Archives

বাঙালনামা : এক বাঙাল অথবা বাঙালির বিশ্ববীক্ষা

তপন রায়চৌধুরীর জীবন আক্ষরিক অর্থেই বর্ণাঢ্য। কেবল বর্ণাঢ্য বললে অবশ্য বেশ কমিয়েই বলা হয়। বলা দরকার, নানা দিক থেকে তিনি ভাগ্যবানও বটে। বেশ কবার বিনয়বশত নিজের যোগ্যতার সাপেক্ষে তুলনামূলক ‘বাড়তি প্রাপ্তি’র কথা বলেছেন তিনি। যেসব জাগতিক প্রাপ্তির উল্লেখ করে তিনি বিনয় দেখিয়েছেন, সেগুলো তাঁর ক্ষেত্রে মোটেই বেশি নয়। কিন্তু মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা যেসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তার সবটা তো ব্যক্তিগত অর্জন নয়। জন্ম, পারিবারিক উত্তরাধিকার, বহু মানুষের জীবনের মোড়-ঘোরানো সময়ে বেঁচে থাকা, রাজনৈতিক বা ক্ষমতাসম্পর্কের অন্তরঙ্গ হতে পারা, এমনকি লেখালেখির উৎসাহ আর ভোক্তা পাওয়া — এগুলো ঠিক ব্যক্তিগত কৃতিত্ব দিয়ে সবটা ব্যাখ্যা করা যায় না। তপন রায়ের ক্ষেত্রে বলা যায়, তিনি সময় ও প্রতিবেশের প্রশ্রয় পেয়েছেন; সাথে সাথে নিজের যোগ্যতা ও তৎপরতায় নিজ সময় ও প্রতিবেশকে তৈরিও করেছেন। তাই এ ‘শিক্ষাজীবী’র আত্মজীবনী এত আকর্ষণীয় হয়েছে।

বাঙালনামা [আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ॥ প্রথম সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ : ২০০৭] বাংলা ভাষার সবচেয়ে সুলিখিত আত্মজীবনীগুলোর একটা। লেখক অবশ্য বলেছেন, এটি ‘আত্মজীবনী নয়, স্মৃতিকথা’ মাত্র (পৃ. ১০)। একথা বলার কারণও তিনি জানিয়েছেন। খাঁটি আত্মজীবনী লিখতে গেলে ব্যক্তিজীবনের এমনসব অভিজ্ঞতার কথাও লিখতে হয়, সাধারণভাবে যেগুলো জনতার সামনে হাজির করা স্বস্তিদায়ক নয়। যেমন কোনো গোপন অপরাধ বা হীন আচরণের কথা। তবে আত্মজীবনী সম্পর্কে বাংলার বিদ্বৎসমাজে যে কথাটা বেশি চালু, তা হল, বেশিরভাগ আত্মজীবনীতে যৌনজীবনের বর্ণনা থাকে না। কথাটা এভাবে বলা যায়: যা কিছু ট্যাবু হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত তা জীবনীগ্রন্থেও ট্যাবু হিসাবেই থাকে। তপন রায়চৌধুরীও একই কথা বলেছেন। বলেছেন, নিজের গোপন প্রকাশ করে এমনকি বাজারি প্রসার পাওয়ার মতো বুকের পাটাও তাঁর নাই। তাই আত্মজীবনী নয়, স্মৃতিকথাই সই।

কিন্তু এ প্রসঙ্গে অন্যরকম ভাবনার যথেষ্ট সুযোগ আছে। উৎপাদক ও ভোক্তা দুই দিক থেকেই। আত্মজীবনী সম্পর্কে বাংলার শিক্ষিতসমাজের পূর্বোক্ত ভাবনা এবং — তপন রায়চৌধুরীর ভাবনাও — যথেষ্ট পরিমাণে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সত্য বটে, উদারনৈতিক মানবতাবাদী ডিসকোর্সে ব্যক্তিকে যথেষ্ট পরিমাণে স্বরাট আর স্বাধীন ভাবা হত। কিন্তু আজকাল তো আমরা জানি, ভাষা-সংস্কৃতি-শ্রেণি-মতাদর্শের দুর্ভেদ্য জালে ব্যক্তিমানুষ কী সাংঘাতিক রকমে সামষ্টিক। বাঙালনামা থেকেই একটা উদাহরণ দেয়া যাক। বিলাত থেকে ফেরার পথে প্রায় অর্ধেক দুনিয়া ঘুরে লেখক ভারতে ফিরেছেন। পথে আরব দুনিয়ার একটা বড় অংশ মাড়িয়ে তাঁকে ভারতবর্ষে ফিরতে হয় (পৃ. ২৫০-৫৩)। পুরা আরব দুনিয়ায় তিনি দেখার মতো বা উপভোগের মতো কিছুই পাননি। ব্যাপারটাকে রায়চৌধুরীর মুসলমান-বিদ্বেষ হিসাবে দেখার অবকাশ নাই। এ বস্তু জ্ঞানত তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। প্রাচ্যবাদী চর্চার ফল হিসাবেও দেখার দরকার নাই। কিন্তু যে শিক্ষা ও রুচির মধ্যে তাঁর জন্ম আর বেড়ে ওঠা, তাঁর দেখার চোখ আর অনুভবের রুচি যেভাবে ভালো-মন্দ নির্ধারণের নিরিখ তাঁর মধ্যে জমিয়ে তুলেছিল, তার ভূমিকা তো অবশ্যই আছে। ধরা যাক, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান যুবা এ পথ ধরে ভারতবর্ষে ফিরল। মরুপ্রান্তরের ওই বিপুল বিস্তারে কারণে-অকারণে সে কি শিহরিত হবার মতো অসংখ্য উপলক্ষ পেয়ে যাবে না? পাওয়ারই কথা। মানসগড়নের বড় কাঠামো বাদ দিয়ে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যবিচার খুব বাস্তবসম্মত হবে না। ব্যক্তির মধ্যে ফারাকটা ঘটে আরো ছোট কাঠামোয়। নীরদ সি. চৌধুরীর সাথে অক্সফোর্ডে পুঁইশাক নিয়ে তাঁর যে বিরোধ বেঁধেছিল (পৃ. ৩৭৩), তাকে সেই ছোট কাঠামোর ফারাক বলতে পারি। বড় কাঠামোর বিচারে তাঁরা দুজন আসলে একই কোঠায় পড়বেন।

আত্মজীবনীতে কী থাকবে আর কী থাকবে না, তার নির্ধারণে সম্ভাব্য ভোক্তার ভূমিকাও বেশ গুরুতর। এখানে ভোক্তা কথাটা অচিহ্নিত বাজার অর্থে দেখাই ভালো। বাজার মানে আবার শুধু বইয়ের কাটতি নয়; যে ধারণা আর বিষয়গুলো জ্ঞানরাজ্যে দাপুটে থাকে, সেগুলোই আসলে সম্ভাব্য ভোক্তার ফর্দটা তৈয়ার করে। এখন যৌনতা বা সেক্সুয়ালিটি যদি তত্ত্বের বাজারে কল্কি না পেয়ে শুধু রসময় গসিপের অংশ হয়, তাহলে, অনুমান করি, আত্মজীবনী-লেখক সে বস্তু উপস্থাপনার ঝুঁকি নেবেন না। কিন্তু যৌনতা যখন রীতিমতো সামাজিক-মানবিক গবেষণার চোস্ত উপাদান হয়ে ওঠে, যখন তত্ত্ববাজির আকর উপাদান হিসাবে বাজারে চড়া-দর হাসিল করে, তখন তা উপস্থাপনের বাড়াবাড়িও ঘটে। এরকম উদাহরণ এই নিরীহ গরিব বঙ্গেও বিস্তর পাওয়া যায়। ব্যাপারটাকে শুধু অর্থকড়ির মানদ-ে দেখা সত্যের অপলাপ হবে।

উপরের আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা এই যে, বাঙালনামাকে আত্মজীবনী হিসাবে পড়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বর্তমান আলোচনার জন্য এই চিহ্নায়নের প্রয়োজনও আছে। স্মৃতিকথায়ও ব্যক্তি-লেখকটিকে চিনে নেয়া যায়। কিন্তু আত্মজীবনীতে ব্যক্তির হাজিরা অনেক জোরালো থাকে। তাই বাঙালনামা পাঠসূত্রে খোদ তপন রায়চৌধুরীর ব্যক্তিগত-শ্রেণিগত ভাব-স্বভাবের পর্যালোচনাও উপকারী হওয়ার কথা।

যে অভিজ্ঞতাটা তিনি ¯্রফে জন্মসূত্রে পেয়েছেন, যে সময়টা ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক আনুকূল্যে নিজেই মূল্যবান, তার বিবরণীটা তিনি দিয়েছেন মোটামুটি সামগ্রিকভাবে। তিনি জানেন, এগুলো ঐতিহাসিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। জানেন, এসব ঘটনা বা বাস্তবতার আরো বহু বিবরণীর সাথে পাঠক পরিচিত। জানেন বলেই তাঁর বর্ণনায় দুইটি ঝোঁক খুব পষ্ট। একদিকে তিনি চেয়েছেন, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত বিবরণী তোলা থাকুক, যা হয়ত অন্য দশ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-বিবরণীর একটা হয়ে মূল্যবান হবে। অন্যদিকে ওই অভিজ্ঞতাগুলো সম্পর্কে ইতিহাসের অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্তগুলো কিরকম, তারও সংক্ষিপ্ত কিন্তু মূল্যায়নধর্মী পরিচয় যোগ করেছেন। দুই অংশ মিলে ওই সংক্ষিপ্ত উপাধ্যায়গুলোতে এক ধরনের পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যায়।

কিন্তু কেতাবের উত্তরভাগে, পরিণত বয়সে নিজের জীবন ও কর্ম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে, তিনি বর্ণিতব্য বিষয়ে খানিকটা লাগাম টেনেছেন। বর্ণনা করেছেন প্রধানত কর্মসূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতা। শিক্ষকতা আর শিক্ষাতত্ত্ব, শিক্ষা-প্রশাসক হিসাবে অভিজ্ঞতা, আর সামগ্রিকভাবে কর্মসূত্রে-আড্ডাসূত্রে পাওয়া স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ এ অংশে গুরুত্ব পেয়েছে। বর্ণনাভঙ্গিতে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না। থাকার কথাও নয়। যিনি জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্সি কলেজ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা, দিল্লির কেন্দ্রীয় আরকাইভস আর দিল্লি স্কুল অব ইকনমিকসের অভিজ্ঞতা, আর শেষে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে একেবারে অক্সফোর্ড পর্যন্ত, সেখানেও না থেমে দুনিয়ার নানা প্রান্তের আরো কিছু কুলীন বিদ্যাঙ্গনের খবরাদি — বিষয়গৌরবেই তাঁর তাবত দ্বিধা অন্তর্হিত হওয়ার কথা। তদুপরি বর্ণনাকারী ব্যক্তিটি প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ঈর্ষণীয় রকমের লম্বা-চওড়া কেদারায় আসীন। অবস্থানগত প্রত্যয় বাঙালনামার সবচেয়ে গুরুতর আকর্ষণ। যতই বিনয় দেখান না কেন, লেখার সময়ে লেখকটি যে বেশ উঁচু আসন থেকেই কথাগুলো বলেছেন, তা গোপন থাকেনি। ভঙ্গিতে মার্জিত রুচি সর্বত্র যে রক্ষিত হয়েছে, তা লিখনশৈলীর মাহাত্ম্য হিসাবেই পাঠ্য।

শুরুটা হয়েছে যথারীতি নিজের জন্ম ও বংশপরিচয় দিয়ে। দেয়ার মতো পরিচয়ই বটে। পিতৃকুল শুধু নয়, তাঁর মাতৃকুলও — দেখা যাচ্ছে — যথেষ্ট পরিমাণে কুলীন। তবে বরিশালের জমিদারবাড়ির ছেলেদের কাছে তাও কল্কে পাওয়ার মতো নয়। যাই হোক, প্রথম দিকে ছোট্ট এক চিলতে পরিচয় আছে কুমিল্লার। তাঁর মামাবাড়ির বর্ণনা। এ বর্ণনা এক হিন্দু ভদ্র পরিবারের। এক সচ্ছল পেশাজীবীর। তবে এর মধ্যে এক ঐশ্বর্যম-িত জীবনরীতির স্মৃতিও আঁকা রইল। এ ঐশ্বর্য আর্থিক সচ্ছলতার নিশ্চয়ই; তবে কেবল তা নয়। অন্তত সম্পন্ন হিন্দু পরিবারের খাবার-দাবার আর জীবনযাপনের যে স্মৃতি এখানে তোলা রইল, তা উপন্যাসের বহু বর্ণনাকে বানোয়াট গালগল্পের অপবাদ থেকে রক্ষা করবে।

এরপর যথারীতি বরিশাল। বরিশালের সমকালীন ভদ্রসমাজের যে পরিচয় এখানে আছে, তা সামাজিক গবেষণার মূল্যবান উৎস হিসাবে গণ্য হওয়ার মতো। কৌতূহলী পাঠক-পাঠিকার কাছে জমিদারবাড়ির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলো আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। জমিদারির অতীত, তার বর্ধিষ্ণু অবস্থা, তার পতনের কালে ভাঙনের শব্দ। তপন রায়চৌধুরীর লেখায় পরিমিতিবোধ বস্তুত অসাধারণ। সেসঙ্গে রসবোধ। দুটিই এ অংশেও পুরামাত্রায় বিদ্যমান। কিন্তু সংক্ষিপ্ত পরিসরেই পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া গেছে। এ অভিজ্ঞতার জোরেই অনেকদিন পরে জমিদারি-ব্যবস্থার ওপর ব্যক্তিগত স্মৃতিনির্ভর এক প্রবন্ধ পড়ে অ্যাকাডেমিক সভায় তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। বাংলা মুল্লুকের আধুনিক ইতিহাসের গোড়া এই জমিদারি-ব্যবস্থা। এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাহেতু এমন কিছু মন্তব্য তিনি করতে পেরেছেন, যা বাইরের কারো পক্ষে কেবল ঐতিহাসিক গবেষণার জোরে করা সম্ভব হত না। যেমন, বাংলা সাহিত্যে জমিদারশ্রেণির উপস্থাপন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য:

আয়েসে অভ্যস্ত জমিদারশ্রেণি এক দিকে বংশবৃদ্ধি করেছেন আর অন্যদিকে নায়েব-গোমস্তার হাতে সম্পত্তি দেখাশুনোর ভার ছেড়ে দিয়ে ক্রমে নিজেরা দারিদ্র্যের প্রান্তসীমায় পৌঁছেছেন। এই অবক্ষয়ের ইতিহাস কেউ লেখেননি। তারশঙ্কর-বনফুলের উপন্যাসে জমিদারদের এক রোমান্টিক ছবি তুলে ধরা হয়েছিল, যদিও শেষের দিকের লেখায় তারাশঙ্কর শ্রেণি হিসাবে জমিদারদের অন্তঃসারশূন্যতার কথাই বলেছেন। (পৃ. ১৬১)

এ মন্তব্যে জমিদারি-ব্যবস্থার অংশীদার হওয়ার বাইরে তাঁর সারাজীবনের সাহিত্যপাঠেরও বড় ভূমিকা আছে। অন্যত্র তিনি মন্তব্য করেছেন জমিদারির আভিজাত্য সম্পর্কে। লিখেছেন, শ্রমশোষক এ শ্রেণিকে অভিজাত বলা ঠিক নয়; বা সামন্ততন্ত্রের আভিজাত্যের ধরন অন্যরকম ইত্যাদি।

এ ধরনের মন্তব্য-মূল্যায়ন অবশ্য সতর্কতার সাথে দেখাই ভালো। উত্তরকালে বিদ্যাজীবী হিসাবে স্বোপার্জিত আভিজাত্যের সূত্রে কৌলীন্যের যে উঁচু ছাঁদ রোজগার করে নিয়েছিলেন, তাতে ভর দিয়েই বোধকরি এ ধরনের মন্তব্য তিনি করতে পেরেছিলেন। তাঁর বড়-পরিবারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রে, অনুমান করি, জমিদারির স্মৃতি এভাবে কালিমালিপ্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কথাটার উল্লেখ আসলে সে কারণেও নয়। জমিদার-পরিবারের সন্তান হিসাবে তিনি নিজে যে সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক-সম্পর্কগত সুবিধা পেয়েছিলেন, তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়, তার মূল্য মোটেই হেলাফেলার নয়। ফলে জমিদারিজনিত আভিজাত্যকে তিনি যেভাবে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, তা খুব খাঁটি হয়নি। আমরা পরে দেখব, জীবনীর জমিদারি-ব্যবস্থা-সম্পর্কিত পর্যালোচনামূলক অংশগুলোতেও তিনি প্রকৃতপক্ষে খুব গভীরে যেতে পারেননি বা যেতে চাননি।

বরিশালবাসের সময়টাতে অনেকের কাছেই হয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে রাজনৈতিক তৎপরতার বিবরণ। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। কেন্দ্রের নির্দেশনায় বা নির্দেশনা ছাড়াই মফস্বল-শহর-ধরনের প্রান্তগুলোতে সেই আন্দোলন বাস্তবে কী রূপ ধারণ করেছিল, তার সাফল্য-ব্যর্থতার মাপগুলোই বা কেমন — এসবের এক অন্তরঙ্গ ছবি আছে এ অংশে। একটু সতর্কতার সাথে পড়লে বোঝা যাবে, পরবর্তীকালীন অভিজ্ঞতা বা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস-রস ওই বর্ণনায় খানিকটা বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। তাছাড়া লেখকের নিজের শ্রেণিগত-রাজনৈতিক পক্ষপাত জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে বর্ণনাকে খানিকটা বেশিই প্রভাবিত করেছে। আত্মজীবনীতে এরকমই হওয়ার কথা। এরকম হওয়াই হয়ত ভালো। কিন্তু এ বইয়ের অন্য অনেক বিবরণীর মতো এই অংশেও ঐতিহাসিক নৈর্ব্যক্তিকতার ভঙ্গিটি এত প্রবল যে ব্যক্তিগত মন্তব্যকেও সার্বিক মন্তব্য বলেই মনে হয়। তবে এর ফলে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হিসাবে অংশটির পূর্বকথিত মূল্য মোটেই কমে না।

সে মূল্য শুধু কংগ্রেস-পরিচালিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিচয়ের জন্যই নয়। অন্য রাজনৈতিক তৎপরতার সংবাদের দিক থেকেও বটে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হয়ত শেরে বাংলা ফজলুল হকের তৎপরতা। কয়েকটা রেখায় তপন রায়চৌধুরী ফজলুল হকের ব্যক্তিস্বভাব, মনের গড়ন আর রাজনীতির যে ছবি এঁকেছেন, বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্তের সাথে অন্তরঙ্গ যোগ থাকলেই কেবল তা সম্ভব। বাজারে নতুন আসা মুসলিম লিগের রাজনীতি সম্পর্কেও কিছু মন্তব্য আছে। তবে সেগুলো সম্ভবত অপ্রচলিত কোনো তাৎপর্য বহন করে না।

‘আমাদের প্রজন্ম জাতীয় জীবনের দুই ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে — প্রথম ’৪৩ সালের মন্বন্তর। দ্বিতীয় ’৪৬ সনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ (পৃ. ১২৬)। — বিশেষ সময়ে জন্মানোর বিশেষ সুফল হিসাবে এই দুই ঘটনার ‘প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ’ আছে বাঙালনামায়। দুর্ভিক্ষের বর্ণনায় খুব নতুন কথা নাই। তবে, অমর্ত্য সেনের গবেষণার প্রভাবে কিনা বলা মুশকিল, দুর্ভিক্ষ যে সামগ্রিক কোনো বিপর্যয় ছিল না, বরং বহু মানুষের জন্য ভাগ্য গড়ার উপায় হয়েছিল, অর্থাৎ বণ্টনের এবং পরিকল্পনার সমস্যাটাই যে প্রধান সমস্যা ছিল, সেকথা মনে রেখেই তপন রায়চৌধুরী কথাগুলো সাজিয়েছেন। আর, অন্য অনেক ব্যাপারের মতো, এখানেও একটা বাড়তি পাওয়া তেতাল্লিশের মন্বন্তর সম্পর্কে প্রধান গবেষণাগুলো সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী মন্তব্য।

তুলনায় ছেচল্লিশের দাঙ্গা সম্পর্কিত বিবরণ অনেক বেশি আকর্ষণীয়। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের স্পর্শকাতরতা থাকায় দাঙ্গা-বিবরণী তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয়। প্রভাবশালী বয়ানে মুসলিম লিগের পা-া আর সোহরাওয়ার্দীর গু-াদের দাঙ্গাবাজ হিসাবে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। তপন রায়চৌধুরীকে অবশ্য তাল সামলানোর জন্য বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। ঐতিহাসিকের কা-জ্ঞান আর ‘উদারনৈতিক মানবতাবাদী’ অবস্থান তাঁকে দোষাদোষির বদলে পর্যালোচনার দিকে নিয়েছে। ফলে দাঙ্গার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে এখানে। উৎকৃষ্ট কথাসাহিত্যের মেজাজ আছে এসব মন্তব্যে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ বা খুশবন্ত সিংয়ের দিল্লি ইত্যাদি দাঙ্গাকেন্দ্রিক রচনার কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাঙালনামার সম্প্রদায়গত সম্পর্কের বয়ান কলকাতার মূলধারার ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে না। স্বভাবতই অনেক পাঠক ক্ষুণœ হয়েছেন। তাঁরা লেখককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন: মুসলমানদের তিনি যথোচিত গালিগালাজ করেননি [‘নিবেদন’ অংশ দ্রষ্টব্য]। আসলে কিন্তু লেখকের দিক থেকে মুসলমান-পক্ষের প্রতি আনুকূল্য দেখানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং গালগল্প বাদ দিয়ে কলকাতা-দাঙ্গা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুতর যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় — প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে — তিনিও সেই প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলেছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অসৌজন্য — অধিকাংশ ভাষ্যকার যা করে থাকেন — দেখাননি; কারণ, ওই নথিপত্র, যদি কিছু থেকে থাকে, এখনো গবেষকদের নাগালে আসেনি। সোহরাওয়ার্দী সরকার তথা কলকাতা পুলিশের ভূমিকা, তপন রায়চৌধুরীর মতে, খুবই সন্দেহজনক। অন্যদিকে, আবুল মনসুর আহমদ বা আবদুর রাজ্জাকের মতো বিপরীত পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটা কোনো গুরুতর প্রশ্নই নয়। কারণ, আবদুর রাজ্জাকের বরাত দিয়ে যদ্যপি আমার গুরুতে আহমদ ছফা যেমন জানিয়েছেন, কলকাতা পুলিশের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। এরা সোহরাওয়ার্দীর কথিত গু-া হয়ে কলকাতায় হিন্দু-নিধন করেছে — এ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য নয়। তপন রায়চৌধুরী সঙ্গত কারণেই কলকাতার কথিত ভদ্রলোকসমাজের সাংস্কৃতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে, তাঁর মতে, ইংরেজপক্ষ আর প্রাদেশিক সরকারপক্ষের গাফিলতি যে ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

এখানে বলে রাখা দরকার, কংগ্রেস-মুসলিম লিগ রাজনীতি এবং ভারত ও বাংলাভাগ সম্পর্কে মূল্যায়ন পেশের ক্ষেত্রে তপন রায়চৌধুরী উল্লেখ করার মতো বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। এ বিবেচনা তাঁর স্মৃতিপ্রসূত বলে মনে হয় না। তাঁর সময়ের এবং শ্রেণির মানুষেরা এ ব্যাপারে বিপুল পরিমাণ গালগল্পের জোগান দিয়েছেন। বাংলাভাষী অঞ্চলে, এমনকি (ছদ্ম)-অ্যাকাডেমিক প্রাঙ্গণগুলোতেও, এসব গালগল্পের প্রবল প্রতাপ। প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগুলোর সাথে পরিচয় থাকায় বাঙালনামার তপন রায়চৌধুরী এসব পুরাণধর্মী ইতিহাস থেকে নিজেকে হেফাজত করতে পেরেছেন।

বাঙালনামার দ্বিতীয়ার্ধে ভারতবর্ষের নতুন রাজধানী দিল্লির পরিচয় আছে। এ পরিচয় কিছুটা নগর-পরিকল্পনার দিক থেকে, কিছুটা রাজনীতির দিক থেকে। তবে এ দুই পরিচয় খুবই সামান্য। লম্বা বিবরণ আছে দিল্লির আমলাতন্ত্রের। অল্প কিছুদিন তিনি ন্যাশনাল আর্কাইভসের কর্তাব্যক্তি হিসাবে কাজ করেছিলেন। এই কাজ নেয়া আর কাজ করা — দুই সূত্রে আমলাতান্ত্রিকতার একটা পরিচ্ছন্ন ছবি ফুটেছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান হিসাবে কাজ করার সময়ে শিক্ষাপ্রশাসন সম্পর্কে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাও এই আমলাতান্ত্রিকতার সাথে তুলনীয়। এসব ছবি খুব অন্তরঙ্গ বটে, কিন্তু সুখকর নয়। পাঠকালে কখনো কখনো মনে হতে পারে, দীর্ঘদিন পশ্চিমে সুবিধাজনক জীবনযাপনের ফলে আদর্শ বা মান সম্পর্কে তাঁর যে ধারণা অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতা হিসাবে আত্মস্থ হয়েছে, তারই নিরিখে বুঝি তিনি ভারতবর্ষের ওই গঠনপর্বের পরিচয় দিয়েছেন। সে কারণেই তাঁর চোখে আগের অভিজ্ঞতাগুলো এতটা কালো হয়ে ধরা দিয়েছে।

পুরো বাঙালনামার, একদিক থেকে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান উচ্চশিক্ষা আর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা সম্পর্কে বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার প্রদর্শনী। অভিজ্ঞতাটা মুখ্যত ইতিহাস-গবেষণার। সেদিক থেকে ইতিহাসপিপাসুদের জন্য এ এক জরুরি আকরগ্রন্থ। ঐতিহাসিক, ইতিহাসগ্রন্থ, গবেষণাপদ্ধতি, গবেষণার বিষয়, ইতিহাসের বাজার, বাজারের সাথে উৎপাদক-ভোক্তার সম্পর্ক — ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে অজ¯্র তথ্য আর মূল্যায়নে সমৃদ্ধ এ বিবরণী। কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার — শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে অর্থ-মঞ্জুরি, প্রাতিষ্ঠানিক সমুন্নতি রক্ষা থেকে পশ্চিমা ফান্ডের জাহেরি-বাতেনি বিষয়াদি পর্যন্ত — নানাদিকও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। শুরুটা হয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রেসিডেন্সি কলেজ দিয়ে। সেখানে আছে কলকাতার বহু বিশ্রুত প-িতের কথা। তারপর তো দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্সের আভিজাত্য। দুনিয়াজোড়া অ্যাকাডেমিক সম্পর্ক, অ্যাকাডেমির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং রমরমা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার খুব চমৎকার আভাস আছে এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, বাংলাদেশে যে আবহ সম্পর্কে আমরা সর্বার্থে অজ্ঞ। এরপর অক্সব্রিজের খুঁটিনাটি তো আছেই।

শিক্ষাব্রতীদের কাছে এ বইয়ের আরেকটি দিক খুব আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। পুঁজিবাদী দুনিয়ার লিবারেল জমানা থেকে নিও লিবারেল জমানায় প্রবেশ এবং শিক্ষানীতিতে তার প্রত্যক্ষ অভিঘাত। নিজের কর্মকালে তপন রায়চৌধুরীকে অবশ্য এই পরিবর্তনের চাপটা খুব বেশি বইতে হয়নি। কিন্তু লক্ষণগুলো জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেতা প্রবলভাবে কাবু করে ফেলছিল অক্সব্রিজের বনেদিয়ানাকে। সঙ্গত কারণেই এই বাজারি ব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের অনুকূল মত প্রকাশ পায়নি।

প্রায় যে কোনো আত্মজীবনীর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সাধারণত এটি লেখা হয় পরিণত বয়সে। জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্তগুলো যথেষ্ট পাকা হয়ে যাওয়ার পর। ফলে পেছনে ফিরে পুরানা অভিজ্ঞতার বয়ান একেবারে তখনকার ভাবভঙ্গিসমেত হাজির করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। আত্মজীবনীই বলি আর স্মৃতিকথাই বলি, এ ধরনের লেখার প্রধান অবলম্বন তো স্মৃতি। তথ্য-উপাত্ত না হয় অন্য সূত্র থেকে ঠিক করে নেয়া গেল। কিন্তু ঠিক কোন ঘটনা বা অনুভূতিটিকে লেখক লেখার সময়ে খুঁচিয়ে চাগিয়ে তুলতে চাচ্ছেন, আর সংশ্লিষ্ট স্মৃতির পুনর্নির্মাণই বা কোন কোন উপাদানগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিল, তার সবই তো নির্ভর করে লেখার সময়ের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। বলা দরকার, আত্মজীবনী শুধু ইতিহাসই নয়, ইতিহাসের মতোই বানিয়ে তোলা জিনিস। অতীতের বয়সজনিত আর পরিবেশজনিত ভাবটা যদি মুনশিয়ানার সাথে রক্ষিত হয়, তাহলেই পাঠকের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়। দুটি কথার ওপর এখানে আলাদা করে জোর দিতে চাই। এক. শব্দটি ‘মুনশিয়ানা’; সত্যের নিষ্ঠাবান খোঁজাখুঁজি নয়। ‘সত্য কঠিন’ বটে আর ভালোবাসার মতো মূল্যবানও বটে, কিন্তু সে যে কোথায় থাকে অন্তত বুদ্ধিমান মানুষ তার হদিশ পাবার আশা করবে না। প্রয়োজনও বোধ করবে না। দুই. স্মৃতি বা নিজের জীবন-সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো যতটা ব্যক্তিগত মনে হয়, আসলে মোটেই তত ব্যক্তিগত নয়। ‘নিজের জীবনটাই যাপন করছি’ এবং ‘নিজের মতোই করছি’ — ইত্যাদি চিন্তা শিক্ষিত ভদ্রলোকশ্রেণির মধ্যে অতি প্রবল। নিজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এরকম চিন্তা হয়। লক্ষণবিচারে কথাটা মিথ্যাও নয়। কিন্তু অধিকতর গভীর নানা সত্য আমাদের নিশ্চিত করে, ব্যক্তিগত জীবনের বড় অংশটাই আসলে দখল করে থাকে ‘অন্য’রা। এটা ভালো বোঝা যায় যখন ‘আমার’ জীবনের কোনো ঘটনাই অন্যরা ব্যবহার করে ঠিক ওইভাবে যা আমার কাছে মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাঙালনামায় ‘আত্ম’ অংশটা বরং একটু বেশি পরিমাণেই আছে। লেখকের পক্ষপাত আর জোরারোপ এখানে প্রায় বিরামহীন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সত্যের খাতিরে বলা দরকার, লেখাটি কথাসাহিত্যধর্মী নয়। কথায় রস আছে যথেষ্ট; সে রস বেশ সুস্বাদুই বটে। চরিত্রের উপস্থাপনায় ব্যক্তিটিকে যথাসম্ভব এঁকে দেয়ার চেষ্টাও আছে। এমনকি কোথাও কোথাও পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈয়ার করে রীতিমতো সংলাপসহ চরিত্রগুলো উপস্থাপিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও বয়ানটাকে কথাসাহিত্যিক মেজাজের বলা যাচ্ছে না। কারণ, পুরো বইতে একটা নিরাসক্ত দূরত্বের মেজাজ গদ্যভঙ্গির বিশিষ্টতায় রক্ষিত হয়েছে। ব্যক্তিগততার মধ্যে একটা নৈর্ব্যক্তিক সুর প্রধান হয়ে উঠেছে। এটা অন্তরঙ্গতার বিয়োগ নয়; বরং একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির যোগ। সেই ভঙ্গিটা ঐতিহাসিকের। এ কেতাবের লেখক যে একজন ঐতিহাসিক, সে কথা লুকানোর কোনো চেষ্টা তিনি করেননি। নিজের দেখা ঘটনাগুলোকে ইতিহাসের সিদ্ধান্তের সাথে তিনি প্রায়ই মিলিয়ে দেখেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী ঐতিহাসিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের সাথেও মিলিয়েছেন। নিজের ইতিহাস-গবেষণার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদেরও। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য আমাদের কথিত ইতিহাসদৃষ্টির মূল প্রমাণ নয়। ইতিহাসের বয়ানে নৈর্ব্যক্তিকতার একটা আবরণ থাকে। থাকতে হয়। ঐতিহাসিক দেখেন খানিকটা দূর থেকে — নিরাসক্ত ভঙ্গিতে। বাঙালনামার পুরো বর্ণনাটা এই ভঙ্গিতে বলা। পুরো বইটাই মূল্যায়নমূলক। কিছু মূল্যায়ন আবার পাঠক-পাঠিকার বিবেচনার জন্য তুলে রাখা। আর মূল্যায়নটা যেন ‘আমার মনে হয়’ ধরনের না হয়ে দশের পাতে পরিবেশনের উপযোগী নৈর্ব্যক্তিক হয়, তার চেষ্টাটাও চোখে পড়ার মতো। একদিকে আত্মকথনের অন্তরঙ্গতা, অন্যদিকে ঐতিহাসিকের মেজাজ — দুয়ে মিলে ভঙ্গিটা খুব কাজের হয়েছে।

আত্মজীবনীকে মূল্যবান করে তুলবার জন্য তপন রায়চৌধুরীকে খুব একটা কায়কসরত করতে হয়েছে বলে মনে হয় না। নিজের ঊনতার কথা বলে যতই বিনয় দেখান না কেন, বাঙালি বা ভারতীয় পাঠকের জন্য আকর্ষণীয়-অবশ্যপাঠ্য এমনসব ঘটনা-ব্যক্তিসান্নিধ্য-কর্মক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনটি কেটেছে যে চাইলেও তিনি একে অনাকর্ষণীয় করতে পারতেন না। লেখার ভঙ্গি বেশি খারাপ হলে বড়জোর পাঠকের বিরাগভাজন হতেন; বর্ণিতব্য বিষয়ের মাহাত্ম্য তাহলেও অক্ষুণœ থাকত। এই বিষয়-মাহাত্ম্যের একটা অংশ সময়ের দান। ব্রিটিশ-ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে মুখরোচক সময়ে জন্মেছেন তিনি। কাজ করেছেন ভারত রাষ্ট্রের উন্মেষ-বিকাশের ঐতিহাসিক মুহূর্তের দুই কেন্দ্র কলকাতা আর দিল্লিতে। পরে বিলাতে দীর্ঘদিনের মার্জিত-অভিজাত জীবন। জীবনযাপন আর সান্নিধ্যের যে আভিজাত্যে তাঁর জীবন কেটেছে, তার অর্ধেকটা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, বাকিটা নিজের রোজগার। দুটিই ঈর্ষণীয় মাত্রায় উঁচু তানে বাঁধা। তাঁর জীবনকাল যে ইতিহাসের গুরুতর আকর্ষণ, ঐতিহাসিক হিসাবে সে বোধ তাঁর ষোল আনা ছিল। বলেছেনও: ‘বর্তমান রচনার প্রধান উদ্দেশ্য এক লুপ্ত যুগের স্মৃতি পরিবেশন করা, … ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের বাঙালি সমাজের সঙ্গে আমার দৃষ্টিতে আজকের যুগের সমাজের সবচেয়ে বড় তফাত প্রধানত এক বিষয়ে। সে সময় জীবনের নানা ক্ষেত্রে কিছু মানুষ দেখেছি — যাঁরা আদর্শনিষ্ঠায় চরিত্রগুণে অনন্যসাধারণ। …’  আবার জীবনের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার সৌজন্যে যে অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক আভিজাত্য তাঁর উচ্চারণে-রুচিতে জমে উঠেছে, সে সম্পর্কেও তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন। নিজের মত যথেষ্ট জোরের সাথে উচ্চারণ করেছেন; অন্যের যে মত অপছন্দের, তা জানাতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি। কিন্তু দুটিই করেছেন অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে। নিজের অবস্থানকে একবিন্দুও ক্ষুণœ না করে অন্যের জন্য যথাবিহিত পরিসর নিশ্চিত করা ব্যক্তির ঔদার্য আর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। সেই অবস্থানকে গদ্যে অনুবাদ করার সাফল্য বাঙালনামার দুর্লভ ঐশ্বর্য।

এই আরামদায়ক ‘সাধু’ গদ্যে লেখা প্রায় চারশ পৃষ্ঠার ভাষ্য থেকে যদি লেখকের মতাদর্শের হদিশ নিই, যদি দেখতে চাই জীবন-জগৎ সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি কী, তাহলে খুব বেগ পেতে হয় না। তিনি রাখঢাকহীনভাবেই একজন লিবারেল হিউম্যানিস্ট — শব্দটির আদি তাৎপর্যেই। ব্যক্তিটি ভারতীয়, আর কর্মসূত্রে বিশ্বনাগরিক — এ দুই তথ্য যোগ করলে সংজ্ঞাটিকে আরেকটু বিশেষায়িত করা হয় মাত্র।

ভদ্রলোক, ভদ্ররুচি এবং ভদ্র জীবনযাপনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই প্রকাশ পেয়েছে। এরকম জীবনই যে কাক্সিক্ষত তাতে তাঁর কোনো সন্দেহ নাই। বারবার তিনি মানুষের — বিশেষত ভদ্রসমাজের — রুচির ঊনতায় বিস্ময়সূচক বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বিপুল মানুষের জন্য এ ধরনের সুরুচির বন্দোবস্ত ঠিক কিভাবে হতে পারে, সে সম্পর্কে উদ্বেগ দেখাননি। কিংবা রুচির সঙ্কট বা খারাপ জীবনযাপন বদলানোর জন্য বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যেও যে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া উপায় থাকে না, সে প্রসঙ্গ পারতপক্ষে তোলেননি। একবার কেবল, শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে, উচ্চশিক্ষায় বাজেট কমিয়ে নি¤œস্তরে বেশি বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ধরনের প্রস্তাবও বাঙালনামায় যথেষ্ট বিরল। বলা যায়, তপন রায়চৌধুরী গভীরভাবে বিপ্লব বা সামাজিক পরিবর্তনের বিরোধী। প্রচলিত স্থিতির পক্ষেই তাঁর অবস্থান।

কিন্তু তিনি তো মানুষের কল্যাণ চান। তার উপায় কী? রায়চৌধুরীর কাছে উপায় খুব জটিল নয়। ক্ষমতাসীন বা উঁচু আসনের ব্যক্তিদের ঔদার্যই নানা প্রকারে সঞ্চারিত হবে নিচে। ক্রমশ ‘উন্নতি’ সঞ্চারিত হবে অধিকতর মানুষের মধ্যে। আদর্শ হিউম্যানিস্ট পদ্ধতি। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বিস্তর সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও গরিব মানুষদের কথা এ কেতাবে নাই বললেই চলে। বরিশালের সামাজিক পরিস্থিতির বর্ণনায় নাই, ভারত-সম্পর্কিত অসংখ্য মন্তব্যের মধ্যে নাই, এমনকি তাবত দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে যেখানে তাঁর জীবনদৃষ্টি প্রকাশিত হয়েছে, সেখানেও নাই। উৎপাদন-বণ্টন সম্পর্কিত জটিলতা অর্থনৈতিক ইতিহাসের এই ঝানু অধ্যাপকের চিন্তাজগতে প্রায় অধরাই থেকে গেছে।

তাঁর নিজের ইতিহাসদৃষ্টি আর অন্যদের মূল্যায়নেও সে সত্যের প্রবল প্রতাপ। ইতিহাস তাঁর কাছে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির সত্য নয়; বরং বিদ্যমান সত্যের পদ্ধতিমাফিক উদঘাটন। এ কারণেই উত্তর-আধুনিকতা, নারীবাদসহ সব ধরনের ক্রিটিকেল চিন্তা তাঁর বিরূপতার শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঠাট্টা করেছেন তিনি সাবলটার্ন স্কুল নিয়ে। এ স্কুল যে ভদ্রলোকদের বিষোদগারের একটা প্রক্রিয়ামাত্র, ঠাট্টাচ্ছলে হলেও, তিনি তা জানিয়ে দিতে ভোলেননি। কার্যকারণ সম্পর্ক তিনি নিজেও খোঁজেন। জানেন, ইতিহাসের প্রধান লক্ষ্য সেটাই। কিন্তু তাঁর কার্যকারণ একটা সীমিত গ-ির বাইরে যেতে চায় না। বাংলা বা ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বাঙালনামার উপনিবেশ-প্রসঙ্গ আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো ব্যাপার। কারণ, তাতে ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে দুনিয়াজুড়ে চালু প্রভাবশালী মতগুলোর একটির প্রতিফলন ঘটেছে। বর্তমান প্রসঙ্গে বলা যাক, উপনিবেশ-প্রসঙ্গ দৃশ্যত বইটিতে অসংখ্যবার এসেছে। যদি সবগুলো উল্লেখের কাজ-চলতি সারসংক্ষেপ করি, তাহলে বলতে হয়, অনেকগুলো ফলের কারণ হিসাবে তিনি ওই শাসনকে চিহ্নিত করেছেন। ভারতীয় ভদ্রসমাজের দৃষ্টি ও রুচির সংকীর্ণতা পুরো বাঙালনামায় লেখকের সবচেয়ে গুরুতর আক্ষেপের বিষয়। এ সংকীর্ণতার কারণ কী? এ প্রশ্নে তপন রায়চৌধুরী কালবিলম্ব না করে উত্তর দেবেন: উপনিবেশিত সমাজের অংশ হয়ে অতি হীনমন্য-দরিদ্র জীবনযাপনে বাধ্য হওয়াই এর কারণ। বস্তুত, এ বাক্য বইটিতে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে নীরদ সি. চৌধুরী সম্পর্কিত পৃষ্ঠা ছয়েকের (পৃ. ৩৬৮-৭৪) উল্লেখ করা যেতে পারে। নীরদ চৌধুরী সম্পর্কে এ এক অন্তর্ভেদী অবলোকন। তাঁর পা-িত্য এবং চারিত্রিক অসঙ্গতির দ্বৈত সত্য এখানে উদঘাটিত হয়েছে। কিন্তু নীরদবাবুর চারিত্রিক অসঙ্গতির উৎস কী? তপন রায়চৌধুরী নির্দ্বিধায় বলেছেন, ইংরেজশাসন। কিন্তু তাঁর এ পুনরাবৃত্ত উল্লেখ সম্ভবত খুব গভীর কোনো তাৎপর্য বহন করে না। কারণ, তাহলে এ বইতে অনেকবার এ কথাও উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল যে, যাঁদের বা যে শ্রেণির কথকতায় তাঁর আত্মভাষ্যটি এত মহিমাময় হয়ে উঠল, তাঁরা বা তাঁদের শ্রেণিটি ওই ইংরেজ শাসনেরই প্রত্যক্ষ ফল। অন্য কোনো প্রেক্ষাপটে এরচেয়ে ভালো বা খারাপ কিছু হতে পারত। কিন্তু কিছুতেই এরকম নয়।

ক্রিটিকেল দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আসলে তাঁর আত্মজীবনীর মূল প্রকল্পটিকেই সংশয়ে ফেলে দেয়। এ বই পাঠকের জন্য, আগেই বলেছি, অসংখ্য প্রাপ্তির উৎস। কিন্তু ভদ্রজনোচিত বিনয়বশত লেখক বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর জীবন নিজের কথা লিখে বলার মতো মূল্যবান নয়। একটা যুগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্যই তিনি লিখেছেন। এ যুগটির পরিচয় উদঘাটনে তিনি যথার্থই মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু একবারও প্রশ্ন তোলেননি, কোন পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের বিদ্যামুখী-সংস্কৃতিবান ব্যক্তিবর্গ পয়দা হতে পারল। কেনই বা পরবর্তী ভারতবর্ষ এ যুগ এতটা দ্রুত হারিয়ে ফেলল। বস্তুত, পদ্ধতিগত দিক থেকে এ প্রশ্ন তাঁর কাছে কোনো প্রশ্নই নয়। জমিদারি-সংক্রান্ত তাঁর যাবতীয় মন্তব্য সে কথারই সাক্ষ্য। জমিদারির ভগ্নদশা তিনি বর্ণনা করেছেন। উদ্বৃত্তভোগী অসংখ্য মানুষের মননশীল চর্চার উল্লেখও করেছেন। কিন্তু এ প্রথার সাথে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথাটা একবারও বলেননি। বাঙালি ভদ্রলোকদের পরবর্তী ইতিহাসে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দিকনির্ণায়ক ভূমিকা তাঁর তাবত আলোচনায় অনুল্লেখিত থেকে গেছে। অথচ, যে প্রশ্নগুলো তিনি উত্থাপন করেছেন, তার প্রায় প্রতিটির সাথে ওই ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। যদি ইউরোপের কোনো সময়খ-কে এ পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পদ্ধতিগত সঙ্কট অনেক কম হবে। কারণ, ইউরোপে সামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন বা সমরূপতা অর্জিত হয়েছে শতাব্দী-পরম্পরায়। কিন্তু উপনিবেশিত বাংলা বা ভারতবর্ষের পরিচয় দিতে গিয়ে কাঠামোগত রূপান্তরকে এত কম গুরুত্ব দিলে তাকে কেবল পদ্ধতিগত ভিন্নতা বলে চালানো মুশকিল; দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাই বলতে হবে।

কাঠামোগত প্রেক্ষাপটকে ন্যূনতম গুরুত্ব দিয়েছেন বলেই পুরো বইটিতে তাঁর মূল অবলম্বন হয়েছে ব্যক্তি। আলোকিত বা সফল ব্যক্তিবর্গ। এঁদের অনেকেই খ্যাতিতে-কীর্তিতে রীতিমত ঈর্ষণীয়। কিন্তু ব্যক্তি-বিবরণীতে কি কালকে ধরা যায়? ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তাঁর ভাবনাজগতে এতটাই একচ্ছত্র যে, অক্সব্রিজে নিওলিবারেল হাঙ্গামাকে তিনি অনায়াসেই ব্যাখ্যা করেন ‘মুদিনন্দিনী’ মার্গারেট থ্যাচারের ব্যক্তিগত কুকীর্তি দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অন্যায় হামলার দায় থেকে পশ্চিমা ভদ্রসমাজকে বেকসুর খালাস দিয়ে তিনি একক দোষ চাপান বুশের ঘাড়ে। আফগানিস্তানের তালিবান বা ভারতীয় হিন্দু জঙ্গিবাদের প্রতিটি উল্লেখের কালেই তিনি নিজ স্বভাবের বাইরে গিয়ে দেদার গালিগালাজ করেছেন। কিন্তু এই দুই গোষ্ঠীর কুলজি ঘাঁটার জন্য একটা বাক্যও ব্যয় করার দরকার বোধ করেননি। উদারনৈতিক মানবতাবাদীদের সরল কায়দাই বটে!

দৃষ্টিভঙ্গির এই অজটিল সারল্যের সাথে কি শ্রেণিভিত্তির কোনো সম্পর্ক আছে? তপন রায়চৌধুরী নিজে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির মানুষ। বিদ্যাজীবী হিসাবে দেশে-বিদেশে যে জীবন তিনি যাপন করেছেন, তা আর যাই হোক সা¤্রাজ্যবাদী প্রতাপশালী বিশ্বব্যবস্থার বিপরীত কিছু নয়। জাতীয়তাবাদী হিসাবে তিনি কংগ্রেসের সমর্থক আর নেহেরুর বিশেষ অনুরাগী। ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ তাঁবে বেড়ে ওঠা শ্রেণিটিই স্বাধীন ভারতের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই ব্রিটিশ আমলের চেয়ে স্বাধীন ভারতের নেহেরুর আমল যে অনেক ভালো — এ তথ্য প্রচারের একটা দায় যেন তিনি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এসব বাস্তবতা কি জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে অধিকতর ক্রিটিকেল হওয়া থেকে তাঁকে বিরত রেখেছে?

দেখা যাচ্ছে, লিবারেল হিউম্যানিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রকট সীমাবদ্ধতাগুলো বাঙালনামায় খালি চোখেই পড়া যায়। সুখের কথা, ওই দৃষ্টিভঙ্গির অর্জনগুলো থেকেও এ জীবনীগ্রন্থ মোটেই বঞ্চিত হয়নি। প্রথমেই বলতে হয় ভাষার কথা। এই ভাষা বইয়ের ভাষা, বইনির্ভর সংস্কৃতির ভাষা। বিপুল সংখ্যক পুস্তকবাহিত বাগধারায় শোভিত; কিন্তু বাকনির্ভর স্বরভঙ্গি মোটেই উপেক্ষিত হয়নি। তবে এককভাবে এ ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হাস্যরস। নির্মল হাস্য, ব্যঙ্গ আর বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসের অবারিত যুৎসই আমদানি বইটিকে যাবতীয় ভার থেকে রেহাই দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির যে অন্তরঙ্গ পরিচয় এ বইয়ে আছে, তার জুড়ি বোধকরি বাংলা ভাষায় কেবল সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাতেই মিলবে। ভোজন-রসিক হিসাবে তপন রায়চৌধুরীর খ্যাতি এ গ্রন্থে পূর্ণমাত্রায় রক্ষিত হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দুনিয়ার বিচিত্র খাবারের তুলনামূলক বিবরণ আর সেই বিবরণে প্রায়শই বাংলা মুল্লুকের উল্লেখ শেষ পর্যন্ত আর শুধু খাদ্যবিবরণীতেই সীমিত থাকেনি, রীতিমতো সংস্কৃতি-অধ্যয়নের তরিকায় উন্নীত হয়েছে। তৃতীয়ত, পর্যটন-উৎসাহী পাঠকের জন্য এ বই বিচিত্র তথ্যের আকর। এদিকটা সম্ভবত অ-তুলনীয় নয়; কিন্তু মূল্যায়নধর্মী মন্তব্যগুলো সমজদার ব্যক্তিত্বের চিহ্নবাহী।

সর্বোপরি, পুরো বইতে বিকীর্ণ হয়ে আছে বিচিত্র জনগোষ্ঠীর মনোজগতের চালচিত্র। আমরা জানি, পশ্চিমা লিবারেল হিউম্যানিজম তার ইউরোকেন্দ্রিকতার জন্য বিশেষভাবে নিন্দিত হয়ে থাকে। দুনিয়ার বড় অংশকে বাইরে রেখেই এই মতাদর্শের কারবারিরা মানুষ, মনুষ্যত্ব, মাহাত্ম্য আর রুচির নিরিখগুলো প্রজন্ম-পরম্পরায় গড়ে নিয়েছিল। ওই মতাদর্শের এক অপশ্চিমা খাতক হিসাবে তপন রায়চৌধুরী, আমরা আগেই দেখিয়েছি, ক্রিটিকেল দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ কোনো পরিচয় দেননি। কিন্তু ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসাবে নিজেদের সংস্কৃতির মূল্যায়নের পাশাপাশি পশ্চিমা সমাজগুলো সম্পর্কেও সজাগ থাকতে চেয়েছেন। সার্বিকভাবে বিশ্বমানবই তাঁর সীমা। কিন্তু বিশেষভাবে বিশেষ জনগোষ্ঠী কী কী আভ্যন্তর লক্ষণে বিশিষ্ট, তার বিস্তর নির্দেশনা বাঙালনামায় পাওয়া যায়। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই হয়ত তিনি নিজের গবেষক-জীবনের পরম লক্ষ্য হিসাবে বাঙালির মনোজাগতিক ইতিহাস লেখার কর্তব্য নির্ধারণ করেছিলেন।

সে কেতাব তাঁর আর লেখা হয়নি। তবে তার অংশ হিসাবে তিন কীর্তিমান বাঙালির ইউরোপ-বিবেচনার ফিরিস্তি লিখেছেন ইউরোপ রিকনসিডার্ড নামে। এখানে একটা শেষ প্রশ্ন তোলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এ বইয়ের নামের ‘বাঙাল’ অংশের কোনো গুণবাচক তাৎপর্য কি আছে? বইতে বেশ অনেকবার লেখক ‘বাঙাল’ বলে নিজের পরিচয় দিয়েছেন। রোমন্থনের মতো ব্যাপকভাবে না হলেও বরিশালি বাঙালভাষার ব্যবহারও যথেষ্ট আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘বাঙাল’ পরিচয়টা আলঙ্কারিকই থেকে গেছে। লক্ষণীয়, ‘আমি বাঙাল’ বা ‘বরিশাইল্যা বাঙাল’ বলে যে কবার তিনি রুখে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, তার প্রায় কোনোবারই ভেবে-রাখা কথাগুলো উচ্চারণ করেননি — মনে মনে বলেছেন মাত্র। কথাটার প্রতীকী মানে এই দাঁড়ায় যে, বাঙালসত্তার কোনো মটিফ যদি থেকেও থাকে, বাস্তবের তপন রায়চৌধুরীর মধ্যে তা প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হলে, সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে, তাঁর প্রতিষ্ঠায় বিঘœ ঘটত। তবে ‘বাঙালসত্তা’ বাড়তি উপাদান হিসাবে ফেলনা নয়। অন্তত রঙ্গরসের দিক থেকে। খুব অসচেতন পাঠেই ধরা পড়বে, বাঙালভাষা সর্বত্রই রঙ্গরসিকতার উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষার শিল্প-শোভনতার কথা বলা হচ্ছে না। সেদিকটা বাঙালনামায় অসাধারণ। কিন্তু বাঙালভাষা এ বইয়ের মূল গদ্যধারায় কোনো অন্তরঙ্গ ছাপ রাখেনি। আর সার্বিকভাবে পুব বাংলার বাঙালের জীবন আর সংস্কৃতির যে ইতিহাস, বাঙালনামার সাথে, মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন উল্লেখ সত্ত্বেও, তার প্রত্যক্ষ কোনো যোগ নাই। এ বই আদতে ‘বাঙালিনামা’ই। সব বাঙালি তার অন্তর্গত নয়। উনিশ শতকে কলকাতায় উদ্ভূত, বঙ্কিমচন্দ্র-কথিত বা নীরদ চৌধুরী-বন্দিত, নতুন বাঙালি এর বিষয়। বাংলার যে অংশেরই বাসিন্দা হোক না কেন, শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-বিত্তসূত্রে ওই জনগোষ্ঠী মিলেছিল কলকাতার ভূগোলে বা মানস-ভূগোলে; তারপর ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে বা সারা দুনিয়ায়। বাঙালনামা ঘোষিতভাবেই এই সফরের আংশিক আমলনামা।

[পুনর্মুদ্রিত]

হুমায়ুন আজাদ কোন অর্থে কতটা প্রথাবিরোধী?

হুমায়ুন আজাদ কোন অর্থে কতটা প্রথাবিরোধী?

মোহাম্মদ আজম

হুমায়ুন আজাদ প্রসঙ্গে ‘প্রথাবিরোধী’ কথাটা প্রচলিত হওয়ার একটা উৎস ছিল তাঁর বইয়ের ফ্ল্যাপ। ফ্ল্যাপের গদ্যভঙ্গি নির্ভুলভাবে সাক্ষ্য দেয়, কথাগুলো তাঁর নিজেরই লেখা। পরে নির্বাচিত প্রবন্ধ [আগামী, ১৯৯৯] বইয়ের ভূমিকায় তিনি বহুবার বলা কথাগুলো আরেকবার বলেন: ‘আমি প্রথাগত থাকি নি কোনো এলাকায়; বাঙালি প্রথায় সুখ ও স্বস্তি পায়, আমি পাই নি। আমার সব ধরনের লেখায়, এবং প্রবন্ধে, তার পরিচয় রয়েছে। … আমার লেখা নিয়ে নানা বিতর্ক বাধে, নিষিদ্ধও হয়; এগুলো সুখকর নয় প্রথার কাছে।’ এ ব্যাপারে সাধারণভাবে অন্যদের সম্মতি ছিল; অসম্মতিরও অভাব ছিল না। কিন্তু কেউ কোথাও পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘প্রথাবিরোধী’ কথাটার সুলুকসন্ধান করেনি। কথাটা কি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছিল, নাকি আজাদের ক্ষেত্রে এর কোনো বিশেষ সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে, তা কেউ বিচড়ে দেখেনি। দেখার দরকার ছিল। ‘প্রথা’ কথাটাকে যে অর্থেই দেখা হোক না কেন, তার যোগ অতীত আর বর্তমানের সাথে। সেদিক থেকে ‘প্রথাবিরোধিতা’ কথাটার যোগ হবে বর্তমান আর ভবিষ্যতের সাথে। যে কোনো ‘প্রথাবিরোধিতা’ আসলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘প্রথা’ মাত্র। সমাজপ্রগতির ধারাক্রমের সাথে এর যোগ। ফলে ব্যাপারটাকে, যদি সত্যিই এ নামায়নের কোনোরকম তাৎপর্য থেকে থাকে, ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদের মধ্যে সীমিত করে রাখার সুযোগ নাই। বৃহত্তর সমাজ বা অন্তত শ্রেণি-বিশেষের পর্যালোচনার অংশ হিসাবেই তা পাঠ্য।

কিন্তু এ ধরনের পাঠের কোনো ইশারা এখন পর্যন্ত খুব একটা দেখা যায়নি। আসলে আজাদের বইগুলোর প্রাথমিক ধরনের রিভিয়্যুই হয়নি। তাঁর জীবদ্দশায় রিভিয়্যু না হওয়ার একটা ছোট্ট কারণ ছিল। কেউ পারতপক্ষে তাঁর বিরাগভাজন হতে চাইতেন না। কারণ, তাঁর জিহ্বা আর কলমে যথেষ্ট ধার ছিল, আর ধারটা ছিল নির্মম। কিন্তু তিনি তো প্রভাবশালী লেখক ছিলেন। তাঁর লেখা যতই স্বতন্ত্র স্বরের হোক না কেন, তিনি তো স্বয়ম্ভু নন। তাঁরও ইতিহাস আছে, চিন্তার গতিপ্রবাহের মধ্যে তাঁর বিশেষ হয়ে ওঠার চিহ্ন আছে। এগুলোর তত্ত্বতালাশ সামাজিক গবেষণারই অংশ। ব্যক্তিভজনা আর ব্যক্তিনিন্দার বাইরের এ এক জরুরি কাজ। এ কাজটা যে হয়ে ওঠেনি তার কারণ ঢাকার সাংস্কৃতিক গরিবি। এখানকার পাঠপদ্ধতি ভারি পক্ষবিপক্ষনির্ভর। কী বলছেন তার তুলনায় কে বলছেন তা শনাক্ত করার প্রবণতাই এ সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য। ফলে পক্ষ খোঁজা এবং বাজারে জেঁকে বসা গালগল্প ও মিথে সওয়ার হওয়া সাধারণভাবে এখানকার মূল পাঠ-প্রবণতা। বর্তমান নিবন্ধের প্রধান লক্ষ্য গালগল্পের অন্তত একধাপ গভীরে গিয়ে আজাদের রচনাবলির সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন। তাঁর রচনাবলির মূল্যায়ন এ রচনার লক্ষ্য নয়, যদিও মূল্যায়নধর্মী কিছু মন্তব্যও আছে। সমাজ-সংস্কৃতি পাঠের অংশ হিসাবে ‘প্রথাবিরোধিতা’র জাতকুল বোঝার জন্য এখানে তাঁর রচনাবলির গুরুত্বপূর্ণ একাংশের সাহায্য নেয়া হয়েছে।

২.

সাহিত্য, বিশেষত কবিতা, এবং ভাষা — এ দুটি আজাদের মননশীল গদ্যের প্রধান এলাকা। শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ [ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৮] বইয়ের ভূমিকায় পাই এ ধরনের বর্ণনা: ‘ … আমার দুটি প্রধান প্রবণতা: কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ, ও ভাষার প্রতি আমার বিজ্ঞানমনস্ক আগ্রহ।’ তাঁর নির্বাচিত প্রবন্ধগুলোও ‘প্রধানত ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক’। অর্থাৎ এ দুই এলাকার পর্যালোচনা হুমায়ুন আজাদের প্রতিনিধিত্ব করবে।

সাহিত্যমাধ্যমগুলোর মধ্যে হুমায়ুন আজাদ প্রধানত কবিতা নিয়েই লিখেছেন। কবিতার তত্ত্বে তাঁর আগ্রহ ছিল এবং বিশ্লেষণ ও ইতিহাস-প্রণয়নেও। নাটক বা ছোটগল্প তাঁর বিশ্লেষণের বিষয় হয়নি। উপন্যাস নিয়ে লিখেছেন কম; ‘একুশের চেতনা ও তিন দশকের উপন্যাস’ বা ‘নারীদের নারীরা: নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি’ প্রভৃতি প্রবন্ধে পড়ার সুখ আর তীক্ষè মন্তব্য পাওয়া যায় বেশ। যদিও উপন্যাস-ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর তিনি নেননি কখনো। শিল্পকলার তুলনায় অন্যতর অনুসন্ধানই এসব রচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। লেখাগুলোতে একধরনের দ্রুততা আছে, যেনবা লেখার কালে বিস্তার-বিশ্লেষণের বদলে দ্রুত শেষ করার আকাক্সক্ষাটাই প্রবল ছিল। কবিতার ক্ষেত্রে এরকম দেখা যায় না। কবিতা-বিষয়ক অনেক রচনাতেই তিনি বিস্তারধর্মী। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ক্লান্তিহীন আর সংগৃহীত উপাদান বিশ্লেষণ করা বা গুছিয়ে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় রকমের ধৈর্যশীল। তাঁর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সমালোচনাধর্মী গ্রন্থ শামসুর রাহমান: নিঃসঙ্গ শেরপা [আগামী, ২০০৪ (১৯৮৩)] এর ভালো উদাহরণ।

এ বইতে একজন পরিশ্রমী গবেষক আর আবেগী-মননশীল কাব্যপাঠকের সম্মিলন ঘটেছে। বইটির কাব্যবিশ্লেষণপদ্ধতি সম্ভবত খুব প্রশংসনীয় নয়। কারণ, এখানে কবিতার শরীর আর মনকে আলাদা করে প্রায় আলগা উপাদান হিসাবে পড়া হয়েছে। আধুনিক কবিতা, বিশেষত তিরিশের কবিতা, বিশেষভাবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত থেকে কবিতার শরীর অধিক মূল্য পাওয়ার তাত্ত্বিক উসকানি দেখা যায়। বাংলাদেশের কাব্যসমালোচনায় এর ফল হয়েছে শোচনীয়। সৈয়দ আলী আহসান আর হাসান হাফিজুর রহমানের অসাধারণ সাফল্যের পরে, প্রধানত এই রোগের কারণেই বাংলাদেশে কাব্য-আলোচনার মানসম্মত ধারা গড়ে ওঠেনি। যাই হোক, এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আজাদের গ্রন্থটি মূল্যবান। এটি এত বিশদ আর পরিশ্রমসাপেক্ষ, ব্যক্তি-পাঠকের সাথে সমালোচকের যোগ এখানে এতই অন্তরঙ্গ, আর সিদ্ধান্তগুলো এত পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গদ্যে উপস্থাপিত যে, একে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বইটিতে আজাদ শামসুর রাহমানকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন তিরিশের, তাঁর ভাষায়, দেবদূতগণের বিশ্বস্ত সাগরেদ হিসাবে; একইসাথে রাহমানের বাস্তবলিপ্ততাকেও সসম্মানে আঁটিয়ে নিয়েছেন নিজের পাঠপদ্ধতির মধ্যে। এ দুটোই আসলে হুমায়ুন আজাদের কাব্যবিশ্লেষণের প্রধান ক্ষেত্র।

আজাদ মূলত আধুনিকতাবাদী সাহিত্যতত্ত্বের একাংশের খরিদ্দার। এ ব্যাপারে তাঁর সততা এবং চরিত্রবানতা প্রশ্নাতীত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় বিবর্তনহীনভাবে তিনি এ ধারার চর্চা করেছেন। শামসুর রাহমানকে নিয়ে লেখা বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন বুদ্ধদেব বসুকে। উৎসর্গপত্রে বুদ্ধদেব বসুকে অভিহিত করেছেন ‘বাংলা ভাষায় আধুনিকতার শিক্ষক’ হিসাবে। বুদ্ধদেব বসু সম্ভবত বাংলাভাষী অঞ্চলে চর্চিত সব ধরনের সাহিত্যিক আধুনিকতার শিক্ষক নন। তবে আজাদ যে আধুনিকতার চর্চা করেছেন, তার শিক্ষক তো বটেই। খুব গভীর অর্থে। সমাজ-রাজনীতিকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিবিশ্বের জটিল-গভীর ব্যাপকতা আবিষ্কারই বুদ্ধদেব বসুর কাছে কাব্য এবং কাব্যবিশ্লেষণের মূল ব্যাপার। নন্দনতাত্ত্বিক বাটখারা সেখানে বিশ্বজনীন। যে দেশ-কালে চর্চিত হচ্ছে কবিতা, তার ভূমিকা একেবারেই গৌণ। সে গৌণ ভূমিকাও আবার রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের নয়, খোদ সাহিত্যের ইতিহাসের। এ ধরনের নন্দনতত্ত্বের প্রতি আজাদের চরম পক্ষপাত ঘোষিত হয়েছে ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’, ‘মধ্যাহ্নের অলস গায়ক: রোমান্টিক বহিরস্থিত রবীন্দ্রনাথ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে। প্রাথমিকভাবে এসব প্রবন্ধে ঘোষিত বিশেষ মতের তীব্রতাকে বুদ্ধদেব বসুর তুলনামূলক প্রশস্ত নন্দনবোধের সাথে মিলহীন মনে হবে। কিন্তু আমরা যদি বসুর বদলেয়ার-অনুবাদের ভূমিকা-প্রবন্ধ কিংবা সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ বইয়ের ‘আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি’ প্রভৃতি প্রবন্ধ পর্যালোচনা করি, তাহলে দুইয়ের গভীর সাযুজ্য সম্পর্কে সংশয় থাকবে না।

হুমায়ুন আজাদ অবশ্য দেশকাললিপ্ত কাব্যধারা সম্পর্কেও বিস্তর লিখেছেন। ‘কবিতা ও রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের কবিতার প্রগতিশীল ও প্রগতিবিরোধী ধারা’, ‘ভাষা-আন্দোলন-পূর্ব (১৯৪৭-১৯৫২) কবিতার শৈল্পিক ও সামাজিক চারিত্র্য’, ‘ভাষা-আন্দোলন-পূর্ব (১৯৪৭-১৯৫২) বাঙলাদেশের সাহিত্যে বিধৃত সমাজের রূপ: বাঙালির স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ এবং সমধর্মী বই ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি [১৯৯২]-তে আজাদ লিপ্ত কাব্যধারার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। এগুলোর অধিকাংশই ব্যয়িত হয়েছে সংশ্লিষ্ট কাব্যধারাকে নাকচ করার কাজে; তবে প্রশংসাসূচক বাক্য বা অনুচ্ছেদও আছে। বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে একটা প্রতিষ্ঠিত মত এই যে, এ কবিতা যতটা অন্তর্চারী তারচেয়ে অনেক বেশি বহির্চারী; আর এ জনগোষ্ঠীর আন্দোলন-সংগ্রামমুখর বাস্তবতা এ কাব্যবৈশিষ্ট্যের উৎস। দেখা যাচ্ছে, আজাদ ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এ বাস্তবতায় সাড়া দিয়েছেন। ‘কবিতা কি ও কেনো’ প্রবন্ধে তিনি কবিতার জন্য রীতিমতো অনেকগুলো কাজ সাব্যস্ত করেছেন। যদিও এ প্রবন্ধে এবং অন্য অনেক জায়গায় তাঁর অস্বস্তি পরিষ্কার: বাস্তবের মোকাবেলা করতে গিয়ে ‘জীবন ও প্রতিভা ও কবিতা সবই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যদি সুস্থ জীবন পাওয়া যেতো, তাহলে আমাদের কবিতা অন্য ¯্রােতে বইতো; তা হয়তো হয়ে উঠতো স্তব বা গান বা লোকোত্তর শ্লোক’। এ জাতীয় আহাজারির ব্যাপকতা প্রমাণ করে তত্ত্বীয়ভাবে কবিতার বা সাহিত্যের এই দুই ভূমিকাকে তিনি সমন্বিত করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর এ জাতীয় রচনার — সাহিত্যকেন্দ্রিক ও অন্যবিধ —প্রাচুর্য প্রমাণ করে, নিজের অগোচরেই বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার মূলধারাটি তাঁর মানসপ্রবণতারই অংশ ছিল। শামসুর রাহমানের মধ্যে এ দুইয়ের দুর্দান্ত সমন্বয় দেখেছেন বলেই এতটা ঐকান্তিকতায় তিনি রাহমানের কবিতা পড়তে পেরেছিলেন।

খুব সংক্ষেপে উপরে হুমায়ুন আজাদের সাহিত্যবিষয়ক রচনাগুলোর নন্দনতাত্ত্বিক ঝোঁক বিশ্লেষিত হল। এগুলোর জাতকুলের আরেকপ্রস্ত হদিশে, বিশেষত প্রথা-প্রথাবিরোধিতার সাপেক্ষে, একটু পরে আসব। তার আগে তাঁর ভাষা-বিষয়ক রচনায় নজর দেয়া যাক।

অধ্যাপক আজাদের ভাষা-বিষয়ক রচনাবলির পরিমাণ অনেক। বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ বাদ দিয়ে শুধু বইগুলোর তালিকা এরূপ: চৎড়হড়সরহধষরুধঃরড়হ রহ ইবহমধষর [১৯৮৩], বাঙলা ভাষার শত্র“মিত্র [১৯৮৩], বাক্যতত্ত্ব [১৯৮৪], কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী [১৯৮৯]। শেষোক্ত বইটি কিশোরপাঠ্য হলেও আজাদকে বোঝার জন্য মূল্যবান। তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান [১৯৮৮] এবং অর্থবিজ্ঞান [১৯৯৯] নামের দুটি বই তিনি লিখেছেন মূলত ছাত্রপাঠ্য বই হিসাবে। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন বাঙলা ভাষা নামের দুই খণ্ডের [১৯৮৪, ১৯৮৫] জরুরি বই। এ বিপুলাকার বইতে বাংলা ভাষায় রচিত মূল্যবান ভাষাবিষয়ক প্রবন্ধগুলো সঙ্কলন করা ছাড়াও আজাদ বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাস লিখেছেন অন্তত শ-খানেক পৃষ্ঠায়।

আজাদ একজন প্রশিক্ষিত ভাষাবিজ্ঞানী। পিএইচ ডি গবেষণার অংশ হিসাবে তিনি চমস্কীয় ব্যাকরণের কাঠামোয় কাজ করেছেন। তাঁর ইংরেজি বইটি এবং বাক্যতত্ত্ব এ গবেষণার ফল। অন্যান্য রচনায় তিনি মূলত প্রথাগত ব্যাকরণের বাইরে এসে বর্ণনামূলক বা রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ধারায় বাংলাভাষা-ব্যাখ্যার পক্ষে প্রাজ্ঞ প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি বাংলা ব্যাকরণের প্রচলিত কাঠামোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিস্তর লিখেছেন। বস্তুত বাংলাদেশে ‘প্রথাগত ব্যাকরণ’ কথাটা এতটা প্রচলিত হয়েছে তাঁর লেখালেখি থেকেই। নতুন ব্যাকরণ লেখার একটা প্রস্তাবও তিনি দিয়েছিলেন; যদিও এ ধারায় নিজে অগ্রসর হননি। তাঁর নিজের গবেষণায় অবশ্য তিনি চমস্কীয় ব্যাকরণের একটা ধারাকে কাঠামো হিসাবে ব্যবহার করে বাংলা ভাষার অংশবিশেষ বিশ্লেষণ করেছেন। চমস্কীয় ব্যাকরণে কোনো দখল না থাকায় তাঁর বই দুটি সম্পর্কে কোনো মূল্যায়নধর্মী পর্যালোচনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়; এ লেখার জন্য তা জরুরিও নয়। কিন্তু পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যথেষ্ট আয়তনের বই দুটি সুশৃঙ্খল আর সুখপাঠ্য।

হুমায়ুন আজাদের ভাষাবিজ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই শৃঙ্খলা আর স্বচ্ছতা। মনোরম গদ্যে তিনি লিখেছেন, তথ্য-উপাত্তকে পদ্ধতিমাফিক সাজিয়েছেন এবং গদ্য আর গদ্যবাহিত ভাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছেন। সে এতটাই যে, তাঁর ভাষাবিষয়ক বিপুল রচনায় অস্বচ্ছ পরিভাষা আর সংজ্ঞার্থ ব্যবহৃত হয়নি বললেই চলে। তিনি নিজে যেসব পরিভাষা বানিয়েছেন সেগুলো তো স্পষ্ট বটেই, এমনকি প্রচলিত যেসব পরিভাষা ব্যবহার করেছেন সেগুলোর মধ্যেও হয় স্বচ্ছতা আমদানি করেছেন অথবা বেছে নিয়েছেন অপেক্ষাকৃত সরলটি। সুশৃঙ্খল ভাষা-আলোচনা আর ভাষা-বিশ্লেষক গদ্যের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে আজাদ অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে অনন্য। এ ব্যাপারে তাঁর সাথে তুলনা চলতে পারে কেবল রবীন্দ্রনাথের, যাঁকে তিনি যথার্থই বাংলা ভাষার বিশ শতকের প্রথমার্ধের প্রধান বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। বিষয়ের ওপর স্বচ্ছ দখলজনিত প্রত্যয় আর কায়ক্লেশহীন ভঙ্গি বাংলা ভাষাচর্চায় আজাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে মনে রাখা দরকার, বাংলা ভাষাবিশ্লেষণে তিনি সুনীতিকুমার, শহীদুল্লাহ্ বা আবদুল হাইয়ের মতো বড় অবদান রাখেননি। তিনি মূলত পরিচয়মূলক উপকারী ভাষ্য রচনা করেছেন। অন্যদের কাজের মূল্যবান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর নিজের প্রস্তাব-মোতাবেক বাংলা ভাষার বর্ণনামূলক ব্যাকরণের কোনো প্রকল্প যদি কখনো গৃহীত হয়, তাহলে বাক্যস্তরে তাঁর গবেষণা মূল্যবান গণ্য হওয়ার কথা।

৩.

সাহিত্য-সমালোচনায় আজাদ যেসব সংজ্ঞা ও প্রণালিপদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, কিংবা যেসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, সেগুলো কতটা প্রথাবিরোধী? সাহিত্যপাঠের নতুন কোনো প্রস্তাব কি তিনি পেশ করেছেন? এমন কোনো দৃষ্টিভঙ্গির হদিশ কি তাঁর রচনায় মেলে, যার স্পর্শে বদলে যাবে বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ইতিহাস বা ইতিহাসের একাংশ? তাঁর বিশ্লেষণে বা তত্ত্বের ছায়ায় কি কোনো গৌণ সাহিত্যিক মুখ্য হয়ে উঠেছেন, বা কোনো মুখ্য কবি গৌণ? খানিকটা বিস্ময়কর শোনাবে হয়ত, কিন্তু এ সবগুলো প্রশ্নের উত্তরই আসলে নেতিবাচক।

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সম্পর্কে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যেসব নতুন সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে, আজাদের লেখায় তার কোনো ইশারা পাওয়া যায় না। আসলে প্রাক-আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর নির্ভেজাল বিদ্বেষই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বরাবরই মেনে নিয়েছেন এই গল্প যে, উনিশ শতকের গোড়ায় বাংলা গদ্যের সূত্রপাত আর নতুন সাহিত্যরীতির আমদানির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয়েছে। উনিশ শতকের বঙ্গীয় ইতিহাসের এই সরলরৈখিক বয়ানের কোনো অংশ সম্পর্কে তিনি কোনো প্রশ্ন কখনো উত্থাপন করেননি। মনে রাখা দরকার, এ ধরনের ভিত-কাঁপানো প্রশ্ন অনেকেই তুলেছেন এবং সাহিত্যের পঠনপাঠনে নতুন আলো ফেলেছেন। তিনি মধুসূদন নিয়ে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার বিশালকায় সঙ্কলন করেছেন। কিন্তু তাঁর কাজে এই দুই মহারথী-সম্পর্কিত সিদ্ধরসের হেরফের ঘটেনি। ‘আধুনিক কবিতা’ ছিল তাঁর পক্ষপাতের প্রধান এলাকা। এলাকাটি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে তুমুল প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাঁর জন্মেরও অনেক আগে। বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে। আজাদের প্রজন্ম এ ব্যাপারে শুধু দ্বিধাহীনই ছিল না, ‘আধুনিকতা’র ধারণায় বিশ্রীভাবে আসক্তও ছিল। ফলে আধুনিকতা নিয়ে তাঁর লিপ্ততা মূল্যবান আর কার্যকর হতেও পারে, কিন্তু কিছুতেই প্রভাবশালী প্রথার ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশের সাহিত্য প্রসঙ্গে আজাদের লেখালেখির সারসংক্ষেপ করলে একই চিত্র পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের কবিতা চল্লিশের দশকে ছিল মুখ্যত ‘ইসলামি’ ওরফে পাকিস্তানবাদী; বায়ান্নের ভাষা-আন্দোলনের প্রভাবে ওই ধারা বদলে যায়, একাত্ম হয় আধুনিক বাংলা কবিতার মূলধারার সাথে; বাংলাদেশের কবিতা যতটা ব্যক্তিধর্মী তারচেয়ে অনেক বেশি সামষ্টিক — অতি-প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত এই ছকটি আজাদ বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করেছেন। তবে হ্যাঁ, পাকিস্তানবাদী কাব্যধারাকে নিপুণভাবে নাকাল করার জন্য তিনি বাড়তি বাহবা পেতে পারেন। এ ব্যাপারে তাঁর সামর্থ্যরে প্রশংসা করা যেতে পারে; কিন্তু এক্ষেত্রেও তাঁকে প্রথাবিরোধী বলা যাবে না। কারণ, কবিতার ওই পর্ব সম্পর্কে বাংলাদেশে একই ধারণা পোষণকারীর সংখ্যা এবং প্রভাব বিরোধীদের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের বেশি। তাহলে সাহিত্যের এলাকায় কোন সে প্রশ্ন যার খোঁজাখুঁজিতে বা প্রতিষ্ঠায় হুমায়ুন আজাদ নিঃসঙ্গ লড়াই করেছিলেন?

ভাষাচর্চার এলাকায়ও এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব সহজ নয়। বাংলা ভাষার উদ্ভব, বিবর্তন, বিকাশ ও সার্বিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে তিনি প্রায় নিঃশর্তে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন। এই সমর্থনটা ভালো কি খারাপ সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কথাটা হল, মতের এ ধারাই বাংলা ভাষা-বিবেচনার মূলধারা। ওডিবিএলের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল সংশয়হীন অনুরাগের। উদাহরণ হিসাবে বলছি, অপর ভাষা বইতে দেবেশ রায় এই মহাগ্রন্থের যে ধরনের ক্রিটিকেল পাঠ দিয়েছেন, তার তুল্য কোনো পাঠ হুমায়ুন আজাদ এ বই বা ভাষাকেন্দ্রিক অন্য কোনো বই সম্পর্কে কখনো দেননি। এমনকি ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ [১৯৩৯]-কে ‘সংস্কৃত-অনুসারী’ বা ‘প্রথাগত’ বলে চিহ্নিত করলেও এ-সম্পর্কিত কোনো বিশ্লেষণের দিকে তিনি যাননি। ‘প্রথাগত বাঙলা ব্যাকরণ ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ নামের প্রবন্ধে তিনি শহীদুল্লাহ্র ব্যাকরণটিকে রীতিমতো তুলোধুনো করেছেন। ওই ব্যাকরণ নিঃসন্দেহে কু-লিখিত; কিন্তু এর অন্যরকম তাৎপর্য আছে। যেসব কারণে প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ আজো লেখা হয় নাই বলে বিলাপ শোনা যায়, যে বিলাপের আজাদও একজন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার, শহীদুল্লাহ্র ব্যাকরণটি তার কারণ নয়। কিন্তু সুনীতিকুমারের বই — সুলিখিত এবং বিশদ বলেই — এর অন্যতম প্রধান কারণ। এ বইটি ওডিবিএলের মতো নয়; বরং মাত্রাতিরিক্ত রকমের সংস্কৃতানুসারী ব্যাকরণ। রবীন্দ্রনাথের রচনায় অন্যরকম ব্যাকরণের ইঙ্গিত আছে। শহীদুল্লাহ্র ব্যাকরণ সেই ইঙ্গিতের অক্ষম অনুসরণ হিসাবে আংশিক প্রশংসা পেতে পারত। আজাদ তাঁর জন্য সে প্রশংসা ধার্য করেন নাই।

কথাটা তোলার অন্য কারণ আছে। বাংলা ভাষার সবচেয়ে ‘প্রথাবিরোধী’ ভাষাতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তাঁর কালের প্রভাবশালী ভাষাদর্শনের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করেছিলেন। আক্ষরিক অর্থেই লড়াই। আজাদের লেখালেখিতে সে লড়াইয়ের সম্মানজনক স্বীকৃতি আছে। কিন্তু আজাদ কার্যত রবীন্দ্রনাথের বাংলা ভাষাচর্চাকে উপেক্ষা করেছেন। ওই প্রথাবিরোধীর মত-মর্জি — কার্যত — উপেক্ষা করে তিনি প্রচলিত-প্রভাবশালী মতেই নিষ্ঠাবান ছিলেন। এ প্রসঙ্গে আরো তিনটি উদাহরণ দেব।

প্রথমেই আসা যাক তাঁর নিজের গবেষণা সম্পর্কে। পশ্চিমে ডিগ্রিমূলক গবেষণার জন্য তিনি স্বভাবতই ওই সময়ের সবচেয়ে চালু আইটেম বেছে নিয়েছিলেন বা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমরা জানি, চমস্কি নিজের মত বারকয়েক বদলেছেন, এবং তাঁর অনুসারীরাও বিচিত্র মতে বিভক্ত হয়ে আগের জায়গায় কেউ আর থাকেননি। আজাদ কিন্তু পরের দশকগুলোতে নিষ্ঠাবান অনুসারীর মতো পুরানা মূলধারাটির চর্চা করে গেছেন। আশির দশক থেকে ভাষাবিজ্ঞানের মূলধারা যেসব বিচিত্র-জটিল পর্বের মধ্য দিয়ে গেছে, আজাদের সমকালীন লেখালেখিতে তার কোনো নিশানা পাওয়া যায় না। এখানে বাখতিন বা ভলশিনভের মতো প্রথাবিরোধীদের কথা বলা হচ্ছে না। এমনকি অনেক পরে লেখা অর্থবিজ্ঞান বইতেও আজাদ থেমেছেন যথেষ্ট আগে।

বাংলা ভাষা আর গদ্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে আজাদ বরাবরই সবচেয়ে প্রচলিত মতগুলো প্রচার করেছেন। ভাষা ও ব্যাকরণের সংস্কৃতায়নজনিত দুর্গতি সম্পর্কে বারবার লিখলেও নিজের সিদ্ধান্তগুলোতে কোনোভাবেই ভিন্নমত উত্থাপন করেননি। কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী [১৯৮৭] বইতে তিনি শুধু ওই মতগুলোর পুনরুৎপাদনই করেননি, আবেগে মথিতও হয়েছেন, যে আবেগ মতগুলোর সাথে ব্যক্তিগত যুক্ততা ছাড়া সম্ভব নয়। আসলে ভাষাবিজ্ঞানের জ্ঞান থেকে তিনি জানতেন উনিশ শতকের বাংলা গদ্য-ব্যাকরণ-অভিধানের চর্চা খুব স্বাভাবিক গতিতে এগোয়নি। কিন্তু বিশ্বাসের দিক থেকে ওই অস্বাভাবিক কায়দায় প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী ধারাই তাঁর সমর্থন পেয়ে গেছে। ‘বাঙলা গদ্যচর্চা ও বিদ্যাসাগর’ প্রবন্ধটি এর ভালো উদাহরণ। প্রবন্ধটি পরিচ্ছন্ন এবং সুখপাঠ্য। এর পদ্ধতিগত দিকটাও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ওই শতকের ভাষাচর্চার সাথে নিজের পরিচয় থেকে জানি [বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আজম, আদর্শ, ২০১৪], কী জটিল পরিস্থিতির সম্ভাব্য সরলতম ব্যাখ্যা আজাদ করেছেন। অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত-প্রচলিত মতটিকেই তিনি আরেকবার প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।

বাংলাদেশের মানভাষা নিয়ে হুমায়ুন আজাদের সিদ্ধান্তেও আমরা একই কিসিমের টানাপড়েন দেখব। তিনি মানভাষা সম্পর্কে জানেন, বাংলা মানভাষা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও জানেন। জানেন, বাংলাদেশের মানভাষা-সম্পর্কিত ধারণা এবং তৎপরতা মানভাষাতত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু তিনি প্রচলিতকেই মেনে নেন। ‘মান বাঙলা উচ্চারণ ও উচ্চারণ অভিধান’ প্রবন্ধে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান [১৯৮৮] গ্রন্থের পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি মৃদু আপত্তিসহ কলকাত্তাই উচ্চারণকে ঢাকার মান উচ্চারণ বলে মেনে নেন। এর কারণ হিসাবে তিনি ভাষাবিজ্ঞানসম্মত নয় এমন এক যুক্তি উদ্ভাবন করেন: ‘মান বাঙলা উচ্চারণ হচ্ছে শিক্ষিত, সুরুচিসম্পন্ন, সংস্কৃতিপরায়ণ বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্চারণ। বাঙলাদেশে এ-শ্রেণীটির বিশেষ বিকাশ ঘটে নি।’ পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে কোনো মূল্যায়নমূলক পর্যালোচনায় যাচ্ছি না। শুধু বলে রাখি, এ মতই ঢাকার প্রথানুগ মত।

হুমায়ুন আজাদের ভাষা-বিষয়ক রচনাদি প্রায় নিঃশেষে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতেই হয়: আজাদ ভাষাচর্চায় প্রথাবিরোধী তো ছিলেনই না, বরং ছিলেন সবচেয়ে প্রচলিত-প্রথাগত মতের সমর্থক-পৃষ্ঠপোষক।

৪.

প্রশ্ন হল, তাহলে তাঁকে ‘প্রথাবিরোধী’ মনে হয় কেন? তারচেয়ে জরুরি কথা: এই প্রথাবিরোধিতার স্বরূপ কী? চারটি পর্যায়ে এ স্বরূপ বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

প্রথমত, হুমায়ুন আজাদ উচ্চারণে চরমপন্থি ছিলেন। অতিশয়োক্তি তাঁর উচ্চারণের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পক্ষপাত বা বিরোধ — কোনো ক্ষেত্রেই সাধারণত তিনি সুপারলেটিভ ডিগ্রির নিচে নামতেন না। তিনি প্রবাদের মতো বাক্য বা বাক্যাংশ তৈরি করতে পারতেন। অনায়াসেই এমন ‘ট্যাগ’ বা ‘লেবেল’ লাগাতে পারতেন, ব্যক্তি বা বিষয়কে এমন বিশেষণে বিশেষায়িত করতে পারতেন যে, কথাটাতে অনেক বেশি আলাদা মনে হত। জনৈক নজরুল-গবেষক সম্পর্কে তাঁর ‘নজরুল-মাজারের খাদেম’ বিশেষণটি বেশ বাজার পেয়েছিল। বৈশিষ্ট্যটি তাঁর কবিত্বশক্তির নির্ভুল সাক্ষ্য। প্রবচনগুচ্ছ [১৯৯২] তাঁর এসব বৈশিষ্ট্যের নির্ভরযোগ্য দলিল। তাঁর এ গুণ নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় এবং ঈর্ষণীয়। কিন্তু এগুলো প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মন্তব্য মাত্র, বড়জোর মত; মোটেই এমন কোনো বিশ্লেষণজাত সিদ্ধান্ত নয় যা প্রচলকে শনাক্ত করে অপ্রচলকে প্রতিষ্ঠা দেয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক।

আশি-নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসের রমরমা বাজার গেছে। ‘সিরিয়াস’ সাহিত্যের উৎপাদক-ভোক্তাদের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তির সীমা ছিল না। এ সাহিত্য পাঠের বা বর্জনের কোনো তরিকা কেউ বাতলাতে পারেনি; কিন্তু অসন্তোষটা পুরামাত্রায় ছিল। এমতাবস্থায় আজাদ এগিয়ে এলেন। তিনি জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসকে অভিহিত করলেন ‘অপন্যাস’ নামে। আর এগুলোর জনপ্রিয়তার উৎসকে চিহ্নিত করলেন এভাবে: ‘মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে রয়েছে এক দূরারোগ্য দাদ, যা চুলকোলে পাওয়া যায় বিশেষ আনন্দ। ওই দাদটির নাম ‘সুখদুঃখ’।’ আমি এখানে ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করলাম। একই কথা তিনি বহুবার বহুভাবে বলেছেন। কথা দুটি জনপ্রিয়ও হয়েছিল খুব। আজাদ এখানে দুটি ‘লেবেলিং’ করেছেন। দুটিই জুতসই, সহজে উচ্চারণযোগ্য এবং অর্থবহ। এ উচ্চারণ — আর কেউ এরকম বলে নাই বা বলে না যেহেতু — তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করল। কিন্তু এক পর্দা গভীরে ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম।

আজাদ নিজেও জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। জনপ্রিয় ধারার নানামাত্রিক চর্চায়ও শামিল ছিলেন। এ কারণেই কেউ কেউ তাঁর মন্তব্যকে ঈর্ষাপ্রসূত বলেছেন। এটা সত্য হতেও পারে। আমরা প্রসঙ্গটিকে তাঁর অসংখ্য মত-মন্তব্যের প্রতিনিধি হিসাবে পড়ছি বলে এ ব্যাখ্যা আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গে যথেষ্ট নয়। আজাদের মন্তব্য বিশ্লেষণমূলক নয়। জনপ্রিয় সাহিত্যের বিশ্লেষণ নন্দনতাত্ত্বিক-সমাজতাত্ত্বিক-মনস্তাত্ত্বিক নানা পাঠের মূল্যবান আধার। সারা দুনিয়াতেই। আজাদ সেদিকে যাননি। তিনি বাতিল করার সূত্রও প্রস্তাব করেননি। কিন্তু বাতিলমূলক মন্তব্য করেছেন। তাঁর মন্তব্য ওই ধারার রচনা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সত্য প্রকাশ করে না। হুমায়ূন-মিলন-সাবের তাঁর মন্তব্যের লক্ষ্য। এঁদের প্রত্যেকেরই ‘সিরিয়াস’ সাহিত্য হিসাবে পাঠের মতো রচনা যথেষ্ট আছে। রচনারীতির কারণে বা ঝাঁকের কই হিসাবে সেগুলোও জনপ্রিয় হয়েছে। ‘অপন্যাস’ বা ‘সুখদুঃখ’ লেবেল দিয়ে তাঁদের ‘ভালো’ রচনাগুলো ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে আমাদের জন্য জরুরি কথাটা হল, এই দুই সংজ্ঞায় আজাদ আসলে প্রচলিত ধারণার বাইরে কিছুই বলেননি। বিরোধীরা তো বটেই, এমনকি অনুরাগীরাও হুমায়ূন আহমেদের রচনা নন্দনতাত্ত্বিক উৎকর্ষের জায়গা থেকে পড়েন না। মৃত্যুর পরেও প্রতি বছর দেখছি, হুমায়ূন আহমেদের অনুরাগীর দল একই গীত গেয়ে যাচ্ছেন — তিনি পাঠক পয়দা করেছেন, তিনি প্রকাশনা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, তিনি কলকাতা থেকে পাঠকের কেবলা ঢাকার দিকে ফিরিয়েছেন ইত্যাদি। সেই একই কাসুন্দি। প্রবল হুমায়ূন-বিরোধীরাও এসব ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করবেন না। নন্দনতাত্ত্বিক বাটখারায় হুমায়ূন আহমেদকে মাপা বা অন্যতর নন্দনের আকাক্সক্ষাটা দুই পক্ষেই গরহাজির। হুমায়ুন আজাদ তাহলে এই বিপুল মানুষের অস্ফুট-অর্ধস্ফুট কথাকে জুতসই নামে চিহ্নিত করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ কাজ, সন্দেহ নাই; কিন্তু কোনো অর্থেই অপ্রচলের আবাহন নয়। বলতে পারি, হুমায়ুন আজাদের এ ধরনের বহু মত-মন্তব্য আসলে অতি প্রচলিত ভাবকে অপ্রচলিত কথায় উপস্থাপন করতে পারার সামর্থ্য।

দ্বিতীয়ত, সব সমাজেই চিন্তা ও মতাদর্শিক জায়গায় অনেক ধূসর এলাকা থাকে। সংশ্লিষ্টরা হয়ত পক্ষ নেন, কিন্তু বিপরীত দিকেও যথেষ্ট যুক্তি-প্রমাণ হাজির থাকায় জোরালো অবস্থান নেন না। অনেকেই মধ্যবর্তী মতে নিষ্ঠ থাকেন। এ ধরনের বহু এলাকায় আজাদ জোরালোভাবে পক্ষ নিয়েছেন এবং ততোধিক জোরালো ভঙ্গিতে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর এসব মত জোরালো ভিন্নমতের মতো শোনায়। আমি এখানে ভাষা ও সাহিত্যের এলাকা থেকে এরকম দুটো উদাহরণ দেব।

মান বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ কী অনুপাতে ব্যবহৃত হবে সে বিতর্ক হ্যালহেডের আমল থেকে আজ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক স্তরের এক প্রধান বিবেচ্য। আমরা জানি, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানবাদী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলায় এ ধরনের শব্দের আরোপণমূলক ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়েছিল। পরে ভাষা-আন্দোলন আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের সমান্তরালে সেই আরোপণ হ্রাস পায়। কিন্তু লেখ্য-বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ থাকবে কি থাকবে না, সে সিদ্ধান্ত চট করে নেয়া সহজ নয়। ঢাকার প্রভাবশালী মত ও চর্চা না থাকার দিকেই; যদিও তত্ত্বীয়ভাবে তা প্রতীয়মান করা বেশ কঠিন। কারণ, ওডিবিএলের [সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯২৬] হিসাবে মান কথ্যবাংলায় এ ধরনের শব্দের পরিমাণ অন্তত আট শতাংশ। আর সৈয়দ মুজতবা আলী বা শওকত ওসমানের মতো খাঁটি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ লেখকদের লেখায় অথবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র মতো খাঁটি ‘আধুনিক’ লেখকদের লেখায় এ ধরনের শব্দের ব্যবহার এত বেশি যে, অনেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। আজাদ কিন্তু কোনো প্রকার দ্বিধা না রেখেই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; আর আরবি-ফারসিমূল শব্দের ব্যবহার ও পরিহারকে সাব্যস্ত করেছেন যথাক্রমে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিশীলতা হিসাবে। তাঁর সিদ্ধান্ত ভাষাতত্ত্বসম্মত নয়; বাংলা ভাষার ইতিহাসসম্মত নয়; এমনকি সমকালীন বাংলা ভাষার গতিপ্রকৃতিসম্মতও নয়। তা সত্ত্বেও, আগেই বলেছি, এটাই ঢাকার — কলকাতার নয় — প্রধান মত। আজাদ একরোখাভাবে সে মত উচ্চারণ করার ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীর সম্মান পেয়েছেন।

অন্য উদাহরণটি নেব তাঁর নজরুল-বিবেচনা থেকে। তিনি প্রায়ই বলতেন, নজরুল এক মহাপদ্যকার। শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেভাবে নিজের কবিতাকে আদুরে ভঙ্গিতে ‘পদ্য’ বলতেন, সে অর্থে আজাদের এ বিবেচনাকে প্রশংসা হিসাবে নেয়া যায়। কিন্তু তা হবার নয়। ‘কবিতা’ এবং ‘পদ্য’কে সুস্পষ্ট বিপরীতার্থক শব্দজোড় ধরে নিয়ে তিনি মন্তব্যটি করতেন। এখানে ‘পদ্য’ নি¤œশ্রেণির সৃষ্টি। তার মানে নজরুল কবি হিসাবে গৌণ। এটা আমাদের সমাজের প্রভাবশালী মত নয়। কিন্তু নজরুল সম্পর্কে প্রভাবশালী মত কি খুব স্পষ্ট? অন্তত অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে? আমি অন্যত্র, ‘‘আধুনিক’ বাংলা কাব্যধারায় নজরুলের স্থান বিচার’ [সাহিত্য পত্রিকা, সংখ্যা ২-৩, জুন ২০১৩] প্রবন্ধে দেখিয়েছি: বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী নন্দনতাত্ত্বিক বাটখারায় নজরুল পড়া যায় না; পড়লে তাঁর স্থান গৌণ হতে বাধ্য। হয়েছেও তাই। বাংলা সাহিত্যের স্বীকৃত ইতিহাসগুলোতে নজরুল কার্যত গৌণভাবেই স্থান পেয়েছেন। তাঁদের ওই বিচার ঠিক নয়। আর আজাদের মত-মন্তব্য তো ঠিক-ভুলের পাল্লায় আসবে না। কারণ, তিনি মন্তব্য করেছেন মাত্র; মত প্রতিষ্ঠার জন্য কাগজ-কালি খরচ করেননি। তবুও তাঁর মতটি মূল্যবান। কেন মূল্যবান তা বোঝার জন্য নীরদচন্দ্র চৌধুরীর উদাহরণ দেব।

নীরদ চৌধুরী বলতেন, তিনি একইসাথে বাঙালি ও ইংরেজ। বলতেন, উনিশ শতকের নতুন বাঙালি আসলে ইংরেজি¯œাত হিন্দু। তাঁর এই দুই মত ঠিক নয়। কারণ এতে অত্যন্ত জটিল একটা পরিচয়কে খুব সরল করে আনা হয়েছে। কিন্তু এ মত অত্যন্ত মূল্যবান। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস এবং উনিশ শতকের যাবতীয় মহাবয়ান খুব বিশদভাবে দেখায় যে, এ ইতিহাস ইংরেজ সাহচর্যে উদ্ভূত উচ্চবর্ণ-হিন্দুর ইতিহাস। কিন্তু কথাটা রয়েসয়ে বলা হয়। ঢেকেঢুকে বলা হয়। তাতে অনেক সময়েই সত্যের নি¤œতম সহনীয় মাত্রায়ও টান পড়ে। নীরদ চৌধুরীর প্রভাবশালী রচনায় খোলামেলা এসব উচ্চারণ সহসা আঘাতে আমাদের সচকিত করে। ভদ্রতার পেলব মুখোশে প্রচণ্ড আঘাত করে। তাঁর মতেই যে আমরা নিষ্ঠ হই তা নয়। কিন্তু তাঁর মত আমাদের নিজেদের মতের ব্যাপারে সচেতন করে। হুমায়ুন আজাদের বহু উচ্চারণ সম্পর্কেও একথা প্রযোজ্য। আজাদ হয়ত খেয়াল করেননি যে, নজরুল-সম্পর্কিত তাঁর শনাক্তি কবিতার বৈচিত্র্য নস্যাৎ করে তাঁর বহু সাধের কাব্যলোককে বড্ড একরৈখিক করে ফেলছে। বড্ড সংকীর্ণ করে ফেলছে। হয়ত খেয়াল করেননি, যে অভিযোগ তিনি নজরুলের বিরুদ্ধে তুলেছেন, তা ভিন্ন অর্থে তাঁর নিজের কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানমুখর শ্লোগানধর্মী লিপ্ত কবিতার যে ধারা নজরুলে তুমুল প্রতিষ্ঠা পেয়ে চল্লিশের কবিতা আর শামসুর রাহমান হয়ে হুমায়ুন আজাদ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা সম্পর্কে আজাদ হয়ত খুব একটা হুঁশিয়ার ছিলেন না। কিন্তু তাঁর কাঁচা নজরুল-বন্দনা আমাদের গোঁজামিলের সংস্কৃতিকে দারুণভাবে আঘাত করতে পারে, নজরুলের কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক খোঁজাখুঁজিতে উৎসাহিত করতে পারে, যদি অবশ্য আমরা সতর্ক হই।

তৃতীয়ত, তত্ত্বায়ন ও তত্ত্ব-প্রয়োগের দিক থেকে আজাদ অতিমাত্রায় সরল হতে পেরেছেন। তাঁর তত্ত্ব ব্যতিক্রমহীনভাবে পশ্চিমা। এটা তাঁর নির্বাচন নয়; বরং তিনি মনে করতেন, পশ্চিমই কেবল এ বস্তুর উৎপাদক হতে পারে। অন্যদিকে তত্ত্বের প্রায়োগিকতার দিক থেকে তিনি বিশ্বজনীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। এই যে পৃথিবীর এক প্রান্তে তত্ত্বের উৎপাদন আর অন্য প্রান্তে ভোগ — এ দুয়ের কোনো ক্ষেত্রেই তিনি পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে গুরুতর বিবেচ্য মনে করতেন না। এ দৃষ্টিভঙ্গি লিবারেল হিউম্যানিস্টের। এ প্রকল্প পশ্চিমা আধুনিকতার ক্লাসিক পর্বের। কিন্তু আজাদ পশ্চিমা আধুনিকতার ওই ক্লাসিকেল ঘরানারও ভোক্তা ছিলেন না। বরং বিশ শতকের গোড়ায় প্রধানত শিল্পকলায় যে নতুন আধুনিকতার বিকাশ ঘটেছিল, তিনি ছিলেন তারই একাংশের নিষ্ঠাবান খাতক। এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদ, এবং শিল্পকলাসহ যাবতীয় মানসিক-মাননিক উৎপাদনকে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত করে দেখা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ বৈশিষ্ট্যগুলো আজাদের মধ্যে কোনো না কোনো আকারে পাওয়া যাবে। বস্তুত এটা তাঁর গভীর বিশ্বাসের মতো ছিল। ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ প্রবন্ধ এবং কবিতার আধুনিকতা-সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলো তার প্রমাণ। আজাদের ঘোর কর্মময়তার কালে দুনিয়ার তত্ত্বের বাজার আমূল বদলে গিয়েছিল। উত্তর-আধুনিকতা আর উত্তর উপনিবেশবাদ তত্ত্ব-সম্পর্কিত পুরানা সিদ্ধান্তগুলোকে প্রায় সর্বাংশে নাকাল করেছিল। আজাদ কিন্তু এগুলো দ্বারা সামান্য পরিমাণেও আলোড়িত হননি। তিনি দ্বিধাহীনভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁর পুরানা সিদ্ধান্ত।

এই যে তিনি পশ্চিম থেকে তত্ত্ব ধার করছেন আর তত্ত্বের উৎপাদন-প্রয়োগ স্তর সম্পর্কে কোনোরূপ প্রশ্ন না তুলেই সেগুলো বেশ ইমানের সাথে ব্যবহার করছেন প্রাদেশিক বাংলায়, এটা তাঁকে ভিন্নরকম মনে হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তত্ত্বের বাজার অস্থিতিশীল, কিন্তু তিনি ঈর্ষণীয় মাত্রায় স্থিতিশীল। ওই স্থিতিশীল চোখ দিয়ে খোদ তত্ত্ব আর প্রণালিপদ্ধতিকে কোনোরূপ প্রশ্ন না করে তিনি এ গরিব বঙ্গে — বিশেষত বাংলাদেশে — সেগুলো হুবহু খাটাতে চেয়েছেন। ফলে আরোপিত তত্ত্ব আর যার উপর আরোপিত হচ্ছে, এ দুইয়ে সামঞ্জস্য ঘটেনি। অসামঞ্জস্যটাকেই তিনি প্রকাশ করেছেন সিদ্ধান্ত হিসাবে। তাই তাঁর সিদ্ধান্তটা অপ্রচলিতের মতো মনে হয়েছে। চিন্তার এই ধরনের জন্যই আগে থেকে ধরে নেয়া বর্গ, সংজ্ঞা বা ‘লেবেলে’র আওতায় তিনি সবকিছু পড়তে চেয়েছেন। সংজ্ঞা বা ‘লেবেল’টা যে তিনি নিজে তৈরি করতেন তা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো পশ্চিম থেকে সরলভাবে ধার করা, বা পশ্চিমাগত ধারণার কলকাত্তাই চর্চা থেকে ধার করা। তাঁর সমগ্র রচনায় ‘আধুনিক’ শব্দটির ব্যবহার এর ভালো উদাহরণ। এটি বস্তুত তাঁর রচনাবলির প্রধান চাবিশব্দ। কিন্তু শব্দটির পর্যালোচনামূলক সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তা তিনি সারাজীবনে একবারও বোধ করেননি। কোথাও কোথাও পশ্চিমা সংজ্ঞাটির সীমিত পরিচয় দিয়েছেন মাত্র। তিনি একে প্রদত্ত বা প্রাপ্ত হিসাবেই ব্যবহার করেছেন। সে এতটাই যে, এমনকি কলকাতার বাংলা কবিতার আধুনিকতা সম্পর্কেও তাঁর কোনো ধরনের সংশয় কখনো জাগেনি। তিরিশের কবিদের সম্পর্কে তাঁর উপভোগমূলক আবেগি বয়ান পাওয়া যায় বিস্তর; কিন্তু বাংলা কবিতার ওই গুরুত্বপূর্ণ স্তর সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী কোনো প্রবন্ধ পাওয়া যায় না। এটি তাঁর বিশ্লেষণের এলাকা নয়, বরং মান-নির্ধারণের ক্ষেত্র; যার নিরিখে তিনি পড়বেন শামসুর রাহমান; প্রশংসা করবেন কোনো কোনো লেখার, আর বাতিল করবেন অন্য অনেকগুলোকে।

এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সীমাবদ্ধতার সূত্রে’। এ প্রবন্ধের মূল সিদ্ধান্তটি বহুলপ্রচলিত। তা এই: আধুনিক বাংলা সাহিত্য পশ্চিমের দান। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি মাত্রাতিরিক্ত সারল্যের আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে এ প্রবন্ধে এবং ‘মধ্যাহ্নের অলস গায়ক: রোম্যানটিক বহিরস্থিত রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে তিনি একটিমাত্র সংজ্ঞার নিরিখে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংজ্ঞাটি হল: ‘রোম্যানটিক’। শব্দটি যে সংকীর্ণ নির্দিষ্টতায় তিনি ব্যবহার করেছেন, তা মোটেই ‘পশ্চিমা’ চর্চার বিপুল তাৎপর্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। আবার যাঁর ক্ষেত্রে এটি প্রযুক্ত হল, তাঁর সৃষ্টিশীলতার জটিলতাকেও স্পর্শ করে না। তিনি কিন্তু একরোখা ভঙ্গিতে ওই হ্রাসকৃত ‘রোমান্টিক’ সংজ্ঞাটিকেই পশ্চিমা সংজ্ঞা হিসাবে ধ্র“বজ্ঞান করেছেন, রবীন্দ্রনাথের ওপর তা আরোপ করেছেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত ‘প্রথাবিরোধী’ হল।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, ‘পশ্চিম’ কখনোই হুমায়ুন আজাদের ক্রিটিকেল দৃষ্টিভঙ্গির ‘বিষয়’ হয়নি। এমনকি খুব গভীর অর্থে কলকাত্তাই আধুনিকতাও নয়। তাঁর সমগ্র লেখালেখিতে এ সংবাদ একেবারেই পাওয়া যায় না যে, উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা অঞ্চল দুনিয়ার সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত এবং সফল ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্র ছিল। পশ্চিমা আধুনিকতার সা¤্রাজ্যবাদী প্রকল্প আর কলকাত্তাই আধুনিকতার ঔপনিবেশিক খাসলত নিজেরাই নানা প্রান্তে তৈরি করেছিল অসংখ্য নিষ্ঠাবান অনুসারী আর অজ¯্র প্রথা। এই প্রথার সজ্ঞান-অজ্ঞান অনুসরণ সম্পর্কে আজাদ সজাগ ছিলেন বলে প্রমাণ মেলে না।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজবিকাশের ইতিহাস খুব একটা ধারাবাহিক নয়। শিক্ষিত হয়ে ওঠার আগেই রাজনৈতিক কোটায় চাকরি-বাকরির সুবিধা পাওয়া, খুব কম সময়ের মধ্যে যথাক্রমে ‘আজাদি’ আর স্বাধীনতার সুযোগে রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠা, ইংরেজি শিক্ষা ও দেদার অভিবাসনের মধ্য দিয়ে দেশচ্যুত হওয়া এই মধ্যবিত্তের এক শতকের ইতিহাস। যে ধরনের থিতু স্তরবিন্যাসের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম-পরম্পরায় পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যবিত্ত-সমাজ গঠিত হতে আমরা দেখেছি, এমনকি ভিন্ন অর্থে পশ্চিম বাংলারও, বাংলাদেশে তা হয়নি। এখানে সামাজিক স্তরবিন্যাসে বিশৃঙ্খলা প্রবল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং দুর্নীতির অবাধ প্রশ্রয়ে দ্রুত টাকা কামানোর সুুযোগ থাকায় গড়ে প্রায় প্রতি দশকেই পূর্বতন কাঠামোও বদলে যায়। ফলে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবশালী ডিসকোর্সে বিশৃঙ্খলা বিস্তর। যেসব আদব, প্রথা আর রাজনৈতিক-সামাজিক মতাদর্শে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষিত হয়, সেগুলো এখানে ভীষণ চঞ্চল। অ্যাকাডেমিক চর্চার ঐতিহ্য তৈরি না হওয়া এর একইসাথে কারণ ও ফল। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র জ্ঞানভিত্তিক নয় — এই বহুপ্রচলিত কথাটাকে এ গভীর অর্থেই পড়া দরকার। স্বভাবতই এখানে মিথের প্রবল প্রতাপ। অপরীক্ষিত ধারণা আর সিদ্ধান্তের নিরঙ্কুশ রাজত্ব। এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যক্তির সাহস, ব্যক্তিত্ব আর প্রগতিশীলতার জন্য মোটেই অনুকূল নয়।

একই কারণে আমাদের রাষ্ট্র থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম সংগঠন পর্যন্ত সর্বত্র নৈর্ব্যক্তিকতার বড় অভাব। কাঠামোগত নৈর্ব্যক্তিকতার মধ্যে ব্যক্তির নিয়মানুগ স্বাধীন আচরণের সুযোগ এখানে খুবই সীমিত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক জিয়া হায়দার রহমান বাংলাদেশ সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী তাঁর একাধিক লেখা-বক্তৃতা-সাক্ষাৎকারে প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। বলেছেন, বাংলাদেশে কাজ করতে হয় প্রবলপ্রতাপ বসের অধীনে। অর্থাৎ ব্যক্তির অধীনে কাজ করে ব্যক্তি। ব্যক্তির কর্মক্ষমতা আর সৃষ্টিশীলতা নষ্ট করার জন্য এ পরিস্থিতি খুবই কার্যকর। এ অবস্থা ব্যক্তিকে নতজানু করে; নিজের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবসময় সংশয়গ্রস্ত রাখে; নিজের উপলব্ধি স্পষ্টভাবে প্রকাশের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

তাহলে একদিকে জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তের বদলে মিথ ও বিশ্বাসধর্মী সিদ্ধান্তের প্রবলতা, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক নৈর্ব্যক্তিকতার অভাব — এ দুটি আমাদের গোজামিলে ভরা নতজানু সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ুন আজাদের মন্তব্যপ্রবণ ‘প্রথাবিরোধিতা’র এক গভীর তাৎপর্য বোঝা যাবে। আজাদ প্রথানুগ জীবনযাপনই করতেন। সংসার, পেশা, বিদ্যাচর্চা, লেখালেখির প্রকাশ ইত্যাদির নিজস্ব কোনো কেতা উদ্ভাবনের জন্য তাঁকে লড়তে দেখা যায়নি। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়েই তিনি ক্রমে এমন এক প্রত্যয় আর সাহস হাসিল করেছিলেন যে, মুখ চেয়ে কথা বলার ঢাকাই সংস্কৃতি তাঁকে আর মেনে চলতে হয়নি। নিজের উপলব্ধি নিঃসংশয়ে প্রকাশ করার হিম্মৎ তিনি বহুবার দেখিয়েছেন। আধুনিক বাংলা কবিতার এক সঙ্কলন তিনি করেছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা না থাকায় কেউ কেউ গোস্বা করেছেন। গোস্বাটা ন্যায্য ছিল না। কয়েকজন কবির কবিতা তিনি সঙ্কলনে নেননি, তাঁর ভাষায়, এঁরা প্রগতিশীলতা থেকে খারিজ হয়েছেন বলে। তাঁর সিদ্ধান্ত ঠিক কি বেঠিক সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। কিন্তু নিজের উপলব্ধিকে নিঃসংশয়ে প্রকাশের যে উদাহরণ এখানে আছে, তা আরো দশ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করতে পারে। প্রতিবাদের এবং প্রত্যয়ী উচ্চারণের একটা বিশেষ ধরনে আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারে। বাংলাদেশে প্রত্যেকেরই এক গোয়ালের গরু হয়ে ওঠা এবং নতজানু বাকরুদ্ধ সংস্কৃতির প্রবল প্রতাপের মধ্যে — এ কারণেই —হুমায়ুন আজাদকে মনে পড়ে।

৫.

‘প্রথাবিরোধী’ হিসাবে হুমায়ুন আজাদের খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা সম্ভবত গভীর কোনো তাৎপর্য প্রকাশ করে না। তাঁর প্রধান দুই এলাকায় — ভাষা ও সাহিত্যে — তিনি বাংলা অঞ্চলের প্রভাবশালী ডিসকোর্সের মধ্যেই কাজ করেছেন। তবুও উচ্চারণের বিশিষ্টতা, প্রত্যয় আর সাহস তাঁর অসংখ্য মত-মন্তব্যকে প্রথাবিরোধীর সম্মান জুগিয়েছে। বলা যায়, হুমায়ুন আজাদের প্রথাবিরোধিতা ভঙ্গিপ্রধান, তবে, ভঙ্গিসর্বস্ব নয়।