Archives

জীবনের ছায়ায় রোদ্দুরের গল্প

জীবনের ছায়ায় রোদ্দুরের গল্প

একেবারে সাদামাটা আমি ছুটে যাই জীবনের কামারশালায়। সাধারণ মানুষের ভিড়ে আমি অদ্ভুত এক জীবনবাসী। আমার অস্তিত্বের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণে আমি হেঁটে যাই। আমি বিশ্বাসী নই তবু বিশ্বাসের প্রদীপ হাতে সে আমাকে আলো দেখায়, চেতনা ভেদ করে সে প্রবেশ করে, সে আনন্দ-বেদনার আনুভূতির নিয়ে আমার দ্বারে কড়া নাড়ে; আমি এসব না এড়িয়েই সন্ন্যাসী হওয়ার মন্ত্র পেয়েছি। আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র। অবুঝ বালকের মতো বিশাল সমুদ্রে এলবাট্রস হয়ে কেবল যাত্রা শুরু হয়েছে মাত্র। ঠিক তখনি কাকদর্শী মনের কোনো আগন্তুকের আগমনে শুরু হয় সমার্পনের যজ্ঞ। এ যজ্ঞে আমি পুরোহিত কাক হলেন দেবতা। দেখছি শুনছি আর অবুঝের মতো সমার্পনের যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছি। জনমনে কলরব, হলো কী? হরিহর হৃদয়ের এ কোন আয়োজন! যত দূর জানা যায়, উৎসুকের গল্প শুনে, তারা উভয়ে বিপ্লবের ধারক।

তারপর থেমে গেল সব ঝড়। শান্ত হয়ে এলো বিক্ষিপ্ত নদীর ঢেউ। ডিঙি নৌকাটা খুব দুলতে থাকে সাবধানে এপাশ ওপাশ। নৌকার তলা থেকে বেরিয়ে আসে একটু একটু করে চাপা শব্দ। এ সমাজ ও সমাজের নিয়মের কাছে আমার অনাগত স্বপ্ন, বোধ, স্নিগ্ধ আকাশ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছা তখন বিরল। নিজের কাছেও তোমাকে পাওয়ার কোনো আবদার নেই। অযোগ্যতাকে মহার্ঘ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে ভেতরে ভেতরে। বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেমের ব্যর্থতা অথবা রমণী প্রেমের উল্টোপিঠে লুকিয়ে থাকা কামের তাড়না সেই বোকা জীবনটাকে দারুণ ক্লান্ত করে তুলেছিল।

মনের বিরুদ্ধে গিয়ে সমান অনুকূল সিদ্ধান্তে এবার বুদ্ধিমান হবার পালা। দিগন্ত বিস্তৃত মনের আমি চালাক হবার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। প্রতিযোগিতা নিজের সাথে নিজের। তৈরি হয় নতুন একটি জগৎ। সেখানে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে হারাচ্ছি একটু একটু করে। তবু স্থির থাকি সিদ্ধান্তে। আমাকে শেয়ালের মতো ধূর্ত হতে হবে; কার্তিতের কুকুরের মতো কামুক হলেই আমি বোকাবনে যেত পারি! শুরু হয় জীবত্মার সাথে পরমাত্মার লড়াই। এই লড়াইয়ে দৃষ্টি কেবল দর্শক।

ভাবনা গুলোর অন্তরালে জমা হতে থাকে ক্ষত। এভাবে আমার ব্যক্তিত্বেও সাথে আত্মার, আত্মার সাথে দৃষ্টির বিরোধপূর্ণ আচরণের প্রভাব পড়তে শুরু করে আমার প্রাত্যহিক জীবনে। এক পর্যায়ে নিজের আচরণে নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠি। তাগিদ আসে বিদ্রোহের।

জনএডাম্সের একটি কথা বলা দরকার, প্রতিবাদ যে করতে জানে না, প্রতিকার তার আশা করা উচিত নয়। কর্ণের মতো অঙ্গরাজ্য পেয়ে যারা নিজেদের সর্বেসর্বা মনে করে আমার বোধের তীর তাদের বুক লক্ষ করে। কলির অসুর বধ হয়নি তবে তাদের চেতনায় আমি নিশ্চিত বিভিষিকা।

আমার ক্ষমতার মানচিত্রে শীতল জ্যোৎস্না এবং হৃদয়ের সবুজে আকাশের নীল। তবু আমি প্রতিদিন হৃদয়ের তানপুরার ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করি। জানি তানপুরার তারে আমি রক্তাক্ত হবো। কিন্তু ঘুমের প্রশান্তি পেতে আমি নৃত্য করি।

সচেতনে আমি আঁড়ালে চলে যেতে থাকি। তখন নিজেকে ভালোবাসতে পারছি এমনটাও নয়। যদিও আমার অখণ্ড অবসর। তুমুল ইচ্ছের স্বাধীনতা নিয়েও আমি নিজের কাছে বন্দি। স্বেচ্ছায় বন্ধনমুক্তি পেয়ে নিজের রাজত্বকে স্বাধীন ঘোষণা করি। এই রাজত্বে প্রেম নেই, বন্ধু নেই, ক্ষেত্র বিশেষে আমিও নেই। তবে কবিতায় তৈরি হতে থাকে বন্ধু অতঃপর নারী। তখন আমার ভেতরে–

রাতের চাদরে ওম ওঠে তোমার শরীরবৃত্তে

লতানো তরুলতার কণ্ঠ হয় ভারি

পূর্ণিমার বাড়িয়ে দেয়া অকৃপণ সরলতা

কাঁদুনে ফড়িঙের মতো ধরা দেয় বিক্ষিপ্ত ঝরাপাতায়

কিংবা সাপে নেউলে সময় আর বন বিথিকায় উতল যাপিত জীবনে

জনান্তিকে লতানো যন্ত্রণার পাঁপড়ি ঝরেছে মেঘবাসরে

বননিকেতনে আরতি চলছে কুসুম ঝরা অনাদরে

উত্তম ব্যবধানে লুণ্ঠন হয় চাড়াল যুবক!—বিদীর্ণ প্রান্তরে

যেখানে খেজুর মাথি আর শালুকে জীবন খোঁজার বেতাল চেষ্টা

অতঃপর…

চাহনিতে কাল মেঘ ব্যথাতুর হাহাকার নক্ষত্র পাড়ায়

মতিহার ক্লান্তির চাদর জড়ায়ে, এই পথ ধরেই তো যেতে হবে

অভিজাত প্রেমিকার চৌকাঠে, রঙিন ব্যথার আহ্লাদে হতে হবে

                        ক্ষণ জন্মা যুধিষ্ঠির

মিছরির ছুরির মতো শেফালি কামিনী, টগর আমাকে কেটে চলেছে তখন প্রতিনিয়ত। মর্ম প্লাবি অন্তররস একটু একটু করে শীতল আমাকে টগবগিয়ে ফোটায়। রেলের ঘর্ষণ ও কর্ষণ পিষে ফেলে বিগত যন্ত্রণার কীটপতঙ্গ, বকুলের সুখ তখন হাতের মুঠোয় কিন্তু পাল্টে গেছি আমি! সাবধানী কৃষাণের মতো আগে প্রয়োজন বুঝে নিই।আমি নির্মম পাষাণের বুক ভেদ করে বুলেট নিক্ষেপ করি। তখন বিলুপ্ত প্রায় ইচ্ছাগুলো বকুল সুখ জাগায় ইন্দ্রিয়তে। তোমাকে অভিবাদন—আমার ভবিষ্যৎ, আমার প্রেম, আমার নারী অতঃপর আমার কবিতা।

জোয়ারের টানে ভেসে যাওয়া আমি স্রোতের বিপরীতে হাঁটি। ভুল মানবের অহংকারের অট্টালিকা গুড়িয়ে দিয়ে আমি বলতে শিখেছি, বিশ্বাস করতে শিখেছি। আমি তাকে সাথে নিয়ে স্বপ্নজয়ের ভেলা ভাসিয়েছি অজানায়। আমি জানি, আমি পৃথিবীর ‘যোগ’। আমার কবিতা আছে, আমার কল্প-বাস্তবতার পাখি আছে। আমি তার পিঠে সওয়ার হয়ে ভেসে যাই মেঘের জলে। আশা, নৈরাশ্য, স্পর্শ আর আমি প্রেমিক ইচ্ছে হয়ে বেঁচে আছি, থাকব।

সমস্ত নিঃশ্বাস ফুরাবার আগে

ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর সোনালি ইচ্ছা এক হয়ে মিশে যায়

ঘাসে। ব্যথা কমানোর কোনো আবেদন তখনও জানা যায়নি।

ওপারের হাহাকারে ভীত নয় মাটির শরীর—আশ্রয়হীন বেদনার

গ্লানিতে চোখে ভেজা বালিশ একটুও পাল্টায়নি যেমন,

অসম দূরত্বে গড়া যে দেনা-পাওনা তাতেও লাগেনি করুণার

ছাপ। শুধু কেউ বোঝেনি কেমন করে উল্টে যায় রামের

চ্যালা। এখানে সেখানে শোনা যায় নারায়ণ তুমি হইও না

রামের মতোন। অবুঝের মতো যেও না ঐ পথে—যেখানে

ডিজাইন করা ঢ্যামনা জীবন। আগুনের গায়ে লাগে সূর্যের তাপ

বেদনার মতো করে, অবসর বিকেলে আসে অনাবাদী নিদ্রার ঘোর,

স্বপ্নে—দুরন্ত যুবক দক্ষিণা পেতে চায় রক্তশূন্য নীলাম্বরে

যখন ভারহীন কলমিলতা গৃহহীন ছদ্মবেশী।