৃষ্টিতে পুরোপুরি না হলেও সামাজিক অত্যাচার সহ্য করার নিরিখে ঐতিহাসিকভাবেই তারা বাঙালি মুসলমানের সমধর্মী। আমরা অষ্ট্রিক-মঙ্গোলদের বংশধর, যারা চিরকাল এদেশে ছিল নিপীড়িত, নির্যাতিত। তাদের অধিকাংশ মানুষ হিসাবে এখনো নিম্নবর্ণের, নিম্নবিত্তের, অস্পৃশ্য। তারা অতীতে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। কেউ কেউ বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, যেমন সাঁওতাল। কিছু লোক উত্তর ভারত থেকে আসা বিভিন্ন রকম লোকের সাথে মিশে সামাজিকভাবে কিছুটা উচ্চবর্ণের অধিকারী হয়েছে। আর বেশির ভাগ ছিল চণ্ডাল। যারা চণ্ডাল, তারা ছোটলোক, নিম্নবর্ণের, অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য তারা গ্রামের মধ্যে বাস করতে পারবে না, গ্রামের প্রান্তদেশে বা বাইরে বাস করবে। তারা পুরো চালের ভাত রেধে খেতে পারবে না। উচ্ছিষ্ট খাবে অথবা ক্ষুদ রেধে খাবে। নতুন কাপড়, পুরো শরীর ঢাকা কাপড় তারা পরতে পারবে না।

অগতানুগতিক ধারার বুদ্ধিজীবী আহমদ শরীফের ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ শীর্ষক বক্তৃতা থেকে পাচ্ছি যে—

অস্ট্রিক-মঙ্গোলদের নিজস্ব একটা সংস্কৃতি ছিল। সেটাই চিরকাল বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা। তার প্রভাব থেকে বাঙালি কখনও মুক্ত হতে পারবে না। সে পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও মুছে দেওয়া যাবে না। বাঙালির চেতনায়, স্নায়ুতে, রক্তধারায় তা মিশে আছে—যুগ যুগ ধরে চলছে। সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র, দেহতত্ত্ব—এগুলো হচ্ছে বাংলার আদি মঙ্গোলদের দান, আর নারী দেবতা, পশু-পখি, বৃক্ষদেবতা, জন্মান্তর প্রভৃতি হচ্ছে অস্ট্রিকদের দান। এগুলোর মধ্যে মন-মানসিকতা ও মননের যে বৈশিষ্ট্য লুক্কায়িত আছে, তার প্রভাব থেকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ কখনও মুক্ত ছিল না, আজও মুক্ত হয়নি, ভবিষ্যতেও হতে পারবে না। এ বৈশিষ্ট্য বাঙালির চরিত্রে ও জীবনে অন্তর্নিহিত। বাঙালি বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য, ইসলাম প্রভৃতি ধর্ম গ্রহণ করে নানা সম্প্রদায়ের রূপ লাভ করেছে বটে কিন্তু কখনও সে সাংখ্যযোগ ও তন্ত্রের প্রভাব কাটাতে পারে নি। ফলে বহিরাগত প্রতিটি মতবাদ এখানে এসে নতুন রূপ লাভ করেছে। নতুন চরিত্র নিয়েছে। বাঙালি রূপ নিয়েছে। …পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ধর্ম ছিল তাবিজে-কবজে, পিরে-দরগায় এবং সত্যপির-ওলাবিবি-খাজাখিজির সেবায় সীমিত।

এই বক্তৃতার শেষাংশে আহমেদ শরীফ উপসংহার টানেন এই বলে—

বাঙালি মুসলমান যে শতকরা পঁচানব্বই জন হাড়ি, ডোম, বাগদি, চাঁড়াল, মুচি, মেথর থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে তার প্রমাণ হচ্ছে, হিন্দুর মধ্যে উনিশ শতক পর্যন্ত যেমন নিম্নবর্ণের লোকদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা কিছুই ছিল না—তেমনই মুসলমানেরও ছিল না। …নিম্নবর্ণের হিন্দুরা যেমন নিজেদের কৃতি ও কীর্তির স্বাক্ষর নিজেরা রাখতে পারে নি তেমনি বাঙালি মুসলমানও পারে নি, বাঙালি মুসলমানেরা আজ অবধি সাত শ বছরেও একজন বাঙালি দরবেশ তৈরি করতে পারে নি। সব দরবেশ বিদেশী-বিভাষী—আল মাদানী, আল বোখারি, সমরখন্দি।

এসব যে খুব আগেকার কথা তা নয়। এমনকী ১৮৮৩ সালেও গ্রাম-বাংলায় অনেকেই আরবিতে নামাজ পড়তে জানতেন না। বেশিরভাগ অঞ্চলেই নামাজ পড়ানোর যোগ্য ইমামের অভাব ছিল। এই অবস্থা দূর করতে ফারায়েজী-ওয়াহাবী আন্দোলন কিছুটা ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে। তবে এই আন্দোলনও রেনেসাঁর মতোই খণ্ডিত। না হয়ে উপায়ও ছিল না। কারণ বাঙালি মুসলমানের যে সীমিত অংশ তখন চিন্তা-ভাবনা করতে শিখেছিল, তারাও যুগপৎ অনেকগুলি পরস্পরবিরোধী ভাবধারা দিয়ে প্রভাবিত ছিল। যেমন ইসলামি ভাবধারা, উপনিবেশিকতাবিরোধী প্যান ইসলামবাদ, গোঁড়া মতবাদ, উদারনীতিবাদ, ব্রিটিশ সমর্থক ও বিরোধী, হিন্দু জমিদারবিদ্বেষী এবং কংগ্রেসবিরোধী। স্বভাবতই অবিকশিত একটি মানস এই রকম পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তিতে পড়তে বাধ্য। এবং ঘটেছিল সেটাই। পিছিয়ে পড়া, কৃষিনির্ভর, অত্যাচার ও দারিদ্রজর্জরিত বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠি তাদের নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো দিকনির্দেশনাই পায়নি।

পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষক সমাজ নীলচাষে-দাদনে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তাদের চিরস্থায়ী বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেইসঙ্গে জমিদারি ব্যবস্থা এবং সরকারি আমলাতন্ত্র ভূমিসংক্রান্ত আইনগুলোকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছিল। যার ফলে কৃষকরা জড়িয়ে পড়ত নানা ধরনের মামলা-মোকাদ্দমায়। আর আইনে ছুঁলে আঠারো ঘা। সুতরাং হিন্দু আইন ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো হলেও ক্রমান্বয়ে সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে মামলার শিকার কৃষক পরিবারগুলো।

আহমদ ছফা যে ‘বাঙালি মুসলমান’ সমাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, যার অস্তিত্বকে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সমার্থক মনে করতেন, এই-ই হচ্ছে সেই বাঙালি মুসলমানের নৃতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।

এতক্ষণে একটা ব্যাপার নিশ্চিতই পরিষ্কার হয়ে এসেছে যে আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমান’ চেতনার কাছাকাছি পৌঁছানোর ক্ষমতা তথাকথিত বাংলাদেশী বা বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে যারা কোমর কষে লড়াই করে, তাদের নাই। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে সাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারী অর্ধশিক্ষিত, সেনা ও স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট বুদ্ধিজীবীদের থেকে আহমদ ছফার অবস্থান যোজন যোজন দূরে, যেমন দূরে আওয়ামী সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠি থেকেও।

৩.

যে বাঙালি মুসলমান সমাজকে আহমদ ছফা পশ্চাৎপদ বলে গালি দিয়েছেন, অপরিণত মানসের অধিকারী বলে যাদের প্রতি তাঁর ব্যাঙ্গের অবধি ছিল না, বারবার নিজের পথ অনুসন্ধানের ব্যর্থতার জন্য যাদের তিনি করুণা করতেন, সেই বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি ছিল বরাবরই। সেই প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি পরবর্তীতের সরাসরি পক্ষপাতিত্বে দাঁড়ায় এই কারণে নয় যে তিনি স্বয়ং ঐ সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বরং এই সমাজ তাঁর সাধুবাদ অর্জন করেছে এই কারণে যে বাঙালি মুসলমানই  উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম একটি আধুনিক রাষ্ট্র স্থাপন করেছে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭১ সালেই প্রথম পৃথিবীতে বাঙালির একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই রাষ্ট্রকে জন্মদান করেছে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমান কৃষক ও তাদের সন্তানরা। শুধু তাই নয়, আহমদ ছফা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণপ্রণালীর সাহায্যে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে বাঙালির ভবিষ্যৎ মানে আজকের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কারণ পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দুরা ১৯৪৭ এর দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালিত্বের মোহ ত্যাগ করে সর্বভারতীয় হবার সাধনায় মগ্ন হয়ে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চর্চা শুধুমাত্র লেখকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গীয়রা অর্থনৈতিকভাবে আগে থেকেই ছিল মারোয়াড়ি-গুজরাতি-মুৎসুদ্দি পুঁজির ক্রীড়নক, আর এখন তারা সবকিছুর জন্যই হিন্দি বলয়ের মুখাপেক্ষি।

কিন্তু পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান আরো আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল ১৯৪৭ এর পরপরই। প্রত্যাঘাতের জন্য সময়ও ক্ষেপণ তারা করেনি। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি যেমন হিন্দি বলয়ের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে, বাঙালি  মুসলমানরা তা নেয় নি। পশ্চিম পাকিস্তানিদের যে কোনো ষড়যন্ত্র তারা দ্রুত উন্মোচন করতে পেরেছে, পাকিস্তানি মোহ থেকে সরে আসতে তাদের দেরি হয় নি। ফলে বলা দরকার যে ভাষাপ্রেম ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাবোধ থেকে নয়, নিজেদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নেই প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা সোচ্চার হয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাভাষা ও বাঙালির সংস্কৃতি তার এই প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরুর লগ্নেই নীতি-নির্ধারণে একচেটিয়া ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুইটি নীতি প্রণয়নের ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায় কেন বাঙালি অভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবী ছিল। প্রথম ঘটনাটি ১৯৫০ সালের। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়নকল্পে একটি কমিটি গঠিত হয়। যাকে বলা হয় বেসিক প্রিন্সিপল কমিটি। এই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেখা যায়, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে একটি কলোনির চাইতে মোটেই বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়নি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবাঙালিদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকী ইসলামিকরণের নামে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার নীল-নক্সাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে একটি গোপন কেন্দ্রীয় সার্কুলার ফাঁস হয়ে যাওয়া। এই সার্কুলারে তিনটি জিনিসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, কেন্দ্রের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ ঘনিষ্ট করে তোলা এবং সহজে মত বিনিময়ের সুযোগের স্বার্থে সরকারি উচ্চ পদগুলোতে উর্দু জানা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া। ভারত থেকে আগত কয়েক লাখ অবাঙালি পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবাসিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সরকারি প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ অনেকে রয়েছেন। উচ্চপদে নিয়োগে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং কোনো ক্ষেত্রে উপযুক্ত সংখ্যক লোক না পাওয়া গেলে পাঞ্জাবি ও সিন্ধি অফিসারদের পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগের জন্য পাঠানো হবে। দ্বিতীয়  নির্দেশ হচ্ছে, অবিভক্ত ভারতে ডাক, তার ও রেলওয়ে বিভাগে ছোট-বড় চাকরির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের লোকজন। পূর্ব পাকিস্তানের ডাক, তার ও রেলওয়েতে স্থানীয়  লোক রিক্রুট ও ট্রেনিংয়ের বদলে মোহাজের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে লোক নিয়োগ করতে হবে। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হচ্ছে, সামরিক-অসামরিক এবং পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদে বাঙালি নিয়োগ এড়ানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। এজন্য প্রচার করতে হবে যে দক্ষ বাঙালি অফিসার পাওয়া যাচ্ছে না। মনে রাখতে হবে ‘সরকারের গোপন স্বার্থ সুবিধা’ সংক্রান্ত ব্যাপারে বাঙালিদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করাই ভালো।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমার ঘোর কাটার জন্য এই দুুটি ঘটনাই যথেষ্ট ছিল। বাঙালি মুসলমান কৃষক তখন পাট বেচে, গতর বেচে তার সন্তানকে পাঠাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিক্যালে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করতে। কেননা ততদিনে তার কানেও পৌঁছে গেছে শিশুপাঠের দুই লাইন—লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।

সেই কৃষক দেখল যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে তার শিক্ষিত সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। নিজে খেতে পাই বা না পাই, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। এ হলো বাঙালির চিরন্তন কামনা। সেই সন্তানের দুধ-ভাতে উৎপাত! কৃষক হুংকার দিল। বাহান্নোতে রক্ত ঝরল বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া কয়েক কৃষক সন্তানের। অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। তারপরে চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছয়দফা—ধাপে ধাপে একাত্তর। সারা পৃথিবী অবাক হয়ে দেখল বাঙালির একটি নিজস্ব রাষ্ট্র হয়েছে। এই প্রথম বাঙালির ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালি নিজে।

আহমদ ছফা এই বাঙালি মুসলমান কৃষক অধ্যুষিত ব-দ্বীপের ভবিষ্যত নিয়ে প্রচণ্ড আশাবাদি। সন্দেহ নেই, তাঁর আশাবাদের অনেকখানিই আবেগ ও কল্পনানির্ভর। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রম সংশোধন মনে করেন। তাঁর মতে দ্বিজাতিতত্ত্ব তো ভুল ছিলই, ভারতে একজাতিতত্ত্বও ভুল। কারণ ভারতবর্ষ হচ্ছে বহুজাতিক। আহমদ ছফার মতে অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বয়ংসম্পূর্ণ সার্বভৌম বাংলাদেশ ভারতের হিন্দি বলয়ের আধিপত্যাধীন অন্যান্য জাতিসত্ত্বাগুলোকেও সার্বভৌমত্বের প্রেরণা যোগাবে। তাই ভারতের হিন্দি নেতৃত্ব কোনোদিনই চাইবে না যে বাংলাদেশ স্বাবলম্বি হোক।

আহমদ ছফার মতে, বাঙালির একটি অংশ নিজেদের বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে যাচ্ছে, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে ভারতীয় হবার উদগ্র বাসনায়। তাই বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাংলাদেশের ওপর। বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র, শোষণ, অশিক্ষা বিরাজমান তার প্রধান কারণ বাংলাদেশের নির্যাতিত জনসাধারণ আজ পর্যন্ত ইতিহাসের চালিকাশক্তি হতে পারে নি। তবে তারা কখনোই য্দ্ধুক্ষেত্র ত্যাগ করে নি।

বাঙালি মুসলমান বলতে আহমদ ছফা সেই অত্যাচারিত, নিগৃহীত কিন্তু সংশপ্তক বাঙালিকেই বুঝতেন।

আধুনিকতাবিমুখ বাঙালি মুসলমান ও বাংলাদেশের বিকাশ সমস্যা

সালাহ্উদ্দিন আহমদ

আজকের বিশ্বের সব চাইতে দরিদ্র এবং অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এই অবস্থার জন্য যেসব কারণ সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয় সেসব হল : (ক) বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ; (খ) জনসংখ্যা-বিস্ফোরণ এবং (গ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব। কিন্তু বাংলাদেশের অনগ্রসরতার জন্য যে কারণটি আমার কাছে মৌলিক বলে মনে হয় সেটি হল আমাদের আধুনিক মন ও মানসিকতার অভাব। বিশ শতকের শেষ পাদে বাস করলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মনকে মধ্যযুগীয় অন্ধ বিশ্বাস ও গোঁড়ামী আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আধুনিক যুগের জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার ফলে মানুষের জীবনধারনের ক্ষেত্রে যে সকল সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলি ভোগ করা সত্ত্বেও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের চিন্তাধারায় অতীতমুখী মনোভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান। এ অবস্থা কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়; প্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য। ইউরোপের তুলনায় প্রাচ্যের চিন্তাধারায় অতীত বা পশ্চাদমুখী মনোভাব বিশেষভাবে দেখা যায়। এর দুটি কারণ হতে পারে। প্রথমত, ইউরোপের তুলনায় এশিয়ার সভ্যতা প্রাচীনতর। দ্বিতীয়ত, গত দু’শ বছরের মধ্যে এশিয়ার অধিকাংশ দেশ কোন না কোন সময়ে ইউরোপের শক্তির অধীনে ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালে এই দেশগুলি ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতা লাভের পর পরাধীন যুগকে ভুলে যাবার চেষ্টা এবং ঐ যুগের অবদানকে অস্বীকার করার প্রবণতা আমাদের জাতীয় আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই বোধ হয় আমরা অনেকে অতীতের কল্পিত স্বপ্ন যুগকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখি।

এই উপমহাদেশে আধুনিকতার সূচনা হয়েছিল উনিশ শতকের প্রথম দিকে, বিশেষ করে ইংরেজ রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। এবং এর ধারক ছিল নব্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বস্তুত ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই উপমহাদেশে একটি দেশজ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এবং উনিশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত এই শ্রেণী সর্ব ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন যে, ইংরেজ-রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই উপমহাদেশের পুরাতন ঐতিহাসিক সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কোন স্থান ছিল না বলা যায়। ইংরেজ রাজত্বকালে ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য ও শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে সহযোগিতার ফলে এক নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অভ্যুদয় ঘটে। উনিশ শতকের প্রথম ভাগ নাগাদ এই শ্রেণী ছিল প্রধানত হিন্দুদের দ্বারা গঠিত। এর কারণ হিন্দুদের বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। সুদীর্ঘ মুসলিম রাজত্বকালে তারা অনেকেই সে আমলের রাজভাষা ফার্সী এবং এমনকি আরবী শিখতে দ্বিধা করেনি এবং তার ফলে মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা করে নানাবিধ সুযোগ সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। তেমনি ইংরেজ রাজত্ব এদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দুরা সাগ্রহে নতুন শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করে লাভবান হয়েছে। তারা ইংরেজি ভাষা শিখতে সর্বাধিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এই ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন এবং বিশেষ করে আঠারো ও উনিশ শতকের যুক্তিবাদী ও উদারনৈতিক এবং মানবতাবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছে। এর ফলেই শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের ‘বাংলার রেনেসাঁস’ বা নব জাগরণ। মধ্যযুগীয় আবর্ত থেকে হিন্দু সমাজের আধুনিক উত্তরণ ঘটেছিল এই রেনেসাঁস আন্দোলনের মাধ্যমে। রাজা রামমোহন রায়ের ধর্মসংস্কার আন্দোলন, ইয়ং বেঙ্গলের অনুসারীদের যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী চিন্তা এবং বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার আন্দোলন হিন্দু সমাজকে নিয়ে গিয়েছিল আধুনিকতা ও প্রগতির দ্বার প্রান্তে। এর পর থেকে শুরু হয়েছিল অগ্রগতির পথে হিন্দু সমাজের জয়যাত্রা।

তুলনামূলকভাবে বাংলার সমকালীন মুসলমান সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল বরাবরই দুর্বল। এই দেশীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তেমন উৎসাহ কখন দেখা যায়নি। এদেশের ব্যবসাবাণিজ্য প্রধানত হিন্দু বণিক ও মহাজনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বৃটিশ আমলের আগে থেকেই এই দেশের অধিকাংশ ভূসম্পত্তি হিন্দুদের হাতে ছিল। নবাব মুর্শিদকুলী খানের সময় বাংলার জমিদারদের তিন চতুর্থাংশ এবং অধিকাংশ তালুকদার হিন্দু ছিলেন। মোগল শাসনব্যবস্থার অধীনে মুর্শিদকুলী খান বহু সংখ্যক হিন্দুদের রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করেন। বস্তুত মুসলমান আমলে এদেশের রাজস্ব বিভাগের চাকুরী প্রায় একচেটিয়াভাবে হিন্দুদের হাতে ছিল। কেবলমাত্র বিচার বিভাগে মুসলমানদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু অধিকাংশ বিচারক, উকিল ও আইনজীবী ছিলেন বহিরাগত মুসলমানদের বংশধর—তাঁরা বাঙালী ছিলেন একথা বলা যায় না। মুসলিম আমলে বাংলার নবাব এবং অভিজাত শ্রেণীর একটা বিরাট অংশ ছিলেন অবাঙালী এবং বহিরাগত। মুসলিম আমলে মুসলমানদের আধিপত্য প্রধানত মুসলিম রাজশক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। আঠার শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন সেই রাজশক্তি ভেঙ্গে পড়ল তখন ঐ রাজশক্তির উপর নির্ভরশীল আর্থ-সামাজিক কাঠামোতেও ভাঙ্গন দেখা দিল।

ঊনিশ শতকের বাংলার মুসলিম সমাজের একটা বৈশিষ্ট্য হল যে, এই সমাজ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। মুসলমান অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা ছিলেন অধিকাংশ নগরবাসী বহিরাগত মুসলমানদের বংশধর এবং উর্দুভাষী। অন্যদিকে বাংলার অধিকাংশ জনসাধারণ ছিলেন দরিদ্র গ্রামবাসী এবং তাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ফলে নগরবাসী অভিজাত শ্রেণীর মুসলমানদের সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র মুসলমানদের একটা বিরাট ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে যখন প্রয়োজনের তাগিদে নগরবাসী মুসলমান অভিজাত শ্রেণী ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে নিজের অবস্থার উন্নতি করতে কিছুটা সক্ষম হয়, তখন তার সুফল গ্রামীণ অঞ্চলের মুসলমান জনসাধারণ ভোগ করতে পারেনি। কিন্তু এই অভিজাত শ্রেণীর মুসলমান নেতারা বাংলার সমগ্র মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দাবি করতে দ্বিধা করতেন না। তাঁরা হয়তো মনে করতেন যে উত্তরাধিকারীসূত্রে বাংলার অবাঙালী মুসলমান নবাবদের স্থান অন্তত সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁদেরই প্রাপ্য। ইংরেজ সরকারও তাঁদের ‘নবাব’, ‘খান বাহাদুর’ প্রভৃতি গালভরা উপাধি দিয়ে ভূষিত করে তাদের সন্তুষ্ট রেখেছিল। এইভাবে ব্রিটিশ সরকারের অনুরক্ত এক নব্য মুসলমান অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। পরে এই শ্রেণীর লোকেরা যে রাজনীতি করতে শুরু করলেন সে রাজনীতি ছিল আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি। তাঁরা রাজনীতি করতেন নিজেদের শ্রেণী স্বার্থে। জনগণের  মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করা, তাদের অর্থনৈতিক কল্যাণসাধন কিংবা তাদের সামাজিক উন্নতির জন্য কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাঁদের রাজনীতিতে ছিল না। এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রে নবাব আবদুল লতিফের মত ব্যক্তি নেহাৎ জাগতিক প্রয়োজনে ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু সমাজচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ঘোর রক্ষণশীল। সমকালীন মুসলমান সমাজের কুসংস্কার ও গোঁড়ামিকে প্রতিহত না করে তিনি এগুলির সঙ্গে আপোষ করতে চেয়েছিলেন।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের মানুষ- যারা অধিকাংশই ছিল মুসলমান এবং কৃষক শ্রেণীভূক্ত- তাদের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছিল। জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের শোষণ ও অত্যাচারে বাংলার কৃষক শ্রেণী জর্জরিত হচ্ছিল। কিন্তু এই অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি কোন পথে আসবে সে সম্বন্ধে তাদের কোন সচেতনতা বা পরিষ্কার ধারণা ছিল না। শহরের শিক্ষিত মুসলিম অভিজাত শ্রেণী গ্রামবাংলার সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। দুর্দিনে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই দেখতে পাই ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলার দরিদ্র কৃষক শ্রেণী- যারা ছিল অধিকাংশ মুসলমান- তারা তাদের আর্থ-সামাজিক দুর্গতি থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য যে আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়েছিল, সেটা ছিল মূলত ধর্মীয় আন্দোলন। আরবের ওহাবী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তীতুমীর ও হাজী শরিয়াতুল্লাহ্্ পশ্চিম ও পূর্বে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেটি পুরোপুরি শ্রেণী সংগ্রাম ছিল না। আন্দোলনটা জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু এর প্রধান উৎস ও প্রেরণা ছিল ধর্মীয়। তীতুমীর ও শরিয়াতুল্লাহ্্ প্রমুখ গ্রামীণ নেতা খুব শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় চরিত্রের মানুষ ছিলেন। শিক্ষাগত ও মানসিক সীমাবদ্ধতার জন্য তাঁরা সহজসরলভাবে বিশ্বাস করতেন যে, মুসলমানদের অধপতনের মূল কারণ হল তারা হজরত মুহাম্মদের যুগের আদি ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে এবং নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলেছে। সুতরাং মুসলমানদের অতীতের হৃতগৌরবকে ফিরিয়ে আনতে হলে মুসলমানদের সেই অতীত যুগের জীবন যাত্রায় ফিরে যেতে হবে। উত্তর ভারতের রায় বেরেলীর সৈয়দ আহমদ এই মতবাদ প্রচার করার জন্য তারীকা-ই-মুহাম্মদীয় আন্দোলন গঠন করেন। তিনি ইসলামী হুকুমত কায়েম করার জন্য পাঞ্জাবের শিখ রাজত্বের বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ করতে গিয়ে ১৮৩১ সালে শহীদ হন। ঐ বছরেই পশ্চিমবঙ্গের বারাসত থেকে অদূরে সৈয়দ আহমদের অনুসারী তীতুমীর কোম্পানির সরকারের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করে শাহাদৎ বরণ করেন। তীতুমীরের আন্দোলন ছিল জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। এই জমিদাররা নানা উপায় উদ্ভাবন করে নানা অছিলায় প্রজাদের নিকট থেকে কর আদায় করত। মুসলমান প্রজারা বিশেষ ভাবে ক্ষুব্ধ হল যখন তাদের দাড়ি রাখার উপর কর ধার্য করা হল। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির উপর ছিল এটা চরম আঘাত। এর ফলে যে সংঘাত শুরু হল সেটা সাম্প্রদায়িক আকার ধারণ করেছিল। তেমনি পূর্ববঙ্গে শরিয়াতুল্লাহ্্ ও তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়জী আন্দোলনটি মূলত ধর্মীয় আন্দোলন ছিল এই অর্থে যে ইসলামে যা ‘ফরজ’ অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় সেটা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এই আন্দোলনের সূচনা। কিন্তু এর একটি অর্থনৈতিক দিকও ছিল। এটা ছিল জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজের বিদ্রোহ। কৃষক সমাজের উন্নতি কিভাবে করা যায় সে সম্বন্ধে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ধারণা ছিল অনুপস্থিত। ফলে এই সব আন্দোলন নেহাত বিদ্রোহের আকার ধারণ করে নিঃশেষিত হয়েছে; যথার্থ বিপ্লবে পরিণত হতে পারেনি। আর একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলার সব জমিদার হিন্দু ছিলেন এবং সব কৃষক ছিলেন মুসলমান, এটা ঠিক নয়। বাংলার অধিকাংশ জমিদার হিন্দু ছিলেন সত্য; কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান জমিদারও ছিলেন। এবং হিন্দু ও মুসলমান জমিদারদের মধ্যে চরিত্রগত কোন পার্থক্য ছিল না। উভয়ই হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রজাদের শোষণ করতেন। ঊনিশ শতকে মুসলমান জমিদার কর্তৃক মুসলমান কৃষকদের উপর উৎপীড়নের এক করুণ কাহিনী বর্ণনা করেছেন সে কালের প্রখ্যাত মুসলিম সাহিত্যিক মীর মোশারফ হোসেন তাঁর ‘জমিদার দর্পণ’ গ্রন্থে। তেমনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কৃষকদের উপর ইউরোপীয় নীলকর ও এদেশীয় হিন্দু কর্মচারীর অত্যাচারের চিত্র দীনবন্ধু মিত্র তাঁর সুবিখ্যাত নাটক ‘নীল দর্পণে’ তুলে ধরেছেন। বস্তুঃত ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ ও ১৮৭২ সালের পাবনার কৃষক বিদ্রোহের সময় দেখা যায় বাংলা কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা শ্রেণী চেতনা। এই সময় কৃষকরা ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিত হয়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে। কিন্তু এই সংগ্রাম সফল হয় নি। বাংলার হিন্দু মুসলমান অভিজাত শ্রেণী ও ভদ্রলোক সম্প্রদায় যাঁরা ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাদি ভোগ করে আসছিলেন- তাঁরা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিতে চান নি। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- যিনি কৃষকদের দুর্দশার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ‘বঙ্গদর্শন’-এ একাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন- তিনিও শেষ পর্যন্ত কৃষক বিদ্রোহকে সমর্থন করেন নি। এমন কি মীর মোশারফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’ পুস্তকটির প্রচার ঐ সময় বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল এর প্রভাবে কৃষক শ্রেণীর দ্বারা জমিদারদের স্বার্থ বিঘিœত এবং তাদের ভাবমূর্তি কলুষিত হতে পারে।

উনিশ শতকের বাংলার হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে হিন্দু সমাজে রামমোহন থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর ও বিবেকানন্দ পর্যন্ত নেতারা হিন্দু সমাজের চিরন্তন কুসংস্কারবাদি দূর করে সমাজকে সমকালীন যুগের প্রয়োজনে পুনর্গঠন করার প্রয়াস করেছেন এবং তাঁদের আন্দোলনের ঢেউ শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। হিন্দু সমাজে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষের সঙ্গে শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল।

তুলনামূলকভাবে মুসলমান সমাজের অবস্থা ছিল অন্যরূপ। মুসলমান নেতারা যাঁরা ছিলেন অধিকাংশই নগরবাসী, যাঁরা নিজেদের বহিরাগত মুসলমানদের বংশধর বলে গর্ব অনুভব করতেন এবং নিজেদের বাঙালী বলে পরিচয় দিতে ঘৃণা বোধ করতেন, এমনকি নিজেদের পরিবারে উর্দু ভাষায় কথা বলতেন (যদিও সে উর্দু লখনউ বা দিল্লীর উর্দুর মত অতটা মার্জিত ছিল না), এবং বাংলা ভাষাকে নি¤œ শ্রেণীর ভাষা বলে অবজ্ঞা করতেন- তাঁদের সঙ্গে স্বভাবত গ্রাম বাংলার জনসাধারণের কোন আত্মিক যোগাযোগ ছিল না। এ হেন নেতৃবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ভারত থেকে আগত বিশেষ করে জৌনপুরের মৌলানা কেরামত আলির অনুসারীরা বাংলার গ্রামে গ্রামে পরিভ্রমণ করে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁরা এদেশের অমুসলমান বা হিন্দুদের ব্যাপকভাবে ইসলামে দীক্ষিত করতে সমর্থ হন নি। কিন্তু তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তীতুমীর ও শরিয়াতুল্লাহ্্ যে ধর্মীয় আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন তার সূত্র ধরে মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে আদি বা পৌরাণিক ইসলামের অর্থাৎ শরিয়তের বিধান অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা। এই আন্দোলন উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্যাপকতা লাভ করে কিছু সংখ্যক বাঙালী মৌলভি যেমন জমিরুদ্দিন ও মুন্সি মেহেরুল্লাহ্্ প্রমুখ ধর্ম প্রচারকের প্রভাবে। গ্রাম বাংলার হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় বৈপরীত্য ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও যুগযুগান্তকাল ধরে পাশাপাশি বাস করার ফলে এক সমন্বয়ধর্মী দেশজ ও লোকজ সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছিল যার অত্যাশ্চার্য সুন্দর নিদর্শন পাওয়া যায় সতের শতকে মহাকবি আলাওয়ালের কাব্যে এবং উনিশ শতকের মরমী সাধক ফকির লালন শাহ্্-এর গানে- মোল্লা-মৌলভিদের এই নতুন ইসলামীকরণের আন্দোলনের ফলে সেই সমন্বয়ধর্মী বাঙালী সংস্কৃতিতে ভাঙ্গন ধরল। শুরু হল এক নেতিবাচক আন্দোলন; সংস্কৃতি বর্জনের পালা। মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হিন্দুদের যা কিছু সব বন্ধ করতে হবে, এই ছিল এই সব মোল্লাদের নির্দেশ। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে উর্দু ভাষার প্রচলনের চেষ্টা করা শুরু হল। বাঙালী মোল্লা মৌলভিরা উর্দু ভাষায় মিলাদ পাঠ করা প্রচলন করলেন। বাঙালা ভাষায় অধিকসংখ্যক উর্দু শব্দ আমদানি করে এক স্বাতন্ত্র্য মুসলমানী বাংলা চালু করার চেষ্টা করা হল এবং এই ভাষায় অসংখ্য পুঁথি রচিত হতে লাগল। এই প্রক্রিয়া নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখ রক্ষণশীল অভিজাত শ্রেণীর নেতাদের স্বার্থের অনুকূলে ছিল, কারণ উর্দু ভাষার মাধ্যমে এই শ্রেণীর নেতৃবৃন্দের বাংলার মুসলমানদের উপর তাঁদের সমাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সব উর্দুভাষী ব্যক্তি বাঙালী মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতা হিসাবে সরকার ও জনসাধারণ-এর নিকট থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে পড়েন ঢাকার নবাব পরিবারের বেশ কয়েকজন, যেমন নবাব সলিমুল্লাহ থেকে শুরু করে খাজা নাজিমুদ্দিন। উল্লেখ্য, এই উর্দুভাষী নাজিমুদ্দিনই পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করার জন্য জিন্নাহ্্র অযৌক্তিক দাবীর জোর সমর্থক ছিলেন। মুসলমান সমাজের এই মনোভাবের ফলে হিন্দুদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল এবং হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে, মুসলমানদের প্রতি হিন্দু সমাজের উন্নাসিক মনোভাব মুসলমানদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত করতে অনেকখানি সাহায্য করেছিল। মানবতাবাদী দৃষ্টি সম্পন্ন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সমাজের এই সংকীর্ণ মানসিকতার কথা সুন্দরভাবে উল্লেখ করেছেন এই শতকের প্রথম দিকে রচিত তাঁর একাধিক প্রবন্ধে।

এই ভাবে আমরা দেখতে পাই যে, উনিশ শতকে হিন্দুরা যখন তাদের সমাজ সচেতন, বাস্তবমুখী ও জ্ঞানদীপ্ত নেতৃবৃন্দের অনুপ্রেরণা ও প্রচেষ্টার ফলে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে সে সময় বাঙালী মুসলমানদের নেতৃত্বে দেখা দিয়েছিল চরম সংকট। মুসলমানদের দৃষ্টি সামনের দিকে প্রসারিত না হয়ে ছিল পশ্চাদমুখী। তারা ছিল গৌরবজ্জ্বল অতীতের স্বপ্নে বিভোর। ১৮৮২ সালে হান্টারের নেতৃত্বে ভারত সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে পর্যালোচনা করার জন্য যে কমিশন গঠন করেন সেই কমিশন শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মন্তব্য করেন যে, আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে আপোষ করতে অস্বীকৃতি হল এর মূল কারণ।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উনিশ শতকে বাংলাদেশে কিছু সংখ্যক মুসলিম বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাব হয়েছিল। যাঁরা মুসলমান সমাজকে দিয়েছিলেন নতুন পথের সন্ধান। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন দেলওয়ার হোসেন আহমদ (১৮৪০-১৯১৩)। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। ১৮৬১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে বি. এ. পাশ করেন। খুব সম্ভব তিনিই এই উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট। বি. এ. পাশ করার পর দেলওয়ার হোসেন ডেপুটি কালেক্টরের পদে নিযুক্ত হন এবং চাকুরী জীবনের শেষের দিকে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব্্ রেজিস্ট্রেশান-এর পদে উন্নীত হন। অবসর গ্রহণ করার পর তিনি কলকাতায় স্থায়ীভবে বাস করতে থাকেন এবং ১৯১৩ সালে মারা যান।

দেলওয়ার হোসেন ছিলেন একজন অত্যন্ত সাহসী সমাজ সচেতন বুদ্ধিজীবী যিনি পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে মুসলমানদের অগ্রগতির জন্য যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে এবং এমনকি তাদের আইন ও বিধান পরিবর্তন করতে হবে।

সরকারী চাকুরীতে থাকাকালীন দেলওয়ার হোসেন মুসলমানদের নানাবিধ সমস্যার উপরে ইংরেজীতে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এগুলি তিনি ছদ্ম নামে প্রকাশ করতেন। ১৮৭৬ থেকে ১৮৮৬ এই সময়কালে তাঁর রচিত প্রবন্ধগুলি ১৮৮৯ সালে ঊংংধুং ড়হ গঁযধসসধফধহ ঝড়পরধষ জবভড়ৎস এই নামে পুস্তকাকারে কলকাতা থেকে ঞযধপশবৎ, ঝঢ়রহশ ধহফ ঈড়সঢ়ধহু কর্তৃক প্রকাশিত হয়। (১) এই বইটিতে দেলওয়ার হোসেনের ব্যতক্রমধর্মী চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায়।

ঊনিশ শতকে অন্য দুই মুসলিম নেতা নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৪-১৮৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে দেলওয়ার হোসেনের চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। আমরা জানি আবদুল লতিফ নেহাত বাস্তব প্রয়োজনে মুসলমানদের ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু সমাজচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ঘোর রক্ষণশীল। তাঁরই জোর তদ্বিরের ফলে এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্প্রসারণ হয়েছে। আবদুল লতিফ মুসলমান সমাজের রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামীর সঙ্গে আপোষ করতে চেয়েছিলেন, সেগুলি দূর করার জন্য কোন প্রচেষ্টা করেন নি। অন্যদিকে সৈয়দ আমীর আলি ছিলেন চিন্তা ক্ষেত্রে অনেকটা প্রগতিশীল ও সংস্কারপন্থী। তিনি ইংরেজী শিক্ষার জোর সমর্থক ছিলেন এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দিয়ে তার স্থলে মুসলমানদের জন্য ইংরেজীর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক ও কারিগরীবিদ্যা শিক্ষা প্রচলনের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রেও আমীর আলি ছিলেন কিছুটা প্রগতিশীল ও সংস্কারপন্থী এই অর্থে যে তিনি হাজার বছরের আগে মুসলিম আলেমদের দ্বারা ব্যাখ্যা করা ইসলামি আইন ও অনুশাসনকে নির্বিচারে গ্রহণ না করে সমকালীন যুগের প্রয়োজনে  এবং যুক্তির আলোকে ইসলামের চিরন্তন মর্মবাণী গ্রহণ করার পক্ষপাতি ছিলেন। বস্তুত আমীর আলি উনিশ শতকের ইউরোপীয় যুক্তিবাদের আলোকে ইসলাম ও তার অনুশাসনকে ব্যাখ্যা ও পূনর্মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু ইসলামের কোন কোন অনুশাসন ও বিধি সমকালীন যুগের প্রয়োজনে পরিবর্তন করা উচিৎ সে সম্বন্ধে কোন উক্তি তিনি পরিষ্কারভাবে করেন নি কিংবা হয়তো করবার সাহস তাঁর ছিল না। এইখানে আমীর আলির সীমাবদ্ধতা।

তুলনামূলকভাবে দেলওয়ার হোসেনের চিন্তাধারা ছিল বলিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ এবং বেশ কিছুটা বৈপ্লবিক। তিনি নিজেকে নবম শতকের মুতাজিলাহ্্ পন্থী যুক্তিবাদী আরব দার্শনিকদের উত্তরসূরী বলে মনে করতেন। দেলওয়ার হোসেন খুব সম্ভব প্রথম মুসলিম চিন্তানায়ক যিনি ইসলামের কোন কোন অনুশাসন ও বিধি যেগুলি ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়— সেগুলি পরিবর্তন, এমনকি বর্জন করার কথা বলেছেন। মুসলমানদের অর্থনৈতিক দুর্গতির জন্য তাঁদের ব্যয়বহুল অভ্যাস, অলসতা এবং সর্বোপরি অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসকে তিনি প্রধানত দায়ী করেছেন। তাঁর মতে ঋণের উপর সুদ গ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞার বিধান মুসলমানদের মধ্যে পুঁজির বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেমনি মুসলমানদের উত্তরাধিকারী আইনও তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির সহায়ক নয় বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর ভাষায় :

‘when we see how the business of banking facilities commence and how it renders possible the creation of new trades and industries, it becomes apparent how amongst Mohammadans the connection of religion purely so-called with subjects altogether foreign to it- with criminal law, laws of inheritance, laws of contracts, laws of bequest- has acted most injuriously on their material in-terests… we have suffered mentally and morally as well as in our worldly point of view from the connection of our Religion with Law.’

দেলওয়ার হোসেন মনে করতেন যে, পরিবর্তনের প্রতি বিমুখ থাকার জন্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশে প্রায় সব সময় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম থেকেছে এবং এই সব দেশে ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা সব সময় সুরক্ষিত হয় নি।

দেলোয়ার হোসেনের মতে, মুসলমানদের অবনতির একটি মূল কারণ হল তাদের ধর্মীয় গোঁড়ামী ও সহনশীলতার অভাব। মুসলিম দেশগুলিতে স্বৈরাচারী শাসনের প্রাধান্য উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার জন্যই এটা হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলি বিশেষ করে ইংল্যান্ড, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত পার্লামেন্ট, স্বাধীন সংবাদপত্র এবং জনমত দ্বারা চালিত। কিন্তু মুসলমান দেশগুলি সম্বন্ধে এ কথা বলা যায় না। দেলওয়ার হোসেনের ভাষায় :

‘No Mohammadan nation has been able to provide any constitutional means of checking the immense authority and arbitrary power of kings. In the most advanced Christian countries the power of the sovereign- whether designated emperor, king or parliament- is more or less limited by law; but in all Mohammadan countries the sovereign is above the law and is responsible to none for what he may choose to do or not to do.’

বস্তুতঃ দেলওয়ার হোসেনের মতে মুসলিম সভ্যতার অবনতির অন্যতম কারণ হল ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের একত্রিকরণ। তিনি মনে করতেন মুসলমানদের মধ্যে বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতার অভাবের জন্যই তারা আধুনিক যুগের জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়নি। দেলওয়ার হোসেন মুসলমান সমাজের যে সব দোষ চিহ্নিত করেছেন সেগুলির মধ্যে নি¤œলিখিতগুলি উল্লেখযোগ্য ঃ (১) কুরান বিভিন্ন দেশের প্রচলিত ভাষায় অনূদিত না হওয়ার ফলে অধিকাংশ মুসলমান এর মর্মবাণী বুঝতে পারে না; (২) সুদ গ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞার ফলে ব্যবসাবাণিজ্য ও পুঁজির বিকাশ সম্ভব হয়নি; (৩) মুসলমানরা ইচ্ছামত নিজের সম্পত্তি অন্যকে দান করতে পারে না; (৪) পর্দা প্রথা এবং (৫) বহু-বিবাহ।

দেলওয়ার হোসেন মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায় মাদ্রাসা শিক্ষা হল ‘utterly unsuited to the timrs, and it is a mere waste of means to supply people with what has no present value and will be of no tuture use.

দেলওয়ার হোসেন বাংলার সকল শ্রেণীর মুসলমানদের দেশজ ভাষা বাঙলা শেখা ও চর্চা করার উপরে বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, অভিজাত শ্রেণীর শিক্ষিত নগরবাসী মুসলমান বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার ফলে গোটা মুসলমান সমাজের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে কারণ তাঁদের সঙ্গে গ্রাম বাংলার জনসাধারণের চিন্তার ক্ষেত্রে মিলন বা আদান প্রদান হয় নি।

সমকালীন মুসলমান সমাজে দেলওয়ার হোসেনের চিন্তাধারা বিশেষ রেখাপাত করতে পারেনি। কিন্তু আজ থেকে প্রায় এক শত বৎসর পূর্বে তিনি মুসলমান সমাজের অবনতির কারণ বিশ্লেষণ করে এর উন্নতির জন্য যে পথ নির্দেশ করেছিলেন আজকের দিনে বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য সেটা মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়।

দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার বহুদেশ মুক্ত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের অবলুপ্তির ফলে সৃষ্টি হল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র- ভারত ও পাকিস্তান। আবার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণ এক নতুন বাঙালী জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অর্জন করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল কতখানি ভোগ করতে সক্ষম হয়েছে?

বস্তুত বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি খুব উৎসাহব্যঞ্জক বলে মনে হয় না। গোটা জাতি আজ এক অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে ও সমাজ চিন্তায় বিরাজ করছে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা; সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চরম বিকৃতি এবং অর্থনৈতিক জীবনে সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থা। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়। চিন্তা ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবী শ্রেণী ও রাজনৈতিক নেতাদের দেউলিয়াপনা প্রকটভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে গণতন্ত্রের মুখোশধারী একনায়কত্ব পাকাপোক্তভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হল গণতন্ত্রের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সর্বোপরি মানসিক বা মনোজাগতিক বুনিয়াদকে সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তোলে। স্বাধীনতার সংগ্রাম কখনও শেষ হয় না। যুগে যুগে সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে স্বাধীনতারও নতুন নতুন সংজ্ঞা আত্মপ্রকাশ করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি না তার সঙ্গে আসে অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি এবং সকল রকম সামাজিক বৈষম্য ও অবিচারের অবসান। তাই এই স্বাধীনতার জন্য আজ নতুন করে সংগ্রাম করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই নতুন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসে পড়েছে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের উপর। তাঁরা কি এই মহান দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবেন?

(পুনর্মুদ্রিত : ‘জিজ্ঞাসা’ ॥ শিবনারায়ণ রায় সম্পাদিত; পঞ্চম বর্ষ; চতুর্থ সংখ্যা; মাঘ-ফাল্গুন-চৈত্র :  ১৩৯১)

বাঙালি মুসলমানের মন

আহমদ ছফা

বাঙালি মুসলমান কারা? এক কথায় এর উত্তর বোধকরি এভাবে দেয়া যায় : যারা বাঙালি এবং একই সঙ্গে মুসলমান তারাই বাঙালি মুসলমান। এঁদের ছাড়াও সুদূর অতীত থেকেই এই বাংলাদেশের অধিবাসী অনেক মুসলমান ছিলেন— যারা ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যানুসারে ঠিক বাঙালি ছিলেন না। আর্থিক, সামাজিক, এবং রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধাগুলো তাদের হাতে ছিল না বলেই বাঙালি মুসলমানের সাথে কৃষ্টি সংস্কৃতিগত ভেদরেখাসমূহ অনেক দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভুত্বশীল অংশের রুচি, জীবনদৃষ্টি, মনন এবং চিন্তন পদ্ধতি অনেকদিন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের দৃষ্টিকেও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। বাঙালি মুসলমানের যে ক্ষুদ্র অংশ কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে গলে যখন সামাজিক প্রভুত্ব এবং প্রতাপের অধিকারী হতেন, তখনই বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক চুকে যেত এবং উঁচু শ্রেণীর অভ্যাস, রুচি, জীবনদৃষ্টি এবং ভ্রমাতœক প্রবণতাসমূহও কর্ষণে, ঘর্ষণে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অঙ্গিভূত করে নিতেন।

মূলত বাঙালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তারা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাদের কোনো মতামত বা বক্তব্য ছিল না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। যেমন কল্পনা করা হয়, অত সহজে এই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্ব প্রকারে যে ওই বিদেশী উন্নত শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন— ছড়াতে, কেলার বোলে অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্য শক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওযেবার তার বিশ্ববিশ্র“ত ‘ভারতের ধর্মসমূহ’ গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য অথবা ব্রাহ্মণ্য শক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদেরকে একেবারে চিরতরে জন্ম-জন্মান্তরের দাস বলে চিহ্নিত করেছে। আর যে সকল শক্তি ঐ আর্য শক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসন ক্ষমতায় অধিকারী হয়েছেন, তাদের সকলেই মর্যাদার আসন দিতে কোনো প্রকারের দ্বিধা বা কুণ্ঠা বোধ করেনি। শক, হুর, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যারাই এসেছে এদেশে তাদের সকলকেই একেকটি মর্যাদার আসন প্রদান করেছে। রাজ্যবিস্তারে প্রশাসনে তাদের সহায়তা করতে পিছপা হয়নি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাদের পরাজিত করেছিল তারাও যে মানুষ এ কথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছেন। তবু ভারতবর্ষে এমনকি এই বাংলাদেশেও যে, কোনো কোনো নিচু শ্রেণীর লোক নানা বৃত্তি এবং নানা পোশাক অবলম্বন করে ধীরে ধীরে উপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।

বাংলাদেশের এই পরাজিত জনগোষ্ঠী যাদেরকে রাজশক্তি পাশবিক শক্তির সাহায্যে অন্ত্যজ করে রাখা হয়েছিল, তাদেরই সকলে এক সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে সে প্রাথমিক পরাজয়ের কিঞ্চিত প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিলেন। শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবের ফলে প্রাচীন আর্য ধর্মের নব জীবন প্রাপ্তির পর বৌদ্ধদের এদেশের ধন-প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো, তার অব্যবহিত পরেই এদেশে মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা হয় এবং ভীত-সন্ত্রস্ত বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে। হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস। কেউ কেউ অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই  সাম্প্রদায়িকতার জনয়িতা মনে করেন। তারা ভারতীয় ইতিহাসের অতীতকে শুধু ব্রিটিশ শাসনের দুশ বছরের মধ্যে সীমিত রাখেন বলেই এই ভুলটা করে থাকেন।

##

বাঙালি মুসলমানেরা শুরু থেকেই তাদের আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিলেন। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের কারণে তাদের মধ্যে একটা সামাজিক প্রভুত্ব অর্জনের উন্মেষ হলেও জাগতিক দুর্দশার অবসান ঘটেনি। বাংলাদেশের নতুন নতুন রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধর্মালম্বির সংখ্যা আশাতীত হারে বৃদ্ধিলাভ করেছে। যেহেতু  মৌলিক উৎপাদন পদ্ধতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা রুপান্তর ঘটেনি, তাই রাজশক্তিকেও পুরনো সমাজ সংগঠনকে মেনে নিতে হয়েছে। সে জন্যেই মুসলিম শাসনামলেও বাঙালি মুসলমানেরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিগৃহীত ছিলেন। ইংরেজ আমলের উঁচু শ্রেণীর মুসলমানেরা সম্পূর্ণভাবে সামাজিক নেতৃত্বের আসন থেকে বিতারিত হলে উঁচু বর্ণের হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই সে আসন পূরণ করে।

বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাদের মানসিকতার মধ্যেও আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণসমূহ সুপ্রকট। বার বার ধর্ম পরিবর্তন করার পরেও বাইরের দিক ছাড়া তাদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে, নতুন ভাবাদর্শ এসে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসনপদ্ধতি চালু করেছেন, কিন্তু তারা মনের দিক দিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হৃদের মতোই বার বার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগেই ছিলেন বাঙালি মুসলমান এবং মুসলমান রাজত্বের সময়ে তাদের মানসে যে একটি বলবন্ত সামাজিক আকাক্সক্ষা জাগ্রত হয়েছিল তাদেরই রচিত পুঁথিসাহিত্যসমূহের মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। কাব্য সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বিচার অনুসারে হয়তো এসব পুঁথির বিশেষ মূল্য নেই, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এসবের মূল্য যে অপরিসীম সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইতালীর দার্শনিক বেনোদিত্তো ক্রোচের মতে প্রতিটি জাতির এমন কতিপয় সামাজিক আবেগ আছে যার মধ্যে জাতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্যাদের আকারে অতিমাত্রায় বিরাজমান থাকে, রাজনৈতিক পরাধীনতার সময়ে সে আবেগ সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং কোনো রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলে সে আবেগেই ফণা মেলে হুংকার দিয়ে ওঠে। সাহিত্যেই এই প্রথমে জাতিগত আকাক্সক্ষার রূপায়ণ ঘটতে থাকে। জাতিগত আকাক্সক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারলে কোনো মহৎ সাহিত্য যে সৃষ্টি হতে পারে না, একথা বলাই বাহুল্য।

পুুঁথিসাহিত্যের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, বাঙালি আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের মনটি রাজশক্তির আনুকূল্য অনুভব করে হুংকার দিয়ে ফণা মেলে জেগে উঠেছে। কিন্তু ঐ জেগে ওঠাই সার, সে মন কোনো পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারেনি। প্রতিবন্ধকতাসমূহ সামাজিক সংগঠনের মধ্যে বিরাজমান ছিল। সমাজ সংগঠন ভেঙ্গে ফেলে নবরূপায়ণ তারা ঘটাতে পারেনি। কারণ মুসলিম শাসকেরাও স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে যে নেতৃশ্রেণী সংগ্রহ করেছিলেন, তাদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব একেবারে ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি এবং আচরণগত দূরত্বের দরুন শাসকশ্রেণীর অভ্যাস, মনন রপ্ত করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাঙালি মুসলমান।

ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পরে এই দেশে হিন্দু সমাজে ভেতর থেকে যে একটি মধ্যবিত্ত নেতৃশ্রেণী মাথাচারা দিয়ে ওঠে তার মধ্যে মুসলমান সমাজের প্রতিনিধিত্ব প্রায় না থাকার কারণ হিসেবে শুধু ব্রিটিশের ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি’ কিংবা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি ইংরেজ অন্ধবিদ্বেষকে ধরে নিলে মুসলিম সমাজের তুলনামূলকভাবে পেছনে পড়ে থাকার কারণসমূহের সঠিক ব্যাখা করা হবে না।

##

ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু মধ্যবিত্তের উত্থান যুগে ইউরোপীয় ভাবধারা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নানা আধুনিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক চিন্তারাশি বঙ্গীয় হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে যে তরঙ্গ তুলেছিল, তা মুসলমান সমাজকে স্পর্শ করতে পারেনি। আধুনিক যুগের দাবির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে যে সকল ধর্মীয় এবং সামাজিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক মূল্যচেতনার নেতৃত্ব হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী দান করেছিলেন, মুসলমান সমাজে তা একবারে প্রসার লাভ করেনি। জগৎ এবং জীবনের যে সকল অত্যাবশ্যকীয় প্রশ্ন তারা নবযুগের আলোকে ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন, মুসলমানসমাজ তার কিছুই গ্রহণ করেনি। সে সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমির আলী, নওয়াব আবদুল লতিফ প্রমুখ যে সকল মুসলিম চিন্তানায়ক মুসলমানদের হয়ে কথা বলেছিলেন এবং চিন্তা করেছিলেন, মুসলমান সমাজের প্রকৃত দাবি কী হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে চিন্তা করার কোনো অবকাশ পাননি। শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং সংস্কার বলতে তাদের মনে প্রভুত্ব হারানো উঁচু কোটির মুসলমানদের কথাই জাগরুক ছিল।

স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষাকে আশ্রয় করে যে অধিকারচেতনা অপেক্ষাকৃত পরে জাগ্রত হয়, আসলে তা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের আন্দোলন এবং অগ্রগতির সম্প্রসারণ মাত্র। তাদেরকে তা করতে গিয়ে দু-ধরণের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থস্বার্থের দিকে অনেকদূর অগ্রসর হিন্দু সমাজের সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হতো এবং অন্যদিকে উঁচুতলার মুসলমানদের মূল্যচেতনা এবং জীবনদৃষ্টিকে স্বীকার করে নেয়া ছাড়া তাদের গত্যান্তর ছিল না। এই দু-মুখী প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করতে হলে যে শক্ত সামাজিক ভিত্তিভূমির প্রয়োজন ছিল, তাদের পেছনে ছিল না। তাই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে থেকেও ইংরেজি শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ নিয়ে যারা উপরে উঠে আসতেন, উঁচুতলার মুসলমানদের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে তারা নিজেদের সংযুক্ত করতেন। স্যার সৈয়দ আহমদের আলীগড় আন্দোলন থেকে শুরু করে জামালুদ্দিন আফগানীর ‘প্যান ইসলামিজম’ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে আসা সমস্ত আন্দোলন প্রবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অংশীদার করে নিতেন। কিন্তু স্যার সৈয়দের আলীগড় আন্দোলন একান্তভাবে উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমান সামন্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। আবার এই সামন্ত শ্রেণীর সঙ্গে জনগণের শ্রেণীগত তফাত ছাড়া ভাষা সংস্কৃতগত পার্থক্য যে ছিল না একথা বিংশ শতাব্দীতেও ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমানেরা খুব কমই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তারা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অনুরূপ সমাজচেতনা এবং মূল্যবোধ সঞ্চারের চেষ্টা করতেন। কিন্তু বাঙালি জনগণের সঙ্গে এতটা সম্পর্ক বিরহিত ছিল যে ভাবাদর্শিক কোনো জাগরণ আনতেই পারেনি। ধর্মীয় বুদ্ধমত এবং সংস্কারকে আঘাত করে এমন কোনো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুসলমান সমাজের ভেতর থেকে জেগে উঠতে পারেনি। মুসলমানদের দ্বারা সংগঠিত প্রায় সমস্ত সামাজিক কর্মকাণ্ড এই ধর্মীয় পুনর্জাগরণভিত্তিক।

হিন্দু সমাজে যে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন হয়নি একথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তাদের একাংশের মধ্যে অন্তত কিছুসংখ্যক মানুষ মৌলিক চিন্তা করেছিলেন এবং সামাজিক অনেকগুলো বদ্ধমতকে শাণিত আক্রমণ করেছিলেন, বাস্তবে না হলেও তত্ত্বগত দিক দিয়ে বেশকিছু যুক্তিবাদিতার চর্চা তাদের মধ্যে হয়েছে। তাদের কৃত আন্দোলনসমূহ যে সমুদ্র তরঙ্গের শীর্ষে ফসফরাসের মতো জ্বলেছে, সমাজের গভীরে প্রবিষ্ট হতে পারেনি, তার নিশ্চয়ই কারণ রয়েছে। কিন্তু মুসলমান সমাজে যুক্তিবাদিতার চাষ একেবারে হয়নি। নতুন যুগের আলোক জগৎ এবং জীবনকে ব্যাখ্যা করে সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন এমন মানুষ সত্যিই বিরল। মুসলমান সমাজে যে কোনো মনীষী জন্মাতে পারেননি কারণ সামাজিক লক্ষ্যের দ্বি কিংবা ত্রি-মুখীনতা। সামাজিক এবং ধর্মীয় সংগঠনসমূহের মধ্যেই বিভিন্নমুখী লক্ষ্যের কারণসমূহ সংগুপ্ত ছিল।

##

বাঙালি মুসলমান বলতে যাদের বোঝায়, তারা মাত্র দু’টি আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিলেন এবং অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার একটি তীতুমীরের অনুসারীদের দ্বারা পরিচালিত ওহাবী আন্দোলন। অন্যটি হাজী দুদুমিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনেই বাঙালি মুসলমানেরা মনেপ্রাণে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু উঁচু শ্রেণীর মুসলমানেরা এই আন্দোলন সমর্থন করেছেন তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আসলেও কৃষক জনগণই ছিলেন এই আন্দোলন দুটির হোতা। আধুনিক কোনো রাষ্ট্র বা সমাজদর্শন এই আন্দোলন দুটি চালনা করেনি। ধর্মই ছিল একমাত্র চালিকাশক্তি। সে সময়ে বাংলাদেশে আধুনিক রাষ্ট্র এবং সমাজ সম্পর্কিত বোধের উন্মেষ ঘটেনি বললেই চলে। সমাজের নিচু তলার কৃষক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মই ছিল একমাত্র কার্যকর শক্তি। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই আন্দোলন দুটির ভূমিকা প্রগতিশীল ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে পশ্চাদ্গামী ছিল, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

এই আন্দোলন দুটি ছাড়া অন্য প্রায় সমস্ত আন্দোলন হয়তো উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো হিন্দু সমাজের উদ্যোগ এবং কর্মপ্রয়াসের সম্প্রসারণ হিসেবে মুসলমান সমাজে ব্যাপ্তিলাভ করেছে। সমাজের মৌল ধারণাটি কোনো কিছুই প্রভাবিত করেনি। তার ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের মনটিতে একটু রং-টং লাগলেও কোনো রুপান্তর বা পরিবর্তন হয়নি। আমরা দেখেছি ‘শহীদে কারবালার’ ব্রাহ্মণ আজর ঊনবিংশ শতাব্দীর মীর মশাররফ হোসেনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’তে একই স্থানে, একই পোশাকে, একই চেহারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। মধ্যিখানে কয়েকটি শতাব্দীর পরিবর্তন কোনো ভাবান্তর আনতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতে এই মনের বিশেষ হেরফের ঘটেনি। বাঙালি মুসলমান রচিত কাব্য-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান পর্যালোচনা করলেই এ সত্যটি ধরা পড়বে। কোনো বিষয়ে তারা উল্লেখ্য কোনো মৌলিক অবদান আনতে পারেননি। সত্য বটে, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন প্রমুখ কবি কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। একটু তলিয়ে দেখলে ধরা পড়বে, উভয়েরই রচনায় চিন্তার থেকে আবেগেরই অংশ অধিক। তাছাড়া এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দু সমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।

মুসলমান সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হয়তো চর্বিতচর্বণ নয়তো ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগ্মা বা বদ্বমতসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন, তেমন লেখক কবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙালি মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসা-ভাসাভাবে, অনেক কিছুই জানার ভান করে, আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সংকুচিত। ‘বাঙালি মুসলমানের মন” এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশ লাভ করেছে এবং তার একাংশ সুফলগুলো ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এঁচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোনো কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না। যখনই কোনো ব্যবস্থার মধ্যে কোনোরকম অসঙ্গতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকে রীতিমতো প্রতিভাবানের কর্ম মনে করে। শিশুর মতো যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট, দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই। কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালি মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি কালচার বলে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয় না।

বাঙালি মুসলমানের সামাজিক সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক সৃষ্টি, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি চোখ বুলোলেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠবে। সাবালক মন থেকেই উন্নত স্তরের সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশ সম্ভব। এই সকল ক্ষেত্রে তার মনের সাবালকত্বের কোনো পরিচয় রাখতে পারেনি। যে জাত উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজকারবার চলে, তাকে খোলা থেকে আগুনে, কিংবা আগুন থেকে খোলায় এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। সুবিধার কথা হলো নিজের পঙ্গুত্বের জন্য সব সময়েই দায়ী-করবার মতো কাউকে না কাউকে পেয়ে যায়। কিন্তু নিজের দূর্বলতার উৎসটির দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করে না।

বাঙালি মুসলমানদের মন যে এখনো আদিম অবস্থায়, তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই একপা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিকভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু-বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মনের ধরণ-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মমভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থ্ াথেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।

[ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পুনর্মুদ্রিত]

সম্ভাবনা

যখন ভেবেছি আমি

সেই ফুল চিরশরণীয়া-তারপরই

অট্টবার্তা ছড়িয়েছে পথে

ঘরে ঘরে শুধু পদতালি;

খোলা অট্টহাসি সেই গ্রামছাড়া

পথ ধরে দূরে চলে গেছে।

কোথাও বৃষ্টিগীতে ভরে যাবে

আরও-ভেজা গৃহখানি হায়

এই তো ধূলির কণা : শ্মশানের বালি

 

তাহলে বলব নাকি

ফুল সেই চিরভৎর্সিতা-

কিছুটা আত্মীয় সে জঙ্গুলে চুতরা পাতার

অথবা সেই অদ্ভুতুড়ে কৃষ্ণ হরিণ,

যার মরচে-পড়া ঘাড়

বহু আগে মটকে দিয়ে গিয়েছিল বাঘ

 

কিন্তু এই সবই তো কল্পনা :

মিথ্যেগাথা, আসূরিক জাল

এখন সত্য হলো কার্তিকের দিন

মেঘ কেটে গেলে

তারপরই আসতে পারে

অবিরল বৃষ্টিধারাগীতি