Archives

হাসান আজিজুল হকের একক বাচন

চিহ্নের সঙ্গে
হাসান আজিজুল হকের একক বাচন

চিহ্ন : আমাদের এবারের শিরোনাম : ‘কথাশিল্পের ভাষা’। আপনার-তো বহু-বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের বলুন, এখন ফিকশনের যে-অবস্থা, আদৌ কি কিছু দাঁড়াচ্ছে? ‘গল্প’ সম্পর্কে আমাদের দেশের সামগ্রিক যে-অবস্থা সেখানে গল্পকারদের যে-ভাষা, আসলেই কি কার্যকর কিছু হচ্ছে? হাসান আজিজুল হক : এ-প্রশ্নের জবাব-তো খুব বিস্তৃত হবে। এক-রৈখিক জবাব কোনো অবস্থাতেই দেওয়া যায় না। পৃথিবীতে কোনো কিছুই সম্পূর্ণ পজেটিভ নেই আবার সম্পূর্ণ নেগেটিভও নেই। আমরা এ-কালের মানুষ। আমরা বিশ শতকের মানুষ। আমরা একুশ শতকে ঢুকে পড়েছি। ফিকশনের কথা বলছো! এর বিরাট একটা ইতিহাস ও ঐতিহ্য পেছনে পড়ে আছে। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য যে-জাতির থাকে, সে-জাতির জেনারেশনের পর জেনারেশন শিক্ষা-দীক্ষায়, আচারে-আচরণে সেটা আয়ত্ত করে ফেলে। আলাদা চেষ্টা করতে হয় না। দুর্ভাগ্য আমাদের, এখানে এ-জিনিসটা হয় না। এই জিনসটা না হওয়ার কারণে বড় অদ্ভুত ও অসমান ব্যাপার এখানে হতে থাকে। যেমন ধরো অনেকে পরিষ্কারই বলে অমুক মফস্বলের লেখক, মফস্বলের লেখা। জিনিসটা শুনতে খুব খারাপ লাগে কিন্তু কথাটা-তো কিছুটা ঠিক। আলো যে সব-জায়গায় সমানভাবে ছড়ায় না, কথাটা-তো ঠিক। আলো যদি সব-জায়গায় সমানভাবে না ছড়ায় (আলো বলতে আমি বিরহ বুঝছি, বৈষিয়তা বুঝছি, শিক্ষা বুঝছি, দৈনন্দিন জীবন-যাপনের স্বাচ্ছন্দের তারতম্য বুঝছি), তবে কেমন করে হবে? এর ফলটা হচ্ছে, তৈরিও হয় নানা-পদের জিনিস। বলতে পারবো না এটা সর্বনিম্ন, এর চেয়ে নিম্ন আর হবে না। কিংবা এর চেয়ে বড়ো আর হবে না। দুটোর একটা হয়তো বলা যেতো। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা বলা যায় না। সেটাই-তো মুশকিল। আমাদের এখানে ভাগ অনেকগুলো। প্রথম-কথা হলো, বাংলা সাহিত্য যেমনই হোক না কেনো বিশ্বসাহিত্যের সাথে তুল্য। এটা আমি বিশ্বাস করি। তোমরা কি মনে করো জানি না। এটাও ঠিক আমরা যাদের লেখা পড়ে বড়ো হয়েছি তাদের চেয়ে আমাদের চোখ আরো নানাদিকে প্রসারিত হচ্ছে। আমরা আগে হয়তো পড়েছি, বড়ো জোর বৃটিশ উপন্যাস, বৃটিশদের সাথে অন্যান্য যারা যুক্ত সেসব পড়েছি। কিন্তু আজকে আমরা মোটামুটিভাবে আফ্রিকান, ল্যাটিন আমেরিকা, ইটালিয়ান সবগুলো সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পাচ্ছি। পাওয়াটা উচিত। এই ধারণা পাওয়া সত্ত্বেও আমি যা লিখব আর তুলনাটা পাশাপাশি এসে যাবেই। কারণ, তোমার ভেতরে যে-চেতনা রয়েছে, সে-চেতনা তোমার পরিমাপক। কোনো জিনিস যতোটুকু ততোটুকুই-তো মাপবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বাংলা সাহিত্য’, তাহলে একভাবে কথা বলতে হবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বিশ্ব-সাহিত্য’, তাহলে আরেকভাবে কথা বলতে হবে। গণ্ডি যদি ধরি ‘বিশ শতক’, তাহলে এক-রকম, যদি ধরি ‘একুশ-শতক’ তাহলে আরেক-রকম। নানা-রকমের হিসাব আছে। তুমি যদি সংক্ষিপ্তভাবে প্রশ্নটা করে থাকো, ‘স্যার এতো কথার দরকার নেই, সাধারণভাবে বলুন’, তাহলে বলাটা একটু কঠিন হবে। তহলে হবে কি, সন্তুষ্টির জায়গা নেই, গড়-পরতা সব-ক্ষেত্রেই; যেমন রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সবক্ষেত্রে একটা ক্ষয় হচ্ছে বা একটা বিষণœ দরিদ্র-অবস্থা দাঁড়িয়েছে। সে-কারণে সাহিত্যও খানিকটা ক্ষয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার  সাহিত্যের হিসেব আলাদা। হঠাৎ করে সাহিত্যে বড়-প্রতিভা দেখা দেয়। সেটা সব-সাহিত্যে হয়। তেমনি আমাদের সাহিত্যেও হয়তো কিছু বড়ো লেখক জন্মে গেছে। আমি যদি ‘রাইট ফর’ ১৯৪৭ ধরি তাহলে বলবো যে, ৪০-এ যে-ফিকশনটা ছিলো সেই ফিকশনের সাথে তুলনীয় ফিকশন আমাদের এখানে পরবর্তীকালে কি হয়েছে? জোর করে বলতে গেলে তুমি হয়তো বলবে, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহকে কি আপনি বাদ দিয়ে দিচ্ছেন? ঠিক আছে, বহু পর্বত-শৃঙ্গের মধ্যে একটা পর্বত-শৃঙ্গ মাথা উঁচু করে আছে সেটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ৪০-এর দশকের লেখক, পরবর্তীকালে ৬০-এর দশকের লেখকের মধ্যে এককভাবে মাথা উঁচু করে আছে। কিন্তু পাশে তৃণ, ঘাস, এতো জমেছে যে সেগুলো না হলেই ভালো হতো। ঝেটিয়ে বিদায় দিলেই ভালো হতো। কিন্তু তখন যারা করেছিলো অত্যন্ত চেষ্টার সাথে করেছিলো, কারণ তখন একটা নতুন অনুপ্রেরণা। নতুন অনুপ্রেরণা কিন্তু খুবই দ্বিধাবিভক্ত অনুপ্রেরণা। একটা অনুপ্রেরণা হলোনতুন দেশ, স্বাধীন দেশ; আরেকটা হলো, পাকিস্তান আছে, মুসলমান আছে। মুসলমানদের মধ্যে যারা বাঙালি তাদের জন্য সেই যুগটা যেমন হতাশার তেমনি প্রেরণারও বটে। তার মধ্যে ভাষা-আন্দোলন এলো। বোঝা যায় একটা শ্রেণী উন্মুখ হয়ে আছে উঠবে বলে। তাদের মধ্যে যাবতীয় পজিটিভ লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে। এখানে বিরাট একটা ইনটেলিকচুয়াল, বিদ্বান, মনীষী-সমাজ যেটা ছিল সেটা মোটামুটিভাবে অনুপস্থিত হয়ে গেলো। খুব আকস্মিকভাবে। সেই ইতিহাস আমি লিখেছি। ৪৭-এর পরে তখন এক বিরাট শূণ্য জায়গা, একি কাণ্ড!
সেই নাইন্টিন সেঞ্চুরিতে পূর্ববাংলার মানুষ পাট বিক্রি করে বড়লোক হয়েছে। অশিক্ষিত মানুষ। তার সব পায়রা নাচানোর জন্যে, মদ খাওয়ার জন্য, মেয়ে মানুষ উপভোগ করার জন্যে কলকাতায় আসতো। থাকতো। বাঙ্গাল মানুষ-তো উড়ন্ত এক জন্তু। বাঙাল বড়ো অদ্ভুত। সে-মনোভাব অল্প-বিস্তর রয়ে গেছে। আজকে আবার যখন ঐ-অবস্থা হলো, তখন দেখলো যে, একটা ‘ফ্রি-ডাউনফল’ হয়েছে। কিন্তু সেই ‘ডাউন’-এ কারা থাকবে খেলবে তাদের উপস্থিতির ঠিক নেই। এখন খুব সহজে যেটা ধরে মানুষ, আমাদের এখানে‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’। কাজেই যে-মুহূর্তেই আমরা উন্নতির কথা ভাবি আমরা প্রথমে লেখাপড়ার কথা ভাবি। আর-তো উন্নতির আপাতত কোনো চান্স নেই। এখন এই যুগে লেখাপড়ার গুরুত্ব আর ফিফটির গোড়ার দিকের লেখাপড়ার গুরুত্ব মোটেই এক নয়। তখন সংখ্যাও কম, গুণে-মানে দরকারও ছিল অনেক বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিলো। অনেক রকমের ব্যাপার ছিলো। তখন সেই ভাষা আন্দোলনের মুহূর্তে বাঙালিত্ব-মূলক ভাষা, সংস্কৃতি এটা অবলম্বন করে এ-দেশে আবার নতুন একটা জাগরণ হলো। আর সেই জাগরণের বিরুদ্ধশক্তি যেটা, সেটা সমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলো। আমরা মোটামুটি বিজয়ী হয়েছি। ৫২ সালের দিকে তাকালে মনে হয়, একটা অনুপ্রেরণা এসে গেছে। পাকিস্তান সমর্থন নয়, কিন্তু একটা দেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে তার একটা স্বতন্ত্র সত্তা দেখা দেয়। স্বতন্ত্র সত্তা দেখা দেওয়ার পর সে কি করবে সেটা মোটামুটিভাবে তৈরী হয়ে গেছে। সে-জন্য ৫২ সালটাকে আমি ল্যান্ডমার্ক বলি। ৫২ সালের উপর সরাসরি সাহিত্য খুব কম। নেই বললেই চলে। আমি দু-একটা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখেছি ঐ-যারা ছিলো হাসান হাফিজুর রহমানের আটটা কি নয়টা গল্প আর কয়টা কবিতা! তারপর আমি বাংলা একাডেমিতে নতুন করে করলাম, আমার সম্পাদনায় বেরুলো। আমি লিখিয়ে নিলাম। তখন-তো আর প্রত্যক্ষদর্শী নেই। তখন আর একুশে ফেব্র“য়ারি নিয়ে লেখার লেখক নেই। সে-কারণে, লোক দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হলো। ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশটা গল্প বেরুলো। এখন-তো আর কেউ ভাষা-আন্দোলন নিয়ে লিখবে না। আর কিছু হবেও না। তাছাড়া তার ইমপ্যাক্টও চলে গেছে। যদি বলি পাঁচের দশকটা নিদারুণ-নিপীড়নের মধ্যে থাকার কারণে প্রতিবাদের জায়গাটা খুব সবল ছিলো, এই কথাটা ঠিক। দুরকমই হয়। কিন্তু, পরে কিছুই করা যায় নি, সব মরে গেছে, অথবা মুমূর্ষু। আর তারা যে উঠে দাঁড়ায়। পাঁচের দশকে আমাদেরকে মুমূর্ষু করে ফেলার চেষ্টা হয়েছিলো। পাঁচের দশকের আমরা যারা তরুণ-যুবক, আমরা খুব ভালো করে জানি এ-দেশটাকে নিজের মনে করার কোনো কারণ ছিলো না। কারণ উপস্থিতিই-তো আলাদা। তুমি একটা দোকানে যাচ্ছো‘কিয়া ভাই?’ একটা জুতোর দোকানে যাচ্ছে‘এ লি যে, এ লি যে।’ চারিপাশে কি-রকম একটা আবহাওয়া! আবার আমি যেহেতু ভিন্ন রাজনীতি করা লোক, সে-কারণে একটা প্রত্যক্ষ নিগ্রহের স্বীকার হয়েছিলাম। একেবারে শারীরিক থেকে শুরু করে যা তোমরা কল্পনা করতে পারবে না। তার মানে যেমন ডিপ্রেশন ছিল, রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিলো। রাজনীতিতে সরকার পিছিয়ে ছিলো, এখনো তাই। আমাদের এখানে পিছিয়ে আছে যেসব সম্প্রদায় তার মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষাহীন-অনগ্রসর হচ্ছে রাজনীতিবিদরা। এবং যে-আদর্শটা অবলম্বন করে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছে, পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছে, পাকিস্তান হওয়ার পরও যারা যারা জীবিত ছিলো, তাদের মধ্যে একেকটা জ্যান্টস ছিলো। শেখ মুজিব তখনো তরুণ এবং প্রায় একক একজন নেতা। তার মাথার উপরে একটা লোক বসে আছে সোহরাওয়ার্দী। উনি পূণ-বিকাশও দেখতে পাচ্ছেন না, শাসন-দূরদর্শিতাও তৈরী হচ্ছে না। সে-ভদ্রলোক বাংলা বেশি জানে না। তার শিক্ষা-দীক্ষা ইউরোপীয় ধরনের। সে-তো দেশটার কিছুই বুঝবে না। বোঝেও নি। তারপর শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, সে-তো বুড়ো হাতি। (রাজার বুড়ো হাতি হাঁটছে আর ঢং ঢং করে শব্দ হচ্ছে।) ওরা বুড়ো হাতি হয়ে গিয়েছিলো। ওদের দিয়ে আর তেমন কিছু হওয়ার ছিলো না। আর বাকি যারা পণ্ডিত ছিল, পণ্ডিতরা দুরকম কাজ করেএকদিকে আমাদেরকে অনেক কিছু দেয়, অন্যদিকে অনেক কিছু পণ্ড করে দেয়। সবমিলিয়ে পাঁচের দশকে খুব ডিপ্রেসিং ছিল। সাহিত্যেও তার ছাপ পড়ে গেছে। সেই কারণে পাঁচের দশকটা কেনো যে এইরকম আকারে রয়ে গেলো আমরা কারণ খুঁজে পাই না। পাঁচের দশকে একটাও ভালো লেখা খুঁজে পাচ্ছিই না প্রায়। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ তখন আর দেশে নেই। আবু ইসহাক একটা বই লিখে আর লিখেন নি। সূর্য দীঘল বাড়ি সেটাও-তো প্রায় চারের দশকের। ৪৮ সালে বেরুলো লালসালু। কামুকে আমরা বিখ্যাত বলি বটে। তার বই বেরিয়েছে অনেক পরে। প্লেগ বেরিয়েছে পরে। অন্যান্যগুলো-তো ইংরেজি হয়েছে ষাটের দশকে। কামু দ্বারা প্রভাবিত এসব বাজে কথা বলে কোনো লাভ নেই। উনি ওই-রকমই লিখতেন। মাঝে কিছু কবি আত্মপ্রকাশ করলেন, শামসুর রাহমানের মতো কবি। এখানে একটু হাত ধরাধরি আছে। কবিতার ক্ষেত্রে হাত ধরাধরি হয়। অর্থাৎ তিরিশের কবি একটা গ্র“প। তাদের মধ্যে কতোগুলো কমন ফিচারস আছে। ‘আধুনিক কবিতা’ বলে একটা বই রচনা করা যায়। আধুনিক কবিতায় ইউরোপিয়ান মিথলজি দ্বারা তারা সৃষ্টিকর্মকে নানাভাবে উৎসাহিত করে। যেমন আমাদের পঞ্চ-কবি বলে থাকি। কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করি, কথাসাহিত্যে এ-জিনিসটা এলো না কেনো একেবারেই। কেনো বিভূতিভূষণ এ-পথে হাঁটলেন না? মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় এ-পথে হাঁটলেন না কেনো? একই সাহিত্য, অথচ তার কবিতা-শাখা হঠাৎ একটা আন্তর্জাতিক মানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আর কথাসাহিত্যে আন্তর্জাতিক মানে-তো বলতে পারছোই না, সেই সেকেলে আমাদের বাঙালি নির্ধন গরিব, আচ্ছা এর কারণ কী। আমি কিন্তু অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু এর কোনো জবাব পাই নি। তাহলে কবিতাকে কি বলবো ঠুনকো বা চাপানো ছিলো। তিরিশের দশকের যে অমিয়ভূষণ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে। সেই-সময়েই লিখা পথের পাঁচালি, সেই-সময়েই লিখা পদ্মা নদীর মাঝি, এদেরকে কেউ আধুনিক বলে না, আর কবিগুলো সব হয়ে গেলো অত্যাধুনিক। বেশিরভাগ ইংরেজিতে কথা বলেছে। দার্জিলিং চা খাচ্ছে। সে-প্রভাবটা কেনো সাহিত্যে? কয়েকজন কবির উপরের ঢেউটা কিন্তু সাহিত্যের উপর নয়। ফলে আজকে এদের আধুনিকতা ফিকে, ফেল করে গেছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ কিন্তু ফেল করে নি। ঐ-সময়টাতে বাদুলে পোকার কিছু উড়েছিল। ঐ তিরিশের দশকেই জনসংখ্যার অবস্থা খুব খারাপ। আমাদের রাজনীতির আবস্থাও খুব খারাপ। সাম্প্রদায়িকতার দেখা তখনও সেইভাবে দেয় নি। ৩৫ সালে কংগ্রেসে মুসলিম লীগ জয়েন করার আগে ঠিক ওই রকম হয় নি। বিশের দশকে দুএকটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল তারপর আর তেমন কিছু নয়। কিন্তু এই নতুন ফিচারগুলি সেই সঙ্গে কৃষকদের একটা দুর্বিষহ অবস্থা। তার জন্য একের পর এক কৃষক-সমিতি হচ্ছে, আন্দোলনগুলো ঘটেছে। তিরিশের দশকে এগুলো খুব সাংঘাতিক হচ্ছে। তার ছাপ হাঁসুলি বাঁকের উপকথায় আছে। আর জঙ্গলে পড়ে থাকলে হবে না। এইবারে আমাকে রেলে গিয়ে কাজ করতে হবে। নতুন যুগ সাড়া দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের কবিতা তাদের ব্যাক-সাইডটা আমাদের দিকে এক্সপোজ করে রেখে দিয়েছে। আমি মাঝে মাঝে খারাপ কথা বলে ফেলি, কিন্তু কি করবো বলো? ইউরোপে একটা সাংস্কৃতিক সমতা পাওয়া যায়। আমাদের এখানে সেটা গড়ে উঠে নি। যদিও পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতার পূর্বকাল পর্যন্ত এক-ধরনের অখণ্ডতা ছিলো-তো, এখন আলাদা হয়ে গেছে! এরচেয়ে বেশি কথা বলতে গেলে সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গ উঠে যাবে। সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ তুলতে দোষ কিছু নেই। কারণটা খুজলেই হয় যে, কেনো সাম্প্রদায়িকতা দেখা দিল? কারণ, শাসক যখন শাসিতের মধ্যে পড়ে গেলো তখন সেই শাসিতের মধ্যে উন্নতি করলো। কিন্তু কোনো? শাসকদের যারা উত্তরাধিকার তারা হলো না কেন। মনে হয় না? মুসলিমেরাও-তো ছিল। দীর্ঘকাল। পাঁচশ, ছয়শ বছর। মুসলমানরাও-তো ক্ষমতায় ছিল। তারপর কি হলো হঠাৎ? একেবারে, ‘তোমারে বোধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’, প্রায় সে-রকম। মারব ইংরেজকে কিন্তু ইংরেজদের দ্বারাই। মুসলমানদের সে-জিনিসটা হলো না। সেটা কি অহংকার? সেটা কি জাতিগর্ব? কি সেটা? আই ফেইলড টু এক্সপ্লেইন। কেনো এটা হলো, এ-রকম একটা পরিস্থিতিতে সাহিত্যের আধুনিকতা বিচার করাটা খুবই মুশকিল। আবার যে-গদ্য সাহিত্য তৈরী হচ্ছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ হিসেবে ধরা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ আছেন তো। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র তার পরবর্তী সাহিত্যিক এক অর্থে বিশ্ব-সাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয় নয় কেনো?  ঐ-সময় যা যা তৈরী হয়েছিলো তা-তো আমরা দেখেছি। ঐ-সময় হয়তো ডিকিন্স, থ্যাকার, হার্ডলি লিখছেন। কি তফাৎ? মূল তফাৎ কি হচ্ছে? একটা তফাৎ হচ্ছে, সমগ্র জাতির ঐতিহ্য পার্ট বাই পার্ট ভাগ হয়ে গেছে। কারণ, সমস্ত দেশ অনেক আগে স্বাধীন হয়েছে। রক্তপাত লড়াই অনেক বেশি করতে হচ্ছে। ওরা নিম্নতম একটা জায়গায় সমতা এনেছেন। কিন্তু ডিকেন্স হাতে নিলে সাধরণ পাঠকরা মুখিয়ে থাকে যে, কখন কপার কিল্ডের পরবর্তী অংশটা আমেরিকাতে পৌঁছাবে? অনেকটা আমাদের হুমায়ূন আহমেদের মতো। একেবারে পতাকা নিয়ে, ‘ডোরাকে মারা চলবে না, ডোরাকে মারা চলবে না। বাঁচিয়ে দিতে হবে।’ একেকটা চরিত্র এ-রকম! তাহলে ধরো, যাকে এ্যাড্রেস করতে হয় লেখকদেরকে সেটা বিরাট, মানে মোড়লের কাছাকাছি। আর উপনিবেশ স্থাপনের ফলে ভাষাটার চলন এতো বেশি বেড়ে গেলো। আমরাও সেসব লেখা পড়তে পারছি। আর পড়লেই তার প্রভাব হবে। প্রভাব পড়লে তার ব্যবহার হবে। এগুলো তখন আমাদের হয়ে গেলো। আর ইউরোপে সেটা ছিল আগে থেকে। এই গল্পটা আমি অনেকের কাছে করেছি। আমাকে একজন রাশিয়ান বলেছিলেনদস্তয়ভস্কি ছাপা হবে কি করে। আমাদের এখানে দশ কোটি লোক সব স্বাক্ষর। বই-ই লেখে কতো! বই জমা দেয় এবং স্ট্যান্ডার্ড বই। সেগুলোই রাখার জায়গা নেই। এতো বেশি! তোমরা যা বই লেখো তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। এই বইগুলোর পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হয়। কেউ তো প্রাইভেটলি বের করতে পারে না। সেই জন্য তো অনেক সময় ফেলেও দিতে হয়। আর হয়তো প্রকাশের মুখই দেখবে না। যদি আমি একটা কপিও খুঁজে পাই। টলস্তয়ের ওয়ার এন্ড পিস পাওয়া যাচ্ছে প্রত্যেককে দোকানে লাইন দিতে হবে। তখন টলস্তয় ছাপতে ছাপতে শেষ। আর বের করতে পারবে না। পরিস্থিতি কি রকম তাহলে দেখো। আমাদের কিন্তু মোটেই তা না। হাসান আজিজুল হক, কে, কে লোকটা? অনেকে হয়তো পেলোই না খুঁজে। তাহলে বার্নাড শ-র মতো বলতে হয় : ‘হড়ঃ ঃড় শহড়ি সব, ংযড়ংি ুড়ঁৎংবষভ ঁহশহড়হি’। আমি কে এটা যদি তুমি না জানো, তার থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, তুমি কিচ্ছু না। আমাদের অবস্থা তাই হয়েছে। বলতে হয় আমি অমুক। তাহলে এই সাহিত্যের পাঠক নেই। অথচ বই বের হচ্ছে। তাহলে পাঠক সীমিত, কম। দুর্ভাগ্যের কথা, বলতে গেলে যারা লেখক, তারাই পাঠক। আমি-তো মনে করি, আমাদের এখন এমন হয়েছে, বান্ধবিকে গান শোনাতে ডাকতে হবে সতীশকে। ‘ও মোর কানাই তোরে জানাই মোর দুঃখ’। কবির কবিতা লিখে ডাকতে হয় কবিকে। কিন্তু কেউ কোনোদিন বলে নি পড়ে কি বুঝলাম, কি পড়লি, কি করলি তুই? এতো কথা তোমাদের বললাম তো, সবগুলি একটু একটু করে কনট্রিবিউট করছে আমার এই কথাগুলোতে। তাহলে আজকের পৃথিবীতে আমাদের যা লেখা হচ্ছে তার বেশিরভাগই সম্ভবত যথেষ্ট মানসম্পন্ন নয় এবং সাহিত্য যখন টেকসই জিনিস দেয়, তখন এক রকম দেয়। সাহিত্য একটা অদ্ভুত ব্যাপার! সিল্কের মতো, যতো কাঁচবে ততো সোনার মতো ঝকঝকে হবে। আমাদের ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। হচ্ছে, চকমক করে উঠছে চারিপাশে, তারপরেই বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছে। হুমায়ূন সম্পর্কে কি আলাদা কথা বলব। একই কথা। দাঁড়িয়ে রয়েছে উত্তুঙ্গ মাথা তুলে এরকম ওয়ার্কস খুব কমই আছে। যা কমে যায় তার সঙ্গে উল্লেখ করতে গেলে ব্যতিক্রমের কথা বলতে হয়। এতোটা দুর্দশাজনক একটা ছবি তুলে ধরছি বলে বলতে পারো, ‘আমরা কি কিছু করতে পারি নি স্বাধীনতার পরে? তখন বলতে হয়, করেছো বইকি। একেবারে যে করো নি তা নয়। ষাটের দশকে লড়াই করেছো, কিছু কাজ হয়েছিলো। পাঁচের দশকে লড়াই করেছিলে, কিছু কাজ হয়েছিলো। সবসময় লেখাতে সামাজিক লড়াই দেখাবে তা-তো নয়। সাংস্কৃতিক লড়াইও বটে। আমাদের বিরোধী দেশ যতো বেশি লড়াই ও ততো বেশি। যতো বলছে রবীন্দ্রনাথ গাইবে না, ততো গাইবে। যতো বলছে মুসলিম কবি নাও, ততো পাঁচজন বিখ্যাত বিখ্যাত কবিকে নিয়ে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান হচ্ছে। যা বলছে তার উল্টো করছে। অথচ মার্শাল ল চলছে, তরুণদের মধ্যেও তাই, আমাদের মধ্যেও তাই। আমরা কারো কথা শুনবো না। তবে আমি অতিক্ষুদ্র প্রাণী। আমি রাজশাহীতে ধূলার পোকার মতো ধূলায় লুকিয়ে থাকি। আমি কিছুই দাবি করবো না। আমি কিছু প্রভাব-বিস্তারও করতে পারি নি। আমি অশিক্ষিত, ব্রাত্য, সত্যিকথা বলছি। আমার বহুত কম পড়াশুনা ছিল তৎকালে। আজকে আমার পড়াশুনা অতোটা কম নেই। কিছু বিখ্যাত জিনিস পড়া ছিল তৎকালে। এছাড়া বলার মতো কিছু নেই। বাংলা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ পর্যন্ত তারপর বাংলা ছোটগল্প আর কি লেটেস্ট বলতে পারবো না। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প কতোটা এগিয়েছে আমার কোনো ধারণা ছিল না। এটা আমি বলি, কিন্তু লোকজন বিশ্বাস করে না। কিন্তু কথাটা সত্য। কম পড়েছি। পরে পড়েছি অনেক। ডিটেইলে পড়েছি। ভালো করে পড়েছি। তবে দেরিতে পড়েছি। এই সময়টাতে এগুলো যদি হয় নিজে থেকে এগুতে হবে। আমার আর কোনো উপায় নেই। তাই বাধ্য হয়েই আমার যে ইমেজ-স্টিম আছে, তাই চালায়, আমি আর কি করবো। আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ষাটের দশকে গল্প-টল্প লিখি নি। আধুনিক হবার চেষ্টাও নেই আবার বিখ্যাত লোকদের মতো গল্প লিখে বিখ্যাত হবার চেষ্টাও নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক অবস্থার কারণে কোনোটাই আমার ছিলো না। এমন নয় ঢাকায় থাকলে আমি হয়তো এ-রকমই হতাম, কিন্তু আমি যে ঢাকায় থাকি নি এখন হিসেব করে দেখলে দেখি, সেটা আমার জন্য একটা আর্শিবাদ। কারণ আমি ঐ-সমস্ত উটকো আধুনিকতার ঝামেলায় পড়ি নি। লিখেছি একটু আধটু। কিন্তু আমি ওদের মতো করে লিখি নি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যখন কণ্ঠস্বর বের করলো তখন নানা  নেগেটিভ লেখা চারিপাশে, কণ্ঠস্বর-এ আমার বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আমার মতো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কখনো আমাকে বলেও নি, ‘আপনি এ-রকম লিখছেন কেনো? ঢাকায় গেলে আমাকে সন্দীপণের চিঠি পত্র দেখাতো। ওদের পাগলামির খবর দিতো। আমি মজাই পেতাম। তার বেশি আর কিছু না। আমি তখন তাকিয়ে দেখলাম সমস্ত দেশটার দিকে।  কাজেই আমি যদি ঐতিহ্যকে পিছিয়ে দিয়ে থাকি তাহলে বল, তাহলে আমাদের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতি, তারাশঙ্কর কিংবা শরৎচন্দ্রের নিম্নবিত্ত মানুষ, কিংবা রবীন্দ্রনাথের অনেক নিম্নবিত্ত মানুষ এই জায়গাতে  আমার চোখটা চলে গেলো। আর পশ্চিমবঙ্গে এই রকম একটা আবওহাওয়ার মধ্যেই-তো ছিলাম। তখন তো বুদ্ধি জ্ঞান হয় নি। তখন-তো কার্যকারণসূত্র টের পাই নি। পাকিস্তানের সব শোষণ-তো আলাদাভাবে টের পাই নি। মারগুলো-তো তখন পিঠে এসে দমাদম লাগছে। পাঁচের দশকের মার ষাটের দশকে মনে থাকবে না? প্রচণ্ড লাগছে আর কি। আর সেই-সময় মনে হচ্ছে একদম রাখা যাবে না। তখন স্লোগান-মূলক সাহিত্য সেটা খুব সম্ভাবনাময়। আমার সেটা হয়েছে কি-না জানি না। দুটা গল্পে সেটা করেছি স্লোগান-মূলক। আমার তখন আর বিষয়ের অভাব হলো না। আমার তখন আর মনে হলো না আধুনিক সাহিত্য ওরা যা লিখছে তা দেখে লিখি। কিছু করতে হলো না। প্রথম গল্প ‘শকুন’। ব্যক্তিগত, বালক জীবনের একটা ঘটনা। তারপর ‘তৃষ্ণা’। এ-রকম একটা বালককে দেখেছিলাম। কোন গল্পটা না! একেবারে ডিরেক্ট ফ্রম এক্সপেরিয়েন্স। ও যধাব ফবংবৎরনব ড়হষু সু বীঢ়বৎরবহপব। আর আমি নিজে কিছু করি নি। আমি দূরে ছিলাম। কিন্তু লক্ষ্য করছি আবদুল মান্নান সৈয়দ, তার পপুলারিটি, তার সাহিত্যের সুনাম। আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনে কখনো স্বীকৃতিই দেয় নি যে, আমি একজন লেখক। এ-রকম অনেক হয়েছে। পুরোনো-কালের ঐ-গ্রামের বিষয় নিয়ে লেখে। সেই ধারণাটাই ছিলো। আমার কপাল ভালো তোমরা এখন অন্য কথা বলছো। ঐ-ধারণা আমার নিজেরও ছিলো, তাই লোকজনেরও ছিলো। এ-সময় আহমদ ছফা লিখছে ‘সূর্য তুমি সাক্ষী’। আরও দুএকজন লিখছে। আর বুড়োদের মধ্যে সেই পুরানো হাড়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, কাঁদো নদী কাঁদো, চাঁদের  অমাবস্যা। আর-তো তেমন কেউ নেই, আর কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক এরা এসে গেলেন। আর অনেকে পিছিয়ে গেলেন যেমন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত আলি, এঁরা তেমন কিছু করলেন না। পরবর্তীকালে ষাটের দশকে আবার নতুন করে জেগে উঠলেন। পাঁচের দশকে সাহিত্য অন্তত একটু জামা কাপড় বদলালো। আর কবিতায় যে-উগ্রতা তিরিশের দশকে শুরু হয়েছিলো তাই পঞ্চাশে ছিল এবং ষাটে দেখা গেল। তখন বোদলেয়ারের চাইতে বুদ্ধদেব বসু বেশি বিখ্যাত। কারণ বোদলেয়ার অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। এমন নানা-রকম ব্যাপার-স্যাপার। আমরা এসব পড়ছি। উদ্ভাবিত হচ্ছি। কিন্তু অভিভূত হবার ব্যাপারটা আমার জীবনে ঘটে নি। এখনো আমি সহজে অভিভূত হই না। সে-জন্যই তোমার এ-প্রশ্নের এতোবড় করে জাবাব দিলাম। আজকে মনে হয়, যে-ব্যতিক্রমগুলি বাদ দিলে আমাদের সাহিত্যের শাখাগুলি যে জোর পাচ্ছে তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। যতো দিন যাচ্ছে জোর যেনো ততোই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তারুণ্য যেনো আরো ক্ষীণ হয়ে আসছে। তরুণের  গলা আর সেভাবে শোনা যাচ্ছে না।
এর কারণ সামগ্রিকভাবে শিক্ষা। সংস্কৃতি ও শিক্ষা। শরৎচন্দ্রের এতো পাঠক ছিল, এখন আর হয় না। তার কারণ শুরুটা দেখেছে-তো ৪৭-এ। তারপরে এই সাম্প্রতিক-বিশ্ব। তারপর আমাদের এই লেখাপড়া তারপর পাকিস্তানের ছেড়ে চলে যাওয়া। ফলে আমরা যে একটা জাতি সুবিকশিত হব সেটার কোনো সুযোগ হলো না। একাত্তর সালের পরে না রইল আদর্শ, না রইল কিছু। দোষারোপ-তো সাহিত্যের হল। ধরে চাপকানো উচিত রাজনীতিবিদদের। তারা শুধু খেয়েছে, তারা কিছু করে নি। তা না হলে এ-রকম হবে কেনো, তারা যদি কিছু করেই থাকবে তাহলে জাতির জনককে মেরে ফেললো কেনো?। চার নেতার মৃত্যু ঘটে কেনো? সব ঠিক মতো যদি চলতো তাহলে তাজউদ্দীন আর শেখ মুজিবের মধ্যে ফারাক তৈরী হলো কেনো? সব যদি ঠিকভাবে চলবেই তাহলে বাকশাল হলো কেনো?
যা হোক, দুটি কারণে আমার কথা বলা অনেকটা মুশকিল। এক. আমার বয়স হয়েছে, আমার আর তেমন দেবার কিছু নেই। কাজেই বেশি বকবক করাটা আমার উচিত নয়। যেটিই তোমাকে বলছিলাম। কবিতার ক্ষেত্রে সেটা এ-রকম হচ্ছে কেনো? আমি ভাবার চেষ্টা করি। সে-রকম আমাদের নয় কেনো। শামসুর রাহমান বড়ো কবি। পরবর্তীতে উনি যেটা করেছিলেন সেটা একটা ভালো জিনিস। সাধারণ মানুষকে এ্যাপিল করতে পারা! এমন জিনিসগুলো নিয়ে খুব হৃদয়দ্রাবক লেখা লিখেছিলেন। ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘আসাদের শার্ট’ ইত্যাদি। তিনি পুরো সেন্টিমেন্টটা ধরতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর যেটা বিশেষভাবে বিকশিত হয়ে উঠল। কবিতা শক্তির জায়গা থেকে হিসেব করলে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভূত কবিতা শক্তি যা তিনি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। বিষয়বস্তু অনেক-সময় আমি বুঝতে পারি না। আল মাহমুদও কিছু দেশজ উপাদান ও সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। সেই জায়গা থেকে বলতে গেলে সেই পুরোনো নামই করতে হয়। আবুবকর সিদ্দিক বা আমরা যারা অবসিত তাদের নামই করতে হয়। কিন্তু এটা-তো কোনো কাজের কথা হলো না। আবার পৃথিবীর দিকে যদি তাকিয়ে দেখি কবিতা এমনিই কেমন যেনো মার খেয়ে গেছে। তার বাস্তব কারণ প্রযুক্তি। এই আলোচনা এখানে থাক। ভীষণ লম্বা হয়ে যাবে। এর কারণ কি। মানুষের যে জীবন-যাপনটা স্বাভাবিক সেখানে যখন ভীষণ পরিবর্তন ঘটে তখন মানুষটাকে এক-রকম বদলের দিকে তাড়ায় আরকি। যে-অবসর, যে-শান্তি, যে-কর্মকোলাহলহীনতা তারপর জীবন ধারণের স্বাভাবিকত্ব, চিরাচরিত অভ্যাস থেকে সরে যাবার পরে প্রযুক্তি একেবারে আমাদেরকে টেনে অন্য দিকে নিয়ে গেছে। এর থেকে মনে হয়েছে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ বাড়ে নি বরং কমেছে। যোগাযোগ যদি কমেই থাকে, মানুষ মানুষকে অনুভব করবে কী জন্য? আবেগগুলো কাজই বা করবে কেনো? ধরো ইউরোপে নারী এতো সুলভ, সেখানে একটা শেলী আর পাওয়া যাবে না, আমাদের এখানেও প্রায় সে-রকম জায়গায় চলে এসেছে। কাজেই কবিতার যেটা জায়গা আমার-তো ধারণা ইনটিলেক্ট ছাড়া কিছুই তৈরী হয় না, কিন্তু তার মূল উপাদান হলো গভীর অনুভব এবং উপলব্ধি। এবং সেটা কোহেরেন্টলি হওয়া দরকার। সেটা যদি কোহেরেন্টলি প্রকাশ না পায় তাহলে কিন্তু সেটা কবিতা হবে না। রবীন্দ্রনাথও অনেক চেষ্টা করেছেন কিছু আবোল-তাবোল কবিতা লিখতে। কিন্তু আমি দেখেছি অর্থ নেই, অথচ দারুণ! এখন সে-রকমটাও তো হলো না। খুব গম্ভীর কবিতা সব। তাও-তো বুঝতে পারি না।  অতোটা কিসের প্রেম? কি লেখে? প্রেমটা-তো আমি ভালো বুঝতে পারি না। প্রেম আর সেক্স এর মধ্যে পার্থক্য কি আমি ভালো বুঝতে পারি না। একটারে ছাড়া আরেকটা আদৌ সম্ভব কি-না তাও বুঝতে পারি না। যা বুঝি না তা নিয়ে অনর্থ মাথা ঘামাতে চাই না। কবিতা মানেই ‘তুমি’ আছে। ‘তুমি পাশে থাকলে’, ‘তুমি চুল এলিয়ে দিলে’, ‘তুমি বারান্দায় বসে থাকলে’, ‘তুমি গান করলে’ এই-সব, অন্য-কোনো বিষয় নিয়ে লেখে না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তবু তো উপদ্রুত উপকূল নিয়ে লিখেছিল। আবুল হাসানও-তো ‘পাতাকুড়ানি মেয়ে’ লিখেছিল, আল মাহমুদও ‘নদীর মতো বল কন্যা কবুল কবুল’দারুণ সমস্ত কবিতা। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী ছিলেন তো। এদের চেয়ে খারাপ কবিতা লিখবো না, বড় লিখব তা কথা নয়। আলাদা কবিতা লিখবো। তো আলাদা কই? হচ্ছে কোথায়? কবিতা লেখা বা পাড়ার দিকে আমি যাই নি। কিন্তু জায়গাটা-তো বুঝতে পারি, কবিতা আমাদের কোন জায়গাটা দখল করে রয়েছে? টের পাই, নিজের লেখা থেকে-তো আমার একটা ধারণা আছে, কাউকে বলি বা না বলি। সেজন্য আমি বলি যে, কবিতা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তাই বলে কবিতা সম্পর্কে বলতে আমি একফোটাও ভয় পাই না। কেননা কবিতা-তো কারো পৈতৃক জিনিস না। আমার অধিকার আছে, আমি গান শুনে কি অনুভব করব। বলতে পারো, আপনি তাল বুঝেন নি, লয় বুঝেন নি, এ-ছাড়াও যা বুঝেছি তাও আমার বলার অধিকার আছে। কবিতা সম্পর্কে সে-কথা বলব, দেখো মাঝে-মাঝে পড়ি। উল্লেখ করার মতো কবি, করলে আমি করতে পারবো দশ-পনেরো জনের কথা। কিন্তু বলে লাভ কি। এরা এ-রকমই সব। খুব-তো অসাধারণ কিছু নয়। আর গল্প! এটা উঠে গোলো না-কি। সারা পৃথিবীতেই আর গল্প দেখি না। এই ল্যাটিন আমেরিকান, এরা তবু গল্পের নাম করে ছোট-উপন্যাস বা অনেক কিছু করেছে। কিন্তু এখানে আর তেমন গল্প দেখি না। কাজেই এ-শাখাটাও চলতে চলতে মৃত হয়ে পড়েছে। তারপর এক-বছর দেখেছি উপন্যাস, উপন্যাস জীবন্ত। তার কারণ হচ্ছে উপন্যাস একটা কাজ করতে পারতো, এর হাতির মতো ধারণ শক্তি, সেই কারণেই প্রচুর আবর্জনা তৈরী হয়ে যায়। আমি একেকজনকে বলি, ভাই তিন কেজি মাংস খেয়ে শরীর শক্তিশালি রাখা ভালো, না-কি আড়াই-মন ঘাস খেয়ে শরীর হাতির মতো করা ভালো?
কবিতা আর গল্প প্রায় শুকনো স্রোত। উপন্যাসটা কিন্তু অনেক বেশি হচ্ছে। যান্ত্রিক-জীবনের উপলব্ধি উপন্যাসের ধারণ-ক্ষমতা বেশি। ঐ-যে বললাম উপন্যাসের ধারণ ক্ষমতা হাতির মতো। প্রচুর খেতে পারে কিন্তু সেটা হয়তো অসাঢ়। কোনো লাভ হয় না, তার চেয়ে দশ কেজি মাংস খেয়ে একটা সিংহ অনেক ভালো থাকে। ঐ-ভাবে যদি তুলনা করি তাহলে বলব আমাদের খড়-বিচালি বেশি। প্রচুর খড়-বিচালি। তারমধ্যে কিছু কিছু পাওয়া যাবে অমূল্য রতœ। আমাদের এখানে উপন্যাসটা অন্য দুই শাখার চেয়ে একটু পপুলার হয়েছে। পপুলার হওয়ার কারণ হুমায়ূনের মতো লেখক বা জাফর ইকবালের মতো লেখক। আমার যা মনে হয়, আমার নিজের লেখা বেশির ভাগ লোকই পড়ে না, কিন্তু আমার সাথে কথা বলতে চলে আসে। কিছুই পড়ে না। না পড়ে কথা বলতে আসাটা আমাকে অপমান করার সামিল। এ আবার কি কথা! সাংবাদিকরা কিছুই পড়ে না, উপন্যাসই পড়ে না। ট্রেনে বাসে বিক্রি হওয়া সস্তা বইগুলোও বিক্রি হয় না। এদের পাঠাভ্যাসই নেই। আমাদের এখানে পড়ার প্রবণতা বাস্তব কারণে কমেছে আবার আমাদের জাতীয় কারণে কমেছে। আমাদের জাতি যা দরকার তা না করে, যা দরকার নয় তাই করে। খারাপের দিকেই যাচ্ছে। নিজের কথাই বলি। আমার স্মৃতিকথা ৩য় খণ্ড যখন পড়বে তখন কিন্তু তুমি পাবে আমার কৈশোর বেলা, খুঁজে বেড়ানো আর লেখাপড়া। তুমি একটু অবাকই হবে। এতো বিষয়ে আগ্রহ কী করে! এসব-তো স্বাভাবিক গল্প। এতো আগ্রহ কেনো? আমি এখানে লিখেছি রবীন্দ্রনাথের গল্প কখন পড়েছি। কিন্তু এতো জেনুইন, একটাও বাজে কথা ভেবে লিখতে হচ্ছে না। কারণ আমার স্পষ্ট গল্পগুলোর লাইন বাই লাইন মনে রয়েছে। শেষ মনে রয়েছে। এমনভাবে পড়েছি। গেল কোথায় সেই পড়াটা ছেলেমেয়েদের।
একটা হচ্ছে যে পেট, বাবা, ওর উপরে কোনো কথা চলবে না, সেটা চালাতেই হবে। চাকরি বাকরির এই অবস্থা। ভালো এডুকেশন নিয়েও কিছুই হয় না। প্রযুক্তিও একটা কারণ। প্রযুক্তির কোনটা আমি নেবো কোনটা না, তা-ও তো বুঝতে হবে! আমি হিসেব করে দেখেছি, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ-বিজ্ঞান, সাহিত্য এইগুলোই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানের যে-অংশটাকে নলেজ বলা চলে সেটা তো নেই। তাহলে কেমন করে কি হবে? এই পরিস্থিতিতে পড়ে দেখা যাচ্ছে, একটা দুইটা উপন্যাস হচ্ছে। এটা ব্যতিক্রমই বলব। কিংবা উপন্যাসের ক্ষেত্রে হয়তো এটাই হয়ে থাকে। নাইনটিন সেঞ্চুরির একটা নতুন উত্থান-তো উপন্যাস।
আমি অতোটা হতাশ নই। এখন কিন্তু একটা বিষয় ভালো হয়েছে। সেটা হলো প্রবন্ধ-সাহিত্য। তার মানে প্রবন্ধে কিন্তু জ্ঞান, পাঠ সবকিছুর পরিচয় থাকে। প্রবন্ধটা একটু উন্নত মানের হচ্ছে। কিন্তু প্রবন্ধের মান উন্নত হলে ক্রিয়েটিভের মান উন্নত হবে এটা-তো সংযুক্ত নয়। হতাশ হয়ো না। কারণ একজন শহীদুল জহির-কে যখন পেয়েছিলে, একজন মাহমুদুল হককে যখন পেয়েছিলে। এখন যারা লিখছে, যতো পুরানো ঢঙেরই হোক, তবু-তো লিখছে। আমার ধারণা মানুষ ব্যাক করবে একদিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের জেনারেশনের নাম ছিলো ‘লস্ট জেনারেশন’। সেখানেও হ্যাভেনের মতো শিল্পি তৈরি হয়েছিলো। এই সময় কবিরা ছিল, পেইন্টাররা ছিল, লস্ট জেনারেশনের। লস্ট জেনারেশনের যে সৃষ্টি পরবর্তীকালে আর তাও নেই।
এখন নতুন একটা ছেলে দেখবে কি করে? সে জানে না তো লিখবে কি করে। অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত যে গোল্ডেন এ+ পেয়ে পাস করে এসেছে। তাকে যদি বলি, ‘আমি এস.এস.সি তে গোল্ডেন এ+ পেয়েছি’-এর ইংরেজী বলো। সে বলতে পারছে না। তার মানে তাকে শেখানো হয় নি। তাহলে কি করতে হবে? সম্পূর্ণটাকেই ঢেলে আবার নতুন করে করতে হবে। তার মানে সমাজটার এই গড়ন রাখা যাবে না। যতোক্ষণ পৃথিবীতে মুনাফা ও পণ্য আছে ততোক্ষণ প্রযুক্তি থাকবে। সেদিন দেখলাম যে, এক ভদ্রলোক বলছেন যে, এটা তো মানব-স্পর্শ মুক্ত সভ্যতা! ধ্বংস আরম্ভ হয়েছে। উইজডমের সাথে নলেজের এমন ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে গেছে যে, এখন সবকিছু ইনফরমেশন ও নলেজ হয়ে গেছে। কিন্তু ঐহ্যিক বিষয় থেকে কখনো জ্ঞান জন্মায় না। যদি জন্মাতো তাহলে সমস্যা ছিলো না।
আমি বললে-তো উপদেশের মতো শোনাবে। প্রত্যেকটা মানুষকে নিজের জীবনের কাজ বেছে নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, এটা করার জন্য আমার জন্ম হয়েছে। এর থেকে উচ্চতর কিছু করতে হবে। লেখার বিষয়টা যদি ঐ-ভাবে গ্রহণ করা না যায় তাহলে কখনো উন্নতি করতে পারবে না। আমি ঢাকাতে থাকি অতএব আমি অনেক বেটার লিখি। কিংবা এতো লোক আমাকে প্রশংসা করল আমার মতো বড় লেখক আর নেই। এটা কোনোই হেল্প করবে না। কোনো কিছুতেই হেল্প করবে না যতোক্ষণ পর্যন্ত না একজন লেখক মনে করবে যে, আমি লেখক। সেইটা আমার একমাত্র অবধারিত নিয়তি। আর কিছু করার নেই। আমি আজকাল লোকজনদের বলি আমার সাথে পলিটিক্স নিয়ে আলোচনা করবে না।
প্রথম থেকেই মনে হয়েছে আমার কিছু হওয়ার নেই। কিন্তু প্রফেসন-তো একটা থাকতে হবে। লেখকের জন্য সবচাইতে কাছাকাছি প্রফেশান হচ্ছে টিচিং, আর সবচাইতে দূরের প্রশাসন। তখনকার যে ঈঝচ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এগুলোর  ক্রেজ ছিল, তা আমাকে স্পর্শও করে নি। তাই মনে হলো, আমি যে-করে হোক মাস্টার হব। তখন মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়েরই মাস্টার হব। পাস করার পর থেকে তেরো বছর বিভিন্ন কলেজে, ইনক্লুড স্কুল। কিন্তু ঠিক ছিল আমার লেখালেখিটা। লেখালেখিটা কেনো? কারণ, আমি যা জেনেছি তার ভাগ আমি সবাইকে দেবো।
চিন্তার ফ্যাকালটিটার এখন কোনো নারিশমেন্ট হচ্ছে না। এই ফ্যাকালটিটা, আমাদের যতো-রকম ফ্যাকালটি আছে তার মধ্যে ইনটোলিকচুয়ালিটির কোনো নারিশমেন্ট হচ্ছে না। প্লেটো বলেছেন তিনটি মূল ফ্যাকালটি আছে। একটা হচ্ছে পিওর র‌্যাশনাল ফ্যাকালটি। মানুষের সঙ্গে এর মৃত্যু হয় না। সেটা অমর জিনিস। আর একটা হচ্ছে আমাদের মহৎ-প্রবৃত্তি। মহৎ-প্রবৃত্তিগুলো সারাজীবন মহত্ব, দয়া, মায়া ইত্যাদি দেখায়। দেহের সঙ্গে থাকে। আর একটা হচ্ছে নিম্নতম-প্রবৃত্তি। নিম্নতম প্রবৃত্তিগুলোর জন্য মানুষ পাগল হয়, কামড়া-কামড়ি করে, লোভ, লালসা যাবতীয় কিছু করে। এটা-তো একদম দেহ থাকা না থাকার সাথে সম্পর্কিত। দেহ নেই-তো এগুলোও নেই। এভাবে যদি তুমি দেখ, একটা মানুষের ভাগ যদি করো, একটা মানুষের মূল পরিচয় হলো তার ইনটেলিকচুয়লিটি, যেটা র‌্যাশনাল বষবসবহঃ। সেটার-তো নারিশ করতে হবে। সেই নারিশমেন্ট-এর কোনো ব্যবস্থা নেই।  আমাদের চিরকাল বলে এসেছে, ‘তোমরাও কর, তোমাদেরও এ-রকম হবে’! আমি এ-রকমই বলি, বললে উপদেশ হয়, কিন্তু আমি এসব মানি। লেখক হওয়া, আর-তো কিছু হওয়ার নেই, তা বললে-তো হবে না। লেখক হবো, সম্মানের অধিকারী হবো, ক্ষমতার অধিকারী হবো, টাকা-পয়সার অধিকারী হবো, সব হতে চাইলে-তো হবে না। তাহলে-তো আমাকে আগেই ঠিক করতে হতো যে, এ-পথ তো আমার নয়। এই জিনিসটা ভালো করে মাথায় নিয়ে প্রত্যেককে বলি যে, দেখো এটা একটা এক্সক্লুসিভ ট্যুর। পজিশন। নড়বার চড়বার অলটারনেটিভ নেই। এটা একক একটা জিনিস। সেটা ছিল। তা নইলে স্কুলে মাস্টারি করে, আট-আনা থেকে একটাকা পারিশ্রমিক, দিন পাঁচটা সাতটা গল্প লিখি, একটা চটের থলিতে ভরে অফিসে অফিসে যাচ্ছি আর মুচকি মুচকি হাসছি আর ভাবছি এইটাই-তো আমাদের একমাত্র ঔষধ। আর কোনো কাজ নেই। একটা সাইডে থাকতে হবে। লেখা, আর জার্নালিজম অনেকটা কাছাকাছি, টিচিংও অনেকটা কাছাকাছি, তাছাড়া কোনো প্রফেশনই নেই। এক্সক্লুসিভ রাইটার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনো প্রফেশান ছিল না। তারাশঙ্কর কোনো চাকরি বাকরি করেন নি। আমি দেখছি যদি লেগে থাকা যায়, এ-কথা ঠিক যে, ঠকতে হয় না। আমি যে এই পজিশনটা বলছি, যে-রকম আদর্শের সঙ্গে যাচ্ছি কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এটাকে কেউ-তো অনুসরণ করে না।
লেখালেখির ব্যাপারে আমার মনে হয় কোনো একটা জায়গা অব্যাখ্যাত থেকে যায়। ব্যাখ্যা করা যাবে না। তোমার এ-প্রশ্নটার উত্তরে বলতে হয়, আমি প্রত্যেকটা গল্প লেখার সময় তীব্রভাবে সচেতন হয়ে অন্য গল্প থেকে আলাদা একটা ভাষা ব্যবহার করতে বসলাম, এ-রকমটা করে হয় না। আরেকটা কথা, আমার মনে হয়, রিপিটেশন জিনিসটা বিরক্তিকর। একজনের রিপিট করা, একই কথা, রিপিট করা বিরক্তিকর। অবার একই অনুভব বারবার চালানো সেটাও বিরক্তিকর। আমি যখনই কোনো গল্প লিখতে বসি, আমি ভাবি যে, এটা-তো অমুক গল্পের মতো করে লেখার দরকার নেই। আমার সব গল্পের ভাষা একভাবে তৈরী নয়। কেনো নয়? আমি কি ইচ্ছে করে এ-রকম ভাষা লিখেছি। ইচ্ছে করে একটা দুটি গল্প আমি ভাষার উপর জোর দিয়ে লিখেছি। সেটার জন্য আমি অনুতপ্ত। না করাই উচিত ছিল। সেটা হচ্ছে, ‘জীবন ঘষে আগুন’। এখানে ইচ্ছে করে ভাষাটাকে নিয়ে কাজ করা আছে। তাছাড়া ভাষাকে নিয়ে আমি বিশেষ করে গুরুত্ব দিই নি। মনে করেছি যে, আমি যা করতে চেয়েছি সেইটার বাহন হবে ভাষা। তাই না? কয়লা নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রেন দরকার। কয়লা নিয়ে যাওয়ার জন্য যদি গরুর গাড়ি খোঁজো তাহলে হবে না। সেইটা ভাবতে হবে। গল্পটা লিখব, বহন করবে-তো ভাষা। কেমন ভাষায় তাহলে আমি লিখব? নৌকো না-কি উড়োজাহাজ? কিসে গতি আসবে। আর রিপিটেশন করবো না। নিজেকে রিপিট করবো না। আর রিপিট না করা মানেই হচ্ছে আমি বাধ্য হয়ে চিন্তার ধাঁচই গড়ে তুলবো। প্রথম বাক্যই আলাদা হয়ে যাবে। প্রথম বাক্য নিয়ে আমি একটু ভাবি। ভেবে মনে করি ও-বাবা এতো সমরেশ বসুর চা-এর স্টল হয়ে গেলো। না এটাতো চলবে না। এ-রকম ভেবেছি, ফলে উৎকৃষ্ট হয়েছে, লোকে বলে। যেমন ‘আত্মজা একটি করবী গাছ’ আমি তিন-চার চার লিখলাম, তারপর প্রিন্ট আনার পর এতোই বিশ্রী লাগলো! কতোবার পড়ি, হঠাৎ আমার মধ্যে একটা বোধ জাগ্রত হলো। ‘এখন শীতকাল’ এইটা দিয়েই শুরু হলো।
দেখ, একেকটা মানুষের একেকটা অনুভূতি। কারো লম্বা গল্প শুনতে ভালো লাগে, কেউ লম্বা গল্প শুরু করলে মনে হয় কখন ছাড়বে-রে বাবা। আমার ঠিক এ-রকমই। এটা আমার ধরণ হয়ে গেছে। বাক্য নিয়ে আমি খেলা করি না, আমি বলি যে, ভাষা নিয়ে লেস মনোযোগ দাও। এতো ভাষার সৌকর্য দরকার নেই। যদি কৃত্রিম লেখক হতে না চাও তাহলে ভাষার অতো সৌকর্য দেখিও না। ভাষাটাকে চলতে দাও তার মতো।
ভাষাকে এমন করে আমি ব্যবহার করতে চাইছি যাতে ম্যাক্সিমাম ফল তার কাছ থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু নতুন ধাঁচ বা নতুন কিছু করার চেষ্টা করার দরকার নেই। আর বাংলা ভাষার শব্দের প্রাচুর্যও-তো আছে। সেটা কেউ ব্যবহার করে না। সেটা করতে পারলে খুব ভালো। এই আমার এখানে একটা পাণ্ডুলিপির প্র“ফ আছে, এখানে লেখা আছে, ‘স্যার ইয়োলো কালি দিয়ে দাগ দেয়া জায়গাগুলো বিশেষভাবে লক্ষ করবেন। আমি লক্ষ করে দেখলাম যে, সে-রকম যদি দশটা জায়গা থাকে তার মধ্যে আটটা আমারটাই ঠিক। ওরা ওটা বুঝতে পারে নি।
পুরোনো বই কিনতে গেলাম, প্রত্যেক পাতায় পাতায় ছেড়া, যেখানে-সেখানে মন্তব্য লেখা। কোনোটা পেন্সিলে, কোনোটা কলমে, কোনোটা-বা কার্বন পেন্সিলে। সেই জায়গাগুলো ধেবড়ে গেছে। কার্বন পেন্সিলে লেখা জায়গাগুলো ধেবড়ে গেছে। লিখেছি, ওরা বুঝতে পারে নি। আমি লিখে দিলাম, ঠিক আছে। এমন হয়, শব্দ-তো নিজস্ব। দুম বললে দুম বুঝায় না। ধ্বনিই আমাকে বলে দেয় যে, এর অর্থ কি। ধেবড়ে গেছে বললে বোঝা যায় যে, ধ্যাবড়ানো বা নষ্ট হয়ে গেছে।  আমি এরকম অনেক কথা ব্যবহার করেছি। বিশেষ করে আমি যখন সুযোগ পাই, মানুষের কাছে, মানুষের মধ্যে কথা বলার, তখন আমি খুবই মনোযোগের সাথে লক্ষ করি। সে-জন্য মুখে বলতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। মুখে কথা বলাও যেমন লেখাও তেমন। তফাৎ হয় না খুব একটা। কোনো কোনো মানুষ একটু বেশি বুঝলে-তো ঠকবে। বেশি গ্রাম্য, বেশি গ্রামীণ শব্দ, আমি ইচ্ছে করে বললেও বুঝবে কি? যেমন ধরো, খুব ঝগরাটে দুই বোন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে, হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে। খুব তাল দিচ্ছে। যাচ্ছেতাই মুখ খারাপ করে গাল দিচ্ছে। হঠাৎ একজন গাল দিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন চুপ করে আছে। আসলে চুপ করে নেই, সে আঁচলটা পেতে আছে। গাল দেয়া হলে, এবার
উপন্যাস বরাবরই লিখতে চেয়েছি। কিন্তু লেখা তেমন আর হলো না। এটাও একটা যুক্তিসঙ্গত কথা, লিখতে চাই কিন্তু অতো লিখার সময় পাই না। আর বললাম, রিপিটেশন করবো না। এই বয়সেও রিপিটেশন করবো না। বয়স বেশি হলে মানুষ বেশি কথা বলে, আমি তা বলতে চাই না। অন্তত লেখাতে নিশ্চয়ই না। আমার অদ্ভুত লাগে, কয়েকজন বড় লেখক আমাকে টানে না। বড়ই বিশিষ্ট ভাষা, ঐ ভাষাটা প্রাণহীন মনে হয়। আর্টিফিসিয়াল মনে হয়।
জ্যোতিপ্রকাশের গল্পÑ অসাধারণ সব গল্প। কিন্তু বেশি যতœ হয়েছে। এতোটা যতœ ভালো না। আমার মনে হয় একটু এলোমেলো থাকা ভালো। কারণ আমি যতোদূর জানি, রুশ-ভাষা তো জানি না, কিন্তু মন্তব্য করতে শুনেছি যে, তলস্তয়-এর ভাষা ভেরি ব্যাড। ব্যাড হোক আর যাই হোক, ওয়ার এ্যান্ড পিস আর পৃথিবীতে লেখা সম্ভব হবে না। তারপর দস্তয়ভস্কি, অতিকথন, দারিদ্র্যের জন্য। বড় ভাই তার ঘাড়ে সংসার ফেলে দিয়ে কেটে পড়ল। তখন-তো ড়িৎফ ধরে-ধরে পয়সা। ফলে, ইনফ্লেটেড করে দেয়। তারাশঙ্কর ইনফ্লেটেড, কিন্তু মানিক বন্দোপাধ্যায় তা নয়। মনে হয় যেনো কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে। একেকজনের একেক রকম অদ্ভুত স্টাইল আছে।
আসলে আমার ধারণা বেসিক্যালি বদলায় নি। যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে ক্রমাগত নতুন নতুন জিনিস জড়ো হয়েছে। আরেকটা জিনিস, আমার মনে হয় আমার পড়াশুনা করাটা উপকারে এসেছে। বিশেষ করে উপন্যাসিকের পক্ষে সবকিছু খুব ভালো করে জানা দরকার। অর্থনীতি না জানলে একালে উপন্যাস লেখা উচিত না। রাজনীতি না বুঝলে একালে উপন্যাস লেখা উচিত না। এগুলো যদি তুমি ধরতে পারো তাহলে মনে হবে কি সমাজটা তোমার কাছে অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে। এজন্য আমার পড়াটা আমি বহাল রেখেছি। এখনো আমি বিভিন্ন দার্শনিক যারা আছেন তাদের বই পড়ার চেষ্টা করি। ইচ্ছে করে যে লিখি তাদের পক্ষে-বিপক্ষে কিন্তু এতো সময় আমার নেই। এখন আমি বসে বসে পোস্টমর্ডানিজমের উপর একটা লেখা লিখতে যাবো, না, সে আলাদা জগৎ, তা করতে গেলে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে করতে হবে, এভাবে হয় না। প্লে¬ন কথা প্লেনভাবে লিখব, এই। মা যে ভাষাতে কথা বলতো, ‘আমার যখন ল বছর বয়েস তখন আমার ভাই হলো আমার মা তাকে আর আমাকে ল বছর রেখে মরে গেলো। ভাই তখন ছোট। আমারই উপর এসে পড়ল। আমি তখন কাকালে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ভাই কিরমে কিরমে আমার কাকালের পুটলি হয়ে গেলো।’ চললো-তো চললো। ব্যাস। তারপর মা বলে ব্যাডা হচ্ছে? হ্যাঁ হ্যাঁ হচ্ছে হচ্ছে, তুমি বলো। মা দুটো তিনটা কথার পরেই একটা কথা বলে যে মরে যাওয়া লাগবে। তারপরে বাপ ছিল, আরো বিয়ে করলে, তিনটা ছেলে হলো তারপর বাপ আমার মরে গেলো। তারপর একটা ছোট ভাই হলো। ছোট ভাইটা বেশি বড়ো হলো না। তারপর সে মরে গেলো। মরে গেলো ক্যান, মানুষের-তো মৃত্যুই অধিক। মানুষের জীবনের সবটাই-তো মৃত্যু। সেটা একটা স্টাইকের পয়েন্ট। মানুষের মরে যাওয়াটা। মানুষ একবার মরে না হাজার হাজার বার মরে। আকস্মিকভাবে এই চিন্তাগুলো দেখা যায়। আমি আগে যে চিন্তা করি নি। আকস্মিকভাবে এ-চিন্তা দেখা যায়, মনে হয় সামথিং বিস্ময়কর। এটা কেনো মনে হচ্ছে। আমি সর্ব বিষয়ে খুব ছেলেমানুষ। তুমি চিন্তা করতে পারবে না। বলবে স্যার আপনি ছেলেমানুষের মতো কাজও করেন? হ্যাঁ, আমি করি। আমি এখনও বাচ্চাদের বই পড়ি। এখনো পর্যন্ত সিরিয়ালগুলো দেখি। সিরিয়াল দেখে আবার রিঅ্যাকশানও হয়। ও মবঃ বহাড়ষাবফবেশ ভালোই। আমার কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায়। তারপর তোমরা যে এলে এটা ‘ওয়ান অব দা প্লি¬েসন্ট ডেইজ অব মাই লাইফ।’
যা হোক, আমি লেখার সবটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারি নি। আমি যদি শতশত বছর বেঁচে থাকি তাহলেও এ-কথা মনে হবে যে, শেষ করা গেলো না। এতো অন্তহীন কাজ আছে। আমি যা করেছি তার সব ভালো করতে পারি নি, সে-ক্ষেত্রে বলি, আমি সবচাইতে কম পড়ি আমার নিজের প্রকাশিত রচনা। কারণ আমার নিজের প্রকাশিত রচনা আমার কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুব দুর্বল মনে হয়। খুব কমন বলবো না। আমি যে খুব বিরাট কিছু করতে পেরেছি তা মনে হয় না। আর আমি কালকে দেখি, পৃথিবী দেখি, সভ্যতা দেখি। তারপর মনে হয় যে, কোনো কিছুই কারো নতুন করে জানার নেই, জানানোরও নেই। সবাই সবকিছুই জানে। আলাদা কি? আলাদা ব্যক্তি হিসেবে জন্মেছে। এই জন্যই আলাদা। তোমার একটা আলাদা কনসাস আছে। কেউ যদি বলে, সারাজীবন আপনার কী ক্ষোভ থেকে গেলো, না-কি আপনি সন্তুষ্ট থাকলেন? আমি কি বলি, কাজটা করেছি। ১০০ ভাগ সন্তুষ্ট নই, কিন্তু সন্তুষ্ট মোটামুটি থাকতে পেরেছি। বললাম তো, দুইশো বছর বাঁচলে আরো লিখতাম। সে-রকম জিনিসও আছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস যোগ হচ্ছে-তো। বদলাচ্ছে না-তো। কোনো কিছুই-তো বদলে ফেলি না। ঠিক আছে আমি এগুলো ভুলে গেলাম তা-তো হয় না। তাই সেই দিক থেকে আমার অসন্তুষ্টিও নেই, অতিসন্তুষ্টিও নেই। আমার খ্যাতির প্রতি মোহও নেই। অতিমোহ নেই। বরং উল্টোটা। তুমি কি টাকা দিয়ে আমাকে কিনবে না-কি, এটা আমার মুখে আগেই চলে আসে। আমি তো মাস্টার হয়েছিলাম এজন্য যে, প্রত্যেকটা বিষয়ে আমি ধনংড়ষঁঃব ভৎববফড়স ভোগ করবো। যেটা একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই পারে। কারো কথা তাকে শুনতে হয় না। লেখক হওয়ার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা। আমাদের মতো একটা বিশ্রী-সমাজে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো পেতে পারে। প্রত্যেক দিন জবাবদিহি করতে হয় না।
আমার লেখায় টুইস্ট নেই। প্লেন। রবীন্দ্রনাথও কিন্তু টুইস্ট-ফুইস্ট বা বিস্ময়কর কিছু পারতেন না। ‘পোষ্টমাষ্টার’ গল্প চিনতে পারো। একেবারে কোনোটাই টুইস্ট প্রয়োগ করার কিছু নেই। কিংবা অবাক করে দিল, মারল চাবুক, চমকে উঠল বানর, এটা কি বলল এ-রকম চমক নেই। চেখবের গল্পগুলোতেও খুব চমক নেই। এ-ধরনের চমক ও হেনরির গল্পে আছে, মোঁপাসার গল্পে আছে। খুব বেশি আছে। কিছু-তো নতুন দিতে হবে। তা না হলে কি করে হবে। তা না হলে পড়বে কি করে? পড়তে একটা আগ্রহ তৈরী-তো হতে হবে।
আমার গল্পে আমি ইচ্ছে করে-তো কিছু করি নি। সাহিত্য-পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় তিনবার ঐ-একই প্রশ্ন ওটার একটা বিশেষ মূল্য আছে। মানুষ যে সম্পূর্ণ অমানুষ হয়ে যায় না, যেতে পারে না। চরম অমানুষ হওয়ার পরও অত্যন্ত তিক্ত, বুড়ো কানতেছে। আবার শেষ অংশ স্বাভাবিক বলে মনে হয় কারণ, তার পয়সা নেই বলে সে ওখানে যেতেও পারছে না। তারপরে কে কাঁদছে? তুমি কাঁদছো? এটা আমি বলছি, আসলে কে কাঁদছে? আমি কার কান্নার কথা বলছি? আশেপাশে শব্দ-টব্দ যা কিছু হয়, তা কট্রিবিউট করে কি? খুব বিশ্রী করে মুখ খারাপ করছে, মাগি চুপ কর। মুগরিগুলো একসাথে কক কক করে উঠলো, এগুলো কিছুই না। এগুলো এ-রকম হলো কেনো? শেষটা এরকম বিজবিজে করে ফেলা আরকি। আমি-তো ঐ রকম গল্প লিখি না। একেবারে বাক্য খুব করে রচনা করে বিত্তান্ত লিখি না। আমার মনে হয় যে, সব জিনিস এক সঙ্গে ফ্লো করব। এটা তাই। একটা গল্পে ঘটনাও বলতে চাই নি, ঐ-ঘটনার সঙ্গে পরিচিতি পৃথিবীটার, ন্যাচারটার অলটার, যে সংসারগুলো সবটাই মুখ্য হতে থাকুক। চলমান থাকুক। এটা আমার ইচ্ছা ছিল। এমন ইচ্ছা আমার এখনও আছে। এই যে ছবি দেখি না? বাংলা ছবি আমরা দেখতে পারি না, তার একমাত্র কারণ ধীর-গতি। এতো ধীর-গতি। অসম্ভব! সহ্য করাই যায় না। আমার কোনোকিছু গল্পটল্প বলতে গেলে, সরাসরি কটাকট কথা বলি। সেটা এই ট্রাডিশনে নেই। কটাকট কথা বলা নেই। নিম্নকণ্ঠে গভীর কথা বলা প্রায় নেই। সিরিয়াল-তো খুব পিছিয়ে আছে? বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাও পিছিয়ে আছে?
অনেক দিন বাচলে আরো অনেক কাজ করা যেতো। তবে সুনির্দিষ্ট কোন প্লান নেই। কান্টের উপর বই লিখতে চেয়েছি। লোকের বই পড়ে আমার এতো অতৃপ্তি হয়, ধুর ওরা কিছু লিখতে পারে না। তাই, কান্টের উপর আমিই লিখতে চেয়েছি। সক্রেটিসের উপর লিখেছি। কান্টের উপরও লিখতাম। কিন্তু সময় নেই। পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে যে এতো মাথা-ঘামাচ্ছি তাই নিয়ে একটা বড় লেখা লিখার ইচ্ছা ছিল। মৌলিক। এগুলো এখন আর করার সময় নেই। বাংলা ভাষা নিয়ে একটা কাজ আমি ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে যখন পড়াচ্ছিলাম তখন করেছিলাম সেইটার একটুখানি বেরিয়েছে এক জায়গায়। একবিংশতে ছাপা হয়েছে। ঐটার একটা পুরো বই বের করতে চাই। এ-রকম আরও কিছু-কিছু কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। আমাদের লাইফটা ল্যাতা-জোবড়া হয়ে গেছে। কৃষকের বাড়িতে ধান হওয়ার সময়, এখানে ধানের আটি ওখানে খড়, এখানে বিছানো, ওখানে শোবার ঘরের কাছে চলে গেছে, তো ওরা বলে ল্যাতা-জোবড়া হয়ে মিশে গেছে। লাইফও তাই। একেবারে হিসেব করে, এক দুই করে ‘এই অংক মিলে গেল, আমি মরে গেলাম’। এভাবে-তো হয় না!

ভাষারীতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাষারীতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
হাসান আজিজুল হক

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষা ব্যবহার থেকে যে প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে তা এই; ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কী? ভাষা কি বাস্তবকে প্রকাশ করে? ভাষা কি বাস্তবকে প্রকাশ করতে পারে? বাস্তবকে অবিকৃত প্রকাশ করাটাই যদি লেখকের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় এবং ভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহার যদি তাঁর আয়ত্তের মধ্যেও থাকে, তবু কি তিনি ভাষা দিয়ে বাস্তবের পুননির্মাণ সম্ভব করতে পারেন? এই প্রশ্নগুলি থেকে আর একটি প্রশ্ন সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকবে মাত্র : বাস্তব বলতে কি বুঝতে হবে? বাস্তবের কি একটিমাত্র অনড় চেহারা পাওয়া যায় যা সহজেই ভাষা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে? বাস্তবটা অবিকল একরকম। ঘরের মধ্যে আলমারিটা অবিকল এরকম-প্রাকৃতিক কারণে তার ভিতরের গতি ও পরিবর্তনের কথাটা ছেড়ে দিয়েও বলা যায় ঘরের আলমারি অবিকল একরকম-কিন্তু প্রশ্ন তা নয়, দশজন লেখক যখন এই অনড় অবিকল বাস্তব আলমারিটা দেখেন, স্পর্শ করেন, তখন এই দশজনে আলমারির অবিকল একই বর্ণনা দেন না কেন? দিতে কি পারেন তাঁরা? ইচ্ছে করলেও? তবে ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কী?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষারীতির আলোচনার শুরুতেই এতগুলি প্রশ্ন তোলার কারণ হচ্ছে একটা ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ মত প্রায় কুসংস্কারে দাঁড়িয়ে গেছে যে তিনি একজন বাস্তববাদী লেখক। বাস্তববাদ জিনিসটা কী বোঝার আগে বাংলাসাহিত্যে অনেক অবাস্তববাদী লেখক আছেন এটা মেনে নেওয়া কঠিন। একটা হিসেবে বলা যায় যে সব লেখকই বাস্তববাদী। বস্তুকে সামান্যমাত্র অবলম্বন করে যে কল্পনার জন্ম মনের মধ্যে ঘটে, সে কল্পনাতেও বাস্তব না বলার কোনো কারণ নেই যদি লেখকের মনটাকেও আমরা বাস্তব বলতে রাজি থাকি। কাজেই বোঝা যাচ্ছে আমরা বাস্তবের রকমফের করি এবং একজন লেখককে বাস্তববাদী আর একজনকে কল্পনাবাদী বা ভাববাদী পট্টি সেঁটে দেবার সময় এই রকমফেরটা নিজের বা অন্যের কাছে ব্যাখ্যা না করলেও একরকম করে ঝালিয়ে নিই। আসলে প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় শিল্পী যে মাধ্যমে বা বাহন ব্যবহার করে কাজ করেন তার সঙ্গে বাস্তবে সম্পর্ক কেমন দাঁড়ায় অর্থাৎ চিত্রকরের রেখা আর রঙের সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কি, লেখকের ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কী? সব শিল্পী বাস্তবকেই প্রকাশ করতে চান, আরো জাজ্বল্যমান করে, আরো তীব্র করে, হয়তো বা আরো বাস্তব করে। বাস্তবের পক্ষে আরো বাস্তব হওয়া সম্ভব নয়-সে যা আছে তাই, বেশিও নয় কমও নয়, শিল্পীই একমাত্র চেষ্টা করতে পারেন তাকে আরও বাস্তব করে তুলতে-বলতে কি সাধারণভাবে যা অসম্ভব বলে ধর্তব্যের মধ্যে আসে না তাকেও বাস্তব করে তোলার দুরূহ চেষ্টা একমাত্র শিল্পী ছাড়া এর কেউই করেন না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষারীতির দিকে একটু মন দিলে ঠিক এই ধারণাটিই তৈরি হয় যে ভাষা তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন বাস্তবকে শান দেবার পাথর হিসেবে যাতে বাস্তব পাতলা হয়, সূক্ষ্ম হয়, আগুনের মতো উজ্জ্বল তৃপ্ত হয় আর তাতে দেখা দেয় ক্ষুরের ধার। উপমাটা একেবারেই ঠিক হলো না, ভাষা পাতলাও নয়, সূক্ষ্মও নয়, আগুন বা আগুনের রঙের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, ভাষা নিজে নিজে গরম বা ঠাণ্ডা কিছুই নয়। ভাষাকে যে শান দেবার পাথর বলা গেল সেটাও বোধহয় ঠিক নয়। বাস্তব একটা আলাদা ব্যাপার, তাকে ভাষার পাত্রেই স্ফুলিঙ্গ বের করা যায় হয়তো কিন্তু ভাষা তো পাত্রও বটে, লেখক বাস্তবকে ভাষার পাত্রেই ধরবার চেষ্টা করেন। তখন আর বাস্তবকে ভাষা থেকে কোনোরকমেই আলাদা করা যায় না। তাহলে মনে হয় কথাটা এইভাবে বলা যায় যে বাস্তবের অন্তর্নিহিত অসংখ্য দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া, সেইসব দ্বন্দ্বকে দ্বন্দ্ব হিসেবে শনাক্ত করা, সত্যে আপেক্ষিকতাকেই দিগদর্শন জ্ঞান করা এবং দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে একটা কোনো পর্যায়ে সমগ্রতা পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে ভাষা এবং অবশ্যই কোনো লেখকের ভাষারীতির আলোচনায় প্রয়োগ করতেই হবে। অন্যদিকে ভাষা বিষয়ে প্রথম দ্বন্দ্বটিই এই যে ভাষা হচ্ছে তর্কাতীতভাবে, প্রশ্নাতীতভাবে সর্বসাধারণের সম্পত্তি, একশোভাগ পাবলিক প্রপার্টি, পুরোপুরি ভাগের মা। ভাষা এমন একটা নৈর্ব্যক্তিক বিশাল প্রবাহ যে ব্যক্তি তাতে আত্মসমর্পণই শুধু করতে পারে। ‘আমার বাইরে’ এই কথাটা প্রতিমুহূর্তে তাকে মানতে হয়। আবার বাস্তবের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক কখনোই আত্যন্তিক নয়, সে সম্পর্ক কৃত্রিম, বানিয়ে তোলা, আপসে মেনে নেওয়া; শব্দের অর্থ বস্তু, চিন্তা বা আবেগের সূচকমাত্র, শব্দের ধ্বনি-চেহারা প্রতীক ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যদিকে ভাষা সম্বন্ধে বিপরীত সত্য হচ্ছে, ভাষা চরম ও চূড়ান্তভাবে ব্যক্তিগত, ব্যক্তি একা বা যৌথভাবে ব্যবহার না করলে ভাষার ব্যবহার নেই। ভাষার গায়ে ব্যক্তি তার নিজস্বতা বা অনন্যতার ছাপ মেরে দিতে চায় কি না, স্বাতন্ত্র্য অর্জনের চেষ্টা করা তার পক্ষে উচিত কি না এসব প্রশ্নই ওঠে না, নিজস্ব ছাপ না লাগিয়ে ব্যক্তি ভাষা ব্যবহারই করতে পারে না। পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা কত এই প্রশ্নের একটা জবাব হতে পারে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যত আছে ততই। ভাষা যে সর্বসাধারণের সম্পত্তি সে কথাটা চাপা পড়ে যেতে বাধ্য ভাষার ব্যবহারের কথাটা সামনে এলেই। ভাষা তখন একজন ব্যক্তির, বিশেষ করে একজন লেখকের অস্ত্র, আয়না, বাহন, শানপাথর, ধারণাপাত্র সবই।
বাংলাভাষার অন্যান্য কথাসাহিত্যিকের তুলনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেলায় চোখে পড়ার মতো একটি ঘটনা ঘটেছে। ভাষা সর্বসাধারণের সম্পত্তি বলেই ভাষা যেন মানিকের প্রতিপক্ষ। তাঁর কাছে ভাষা একটা চ্যালেঞ্জের মতো, তাঁর সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক দাঁড়ায় বিরোধমূলক। ভাষার সর্বসাধারণত্বটিকেই তিনি নাকচ করতে চান, ঝেড়ে ফেলে দিতে চান ভাষার গায়ে লেগে-থাকা সর্বজনের সর্বক্ষণের ব্যবহারের দাগ। তিনি যা কিছু প্রকাশ করতে চান ভাষা তাকেই টেনে নামিয়ে আনতে চায় পদাতিকের দলে; প্রথায়, অভ্যাসে, সংস্কারে বহুকাল থেকে নির্ধারিত হয়ে যাওয়া শব্দের অর্থ, বাক্যবন্ধের পরিচিত ক্ষয়-পাওয়া চেহারা লেখাকে অনুজ্জ্বল ম্যাড়মেড়ে গতানুগতিক করে তুলতে চায়, মানিক প্রাণপণে তার বিরোধিতা করেন, লেখার কাজে নিজের ভাষাকে করে তুলতে চান তাঁর নিজের উৎকট স্বাতন্ত্র্যের বাহন সর্বসাধারণের সম্পত্তিকে আনতে চান একেবারেই নিজের আয়ত্তে। ভাষার সঙ্গে এই লড়াইটা-গড় ব্যবহারের সকলের ভাষাকে নিজের কাজের উপযুক্ত করে নেওয়া যা থেকে স্টাইল বা শৈলী নামে একটা অস্পষ্ট ও অসংজ্ঞায়িত ব্যাপার দেখা  দেয়,  সব লেখককেই করতে হয়। বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো লেখক থেকে শুরু করে মাঝারি ছোটো সবাইকেই। কিন্তু লড়াইটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে তাঁর লেখা শুরুর সময়ে যতটা মরিয়া হয়ে ওঠে এবং যত দ্রুত তিনি লড়াইয়ে জিতে ভাষার উপর নিজের আধিপত্যটা পাকাপোক্ত করে নিতে পারেন সেটা বিশেষভাবে লক্ষ করতেই হয়। আমি অবশ্য বলতে চাইব না যে, লেখকমাত্রেই কোমর বেঁধে সচেতনভাবে ভাষার সঙ্গে এই ধস্তাধস্তিটা করেন, তবে প্রতিভাধর লেখকমাত্রেই ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁর এই বিশেষ মাধ্যমটির সীমাবদ্ধতা এবং তার মধ্যে নিহিত কঠিন শর্তগুলো সম্বন্ধে সজাগ ও সতর্ক না হয়েই পারেন না। কারণ কেউ চান আর না চান ভাষার সঙ্গে এই লড়াইয়ের ব্যাপারটা ভাষার নিজের প্রকৃতির মধ্যেই আছেÑএড়ানোর উপায় নেই, অজান্তে হলেও যে কোনো সৃষ্টিশীল লেখককেই ভাষার গতানুগতিকতার আড় ভাঙতেই হবে। মানিক মনে হয় দৃঢ়সঙ্কল্প নিয়েই নিজের ভাষা তৈরি করে নিতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর মতো তীব্র আত্মসচেতন লেখক তো দেখি না। কিংবা হতে পারে সঙ্কল্পের কোনো প্রয়োজন ছিল না, তাঁর ব্যক্তিত্বের কটু স্বাতন্ত্র্যই গদ্যের স্ব-নির্মাণের কাজে তাঁকে প্রবৃত্ত করেছিল।
রং রেখা যাঁরা ব্যবহার করেন, ধ্বনি ছন্দ তাল নিয়ে যাঁদের কাজ, দৃষ্টিগ্রাহ্য দেহভঙ্গিমায় যাঁরা ফুটিয়ে তুলতে চান কোনো সংবাদ, তাঁদের কাজে মুক্তি বেশি। ভাষা নিয়ে যাঁদের কাজ তাঁদের তা নয়। ভাষা মাটিতে এমনভাবে পড়ে থাকেÑবিশেষ করে গদ্যের ভাষা,  যে তা নড়তে চায় না। তার পাখা নেই। শব্দের অর্থ কোনো একভাবে নির্ধারিত, বারোয়ারি বাজারি, তা বোধহীন ওজনের মতো শব্দকে টেনে নামিয়ে আনতে চায়। শব্দ, বাক্যবন্ধ, শব্দ-সাজানো, বাক্য তৈরি কী ক্লান্তিকরভাবেই না কতকাল ধরে একরকম, কী অবসাদে জড়তায় তাদের অর্থ বাঁধা, কী ভোঁতা কী দৈনন্দিন! কিন্তু এতে কোনোরকম নাড়া না দিয়েই কাজ চালিয়ে নিয়েছেন বহু লেখক যাঁদের লেখা পড়লেই বোঝা যায় ভাষা তাঁরা বারোয়ারি সম্পত্তির মতোই পেয়েছেন, বারোয়ারি সম্পত্তির মতোই তাকে ব্যবহার করতে চান। অর্জন করার কিছু নেই তাঁদের কাছে। এইরকম লেখকদের পক্ষে বাস্তববাদী হওয়াটা তুলনায় সহজ, বাস্তববাদী আখ্যাটি তাঁরা পেয়েও যান সহজে। যে বাস্তব প্রদত্ত হিসেবে গোটাগুটি ইন্দ্রিয়ের সামনে আসে, জীবনের মোটা চেহারা আঁকড়ে ধরে যা আকার পায়, হাতে-পাওয়া ভাষাতে সেটাকে প্রকাশ করতে পারলে তাকে অসম্ভব পরিচিত স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। স্বীকার করতেই হবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তববাদী লেখক ছিলেন না, যখন তিনি তা হবার চেষ্টা করেছিলেন তখন যে সফল হয়েছিলেন আমার তা মনে হয় না। কারণ ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দ্বন্দ্বের তীব্রতাকে তিনি ঠিক কখনোই অতিক্রম করে আত্মপ্রসাদ পেতে পারেন নি।
ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক যদি কৃত্রিম হয় এবং সেজন্যে ভাষা-নির্মিত বাস্তব প্রকৃত বাস্তবকে যদি আদৌ ছুঁতে না পারে, তাহলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখকের পক্ষে যা স্বাভাবিক তিনি ঠিক তাই করেন; তিনি এই কৃত্রিম প্রথাসিদ্ধ সম্পর্ক ভেঙে ফেলে ভাষা, বাস্তব এবং নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সমন্বয়ে ভরা একটা নতুন সম্পর্ক তৈরি করে নিতে চান। তিনি যে ভাষাকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করে তুলতে পারেন তা নয়, তাহলে শব্দকে অর্থহীন করতে হয়, বাক্য ও বাক্যবন্ধনের চেনা চেহারা, পুরনো নিয়ম সবই বাতিল করে দিতে হয়, ভাষাকে করে তুলতে হয় এমন একটি ধারণপাত্র যা নিজে কিছুই ধারণ করে না কিন্তু লেখক স্বর্গমর্ত্যরে যাই-ই রাখুন না তাতে তাই সে ধারণ করতে পারে, ভাষাকে তাহলে করে তুলতে হয় এমন একটি আয়না যা কোনাকুনি, সোজাসুজি, আড়াআড়ি সব রং প্রতিফলিত করতে পারে। এতটা বলা মানিকের পক্ষে সম্ভব না বটে, হয় না কারণ ভাষাই তাতে বাদ সাধে কিন্তু বাংলা গদ্য নিয়ে মানিক এই পথে বহুদূর এগিয়ে যান। এমন একজন লেখককে কীভাবে বাস্তববাদী বলা যায়? বাস্তববাদী তো বটেই, কিন্তু বাস্তববাদী কথাটা মোটেই যথেষ্ট নয় তাঁর পক্ষে অন্য নানারকম লেবেল তাঁর রচনার উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা যায়, পরাবাস্তববাদ, নব্যবাস্তববাদ, তাতে তেমন পরিষ্কার হবে না মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষারীতির মূল চেহারাটা। লেখক হিসেবে তাঁর জন্যে একমাত্র মাধ্যম যে ভাষা তাকে নিজের সৃষ্টির কাজে লাগাতে গিয়ে একটা সম্পর্ক তাঁকে তৈরি করে নিতে হয়েছে ভাষার সঙ্গে যা সব লেখককেই করতে হয় কিন্তু এই সম্পর্ক পাতাতে গিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন তীব্র আত্মসচেতন আর এই আত্মসচেতনতা এমন করে লেপে দিয়েছেন ভাষার গায়ে যে ভাষার সাধারণ চেহারার সঙ্গে সঙ্গে তার মোটা দাগের দৈনন্দিন ব্যবহারটা অনেক দূর পর্যন্ত ওলটপালট হয়ে গেছে। এই সম্পর্কে মানিক দাঁড়িয়েছেন এক ধরনের বৈরিতায় যাতে ভাষার প্রতিবন্ধক তিনি চুরমার করে দিতে পারেন, যাতে ভাষা কেবল তাঁরই অভিপ্রায়, তাঁর আবেগ, তাঁর চিন্তা-বিশ্লেষণ, জগৎ-ভাবনা সাহিত্যের ভাণ্ডারে মাত্র একবারই সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে কোনোরকম প্রতিতুলনা না রেখে। এর ফলে যে ভাষারীতিটা মানিকের দখলে আসে তা দিয়ে তিনি কেবল তাঁরই বাস্তবকে রূপ দিতে পারেন। বাস্তব তখন আর ‘ঐখানের’ একটা বর্ণনীয় বিষয়মাত্র থাকে না, তা হয়ে ওঠে জীবন্ত, স্পন্দমান, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অন্তহীনভাবে সম্ভাবনাময়। মানিক যা করেন লেখকমাত্রেই তাই করেন; করেন মানে করতে বাধ্য হন। বাস্তবের বোধের জন্যে এটাই মানব-শর্ত। লেখক শিল্পীর কথা নয়, ব্যক্তির চেতনায় প্রতিফলিত না হয়ে অভিজ্ঞতা তৈরি হবারই কোনো উপায় নেই, এসব কথা সত্যি তবে অন্যদের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তফাৎ এইখানে যে তাঁর চেতনায় বাস্তবের এই প্রতিফলন অত্যন্ত তীব্র আলোয় ঝলসে ওঠে; তা যেমন উগ্র তেমনি স্বকীয়, এমন যে বাংলা গদ্যে তার তুলনা পাওয়া যায় না। তাঁর চেতনায় বাস্তবের এইরকম প্রচণ্ড উদ্ভাস থেকেই তাঁর অনন্য ভাষারীতির জন্ম, না তাঁর অর্জিত ভাষারীতির প্রকাশের ফল এমন বাস্তব, সেটা পুরোপুরি মীমাংসা করা কঠিন। মনে হয় তাঁর বোধ থেকেই তাঁর ভাষারীতির ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্যে সহজতর হয় যদিও কাজের সময়টা বোধ আর ভাষারীতির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা নিশ্চয়ই জোরালো হয়ে ওঠে। মাধ্যম হিসেবে ভাষাও প্রচুর ও প্রবল শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে। সৃষ্টিকর্মের একেবারে মূলে গিয়ে হয়তো পাওয়া যাবে একটা রেণুতে মেশামেশির প্রক্রিয়া।
তাহলে এমন যে বাস্তব তা কি মানিকের ব্যক্তিগত বাস্তব? কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিকে যে আলাদা করা যায় না তা তো স্পষ্ট। প্রশ্নটা বোধহয় ঠিক তা নয়, ব্যক্তিগত মানে মনগড়া কি না এইটাই প্রশ্ন। অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতেও মনের ক্রিয়া আছে। এমনকি অভিজ্ঞতাশূন্য মানসিক তৃপ্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও আছেÑচিন্তার, আবেগের, ইচ্ছার বিরাট কাঠামোর মধ্যে আত্মসঙ্গতিপূর্ণ মজবুত প্রাসাদ বানানো যায়। মানিকের বাস্তব কি এমনি মনগড়া প্রাসাদ? মানিকের সমস্ত সাহিত্য সামনে রেখে এই প্রশ্নের এখন একটিই স্পষ্ট ও দৃঢ় জবাব দেওয়া যায়; তিনি শুধু বাস্তববাদী লেখক নন, কট্টর বাস্তববাদী লেখক; বোধহয় সমস্ত জীবনে এমন একটি বাক্যও লেখেন নি যা কেবল মনের ছায়া, যার পেছনে নেই মনের বাইরের বাস্তবের মাটি। অবশ্য মানিককে কট্টর বাস্তববাদী লেখক বলার সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলে নিতে হবে যে বাস্তবের সঙ্গে তিনি কিন্তু বরাবর একই সম্পর্ক রাখেননি, দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাবের দিক থেকে কথাটা বলছিÑ বলতে চাননি একই কথা। লেখক জীবনের নানা পর্যায়ে বাস্তব নিয়ে তিনি নানাভাবে মনস্থির করেছেন, নিজের সাহিত্যকে দিয়ে অনেক ধরনের কাজ করিয়ে নিতে চেয়েছেন। সাহিত্যে বাস্তবকে নিয়ে গন্তব্য বা লক্ষ্য বদলেছেন ঠিকই কিন্তু সেই বদলের সঙ্গে তাঁর ভাষারীতির সম্পর্ক রাখেননি; সেটাকে আলাদা রাখারই চেষ্টা করেছেন। ভাষারীতি বাহন হিসেবে তাঁর কাজ করে দিয়েছে। এই আলাদা করার কাজটা লেখক ইচ্ছে করলেই করতে পারেন কি না, বাস্তবের বোধ সম্পূর্ণ পাল্টে গেলে তা ভাষারীতিকেও পাল্টে দেয় কি না, দিলে কতটা দিতে পারে এই জটিল সমস্যাটির মধ্যে ঢোকার সুযোগ এই লেখায় নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষারীতির সঙ্গে পরিচয়টা একটু নিবিড় হয়ে এলে এটাও আস্তে আস্তে ধরা পড়তে থাকে যে তাঁর ভাষারীতির নানা পর্যায় আছে। বাস্তব সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, সাহিত্যে করণীয় সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব, শিল্প ও শিল্পীর কাজ সম্পর্কে তাঁর মত, মার্কসবাদ গ্রহণ করার পর লেখার উদ্দেশ্য এবং তাঁর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইত্যাদি নানা বিষয়ের সঙ্গে তাঁর ভাষারীতির নানা পর্যায়ের সম্পর্ক যে আছে তাতে সন্দেহ নেই, তাঁর ভাষারীতির এইসব পর্যায় পরস্পরবিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে, এমন কি লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁর মনোভাবের বদল তাঁর ভাষারীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে বলেও ধারণা হতে পারেÑকিন্তু সত্যটা এই যে তাঁর ভাষারীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলি কখনই বদলায়নি। কারণ ভাষারীতি নিজে সাহিত্য নয়, সাহিত্য বলতে লেখক যা যা বোঝেন, যা যা করেন তাই বয়ে নিয়ে বেড়ায়; একটা দিক থেকে তা বিদ্যুতের তার, বিদ্যুৎ নয়।
চল্লি¬শের দশকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর লেখায় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার প্রয়োগ ঘটাতে সচেষ্ট হন, এখনকার মতো তখন ব্যাপারটাকে স্পষ্ট করে তুলতে পারা যায়নি বরং এদেশে কথাটা আগন্তুক বলে প্রচুর বিতর্কের ধোঁয়া ওঠে এবং সমস্ত কথা ধোঁয়াতেই ঢাকা পড়ে। সাহিত্যে সংস্কৃতিহীন রাজনীতি সমাজে যে ষণ্ডের ভূমিকা নিয়ে থাকে সাধারণত, অতীতে এবং বর্তমানেও,  চল্লিশের দশকে শিক্ষিত মার্কসবাদীদের অনেকে যাঁরা পার্টিতে রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তাঁরা এই বিতর্কে সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনীতির প্রসঙ্গটিও নিয়ে আসেন। এতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একভাবে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার কথাটা বুঝে নেন। ফল দাঁড়ায় এই যে লেখার ব্যাপারে একটা খুব নির্দিষ্ট লক্ষ একেবারে চৌহদ্দি-টানা উদ্দেশ্য লেখার আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে যা তাঁর উপরে চাপানো, যা তিনি নিজে পুরোপুরি নানা সূত্রে অর্জন করেননি। লেখার বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত করতেই ফাঁপর লাগে তাঁর। এই দোটানা সমস্যার সমাধান আর তিনি বাকি জীবনে করতে পারেন না। তাঁর আগের পর্যায়ের বাস্তবতার বোধ বারবার হানা দিতে থাকে তাঁর পরের লেখায়। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থাটাই যে কোনো সৎ লেখকের জন্যে সত্যিকার অর্থে আত্মিক সঙ্কট। দোষ সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার নয়, যাই-ই বোঝাক না এই বিষয়টা,  গোর্কি যখন ‘আমার ছেলেবেলা’ লেখেন বা ‘মা’ উপন্যাসটি রচনা করেন যখন তাঁকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার পাঠ নেবার জন্যে কোনো ক্লাশ করতে হয়নি, ওঁর লেখা পড়ে বিষয়টা সম্বন্ধে যা বোঝার তা আমরা ঠিকই বুঝে যাই কারণ সমস্ত ব্যাপারটাই গোর্কির ভিতর থেকে তৈরি হয়ে রূপ নেয়, তিনি যা কিছুর ভিতর দিয়ে গেছেন তার সবই বোনা হয়ে যায় তাঁর লেখায়; তাঁর কষ্ট, তাঁর লড়াই, মানুষের অপার মানবিকতা, মানুষের সীমাহীন অমানবিকতা সমস্ত কিছুই রক্তের ভাষায় লিখে রাখেন। এর নাম সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বা এইরকম কিছু একটা দিলেই তা শিখে নেবার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভ্যস্ত ভাষারীতি চল্লি¬শের দশকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ধাঁচ মকশো করতে গিয়ে কোনো বড়ো ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল কি না বলা কঠিন। অর্থাৎ আধার কি মিলতে চায়নি আধেয়ের সঙ্গে, আমাদের নিঃসংশয় হওয়া কঠিন। কিন্তু ভাষাই যার একমাত্র অবলম্বন সেই লেখক মানুষটি যখন জনগণের সম্পত্তিকে নিজের মতো তৈরি করে নিতে গিয়ে যথাশক্তি নিয়োগ করেন, তখন ভাষা ব্যক্তিত্বের ধাঁচের সঙ্গেই লগ্ন হয়ে যায়, তখন আধেয়কে বহন করা, তাকে রূপ দেওয়াই লেখকের নিজস্ব ভাষারীতির মূল লক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
এত কথার পর হয়তো একটু আশ্চর্যই লাগবে এই দেখে যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু বাংলা গদ্যের বাইরের চেহারাটায় ভাঙচুর তেমন কিছুরই করেননি। বাইরের চেহারা বলতে বুঝছি শব্দ বাছাই, বাক্য তৈরি, বাক্যের মধ্যে শব্দগুলি বসানোর ক্রম, বাক্যাংশগুলির পারস্পরিক সংস্থান এবং সম্পর্কস্থাপন এইসব। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ তিনি লিখেছিলেন একুশ বছর বয়েসে, রচনা হিসেবে তাঁর প্রথম উপন্যাস, প্রকাশের দিক থেকে দ্বিতীয়। মানিকের প্রথম ছোটগল্প ‘অতসী মামী’তে শরৎচন্দ্রের ঝাঁজ বেশ জোরালো, হয়তো তাঁর সারাজীবনের সমস্ত লেখার মধ্যে এই একবারই, কিন্তু ‘দিবারাত্রির কাব্য’র আশপাশে কাউকে দেখা যায় না। ভাষার মধ্যে কোথাও কোনোরকম উৎকেন্দ্রিকতার ছাপ নেই, বাক্যগঠন পরিচিত ও চেনা এই অর্থে স্বাভাবিক। খুব সাধারণ আটপৌরে শব্দের ব্যবহারÑ সেটাও বাংলা গদ্যে তখন রীতিমতো চালু হয়ে গেছে, সর্বনাম আর ক্রিয়াপদের চলিত রূপের ব্যবহারও তখন পুরনো হয়ে এসেছে, বলতে কী মানিকের একুশ বছর বয়েসের গদ্যের তখন এই রকম চলন:
সকাল সাতটার সময় রূপাইকুড়ার থানার সামনে হেরম্বের গাড়ি দাঁড়াল। …পূর্ব আর পশ্চিমে কেবল প্রান্তর আর দিগন্ত। মাঝে মাঝে দু একটি গ্রামের সবুজ ছাপড়া বসানো আছে, বৈচিত্র্য শুধু এই। উঁচুতে কেবল পাহাড়। একটি দুটি নয় নৈবেদ্যের মতো অজস্র পাহাড় গায়ে গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, অতিক্রম করে যাওয়ার সাধ্য চোখের নেই, আকাশের সঙ্গে এমনি নিবিড় মিতালি।
আন্দাজ করার উপায় নেই কী বিষাক্ত তিক্ত স্বাদ, কী মর্মান্তিক শে¬ষ বিদ্রূপ, কী অসহ্য ভালোবাসা আর গরল এই সরল গদ্যভাষা নিঃশব্দে ঢালতে থাকবে পাঠকের মনে। কেমন আবছা ধোঁয়াটে হয়ে আসবে পরিচিত পৃথিবী, বাস্তবের শক্ত তীক্ষè খোঁচগুলি মোলায়েম হয়ে গলে যেতে থাকবে, সাদা চোখের জগৎ মানুষের চেতনার সম্পূর্ণ দখলে চলে যাবে, তাতেই ডুববে, তাতেই ভাসবে। সাদামাঠা গদ্য ব্যবহার করে এমন অসম্ভব ফল মানিক পান এই কারণে যে বাংলা গদ্যকে তিনি পড়ে থাকা সাদামাঠা গদ্য হিসেবে নয়, নিজের তৈরি হাতিয়ারে পরিণত করতে পেরেছেন এবং সেটা সম্ভব হয়েছে বাস্তব নিয়ে যে তীব্র চেতনা তাঁকে ক্রমাগত তাড়না করে, নিদারুণ যন্ত্রণা দেয়, সেই একই চেতনা তিনি ভাষার মধ্যে, তাঁর বাক্যগুলির ভিতরে স্থাপন করে তাদের বাস্তবের দিকে এগিয়ে দিতে পারেন। মাষ্টামশাইকে বিষ খেতে দেবার পরামর্শ দিলে মালতী হেরম্বকে ঘর থেকে বের করে দেবার পর ‘হেরম্ব আর কোথায় যাবে,’ গেল বাগানে। ‘এখানে আছে ভোরের পাখির ডাক আর অসংখ্য কীটপতঙ্গের প্রণয়। পচা ডোবার জলে হয়তো অ্যামিবা আত্মপ্রণয়ে নিজেকে বিভক্ত করে ফেলেছে, তরু-বল্কলের আড়ালে পিপীলিকার চলেছে শুঁড়ে শুঁড়ে প্রণয়ভাষণ, হেরম্বের পায়ের কাছ দিয়ে এক হয়ে এগিয়ে চলেছে কর্ণজলৌকা দম্পতি, গাছের ডালে ডালে একজোড়া অচেনা পাখির লীলাচাঞ্চল্য।’ দৃষ্টি যাঁর জীবনলীলার এই আদিম নিঃশব্দ বিপুল ক্রিয়াকাণ্ডে প্রোথিত হয়ে গেছে, তাঁর কাছে আর কি আশা? জীবন্ত গোটা স্বাভাবিক মানুষ কিভাবে তাঁর কাছ থেকে আশা করা যায়? হেরম্ব নামে যে ঘুরে বেড়ায় সে কে? আনন্দ কি নর্তকী কিশোরী? অসুস্থতা আর বিকারে ভরা, ভালোবাসা ঘৃণায় বিস্ফোরণমুখী একটা জগতে মানুষের ছায়া, মানুষের টুকরো আসর জাঁকিয়ে বসেছে। মানিক নিজেই বলেছেন, ‘বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতকগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায় সেইগুলি কেউ মানুষের নয়, মানুষের প্রজেকশন-মানুষের এক টুকরো মানসিক অংশ।’
দ্বিতীয় উপন্যাসে, ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে, তাঁর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ রচনায়, মানিক, মনে হয়, ভাষার বাইরের চিহ্নের হিসেবে প্রথম উপন্যাসটি তুলনায় আরেকটু পিছিয়েছেন। একেবারে সাধুভাষায় ফিরে গেছেন তিনি। ক্রিয়াপদের চলিত রূপ বর্জন করে তার সাধুরূপটিকে ব্যবহার করেছেন। ভাষার এই সাধুরূপে তিনি অনেকদিন লিখেছেন, তাঁর জীবনের সম্ভবত সেরা উপন্যাসটি, তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ও এই ভাষারীতিতেই লেখা। তবে সাধু বলতে একেবারেই নামমাত্র। ক্রিয়ার সাধুরূপটি নেহাৎ না রাখলেই নয় এইভাবে, মুরুব্বির সামনে মুখটা একটু ঘুরিয়ে বিড়ি টানার মতো কোনোরকমে আছে শুধু। খুবই আলগা ঝুলন্ত। সর্বনামের ব্যাপারে মানিক করেছেন যথেচ্ছাচার। তাহার তার তাহাকে তাকে তাদের তাহাদের সবরকমই আছে আটপৌরে, মুখ-চলতি, নি¤œবর্গের মানুষের মাটি-মাখা, আধ-ফোটা বা ভীষণরকম বিকৃত এমন কি নানাধরনের অশিষ্ট শব্দ মানিক তাঁর উপন্যাসের বর্ণনাংশে ব্যবহার করতে কসুর করেননি। উনিশ শতকের সমালোচকরা তো নির্ঘাৎ গুরুচণ্ডালির অভিযোগ নিয়ে আসতেন তাঁর বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের কোনো অর্থ আজ নেই বটে, সেই সময়েও ছিল কি না সন্দেহ, ভাষার নিয়মনীতি বেশি দূর পর্যন্ত খুঁজতে যাওয়ার মানে নেই, প্রতিভাবান লেখকদের বেলায় তো নেই-ই, তবু ভাষাগঠন একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে এলে সব ভাষাতেই কিছু নিয়মবন্ধন এসেই যায়Ñ সেদিক থেকে দেখতে গেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গদ্যরীতির মধ্যে অরাজকতা অনিয়ম আকছার দেখতে পাওয়া যাবে সন্দেহ নেই। অবশ্য ক্রিয়ার সাধুরূপের ভিতরে সর্বনামের চলিতরূপ মিশিয়ে দেওয়া, বাংলাভাষার সাধু-চলিত চেনার প্রধান চিহ্ন, এবং তাতেও কোনো নিয়ম না মেনে শুধু কলমের মুখের বাক্যটির দিকেই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করা কিংবা বাক্যের মধ্যে শব্দ বা শব্দবন্ধের ক্রমে প্রচুর উল্টোপাল্টা করাকে ঠিক নিয়মভঙ্গের মধ্যে ফেলা যায় কি না সন্দেহ। তবু মানিকের গদ্য পড়তে গেলেই তাঁর সাধু গদ্যরীতির ভঙ্গকুলীন নয়, জাতিচ্যুত বলেই মনে হয়। বাইরের চেহারায় কিছুই প্রায় ধরা পড়ে না সত্যি, কিন্তু পাঠক মর্মে অনুভব করতে পারেন মানিক প্রচলিত সাধুরীতির জাত মেরে দিয়েছেন। এটা স্পষ্ট হয় মানিকের চলিতরীতিতে লেখা রচনাগুলির দিকে নজর দিলেÑ খেয়ালই হয় না যে তিনি রীতি বদলেছেন, সাধুরীতিতে না লিখে চলিতরীতিতে লিখেছেন। তাঁর গদ্যের নিগূঢ় প্রকৃতি এমনি স্বতন্ত্র এমনি অমোঘ যে এক রীতি থেকে আর এক রীতিতে যাতায়াতের পথটাকে ধরতে পারাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সাধুচলিত পার্থক্যটা সেক্ষেত্রে নেহাৎ-ই কথার কথা হয়ে দাঁড়ায়, কয়েকটি যান্ত্রিক চিহ্নমাত্র উল্লে¬খ করা ছাড়া আমাদের জন্যে আর বলার কিছু থাকে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও কোনও উপন্যাস সাধুরীতিতে লেখা আর কোনও কোনও উপন্যাস চলিতে এটা ভাবতে বসলেই দেখা যাবে স্মৃতিতে সমস্তটাই একাকার হয়ে গেছে। আমার ধারণা একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই সাধুচলিতের বিতর্কটাকে চিরকালের জন্যে পুঁতে ফেলতে পেরেছেন। তাঁর ভাষা একদিকে চলে গেছে লোকজ ধারার ভিতরে, জটিল শিকড়বাকড় মেলেছে মাটির তলায়। সরু মোটা তারে বোনা জালের মতো ছড়িয়ে গেছে অন্ধকারে, নিভৃতিতে, আদিমতায়, রসে-রহস্যে, আবার জীবনের কলরোলে আনন্দে যন্ত্রণায়। অন্যদিকে তাঁর ভাষা গেছে যুক্তি দার্ঢ্যরে দিকে, বিজ্ঞান আর ন্যায়শাস্ত্রের কঠিন কঠোর শৃঙ্খলার দিকে বিশ্লেষণ আর বিচারের ইস্পাতকঠিন পথে। তাঁর ভাষা ব্যবহারের ধরনটা থেকেই এটা বোঝা যায়। সাধুরীতিতে লিখতে গিয়েও কী অবজ্ঞা তার প্রতি! অবলীলায় লিখছেন ‘বিয়াইয়াছে।’ একবার লিখছেন? বিয়াইয়া, রাগাইয়া, চেঁচাইয়া, ঝিমাইতেছে, ফুটাইতেছে-ক্রিয়াপদের একেবারে অন্ত্যত চেহারাটার সাধুরূপ লিখে যাচ্ছেন, সাধুরীতিটাকে গালাগালি দেওয়ার মতো। তোয়াক্কাই করছেন না তাহাতে তাকে তাহাদের কী যে তিনি লিখছেন! বাক্যের মধ্যে শব্দস্থাপনে যতটা সাধারণ নিয়মের লঙ্ঘন করা যায় তার কিছুই তিনি বাদ দিচ্ছেন না। তাঁর মনের খুব ভিতরের একটি কথাকে তীক্ষমুখ ছুঁচের মতো বাইরে নিয়ে আসার সংকল্পে যেভাবে বাক্য উচ্চারণ করা মানুষের জন্যে অসুবিধেজনক তাও তিনি নির্বিকার চালিয়ে দিতে দ্বিধা করছেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যে সবচেয়ে বড়ো গাল হচ্ছে তাঁকে ভাষাশিল্পী বলা। কর্মকারের মতো কিংবা হাতে-কলমে কাজ করা মিস্ত্রির মতো মানিক ছাড়া আর কেউই-ই এত একরোখাভাবে বাংলাগদ্যকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন বলে আমার জানা নেই। নিজেকে যে তিনি কলম-পেষা মজুর বলতেন সেটা যেন আক্ষরিক অর্থেই ঠিক। আরবি, ফারসি, খাঁটি বাংলা শব্দ, তৎসম শব্দের বিকৃত রূপের ব্যবহার তাঁর গদ্যে এতই প্রবল যে এইসব মিলেমিশে একটা প্রায়-অপ্রীতিকর স্বাদ পাঠকের তালুতে গিয়ে লেগে থাকে; একটা তীব্র অদ্ভুত গন্ধ, ঝাঁঝালো মশলার রান্নার মতো, নাকে এসে ধাক্কা দেয়। সাধু-চলিতের কথাটাই তখন হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়।
ভাষার মধ্যে এইসব অল্পবিস্তর কাজ করে মানিক চমৎকার ফল পান। যে বাস্তব তিনি সৃষ্টি করতে পারেন তা হয়ে ওঠে তীব্র, জীবন্ত পদার্থের মতো বিবর্ধমান, বহুমাত্রিক। বাইরের বাস্তবের ঠিক উলটো হয়ে দাঁড়ায় এই বাস্তবের চরিত্র, তা হয়ে ওঠে ভীষণরকম আত্মসচেতন। তিনি নাটকীয়তাকে একেবারে ছাড়তে চেয়েছেন (ফলে বহু জায়গাতেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের গলা-চাপা নাটকীয়তা যা পাঠককে প্রায় শারীরিকভাবে পীড়ন করে), বর্ণনাকে নামাতে চেয়েছেন নিচুগ্রামে, প্রায়ই ব্যবহার করেছেন প্রত্যাশা-রেখার নিচে রাখা নিরুচ্ছ্বাস কথন। বাঙালি সব ত্যাগ করে আদেখলার মতো যেটা চিবিয়ে খাবার চেষ্টা করে আর যাকে ধরে বেঁচে থাকে সেই সেন্টিমেন্টালিটি তিনি নির্মম হাতে ছেঁটে দিতে চেয়েছেন তাঁর লেখা থেকে। তা সত্ত্বেও তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্ভবত একটি তীব্র আত্মসচেতনতা যা তিনি কিছুতেই তাঁর কোনো লেখা থেকে আলাদা করতে পারেন না। বহু উদ্দেশ্যসাধক হলেও মানিকের ভাষারীতিতে এই বৈশিষ্ট্য তিনি না চাইলেও থেকে যায়। নিজের একটা অদ্ভুত উপস্থিতি তিনি আড়াল করতে পারেন না। সাধারণ বর্ণনার মধ্যেই দুএকটি অতর্কিত মন্তব্য কিংবা বর্ণনীয় বিশেষ প্রসঙ্গ বিদ্যুতের মতো চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। ‘পদ্মানদীর মাঝি’র শুরু:
বর্ষার মাঝামাঝি।
পদ্মার ইলিশ ধরার মরশুম চলিয়াছে। দিবারাত্রির কোনো সময়েই মাছ ধরিবার কামাই নাই। সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে নৌকার আলো ওগুলি। … শেষ রাত্রে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদ উঠে। জেলে নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত শাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে, গাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়।
বাস্তব পড়ে থাকে। মানিক তার মধ্যে থেকে কিছু জিনিস বাছাই করে আমাদের দেখান-মৃত শাদা ইলিশ মাছ, মাছের চকচকে আঁশ, তাদের নিষ্পলক চোখ। কুবের এসব দেখতে পায় না, দেখতে পেলেও তার কোনো ছবি তার চেতনায় নেই। পদ্মার জেলে ধরে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, হয়তো হাজার হাজার বছর ধরে, মানিক লিখে যান:
দিন কাটিয়া যায়। জীবন অতিবাহিত হয়। ঋতুচক্র পাক খায়, পদ্মার ভাঙনধরা তীরে মাটি ধ্বসিতে থাকে, পদ্মার বুকে জল ভেদ করিয়া জাগিয়া উঠে চর, অর্ধশতাব্দীর বিস্তীর্ণ চর পদ্মার জলে আবার বিলীন হইয়া যায়। …জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণœ। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়। আর দেশী মদে। তালের রস গাঁজিয়া যে মদ হয়, ক্ষুধার অন্ন পচিয়া যে মদ হয়। ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।
এই ভাষার ভঙ্গির মধ্যে শুধু যে তীক্ষè আত্মসচেতনতা আছে তাই নয়, আছে একরকমের চিরন্তনতা। নিঃশব্দ, প্রবল, অপ্রতিরোধ্য জীবনপ্রবাহের একটা টানা একঘেয়ে বর্ণনা। কিন্তু এই চিরন্তনতার জাত আলাদা। রবীন্দ্রনাথের মতো তা মানবজীবনের প্রসন্ন অফুরান রসের কথা বলে না। একটি কুটিল ক্রূর নিষ্ঠুর সংগ্রামের কথা যেন মানিকের ভাষার শরীর লেপটে থাকে। জীবনের অতলে আছে যে প্রচণ্ড আসক্তি বিনাশ আর আক্রোশের দ্বন্দ্ব মানিকের ভাষা ঠিক তাকেই প্রকাশ করে দেয়। অবিশ্বাস্য সহজ দু-চারটি বাক্যেই মানিক কুবেরের কুঁড়ের মধ্যে ছোট্ট একটি ঢেঁকির বর্ণনার উপলক্ষে পদ্মা নদীর উত্তাল তরঙ্গ এনে হাজির করতে পারেন। চোখের সামনে পদ্মা তার সুদীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে আলো-অন্ধকারের ভিতর দিয়ে বয়ে যেতে থাকে, কখন তার প্রবাহ জীবনপ্রবাহ হয়ে ওঠে ধরতে পারা যায় না।
বাক্যকে সামান্য একটু বাঁকিয়ে কী ভয়ানক শে¬ষ যে তিনি তৈরি করতে পারেন কল্পনা করাও শক্ত হয়ে ওঠে আমাদের জন্যে যেন ছোটো ছোটো ইস্পাতের ফলা, বিষমাখানো তীরের মুখ। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-র শুরু এইভাবে:
খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।
একেবারে দ্বিতীয় বাক্যেই একটিমাত্র শব্দের অপ্রত্যাশিত মোচড় দেওয়া ব্যবহারে মানিক একটি ঘটনাকে তীব্র চেতনায় বিদ্ধ করেন। শব্দটি ‘কটাক্ষ’। ঐ একটিমাত্র শব্দে আমাদের চেতনাকেও ঘটনাটি আকাশের বিদ্যুতের মতোই ঝলকে ওঠে। বাজে পড়া মৃত্যুর দশা। মানিক বর্ণনা করে যান:
হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন তরুটির মূক অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মমমতায় গড়িয়া তোলা জগৎটি তাহার চোখের পলকে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে।
বজ্রাঘাতে যার মৃত্যু ঘটল তার মুখের ‘বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া’র উল্লেখ এমন কী গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু মানিকের সে কথাটা জানানোর প্রয়োজন আছে। যে মরে গেছে তার কথা বলতে গিয়ে মানিকের এই হাস্যকর কথাটাও বলার প্রয়োজন আছে, শুধু প্রয়োজন নয়, বলতে তাঁকে হবেই যে চামড়া ঝলসে পুড়ে গেলেও ‘সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না।’ এরপরেই মানিকের সেই প্রিয় বর্ণনা, যা তিনি প্রথমদিকের উপন্যাসগুলিতে ফিরে ফিরে করেছেন। প্রকৃতির মধ্যে জীবনের সার্বক্ষণিক ক্রিয়াকাণ্ড। অতি ক্ষুদ্র জীবনকণার একক থেকে শুরু করে জীবনের বৃহৎ ধারার বর্ণনা করেন, জড় থেকেই উঠে আসা প্রাণ আর স্পন্দনের কথা তিনি বলেন: মৃত হারু ধীরে ধীরে জড়ের জগতে ঢুকে পড়ে, এখন জীবনের অন্যরকম কাজে লাগবে সে:
হারু দেখিতে দেখিতে ভিজিয়া উঠিল। স্থানটিতে ওজনের ঝাঁঝালো সামুদ্রিক গন্ধ ক্রমে মিলাইয়া আসিল। অদূরের ঝোপটির ভিতর হইতে কেয়ার সুমিষ্ট গন্ধ ছড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। সবুজ রঙের সরু লিকলিকে সাপ একটি কেয়াকে পাকে পাকে জড়াইয়া আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। গায়ে বৃষ্টির জল লাগায় ধীরে ধীরে পাক খুলিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল। ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক চোখে হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্যে দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইয়া গেল।
মানিকের ভাষারীতি দরকারে দার্শনিকতা প্রকাশ করে এবং তাকে খুব সস্তা দার্শনিকতা বলা চলে না। নিজের অভিজ্ঞতার উপরেই তিনি নির্ভর করেন বেশি। প্রকৃতির দিকে, নিভৃতি ও গূঢ়তার ভিতরে সহজে সরাসরি তাঁর চোখ চলে গেলেও দৃষ্টিটা তার শেষ পর্যন্ত স্থির হয় সমাজে, মানুষের মধ্যে এসে। ‘পদ্মানদীর মাঝি’-তে সমাজ ব্যক্তি মানুষ সবই আছে, তবে এসবের স্থাপনা প্রকৃতির পটভূমিতে, যে প্রকৃতি চালচিত্রও বটে, উপন্যাসের ভালোমন্দের সমস্ত ব্যাপারে অংশগ্রহণকারীও বটে। ফলে মানিকের ভাষা স্বচ্ছন্দ সাবলীল হয়ে উঠতে পারে সহজে। ভাবনায় উলটো পথে ধরে দার্শনিকতা আসে অনায়াসে। শান্ত নিরুচ্ছ্বাস বর্ণনা, মানুষগুলির নানাধরনের উল্টোপাল্টা মনোভাবের সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, পক্ষ আর রগরগে ঘটনার অভাব সব মিলিয়ে পাঠকের মনকে উত্তেজিত বা বিচলিত হতে দেয় না; তা যেন জীবনের রাগ-অনুরাগ, ঘৃণা-বিদ্বেষ, কঠোর দারিদ্র্য, দুঃস্বপ্নের মরীচিকা, প্রচণ্ড আসক্তি আর তীব্র বিরাগ, জিভের উপর রেখে যাওয়া তিক্ত স্বাদ এসবের একটা বিশাল বৃত্ত তৈরি করে। এই বৃত্ত বড়ো হতে চায় কেবলই, জীবনের দিকে এগিয়ে আসা মরুভূমির মতো। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় প্রকৃতি বাদ পড়তে শুরু করেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষার মধ্যে অস্থিরতা ঢুকছে একটু একটু করে। তীক্ষ শ্লেষ, তীব্র বিদ্রূপে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে তাঁর বাক্যগুলি। প্রেম আর তার ঠিক উলটোপিঠের কঠিন বিমুখতার প্রতিক্রিয়া অসুস্থ করে দিতে চাইছে পাঠকের মন। ইচ্ছামৃত্যুর মতো ভয়ানক আত্মবঞ্চনা প্রকৃতিকে দূরে সরিয়ে রাখছে বা প্রকৃতির ভিতরের শান্তিটুকুও নষ্ট করতে চাইছে; এসব ঘটছে, কারণ ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় সমাজ সামান্যই আছে, আছে আলাদা আলাদা ব্যক্তি। শশী সমাজের এতটুকু তোয়াক্কা করে না। এই যে প্রকৃতি থেকে ব্যক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া, আরো পরে সমাজকে লেখার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, এসবের ধীর বিবর্তন মানিকের নিজের মনের জগতেই ঘটতে থাকে, তা তাঁর ভাষারীতির উপর চাপ ফেললেও তার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি কিন্তু অবিকৃতই থেকে যায়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় প্রকৃতি থেকে মানুষে যাবার প্রক্রিয়া বেশ চোখে পড়ে। শশীর বদ্ধ জগৎটার মধ্যে আমাদের ঢুকে পড়তে হয়। কুসুম-শশীর পরিণতিহীন আসক্তি কেবলই চারদিকে আগুনের ফুলকি ছিটোতে থাকে, বিন্দুর বিকৃতিতে ভরা জীবনের বর্ণনায় আমাদের নিশ্বাসের কষ্ট হয়, তবু থেকে যায় একটা তালপুকুর যার ‘গভীর কালো জলে হাঁস সাঁতার দেয়, তাদের গায়ে ঠেকিয়া লাল ও সাদা মেঘ আর বন্য কপোতের ঝাঁক। শালিখ পাখি উড়িবার সময় হঠাৎ শিস দেয়।…তালপুকুরের নির্জনতাকে সে (মতি) শুধু ভোগ করে গায়ে জড়ানো আঁচলটি কোমরে বাঁধিয়া।’ আর থেকে যায় মাটির টিলাটি যার ‘উপর সূর্যাস্ত দেখিবার শখ এ জীবনে আর একবারও শশীর আসিবে না।’ ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র পর থেকেই প্রকৃতি ব্যক্তি দুই-ই যেন একটু পিছন দিকে সরে যায়। সামনে আসে সমাজ, সমাজের ভিতরে আটকে থাকা সামাজিক ব্যক্তি-মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে মানিকের লেখায় আসতে থাকে কী যে বিরক্তি, কী যে বিবমিষা, অসুস্থতা বিকার! এখন শ্লেষ প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, দাঁত কড়মড় করার আওয়াজ পাওয়া যায়। চল্লিশের দশকের অনেক ছোটোগল্প, বেশ কিছু উপন্যাসের সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ধাঁচ মানিকের জন্যে সান্ত¦না আনতে পারে কই। ‘চতুষ্কোণ’-এর রাজকুমার, ‘আরোগ্য’-র ড্রাইভার নায়ক অসুস্থ থাকে অকারণে। তারা জানে না কেন তাদের মাথা ধরে, কোন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কষ্ট পায় তারা। রাজকুমার নির্দোষ বিকারে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে চায় যুবতী মেয়েদের উলঙ্গ চেহারার সঙ্গে তাদের মনের গড়নের কোনো সম্পর্ক আছে কি না দেখার জন্যে। মানিকের ক্যানভাস ছোটো হয়ে আসে, দৃষ্টির চৌহদ্দিও সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ে। এসব ঘটে বটে তাঁর নানা পর্যায়ের লেখার মধ্যে কিন্তু তাতে তাঁর ভাষা আর কলাকৌশলের মূল চেহারাটার তেমন বদল হয় না, এই ছাড়া যে তাঁর ভাষার শান্তভঙ্গিটি তিক্ততায়, বিরক্তিতে, আত্ম-বিশ্লে¬ষণে, অতি-বৈজ্ঞানিকতায় ক্লিষ্ট হয়ে যেতে থাকে। তাঁর লেখায় প্রতীকী চারিত্র্য বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা হারায়। তবে তা শেষ পর্যন্ত মানিকেরই ভাষা থেকে যায় তাতে সন্দেহ নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষারীতিকে তাঁর কঙ্কালের কাঠামোয় আনতে পারলে দেখা যাবে ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘জননী’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বা এই একই কালপর্বের অসামান্য ছোটোগল্পগুলি যিনি লিখেছেন সেই একই লেখক ফিরতি-বিশ্বাস পাওয়া ‘শহরতলী’, ‘ইতিকথার পরের কথা’ ইত্যাদি উপন্যাস আর ‘আজ কাল পরশুর গল্প’গুলিও লিখেছেন, লিখেছেন ‘চতুষ্কোণ’, ‘আরোগ্য’র মতো উপন্যাস। এমন কি ভাঁটা-পড়া লেখকজীবনে যখন শুকিয়ে-ওঠা নুড়ি-পড়া খাতাটি মাত্র শূন্য পড়ে আছে তখনকার উপন্যাস ‘হলুদ নদী সবুজ বন’ ‘প্রাণেশ্বরের উপখ্যান’-ও এই একই লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা। ভাষার উপর জমে থাকা আবরণগুলিকে সরালেই সেটা চোখে পড়বে। পরিবর্তন ঘটেছে মানিকের বিশ্বাস, মতে, অবস্থায়, দৃষ্টিতে, দীক্ষায়Ñএই সবই প্রতিফলিত হচ্ছে তাঁর ভাষাভঙ্গিতে, প্রকাশরীতিতে।
মানিকের ভাষা শেষের দিকে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এই মতের তেমন কোনো অর্থ নেই। আসলে আর তাঁর দেবার মতো কিছু ছিল না। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাস্তবকে তিনি দেখেছেন, বাস্তব সম্বন্ধে নানাভাবে মনস্থির করেছেন। যত তিক্ততা, যত অবিশ্বাস, যত লোভ, যত আশা বা হতাশা, যত ঘৃণা বা ভালোবাসা, অনুভূতির যতরকম স্তর তাঁর পক্ষে ভাষায় ধরা সম্ভব ছিল তার সবই তিনি তাঁর বেশ সংক্ষিপ্ত ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সের মধ্যেই খুব দ্রুত, অমানুষিক পরিশ্রমের ভিতর দিয়ে ধরে রেখে গেছেন। তার ভাষা মূলত বদলায় না বটে কিন্তু যখন আর তাঁর প্রায় কিছুই লেখার নেই তখন কি করতে পারতেন এই কলম-পেষা মজুর? তিরিশের দশকের ক্ষয়, শূন্যতা, ঘুণ, চল্লি¬শের দশকের বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতার জন্যে জাতীয় আন্দোলন ও সংগ্রাম, মানুষ জাতির জন্যে স্তালিনের রাশিয়ার বিরাট অর্জন এসব নিয়ে তো লেখা হয়ে গেছে। তারপরে ‘বিজয়শব্দে নয়, গোঙানির আওয়াজ’ করে এসেছে উপমহাদেশের স্বাধীনতা। মানিকের চোখের সামনে তখন বিধ্বস্ত পৃথিবী। ম্যাড়মেড়ে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার আলো কুষ্ঠের ক্ষতের উপরে খেলা করছে। অসুস্থ, আশাশূন্য, মোহশূন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময়ে কলমটাকে পেষা ছাড়া আর কি করতে পারতেন কে জানে। ভাষার মধ্যে কাজেই ফিরে আসে তাঁর সমস্ত মুদ্রাদোষ যা আগে চমৎকার মিশে গিয়েছিল রচনার সঙ্গে। কথাশূন্য, ফাঁপা উলটো-লজিক রাস্তায় ঘন ঘন স্পিডব্রেকারের মতো লেখাকে আটকে ধরে, বৈজ্ঞানিকতা তুচ্ছ বাগাড়ম্বরে দম-চাপা হয়ে মারা পড়ে। বিশ্লে¬ষণ গভীর যুক্তিজাল ছড়ানোর ভান করে, কিন্তু একপা এগোয় না। অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত উপহার দেবার প্রাণান্ত চেষ্টা কখনো করুণ, কখনো হাস্যকর হয়ে ওঠে। এমন কী বাক্যের সঙ্গে বাক্য জোড়া দেবার নিবিষ্টতা পর্যন্ত মানিক হারিয়ে ফেলেন। তাঁর এই সময়কালের লেখা পড়া কষ্টকর। লেখকমাত্রেরই ক্ষমতা সীমিত, ফুরিয়ে যেতে হয় সব লেখককেই, তবে বাস্তবকে বাদ দিয়ে যে লেখকের একপা এগোনোর ক্ষমতা নেই, বাস্তবকে দেখার নতুন চোখ আর না মিললে, উপলব্ধির সমস্ত সঞ্চয় পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে এমন কি তলানিটুকু পর্যন্ত শুকিয়ে গেলে একজন লেখকের জন্যে যা ঘটতে পারে, মানিকের জন্যে ঠিক তাই ঘটেছিল।
তিনি অসাধারণ লেখক ছিলেন। অসম্ভব রকম ব্যক্তি লেখক ছিলেন। অনন্যতা স্বকীয়তা তার পরিচয়ের অন্য নাম ছিল। সম্ভবত সেই কারণেই শেষ লেখাগুলিতে যখন আর তাঁর ঝুলিতে তেমন কিছু নেই, তাঁর ভাষারীতি এত শূন্য এত নিঃস্ব হয়ে উঠে।

[হাসান আজিজুল হকের নির্বাচিত প্রবন্ধ থেকে সংকলিত]