Archives

মন— চেতনা ও সঙ্গীত

বহুদিন আগে কনফুসিয়াস বলেছিলেন :The superior man tries to promote music as a means to the perfection of human culture. When such music prevails and peoples mind are led towards the right ideals and aspirations. We may see the appearance of a great nation. একটা জাতির পরিচয় বিধৃত থাকে তার সঙ্গীতে।  জাতিকে পরিপুষ্ট করে সঙ্গীত মানুষের মনকে ‘right ideals and aspration —অর্থাৎ সঠিক পথেই নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আসার আগে একটু গোড়ার দিকে আসা যাক। মানুষ জ্ঞানত হোক বা অজ্ঞানত হোক এসে পড়েছে দ্বন্দ্বের রাজ্যে। নাকি নিজেরাই তৈরি করেছি ঐ দ্বন্দ্বের রাজ্য। বার্টান্ড রাসেল প্রথম আধুনিক দ্বন্দ্বময় জগতের সবরকমের সমস্যাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন : ১. মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব, ২. মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব, ৩. মানুষের সঙ্গে তার নিজের অন্তরের দ্বন্দ্ব। এক নম্বর দ্বন্দ্বের জন্য হাতিয়ার করেছে বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের অপার কৃপায় মানুষ নিজেকে শুদ্ধ এই গ্রহটিকেই নিশ্চিহ্ন  করে দেবার কাল আবিষ্কার করেছে। পৃথিবীর বুকে একটিমাত্র প্রজাতির অধিকারী কোন প্রাণীর এমন আহাম্মক কা- ঘটাতে পারেনি । আবাল্য এর জন্য কেউ বিজ্ঞানকে দোষ দেয় না। দোষটা বিজ্ঞানের। সে যাই হোক বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে ঐতিহ্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নেমে পড়ল এ কোন বিজ্ঞানী। মস্তিস্কের পরিপূর্ণতাইতো তৈরি হলো না বিধ্বংসী ক্ষুদ্র স্বার্থবািহী বুদ্ধি নিয়ে তৈরি হল তার রাজনীতি ও সমাজনীতি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হল মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব। তৈরি হল সবল শাসক আর দুর্বল শোষিত। সেই ট্রেডিশন শুধু সমানে চলছে না,  আজ বড়বেশি প্রকট সমস্যাসৃষ্টিকারী। এবার আমি আসল দ্বন্দ্বে— মানুষের সঙ্গে তার নিজের দ্বন্দ্ব। এর মূল বেশ গভীরে। এই একটিমাত্র কারণেই আসছে উপরোক্ত দুটি দ্বন্দ¦। সমস্ত সমস্যার জন্য দায়ী এই তৃতীয় দ্বন্দ্ব। আপন অন্তরে যে মানুষের সমন্বয়ের সুষমা প্রতিষ্ঠিতই হলো না— সেই মানুষ তো সৃষ্টি করবেই নানা রকমের দ্বন্দ্ব। বাইরের দ্বন্দ্বের যতো বিরোধ বৈষম্যের কালিমা মানুষের জীবনকে প্রতিপদে কলঙ্কিত করে তুলছে তা আসলে তার selfবা অন্তরের দ্বান্দ্বিক কালিমারই  প্রকাশ। রাসেল নিজেই বলেছেন : : And therefore the soul which is not at peace with itself cannot be at peace with the world and external wars have to continue in order to hide from individual men that the real war is within… … যারা ভাবেন যে দ্বন্দ্ব সমস্যা একদিন মুছে যাবে, মানুষ হয়ে উঠবে মানুষ- তারা বোকা। আসলে মানুষের মতো মূর্খ এবং হিংস্র জাত আর দুটি নেই। প্রকৃতির যে আনুকূল্য আমরা পেয়ে এসেছি তার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। সর্বপ্রথম নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধটা জিততে পারিনি আমরা। সমতা আর সহযোগের নীতি না মেনে পাঁচটা ইন্দ্রিক নিয়ে আমরা বাইরে যুদ্ধ করছি। লাখো লাখো প্রাণীদের মধ্য থেকে একটারও নাম করা যাবে না যে বা যারা এ সমতা আর সহযোগের নীতি নেয় নি। শুধু মানুষ— একা মানুষ — হোমোসেপিয়েন্স।

আদিম মানবের ভয় ছিল প্রধানত বাহ্য প্রকৃতির রুদ্ররোষের। ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড়— আদিম মানবের বুকে ভয় জাগাত— এমনতরো আমরা জানি না। কিন্তু যা জানিনা, তা হল নিজের কাছে নিজের ভয়ের ইতিহাস। কদর্য পরশ্রীকাতরতার বীজ কোথা থেকে এল মানুষের মনোভূমিতে? কোথা থেকে জন্ম নিলো বিচিত্র ঈর্ষা ও ক্রোধ? এই গ্রহে আছে প্রায় আটহাজার আটশ পিঁপড়ে। বহুকাল ধরে তারা এই গ্রহের বাসিন্দা। এই প্রতিদ্বন্দ্বীতার হাত ধরে আসেনি তো এমন বিধ্বংসী ক্রোধ ও ঈর্ষা। একটি প্রজাতি বলে কি মানুষের মধ্যে নিজের নিরাপত্তাহীনতার ভয়। এই ভয় থেকেই কি তবে বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব? এই ভয় থেকেই কি হাজারো ধর্ম, হাজারো মতবাদ রাজনীতি সমাজব্যবস্থা? মানুষের নিজের অন্তরেই শত্রু আমি গোপন করে আছে। তাই তো অহরহ বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হয়ে আসছে আমাদের জীবন। কতো রকমের ফোবিয়া বা ভয়। আর অন্য কোন প্রাণীর এতো রকমের ফোবিয়া নেই। চারিদিক থেকে পুঞ্জীভূত ভয়ের ঘোর ডিঙিয়ে মানুষ কোন আলোকে আশ্রয় করে টিকে থাকবে। তবে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এই ভূতের রাজ্যে এসেছেন যীশু, এসেছেন বুদ্ধ, লেখা হয়েছে গীতা-উপনিষদ-বাইবেল-কোরআন। বলা উচিত যীশু-বুদ্ধ একা আসেননি। এসেছিল একটা যুগ, একটা সময়। ধীরে ধীরে ঐসব মহান দীপশিখার উৎপত্তির জন্য তৈরি হয়েছিল ধরিত্রী। গীতা-উপনিষদ-কোরআন-পুরাণ-বাইবেল। লেখা হয়ে ওঠার জন্য একটা সময় তৈরি হয়ে গিয়েছিল।  মানুষই তৈরি করেছিল সেই সময়। তারপর একসময় সেইসব মহান জীবনের বাণীগুলি, গাঁথাগুলি, লেখা-লেখাগুলি, কুলঙ্গীতে তুলে রাখে। সময়ের ধুলোয় ঢাকা চাপা পড়ে যায় মহৎ সেইসব জীবন ও কাব্য। আর দেখা যায় না মহান সেইসব সঙ্গীত। সংজ্ঞাটিকে দূরে রেখে মানুষ বৌদ্ধিক প্রজ্ঞাকে অন্য সুরে বাজায়। ফেলে আসা একটা সুন্দর অতীত ছাড়া তার কাছে না আছে সুখকর বর্তমান না আছে শান্তিসব ভবিষ্যৎ। চারদিক অন্ধকার। সেই কবে, কত হাজার হাজার বছর আগে বুদ্ধ-খ্রীষ্টানরা রাগ-বিদ্বেষ নয়, ক্ষমা-ধৈর্য-তিতিক্ষাই হোক শাশ্বত মানুষের মূলমন্ত্র। আমরা শুনিনি। কিন্তু আজ শুনছি, শুনতেই হচ্ছে। সম্প্রতি (ঐ.ঞ ১৮.০২.২০০৪) রয়টার্স এর একটা খবর চোখে পড়ল তাতে— মেরী ম্যাকিলে লিখছে : ঃthey say to forgive is devine it may be good for your health too. researcher request যারা নাকি ক্ষমাপরায়ণ, ধৈর্যবান— তাদের রক্তচাপ সুষম থাকে। আমেরিকার গবেষক ক্যাথলিন এ. বলেছেন : ‘Ôadapting a more forgiving stance towoards othears may heve important health benifits… young adult who are less forgiving type was directly related to blood preaser বিখ্যাত জার্নাল অফ বিফোর্ডফোরাম মেডিসিনের এক গবেষণা প্রবন্ধে ক্যাথলিন জানাচ্ছেন, উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে ডায়াস্টলিক প্রেসার বেড়ে গেলে ঝুঁকি থাকে। একজন ছাত্রের ওপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যারা ভুলে যেতে পারছে, ক্ষমা করে দিতে পারছে, তারা শারীরিক মানসিকভাবে ভালো থাকছে। রক্তচাপ সুষম থাকছে। আর তিতিক্ষা যাদের নেই কোন কিছু বাঁজে ঘটনা ভুলে যেতে পারে না, তাদের ঝুঁকি বেশি।

one important therapy about illness is that those who have larger responses and maintain them for longer period of time are increased for a of choronic diseases such as cancer and heart disease. অর্থাৎ আনেকক্ষণ ধরে জমে রাখা ক্ষোভ বা ক্রোধ এমনকি ক্যান্সার এবং হার্টের রোগের সমস্যা জমাতে পারে। গীতা কিন্তু সর্বপ্রথমে বলেছে : ‘তাং তিতিক্ষক ভারত।’ শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তি বা ক্রোধান্বিত ব্যক্তি যে কিভাবে বিপদ ডেকে আনতে পারে তাও শুনতে হচ্ছে এতোদিন বাদে বিজ্ঞানের কাছে। নিউইয়র্ক থেকে অ্যাসোসিরেটেট প্রেস (ঐ.ঞ- ৩.৩.০৪) জানাচ্ছে! আমেরিকার হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বিখ্যাত জার্নাল সার্কুলেশন-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলেছেন মাথাগরম পুরুষ বেশি করে স্ট্রোকের শিকার হয়ে পড়েছেন। রাগ বা এ্যনগার, হোস্টালিটি বা শত্রুভাবাপন্নতা (যা মূলত ভয় থেকে আসে) শ্রদ্ধার অভাব এসব থেকে আসতে পারে আবিদরিয়া  যা হার্টের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে। হার্টের স্ট্রকের ঝুঁিক বেড়ে যায়। …

গীতায় কিন্তু বহুদিন আগেই লিখিত হয়েছিল : ‘ইন্দ্রিয়জ্যে স্থিরসৈয্য রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ’— রাগ-দ্বেষ-হিংসা-মোহ-শত্রুতা এসবের নঞর্থক মানসিক চাপে মানুষের জীবন ক্রমশ হয়ে উঠছে দূর্বিষহ। নানা উদ্ভট মানসিক চাপে মানুষ আজ বড় বেশি বিপন্ন। এখনও সময় আছে সার্থকভাবে বীজ রোপন করতে হবে মানবের মনোভূমিতে। সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম নানা সদর্থক ভাব-অনুভবের বীজ থেকে জন্ম নেবে সবুজ শাশ্বাত মানব। কোথা থেকে পাওয়া যাবে এসব সদর্থক ভাবের বীজ! কেন সঙ্গীতও তার আত্মাধিকতার পরিম-ল থেকে মানুষের অন্তরের যা কিছু রম্য সম্পদ—  সত্য, ন্যায়, মৈত্রী সমস্তকিছু উঠে আসুক না কেন মনের গভীর থেকে। বাইরের জগত ছেড়ে দিয়ে আপন অন্তরে সে ডুব দিক। মনের গভীর গহনে দ্বন্দ্বের মোকাবিলা করুক মানুষ। ডুব দে মন কালী বলে। পরিস্ফুট হোক মনোরাজ্য।