Archives

‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ : ফিরে দেখা ইতিহাস

‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ : ফিরে দেখা ইতিহাস

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে গাথা আছে অনেক বেদনালিপি। অনেক জীবন আর জীবনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আজ বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন। সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে পরবর্তী সময়ের অনেক গ্রন্থে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই ঘটনাক্রম ও ইতিবৃত্ত নিয়ে তখনকার পত্র-পত্রিকায়ও অনেক লেখালেখি হয়েছে। শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ এক্ষেত্রে অন্যতম একটি পত্রিকা। পত্রিকাটিতে অন্যসব লেখার পাশাপশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড খণ্ড বিচিত্রা উঠে আসতো। অনেক প্রাবন্ধিক তখনকার দিনে পত্রিকাটিতে নিয়মিত লিখতেন। যে সব লেখালেখি চলে গেছে অনেকের অগোচরে। নবীন প্রজন্মের অগোচরে তো বটেই। কিন্তু আমাদের সমাজেই কিছু চোখ আছে যে চোখ ইতিহাসকে বারবার ফিরে দেখে। অন্যকে দেখার আহ্বান জানায়, উদ্বুদ্ধ করে। অধ্যাপক ও গবেষক মুহাম্মদ হাসান ইমামের (জ. ১৯৫৬) সচেতন সেই চোখ ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রার’ পাতায় পুনর্নিবদ্ধ হয়ে নতুন প্রজন্মসহ পুরো বাংলাদেশকে আবার ফিরে দেখার আহ্বান জানায়, ‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ নামে।
‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ হাসান ইমামের সংকলিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ। এর ভিত্তিভূমি ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকা। লেখকের সম্পাদিত গ্রন্থটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেন্দ্রিক খণ্ড খণ্ড চিত্র উঠে এসেছে। ১৯৬ পাতার গ্রন্থে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রার’ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের মোট ২৫ টি খণ্ডচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। হাসান ইমাম তাঁর এ গ্রন্থে প্রথম বর্ষের ২০টি, দ্বিতীয় বর্ষের ৪টি ও তৃতীয় বর্ষের ১টি প্রবন্ধ সংকলিত করেন। তবে সেগুলোর সবই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর মধ্যে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রায়’ প্রকাশিত।
লেখকের এ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধটির প্রাণকেন্দ্রে আছে একজন মার্কিন কন্ঠশিল্পীর কথা। সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রথম বর্ষের চতুর্থ সংখ্যায় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এ প্রবন্ধটি হাসান ইমাম গ্রন্থভুক্ত করেছেন। প্রবন্ধটি পাঠ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সচেতন বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোল ফিল্ড হাউসে মার্কিন শিল্পী জোন বেয এর কন্ঠে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের কথা। পনের হাজার দর্শকের সামনে জোন বেয গানে গানে তুলে ধরেন বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি মানুষের হৃদয়ের কথা। সেদিনের সেই গান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বুঝতে পারে বাংলাদেশ বিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক নয়। তারা জোন বেয এর গানে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করে। মুহম্মদ হাসান ইমাম তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে বিষয়টিকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন বিচিত্রার আলোকে।
গ্রন্থটিতে আর যে সব প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে সেগুলোকে মোটামুটি তিনটি পর্বে বিভাজন করা যেতে পারে। তা হলো- ১. যুদ্ধ-সংগ্রামের ইতিবৃত্ত ও স্মৃতিচারণমূলক ২. ব্যাক্তিজীবনভিত্তিক এবং ৩. সাধারণ চিন্তাচেতনামূলক।
যুদ্ধ-সংগ্রামের ইতিবৃত্ত ও স্মৃতিচারণমূলক যে সব প্রবন্ধ লেখক এ গ্রন্থের আলোকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন সেগুলোর মধ্যে আছে- “চট্টগ্রামে প্রতিরোধ : বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র”, “যুদ্ধের ডাইরী,” “একটি বিষাদময় স্মৃতি- আমি স্যাবরের শব্দ আর শুনতে চায় না”, ”চিলমারী রেইড”, “১৬ই ডিসেম্বরের স্মৃতি”, “এবোটাবাদ থেকে দেবীগড়”, “সম্মুখ সমরে বাঙ্গালী”, “মহানাটকের শেষ”, “সংগ্রামের এক প্রান্তর- ১,” “সংগ্রামরে এক প্রান্তর- ২,” “সেকেন্ড বেঙ্গল রেজিমেন্ট, মার্চ, ১৯৭১”, “ভুলি নাই! ভুলি নাই! ছাব্বিশে মার্চ ১৯৭১”। “চট্টগ্রামে প্রতিরোধ : বিপ্লবীবেতার কেন্দ্র” প্রবন্ধটি মেজর এম.এস. ভুঁইয়ার লেখা। এটি বিচিত্রার প্রথম বর্ষের সপ্তম সংখ্যায় ২৯ জুন ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিঝরা দিনের কাথা বলতে গিয়ে লেখক চট্টগ্রামের মাটিতে পাকবাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। এটি মূলত এম.এস. ভুঁইয়ার ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার অংশভাগ। “যুদ্ধের ডাইরী” মেজর আমিন আহমদ চৌধুরীর লেখা প্রবন্ধ। এখানে স্মৃতিময় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যুদ্ধ পরিস্থিতির দিনগুলোর কথা। পাশাপাশি আছে বিশ্ব ইতিহাসের ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাকে স্মরণ। “একটি বিষাদময় স্মৃতি-আমি স্যাবরের শব্দ আর শুনতে চাই না” নামে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয় বিচিত্রার ২১তম সংখ্যায়। হাসান ইমামের মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র গ্রন্থে এটির লেখকের নাম পাওয়া যায় না। তবে এ স্মৃতির লেখায় উঠে আসে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের স্ত্রী মিলি রহমানের আর্তনাদের কথা। মিলি রহমান চিৎকার করে বলেন, আমি আর স্যাবরের শব্দ শুনতে চাইনা। কেননা এ শব্দে তাঁর স্বামীর নিহত হওয়ার স্মৃতি ভেসে ওঠে। “চিলমারী রেইড” গ্রন্থের পরের প্রবন্ধ। এটি লে.কর্নেল এম আবু তাহেরের লেখা। এখানে উত্তর বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দরে পাকবাহিনীর ঘাটি রেইড দেয়ার কথা উঠে এসেছে। “১৬-ই ডিসেম্বরের স্মৃতি” প্রবন্ধে আছে যুদ্ধজয়ের ইতিকথা। এটি হুমায়ুন আজাদের স্মৃতিচারণমূলক লেখা। “এবোটাবাদ থেকে দেবীগড়” লিখেছেন লে. কর্নেল এম.আবু তাহের। এখানে লেখকের স্মৃতির কথামালা ভাষা পেয়েছে। “সম্মুখ সমরে বাঙ্গালী” লিখেছেন আমিন আহমদ চৌধুরী। এখানে অনেক ইতিহাসের সাথে লিপিবদ্ধ হয়েছে দুটি যুদ্ধের শহীদ ও নিখোঁজদের তালিকা।
“মহানাটকের শেষ অঙ্ক” লিখেছেন আবদুল হক। এখানে স্বাধীনতার অবশ্যম্ভাবী প্রতিবেশ উঠে এসেছে। একাত্তরের ডিসেম্বরের দিনলিপির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় “মহানাটকের শেষ অঙ্কে”। “সংগ্রামের একপ্রান্তরে” লিখেছেন মেজর জাফর ইমাম। বিচিত্রার দুটি সংখ্যায় তিনি একই শিরোনামে দুটি লেখা লিখেন যা ‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। “সেকেন্ড বেঙ্গল রেজিমেন্ট, মার্চ ১৯৭১” মেজর সফিউল্লাহ’র লেখা। এটি বিচিত্রার ২য় বর্ষের ৪৩ তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এখানে গাজীপুরের ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কথা উঠে এসেছে। কর্নেল আমিন আহমদ চৌধুরীর লেখা আর একটি প্রবন্ধ “ভুলি নাই! ভুলি নাই! ছাব্বিশে মার্চ ১৯৭১”। এখানে ভয়াবহ যুদ্ধের প্রথম প্রহরে পাকবাহিনীর আক্রমনের আকস্মিকতার কথা ভাষা পেয়েছে।
‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে ব্যক্তিজীবনভিত্তিক যেসব লেখা বিচিত্রার আলোকে গ্রন্থীভূত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- “স্বাধীনতা সংগামে এস.ফোর্স ও কর্নেল সফিউল্লাহ,” “স্বাধীনতা যুদ্ধে ৭ নম্বর সেক্টর ও কর্নেল জামাল,” “শহীদ লেফটেন্যান্ট সামাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী,” “আমি কাদের সিদ্দীকি বলছি,” “বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর” এবং “উই স্যালুট মেজর হায়দার”। ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের দিনে এসব মানুষের মহত্ব ও ত্যাগের কথা উঠে আসে ব্যাক্তির জীবনকেন্দ্রিক এসব প্রবন্ধে। মুহম্মদ হাসান ইমাম গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে বিচিত্রার এসব প্রবন্ধ তাঁর গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে এমন কিছু লেখনি সংকলিত হয়েছে যেখানে যুদ্ধ-সংগ্রামের পরিস্থিতিতে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত ও প্রেরণাদানের কথা উঠে এসেছে। আবার কখনো এসেছে বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষার কথা। এ জাতীয় লেখাগুলো হচ্ছে- “চরমপত্র,” “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বাংলাদেশ,” “একটি জাতির জন্ম,” “জনতার একজন হিসাবেই যুদ্ধ করেছি,” “আপনারা আমার জনগণের বাহিনী”। “চরমপত্র” প্রবন্ধে উঠে এসেছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চরমপত্র পাঠের কথা। “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বাংলাদেশ,” নামক প্রবন্ধে মাহফুজউল্লাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা এ দেশে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ চালিয়েছে তাদের বিচারের কথা বলেছেন। “একটি জাতির জন্ম” মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের লেখা প্রবন্ধ। তাঁর মতে, যেদিন ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়, সেদিন থেকে জন্ম হয়েছে বাঙালি জাতির। এরপর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তার পরিপূর্ণতা ঘটে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ লিখেছেন “জনতার একজন হিসেবে যুদ্ধ করেছি”। ‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে সংকলিত সর্বশেষ লেখাটি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর। “আপনার আমার জনগণের বাহিনী” নামক প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের নবগঠিত সেনাবাহিনীর নবীন ক্যাডেটদের জনগনের হয়ে দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ গড়ার নানাবিধ ঘটনা চিত্রিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র’ গ্রন্থে। যদিও এর সবগুলো লেখা তখনকার বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত তারপরও এগুলোকে গ্রন্থীভূত করে এক সঙ্গে প্রকাশ করা মুহম্মদ হাসান ইমামের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। কেননা দীর্ঘ সময় পর বাঙালির ত্যাগ ও গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড চিত্রগুলো একসঙ্গে প্রকাশ করে আজকের বাংলাদেশের কর্মচঞ্চল মানুষকে তিনি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর আহ্বান করেছেন। গ্রন্থটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি দলিল হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে।