Archives

হাবিব জাকারিয়া’র গল্প

নামানুষ
(সম্পূর্ণাংশে ফ্রান্ৎস কাফ্কার ছোটগল্প প্রভাবিত)

কথা.
বিবর্ণ হয়ে এসেছে ভাটিবেলার দৃশ্যপট। আরও একদিন। আশ্বিনের সূর্য নিভে আসা উনুনের শ্বাসটান শুনিয়ে মিশে গেল না-নদীর স্রোতে। সারা নদীতে তার মৃত্যুযন্ত্রণা দুলে দুলে কমলা বর্ণের সঙ্গীত শোনায়।
তখনই আচমকা ছুটে এল অন্ধকার, মৃত সূর্যের শোকে কালো বসন তার, এমনকি প্রান্তর জুড়ে ছিটানো কাজল মাখা কান্না চুইয়ে চুইয়ে ঝরে নদীর শরীরে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি খুব বিষণ্ন ছিলাম। ভাবছিলাম, আমার চতুর্দিক পুড়ে গেছে খরায়, মানুষের গলিত শবও বুঝি জলের কাছে ছুটে আসছে জলের আকৃতি পাবার লোভে। আর তাদের তৃষ্ণার্ত হাঁয়ে সেঁধে যাচ্ছে কাশবনের চিবুক পর্যন্ত জনপদ, দীঘল বালিয়াড়ি, সব। আমি নিঃসঙ্গতর হয়ে যাচ্ছিলাম, আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম– এই নৌকা, কেবল এই নৌকাই মহাবিশ্বের তুমুল অন্ধকারের মাঝে একা এক প্রাণ নিয়ে ভেসে যাচ্ছে।
না, অকস্মাৎ অন্ধকার ভীষণ প্রসন্ন আজ। সকল দৃশ্যাবলী তাই তার জিহ্বা বেয়ে কণ্ঠনালীতে হোঁচট খায়। ফিরে আসবার সময় তারা পূর্ব দিগন্ত থেকে উপড়ে আনে চাঁদ, তাদের গায়ে লেপ্টে থাকা রূপালি জ্যোৎস্না অনুপম ঝিলিক ছড়ায়।
এমন সময়, কি এক অজানা আশঙ্কায় হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম আমি, সেই কান্নায় নিথর হবার আগে পাখিরা আরেকবার কলকণ্ঠে মেতে উঠল, বায়ুর দেহ উদোম করে উড়ে গেল শব্দ বসন, আর নৈঃশব্দ সেই বসনকে ঘুড়ি ভেবে উড়িয়ে দিল আকাশে, হেসে উঠল খলখলিয়ে।
অকস্মাৎ দেখি, আমি একা নই নৌকায়, আমরা চারজন। ঐ বোবা বৃদ্ধ মাঝি এবং আমরা তিনজন। এক সুকুমার কিশোর, এক টগবগে তরুণ আর আমি, ক্রমশ জীবনের ভাটিগামী। আমরা কেউ কাউকে চিনি না, চিনবার আগ্রহ বা ইচ্ছাও ছিল না, কেননা আমরা জেনে গিয়েছি এখন মৃত্যু ভিন্ন আমাদের আর কোন ভবিষ্যৎ নাই। জীবনের ঘাট থেকে আমাদের টেনে-হিঁচড়ে এই নাওয়ের অভিযাত্রী করা হয়েছে। অথচ কি এক মানবিক হিংস্রতায় আমরা ঐ শ্বেতসর্বস্ব মাঝিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম, এমনকি এখন আরও বেশি, যতক্ষণ না আমার চিৎকার উপচে গান গেয়ে প্রমাণ করে দিল সে বোবা নয়।
পদ.
জীবন একখান ছোট্ট নাও,
রৌদ্রে ঝড়ে বাইয়া যাও,
ডুবে যদি ডুবল হঠাৎ
কিছুই করার নাইরে বন্ধু
কিছুই করার নাই।
বোলাম.
বৃদ্ধ বোবা নয় জেনে আমার তরুণ সঙ্গী হঠাৎ সেই কিশোরের দিকে একপলক তাকিয়ে মাঝিকে চিৎকার করে বলে
: আমরা কি সত্যিই মরতে যাচ্ছি? (বৃদ্ধ নিশ্চুপ) কথা বলেন না কেন? বলেন, আমরা কি মরে যাচ্ছি?
বৃদ্ধ : (আপন মনে) হায়, জীবনের কি বান্ধনগো। এক নাটাইয়ে তার অযুত-নিযুত প্রাণ। এই ঘুড্ডির সুতায় তিনি নাজানি কোন মাঞ্জা দিছেন!
তরুণ : ও একটা বাচ্চা ছেলে। ওর কি দোষ। ও মরবে কেন?
কথা.
এই ‘কেন’ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে বাতাসে, আর বৃদ্ধ মাঝির হাসি বীভৎস থেকে বীভৎসতর, ভেঙে দেয় সকল জলীয় কণার অনুবিন্দু, শিশির বৃষ্টিতে ভিজে যায় আমার শরীর। কী প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমার সব জড়তা, আড়ষ্টতা চতুর্দিকে ছিটকে যেতে থাকে। আমিও চিৎকার করে, বন্ধ দু’চোখে আরও অন্ধকার সঞ্চিত করে বলিআমি বাঁচব, আমি বেঁচে আছি।
ততকথা,
সত্যিই আমি বেঁচে ছিলাম, তখনও। বোধকরি সেই ছিল অন্তিম স্বপ্ন। আমি এমনটা ভাবলাম, যখন আমার অপ্রসন্ন ঘুম ভেঙে গেল। যখন দেখলামনৌকা নেই, নদী নেই, বৃদ্ধ মাঝিও নেই। আর সত্যিই, মৃত্যু ব্যতীত আমার আর কোন ভবিষ্যৎ নেই। আতারুণ্য আমি শৈশব ও কৈশোরের মৃত্যুশোকে আর্তনাদ করেছি। আর এখন, আমি সেই শ্বেতসর্বস্ব বৃদ্ধ মাঝি, সমগ্র জীবনের মৃত্যুর জন্য আর্তনাদ করছি। এই আমার স্বপ্নের একক এবং অদ্বিতীয় ব্যাখ্যা। জানি, দ্রুত অতিক্রান্ত হচ্ছে সময়, কোন এক দেয়াল ভেঙে গেলেই মুখোমুখি আমি ও মৃত্যু।
পদ.
সময়ের চতুর্দেয়াল অকস্মাৎ ভেঙ্গে গেলে
যাপিত কাল শতমুখা অনিশ্চিতগামী…
জীবিত প্রাণ ঘনঘোর রহস্যালোকে
জানেনা নিঃশেষের অন্তগান,
তবু এই অন্তিম রাত্রিতে
সময়ের কোটিভাগ এক একটি ডিঙি নাও,
মুছে দিয়ে অতীত ভবিষ্যৎ, ছোটে অনামা আঁধারে।
কথা.
আমার ধারণা, সকলে আমাকে মৃতই বলে। যদিও কথাটি কেউ কখনও আমাকে বলে নি, তবু মানুষের চোখ আমাকে দেখে আর উদ্দীপ্ত হয় না, তাদের চোখের সামনে আমি আকৃতির বিভ্রম হয়ে থাকি। কেননা, নাট্যমঞ্চে এই যে টিলাটি দেখছেন, এ ছাড়া আমার কোন সংস্থান নাই, এই একটি তাঁবু গেড়ে আমি জীবনের প্রান্তরে ক্যাম্প ফেলে বসে আছি। আর এই দোলনা আমার নিত্যসঙ্গী। আমি কর্মী কিন্তু আমার জন্য কোন কাজ নাই। আমি ভীরু এবং কখনোই নিজেকে কোন কিছুর সামনে ঠেলে দিই না। অবশ্য আমি আমাকে আর পাঁচজনের মত তাদের সাদামাটা গোত্রেও ফেলি না। আমার কাজ না পাওয়ার পিছনে একটাই কারণ, তা হলো… কিংবা হতে পারে, এই কাজ না পাওয়ার জন্য আমার কিছু করার নাই। যাই হোক, ব্যাপারটা এই যে, আমাকে কাজের জন্য কেউ ডাকে না। অন্যদের তো তাও কেউ কেউ ডাকে। যদিও, তারা আমার মত কখনোই চেষ্টা করে না। কিংবা এমনও হতে পারে ওরা কখনও এই ডাক পাওয়ার জন্য আকর্ষণ অনুভব করে নি। অথচ আমি, অন্তত আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি, কিছুদিনতো এই আকর্ষণ আমার মধ্যে লক্ষ্য করার মত একটা বিষয় ছিল। যাই হোক, আমার পিতামহ ছিলেন জীবন বিশেষজ্ঞ। উনি বলতেন…
পদ.
একপলকের জীবন হায়রে
পিছন ফিরলে নাই,
সাঁকো পার হইতে গেলে
সামনে যাওয়া চাই।
কথা.
বৃদ্ধ বয়সে আমার পিতামহের হাতপাগুলো থাকা না থাকার অর্থ ছিল সমান। ঘরের বারান্দায় বসে উনি অবাক হয়ে আমাকে দেখতেন। শৈশব-কৈশোরে উনিই ছিলেন আমার একমাত্র বন্ধু, উত্তর কৈশোরে অজান্তে কোনদিন সুতো ছিঁড়ে গেলে আমি নই, উনি মানবেতর কিংবা মানবোর্দ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তখন নয়, তার মৃত্যুর পর সম্পর্কটা আমাকে তৈমুর লঙের মত দানবিক ভঙ্গিতে হানা দিত।
যাই হোক, তার সেই পরিণতির প্রতি আমার অমনোযোগ আমাকে তারুণ্যে প্রবেশ করার পথে স্বপ্নালু-উচ্চাভিলাষী করে তুলেছিল। নতুবা আমার চিরজীবন বালকত্বেই শৃঙ্খলিত হয়ে যেত। পিতামহের সেই তাকিয়ে থাকার অর্থ দীর্ঘকাল পরে আমার বাবার মুখে শুনতে পাই।
ততকথা.
বাবা বলতেন, “শোন্… যে জীবন বাঁইচা গেল তোর দাদায়, যে জীবন বাঁইচা গেলাম আমি, সে জীবন আর তোর কাছে ফিরবো না। মনে কর, তোর দাদায় গেছে নলছুটা থাইকা দহগ্রাম, আমি গেলাম দহগ্রাম থাইকা ফুলেরহাট, তুই যাইবি ফুলেরহাট থাইকা যতদূর মন চায়। বুঝলি?”
বাক্যের শেষদিকে তার কণ্ঠ ভয়ঙ্কর ভৌতিক হয়ে উঠত, চতুর্দিকে রাত্রির নিস্তব্ধতা– তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতেন“যা আউগায়া যা, সামনে যা, পিছনে তাকাইসনা।”
বাবার সেই ভৌতিক মহাবাণী সেই কালের ঋতুর বাতাসে মিলে কোন পর্বতচূড়ায় তুষার সৃষ্টি করতো তা জানা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি, সে অজানা গ্রাম আমার চেনা হয় নি।
আমার প্রয়োজন ছিল সুখী জীবন, কেবল দুটো জরুরি শব্দ। এই প্রয়োজন থেকে অকস্মাৎ জীবন সম্পর্কে একটি কবিতা আমার ভেতরে বদ্ধমূল হয়ে যায়।
পদ.
কারণ, আমরা সাদা তুষারের উপর নির্জন গাছের মত,
দেখে মনে হয় ক্লান্তভাবে শুয়ে আছি,
হয়তো আলতো একটু টোকা দিলেই গড়িয়ে যাবো।
কিন্তু না তা করা যাবে না,
কারণ মাটির গভীরে গেঁথে আছে আমাদের শিকড়,
অথচ দেখুন, এটাও নেহাতই একটা দৃশ্য।
কথা.
আপনারা বলবেন, আমি সেই পুত্র যে পিতার নির্দেশ অমান্য করেছে। এর বিপক্ষে আমার একটি যুক্তি প্রদর্শন করতে হবে। কেননা, আপনারাও বিশ্বাস করেন যে, যুক্তি দিয়ে সবকিছুই সিদ্ধ হতে পারে এবং পাল্টা যুক্তি দিতে না পারলে আপনারা নিজেদের পরাস্ত মনে করবেন। ঠিক সে কারণেই এই গল্পটি বলা।
ততকথা.
অনেকেই এই অভিযোগ করেন যে, জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তা নিছক গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাত্যহিক জীবনে তা কোনো প্রয়োজনে আসে না, যে জীবন ঠিক আমাদের। যখন জ্ঞানী ব্যক্তি জানান ‘রাস্তা অতিক্রম কর’ এর অর্থ অন্য কিছু। বাস্তবিকই কোন রূঢ় পথের এপার থেকে ওপারে যাওয়া নয়। হয়তো এমন কিছু যা ঠিকভাবে মেনে চললে অমেয় ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া যাবে। কিংবা এমনও হতে পারে, উপকথার মত, কিছু একটা যা আমরা জানি না। এবং যেহেতু জ্ঞানী ব্যক্তিটিও সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানান না, শেষ পর্যন্ত উপদেশটি আমাদের কাছে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা বলা যায়, নীতিবাক্য আমাদের কাছে ধারণার অতীত একটি ধারণা যা আগেও আমাদের মধ্যে ছিল। অথচ, দৈনন্দিন সংগ্রাম এর বিপরীত অন্য কোনো দিকে।
বোলাম.
ধরুন একজন মানুষ বলে উঠলেন : তাহলে তুমি কেন প্রত্যাঘাত কর? নীতিকথা অনুসৃত হলে তুমিও জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে যেতে বাধ্য। প্রাত্যহিক জীবনের কোন সংগ্রামই আর সংগ্রাম থাকবেনা।
অন্যজন বললেন : বাজী লড়তে পারি, এটাও একটা নীতিকথা।
প্রথমজন বললেন : তুমি জিতে গেছ।
দ্বিতীয়জন বললেন : তবে, দুর্ভাগ্যক্রমে এ জয়লাভ নীতিগল্পেই।
প্রথমজন বললেন : না, রূঢ় বাস্তবে, নীতিগল্পে তুমি হেরে গেছ।
কথা.
ফলত এই মহাপৃথিবীর পথে একজন পথিক হিসেবে মনুষ্য সভ্যতার সব কৃতকর্মের দায় আমি বহন করতে পারি না। কেননা, এসব দায় নিষ্পন্ন করার সাধ্য আমার নাই। সেজন্য কোন রাতে যখন রাস্তার উপর দিয়ে আমি হেঁটে যাই, তীব্র চাঁদের আলোয় এবং রাস্তা ক্রমশ উঁচু হয়ে যাবার কারণে যদি এসময় রাস্তায় একটা মানুষের মূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে, যদি মানুষটি ছুটতে ছুটতে আমার দিকেই এগিয়ে আসে, আমি ভুলেও কখনও তাকে ধরতে যাব না। লোকটি যদি বৃদ্ধ হয়, অত্যাচারিত হয় তবুও না। এমনকি তার পেছন পেছন অন্য একটি মানুষকে চিৎকার করতে দেখলেও না। তাকে দৌড়তে দেব।
কারণ, তখন রাত্রি এবং কোনোভাবেই আমি তাকে সাহায্য করতে পারি না। যদি জ্যোৎস্নার আলোয় আমার রাস্তা ক্রমাগত উঁচু হয়ে সামনের দিকে উঠে যায় তবু এমন ঘটা তো অস্বাভাবিক নয় যে, তারা শুধুমাত্র রোমাঞ্চের জন্যই একে অপরকে তাড়া করছে? কিংবা তারা উভয়েই কোন ব্যক্তির পিছু নিয়েছে? এমনও হতে পারে, প্রথমজন হয়তো দ্বিতীয়জন নির্দোষ তাকে খুন করার জন্য ছুটছে আর তাহলে এমন ক্ষেত্রে আইনের চোখে আপনি অপরাধী হয়ে যেতে বাধ্য। এমনও হতে পারে, ওরা কেউ কাউকে চেনে না। প্রত্যেকেই আলাদাভাবে নিজেদের বাড়ী ফিরে যাচ্ছে অথবা ওরা রাতের পাখি কিংবা প্রথমজনের হাতেই হয়তো অস্ত্র রয়েছে।
যাই হোকনা কেন, ঠিক এরকম মুহূর্তে আমার কি ক্লান্ত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক নয়? এসময় কি আমি নেশাগ্রস্ত হব না? কিন্তু আমার সৌভাগ্য, দু’জনেই আমার চোখের সামনে থেকে অপসৃত হয়ে গেছে।
ততকথা.
এই সমস্ত কারণে আমি এই টিলার উপরে দোলনায় দুলি, তাঁবুতে শুয়ে কাপড়ের বুনন লক্ষ্য করি এবং একসময় ঘুমিয়ে পড়ি, কখনো জেগে উঠি আবার অতিদ্রুত ঘুমিয়ে যাই। মাঝে মাঝে দোলনায় দুলি… দুলি।
পদ.
কয়ে আকার বর্গীয় জ.
দুলছে দেখ অকাজের কোজো,
সময়তো ভাই নেই থেমে
ছুটতে ছুটতে গেলাম ঘেমে।
কথা.
এখানেই আমার বসে থাকতে ভালো লাগে। কারণ, এই উচ্চতম টিলা থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদগুলোর মাঝে আমাদের মানচিত্রটিকে সম্পূর্ণ আবিষ্কার করা সম্ভব না হলেও, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। সত্যি বলছি। এমন নয় যে, এই টিলাটি সব কিছু দেখাতে পারে। তবে, আমার মতে শুধুমাত্র এই টিলা থেকেই তা দেখা সম্ভব এবং অবশ্যই এই টিলার মুখ প্রভুদের মানচিত্রের দিকে নয়।
এমনও হতে পারে, হয়তো অন্যরা এখন আমাকে ভুলে গেছে। আমি না জানতে চাইলেও, একজন একদিন এই টিলার এসে আমাকে একথা জানিয়ে গেছেন। মানচিত্রের আবরণ– আবরণ দেখে আমার এ ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে।
পদ.
নদী নালা ফসলের মাঠ শুষে
সবাই কেন্দ্রে ছুটছে, কেন্দ্রের ভূখণ্ড মহাশূন্যমুখা।
এদিকে মানচিত্রের সবুজ শাড়ী খসিয়ে নিচ্ছে প্রভু,
অবশিষ্টরা ফাটা মাটিতে পা ডুবিয়ে
তাকিয়ে আছে আকাশে।
কথা.
এই আকাশ আমার জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যাপার, এর অস্তিত্ব কখনই আমি অনুবভ
করি নি। যেখানে কোনদিন, অন্তত অবাক হওয়ার জন্যও আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় নি। ফলে আমার এখনও কেন্দ্রগামী কিংবা সেইসব পা ডুবিয়ে থাকা আকাশমুখা মানুূষগুলোর সাথে পরিচয় হওয়া সম্ভব নয়। এদের দৃষ্টি ও ঘাড় ঊর্ধ্বমুখে স্থবির হয়ে গেছে। আর আমি গেঁথে আছি সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টার পিরামিড শীর্ষে।
ততকথা.
এর মাঝে অকস্মাৎ একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখি, আমার দোলনায় বসে অন্য একটি লোক দুলছে, লোকটি আমাকে ভীষণ বিশ্রীরকমভাবে অনুকরণ করছে দেখে আমার তীব্র ঘৃণা হল। তার পোশাক, তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিমা এমনকি গোঁফের শীর্ষে যে ভাঁজটি তাও আমার মতো। লোকটি আমাদের মানচিত্র থেকে এসেছে, সম্ভবত আমার গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য, কিন্তু তাকে দেখে আমি এতটা কীটাক্রান্ত বোধ করলাম যে, সারা দেহে একটা ঘিনঘিনে কাঁপুনি নিয়ে আবার তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি, এমন সময় সে আমাকে ডাকল। এই ডাক শুনেই আমি আবিষ্কার করলাম লোকটি সেই আকাশমুখাদেরই একজন এবং তার কণ্ঠ হুবহু আমার মত।
আমাকে ঘুরতে দেখেই সে বলে : পালাচ্ছ কেন? বসো, একসাথে দোল খাই।
আমি বসে পড়লাম। সে আমাকে অনেক প্রশ্ন করল, আমি কোন উত্তর দিলাম না।
অবশেষে আমি বললাম : সম্ভবত আপনি এখন দুঃখিত, কেননা আপনি আমাকে ডেকেছিলেন। আমি যাই।
তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। সে আমাকে টেনে বসিয়ে দিল।
বলল : বস। জানো, আসলে এটা একটা পরীক্ষা। যিনি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেন না, তিনিই কৃতকার্য হন। বলে একবারের জন্য পেছনে না তাকিয়ে সে চলে গেল।
তারপর আর কখনও আমি তাকে দেখি নি। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, আমার ভেতরে একটা পাথর ফেটে ঝরণা বইতে শুরু করেছে, সমুদ্রের মত বিশালত্ব যার চেতনায়।
তারপর, এখনও আমি দোলনায় দুলছি। আমি কর্মী কিন্তু কর্মহীন। আমি জানি, আমার অবশ্যম্ভাবী গন্তব্য মৃত্যু।
আসলে কাজের কোন সংজ্ঞা হয় না।
বেঁচে থাকতে চাওয়াই একটা বড় কাজ। না, হয়তো ভুল বললাম।
যাই হোক, আপনারা কেউ চাইলে এই দোলনার অর্ধেকটা নিতে পারেন,
সাথে এই তাঁবুর অর্ধেক খড়ের বিছানা।
কিন্তু তা হবে না। আমি নিশ্চিত যে, মানচিত্রের বর্তমান উৎসবগুলো আপনাদের খুব পছন্দ হয়েছে। সেকারণেই নাটক শেষে, পর্দা পতনের সাথে সাথে আমাকে আপনারা উদ্ভট বলে ছুঁড়ে ফেলবেন …