Archives

শর্ষে ফুল ও কর্পোরেট ভালবাসা

কুয়াশার তুলোয় মোড়া হলুদ বল যেন, ঝুলে আছে ম্লান আলো নিয়ে ল্যাম্পপোস্টে। তীব্র শীত-রাতের শেষার্ধ। ট্রেন থেকে নেমে পিছন ফিরে একবার দেখে নিল সদ্য স্টেশন-ত্যাগী ’ধূমকেতু’। ধূমকেতু এক্সপ্রেসেই সাপ্তাহিক বাড়ি ফেরা মুহিতের।
পাশা মুহিতুর রহমান ওরফে মুহিত পাশা বেসরকারি অফিসের মাঝারি গোছের কর্মকর্তা। কদাচিৎ লেখালেখি করলেও এ পরিচয়টা গোপন রাখতেই পছন্দ করে। উপজেলা শহরে বেড়ে ওঠা মুহিত বিগত পাঁচ বছর ধরে রাজধানি থেকে বার বার ফিরে আসে এই উপজেলাতেই প্রাণের টানে, মনের ঘ্রাণে। অবরোধ-হরতাল ছাড়া আর কোনো কিছু পরোয়া করে না সে। করবেই বা কেন, এখানেই তার সংসার, প্রিয়তমা স্ত্রী-শাহানার আস্তানা, পরম ঠিকানা। শাহানা সরকারি স্কুলে পড়ায়। সরকারি বলে কথা! স্থায়িত্ব,নিশ্চয়তা, দীর্ঘদিন ছুটি পাওয়া পেনসন, মুহিতের বেসরকারি ‘এই আছে এই নেই’ গোছের চাকরির বিপরীতে বড় হয়ে দেখা দেয়। এসব যুক্তির কাছে নত হয়ে মুহিতের ঢাকায় চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকা, মনে মনে মরে যায় স্ত্রীকে নিয়ে একসাথে ঢাকায় থাকার তুমুল বাসনা।
কিছু আগেই হয়ত রাত-প্রহরী শেষ সাঁজাল জ্বালিয়ে উত্তাপের উপমা নিয়ে জবুথবু শুয়ে থাকে পোস্টাফিসের বারান্দায়। ধোঁয়ার কুণ্ডলি কুঁজো হয়ে নুয়ে পড়ে কুয়াশায় ভিজে ভিজে, দাঁড়াতে পারে না মাথা উঁচু কোরে। দাঁড়াতে পারে না কুকুরটিও, শুয়ে থাকে সাঁজালের পাশে।
মুহিত পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় বাড়ির বারান্দায়।এখন আর কলিং বেল লাগে না, সেলফোনেই সেরে নেয়া যায়। হলোও তাই। ’আসছো..? খুলি… এত শীতে…’। সেলফোনের জটিল অজানা তরঙ্গ পেরিয়ে কোনো এক অতল গভীর ঘুমের দেশ থেকে যেন ভেসে এল আদ্রতায় মেশানো এক কুসুম কণ্ঠস্বর, ছড়িয়ে যায় মুহিতের মুগ্ধ-মৌন চৈতন্যে। সূর্যহীন ভেজা-ভোরের বার্তা পাওয়া গেল পাখির কলতানে। ভালবাসার ওমে টুপটাপ শিশিরের শব্দ টিনের চালে গলে গলে পড়ে। মুহিত শুয়ে থাকে দীর্ঘসময় লেপের ভেতর।
‘চা খাও, আমি হেঁটে আসি’ বলে সিথানের পাশে কাপ রেখে বেরিেেয় গেল শাহানা। রক্তের শর্করা বেড়ে গেলে এমনটাই বিধান। সন্তান প্রত্যাশায় নিয়মিত চেক-আপে সম্প্রতি ধরা পড়েছে। তাই নিয়ম মেনে রুটিন বেঁধে জীবনযাপন। দরজা টেনে দেয়ার শব্দ, কোমল কেড্স-এ মোড়ানো নরোম পা ক্রমশ দূরে সরে যায়, ঘাসের ডগায় লেগে থাকা শিশিরে ভিজে ওঠে শাহানার পা। মুহিত দেখতে পায়। অনুভূতির প্রসারিত চোখ চোখে-চোখে রাখে। আহা! এমন হয় না কেন প্রতিটি সকাল, প্রতিদিন পায় না কেন সাহানার সান্নিধ্য-সোহাগ, পায়ের আওয়াজ!
‘এভাবে কতদিন আর আসা যাবে জানি না। অবরোধ-হরতালে প্রতিদিন যেভাবে মানুষ পুড়ছে-মরছে, খুব ভয়ে ভয়ে গাড়িতে বসে থাকি। মনে হয় এই বুঝি জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়লো পেট্রল বোমা। প্রতিটি মুহূর্ত আতংকে থাকতে হয়’জ্জনাস্তার টেবিলে এসব বলাবলির ফাঁকে শাহানার হাতে ধরিয়ে দিল সদ্য প্রকাশিত একটি কবিতার বই। একাত্তরের এলিজি- মামুন মুস্তাফা।
‘তোমার কবি-কলিগ?’
‘হ্যাঁ, তুমি এর লেখা আগেও পড়েছ। এটা কিন্তু অন্যরকম লেখা। তুমি তো একাত্তরের চিঠি পড়েছ, সেখান থেকে কয়েকটি চিঠির গভীরতম অনুভূতির অতল থেকে তুলে আনা শব্দাবলিÑপড়ে দেখ ভাল লাগবে।’ চা খেতেখেতে কটি কবিতা পড়েও ফেলে শাহানা।
‘তোমার কলিগ লেখে, সেও তো ব্যস্ত। তুমি লেখ না কেন? সেই কবে লিখেছ! তোমার লেখা পড়ে পড়েই তোমার প্রেমে পড়লাম, আর তুমি লেখাই ছেড়ে দিলে।’
‘বিয়ে করেইতো এসব হলো। এইতো এখন বলবেজ্জগ্যাস আনো, বিদ্যুৎ বিল দাও, পেপার বিল দাও, বাজার করে আসো, ওসুধ নাই, দোকানের বাকিÑকত কি!’
‘আবার চেষ্টা করো না প্লিজ। এখনই তো সময়। দেখ না সময়টা আশির দশকের মত টালমাটাল হয়ে উঠছে। সময়কে ধরে ধরে কবিতায় পুরে দাও। আবার কবি হয়ে যাও।’
‘যথার্থ লিখতে হলে, কবি হতে হলে মানুষের কাতারে থাকতে হয়, জানো তো?’
শাহানার প্রেরণা মুহিতের ভালই লাগে। আরও একবার প্রবল-প্রতাপে ছুঁয়ে দেখতে চায় শাহানাময় রা.বি’র তাপসি রাবেয়ার করিডোর, মতিহারের সবুজ চত্বরে খোলা গলায় শব্দের বিচ্ছুরণজ্জ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’। সেই শাহানা, শাহানা কতকিছু বোঝে, বোঝে না শুধু এনজিও অফিসের ঘুপচি টেবিলে কি-বোর্ডের শব্দতলায় তলিয়ে যায় কত স্বপ্ন, কবিতার কত লাইন! যাপিত কর্পোরেট জীবনের ইঁদুর দৌড়ে ময়লা-ধুলোয় শুধু বয়স বাড়ে, বাড়ে না অন্যকিছু। এ এক কাঁচুমাঁচু জীবনের রোজনামচা। কেন্নোর মত গুটিসুটি বেঁচে থাকা। ‘বেঁচে-থাকা’জ্জসত্যবোধ করে না মুহিত, বরং বলা যায় এখনও বাতাসের নামে কী সব আসা যাওয়া করে নাকের ভেতর দিয়ে। সমুদয় কাজ শেষে বিকেল আসে।
মুহিতের ইচ্ছে করে শাহানার সাথে হাঁটতে। গ্রামের রাস্তায়, হলুদ শর্ষে ক্ষেতের আল ধরে, পাশাপাশি অনেকদূরজ্জযতদুর চোখ যায় চাপচাপ হলুদ ছুঁয়ে। বেরিয়েও পড়ে দুজন। সন্ধ্যা সমাগত হলে সিএন্ডবি রাস্তার শেষে বিস্তীর্ণ মাঠ সংলগ্ন পুরোনো বটগাছ। কত গাছই কাটা পড়ে চলে গেছে ইঁটের ভাটায়। মাত্র ক’টি এখনও খাড়া হয়ে আছে, হয়তো দোকানিদের দরদামের আশায়। রজবের টি-স্টল। আজও আছে। রজব চাচা বলেই ডাকা হতো। কত মানুষ এসেছে এ স্টলে একসময়। তখনও রাস্তা হয় নি। মধ্যদুপুরের সুনশান নীরবতায় রেল স্টেশন থেকে মাঠ বরাবর গরুর গাড়ি আর দু’পাই ছিল সম্বল। কেরোসিনের বদলে এখন বিদ্যুত, বাতি, পাখা, রঙিন টিভি, কত কি! শাহানাকে নিয়ে চা খেতে ঢোকে মুহিত। কোণার দিকের টেবিলে বসে চা-এর কথা বলে।
‘ক্যারে বা আইছু, বউমা’ক লিয়ে আইছু, ম্যালাদিন পর আলু।’
রজব চাচার সহজিয়া কথায় প্রাণের ঝলকানি চকচকে বাল্বে প্রতিফলিত হয়। দুএকটি মামুলি কথা, চা খাওয়া, তারপর চলে যাওয়া। খুব সহজেই পারে মুহিতেরা। মুহিতের মনে পড়েজ্জকবে কোন অচেনা অথচ বিশ্বস্ত হাতে পাতার পর পাতা ভরা লেখা, যুগযুগান্তের শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির কথা, বিশ্বময় সাম্যের স্বপ্ন সঞ্চারণ, কত চিরকুট হস্তান্তরজ্জস¦ভাবজাত ঘাড় বাঁকা করে থাকা রজব চাচার কাছে নিয়েছি-দিয়েছি। আজ সেসব কেবলই স্বপ্ন-স্মৃতি-রোমান্টিক অনুভব কখনো-সখনো। আজ ফিরে আসার কালে মুহিতের মনে হয়, হায় রজব চাচা, তোমার মাথা স্বভাবজাত হেলে থাকে বামে। আর আমার! আমাদের! আমাদের মাথাটা ডানে-বামে দুলতে দুলতে কেমন হেঁট হয়ে হেলে আছে, নুয়ে আছে, তোমার এবং তোমাদের কাছে! তুমি দেখতে পাও না! কেউ দেখতে পায় না! সঙ্গে থাকা শাহানাও।
হাঁটতে হাঁটতে কথা তোলে শাহানা ‘আমার বান্ধবী সুমির কথা মনে আছে? ঐ যে ভার্সিটিতে একসাথে পড়তাম। খুব করে বলেছে ঢাকায় যেতে। নিয়ে যাবা?’
‘যাবা, চলো। দুদিন অবরোধ নাই। গেলে আজকেই। স্কুল ছুটি আছে না?’
‘হু’, একটু থেমে শাহানা আবার বলে, ‘আজকেই? সেইতো মাঝরাতের ট্রেন, তাইতো? জানো, সুমির হাজব্যান্ড ওর ম্যারেজডেতে ওকে একটা ফ্লাট গিফ্ট করেছে। ও খুব খুশি।’
‘সুখী তো?’
‘অবশ্যই সুখী।’
‘ফ্লাট গিফ্ট! বাব্বাজ্জওর হাজব্যান্ডের নিশ্চয় অনেক টাকা।’ মুহিত হলুদের শেষে শুকনো খটখটে রাস্তায় চোখ রাখে।
‘তা আর বলতে! পেট্রোবাংলায় চাকরি করতো, এখন করে না। কী সব ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের বিজনেস করে। যাকগে, আমি কিন্তু যাচ্ছি।’
অবশেষে যাবার আয়োজন। অনেকদিন একসাথে দীর্ঘ ভ্রমণ হয় না। আজ হবে। ডেকেও নিয়ে যাওয়া যায় না শাহানাকে, আজ স্বেচ্ছায়। ভাবতে ভালই লাগে। শর্ষে ফুলের গন্ধে ভরে থাকে মুহিতের মন।
দুই
সত্যি এবার শাহানা ঢাকায় এসেছে। অনেকদিন পর। আসি আসি করেও দেরি হয়ে গেছে বেশ। অবরোধ হতে পারে। আটকে যাবার ভয় আছে। স্কুলের ছুটিও প্রায় শেষ। কিছু কেনাকাটা করে শাহানা। সময় নষ্ট করা যাবে না। অফিস শেষে শাহানাকে নিয়ে সুমিদের বাসায় গেল মুহিত। শীতের রাত আটটা-ই অনেক। ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা। লেকের ধারে। নতুন ভবনের তিনতলা। দখিন দুয়ারী। কলিং বেল। খুলে গেল দরজা, খুলে গেল মনের দরজাও। জড়িয়ে ধরা, লুটোপুটি, খুশিতে ছোটাছুটি। কথারা চলছে কলকল করে। মুহিতের ভালই লাগছে, শাহানার গাম্ভীর্য মেশানো সুশ্রী মুখে যেন ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে’।
‘আয়, ঘুরে ঘুরে দেখ।’ টেনে তুলে নিয়ে গেল সুমি। মুহিতেরও গত্যন্তর নেই, পিছু নিল।
‘এই ফ্লাটটার কথাই তোকে বলেছিলাম, এবার ম্যারেজডেতে গিফ্ট করেছে। বুঝলি আমিতো অবাক! ঘরে যা দেখছিস সব কিন্তু বাইরের, দেশের একটাও না। প্রায় দুই কোটি লেগেছে।’
‘খুব সুন্দর, তোর ভাগ্য বলে কথা, আনকমন, তোর বরটাও আনকমন নাকি রে। ওকে বলেছিস? আমরা আসব জানে? সেই কবে দেখা, বিয়ের দিন।’
‘বলেছি, সময় পেলে আসবে। প্রতিদিন রাত একটার পর আসে। বছরে আর কয়দিন বা এখানে থাকে, বেশি সময়তো বিদেশেই কাটায়। আসলে ও এত ব্যস্ত! আর ব্যস্ত না থাকতে পারলে পুরুষ হলো কেমন কোরে। এই সময়ে ব্যস্ত থাকতে পারা, ভাল ইনকাম করতে পারা একটা যোগ্যতার ব্যাপার বুঝলি?’
ফ্লাটটা ঘুরেঘুরে দেখতে থাকে শাহানা, দেখাতে থাকে সুমি। শাহানা-মুহিত নির্বিকার পর্যবেক্ষক। ড্রইংরুম, বেডরুম, রিডিংরুম, কিচেন, ব্যালকনি এমনকি ওয়াশরুম পর্যন্ত দেখতে হলো, সুমির দেখানোর দাপটে। মুহিত দেখতে থাকে অর্থের অন্ধকারে অস্বচ্ছ-অসহ্য পোয়াতি রূপটা।
রিডিংরুম ভর্তি বুকসেলফ আর সেলফ ভর্তি দেশী-বিদেশী বইয়ের গাদা। গাধাদের পাঠ উপযোগী বইও কম নাই। মুহিত দেখতে থাকে বইগুলো।
‘এত বই! তোমার হাজব্যান্ড পড়ে কখন, সময় পায়?’
‘না না, এসব একবারে একদিনে মিনি ট্রাকগুলো আছে না? ওইটা ভর্তি কোরে কিনে আনলো। আমি তো ভাবলামজ্জযাক বাসায় বই পড়বে, তার মানে ওকে বেশি বেশি বাসায় পাবো! তা আর হলো কই?’ সুমির শব্দ-স্বরে সুস্পষ্ট কম্পন। ট্রাকভরে বই এনে বললো, ‘এগুলো ধীরে ধীরে সাজিয়ে রাখো সেলফে।’
‘এত বই পড়বে কখন?’ প্রশ্ন করলে বললো, ‘পড়বো কেন? বইতো পড়ে সফল হওয়ার জন্য। আমি তো সফল। সফল না? আমার কীসের অভাব? পড়তে হবে কেন? সাজিয়ে রাখো, এটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার বুঝেছো?’
‘আমি তো শুনে হতবাক। কী করবো, সাজিয়ে রেেেখছি। কলেজে হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, রুদ্র’র কবিতা পড়তাম, আবৃত্তিও করতাম, মনে আছে তোর? এখনও একটু আধটু পড়ি। তুইতো ছিলি যাকে বলে পড়–য়া। মুহিত পাশার কবিতা হলে তো কথাই নাই! কী মুহিত ভাই এখনও লেখেন না?’
‘টুকটাক। এভাবেই টাক পড়ে গেল, নতুন লাইন আর গজালো না!’
শাহানা বললো ‘সুমি তোদের আরেকটা বাসা আছে না, বলেছিলি?’
‘হ্যাঁ, আরও তিনটা। উত্তরায়, বারিধারায় আর ইস্কাটনে। এইটা নিয়ে চারটা।’
‘ভালই আছিস।’
‘হ্যাঁ ভালইতো। টাকা-পয়সা কোনো সমস্যা না বুঝলি?’
বুকসেলফ-এর বইগুলো দেখতে দেখতে, দেখাতে দেখাতে কথা চলছে, কথা বলছে। আশির দশকের দুএকটি কবিতার বই টেনে নিয়ে খুলে খুলে মনে করিয়ে দিলজ্জ‘মনে আছে? এটা যখন প্রথম পড়ি, কি যে মজা, তুইও পড়েছিলি, সে কী কাড়াকাড়ি, মনে আছে?’ সুমি বলে।
মুহিত এখন নির্বোধ পর্যবেক্ষক। দেখছে বইগুলো, নাকি দেখছে সুমির স্বামীর রুচির পরিধি। সুমি আরেকটি বই তুলে নিল।
‘দেখ দেখ এই বইটা।’ তৃষ্ণার কলস। কভার পেজ খুলেই দেখতে পেল লেখা আছে- ‘উৎসর্গ: একান্ত আপন যে জন, বন্ধু তুমি বধূ তুমি…শাহানাকেজ্জমুহিত পাশা’।
নীরবতা। হঠাৎ শৈত্য প্রবাহ যেন ঘরময়। সুমি শাহানার দিকে তাকায়। শাহানা মুখটিপে কী এক পরম আত্মপ্রসাদে চেয়ে থাকে সুমির দিকে। সুমিও তাকায়, না কি হারায় কিছু!
‘তোর অনেক আছে, আবার আমার যা আছে তা তোর নেই। এই প্রাসাদ, কোটি কোটি টাকা তোকে হয়তো সাধারণ আনন্দ যোগাতে পারে, কিন্তু তৃষ্ণা মিটবে না। ভাল করে চেয়ে দেখজ্জতোর সবই শূন্য, ফাঁকা। অথচ ঐ একটি তৃষ্ণার কলস আমাকে দিয়েছে গভীর শান্তি, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার, আত্ম-পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা। যা তোর নেই, কখনও পাবিও না, কোটি টাকাতেও’জ্জশাহানার উচ্চারণের ঝলকানিতে সুমির রক্তহীন-ফ্যাকাসে মুখটা ধরা পড়ে যায়, যা ঢাকতে পারে নি বিদেশী ঝাড়বাতিও।
শীতের রাত, প্রায় এগারো। যেতে হবে ফিরে মুহিতের ঢাকাস্থ ভাড়া করা ঘুপচি ঘরে। ডিনার সেরে শাহানা মুহিত নেমে আসে নীচে। সুমি ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। রিক্সায় চেপে বসে দুজন। কুয়াশার সাদায় সুমির অভিজাত অনুভূতিতে শাহানা কি দিয়ে গেল কাফনের শুভ্র শূন্যতা! রিক্সা ছোট হয়ে আসে ক্রমশ, আর বড় হয় সুমির শূন্যতা। রিক্সা দৃষ্টির আড়াল হলে সুমির কর্নিয়া ক্যামেরার মত স্থির হয় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টে। দারুণ নিঃসঙ্গতায় ঝুলে থাকা বিমর্ষ বাল্ব, যেন তুলোয় জড়ানো এক হলুদ টেনিস।