Archives

বই ও পত্রিকা আলোচনা

বই ও পত্রিকা আলোচনা

আত্মজা ও একটি করবী গাছ ॥ হাসান আজিজুল হক

বাংলাদেশের গল্পসাহিত্যের ধারায় হাসান আজিজুল হক (জন্ম : ১৯৩৯) স্পষ্ট স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী। বলা যায়, লেখক জীবনের সূচনাপর্বেই (১৯৬০-৬৭) তিনি উল্লিখিত সাফল্য অর্জন করেন, — যার প্রমাণ : তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ আত্মজাও একটি করবী গাছ (১৯৬৭)। আলোচ্য এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলা যায়, গল্পরূপে সেটা যেমন শিল্প, তেমনি জীবনের অনুবাদও বটে। জীবন ও শিল্পের এরকম ভারসাম্যপূর্ণ সঙ্গতি বাংলাদেশের ছোটগল্পে এর আগে ঘটেনি বলে আমরা ধারণা করি। স্বীকার করি, সব লেখকেই কমবেশি সমাজসচেতন। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের বিশিষ্টতা এই যে, সমাজ সম্পর্কে তাঁর তত্ত্বগত জ্ঞান যেমন স্পষ্ট, তেমনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও সুসম্পন্ন। তাঁর বিশিষ্টতার আরও একটি কারণ এই যে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য গল্পকারদের মধ্যে একমাত্র তিনিই উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতার অধিকারী এবং অভিবাসী মনস্তত্ত্বের শিকার। আগেই বলেছি, সমাজ সম্পর্কে তাঁর তাত্ত্বিক ধারণা পরিচ্ছন্ন ও সুসংহত। এই কারণে সমাজ মনস্তত্ত্বের জটিল প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি মানুষের অবস্থা ও অবস্থানগত স্বরূপ উদ্ঘাটনের শিল্পসম্মত কৌশল প্রায় অনায়াসে তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছেন। এই ব্যতিক্রমও বিবেচনার যোগ্যতা রাখে।

আত্মজা ও একটি করবী গাছ গ্রন্থ অবলম্বনে উপরিউক্ত ধারণাগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করাই বর্তমান আলোচনার প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে অবতীর্ণ হওয়ার আগে হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক কিছু ধারণা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

২.

হাসান আজিজুল হক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাবর্ষে (১৯৩৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন পর্যন্ত (১৯৫৪) তিনি সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে (দৌলতপুর, খুলনা) স্থানান্তরিত হন। জন্মভূমির সঙ্গে বিচ্ছেদ ও পরিবর্তিত রাষ্ট্রভূমির সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর বিরল অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিমানসকে ব্যতিক্রমীভাবে গড়ে তুলেছে বলে অনুমান করা যায়। আমরা আরও অনুমান করি যে, বয়ঃসন্ধিকালীন ঐ অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি আলোচ্য লেখকের বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করেছিলো। রাঢ় বাংলার নীরস প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল থেকে খুলনার আর্দ্র সবুজ সমারহে উপনীত হয়েও বিচ্ছেদের সূক্ষè বেদনা তিনি মুছে ফেলতে পারেননি। ‘যে ভিতরে আসে’ শীর্ষক রচনায় তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রচনাটির এক জায়গায় তিনি বলেছেন— ‘আমার বগলে শতরঞ্জি মোড়া ছোট বিছানা, হাতে বেতের একটি স্যুটকেস। আমার সর্বস্ব ধন।’

ছাত্রজীবনে তিনি সমাজবাদী ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়নে’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৫৭ সালে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ-এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পর্কিত হন। সেই থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি ব্যক্তি ও লেখক হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৬৮ সালের বিশে ও একুশে অক্টোবর ‘আফ্রো-এশীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠানে হাসান আজিজুল হক ‘আফ্রিকা-এশীয়ার গণমুখী সাহিত্যের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন, যেখানে শোষণমুক্তির সাধনা লেখকদের প্রধান করণীয়রূপে বিবেচিত হয়।

প্রসঙ্গক্রমে লেখকের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রমাণবহ একটি তথ্য উল্লেখ করা যায়। বর্তমানে তিনি প্রগতিবাদী ‘বাংলাদেশ লেখক শিবিরে’র সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। বদরুদ্দীন উমর ও পরলোকগত অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদের সংস্রবধন্য

এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ হল সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে শ্রেণীসংগ্রামের নান্দনিক হাতিয়ারে পরিণত করা। পেশাগতভাবে হাসান আজিজুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক ছিলেন। অনুমান করা অযৌক্তিক হবেনা যে, দর্শনচর্চা আলোচ্য লেখকের সমাজভাবনাকে গুণগতভাবে পুষ্টি জুগিয়েছে।

৩.

সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘শকুন’ নামক গল্পের মাধ্যমে হাসান আজিজুল হকের আত্মপ্রকাশ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ সমুদ্রের স্বপ্ন, শীতের অরণ্য (১৯৬৪)-এ ‘শকুন’ গল্পটি অন্তর্ভুক্ত। ঐ গল্পের এক জায়গায় আছে :  ‘ছেলেদের কথায় শকুনটাকে দেখে তাদের রাগ লাগে, … সুদখোর মহাজনের কথা মনে হয় ওকে দেখলেই। নইলে মহাজনকে লোকে শকুন বলে কেন।’ এই অল্প বর্ণনাতেই লেখকের জীবনদৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি উদ্ভাসিত হয়েছিলো, যা তার আর্থসামাজিক অভিজ্ঞানের দ্যোতক। এই ধারণা আরও সংহত মনে হয়, যখন লেখক বলেন, ‘কিন্তু শকুন শকুনের মাংস খায় না।’

হয়তো এই কারণে অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ‘শকুনকে শ্রেষ্ঠ একটি গল্পের মর্যাদা দিয়েছেন এবং লেখকের রচনারীতিকে ‘সহজ সরল ও প্রতীকধর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্মী’ বলে বর্ণনা করেছেন। এই কথা সত্য যে, উক্ত প্রশংসাধর্মী মন্তব্য পূর্ববর্তী ও সমকালীন অনেক লেখকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের প্রয়োগ ঘটিয়ে গল্পকার হিসেবে নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে হাসান আজিজুল হকের বেশি সময় লাগেনি। আলোচ্য গ্রন্থ আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭) তার পরিচয়বাহী।

৪.

আগেই বলেছি, সমাজচেতনা ও জীবনবোধের নিজস্বতাই একজন লেখকের বিশিষ্টতা নির্ধারণ করে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মৌলিক একটি উপাদান, যা একজন লেখক থেকে অন্য একজন লেখককে আলাদারূপে চিনতে সাহায্য করে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ থেকে বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনীর নজরুল আলাদা, রাতভরে বৃষ্টির বুদ্ধদেব বসু থেকে পদ্মানদীর মাঝির মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আলাদা; তেমনি বহেনা সুবাতাস (১৯৬৭)-এর জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত থেকে আত্মজা ও একটি করবী গাছের হাসান আজিজুল হকও আলাদা। লেখকের ব্যক্তিগত অবস্থা ও অবস্থান পৃথকীকরণের স্বীকৃত সূত্র। এই সূত্রে হাসান আজিজুল হকের পরিচয় গোড়াতেই তুলে ধরেছি। আমরা দেখেছি তিনি একজন উদ্বাস্তু বাঙালি মুসলমান, পশ্চিমবাংলার গ্রাম থেকে পূর্ববাংলার মফঃস্বল শহরে উপনীত। এই সুবাদে দুটো স্পষ্ট রকমের অভিজ্ঞতা তাঁর অনন্যতাকে সম্ভাবনাময় করে তুলে ধরেছে বলা যায়। প্রথমত রাঢ়-অঞ্চলের বিত্তহীন মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, ভারতবিভাগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অস্বস্তিকর জটিলতা। পরবর্তী সময়ে এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর অর্জিত জ্ঞানের সংস্পর্শে আরও সংহত এবং শাণিত হয়েছে বলে মনে করি। ফলে তাঁর উপজীব্য রচনার লক্ষ্য কেবল শিল্পসৃজনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সেটা সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সমান মূল্য দান করেছে। কুষ্টিয়ায় প্রদত্ত এক ভাষণে (১৬.১.১৯৮১) হাসান আজিজুল হক বলেন : ‘আমি যাদের কথা বলতে চাই তারা হচ্ছে আমাদের দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসটা তাহলে কী? এই ৯৫ ভাগ মানুষকে মুক্ত করতে হবে। আমার রাগের কারণ কী? এই ৯৫ ভাগ মানুষের প্রতিভা ও কর্মশক্তির কোন বিকাশ নেই এই সমাজে। ৯৫ ভাগ মানুষ এদেশে চাপা পড়ে আছে। এত বড় অন্যায় ও অমানবিকতা একজন লেখক যদি অনুধাবন করতে না পারেন তবে তিনি কিসের লেখক?’

উদ্ধৃত বক্তব্যে লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটি সুস্পষ্ট। এই উক্তি বা উপলব্ধি তাঁর অভিজ্ঞানের প্রতিক্রিয়া। এই অভিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেখকের অভিজ্ঞতাজাত আরেকটি দিক; সেটা হলো : ভৌগোলিকতা বা স্থানিকতার রূপায়ণ। হাসান আজিজুল হকের রচনায় যে ভূগোল, তার প্রকৃতি প্রধানত এরকম : ‘কোন লেখায় খানিকটা প্রকৃতি বর্ণনাকালে এক সময় আমার মনে হতো লেখকের মনে বেশ খানিকটা দয়ামায়া আছে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের এই এলাকায় প্রকৃতির দিকে চেয়ে আমার রক্ত শুকিয়ে ওঠার উপক্রম। এক হাত দূরে ছোরা হাতে ভয়ানক আততায়ীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেও যেন এমনভাবে আগাগোড়া শিউরে উঠতে হয়না। চারদিকে খোলা, বিবর্ণ, ধুলোটে। শুকনো মাটিতে এক ফোঁটা রস নেই, ঘাস পুড়ে প্রায় ছাই হয়ে গেছে।’ একই রচনায় প্রকৃতির নির্মমতার প্রেক্ষাপটে বাঁচার বিরামহীন লড়াইকে অঙ্গীকার করে তিনি বলেন : ‘প্রকৃতি একমাত্র সাহিত্যে ও কাব্যেই স্বতন্ত্র চেহারা ও অস্তিত্ব পায়, বাস্তব জীবনে নয়। জীবনে ব্যাপারটা দাঁড়ায় আলাদা। প্রকৃতি হয়ে দাঁড়ায় জীবনের উৎস, বাঁচার শর্ত; তার জমি, তার ঘরবাড়ি; …মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি একেবারে অর্থহীন কাব্যি হয়ে পড়ে। বোধহয় এইভাবে ভেবে থাকবো বলেই উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতি আমার কাছে এত নিদারুণ মনে হয়েছিলো। …অস্তিত্বের সঙ্গে মেশা সেই অসহ্য সংগ্রামের কথা ভেবেই আমার মনে আতঙ্ক জন্মেছিলো। আমরা ভদ্রলোকেরা, পরজীবী ও পরশ্রম অপহরকরা যখন জনগণকে আরো পরিশ্রম করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে বলে মাগনা উপদেশ ঝাড়ি, তখন সেই উপদেশ যে কি মর্মান্তিক উপহাস হিসেবে দেখা দেয়— উত্তরাঞ্চলের খরার খোলা মাঠে পাঁচ মিনিট স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকলে তা হৃদয়ঙ্গম হয়ে যায়। …আর সমাজ গঠনের ভিতরের খুঁটিনাটি জানতে পারলে তো কথায় নেই—’। এই প্রকৃতি ও এই মানুষজন নিয়েই হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য। অভিজ্ঞতা প্রকাশের সততা ও ঐকান্তিকতাবশত রাঢ় বঙ্গের জীবনযাত্রাই হয়ে উঠেছে তাঁর গল্পের প্রধান উপজীব্য।

একজন তরুণ গবেষক সংগতভাবে হাসান আজিজুল হকের গল্পকে ‘রাঢ়বঙ্গের উত্তরাধিকার’ রূপে চিহ্নিত করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সমালোচক সুবীর রায় চৌধুরীও এর আগে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে হাসান আজিজুল হকের গল্পের জায়গাজমি ও মানুষজন নিয়ে যে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন, সেখানেও দেশান্তরিত অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি হাসানের গল্পের অধিকাংশ চরিত্রে উদ্বাস্তু মানসিকতার প্রভাব অনুধাবণ করেছেন। আমরাও মনে করি যে, দেশমাটি ছেড়ে যাবার অভিজ্ঞতা অনেক হিন্দু বাঙ্গালির যেমন আছে, সে রকম মুসলমান বাঙ্গালির অনেকেরই নেই। এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার ফলে হাসান তাঁর গল্পাশ্রিত শরণার্থী চরিত্রগুলোকে মমতার স্পর্শে জীবন্ত করে তুলতে পেরেছেন। উপর্যুক্ত আলোচনার যথার্থতা প্রতিপন্ন হয় আত্মজা ও একটি করবী গাছ গল্পগ্রন্থে।

৫.

নামগল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ দিয়েই গল্পের শুরু। অর্থনৈতিক মুক্তির অভাবে ’৪৭-এর রাজনৈতিক স্বাধীনতা যাদের জীবনে মমতাহীন ও অর্থহীন ঘটনারূপে সাব্যস্ত হয়েছে, উক্ত গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কেশোবুড়ো তাদের একজন। স্বাধীনতা তার ভাগ্যে উদ্বাস্তুটুকুই দিয়েছে। এই পর্যায়ে, বেঁচে থাকার সর্বশেষ অবলম্বনরূপে আত্মজার শরীরকে পুঁজি করতে সে বাধ্য হয়। কয়েকজন অধঃপতিত যুবক এই বৃদ্ধের গ্লানিময় উপার্জনের উৎস। ভোগবিলাসী ঐ যুবকেরা যখন খুশি আসে; কেশোবুড়ো তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নেবার ভান করে; তারাও টাকা ধার দেবার ভান করে। বৃদ্ধ কেশোর উক্তি— ‘আর কতো ধার নিতে হবে তোমাদের কাছে! কবেই বা শুধতে পারবো এই টাকা!’ কিন্তু টাকা ব্যতিরেকেই সেই ধার শোধ হয়ে যায়।

পরিশীলিত সামাজিকতার ছদ্মবেশে দেহব্যবসার এই আয়োজন কেশোর পিতৃমনকে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু পাকস্থলীর ক্ষুধা বড় নির্মম; তার দাবি থেকে কারো নিস্তার নেই। সেই দাবি মেটানোর বিকল্প কোন পথ কেশো বুড়োর নেই। তার শরীরে শক্তি নেই; আছে ব্যাধি আর বার্ধক্য। তার উর্বর কোন জমিজিরাত নেই, আছে যৌবন-পীড়িত একাধিক কন্যাসন্তান। তাই বিবেকের যন্ত্রণা সত্ত্বেও নিজের অসহায়ত্ব ও কৃতজ্ঞতাকে জাহির করতে হয় এইভাবে : ‘এই তোমরা একটু আধটু আসো, যখন তখন এসে খোঁজ খবর নাও। সময় অসময় নেই বাবা তোমাদের। তোমরাই ভরসা, আমার পরিবার তোমাদের কথা বলতে অজ্ঞান। …বাড়ির বাগান থেকে অন্ন জোটানো আবার আমাদের কম্ম— হ্যাঁঃ। ও তোমরা জানো।’ গল্পের শেষদিকে স্বীকারোক্তিমূলক কথকতায় বেরিয়ে আসে একটি তথ্য, যা একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর ও করুণ। যুবকদের উদ্দেশ্যে প্রায় প্রলাপের ভঙ্গিমায় কেশো বুড়ো বলতে থাকে, ‘আমি যখন এখানে এলাম, আমি একটা করবী গাছ লাগাই বুঝলে? …ফুলের জন্য নয়, বিচির জন্য, বুঝেছ করবী ফুলের বিচির জন্য। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে।’

অর্থাৎ গর্ভপাতের অগ্রিম চিন্তা ও পাপবোধের নিভৃত সূচনা করবী গাছ রোপনের সন্নিহিত কালেই ঘটেছিলো। কথাশেষে আকুল কান্নার মাধ্যমে অসহায় পিতা অপরাধ যন্ত্রণায় উপশম রচনার চেষ্টা করছিলো। কেশোবুড়োর পূর্বপ্রস্তুতির মধ্যে করুণ নাটকীয়তা বিদ্যমান; নিয়তিবাদের আভাসও এতে পাওয়া যায়। এটা আলোচ্য গল্পের রচনাশৈলীগত দিক। আমাদের ধারণা, মূলবক্তব্য নিহিত রয়েছে আর্থসামাজিক কার্যকারণের মধ্যে। এর ফলে, ছিন্নমূল মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামেই সেখানে প্রধান হয়ে উঠেছে। আমরা জানি, বংশধারা ও মৌলিক প্রবৃত্তিকে মানুষ যেমন ছাড়তে পারেনা, তেমনি মানবিক বৃত্তিমূলক সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকেও সে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে পারেনা।

শোন্তরী কেশোরবুড়োর জীবনে পরাজয় ছিলো নিয়তির মতো অবধারিত ব্যাপার। তার সামনে মোটামুটি দুটো পথ খোলা ছিলো। এক : ক্ষুধার কাছে পরাজিত হওয়া, দুই : বিবেকের কাছে পরাজিত হওয়া। কিন্তু ক্ষুধা যে সমাজেরই বিবেকহীনতার ফল হাসান আজিজুল হকের কেশোবুড়ো সেটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কেশো বুড়ো বাধ্য হয়ে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ক্ষুধাকে জয় করতে চেয়েছে। কিন্তু সে জানতো, পাকস্থলীর চাহিদা মেটানোর পর বিবেকের কাছে পরাজয়ের ক্ষয়ক্ষতি তাকে পরিমাপ করতে হবে।

তাই বিষাক্ত বৃক্ষরোপনের মধ্য দিয়ে তার উদ্বাস্তু জীবনের উদ্বোধন ঘটেছিলো। ঐ করবী গাছ কেবল জীবনের নির্মম বাস্তবতার রূপকেই নয়, একই সঙ্গে নৈতিকতাবোধেরও প্রতীক। এই সূত্রে বলা যায়, শ্রেণীসচেতন হাসান আজিজুল হক কেবল সর্বহারা-শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে কেশোর চরিত্রকে সঙ্কুচিত করে রাখেননি, বাস্তব ও পূর্ণ মানুষ হিসেবেও তাকে বিকশিত করেছেন। আমরা বলতে পারি, কেশো বুড়ো ক্ষুধা ও বিবেকের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়াই করতে চেয়ে বিত্তহীন জনগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতারই জানান দিয়েছে।

‘দৈনিক সংবাদ’-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ হাসান আজিজুল হকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার শিল্পিত পরিণাম। ফুলতলী নামক একটি অঞ্চল এই উপজীব্যের উৎস। শিল্প রচনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ব্যবহার প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক ঐ সাক্ষাৎকারে বলেছেন— ‘অভিজ্ঞতা শব্দটিকে না ছিঁড়ে যতোটা টানা যায়, আমি ততোটাই টানবো।’

৬.

এই প্রত্যয়ের প্রতিফলন আলোচ্য গ্রন্থের একাধিক গল্পে লক্ষ করা যায়। নাম গল্পের পরেই আছে ‘পরবাসী’। দেশভাগজনিত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সেখানে পুনরায় উন্মেচিত হয়েছে।এই গল্প অভিজ্ঞতার নিছক সম্প্রসারণ মাত্র নয়। পূর্ববর্র্তী গল্পে লেখক দেশভাগের পরিণামকে ব্যক্তিগত খাতে খতিয়ে দেখেছিলেন। ‘পরবাসী’ গল্পে সেই সংকট বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছে। কেশোবুড়োর জীবনে যে সংকট ছিলো অর্থনৈতিক, ‘পরবাসী’ গল্পে তা রাজনৈতিক ব্যাপকতায় পর্যবসিত।

‘পরবাসী’ গল্পটি পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজীবী সমাজকে আশ্রয় করে রচিত। তার আখ্যানবস্তু হচ্ছে সা¤্রদায়িক দাঙ্গা। ক্ষেতমজুর বশির আতঙ্কের সঙ্গে জানায়— ‘পাকিস্তানে হিদুঁদের লিকিন একছার কাটচে— কলকাতায় তেমনি কাটচে মোচলমানদের।’ এরপর বশির পাকিস্তানে পালিয়ে যাবার কথা ভাবতে চায় এবং ফিসফিস করে নিজেকেই যেন নিজে বলে ‘হাজার হলেও পাকিস্তানটো মোচলমানের দ্যাশ, সেখানে মোচলমাদের রাজত্ব-।’ ‘তাইলে যাস নাই কেনে? — পাল্টা এই প্রশ্নের জবাবে সে বলে— ‘আমাদের কি সায়োস হয় চাচা ঘরসংসার নিয়ে কোতাও যেতে।’ গল্পের প্রধান চরিত্র ওয়াজদ্দি বশিরের এই আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত হতে চায়না; ক্ষিপ্ত ভাষায় সে বশিরকে বলে— ‘তোর বাপ কটো? এ্যাঁ— কটো বাপ? একটো তো? দ্যাশও তেমনি একটো। বুইলি?’

ওয়াজদ্দির গ্রামীণ সরলতামাখা উক্তিতে হাসান আজিজুল হকের প্রত্যাশা হয়তো ক্ষীণভাবে উঁকি দিয়েছিলো। কিন্তু দাঙ্গায় ওয়াজদ্দি নিহত হবার ফলে লেখকের অভিজ্ঞতার রায় বিপরীত দিকেই ঢলে পড়ে। সেই প্রাপ্তি বা বাস্তবতা হল এই : সাধারণ মানুষের সরলতা ও আশাআকাক্সক্ষা রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতার কাছে পরাজিত। আধুনিককালে রাজনীতি যে মানবভাগ্যের পরিচালিকা-শক্তিতে পরিণত হয়েছে ‘পরবাসী’ তার প্রমাণবহ। প্রসঙ্গত, উদ্বাস্তু সমস্যার প্রতিফলন এখানে ঘটেছে ভিন্নভাবে। বশির পাকিস্তানে পালাতে চেয়েছিলো, ওয়াজদ্দি দৃঢ়কণ্ঠে তার প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু ভারতকে মাতৃভূমি বলে অন্তর থেকে মেনে নিয়েছিলো যে ওয়াজদ্দি, দাঙ্গায় শোচনীয়ভাবে সেই ওয়াজদ্দিরই মৃত্যু ঘটেছে। বশির দেশান্তরী হয়নি, ওয়াজদ্দি হতে চায়নি; আত্মজা ও একটি করবী গাছের কেশোবুড়ো হয়েছিলো; এবং স্বয়ং হাসান আজিজুল হকও হয়েছিলেন। এখানেই আর্থসামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের দাবি জোরদার হয়ে ওঠে।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, এদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন রকম। কেশো বুড়ো একেবারে বিত্তহীন এবং ভূমিহীন। সে প্রমাণ করেছে ভূমিহীনদের জন্য ভৌমিক স্বাধীনতার কোনো অর্থ নেই। সেই তুলনায় বশির ও ওয়াজদ্দির অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো— অল্প হলেও জমিজমা তাদের আছে, শ্রমবিনিয়োগের ক্ষেত্রও আছে। অতএব উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তার পাড়ি জমানোর সাহস তাদের নেই, থাকার কথাও নয়। আবার উদ্বাস্তু সমস্যাকে জয় করবার সহায়সঙ্গতি হাসান আজিজুল হকের ছিলো। তাঁকে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষই বলা চলে। তাই, ভূমি বিনিময়ের মাধ্যমে পারিবারিকভাবে তারা মানচিত্র বদল করতে পেরেছিলেন। কিন্তু নিবাস পাল্টালেও মনমানসিকতা পাল্টানো সহজ নয়। অতএব উদ্বাস্তু মানসিকতা ও ছিন্নমূল অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাচেতনা ও বিবেককে যন্ত্রণা দিয়েছে। লেখকের এই দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সুবীর রায় চৌধুরী মনে করেন যে, দেশবিভাগের সাম্প্রদায়িক দিকটি হল ঘটনার বহির্কাঠামো। মূল সমস্যা হলো জীবনবিরোধী সংকীর্ণতা এবং মানববিরোধী স্বার্থমগ্নতা।

এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক; কিন্তু সুসম্পূর্ণ নয়। কারণ হাসান আজিজুল হক শ্রেণী-বৈষম্যসচেতন রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত একজন লেখকও বটে। আত্মভাষ্যমূলক ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’ তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। ‘গল্পের জায়গাজমি মানুষ’ শীর্ষক রচনায় তার প্রাক্তন নিবাস রাঢ়ের জীবন সংগ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে নানা পর্যায়ে তিনি আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন : ‘এদের কেউই মানুষের জীবন কাটালোনা। সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি ইত্যাদি কথা তোলা তো ইয়ার্কি করা ছাড়া আর কিছুই হবেনা-পশুর সঙ্গে মানুষের জীবনের যদি কোনও ভেদরেখা থেকে থাকে, সেটা এদের কাছে একেবারে লেপেমুছে গেছে।’

৭.

যাঁরা সংস্কৃতিগত ঐক্যকে শ্রেণীস্বার্থে ব্যবহার করতে চান, তাঁদের সম্পর্কে এই লেখকের মন্তব্য : ‘এই নিয়ে শহুরে শিক্ষিত মাঝারি ভদ্রলোকেরা করেন ভণ্ডামি— চোখে তাদের সামান্য বাষ্প আসে আর উপরতলার এরা করেন রাজনীতি।’ একই দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদেরকেও তিনি সমালোচনার বাইরে ভাবেননি— ‘সমাজ থেকে জীবন থেকে আমাদের দেশের জীবনপ্রবাহের মূলধারা থেকে শিক্ষিত মানুষের এই সামগ্রিক ও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার ব্যাখ্যা কোথায়! শিক্ষিত মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি আর পাণ্ডিত্য সমস্ত সমাজের পটে হাস্যকর গলগণ্ডের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

উক্ত উপলব্ধির ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন লক্ষ করা যায় বিশ বছর আগে লেখা ‘মারী’ গল্পে। শাসকগোষ্ঠীর প্রহসনমূলক সেবা এবং রাজনীতির কুটিল প্রভাব ও দুর্নীতি উদ্ঘাটন ঐ গল্পের মূল লক্ষ্য।

সামাজিক ন্যায়হীনতা আমাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে তীব্র ও ত্বরান্বিত করে তুলেছে। এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় মধ্যবিত্তশ্রেণীর নরনারীভিত্তিক গল্প ‘সারাদুপুর’, ‘অন্তর্গত নিষাদ’, ‘উটপাখী’ ও ‘সুখের সন্ধানে’ নামক গল্পে। গল্পগুলো পড়লে বোঝা যায়, বেঁচে থাকার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যে অসঙ্গতি— তার কার্যকারণসূত্র অনুমানের অতীত নয়।

‘অন্তর্গত নিষাদ’-এর নায়ক নগরবাসী একজন কেরানী। শিক্ষিত; হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান এ্যান্ড দি সী’ও তাঁর পড়া, —সেহেতু সচেতন মনের মানুষ। সে দারিদ্র্যবিদ্ধ, অথচ বিত্তনির্ভর স্বচ্ছলতার আনন্দ সে দেখেছে, যা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। অন্যের উপার্জনকে স্ফীত করার স্বার্থে নিজের জীবনের সকালসন্ধ্যাকে সে বন্ধক রেখেছে। সে শোষিত জনগণেরই শিক্ষিত ও নাগরিক প্রতিনিধি মাত্র।

চালচিত্রের খুঁটিনাটি গ্রন্থে বর্ণিত সরকারপন্থী এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী এই গল্পের নায়কের সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করা যেতে পারে। সেখানে পরশ্রমজীবী একজন ব্যক্তি বলেছেন— ‘আখমাড়াই কল যেমন আখের রসটুকু নিংড়ে ছিবরেটা বের করে দেয়, ঠিক সেভাবেই আমি ওদের শ্রম নিংড়ে নিচ্ছি। … ওদের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই অথচ শ্রম ঠিকই ঢেলে যাচ্ছে। … কাজেই ওদের স্রেফ টিকিয়ে রাখার দায়িত্বটা নিলে লাভ তো আমারই।’

এই স্বীকারোক্তির আলোকে বলা যায়, গ্রাম ও শহরে উৎপাদন ব্যবস্থা পৃথক হলেও শোষণের পাত্ররূপে কৃষক-শ্রমিক-কেরানীতে কোনো ভেদ নেই। তবে শিক্ষার সুবাদে শোষণের কলকবজা চিনতে পারলে শোষিতের যন্ত্রণা আরও বাড়ে। সেই যন্ত্রণাই নিষাদ বা শিকারীরূপে বসবাস করে বঞ্চিত মানুষের মনে। তখন সে প্রতিবাদী আচরণ করতে পারে; মানসিক প্রতিবন্ধীর মতোও আচরণ করতে পারে। ‘অন্তর্গত নিষাদ’ গল্পের নায়ক অনেকাংশে দ্বিতীয়োক্ত ধারার।

গল্পের নায়ক আত্মহত্যা করেছিলো। কিন্তু আত্মবিনাশের আগের দিন আরব্যরজনীখ্যাত একদিনের বাদশাহের মতো সে জীবন যাপন করে নিয়েছিলো। বেতনের সমস্ত টাকা একদিনেই উজার করে খাওয়াদাওয়া করলো, ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামা কাপড় এবং ঘরের জন্য এটাসেটা কিনলো। বদলে ফেললো বিছানার চাদর, পান খেলো, সিগারেট খেলো, ঘরের সবাইকে জড়ো করে সুখী মানুষের মতো করলো গল্প-তামাশা, রাতে শুয়ে পড়লো বৌয়ের গলাজড়িয়ে এবং সকালে ঘরের কড়িকাঠে ঝুলতে দেখা গেলো তার লাশ।

দারিদ্র্যখচিত জীবনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একটি সুখীদিন নির্মাণের এই আলেখ্য রীতিমতো লোমহর্ষক। হয়তো সেই চরিত্র অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের শিকার, কিন্তু এই ক্ষেত্রে লেখকের ইশারা অর্থনৈতিক পীড়নের দিকে বলে ধারণা করি।

৮.

রাঢ়গ্রামের কেশোবুড়োর তুলনায় বশির ও ওয়াজদ্দির অবস্থা ভালো। আবার ‘অন্তর্গত নিষাদে’র নিম্নবিত্ত কেরানীর চেয়ে ‘উপপাখী’র সংস্কৃতিজীবী লেখক অনেকাংশে স্বচ্ছল। এই নায়ককে কেন্দ্র করে হাসান আজিজুল হকের সমালোচক মন নিজের শ্রেণীর বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছে বলে মনে হয়।

এই লেখক অনিকেত মনোভাবাপন্ন এবং আত্মবিচ্ছেদের শিকার। বুদ্ধীজীবীসুলভ সমাজ বিচ্ছিন্নতার গ্লানি এমনভাবে তাকে গ্রাস করে ফেলে যে, মৃত্যু তার নৈমিত্তিক চিন্তায় পর্যবসিত হয়। তার মনে তার আত্মায়, তার সত্তায় মৃত্যু সারাক্ষণই ভর করে থাকে।

কেশোবুড়োর জীবনে স্বাধীনতা অর্থহীন প্রতিপন্ন হয়েছিলো। ‘অন্তর্গত নিষাদ’-এর নায়কের জীবন ছিলো অসার্থক। কিন্তু ‘উটপাখী’র নায়ক, যিনি একজন লেখক, -তাঁর কাছে জীবনটাই হয়ে উঠল অর্থহীন। তাঁর জীবনযন্ত্রণা এতোই সূক্ষ্ম যে, করবী ফুলের বিচি বা কড়িকাঠে তার সমাধান নেই।

লেখককে নিয়ে গল্প ফাঁদতে বসে সমাজব্যবস্থার কাছে মানুষের অসহায়তা তাকে দ্বন্দ্বজর্জড়িত করে। তাই নগর-সংস্কৃতিজীবীর প্রতীকরূপে হাজির হয় ‘উটপাখী’ ; যে পাখি বালিতে মুখ গুঁজে মরুঝড়ের বাস্তবতাকে এড়াতে চায়। ‘গল্পের জায়গাজমি মানুষ’ শীর্ষক রচনায় ঐ জাতীয় বুদ্ধিজীবী লেখকদের উদ্দেশ্যে তিনি যেন মুখর হয়ে ওঠেন— ‘উৎসবের দিন বলে সাধ্যমতো ক্ষারে কাঁচা হাফশার্ট ইত্যাদি পড়ে এসেছে, জবজবে করে তেলও মেখেছে। এক এক করে এদের সকলের মুখের দিকে চেয়ে অকস্মাৎ ঝলকের মতো একটা প্রায় আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আমার হয়ে যায়। উপলব্ধিটা হলো : এদের কেউই মানুষের মতো জীবন কাটালোনা। সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি ইত্যাদি কথা তো ইয়ার্কি করা ছাড়া আর কিছুই হবেনা— পশুর সঙ্গে মানুষের জীবনের যদি কোথাও কোনো ভেদরেখা থেকে থাকে, সেটা এদের কাছে একেবারে লেপেমুছে গেছে।’

এই ভাষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘উটপাখী’ তুল্য নায়ককে সমালোচনার কড়িকাঠে ঝুলিয়ে দেয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু বিচারকালে ষাটদশকের রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিবেকবান বুদ্ধিজীবীদের জন্য আইয়ুবী আমলে (১৯৫৮-৬৯) চরম দুর্দিন গেছে। প্রতিটি মুহূর্তে তখন রচিত হচ্ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতার মৃত্যু, বিবেকের দহন ও দমন। নায়ক চরিত্রে তার পরোক্ষ প্রতিফলন ঘটেছে বলে আমাদের ধারণা। তখন বুদ্ধিবৃত্তি ও বিবেকের ক্ষমতা ‘উটপাখী’র ডানার মতোই সীমাবদ্ধ ক্ষমতার গ্লানিতে ভারাক্রান্ত ছিলো।

প্রসঙ্গত আত্মবিচ্ছেদের ব্যাপারটিকে কেবল তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবেনা; এটি আধুনিক বিশ্বেরই নেতিবাচক একটি প্রতিক্রিয়া। মনোব্যাধি রূপেও যদি এটাকে দেখতে চাই, তাহলেও খেয়াল রাখতে হবে যে, আত্মবিচ্ছেদের যন্ত্রণা কেবল পরিণতবয়স্ক ও পরিণতবুদ্ধির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা; সেই যন্ত্রণা বয়স ও বুদ্ধিকে অতিক্রম করে যায়। কেননা আত্মবিচ্ছেদের ক্রিয়াবিক্রিয়া সংবেদনশীলতার নিরিখে মূর্ত হয়। ‘সারা দুপুর’ গল্পে এর পরিচয় পাওয়া যায়।

উক্ত গল্পে দেখা যায়, আধুনিকতার নামে পিতামাতার ভোগবাদী জীবনযাপনের খেসারত দিতে হয়েছে নিরীহ এক কিশোর সন্তানকে। তাদের ব্যাভিচারের যে আনন্দ, তার ক্লেদ কিশোর কাঁকনের মনকে বিষাক্ত করে দেয়। ‘মাকে পরপুরুষের অঙ্কশায়িনী হতে দেখে কিশোর সন্তানের মনে যে অভিঘাত রচিত হয়, তার সঙ্গে প্যারিসের বালক বোদলেয়ারের যন্ত্রণাগত কোন পার্থক্য নেই। ক্লেদজ কুসুম (১৯৫৭) রচনার মধ্য দিয়ে বোদলেয়ার কিঞ্চিত উপশম হয়তো অর্জন করেছিলেন। কিন্তু কিশোর কাঁকনের যন্ত্রণার উপশম ঘটেছিলো আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। দুজন দুভাবে ধ্বংসের পথ বেছে নিলেও আত্মবিচ্ছেদের প্রশ্নে দু’জনের মর্মবেদনার দূরত্ব নেই বললেই চলে।

মানুষের জীবনতৃষ্ণার অপরপিঠেই যেন রয়েছে অবদমিত মৃত্যুতৃষ্ণা। সেটা ব্যক্তিভেদে নানাভাবে প্রকাশ পেতে পারে।

কেশোবুড়ো মৃত্যুকে কবরীগাছের আদলে আগে থেকে রোপন করে রেখেছিলো। ‘অন্তর্গত নিষাদ’-এর নায়ক একটি দিনের সুখকে অমর করে রাখার জন্য বিড়ম্বিত জীবনের সম্প্রসারণকে মৃত্যু দিয়ে রুখে দিয়েছিলো। কিশোর কাঁকনও আত্মার পবিত্রতা রক্ষার উদ্দীপনায় মৃত্যুকে বরণ করেছিলো। আর ‘উটপাখী’ গল্পের পরিশীলিত নায়ক মৃত আত্মা নিয়ে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর জীবনের ভার বহন করে চলেছিলো।’

সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক বিচারের শিল্পিত কৌশল আত্মজা ও একটি কবরীগাছের অন্যতম উজ্জ্বল দিক। এই ক্ষেত্রে লেখকের দক্ষতা আমাদের গল্পসাহিত্যকে উচ্চতর মাত্রায় উন্নীত করেছে বলা যায়। এইসূত্রে অন্যলেখক থেকে তাঁকে গুপ্তভাবে পৃথক বলেও মনে হয়।

এরপরও বলবো, প্রশংসনীয় কলাকৌশল সত্ত্বেও লেখকের স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয় মাটি ও মানুষকে নিয়েই বেশি। তাই বারবার তাঁকে ফিরে আসতে হয় নিজস্ব অভিজ্ঞতার পরিমণ্ডলে, উত্তরের জনজীবনে, এবং তাঁর ভাষায় ‘অন্যায় পীড়িত ৯৫ ভাগ মানুষের কাছে’ (দ্র : ‘গৌড়ী, কুষ্টিয়ার প্রদত্ত ভাষণ)। গ্রন্থের শেষতম ও দীর্ঘতম (পৃ : ৭২-১০২) গল্প ‘আমৃত্যু আজীবন’ তার সাক্ষ্যবহ।

শোষিত কৃষকদের সংগ্রামশীল জীবন এর প্রতিপাদ্য বিষয়। একজন কৃষকের চাষের গরুটা যখন সাপের কামড়ে মারা পড়লো, তখন একটি কৃষিপরিবারে বজ্রপাতের মতো নেমে এলো অনিশ্চয়তার হাহাকার। এর তুলনায় সন্তানের মৃত্যুও যেন বেশি গ্রহণযোগ্য ছিলো। করমালির আর্তিতে অন্যদের শঙ্কাপূর্ণ ভবিষ্যতও যেন দুলে উঠে। …‘আমার তো জমি নেই এক ছটাক— মোডে জমি নেই আমার। যেটুন আছে, তাতে একটা মাসও চলেনা। দামড়া দুডো ছিলো তাই পরের জমি আবাদ করে দুডো ধান পাই। এ্যাহন, এ্যাহন আমার ধলা গেল আমি কি করবানে। …মৃত গরুটাও এই যন্ত্রণার সহানুভূতিতে আর একটু হাঁ করে একপাশে তার কালো জিভ এলিয়ে দেয়।’

অতঃপর গরু কেনার জন্য একমাত্র জমিটুকু বন্ধক দিতে হয় তাকে যদিও ঋণ শোধের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যে টাকা দিলো তার চোখেমুখে সেই গোক্ষুরের ঝিলিক। হাসান আজিজুল হক অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সম্বল-সংহারক সাপের সঙ্গে শোষকদের তুলনা করেন।

চাষের জমিতে ফণাতোলা গোখরাকে দেখে করমালির ছেলে ভয়ে কাঁপছে। অথচ করমালি যেন ভয় পেতেও ভুলে গেছে; আত্মরক্ষার উদ্যম নেই, প্রত্যাঘাত করার উদ্যোগ নেই; অনেকটা সমীহভাব নিয়ে সে নির্বিকার। ভীত সন্ত্রস্ত ছেলেকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে ‘কেউ মারতি পারেনা। ওরে মারা যায়না কোনোদিন।’

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে পারি, এই লেখক তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘শকুন’-এ সুদখোর মহাজনদের শকুনের সাথে তুলনা করেছিলেন। এ থেকে লেখকের চিন্তাচেতনার একটি ধারাবাহিক পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। শ্রেণীবিভক্ত সমাজের শোষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের অভিজ্ঞান পরিচ্ছন্নই কেবল নয়, পরিশীলিতও বটে। তাই প্রতিবাদের চেতনা পাঠকচিত্তে সঞ্চারিত করার স্বার্থে অতিনাটকীয় কোনো মীমাংসা তিনি টানেননা; জমিদার-জোতদারকে ঐ গোখরোর কামড় খাইয়ে আকস্মিকতার দ্বারা মলিন করতে চাননি তিনি। কেননা হাসান আজিজুল হক শুধু সমাজকে আঁকতে বসেননি, শিল্পও রচনা করতে চেয়েছেন।

রাঢ়ীয় জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখকের স্বীয় বক্তব্য এ প্রসঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে। — ‘আমার লেখা এই হলো জায়গাজমি মানুষ। এইসব বর্ণনা করাই কি শিল্প? যেমন আছে, তেমনি নগদ বর্ণনা? তা মনে হয়না। তবে এই হচ্ছে ভিত্তি। এটা জানা থাকলে দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবন কাঠামো জানা হয়ে যায়। কিন্তু মানতেই হবে এই জানার সঙ্গে সাহিত্যশিল্পের কাজের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ খুব স্পষ্ট হয়না। …সাহিত্যে শিল্পী আত্মপ্রকাশেরই চেষ্টা করেন বটে। তবে শিল্পী নিছক ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বাঁধা তাঁর স্বতন্ত্র জগতেরই প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেন তিনি।’

৯.

ক.লেখকের অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞানের শিল্পিতরূপায়ণ পর্যালোচনা করে আমরা কয়েকটি ধারণায় উপনীত হতে পারি, যা গল্পকার হিসেবে হাসান আজিজুল হকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দ্যোতক। লেখকের জন্ম রাঢ় অঞ্চলের এমন একটি গ্রামে, যেখানে জীবনযাপনের অর্থই হলো জীবনসংগ্রাম। এই অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাচেতনা দৃষ্টিভঙ্গিকে অবিরাম প্লাবিত ও পরিচালিত করেছে। পরিণত বয়সে উপর্যুক্ত জ্ঞানচর্চাও অনুসন্ধিৎসার ফলে সমাজগঠন ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর ধারণা সুসংহত হয়। তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার কারণে সমাজের সঙ্গে দায়বদ্ধতার সম্পর্ক বোধ করেন। তাঁর বিবেক অবিচ্ছিন্নভাবে শোষিত মানুষের অনুকূলে অবস্থান গ্রহণ করে। এই সূত্রে বুর্জোয়া সাহিত্যধারা থেকে তিনি পৃথক।

খ.সমাজদর্শনচর্চার ফলে স্বাতন্ত্র্যের আরও একটি বৈশিষ্ট্য তিনি অর্জন করেছেন। সেটা হলো : সমাজমনস্তত্বের সঙ্গে ব্যক্তিমনস্তত্বের মিথস্ক্রিয়া। এর ফলে তাঁর রচনাকর্মও ভিন্নমাত্রা অর্জন করেছে।

গ.বাঙালি-মুসলমান লেখকদের মধ্যে শরণার্থী বা রিফিউজির সংখ্যা নিতান্ত বিরল। ফলে সুবীর রায় কথিত উদ্বাস্তু-মানসিকতা তাঁর গল্পে ভিন্নতর স্বাদ আনয়ন করেছে।

আমরা দেখেছি, উপন্যাসশিল্পের শ্রেণীকরণের মধ্যে আঞ্চলিক উপন্যাস স্বীকৃত আসন লাভ করেছে। যদি আঞ্চলিক গল্পকেও স্বতন্ত্র আঙ্গিকের মর্যাদা দেয়া হয়, তাহলে তা আলোচিত গল্পগ্রন্থ আত্মজা ও একটি করবী গাছ-এর প্রাপ্য। জেম্স্ জয়েসের (১৮৮২-১৯৪১) ডাবলিনার্স (১৯১৪)-এর মধ্যে ডাবলিন শহর যেভাবে মূর্ত হয়েছে বলা হয়, সেরকম আত্মজা ও একটি করবী গাছ-এ আমরা রাঢ়বঙ্গের অন্তর্গত রূপ খুঁজে পাই। ভূগোল ও পরিবেশের এইরকম শিল্পসঙ্গত পরিণাম বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে চিত্রিত হয়নি বললেই চলে। এই প্রসঙ্গে আঞ্চলিক ভাষারীতিকে সফল এবং সরসভাবে প্রয়োগের কথাও যোগ করা যায়।

আধুনিক লেখক মাত্রই নগরজীবন-সচেতন; হাসান আজিজুল হকও তাই। ‘অন্তর্গত নিষাদ’, ‘মারী’, ‘সারাদুপুর’, ‘উটপাখী’ প্রভৃতি গল্পে নগরজীবনযন্ত্রণার চাহিদাও তিনি মিটিয়েছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সমাজের প্রতি তাঁর মনোযোগ অক্ষুণœ ছিলো। এটাকে নাগরিক চেতনারূপে বিবেচনা করলে লেখকের মাত্রাঘনতা আরও বেশি প্রমাণিত হয়। পরিশেষে বলা যায় যে, আত্মজা ও একটি করবী গাছ অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের রসায়নে জারিত শিল্পসম্মত জীবনবাদী একটি রচনা।

[তাসলিমা বেগম ॥ আত্মজা ও একটি করবী গাছ : পুনর্মূল্যায়ন]

অস্তিত্বের সমস্যা ও লেখালেখি ॥ মহীবুল আজিজ

মহীবুল আজিজের অস্তিত্বের সমস্যা ও লেখালেখি নিয়ে কিছু বলার আগে পুস্তক-মূলে গ্রোথিত দুখণ্ডের (১২+০৮) কুড়িটি লেখার দিকে চকিত দৃষ্টি ফেলি, তার অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে লেপ্টে আছে পূর্ণ সৃজনশীলতার ছাপ— আগ্রহ জন্মে, মনের-কেন্দ্রে জিজ্ঞাসা তৈরি হয় : ‘দুই ব্রাহ্মণ’ কে? গৌরকিশোর ত্রয়ীতে কী আছে কিংবা কেন শহীদুল জহির আছেন, পিন্টারের নোবেল বক্তৃতার পরের কথা কী, ‘অস্তিত্ব’ বা অস্তিত্ব-বিষয়ক কাঠামোর সুলুকসন্ধান কেমন হতে পারে প্রভৃতি নিয়ে। পুস্তকের শেষোক্ত অংশে বিন্যস্ত ৮টি লেখা খুব বেশি পরিশ্রমের উত্তাপে গড়া— কারণ, ওতে বিশ্বভ্রামণিক দৃষ্টিকোণ পুনর্নির্মিত; নতুন নতুন এলাকায় মানবিক প্রতিবেদনের সম্পূরকতা অবিভাজ্য দার্শনিক গুণে নির্ধারিত। গ্রন্থলেখক মহীবুল আজিজ তুমুল পরিশ্রমী, সেখানে বিশ্বসাহিত্যের প্রধান লেখক-সমালোচক করাঙ্গুলেয় প্রতিশ্র“তি অর্জন করেন, এবং নিজে এসব দেখেশুনে এক পর্যায়ে ম্যাথু আর্নল্ডকে এতদ্সংবাদে আমাদের সম্মুখে মনে করিয়ে আনেন, ‘নিন্দা নয়, পাণ্ডিত্য প্রকাশও নয়, ভালো যা-কিছু লেখা ও ভাবা হয়েছে, তার মর্ম গ্রহণ এবং নতুন চিন্তার ও নতুন কল্পনার পথ খুলে দেওয়া’(The business of criticism, he says, is neither to find fault, nor to disply the critic’s own learning or influences; it is to know `the best which has been thought and said in the world’, and by using this knowledge to create a current of fresh and free thought.)এসব ভূমিকা-পর্বের কথোপকথনে মহীবুল আজিজ গ্রন্থটির পূর্ণায়ত আখ্যায় প্রত্যক্ষ হন। প্রথম প্রবন্ধটি ‘চর্যাপদ : বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি’, এতে চর্যাপদ-পাঠ সাম্প্রতিক হয়ে উঠেছে। জানা যায়, যে কাঠামোয় ভৌগোলিক পরিখাটি তৈরি, সেখানে ‘শাসক-শোষিত’, ‘উচ্চ-নীচ’ বিপরীতাত্মক-তত্ত্বটি (নরহধৎু-ড়ঢ়ঢ়ড়ংরঃব ঃযবড়ৎু) নতুন অভিধায় চিহ্নিত হয়। মৌর্য-শশাঙ্ক-পাল-সেন শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস চর্যাপদের চরিত্রদের নিরিখ গ্রন্থিত করে। ড. আজিজ তৈরি করেন আর্থ-নীতির ইতিহাস, সমাজ-চিন্তার সৃজনশীল পাঠ-কাঠামো আর বিদেশী পরিব্রাজকগণের বয়ান-কাঠামোয় তৈরি করেন কৌম-সংস্কৃতির বিস্তৃত জীবনধারা। অভিপ্রয়ান উপপ্লবের সারাৎসার চিহ্নিত হয়। আজিজ লেখেন : ‘মৌর্য যুগে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারণা মধ্য ও পূর্ব ভারতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে পালন করে যুগান্তরের ভূমিকা।… বৌদ্ধধর্মের তুলনামূলক সহজ তাত্ত্বিক-দার্শনিক দিকগুলি সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করে এবং চতুর্বর্ণে বিভক্ত সমাজের নীচের দিককার শ্রেণীতে এ-ধর্ম গৃহীত হয় সাদরে।… সেন-শাসনোত্তর তুর্কী-বিজয় এবং সুলতানী আমল প্রভৃতি পেরিয়ে বাংলার নৃতত্ত্ব ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।… — এ পর্যায়ে সাহিত্যেও সেরূপেই চরিত্র রচিত হয়েছে। মনসা-চণ্ডীদেবীরা মানবীরূপে আসেন কিন্তু চর্যার মানবীরা আরও অধিক-পূর্বের কিন্তু তবুও তারা রয়ে যান দেবতার-মাহাত্ম্যের অনেক ঊর্ধ্বে ততোধিক মানবীরূপে। মুকুন্দরাম ও মানিককে তুলনায় এনে দুই সমাজের স্তরকাঠামোর ধারা উৎকীর্ণ করেন কিন্তু পিছিয়ে যান না, পুঁজি-কর্পোরেট সংস্কৃতির স্বরূপ, শোষণের প্রান্ত, আগ্রাসনের অভিমুখ সর্বোপরি মানবসত্তার জরুরি নির্দেশ ও অনিবার্য সংকেত প্রতিচিত্রিত করেন গ্রন্থকার। এটি ভিন্নতর বিশ্লেষণ। সৃজনচর্যার অভিনব প্রান্তমুখ। ইউটোপীয় রাজ্যের সংজ্ঞার্থ ‘গুজরাট’-নগর বা ‘ময়নাদ্বীপ’ পরতকথায় অভিনেবিশত। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাম্য’ মহীবুলের লেখায় নিবিড় গ্রন্থনা পেয়েছে। মার্কসের সাম্য নয়, স্টুয়ার্ড মিলের ইউটিলিটি-দর্শনের প্রতি বঙ্কিমের আকর্ষণ ছিল। উনিশ শতকের বুদ্ধিজীবী হিসেবে বঙ্কিম যে সমাজকাঠামোর চিন্তা করেন— তা পাশ্চাত্য মনীষা থেকেই গৃহীত এবং একইসঙ্গে তাঁর শিল্পপ্রতিভার স্তর-কাঠামোতেও সাম্য-সমাজতত্ত্বের নির্দেশনা ছিল। শিল্পীজীবনে বঙ্কিম এক আধারে অনেক স্ফূলিঙ্গের সৃজন করেছেন। সেখানে সমাজের দ্বন্দ্ব ও অভিঘাতই প্রধান, মানুষধর্ম উৎসকেন্দ্র। এ নিয়ে ওই কালের নিরিখে তর্ক-প্রতর্ক-বিতর্ক আছে কিংবা একরকম নিজেও হয়তো সংস্কারজালে বাধা পড়েছেন, পেছনের টানে কখনো তল্পিতল্পা গুটিয়েছেন কিন্তু মেধার কারুণ্য অবসিত হয়নি। গৌরকিশোর ঘোষের ত্রয়ী-উপন্যাস নিয়ে লেখা রচনাটি নতুন আস্বাদে উপভোগ্য। সময়খণ্ডটি নবতররূপে চিত্রিত। সময়ই চরিত্র। যুগান্বেষণই চরিত্রের ধর্ম। ১৯২২-২৬, ১৯৩৫-৩৭, ১৯৯০ সময়খণ্ডের গ্রন্থন যথাক্রমে জল পড়ে পাতা নড়ে, প্রেম নেই, প্রতিবেশী উপন্যাস। প্রবন্ধকার কাহিনি-চরিত্রের বয়নকাঠামোর ভেতরে রাজনীতি ও ইতিহাসের গতিক্রম নির্ণয় করেন। উপন্যাসের প্রলুব্ধতা কী? শর্তচিহ্নইবা কীভাবে তৈরি! প্রবন্ধকারের লেখায় তার উত্তর আছে। বাংলাদেশের উপন্যাসের স্যবলটার্ন চরিত্র চর-নদী-সমুদ্রপবর্তী মানুষের জঙ্গমতায় নির্দেশিত। পক্ষ-প্রতিপক্ষ নয় শোষক-শেষিত দৃষ্টির তাপ ওই জঙ্গমী চরিত্রের অভিমুখ তৈরি করেছে। উপন্যাসের বাস্তবানুগ সিদ্ধিও আছে বর্ণনায়। শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাস ‘ভাটি অঞ্চলের অস্তিত্বের সংগ্রাম’ প্রবন্ধটির অকুস্থল। কিন্তু আলোচনার ক্রমিক-তুলনায় এসেছে সারেং বৌ কিংবা লাল সালু উপন্যাস। একইভাবে শহীদুল জহিরের উপন্যাস-গল্প আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি তুলনায় আনেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বা মামুন হুসাইন। তুলনামূলক ডিসকোর্স অসামান্য হয়ে ওঠে গ্রন্থকারের সৃজনশীল সমালোচনার ভেতর। বিদগ্ধতার ভার নয়, মহীবুল স্বতঃস্ফূর্তভাবে তুলনামূলক কর্ম-কাঠামোর বয়ানটি বুনে দেন যৌক্তিক শৃঙ্খলার ভেতর। শহীদুল জহির সাম্প্রতিক সময়ের লেখক, তার ভাষা-চিত্রকল্প বিবরণও নতুন, দর্শনও আলাদা। ভেতর ও বাহিরের স্বরের যোজনা দুর্দান্ত। মহীবুল নিজেও স্পর্ধিত কথাকার, ফলে সহকর্মীর সাম্প্রতিক বয়ন-কাঠামোর অনেক নতুন সন্ধান মূর্তমানতা পায়— তাঁর বয়ানে, ‘কথা ও কথকতার বাস্তবতা’ সেরূপ রচনা। নিজস্ব প্রয়াম-বিবরণী তৈরি—শহীদুল জহিরের লেখা নিয়ে। স্বল্পপ্রজ, বিরল শহীদুল জহির অনন্য কথকরূপে— কিন্তু কথকের অনন্যতা কীসে? এখানে তার সম্বিৎ স্বয়ম্প্রকাশ।

গ্রন্থকার মহীবুল আজিজের কবি ও কবিতা বিষয়ক বেশ কিছু প্রবন্ধ এতে বিন্যস্ত হয়েছে— তালিকায় আছেন, শামসুর রাহমান, দাউদ হায়দার, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্। লেখক তাঁদের কবিতা ও কবিমনস্কতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বলে নিই, কবির ক্রমোন্নতি, নান্দনিকতা তার লক্ষ্যবিন্দু। ড. মহীবুলের গ্রন্থে কবিমানস ব্যাখ্যানে পরিপ্রেক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাতে কবির বলনের সঙ্গে চলন, চেতনাদর্শ-সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র অংশীদার হয়। ফলে, শামসুর রাহমানের ব্যক্তি-রুচি ও সংস্কৃতি, সাইয়িদ আতীকুল্লাহর স্বৈরশাসনের প্রতি ঘৃণা আর দাউদ হায়দারের ‘নির্বাসিত’ প্রণায়াম কবিতার ভেতর একত্রিত হয়। কবিতাগুলো নিছকত্ব বা বায়বীয়তা পরিহার করে চলতি আলো-হাওয়ার প্রদীপে প্রদীপ্ত হয়। গ্রন্থকার নিজেও লেখক, সুতরাং লেখকশৈলির প্রতিপাদ্য সম্পর্কে কেন কী-র প্রশ্নটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সে মর্জিটি তিনি এতে চিনে নেন, বুনে দেন। ফলে দস্তয়ভস্কির উপন্যাস, শিম্বর্সকার কবিতা, নাওয়াল সাদাওয়ির ব্যক্তিত্ব সম্পূরক হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, সমালোচনার এই প্রবণতাটিই মুখ্য, কারণ শিল্প বিভিন্ন মাধ্যমে যে নান্দনিকতা প্রতিশ্র“ত করে— তাতে চেতন-অবচেতনের ভেতর দিয়ে তার অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধির দর্শনই স্থাপিত হয়, এবং নিশ্চয়ই তা নানা মাপে বা কেন্দ্রিকতায় দীপিত হতে পারে এবং তা বিবর্তমান রুচি ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে নয়— স্বীকারে নিয়েই। “সাহিত্যিকের দায়” প্রবন্ধে লেখক এ কথাটিই বলেছেন। মহীবুলের “সাহিত্যের তত্ত্ব” নিয়ে লেখাটি বেশ আগে আমার চোখে পড়েছে। সাহিত্যতত্ত্বালোচনায় তিনি কোনো বৃত্তে আটকান নি, বিশেষ করে পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব আর প্রাচ্যতত্ত্ব এ পর্যায়ে ঠিক যে আলাদা করে বিচার করা সম্ভব নয়— সেটা বুঝি এখন মানতেই হয়। কারণ, একালে যে সব তত্ত্ব তৈরি হচ্ছে তা অনেকটাই তো পূর্বের পুনর্নির্মাণ। সেটি নবায়ন করেই সব তত্ত্ব চলছে। কলোনিয়াল ডিসকোর্স ছাড়া যেমন পোস্ট-কলোনিয়াল ডিসকোর্স ঠিক করা যায় না তেমনি পোস্ট-কলোনিয়াল ডিসকোর্স আলোচনায় আসলে লোকসংস্কৃতির আধুনিক মণ্ডনটি কীভাবে অস্বীকার করা যাবে? রোলা বার্থ কিংবা হোমি ভাবা যে ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্ব হাজির করেছেন তাতেও ইস্ট-ওয়েস্ট মিশেল ছাড়া চলে কী করে! যেটা বলতে চাই, গ্লোবালাইজেশন তত্ত্বকে ‘হেজিমনি তত্ত্ব’ বললেও এর ভেতরে গ্লোবাল-নিরপেক্ষতাও আছে। তাতে করে ‘ম্যাজিক রিয়ালিটি’ কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের তত্ত্ব হয়ে যায় না।

অধ্যাপক ও লেখক মহীবুলের প্রবন্ধগ্রন্থটিতে কিছু ‘ইনফর্মাল’ লেখা বেশ চিত্তাকর্ষক ও জানা-শোনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইবসেন, পিন্টার কিংবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও আনিসুজ্জামান এ লক্ষ্যের প্রতিপাদ্য। এর মধ্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ নিয়ে লেখাটি একাডেমিক হয়েও নন-একাডেমিক। তবে নিশ্চয়ই কোনো লেখাকে এভাবে লেভেল আঁটার যায় না, কিন্তু পঠন-পাঠনে এ গ্রন্থকার প্রশ্নটি উস্কে দিতে সক্ষম হয়েছেন যে— কেন এঁদের পাঠ জরুরি। কেন এঁদের প্রয়োজন কোনো সময়ে ফুরোবে না। এসবের প্রয়োজনের ভেতর দিয়ে মহীবুল পাঠক সমাজকে চিনে দেন এবং সে চেনার ভেতর ভিন্ন জ্ঞান-পরিসর তৈরি করেন— তাতে শেক্সপীয়ার বা রবীন্দ্রনাথের যেমন গুরুত্বপূর্ণ— কখনোই শেষ হবার নয় তেমনি চলতি সমাজের মনীষীদেরও কালরথে সংশ্লিষ্ট করা জরুরি— যে কারণে, ইবসের প্রয়াণ-শতবর্ষেও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। যথারীতি এধরনের লেখায়ও মহীবুল বলেন :

তরুণ ইবসেনের পাঠ্যসূচিতে থাকে শেক্সপীয়ার, ওলেন্সলাগার, কিয়ের্কেগার্ড, ভোলটেয়ারের মত লেখকদের জীবনী। ১৮৪৮ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যুগে তিনি টগবগে তরুণ। সৃজনস্পন্দনে কম্পমান ক্লান্তিহীন। ১৮৪৭-এ একটি কবিতা রচনা করেন তিনি যেটির নাম দেন ‘সমর্পণ’। কবিতাটিতে সন্দেহ এবং আশার দোদুল্যমানতা চিত্রিত।

এভাবে প্রায় সব প্রবন্ধেই তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আর নির্ধারিত লেখক রচনার সম্পৃক্তি নির্ণয় করেন। এ পাঠ যৌক্তিক এবং পূর্বাপর নির্ধারিত। স্মরণে নিই, যদি তাঁর কথাসাহিত্য বা কবিতা নিয়ে আলোচনা পড়ি সেখানেও দেখা যাবে দক্ষিণ মৈশুন্দি কিংবা পাস্তারনাক, রোকেয়া, ইলা মিত্র বা বঙ্গবন্ধু অন্য তলে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। সর্বসাকুল্যে বলতে চাই, মহীবুল আজিজের বক্ষ্যমান গ্রন্থটি মূল্যবান হয়ে ওঠে দুটি প্রস্তাবনায় : এক. বিষয়-শিরোনাম নির্ধারণে নির্বাচনবিন্দু, দুই. প্রতিটি আলোচনাকে বৈশ্বিক আর্থ-সংস্কৃতির সম্পূরকতায় যাচাই করবার প্রয়াস। এক্ষেত্রে তাঁর কোনো লেখকই কোনো আঞ্চলিকতায় বা উপরিতলের ম্যাটমেটে সাদা-সরল ব্যাখ্যানে আটকান নি। শামসুদ্দীন আবুল কালামের চর-নদীর অঞ্চলভিত্তিক উপন্যাসালোচনায়ও জাগিয়ে দিয়েছেন জঙ্গম ও সংক্ষুব্ধতার কালজয়ী সাক্ষ্যে।

অস্তিত্বের সমস্যা এবং লেখালেখি— এ কালের সত্তাভিত্তিক মানুষের অস্তিত্বিক পাঠালোচনা। বইটির প্রতিটি প্রবন্ধ সুখপাঠ্য ও আনন্দদায়ী। যেহেতু কোনো লেখাই লেখকের কাছে ‘গজদন্তের মিনার’ নয়— তাই সেটি পড়তে পড়তে এক সঙ্গে অনেকগুলো পাঠ এখানে তৈরি হয়ে যায় এবং অনেককিছুর ভেতর দিয়ে পাঠকের অবগাহনের সূত্রপাত ঘটে। ‘অস্তিত্ব’ চিহ্নিত হয়, বিশ্বনাগরিক অস্তিত্বকে আমলে নিয়ে। বইটির প্রসার ঘটলে, আখেরে পাঠকই লাভবান হবেন।

[শহীদ ইকবাল ॥ অস্তিত্ব, বিশ্বনাগরিক : সমস্যা ও লেখালেখি]

লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা ॥ হাফিজ রশিদ খান

লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা— কবি হাফিজ রশিদ খান-এর কাব্যগ্রন্থ। শিরোনামটা পড়তেই একটা প্রাচীন গন্ধ নাকে এসে লাগে। এক পরাজিত সময়, কিছু রক্তমাখা ঘটনা চোখের সামনে এসে ভেতরের আমিত্বকে নাড়িয়ে যায়। গ্রন্থের ভেতরেরটা জানার একটা আগ্রহ এসে ভর করে পাঠকের মনে। সেটার সাথে সময়ের সহজলভ্যতা বা সহযোগিতা যোগ হলেই শিরোনাম-আবিষ্ট পাঠক আর একটা মুহূর্তও নষ্ট না করে ঢুকে পড়ে কালো অক্ষরে অক্ষরে সাজানো অচেনা মানসচিন্তাকে আবিষ্কার কিংবা অনুবাদ করতে। লর্ড ক্লাইভ আর তার পথিক কারা— তাদেরকে আর তাদের কাজকর্মকে দেখার জন্য, জানার জন্য শব্দের ভাঁজ খুলে ভেতরে ঢুকে পড়েন পাঠক। সামনে ১১২ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ একটা যাত্রা। সে যাত্রায় অনেক অনেক ক্লাইভকে অনেক রূপে, অনেক কষ্টের কারণ হিসেবে দেখা হয়ে যায়— দেখা হয়ে যায় একটা সচিত্র সময়।

প্রবেশ পথে প্রথাগত কিছু রীতিনীতি পার হয়ে এলেই দেখা মেলে তিন গল্পকারের (জাহেদ মোতালেব, রিপন মিনহাজ, শোয়ায়েব মুহামদ), যাদেরকে উৎসর্গ করা হয়েছে কাব্যগ্রন্থটি (এই ‘তরুণ’ তিন গল্পকারকে জানার একটা আগ্রহও জাগিয়ে দিয়ে গেল বইটি!)। সূচিপত্রে গিয়ে একটু হোঁচট খেতে হয় বৈকি। বইটিকে তিনটি উপশিরোনামে ভাগ করা : ‘লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা’, ‘দইজ্জার কূল আর পাহাড়ের কাছে’ এবং ‘বিধ্বস্ত ক্যাম্পাস’। সেটাকে আপাতত পাশ কেটে ভেতরে ঢুকতেই দেখা মেলে শিরোনাম কবিতা : ‘লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা’। বোঝা যায়, একটা কষ্ট আর আক্ষেপ কবিতার শরীর জুড়ে। ‘সকলেই পথিক অন্যের/ লর্ড ক্লাইভের’। আর যারা ‘সরলরেখা’, যারা ‘প্রান্তিক’, তারা ‘খুব একা’। শুরুর এই কবিতা দ্বারা পাঠক শিরোনামের মর্মার্থ খুঁজে পান, স্বীকার করে নেন— গ্রন্থটির শিরোনাম কবির সাহিত্যবোধ প্রকাশের পাশাপাশি তা পাঠকের পাঠ গ্রহণকেও জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। উদ্ধৃতি :

পাখি ও পশুতে দারুণ নির্মম

চারপাশের ক্রন্দনে অবজ্ঞা চরম

…      …        …

সকলের দম্ভের পা ভ্রƒর মিসাইল

আর্ত জনপদে দুর্দান্ত ইজরাইল

কবির এই বক্তব্যকে টেনে নেয় পরবর্তী বেশ কিছু কবিতা। মূলত প্রেম, বিরহ বা মিলন ছাপিয়ে সমাজের এই ‘কুলাঙ্গার’ দিকটাই বার বার উঠে এসেছে নানান কবিতায় নানান শব্দমালার যোগসাজশে। কবি বলেছেন :

সম্মিলিত স্মৃতিকোষ ফসিলের দখলে এখন

সামান্য দূরের দিনের কথাও

ঠিকঠাক আসছে না মনে

গোলা ভেঙে শস্যকণা নিয়ে যাচ্ছে

অচেনা মুখোশপরা চেনা লোকে

…        …        …

হচ্ছি কুলাঙ্গার দিন দিন… (‘কুলাঙ্গার’)

অথবা,

মরছে মানুষ

জাতিগত

ভাষাগত

মৃত্তিকা ও বিশ্বাসের

সাম্প্রদায়িক শিঙায়

আগুনের ড্রাগন বিরাট জিহ্বায় অনুসরণ

করছে তোমাকে (‘অং সান সুচি’)

কিন্তু কোথায় লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা? তারা আছে, আছে তো। সমাজের প্রতিটি স্তরেই ক্লাইভের প্রেতাত্মা ভর করে আছে অগণন মানুষের উপর। ক্লাইভ নেই, ইংরেজরা নেই কেউই, কিন্তু আমরা অনেকেই নিজ দায়িত্বে তাদের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করবার প্রতিযোগিতায় নেমেছি! নেমেছি বৈকি! নইলে এই যে এত অরাজকতা চারিপাশে, তা সৃষ্টি করছে কারা? কেন কবির স্মরণে এখনো সেই বিষাদ— ‘গেল আমার ধানের দিন/ শূন্যে গেল ভাতের চিন/ বস্তাভর্তি এলো টাকা/ তামাকচাষের ঋণ’ (‘তামাকশিল্প’) তবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিস্তৃতির জন্য এই সব মানুষের প্রকরণগত পার্থক্য তৈরি হলেও আচরণগত কোনো পার্থক্য তৈরি হয়নি— পরিমাণের সাথে মাত্রাও বেড়েছে বরং, কমেনি এতটুকু। সেই আচরণের প্রভাবে আমরা ‘দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলি’ (‘সাম্প্রদায়িক’)।

কবি হাফিজ রশিদ খান তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য স্যাটায়ারকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন বেশ দক্ষতার সাথে। কারণ, ভেতরের কষ্ট আর যন্ত্রণাকে লাঘব করার জন্য, সমাজকে তার ক্ষতগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য একটা খুব কার্যকর উপায় হচ্ছে স্যাটায়ার। ‘মহাবধ্যভূমে অপচনশীল/ আছে দেশ এক, খ্যাতি যার সুফলা-সুজলা/ ও শস্যশ্যামলা’ (‘এইসব শকুনেরা’) বলে কবি যখন কবিতা শুরু করেন, বোঝাই যায়, তার স্যাটায়ারের মোড়কে ঢাকা রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। অন্যান্য অনেক কবিতা— ‘ঢাকার কাগজের কবি’, ‘সাম্প্রতিক বাংলাসাহিত্য’, ‘ইনানির চরে’, ‘কবিতা অপরাধকর্ম’, ‘নাগরিকবান্ধব শহর’, ‘উন্মাদেরা’, ‘বেগানা বিষাদ’, ‘কবি ও সাংবাদিক’, ‘মৌন বিপ্লবহেতু’ ইত্যাদি— শুধু শিরোনামেই নয়, শরীরেও বহন করছে স্যাটায়ারের ক্ষুরধার শব্দযোজন। ‘সাম্প্রতিক বাংলাসাহিত্য’ কবিতায় কবি বলছেন :

মাথার ওপর কড়া রোদ

সত্ত্বেও পায়ের শক্তি নিয়ে চলি

বাংলা একাডেমি

…        …        …

পাশে নেই ‘আমি সুভাষ বলছি’

তারপরও আমরা প্রফুল্ল, ক্ষুরপথে

বাংলা একাডেমি চলছি…

আবার,

আমার ভেতরে কান্না করে অজস্র মানুষ

ওদের চোয়ালে রক্ত

বুকে রক্ত

পায়ে রক্ত— কোথায় লুকোবে তারা

এইসব যন্ত্রণার চিহ্ন (‘কান্না’)

রূপকের আশ্রয় না নিয়ে সরাসরিও কথা বলেছেন দ্রোহ আর প্রতিবাদকে অক্ষরে অক্ষরে ধারণ করে :

ভ্রাম্যমাণ তাঁবুগুলোর খুুঁটিতে

উদ্বাস্তুর সারাদিনের ছুটিতে

রক্তপিপাসু এ দুঃখ মূক ও বধির

সীমান্ত হত্যায় নিরবতা [ংরপ] কালভৈরবীর… (‘দুঃখ মানে’)

কবিতা হিসেবে এই লাইনগুলো কতটা কাব্যিকতার দাবিদার, সে আলোচনায় না গিয়েও এ কথা বলা যায়— কবি তো সমাজকে বিশ্লেষণ করেন, তারপর সেটা তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। কবি যদি সরাসরি তার বক্তব্যকে পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করতে চান, সেটা কেন অযোগ্যতা হবে কবির কিংবা কবিতার? সব কবিতাই যে রূপকের কড়া গন্ধের আড়ালে নিজেকে অপ্রত্যক্ষ করতে চাইবে, তা তো নয়। কবি হাফিজ শুধু সমাজকে নয়, নিজেকেও বিশ্লেষণ করেছেন দু-একটি কবিতায়। কবির আত্মবিশ্লেষণ দেখুন :

আমি তো খাদের কিনারের খুব সতর্ক মানুষ

তারপরও বিপুল পতনে

আমার সমাধি ঘটেই চলেছে

ওই বিশ্লেষণ থেকে তবু আলো আসে

আমার আঁধার

অথচ সতৃষ্ণ জ্ঞানের গুহায় (‘অমর্ত্য সেন’)

আশার বাণীও শুনিয়েছেন কবি। কারণ, নতুন প্রজন্মের করোটে শুধু হতাশা ঢুকিয়ে আগামীকে সুন্দর করার চিন্তা করা যায় না কিছুতেই। সেজন্য কবি স্বপ্ন দেখেছেন নিজে, দেখিয়েছেন আগত সময়কেও। ‘নতুন মুক্তিযোদ্ধা’য় কবির প্রত্যাশার স্ফুরণ ঘটেছে :

যা কিছু মৃত্তিকা যেখানে কর্ষণযোগ্য

পাহাড় যেটুকু অরণ্যশোভিত

নদীর পাশের ঘরগুলো ঘিরে

যতোটা সুন্দর প্রকাশিত

সৈকতের যেখানে মিলেছে বালিয়াড়ি স্তনের বিলাস

প্রোথিত করবো কামনার উলঙ্গ উল্লাস

জানা কথা, মিথ বা পুরাণের ব্যবহার কবিতাকে শুধু ঋদ্ধ আর সাবলীল-ই করে না, বক্তব্যকে কেন্দ্রীভূত করে তা পাঠকের মননের খুব কাছাকাছি টেনে নিয়ে যায়। কবি হাফিজ তার কিছু কিছু কবিতায় এই মিথকে এনে অনেক কথাকে আবদ্ধ করতে পেরেছেন একটা মাত্র শব্দ বা লাইনে। যেমন, ‘সাম্প্রতিক বাংলাসাহিত্য’ কবিতায় কবি বলেছেন, ‘বুদ্ধির কঠোর তপস্যায় দেখি সকলেই কালনেমি’। তেমনি ‘প্রমিথিউস’, ‘রাজা চণ্ডীদাস’ ইত্যাদি পুরাণচরিত্রকে কবি নিখুঁতভাবে, অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপযুক্ত জায়গায় বসিয়েছেন অর্থকে আরো বেশি মননস্পর্শী করতে। রেফারেন্স হিসেবে কবি যে নামগুলোকে ইতিহাস থেকে তুলে এনে বইয়ের পৃষ্ঠায় আসন দিয়েছেন, সেগুলোও বেশ অর্থবহ, অর্থ-সমৃদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, রজব আলী কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলা, অং সান সুচি, মার্টিন লুথার কিং-দেরকে কবি হাফিজ কবিতায় ডেকে এনেছেন প্রয়োজনের তাগিদে, যেমনটি মিল্টনকে ডেকেছেন ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ তার ‘London 1802’  ১৮০২’ কবিতায়। কিছু কিছু শব্দ ও বাক্যের প্রয়োগে— যেমন, ‘দরদি সন্ধ্যায়’, ‘তুমুল ভিক্ষুক’, ‘কৃষকতা’, ‘ঝাঁক- ¯েœহার্দ্র জননী’, ‘ঠাসবুনট পংক্তি [sic]Õ ‘মিছিলের মতো দলে-দলে আসে নির্ঘুম রাত’— বেশ নতুনত্ব আর চমৎকারিত্ব ফুটে উঠেছে। কবি যে কবিতার পথে হাঁটছেন দীর্ঘদিন, এগুলো তারই পরিপুষ্ট প্রমাণ।

একটা কবিতা যদি পাঠকের মনে কোনো চিত্র তৈরি করতে না পারে, প্রাণহীন সে কবিতা যে পাঠকের মনে কোনো আসন পাবে না, তা বলাই বাহুল্য। কেননা, চিত্রকল্প যে কোনো কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ— কবিতার প্রাণ। কবি হাফিজের কবিতায় চিত্রকল্প আছে গতানুগতিক আর অভিনব— এই দুই ধারাতেই। কিছুটা অনুকরণ হলেও ‘শাদা-শাদা’ তারাকে ‘পরোটার’ সঙ্গে তুলনাটা বেশ অর্থবহ। ‘ভেজা-ভেজা কাঁপা-কাঁপা গান’ (‘শ্যামল মিত্রের গান’) পাঠককে ‘গান’ ‘দেখা’র অনুভূতি এনে দেয়। শব্দের উপর দখলদারিত্ব থাকলে তাকে একটা কবিতায় যে কোনো অবস্থানে এনে কবি এভাবেই অশরীরী কোনো কিছুকে শরীর দান করেন, অদৃশ্যকে করেন দৃশ্যমান। একই ভাবে ‘সবুজ ফুসফুস’ (‘মিসকিন শা’র হাতে’), ‘পড়ার টেবিলে হঠাৎ অন্ধকারের/ জাঁকালো উপস্থিতিতে/ অক্ষরেরা হারিয়ে গেল অরণ্যে’ (‘বৈদ্যুতিক আলো না-থাকা একটা রাতের গল্প’), ‘এইবার বৃষ্টির নিপুণ মাজেজায়/ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে/ বদ্ধ নদীগুলোর বুকের জ্বালা’ (‘ঘের’) ইত্যাদি চিত্রকল্প প্রতিভাত করে যে, শব্দকে সুকৌশলে ব্যবহার করে তাকে দিয়ে কাব্যিক আচার পূরণ করায় কবি বেশ নিপুণ। একই ভাবে রূপকের ব্যবহারে দক্ষ হাতের কারুকাজ বেশ লক্ষ্যণীয়। দেখুন একটা উদাহরণ :

এখন তো বর্ষা মানে সুবিশাল

ধাতবপাত্রের ফুটো দিয়ে যেন

দুর্বার গতিতে

অবিরল জলধারার অবতরণ (‘বরষা রে’)

কবি সংস্কৃতিকে কবিতায় লালন করেছেন একান্ত নিজস্ব ঢঙে। সেখানে তিনি পুরাতনকে তুলে এনেছেন নতুনদের সামনে আরো নবতর পথের দিশারি হতে। ‘বৌদ্ধ বিহার’ কবিতায় কবি বলেছেন :

আমি অক্লান্ত বৌদ্ধ বিহার

সময়ের সোপানে-সোপানে গেঁথে

রেখেছি হাজার বছরের চিহ্ন

কঠিন চীবরে আমি চেতনার সমাহার…

একইভাবে চাকমাদের বিজু, মুসলমানের ঈদ, হিন্দুদের পূজা ইত্যাদি উঠে এসেছে অনেকটা কাব্যিক চাহিদাপূরণের হাতিয়ার হিসেবেই। দৃষ্টির জালে উঠে আসা অন্য কয়েকটি বিষয়কে এই আলোচনায় জায়গা না দিলে আলোচনাটি একপেশে হয়ে যেতে পারে, হারাতে পারে পাঠ-নিরপেক্ষতা। প্রথমত, আমার কাছে ‘দইজ্জার কূল আর পাহাড়ের পায়ের কাছে’ উপশিরোনামভুক্ত কবিতাগুলোকে বেশি বলিষ্ঠ লেগেছে। এই উপশিরোনামভুক্ত ‘ভালোবাসাত্রাণ’, ‘বোরকা’, ‘মসজিদ ও দেবালয়’, ‘বিজুপর্ব ১৪২১ : এক’, ‘জ্যোতির্ময় বাঙাল’, ‘শাহি কিরিচের গল্প’, ‘প্রজন্ম চত্বর’, ‘শুভস্য শীঘ্রম’, ‘সোনালি সুতোয় বাঁধা উপহার’ ইত্যাদি কবিতা বেশ সুখপাঠ্য— মনে হয় একজন শিল্পীর নিখুঁত তুলির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। (বলাই বাহুল্য, সব পাঠকই আমার সাথে একমত হবেন, আমার রুচি আর বিশ্বাস, আমার আবিষ্কারিক দক্ষতা আর চাহিদা সব পাঠকের চাহিদাকে প্রতিফলিত করবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ অবশ্যই নেই। বলে রাখা ভালো, কাব্যিক বিচারে যেহেতু আলাদা আলাদ স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে বলে আমার প্রতীতি জন্মেছে, সেজন্য উপশিরোনামগুলোকে আলাদা আলাদা উপশিরোনামে আলোচনা করলে বেশি সুবিধা হতো নিশ্চয়। সেক্ষেত্রে রচনার ব্যাস-ব্যাসার্ধও বাড়তো অন্তত তিন গুণ। সেটা আমার সীমাবদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা সময় আর স্থানেরও।) দ্বিতীয়ত, উপশিরোনামগুলো অস্পষ্টতার কাছে পরাজিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। শেষের উপশিরোনাম (‘বিধ্বস্ত ক্যাম্পাস’)-এ তার প্রকাশকাল ও উৎস উল্লেখিত আছে। অন্য উপশিরোনামদ্বয়ের সাথে (এমনকি ব্লার্ব বা অন্য কোনো অংশেও) এ ধরনের কোনো তথ্য সংযোজিত হয়নি বলে সেগুলোকে স্বভাবতই একই গ্রন্থভুক্ত পুরাতন কবিতাগ্রন্থের সংকলন বলা যাবে না। তাহলে লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা কি নতুন পুরাতন কবিতার মিশেল, নাকি কোনো সংকলন— এ নিয়ে একটু ধন্দে পড়ে যেতে হয়। তৃতীয়ত, চটুল কিছু কবিতা (যেগুলোকে ছড়া বললেই বরং সুবিচার করা হয়) — যেমন, ‘রূপসী এক্সপ্রেস’, ‘মেধস মুনি’, ‘পিছের কথা’, ‘বাংলাদেশের গরিব’, ‘বড়শি’ ইত্যাদি— এই গ্রন্থের আভিজাত্যকে কিছুটা হলেও নষ্ট করেছে। যে গাম্ভীর্য নিয়ে পাঠক বইটি শুরু করেন, তা মাঝে মাঝেই হোঁচট খায় অপ্রত্যাশিত এসব চটুল ‘কবিতা’র কাছে এসে। বুঝতে অসুবিধে হয় না, এই কবিতাগুলো যুক্ত করার একটা মোহ কাজ করেছে কবির মনে, কারণ, সেগুলোতে কিছু সূক্ষ্ম বক্তব্য আছে স্যাটায়ারের মোড়কে। কবি এই মোহকে কাটিয়ে ওঠার সাহস করতে পারলে সংকলনটি আরো বেশি পূর্ণতা পেতো, কোনো সন্দেহ নেই। চতুর্থত, মুদ্রণপ্রমাদ-এর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কিছু কিছু বানানের ভুলটাকে হয়তো উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু তারপরও অনেকগুলো ভুল দৃষ্টিকে পীড়া দেয় বেশ। সেগুলো, যে কোনোভাবেই হোক না কেন, এড়ানো গেলেই ভালো হতো— এড়ানো যে অসম্ভব ছিল না, তা-ও নয়। আধুনিক বানানরীতিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পালন করা হয়নি। শব্দচয়নে আরো একটু সতর্ক হওয়া যেতো— অপ্রচলিত কিছু শব্দের ব্যবহার (যেমন ‘তব’, ‘মম’ ইত্যাদি) এড়ানো গেলে শব্দযোজনগুলো আরো দৃঢ়তা পেতো নিশ্চয়।

[প্রত্যয় হামিদ ॥ লর্ড ক্লাইভের পথিকেরা : সমাজচিত্রের দর্পণ]

ম্যাজিক লণ্ঠন ॥ কাজী মামুন হায়দার সম্পাদিত

মাসচারেক পূর্বের কথা— সন্ধ্যেবেলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কৃতী অধ্যাপককে বলতে শুনেছিলাম- ‘একসময় ঢাকায় যেমন কবিদের ভীড় দেখা যেতো, এখন দেখা যায় ফিল্ম-মেকারদের’। কথাটির সত্যাসত্য কিংবা বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি, আমাদের মফস্বলের পাড়া-মহল্লাগুলোতে খোঁজ করলেও এমন দু-চারজন আপনিই মিলে যান— যারা চলচ্চিত্র করছেন/পড়ছেন। সুতরাং চলচ্চিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের, আরেকটু অপ্রশস্ত করে বললে তরুণ সমাজের ব্যাপক আগ্রহের দিকটি স্বীকার করতেই হয়। চলচ্চিত্ররুচি এবং চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধতা অনুসারে চলচ্চিত্রের দর্শকদের মাঝেও বিদ্যমান রয়েছে দুই শ্রেণি। এক শ্রেণির দর্শকদের ধারণায় চলচ্চিত্র নেহাতই আর পাঁচটা বিনোদন মাধ্যমের মতো অর্থাৎ অবসরে ‘আনন্দ যাপনে’র উপায় মাত্র। এদের পরিচয় সাধারণ দর্শক নামে। আরেক শ্রেণির দর্শক আছেন, যাদের কাছে চলচ্চিত্র নিছক আনন্দ লাভের উপায় মাত্র নয়— বরং সচেতন শিল্প বা ‘আর্ট’। জীবন, সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাসের, ‘সেলুলয়েডীয়’ ভাষ্য। অবশ্য, চলচ্চিত্র ‘আর্টে’র একেবারেই নবীনতম শাখা। এর বয়সের কৌলীন্যও অল্পদিনের, ১০০ বছরের কিছু বেশি। আদতে, এই ‘আর্ট’ পদবাচ্যটি চোখে পরার পরই পাশ্চাত্যের শিক্ষিত সমাজে আরম্ভ হয়েছিল চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা-গবেষণার পর্ব। যার হাওয়া এসে লেগেছিল এদেশেও। শুরুর দিকে, বাংলায় চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা সাহিত্য পত্রিকাগুলোর দু-চারটি কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অল্পসংখ্যক এবং আজকের তুলনায় বিপুলাংশে সমাভাবাপন্ন পাঠকের আলাদা কোনো দৃষ্টি কাড়ার কিংবা তৈরির প্রয়াস এর মাঝে ছিল না। বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘বিজলী’ প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে।

‘বিজলী’র উদ্যোক্তাদের মাঝেও ছিলেন সেকালের বেশ কিছু নামিদামী ব্যক্তি— দীনেশরঞ্জন দাস, নলিনীকান্ত সরকার, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, শচ্চিদানন্দ সেনগুপ্ত, অরুণসিংহ প্রমুখ। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’ প্রকাশিত হয়েছিল এদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ খ্যাত ফজলুল হকের সম্পাদনায়। এরপর যুগপরিক্রমায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পত্রিকাগুলো সম্প্রসারিত হয়েছে বিস্তৃতভাবে; চলচ্চিত্র আন্দোলনেও রেখেছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

প্রাথমিকযুগে চলচ্চিত্র পত্রিকা বলতে বোঝাতো— প্রচারমূলক আলোচনা নির্ভর পত্রিকাকে। যেখানে চলচ্চিত্রের ‘টেক্সট’ই ছিল আলোচনার মুখ্য উপকরণ। আজকের দিনে এখানেও ঘটেছে হাওয়া বদল; যুক্ত হয়েছে সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শনের মতো ‘মাথা খাটানো’র বিষয়সমূহ। ফলে চলচ্চিত্র নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য যেমন চোখ-কান খোলা রাখা প্রয়োজন, তেমনি দরকার চিন্তা-চেতনার গতিময় বিবর্তন। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ চলচ্চিত্র বিষয়ক ষান্মাসিক পত্রিকা, এটি কাজী মামুন হায়দারের সম্পাদনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে দুবার প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ নামটি পূর্বপরিচিত হলেও এর নবম সংখ্যায়ই আমার প্রথম পাঠ। ‘ম্যাজিক লণ্ঠেেনর নবম সংখ্যাতে রয়েছে ‘স্মরণ’, ‘চলচ্চিত্রের বর্তমান’, ‘চলচ্চিত্র বীক্ষণ’, ‘চলচ্চিত্র সমালোচনা’, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’, ‘ম্যাজিক আড্ডা’ ‘ম্যাজিক পুনর্পাঠ’, ‘সাক্ষাৎকার’, ‘ধ্র“পদী চলচ্চিত্র ও নির্মাতা’, ‘চলচ্চিত্র ইস্্কুল’, ‘দেশে দেশে চলচ্চিত্র উৎসব’, ‘চলচ্চিত্রের বই’, ‘সংবাদপত্র, টেলিভিশন, নিউজমিডিয়া’— মোট ১৩ টি বিষয়ে লেখা। সঙ্গে ‘চলচ্চিত্র-বীক্ষণ’ বিভাগে ‘দেখা অতঃপর লেখা’ শিরোনামের একটি নতুন উপবিভাগও আছে। আগের সংখ্যাগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারের ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ও অভিনবত্ব—চমৎকারিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। এই অভিনবত্বের আস্বাদ পাওয়া যায়— ‘এই সংখ্যায় যা আছে’ পাতা থেকেই। এখানকার ‘ডিসকোর্সে বাঁধা মুক্তিযুদ্ধ নায়ক যেখানে চাষী’, ‘ফর্মুলার তোড়ে ভেসে যাওয়া রাবীন্দ্রিক উপাখ্যান’, ‘বাণিজ্যিক বিচলনে শিল্পের বলি’, ‘নির্মাতা অমিতাভের বাউল-বিরোধী আকাম’, ‘রাষ্ট্র নিয়ে বুনুয়েলের ফ্যান্টাসি’ কিংবা ‘পাপাত্মার বিপরীতে মহাত্মা নির্মাণে গান্ধী’ চমৎকার রচনা— একইসাথে অভিনবত্বও। ফলে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ পাঠের একটা প্রবল মোহ এখান থেকেই শুরু হয়ে যায়।

আবদুল জব্বার খানের (১৯১৬-১৯৯৩) মুখ ও মুখোশ (১৯৫৬) কে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক বাংলা চলচ্চিত্র ধরলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বয়স মাত্র ষাট বছরের। মুখ ও মুখোশের নির্মাণকালে উপমহাদেশীয় তথা ভারতীয়  চলচ্চিত্রেও চলছিল এক ভাঙ্গা-গড়ার কাজ। চলচ্চিত্রের ধারণাগত পরিবর্তন এবং ডাকসাইটে পরিচালকদের আগমনে লোপ পেতে শুরু করেছিল ‘নিউ থিয়েটার্স’ যুগের একঘেয়ে ‘ইনডোর’ অভিনয়নির্ভর চলচ্চিত্রের ধারা। ১৯৫৫-তে মুক্তিপায় সত্যজিৎ রায়ের (১৯২১-১৯৯২) পথের পাঁচালী এবং ১৯৫৮-তে ঋত্বিক কুমার ঘটকের (১৯২৫-১৯৭৬) অযান্ত্রিক। যা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে ধাবিত করে সাবালকত্বের দিকে। ‘ম্যাজিক লণ্ঠনে’র নবম সংখ্যাতেও এসেছে সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গ। ‘ম্যাজিক আড্ডা’য় স্থান পেয়েছে— ‘সত্যজিতের নায়িকারা’ শিরোনামে ‘অপুর সংসার’র (১৯৫৯) ভোরের যূথিকা শর্মিলা ঠাকুর, ‘চারুলতা’র (১৯৬৪) ‘গ্লামারাস’ একাকিনী মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং ‘তিনকন্যা’র (১৯৬১) ‘সমাপ্তি’ পর্বের দুষ্টু কাঠবিড়ালী মতো বিষয়ে অপর্ণা সেনের সঙ্গে সংবেদনশীল পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের (১৯৬৩-২০১৩) প্রাঞ্জল আড্ডা। প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে— সত্যজিতের চলচ্চিত্র এবং নারী চরিত্র। এখানে পরিচালক বিচারের প্রশ্নে ঋতুপর্ণ ঘোষের একটি মন্তব্য বেশ নজর কাড়ে : ‘একজন মাস্টারকে জাজ করবো তাঁর মাস্টারপিস দিয়ে, নিকৃষ্ট কাজগুলো দিয়ে নয়’। এদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে চাষী নজরুল ইসলাম (১৯৪১-২০১৫) এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব; বলতে গেলে যিনি এ ধারার পথকর্তা। এবারের ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ ‘স্মরণে’ স্থান পেয়েছেন তিনি। ইমরান হোসেন মিলন লিখেছেন চাষী নজরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে। বিশেষত ওরা ১১ জন (১৯৭২), হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭) ও মেঘের পরে  মেঘ (২০০৪) মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্রায়ণ এবং ইতিহাসের দায়বদ্ধতায় পরিকীর্ণ। আবিষ্কার করেছেন চাষী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্রে ‘ডিসকোর্সে আবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধকে’। এর সঙ্গে ‘সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণে চাষী : ফর্মুলার তোড়ে ভেসে যাওয়া রাবীন্দ্রিক উপাখ্যানে’ নাজমুল রানা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ছোটগল্প অবলম্বনে চাষী নজরুল নির্মিত শাস্তি (২০০৪)  ও সুভা (২০০৬) চলচ্চিত্র দুটি নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে হাজির করেছেন— সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে নির্মাতার স্বাধীনতাজনিত অযাচারের প্রমাণ। এছাড়া ‘চলচ্চিত্র সমালোচনা’ বিভাগে তানভীর মোকাম্মেলের (জ. ১৯৫৫) জীবনঢুলী (২০১৪) নিয়ে আলোচনাতেও এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্রকরণের প্রসঙ্গ। এখানে তৌফিকুর রহমান আবিষ্কার করেছেন তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ ৭১- এর স্পর্শহীন ঢুলী জীবনকে। সঙ্গে দেখার চেষ্টা করেছেন— তানভীর মোকাম্মেলের মুক্তিযুদ্ধ নির্মাণের স্বরূপকে। এই বিভাগের শতরঞ্জ কি খিলাড়ির (১৯৭৭) জেনারেল জেমস উটরম খ্যাত অভিনেতা ও প্রখ্যাত ব্রিটিশ পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরোর (১৯২৩-২০১৪) গান্ধী (১৯৮২) নিয়ে প্রদীপ দাসের ‘পাপাত্মার বিপরীতে মহাত্মা নির্মাণে গান্ধী’ শিরোনামের লেখাটিও গান্ধীজীর ব্যক্তিজীবন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দেশবিভাগের ইতিহাসকে অশেষ করেছে।

‘চলচ্চিত্রের বর্তমান’ বিভাগটি বেশ প্রশস্তÍ। ব্যাপ্তি প্রায় ৭০ পৃষ্ঠা জুড়ে। এখানে সম্পাদক কাজী মামুন হায়দারসহ মোট নয়জনের লেখা সন্নিবদ্ধ হয়েছে। প্রসঙ্গে সমকালীন হলেও লেখাগুলোয় প্রকরণের দিক থেকে রয়েছে বিভিন্নতা, বৈচিত্র্যতা। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র, থার্ড সিনেমা, যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র, বলিউডের চলচ্চিত্রে প্রকট জাতীয়তাবাদ, চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে সমকালীন সংকট রচনাগুলোতে মুখ্যতা পেয়েছে। থার্ড সিনেমার যাত্রা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। এটি মূলত লাতিন আমেরিকা বা তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্র। তবে থার্ড সিনেমাকে তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্র নামে অভিহিত করা হলেও, তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্র মাত্রই থার্ড সিনেমা নয়। এর রয়েছে বিশেষ কিছু স্বকীয়তা। থার্ড সিনেমা বলতে তৃতীয় বিশ্বের সেই চলচ্চিত্রকেই বোঝায়— যা সার্বিক অর্থে সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে দণ্ডাময়াণ। মূলত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে যতটা সম্ভব বাস্তবতাকে স্পর্শ করবার প্রয়াসেই সূচিত হয়েছিল থার্ড সিনেমার নির্মাণ। আশিষ রাজাধ্যক্ষ ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪) কে থার্ড সিনেমার ভারতীয় উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসেন তাঁর— ‘উবনধঃরহম ঞযরৎফ ঈরহবসধ’ শীর্ষক লেখায়। এখানে ‘তৃতীয় সিনেমা বিতর্ক’ শিরোনামে সেই লেখাটিরই ভাষান্তর উপস্থাপন করেছেন চলচ্চিত্র সমালোচক, শিক্ষক ফাহমিদুল হক। ‘বৃত্তাবদ্ধ বৃত্তের বাইরে : বিপ্লব প্রতিবিপ্লবের ফাঁদে গুমরে কাঁদে চলচ্চিত্র’ শিরোনামের লেখায় কাজী মামুন হায়দার তুলে ধরেছেন সাহসী চলচ্চিত্র ভাবনা। তাঁর মতে— আশির দশকে বাণিজ্যিক অর্থাৎ মূলধারার প্রতিকূলে যাত্রা শুরু করা ‘বিকল্পধারা’র চলচ্চিত্রে যে আগুন ছিল, সে আগুন আজ নিভে গেছে। অবশিষ্ট নেই আশা বাঁধবার মতো আর কিছুই। এই বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন— গোলাম রাব্বানী বিপ্লব পরিচালিত, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত, অস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীত বৃত্তের বাইরর (২০০৯) নিঃশব্দে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়াকে। এখানে পুঁজিবাদের প্রকোপে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকতা-সংস্কৃতিকে মামুন হায়দার তুলে ধরেন সাহসের সঙ্গে— ‘আমাদের পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ যেনো কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি। অবস্থাদৃষ্টে কখনো কখনো মনে হয়, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের মাথা তাদের কাছে বন্ধক রেখেছেন। এই গোষ্ঠীর কেউ টেলিভিশন চালায়, সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও কৃষি উন্নয়নের তাবেদারি করে। কেউ মাদকের বিরুদ্ধে, অ্যাসিডের বিরুদ্ধে, সব ভালোর সঙ্গে নিজেদের আলো করে যুক্ত রাখে’। কাজী মামুন হায়দারের এমন ভাবনা সত্যিই আমাদের চোখ খুলে দেয়, সাথে শঙ্কারও উদ্রেক ঘটায়। এ কোন ভবিষ্যতের পানে ধাবিত হচ্ছি আমরা?

বাউল দর্শন বাঙালি লোকজীবনের এক মহৎ প্রকাশ। নি¤œবর্গের মানুষেরা ধর্মীয় নিষ্পেষণের নিগড় থেকে মুক্তি পাবার অভিপ্রায়েই জন্ম দিয়েছিল; মানুষে-মানুষে মহামিলনের এ দর্শন। যেখানে ‘চণ্ডীদাস’র উক্তি’র মতোই ধ্র“ব— ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ প্রত্যয়টি। বাউল দর্শনে কতগুলো তত্ত্ব স্বীকার করা হয়। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে এগুলো— ‘দেহতত্ত্ব’, ‘মনের মানুষ তত্ত্ব’, ‘গুরুতত্ত্ব’, ‘রূপ-স্বরূপতত্ত্ব’, ‘প্রকৃতি সাধন তত্ত্ব’, ‘পরমতত্ত্ব’, ‘চারচন্দ্রভেদ তত্ত্ব’, ‘প্রেমতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত’¡। ন’টি তত্ত্বের মাঝে দেহতত্ত্ব বা দেহ সাধনা বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। কারণ, মানবদেহ এখানে পরম সম্পদ, সর্ব সাধনার আধার। বাউল দর্শনের এই নিগূঢ় সাধনা, বিশেষত ‘নারী সাধনা’কে কেন্দ্র করে অমিতাভ চক্রবর্তী নির্মাণ করেন— কসমিক সেক্স (২০১২) চলচ্চিত্রটি। ‘সেন্সর বোর্ডে’র বেড়াজাল অস্বীকার করে ২০১৫ সালে অনলাইনে মুক্তি পাবার পর থেকে চলচ্চিত্রটি নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত। ‘চলচ্চিত্র বীক্ষণ’ বিভাগে ইব্রাহীম খলিল আলোচনা করেছেন ‘কসমিক সেক্স’-এ বাউল দর্শন ও নারী সাধনার যথার্থ চিত্রায়নের প্রশ্নটি! পরিশ্রমসাধ্য এ লেখায় তিনি বাউল দর্শনের গূঢ় বিষয় ‘খোলা বাজারে’ প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিচালকের দায়বদ্ধতাকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেই সাথে ফকির শামসুল সাঁইয়ের সাথে বাউল দর্শনের নানা বিষয়কেন্দ্রিক আলোচনা লেখাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এখানে আরো সন্নিবদ্ধ হয়েছে- উত্তর কোরিয়ার পরিচালক কিম কি দুক’কের অ্যাড্রেস আননোন (১৯৯৭), ইয়োভাল অ্যাডলারের প্রথম কাজ বেথেলহাম (২০১৩), হানি আবু আসাদের ওমর (২০১৩), আন্দ্রেই তারাকোভস্কির প্রিয় নির্মাতা লুই বুনুয়েলের দ্যা ফ্যান্টম অব লিবাটি’ (১৯৭৪) এবং দেখা অতঃপর লেখা উপবিভাগে লুইস মাদুরোর ইনোসেন্ট ভয়েসেস (২০০৪) নিয়ে বস্তুনিষ্ট আলোচনা। এসব আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে বাংলাদেশের কিছু প্রসঙ্গও আলোচিত হয়েছে। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ প্রকাশিত হচ্ছে আজ ৫ বছর। এর অন্যতম আকর্ষণীয় একটি বিভাগ— ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’। আগের সংখ্যাগুলোতে যেখানে এসে কথার মালা গেঁথে গেছেন— জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আবু সাইয়ীদ, নুরুল আলম আতিক, গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের মতো চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। একসংখ্যা পরপর প্রকাশের ধারাবাহিকতায় এবারের সংখ্যাতেও প্রকাশ পেয়েছে— ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৫’। ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল সময়ের চলচ্চিত্র কী পেলাম, কী হারালাম’ শিরোনামের এবারের কথামালার কথক ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র  নির্মাতা কাজী হায়াৎ। তিনি কথা বলেছেন— বর্তমান সময়ে নির্মিত চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার প্রবেশ, দর্শকরুচি, প্রেক্ষাগৃহের দুরবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট মনীষী সনৎকুমার সাহা প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে নিজের চলচ্চিত্র ভাবনা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন— বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু’কে। ‘প্রায় অনধিকার চর্চা শিরোনাম’র সেই চিঠিটি প্রকাশ পেয়েছে এবারের ‘ম্যাজিক পুনর্পাঠে’। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর রাজশাহী শহরের একটি প্রেক্ষাগৃহে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। দেখেছেন— প্রেক্ষাগৃহ জগতের অনেক ভাঙা-গড়া। সাক্ষাৎকার বিভাগে রয়েছে জাহাঙ্গীরের মতো প্রান্তিক ‘চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট’ মানুষের চলচ্চিত্র, প্রেক্ষাগৃহ ও দর্শকরুচিসহ নানা বিষয়ে কাজী মামুন হায়দারের সঙ্গে স্মৃতি রোমন্থনসহ পর্যালোচনা। এ বিভাগের আরেকটি বিশেষত্ব ব্রাজিলের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার ফার্নান্দো মেইরেলেসেএর সাক্ষাৎকার। সুখপাঠ্য বাংলায় এর ভাষান্তর করেছেন রাশেদ মিন্টু। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (জ. ১৯৪৪) এমন একজন শিল্পী— যার চলচ্চিত্রেও পাওয়া যায় কবিতার স্পর্শ। ‘চলচ্চিত্রের বইয়ে রোকন রাকিব আলোচনা করেছেন— বুদ্ধদেব বাবুর কীভাবে ছবি করি, কীভাবে ছবি হয় বইটি নিয়ে— ‘ছাপার হরফে আলোছায়ার খেলা’ শিরোনামে। এ ছাড়া ‘চলচ্চিত্রের ইস্কুলে’ স্থান পেয়েছে পোল্যান্ডের ‘লডজ্্ ফিল্ম স্কুল’। ‘দেশে দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে’ এসেছে চেক প্রজাতন্ত্রের ‘কারলভি ভারি চলচ্চিত্র উৎসবের কথা। শিরোনামটিও বেশ চমকপ্রদ— ‘আরোগ্য নগরে চলচ্চিত্রের ঝরনাধারা’।

রচনানৈপুণ্য, উপস্থাপন ও বিষয় নির্বাচনের দিক থেকে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ বাংলাদেশের অপরাপর চলচ্চিত্র পত্রিকাগুলোর তুলনায় পুরোপুরি ভিন্নতর। চলচ্চিত্র নিয়ে গৎবাঁধা তরল আলোচনা নয়— বরং তারা দিতে চায় একেবারেই আলাদা কিছু। ক্ষেত্রভেদে সেটি সরল চিন্তক পাঠকের জন্য ঝাঁকুনি বিশেষও হতে পারে। পাঠ করতে গিয়ে— একটা বার্তা অনায়াসেই পাওয়া যায় যে, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ কোনো প্রথার দাস নয়। পরের দশম সংখ্যাটি পাঠের একটা প্রবল আগ্রহ নিয়েই ইতি টানছি।

[নাজমুল হাসান পলক ॥ ‘ম্যাজিক লণ্ঠনে’র নবম সংখ্যা এবং কিছু কথা]

ট্রিলজি

সমস্ত ধূসর প্রিয়

শহীদ ইকবাল

নয়ন মেলে পর্ব

একটা বিরাট সবুজ পাতানো ময়দান। কালেক্টরেট মাঠ। গত কয়েকদিন মাইকে কান ফাটানো আওয়াজ চলিতেছে। গুরুগম্ভীর আর চুটকীর টানে শোনা যায় সে জনসভার ডাক। দূর থেকে আসা ক্ষীণ আওয়াজ ক্রমশ কাছে আগাইয়া আসে। ভার নিয়া আসে। প্রবল হইয়া ওঠে। সিনা টান করা দম্ভ তখন রমরমা টমটমে গড়ায়। বুঝি তাপও ওঠে। তখনই পেছনে আরও একটা টমটম লয়হীন চাকা গড়াইয়া আগাইয়া আসে। উহাতে দুই পার্শ্বে দুইরকম উঁচা লম্বা বিলবোর্ড সাজানো থাকে। সাঁটানো লম্বা। রঙিন পোস্টারে লেখা চন্দনদ্বীপের রাজকন্যা। ওখানে অন্ধ রাজনায়কের করুণা বিগলিত নিষ্পাপ ছবি বেরং নিয়া দাঁড়ানো আর তার পাশেই নায়িকা রোদনরত– অসহায়ত্বে ব্যাকুল। পাশে অনেক টুকরা টুকরা দ্বীপ, সে দ্বীপের ভয় ও নির্জনতা ছমছম ঝিম্ মারা, কিন্তু মায়া তাহাতে দুলাইয়া ওঠে, এক গভীর রোশনাই পল্লবিত হয়। মনে হয়, কেন এই হতভাগ্য যুবরাজের এমন পরিণতি! আশার ছলনে ভুলিয়া মন কয় আহা– এই যুবক কীভাবে উদ্ধার পাইবে, কীভাবে তাহার চক্ষুতে আলো ফিরিবে, কে তাহাকে প্রসাদ দিবে, রাজকন্যার হাতে কীভাবে সে ফিরিয়া আসিবে! সে সব উৎকণ্ঠার ভেতরে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর হাস্যরসের ঘূর্ণায়মান কঙ্করূপ বিচিত্র রাজপোশাকে সজ্জিত, তখন সে বনবালা কয় এই বুঝি করুণার সিন্ধু! সে ভাগ্যকে মানিয়া লয় নাই, বিস্তর জোনাকি সাক্ষ্য রাখিয়া এই অন্ধ পরবাসী যুবককে সে সমর্পন করিয়াছে। জীবনের সবটুকু ঢালিয়া দিয়াছে। এই সুখসমুদ্দুর আর অন্ধ রাজা আর গরিব কন্যার প্রেম এ জীবনে কে মনে রাখিয়াছে। কে জানে উহার সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় দ্বন্দ্বের কথা। নয়ন মেলিয়া তাহার প্রকাশ ঘটে। মাখনুন ওই রাজা রাজকন্যার প্রেমের কথা জানে, দুঃখী নারীর জন্যে রাজকন্যার অবুঝ প্রেমের পরিণতিও জানে আর জানে ইউসুফ জোলেখা, শশী-পুন্নু আর রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের কথা। খুব গভীর করে মনে আছে এক যাত্রাদলের রূপভানের নিপুণ কাহিনির ছল ছল ছবি। সেখানে তাজেল নামের এক চরিত্র আছিল। আছিল এক বনবাসী কন্যারও আকুতি। তবে এই দ্বীপের রাজকন্যার পরিণতি কী হইবে কে জানে! এসব ভাবতে ভাবতে অনেক সময় তাহার চোখের পর্দা কাঁপে। কাঁপে ওই টমটমে টানানো পোস্টারও। ৩ হাত বাই ১  হাত পোস্টারে সম্পূর্ণ রঙিন বলিয়া তাহা লিখিত। ছবিতে সঙ্গীতের ভেতরে তেজস্বী অশ্বটা ঠুলি চোখে দৌড়ায়— থামে, হাঁটে; একসময় সে পানির জন্য দম দেয়। ক্রমশ বটতলার ঠাণ্ডা হাওয়ায় দিকে হাঁটে, একপায়ে খাড়ায় আর খাদ্য টানে। বটছায়ার ভেতরে অসহায়ভাবে ভুষি টান মারে, নাদে। কিন্তু সামনের তেজী ঘোড়াটার টকটক আওয়াজে সামরিক শাসকের র‌্যাংক দুলদুল করে, কাঁপে। আরও কাঁপে, চিকন-ধারালো মাথাটা। তেজ থাকায় বুঝি কারো আদেশ বা নির্দেশ সে পালন করে। ওখানে বসা লোকটার মুখ কটকটা কালছা রঙের। গোঁফটা চিক্কন, পাতলা। মাথার চুল মর্জিমাফিক ছাঁটানো-সাজানো। টমটমের সামনে দিয়া দৌড়ানো কুত্তা থমকে দাঁড়ায়, লেজ দোলায়। রাস্তার হ্যাকনায় তখন টমটম দোলে, গতিতে হুজুর হুজুর টঙ্কার। চড়া রোদে পাকা বটপাতা— তার বয়সের ঘোষণা আনে। দমকা পাতলা বাতাসে পাতা ওড়ে। ওটা হলুদ, ঝরাপাতা। লুটায় তা চাকায়— ধুলায়। শাসক অস্তমিত ঝরাপাতার রঙ নেবেন না কখনো? উনি তো চিরকালীন শাসক। তাহার মৃত্যু নাই। অমর, অজর, অক্ষয়। এই কালপুরুষ যখন কালেক্টরয়েট ময়দানে নামিবেন তখন সামনের রাস্তা ভরিয়া উৎসুক জনতা হাঁ মেলিয়া তাহার আয়োজন দেখিয়া চলিবে। চলার ধরণ বুঝিবেন। কতোজন তাহাকে তোষামোদ করেন তাহারাও তাহা করিয়া খ্যাতিমান হইয়া চলিবেন বলিয়া মনে হয়। শুন হে মানুষ! তোমরা এভাবে অমরত্ব পাইতে পার। তোমার ভেতরের অনাস্বাদিত বাসনা পুজাইতে পার। সে বাসনার সকল মানুষের আগ্রহী চোখকে নিজের চোখে দেখে। বেমালুম ভুলিয়া তুমি তোমার পূর্বসূরির বেশ ধারণ কর। তাইতো দীপালীর জীবনের দাম নাই। এ ধরায় তুমি আসিয়াছ বাদশাহ হইয়া। সে বাদশাহ তোমাকে খান্দানী করিয়াছে, তাহার রেশ এখন টমটমের চাকায় আটকাইছে। মাখনুনের নয়ন এখন চরায় পড়া লঞ্চের মতো। ওখানে কাহার উল্লাস, কীসের আয়োজন! কতো মানুষের স্রোত, কতো মানুষের আকুলতা আর করুণা— সবই কী মরা পোড়ানোর জন্যে! নাহ্ মিসেস গান্ধীর সুনাম নিয়া কথা হয়। কাল বিবিসি রেডিওতে বলা হইছে, ‘তিনি অনন্তকাল বাঁচিয়া থাকিবেন, মানুষের জন্য যে কাজ করিয়াছেন মানুষ তাহা চিরকাল স্মরণ করিবে।’ কোন রিপোর্টার সে? বুঝি মার্ক টালী বা এন্ড্যু হোয়াইটহেডÑ নাকি ফিক্স-টিক্স কেউ। কিন্তু এখানে তো তা নাই। এই ব্যক্তির এতো চাখাচাখির কারণ কী? ইনিও কি চিরকালের কেউ নাকি!  নাহ, মেলানো যায় না। বাদুড় আর চিল তখন নীল আকাশে দোলে। ঢেউ খেলে, কান্নার সুরে ভাসে আর করুণার অবগাহন তুলিয়া আনে ধোঁয়ারূপÑ যেখানে গান্ধীজী পুড়িয়া যান। রাজঘাটের চত্বরে তিনি বিনাশিত। এই অবতার ধম্ম এই মাটিতে পোঁতা। আরও ভেতরে আছে অসীম আলোক। তবে কী গান্ধীজী আবার ফিরিবেনÑ হাঁস হইয়া কিংবা উড়ন্ত ধবল বকের পাখনা মেলিয়া। শান্তির দূতরূপে অগ্যস্ত পথিকরা এরূপে আবার আসিবে; ভরা মহানন্দার শরপড়া সোঁতে বা ডাহুকের স্বচ্ছ শীতের কোমল কুসুমে। ওই শ্লোকের ভেতর নিষ্ঠুরতার বলয় গুরুভার হইবে! চন্দনের কাঠ জ্বলুনিতে ভস্মসাৎ দেহ আনিবে, তখন নয়ন মেলিয়া সব সাঁতরাইয়া কয়, ‘আমার হত্যার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়া ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নতুন শক্তি উদ্বোধিত করিবে।’ এই পোড়া মৃত্যু আর বিরল সব বাণী ওই সিনেমাওয়ালার পোস্টারে আর কালেক্ট্রি মাঠের সভায় একত্রিত হইলে, মাখনুন কী করিবে, তাহার শ্যামলরূপ ছাই মেঘে বিলি কাটে আর খুলিতে ডুম-ডুম টাক-টাক দুন্দুভী করে। মাখনুন তখন অনেক কিছু হইতে চায়। ওই যুবরাজ আর প্রেমিকার বাহুডোর তাহাকে নতুন শক্তি দেয়। টসটসা গাল আর লাল ঠোঁটের ভেতরে করুণা পায় না। কিন্তু নায়কের অসহায়তার ভেতর দয়া তৈরি করে। এই দয়া আর নায়িকার ঠোঁট ঠিক ম্যাচ করে না। ছবির চাহনিতে রমনীমুখ খালার মতো বা ফুপুর মতো ভারী, বিশাল। আর কার কাছে তার যেন শোনা রেখাবিবি বা এখলাস চাচার স্মিতা পাতিল মার্কা কিছু মনে হয়। মনে আছে একটি বিশাল বাক্সের ফিতা দিয়া চালানো তখনকার ভিডিওর কথা। ঠিক মনে নাই আবার কিছুটা মনেও আছে কিন্তু বলা হয় স্মিতা পাতিলের নিষ্পাপ মুখশ্রী ওই সিনেমার খুনি-জল্লাদ বা নৃশংসতার প্রতিবাদ গড়ানো। তখন পাশ থেকে বাণীবাহিত বায়ু কণ্ঠ কাঁপায়, ‘আসিতেছে…’ ধ্বনি আর বিশাল জনসভার কর্কশ উচ্চারণ তখন বেশ মাকড়শার বুননি পয়দা করে, দপ্ কইরে জ্বলে দীপালি সাহার মুখ, সে কীসের মূর্তি, তাহাকে কেন মারি ফেলে, ওই কুত্তার বাচ্চা আবার কীয়ের জনসভা দেছে রে, মার চুদির ব্যাটারে… দুম দুম শব্দ ওঠে, পাটকেল ছোঁড়া হয়, ধুলা-বালির অন্ধকারে উঁচু আকাশের আলোতে রঙ কমলা হয়— স্থির হয়… ঘন হয়… কিচ কিচ শব্দে বাবুই পাখির দল ঝাক মেলিয়া ওড়ে, দু’একটা সীমানা না পাইয়া গোলজার চাচার পেছনের উঁচু তালগাছটায় দোলে, ভেতর-বাহির করে— অন্যটাতে যায় আসে, খুব তাড়াতাড়ি পড়ি যায় অশ্বারোহীরা, মাইক ছিনতাই হয়, তুমুল কোলাহলে জটলা হয়, খুনী স্বৈরাচারের দালালেরা ধ্বংস হোক নিপাত যাক…; মাখনুন দূরের ডাক শোনে— চাকু আর কী কী সব ধারালো অস্ত্র নিয়া দাপদাপি দেখে, সেখানে স্কুল ঘরের বারান্দা টিউবওয়েলের পাড় ফাত্তাহ মাস্টারের দোকান কালীপদের হাপর টানা কামারের দোকানের পেছনে বাঁশঝাড় আর দূরে মেছের নাপিতের চুলকাটার ছাপড়ায় ভাঙা গ্লাসের চারফাটায় উচা-নীচা মুখ মিনিটের ভিতরে উল্টাপাল্টা নড়ে, কিছুটা কাঁপেও— পরে মেসমার হয়। এসব যন্ত্রণা বা ক্ষয়ক্ষতির বিধিলিপি নিয়া জেদ আর ব্যক্তিগত শত্র“তাও এক কাতারে পড়ে। কিন্তু তলে তলে ভয় বাড়ে সকাল থেকে দুপুরের পরে সন্ধ্যা আসে সূর্য ডোবার আগেই শোনা যায় খুন হইছে, কাদের সরকার এক চোটে মিস্টার আবেদ সাহেবের হাত খণ্ডিত কচ্ছে, জামতলার পাশের নামায় একজনকে ধরি পা ফাল্টা করছে। এসব শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে পুলিশের বৃদ্ধি ঘটে, দাঙ্গামার্কা পুলিশের আগমন ঘটে। তাড়তাড়ি চতুর্দিকে শ্মশান নামে। সরকার নাকি থানা বা কেউ কেউ উক্ত দলের লোক বা চিয়ারম্যান খুব তড়িৎভাবে না হইলেও এখন এই অন্ধকারে নামি আসেন। দুএকটা মেলেটারি গাড়িও আসে। মাখনুন গাড়ির দিকে তাকায়, উহা কী তবে রাষ্ট্র! আবার মেলেটারির কট্টোর পোশাকের দিকে তাকায় উহা কেমন রাষ্ট্র! আবার সে জেনারেলের আদেশ-নির্দেশ ছড়ানো পরিপত্রের ধূলিমলিন কাগজের দিকে তাকায়— উহাও কী রাষ্ট্র! কোথায় তাহার বাস কে তাহার নিবাস? দীপালি মরিয়া গিয়া কী রাষ্ট্রকে ঝামেলায় ফেলাইয়াছে— নাকি এই রাস্তার নামায় পা-কাটা মানুষটার চি-চি কণ্ঠস্বরের ভেতর রাষ্ট্রও চিচি-চিহি করিতেছে… না এই কী সে দেখিবে, কোথায় কালেক্ট্রি মাঠের জনসভা, আর কে যেন আসিবেন, তিনি তো ভক্তি আর শক্তি নিয়া আরামে মায়ের দুধের ন্যায় স¹-স্বাদ নেয়… এ নিয়া রোমান্স করে, শিরশির করে শরীর, তরতর করে তার শিরা-উপশিরা, এক সময় সে স্কুলঘরের উঁচা বারান্দাটায় বসে, হাওয়ায় হাওয়ায় হেলে আর এক নিমিষে পালওড়া নৌকা দেখে, নীলরঙা সবুজ ইংলিশ প্যান্ট তখন কালা, ইতিমধ্যে সেদিন তাহার বিশুর কথা মনে হয়। বিশুর তো পায়ের দিকে কাটা কাটা লোম আছে কিন্তু ওপরের দিকটা ওঠালে আশ্চর্য হছিল— এতো ঘন লোম— তার বাপের মতো, তবে কী শালার এতোই বয়স! কিন্তু তখন ফিকে চাঁদ তাকে আড়ালে টানে, নীচে হিস্যু দেয়, তারপর একটা আরামের সুখ তাকে পেছন দিকে হাপর টানায়, জোর দেয়, হাতায়, বাড়ায়, বাড়তি দোলায়, টকটকটক করে, দীপালিকে কাছে আনায়, বিরাট অবয়বে অপরাজেয় বাংলার একমাত্র নারীমুখটা হ্যাচকা টানে এক ব্যক্তিত্বে দাঁড় করায়, কী উচুঁ তার শির, তাকানোর সৌম্য দৃষ্টি, কতোদূর আর কতোদূর, বেশ কর্কট সময়টুকুকে আঘাত করে, আরও আঘাতে মুড়িয়া দেয়, তবে সে শূন্যতায় ভরা থাকে। গ্রাস করে সর্বত্র তার ওই মুখাবয়ব, তার নিটোল মুখ, টিকালো নাক— ভাঙ্ ভাঙ্ রে কারার দ্বার, মাখনুন দাঁড়ায়। পশ্চিমে তাকায়, মাঠের শেষ প্রান্তে চোখ যায়— এক সময় ঘিরিয়া আসে দীপালি আর বসুনিয়া। নারী-পুরুষ মূর্তি পাশাপাশি, দুই বিপরীত, দুই মুখো, দুই শক্তি, দুই ভূজা— সেখানে আরও অনেকরকম আবেশ আসে, ক্রমশ ঘনীভূত অন্ধকারে চতুর্দিকটা ঢাকে, সেখানে সমস্ত ভয় আর সাহসের যুদ্ধ বাধে। সে যুদ্ধে এক সময় অনেক আগের মওদুদ বিএসসি বা আরও কেউ কেউ সুখনগর বা এই রূপদিয়ায় ভরাট মূর্তি ধরিয়া আনে। ভেতরে খকসোর বাসও আবার লাজন¤্র। কী এক বাতায়ন যেন খুলিয়া গিয়াছে। কালই যেন পড়া হচ্ছিল নজরুল না-কি কে যেন বলে, সহসা আমি চিনেছি আমারে/ আমার খুলিয়া গিয়োছে সব বাঁধ— সে রকম কী মনের কারা খুলিয়া গিয়া সব ভাসিয়া উঠিয়াছে না-কি? এতো মহড়া কেন, এতো কেন উৎসব আর প্রলয়ের নৃত্য, তখনও চিক্কুর থামে নাই, হাওয়ার গরম দূর হয় নাই, ভস্ শব্দে রায়ট পুলিশ গাড়ি থামায়, কী য্যান খোঁজে— তারপর চলে আবার থামে, স্লো করে, জোনাকির রঙ ঝিলমিল ভাসানো, দূর থেকে বেসুরা আজান কচুরপাতার পানির মতো ভাসে, কাছে-দূরে হয়, ওপর-নীচও করে, ইন্দিরার পাড় থেকে মাটির ভাণ্ডে অযুখানার টুকটাক আওয়াজ কানে পড়ে, তারপর মাখনুন ভয়ের ভেতরে ক্বেরাত পড়ে, তিনবার না দুইবার বা আরও বেশিÑ কররেখায় গুণতি ভুল হয়, তার ভেতরও টুক করে মানুষ পোড়া, ইন্দিরা-শ্মশান কিংবা মওদুদ বিএসসির কব্বর গড়গড়া দিয়া ওঠে, ওইখানে কামারের দোকানের পাশে কব্বর আছিল— এখন তা নাই, থাকার কথা নয়, তবে কুকুর ভোগে ক্যা… শেয়ালও ল্যাজ উঁচি দৌড়ায় নাকি পলায়, মাখনুনের চাপ বাড়ে, পেট ভারি আর শিশ্নের ভেতরে কঠোর কঠিন কারা তৈরি হয়। আলোছায়া আর তাড়ানো বাতাস এক করিয়া ভুলিয়া ওঠে। সবুজ ঘাসের ওপর একটি নাম না জানা লালপোকা ঠিকরানো নীল আলো ফেলে। সে কি আলো না আলেয়া বোঝা যায় না, মাখনুন মৌসুমী বায়ুর ভেতরে দেহের কম্পমান রূপ দেখে, তুমুল পালফোলা আনন্দের ভেতরে শরীর জুড়ে দীপালী বা অপরাজেয় রমণী বা পুরানা শান্তশ্রীকে দেখে। একইরূপে তারা এই অন্ধকারে যখন ভীড় করে তখন ওয়াজ কানে আসে— ‘যার এক ফোঁটা পাতলা শুক্রাণু বাহির হয়… তার ওজু নষ্ট হইয়া যায়’, গোছল না দিলে পাক হওয়া যায় না। কিন্তু শান্তিশ্রীরা দল ধরে তার কাছে আসায় কখন যেন ওর ওজু নষ্ট হয়, তাই আর তো সালাৎ আদায় হবার সুযোগ নাই, ফলে মনটা এখন মাছের আঁশটের গন্ধ, তখন একটু মাস্টারবেশনেরও সুযোগ আসে, আরাম হয় তাতে, ভয় কাটে আর সুখ ছড়ায়া পড়ে কুলা হাকা বাতাসের ধানের মতো। হাতের ওপরোত তুলি ঝুর ঝুর করি ধান যখন ছিটায় তখন বৃষ্টির মতো ঝপাৎ শব্দ হয় আর তামান পাতান দূর হয়। ধুলা-বালিও সেই রূপ ধারণ করে। এবার ওই অপরাজেয় রমণী চোখ-মুখ খোলে। এই অপরাজেয় রমণী কাঁপে কিন্তু কয়েক রঙা হইয়া নাচে। ঘোর তৈরি করে নাকি মাথা ঘোরে, সেকি রক্ত দেখছে, কবে যেন ট্যাক-কাটা দাও দিয়া পাও কাটি সে গোয়ারমেন্টের ওই লাল হাসপাতালোত গেছিল। তখন কম্পাউন্ডার আসি চকচকা তির্যক যন্ত্রপাতি দিয়া ঠ্যাং আরও চেরা শুরু করলো আর হুলহুল করি রক্ত বার হয়, তখন তামান ঘোরা শুরু হলো— নীচা নামার ওপর দাঁড় করা শিরিসের গাছটা দুলি ওঠে, পাকা ধানের ক্ষ্যাত পঙ্গর দেয় আর সবকিছু তিন চার টুকরা হয় আর আলোছায়া কাঁপে— তখন এইরকম কী মনে হয়! না হলে ইন্দিরার ববকাট কাঁচাপাকা চুলের মধ্যে ম্লান হাসি ওভাবে ভীড় করে না ক্যান? না, ওখানে তো দীপালিও আছে, দীপালির পোস্টার না-কি ডান্টা উঁচু করা হাতে তীব্র স্বরে কয় ‘দমননীতি বন্ধ কর’, ‘গণবিরোধী নীতি প্রত্যাহার কর’ ওসব কালা-কালা সমান সমান লেখা দোলে আর নাফ পাড়ে। বর্ণমালা দুর্গার চোখের ন্যায় জ্বলজ্বলা, হাসিয়া ওঠে আলোকিত করে দিগি¦দিক, শক্তি-সাহস দেখায়, তেজও প্রকম্পিত। মাখনুনের চোখে পড়লে বর্ণমালা মায়ের মূর্তি ধরে, সে স্তননে ধরাকে প্লাবিত করে, একত্রিত করে। তখন মেলাগুলা ফাঁকা বাতাস হুড়মুড় করে জনস্রোতকে ঘিরি ফেলে। গিরি-সমান হয়। তারপর তামান গতি পায়, বেগের ত্রাসে সব সোত্তে একঢালা হয়া মাটিত পড়ে— তখন দীপালি হুড়াম্যাক্তায় নাই নাই হয় আর চেকন গলায় আওয়াজ তোলে অথচ কিছুই বোঝা যায় না। চেকন আওয়াজটা কানের পীঠে আসে, কেমন জানি নরোম মাখনের মতো পর্দায় প্রতিঘাত করে, তার মধ্যে করুণ ছায়া আর আবছায়ার ঘোর মিশিয়া কী একটা ভাসানো আবেগ তৈরি হয়। মাখনুন শৃঙ্গার সুখ পায়। ওরকম আওয়াজে তার রক্তসঞ্চালন গতি পায়। তখন আগ্রহ হইলে চুমা দেয়, চুমিয়া চুমিয়া সব প্রত্যঙ্গ নিয়া একত্রে পৌঁছায় গলায়, সোনার  কণ্ঠহারে, বলিরেখায়Ñ তারপর আদরে আদরে পাতলা ফর্সা চামড়ায় একটু লাল করে দিলে লাল পিঁপড়ার কামড়ে চাকা চাকা নির্মিতি পায়, সোনালী সূর্যালোকে রোমকূপ তখন ঘন ও স্পষ্ট হয়, তারপর তা গলার পেছনে গর্দানে পৌঁছায়, গোল ব্লাউসের বর্ডারের প্রান্ত ধরে অনেক কিছু গড়ে তোলে, ছন্দোময় হয় দেহতরী— গড়ে ওঠে পছন্দের ইমারত। দীপালির কণ্ঠ তখন আরও ক্ষীণ। তাপ বাড়ে, ভেতরে উষ্ণতারও বলোক ওঠে। কণ্ঠটাও গাঢ় হয়, কঠিন জটায় হাত দিয়া সে জননীয়তা উপভোগ করে— ফিরে আসে তখন এক বান্দরের বাচ্চা, সে চুকচুক করে দুধ টানে, কিচিরকিচির শব্দ করে— সে শব্দে আর গলার আওয়াজ এক থাকে না, গোলমেলে ঠেকে, বাধা হয়— আর সরিয়া যায়। দ্রুত ছায়ার সাথে তখন চলে পাড়াপাড়ি যুদ্ধ, তখনই শান্তশ্রী মূর্তমান হয়। সেই কবেকার কালা শরীর। হাত ফসকে সবটুকু বেরিয়া পড়ে। মাখনুন দপ করে স্কুল মাঠের মাঝখানে বসে। ততক্ষণে পাকুড়ের তলায় ঢোপটাতেও আলো জ্বলে। সবাই তখন ভিতা-ভিতি হইছে। একদিন দেখা যায় হঠাৎ এখলাসুর রহমানের নামে ওয়ারেন্ট আসিয়াছে। উনি কই থাকেন কী করেন সে সব নিয়া থানা-পুলিশের লালকোঠায় প্রশ্নচিহ্ন, এই এলাকার চলতি মারামারিতে এখন তাহার অদৃশ্য হাত ধরা পড়িয়া গেছে। খুব ভোরে একদিন জানা গেল এখলাস চাচা এরেস্ট হইছেন। তাতে অনেকেই আশ্চর্য হয়। আইনের তার কোথায় কীভাবে প্যাঁচ কষে, কেউ জানে না। কেউ তাহার অদৃশ্য ও কটাক্ষরূপ দেখে নাই। ‘গুরু উপায় বলো না’— গানে এখলাস চাচা সত্যিই কোনো এক সকালে কোমরে দড়ি পরিয়া সকলের সম্মুখে হাঁটিয়া হাঁটিয়া সোজা পুবমুখা উদিত সূর্যের দিকে তাকাইয়া দুজন হাবিলদারের সঙ্গে বড় সড়কের দিকে যাচ্ছিলেন। মাখনুন তখন বিশুকে খোঁজে। কিন্তু এই পরিণতির জন্য আচমকা চোখ ফাটিয়া জল ঝরি পড়ে। বিশুই তো সব বলবার পারে, কেন এই মানুষটার এমন গতি, মাখনুন অনেকক্ষণ চলতি পথে তাকায়, এখলাস চাচা বুঝি চেনে না তাকে, তাক্ কী মার দিছে, পরনের কডের প্যান্টটা কী যে ময়লা, চুলদাড়িতে মুখ ভরা, মাখার চুল চক্ষু ঢাকিয়া ফেলিয়াছেÑ চেনা মানুষটাকে খুব অচিন মনে হয়, দুর্বল মনে হয়, জীবনের ব্যর্থ পথের ইবলিস বলে জনসমক্ষে সে পরিগণিত হয়। কেউ কয় নাস্তিক, কেউ কয় ভেতরে ভেতরে কুকামের ওস্তাদ, কেউ কয় লান্নৎ। মাখনুন কিছুই বোঝে না, ভোরের শিশিরে সে বাবুই পাখির পাতলা ফড়িংয়ের রোদ দেখে— আনন্দ কেমন এক সন্নাসী তখন— যাহা ভালোমানুষের গান বোঝে না, হারানো বিপর্যয়ের সুখ টান আর স্বচ্ছ ডোবায় কৈমাছের পাখা টানার মজা দেখে। এভাবে স্রোতস্বিনী ইছামতি আর পুনর্ভবা যেন বহাইয়া চলে অনেককাল! সেখানে জনউদ্যোগে একদিন লম্বা বাঁশের সাঁকো তৈরি হয়, বাধাপ্রাপ্ত গতিতে পুনর্ভবার তীরে ভাঙন হয় কম কিন্তু কাশতরীর পালে এখলাস চাচার কমুনিস্ট স্বপ্ন দুর্গার হাসিতে ভাসে। লম্বা হাঁটা সুলিতে তখন শোকপ্রতিবাদ চলে। মৌন প্রতিবাদের ধুলায় কিংবা ঘাসে ঘাসে এক সময় মওদুদ বিএসসি মূর্তমান স্বরে কইছিলেন, ‘যতোবার হত্যা কর আবার জন্মাবো কালের পাতায় লিখব বিপ্লবের ইতিহাস’। কবে তখন শোনা হয় সুখনগর হাইস্কুলে ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’— নামের এক যাত্রার ধ্বনি, তাহাতে রেফারেন্সে দাঁড় হয় বিএসসির, মুঠে-মজুরের পক্ষে সে বাজিগর তখন কইছিলেন, ক্ষেতমজুরের শক্তি কায়েমের লক্ষ্যে আজ সমাজে আন্দোলন হইতেছে। গুটিকয় মানুষের পক্ষে মাখনুন তখন ফুটবল পোস্টের কোণায় ওকরা গাছের ফাঁদে পা আটকায়, বুড়ি আঙ্গুলে তখন মোটা সীট-কাপড় শুকতে শুকতে এখলাস চাচার ছবি ভাসায় কিন্তু তার আগে সে ওখানে অনেকগুলা রঙ্গীন বই পাইছিল। কাস্তে হাতুড়ির লোগো নিয়া ওইসব বইয়ে সে কী কী কঠিন কথা জানছিল— বিশু সেগুলা তর্জমা করি কয়, ‘বাল— ওগলা তোর মাথাত ধরবানায়’— তখন রাগ হয়, খারাপ কিছু না কইলেও সে মনে মনে জিদ ধরে, তোক না ছাড়লেও একদিন দেখিম… হায়! সেই এখলাস চাচাক নাকি কাল জেলা আদালতোত তুলবি, খাবার-থাকার জন্য তাক কিছুই দেওয়া হয় নাই। খুব মনে পড়ে বিএসসিকে— মানুষটার আদালত ভাসানো স্বর এক সময় সেই পাইছিল, তবে আজ আর কে দাঁড়াইবে কে রক্ষা করিবে তাকে! ২. সুখনগর হাইস্কুলে মাখনুন যখন নবম শ্রেণিতে উঠল তখন অনেকগুলা স্বর আর ছায়া জীবন থেকে সে অপসৃত হইয়া চলিছে। সেই কালস্রোতের ধারায় অন্ধকার স্কুলকোণার বর্ষায় চুমচুমা কালো নোয়াখালি স্যর অন্ধকার কব্বরের পরিবেশে ফরিদপুর থাকি বহাইয়া আসা ছাতা সেলাই করিয়া একদল লোকের কাম দেখলে বারান্দার নীচে দূর্বামাড়ানো ঘাসে পা দিয়া ভরাট স্বরে ছোট্ট করি কন, ‘কিংখাব চেনোস’? কিংখাবের টুকরা? জীবনের অন্ধকার তখন আরও সর্বনাশের গভীরতা নামাইয়া আনে। কঠিন কঠোর ওই সর্বনাশায় মাখনুনের ভয় পায়। ভয়টা উঁচু হয়। কী যেন এক প্রাচীর সে তৈরি করে। কালো তার রঙ। ভয় তার কালিমাখা। চতুর্দিকে ভয়াল অন্ধকার গ্রীবা ঘিরিয়া থাকে। শিহরণেও মাতে। লজ্জাতেও ধরে। শীত ঝুলাইয়া আসে। ঝুল মারে। হিমানি চাপি ধরে। কতোকিছু শৈবালের তলার আঠায় আটকায়। জমাট কিছু পেছনের দিকে ঠেলে। শক্ত হয়। কঠোর আর ঠান্ডা ইস্পাতকঠিন তাপে শিরার প্রবাহ ঝংকার তোলে। ন্যাড়া শিমুল গাছে হাতপা ছড়ায়। দূরের দীঘির পঙ্গর ফোলা তরঙ্গ ছোঁয়া বায়ু বয়, পাড় ভাঙ্গে, মনিষ্যিহীন প্রান্তরের সীমানা ধরিয়া সরসর বাঁশিও কুঁকুঁকুঁ আওয়াজে হাম্বা হাওয়ার খেলায় মাতঙ্গ করে। তখন মাখনুন স্কুলবারান্দার মোটা পিলার আঁকড়াইয়া ধরে। অবলম্বন ঘেঁষে ঘেঁষে পরে আড়ালে দাঁড়ায়। খেয়াল করে নোয়াখালির লাশমোড়া ধবল পাঞ্জাবির কানির দিকটা কই। কিংখাব! কিংখাব!! কিংখাবের টুকরা! জ্বীন নাকি! নয়তো অন্য কিছু। নাহ, তবে ছাতার দোকানিরা আর বারান্দায় নাই ক্যান! কই রে …ওরা আওয়াজ দিলেও তো হয়! হ, হাটে শাদা পাঞ্জাবী এবার দেখা যায়। কিন্তু কালো নয়, লোহার মতো শক্তও নয়। নরোম, ম্লানময়, কমলালেবুর কোয়ার ন্যায় ঠোঁট, কালো-গুলা একটু মসৃণ, চোখে ঘোলা রঙ, গলার নীচে তিনস্তরের মোটা মোটা নেকলেস, ক্যালভিন ক্লেন মার্কা ক্যালিজন, নীচের দিকটা শাদা না-কি মিরাণ্ডা রঙ না ঘন দুধেল ধারা চপচপ ঝিলিক মারে, বোঝা যায় নাÑ হাঁটুর নীচে তো কিছু নাই… তীব্র হাওয়ায় ওড়া পীঠে পাখনার মতোন কী যেন দোলে, নখগুলার আগায় আল্পনা ধরা, মন্দির-প্যাগোডা-মসজিদের গম্বুজ ধরনের বৈভব বসানো। মেহেন্দি নাকি আল্পনার আঁকিবুকি না মেশিনে মারা সিঙ্গাপুরের বিউটিপার্লারের কোনো ব্র্যান্ড— কেডা! কে কে কে!!! মাখনুন আরও লজ্জা পায়, ভয়ের ভেতর ঢুকি পড়ে, সাড়াহীন শব্দে মিঁউ মিঁউ করে কিন্তু আরও কিছু বলার আগেই দেখে কিছু নাই। তখন হাওয়াও লুপ্ত। কখন যেন নোয়াখালি স্যর চলি গেছেন। নির্বিকারভাবে একটা স্থির পোটলা ঘুমায়। বারান্দায় ছাতিঅলারা রাতের দৈনন্দিন খাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। পেছনে চাটাইয়ের বেড়ার ওপারে ছাতাঅলার মাগি গ্যালন গ্যালন মোতার পর চেকন গলায় কয়— ওষুদ আনো, মরিম ক্যালা! মাখনুন তখন খালি আলোতে আসি-যাই করে। শরম-ভরম পায়। ক্যারে কী দেখলু? না, কাঁপে— প্রশ্নটা তার নয়, ওই মেস্তারের দিকে তাকালে খুব আরাম পায়। কেউ কি দেখছে কিছু? কিন্তু সুন্দরী পরী ধরা তো খারাপ নয়। সে তাকে চায়। ফর্সা ঠ্যাংগের ভেতরে নিজের ঠ্যাং ঢুকালে সে কী আরাম পায় নাকি জ্বরের ব্যারামে বমি আসে— ঠিক করার আগেই পাকুড়তলা থাকি লাঠি লজেন নিয়া বিশু ডাকি চলে— এখলাস চাচা কই? কালেক্টরেট মাঠের জনসভার প্রচার নিয়া যেদিন মারামারি হয় সেদিন মাখনুনের রেজাল্ট নিয়া বাপের কাছে তার সহবন্ধুরা আসে। তারা শুকুর গোজারি করিয়া দোয়া করে, খুব প্রশংসা করে। এই ছেলে একদিন মহান হইবে। বহু কেতাব লিখিবে। শুন নাই, সেই হাফিজ বা খৈয়ামের কথাÑ তাহারা যেমন বহুদূর পর্যন্ত সুনাম প্রসারিত করিয়াছিল এই ছেলে একদিন তাহাই করিবে। মাখনুন শিহরিত হয়, বাপ তখন তোতলা হাসিমুখে ঘরের উপরের টিনের বাতার দিকে চাহিয়া মায়ের সহিত পুত্রের প্রশংসা নিয়া গালগল্প করে। তাহার বুক ফুলিয়া ওঠে। সে বাহির হয়। মনে মনে সে নিজেকে পর্বতসমান জারি করে। সত্যিই সে একদিন এই পাড়া ছাড়িয়া গ্রাম ছাড়িয়া স্কুলমাঠ ছাড়িয়া পড়শি ছাড়িয়া খালা মামা নানী ছাড়িয়া অনেক দূর চলিয়া যাইবে। এই গ্রামে আর ফিরিবে না। তবে যখন আসিবে তখন সবাই তাহাকে দেখিবে, এই সেই মাখনুন— সে কত্তোবড় হইছে, গায়ে মজার সুবাস নিয়া চলে, উহাকে বসিতে দাও, পাখার বাতাসে তাহার সেবা কর, বড় বাতি আনো, হ্যাজাগ আনো, আজ হাটের বড় মাছ কিনিয়া তাহার রসনার সন্ধান কর, এই ছাওয়াল আবার কবে আসিবে কে জানে! এমন খোঁয়ারির ভেতর হঠাৎ বিশু আসিয়া কয়, এখলাস চাচার জেল হইছে। খুব গলা ছাড়া কান্দোন তিনি করেন নাই, হো হো করিয়া হাসিয়া কইছেন, বিপ্লব একদিন আমার পায়ের উপর দিয়া আসিবে, তোরা মাঠে থাক। সব মিথ্যারই বিচার হইবে। এমন বন্দীর নিরুপায় নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রতিপক্ষরূপে কাল বিকেলে এ অঞ্চলে জনসভার আয়োজন করে। কোন মন্ত্রী আসিবেন তার প্রচার ইতিমধ্যেই শুরু হইছে। পৃথিবীর সকল সূর্যোদয় বুঝি এমনি করিয়াই ক্রিমিনালদের হাতে চলিয়া যাইবে! ঠিক বোঝার আগেই দুমদাম আওয়াজ হয়। সর সর করে সব ঝাপ পড়িয়া যায়। আজ নাকি এ এলাকায় জরিপ আসছে। সকল মানুষ কী সব আলোচনা নিয়া জটলা করে। ভেতরে বাইরে চাপা উত্তেজনা। থানার পশ্চিমে কে একজন ম্যাজিস্ট্রেট নির্দেশ দিয়া কন, সকল অবৈধ দোকানপাট সরান, দখলদার উচ্ছেদ চলবে। এসব কথার ভেতরে কি-রকম পলিটিক্স ঘটানো আছে কিছু বোজা যায় না। জমি দখলের, ঘর দখলের, আলোবাতাস দখলের কিংবা আকাশ দখলের বা কাউকে উচ্ছেদ করার, বঞ্চিত করার অভিলাস আর কাহার কেউ তো জানে না। অতঃপর দলা পাকা সকলেই ঘরে ভীরু হয়া পড়ে। ক্ষমতার প্রভাব নিয়া তড়পায়— তলার নীচে মাথা দেয়। নেদুআর বাচ্চু হোঁতা, কালা কিশকিশা গোদা গোদা ঠ্যাং নিয়া তখন ওসি সাবরে পাহারা দেয়। গরমে চতুর্দিক পোড়ে, কলিজা পোড়ে, ঘর পোড়ে, বেণুবনের ছায়ার ভেতরে ছাওয়া পাতা ঘুরিয়া ঘুরিয়া এলাইয়া পড়ে; পর্চা ওড়ে, এজমালি বা কবলা করা জমি নিয়া আলাপ বাড়ে, আমিন নাকি সরকারি আমিন দাগ বসায়, দাগ পড়েচিহ্নিত হয়, ভূমি আলাদা হয়, দাগে কাটা পড়ে জ্যোতিন্দ্রনাথ সরকারের ভিটা। কতোকালের সে ভিটা! ওই ভিটায় এককালে তাহার বাপ আছিল, তারও বাপ থাকিছেসেই ভিটায় কাটা পড়ে, পুণ্নিমার টানে গোল গোল আলো নিয়া কলার পাতার ফাঁকে জন্ম হওয়া দীপক সাহা, দীলিপ সাহার আর পতিত সাহারা ফ্যাল ফ্যাল করি তাকায়। তাহারা বুঝি এইবার চিরজনমের ভিটা ছাড়িবে, ওই ভিটা নাকি সরকারের, নাকি অন্য কারোল— হ্যাঁ, বুঝচি উহা কার, আমাদের তাড়াইয়া দেওয়ার ষড়যন্ত্র, হেঁদু তোআর তো কেউ নইনাই সরকার বা বাচ্চু হোঁতার ক্ষ্যামতা, নাই টাকা খাওয়া কোনো মুক্তারের মামলা করার তাকোদ। হুম হুম করিয়া ভিটা ছাড়ার কান্না ভইরা ওঠে, পরিত্যক্ত স্মৃতি সাপের জিহ্বার ন্যায় হিলহিল করে… (চলবে)

সমস্ত ধূসর প্রিয় [ধারাবাহিক ট্রিলজি]

[পূর্ব প্রকাশের পর]

মাখনুন ক্রমশ বাইরে তাকায়। এককালের বকুলগন্ধা ভোর এখন কড়া রোদ ছেয়ে আনে। অঙ্কুরোদ্গমের কড়া আকর্ষণ এখন নাই। বাটা হলুদের রঙে দিগন্ত বাওফোটা আওয়াজ ওঠে। সে হাতছানি দেয়। কে যেন ডাকে। সম্মুখে এক কালিগোলা অন্ধকার পথ বুঝি, নাকি শুভ্র বসনার কালস্রোত তাহার পানে অপেক্ষমান। বড় একটা পঁইয়ের ভেতরে অনেকগুলো পয়সা আছিল। গেল হাটবারেই সে বেশ কিছু পয়সা নিকানো বারান্দায় হাঁটিয়া এখানে জমা দিয়াছে। এই বারান্দার পঁইগুলো একসময় ভর্তি হয়। জীবনটাও কী ভর্তি আর বিনাশের অপেক্ষায় তৈরি থাকে তখন! কুয়াশা ঠেলে গরম জিলাপি নিয়া আসেন দোকানদাররা। সাথে কিছু বাসনকোসনের প্রয়োজনীয় উপকরণ। বেশীর ভাগই ইঁদুরে আটকানো গর্তের ধান-চাল। মাখনুন কিছুদিন হলো গ্রামে আসিয়াছে। এটি মার্বেলগ্রাম। এ আনন্দধামে অনেকবারই আসিয়াছে কিন্তু এবার খঞ্জনার খরায় পৌষসন্ধ্যার ডাক আসিয়াছে। সে ডাকে নিজেকে পাল্টায়, খুব বদন-অনুরাগ পলাতকা হইয়া ওঠে। এবার তার জীবনের নতুন পরীক্ষা। কিন্তু সবকিছুর আগেই রেডিওর শোনা খবরে বটতলার ছায়া ঘিরিয়া পানদোকানির জটলায় এক খবর তৈরি হয়। বেতারভাসা এ খবরের মানে নাই। ‘ক্যাডা যান ফির দেশের ভার নেছে’। মাখনুনের মনের ভেতর ভয় তৈরি হয়। সে ভয়ে সবার আগে স্কুলঘরের কথা মনে আসে। ঘিরিয়া ধরেন গ্রামার মাস্টার। কাল ভোরে রওনা দিয়া গরম ভাত খাওনের আগেই গ্রামার মাস্টারের কঠিন কণ্ঠ আছড়িয়া পড়ে। কিন্তু এক চাপা স্বর ভয়ার্ত করে। সে স্বর কঠিন না ক্লান্তিকর ঠিক বোঝা যায় না। কে আসিয়া বলে, বড় সড়কে খালি মেলেটারির গাড়ি। জলপাইরঙা সে গাড়িতে বড় বড় আলো। আলো কী আলোর ঝলকানির বিপদের ধ্বজা নাকি কোনো আশার সংকেত— আলোকে ভালো লাগে কিন্তু ভয় তো অবিমিশ্র হইয়া ভেতরে লকলক করে, ঢেউ তোলে, আড়ার আড়ালে অমাবস্যায় বাঁশি বাজায়, ঠাণ্ডার কোপে কালি দাপায়, পাঠার বলি হয় আর কোণায় কোণায় তারকা আলো দেখায়। তখন সখিনা দুধমা হন। বড়ো করেন। সড়সড় আওয়াজে পায়ের ওপর দিয়া ঢোরা চইলে যায়, ঠাণ্ডা সরীসৃপ রসে সোনার মানুষ কল্পছায়ায় দোলে— তাহা কী কোনকালে করম আলী ফাঁসী দিয়া ওই ডালের হ্যাকনায় মরিয়া দাঁড়াইয়াছিল নাকি ভয়ের দৌড়াইয়া হাপাইতে হাপাইতে দম বন্ধ হইয়া মরিয়া গিয়াছিল পাশের বাড়ির বুড়া দাদার নাকান। দাদা নাকি ভুল কইরেছিলেন, সে ভুলের মাফ পান নাই। ভয়মাখা ওসব গল্পেই সখিনা খুব আদর দেন ছোট্ট মাখুকে। মাখুর মনে নাই না আছে বোঝে না, কিন্তু আলোতে সে সখিনাকেই পায়, সে বড়সড়কের ঠিকরে পড়া আলোয় দেখে সখিনা, সে খুব তেল দেয় রোদ পোহাইয়া কোলো নাচায়, বুকে ডুবায়, ঘাড়ে আদর করে, থাইতে টেপে, কচি নুনুতে হুম হুম করে আর সরীসৃপ আরামে নিজে সুখ নেয়। লালা জমে মুখে। অজান্তেই ঢোক গেলে। আশপাশ তাকায়। ‘এইডা মোর ছাওয়াল’, কত্তো বড় হইবো, তখন সখিনা মইরে যাইবো, মাখনুনের চোখে আর কপালের কালো টিপে বারবার তাকায়, ওই টিপ কুশন্যি তাড়ায়, তাকে বাঁচায়, আর আলো নাকি সব অন্ধকার তাড়ায়, কই অন্ধকার, কেড্যারে বাবা, উদিকে কেউ নাই নাকি— ডাকে গ্রামার মাস্টোর, ক কাউ রচনা ক, দি কাউ বলার পর শ্বাস নেয়। কাঁপে। হিলহিল করে বাইরের বাতাসে খরা আসে। গা পোড়ানি খরা। আর তার তাপে গ্রামার মাস্টারেরও ভাপ ওঠে। সাহস পায় না। এতোক্ষণ সখিনা যে আদর দিছে তাতে ভয় আছিল না, এবার কী যেন ঘটে, ভয় তৈরি হয়, ওমা মেলেটারি নামছে কেন? এ গ্রামোত মেলেটারি আসিছে ক্যান। সাথে নাকি বড়ো দারোগাও। সবদিকে শুনশান। রাতের আঁধার নাই। হঠাৎ সম্বিৎ আসে। ছম ছম করা শরীর ভুলকি মারে। ‘তোমাক বাড়িত ডাকে’। কীসব হারিয়ে ফেলে মাখনুন। এ গ্রামে সবাই তার মামা। মামায় ডাকে। ভয় আর আর্তনাদ এক হয়ে খাঁড়ায়। হাঁটে। মওদুদ বিএসসির মতো ইংরেজি কানে ভাসে। না হলে গ্রামার মাস্টার তাকে ছাড়বে না। দ্রুত পা চালায়। অন্ধকার খুলি পেরিয়ে তখন হ্যাজাগের আলোয় খাওয়ার আয়োজন চলে। অপেক্ষমান মামা তাকে ডাকেন, কাছে নেন। কিন্তু মাখনুন স্বস্তি পায় না। ভেতরের হাপর লুকায় আর অধোবদনে ইলিশ মাছের ঝোল আর শীতে তোলা সিল আলু কামড়ায়। ব্যঞ্জনে সুখ পায় কিন্তু শান্তি হয় না। ইলিশ মাছের ডিম, ফালা করে কাটা লম্বাটে আলু আর জমির তোলা টম্যাটো খুব আনন্দে সে গলা দিয়ে আত্মসাৎ করে। হ্যাজাকের আলোর যখন তীব্রতা কমে আসে তখন ইলিশের পেটির লম্বা কাঁটা দন্তচূর্ণ করতে ভয় পায়। শিং মাছ দিয়া ঝোল করা বেগুনও ইতিমধ্যে তার পাতে পড়ে। সে ভরপেটে খেয়ে বাড়ির গাইয়ের দোয়া দুধ কাঁসার গেলাসে স্বরসমেত পান করে। কিন্তু সখিনার স্মৃতি কিংবা গ্রামার মাস্টার তাকে ছাড়ে না। মাখনুন জিহ্বায় তৃপ্তি নিলেও মনের ভেতরে যেন কাঁটা আটকায়। তখন বাইরে কে যেন ডাকে, মাখনুন কাচারির দিকে আয়। সে ভয় পায়। লজ্জাও নাকি বিভ্রম ঠিক করতে পারে না। কিন্তু খাবার পর ঘন অন্ধকার ঠেলে সে ক্রমশ যখন কাচারির বারান্দার দিক দিয়া হাঁটতে শুরু করে, তখন পেছন থেকে জোনাকীর ফাঁক দিয়ে ঝি-ঝির শব্দ শীর্ণ আওয়াজ কানের ভেতরে ঢোকে। কান আর বাইরের হুড়া আওয়াজের স্বর পৌষসন্ধ্যায় প্রগাঢ় হলে দীঘির ওপারে হৈ ওঠে। ঘন অন্ধকারের ভেতরে নতুন ডাক কানোত পড়ে। হ, আজ আর ক্লাশ হবি না। বুলবুলিতে বুলবুলিয়া ওঠে মন। আনন্দের উপর ডানায় পাড় ওঠে। এর মাঝেই পেছন থেকে এখলাস চাচা হাক পাড়েন। কীরে তুই মাখনু না? বেশ বড় হইচোস, এখন তোর কোন ক্লাস? আশ্চর্য, এখলাস চাচা! মাখনুন শরম পায়। ভয়ও পায়। এখন সব চুলে পাক ধচ্চে। আয়, এদিকে আয়, বল … চা খাবি? তোর বন্ধুরা কই, কী যেন নাম বিশু আর কে কে! আচ্ছা, এগুলো পড়। ভালো লাগবে। সুন্দর চিকচিকা প্রশস্ত সাইজের বই… তাতে লেখা ‘উদয়ন’ আরও কী কী। কেন এগুলো দিল, তার তো পয়সা নাই। নে চা নে। এগুলো পড়িস। পড়া শেষ হলে আবার তোকে অন্য বই দেব। ‘উদয়ন’, লেনিন, পুঁজি, নিকোলাই এসব দাঁতভাঙা উচ্চারণে তার যেন কেমন লাগে। কিন্তু বইগুলা সুন্দর, গন্ধও নতুন টাকার মতো। চা খাওয়ার পর সে বলে, কী তোর রেজাল্ট? কতো রোল করছিস। ‘কী মিঞা’ মন্টুর বাপ চীৎকার করলে ‘আছি চাচা, আপনি ভালো’ বলেই অন্যের সাথে কথা চালান। কথাগুলো কঠিন কিন্তু অনেক বিষয় নিয়া সে হড়হড় করে বলে যায়। জাপান-চীন-ভিয়েতনাম কী সব। মনে হয় বর্ষিয়ান মওদুদ বিএসসিও ফেল। মাখনুন তোতলায়, সতের…। আচ্ছা এবার ফার্স্ট সেকেন্ড হবি। তোকে বিদেশ নিয়া যাবো। পারবি তো! কী যে বলে— এখলাস চাচা, বুঝতে পারে না। সে বড় জোর ঢাকা চেনে। ওটাই তার শখ। কিন্তু বিশুটা কেন! শালা বড় চালাক। রাশিয়া নিয়া এখলাস চাচার সঙ্গে ও টক্কর দেয়। কী কী যেন পড়েছেও। মাখনুন বিশুর প্রতি হিংসুটে হয়ে ওঠে। শালা, বেজায় তাফালিং করে। কেন যে ওর কথা বলছে। এগুলো পড়লেই কি সবাইকে টপকানো যায়। ও ব্যাটাও বলেছিল, লেনিন না কি জানি! আন্ডারগ্রাউন্ড, মুক্তি, সে পাট্টি করতে চায়। বলে যে, এই ব্যাটা কম্যুনিস্ট চেনোস। কর্দমাক্ত কদমের মতো মনটা বিষায়, তখন ভেতরে ভেতরে এখলাস চাচার সান্নিধ্য আর এসব বই মিলে আনন্দই হয়। এক সময় তা অনেক দূর পৌঁছায়। সেই স্কুলবারান্দা আর গ্রামার মাস্টার বাতিল করে দিয়ে বিশুকে পরাজিত করে সোজা উত্তরে পর্কের দিঘী বা সার্কেল অফিসারের বাংলো হয়া ডুবাপুকুরের দিকে চলে যায়। তখন দোয়েল-শ্যামার ডাকে প্যাগোডার উচ্চ মিনারে বহুকালের ধ্বনি স্পৃষ্ট হয়। সে জনতা কারা কোন স্থপতি তার চাঞ্চল্যরেখা কারা নির্মাণ করেন, জানা যায় না। র‌্যাফেল-ম্যাডোনার ভাবচিত্রে বা কোনো শরীরী বনলতার মর্মরে সুফি অবগাহ দোদুল্যমানতা তুললে কোথায় যেন দ্রিম দ্রিম বোল ওঠে। তখন বুঝি মা মেরী তরী ভাসান, কাঁপেন দোলেন; পুণ্যবতী হয়ে ভরাট যৌবনের চিহ্নে কুঁদে কুঁদে কোনো পুরুষ তার অবয়ব তোলে, কামুক শরীরে জন্মধাত্রীর অধিকারে সব সামন্ত পুরুষ এক লক্ষ্যে একাকার হয়। টেরাকোটা নাকি মূর্তমান দুর্গা, হতেও পারে নাও পারে, তবে বাতাস বাইয়া তা তরঙ্গের ভেতরে কিছু রাগী উষ্ণতায়ও পুঁর পুঁর করে। এ ধাক্কায় তখন মাখনুন দেখে এখলাস চাচা অন্য দিক দিয়া হাঁটতে শুরু করেছে। বুঝি বিশুর বাড়ির দিকে যাবেন। বিশুদের ওখানে একটু গমগম করা ভীড়ও আছে। কারণ, আজ ওদের ভাইফোঁটা। মাখনুন এখলাস চাচার যাত্রারথে তাকানোর আগেই এক বড় লম্বা কুসারভর্তি সুগারমিলের গাড়ির আলোছায়া তার মুখের ওপর দিয়া চললে রোদটা কাঁপে, হলুদ আর কমলা রঙ যাওয়া আসার ভেতরে কালছে রংটাও ভাগ বসায়। তখন হাবিলদারের ব্যাটা গাড়ির পেছনে লটকায়া টপটপ করি কুসার ফেলায়, তড় তড় করে তা তখন পড়তে থাকে নানা জায়গায়, ধুলোয়-রাস্তায় কখনো বা কারো গায়ের ওপর। চলন্ত গাড়ি থেকে কুসার ফেলতে ফেলতে সে অনকদূর পর্যন্ত যায় এবং পেছনের দিকে আবার ফিরে আসে তখন অনেকগুলা কুসার কারো মালিকানায় জমা হয়, তার অংশীদার সেও পায়। গাড়ি চলার প্রবাহে চলমান আলোটা মুখ থেকে যখন মুছে যায় মাখনুন তখন দেখতে পায় জুঁইদের বাড়ির অনেকরঙা নামহীন ফুলের গেটটার ছায়াও তার কাছ থেকে মুছে দূরে চলে গেছে। তাতে ভয়টা কাটে। কিন্তু সূর্যিডোবার ভেতরে হাবিলদারের বেটা তাকে বড়পুলের দিকে দুধমাখা ভাত কাকে খায় বলে মার হাতছানি দিয়া ডাকার মতো ডাকে। পাশের স্কুল মাঠে তখন ভলিবল খেলা আর জনতার উপচে পড়া ভীড়। তখনই খুব দ্রুত একটা হিম বাতাস দৌড়াইয়া আসে। মাখনুন অজগরের আওয়াজ টের পায়। ওই পুলের তলে কী অজগরের বাস! ওখানেই তো একদিন শমশের, ময়েজ, মন্টু, স্যারের বেটা হাবলু আর করিম রিফিউজির ব্যাটা আলাদা আলাদা হয়া অকাম করছিল, তারই নতুন ধারা চলিতেছিল— ঠিক বোঝা যায় না। ওসব খারাপ কাজ আর হাঁ-ধরা অজগর তাকে প্রতিকূল করে তুললে ডুবাপুকুর গ্রামটা খুব কাছের হয়া যায়। তীরছোঁয়া করাল অশনি বাইয়া মওদুদ বিএসসি এন্তেকালের খবর রচিত হইলে অজগর গলায় প্যাঁচাইয়া ধরে। শ্বাস বন্ধ হয় মাখনুনের। গারোয়া আক্রান্ত মুরগীর অল্পপ্রাণ হাঁসফাঁস তাহাকেও চাপাইয়া ধরে। ‘তুই দৌড়া…’, নওশাদ-খকসো নাই, তাহাকে রাবেয়া লইয়া গিয়াছে, হারানো গৌরীকে সে ফিরাইয়া পাইয়াছে।

৬.

মওদুদ বিএসসির এরকম হঠাৎ বিছানা পাওয়া মৃত্যুর পর সেই শ্মশ্রুমণ্ডিত প্যারামাউন্ট ম্যান নাই নাই ধ্বনিতে স্মৃতিতে ভাসেন আর সুখনগর হাইস্কুল ডুবাপুকুর গ্রাম একতালে তাহার ওরশ বাইয়া চলে। কেন তিনি আসিবেন এই অপার ভূমিতে— মাখনুন স্বপ্নে দেখে, হুপহুপ কইরা ভোরের বাতাসে কান্না নাইমা আসিয়াছে, জুঁইকে অস্বীকার সে তখন করে, পাতালপুরীর গান আর রূপকথার পুরানা অন্ধকার মসজিদের কবরে ঝাড়ে তাহার সব আনন্দ আটকাইয়া যায়। আহা! আর সেই জয়ন্তী নাই। ভার আর হাড় এখন একাকার। কেন তিনি নাই… নাই হইয়া গেলেন। কোনকালের দূরপাল্লা-মাঝারীপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের গপ্পের মইধ্যে তিনি সান্ধাইয়া দিয়াছিলেন, সে গল্পে ভাইসা ওঠেন মুকুলভাই, হ সেই মুকুলভাই কবেই মইরে গেছেন, ক্যামনে মরেন কান্দেন আসেন বৃষ্টিতে ভাইস্যা সে কান্দোন চিকচিক করে, পাতা চুইয়া বৃষ্টিতে নামে, আমড়া গাছ চুইয়া ঝরা পানি ঝমঝম করে, চোখ ঢুলে বৃষ্টি আসে হঠাৎ মরেন একসময় স্মৃতিভরা শেখসাহেব চিক্কর কইরা কইয়া চলেন ‘ত্বরা কারা, ক্যান আইচস, কী চাস্’—হায়! তহনও টিকটিকি লাফায় ফুচকি মারে লিওনিদ ব্রেজনেভের রুশ নৌবহরে ফাঁইসা যাওয়া স্মৃতিতে মার্কিন পরাশক্তির খবরাখবর জনে জনে ভাইস্যা বেড়ায়, রেডিওতে তখন হঠাৎ এক বাণী তাহার কুহরে বিভঞ্জন তোলে, খররোদ্দুরে জারি হয় জরুরি অবস্থা, ‘তাহারে হত্যা করা হইয়াছে’। কিসিঞ্জারের চিরায়ত ক্ষোভ আনন্দে পরিণত হয়। কেউ কিছু বুইঝাও উঠতে পারে না, আবার কি হইলো! ভুরুক্ষেপ নাই। মাখনুন যুদ্ধাতঙ্ক শুনতে পাগল— এতো আর এক জলাতঙ্ক, হাহাকারের হাওরকান্না। আবার বুঝি যুদ্ধের ডঙ্কা। পুরানা শত্রুদের আগমন। তাড়াতাড়ি হাওয়ায় ভাসে গালফ উপত্যকার বাদশাহবৃন্দ সকলেই আওয়াজ উঠাইয়া বন্ধ মুখ খুলিয়া স্বীকৃতি দিয়া চলে। কতোকালের হাসফাঁস অবিরত হইয়া উঠিয়াছে এখন। তখন উইড়া চলে বড় কাঁঠাল গাছের তলা দিয়া জমা হওয়া পাকা পাতা, খুব সুর করে মগডালে কালো কোকিল ডাকিয়া চলে, পাছড়ায় বিলকুল ধ্বনির হাক, কুত্তাডাক অনেক বাড়ে আরও বেশি গভীর রাতে গরগর রাগে হাত কামড়ায় ঢাকাইয়ার পোঁয়া। মুখ ভ্যাঙচায়, শালা দোকানোত আয়, পপ্অঅ্স্যা দে। পাগলা শিঙ্ ওঠা বাছুরের ন্যায় ঢিস্ মারে, কাঁটাতার দেওয়া কাছারি মাঠে তখন ফুটবল খেলা নিয়া তুমুল মজার আনন্দ উৎপাদন চলে। ডালকাদা দিয়া ফুটবলের পেল্লাই আয়োজনের ভেতরে বড় আকারের পশ্চিমা বাতাস ধাইয়া আসে। নরোম বৃষ্টির হাওয়া ওড়া ডাকও মেলে তাহাতে। তখন বাইরে বিশাল খোলা পাথারে বর্ষজীবী জামগাছের টুপ টুপ মিষ্টি বুনি জাম মাটিতে পড়ে আর ওই প্রান্ত থেকে বিশুদের বাড়ি দেখা যায়— সেখানে বেঞ্চি নিয়া বসিয়া থাকে অনেকেই, পরে রিফিউজির পোলা ভাঙ্গা কাছারির দেওয়াল টপকাইয়া শেওলাভরা পুকুর ডিঙাইয়া পুরানা আবর্জনায় পা দিয়া বিশুদের বাড়ির বারান্দায় আসিয়া ঢোকে। কম্পমান হাওয়া তখন ছুটিয়া আসে— বিলের ঠাণ্ডা বাতাসে ইথারের ভেতরে শোনা যায় ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ, তখন ঢাকাইয়া পোঁয়ার মনোহারি দোকানে প্রচুর ধুলামাটি ঢুইকা পড়ে। সেখানে সবুজ হাফহাতাশার্টে আর হাফপ্যান্টে হাত বুলাইয়া সে মাগিপাড়ার কাহিনি বইলা যায়। কিন্তু ওসব রসদ আলাপে ছেদ পড়ে, যখন পাশের দোকান থেকে এক অজানা হুঙ্কার আসে— চোতমারানি… ঝাপ নামা। তখন পাশের ফুটবল মাঠে আনন্দ নমিত হলে কমলা চিক্কন রেখা সাঁঝ আকাশে দেখা যায়, বুঝি ভাইস্যা আসে ঝড়ের প্রবাহ, পরদেশী মেঘ ক্ষুদ্র জটলার আগায় তেরসা হইয়া, একটা সাদা রেখা বিলাইয়া দেয়, আলো ঠিকরে পড়ে, ওটি কী আলো না কারো জলঠোঁটে আঁকা লিপস্টিকের টান, নাকি বেগুনি লিপস্টিকের আবরিত পদনখ কিন্তু তাহাতে চাঁদ নাইমা আসুক, পূর্ণিমা সন্ধ্যা পাইয়া বসুক আর পিছিয়া পড়া মাখনুন ভুলে যাক মওদুদ বিএসসির কষ্টধরা ছবি। একই ছবি ঘিরিয়া ধরে বার বার, তাহাকে হুহু হাওয়ায় ভাসিয়া নিয়া যায়, পুরাণের ধন্দে বাইন্ধা ফেলে। হুপ হুপ কইরা কয়, মনে নাই বড় সড়কের ধারে পাকা রাস্তায় একবার বড় নানীর জানাজা হইছিলো, কতো মানুষ সার হইয়া ধবল তরঙ্গে সব গাছপালা আর পাকা ধানের ক্ষেতকে ভাসিয়া দিয়াছিল, রাব্বি-ই হামহুমা কইয়া দলে দলে মানুষ নানীরে কাঁচা বাঁশের মাচাঙ্গিতে তুলিয়া টাব্বোর দিয়া দূরে বাঁশঝাড়ের ভেতর কব্বরে নামাইয়া লয়। তখন হুপহুপ কান্দিয়া মাইয়া সখিনা কয়, মা তুই আর আসপু না, কতোকাল তোরে না দেখিয়া থাকুম ক্যামনে! হায়, তখন ঘোড়ার গায়ে হাত দিয়া পরদাদা কয়, পাগলি— মানুষ মরি গেলে আর পাওয়া যায়! সখিনা তখন বেহুঁশ। কান্দনে ভরিয়া ওঠে পরদাদার বেতো ঘোড়ার চোখ, সে কী দুলদুল নাকি! মাখনুনের মনে হয় মওদুদ বিএসসি সব বলিয়া গেলেও আর আসিবে না, সেও ডুবাপুকুরের বাঁশতলায় চিরশায়িত, এ ঘুম আর ভাঙিবে না, পরদেশি মেঘলা আর ঘুম ভাঙাইবে না। তখন হঠাৎ একটা মুচি বড় কাঁঠাল গাছ থেকে কোণার চেয়ারে বসা মখলেস মামার পেপারের ওপরোত পড়ে। ঢাকাত তো গুলি হচে, ছাত্র মারছে। ইনভারসিটির মেধাবী ছাত্রদের ওপর সামরিক জান্তা গুলি চালাইছে। ৫জন নিহত। আরে কালকার পেপারোত তো বসুনিয়াকও মারল। হাহ হা… জিয়াক মারি তোদের সুখ হবি। ভুলটা তো কল্লি বুড়া সাত্তার। পাশের মোজাম্মেল স্যার বলিতে থাকে, মখলেস মিয়া ছাত্র মারা কী, তোমার নেতা তো মুক্তিযোদ্ধা হয়া ম্যালা মুক্তিযোদ্ধাক ফাঁসাইছে। আর এ ব্যাটা কেবল তো শুরু কল্লো। মোঘলের হাতোত পড়ছে সব। মুকুল ভাই তো ঠিকই কইছিল, ইনভারসিটির ছাত্র, তাক্ কেমন মারে? বোল্লার চাকোত ঢ্যাল— রেহাই নাই। মাখনুন এক বিরাট মিনারে দাঁড়াইয়া যায়। ওখানে কী আবদুল জব্বার মুন্সীর আযান পড়ে না অন্য কেউ আজ তার অসুস্থতার সুযোগ নিয়া বেসুরা গলায় আযান দেয়! ওই মিনার তো আযানের জইন্যে না, ওখান দিয়া মন্দির দেখা যায়, বড় বড় দলান দেখা যায়, আর দেখা যায় ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি। কিন্তু ইনভারসিটির ছাত্রদেরও দেখা যাইবে। ওরা বড় বড় হলে থাকিয়া কী সব বড় বড় লেখাপড়া করে, সে লেখাপড়ার ভেতর অনেক রকম কাম, ব্রিস্টল টানে, কার্জন হলের কোণাত বসি চা খায়, মাইয়াদের লগে ফুচকি দিয়া হাসাহাসি করে, মাঝে মাঝে ফর্সা মাইয়ারা হাত ধইরে টানাটানি করে, গায়ে গা ঘেসিয়া বসে— কেউ কিচ্চু কয় না। হাবলা হইয়া তাকায় মিনার থাইকা, মিনারের ওপরোত ম্যাঘ ওড়ে, কী সুন্দর ভেলা ভাসিয়া বেড়ায়, বহাইয়া যায় দিগন্তের কোমল বাতাস, চুর চুর কইরা চিকন বৃষ্টি নামিলে মিনারের গাহে যে গুহা তাহা চিত্রল হইয়া ওঠে, জামানাও নতুন মনে হয়, হাওয়ায় দোলে রোশনাই নাঙা পৃথিবী, তখন মুকুল ভাই কয়, হা রে মাখনুন কী করিস, নাম্, তাড়াতাড়ি নাম। তখনও সে নামে নাই, বৃষ্টি পড়িয়া আসিয়াছে, কুয়াশা নাকি ঘন মেঘ ঘনাইয়া আসিয়াছে ঠিক জানা যায় না। তবে সে নিজেকে নামাইয়া নেয়, একদিন এরকম ছাত্রদের দেখতে যাবে। ওরা কোথায় থাকে, কেমন করে পড়ালেখা করে, কী জামা গায়ে দেয়— ওরা নাকি বড় বড় চুল থোয়, পেপারোত ছবি দেখি বোঝা যায় না। মুকুল ভাই যে থাকার জাগাটার কথা কছিল, শহীদুল্লা হল নাকিÑ ওটাও একবার দেখার জইন্যে প্রলোভন কামড়ায়। শখ ওঠে। ঘুড্ডি ওড়ানো শখ। নতুন মাইয়া দেখার শখ। সব খালি এক হয়া তড়পায়— ভেতর বাহিরে।

ক্লাসের পড়ায় মাখনুনের মর্জি ছড়াইয়া পড়িলে বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্যান্ডেলে বেশ গুরুত্ব তৈরি করে। ও মেরি গো এন্ড কল দ্য কাটেল হোমের আবৃত্তিটি হেডস্যার পছন্দ করেন, তিনি হাতের স্পর্শ দিয়া তাহার সেই সুদৃশ্য মনোরম কক্ষে টানিয়া নিয়া সুললিত কণ্ঠে কন, চার্লস কিংগসলির কবিতাটা তুই কার কাছে পাঠ নিয়াছিস। সেই প্রথম সে তৃপ্তি নিয়া চোখ ভাসানো কণ্ঠে বলিয়াছিল মওদুদ বিএসসির কথা। সেই প্রথমবার যেন সে তাহাকে পায়। মাস্টাররা মাখনুনকে এবার জুনিয়র বৃত্তির জন্য প্রস্তুতি করিয়া দেন। পেছনে অনেক পুরানা গল্প প্রচলিত থাকে। কেবা তাহাকে বলে, বিএসসি স্যার পাঁচ নিয়মে অঙ্ক করান। সে অঙ্কের নানাবিধ সমাধানে স্যারের যথেষ্ট ক্যারিজমা আছে। আরও অনেক শ্রুতিকথায় জানা যায়, ইংরেজি স্যার নাকি সাড়ে পঁচাশি পৃষ্ঠা লিখিয়া ভালো ফল করিয়াছিলেন। কেউবা বলে, গ্রামার স্যার দুইঘণ্টা একটানা ইংরেজি বলিয়া জাদরেল শিক্ষক বলিয়া সমাজে নামকরা হইয়াছেন। বাংলা গ্রামার তো জাহাজ, তিনি প্রচুর প্যারাগ্রাফ আর রচনা লিখিয়া বিদ্যার জাহাজে পরিণত হন। এইসব অনেকরকম আস্ফালন চাপানো বিদ্যাভয়ংকরী শিক্ষকবৃন্দ যখন সুখনগর হাইস্কুল ঘিরিয়া থাকে তখন হেডস্যারের সুদৃষ্টিতে পড়িয়া চিন্তা লাগে। নানা প্রশ্ন ভীড় করিয়া আসে। লেখাপড়াটা কীভাবে মানুষের জীবনে কাজে লাগিবে। তাহার প্রত্যয় কিসে! যেখানে আবেগ আর উচ্চাশা দিয়া তো সমস্ত পরিপার্শ্ব ঠিকানাহীন আদর্শহীন লক্ষ্যের নিমিত্তে চলিতেছে— সেখানে ভরসা কোথায়! যে মুক্তিযুদ্ধ হইয়াছিল, সেখানে কে প্রধান, কে জাতির পিতা তাহা নিয়া বিতর্ক এখনও শেষ হয় নাই। যিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চিন্তাকে বাতিল করেন, তিনিই আবার একক ক্ষমতায় প্রেসিডেন্ট হন, একটি রেখে সব কাগজ বন্ধ করিয়া দেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের কথা একযুগ পর এখন ভাবিলে কী যে অলৌকিক মনে হয়, শুধু ন্যায়যুদ্ধ করা নির্ভীক তাজ আর ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শিতাই ভাসিয়া আসে। কেউ কী করিয়াছেন সে প্রশ্ন নয়, কিন্তু দেশদর্শনের ভাবনাটা কার ছিল? উলোটপালোট ডালপালায় খালি বিতর্ক জড়াইয়া আসে মাখনুনের। সে হাঁটিয়া চলে, আজ অঙ্কস্যারের ক্লাস। সমীকরণের সমানচিহ্নের এপার-ওপার রহস্য মজাই লাগে। স্যারের অপেক্ষার ভেতর ছোট্ট পাকুড়তলায় সাদা ট্রানজিস্টারে বেলা তিনটার খবর শোনা যায়। গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষদল কীসব বলিয়া যান। কে যেন চিক্কুর দেয়, রাতের খবরের ওপর। তখন আবার কেউ ত্রস্ত হয়। দিগন্তের আলো ঘন হইয়া আসে। কচি পাকুড়ের নীচে, নম্র বাতাস প্রবাহিত হলে, দূর থেকে এক দোহারাগোছের ছাত্র চীৎকার করে। এর অর্থ বুঝে ওঠার আগেই পাট্টিকোন্দলের আভাস মেলে। চিকা মারা নিয়া কী যেন হয় বা রাতের মধ্যে কিছু হতে পারে বলে ভয় ছড়ায়। যেখানে দলীয় অফিস সেখানে জটলা, ক্ষমতা আর প্রভাবের চেষ্টার মাত্রা বাড়ানো— এমনসব ভয় পাকুড় গছের শিকড়কে অজগরের মোটা শরীর নাকি সেদিনের মোটা দাড়াসের মতো মনে হয়, ঠিক আমলে আনা যায় না— কিন্তু এর মধ্যেই লম্বা কাঠিবেত নিয়া অঙ্কস্যার লম্বা বারান্দা মাড়িয়া ক্লাসকক্ষের দিকে আসিতে থাকেন। কিন্তু স্কুলঘরের সামনের গাঢ় সবুজ গাছের ওপর বড় ছায়াটা বাড়ে, কোমল ছায়া নাকি অন্ধকারের পূর্বাভাস তাতে ঠিক কিছু চেনা চলে না। এক পর্যায়ে ভয় আর নারকি পরিবেশ গুরুতর হইলে রাতের খবরের গোলাগুলি আর ছাত্রহত্যাও সকলকে শিহরণ জাগায়। ভেতরে জাগিয়া তোলে একদিকে পুলিশ আর অন্যদিকে ভার্সিটির ছাত্রজনতা, শুরু হইছে কুরুক্ষেত্র, ন্যায়-অন্যায় যুদ্ধ আর মধ্যিখানে ভীষ্ম বা গুরু দ্রোণাচার্য দণ্ডায়মান। আসছে যাচ্ছে ধূলিঝড় টিয়ার শেল কাঁটাতার পেরিয়ে এগুনো, গোঁফওয়ালা হাফহাতা শার্ট আর বেলবটম প্যান্ট পরা ঝাকড়া চুলের এক যুবক বলে বলিয়া চলেছে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল কর, সমাবেশ, বটতলায় এক হও, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল’—এসবের ভেতরে ট্যা ট্যা ট্যা দ্রিম দ্রিম ফোটাফুটি শুরু, ধর ওখানে কী অপরাজেয় বাংলা টিএসসি রোকেয়া হল ডাস গ্রন্থাগার কলা ভবন মহসীন হলের ভেতরে আওয়াজ হয়; বাহির হ, জহুরুল হক হলের সামনের রাস্তায় গুলি বসুনিয়া ওহ হা ধর ধররররররররবসুনিয়া নাই, রাউফুন বসুনিয়া বসু বসু মুখ থুবড়ে পড়িয়া থাকে। তীব্রতর হয়ে ওঠে গোটা প্রান্ত, কী যেন চোখের জ্বালা, এতো জ্বালা কেন? চোখ ঘষে, চুলকায়, বিরাট স্বরের ডাক ওঠে আয় বাবা…। বটের তলে রুটি ভাজা খায় আজিজের বাপ নাকি হাকিম বাবা, ওখানে তুলা ধুনায়, শালু কাপড়ে ঢোকায়, ধিঙ ধিঙ টুং টাং ফটাস ফট, খালি তার ছেড়ে, ফটাস ফটাস আওয়াজে বসুনিয়া মরে, পরের দিন আরও মেলা মানুষ মারি ফেলায়। বড় আওয়াজ ওঠে ‘জাফর জয়নাল দীপালি সাহা আইয়ুব মোজাম্মেলের রক্তের ওপর দিয়ে সামরিক জান্তার আর সুযোগ নাই। ওকে গদি ছাড়তে হবে, শিক্ষানীতি বাতিল করতে হবে, ভাইসব গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বন্দী ছাত্রজনতার মুক্তি দিতে হবে, এ লক্ষ্যে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে আপনারা এক হোন, গণতন্ত্র দিতে হবে, সামরিক জান্তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে, বিচার করতে হবে জাফর জয়নাল দীফালি সাহার রক্তের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হবে না, জান্তার লেলিয়ে দেওয়া পেটোয়া বাহিনিকে প্রতিরোধ করুন, ওই আইয়ুবের প্রেতাত্মাকে বিতাড়িত করুন, ছাত্র সমাজ আর ঘরে ফিরবে না। এ সংগ্রাম সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ক্রমিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’ ধ্যাৎ ওটা তো আজকের সংবাদ না ইত্তেফাক মোজাম্মেল স্যার হাতে নিয়া রুটির দোকানের সামনে পড়ে চলতে লাগলে বিবিসির খবরের দাবি ওঠে। পোনে আটটায় আজকা বিবিসি শোনার বাতিক বাড়ে, তোরটাত ধরে তো, কোন ব্যান্ডে রে! শর্ট ওয়েভে… নাহ তখন তো তার পড়ার টাইম। কিন্তু সুযোগ নিয়া বার হবে। কসাইয়ের দোকান বা অন্য কোথাও টঙোত বসলেই হবি। তবে একসময় এই এলাকায় মাইকিং শুরু হয়, কাল বিরাট ছাত্র জমায়েত। স্থান ডুবাপুকুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠ। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে অনশন ও ছাত্রজমায়েত। কিন্তু বিবিসির সংবাদ আরও ঘোরাল করে সবকিছু। দ্রুততর সময়ে ডুবাপুকুর-সুখনগর আর ঘুঘুমারি এলাকায় কারা যেন খণ্ড খণ্ড মিছিল বাহির করে। সেখানে অনেককেই দেখা যায়। কিছু কম্যুনিস্ট নেতা, কেউবা বিভিন্ন দলের কর্মী কেউবা ছোটখাট দলের মেম্বার। মানিক মিঞা সারাটাকাল জাসদের হয়া কাজ করিছেন। তাহাদের শ্লোগানের জোশ আরও বেশি। লোকও হয়েছে। ওদিকে কাজী সাহেবের উপস্থিতিতে কিছু নেতা বটতলায় জমায়েত হয়ে বক্তৃতা করে। তারা জাফর জয়নাল দিপালী সাহা আর বসুনিয়া হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায়। স্বৈরশাসকের গুষ্ঠি উদ্ধার করে।

৭.

মাখনুন আর হাবিলদারের বেটা আর মন্টু করিম রিফিউজির ছেলের সঙ্গে তখন এখন অনেক দূরত্ব। ইউনিভার্সিটির শখ আর স্বপ্নটা এখন ঘোরালো। মুকুল ভাইয়ের মতো বড় কোচে ওঠার শখ। অনেক ভোরে ফিরিবে সে তাহার দ্যাশে। মা মা আওয়াজে ভাসিয়া দিবে, ভোরের হাওয়ায়। ঘিরিয়া আসিবে রোমাঞ্চভরা দিগন্তমেশা সব বৃষালি অন্ধকার। যেন মায়ের ডাকে বিদ্যাসাগর দামোদর পাড়ি দিয়া আসিয়াছে। দরোজায় আওয়াজ ওঠে, মা তখন গপ্পো শুনিবে— ক্যামনে তুই আইছিস বাবা। সেই ফুলছড়ি ঘাট, বাহাদুরাবাদ ঘাট স্টীমার ট্রেন ঢাকা এসব তো মওদুদ বিএসসি হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্নগুলা নিয়া তিনিই একদিন বলিয়াছিলেন, তুই সত্যাশ্রয়ী হইবি, মানুষের কল্যাণের দিকে তাকাইয়া নিজেকে ভরাইয়া তুলবি। হায় সেই ঝড়ের রাতে বনবাসী রাজকন্যার ছবি দেখিয়া ফিরোনের সময় মরিয়া যান রিফিউজি ব্যাটা, বড় বাক্সটা পড়িয়া আছিল তাহারই পাশে। তখন কে যেন বলিয়াছিল ওই লাশ কুশন্নি, মরা ছোওয়া যাবি না। বাক্সের ভিতরে পান বিড়ি আর কিছু সিগ্রেট আছিল। ব্রিস্টল বা ক্যাপস্টেন সিগ্রেটের তখন কী এক নেশা ভুনিয়া ওঠে। সমস্ত বাক্স জ্বলিয়া তখনই ফুটুস শব্দে মেলেটারি আসিয়া পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারপিট হয়। তালিকা করা হয়। কেডা কাল জনসভা করছে, এক বাচ্চাকো ছাড়া হবি না। এইডা কী লেলাইয়া দিছে নাকি কেউ! সন্দ হয়, ভয়ে গা ছমছমাইয়া ওঠে, দালাল আবার কেডা। রাজাকার নাকি দোসর, সেই একই রকম মনে হয়া সামনে ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চার নাকান থপথপ কইরা আগাইয়া আসিতেছে। সটাং করে ভোঁ দৌড় দেয় অনেকেই, কারেন্টের তারের ন্যায় সবকিছু ছাপাইয়া যায়। প্যাঁচাইয়া ধরে। তারপর রেজিস্ট্রি অফিসের বারান্দাত নিয়া যায়, কাকো কাকো হাত বান্ধি ঝুলায়। তারপর গোল হান্টার দিয়া ঠ্যংগোত থালি কোপ, এমন কোবান কোবায় যে লুঙ্গি নষ্ট হয়া যায়। দলিল লেখকরা হাঁকে ডাকেও আসে না। শুক্কুরবার আছিল, জুম্মার নামাযের পর আরও আওয়াজ আসি চাপি ধরে, অন্য এক ছাত্রোক থানাত নিয়া বাঁশডলা দিছে। অনেক বড়ো ভূতুড়ে আমগাছটার নীচে তাকে ফেলাইয়া কয়েকজন পুলিশ মিলিয়া বাঁশডলা চালায় আর কয়, শালা বড় বড় বক্তৃতা দেস, সেলিম দেলোয়ার কেটা হয় ক, তোর বাপ নাকি! আর ওই মালু মাগি দীপালী না ক্যাডা ওডা কেডা ক, কুত্তার বাচ্চা, লাঠির বাড়ির সপাং আঘাতে সে শুইয়া পড়ে, তারপর বেহুঁশ। কাঁপে তখন সবকিছু, দূরে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া বাউন্ডারি পার হয়া কিছু কিশোর তখনও বল খেলে, ক্যাচ ধরার প্রাকটিস করে, কিন্তু পাশের পুকুরে বল পড়িয়া গেলে যে কম্পমান ঢেউয়ে ওঠে তার সাথে জলতরঙ্গ তোলে জাফর জয়নাল দীপালীর প্রেতাত্মা— উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া কয়, আসো ভাসো, ওইতো নামিছে পুলিশ, জিরো পয়েন্ট, গোলাপ শাহ, কার্জন হল, ফজলুল হক হল, টিএসসি কেডা দৌড়ায়, এতো দৌড় কেন, মাংস ছিনাইয়া নেওয়া কুকুরের পালানটি দৌড়ের চাইতেও তাহার রেশ অনেক বেশি, জনসন না জনসন না অলিম্পিক তারও বেশি দ্রুততর দৌড়, খুব উল্টাপাল্টা কাঁটাতারের বেড়ায় তাহা আটকায়, চোখ জ্বলা কাঁদানি কান্দুনি ফোঁপায়, গোঙ গোঙ আওয়াজ তোলে, লাল আলো, তার ভেতরে ভেতরে ধুলারাশি তারাআলোর ন্যায় সেই আলোকে ধরে কাঁপে, ঠিকরাইয়া পড়ে ছেঁড়া কভারের বালিশের ওপর, কিছু ছড়ায় ওর গায়ে, ছাদের ওপরে ভাসানো ঘুড্ডিটা সড়াৎ করি পড়ি যায়— এর অর্থ কী? কেডা ষড়যন্ত্র করে, কেডা মন্নি দিছে, কেডা যান কয় ‘তোলো’। তারপর জহুরুল হক হলের ওপারের খেলার মাঠে থোকা থোকা হয়া ভরা মেলেটারির গাড়ি আটকায়, কেউ কয় জেটএমএলএ বা কেউ আসিছে, কিলাবি-পিটাবি হে, ডান্ডাত সব ঠিক করবি, ছাত্রগুলাক এক্কেবারে ভেতরে সান্দাইয়া দেছে। এরপরও ঠাণ্ডা লাগে। পানি আনে। আমবাগানের গুটি আমের গন্ধ কানের ভেতরে নাকের ভেতরে টকটক করে— টোকায়, মজার কুমকুমা গন্ধ, তাতে লালবাসনা, রক্তের নাকান টেস্ট, কেডা যান হাত টানে, চোখ মেলায়, গোল গাছটা কী যে সাজানো! উপরের আকাশের ছাদ, বারান্দা নাই, আলো আর আলো, দূরে কূলু নদীর বহানো ¯্রােতশব্দ, সেখান থেকে ঠাণ্ডা সৌরভের সরবরাহ আসিয়া পড়ে। আকাশ আর নদীর প্রভঞ্জন বায়ুতে ভর করে বামপন্থা অচেনা ছাত্রটা আরও মারের মধ্যে বাঁশডলা খায়। সে কাঁদিরাবাদের দিকে থাকে। ঢাকায় তখন তাহার খুব না। খুব ভালো ছাওয়াল আছিল, তখন পাশ দিলে মানুষ বাড়িত মেলা রকমের মিষ্টি আনছিল, গর্ব করিয়া কয়, ওরে রাশিয়া পাঠামু, নাম গেছে, অনেককিছু জানেÑ মাখনুন শোনে, কী তার যে হাতের লেখা, সুন্দর সুন্দর নোট আর সবগুলা সাজানো অক্ষরমুদ্রার কামকাজ, এতো পরিষ্কার লেখা হয় মানুষের ক্যামনে! ছাত্রকে তোলে না, ফেলিয়া রাখে, ওর বাপ-ঠিকানা নে— তারপর তুলিস ওসি দাপটের সাথে কয়, চিক্কুর দিয়া কয়, কী সব খারাপ খারাপ কথা! কিন্তু পরের দিন আরও অনেক আন্দোলনের কথা শোনা যায়। বিবিসি রেডিওতে সেরাজুর রহমান ভারি কণ্ঠে ঢাকার ছাত্রহত্যার প্রতিবাদের সংবাদ প্রচার করে। নানাদিকে ধরপাকড় হলেও কিছু ঠাণ্ডা হবার নয়। ঠিক কৃষ্ণচূড়ার রাঙা সারিতে রমনায় কিংবা টিএসসির বারান্দায় অনেকেই নামিয়া আসিলে চতুর্দিকে পুলিশ ঘিরিয়া নেয়। আবার কিছু হইবে কী! ওসবের তোয়াক্কা না করিয়া মিছিল বাহির হইয়া কলাভবনের দিয়ে যায়। বসুনিয়া স্তম্ভে ফুল দেয়। মহসীন হলের দিকে যাবার পথে আরও কয়েকশ’ ছাত্র যুক্ত হয়। সূর্যসেন হলের পেছন দিয়া তাহারা সোজা রেজিস্ট্রার অফিসের দিকে যায়। কিকন্তু পুলিশের বাধার মুখে পড়িলে অনেকগুলা কুত্তা সেখানে মারামারি শুরু করে। কীসব খাবার নাকি সেক্সুয়াল ব্যাপার নিয়া ঠিক বোঝা যায় না। চলে না তাহাদের লক্ষ্যনির্দিষ্ট কিছু— এতে মেলেটারি মার্কা গন্ধধূপের বাসনা ওঠে, তাতে নরোম ছায়াটা দ্রুত লয়ে অনেক সারি বাধা গাছের বিশাল সমাহার করা মাঠটা পেরিয়ে চওড়া সিমেন্ট করা পাকারাস্তাটার দিকে চলিয়া যায়। তাতে শরম লাগে, বেশ উঁচু দলানগুলায় জানালার ফাঁক দিয়া তাকানো ফ্যানগুলা ক্রমশ স্লো হইয়া যায়, শীতও আর থাকে না, গরোম লাগে। গরোমে গরোমে নরোম রোদটা আরও গরোম হয়, তাপানুরাগ ছাড়ায় ছাত্রদের বেঞ্চিতে, ছাত্রীদেরও— পরে তাতে ভাপ ওঠে, কুত্তাগুলা কী যেন মীমাংসার মধ্যে পড়ে ভিতাভিতি হইয়া যায়— স্বচ্ছ নীল আকাশে দেখা যায় শকুনের ডানা পাখা মেলেছে। ওটা আরও উপরে ওঠে, ছোট হয়, কিন্তু তুমুল ঢেউ দিয়া মাটিমুখা হয়। তবে এসব ধীর লয়ের কর্মপ্রবাহের ভেতরে মিছিলটা পথ হারায় না, সেটি কয়েকটা সিঁড়ির ওপর বসিয়া পড়ে। নানারকম ভারি বক্তৃতায় মার্গারেট থ্যাচার কিংবা রোনাল্ড রিগ্যান রেফারেন্স ধরে জয়নাল দীপালীর বন্ধুরা হুংকার করে। কেউবা পোস্টারের কালির লম্বা টান দেয়। কর্মসূচি নিয়া জমায়েতের পদক্ষেপ বিচার করা হয়। কলাভবনের দিকে একটা ঘুঘু টানা ডাক দিলে— ওখানে দুটো বিদেশি আর একটা হাফপ্যান্ট পরা ধবধবে শাদা বিদেশিনী পাখি শিকারের অনুশীলন করে। কেউবা হেঁটে হেঁটে জিয়া জসীম উদ্দীন হলের দিকে চলিয়া যায়। তখনও সূর্যসেন হলের রেডিওতে খবর হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম উত্তেজনা, সরকার অবস্থার দিকে কড়া নজরে তাকাইতেছে। এটা আকাশ-বাণীর সংবাদ। কিন্তু সবকিছু ছোট্ট হইয়া যায়। উচ্চতাটা নীচু হয়, কণ্ঠ শীতল হয়, হাওয়া দিক পাল্টায়। এতো বড় বিদ্যালয় কেউ যেন কিছু পায় না। অন্ধকারগুলা কুত্তার লেজে ভর করিয়া সূর্যসেন হলের গেটে জমাট হয়। পচা ফোয়ারাটায় পানি না পড়া অবসাদের মতো খালি ঘোরে আর শোঁকে, ঠ্যং ঝাড়ে, বসে, নড়ে, গা চুলকায় আর দূরে আর একটা কালা কুত্তার মতিগতি অনুসরণ করে। তখন হৈ ওঠে, জিয়া হলের রাস্তায় কে যেন পিটানি খাইতেছে, টানিয়া নিয়া যাইতেছে চোরা রাস্তা দিয়া কাঁটাবনের রাস্তার দিকে। মাখনুনের চোখ পড়ে পাঁচতলা থাইকা, ডুকরিয়া কান্দোন ওঠে, ভারা ভারে গরোম লাগেÑ হাফ প্যান্টের ভেতর থেকে ঘুমন্ত শিশ্নটা থেকে আঠা পড়ে, ঘুম ভেঙে যায়, খুব গুলগুলাইয়া ওঠেÑ আরে থানার বাঁশডলার ঘটনাটা কুনদিক থাকি কুনিদিক গেল! চোখ ঘসে। অকাম অকাম মনে হয়। রিফিউজির ব্যাটাও তো আর নাই। বই ছেঁড়ার পর কথা না বললেও সে খুব কাছেরই মনে করে তাকে। স্বপ্নদোষ নিয়া সে ভালো কিছু বলতে পারিত। নবম শ্রেণির ক্লাসের পরে সে এখন জোর দিয়া নতুন নতুন জ্ঞান আহরণের প্রতিযোগিতা নিয়া ব্যস্ত। সেখানে স্বপ্ন আর ওইসব হাওয়ার দিনে ফেরা জীবনের স্বপ্নসমূহ টানিয়া নিয়া চলে। মাখনুন, বিশুকে নিয়া স্কুলের পেছনে কাঁঠাল তলায় পৌঁছিলে, কলাপাতার ফাঁক দিয়া, কালী মন্দিরের পাশে সাপের বেরুয়া রূপ দেখে, উহার বিষে ঔষুধ হয়, কোনো কোনো সাপের মধ্যে মণি থাকে— বিশুর এসব উক্তির চেয়ে গাছের উপর দিয়া স্কুলঘরের ছাদে ওঠার আগ্রহ জমে। ওখানে কোনো কোণায় বসিয়া দুইজনে ক্যাপস্টেনে টান দিলে খোঁয়ারিটা জমে ভালো। তাছাড়া ওর হাঁটুর নীচে বিস্তর লোমের যে দাগ পাওয়া যায় তাহা সেয়ানা হওয়ার নতুন শব্দ, ওতে নিজের ভেতরেও পুলক ওঠে। বেশ কিছুদিন আগে সে নিজের অবস্থানটা জানতে গিয়ে এক অপরিচিত মেয়ের পদশব্দ কানে আসিয়াছিল। সে জানায় তুই নাকি খুব ভালো ছাত্র, তবে বাসায় আসিস। কেন সে বাসায় ডাকিয়াছিল, সেসব বিশুকে জানাতে চায় না। কিন্তু বিশু বলে মেয়েদের শরীরে গুল্টি গুল্টি গন্ধ আছে, ওটা ঠিক শুকানো আমলীর মতো। বোকা কোথাকার! তোক ডাকছিল— যাস নাই! তখন ওসব কথা মাখনুনের মাথায় বোল তোলে। ক্যাপস্টেনের প্যাকেট আর দেশলাইটা বিশার হাতে দিয়ে স্কুল ঘরের ঝাদের কিনারে খুব বেশি চাপ দিয়া হিস্যু দেয়, একটু ঘসাঘসিতে মনটা পুলকিত হলে শিশ্নটা ফুলে ওঠে, পারলে মৈথুনও করে, মেয়েটাকে মাথা থেকে বিদায় করাও হয়, আর তাছাড়া বিশু তাকে বোকা বললে একটু কষ্টই হয়, ওটা ঝাড়তেই হবে, কিন্তু সময় তো লাগবে, ওদিকে বিশু যদি ডাক পাড়ে। কিন্তু এর মধ্যেই হস্তমৈথুনের কাজটা শুরু হয়ে যায়, বেশ ঘিরে ধরে অনেক রমণী মুখ, প্রচুর গুল্টি গুল্টি বুক আর নরোম শরীরের ঘাম তাহাকে চুষতে থাকে, বিশুটা কী করে সে ভুলেই যায়, কিন্তু অনেকরকম গরমে মাখনুনের বেশি সময় লাগে না, একটু বীর্য তীর থেকে ধাইয়া আসে, সেখানে সবটুকু আনন্দ গড়িয়া আসিলে, মাথাটা পরিষ্কার হয় কিন্তু বিশুকে কিছু না বলার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। ক্যারে! এতোক্ষণ কী করলু! নে সিগ্রেট নে! কালকার খবর শুনছিস তো। এখলাস কাকুর খবর জানিস। উনি তো আর দ্যাশে নাই। রাশিয়া-ফাশিয়া চইলে গেছে। অনেকগুলা বই দিয়া গেছে। শালা মাল একটা। বিশুর দিকে চোরা মুখে তাকায় মাখনুন। তারপর তার মকবুল মিঞা নাকি অন্য কারো কথা মনে আসে। কাল তো খবরে কইলো, অপারেশন ব্লুস্টার না কীয়ের কথা যেন। ইন্দিরা গান্ধী নাকি মেলা শিখকে জবর শিক্ষা দিতাছে। মাইরা ফেলাইছে ভিদ্রানওয়ালারে। জাদরেল কট্টোর নেতা। ওইটা কীয়ের অপারেশন রে! মাখনুন ঠিক বোঝে না। এখন তার গা ঘিন ঘিন করছে। কেমন যেন জ্বর জ্বর বোধ হচ্ছে। সিগ্রেটের মজাটা পানশে লাগছে। দে সিগ্রেট দে! ঠ্যাংটা ছাদের পাশে গাছের ডালটায় ঝুলিয়ে দেয়। বিশু গুণগুণিয়ে গায় : পরদেশী মেঘ রে আর কোথা যাস নে/ বন্ধু ঘুমিয়ে আছে দে ছায়া তারে/ বন্ধু ঘুমায় রে… ও বন্ধু মালটা দে। বিশু দূরে তাকিয়ে দেখে কীসের একটা হৈ চৈ। কোনো মিছিল বুঝি। নিপাত যাক— শব্দটা কানে আসে। তারপর দৌড়াদৌড়ি। ধুলায় নাকি শাদা-নীল গ্যাসে এলাকাটা চূর হয় ঠিক বোঝা যায় না। ঝাঁঝটা নাকে লাগে। মাখনুন হাসে। দূর বাল যা হয় হোক— এটে আর কেটা আসপে। দে মাল দে! পরে পাড়ার কোনো মারামারিতে থমথমে পরিবেশ গড়ে ওঠে। এসব কীসের প্রভাব, ইন্ডিয়া কী দ্যাশটাক নিয়া নিবি বুঝি। এর মাঝে কালীমন্দিরের দিক থেকে কে যেন চিক্কুর পাড়ে। সেই মগোর মা না আর অন্য কেউ। কতোকাল পর মগোর মাও আসলো কোত্থেকে— ঠিক বোঝা যায় না। এখন এ জায়গাটা আর নিরাপদ নয়, বাড়ি ফেরাই ভালো। বনের উঁচু মাথাটা তখন ঘুমিয়া। থির করা সব ঘন জঙ্গল। শুনশান নীরবের ভেতরে এক প্রস্থ জমাট অন্ধকার। নেমে পড়ার পর মগোর মাওয়ের আওয়াজ থেমে যায়। কলোরবও কমিয়া যায়। ভেতরে ভেতরে কল্পনার জাল প্রশস্ত হয়। মনে আছে মামার কথা। সে তাহাকে শোনাইয়াছিল তুই তো ভালো ছাত্র। শিখ চিনিস! কালকের খবরে আবার শিখরা বেশ আলোচনায় আসছে। চাপা দাড়ি আর পাগড়ি— মজার না! হিংস্রও অনেক। স্বর্ণমন্দিরে হামলার প্রতিশোধ নিবো— খুব তাড়াতাড়ি। কথাগুলো সে বলতে শুনেছে মোজাম্মেল স্যারের সঙ্গে আলাপে। পড়াশুনার ফাঁকে একসময় মামাকে বাপ জিজ্ঞ্যেস করে, কীরে তোরা তো শহরে থাকিস। রাজনীতি ফাজনীতি দিয়া কিছু হবে কী! তখন শিখ-টেম্পল নিয়া কথা হয়। ভরা আসরে বিছানা ভর্তি আরও কে কে আছিল। ঘড়ির দোকানদার মকবুল থ্রি ব্যান্ড রেডিও নিয়া আসে আর কয়, শালা আকালি ফাকালি সব সাইজ, ইন্দিরার তেজ কতো! মামা তখন কয়, তাই না, সোজা না, অনেক সিভিল মারা পড়ছে। কিন্তু সরকারও বাটে পড়ছে। উপায়হীন হয়েই ব্লুস্টার অপারেশন ঘটাতে হইছে। কিন্তু ফল ভালো নয়। ইন্দিরাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ওরা ছেড়ে দেবে না। মাখনুন তাকিয়া রয়! শিখদের কেশ, তলোয়ার আর পাগড়ীর প্রতি একধরনের আকর্ষণ আছে। স্বর্ণমন্দির, দ্য গোল্ডেন টেম্পল ওটা কী সোনা দিয়া মোড়ানো? কতো সোনা লাগছে— মামা কী বলতে পারবে? অনেক বই পড়ে নিশ্চয়ই মামার উত্তর আছে। কিন্তু বলাটা হয় না। সে সম্প্রতি লুঙি ধরিয়াছে। কেমন যেন ফাঁকা লাগছে, উসখুশ করে, গরমে বাইরের বটতলায় টোঙের ওপর বসিয়া রাজনীতি নিয়া নানা কথা শোনে। বিশু যে বললো কীসব, ওর জ্ঞান দেখে তার হিংসা হয়। সে কোথায় পায় এসব কথা। কডের টাইট প্যান্ট, প্যাঁচানো চুল আর প্লেবয় শার্টের মতো কথাগুলোও তার নতুন নতুন। ওসব কিছুই তার নেই। কতোদিন ওরকম চুলের জন্য বাপের কাছে বায়না ধরেছে, কিন্তু হয়নি, সে সোজা মেছের নাপিতকে চামছাঁটার নির্দেশ দিয়া বলিয়াছে, ‘নইলে পয়সা নাই। ওসব হিপ্পি চলবে না’। মার্গারেট থ্যাচার না-কি যেন বলছিল বিশু। মেলেটারী নাকি ঘিরিয়া ফেলেছে স্বর্ণমন্দির। বাংলাদেশে তো এসব নিয়া কানাঘুষা চলছে। সামরিক সরকার কী সেফ! পৃথিবীর ইতিহাস নির্মম ও বেসামাল। তোদের গিলিয়া নেবে ওই ইন্দিরা। এখন তো ব্রেজনেভও নাই। মামার রেশ ধরিয়া আওড়ানোর সময়গুলা এই অরণ্যে কিংসলীর কবিতার মতো খোঁয়ারি তোলে। এখনও সেই বাঁশডলার দৃশ্য তাহাকে ছাড়ে নাই। রাতের অন্ধকারে অনেক সময় চীৎকার আসিয়া ঘিরিয়া ধরে। কাল নাকি আবার সমাবেশ। সে কিছু ছাত্রকে রাতে দেয়ালে লিখতে দেখেছে ‘রুশ-ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার-সাবধান’। কুপির আলোয় ওদের চেনা চেনা ঠেকে। কিন্তু এর মানে বোঝে না সে। টাকা-পয়সা নিয়াও কী সব আলাপ হয়। নেতা যদি কাল ট্যাকা না ছাড়ে, তাহলে মুশকিল আছে। ছোট্ট ছোট্ট স্ট্রীকারের মতো লাগায়, বিশেষ বিশেষ জায়গায় লেখা ‘পঞ্চম বাহিনী প্রতিরোধ কর’।

সুখনগর হাইস্কুলে বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তখন মানুষের ঢল নামে। কিছুদিন আগে সামরিক সরকারের আদেশে থানাগুলা জেলার কাছাকাছি নিয়া যাওয়ার যে ধোঁয়া উঠছে, তার এক ফোঁটা প্রসব এখানেও ঘটিয়াছে। নতুন একজন শাসক আসিয়াছেন। গর্জান ও শাসান। হেডমাস্টার মশাই তাহাকে চেয়ার ছাড়িয়া দিয়াছেন। অনেক মানুষের বান ডাকিয়াছে আজ। লেরি হোমস আর মোহাম্মদ আলীর মুষ্টিযুদ্ধ নিয়া খোশ আলাপ চলে। স্কুলে টেলিভিশনে ওসব দৃশ্য নিয়া পাড়ায় পাড়ায় কাহিনি আছে। দূরে এক মাটির দেয়ালে হেলান দিয়া শার্টে ধুলা মাখিয়া সে জানালার চিক্কন ফাঁক দিয়া সেই মুষ্টিযুদ্ধের ফড়াৎ ফড়াৎ আওয়াজে দেখিয়াছিল। আলো না বিজলীর রেখা নাকি চিকন কোনো সূর্যরশ্মি ঠিক বোঝা যায় না। তখন পেছন থেকে কে যেন বলে তোর বাপ আসছে। মাখনুনের ভয়ে চোখে পানি গড়াইয়া পড়ে, কানে টান আসে, আজ পড়া হয় নাই ক্যা, ট্রান্সেলেশন কেটা করবে! তার হাত ঘামে। বুক কাঁপে। শার্টের ময়লার কৈফিয়ৎ নিয়া চিন্তার সম্প্রসারণ ঘটিয়া চলিলে বড়ো পাকুড় গাছের তলায় দাঁড়ানো বিপিন ডাক্তার কন, ‘ছেলেকে ওভাবে শাসন করবেন না’। কিন্তু উপকার হয় না। একইভাবে অনেককাল সিনেমা দেখা বা নাটক দেখা কিংবা বিশুর মতো রাত করে যাত্রা দেখা কোনোকালে হয় নাই। বর্ষণে অনেক জল পার্শ্বের নদী দিয়া নামিয়া গিয়াছে। সেই লম্বা তরবারি আর জাঁকালো নবাবী টুপির মহড়া দৃশ্য থেকে কবেই অবসিত হইয়া গিয়াছে। আর হয় নাই বাদ্য বাজানো, তলোয়ার উঁচিয়া মাজার ঘুরিয়া সোনার কেল্লার পরিবেষ্টনে ভোর আসে নাই, ঝুনঝুনিওয়ালারা ফেরে নাই আর সেই পথে, পাগলা ফকির গায় নাই সুর করিয়া কোনো কাওয়ালি। কতোকালের কতো চিহ্নই তো ভাসিয়া গিয়াছে রূপদিয়ার জলে। মাজারের পাশে বড় সরকারি লোকটা তাহার সামনে দিয়া যখন হাঁটিয়া যায়, তখন পারফিউমের গন্ধে সোনারোদ ঝরে। ছায়াটা বেশ লম্বা দূরে গড়াইয়া যায়। মেলাটা আর মনে থাকে না। হাতে সোনালী রঙের কী যেন গোল চাকচিক্যময় জিনিস চোখে পড়ে— গোল্ডেন টেম্পল মার্কা। আর তখন আসা হয় নাই। পরে শোনা যায় ওই ম্যাজিস্ট্রেট বেশ কজনকে কড়া শাসনে রাখিয়া কন, ‘এখানে এখন মবিল কোট, ডান্টার শাসন চলিবে।’ কীসব কালো কালো মেঘ তখন বাতিল হইয়া যায়। বেশ হালকা করা কমলা রোদে কিছু কুষণ্নি কাক ঘোরাফেরা করে। পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শরীরচর্চার অংশে মল্লযুদ্ধ রাখা হয়। মোহাম্মদ আলী আর লরি নিয়া কথাবার্তা হলেও, এক সময় হাইজাম্প লংজাম্প আর অলিম্পিয়ান দৌড়ে অনেক হাততালি যখন চলে তখন কাহার যেন ক্রন্দনে সবকিছু ছাপাইয়া ওঠে। মোহাম্মদ আলীর হাত ভাঙিয়াছে। সে আর বাঁচিবে না। এরকম উত্তাপে সমস্ত খেলা পরিত্যক্ত হইলে প্রশাসক যাহা কন তাহাই হয়। এই খেলা আর কোনোকালে এ মাঠে হইবে না। মাখনুন স্বপ্নে দেখে ওই আহত মানুষটা হাতে দড়ি দিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, জনতার বাহবাও তাহার। এক সময়ে হেডমাস্টারের কক্ষের বিশাল টেলিভিশনটা চুরি যায়। তখন পাড়ায় পুলিশ চলিয়া আসে। টারজান দেখা হয় না। বন বনান্ত হারাইয়া যায়। কষ্ট বহাইয়া চলে। মেয়েরা আর চুল বাঁধে না। পুরাতন কাছারি ঘরে সাপ বাসা বাঁধে। কাঁঠাল গাছটায় আর মুচি ধরে না। কাঁটাতারে ঘেরা অফিসে সকলেই মনমরা হইয়া থাকে। মার্শাল ল নিয়া কথা কয় না। জেডএমএলএ-র ছবিতে সবাই আড়ষ্ট। এর অর্থ কেউ জানে না। ছাত্ররা জয়নাল দীপালীর বদলা নিতে চাইলেও কিছুই হয় না। কেউ কেউ সামরিকদের সাথে চলে। কারণ, বাঙালি লাঠিত সোজা। তবে কী ভোর আসিবে না, না-কি স্থির প্যাশনে সবকিছু ত্রস্ত হইয়া শুধুই খোঁয়ারিতে ভাসিয়া যাইবে। টারজান মার্কা জীবনেরও সাধ নষ্ট হইয়া যায়। তাপ আর ভাপ বিদূরিত হয়। তখন এক সকালে ট্রিগারের চাপে মিসেস গান্ধী নিহত হন। বিশু স্কুলে আসয়া বলিয়া ফেলে আজ ইন্দিরা গান্ধী শিখদের হাতে মারা গেছেন। স্কুল বন্ধ দেওয়া হোক। গ্রামার স্যার চড় তুলিয়া কন, চামড়া থাকবে না। সেই দিন রাত্রিতে ভীড় করিয়া শোনা হয়, খুব কাছে থেকে করা গুলিতে শিখ দেহরক্ষীদের হাতে প্রধানমন্ত্রী নিহত হইয়াছেন। মাখনুন ঘোরে আর একাধিক ব্যান্ডে কান পাতিয়া শোনে, কিন্তু শোনা যায় না, বেতার তরঙ্গের দুর্ঘট আর দুর্বল ওয়েভের কারণে। বড় ক্যাসেটে ওসব শোনা গেলেও সবার আগ্রহ নাই। তবে রূপদিয়ার ছোট্ট চা’র হোটেলে খুব নরোম সুরে মোজাম্মেল স্যার বলেন, এ দুনিয়ায় হার-জিত বা জয়-পরাজয়ের কী কোনো নির্ধারিত মিনিং আছে? অলক্ষ্যে মিনিংলেস মিনিং-ই প্রতিষ্ঠিত। তাই হত্যার পীঠে হত্যা ঘটে— যার পেছনের সত্যটি কেউ জানে না।

নশ্বর নিয়তির মুদ্রা

পলা ঝুম বৃষ্টিতে একা হয়ে গেল। সে আর যেন ফেরত আসবে না। কইতে পারে না কিছু। কেন যে আর সেইসব দিন ফেরত আসিবে না তা ওই ভোরমাখা বটগাছটাই শুধু বলতে পারে। হায়রে বটগাছ! বিশাল চাহনিতে ঝুরি নামিয়া আসিয়াছে মাটিতে, কী সে শ্যাওলা সম্ভ্রমভরা মাটি যেখানে ঝুরির শত মাথা দুলিতে দুলিতে একপ্রহরে কুশি গজাইয়া তাহাতে বীজ ও শেকড়ে পরিণত হইছে। পলা সরল মনে তাকাইয়া রয়, এই গাছের দিকে। সেখানে সন্ধ্যার পরই থোকা থোকা অন্ধকার নাইমা আসে। কা-টার ওপরে ঠিক মোটা হ্যাকনায় ঘন জমাট এক অন্ধকার গাছটাকে পাহারা দেয়। গাছটা এই এলাকার জনপদকেই শুধু শাসায় না শাসনও করে। ভয় দেখায়। সে ভয়ে সকলের সমীহ তৈরি করে। তবে সে অনেককে সেবাও দেয়। প্রশ্রয় করে। বটবৃক্ষের ছায়ার মতো তার নিদান মায়া। এ মায়া বহু পুরাতন। সে মায়া রাখিয়া চলে। এ এলাকায় সবচেয়ে বয়সি মানুষটাও তার ছায়ার ওপর ভর কইরে বড়ো হইছে। পলা তো সেদিনের! পলা তির তির করা আগায় বিষণœ চক্ষুচোষা নয়নে গাঢ় ঘুমধরা পাতার দিকে তাকাইয়া রয়। কী এক ঊর্ধ্বমুখি তার ক্লেশ ও প্রসন্নরূপ। তার কোনো তমঃগুণ নাই। সে সবকিছু আঁকড়িয়া আছে। বটগাছটাও এখন শুকাইয়া চলিছে, বুঝি আর বাঁচিবে না। বহুবর্ষজীবী বলিয়া নয়, এলাকার অনুশাসনে ইহার বৃদ্ধি ব্যাহত। আর না বাড়িয়া তাহা কুঁকরাইয়া যাইতেছে। ক’দিন আগে সেই বড় ডালটাও পড়িয়া গিয়াছে। এবার অন্যগুলাও পড়ন্ত, রসে শুকাইয়া ক্ষীণতর। আর বুঝি তাহার প্রাণ রহিবে না। মানুষকুলও কী তাই! তাহারও বুঝি এভাবেই মায়া রাখিয়া যায়। তার জন্যই নির্বিকার গাঢ় সবুজমায়ায় সে ধরা। পলা এ গাছটার সঙ্গে নিজের একাকীত্বের সম্বিৎ মেলায়। কিন্তু পারে না। ভাবতে ভাবতে এলোমেলো হয়ে যায়। ভেতর থেকে ধেয়ে আসে ক্লান্তিকর ঘুম। ঘুমটা ধরে আসে চক্ষু জুইড়া। তখন এ নগরবাড়ির তিনতলাটা বেশ ছায়ালো হয়। আরামের হাওয়ায় ঘুম বাড়ে। বন্ধুর মতো সে মায়া। রজত, সেই রজত! তবে সে এখন একা। দুর্ভাগার পৃথিবীতে আগমনের সংবাদলগ্নে গতরখালি করা মায়ে কবে মইরা গেছেন, চক্ষের আগালে নেই মত্যু— কেউ জানে না। তখন থিইকা বাবার কাঁধে থাকেন। পরে পলা বাবার তুল্য আদর্শ লইয়া এই নগরবাড়িতে রোদ্দুর হয়, রাসকলনিকব মার্কা পায়, তাহাতে সেঁধিয়া হয় অপরাধী, শাস্তির শক্তি অর্জন করেন। পদার্পিত হয় ফেনেগানস জগতে। ডার্কনেস আত্মার ক্রন্দন তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। এই তৃতীয় মা এখানে নাই। বেশ কাজবাজ নিয়া ব্যস্ত। খুব একটা আসেন না, এই বাসাটায়। বিদেশ ভ্রমণ বা নিজের কীসব বিদেশি কামকাজে তাহার সময় ঘোরে চলে, অতিবাহিত হয়। বিবাহ সম্পদ নহে, কিন্তু বাবার ঘটে তাহা তৃতীয় পর্যন্ত কেন গড়াইয়াছিল সে প্রশ্ন অনেক রহস্যে নিমজ্জিত। পলা যে মোনাইলের স্মৃতিতে গড়া সেখানে বাবা তাহার আশীর্বাদ। তিনি আসিয়াছিলেন মধুমতির সেই পুরনো এলাকা হইতে। তবে তাহার চৌধুরী আভিজাত্য বলিষ্ঠ কাঠামোতে ছিল অতুল্য এবং এ এলাকায় নিঃস্ব হইয়া নতুন বসতি করিলেও তাহার ক্ষমতা আর সমীহ এক ছাঁদে গঠিত। তুচ্ছ বিষয়েও তিনি প্রধান, প্রটোকল থাকে তাহার বাড়ির দেউড়ি পর্যন্ত। সে সব পুরানা কথা। কিন্তু এই তৃতীয় মা-জান কী এক হঠকারি প্রয়োজন নাকি নিছক বাবার কোনো ভ্রান্তির দায় নিয়া এই নগরবাড়িতে আসীন— ঠিক তার কারণ অনুধাবন করা কঠিন। ওইটুকু বাবার ব্যক্তিত্বের ফাঁদে আছিল আটকাইয়া। কে তাহাতে হাত লাগাইবে। কে-ই বা বলিবে আপনের জীবনডা এমুন কান! পলা শুধু জানে এই মা তাহার প্রভাব বা অধিকার থেকে দূরের ছায়ায় ঘেরা এবং সর্বাত্মক নির্ঝঞ্ঝাটরূপিনী। তাহার কাজে সেই একশ’।
তবে অনেক ঘোরাল পরিবারের কানাকাঞ্ছির সদস্য পলা বাস্তবের কার্নিশ বহিয়া অনেককাল অবিসম্বাদিত স্বপ্নে বড় হইয়াছে। গঞ্জনা ছিল সমাজে অনেকগুলা মা থাকিবার কারণে। ‘কেডা কাহার ছাওয়াল বুঝি না তো!’ কিংবা ‘ও ওই তিন বৌ অলা চৌধুরী!’— এসব সামাজিক নীতির বিরুদ্ধ আচারে কিছু কর্ম চিরকাল কীভাবে বিদ্রুপে পরিণত হইয়াছে, কিন্তু অনেকটাই আবার সমাজের নিকট ধন্য বলিয়া গৃহীতও হইয়াছে। আয়রনি ছাড়া এসব আর কী! রজত ও পলার এই এক এককালীন জীবন, আহা সেই চীৎ পঙ্গরের উদাস হাওয়া আর বাওয়া নদীর তরে মাঝি বাইয়া যাওয়ার কোমল সুরধ্বনি। সেই সে বাড়িতে বসন্তবাবুর গড়া কাঁঠালতলায় আছিল কোটার বাড়ির শান্তিমাখা রূপালী দিনসমূহ। রজত কই! এভাবে সে হারাইয়া যাইবে কী! ভয়কাতুরে ঝড়ে বা বেহিসাবি জীবনের অনেক টানা মুহূর্তগুলা ছিল ওর বায়নায় ভরা ভরপুর। তবে খরায় আটকে যাওয়া নৌকোর ন্যায় সে এখন অচল নয়, অনিশ্চিতরূপে নাই, আবার আসিবে, আপাতত শূন্যে মিলান। কাহিনি তাহার ছোঁড়া তীরের ন্যায় গড়াইয়া গিয়াছে। তুমুর এক প্রেমিক হিসেবেই পলার মনে সে জীবিত। কী দুর্মর হাসি আর আনন্দে সে তাহাকে জড়াইয়া ধরে। ইঁদারার পাড়ে হাত বাড়াইয়া কয়, ননীর মতো হাত। সে ননীকে চেনে না। সত্যিই ননীর মতোই দেখিয়াছে সে এইসব ধ্যানের সময়। নির্ণিমেষরূপে সে জীবনের সময়সমূহ কাটাইয়াছে। তাহার জীবনে আসিয়াছে ঝরা শিউলির মতো। আক্ষেপ বা অনিন্দ্য করিয়া তোলা নয়, রজত সবকিছুরই ঊর্ধ্বে। প্রেমময় পৃথিবীতে সে অপরূপ। কিন্তু বাবা বরাবরই অভিভাবকরূপে মরহুম দাদার মধুমতির তল্লাটের পুরান বাড়ি নিয়া কী সব ভোগ লালন করিতে থাকেন। উষ্ণীষ আমেজে কইয়া যান— এসব ঘরের মাইর নাই। এই দরদলানে কতোকাল কবুতর আর বাবুই আসিয়া বসে, তাহাতে পুণ্যি হয়। বখিল মানুষের মুক্তি ঘটে। জীবনের গতি বাড়িয়া যায়। সুবেহ সাদেকের মুগ্ধতা ফেরে। ওরা ফেরেশতার কলকণ্ঠ ধারণ করে। এসব ভাঙুম না, এইটা এয়ারকন্ডিশন দলান। গরমে শীত, শীতে গরম। খুব কনকনে শীতে এই ঘরের কড়িবর্গা কাঠের দরোজা-জানালা আর উপরের নকশাকাটা বাঁশের জিগজ্যাগ পরিবেশনায় তাহা কুটিল আনন্দময়। এক ধরনের বনেদি বাসনাও থরে থরে ভরাট থাকে। এক-দুই-তিন ঘরের নশ্বর নিয়তির গাঁথা পলার বাবার এই শেষ নগরবাড়ি। মধুমতি-মোনাইল পার হইয়া বুঝি এই নগরবাড়ি। একালের এখন একাকী এক পলার গৃহ। তৃতীয় মা তাহার পথে পরিচালিত। শূন্যজীবনের দ্বারে তাহার কেউ নাই। অনিমেষ আলোর বলয়ে সে একা। সময়সিন্ধুর ভেতরে সবকিছু তাহার এখন চিড়িয়াখানার ভারে আটকানো। একাকী এই মোনাইলে। কিন্তু সুখ আসিয়াছে, ফসলের তরে, শিশুদের ও মানুষীর মুখে দেখিয়া। ভরা চান্দমাখা স্থূল সুখ তাহার ফুরফুর করে, অবরুদ্ধরূপে। উষ্ণতার ভেতরে তাহা কত্তোকালের মনোটোনাস, দুঃখ আর দুঃসাধ্য চিন্তায় গড়ানো। তাই সে ফেনেগানস। অন্ধকার এক আত্মা।

দুই.
মধুমতী পার হওয়া চিক্কন সুতোপড়া রাস্তার পাশে এই ঘরে কে ছিলেন আগে! দাদা পরদাদা বা আরও অন্য কেউ— যতোদূর দেখন যায় ধান আর জলা। সেই পুরনো কপচা। সে জলায় পলায় ওঠে কী সব গুজার আর ব্যাম। পেশা আছিল মাঝির। আরও অন্য সব মানুষের পেশা বা চলন-বলন কী আছিল! কেউ তাহা জানে নাই। এখন আমরা এই ঘরকে গৃহ বলি। আগে কেউ গুহা বলিত। গর্তের মাজেজাও আছে। যুদ্ধের সময় গর্তের মধ্যে ঢুকিয়া প্রাণ বাঁচানোর প্রচেষ্টায় তখন প্লেন ওড়ে, গর্তে লুকাও। পাকবাহিনি গুলি করতাছে গর্তে ঢোক। মশার কামড় আর গরমমাখা বৃষ্টিতে শ্বাস ছাড়ানো কষ্টকর ঘটনা এই গর্তের কাল। পাকবাহিনি তখনও চেনে নাই, এই গর্তের মাজেজা। গর্তের নিরাপত্তাই কী জীবনের নিরাপত্তা আছিল। খালে কয়, তোর বাপরে বাঁচাইছি। সেই গলা তখন মিয়ানো। তবে জিদ আর অভিমানের খেয়ায় মেনাইলে তাহার দ্বিতীয় বিবাহের নতুন পথ রচিত হইয়াছিল। কীভাবে এই পুরানা করতোয়া তারে আশ্রয় দেয়, বাপের কইত্থেকার পুরানো ভিটা ছাইড়া, সম্বলহীন হইছিলেন। বসন্তবাবুর গড়া কোঠায় আশ্রয় হয়। চৌধুরীর তখন আর সে সব আছিল না। সিমেন্ট শিলবাধা সাড়েতিনহাত চওড়া সাপ প্যাঁচানো রাস্তার পাশে পশ্চিমমুখো চিক্কন সরু ধুলামোড়া রাস্তার মাথায় বসন্তবাবুর বসতি। ছায়াঢাকা, পাখিডাকা গ্রাম মোনাইল। পলা পাশের পুকুরে নিজের ছায়া দেখে। চিমচিম পানিপোকা সাঁতরায়। বিলি কাটে। পঙ্গর দেয়। তখন কাঁপে পলার মায়াবিমুখ। ভারি হয় বা পাতলা হয় সে ছবি। ছবি ঘিরে বাঁশকঞ্চি অহেতুক ছায়ার ভেতরে এক সাদা রোদে কালো রঙিন পোঁচ দেয়। সে পোঁচ এতোই শরীরী যে তাতে পূর্ণ হয়ে ওঠে কারো মায়াবি মুখ। কী পলা তা নয়, কিন্তু পূর্ণ মুখে তীব্র আগুনমুখো কোমর-জঙ্ঘা। সেখানে প্রজননমুখ চিহ্নিত। প্রজননের পরিতৃপ্তিতে ভরা শরীর। স্নিগ্ধ পীঠ আর কোমর বেয়ে নেমে এসেছে মাংসপেটা অবয়ব, গড়ে ওঠে তীক্ষè মূর্তি, তবে ওকি প্রজাতির অবচেতন জন্মের স্বাদ এঁকে দেয়! ঠিক তাই হবে, আবার নাও হতে পারে। পলা তখন থেকেই বাবাকে চেনে। আকৃষ্ট হয়। ক্ষুধার্তের সম্মুখে গনগনা ভাতের উত্তাপ নাসারন্ধ্রে আঘাত হানে। ক্ষুধা আর অশেষ আনন্দের ভেতরে পিতৃমুখই সর্বাত্মক হয়ে ওঠে। কী তার লুব্ধলহরি। বিরতিহীন অভীপ্সা চিরল পাতার কোণে উল্কিরশ্মি আঁকে। সেখানে অনেক জীবনের প্রতিরূপ অঙ্কিত হলে পুবাল হাওয়ায় বিরাট বিরান পাথার প্রকম্পিত হয়। তখন কী সে একাকি ছিল। ঠিক সেটি নয়। আরও কে একজন। সে ওই পিতৃপ্রতিচ্ছবিরই দহ। শন শন হাওয়ায় পেছনের সবুজ ক্ষেত মাথা নোয়াইয়া হেলিয়া যায়, অনেকরকম স্বর আসে, চেনা-অচেনা-অজানা এবং লুপ্তপ্রায় প্রতিধ্বনি; অনেকটা পুরনো প্রত্ন কষ্ট। সেখানে অন্ধকারের রূপের ভেতর প্রতিষ্ঠিত হয় চিরায়ত পিতৃমূর্তি। সে কী অন্ধকারের আলো! আলোটুকু কেন তাহার হাতে স্পর্শ ও অনুরাগ তোলে। তার মধ্যে সেঁধিয়া যায়। বিপুল হাওয়া যখন এসব সুখমুখে বিলোড়ন তোলে, তখন ভয় আসে। বিষণ্ন ভয়, অপার আমোদও বহাইয়া তোলে। এ তো সেই পুরনো সুন্দরের আগমন। পলা তখন বড় হয়, আরও বড়। তার ভেতরে এক অন্য রমণীরূপ রমনীয় হয়। কে যেন ডাকে। কার যেন স্বর, বাবার, পিতার, ও-সে প্রভাবিত জীবনের উত্থান বুঝি। কে সে! সে সেই জন্মরত মায়ের বিচ্ছেদে ভরা তুমুল আর্তনাদ! পলা সম্মুখে এ বাস্তবটুকু অতর্কিত পিতার স্বরূপে প্রকাশ। এখন একাকি নগরবাড়ির এই বসতের পীঠে এক মনোটোনাস ধইরে আসে। পলার এ ধারার ভেতরে দোয়েল আর শ্যামার ডাক করুণা তোলে। সেই কবে ফেলিয়া আসিয়াছিল সে দুধিয়াবাড়ি মোনাইল গ্রাম। আর তার মনে নাই। সেখানে কলরোলে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে অতীতের সব কামুক আস্তাবলের স্মৃতি। এলাকার সকল মানুষ তো তখন একান্নবর্তী। তাহাতে যোগ ঘটিয়াছিল চৌধুরী নামের এক একাকী তাহাদের। সেই যাযাবর হইয়া বাবা আসেন মধুমতির দরদালান ছাড়িয়া। ওখানে শিক্ষা আছিল, রাজনীতিও ছিল কিংখাবের পাতায় মোড়ানো। মধুমতির পাড়ে দাদা পরদাদার ঘোড়া চরিত। হাতিতে আসিত কোনো এক রাজার সংবাদ আসিত। কী তার রোশনাই। মুসলিম জীবনের এসব রোশনাইয়ের ভেতর রাজার বেশে দাদা যখন হজ্বে যান শোনা যায় তখন পাড়া জুড়িয়া মানুষের উৎসব উঠিত। কী করুণ সেই উৎসবের দিন। পলারা তখনও জন্মায় নাই তার বাপের বয়সও তেমন হয় নাই, পুরনো মানুষ নাকি আদি জনতা ভরা যুবকে জীবনের সমস্ত সুখ ধরায় নামাইয়া আনেন। বলক দেন আর প্রাণ ছাড়িয়া উজান গাঙ্গের নাইয়ারূপে রাধারমণ জীবনের সময় কাটাইয়া দেন।
রাজা আসিয়াছে বাদ্য বাজাও সকলে মিইলা ভোরের মন্দিরা বহাইয়া আনো, সেকালে এ এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য অনেক লোক মোনাইলে মাদ্রাসা বানায়। কতোদূর থেকে মানুষ আসিয়া বসে। মাদ্রাসার মধ্যে তখন কোলাহল ওঠে। কান্না আর করুণের কারুণ্য জ্বলে। বাতাসে ফোয়ারা ওঠে। কুল কুল করিয়া মোনাইলের পাশের চওড়া নদীতে বজরা আসিয়া ভেড়ে। পলার মাতুলালয়ের বংশধররা তাহাতে জীবনের অস্তিত্ব খুঁজিয়া লন। কতোদূর থেকে অনেক মানুষ কোনো কোনো দিন এ এলাকায় আসে। আর বলে, কইগো করুলের বাঁশিতে আর স্রোত বহাবে না কোনোকালে? তখনও সূর্য পূবাল হাওয়ায় তাহার রশ্মি ঝইরা তোলে নাই। স্বর ওঠে, অনেককালের স্বরে মাদ্রাসার বারান্দা থেকে শোরগোল আনে। শোনা যায় কোন যে বৃটিশ ফর্সাওয়ালা এই মাদ্রাসায় আসিয়াছেন। তিনি বলেন, ফার্সি নয় আর এখন যে ইংরাজি শিখিবে তাহার চাকরির ব্যবস্থা লিবে সরকার। এই মাদ্রাসায় তখনও বাইরের দূর থেকে মৌলবি আসেন, তিনি কি নোয়াখালির মানুষ কি-না জানা যায় না, কিন্তু তাহার অনেক আদর থাকে নানা বাড়িতে পড়ান তিনি, তাই তার আদেশ নির্দেশে পাতা ঝরে, পাতা ওড়ে, মানুষও এক লয়ে কথা ওড়ায় আর কয় মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। একদিন একটা বড় ঘটনা ঘটিয়া গেল। মাদ্রাসার ভেতরে এক কোণায় হঠাৎ ভসকা মাটিতে কিশোরী কলি বেগমের পা ডুবিয়া গিয়াছে। তার পর হইতে কলি কীসের আঁচে প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছে। তাহার মুখ থেকে গান পড়িয়া গিয়াছে, হাসি নির্বাপিত, কথা নাই শুধু এক পলকের দৃষ্টিতে সারাদিন তাকাইয়া থাকা। এইখানে গর্ত কীসের? অনেকের সে হৈচৈ মার্কা প্রশ্নের পর একদিন শোনা গেল কোনো এক বিকেলে ওখানে কলি বেগমের একাকি গমন ছিল। তখন ফিরতি পথে কাহারা যেন হাতে একপ্রকার মার্কিন কাপড়ের পুটুলি দেখিয়াছে। পুটুলিতে কী আছে, কেন সে পুটুলি আনতে গিয়াছিল সে উত্তর কোনোকালেই না মিলিলেও কলি বেগম একপ্রকার ক্রমশ সমাজবিচ্যুত হইয়া পড়েন। মানুষ স্বপ্নানোর কথা বলে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়া সে চলে। স্বপ্নের টানেই সে ওই গর্তের দিকে গিয়াছিল এবং সোনাদানা জাতীয় কিছু পাইয়াছে। সেই সোনাদানার পরিমাণ অনেকভাবে গুঞ্জরিত হয়, পল্লবিত হয় এবং এক এলাকা শুধু নয় অনেক এলাকায় তা বৃষ্টির ছাটে পাওয়া পানির মতো সিক্ত-সান্নিধ্য পাইয়া দেয়। ভেতরে ভেতরে নির্বাক এক মাইয়ার নাম ভুবনডাঙায় ভাসে। ব্যাপ্ত চরাচরে কূলুকূলু রবে তরঙ্গ তুলিয়া ব্যাপক আকাশ নীলে জড়াইয়া কয় : ওহে, ওখানে জ্বীন পড়িছে। ওটা আগুনের দলা। ওটাকে বেশি অশান্ত করিয়া না তুলিও। বিগড়াইয়া গেলে সে তোমাকেও হরণ করিতে পারে। এভাবে কলি বেগম কীভাবে পাল্টান, কীভাবে তিনি শক্তিশালী হইয়া ওঠেন, কীভাবে অনেককালের স্মৃতির ভেতরে দৃঢ় প্রপাতে অবস্থান করিয়া লন তা কেউ হিসেব করে না। হিসেবের তো অনেক সময় তখন। মোনাইল এলাকায় অনেক জমি পরিত্যক্ত, করতোয়ার ধারায় নৌকা বাইলেই মাছ ওঠে, এক ফসলা ধানে অনেকের অন্নসংস্থান হইয়া যায়। গুরুগুরু দেয়া ডাকিলে গৃহের তলে নারীপুরুষের নির্বাক জীবন যাপনের ভেতর একমাত্র আশিস দাদা চমৎকার বাঁশি বাজাইয়া কাজল ভোমরার সুর তুলিয়া বর্ষাকে আরও বরিষধারায় যুক্ত করেন। প্যাঁচ প্যাঁচ করা কর্দমাক্ত উঠানে মাথোল মাথায় আশিস কাহা ঘরবারান্দার ঘোরাঘুরির ভেতর বাঁশিতে নিয়োজিত হন। এ এলাকায় তিনি বাঁশি কাহা। সেই অসীম অবসর মাখা সময়ে দিনরাতের ছন্দোময় আগমন-প্রস্থানে লাগোয়া মাদ্রাসার ভেতরের কোণার ভসকা গর্তের টানে কলি কখন কখন যুক্ত হন, আরও কোনো পোটলা তিনি পাইয়াছেন কি-না, নাকি এবার নতুন পোটলা পাইয়াছেন— যাহার রঙ লাল সালু কাপড়ের ন্যায়, নাকি পান নাই, পাইলেও স্বীকার করেন নাই, বা কে-ইবা জিগাইছে, কারে কেডা জিগায়, সক্কলেই তো ভয়ে পুরাট, তবে আবার কেউ জিগাইছে উহা লালা রঙা, কেউবা দেখিয়াছে সত্যিই উহা লাল— তাহলে কখন তাহার এ প্রাপ্তিযোগ, কেউ কী ওই মাদ্রাসার দিকে যাইতে দেখিয়াছে, কেউ কয় দেখিয়াছে কেউ কয় সন্দো হয় গেছিল বুঝি আবার কেউ কিছু দেখে নাই, দেখিলেও দেখে নাই— ভয়ে চাইপা যায়। এরকমে কলি আর কলি থাকেন না। যে কলি কিশোরী আছিল, তখন তাহার বালেগ হওয়ার লক্ষণ পাওয়া যায় নাই, এখন কয়েক মাসের ব্যবধানে তাহার সবকিছু পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মুখ পাল্টায় বুক পাল্টায় গঠন পাল্টায় দেহ পাল্টায় ঘন লোমও বুঝি দেখা যায় কী যায় না— সেটা কেউ দেখে নাই। ক্যামনে মাইয়াডা এমন হইলো বাড়ির গার্জেন অলস অনেক সময়ে ভাবতে ভাবতে কঠোরভাবে ক্লান্ত। এখন খালি গড়িমসি। ওই মাইয়া নিয়া আর চিন্তা কইরে লাভ নাই। কী হয় হোক। মায়ে কান্দে আর কয় কপালডা ক্যান এমুন হইলো। বাপে কয় এই মাইয়া সারা জেবন পালোন লাগবো। কিন্তু বাইরের স¹লে কয় হালার মাইয়া বাপমায়ের কপাল ফিইরা দেছে। অনেক কিছু পাইছে। ওডা আগুনপরী। ওর ভেতরে অনেক মুশকিলের আছান আছে। আসাদ মিঞা তোমার সন্তানের আছানও তিনি করব্যার পারেন। তেনার লগে কতা কও। অনেকবার কতা কইলে একবার তিনি জবাব দেবেন। সেই জবাবেই তোমার আছান হইয়া যাইবে। দ্যাহেন নাই কলিমপুরের ছেইলেডা তো তার কাছেই ভালো হইয়া গেল। এরূপ সংবাদের ভেতর একদিন মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব অস্থির হইয়া উঠিলেন। তিনি ওছিহত দিয়া দেলেন ওই মাইয়ার নাম কেউ মুখে আনবার পারবা না। কেন কী কারণ, তাহার সবিশেষ উত্তর কাহারো জানা নাই। টুপটুপ আলো জ্বলা পুরাণকথা মোনাইল মোড়ের একটুকরা দোকানে পৃথিবীর সব সংবাদের ন্যায় তখন সকলের কানে আঘাত মারিতে থাকে।
পলার ক্রন্দনময় জীবনের সঙ্গে যে বৃষ্টির প্রলাপের সংবেদন লুক্কায়িত তাহার প্রভাব ওই মোনাইল গ্রামের কোনো প্রান্ত থেকে ভাসিয়া আসা আশিস কাহার মরমী সুর কিনা তাহা বোঝা যায় না। তবে কলি বেগমের প্রবাহিত জীবনের ন্যায় অনেক আলো আর অভিক্ষেপ মাতৃকুলের কোনো পূর্বপুরুষের ছায়ায় আলোড়িত এবং তাহা এ প্রকৃতির ভেতরে নির্ধারিত আছে। ওই গ্রামে আরও সিক্ত জীবনের খবর মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন। মুসলমানগণের জলডোবা হাওয়ায় করতোয়ার এপার ওপার লোকসমাগম স্থির ছিল। এখানো কোনো জীবনের স্রোত আছিল না। অন্ধকারের ভেতরে কোনো কোনো গৃহে কুপি জ্বালিত, বাইরে বিরাট কাছারির বারান্দায় সুন্দর আঁকশি করা দুয়ারে বসিতেন চৌধুরী সাব। তার গায়ের গন্ধ আছিল পোলাওয়ের লাকান। সফেদ পাতলা যে পাঞ্জাবি তিনি পরিধান করিতেন, তখন তাহার হাতা মগরা পর্যন্ত ডুবাইয়া যাইত আর পরিতেন কোলাপুরির জুতা। এসব এ গ্রামে কেউ বুঝি দেখে নাই। সর্বস্তরের মানুষ কাছারিতে আসিয়া সুসম্মানে তাহাকে মাথায় তুলিয়া আদেশনির্দেশের অপেক্ষায় থাকিয়া লেজনাড়া কুকুরের ন্যায় অধর নয়নে চাহিয়া কন, বাবা আমার সময় ফুইরা আসছে, এবার তুমি একটা কিছু করো। চৌধুরী শুধু ইশারা করেন। মোনাইল গ্রামে তখন বাইরে চিকনা রোদে হাওয়া ওড়ে। বলশীল বাতাস বহাইয়া দেয় প্রচুর বাবুই পাখি। তারা হাওয়া দোলায় তালগাছের ঊর্ধ্ব শাখায়। এক পায়ে দাঁড়ানো তালগাছের ন্যায় নারকেল সুপুরি আর শিরিস এক হইয়া চৌধুরীকে উনপঞ্চাশ বায়ুতে দোলা দেয় তখন কোন মন্দিরে ঊলুধ্বনি পড়ে, ডাক ওঠে আইজ পূর্ণিমা। এই কোজাগরি পূর্ণিমায় রীতি মানিয়া এখানে যাত্রাদল আসে। চাকুন্দার মাঠে এবারের এই যাত্রাপাট্টির নাম ওস্তাদ আলীর যাত্রাপাট্টি, যাহা সুদূর যশোর হইতে আসিবে।
কিন্তু এই নগরবাড়ি তো কোটাঘর নয়। এতে বসিয়া ঘিরিয়া ধরে বসন্তবাবুর কোটাঘরের গপ্পো। সে তো গর্ত আছিল না। পলার মনে আছে সেই কতোকাল আগে সে এক শীতের রাতের কোমল গন্ধমাখা ভোরে হুড়কা খুলিয়া বাহিরে আসিলে সত্যিই তার গর্ত থেকে বাইরে আসার ভাবটাই মনে হইতো। হায়রে শীত! অথচ গর্তের মধ্যে কী মখমলে গরম। এইটা কেমন গরম! কুসুম কুসুম। নাকি মজাদার গরম। মার হাতের সুতোয় বোনা স্ট্রাইপ নকশাদার সোয়েটারের ভেতরে হাত রাখা উষ্ণতা নাকি ঠাণ্ডা পানির গোসলের পর শীতের উঠানে এক চিলতে রোদ্দুরের জমে ওঠা নরমগরম ভাপ নাকি গ্রামে শীত আসিয়া যাওয়ার সময়ে নাড়ার আগুনের তাপের কোমল সুখের স্বাদ। ঠিক বোঝা যায় না তরে ওই শীত সকালে কোটার ঘরের ভেতর থেকে সত্যিই বেশ উষ্ণ হাওয়া বাহির হইয়া বাইরের ঠাণ্ডা প্রকৃতির ভেতর নেতিয়া পড়ে। ঘরের বাইরে টিনের চালার বারান্দা, তাতে ফোঁটা ফোঁটা নেওর জমানো, আর টুপটুপ কাঁঠাল পাতা বাইয়া ঝমঝম করা বৃষ্টিটিন— যেখানে জল পড়ে পাতা নড়ে— শব্দটুকু কানের পর্দায় লাগে। মধ্যকর্ণের ভেতরে অনুরণিত হয়। সেটা অনেকক্ষণ বজায় থাকিলেও পরে বাইরের ঠাণ্ডা সুমন্দ বায়ুতে বকুলপাতার গন্ধ কিংবা কৃষি ব্যাংকের সামনের সার করা ফুল গাছের মধ্যে দুধসাদা গন্ধরাজ একরকম ঘন বোলে সুগন্ধ তোলে। পলা তখন মোটা সোয়েটারে হাত ঢুকাইয়া তাৎক্ষণিক পেছনের উষ্ণ ঘরের রজতের ডাক শুনতে পায় ‘স্যার আইছে তাড়াতাড়ি আয়’। সবকিছু দ্রবীভূত হয়, ক্রন্দনরতা বিরক্তি ভর করে। রাগে একটা গন্ধরাজ ছিঁড়া ফেলে। একটু এগিয়ে যে কমিনী গাছের সারিতে থোকা থোকা ফুল নিজস্ব সত্তা জুড়িয়া বিছাইয়া রাখার আয়োজন করে— তাতে বাগড়া আসে। কোমল কুয়াশা আর কামিনী কদিন আগে বেলালের দোকান থেকে কেনা নতুন সেন্ডেলের আঘাতে ধরাশায়ী হয়। এক ঝপ্ সুশ্রী আলো যেন নিইভা যায়। বিষণ্নতার বাতাসে পুরো এলাকাই শুধু নয় উঠান ও স্কুল গমনের সোজা রাস্তার পথও বিচলিত হইয়া পড়ে। কেনো মাস্টার আইলো। তাইলে তো সে কোটাঘরের বাইরে আইতো না। প্রভাতসূর্য তখন বেশ কড়া হয়ে উঠছে। যদিও শীত, তবুও তার উন্মোচনটুকু কড়াই মনে হয়। পরে কী হইয়াছিল মনে নাই। রজত চলিয়া গেলে কোটাঘরের স্থায়িত্ব তাহাকে তাড়ায়। এই কোটাঘরটার ওপরে একটা বয়সি কাঁঠালগাছ সর্বদা অভিভাবকত্বের মর্যাদা নিয়া মনে হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। তাতে উৎকীর্ণ সূর্যতাপ আর নিমীলিত হাওয়ার করুণ প্রতিশ্রুতি এই কোটাঘরের নিমিত্ত বরাদ্দ হয়। স্বভাবসুলভ কোটাঘরটা আরও এসিমূলক সক্রিয়তায় দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে। টুপটাপ নেওর ঝরে আর টিনের চালের নীচে ফোঁটা ফোঁটা দলবদ্ধ শিশিররূপজলদল একপ্রকার নকশী আঁকিয়া ঘর ও তাহার সন্নিকটস্থ বারান্দার সুস্থ পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখিয়া চলে। কড়িবর্গায় মোট বারোটির মধ্যে কয়েকটি মোটা তল্লাবাঁশের ঘন ঘন পোরের শক্ত জয়েন্টে তাহাতে সংঘবদ্ধ। সেখানে কেন এই তল্লাবাঁশ আসিল তাহার কারণ জানা যায় অপর যুদ্ধের কাহিনিতে। পাকবাহিনি একাত্তরের জুন নাগাদ এই ঘরে কিছু মালপত্র নিয়া জোরপূর্বক বসতি নেয়। বাড়ির মালিক চৌধুরী সাব আগেই তালা লাগাইয়া চলিয়া যান। যেহেতু যুদ্ধ শুরু হইয়াছে, শোনা যায় ভাঙ্গিয়াছে আঙরার পুল, আখিরার পুল, হরিণসিংদীঘির ওপরের কালভার্টÑ তখন দলে দলে জলপাইরঙা মেলেটারি ঢুকছে আর ঢুকছে। তার মধ্যে শুরু হয় বর্ষা। তখন পলার বয়স বার পার হইয়াছে। আশ্রিতা কইলেন আপনে পলারে নিয়া যান। আমার যানের চাইয়া পলারে আমি চাই কিন্তু হের যদি কিচ্চু হয় আমি আফনেরে কী কমু! শুনলাম রাইতে মেলেটারি ঘিরিবে। আপনে তো মুক্তি। পলান। পলারে লইয়া যান। এই মাইয়ারে জেবনের ওপর দিয়া বাঁচোন লাগবো। চৌধুরী কান্দিয়া ওঠেন। ভরিয়া যায় অশ্রু। মোনাইল থাইকা তিনি কোথায় পলাইবেন। এই বাড়ির কোটাঘর নিয়া তিনি যে জেবন শুরু করেন তাহার ফল কী পলানোতেই স্থির হইবে। অনেক ভাবিয়া সময় গত হইলে তিনি তালা লাগাইয়া করতোয়া দিয়া উত্তরে এগুনোর সিদ্ধান্ত নেন। কীভাবেই বা যাইবেন। নৌকা নাই। কেউ এসকল পথে আর চলিতে রাজি না। কিন্তু উপায়হীনের উপায় আছে। সেই সত্যটুকু তিনি উপলব্ধি করেন। নিজের প্রতিরোধের মুখেও পড়েন। তিনি পলাতক হন কীভাবে। শুধুমাত্র নিজ আর এই মাইয়াকে উপলক্ষ করিয়া তিনি সবকিছু ছাড়িতে পারিলেন। পেছনে কী রহিয়া যাইবে সব কর্ম! মাদ্রাসার কী হইবে। যে মুক্তির লোকদের তিনি তৈরি করিয়াছেন তাহারা কার নিমিত্তে যুদ্ধ করিবেন! কীসের সে যুদ্ধকৌশল! আশ্রিতা কিংবা যাদের সঙ্গে তাহার মিলমিশ, যাহারা এক অন্নবস্ত্রে এখানে অনেককাল তাহাকে রাখিয়াছিল। অনেককাল অর্থটি যতোদিনই হোক, বসতি তো মায়ার হাওয়ায় তৈরি। সেই মায়াটুকু তো তাহাকে পেছনে টানে। কী করিবেন ঠিক হয় না। কয়েক রাত নির্ঘুম চলিয়া যায়। মুক্তিদের চোখের দিকে তাকানো অসম্ভব হয়। তিনি কালই তাহাদের সমস্ত কৌশল নিয়া বসিবেন। গেরিলাদের অস্ত্র কিংবা ওপার থাইকা যে সরঞ্জাম আসার কথা সেসব বিষয়ে বুঝিয়া দেবেন। অনেক দায় নিয়া এভাবে সারারাত কাটিয়া চলেন দুঃস্বপ্নে, এ জীবনকে আর কতো ঠেলিবেন তিনি। সেখানে কতোলোক নিশিরাইতে আসিয়া ভর করে। অধিকার করে বিবেকের প্রাচীরে। অবরুদ্ধ হইয়া তিনি একপ্রকার মরণযন্ত্রণায় উপনীত হইয়া চলেন। মৃতবাবা সামনে আসেন। আবার সেই মোহন চরিত্র! আসেন তাহার মা কিংবা বিবি ও পলার মা। সবকিছুর জড়ানোপ্যাঁচানো ভারে শব্দহীন মূক হইয়া তিনি অবিন্যস্ত বেশ লইলেন। গ্রামের জব্বার, হবিবর তাহাকে দেখিয়া হুম হুপ কইরা কয় মিয়াবাই আফনে ছইলে যান, মেলেটারি আপনারে খুঁজতাছে, আর কী কী লোক আসিয়া আপনারের নাম জিগায়। সে তাহার পানে তাকাইয়া কন্দোনে ফেরে। আরও এরকম কতোজন কতো সংবাদ দেয়। ব্লাকআউটের কালে এই তো সত্য! বিশ্বযুদ্ধের সময় বা দাঙ্গার সময়ের কিছু ঘটনা তো তার স্মরণে আছে! তবে কী চৌধুরীর মৃত্যু হইতেছে! না তিনি কিছু করিবেন না। এখানেই থাকিয়া যাইবেন। থাকিতেই হইবে। বেঈমান হইবেন কেন। না থাকেন নাই। এসব ভাবতে ভাবতে একরাত্রে তড়িৎ তিনি করতোয়া দিয়া উত্তরে পৌঁছান। পরে পুনর্ভবা, ইছামতি বাইয়া ক্রমশ মহানন্দার দিকে চলিলে তাহারই শাখা নাগর দিয়া এপারে জগদল রাখিয়া ওপারে চলিয়া যান। কী নির্নিমেষ প্রশান্ত আকাশ তখন। সেসব বাহিয়া জনমানবহীন প্রান্তরে চলেন তিনি— তবে কেউ তাহা সেসব জানিতে পারে নাই। ওপারের কী এক নিস্তরঙ্গ গ্রামে তাহার আশ্রয় হয়। শুধু একটি নদীই তখন সমস্ত নিরাপত্তা দিয়াছিল। কী কষ্টের সেসব দিন। আত্মঅবমান। এক স্বার্থে এই দেশ, শুধু ঔরসজাত সন্তানের অছিলায় তিনি বিশ্বাসঘাতকের দলে পড়িয়া যান কিনা তাহা নিয়া ভেতরে তোলপাড় উঠিলেও, এক অজানা শক্তিতে তাহা সামলিয়া নেন। তারপর মোনাইলে ঘনবর্ষার চাকায় লাল মাটিতে ধীরে ধীরে উঁইপোকার সারির নাহান মেলেটারি আসে। সে বর্ষায় তাহাদের গাড়ির চাকা দাবাইয়া যায়, উহা দুলদুলের পায়ের খুরের ন্যায় আটকাইয়া পড়ে, কষ্টে ওঠে ধীরে চলে এবং স্থানীয় লোকদের সহায়তা নিয়া তাহারা একপ্রকার বন্ধুর পরিবেশ পুনর্গঠিত করে। সেই বন্ধুদের মধ্যে যুক্ত হইয়া যান চৌধুরীপ্রিয় হবিবর রিফিউজি। তার অভাব অনটন যেমনই হোক, তিনি ধরিয়া নেন এই জীবন দোয়েলের— এখানে ফিরিবার কিছু নাই। কপালের লিখনের বাইরে আর কিছু ঘটিবে না। সেই কবে ছেষট্টির বড় ঝড়ে যে লাকসাম থাইকা চইলা আসেন এই অঞ্চলে, বাক্সপেটরা আর পানসুপুরি নিয়া সেবায় জনতার আদালতে আসীন হন তারপর মোনাইলের সরকারি খাস জমিতে একচালা নিয়া জীবন চলা শুরু। মোনাইলে চৌধুরীর তখনও ততোটা প্রতাপ হয় নাই। ক্রমাগত কয়েকটা সন্তান জন্মের সুখে সে ডেরা যখন দ্রুত ভর্তি তখন এই যুদ্ধ ঢাক বাজিয়া ওঠে। ডেরায় তখনেই সকলেই আছিল। দ্বারাপুত্রপরিজনসমেত সেই ফাঁকা একটিয়া বাড়িতে হাগার কিছু নাই, নাই কোনো কুয়ার পানি। অনেকদূর কৃষি ব্যাংকের টিউবওয়েলের লাইনধরা মানুষের লগে পানি আইনা বিবি দুমুঠা খাওনের ব্যবস্থা করে আর ঝংকার দিয়া কয়, ‘আমার আর নিদানেও কিছুই ফায়দা হইবো না। হালার কুত্তার জেবন, মরণও হয় না!’ ঝংকারের শরীরে নাচন উঠিলে ফাঁকা পঙ্গর দেওয়া বাতাসে জলের ঘূর্ণি ওঠে। তাহাতে কী ছবি দেখা যায়? উহা কাহার ছবি! রঙিন, সম্পূর্ণ রঙিন। ঝালর তোলা গুমগুম মূর্ছনা। চলচ্ছবির দোলা। এইসব জেবন রঙিন জলের ঘূর্ণিতে নাচিয়া ওঠে। নিজের ছবি দেখা যায়। তাহাতে ঠিকরে পরে পুবের আলো। গড়ে ওঠে উত্তাপের রোশনাই। ঝির ঝির হাওয়া কঞ্চির প্যাঁচ আর পাতলা বাঁশপাতার নোছনা বিবির গায়ে আসিয়া ঠেকিলে শূন্যতার ভরকেন্দ্র গাঢ় হয়। ময়লামাখা আঁচল দোলে বাতাসে। কাঁপে। ব্লাউজহীন কালা মাতৃশরীর আরও আহ্বান জানায়। ভয় হয়। আরও ভয় তীব্রতর হয়। বাঁশঝাড়ের ভেতরের কুশন্নি হাঁক ওঠে। এই ফাঁকা মাঠের আন্ধারে যখন একটি কুপি জ্বলে তখনও এক শিকারী কুকুর নির্বিকার জীবনের নস্যাৎ আকুল আহ্বানই ধারণ করে। ভয়টুকু রিফিউজির শরীরে উল্টা প্রতিক্রিয়া তোলে। তাইতো এক আকাঙ্ক্ষায় চৌধুরীকে ভুলিয়া পাকসেনাকে সে অবলীলায় অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করে। সেখানে কর্মলয় তাহার বেশ দ্রুত। তৎপরতার বোলও কম থাকে না। পাক অফিসার গ্রহণ করে তাকে। সে মেলেটারির আদেশ-নির্দেশে ব্যাকুলভাবে তৎপর হয়। এক পর্যায়ে দিকনির্দেশনা দিয়া এই এলাকায় মেলেটারি বহরকে ঢুকাইয়া লয়। হবিবর একা থাকে না কিছু দোসর যুক্ত হয়। একসারিতে আসে আরও অনেকেই। চেনা এলাকাগুলা আরও চিরপরিচিতি পায়। চতুর্দিকের ঘাসে ঘাসে রব ওঠে। কুলু কুলু নদীর স্রোত ভরাবর্ষায় আরও স্থির হয়। স্রোতের বলোকে ভেসে আসে অনেককালের জমানো বর্জ্য আর কারো ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক রাবারের দোমড়ানো পুতুল। সে পুতুলের পায়ের সঙ্গে বাঁধা কিছু খেলনাপত্র। সবুজ জীবনসমূহ অনেক ক্লান্ত তারে আটকা পড়ে। ঘরের ভেতরে আরও অনেক ঘর আর কম্পমান সুখ অসুখের আহাজারিতে থাকে ত্রস্ত। তারপর হট্টমেলার পলায়নপর মানুষের তৎপরতা বাড়িয়া গেলে হবিবর রিফিউজি সবকিছু নিজের তরীতে ভাসায়। স্বপ্নের আরশিতে তুল্য করিয়া তোলে বাস্তবভূমির বিপুল রূপালী-ক্রন্দন স্বর। কী আছে উহাতে! কীসের জীবনের হাতছানি তাহাকে সম্মুখে ডাকে— কেউ তা জানে না। কোন সকালে কীসের ডাক কেউ কী তার খোঁজ রাখে!
চৌধুরীর কোটাঘরের তালা ভাঙিয়া হবিবরের নির্দেশেই একপ্রকার মোকাম তৈরি হয়। চৌধুরীর আশ্রিতা উধাও হন। কী তাহার পরিণতি কেউ জানে না। অনেক ডামাডোলে আশ্রিতা হারাইয়া যায়। পলা পরে কড়িবর্গার ইতিহাস শুনিয়া বলিয়াছিল ‘এই বুদ্ধি কী করিয়া আসিল!’ মোটা মোটা বর্গা নামাইয়া কোটাঘরের বাইরে বিশাল চুল্লীতে ঢুকাইয়া চলিত বড়ো বড়ো হাঁড়ির রান্না। মুরগি, গরু-খাসি জবাই আর আনন্দের উৎসব তখন সেখানে। এই এলাকায় কারো গরু-খাসি জীবিত থাকে নাই। অবারিতভাবে সকল প্রাণীর শরীর আহার দেশ উদ্ধারের নিমিত্ত নিষ্পত্তি হইতে থাকে। কোটা ঘরের উঠানের সামনে বড়ো চুলায় বাঁশ-বাতি, জামা-কাপড় নামাইয়া মালিকহীনের মালিকানায় রান্ধনের কর্ম চলিতে থাকে। হবিবর রিফিউজি যোগানদাতারূপে কিংবা সাহসী ইনফর্মাররূপে নেতৃস্থানীয় হন, সম্মুখ অধিকার করেন। পাক সেনাদের কর্মের নেতৃত্ব লইয়া ফেলিলে কোটা বাড়িটি কেন্দ্রীয় আস্তানায় পরিণত হয়। তখন রন্ধনশালার ব্যঞ্জনে কড়িবর্গা, বুনোবাঁশ, স্থানীয় আমগাছের ঝড়ে পড়া শুকনা ডাল কিংবা পরিকীর্ণ পানশালার গ্রহণীয় বস্তুসামগ্রী গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্ত নিমজ্জিত হয়। ম্যাসেব চিক্কুরে একবার বাড়ির মালিক আসিলে হবিবর কয় ‘তোরা পালাও’। দ্রুত গ্রেফতার বা চোখবান্ধার ভয়ে সে একসময়ের দাঙ্গায় ভাঙ্গা সাইকেলের গুণা দিয়া বান্ধা হ্যান্ডেল ধরিয়া গাত্রোত্থানের উদ্যোগ হইতে শুরু করিলে সম্মুখতটে এ্যারেস্ট হন অন্য এক পাকসেনার হাতে। তখন আরও দেখে মতি, নবি, দছিসহ আরও কয়েকজনের একই দশা। গর্তে নামাইয়া ঝুট বলার দায়ে উদ্যত কঠোর লোহার বন্দুকের নল। পরিবেশটা নিরিবিলি ও নির্মিয়মান। কট্টর ক্লেশ সবার বুকে। স্কুলঘরটা গত মে’র ঝড়ে চাল উড়ানো। পেছনের ফাঁকা প্রান্তরের মাঠ পেরিয়ে পঁচাকন্দর গ্রামে মুষ্টিমেয় ক’জনা লুক্কায়িত ও ত্রস্ত। আইয়ুব জান্তার হাতে গড়া চৌকোণা লোহার উপর আরসিসি ঢালাইয়ের তিনহাত প্রস্থের চিক্কন রাস্তায় বালুধুলা উড়ার চেয়ে আরও বেশি স্তব্ধতা থাকে শিয়াল-কুকুরের ডাক। কিংবা দূরের কোনো একটিয়া কোটাবাড়ির কুপি আলো কিংবা মাত্র কদিন আগে গড়া ইলেকট্রিক পোলের ওপর তীরহানা সূর্যের আলোতে রূপালি উজ্জ্বল আলোর দুপুর ক্লান্ত রোশনাই নিয়া রাত্রিদিন চলিলে এই গর্তে দাঁড়ানো মোর্দারূপপ্রাণের কী দশা হয় সাইকেল পালানো এই বাড়ির ধরার পড়া মালিক তা জানে না। একবার ছল করে, একবার সুযোগ খোঁজে, একবার রিস্ক লইয়া কোনোদিকে ফাঁক খোঁজে। মনে মনে ভাবে হবিবর রিফিউজিকে হাত করিলে সবকিছুর বুঝি আকুল অবসান হইতে পারিত। কিন্তু না! গর্তে নামানো তিনজন আর এই পলায়নপর ব্যক্তি একত্রিত হইতে থাকিলে এ এলাকার নিথরতা ভাঙিতে থাকে। তীব্রতর হয় আসন্ন কষ্ট। জটিল হতে থাকে গোটা পরিবেশ। বায়ু ওড়ে শীতল ও করুণ আবহে। কোটাবাড়িতে তখন আশ্রিতার ক্রন্দন ছাপিয়া ওঠে। এক সুখ আর শান্তির স্বপ্ন গাঢ়তর হয়ে ওঠে। আরও বায়ুবয় উত্তরের দিকে। শোনা যায় কোনখানে গ্রাম জ্বলিয়া গিয়াছে। আবার গড়িয়া ওঠে রাতের আলো। সেখানে ভূত পেত্নী আর শ্মশানের শব্দ আসে। মোনাইল দুর্গাপুর নামের গ্রামে কেউ থাকে না। পাটের ক্ষেত, সবুজ প্রকৃতির অরণ্যানী মানুষকে যে সবুজরূপে রাখে তা যেন কোন ইশারায় বিষণ্নতার বাতাসে হুহু রবে বইয়া চলে। কোনো গ্রাম নাই, শুধু পাথার আর পরের পাথারের ক্লান্তি। শূন্যতার পরে আরও অধিক শূন্যতা। দুধিয়াবাড়ির পাশে যে বড় নদী তাহার বেগ স্থির কুলু কুলু রব কারো আশায়-নিরাশার দোলায় স্তম্ভিত অবয়বে করুণ। এই তলে আরও বলক ওঠে, বৃন্তদল দুলিয়া ওঠে, ক্রমশ ফুটিয়া ওঠে কাঁঠালিচাপার কুন্দমুখ। বুনো ওরসে পলে পলে হাওয়ার যশ তৃপ্তিময় হইলে আরও অধ্যাত্মপ্রীতি প্রমুখের সংশ্রবে প্রবল হয়। প্রান্তরের চোখজুড়ানো আঁকশিতে কিছু মনুষ্য স্বর এক আবাহনের জ্বরে ভাসে। সশস্ত্র জলপাই রঙা গাড়িতে গোয়ারমেন্ট বা তার আদেশ কোপানো কণ্ঠ নুয়ে পড়া আকাশকেও সংঘবদ্ধ করে। তুলে ফেলে তোলা আঁকশি। তাতে যুক্ত করে কঠোর শক্তিভূতির দাপট। তখনও চোখ বান্ধা হয় নাই। মেলেটারি কোঠাবাড়িতে খাওয়ায় ব্যস্ত। দ্বিতীয়বার রান্নার হাড়ির জন্য গত রাত্রিতে কিছু মুরগী ধরিয়া আনা হইয়াছে। কিছু ছাগলছানা অদূরে ভ্যাবায়। ভুখা পেটে নোলায়। নিয়তির ক্রুদ্ধ অভিশাপে দাবিয়া গিয়াছে তাহাদের পা। এরাও কী অপেক্ষমান! জান যাওয়ার চিন্তায় ভরপুর। একপ্রকার তাকানোর ক্ষেত্র একই হইলেও দছি বা মতি বা চৌধুরী কেউই আর প্রাণের আশা করে না। প্রাণহীন প্রাণও তুচ্ছ সময়ের প্রলম্বিত রূপ খোঁজে। এভাবেই কী জীবনের সুর একলয়ে ভাসে ওই দুধিয়াবাড়ির করতোয়া ছাড়া নুয়ে পড়া মেঘদলে একত্রিত হয়! ঠিক ছিন্ন ভিন্ন চিন্তার আসর ও অবসরগুলা। এর সম্মুখে পেছনে কোনো রীতি বা নীতি ধরা পড়ে না। হবিবর রিফিউজিকে বুটজুতার এক লাত্থিতে দূরে চটকাইয়া দিয়া এক পাকসেনা কয়, হঠ্ যা! সে উঠিয়া পায়ের নীচে হুমড়ি খাইয়া কোঁকায়। আনিবে তো আজই বিশাল একখান গোরু। লাত্থিগুড়ি খাইয়াও হবিবর আঠার মতো লাগিয়া বাংলা ভাষার অবলম্বনে তোলপাড় করা গাল তুলিলেও বডি ল্যাংগুয়েজে তার প্রকাশ ঠিক দেখায় না। এইটুকু বুঝিলে গর্দান নিয়া নিবে। একটুক্ষণের মধ্যেই বিরাট ঝালোরঅলা মোটা চাকার তিনখান টেরাক ধাই ধাই রবে আসিয়া মোড়ের বটতলায় দাঁড়ায়। কী এক ইশারায় তাহাদের নতুন এজেন্ডা রচিত হইছে। পরিচিত রাস্তাচেনা মানুষের প্রয়োজন বুঝি— কিংবা ঠিক কী এক টেনশান সকলের কাঁধে অলঙ্ঘনীয়রূপে ক্রিয়াশীল। অঙ্গুলি ইশারায় পলকেই সকলকে মুক্তির আদেশ দেয়। এক লম্ফেই সক্কলেই ছাড়া পায়। দে এক জানছেঁড়া দৌড়, কোটাবাড়ির মালিক ওই ভাঙ্গা সাইকেলকে কাছেই হেলানোরূপে পায়। সে তাহাতে উঠিয়া সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে দূরদেশের উদ্দেশে নয় চিরকাল সে আর ফিরিবে না সেই প্রত্যয়েই চলিয়া যায়। হবিবর ঈর্ষার ভেতরে এই ঘটনাকে অসুখরূপেই চিত্তের মধ্যে রেখে একপ্রকার ক্রদ্ধ হয়। এই কোটাবাড়িটি যুদ্ধশেষে কাহার হইবে। কেন সে অধিকার হারাইল। পলাইয়া চলিলে সে কি আবার আসিবে! হায়রে কপালÑ এই লাত্থিগুঁতার কী আর দাম থাকিল। সে কারণে হবিবর কী কুপিত! দমনে তার আড়ষ্টতা বাড়ে, মনোযোগ পায় না কোনো কামে। পেছনে পেছনে তার আত্মা লাগামছুট হয়। মনে হয় অধিকৃত অধিকারও বুঝি দুর্বল হইয়া গিয়াছে। সেও কী এক রাত্রিতে সব ছাড়িয়া অন্য কোনো আস্তানার দিকে ধাবিত হইবে। সন্ধ্যাবাতির আলোর তেজ দুর্বল হলে দূর থেকে চিক্কুর শোনা যায়। তাতে আছে হিক পাড়া হাহাকার। বেলোয়াড়ি সুরের মধ্যেই করুণকান্নার লয়শীল বিলাপ-বিনাশী স্বর। সেও বিনাশী এখন। একইরূপে তার জীবনেরও পাদপ্রদীপ নিবিয়া গেল মনে হয়। নিভন্ত প্রদীপের মুখে যে হাহাকার ধ্বনি সে কী তারই প্রতিধ্বনি! ঠিক জানে না। কিন্তু আর পেছনেই বা ফিরিবে কীভাবে। বিবির কণ্ঠটি আবার নিকটে চলিয়া আসে। সেই রাত্রিতেই সে বলিয়াছিল ‘ট্যাকার কিছু নাই, দুই বান্ডেল টিন তো পাওয়ার কতা।’ চালফুটার ভেতরে কুত্তার গা-ঝাড়া চলিলে সে চিক্কুর দিয়া কয়, শোয়োরের বাচ্চা, তামান দিন কী করোস বাল। জেবনের তামানটা চুকলি দিয়া কী করলু! এসব আকার প্রকারে চতুর্দিক দিয়া তাকে যখন ঘিরিয়া ধরে তখন পেছনে ওঠে হুহু বাতাসের টান। বিলি কাটা রোদের ওপর দিয়া বিষণ্ন ছায়া দৌড়ায়। তারপর হিম ঠাণ্ডা নামিয়া তার দৃষ্টিজোড়া নিমীলিত নশ্বর দৃকপাতে সুনসান নীরবতায় একপ্রকার অসহায়ত্বের অভিজ্ঞান দানা বাধিয়া ওঠে— মেলেটারির দিকে একপ্রকার তাকায়। চুতমারানি তোদের ঘরোত আর কেউ নাই। ক্যান যে তোদের ফাঁদোত পাও দিছিনু। এরপর আর দ্বিধা থাকে না। সে নির্বিকার উঠিয়া বলে মোরগের রানগুলা চুরি করি নিয়া বউয়ের হাতে দিলে আর বেশি কথা থাকে না। সেই ব্যবস্থা নিয়া সে বলে পাক জাউরাদের পুটকিৎ আর রান ঢুকপান্নায়। এরপর সে ডুমা ডুমা গোশত চালানের চোখে যখন উদ্ধত তখন কীসের এক চিক্কুরে বাথানে ওপার দিয়া ডোকরাডুকরি ওঠে। আগুন জ্বলে। পাকিদের হাসাহাসি থামে না। কান্নার রোলে উপরের চিলকানো আকাশের বিজলী জমে। চীৎকার পরিব্যাপ্ত হয়, চরাচর জ্বলিয়া ওঠে। গঠনরূপে আকাশ-বায়ু-বৃষ্টি নতুন অবয়বে হাতছানি দেয়। এ কীসের উল্লাস! জল্লাদের দরবারে কার সে প্রদাহ? দহের নৈঃশব্দ্য যেন আরও ক্রন্দনরত। সে সকল অশান্ত অভিপ্রেত প্রেতরূপ তুমুল কাঠিন্যে প্রলুব্ধ। হবিবর রিফিউজির সুযোগের অপেক্ষার অবসান ঘনিয়া এলে গোশতের বাটির ভরাট ভা- ওই ফাঁকা উত্তুরে জীবনে আনে স্বস্তির প্র¯্রবন। তৎপরতার ভেতরে আগুনলাল উষ্ণতার আওয়াজের রব যখন দীপিত তখন বিবির মুখে চোখে নতুন স্বপ্নের আস্বাদ কাঁপে, দুলে ওঠে কম্প্রমান কোলাজবুননি। চোখশাদা দৃষ্টির ছায়া দূরের ক্ষীণ আলোয় তখন পাতলা সারস দেখে, চৈ চৈ আওয়াজে সারস নাকি হাঁসদল পাছা দুলিয়া দ্রুতলয়ে চলে। দলবাঁধিয়া নামিয়া যায় উত্তর-দক্ষিণে চওড়া পুকুরনদীতে, তারপর ভাসে, ডাগরমাথা দোলায়, কেশর ঝাপটিয়া জৈবিক ভঙ্গিমায় দাঁড়ায়— নাহ তারপরও রোশনাই নাকি থামে না ঘুলঘুলির ভেতর ঝুলন্ত কুলায় দোলে দোলদোল দোদুল নাচ লালিমা মোরগ পাখায় ফুড়–ৎ বিভাসে ঝির ঝির গুড়া ধুলা। বিবিসাব বায়না আর নেয়না। কত্তোকালের সুরম্য শানের ইঁদারায় ঝুপঝুপ আওয়াজ যখন প্রগাঢ় হয় তখন জলছায়ায় মুখ কাঁপে, ক্ষীণ ঢেউ দোলে তখনও নিজের মুখটুকু চেনা যায় বা ফেটে ওঠে। বিবির খাওয়ার আয়োজন আরও তুমুল। তসরের তাগে আটকায়। তাগায় তাগায় জোড়সেলাই অনেককালের সুখকে মাখায় নাকি দুঃখকে বিলোড়িত করে জানা যায় না। কত্তোকাল আগে একমাত্র সন্তানটা মরিয়া তাকে ভুলিয়া গেছে। সে মৃত্যু কী কঠোর না আদরের! আর আশা জাগানিয়া অভিপ্রায় পাড়া জুড়িয়া হাওয়ায় ভাসিয়া বেড়ায়। হবিবরের দ্বারা দুইবারের অ্যাবরসনের পরে বিবির প্যাট নষ্ট হইলে এই পাথারের একাকিত্ব আর ইঁদারার মুখ দেখা মুখ কালিছায়ায় আকুল। হবিবর তখন কোটার কোণায় অবসরনিদ্রা যায়। পাক মেলেটারির গতরাতের কা-টা তাকে বসানো ঘুমে দুঃস্বপ্নগ্রস্ত করে। এই দুঃস্বপ্ন কীসের। সারা দেশব্যাপী তারই দান চলিতেছে। কেউ কিচ্ছু কয় নাই। খালি কান্দোনের ভারময় কণ্ঠ, সুনসান নীরবতা। কোটার ঘরেই পালাক্রমে পাশবিক ক্রিয়ার পর সে বেহুঁশ হইলে খালি গলায় কয়, ম্যাবাই ও ম্যাবাই! বাই বাই মোর, আয়… আং…!
হবিবর তখন পাক বহিনির হাস্যসুখের বিপরীতে হাহাকারের তোলপাড় শুনিতে থাকিলে সেও তার জীবনের ক্রন্দন শোনে। পাড় ভাঙ্গা প্রতিধ্বনি ভাসিয়া আসে। রাত্রির অন্ধকার ক্রদ্ধ হইয়া কয়, ক্যান মনে নাই- ইইইই… তলোত এক দর্জাল তোর মায়ের ওপর উপগত হইছিলো আর তুই চিক্কুর দিয়া … চিলস হাটিয়া বাঁশবন বাঁশের আড়া ভেদিয়া য়ায়ায়া… পা কাঁপে কম্পমান পা এক তলা দুই… তিন চার পাঁচছয় তারপর উপরের ছাদ থেকে ঝিম ঝিম কইরে কাঁপতে কাঁপতে সড়াক কইরে নিচের দিকে অনেক নিচেচেচে চে চলে আসে থ্যাককককককক। হাহহা সে মইরে গেলনি… নাহ তার আগেই হবিবরের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে জেগে উঠে ভাবে ছয়তলার নিচে পাকার ওপর ক্যাডা ফেলে দিল! বাঁচিল। হায়রে বাঁচন মন। প্রায়ই আজকাল এই ঝিমঝিমঝিমমমমমম… স্বপ্ন তাকে তাড়ায়। ঘুমের ভেতরে আরেক ঘুম গড়ে ওঠে। ঘুমের গড়নে গড়নে পাহাড় পর্বতের উঁচু চূড়া খাড়ায়। সেখানে সে পৌঁছায় নাবে আবার পৌঁছায় নাবে উহা বুঝি বান্দরের তৈলমাখা বাঁশের ন্যায়— তারপর সড়াক করিয়া পইড়ে যেতে থাকলে কে তাকে আটকায় নাকি থ্যাতলা হয়্যা যায়। তারপর রক্ত… রক্তমাখামুখ… জান আছে না নাই… নাক সোত্তায়া ঠিক করে কয়জন। সিদ্ধান্ত নেয় কী নেয় না, বোঝে কী বোঝে না… মরলে কান্দোনের ঢেউয়ে পঙ্গর দেয় তামান মানুষ। সে পঙ্গরে দখিনা হাওয়া নাই নাই বুলবুলির থির হয়্যা থাকে, হিক পাড়ে ছোট্ট অবোলা শিশু। ঘুমের দ্বিতীয় স্তরে এই পঙ্গর সে দেখে, ঘুম নাকি কান্দনের পঙ্গর, নাহ কিছুই বোঝে না, তাহলে বুলবুলিটা ওভাবে থির হয় কেন! ওর কী কোনো জবান নাই, ও কী কথা কইতে জানে না! বুলবুলিও কী টের পাইছে যে মানুষটা আর বাইচে নাই। সে বিশাল পাথার দিয়া ধানের ভিঁয়ের নরোম আলের ওপর দিয়া বড় বড় পায়ে দৌড়াইয়া আসিতেছে। মেলা বড় খালের পাশের পাড় দিয়া আটাষ্যড়ির গাছের ভেতরে পিঁপড়ার ভাসা আউলাইয়া দিয়া জামের তলে গোরস্থানের মোর্দাদের বুকে পা দিয়া সে এই মুহূর্তে সোবানের বাপের বাড়ির পাশের পাছকা বারান্দায় লুকিয়া দম নেয়। সেখানে দম ফাটা ধুকপুকানির ভেতর ডালিম গাছের দিকে চোখ পড়তেই দেখে বুলবুলি চুপচাপ। এখানেও ওই বুলবুলি! সে কী তাহার পিছ নেছে! ক্যান তার অপরাধ কী! সে কী করতে পারে। মাকে গর্তের ভেতর ফেলে অরা কী করছে দেখে নাই, মা-ই তো তাকে কইছে বাবা তুই পালা অরা তোক মারি ফেলাইবে। পালালালা….., তখন সে কী করিবে। কুত্তারা মার গলা আর কাপড়া নিয়া টানাটানি করতে থাকলে সে কিছুই করে নাই তা ঠিক কিন্তু কুত্তগুলা পাইলে তো তাক আগে মারি ফেলাইতো। মা-ই তো তাকে জানের বদলে বাঁচাইয়া দেওয়ার জন্য হিক পাড়িয়া কয় পালা বাবাধন, কসম খাাাা… যাাাাাাাা… তখন কী করিবে মাকে ফেলাইয়া সে চইলা আসছে। কুত্তাগুলা পরে কী করেছিল কেডা জানে কিন্তু ওই জায়গায় গিয়া আর সে কাউকে পায় নাই। সে মুক্তপ্রান্তরে হিক পাড়িয়া কতো কান্দিছে… কেউ আছিল না… আর এখন এই বুলবুলি তার পাছ নাগিছে। স্বপ্নের ভেতর আসিয়া মাতব্বরি করতিছে। বার বার বুলবুলি আর দুঃস্বপ্ন তাকে যেন খাইয়া ফেলাইতেছে। পাছকাবান্দায় সে বসিয়া হাফায় আর পাকা ডালিমের দিকে বুলবুলির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় আর হাসে, কোত্থেকে যেন তার মনে ভেসে ওঠে তারে বাঁধা আকুল বৃষ্টিপাত : বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল, বাগিচায় বুলবুলি তুই … তারপর আরও সে হাসে… বুলবুলির পাখা ঠোঁট নিয়া কী সব ভাবে। সড়াক করে দরোজায় বিপুল আওয়াজ হলে বিবি তুমুল কর্কশ গলায় ডুমা গোশতের কথা বাদ দিয়া টিনের বান্ডিলের কথা পাড়ে। তখন দোতরফা ঘুমের ভেতরের গহীন রাস্তা বন্ধ হইয়া যায়। খুব চাপ বাড়ে। মাথার ভারে মেরুদ- নুয়ে পড়ে। বাঁকা হয়ে পড়ে। কোটাবাড়িতে মেলেটারির আশা-আশ্বাস হাতাশ করে। হাড় জ্বলুনি অসুখে পেয়ে বসছে যেন। দিনরাত্রির প্রদাহ আর কতো! চিত্র ও চিহ্নিত অভিযোগসমূহ দোটানায় আনে। ভেতরে জ্বর ছাইয়া গেলে বিবির বৃহৎ মুখ আড়ালে চলে যায়। সেও কী এই ঘরবাড়ি-সংসার আর মইরা যাওয়া সন্তানের স্মৃতিকে বড়ো করিবে। কবে তা ঘটবে? কে তাকে আস্থা ও নিশ্চয়তা নেবে। যুদ্ধ কী শ্যাষ হইবে! মুক্তি নাকি গেরিলা নাকি কীসব আক্রমণের কথা পাকবাহিনি কয়। যুদ্ধ শ্যাষ হলে এই কোটা বাড়িটাই কী তাহার দখলে আসিবে। হারজিতের মাহাত্ম্যও অপরিষ্কার। সে বিবির দিকে তাকাইয়া কয়, ‘হবি হবি…’।

তিন.
পলার একাকীত্ব জীবনের তারগুলা কী পূর্ববর্তী বংশের ধারার মধ্যে ছায়ায় আটকানো? তার এখনকার চিড়িয়াখানায় কী এক ফেনেগানস হয়ে সে বাস করছে। যুগের প্রবাহ এখন তাকে নানাদিকে টানিয়া নিয়া চলে। প্রতিদিন তার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলা একপ্রকার আপোষহীনতার দিকেই টেনে নিয়ে চলে। না, সে কোনো কম্প্রোমাইজ করতে জানে না। এ তল্লাটে পিতৃহারার হবার পরও কয়েকটি বছর চলে গেছে। যে বাবা সবকিছু তাহাকে দিয়া গড়িয়া গেছেন তার প্রতি তার কোনো অভিযোগ নাই। বরং বাবাই তাহার মুখশ্রী। কতো কীভাবে তিনিই জানাইয়া দিয়াছে এই পৃথিবী তোমার মা, তুমি সেখানে সেভাবেই স্বাধীনতা নিয়া চলিবে, সততায়-সাহসে আপস করিবে না। কই আর আপস! রজত নাই, ননীর খবর কোথায় কিছুই তো সজীব নয় আজকাল। এখন তাহার সময় বহিয়া যায় দেশি-বিদেশি ছবি দেখিয়া আর আঁকিয়া। বই পড়াটাও এখন নেশায় পরিণত। প্রতিটি জগতই যেন ফেনেগানস প্রত্যাশা। এইসব নেশা নিয়া সমাজে চলাটা কঠিন মনে হয় না। কারণ, পলা সিদ্ধান্তে অটল। যে একাকীত্বটা আছে, সেটা বাবার দাদার তিনভিটের স্মৃতি ও শ্রুতির সরীসৃপ মোহে কাটানো। আর তার অনুপস্থিত জীবন নিয়া সে কী করিবে? নিজেই যেখানে শূন্য সেখানে কে পৃথিবীর জন্য কী করিয়াছিল— সে অবশেষ চিহ্ন দিয়া কী প্রয়োজন! বাবাও তো তাই ভাবতেন। যে অভিমানে তিনি ফিরিয়া আসিয়াছিলেন মধুমতী থেকে এক মায়ের কোলে। যেখানে হঠাৎই পলা আসিয়া পড়ে। আসলে এতো পলা নয়, চৌধুরী বাবারই মাইমেসিস মুখ। সেখানে তাই বার বার ফিরিয়া আসে বাবার জীবন মুহূর্তের অবিনাশী সংবাদ— যাহা তার মেয়ে পাইয়াছে, তমঃসম্পূর্ণতার সূত্রে। কিন্তু প্রেম আর বিপ্লবের রোরুদ্যমান কলরব তো তার জীবনে কম নয়। বাবার জীবনে প্রেম আছিল, দোয়েলের স্বপ্ন ছিল, ছিল এক পরকীয়া জীবন। নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় তাহা মাখা। সত্যের ছানানো রূপকথা, ক্লান্তি আর হতাশার নিছক এই ছিল শাসনমাত্র। তাই সেই বাবাই তাহার কণ্ঠস্বর। কিন্তু মধুমতী আর তার বাবা তো কুলীন, কুলীনের বংশগতি তুমুল সংস্কারে নিকানো। তাই ধরিয়া আসে রজনী হলো উতলার কিম্ভূত আবেশে। চৌধুরীর তখন মধুমতি আম্রবর্ণের মহিমায় তোস্তরীরূপে মনে আসে। সেখানে আবার বোতোফেন বিমুগ্ধতার প্রলাপন তোলে। ক্যানভাস রঙ অতলে বিভাসিত হয়। এমন শূন্যতা কি তাহার জন্য! বড়বিবি তো নিছক এক মেয়েলি মানবী। ওর জীবনভর সংসারের টানটা আর মানুষকে ভালোবাসার মোহটা বেঢপ নয়। কিন্তু কোথায় এক অচল অথর্ব জীবনের বাসিন্দা হন তিনি। যেখানে তার অভিমানটা রাগান্বিত সাপের বেরুয়া পাকানো রাগের মতো স্থির-ফনানো। একটুকু হাওয়া লাগলেই দ্রুতলয়ে সে ফোঁস শব্দে বিরূপতা প্রকাশ করে। রান্না আর আরাম আয়েশের সুখশায়রে তাহার জুড়ি এ তল্লাটে নাই। বড়বিবি যেভাবে হেরেমে ছিলেন, সেটা অস্বাভাবিক বলা যায় না। কিন্তু ভেতরের বিবিবাসনা নাই। তেমন শক্তি-সামর্থ্য তাহার নিকট অচিন। যা অচিন তাহার বাস কূল ছাপাইয়া একদিন সমুদ্রকে অস্বীকার করে। পেছনে ফেরে। অন্যদিকে বাঁক বদলায়। পূর্ণিমা ভরা সৌন্দর্য তাহাতে নাই, নাই কঠিন জীবনের চীবর উপাসনা— যাতে কোমলরূপে বাধা পড়ে সর্বরকম সংশ্রবে। একবার ভোরে সে বিবির পাশে শুইয়া আছে। অনেকরকমে সে সোহাগের ভাণ্ডার রচনা করে। কিন্তু ঠাণ্ডা-শীতল সম্বন্ধ সবকিছু বাতিল করিয়া দেয়। তখন চৌধুরী এক বড় শিমুলতলায় জটলা অন্ধকারে দাঁড়ান। এই অন্ধকারের মিতালীটা তাহাকে জাগাইয়া তোলে। শিমুলতলাই তাহাকে ভোরের যোগ-বিয়োগ শেখায়। এই ছায়ার আলোর সঙ্গে মনে পড়ে মধুমতি তীরের উপর ছাওয়া বিরাট বনবাড়ির বিসংবাদ। সেখানে ঠিক খাড়া ছায়াটা তার শরীরে ছুইলে তখন সরল অঙ্ক নিয়া আসিতেন ‘অঙ্কের জাহাজ’ ওয়াহেদ মাস্টার মশাই। গুরুগম্ভীরভাবে অনেকটা তুলনা দিয়া বলেন, জীবনের হিসাব সোজা, তোরা সোজা পথে চলিস, নিয়মের ভেতরে— তখন সরল অঙ্ক মিলিবে। সামন্ত সমাজের শেষ রেশ বহাল। ডাক আসে ওই বড়বাড়ি থাইকা। তোমার পড়াশোনার খবর কী? কী পড়? বড়বাড়ির মুরুব্বী ওসব অঙ্ক তেমন বোঝেন না, বলেন : ট্র্যাজেডি কয়টা আছে ক দেহি… শেক্সপীয়ারের। খুব পড়তেন তিনি শেক্সপীয়ার। মকবুল চৌধুরী বলিতে পারলে, এই বিবির লগে পবিত্র বিয়ার লগন ঠিক হইতো। বড়বিবি সুন্দরী চোখে ধরে। কিন্তু সেই যৌবনে সবটুকুই নিরূপদ্রব হইয়া রহেন। পাছ বাড়ির পাছকাবান্দায় বিবিকে কন, তোমার কী হইছে। শরম কর ক্যা! বিবি কয়, আমার ডর করে। আরও পরে ব্যাপক ভয়ে কয়, আমার কাছে আইয়েন না— আমি মইরে যামু। ক্যান তোমার কী যাদুটোনা ঠেকছে? না, আফনে যান। এভাবে মাস-বছর পড়িলে দীঘির পুকুর আর ঠাণ্ডা নিমতলার গন্ধ-প্রশস্তি তাহাকে বেপরোয়া করিয়া তোলে। অভিমানটা জমাট চলে। ভোরের ডাক অচিন মনে হয়, একটিমাত্র মোরগের বাঁকও কঠিন হইয়া পড়ে। ছাব্বিশ বছর বয়সী চৌধুরী নিজেকে বেশরম কইরে তোলেন। হঠাৎ কইরে জোরমতোন করেন তাকে, তারপর জ্ঞানহীন বিবি কীসব বইলে চলে— তুমি তো মরিয়ম। ওই যে মরিয়ম আসিছে। হ্যা, রাতে আসিবে। তোমার সঙ্গে আমি দেখা করবো আমলির পাথারে। নাহ, কখনোই বিয়া করবো না। এক ধরনের শুদ্ধ বাংলায় অকাতরে কী সব বলতে থাকে। তখন দূর থেকে ফকির ধরা হয়। বিশাল বাড়ির বিরান আঙিনায় মাছরাঙা উইড়া আসে। কোণার গোলাপ গাছটা ন্যূব্জ হইয়া বাতাসে কাঁপে। ঘন দোলায় ছোট্ট ফুসকো পোকা ঘোরাঘুরি করে, রেণু ছড়ায়। ডাকাডাকিতে ‘তুমি’-ডাক ধরে আসে। জন্মদানের আবহে তার ডগা ফুলিয়া ওঠে। ডগার ওপরে অনেক অভিসার-আশিস ভরা। এরকম আয়েজন বুঝি বেশ কয়েক বসন্ত ধরে চলিছে গোলাপের শরীরে। কাঁটা পড়িয়া গেছে, পাতায় দাগ আসিয়াছে, ছিনাইয়া নিয়াছে জীবনের অনেক আনন্দ। সে আনন্দে ঘন ঘন বাসর কথা উপচিয়া পড়ে তুচ্ছ বাবুই ডানার ন্যায়। ফুড়–ৎ করে বাবুই— যার পাখা দোলে তালগাছের ডগায়, শীর্ণ পাতার কোণে ছন্দ তোলে আর দো-দুল উচ্চ করে স্বরে বলিয়া ওঠে এই নীড়ে বসত গড়ি আর একত্রে গাহিয়া কই স্বরের প্রলাপন। সবকিছুতে জীবের জন্মকৌশলের নাচানাচি। সেসব যেন এখানে কষ্টে আর দুর্বলতার কম্পনে হারানো জৌলুস। লাল মাটির প্রাচীরের ওপর তখন নাড়ার ছাউনিতে অসময়ে মোরগ ডাকে। এমন মোরগ ডাকার অর্থ করেন অনেকেই। চৌধুরীর বিবি ফাঁসাইয়া গেছে, ওই চৌধুরীর কারণেই। কী করছে সে! কেন বিবি অজ্ঞান হইলেন। কেন ইহজীবনের আর বিবি এ বাড়ির সজাগ ঘরণীরূপে থাকিবেন না। কলকাতায় লইয়া চল। সেখানে বৈদ্যি দেখান হইবে। এসব নানা বিতিকিচ্ছিরির পর সবকিছু উলোট-পালট হইছে। খবর আসে চৌধুরী কী যেন করিয়া বিবিকে বিপদগ্রস্ত করিয়াছেন। চৌধুরী বড়বাড়ির কাছাকাছি আর যায় না। তখন থেকে বড় শিমুলগাছটাই তার রোমন্থনের জায়গায় পরিণত হয়। তাহাতে ফুলে ফুলে যে পতঙ্গ ওড়ে তার প্রশ্বাস নেয়। তাই এই শিমুলই তাহার সর্বত্র এক স্বর রচনা করে। এই শিমুলের ভেতরেই বৃক্ষবীজ ও জীবনের নতুন রূপ খুঁজিয়া লন। তাই তিনি বড়বিবির সব জ্বীনধরা কর্মকা- নিয়া চিন্তিত হইয়া থাকেন। কীভাবে পরে এক পাতলা ঠুনঠুনা মানুষে পরিণত হন। খাবার-দাবার বন্ধ হইয়া যায়। চলাফেরা স্বাভাবিক থাকে না। ক্যাডা যে ফকির করছে— না হইলে এমন হইবো ক্যা। এসব থেকে রোধ পেতে গোটা বাড়ি বন্ধ করার ব্যবস্থা হইল। মানুষজনকে কদু আর গোশত দিয়া ভরপেট খাওয়ানো হইল। জ্বীন তাড়ানো হুজুর ঘর বন্ধ করিয়া দিলেন। সারাদিন এসব নিয়া বেশ এন্তেজাম। বেশ খানাপিনা ছিল। কিন্তু কর্ম কিছুটি হইলো না। শুকনো বিবি এখনও বেসামাল হইয়া ক্রুদ্ধ হন, গালি দেন। বাড়ির স্বাভাবিক পরিবেশ দূষিত হয়। মুরুব্বীরা বিব্রত হন। সকলেই বলিলেন নিশ্চয়ই কেউ বান মারিয়াছে। সেডা কে হইতে পারে। অলিতে গলিতে কিংবা ভেতরের নানা মহল্লায় ও পাশবাড়িতে এ নিয়া কানাঘুষা চলিল। মানুষের কুষন্নি পড়িয়াছে। মানুষ এর ভালোমন্দ নিয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এভাবে বেশ সময় গত হইলে তারে কলকাতায় লইয়া যাওন হয়। কিন্তু পরে তাহার পাগলামি আরও ভীষণ রূপ পাইলে সকলের ধৈর্য্য ত্যাগ করিয়া তিনি আলাদা হইয়া বসতি লন। কিন্তু মানুষের তীব্র কানকথা আর অপৌরুষেও ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়া চৌধুরী আর বাড়ি ফেরেন না। এইটি ছাড়াও তাহার আরও ক্ষোভ আছিল। সকলে ভার নিজের স্কন্ধে নিয়া তিনি চইলা যান। তবে এরপর আর কখনো ভীষণ কালো মেঘ তাহাকে ছায় নাই। কারণ, এ গ্রামে তাহার বসতি কঠিন হইয়া পড়ে। সকলেই নানারকম প্রশ্নে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। পরের জিনিস নিয়া এলাকার সকল মানুষ যখন ব্যাপকভাবে কলকাকলিতে মুখর তখনই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ছাড়িয়া আসার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু একজন মানুষের সময় আর জীবনের কাঁচামিঠা স্বপ্নগুলা তো এরকম আছিল না। একটি নারীই মনে হয় তাহার সময়কে বিরূপ করিয়া তোলে। সব ছাড়িয়া গেলেÑ সিদ্ধান্ত নিয়া ফেলেন আর বিবাহের গতিমুখ খুঁজিবেন না। কিন্তু কিছুই তো ভাগ্যে নাই। নাই নিয়তিতে বাড়া। তবে এক ঝাঁক জীবনের স্বপ্ন তার কণ্ঠে। বাইরের অনির্দেশ্য জীবন তাই নিয়া তিনি করতোয়া অভিমুখে চলিয়াছিলেন। কিন্তু বাড়ির পাদপ্রদীপে দেখিয়াছিলেন প্রত্যক্ষ অনেককিছু। অপরিচিত জীবনের রূপ নিয়া চৌধুরী সংসারের এমন বিরূপ ক্রন্দন ছাপিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও দেখেছেন। মানুষের ভেতরের বেদনার নীল রূপ তাহাকে হাহাকারে অন্ধকারে ফেলিয়া দেয়। এই দেশে সম্প্রদায় আর ভেদের দ্বন্দ্ব আগে আছিল না, আধুনিক সময়ে তাহা সর্পের লেলিহান স্বাদের ন্যায় গড়িয়া ওঠে। সেখানে মানুষ তো ছোটতে পরিণত হয়। সে অভিসম্পাতি হইয়া ওঠে। অনেকরকমে কষ্ট ও ক্লান্তিতে তাহার রূপ নিস্পন্দ হইয়া আসে। অনেক রাজনৈতিক কর্মকা- সম্পর্কেও জানিয়াছেন। তাহাদের বাড়ির ভেতরে বাইরে কোনো আওয়াজ নাই। বড়বাড়ির চেয়েও এ বাড়ি অনেকসময় বেশি সমীহ অর্জন করে। তবে চোরডাকাতের সমারোহও ছিল। হিন্দুমুসলমানের সংঘাতে চুরি যায় মন, চুরি যায় জীবনের অর্জিত সামগ্রীও। একবার অনেক মানুষ দেখে চৌধুরীর ড্রয়ার ভাঙা, সেখানে অনেক গহনা আছিল। এসব সামন্তকালের বিকার নিয়া যখন তিনি খুব তীব্র শূন্যতায় আছড়াইয়া পড়েন করতোয়ায়, তখন কে যেন আসে! পায়ের মল শোনা যায়। নূপুরের নিক্বনে প্রতিবিম্বিত হয় তাহার মন। খাজুরাহ অবয়বে ভরে চলেন। প্রতীক্ষার অবসান হয়। কামের ভেতরে সবটুকু শুষে নেন তিনি। কিন্তু কোথায় যেন শূন্যতা হাওয়া দিয়া ওঠে। ফেরেন দেখে আসা চলে আসা চলমান কান্তজীউ, অদ্ভুত তার লেখনী। কম্বিনেশান। পরে সেই আড়ার ভেতরেই বুভুক্ষ অন্তর দায়িত্ব নিয়া ফেলে। পলা আসে। এসব কয়েকটি ব্যর্থ মুদ্রা দিয়া বিরাটত্বের কাহিনি সাজানো চলে না। কিন্তু কার্যত কিছ্ইু হয় না। তখন কেউ চৌধুরীকে চেনে না। পলার ভেতরেই চৌধুরীর সবটুকু নির্যাস নির্মিত হয়। সে জন্মিলে মৃত্যু আরও তুচ্ছ হয়, জীবন জটিল পথ যেন হাঁটিয়া চলে।

চার.
মকবুলার রহমান চৌধুরী মেনাইল গ্রামের বাসিন্দা হইয়া যান, কখন কী এক অপরিচিত রহস্যে! খুব ভরা রাইতে নাকি শোনা যায় তিনি করতোয়ায় আসিয়াছিলেন। বিরাট নদীর কুলুধ্বনিতে পার রাখিয়া উঁচু এক পাকা সেতুর ওপর দাঁড়াইয়া শুধু নিধুয়া দৃষ্টিতে সবুজ আদিম প্রকৃতির রঙ দেখিয়া চলেন। তখন তিনি ক্ষুধার্ত। একটু পানের নেশা আছিল। কিন্তু তারও বেশি নেশা নদীতে-পানিতে। পানির আকাক্সক্ষা তাহার প্রচুর। সেও জন্মরক্ত স্বপ্নের বোনা। নৌকা করতোয়ায় আটকালে অনেক ক্রোশ হাঁটিয়া ক্লান্ত হন। সেই রাতে ভরা পূর্ণিমা আছিল। কী এক অভিমান বুঝি তাকে এ পথে নামাইয়া আনিয়াছিল। ঝম ঝম বৃষ্টি নামে, কালো মেঘ চাপিয়া আসে পশ্চিম দিগন্তে। আদিম অরণ্য আর বিস্তর সবুজ বন বনানীর ভেতরে বেপরোয়া মনে ভাসেন ডোবেন। অন্তর রহস্য নিয়া তিনি খুব কাতর। চৌধুরীর গাম্ভীর্য নয়, বয়সের তারুণ্যের কণা তাকে ফলবান করে। অন্ধকারে পথরেখা বিলীন। বিজলীর আলোয় পাটাতন দেখা চলে। তিনি আজান শোনেন। ক্ষীণ শব্দ। কিন্তু দিগভ্রান্ত। তারপর আড়ার কোণে পৌঁছে দেখতে পান বান্দিনীর বিচার নিয়া তুমুল হট্টগোল। নামাজের পর তাহা অধিক সংঘটনের আশঙ্কা। ঘটনার জ্বর রূপকথায় আটকানো। শোনা যায় ওই বান্দিনীই অভিমানির হেরেমবন্দিনী। সে হেরেম কই? চৌধুরী কিছু সাথে আনেন নাই। তবে নিস্বঃতর আশীর্বাদ আর কী! কপর্দকশূন্যরূপেই সবকিছু সম্প্রদান হইলে ওই বসন্তবাবুর ভূতমন্ত্রের আখ্যা পাওয়া পতিত কোঠাবাড়ি নীড় রূপ ঘনাইয়া আসে। সেই কোটাঘরে অনেক রকমারি কিছু নাই— যাহা চৌধুরীর গ্রহণে ধরা পড়িবে। ওই জ্যেৎস্নালোকিত দুধঝরা রোশনাই রাত্রিতে ভরাবর্ষার ধারায় ওই বাড়িই আছিল নগদ আশীর্বাদ। তুমুল সে বৃষ্টিমাথা শারদ রাত্রি। তার বেশিদিন নয় পরের বছরের আগোনের আগেই পলা জন্মিয়াছিল। খুব নিকট ধারে কাছেই তাহাদের প্রচার-সম্প্রচারে সমীহ গড়িয়া ওঠে। কারণ, চৌধুরীর সমতুল্য মানব তল্লাটে কেহ নাই। ক্রমশ এলাকার অধিকার আর ন্যায়সত্যে কিছু কাজকর্ম পেয়ে গেলে সবকিছুর কর্তারূপেই তার অবস্থান দৃঢ় হয়। তখন তিনি পাকিরাষ্ট্রের শোষণ নিয়া কথা কন। বইলা চলেন হক-ভাসানীর কথাবার্তা। কৃষক-প্রজাসমেত অলঙ্ঘিত ন্যায্য পাওনা তেভাগার দাবি নিয়া কীসব মূল্যবান ও জটিল কানে ধরা কথাবার্তা। কিন্তু চৌধুরী ভেতরে ভেতরে অসুখ অনুভব করেন। শোপেনহাওয়ার প্রভাবিত করে। দুঃখবাদী দর্শন আর দুঃখ তো এক জিনিস নহে। তবুও ওর প্রতাপ অনুভব করেন তিনি। একসময় কাছের কাউকে ডাকেন। ক্যারে আজ নদীর বাতাত মাছ নাই। মাছের নেশা তাহাকে ভরাইয়া তোলে। ভরাবৃষ্টিতে তো মাছ আসে, সেই পুনর্ভবা, দুধকুমার তাড়াইয়া মাছগুলা ফূর্তিতে চলাচলি করে। গায়ের আভায় ঠিকরে পড়ে তড়পানো আলো। ও আলোর রঙ কেমন জানি। গুজার বা শোল অন্য রকমের। ঠিক কালো নয়, মেটেও নয়, শ্যাওলাধরাও নয়। কেন ওদের এতো উল্লাস— ওই কালো চোখে, সেখানে মানুষ কেন এতো শূন্যে ভরা। অনেক দিকের বাতাস আসে। বৃষ্টিও দৌড়ায়। পতপত আওয়াজে মোনাইল তখন ভরপুর। সবুজ শানানো বন আর উঁচু উঁচু বৃক্ষসকল অতিশয় মায়াবী হইয়া যেন আশ্রম বানাইছে মানুষের সাথে। মানুষের বসতি তাহাতে ধরিয়া আসে। বত্থ নামার কথা আলাপ হয়। এই জলসীমানার পর বিস্তর বিরাট বিল আকড়াইয়া আছে তাহার অনেকটা জুড়িয়া। বর্ষায় নৌকা চলে না। অনেক জেলে যে আসেন তাও নয়। তবে তখনও মোনাইলে রাস্তা নাই, বিল্ডিং নাই, বাতি নাই। সন্ধ্যার ভেতরে অন্ধকার ধরিয়া আসে। চতুর্দিকে পড়িয়া থাকে শুনশান নীরবতা। হাটবাজার বা আইলে ডারকা বসানো মানুষ পরাণ বন্ধুরে কইয়া বিরাট খুলির ভেতরে ঢুকিয়া পড়ে। হাতের আগুনে খয়বার, হবিবর, আজগার, জব্বার গান আর সুরের ভাঙা রোদ-অন্ধকারে বাবুই বাসার ন্যায় দুলিতে থাকে। জ্বলজলা চোখে তাহাদের রঙ চেনা যায় না। চোখে মুখে আলো ছাওয়ায় লটকানো অন্ধকারে কন— মিয়াভাই, চলেন কাচারিত যাই। আরে আপনে তো আসরের আসল মানুষ। চলেন আজ ভাওয়াইয়া শুনামু। পাট্টি আচে। কিন্তু তেমন সাড়া পান না চৌধুরী। অসুখে আনন্দ যে নিষ্প্রভ করিয়াছে তাহা নয়, ভেতরের দাহটুকু নানাভাবে তীব্র ও তাড়াহত। তার ভেতরে রয়েছে বিচিত্র শাহী মার্কা গণ্ডগোল। রেডিওতে শোনা যায়, পাক-ভারত যুদ্ধের কথা। এদেশে নাকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়া শোরগোল উঠছে। জন্মদিন পালন নিয়া সরকার বাধা দিছে। ওদিকে চীন-ভারত উত্তেজনারও আওয়াজ ওঠে। তিব্বত নিয়া কীসব চলতাছে। তাইলে কী এই অঞ্চল আবার অশান্ত? ঠিক অনেক কিছু বুঝে উঠতে পারলেও চৌধুরী নিমজ্জিত হইয়া অনেক কিছু ভাবেন। বেচইন হয়ে পড়েন। আড়ালে এই দেশের মানুষ নিয়াও বেশ সক্রিয় হন। কিছুই তো জানা যায় না। এই জনপদ শান্ত আর নির্বিকার, কিছু মানুষের ভেতর। দ্বিচক্রযান ঘাড়ে করিয়া কাদামাটি অতিক্রান্ত পথে যোগাযোগহীন জীবন। ওসবে মানুষের কান নাই। সভ্যতার আলোশূন্য এ গ্রামে তার চলিবে না। কেউ সময়কে ঠিক কান পাতিয়া দেখে না। চলতে ফিরতে হাওয়ায় শুধু বাবুই দোলানো জীবন। তাহাতে সুখ আর সুখের প্রহরা। শান্ত করতোয় বাঁধানো পুরানকথা। উহাতে চলৎশক্তি তিরোহিত। দুই পাড়ে করতোয়ার কর্তা সকল আড়ষ্ট ধরিয়া কহেন, উহাতে ভাসোন আর ডুবোনকলা তুমি পাইয়াছ মৎসজীবন, সে ফলন করে যুবতীরে, তাহাতে বহাইয়া লাঙ্গল তুমি জমিতে আনো ফলন। জলাঞ্জলি দেও এই নদীর ভাসমান জলায় খড়কুটো বা পরানভাঙা বেদনা-বিরহকাল। তাই কহিয়া চলে কলাপাতা, আ¤্রকানন আর পাইকুড়তলার স্নিগ্ধছায়া। ওখানে পিঁপড়েজীবন পালন করে শেকড়বাকড়ের সার, নারকেলের কন্দরে আটকান বাড়ন্ত ডাব আর কচি নারকেলের শরীর, পথের পাশে বৃষালির মুখ, আটাস্যড়ি-ধুন্দল-শেয়ালমুত্রা-লজ্জালতা আর খেজুরকাঁটা। তাহাতে বিস্তর ভূমি মোড়াইলে আজগার-জব্বাবৃন্দ জমিতে মাতৃবন্দনা করে আর ওড়ায় সবুজ ধানশীসের বাতি, বিলিকাটা বহানো তারে ছুঁইয়া চলে ভরা পালকাটা প্রশান্ত ছায়ার রূপ। সে ছায়ায় মনের মানুষ ভাসানো নরোম রোদে, খড়ের পৌষসন্ধ্যায় নাড়ার আগুনে শরীরে ওঠে ওমমাখা জ্বর। তারপর চৌধুরী ওসব জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়া ভাবেন আর বড় হওয়া পলার জন্য মনে মনে ইন্দিরাকে ঠিক করেণ। একমাত্র কন্য সে তার আদর্শ পাইবে। কিন্তু এ গ্রামে তাহার বসত ও স্বপ্নের নিরাপত্তা কে দিবে। কে তাহার অনুপস্থিতিতে সুখের ভেলায় পাঠাইবে কোনো বড় পাঠনিকেতনে। এই বাড়ন্তর জন্যই এখন জীবটুকু ভরা। যে মা তাহাকে প্রশ্রয় দেবার কথা, ভরিয়া তুলিবার কথা সে তো শুরুতেই তার শেষবিন্দুতে পৌঁছাইয়াছে। হায়রে মৃত্যু! মানব মৃত্যু আসলে কী! সে কেন সবকিছু আউলাইয়া দেয়। কিংবা তাহার কারণইবা কী। যে করতোয়া কয় এই মোনাইল তুমি মানুষের ভেতরে বন্ধন রচনা কর, যে শস্যভূমি কয় তোমাকে শস্য দিয়া আমি বাঁচিয়া রাখি, যে প্রেম কয় তক্ষণি তোমার গর্ভে জীবন আসিবে এবং তুমি তাহার ভেতরে পাইবে অনন্ত প্রজন্মের দিকহারা শূন্যতার প্রশ্রয়— সেখানে কীভাবে এই পলার জন্ম হইল আর পরেই তাহার মা মরিয়া গেলেন। এই জীবন আরও গভীর শূন্যতায় জড় হয়। বেশ বেশুমার বেপথু পথে চলে। অসহায় হইয়া ওঠে। সবকিছু এই নিশ্চল স্থাবর প্রকৃতির ন্যায় আটকাইয়া যায়। এসব দুর্ভর বেদনা যখন চৌধুরীকে ভরাইয়া তোলে ঠিক তখনই আজগার আর জব্বায় কয় ‘মিয়াভাই আজ হামার বাড়িত পিঠা খাওনের দাওয়াত’। কীরকম এক প্রশ্রয়ে সে দাওয়াত তিনি গ্রহণ করেন ঠিক জানা যায় না। তবে তার মধ্যেই শোনা যায় ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়া যে কাজকর্ম চলিতেছে তাহার ওপর জারি হইয়াছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিলে অনেক কঠোর ব্যবস্থা। তখন এই প্রতিরোধ আরও শানিত বলিয়া জানা যায়। সেখানে ঐক্য ক্রমশ একজালে বন্ধনী পাইতেছে। এই বন্ধনীই কী আমাদের এই করতোয়ান্যায় নিশ্চিন্ত মানুষের ভেতরে আরও নতুন কোনো সত্যে আদিষ্ট হইবে। ঠিক করিয়া কওন মুশকিল। পলা আসিয়া গৃহকোণে দাঁড়ায়, বোবা শিশুর বৃদ্ধি এবং তার ভেতরের ঐক্য-আনন্দ কী এই দেশের প্রতিটি মানুষের ভেতরের সুখ! আশ্চর্য সবকিছু মিলিয়া চলে। মধুমতি তীরের কথা মানে আসিলেও সে বাড়ির ভেতরে আরও আগে শোনা গিয়াছিল অনেনককাল আগের মানুষের কণ্ঠ। ক্ষুদিরাম বা সূর্যসেনরা এদেশের জন্য জীবনী দিয়া গেছেন। আর গল্পচ্ছলে চৌধুরীর বৃদ্ধ পিতা তখন কন, কইছিনে! নজরুল মুসলমান। সরকার তাহারে সংস্কার করিবে, এইতো পাকিস্তান হইছিনে? সেসব ঠিক বোঝেন না চৌধুরী। এর মাঝে তো কেটে গেছে প্রায় দেড়যুগ। তাহার জীবনের স্রোত পাল্টাইয়াছে। হাঁক পাড়ে, কই মিয়াভাই, পিঠা তো তৈরি। সম্বিৎ ঠিক নয়, এই অঞ্চলের ম্যাপ আনিতে হইবে। এতে পূর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম দুনিয়ার খোঁজ থাকা চাই। মস্কোটা কী কয়! সেডা তো ভারতের পথেই থাকার কথা। কিন্তু তার স্বরূপ তো বোঝা দায়। স্ট্যালিন নিয়া কইছিলেন তার বাপ। লেনিনের পরে সাম্য নিয়া সমাজতন্ত্র নিয়া তো কতো কীই হইলো, বিশ্বযুদ্ধও বাধাইয়া ফেলাইল, এর ভেতরে ভারতভাগ করিয়া দিয়া সব পলাই পলাই করছিলো। মিয়া মাউন্ট ব্যাটেন নৌবাহিনীর জাঁদরেল মানুষ হইয়া কন, ওহে নেহেরু-জিন্নাহ মিয়া তোমগো দ্যাশ তোমরা নাও। হ্যা, এই মারপ্যাঁচে পইড়া এ বাংলার মুসলমানরা অচ্ছুৎ হইছে। তাদের শাসন করে। এর প্রতিকার কী? স্ট্যালিনের পরে আবার উত্তেজনা, ক্রুশ্চেভ কোল্ডওয়ার পয়দা করিলেন। চৌধুরী সেইসব বিচিত্র অনুভবের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ নিয়া সরকারের তেলেসমাতি আর ওদিকে জার্মানিরে ভাগ কইরা ওয়াল তুইলা দিল। এক্কেবারে কোল্ড ওয়ারের পরেকটা ঠুইকা দিছে। কই আসেন মিয়া! কিন্তু এসব ভেতরে পৃথিবীর সব পূর্ব-পশ্চিম দ্বন্দ্ব বা ন্যাটো-ওয়ারশ ভাগাভাগির অস্থিরতায় তার শূন্যতা বাড়ে। কী এক সামন্ত জীবনের ভেতরে টুকটাক যা জানাশোনা আছিল, তাই নিয়া মহা বিপাক রচিত হইলো। তবে রাশিয়াপন্থী বা অন্য যে পন্থীই হোন স্ট্যালিন পরবর্তী ক্রুশ্চেভ শাসন, তার ডি-স্ট্যালিন নীতি, কোল্ড ওয়ারের পরিণতি আর এদিকে বৃটিশদের উপনিবেশ ছাড়ার মরিয়া সব হিজিবিজি সিদ্ধান্ত তাকে মানুষের লাভক্ষতির বিভায় দোদুল্যমান করিয়া তোলে। রাষ্ট্রনায়কদের মূল্যয়নের শক্তি তাহার নাই, এখন তার প্রভাব তো ছড়াইয়া পড়িতেছে, টেনশান আছে মিলিটারীতে, অর্থনীতিতেও— পক্ষ-প্রতিপক্ষ তো কুরাইয়া খাইবে সকলকে। তখন কী এই মোনাইলেও ট্যাংক আসিবে? সরল স্মৃতিমাখা জীবনে, তার সেই বড় দরদলানের মধুমতীও কী আক্রান্ত হইবে, সে না হয় তাহার নিজের কথা কিন্তু আপামন মানুষজন তো সমরাস্ত্রের খেলা বোঝে না, বোঝে না কে বড় কেডা ছোট, তাহাদের ভেতরে এখনও শুধু পীঠা-পুলির টান, বাউল হইবার বাসনা— আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বাতিল হয়, ওদিকে চিরকালের জার্মান প্রাচীর যদি মানুষ-সংস্কৃতি ভাগ করে তবে কী হইবে এই জীবনের। ভাবিতে ভাবিতে তার সন্তান পলার ছবি তৈরি হয়। পলা হাসে, ওলে…, হিহিহি, তুই কী স্ট্যালিন হইবি, ঝগড়া-ঝাটি দল নিয়া পলিট ব্যুরোর নেতা লেনিন আসেন, ট্রটস্কি আসেন, পার্টি সমাজতন্ত্র যে কোনো মূল্যে থাকিবে, ঘন গোঁফে ট্রটস্কি দাঁড়ান, আলো মাখা তার চোখ, কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিÑ ধারালো বৃদ্ধিতে সবকিছু পুড়িয়া যাইতেছে, শ্রেণিহীন সমাজ, বুর্জোয়া ভ-দের লাথি দিয়া, মারিয়া পিটিয়া বিদায় কর। সোশ্যালিস্ট সমাজের নামে কোনো ব্যুরোক্র্যাসি চলিবে না, স্ট্যালিন জনতার শত্রু, তার বিরুদ্ধে এফআই সকলকে এক করিতেছে, উঠুন জাগিয়া উঠুন… ট্যা ট্যা ট্যা… স্ট্যালিনের স্বার্থে আঘাত পড়িলে সে দুনিয়া হইতে বহিষ্কার, ওই মেক্সিকোতেই মার্সেডার মার্ডার। হত্যার নায়ক বিপ্লবীদের হিরো হন, অর্ডার অব লেনিন পান এইভাবে দুনিয়ায় ভিন্নমতের অবসান হইয়াছে পাওয়ার রাজনীতির হাতে। ক্ষমতার অধিকারীগণ কালের কালচক্রে পছন্দ করেন নাই স্বজন-বিজন কাউকেই। কোনো স্থানেই নাই তাহার প্রহরা। সর্বকালে বুঝি এই নিয়মই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। মারিয়া মার্সেডার বিজয়ী হইলে, সম্মান পাইলে, জেলখাটার পর মুক্তি পাইলে ক্ষমতা তাহাকে সংবর্ধিত করে। সেখানে নীতির কী গুণ! চৌধুরী বোঝেন, ট্রটস্কির কণ্ঠ অবরুদ্ধতার নীতি গোড়া থেকেই গঠিত হয়, হত্যার নায়করা স্বীকৃতি পান কিন্তু ইহাও সত্য যে এ পৃথিবী কোনোকালেই কাহারো দাসত্ব মানিয়া লয় নাই। নীতির চাকায় সত্য তো বেপথ নেয়নি। সে ধীর কমলপ্রবণ সন্ধ্যায় চলিয়াছে। সেই চোখ ছাড়ে না কাউকেই, লিয়াকত আলীর হত্যার পরে একের পর এক শাসন পট পরিবর্তিত হইয়া চলে। পাকিস্তানের হেফাজত কেউ দেখিতে পান না। সবকিছু বুঝি তাহারই ধারাবাহিকতা। ট্রটস্কিপন্থীরা ক্ষমতার বাইরে সটকে যান, প্রতিশোধপ্রবণ স্ট্যালিনও কোন এক ঘুমে চিরনিদ্রা পাইয়া লন। মাসেডার তো মার্ডারের পরে বীর ঘোষিত হইয়াও বাঁচিয়া থাকেন না। স্ট্যালিন মূর্তি জর্জিয়ার লেগাসি তৈরি করে কিন্তু সত্যিই ইতিহাসের কাঠগড়াতে তিনি রেহাই পান নাই। ইতিহাসের সোনার পাথর বাটি তো আটকানো থাকে অনেক মানুষেরই হাতে, এক কাল হইতে অন্য কালের রথে। চৌধুরীও তাই রেহাই পান না। সেই কড়িবর্গার কণ্ঠরোধ করা বিবিজানের নিকট হইতে। সবই সবটুকু মানুষের চলমান অভিপ্রায়ের ভেতরে, ভক্তের দ্বারে বাধা। পীঠার ডাকে উঠিয়া পড়িলে সকলেই ত্রস্ত হইয়া কন, মিয়াসাব কী কোনো সমেস্যা! আবার হাঁটেন, একসময় বিরাট কাঁঠাল গাছের নীচ দিয়া, লম্বা সুপারির সারি পার হইয়া, শিমুলতলায় আসেন। সেখানে একটু থামেন, মনে হয় ওটা একটা বোধীবৃক্ষ, গত রাত্রিতে তার পরিবেশনা বেশ আনন্দ দিয়াছে। কতো আন্দময় সব সময় কিন্তু কেউ বেশিদিনের জন্য সবটুকু নিতে পারে না। যে নির্মম মৃত্যুর ভেতর দিয়া স্ট্যালিন ঘুমের বাসিন্দা হইলেন পরে তাহারই অনুসারী ক্রুশ্চেভ এখন তা বাতিল করিয়াছে। দোর্দ- শাসকের আদেশে লৌহমেহফুজ কাঁপিলেও সত্যশাসন তো মরে না। ট্রটস্কি মরেন নাই। তার পন্থা নিয়া দেশে দেশে নতুন সময় আসিবে। রোদে তিনি বিশাল বপুর স্ট্যালিনকে দেখেন, মার্সাল! হে মার্সাল!!, তুমিও কলঙ্কিত, জিন্নাও কলঙ্কিত, আইয়ুব আসিয়াছে… স্তাবক অনুসারীরা বাদ্য বাজাচ্ছে, কিন্তু ইহার পরিণতি নতশিরে সক্কলেই জানিবে। একদিন সত্যই বলিয়া দিবে, তুমি জিঘাংসার বাদক। তুমি মত-পথ-সত্য মানো নাই, ক্ষমতার কৃষ্ণ উপভোগে তুমি বিনাশী। আর এই তো জীবন, ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন-দেশবন্ধু-সুভাস সকলেই ডেস্পারেট, অসুবিধায় নিপতিত কালপরিক্রমা— এখন ওই আকাশের নীলিমায়, গোধূলির রঙিমায় তাহারা জ্বলিয়া কন, দেশপ্রেম রাখুন, সত্যটি নিয়া আসুন, শিক্ষা নিয়া এখন ছাত্রদের যুঝছে মত্তপ্রবণ মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষানীতিটি নিয়া কথা নাই, মনে মনে ছাত্রদের সমর্থন দেন তিনি। বোধীবৃক্ষটি পরে জব্বার তাহার এলাকার সকল ফসল জমায়। ছাত্রদেরও বোঝায়, কী যেন কন মার্শাল মিয়া, তোদের ঘাড়ে সোভিয়েত ভূত চাপছে। শালার ছাত্রগণের বয়স বেজায় কম, খালি সোজা সোজা চায়। এর ভেতরে গুণ্ডা নামোনোর কাম আছে। মোনেম খা’রে ডাক। এইসব এখন তাহার ঘাড়ে ওঠে, এর মধ্যেই খবর পান বিশাল গ্রেট ম্যান মরিয়া গেছেন। চার্চিল নাই। আর্টিস্টের মৃত্যু নিয়া ভ্রুক্ষেপ কে করে কিন্তু দাগ রাইখা যান। সবুজ পাতায় আর পিলপিলানি মধুর বাতাসে চার্চিল চলিয়া গেলেন। খুব ক্রান্তি লগ্ন, পুব-অঞ্চলে ছাত্ররা ক্ষেপিয়াছে। একর পর এক ক্ষমতার গৃহে চলে তড়পানি। তখন জব্বারের বৌ হাক পারে পানি আন মিয়ারে ওজু করা। চিয়ারে বসা হইলে শোনা যায় ঘুঘুর ডাক, এই ঘুঘু নাকি সোনাঘুঘু, সে অনেক রকম ভাবে ডাকে, আহাজারি করে, আদেশ দেয়, পুব দিকের কোণায় সে প্রত্যহ তাহার নিয়ম করা ডাক সকলকে পাহারা দেয়, ওপারে নারার ভেতর আজই ধরা শোল আর পুঁটির চচ্চড়ি মজার বাসনা ছাড়ে। অনেক কালের পোষা মোরগে রান্নার ধোঁয়া কানে আসার আগেই পলার কান্না তাহাকে গ্রাস করে।
চৌধুরী পলার দিকে মুখ ফেরান। এ তল্লাটে তাহার বিস্তর আলাপন ঘটে, এক সময় তার ভেতর দিয়া গড়িয়া তুলিতে চান ওই পড়াশোনার জন্য কিছু ঘর-দলান। করতোয়ার ধারা বাহিয়া যেদিন আসেন তখন তো কিছু জিনিসপত্রও আছিল। দাম তার কম নয়। সেগুলা দিয়া কিছু ক্রয় হয়। কিছু কাজে খাটে আবার কিছুর সঞ্চয়ে কাজে লাগে। বিষয়গুলা শুধুই নিরাপত্তার জইন্যে। কিন্তু ক্রমশ কিছু করোনের ভেতরে সব শূন্যতার উড়াল দিতে চাহেন। ফারসি আর আরবি দিয়া কী হয়, ইংরেজি না শিখিলে। যেসব কাম ওই মাদ্রাসায় হয় তিনি তাহাতে বেকুব ছাড়া কিছু দেখেন না। তাই ভাবিয়া লন মৌলবীর লগে বসিয়া কিছু করিবেন তিনি। কিছু লাঘবের জইন্যে বুঝি মনের এই প্রস্তাব। সংসারে যুদ্ধ যেমন আছে দেশে দেশে যুদ্ধেরও রব উঠিল। পাক ভারত যুদ্ধ লাগিল, পাশাপাশি পাকিদের ব্যস্ততায় শেখ মিয়া প্রস্তুত করিয়া লন ছয়দফার বিষয় আশয়। কী সব দফা দফায় কাম নাই, মৌলভী বেপরোয়া হইয়া কর, পাকিস্তান ভাঙলে জান দিমু গিয়া। চৌধুরী শিহরিয়া ওঠেন। উন্মূল বলে আঁচড়ও নাকি সে ইতিমধ্যেই কাটিয়াছে। আর নানা রটনা তৈরি হইছে, চৌধুরীকে নিয়া। কিন্তু মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেবের সঙ্গে তার শলা আছে। করতোয়ায় আনো এবার নতুন জলসীমা। যে মাদ্রাসায় সময় চলে ধর্মীয় কাহিনি নিয়া, দুলদুল ঘোড়া আর চৌথা আসমানের আড়ম্বরে সকলে শির নীচু করিয়া আল্লারসুলের কীর্তন করে— হুজুর কয় এখানে তো ইংরেজি চলবো না চৌধুরী। বড়ো বেদাত কাম। কোনোকালে এইডা হয় নাই। আপনে অনেক শিক্ষিত মানুষ এইডা করিলে আপনের সম্মান হারাইতে পারে। যুক্তি পরম্পরায় নতুন শিক্ষক আনা বা নোয়খালির মাস্টোররে দিয়া নতুন কিছু জ্ঞানের ব্যবস্থা করার কথা ভাবলে হুজুর কিছুটা সংযত হন। এক পর্যায়ে চৌধুরী নিজেই ইংরেজি বিষয়টা পড়াইতে আগ্রহী হন। কিন্তু সে লক্ষ্যে তেমন মানুষ মেলে না। আগ্রহ বড় দুর্বল। আর চতুর্দিকে ঘিরিয়া ধরা কুসংস্কার কীভাবে দূর হইবে সেটি প্রশ্নশীল বিষয়। ভাবিলেন জেলাশহরের কোনো পরিদর্শককের পরামর্শ নিতে হইবে। অনেক এলোমেলো বিষয়ভাবনায় তার সহায়ক হবেন যিনি তারই বা অস্তিত্ব কই! কাউকে সঙ্গে নিতে পারেন না। হবিবর রিফিউজি স্কুল পাড়ের বেশ কাছের, তাকে নিয়া তিনি সদরের দিকে চলতে শুরু করেন। পথ কয়েকদিনের। মোনাইল থেকে প্রথমে দ্বিচক্রযান। কিন্তু দুইজন চলবেন কীভাবে। শেষে ঠিক হইলো গরুরগাড়িই যোগ্য। চৌধুরী হবিবর রিফিউজিকে ইশারা দিলে তিনি সে মতো উদ্যমী হন। কিছু বই আর রেডিও নিয়া সুবেহসাদেক অন্তে চৌধুরী যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ভোরের খবরে জানা যায় শেখ সাহেব ছয়দফা দিয়াছেন। সেসব নিয়া কী সব গোলমাল সর্বত্র। একটা ভয় ভয় আর লুকোচুরি খেলা। কোনো বিসম্বাদ কি-না বোঝা যায় না। জড়ানো প্যাঁচানো মনে হয় অনেক কিছু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক হচ্ছে। ছাত্র-জনতা নিয়া শেখ সাহেব কী করেন তাহা বোধগম্য হচ্ছে না। উইনস্টন চার্চিলের একটি বাণীর কথা মনে আসে ‘লেট আওয়ার এ্যডভান্স ওয়ারিয়িং বিকাম এ্যডভান্স থিংকিং এন্ড প্লানিং’। সে রকম দূরদর্শিতা না হলে তো মারা পড়তে পারে অনেকেই। কয়েকদিন অপ্রস্তুতির ভেতরে চৌধুরীর বিপন্নতা বাড়তে থাকে। শিশু পলার জন্য উদ্বিগ্নতা আর ক্ষেদ তৈরি হয়। তখন তিনি দূরে শোনেন কোনো এক বোটম্যানের ভরা গলা :
রাই জাগো রাই জাগো সুখসারি বলে/
কতো নিদ্রা যাও গো রাধে শ্যমনাগরের কূলে
মোনাইল গ্রামে এসব নিয়া কেউ ভাবে না। তবে শেখ সাহেবরে অনেকেই চেনে। তার পক্ষে সকলের অনেক আস্থা। কেউই মনে করেন না তিনি পরাজিত হবেন। জান দিয়ে তারা নেতার জন্য লড়তে রাজি। তবে এসব নিয়া ভাবারও মানুষ কম। কৃষক মনের ভেতরের সম্পর্ক মাটি আর জলের সঙ্গে। সেখানে তাদের আহার-অন্ন আর উর্বরতার সম্পর্ক, রাষ্ট্র-শিল্প নিয়ে খুব জ্ঞানগম্যি তাদের নাই। এটা সহজেই চিনে নেওয়ায় যায়। মোনাইলে বৃষ্টি নামলে জমির উর্বরতা তৈরি হয়, কোনো না কোনো সিজেনে জমে ওঠে ফুল আর ফলের সুশোভন উল্লাস। সেই উল্লাসে মানুষের মন ও মর্জি অবমুক্ত। ভরা করতোয়া তো আরও বেশি যৌবনময়। সে বহাইয়া আনে বিস্তর জীবনের প্রহল্লাদ। চৌধুরী রুশ ইতিহাস বা ভারতবর্ষের ইতিহাস যেটুকু সনাক্ত করেন সেখানে কৃষকের সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের তরিকা আলাদা। ভূমি মাটি মানুষের ভেতরে যে পরিক্রমা তাহাতে উত্তর এশিয়া বা ইউরোপ একরকম। আর এখানে ধর্ম আর ধর্মীয় আবেগের জৌলুশ মৌলভী মাস্টার থেকে শুরু করিয়া সকলের ভেতরে একই। একই ভবে, একই রীতিতে জীবনের যুদ্ধ তৈরি, গড়ে ওঠে সমূহ সম্মুখ চলার প্রেরণা ও আবেগ। কিন্তু ভূপ্রকৃতির গড়নে তা আলাদা। ভারতীয় ধর্ম আর পুঁজির মধ্যে একটা বিরোধ আছে। পুঁজি সৃষ্টির কাঠামো আলাদা। এর ভেতরে শ্রম ও শ্রমিক চেতনা জড়িত। এ বঙ্গে শ্রমিক কই! এখনও সে ধারণাও নাই। এই মোনাইলে কৃষক আছে, ভূমিতে ফলন দেয়, বর্ষা আসে, গরম আসে, শীত আসে— এক খন্দ বা দুখন্দ চাষ করিয়া— গোয়ালে গরু, বৃক্ষে ফল, মাটিতে বাড়ন্ত সব্জি চাষিয়া— জীবন ও জীবিকার উপকরণ রচনা করে। এর জন্য যে অর্থ বা শ্রম তাই তাহাদের মোক্ষ। এর বেশি সংগ্রাম তাহাদের কই। তাইতো জীবনের সংগ্রাম আলাদা। সম্মুখের অবস্থান নেওয়ার প্রতিযোগিতাও সেইরকম। কীসের প্রতিযোগিতা, কার ক্ষমতা, কার অধিকার এসব প্রত্যয় বুদ্ধির চেয়ে ধর্ম দিয়া বাঁধা। এখানে দুর্বল বুদ্ধির শক্তি। শেখ সাহেবের ডাক এদের কাছে তাই দেশাত্ম আবেগের পৈঠায় বাঁধা। দেশের মাটি আর জমিনের জন্য এই আহ্বান। এইটি তাহারা হারাইতে দেবে না। চৌধুরী সম্পদ হরণ, পাটশিল্প স্থাপন, অর্থপাচার নিয়া বলিলে শুনিতে সক্ষম কিন্তু শোণিতধারায় তাহার স্থান অল্প। তাই অবিসংবাদী নেতাকে মানিয়া নেয়। সেখানে ছাড় নাই। শক্তির অপচয়ও সেখানেই। কিন্তু কলকারখানা নিয়া তাহাদের বুদ্ধি কম। মোনাইলে কী এসব আছে! চৌধুরীও ব্যবহার্য জীবনের সঙ্গে কী সম্পর্কিত নন! বইপুস্তকে পৃথিবীর ঘটনা-পরম্পরাই তো তার পুঁজি। আর কিছু ওই বাবার বানানো গল্প। কিন্তু এটুকু অনুমান করেন যে, ভূমিতে কৃষ্ণ-বৈষ্ণব-শাক্ত-বুদ্ধ কিংবা পীর-মুনি-ঋষির যে আশ্রম সেখানে জীবনধারণ অবিমিশ্র— সেখানে কার কী। ওই জব্বার-আজগার তো প্রকৃতির পুরানা মুরিদ। কেন সে যুদ্ধ করিবে। তাই তার বিবেচনায় একটা আশঙ্কা তৈরি হয়, পাঞ্জাবী পাণ্ডারা যুদ্ধ করিলে এদেশের মাটি তো পুড়াইয়া কালসিরা করিয়া দিবে। কিছুতেই তাহা পারা সম্ভব নয়। কে অস্ত্রের মুখে লড়িবে, কে শত্রুকে খতম করিবে— কী তাহার উপায় সে বুঝিয়া পায় না। যুদ্ধ যদি হয়, তবে নিজেরই বা কী হইবে, পলাকে নিয়া সে কী করিবে, কোথায় যাইবে? আর সত্যিই কী কিছু হইবে। তখন এই মাদ্রাসাটা নিয়া তার যে স্বপ্ন আছে, কী হইবে তার। কীভাবে সে এ অঞ্চলের নিরক্ষর মানুষের দায় কাঁধে লইবে। ভাবিয়া অস্থির হয়। মনে মনে একটা মীমাংসার কথাই ভাবেন। কিন্তু ছয়দফার পর ক্রমশ জনতার আস্ফালন বাড়িয়া চলছে, প্রতিপক্ষও বেশ শক্ত হচ্ছে। পূর্ব-বাংলা নিয়া আইয়ুব খান বিপদেই আছেন। বিডি মেম্বারগণ তো তাহাকে আর রক্ষা করিতে পারিবেন না। এই তো সেদিন এক বিডি মেম্বার দায়সারা গোছের কথা বলিতেছেন। সে তো সরকারি দালাল, অনেক অর্থকড়ির উচ্ছিষ্ট তাহার পকেটে, এক ধরনের দাপটও আছে, কার কার সমস্যার কথা বলিয়া সে অর্থের বিনিময়ে নিজের আখের গুছাইতেছে— সরকারের অবস্থানে তাহার ভ্রুক্ষেপ নাই। এইসব লেজুড় দিয়া সরকারের কী উপকার বোঝা দায়। শুধু এজেন্ট হইয়া কে কী বলে তার সংবাদ প্রচার করে। কওমী রক্ষার বড় দায়িত্ব যেন সে কাঁধে নিয়াছে। এইভাবে যেমনটাই ঘটুক চৌধুরী যুদ্ধের ডামাডোলকে মন থেকে পছন্দ করিতেছেন না। তিনি ছাড়িয়া দেন। ভানায় ব্যাকুল হন। সকলকে ডাকেন, তোরা গান ধর। বা আমাকে করতোয়ার তীরে বাউলের কাছে নিয়া চল। দ্যাশের ঠিক পরিণতি না জানিয়া ক্যমনে কামে বাহির হই। রিফিউজি ব্যাটাকে কয়েকদিন ক্ষান্ত দিতে ক। এভাবে সময়ক্ষেপন হইলেও একটা ডর তাকে বেশি চাইপে ধরে, যুদ্ধ-যুদ্ধ আর যুদ্ধ নিনাদ। সে আরও অস্থির হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা নিয়া। সেখানে সকলকে কী এক অপবাদে মান-অপমান করা হইলো। এই দ্বন্দ্ব তো সরকার ও জনতার। এখান থেকে সরার উপায় নাই। আইয়ুব বা অন্যরা টাসেল-এ যাচ্ছে বলেই মনে হয়। এর মধ্যে সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার খবর ঘটে। পরিস্থিতি আরও বেপরোয়া। খোলা আকাশের নীচে হাঁটিয়া, তাহাকে পরিবেষ্টন করিয়া অনেকেই থাকে। দূর হইতে মৌলবীর ফর্সা পাঞ্জাবী দেখা যায়। আজকের আবহাওয়া বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময়। এর ভেতরে একটা চিমটা দেন। রক্তসঞ্চালনে বাধা নাই তো! হায়রে এই রক্তেই তো ভক্ত দিয়া বাঁধানো। কতোরকম বিস্ময় দিয়া বাধা এ শরীর। তার রহস্যও কী কম। প্রতিটি মানুষ ভাবনা চিন্তায় বিষম হইলেও প্রত্যেককেরই প্রাণস্ফূর্তি বিশেষ রহস্যে ঘেরা। অতীতেরস্বপ্ন আর অভিভূত ভাবনা দিয়া গড়া। সেজন্য দয়া আর করুণার্দ্র তো এই প্রকৃতির ভেতরেই আচ্ছাদিত। বাড়ির ভেতর হইতে তাহার একজন আশ্রিতা খবর দেয়। পলার পাহারায় সে থাকে। ছোট্ট শিশুর জন্য কী কী সওদা প্রয়োজন। কোটাবাড়ির শব্দ দূরে পৌঁছায় না। সম্পর্কটা তো রক্তে বাঁধা। সেখানে সর্বপ্রকার অনুভূতিও তার নিজের। সে কইয়া দেয়, আসিতেছি। বাড়িতে অনেক তাপশোক এই পঞ্চাশোর্ধ্ব আশ্রিতারই হাতে। সে তাহার কাছের, পলার মার ধাত্রীরূপে আসীন। এ পর্যন্ত সবকিছু তাহার হস্তেই পুরামাত্রায় অর্পিত। সেখানে আশ্রিতার আরও কেউ কেউ আসেন যান, কিন্তু পলা তাহাকে জন্মের পর পরই গ্রহণ করিয়াছে। মৌলবী কন, সাব কই চললেন! যাইবা মিঞা ওই নদীর দিকে। আজানের তো দেরি আছে। নাহ্ মোড়ে আজ জলছা আছে। ওখানে বোগদাদী মহাশয় আসিবেন। সারা রাইত ওয়াজ হইবে। সেসব নিয়া একটু কামে আছি। হুম! আমারে দাওয়াত লইবানা। কী যে কন, আপনি তো আইবেনই। কিন্তু … যাক আসি তাইলে। এ অঞ্চলে অনেক কিছুরই অভাব। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলে বা রবিউল আউয়াল মাসে, মোহররমে উৎসব হয়। পাড়া গ্রাম জুড়ে মেলা বসে। বাদ্য বাজে। খাবারের বিশাল মহরত নিয়া আসে লোকজন। কোনো কার্পণ্য নাই। মোনাইলের আশেপাশের কমদপুর, মাদারীপুর, ফুলপুর, ঢোলভাঙা প্রভৃতি এলাকা থেকে লোক আসে, ওরশ হয়। সকলেই রাতদিন ব্যস্ত হইয়া পড়ে। সে ব্যস্ততার সময় ঘনাইয়া আসিতেছে। বোগদাদীর কথাবার্তা শুনিতে বেশ সুরেলা, কিন্তু অনেকটাই অন্যরকম। যাইবেন আজ। কিন্তু তার আগে পলার সংবাদ আর সংসারের খবরটুকু তো নেওয়া দরকার।
মোনাইলের নিস্তরঙ্গ জীবনে তরঙ্গ আছে অনেক। কোজাগরি পূর্ণিমার যাত্রা, দুর্গাপূজায় মেলা, মহররমের মেলা অনেক ঘর ভরিয়া ওঠে। ভেদ থাকে না। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো হয় যখন কালবৈশাখি আসে। ভয় আর ভীতি বৈশাখ জুড়েই। কোনো সময় ডাকাতি বেশ বাড়িয়া যায়। চোরও আছে। এসব অনেকটাই পুরানা রীতি। চোর নিয়া অনেক গল্পও আছে, পুলিশ-থানা নিয়া এখনও এখানে ভীতিসংকুল মানুষ জীবনকে বার বার নতুন করিয়া দেখে। শামসুজ্জোহা হত্যার খবর আজ প্রচারিত হওয়ার পর ঢাকার খবরে নতুন উত্তাপ উঠিয়াছে। কী সে রোদজ্বলা তাপ! ঠিক অনুমানও হয় নাÑ এর কারণ কী? ছাত্রমিছিলে হামলা, ছাত্রদের নির্যাতন করা, শিক্ষক হত্যার খবরসমূহ ক্রমশ গতি পাচ্ছে শহরের নানা জায়গায়। এবার ছাত্ররা নতুন দফা দিবে। নিস্তরঙ্গ গ্রামে অনটন-অভাব আর কল্পকথার ব্যাকুল করা ভাব নিশা নিয়া বহমান। সেটির সুর ও তাল অনবদ্য। তাহার ভেতরে কোনো মৃত্যু সঠিক বলিয়া মনে হয় না। চিন্তায়-চৈতন্যে তাহার ব্যাকুল মন বহুমুখি। হঠাৎই এই মৃত্যু সংবাদ চৌধুরীকে একটা বিষম পরিবেশে তুলিয়া ধরে। কতোকাল মানুষের প্রাণিতুল্য বাঁচনের চাপ। সে কী সত্যিই চিরকাল থাকিতে পারে? সে কী অমরত্বের দোঁহে ভরাট হইয়া ওঠে। কে তাহাকে চিরসুখি করিবে! জোহা সাহেব মরিয়া গেলেন, এখন সে মৃত্যুর পরিণতি কী! এ সংসারে কে আপন আর পর। বাতাসের আহ্বানে পঙ্গর ওঠে, জীবনের সারসত্য পল্লবিত হয়, বাঁশঝাড়ে বিবি ডাকে, পলারে চিনছ— সে তোমারই মাইয়া, জন্মের কষ্টে মইরা গেছি, তুমি তাহার সমস্ত সম্পদে রাইখ। পেছনে যা ফেলিয়াছ সেরকম পিছনে ফিরিয়া ফল কী— বুদ্ধিতে ফেলাইয়া দিও না। মনে আছে, ওই আড়ার ভেতর তুমিই তো পরথম কইলা এর দায়িত্ব আমি নিমু। কী অচিন আছিলা। তোমার মুখচোখ আর শরীরের তাপ সুন্দর হইয়া উঠিলে আমি তোমার দিকে একবার তাকাইয়াছিলাম। জুম্মাঘরের পাশে বড় ইঁদারার কোণে দাঁড়াইয়া তুমি কীসব ভাবছ, তখন নীরব বাতাসে তোমার চুল ওড়ে, চক্ষে বিড়ালের আলো ঘিরিয়া ধরে, রোশনাই নাই কিন্তু মুখশ্রী বেশ আনন্দময়। আমার মন ভরিয়া যায়। সেরকম সময়েই একদিন ফুলশয্যায় তুমি আমার হইয়া গেছিলা। হায়রে সুখ! এই মোনাইলে তো মনে হয় তুমি আমার জইন্যেই আসিয়াছিলা। তাহাতে কতো জন্মের কান্না আর বিবাদ জড়ানো ছিল। বেশ তারুণ্যের কলাপাতা নড়ানো হাওয়ায় তুমি আমারে চুম্বন দিলা। শিহরণে তখন যেন বন্যার মতো আবেগ উপচাইয়া পড়ে। বন্যার আহাজারি তো কম নয়। সে এই মোনাইল গেরামেও মেলাবার আইছে। মোনাইল-গজনফরপুর ভাসিয়া যায় তার দুই বছর আগে। মেলা মানুষের জেবন কষ্ট ছিল। তবুও নিজে মরি নাই। আমার কিচ্ছু আছিল না। সেই জইন্যে তো মানুষ আমালে লইয়া ফুটবল খেলার সুযোগ পাইছে। তুমিই পুরুষ হইয়া আমার গায়ে হাত রাখছ। তখন পরথম মনে হইছিলো যৌবন আইছে। স্তন ফুটিয়াছে। রোমকূপে শিউলি ফুটিয়াছে। বকুলের আবেগ আর গন্ধ ছাইয়া গেছে গোটা এলাকা। তুমিই আমার ধন। বাপে তো সেই বন্যায় মরিয়া গেল। সে খুব আদরে গামছাভরা বাতেসা আর গুড়ের জিলাপি দিত। আগুনে সেঁকা জিলাপি। বাপটা হঠাৎ করতোয়ার পানির তোড়ে পাঁকের ভেতরে পইড়া নাই হইছিল। কান্দছি অনেক, চিরকালের কান্না ভেতরে শুকিয়া যায়। এসব নিয়া তুমি এখন বিরাট আশ্রয়। পরথম রাত্রিতেই তুমি আমার শরীরে বাসা বাঁধিয়াছিলে। ফুল আর নদী তখন একাকার। ক্রমশ পাল্টে দেহ, শরীর আর মন। ত্বকে নতুন গন্ধ সৃষ্টি হয়। আওয়াজ ওঠে কোটাবাড়ির পাশের বাঁশবনে। তোমার চক্ষে নতুন স্বপ্ন আছিল। পরের দিনও খুব আদর দিয়া গলায় তুলিয়া লইছিলা। হায়রে আমার সোনার মানুষ। কী এক কারণ পক্ষীর আওয়াজ উঠিলে ভয় আর সীনার কাঁপুনি ঘন হয়। তীব্র হয় গোদম পাখির আওয়াজ। কেডা ডাকে গো! এই এলাকায় ডাকাত আপিনি! হাসি পাইছিল। কতোকালের হাসি আর সুখ তখন তুমি চোখে আর মুখের সাঁতারে ভরিয়া দাও। আমি আর কিচ্ছু কই নাই। তখন কুকুর আসে ওসরায়। একটু নীচু আঙিনায় পানি ফেলি, ডাব গাছটা সে পানিতে চিরল পাতার হাসি দেয়। ওখানে টুনু নাকি রে! এই টুনু… ওগো টুনুরে মারিও না। সে বড় ভালা, নাতদিন খালি পাহারা দেয়। বাপের মরণের পর হুল হুল কইরা কান্দে আর গোরস্থান শুঁকে শুঁকে বেড়ায়। নাই আমিও এখন ওই বাপের লগে আছি। তোমার পলা কতোবড় হইছে। আমার কান্দোন আসে। ওর হাসিটা কী তোমার নাখান। বেহুঁশহইয়া মরনের ভেতর আর ওখ পাই নাই। কেড! মিয়া ভাইনি! জব্বারের আওয়াজে সবকিছু যেন থেকে গেল। কী কইছিলেন মিয়া ভাই! কেডা নাকি মরছে। কই আর তো কইলেন না। বাঁশঝাড়টায় কী দেখেন…। ও বুচ্ছি। এইডা তো ভাবীসাবের গোর। আপনে তো জ্ঞানী, কন তো মরণের কাম কী? মানুষ মইরা যায় কোহানে। একদিন আমগোরে দাদী কইছিলো, এক্কেবারে হারাইয়া যায়। মইরা গেলে যতো খোঁজ তার আর পাওন যায় না। অথচ মনে রয়, সবটি বুঝি আচেন। এগুলা নিয়া কিচু কন তো মিয়া বাই। তুই বুঝবি না রে জব্বার। তবে মৃত্যু খুব আনন্দের। একে আনন্দের চোখেই দেখা ভালো। চিন্তা করবি কিন্তু দুশ্চিন্তা করিস না। চিন্তা-দুশ্চিন্তার সারার্থের বাইরে মৃত্যু কী তবে কিছুই নয়! জব্বারের ওসব মাথায় ঢোকার কথা নয় কিন্তু সে আশ্চর্য হয় এসব নিয়া চৌধুরী যা বলেন তা ঠিক বিশ্বাস হয় না। সবই আল্লার ইচ্ছা। জোহার মৃত্যু নিয়া ছাত্ররা এক হইয়া রাস্তায় নামলে খুব দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাইয়া যায়। নানা স্থানে বিচিত্র সব ঘটনার সংবাদ আসছে। ঘরে-বাইরে কী নতুন কিছু ঘটবে? শেখ সাহেব বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠিছেন, পশ্চিমাদের কাছে। তারা নানাভাবে বুঝি তাকে মানাতে চাইছেন। কিন্তু এটা মানানোর তো কিছু নাই। কারণ, ন্যায্য অধিকারই শুধু নয়, ক্রমাগত যে পীড়ন-অত্যাচার-বঞ্চনা যে চলছে তার বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম। পাকিস্তান ভাঙা নিয়া যে ব্লেম শেখকে দেওয়া হচ্ছে তা তো অভ্যন্তরীণ সমস্যা কিংবা সমস্যাকে সমস্যা বানাবার চেষ্টা। এসব নিয়া এখন বেশ ঘনীভূত কিছু হচ্ছে। মুদি দোকানে আলাপ হয়, পানের দোকানে খবর-প্রার্থী মানুষের হিড়িক আর নানা রকম স্ল্যাং দিয়া পাকিস্তানীদের বর্বরতার শিক্ষার কথা বালে। কিন্তু এটি তো কঠিন বিষয়। শেখ সাহেবের বিষয়ে এ অঞ্চলের মানুষজন এখন বেশ কনসার্ন। এটি দু/এক বছর আগেও এতোটা ছিল না। এখন জোরালো, কেউবা জেবন দেওয়ার জন্যও পাগলা। হায়রে জেবন! এইটা সহজে দেওন যায় না রে জব্বার। কিন্তু এখন বুঝি মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেভাবে তৈরিও হচ্ছে। তবে আবেগ দিয়ে তো যুদ্ধ করা যাবে না। তাহলে মারা পড়বে অনেক। সাফল্যও আসবে না। কী কৌশল নিতে যাচ্ছেন নেতৃবৃন্দ। ছাত্ররা যে এগারো দফা দিচ্ছে, সেটি নিয়া কী রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হচ্ছে। ঠিক কিছুই বোঝা যায় না। খবরই মোটিভেশন করছে সব মানুষকে। কারো মধ্যে কোনো রাজনীতি দেখি না। কিন্তু তিনিইবা এসব নিয়া এতো উতলা কেন! এলাকায় মেলেটারি এলে, এ্যারেস্ট হলে তিনিই হবেন। তখন পলার কী হবে। আপাতত তিনি নিজেরটাই ভাবছেন। দেশের মানুষের কথা আর কী ভাববেন। ক্ষমতা কাঠামো ভাঙ্গতে গেলে দূরদর্শিতা দরকার। সেটি শেখ সাহেবের আছে কী? মনে হয়, এতো বেশি সংখ্যক বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়া তিনি বেশ শঙ্কিত, ভয় ও দ্বিধাও আছে। তবে তাঁর এসব চিন্তার মধ্যে একটা সততাও আছে। কারণ, মানুষের মৃত্যু তো তিনি চান না। এই অধিক সংখ্যক মানুষ নিয়া তিনি যাইবেন কই— সে রকম দ্বিধাও কাজ করছে বলে মনে হয়।
মোনাইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক মায়ার আদরে শেখ সাহেবকে গ্রহণ করেছে। এইটিই বোঝা যায়, রক্ত-সম্পর্কিত মনে করছে তারা তাকে— ঠিক রাজনীতি বোঝে না কিন্তু শেখ সাহেবের দিকে থাকে। গ্রামটাকে ঘিরে এখন আলোচনাও হয়। মনে হয় প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, বাইরের বসতি ক্রমশ বাড়ার ফলে। কিন্তু মানুষের চিন্তাজগতে এতোকাল মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখিতিছি না। ওসব পা-ুলিপি যেন পাতায় পাতায় পড়া নিশির শিশিরের রহস্য। কোনো এক আস্থা বলে মানুষ পেছন ফিরিয়া চলে, জীবনের রাগ-অনুরাগের মায়ায় জড়ায়। মরীচিকার পেছনে জাটাজালে আবদ্ধ। অমোঘ রহস্যের সঙ্গে নিজেদের জীবনের বাস্তবতা তীব্রতর। যে বাস্তবতার মধ্যে তাহারা বসবাস করে তাহার মধ্যে নাই কোনো লৌকিক জীবনের সংগ্রাম। কলি বেগম বা বঁশি কাহারা বুনিয়া চলেন তাহার অনন্ত রহস্যাবলী। সে সব রহস্য নানাদিকের বাস্তবতাকে পুনর্গঠিত করে। বাস্তবতার ভেতরে গড়িয়া ওঠে অনন্তের রহস্য। এ রহস্য কী পুরানা ভিটায়, বাঁশবাদারে, খড়ের আখড়ায় কিংবা সন্ধ্যায়-রাত্রির অবিশ্বাস্য আঁধারে ঠিক কে বুঝিবে। দাদা-পরদাদার পরভূমে মর্ত্যরে উড়ন্ত শালিকে, চিরল পাতার স্বত্বে, চূতমুকুলের গন্ধে কতোকালের বধির সাক্ষ্য রহিয়া যায়। এরূপ রহস্যের তাগাদার ভেতরে চৌধুরীও তো কম যান না। যে পরিবর্তনে ট্রটস্কি তাহার আইডলে পরিণত, যেখানে পূর্ব-বাংলার পরিবর্তনের রেশ বহাইয়া যাইতেছে তাহার চিত্তভূমিতে সেখানে কেন তাহার সম্মুখে মৃত বিবি পেখম মেলে, করতোয়ার মধ্যরাতের শিস কানে আসে, বাঁশঝাড়ের তীরমাথায় ছুঁচলা সাপের খেলা শিরার ভেতরে প্লাবন তোলে, কীভাবে আড়ার ভেতরের জুম্মাঘরে বিশেষ পাপ-নিরূপিত স্বর কোনো বিড়ালের চোখে বহাইয়া যায়— সেখানে চৌধুরী বেচইন হন— তবে কী পার্থক্য জ্ঞান আর ভবের অনুসারীদের। এইরূপ কী বাঙালি মধ্যবিত্তের অর্থব্যবস্থার কাঠামোতে পরিকীর্ণ নাকি ভবের ভাবে উপনিবেশ ঢুকিয়া পড়ে— সমস্ত প্রতাপ নিয়া— তাহাতে গান্ধী আর সুভাস বসু বিরোধ বাধায়, দেশবন্ধু আর সাম্যের পথে থাকেন না, বুর্জোয়া আর প্রগতির ভেদ-পার্থক্য ঘুচিয়া যায়, বস্তু আর ভাব অবিমিশ্ররূপে চেতনার মণিকোটায় সখ্য গড়িয়া তোলে। এইভাবে তো জীবন কোন এক বেড়াজালে থেমে যায়। চৌধুরী নিজেও বুঝি সেই ধারা বহন করেন। নইলে কেন ভেতরে এতো সংশয় ও দ্বিধা নিয়া চলিতেছেন। বাঙালির নেতা শেরে বাংলার উত্তরসূরি হইয়া শেখ সাহেবও বুঝি সে গড়নেই মানুষকে মুক্তির আহ্বান করেন। সে মুক্তি সত্য ও বাস্তবের রেখায় আবদ্ধ হইলেও বেগের আবেগ আছে। সেখানে তিনি গড়িয়া ওঠেন। কবি হইয়া দাঁড়ান। নিজের আবেগে অতুল্য হইয়া ভাষণ দেন। এই অনুভূতি তো মাটির মায়ায় ধইরা আসে। মৃত্তিকার ভেতরেই তো তাহার ঘনানো কাহিনি। চৌধুরী এসব ভাবচক্রের ভেতরেই নির্বাচনের সংবাদ পান। নির্বাচনের দিকে আগাইয়া আসো হে পাকি সরকার। কেন এই নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার রুষ্টরূপ মোকাবেলার জইন্যে না অন্য কোনো কিছু। কিন্তু সমাধানের পথ নিয়া তুমি দ্বিধান্বিত। ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্রের গন্ধ প্রকট হইছে। তীব্র হাওয়ায় তখন কে একজন অপরিচিত মানুষ সালাম প্রদানপূর্বক সম্মুখে দাঁড়ান। পরনে মলিন বেশ। পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরিহিত। সময়টা শীত পেরুনো, চৈত্রের কাছাকাছি। পড়ন্ত সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিছে। এইমাত্র দুয়ার থাইকা তিনি বাইরে বেরুবেন তখনই এই সফেদ দরবেশধারীর আগমন। বোঝা বড় দায়, তার উদ্দেশ্য কী? সাহায্য চান না কিন্তু বিশেষ তন্ত্র সাধকের ন্যায় তাহাকে বিশেষ জ্ঞান দিতে শুরু করিছেন। বুঝিয়া বলেন, তাহার ভেতরের প্রৈতিশক্তির কথা। এ শক্তির মাহাত্ম্য নিয়া তিনি বেশ চকিত। পেয়েছেন তীক্ষè দিব্যশক্তি। এ অধ্যাত্মশক্তি তিনি দিতে চান মিয়াকে। এ লইয়া তাহার বিশেষ আগ্রহ। কিন্তু পলার ক্রন্দনধ্বনি তাহাকে বিচলিত করে। সে আশ্রিতাকে ডাকে এবং তাহার সমাধান দিতে বলে। অভিমানি দরবেশ চলিয়া যায়। কীভাবে এক মায়া রহিয়া যায়। পলার কাছে যান। তাহার কিশোর স্পর্শী বাতাস নতুন ধারা নিয়া আসে। সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর প্রশ্ন করে। বিদ্যাসাগরের সহজ পাঠ তাহার কেন্দ্র। পড়িয়া ফেলিয়াছে দুএকটি ডিকেন্সীয় পঠন। আলেক্সাজান্ডার ডুমার থ্রি মাস্কেটার্স-এর কাহিনি নিয়া সে প্রশ্ন করে। যুক্তিহীন অনেককিছুর উত্তর নাই। অবুঝ উত্তর, কিন্তু এর জিজ্ঞাসা এতো প্রখর কেন। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন এক অনন্য সৃষ্টি। পলার বৃদ্ধি ও ক্রমবিকাশ তাহাকে মুগ্ধ করে। জিজ্ঞাসার পর্যায়গুলা বহুমাত্রিক। বিজ্ঞানও বহুমাত্রিক। কিন্তু তাহার সবচাইতে আগ্রহ বিস্ময়মুগ্ধ রোমান্টিক দৃষ্টি। ‘স্কাইলার্ক’-এর অপরূপ সৃষ্টি। সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে। সকল কবিই তো সেদিকেই অগ্রবর্তী। পলার মুখে এক স্বরূপ তিনি লক্ষ করেন। অনেকরকম মুগ্ধতায় যে সময়টা কাটিয়া যায় তাহা এক অমোঘ নিয়তি। পলার বৃদ্ধি, দৃষ্টি, আকর্ষণ ও অভিপ্রায় দুরন্ত হইয়া ওঠে। পলাকে নিয়া সে করতোয়ায় পৌঁছায়। ভীষণ ধারায় নামাইয়া কয়, ‘আইজ তোরে পাল নৌকোয় তুলিয়া দিই’। ওড়াও পাল ওড়াও। উড়ন্ত বাতাসে ঢেউ উঠুক, জেগে উঠুক সব চরাচর, পৃথিবী পাক নবতর রূপ। সে রূপে পলা আর প্রকৃতি একরূপে চলুক। সে এক নতুন নবশাখে গাহুক প্রেমের গান। ঢেউ আর পঙ্গরে সমস্ত তীব্রতা ছাইয়া যাক, দৃষ্টির অভিমুখ প্রচ- হইয়া পড়–ক। তী ছাপিয়া জীবনে দেখা দিক নবলব্ধ জীবনধারা। সে তাকাইয়া রয়, দৃষ্টি অনুসন্ধান করে, আরও আনন্দে বইলা ওঠে ‘বাবা, ওই সবুজে আলো আসিলে তার রঙ কেমন হইবে’— আহা আনন্দ। এই আনন্দের প্রশ্নে চৌধুরী অতীতকে সুন্দর করে ফিরে পান, জীবনকে ফিরে পান, আর অতিশয় মুহ্যমান হইয়া কন, উহার রঙ আর রূপের ব্যাখ্য কহতব্য নহে মা— তুমি প্রশ্নে প্রশ্নে নিজেকে আরও অনেক রকম করিয়া তোল— তুমিই তোমার উত্তর খুঁজিয়া পাইবে। এই আশ্চর্য অভিপ্রায়সমূহ লইয়া হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি জইমা আসিল। তুমুল করতোয়া বাতাস ধাইয়া তোলে। পলা বাবার মুখের দিকে তাকিয়া কয়, তোমার ভয় নাই রে বাবা! সত্যিই আলো নিবিয়া অন্ধকার হইলে ভয় তো আসিবেই। অন্ধকার তো ভয়েরই প্রদীপ। উহা ঠেলিয়া আলোর সন্ধানে সম্মুখে এগুতে হয়। আলোর উৎপাদনে নিজেকে যুযুধান করিয়া লইলে ক্রমশ পরাস্ত অন্ধকার বিলোপ হয় কিংবা তাবৎ ভ্রষ্ট মিথ্যালোলুপদের বিপরীতে সত্যের দ্বার উন্মোচিত হয়। সত্যই সঠিক, সদা সত্য বলিবে— ইহার জন্য সাহস দরকার— এখনও ভাবি হায়রে! ট্রটস্কি আর ডিক্টেটর স্ট্যালিন! কে পরাজিত আজ? এমনই বাঁকে আছেন কতো বিশ্বমানব, কেউই চিরকাল রহে না কিন্তু সাহসী আর কর্মপ্রবণ মতের প্রতিষ্ঠা হয় চিরকাল, মানুষ মরে রে মা কিন্তু সত্য মরে না… বলিতে বলিতে তাহার বাপের কথা মনে আসে, সেই তো তাহাকে এইসব ইতিহাস ধরিয়া দিয়াছেন, আজ তাহা সে প্রত্যক্ষ দেখিতে পায়। পলার মুখকালো অন্ধকার ওই বহিয়া চলা ঝড়বাতাসের অন্ধকারের ন্যায় বহাইয়া আসে। সে বাড়ির অভিমুখে যখন চলে তখন প্রচুর বৃষ্টি ধরে। মুষলধারের বরিষণে মনের ভেতরে আলোড়ন ওঠে। কী একটা দেখিতে পায়! চলৎশক্তিতে বর্ষার ধারায় রহিত হইলে বিশাল এক গুঁইসাপ নামিয়া সরু গর্তে ঢোকে। বাঁশঝাড়ের ভেতরে তাহার নির্বিকার গমনপথ। পরে অনেক সবুজের লতাগুল্মের ভেতরে হানাবৃষ্টি তাহার শক্তি তুলিয়া ধরিলে— তাহার সমস্ত লালরাস্তায় আঠালো মাটির ভেতরে পা চালাইয়া সম্মুখে চলে। তখন আরও বাতাস উত্তর দিক হইতে বয়। কিছুদূর পরেই তাহার বসতি কোটাঘর। আশ্রিতা তাহাদের অপেক্ষায় ভয় পাইয়া আছেন। কেন তাহার নৌকায় উঠিতে গেল— ঠিক বুঝিতে পারিল না। তবে চৌধুরী একটু আনন্দই পায়। পলাকে আশ্রিতার হাতে তুলিয়া দিয়া অবমুক্ত হয় এবং আবার ওইপথে চলিতে থাকে। কোনো পেছন ডাকের অপেক্ষায় সে থাকে না। উপর থাইকা ছোট্ট পাহাড় গড়াইয়া ধারা বর্ষা নামিছে। গর্জন খুব কঠিন। দেখা যায় বিজলীর রেখা। মাদ্রাসা ময়দান ভরিয়া গিয়াছে। তবুও তর নাই। চৌধুরীর এসব বৃষ্টিতে পাপমুক্তির কামনা দিয়া ওঠেন। কবে তিনি আইলেন এই গ্রামে! পলার মা তাহাকে কতো প্রশ্রয় দিয়াছে। অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে তিনিই তাহার স্ত্রীপ্রেম দিয়া ভরাইয়াছিলেন। ডাকিতেন সোনার মানুষ বইলা। সেই সোনার মানুষ ছাড়িয়া কই তিনি! সোনার পিদিম, সোনার ধান, সোনার কাহিনি, সোনার ছেলে এই রূপোলি জলরেখার ভেতরে পশ্চিমে সোনালী রঙ ভাসিয়া ওঠে। সেই সোনার ভেতরে দেখেন সোনার হাঁস। সোনার রিংপরা বেগমজাদি। গোটা শরীরে সোনার জড়োয়া আর সোনার মুখে তীব্র চাহনি। কিচ্ছু দেখেন না। কিন্তু আছে প্রচুর সোনার বিছা। ছড়ানো সে বিছায় জলসাঘরে আওাজ ওঠে। ভীষণ ঘূর্ণাবতে আটকায় সোনার নিক্বন, শরীরের আলো আর বিস্তর পড়ানো জড়োয়া-বিছা। ঘোরে আর ঘোর তীব্র হয়, আরও বর্ষা নাকি গুঁই ঠিক চেনা যায় না। ওপারে যেমন পচা গন্ধ এপারে তেমনি সতেজ বৃষ্টিচাঁন্দ টপটপ রবে সবকিছু আঘাতে আঘাতে মর্মর করিয়া তোলে। ভাসেন না ঠিক দেখেন নাকি অনেক ছাত্রের ভেতরে জিগান, এই বাবু কও তো ‘মাউন্টেইন’ মানে কী! সমস্বরে কয় পাহাড়। আরে! পাহাড়, কই পাহাড়। এইটা যুদি পাহাড় হয় তবে মালভূমি, পর্বত কোনটা। সে আবার একই প্রশ্ন জিগায়! কইছি তো, পরের প্রশ্নডা কন! ওহ আচ্ছা আচ্ছা, ক, ভাষার জইন্যে কেডা জেবন দেছে! জব্বার নাহ এই জব্বার কোন জব্বার, তাহার কয়েকজন জব্বার পরিচিত। এক জয়নাব তাহার স্ত্রী কিংবা গ্রামের জব্বার মিয়া নাকি জব্বার মুন্সী কিংবা আরও অনেক কিন্তু সেও ঠিক কইরা ওঠে না জব্বার কেডা। এরপর আবার সে নতুন কিন্তু লম্বা একটা মোরগের ডাক শোনে— সে বুঝি সাপ দেখছে, ওরা কী সাপ দেখে! নাহ, পলা নাই তো, সাপ নাই, মোরগ নাই, সোনা নাই তাহলে এখন সে এতো মাদ্রাসার ছাত্র দেখছে কেন! কারণ, কী? কীভাবে সে ছাত্রদের ইংরেজি শেখায়? শিখাইতে পারছে কী? ক, অল দ্যাট গ্লিটার্স আর নট গোল্ড— মানে কী? পড়াশোনার খবর নিয়া চলে সে। একলা চলে কিন্তু ছাত্রদের সাথে চায়, ওদের ছেইলে মনে করে। কিন্তু কয় না, আবার জিগাইলে কয়, স্যার মেলা বেল হইছে, আপনারে কখন কইছি! হাঁটেন চলেন। বেল নাই, ঝরি হবি। হ্যা, এই ঝরিই তোর তার এতো আনন্দ দিছে, সোনারে ফিরাইয়া দিছে। এসব কী যেন একটা বোল তাকে পদ্মফুলের মতো শোভিত করিয়াছে। কিন্তু আওয়াজ আসে না, দমদম ভয় দ্রিম দ্রিম কইরা তাহার দিকে ধরিয়া আসে। আবার কন, ক মাউন্টেন কী! কয়বার কন, ক ক মাউন্টেন কী, মাউন্টেন বানান কর। কইছি, তো আবার ক, আবার ক, বইলা তিনি পাকুড়-আম আর শিরিস গাছের তলে গাছের শিপায় খাড়ান। শিপা নাকি গুঁই নাকি বাতাসা ওই বাতার তলে পটাস আওয়াজ, ট্রটস্কিকে মারছে, মরছে তো! কইত্থে কন তুমি হ, ওডানা মেক্সিকো, বিশ্বকাপ, জেতছে, ওখানে আরও আছে উরুগুয়ে, ব্রাসিল আর চিলি। চিলি, পেরু, চে, ক্যাস্ট্রো তখন কেবল সরিছে স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ আইছে, মরণযাত্রার যাত্রার স্মৃতি হাতড়ায় চার্চিল, তাহার সঙ্গী কবেই মইরে যায় বিশ্বযুদ্ধটা শ্যাষ করবার আগেই। ফাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, খাটিলেন, করিলেন, পরিলেন কিন্তু জয় দেখনের আগেই টুপুস… খুব শরীর খাপার; তখন কী এই শিপায় গুঁই পেঁচাইয়া আছিল! হ, টপাস টপাস তর তর কইরে এখন আবার পড়িতে হয় কীসের য্যান মাউন্টেন-এর উত্তর। উত্তর দেয় ক্যাডা! আর পাশ করে নাই। ক্যামনে পাশ করিবে, কেউই তো পড়ে নাই। হুজুর নাকি গোপনে গোপনে কয়, চৌধুরী পাগলা একটা, ইংরেজি পড়োস মানে! বেদাত বেদাত বেদাত কাম! নাউজুবিল্লাহ্। খোদার কসম, ওইডা আরবির লগে চলবো না। হ হ আর চলবো না। কেডা! মিয়া বাই না কেউ… হামরা ওই পাড়ার কেউতা বা, মুই কেউতা চাচা, ওইযে তোমার কামোত নামচিনু, কুয়া খুড়বার গেনু তারপর গর্তোত ঠ্যাং দিয়া নামবার সময় ওটি যে গোমা সাপ আছিল, ঠ্যাংগোত দিলি কামোড়, তারপর না মুখ দিয়া উঠিল ফ্যাপনা, মরি গেনু। তোরা তো আছিনেন না, কী এক কামোত জানি গরুর গাড়িত সদরোত গেনেন। কেউতা বা মুই কেউতা। সাপের কামোড়োত, বিষ উঠি মরি গেনু, তারপর মোর ব্যাটাটা এখন নাকি খালি বাউদিয়া হয়্যা ঘুরি বেড়ায়, কাম পায় না। মাগ্ তো ফির বিয়া বচ্চে। কে! হে! কে ওখানে, কেউতার বাচ্চা। চিক্কুর তোলে! কবেকার কথা। আমি তো চে নিয়া ভাবছি। তুই কেডা। ক, মাউন্টেন কারে কয়? পড়িস নি। মাস্টার দাঁড়াইয়া থাকে। কেউ কইতে পারে না। ক্যান, তিনি তো এতো খারাপ টিচার না। টিচাররা কী কিছুই পড়াইতে পারেন না। হতাশা বাড়ে, ক্রন্দন ছুইটা যায়। ভাঁটফুলে ঘর ভরে। বাসা ভরে জলে। কতো জল। এতো কাজল। পলার মার কাজল নাই। সে তো খালি চোখে থাকিতেন না। কাজলের আলাদা শক্তি। সুরমার চেয়ে তাহার সৌন্দর্য অন্য। এই কাজল, নিজেরাই বানান। ধানসেদ্ধ ডেকচির তলে কাঁসার পাত্র দিয়া আগুনের কালি নিয়া সর্ষার তেল দিয়া বানোন যায়। পলার মা কোনোদিন কাজল কেনেন নাই। কিনিবার কী প্রয়োজন! সেই কাজলে সরিষার তেল ঢুকাইয়া টানা দিয়া কন, দেখেন না কেমুন হইছে। তোমার মাইয়া আসিলে তারেও দিও। ক্যামনে যে হে বড় হইবো। পলার মা কী জানিত যে, সে মরিয়া যাইব। সকলেই কী চে, ট্রটস্কি, রুজভেল্ট, চার্চিল মার্কা খালি মইরা যায়। ঠেকায় না ক্যা! মরলে আর কী থাকে কিছু? শিপাটায় পা পেছলে না, ওখানে এখনও টুপ টুপ পড়ছে। কেউ কী নাই এই উত্তরটা দিবার, ক মাউন্টেন কী! কখন তোরা বাড়িত যাবি! ক, তাড়াতাড়ি ক। আবার ভোর না অন্ধকার, না সোবেহ সাদেক না গোধূলিবেলা! সবই এক ধরনের। ক দেখি কীসের জইন্যে দিন শ্যাষ হয় আর রাইত নাইমে আসে। কেউ কয় না। স্যার, ওগলা তো বেদাত উত্তর। আল্লা দেছে, তাই হয়। কেডা শিখাইছে? আহ্নিক গতির কারণে। বার্ষিক গতি, চাঁদ কীসের উপগ্রহ। পৃথিবী গোলাকার, ডিমের ন্যায়। কেউবা কয়, কমলালেবুর নাহান গোল। আর সূর্য ঘোরে না পৃথিবী ঘোরে। মাথা ঘোরে এসব শুনিলে। মাথা ঘুরিলে, তামান কাঁপেÑ ভূমিকম্প হয়। ভূমি কাঁপে, ভূমির ধ্বস নামে। হাওয়া দোলে। কঠিনে কঠিনে বাতাসে সবকিছু হয় কঠিন। তাহাতে কতো কী যে দোলায়, হাওয়া উড়ে, ফোরাতকূল কুলু কুলু বহায়। তাইলে কেউ পারোস নাই, মাউন্টেনের উত্তর। স্যার, কইছি তো পাহাড়! পাহাড়!! পাহাড়!!! পাহাড়, ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়-ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়ঢ়, চৌধুরীর সম্বিৎ ফেরে না। হঠাৎ ঘোর ভাঙে। দুইটা চারটা ছয়টা দুই দুই দোঁহে কী যেন সমান তালে বাড়ে। কই তিনি! পলা! পলা!! পলাকে রেখে আসেন নাই নাকি সেও অন্য কিছু হইয়া গেল। সে কি পলা না মা মা পলা মা মা মায়ের মুখ, দেবী মূর্তমান, দেবতা নাকি সে নিজেই এই শিরিস গাছের তলে বসিয়া আছেন। পূজে দেন। সামলান না আর। শেরে বাংলা তো কিছুই করিতে পারিলেন না। বড়ো বড়ো চল্লিশখান আম একাই খাইয়া এত বড় মেধা নিয়া দ্যাশের মানুষের লাগি কোনো কামই করিলেন না। হিজিবিজি কইরা, দুই চারদিন মন্ত্রী থাইকা শ্যাষ। কৃষকও নাই প্রজাও নাই। সুহরাওয়াদী মিয়ারও কিছু তো পাওন যায় না। এবার সব শিষ্য বাদ দিয়া একজনরে নিয়া সগগলে ভাবিছে। আর কী নিয়া ভাবছেন। এতোক্ষণ কী দুঃস্বপ্ন দেখিছেন। স্যার, ইলেকশন তো হইছে। আপনে যা কইছেন তাই হইছে। শেখ সাহেবের দল নাকি পাশ করিছে। হুম কেডা কয় রে, কীয়ের খবর, চৌধুরী একটু স্বাভাবিক হন। সবগুলা ছবি মাথা থেকে সরিয়ে ফেলেন। একে এক সব সরান। বিশেষ করে ‘মাউন্টেন’ বিষয়ক ছবি। ওসব সরাইলে মৌলবীই দৌড় দিয়া আসে, জিতছিইই…। আপনে এক্কবারে জুতিষি। হুম, মেজাজ ওঠে চৌধুরীর। কীসব বেদাত টেদাত হইলো একটু আগে… কে? এই মৌলবী না? ঠিক কী! হুম… কী হইছে, রেডিও ধর, আমারে ডাকিস। আমি একটু কোটাত্থে আসি। সন্ধ্য তো পার হইছে নাকি! যা আইতাছি। জব্বাররে ডাককক, হু হু… আরে জব্বারও তো আছিল… ও কি রে আবদুল জব্বার, জয়নাবের সোয়ামি, খালি সোয়ামি স্বামী লাগে, ও দিয়া কী হয়! কাম নাই কিছু, সোয়ামী হইছে। হুম, ডাক তো জব্বাররে। এই তো আমাদের মোনাইলের জব্বার। মাথা থেকে ছবিগুলা পঙ্গর তুইলা আসে। সে পঙ্গরে তাল-নারকেল ছবি পড়ে। কী উঁচু সে লম্বা গাছ। পুকুরের পানিতে গোছলে নামিলে ওই তাল আর নারকেল গাছে তাকাইয়া মনে হয় আহা যদি লম্ফ দিয়া ডানায় ভর দিয়া যাইতাম। পলাও কইছিলো। ওখানে উড়িয়া উঠি। যদি পাখির ডানা থাকে, মোরগের পাখা থাকে… চৌধুরী কন, মা সময়েরও ডানা থাকে। সবকিছুরই ডানা আছে। কিন্তু তাহা চিনিতে হইবে। ঠিক বোঝে না পলা। কিন্তু উড়িবার পাখা সে চায়। হে হংসবলাকা,/ ঝঞ্ঝামদরসে-মত্ত তোমাদের পাখা কিংবা মনে হল, এ পাখার বাণী দিল আনি… তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি। কিন্তু এতো বেদনার ঢেউ! তাই পাখা সুদূরের লাগি বিবাগী! দোলে সে পানিতে, উঁচু তাল ঝুপ করিয়া পানিতে পড়ে, নীচেই পড়ে, অভিকর্ষজরূপে তাহার টান নীচে কিন্তু কী সে পলকের দৃষ্টি। চৌধুরীর শিমুল গাছের ন্যায় পুকুর পাড়ের ওই বৃহৎ সব একপায়ে খাড়ানো বৃক্ষপুঞ্জের কথা স্মরণে আসে। সে তাহা আর টানিতে পারে না। সব ছবি মুছিতে চায়। এখন তাহার নেশা রহিয়াছে। কী এক খবর দিয়াছে মৌলবী। সে কী যেন উল্লাসে তাহা বলে। তবে সে তো খুশি হওয়ার কথা বলিল কেন। পাকিস্তানী ঈমান রক্ষায় তো এইসব জয়বিজয়ের প্রভাব ঠিক মিলিতেছে না।
তারপর খবরের ভিতর দিয়াই সর্বদিকে যখন জনযুদ্ধের সূত্রপাত তখন আবার বর্ষা আসিয়া পড়ে। তার আগেই নানাদিকে শুরু হইছে যুদ্ধ। মইরা গেছেন একরাতেই গোলা গোলা মানুষ। ফড়াৎ ফড়াৎ আওয়াজে কপ্টার ওড়ে। গরমটার ভেতরেই মানুষ মারা শুরু হয়। বাজারে আগুন দেয়, বাড়িত লাগায়, পুল ভাঙ্গে আর গেরিলা না কি কার কেডা কিছু বোঝন যায় না। শুরুতে পাকিদের পাখির নাকান একতরফা মানুষ মারা সম্পন্ন হইলে থামে। আবার শুরু হয় রাত-বিরাতে। আস্তে আস্তে নানাদিক ছড়াইয়া পড়ে। পিঁপড়ার নাকান পিরপির কইরে মানুষ মারে আর আগায়। প্রতিহত করার পাঁয়তারাও তো কম নয়। মুক্তিরা কাম করে। গেরিলা হয়। পাগারোত ঠেসি ধরে, ঢ্যাল মারে, পুল ভাঙ্গি দেয়, পেছনের বাতাস আটকায়া দেয়, বাড়ির ভিটাত কাকাতাড়–য়া টাঙ্গায়া ভয় দেখায় আর গর্ত খোঁড়ে। মানুষের মুখে মুখে এসব সংবাদসকল বেপরোয়া ছড়াইয়া গেলে সকলেই প্রস্তুতি নেয়। দলে দলে মুক্তির লোকও তৈরি হয় নানরকম। চৌধুরী বিপুল বেগে তাহার ঐক্য তুলিয়া ধরেন। কিন্তু মোনাইলের ভীড় আসে পরে। বর্ষার ভেতরে।
বসন্ত কোটাবড়িতে করে ফিরিয়াছিলেন চৌধুরী ঠিক বিশেষ জানা নাই। কারণ, সকলে জানে উহা আর নাই। হবিবর রিফুউজি সব ধুইয়া দিয়াছে। কুলনাশিনী যুদ্ধের তা-বের পর তারপর মোনাইল একটু আলো পায়। দোকান আসে। ফেরী করা মানুষ ঘরে ঘরে ঘোরে। মোড়ে প্রথম সাইকেল আসে। চৌধুরী সাহেবের সাইকেল। যুদ্ধ শুরু হইলে বড় সড়ক দিয়া পাকিবাহিনি এড়াইয়া চলিলে হঠাৎ গোলা আসিয়া পড়ে। পরে দেখে সে বিপদের সম্মুখীন। খালেবিবি তাহারে তখন উদ্ধার করে। হবিবর রিফুজি তখন বেশ মৌজে থাকে। থুলথুলা হয়, তাজা কুত্তার নাকান। তারপর চৌধুরী কী করেন বিশেষ কূল-কিনারা থাকে না। শহরের দিকে ফেরেন। পলার জন্যই নগরবাড়ি কিনিয়া লন। যুদ্ধের পরে হবিবর রিফুজির দিকে তাকালে, তাহার শক্তি-সাহস বাড়ন্ত মনে হইয়াছিল। গলা কর্কশ। এক অদরকারি জায়গায় তখন তাহার বাড়ি। লোকে বলে, সে বাড়ি করি আছে। এ জায়গায় সে কেন, কীভাবে এখানে সে আসে বা বসত গড়িয়া স্থির হইছে— পলা জানিত না। শুধু লোকমুখে কিছু প্রচার আছে। যেখানে প্রায়শ কানে আসে খালি বান্ডিল টিনই নয়, অনেক সোনা-দানাও আছে রিফুজির গৃহে। যুদ্দের সময় সব হাতাইছে ওগুলা সময় গেলে আস্তে আস্তে বাহির হবো। যেমন আটফুটা বার ফুটা টিন বাহির হইছে তেমন। কুত্তার লাকান লাত্থি-গুঁতা খাইছে, তাও এলাকা ছাড়ে নাই। আল্লায় এহন সুখ দেছে। এই এলাকায় পলারা অনেককাল নয়, তারা তো মধুমতির সন্তান। কখন তা! সে জানে না। বাবার সেই বজরানৌকো নিয়া এই শূন্য ঘরে যে সুন্দর চাপিয়া আসিয়াছিল তখন সে ভীষণভাবে আছিল লাকসাম ফেরা ভাগ্যগড়া দুখি যুবক।

পাঁচ.
পলার একাকি অবস্থানে এসব স্মৃতিমাখা সময়ের গল্পগুলা এখন তার সময়কে অধিকার করে। অশেষ আনন্দ দেয়। নিজেকে সেঁধিয়া রাখে। কলি বেগম কেমন আছিলেন? সত্যিই কী তিনি শেষমেষ ওই গ্রামে ক্ষমতাধর হইয়াছিলেন। একপ্রকার নিজের সঙ্গেই তার মিল হয়, কলিই বুঝি তার মনে কলি। পলা খাইতে বসে, আয়নায় মুখ ফেললে আজকাল অনেকবারই কলিদীদুর কথাই মনে হয়। সে তো তার দীদু। বাবা প্রায়শই এই দীদুর গল্প বলেন। দীদুর প্রাণ তার বাবার সাথে গাঁথা। মোনাইল গ্রামের ভোরটা মোরগ-ডাকা ভোর। আশ্চর্য সেই প্রতিটি সময়! ভোরের আযান পড়ার আগে চালাপ্রাচীরে মোরগ বাকে, কী চকচকা সে মোরগ! বেশ ঝালর চড়ানো, চিকচিক রঙ তার। যখন সে বাকে তখন ঢেউ উঠিয়া আসে গ্রীবা উঁচিয়া, লেজের মতো ফড়ে ঢেউদোলা দিয়া পুরুষালি বর্ণ ধারণ করে। সান্নিধ্যে মুরগী পাইলে সে বোল তোলে আর চরকি পাকে ঘোরে, কুয়াশা শীতে এই মোরগটাই আযানের ডাক তোলে, টুপ টুপ কুয়াশায় হ্যাজাকের ক্ষীণ আলোয় একটা রশ্মি বিলাইয়া দেয় ইঁদারার চতুর্দিক দিয়া। কেমন একটা রাখালি সুর ঠাণ্ডা প্রভাতে তখন ধাইয়া আসে, নীরব নিস্তব্ধতার ফাঁকে সে হনহন করিয়া দৌড়ায়, আমলির পাথার, জামগাছ, পাকরি আমের গাছ, শিরিস গাছ আরও কতো কিছু পেরিয়া অনেকদূর হয় সে বাঁশীর আওয়াজ :
কাছে পাইবা না রে হায়
কাছে পাইবা না…
হায়রে আমার নশ্বর রে হায়
হায়রে আমার মন (২)
নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়া সশব্দে এক ঝাঁপি আলো, কুপির ডগায় থির হইলে পলার চেতন ফেরে। কে যেন আসিয়াছে। বাইরে প্রচুর শব্দ। কানকানি করছে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, এখনকার সময়টা এমন নয়, কিন্তু এমন কেন? দোতলার সিঁড়ি পেরিয়ে থকথকে হৃদয়টা কঠোরতার দিকে নিয়ে যায়। যেন শার্টার পড়ে গেল মনের ওপর। কৃত্রিম কলকণ্ঠে দোতলার কড়িডোরে দাঁড়ায়। এই আছের! ওখানে কী? নগরের রাস্তাটা এ বাড়ির সম্মুখে বেশ সোজা। সদর গেটের সম্মুখেই সদ্য বসানো বিরাট ইলেকট্রিক পোল। তার নীচেই ঘটনাটা ঘটেছে। নতুন তারে চিকচিক চান্দ্রআলোয় কাক আসে, পলা দেখছে। নতুন আলোর নাকি ঝলকানি তৈরি হবে। সুইচে জ্বালবে আলো। কিন্তু ব্যতিক্রমী ঘটনাটা আছের যেভাবে পরে বয়ান করেছিল, তাতে তার ভয় বা কষ্ট দুটোই ছিল। এই আছেরই শুধু তার আরামঘর পর্যন্ত যেতে পারে। সে বলে, পরে কমু, আপনে ঘরে যান। পলার একাকি জীবন আর এই বাইরের ঘটনায় অনেক তফাৎ। সে রেডিও খোলে, বিবিসির খবরে কান দেয়। বাইরে হ্যাজাগ নেই। তেল ফুরানোর পরে আর ঠিক করা হয়নি। কুপির আলোই শিখা প্রদীপ্ত করে তাকে আলোকিত করছে। কই, কোনো খবর নেই রজতের। ঢাকা, কলকাতা, হংকং আর কোথায় কোথায় তার কাজ থাকে। ওই পৃথিবীটায় তার হঠাৎই আগমন। যে কলিদীদু আর মোনাইল গ্রাম সেখানেই সে তাকে প্রথম দেখে, তখন সেই মধুপূর্ণিমার রাত আর যশোরের নামকরা যাত্রাদলের ‘জল্লাদের দরবার’ মঞ্চস্থ হওয়ার খবর পায়। সেই মঞ্চের এক কোণায় রজতও আছিল। দুনিয়ার রোশনাই যেন ঠিকরে পড়ে সেখানে। ভরা বাতিতে কোমর দুলানো নর্তকী কণ্ঠশীলন তপ্ত করে তোলে। সময় আর কর্মসংযোগের মুহূর্তগুলা অনেক মানুষের হৈরৈ আর চমকপ্রদ মুহূর্তগুলা দীপ্তিমান করে তোলে। সড়কি আওয়াজে তখন কে যেন পুরনো হিন্দি গান ধরে আসে। প্যান্ডেলের ভীষণ পুরাতন সে মুহূর্ত অনেককাল স্মৃতিবন্দী হয় পলার ভেতরে। সাথে রজতও। কই সে রজত। বাইরের গুলতানি কিছুটা কমিয়ে আসলে ক্যামিজলের ঝুলন্ত জাফরিতে হাত নাড়ে, আরও অশেষ হইয়া ওঠে। সাথে এখন তুচ্ছ একটি বই। ফেনেগানস ওয়েক। কীসব যে লেখা। মগজের তাবৎ বুদবুদ ওতে গেথে দেওয়া হয়েছে। মগজের চিন্তাগুলা কী এমনই। এতোই এলোমেলো। রজত আর ওই প্যান্ডেলের অন্য মানুষদের সঙ্গে শ্রেণিগত ফারাক যেমনই হোক— ওদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ চিরন্তন ছিল। ফড়িংয়ের রোদের মতো মায়াবী সব অন্তর্জাল। ভেতরে মর্মকুসুম। ঝেড়ে আসা অপেক্ষমান বৃষ্টির ঠিক পূর্বমুহূর্ত। তারপর ডগডগ আওয়াজে খুব নীচু দিয়া কপ্টার কী যেন পাতাঝরা পত্র ফেলিয়া যায়। ঠিক ফাল্গুনের দিন যেন। প্রস্বেদনের কারণে হলুদ পাতার বোটা ছাড়া মগ্নতা। তাতে বিচ্ছিন্নতা আছে কিন্তু কান্না নেই। ছিন্ন ভিন্ন রঙ সর সর রুক্ষ্ম হাওয়ায় পায়ের কাছে নুয়ে যায়। তেমনই ওই মধুমতি, পশুর আর খালিশপুর নিউজপ্রিন্টের কাগজ উড়িয়া আসে, ধানক্ষেতে আর প্যান্ডেলের ভেতর। ‘উড়–জাহাজ থাকি কাগজ পড়চে’- রজত একটি হাতে নিয়ে পড়ে শোনায়, ওহ দেশ গড়ার আহ্বান, কোদাল ধরার আহ্বান, বয়স্ক শিক্ষার আহ্বান। তখন ওসবের অর্থের চেয়ে কপ্টারের ফাটা আওয়াজ, ধেয়ে আসা কলমিবাতাস আর জলপাই রঙের অনেক খরখরা যন্ত্রপাতি আকাশে ভাসতে থাকে এবং তা কাছে চলিয়া আসে। ওড়ে, বিশাল ঘূর্ণিতে, পটপট আওয়াজে, মুখ নামাইয়া তীরবেগে তা উঠাইয়া লয়। রজত খুব দ্রুত এসে পলার কণ্ঠ চেপে বলেছিল, বল লোহা কীভাবে আকাশে ভাসে। হাঃ হাঃ, সেসব উত্তর কলাপাতার বুকপিঠ ভরে কবেই ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে। পলাতকা ছায়ার ন্যায় আমবাগানের তারে বা অন্ধকারের ঘুলঘুলিতে লটকোনে লটকাইয়া হারাইয়া গিয়াছে। প্রচুর পাকাপাতা আর শুকনা পাতার ইঁদুর আওয়াজে সম্বন্ধহীন মিলাইয়া গিয়াছে। তাহারা ফাঁসিয়া যায় সময়ের ভেতরে, দুরন্ত সাহসে আর ভরা অভিমানের খেয়ায়। তখন সেই লয়েই গড়ে ওঠে দুমদুম শব্দ। আছেরের পা তাহাতে মেলায়। অপার আহ্বানে ছন্দ তোলে। হুড়পাড় কইরা কয় ‘কাটামু-ু’। কম্বলের উষ্ণতা ছেড়ে পলা ক্যমিজলের ভেতরের মাংসপি- অনায়াসে স্তননের তরে কয়, মানে? হ আপা! বিস্ময়কর। এ পাড়ায় কী সমস্যা আবার? তাই কী মানুষের এতো কানাঘুষা। কিন্তু কীসের তা! ভয় তীব্রতর হয়। বিশ্বস্তরূপে ঘরের আসবাবের দিকে তাকায়। তাতে অর্থ তৈরি নাকি ভয় তৈরি নাকি মায়া তৈরি নাকি দামেস্ক নাকি সীমার ব্রাহ্মণ একের পর এক ফোরাতকুলের পাড়ে দাঁড়াইয়া যায়। ক্রন্দন নয়, অসহায়ত্বের পাহারা আসে। আছের কাটামু- নিয়া আবার কী বলতে চাইলে, সে ইশারা করে, কম্বল জড়াইয়া পঞ্জটাসহই পালঙ্কে ওঠে, গায়ে জড়ায়, বলে লাইট জ্বালা আরও, ওখানে দরোজার পাশে দাঁড়ায়।
‘পটাস করি লাত্থি দিয়া চিৎ করি ফ্যালা’— কে করে এইসব উচ্ছৃঙ্খল উক্তি করে। কারণ কী। তীব্রভাবে কানে হাক দেয়। তখন এসির বাতাসটাও গরম বোধ হয়। কিছুটা হরর ছবি চলছিল পলার এলইডিতে। সোফার পাশে খাবার আর মোটা টানানো পর্দায় বার বাই পাঁচ এ রুমটাতে একপ্রকার ভূমিকম্পই ওঠে। আছেরের ডাক আসে। পলা জিন্সটা পরে নেয়। গলায় ওড়না টেনে নেয়। নীচে নামতে প্রস্তুতি নেয়। এর মাঝে আবার চিক্কুর বাড়ে। বাইরের পরিবেশটা ততোধিক গুমোট হয়ে ওঠে। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। পুড়ছে সব। বাইরের দিকে আসতেই প্রচুর হল্কা তাকে ঘিরিয়া ধরে। একপ্রকার আগ্রহ থেকেই পলা নিচে নামিতে চায়। মরা বটগাছের পাশ দিয়া আসিতে চায়। এ জনমে মানুষজন ছাড়া, কোলাহল না করে অনেকটা সময় পার করলেও পেছনের জীবনের যতো বিস্তৃত কোলাহল তা তো হাতছানি দিয়েই ডাকে তাকে। সেখানে তো অসন্তোষ নাই। তার হাসিই পায়। একলা জীবনে ওসব উপভোগ চলে। সেই হবিবর রিফিউজি বা কলিদীদু যেন এক বিরাট হস্তীদেখার গমক গমক আনন্দ। বটতলার সেই হাতী দর্শনের দৃশ্য এখনও চোখের সামনে তরঙ্গ তোলে। হাতীই দেখছিল সে টিভিস্ক্রীনে। হাতীর পাল, হায়রে গজদন্ত… গজ… গজ, সেই গজ মেয়ে লিজার নাকি আজও বিয়া হয়নি। ঢাউস শরীরে কোনো এক সকালে ভোরে স্কুল বারান্দায় সে শিউলী ফুল কুড়ায়। তখন প্রকাশ তাহাকে দেখিয়া কয় ‘ক্যারে… এতো ভোরে তুই এটি ক্যা!’ সে কইছিলো ‘হামরা খুজতিছি, শিল্পি ফুপুক’। পরে শোনা যায় সে তাহার প্রেমিকের হাত ধরিয়া রাতের আঁধারে পলাইয়া গিয়াছে। হায় সে কে, তাহা তো এখন সে জানে। আর বুনো ঘাসের ফলনে এক তুমুল তৃপ্তির ভেতরেই এসব বায়না তাকে ছেকে ধরে। ‘নাইমেন না’— আছের বাধা দেয়। খুব খারাপ অবস্থা। রক্ত আর রক্ত। পুলিশ আইছে। কিছুক্ষণ আগের কাটামু-ু বিষয়ক তত্ত্ব কানে চাপিয়া আসে। ফর্সা শরীরে তখন তারও রক্ত জমে যায়। আছের… তুমি দজ্জা লাগাও, আমি যাবো। না আফা নাইমেন না। আরও কিছু হইতে পারে। আরও কিছু…কী! বীভৎস এসব দেখে তার হাত কাঁপে, পদস্ফীতি ঘটে। নেমে আসে। রাস্তাটায় লোকরণ্য। ইলেকট্রিক বাল্ব টিমটিমে। সে ঠেলিয়া দাপটের সঙ্গে সামনে চলে। তখন সে শোনে কুচকুচে কালো মোটা খালি শরীরের একজন খুব কর্কশ গলায় স্ল্যাং বলে। এতোই বিরূপ যে ভেতরের দশা ওখানে তিষ্ঠানো দায়। পলা ফেস করতে পারে না। সমস্যাটা কী তারও কিনারা করা যায় না। সবাই অশিষ্ট হয়ে উঠেছে। এ-কী কোনো রাজনৈতিক ব্যাপার, না পূর্বসূত্রের পারিবারিক কোন্দল। তখন পাশ দিয়া হরিবোল ধ্বনি ওঠে। একটি অংশে টুংটাং আওয়াজ হয়। শ্মশান যাত্রায় গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষ নির্ধারিত ছন্দে হাঁটে। ওপাশে চীৎকার শোনা গুঞ্জরন। কুকুর নির্ধারিত ভঙ্গিতে লেজ দুলায়। কিছু ইঁদুর এখন স্ল্যাবের নিচে ড্রেনে কী উদ্দেশে যেন ছুটোছুটি করছে। পলা বাইরের ফাঁকা জায়গায় সরে এলে দেখে আরও পরিচ্ছন্ন পোশাকের দারোগা এসে নামছে। ঘটনার ময়না তদন্ত হবে। একজন নারী হত্যা হয়েছে। সে অন্তঃসত্ত্বা। আঁধারের টুকরীতে ছিল ভ্রুণ। সে রক্তজবা। রক্তলাল হয়ে উঠেছিল। সেই রক্ত আরও প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাইরে ছড়ালো। বাইরের দূষণে বীভৎসতা লাল হয়ে ক্রমশ কালিমায় পর্যবসিত। কালো রূপটায় এখানে আরও দাঁড়ানো। সমাজ ওটাকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়াছে। ফলে তার এ সুন্দর-করুণ পরিণতি। কিন্তু ভেতরের কারুণ্যটুকু কী? পলা আরও অবসাদ ও ত্রস্ত হয়ে ওঠে। একাকীত্ব আর অনভ্যস্ত চিন্তার ভেতরে এক সময় সে নিজেও ঝুর ঝুর প্রকৃতির অংশীদার হতে থাকে। কী এক বাসনার সীমা ঘিরে ধরে। বুকের ভেতরে শীৎকার জমাটবদ্ধ হয়। মেঘও তৈরি হয়। মেঘলা আকাশে এক পরদেশী আবেশ ভেসে ওঠে। পলার শিরায় তখন আনন্দের উদ্গম ঘটে। একি ওই রক্তবীজের ধারণা নিয়া তৈরি। আছের আবার ডাক পাড়ে। হু হু হাওয়ায় হিমালয় বা তক্ষ্মশীলা কিংবা উজ্জয়িনীর পাড় কাঁপতে থাকে। তখন ওপার থেকে পুলিশের পিটানির শব্দ আসে। তখন হাত বাঁধা এক পুরুষের দোদুল্যমান দেহ দেখে। বাড়ির খরগোশবাচ্চাসমূহ বিদ্ বিদ্ করে তাকায়, ফুচকি মারে। ওপাশে মুরগীর ঘরে কুই কুই শব্দ আসে। শ্যাঁওলা ধরা প্রাচীরে প্রচুর জোনাকী ওড়ে। সুপুরির সারিতে ছায়া দোলায়, তখন ওই ঝুলন্ত দেহটিও আলো-ছায়ায় দোলে। মাথাটাও দোলে, ঝোলে, সুপুরির ছায়ার ভেতরে আলোও দোলে, খেলে, হাঁটে, চলে, ছড়িয়ে পড়ে, এগিয়ে চলে পলা, সেও দেখে, সেও কী দুলছে কাঁপছে, হাঁটছে কেন? নাহ ওদিকে খরকোশ আছে, ওর চোখ মাথা আছে তা জ্বলে, কুঁৎ কুঁৎ করে আর কান উঁচু করে ঝাপটায়, সময় খরচ করে। জ্যৈষ্ঠের গরমটা পেকে এখন দূরের মেঘ প্রভঞ্জন তুলছে। একপ্রকার গরম ভাপ তাতে। কালবৈশাখি কী? কোণায় কোণায় বিজলীরেখার চোখ রাঙানি ঝুলছে ওয়াও শব্দে মারপিটও জোরালো হয়। মেঘ না বাতাস নাকি ওই লম্বা সুপুরির সারির ছন্দদোলা নাকি চিক্কুরের ভেতরে কোঁকড়া পাও ঝোলে, লাঠির ডাঙে ক্যাকায়, পলাকেও সেগুলা বেভুলো করে তোলে, সম্বিৎ ফেরে অচেনা এক বাউল তখন ছড়ানো গলায় নিশ্চিন্তে বলে যায়Ñ আমি মরিয়া হইবো শ্রীনন্দের নন্দন তোমাকে বানাবো আধা। উফ, টক করে পলার কানে ওঠে সুরটা। সে ফেরে নিজের ভেতরে, ওই যশোরের যাত্রাদলের মোঘল রাজমুকুট, দারুণ প্যাঁচানো মঞ্চ, হ্যাজাগের আলো আর ব্যাটারিতে চলা উঁচু লম্বা তিনকোণা টাওয়ারের মাথায় আলো জ্বলা রঙিন বাল্ব। কী দুম দুম সব আওয়াজ কানে আসে। ও কি মাইরের আওয়াজ নাকি প্যান্ডেলের ভেতরে দারোয়ানের থপথপ চলার আওয়াজ। কড়া ক্যাপ্টেন। মোটা লাঠি নিয়া ডাঙায়, টিনে বাঁশে কখনোবা ধান কাটা কাঁদা শুকানো উঁচুনিচু ভূমির উপরে। গুছির শেকড়ে মাইরে উপড়ে ওঠে, নাহ, ওতো ক্যাপ্টেন নয়, পুলিশ মারে ওই রক্তমাখা বাড়ির অপরাধীরে, ঝুলাইয়া ঘুলিয়া ওঠে মনপবনের নাও , দাবড়ায় আরও দূরে টিমটিম আলোতে প্যান্ডেলের ভেতরে বাঁশ দিয়া ঘেরা ফান্ট কেলাস সেকেন্ড কেলাস কেউবা থরে থরে উপরে ওঠে, বেশ উঁচা টোঙ, কষ্ট আর ক্লান্তির ভোর তাতে কাটে না, দূরে নায়িকা দৌড়ায়, ভাবিয়া সরোজ কয় ঐ কৃষ্ণ ফদ প্রেমেরও মায়া ডোরে বান্ধিও বান্ধিও। পলা তখন অনেক মানুষের ভেতরে প্রবেশ করলেও তার মধ্যেই সে দূরে পেঁচা ও ঘুঘুর ডাক শুনতে পায়। কেন ঘুঘুর ডাক, রাতে তো তা হয় না। না উহা অন্য ডাক, অন্য আহ্বান। তখন বুলবুলা শরীরে কে যেন হাত দেয়। আলোআঁধারে টোনা দেয়, একটু চাপও অনুভব হয়। খুব নরম শরম মিশে গাঢ় ও ঘনানো অনুভূতি প্রলেপ জড়ায়। সে প্রলেপে ঘি না ননী… না ননী নামের অনেক পুরনো মেধাবী ছেলে এ পাড়ায় আছিল। সে খুব অংকের ভালো ছাত্র। সেই কবে টুক করে মরে যাওয়া বাবাটা বলতো ও অঙ্কের ভালো ছেলে, ও গণিত নয় শুধু ফিজিক্স ভালো পারে। সেই ননী এসেছিল, তাহার কাছে। আব্বাই ওকে লাই দেয়, প্রশ্রয় দেয়। খুব কঠোর মন ওর। গায়ে কম দামে কেনা রঙচটা ব্লেজার আর একপ্যান্ট ও চটি পড়ে আসতো। ননীই সুন্দর অর্থ করতো চাঁদ-সূর্য আর জ্যোৎস্নার। নাহ, ননী এখানে কেন, সে তো কতোকাল আসে না। বাবা তাকে নতুন উইংসাং কলম দিয়াছিল। রঙও মনে আছে। ওটা কী রঙ যেন! পিংক কালার বুঝি! খুব যতœ পেত, ফলে আরও ভালো লেখে। ওটা কলম না আরও অন্য কিছু, বুক পকেট বা নখকাটা হাতে যখন পিং পং করে মজা লাগে। মামা কইছিলো উইংসাং কলম দিয়া পরীক্ষা দিস, আরে ওটা তো কাগজের ওপর উড়–জাহাজের নাকান দৌড়ায়, তিন ঘণ্টা ক্যা আড়াই ঘন্টায় তোমার পরীক্ষা শ্যাষ হবি, আর পায় কেটা! এখন সাপ্লাই ঠিকমতো হলি হলো। তয় তোমার ননীক দিয়া এ কাম হাবানায়। কিন্তু ননীই কী এখানে এতো ভীড়ে শরীর টেপে, ধাক্কায় আরও টেপার সংবাদ সকলেই বলে কে টেপে নজিমা, করিমা, জয়নব, আরও মেলা জন, সবাই টেপার রস অনুভব করে। তখন পলা বাবাকে ধমকায়। ক্যান ননী টেপে? হাসে এবং কইতে থাকে দেখ ওর মতো ছেলে হয় না। নীতি আর আইন ওর ধর্ম। ও তোমারে টেপে নাই, পার নাই তাই গালে দিয়া মারছে। ঠিক করছে। এতই কিছু যদি শিক্ষণ হয়। তখন বেলা গড়ায়। আরও অন্ধকার হলে ননী চলিয়া যায়। কিন্তু বিজলী পরাস্ত হইয়া দড়দড় বৃষ্টির ফোঁটা আসে। ঝড় নাই কিন্তু একসাথে মেলা ফোঁটা পড়তে শুরু করলে, সবাই সরাসরি করে, টেপার আরামও চলিয়া যায়। পলা চমকে ওঠে, আরে আছের কই? সে দ্রুত বৃষ্টির ফোঁটায় কিছুটা গা ভেজাইয়া বড় গেট পার হইয়া প্রচুর কড়ি ফুল আর পাতলা লম্বা চিকন পাতা ছানাইয়া বাড়ির সামনের সরু রাস্তা দিয়া এক ধাপ সিঁড়িতে ওঠে। হুল্লোড় করে আছেরকে ডাকে। কইরে… কই থাকিস! আরও ঘোর বরষা অবিরাম হলে, ফোঁটাগুলা হুল ফোঁটায় পরিণত হয়। হুলে অনেকে এলাকা ছাড়ে। যে গম গম ছমছম ভয় ছিল সর্বত্র তা ঝেটিয়া বিদায় করে ফোঁটাসমূহ। ফোঁটার তেজ আরও বাড়ে, আরও তীব্রতা ছড়ায়। কণ্ঠধরা হয়। প্রলাপন ধামে। কিন্তু ননীর টেপার অনুভব যায় না। কেমন রাগ-ভৈরব কাছটান করে। হায়রে ননী। পলা এখন জানালাটা ছেড়ে দেয়। হনহন বৃষ্টি তাকে ডাকে। মৃত বাবার শরীরে এখন কিছু নাই। টপটপ করা বৃষ্টিতে সরে যায় নীরবে দাঁড়ানো গোরস্থানের ধূলিকণা। বাইরের হাওয়ায় ভর করে বাবার সাথে ননী ঘরে এসে ঢোকে। হ্যাঁ, আজ দুপুরের খাবার কী? মুগের ডাল মুড়িঘণ্ট আছে তো! ননী বসো বসো। মা মা বলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়তেই বড় পর্দায় আরশোলা আর টিকটিকির ধরাধরি শুরু হয়। তাতে ভেলকিবাজিটা মজার লাগে। এই ভেলকিই কী জীবনের রূপ? সবাই কী ভেলকিই করছে। কই, টিকটিকি বা আরশোলার তো কোনো বিকার নেই, তবে জীবনটা কেন ওদের মতো প্রতীকী হয়া উঠছে। নাকি সব ওতেই আটকি গেল। পলার বৃষ্টির ছন্দ আর ওসব তুরুক তুরুক খেলা বেশ একরেখায় চলে। হাওয়া ওড়ে। ভেসে আসে বৃষ্টিধোয়া শীতল বাতাস। দৌড়াতে থাকে ডাঙ খাওয়া চোর। সে কি ছাড়া পেয়ে হাসে আর কয়, মাগির এরপর হবি! জানি না সে কী কয়। কার কথা কয়। কেন সে এমন রূঢ় হয়ে ওঠে। পলাও তো কিছু কবার পারে না। সে শুধু শোনে আর বৃষ্টির ফোঁটার নাকান তওবা পইড়ে দাঁড়াইয়া রহিয়াছিল। আর তাই কী! ননীর টেপার জন্য সবকিছু করছে। চলবো না। পলা তুই তোর বাপের মতো হস নাই। কিছু পাস নাই। তয় মায়ের অনেক কিছু আছে। তার তো মাসকে মাস খবর নাই। বিটিক নিয়াও ভাবনা নাই। এভাবে আবার তপ্ত পলা ভেলকিতেই গড়াইয়া পড়ে। হাপিত্যেস নয়। গোটা শরীর জুড়ে বৃষ্টির ভরম পেয়ে বসে। বৃষ্টিটাই বুঝি সবকিছুর জন্য দায়ি। সে তুচ্ছ করে, কর্মনাশা করে। সে যে গুণ গুণ করে গান গায়। সে গানের রেশ বৃষ্টির ছাঁটে বাউল রূপ ধরে। চলে কী এ সময়? পলা অর্থ পায় না। তবুও ননীর আকর্ষণ টের পায়। ননী আসছে, চুম্বনে চুম্বনে ঠোঁট শানিয়ে নিচ্ছে, স্তনে স্বনন তুলছে, বাতিতে আলো দিচ্ছে আর অপার করে দিচ্ছে তুমুল করা অনেক সময়। অনেক রকম উপভোগে সে সোনার মানুষের কথা শোনায়। তখন নাকি কোন ভোরে এক মহানায়ক হত্যা হয়। এই কী ভবিষ্যতের দায়। তাহারে না মারিলে, কিছু নষ্টের সীমানা না তৈরি করিলে সৃষ্টি হয় না, তখন ইটের ওপর খোলা কোনো নির্মিয়মান ভিটায় উঠিয়া পলা দেখিয়াছিল পুবের তীব্র বাতাস আর লেকের পাড় জুড়ে ত্রিপলে আটকান অনেকগুলা লিলিপুট মার্কা মানুষ। তাহার মধ্যে শেখ এক কেমন মূর্তি ধরে। সে গালিভারের ভূমিকা নেয়। অনেকরকমে বাঁধিয়া ফেলা হইয়াছে তাহাকে। সে চীৎ হইয়া কয় এদেশে ডিম ভাঙা নিয়া যুদ্ধ হইছে, সকলে মিলিয়া আমারে মারিয়া ফেলার কায়দা চলছে কিন্তু মনে রাইখ : এই দেশ মুক্ত হইবে। তারপর লেকের টল টল পানিতে তাহার মুখ আঁকা হয়। সেখানে পসরা সাজিয়া বসে অনেকেই। শেখ সেখানে হাঁটেন আর ভাবেন শেরে বাংলা বা সুহরাওয়ার্দী এবং আরও কেবা কইছিল তখন, তুমি হইবা এইদেশের মূল নায়ক। বাঙালিরে স্বাধীন দিবা, কইবা শাসনের সমান জিন্দার ব্যাখ্যা। তা ছড়াইবে মধুমতীর হাওয়ায়, ভেলকিবাজির নাহান পঙ্গর দিবা পদ্মায়-ভাঙ্গায় আর বহুকালের কোনো গম্বুজের তীর মাথায়। তোমারে তাই সাজনের দরকার। সাজিলে তোমাকে নবাব নবার লাগে। তুমি নতুন নবাব। তোমার জন্মলাভ এদেশের ভেতরে ভোর আনিয়াছে। তখন কেউ হাসে আবার আড়ালে কান্দেও। গাও গেরামের মানুষ নবাব ডাকে, এক নজরে তাকাইয়া কয়, সে কী করে তার লগে আমরা সগলে এক থাকি। অনেক লোক পালা হয় তাকে দেখার জইন্যে। সে বড় গলা কইরা কয়, আরে পাকিরা যাইব গিয়া। কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না। এক থাকেন সবাই। পাড়ায় পাড়ায় সজাগ করেন সকলকে। ওই শামসুল ডাক্তার, হোসেন মিঞা আর ওইপাড়ের গোলতার সর্দার এক হওনের পরামিশ নেন। বেতার শোনেন। স্বাধীন বাংলা বা আকাশবাণী এইসব, বাইরের। সেই হাওয়া তখন নানা রকম হয়া জায়গায় জায়গায় ছড়ায়, একটাই কথা তিনি কইছেন… তাহা ব্লিসিং— বাণীরূপে ছড়াইয়া যায়। ছয়দফা এগার দফা নিয়া তারে তখন ঠেইসা ধরে শাহবাগের সামনে। পঙ্গর দেওয়া মানুষের মেলায় ভাসে নানা আওয়াজের শব্দ, হাল্কা-পাতলা, ভারী-শক্ত, কমবেশি আরও। পর্দা ফাটনো চীৎকারও। শুধু সাঁতরায় আর হাত টানে নেতার কাছে যাওনের জন্য উৎলায়। কী হবে, এবার কই যামু, লীডার কন, ভালা কইরা তাকান। দুলা, মহিরা, বায়েজীদ, আকাশ, আনোয়ার, খালেদ, তাহের, শওকত, মঞ্জুর, হায়দার, জিয়া সবাই নেতার ছাতার তলে দাঁড়ায় আর হৈ হৈ রব কইরা তাকায়। আশেপাশে অনেক চ্যাংড়া নেতাও থাহে কিন্তু কাররো পরামর্শ কামে দেয় না। সবাই একমুখে তারে তাকাইয়া কয়, শেখ, আপনি সবার নেতা কিছু পরামিশ করেন! বিশাল বুকে তখন কী যে কান্না আসে, মধুমতীর হাওয়ায় ওড়ে পরাণ, পদ্মাপাড়ের রেণু ডাকে, শুনশান বত্রিশ নাম্বারে কী যে এক গরম খরা তোলপাড় তোলে, লেক এরিয়ায় ওড়ে বাদুড়। এভাবে অনেক অনেক সময়ের ঘটনা বাপের কথার তোড়ে বড়বড়া হয়া পলার কোচড়ে আছড়াইয়া পড়ে। ওম ওড়ায়। কচিকাচা সৌন্দর্যে সুখ সৃষ্টি হয়। ওতে মাতৃত্বও ভর করে। কতোকালের মর্মমাখা মা, মমতার ধারায় দ্রৌপদীর অগ্নিজন্ম হয়া ওঠেন। এক বিরাট অগ্নিস্ফূলিঙ্গের ভেতরে জন্ম নিয়া সমস্ত সন্তাপ তিনি ধারণ করেন। তার তার গড়ন, প্রকৃতির ভেতরে আস্বাদন আর তাতে স্বয়ম্বর হওয়া। পুরুষের গ্রহণ কী তাহার জীবনে এতোই কাম্য ছিল! কতো রাজা, রাজন্য এ কূল ভাঙেন অন্য কূল গড়েন, তাদের বীরত্ব বা শৌর্য একসময় বিবির ভেতরেই প্রকাশিত হয়। যুগে যুগান্তেরে দ্রৌপদীরা সেভাবেই রাজাদের সম্মান সূত্র পয়দা করিয়াছে। দ্রেীপদীর স্বয়ম্বর সভায় অর্জুনের জয়, কর্ণের পরাজয় সুকঠিন হইলেও দ্রৌপদী বাধা আছেন অলঙ্ঘনীয় কুন্তীর আদেশে। কুন্তীও মা, মায়ের আদেশেও বিরাজিত ওই পুরুষধর্ম, সেও পূর্ণরূপে কামকামিনীর ধারায় পুরুষকে অধিকৃত করে, যাহা দ্রৌপদীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রুচি- সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে এক শয্যাশায়িনীর অভিনয়। ইহাতেই নারী প্রকৃতিগর্ভা। সেই সুখে ভোর হয়, রোদ ওঠে, স্নানবসনার গন্ধ রচিত হয়। আহা! সে সুখ, সকলেই তাহাতে নির্বাপিত, সেই নির্বাপিত স্মৃতিতে পলা নারীরূপ পাইয়া বসে। সে দেখে সমস্ত প্রকৃতির রূপ তাহার শরীরে ধৃত। সে আর বালিকা নয়। রমনী শ্রম অধিষ্ঠিত। যখন বাবা আসিয়া দাঁড়ান বিরাট দরদালানে, তখন তার নবাবী চালে জন্মআধার ঘনিয়া আসে— পলা তাহার সেই মা, সে নতুন করিয়া কীর্তিস্বরূপা, কীর্তিনাশার কীর্তন গায়। বাবা নৌকা চালান, বৈঠায় তরঙ্গ তোলেন, যৌবন ভরমিয়া ওঠে— ভরা মধুমতিতে। হায়! ইহা এক গোপালীর অভিবাদন। সে তাহার বাবাকে পুষ্ট করে, গড়ায়, বৃদ্ধির ছায়া দেয়, ক্লান্তি কাটাইয়া কর্ম ঘটায়, সেই নদীর তীর ধরে অনেক আদান-প্রদান চলে, কুলু কুলু নদীতে বজরা আসে, সারবাঁধা সব ডিঙ্গি বহাইয়া যায় আর লঞ্চ বা ছোট স্টীমারে গজারিয়া গজরায়। বাবা, তুমিই জাতি জন্মদাত্রী, জাতির পিতার জন্মক্রোড়ের আলিঙ্গন। পলা বাবাকে তাকাইয়া দেখে কিন্তু ঘুমের গলায় আবেশ ধরায়। একলয়ে শোনায় তাহার বাবার কণ্ঠস্বর, তিনি অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরী। পুরনো একটা সোফার ফাঁকে যে গোঁফওয়ালা বিড়াল কাঁটা চিবোচ্ছে সেও ওসব কান পাতিয়া শোনে। এটি অনেক পুরনো গোথিক নকশার বাড়ি। কার এ নকশা, পূর্ববর্তী চৌধুরী নাকি কোনো হিন্দু জমিদারের, পরে ছিনাইয়া লওয়া, তাড়াইয়া দেওয়া জনপদ। আহা, এই দেশে ইতিহাস খুঁড়িলে শুধু তাড়ানো আর পালানোর ইতিহাস জড়াইয়া পড়ে। মোনাইলে পলার বড় হওয়ার কাহিনি তো সে সূত্রই কহে। সেই উঁচাটন জীনমার্কা কোটাঘরের জেবন, সেখানে তো কাহারও ইতিহাস নাই। কিন্তু বিচ্যুত ইতিহাসের শাখায় ঝোলান তাহার অন্তহীন গড়িমসি কাল পার হইয়া চলে। চৌধুরী তখন কোথায় আছিলেন! নাকি অন্য বীজরক্তে অনেক আগেই পলা প্রত্যূষ দেখিয়াছিল। বাবার কোনো এক বসতির নাড়ীই পলা বহাইয়া যান। অন্তরের আহাজারি তো কঠিন। সেখানে হবিবর রিফিউজি বা দেওয়ালে কতো শ্বাসকষ্টের আওয়াজ লুক্কায়িত, মাঝে মাঝে সে খাঁজ উঠান— তাহাতে ফুচকি মারে অনেক টিকটিকি-গান্ধী পোকারা, কেউ আছে বা চলিয়া গিয়াছে, বংশপরম্পরায় তাহাদেরও আনাগোনা এখনও কম নাই, ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষè আলো দেওয়া জোনাই উড়াইয়া চলে, গড়গড়াইয়া আরও অনেক পোকা উড়ে ধরে, তখন চৌধুরী এক ঢংয়ে প্রত্যক্ষ বয়ান করিয়া চলেন, বিরাট তাহার নাদ, কানে পৌঁছয় শীর্ণ সান্নিধ্য নিয়া, কখনও উচ্চ তারে আটকানো, তাহাতে চকচকে শাদা বেড়ালের চক্ষুতে পলক আসে না, ফুচকি মারে আর আয়েশে চিবায়— সেকি নিজেরে এই দরদলানের মালিক ভাবে, বোঝা দায়। সামন্ত স্বরের হুলো মেজাজ আর হেজাগরঙা শাদা শরীর আর শাদা বেড়াল মিলিয়া ঠুকঠাক আলাপনের পরিবেশ আনে, সেটি ঘরের বাতাসে গুমোট পরিবেশে পলকা ধ্বনিপ্রবাহ তোলে। শ্রোতার কর্ণে দোলায়। অনেকগুলা মানুষ যখন শেখের মুখের পানে চাহিয়া থাকে, তখন সে বুঝি একটু দিশাহারা হয়, বিপুল গগনে ভরা আলোর পানে তাকায়, নিশানা খেঁজে, নিজেই পলকা আশ্বাসে ভেবে নেয়Ñ এইসব বহুত জনতা লইয়া আমি কোন দিকে যামু, আমি ঠিক পথ কী! ঠিক পথে আছি তো! সংশয় হয়, ভয় হয়, তবুও সকলের সম্মিলিত স্বরে আশ্বাস আর আত্মবিশ্বাস জাগরিয়া গলা ধরিয়া লয়— সে গলায় গ্রীবা উন্মুক্ত, টুপ করিয়া কোনো পাতা গায়ে পড়ে, বটবৃক্ষ কোণায় দাঁড়াইয়া কয়, শেখবাবু তোমার কপালে বহুত কষ্ট আছে, তয় মেহন্নত করো কিন্তু কই কিছুই তো হয় না এখানে। পুলিশ আসিয়াছিল, চলিয়া গিয়াছে, যাহার পাপ তার কিছু নাই, মাইয়াডারে কাস্টুডি করিছে। এইডা কী আইন অইলো? ট্যাকা নেছে, আর কাস্টুডিতে রাখছে। কেউ কারো কথা না কইলে শেখ সাহেব উল্টান, পেছন হাঁটেন, একদিন সেখানে চাঁদতারার রহস্য প্রতিবিম্বিত হয়। আসের দেখে, দুনিয়া ফিইরা আসছে। কিন্তু শান্তি নাই কেন? গয়েবানা আওয়াজে একদিন মৌলবি মোহাম্মদ আমির আলী ছাহেব কন আবার এই দেশে আমাদের দল ফিরিবে। কারণ এটা সকলের আস্থার পাট্টি। এতে ধর্মীয় অনুশাসন মান্য করার মন্ত্র আছে। সকলেই সেই ধাঁচে গড়া। কিন্তু নেপথ্যে একজন নেতা তৈরি হওনের কথা। সেই নেতা সব করিবে। শেখের মাথার ওপর চাটি মারিবে। বিশ্বাসঘাতকতার রজ্জু বুনিবে। অনেক বড় ও উদ্দীপনার সে রজ্জু। তাহাতে বাধা পড়ে এই মাটি ভূখণ্ডের জ্বরকাঁপা অসহায় মানুষজন। বাসন্তীর নামে, পি-ব্যবস্থার নামে, নৌবহর আটকানোর নামে কতো রকম কর্ম চলেÑ মানুষ কিছুই জানে না। পাকিস্তান মরিয়া গেলে শাসনের ভেতরে অনেকপ্রকার শাসন শুরু হয়। সুবিধা অসুবিধার তোপে আসেরের বাপ কইছিল ‘এইটা চোরের দ্যাশ’। সেই কিসিঞ্জার মিয়ার নাকান এমন সব উক্তি ছাপড়ার উপরে বসিয়া গেলে অজগরের প্রশ্বাস বাড়ে, অনেকমুখা অন্ধকার হাতড়ায়, দোলায় আলো ফোটা কিরণের ভেতরে চিকচিক ধুলা নাচন দেয়, টর্চের বাতির লাহান ঠিকরানো আলো পড়লে ওপারে তখন দুলির মাওয়ের কাপড় খুলে যায়। সেখানে মোনাইলের আছাদ মিয়ার পরিবারের কেউ ওই জানালার রোদের ওপর তারে ঠেসিয়া ধরে। সে শ্বাস বন্ধ হয়, চিক্কুর পাড়ে, বাইরে কুত্তা ডাকে, অনেকক্ষণ… তখন জল গড়িয়া যায় পলার, সেও কান্দে, হাঁপায়, দরোজার ওপারে আওয়াজ পড়লে দেখে আছের দাঁড়াউয়া কয় —আফা, আপনে ডাকতে কইছিলেন’। হুম! যা এখন। গরম পানি দে! জিন্দা মানুষ এমন কেন! এরপর পলা প্রশ্নের ওপারে নিজের জীবনের অনায়াস মুহূর্তগুলার ওপর নিজেকে খোঁজে। সেখানে জোনাকি-বৃষ্টি-দেবতা-পুষস্ন-ওষ-ত্যালপিঠা-ছাইয়ের কষ্ট ভর্তি। নামানো দেবতারা ওখানে শান্তি দেয়। তারা রোদে পঙ্গর দেয়। তীব্র ঘনানো রোদ মাঝ মাঠে বিলি কেটে প্রচ- বেগে ধাইয়া আসে। পলারে পলা…, বাড়িতে মুন্সী আইছে। আমছিপারা লইয়া যা। মোনাইল এলাকার এই মুন্সী পেটের তাগিদে পড়ায়। কেডা রে! হবিবর রিফিউজির বাড়ির না! হ, কতোদূর থাকি তোরা তামান দুনিয়া মাইরা এই এলাকায় আইছ। বেশ বোল পড়ে, টুপ টুপ করে কানে টঙ্কার ওঠে। হাহাকার নয়, একটানা নিরাশা দৌড়ায়। পলা পিরপির করে এসে দাঁড়ায় বুঝি! হুজুর গাল টেপে, আর এদিক ওদিক তাকায়, অনেকক্ষণ পরে কয় মাতাথ কাপড় টান। কীসের কাপড়! বাইরে বেলকোনিতে কাপড় ওড়ে, পানি পড়ে, সেটানো কাপড়ের ভেতরে কোনো গর্ভবতীর শরীর বা ভেজা ভাঁজ— এসব অনেকপ্রকার গভীরতায় পলার সজাগ দৃষ্টি তৈরি হয়। সে বারবার তাহার অজান্তের আদর্শ অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরীর ছবির দিকে তাকায়। সে এখন তার সম্মুখ দেয়ালে পোট্রেটতুল্য। এটি ফ্রেমে আঁটা বেশ জীবন্ত। হ্যা, তার দিকে তাকিয়েই সময় গড়ায়, ননী গোপালের কথাও মনে আসে। সেও একটা প্রতিবিম্ব যেন, প্রাণপ্রিয় প্রতিবিম্ব। একাকীত্বের প্রতিবিম্ব।

ছয়.
জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ তিনটি সত্য ভাগ্যের অনেকের কাজে দিলেও পলা ব্যতিক্রম। এখন ফাল্গুন মাস। পাড়ায় কার যেন বিবাহের সকল এন্তেজাম চলছে। ওখানে ওর যাওয়া হয় নাই। তবে একপ্রকার জীবনের দাগ রইয়া গেছে। পলা সে দাগটা খোঁজে। রজত আর ননী গোপাল অনেক সময় পার করে। সে রজতকে চিনিয়াছিল রঙের টানা রেখার ভেতরে। আর ননী গোপাল তো বাপের খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন। সেজন্যই তার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। সে আকর্ষণে ছিল না বেশি কোনো ব্যঞ্জনা। অকাট্য কোনো বিষয়ও নয়। তীব্র সত্যে তাহার নগদ যাওয়া-আসা ছাড়া ননী গোপাল আর কিছু নয়। কিন্তু ভেতরের শূন্যতাগুলি মাঝে মাঝে পেখম মেলে দেয়। সে নিজে সাজায়, ঘরকে সাজায় কিংবা নতুন মডেলের কিছু সামগ্রী কিনিয়া তাহাতে সে নিজের মনের তুলনা করে। যাচাই করে পছন্দের উচ্চতা! কিন্তু সমাজের প্রতিরোধটাই তাকে পীড়িত করে। একজন মেয়ের জীবন, মানুষের জীবন নয়। যে সময়ে তার কৈশোরকাল বাবা কোনোরকম মানুষের ভেদে মানুষকে নির্ণয়ের কথা শোনাননি। তাহার সামনে ছিল চার্লস ডিকেন্সের জীবন, কড়া কঠিন রোদের দুপুরে সময় অতিক্রম করে তিনি জানিয়েছিলেন, একলা চলতে শেখার নির্মম সত্যগুলি। কী আছে ওর ভেতরে, সেজন্য মনীষীর জীবনী পাঠ করো। মৃত্যুর আগেও তেমনটি ভাবেন তিনি। মেয়ের জন্য সর্বরকম প্রস্তুতি গড়িয়া দেন। নগরবাড়ির দেউড়িতে দাঁড়াইয়া তিনি মানুষের জীবনকে দেখেন। বলিয়া ওঠেন ‘পলা দেখ, মানুষের কী রসবোধ, সে ঘোড়াকে নিজের সন্তানের চেয়েও যত্ন করে। সেই যেন তাহাকে সাজাইয়া দেয়। আওয়াজ দিলে সে কথা কয়’। মানুষও সেরকম করে, টাকা পয়সা দিয়া মানুষকেও পোষা যায় আজকাল। মানুষতো পণ্য, সে পণ্যের মাপে নিজেকে নামাইয়া আনিয়াছে। মহাপৃথিবী মানুষের মূল্যকে বিক্রি করিয়াছে। মানুষ এখন মূল্যহীন। এই মূল্য পাওনের জন্য মনের চোখে সবকিছু দেখিতে হয়, আপনারে চিনিতে হয়। পলার চোখ ভইরা চল নামে। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই বাবা এসব বলিয়া এই প্রকৃতিতে বৃষ্টি আনিয়াছিল। বাবা কেন চলিয়া গেলেন। পলার মা নাই বাবা নাই, সে তো এ মহাপৃথিবীতে একা এক নারী। সে চাইলেও তো নিজের মতো কিছু করতে পারে না। বেসামাল হইয়া যায়। জ্যেৎস্না দেখিয়া সে কষ্ট পায়। ভোর দেখিলে কোনো এক গোবৎসের লেজ নাড়ানো আনন্দের উপসুখ পাইয়া বসে। ঘোড়া দেখিলে তাহার আত্মীয়তা চেপে বসে। আর বৃষ্টি তো মনে হয় বাবারই তৈরি। কী এক একাকী আমার বাবা। সবকিছুর ভেতরে মাখানো। পলার এই মাখানো বৃষ্টি, তাহার বাবাকে ভাসিয়া আনে, আর কয় কতোকাল তোমার সঙ্গে সাঁতরাইনি, যাইনি সেই জগদল, নাগর উপকূল আর বৃষ্টিতে সেই খোলা প্রান্তরে কাটানো কী চঞ্চল মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হইলে, সেই আত্মসমর্পনের সংবাদ এই খোলা মাঠেই বাবা বলিয়া বসেন। চল আজই দেশে ফিরিয়া যাই। সেই কোটাঘরে বসি। তোর মায়ের নামে মিরাদ দিই। দেখির আশ্রিতা এখনও বাঁচিয়া আছে। কিন্তু কিচ্ছু হয় নাই। বাবা সব থেকে ফিরিয়া নিয়া কন, চল সদরে যাই। সেখানেই বসত গড়ি। এই সেই নগরবাড়ি। কতো সেই যুদ্ধের স্মৃতি ঘিরিয়া ধরে। আকাশবাণীর দেবদুলাল বাবুর কণ্ঠ পাইলেই বাবা তরঙ্গ উঠাইয়া কন, দেখ একটা ফেলাইছে। এসব লইয়া একদিন এই নগরবাড়ির লনে আসর বসে। আশরাফ চাচাসহ অনেকেই আসেন। বাবা মধুমতীর তীরের বাসা থেকেও ঘুরিয়া আসেন। সবকিছু কী আনন্দের উপলক্ষ বহাইয়া আনে। সবকিছু হারাইয়াও যেন স্বাধীনতার আনন্দে ভুলিয়া যান তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা। এরপর এই বাড়ির ভেতরেই গানের আসর বসে। পলা ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে সুপ্ত রাতে’ গেয়ে শোনায়। সে রাতে খুব পূর্ণিমা ছিল। তখন ননী গোপাল আসে। সে তাহাকে ফিজিক্স পড়াতে থাকে। ননী গোপাল লম্বা, ফর্সা এবং ব্যক্তিত্ববান বলিয়া প্রতীয়মান হয়। অনেকভাবে সে মহাজাগতিক রহস্যের ব্যাখ্যা বয়ান করে। আইনস্টাইন বা ম্যক্সপ্ল্যাংক পড়ায়। শ্রুডিংগারও। এস পড়ে সে বস্তুবাদি হয়। বস্তুর দর্শন আর ব্যক্তির কল্পনা এক কইরা সে নতুন কিছু বিস্ময়ের আনন্দ খোঁজে। সত্যের ভেতরের আনন্দই তো মন দিয়া গড়া। মনের বিপুল রহস্য নিয়া সে প্রশ্ন করে, মানুষ যে প্রকৃতির অংশ তাহার সত্যিকারের সৌন্দর্য কী, মনেরই বা প্রভাব কতোটুকু ইত্যাদি দুর্মর হইয়া চলে। ননীর যুক্তি উপস্থাপনে আড়ষ্টতা আছে কিন্তু কথা বলায় সে বেশ পরিপক্ব। ধারণাও অনেক পরিষ্কার। পলা নানাভাবে পড়াশোনার ভেতরে থাকলেও বাবা বলেছিল, ননী তোকে পছন্দ করে। তুই কী বলিস! আশ্চর্য হইয়া যায়। পরে পলা নিজেকে নিয়া প্রশ্ন করিয়াছে অনেক, তারপর সবকিছু থেকে নিজেকে ননকম্প্রোমাইজ বানাইয়া বাতিল করিয়া দিয়াছে। পুরুষ মানুষ নিয়া তার আপত্তি নাই কিন্তু পুরুষতন্ত্র তাহাকে টর্চার করে। সে যে কোনোভাবেই হোক তাহা মানিয়া লইতে পারিবে না। বরং একাকী সমস্ত কিছু উপভোগ করিয়াই সে চলিতে চায়। মকবুলার রহমান চৌধুরী যে ছাঁচে মেয়েকে গড়িয়াছেন, সেখানে আপস শব্দটা অচল, বহিষ্কার হইয়া গেছে বহু আগেই। স্বতন্ত্র হইয়া চলাই তার স্বভাব। কিন্তু পিতৃমৃত্যুর পর সে যেন নারীর পৃথিবীতে একা অনুভব করে। অনেক কাজেই সে জড়াতে চায়। কাজ করার শক্তি ও যোগ্যতা নিয়া তার প্রশ্ন নাই কিন্তু সব পুরুষই একইভাবে নারীকে দেখে। এই বেপরোয়া বিষদৃষ্টি কোথায় নাই। মাঝে মাঝে সে নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, তার মনটাই কী এভাবে গড়া। সে কী আসলে ওই চোখেই পুরুষকে দেখছে। কিন্তু সে সবকিছুর উত্তর পাইলেও এই সত্যটি দেখে এ পৃথিবীতে পুরুষের নারীর সম্মান নাই। পৃথিবীটা নারীরা দ্বিতীয় হিসেবে পরিগণিত। এই পরিগণন থেকে সে কোনো কিছুই বাদ যাইতে বা বিরত হইতে দেখে না। কমোডিটির মধ্যে নারী অবলুপ্ত। বড় বড় কবিরা বস্তুতে বিলীন হন, আর নারীরা বিলীন হন পুরুষে। এর ফলেই পলা একা। সে বিলীন হওয়ার সত্তা নয়। বাবা কীভাবে বড় করেন, বাবাও তো পুরুষ? কিন্তু মেয়ে তো বাবাকে পুরুষ মনে করে না। সে বাবাই মনে করে সেজন্য যে ব্যক্তিটুকু পায়, সেও ব্যক্তি হইয়া ওঠে, জীবনের চাকায় সে হইয়া ওঠে স্বতন্ত্র। পলা, বাবার মৃত্যুকে এক অতিন্দ্রীয় দৃষ্টিতে চর্চা করে। কোনো আকাশগঙ্গায় সে বাবাকে দেখে সে তাকাইয়া আছে, সপ্তর্ষিতে দেখে বাবা তাকাইয়া হাসিতেছে আর চাঁদ উঠিলে অনেক বেশি তার হইয়া ওঠে। কারণ, ভরাট চাঁদের রঙে বাবাই তাহাকে স্নান করিতে শেখাইয়াছে। বাবাই তাহাকে ওই আলোরঙা করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছে। কী এক অমোঘ শক্তিতে তিনি তুমুল হইয়া আসেন আর কন, কই সকালবেলায় ‘তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে’ গাসনি? না, আর কতোকাল সে গান গাওয়া হয়নি। কোনো বৃষ্টিতে বাবার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতও আর গলায় ওঠে না, বিপুল তরঙ্গ রে..। ওসব গেঁথে গেলেও আর গলায় সাধানো যায় না। কিন্তু গভীর স্বরে চতুর্দিকে বিশাল প্রতিমা ভরণ করিয়া ওঠে। কেন এ বিশাল মূর্তি? কীসের এ দ্বেষ! এসবের ভেতরে মানুষও তো সবাই একা। ননী আসিয়া পড়ে। সে বলিতে থাকে, তুমি তো গান গাও, বলো তো গানের সুরস্রষ্টা মানুষ হইলেও তার ধ্বনিলোক কোথায় বিরাজে! এমন প্রশ্নে সে আৎকে ওঠে? সত্যিই… সে অবচেতনে বলিয়া ওঠে কেন— এই প্রকৃতিতে, বস্তুর ভেতরেই। ননী লাফাইয়া ওঠে, মাভৈ! চলো তোমাকে বেরিয়া আনি। সত্যি সে বেড়াইতে যায়, অনেক রকম পথ পেরিয়া এক খোলা মাঠোর মুখে আসিয়া দাঁড়ায়। সেখানে নিস্তব্ধ পুকুরে সন্তরণ করে হাঁস আর চড়–ই। ওতে ছাপাইয়া আসে পেয়ারার সবুজ কচি পাতা। ফুড়–ৎ করিয়া বাবুই কী মাছরাঙা পেখম মেলিয়া আনন্দ প্রকাশ করে। ওটা পার্ক। নগরবাড়ি থেকে কিছু দূরে। ননী কাছে আসে। সে বলে, দেখো তুমি যেভাবে পৃথিবীর সব পুরুষকে আটকাইয়া দিয়াছ ওটা কিন্তু অবিশ্বাস্য। ওতে বস্তুর মাহাত্ম্য কী আছে! পলা থামিয়া যায়। ননী তুমি অন্যরকম ছেলে। তোমার পুরুষ ডিফেন্ড করার ভিত্তি কী! কেন এসব প্রশ্ন করো? তখন ফর্সা মুখে খুব কমলা রোদ আসিয়া পড়ে। ভেষজ প্রকৃতি তার চুলে নতুন ছাঁদ রচনা করে। আরও বেশি হাওয়া উড়িয়া আসে। সবুজ শাড়িতে যুক্ত হয় এক নতুন প্যানোরমা। সেখানে নতুন পল্লবিত ধারা প্রকৃতিময় হইয়া ওঠে। ধারে ও পাড়ে জমিয়া ওঠে জোনাকআলোর রাশীকৃত চুর্ণি, দিগন্ত জুড়িয়া ভরিয়া ওঠে প্রভূত সালোক পাতান স্বর। ওখানে গাভী চরে গোবৎসের মতো। মানুষ আর সবুজ নালী ঘাস জুড়িয়া বসে বারো মাসি বৃষ্টির উপলভ্য আলিঙ্গনেÑ কীভাবে যেন সে শব্দের বিন্যস্ত করে। কারো শোনা কবিতার বাণী অন্যভাবে ছায়া দেয়, আলোতে আনে গভীর স্পর্শ। এসব যখন সহজাত রূপ পায় তখন ননী গোপাল তাহার হাত ধরে। সে উত্তাপের ভেতরে অনুভব নরোম। প্রলাপন সুখময়। পলা এসব অনুরাগের স্পর্শটুকু একইরকমে অনুরাগে আনে। সেখানে আরও রূপ-অরূপ মহিমা জড়াইয়া আসে। সে হাতের পরশে গোল সূর্য রঙের রেখায় পরিপ্লুত হইলে অনেক আকাশ ছাইয়া আসে। কবিতার পাখিরা নীড়ে ফেরে। পলা আর ননী গোপাল সামনে চলে। সে মনের কোঠরে অধিক প্রশ্ন আনিয়া বলে, তুমি বলিয়াছ এই প্রকৃতি বস্তুর দাগে তৈরি। আমি সেটি আরও গভীর করিয়া কই যদি আবেগ আর অনুরাগ বস্তুতে না বসিয়া থাকে তখন তো বস্তু বিলীন হইতে পারিবে না। মনবীর রূপই সেখানে মুখ্য। এই মহাকাশ বা বিশ্বময় যে প্রলাপন সেখানে উত্থান-পতন আছে, স্থিরতাও আছে গতিও আছে, অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নও আছে— কিন্তু সবকিছুই মানুষ পরিবেস্টিত। মানুষের ভেতরেই সে পরিপূর্ণ হইয়া ওঠে। এসব কথার আড়ালে ননী গভীর হইতে চায়। ননীর ভেতরে অমোঘ আনুগত্য রচিত হয়। সে পথে পলা একেবারে নতুন হইলেও সে বলে ওসব পুরুষ আধিপত্যের প্রাথমিক পর্ব। সে কিছুতেই এর ভেতরে নিজেকে এক করিতে পারিবে না। অনেক নারীই এসব প্রতিটি অচ্ছুৎ মুহূর্ত রচনা করিয়াছে। এতে আছে সমর্পণ আর ওই লাঠি-দর্শন। লাঠি ছাড়া নারীর চলে না। শৈশবে-কৈশোরে-যৌবনে-প্রৌঢ়ত্বে সর্বদা তাহার পিতা বা বাবা বা পুত্ররূপি লাঠি লাগিয়াছে। এই লাঠির বিরুদ্ধে গেলেই সমাজ চীৎকার করিয়া উঠিয়াছে। সমাজ শাসাইছে। নকল চক্ষুতে তাকাইয়াছে। আর নারী তার প্রতিপক্ষ হইয়াছে। এসব বক্তব্য সে অনেককাল দেখিয়াছে। অনেককালের রচনায় তাহা রাখিয়া আছে চরম স্বাক্ষর। এই স্বাক্ষরের ভেতরেই জীবনের আশা ও আলো নিভু নিভু হইয়াছে। সে আদিকালে যে স্বাধীনতা সমজে আছিল, একালে তাহা নাই। অনেক পুঁজি ধরা দিয়াছে, অনেক জৌলুস আসিয়াছে কিন্তু মানুষের মুক্তি ঘটে নাই। সেই কুঁড়েঘরেই আছে মেয়েসকল। পলা ননীকে কিছু বুঝায় নাই। সে বুঝাইতে চায়ও নাই। কেননা ননীর ভেতরে পরিপুষ্ট আছে বা নাই কিন্তু সে তাহার আহ্বানকে গ্রহণ করিতে পারিবে না। সে আহ্বানে তাহার এতাটুকু আবেগ রচনা করে না। এসব শক্তি বুঝি অনেককাল তিরোহিত হইয়া গিয়াছে। ব্যক্তির ভেতরে সেঁধিয়া জীবন পার করিতে পারিবে না। সেটি সাফ করিয়া বলারও কোনো অর্থ নাই। ননী বোকা নয়। কিন্তু একপ্রকার অন্ধকার আত্মা রচিত হয় পলার ভেতরে। একা চলা বা না চলা মুখ্য নয়। কিন্তু সে একটি পরম্পরা শক্তি। সে শক্তির বেতরে জন্ম বা গ্রহণের আনন্দ আছে। আছে পূর্ণতার তরঙ্গ। সেখানে তো একজন পুরুষ অবশ্যম্ভাবী। এই একাকী জীবনে সবকিছু তাহার মতোই চলুক কিন্তু তাহার তো পরম্পরা-অবকাশটুকু দরকার। সেখানে তো পিছুটান থাকা মানে গতিহীন হওয়া তাল পড়িয়া যাওয়া, তবে সেখানে ননী বা যে কেউই হোক, তাহার সিদ্ধান্ত পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন আছে। এসব দিবধা দোলাচলতার ভেতরে আরও একটি উলম্ব রেখা তাহার ভেতর দিয়া চলিয়া যায়। এই মর্ত্যে মৃত্যু তো আছেই। বাবা নাই। আমিও নাই। তবে কী কাহার পরম্পরা নষ্ট হইল, রহিল কী! টিকিল কী! সত্য-মিথ্যা কী! জগতে অনেককাল মানববসতি আছে, বহুকাল আগে যে সভ্যতা বিলুপ্ত ঘটিয়াছে তাহার কে প্রজন্ম রাখিয়াছে বা রাখে নাই সে সবের খরচ এই পুথিবীতে কীভাবে ঘটিয়াছে, কাহারা তাহার হিসাব রাখিয়াছেন— এসব প্রশ্ন তো আছেই! আরও অনেক যুক্তির ভেতরে ননীর প্রতিপাদ্য তাহাকে হন্ট করিতে থাকে। একপ্রকার আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রও রচিত করে।
ঘুম আর অচেতন সত্তার ভেতরে ননী আসে। সে তাহাকে তুলিয়া ধরে। পলা আজ রাগ করিয়াছে। কারণ, বৃষ্টির ভেতরে অসীম শূন্যতার সে বাবাকে অনুভব করিয়াছে। ননী বেসামাল হইয়া তাহার ওপর রুষ্ট হয়। পলা বলে, হাঃ হাঃ, ইহা তো আগেই জানি, তোমাকে বলিহারি দেই। এখন তাহার বাড়ির উঠোনে একটু রৌদ্র আর ছায়ার খেলা। সেখানে সন্তানহীন এক রমণী পলা। ননী ফিরিয়া আসিয়া সে তাহার সন্ধানে ব্যাপৃত। কিছু একটু সোহাগ-অনুরাগে জড়তে চায়। কিন্তু তাহার মুড নাই। সে অসহায়। ননী অপ্রস্তুত হয়। আর ঘরে ফিরিয়া আসে নাই। রাত্রি পার হইলে পলা অসুখী হইয়া পড়ে। একপ্রকার সুখের ভেতরে অসুখ জড়াইয়া আসিলে সে বেশি সময়ে তাহার নিকটস্থ থাকিয়া আশার সংবাদ দেয়, সম্মুখের সুখ-চিন্তায় হয় বিভোর। একটি সন্তান এ পৃথিবীর মুখ দেখুক। সন্তান সে কেন? পুরুষ কেন সন্তানের জন্মদাতা নয়! এই প্রক্রিয়া কী বায়ো-পরীক্ষণে আবিষ্কৃত হয় না। এখানেই তো তাহার সমস্ত সত্তা আটকাইয়া আছে। পলার ভেতরে এসব বিষয় গভীরে একটি পরিবেশ তৈরি করে। মঙ্গলে মনুষ্য বসতি পাইলে কিংবা চাঁদে বসতির পরিবেশ রচিত হইলে তবে মানবজন্মের প্রক্রিয়া কেন শুধু একজন রমণী লইবে? সে প্রশ্নটান তাহাকে এবং ননীর সম্মুখে তুলিয়া ধরিলে— ননী বিশেষ কিছু বলে না। এখানে তাহার বিজ্ঞান যেন থমকিয়া দাঁড়ায়। তবে কী পুরুষ সমাজ এই দায় নিতে চায় না। বিষয়গুলা ননীকে সেপ্রস্তাবরূপে দেয়। ননী হাসিয় বলে তোমার মাথায় কিছু নাই। তুমি সৃষ্টি ও প্রকৃতিকে অস্বীকার করিতে চাও! বৈজ্ঞানিক নিষ্পত্তিতে তাহার তুমুল অযৌক্তিক আপত্তি। এভাবে এক রাত্রিতে তুমুল বিবাদ উঠিলে, সে তাহার পৌরুষরূপ প্রকাশ্য ধরিয়া পেলে। শুধুই একপ্রকার জৈব চাহিদা নিয়া কাছে আসিলে পলা অসুস্থ হইয়া পড়ে। এটিকে সে জন্তুতুল্য করিতে চায় না। ননীও তাহা জানে। কিন্তু পুরুষ বলিয়া খুব দ্রুত সে কর্মস্থলে নিয়া চলে, সেখানে ডমিনেশন আছে, আরোপিত হওয়ার আছে, সে রমনী শরীরকে ভোগের ভেতরে ঢুকাইতে চায়। ভোগ আর নিষ্পত্তি। ভুক্তভোগী হওয়াই কী নারীর গলগ্রহ রূপ নয়। সে কেন ওভাবে প্রেমহীন শরীরে তাহাকে কাছে নিবে— হোক না সে স্বামী। ননী সেটিই চায়। শুধু একপ্রকার আমোদ, কিন্তু তা অনন্তরূপে থাক— তাহা নয়। এই জৈবপ্রক্রিয়ার ভেতরে সে প্রেমের প্রস্তুতিতে রহে না, দাঁড়ায় না। অবশিষ্টও রাখে না। কেন তার এ দমন? প্রশ্ন করিলে উত্তর মেলে না। ননীর বিজ্ঞানমনষ্কতাও কী ওই দরোজায় গিয়া আটকাইয়া যায়! পলা প্রেমহীন সেক্স করিবে না। এতে তাহার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হইলেও নয়। সে ফিরিয়া যাইবে। অনমনীয়তার একশেষ ঘটাইয়া দেবে। পলার এ রূপটিকে সে অর্জনের পক্ষে নেয়। সে অপ্রতিরোধ্যরূপে নিজেকে আটকাইয়া রাখে। কিছুতেই আপোষের দিকে নেয় না। এমনকি সন্তানও নয়। হঠাৎ এসব তর্ক ফুরাইয়া যায়— যখন আছের আসিয়া পড়ে। আফা! দরোজায় কেডা যান আইছে। কে! কে! কেন? কেন? ননী? সে কেন এখানে। ফিরিয়া তাকায়। অনেকদূর পর্যন্ত আলো চলে। তীরবেগে ঠিকরাইয়া পড়া আলো বেসামাল হইয়া তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। নো নো… তুই কেন ডেকেছিস! তুইও তো পুরুষ। ভাগ! বেটা… ভাগ, তুই কেন এঘেরে আসিয়াছিস। আছের চলিয়া যায়। সে কিছুই বুঝিতে পারে না। কোনো উত্তরও তাহার মুখে আসে না। কোনোরকম কথার লাইনও সে পায় না। হ্যা, সে তাহার নগরবাড়িতে নিজেকে নিয়া আছিল। ননী কই। অনেক আগেই তো সে চলিয়া গিয়াছে। ননী কেন আসিল? ঠিক সে বুঝিতে পারে না। বরং তাহার খুব প্রিয় মুখ রজত। যাহাকে সে অনুভব করে। সে তো নাই। সে তা বিভুঁইয়ে। বেচইন কখনো হয় মনটা। সত্যিই সেবার তাহার আগমন নতুন বলিয়া মনে হইয়াছিল। লম্বা, ফ্রেন্সকাট দাড়ি আর অনেক শান্ত পারফিউমে আটকানো তার ব্যক্তিত্ব। সে বলিয়াছিল ‘অবসেশন’। মুগ্ধ হইয়া সে তাকাইয়া থাকে। আরও অতি বিশুদ্ধ শব্দে বলে চল, এখনতো বোম্বাই আছি। তুই গেলে গোয়া, কর্ণাটক আর কাশ্মীর ঘোরা যাবে। সব তোর ইচ্ছে। আমার কার্ডটা নে। কতো মনে পড়ে। কী মনে পড়ে! কিশোর… কিশোর… আর কিশোররূপ। মোনাইলের কিছু মুহূর্ত, স্যার আইছে। কী ছিলি তুই। ঘুমটা অন্যরকম হইয়া পড়ে। রাগটাও পড়ে যায়। এভাবে ঘুম ভাঙার পর রজত এসে পড়ায় একপশলা বৃষ্টিতে ভিজিয়া গেল ক্লিন্ন মনটা। বেশ প্রফুল্ল মনে হয়। আছেরকে ডাকে। শাওয়ারটা ছেড়ে দে! দেখ পানির অবস্থা কী? আমার মনটা বেজায় মন্দ ছিল। নাস্তা কী করেছিস। প্রহরটা বেশ চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিপুলরকম তরঙ্গ তাহাকে ছেয়ে ফেলে। পলা দাঁড়ায়। উঠিয়া কয়, জানালাটা খুলে দে। তুই একটা কার্ড নিয়ে আয় তো। আজই রজতকে ফোন করবো। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর তো কাটেনি। রজতই যদি আকর্ষণ করে তবে ননী কী মন্দ! তাহাকে সে যেভাবে পাইল তা কী? রজতের প্রতি আকর্ষণই বা কেন? রজতও কী পুরুষ নয়। কিন্তু বিপরীত প্রতিরূপের বাইরে একপ্রকার শ্রেয়োতর প্রেম বুলাইয়া ওঠে, শিউলি ফুলের মতো। সেখনে ভোর আর নগ্নবাতাস এক হইয়া গান তোলে। তাহাতে রজত আগাইয়া আসে। নির্বাচিত হয়। সে যাইবে, দেখিবে এবং চলিবে। তবে এর মীমাংসা কই? পার্থক্য তো রহিল না। একা আর রহিবে না! না রহিবে! চলিবে, আসিবে, তাহার সঙ্গী যেই হোক, রজত এখন অন্যতর। পলা কেন যেন ওই স্বপ্নের ভেতরেই ননীকে বাতিল করিয়া দিয়াছিল। বিপরীতে উঠিয়া আসে রজত। তবুও সে জানে ওর ভেতরেই তাহার অবস্থান বুঝি সত্য হইয়া উঠিয়াছে। তবে কী ইহাই প্রেম! এর মধ্যে কী রমণীমুদ্রা নাই। সমর্পণ নাই। তুচ্ছতা নাই। পুরুষতন্ত্রের অনুগ্রহ সে পাইবে না? সবকিছু ছাপাইয়া তবে রজত কেন উঠিয়া আসে। সে কেন অবিসম্বাদিত রূপে তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়ায়— ঠিক প্রশ্নাতীত হইয়া ওঠে যেন সবকিছু। পলা নিজেই অনেককিছুর উত্তর খুঁজিয়া পায় না।
এসব ভেতরের প্রশ্নের ভেতরে জোসেফ কানরাডের হার্ট অব ডার্কনেস পড়া যায়। ওটা শেষ হলে টমাস মানের দীর্ঘ উপন্যাস ম্যাজিক মাউন্টেন নিয়াও বসা যায়। উপন্যাসের নিখুঁত বিবরণীতে মন তৃপ্ত হয়। কতো সুকঠিন জীবনের আঘাত তীব্রতর হইয়া ধরা দেয়। সময়ের প্রবাহে রজত কেন যেন এক আশ্রয় প্রশ্রয়ের কিনারায় দৃশ্যমান হয়। সেখানে সে বহাইয়া আনে কলাপাতার সুবাস। তুমুল গন্ধের ভেতরে ছায়াঘন কুয়াশার আস্বাদ তৃপ্তিময় হইয়া ওঠে। কতো কঠিন হৃদস্পন্দনে সর্বরকম ভোরের আহ্বান তাহাতে বহাইয়া আনে। পলা একের পর এক উপন্যাসের পাতা ওল্টায়। ননী গোপাল কই! সত্যিই বাবা একজন ভালো ও শিক্ষিত ছেলেকে নির্বাচন দিয়াছিলেন। সে নানা যুক্তিতে বিজ্ঞান চেতনার সঙ্গেও যুক্ত হইয়াছিল। যে বিজ্ঞানমনস্কতা তাহাকে যুক্তির জালে সারাক্ষণ আটকায় সেটি ননী গোপালেরও ছিল। কিন্তু পুরুষ বলেই মনে হয় তাহাকে। পুরুষের শক্তিতেই সে স্বাবলম্বী। সেখানে অন্য কারো সংযুক্তি মানে আটকাইয়া যাওয়া। হায়রে পুরুষ! সে ভয় পায়, সাহসী হইতে পারে না, কাপুরুষ হইয়া নিজেকে সমাজ-নিরাপত্তার ভেতরে রাখে আর হিপোক্রেসি কইরা অন্যরে পরামর্শ দেয়। এ পরামর্শের ভেতরে কষ্ট আর গ্লানি ছাড়া আর কী আছে। এরকমভাবে এক সময় সে মনের পর্দায় নষ্ট পচা মাছিহানা কুমড়ার ন্যায় গলিত বস্তুতে পরিণত হয়। সেখানে সে চিহ্নিত হয় পলাতক হিসেবে। ফেরারির সম্মুখে কিছু নাই, শুধুই পলানোর ভয়। জীবন থেকে, সমাজ থেকে, নিজের মন থেকে সে পালিয়ে বেড়ায়। পলায়নপর মানুষ হিসেবে সে পরিগণিত হয়। এমনটা তো অধিকাংশ পুরুষ মানুষই। আচরণে এক কর্মে আলাদা। তারা প্রকৃতির ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধরে। নিজের জীবন থেকেই তারা পলাতক। কারণ, যাহা বিশ্বাস করে তাহা করিতে পারে না। আবার যাহা তাদের অবিশ্বাস তাহাই করিতে হয়। পলার অভিজ্ঞতার স্কেলে ননী গোপালই সূত্রধর। সেইটি সে নিজের নানা প্রান্তের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলায়। এই অভিজ্ঞতাই জীবনের নতুন প্রবর্তনা। সেখানে সে চিনিতে পারে নতুন নতুন অনেক রঙীন মুখোশ ও চরিত্রকে। বিশেষভাবে যিনি কৃতজ্ঞতার ঝুলিতে আবদ্ধ করিয়াছেন তিনিই অনেকভাবেই এখন সত্যে পরিণত হইয়াছেন। তবে ননী মানুষ হিসেবে অপরিচ্ছন্ন নয়। বিজ্ঞাসমনস্কতার ধারে কাছে যেখানে মানুষ পাওয়া কঠিন সেখানে সে এ পর্যায়ে প্রখর যুক্তিবাদী ও অনেস্ট। তবে রজত থাকে অপার অনুভবে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করিয়া। রজতের প্রতি তার যে আকর্ষণ সেখানেও তো এক অর্থে তার নীতি ও আদর্শের প্রতি প্রতারণা— ননী আর রজতের প্রকৃতি কী ভিন্ন? সেখানে শৈশবের সংযুক্তিই তাহার কারণ বলিয়া মনে হয়। পলা একপর্যায়ে তারবার্তা পাঠায়। সে রজতকে পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। মোনাইলের রজত! ঠিক কীভাবে তিনি এ পর্যায়ে আসীন— সে বিষয়ক প্রভূত অভিজ্ঞতা তাহার নাই। কিন্তু একপ্রকার প্রবল আত্মবিশ্বাসী হইয়া উঠিলে নিজের প্রশ্নটি জোরাল হয়। কিন্তু সে যোগ স্থাপন করে। আছেরকে ডাকিতে থাকে। সে নাই! বাইরে ফিরিয়া তাকায়, ধেয়ে আসে সেই পুষ্পবৃষ্টি— বাচুপান কে মোহাব্বাত কো/ দিল সে… না যুদা কার না/ যবইয়াদ মেরিয়া আয়ে মেল মি কি দুয়া কারনা কিংবা মেরায় দিল ইয়ে পুকারে আজা/ মেরায় ঘুম কে সাহারায় আজা/ ভিগা ভিগা হেসামা এইসে মেরে ফুকাহা… সে সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়া যায় এক অপূর্ব রোমান্টিক জগতে। সে স্মৃতিময় সুধায় ভরিয়া আসে বাবা আর জগদলের বৃষ্টিমুখর মুহূর্ত। মিউজিক তবে বুঝি স্মৃতিকে ধরিয়া রাখে, মনকে পবিত্র করে, মরে ওষুধও বটে। সে পুরো ‘লেখে পেহলা পেহলা পিয়ার ভারকে আখো মেখো মার যাদু নাগরিব পেয়াইয়া… হে কইই যাদুগর’ মনে আসিলে ঈষৎ বাঁকা মুখের দেবআনন্দকে মনে আসে। মিউজিকের সঙ্গে রংঢংয়ের কী অসামান্য মিক্সিং তাকে হাসির উত্তাপের ভেতরে ঠেলিয়া দেয়। পলা ফিরিয়া চলে, রোদের পৃথিবীতে। যতোদূর মানুষের চোখ চলিয়া যায়, অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত সে জন্মাইতে দেখে। আর ভুলিয়া যায় অগণন মানুষের শরীরের ভেতরে এক বন্দিনী নারীর জীবনের গল্পকথা।
সত্যিই একদিন রজত ফিরিয়া আসে। এক দমকা বাতাসে নারীরূপী পলার রূপ ও মনকে সে যতিহীনভাবে গ্রহণ করে। অনেক দিনে স্রোত আজ হিজলের সূর্যকিরণে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে। নগরবাড়িতে নতুন আলোয় অন্ধকারের মুখ যেন ঢাকিয়া যায়! তবে ঠিক অনুমানও সহজ হয় না। নাকি আলোই ঢাকিয়া গেল। অরব প্রহরায় ঘরে ঢুকিয়া চুম্বনে ভাসিয়া দেয় পলার শরীর, অনেক দিনে বুভুক্ষু ক্ষুধা নিবিড় হইয়া আসে। নিষ্ফলতার অধম অন্ধকার পলাইয়া যায়। নতুন এক আত্মবোধের দ্বীপ জাগিয়া ওঠে। তোমারে জেনেছি কহিয়া এক নতুন পৃথিবীর প্রাণ সে উপভোগ করে। জামের বনে দেখা দেওয়া হলুদ পাখি গান ধরে। রজত আর পলা, পলার প্রেরণায় রজত আজ এ বাড়ির অতিথি। কী এক পূর্ণতার ভেতরে নক্ষত্র আকাশ বুঝি নীড় খুঁজিয়া পাইয়াছে। ঋতুর কামচক্রে হেমন্ত খুব স্থির। পলা নিজ হাতে রাঁধিয়া চলে এবং সপ্রতিভ গতিতে মনে আনে কল্যাণের গভীরতা। অনেক কিছু সে পেছনে ফেলিয়া আসে। প্রশ্নের অনেক স্থিরকথায় হংসী প্রেম কেন রক্তের ভিতরে প্রবেশ করে! পলার আদর্শ আর ওই ফেনেগানস জগতের ভেতরে যুদ্ধ-রক্ত আর রিরংসা বুঝি ঢাকিয়া গেছে। পলার অহংকার দূরীভূত। বাবার জীবনকেও সে এখন ইতিহাসের রৌদ্রে ভাসাইয়া দিয়াছে। কিন্তু কেন? একশ এমন সম্পর্ক সঠিক নিশানা পায় না। পলার ভেতরে সে ধারণা অমূলক মনে হয় না। কিন্তু রজতের সবটুকু সে গ্রহণ করিতে চায়। সম্প্রদায়গত বিভেদে, অনেক বড় প্রতিরোধ তাদের আছে, রজত সেটা অতিক্রম করিতে পারে না। কিন্তু পলা সেটি মানিবে না। এভাবে যুদ্ধ এবার নতুন মাত্রা লইয়া চলিতে লাগিল। সেখানে রজত আর পলার সম্পর্কটি একরথে চলিলেও ধর্ম আর সমাজের দেশীয় উপলক্ষ্যে প্রাণের একাগ্রতা শ্রীহীনতার টাটকা স্বদে থামিয়া যায়। কিন্তু পলা বেশি অনুভবে জড়ায়। সে অনুভবের স্বীকৃতি কী কেমন এসবের অর্থ তাহার কাছে মূল্যহীন। রজতের নিকট যা গুরুত্বপূর্ণ। তবুও পলাই সম্পর্কটি অফুরন্ত রৌদ্রের উৎসবে টানিয়া চলে। আজও সে আসিয়াছে। আছের সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া দেয়। এ বাড়ির ভৃত্য হিসেবে সে সবকিছুতেই সাময়িক হইলেও রজতকে সে গ্রহণ করিতে পারে না। পলার তীব্র অনুকম্পায় সে অনেক কিছু অবিশ্বাসের দুলুনিতে দোলায়। তখন তাহার চোখ ভরিয়া জল আসে। মিনতি দুর্বার হইয়া আসে। কী এক প্রচুর সৌভাগ্যই সে পাইয়াছিল, সেখানে রজত কেন! কী তাহার উদ্দেশ্য, কোথায় তাহার পরিণতিÑ আছের ভৃত্য হইয়া এসবের কী অনুমান করিবে। কিন্তু যে জীবন ফড়িংয়ের উৎসব আছিল সেখানে এই নতুন রূপান্তর কী অচিন নয়, কে তাহাকে এপারে ঠেলিয়া দিল? ধর্মবিভেদটা বাড়ির বাইরে গুরুতর হইতে পারে কিন্তু পলা ওসবে ঠিক বেপরোয়া হইয়া পড়ে। যেভাবে পাশের বাড়িতে পুলিশ আসিয়াছিল, সে কুকর্মের অভিধা দিয়া চোরকে সাক্ষ্য করার কথা দিদির মনে নাই বুঝি। আছের সাহসে ভর করিয়া তাহা একদিন বুঝাইয়া বলে। তখন পলা কাকাতুয়া দেখিয়াছিল, ডাহুকের ডাক শুনিয়াছিল, সেই ডাক বুঝি এবার এ ঘরেও কেউ ডাকিতেছে। একে কী বলে! কাহার আকুতি তাহার প্রতি চাহিয়া আছে? কেন সে তাহাকে প্রশ্রয় দেয়। রজত তো অনেককালের হইলেও এখন কেন ছাড়িয়া যায় না। অনেক প্রশ্ন ঘর ছাড়িয়া বাইরে আছেরের কাছে আশ্রয় পাইল। ঘরের সীমানা ছাড়্য়াা তাহা একদিন বাইরের রাস্তাতেও গড়াইল। পলার ভেতরের সুখ সকলে জানিলে সে কী করিবে, এসংসারে তো তাহার কেউ নাই, কিন্তু না বুঝিয়া সে প্রেমের মরা জলে ডোবে না— ভাবিয়া অকাতরে সময় বিসর্জন দিতে থাকে।

সাত.
একাকি মেয়েটির মনের আর বাইরের ঝড় প্রবল হয়। সে রজতকে নিয়া আর ভাবিতে চায় না। রজতের কর্মকাজ চলিয়া যায়। রজত কর্মে পটু। সে বিচিত্র রহস্যে ও অনুসন্ধানে ভরপুর। কিন্তু আশৈশব গাছ নদী মেঘ আর রৌদ্রমাখা সময়ে সে তো তাহারই। কর্মের মাঝেও সেই তাহার কেন্দ্র। যে পলা তাহার কাছে গড়িয়া ওঠে বঁইচির ঝোপ আর শাঁইবাবলার ঝাড়ে— সেখানে টুপটুপ বৃষ্টি আসিলে যে পতনের শব্দ শুনিতে পায় সে তো তাহারই আলিঙ্গন, ক্লান্ত কষ্টেও সে হইয়া ওঠে বটের পাতার মসৃণ পথ। কিন্তু রজত এক পর্যায়ে এসে দৃঢ় হইতে চায়। সমস্ত সংস্কারগুলাই বুঝি তাহাকে কঠিন ও ক্লান্ত সিদ্ধান্তের দিকে আগাইয়া দেয়। মাঝে মাঝে সে ক্লান্ত শকুনের মতো হইয়া ওঠে। পলার ক্রমিক সম্পর্কটি ঠিক বেশিদিন না হইলেও সময় তো আগাইয়াছে। বছর ঘুরিয়া আসিয়াছে। বন্ধুমহলে বা বাইরের এনডেন্টিং-এ তাহার কাজে ধীরগতি আসিয়াছে এখন। তবুও সেসব নিয়া তাহার স্বতন্ত্র জীবনে কোনো ভয় বা দ্বিধা প্রবলরকম নয়। কারণ সেগুলা একটা পর্যায়ে পুষাইয়া লওয়ার ক্ষমতা তাহার আছে। তবে চলাফেরার মাঝে খুব একটা দ্বিধা বা আড়ষ্টতাও যে নেই— তাহা নয়। কিন্তু সে পলাকে ক্যাজুয়ালি দেখিতে চায়। নীরবে নিঃশব্দে সে আসলে নারীর প্রতিমূর্তিতেই তাহার স্বরূপ ফিরে চায়। এ ধরনের নারীরূপ প্রকাশ পাক সেদিকেই তাহার অনিমেষ নজরদারি। এসব নিয় পলার এই গৃহে অনেকবার সে ভাবিয়াছে। সেখানে সে টিকটিকির সঙ্গে খেলিয়াছে— এইসব সিদ্ধান্ত নিয়া। তখন বাইরে প্রখর রোদ্দুরের আলো বিজলীরেখা অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে। কোনো এ পার্শ্ব দিয়া পলা তাহার পাশ থেকে উঠিয়া গিয়াছে। পলা কাঁদছিল। সে কান্নার ভেতরেই সে দেখে এক স্ফটিক আলো খুব তীক্ষ্ণভাবে তাহার চোখে লাগিতেছে। এইটা কীসের আলো! তাকাইয়া ও মুখ ফিরাইয়া দেখে এক টিকটিকি দেওয়ালে খেলা করিতেছে একটি উড়ন্ত পোকার সঙ্গে। সে পোকাটি আর টিকটিকির খেলা তুমুলভাবে বাহাজপ্রবন হইয়া ওঠে। কে কাহার অস্তিত্ব ধরিয়া রাখিবে তাই নিয়া তুমুল ধস্তাধস্তি চলিতেছে। সেখানে অনেক আলো নাই কিন্তু এই তুচ্ছ আলোতেই তাহাদের যুদ্ধ চরিতেছে। টিকটিকি পোকার কাছে যখন পরাস্ত হওয়ার পথে তখন সে বেশ বলপ্রয়োগে তাহার শরীরে আঘাত করিতে চায়। কিন্তু খুব বুদ্ধিদীপ্তরূপে তাহা কৌশলে আয়ত্বে আনিতে পারিতেছে। রজত এ খেলার অংশীদার হইয়া যায়। পলার অশ্রুরেখা তখনও চলে। সে ওয়াশরুমের দিকে ধাবিত হইলে দেয়ালের ঠিক প্রান্তরেখায় যুদ্ধ থামাইয়া তাহারা কী যেন ঠাহর করিতে চায়। তখন সবকিছু থেমে যায়। বিরতি আসে। ক্ষণিক সময় পরে আর যুযুধান মনোভাব থাকে না। ছাড়াইয়া নেয়। রজত গভীর হয়ে ওসব তা- দেখিয়া চলে। এ বাড়ির দেয়ালে প্রচুর কাজ আছে। কোনোটা অহেতুক, কোনোটা বেশ সৌন্দর্যমতি। ভারতবর্ষের দক্সিণে সে অনেক মন্দির দেখিয়াছে। সেসব মন্দিরের প্রাচ্যীয় স্থাপত্য তাহাকে মুগ্ধ করে। সে বিস্মত হইয়া অনেকদিন সেসব স্থানে কাল অতিবাহিত করিয়াছে। বিস্মত তো কম হয় নাই। অনেকদিন সে মন্দিরের পাশেই হোটেলে নিয়া থাকিয়াছে। বেনারস কিংবা খাজুরাহ, অজান্তা-ইলোরা কিংবা লাক্ষেèৗতে বারাসাতে কোথায় সে যায় নাই। কিন্তু সে সব কিছু নয় এক ধরনের গোথিক অবয়বই তার চোখে পড়ে। এর মধ্যে মুসলিম কিছু আছে তাও বলা চলে না। অত্যন্ত আগ্রহ নিয় সে পলাকে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্র্কটি কী বলবে? কবে কীভাবে এটা তোমরা নিয়াছিলে? পলা ক্রুদ্ধ ফণিনীর মতো বলিয়া ওঠে, ওসবে তোমার কাজ নাই। এ বাড়ি নিয়া তোমার কোনো প্রশ্নে আমার আগ্রহ নাই। ওসব তৃতীয় মার মতো কথা বলিও না। বিহ্বলরূপে সে বিষম হয়। কিন্তু গোথিক প্যাটার্নের ভেতরে যে বাঁক সেইটিই এখানে আছে, নিশ্চয়ই এটি বেশ পুরনো বাড়ি। পলে তাহার কাজের ফাঁকে যত্ন আছে। এই যত্ন তো এখন বিলীন। যেভাবে সবকিছু পুঁজির চলমান চাকায় আটকাইয়া গিয়াছে, তাহার নিশানা নাই, নির্মাণও নাই। টিকটিকি আর নাই। এখানে অসংখ্য ঘন ঘন ফুটা, তাহার ভেতরে বাইরে জুড়িয়া বসিয়াছে মাকসড়সা। ছাদজুড়ে মস্ত ছায়াময় আঁকা প্যান্ডেল। তাতে ভর করিয়া আছে নানা রঙের ছায়া আর স্মৃতির নকশা। মনে পড়ে পলার বাবা চৌধুরীকে। কিন্তু রজত সংস্কারের চালাকিতে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়িলে পলার প্রেম আর বৈরাগ্য নিয়া সে মাঝে মাঝে ভয়ও পায়। ভয়ের ছবিতে তাহার ছায়া দুলায়। সে কোন পথে চলিতেছে। আদৌ তাহা নিষ্ঠুরতার দিকে তাহাকে টানিয়া নেয় কিনা। দায়িত্বই তো একটি মানুষের জীবনের সব নয়। এর বাইরে মনের বিহ্বলতা বা আকুলতাও তো একটি বস্তু। তাহার দাম মানুষ ছাড়া আর কে দেবে! এরূপে মসৃণ তুলি হাতে নিয়া সে জীবনের ছবিগুলি আঁকিতে থাকে। নীচে নামিয়া আসে। এক চিলতে উঠানে তুচ্ছ একটি গাছে সে জন্মের উৎসবে ব্যাকুল। ইহা কী পুরনো বটগাছটার নবীন রূপ! বৃক্ষের টানে বটটা আর মনে রাখার মতো নয়। নতুনটাই এখন জন্মোৎসবের মোহে কাতর। সেখানে দাঁড়াইয়া সে নিজেরও জন্ম ও মৃত্যুর খেলা বুঝিতে পারে। একটু দূরে একটি পরিত্যক্ত ইঁদারা। সেখানে অনেককালের জল জমিয়া আছে। স্থির জলে পোকা ভাসমান। মুখ দিয়া সে দেখে। মুখ নাকি তাহার অবয়ব। সে কাঁপে, টুপ করিয়া পোকার লম্ফঝম্ফ দেখিয়া থামে। তখন তাহার মুখশ্রী কাঁপে, শীর্ণ ঢেউয়ে দোদুল্যমান হয়। এক দুই তিন ঢেউয়ে ধারা জন্মে। সেখানে ধারণা তৈরি হয়। আকুলতাও আসে। তখন অনেক দিন হয়ে গিয়াছে, পৃথিবী চলিয়া গিয়াছে— ভরা কলসের শব্দ, ঝনঝন আওয়াজে বাটিবাসনের শব্দ, তীব্রতর হয় উপরের অনেকজনের পালাক্রমে পানি ঢালার শব্দ। শব্দ আরও সত্য, উপেক্ষিত শব্দ, আলোড়িত শব্দ, বালতির-কুটিকালেরপাত্রের ধোয়া কোমল হাত আর স্নেহভরা মন দিয়া সবকিছু রচিত। এ রচনার ভেতরে উঁচু একটা স্তম্ভ— যেখানে অযু বা অর্চনা চলে। এই নিমিত্ত ক্জা ছাড়াও ওখানে বসিয়া পাড়ার কলহ মিটানো যায়। কলহের কেন্দ্রে যিনি তিনি একটু নীচুতে থাকিবেন আর যিনি বিচারদাতা তিনি উপরে অন্যরা সব আম-পাবলিক। কিন্তু কম্পমান মুখ থরে সাজানো ইটের ভেতরে ভাসে আর চলে থামে আর নড়ে। ইটগুলার ফাঁকে পুরনো শ্যাওলা আর একটা চিকন সাপ লম্বা করিয়া শুইয়া ধ্যানস্থ নাকি ঘুমায় ঠিক বোঝা যায় না। আছের ঢিল দিলে বুঝি তাহার ধ্যান ভাঙে। সে বোলায়, নাড়ে আরও কিছু করিতে চায় স্তনের বোটায় তুমুল আদরের খেপ তোলে, সরিয়া যায় ফর্সা বুকের চতুর্দিকে, তাহার বুক কালো ও ফর্সা নাকি সেও ফর্সা ঠিক টের পাওয়া যায় না। কিন্তু সে সাজে বেশ ফনাইয়া ওঠে, রাগ নাই কিন্তু প্যাঁচাইয়া ধরে, সাজে, চুম্বন দেয়, খুব ভালোভাবে আকাড়িয়া কয় মিশে আছি তোমার শরীরে। তখনও ঢেউ কাঁপে নাকি আরও দোলা দ্রুত হয় ঠিক বোঝা যায় না, তরঙ্গই তো, কিন্তু সাপের পঙ্গরে তা অন্য ঢেউ সৃষ্টি করে। আরেকটি ঢেউ পাইলে দেখে পলাও আসিয়াছে। সে তো তাহার পাশে। নাগ-নাগিণী পাশাপাশি। ওই পানিতে সে খুঁজিয়া বেড়ায়। ঠিকই ইটের ফাঁকে জিহ্বার পিলপিল আহ্বানে বেরিয়া আসিল। তারপর একটু খুনসুটি ভরা পাখিপলক নির্বাপিত, তারপর খুব কাছাকাছি। পলার ফোরা চোখ এখন একটু প্রশান্তিময়, সেখানে ডানা মেলিয়া চিল উড়িতেছে, ভয় বা দ্বিধা আর অনেক প্রশ্ন আপাতত অন্যায় করিয়া পলাইয়া গিয়াছে। রজত মুখ ফেরায় না। সে ইঁদারার কূপে বশীভূত মনে হয়। বশে আর বিষণ্নতা থাকে না। কেটে যায় সবটুকু গোয়ার পুঁজির লাভ আর বিনিময়। সাপের সন্তর্পনে গর্জায় কম্পমান মুখ আরও গভীরে তলাইয়া যায়, দ্রুত উপর নীচ করে, ভাসে, গতি পায়, মন্থর হয়, কিন্তু নাগ আর নাগিন এখন বেশ মুখোমুখি। সে হস্ত ডানার মতো প্রসারিত করে। হাত বাড়ায়। পলা নাই। কেন? দূরে, সে দাঁড়াইয়া আছে ওই জন্ম বৃক্ষের তলায়। হাত গুটাইয়া, চুল ছাড়িয়া, ওড়না ঝুলাইয়া, খোলা পঞ্জে পা ঢুকাইয়া, ঢোলা স্যালোয়ার পরিয়া আর প্রিন্টঅলা সুতির কারুকাজে বুনানো জামা পরিয়াÑ কী এক মুগ্ধতা! সে কী যেন খোঁজে। কিন্তু রজতের হাতচাড়া সে এখন। ইঁদারায় তাহার কম্প্রমান মুখে সে এখনও ঝুলন্ত, সম্বিৎময়। তারপর চীৎকার। কাহার ঠিক বোঝা যায় না। হাহাকারের চীৎকার। কে যেন খুন হইয়াছে। সে খুন হইলো! কইয়া যায় আছের। নাহ এ খুন সে খুন নয়, পাশে পাশা খেলা চলিতেছে! সে খেলায় যাহা হারজিৎ তাহাই খুনোখুনি। যাহা উল্লাস তাহা শোষণ বা সনাক্তময় রক্তরেখা। অনেকমুখ এখানে আসিল কোন সময়! চীৎকারের পরই পলা আসিয়াছে। এবার সে হাতের মুঠোয়। পলা পত্রপুটে বন্দিনী, এই বন্দিই আমার প্রাণেশ্বর। টুপ শব্দে ঢিল ছুঁড়িলে সে মাথা তোলে, কে এই কুয়াপাড়ে নাকি ইঁদারা পাড়ে আসিয়াছে রে! ইঁদারাই তো উদারা, এখানেই শুরু হয় স্বরগমের প্রথম চরণ। সক্কালের ভোরে সকলেই আমন্ত্রিত। সেখানে বাড়ির কুশল আর কাহার কী সম্বাদ তাহা রেকর্ডে আটকা পড়ে। এরপর আবার একদল তারপর দলের ভেতরেই দল, দল আর দল, কেউবা যায় কেউবা কথা কহিতে কহিতে আসে, আসা যাওয়ার মাঝে সাক্ষাৎ আর সম্বন্ধ রচিত। এই মাটি আর কণারাশির ভেতরে সেই শব্দই প্রতিধ্বনিত। তাহাই সে এই কূপের ভেতরে ক্রম-অভিযাত্রারূপে পাইতেছে। ভয়ও তৈরি হয় তাহাতে। কারণ, উহা চৌদ্দ হাত পরিমাণ খালি ইটের উপর ইট দিয়া গাঁথা। তাহার পর আরও আছে। গভীরে নাকি এক সময় কুমীরও আছিল। সে কুমীরের ছিল কুম্ভীরাশ্রু। সে পলাকে ঠাট্টা করিয়া একবার কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণের কথা কহিয়াছিল। তখন সে কষ্ট পাইছে। তাহাতে আরও কয়েকদিন বিষণ্নতার প্রহর আর সন্দেহের সীমারেখা বৃদ্ধি পাইয়াছিল। কয়েকদিন তাহাকে ছোঁয়া বেশ দুষ্কর আছিল। পরে কী করিয়া যেন সবটুকু বাষ্পাচ্ছন্নতা পাইয়া উবিয়া যায়। সময় নষ্ট আর প্রেম নষ্ট ধরিয়া চলে— এইসব কুম্ভীর বিষয়ক কথকতা। তারপর সে সতর্ক হয়। পলা আর শোনে নাই কিন্তু সন্দেহটা কিংবা এইসব কথনের সংজ্ঞাটা ভেতরের মণিকোঠায় সুন্দর করিয়া স্থাপন করিয়াছে। এসব আর সহজে বাহির হইবে না। এই ইঁদারায় তখনও মুখ কাঁপে আর ভয় ধরে, পায়ে কী সাপ বাঁধিল, পা ঘোরায়, তাহার হাফপ্যান্ট আর কোলাপুরিটা টানে বাহির করে, নাহ পিঁপড়া ঢুকিছে, তয় অশনি কাকা দূরে কাকা করে ক্যা! ওই কী আমারে কপালডা খাইতে চায়। এমনিই তো পলারে লইয়া মহাবিপদে আছি। তাহার ওপর আবার বিপদ সংকেত দেয় কিনা! রজতের মাথা ঘোরে, সে দুইটা মুখ দেখে ক্রমশ তা বাড়তে থাকে চার ছয় দশ এতো মুখ কেন, তোমার ভেতরে ক্যান এতো মুখ, জনতা ঘিরিয়া আসিয়াছে, হেন্দু শালা হেন্দু এই বাড়িত থাকি কী করোস! পাড়ার ইজ্জত ডুবাইচস। হারামীর পূত, বাড়িত্থেন বারা… শালা কুত্তার বাচ্চা, মালুর বাচ্চা, বাইর হ, পলা তীব্রবেগে বাহির হয়, নাহ, কে তোমরা! এখানে কেন? ও আমার লোক। ওর দায়িত্ব আমার। সমস্বরে পাড়া নষ্টের হুংকার দেয় চল্লিশোর্ধ্ব কিছু যুবক। কীসের পাড়া নষ্ট! কোন বংশ তোদের। চৌধুরীর মেয়ে এই নগরবাড়ির মেয়ে সে কোনোদিন পাড়া নষ্ট করবে না। তোরা বিশ্বাস রাখ। কে তোদের উস্কাইছে। এরকম করে তোরা শুয়োরের দলের মতো আসছিস কেন? যা, চলে যা। কোনো অঘটন আমি ঘটাইনি। তোদের কোনো সমস্যা আমি করি নাই। এভাবে আসিলে ঘটিলে এই এলাকার ছাড়িয়া, জয়গা জমি লোপাট করিয়া চলে যাবো। তোদের সম্মানের হানি আমি করবো না। কে একজন মুরুব্বী নারীকণ্ঠের দুর্বার শাণিত গলার স্বর শুনিয়া কন্ভিন্স হইয়া কয়, চৌধুরী সায়েবের মাইয়া তো! চল পরে দেখা যাবে। কী সব রকম যে ব্যাপার… আইল এক ভিনদেশী তাহার নাগর নিয়া এ পাড়ায়…। উফ বিচ্ছিরি… আছের আছের পানি আন? হ ম্যাম পানি চাইছে। যা, রজত তখনও আওয়াজ শোনে, এক নয় অনেক তাড়াইয়া আসে, ভয়ানকরূপে আসে, ভীতিকররূপে আসে, দাবানলের ন্যায় আসে কানে প্রতিধ্বনিত হয় অনেক বার, অনেক রঙে আর অনেক বর্ণে, অনেক ছন্দে। তবে সমাজে কী তাহার অবস্থান এখন দ্বিতীয় শ্রেণির। গলার স্বর নিচু। সাপদ্বয় এবার জড়াইয়া নিয়াছে উভয়কে। দেখ দেখ… পলাকে সে ডাকিতে চায়। কিন্তু বিষণœ পলা এখন কঠোর ও আগুনে আক্রান্ত। সে পলাতক কিছুই মানিতে চায় না। সে ভীরু নয়। সে অপরাজিত নয়। রজত আর ননী গোপালের যে কোনো পার্থক্য নাই তাহা তো আর কোনো রেখা দিয়া আলাদা করা যাইবে না। কিন্তু তবুও রজত তাহার অনেক প্রিয় হয়। শরীরের দুঁহুঁ সম্বিৎ কাটে না। বিচ্ছেদ অনেক কষ্টের হইয়া ওঠে। বিরহ মানা যায় না। ননীকে সে যোগ্য অযোগ্য করিতে চায় না কিন্তু সে তাহাকে একপ্রকার আড়ষ্ট করিয়া ফেলে। অধিক কিছু থাকিলেও তাহার জন্য মনের আহ্বান নাই। তাহার ঠোঁটে মুখে চরণে নাই কোনো ঘাসের শোভা, নাই কোনো প্রেমময় আবেশ, সে পারে না জ্যেৎস্নার নদীতে রূপোলী রাজহাঁস চরাইতে— সে একরাশ পৃথিবীর বড় বেশি বৈষয়িক মানুষ। তবুও তাহার প্রতি আকর্ষণ আছে। কিন্তু প্রেম নয়। তাহার প্রতি আকাক্সক্ষা আছে, অবিশ্বাস নয়। রজত তো সবকিছুই হইয়া আছে। রজত রাজমণি। সে কী তাহা মুখ্য নয়, সে আমার, পলার। তবে কেন সে সবটুকু মিটাইয়া ফেলিতে পারিতেছে না। এভাবে হিন্দু-মুসলিম বসতি তো ক্রমেই সমস্যার ভেতরে নতুন সমস্যা করিয়া তুলিতে পারে। তাহারা কী বিবাহিত! বিবাহ তো একটি সামাজিক আচার। উহা অনেকালের চলমান রূপ! সেটিই তো এখন দৈনন্দিন তাহার প্রশান্তির জায়গা! সকলের গ্রহণযোগ্য জায়গা। তখন দল বাঁধিয়া আর কেউ আসিবে না। সমস্বরে চৌধুরীর মেয়েকে অসম্মান করিতে পারিবে না। সে কেন তবে সবটুকু সিদ্ধান্ত নেয় না! নাহ! মন আর নীতির বাইরে সে কিছু করিবে না। সে চোর নয়। যাহা করিয়াছে প্রকাশ্যই করিয়াছে। সবটুকুর দায় তাহার নিজের। রজত আর পলা একরকম জীবন যাপন করিবে। সেখানে তাহাদের মন আর মনের ভিটার বিশুদ্ধ চাষাবাদই মুখ্য। ইহা নিয়া সে এই কর্পোরেট সমাজে লুকোচুরি করিতে পারিবে না। কী হয় না এদেশে! ধর্মের নামে, সমাজের নামে, অর্থের নামে— সব মুখোশধারীরাই সমাজে এক বর্ম পরে আছে। তাহারাই তো দেশের অধিকাংশ সম্পদ লুঠ করিয়া চলিতেছে। তাহার সমস্ত অসামাজিক কাজ করে গোপনে, রাতের আঁধারে, লুকাইয়া, বিবেককে চাপা দিয়া, ধর্মের ন্যায়সত্যকে হিপোক্রেসী করিয়া চালাইয়া দিয়া— সেখানে তাহার অবস্থান স্পষ্ট। এজন্য সে মনের বিরুদ্ধ কিছু কেন করিবে। একাকী হইয়াই সে থাকিবে। একার ভেতর দিয়াই সে মনের সমস্ত শিক্ষা ও স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে প্রতিরোধ আসিবে, কিন্তু প্রতারক সমাজে সেটুকু প্রতিবন্ধকতা সে করিতে না পারিলে তবে কীসের শিক্ষা সে অর্জন করিয়াছে। বাবা অধ্যাপক মকবুলার রহমান চৌধুরীর মেয়ে তো নিজের অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্ব নিয়া চলিবে। সেখানে সে যতো প্রতিবন্ধকতা আর প্রতারণা দেখুক সে প্রতিরোধ করিবে, যুদ্ধ করিবে, জয়ী হইবে। নয়তো এ জীবনের কী লাভ। প্রতারণার জীবন লইয়া সে কী করিবে। ক্রমশ সে সিদ্ধান্তের দিকে আগাইয়া চলে। কিন্তু রজত! সে তো পুরুষ! সেও প্রতারক? নইলে সে কেন পলাকে কুম্ভীরাশ্রু বলিয়া তাচ্ছিল্য করিবে। সে কনে নিজেকে মানুষ না ভাবিয়া দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করিবে— সেজন্য অর্থই তাহার নিরাপত্তা— সেটিই তাহার জীবনের দর্শন হইবে। তাহার বৈষয়িক জ্ঞানকে সে গুরুত্ব দিয়াছে কিন্তু এও তো সত্য যে একপ্রকার নব-জীবনানুসন্ধানী রজত অনেক বেশি ভালোবাসে পলাকে। জীবনবাদী মানুষ হিসেবে সে অনেক বেশি রুচিময় ও ভাবানুরাগী। পলা জানে মানুষের মূল্য কীসে! মানুষের ভেতরের সত্য কীভাবে প্রলুব্ধকর। কীভাবে সে সংগ্রামকে জীবনকে মোকাবেলা করে— যতো মত তত পথ— এটি তো দর্শনের কথা— তবে সে কেন তাহাকে নিজের জীবনের বোধ চাপিয়া দিবে। পলা তো নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত নয়— নিজের কাছেই, তবে তা তা কেন অন্যের জীবনের পাথেয় হবে। সকলেই তো একটি ধারণা নিয়া চলে, এই ধারণাই কারো কারো কাছে মত ও দর্শনস্বরূপ, সেটি একটি উচ্চতায় পৌঁছাইলেই সত্যটি দাঁড়ায়— পলা সেভাবেই তার মকে বিচার করে। কিন্তু অস্তিত্বের স্বাধীনতা তাহার প্রধান ধারণা।

আট.
রজত কমাসের জন্য চলিয়া যাইবে। এবার একটু ভারতবর্ষের বাইরেও তাহার সিডিউল। পলা যেতে চাইলে আপত্তি নাই। কিন্তু সে যেতে চায় না। রজতকে বলে, এখনও যে দিন পনের সময় তোমার আছে আমরা সেটুকুই উপভোগ করিতে চাই। চলো, মধুপুর ঘুরিয়া আসি। খুব ঘন বনানীময় রাস্তা। ওখানে একটা সরকারি বাংলোয় আমরা কাটিয়া আসি। কিছু আদিবাসীদের সঙ্গে দেখা হবে। পলা তো স্থির জীবন নিয়া, পুস্তকের কুটুরীতেই সময় কাটাইয়াছে। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর পর সে এই বাড়িতে প্রায় একাই। রজতের সঙ্গে যোগাযোগ আর ক্রমশ ননীর সঙ্গে সম্পর্কটা থিতিয়ে আসা— সব মিলিয়া সে এক স্থির জীবনের ভেতরেই সময় কাটাইয়াছে। রজত প্রস্তাবটি নিতে বরাবরের মতো দ্বিধা করে। কারণ, ভেতরের ভয়! সংকুচিত আত্মার পেছন ফিরানো টান। পলা ওসব তুড়িতে উড়িয়ে দেয়, যাহা সত্য তাহাই সদা সত্য— রজত তা মানিলে যাইবে নচেৎ নয়। ওই গহীন অরণ্যে কোনো দুর্ঘটনা হইলে পলা কী করিবে! কী পরিচয়ই বা তাহাদের! ওসব রিস্ক। নো নো… পলা বেদমরকম হাসিয়া ওঠে। পুরুষ তো! আবার হিন্দু পুরুষ! তাইতো এতো অবরোধ? একটা চারদিকের দেয়াল উঁচু করা ঘরই কী সবটুকু নিরাপত্তা মানুষের! প্রশ্নগুলি সে রজতকে করতে চায় না। এই নগরবাড়ি, এই ভিটে, পুরানা ইঁদারার পাড়, শঙ্খচিলের বাসা বাধা আমলকি গাছ, পাশের বাড়ির বাড়তি হরীতকীর শ্যাওলাপড়া ডাল আর এই ছোট্ট সবুজ পাতার নামহীন বৃক্ষটাই তো অনেকবার করে রজত দেখেছে, কাছে গেছে, কোমল করে আদর দিয়াছে কোনো অসুবিধা হয়নি। অনেকদিন ধরে এই তো চলছে। সে গেছে আবার ফিরে এসেছে। যোগাযোগ নানাভাবেই হয়েছে হয়ে চলেছে। তবে তাই হোক। এখন আমরা কোথাও যাবো না তাহলে— নাহ, ইচ্ছে করছে না। মনের ভেতরে সবটুকু সে পুষে রাখে, স্বপ্নগুলা থৈথৈ করে হেঁটে বেড়ানোর সুযোগ পায় না। রিস্ক রিস্ক, ভয়, অপমান, আত্মসম্মান দিয়ে ঘেরা রজত নামক এক পুরুষের জীবন। সেখানে সে দাম্ভিক কেন? কেন অহংকারী, কেন অনেকভাবে পুরুষ হিসেবে সমাজে জাহির করতে চায়। একসময় তো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানগুলা কতোকিছুই নিষিদ্ধ করে দিয়াছিল। এর মধ্যে তো স্বার্থ লুক্কায়িত ছিল। সে স্বার্থের পর্দা তো কেউ না কেউ ভেঙেছে। সামান্য সত্যের ভেতর দিয়ে অসামান্য সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একটি ন্যায়ের ভেতর দিয়েই দশটি ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। এইরূপ কর্মপ্রয়াসে জোয়ান আর্ক, এলিজাবেথ টেলর, প্রিন্সেস ডায়ানা, মেরিলিন মনরো এখন হিরো হইয়া বাঁচিয়া আছেন। মডেলরূপে বন্দিত। অথচ কেউ সেসব মনে রাখে না। কেউ মনে রাখে নাই, কেউ তা মনে রাখার দায়ও নেয় না। ইতিহাসের বড়ো সত্য ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। পলার এই চিড়িয়াখানাটা আরও মজবুত হয়ে পড়ে। কেউ এটা ভাঙতে পারে নাই। বাবাও পারে নাই। রজতও নয়। কারণ, সবাই পুরুষতন্ত্রের ধারক, ওই একই মন্ত্রের উপাসক— কিন্তু কেউ তো এ খাঁচা ভাঙবেই। কথাগুলা রজতের জন্য নয়। একটি পক্ষের ওপর চাপাইয়া দেয়া নয়, কোনো ধর্মের ভয়ের অবদমনও নয়—পলা জানে নারীর সংস্কার আর টানও তো আরও বহুদূর। কিন্তু তুচ্ছ তুচ্ছ বিশ্বাসগুলাকে আমরা কেন মারিয়া ফেলি। ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা আর সৎ অনুভবপুঞ্জকে কেন আমরা বিসর্জন দিয়া ফেলি— কেন একবারও বলিয়া ফেলি না ওই মহানন্দা তুমি যেন ছোট মেয়ে, তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আর আমারি নিজের শিশু সারাদিন নিজ মনে আমারি সাথে যেন কথা কই। সেটি মানুষের আকাঙক্ষা, শুধুই কোনো নারীর বা পুরুষের আকাক্সক্ষা নয়, গভীরতর জীবনের ভেতরের ঘুম, সে পাখি সেইতো শাদা পাখি, সে চরিয়া মরে মাঠে আকাশে বাতাসে। এসো তাহাকে আলিঙ্গন করি। মোনাইলের হইয়া কই বাঁশি কাহার আনন্দ কথা, কই সেই সাহসী অপাপবিদ্ধ মানুষের গল্পকথা। তাহারাই তো বিশ্বের সম্রাট সভ্যতার সম্রাজ্ঞী। প্রকৃত জন্মের স্বরূপ ও সার্থকতা তো তাহাতেই। পলার প্রতিরোধ যুদ্ধের রণাঙ্গন এরকম নানারূপে সজ্জিত, তাহার ভেতরে সুখ আর নিরন্তর শান্তির সদা মুক্তি নিহিত। সেজন্যই সে নিজের ভেতরের সংস্কারগুলাকেও দূরীভূত করিয়া ফেলিতে চায়। অপরূপ আনন্দ দিয়া তাহার শরীরের ছন্দকে পুরুষের ছন্দের সহিত মেশাইতে চায়। সাহস আর বিপ্লব তো সেখানেও। কাম আর প্রেমই তো বিপ্লবের সাহচর্য। রজত সবকিছু বুঝিয়া লয়। পলার আত্মাকে সে পিতৃভূমি মোনাইলের তালতলার পুকুর বলিয়া গ্রহণ করে। সেখানে প্রতিটি সঙ্গম আর ভোর নতুনরূপে আসে। অপরিসীম তৃপ্তি খা-বদাহন তাহাকে অনেক দূর ভেলাই ভাসাইয়া তোলে। ঘুরাইয়া প্যাঁচাইয়া অনেক সংহত সমীহে সে আলিঙ্গন করে। পরণকথার গন্ধে কাঁধ রোমশ বুক জঙ্ঘা উরু লোমরাজি পদনখ চোখ নাক মুখ গ্রীবা বুক স্তন নাভীমূল অনবদ্য কামাগ্নিতে পল্লবিত হইয়া ওঠে। এককালের অসীম অসূর যেন তাহারা, সেখানে স্রোত বড় উদ্দামময়, উচ্ছ্বাস বড় দুরন্ত আড়ম্বরপূর্ণ। এক সময় সে চুলে আর তাহার ভেতরে আত্মালালিত অবসর খুঁজিয়া ফেরে, তখন স্পন্দন-সংঘর্ষ গতি পায়, সব কালপুরুষ জেগে ওঠে, অন্ধকার যেন অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকে। রজতততত তুমিইইই পলা তার রৌদ্র আক্রান্ত পৃথিবীতে কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদ শুনিতে পায়। সেখানে কে ভয় পায়! কে তাহার পুরানা সংস্কারের ভেতরে মুখ লুকায়! কে সে বেঈমান নিজেকে নির্জীব বলিয়া ঘোষণা করে? মাঘসংক্রান্তির কাল উপচাইয়া পরে তখন তাবৎ পুরুষগ্রন্থিতে। নারীর কমলিনী আর ঘরে থাকে না, সে বলিয়া ওঠে আমি নীল কস্তুরি আভার চাঁদ। বেশুমার অনুগ্রহ অস্বীকার করিয়া তোমার কাঁধে উঠিয়াছি, আমাকে তুমি গ্রহণ করো, আমি তোমার সাহচর্যে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াই, তুমি কেন কুঁকড়াইয়া থাক, বেশ্যার আহ্লাদে উজ্জ্বল হও, নামিয়া আস ভয়াবহ আরতিতে। আলো আর স্বপ্নের কথা না বলিয়া উদ্যম হওয়ার অস্ত্র গ্রহণ করো, আমি অনেক দিন তোমাকে এইভাবেই পাইয়াছি, পাইয়া চাই। আক্রোশ তখন আর থাকে না। রজত হাসিয়া ওঠে, খাজুরাহ ভঙ্গিমায় সে জঙ্ঘা তুলিয়া নেয়, তাহার অপবাদ আর আড়ষ্টতা বাহিষ্কার নিয়া জন্মায়, অসীম মোহে স্তনের ভেতরে আকাশগ্রন্থি রচনা করিয়া চলে, সোনার হরিণ দৌড়ায়, পলা হিম হাওয়ায় জাগিয়া ওঠে— নীলবসনার সত্যে সে গাহিয়া যায় :
চঞ্চলা হাওয়া রে ফিরে ফিরে চল রে
গুণ গুণ গুঞ্জনে ঘুম দিয়ে যা রে
পরদেশী মেঘ রে আর কোথা যাসনে
বন্ধু ঘুমিয়ে আছে দে ছায়া তারে
বন্ধু ঘুমায় রে
পলার স্বরে মাঘনিশীথের কোকিল জাগিয়া ওঠে। ঘুমঘোর রচিত হয়। মেঘ আর মৈথুন রোরুদ্যমান হইয়া ওঠে। কী অসীম এক রাত্রির নক্ষত্র তাহাকে ভরিয়া তোলে। পলার ভেতরের সমস্ত রিপুদল যখন আত্মসাৎ করে রজত তখন সে চরম কোমলে বাঁধিয়া কহে : ‘ফিরে এসো’। তারপর টুকটুক আওয়াজ ওঠে, ওবাড়ির ঘরনীদের তাড়া চলিতেছে বুঝি— ঠিক জানা যায় না— যেমনটা উপসাগরের অথৈ ধ্বনি এখানে নাই— কারায় কিছু থাকে না। থাকে শুধু মানুষের জীবন।
রজত চলিয়া যাওয়ার পর পলার ভেতরে একপ্রকার সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। আবার সে এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের নতুন শব্দার্থ তৈরি করিতে চায়। প্রলুব্ধ স্বপ্নকে নতুন করিয়া জাগাইয়া দেয়। সম্ভাব্য জীবনের সন্ধান দোদুল্যমান করিতে করিতে সে নিজেই জ্যোৎস্নার শরে নিমগ্ন হন। যে সূর্য স্নিগ্ধ তাহাকে শাশ্বত সূর্যে পরিণত করেন। আছেরকে ডাকেন। এই ঘর পাল্টাইতে হইবে। পেছনের বড় ঘরটায় আমার সবকিছু নিয়া যা। এখন থেকে এই ঘরে আর কেউ বসত করিবে না। খুব দ্রুতই রজতের ইমেল সংবাদ আসিল। ফোনে অধিকবার কথা হইলেও লিখিয়া বচন বিস্তারিত করা তাহার অভ্যাস। এতে তার একটপ্রকার স্বস্তিও আছে। যতোটা অসাধারণ করিয়া সবকিছু অর্থারোপ করিতে পারে ততোটাই সে কথা বরার সময় নিরুত্তর থাকে। একাকি এখন সেও। শিঘ্রই সে গোয়া যাইবে। সেখানে সে তাহাকে সঙ্গে লইতে চায়। কেন পলা এসব আহ্বানে সম্মতি দিবে। মানুষের স্বভাব তো ক্ষেত্রবিশেষে আটকায় না। সেসব তাহার পছন্দ নয়। আর যে ঘরে সে সমাসীন হইতে চায় তাহা একান্তই নিজের নতুন শয্যা। অনেককাল আগে বাবা ট্রটস্কির কথা বলিয়া শিখাইয়াছিলেন অনেককিছু। পরে এ ধারায় এই নতুন বাংলাদেশেও হত্যাকা- হইয়াছে। যিনি মধুমতি তীরের মানুষ, যাহার আবেগ আছিল দ্যাশ স্বাধীন করা নিয়া, সে কঠিন স্বপ্নটি তিনি বাস্তবে রূপ দিয়াও বাঁচিতে পারে নাই। স্বার্থলিপ্সু বেনিফিসিয়ারির দল একে একে রাজার অনুচরদের অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকা অবস্থায় কারাকক্ষে হত্যা করে। কিন্তু পৃথিবী তো আরও নির্মম। বিশ্বাসঘাতকরা নির্বোধের মতো কিছুই বুঝিতে পারে নাই। নতুন রাষ্ট্রের পরিবর্তন আসিয়াছে, জীবনের গতিমুখ পাল্টাইয়াছে, পেছনের অভিশাপের লেশ এখনও শ্যাষ হয় নাই। কর্ম ও কাঠিন্য প্রভূতরূপে নীরব। বিন্তু পাখির ঝরনা সবকিছু মনে রাখে। কঠিন অভিশাপ যিনি বহন করেন তিনিও মরিয়া যান কিন্তু কালে কণ্ঠে দাগ রাখিয়া যান। বলির পাঠা হন মঞ্জুর নামের একজন, ইতিহাসে সে খুনী বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে, অথচ তিনি খুনী নন। খুনের দাগ আঁকিয়া রহিয়াছে তাহার নামের অক্ষরে। আজ বলিয়া ওঠে খালেদ হত্যার বিচার চাই, তাহের হত্যার বিচার চাই, হায়দার হত্যার বিচার চাই, মঞ্জুর হত্যার বিচার চাই— সকলের সাথে আরও অনেক নাম না জানা মুক্তিসেনারা নতুন দেশে কারণে অকারণে মরিয়া গিয়াছেন। বাবার স্মৃতি ঘিরিয়া যেসব হত্যাকা- সারাক্ষণ থাকিত, প্রলুব্ধ করিতÑ এখন তাহাই এই নতুন গৃহে বুঝি জমা হইল। সে এখন ট্রটস্কির জীবনী পড়ে। স্ট্যালিন, ক্রুশ্চেভ, ব্রেজনেভ-এর পাশাপাশি স্টেটস্ম্যান চার্চিল, রুজভেল্টের জীবন ও রাষ্ট্রপরিচালন নীতির প্রতি তাহার স্বীয় আকর্ষণ এখন তুঙ্গে। এসব পড়িয়া সে এই দেশের ফিরে আসা প্রান্তরে ফিরিতে চান। স্বাধীনতার বীরযোদ্ধারা অকাতরে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা কারণে অকারণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই নিহত হইয়াছেন। যেসব মিলিটারী অফিসার শেখহত্যার পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে নির্মমভাবে হত্যার স্বীকার হইয়াছেন তাহারাই এ রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্টের বেনিফিসিয়ারি। কিন্তু ইতিহাস তো স্থির নয়। পলা তাহার বাবাকে দেখে। তিনিই বলিয়াছিলেন, সকল কমিটেড মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু বুঝি অবশ্যম্ভাবী হইতে পারে— দেশ তো ভিন্ন দিকে চলিল। এরূপ অভিপ্রায়ের কণ্ঠটি তাহার খুব দুর্বল ছিল। কারণ, যুদ্ধের সময় তিনিই বিবেকরুদ্ধ হইয়া পলাইয়া যান পাশের দেশে। সেখানে যে কাজই করুন কিন্তু কষ্ট ছিল অনেক। এই স্বাধীন ঘরে আবার রজত ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত সে কিছু কাজ করিতে চায়। কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নয় নিরপেক্ষ মননের বীজ রোপন করা প্রয়োজন। সে কারণেই স্টেট্সম্যানদের ইতিহাস তাহার বিশেষ প্রয়োজন। কোন পথেরকথা কীভাবে কতোটা সত্যের সহ্যে উপস্থাপিত করা সম্ভব। এসব বেপরোয়ার ভাবনা যখন তাহাকে ছাপিয়া ফেলে, অনেক প্রকারে বাবার প্রচ্ছায়া হিম হইয়া দাঁড়ায়, তখনই এক প্রহেলিকা ভর করে। রজত-ননীর প্রহেলিকা। রজত মেলে বিশদ প্রেমকথা বলিয়া নরওয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করিয়াছে। ওখানে গিয়া সে দুজনের সম্পর্ককে পরিণতি দিতে চায়। পলা লিখিল, ‘আমি রাজি নই’। এই একটি বাক্যেরই প্রতিউত্তরে সে আবার বহু দার্শনিক অর্থ তৈরি করে। ক্ষীণ পরিসরে এসবের উত্তর নিয়া যে গোসিপ— এতে তাহার আগ্রহ নাই। বিশ শতক শেষ হতে চলিল। এসব যোগযোগে তাহার আড়ষ্টতা রহিয়াছে। রজতের অর্থখরচে যায় আসে না। সে তাহাকে পেতে চায়। কাছে চায়। একাকীত্ব তাহার অধৈর্য। কিন্তু পলা নিজের যুদ্ধমান জীবনের ভেতরে একটিই স্বপ্ন নিয়া বাঁচিবে—সেটি মন ও মুখের সততায় চিহ্নিত। আছের আসিয়া পড়ে, দোতলাটায় যে জানালা আর ছাদের কারুকাজ ছিল তাহা এখানে নাই— বাতাস কম, আলো কম কিন্তু কলোরব নাই— তাই সে বলে তুই সব ব্যবস্থা কর। এর মাঝে মালিন্যযুক্ত এক চিঠি আসিয়া পড়ে। কে যেন লিখিয়াছে। ‘কিছুদিন আগে ননীগোপাল মরিয়া গিয়াছে, তাহার ক্যান্সার হইয়াছিল’। বজ্রাঘাত মনে হইল পলার। এই সেই ননীগোপাল! কে লিখিয়াছে এ চিঠি, কোথায় থেকে এ চিঠি আসিয়াছে— কী হইবে কী করিবে সে এখন… অস্থিরতা বাড়তে থাকে, দ্বিগুন বেগে তা বহাইয়া যায়। সে বুক ফাটা আর্তনাদ করিয়া আসে। আছেরকে পানি আনিতে বলে। গলা শুকাইয়া যায়। মৃত্যু এতো কঠিন কেন? বাবার মৃত্যুর পর অনেক কিছুই তাহার গ্রহণযোগ্য মনে হইয়াছিল। কিন্তু ননী! সে কীভাবে কোন কষ্টে মরিয়া গেল। হায়! হে মৃত্যু, তুমি এক স্থবির যৌবন।
ননী একবারই তাহার হাত ছুঁইয়াছিল। সেটি তাহার নিবেদন নয়। কিন্তু কষ্ট পাইলেও পলা তাহাকে গ্রহণ করে নাই। মনের দামটুকু সর্বদা সে উচ্চে স্থান দিয়াছে। মনকে প্রতিপক্ষ করিয়া সে কিছু করে নাই। জীবনের সবটুকু তাহার নীল রঙের ছায়ায় জড়ানো। ননী ক্রমশ তাহাকে অধিকার করিয়া ফেলে। সে হাতে চন্দন দিয়া সে অনেক রকম সত্যের কথা বলে। কিন্তু কিছুই তাহার নিরাপরাধ মনকে পায় নাই। ননী বুঝি আর কারো স্পর্শ পায় নাই। সেই প্রতিজ্ঞা তাহার ছিল। কিন্তু এই অবিচল জীবনে সে ব্যর্থ না অব্যর্থ তাহা জানে না কিন্তু মৃতের গল্পে নারীর প্রণয় ব্যর্থ হয় নাই। বিবাহিত জীবনের সাধ নির্বাণবস্তুপ্রতীম হইয়াছে, কিন্তু ননী তাই বাঁচিয়া রহিয়াছে। এক নতুন উপলব্ধির সময় তাহাকে আচ্ছন্ন করে। যেখানে ননীর অভিনয় শেষ হইল। শেষ তো নয় যেন সাক্ষ্য সৃষ্টি করিয়া গেল।

নয়.
পলা আজ যেন প্রথম ঝুম বরষা দেখিল। কদম আসিয়াছে। জারুল ঝরিয়া আকাশকে শ্বেত-কমলায় বর্ণিল করিয়া দিয়াছে। এখন আর একা নয় সে। নগরবাড়ির স্মৃতিময় বটগাছটার নাই ধ্বনি এখন চরাচরে প্রতিবিম্বিত। রজত কী করিয়া তাহার মনকে বাধিয়া ফেলে তাহার উত্তর শুধু প্রেমের ডোরেই সীমাবদ্ধ। রজত আসিবে, ফিরিবে। ননী চিরকাল ফিরিবে না। আসিবেও না। কিন্তু ননীর মতো হাত তাহারই প্রিয়। খুব ঘনঘোর ঘনঘটায় বৃষ্টির সাথে তাহার সময়টাও কূলে ভিড়িল। এটি ঠিক কূল নয়। ব্যাকুল মনে কুটিল দ্বন্দ্বের তীর। যেখানে আরও একটি নতুন জীবন শুরু হইবে। কী তাহার নতুন জীবন! মৃত ননীর কুয়াশায় হাঁটার শব্দ, ক্লান্ত রজতের না ফেরার ব্যস্ততা আর পলার অফুরন্ত সময়ের বিন্যস্ত নতুন রূপ। যেখানে এখন নতুন কিছু করার সময় আসিয়াছে। এই নগরবাড়িটা সে বেচিয়া দিবে। গচ্ছিত অর্থ নিয়া সে মোনাইল ফিরিবে। সম্মুখ নয়, পেছনে ফিরিয়া আবার সে সম্মুখে ফিরিবে। পলার মোহন্তরূপ তো সবটুকু ব্যক্তিত্বেই ঘেরা। অপমানের স্বাদ সে নিতে জানে না। সে ফিরিবে মোনাইলে। কোটাবড়িটি না থাক, হবিবর রিফুউজি হয়তো পলাইয়া থাকিবে বা মরিয়া গিয়াছে— সেসব দাবি নিয়া নয় সে ওখানে যাইবে একটি গৃহের জন্য। এই গৃহটি তাহার অতিশয় কাম্য। রজতকে সে জানিয়া দেয়, ফিরিলাম গৃহে। তৃতীয় মার হাতে নগরবাড়ি ছাড়িয়া দিয়াছি। তুমি কবে আসচ। এবার শুন্য ঘরে আসিয়াছে এক সুন্দর। পলার এসব কর্মকাণ্ডের ভেতরে নতুন রূপ ধরিয়া আসিবে আরও অধিক কুসংস্কার আর কানকথার শব্দ। এই গ্রাম তো আরও অধিক কানাকানিতে উচ্ছল, সেখানে সে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে! চৌধুরী তো এখানে পুরানা মানুষ। তাহাকে কেউ চিনিবে না, সমীহ করিবারও প্রশ্ন নাই। তবে পলার আশ্রয় কী? বইপুস্তক আর গান-গজল-সিনেমায় তাহার কতোকাল চলিবে, এসবের সরবরাহ কে করিবে? কে তাহার সেবা দিবে? একলা আকাশে তাহার প্রশ্রয় কীভাবে ঘটিবে— জানা নাই। জীবনের বিবাদ তো মনে হয় আরও বাড়িবে। মৌলবী আমীর আলী সাব কিংবা কলি বেগমের খবর কেউ জানিবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত কেন? পলা কিছুতেই তাহার অবস্থান পরিবর্তন করিবে না। গৃহকেই শুধু জানে। একাকী জীবনে এই গৃহই সে চায়। নতুন গৃহ। মায়ার গৃহ। বন্ধনে বাধা গৃহ। ইহাই তাহার স্বপ্ন। প্রতিপক্ষ আসিলে তাহা মোকাবেলা করিবার সামর্থ তাহার রহিয়াছে।
মোনাইল ফিরিবার আগে আছের কর্তৃক সমস্ত বন্দোবস্ত শেষ করিলে— এই গ্রামে তাহার নতুন স্বস্তি মিলিল। তৃতীয় মা তো নিরুদ্দেশ। সে নিজেও এখন নিরুদ্দেশ। এতেই বুঝি মনের মুক্তি আসিবে। নতুন এক সমাজ গড়িবার লক্ষ্য নিয়া সে এবার মাঠে নামিবে। সেটি শুধু প্রজন্ম সৃজন নয়, পূর্ণ মানুষ সৃষ্টির নিমিত্ত কাজ। সে কাজ নিয়া সে কারো দ্বারস্থ হইবে না। অভাব বা দারিদ্র্য বিতাড়নের ব্যবসা নয়, কোনো শ্রেণি-সোসাইটি গড়ার কেন্দ্র নয় সেটি, আধুনিক মনস্ক মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক কেন্দ্র। সেখানে পাখির স্বর পুঞ্জীভূত হইবে, পুকুরের তরঙ্গ চলিবে, প্রচুর বৃক্ষের দর্শন সৃজন হইবে, রাজনৈতিক দেশপ্রেমিকের ইতিহাস রচিত হইবে। গুচ্ছ গুচ্ছ স্বরে এই গৃহ তো তাহারই গৃহ। তবে বিন্দুমাত্র মুখ ও মনের ভিন্নতা রইবে না। গোটা জীবনের চলিকাশক্তির যে দর্শন সেইটিই প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র এই মোনাইল। এইটি তাহার কর্মক্ষেত্র। রজত বলিয়াছিল অনেক স্মৃতির কারণেই তোমার এই বসতি— ইহাও একপ্রকার আপোষ ও সীমাবদ্ধতা। পলা তীব্র উত্তরে বলিয়া চলে ‘আদিম দেবতারা’ পড়িয়াছ তো! আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে তোমাকে দিল রূপ… তোমার সংস্পর্শের মানুষদের রক্তে দিলো মাছির মতো কামনা। এইসব কামনা নিয়া তোমার ভাবিবার অবকাশ নাই, পলা তাহার জন্য যাহা স্বাভাবিক তাহাই করিবে এবং করিয়া চলিবে। সত্যিই সে বুঝি আদিম দেবতার আগুন নিয়া সম্মুখে চলিতেছে, একাই— একাকী, অপ্রতিদ্বন্দ্বীরূপে; এই অস্বাভাবিক সমাজে, স্বাভাবিক কাজ করিবার নিমিত্ত। সে তো কারো মুখাপেক্ষী নয়, রজত সেখানে মুখ্যও নয়— পুরুষশাসিত সমাজের এই গৌণরূপ গোড়া থেকে শুরু করিয়া যদি সর্বত্র প্রতিফলিত হয় সে অভিজ্ঞতা সমাজ কীভাবে নিবে— ননী বলিয়াছিল, বস্তুই প্রকৃতির নিশানা। সে সম্মুখে চলে, পেছনে নয়। পলার তো সে বিশ্বাস আছে। এই সিদ্ধান্ত তো বিশ্বাসের পাথরেই নির্মিত! ##
shiqbal70@gmail.com
২১/০৬/১৫

পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা
শহীদ ইকবাল

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা
শহীদ ইকবাল

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় বাংলাদেশের কবিতার বীজ রোপিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সাল-তারিখ দিয়ে তো কবিতা শুরু হয় না, বিচারও হয় না। নির্ধারিত কালখণ্ডেই থাকে এর কারণ। এর ভেতরেই চেতনা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কৃষ্টি, আত্মসত্তার প্রকাশ, জাতীয় চেতনার উদ্বোধনজ্জদ্বান্দ্বিক জীবন পরিক্রমারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্ফটিকস্বচ্ছরূপ। চিরায়ত নৃ-সংস্কৃতির ধারায় তা স্নাত ও ক্রমবর্ধিতও। তা স্থিতি পায় সিক্ত মাটি-হাওয়ার নির্দিষ্ট ভূগোলে। এটির স্থান অস্তিত্বশাসিত পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশে। বস্তুত, ত্রিশোত্তর কবিতার অনুসৃত ধারাটিই এই বাংলাদেশের কবিতার ধারা।

২.
পাকিস্তানের জন্য ‘উন্মাদ’ কবিকুল বহাল থাকেন, তদ্রুপ ঐতিহ্যে কবিতা লিখতে থাকেন। অপরদিকে ক্রমশ নিজেদের আত্মপরিচয় আর বাঙালির স্বতন্ত্র চেতনার পথটি অবমুক্ত হতে লাগল, প্রথমত : মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দস্তুর পূর্ব-বাংলার মাটির সমন্বয়ী দৃষ্টি স্ফটিক রূপে, এমত সমর্থনটি আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, দ্বিতীয়ত : ক্রমশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন। ইত্যাকার এর ভেতরে মূল কাব্যধারাটি অঙ্গীকৃত হয়ে পড়ে এবং নিজেদেরও সমন্বয়ী চেতনার স্বাতন্ত্র্যরূপে নতুন ফুল-পাখি-নদী-নারী আর নক্ষত্রের গানে স্বচিন্তায় সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। এখানে চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিদের পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। তবে তখন থাকে অল্প বয়সের আবেগ, যুক্তিহীনতা, নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা। ‘নতুন কবিতা’র কবিদের পঙ্ক্তি তার প্রমাণ। তবে পাকিস্তান-আবেগ বা নিজ ধর্মের বিশ্বাস অবসিত হতে সময় লাগে। একপ্রকার ঝুঁকিও। তবে কবিদের প্রারম্ভিক এ পর্বটির উত্তেজনা দেখার মতোই ব্যাপার। তবুও থিতু হওয়ার পথটি তৈরি হয় উজানের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার পথ অর্জনে একদিকে কায়েম হয় ত্রিশোত্তর কবিপ্রভাব এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাম্যবাদী কবির অনুপ্রেরণার আবর্ত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেমনটা বলেন, ‘ক্রম-প্রসারমান মধ্যবিত্তের কর্মজীবনের অন্তরালে যে আবেগ-আকাঙ্ক্ষা নিহিত ছিলো–তারই প্রকাশ ঘটেছিলো ঐসব কবিদের রচনায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দীনজ্জএঁরা সকলেই এই সময়ে কাব্য সাধনা শুরু করেন। এঁদের শৈল্পিক সাফল্য অবশ্যই তুল্যমূল্য নয়; কিন্তু সেই কবিকুলের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো—এঁরা সবাই নতুন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। এবং সেই সূত্রে এঁদের কবিতার ভাষা, ফররুখ আহমদের অনুসরণে, মিশ্র নয়, বিশুদ্ধ বাংলাজ্জরূপক, উপমা, প্রতীকের ব্যবহারে এঁরা বাংলা কাব্যের অবিভাজ্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। প্রায়শ তিরিশের কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে লগ্ন। সে কারণে এইসব কবিদের প্রাথমিক রচনায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব একেবারে আকস্মিক নয়।…’ এক্ষেত্রে পঞ্চাশের কবিদের একটি উল্লম্ফন যুগ রচিত হয়। বাংলাদেশের কবিতা এগুতে থাকে প্রধানত সদ্য চলমান মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। এবং প্রসঙ্গত কবিরাও নিজেদের ভেতরে বদলাতে থাকেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক।
পূর্বাপর এমন ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্ম হলে বাঙালি মুসলমান ঢাকাকে আশ্রয় করে নতুন স্বপ্ন দেখে। সাম্রাজ্যবাদের মুক্তির লগ্নে, বাঙালি মধ্যবিত্ত বসতি নেয় ধর্ম-ঐক্যের ভেতরে। পরে ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কর্মচঞ্চল্য। দীর্ঘবঞ্চিত জীবনে উপনিবেশিত বা হিন্দু আধিপত্যের ভেতরে ‘পথহারা পথিক’ যেন পথ খুঁজে পায়। বাঙালির নগর জীবনও তৈরি হয় তখন থেকেই। পুঁজির বিকাশ ও সম্প্রসারণের ব্যাপারটিও তখন ঘটতে থাকে নানাকৌণিক। গ্রাম ছেড়ে শুরু হয় শহরে আসা। কিন্তু গ্রামীণ রূপসী বাংলার আবেগ থাকে চিত্তে। সবকিছু বুকে নিয়ে নাগরিক বসতি শুরু করেন ভাগ্যসন্ধানী মানুষ। পুঁজির প্রকোপে তাঁরা ছড়াতে থাকেন নিজেদের মতো করে। অভিবাসনও চলতে থাকে। অধিকন্তু পূর্ব-বাংলার চল্লি¬শের কবিরা কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ‘ত্রয়ী’ এ সময়ের আগেই কবি পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাষার দাবি যতো দৃঢ়তর হচ্ছিল ততোই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। কবিরাও যেন পাচ্ছিলেন মাটির লালিত্য। প্রসঙ্গত এসব ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঐ মধ্যবিত্ত। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বার্থপরতা পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ব-বাংলায় তাদের মনোনীত এজেন্ট তৈরি করতে শুরু করেন। তরুণ-কর্মপ্লাবী-সাহসী-পরার্থসেবী তরুণদের সামষ্টিক আন্দোলন ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রশক্তির এ অপতৎপরতায় সদ্য স্বাধীন মুসলমানদের অনেকেই স্বার্থভোগী হয়ে ওঠেন। নতুন আবেগের ভেতরে কিছু শ্রেণি বা স্বার্থপর গোষ্ঠী তৈরি হবে–এ আর নতুন কি? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন আল আজাদ এ সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁদের কবিতায় থাকে পূর্বসূরিদের মায়া ও কল্পজগতের অবভাস। এ কবিদের হাতে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফ্রন্টের জয়লাভজ্জএসব কবিতার পক্ষে উক্তি ও উপলব্ধিকে তৈরি করে। একটি কবিভাষাও তাঁদের ক্রমশ আয়ত্তে আসছিল। আর মধ্যবিত্তও একটা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করছিল। তবে এর বিপরীতে ইসলামপন্থি অংশটিও যে ‘হয়ে ওঠে’ না, তা নয়। তাঁদের দ্বিধান্বিত স্বরটি ‘পাকিস্তান’ আর ‘কায়েদ-ই-আযমে’ আটকানো। তবে তফাতটা উপর্যুক্ত অংশের আলোচিত কবিদের কবিতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা সম্ভব। তবে সদ্য সচল একটি সমাজে যে সবকিছুই পূর্ণাঙ্গরূপে বিদ্যমান থাকবে, তা সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের কোপানলে যে মধ্যবিত্ত তা শুধু অনিবার্য বাঁচার অংশ ও অধিকারটুকু চেয়েছিল, সে যখন স্বাধীন হল তখন শঙ্কামুক্ত হয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠল। ঘটল যাবতীয় সীমাবদ্ধতার অবসান। আবেগের যেন মহীরুহ প্রত্যাবর্তন। ‘নতুন কবিতা’ কিংবা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’ সংকলনের লেখকরা শুধু বিষয়বুদ্ধি নয়, বিষয়াতীত বিষয়কেও তারা কবিতায় উপাদানরূপে আনতে চাইলেন। কবিতার মূলধারাটি বজায় রেখে সামষ্টিক প্রবণতায়, সমন্বয়বাদী ভাবনায় শিল্পকে বহুমুখি করে তুলতে চাইলেন। এবং বোধকরি পরের দশকে তা পরিপূর্ণরূপে কূলে ফেরার পালা। অবশ্য সে অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়া তো ‘কাব্যকে বৃহৎ কাল-চৈতন্যের সমান্তরাল একটি সরল রেখায় বয়ে নিয়ে’ আসার প্রত্যয়।
পঞ্চাশের কবিরা একটা দশকে সীমাবদ্ধ নন। কবিত্ব নির্ণয়েও তাঁদের প্রারম্ভ ও প্রতিশ্র“তিটি এখানে বজায় থাকে। এ দশক বাংলাদেশের কবিতার প্রারম্ভিক কাল। বাঙালি মুসলমান পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে কাব্যভূমির মৌল সূত্রটি সন্ধান করছে এ দশকে। যাঁরা পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন সে কবিতায় উঠে আসে লোকজ জীবন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্পর্শগন্ধময় আকুতি, ফুল-প্রকৃতির প্রণয় আর পরিশুদ্ধ মূল্যবোধের চর্চার মত্ততা। চেতন-অবচেতনভাবে মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতে নির্ধারিত সৃষ্টিসত্তা রূপান্তরিত হয় নদী-প্রকৃতির নিস্পৃহ নৈর্ব্যক্তিক সত্তায়। নদী ও মানুষের কবিতা লেখেন সানাউল হক। লোকায়ত নন্দনে সাত-নরী হার লেখেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অনেকেই ফেরেন স্নিগ্ধ মহিমান্বিত উজ্জ্বল জীবনে। সেখানে এক রকমের সংস্কার যে থাকে না তা নয়। কিংবা মানবতার জন্য দায় বা নিরঙ্কুশ আকুতি, নারীর শরীরী প্রণয়, আসঙ্গলিপ্সা, জৈবিক প্রণোদনা এমনসব বিষয়গুলো আড়ষ্ট; কারণ, রোম্যান্টিকতার পূর্ণায়ত রূপটি তখনও তেমন করায়ত্ত হয়নি তাঁদের নিকট। এ পঞ্চাশে আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক ক্রমশ অধিকার করছেন জীবনের যাবতীয় ও সূক্ষ্মতর বিষয়সমূহ। কবিতার উপাদানগুলোতে তুলে এনেছেন মানবতার সর্বোচ্চ ক্ষেদ। নাগরিকতার অন্তর্ভুক্তিও পায় কবিতা।
বায়ান্ন থেকে আটান্ন বাংলাদেশের কবিতায় স্ফূর্তি আসে। এরপর বাষট্টি পর্যন্ত বিপর্যস্ত। বাষট্টির পর পূর্ণ প্রবাহ। শামসুর রাহমান পঞ্চাশের গোড়ায় শুরু করলেও প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বেরোয় ষাটে। প্রায় একই ঘটনা সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান এবং এ পর্বের অন্যান্যদের ক্ষেত্রে। তবে কবিমেধার পূর্ণতা আসে একটা সময়ে। সে সময়কে চিহ্নিত করা একটু মুশকিল। কারণ, এ বিচার অনেকটা সাবজেক্টিভ এবং আপেক্ষিক। আহসান হাবীব বা শামসুর রাহমানের মতো অনেকেই কয়েক দশক ধরে কাব্যসাধনা করেছেন। কবিরূপে অনেক পরীক্ষার আবর্ত যেমন তাঁরা অতিক্রম করেছেন তেমনি তাঁদের প্রতিমায় সাধিত হয়েছে ‘নিকষিত হেম’ সমৃদ্ধি। এক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাটিও বিচিত্র। প্রথম কাব্যে শামসুর রাহমান যেভাবে উপস্থিত–রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) তা পরিবর্তিত। কারণটি নিহিত দেশ-কাল-সমাজ-প্রতিপার্শ্ব চেতনায়। যে দৃশ্যমান জগত থেকে কবিচেতনা দিব্যমূর্তি লাভ করে। অবচেতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় যে সত্তাটি–সেখানে অভিজ্ঞতা-অন্বেষিত স্মারক প্রস্তুত করেন কবি। স্মর্তব্য, এ সময়টায় সম্পাদিত কবিতা সংকলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন–এসবে যে নতুন মধ্যবিত্ত উঠে আসে তাঁরা অনেকটা পরিশোধিত। অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবিক কল্যাণের বিষয়সমূহই তারা সামনে এনেছেন। ধর্মীয় সংস্কার ও জাতপাত-শ্রেণিভেদ তাঁরা অস্বীকার করে। শাশ্বত শিল্পচেতনাকে দেয় প্রাধান্য। এ বিশ্বাস আসে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের ভেতর দিয়ে। তবে অবাঙালি শ্রেণিশক্তি বা সামন্তগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় ‘অনুগত চর’রা নানাভাবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা চালান। এতে করে দ্বন্দ্বাত্মক আবহ যে রচিত হয় না তা নয়। এসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই পূর্ব-বাংলার নব-উত্থিত মধ্যবিত্তশ্রেণিটি সমাজসম্ভূত শিল্পজগতটি নির্মাণ করতে থাকে। প্রসঙ্গত বহির্দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের ভূত যে ঐ সামন্ত শাসক বা আমলাদের শক্তি জোগায়নি তা নয়। বরং বিপুল জোয়ারের স্বপ্নকাতর আবেগের ভেতরে রাষ্ট্রের এদেশীয় এজেন্টরা নিজেদের আখেরের লাভ এবং লোভ চিনে নিতে ভুল করে না। কিন্তু এসব অন্তরায় আদর্শ সচেতন নতুন মধ্যবিত্তকে কিছুতেই পরাস্ত করতে পারেনি। বরং লক্ষ করা যায়, বিপরীতমুখি ধর্মীয় চেতনা ধারার কবিরা ম্লান হওয়াই শুধু নয়জ্জক্রম-অপসৃত হতে থাকেন। এ পটভূমিতে সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৯-১৯৭৫) ‘সমকাল’ (১৯৫৭) পত্রিকাকে ঘিরে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিচর্চা আরও বেগবান হয়। তাঁদের যাত্রা পঞ্চাশের মধ্যভাগে। কিন্তু প্রকরণগত ঔজ্জ্বল্য পরীক্ষা করলে ষাটের প্রথমার্ধেই অনেকটা চকিত। হয়ে উঠেছেন স্থির, বাড়ন্ত।
১৯৫৮তে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৯০৭-১৯৭৪) পাঞ্জাবি সামরিক সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন। এতে এ অঞ্চলের মুসলমানরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। বিভ্রান্তি আর স্থিরতা জন্ম নেয় সমাজস্তরে। উল্লিখিত মধ্যবিত্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ, অনেকক্ষেত্রেই স্বাভাবিকভাবে, আইয়ুব অনুগত শ্রেণি তৈরি হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! চিরকালই ক্ষমতালোভীর দল, চাটুকারের দল, হালুয়া-রুটির সন্ধানী, উচ্ছিষ্টভোজীরা এমন সুযোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। উপনিবেশবাদ অবসানে নতুন রাষ্ট্রে এমন শ্রেণিকাঠামো অনুপস্থিত থাকে না। আর পাকিস্তানের মতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রপুষ্ট রাষ্ট্রে এ সুযোগ আরও বেশি। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিপতির অনুগত দলবাজ, ফড়িয়া শ্রেণি প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়। আসন্ন ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’ (১৯৬২)র নামে দ্বিধাবিভক্তি আর আত্মক্ষয়ের অধ্যায় রচিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশে ভাগ হয়ে যায়। একজন পশ্চিমা সমর্থক অন্যজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এরূপ নানামুখি বিভ্রান্তিতে গণসমাজে ডিক্টেটর আইয়ুব খানই ‘হিরো’ তে পরিণত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক উঠতি মধ্যবিত্ত আত্মমগ্ন ও অন্তর্লীন হয়ে পড়ে। একটা বিচ্ছিন্নতা, বৃত্তায়ন আর বিড়ম্বনা গ্রাস করে। কবিরা তেমন এগুলেন না। কবিতা ‘গ্রহণ-ধরা ছায়ার মতো’; অনালোকিত। তবুও চণ্ড আইয়ুবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপন সম্পন্ন হয়। বোধকরি কবিরা এরপর আর অক্রিয় থাকেননি। এ পর্বে একদিকে লোকায়ত এবং নাগরিক চেতনা দুটোই এগুতে থাকেজ্জআর বলতেই হয় কবিভাষার অবলম্বন-বিভাবে জাগরিত ঐ ত্রিশের উত্তরাধিকার।
ষাটের প্রারম্ভ থেকেই পূর্ব-বাংলার জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার বোধটির সঙ্গত প্রকাশ ঘটাতে থাকে। এ দশকের প্রথমার্ধের কবিরা মুখোমুখি হন মৌলিক গণতন্ত্র বা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হতাশ, বঞ্চিতজ্জযতোটা স্পন্দিত ছিলেন ঠিক ততোটাই হলেন মলিন। কবিতায় তখন বাহুল্য হয়ে ওঠে যৌনতা, বিচ্ছেদ, উগ্রতা; কিংবা পরাবাস্তব (surrealist) চিত্র। শামসুর রাহমান পরিবর্তিত; আল মাহমুদ আধুনিকতার সমস্ত শর্ত বজায় রেখে গ্রামীণ লৌকিক জীবনে ফেরা আর আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তব প্রকরণে আটকান। তবে এসবের ভেতরে কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে কায়েম হতে থাকে স্বাজাত্য, স্বদেশপ্রেম। সেটা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পঙ্ক্তিতে, কখনও উপমাপ্রতীকে। এগুলো ষাটের প্রথমার্ধে শুরু হলেও স্পষ্টতর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে অধিকারের জানালা খুলে দেয় ‘ছয়দফা’র স্বায়ত্তশাসনজ্জযেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যচিন্তা বেগবান। একটু পরিচিতি কবিরা এগুলেন, পৌঁছালেন নিজ বাসভূমে, লিখলেন পয়ারে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা। অদ্যাবধি বাংলাদেশের কবিতার সবচেয়ে প্রজননোচ্ছল সুদিন এ সময়টি। প্রসঙ্গত, তখন কিছুকাল আগে মৃত্যু হয়েছে জীবনানন্দ দাশের (মৃত্যু ১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (মৃত্যু ১৯৬০); বুদ্ধদেব বসু জীবিতজ্জ তিনি করে ফেলেছেন কবি শার্ল বোদলেয়ার ও মারিয়া রিল্কের কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে (টি. এস. এলিয়টের অনুবাদক) কিংবা অমিয় চক্রবর্তী দুর্দাম লিখে চলেছেন। ষাটের প্রান্তিক এ কবিরা এসব থেকে প্রবল বৈশ্বিক হয়ে পড়েন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক সুররিয়ালিস্ট, পাশ্চাত্য অনুগত; নির্মলেন্দু গুণ প্রত্যক্ষ, নিরাবরণ, গণমানুষের পক্ষের পদাতিক। আর মহাদেব সাহা রুগ্ন রোম্যান্টিক। রফিক আজাদ চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মর্মদাহনে নির্ণীত। এঁরা এগিয়েছেন একাত্তরের ভেতর দিয়ে, এ পর্যন্ত।
৩.
কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রত্ন অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবি– তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : ÔPoetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছেজ্জযেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তাণ্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কল্পসৌন্দর্যই সেখানে মুখ্য। অবচেতন বা নির্জ্ঞানসত্তায় স্বপ্ন তথা যৌনবিহার অহং-রূপটি এক কল্পপ্রতিমার ধারণার জন্ম দেয়। কল্পনা বা আবেগই সেখানে মুখ্য।
একাত্তর-উত্তর কিশোর বয়সী রাষ্ট্রে পুঁজির প্রসার, মানুষের সম্পর্কের বন্ধন বিচিত্ররূপ লাভ করেছে, আয়-ব্যয়ের সীমানা বা সামাজিক মর্যাদা কুশৃঙ্খলে আচ্ছন্ন। সাহিত্য-দর্পণে কিছুই অনালোকিত থাকে না– কিন্তু শিল্প তো তার চিরন্তন পারিপার্শ্বিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, রচনা করে উত্তরপ্রজন্মের অনিঃশেষ অবারিত অভিসার। ষাটোত্তর লেখকবৃন্দ বিস্তর অভিজ্ঞতায় সাহিত্যের আধার আধেয়র চর্চা করেছেন। বিস্তর সময় ব্যবধানে তা একপ্রকার উত্তীর্ণ-অবমুক্ত বলা যায়। যে অভিমুখে পূর্ব-বাংলার সাহিত্যকারগণের হাতে সৃজিত হয়েছিল, শেষাবধি সে স্বপ্নকল্পনা ততোধিক হয়ে উঠেছিল– এই স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তাদের স্বার্থরক্ষায় অনুগত মুৎসুদ্দি শ্রেণি তৈরি করে। আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব শিল্পী লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। অজাচারজ্জ‘অনাহার’ চললেও পরিশুদ্ধি তো চলেই। এখনও অনেক কবি নির্মোহ, নির্লোভ। সত্তর দশক এ বিধ্বস্ত, হতাশার মুখে; রচিত ইমেজজ্জস্রোতের বিপরীতে। ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, অবক্ষিণ্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা লেখেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। নানা রকমে এ সময়ের কবিরা প্রস্ফুটিত। কেউবা আত্মমগ্ন, অন্তর্লীন; কেউবা অনুকরণপ্রিয় রোম্যান্টিক। একটা স্ববিরোধীতা, দ্বন্দ্ব-দোলাচলতা দেশ-কালসাপেক্ষে চলতে থাকে। এ সময়ের কবিরা একদিকে যেমন উত্তরণের চেষ্টা করেন তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদে হয়ে ওঠেন স্পষ্টভাষী। নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মোহন রায়হান সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুক্তমানবতার বিজয়বার্তা ঘোষণা করেন। কবিরা আশাবাদের বাণীই প্রত্যয়দীপ্ত করেন। এ সময় স্বাধীন দেশে অনেকেই মূল্যবোধের ভিত্তিটি তৈরি করেন। প্রধানত মুক্ত স্বদেশে, স্বাধীন এ দশকে, বাঙালির আবেগ হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধ। নারী বা শ্যামলী নিসর্গ যোজনা করে নতুন মাত্রার। স্বপ্ন-সম্ভাবনার মূর্তিমান বিন্দুতে থাকে যাবতীয় অস্থিরতার অবসানের আর্তি। কবিরা একটা স্থির ও স্থায়ী প্রকরণ-নির্মাণে পরিশ্রমী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তির আনুগত্য, ব্যক্তিবলয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় শুভ ইঙ্গিত। সেখানে চিহ্নিত থাকে সময়ের বলিরেখা। এ দশক অনেক প্রলম্বিত, এঁদেরই অনুবর্তী পরবর্তী দশকের কবিরা। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ শতকের কবিরা নতুন কবিভাষায় যেমন উঠে আসেন তেমনি পূর্বের কবিকুলও অর্জন করেন অপরিহার্য প্রত্যাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পরে থিতু হওয়া, অভিজ্ঞতা আবেগরহিত, সত্তরের প্রবাহ পৌঁছায় আশিতে। একই ধারায় ও আচরণে, তবে চেতনার শুদ্ধতা পরিপক্ব, বুদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি, আরও অধিক নিরীক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা জারি, বেশি ঢুকে পড়ে স্থূল পারিপার্শ্বিকতা। শুদ্ধশব্দ নির্মিতির চেষ্টায় কৃত্রিমতা নেই তা বলা যাবে না, তবে কৃত্রিমতা একটা পর্যায়ই বলতে হবে এ সময়ে; তবুও আসলেন অনেকেই স্বৈরাচারী শাসনের বিপরীতে, লিট্লম্যাগে ভর করে, সমস্ত আগ্রাসী শক্তিকে অভয়ে এড়িয়েজ্জযদিও তা জটিল কিন্তু কবিতার জন্য সবই রপ্ত হতে থাকে। ‘পরাভব-প্রাণ’ কিছুতেই নয়, ততোধিক আবেগঘন প্রাণে বাজল জীবনের বাঁশী। স্বদেশমুখরিত, স্বাধীনতার অনতি পরের আবেগের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্রজ্জকিন্তু এগুনোটা, বোধের ব্যাপারটায় আশি পূর্ণাঙ্গ, আর ধারায় তো অবশ্যই অখণ্ড। কবিতা যে সমকাল ও সমাজকেই রাখবে তার ভেতরেজ্জতা তো নয়, সেটা হতেও পারে না। নন্দনকর্ম অবশ্যই পরিবেশ চায়, সেজন্য তার অপেক্ষা ও গুরুত্ব আছে, কিন্তু অনির্বচনীয় বলে যে কথাটা কবিতায় অনিবার্য তা কীভাবে এলো? আশিতে কবিরা পূর্ব-পাঠ, পাঠ-অভিজ্ঞতায় সমাজধর্ম, মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রত্নদৃষ্টি অর্জন করেন। ঢাকার নাগরিক হিসেবেও অভিজ্ঞ। অশনির বিরুদ্ধে উজানে যেমন চলছেন তেমনি শেকড়েও ফিরে শানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি নাগরিক অভিজ্ঞতা। চেতন-অবচেতন বিন্দুটি শ্লোগানতাড়িত, সাম্রাজ্যবাদ ফুঁসছে; কবিতা ব্যঙ্গে হাসছে, জীবন নিয়ে যেমন পরীক্ষা, উক্তিতেও পরীক্ষাজ্জনন্দন পরিমণ্ডলটির ভিত্তি এরূপেই নির্ণীত হতে থাকে। প্রজ্ঞাঋদ্ধ প্রতীকপ্রতিমা, উপমা-ভাষা, শুদ্ধশব্দ; খিস্তিখেউড়, আঞ্চলিকতা নিয়ে আশির ভিন্ন বাতাবরণ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সামরিক শাসন-কাঠামোর ভেতর-বাহির পটচিত্র অংকন করেন, রূপকথা বা উপকথার অর্থারোপটি তাঁর অনেক কবিতার প্রাণভোমরা। শোয়েব শাদাব কিংবা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এখনও এরকম সোনা-রূপার কাঠি বা ‘সমুদ্দুর’ পুরাণে আছেন। তবে তাঁরা জীবিত, এ পর্যায়ে হয়তো এমনটা এখন নিশ্চিত, তাঁরা কবি হিসেবে চলমান। তাদের ভবিষ্যৎ জানা মুশকিল। তবে প্রচ্ছন্ন আশঙ্কা এজন্যই স্বার্থ-অভাব-সংসার-কর্মব্যাপদেশ-ভোগবিলাস সবমিলে ‘অনেক আলোর ঝলকানি’র তো অনেকেই ধরাশায়ী। তবুও যাঁরা কবিজীবী তাঁদের প্রণাম।

৪.
নব্বুই ও শূন্যের দশক বেয়ে এদেশের সাহিত্য এখন অপরিমেয়। মুক্ত ও মনোপোলার বিশ্ব, তথ্য-প্রযুক্তির প্রবাহ, মানুষে মানুষের সম্পর্ক, ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অবসাদ, গূঢ় ও রহস্যের বিচিত্র ফাঁদ সাহিত্যের ভাষাকে পাল্টে দিয়েছে। শ্রেণি-ব্যবস্থায় কর্পোরাল সংস্কৃতি মনুষ্যচেতনাকে প্রবলরূপে শাসন করছে। কবিতা কঠিন, বিজ্ঞাপনের ছায়ায় বন্দি বাজারচলতি দোষে দুষ্ট। এরূপ অভিজ্ঞতায় কবিতা নেই তা বলা যাবে না। ভাষার উৎকর্ষ ঘটেছে, সাহিত্যে বিশ্ব-অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরুনো সাহিত্য পূর্ব-বাংলার সেই মুসলিম সংস্কারাশ্রিত সাহিত্যকে এখন তা চ্যালেঞ্জ করতে চায়। পরিবর্তনের সূত্রটুকু তাতেই ধরা পড়ে। নব্বুইয়ে কিছু কবিপ্রতিভা এলেও ঐ একইরূপে অখণ্ডরই খণ্ড বলতে হবে তাঁদেরও। তবে পরীক্ষিত কি-না সেটা বলা এখনও কঠিন। এ নিরীক্ষার জন্য এখনও সময়ের প্রয়োজন। ধীর অভিজ্ঞতার সন্দর্শনও কাম্য। এখন এই নতুনদের জন্য পরিচর্যার পরিসীমা, কবিদৃষ্টির সামর্থ্য এখনও অপেক্ষমান। উত্তর-আধুনিকতা এসেছে অনেকভাবে, কার্যকর যুক্তিটি কিছুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আকর টেক্সট নেই। কবিতায় অনেক আশা-সম্ভাবনা-অনিবার্যতা আসবেই, উপাদান-উপকরণও থাকবেজ্জসেটা তো বাজারী, বহ্বাস্ফোট, মিডিয়া কারবারি হলে চলে না। আর কবিতার মতো শিল্পে তো অসম্ভব। কবিতায় প্রত্যয় ও পরিচর্যা কিংবা মেধা-যুক্তি-আবেগ বললে জীবনানন্দ-সুধীন-বিষ্ণু-বুদ্ধদেব আর একালে আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুবকর সিদ্দিক উদাহরণ তো বটেই। এঁদের অনুগামী ধারাতেই নতুনরূপে আসেন কবিপ্রজন্ম। তাঁরও অর্জন করে স্বদেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির গন্ধ। অবশ্যই তাঁদের সে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

পাঠ : এ্যালবাম সম্পাদক : মনজু রহমান : রাজশাহী

শরতের দরজায় হেমন্ত শিশির ভেজা পায়ে কিছুটা আগেই কড়া নাড়ে। এই শরৎ হেমন্তের মধ্যলগ্নে বিশ শতকের সত্তর দশকে পথে নামে এবারের এ্যালবাম। মনজু রহমানের (জ. ১৯৫৬) সম্পাদনায় কবিতার ছোটকাগজ এ্যালবাম। প্রাচীন কাল থেকে কবিতার যে পথ চলা তার; আধুনিককালে এসেও অনেক দীর্ঘ। আর এই দীর্ঘ পথের সঙ্গী হয়েছে এ্যালবাম। আধুনিক কালে ফেসবুক, টুইটারে যখন একদল আসক্ত ঠিক অপরদিকে মনের কল্পনা ভাবনা চিন্তাকে আরেকদল কবিতা, গল্পে ভরে তুলছে। তরুণদের প্রেরণা উচ্ছ্বাস ও লেখালেখিতে আজও বেঁচে আছে অনেক ছোটকাগজ। বয়সের তারুণ্য নয় মনের তারুণ্যই বাঁচিয়ে রাখে ছোটকাগজকে। শিল্প সহিত্যের ছোটকাগজ এ্যালবামের প্রচ্ছদে যেন এক কাগজের তৈরি প্রাচীন স্থাপত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন খালিদ আহসান। এ সংখ্যাই ষাট দশকের কবি ও সাড়া জাগানো লিটলম্যাগ বিপ্রতীক (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৭) এর সম্পাদক প্রয়াত ফারুক সিদ্দিকীর (১৯৪১-২০১৪) স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। আলোচ্য সংখ্যাটিতে কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলি, তার নির্বাচিত কবিতা, কবির চিঠিপত্র, বিপ্রতীক-এ প্রকাশিত লেখা পুনঃমুদ্রণ, পাঁচ দশকের পঞ্চাশজন কবির গদ্য-পদ্য এবং সর্বশেষে গ্রস্থালোচনা স্থান পেয়েছে।
কবি ফারুক সিদ্দিকী স্মরণে তার সতীর্থদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে উঠে এসেছে অনেক কথা। ফারুক সিদ্দিকীর জীবনের ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র, লিটলম্যাগ সর্ম্পকে নানা কথা উঠে এসেছে এখানে। ৬৭-এর বিপ্রতীক শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজে এক জ্বলন্ত শিখা। ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে জোয়ার শুরু হয় তার অগ্রভাগে ছিলেন কবি ফারুক সিদ্দিকী। সুদীর্ঘকাল সম্পাদনা করে গেছেন বিপ্রতীক। তবে বিপ্রতীক, এর প্রথম সংখ্যাটির যৌথ সম্পাদক ছিলেন, মহাদেব সাহা ও কাজী রব। প্রকাশক ছিলেন ফারুক সিদ্দিকী। বাংলার কাব্যাঙ্গনে এক আলাদা মাত্রার লিটল ম্যাগাজিন বিপ্রতীক। ফারুক সিদ্দিকী বগুড়ায় জন্ম নিয়ে জন্ম দেন ছোটকাগজের। তিনি একাধারে কবি ও সম্পাদক হিসেবেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। তিনি মাত্র দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। একটি কাব্যগ্রস্থ স্বরচিহ্নে ফুলের শব অপরটি প্রবন্ধগ্রন্থ তামসিক নিসর্গে ঈশ্বরনামা ও অন্যান্য। তিনি সবসময় প্রতিষ্ঠা-বিরোধী চেতনা আমৃত্যু লালন করে গেছেন। তার লেখার মধ্যে এক ধরনের ভিন্ন ভাব, ভাষা, ছন্দ ছিল। শব্দকে তিনি ভালোবাসতেন তাই তাঁর কবিতা মানেই শব্দময়-‘আনন্দ, চিরায়ু রৌদ্রে পৃথিবীর রূপরেখাময় মৃগনাভিরাঙ্গা। ক্রমভয়াল পথ মোচনের উঠে আসা বেপুথপদ আশ্বাস’ (কৃষ্টিতে মৌমাছির চিত্র) ফারুক সিদ্দিকী ছিলেন সহজ, সরল ও শিশুসুলভ। তিনি শুধু কবিতাই লেখেন নি, কবিতা বিষয়ক গদ্যও লিখেছেন অনেক। তিনি কবিতাকে ঐতিহ্যাশ্রিত শিল্পরীতিতে সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহ্যের গণ্ডি পার হতে চাননি। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেনÑ ‘বাস্তবতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের কষ্টকর গ্লানির একরৈখিক দৈর্ঘ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ কবিদের বিষয়বস্তু আজও হতে পারেনি। ফলে কবিতা অনেকাংশে হৃদয়-সংবেদী হয় না, ‘ভুঁইফোঁড়া, মর্মহীন মনে হয়’। কবি ফারুক সিদ্দিকী জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করেছেন ছোটকাগজের প্রতি। আর কবিতা যেনো তার জীবনেরই একটি অংশ। ফারুক সিদ্দিকীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চারজনের কথায় এসবই উঠে এসেছে। সত্তর দশকের কবি মনজু রহমানের সঙ্গে ষাটের দশকের কবি ফারুক সিদ্দিকীর একটা ভালো যোগাযোগ ছিল। আলোচ্য সংখ্যাটিতে ফারুক সিদ্দিকীর লেখা নয়টি পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। পত্রগুলোর প্রাপক মনজু রহমান। অধিকাংশ পত্রে প্রেরক মনজু রহমানের কাছ থেকে ভালো প্রবন্ধ লেখা চেয়েছেন সেটিই তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতা এক বিশাল সমুদ্র। অনন্ত, অসীম। আর এই বিশাল সমুদ্রে কবি খালিদ আহসনের যাত্রা শুরু দেশ স্বাধীনতার সময় থেকে। নিজের অনুভূতি ছাড়াও অন্যের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তার কবিতায়। প্রত্যেক কবিরই একজন প্রিয় কবি থাকে, তেমনি খালিদ আহসানের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ। তার মতে, ‘রবীন্দ্রনাথ যেন বাঙালির এক পরম আশ্রয়, আত্মার অনাবিল শান্তি’। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, সামাজিক ঘটনা সবই যেন কবিতায় তুলে ধরেন কবি খালিদ আহসান। তার নদী নেমে এলো কবিতায় দেখিÑ ‘নদী তুমি কোথা থেকে এলে/ পাহাড় গড়িয়ে নামলে/ পাহাড়ের বুক চিরে ফিরে এসে/ আমার সাদা কাগজের উপর থামলে/ কলমের পাশে দাঁড়ালে’। দৃশ্যরূপ, কল্পনা এবং নিরাশ্রয় অশরীর ভাবরূপগুলোকে একত্রিত করে অপরূপ মূর্র্তিতে বচন শিল্প, শব্দশিল্প ও বাক্যশিল্পের দ্বারা কাব্যকে সম্পূর্ণতা দান করে নাজমীন মর্তুজা। নারী, চাওয়া পাওয়া, সতী, বাঁদরামি খেলা, ব্রজধাম এই পাঁচটি কবিতার বেশিরভাগ স্থানেই তিনি নারীকেন্দ্রিক কথা বলেছেন। নারীরা প্রেমে পড়লে কত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়েও পাথরের মত শক্ত হতে পারেন তা তিনি নারী, কবিতার মধ্যে দিয়ে বুঝিয়েছেন। ‘তৃপ্ত প্রেমে পড়া নারী/ যমুনা সেতুর মত শক্ত/ তক্তার উপরে সানন্দে শুয়ে থাকে/ প্রেমে পড়া মেয়ে।’ তার কবিতার মধ্যে দুঃখ, কান্না, রাগ অভিমান, প্রেম-বিরহ, আনন্দ, শূন্যতা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তার কবিতার মধ্যে ছন্দের গঠনগতরূপ তেমনভাবে প্রকাশ পায়নি। কাব্যিক ভাব, ভাষা, ছন্দ সবকিছুকেই আত্মস্থ করেছেন কবি শামীম হোসেন। তার কবিতার মধ্যে প্রকৃতির চিত্রই বেশি চোখে পড়ে। কবিতার লাইনে তিনি যেন এক মহুয়া নারী। আত্মকেন্দ্রিক কবিতায়Ñ ‘আমাকে বাঁধার আগে বেঁধো তুমি স্বরের কুসুম/ এই মাটিগন্ধী মন প্রজাপতি হবে-/ নৌকার গলুই ধরে পাড়ি দেবে সমুদ্রের পথ।’
বেদনার রং কি তা হয়তো না জানলেও একটা ধারণা যে তা নীল। আর এই নীল যে শুধু বেদনা, কষ্টের প্রতীক তা নয়। নীল যে ব্রহ্ম, নীল যে আকাশ, নীল কৃষ্ণ-জনার্দন হতে পারে তা বুঝিয়েছেন কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী, তাঁর নীলাভিলাষ কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন নীলের জয়গান গেয়েছেনÑ ‘নীলের মধুতে তুমি শ্রীমধুসূদন/ নীলের যাতনা জ্যোতি কৃষ্ণ-জনার্দন।’ শাসক কবিতায় তিনি কবিতার নামকরণের যে সার্থকতা তা তিনি অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। শাসকের রূপ তুলে ধরেছেন। কবি সুস্মিতা চক্রবর্তী মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কলম হাতে সৃষ্টি করেছেন কবিতার।
প্রেমের বিরহে কেউ হয়েছে সন্ন্যাসী, কেউ হয়েছে পাগল আর কেউ হয়েছে কবি। কবি তৌহিদ ইমামের কবিতার জন্ম বিষণœতা থেকে। আর এ বিষণœতা প্রেমের। সংরক্ত, পরকীয়া, রাত্রিপুরাণ-১, রাত্রিপুরাণ-২, লোনা জোয়ার, সংগীতিকতায় এই পাঁচটি কবিতার প্রত্যেকটি কবিতায় ধরা দিয়েছে প্রেম, বিষণœতা। সংরক্ত কবিতায় দেখিÑ ‘মাঝে মাঝে মনে হয়/ আমিই কেন হলাম না তোমার প্রথম প্রেম?/ কেন আমার জন্যই ফুটল না তোমার আদিম হৃৎপদ্ম?’ কবিতার ভাষার মধ্যে এক ধরনের কামনা ভাব জাগ্রত করেছে কবি এবং কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও ধরা পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে।
কবি প্রত্যয় হামিদের কবিতার মধ্যে পরিচিত শব্দের নতুন করে ব্যবহার এবং ভাবনার দিকগুলো ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে। নারীকে স্পর্শ করার আকাক্সক্ষা প্রত্যেক মানবেরই থাকে। আর এই স্পর্শ ১ থেকে ৫ সংখ্যক কবিতায় এই ধারণাগুলোই কাব্যিক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রেম, ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে স্পর্শ করার যে অনুভূতি তা তিনি বুছিয়েছেন এই ভাবেÑ ‘এই ঠোঁট, এই হাতের তালু-/ এগুলো আমি, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম।’
মাহমুদ হাসানের মুক্ত গদ্য সাতমাথার স্বপ্নের ফেরিওয়ালা-তে বগুড়া শহরের সাতমাথার মোড়ে তার যে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে তা তিনি উপস্থাপন করেছেন। নিজের জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে তুলে ধরেছেন এখানে। কবি হওয়ার স্বপ্ন, কবিতা প্রকাশের ইচ্ছা, লিটন ম্যাগাজিনের সাথে সম্পর্ক সব রকম কথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। মৃত্যুর কাছাকাছি এসেও তিনি আজও কবিতা লেখেন। কবির জীবনে নানা কবি চলে গেছেন না ফেরার দেশে, কেউ হয়তো কবিতা ছেড়ে দিয়েছেন আবার কেউ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন কবিতাকে এসব কথায় ভরে তুলেছেন মুক্তগদ্যটিকে।
রৌদ্রবঞ্চিতলোক শিবলী মোকতাদির রচিত মুক্তগদ্য। এই মুক্তগদ্যে তিনি কাব্যিক রূপ, ভাষা, ছন্দ প্রয়োগ করে লিখেছেন। তবে এটির ভাব জানা একটু কষ্টকরই বটে। কবিতাকে নিয়ে লেখা এই মুক্তগদ্যটি এক নতুন আঙ্গিকে লেখা। এবং তা কিছুটা হলেও দুর্বোধ্য। এই মুক্তগদ্যটিতে বারবার একটি চরিত্রেরই সন্ধান পাই তা হল ইমারত আলী।
মনজু রহমানের কবিতায় রাজনীতি, সমাজ, অবক্ষয় ও কাল উদ্ভাসিত হয়ে নারীর মুখ ও অনুভবের চিত্ররূপে। এক আলাদা শব্দ ও প্রতীকের ব্যঞ্জনায় অনুরণিত হয়েছে তার কবিতায়। আর অনেক শব্দ কবিতার অলঙ্কার হয়েছে। কবিতার গাঁথুনি, ভাষার প্রয়োগ, ছন্দ, উপমা সবকিছুই যেনো ধরা দিয়েছে তার কবিতার মধ্যে। ‘আমি কেন নতজানু হবো চপল কৃষ্ণ তোর মোহনী রূপে!/ যদি নত হই, চলে যাবো বনলতার চোখের উঠোনে।’
সর্বশেষে মনজু রহমানের কাব্য জয়তি নিয়ে আলোচনা করেছেন অনুপম হাসান। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জয়তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার প্রেক্ষাপট আর প্রতিচিত্র। জয়তু মাতৃভূমি। আর এই মাতৃভূমিকে কীভাবে লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে তারই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র এক নারীকে প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হয়েছে জয়তি কাব্যে।
ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা থেকেই হয়তো কবিতার সৃষ্টি, আর এই সৃষ্টির স্রষ্টা হলেন কবিরা। আধুনিককালের যে কবিতা এর সাথে জড়িয়ে আছে মুখশ্রী। কবিতায় শব্দ প্রয়োগ একটি বড় বাহক এ সম্পর্কে ঝ.ঞ. ঈড়ষবৎরফমব বলেছেন ইবংঃ ড়িৎফ রং ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ আলোচ্য সংখ্যাটিতে অনেক তরুণ, প্রবীন কবির কবিতা পাই। প্রত্যেকের লেখার ধরন ভিন্ন ভিন্ন, তবে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্বল। সবই যে কবিতার গাঁথুনিতে এ্যালবাম আরও বড় হোক, সর্বত্র বিস্তার করুক। এ্যালবামের প্রতিটি পাতায় এক একটি কবিতা চিত্র হয়ে উঠুক। নবীন-প্রবীন লেখকদের দীপ্ত লেখায় এটি শাণিত হোক নিয়ত।

পাঠ : মাসিক কবিতাপত্র

মাসিক কবিতাপত্র আকস্মিক হাতে এলো সোনাপাড়ার কবি মাসুদারের মাধ্যমে। উনি স্কুলশিক্ষক। কবি ও কবিতাকর্মী। ধরাবাঁধা প্রচারবিমুখ। নেশাগ্রস্ত-মাতাল ভণ্ডামী বা স্টান্ট নয়, এমনি-এমনি আকস্মিকের খেলায় রত ওঁর কবিতা। সেই একদিন স্ব-দায়ে পাঠালো মাসিক কবিতাপত্র। গেরুয়া মলাটে ঠাসা লেখা, কোনো ফাঁক নেই, কৃপণের কৃপাণ; কিন্তু কাজ হয়েছে প্রচুর। তরতাজাও। নেশা হলো, কবে পাবো, মাসিকটি। পেলামও। এক, দুই, তিন…পর পর বারো পর্যন্ত, হতাশা কাটলোÑ যে ওদের প্রতিশ্র“তি পাই পাই করে শোধ করে দিয়েছে; যেমন বলা তেমন কাজ। তখন এই কমিটমেন্টের ভেতরে আমার কাগজটি হাতে নিই, কিছু অর্জন করার চেষ্টা করি, মিলিয়ে নিয়ে, ধারাবাহিকতাটুকুও দেখি, একের পর এক সংগ্রন্থন, অতঃপর বাঁধাইয়ে দিয়ে, কিছু ঔজ্জ্বল্য চিহ্নিত করা। অতঃপর আমার সহ-সম্পাদক রফিক সানিকে বলি ওটা নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে, কবিতাসংখ্যায়। সেমতে এই অনুসন্ধান, এবং পুরনো পড়াটাও আবার এক লহমায় ঝালিয়ে নেওয়া।
বলে নিই, এটি বেরোয় কলকাতা থেকে, সম্পাদকমণ্ডলী আছে, নির্ধারিত সম্পাদক চেখে পড়ে না, নানাঅঞ্চলের সব সম্পাদক, ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়িয়ে বাংলা কবিতার চর্চার কথা বলছেন। একবছরের প্রজেক্ট। বেরোয় প্রতি ইংরেজি মানের ১৫ তে। আমার হাতে ক্রম-সংখ্যায় মোট বারোটিই আছে। বিস্ময়কর যে, এরও বারোমাস্যায় মনের বদল ঘটেছে। কিছুই যে সর্বদা একরকম থাকে না, তাইতো প্রমাণ। একবার আমরা জলপাইগুড়িবাসী গৌতমগুহরায়-এর একটি মজার বই করি। সে বইয়ে অরুনেশ ঘোষ, ফালগুনী রায়দের মতো ‘লেফটিস্ট’ লেখকদের চিনে ফেলি। খুব পুলক হয়, আগে ওদের নাম তেমন জানতাম না। এই বইয়ে ওঁদের ডেডিকেশন আর পরিচর্যা সম্পর্কে খবর পেয়ে লজ্জায় গুটিয়ে যাই। এমনটাও ছিলÑ এ বাংলা ভাষায়, বাংলাভাষার এমন কমিটেড মানুষ, হায়! একবার পায় তারে কী! মাসিকপত্রটির ১-এ অরুণেষ ঘোষ-এর লেখা দিয়ে শুরু, অন্যরকম কবিতার ভাষা ‘মৃত্যুর আগের রাতে’। মলয় রায়চৌধুরী, শ্যামল কান্তি দাসসহ অনেকেই, আর শুরু হলো রাজীব সিংহের লেখা “ভালো আছো, নয়ের দশক”। রাজীব সিংহের জন্ম ৬৯ কিন্তু কথা বলছেন অভিজ্ঞ ভাষায়, সাহিত্য নিয়ে গালগল্প, কবিতা নিয়ে কথাবার্তা, পত্র-পত্রিকার রুচি আর দর্শন নিয়ে আলোচনা সন্নিবদ্ধ। রণজিৎ দাশ নিয়ে গৌতম গুহরায়ের লেখা। পরের সংখ্যায় “ব্লাড লিরিক” ও “ডেথ মেটাল” নামে লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী, জীবনানন্দ নিয়ে জীবতোষ দাস, অনীক রুদ্রর অন্য ধারাবাহিক (অরুণ মিত্র নিয়ে), রাজীব সিংহের “ভালো আছো, নয়ের দশক”-এ পর্বের ব্যবচ্ছেদ ফালগুনী রায়। তৃতীয় সংখ্যায় উৎপলকুমার বসুসহ অনেক কবি (অ-কবিও আছেন নিশ্চয়), দীর্ঘ কবিতায় উৎপল ফকির (আগে চিনতাম না), বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ধারাবাহিকসমূহ। পরের সংখ্যায়ও কবিতার পাশাপাশি লেখক ধারাবাহিকে যুক্ত হয়েছেন এবং সমাসীন অনীক রুদ্র; অন্যরাও চলমান, এর পরে শূন্য দশক নিয়ে পরের সংখ্যা। ৬ সংখ্যাটি ‘বাংলা সনেট’ বিষয়ক। শুরু মধুসূদন শেষ একালের কবিবৃন্দ দিয়ে। দুটি সুন্দর গদ্য শিরোনাম ‘সনেটের কথা’ ও ‘বন্ধনেই মুক্তি’। ৮ম সংখ্যার মূলকেন্দ্র দীর্ঘকবিতা ‘অতন্দ্র বিমান’। লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে :
নানান প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকটে ধুকতে ধুকতে মাসিক কবিতাপত্রের ৮তম সংখ্যায় আমরা পা রাখলাম। মাসিক কবিতাপত্র এখনো পর্যন্ত প্রতি মাসের ১৫ তারিখে বের করতে পেরেছি আমরা তিন/চারজন বন্ধু নিজেদের পকেট খরচ, নেশার খরচ কাটছাঁট করে। পত্রিকার প্রথম দু-একটা সংখ্যা বেরোনোর পর আশ্চর্য, প্রায় একই কথা সাবধানবাণীর মতো বলেছিলেন, ফোনে, বাংলা কবিতার সর্বজনমান্য শ্রদ্ধেয় প্রবীন কবি থেকে সত্তর দশকের অন্যধারার প্রিয়কবি এবং দিল্লিনিবাসী প্রিয় সিনিয়র কবি ‘সাবধান। এবার কিন্তু শত্র“ বেড়ে যাবে তোমাদের। গালাগাল প্রশংসা সবই তোড়ে ধেয়ে আসবে এবার’। সন্তান যতো বড়ো হয়েছে, ততো দুশ্চিন্তা বেড়েছে আমাদের।
নবারুনের কবিতা এ সংখ্যাটিকে উচ্চতা দিতে সক্ষম হয়েছে। ৯তম তে আছে অনীক রুদ্রর পাণ্ডুলিপি, ধারাবাহিক নিয়মিত, তবে বিষয় পাল্টাচ্ছে। মার্কেজ আছেন ১০ম সংখ্যায়, ১২তম তে আছে ‘ঘরছাড়া’, সেই রাজীব সিংহের ‘ভালো আছো, নয়ের দশক?’
কবিতাপত্রের গুণ ও প্রাণ এর ধারাবাহিকসমূহ। রাজীব সিংহের টানা গদ্যটি ছাড়া অন্য অনেকেই ১২ সংখ্যার মধ্যে ধারাবাহিক গদ্য নিয়ে এসেছেন চলে গেছেন। কিন্তু কাজ রেখে গেছেন। তারা দায়িত্বশীলও বটে।
২.
কবিতাপত্র কবিতার কাগজ। কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ। লেখকগণ কবি, কবিতাই তাদের প্রাণধর্র্ম। বাংলাভাষার কবি ও কবিতার অনবদ্য একটি প্রচারপত্রের কাজ করেছে মাসিক কবিতাপত্র। বারো মাসের বারোটি সংখ্যা একঘেয়ামি নয়। আলাদা। মেজাজ ও ভঙ্গিও স্বতন্ত্র। স্বাদেও পার্থক্য বিরাজমান। অরুণেশ, প্রণবেন্দু, মলয় রায়চৌধুরী, অরুণ মিত্র, শান্তি লাহিড়ী, জয়দেব বসু, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সিদ্ধেশ্বর সেন, ফালগুণি রায়, রবীন সুর, মণিভূষণ ভট্টাচার্য নানাভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। এঁদের কবিতাপ্রসিদ্ধি বা খ্যাতি কম নয়। প্রণবেন্দু তো শেরপা। জয় গোস্বামী লেখেন : ‘সমস্ত ভাঙনের মুখে গড়িয়ে পড়তে পড়তেও উঠে আসবার, ঘুরে দাঁড়াবার এই ইতিহাস প্রণবেন্দুর আজীবনের লেখার মধ্যে ধরা আছে। স্পষ্ট, একমুখী কোনও সরলরেখায় নয়Ñ ধরা আছে নানা উচ্চতায়, বহুবিধ অনিশ্চয়তার এপারে ওপারে… প্রণবেন্দুর কবিতা বাণী দেয় না, ভর্ৎসনা করে না, সভায় সফল হয় না, আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে ওঠে না…’ এরকম করে পাওয়া যায় না অনীক রুদ্রর লেখায়। তিনি লেখেন : ‘প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে কখনো রাগ, বিরক্তি বা উষ্মা প্রকাশের ব্যাপারে আমি দেখিনি। … তাঁর কবিতা নিয়ে সেভাবে কখনোই ভালোমত আলোচনা হয়নি পত্র-পত্রিকায়। তবু তিনি এক বিশিষ্ট কাব্য ব্যক্তিত্ব ও মানুষ…।’ অনীক রুদ্র অনালোকিত কবিদের ও কবিব্যক্তিত্বকে চমৎকার ইঙ্গিতে তুলে এনেছেন। জয় গোস্বামীর উদ্ধৃতি আবার দিই : নব্বুই পেরিয়েও অরুণ মিত্র লিখতে পেরেছেন প্রেমের কবিতা। লিখতে পেরেছেন স্পর্শের কথাই বলছি। শুধু নারী নয়, এই স্পর্শ বন্ধুত্বের, পাখি, পতঙ্গ গাছপালায়, রাস্তায় অচেনা শিশু, কাজের মেয়ে পিয়ারিয়া, থলে হাতে একসঙ্গে সবজিবাজারে ঘোরা মুখচেনা প্রতিবেশি, রংঝাল দেওয়া মিস্ত্রি, জুতো সারাইয়ের মুচি থেকে, নারকেল গাছে ঝুলতে থাকা ডাবের কাঁদি, পানের বরজের গাঢ় হয়ে থাকা, কচুপাতার রঙ ঠিকরে দেওয়া পর্যন্ত এই স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ত। জগৎজীবনজোড়া এক স্পর্শের কথা তাঁর কবিতায়Ñ সেটাই যাকে বলে প্যাশনÑ অথচ তার তীব্রতা লুকিয়ে আছে নীচে, যেন সেই কবিতার উপরে হাত ছোঁয়ালে বোঝা যায় তার স্পর্শের তাপ।’ অনীক রুদ্র ‘সময়ের অর্জন : সঙ্গদোষ বা গুণ পর্বে’ লিখেছেন : ‘বাংলা কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে প্রায়শই তিনি ঝাক্ প্রেভের, ঝুলে সুপেরভিয়েল, লুই আরগঁ,আঁরি মিশো-তে চলে যেতেন। নাজিম হিকমত তাঁর প্রিয় কবিদের একজন। তবু অরুণদা আমার দেখা আদ্যোপান্ত এক বাঙালি যাঁর আত্মা ও শিকড় বিস্তৃত ছিল জন্মভূমির সুখ-দুঃখ-শোক-রাজনীতির ও বাস্তবতার খুঁটিনাটিতেই।… আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স, ইয়োরোপ ও লাটিন আমেরিকার কবিতার দিগন্ত খুলে দিতে পারতেন কবি অরুণ মিত্র।’ এভাবে অনীক বামপন্থী জয়দেব বসু নিয়ে বলেন : ‘টানা বছর কুড়ি জয়দেব মন দিয়ে কবিতাই চর্চা করেছেন। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থও তার উৎসাহের বিষয় ছিল’। স্মৃতিচারণায় সত্তরের কবি শামশের আনোয়ার প্রসঙ্গেও বলেছেন অনীক রুদ্র। এ কবি সম্পর্কে গৌতম গুহরায়ের মন্তব্য : ষাটের যে কয়েকজন কবির উচ্চারণে বাংলাভাষার প্রাঙ্গনে অন্যরকমের ধ্বনি জাগছিল তাদের প্রধানতম এই শামশের আনোয়ার। মাত্র তিনটি কবিতার বই, ছড়ানো ছিটানো আরও কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ রেখে বিদায় নিলেন। শামশের কাব্যিক বিদায় নিলেন ঠিক নয়, এক ধরনের নির্মম আক্রমণের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ছিল তাঁর মৃত্যু। শামশের, যার প্রিয় গাণিতিক সংখ্যা… শূন্য।’ এভাবে প্রতিতুলনার বিবেচনা আমার মতেÑ রুদ্রর স্মৃতিচারণার পাশাপাশি মিলে যাক কবির ‘ক্লান্তি’ ও উৎসারিত অভিমুখÑ যা সম্পূর্ণতার পরিলেখ, সামগ্রিকতার সম্ভার। রাজীব সিংহের ধারাবহিকটি কবিতার রুচি ও নন্দন পরিচর্যার, উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়। ধারাবাহিকগুলো কবিতাপত্রকে দিয়েছে বাড়তি মূল্য। যে বারোটি পর্বে ‘নয়ের দশক’ তৈরি হতে দেখি তাতে পশ্চিম বাংলার সামগ্রিক আর্থ-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, মনন-রুচি-মনস্বীতা, সাহিত্য আন্দোলনের অভিমুখ, লেখকগোষ্ঠী, লেখকদের দান-অবদান, বৈশ্বিক প্রতিমূর্তি দারুণ এক প্রতিচ্ছবি উৎকীর্ণÑ দু-আড়াই পৃষ্ঠা জুড়ে। স্যালুট, রাজীব সিংহকেÑ আমাদের সমৃদ্ধ করবার জন্যে। এতে নয়ের দশকের কবিতাভাষাটি চেনা যায়। এ ভাষা পশ্চিমবঙ্গের ধুলোমাটির উত্তাপে প্রতিশ্র“ত। সমাজ-রাজনীতির আন্দোলনে পুনর্গঠিত, রূপান্তরিত। লেখক বামপন্থা চেতনায় কবিমন ও সমাজের তল-খুঁত পর্যবেক্ষণ করেছেন, চেয়েছেন পরিবর্তনসূচক হিতকর কিছু, বণ্টন-বৈষম্য চিন্তায় কবির কাজ, বিপরীত-অশুভ সবকিছুর জন্য রাগী মনোভাবÑ লেখায় গড়ে ওঠে কর্পোরাল সুবিধাভোগীদের স্বরূপ, তাতে তৈরি শ্রেণিকাঠামোÑ এবং তার বিদ্রƒপের ভেতরে কবিতা ও কবিকণ্ঠÑ বিশেষ করে নব্বুই কবিতার প্রতিরোধী ভাষা, সমীর রায়, সুজন সেন, নিখিলেশ রায়, তুষার রায়, বিশ্বজিৎ পাণ্ডা প্রমুখÑ স্মৃতি-নস্ট্যালজিয়ায় ষাট-সত্তর-আশির প্রবাহ ও কর্মদ্যোগী সমগোত্রীয় কবিকুলÑ এক কথায় এটি চমৎকার সিরিজ। বাংলাদেশের বাইরের বাংলাভাষার আলাদা স্বর ও গড়ে ওঠা রাজনৈতিক কষ্ঠস্বর অবশ্যই নতুন পাঠ। এর বিস্তৃতি ও বিস্তার বাংলা কবিতাকে দিতে পারে বাড়তি উচ্চতা, এদেশের কবিরাও এর টেস্ট গ্রহণ করতে পারেন। এ দশকে শুধু কবিতা ও কবিকণ্ঠের কথাই নয় বিবরণ আছে লিটলম্যাগচর্চা ও বিভিন্ন ম্যাগের সম্পাদক, সম্পাদনাভাষ্য, প্রশ্নশীল গোষ্ঠীচেতনা, পূর্বাপর কবিদের ধারা ও প্রবাহ যাচাই প্রভৃতি। বৈশ্বিক যোগসূত্র, ভারত ও বিশ্বসমাচারের মাল-মসলা, নির্বাচিত স্টেটসম্যান মাও, লেনিন, মায়াকোভস্কি। রাজীব সিংহ মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এ সিরিজে, নিজের আবেগ ও অনুধ্যানও যুক্ত করেছেন তত্ত্বের পাশাপাশি। নীরস নয়, তথ্যকে ইতিহাস-পাঠে উন্নীত করা এবং তার বোধ ও বিশ্বাসকে অনুগত করা : ‘সভ্যতার অনিবার্য প্রভাবে মানুষের গোষ্ঠীজীবন ক্রমশঃ রূপান্তরিত হয় কলোনরি জটিল জীবনে। এই পৃথিবীর পরিমণ্ডল, তার জড় ও জীব, প্রকৃতি ও প্রাণী প্রত্যক্ষের অভিঘাতে বিক্রিয়া ঘটায় সৃজনশীল মনে। ¯্রষ্টার সূক্ষ্মতম অনুভব লিপিরূপ পেয়ে ওঠে কবিতায়, মূর্ত হয়ে ওঠে ছবিতে-গানে।…’ অনেক প্রশ্ন তুলেছেন, সাহিত্যকে ভাগ করা যায় না, কোনো দশকেও বাধা যায় না, কোনো অঞ্চল বা সীমায় বা কেন্দ্রে কুক্ষিগত করা যায় নাÑ লিটলম্যাগ এ পর্যায়ে স্বাভাবিক ভূমিকা গ্রহণ করে, তাই প্রশ্নের ভেতরেই বুঝি আমরা উত্তর পেয়ে যাই। তবে এ পর্যায়ে নব্বুইয়ের কবিতা সম্পর্কে একটি স্টেটমেন্ট উদ্ধৃত করি, যা পরবর্তী কবিতার ক্ষেত্রকেও চিহ্নিত করতে পারে : ‘নয়ের দশকের বাংলা কবিতা প্রধানত দুটি ধারার। যাঁরা এই সময়ে লিখতে এলেন, আশ্চর্য তাঁদের কবিতায় খুব সুস্পষ্ট ভেদরেখা টানা খুব সহজেই সম্ভব। ছন্দ ও প্রকরণ নিয়ে একটি ধারা, মূলতঃ নয়ের দশকের প্রথম ছয়-সাত বছরে এটিই প্রধান ¯্রােত। অন্যদিকে একটি চোরা¯্রােত, প্রথাগত ছন্দোবদ্ধতা থেকে মুক্তির আরেকটি ধারা। পরবর্তী সময়ে এটিই প্রধান ধারা হয়ে উঠবে। লক্ষ্য করা যায়, ছন্দ নিয়ে বেশ ভালো কাজ হয়েছে এ সময়ে। পূর্ববর্তী দশকে বাংলা কবিতা যেভাবে প্রথাগত ছন্দবর্জিত হয়ে ক্রমশ পাঠকবিমুখ হয়ে গেছিল, সেখান থেকে এই সময়ের কবিরা অনেক প্রস্তুত, তাঁরা প্রথা মেনেই প্রথাবিরুদ্ধ হয়েছেন। ছন্দ জেনেই তাঁরা ছন্দ ভেঙেছেন। সরে গিয়েছেন গদ্যের অমোঘ আকর্ষণে। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কম হয়নি এ সময়ে। লিরিক-আশ্রয়ী কবিতার পাশাপাশি অন্যধারার কবিতা, সেখানে ফর্ম-এর চেয়ে বিষয় অনেক বেশি গুরুত্ব পেলো। আবার টানা গদ্য, অক্ষরবৃত্তের ক্রম-ব্যবহার, স্বপ্নের মতো নির্মাণ আর বিনির্মাণ, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন ঐতিহ্যের সঙ্গে খুঁজেছে তার উত্তরাধিকার। পাল্টে গেল কবিতার চিরাচরিত ভাষা। পরিবর্তিত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া, মানুষে মানুষে পালটে যাওয়া মূল্যবোধ, প্রেম, যৌনতা ও সম্পর্ক বিষয়ে নতুন নতুন ধারণা, নারী-পুরুষ-উভলিঙ্গ ও সমকামী সম্পর্ককে একই নিক্তিতে ওজন করবার নিজস্ব দর্শন ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ কবিতাকে সত্য কথা বলবার সুযোগ করে দিল।’ এইটিই সম্প্রতিক কবিতার মৌল পাটাতন। যার প্রবাহ এখন চলছে। সময়ে তারও পরিবর্তন ঘটবে, সে অপেক্ষার অনুবর্তনও পরিগৃহীত রয়েছে তার ভেতরে।
ষাটের অপরার্ধ্ব ও বাংলা কবিতার বিস্ফোরণ নিয়ে সন্দীপ দত্তের ধারাবাহিক, তত্ত্বপ্রবণ, হাংরি, শ্র“তি, ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন, প্রকল্পনা সর্বাংগীন কবিতা, থার্ড লিটারেচার আন্দোলন প্রভৃতির স্বরূপ-স্বীকৃতি ও ইতিহাস বয়ান। যশোধারা রায়চৌধুরীর মেয়েদের প্রতিবাদী কবিতা ভিন্ন তথ্যের প্রতিপাদ্য। আলাদা স্বাদের রচনা। কবিতা সিংহ, কৃষ্ণা বসু, তসলিমা নাসরীন, মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরুষতন্ত্র, মাতৃত্ব, নীতিবোধ, অধিকার নিয়ে কবিতার ব্যাখ্যাই শুধু নয় প্রতিবাদের বিস্তৃত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তিনিষ্ঠ রচনা তৈরি করেছেন যশোধারা রায়চৌধুরী।
৩.
মাসিক কবিতাপত্র প্রচুর কবিতাও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের কবিদের কবিতাও আছে। দুফর্মা-একফর্মার পাণ্ডুলিপিও ছেপেছে। নবারুল ভট্টাচার্যের আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি অতন্দ্র বিমান, অনীক রুদ্রর এ পর্যন্তÑ অবশ্যই আকর্ষণীয়। আনন্দময়। ৬ষ্ঠ সংখ্যাটি সনেট নিয়ে। সনেটের আস্বাদনটুকু পূর্ণমাত্রা উজ্জীবিত এখানে। বিভিন্ন কবিদের প্রয়াসে তা হয়ে উঠেছে ভিন্নরূপে আস্বাদনযোগ্য। বিভিন্ন প্রয়াসে মাসিক কবিতাপত্র অনবদ্য ও আকর্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজ্যের কবিদের কবিতা ও কবিভাষা নিয়ে এই কবিতাপত্রটি একটি আকর্ষণীয় কাজ দাবি করতে পারে। যা বাংলাদেশের কবিদের অনুঘটকস্বরূপ। এবং প্রেরণারও। বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি অবশ্যই বাড়তি মাত্রা। আমরা নিয়মিত পেতে চাই। নিজেরা সমৃদ্ধ হতে চাই।

[ট্রিলজি]–সমস্ত ধূসর পিয়

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

মাখনুন বিশাল কাঁঠালতলার ছোট্ট কোণার সময়গুলা ছাড়িয়া একদিন সেই কাঁঠালগাছের ছোট্টমুচিধোয়া ফোঁটা পানির গড়ানো অংশে হাত রাখে। কাঁঠালমুচির অংকুরোদ্গম দেখে। ফলবান বৃক্ষের আত্মদান অভ্যাসে নয়, চিরায়ত আনন্দে— তা দেখে নেয়। এ গাছটা কবে কোন হিন্দু স্বর্ণকার রোপণ করিয়াছিলেন, কে জানে? শোনা যায় তার নাম বসন্ত বৈরাগী। কতো বড় সেই গাছ, এর শাখা-প্রশাখা মসৃণ কোমল, বড় খালার থাইয়ের মতোন। অনেক উঁচুতে উঠে বসে থাকতে খুব মজা লাগে। এক রকমের উষ্ণতাও আছে তাতে। যেন খালার বুকের ময়লা নরোম কাপড়ের ওমে মুখ গুজানো বাসনা। ওতেই কী ডিম পাড়ে ডেকি মুরগীটা! গোল থাইয়ের ওপর মচমচা গরম আমেজ আর দুলুনির কোছায় মগ্ন তামান শরীর। খালি লুকাতে চায়। আর ভেতর থেকে গুগলি ওঠে। তাতে রক্তবীজের ধারায় মর্ত্যে নাইমা আসে শিশু। সে নতুন উষ্ণতার সন্ধান করে। আলোয় আলোয় আকাশ দেখে। আকাশের ওপারে তাকিয়া কয় অন্ধকার থেকে কই আইসা পড়লাম। তাতে উষ্ণতা ভর করলে হঠাৎ বন্দ চোখ খুইলা তাকাইয়া দেখে এ তো কাঁঠালগাছের মোটা ডাল। তয় এইটাই কী বড় খালার থাইয়ের মতোন লাগছে? কী ধরনের আরামকোণা আছে এই থাই-ডালগুলায়, তাতে পাখি বসে, কাক ওঠে, ঘুঘু আসে, শালিক ঠ্যাং তুইলা পাখা ঝাপটায়। ফুড়–ৎ কইরা এপাতা ওপাতার নাচনের সঙ্গে যেন বায়না আনে। সে বায়নায় তুরতুরা ঠোঁটে পশম খুঁটে, ঝপঝপ ডানা ঝাপটায় আর কুচকুচ পশমহানা বাকুম তোলে। এতে গাছের মগডালের সঙ্গে রোদছায়ার উল্কিতে বোল ওঠে। তির্যক কমলা রঙের রোদ তাতে নকশা আঁকে। শিরশির আনন্দের ভেতরে তৃপ্ত ঠাণ্ডা বাতাস ছুঁইয়া দেয়। কাঁপে, দোলে, আর ভর দিয়া বোঁটার সাথে গড়ে তোলে চিক্কন মোনালি সংযোগ। অপার মুখে সে ভালোবাসা মানুষের বুকে ওরাল তোলে, গুরুগম্ভীর প্রার্থনা বইয়া আনে। মাখনুন তখন শতকিয়া আর মানসঙ্কে ঘর মেলায়। কঠিন মাষ্টারের মুখের দাড়ি নড়ে, হাত দিয়া টানে, একটু কাঁপেও। স্কুলের উত্তর দিকের দরোজা দিয়া তখন হু-হু করা হাওয়া তীক্ষè হয়া ঢোকে। তিন বেঞ্চের শেষটার কোণায় মাখনুন শীতে কাঁপে। আজ তার গায়ে হাফ হাতা মলিন শার্ট। বুকপকেট কোচকানো। সবুজ হাফ প্যান্টের তিনবোতামের একটা অন্যসুতায় আটকানো। এ কাঁপুনি আরও বেশি বোধ হয়, কারণ আজ সালোক সংশ্লেষণ বিষয়ক পড়া। তখন একপ্রকার নিজেকে নেতিয়ে নেয় সে, আরামের ভাপে তার মাইয়া বন্ধু জুঁইয়ের কথা মনে হয়। ফুলতোলা সাদা কামিজের তলে মোটা রানে আনন্দ ওঠে। পরিষ্কার লোমছাড়া থাইয়ে নীচে নামানো পায়ে তার হাইট মাপা যায়। উপচানো আলাপে ওই ধানভানা মেশিনপাড়ের ঢকঢক কলের পানিপড়া আওয়াজে কয়, ‘খুব ভালো ছেলে’। পাশের আলাদা লাইনে সেও তখন পড়া নিয়া ব্যস্ত। কিন্তু আরাম হয়। তীব্রতর স্বর ওঠে। ভেতরে টকমিষ্টি আওয়াজ ঘনায়া আসে। হঠাৎ স্কুলঘরটা দুইলা ওঠে। এ কি ভূকম্পন! একবার দুবার অনেকবার। তখন কঠিন মাস্টার ভয়ে দোয়া পড়ে। বলে এই তোরা সানা পড়। ওইটা ছোট দোয়া। এর মধ্যে হেডমাস্টার বাইরে এসে বলে, সকলকে স্কুল মাঠে আইতে কন। ভূমিকম্প আসচে। হেডস্যার নোয়াখালির মানুষ বলে পরিচিত। আড়ালে সবাই তাকে নোয়া স্যার বলে ডাকে। মাখনুন ভূকম্পনে ভয়ের চেয়ে স্বস্তিই পায়। এসব সালোক সংশ্লেষণ পড়া সে বোঝে না। বাইরে যাওয়ার অর্ডার আসলে মনটা ভরে ওঠে। সে পেছনের ভাঙা দরোজা দিয়ে বাইরের প্রান্তরে তাকায়। নুয়ে পড়া আকাশে ভোরের কণারাশির আলাপে মুগ্ধ হয়। আকাশজোড়া এতো আলো সে কখনো দেখেনি। আলোর মাঝে বিপুল বিকিরণে তীরমাথা যুক্ত হয়। ওতে কী লাল দেখা যায়! নাকি কমলা লাল। বড় বড় ইলেকট্রিক পোলে ছাওয়া, দুলন্ত তারের চিক্কনরেখা মনে করিয়া দেয় তার প্রাচীন সুখদ প্রলয়মাখা দিনকে। তা কি অনেককালের কোনো কথা? তখন তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল এখানে। বিরাট স্কুলবাড়ির এই পেছনটায়। এসব ভাবলে রিফুজি মনে হয় এখন। ধীরে ধীরে হাঁটা পথে বাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে আঙরার বিলের ওপর দিয়া এখানে আসে। এই মাঠেই তখন সার্কাস চলে, মোগলে আযম আর পুতুল নাচের খেলা। আসতে আসতেই তা শুরু হয়ে যায়। তখন কেমন যেন এক মামা তিনি বলেন, এখন আর নয়, পরের শোতে। শো আবার কী! এখন এই আকাশ দেখে তার শোর কথা মনে হয়। শো, আহা সেই শো। তারপর ভোরের আলোরেখা সবকিছু ছেদ করিয়া ছিনিয়া নেয় অন্ধকারকে। রক্তমাংসের তুমুল আক্রমণ ছিল তাতে। গড়ানো বালুকণা আর কিম্ভূত এক দরগার ভয়মাখানো আওয়াজ। অনেকদিন পর এই প্রান্তরে এইসব মনে পড়ার সুযোগ হলো। এই সুযোগ আর কোনোদিন সে পাইবে না। নোয়া স্যার যে ব্যবস্থা কইরে দিলেন, মনে মনে তারে সে শ্রদ্ধা জানায়। বইয়ের পাতা সেদিন আর ফিরে আসে নাই। উড়ন্ত আলোয় কালো অক্ষরকে আর কোনো স্যার সেদিন তারে পায় নাই। ভূকম্পনটাই তাকে সবরকম ভালোবাসা দিয়া গেল। এ যেন জুঁইয়ের চাইয়াও তখন অনেক বেশি আপন।

এই জুঁই তাকে মায়া করে, একটু একটু ভালোও মনে করে। কিছুতেই বিরোধ নাই, যা কওয়া যায় তাই শোনে। সমর্পিত মানুষকে যেমন সবাই ভালোবাসে তেমন। সাহস নাই, খালি মনের ভেতরে কুৎকুৎ করে। মনের কথা বাইরে ঘোষণা না করলেই সবাই ভালো কয়, ভদ্র কয়। এই গাছের পাতাটাও সেরকমই ঠেকে, সে বাতাসে বাতাসে হেলে— মাখনুনের মতো। পরে জুঁই তাকে কইছিলো, যুথি ফুল চিনিস। আমাদের বাড়িত আব্বা লাগাইছিল। ভারি মজার বাসনা। তোর গালগুলাও জুঁইফুলের মতোন। এসব নিয়া কাঁঠালপাতা আর বসন্ত বৈরাগীর গাড়া এ গাছ সম্পর্কে নিজেকে সে সুন্দর কইরা তোলে। বাঁশী হাতে নরেশ কৃষ্ণের সুকুমার মুখ তার মনে বাসা বাঁধে। বিশুদের বাড়িতে এক বিরাট ছবি দেখে একপ্রকার ভয় আর পাপবোধ মনে জাগে। এইসব মানুষকে জীবন দেবে কে? কেন ওদের মূর্তি হয়। আসলে এসব কাজে সকলের যোগমায়া রচিত হয়। যেমনটা গাছে বসা পাখিটাতেও আছে। এই পাখির ডানার ছাঁটে কী চমৎকার রঙ নিয়া ওড়ে কিন্তু পাখির আনন্দ কেন মানুষের আনন্দ হয় না! মাখনুন প্রায়ই এই গাছে ওঠে, প্রাচীরে পা দিয়া, ডাল কাটা গর্তে পা রেখে আস্তে আস্তে উপরে ওঠে। ওখানে পছনের জোড়া ডালে বসে নীচে-উপরে তাকায় আর স্বপ্ন বোনে। সারাটা জেবন এই ডালেই গাছবসতি করলে কেমন হয়, মোজাম্মেল স্যার বলেন পাখি আর মানুষের মন এক, গাছ সেটা টের পায়। কখনো গাছ কাটিস না। এসব শুনলে মাখনুনের কান্না আসে, তাহলে বড়রাস্তায় জামগাছটা কাটল কেডা! এখানে বসেই একদিন সে পাখির স্বপ্ন দেখিয়াছিল, নীল আকাশের সাদা ভেলায় পাখি-বিমান উড়িলে তখন সে ঘুমিয়া পড়ে, নানীর ডাক পিছলে পা ফসকে সে গাছ থেকে পইড়া যায়, বুকে আছাড় খায়, তারপর ঘোর আসে। নিইভা যায় চান্দের বাতি। ফর্সা বাতিটা চিমনীর আলোয় রঙ ধরে, বেত দিয়া মাস্টার পেটায়, তড়পাতে থাকলে রহমান পিওন দড়ি আনে, ক্যারে তুই গাছোত ক্যা! তারপর হুমহুম করি মেলেটারি যায় পচ্চিমে আঙরার বিল ভাঙে, মেলেটারি ছোল কাড়ি নেয়, আর দেয় না, এই-ওই করে আর কয়, মাও তুমি চইলে যাও। এই নাদুসনুদুস ছাওয়াল আর দেওয়া হবি না, আমরা নেমো। দেয় না, দোলায় দুলে দুলে চলে, মেলেটারি আসে যায়, আবার আসে যায়, দুরুদুরু কান্নায় তপ্ত ভাপে বেলা ওঠে, গড়ায়, পেছায়, হঠাৎ কমান্ডার আইলে, ছোলের ঝামেলা বা শখ মিটা যায়, মা ফেরত যায়। কী ইচ্চা মানষের, যদি গুলি করে তয় কিচ্ছু করবার নাই, হুট হুট করে মওদুদ বিএসসির সাদা পাঞ্জাবী নাকি চান্নির আলো নাকি রইচের দোকানের ফর্সা ঘোলা বাল্ব– কুত্তা এত্তেলা দিয়া তড়পায়, কোপান দিলে, বিস্কুটের ঠোঙা ছাড়ি দৌড়ায়, সেও দৌড়ায় পচ্চিমে-পূবে ওড়াল ওঠে, মিছিল বারায়, ভোট ভোটার ১৫ নং ১৩নং ভালো খবর, জিতিবে। হোসেন জিতিবে, বিষ খাইবে না, আছে নবীজীর দোয়া। দুলদুল আর দরুদ-বারুদ সবই। তড়পায় বিরাট কালা পিঁপড়ার কামড়ে সচেতন হলে দেখে সে কাঁঠালের ডালের খোপেই বইসে আছে। এখানে মাখনুন বাঁইচ্যা আছে। সে ঘুমে-কষ্টে-আনন্দে স্বপ্ন দেখে, এই গাছতলার নীচের কোটার ঘরে। রূপদিয়ার মোকাম এটা। অনেকেই বলে এই গাছটিই সীমানা। এখান থেকে দেড় ক্রোশ সোজা হাঁটা দিলে ডুবাপুকুরের আইল শুরু। এ রাস্তায় কখনো চাঁদ ওঠে ভরা জোয়ার নিয়া, কখনো কালিগোলা আন্ধার। ছাতা দুলিয়া, পাঞ্জাবীর হাত গুটায়া পান মুখে নিয়া রাস্তা হাঁটেন মওদুদ বিএসসি। সক্কলেই কয়, মাষ্টারের মুখের সামনোত কেটা দাঁড়াবি, বুকের পাটা কয়টা। মাখনুনের বাড়ির কাঁঠালছায়া আর মওদুদ বিএসসি অন্তরমন এক তুলনা হয়। একরূপ আবেগে গাছটা যেন ছায়া দোলায়, পুনর্বার ঝড় উঠলে গর্জন তোলে। একসময় সে গর্ভবতী হয়, প্রচুর ফলে আমজনতার আহার রক্ষা করে, মিষ্টি সে আহারে গন্ধঢালা মনে পাড়া জুড়ানো মানুষের আনন্দে রোল ওঠে। চিক্কুর ওঠে কার বাড়ির কাটোল রে বা? ওর ছোলের বেটা হবি, দোয়া করি। তখন কানাবুড়ি আশীর্বাদ দেয়, রাঙার মা বর দেয় বাড়ির ছেলের জন্যে। এ গাছবাড়ির দরোজা জানালা চেয়ার টেবিল সবকিছু গরিব এবং মহৎ বিদ্যুতময়। ওখানে কাষ্ঠাসন করেন বড় অফিসার, কাজী সাহেব, থানার দারোগা বড়বাবু। বেড়া আটকানো এই খাঙ্গায় অনেক সিদ্ধান্ত হয়, শালিস বসে, মীমাংসা নিয়া চলে যান দর্শনার কুতুব মৌলবী কিংবা হাজেরা বিবি। তাদের সমস্যার সমাধান এই চেয়ারে বইসাই নিষ্পন্ন হয়। এই আজও সকালে দূরের মৌলবী আসিয়াছেন কীসের যেন এন্তেজাম নিয়া। তার আলোচনা করে বহুক্ষণ। মাখনুন হাবিলদারের ব্যাটার মতো চালাক নয়, কিন্তু সে একরোখাগোছের। যে কোণার ঘরটা আছে সেটা সে নিজের বলে অধিকার নিতে চায়। কিন্তু হয় না। একঘরে বাপমাভাইবোন গোলাগুলি থাকতে ঘেন্না করে। রাত হলে বাজার খরচের আর হারিকেনের ত্যাল পুড়ি খালি বিষাদসিন্ধু শোনা। বিষাদসিন্ধুর কথা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। খালি কষ্ট আর কান্নাকাটি। ছবির লাকান ভাইসা ওঠে পাগড়ি পড়া মাসহাব কাক্কা। সম্মুখ সমরে জয় ওঠে। ভীড় কাটাইয়া দর্শকের শব্দে আকাশ কাঁপে। ফোরাত কূল চাক্ষুষ হইয়া ওঠে। সশস্ত্র এসব অভিযানের ভরকেন্দ্র জুইড়ে গড়ে ওঠে মাখনুনের স্পর্শধায়ী মগোজ। চলতে থাকে যুদ্ধ আর ক্রন্দনের তপ্ত মেশামেশি। বাপের গদি বিছানায়, মায়ের থুতনিতে বাপের জামাফেলা হাঁটু আর শ্রবণে আক্রান্ত মগোজ ভীষণ আক্রমণে আটকানো সেই যুদ্ধের তরবারি। এ যুদ্ধে ভয় আর জয়ের সাহস গড়িয়া ওঠে। বিষাদসিন্ধুর গদ্যের তরবারিতে ভৈরবীরাগ প্রস্তুত হয়।

তবে ফোরাতকূল আর দুলদুল ঘোড়ার আওয়াজ মাখনুনের কান বিড়বিড় করলে ঝমঝম করে কাঁঠাল গাছের শাখা-প্রশাখা বেয়ে সরসর বৃষ্টির পানি গড়ে পড়ে। অন্ধকারের ভেতরে কুমকুম করে ত্যাল কমে আসা হারিকেন। টিনের চালে পটপট দমকা বাতাসে বৃষ্টির ফোঁটা নামে। হারকেনের ত্যাল না থাকলে চিক্কন ফিতাডার মাথায় কানি বের হয়। তা একপ্রকার লম্বাও হয়। সে লম্বা শীশে চিমনির এক অংশে কালো কালি জমে। ঘোলা হয়া আসে হারিকেন। বিষাদসিন্ধুর পাতা লালচে হয়। কালো অক্ষরগুলা রঙ পাল্টায়। কাছে এসে দুলদুল ঘোড়ার কাহিনি আবেগের কম্পন আওড়ালে মাখনুন কান্দে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলা চোখোত পড়ে। সে চোখে আন্ধারের ভেতর অল্প ক্রম-আলোতে বালিশটা ভিজিলে কখন যেন চোখ বন্ধ হয়। ভীষণ পানির তোড় তাকে তাড়া দেয়। মাখনুন ঝাঁপ দেয়। বিলের বাতা কিংবা করতোয়া নদীর ওপর পুল থেকে উল্টালাফের ফলে পংগোরের তির্যক কাঁপুনি গোটা শরীরকে ভিইজা দেয়। পানির ওপর হাঁটা, তার স্বরের ওপর ঘুষি মারা আর পংগোরে পংগোরে নিমতলা পার হয়া একাকি অনেকদূর চইলে যাওয়ার খুব সুখ লাগে। মওদুদ বিএসসি কয়, পানি আর আলো মানুষের জীবনের সঙ্গে রিলেটেড। জল জল আর জল এছাড়া মানুষের চলে না। আবার একে ভয়ও করে মানুষ। জলের ছায়া কিংবা জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা বলা, লেক-পাহাড় নিয়া মানুষের উৎসব কাতরতা সবকিছুই মানুষের আগ্রহের বিন্দু। আলোও তাই। পতঙ্গের মতো মানুষও আলো ভালোবাসে। আর পরিবেশের সঙ্গে সবকিছু জড়িত। পূর্ণিমার আলো, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা আর মানুষের আবেগ-অনুরাগের শরীর এক বেণীতে আটকানো। মওদুদ বিএসসি হরোস্কোপের ব্যাপারে আগ্রহী নন কিন্তু প্রসঙ্গ তোলেন। পরে আবার শোরগোল তোলে বিনষ্ট মনের ফেরারি মানুষকে দায়ি করেন সবকিছুর জন্য। মানুষের আয়রনি হচ্ছে, সভ্যতার খাতিরে পরিবেশ সে বিনষ্ট করবে এবং সেই আবার পরিবেশ ফিরিয়েও আনবে। মাখনুন এসব ভাবলেও জলের ইশারা খুঁজে পায় না। অনেক জোড়াতালির পালতোলা নৌকায় সে একবার কাঁদতে বসে, এঞ্জিন নষ্ট হলে খালি চারআঙ্গুল বাদ দিয়া নৌকা কাঁপা শুরু করে মাঝ যমুনায়। হায়রে পানির বলকানি। মাঝি কয়, নড়েন না, চুব হয়্যা থাকেন। অনেকক্ষণ পর স্যালো চালু হলে বড়খালের ফাঁকা তীরে নামি দিয়া কয়, আজ আর নৌকা চালাবানাও ত্বরা কোটে যামেন যাও। সেই ভয় আর মওদুদ মাস্টারের কথাকে মেলালে মাখনুন আগুন আর পানির শব্দ শুনতে পায়। হারকেনের আগুন আর পানির আওয়াজ মেল্যা দূর পৌঁছায়। বড়খালে তখন মানুষ ঘুমায় আর কুত্তার রোল ওঠা কান্না গাঢ়তর হয়। খালি তখন শিরশিরা হাওয়া কুসারের ক্ষেত আর শর্ষের আল দিয়া বাতাস বোলা মায়ায় ভাসে, দৌড়ায়। মাখনুন তখন উষ্ঠা খায়, আর দিশেহারা হয়া কয়, ‘এরামে বাঁচি থাকা যায়, বড়ফুপুর নাকান মরিলে কীসের দায়’— লক্ষ্য যে অনেকদূর! অনিঃশেষ কাশবিছানো মাঠ ধরে হাঁটে, কী গভীর মগ্ন আকাশ, পাখির ডানা আর যমুনার পাড়কাঁপানো সুর। এ এলাকার সংস্কৃতিটা বেশ আলাদা ঠেকে। মাটি থকথকে, জলের ছোঁয়ায় তার সিক্ত পরিণতি জুড়ে দিয়েছে হাওয়াই মন। মনের উত্তাপে বাইরের রূপ শক্ত ভেতরে কাদা। সবকিছুর ভেতরে রহস্য, রহস্যের তালে সামনে দিয়া অগোছালো ঘর, বাড়ির বউ, আর কষ্ট-যন্ত্রণার চিৎকার। উদামপীঠে চাক্কুর মায়ের সংসার। কবে গত হইছে তার স্বামী, চাক্কুই এখন সংসার চালায়। উদাম বাড়িতে মাখনুন ঢুকলে খাবার জন্য তেষ্টা ওঠে, যদিও আজ ভরা পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমায় দিনেরবেলা খাদ্য আহার বারণ, সমুদ্রে জোয়ার দিছে, শরীর এর শালীন থাকার কথা কয়– কবে কইছিলো জেঠুবাবা, শালা কম খা, খাওনের জন্য খালি বাসনার পিছে পিছে হাঁটিস। তারপর সেসব মিথ্যাদিনে জেঠুর চোখ ছাড়িয়া এই বড়খালের তুচ্ছ জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়লে দূর থেকে সে এলেকশানের আওয়াজ শুনতে পায়। স্বাধীনের পরে খুব কম সময়ে হারানো বড় ফোর্সের নায়ক মশাররফ মরিয়া গেছেÑ ভারতের দালাল বলিয়া, কেউবা প্রতিশোধে তার নিজের আগার মিটাইছে। স্বাধীনের সুবাতাস নাই, কেন এ দেশের মাটির মানুষ সুখ সুখ করিয়া ভার হইয়া আছে– তাহার খোঁজ কে রাখে। কিন্তু ক্ষমতাও কী ভাগ হইছে। মাখনুন চাক্কুর মায়ের হাতের ডালভাত খাইয়া মোড়ের দিকে ভাষণ শুনতে যায়। কাল পরীক্ষার জন্য উৎসব পড়িয়া গিয়াছে। সে পরীক্ষায় কতো মানুষ এলাকায় আসিবে! কার ভালো কে চায় সেটি বোঝা কষ্টকর। সাইকেলে সাইকেলে মাখনুনদের আশেপাশের চিরচলাফেরার এলাকা ভরিয়া যাইবে। রওশনপুর, কুতুবপুর পার হইয়া অনেক দূরদেশের ডিস্ট্রিক্টের লোক আসিবে। তাহারা ফেসিলিটি চায়, সাপ্লাইয়ের বন্দোবস্ত খোঁজে। বড় লম্বা মানুষ, বিদেশি স্যুট আর টি-শার্ট গয়ে লইয়া মাখনুনরে কয়, ‘তোমাদের এখানে ভালো দপ্তরী কে? উনার সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা আছে কী?’ এই ভোটঘর, ধানেরশীস-তালা-মই-আনারস মার্কার লারেলাপ্পাটা এখানে ভালোই। কাছে আসেন লাভলু দা। লাভলু দা এই এলাকার হলেও মাখনুনের জাতবন্ধু। কয়েকদিন ও ওকে নিয়া বিড়ি খাওয়া আর পরে পাড়ের ঢালে ভেতরে পুরানা সিনেমা হলে সুচরিতার ছবি দেখতে নিয়া গেছে। তখন শুনছিল ভোরে এক বিরাট জীবনের সংবাদ। নাচুনি বুড়ির ভেতরে মেলা ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের প্রলয় নৃত্য। তখন বিরাট শোরগোল শোনা যায়। এক অন্ধ আলো ঘিরে ফেলে প্রবল ছায়াগুলো, সে তখন আকাশের গুচ্ছ তারার দিকে চোখ মেলিয়া ডাকে, আয় আয় আয়! মাখনুনের ডাক পাড়া কণ্ঠ আর নাচুনি বুড়ির প্রলয় নৃত্য হাওয়ায় ভাসে না, মনের বারান্দায় হুমড়ি খাইয়া মৃত মানুষের কথা শোনায়। না মৃত নয়, মোহাম্মদ আবুল নামে একজন, যে অন্যায় ভাবে খুনের দায়ে এক চিক্কন বারুদ পান করিয়াছিল। কেউ কিচ্ছু বলে নাই। সবাই বিশ্বাস করে সে বারুদে বিষ নাই, ধ্বক নাই, গন্ধ নাই। কেউ তার চিহ্নমাত্র পাইবে না। সেটার কোনো মালিকানা রইবে না। হজমের ভেতরে তার তেজ ফুরাইয়া যাইবে। সেই কাম ঠিক ঠাকই চলে। কিন্তু বিধির বিধান কাটবে ক্যামনে। তা ফিইরা আসে। জানান দেয় খুনীর খুনের শার্লোক পরিক্রমা। রব ওঠে। প্রিয়তমার চোখের জল প্রবল বর্ষণ আনে। সেই বৃষ্টির ফাঁদে সমস্ত হাহাকার সকলকে সঙ্গী করে। কোলের কাঁখের হ্রেষা দূরন্ত হইয়া কয় : আয়, আয়, আয়। সত্যিই আইসা গেল, সব গুপোন কতা বাইর হইয়া পড়লো। কী নির্মম আর কতো তুচ্ছ মৃত্যু। সেখানে প্রবল অত্যাচার, নিরুপম হাহাকার, আর তীব্র কষ্ট খরা রোদের ফড়িং চীৎকার, চিরকালের হারানো জাফরান বেদনার ভার চুইয়া ওঠে কন্যা আর প্রিয়তমার স্বর। কেউ তা দেখে নাই, হায়রে অভাগা জীবন। কুৎকুঁতে স্বার্থে সব ভুইলা যায়, দ্যাশ বেচেÑ জীবন বেচে। কী স্বার্থ আছিল তাতে। পাপ কী বাঁচে? পাপের সমুদ্র কেউ কী দ্যাখছে। নিদারুণ তার আর্তনাদ। সমুদ্রের কোলাহলও তাতে পরাস্ত। মাখনুন সমুদ্র দেখে নাই, ছবি দেখছে। পাগলী বুড়ি ওই ছবিতে নামে, নীল সাগরে পঙ্গর দেয় আর আবুল বাবার ইশারায় ডাক পাড়ে। তখন খুব দ্রুত ঐশী বাণী চিক্কুর দিয়া ধমকের সাথে কয়, চেনোস বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনরে চেনোস। শিইখ্যা রাখ ভরা জীবনের লাইগ্যা : ‘যারা আক্রান্ত হয়নি, যতক্ষণ না তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো ফুঁইসা উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হইবো না’, হয়নি তা কোনোদিনও। নুনের সামনে ভেসে ওঠে আবাস সেই ফটিকছড়ি। মাঘনিশীথের রাতে ডাক ওঠে। পেছনে পিস্তল ঠেকাইয়া মারিছে। বউ কান্দে, কষ্টে হুপ হুপ কইরা কান্দে কোলের শিশু। টুপ কইরা নেওর পড়ে, কানের গোড়া দিয়া। দূরে তিনটা কুত্তা একসঙ্গে গা মোচড়ায়। সড়াক কইরা উইড়া যায় বাজপাখি। শান্ত সমান সবুজ জমিনে নির্জনতা আরও গাঢ়তর হয়ে আসে। জোনাক পোকার আলোও ক্লান্ত হয়ে কমে আসে। তখন কি সব মানুষ ঘুমায়! বুড়ির নৃত্য তো বহুদূর তখন। যাত্রার ফ্লুট বাজানোর মতোন মিইয়া থাকে। মিহিটা আরও গভীর। এতো নিথরতার ভেতর ‘টাস’ আওয়াজ হয়। ফ্যাটকা টাস। তাতেই আবুল মইরা যায়। কলঙ্ক লিপিত হয়। কাহার নির্দেশে ঘুচায় আলো। অন্ধকার প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। ঘিরিয়া ধরে। অধর্মের অপরাধে দুর্যোধনের ন্যায় সকলের মদ্যেই খালি গোয়ালাকে দেখে। পানিতে দেখে, দ্রোণাচার্যকে দেখে, ভীষ্মকে দেখে, বিদূরকে দেখে। গোয়ালার প্রভাবে সে নিজেকেও ভুল দেখে। সে কী ভুলিয়া গেল নিজেকে? পানিতে মুখ দেখিতে গেলে এ তো গোয়ালা! কীসের এতো প্রতাপ তাহার, আমি মানি না। এই গোয়ালাই তো আবুল। তাহারে সরাইয়া দেছে। আর কোনো শত্রু নাই। কেউ আর পেছনের দরোজা দিয়া আসিলে ভয় নাই। আবুলরে নিয়া আছিল মহা বিপদ। সে খালি ন্যায়ের কথা কয়। ট্যাকা চেনে না— বোকার কোনেকার। এভাবে জীবন নিয়া কতো মক্কোর মানুষেরÑ এ্যাঁ। থুবড়ে পড়ে গোটা শরীর। রক্ত নাই। খালি ঠ্যাং উঁচু করা একটা কালো পাখি লম্বা সুরে ধুম ডাক পাড়ে। ডাকের ভেতরে হাহাকার। চিনচিনা ব্যথা। ঘিরে থাকে কুসন্নী ডাক। পুরানা মসজিদের ভেতর থাকি জ্বীন বহির হইয়া আসে। ইঁদুর পাশ দিয়া মুখ শুঁকে হাঁটাহাঁটি করে। জন্তুকুল নিজের মতোন ডাকে। বিরাট হয়া ওঠে লাশ। কতোক্ষণ আগেই সে বাঁচার জন্য আল্লাকে ডাকিছে। পশুপাখির কাছে মাফ চাইছে। এখন সব থেকে সে অবসিত। নিশ্চিত তার মিনতি ছিল অনেক। কতো মায়া, দয়া, আকাক্সক্ষা সব বরবাদ। কীসের জন্য এতো সুন্দর সবকিছু! যেখানে মানুষ নাই, জেবনের দাম নাই, আবুল মইরা গেলে কিচ্ছু হয় না। কারণ ছাড়াই সিংহ নিরীহ শাবকের ওপর চড়াও। রক্তশোষকের মতো ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। মহাসিন্ধুর ডাক সে চেনে না। সার্কিট হাউজের কোণায় তখন টেনশানে হাঁটে মাখনুন। লাভলুও থাকে। কয়, ফাঁকোত চুব কবি থাকিস। মেলেটারি আসিছে। কাকো বাঁচাবি না। বিড়াল চকচকে চোখে তাকায়। মাখনুন বাঘের বাচ্চাই মনে করে ওকে। শালা ভয়ঙ্কর।

পাঁচ.

মুকুলভাইয়ের মুখে মাখনুন দূরপাল্লা-মাঝারীপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়া গল্প শোনে, কিন্তু সে গল্পের মুকুলভাই কবেই মইরা গেছেন, ক্যামনে মরেন কান্দোন আসে বৃষ্টিতে ভাইস্যা কান্দন চিকচিক করে, পাতা চুইয়া বৃষ্টি নামে, আমড়া গাছ চুইয়া ঝরা পানি পড়ে, চোখ ডলে বৃষ্টি নামে হঠাৎ মরেন একসময় স্মৃতিভরা শেখসাহেব— ‘ত্বরা কারা, ক্যান আইচস’ তহনও টিকটিকি লাফায় ফুচকি মারে, এক ইশারায় রাইফেলের নটে চাপ দিয়া লুটাইয়া দেন তারে সিঁড়িঘরের রানায়। বাইরে তখন কালো কুচকুচা আন্ধার, গুড়–ম বিজলীরেখায় ক্লান্ত গোমরা আকাশ, কুত্তছানা এনিতেই বেশি চিক্কুর দিতে থাকে। সোনার দ্যাশ শ্যাষ হইয়া গেছে তার নির্মম বয়ান পাড়ে ওই কালোকিষ্টি নধরকান্তি সেক্সী কুত্তার থুলথুলা শরীর। দ্যাশটারও দশা এই কুত্তাডার ভীরু চিক্কুরের লাকান। মাখনুনের এসব মনে নাই। মাঝে মাঝে ঝড়পোড়া বাউরা আসি ঠেসি ধরে তাকে। তার ভেতর আউলা-বাউলা এসব কানোত পড়ে, কখনো শির শির করি ঠ্যাং কাঁপে। মুকুল ভাইয়ের সাথে আবার শেখসাহেব ক্যা। তাই তো সগ্গোল সময় শেখসায়েবের গুষ্টি উদ্ধার করিছে। ঢাকাত থাকি বাড়িত আসলে খালি উল্টা-পাল্টা কথা কয় শেখসায়েবোক নিয়া। ভার্সিটির শহীদুল্ল্যা হলোত এখন খালি বড় বড় নেতা আর রেবলবারের গপ্পো— মুকুল ভাই নিজেই নাকি সেগলা হাতে নিয়া চলেন। সবাই তাক ডাকে আর সন্মান করে। পুকুর পাড়োত বসি খালি মন্ত্রী আর হলের নেতাদের সম্পর্ক নিয়া কীসব কথাবার্তা কন। তখন ভার্সিটি ভ্যাকান্ট হলে প্রকাশ খলিপ্যার দোকানোত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সে সব শৌর্য-বীর্যের কাহিনি বলিয়া চলেন। মাখনুন এক কানে তা শোনে। খালি শোরগোল। ঘুমালেই এসব শোরগোল তাকে ঘিরিয়া ধরে। জিয়ার মৃত্যুর দিন থাকি কেমন একটা শোরগোল তখন চারিদিকে। কান্না আসচিলো সেইদিন। শহরের সব দালানকোঠা, গাড়ি-বাড়ি, রেলওয়ে-স্টীমার মরহুম জিয়াকে আলোচ্য কইরে তোলে। পরে এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ওই পদে বসিলে তার জন্য গণভোট হয়। থমথম হওয়া পরিবেশ অনেককাল টাইনে চলে। মাখনুন সে ভোটের পোস্টার নিয়া সাইকেলের পেছনে অনেকদূর হাঁটি আসার পর বিরাট সামিয়ানার পাশে প্রাইমারী স্কুলের বারান্দার সিঁড়িত বসে খোর্মা আর একপিচ গুড়ের জিলিপি খাইচিলো। পরে ময়লা হাত চেটে গুড়ের স্বাদ নিলে আরেকটা জিলিপির জন্য খুব লোভ হয়। এ বয়সী কয়েকটা ছেলেকে পাশ কাটিয়া ভীড় ঠেইলে অনেক বড় জিলিপির বস্তার দিকে তাকায়া থাকে। হঠাৎ লম্বা স্যুট পরা মখলেছ মামা স্টেজের পাশে দাঁড়াইলে সাদা দাঁত বার কইরা কয় : ‘ক্যারে আরও জিলিপি নিবু? চিক্কুর দিয়া ৫খ্যান জিলিপি ধরি দিয়া কয় যা, বাড়িত যা। ফকিরের ডৌল আর ঘুরিস না।’ মখলেছ মামা প্যাটোয়ার বান্দা ঢোলা প্যান্ট আর সাদা শার্ট পরে বেশ ঝাঁকি দিয়ে উঁচা মঞ্চের ওপর ওঠেন। কান্নাবিজড়িত আবেগে বলেন : এইবার ভোটে সাবেক বিচারপতিকে ভোট দিয়া মানুষ জেনারেল জিয়াহত্যার প্রতিশোধ নিবি। ভাইসব চট্টগ্রামের লৌহমানব সাবেক মন্ত্রী এখন আপনাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নিয়া আসবেন। এসব কথায় মখলেছ মামার খুব নাম হয়, মাখনুন জিলিপি হাতে নিয়া বাইরে আসে। একা একা নিরানন্দ মনে হয়। পাশের শিরিসের তলে বসে সে সবকটা জিলিপি খাইতে পারে নাই, তখন দুমদুম আওয়াজ তোলা ধানভানা মেশিনের পাশ দিয়া একটা ক্ষীণ শোঁসানো শব্দ তার কানে আসে। দুটা হেরিংবোন রাস্তার স্পর্শবিন্দুর পাশে প্রাইমারী স্কুল মাঠ। সেখানে নিজ নিজ কাজে যখন ব্যস্ত সবাই, তখন এক খারাপ জিনিস তার চোখে পড়েছিল। সেটি খারাপই তো, চালমেশিনের পাশে ছোট্ট ফাঁকা দিনের অন্ধকারে কীসব খারাপ কাজ সেখানে চলছিল। সে মানুষটার নাম মাখনুনের মনে নাই। কিন্তু সে চেনে তাকে। এরকম আরও কয়েকটা লোক একসঙ্গে হয়ে মাঝে মাঝে এখানে বসে বিড়ি ফুঁকায় আর কী কী সব বলে। মাখনুন, বিশু, হাবলু এসব অনেক কাজের সাক্ষী। কিন্তু হাবিলদারের বেটা এসব বললে বিশ্বাস করে না বা চেপে যায়। কারণ কী! কারণ এর মধ্যে সেও আছে। কেন একদিন তো সে স্বীকারই করেছিল, গর্ব করে বিবরণও দিয়েছিল সে খারাপ কর্ম্মের। কিন্তু সাক্ষাৎ এ ঘটনাটি বেশ কিছুদিন তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। একি জীবনেরই কোনো স্বরূপ! বা পুরুষ পোকা স্ত্রী পোকা, পুং মৌমাছি স্ত্রী মৌমাছি মাটি ও জলে সাপের প্যাঁচানো শরীর আলিঙ্গনের কাম্য রূপটি কীভাবে তাহা এ নিষেধের তটে খারাপ বলিয়া প্রতিভাত হইলো!

একটা বড় মুড়ির টিনের মতো গাড়ি আসিয়া থামিল। এ গাড়িটা বেশ বুড়া। সময়টাও বুড়া। কারণ মানুষগুলা চলতে ফিরতে সময় লাগে অনেক। এর প্যাটে অনেক মানুষ ধরে। সময় নিয়া থামি থামি সে জিলা শহরের দিকে চলে। সেমেন্টে বাঁধা চিকন রাস্তা, রাস্তায় কেউ থাকলেই তাকে তুলে নেয়। মাখনুনের পুরানা মাটির একটিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় এ গাড়ির নিত্যদিনের যাতায়াত। সে রোদে বসিয়া ‘মহৎ প্রাণ’ গল্প পড়ছিল। এক সৎ মানষের কাহিনি। কিন্তু এ গাড়ি আসলে উঠতে চায়। দূরেদেশে যাইবে সে। যেভাবে মওদুদ বিএসসির ছেলে চলিয়া গিয়াছে। সে তো বিদেশ কিন্তু মন আড়ষ্ট হইয়া, ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বিরান পাথার অবমুক্ত হয়। কেউ নাই সেখানে। অনেককালের মাটি হাতে ছানিয়া বিএসসি কয় মাখনুন এই দ্যাশে আর থাকোন যাইবো না। ত্বর বাইজানের নাহান চইলা যাইবো। আবার বুঝি যুদ্ধ লাগবে। কেমন একটা গরম গরম ভাব। খালি চোরাগুপ্তা খুন আর ফাঁসানো মৃত্যুর দড়ি ভালো ভালো মুক্তিযোদ্ধা মেলেটারির গলায় পড়ছে। খালেদ, হায়দার, তাহের সবাই বিচারের নামে, ক্ষমতার নামে, গদি দখলের নামে খুন হচ্ছে। যারা খুন করছে তারাও একসময় হয়তো খুন হবে। এই দ্যাশ কী খুনীদের হাতে চলে গেল! মাখনুন এতোক্ষণ মুখোমুখি থাকলেও এসব জ্ঞান কুলিয়ে উঠতে পারে না– সইরে আসি কয়, হামার কী হইবে! মুকুল ভাইয়ের নাহান আবোল তাবোল বকলেও কাম আছিল। বড়ো গাড়ির সামনে আসলে এসব নানা চিন্তা মাথায় আসে। বিএসসি এখন বাড়ির বাইরে যান না। খাঙ্গা ঘরেই তার সময় কাটে। আর এসব আশঙ্কা নিয়া বলিরেখার বলয়ে বসবাস করেন। সেদিন কী কারণে বিড়বিড় করে আরও কী কী সব বললেন। মাখনুন বোঝে না, হাতড়ায়, সে স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার পাগড়িতে আর শায়েস্তাখানের আটমন চালের গন্ধ নিয়া ওখানে দাঁড়াইয়া থাকে। (চলবে)

হয়নাকো দেখা

শহীদ ইকবাল

1

মৌলবীসাব খুব সুর করে কীসব গপ্পো পাড়েন ‘ত্বরা জ্বীন দেখচোস? আল্লাতালা মানুষ আর জ্বীনের সম্মান দেছেন, তার বিচার হইবো, কাল কেয়ামতের ময়দানে।’ কপাল ভেতোরে ভেতোরে জপ করে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে’- মানে কী? গা শিউরে ওঠে, কয় কি হুজুর! কাল কেয়ামত পুন্নি, মানে তো সব শ্যাষ। হুজুর কঠোর চাবালিতে কন, ‘মানুষ তোমার হুস হয় না?’ কাল আর বেশি দূরে নাই। এই পুলসেরাত, গরম পানি, দেড়হাত মাতার ওপর সূর্য, হু হু করে কান্দি বেড়ানো মানুষের প্রলাপ, এ ওর দ্বারে, সে আরেকজনের দ্বারে ঘুরছে তো ঘুরছে, কোনো ফায়দা পাচ্ছে না। হে মানুষ দুনিয়ায় যদি ঠিকঠাক চলতিস তবে কী আজ এই দশা হয়!- কিন্তু সবই কী কালকের ব্যাপার! হিসাব মেলে না কপালের। তার কানে বার বার ফুইটে ওঠে ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ ‘কাল কেয়ামতের ময়দানে…’ মারাত্মক ধ্বনি। কী ভয়ঙ্কর কথা! এর মধ্যেই বুঝি পুন্নির পুনর্জন্ম হইছে। ভাবতে ভাবতে কুঁকড়ে যায়। ক্লান্তি কামড়ায়। কী এক কুৎসিত ক্রোধ তাকে চেপে ধরে। স্বস্তি দেয় না। খড়ের মাঠে দাবড়ায়। আর চিক্কন হিহি আওয়াজে তাড়া করে। পুন্নি পুন্নি… ছাইড়ে দেয়, আর ভাল্লাগে না। বাপ-মাও, পুন্নি আর এই তামান মানুষ তাইলে কোথায় যায়! কী হয় সবার। নাকি ভূমিকম্প হবে, কড়া কথাবার্তার পর হুজুর থামলে বাইরে সক্কলে কয়, একনা গোরজিয়ারত করা নাগে, সব্বাই হাটো। ভাগে ভাগে হাঁটো। থোকা থোকা হয়া চলো। গায়ে গায়ে। হাঁটাহাঁটি ভাগে ভাগে চলো। তখনও বেল ফোটে নাই। এ পাড়ায় লোকচলাচল এক্ষুণি শুরু হবে। ছুটবে সাইকেলে, ভ্যানে বা তরিকামতো যার যা বাহনে। এ সময়টা বেশ ঠাণ্ডা, বেশি পরিমাণ সুনসানও। কোথাও কেউ নাই, ঘুপঘুপ্যা আন্ধার, টাটির ভেতোর ক্যাৎ-কুত আওয়াজ। ধরপড় হয়। দৌড়ায় আর তাড়ায়। সর্বদিকে কৃপণ আওয়াজ। বাঁচোনের মইদ্যে হড়হড় কোপানি। দূরে ব্যাঙ ডাকে। ক্যান ব্যাঙ ডাকে, ও কারে ডাকে, ও-কি জানে না কাল কেয়ামত পুন্নি! পন্নি ভাসিবে। সে ভয় নাই? ক্যান এই তো কদিন আগে ওই পুকুর পাড়ের গোরের পাশে গরু বান্ধা আছিল, তাই অবলা বলি কার যেন জান আজাবের আওয়াজ পাইছে। হায়রে কোপাওচে! মাইনসের হাতে খুন হওয়া মরা ব্যান আরও তেজী। মাইয়া মানুষ ক্যাং করি কোপায়, হাঁটুর ওপর সপাং সপাং আর ওই খালি ওল্টোচে। না না ওটা আবেদ দর্জিই হবি। পুন্নি তো মরিছে অন্যের হাতে, তার পাপ নাই। সব পাপ নেছে নিজে। কেন সে মরি যায়! মরণের ওপারে সে কী হাঁটিয়া বেড়ায়। তাড়ায়… রাতে-আন্ধারে, পুকুরে, কেমন একটা বিস্ময়কর বেশে সে সেদিন রাতে আসিয়া দাঁড়ায়। সে আসিয়া কয়, আড়ার ওপারের মসজিদের কোণার পুকুরে রাইতে IQBALঅনেক মুসল্লি আসে। সেখানে আপনে যান। কাম করেন। নিয়ত করেন এবারের দুইখন্দের এস্তেমার অন্তত এক খন্দে যাইয়েন। সেখানে মেলা মানুষ। তাদের লগে সময় পার করাটা ফরজ বইলে মনে করেন। এরপর ঘুমটা কার ডাকে ছুটে যায়। তারপর থেকে মাথায় খুব চাপ কপালের। সারা দেহ ছম ছম করে। বাতাসে কান্না ওড়ে। হায় পুন্নি কেন মইরে যায়। সে কি আবেদ দর্জির পাশে নাই। নাকি সকলে এক হইয়া ওরশ করে। কী মজার সে ওরশ। গরুর পাল একের পর এক জমা হয় ওরস ময়দানে। কী সুন্দর নাদুস-নুদুস সেখানকার গরু। নধরকান্তি এসব গরুর রঙবেরঙ-এর পোশাক কতো আকর্ষণীয়। নানা রঙের গরু। গরুর গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্লাগ টানানো। চোখের ঠুলির উপরে লাল নীল চশমা। শিঙে ওড়ানো পতাকা। পায়ে ঘুঙুর। নালে পেতলের বেড়। গলায় রঙীন কাগজের কথামার্কা মালা। দয়াল বাবা আর নকশাবান্দা মোজাদ্দেীর জয়গান। গরুই বান্দার জান। সে তার সেবা করে, মায়ার চোখে দেখে। আদর দেয়। সেই ওরশে এক হয় পুন্নি আরও অনেকেই। এখানে আজ অনেক জান কোরবানী হইবে। জানের বদলে জান। পুন্নির জান কী নতুন করিয়া পয়দা হয়! তাও হোক! তাহলে এখানে ব্যাঙ ডাকার কি হলো। ওইটাও তো অবলা, হে বোঝে না। কিছুকাল আগের কথা, পুন্নির পরেই আবেদ দর্জি মারা গেছেন এখানে। তার ওপর বিরাট জামের গাছ। গাছটা ফলে টুসটুস। ছায়া দেয়, পাহারা দেয়, আর ঘিরিয়া ধরে থাকে দর্জি। লোকমুখে শোনা যায় তিনি খুব ভালো মানুষ আছিলেন। এলাকায় তখন যেমন সুনাম এখনও তা বহাল আছে। তিনি কাঁচা বাড়িতে বইসে দর্জিগিরি করেন। আসলে নামে তিনি দর্জি কিন্তু কাজ করতো তার ছেলেরা আর পোষ্য কর্মচারিরা। এলাকায় তিনি সকলের হইয়া থাকিতেন, দল বাইন্ধা সকলকে কীসব শেখাতেন। কপালের সেয়ান মনটা কিচ্ছু ভোলে নাই, সব মনে আছে। তিনি সক্কলকে পুকুর পাড়ে বইসে কন, ওই দেখ মেঠো চাঁদ, ওইহানে কয়দিন আগে মানুষ বেড়াইয়া আসচে। দুধের মতোন চাঁন্দ, চন্দ্রকারিগর কে? ভাবিতে ভাবিতে তখন চোখে পানি আসে, আবেদ দর্জি চইলে আসেন না, ভয়ে সবাই একে একে সইরে পড়ে, শুধু তিনি বইসে থাকেন। দোয়া পড়েন, সুরা ইয়াসিন পড়েন। আল্লা-নবী-চৌথা আসমান তামান বিল যেন বিলবিল করে। কী সে পুন্নি রোশনাই! এ মাঠের চতুর্দিকে ফটফটা আলো। আলো তো নয়, পুন্নির নাহান দুধের নহর। এই গ্রামটা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আইলের ওপর বসলে বিল পর্যন্ত রাতের চাদ্দোর বিছানো। কী মজার সে চাদ্দোর। জ্যোৎস্নারাতে তার আরও বাহার রঙ। মনে হয় ধারালো কুয়াশার ভেতর কেউ যেন পালের নৌকা ভাসাইয়া দিছে। বাইয়া যাও মাঝি নাকি সোহাগ চান্দ বদনী ধ্বনি- ভাবতে পারে না দর্জি। দর্জির চোখ কী শাদা! পুন্নি শাদা, পাঞ্জাবী শাদা, পায়জামা শাদা, বকলেসঅলা শাদা জামা বানাইতে বানাইতে তার চোখ শাদা হইয়া উঠছে। শাদা কইতর কত্তো প্রিয় তার। দাদায় কইতেন আবেদ শাদা কইতর মারিস না, ওই কইতরের রক্তে যাদু-টোনার কাম হয়। কোন কালে চতুর্দিকে বাড়ি বন্ধ করে নিয়াছিলেন তিনি। কিন্তু শাদা কইতর বাকবাকুম করে আর দুলে দুলে পা হাটিয়ে চললে ভেতরটা দুপ দুপ করে। পুন্নি না শাদা কইতর। পুন্নির বৃদ্ধি, ষোলকলা পূর্ণ, তার আগেই মইরে যায়। সে মরে গিয়ে শাদা হাঁস হইছে, কইতর হইছে। তাইতো সে আলাদা সমীহ পায়। কপালের চোখে এসব দুললে তা হঠাৎ করে তামাদি হইয়ে যায়। কিন্তু কপালের বিশ্বাসে আবেদ দর্জি ছিলেন অন্য মানুষ। ভাবের ঘোরে এক মত্ত বাউল, ফর্সা ধবধবে দর্জি। আবেদ দর্জির তখন পাকুর পাড়ে বইসে মনে করে পুরান কথা। এই শাদা নহর কী সব কথা তার মনে কইরা দিল। মনের ভেতরে কাফনের জ্বর ওঠে। মনটা বেসুরো হয়ে ওঠে। ফিরে আসেন বাড়ি। নাতনিকে কোলে করে ঝুম বৃষ্টিটা ধরে গেলে কোটার ঘরে ঢোকেন। বাসনে ওঠানো আলু দিয়া রাঁধা মুরগির মাংস তোলা ছিল। কেউ ছিল না। যে যার কাজে ব্যস্ত। পুকুর পাড়ের ভয় কাটে না। শাদা আলেয়া ঘিরিয়া ধরে তাকে। ক্রমশ কঠিন হচ্ছে তার শাদা ভীতি। পুন্নির ভয়? তিনি দাঁড়ান। নাতিকে কোলে তুলে অবলম্বন করেন। বাইরে মেঘলা রাতের অন্ধকার, জোনাকী নাই। কেন যেন একা হয়ে যান দর্জি। নাতিকে নামিয়ে দিয়ে কাঁসার থালায় মাংসের ভাতটুকু নিয়ে নেন। খুব তৃপ্তি মেখে খুওয়ার পর এলাকার নেভানো আলোয় স্বস্তি পান। এ তো সাদা নয়। কালো। মরণসুখ এখন আলাদা লাগে। কী যে এক মরণের খেলা। এশার নামাজ পড়ার আগেই পাতানো তোশকের চৌকিতে একটু শুইয়ে নেন। টুকটাক ঝিরঝির আলো এ ঘরে আসে আর চলে যায়। বাড়ির গৃহিনী বুঝি ফিরে আসছে। সেই গৃহস্থ গৃহিনীর কাজে আলোর পায়চারি তোলেন। কাঁচা দেয়ালে আলোক নকশা আঁকে, উল্কি হেঁটে বেড়ায়, দানা দানা ছায়া ঘোরে, সাঁতার তোলে মাটির দেওয়ালে। দর্জি আলো-আন্ধারী চোখে এইসব আলোর রেখাপাত আরও গাঢ় করে তোলেন। ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে চিক্কন রেখার কণিকা। নিকানো দেয়ালে শুষে নেয় আলো। শোষণের প্রক্রিয়াটি ধারালো। গৃহিনীর কাজের ছন্দে নির্মিত পদশব্দের ভেতরে সে আলোর রেখা কেঁপে কেঁপে উজানভাটি করে, আবার সরে যায়, চলে আসে। নিকানো দেয়াল আরও ভাস্করময় হয়ে ওঠে। কত্তোকাল আগের এই ঘরের কড়িবর্গার ওপরে কোণাকুণি বাঁশের ছাওয়া ছাদের চিত্রপট আরও মিইয়ে আসে। আলোর অধিকার খুব প্রচ-তর হলে দর্জি ঝিমিয়ে পড়ে। ঘুমায়। কিন্তু ঘুমটা ঠিক কম্পমান। আলোটা কী খুব তাড়া করে তাকে। একি আলোর তাড়া নাকি জীবনের পালানো কুত্তার বহুমুখি শ্লেষ। না এসব চান না তিনি। একপর্যায়ে আলোর দেয়ালিই তার মস্তিষ্কের ভেতর প্রবেশ করে। খুব হাঁপিয়ে ওঠেন। চিৎ হয়ে শুয়ে কড়িবর্গার ভেতর থেকে টেনে তোলেন অনেককালের সময় সাক্ষ্যের ইতিহাস। যথোচিত উপায়ে সব কাজ চলে। একসময় রাত গাঢ়তর হয়। শান্ত হয়ে আসে পাড়া। কালি সরে গিয়ে আবার এক ফর্সা প্রকৃতি উন্মুখ হতে চায়। তবে সে ফর্সা ‘শাদা’ নয়। চলাচল থেমে গেলে বাড়ি জুড়ে কনকন সুর আর দুদ্দাড় আওয়াজের তোড় ওঠে। কেউ খোঁজ নেয় না আবেদ দর্জির। সে চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমায়। ঘুম তো শন্তির শাসন। আর মগজে যে আলোর মায়াজাল নিয়ে তিনি শুয়ে আছেন তা তো প্রশান্তিরই। মুরগির ঝোল আর আউশধানের মোটা চালের ভাত ঘুমকে আরও নীচের দিকে টানে। তলিয়ে যায়। এ ঘরের সামনে দুইঘর উঠান। সেখানে ধীরে ধীরে হাটফেরত মানুষরা ভীড় করে। বিভিন্ন জিনিসের দর নিয়ে শলাপরামর্শ করে। কেউবা রাতে মাছ মারার জন্য জাল, হেংগা, ডারকি ঠিক করে। টিপ টিপ আলো জ্বলে। সে আলো কম কী বেশি তা কারো খেয়াল নেই। আলোর কাজও এখন কম। মুখ দেখাটাই আসল। ফলত তারও খুব দরকার নয়। পায়ের শব্দে মানুষ চেনা যায়, ঘুঘুর ডাকে অবস্থা বোঝা যায়। গলার শব্দে আহ্বান জানা যায়। আশ্চর্য ধ্বনি আর কানের অনুভূতি। প্রখর তার শব্দটান। কান থাকলে আলোর প্রয়োজন পড়ে না। তাই এ রাতে একে একে একটু ঢেউ খেলানো উঠানে বিভিন্ন বাহনে মানুষ এলে বা আলাপ আলোচনা হলে আলোর চেয়ে কানের কাজ আর মুখের বাক্য বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সেভাবেই একে একে উঁচু শান বাঁধানো বারান্দায় খাওয়া-দাওয়া চলে। উঠানে চলে আলাপ, আর বাইরে বিশাল খুলিতে গভীর ফর্শা। এর রূপ রাত বাড়ার সাথে সাথে একটু একটু করে বাড়তে থাকলে কাছারির পাশবারান্দায় আর একটি বৈঠক শুরু হয়। ভেতরের উঠানের আলোচনা আর এখানকার বৈঠকী আলোচনার মধ্যে অনেক ফারাক। সাধারণত বিড়ি বা কনডম বা দুধ টেপার বিষয়ে প্রাধান্য বেশি। মেয়েলি আলোচনাটাই নয় শুধু রাতের অপারেশানের নানা পরিকল্পনা থাকে তাতে। তবে বিশ্রম্ভালাপের সবচেয়ে উচ্চতর পর্যায়টি সিনেমার নায়ক ও নায়িকাদের নিয়ে। বিপরীতে খোলা প্রান্তরের হাওয়া উঁচিয়ে কাঁচা কাছারির অন্য বারান্দা। এ কাছারির জৌলুস নাই। এর সাথে লাগোয়া গোয়াল ঘর। সেটি খেড় দিয়ে ছাওয়া। চৌকোণ গোয়ালঘরের পিড়ালিটা সাধারণত শীতের রোদের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফর্সা রাতের কানসোনা আলোতে যখন দলবদ্ধ হয়ে এসব আলাপ চলে তখন কারো চোখ একটু প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দিলে চোখে পড়বে সবুজ কচি কোষ্টার ক্ষেত, বিশাল ইন্দিরার শান আর পাশ দিয়ে কাঁচা সবুজ রাস্তা। সেদিক দিয়েই আরোহীরা বাড়ির উঠানে পা রাখছে। কাজের লোকরা ফিরতে ফিরতে হাঁক দেয়, কোনো বিশেষ ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। এই যখন রাতের অবস্থা আবেদ দর্জি তখন এক হয়ে অন্ধকারের ভেতরে চিৎপাতই আছেন। কোনো সাড়া নেই। স্বাভাবিক মানুষজন কিছু মনেও করে না। বিশেষ করে ঘুমন্ত মানুষের প্রতি কারো আগ্রহ থাকার কথাও নয়। গৃহিনী অজুর পর এশা শেষ করে, সকল কাজের ইতি টানবেন, নাতির ঘুমানোর জায়গা পরিবর্তন করবেন, তখন একটু ডাক পাড়েন। ‘কী হলো!’ ক্যা গো! নড়েন না। চিৎ মানুষের তখনও বুঝি আলোর রেখাসমুদ্র পাঠ করা হয় নাই। এসব কী তিনি পাড়ি দিচ্ছিলেন না ‘শাদা’র অর্থ খুঁজছিলেন? দর্জির জীবনে কোনো পাপ নেই। একটু বেশিই বেঁচেছেন, তার রেস্ট আরাম বা উৎপাতের বাইরেই তিনি থাকেন। যে শাদা তার চোখের সামনে ঝুলে থাকে, পলকের পর পলক যেভাবে মাঠ-তালদিঘি পেরোয়, বিলের বাতা পর্যন্ত ঠেলে নেয় সেখানে শাদা কাফনও কী এক হয়। শাদাতত্ত্বের ভেতরে নিজের মনের ধারাবিবরণী যখন আলোর রেখায় অভিষিক্ত হতে থাকে তখন কী হিক্কা ওঠে! কষ্ট হয়! বেলা পড়ে যায়। টুপ করে ফুটফুটে চাঁদ ডুবে যায়। সত্যিই গৃহিনী আর কোনো সাড়া পান না। ঠাণ্ডার ভেতর চাপ বাড়ে। অন্যরকম তার ঠাসা স্বাদ। এক্কেবারে নরোম ও নেওর নেওয়া। এমনটা তো সাপের গাও-ও নয়। চিক্কুর পাড়েন। চট করে গৃহিণীর আওয়াজ কাঁচা দেওয়ালে হোঁচোট খায়। অনেক পুরনো কাঠের জানালার পাল্লায় আটকে যায়। কোনো  পর্দা থাকে না এ জানালায়। ছিলও না কোনোদিন। বাইরের জটলা তখনও একই গতির। আরও বাইরে যারা বিশ্রম্ভালাপে মাহেল তারা বেশ জমিয়ে বসেছে। গল্প চালিয়ে যাচ্ছে গানের দৃশ্যের বিচিত্র কাহিনির। এখানে সকলেই মত্ত মাতোয়ারা। একটু পরেই তারা বন্দরের দিকে হাঁটা দেবে। আজ শিষকাটার ধানের টাকার মজমা অনেক। কিন্তু মুহূর্তেই বিপরীত হাওয়া তৈরি হয়। ভেতর থেকে খবর আসে আবেদ দর্জি আর নাই। সকলেই ভাইঙা পড়েন। মুহূর্তের টর্নেডো যেন অনেক কিছুই ছিনতাই করে নিয়া গেছে। পুন্নি তখন ভাইস্যা ওঠে। তড়পায় এবং আরও পরিষ্কার হয়। গড়ে ওঠে নতুন ভাবমূর্তি। কেন সে এমন কইরা জাপটে ধরে তাকে। ওর তো বুনি ওঠে নাই। খুব নরোম নরোম আদরে সে কয়, কপাল তুই তো কপাইল্যা। তোর লগে চইলে যাম। মিষ্টি হাসিতে তার দম ফাটে। কদুর তেলে ভেজা জবজবে পাতলা চুলের লম্বা বিনুনি। সেটি দুইলা ওঠে। সাপের মতো গোটা পীঠ জুড়ে হাটে। ইঙ্গিত করে। ছন্দে দোলায়। উঁচু জামবৃক্ষের প্রশাখার ন্যায় আস্তে আসে বেণী দোলায়। তার ফাঁক দিয়া আলোর কিরণ নাকি যৌবনের ধূপ বিলায় বোঝা যায় না। হতে পারে কটাক্ষের ত্রপামাখা নিক্ষিপ্ত তীর। সরমে ছিন্ন সে। জামপ্রশাখা ফলবান কিন্তু ছুঁইতে দেয় না সে ফল, পুন্নিও ছুঁইতে পায় না, অপাঙ্গে তাকায়। ইঙ্গিতে ডাক দেয়। সে এবার নতুর রূপে কপালের সম্মুখে আনে। আবেদ দর্জির সঙ্গে। সে কী দর্জির প্রতিবিম্ব নাকি! কপাল ভয় পায়। আবেদ দর্জির মৃত্যু নিয়া যখন সবাই ব্যস্ত কপাল তখন পুন্নির ছায়ায় কম্পমান। বেঁধে নেয় সে তারে কঠোর বিহনে। হ, কত্তোকাল আমারে মাইরা খুব আরামে আছ। বিরহে পুড়মু কতোকাল। অন্যায় না কইরাই মারলা আমারে ডাক্তারের অবহেলার করো নাই প্রতিকার। আর কাউরে এ অবহেলার শিকার কইরো না। কী যে বিরহের জ্বালা। খুন করছো তুমি। খুনী হইয়াও তুমি আমার- চিরকালের আমার। এখনও তুমি তেমনিই আছ। এই মরাবাড়িতে করো কী! যে মানুষটার অস্তিত্বের কোনো জায়গায় নাই, সে হঠাৎ করে নায়কের আসনে আসীন হয়। পরের ঘটনা গুরুত্বহীন। সেই আবেদ দর্জির গোরজিয়ারত পর্ব নিয়া সকলে ব্যস্ত থাকলেও ‘কাল কেয়ামতের ময়দান’ কথাটা কপালের ভেতর থেকে নামে না। পুন্নির অবলা মন আর অবলা পশুর আওয়াজ আর লোকমুখে শোনা কাতর কথার ভেতর সে নিজেকে বুলায়, আদর করে মৈথুন করে। ক্যান ওই পশুটা কব্বরের পাশে বিরান পাথারে লেজ উঁচিয়া এতো উন্মত্ত হইছিল। বাওয়ানো এঁড়ে পশু তো ও নয়। কিন্তু কেন সে এরাম হইলো। হুজুর কয় গোর আজাবের তাপ ওই অবোলা বুঝতে পারছে। এই মাঘ-পৌষসন্ধ্যায় যখন নেতিয়া পড়িছে সবুজ আলো, পশ্চিমে গোধূলীর আলো বিলীন হচ্ছিল তখন ওই পশুটা জানতে পারে এই গোরে শব্দ হইতাছে। শুধু একটি নয় কয়েকটি পশু আশেপাশে একই প্রকৃতির আওয়াজে রোরুদ্যমান। সকলের ভেতরেই তখন একই উত্তেজনা দেখা গেছে। এবং সময়টাও একই। হুজুর এই দৃষ্টান্ত দেখিয়া বলেন, আবেদ দর্জির মতো পুণ্যবান মানুষের যদি এই অবস্থা হয় তবে ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ তোমার কী সাক্ষ্য চায়! হে মানুষ তোমরা বুঝিয়া লও। সেই ঘটনার পর নানাভাবে আবেদ দর্জির বাড়িতে ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। শুক্রবার, রবিউল আউয়াল কিংবা শবেবরাত, রমজান পূণ্যবান সময়ে আয়োজন চলে জেয়ারতসহ সাধ্যমতো মিস্কিন খাওয়ানোর কাজ। কপাল সুবেহ সাদেকে আজকের জেয়ারত শেষে এই পুণ্যবান মানুষটার পক্ষে নিজেও কিছু কাজ করে। কিন্তু হুজুরের ‘কাল কেয়ামত-পুন্নি’ শব্দটা কপালের ভয় ভয় ঠেকে। কানের ভেতর দিয়া মরমে পশে। সেখানে যেন সে বসে পড়ে। বার বার হন্ট করে। কতো মানুষ মইরা গেল মরিয়া পচিয়া হাজিয়া গেল কিন্তু ‘কাল কেয়ামত… পুন্নি’ শ্যাষ হয় না। উদাসীন হয়ে সে সাঁতরায়, চিক্কুর দেয়, ইশারায় সেই শ্বেত জোব্বা পরিহিত ব্যক্তি তার কাছে আইসা কয় ‘এই বরফ চাঁদ আর জ্যোৎস্না তামাম আসমানে যিনি ছড়াইয়া দেছেন তরতর কইরা জমিনে সাজাইয়া দেছেন তার লাগে ত্বর মন কান্দে, শিশুমনে তুই জপ কর, কাল কেয়মতে ত্বর আসান হইবে, মানুষকে শেখা, মনকে ভেজা, পাগল মনের হাহাকারকে নিষ্ঠুরতায় বাইন্ধে রাখ- এমন আলাবোলা আওয়াজের পর সব ফর্সা হইয়া যায়, জ্যোৎস্নাআর চাঁদ তখনও দূরে হাসে, সোনালী সিংহের গল্পে ডাক পাড়ে আয়-আয়…, আয়-আয়…! আবেদ দর্জির তারপর চাঁদের পাল্কীনায়ে ভাসেন, চাঁন্দের কারিগর খোঁজেন, চাঁন্দবদনী চান, মাইনসে মাইনসে চাঁন্দের ফেরী করেন আর কন ‘আইসো চান্দের পাল্কীতে/ ভাইসো সোনার পঙ্খীতে, যা আমার যামিনী/ চইড়া চল কামিনী’। সেই আবেদ দর্জি জ্যোৎস্না নিয়া কতো গপ্পো বানান, সকলকে ঠেইলে লইয়া যান চান্দের দ্যাশে। এসব গল্প এখনও আওয়াজ তোলে এই চাঁন্দনিভা সুবেহ সাদেকে। কপাল সেই অবলার তরে জাম গাছের কথা পাড়েন, সত্যিই আবেদ দর্জির তো এমন গোরআজাব হওয়ার কথা নয়। শোনা যায় সত্যিই তিনি জ্যোৎস্না পাগল মানুষ আছিলেন। মানুষের লগে চন্দ্রকারিগরের কাহিনি বলা, আর ওই পুকুরপাড়ের সাদা মানুষের বাণী প্রচারই তার কাজ ছিল। তার সুনামও বয় তাতে। শোনা যায় দেখতেও তিনি ছিলেন জ্যোৎস্নার মতোই। হাহাকারের পানশালায় তার ভোজ নিত্যদিন। সেই হাহাকার ছইড়ে পড়ে মনের স্বাস্থ্যে। সেভাবেই তিনি গত হন। তার ভক্তকুল এমন মৃত্যুতে বেহুঁশ হইয়া কান্দে। অনেক মানুষের ভেতরে সে মৃত্যুকাফেলায় ব্যতিক্রমী ছিল পাড়ার সকল শিশুর আগমন ঘটে। শিশু তো নয় পুন্নির চেহারা। পুন্নির ভরে কপাল তাকায়। শিশু নাকি পুন্নি, পুন্নি নাকি শিশু সব পুন্নিই তার শবকে ঘিইরা রাখে, চিইনা কয় ইনিই সেই চাঁন্দবুড়া। চান্নিতেই তার গোসল হবে। অদ্ভুত সব আলোমাখা আয়োজন। সে আলোতে বর্ণালী বয়, হাওয়া বন্দ হয়। গোলাপজল ছিটায়। কাপড়ায় পড়্ পড়্ শব্দ করে। টস্স্যা নাগা টরটরা চোখে কোঁকড়া কোঁকড়া হাতপায়ে ঝ্যালঝ্যালা চামড়া সাট্ হয়্যা থাকে। গোছল দেও, কাপড়া পরাও, কাফেলায় তোল। সেই তোলা মানুষটার কাল কেয়ামতের বিচার শুরু হলে- সে নাকি ঘ্যাঙগায়। পুন্নির লগে আসপি। পরে দেখা হবি। ভুল বকে। কপাল কব্বরের পাশে গিয়া জল ফেলে। কেটা যে কয় ওটি গোরআযাব হওচে। কিন্তু কপাল খুঁজে পায় না কিছু। খালি হাতড়ায়, আর হুলহুল করে কান্দে। টপটপ করে জল পড়ে, হায়রে সেইসব মানুষ! যখন তোকে ওখানে রাখি তখন তুই আগামী কঙ্কাল, আর কত্তোদিন কপাল তার লগে পইড়ে আছে।
আবেদ দর্জির গোর কাঁপানো আওয়াজ কেউ দেখে নাই। পুন্নির মতো অবলা জন্তুরা দেখিছে। দড়ি ছিরি পালাইছে বাছুর, পাশের ষাড় তখন আর্ত হিম। বোঝা যায় ভয়ে তার লিঙ্গ খাটো হয়া গেছে। খালি হুঙ্কার পাড়ে, লম্বা করে ডাক পাড়ে। গোরে শোওয়া আবেদ দর্জি তখন ওঠে, এশরাক পড়ে। ভেতরে খুব হাওয়া। গূঢ় আওয়াজ সারাক্ষণ তার কানে চিক্কুর দেয়। ভেতরে এক নবীন দুনিয়ার জামিন্দার সে। পুন্নি আছে, বিবি আছে, ফল আছে, রংবেরঙ পাখি আছে, আছে মৃদুমন্দ নহর। তাতে সাদা সাদা বিলাই নাফ পাড়ে। নাদুস নুদুস শরীরে তার পিরপিরানি ভাব। হ, সেই কত্তোকল আগে বড়বাড়ির উঠানে সায়েবগো বিবির কোলে এইরাম বিড়াল দেখছে সে। সে বিড়াল হাগেও না মোতেও না। সে মানুষের চ্যায়াও দামী খাবার খায়। কড়া গলায় চৌধুরী এসব কাজ নাযায়েজ বলে তাড়িয়ে দিলেও বিবিরা তার প্রতিবাদ করেন। বিবির তো কোনো কাম নাই। সে করবে কী?  খালি বিড়াল পালন করাই তার কাজ। এই বিরাট বাড়ির ভেতরে উঁচু খাটের ওপর মাসায়েল গন্ধে বিড়াল স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। এমন স্বাধীনতা মানুষেরও নাই। বাড়ির অনেক চাকর-বাকরও এই বিড়ালের দাস। গত বকরিঈদের পরের দিন যখন বাড়ি জুড়ে মানুষের মেলা বিরাট উঁচু করে ফটফটা ছবিঅলা বাক্সতে ব্যাটারি দিয়া আগুন লাগানো হয় তখন সেনেমার জন্য তিণ ধারণের ঠাঁই নাই, তখনও এই বিড়াল ম্যাম সায়েবের কোলে বইসে সেনেমা দেখছে। কিন্তু কাল কেয়ামতে এই অবোলা বিড়াল কী ম্যাম সায়েবের গোরআজাবের খবর পৌঁছাইবে? এ বাড়িতে কী তখন সেই ওছিলায় মেলা ফকির মিস্কিনের খাওয়ার আয়োজন হইবে, চান্দে চান্দে নানা অকেশানে! কপাল এই বিড়াল পালার মর্তবা আবিষ্কার করে ফেলে। কপলও পুন্নির আদেশ শুনিছে। সে যাইবে মসজিদের ভিটায় আর এস্তেমার মুনাজাতের মাঠে। নাজাতের জন্যি। বিড়াল পালার চাইতে এইডা বড় কাম। পুন্নি যে স্বপ্নাইচে! উচ্ছল প্রাণশিখায় সে সাহস স্বপ্ন হইয়া ধরা দিছে।


বিশেষ কোনো ব্যাপার নয়, হঠাৎই জেদ হয় কপালের : আজ রাতেই একটা কিছু হবে। দুধে-আলতায় পুন্নির বুকে চাপা ধাক্কা দেয়, পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায়। হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই নিদানকাল উপস্থিত। মৃত্যু। বোধহয় বেপরোয়া আঘাত বা বেকায়দার আঘাত। এ নিয়ে হৈচৈ। হট-টক।
তারপর দশবছর ছয়মাস তিনদিন আজ। কপাল তখন শিন্নিপুরের মানুষ। এখনও ফিরে ফিরে পুন্নিকে মনে পড়ে। কেন তাকে ফেলে দিল, মাইরে ফেলল, কী তার অপরাধ। সে অপরাধের মাত্রা কতো। একটা মাইয়ের গায়ে হাত দেছেল সে কেন। তখন কী সে কিছু বুঝতো না! ভাবে আর হাঁটে- ওই নির্জন সঙ্গহীন রাস্তাটায়। খুনী ফেরারী সে। রাস্তাটায় চলে একা কিন্তা সমস্ত রাস্তাই বন্ধ। চতুর্দিকে বন্ধ। ঘিরে থাকে অক্টোপাশের মতো। কত্তোদিন এভাবে? এর শেষ কোথায়। এ নিশি রাইত কী পোহাইবে না! জীবনের এ তিনটি বছর তো কতোকাল। আর কী হবে এ জীবনের! হাঁটে আর নিজেকে প্রশ্ন করে। কত্তোকাল হাসি নাই। হাসার কালগুলো আরও না-হাসার কথা বলে। কিন্তু বিপরীতে কান্নাইবা কোথায়। কাঁদিয়ে কী হইবে। যা হওনের তা তো হইয়া গেছে। কপালের কতো কথা মনে পড়ে। এর মাঝে ঝুমঝুম হাওয়ার ভেতর দিয়া বৃষ্টি নাইমে আসে। সে বৃষ্টিতে তার চিন্তা আরও পলি পায়। যেন ফিরে পেয়েছে তার পুরনো সময়। বৃষ্টি তুই কত্তো পুরনো! সেই বেরাকার কথা মনে আছে, যখন মোটা হেডস্যার চিক্কুর পাইড়ে কয় এ কাল্টু কপাল জামতলায় গিয়া খাড়া। তোর অখন বৃষ্টিভেজা শাস্তি। তেরোর ঘরের নামতা তিনমাস ধরে শ্যাষ করিস নাই। হ, বৃষ্টি-শাস্তি। সে শাস্তিতে শরীরের কষ্ট নাই, বেশি কষ্ট মনের। তাও আবার নামতা না পারার জন্যে নয়। জেদ করিলেও ওটা শ্যাষ হইতো! কিন্তু হেডস্যার কাল্টু কয় ক্যা! সক্কলেই শুনলে কাল্টু আরও কালোতে পায়। অন্ধকার কালা। কালো কালা। গুজগুজা কালা। সে কী এতোই কালা। শেষ হয় না। পুন্নি ছাড়া জীবনের সবই তাকে কালা কইছে, কাল্টু কইছে। কিন্তু পুন্নি কয় নাই। পুন্নি আহারে পুন্নি! পুন্নির তখনও দুধ ওঠে নাই। হাফ প্যান্ট পরে। অনেক মাইয়ার মধ্যে ঝুপ করে বইসে পড়া বানায়। সাদা ফুলঅলা ডোরাকাটা ফ্রক পরে। পায়ে স্যান্ডেল। গোছা হয় নাই, রোমও নাই। এক রাতে এই পুন্নিকেই স্বপনে দেখে কপাল। সেখানে কী বিশ্রী ময়লা পানিতে নামছে সে! পুন্নি তাকে এমন অকাম করলেও কাল্টু বলে না। সে চারআনার সিকি তোলে ময়লা পানি থেকে। ওটা ফেইলা দিছিল অন্য বন্ধু। কিন্তু পানিটা ময়লা কেন? এ পানিতে কী হয়। তাতে বা তাকেই নামতে হলো কেন? সে কি বন্ধু সেবায় রত ছিল। তার বিত্তান্ত নাই। খালি স্বপ্নের ভেতরে পানিতে নামার আওয়াজ। অনেক কষ্টে যখন সিকিটা পাইলো তখন পুন্নি কয় তুই কি চাকর! কোনো জবাব দেয় নাই কপাল। একটা সুকি তুলে উপকার করলে কেউ চাকর হয় নাকি। সেটা মনে মনেই থাকে। এরপর খুব হিসু লাগে। আরামে সে হিসু সম্পন্ন হয়। ঘুমটাও খুব গাঢ় হয়। পুন্নির জন্য তখন খুব মন খারাপ হয়। ও কেন তাকে চাকর কইল। আবার মুখ ফেরায়। এবার কেমন চাপা রোদ তাকে চেপে নেয়। সইরে গেছে পুন্নি। কুট শব্দে চোখ খুইলে দেখে বেল উঠছে। কেউ নাই, খালি বিছনে ভেজা। হাসি পায় কপালের। কত্তোকাল যেন পুন্নিরে দেখে নাই। সেই সুকি ফিরে নিয়াছিল ওই বন্ধু! সে কোথায়। মা পরে বলছিল হারামি কাল্টু ফির বিছানাত মুতচোস! এভাবে সক্কলেই কাল্টু প্রতিষ্ঠা দিলেও পুন্নি ফ্রি করে দেয় তাকে। কেন? সে জানে না। পরে একবার ভীষণ ঝড় হলে কয়েকদিল স্কুল বন্ধ থাকে। হেডস্যার আসেন কিন্তু আর কেউ আসেন নাই। রাইতেও হেডস্যার কী কী করেন স্কুলে। পরে হাঁটতে হাঁটতে জামতলা দিয়া, কালিমন্দিরের পাশের কোণায় এস্তেঞ্জা কইরে সোজা হাঁটা দেন বাড়ির দিকে। বিড়বিড় করে কী যেন বলা তার অভ্যাস। তখন স্কুলে সাবান দেয়, বিস্কুট দেয়, লেখার জন্য বোর্ড আসে, খাতা আসে- মাইরি গন্ধে কী মজা সেসব। কপালের বেশ মনে আছে, অনেক খাতা এসে স্কুল বারান্দায় দাঁড়াইলে সে হাত দিয়া নাড়িলে আফের স্যার কাল্টু বলে চিক্কর দিয়া গাল দিছিল। পরে সে আর ওখানে ছিল না। ওখানে কেডা! ও তুমি, প্রত্যহ এখানে কী করো। ধ্যান করো বুঝি! এইহানে ধ্যান কইরে কিচ্ছু হইবো না। উপাসনালয়ে যাও। সারাক্ষণ ক্ষমা চাও। না-কি? কে এই লোকটা। সেও কি কপালকে খুনি বলে জানে? এককালের কাল্টু এখন সবার কাছে কি খুনী! সে আটকে যায়। উপাসনালয়ে কেন যাবে? ইচ্ছে করে অনেক কিছুই করা যায় কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছুই করা ঠিক না। কপাল এ রাস্তায় ঠিকানা খোঁজে। পথ খোঁজে। এতো উন্মুক্ত উদার রাস্তা, মুক্ত হাওয়া, পুন্নির নাকান জোছনা, দূরে বিস্তারিত আকাশ, উদার পাগলা হাওয়া, বৃষ্টিভারী যৌবনমাঠ সবই আছে। সবকিছু হাতছানি দিয়া ডাকে। কিন্তু কাছে যাওন যায় না। সবই পবিত্র। বুজর্গ। কিন্তু কপাল একা খুনী। একাই সে খুনের বোঝা নিয়া ঘুরে বেড়াইতেছে। কেন সবকিছু প্রাণখুলে তাকে ডাকে কিন্তু যেতে পারে না। হেডস্যারের মতো শাস্তি পাইলেও তো ভালো লাগে। কাল্টু বললেও ভালো লাগে। কিন্তু কোথায় তার ঠিকানা! কেন সে এতো অসহায়। এ রাস্তায় আরও চলে কপাল। বেরুতে পারে না। সবাই তাকে ঘিরিয়া ধরে। পথ আগলাইয়া কয়, ফিসফিসে কয়- তুই খুন করছোস। কিন্তু কেন সে পুন্নিকে আঘাত করে, কীভাবে বা কোন্ স্বার্থে সে এ কাজটি করিয়াছিল- তাহার জবাব কী? বা সে তো সেইদিন একপ্রকার প্রস্তুতিই লইয়াছিল, মারিবার- কী করিয়া সে মারে! কেন মারে! অবলা বালেগেরে কেউ মারতে পারে? পারে না। কিন্তু সে মারিয়াছিল। কেন- তাহা বলে নাই। কত্তোকাল বলিতে পারে না। সে কাল্টু বলে নাই তাই বুঝি তাহার অপরাধ।
কপাল কুৎসিত, কালো কিন্তু পুন্নি তো উজালা। আগুনের আলোতে জ্যোতির্ময়।


কপাল আর পুন্নি হঠাৎ এক গাঁয়ের মানুষ হয়ে গিয়েছিল। কপালের মায়ের অন্যত্র বিয়ের পর সে নিজের মানুষকে চিনতে পারেনি। মাকে চেনাও কষ্ট মনে হতো তার। মা কী ভালোবাসতে পারেনি তাকে? আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা… হায়রে মা! জন্ম দিলি, পেটে ধরলি, খাওয়াইলি, কসমধরা কষ্টে জন্ম দিলি, তারপর নাই। নামও রাখছিলি ‘কপাল’। কী কষ্টের নাম। মনে হয় যৌবনটা খুব মজার। তোর ভিটায় তখন নকল মানুষ। মায়ের আঁচল তাতে ফুরিয়া যায়। কী লম্বা সে আঁচল! দুধমাখা ভাত আর ওমমাখা আরামের দিন কতো মানুষের থাকে। আঁচলে বোনে তারা, অফুরন্ত তার ফুটন্ত আসর, চলতে চলতে কতো সুর আর কতো গান। তুই মা হইয়া কিচ্ছু দিলি না। এখন মনে হয় হামাগুড়ির ভেতরে রোশনাই চাঁদে কতো কীই তো ঘটিতে পারিতো। বাড়ির পাশের কুল গাছটার মিষ্টিকুল, তার ভেতরে টলমল পুকুরের পানিতে নিজের মুখ, একটা সুন্দর ডালে পা দোলাইয়া ‘হায়রে আমার মায়ের দুপুর’ গাওয়া যাইতো। কিন্তু কই। এখনও নিমতলার শ্মশানে মরা পোড়ে, ইছামতির বুক বাইয়া মানুষের জীবন-জীবিকা ফুরাইয়া আসে, শুকনা নদী এখন কুলুকুলু- ধীর ও শান্ত। কেন মা নদীটা শুকাইয়া গেল। পাশের গোরস্থানটায় বহু কচি নওলি ঘাস উপরের দিকে হাঁ কইরা ডাকছে। তাতে বাতাসের দোলা বইয়া চলছে। মৃত মানুষদের মতো তুমিও মইরা গেছ। সেই মানুষটার লগে তোমার দিন যায় রাত আসে। সেখানে নতুন নতুন মুখ পয়দা হইছে। তাদের নিয়া তুমি এখন কুন্তীমা। আর আমার নাম দিছ কপাল, আমি ওই কর্ণ-কপাল। কর্ণের বঞ্চিত মাতা কান্দে, আড়ালে বালিশ ভিজায়, চক্ষু লাল করে, কান্দনে মুখ ফোলায় কিন্তু তোমার কী অবস্থা? ক্যামনে দোষ দিমু তোমার যৈবনের, আর আমি তো জানি না তুমি কেমন আছ, কী তোমার কষ্ট। তোমার মায়ের আঁচলেরই বা দশা কী! এসব বইলা কাম কী। নিজের জীবনটা ভস্মসাৎ হইলো রিফুজির মর্যাদা নিয়া। আর পরে প্যাট খসানো কপালের যতো কু-কাম তার সাথে যুক্ত হয় পুন্নিকে মাইরা ফেলিয়া। সে মরছে কিন্তু আমারে ছাড়ে নাই। কিছুতেই সে পিছ ছাড়ে না। খালি দুয়ারে দাঁড়ায়। বাধা হয়। আটকায় আর নছিহত করে। সর্বশেষ নছিহত তার এস্তেমায় যাওয়ার আদেশ। মরণের ওপার থাকি আদেশ আসলে তা আটকায় কেডা। কিছু বলি নাই। এর মদ্যে এখন এইহানে হাসপাতালের দেয়াল ঘেষা এক রিফুজির ঘরে এক বেলা খাবার দিয়া হাসপাতালের ভেতরে আমারে ডোমের কামে লাগায়। মানুষ কাটার কাম। এইটাই আশ্রয়। একটা দুটা তিনটা মানুষ কাটতে হয় প্রায় দিনই। আর কতো ক্লান্তি। একে তো পুন্নির চাপ, রিফুজি হয়া সারাক্ষণ অশান্তির ভুল নিয়া হাঁটা, তার ওপর খাওন-দাওন আর এই ডোমের কাম। করণ যায় কিন্তু আনন্দ নাই। কিন্তু এইটা তো পেশা না। কতোকাল মানুষ কাটমু। প্যাটের দায়ে কাম করি। যে ফুলতলার ফুলের গন্ধে জীবন চলার কথা তা ডোম ঘরের নিষ্ঠুরতায় আটকানোর ইচ্চে নাই। মাঝে মাঝে চাক্কু ধরলে ঘাম ছুইটা যায়। কিন্তু ডাক্তারদের নির্দেশ থাকে। এক পর্যায়ে ঘাড় ঘুইরা যায়। বাতাস উল্টা বয়। মানুষের স্থাপনা বদলায়। ফুলতলার সার করা কামিনী হারাইয়া যায়। সকালের বকুল আর পড়ে না। পড়লেও তাতে মালা হয় না। ধুলোয় মেলায় সে গন্ধ। বাপের কেনা হজমি জিহ্বায় টানতে টানতে ভোরবেলা বকুলতলায় কে ওই যায়! উঁচু বকুলতরার ফুল মুখ্য নয়, মরা বাপের কাম হলো ফজর পড়া। জন্মের আগ দিয়া সে ঝরা বকুলের গন্ধসমেত পলাইছে। তাই এখন দূরের অনেকেই। সবাই পলাইছে। অফিসপাড়াটা এখন শহরের অনেক মানুষের মোতার জায়গা। পাশের অন্ধকারে অনেক কনডমের পাতা। এর পরে গোলজারের ভিটায় গড়ে ওঠে বড় বিল্ডিং। যে চোখে বিলের বাতা চোখে পড়ত তাতে এখন চকচকে টিনের ঝলকানি। খেরা করে রোদ্দুর। তাতেই পাল্টায় আর ফেরায় নতুন কিছু। এটা এখন কঠিন কাজ নয়। গরু জবাইয়ের পর কসাইরা যে কাম করে তেমনই। বডি ফাড়া, তারপর মূল কামটা তো ডাক্তাররাই করেন। কামডা কঠিন না। কিন্তু সমস্যা পুন্নিরে নিয়া। একটা খুন করা মাইয়া পোস্টমর্টেম করতে যাইয়া আরও সমস্যার তৈরি হইলো। কী আর কমু! ভয়ে সিটসিটা! কুন্তীমায়ের কথা তখন মনে হলো। সেই য্যান রক্ষা করবি। মা কী করুম! ধূর শালা মাকে চেনোস তুই? কবে তোর মা আছিল? মা পলাইয়া গেছে কবে, সেই কোন সকালে কাঠগোলাপ ফোটার আগেই। এগলো ফুটতো বুঝি মাকে বাঁচানোর জন্যই। দোকানের আড়ালে একটা বড় টকটকা কৃষ্ণচূড়া ঠিক তার বিপরীতেই মিশমিশা শান্ত গন্ধরাজের গাছ। এতো মড়কা ডাল, ওঠাও যায় না পাড়াও যায় না। কিন্তু খুব যৌনলোভা ফুল। কী তার মদমত্ত রঙ। গরমের হাল্কা বাতাসে সে বেণী দোলায়। গ্রীবার ভঙ্গি তার পুষ্ট রমণীর আনত শ্রদ্ধার মতো। মা-টা তেমনই ছিল। এ মা-ই ফুলতলার পরিচয় বলে বলে ভেতরে বাস্নাটা দিয়া দিছে। সেই বাসনায় জেবন বহিয়া চলে। প্যাটের মইদ্যে থাকতেই শুনছিনু! এইসব ভেবে এভাবে কতোকাল যায় কপাল ভাবে না। রিফুজি তাকে আশ্রয় দেয়- এক প্রকার জীবন চলছিলই। ভালোই ছিল তা। এক ধরনের রঙ ছিল তাতে। লাশ কাটা ঘরে মানুষ পশুতে তেমন পার্থক্য নাই। এক প্রকার কশাই-ই সে। এমনকি নারী-পুরুষ পার্থক্যও সেখানে নেই। প্রথম দিকে না বুঝেই সাহসের সঙ্গে সে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন। মাইয়াটা বাছকানা। ক্যমানে খুন হইলো? পুন্নি তো না! সে দৌড়ায় তখন। ওড়না ফেলে চলে। বেনী দোলায়। অনেক দূর থেকে আসে আর কয় তোমারে মানুষ কাল্টু কয় ক্যা? ছায়া তোলে। চোখ খোলা। বিদ্যুত চলে যায়। অন্ধকার যেন আলোর চেয়ে অনে বেশি। ১০০ পাওয়ার নাকি ৫০০, ১০০০। বাড়তে থাকে। ডোমঘরের ওপর খুব বৃষ্টি নামে। ফর্সা বৃষ্টি। নাহ শাদা। দর্জির শাদা। ভয়ের শাদা কবুতর। ভয়ার্ত কবুতর হাঁটে। ঠ্যাং দোলায়। পাচা নড়ায়। বাকবাকুম শব্দের ভেতর বোঁ বোঁ ফ্যান ঘোরে। বাতায়ন নাই। বাঁশের আগায় বাঁশপাতালি সাপ দৌড়ায়। সাপ না পুন্নি। সাপের মতো ঠা-া। প্যাঁচায়। যুৎ করে ধরে। সঙ্গমের আয়োজনে ওস্তাদী করে। নুনুতে হাত দেয়। কয় ক্যারে তাপ নাই ক্যা। সাপ তো সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত। বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর ফ্যান তোলে। মাইয়াটার শরীরে সাপের কাটা কাটা দাগ। চিহ্নগুলো আরও চেরা। সে তাকায় বড়ো বড়ো চোখে। জাপটায়। সাপকেই সঙ্গী করে। পায়ে কী সাপ নাকি? নাকি চাটাই আর দড়ি। এতো প্যাঁচ। পুন্নির চোখ আরও বড়ো হয়। জাপটায়…। আছড়ায়। হঠাৎ সে বেহুঁশ হয়। কপালের কপালে চোট খায়। হুড়কায় টোকা পড়ে। ক্যারে! কপাল কপাল!! কপাল!!! ডাক্তার এসে গেছে। ডোম দরোজা খোলে না কেন? মুচি রিফুজির লোক এসে ভাওলে দেখে কপাল অজ্ঞান। আলোর মধ্যে রক্তাক্ত। ডাকলে ধরপড় করে ওঠে। রোশনাই আলোয় সে ঠিক কিছুই বুঝতে পারে না। ডাক্তার সাব বলে, ওকে দিয়ে আর বুঝি চলবে না। ভয় পেয়েছে। এ কাজটা এখনও হয়নি।’ ওকে বদরান। রিফুজির লোক পক্ষে বলার চেষ্টা করলে থামে…। বেশ। তারপর আর লাশকাটা ঘরে ঢোকা হয়নি। সে থমকে যায়। এই বিলাপ আর সাপের নহরের সাথে যুক্ত হয় পুন্নি। কপাল ভালোবাসার পুন্নির জন্য মন ভরে কাঁদে। অনেক কান্নার পর সেদিন সে নতুন জন্ম পায়। সে রাত্রের এক গভীর স্বপ্নে পৃথিবীর সবকিছু পাল্টে যায়। এই লাশ কাটার কাজ ছেড়ে নিজেই এক ওয়ারিশহীন মানুষে পরিণত হয়। রিফুজির ঘর ছাড়ে। রথগুলো বদলায়। কিন্তু রথ তো একই। ফিরতে চলতে দুবরাজপুর গ্রামে আসে। এটি নতুন গ্রাম। একটা টানে পলের ভিটে, উঁচু ইলেকট্রিক তার আর বিরান পাথারে সে একাকী। কোনো গৃহস্থ নয়। এক পিলারের নীচে বসে পড়ে। পরিব্রাজকের বেশে। ধানচাষী, মৎস্য বিক্রেতা বা কেউ এলে বলে, কিছু না ভাই। চলি বেড়াই। কপাল এরপর অনেক রাত্রে ঢুকে পড়ে দূরে এক আলোর ম-পে। আলোর নিশানায়। অন্ধকারের বিপরীতে তো আলোই।
লালদিঘীর বাজারে তখন মানুষের ভীড় কমেনি। ইউনিয়ন কাউন্সিলে জটলা। একটা ভ্যান দাঁড়ানো। উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই বলে ‘মরার ভ্যান’। মানুষ ওঠে না ওতে। শীর্ণ শরীরে প্যাঁচানো গোঁফে ভ্যানের দায়িত্ব তার হাতে। সে কম কথা বলে। জটলার ভেতরের নানা কথায় সে একদম নিঝুম চুপ। দাঁড়িয়ে টানতে থাকে কোমরে প্যাঁচানো গফুর বিড়ি। পঁচিশটির প্যাকেট এটি। দাম সোয়া দুই টাকা। ৫০ লেবেল ফেরত দিলে এক প্যাকেট ফ্রি। বাম কোমরে লেবেলগুলা অন্যভাবে আটকানো। সম্ভবত সিমেন্টের ব্যাগের টুকরায়। তবনটা কঠোর রোদে রংপোড়া। দুএক জায়গায় সেলাই মারা। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। ধুলোয় মাখা পায়ে, গোছার ওপরে লাল সুতা বাঁধা। সুতাতে কীসের তাবিজ! সম্ভবত এক্সিডেন হইছিলো ভ্যান। তারপর পায়ের আঘারে বিষ বিশল্যকরণের নিমিত্ত এই তাবিজ। মরা কোথাকার! কপাল কি মরা নিয়েই জন্মেছে? এ জটলার ভেতরে সে ঢুকে পড়ে। যদিও তার উদ্দেশ্য কিছু খাদ্য-খাবার। গত দুদিন খুব অনাহার। কিন্তু মরাটা ওভাবেই ভ্যানে পড়ে থাকলে আর কাউন্সিলের ভেতর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে সময় এভাবেই বেশুমার পার হবে। ভ্যানঅলা টাকা দাবি করবে। কারণ, আরও ট্রিপ আছে তার। এসব নির্দিষ্ট খেপ মিস হলে অনেক লস। সে একটু বিহ্বল হয়। কপাল লাশের দিকে তাকায়। মনে পড়ে ডোমঘরের কথা। এখানে ওই মেয়েটিই নাই তো! নীল পলিথিনের ভেতর সে নড়ছে না তো! চোখ কী খোলা না বন্ধ। সে পাশ ফেরায়। বড়োরাস্তার ওপারে চলে যায়। বড়ো একটা দোকানে ঢুকে পড়ে। অনেক লেনদেনে মাঝে মালিকের সঙ্গে কথা হয় না। সে চোর নয়। মিথ্যাও বলবে না। মোটা আমগাছের তলায় ফিরে আসে।  সেখানে গোলজার! গোলজার!! করে আওয়াজ ওঠে। ক্যারে বা তুমাক তো ভর সাঁঝোত ওটি বসি থাকপ্যার দেকনু, কি কাম বাহে। কোটেত্থাহি আচ্চেন-  নোয়াখালি নাকি।’ কপাল উত্তর খুঁজে পায় না। খাবার চায়। জীর্ণ মলিন পাঞ্জাবীতে এখন অনেক দাগ। মুচি রিফুজি কোত্থেকে এটা আনি দিছিল-  কে জানে। ডোমের কাজের জন্য দুটা তবনের একটা এটা। এখন দাড়িগোঁফ মুসল্লিমার্কায় পরিণত, কদ্দিন কাটা হয় না। খাবারটা গোলজার মালিকের হাত দিয়াই আসে। আলুর ডাল আর অর্ধেক ডিম। হোটেলের সকালের রান্না, এখন সে পাতিল তুলছে, এটা না দিলে খাবারটা ফেলে দিতে হবে। প্রতি রাতে গোলজার মিয়া সব মূল্যবান পাতিল ও জরুরি জিনিস পাশের বাড়িতে রেখে আসে। এ হোটেলের চতুর্দিকে ফাঁকা। কটা পচাকাঠের চেয়ারটেবিল আর কোণায় একটা নড়বড়ে নলকূপ। সারাক্ষণ এ টেবিলে থাকে ঢিলা আড্ডা। আমগাছের ছায়ায় ভরা এ ঘরটার স্যাতসেতে ভাব খারাপ লাগে না। গরমে বেশ ছায়া দেয়। ভোটভাটে খুব সরগরম। দুপুরে আর রাতে বিশ থেকে পচিশজনের ভাত চলে। বৈঠকি মেজাজের এ হোটেলে খাওয়া দাওয়ায় মালিক বেশ উদার। কপাল মাছের পিচ পায়। দুটুকরা মাংসও জোটে। ক্ষুধা নিবারণ হলে এবার আলোর দিকে হাঁটে। বিশাল উঁচু আলোর হাতছানি যেন? কাউকে কিছু বলে না। আনমনে আলোর টানটাই ঠেলে নেয় তাকে। খেয়াল করে ততোক্ষণে কাউন্সিলের সামনটা ফাঁকা হয়ে গেছে। পুন্নি কী চইলে গেল তাইলে? এই কাউন্সিলঘর, জটলা মানুষ, ভ্যানঅলা তারে কই নিয়া গেল। এখন রাত নাইমা আসছে। যে আলোর দিকে সে যাচ্ছে তা এখনও তারার মতোন। আলোর কুটিল চোখ তাতে এখনও শ্যাষ হয় নাই। একটু সামনে এগুলে আলোর তারা হয়তো স্পষ্ট হবে। কিন্তু ততোদূর পুন্নি যাইতে দিবো না? সে তো এতো মানুষের ভেতর থেকে ছাড়া পাইছে। কিন্তু নিজের ভেতর থেকে তো মুক্তি মেলে নাই।
রাত্রি গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোনাকীর আলো আর দূরের বিচ্ছুরিত আলোর ঝলকানিতে গোলমাল ধরা পড়ে। কীসের এক কাঠিন্য যেন ক্রমাগত গ্রাস করে তাকে। হাঁটার পথে পুরনো আমলিগাছের অন্ধকার আর তার পাশোর খাদের কর্কশ ভূতুড়ে পরিবেশ এড়িয়ে সে যখন রাস্তার ধার দিয়া সম্মুখে চলে তখন হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির তেরছা তীব্র তীর শুরু হলে আমলির গাছের আড়ালে সে নিরাপদ বোধ করে। কিন্তু খাদের নিরিহ ভয় তাকে স্থির করে দেয়। সে অপেক্ষা করে পথচারি কেউ তাকে সহায়তা করুক। তার পাশে এসে নিরাপদে দাঁড়াক। ব্যাগভর্তি সওদা নিয়া দুজন লোক ঝরির ভেতর থাকি গা বাঁচায়। কপাল এখন বেশ স্বস্তিতে। এই মুহূর্তে পুন্নির ভয় মুখ্য থাকে না, যতোটা বৃষ্টির ভয়। কিন্তু এ বৃষ্টি তো ভয়ের নয়। এক সকালে শিন্নিপুরে এ বৃষ্টিতে ভিজে সে নওলি ঘাস দেখেছিল। কতোকাল আগের কথা