Archives

উপন্যাসের ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ

উপন্যাসের ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ
সনৎকুমার সাহা

উপন্যাসের, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ভাষা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করার আগে ঠিক এই বিষয়ে না হলেও এর সঙ্গে পরোক্ষ যোগ থাকতে পারে, তাঁর এমন কিছু কথার দিকে এখানে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তিনি বলেছেন, ‘সংস্কৃত ভাষা কথ্য ভাষা ছিল না বলিয়াই সে ভাষায় ভারতবর্ষের সমস্ত হৃদয়ের কথা সম্পূর্ণ করিয়া বলা হয় নাই।… মৃত ভাষায় পরের ভাষার গল্পও চলে না। কারণ, গল্পে লঘুতা এবং গতিবেগ আবশ্যক, ভাষা যখন ভাসাইয়া লইয়া যায় না, ভাষাকে যখন ভারের মতো বহন করিয়া চলিতে হয়, তখন তাতে গান এবং গল্প সম্ভব হয় না।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেমন রমণীর, তেমনি পদ্যেরও অলঙ্কারের প্রতি টান বেশি, গদ্যের সাজসজ্জা স্বভাবতই কর্মক্ষেত্রের উপযোগী। তাহাকে তর্ক করিতে হয়, অনুসন্ধান করিতে হয়, ইতিহাস বলিতে হয়, তাহকে বিচিত্র ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকিতে হয়, এই জন্য তাহার বেশভূষা লঘু, তাহার হস্তপদ অনাবৃত। দুর্ভাগ্যক্রমে সংস্কৃত গদ্য সর্বদা ব্যবহারের জন্য নিযুক্ত ছিল না, সেই জন্য বাহ্যশোভার বাহুল্য তাহার অল্প নহে। মেদস্ফীত বিলাসীর ন্যায় তাহার সমাসবহুল বিপুলায়তন দেখিয়া সহজেই বোধ হয়  সর্বদা চলাফেরার জন্য সে হয় নাই, বড়ো বড়ো টিকাকার ভাষ্যকার পণ্ডিত বাহকগণ তাহাকে কাঁধে করিয়া না চলিলে তাহার চলা অসাধ্য। এই উদ্ধৃতি তাঁর ‘কাদম্বরীচিত্র’ প্রবন্ধ থেকে। ১৩০৬ সালে লেখা। প্রাচীন সাহিত্য গ্রন্থে আছে। বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন তিনি এই মন্তব্য দিয়ে। এখানে ‘কাদম্বরী’ বা সাধারণভাবে সংস্কৃত রচনা আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। আমরা বিশেষভাবে নজর দিতে চাই তাঁর উপন্যাসে ভাষার গড়নের দিকে। তার পূর্বপ্রস্তুতিতে এই কথাগুলো বোধ হয় আমাদের সহায় হয়। শুরুতে এও বলে নেওয়া ভালো, তাঁর বক্তব্যের মূলভাবের সঙ্গে সার্বিকভাবে আমরাও একমত। তবে উপন্যাসে বহুমুখী, এমনকি পরস্পরবিরোধী, চিন্তা-ভাবনা, অনুভব-উপলব্ধি, জীবনস্বপ্ন-জীবনচর্চা একসঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাদের সমস্তটা ফুটিয়ে তুলতে, অথবা তাদের কোনো-কোনোটির মেজাজ বা প্রাণবস্তুর যথাযথ প্রকাশ ঘটাতে চলমান কথ্যভাষা, যা আক্ষরিক অর্থে মুখের ভাষা, সবসময়ে স্রষ্টার লক্ষ্য সাধনে বা উপভোক্তার সর্বোত্তম তৃপ্তি বিধানে যথেষ্ট কিনা এ প্রশ্ন কখনো কখনো আমাদের মনে মাথাচাড়া দেয়। উপন্যাসের বস্তুরূপ ও শিল্পরূপ এক জায়গায় মেলাতে ভাষা কি শুধুই বাহন, নাকি লক্ষ্যতালিকায় সেও হয়ে পড়ে পরস্পরনির্ভর পরিবর্তনশীল বিষয়রাশির একটি, এবং তা উপন্যাসের দেশ-কাল-পাত্রের ওপর যেমন, তেমনি তার অন্তর্গত অভিপ্রায়ের ওপরেও নির্ভরশীল, এ জিজ্ঞাসাও গোটা প্রক্রিয়ায় তার ভেতরের তাগিদে আপনা থেকে আকার পায়। অনিবার্যভাবে আমরা তার মুখোমুখি হই।
উপন্যাস নিয়ে নয়, সংস্কৃত ভাষা নিয়ে তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যা খুব জোরের সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন এবং এই উদ্ধৃতির শুরুতেই যা পাই, তা নিয়ে প্রাথমিক বিবেচনায় দু’চার কথা বলার সুযোগ আছে মনে হয়। এই কথা বলা শুধু সংস্কৃত ভাষার ব্যাপারে তাঁর ধারণা যাচাই করার জন্যে নয়। উপন্যাস প্রসঙ্গে, বিশেষ করে তার ভাষার ঐতিহ্য-ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে, আমাদের আলোচনাতেও ভাবনা-চিন্তাগুলোর ঢুকে পড়া সম্ভব এবং তা একেবারে অনর্থক নাও হতে পারে। তিনি যে বলেছেন সংস্কৃত কথ্য ভাষা ছিল না বলে এ ভাষায় সমস্ত হৃদয়ের কথা সম্পূর্ণ করে বলা হয়নি, এতে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ খুব একটা নেই। পরে আরো জোরের সঙ্গে তিনি বলেছেন সংস্কৃত মৃত ভাষা। এবং মৃত ভাষায়, পরের ভাষার গল্প চলে না। গল্পে লঘুতা চাই, গতিবেগ চাই। ভাষাকে তার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। যদি সে তা না পারে, যদি তাকেই ভারের মতো বয়ে নিয়ে যেতে হয়, তবে তাতে গল্প ফুটে উঠতে পারে না। প্রাণের লক্ষণে দীনতা তার ঘোচে না। কোনো ভাষা মৃত হলে, বা পরের হলে এ কথা খুবই সঠিক। রবীন্দ্রনাথের কালে সংস্কৃতকে তেমন বলা অসংগত নয়। কিন্তু কালিদাস, ভবভূতি বা বাণভট্টের সময়ও কি ওই ভাষা মৃত বা আরোপিত ছিল? ওই ভাষার বাস্তব অবস্থানের এবং অবস্থার ধারাবাহিক ইতিহাস থেকে কি তা একশো ভাগ সত্য বলে মেনে নেওয়া যায়? যদি যায়, তবে তাঁর বক্তব্যে সায় দিতে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু যদি না যায়, তবে অন্য সম্ভাবনার কথাও ভাবতে হয়। উপন্যাসের ভাষার বিচার-বিশ্লেষণে তারাও নাক গলাতে পারে।
গণমানুষের মুখের ভাষা কখনই ছিল না সংস্কৃত। যতদূর জানা যায়, পালি, কয় ধরনের প্রাকৃত, এরাই ছিল সাধারণভাবে মানুষে-মানুষে দৈনন্দিন কথা বলার ভাষা। তাদের ভেতরে সহজ যোগাযোগ ছিল। এক না হলেও পরস্পর চেনা-পরিচয়, বোঝাপড়া অনেকটাই সাবলীল ছিল। তা নইলে উপমহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের যাতায়াত, ইচ্ছামতো কোথাও থিতু হয়ে বসবাস অত সহজ ও স্বাভাবিক হতো না। সংস্কৃতের পিঠে চড়ে আর্য সম্প্রদায় সারা ভারতে ছড়িয়েছে, সর্বত্র বসতি গড়েছে, এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। সত্যের ছিটা অবশ্য কিছু থাকতে পারে। তার অনুপাত কোনোভাবেই শতকরা পাঁচের বেশি নয়। যদি বলি, বহিরাগত আর্যদের মুখের ভাষা ছিল সংস্কৃত, তবে তাও পুরোপুরি মেনে নেওয়া মুশকিল। আদি বাসস্থান থেকে যে জনগোষ্ঠী ইউরোপ-এশিয়ার নানা দিকে ছড়ায়, তাদের সাধারণ কথ্য ভাষা নিশ্চয় ছিল। পারস্যে, মধ্য এশিয়ায়, পূর্ব-ইউরোপে নানা ভাষায় তার স্মৃতি এখনো মেলে। অনেক সংস্কৃত শব্দ ছড়ানো আছে সেসবে। শুধু তা থেকে আমাদের পরিচিত সংস্কৃত তাদের আদিরূপ, এমনটি দাবি করা ঠিক হবে না। যদিও সংস্কৃত ও ওইসব ভাষার উৎস ছিল এক অথবা অনুরূপ, এমন ধারণা এক কথায় খারিজ করে দেওয়া অনুচিত হবে। ব্যাকরণের শৃঙ্খলায় সংস্কৃত আসতে শুরু করে আজ থেকে আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে। ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনের প্রায় হাজার বছর পর। মুখের ভাষার এই পরিশীলিত রূপই সংস্কৃত। তার নামেও তারই ইঙ্গিত। তবে মুখের ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তার বজায় ছিল দীর্ঘদিন। দূরত্ব যে গড়ে ওঠে, তার পেছনেও সামাজিক সংহতির তাগিদ একটা ছিল। পরে সংস্কৃত যদি প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে, তবে তার একটা কারণ, সমাজের গতিশীলতা নয়, বরং ঠিক তার উলটোÑ তার স্থিতিশীলতা, তার অনড়ত্ব। সমাজ সংস্কৃতকে রসদ যোগাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই তা শুকিয়ে মরেছে। ভাষা তার নিজের বৈশিষ্ট্যে সমাজকে দূরে ঠেলেনি। বরং সেখানে সে ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। এটা বুঝি, যখন দেখি, বুদ্ধবাণীর বিপুল প্রচার ও প্রসার ঘটে মুখের ভাষা, বিশেষত পালিতে। কিন্তু বৌদ্ধদর্শন ও সাহিত্য পরে রচিত হতে থাকে সংস্কৃতেই। নিশ্চয় অহেতুক নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগসূত্রগুলো তাদের ওই দিকে যেতে বাধ্য করেছে। কাক্সিক্ষত ফলও তার মিলেছে। দূরের স্মৃতি হলেও কথাগুলো আমরা মনে রাখি। উপন্যাসের ভাষা নিয়ে আমাদের ভাবনা-চিন্তায় এরা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়তো নয়।
তবে উৎস যাই হোক, সংস্কৃত কেবল তার উপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠেনি। তা থেকে আদি আর্য শব্দ বাছতে গেলে কম্বলের লোম উজাড় হবার দশা হবে। পালি-প্রাকৃত খাঁটি আর্যভাষা নয়, যদিও অসংখ্য আর্য শব্দের অপভ্রংশ তাতে মিলেছে। আবার কথ্য খাঁটি আর্য শব্দও তাতে নির্বিবাদে ঢুকে পড়েছে। যে-কোনো মুখ-চলতি ভাষার মতো সে-সবও ছিল ঢিলেঢালা; কাঠামো বিন্যাসের আদল তাদের একটু একটু করে ভেসে উঠেছে, তবে তা ঘটেছে মানুষের কথা বলার ধরনকে অনুসরণ করে। ওই কাঠামো আগে গড়ে উঠেছে, তারপর মানুষের সমাজ তা গ্রহণ করেছে, এমন ধারণা সাধারণভাবে অবাস্তব মনে হয়। তবে কাঠামো একটা দাঁড়িয়ে গেলে তার প্রতি গণমানুষের সহজ স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য আপনা থেকে তৈরি হয়ে যায়। এইরকমই ঘটে অধিকাংশ চালু ভাষার বেলায়। এদিকে পালি-প্রাকৃত মিলে সারা ভারতজুড়ে যে ভাষাভূমি রচনা করে, তার রূপবৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো হলেও একক নিয়ম-শৃঙ্খলার ধরাবাঁধা ছকে তাকে আনা যায় না। আলাদা আলাদা পরিমণ্ডলে তাৎক্ষণিক ভাব তাতে চলে, কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক চিন্তায় অথবা বহুমাত্রিক যোগাযোগে তা বেশিদূর কাজে আসে না। অনুভবের গভীরতর তলকেও তা ভাষার বাঁধনে ধরতে পারে না। রাষ্ট্র বা সমাজের নিয়মনীতিকে সবার কাছে একইভাবে পৌঁছে দেওয়ায় ও সবার উপর একইভাবে প্রয়োগ করায় এতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। মানুষের কল্পনাপ্রতিভা, চিন্তাক্ষমতা ও কর্মকুশলতা স্বাভাবিক বিকাশের পথ ঠিক ঠিক খুঁজে পায় না। এই অভাব পূরণের বহুমুখী সামাজিক তাগিদই ওই ভাষাভূমিতে সংস্কৃতের প্রাধান্য ও গৌরব অনিবার্য করে তোলে।
আমরা দেখি, সংস্কৃত তৎকালীন ভারতবর্ষে যেসব ভাষায় মানুষ কথা বলতো তাদেরই পরিশীলিত নিয়মাবদ্ধ সমন্বিত ও সুসংহত এক রূপ। কাজেই তাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আরোপিত বলা যায় না। প্রায়োগিক দিক থেকে অবশ্য তা জ্ঞান ও কর্মকাণ্ডে ক্ষমতার বৃত্তে আটকে থাকে। দায়ী এ জন্য সংস্কৃত ভাষা নয়, বর্ণাশ্রমভিত্তিক যে ব্যবস্থা সমাজে স্বীকৃতি পায় এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় বারবার পালাবদল ঘটলেও উৎপাদন-সম্পর্কে যা অক্ষুণই থেকে যায়, তা-ই এ জন্য দায়ী। এ ভাষার গণমানুষের সহজ আয়ত্তে চলে আসা তা প্রতিহত করে। তবু ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তি রচনায় তার ভূমিকা উপেক্ষণীয় নয়।
এও সত্য, এই ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রকাশ ক্ষমতা একে অনন্য মহিমায় উদ্ভাসিত করেছিল। এর সুষ্ঠু প্রয়োগে যারা পারদর্শী, তাদের চিন্তাশীলতার বিস্তারে, ও তাদের অনুভূতিকে প্রখর করায় তা দারুণভাবে উপযোগী হয়ে উঠেছিল। এত স্বাভাবিকভাবেই এক স্ববিরোধের সৃষ্টি হয়। সংখ্যাগুরু অভাজনদের কাছে সংস্কৃত পৌঁছায় না। তারা মানসিকভাবে দুর্বল থেকে যায়। অন্যদিকে অতি অল্পসংখ্যক মানুষ এই ভাষার উপর দখল থাকায় চিন্তায় ও কর্মে অনেক বেশি স্বাধীনতা ও সুবিধা ভোগের সুযোগ পায়। কিন্তু সে সুযোগও বেশির ভাগ মানুষের অক্ষমতার কারণে সর্বসাধারণের কল্যাণ সাধনে তেমন কাজে আসে না। সংস্কৃত স্বয়ং অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়তে থাকে। মুখের ভাষা থেকে সে নিজেও আর কিছু গ্রহণ করায় আগ্রহ দেখায় না। সে, সরাসরি সংস্কৃত নয়, সে যাদের দখলে থাকে, তাদের সবটা। শিকড় থেকে সংস্কৃত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিপুল ঐশ্বর্যরাশির ভেতরে আত্মনির্বাসনে-অনশনে তার দিন কাটে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব যদিও লুপ্ত হয় না।
কার্যকারণে এর সঙ্গে জড়িয়ে আরো একটা সুদূরপ্রসারী যুগান্তকারী ব্যাপার ঘটে চলে। বিস্তীর্ণ ভাষাভূমিতে এককেন্দ্রিক প্রবণতা আর বজায় থাকে না। জনগণের পারস্পারিক যোগাযোগে নৈকট্যের ও ঘনত্বের তারতম্যে ভাষার ভূমণ্ডলে ফাটলগগুলো প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। আলাদা আলাদা ভূখণ্ডে নতুন নতুন কেন্দ্রের দেখা মেলে। বিভিন্ন কেন্দ্রাভিমুখী ও কেন্দ্রাপসারী শক্তির যোগাযোগে ও কাটাকাটিতে, আকর্ষণে ও বিকর্ষণে, নতুন নতুন ভাষার রাজ্য গড়ে উঠতে থাকে। প্রত্যেকে তারা আপন আপন এলাকায় স্বনির্ভরতার ও স্বয়ং-শাসনের নিশান ওড়ায়। পুরনো ভাষা-ভূমির কিছুই তারা বর্জন করে না। কিন্তু মিশ্রণের গতি-প্রকৃতিতে একে অন্য থেকে আলাদা হয়ে যায়। বাস্তব কর্মকাণ্ডে ঘরে-বাইরে সম্পর্কের বিভিন্নতাও প্রতিটি ভাষার গড়নের ওপর তার আগের বৈশিষ্ট্যের ছাপ অবিরাম রেখে চলে। এইভাবে দেখা দিতে শুরু করে বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, ওড়িয়া, অহমিয়া ইত্যাদি বিকাশোন্মুখ ভাষা। প্রায় হাজার-বারোশো বছর আগে এর সূত্রপাত। ক্রমে তারা প্রত্যেকে আপন-আপন এলাকায় অধীশ্বর হয়ে বসে। সংস্কৃত দূরে সরে। যদিও তার স্মৃতি বহন করে চলে এই রকম প্রতিটি ভাষা। আবির্ভাবকালে একাধিক ভাষার উৎসভূমির প্রকৃতি ছিল একই রকম। ওইসব অঞ্চলে পালি-প্রাকৃতের কথ্যরূপে তফাত তেমন ছিল না। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলা, ওড়িয়া, মৈথিলি ও অহমিয়া ভাষা। প্রত্যেকেই তারা চর্যাপদকে তাদের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে মনে করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরঙ্গে ও বহিরঙ্গে তারা ভিন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু একটা বিষয় এখানে খেয়াল করবার। পুরনো জমিতে নতুন নতুন ভাষার যে উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে চলে, তা প্রধানত রূপ পেতে থাকে চলমান জীবনের প্রত্যক্ষ ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনে তাদের ভূমিকাকে অবলম্বন করে। যে হৃদয়ানুভূতি উথলে ওঠে, যার আবেগ সর্বজনীন ও সহজবোধ্য, তাকেও সবার কাছে বোধগম্য ভাষায় বোঝাবার একটা তাগিদ এর সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু গভীরতর চিন্তা, বিমূর্ত ধ্যান-ধারণার অনুধ্যান, একটা-একটা করে অনুভবের বিভিন্ন পর্দাকে চিনে নেবার চেষ্টা, এগুলোকে সুশৃঙ্খল আকার দিয়ে প্রকাশক্ষম করার প্রয়াস এখানে খুব একটা চোখে পড়ে না। একটা সম্ভাব্য কারণ, তা অনুশীলনসাপেক্ষ এবং এজন্য সংস্কৃত তখনো প্রবলভাবে বর্তমান। পঞ্চদশ শতকে বাংলায় নব্যন্যায়ের চর্চা গোটা ভারতবর্ষে বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা তার বাহন হয়নি। এজন্য সংস্কৃতের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল। মননের উপযোগী তখনো হয়ে ওঠেনি বাংলা। তার  জন্যে মুখের ভাষা হওয়াই যথেষ্ট নয়। মগজের অদৃশ্য কারবারই সেখানে চাবিকাঠি ঘোরায়। পরে এই অবস্থার পরিবর্তন দীর্ঘদিন হয়নি। এখনো তা সম্পূর্ণ হয়েছে বলে বলা যায় না। পাঠান-মোঘল শসনকালে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে চালু থাকে ফার্সি। ব্রিটিশ আমলে তার জায়গা দখল করে ইংরেজি। তাদের প্রভাব পড়েছে বাংলা ভাষার ওপর নিশ্চয়। কিন্তু ওইসব নৈর্ব্যক্তিক ভাবনা-চিন্তায় এবং তাকে প্রকাশযোগ্য করে তোলায় বাংলা কোনো ভূমিকা রাখেনি। তার প্রয়োজনও তেমন অনুভূত হয়নি। আমাদের কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে উপন্যাসের ভাষা নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। ইতিহাসের পাকচক্রে বাংলার মনীষী-চিন্তাবিদ-কবি-সাহিত্যক, সকলেই ভাষার ব্যাবহারে ঐতিহ্যগতভাবে উভচর। গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা-চিন্তার প্রকাশে বাংলার উপর নির্ভরতা খুব কমই। এখনো সক্ষমতার পরিমাপ ইংরেজিতেই। বাংলায় লেখা সাধারণ পাঠক-পাঠিকার কথা মনে রেখে। তাতে সরল ও ভাসমান বিষয়-ভাবনারই প্রাধান্য। নইলে তাদের বিমুখ থাকার আশঙ্কা। যে ভাবনাক্রম জটিল, অথবা যেখানে আসল কথায় পৌঁছুতে সিঁড়ি ভাঙতে হয় অনেক, তা নিয়ে বাংলায় লেখালেখি তেমন হয় না। একটু-আধটু যা হয় তাতে খুব সাড়া মেলে না। পরিণামে এইটিই রেওয়াজ বলে সবাই মেনে নেয়। অলিখিত মানদণ্ডও তৈরি হয় এই বিষয়টি মাথায় রেখে। অথবা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ তাকে নামিয়ে আনে এখানে। প্রতিফলন এর চোখে পড়ে বাংলা উপন্যাসে ভাষা-ব্যবহারের ধারাবাহিক পরিচয়েও। এটা যে অনভিপ্রেত বা অশুভ, এমন কথা আমরা বলি না। রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল এতে। শুধু এটুকুই দেখবার, সমগ্রের চলমান ধারা পেছনে রেখে জীবন-ভাবনার সবটুকু ফুটিয়ে তোলার সচেতন প্রয়াস ধরা পড়ে কিনা।
প্রাচীন সাহিত্যের ওই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আরো লিখছেন, ‘সংস্কৃত সাহিত্যে গদ্যে যে দুই-তিনখানি উপন্যাস আছে তাহার মধ্যে কাদম্বরী সর্বাপেক্ষা প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে। … বাণভট্ট যদিচ স্পষ্টত গল্প করিতে বসিয়াছেন, তথাপি ভাষার বিপুল গৌরব লাঘব করিয়া কোথাও গল্পকে দৌড় করান নাই; সংস্কৃত ভাষাকে অনুচরপরিবৃত স¤্রাটের মতো অগ্রসর করিয়া দিয়া গল্পটি তাহার পশ্চাতে প্রচ্ছন্নভাবে ছত্র বহন করিয়া চলিয়াছে মাত্র। ভাষার রাজমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য গল্পটির কিঞ্চিৎ প্রয়োজন আছে বলিয়াই সে আছে, কিন্তু তাহার প্রতি কাহারও দৃষ্টি নাই। …’
পরে আমরা দেখব, নিজের উপন্যাসে তিনি বরাবর গল্পকেই অগ্রধিকার দিয়ে এসেছিলেন; ভাষা যাতে আগ বাড়িয়ে নিজেকে জাহির না করে, এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন সবসময়। সরল-বোধগম্য ভাষার নির্মাণই, মনে হয়, তিনি পছন্দ করতেন। তবে মুখের ভাষার হুবহু প্রতিলিপি তিনি রচনা করেননি। অথবা বলা যায়, তাঁর শিল্পীসত্তাই তা করতে দেয়নি। এবং ভাষা যেভাবে গড়ে উঠেছিল, তার আকার-প্রকার-চালচলনও হয়তো তাঁকে চালিত করে থাকবে। তার পরেও ঝোঁক ছিল তাঁর প্রধানত গল্পকেই টেনে নিয়ে যাবার দিকে। ভাষাকে বহুমুখী করে বিষয়ের অন্যান্য মাত্রা সামনে টেনে আনায় তিনি আগ্রহী ছিলেন বলে মনে হয় না। যেটুকু যা এসেছে গল্পের লেজ ধরেই এসেছে। উপন্যাস এতে গভীরতা স্পর্শ করেছে কিনা, সব মিলিয়ে তা অপূর্ণ থেকে গেছে কিনা, এ প্রশ্ন ফলে, উঠতেই পারে। এ নিয়ে পরে আমরা ভেবে দেখব। তার আগে ওই ভাষার পটভূমির বিকাশোন্মুখ ছবির উপর একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিই।

২.
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলায় উপন্যাস রচনার প্রাথমিক প্রয়াসের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে নববাবুবিলাস (১৮২৩) বা ফুলমনি ও করুণার উল্লেখ আমরা করতেই পারি। তবে এইটুকুই। উপন্যাসের লক্ষণ হয়তো আবছা একটু-আধটু ফুটে ওঠার উপক্রম করেছে, কিন্তু ভাষার নির্মাণে সচেতন সৃষ্টিশীলতা তেমন ধরা পড়েনি; ভাবের মণ্ডনকলাও কোনো গুরুত্ব পায়নি। মনে হয়, বলার কথাটুকু বলে ফেলার দিকে শুধু নজর, অথবা সাহিত্য-বর্জিত বিশেষ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে কাহিনির অবতারণা,  এর বেশি কোনো মূল্য তার নেই; এর বেশি কিছু প্রত্যাশিতও নয়। নববাবুবিলাসে ভাষার শ্রীছাঁদ সৌষ্ঠব কিছুই গড়ে ওঠেনি। গদ্য নৈরাজ্যিক। শব্দ ব্যবহার লঘু-গুরু বাচ-বিচার ছাড়াই অপরিকল্পিত; সে কারণে সামঞ্জস্যহীন। ফুলমনি ও করুণা যতটা উপন্যাস, তার চেয়ে বেশি সুসমাচার। পাঁচালির বিপরীতে গদ্যে অনুরূপ নীতি-কাহিনি শোনানোই বুঝি এর লক্ষ্য। একেও ঠিক উপন্যাস বলা যায় না। এর ভাষাও প্রতিনিধিস্থানীয় নয়।
প্যারীচাঁদ মিত্রের (টেকচাঁদ ঠাকুর) আলালের ঘরের দুলালকেই (১৮৫৮) বাংলা ভাষার প্রথম সফল উপন্যাস বলে গণ্য করা যায়। ‘সফল’ শব্দটা অবশ্য আপেক্ষিক। উপন্যাসের লক্ষণগুলো মোটামুটি এতে ধরা পড়েছে, সেই বিচারে এ সফল। এদিক থেকে এর বেশি আর তেমন কিছু বলার নেই। তবে এর বৈশিষ্ট্যের ও খ্যাতির স্থায়ী কারণ অন্য। কলকাতা ও তার আশপাশ  অঞ্চলের মানুষ তখন যেভাবে যেমন কথা বলতো, প্যারীচাঁদ মিত্র হুবহু সেইভাবে তেমন সেই ভাষা তুলে এনে তাঁর লেখায় তাকে ব্যবহার করেছেন। মুখের ভাষা ও বইয়ের ভাষার ভেতরে কোনো দূরত্ব রাখেননি। কি বর্ণনায়, কি সংলাপে রাস্তার খিস্তিখেউর, অন্দরমহলের আয়েশি বুলি, ইয়ার-বখশির অসার তেঁদরামি, ঠগ-বাটপাড়ের চটুল চালিয়াতি, এসবই অবিকল সেই রকম তরতাজা তিনি হাজির করেন, যেন তারা অনর্গল হুড়মুড়িয়ে আসে। বাস্তবে ও কল্পনায় কোনো ব্যবধান তিনি রাখেননি। বাস্তবই তাঁর কল্পনাভূমি। এবং বিষয়-ভাবনায় স্থূল ও সূক্ষ্ম কোনো বাছবিচার তিনি করেন না। তাঁর উপন্যাসের ভাষা ‘মৃত’ নয়, ‘পরের’ও নয়, একেবারে প্রত্যক্ষ বাস্তবের খাঁটি কথ্য ভাষা। এবং রবীন্দ্রনাথ ভাষায় যে ‘লঘুতা’ ও ‘গতিবেগে’র ওপর জোর দিয়েছিলেন, তার প্রকাশ ছিল তাতে স্বতঃস্ফূর্ত। অতএব একে শুভ সূচনা বলাই সংগত। উপন্যাস সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ছবিটাও এ থেকে যদি কেউ বহু বর্ণিল রঙে এঁকে নিয়ে থাকে, তবে তাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলা চলে না। প্রায় একই সময়ে (১৮৬২) প্রকাশিত হয় কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশা। উপন্যাস না হলেও এ উপন্যাসের সমগোত্রীয়, হুতোমের চোখে দেখা এখানে সমাজের চালচিত্র। তার অসংগতি, অব্যবস্থা, আতিশয্য, এগুলোর তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ধরা পড়ে এতে। ধরাবাহিক কাহিনির সূতোয় গাঁথা হলে অনায়াসেই কোনো উপন্যাসের অংশ হতে পারত। আমাদের যা বলবার, তা হলো, এখানেও অবলম্বন কলকাতা ও তার শহরতলির সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। গুরুগম্ভীর চালে নয়, আলালের মতো এখানেও লঘুতার যথেষ্ট অবকাশ। আগামী দিনের কথাসাহিত্য যে মুখের ভাষাকে মান্য করছে, প্রত্যক্ষের ঘটনাপ্রবাহ যে সেখানে কাহিনির মূল সুর বেঁধে দিচ্ছে, এমনটি তখন অসংশয়ে ভাবতে পারত যে কেউই। সাধারণ লোকরুচিকেও তা তুষ্ট করত নিশ্চয়। কিন্তু তা হয়নি। উপন্যাসের ভাষা অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। এবং তাতে রবীন্দ্রনাথের যে বিরাগ ছিল না বরং সানন্দে তার অনুসরণই তিনি করেছিলেন, এটাও আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়।
তবে ব্যাপারটা যে হঠাৎ ঘটেছে এমন নয়। ভাষার ব্যবহারে কায়েমী স্বার্থের কোনো কারসাজির অভিযোগও এখানে টেকে না। সংস্কৃত ভাষার অনুসঙ্গী শিল্প ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ধারা একটা আগে থেকেই ছিল। বাংলা ভাষার নিজস্ব বলয় গড়ে উঠতে থাকে তার ওপরে  দাঁড়িয়েই, যদিও নিজেকে সে চেনাতে চায় তার আপন অনন্য বৈশিষ্ট্যে। ভারতবর্ষের নান্দনিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য সে খারিজ করে না; কিন্তু নিজেকেও সে আলাদা করে জানাতে চায়, জানায়। এতে সংস্কৃতের বিধি-বিধান থেকে সে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজে, যদিও তার জ্ঞানকাণ্ড থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয় না। খোলামনে অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ডর পিদকেও হাত বাড়ায়। এতে ভাষার নির্মাণ পুরোপুরি নির্জ্ঞান-চালিত সহজিয়া ও মাটিঘেঁষা থাকে না। তেমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতার সকর্মক চলকগুলো অবশ্য সে আত্মস্থ করে সক্রিয় রাখতে চায়। এই উদ্যোগে প্রধান ঋত্বিক হয়ে দেখা দেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। প্যারীচাঁদ মিত্রের তিনি সমসাময়িক। কিন্তু ভাষা তার কাছে জন্মসূত্রে পাওয়া স্বাভাবিক উত্তরাধিকার মাত্র নয়। হাতুড়ি, বাটালি, ছেনি নিয়ে একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ে গদ্যভাষার মূর্তি তিনি কেটে কেটে গড়ে তুলতে থাকেন। রূপ ও লাবণ্য তাতে যোগ করেন। এই গদ্য সংস্কৃতের তাঁবেদারি করে না। সংস্কৃতকে অশ্রদ্ধাও করে না। মৌলিক উপন্যাস তিনি রচনা করেননি। তবে বেশ কিছু ভাবানুবাদে বাংলা গদ্যকে তিনি এক শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেন। সীতার বনবাস, শকুন্তলা, মহাভারতের উপক্রমণিকা, ভ্রান্তিবিলাসÑএসবে তার পরিচয় মেলে। গদ্য নৈর্ব্যক্তিক, কার্যক্ষম ও লাবণ্যময়। কিন্তু এ বাংলা-গদ্য। কাঠামোগত দিক থেকে; শব্দচয়নে ও তার ব্যবহার প্রণালীতেও। তৎসম শব্দের ব্যবহার অবশ্য ঐতিহ্যগত কারণে তুলনায় অনেক বেশি। বাংলা উপন্যাসের মূলধারা দীর্ঘদিন ভাষার এই ছককে পেছনে রেখে অগ্রসর হয়। বিদ্যাসাগরের তর্ক-বিতর্কের ভাষা কিন্তু দ্বন্দ্বমুখর। তা প্রাত্যহিক ভাষা ব্যবহারের অনুসারী। কি তাঁর সাহিত্যিক গদ্য, কি তর্কের গদ্য, কোনোটিই গোঁড়া সংস্কৃতাভিমানীদের তুষ্ট করেনি। তবে এই গদ্যই বঙ্কিমের উপন্যাসের মডেল। একে কোনোক্রমেই মুখের ভাষার হুবহু অনুসারী বলা যাবে না। বাংলা উপন্যাসের এতে ভালো হয়েছে, না, মন্দ হয়েছে, এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ যখন মুখের ভাষার ব্যবহারের সফল উদাহরণ আগেই তৈরি করে দিয়ে যান। আমরা এ প্রসঙ্গে পারলে পরে আবার ফিরে আসব। আপাতত বঙ্কিম যে শক্ত হাতে প্রবল টানে বাংলা উপন্যাসে ভাষার নির্মাণকলার এক দিকচিহ্ন এঁকে দেন, তার বৈশিষ্ট্য থেকে এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু বুঝে ওঠার চেষ্টা করবো। রবীন্দ্রনাথের কথা সেই সূত্রে চলে আসবে। তা যেমন উপন্যাসের ভাষা নিয়ে তাঁর কথা, তেমনি তাঁর উপন্যাসের ভাষা নিয়ে তাঁর অনুসরণে আরো দু-একটি কথা।
বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে। কপালকুণ্ডলা এক বছর পরে। বাংলা উপন্যাসের গদ্য যেমন একটা মজবুত কাঠামো খুঁজে পায়। তবে এর গড়ন আলাল বা হুতোমের গদ্য থেকে যথেষ্ট আলাদা। লক্ষ্যও অনেক বেশি ব্যাপক। পাঠকের অন্তরঙ্গ হওয়া এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য নয়। তার সুপ্ত অনুভূতিকে জাগ্রত করে নৈর্ব্যক্তিক বোধের বিস্তার ঘটানোতেই এর সার্থকতা। নিতান্ত স্থানীয় বুলিতে ইয়ার-দোস্তি-মাখামাখি এতে প্রশ্রয় পায় না। চেতনার কোষে কোষে আলো ফেলে ভাবনা-চিন্তাকে সচল করার দিকেই এর বেশি ঝোঁক। বুদ্ধিহীন আবেগের ঢেউ তোলা, বা কথা চালিয়াতিতে আসর মাত করা এখানে প্রধান হয়ে ওঠে না। তাই বলে ভাষার চারদিকে নিষেধের দেয়াল তুলে দেওয়া, আর জানা-শোনার বড়াই করে নানারকম দুরূহ কালোয়াতি দেখানো, এসব দিকে যে মাত্রাতিরিক্ত নজর পড়ে, তাও নয়। সংস্কৃত সাহিত্যের এই দিকটি রবীন্দ্রনাথকে খুশি করেনি। বঙ্কিম একে এড়াতে পেরেছিলেন। এবং তা শুরু থেকেই। ভাষায় মাত্রাজ্ঞান তাঁর কখনো বিপর্যস্ত হয়নি। যদিও ভাষার চাল সব জায়গায় একরকম ছিল না। দুর্গেশনন্দিনী আর ইন্দিরা¬ পাশাপাশি রেখে পড়লেই বিষয়টি ধরা পড়ে।
মুখের ভাষার রূপকাঠামো থেকে সরে এলেও বঙ্কিম ভাষাকে দুর্বোধ্য করেননি। বিদ্যাসাগরের পথে এগিয়ে তিনি বরং তাকে আরো সাবলীল ও শিল্পশোভন করে তুলেছেন। মূলত শিল্পাভিমানীর চর্চার ভাষা বলে এ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। আবেদনও এর ক্ষুণœ হয়নি। উলটো দিকে আলাল বা হুতোমই টাটকা মুখের ভাষার সব প্রাণবন্ত আয়োজন নিয়ে ক্রমশ বিস্মৃতির পথে অগ্রসর হয়েছে। সমাজে ভদ্ররুচির প্রভুত্ব দিয়ে এর কিছুটা ব্যাখ্যা মিলতে পারে কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ হবে না; এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে হবে, তাতেও সন্দেহ থেকে যায়। গোটা ভারতবর্ষজুড়ে একসময় সংস্কৃত ভাষার যে একটা সামাজিক প্রয়োজন গড়ে উঠেছিল, তারই আদলে মনে হয়, বাংলা উপন্যাসে বঙ্কিমী ভাষার প্রতিষ্ঠার ও একই সময়ে আলাল-হুতোমের ভাষার মহিমা বিলুপ্তির একটি সংগত কার্যকারণ সম্পর্কের চেহারা খাড়া করা যায়। বঙ্কিমের লোকোত্তর প্রতিভাও অবশ্য একটা অনুপেক্ষণীয় বিষয়।
পালি-প্রাকৃতের জমির ওপর যে অঞ্চলের মানুষ বাংলাকে এক সাধারণ ভাষা হিসেবে গড়ে তুলেছে তার সব জায়গায় মুখের ভাষা একরকম নয়। একেক জায়গায় তার একেক চাল। স্থানীয় উচ্চারণের নানা বৈশিষ্ট্য তাতে মেশে। কথা বলার ঐতিহ্যেও তফাত তৈরি হয়। তাতে হয়তো সঞ্চিত থাকে ব্যাখ্যাতীত প্রাচীন অভ্যাসের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। লৌকিক শব্দভাণ্ডারেও তফাত দেখা দেয়। নিট ফল দাঁড়ায় এই, আপন আপন নিজস্বতা নিয়ে মুখের ভাষা যেমন প্রাণবান ও সতেজ হয়ে ওঠে, তেমন অঞ্চলের বিভিন্নতায় তার বিভিন্নতাও প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকে। সবই বাংলা ভাষার নানা চল। কিন্তু সবাই তারা সর্বসম নয়। অপিনিহিতি, অভিশ্র“তি ও অনুরূপ আরো শব্দ-রূপান্তর প্রক্রিয়া একই রূপ নেয় না। নানাভাবে, নানামাত্রায় বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আকারে কণ্ঠনিঃসৃত হয়। বাংলা ভাষা এক হলেও তা বহুরূপী হয়ে পড়ে। ভাষার ঐক্য ধরা পড়তে থাকে এই রকম সব জায়গার মানুষের যোগাযোগের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে তার গড়ে ওঠায়। তার সহজ প্রকাশ ঘটতে থাকে গানে, কবিতায়। মুদ্রণ শিল্প তখনো দেখা দেয়নি। গদ্য সাহিত্য তৈরি হয়নি। কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদে, মঙ্গলকাব্যে, বৈষ্ণব কবিতায়, বাউল গানে, শ্যামা সংগীতে, পাশাপাশি পুঁথি সাহিত্যে, মর্সিয়া গানে, এমনকি প্রবাসে রাজদরবারে আলাওলের কাব্যে বাংলা ভাষার সর্বজনমান্য রূপ একটি বিকশিত হতে থাকে। সবাই বুঝতে পারে। কিন্তু সবাই তেমন করে কথা বলে না। সবার মুখের ভাষা এ নয়। অবশ্য বহু ধরনের বহু মানুষের সামনে নৈর্ব্যক্তিক বক্তৃতার ভাষা এই রকম হয়ে উঠতে থাকে। সেখানে ভাষার সাধারণীকরণে প্রয়োজন পড়ে। আমরা দেখেছি গোটা ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে এমন সাধারণীকরণের তাগিদ থেকে সুসম্বদ্ধ আকারে বেরিয়ে এসেছিল সংস্কৃত ভাষা ক্ষুদ্রতর ক্রিয়াভূমির ওপর একই রকম প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে আকার পেতে থাকে সবার কাছে একইভাবে গ্রহণযোগ্য বাংলা ভাষা। সবার মুখের ভাষা এ নয়। সেদিক থেকে অনেকটা নির্মিত। এমনকি আরোপিত। কিন্তু সবার সঙ্গে তার স্বাভাবিক সংযোগ। একে কৃত্রিম বলা যায় না।
কৃত্রিম নয় আলাল-হুতোমের ভাষাও। এবং তা সরাসরি মুখের ভাষা। কিন্তু একে প্রতিনিধিস্থানীয় বলা যায় না। অন্তত সেই সময়ের বাংলায়। কলকাতা ও তার আশেপাশের মানুষজন শিষ্ট-অশিষ্ট যেমন কথা বলতো ঠিক সেই রকম তার প্রতিলিপি এখানে রচিত হলেও তা সর্বাংশে আঞ্চলিক। অন্যান্য অঞ্চলের তার সঙ্গে একাত্মতা গড়ে ওঠেনি তখনো। খাঁটি মৌখিক হলেও উপন্যাসের ভাষা হিসেবে তাতে সাড়া দেবার জন্য সবাই প্রস্তুত ছিল না। আরো পঞ্চাশ বছর পর সবুজপত্রের যুগে ব্যবধান অনেকখানি ঘুচেছে। কলকাতা ছিল রাজধানী। সব অঞ্চলের মানুষ সেখানে এসেছে। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসনিক কাজকর্ম, সবকিছু হয়ে পড়েছে কলকাতানির্ভর, কলকাতামুখী। রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠায় যাতায়াতও সহজ হয়েছে। ক্রমে গোটা বাংলারই বিদ্বৎসমাজে ওই ভাষা মুখের ভাষা অথবা মুখের ভাষার নিকটতম বিকল্প হয়ে উঠেছে। তাছাড়া উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সব পেশার মানুষের ভেতরেও তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। অবশ্য কলকাতার ভাষাও শুধু কলকাতার থাকেনি। রাজধানী শহরে তাতেও মিশ্রণ নিরন্তর ঘটে চলেছে। প্রধানত গোটা ভাগীরথী অববাহিকার কথ্য ভাষা তার টানে তাতে অবলীলায় এসে মিশেছে। কলকাতা তাতে বাধা দেয়নি। হয়তো তার বাধা দেবার কথা মনেও হয়নি। বাস্তব পরিস্থিতি তাতে প্রশ্রয় দেয়নি। এ থেকে সর্বজনমান্য কথ্যভাষা একটা বেরিয়ে আসে। তা প্রতিনিধিস্থানীয় শিষ্ট ভাষারও আকার পায়। তবে তার জন্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কিছু কাল। বঙ্কিমের সময়ে তাঁর ভাষাই ছিল সব বাঙালির সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ভাষা। কিন্তু তাকে কোনো মতেই বলা যাবে না তাদের মুখের ভাষা।
তা না হলেও এই ভাষাতেই উপন্যাস তার উৎকর্ষের শিখরচূড়া স্পর্শ করে। রবীন্দ্রনাথ যে মুখের ভাষায় গল্পকে ‘দৌড় করাবার ’ কথা বলেন, তার উপন্যাসে তার অভাব আছে সত্য, কিন্তু গল্পের গতি তাতে কোথাও বাধা পায়নি। কোথাও কোথাও তার রুদ্ধশ্বাস ছুটে চলা পাঠকেরও হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। তবে গল্পের এই ছুটে চলাই উপন্যাসে যথেষ্ট নয়। শুধুই ঘটনার সুচারু বর্ণনায় তা সিদ্ধকল্প হয় না। তাতে তার খোলসে পরিচয় ফুটে উঠতে পারে চমৎকার। কিন্তু পারিপার্শ্বের চাপ, মনোজগতে মেঘ ও রৌদ্রের নানা খেলায় আলো-ছায়ার বিচিত্র বর্ণবিন্যাস, নিরাকার চিন্তার সাকার নির্মাণে তার বহুমুখী দ্যোতনা, উপলব্ধির গভীরতর তল পর্যন্ত সংবেদনের নানা স্রোত,  এগুলোর বাকরূপ যেমন যেমন চাই, তেমন তেমন রচনা করায়, আরো কিছু দরকার। মুখের ভাষা তখন তাতে কাজে আসত বলে ধারণা করা মুশকিল। কারণ মুখের ভাষার পেছনে অভিজ্ঞতার কেলাসন এদেশের সাধারণ মানুষের ভেতর ওই সময়েও তেমন দানা বাঁধেনি। যদিও তারা যে অকল্পনীয় বা অবাস্তব, তা নয়। শিল্প এই দুই প্রান্তকে মেলায়। বঙ্কিম তাঁর ভাষার নির্মাণে এই অসাধ্য সাধন করেন। দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, এক বিন্দুতে এসে মেশে। বাংলা উপন্যাস ওই কালের বৃত্তে তার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটায়।
কপালকুণ্ডলা বঙ্কিমের দ্বিতীয় উপন্যাস। শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডে এখনো তুলনারহিত। মুখের ভাষার অভাব পাঠককে দূরে ঠেলেনি। বরং এই উপন্যাসের পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হতে তার ভাষা বিশেষ সহায় হয়েছে। এই ভাষা বিদ্যাসাগরের অনুসারী,  দৃঢ়নিবন্ধ, প্রাঞ্জল, কিন্তু মোটেই ঘরোয়া নয়। রাজসিক দূরত্ব একটা আছে, কিন্তু তা আকর্ষণ করে। মধুর সমাপ্তি এতে নেই, কিন্তু ওই মধুর সমাপ্তির আকাক্সক্ষা বহুগুন জাগিয়ে দেয়। দৈনন্দিন জীবনের কাহিনি এ নয়; কিন্তু জীবনতৃষ্ণা এখানে দুকূলপ্লাবী, একই রকম বৈরাগ্যের সম্মোহন। দুটোই খাঁটি। মানব অস্তিত্বের সহচর। প্রতিদিনের ঘটনায় তারা খোলা চোখে দেখা না গেলেও ঘটনার পেছনে অদৃশ্যে তারা ঢেউ তোলে অবিরাম। কপালকুণ্ডলা তাই অবাস্তব মনে হয় না। বরং মনে হয় বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব। তার ভাষা নৈকট্য ও দূরত্বের ভেতরে এক অপরূপ ভারসাম্য রচনা করে। এই ভারসাম্য শিল্পের কাক্সিক্ষত ধন। জীবনঘনিষ্ঠ না হলেও একে উপেক্ষা করা যায় না। মুখের ভাষা যদি চেতনার ওপরতলেই কেবল ভাসমান থাকে, তবে দূরত্বের সঙ্গে, এবং গভীরতার সঙ্গে, ব্যবধান ঘোচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে।
কপালকুণ্ডলায় মতিবিবি ও নবকুমারের পান্থনিবাসে প্রথম সাক্ষাৎকারের ক্রান্তিমুহূর্তের বর্ণনা একটি সংক্ষিপ্ত শ্বাসরুদ্ধকর বাক্যে : ‘প্রদীপ নিবিয়া গেল।’ গোটা বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে এমন অমোঘ বাক্য মন্ত্রগাঢ় সম্পূর্ণতায় আর দ্বিতীয়টি উচ্চারিত হয়েছে কিনা সন্দেহ। প্রদীপ নিভে যাবার অন্ধকারে প্রেক্ষাপটের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবটা মুহূর্তে উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। অনুভবের নাটকীয়তা ও তীব্রতা আমাদের স্তম্ভিত চেতনায় আবিষ্ট করে। আমরা ক্ষণিকের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। ভাষা আটপৌরে নয়। নিরাসক্তই। তবু তাতে ভর করে নৈর্ব্যক্তিক আবেগ। আলালের ভাষায় এমনটি সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না। এর গাম্ভীর্য, করুণা ও দূরান্বয়ী বিস্তার তাতে সংকুচিতই হতো।
আর একটা জায়গা বেছে নিই, ‘কপালকুণ্ডলার সেই রূপ পূর্বস্মৃতি জাগরিত হইতেছিল; বালিয়াড়ির শিখরে যে সাগরবারিবিন্দুসংস্পৃষ্ট মলয়ানিল তাঁহার লম্বালকম-লমধ্যে ক্রীড়া করিত, তা মনে পড়িল; অমল নীলানন্ত গগনপ্রতি চাহিয়া দেখিলেন; সেই অমল নীলানন্ত গগনরূপী সমুদ্র মনে পড়িল। কপালকুণ্ডলা পূর্বস্মৃতি সমালোচনায় অন্যমনা হইয়া চলিলেন।
ইচ্ছা করেই এই অংশটার ওপর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কপালকুণ্ডলায় এমন বর্ণনা অপ্রতুল। এ স্পষ্টতই সংস্কৃতগন্ধী। মুখের ভাষা কোনোক্রমেই নয়। কিন্তু এই ভাষাই কপালকুণ্ডলার সাংসারিক বাস্তবতা থেকে তার মানসিক দূরত্ব প্রকট করে তোলে। ভাষার এই নির্মাণ, অবশ্যই কৃত্রিম, বঙ্কিমের শিল্প-মাধ্যম। গল্প বলাই শুধু তার কাজ নয়। গল্পের আত্মাকেও তা ফুটিয়ে তুলতে চায়। ফুটিয়ে তুলতে চায় তার পারিপার্শ্বের ভাবরূপকেও। উপন্যাস তেমনটাই দাবি করে। শুধু মুখের ভাষাকে অবলম্বন করলে লেখকের সহায়-সম্বল হ্রাস পায় কিনা, তা তাই ভেবে দেখার বিষয়। ভাষা যতো সহজ হয়েছে, মুখের ভাষা যত সার্বভৌম হয়ে উঠেছে, উপন্যাস লেখা তত বেড়েছে। মুখের ভাষা তাতে অনর্গল হয়েছে। উপন্যাসের শিল্পমান একই সঙ্গে বেড়েছে কিনা, এ প্রশ্ন কিন্তু করাই যায়।
বঙ্কিমের ভাষাও পরে তুলনায় সহজ হয়েছে। কিন্তু তা মুখের ভাষার অন্ধ অনুসরণ করেনি; ভাষার প্রয়োগরীতিও তার খুব একটা পাল্টায়নি। বিষবৃক্ষ¬ (১৮৭৩) থেকে পড়ি : ‘ রাত্রি অন্ধকার, চারিদিক অন্ধকার, গাছে গাছে খাদ্যোতের চাকচিক্য সহস্রে সহস্রে ফুটিতেছে, মুদিতেছে, ফুটিতেছে। আকাশে কালো মেঘের পশ্চাতে কালো মেঘ ছুটিতেছে, তাহার পশ্চাতে আরও কালো মেঘ ছুটিতেছে তৎপশ্চাতে আরো কালো। আকাশে দুই একটি নক্ষত্র মাত্র, কখনও মেঘ ডুবিতেছে, কখনও ভাসিতেছে। বাড়ির চারিদিকে ঝাউগাছের শ্রেণী, সেই মেঘময় আকাশে মাথা তুলিয়া নিশাচর পিশাচের মতো দাঁড়াইয়া আছে। বায়ুর স্পর্শে সেই করালবদনা নিশিথিনী-অঙ্কে থাকিয়া তাহারা আপন আপন পৈশাচী ভাষায় কুন্দনন্দিনীর মাথার উপর কথা কহিতেছে। পিশাচেরাও করাল রাত্রির ভয়ে, অল্প শব্দে কথা কহিতেছে। কদাচিৎ বায়ুর সঞ্চালনে গবাক্ষের মুক্ত কবাট প্রাচীরে বারেকমাত্র আঘাত করিয়া শব্দ করিতেছে।… সর্বোপরি সেই বাতায়নশ্রেণীর উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছেÑ আর পতঙ্গদল ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে। কুন্দনন্দিনী সেই দিকে চাহিয়া রহিল। এই যে করাল রাত্রির ভৌতিক উচাটন, এ কার্যত কুন্দনন্দিনীর যন্ত্রণাদগ্ধ তাপিত হৃদয়ের অসহায় ব্যাকুলতারই প্রতিফলন। এ গল্পকে অনুসরণ করে না। গল্পের আত্মারই শিল্পশাসিত উন্মোচন ঘটায়। এবং তা করে মুখের ভাষা থেকে সরে এসে লেখকের চৈতন্যকে আশ্রয় করে ভাষার শুদ্ধতার সমান্তরাল এক জগতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। উপন্যাস আত্মস্থ হয়।
রবীন্দ্রনাথ যে গল্পের গতিশীলতাকে অগ্রধিকার দেন এবং সেই সূত্রে মুখের ভাষাকেই হাতিয়ার করার কথা বলেন, এও কিন্তু কোনো অনমনীয় চরম অবস্থান নয়। আমরা দেখেছি সংস্কৃত গদ্যের অনড়ত্বে ও অলঙ্কার বিলাসীতায় অসহিষ্ণু হয়েই তিনি ওই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। তা নইলে তাঁর বক্তব্যও আপেক্ষিক। মুখের ভাষার ব্যবহারিক ক্ষমতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাই বোধ হয় তাঁর লক্ষ্য। আগেই বলেছি, উপন্যাস রচনায় তিনি প্যারীচাঁদ মিত্র বা কালীপ্রসন্ন সিংহকে গুরু মানেননি। বঙ্কিমেরই তিনি পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। যদিও ভাষায় অলঙ্কার ও আড়ম্বর তাঁর অনেক কমে এসেছিল। বিষয়টি বোঝার জন্যে তাঁর উপন্যাসের ভাষার দিকে এবার আমরা নজর দিই। কথ্যরীতি হলেই ভাষা সহজবোধ্য হবে কিনা, এ প্রশ্নটিরও এই সূত্রে মুখোমুখি হবার চেষ্টা করি।

৩.
রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস বউ-ঠাকুরাণীর হাট। প্রথম প্রকাশ ১২৮৯ বঙ্গাব্দ। বাংলা উপন্যাসের উপর বঙ্কিমের শাসন তখনো প্রবল। বলা যেতে পারে সর্ববাদিসম্মত। ওই বছরই ছেপে বের হয় তাঁর আনন্দমঠ। শেষ দুই উপন্যাস দেবী চৌধুরানী¬ ও¬ সীতারাাম লেখা শেষ হবে আরো পরে। অবাক হবার কিছু নেই, আনন্দমঠের ভাষা বউ-ঠাকুরানীর হাটের ভাষার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও সচল। রবীন্দ্রনাথের তখন সবে উপন্যাস লেখায় হাতেখড়ি, আর বঙ্কিম অভিজ্ঞ ও অনায়াস। মুখের ভাষার অনেকখানি কাছে চলে এসেছে তাঁর সংলাপের ভাষা। রবীন্দ্রনাথের তুলনায় তা জড়োসড়ো, আড়ষ্ট।  আনন্দমঠে এক জায়গায় পড়ি :
‘নিমাই বলিল, তা হোক, আমি বাঁদরী, আমি পোড়ারমুখী। একবার বউকে ডাকবো?’
‘আমি চললুম’, এই বলিয়া জীবানন্দ হন্হন্ করিয়া বাহির হইয়া যায়। নিমাই গিয়া দ্বারে দাঁড়াইল, দ্বারের কবাট রুদ্ধ করিয়া, দ্বারে পিঠ দিয়া বলিল, ‘আগে আমায় মেরে ফেল, তবে তুমি যাও। বউয়ের সঙ্গে দেখা না করে তুমি যেতে পারবে না।’
জীবানন্দ বলিল, ‘আমি কত লোক মারিয়া ফেলিয়াছি, তা তুই জানিস?’
এইবার নিমি রাগ করিল, বলিল, ‘বড় কীর্তিই করেছ, স্ত্রী ত্যাগ করবে, লোক মারবে, আমি তোমায় ভয় করবো! তুমিও যে বাপের সন্তান, আমিও সেই বাপের সন্তান, লোক মারা যদি বড়াইয়ের কথা হয়, আমায় মেরে বড়াই কর।’
জীবানন্দ হাসিল, ‘ডেকে নিয়ে আয়, কোন্ পাপিষ্ঠাকে ডেকে নিয়ে আস্বি নিয়ে আয়, কিন্তু দেখ্, ফের যদি এমন কথা বলবি, তোকে কিছু বলি না বলি, সেই শালার ভাই শালাকে মাথা মুড়াইয়া দিয়া ঘোল ঢেলে উল্টা গাধায় চড়িয়ে দেশের বার করে দিব।…’
সংলাপে তখনো ক্রিয়াপদে সাধু-চলিতের মিশ্রণ। অন্যান্য শব্দের বেলাতেও চেখে পড়ে লঘু-গুরু পাশাপাশি। বোঝা যায় তখনো সংলাপের ভাষা একটা স্বীকৃত মানে এসে পৌঁছায়নি। তা সত্ত্বেও এই ভাষা বাস্তবের ছবি যথেষ্ট জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলে। পাশাপাশি ¬বউ-ঠাকুরানীর হাটে¬ শুরুতেই দেখি : ‘সুরমা কহিলেন, ‘প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাকো, ধৈর্য ধরিয়া থাকো। একদিন সুখের দিন আসিবে।’ উদয়াদিত্য কহিলেন, ‘আমি তো আর-কোন সুখ চাই না। আমি চাই, আমি রাজপ্রাসাদে না যদি জন্মাইতাম, যুবরাজ না যদি হইতাম, যশোহর-অধিপতির ক্ষুদ্রতম তুচ্ছতম প্রজার প্রজা হইতাম। তাঁর জেষ্ঠ্যপুত্র, তাঁহার সিংহাসনের, তাঁহার সমস্ত ধন মান জশ প্রভাব গৌরবের একমাত্র উত্তরাধিকারী না হইতাম। কী তপস্যা করিলে এ-সমস্ত অতীত উল্টাইয়া যাইতে পারে।…’
এখানে সংলাপ সাধু ভাষা-নির্ভর। দু-একটা চলিত শব্দ ঢুকে পড়েছে। (‘তাঁর’, ‘চাই না’)। কিন্তু আড়ষ্টতা ঘোচেনি। সাধু ভাষার জমাট ভাবও ঠিক ঠিক ফোটেনি। তবে ভাষা যে বঙ্কিমের বৃত্তেই ঘুরপাক খায় তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মুখের ভাষা থেকে তা অনেকটাই দূরে থেকে যায়। চার বছর পরে লেখা রাজর্ষির ভাষা আর একটু গোছানো। তবে একই ধাঁচের। ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। গল্প বলায় বা গল্প শোনায় কোথাও হোঁচট খেতে হয়নি। উপন্যাসের ভাবনাবিশ্বে এই ভাষা মূল্যসংযোজনও তেমন কিছু করেনি। এক শিথিলবদ্ধ কাহিনি আপন গুণে ও বৈগুণ্যে যেমন থাকার, তেমনই থাকে। আর কোনো আকর্ষণ তার থাকে না। এটা খেয়াল করি, রবীন্দ্রনাথের সব উপন্যাসই প্রধানত গল্পকেন্দ্রিক। ওই গল্প ভালোভাবে বলাটাই তাঁর ভাষার প্রাথমিক কাজ। সংস্কৃত সাহিত্যে এই কাজে গাফিলতি তাঁর প্রভূত বিরাগের কারণ হয়েছে। গল্প ফেলে ভাষার প্রসাধনে যতœ নেওয়া তাঁর বাহবা পায়নি। নিজে উপন্যাস লেখার সময়েও বিষয়টি নিয়ে তিনি সতর্ক থেকেছেন।
তবে মুখের ভাষার পক্ষে তিনি সওয়াল করলেও তাঁর উপন্যাসে তার দেখা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো বেশ কিছুদিন। যদিও ঋজুতা থেকে লঘুতার দিকে ভাষা ঝুকেছে অনেকখানি। সোজাসুজি পড়া যায়, আর বাক্যসমূহ (আবশ্যিকভাবে বিষয়ের ভাব নয়) সহজ-সরল বোঝা যায়, এদিকে তাঁর সজাগ ও সযতœ দৃষ্টি ছিল বলেই মনে হয়। কিন্তু সবুজপত্র বের হবার আগ পর্যন্ত কাহিনি বর্ণনায় সাধু ভাষা তিনি ছাড়েননি। চোখের বালি ¬(১৩০৯ সন) ও নৌকাডুবিতে (১৩১৩ সন) সংলাপেও তা-ই ছিল। এমন কি গোরায় (১৩১৬ সন) চলিত ভাষার সংলাপ পেরিয়ে আবার সবুজপত্রেই চতুরঙ্গতেও (১৩২১ সন)। কেন চতুরঙ্গতে অমন করলেন তিনি, তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে ধরা পড়েনি। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, এইটিই তাঁর সবচেয়ে আপসহীন সবচেয়ে তীক্ষè, বাহুল্যবর্জিত, গভীর প্রশ্নদীর্ণ, অন্তর্মুখী উপন্যাস। ধরাবাঁধা কোনো ছকের ভেতরে একে ফেলতে পারি না। এর মননশীলতা, এর আকুতির সততা ও তীব্রতা এখনো আমাদের অভিভূত করে। অথচ ভাষা নিরাবেগ। কিন্তু তাতেই ঘটে মর্মবিদারী বিস্ফোরণ। যদিও দুদণ্ড বসিয়ে সুখ-দুঃখের সাতকাহন শুনিয়ে পাঠকের মন ভেজাবার কোনো চেষ্টাই তাঁর নেই। এত দ্রুত চালে, এত সংক্ষিপ্ত ভাষণে বাংলায় আর কোনো উপন্যাস লেখা হয়েছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু তাঁর অবলম্বন পূর্বাপর সাধু ভাষা, যা কিনা গতানুগতিক ধারণায় কিঞ্চিৎ ভারী এবং তুলনায় ধীরগতিসম্পন্ন। তারপরেও এ উপন্যাস রুদ্ধশ্বাসে এগোয়। মধুর পরিসমাপ্তি টেনে পাঠককে খুশি করার কোনো চেষ্টা তাঁর নেই। অমিমাংসেয় অতলতায় বিষয়-ভাবনা ডুবে যেতে থাকে। কিন্তু রেশ তার থেকে যায়। বুকের মাঝখানে কাঁটার মতো তা খচখচ করে।
তাঁর তৃতীয় উপন্যাস চোখের বালি কিন্তু কোনো ব্যতিক্রমধর্মী রচনা নয়। বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল পথ করে দিয়েছে আগেই। যদিও ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত থেকে দৃষ্টি সরে এসেছে অনেকখানি মনোজগতের অব্যক্ত, কিন্তু অতিপ্রকৃত ক্রিয়াকলাপের ওপর । অনেক পরে নিজেই তিনি বলেছেন, (১৩৪৭ সন) ‘Ñশয়তানের হাতে বিষবৃক্ষের চাষ তখনো হত এখনো হয়, তবে কিনা তার ক্ষেত্র আলাদা, অন্তত গল্প এলাকার মধ্যে। এখনকার ছবি খুব স্পষ্ট, সাজসজ্জায় অলঙ্কারে তাকে আচ্ছন্ন করলে তাকে ঝাপসা করে দেওয়া হয়, তার আধুনিক স্বভাব হয় নষ্ট। তাই গল্পের আবদার যখন এড়াতে পারলুম না তখন নামতে হলো মনের সংসারের সেই কারখানা-ঘরে যেখানে আগুনের জ্বলুনি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে উঠতে থাকে।…’ তিনি আরো বলেন, ‘Ñ চোখের বালির গল্পকে ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে দারুণ করে তুলেছে মায়ের ঈর্ষা। এই ঈর্ষা মহেন্দ্রের সেই রিপুকে কুৎসিত অবকাশ দিয়েছে যা সহজ অবস্থায় এমন করে দাঁত-নখ বের করত না। যেন পশুশালার দরজা খুলে দেওয়া হলো বেরিয়ে পড়ল হিংস্র ঘটনাগুলো অসংযত হয়ে। সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশে¬ষ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বালিতে।’
এখানে তিনি যা বলেছেন, তা যে বিভ্রান্তি জাগায়, এমন নয়, মনে একটা জায়গায় তা সঠিক মনে হয়। কিন্তু সবটুকু নয়। ‘সেই রিপুকে কুৎসিত অবকাশ,’ ‘দাঁত-নখ বের করা’, ‘পশুশালার দরজা’, ‘হিংস্র ঘটনাগুলো’ এইসব দৃশ্যকল্প এমন এক বিরূপতার পরিমণ্ডল রচনা করে, যা চোখের বালির খণ্ড পরিচয়ের ইঙ্গিত হয়তো একটু দেয়, কিন্তু সার্বিকভাবে মানুষী বিপন্নতার, তার অসহায় জীবনতৃষ্ণার, তার বোধের জাগরণের যে মায়াময় নিবিড় অনুভব এই উপন্যাস পাঠকের চেতনায় সঞ্চারিত করে, তার কোনো আভাসই তারা দেয় না। তাঁর এই ব্যাখ্যায় অন্য কোনো ভাবেও তা ফুটে ওঠে না অথচ এইগুলোই চোখের বালিকে এক মহৎ উপন্যাসের উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখনো তাকে পরম মমতার, অশেষ আগ্রহের বিষয় করে রেখেছে। এবং এমন করায় তাঁর সাধু ভাষার বর্ণনা ও কথোপকথন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। যদি বলি ওই অনুভবকে তা বরং ঘনত্ব দিয়েছে, গল্পের সঙ্গে সঙ্গে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়নি, তাহলে তাতে কি অহেতুক কোনো অতিশয়োক্তি ধরা পড়বে?
বিনোদিনী যখন তার সব বঞ্চনার আক্ষেপ চেতনায় একত্র করে ‘মনে মনে তীব্র হাসি হাসিয়া বলে, ‘কোনো নারীর কি আমার মতো এমন দশা হইয়াছে। আমি মরিতে চাই কি মারিতে চাই, তাহা বুঝিতেই পারিলাম না,’ তখন তার অন্তর্জ্বালা, তার করুণা স্থির লক্ষ্যে এখনকার পাঠক হৃদয়কেও বিদ্ধ করে। এ যে মুখের ভাষা না, এতে ছবিটি মনে গেঁথে নিতে কোথাও কোনো  তাল কাটে না; বরং ভাষার এই কিঞ্চিৎ ব্যবধান তাকে নির্লিপ্তভাবে দেখার অবকাশ একটা এনে দেয়। যে-কোনো শিল্প সৃষ্টির উপভোগে এই দূরত্বের প্রয়োাজন বোধ হয় উপেক্ষণীয় নয়। অবশ্য উপন্যাসে ভাষাই যে তার একমাত্র মাধ্যম, এমনটি নাও হতে পারে। বিষয়ভাবনার ভেতরেও দূরত্ব লুকিয়ে থাকা সম্ভব।
চোখের বালি থেকে আর একটা উদাহরণ দিই। বিনোদিনী চৌকি হইতে ভূমিতে লুটাইয়া পড়িয়া বিহারীর দুই পা প্রাণপণ বলে বক্ষে টাপিয়া ধরিয়া কহিল, ‘ঐটুকু দুর্বলতা রাখো ঠাকুরপো। একবারে পাথরের দেবতার মতো পবিত্র হইয়ো না। মন্দকে ভালোবাসিয়া একটুখানি মন্দ হও।’ বলিয়া বিনোদিনী বিহারীর পদযুগল বারবার চুম্বন করিল। বিহারী বিনোদিনীর এই আকস্মিক অভাবনীয় ব্যবহারে ক্ষণকালের জন্যে যেন আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। তাহার শরীর-মনের সমস্ত গ্রন্থি যেন শিথিল হইয়া আসিল। বিনোদিনী বিহারীর এই স্তব্ধ বিহ্বল ভাব অনুভব করিয়া তাহার পা ছাড়িয়া দিয়া নিজেই দুই হাঁটুর উপর উন্নত হইয়া উঠিল এবং চৌকিতে আসীন বিহারীর গলদেশ বাহুতে বেষ্টন করিয়া বলিল, ‘জীবনস্বর্বস্ব, জানি তুমি আমার চিরকালের নও, কিন্তু আজ এক মুহূর্তের জন্য আমাকে ভালোবাসো। তারপর আমি আমাদের সেই বনে-জঙ্গলে চলিয়া যাইব, কাহারও কাছে কিছুই চাহিব না। মরণ পর্যন্ত মনে রাখিবার মতো আমাকে একটা কিছু দাও।’ বলিয়া বিনোদিনী চোখ বুজিয়া তাহার ওষ্ঠাধর বিহারীর কাছে অগ্রসর করিয়া দিল। মুহূর্তকালের জন্যে দুইজনে নিশ্চল এবং সমস্ত ঘর স্তব্ধ হইয়া রহিল।’ এখানেও সাধু ভাষার ব্যবহার, সংলাপেও, আমাদের বিন্দুমাত্র প্রতিহত করে না। মুহূর্তের প্রেক্ষাপটে অনন্তের মর্মকথা আমরা ঠিকই শুনতে পাই।
কাহিনী বর্ণনায় চলিত ভাষার ব্যবহার গোরাতেও নেই। তবে মুখের ভাষাকে আশ্রয় করেই এখানে সংলাপ রচনা। শুধু মুখের ভাষা নয়, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও অবস্থানের সঙ্গে খাপ খায়, এমন মুখের ভাষা। ফলে কথোপকথন যে অনেক বেশি বাস্তবানুগ, তাতে সন্দেহ নেই। তার সঙ্গে কাহিনী বর্ণনায় সাধু ভাষার কোনো বিরোধ ঘটে না। বরং দুইয়ের ভেতর এমন এক ভারসাম্য তিনি বজায় রাখেন, যাতে উপন্যাসের স্বাভাবিকতা ও সাবলীল গতি কোথাও ক্ষুণœ হয় না। দেশকাল ও ব্যক্তির পারস্পারিক সম্পর্ক-সম্বন্ধ নিয়ে, ব্যক্তিত্বের ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে, জীবনের উদ্দেশ্য ও মানবমুক্তির পথ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্কে, প্রশ্ন ও উত্তর অন্বেষায় এই উপন্যাস পরিকীর্ণ। এসবের সঙ্গে, তাদের বিবিধ মাত্রার বর্ণের ও মেজাজের তারতম্যের সঙ্গে তার ভাষা যেন অস্থি-মজ্জায় এক হয়ে যায়। তার গাম্ভীর্য ও লালিত্য দুই-ই মনে হয়, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে দ্বন্দ্ব-মীমাংসার সত্যস্বরূপ থেকে উৎসারিত। পাঠক তাই তাদের সম্মোহনে জড়িয়ে পড়ে। সরাসরি সাড়া দেয়। ভাষার সঙ্গে তার সহজ ঐক্য গড়ে ওঠে। কোথাও তা দুর্বোধ্য ঠেকে না। বাক্য গঠন যেখানে সাধু ভাষার রীতি মানে, সেখানেও প্রায় সব শব্দই সবার চেনা। প্রমিত বাংলা ভাষা যে এক সর্বজনবোধ্য ও সবার ব্যবহারযোগ্য আকার পায়, এখানে তারই কুশলী প্রয়োগ চেখে পড়ে। পাঠক-পাঠিকার সঙ্গে একৈকান্ত সম্পর্ক আপনা তেকে তৈরি হয়ে যায়। যদিও তার স্বাতন্ত্র ও সৌকুমার্যও বজায় থাকে। সব মিলিয়ে গোরা যে এক মহান সাহিত্যকীর্তির মর্যাদা পায়, তাতে তার ভাষার এই অনায়াস দূরান্তিক অন্বয়ের ভূমিকা কম নয়। আলালে-র অনুসারি হলে এমনটি হতো কিনা সন্দেহ। উপন্যাসের বৃহৎভাবেরও তাতে দানা না বেঁধে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকতো।
ঘরেবাইরে (১৩২২ সন) থেকে শুরু করে পরের আর কোনো উপন্যাসে তিনি সাধু ভাষার প্রয়োগ ঘটাননি। অনুঘটকের কাজ করে থাকবে সবুজপত্র। ঘরেবাইরে ধারাবাহিক বের হয় প্রথম সবুজপত্রেই। আরো পাঁচটি উপন্যাস তিনি লেখেন : যোগাযোগ (১৩৩৪-৩৫ সন), শেষের কবিতা (১৩৩৫ সন), দুই বোন (১৩৩৯ সন), মালঞ্চ (১৩৪০ সন) ও চার অধ্যায় (১৩৪১ সন)। তবে চলিত ভাষা মানে সব বাঙ্গালির একক মুখের ভাষা নয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা বিভিন্ন। একের সঙ্গে অন্যের তফাত কোথাও কোথাও অতিমাত্রায় প্রকট। যুগ যুগ ধরে সহজ পারস্পারিক যোগাযোগের প্রয়োজনে যে সামান্যীকরণের প্রয়াস অবিরাম চলে আসছে, তারই পরিণাম আজকের এই চলিত ভাষা। এও প্রমিত ভাষা এবং সর্বজনগ্রাহ্য। ছাঁচ একটা তার গড়ে ওঠে। তার খুব পরিবর্তন ঘটে না। ঘটা বাঞ্ছনীয়ও নয়। তেমন হলে বাংলা ভাষার গোটা প্রকাশকলাই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা। তবে তার চারপাশ খোলা। শব্দরাশি নতুন নতুন অনবরত তাতে যোগ হয়। ভেতর থেকে, বাইরে থেকেও। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চলের বহুবিধ কথ্য শব্দ যেমন, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগে নানারকম বিদেশি শব্দও তেমন। প্রমিত বাংলা ভাষার মূল কাণ্ডে তারা যুক্ত হয়। একসময়ে তার শরীরের অংশ হয়ে যায়। অনেক শব্দ বেরিয়েও যেতে পারে। যায়ও। সাধারণত করো হুকুমে নয়, দৈনন্দিন ব্যবহারে তারা আর কাজে লাগে না, সেই জন্যেই। চলিত গদ্যের এই প্রমিত রূপ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে যখন প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে সবুজপত্র ছেপে বেরোনো শুরু হয়। শিক্ষিত মহলে মুখের ভাষাতেও তার ছাপ পড়তে থাকে। এবং বাংলার যে-কোনো অঞ্চলের সাধারণ নিরক্ষর মানুষেরও তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। মুখের ভাষা বলে নয়, এই সর্বজন বোধগম্যতাই তাকে সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত করে। ক্রমে এইটিই কথা বলার ও লেখার অবিসংবাদী প্রমিত রূপ বলে স্বীকৃতি পায়। সবুজপত্রের অনুসরণে রবীন্দ্রনাথও তখন এইপথে অগ্রসর হন। উপন্যাস রচনায় আর আগের ভাষারীতিতে তিনি ফিরে যাননি। অস্বীকার করা যায় না, ভাষার বাড়তি মেদ এতে বেশ খানিকটা ঝরে পড়ে। তা অনেক সপ্রতিভ, আরো ব্যস্তবাগীশ। সাজগোজের বাহার তার কমে। গল্প বলায় বৈঠকি মেজাজ একটা আপনা থেকে এসে যায়।
কিন্তু এতে সব মিলিয়ে উপন্যাস কি সমৃদ্ধ হয়েছে? তার শিল্পরূপে নতুন নতুন সম্ভাবনার বিকাশ কি তার সক্ষমতা বাড়িয়েছে? পাঠকের চেতনাজগতে সে কি নিজেকে আরো ছড়িয়েছে? অথবা আরো গভীরে কি তার বার্তা গিয়ে পৌঁছেছে? অন্তত রবীন্দ্রনাথের পরের উপন্যাসগুলো পড়ে আমরা এসব বিষয়ে কি কোনো সুস্পষ্ট ধারণা খাড়া করতে পারি?
আমরা দেখেছি, সংস্কৃত সাহিত্যের আলোচনায় তাতে গল্পকে ‘দৌড় করানোয়’ ভাষার ব্যর্থতার বিষয়টি তিনি খুব জোরের সঙ্গে উত্থাপন করেছিলেন। মনে হয়, কথাসাহিত্যে গল্পকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে ঘাটে ঘাটে না থেমে অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে না পড়ে একটানা তা অনায়াসে সহজভাবে বলে ফেলাটাই বোধ হয় তাঁর কাছে প্রধান হয়ে উঠেছিল। ঘরেবাইরে ও চার অধ্যায় নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় ওঠে, যখন নিন্দুকরা তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁর বিরুদ্ধে সনাতন ভারতীয় মূল্যবোধে আঘাত হানার অথবা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজশক্তির প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন, তখন তিনি এইটিই বোঝাতে চান যে গল্পের নিজস্ব তাগিদে বিষয় যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছে তিনি সেভাবেই সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ও নিরপেক্ষ থেকে তা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। লেখক হিসেবে তাঁর দায় মূলত ওইটিই। এবং গল্প তার যৌক্তিক ও নান্দনিক পরিণামে বিপথে চালিত না হয়ে ঠিকঠিক পৌঁছুল কিনা, সেইটিই, এবং সেইটুকুই, তাঁর দেখবার। হতে পারে তর্কের খাতিরে তিনি তাঁর বক্তব্যে ঝোঁকটা গল্পের ন্যায়ের ওপরে শুধু দিয়েছেন। লেখকের করণীয়ও তিনি সেই অনুযায়ী চিহ্নিত করেছেন। কারণ, গল্প ছাপিয়ে তাঁর আর কোনো বক্তব্য থাকে না, গল্পের বিষয় ও গতিমুখ ভিন্ন হলে তাঁর বলার কথাও ভিন্ন হতো, তাঁর অভিমত এই রকমই। হতে পারে নিজেকে আড়াল করার একটা চেষ্টাও এখানে আছে। অনেক জায়গাতে নিজের লেখার যে ব্যাখ্যা তিনি দেন, তা যথেষ্ট নয়, কোথাও কোথাও গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিশেষ করে সাহিত্যের মর্মসন্ধানে। (যেমন, ‘জীবনদেবতা’, বা ‘শাজাহান’ কবিতা নিয়ে তাঁর মন্তব্য)। তা হলেও গল্পকে তাঁর অগ্রাধিকার দেবার বিষয়টি হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভাষার দায়িত্ব এখানে তার যোগ্য বাহন হয়ে ওঠা গল্পকে বেগবান করা এবং তার অন্দরমহলের ও বারমহলের সব খবর ঠিক ঠিক হাজির করা।
মানতেই হয়, চলিত ভাষার ব্যবহারে এই কাজ রবীন্দ্রনাথের কাছে অনেক সহজ হয়ে আসে। গল্প নিজের জায়গা-জমিতে ইচ্ছামতো চরে বেড়ায়। অন্য জমিতে যাতে ঢুকে না পড়ে, সে জন্যে যখন যেমন প্রয়োজন, তার রাশ টেনে ধরা যায়। ভাষার বাজে খরচ হয় না। গল্পও পুরোপুরি আত্মনিষ্ঠ থাকতে পারে; ভাবনা-চিন্তা এদিক-ওদিক ছড়ায় না, অথবা বিকল্প কোনো সম্ভাবনার দিকে ছোটে না। গভীরে দৃষ্টি দেওয়াও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তার অবকাশ তেমন জোটে না; জুটলেও গল্প নিজেই তা নেয় না। একটা ফল এই দাঁড়ায়, গল্পের বেধ আর আগের মতো প্রশস্ত থাকে না, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কমিয়ে ফেলা হয়। উপন্যাসের বহুমাত্রিক বিস্তারের সম্ভাবনা অনেকখানি ক্ষুণ হয়।
ঘরেবাইরে আর চার অধ্যায়ের দিকেই প্রথমে দৃষ্টি দিই। কোথাও কোনো অতিকথন নেই। ভাষার গতি সহজ-স্বচ্ছন্দ। গল্পের টেনশনও তাতে ধরা পড়ে ঠিক। আর এই ভাষার যে দিপ্তি, তা আমাদের চেতনায় আলো ছড়ায়। কোথাও কোথাও ভাবের সংঘর্ষে, চকমকি পাথরের ঠোকাঠুকির মতো, আগুনও জ্বলে। কিন্তু উপন্যাস প্রধানত, এবং প্রবলভাবে গল্পকেন্দ্রিকই থেকে যায়। চেতনায় তার প্রসারণ খুব ঘটে না। ঘরেবাইরে¬তে বিষয় উপস্থাপনের যে ছক বেছে নেওয়া হয়েছে, তা কাঠামোগতভাবেই আত্মনিবেশী। মুক্ত পরিমণ্ডল আপনা থেকে তাতে ছায়াপাত ঘটায় না। ঘটনা ও চিন্তার বহুবিধ অভিক্ষেপের পথ তেমন খোলা থাকে না। বিমলা, নিখিলেশ ও সন্দীপের চোখ দিয়ে যেটুকু যা দেখা। ঘটনার মূলও সেখানে। এতে চিন্তার সূত্রগুলো আলাদা আলাদা চিনে নেওয়া যায়। মননের রূপ ও লাবণ্য আমাদের মুগ্ধ করে। সংঘাতের আশঙ্কায় বিচলিত থাকি। বিপর্যয় বিষণœতা ছড়ায়। ক্রিয়ায়-প্রতিক্রিয়ায় চিন্তা ও ঘটনা একে অন্যে জড়া-জড়ি করে চলে। কিন্তু তার সবটাই ওই বৃত্তের ভেতরে। এবং চলিত ভাষার দ্রুত চাল তাতে অনিবার্য গতি আনে। গল্পের পরিণতি আমাদের মন স্পর্শ করে। এবং তা ওই গল্পের সীমা মেনে নিয়েই। এখন প্রশ্ন হলো, উপন্যাসের লক্ষ্য কি শুধু ওই পর্যন্তই? একটু রয়ে-সয়ে, আরো গভীরভাবে চারপাশের সবটুকু নিরাসক্ত দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখাও কি তার কাজের ভেতরে পড়ে না? যদি পড়ে, তবে তা কি ঘরেবাইরের কাহিনী-বিন্যাসের ছকে খাপ খায়? তার চলিত ভাষার অপ্রতিরোধ্য প্রবাহও কি তাকে তার প্রাণস্পন্দনসমেত ঠিক ঠিক মেলে ধরে? একই প্রশ্ন উঠতে পারে চার অধ্যায় নিয়েও। চোখের বালি বা গোরা শিল্প সামর্থের যে উচ্চতায় উপন্যাসকে নিয়ে যায়, পরে চলিত ভাষায় লেখা তাঁর কোনো উপন্যাসেই তা সম্ভব হয়নি। সামূহিক বাস্তবতায় জীবন-জিজ্ঞাসার ও জীবন-ভাবনার ভার ও ধার এক সমন্বিত আয়োজনে বয়ে নিয়ে যেতে প্রমিত হলেও চলিত ভাষা কি একটু ঠুনকো এবং সে কারণে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে? বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলেও আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় সেরা উপন্যাস সব সাধু ভাষায় লেখা। পথের পাঁচালী, পুতুলনাচের ইতিকথা বা হাঁসুলিবাঁকের উপকথার বর্ণনাভাগ লেখা সাধু ভাষাতেই। গত ছয় দশকে অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে চলিত ভাষায়। আগের ওই উপন্যাসগুলোর মান কেউই স্পর্শ করতে পারেনি। চলিত ভাষার হালকা চাল কি উচ্চাভিলাসী উপন্যাসের সামগ্রিক দৃষ্টির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়?
শেষের কবিতা ভিন্ন ধরনের, ভিন্ন স্বাদের এক উপন্যাস। অসাধারণ এর ভাষার কারুকাজ। মেধাবী বুদ্ধিদিপ্ত কথার ছটায় আমরা প্রায় মন্ত্রমুগ্ধ। অমিত-লাবণ্যর কোনো কোনো উক্তি এখনো তরতাজা। কালকে পরাস্ত করে উচ্চারিত হয়ে চলে বারবার। এর গড়নও বলা যায় নিখুঁত। নির্মেদ ও মনোহর। কাহিনীর আকর্ষণ তীব্র। চুম্বকের মতো টেনে রাখে। তার পাত্র-পাত্রীরা সুরুচি ও সুশিক্ষার সঙ্গে হৃদয়ের শুদ্ধ অনুভব আত্যন্তিক সততায় অনায়াসে এক বিন্দুতে এনে মেলায়। আমরা চমৎকৃত হই। অকুণ্ঠচিত্তে উচ্ছ্বসিত সাড়া দিই। কিন্তু উপন্যাস হিসেবে শেষের কবিতা শূন্যগর্ভ। দেশকাল-সমাজের পটভূমি যেন পায়ের তল থেকে ক্রমাগত দূরে সরে। এক সময় তা অদৃশ্যে হারায়। মানব-মানবীরা মাধ্যাকর্ষণের বাইরে নিরবলম্ব ঝুলে থাকে। যদিও তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আমরা টের পাই। মায়ার খেলা অবশ্যই মোহ ছড়ায়। কিন্তু তা সবটাই ওপর ওপর। শিকড়ে কোথাও টান ধরে না। তেমন যদি না হয়, তবে চলিত ভাষার ব্যবহারের এমন শাণিত শীলিত আশ্চর্য বর্ণময় প্রদর্শনীও উপন্যাসের অপূর্ণতা ঘোচায় না। তাকে সার্থক করে না। কপালকুণ্ডলা লোকালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাচীনগন্ধী ভাষায় মানবজীবনে এক মৌল প্রশ্নের সামনে আমাদের রুদ্ধবাক দাঁড় করিয়ে দেয়। তার ভার আমাদের মনের ওপরে চেপে বসে। আমরা তাকে এড়াতে পারিনা। কিন্তু শেষের কবিতা চলমান জীবনের নাট্যমঞ্চ থেকে সবার বোধগম্য অতি সাবলীল, অতি মনোহারী চলিত ভাষায় যে ভাব-পরিমণ্ডল রচনা করে তা কোনোভাবেই জীবনসংলগ্ন থাকতে চায় না। প্রাত্যহিকতার দাবি পেরিয়ে অতিরিক্ত পাওনার দিকে তার ঝোঁক। হোক চলিত ভাষা, তবু উপন্যাস কি এর উপযুক্ত মাধ্যম? বলা হয়, চলিত ভাষাতেই আমরা কথা বলি। তা জীবন্ত। তাতেই আমাদের জীবনচর্চার অকৃত্রিম প্রতিফলন। কিন্তু তেমন হয় কই? কথার পিঠে কথার ঝাঁক। কাগজের ফুল যেন সব। আশ্চর্য বর্ণময়। কিন্তু জীবনেও স্বেদের গন্ধ নেই। লোনা স্বাদ জড়িয়ে নেই। কথামালা আকাশে ওড়ে। মাটির কাছাকাছি হতে চায় না। অথচ এই হতে চাওয়াটাই পাই বঙ্কিমের উপন্যাসে। পাই রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি, গোরা, চতুরঙ্গে। এ সবেতেই বর্ণনার ভাষা সাধু। জীবনের মুখোমুখি আমাদের যে তা দাঁড় করিয়ে দেয়, তাতে কোনো ভান থাকে না। আমরাও তার ভেতর পর্যন্ত দেখতে চাইলে দেখতে পাই। সবই উপন্যাসের পরিমণ্ডলে।
আমরা দেখেছি, আলাল বা হুতোম বাংলা উপন্যাসে সম্ভাবনার একটা পথের সূচনা করেছিল। অনেকদিন সে পথে কেউ যায়নি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সবুজপত্রের ঢেউ এসে লাগার পর ওই পথের দিকে আবার অনেকে ফিরে তাকায়। তাতে চলাচলও শুরু হয়। ভাষাকে সহজ করায় ও পাঠককে তার জাদুতে গল্পে সম্মোহিত করে রাখায় অবশ্য এর ভেতরে অসামান্য সফলতা দেখিয়েছেন শরৎচন্দ্র। অনেকটা ইংরেজি সাহিত্যে ডিকেন্সের মতো। কিন্তু তিনি সাধু ভাষার ছাঁচ ভাঙেননি। মুখের ভাষার চাল ও বোল তিনি সাধু ভাষাতেই ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর লেখা যে সাধু ভাষায় এটা কারো খেয়াল করার প্রয়োজন করে না। কিন্তু এবার চলিত ভাষা সরাসরি সাধু ভাষার জায়গায় চলে আসতে থাকে। প্রমিত-চলিত ভাষাও মুখের ভাষার দিকে ঝোঁকে। প্রচুর আঞ্চলিক-স্থানীয় শব্দ ও আনুষঙ্গিক কথ্যরীতি বাঁধ ভেঙে অবলীলায় মূল ধারায় ঢুকে পড়ে। তাতে অনেক কিছু তাদের মিশেও যায়। এটা বাংলা গদ্যের প্রণশক্তিরই পরিচয়। নিজের প্রকাশক্ষমতা তার বাড়ে। বহুরূপী হবার সুযোগও তার ঘটে। এমনকি স্বেচ্ছাচারী। ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক কথ্যরীতি ভাষায় অসংকোচে দাপিয়ে বেড়ায়। এটা যেন ডেকে হেঁকে আলাল-হুতোমকে ফিরিয়ে আনা। তবে শুধু কলকাতার অশোধিত ভাষাই নয়, বাংলার যে-কোনো অঞ্চলের অনুরূপ অমার্জিত ভাষাই নিজেকে জাহির করার সুযোগ পায়। ভাষার কৃত্রিমতার খোলস আরো শিথিল হয়ে পড়ে। তাতে হাততালিও জুটতে থাকে প্রচুর। বাংলা ভাষা তার প্রকৃত বাস্তবতায় প্রকাশমান হচ্ছে। এই ভেবে সঙ্গত প্রত্যাশায় উৎফুল্ল হন কেউ কেউ। তার বিচিত্র বৈভব মুগ্ধতা জাগায়। তবে তার কাণ্ড কিন্তু এতে আরো শক্ত মজবুত হয়ে ওঠে না। শালপ্রাংশু হবার সম্ভাবনা তার বাধা পায়। সঞ্চারিণী পল্ল¬বিনী লতার মতো বরং তা বেড়ে উঠতে চায়। থোকায় থোকায় তাতে ফুটতে থাকে রঙ-বেরঙের ফুল। এর ছাপ পড়ে উপন্যাসেও। তার ভালো হয় কি তাতে? প্রশ্নটি একেবারে অনর্থক মনে হয় না।
প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে মুখের ভাষার অনর্গল ব্যবহারের এক পরোক্ষ পরিণাম, আমাদের ভাবনা-চিন্তা-কল্পনা-বাসনা এগুলোও মুখের কাছে আটকে থাকতে চায়। জোর ধাক্কা না দিলে মাথায় গিয়ে কড়া নাড়ে না। স্বভাবগুণে আপনা থেকে স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে আসে। বুদ্বুদের মতো আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে যায়। যাঁরা পড়েন বা শোনেন, তাঁদের কাছে তা জলভাতের মতো সহজপাচ্য, ওই রকমই তার অকুণ্ঠ আয়োজন। কোথাও এতটুকু কাঁটা বিঁধে না। চিবুতেও তেমন হয় না। উপন্যাসের ভাষা হিসেবে এইটিই যে সাধারণ পাঠক-পাঠিকাদের বেশি পছন্দের হবে এবং এতেই যে তারা বেশি মজবে, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু সাহিত্যের দায় কি পুরোপুরি মেটে? বলার কথা অঙ্কুশহীন প্রকাশ করা যেমন তার একটা কাজ, তেমনি চিন্তাকে গভীরে নিয়ে গিয়ে অথবা দুর্গম অনভ্যস্ত পথে পরিচালিত করে বাস্তবের স্বরূপ উন্মোচন করা, এও তার আর একটা কাজ। ভাষা সবসময় মুখের কাছে লেপ্টে থাকলে তা কি এই দ্বিতীয়টির জন্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না? এমন কি উপন্যাসেও? জনতোষিণী যদি হয়, তবুও? দূরত্ব ও নৈকট্য, দুইয়ের ভেতর যোগসূত্র রচনা করা, যাপনীয় মানবজীবনে সম্ভাবনার ক্ষেত্র প্রসারিত করা, এও তার সত্যবদ্ধÑ এবং সত্যসন্ধওÑ কাজ। ‘কাছে ছিলে, দূরে গেলেÑ দূর হতে এসো কাছে’Ñ উপন্যাসেরও মূল সুর এইরকম। মুখের ভাষাতেই শুধু সওয়ার হলে তা অনেকটাই অধরা থেকে যাবার আশঙ্কা।
আরো একটা বিষয় ভেবে দেখবার। রবীন্দ্রনাথের সময় এটি মাথা তোলেনি। তখন ছিল সর্বজনগ্রাহ্য একক চলিত ভাষার রূপ নির্মাণের সাধনা। তাতে মোটামুটি সায় ছিল সব অঞ্চলের বাঙালির। কিন্তু মুখের ভাষার বিভিন্ন রূপ যদি সার্বভৌমত্ব দাবি করে স্বাধিকারপ্রমত্ত হয়ে উঠতে চায়, যার লক্ষণ কোথাও কোথাও যে এখন একেবারে চোখে পড়ে না তা নয়, তবে বাংলা ভাষার বিচরণভূমি যে নানা ফাটলে বিদীর্ণ হতে থাকবে না এর নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভাষা এককেন্দ্রিক না থেকে বহুকেন্দ্রিক হবার দিকে ঝুঁকতে পারে। কলকাতা, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম অথবা পুরুলিয়া কি কোচবিহার, ভাষার আলাদা আলাদা রূপবিন্যাস রচনাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। তাতে বাংলা ভাষার কাঠামোগতভাবে এককেন্দ্রিক না থেকে টুকরো টুকরো হয়ে বহু বহু কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব। সেখানে বিভিন্ন জায়গার মুখের ভাষা বা উপভাষা আপন আপন বলয়ে নিজের নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠাকেই বড়ো করে দেখতে পারে। চিন্তার ভাষার একমুখিনতাও তা হলে ভেঙে যায়। তার নৈর্ব্যক্তিক মমনশীলতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুখের ভাষার খণ্ড খণ্ড বৃত্তে দলা পাকিয়ে তা কেবল প্রত্যক্ষের প্রাথমিক স্তরেই হুটোপুটি করতে পারে। উপন্যাস সেখানে কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে দাঁড়াবে, মানবচেতনার কোন স্তর কেমন করে স্পর্শ করবে, এ প্রশ্নগুলোও তাহলে সামনে চলে আসে। একেবারে অবাস্তব নয় এরা। চারপাশের অনেক তৎপরতায় এর ইঙ্গিত মেলে।
তবে এসব কথা বলার মানে নয় মুখের ভাষাকে অবহেলা করা। সাহিত্যে, বিশেষ করে উপন্যাসে তারও একটা জায়গা আছে। এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কারণ উপন্যাস সমগ্রের প্রেক্ষাপটে জীবনের সারকথা ওই জীবনকে ঘিরেই বলতে চায়। সেখানে মুখের কথা অতিআবশ্যকীয় উপাদান। উপন্যাসের অন্তর্বয়নে বিষয়ভাবনার তাগিদেই তার  যথোচিত ব্যবহার অনেক সময় প্রাসঙ্গিক ও অতিশয় কাম্য। শিল্প সৃষ্টিতে তা পূর্ণতা দেয়। তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। কিন্তু মুশকিল বাধে, যদি এইটিই সর্বাঙ্গীণ হয়ে উঠতে চায়। কমলকুমার মজুমদার যাকে বলেছেন ‘খুকু গদ্য’ তার সরল, অস্ফুট, অন্তসারশূন্য ও পৌনঃপুনিক উচ্চারণ পাঠকমনে সত্য অনুভবের কোনো ভাবেই ঝঙ্কার তোলে না, বরং তাকে সহজ পাঠের তরল তমি¯্রায় ডুবিয়ে রাখে। জীবনের কথা সেখানে প্রাণের গভীর আকুতি হয়ে ফোটে না। ফলে তা শিল্পও হয় না। কমলকুমার তাই প্রায় দানবিক ক্ষমতায় তাঁর অন্তর্জলী যাত্রায় একরকম হাতুড়ি বাটালি ছেনি দিয়ে কেটে কেটে, চেঁছে চেঁছে তাঁর ভাষার শিল্পকাঠামো নিজেই তৈরি করে নেন। মুখের ভাষা, এমনকি অন্ত্যজ মানুষের জীবনশাসিত ভাষাও বাদ যায় না। কিন্তু তা তিনি গেঁথে দেন কালের চলচ্চিত্রে এক স্থিরবিন্দুতে দৃষ্টি রেখে আদিম প্রাণের মৌলিক আকুতির তান্ত্রিকসুলভ উচ্চারণে। তা নিরাসক্ত; কিন্তু মায়ার অভিসারী। ভাষাতে মিশে যায় অতীত ও বর্তমান, ব্রাহ্মণী ও চণ্ডাল। সাধু ভাষাতেও তিনি ছবি এঁকে চলেন আশ্চর্য দক্ষতায়। এবং তা শিল্প হয়। কারণ জীবনের শুদ্ধসত্ত্ব অনুভব তাতে উদ্ভাসিত হয়ে চলে।
তবে শিল্পের চাহিদা মেটাতেÑ বিষয়-বিষয়ী অভেদ একৈকান্তিক করে তুলতেÑ মুখের ভাষাও প্রয়োজনে হয়ে উঠতে পারে যথার্থ প্রতিনিধি। প্রমিত ভাষার সীমা পেরিয়ে তা আশ্রয় করতে পারে প্রকৃতকে। এতে সে কোটরবাসী হয় না, বরং কোটরের খোলস ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে। এমনই তার আয়োজন হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখিতে। অজপাড়াগাঁয়ের অখ্যাত অবজ্ঞাত অনামী গৃহবধূর ভূমিকায় পরিপূর্ণ বিশ্বস্ত থেকেও এই উপন্যাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে নারী তার জীবনের কথাÑ তার অন্তর্লোক ও বহির্লোক দুটোর কথাইÑ নিখাদ সরলতায় বলে যায়, তাকে তার অখণ্ড সত্তার মর্মবাণীতে প্রাণময়ী ব্যক্তিত্বময়ী করে দেখায় দেখানোয় এই ভাষা স্বয়ং ওই ব্যক্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য ও অতুলনীয় উপাদান হয়ে উঠেছে। শিল্পীর প্রত্যক্ষণের বিষয় যে স্বয়ং আত্মস্বরূপে বিষয়ী হয়ে ওঠে তাকে আমরা আলাদা করে চিনে নিই অনেকখানি ওই ভাষার গুণেই। এ কোনোক্রমেই আঞ্চলিক-গ্রাম্য-মুখের ভাষাকে জাহির করা নয়; প্রমিত ভাষাকে তাল ঠুকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়াও নয়। ওইভাবে ভাষার নির্মাণে শিল্পপ্রতিমা আমাদের চেতনায় সর্বতোভাবে বিশ্বাসযোগ্যা ও পরিপূর্ণরূপে বাস্তব হয়ে ওঠে, এইটুকুই যা বলবার। ছান্দোগ্য উপনিষদে পিতা আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে শেখান, বিশাল বটগাছের অতিক্ষুদ্র ফলে যে প্রণময় সত্তা, তার অর্থাৎ পুত্র শ্বেতকেতুর ভেতরেও তাই, এবং গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সকল প্রপঞ্চে তারই প্রকাশ। দর্শনে বা বিজ্ঞানে এই বার্তা ও তার কার্যকারণ সূত্রের যৌক্তিক বিন্যাসই যথেষ্ট। কিন্তু শিল্পে-কথাসাহিত্যে বটবৃক্ষের ওই ফুলকে তার ক্ষুদ্রতায় ও সজীবতায় তার আপন সত্তার সমগ্রতায় সত্য করে তুলতে হয়। একই সঙ্গে তাকে চারপাশের প্রাণপ্রবাহে রূপে রূপে প্রতিরূপে মেলাতে হয়। আগুনপাখির ওই নারীর ভাবরূপে প্রাণ প্রতিষ্ঠাও ওই রকমই। এবং তাতে এক মৌল উপাদন তার মুখের ভাষা। এটা না থাকলে তার সৃষ্টিকল্পনা পূর্ণতা পেত না। তার শিল্পরূপে শূন্যতা থেকে যেত। মুখের ভাষার প্রয়োগ অতএব এখানে এই বিশেষ উপন্যাসের শিল্প সার্থকতার প্রয়োজনে। কোনো সাধারণ বক্তব্য তুলে ধরার জন্যে নয়। তারপরেও মুখের ভাষার সৃষ্টিশীল ব্যবহারে আগুনপাখি¬ অনন্য। এবং উপন্যাস হিসেবে এরও দাবি, মনে হয়, কালকে পরাস্ত করা, যেমন ছিল ভিন্নতর প্রেক্ষিতে ও ভাষার ভিন্নতর পরিমণ্ডলে অন্তর্জলী যাত্রার।
রবীন্দ্রনাথ কিন্তু উপন্যাসে ভাষাকে মুখ্যত মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। নিজে সে বিষয় হয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করুক, অথবা বিষয়ে অঙ্গিভূত হোক, এটা তাঁর সমর্থন পায়নি। তবু মাধ্যম হিসেবেই বিষয়ের প্রতি তার বিশ্বস্ত থাকাকে তিনি অপরিহার্য মনে করেছেন। নিজেও উপন্যাস রচনায় এ বিষয়ে সচেতন থেকেছেন। তারপরও মনে হয়, তাঁর সাধু ভাষার ব্যবহার বিষয়ের গভীরতা ও গাম্ভীর্য যতটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে, প্রমিত চলিত ভাষা ততটা পারেনি। চলিত ভাষার আপেক্ষিক চপলতা এখানে কি অন্তরায় হয়েছে? নিজেও যে সে ক্রমাগত নিজের ওজন কমিয়ে হালকা হবার ওপর জোর দিয়েছে Ñ সমাজই সেইভাবে তাকে চালিত করেছেÑ এও কি তার ধারণক্ষমতা কমিয়েছে? ভাষার বেধ যদি হ্রাস পায়, পাতলা কাগজের মতো যদি হয় তার দশা, তবে বহুস্তরীয় বহুমাত্রিক ভাবনার আয়তনিক গুরুত্বের সঙ্গে তা খাপ নাও খেতে পারে। উপন্যাসের তাতে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ার আশঙ্কা। সমস্যাটি কিন্তু চোখে পড়ছে আজ য়োরোপ-আমেরিকার উপন্যাস সাহিত্যের বেলাতেও। সেসব জায়গায় উপন্যাস ভেতরে যত ফাঁপা হয়ে পড়ছে, তত বাইরের নানা উপকরণে নিজের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। প্রতœবিদ্যা, ভ্রমণকথা, কল্পবিজ্ঞান, জাদুবাস্তবতা Ñএগুলো ভর করছে উপন্যাসে। তার উনিশ বা বিশ শতকের মর্যাদা কিন্তু তাতে ফিরে আসছে না।
[

[ফিরে দেখা : রবীন্দ্রনাথ ॥ বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০১২ থেকে মুদ্রিত]