Archives

দলিত চাঁদ

কুরবানি ঈদের গোল চাঁদটা তোরাব আলীর সামনের টেবিলে শোভা পাওয়া শত শত সোনা রুপোর মেডেল, ক্রেস্টের মত ঝলমল করছে। হাবু ঠোঁটের উপর চাঁদ বিছিয়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে। চাঁদ দেখে খক্ খক্ কাশির মত হাসতে থাকে অথবা হাসে নাজ্জএটাই তার কান্না। কাশির মত, হাসির মত হয়ত তার কান্না। ‘চাঁদটা কী গোল!’ ওর হাসির জল ঠোঁট বেয়ে শিশিরের মত ঝরতে থাকে বেগুনি ঘাসের উপর। রাত পেরুলেই ঈদ। সবার সাথে ত্যাগের মহিমা ভাগ করে নিতে গ্রামে এসেছে এম.পি. তোরাব আলী। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আতিকুল্লাহ হাইস্কুলের মাঠে আজ সারাটাদিন এম.পির মেডেল, ক্রেস্ট আর সোনার প্রতীক গ্রহণের অনুষ্ঠান চলেছে। অনুষ্ঠান শেষে কর্মীদের সাথে মতবিনিময়ে বসেছে তোরাব আলী। হাবু সারা দিন এ মাঠে বসে আছে। যেখানে মানুষের সমাগম হবে সে জায়গা ছেড়ে এক চুলও নড়বে না হাবু। এই স্কুল মাঠে কাল সাত সাতটা গরু কুরবানি দিবে তোরাব আলী। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক এরতাজ মিয়া এম.পি.কে উদ্দেশ্য করে বলে, স্যার আপনাকে প্রতিদিন রাতে দেখি।
কে যেন বলে ওঠে, স্বপ্নে?
Ñহা হা হা… হেসে ওঠে মজলিসের ভেতর থেকে কয়েকজন।
Ñটিভির টক শোতে। আপনি কত সুন্দর করে কথা বলেন! এরতাজ মিয়া আবার বলে।
Ñতাই না কি? আপনারা শোনেন? তোরাব আলী বলে। প্রসঙ্গ পাল্টে আবার সে এরতাজ মাস্টারকে বলে, মাস্টার সাহেব ওসব বাদ দেন। এখন বলেন স্কুলের খবর কী? এখন সব ঠিকঠাক মত চলছে তো?
Ñজি। এম.পি সাহেব। আর কোনো সমস্যা নাই।
এরতাজ মিয়া ছ’সাত মাস হয় প্রধানশিক্ষক পদে যোগ দিয়েছে। এর আগে হালিম মাস্টার প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সে তোরাব আলীরও সরাসরি শিক্ষক। বছরের পর বছর সেই তো তোরাবের স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফিস মওকুফ করিয়েছে। সে অনেক আগের কথা। তার কাছে কৃতজ্ঞ সে। কিন্তু তাকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে বাধ্য হয়েই হটিয়েছে তোরাব আলী। আসলে চেইন আব কমান্ড বলে একটি কথা আছে। অধীনস্থকে যদি কমান্ড করতে বিব্রত হতে হয় তবে ল-অব-অর্ডার বলে কিছু থাকে না। এলাকার স্কুল কলেজগুলোর আয় দিয়েই তো তোরাবের হা করে থাকা পাতিনেতাদের মুখ বন্ধ করতে হয়। ওরাই তো দলের শক্তিজ্জওদের বঞ্চিত করা যায় না।
Ñসামনে বার যদি নির্বাচনে জিততে পারি এলাকার চেহারায় পাল্টে দিব। তোরাব আলী তার মুখস্থ বুলিটা আরেকবার ছাড়ে।
Ñএম.পি সাহেব আমার একটা আরজ ছিল। দলের এক বয়স্ক কর্মী হাত তুলে দাঁড়ায়।
Ñএই তোমার আবার কী আরজ। এম.পির পি.এস চিৎকার করে ওঠে।
Ñআরে চিৎকার কর কেন? বলেন চাচা বলেন। তোরাব লোকটিকে অভয় দেয়।
Ñঈদের দিন তোমার বাড়িতে দাওয়াত খাব।
Ñএই কথা। স্কুলমাঠেই খানা হবে নামাজ পড়ে সোজা চলে আসেন।
Ñআরে তোমার আলিশান বাড়িটা দেখতে চাই। তোমার তিলোত্তমার দরজায় তো বিদেশি কুত্তা বসা। সারা বছর ঢুকতে পারি না। ঈদের দিন তো একটু ঢুকতে দিবা। তোমার হয়ে কাম করি এটুকু তো আবদার শুনবা। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীও তো ঈদের দিন সাধারণ জনগণকে বাসভবনে দাওয়াত করে। এলাকার এই মুরব্বিয়ানা লোকটা এভাবেই সবাইকে জ্ঞান দিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে। তাছাড়া যে নেতার হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে তার কাছে তো দাবি নিয়েই কথা বলবে। এমনই ধারণা তার। দলের নিবেদিত প্রাণ নিঃস্বার্থ কর্মী সে। দল করে চুল পাকিয়েছে কিন্তু দল থেকে তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা আজো নেয় নি। অবশ্য সুবিধা নেয়ার জন্য যোগ্যতা থাকা চাই। অন্যান্যদের এমনই ধারণা। এধরনের কর্মীদের দলের অন্যরা ভাঁড় বলে থাকে।
এ তো মুসিবতের কথা। গ্রামের অশিক্ষিত লোকজনের মুখে কিছু বলতে বাধে না। ভরা মজলিসে এমন আরজি করে বসল বুড়া। তোরাব আলী না করে কেমনে? মনটা বিষিয়ে ওঠে তার। এমনিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বেকাদায় আছে সে। হবে না তো কিছুই শুধু লোকজনের সামনে বেইজ্জত করে ছাড়বে।
Ñতোমার বাড়ির ভেতরখানা নাকি এক্কেবারে বেহেস্তখানা। নামটাও জব্বর, তিলোত্তমা। আমাদের দেখাইবা না? সবাই জিজ্ঞাসা করে এম.পি.র বাড়ির ভেতরে গেছস? বলি, দেখি নাই। তখন সবাই হাসাহাসি করে। বলে, এম.পি.র কাছের লোক হয়েও তার বাড়িতে একবার ঢুকার সুযোগ পাওনাই। কী বলি বলো এম.পি. সাহেব? কথাটা তো সত্য।
Ñচাচা তোমার জন্য আমার বাড়ির দোয়ার সবসময় খোলা।
হাবু তার ভাঙা পা লাঠির সাথে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, ‘হারাও যাবো, হারাও যাবো। হামাদের কি হক নাই? কাল তোমার বাড়িতে হামাদের সবার দাওয়াত। খিঁচ্চালাব। তালি তালি।’ এই বলে আরো জোরে জোরে হাততালি দিতে শুরু করে সে। তার পাগলামি দেখে মজলিশের অনেকেই হো হো করে হেসে ওঠে।
Ñচুপ কর বুড়া পাগলা। একজন দলীয় কর্মী বলে ওঠে।
তোরাব আলী বিব্রত হয়। ‘ঠিক আছে। বেনু, এদিকে আয়।’ তোরাবের সেরা চামচা বেনু দৌড়ে আসে।
Ñজি ভাই।
Ñমসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে দে। এবার ঈদে এলাকাবাসী আমার বাড়ি দেখার সুযোগ পাবে।
Ñঠিক আছে ভাইজান।
চারদিক থেকে করতালি শুরু হয়।

তোরাব আলীর বাবা মহসীন আলী নিতান্ত গরীব মানুষ ছিলেন। টিনের ছাদ আর ইঁটের গাঁথুনি দেয়া ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল তার। তোরাব আলীর রাজনীতি শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায়। হলে সিট দখলের রাজনীতি দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। ঢাকা শহরে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালানোর মত অবস্থা বাবা মহসীন আলীর কোনো দিনই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট না পেলে ঢাকায় টিকে থাকা তোরাব আলীর পক্ষে কোনো দিনই সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতা থেকে হলে সিটের দখল পাওয়ার জন্য রাজনীতির খাতায় নাম লেখায় সে। এরপর টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি কত কী যে করেছে ঢাকায়জ্জশুধুই টিকে থাকার জন্য। দশ বছর আগে এলাকায় ফিরে এলে তার দল তাকে পৌরসভা নির্বাচনের জন্য সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু তা গ্রহণ না করে নিজ দলের স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার হয়ে কাজ করে সে। এভাবে এলাকার রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় তোরাব আলী। আসলে রাজনীতির চালগুলো খুব ভাল বোঝে সে। এর দুবছর পরে এম.পি. নির্বাচনে দলের নোমিনেশনের জন্য অনেক দৌড়ঝাপ করে। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে তা পেয়েও যায়। নির্বাচনী প্রচারণা ও জামানতের টাকা জমা দেয়ার মত আর্থিক অবস্থা তার ছিল না। সে এলাকার লোকজনের কাছে নির্বাচনের জন্য অর্থ সাহায্য চায় আর এই বলে ওয়াদ করে যে, ‘আমি জয়ী হলে আপনাদের জন্য কাজ করব। আর যেদিন দেখবেন আমার বাবার টিনের চালে সিমেন্টের ঢালাই হয়েছে সেদিন বুঝবেন আমি দুর্নীতি করেছি।’ এলাকাবাসী তার আবেগপূর্ণ ভাষণ শুনে অভিভূত হয়। তারা তাকে কতভাবে যে সাহায্য করেছে! কৃষক তার বীজের জন্য জমানো টাকা থেকে সাহায্য করেছে, গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা তাদের হাতের বালা পর্যন্ত খুলে দিয়েছে। যা হোক সে তো ছয় বছর আগের গল্প। আজ শুনলে অনেকের এসব অলীক গল্প মনে হবে। সেই টিনের চালার বাড়ি কোথায় হারিয়ে গেছে। সেখানে এখন বিশাল ডুপ্লেক্স। বাড়ির মেঝেতে ইটালিয়ান সিরামিক, বৈঠকখানায় ইরানি কার্পেট, ডাইনিং-এ ঝুলছে বেলজিয়ামের ঝাড়বাতি, টয়লেটে সব আমেরিকান ফিটিংস। বাড়ির চারদিকে ফুলের বাগান। নাম না জানা দেশি বিদেশী ফুলের সমাহার রয়েছে সেখানে। বাড়ির পেছনে একটি ছোট্ট খাঁচায় দুটি চিত্রা হরিণও রয়েছে। তবে গ্রামের লোকজন এসব দেখে নি। শুধুই শুনেছে। এ বাড়িতে এখন আর কেউ সেভাবে বসবাস করে না। ঢাকা থেকে তোরব আলী ও তার পরিবারের লোকজন অথবা কেন্দ্রীয় কোনো নেতা এলে এখানে থাকে। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য রয়েছে বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার, বাবুর্চি, দারোয়ান, মালি। এরই মধ্যে গ্রামবাসির মধ্যে বাড়িটি নিয়ে অনেক গল্প চালু হয়েছে। অনেকে নাকি হুরসদৃশ নারীদেরও এ বাড়ির ছাদে, বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। তারা এদেশের নয়জ্জদূর কোনো দেশের, ইরান তুরানের হয়ত। অনেকে বলে বাদশাহ সাদ্দাদের প্রেতাত্মা তোরাব আলীরর উপর ভর করেছে। সেও সাদ্দাদের মত বেহেস্তখানা তৈরি করেছে। সঠিক পথ দেখাতে সাদ্দাদের কাছে তো আল্লাহ হুদ(আ.)কে পাঠিয়েছিলেন। তোরাব আলীর হেদায়েত করতে আল্লাহ কি কাউকে পাঠাবে না? গ্রামবাসী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এ কলি যুগে কেউ আসবে না। পাপদিন দিন বাড়তে থাকবে? এসব গল্প অলস রাতে গ্রামবাসীর বিনোদনের খোরাক যোগাচ্ছে বেশ ক’বছর ধরে।

ঈদের দিন আজ। গাঁয়ের লোকের মনে আনন্দ ধরে না। মাঠে নামাজ পড়ে ছেলে বুড়ো সবাই মিলে যাবে তোরাব আলীর বাড়ি। ভাল-মন্দ খাবে অতঃপর খিলান করতে করতে বাড়ি ফিরবে। হাবু সক্কালে উঠে পাগলা নদীর ঠাণ্ডা জলে গোসল সেরেছে। তার পুরান লুঙ্গিটা ভাতিজা শুক্করের বউ কেচে মাড় দিয়ে কড়কড়ে করে দিয়েছিল। গায়ে দিয়েছে হাওয়াই শার্ট। মাথায় একটা শত ছিন্ন নেটের টুপি। তোরাব আলীর পাশে বসে নামাজ পড়বে বলে সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে ঈদগাহে এলো। তখন কেউ সেভাবে আসে নি। মাদ্রাসার ছোট হুজুরেরা মাঠে কাফনের মত ধবধবে সাদা সারি সারি কাপড় বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত। ইমাম সাহেবের মেহরাবটা মখমলের জায়নামাজ দিয়ে ঢাকা। পাশে আতরদানিতে আতর, তুলো রাখা আছে। জ্বলন্ত আগরবাতি ভুর ভুর করে একটা পবিত্রগন্ধ ছড়াচ্ছে। মিষ্টি পবিত্র গন্ধটা ছাপিয়ে হাবুর নাকে এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আজ সকালে নদীর ধারে স্নান করতে আসা দুষ্টু ছেলেদের প্রাকৃতিক অপকর্মের বিশ্রী গন্ধ। ‘উহ! কী গন্ধ।’ আতরদানি থেকে তুলোয় করে একটু আতর নিল সে।
-আরে আরে! তুমি এখানে কী করছ গো। ঈদগাহের খাদেম এগিয়ে আসে।
Ñএকটু আতরই তো লিয়েছি গো। হাবু বলে। আজকে এম.পির বাড়িতে হার দাওয়াত। কাল এম.পির সাথে হার পেপারে ছবি ছাপা হোবে। বেশি বকলে খিঁচ্চালাব।
Ñবাব্বা! খাদেম মুচকি হেসে বলে। আমাকে খিঁচে ফেলবা?
Ñখিঁচ্চালাব। হাবু আবার তার আধো অর্থের নিজস্ব শব্দটা উচ্চারণ করে।
খাদেম ভাল করে জানে লোকটা আধপাগল। কিছু করতে, কিছু বলতে তার বাধে না। তাই সে খুব একটা কথা বাড়ায় না, ঠিক আছে আতর নিয়েছ ভাল কথা। এবার সরো। যাও, এখন পেছনে গিয়ে বসো।
হাবু প্রথম কাতারে ঠিক মাঝামাঝি গিয়ে বসে। আকাশের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে খিল খিল করে হাসতে থাকে সে। কোনো পুরনো স্মৃতি অথবা জীবনের কোনো পরিহাস, কিংবা প্রচলিত সমাজের সমীকরণ আবার হয়ত কোনো কিছুই না তাকে হাসতে বাধ্য করছে। এভাবেই চলতে থাকে তার হাসি। নামাজে আসা মুসল্লিরা তাকে দেখে দূরে গিয়ে বসছে। তার পাশে বসতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। লোকটা আধপাগলা। মানুষের মুখের উপর হুট করে এমন কথা বলে বসে যে সামনের মানুষটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। তবে হাবু আজ পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতি করে নি। হয়ত খুব বেশি হলে দুটো অবান্তর প্রশ্ন করবে অথবা দুটো পয়সা চাইবে, চা-বিড়ি খাওয়ার জন্য। খুব বেশি হলে কারো বাড়ির দরজা খোলা পেলে হুট করে বাড়ির অন্দর মহলে ঢুকে পড়বে, বাড়ির গৃহিণীকে দুতিনটা উপদেশ দিবে তারপর নিজের পেটে হাত বুলিয়ে বলবে, ‘খিদা লাগছে ভাত দে তো।’ খাওয়া হলে আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকবে না। গ্রামবাসীর উপর এটুকুই তার উপদ্রব, জ্বালা-যন্ত্রণা। আসলে সে এমন ছিল না। একাত্তরে সে টগবগে যুবক। স্কুলে পড়ছে আর অবসরে বাবার সাথে মহানন্দার বুকে নৌকার দাঁড় টানে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবার অনুমতি নিয়ে সে যুদ্ধে গেল। একদিন নাকালবাড়ি প্রাইমারি স্কুলে গেরিলা আক্রমণের সময় একজন পাক সেনা তার হাতে ধরা পড়ে। পাকসেনাটিকে মাটিতে আছড়ে ফেলে হাবু তার নাঙ্গা ডান পা শত্র“র গলার উপর চড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘অতদূর দেশ পাড়ি দিয়ে তুই এখানে এসেছিস আমাদের বাপ-ভাইদের মারতেÑমা-বোনদের বেইজ্জত করতে? তোর সাহস তো কম না, আমার মাটিতে এসে আমাদেরই মারবি? তোরে আজ এই পা দিয়ে পিশে ফেলব। ঘাড় মটকে দেবরে বদমাশ!’
পাকসেনাটা অনুনয় বিনয় করে কাঁদতে কাঁদকে বলে, ‘মুঝে ছোড় দো। হামি আভি চলে যাব। হামারা বুড়ি মা মরে যাবে… উসকি কয়ি নাহি, হামি ছাড়া।’
তার কথা শুনে হাবুর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তার মাও তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে কবে বাড়ি ফিরবে এই অপেক্ষায় চোখের জল ঝরাচ্ছে। পাকসেনাটিকে সে কিরা-তওবা করিয়ে নেয়, সে আর যুদ্ধ করবে নাÑসোজা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাবে। পরে হাবুদের গেরিলা দলের নেতা আতিকুল্লাহ বিষয়টা জানতে পেরে হাবুর উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়। হাবুকে রাইফেলের বাট দিয়ে পিঠে কয়েকটা আঘাত করে আতিকুল্লাহ। মার খেতে খেতে হাবু এক সময় জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গেরিলাদের কাছে ‘ক্ষমা’ বলে কোনো শব্দ থাকতে নেই। শত্র“কে নাগালে পেলেই তাকে যেকোনো মূল্যে নিধন করতে হবে। তার এই ক্ষমার কারণে গেরিলা দলটির যে ক্ষতি হয় তার জন্য হাবুকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিলেও অনেক কম দেয়া হত। পরের দিন সেই পাকসেনাটি বিশাল এক বাহিনীকে পথ দেখিয়ে তাদের অবস্থানে নিয়ে আসে। একটা গেরিলা হামলার পর অত অল্প সময়ের মধ্যে শূন্য প্রান্তরময় ঐ এলাকায় গা ঢাকা দেয়ার মত নতুন আশ্রয় খুঁজে পাওয়াটা ভীষণ কঠিন ছিল। কারণ এর সাথে নিরীহ গ্রামবাসীর জীবনও জড়িয়ে পড়ে। পাকসেনারা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে অতর্কিত হামলা করে। গেরিলা নেতা আতিকুল্লাহ সহ দলের আরো সাতজন সদস্য ঐ দিন শহীদ হয়। সেই পাকসেনাটির বিশেষ অনুরোধে প্রাণে না মারলেও হাবুর ডান পায়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে ফেলে রেখে যায়। জীবন-মৃত্যুর এক অনিশ্চয়তার মধ্যে সে জঙ্গলে পুরো একটা দিন পড়ে থাকে । প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হলেও গ্রামবাসীর সহায়তায় শেষপর্যন্ত বেঁচে যায়। এ ঘটনাটি তাকে ভেতর থেকে দমড়েমুচড়ে ফেলে। তার এ জীবনকে সে বন্ধুদের প্রাণের বিনিময়ে শত্র“র ভিক্ষায় পাওয়া অভিশপ্ত জীবন বলে ভাবতে শুরু করে। তার উপর গ্রামে ফিরে দেখে, তার যুদ্ধে যাবার অপরাধে রাজাকাররা তার পরিবারের সবাইকে ঘরে বন্দি করে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। কেউ বাঁচেনিÑবাবা, মা, ছোটবোন এমনকি বাড়ির প্রিয় গরুটাওÑকেউ না। নিঃসঙ্গ একাকি জীবনে হাবু ধীরে ধীরে বৃন্তচ্যুত শীতের শুকনো পাতার মত রঙ বদলাতে থাকে। হাবু মুক্তিযোদ্ধা কখন যে হোব্বাপাগলায় রূপান্তরিত হল গ্রামবাসী এখন ঠিক করে মনে করতে পারবে না।
তোরাব আলী তার লোকজন সমেত ঈদগাহে ঢুকলে চারিদিকে গুনগুন, বুনবুন রব উঠলজ্জ‘এম.পি সাহেব এসেছে। এম.পি সাহেব এসেছে।’ একজন দলীয়কর্মী হাবুর কাছে এসে বলল, ‘এই উঠ। এখানে তুই কী করছিস পেছনে গিয়ে বস। যাহ।’
হাবু ভয় পেয়ে দ্বিতীয় কাতারে গিয়ে বসল। আবার দ্বিতীয় কাতার থেকে চোখ রাঙানি দিয়ে একজন তাকে পেছনে যেতে বলল। সে এভাবে পেছাতে পেছাতে পেছনের শেষ সারিতে গিয়ে পড়ল। হাবু দাঁড়িয়ে তোরাব আলীকে দেখার চেষ্টা করে। তোরাব আলী প্রথম কাতারে ঠিক তার স্থানটাই বসেছে। হাবু বিড়বিড় করে কীযেন বলছে আর খিল খিল করে হাসছে। পাশের এক বালক ইশারায় তাকে চুপ করতে বলে। ভয় পেয়ে এবার সে সত্যি চুপ হয়ে যায়।
নামাজ শেষে হাবু পাগলা তোরাব আলীর গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আর আকাশের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রের মত বিড়বিড় করে কী যেন বলেজ্জহয়ত কিছুই বলে না। রসের ভারে ঝরে পড়া মৌচাকের টুকরোর সাথে দলাপাকানো মৌমাছির মত মানুষগুলো তোরাব আলীকে ঘিরে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। হাবু তোরাবকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার দেয়, ‘হামাকে তোমার সঙ্গে লিয়ে তোর বাড়ি চল। দেখতে তো পাছিস হামি ল্যাংড়া হাটতে পারি না।’ কিন্তু মৌমাছির ভনভন কোরাসে হাবুর কথাগুলো গিলে খেয়ে ফেলে অথবা তোরাব আলী শুনতে পেলেই বা কী এমন হত।
হঠাৎ এম.পির গাড়ির চারপাশে মানুষের এমন ঢল নামলে সেখানে খোঁড়া পা নিয়ে হাবুর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় না। সরতে সরতে তাকে অনেক দূরে গিয়ে দাঁড়াতে হল। একবার তো সে পড়েই যাচ্ছিল। হাবুর মেজাজ বিগড়ে গেলে সে চিৎকার করে ওঠে,‘ পাজির দল! হামাকে ধাক্কা মারিস! এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’ তার গালি শুনে আশেপাশের বাচ্চা ছেলেরা হাসাহাসি শুরু করল। কেউ কেউ আবার গান ধরলজ্জ
‘হোব্বা পাগলা, হোব্বা পাগলা, হোব্বা পাগলা কই?
হোব্বার বউ পোলাও রেধেছে, সঙ্গে আছে দই।’
Ñ‘সারাক সারাক, এখান থেকে। খিঁচ্চালাব।’ হাবু লাঠি তুলে মারতে উদ্যত হল। ছেলেগুলো যে যেদিকে পারল দিল ছুট। হাবু খোঁড়াতে খেঁাঁড়াতে রওনা দিল তোরাবের বেহেস্তখানায় একটা দিন কাটাতে। এভাবে খুঁড়িয়ে এগুতে গিয়ে ঈদই শেষ হয়ে যায় কী না এই আশঙ্কার মধ্যে আছে হাবু। হঠাৎ রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে তার ছায়ার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল সে, ‘তুই কেনে হামার সাথে আসছিস যাহ বাড়ি যাহ।’ সামান্য হাঁটতে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে তার ছায়ার দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকায়, ‘আবার হামার পিছা লিছে! এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’এগুতে এগুতে বিড় বিড় করে পোংঠা সব পোলাপানদের চৌদ্দোগুষ্ঠি উদ্ধার করে চলল সে, ‘সব বেঈমান। হামার সাথে বেঈমানি। হামার পিছে ক্যালা ছায়া ল্যালিয়ে দিয়েছে? কাহুকে হামি ছাড়ব না। খিঁচ্চালাব।’ রাগে হাতের চেটো দিয়ে নাক ঘষতে থাকে সে। তোরাবের তিলোত্তমায় যখন পৌঁছাল হাবু ঘেমে নেয়ে একাকার। তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে ওর। চৈত্রের কুকুরের মত হাঁপাতে হাঁপাতে হেঁটে চলা পথচারীদের বলে, ‘এই বলত ঈদ আছে না শেষ?’ হাতের লাঠিটা ঠক ঠক করে কাঁপছে। তিলোত্তমার সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। এই ভিড় ঠেলে ভেতরে যাওয়া হাবুর সাধ্যি নেই। তবু সে ভিড়ের চাপাচাপির মধ্যে নিজেকে নিয়ে ফেলল, ‘এই সর কহোছি এম.পি হাকে দাওয়াত করেছে। এক্কেরে খিঁচ্চালাব।’ ভিড়ের চাপে দম বের হবার যোগাড় সবার। বাড়ির প্রধান দ্বারে দাঁড়িয়ে কয়েকজন দলীয় ক্যাডার মোটা লাঠি ঘুরাচ্ছে আর বলছে, ‘আস্তে আস্তে।’ ‘একজন করে।’ ‘লাইনে।’ ‘সিরিয়াল, সিরিয়াল।’ ক্রমশ মানুষের ঢল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। শত কণ্ঠের মধ্যে হাবুর আতঙ্কিত চাপা স্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, ‘সর, সর, এক্কেবারে খিঁচ্চালাব।’
এত দিন তোরাব আলী বেশি মানুষ দেখলে খুশি হতজ্জদলের সমাবেশে অথবা নির্বাচনী জনসভায় মানুষ যত বেশি, ততই তার মন আনন্দে নেচে উঠত। আজ হয়েছে তার উল্টো। অতিরিক্ত মানুষের ঢল দেখে প্রথমে সে বিরক্ত হয়েছিল কিন্তু ধীরে ধীরে সে বিরক্ত আতঙ্কে পরিণত হয়। আজ কী তার প্রসাদদুর্গ ভেঙে ফেলবে নাখাক্কা মানুষের দল? মানুষের ¯স্রোত শেষই হয় না। মানুষ আসছে তো আসতেই আছে। সে ভয় পেয়ে থানায় ফোন করে। হঠাৎ পুলিশ কোথা হতে বাঁশিতে শীৎকার দিতে দিতে দৌড়ে এসে তোরাব আলীর মেহমানদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। দলের ক্যাডাররা বড় বড় বাঁশ নিয়ে মারমুখী হয়ে মানুষের উপর চড়াও হল। শুরু হয়ে গেল দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি, ধাক্কাধাক্কি… ব্রাত্যজনের হাজার বছরের পুরনো বহুচেনা পদোবিউগলের সুরের মাঝে তাদেরই অতি চেনা একটি মানুষের আর্তনাদ হারিয়ে যেতে থাকে রক্ত-জলের সোদাগন্ধ মাখা ধুলোর স্তরে স্তরে। বাঙালির অজ¯্র পায়ের বঞ্চনার গল্প লেখা হতে থাকে একটি মানুষের বুকের জমিনে।

পরের দিন দৈনিকগুলোতে সংবাদ হলজ্জএম. পি তোরাব আলীর বাড়িতে ঈদের দিনে প্রীতি সাক্ষাতে গিয়ে মানুষের ভিড়ে পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।