Archives

কী লিখি কেন লিখি ৬

আজ থেকে আনুমানিক পনের বছর আগে নজরুল ইনস্টিটিউট আয়োজিত এক কবিতা পাঠের আসরে একজন ভক্ত শ্রোতার সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি আর কি লেখেন? পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ। তিনি আমার হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যা যা লিখতেন ইনিও তার সবই লেখেন। সে মুহূর্তে একটু অপ্রতিভ হয়েছিলাম। মজিদ মোটামুটি ঠিকই বলেছিলেন। ঠাকুরের মতো অনেক ধরনের সাহিত্যই লিখি আমি, কেবল নাটক ছাড়া।
প্রথমে কবিতার কথা বলি। কবিতা দিয়েই তো আমার সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়েছিল। আরম্ভটা বোধ হয় কোনো-না-কোনো মুগ্ধতা থেকে হয়। নিজেকে আবিষ্কারের অন্তঃপ্রণোদনা থেকে লেখা-লেখির সূত্রপাত ঘটে! তারপর সামনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয় মাথায়। হৃদয়ে কতো রকম অনুভূতি যে হয় তার শেষ আছে? একজন কবিমানুষ সেসব ধরতে চান তার লেখায় অর্থাৎ কবিতায়। এমন অনেক অনুভব-আবেগ-সংবেদ আছে যেগুলোকে চেহারা দিতে হয় শুধু কবিতায়। গল্পে বা অন্য ধরনের গদ্যে সেগুলো সাকার করে তোলা যাবে না তা নয়, কিন্তু কাব্যই হচ্ছে সেসব অনুভব প্রকাশের যোগ্যতম স্থান। কাজেই ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কবিতার কোনো বিকল্প নেই। আর এখন, অনেককাল যাবৎই, এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো দুটি কারণ। ১. অভ্যস্ততা ২. প্রয়োজনের তাগিদ।
কবিতা প্রসঙ্গে আমার বাইন মাছের কথা মনে পড়ে। বাইন মাছের একে তো আঁশ নেই, তার ওপর ভীষণ পিচ্ছিল। ছাই দিয়েও তাকে আটকানো যায় না অনেক সময়। কবিতা ওই বাইন মাছ। জোৎস্নারাতে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় বনদেবী। কী তীব্র তার হাতছানি, কী মোহময় তার পা ফেলার ভঙ্গি! তার মুখমণ্ডল ভালো করে দেখা যায় না। তার খুব কাছে পৌঁছার আগেই সে উধাও। আবার একঝলক দেখা যায় অদূরে ঝোপের পাশে। দৃষ্টিনন্দন দেহভঙ্গি, আলোলিত চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! কবিতা ওই পূর্ণিমা রাতের বনদেবী!
পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময় যাবৎ কবিতার সঙ্গে আছি। কাব্য নিয়ে থাকা মানে কুয়াশাগ্রস্থ থাকা, এক রকম আচ্ছন্নতার মধ্যে থাকা। কবিতার মতো এতোটা কুহকপ্রধান, এতোটা আলো-ছায়াভরা শিল্পমাধ্যম পৃথিবীতে আর নেই, আমার এমনটাই মনে হয়। কবিতা আমাকে সুনাম দিয়েছে। নিন্দার কাঁটাও কম হজম করিনি কবিতাকে ভালোবেসেই। এই কবিতাই আমার ব্যক্তিগত বিষাদকে উসকে দিয়েছে অসংখ্যবার। তারপরও কবিতাকে আঁকড়ে আছি কেনো? আদৌ আর কবিতা লিখবো না এমন ভাবতে পারছি না কেনো এখনো? তার কারণ কবিতা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেক কিছুই তো লিখি। কিন্তু কেবল কবিতা লেখার ভেতর দিয়েই আমার সৃষ্টিশীল নিঃসঙ্গতাকে উদ্যাপন করতে পারি, আমার অনুভূতিরাশি কতোখানি প্রকাশ করতে পেরেছে আমারই প্রযুক্ত শব্দমালা! তাই, আবার, কবিতা না লিখে থাকতে পারি না।
এবার গদ্যের প্রসঙ্গ। আমার প্রথম গদ্যপ্রয়াস ছিলো একটি ছোটগল্প। ১৯৮১ সালে ‘দরজা’ নামের গল্পটি পত্রস্থ হয় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’য়। ষাটের দশকের কবি ও সম্পাদক, পণ্ডিত রণজিৎ পাল চৌধুরী (রণপা চৌধুরী) ছিলেন তখন ওই দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক। মনে আছে তার বছরখানেক পর একই কাগজের জন্য লিখেছিলাম একটি প্রবন্ধ, আবুল হাসানের ওপর। যতোদূর মনে পড়ে ওটাই আমার প্রথম প্রবন্ধপ্রয়াস। পুরো দু’পৃষ্ঠার সাহিত্য সাময়িকী তো আর শুধু কবিতা ও রিভিউ জাতীয় লেখা দিয়ে ভরানো যেতো না। সেজন্য দরকার ছিলো অনেক অনেক মুদ্রণযোগ্য গদ্য রচনা। কবিতার পাশাপাশি তাই, মাঝেমাঝে আমি গল্প/প্রবন্ধ ছাপতে দিতাম ‘দৈনিক বার্তা’য়। পরে, ততোদিনে আমি ঢাকায়, ১৯৮৭/৮৮ আমার প্রবন্ধ নিয়মিত বেরুতে শুরু করলো একাধিক জাতীয় দৈনিকে। তার পেছনে চিন্তামূলক গদ্য লেখার অন্তর তাগিদ যেমন ছিলো তেমনি ছিলো দুটো পয়সা উপার্জনেরও গরজ। কেননা সেসময় আমি ছিলাম বলা চলে অর্ধবেকার। গল্প, প্রবন্ধ, আলোচনা, বই পর্যালোচনা, স্মৃতিকথা, উপন্যাস—এই-যে বিচিত্র রকম গদ্যের নিরবিচ্ছিন্ন চর্চায় লিপ্ত আমি দীর্ঘকাল, তার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে পয়সা প্রয়োজন। কে না জানে গদ্যের সঙ্গে টাকার একটা সম্পর্ক আছে। ন্যূনতম যোগ্যতা নিয়েই তো একজন কবিযশোপ্রার্থী তরুণ গদ্য লিখতে আরম্ভ করেন। কেউ কেউ হয়তো নিছক পার্থিব প্রয়োজনে শুরু করেন না; কিন্তু লিখতে লিখতে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই তার গদ্যের উন্নয়নের দিকে—তার শাব্দিক ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের দিকে দিকে মনোযোগী হন। সাধ্যমতো ওস্তাদী অর্জন করেন। আমার বেলায়ও তাই হয়েছে। আর আমার ছোটগল্প ঢাকাস্থ পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত বেরুতে থাকে নব্বইয়ের দশকে।
কবিতার সঙ্গে আবেগের এবং অন্তঃপ্রণোদনার সম্পর্ক অতি নিবিড়। কথাসাহিত্যের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ভাব জীবনের বহুরূপী বাস্তবতার। আর প্রবন্ধের সঙ্গে যুক্ত লেখকের ব্যাপক পাঠ অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধি। জীবনের অভিজ্ঞতাও এতে নতুন মাত্রা যোগ করে বৈকি। কিন্তু চিন্তাপ্রধান রচনার ক্ষেত্রে সেটা গৌণ বিষয়।
ভেবে দেখেছি, অনেক বছর একত্রে বসবাস করা হয়ে গেছে এমন পরীক্ষিত স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর যে সম্পর্ক, কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখন সেরকম। সম্পর্কটা খুব মধুর নয়, আবার দ্বন্দ্বময়ও নয়। সম্পর্কটা আসলে অম্লমধুর। কাব্যের মতো বিষয়কে যারা জীবনের ধ্র“বতারা বলে মেনে নিয়েছেন তাদরে মনোবেদনা অন্তহীন। এই যে, সৃষ্টিশীল মুহূর্তগুলো অতুলনীয়। আর মানসম্মত কিছু লিখে উঠবার পরের অনুভূতি ঠিক অক্ষরে প্রকাশযোগ্য নয়। তাইতো সাহিত্যকরা লেখেন। নানান বাধা-বিপত্তির পরও লেখাটা চালু রাখের তারা। রেখেছি আমিও।