Archives

স্নান ৩৩

জামদাগ ও রাধাদির সময়পর্ব
আমরা অনেক কেঁদেছিলাম একদিন, দাদখানি চাল আর মসুরের ডাল কেনার বাজারে। তখন মমতাময়ী কেউ একজন আমাকে খুব কাছে টেনে জড়িয়ে বলেছিল, কেন এতো কান্না তোর, চোখ জ্বলে কেন এতো কাঁদিস তুই বাবা! ভর জ্যোৎস্নায় আজ বিশাল জামগাছের ফাঁক দিয়া চই চই শব্দে শুকলাল বাঁশী বাজাইছে : ‘বনমালী গো তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’। সত্যিই রাধাদি সে জ্যোৎস্নয় কী সুন্দর লম্বা আঁচলওয়ালা শাড়িতে বিরাট সীনা নিয়া আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়ান। বনবাউল তখনও গান ছাড়ে নাই, সেও তখন কান্দিও কান্দিও… স্বরে বিলাপ তুলছে, আচমকা রাধাদি কেমন মনে নদীমাটির তারে গোটা শরীরে গভীর কামিনীগন্ধা হইয়া ওঠেন। তখন জামগাছটা থৈ থৈ করে তাকে নাইওরে ডাকে, হুন হুনা স্বরে আওয়াজ বাড়ে, ভরকেন্দ্রে কাঁচুলী নিচোল পরকীয়া দুইলা ওঠে। তাতে কাঁদন-বাঁধন আরও বাড়ে, সুখ বইয়া আনে তুমুল মায়াভয়, গরমের ভেতরে উষ্ণ মৃদুমন্দ হাওয়ায় গুর”গম্ভীর¬-বলোক বাড়ে। রাধাদি খুব ভালোবাসেন, নিজেকে চুমিয়া তোলেন, ভরমে আদরে বলেন, তোর অছোঁয়া শরীরে এখনও বৃষ্টি ছোঁয় নাই। জামজ্যোৎ¯œার দাগ এখনও লাগে নাই। ভরে নাই ঠোঁট-চোখ-মুখ-বুক আর দহনের স্বর। এখনও রূপালী জ্যোৎস্নার তাপ তোর গতরে নছনছা কইরা রাখছে। আর অনূঢ়া আমারও সেলাই-তাগায় কিচ্ছু ধরে নাই। আয়! মুইছা দেই কান্না, এর ভেতরেই অশ্ব-গজ-সর্প আর বনমালীর গন্ধ পাকিয়া উঠিবে। রাধাদি তখন ভরিয়া তোলেন তুমুল আনন্দ। বাঁশরীর বীজ বোনেন, বসুন্ধরার শুনানি সাড়ায় বীজানন্দের বহতায় ডাইকে কন : মা, তোমার এতো আদরের রাধা আজ শোক শ্যাষ কইরা বৃদ্ধ জামরঙায় অনেক আলো দিছে, তৈরি করছে কল্যাণময় মানুষের দয়াসুখ। ইহা অনন্ত আর অনিঃশেষ হইবে। বাঁচিবে চিরকাল।
তাই গত পাঁচ বছরে রাধাদির কল্যাণে তার সকল শোক শ্যাষ হইয়া গেছে। এবার ষষ্ঠ সাড়ম্বরে কান্নাছাড়া স্বভাবেই রাধাদিকে নিয়া তার সুখভেলা ভাসিয়া চলিবে। ফিরে আসবে কান্না কিন্তু তা গতও হইবে, কারণ সে তো রাধাদিকে পাইছেজ্জশিমুলফোটা ভোরের পলমোড়া ভিটায়, সন্ধ্যারাখালের বেভুলা বায়েজ্জঠিক চিরটা কালের মতো।

চিহ্নপ্রধান

ইরফানুর রহমান
মুক্তিযুদ্ধ : মানুষের মানচিত্রের স্বপ্নের জন্য ইতিহাসের লড়াই
উৎসর্গ : শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পবিত্র ও জীবন্ত স্মৃতির উদ্দেশ্যে
[ক্ষমতার ইরেজারের সঙ্গে স্মৃতিলিখনের লড়াইই মানুষের লড়াই ।। মিলান কুন্ডেরা]

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা ভদ্রলোকি ‘ইতিহাস’ চালু আছে। মুক্তিযুদ্ধের এই ‘ইতিহাস’ পাঠ করলে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটা খেলা, যার একপক্ষে ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা, অন্যপক্ষে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধের এই ‘ইতিহাস’ জুড়ে থাকে মুর”ব্বিদের মূর্তি, তাঁদের অসাধারণত্বের অতিপ্রশংসা, সামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, মুক্তিযুদ্ধের টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি, ঘোষকসংক্রান্ত বেহুদা বিতর্ক, ধর্মকেন্দ্রীক বিপজ্জনক বাহাস, এবং অজস্র পরিসংখ্যান।
মুক্তিযুদ্ধের এই ‘ইতিহাসে’-র বাইরেও একটা ইতিহাস আছে। এই ‘ইতিহাস’ মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়ে সেই ইতিহাস সম্পর্কে একটু আধটু ধারণা দিতে, কিংবা বলা যায়, সেই ইতিহাস তার নিজ শেকড়সংলগ্নতার শক্তিতেই এই ‘ইতিহাসে’ ঢুকে পড়ে। সেটা মানুষের মানচিত্রের জন্য স্বপ্নের ইতিহাসের লড়াই, ‘গণযুদ্ধের জনযোদ্ধাদের’ শত সহস্র বছরের ইতিহাসের লড়াই, শোষক নিপীড়কদের বির”দ্ধে। যে স্বপ্নের সূচনা ঘটেছে প্রাচীন ভারতে বহিরাগত আর্য আগ্রাসনের বির”দ্ধে দ্রাবিড় এবং ভূমিপুত্রদের প্রতিরোধ থেকে। যে স্বপ্ন বেঁচে থেকেছে বহিরাগত মুঘলদের বির”দ্ধে ‘বুলঘাখানা’ বাঙলার নিরন্তর বিদ্রোহে। যে খোয়াব বুকে নিয়েই ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে মুর্শিদাবাদের সিপাহি থেকে ফকির মজনু শাহ-ভবানী সন্ন্যাসী-জয় দূর্গা দেবী চৌধুরাণীর নেতৃত্বে নিম্নবর্গের বিদ্রোহী থেকে তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লা ও ফরায়েজি আন্দোলনের লড়াকু থেকে সাঁওতাল সিদু ও কানু মাঝির তীর ধনুকের ধারকগণ থেকে স্বদেশী আন্দোলনের সন্ত্রাসবাদী থেকে তেভাগা আন্দোলনের চাষী। যে খোয়াবের বশবর্তী হয়েই একদিন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান ও তফসিলি হিন্দুদের এক বিশাল অংশ পাকিস্তান কায়েমের জ্বালানি হয়েছিলো, যে স্বপ্ন পাকিস্তান কায়েমের অব্যবহিত পরেই মাটির সানকির মতো ভেঙে গিয়েছিলো পূর্ববাংলার হতদরিদ্র মানুষদের উঠোনে, যে খোয়াব দ্বারা তাড়িত হয়েই বায়ান্নোয় ‘বাঙালি মুসলমানের [মানসিকভাবে] স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ ঘটেছিলো ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে।
মানুষের মানচিত্রের এই স্বপ্নই আসলে স্বাধীনতার স্থপতি। এই স্বপ্নই পাকিস্তানের লুটেরা সাম্প্রদায়িক সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসকশ্রেণীর বির”দ্ধে লড়েছে, কখনো রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাংলা বর্ণমালা রক্ষার দাবীতে, কখনো রক্তচক্ষু সামরিক শাসনের বির”দ্ধে পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের ও ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে। এবং এই স্বপ্নই অনিবার্য করেছিলো বাংলাদেশের জন্ম।

২.
মুক্তিযুদ্ধের ভদ্রলোকি ‘ইতিহাস’ যান্ত্রিকভাবে বলতে/লিখতে পছন্দ করে : ‘৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত আর ২ লক্ষ ৮০ হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।’ এই বয়ানে কি কোনো ধরনের সমস্যা আছে? আছে।
প্রথম সমস্যা ‘মা-বোন’ শব্দটার ব্যবহার নিয়ে। রক্তের সম্পর্ক নেই এমন নারীকে আমি কখন মা বা বোন বলে ডাকতে চাইবো? যখন আমি তাঁকে আমার বাসনার এলাকার বাইরে রাখতে চাইবো, একজন পুর”ষ হিসেবে, সচেতনভাবে। নইলে মা বা বোন ডাকার তো কোনো অর্থ হয় না! ব্যক্তিগত জীবনে রক্তের সম্পর্ক না থাকা মানুষকে মা বা বোন ডাকাটা মানবিক, কিন্তু, ১৯৭১-এর নিপীড়িত নারীদের জন্য এটা একটা অদ্ভুত ট্র্যাজেডি তৈরি করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা যখন বাংলাদেশের নারীদের ওপর সুপরিকল্পিতভাবে ধর্ষণসহ পৈশাচিক সব অত্যাচার চালিয়েছে, তারা নারীদের ‘কামসামগ্রী’ হিসেবে দ্যাখে বলেই তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে দিনের পর দিন মাসের পর মাস রেইপ ক্যাম্পগুলোতে পাগলা কুত্তার মতো বাংলাদেশের নারীদের ওপর নির্যাতন চালানো। আজকে যারা সেইসব নিপীড়িত নারীদের ‘মা-বোন’ ডাকছেন, তারাও কিন্তু একজন নিপীড়িত নারী যে তার  ‘লৈঙ্গিক পরিচয় সত্ত্বায় ধারণ করেই একজন মানুষ’- এভাবে চিন্তা করতে পারছেন না, পাকিস্তান আর্মি তাঁদের ওপর পিশাচের মতো অত্যাচার করেছে বলেই যে তাঁদের মানবিক পরিচয় খারিজ হয়ে যায় না, এই সেন্সটুকু কারো মধ্যে কাজ করছে না।
ফলে মুক্তিযুদ্ধের পরে তাঁদের বেশ্যাবৃত্তি বা আত্মহননে বাধ্য করতে যাঁদের বিবেকে বাঁধেনি, বেয়াল্লিশ বছর পরে যান্ত্রিক আবেগহীন গলায় ‘মা-বোন’ ডাকতেও তাঁদের এতোটুকু লজ্জাও হয় না, নিপীড়িত মানুষগুলোর যন্ত্রণা-দীর্ঘশ্বাস-কান্না নিয়ে চলে নির্বাচনের রাজনীতি! ‘মা-বোন’ ডাকা যাবে না তা বলছি না। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ‘মা-বোন’ ডাকার মধ্যে যে ব্যাটাগিরির ধূর্ততার রাজনীতি কাজ করে সেটা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কথা বলছি।
দ্বিতীয় সমস্যা ‘ইজ্জতের বিনিময়’ শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে, অর্জন লড়াইয়ের সাথে সম্পর্কিত, বিনিময় ব্যবসার সাথে। আমরা কি ১৯৭১ এ পাকিস্তানের সাথে কোনো বিজনেস ডিল করেছিলাম স্বাধীনতা নিয়ে, নাকি, লড়াই সংগ্রাম করার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম? রাজাকার আলবদর আলশামসরা ‘বিনিময়’ শব্দটা ব্যবহার করতে পারে, তারা টাকাপয়সার বিনিময়ে আমাদের দেশের নারী পুর”ষ শিশুর নিধনযজ্ঞে ও রিফিউজি বানানোয় ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় দোসর এবং পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, তারা লক্ষ লক্ষ নারীকে রেইপ ক্যাম্পের নৃশংস হিংস্রতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো বাংলার স্বাধীনতা অর্জন করেছি! যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা রেইপ ক্যাম্পে পাগলা কুকুরদের পৈশাচিক হিংস্রতার বির”দ্ধে বেঁচে থাকার মাধ্যমে যুদ্ধ করেছেন তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা বলে কাউকে সেকেন্ড ক্লাস মুক্তিযোদ্ধা বা ঘৃণা-কর”ণা-অবহেলার পাত্রী বানানোর কোনো অধিকার আমাদের নেই। বিনিময়ের মতো একটা রাজাকারি শব্দ আমরা ব্যবহার করবো কেনো? এর কারণ কি এই যে মুখে যাই বলি না কেনো ভেতরে ভেতরে রাজাকারদের সাথে আমাদের অনেক ‘মূল্যবোধগত’ মিল আছে?
দুটো সমস্যার শেকড়ই লুকিয়ে আছে পুর”ষতন্ত্রের মধ্যে। হ্যাঁ, ‘পুর”ষতন্ত্র’ হচ্ছে সেই মতাদর্শ যার ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভদ্রলোকি ‘ইতিহাস’ গোপনে লালন করে এমন সব মূল্যবোধ যেসবের বির”দ্ধে লড়াই করেই আমরা ‘স্বাধীন’ হয়েছি, কাগজেকলমে। সত্য সাধারণত তেতো, এই কথা পড়ে অনেকেই উত্তেজিত হতে পারেন, কিন্তু সত্য যতো তেতোই হোক সত্য সত্যই।
আর তাই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটা শুনলে পুর”ষ মুক্তিযোদ্ধার কথা মাথায় আসে। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা বা রেইপ ক্যাম্পে পাগলা কুকুরদের পৈশাচিক হিংস্রতার বির”দ্ধে বেঁচে থাকার মাধ্যমে যুদ্ধ করা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মাথায় আসে না। মুক্তিযুদ্ধ, অন্তত এখন পর্যন্ত, ভদ্রলোকি ‘ইতিহাসে’ পুর”ষদের যুদ্ধ। কিন্তু মানুষের মানচিত্রের জন্য স্বপ্নের ইতিহাসের যে-লড়াই, তা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভদ্রলোকি ‘সেলিব্রেশনে’ সীমাবদ্ধ নয়, তা নিরন্তরভাবে প্রবাহিত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলায়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের লুটপাটের বির”দ্ধে বিপন্ন মানুষের লড়াইয়ে, সেখানে নারীপুর”ষের বৈচিত্র্য থাকলেও বিভেদ নেই, স্বার্থের সংহতি আছে, আর এই স্বপ্নই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে আজো।

৩.
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় নি, এখনো, মুক্তিযুদ্ধ চলছে। মুক্তিযুদ্ধের একটা অসমাপ্ত লড়াই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। যুদ্ধের পরে সেই প্রক্রিয়াটা শুর” করা হয়েছিলো, খুব দায়সারাভাবে, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের’ চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তানি সামরিক মূল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করেই পাকিস্তানে পাঠানো থেকে শুর” করে ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণার দিন শর্ষিণার পীর আবু সালেহ (এই পীরসায়েব ১৯৭১ সালে ফতোয়া প্রদান করেছিলেন, নারীদের গণিমতের মাল হিসেবে ধর্ষণ করা জায়েজ, এরশাদ আমলে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন) ও শাহ আজিজের (এই শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীকে জিয়া আমলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়) মতো প্রথম সারির যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে বের হয়ে আসা ইত্যাদি থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে মুজিব আমলে নেওয়া উদ্যোগে সদিচ্ছার অভাব ছিলো। তারপর মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর একের পর এক সামরিক শাসকেরা এসে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করেন। জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসরগিরি করেছে, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো সরকারই জামাতকে নিষিদ্ধ করে নি গণহত্যা ও ধর্ষণে এর একাত্তরকালীন ভূমিকার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের পর ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ব্যান্ড করার কারণে জামাত নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। এই কারণেই মুজিব সপরিবারে খুন হওয়ার পর, সামরিক শাসকদের জন্য এতো সহজে সম্ভব হয়েছিলো, জামাতকে বাংলার মাটিতে ‘রাজনীতি’ করার অধিকার দেওয়া। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা এরা সবাই কখনো না কখনো গোপনে বা প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামীর সাথে হাত মিলিয়েছে ‘ভোটের রাজনীতির’ হিসাবনিকাশে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্দোলন শুর” না করলে, কে বলতে পারে, আজ হয়তো জামায়াত খুনী নিজামীদের মুক্তিযোদ্ধা দাবী করতো! শহীদ জননী এবং একাত্তরের ঘাতক ও দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ফলে যে গণআদালত তৈরি হয়েছিলো এইসব জানোয়ারদের বিচারের জন্য, ২০১৩ সালের শাহবাগ সেই মহান আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার বহন করে, এবং যেই আওয়ামী লীগ শহীদ জননীর আন্দোলনে পেছন থেকে ছুরি মেরেছিলো সেই দলই আজ শাহবাগ আন্দোলনকে নিজেদের নির্বাচনী ভোটব্যাংক তৈরির উদ্দেশ্যে ছিনতাই করেছে। আর বিএনপি একাত্তরের গণহত্যাকে অস্বীকার করার খায়েশে যেখানে সেখানে গণহত্যা দেখে বেড়াচ্ছে, ইসলাম হেফাজতের নামে জামায়াতে ইসলামীকে হেফাজত করছে, মার্কিন-ভারত-রাশিয়ান স্বার্থে টিকফা চুক্তি-রামপাল প্রকল্প-রূপপুর প্রকল্পের মতো বাংলাদেশধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা না করে আমাদের এই ‘বিরোধী দল’ দেশের মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে ‘আন্দোলন’ করছে।
রামু থেকে সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জাতিসমূহের মানুষদের ওপর অত্যাচারে, এরা সবাই মিলে মিশে এক হয়ে যায়। কে সরকারি কে বিরোধী বোঝা যায় না। স্বাধীনতার স্বপক্ষ বিপক্ষ প্রতিপক্ষ তখন পরস্পরের দোসর।
রাজাকার মানে স্বেচ্ছাসেবক, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় যারা বিদেশি দখলদারদের সেবা করে, পদলেহী কুকুরের মতো। এই অর্থে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা, জামাত সবাই রাজাকার দল। কারণ, দেশের সম্পদ মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেটদের কাছে পানির চেয়েও সস্তা দরে বেচার ক্ষেত্রে এদের মধ্যে ফারাক নেই। মার্কিন ভারতের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য খাত ধ্বংস করে ফেলতে এদের মধ্যে ফারাক নেই। বিদেশী দূতাবাসগুলোয় দৌড়াদৌড়িতে এদের মধ্যে ফারাক নাই। শুধু জামায়াত ইসলামীকেই আমি রাজাকার ভাবি না। এদের সবাই রাজাকার।
এবং এরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। কৃষকদের হত্যা করে। মধ্যবিত্তের যে-অংশটা এখনো ‘জাতে’ উঠতে পারে নি, তাদেরকে হত্যা করে। আজকে মুক্তিযুদ্ধের বেয়াল্লিশ বছর পরও নারী নিপীড়নকারী দাঁতাল শুয়োরদের অভয়ারণ্যই রয়ে গেছে এই দেশ, আর তার জন্য, সমাজের পুর”ষতান্ত্রিক ভিত্তির পাশাপাশি এই দলগুলোও দায়ী। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেহায়া লোকটা ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করেছে, পাকিস্তান থেকে ‘উত্তরাধিকার-সূত্রে’ এসেছে অর্পিত সম্পত্তি আইন, এবং এইসব সাম্প্রদায়িকতার ‘ঐতিহ্য’ বজায় রেখেছে দলগুলো। তর”ণ প্রজন্মই সারা দুনিয়ায় পরিবর্তনের নিশান ওড়ায়, তাই, আমাদের দেশে তর”ণ প্রজন্মকে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা হয়েছে হাজারো রকমের রঙিন নেশায়। সমাজ জাহান্নামে যাক, তুমি ‘ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট’ হও, আহাম্মকের মতো নিজের লাইফ ‘এনজয়’ করে বেড়াও।
বিপ্লবী রাজনৈতিক দলগুলো তার”ণ্যের ধারক ছিলো এইদেশে। এখনো তারা আছে। জনগণের পাশেই আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে বিভাজনের কোনো সীমা নেই। এই বিভাজনের একটা বড়ো কারণ : ‘আন্তঃমতাদর্শিক বিতর্ক।’ তো ‘আন্তঃমতাদর্শিক বিতর্কের’ নামে বিপ্লবীরা স্নবারি-চর্চা চালিয়ে যেতে পারে, তাতে জনগণের ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না, কারণ এখন পর্যন্ত জনগণের পাশে এঁরাই আছে। হাজার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, যে স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে এখনো এঁরাই সম্মুখসারির লড়াকু।
মানুষের মানচিত্রের স্বপ্নের জন্য ইতিহাসের যে-লড়াই মুক্তিযুদ্ধ, তা কারো জন্যই অপেক্ষায় থাকে না কখনো, কারো জন্যই না। ইতিহাস তার নিজের ধারায় ঠিকই চলতে থাকবে, ভদ্রলোকি ‘ইতিহাসের’ নিগড়ে সে আটকে থাকবে না, মুক্তিযুদ্ধ ভদ্রলোকি চর্চার ওপর নির্ভর করেনি কোনোদিন। আমি মনে করি, আমাদের আদি মুক্তিযুদ্ধ যে স্বপ্ন নিয়ে হয়েছিলো সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এই বাংলায় অবশ্যই হবে, তবে তার জন্য স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রেখে আমাদেরকে সংগঠিত হতে হবে ও মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে সকল প্রকার শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের বির”দ্ধে।

জিয়াউল হক সরকার
তল্লাশি

খোকা ঘুমিয়েছে। রাত হয়তো অনেকটাই গভীর হবে। ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। সেলফোনের আধিক্যে এখন হাতঘড়ির ব্যবহার অনেকটা উঠে গেছে। ছোটকালে দেখতাম বাবা বালিশের কোণে সবসময় ঘড়ি রাখতেন। কিন্তু এই অধুনাকালে সেই স্থান দখল করে নিয়েছে সেলফোন। সময় দেখানো ছাড়াও উপরন্তু অনেক সুবিধা নিয়ে যেমন হাজির হয়েছে, তেমনি বিড়ম্বনাও কম নয়। যেমন হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই আজ বন্ধ হয়ে আছে। ঘুমঘুম চোখে অফিসের ফাইলগুলো নাড়ছি। এমন সময় দরজায় কড়াঘাত শোনা গেল। বাইরে থেকে উচ্চস্বরে কে যেন বারবার বলছে, রফিকুল সাহেব, রফিকুল সাহেব, দরজা খুলুন…দরজা খুলুন…। সুমনা গিয়ে দরজা খুলতেই খটখট শব্দে কয়েকজনের ঘরে প্রবেশের শব্দ শোনা গেল। রফিকুল সাহেব কোথায়? এভাবেই হয়ত কেউ সুমনাকে জিজ্ঞেস করছে। আমি শোবার ঘর থেকে দরজার কড়াঘাতের শব্দ, উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসা আর বুটের খটখট আওয়াজেই অনুমান করছি হয়তো আমার চেয়ে ক্ষমতাধর বা উচ্চ পর্যায়ের কেউ হবেন। ভাবতে না ভাবতেই আমার সামনে এসে হাজির! জিজ্ঞেস করলেন, আপনিই রফিকুল সাহেব? আমি বললাম হ্যাঁ, আমি।
হঠাৎ কোন আড়ম্বর ছাড়া রাষ্ট্রের এহেন উপস্থিতি দেখে আমি হকচকিয়ে উঠলাম। অবশ্য ছোটকাল থেকেই বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন চেহারায় রাষ্ট্রকে দেখেছি। কখনো দানবের বেশে, কখনো মানবের বেশে। আবার কখনোবা দৈবদূত হয়ে আসে আমাদের কাছে। তাছাড়া আর আট-দশজনার মতোই আমার কাছে রাষ্ট্র মানে পুলিশ, আইন-আদালত, আমলা, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ইত্যাদিই মনে হয়। একটু বাড়িয়ে বললাম  বৈকি! কিন্তু আজ আমার ঘরে রাষ্ট্রের এহেন উপস্থিতি সুখকর নয়। হোমরা-চোমরা গোছের (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়তো হবে) একজন আমাকে বললেন, আমরা তেজগাঁও থানা থেকে এসেছি। আপনার বাসা তল্লাশি হবে। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া অবস্থা। ইতোমধ্যে খোকা ঘুম থেকে জেগে গেছে। সুমনা আর খোকা কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, কেন? উপযুক্ত কোন কারণ আছে কি? ওসি সাহেব রক্তচক্ষে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা গোপন সূত্রের ভিত্তিতে এসেছি। একটি হত্যাকাণ্ডের সাথে আপনার কোন না কোনভাবে যোগসাজশ আছে। অথবা আপনি তাদেরকে আশ্রয় বা অন্য কোন উপায়ে সহযোগিতা করছেন।
আমি কোন কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু এতটুকু বললাম, কিসের হত্যাকাণ্ডের? কার হত্যাকাণ্ড? আমি এসবের কিচ্ছু জানি না। আর আপনারা আমার বাসা তল্লাশি করছেন? ওসি সাহেব তিলক্ষণ বিলম্ব না করে হুকুম করলেন সাড়াশি তল্লাশি করবার জন্য। মুহূর্তের মধ্যেই তছনছ শুর” হয়ে গেল। আমি নির্বাক সুমনার পাশে এসে দাঁড়িয়ে চারদিকের কুর”ক্ষেত্র দেখছি আর ক্ষোভের ঝড় নিজের মধ্যে দহন করছি। ভাবছি কখন মুক্তি পাব। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবলগুলো ফিরে এসে জানালো কোথাও কিছু পাওয়া যায় নি। আমার মনে একটু স্বস্তির হাওয়া বইল। দীর্ঘশ্বাস নিলাম। সুমনা ও খোকার দিকে বলিষ্ঠ দৃষ্টিতে ফিরে তাকালাম। কিন্তু ওসি সাহেব আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, এত বড় ট্রাঙ্ক! এখানে কি আছে? খুলুন এটি। আমি সুমনাকে চাবি আনতে বললাম। সুমনা একবার আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার পুলিশ অফিসারের দিকে। কি আর! সুমনা তড়িৎ গতিতেই চাবি এনে ট্রাঙ্কটি খুলে দিল। কনস্টেবলরা হাতড়াতে লাগল। হাতড়াতে হাতড়াতে ফ্রেমে বন্দি একটি প্রতিকৃতির দিকে নজর পড়ল। হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখতেই র”পালি ফ্রেমে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে খান্খান্ হয়ে গেল। আমরা শুধু নির্বাক দর্শকের ভূমিকায়। কিন্তু এ বিষয়ে ভ্র”ক্ষেপ না করে ওসি সাহেব একটু ধমকের সুরেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কাছে কি ব্যবসায়ী আসলাম তরফদার হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত কোন তথ্য আছে? আমি বললাম, না, কোন তথ্য নেই। কিচ্ছু জানি না। তারপরও নানারকম হে-সে, কত কি জিজ্ঞাসা। ওসি সাহেব যাবার কালে থানায় দেখা করার হুকুম জারি করে প্রস্থান করলেন।
পুলিশদের যাবার পরপরই সুমনা ক্ষিপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, এসব কি হচ্ছে? আমি কোন উত্তর না দিয়ে নির্বিকার রইলাম। একটু পর স্বস্তারায়নের জন্য প্রতিকৃতিটির দিকে এগিয়ে গেলাম। চূর্ণ-বিচূর্ণ ফ্রেমটি তুলে নিয়ে বেলকোনির কোণায় রাখা চেয়ারটিতে বসলাম। ভাঙা ফ্রেমটিতে চোখ রেখে অতীত হাতড়াতে থাকলাম। মনের পরতে পরতে অগোছানো স্মৃতিগুলো স্পষ্ট হতে লাগল। আয়নার মতো সামনে ভেসে উঠল আমার প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক মোহনলাল স্যারের কথা। যার জন্যই এই প্রতিকৃতিটি কেনা। গতকাল বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উৎযাপন অনুষ্ঠানে গিয়ে স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। কি আশ্চর্য এক মানুষ। যার জীবন-আদর্শ, কর্মে-মর্মে রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, গান আর উপন্যাসের মধ্যে যার বসবাস। আমার জীবনের প্রথম কবিতার বই ‘সঞ্চয়িতা’ তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া। সারাজীবন যিনি রাবীন্দ্রিক আদর্শ ফেরি করে বেড়িয়েছেন। যা হোক, গ্রামে অনেকদিন ধরেই ফেরা হয় না। এবার ভাবছি কয়েকদিন ছুটি পেলেই গ্রামটা দেখে আসব। আর অনুষ্ঠানে গিয়ে স্যারের কথা মনে পড়াতেই ভাবলাম অন্তত তার জন্য একটা প্রতিকৃতি কিনে রাখলে মন্দ হয় না। তবে অনুষ্ঠানে দু’দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিকদের (মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর) বক্তব্য শুনে আমার মনের কোণে রবীন্দ্র-চেতনা বেশ ভালোই শাণিত হল। মনে হচ্ছিল সারা উপমহাদেশ রবীন্দ্রনাথের চেতনা-আদর্শে শুদ্ধি হচ্ছে। আর তারা এটি করবার খেলাফতি নিয়েছেন। সাধু! সাধু! সাধু! কাঁপছে চারিধার। অতঃপর আমরা সপরিবারে রবীন্দ্রনাথের চেতনা-আদর্শে বিধৌতিত হয়ে প্রতিকৃতি নিয়ে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু একি! বিধৌতিত রবীন্দ্র-চেতনা শুকাতে না শুকাতেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাষ্ট্রযন্ত্রের এহেননিষ্পেষণে আমার ক্ষত-বিক্ষত রবীন্দ্রনাথ মনের অন্তকোণে ‘আঘাতে’ পরিণত হল। রাত্রির গভীরতার সাথে সাথে ক্রমেই আঘাত বেড়ে চলল।
ও, মোহনলাল স্যারের কথা আরো একটু খুলেই বলি। আমাদের মোহনলাল স্যার ষাটোর্ধ্বই হবেন। শুনলাম গতবছর নাকি অবসরে গেছেন। আমি যে বেসরকারি রেজিস্ট্যার্ড প্রাইমারিতে পড়তাম সে স্কুলেরই সহকারি শিক্ষক ছিলেন। আমরা তাকে ‘সেকেন্ড স্যার’ বলে ডাকতাম। দেহ বেশ লম্বাটে, ফর্সা। বেশ ঠাণ্ডা মেজাজের হলেও কখনো কারো ওপর রাগলে তার কপাল বাম। বেশিরভাগ দিন বিকেলে তিনি বাড়ির সামনে বাঁশের মাচাতে বসে বিকেলটা কাটাতেন। পথে নানা কিসিমের মানুষ চলাচল করত। তার পছন্দমত দু’চারজনকে থামিয়ে গল্প করতেন। কত বিকেল যে আমার স্যারের মাচায় গল্প করে গেছে তার লেখাজোখা নেই। তবে মনে পড়ে নজর”ল, রবীন্দ্র থেকে জগদীশ, গৌতম বুদ্ধ থেকে সিরাজুদ্দৌলা, বৃটিশ শাসন, সূর্যসেন, তিতুমীর কত কি গল্প শুনেছি। তখন শুধু তার সম্মুখ পানে চেয়ে অমৃতের মত শুনতাম। বুঝতামই-বা কতটুকু। আজ কিছুটা হলেও উপলব্ধি করি। আর এসব স্মৃতি থেকেই ভাবলাম সেকেন্ড স্যারের সাথে দেখা করে যদি রবীন্দ্রনাথের একখানা প্রতিকৃতি উপহার দেই তিনি ঢের আনন্দে আটখানা না হয়ে পারবেন না। কিন্তু রবীন্দ্র প্রেম, চেতনা আদর্শে বুদ্বুদ হওয়া আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র আমারই সামনে খান্খান্ করে দিয়ে গেল আমার রবীন্দ্রনাথকে। আশ্চর্য। সবই সাধারণ, সাদামাটা, স্বাভাবিক। ভাবতে ভাবতে দেখি পূবের আকাশ ফর্সা হতে শুর” করেছে। রক্তমাখা সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে। প্রাণবন্ত সূর্যের সাথে আমিও সতেজ হতে লাগলাম। ভাবলাম যাগ্গে এসব কথা, অন্তত ভোর হবার দৃশ্যটা অনেকদিন পর উপভোগ করা যাক। আড়মোড়া দিয়ে সকাল হবার দৃশ্য উপভোগ করছি। মনে হচ্ছিল কোন এক নবদম্পতির কাছে নতজানু হয়ে পুনর্বার জন্মভিক্ষে চাচ্ছি। খসখস শব্দে ঘোর ভেঙ্গে গেল। পেছনে তাকিয়ে দেখি সুমনা দাঁড়িয়ে আছে। রাতে তো ঘুমোলে না, অফিসও কি যাবার ইচ্ছে নেই, ওর দিকে ফিরে তাকাতেই বলল। আমি কোন উত্তর না দিয়ে সোজা গোসল সেরে নাস্তার টেবিলে বসলাম। নাস্তা সেরে অফিসের ফাইলগুলো গোছাতে আরম্ভ করলাম। এর ফাঁকে সুমনার সাথে দু’একটা ভাঙা ভাঙা কথা হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলে দু’একটা উত্তর করছে আবার কোনটি মাথা নেড়ে দায় সেরে ফেলছে। তবে রাতের প্রসঙ্গে কোন কিছুই নয়। মনে হচ্ছে আমাদের মাঝখানে বড় একটা অদৃশ্য দেয়াল আছে। ভাবছি কীভাবে এই প্রাচীর ভাঙবো। কীভাবে বোঝাই রাতরে ঘটনার দায়ভার আমার ওপর না দিয়ে পুলিশকে দাও। আমার সাথে এসবের কোন সর্ম্পক নেই। এদিকে অফিসের সময় হতে চলছে। প্রতিদিন প্রায় ঘণ্টাখানিক সময় বেশি হাতে নিয়ে বের হতে হয়। না-জানি যানজটে দেরি হয়ে যায় কিনা। তড়িঘড়ি করে ফাইলগুলো গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। খোকাকে ঘুমের ঘোরে একটু আদর দিয়ে টাইয়ের নট বাঁধতে বাঁধতে বেরিয়ে পড়লাম। সুমনা প্রতিদিনের ন্যায় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

রিঙকু অনিমিখ
বহ্নি

যদি তাই হতো তাহলে বহ্নির সঙ্গে এই যে আমার যোগাযোগহীনতা তা আরো দীর্ঘ হতে পারত, কিংবা এই দীর্ঘতা হয়তো কোনদিন ফুরোতোই না, অথবা এমনও হতে পারত যে আমাদের দেখা হলো কিন্তু কেউ কাউকে চিনলাম না। আমরা তখন অনেক বদলে গেছি। এমনকি এটাই যে বহ্নিদের বাড়ি তা-ও হয়তো জানা হতো না কোনদিন। ‘থাক না, তুই ঘুরে আয়। আমি আছি এখানেই।’ শাহিন ছাড়ল না। আমাকে পেছনে তুলে নিয়ে কাশিনাথপুরের এইপাশটায় চলে এলো। এদিকটায় আমার আগে কখনই আসা হয় নি।
মোটর সাইকেলটা ডানদিকের গলিতে পড়তেই বহ্নির সঙ্গে দেখা। ও-ই ডেকে আমাদেরকে থামাল। চুলখোলা অপি করিম মার্কা চেহারার বহ্নিকে প্রথমে চিনতেই পারি নি। যখন চিনলাম তখন আমরা হ্যান্ডসেক করছি সঙ্গে কুশল হচ্ছে, দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে, জমানো কথার উদ্গীরণ হচ্ছে। এরই মধ্যে শাহিনের সঙ্গে এক পশলা পরিচয়ও হয়ে গেছে। আমরা এখনও কবিতা লিখি শুনে বহ্নি সেই পুরনো ভঙ্গিতে খুব মিষ্টি করে রসিকতা করল। আমি আর বহ্নি একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম তখন খুব ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা। ও আমার খুব ভক্ত ছিল। আমিও কি ওর ভক্ত ছিলাম না! দুজন দুজনকে ভালোবাসতাম আমরা। জানতাম। কিন্তু কখনও জানানো হলো না। ‘ভালোবাসি’ শব্দটি খুব সঙ্কোচপ্রিয়।
‘তোর কিন্তু অনেক চেঞ্জ হয়েছে।’ আমরা তখন বহ্নিদের বারান্দায় যেখানে মাধবীলতার জড়াজড়ি সেখানটায় দাঁড়িয়ে। তিন পাশে দেয়ালের আড়াল এক পাশে মাধবীর আলিঙ্গন। এই ছোট্ট নির্জন জায়গায় আমরা দুজন মুখোমুখি। নির্জনতা তাড়াতে নীরবতা ভাঙলাম আমিই প্রথম। উত্তরে বহ্নি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘চেঞ্জ হয়েছে মানে কি রে’? চেঞ্জ হয়েছে মানে তুই অনেক সুন্দর হয়েছিস। বহ্নি চোখ বড় একটু টেনে টেনে ওর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, তুই কিন্তু একটুও বদলাস নি। সেই আগের মতোই তোর তাকানোর ভঙ্গি। তুই কি জানিস, তোর ওই চোখের তীর ছুঁড়ে কতো মেয়েকে তুই খুন করতিস। হেসে বললাম, তা ঠিক জানি না, তবে একজনকে যে অনেক চেষ্টা করেও কখনও বোঝাতে পারি নি যে আমি তোমার খুনি। তা বলতে পারব। ‘ও-মা কে সে?’ বহ্নি কৌতুহলি চোখে চাইল। যদি বলি, তার নাম ‘বহ্নি’। আমি নির্দ্বিধায় বললাম। বহ্নি কৌতূহলী চোখে চাইল। বহ্নি হঠাৎ নিভে গিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে চোখ নামিয়ে নিল নিচের দিকে। আবারও নির্জনতা হানা দিল। এবং যথারীতি আমিই নীরবতা ভাঙলাম, বহ্নি শোন, আমাদের তো একটাই জীবন, তাই না? কী লাভ বল এই জীবনটাকে অবহেলা করে। এই যে আমাদের বয়সটাকে ফেলে রাখছি, এভাবে ফেলে রাখলে একদিন তাতে জং ধরবে, ক্ষয়ে যাবে, ধূসর হবে। আমি ডাকলাম, বহ্নি? ‘উ’- বহ্নির মৃদু উত্তর। আমার দিকে তাকা তো। ও একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল। এই চল না, চল না আমরা দুজনে মিলে দুজনার মনের তুলি দিয়ে আমাদের আকাশে রঙধনু আঁকি। ধূসরতা সরিয়ে আমাদের জীবনটাকে রঙিন করে তুলি। কথাগুলো বলতে বলতে আমরা দুজনে অনেক ঘন হয়ে এলাম। ধীরে ধীরে আমার আঁজলায় ভরে উঠল বহ্নির মুখ। আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ তখন সমুদ্র ছুঁয়েছে। তারপর কেউ জানল না এই ছোট্ট তিন দেয়ালের নির্জন বারান্দায় দুজোড়া ঠোঁট ছুঁয়ে দিল পরস্পরকে। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু শিহরণ আকাশ-পাতাল। যেন শীত ভোরে পুকুর জলে স্নানের প্রস্তুতি।
বহ্নির দুহাতের সজোর-ধাক্কায় আমাদের মাঝখানে তখন হাত দুই ব্যবধান। বহ্নির কন্ট্রাক নাম্বার নেব বলে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়েছি তখনই, ঠিক তখনই বিশ্রী শব্দে বেজে উঠল ফোনটা। এই অসহ্যকর শব্দ থেকে বাঁচতে কাট বাটনে চাপ দিলাম। আশ্চর্য, টিউন অফ হলো না। আবারও চাপলাম। এবারও অফ হলো না। বিরক্তির চূড়ান্তে পৌঁছে গেলাম এবার। তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ দিতেই ঘুমটা ভেঙে গেল।
স্বপ্নের ঘোরটা যখন কাটল, দেখলাম পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়া নীরেন্দ্রনাথ চক্রবতীর ‘কবিতা কী ও কেন’ বইটি শক্ত করে ধরে আছি। বালিশের পাশে মোবাইল ফোনটা তখনও বেজেই চলেছে।

রুহান রাতুল
ইচ্ছে পূরণ বা ভাঙনের গল্প

শূন্য
আমাদের কারো কারো কিছু বিদ্রোহ থাকে; শীতল।

দুই
জামালউদ্দিন মিয়ার চিন্তা করা উচিৎ। এই উচিৎ বা অনুচিৎ যখন ফজলুর চা-দোকানের বিশেষ আলোচ্য; তখন রাজন চিন্তিত হয়, রমিজ ফাটার পরাজয়ে তারও সক্রিয়তা সে মনে করে; আর এতে তার লজ্জাই লাগে, কেননা জামাল উদ্দিন মিয়ার কর্মকাণ্ডে আশপাশের কানাকানি সেও শুনতে পায়। অর্থাৎ, রমিজ ফাটার কুকীর্তিগুলো ঢাকা পড়তে শুর” করে। তখন কেবল তার সুনামটুকু মুখে মুখে ফেরে; ফলে কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয়, আবার আইসো জামাল মিয়া, দিমু ভোট, আগাগোড়াই দিমু!

এক
লোকটি ঘুমুচ্ছিল; স্পন্দনহীন তন্দ্রা, গায়ে একটা জীর্ণ চাঁদর লম্বালম্বি। ভিতরের পাখিটা কোথায় যে উড়ে উড়ে চলে গেছে গন্তব্যহীন… বাহারউদ্দিনের উঠোনজুড়ে তখন লোকের সমাগম কারো কারো অশ্র”হীন আফসোসও শোনা যায় ‘ব্যাটার কপাল খারাপ, পোলাপাইনরে দেইখা যাতি পারল না’।
উঠোনের দক্ষিণের আমগাছটির সাথে দুটো গর” বাঁধা; বাড়ির ঘটে যাওয়া ঘটনা গর”গুলোর প্রতি সকলকে অমনোযোগী করে। তীব্র রোদে সকাল পুড়ে পুড়ে তখন দুপুর। দুটো গর” নিথর দাঁড়িয়ে থাকে ভাবনাহীন।

এতো যে শব্দ হচ্ছিল তবু আশপাশে বিরাজ করছিল নীরবতা। একসময় নীরবতা ভাঙে। জামালউদ্দিন মিয়ার গাড়ির হর্ন বাজলে সবার নিরাশ মনে এক ধরনের আশা জাগে; কেননা রমিজ ফাটাকে তারাই বিদায় করে জামাল মিয়াকে চেয়ারম্যান বানিয়েছে। সবাই ভাবছি লোকটির এবার বুঝি কিছু একটা হয়। নিশ্চিন্তে বুঝি সেও তার ঠিকানায় পৌঁছতে পারে এমত প্রত্যাশায় কারো কারো কথা মুখেই থেকে যায়; অতঃপর গাড়ির দরোজা খুলে দিলে ব্যাটা কি আফজাল বা ইটালি গ্লেস দেয়। অর্থাৎ, চেয়ারম্যান জামালমিয়া তখন মন্থরগামী।
শায়িত লোকটাকে যখন চেয়ারম্যান দেখে, তখন তার মুখে লোকজন বিলাপ শোনে ‘আহারে বেচারা!’ রসুলপুর থেকে দিন মজুরি করতে এসে…
এরকম দীর্ঘশ্বাস খুব ছড়িয়ে যায়, আশপাশের লোকজনকেও বেদনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করে। আবার একটু ভীড় হয়; তখন বাহারউদ্দিনের বড় ছেলে কাগজ-কলম চেয়ারম্যানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ‘গ্রামের সবার স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে, এখন আপনারটা হলেই হয়।’
চেয়ারম্যান খাতাটা হাতে নেয় এ পর্যন্তই, স্বাক্ষর আর করে না। বরং সে তখন গাড়িমুখী। অথচ এই যে লোকটি ঘুমিয়ে আছে তাকে নিয়ে আমাদের উচ্চারণ আর কতদূর নিয়ে যাবে? তার ঠিকানা পর্যন্ত কী? এসব অবশ্য দূরের কথা; তখন কেবলই হতাশা। কেননা চেয়ারম্যান সাহায্য করলে সবই সম্ভব ছিল; কিন্তু চেয়ারম্যান তা করে না। বরং চেয়ারম্যানের লোক বাহারকে ডেকে নিয়ে অদ্ভুত প্রস্তাব দেয়; বলে, চেয়ারম্যানের গাড়ির তেল খরচটা দিতে হবে, ভাড়াটে গাড়ি, নইলে…
তখন বাহারউদ্দিন কী আর করে! সে কতটা হতবাক বা নির”পায় বোঝা যায় না; সে চেয়ারম্যানের কাছে যায়। চেয়ারম্যান তখন নীরব…আকাশমুখি।
আমগাছটির সাথে বাঁধা গর”দুটো তখনও নীরব দাঁড়িয়ে। তাদের চোখেও জলের রেখা।

পঞ্চাশ
গ্রামের ছাদেক মোল্লা ২১ কবুল শেষ করে আবার পশ্চিম পাড়ায় ঘোরাঘুরি শুর” করেছে। শোনা যায় মহিতের বোন পাখিকে নাকি বশ করেই ফেলেছে। এসব কানাকানি প্রবল হলে মহিত বিচলিত হয়; সে বউ-বোনকে নিয়ে পার্বত্য এলাকায় চলে যাবার মনস্থির করে। এবং যেহেতু পার্বত্য এলাকা মহিতের অভ্যস্ত এলাকা, তাই তার সিদ্ধান্ত সফল হয়।
তখন সাদেক মোল্লা আর কী করেন। জামালউদ্দিন চেয়ারম্যানের তল্পিবাহক হিসেবে এরপর তাকে নিয়মিত দেখা যায়।

নিরানব্বই
একদিন চেয়ারম্যানের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়।
জনাব,
আজবপুর ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানিত সদস্যবৃন্দকে জানানো যাচ্ছে যে, আগামী বুধবার সকাল এগারোটায় দুর্যোগ বিষয়ে আলোচনা ও মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে।
স্থান: শহীদ স্মরণ উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রাপক         আহবায়ক
রাজন আহমেদ ॥ ওয়ার্ড নং ৯, আজবপুর ইউপি         জামালউদ্দিন মিয়া
[বি. দ্র. দুপুরে খাবার ব্যবস্থা আছে।]

দেখা গেল পরদিন একে একে সবাই এসেছে; কিন্তু যার আসার সেই চেয়ারম্যানের কোন খোঁজখবর নেই। ফলে ফুসফাস হচ্ছিল, কেননা গতকাল নাকি চেয়ারম্যান বলেছেন, সময়মত না এলে হবে না, এবং তিনি রীতিমত বাণীও ছেড়েছেন, যে জাতি সময় সম্পর্কে সচেতন না সে জাতি মনেপ্রাণে বড় হতে পারে না। তখন চেয়ারম্যান হাতে তালি পেয়েছিলেন। অথচ এগারটা ছাড়িয়ে ১ টা বাজলেও চেয়ারম্যান কোথায় ব্যস্ত কে জানে!

একশ
ভাবনার যোগফল যখন মাথার মধ্যে এলোমেলো তখন রাজন চেয়ারম্যানকে উপস্থিত দেখে। চেয়ারম্যানের এই উপস্থিতি তাকে কতটা স্বস্তি এনে দেয় বোঝা যায় না। অন্যদের মধ্যে অবশ্য একটা উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। চেয়ারম্যানও তার বক্তৃতায় মধু ঢালে অসহায় গরীব মানুষদের জন্যেই আমার সারাজীবনের পরিশ্রম, আমার স্বপ্ন…চেয়ারম্যানের কথাগুলো কেবলই লম্বা হতে থাকে, মাঝে মধ্যে হাততালি হয়; রাজন নীরব, তখন তার শোনার পালা। শুধু সে কানদুটো খাড়া করে রাখে।
[দ্র. দুপুরের খাবার আর হয় না।]

পুনশ্চ
বছরের বন্যা খুব প্রলয়ঙ্করী হলে সরকারি সাহায্য খুব আসে। চেয়ারম্যানের আনন্দজনিত উত্তেজনা রাজন দূর থেকেও অনুভব করে। এমন কি ফজলুর চায়ের দোকানেও সাহায্য নিয়ে কথা ওঠে। রাজনের ভিতরে বিক্ষিপ্ত হয় জামালউদ্দিন মিয়ার একটা গাড়ির স্বপ্ন বুঝি এবার পূর্ণ হয়।

ফারুক ইমন
চিৎকার

ডাহুক পাখি জীবনে কখনো দিনমান ডাকে। ডেকে ডেকে গলা দিয়ে রক্ত ঝরায়, সেই রক্তে ডাহুক পাখির সাদা ডিমে লাল আল্পনা আঁকলে একটি পাখির আগমন ঘটে বাঁশঝাড়ে-বনে। মতিহারের বৃক্ষ তলে শুয়ে, মিহি ঘাসের ছোঁয়া গালে ছুঁইয়ে আমি ভেবেছিলাম মানুষের জীবনে কি আসে অমন সময়! আমি তো পাখি নই! আমার মানুষের জীবন, এমন ধারার জীবনে শনি, রবি, সোম আমিও চিৎকার করলাম। মতিহারের আমপাতা, চেরী ফুলেরা, জোহার সমাধি ঘিরে থাকা লতা-গুল্মেরা সেই চিৎকারে সাড়া দিয়েছিল, গগণ কাঁপিয়ে সমর্থন জানিয়েছিল গগণশিরিষ, জার”ল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার সারি। তুমি লাল পেড়ে শাড়ি পরে মতিহারে হাটবে! কোন বন্দুক নয়, কোন খাকি পোষাক নয়, কোন নীল গাড়ী নয়, কোন দলের ক্যাডার, কোন মাস্তান, কেউ তোমাকে বাঁধা দেওয়ার থাকবে না। তুমি গুনগুনিয়ে গাইবে, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো, এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো।’ এমন একটি উপত্যকার জন্ম দিতে আমরা চিৎকার করি।
আমাদের চেতনায় ছিল ৭১-এ ঘরে না ফেরা তর”ণের জ্বলজ্বলে দৃষ্টি, লক্ষ তর”ণের হাসি মুখে মৃত্যুকে বরণ করার ইতিহাস। বন্দি শিবিরকে দুর্গম দূর্গ মনে করে বোনের দিন-মাসের হিসাব, মায়ের দম বন্ধ করা ছেলে হারানো কষ্ট, বাবার ঘুমহীন প্রতিক্ষা একটি নতুন দেশের জন্য।
সন্তানের রক্তে ভিজে এ মাটি আজও জবজব করে, আজও বন্দুকের নোংরা শব্দে পাখির ডাক চাপা পড়ে, রোজ ডাহুক পাখির মত কিছু মানুষ চিৎকার করে চলে। একটি উপত্যকার জন্য, যেখানে তুমি সগর্বে মাথা উঁচু করে পড়বে : ‘বল বীর বল উন্নত মম শীর।’
কোন নিষেধ, কোন সান্ধ্য আইন, কোন রক্তচোখ, কোন মৌলবাদের রাহু, কোন প্রভু দাসের সম্পর্ক কেউ! কোন পরোয়া থাকবে না তোমার।
মাকে ভালোবেসে যাঁরা রক্ত ঢাললো, পলাশের চেতনায় যাঁদের সিনা টানটান, পদ্মা যমুনার জলে আজো যারা অশ্বের ডাক শোনে। তাদের রক্তের ওপর কোন অন্যায় নীতি টিকবে না। ঐ সব কালো নিষিদ্ধতা, বন্দুক, নজরদারি ঠেকাতে পারবে না অন্যায়। এমন ধারার মানুষেরা ডাহুক পাখির মত চিৎকার করবেই, গলায় রক্ত এলেও চিৎকার থামবে না, শ্লোগান চলবেই মুক্ত একটি উপত্যকার জন্য।

রফিক সানি
বাউণ্ডুলে কবি শান্তনু র”দ্র’র প্রথম লেখা

সবে চাকরিতে যোগ দিয়েছি। নতুন চাকরি। কতো দিন যে বাড়িতে যেতে পারি না। মাকে দেখতে পাই না। বাড়িতে একটা ছোট্ট ভাই আছেদিলীপ, তার কপালে চুমু দিতে পারি না। তনুশা নামের একটা বোন আছে তাকে নামতা শেখাতে পারি না। ঐকিক নিয়মের অংক করিয়ে দিতে হবে সেই কবে থেকে বলছে। কী করবো ছুটি যে পাই না। চাকরিতে যোগ দিয়েই তো আর ছুটি নেওয়া যায় না। একদিন অবশ্য গিয়েছিলাম ছুটি নিতে সেদিন বাড়ির জন্য মনটা খুব ব্যাকুল ছিলো মায়ের জন্য, দিলীপ-তনুশার জন্য। আমার সামনেইছুটি চাওয়ার অপরাধে একজনকে বের করে দেওয়া হলো চাকরি বাতিল করে। অল্পের জন্যে রক্ষা পেলাম। আর কোনো দিন ছুটির কথা ভাবি নি। অনেক হাবুডুবুর পর এ চাকরিটা পাওয়া। আমার জন্যে না হোক বাড়ির জন্যে তো কিছু করতে পারছি। বাবা গতো হয়েছেন অনেক আগে। এখন মা, দিলীপ-তনুশার শেষ ভরসা আমি। তাই শত ব্যাকুলতা বুকে চাপিয়ে কাজ করেছি। ছুটি নেই নি। এই যে বাড়িতে যাচ্ছিবস সেদিন সদয় হয়ে নিজেই ছুটি দিলেন। বারো দিনের ছুটি। কিন্তু এমন সময় ছুটিটা পেলাম যখন আমার বাড়িতে যাওয়ার আর কোনো দরকার নেই। চাকরিরও আমার দরকার নেই। দিলীপের নামে যে ডি.পি.এস. ছিলো সেখানে টাকা দিতে হবে না, তনুশার গাইড-বই আর কিনতে হবে নাও আর স্কুলে যাবে না, যেতে পারবে না। আর মায়ের জন্যে কোনো দিনই আর কিছু লাগবে না। তার শেষকৃত্যের জন্যেও কোনো টাকা লাগবে না। তার সৎকার করেছে তারা। চিতায় তাকে নিতে হয় নি। আমাদের বাড়িটাই চিতা হয়েছে। সে চিতায় মায়ের কোলে দিলীপও ছিলো। ভাইটি আমার মায়ের সাথেই স্বর্গে চলে গেছে। তনুশা পাশের ঘরে পড়ছিলো। এবার সে ক্লাস ফাইভে। নতুন বই দিয়েছে স্কুল থেকে। সেও হয়তো জ্বলতো সেদিন। কিন্তু তারা দয়া করে তাকে ঘরের বাইরে এনেছিলো। আগুনে পোড়া থেকে তার চামড়া-মাংস-হাড়কে রক্ষা করেছে। আগুন থেকে বাঁচিয়েছে বটে কিন্তু হৃদয়ে আগুন ঢেলে দিয়ে গেছে। সে আগুন জ্বলবে আজীবন। দহনে দহনে শেষ হবে কিন্তু ভস্ম হবে না কখনও। তাকে এ দহন থেকে মুক্তি দিতে পারবে না কেউ, না সমাজসেবীদের কোনো সান্ত্বনা, না মন্ত্রীদের মুখের বিচারের প্রতিশ্র”তি। তাকে মুক্তি দিতে পারবেনা আমার জমানো টাকা, আমার চাকরি। আমার এ চাকরি আর দরকার নেই। এখন আমার ছুটি শুধু বারো দিনের নয় ছুটি বারোমাস। এখন বাউণ্ডুলে হয়ে ঘুরবো পথে পথে। প্রতিশোধস্পৃহায় সন্ত্রাসী হবো না। সন্ন্যাসী হবো, হবো কবি¬
ধুলো জমে মলিন হয়েছে রাস্তার পাশের গাছগুলো
এখানে একটু বৃষ্টি দরকার
এখানে শ্রাবন্তী লেক, বসার নির্ধারিত স্থান পরিত্যক্ত
এখানে একটু পবিত্র বৃষ্টি দরকার
বৃষ্টি দিয়ে শুদ্ধ করা দরকার হাই-ওয়েটি
যেখানে টায়ার আর নরমাংসের গন্ধ ভাসে।
সমুদ্র-শোষিত পবিত্রপানির এক পশলা বৃষ্টি এখানে অতিপ্রয়োজন।

হঠাৎ বৃষ্টি এসে থেমে গেলে আর ফিরে পাওয়া হবে না
দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাই চোখ নিবদ্ধ রেখে
সে আসলে বলবো তোমার ছাঁটদিয়ে ভিজিয়ে
দাও সাদা দেয়ালের ওই কালো দাগটি;
মুছে ফেলো কালিমা। দোহাই তোমার
বয়ে নিয়ে যাও এই ড্রেনে পড়ে থাকা মাথার খুলিটি,
ভেসে থাকা মাথার মগজ, রক্তের লাল।
এখানে এক পশলা বৃষ্টির অতিপ্রয়োজন।

এখানে একটু পবিত্র বৃষ্টি দরকার
এখানে কুকুরের বীজে মানুষের উৎপাদন হয়
এপাড়ার টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি দরকার
এখানে পতিতারা নির্ঘুম রাত কাটায় সেবকের আশায়
পালকেরা রাজপথে, ভাষণে মঞ্চে,
ধ্বংসে মত্ত সাজানো ভুবন
এ আলয় ধুয়ে দিতে হবে
ধুয়ে দিতে হবে এ নগর।

এখানে একটু বৃষ্টি দরকার, পবিত্র বৃষ্টি।

রিংকু রাহী
সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছি

গোগ্রাসে গিলেছে তোকে
এ শহর জানে
প্রিয়তম আমার কতো প্রিয়
যদিও
নদীও
শুকিয়ে কাঠ
তথাপি তোর চৌকাঠ লোনায় ভারাক্রান্ত
আমি খানিকটা মুগ্ধ তোর অভিমানে
আর বাকিটুকু স্নাত

অথৈ, বিনা কারণে

যোগাযোগ নেই
অথৈ
শুধু রাস্তা কমানোর দায়ে হেঁটে চলেছি
ক্রমান্বয়ে
হৃদ মাঝারে পুরে নিয়েছি
ধোয়া-ধূলো-বার”দ
এমন বূহ্যের সেনানী আমি
শুধু র”হু র”হু বলে কাঁদি
যোগাযোগ নেই
অথৈ
শুধু কমিয়ে ফেলার জ্বালা
শুধু আগুন ছোঁয়ার ঝাল।

হিশাম ম. নাজের-এর কবিতা
১.    গর্ভের মার্কেটে ঈশ্বর বীর্যের বিনিময়ে
জীবনের জন্ম দেয়।
আমি দিন শেষে দীনহীন বাতাসে রাতের আঁধারে
গর্ভ খুঁজি
এক ঝলক ইশ্বরের আশায়।
ইশ্বর মেলে না,
মেলে খালি ভ্র”ণ ও জারজের ইশ্বরপনা
আর বিকে যাওয়া পণ্যের পসরা।
আয়নায় দাঁড়িয়ে তাই আনমনে করে যাই
আয়নার বন্দনা।
স্বপ্নগর্ভে হারাই
শহরমেলার আলোতে দাঁড়িয়ে আঁধারের আদিতে হারাই
আস্ত আস্তে হারাই সেখানে যেখানে ইশ্বরহীনতার বোধটাই
সর্বসত্য. . .

২.    প্রচণ্ড শব্দে শব্দগুলো বাক্যে গেঁথে বসে,
আর খাতার মৃতরঙে ফুটিয়ে তোলে সাদাকালোতে মোড়ানো রঙিন অর্থ
জেগে উঠে পুরো একটি জগৎ ক্ষুদ্র সে অক্ষর বৃক্ষরাজী থেকে,
একখানা মাত্র নিখোঁজ প্রশ্নের সন্ধান দিতেজ্জ
‘শেঁকড়ের শেষ কোথায়?
শেষের শেঁকড় কি থেমে যায়
স্রেফ উত্তরের উপহারে?’
প্রতিটা শব্দ প্রশ্নের হাহাকারে এসে পরিণত হয় অন্ধ পরণতিতে
তাই প্রতিধ্বণির তাণ্ডবতলে উত্তর মেলে না কখনও
কারণ উত্তর বিশ্বচিত্রকার অদৃশ্য বিধাতার মতনই অদ্ভুত
সকল শব্দের জেগে না ওঠার মধ্যেই নৈঃশব্দাবৃত

শশি আলিওশা
প্রোফাইল পিকচার

তুমি খালি ছবি তুলতে চাও
আর আমি বলিতুলুম না, ডর লাগে!
তুমি খিলখিল করে হাসো
আর আমার গায়ে ঢলে পড়ো
যেমনটা একটা ফুলের পাপড়ি আরেকটা ফুলের উপর!
তোমার হাসি থামে না তো থামে না…
যেন বনকচুর পাতে জল টলছে!
নাকি আমি টলছি!
তুমি জিজ্ঞেস করকেন ডর লাগে?
একটা প্রোফাইল পিকচার দিতে কি হয়?

আমি মাথা নিচু করে ঘাস ছিঁড়ি
তারপর কচুরি ভর্তি পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলি
নীল কাঁটাতারে বন্দি হবার ডর
লাইক আকাক্সক্ষার ভয়
একটা পাঁচটা ত্রিশটা একশোটা…

আমি তোমার মুখের দিকে তাকাই
তারপর তোমার হাতের দিকে
তুমি মোবাইলে কি যেন করছো
তোমার নিমগ্নতা দেখে আমি ভাবি
মোবাইলের ভেতর যেন এক আরব্য রজনীর শহর!
হঠাৎ তুমি আমার দিকে না তাকিয়ে বল
জানো, আমার ছবিতে একশো চল্লিশটা লাইক পড়েছে!

আমি শুনি, হাসি তারপর ভেজা ঘাসে পড়ি শুয়ে
একবার শরতের সাদা মেঘে দৃষ্টি ঘষে
তোমার দিকে তাকাই
তোমার চুলের প্রান্তদেশে হাত বোলাই
বলিতাই?

যারিফ মুহিব অয়ন
বাজার

দম বন্ধ হয়ে আসে,
কিছুটা পরিষ্কার বাতাস দরকার
তোমরা সব অসুস্থ হয়ে গেছ
আমি এই অসুখের নাম দিলাম, বাজার
বাজার ভাইরাস, বাজার ব্যাক্টেরিয়া, বাজার ছত্রাক
তোমরা ভাবছো তোমরা আরো সুন্দর হয়ে উঠছো
আমিও তাই অবাক হই
তোমরা দিনে দিনে ফর্সা হয়ে যাচ্ছ
আর আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে
রোদের বাড়তি তাপ, কালো ধোয়া কার্বন, লাইনের লালচে আয়রন জল
আমাকে কালো করে দিচ্ছে
কাপড়ের ভারে আলনা, ড্রয়ার, আলমারিগুলো পুরোনো হয়ে যাচ্ছে
তোমাদের বাজার হচ্ছে না, তোমরা বাজার হয়ে যাচ্ছ?
আর এই বাজারে আসতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন মেক-আপ বক্স
তোমরা সান প্রোটেকশন, রোদচশমা, রঙিন ছাতার তলে ব্যাঙের পেটের মত ফ্যাঁকাসে হয়ে পড়ছো
টানটান চাদরের নরম বিছানা গরম করে কোঁচকানোর আগে
বেসিনের সামনে আয়নায় প্রতিচ্ছবিকে তাড়িয়ে দিচ্ছ পানির ঝাঁটে ঝাপসা করে
ঢাউস বিলবোর্ড, ফ্ল্যাট পর্দার বিজ্ঞাপন, কাঁচি সুতো আর মেশিনের নিচে
কাপড়ের আস্তরণে সাজাচ্ছ নতুন নতুন রূপে
তোমাদের আত্মাটাও কি এভাবেই বদলে যায়?
পুরোনো প্রেমগুলো কি এভাবেই নতুন কিছু দিয়ে বদলে দাও?
জীবন ভাবনা দম বন্ধ করে দেয়
সাদাকালো চোখ জোড়াকে ভাপে ঝাপসা করে দেয়
আমাকে যখন বাজারে যেতে হয় বাধ্য হতে হয়
আমি তোমাদের ভীড়ে তোমাদেরই হারিয়ে ফেলি
সব গুলিয়ে দিয়ে হাতড়াতে যাই
ধাক্কা খাই, দুঃখিত হয়ে ক্ষমা চাইতে ফিরে তাকাই
বলতে গিয়ে থমকে যাই
ঠিক তোমাদের মতোই, সবি আছে, তবু কি যেন নেই
অল্প কিছু একটা নেই,
সেই অল্প অনুপস্থিতির বিধায় তাকে আমরা পুতুল বলে ডাকি
এখন মনে পড়ে বাজার রোগের ফলে কি হয়
বাজার হলে অসুখ শেষে তোমরাও পুতুল বনে যাও
আর আমি বনে যাই পাগল।

অতন্দ্র অনিঃশেষ
বিজ্ঞপ্তি

এখানে সোনালি বিকেল বিক্রি হয়
খুব নগ্ন দামে আখড়া বসে পতিতাদের
অর্থহীন মানুষের বুকের আঘাতে
যে রক্তের পাত
এখানে পান করা হয় শরবতের ন্যায়।

বর্তমানকে ভবিষ্যতের গলায় ফাঁসি দেওয়া হয়
নারীদের দেহে দেহে পোস্টার লাগানো হয়
পুুর”ষের শিশ্নত্বকে চুমু আঁকে পতœীরা।

এখানে কাঁচাফলের বোটা ছিড়ে
লাল করা হয়
এখানে ভাসতে থাকে উদাত্ত দেহের কঠোর জ্বালা
বইতে থাকে ¯্রােতের মত…

মাসিকের রক্ত দিয়ে গোসল করা হয়
এখানে সারাবছরই বসন্ত থাকে
এখানে মাঝি ছাড়া নৌকা চলে
শতাব্দীর আয়ু শেষ
এখানে শুধু দখিনা বাতাস ছাড়া সবই মেলে।

রাসেল রহমান
দেনাপাওনা

তুমি যা বুঝো
প্রভু তা বুঝে,
তুমি যা বুঝো না
সে তাও বুঝে।
আবার,
তুমি যা বুঝো না
প্রভু তা শুনে না,
চাওয়া বুঝো না
তোমায় তা দেয় না।
তাই,
তুমি যা বুঝে চাও
স্রষ্টা তা বুঝে যায়,
তুমি যা পেতে চাও
সে তা দিতে চায়
তুমি যখন পাও
সে তখনই দেয়।

বাসুদেব পাল
ভাবতেই যেন ফাগুন এসে যায়

ফিরে এসো মানুষেরা
ফাগুন কুড়িয়ে জন্ম আমার।
তাই ফিরতে হয়েছে…
তোমরাও ফিরেছো জানি!
ভরাপূর্ণিমাকাল
শিবচতুর্দশী রাতে-
যেদিন কুমারী মেয়েরা ভালো বর পাবে বলে ব্রত রাখে
অথবা দিদি, জেঠীমা, কাকীমারা সিঁথিতে সিঁদুর উঠিয়ে
দীর্ঘ আয়ু কামনা করে তার পতি দেবতার,
সে রাত আসবে জানি এ শুভ্র ফাগুনে।
তার আগে ফিরে এসো মানুষেরা।
ফিরেছি আমিও
এ ফাগুন কুড়িয়ে জন্ম আমার।

এ ফাগুন জড়ায়ে রাখে ঋতুরাজ বসন্ত আমার।
যে নব-দম্পতি বুঝিয়া থাকে তারাও জড়ায়ে রাখে
কতো কথা কয়; ফাগুন বুঝি এই চলে যায়।
প্রেমিক-প্রেমিকা হতে বড় সাধ হয়।
ফিরে এসো মানুষেরা।
এ ফাগুন সব ফিরিয়ে দ্যায়।

শান্ত নদীর পাড় ঘেঁষে মাঝরাতে যে জেলে নৌকা নিয়ে যায়
সেও জানে এ ফাগুন তাকে কতোটা ওজনের বোয়াল তুলে দিবে হাতে!
তখন সেও হয়ে উঠবে তার রাজ্যের রাজা।
কে বলেছে তবে?
গাছেরা থাকবে বসে!
পাখিরা গাবে না গান!
ভ্রষ্ট পথিক পাবে না পথ!
এ ফাগুনে সব পাওয়া যায়।
তবে তার আগে ফিরে এসো মানুষেরা।
আমিও ফিরেছি জেনো
সবাইকে ফিরতে হয়।

এ ফাগুন নতুনের আশা দ্যায়।

মারুফ কারখী
১৭.০৩.২০১৪

কাগজ কালির পরিণয়
অতঃপর
সংঙ্গম
পরিণাম
কাগজের গর্ভধারণ
খানিকবাদে জন্ম
জন্মের নাম কবিতা।

নুসরাত নুসিন
জলপাই সুখ  

গাঢ় লিপিস্টিকের ছোঁয়ায় অবনত মায়া ঝুলে আছে।
সন্ধ্যা ছাড়িয়ে যায় গভীর আঁধার। তখনো
হাতের মাঝে বৃত্ত আদর, আদরের ভাঁজে ভাঁজে
নীরব নিথর থাকে জলপাই সুখ।
চোখের পাতায় আঁকা আগামীর এক্সরে, মাঝে মাঝে
বিনয়ী হয় ক্ষণকাল। তবুও আমাদের
রাজপথ রাত নিয়েই ছুটে চলে।
রাজপথ হাত তোলে। স্লোগানে স্লোগানে
আসে নতুন দুপুর।
মুড়িভাজা ভোর থেকে খই ভাজা গোধূলী
প্রতিটি পর্ব থাকে চঞ্চল মায়ায়, তখনো
শিশির থাকে, তখনো শিশির আঁকে, নিমগ্ন
আনাড়ি আনকোরা ছোঁয়ায়…

সুমন প্র”স্তর প্রবচনগুচ্ছ
১.     বর্তমানে নষ্ট পুর”ষ ধর্ষক এবং নষ্ট নারী আকর্ষক
২.     সফল ব্যক্তিগণ জীবনে এতটাই আশাবাদী থাকে যে হঠাৎ সামান্য ব্যর্থতায়, ব্যর্থতার উপন্যাস লিখতে বসেন।
৩.     সুন্দরীদের মাঝে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে পাখনা মেলে থাকে, তারা ভাবে তাদের সুন্দর চেহারার আকর্ষণে যে কোন সময় আকাশে উড়ন্ত বিমান তাদের বেডর”মে চলে আসতে পারে।
৪.     পুর”ষরা নারীদের কাছে একতরফা স্বার্থ, নারীরা পুর”ষদের কাছে দুতরফা বলী।
৫.     ভালোবাসা হলো শ্বাস প্রশ্বাসের মতো আপনি না চাইলেও আপনাকে নিতে হবে অথবা উগরে দিতে হবে।
৬.     প্রিয়জনকে ভালোবাসার উৎপত্তি তিনটি জিনিস থেকে ঘটতে পারে, ঘৃণা, সৌন্দর্য ও অসুখ।
৭.     কিছু কিছু মহামানব আছে যারা নিজ স্ত্রীর নিটোল কোমরে লালনের ছবি দেখে ও পরস্ত্রীর কোমল বুকে মার্ক্সবাদের চুমো দেয়।
৮.     আমি ক্ষমা পছন্দ করি যদি ঐ ক্ষমার কোন অর্থ থাকে।
৯.     অস্তিত্ব সংকটে পড়লে শ্রেষ্ঠ প্রেমকেও মৃত্যুর পরওয়ানা মনে হয়।
১০.    বাঙালি কারও মুখে অশ্লীল শব্দ শুনলে অস্বস্তি বোধ করে কিন্তু নিজে বলার বেলায় একদম ষোল আনা তারপর বত্রিশ অতঃপর চৌষট্টি কলা।

মোল্লা মামন
ছোটকাগজ : লোকে যারে বড় বলে…

বর্তমানের বিবর্তন আর আগামীর সম্ভাবনাকে ধারণ করে, যাবতীয় প্রচল-প্রতিষ্ঠিত সংস্কার-রীতি ও সংকীর্ণতার সীমানা মাড়িয়ে একান্তআত্মচেতনাকাঠামোর সাথে একাত্ম, আস্থাশীল হয়ে সেই চেতনা-চিন্তনের নিরঙ্কুশ ও নিঃসঙ্কোচ প্রকাশের মাধ্যমই হলো ‘লিটলম্যাগ’। ‘প্রথাবিরোধিতা’, ‘প্রতিষ্ঠানবিমুখতা’, ‘প্রতিবাদমুখরতা’, ‘বির”দ্ধবাদিতা’, ‘পণ্যসাহিত্য বিরোধিতা’, ‘আপোসহীনতা’, ‘প্রমুক্তিচেতনা’ প্রভৃতি বোধ ও বিষয়গুলো লিটলম্যাগচর্চার সঙ্গে সমার্থক। এতদ্বিষয়ক, ‘দেশ’ পত্রিকার মে, ১৯৫৩ সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)তাঁর ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে ‘লিটলম্যাগ’ শব্দটির প্রথম প্রয়োগের মাধ্যমে যে পরিচিতিমূলক বর্ণনা দেন কার্যত তা-ইলিটলম্যাগের মেনিফেস্টো হিসেবে বিবেচ্য।
‘…কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটি নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে: চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটলম্যাগাজিন। লিটল কেন? আকারে ছোট বলে?নাকি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সবই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ঐ ‘ছোট’ বিশেষণটায় আরো অনেকখানি অর্থ পোরা আছে। প্রথম কথাটা একটা প্রতিবাদ: এক জোড়া মলাটের মধ্যে সবকিছুর আমদানির বির”দ্ধে প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বির”দ্ধেপ্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না। সেটা সম্ভব হবে এই জন্যই যে, এটি কখনো মন জোগাতে চায় নি, মন জাগাতে চেয়েছিল। …সময়ের সেবা না করেই সময়কে সৃষ্টি করবার চেষ্টা এইটেই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম।’
হয়ও তাই! জীবন যাঁদের কাছে ‘যাপন’ কিংবা ‘ধারণ’ করার বিষয় নয় শুধু, বরং জীবনকে যাঁরা ‘শিল্পের কাঁচামাল’ বিবেচনা করতে জানেন কেবল তাঁরাই পারেন লিটলম্যাগচর্চা করতে। একই চেতনা ও জীবনবোধের উন্মাদনায় একাত্ম হয়ে তার”ণ্যের অপার-অতল-উত্তাল-অগ্নিঝরা দুঃসাহসিকতার মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় লিটলম্যাগচর্চার সক্ষমতা। তাই এক হিসেবে লিটলম্যাগ হলো ‘তর”ণ বহ্নুৎসবের উত্তপ্ত উদ্গীরণ’ বৈ আরকিছু নয়। তাইতো লিটলম্যাগের সূর্যফসল আবদুল মান্নান সৈয়দ লিটলম্যাগ মানেই বুঝেছেন-‘তার”ণ্যের বিস্ফোরণ, অপ্রাতিষ্ঠানিক চিৎকার-নতুন জ্যামিতি ও ইশতেহার’। আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ মনে করেন লিটলম্যাগ অর্থই হলো দুই ‘ন’ এর নেশা যার একটি হচ্ছে ‘নতুনত্বের’ আর অন্যটি হচ্ছে ‘নষ্টের’। একজন লিটলম্যাগকর্মীকে আমুণ্ডুপদনখ হতে হয়, ‘অসহায় অথচ অস্থির’ ‘দুঃখী অথচ দোর্দণ্ড’ ‘হতাশ অথচ হুংকারবাদী’ ‘অনাহূত অথচ অবশ্যম্ভাবী’ ‘অনিয়ন্ত্রিত অথচ অসামান্য’ ‘কাতর অথচ কর্তব্যপরায়ণ’ ‘বেপরোয়া অথচ বিশেষ’ ‘উম্মাদ অথচ উচ্চমার্গীয়’ সর্বোপরি ‘কিছুই না অথচ অনেক কিছু’। আর উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো চরিতার্থ বা সম্পাদনে লিটলম্যাগচর্চা শুধু আর ‘চর্চা’ থাকে না, হয়ে যায় একটি ‘আন্দোলন’। আর এই লিটলম্যাগ আন্দোলন বিষয়টিই বাংলাদেশের সাহিত্যধারায় এনেছে স্বচ্ছন্দগতি ও স্বতন্ত্রশক্তি এবং একটি ভিন্ন দিক বা ধারণা।সুবিমল মিশ্র যথার্থই বলেছেন : ‘রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে লিটলম্যাগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়-ব্যবসায়িক লেখালেখির সমান্তরালে আরও একটি স্রোত, একটি আন্দোলন।’
উল্লেখ্য, বাংলা সাহিত্যের উন্মেষে-প্রকাশে-বিকাশে ও সাহিত্যধারা ধারণে ‘বঙ্গদর্শন’ ‘সবুজপত্র’ ‘কল্লোল’ ‘শিখা’ ‘কবিতা’ কিংবা ‘সমকাল’ প্রভৃতির অবদানÑ অনবদ্যতা ও অবস্থানের স্বীকার-স্বীকৃতি ও উল্লেখ থাকলেও বিভাগোত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের অবদান, অবস্থান ও অনন্যতা অনালোচিত ও অনুল্লেখই থেকে গেছে। এই কারণে অনবদ্য হওয়া সত্ত্বেও লিটলম্যাগের এতোদিনের অনুল্লেখ ও অনালোচনার কারণ অনুসন্ধান এবং সেই সময়কালীন (১৯৪৭-৭১) লিটলম্যাগগুলোর বৈশিষ্ট্যÑকার্যক্রম ও সাহিত্যেপ্রভাব প্রভৃতি বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ জর”রিÑ অন্তত সাহিত্যের ধারাবাহিকতাÑ ঐতিহ্যসন্দিগ্ধতা এবং সাহিত্যের সাথে সমকালীন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক সঙ্গতিচর্চার অপরিহার্যতা থেকে।
চল্লিশের দশকের শেষের দিকে রাজনীতি অনুষঙ্গি ‘ক্রান্তি’ ও ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকা স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত হতো। এরপর পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলনের উন্মাদনা-যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন-সামরিক শাসনজারি নানাবিধ প্রতিকূলতায় লিটল ম্যাগাজিন সেভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এছাড়াও কারণ, দেশবিভাগোত্তর ঢাকায় তখন মাসিক ‘মোহাম্মাদী’, ‘সওগাত’, ‘মাহেনও’ ইত্যাদি পত্রিকার বাজার রমরমা। দেশবিভাগ ও ভাষা আন্দোলনের মতো বড় ধাক্কায় লিটলম্যাগের বিচ্ছিন্ন থাকা ও অপ্রতুলতা স্বাভাবিক। তবুও এই দশকেই ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘কবিকণ্ঠ’ ফজলে লোহানীর ‘অগত্যা’ কায়সুল হকের ‘অধুনা’ প্রভৃতি লিটলম্যাগচর্চার আদি ও অকৃত্রিম নিদর্শন হয়ে আছে। পঞ্চাশের দশকের আরেকটি স্বল্পায়ু লিটলম্যাগের নাম ‘সপ্তক’। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত-সেবাব্রত চৌধুরী-হায়াৎমামুদ- হুমায়ুন চৌধুরীরা ছিলেন ‘সপ্তক’-সংশ্লিষ্ট। চট্টগ্রাম থেকে বের হতো র”হুল আমীন নিজামী সম্পাদিত ‘উদয়ন’(১৯৫১) মফিজ-উল-হক সম্পাদিত‘পরিচিতি’ (১৯৫৭)। বগুড়া হতে মহসীন আলী দেওয়ান সম্পাদিত ‘অতএব’ (১৯৫৮)। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে উন্মোচন ঘটল বিখ্যাত সংগঠক সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল (সেপ্টেম্বর, ১৯৫৭) পত্রিকার। আপাদমস্তক লিটলম্যাগ না হলেও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সমস্ত লেখকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সম্মিলন ঘটানোর জন্য এবং উচ্চমার্গীয় সাহিত্যর”চির জন্য পরবর্তীতে ‘সমকাল’সর্বজনস্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যকাগজের মর্যাদা পায়। এই সময়কালেই ওপার বাংলায় সুনীলরা ‘কৃত্তিবাসে’র মাধ্যমে যেভাবে লেখকদেরকে একত্রিত করেছিল, এপার বাংলায় পঞ্চাশের ‘কবিকণ্ঠ’ তা না পারলেও ‘সমকাল’পত্রিকাটি তা করেছিল অব্যর্থভাবে।
এরপর ষাটের দশকে ঘটল একঝাঁক তর”ণের সুসংবদ্ধ এবং অবাধঅকুণ্ঠ পদচারণা। লিটলম্যাগই তাঁদের করল একাত্ম। ফলে ষাটের দশকে আসে লিটলম্যাগের জোয়ার। মূলত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘কণ্ঠস্বর’(১৯৬৫)পত্রিকাটির ছায়াতলেই এই সকল খাটিয়ে ও লিখিয়ে তর”ণদের মহাসমাগম ঘটে। আবুল হাসান, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, প্রশান্ত ঘোষাল, সিকদার আমিনুল হক, আখতার”জ্জামান ইলিয়াস এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ যার এক একটা নাম। ভালোবাসার সাম্পান গ্রন্থে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন : ‘সাহিত্যের অঙ্গনে সে সময় ভালো সময় যে সময় ভালো লেখকরা জন্মায় আর সে সময়টা আরও ভালো যখন তারা বন্ধু হয়।’ ষাটের দশকের প্রতিনিধিস্থানীয় লিটলম্যাগ ১.‘বক্তব্য’ (১৯৬২),  ২. ‘স্বাক্ষর’ (কবিতার পত্রিকা, ১৯৬৩), ৩. ‘সাম্প্রতিক’(গদ্যর পত্রিকা, ১৯৬৪) ৪. ‘স্যাড জেনারেশন’(১৯৬৪), ৫. ‘শিল্পকলা’ (১৯৭০) লিটলম্যাগগুলো কণ্ঠস্বরগোষ্ঠীর বন্ধুদের কারো না কারো সম্পাদনায় প্রকাশিত। গার্হস্থ্য মানসতার তোয়াক্কা না করে তর”ণরা উন্মাদের মতো করে গেছেন গদ্যপদ্যচর্চা ও পত্রিকার সম্পাদনা। হায়াৎ মামুদ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘কালবেলা’ (১৯৬৪)এবং ‘সমকাল’-এর আদর্শকে অস্বীকার করে‘কণ্ঠস্বর’গোষ্ঠী যাবতীয় প্রথা-প্রতিষ্ঠান-রীতিকে যেন পদাঘাত করে। ‘কণ্ঠস্বরে’র প্রতিটি সংখ্যায় লেখা থাকে :
যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী; যারা তর”ণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত, যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাস্পৃষ্ট কণ্ঠস্বর তাদেরই পত্রিকা।
প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধ্যাপক, পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, ‘পবিত্র’ সাহিত্যিক, এবং গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায় অনাহূত।
এর থেকেও আরও তীব্র শব্দপাত এবং বোধের ভাংচুর আমরা লক্ষ করি ‘স্যাড জেনারেশনে’র রফিক আজাদের ইশতেহারপন্থী লেখায়। মার্কিন মুলুকে অ্যালেন গ্রিন্সবার্গদের ‘বিট জেনারেশন’-এরপর ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গের মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের ‘হাংরি জেনারেশনে’র অবক্ষয়বাদী চেতনার আদলে এপার বাংলায় ‘স্যাড জেনারেশন’ নামে একটি গ্র”প ও পত্রিকার সূত্রপাত হয়। এক ফর্মার মলাটবিহীন বুলেটিনটিতে রফিক আজাদ লিখিত কিয়দংশ : We are poisoning us conciously./ We have only a faithful friend CIGARETTE/ We are not sex driven youths. We are faithful/ to ourselves and to our ‘sadness’/ What do we want?- NOTHING NOTHING/ we want nothing from our bloody society./ we are exhausted, annoyed, tired and ‘sad’. ষাট দশকীয় অন্যান্য লিটলম্যাগগুলোর মধ্যে  ১. ‘নাগরিক’ (শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত) ২. ‘ভেলা’ (আসাদ চৌধুরী সম্পা.), ৩. ‘উল্কা’ (শশাঙ্ক পাল সম্পা.), ৪. ‘রূপম’ ও ‘কিছুধ্বনি’ (আনওয়ার আহমদ সম্পা) ৫. ‘পরিচয়’ (রোকেয়া সুলতানা সম্পা), ৬. ‘দীপ্তি’ (শাহাদাৎ হোসায়েন/নওগাঁ) ৭. ‘পদধ্বনি’ (মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মনোজ দাশগুপ্ত সম্পা) ৮. ‘এয়ী’ (বজলুল করিম বাহার/বগুড়া) ৯. শব্দশিল্প (ইঞ্জি. ইউনুস আলী), ১০. ‘শ্রাবস্তী’ (হুমায়ন কবীর সম্পাদিত), ১১. ‘ছোটোগল্প’ ১২. ‘লালসূর্য’ ১৩. ‘অপরাহ্ণ’ ১৪. ‘অবেলা’ ১৫. ‘স্বরক্ষেপ’ ১৬. ‘উত্তরণ’ (এনামুল হক সম্পা.) ১৭. ‘বিপ্রতীক’ (ফার”ক সিদ্দিকী সম্পা.)

এরপর সত্তর দশকীয় ছোটকাগজ মূলত সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বদেশী চেতনাচিন্তনকে মর্মে ধারণ করে পথ চলতে থাকে। আশির দশকে আসে ছোটকাগজের আরেকটি সমগ্র স্রোত। যেমন গাণ্ডীব (১৯৮৭) পত্রিকার ইসতিহারে বলা হয় যে- ‘প্রচলিত পঙ্কস্রোত থেকে মুক্তি দিতে হবে কবিতাকে। কবিতার শব্দ এমন হবে যা পাঠকের চেতনায় আছড়ে পড়বে হাতুড়ির মতো, গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবে চৈতন্যের ইট। পাঠকের জন্য কবিতাপাঠের অভিজ্ঞতা হবে মৃত্যুযন্ত্রণার মতো। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাকরণ অগ্রাহ্য করে কবিতায় প্রয়োগ করতে হবে বিন্দুবাদী প্রক্রিয়া’। একইরকমভাবে নব্বুই দশকের প্রতিশিল্প (১৯৯৪) পত্রিকায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মেনুফেস্টো-‘প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক সব দলিল দস্তাবেজের প্রতি অবিরল ঘৃণার সূত্রপাত। কেননা আপসকালিন প্রতিটি প্রক্রিয়া যেমন অনুষঙ্গের মতো পরিত্যাজ্য এবং অপ্রয়োজনীয়। ছোটকাগজ (পাল্টাকাগজ বলাই সংগত) মধ্যবিত্তের ক্লিশে র”চির বির”দ্ধে প্রতিবাদ। কেননা তা পরিশুদ্ধ এবং সচেতন। চাই প্রকৃত মাঠকর্মী। খয়াকাব্য আর মরাগদ্য অস্বীকার করার অহম তাঁর জর”রি’।
এরপর এই শতকের শূন্য দশকের শেষদিকে ২৬ মার্চ, ২০০৯ সালে স্নানর প্রকাশ। পুনঃনিবেদনপর্বেই জানা যায় তার মেজাজী আদর্শ বা আদর্শিক মেজাজ-‘সয়ম্বরসভায় অর্জুনকে দ্রৌপদী যে কারণে বরমাল্য দিয়েছিল আমরা সে কারণে স্নান করি। আসুন! স্নান করা শুর” হলো।… আমরা ক্রমশ বড় হই এই ক্যাম্পাসে, হাজার রঙিন প্রজাপতির মেলার এ ক্যাম্পাস। বনবীথিতলে এসেছে সব সুকন্যারা, আর এসেছে পুংরেণু নিয়ে ঈষাণে বিষাণে ওঙ্কারতুলে ব্যক্তিত্বপূর্ণ সব শ্রীমানকুল। তাদের স্নান করতে বলি রোদ্রেমেঘেঝড়েগম্ভীরে। তারা হয়ে যাক সব শ্রাবনসন্ন্যাসী। লিখুন না একটা কবিতা বা গল্প বা অন্যকিছু। কবে, আজ বা কাল; অথবা যেকোন সময়, হতে পারে জোৎস্নায়, তবু দেখিল যে ভূত- তার আক্ষেপে, অথবা থ্যাঁতা ইঁদুরের রক্তমাখা ঠোঁট মুখে নিয়ে তার জন্য লিখুন। কেন লিখবেন না, লিখুন, লিখতে হবে’। মূলত ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক হলেও দেশের প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলের নব্যলিখিয়েদের এক প্লাটফর্মে আনবার মতোন কৃতকর্মার ভূমিকা পালন করেছে স্নান। স্নানর মোট ৩৩টি সংখ্যায় ২০০র অধিক লেখক, ২৫ জনের মতোন প্রচ্ছদশিল্পী আর ২৮ জন সমন্বয়কের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে এযাবৎ এবং সুখকর বিষয় স্নান এখনাবধি সমগতিতে চলমান। সম্পাদকের বদলে সমন্বয়কদল গঠনের চিন্তাটিও স্নানের অনন্যদিক। তাতে করে তিনচারজনের সম্মিলিত উপস্থাপন আমরা মুগ্ধ হয়ে লক্ষ করেছি কয়েকবার। যেমন ধরা যাক চারজন সমন্বয়কের করা স্নানের ৫ম সংখ্যাটি যা গল্পসংখ্যার বিশেষ আয়োজন ছিল। মাহফুজ হুমায়ন রাশেদ-রাশিদুল ইসলাম রাসু-মর্মরিত ঊষাপুর”ষ-ফার”ক হোসেনের সমন্বয়ে কৃত সে সংখ্যাটি সমস্ত স্নানসংখ্যাগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম (অন্তত আমার বিবেচনায়)। স্নান লেখকতৈরির সাথে সাথে সমন্বয়ক বা সম্পাদক তৈরির যে বিরাট কাজটি করে যাচ্ছে তা বোধ করি একটি সুআলোচ্য বিষয় হবার দাবী রাখে। আরেকটি উচ্চকিত বিষয়, প্রতিটি সংখ্যায় স্নানসমন্বয়কদের আলাদা-ভিন্ন এবং কখনো পুরোপুরি বিপরীত বিষয়-ফরম্যাট-গঠনবিন্যাসের ও বিষয়ভাবনার এক্সপেরিমেন্ট। এক্সপেরিমেন্টের কোন বিষয়টি করা হয়নি স্নানে! গল্পসংখ্যা-কবিতা-সংখ্যা তো মামুলি, কবিদের কবিতার আড়ালকথন কবিতা লেখার সময় অন্যবোধের আত্মপ্রকাশ-কবিদেরকে দিয়েই তাদের কবিতার জন্মরহস্য জানানো-গুচ্ছকবিতাসংখ্যায় অন্য কবির মূল্যায়ন-সচিত্র কবিতাপ্রকাশ-শোকসংখ্যা-সেরা ভালোলাগা সংখ্যা করা এগুলোতে গেল বিষয়ানুগ ভিন্নতার কথা! স্নানের আকার নিয়েও বাদ যায়নি এক্সপেরিমেন্ট। বর্গাকার স্নানও আমরা করেছি প্রত্যক্ষ! এমনকি প্রচ্ছদপৃষ্ঠাটিকেও স্নান সমন্বয়করা ব্যবহার করেছে সৃজনশীলতার অবাধক্ষেত্র হিসেবে। আর ফন্টের মতোন বিষয় নিয়েও কী হয়েছে ও রয়েছে কম মতভেদ!
আবার সবকিছুর বিপরীতে স্নান নিয়ে অসন্তুষ্টির জায়গাও অপ্রতুল নয় এও জানি। স্নানের কোনো সমন্বয়কই বুকে হাত রেখে বলতে পারবো না তাদের শতভাগ সন্তুষ্টির কথা। তাতে কী! আমাদের সীমাবদ্ধতা কিংবা অসন্তুষ্টিই আমাদের প্রাণ। সন্তুষ্ট হলে স্নান ও আমরা উভয়েই হারিয়ে যেতাম হয়তো আরও কিছু আগেই! তাই স্নানের বর্তমান ও আগামীর সম্পাদকদের জন্য অসন্তুষ্ট থাকতে বলাটাই হতে পারে তাদের জন্য শুভকামনা। আসুন! স্নানকর্মীরা আমরা পুনঃপুন অসন্তুষ্ট হয়ে উঠি। অন্তত আমাদের স্নানের ব্যাপারে…

সায়মা আলম নাজ
স্নানটাব

স্নান চত্বর। আমরা যারা কান্নার শব্দ চাপতে চাপতে কাঁদি বা তীব্র হাসির ঝঙ্কার চাপতে চাপতে হাসি তারাই আসি স্নানে, অঝোরে অশ্র”র ঝঙ্কার ছড়াতে। ২০১১ থেকে শুর”, এখন ২০১৪। তিন বছরেরও কিছুটা বেশি সময় কেটে গেলো স্নানর সাথে। ছোট কাগজ স্নান-এর কথা বললেই চলে আসে স্নান চত্বরের কথা। প্রথম দিন ক্লাস শেষে শহীদুল্লাহ্কলাভবন থেকে বেরিয়ে খুব সহজেই চোখে পড়ে স্নান চত্বর। নামটা আমাদের কয়েকজন বন্ধুকে হাসালো। ফোনে কোন বন্ধুকে ডাকার সময় বলতাম গোসলখানায় চলে আয়। এটি ছিল আমাদের বন্ধুদের উন্মুক্ত আড্ডা ক্ষেত্র। এখানে বন্ধুর কোন বয়স ছিল না। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়া বড় ভাই-আপু থেকে শুর” করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছোট ভাই-বোন কখনো বাদামওয়ালা, পাপড়ওয়ালা আবার ভিক্ষুকও হয়ে উঠত বন্ধু। পেছন ফিরে এখন বুঝতে পারি স্নান চত্বর গোসলখানাই বটে। যুক্তি তর্কের উচ্ছল ধারায় স্নাতো হচ্ছি প্রতিনিয়ত। চামড়া চিরে মাংস, মাংস চিরে রক্তের বুদবুদের আকর্ষণ স্নান’র আড্ডা। কখন যে শব্দহীন আবৃত্তি মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় লাভা স্রোত বইয়ে দিয়েছিলো, চিৎকার করে গাইতে গাইতে ঝুপ করে নেমে আসে স্তব্ধতা। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির যুক্তি তর্কের আলোচনার ঝড় এতোটাই তীব্র যে আপাতদৃষ্টিতে লোকে ঝগড়া মনে করে। আর এখানেই স্নান সার্থক। আমাদের মধ্যে রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, বিষণœতা, কান্না, ম্রিয়মাণতা জাগিয়ে তোলে আমাদের একত্রিত করে। যুক্তি তর্কের খেলায় আমরা এখানেই ভাঙি চায়ের কাপ, কিন্তু দাম মেটাতেও ভুলি না। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, রাজনীতি, ধর্ম, সিনেমা, নাটক, চিত্রকলা, আঞ্চলিক ভাষা, গালাগালি, কাম, প্রেম কী নেই যা এখানে আলোচনা হয় না? আমরা এখানে সিগারেট হাতে যেভাবে ধুমপান করতে শিখি, সিগারেটকে না বলতেও শিখি। প্রতি দুমাসে ছোটকাগজ ‘স্নান’ প্রসব করে নতুন লেখক-সম্পাদক। আর আমরা পাঠকরা তাদের গোসল করানোর কাজে লিপ্ত হই। প্রতি ‘স্নান’ প্রকাশের পর লেখক-পাঠক-সম্পাদক এক সম্মিলিত আড্ডা হয়। আড্ডাকালে ৭৪ মাইলেরও বেশি বেগে স্নান চত্বরে সাইক্লোন বয়ে যায়। সে সাইক্লোনে শুদ্ধ হই আমরা, প্রতিটি আড্ডা প্রতিটি শুদ্ধতার জন্ম দেয়।লেখক-পাঠক-সম্পাদক এর আড্ডায় মতামত-দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার পার্থক্য লক্ষণীয়। একটি নতুন ‘স্নান’ বের হবার পর সম্পাদক এবং ‘স্নান’ কর্মীদের ঘিরে ধরে উত্তেজনা, আজকের ‘স্নান’ নিয়ে স্যারেরা, বড় ভাইয়েরা, বন্ধুরা কে কী বলবে এই নিয়েসবার ভেতরই অল্প-বিস্তর উত্তেজনা। এই বিশেষ আড্ডা ব্যতীত স্নান চত্বরে আমরা মেতে থাকি। এখানে শিক্ষকসহ নানা ব্যক্তিকে নিয়ে চলে ব্যঙ্গধর্মী নাটক, কে কেমন, ক্লাসে কোন শিক্ষক কি বলেন সে আচরণগুলো অভিনীত হয়। অভিনয়ের তোড়ে ভেঙে যায় চত্ব¡রের বাঁশের বেঞ্চ, কখনো কেউ পশ্চাৎপদে খায় কাঁটার গুঁতো। এই নিয়ে আমাদের গুর”-আমাদের স্যারের কাছে আমরাই নালিশ দিই। নতুন করে বেঞ্চ বানানো হয়, কাঁটা মারা হয়, আবারো সেই বেঞ্চ ভাঙে। ভাঙা বেঞ্চের মত অনেকেই ভাবে স্নান কর্মীদের মাঝে রয়েছে বিভেদ-শীতল সম্পর্ক। আসলে, এমনটা ভাববার কারণ আমাদের স্বকীয়তা। স্বকীয় হবার কাঁচামাল পাই ‘স্নান’ থেকেই, এখানেই গড়ে চিন্তা-ভাবনার নিজস্বতা, তৈরি হয় মতামত, আমি-আমি হয়ে উঠি, মতামত ও মননের বিভেদ আরো শক্ত করে বন্ধুত্ব, কারণ ‘স্নান’ চত্বরে আমরা যারা আসি তারা জানতে চাই। জিজ্ঞাসার সাথে সাথে কিছু মতামত তৈরি হয়, জানার সাথে তা পরিবর্তনশীল। এ তৃষ্ণার সাথে, চত্বরের সাথে নাড়ির টানে সম্পৃক্ত ১৩০, বিভেদে দৃঢ় হয় বন্ধুত্বের নেশা।

চত্ব¡রের আম গাছের সাথে লাগোয়া বেঞ্চে বসার জন্য আমাদের মধ্যে শুর” হতো হৈ-হুল্লোড়, কে দৌড়ে আগে বসতে পারে। মাঝে মাঝে আমাদের এলোমেলো আড্ডায় শিক্ষকরা উপস্থিত হতেন। সম্মানীয় স্থান ভেবে শিক্ষকদের ছেড়ে দিতাম সেই আমগাছের বেঞ্চ। আরামপ্রিয় শিক্ষকরাও গ্রহণ করেন সানন্দে। এই বেঞ্চগুলোতে লম্বা শুয়ে যে আকাশের দিকে তাকায়নি সে এ চত্ব¡রের মহিমা বোঝে নি। এখানে শুয়ে নিজেকে উদার, চারপাশ, সমস্ত মানুষ সবকছু-সবকিছুকে মহান মনে হয়। আমাদের মনের স্যাটেলাইটে এ চত্ব¡র জীবন্ত। এখানে আমরা ছোটকাগজ কর্মী, সবসময় ভাঙার মন্ত্রে উজ্জীবিত, নজর”লের বিদ্রোহ, এ নিয়ম মানি না, মানবো না, মানবো না স্লোগানে আন্দোলিত। আমরা যদি সবকিছু ভেঙে ফেলতে চাই, জোড়া লাগাবে কে? যদি আগুন জ্বালাতেই ব্যস্ত থাকি তবে আগুন নেভাবে কে? তাই আমরা দুটোরই দায়িত্ব নিই। আমরা দ্রোহে লালিত, দ্রোহকে লালন করে সময়ের জড়তাকে অস্থির করি। আমরা ভালোবাসি, আমরা প্রেমিক, নির্জনতা, মৌনতা, স্লোগান, মানুষের পায়ে চলা, মানুষত্ব বোধের মৃদঙ্গ বাজে কানে। স্নানের অসংখ্য ঘটনা, অসংখ্য কাহিনির চিহ্ন রয়েছে স্নান চত্বরে। স্নান চত্বরের অস্থিরতা তৈরি করে ব্যক্তি মানুষ। নতুন চিন্তা, না খুঁজে পাওয়া প্রশ্নের তরঙ্গে ভাসি হতাশায়। আমরা হতাশ হই, ব্যর্থতায় কাঁদি, কান্না ও চিৎকারে জ্যোৎস্নায় স্নাত করি স্নানকে।
বাস্তবতায় প্রশ্নের সৃষ্টি। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরো প্রশ্ন দেহের শিরা উপশিরায় জড়িয়ে যায়। সেই জড়িয়ে যাওয়া গিট খুলতে আমরা আসি স্নান চত্বরে। এ আড্ডা থেকেই প্রত্যেকে হাতে তুলে নেয় মশাল, প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে, মশাল জেলে শুদ্ধতায় সৃষ্টি হয় ‘স্নান’। প্রতিটি ‘স্নান’ এর পেছনের গল্প লুকিয়ে আছে স্নান চত্বরে। নিজস্ব মতামতে বিভেদের সৃষ্টি করে স্নান। প্রত্যেকের সাথে বিভেদের আকর্ষণে একত্রিত হই আমরা। উন্মুক্ত এ চত্বরে সাইক্লোনের তোড়ে ভেসে যায় মিথ্যা-জড়তা, বিভেদ উপস্থাপিত করে সত্য-উন্মাদনা। আমাদের সকল উন্মাদনা এ চত্বর জুড়ে। জয়তু ‘স্নান’। জয়তু ‘স্নান চত্বর’।

স্বচিত্ত সচিব
স্নান: হৃদয়ের তানপুরায় প্রথম আঁচড়

পাণ্ডিত্য আমার খুব বেশি নেই। না সাহিত্যে না ভাষাবিজ্ঞানে, না ছোটকাগজের সব বড় বড় ব্যাপারে। জন্মাবধি একটু বেয়াড়া গোছের মনটা। কোন কিছুকেই রূঢ় এবং শক্ত করে দেখতে শিখিনি। শক্ত কিছু ইন্দ্রিয়ের সামনে আসলেই হরহরিকম্প। চেষ্টা করি নরম করে অঙ্কুরোদগম করার। ব্যর্থ হলে নমস্কার জানাই। বাবা তুমি যেখানকার জিনিস সেখানে চলে যাও, আমাকে আমার মত থাকতে দাও।
স্নান যখন অনেকের কাছে বৃত্ত ভাঙার হাতিয়ার, দুঃসাহসিক তার”ণ্যের আগুন, অর্জুনকে দেওয়া দ্রৌপদীর বরমাল্যের কারণ তখন তা আমার কাছে সপ্তদর্শী প্রেমিকা আমার ভাললাগা আমার ভালবাসা। যে আমার ঘোমটাধারী আশালতা, লজ্জায় লাল হওয়া বাঙালি বধূ, যে আমার বিনোদিনী, অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কথা নেই বার্তা নেই আমার বাম গালে ধা করে একটু চুমু বসিয়ে দেওয়া আমার ডিজিটাল বউ।
ডিজিটাল বউ বটে, আবার দেখুন আপনাদের যখন এসব বলছি তখন স্নান-১৬ আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে বলছে, এই যে মিস্টার স্বচিত্ত সচিব, তুমি এসব কথা ওদের কেন বলছ? ছি! তোমার কি লজ্জা শরম নেই? ওরা আমাকে কী ভাববে বলতো দেখি।
আমি জানি কেউ কিছু ভাববে না। স্নানও জানে। তবুও সে ওসব কথা বলতে নিষেধ করে। লজ্জায় নয়, ধরা পড়বার ভয়ে। ওযে প্রত্যেকেরই প্রেমিকা, ওর সখ্য সবার সঙ্গে সবাইকে বলে তুমিই আমার প্রথম ও একমাত্র প্রেম। সবাই যা জানে তা স্নানও জানে। তবুও আমাদের গণপ্রেমে কোন সমস্যা হয় না। আমরা সবাই নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে জানি, ত্যাগ স্বীকার করতে জানি, জানি কেবল ভালবাসার জোরেই সুতাবিহীন মালা গাঁথতে। আর সবচে বড় কথা স্নান’র আনলিমিটেড প্রেম। ওর প্রেমের ভাণ্ডার কখনো ফুরায় না। ও অনন্ত প্রেমের অধিকারী, অনন্তকালের প্রেমিকা ও আমাদের রবিঠাকুরের চিত্রা।
স্নান’র সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে স্নান-১৬ থেকেই। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ স্নানের এ সংখ্যাতেই। স্নান সম্পাদক টেবিল থেকে লেখাটি ছোঁ মেরে নিয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই ছাপিয়ে দেয়। প্রথম লেখা প্রকাশের আনন্দ, আবার সেই সঙ্গে একটু সংশয়ও কাজ করে। লেখাটি কি প্রকাশের যোগ্য ছিল? নাকি সম্পাদক-সহপাঠী-বন্ধু ও কক্ষসাথী হওয়ায় কোন কোটা পেল?
এ প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি ভালভাবেই। স্নান কাউকে কোটা দেয়না, নেয়না। গোষ্ঠী প্রীতি, দলবাজির ঊর্ধ্বে উঠেছে সে জন্মের আগেই। এসব কথা কেবল কথার কথা নয়। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি। আমরা কয়েকজন বন্ধু তখন গ্র”প স্টাডি করতাম। লাইব্রেরির বারান্দায়। সামনে চলে আসছিল অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। আগে তো অনার্স পাস করতে হবে তারপর ই.ঈ.ঝ তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে আমরা ডিপার্টমেন্টের পড়াশোনায় মনোযোগী হব। যেই ভাবা সেই কাজ। রেফারেন্স বই সংগ্রহের উদ্দেশ্যে চলে গেলাম লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরিতে বই খোঁজার পাশাপাশি খুব নীচুস্বরে চলছিল আড্ডা, দুষ্টুমি। দুষ্টুমীর এক পর্যায়ে বান্ধবী নীপাকে (অপ্রকৃত নাম) বলি, দোস্ত তোকে হেব্বি লাগছে। কোন ছেলের সামনে তুই এ অবস্থায় যাসনা। যার সামনে যাবি সেই কিন্তু কবি হয়ে উঠবে। নীপা প্রকৃতপক্ষেই সুন্দরী, তার উপর বেজায় রসিক। সে তখন বলল, তাই নাকি? তাহলে তুমি আমাকে নিয়ে লিখনা কেন?
আমি দ্র”ত কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়ি। আর ওকে বলি তুই আমার দিকে হালকা হেসে তাকিয়ে থাক। বাকী সবাইকে বলি তোরা যে যার মত কাজ কর, আমাদের ডিস্টার্ব করিস না। বন্ধুরা হেসে তাই করে।
ঘড়ির কাটা সবেমাত্র চার মিনিট পেরিয়েছে। থেমে গেল আমার কবিতা (কবিতা কি কখনো সমাপ্ত হয়?)। আমি পড়ি। ওরা সবাই পড়ে। প্রশংসা করল শিরোনামহীন সেই কবিতার।
ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। কবিতাটি কবিতা হয়েছে কি-না তারও একটা ব্যাপার থেকে যায়। তাই আমি বন্ধুদের বললাম নীপাকে নিয়ে লেখা আমার এ কবিতাটির একটা পরীক্ষা নেব। এই কবিতাটি কোন পত্রিকায় ছাপাতে দিব। যদি ছাপায় বুঝবো হ্যাঁ কবিতাটি মন্দ হয়নি। পত্রিকা হিসেবে বেছে নিই স্নানকেই। আশেপাশে ও ছাড়া আর কবিতার ভাল মন্দ কে বোঝে? স্নানে সেই সংখ্যায় সম্পাদক কে, আমি তখনো জানতাম না। লেখাটি তাই স্নান বক্সে ফেলার মনস্থির করি। কবি হিসেবে নিজের নাম দিইনি। স্নানের সঙ্গে জড়িত থাকায় আমার লেখক নামটিকে হয়তো অনেকেই জানে। তাই নিজ নামে লেখা দিলে সম্পাদকের ওপর একটা বড় ভাই জাতীয় প্রেসার পড়তে পারে। ভেবেচিন্তে নিজের নামটি অসীম সরকার আর কবিতার নাম দিই ‘কবিতা কিংবা সত্য অথবা সত্য কবিতা’ আর তা ফেলি শহীদুল্লাহ্র স্নানবক্সে নয় একেবারে দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের বক্সে। যাতে সম্পাদকের মনে হয় এটা কবিতার সাথে অসম্পৃক্ত কোন লেখকের কবিতা, কবিতার বিচারটা যেন হয় কঠিনভাবে।
এরপর চুপচাপ কয়েকদিন। স্নান ২৫ বের হয়। সম্পাদক আহমেদ মেহেদী হাসান নীল আমার হাতে তুলে দেয় স্নানের এককপি। পড়তে গিয়ে দেখি আমার ঐ কবিতা। স্নান সম্পাদকের পছন্দ হয়েছে! এর পাঁকা এক বছর পর আমি নীলকে বলি, তোমার ২৫ সংখ্যার অসীম সরকার কে গো? ও বলে ভাই জানি না, ওনাকে আমি খুব খোঁজা খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। আমি বলি অসীম সরকার তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে। আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে আপনি! ওই মিয়া কি কন? ও মজা করে (মাঝে মাঝে এভাবে কথা বলে) ঘটনাটি এজন্যই বললাম স্নানের কাছে লেখকের পরিচিতি অপরিচিতি বড় কথা নয়, বড় কথা লেখা।
স্নান ছয় বছরে পা দিল। সংখ্যা ৩৩ তাতে কী? ওর বয়স তো কোন ফ্যাক্ট না। ও তো চিরযৌবনা। ও আগে কারোও প্রেমিকা ছিল, আজ আমাদের, ভবিষ্যতে অন্য কারো। সবার আদর ভালবাসায় সিক্ত হোক স্নান। ও নিজের মতোই চলুক, ওকে উপদেশ না দেওয়া ভালো। ওর জন্য শুভকামনা।

মেহেদী আব্দুল্লাহ্
স্নান :মন খারাপের মেঘের গায়ে একলা একলা ছবি

তখন সবে স্বপ্ন বোনা শুর”। কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ঘাসে পদচারণা আমার। শরীরে নিয়ে ঘুরছি উত্তাল যৌবন। প্রতিদিন সক্কালে ক্লাসে আর চা এর দোকানে আড্ডা। খুব করে দেখতাম সুন্দরী রমণীদের অট্টো হাসি! গিটার বালককে ঘিরে থাকা বালিকাদের ঢং, লালচে ঠোঁটে চায়ের কাপে চুমুক। দুষ্টু বাতাসটা যখন বালিকাদের বেহায়া দোপাট্টা এলোমেলো করে দিতো তখন ওদের দু’হাত কিযে ইতস্ত হয়ে উঠতো এসব কিছুই আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে নি। সাথে কিছু যুবকের ফেরারীপনা ফাঁকি দেয় নি কিন্তু। ব্যাগ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমরা স্নান করি। এই নিন আপনার কপি, কোন বিনিময় মূল্য নেই।’ স্নান’র আপাদমস্তক পড়ে এক ভাললাগা, জিজ্ঞাসা শুর” হয় মনে। ভাবতাম ইস্ যদি এদের মতো লিখতে পারতাম। কথা বলি স্নান’র পরিচিত মুখের সাথে। জানতে পারি এর চরিত্র। তার পর একে একে কয়েক সংখ্যা হাতে পাই আর পড়ি। পড়তে পড়তেই, ভাবতে ভাবতেই বুঝতে পারি, এ আমার স্নান। জড়িয়ে পড়ি আষ্টেপৃষ্ঠে। আড্ডার প্রাণ পেলাম স্নান চত্বরে। চায়ের দোকানের রূপ কোথায় গেছে ভেসে! হয়ে যাই স্নান’র একজন। সম্পাদনার পালাভারে ১৭ সংখ্যার দায়িত্ব পাই। লেখা সংগ্রহ, বাছাই, প্রচ্ছদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক ধরনের বিড়ম্বনায় পড়ি। হু! তাতে কী? এটাইতো সম্পাদকের কাজ। কী গল্প, কী কবিতা, কী প্রচ্ছদ, কী নাটক সব শাখায় স্নান সম্পাদক র”চিশীলতার, অভিনবত্বের ছাপ দেয়, দেবে। এ যেন তার স্বাধীন সত্তার আপ্রাণ চেষ্টা। উচিৎ অনুচিৎ এর ধার ধারেনা স্নান। পাঠকের কাছে সম্পাদক নিজে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে; লেখকদের দাঁড় করিয়েছে। এটাই স্নান’র সাহস। এসব কিছুর মধ্যদিয়ে স্নান যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাকে দাঁড় করিয়েছে তাতেই বুঝেছি কাজ কী? কতো আদরে, যতেœ বুকে পেতে নিতে হয়। হয়তো স্নানকে কিছুই দিতে পারি নি কিন্তু আমাকে যা দিয়েছে তাই আমার সঞ্চয়, যা পাইনি তা আমার নয়। তা অন্য কারো, অন্য ঘরের, অন্য সুরের। আজও স্নান আমার মনখারাপের মেঘের গায়ে একলা একলা ছবি এঁকে যায়। আর এভাবেই স্নান হয়ে ওঠে আমার, আমাদের বাঁচার রসদ, ভালবাসার সম্পদ।

মশিউর রহমান
স্নান : আমাদের আত্ম-অহংকার, আমাদের আত্মতৃপ্তি

দেখতে দেখতে ছয় বছরে পা দিল স্নান। একটি চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ। কাগজটি চিহ্নপরিপূরক হলেও এর একটা আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে এর আলাদা সাহিত্য জগৎ। আমরা যখন ফাস্ট ইয়ারের ক্লাশ শুর” করি, ততো দিনে স্নান’র দু’একটা সংখ্যা বেরিয়ে গেছে। এক বিশেষ বন্ধু মারফত প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে স্নান’র সাথে। তারপরে মুগ্ধতা, এক পর্যায়ে দুর্বলতা! স্নানকেন্দ্রিক দুর্বলতা! প্রতিটা সংখ্যার জন্য তীর্থের কাকের মত বসে থাকতাম। বের”বে কবে? কবে হাতে পাব?
প্রতিটা সংখ্যা হাতে পাবার জন্য নানাভাবে বিরক্ত করতাম আমার ঐ বন্ধুকে। বন্ধু আমার বিরক্ত হত, আবার হাসিমুখে স্নান তুলে দিত আমার হাতে। দিনকে দিনকে এভাবে স্নানের মুগ্ধ পাঠক হয়ে উঠি…
প্রথম কয়েকটি সংখ্যায় নিছক পাঠক হয়ে থাকা। স্নানের প্রকাশিত কবিতা, প্রবন্ধ,  গল্প পাঠে শুধু মুগ্ধতা বাড়ানো। স্নানের কবিদের কবিতা পাঠ করে, স্নানের গল্প লিখিয়েদের গল্প পাঠ করে, এক সময় নিজেরও কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে। গল্প লিখতে ইচ্ছে করে। স্নান’র শক্তিশালী দিকগুলোর মধ্যে এটি একটি দিক নতুন লেখক সৃষ্টি। কারণ স্নান’র প্রতিটা সংখ্যায় আমরা নতুন নতুন লেখক পেয়েছি। আর এইসব নতুন লেখকের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এর নতুন সম্পাদকরা। স্নান শুধু লেখক তৈরি করে নি, সাথে সাথে নতুন সম্পাদকও তৈরি করেছে। এর উদাহরণ হতে পারে আমার কিছু বিশেষ পরিচিতজন। এমনকি আমি নিজেও। প্রথমে নিছক পাঠক, তারপর আগ্রহবশে কবিতা লেখা বা কবিযন্ত্রণার জায়গা থেকে কবিতা লেখা। স্নান’র বিভিন্ন সংখ্যায় কবিতা প্রকাশ। পরে স্নান’র একটি সংখ্যার সম্পাদক। স্নান লেখক তৈরির পাশাপাশি সম্পাদক তৈরির কাজটি খুব দায়িত্বের সাথে পালন করেছে।
তবে এত ভালোর মাঝে যে, খারাপ কিছু নেই, তা বলা বোধহয় একটু ভুল হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক স্নান’র সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। স্নানকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। সাহিত্যের ছোটকাগজ বলতে যা বোঝায়, সেইরকম ছোটকাগজ ছিল স্নান। কিন্তু আস্তে আস্তে লেখকরা স্নানে অনিয়মিত হয়েছে। আমি স্নান সম্পাদনা করতে গিয়ে একটা বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছি, কোন বিষয় ধরিয়ে দিয়ে লেখকের কাছ থেকে লেখা পাওয়া খুব কঠিন।
স্নান ছয় বছরে পা রাখল। এভাবে স্নান এগিয়ে যাবে অনেকদিন। হয়ত এর কলেবর বৃদ্ধি পাবে, বৃদ্ধি পাবে লেখক, তৈরি হবে নতুন সম্পাদক। যারা হাতে কলমে সম্পাদনা শিখবে। সাহিত্যের ছোটকাগজ হিসেবে স্নান এই কাজটি করে যাচ্ছে নিরন্তর।
স্নানের একজন শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে এর পরবর্তী সম্পাদকদের কাছে বিশেষ নিবেদন থাকবে এই যে, স্নানের লেখক-পাঠক সম্পাদক-সম্পর্ক যেন অটুট থাকে। যোগাযোগ থাকে স্নানের সাথে জড়িত সবার সাথে প্রতিনিয়ত। দরদ দিয়ে, হৃদয়ের রক্তক্ষরণের জায়গা থেকে স্নানকে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে স্নান বাঁচবে দীর্ঘদিন।

রেজওয়ানুল হক রোমিও
স্নানের অবিশ্রান্তে অভিলাষ

আমি স্নান বলছি, মতিহারের সবুজ চত্বর থেকে যেখানে প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে গড়ে তুলেছে অভিনয়ের  শৈল্পিকমঞ্চ। কখনও বা বাতাসটা আর দুরন্ত কাঠবিড়ালিদের ছুটোছুটির মাঝে এক দল তর”ণ-তর”ণীদের অবাক বিস্ময়ের লুকোচুরি খেলা। আমি চির-যৌবনা এই তর”ণ-তর”ণীদের দলে। সকালের সোনা ঝরা সূর্য কিংবা বিকেলের শ্রাবণমুখর সন্ধ্যায় একটি একটি দিন পার করে আমি আজ গৌরবের এক ইতিহাস। যে ইতিহাস তুলে ধরে বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের পরিসর আর আমার বাহুবন্ধনে সংযুক্ত হয় এক একটি অভিজ্ঞতার স্বর্ণপালক।
আমি স্নান বলছি, শহীদুল্লাহ্র প্রাচীনত্বের অলংকার হয়ে যার স্থান হতে পারে আজ ও আগামীর বিস্ময়ে। গণতন্ত্রের মুক্ত চর্চা কিংবা মুক্ত বুদ্ধির যুক্তি তর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র আমার এ অস্থিমজ্জায়। এ অহংকার আমার সর্বাঙ্গের ভূষণ। কখনও মেঘদূতের রোমান্টিকতা, কখনো বা ইডিপাসের কর”ণ ট্র্যাজেডি আবার ভুল করা সূত্রের যন্ত্রণায় কাতর ছাত্রের আশ্রয় আমার এ শীতল বুকে। হয়ত বা তখন আমি মমতাময়ী মা।
আমি স্নান বলছি, বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক হয়ে যার ভাষা সার্বজনীন দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় জীবন যুদ্ধের এক একটি মন্ত্র যার প্রেরণায় কোনো কোনো জীবন হয়ে ওঠে উপাখ্যান। বিভিন্ন উৎসবে তারা যখন আমাকে কবিতা আর গল্পের পাতার আবরণে সুসজ্জিত করে তখন আমি আর তৃপ্তির হাসি না হেসে পারি না। আমাকে ঘিরে তখন কত মানুষের ভিড়, যেন বাড়িতে আনা নতুন বউ! ছাত্র-শিক্ষকদের মিলনমেলায় আমার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্ভাষণ যেন ভিন্নতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
আমি স্নান বলছি, তার”ণ্যের আকাশের সূর্য হয়ে। নীড়ে ফেরা পাখিদের একরাশ কষ্ট আর প্রেমিকের ধূসর চোখে আগামীর অসম্ভবকে জয় করার অন্তঃহীন প্রচেষ্টা। স্বপ্ন আর বাস্তবতার সমন্বয়ে আমি চিনেছি, আমি বাঙালি। কত রোদ, ঝড়-বৃষ্টি এসে হানা দেয় এই বুকে তবুও আমি নীলাঞ্জনা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রের চোখে। বন্ধুত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপনে আমি হয়ত বা নিশ্চুপ সাক্ষী হয়ে থেকে যাই। এভাবে আমার জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আঁকা এক-একটি সময়ের চরমতম অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
এভাবেই কেটে যায়, চলে যায় এক একটি দিন। আমি তবু চির নবীন। আমাকে বাঁচিয়ে রাখা আমার এই সন্তানদের কাছে চির কৃতজ্ঞ আমি। হয়ত বা কখনও কখনও একলা হয়ে যাই! এক রাশ দুষ্টুমিতে গোধূলীর ঐ মিটিমিটি আলোয় আমি তাকিয়ে থাকি প্যারিস রোডের সেই কপোত-কপোতীদের দিকে। কালকের সূর্যটা উঠলেই হয়ত বা তারা এ পথেই হেঁটে আসবে।

নাসিমুজ্জামান সরকার
ভ্রান্তিসিন্ধুতে স্নপন

ভুল করতে গিয়ে সঠিক কোনো কিছু করে ফেলা আর ভুল করে ঠিক কাজ করা একরকম ব্যাপার নয়। কোনো গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকে কাজ করলে ঐ গণ্ডিবদ্ধ মানুষদের মনঃতুষ্টি করা অনেক সহজ হয়। আবার, গণ্ডিচ্যুত হলে মানুষ তাকে বেয়াড়া বলে। ছোটকাগজ করার পূর্বকথা হচ্ছে বেয়াড়া বলে পরিচিতি লাভ করা। কারণ, বিভিন্ন গণ্ডিবদ্ধ পন্থায় এগুলো হয়তো অনেক সহজে উন্নতি করা সম্ভব কিন্তু ছোটকাগজের একনিষ্ঠ কর্মীহতে গেলে তাকে বেয়াড়া হতেই হবে। এই বেয়াড়াদের শুর”টাই হয় ভুল দিয়ে, কারণ শিক্ষাজীবনের শুর”তেই কবিতার নেশা পেয়ে বসে কিংবা যার লেখনীতে শুর” থেকেই একটু বিদ্রোহের আঁচআর দশজন মানুষ তাকে অভিধা দেয় ‘অধোপাতে গিয়েছে’। আর এমনই অধপাতগামীদের ‘সবকিছু ভেঙে দেবো অচল যতো নিয়ম-কানুন’ কিংবা ‘অন্যায়ের কালো ক্ষুধা ভাতে মার, হাতে মার’ অথবা ‘উল্টোপাল্টা আমাদের এইসব চলাচল’ এসব উচ্চারণ এদের পুঁজি আর এভাবেই শুর”। এরপর আর কোনো বিরতি নেই। লেখনীর হাত আনকোরা হলেও এই তর”ণ-তর”ণীদের রক্ত সর্বদা নির্ভেজাল। প্রথম পদক্ষেপ থেকেই সাবধানবাণীও তাদের জন্য ঠিকই প্রস্তুত থাকে। কিন্তু তাদের প্রেম, তাদের গতি বাধভাঙা। তাই অতিচালাকেরা (অধিকাংশই-চোর-চুটকা) যখন বলে ‘ভুল করছো হে নির্বোধ তর”ণ-তর”ণী’ তখন তাদেরও উচ্চারণ করতে বাধে না‘তবে ভুলই হোক জীবনের সূচনা।’ এই ভুল করা তর”ণেরা স্বপ্ন দেখে, একদিন তারা বড়ো হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। আর এভাবে চলতে চলতেই তারা জীবনের দিশাও ঠিকই পেয়ে যায়। এই দিশার নাম প্রেম। এজন্যেই অবশেষে কেউ যদি এই জীবনগুলোকে তাদের কর্ম দিয়ে ভাগ কষে তবে সে দেখতে পাবে তাদের জীবন নিঃশেষে বিভাজিত হয়ে ফলাফলে এঁরা প্রত্যেকে খাঁটি মানুষ। পরশ-পাথরের কথা আমরা কে না শুনেছি যা অতিসাধারণ বস্তুকে খাঁটি সোনায় পরিণত করে। কিন্তু মানুষকে খাঁটি মানুষ বানাতে প্রেমের চেয়ে উৎকৃষ্ট পরশ-পাথর আর কী হতে পারে? এ বিদ্রোহ বন্ধ হয়ে যায় নি বলেই জীবন এখনো ফেড হয়ে যায় নি। এ বিদ্রোহ আছে বলেই তো জীবন আজো বর্ণিল। আমাদের সমাজে এমন মানুষের অভাব যারা স্বেচ্ছায় ভুল করতে চায় সত্য কিন্তু এও সত্য তারা দুর্লভ নয়। এই ভুল করতে গিয়েই তারা সঠিক পথের সন্ধান পায় কিন্তু তা বলে তা মোটেও ভুল করে নয়। এজন্যই, স্বেচ্ছায় করতে চাওয়া এ ভুলকে আমরা শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। ছোটকাগজ ‘স্নান’ হলো সেই প্লাটফর্ম যেখানে আমি প্রথম সজ্ঞানে ভুল করতে শিখেছি। আমার মতো সহস্র তর”ণ-তর”ণীরা আসবে, যাবে আর এভাবেই ‘স্নান’ তাদের স্নাত করবে ভুল করবার মহাসিন্ধুতে। ‘স্নান’ চিরজীবী হোক।

স্নান ৩২

স্নানভাষ্য
কেমন আছেন? এই প্রশ্নটা কাউকে করতে পারছি না। প্রশ্নটা অভ্যাস বশতো করে বসলে নিজেকেই পরিহাসের পাত্র মনে হয়। আমরা ভালো নেই। ভালো নেই বোবা গাছগুলোও। প্রত্যেকটি দিন যায় অনিশ্চয়তার তসবী গুনে। বন্দি পাখির অসহায়ত্বের কথা আমরা লিখেছি। আমাদেরটা লিখবে কে? দলা পাকানো ক্ষোভগুলো বুমেরাং হয়ে নিজেকেই দংশন করে। ভালো খবর বন্ধ্যা হয়ে গেছে। অনেকদিন আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি নি। মানবিক যা কিছু সব স্থবির। লক্ষ প্রাণের বিজয় আগুনে ঝলসে গেছে। রুমমেট নিখিলদার বাড়িটাও পুড়ে ছাই। পাঁচ বছরের রুবেল আর লাল বল ছুঁবে না। ওর ডান হাতের কবজীটা এখন অতীত। রঙিনস্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
সঙ্কট যমদূতের মত জেঁকে বসেছে। এর সমাধান কোথায়? কে জবাব দেবে? কে জবাব চাইবে? কেন ওরা জবাব দেবে? জবাব দেওয়ার জন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে? নিরব। আমি। আমরা। সকলে। স্বপ্নপুরুষ মাদিবাও বেঁচে নেই।

উল্টোযান
সুমি শ্রাবণী

পি.কে বসাক লেনের তিন নম্বর গলি তার গন্তব্য। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতে সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে তার অর্থাৎ বিনুর ফেরার সময় হয়। ব্যতিক্রম ঘটল আজ। আলোগুলো একবার জ্বলেই আবার নিভে গেল। বিনুর পায়ের গতিও দ্রুত থেকে দ্রুততর হলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের স্টল। কুপিবাতির স্বল্প আলো অথবা চুলার গনগনে আঁচে সেসব জায়গা পরিণত হয়েছে আলো-আঁধারিতে। এরকম একটি আলো-আঁধারিতে সহসা তার সঙ্গ নিল চারজন যুবক। পায়ের গতিতে সমান সামঞ্জস্য রেখে তারা সঙ্গী হয়ে উঠলো। অপেক্ষাকৃত ঘন অন্ধকারে ঘিরে ধরলো বিনুকে। বিনুর ভয়ার্ত চিৎকারে আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠার আগেই চিলের চেয়েও অধিক গতিবেগে একটি মোটর বাইকের আক্রমণে যুবকগণ হতবিহ্বল। পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠার পূর্বেই আগুন্তুকের চকিত নির্দেশে বিনু উঠে বসে মোটর বাইকে এবং জীবনের সঞ্চিত সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে তার বাহনকে।
কতটা সময় এভাবে বসেছিলো জানে না বিনু। সময়, কাল, যুগ বা শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রমণ শেষে ভেসে এল একটি সাবলীল কণ্ঠস্বর, ‘এবার নামতে হবে।’ মাথা তুলে বিনু তাকিয়ে দেখে তার পরিচিত বাড়ির গেট। তার নিজের বাড়ি। বিনু   রাস্তায় নামে এবং নিয়ন আলোয় স্পষ্ট দেখে যুবকের মুখ। হ্যাঁ! এ মুখ তার চেনা। কোথায় দেখেছে মনে করতে না পারলেও বিনু নিশ্চিত এ তার চেনা মুখ। মোটর বাইক আরোহী জানায়, তার নাম অতীশ। পি,কে বসাক লেনে তার বন্ধুর বাড়ি। বিনু তাকে এভাবে উদ্ধার করার জন্য ধন্যবাদ দিতে ভুলে না কিন্তু তার বাড়িতে কোন আমন্ত্রণও জানায় না। কারণ, বি.এ পাশ করা বিনুর সন্ধ্যাবেলার এই টিউশন শেষে বাড়ি ফেরা তার বাবা-মা দু’জনেই মেনে নিতে পারে না। উপরন্তু তার এই হঠাৎ বিপদের কথায় তাদেরকে অধিক বিচলিত করা বিনুর ইচ্ছাবিরুদ্ধ ছিল।
এরপরের দু’তিন দিন অজানা ভীতি বিনুকে সন্ধ্যার পূর্বেই ঘরে ফিরিয়ে আনে। ভাবে, অতীশের বলা শেষ কথাগুলো, এসব গলি ঘুপচিতে অন্ধকারে ভালো মেয়েরা চলে না। শুধু আপনাকে চিনি বলেই এভাবে উদ্ধার করলাম। তাছাড়া অতীশের কাজই হল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। বিনু বোঝে না একটি সদ্য পরিচিতা মেয়ের সাথে এ ভাষায় কথা বলা অতিসরলতা না বাতুলতা। তবে এটুকু বোঝে, আর একটি বার তার দেখা পাওয়াটা আবশ্যক। এই চিন্তাই বিনুকে পরপর তিনদিন নিয়ে গেল সেই দুর্ঘটনার স্থানে। তার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য তাতে তৃতীয়তম দিনে পৌঁছে দিল অতীশের কাছে। রাস্তার নিয়ন আলোয় হেঁটে হেঁটে তারা এতটা সময় পার করে যে দু’জন দু’জনের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যত কল্পনা অবধি জেনে যায়। অতীশ বিনুর কাছে প্রকাশ করে তার জীবনের গভীরতম দুর্বলতার কথা। প্রথম দিন যা বলা সম্ভব হয় নি। আসল কথা হল এই যে অতীশ বিনুকে অনেক দিন ধরেই চিনতো এবং জানতো। তবে চারবার বি.এ ফেল করা অতীশ জানতো না কোন যোগ্যতায় তার ভালো লাগার কথা বিনুর কাছে প্রকাশ করবে। তার ভালো গালার এই প্রকাশ তাকে জীবনের চূড়ান্ত প্রাপ্তির দিকে নিয়ে গেল। আর বিনু তার বহু আদর যতে লালিত জীবনে এমন সরলতার দেখা পেয়ে মুগ্ধ, হোক অতীশ বি.এ ফেল কিন্তু পাশ করতে কতক্ষণ।
অতীশ বিনুকে কথা দেয় এবারে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তাকে যে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতেই হবে। কিন্তু পরিস্থিতি তো পাল্টাবার নয়। অতীশের এত দিনের চেনা পরিমণ্ডলে সে সহসা বদলে যেতে পারলো না। আগের মতই অন্যের বিপদে যখন তখন ঝাপিয়ে পড়ে সাহায্য করা, নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজের চেয়ে অন্যের তুচ্ছ কাজকে অধিক গুরত্ব সহকারে পালন করা এবং দিন রাত পরিবারের লোকজনদের মন্তব্য,  তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তোর আর ঘরে বসে লেখাপড়ায় কাজ নেই ইত্যাদি শুনে অতীশ প্রতিবারের মতো এবারও তার ভাগ্যবদল করতে সমর্থ হল না। শুনে বিনুর খারাপ লাগলেও বাবা-মায়ের কাছে নিজের ভালো লাগার কথা জানাতে দ্বিধা বোধ করে না। একমাত্র সন্তানের এই কথায় তাদের আপত্তির যুক্তিসঙ্গত অজস্র কারণ, তাদের কটুক্তি বা মায়ের চোখের জল কোনটাই বিনুকে নিরুৎসাহিত করতে পারলো না। বরং আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে তার পাল্টা যুক্তি ছিল, মা তুমি তো উপার্জন কর না তাহলে তোমার আর বাবার সংসার সুখের হল কিভাবে?’ আর অতীশ আজ কিছু করছে না কিন্তু কালও যে করবে না তাতো নয়। তার মতো এমন পরোপকারী হিতাকাক্সক্ষী ছেলে কখনোই খারাপ হতে পারে না।’
অতীশের বাড়িতে তাকে বাঁধা দেওয়া বা বিনুকে বরণ করা কোনটাই ঘটল না। প্রত্যক্ষ সাহায্য না করলেও বিনুর বাবা-মা আশীর্বাদ করতে কার্পণ্য করলেন না। সে আর্শীবাদ আর অসীম ভালোবাসাকে ভিত্তি করে দু’জনে গড়ে তুললো ছোট্ট একটা ঘর; তথাকথিত সঙ্গার বাইরে যার বিচরণ। এই সংসারে স্ত্রী বিনু সকাল সকাল সাংসারিক কাজ কর্ম সেরে বেরিয়ে পড়ে স্কুলে মাস্টারি করতে এবং তারই রেখে যাওয়া হাত খরচের নির্ধারিত টাকা সম্বল করে অতীশ যায় পরোপকার করতে। তবে হ্যাঁ, এই সংসারে কোন অশান্তি ছিলো না। কারণ তখনো পর্যন্ত কোন অভিযোগ কোন বিরূপতা প্রকাশ পায় নি। বিনুর মুগ্ধতার ঘোর তখনো কাটে নি পরোপকারী অতীশের প্রতি। গল্প চলছিলো এভাবেই কিন্তু আবির্ভাব ঘটে এক নতুন প্রেক্ষাপটের। উল্টোধারায় চলমান এই দম্পতির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে সাত বছরের ছেলে অন্তুর। তাদের দু’কামরার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অন্তুর বাস। অন্তুর বাবা প্রবাসী। মা তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সাত বছরের ছকে বাঁধা জীবনে সে নতুন স্বাদ পায় বিনু অতীশের সংস্পর্শে এসে। তারাও অপরিসীম øেহে তার প্রবাসী বাবার অপূর্ণ স্থানটিকে পূর্ণ করে তোলে। আর মনের  গহীনে লালিত সন্তান বাসনায় তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে বারবার। তা বাস্তব রূপদানের সাধ থাকলেও সামর্থ্যের অপ্রতুলতা বিনুকে নিরন্তর খুঁচিয়ে মারে। তার একাগ্র চাওয়াকে মূল্য দিতেই অতীশ শুরু করে এক নতুন জীবন। টাকা উপার্জনের জন্য তার চেষ্টা বিড়ম্বনায় রূপ নেয়। কোন কাজেই বেশি দিন সে ধৈর্য রাখতে পারে না। তাদের সঞ্চিত সামান্য টাকা থেকে ছোট ছোট ব্যবসায় টাকা খাটায় সে। লাভ তো নয়ই বরং লাগানো অর্থ ফেরত পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারে না অতীশ। আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, বলে ঘরে ফিরে অলস বসে থাকে অথবা ছোটে পরোপকারে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটে প্রেক্ষাপটের। বিনু চায় তার স্বামীকে অন্যরকমভাবে দেখতে। পরমুখাপেক্ষী আর পরোপকারী অতীশ স্ত্রীর সাধ পুরন করতে অক্ষম। সক্ষম, উপার্জনকারী এক নতুন অতীশকে দেখার আশায় স্ত্রী বিনু দিনের পর দিন দুর্ব্যবহার করে তার সাথে। সে সময় অতীশের একমাত্র নির্ভরতা অন্তু। শিশু মনের স্বাভাবিক উচ্ছ্বলতায় অতীশের সব মলিনতা দূর হয়। কিন্তু ঘরে বাইরে সমান পরিশ্রান্ত বিনু ক্লান্ত বোধ করে সংসারে। কষ্ট পায় ফেলে আসা অতীতের জন্য, বাবা-মাকে ভুল প্রমাণ করতে না পারার জন্য। এ কষ্ট তাকে নিরন্তর পোড়ায়। বলে, ‘এভাবে হাত পেতে টাকা নিতে তোমার লজ্জা করে না?’ সারাক্ষণ তো দুনিয়ার অশান্তি দূর কর, এদিকে আমি যে ঘরের ভেতর অশান্তির আগুনে পুড়ছি তার কি হবে? যতদিন না তুমি আমাদের সংসারে শান্তি আনতে পারবে ততোদিন তুমি আমার জন্য ছাড়া কারো জন্য কিছুই করতে পারবে না। এক সময়ের পরোপকারী অতীশ মুগ্ধ বিনু আজ প্রায় উন্মাদ। প্রলাপ তার থামে না, ‘এতোদিন যা করেছো এখন নিজেকে বদলাও।’ ‘আমাকে বদলাতে যেও না বিনু। তোমার এতদিনের চেনা অতীশ বদলে গেলে তুমি সহ্য করতে পারবে তো? অতীশের এমন কথায়ও নিসক্রান্ত হয় না সে। সে বলে, বাইরে কাজ করতে পার না ঠিক আছে, ঘরের কাজে তো আমাকে সাহায্য করতে পারো? না কি তাতে তোমার পৌরষত্বের হানি হবে?’
বিনু শোন একটু বস। বল আমাকে কী কী করতে হবে, আমি তোমর চাওয়া পূর্ণ করব। বদলাব আমি। যতদিন বাইরের কোন কাজ না পাই ততোদিন ঘরের সব দায়িত্ব আমার।’
অতীশের কণ্ঠের শীতলতায় বিনু সম্বিত ফিরে পায়। ভাবে, ‘এ আমি কি করলাম!’
লাশকাটা ঘরের হিমশীতলতা আর অসহ্য নিরবতা ছড়িয়ে পড়ে বিনুর সংসারে। চেনা পরিমণ্ডলে অচেনা হাওয়ার ঝড় ওঠে। পরদিন বিনু স্কুল থেকে ফিরে বিনুর চোখে পড়ে বাড়ির বাইরে অস্বাভাবিক জটলা। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। মুহূর্তে দুলে ওঠে তার সমগ্র বিশ্ব, ধাপ করে বসে পড়ে সে, খাটিয়ায় শোয়ানো দেখে তার প্রিয় অন্তু। অবিশ্বাসী চোখে পুনর্বার পরোখ করে। কি ঘটেছে তা সত্য, তবে কীভাবে ঘটল অন্তুর এই চরম পরিণতি জানার ব্যাকুলতায় মাথা তুলে তাকায়। খোঁজে চেনা মুখ অতীশকে। না, নেই। অতীশ নেই প্রিয় অন্তুর এই দুর্ঘটনায় সে এসে দাঁড়ায় নি তার পাশে। তার চলে যাওয়াকে সম্মান জানাতে অথবা কোন সহযোগিতা করতে। বিনুর কানে আসে জটলার দুএকটি কথা।
পা পিছলে পড়েছে ছাদের উপর থেকে।
সাত তলার ছাদ। সে কি কম কথা?
কিন্তু সাথে সাথে ডাক্তারবাড়ি নিয়ে গেলে হয়তো বাঁচতো। কেউ তো তখন বাড়িতে ছিল না, ওর মা একা। বেচারি… আর কোন কথা কানে আসে না বিনুর। নিঃশ্বাসে ছুটে যায় তার ঘরের দরজায়। দ্রুত হাতে ঘা দেয় দরজায়। অতীশ ধীর পায়ে দরজা খুলে আবার ফিরে যায়। বিমূঢ় বিনুর প্রশ্ন, ‘তুমি কি জান আমাদের অন্তুর কি হয়েছে?’ উত্তর আসে বরফশীতল কণ্ঠে, ‘জানি কিছুটা তবে যাই নি। ঘরে অনেক কাজ ছিলো। তাছাড়া ঘরের খেয়ে আর কত পরের উপকার করবো বলতো?’
বিস্ময় কাটে না বিনুর। এই বদল তো সে চায় নি! অজান্তে হত্যা করেছে তার ভালোবাসাকে! অনুতপ্ত বিনু বসে থাকে নিথর।

হোঁচট
দীপ্ত উদাস

পৃথিবীতে এতো ঘটে যাওয়া ঘটনার মাঝে আমিও একটি ঘটনার ফ্রেমে আটকে গিয়ে স্মৃতি হয়ে গেছি। মাথার উপরে ঘূর্ণায়মান সিলিং ফ্যানটি ঘুরে ঘুরে আমাকে সরবরাহ করছে বাতাস। কিন্তু মস্তিষ্ক ও মনের শীতলতা আসছে না। আজই একটি ইলেকট্রনিক দোকানে গিয়ে মন ও মস্তিষ্ক শীতল করা সিলিং ফ্যান কিনবো। এতো সুন্দর ভাবনায় ছেদ ঘটালো মোবাইল ফোনটা। খুবই ইমারজেন্সি একটি ফোন। রিসিভার বাটনটিতে চাপ দিয়েই শুধু বললাম ‘এইতো আমি রেডি, আর বেশি সময় লাগবে না।’ তাড়াহুড়ো করে রেডি হলাম। বাইরে বেরিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। রাস্তায় কত মানুষের শত ছোটাছুটি। কাঁচা তরকারি বিক্রেতা, নতুন চাকুরি পাওয়া ফরমাল ড্রেসের কেরানি, প্রেমে পড়া ভাবুক রোমিও, সদ্য ছ্যাকা খাওয়া হেলাল হাফিজ, ফুটপাতে দুই টাকা প্রার্থী ছেঁড়া ফরমাল ড্রেসের শিশু, সব ঘটনাকে ছাপিয়ে আমার দৃষ্টি কেবল বাসটার পথের দিকে। এই মুহূর্তে মোবাইলটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। তাতে বারবার সময়টা দেখছি। এমন সময় পেছন থেকে কে যেনো ডাকলো আমার নাম ধরে। ‘ওই সুজন, কৈ যাবি?’ ফিরে অবাক হলাম ঐ যুবকটিকে দেখে। যুবকটি আমার ছোট বেলাকার বন্ধু। মাছ খাবার পর একটি ছোট কাঁটা আটকে থাকার মতো আমার পেছনে লেগে থাকে। এক সাথে স্কুল পালানো থেকে শুরু করে পরীক্ষার খাতায় ফেল পর্যন্ত করেছি। শাহরিয়ারকে বললাম ‘আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হয়েছি। যদি তাতে সাকসেস হই তবে ডিটেইল শোনাবো। এখন সময় নেই বাস চলে এসেছে।’ বলে লাফ দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। ওঠার পর হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো অবস্থা। বাসে উঠেই মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। ভাবতেই পারি নি যে এমন একটা সুন্দর ব্যবস্থা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এই সময় বাসে চারটি সিট ফাঁকা থাকা অপর দিকে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে কি এগুলো কারো জন্য অগ্রিম বুকিং! না, না, একে তো লোকাল বাস তার উপর বুকিং! ভাবনার ধারণার উপর নিজের প্রতিই কটাক্ষ করতে ইচ্ছা হলো। সব ভাবনার অবসান ঘটিয়ে একটি সিটে বসে শার্টের কলারটা ঠিক করে নিজের বাহাদুরি ঘোষণা করে পাশের জানালাটা খুললাম। জানালা দিয়ে সকালের রোদের সাথে বাতাসটা মন মাতিয়ে দিলো। তখন আশেপাশের অন্যান্য প্যাসেঞ্জার এর অবস্থান দেখার জন্য মাথাটা ঘোরালাম। একি? সবাই আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে কেন? সবাই যেভাবে দেখছে তাতে মনে হচ্ছে আমি পুরুষ থেকে মাইগ্রেশন করে সুন্দরী যুবতী হয়ে গেছি। তবে চাহনীর মাঝে কটাক্ষের পাশাপাশি তিরস্কারও আছে। সবার দৃষ্টি আমার দিকে আর আমার সিটের পাশে জানালার উপর। তাই একটু কষ্ট করে হলেও বৃষ্টি প্রত্যাশিত কৃষকের মতো মাথাটা বাঁকা করে উপরে চাইলাম। ওখানে লেখা ‘সংরক্ষিত আসন (মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য)’। ওটা দেখার পর মনে মনে নিজেকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। তাতে যে যুক্তি দাঁড় করালাম তাতে এই সিটটি না ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো উপায় পেলাম না। কেউ যেমন কিছু না বলে অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করছিলো তেমনি আমিও চুপসে যাওয়া আঙুরের মত দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের লোকবল ভারী করলাম। ততক্ষণে আমাদের সাথেও আরো লোকজন জমতে শুরু করেছে। বামে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের পারস্পরিক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেটা ব্রেক সম্পর্ক। ড্রাইভারের ব্রেক চাপার সাথে সাথে যাত্রীদের ধাক্কা লাগা ও সম্পর্ক গাঢ়ো হওয়া। এই সম্পর্ক যখন গাঢ়ো হচ্ছিলো তখনই বাসের জানালার উপরের লেখাটি চোখে পড়লো ‘পকেট সাবধান’। লাল রঙে লেখাটি দেখে ছ্যাৎ করে বুকে একটা ধাক্কা লাগলো। বিদ্যুৎ বেগে ডান হাতটি দিয়ে মোবাইল আর মানিব্যাগ পর্যবেক্ষণ করে স্বস্তি পেলাম। একটু সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করলাম। কারণ সুপ্তির কলেজটা যে দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার বিপরীত দিকে। ঘুরতে গিয়েই একজন যাত্রীর পায়ের উপর পা পড়াতে কাউ করে চিৎকার করে উঠলো লোকটা। আমি হতভম্ভ হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করছি এই সময় সিটে বসে থাকা একজন যাত্রী জিহ্বা ও তালুর সাহায্যে বিশেষ এক চুক চুক শব্দ করলো। বিব্রতকর অবস্থায় বাঙালি যে কতোটা তিরস্কার  প্রবণ হয়ে ওঠে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। সুপ্তির কলেজ শেষ হলেও ওকে আর নজরে পড়লো না। ভাবলাম ও বুঝি আগেই নির্ধারিত স্থানে চলে গেছে। তবুও সুপ্তিকে দেখবো বলে সিটে বসে থাকা যাত্রীর মাথার উপর দিয়ে জানালার দিকে মাথাটা বাড়াতেই কাঁধে একটি হাত পড়লো। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম চোখ দুটো লাল, পনের দিন দাঁড়ি না কামানো, হাতে একপেটি বিভিন্ন মানের টাকার নোটের একটি মানুষ। মুখে পানওয়ালা হাতে নোটওয়ালা লোকটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ‘দেইখ্যাতো শিক্ষিতই মনে হয়। বাস চলতি অবস্থায় মাথা বাইর করতাছেন ক্যান। বমি করবেন? তাহলে কন, বাসের থইন নামাইয়া দেই। মন ভইর‌্যা বমি করেন।’ লোকটির ক্ষমতার দৌরাত্ম্য দেখে বাসে তার পজিসন সম্পর্কে আমার ভাববারও দরকার হলো না। মাথা তুলতে তুলতে বাসের অন্য দিকে তাকাতেই দেখি সেখানে লেখা ‘বাস চলতি অবস্থায় জানালা দিয়ে মাথা বের করবেন না’। ‘দ্যান ভাড়া দ্যান’ লোকটি আমাকে ইশারা করেই বললেন। মানিব্যাগ বের করে খুচরা টাকা না পেয়ে পাঁচশো টাকার নোটের সাহায্যেই দশ টাকার ভাড়া মেটাবার জন্য তার দিকে এগিয়ে ধরতেই লোকটি চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘দ্যাখতাছেন না ঐহানেতো লেহাই আছে পাঁচশো ও এক হাজার ট্যাকার নোটের ভাঙতি নাই। ভাঙতি ট্যাহা দ্যান নাইলে সামনে ইস্টপে নাইমা যান।’ বড্ড রকম বিপদে পড়ে গেলাম। কন্ট্রাকটারকে বললাম ভাই আমাকে সময় দেন আমি টাকা ভাঙতি করে ভাড়া দিচ্ছি। অপরিচিত মানুষ বলে কোনো যাত্রী ভাঙতি দিতে চাইলো না। শেষ পর্যন্ত আশার বাণী তো দূরের কথা ভাঙতিও দিলো না। বললো যে, ‘পঞ্চাশ ট্যাকার বাদাম নিলে ভাঙতি দিমু।’ এতো টাকার বাদাম নিয়ে যে বাসযাত্রীদের বিলি করবো সে পথ তো বন্ধ করে দিয়েছে ওই লাল কালির ‘যাত্রা পথে অপরিচিত ব্যক্তির হাতে কিছু খাবেন না’ কথাটি। যাই হোক, বাদাম স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, উহা এইডস হবার ঝুঁকি কমায়, বাদামে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম থাকে, উহা টিপে টিপে সময় কাটানো যায়, আমি আর সুপ্তি মিলে পার্কে বসে সময় কাটাইবো।’ বাদামের ঠোঙাটি পাশের ব্রেক সম্পর্ক গড়ে ওঠা একজনকে রাখতে দিয়ে চারশো পঞ্চাশ টাকা গুনে ফেরত নিলাম। তারপর পানখাওয়া লাল দাঁতের হরেক মানের টাকার নোটওয়ালা লোকটাকে ডেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। এমন সময় বাসের হেলপার চিৎকার শুরু করলো, ‘সি.ও বাজারের যাত্রীরা গেটে আসেন।’ আমিও সেখানেই নামবো। তাই তড়িঘড়ি করে বাসের গেটের সামনে যাচ্ছি আর ভাবছি, আমার গন্তব্যে এসে গেছি। সুপ্তি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে, গিয়েই ওকে সারপ্রাইজ দেবো। যতো কথা জমে আছে সবই আজ বলবো। আচ্ছা ঐ সময় যদি নার্ভাস হয়ে যাই তবে কি করবো? এই সব ভাবতে ভাবতে বাসের গেটের কাছে আসতেই তার উপরের লেখাটি চোখে পড়লো। আবারো লাল রঙের কালিতে লেখা। এতক্ষণ থেকে এই লাল রঙের লেখাগুলো কেবল বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কিন্তু এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত যে উপকারটি করলো তাতে আমার পঞ্চাশ টাকা বেঁচে গেলো। সেই লেখাটি দেখে আমি ব্রেক সম্পর্কের বন্ধুটির হাত থেকে বাদামের ঠোঙাটি নিয়ে আসলাম। ‘জনাব কিছু ফেলে গেলেন কি?’ কথাটি যিনি লিখেছেন তাকে ধন্যবাদ দিতে দিতে বাম পা না দিয়ে ডান পা বাড়িয়ে দেবার সাথে সাথে চিৎপাটাং হয়ে পড়ে গেলাম। বাদামের ঠোঙাটি হাত থেকে পড়ে গিয়ে ছিটিয়ে গেলো সারা রাস্তায়। কয়েকটি পাক খাবার পর যখন উঠে বসলাম তখন দেখি গা ঘেমে মাথা থেকে টুপটুপ করে ঘাম ঝরছে, বিছানা ভিজে গেছে, ঘড়িতে দুপুর বারটা বাজছে।
আজ সকাল দশ টায় সুপ্তির সাথে দেখা করার কথা ছিলো…

দ্বার ভাঙা জলে জীবনের ছায়া
নীলিমা নূর

তুমি নেই তাতে কি হয়েছেও কথা লোকে বলে। ওরাতো জানে না সত্যবদ্ধ বেদী হয়ে বুকের মধ্যে কষ্টের মাদুর পেতে বসে আছো। তোমার সুউচ্চ স্তনের মত বুকের পাজরে কষ্টের পাহাড় জমেছে যাতে প্রতিদিন একটু একটু করে জমে বিষকাটা। হৃদয়ান্তী, লক্ষ্মী আমার লোকের কথায় কি এসে  যায়? আকাশ কি তার কান্না থামায়, বাতাস কি তার গতি বদলায়। এ কথা বোঝে না হৃদয়ান্তী, দ্বার ভেঙে যায় জলেরতাতে ভেসে যায় তার হাসি-কান্না-চোখরাঙানী। হৃদয়ান্তী ঠোঁট দিয়ে তোলে যদি বিষকাটা তবে হাসিমুখে সে কাটা গেঁথে নেবো বুকে-পিঠে-পাজরে। বয়ে যাওয়া জলের স্রোতে দেখবো তোমার মুখ, দুহাতের তালুতে সাজাবো স্বপ্নের সুখ, কেবল অবিশ্বাস রেখ না ওতে।

ঈশ্বরী তোমার
তমা চৌধুরী

তুমি কি জানো ঈশ্বরী কীভাবে সৃষ্টি হয়
জানা আছে কী তাদের তার কর্ম ইতিহাস
তার চলার ধরন, গায়ের বরণ অথবা হাসির কারণ
তার চোখ কী দেখে, হাত কী ছোঁয়, ঠোট কী চায়

তুমি কী জানো ঈশ্বরী কীভাবে জন্ম নেয়
তার লাবণ্যে কেন আগুন ধরে তার হাসিতে কেন মুক্ত ঝরে
তার প্রলাপ কেন মহাকাব্য হয়ে যায়
ঈশ্বরীর ডিএনএ রির্পোট কি দেখা আছে তোমার
কোন বংশের ধারক সে, মান বাচিয়েছে কত পুরুষের
পুজোর আর্তনাদে মরা কতো পাপীর প্রাণ নিয়েছে খুব সহজে
ঈশ্বরী কৃপা করে কেমনে জানো কী মানব
গোপন নদীতে বান কখন আসে কখন সমুদ্র নোনা জলে ভাসে
কখন পাখিদের গান বিষ হয়ে কাটে জানো কী মানব

খুব জটিল নয়, কাজ ফেলে যদি আসতে পারো কোন এক চাঁদ মরা রাতে
বাড়ির সবচেয়ে বদ্ধ ঘরটায় এক বার এসে দেখো, ঈশ্বরী নয়
খুব চিৎকার করে তোমার মানবী কাঁদে।

দুঃখকে কিনুন অতঃপর ধর্ষণ করুন
সুমন প্র“স্ত

নিজের অপরিপক্ব সফলতায় অন্য পাখিদের ব্যর্থ করছে উটপাখি। ভ­াদিমির ও এস্ট্রাগন এখনও বসে আছে, লাকি হয়ত মারা গিয়েছে। ঘুমস্বভাবী মানুষেরা পরাজয় ভালবাসে। অভাবের তাড়নায় কুমির নিয়মিত হরলিক্স খেতে পারছে না ভেবে এখন মানুষ ঘুমায় পশুদের বাসায়। এদিকে বনের প্রভাবশালী বাঘগুলো খুবলে খাচ্ছে হরিণীদের এবং পাশ দিয়ে একটি জাপানি কাগজের ফুল ভেসে যাচ্ছে। কেয়া বাত! কেয়া বাত! কেয়া বাত! বিশুদ্ধ খেজুর রস বিক্রেতা আপনার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, আপনি জুস পান করছেন। হে ঈশ্বর! আমায় সত্যি ক্ষমা কর। আসলেই আমি গিরগিটি। শ্যাম্পুকে ভুলে গিয়েছি, চারিদিকে শুধু লেবু আর লেবু। অনেক ভালো লাগে যখন রাস্তার ধারে বিকিনি টাঙানো থাকে। সাবাশ! এই তো চাই। পশু বিকিনি পরে না, শুধু সময়মত নাড়াচাড়া করে। বুঝতে পারছি না, সাপ এখন আধুনিক নাকি কাক পেখম কিনছে। হে ঈশ্বর! অন্ধ হতে ক্যালকুলেটর লাগে না, লাগে ভয়; শুধু ভয় নতুবা সিলিং ফ্যান।

অনন্ত যাত্রা
ফয়সাল ইসলাম

অনন্ত হতে বিচ্যুতে
ক্ষুদ্র মায়াবী পৃথিবী
বিপুল মারণাস্ত্র ক্ষেত্র অসীম
মোক্ষম আঘাত সঠিক সময়ে, নিয়মে।
নতুবা, শেষ হলে সময়
ব্যর্থ, রিক্ত শূন্য হাতে
ধাবমান ধীরলয়ে আবার
শূন্য সেই অনন্ত পানে।

ডিপার্টমেন্ট চাই
দৌরাত্ম্য বিনয়

এই যে আমার বায়োডাটা
আনন্দ ও খুশির কোর্সÑএ পাস নম্বর নেই।
ন্যূনতমভাবে স্ফূর্তির কোর্সটা উৎরে গেছি
জেনে গেছি পাতার আড়ালের সূর্যালোকে,
আমার কোন স্নেহের কোটা নেই
নেই কোন ইমোশনাল ইফেক্ট
অবহেলায় পাঠ করবার পরেও
কষ্টের আলোকলতায় লেটার গ্রেড পেতাম।
কিন্তু চর্চার অভাবে কষ্টগুলোও ভুলে যাচ্ছি
হয়তো স্মৃতিশক্তি অন্য কাজে ব্যস্ত আজকাল
তাই আবার খুলে বসলাম কষ্টের পুরোনো আলমারি
বাছাই করে লাল কালিতে দাগ দেয়া কষ্টগুলো
হড়হড় করে পড়ে গেলাম ঝাপসা আলোতে।
দেখলাম এসব বেদনা-যাতনায় ঘুনপোকা বাসা বেধেছে
যতে র অভাবে কলুষিত সুখ খানিকটা জুড়ে বসেছে
নতুন কষ্ট বেদনা-যাতনা খুব দরকার,
আজকাল অলিতে-গলিতে আর পাওয়া যায় না।
হাতের কাছেই রাখা মুঠোফোন অথবা গুগলসপ
নইলে অভিজাত রেস্তোরাতে কষ্টের বিকিকিনি,
একদম সাধ্য নেই আমার এসব কষ্ট পাবার,
আমি অতি সাধারণ ব্যথা-বেদনাতে তুষ্ট
তাই কষ্টানন্দের কোর্সে এ-জন্মে আর পাস হলো না
শুধু কষ্ট বিষয়ক একটা ডিপার্টমেন্ট থাকলে
নিশ্চয়ই আমি হতাম প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
আমি যে কষ্ট ছাড়া আর কোনো বর্ণ পড়তে পারি না
ইচ্ছে তাই বেদনার ঊর্ণজাল ছেয়ে ফেলুক আমাকে
কুঁরে কুঁরে খেয়ে ফেলুক আমাকে যাতনার পোকা,
আমাকে শুধু কষ্ট বিষয়ক সাবজেক্ট পড়তে দেয়া হোক
আঁধারের মতো শুদ্ধ ও পবিত্র যাতনায় আমি সন্ন্যাসী হবো।
(উৎসর্গ: যে অনুজ অগ্রজ হয়ে ওঠে)

দহন
ইরফানুর রহমান

পুড়ে যাচ্ছে পরিবহন, শাহবাগে, পুড়ে যাচ্ছে যাত্রীসমেত
পুড়ে যাচ্ছে নারী, পুড়ে যাচ্ছে পুরুষ, পুড়ে যাচ্ছে মানুষ
পুড়ে যাচ্ছে দেবদূতের মতো ফেরেশতার মতো বাচ্চারা

পুড়ে যাচ্ছে মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা হৃদয়
পুড়ে যাচ্ছে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ক্রিশ্চান নাস্তিক
পুড়ে যাচ্ছে বাঙালি চাকমা মারমা ত্রিপুরা মণিপুরী

পুড়ে যাচ্ছে শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত ক্ষমতার উৎসেরা
পুড়ে যাচ্ছে নয়নপুত্তলি পুড়ে যাচ্ছে সিঁথির সিঁদুর
পুড়ে যাচ্ছে আসমুদ্রহিমাচল পুড়ে যাচ্ছে চিম্বুকপাহাড়

পুড়ে যাচ্ছে চেতনা আর অনুভূতির নৃশংস খেলায়
পুড়ে যাচ্ছে প্রথম লজ্জার স্মৃতি, ভালবাসাবাসি, সুখ
পুড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা আর পুড়ে যাচ্ছে মেয়েবেলা

পুড়ে যাচ্ছে জেলে মাঝি আর শাহরিক বস্তিবাসী
পুড়ে যাচ্ছে রাজধানি পুড়ে যাচ্ছে গ্রাম মফস্বল
পুড়ে যাচ্ছে ভাই বোন মুক্তাঞ্চল মায়ের আঁচল

পুড়ে যাচ্ছে তারুণ্যের তীব্রতা পুড়ে যাচ্ছে মননশীলতা
পুড়ে যাচ্ছে বার্ধ্যক্যের নিরাপত্তা পুড়ে যাচ্ছে অভিজ্ঞতা
পুড়ে যাচ্ছে শিলাবৃষ্টি পুড়ে যাচ্ছে হাওয়াই মিঠাই

দুনিয়ার দীর্ঘতম গোরস্তানের এই আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে
কয়েকটা বিদেশি দূতাবাস, ভবন আর সদন ছাড়া
পুড়ে যাচ্ছে মানুষের যা কিছু এখনো মানবিক!

দীপান্বিতারা
ফারুক ইমন

তালার দাম খুব বেড়ে যাচ্ছে।
দীপান্বিতা,
তোমার বাড়িতে!
তোমাদের প্রধান ফটকে
ইয়াবড় এক তালা!
তোমাদের বারান্দার গেটে-
বেডরুমে, বেডরুমের আলমিরায়!
আলমিরার ভেতর তোমার
একান্ত ব্যক্তিগত ড্রয়ারে…
তোমার ট্র্যাভেল লাগেজে, ভ্যানিটিব্যাগে,
ড্রয়িংরুমের টেলিফোনে, ফ্রিজে,
তোমার এন্ড্রয়েড মোবাইলে-
তালার জয়-জয়কার!
আজকাল আমার ক্যামন
একা লাগে,
তালার দাম বেড়ে যাচ্ছে!
তোমার মনেও কি সম্প্রতি
লাগিয়েছো কোন বিদেশি তালা!

জুপিটারের কথা
সাগর তরী

পুরান বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। আর আপাদমস্তক পরগাছা ভর করে আছে। পরগাছা যদিও বটগাছের উপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে, তবে যতই ক্ষতি করুক না কেন উপকার একটা করে। গাছের গোড়াটাকে টেকো মাথা থেকে বাঁচিয়েছে। দেখুন না আসছে শীতকালে সমস্ত পাতা পড়ে গেলেও পরগাছার পাতা কিন্তু থাকবে। তবে দূর থেকে একে বটপাতা বলেই ভ্রম করে অনেকে। আবার বটে ফল ধরলে অনেক পাখিও আসে। আসলে না যার ফল আছে, তারই দাম বেশি। ধরুন না শিশির আর জুপিটারের কথাটা,
এমন বটগাছের মত দেহ নিয়ে ক্লাসে এসেছে শিশির, বসে আছে একেবারেই পেছনে; সমস্ত শরীরটা পরগাছার ন্যায় লতাগুল্ম ও জলজফুল অঙ্কিত সাদাকামিজে আবৃত্ত। আকাশ থেকে জুপিটার তীক্ষè দৃষ্টি রাখছে নীচে শিশিরের বক্ষে। শিশির তখন ক্লাসে মশগুল। জুপিটার মশা হয়ে এসে তার সারাবক্ষে উড়তে লাগল এবং নিরীক্ষণ করলো কোথায় বসে দু দণ্ড রস পাওয়া যাবে শান্তি মত। অবশেষে শিশিরের নৎবধংঃ (ব্রেস্ট) এর কোনায় বসে ইচ্ছে মত রস পান করে তার তৃপ্তি করল এবং পাছা ফুলে লাল করলো। এদিকে শিশির তার নৎবধংঃ (ব্রেস্ট) চুলকাতে চুলকাতে উত্তেজিত হলো। হঠাৎ স্যারের ধমকানিতে নড়াচড়া বন্ধ করতে বাধ্য হলো।

ঠিকানা
রাসেল রহমান

মা,
আমার প্রথম ঠিকানা
অতঃপর পৃথিবী,
সেই থেকে পৃথিবীর সৈকতে
একটি ঠিকানার খোঁজে
নিরন্তর পথ চলি।

শেষ ঠিকানার আগে
সুখ ঠিকানা ঠাঁই পাবেতো!

রাজনৈতিক ইসলাম : একটি আম-আদমি কথন
নাইটফল

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সাল থেকে। এর পূর্বে এটি পূর্বপাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। পূর্বপাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার প্রক্রিয়া এই জনপদটি শুরু করে অনেক আগে থেকেই, যা সম্পূর্ণ হয় ৭১-এ। কিন্তু আসলেই কি আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পেরেছি?

এই উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা যখন প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ (শুধু ভৌগোলিক দখলদারিত্ব) ছাড়তে বাধ্য হল, তখন আমরা দেখেছি ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতে। তখন ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ধর্ম। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আমরা নাম পেয়েছিলাম পাকিস্তান, ‘পূর্ব পাকিস্তান’। পরে আমরা দেখেছি কিভাবে এই ‘ধর্মীয় ভাতৃত্ববাদ তত্ত্ব’ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের স্বাধীনতাকামী প্রদেশগুলোর আন্দোলন চলছে বহুদিন ধরেই, যা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নামে প্রচারিত। আর স্বাধীন বাংলাদেশ তো এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। আমরা দেখেছি যেকোন তত্ত্বই কোন না কোন সময় মূলানুপেক্ষি হয়ে পড়ে। তাই এই ধর্মীয় মৌলবাদিতার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছুড়ে দিয়েই লিখিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নকশা।

সমসাময়িক বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক যে চরিত্র তা আমাকে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করেছে, আমরা কি সত্যিই সেই নকশাতে আছি? কি ছিল সেই নকশা? আদৌ কি সেই নকশার বাস্তবায়ন সম্ভব?

বর্তমানে সংশয়পূর্ণ ভাবনার চালাচালিতে কিছু বিষয়ের পুনঃআলোকপাত জরুরী হয়ে পড়েছে। যেমনÑধর্ম, ইসলাম এবং রাজনৈতিক ইসলাম।

ধর্ম : প্রচলিত অর্থে ধর্ম বা দীনের ইংরেজি প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘রিলিজন’ ব্যবহার করি। কিন্তু এই ব্যবহার সংশয়পূর্ণ। আমাদের সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে নানা অর্থে ধর্মের বা দীনের ব্যবহার আছে। রিলিজনের প্রথম অর্থ হচ্ছে কোন সংঘের বিশ্বাসে আনুগত্য। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ প্রসারিত হয়ে ‘অসামান্য অলৌকিক সত্ত্বায় বিশ্বাস’ এ পরিণত হয়। অথচ বৈদিক সাহিত্য থেকে ধর্মশাস্ত্রে, আবার ধর্মশাস্ত্র থেকে লোকায়ত বিশ্বাসে আমরা ধর্মের প্রধান চারটি অর্থ দেখি।
ক. ধর্মের প্রধান অর্থ কর্তব্য কর্ম। এর বিপরীতে আছে অধর্ম বা অন্যায় কাজ। এখানে সর্বসাধারণ ও বিশেষের ধর্ম আলাদা আলাদা। অর্থাৎ সাধারণের ছিল এক ধরনের কর্তব্য আর সমাজের বিশেষ স্থানীয় মানুষের ছিল তার থেকে বহুগুন ভিন্ন।
খ. ধর্মের ফলকেও ধর্ম বলা হয়েছে। এখানে আবার অর্থের প্রসার হয়েছে। তাই ধর্মের অর্থ এখানে পূণ্য এবং অধর্মের অর্থ পাপ।
গ. ধর্মের তৃতীয় অর্থ হল সম্পৃক্ত, গীতায় এই অর্থেই ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়’ বলা হয়েছে অর্থাৎ ব্যক্তির গুণকর্মাদিজাত স্বভাবই ধর্মের রূপকে স্থির করে।
ঘ. চতুর্থ অর্থ হল ঋত, নিয়ম। ঋতের পথ ধর্মের পথ।

এখানে আমরা দেখেছি কত রকম প্রসারণ ঘটেছে ধর্ম শব্দের। কত বৈচিত্র্যময় অর্থের ব্যবহার ঘটেছে আমাদের জীবনে। অর্থের এই বিস্তরণ পরবর্তী সময়ে আরো বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। যেকোন একটি অর্থের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, সংঘর্ষের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ইসলাম : ইসলামে ধর্মের সমার্থক শব্দ হল ‘দীন’, দীনের একার্থ হল ‘ব্যাপক’। আবার একার্থ ‘বিশেষ’। আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ককে দীন শব্দে প্রকাশ করা হয়। দীনে আল্লাহ থেকে হয়েছে দীনে ইসলাম এবং সালাম থেকে ইসলাম কথাটা এসেছে। এর অর্থ আত্মসমর্পণ। আল্লাহর আদেশের কাছে কায়মনোবাক্যে আত্মসমর্পণই একজন মুসলিমের কাজ। এই দীনের প্রথম স্তম্ভ হল ইমান, এর মূল ভিত্তিই হল আল্লাহর তৌহিদে আর কোরআনের ঐশিত্বে চরম বিশ্বাস। এই ইমান থেকেই মুমিন শব্দটি এসেছে।
ইমান আর ইসলাম কি এক কথা? এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারণ দীন ইসলাম শুধু বিশ্বাস নয় কথা আর কর্মও বোঝায়। ধর্মে যে অর্থে কর্তব্য আর আচরণের প্রয়োগ আছে, আদাবও সে অর্থে তাই। একজন মুসলিমকে তার নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান ভেদে আদাব অনুসরণ করতে হয়, যেখানে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আবার সমাজের ভিন্নভিন্ন স্তরভুক্ত মানুষের জন্য আলাদা আদাব রীতি আছে। বাদশাহর আদাব, সুফির আদাব বা কারিগরের আদাব এক হবে না, যেমনটি হবে না ব্যাধের আর সন্ন্যাসির আদাবের। এই ইমান আর আদাবের সমন্বই হল দীন ইসলাম।

বাংলাদেশে ইসলাম : ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা আছে। সেটা এই অঞ্চলের প্রথম ইসলাম প্রচারকারী হিসেবে বখ্তিয়ার খিলজীর স্বীকৃতির মাধ্যমেই আবার প্রমাণিত হয়। ইসলাম এখানে বখ্তিয়ারের ঘোড়ায় চড়ে তরবারির আগায় নাচতে নাচতে আসে নি। এমনকি তার এমন কোন উদ্দেশ্যও ছিল না। তিনি এদেশে এসেছিলেন ভাগ্যের সন্ধানে। যেমনটি করে তারও পরে এসেছিল ডাচ, পর্তুগীজ, ব্রিটিশরা। হিন্দু অধ্যুষিত এ অঞ্চলে জাতপাত ব্যবস্থা যখন মৌলবাদী চরিত্র নিল, নিম্নবর্গের হিন্দুদের ভবিষ্যৎ যখন তাদের অতীত পিতৃপরিচয়ে নির্ধারিত হওয়া শুরু হল, তখনই এদেশের নিম্নবর্গের জনগণের মনোযোগ পেল ইসলাম। ইসলাম যেন অনেকটা সময়ের দাবি ছিল, ছিল ইতিহাসের সকল নিম্নবর্গের হৃদয় দিয়ে বোনা এক স্বপ্ন। ইসলামকে আসতেই হত। আমরা দেখেছি কি অসাধারণ এক সমাজ সংস্কার মুহাম্মদ (স.) করেছিলেন ইসলামের মাধ্যমে, এটা ছিল মানব ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় বিপ্লব। বাংলায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল সূফি সাধকদের দ্বারা, যেমন : শাহ পরাণ, শাহ মখদুম, পাঞ্জু শাহ, শাহ জালাল, আদম শহীদ ইত্যাদি সহ আরো অনেকে । এই সাধকরা বললেন এমন এক ধর্মের কথা যেখানে মানুষের পরিচয়, মর্যাদা, ভবিষ্যত আগে থেকেই ঠিক করা থাকবে না। এখানে বলা হয়েছে সাম্যের কথা, ভেদাভেদহীনতার কথা। যা ঐ সময়ের নিম্নবর্গের হিন্দুদের স্বপ্নের কথা ছিল। এ বিষয়ে তদানিন্তন ব্রিটিশ কর্মচারি জেমস ওয়াইজ বলেন, ‘মুসলমানদের সংখ্যা এই পূর্ববঙ্গে বৃদ্ধি পাবে (পরে যা পেয়েছিল)।’ কারণ এই বাংলা কখনই খাটি আর্যদের ছিল না। আর কোথাও হিন্দু ধর্ম এত অনাচারগ্রস্ত হয় নি। অথবা এত অধঃপতিত হয় নি। আর কোথাও গণমানুষকে হেয় করে এত দূরে সরিয়ে রাখা হয় নি। এত অমানবিক আচরণ করা হয় নি কোথাও। সঞ্জীবনী সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র বলেন, ‘যখন ইসলাম এলো পূর্ববঙ্গে তখন আনন্দের সাথে তাদের সমর্থন করেছে চণ্ডাল ও কৈবর্তরা। গ্রহণ করেছে আক্রমণকারীদের ধর্ম ইসলাম।’ ওয়াইজ উল্লেখ করেছেন, ‘এরকম ভাবা সমীচীন হবে না যে মুসলমানরা সবাই এক, তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই, শ্রেণি নেই।’ এই বিভেদ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন বাংলার ও ইসলামের জন্মস্থান মক্কার মুসলমানদের রীতিনীতির অসংখ্য পার্থক্যকে। আমাদের খুব হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে যে এই লৌকিক প্রভাব অঞ্চল ভেদে সব ধর্মকেই প্রভাবিত করেছে। তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইসলামি দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার প্রতীক ‘গডুর’।
পীরদের প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রবল আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন ওয়াইজ। মুসলিম পীরদের মাজারে শুধু মুসলমান নন হিন্দুরাও যান। এসব পীরদের অধিকাংশই যুক্ত পানির সঙ্গে। যেমন : খাজা খিজির, খাজা বদর। এর কারণ কি এই যে, পূর্ববঙ্গ নদীনালা বেষ্টিত এবং এর সাথে সংগ্রাম করেই বাঁচতে হয় এ অঞ্চলের মানুষদের!

হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের অসংখ্য রীতিনীতি এক বলে উল্লেখ করেছেন ওয়াইজ। এর কারণ কি এই যে, ‘বাঙ্গালি সংস্কৃতির উৎস ও ভিত্তি ছিল অস্ট্রিক দ্রাবিড়ীয় মোঙ্গলীয় জ্ঞান বিজ্ঞান তত্ত্ব ও মনন’ বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর প্রশ্ন করেছেন। বাঙ্গালীর মনেও অধ্যাত্ম বুদ্ধি, সংখ্যা, যোগতন্ত্রের প্রভাব বারবার প্রবল রয়েছে। এমনকি এখনো দেখা যায় বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে মানত করছেন। তারা এখনো পঞ্জিকা, ঝাড়ুফুক ইত্যাদিতে বিশ্বাস করেন। তবে এর প্রধান কারণ দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের উৎপাদন পদ্ধতির নিশ্চলতা। বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয় সাধন যেমন হয়েছে তেমনি আবার উৎপাদন পদ্ধতির নিশ্চলতার দরুন ভৌগোলিক ও সামাজিক দূরত্ব বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান মতবাদ প্রয়াস ও দার্শনিক মনোভঙ্গি আলাদা করে  রেখেছে।

একটা ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। তা হল ইসলামের একক, নির্দিষ্ট, অনন্য কোন রূপ নেই। আরবের ইসলাম দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন এই উপমহাদেশে পৌঁছেছে, তখন আর তা আরবের সেই ইসলাম নেই। সে কারণেই একজন আরবের চোখে বাংলার মুসলমানদের মাঝে রূপান্তরিত হিন্দু রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠানের যে সব চিহ্ন ধরা পড়বে তার অনেক কিছুই তিনি মক্কার ইসলামে পাবেন না, আবার বাংলার ইসলামের ভক্তিবাদের সাথে আরবের ইসলামের কোন সম্পর্ক তিনি খুঁজে পাবেন না।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রধান দুটি ভাগ ছিলÑশিয়া ও সুন্নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের মধ্যে শিয়া আধিপত্য লোপ পায় যা আজও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নি। সুন্নিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এদের মধ্যে নানা শ্রেণির উদ্ভব হতে থাকে। সে সময় এদের চারটি প্রধান বিভাগ দেখা গেছে :
১. সাবেকী : হিন্দুয়ানি ভাবধারার ও একটু গোড়া। কৃষকের বেশিরভাগ ও পূর্ববর্তী সুন্নিবংশধারা এই দলে।
২. ফরাজী : শরীয়তপন্থী, শরীয়তুল্লাহ ও তার পুত্র দুদু মিয়া এই দলের প্রতিষ্ঠাতা। সুন্নিদের মধ্যে নিজেদের সবচেয়ে নিয়মনিষ্ঠা বলে দাবি করে।
৩. তাইয়ুনি : মৌলবি কেরামত আলীর পাটনা মাদ্রাসার অনুসারি। ঢাকার ব্যাপক কৃষককুল, দরিদ্র জনসাধারণ ও চামড়া ব্যবসায়িরা মূলত এই উপদলের অন্তর্ভুক্ত।
৪. রাফিইয়াদায়িন : একটু ভিন্নভাবে নামাজ আদায় করে। সমৃিদ্ধশালী ও উদ্যোগী ব্যবসায়িদের মধ্যে অনেকেই এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

দীর্ঘদিন হিন্দুয়ানি আচারে অভ্যস্ত মুসলমানরা তাদের ধর্মের মধ্যেও পৌত্তলিক ধ্যানধারণা, রীতিনীতির অনুপ্রবেশ করিয়ে ফেলে। মি. গ্যাস্টিন ভাস তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন যে, ‘পৌত্তলিক ভাবধারা ও সাকার ধর্মীয় রূপ এখানে এমনভাবে আসন গেড়েছিল যা ইসলামের সারল্যের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান ছিল। এমনকি বহিরাগত বিদেশি ও স্থানীয় দলিতদের সংস্পর্শে এসে হিন্দু ধর্মও তার বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে পারে নি।’
এদিকে ইসলাম প্রসারের প্রথম দিকে লক্ষ লক্ষ হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এ জন্য সে সময় আদিবাসী জাতিসমূহের আচার অনুষ্ঠানের ইসলামকে তুলনামূলক সহনশীল অনুভূতি গ্রহণ করতে হয়েছে তাদের। আর নিতে হয়েছে উদারনীতি। স্থানীয় দেবদেবী, বিশেষ করে আপদবিপদে ও রোগেশোকে স্থানীয় আদিবাসিরা যে লোকজ দেবদেবীর শরণাপন্ন হত, সেই দেবীরা ছিল নিম্নবর্গের হৃদয়ের অতি আপন, পরবর্তী সময়ে এদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। তাই নতুন বিকল্প ব্যাতিরেকে নয়া ধর্মান্তরিত লোকদের পক্ষে পূর্বতন রূপকের ধারণা পরিত্যাগ করা বাস্তবিকই কঠিন ছিল। সাকার ঈশ্বরের কল্পনা তাদের কাছে সহজ। তাই পরবর্তী সময়ে ইসলামে অতিন্দ্রীয় ক্ষমতাসম্পন্ন সমকক্ষ পীরফকিরের ধারণা এক অর্থে ছিল ওই সব রূপকেরই একধরনের বিকল্প।

আমরা একটু মনোযোগী হলেই ধরতে পারব আরবের মুসলমানদের বিভিন্ন আচার এখানকার থেকে কত আলাদা হয়ে গিয়েছিল। যেমন, আশুরা, তাজিয়া, বড় ওয়াফাত। এছাড়াও এখানকার মুসলমানদের কত ধর্মীয় আচার হিন্দুদের বিভিন্ন আচারের সাথে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। যেমন, অর্থের বিনিময়ে খাদেমরা মুহাম্মদের পদঃচিহ্ন দর্শন করাত যা একইভাবে পূর্বে ব্রাহ্মণরা বিষ্ণুপদ দেখাত। এছাড়াও ছিল শিয়াদের মোহররম, তাজিয়া আর হিন্দুদের দুর্গাপূজা। এম দ্য তাসিসর এর মতে, ‘এ দু অনুষ্ঠানের মধ্যে মিল ছিল অনেক দিক থেকেই।’

রাজনৈতিক ইসলাম :
ভীষণই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল দু সম্প্রদায়ের (হিন্দুÑমুসলিম) মাঝে। এরা পরস্পর অপরের ধর্মীয়, সামাজিক আচারে অংশ নিয়েছে, একে অপরের ধর্মের প্রতি হিংস্র মনোভাব তো দেখায়ই নি বরং শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। তাহলে কোথা থেকে শুরু হলো আজকের এই অসহিষ্ণু ইসলামের? কোথা থেকে ধর্মে অনুপ্রবেশ ঘটলো রাজনীতির? আসলে এভাবে ভাবতে গেলে পা হড়কানোর সম্ভাবনা আছে। কারণ ধর্ম কি কখনো রাজনীতি বিবর্জিত ছিল? এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজাটা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। এক অনন্যসাধারণ সমাজ সংস্কারক থেকে শেষ পর্যন্ত যখন মুহাম্মদকে
রাষ্ট্র পরিচালনায় যেতে হল তখন তিনি এর ভয়াবহতাটা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতার জায়গাটি ধরতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি তার শেষ ভাষণে বলে গিয়েছিলেন ‘আমিই শেষ নবী’।
বর্তমানে বাংলাদেশে একটি আত্মচিৎকার অহরহ শুনছি ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি মেশাবেন না’। ধর্মকে রাজনীতি মুক্ত রাখা কখনোই কি সহজ ছিল? আমরা ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম প্রচারককে দেখেছি যারা ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে এর অসাধারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা টের পেয়েছিলেন এবং অনেকেই তা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ, তার পুত্র দুদু মিয়া এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ধর্ম ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে গৌতম ভদ্র তাঁর ইমান ও নিশান গ্রন্থে বলেন, ‘ক্ষমতাকে বাদ দিয়ে, শোষণ ও শাসন, প্রতিবাদ ও আনুগত্যের বন্ধনকে অস্বীকার করে ধর্ম/ধর্মভাব বোঝার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র।’ আমরা দেখছি ধর্ম তার স্তরভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সামাজিক ক্ষমতা ও বিন্যাস নির্দিষ্ট করে দেয় এবং এটা অগ্রাহ্য করার চেষ্টা হবে ভয়ংকর উদাসীনতা।
আমরা ইতিহাসে অনেকবার দেখেছি ধর্মবোধ কিভাবে অনেক বড় বড় আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে এবং রাজনীতি ও ধর্ম একে অপরের প্রতি কী ভীষণ ভাবেই না নির্ভরশীল। একাত্তরে ধর্মকে ব্যবহার করে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আমরা মুণ্ডাদের আন্দোলন থেকে দেখেছি কিভাবে একজন রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলনের নেতাকে পরবর্তী সময়ে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ধর্মীয় নেতায় পরিণত হতে হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিসকোর্সে ইসলাম বরাবরই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে এবং বর্তমানে তা আরও প্রবল। আমরা দেখছি ধর্ম নিয়ে কি অধর্মটাই না চলছে প্রতি মুহূর্তে।  ইসলামকে সামনে রেখে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে দেশ। প্রতিদিন অজস্র মৃত্যু ঘটছে ইসলাম রক্ষার্থে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে দাড়িটুপি পরে কেউ ঘোরাঘুরি করলে পুলিশ তার দিকে আড়চোখে তাকায় আবার চাঁদের বুকে সালোয়ার হোসেন বাইজীকে না দেখতে পেলে হুজুর সাহেব মন খারাপ করেন। একদল ধর্ম বাঁচানোর কথা বলে আবার আরেক দল তাদের হাত থেকে ধর্ম উদ্ধারের প্রতিশ্র“তি দিয়ে মানুষ মেরে চলেছে। দু পক্ষের মধ্যে অনেক অজ্ঞতা আছে, আছে পরস্পরের পরস্পর সম্পর্কে ধারণা নামের আবর্জনা। আধুনিক সমাজের চিন্তা চেতনা সম্পর্কে এ দেশের নিম্নবর্গীয় মুসলমানরা কিছু জানে না আর নিম্নবর্গের মধ্যে যে ইসলামের ধারণা সে সম্পর্কে কিছু জানে না ক্ষমতাবান আধুনিক সমাজ। সমাজের সবচেয়ে আধুনিকতম সংগঠন রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এখন যেতে চায় সব দল। তাই গায়ের জোরে তাদের পিছিয়ে পড়া জঙ্গি সংগঠন হয়ত আমরা বলতে পারব কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হবে কি? আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শাপলা চত্বরের ওই মানুষগুলোকে আমরা কিভাবে ফেস করবো, তারা কি ততটুকু গুরুত্ব পাবে যতটুকু পেয়েছে শাহবাগ? আমাদের আরো সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি ধর্ম ও যুদ্ধাপরাধকে গুলিয়ে ফেলবো? আমাদের খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন ইসলামকে বেছে নেব, যে ইসলাম সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার দাসত্বের সম্পর্কের কথা বলছে, নাকি যে ইসলাম সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রেমের সম্পর্কের কথা বলছে? যে ইসলাম বলছে :
‘রক্ত দেখলে কাঁপবে কেন মুসলিমের অন্তরগো? অন্তরে রাইখো আল্লাহর ডর।’
নাকি যে ইসলাম বলছে :
‘কোরবানি করিতে হুকুম অতি প্রিয়জন, গরু ছাগল হইল কি তোর এতই আপনজন? নিজের থেকে প্রিয় বস্তু আর যে কিছু নাইগো, প্রেম রাখিয়ো অন্তরের ভিতর।’

স্নান-৩২ এর সম্পাদক : হাসিব হাসান রনি

স্নান ৩১

সম্পাদকীয়

আমরা এখন বন্দি। বন্দি বর্ণবৃত্তের মধ্যে। গন্তব্য শেষ হয়েছে ইনবক্সে। আমরা এখন বড় বর্ণশিল্পী। আমাদের চুম্বন, আলিঙ্গন, পাশে ঘেঁষে থাকার ইচ্ছা, আবেগের আতিশয্য, হৃদকম্পন, গন্ধ মেখে থাকার করুণ আকুতি সবগুলো আজ বর্ণ বিনিময়ে। তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখার শব্দগুলো গ্রাস করেছে চকচকে ঝনঝনে বিদেশি মেমসাহেবেরা। অমানবিক প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। তবুও মরচেপড়া অনুভূতি মাঝে মাঝে উঁকি দেয়। আর তখনই ইচ্ছে করে, জড়িয়ে থাকি তোমার কোমর, বৃষ্টিস্নাত কোনো সন্ধ্যায় এক রিক্সায় জড়োসড়ো হয়ে বসি, বাদাম চিবুই কোন কদম গাছের নিচে কিংবা ধূমায়িত এক পেয়ালা চায়ে ওষ্ঠ ছোঁয়ার চেষ্টায় মত্ত থাকি। কিন্তু হায়! এখনো আলাদা করতে পারি নি তোমাকে, তোমার শব্দগুলোকে।
বেণিচুলে লালফিতের নকশা, ঘরজুড়ে নূপুরের শব্দ, নাকফুলে মতির পাথর, হাত ভরা কাঁচের চুরি, পায়ের পাতায় আলতায় মানচিত্র এইসবের পুনরাবৃত্তি আত্মসম্ভ্রমে বাধে। হয়তো তোমাদেরও বাধে; দূরত্বের কারণে। এই নিয়ে আর কথা বলছি না, বর্ণবমি করছে আমাদের আঙুল। ডিভাইসের চার্জ গেলেই কেবল বন্ধ হয় বর্ণবমি। তবুও শেষ রাতে স্বপ্ন দেখি। হয়তো ভুলে। মানুষ হবার। তোমার মানুষ।

কবিতা

রাসেল রহমান এর কবিতা
জীবন

মুক্ত মঞ্চ
অবাধ নৃত্য
অঢেল কাজ
সময় সীমিত

এরফানুর রহমান এর কবিতা
 মেমোয়ার

মফস্বলে বড় হচ্ছিলাম, হতে হতে ছোট হচ্ছিলাম, আমরা তখন লায়েক হচ্ছি, সম্ভাব্য সকল উপায়ে একটু একটু করে শিখছি নারী দেহের রহস্য, আমাদের শিক্ষক ‘রাতের খেলা : দি নাইট কুইন’ সংবাদপত্র বিক্রয় কেন্দ্রে ভীতু বালকেরা ভীড় করে, চলে আসছে অশ্লীলতা মোবাইল ও পিসিতে শস্তায় অর্থাৎ আমাদের কৈশোর এভাবেই নষ্ট হয়ে যায়!
গিলে খায় ‘ও বিজলি চলে যেও না’’ কিন্তু, বিজলিরা থাকে না, চলে যায় বাতাসে! কানে আসে বিজলিরা কাকে জানি চুমু খায় কোথায় কোথায় কোথায়? শুধু স্ক্যান্ডালের শ্বাস শোনা যায় প্রতিধ্বনি তুলে, ঘুমের মধ্যে বারবার আমাদের ঘুম ভেঙে যায়, এ ওর ঠ্যাং ভাঙে এখানে ওখানে মারপিট!
মাঝে মধ্যে অপ্সরী দেখি ক্রিশ্চান কলোনির ছাদে, ওরা ভালো, শুনতে পাই, ওরাও আহলে কেতাব খালি শুয়োরের মাংস আর মদটা না খেলেই…!
ঘুম ঘুম ক্লাসরুম, জেগে দেখি আমার সামনে ম্যাম, ম্যামের সামনে আমি, আমাদের দুজনার মাঝে মহাজাগতিক দূরত্ব, শেষ ল্যাব করেছি ছ’মাস পূর্বে সম্ভবত, ম্যাম তাই ‘চিনতে পারছি না’ নজরে তাকাচ্ছেন, আমার প্র্যাকটিকাল খাতা কেয়ামতের আগেই সাইন করাবো!
আমার বন্ধু মাহিন জীবনে মেলা প্ল্যান করেছে, আহা দু’একটা ছাড়া অধিকাংশই পূরণ হয় নাই তার, আমার বন্ধু সাকিব কখনো কোনো প্ল্যান করে না। জীবন ওর জন্য নির্মম প্ল্যান করেছে একটা, আর রায়হানের জন্যও রিয়াদটা প্রতিটি জন্মদিনে পাঠিয়ে গেছে শুভেচ্ছার বার্তা, নম্বর অন্য ছিলো; আমি বোকা বুঝতে পারি নি!
প্রথম কবিতা লিখেছিলাম বিপাশা বিনতে সাদাতের নামে, তবে সে উছিলা, ছিল লক্ষ্য অন্য কেউ ভুলে গেছি, ভুলে যাই, ভুলে যেতে হয়! বনানী বিশ্বাসের সাথে কোনোদিনই কথা কই নাই। সাকিবের ভাষায়- তারে না-কি ক্লাসরুমে মাঝে মাঝে ঘুমাইলে বিলাইয়ের লাহান লাগতো, মাইয়া নিদ্রায়ও নিশ্চিত হেফজ করতাসে কৌণিক গতিসূত্র, বিলাইটা আমারে ভাইয়ের নজরে দ্যাখে মেলা দিন, ‘ভাইয়ের কপালে দিলেম ফোঁটা, শত্তুর সব পড়লো কাঁটা!’
বাইরে বাইরে নাগরিক কমই জানে, টের পায়, বুঝতে পারে, যে একটা মফস্বলের মানুষ, আধাখ্যাত, নিক্রপলিসে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

নিষুপ্ত শিশুক্ষু এর কবিতা
জীবন যখন যেমন

অনুভূতির জীব আমি পৃথিবীর জীব
বড়ো ছোটো ব্যাকুলতা আমার সর্বসাকুল্যে।
নতুন সুখ-মুখ-ওষ্ঠের ছোঁয়া চাই। পাই। কিন্তু!
যদি বলি, এই সবুজ, এই আদর, খোলা যৌবন
খই খাওয়ার দিন আঁকড়ে রাখবো, নাহ্! সব গুড়েবালি!
নশ্বর সব নশ্বর!
যেনো আমার প্রাণ নেই বস্তুর কাছে, তোর কাছে।
‘মহাকাল’ তুই বড়ো হারামজাদা, নেমকহারাম।
নয়ন দুটিও হারাতে হয় তোর গহ্বরে।

দেবদারু এর কবিতা
৫০-৫০

আর যেভাবেই হোক
ফিরে আসার সম্ভাবনা
ঐ নীল বিলবোর্ডে লেখা আছে।
অযাচিত ভাবে পা ফসকে পড়তে পারো।
আমি প্রস্তুত আছি; এবং
বলে রেখেছি মাকড়শাকে
শক্ত একটা পুরোট জাল পেতে রেখো।
ঝিঁঝিঁ পোকার ব্যান্ড দলে
এক্সপার্ট অনুপস্থিত,
টেনশনটা বড় খোঁচাচ্ছে
কে তখন নেতৃত্ব দেবেÑ
মিলনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে?
বসন্ত নেই বলে কোকিল সফরে
গীতিকার শালিক গান বেঁধে বসে আছে।
শিল্পীর বড় আকাল, দোয়েলও দৃষ্টির বাইরে।
গতকাল মৌমাছিরা এসে
বেশ শাসিয়ে গেল
মধু দিয়ে বানানো মিষ্টিগুলোতে
পিঁপড়া ধরেছে
আর যে ভাবেই হোক
ফিরে আসার সম্ভাবনা
ঐ নীল বিলবোর্ডে লেখা আছে।

ভাঙন সরকার এর কবিতা
সঙ্কট

আমি! আমি হাসনাহেনা ফুলের কচি গাছটি
যার সূর্যের কড়া উত্তাপের ভয়-
ঝিমিয়ে পড়ার, চুপসে যাওয়ার
আর বাতাস; সেও তো আগ্রাসী বৈশাখী ঝড়।
কচি ডালটি; সদ্য বিকশিত চূড়াটি ভাঙ্তেই
তার যত বাহাদুরী।
আর! আর অচল নগ্ন বেড়া!
তারও তো আত্মপক্ষ সমর্থনের সামান্য ফুসরত নেই
দায় মেটাতেই পড়ে বেশরম কালো চশমা।
আমি কি আর সুবাস ছড়াবো না?

রহমতে রাব্বী এর কবিতা
অসংজ্ঞায়িত তরঙ্গ

ফিরে এসেছি আবার শব্দহীন চাঁদ ডোবার পর
হেমন্তের শিশিরভেজা অদ্ভুত রাতের আঁধারে
ছেঁড়া চাঁদের মতো আকাশের নিচে বাসি রজনীগন্ধার
সুবাস আর হৃদয়ের কালো কাঁচে কলঙ্কের আস্তরণ।
আবার যদি নির্বাসন দাও আমার আত্মাকে
পৃথিবীর কুৎসিত মুখে আনন্দে ভেংচি কাটবে
সূর্যের বুকে পদচিহ্ন এঁকে স্বর্গ পেরিয়ে যাবো
কোন নির্জন স্থানে নগ্ন বালির দেশে প্রসন্ন মুখে।
বটগাছের ঝুলন্ত শাখায় ঝুলে আত্মহত্যা করবে না
তমসায় তামাশা দেখা অভ্যাস হয়ে গেছে
শকুনের ভাঙা ডানার নিচে কুৎসিত বসবাস
অসহ্য বিলাপ করে শহীদের রক্ত আর সীমারেখা।
নেমপ্লেট নেই বলে লাথি খাই তবু দুঃখ নেই
ভয় হয় মানুষের সংজ্ঞা নিয়ে বিব্রত মানসিকতায়
আজ হয়তো হেরে গেছি অসম্ভবের দ্বারপ্রান্তে এসে
ঝলসে ওঠা দুপুরে তবু বিকারগ্রস্ত হয়ে ফিরতে চাই।
জানি না ততক্ষণ সবাই গর্তের সন্ধানে বেরুবে কিনা
মৃত পেঁচার ডানা ছিঁড়ে আকাশযান বানিয়ে রওনা দেব
কাপুরুষতার নয় ঘৃণ্যতার সাক্ষী হয়ে
বসে থাকবো হলদে রুটির দোকানে চিরকাল।

তৌহিদুর রহমান এর কবিতা
একটা দ্বিতীয় মুক্তি

একটা শক্ত হাত
করবে পরিষ্কার আবর্জনা-জঞ্জাল
ধরবে সত্য-ন্যায়ের হাল
দিবে তুলে অনাহারির মুখে আহার
আবার ভাঙ্বে একাত্তরের সবিষদের বিষ দাঁত।
একটা দৃঢ় পা
দাঁড়াবে পাশে দুঃস্থের, আসে যদি বিপদ
মারবে লাথি ভাঙবে শৃঙ্খল
মুক্তি পাবে সচ্ছলতা
আসবে শান্তি  বইবে সুখের হাওয়া।
একটা সাম্যের চোখ
দেখাবে এগিয়ে যাওয়ার স্বপন
অন্ধকার দিগন্তের পর সেখানে সোনালি গগন
অচল-অসহায় যারা
তাদের দেবে পাহারা নিয়ে চাতক চোখ।
একটা দরাজ বুক
শুধু দিয়ে যাবে নেবে না কিছু
দুঃখ-কষ্ট, মৃত্যু যতই নেয় পিছু
হাজার মৃত্যু করে আলিঙ্গন
গড়বে মুক্তির পার্বণ, আসবে শান্তি-সুখ।
হে মৃত্যু বিলাসী যুবক!
নাও শপথ, করো না-কো দেরি
তিতুমীর, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম
যে পথে জান করেছে বলিদান
বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে পথে দিয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ
আজই করতে হবে, সে পথের দ্বিতীয় মুক্তি।

এইচ.এম. এরশাদ এর কবিতা
পরিহাস

মজলিশি বিবেকের পরিহাসে ক্লান্ত মানুষ
জীবনের মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত
অসহায় ভাইরাসে প্রতিবন্ধী আজীবন
জ্ঞানীরা মুচকি হাসে এন্টিভাইরাস নেই চা চক্রে
৭১ এর প্রতিবাদীরা অসুস্থ ক্ষমতাহীন
চেয়ে থাকে শিশুর মত।
লুকানো দুঃখ আজও হরিপদ কেরানির মতো
অথবা ক্যামেলিয়াকে না পাওয়ার মতো গোপন
এজন্যই দেশ আজ হিংসা বিহারে
রামুর ট্র্যাজেডি নিত্য ঘটে।
১, ২, শত সংখ্যা দ্রুত যায় বেড়ে
ঠিকানাহীন মাংসহীন দেহ প্ল্যাকার্ড হাতে
কেন ভেসে যায় লাশের মিছিলে জুরাইনে
ক্ষুধার্তকে ক্ষুধার্ত আগুন খেয়েছে
অশ্রু সেখানে পেট্টোলিয়াম অকটেন
মায়াজাল সংসার, রানা প্লাজার মতো শক্ত
প্রেমময় নরম আগুনের মতো লালচে
কেন নিত্য
লাল সবুজের পাশে কালো পতাকা কাঁপে
সময় অশ্রুত
আগুন কি নেভে আর্তনাদের বৃষ্টিতে
মিডিয়ার হুঙ্কার
চলছে এখনও দেখ ব্যস্ত মধ্যরাতে
কেন ওরাই শুধু? আমাদেরও  জীবন যাবে পরিহাসে
না খেয়ে শ্যাভিজমোর আর্তনাদে।

রোমিও এর কবিতা
বিস্ময়ে তুমি

সবুজের বুক চিরে অজানায়
কতবার শিশিরে ভিজে
আমি বিস্ময়ে তাকিয়েছি
এ মাটির স্বর্গ সুন্দরে।
শৈশবের পাল ছেঁড়া সে জীবন
কখন, কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে
ছুটে চলেছে জীবনের আঁকেবাঁকে।
পড়ে থাকে জীবনের শত অবসাদ
প্রকৃতির শৈল্পিক মঞ্চে।
রূপালি জোস্নার নিশ্চুপ রাতে
বাতাসের গন্ধে মিশে থাকা জীবন
যেন জীবনের সব সুখটুকু আলিঙ্গনে
হেঁটে চলেছে সাত সমুদ্দুর।
খেয়ালি মনের কত স্বপ্ন
অঝোরে বৃষ্টি হবে বলে
থেমে নেই। ছুটে চলেছে
এ বাংলার অপার সৌন্দর্যে
স্বর্ণালি সন্ধ্যার শ্রাবণ স্বপনে।

অতন্দ্র অনিঃশেষ এর কবিতা
মতান্তরে

যে দিন তোমায় শেষবার দেখি
মনে হয়েছিল
এ রাত শুধু তারকাদেরই বসবাস নয়।
একবার বিচরণ আর একবার সহমরণ
নাকি একবারই সহবাস
দুই পক্ষের সাধক আমি নই।
হয় তুমি আমাকে নরকে নিয়েছো
না হয় আমি তোমাকে
তবে একসাথে নরকে যেতেও রাজি
তুমি তো স্বর্গে যেতেও ভয় পাও
সন্দেহ তোমার
এখানে কি সত্যিই সুখ পাওয়া যায়!
দীপাদের বাগানে আজও আমি একাই ফুল কুড়াতে যাই।

ফয়সাল ইসলাম এর কবিতা
অতঃপর

অস্তিত্ব আমার ঝাপসা হয়ে আসে
চাওয়া ও পাওয়ার অসম সমীকরণে
এটা, ওটা না সেটা; এই অস্বাভাবিক হিসেবে
গরমিলগুলো সব বজ্রাহত করে,
ভীষণ বেগে ধেয়ে আসে,
ঠিক যেমন ছোঁ মেরে চিল নিয়ে যায় মুরগিছানা।
জীবনের অপূর্ণতা চিড়ে চ্যাপ্টা করে দেয়
জাগতিক কোলাহল মুখরিত আমার চারপাশ,
আমি চোখ বুঁজলেই দেখতে পাই
আমার অস্তিত্ব ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে!
চাওয়া ও পাওয়ার অসম সমীকরণে
এটা, ওটা না সেটা?
আজ বড় বেশি মনে পড়ে!
শুরুর সেই দিনগুলো
ছিল না কোনো পিছুটান, ছিল না কোন অভিমান
শুধু আনন্দ আহরণ, আর সন্ধ্যা হলে
বাড়ি ফিরে মায়ের মৃদু বকুনি।
তবু কি অনন্ত সুখের ছিল না দিনগুলি?
ধীরে ধীরে ভাবনা এসে ঘিরে ধরে আমায়
‘এটা করো, নাকি ঐটা’ চিন্তাগুলো
তীক্ষè ফলার মতো ছেদ করা শুরু করে
আমার শরীর, আমার মন।
তারপর, যখন মেলে না হিসাব
কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আমার অস্তিত্ব, আর
ডানাহীন আহত পাখির মতো
আহত করে যায় আমায়।
অতঃপর
শূন্য আমি, ধ্বংস আমি
মিলিয়ে যেতে থাকি আমার অস্তিত্বে
যেখানে শুরু হয়েছিল আমার যাত্রা
আমাদের সকলেরই কি নয়?
আসা-যাওয়ার মাঝে এই সময়
কি নিষ্ঠুর, কি ছলনাময়!
এইতো এদিকে, না, না, ঐ দিকে
এটা, ওটা না সেটা?
কখনও রবিঠাকুর, কখনও নজরুল, কখনও বা
কিশোর, সুকান্ত। আবার কখনও জীবনানন্দ,
কখনও বা নকশী কাঁথার মাঠ হয়ে
ঐ দূর দেশের শেক্সপিয়র এর অফুরন্ত
ভাণ্ডার। কখনও গালিভার, কখনও লিলিপুট
ব্রব্ডিগ্নাগ্ ও কি নয়?
এই এখন হেক্টর, এখনই এ্যাকিলিস
এখনই আবার শাইলক, এখনই পলিটিক্স
কি চাই আমি, কি সঠিক আমার?
প্রশ্নই শুধু আসে মনে; উত্তর?
সেটা পাওয়ার নয়।
রোমান কলোসিয়ামের গ্লাডিয়েটর আমি?
হতে-তো চাই। কিন্তু সে ভাগ্যও আমার নয়।
নিজেকে হারিয়ে খুঁজি আজ
আমার আমি আজ নাই।
চাওয়া ও পাওয়ার অসম সমীকরণে
এটা, ওটা না সেটা-গরমিলের এই হিসেবে
অশান্ত, বিক্ষিপ্ত, কোলাহলপূর্ণ এই ধরণীতে
এইতো এদিকে; না, না, ঐদিকে
আসলে কোন দিকে?
প্রশ্নগুলো শুধু ঘুরপাক খায়
আমাকে চিড়ে চ্যাপ্টা করে দিয়ে যায়
আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়,
ঝাপসা হয়ে যায়
আমাকে বজ্রাহত করে যায় ॥
অতঃপর
শূন্য আমি, ধ্বংস আমি, রিক্ত আমি
মিলিয়ে যেতে থাকি আমার অস্তিত্বে
যেখানে শুরু হয়েছিল আমার যাত্রা।
আমাদের সকলেরই কি নয়?