Archives

কয়েকটি কবিতা

কবিতা
শুকনো পাতার মতো কবিতারাও এখন বাতাসে ওড়ে ঠিকানাহীন
এলোমেলো উড়তে উড়তে হয়তো কখনো চুলোর আগুন হয়ে যায়
বুকের আগুনে পুড়েই হয়তো তার জন্ম হয় রাতের নিস্তব্ধতায়
পোড়েতো জীবনই- জীবন পুড়ে পুড়ে যেভাবে বাঁচে—কবিতাও তাই

কবিতার বাইরে তোমাকে
কবিতার বাইরে তোমাকে আর কিছুই বানানো যায় না
কিন্তু তোমাকে এখন আর কবিতা বানাতে ইচ্ছে করে না
অথচ আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে দুমড়ে মুচড়ে
তুমি বারবারই লাবণ্যদুপুরের মতো কবিতা হয়ে ওঠো
কবিতার সাথে নিশুতিযাপন ছেড়েছুঁড়ে
যেনো কামরাঙা অসহ্যদুপুরের দখলে আমি
কবিতাশরীর আজ নিষিদ্ধচুম্বনে পূর্ণিমা হবে রাতভর
তোমাকে এ রাতে কবিতার বেনারশিতে সাজানো নয়
আমি আজ কবিতার কোনো কারিগর নই
বুনোচুম্বনে তোমাকে আজ রাত বানাবো নক্ষত্র আমি
স্বর্ণআলো ছড়ানো নগ্নিকাগোলাপ মধ্যরাত ভেঙে
নিজেই কবিতার অধিক কবিতা হয়ে ওঠে
কবিতার বাইরে একটুও নেয়া যায় না তোমাকে
মুগ্ধঘ্রাণে কী অদ্ভুতভাবে অবাধ্য ভোরের আবেগে
ছড়িয়ে পড়ো বুকে ছন্দমাত্রা উপমা অনুপ্রাসের মতো
কবিতার বাইরে তোমাকে আর কিছুই বানানো যায় না

পুতুলদাগ
আনন্দাশ্রু দুচোখে বালিকার। মহাকালী স্কুল-বিস্ময়ে দেখে সে। আহা! এই সেই বিদ্যানিকেতন। সোনামায়ের সোনাপায়ের কচি কচি দাগ যেনো শিশিরে টলমলো। বালিকা খোঁজে একদিন সেই শিশুতরু মা। এখানকার সবকিছুতে আজ যেন মা. যেন এক পুতুল মাথাভর্তি চুলে দুবেণি করে বই হাতে দৌড়াচ্ছে, কল্পনায় দৌড়াচ্ছে রৌদ্র চিকচিক চোখে আর এক অবুঝবালা। চোখে মেঘ-ভেজা মেঘ-মাকে দেখে— কাদামাটি মা…বালিকা হারায় স্মৃতির রামধনু মেঘে। অন্তরে অজস্র ঢেউ অব্যক্ত স্বরে বলে মা!
দেখো তোমার পুতুলপায়ের দাগ আমি কী পাগলের মতো খুঁজছি, ছুঁয়ে নিচ্ছি আমার সর্বস্বতায়। ও মেঘ আমি আনন্দে কাঁদি, তুমি কেন কাঁদো! মাকে তুমিও কী খুঁজে খুঁজে ফেরো!

ব্যর্থ ভয়ঙ্কর দৌড়ের কাছে
দাড়াশ সাপের পেছনে শুকনো মাঠ ভেঙে কী ভয়ঙ্কর দৌড়েছিলাম একদিন
কিছুতেই তাকে ধরতে পারিনি পুরো এক মাঠ শুকনো কাঠের মতো মাটি
ক্ষত-বিক্ষত পা নিয়ে ব্যর্থতার ঘামে সেই যে ফিরেছিলাম শৈশব শরীরে
আজো যেন সেই একইভাবে দৌড়াচ্ছি— আমার স্বপ্নরা
বড়ো বেশি মরীচিকা
কী ভয়ঙ্কর সাপ একদিন জড়িয়েছিল আমার শোবার খাটের পায়ার সাথে
কী ভয়ঙ্করভাবে একদিন ঘাস কাটতে হাতের মুঠোয় ঘাসের পরিবর্তে
মুঠোবন্দি করেছিলাম গোখরা সাপ-নিজের জীবন নিয়ে খেলছি তো
তখন থেকেই— আজ কেন খুঁজি পুরনো প্রাসাদে খসে যাওয়া জীবন
নতুন সূর্যের কাছে-একদিন তো বুঝিনি এ জীবন জীবন নয়—মৃতচোখ
লেগে থাকে শরীরে শুকনো মাঠে যেনো পড়ে থাকা খড় কিংবা নাড়া
পদ্মাতে ডুবেছি—ডুবেছি গড়াই নদীতে কীভাবে বেঁচে গেছি জানিনা হিসাব
কী এক অদ্ভুত– মরে মরে ফিরে আসা-কেন বেঁচে আছি— অনর্থক মনে হয়
কেন এখনো দৌঁড়াই দূরের পাখির কাছে- যে পাখি আমার নয়-আমার তো
ছিলো না পরাণ পাখি কোনো—যার চোখের দুকোণ ভেজে আমার বেদনা
নিজেকে ফেরাবো নিজের ভেতর-স্বপ্নগুলো কুচিকুচি করে কেটে ইচ্ছেমতো
উড়াবো বাতাসে-হাতের মুঠোয় বাঁধবো না লালশাড়ি কবিতা তোমার
তোমার পায়ের নূপুরে কখনোই বাজবে না আমার চুম্বনের শিশির শব্দ
তোমার কাঁচের চুরি প্রজাপতি আদরে আমার রক্তফোটায় পরবে না
লালটিপ
আমি ফিরে যাবো আমার ভেতর-ভয়ে ভয়ে ফিরে যাবো-যদি কোন ভুল
ভুল করে করে-ফেলি—ভুলের আগুনে যদি পুড়ে যায় প্রিয়তমা মৃত্তিকা রমণী
তোমার উজ্জ্বল সুন্দরে থাকবো বলে দূরে সরে নিয়ে যাবো নিজেকেই
তুমি নিজেও জানবে না কতোটা পথ আমি হেঁটে গেছি পেছনে একাকী
তোমাকে হারাবো না বলেই আমার এই চলে যাওয়া-ক্ষত-বিক্ষত কবিতা
সেই কবে থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে কতো উজানভাটি পেরিয়ে তোমার
জীবন-আঁচলে বেঁধেছি নিজেকে- নিজেকেই আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি
সেই শৈশবের ব্যর্থ-ভয়ঙ্কর দৌড়ের কাছে

কয়েকটি কবিতা

কবিতা
শুকনো পাতার মতো কবিতারাও এখন বাতাসে ওড়ে ঠিকানাহীন
এলোমেলো উড়তে উড়তে হয়তো কখনো চুলোর আগুন হয়ে যায়
বুকের আগুনে পুড়েই হয়তো তার জন্ম হয় রাতের নিস্তব্ধতায়
পোড়েতো জীবনই- জীবন পুড়ে পুড়ে যেভাবে বাঁচে—কবিতাও তাই

কবিতার বাইরে তোমাকে
কবিতার বাইরে তোমাকে আর কিছুই বানানো যায় না
কিন্তু তোমাকে এখন আর কবিতা বানাতে ইচ্ছে করে না
অথচ আমার ইচ্ছে-অনিচ্%9

দেবতী দেউল

পাপ বুঝিনা দেবতী

পুণ্যও চিনি না

তোমাকে চিনি

তোমাকে চাই

খরস্রোতা নদী যেভাবে সমুদ্র চায়।

 

অঙ্ক বুঝিনা দেবতী

পদ্যও বুঝি না

তোমাকে বুঝি

তোমাকে চাই

পদ্মা যেভাবে পাগলা ঢেউয়ে সবকিছু নিজের ক’রে চায়।

 

বাণিজ্য শিখিনি দেবতী

লাভ-লোকসান বুঝি না

তোমাকে বুঝি

তোমাকে চাই

স্বর্ণলতা যেভাবে মেঘের মতো ঢেকে রাখতে চায় বৃক্ষশরীর।

 

বন্দিত্ব জানিনা দেবতী

মুক্তিও বুঝি না

জীবনসত্য তুমি

তোমাকে চাই

বন্যার জলে পলি মিশে যেভাবে উর্বরতা বোনে বন্ধ্যাভূমিতে।

 

তুমি কার— কার ছিলে কবে

কার আছো এখন

বুঝি না হিসাবের কড়ি

চাই তোমাকে প্রবল

কবিতা-গহীনে যেভাবে জেগে ওঠে কাঁচা চরের মতো নতুন কবিতা।

 

পাপ বুঝি না দেবতী

পুণ্যও চিনি না

স্বর্গ-নরক বুঝি না

তোমাকেই চাই

জীবন-উৎসবে যেভাবে জেগে ওঠে যুবতীজমিন।

তিতাস-এর শেকড় ও কারুণ্যশ্রুতি ।। রকিবুল হাসান

রকিবুল হাসান

বাংলাসাহিত্যে নদীভিত্তিক আঞ্চলিক উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম। অদ্বৈত মল্লবর্মণ(১ জানুয়ারি, ১৯১৪-১৬ এপ্রিল, ১৯৫১) এই একটি গ্রন্থের জন্যেই বাংলাসাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেছেন। তিনি স্বল্পায়ু জীবনে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও, পরিমাণের দিক থেকে তা বিশাল হিসেবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু গুণগত মানে সেসবের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি রাঙামাটি নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হলো জীবনতৃষা। এটি তাঁর আরভিং স্টোনের লাস্ট ফর লাইফ-এর অনুবাদকর্ম। এ গ্রন্থটি মূলত শিল্পি ভিনসেন্ট ভ্যানগঘের জীবনী। তাঁর গদ্য-নিবন্ধগ্রন্থ ভারতের চিঠি-পার্ল বাক্কে। কবিতাও লিখেছেন ছোটবেলা থেকেই, বিদ্যালয়ে নিচু ক্লাশে পড়ার সময় থেকেই। কবিতা রচনার মাধ্যমেই অদ্বৈতের সাহিত্যজীবন শুরু। ছোটগল্পেও তিনি অসামান্য শিল্পি। তাঁর ‘স্পর্শদোষ’, ‘সন্তানিকা’ ও  ‘কান্না’ গল্পত্রয় তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অদ্বৈত পেশাগতভাবে সাংবাদিক ছিলেন। নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে পত্রিকার প্রয়োজনেই লিখেছেন নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। দেশ পত্রিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। মোহাম্মদী, নবযুগ, কৃষক ও দেশ পত্রিকাতেও তিনি কাজ করেছেন। ভারতবর্ষ, মাসিক বসুমতী প্রভৃতি উচ্চশ্রেণির পত্রিকাতেও গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে।
তিতাস একটি নদীর নাম বাংলাসাহিত্যে অসামান্য মর্যাদায় সমাসীন। বাঙালি পাঠকের কাছে উপন্যাসটি পরম আদরে সমাদৃত। বিদেশি সাহিত্যেও এমন উপন্যাস আছে। এ ধারার লেখকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মারিয়া এজওয়ার্থ, টমাস হার্ডি, আর্নল বোনেট, উইলিয়াম ফাকনার, মিখাইল শলোকভ, এমিলিয়া পারডো বাজান, গ্রাজিয়া ডেলেহডা, ইভান সাংকার, জিন গিয়োনো। বাংলাসাহিত্যে এ-ধারার প্রধান লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, সমরেশ বসু প্রমুখ। নদীনির্ভর আঞ্চলিক এ উপন্যাসগুলো বিষয়বস্তুতে মিল থাকলেও এদের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্রনির্মাণশৈলী, ভাষাপ্রয়োগ আলাদা। তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের লোক-উপাদান, গঠনশৈলি, চারিত্র্যবিচার, মনোস্তত্ত্ব জ্জবিচার্য বিষয়।
তিতাসের ছবি বুকভরা জলের মতো, কখনো আবার নদীর শুকনো বুকে ফসলের ক্ষেত, বিদেশি সংস্কৃতির দাপটে নিজেদের সংস্কৃতির ভেঙে পড়া, জীবন বদলের নানামাত্রিক ছবি এ উপন্যাসের পরতে পরতে সাজানো। যা কখনো আনন্দের, কখনো সর্বস্ব হারানো বুকভাঙা কান্না-আর্তনাদ-আহজারি। গ্রাম-বাংলার জীবনে চিরপরিচিত এক উৎসব নৌকা বাইচ। এ ছবিও উপন্যাসে আছে। নৌকা-প্রতিযোগিদের উৎসাহ দেবার জন্যে নানামাত্রিক গান গাওয়া হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের গান এ উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে। মুর্শিদা গান, বাউল গান, মারফতী গান, পদ্মাপুরাণ গান, পুঁথি পড়া এসব আছে। এ উপন্যাসে গানে গানেই যেন তিতাসের স্রোতের মতো জীবনপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে। তিতাসের ইতিহাস আছে। তিতাসের ইতিহাসতো ‘সত্যের মতো গোপন হইয়াও বাতাসের মতো স্পর্শপ্রবণ’। যে ইতিহাসে যুক্ত হয়ে আছে তিতাসের পাড়ের মালোদের জীবনের আনন্দ-বেদনার জীবন-উৎসবের অপরিহার্য অনুষঙ্গেজ্জযেখানে ধাঁধাঁ, লৌকিক ক্রীড়া, আনন্দ-অনুষ্ঠান, রূপকথা, গল্প বলাজ্জউপন্যাসটির গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকৃতির রঙও তিনি ধরেছেন অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে। বাংলার বারো মাসের স্বভাব-চিত্র ছবির মতো করে এঁকেছেন তিনি। যেন প্রকৃতিকে স্পর্শ করা যায়, তার ঘ্রাণও অনুভব করা যায়। প্রকৃতির সাথে একাত্ম হলেই কেবল এ ধরনের চিত্র আঁকা সম্ভব। যেটি কবি জীবনানন্দের কবিতায় আমরা পাই।
তিতাসে মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। যে সংস্কৃতি ‘মালোরা  প্রাণের সঙ্গে মিশাইয়া লইয়াছিল’। অদ্বৈত-এর ভাষায় :
গানে গল্পে প্রবাদে এবং লোকসাহিত্যের অন্যান্য মালমসলায় যে সংস্কৃতি ছিল অপূর্ব। পূজায় পার্বণে, হাসি ঠাট্টায় এবং দৈনন্দিন জীবনের আত্মপ্রকাশের ভাষাতে তাদের সংস্কৃতি ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মালো ভিন্ন অপর কারো পক্ষে সে সংস্কৃতির ভিতরে প্রবেশ করার বা তার থেকে রস গ্রহণ করার পথ সুগম ছিল না।
এ-সংস্কৃতি ভেঙে পড়ার যন্ত্রণা যেমন আছে, তেমনি শাহরিক নতুন সংস্কৃতিও যে মালোদের জীবনে যুক্ত হয়েছে অপরিহার্যভাবেইজ্জনতুন জীবনের এক মুগ্ধ ঘ্রাণে যেন মালোরাও একসময় আপন সংস্কৃতি ভুলে-বসে। নৌকা-দৌড় খেলা তো মালোদের জীবনেরই এক অপরিহার্য জীবনখণ্ড। নৌকা-দৌড় বা নৌকা বাইচ ঘিরে তাদের আবেগ ও আয়োজন জীবন-উৎসবের রূপ নেয়Ñ যেন আনন্দে জেগে ওঠে গোটা মালো সম্প্রদায়। যে-স্থানে নৌকা-দৌড় হতো সে-দিক লক্ষ করে ছোট বড় নানা আকারের পালের নৌকা ছুটে আসতো। নৌকাতে পুরুষের চেয়ে স্ত্রীলোকই বেশি থাকতো। এদিন তিতাসের দুপাড় যেন আরো মোটা হয়ে উঠতো। দুপাড় ঘেঁষে হাজার হাজার ছোট বড় ছইওয়ালা নৌকা খুঁটে পুঁততো। কোথাও আবার বড় বড় নৌকা গেরাপি দিতো। আর গেরাপি দেয়া এসব এক একটা নৌকাকে ঘিরে দশ বিশটা ছোট নৌকা আশ্রয় নিতো। নৌকা থেকে নানারকমের গান ভেসে আসছে। মনখুলে উৎসবে মেতে সবাই গান গাইছে। প্রাণের ঢেউয়ে যেন তিতাসের স্রোত বয়ে চলেছে, আর তাতে মিশে গেছে কতো রকমের যে সুর :
আমার বন্ধু ঢাকা যায়, গাঙ্ পারে রান্ধিয়া খায় গো,
অ দিদি, জোয়ারে ভাসাইয়া নিল হাঁড়ি কি ঘটি কি বাটি গো
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।

আমার বন্ধু রঙ্গিঢঙ্গি, হাওরে বেঁধেছে টঙ্গি গো
অ দিদি, টঙ্গির নাম রেখেছে উদয়তারা কি তারা কি তারা গো
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।

আমার বন্ধু আসবে বলি, দুয়ারে না দিলাম খিলি গো,
অ দিদি ধন থুইয়া যৈবন করল চুরি, চুরি গো কি চুরি, চুরি গো,
অ দিদি প্রাণ বন্ধুরে তোরা ডাক দে।
নৌকা প্রতিযোগিদের উৎসাহ প্রদান এবং নৌকা-দৌড় দেখতে আসা নারীপুরুষদের আনন্দ দেয়ার ব্যাপারটি এ গানে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এ গানে ফুটে উঠেছে প্রেমের আকুতি। কাল্পনিক একটি চিত্রও এ গানে লক্ষণীয়জ্জঢাকায় গিয়ে বন্ধু নদীর পারে রান্না করে খায়। রান্নার আসবাবপত্র জোয়ারা ভেসে যাওয়ার কথাও গানে আছেজ্জযা কল্পনাপ্রসূত। আবার এ গানে ব্যক্তি-চরিত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। ‘উদয়তারা’ নাম ব্যবহার করে গানটিকে বাস্তবের কাছাকাছি করে ছোঁয়ার চেষ্টা আছে।
নৌকা দৌড়ের সময় বেশকিছু গানের ব্যহার আছে। এক এক নৌকা থেকে ভেসে ওঠে এক এক ধরনের গান। গদ্যভাবের গানও আছেজ্জ‘চাঁদমিয়ারে বলি দিল কে, দারোগা জিজ্ঞাসে, আরে চাঁদমিয়ারে বলি দিল কে।’ একটা গানের সংগে আর একটা গানের কোন মিল নেই। কথা সুর সব আলাদাÑভিন্ন ধাঁচের। অন্য আর একটি গানের কথা :
জ্যৈষ্ঠি না আষাঢ় মাসে যমুনা উথলে গো
যাইস না যমুনার জলে।
যমুনার ঘাটে যাইতে দেয়ায় করল আন্ধি
পান্থহারা হইয়া আমরা কিষ্ণ বলে কান্দি।
অন্য নৌকা থেকে ভেসে আসে :
আম গাছে আম নাই ইটা কেনে মারে
তোমায় আমায় দেখা নাই আঁখি কেনে ঠারো
তুমি আমি করলাম পিরীত কদমতলায় রইয়া
শত্তুরবাদী পাড়াপড়শী তারা দিল কইয়া।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ-বেদনা আকুতি-আর্তনাদ ফুটে উঠেছে এ গানে। মর্মস্পর্শী আকুতিভরা গান আরো আছে :
প্রাণবন্ধু গড়াইয়া দিছে ইলশাপাট্য নথ
সে নথ পইড়া গেল রে
কাল সারা রাত কোথায় ছিলি রে।
সব গানেই নানাভাবে উঠে এসেছে প্রেম ও প্রেমের বেদনা। বিশেষ করে বিরহ-জ্বালা এ সব গানের মূলভাবে স্থান করে নিয়েছে। জীবনের শেকড়ের গান হয়ে উঠেছে এসব গান। স্রোতবিহীন নদী যেমন মরা, তিতাসবিহীন জীবন যেমন মালোরা ভাবতে পারে না, এসব গানও যেন তিতাসের স্রোতের মতোই জেগে থাকে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে। প্রেম এখানে শরীরী প্রেম হয়ে ওঠে নি, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম অপার্থিব এক শান্তি-বারতা তৈরি করে সরল মানুষের মনে। এগানগুলোতে আদিরসের ঘ্রাণ থাকলেও, স্থান-কালের উল্লেখ থাকলেওজ্জএসব ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে লৌকিক সংস্কৃতিবোধ। মুর্শিদা বাউল গান, পুঁথি, কেচ্ছাজ্জএসবও ব্যবহৃত হয়েছে তিতাসে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের নদী-বিহারীদের এসব নিজস্ব সম্পদ। বুকের গহিনে এসব লালন করে তারা। নদী-বিহারীদের জীবনের শেকড়ের সাথে বাংলার মুর্শিদা বাউল গান, বারোমাসি গান, পুঁথি, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলা এরকম নানামাত্রিক গান যুক্ত। এসব বাদ দিয়ে তাদের জীবন হয় না। তাদের আনন্দ-বেদনার সাথে এসব গান একাত্ম হয়ে মিশে থাকে। তাদের জীবনেরই যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এসব মরমী সংগীত। নৌকা দৌড় এখানে আর শুধু দৃশ্যবস্তু থাকে না, গানে গানে নৌকা দৌড় পেয়ে যায় ভিন্নমাত্রা। তিতাসের স্রোতের মতোই গানও যেন প্রবাহিত হয়ে ওঠে সুরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। কখনো তা উৎসাহব্যঞ্জক, কখনো উদ্দেশ্যমূলক, কখনো আবার চিরায়ত প্রেমের স্বরূপেজ্জমানব-মানবী ব্যক্তি পাওয়া না-পাওয়া কখনোবা তা রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেমসাধনা।
নৌকা দৌড়ে নৌকা ছাড়াও ‘প্রকাণ্ড মাটির গামলা বিচিত্র রঙে সাজাইয়া’ তিতাসের বুকে ভেসে পড়তো। উৎসবের এওতো এক ভিন্ন রঙÑএদের মুখে গান-ছন্দ না থাকলেও ‘ফেশন করিয়া চুল দাড়ি ছাঁটাই করা, মাথায় জব্ জবে তেল, পরিষ্কার রুতির ওপর গায়ে সাদা গেঞ্জি’ ঠিকই থাকতো। বাইচের নৌকার সাথে প্রতিযোগিতা তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকতো না। গ্রাম গ্রামান্তরের মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেই তারা খুশি হতো। তিতাস পারের সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছেন। কল্পনার রঙ একটুও না লাগিয়ে বাস্তবতার গায়ে শুধু কাব্যিক-ভাষাটুকু বসিয়ে দিয়েছেন।
গ্রাম-বাংলায় নদীভিত্তিক এলাকায় বেদেনীরা নৌকা-করে এসে নোঙর ফেলে। এর পর আশপাশ এলাকাতে তারা আয়না চিরুনি বড়শি, মাথার কাঁটা, কাঁচের চুড়ি, পুঁতির মালা বিক্রি করে বেড়ায়। আবার এদের সাথে সাপের ঝাঁপিও থাকে। সাপ খেলা দেখায়। শুকদেবপুরে কিশোর ও বেদেনীর পণ্যবেসাতি করে তাদের হৃদয়বৃত্তিক যে ব্যাপারটি উঠে এসেছে তাকে সারসত্তাহীন বলা যায় না। বেদেনীরও যে রূপ থাকে- সে-রূপে কিশোরেরও দিশেহারা অবস্থা তৈরি হয়। পণ্যবেসাতি প্রথম উদ্দেশ্য থাকলেও, একটা পর্যায়ে তা হৃদয়বেসাতিতেও রূপ নেয়, সমাজ-সংসারে তা যে গ্রহণযোগ্য হবে না এ সচেতনতা থেকে ব্যাপারটি যে বেশিদূর এগোয়িনি তা অনুধাবনযোগ্য। এক্ষেত্রে বেদেনীর ভেতরই জীবন-বাস্তবতার প্রাখর্য লক্ষণীয়।
গ্রাম-বাংলায় রঙ মাখামাখি উৎসব তো চিরায়ত। এ উৎসব ঘিরে নিজেদের নানারকম সাজানো গান করা নাচানাচি করে আনন্দ করা এসব তো নিজেদের আপন-সংস্কৃতি। এসব সংস্কৃতি ধারণ ও লালন করেই গ্রাম-বাংলার মানুষেরা বড় হয়ে ওঠে। শুকদেবপুরেও আমরা সে-ছবি দেখি। উৎসবে থাকে রাধার দল আর কৃষ্ণের দল। একদল আগে গান শুরু করে, আরেক দল তার পরেÑগানে প্রশ্ন থাকে, গানে গানেই জবাব। এভাবে পালাক্রমে গান হতে থাকে। এখানে রাধার দল প্রথমে গান শুরু করে :
সুখ-বসন্তকালে, ডেকোনারে
আরে কোকিল বলি তুমারেÑ
বিরহিনীর বিনে কান্ত হৃদাগ্নি হয় জ্বলন্ত,
জলে গেলে দ্বিগুণ জ্বলে হয়নারে শান্ত।
এর জবাবে কৃষ্ণের দল গাইছে :
বসন্তকালে এলরে মদনজ্জ
ঘরে রয় আমার মন।
এসব পালাগানে পরস্পরের প্রতি বাক-আক্রমণ থাকে যেমন, তেমনি রসালো প্রসঙ্গ থাকেÑআদিরসেরই যেখানে প্রধান। একদল আরেক দলকে পরাস্ত করার জন্য নানাকৌশলে তীর্যক ও ‘আদি’ঘ্রাণযুক্ত শব্দের প্রয়োগ ঘটায়। নরনারীর প্রেম-প্রণয়, বিরহ-বেদনা, কাম-বাসনা বিষয়রূপে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব পালাগানে আঞ্চলিক শব্দ উপমা অনুপ্রাস রূপকের শৈল্পিক প্রয়োগ ঘটেছে। উপন্যাসে যা শিল্পরূপ লাভ করেছে।
নদী মানুষের জীবনে প্রবল প্রভাব ফেলে। মানুষ আনন্দ-বেদনায় নিত্যসঙ্গী তো নদীইÑবিশেষ করে নদী পারের মানুষদের। এর বাইরেও কথা আছে। নদী যে কোন মানুষের মনেই প্রভাব ফেলে। তিতাস পারের মালোদের কাছে তিতাসই তো তাদের সব। যে কোন নদীতেই যে তারা মুগ্ধ হয়জ্জনিঃসঙ্গতায় যে নদীর সাথে একাত্ম হয়ে ওঠে। ভৈরব বন্দর পাড়ি দিতেই বুঝতে পারে কিশোরেরা মানুষের কর্মচাঞ্চল্য কমে গেছে। বন্দরের কলরব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শীতের নদী। ঢেউ নেই, স্রোত নেই। শান্ত তৃপ্ত স্বচ্ছ জল আর জল। কিশোর মৌন-মুগ্ধতায় তা দেখতে থাকে।  সে গান শুরু করে :
উত্তরের জমিনেরে,      সোনা-বন্ধু হাল চষে
লাঙ্গলে বাজিয়া উঠে খুয়া।
দক্ষিণা মলয়ায় বায়       চান্দমুখ শুখাইয়া যায়
কার ঠাঁই পাঠাইব পান গুয়া।
আনন্দে যেমন কিশোরের এ গান আপন মনে গেয়ে ওঠে, ঠিক ভয়-ভয় বুকেও তার মনে জেগে ওঠে, ‘মাঝিভাই তোর পায়ে পড়ি পার দেখিয়া ধর পাড়ি’। গান যেন তাদের জীবনেরই এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সে গানে আছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, আপন আনন্দ-বেদনার কথা। জীবনের বাঁক তো কতোভাবেই ঘুরে যায় ‘প্রেমের দেবতা কোথায় কার জন্য ফাঁদ পাতিয়া রাখে’। জীবনের গানও তো কতোভাবেই হয়। কিশোর বাসন্তীকে ভালোবাসতো। বাসন্তীও কিশোরকে ভালোবাসতো। ভিন দেশে এসে তরুণী বেদেনীর স্তনযুগলে স্পর্শে ‘কিশোরের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের শিহরণ’ খেলে যায়। কিন্তু কিশোর প্রেমের ফাঁদে পড়ে উজানিনগরের খেলাতে। জীবনের এই এক অদ্ভুত রহস্যজ্জ‘যাকে জীবনে কখনো দেখি নাই হঠাৎ একদিন তাকে দেখিয়া মনে হয় সে যেন চির জনমের আপন।’ কিশোরেরও তাই হলো। উজানিনগরের খলাতে যে মেয়েটিকে দেখে সে মুগ্ধ হলো, সেই মেয়েটিকে নিয়ে রাতদিন তার একই ভাবনা, ‘কোনো একটা অলৌকিক উপায়ে ঐ মেয়েটির সহিত তাহার বিবাহের আয়োজন হইতে পারে কী না। তাহা না হইলে কিশোরের বাঁচিয়া থাকিয়া লাভ কী?’ অথচ কিশোর কিছুতেই বুঝতে পারে নাই সেই মেয়েটির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে তার বিয়ের আয়োজন চলছে। যখন তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো, ‘সেখানে নতুন একটা শাড়ি পরিয়া, পানের রসে ঠোঁট রাঙা করিয়া, এবং গালে-মুখে তেলের ছোপ লইয়া সেই মেয়েটা বারবার লাজে রাঙা হইয়া উঠিতেছে।’ এই মেয়েটির সাথেই তার মালাবদল হয়। এই মেয়েটি হয়ে যায় কিশোরের স্ত্রী, অনন্তের মা। শেকড়টা থাকলো ঠিকই, স্বপ্ন বলে আর কিছুই থাকলো না। হাওরে-ডাকাতিতে ‘রাতের ঝড়ে পাখির সেই যে ডানা ভাঙ্গিল, সে-ডানা আর জোড়া লাগিল না।’ এ সমাজেও যে কতো রকমের অসার বিধি-নিষেধ, আর এসবের বলি কিশোর। কিশোরের স্ত্রীও। কিশোরকে তো প্রবলভাবেই সে নিজের কাছে নিজের জীবনে টানতে চেয়েছিল-বাসন্তীর সাথে কথপোকথনেই তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে-‘তুমি না কইীচলা ভইন আমার একজন পুরুষ চাই। হ, চাইতি। পুরুষ ছাড়া নারীর জীবনের কানাকড়ি দাম নাই।..আমি কেবল জানি একলা জীবন চলে না! পাগলেরে পাইলে তারে লখ কইয়া জীবন কাটাই।’ এসব চাওয়া তার পূরণ হয় নি। কতোভাবেই তো কিশোরকে সে সুস্থ করে তুলতে চেয়েছে, কাছে পেতে চেয়েছে, জীবনের সাথে একাত্ম করে চেয়েছে। কিন্তু সমাজের কুসংস্কারের বিষাক্ত ছোবলে সেও হেরেছে, পারে নি। মরেছে নিজেও। জীবনের ভয়াবহতা যেমন এখানে অদ্বৈত দেখিয়েছে, তেমনি সমাজের অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও  ধর্মের অসারতা এবং তার মরণ ছোবল কতো ভয়ঙ্কর তাও দেখিয়েছেন কিশোর আর কিশোরের স্ত্রীকে দিয়ে।
সুবলের মৃত্যুর কথা এবার ধরা যাক। তার নির্মম ও বীভৎস মৃত্যুর ভেতর দিয়েই মালিক ও দিনমজুর শ্রেণির  মানসিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র  উপস্থাপিত হয়েছে। কালোবরণের নৌকায় দিনমজুর হিসেবে কাজে গিয়েছিল সুবল। মালিকেরা যুগ যুগ ধরে শ্রমিকের জীবন নিয়ে নির্মম যে খেলাটা খেলে আসছে, তিতাসেও কালোবরণ আর সুবলার মধ্য দিয়ে সেই সত্যটিই উচ্চারিত হয়েছে। নদী-নৌকার সাথে যাদের জীবন-বাঁধা, তাদের মৃত্যুর পথও যে সেখানেই রচিত হয়ে যায়, সুবল কী তা একবারও ভাবতে পেরেছিল! মালিকগোষ্ঠীর কাছে এসব সুবলের জীবনের যে কানাকড়ি মূল্য নেই, সুবলেরা তা কখনো ভাবে না। নিজের জীবন দিয়ে মালিকগোষ্ঠীকে রক্ষা করে যায়Ñতাদের জীবন ও সম্পদ। মুনিবের প্রতি বেতনধারী লোকের মনের মধ্যে সবসময় একটা বাধ্যবাধকতা বোধ কাজ করে। তিতাসে তা ধরেছেন অদ্বৈত। শেকড়ের এই বোধ ভেঙে বেরুনোর চিন্তা সুবলের ভেতর দেখা না গেলেও বাসন্তীর ভেতর দেখা যায়জ্জ‘সুবলার বউর মধ্যে বিপ্লবী নারী বাস করে।’ সুবলের মৃত্যুর কারণে ‘বাসন্তীর হাতের শাঁখা ভাঙ্গিল, কপালের সিঁদুর মুছিল। কিন্তু জাগিয়া রহিল একটা অব্যক্ত ক্রোধ।’ গোকর্ণঘাটের গণ-সমাজের অগ্রবর্তী এক প্রতিনিধি হয়ে ওঠে সে। তার মধ্য দিয়েই মালো সমাজের ইতিবাচক দিকগুলো ফুটে ওঠে। ‘বাজাইরা’ সংস্কৃতি, চটুল যাত্রাবিলাসী সঙ্গীত সাধনার প্রতিও তার প্রচণ্ড ক্ষোভ  ও প্রতিবাদ আমরা লক্ষ করি। পাটনীপাড়ার অশ্বিনী যাত্রার গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলজ্জ‘যেই না বেলা বন্ধুরে বাঁশিটি বাজাইয়া যাও, সেই বেলা আমি নারী খাই। শাশুড়ি ননদীর ডরে কিছু না বলিলাম তোরে, অঞ্চল ভিজিল আঁখির জলে।’ একথা শোনার পর বাসন্তীর ভেতর উগ্রমূর্তি ফুটে ওঠে। বিপ্লবী সত্তার দারুণ এক প্রকাশ ঘটে। সকলের সামনে প্রতিবাদ করে বলে ওঠে সে : ‘ইটা আমার বাপের দেশ ভাইয়ের দেশ। ইখানে আমি কারুকে ডরাইয়া কথা কই না। ইখানে আমারে যেজন আজ্নাইবে, এমন মানুষ মার গর্ভে রয়েছে।’ মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি যে ভেঙে পড়ছে, অধঃপতিত হচ্ছে বাসন্তী তা মেনে নিতে পারে না। সে স্পষ্ট করে বলেছেÑ‘আমি কই মালোপাড়ার কথা। দিনে দিনে কি হইল কও দেখি।’ নদীর রূপ বদলায়-কতভাবে তার বাঁক খায়জ্জমানুষের জীবনও তো নদীর মতোই। তিতাসের ‘কূলজোড়া জল, বুক ভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছাস’ ছিল।’ একদিন সেও ‘স্বপ্নের ছন্দে বহিয়া যায়।’ এই তিতাসেরই ‘কোথায় গেল এত জল, কোথায় গেল তার মাছে। তিতাসের কেবল দুই তীরের কাছে দুইটি খালের মত সরু জলরেখা প্রবাহিত রহিল, তিতাস যে এককালে একটা জলেভরা নদী ছিল তারই সাক্ষী হিসেবে।’ বাসন্তীও তো এই তিতাসেরই আর এক রূপ ‘বাসন্তী আছলাম ছোটবেলা, যখন মাঘ মাসে ভেউরা ভাসাইতুম। তার পরে হইলঅম কার বউ, তার পরে হইলাম রাঁড়ি। মাঝখানে হইয়া গেছলাম অনন্তর মাসী। অখন আবার হইয়া গেলাম বাসন্তী।’ তিতাস আর বাসন্তী একের ভেতর অন্যের প্রকাশ যেন।
তিতাস একটি নদীর নাম-এ শেকড়ের যে গান নদীর গভীর স্রোতের মতো নীরবে প্রবাহিত হয়েছে, এবং সেটিও যে মরা নদীর মতো একসময় মরেও যায়, মরে গেছেজ্জকিন্তু সেই শেকড়টি ধরে রাখার বা ধরে থাকার যে অদম্য মানসিক প্রত্যয়, শক্তি ও সংগ্রাম বাসন্তীর ভেতর দেখা যায় তা অতুলনীয়জ্জবাংলাসাহিত্যে যা এক ব্যতিক্রমী ও অভিনব সৃষ্টি।