অনুপম সেন : এক সুসংস্কৃত মন ও মনন

লেখক : মহীবুল আজিজ

অমর্ত্য সেনের দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান বইটি পড়তে গিয়ে বিস্ময়ভরে ভাবি, ইনিই কী পোভার্টি এ্যান্ড ফ্যামিন্স গ্রন্থেরও রচয়িতা। ভারতবর্ষ ও বিশ্বের ইতিহাস, সংস্কৃতি-দর্শন, রবীন্দ্রনাথ, নারী-পুরুষ বিষমতা, পারমাণবিক ভীতি, ভারতীয় পঞ্জিকা, ইংরেজি সাহিত্য, রাজনীতি— এতো বিচিত্র বিষয়ে এমন সহজগম্যতা একজন অর্থনীতিবিদের হয় কী করে! তখন বুঝতে পারি, আমি বস্তুত ব্যষ্টিবিদ্যার দৃষ্টিতে মননের মূল্যায়নে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। ধ্র“পদী দৃষ্টিতে অর্থাৎ পে¬টো-অ্যারিস্টটলের সময়ে তাঁকেই প্রকৃত জ্ঞানী বলে বিবেচনা করা হতো যিনি নানান বিষয়ে জ্ঞান ধারণ করেন। ফলে এক অ্যারিস্টটলই সাহিত্য-মানবশরীর-বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-তুলনাবিদ্যা ইত্যাদি বহু বিষয়ে জ্ঞানের সন্ধান দেন। সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের রচনাবলী পাঠ করতে গিয়েও এরকম একটি অনুভূতি কাজ করে আমার ভেতরে। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ, দ্য স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়্যালাইজেশন এ্যান্ড ক্লাস ফরমেশন্স ইন ইন্ডিয়া, যেটি তাঁকে বিশ্ব-পরিচিতি এনে দিয়েছে তাঁর পক্ষে বাংলাদেশ : রাষ্ট্র ও সমাজ — সামাজিক অর্থনীতির স্বরূপ গ্রন্থটিও রচনা সম্ভবপর। হোক না সে-গ্রন্থ বাংলা-ভাষায়, তবুও। এমনকি ব্যক্তি ও রাষ্ট্র : সমাজ-বিন্যাস ও সমাজ-দর্শনের আলোকে নামধেয় গ্রন্থটিও হতে পারে তাঁর সমাজবিজ্ঞানী-বিশে¬ষণের অন্যতর একটি মাত্রা। কিন্তু একে-একে যখন মেলে ধরি তাঁর রচিত গ্রন্থ— বাংলা তুলনামূলক সমালোচনা সাহিত্যের নির্মাতা কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন, বাংলাদেশ ও বাঙালি : রেনেসাঁস, স্বাধীনতা-চিন্তা ও আত্মানুসন্ধান, আদি-অন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূত-ভবিষ্যৎ, বিলসিত শব্দগুচ্ছ : প্রতীচী ও প্রাচ্যের কয়েকটি কালজয়ী কবিতার অনুবাদ কিংবা সুন্দরের বিচার সভাতে অথবা নানা কথা নানা ভাবনা নানা অর্ঘ্য, আমার বোধোদয় হয়, এক সুকঠিন সাধন-পথের পথিক অনুপম সেন যে-পথের প্রান্তে পৌঁছালে সেই ধ্র“পদী জ্ঞানীদের সন্ধান লাভ করা যায় যাঁরা আজকের ব্যষ্টিবিদ্যার যুগে ক্রমশ দুর্লভ হয়ে পড়ছেন।

অনুপম সেন সমাজবিজ্ঞানী— একথা বললে তাঁর সম্পর্কে সত্য বলা হয় কিন্তু তিনি কেবল সমাজবিজ্ঞানী, একথা বললে তাঁর সম্পর্কে পুরোপুরি সত্য বলা হয় না। সেই সমাজবিজ্ঞান তাঁর অন্বিষ্ট নয় যে-সমাজবিজ্ঞান নিরেট তত্ত্বের নিরিখে সমাজকে অধ্যয়ন করে এবং প্রকাশ করে অধীত জ্ঞানের ফল। তাঁর অন্বিষ্ট সেই বিজ্ঞান যা ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি-দর্শন-অধিকার-সাম্য-সংগ্রাম ইত্যাকার সমস্ত বিবেচনার সমন্বয়ে যূথবদ্ধ মানবের মুকুর হয়ে ওঠে। তাঁর সেই বিজ্ঞান-অভিমুখী মনটি অনেককাল আগেই পেরিয়ে আসে এক শ্রমসাধ্য প্রস্তুতিপর্ব যার সাক্ষ্য তাঁরই রচিত একটি প্রবন্ধ (১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলাদেশ : রাষ্ট্র ও সমাজ — সামাজিক অর্থনীতির স্বরূপ দ্রষ্টব্য।) এই প্রবন্ধটিকে বলা যায় তাঁর পরবর্তী কর্মসমূহের সার্থক প্রেল্যুড। এটি তাঁর একত্রিশ বছর বয়সের রচনাকর্ম। তখন তিনি কলকাতায়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রকালে। এটি মুদ্রিত হয় বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক নানান বিষয়ে সমৃদ্ধ সংকলন রক্তাক্ত বাংলায়। ‘বাংলাদেশ-সংগ্রামের সামাজিক পটভূমি’ শীর্ষক এ-প্রবন্ধটি শুধু যে অনুপম সেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ তা-ই নয়, এটি বাংলাদেশেরও একটি শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। বাংলাদেশ সম্পর্কে কিস্সু জানে না, এমন লোককেও যদি ১৯-পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধ পাঠ করতে দেওয়া হয় তিনি এই দেশ ও জাতির হাজার বছরের ইতিহাস-পরিক্রমা, জাতিতত্ত্ব, শোষণ-সংগ্রামের পটভূমি সম্পর্কে লাভ করবেন একটি আয়ত অভিজ্ঞতা।

নিঃসন্দেহে প্রবন্ধটি রচিত হয়েছিলো সময়ের প্রয়োজনে। বাংলাদেশের সমষ্টিবদ্ধ মানুষের সমগ্র ঐতিহাসিক জীবনের মর্ম ও আবেগ, অভিপ্রায় ও বাস্তবতা এবং এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণের বিস্তৃত পটভূমি উপস্থাপিত হয়েছে তীক্ষèভাবে। বলাবাহুল্য এরকম বিষয়নির্ভর প্রবন্ধও এটিই প্রথম। এখানে খানিকটা তুলনামূলক অনুষঙ্গ অনুপম সেনের প্রবন্ধটির মৌলিকতাকে আরও বিশদ করতে পারে। তাঁর এ-প্রবন্ধের কাছাকাছি সময়ে (অল্প আগে ও পরে) ইংরেজি ভাষায় প্রবন্ধ রচনা করেছেন হাসান গারদেজি, তারিক আলী এবং হামজা আলাভি। সেসব প্রবন্ধ ছাপা হয় পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জার্নালে। ইংরেজিতে রচিত হলেও সেসব প্রবন্ধের কোনোটাই বক্তব্য ও যুক্তির দিক থেকে অনুপম সেনের উপর্যুক্ত প্রবন্ধের সমকক্ষ নয়। অনুপম সেনের প্রবন্ধের তুলনামূলক শ্রেয়োত্ব এখানেও যে তাঁর  প্রবন্ধটি  পূর্বোক্ত  প্রবন্ধগুলোর পাঠ-অভিজ্ঞতাবিহীন। কেননা তিনি যখন তাঁর প্রবন্ধ লিখছেন তখন একই সময়কালে পাশ্চাত্যেও রচিত হচ্ছে ঐ প্রবন্ধগুলো। প্রসঙ্গত বলা যায় রওনক জাহানের বিখ্যাত গবেষণা-গ্রন্থ পাকিস্তান : ফেইল্যুর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন-এর কথাও যেটি প্রকাশ পায় ১৯৭২ সালে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। একটি জাতির অন্তর্গত সত্তার পুঞ্জীভূত আবেগের ভাষাগত অভিপ্রকাশ অনুপম সেনের এই প্রবন্ধ। এতে রচয়িতার দেশপ্রেম-জাতিপ্রেম-ভাষাপ্রেম প্রবলভাবে উচ্ছ্বসিত কিন্তু তা আবেগের তোড়ে ভেসে যাওয়ার নয় বরং এক নির্মোহ ও যুক্তিপূর্ণ আঙ্গিকে এক নয়া ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর ইতিহাস উন্মোচিত এতে। প্রবন্ধটি একটি দেশ-জাতি-সংগ্রামের চলমান সময়ে রচিত হয়ে অর্জন করেছে পথিকৃতের ভূমিকা। পরবর্তীতে এমন বিষয়ে আরও প্রবন্ধ আমরা পাই কিন্তু অনুপম সেন রচিত প্রবন্ধটি এক গৌরবময় উদ্বোধক নিশান হয়ে রয়েছে।

প্রবন্ধটি নানা কারণেই উলে¬খযোগ্য। এটি অর্জন করছে হাজার বছরের পরিক্রমায় একটি জাতির জন্ম-জয়ের অভিজ্ঞতা এবং এটির মধ্য দিয়েই আভাসিত হয়ে উঠেছেন ভবিষ্যতের একজন সমাজবিজ্ঞানী। ভবিতব্যের একজন সমাজবিজ্ঞানী-সত্তার উদ্গমের জন্যে একটি জাতির অভ্যুদয়ের সমাপতনিক কালকে অনন্যসাধারণ বলেই অভিহিত করা যায়। প্রবন্ধটিতে আছে নানারকম পরিসংখ্যানের ফল, গাণিতিক হিসেব-নিকেশের প্রসঙ্গ এবং বেশ কয়েকটি ইংরেজি শব্দ ও শব্দবন্ধের ব্যবহার। কিন্তু পরিসংখ্যান-গণিত এবং হিসেব-নিকেশ প্রভৃতি প্রবন্ধটির ক্ষেত্রে অপরিহার্য বলেই ধরে নিতে হয়। ভাষাগত বিচারেও বলা যায়, প্রচলিত সাহিত্যতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই প্রবন্ধের ভাষার বিচার চলে না। এর ভাষা একান্তভাবেই এর বিষয়ানুগামী এবং এর ভাষা সম্পূর্ণরূপে সমাজতাত্ত্বিক কাঠামো-আশ্রয়ী। সব মিলিয়ে এটি একটি অনন্য প্রবন্ধশিল্প। এরই সম্প্রসারিত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন লক্ষ করা যাবে আলোচ্য প্রবন্ধের কয়েক বছর পরে (১৯৭৩-১৯৭৯) অনুপম সেনকৃত গবেষণাকর্মের মধ্যে এবং যেটির ফলিত রূপ পাওয়া যায় ১৯৮২ সালে তাঁর পিএইচডি-অভিসন্দর্ভের গ্রন্থাবদ্ধ প্রকাশে।

অনুপম সেনের ব্যক্তিগত অনুভূতি জাতিগত অনুভূতির আশ্রয়ে প্রকাশিত হয়ে তৎকালে একজন মানবিক সমাজবিজ্ঞানীকেই হাজির করেছিলো, যদিও বাস্তবে তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জন করবেন আরও বেশ কয়েক বছর পরে। তাঁর গবেষণা-অভিসন্দর্ভের মধ্য দিয়ে তিনি যে একজন নিউ-মার্ক্সিস্ট সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে আবির্ভূত হবেন সেটি হয়তো ডেসটিনি’র মতো নির্ধারিত হয়ে যায় ১৯৭১-এই। ঠিক এই জায়গাটাতে আমি আরও খানিকটা পেছনে যেতে চাই। বলেছি মাত্র একত্রিশ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন মৌলিক প্রতিভাসম্পন্ন একজন রচয়িতা। কিন্তু এরও তো একটা হয়ে-ওঠার পটভূমি থাকা সম্ভব। সেই পটভূমিটি আমরা পাই তাঁরই লেখা জীবনের পথে প্রান্তরে নামক গ্রন্থে। চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট দশকের চট্টগ্রামের কি সমকালের চমৎকার কিছু চিত্র উঠে আসে তাঁর কথকতায়। চট্টগ্রাম শহর, তাঁর গ্রাম ধলঘাট, গ্রামের বিদ্যালয়, শহুরে স্কুল, বিভিন্ন শিক্ষক, সমকালীন সমাজ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাড়িতে সাহিত্যের আবহাওয়া, বিশ্বসাহিত্যে উৎসাহ— এসব স্মৃতির চূর্ণ জোড়া দিয়ে আমরা এক ব্যক্তিত্বের পরিগঠনে অগ্রসর হতে পারি। অথচ এরও নেপথ্যে পরিব্যাপ্ত বেদনা ও বিষাদের পটভূমি— শৈশবে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আর তা কেবল অভিজ্ঞতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, এর পরিণাম ছিলো দূরপ্রসারী। তাঁর লেখা থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি— ‘আমার অনেকগুলো দুঃখের বিশেষ রূপ রয়েছে। তার প্রথমটি হলো, গ্রামের বাড়িতে সেজদি’র মৃত্যু। দ্বিতীয়, বাবার মৃত্যু। বাবার মৃত্যু আমাদের অনাথ করেছিলো। আর্থিক সংকটে কিছুটা পড়েছিলাম। বাবার মৃত্যুতে আমার এবং আমার ইমিডিয়েট বড় বোনের জীবনে প্রায় বিপর্যয় নেমে আসার উপক্রম হয়েছিলো। মা’র বিচক্ষণতার কারণে আমরা বিপদমুক্ত হই, কিন্তু শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ার যন্ত্রণা যে কত কষ্টের, তা আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি।’ আট বছর বয়সে পিতৃহারা অনুপম সেনকে যে বাকি জীবনের পথ অতি ক্লেশের সঙ্গেই পেরিয়ে আসতে হয়েছে তা অনুমেয়।

ব্যক্তিগত কষ্ট এবং জাতিগত কষ্ট তাঁর সত্তায় জারণ-বিজারণ ঘটিয়ে তাঁকে উপনীত করে এক গভীর জীবনোপলব্ধির জগতে। তাঁর সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা অন্যতর রচনাকর্মের বিচার-বিশে¬ষণে সেটি প্রতিভাত হয়। তাঁর বুদ্ধিজীবিতা বরাবর মানবকল্যাণের সপক্ষে পরিচালিত হয়েছে এবং তাঁর জীবন ও কর্মের একটা বৃহৎ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে দায়বদ্ধতা— সুবিধাবাদবর্জিত স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন তাঁর এষণায় বিগত দশকের পর দশক সমাজ ও মানুষ ব্যতিরেকে অন্য কোনো ভাবনার ঠাঁই হয় নি। এটা একজন পারিবারিক-সামাজিক এবং নানারকম সম্পর্কের সূত্রে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তির জন্যে দুরূহ কিন্তু সেই দুরূহ গন্তব্যই অনুপম সেনের লক্ষ্য। তাঁর প্রবন্ধ-গদ্য কিংবা সাক্ষাৎকারগুলোতে দৃকপাত করবার কালে আমরা কোনোভাবেই তাঁর সামাজিক-সাংগঠনিক কর্মিষ্ঠাকে অবহেলা করতে পারি না বরং তাঁর রচয়িতা-সত্তাকে বলা যায় তাঁর কর্মী-সত্তার অপর পিঠ। চার দশকেরও অধিক কাল তাঁর অতিবাহিত হয়েছে শিক্ষকতায়। কেবল শিক্ষার আয়তনিক কাঠামোয় আবদ্ধ থেকে নিরাপদ-নিরাপোষ একটি জীবন বেছে নেওয়া তাঁর জন্য ছিলো সহজসাধ্য। সহজের মায়া ছেড়ে তিনি বেছে নেন দুর্গম যাত্রাপথকে যে-পথে ঝুঁকির সম্ভাবনা অহর্নিশ। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী দশকটিকে বলা যায় এদেশের ইতিহাসের সবচাইতে মারাত্মক ও জীবনবিপন্নকারী দশক। ষাট-সত্তরের আন্দোলন-সংগ্রাম আর কোলাহলে প্রগতির পতাকাশ্রয় থেকে একটুও না ছিটকে বাঙালির লড়াইয়ের মধ্যে নিজেকে প্রবলভাবে সংলগ্ন রাখার একাগ্রতা তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের মরণপণ স্রোতের মধ্যে। ১৯৭০-এ তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হ’ন। এসময় থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিকতা আর প্রাতিষ্ঠানিক দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাঙালির মুক্তির ন্যায্য সংগ্রামের বিশালতায় একাকার হয়ে যায় অন্যতর সকল রাজনীতি সকল সাংগঠনিকতা। আমরা দেখি তখন পশ্চিমবঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের তৎপরতায় ব্যস্ত সৈনিক— মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে যে-কমিটি গঠিত হয় অনুপম সেন নির্বাচিত হ’ন তার সমাজকল্যাণ সম্পাদক। তবে পশ্চিমবঙ্গে যাবার আগে চট্টগ্রাম শহরে পাকিস্তান-বিরোধী যেসব মিছিল-মিটিং-জমায়েত হয় সেসবের মধ্যে জোরালো ভূমিকা রাখেন তিনি এবং তাঁর মতো সমমনারা। সেসময়টাতে জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতিও দেখা দিয়েছিলো তাঁদের জীবনে— অনুপম সেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনও সেদিনের কথা, ‘সেই সময় আমরা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিলাম।’ স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতন্ত্রবিরোধী ও সামরিক স্বৈরাচার কবলিত করাল কালে অনুপম সেনের সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান থাকে সংগ্রামী সমষ্টিবদ্ধ মানুষের কাতারে। শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির যে-স্মরণীয় উদ্যোগ এদেশকে রাহুগ্রাস-মুক্ত করবার পথে গর্বিত পদক্ষেপে এগোয় তাতে সারথী হ’ন তিনিও। সামরিক স্বৈরাচার বিশেষত এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনেও তিনি থাকেন অগ্রভাগে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মস্থল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা চালিয়ে যাওয়া, শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিজেকে সামিল রাখা এসবই করতে হয় বহুতর ঝুঁকির মধ্য দিয়ে। আমরা এ-ও জানতে পাই নিজের এমন আপোষহীন ভূমিকার কারণে তাঁকে নানারূপ রোষ-হুমকির শিকারও হতে হয়েছিলো কিন্তু সেখানেও তিনি নির্ভীক সৈনিক।

১৯৭১-এ যে-প্রবন্ধ তিনি রচনা করেন সেটি ছিলো তাঁর দেশপ্রেমিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার-জাত এবং সে-প্রবন্ধের একটি ইংরেজি সংস্করণও তিনি তৈরি করে দেন আবু সয়ীদ আইয়ুব সম্পাদিত ‘কোয়েস্ট’ পত্রিকায় ছাপবার জন্য। বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যৌক্তিক পটভূমি, পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ, ছয় দফার ন্যায্যতা প্রভৃতি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেবার তাগিদেই অনুপম সেনের সেই উদ্যোগ। স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁর সেই লেখনী অব্যাহত। দেশ স্বাধীন হলেও এক দীর্ঘ শোষণ-বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বাধীনতার মূল্য ও অধিকার হরণের ক্রীড়া থেকে যায় চলমান। অনুপম সেনের সমাজভাবনামূলক প্রবন্ধসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেসবের মধ্যে নিহিত রয়েছে সুগভীর জীবনদর্শন এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে যে-অভিসন্দর্ভ রচনা করেন সেটিও তাঁর মানবিক-মৌলিক ও দেশপ্রেমিক প্রেরণাস্পর্শিত। মার্ক্সবাদকে অনড়-স্থির মতবাদ হিসেবে না নিয়ে এর মধ্য থেকে সৃজনশীল সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় অনুপম সেন সেই প্রচেষ্টা চালান তাঁর গবেষণাকর্মে। একই সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্বকেও কাজে লাগিয়ে মার্ক্স-ওয়েবারীয় তথা নিউ মার্ক্সীয় দৃষ্টিতে তিনি ভারতবর্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর বিবর্তন, শ্রেণিসমূহের উদ্ভব ও বিবর্তন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিলয়ে শিল্প ও বাণিজ্য অর্থনীতির উদ্ভব ও বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতকে বিশ্লেষণ করেছেন। অসাধারণ শ্রম এবং নিষ্ঠার ফসল তাঁর এই গবেষণাকর্ম। তিনি দেখান, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষে কোনোভাবেই আদি পুঁজি গড়ে ওঠে নি যার ফলে পরবর্তীতে পুঁজি-ধারী ভারতবর্ষীয় নিজস্ব কোনো শ্রেণি তৈরি হয় নি। ব্রিটিশরাই ভারতে পুঁজির বিকাশ ঘটিয়েছে এবং বিকশিত ও পুঞ্জীভূত পুঁজিকে লুটপাট করে নিয়ে গেছে নিজেদের দেশে। পরিণামে বৃটেনে ঘটে শিল্প-বিপ্লব। ব্রিটিশ শাসনামলে কীভাবে জমিদার-মহাজন শ্রেণি, মধ্যবিত্ত, প্রলেতারিয়েত প্রভৃতি শ্রেণি ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রণের বৃত্তে গড়ে ওঠে তার তথ্যসংবলিত বিশে¬ষণ তিনি করেন। একই সঙ্গে ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা কীভাবে এই শ্রেণি-বিকাশের ক্ষেত্রে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করে তার তাত্ত্বিক সালতামামি তিনি দেন। মার্ক্স ও ম্যাক্স ওয়েবারীয়  তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগে এবং তাঁর নিজস্ব প্রকল্পে অনুপম সেন কেবল ভারতবর্ষের সামাজিক বিকাশের চিত্রই তুলে ধরেন না, ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে এক বিশাল সভ্যতা কীভাবে ক্রম-দুর্যোগের ভেতর দিয়ে নিঃস্বতার দ্বারে গিয়ে ঠেকে তার বৈজ্ঞানিক অপিচ মর্মস্পর্শী বিবরণ উপস্থাপন করেন। ১৯৭১-এ লেখা সেই বিখ্যাত প্রবন্ধের অন্তিমে আমরা দেখতে পাই প্রাবন্ধিক অনুপম সেনের স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজ উদ্গমের অপেক্ষায় প্রস্তুত। একইভাবে উচ্চশিক্ষার এই গবেষণাকর্মটিতেও আমরা তাঁর স্বপ্ন ও ভবিতব্যের উদ্ভাসন লক্ষ না করে পারি না। আমি এখানে তাঁর দ্য স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়্যালাইজেশন এ্যান্ড ক্লাস ফরমেশন্স ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থের সর্বশেষ অনুচ্ছেদ থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

India was once economically superior to Britain, then became an exploited colony.
In the meantime, Britain, as the kingpin, has come and gone. India is slowly re-emerging,
gathering strength, augmenting the revolutionary forces against the old powers.

১৯৭৯ সালে এ-মন্তব্য করেন অনুপম সেন। লুণ্ঠনের ধকল সামলে এবং বিবিধ উপপ¬ব মোকাবেলা করে ভারত আজ বিশ্বসভায় নতুন শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুপম সেনের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার নির্যাসই হয়তোবা সম্প্রতি ঝলকে উঠতে দেখা গেছে ভারতীয় লেখক-সাংসদ-রাজনীতিবিদ শশী থারুরের কণ্ঠে অক্সফোর্ডে দেওয়া এক বক্তৃতায়। কাজেই দেখা যাচ্ছে গবেষক-সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের সেদিনের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। বস্তুত স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টি, মানবিকতার বোধ এবং মানুষের কল্যাণে দৃঢ় আস্থাই এমন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তি।

তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম সেই ভাবনা দ্বারা পরিচালিত। হ্যাঁ, ‘সাহিত্যকর্ম’ শব্দটি আমি জ্ঞানতই ব্যবহার করেছি এস্থলে। আমরা তো জানি, যে-জিনিসের মধ্যে ‘সহিতত্ব’ নিহিত থাকে তা-ই সাহিত্য পদবাচ্য। উইনস্টন চার্চিলকে সাহিত্যেই নোবেল-পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো- গল্প-কবিতা-উপন্যাসের জন্যে নয় ‘সহিতত্ব’ রয়েছে এমন রচনার জন্যে। অনুপম সেনের সাহিত্যকর্মকে আমরা তিনটি ধারায় রেখে বিচার করতে পারি— প্রথম ধারায় তাঁর সমাজভাবনামূলক রচনা, দ্বিতীয় ধারায় তাঁর সাহিত্য-সমালোচনামূলক রচনা আর শেষ ধারায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক এবং মৌলিক ও অনূদিত কবিতা।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজ : সামাজিক অর্থনীতির স্বরূপ গ্রন্থটি অনুপম সেনের সমাজ-নিরীক্ষণ এবং সমাজ-বিশে¬ষণের সার্থক দৃষ্টান্ত। এতে উঠে এসেছে রচয়িতার স্বদেশ-সমকাল, উপমহাদেশের বাস্তবতা এবং সমকালীন বৈশ্বিক আর্থ-রাজনীতির চালচিত্র। নাম-প্রবন্ধের কথা ইতোমধ্যে আমাদের বক্তব্যে এসেছে। প্রবন্ধটি শুধু পূর্ববঙ্গের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের চিত্র উপস্থাপনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় নি, এতে উপমহাদেশের নিকট অতীত এবং আসন্ন ভবিতব্যের মধ্যে একটি যোগসূত্রও স্থাপন করা হয়েছে। তিনি দেখান,

দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রায়োগিক ফল রূপে পাকিস্তান-রাষ্ট্রের জন্ম হলেও এটি জন্মক্ষণেই এক বিপুল ব্যবধান ও বিচ্ছিন্নতাকে ধারণ করে নিয়েছিলো। কালক্রমে সেই ব্যবধানের ঘটে প্রসারণ এবং একপর্যায়ে তা অতিক্রম করে যায় তার  স্থিতিস্থাপকতার সীমাকে। প্রায় তিনশ বছর পূর্বে ওলন্দাজ দার্শনিক বারুখ স্পিনোজা বলেছিলেন, কোনো দেশের সেনাবাহিনি যদি কেবলমাত্র কোনো বিশেষ শ্রেণি বা কোনো বিশেষ অঞ্চল থেকে গড়ে ওঠে, তবে সেদেশে গণতন্ত্র টেকে না। অনুপম সেন তাঁর প্রবন্ধে স্পিনোজা’র সেই উক্তিটি মনে করিয়ে দেন এবং বিশে¬ষণ করে দেখান কীভাবে নতুন জন্মলাভ করা রাষ্ট্র পাকিস্তান পাঞ্জাব-অঞ্চলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পাঞ্জাবি সামন্ত-ব্যবসায়ি-আমলা ও বৃহদর্থে সামরিক আমলা শ্রেণির স্বার্থবহ হয়ে ওঠে। আমরা জানি পরবর্তীতে পাঞ্জাব-অঞ্চল সম্পর্কিত এই তত্ত্বটি সর্বজনগ্রাহ্য একটি তাত্ত্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয় কিন্তু আজ থেকে বহুকাল আগে সেই ১৯৭১-এ পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক-সমাজতাত্ত্বিক বিশে¬ষণের নিরিখে অনুপম সেনই প্রথম বিষয়টিকে পাকিস্তানি বাস্তবতার  মূল  সমস্যারূপে  সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আইয়ুবীয় শাসনের নির্যাস ‘বাইশ-পরিবার’-প্রবাদটির বাস্তবতাও সেই সমস্যার মধ্যে নিহিত ছিলো। উচ্চাশাসম্পন্ন সামরিক প্রধান আইয়ুব খান জোতদার-ভূস্বামীদের নির্ভরতায় পূর্ববঙ্গেও সেরকম একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যার মাধ্যমে, অনুপম সেন দেখান, সমগ্র সামরিক আমলা শ্রেণির ক্ষমতাকেই চিরকালীন করে রাখা সম্ভব। তাঁর ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ সেই উদ্দেশ্যের গর্ভজাত।

গ্রন্থর্ভূত প্রায় সবগুলো প্রবন্ধেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার চরিত্র নির্ণয় এবং সেসবের সমাধানে করণীয় সম্পর্কে আভাস রয়েছে। আমলাতন্ত্র ও আর্থ-সামাজিক মুক্তি শিরোনামীয় প্রবন্ধটির কথা ধরা যাক। আমলাতন্ত্র দেশ বা প্রশাসনের জন্যে প্রয়োজনীয় একটি শ্রেণি। প্রাচীন গ্রিসের নগর বা ‘পোলিস’- গুলোতেও এরকম একটি মধ্য-শ্রেণি ছিলো যারা রাজা ও অভিজাতশ্রেণির আজ্ঞাবহ ছিলো। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারও বলেন, ধনতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে যৌক্তিক আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় না। অনুপম সেন বিশে¬ষণ করে দেখান, ইংরেজ আমলে প্রশাসন ছিলো এককেন্দ্রিক এবং তার উদ্দেশ্যই ছিলো একরৈখিক। প্রসঙ্গত আমরা গবেষক অমিয়কুমার বাগচী’র কথাটিও এখানে স্মরণ করতে পারি। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রয়োজন ও যুক্তির চাইতেও অত্যন্ত উচ্চ বেতন দিয়ে কর্মকর্তাদের আসলে ভারতবর্ষ থেকে অর্থ পাচারের ব্যবস্থা করে দেয়। কোম্পানির কর্মকর্তাদের সেই অর্থই তাদের নিজেদের দেশে গিয়ে পরিণত হয় লগ্নী-পুঁজিতে। অনুপম সেনও বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের চমৎকার বিশে¬ষণ করেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রেণিনেতৃত্বশূন্যতার ফলেই বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র ক্রমশ স্বৈরাচারী রূপ নিয়েছে এবং তা একদিনের আকস্মিকতার ফল নয়, এক সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়েই তা গড়ন নিয়েছে। দারিদ্র, অশিক্ষা, বিদেশি সাহায্যনির্ভরতা ইত্যাদি নানা হেতুতে দীর্ঘকাল বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র বিকশিত হয়েছিলো কোনোরূপ জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে। অথচ পাশ্চাত্যের আমলাতন্ত্রের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যই হলো তার জবাবদিহিতা। ঠিক এই প্রবন্ধটির সঙ্গে পরের দুটি প্রবন্ধ (‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণীবৈষম্য’ এবং ‘সামাজিক চাহিদা ও বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ্যসূচি’) মিলিয়ে পড়লে একটি পরিপূরক পাঠের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। অনুপম সেনের বিশে¬ষণে আমরা অনুধাবণ করি, ইউরোপে ধনতন্ত্রের বিকাশে শিক্ষা ছিলো একটি  গুরুত্বপূর্ণ বাহন। অন্যদিকে :

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দেশজ উৎপাদনব্যবস্থা থেকে জাত না হওয়ায় এবং সে সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ থাকায়, এই শিক্ষা

পরভৃত বা পরগাছা হিসেবেই থেকে গেলো বৃহত্তর জনজীবনে, তা কোনোভাবেই কল্যাণের দিশারি হতে পারলো না।

উপরন্তু এই শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যই বাড়ালো না, বৃহৎ জনগোষ্ঠির শোষণকেও সুদূরপ্রসারী ও দৃঢ়মূল করল।

পরিণামে, অনুপম সেনের স্বকীয় শব্দপ্রকাশে, ‘লুম্পেন ও লুচ্চা পুঁজির সর্বগ্রাসী বিস্তারকে’ কোনোভাবেই ঠেকিয়ে রাখার উপায় থাকে না। বস্তুত ধনতন্ত্র মানেই সর্বক্ষেত্রে শ্রেণির বিরাজমানতা, শিক্ষাও তার বাইরে নয়। ইউরোপের উন্নত-ধনতান্ত্রিক দেশগুলির দিকে তাকালেও আমরা দেখবো সেখানে একই সমান্তরালে শিক্ষাক্ষেত্রে দ্বিধা বিরাজিত। একই দেশে বড়ো লোকেদের জন্যে রয়েছে ‘গ্রামার স্কুল’ এবং অ-বড়ো লোকেদের জন্যে ‘কম্যুনিটি স্কুল’। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার, দুই ধারার স্কুল হলেও পাঠ্যসূচির ক্ষেত্রে সেসব দেশে বৈষম্য বিরাজ করে না। অথচ— অনুপম সেনের দৃষ্টি-উন্মোচনকারী প্রবন্ধ থেকে আমরা উপলব্ধি করি, আমাদের সামাজিক চাহিদার সঙ্গে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের পাঠ্যসূচি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শ্রেণি-অনুসারীই নয় মানব-বিকাশের ক্ষেত্রেও তা তৈরি করে রাখলো প্রতিবন্ধকতা।

শিক্ষা-প্রসঙ্গে আমরা আড়াই হাজার বছর আগেকার প্রাচীন গ্রিসের কথা স্মরণ করতে পারি। গ্রেকো-পারসিক যুদ্ধের পরে রক্তারক্তির পথ পরিহার করে মননের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য গ্রিসের জনগণকে জেনারেল পেরিক্লিস যে-পথের সন্ধান দেন তাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো শিক্ষা এবং দর্শন। রেনেসাঁ-যুগে রোমান সভ্যতায় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগের ফলে পুঁজি এবং ব্যক্তি যখন স্বাধীন হয় তখন মানুষ ধর্মীয় বিদ্যা ছেড়ে ইহজাগতিক বিদ্যার দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে। স্বর্গ-নরক-কর্মফল প্রভৃতি ছাড়াও যে জ্ঞানের বিষয় থাকা সম্ভব মানুষ তা অনুধাবন করতে পারলো। ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই রেনেসাঁ-যুগের প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া জর্জিও রাইশ্খ সম্পাদিত এনসাইক্লোপিডিয়া মার্গারিটা (যাতে প্রার্থিব জগতের বিবিধ জ্ঞানের শ্রেণিভিত্তিক সংকলন করা হয়।) পঞ্চাশ বছরের ব্যাপ্তিতে কুড়িবার মুদ্রিত হয়েছিলো। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও ধর্মীয় বিষয়কে গৌণ করে দিয়ে পরবর্তীতে দর্শন-সাহিত্য-আইন প্রভৃতি বিষয় প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা ১৬৬২ সালে রয়েল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে কেবল যে বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিগন্ত উন্মোচন করে তা-ই নয়, তাঁরা পাঠ্যসূচিকে রাষ্ট্র-সমাজের ও বৃহত্তর জনমানুষের কল্যাণের পথে বিকশিত হতে বাধ্য করলেন। অনুপম সেনের সমাজবিজ্ঞানী-দৃষ্টিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকটিত দৈন্য-চিত্র উঠে আসে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণিবিকাশের লক্ষ্যে সাধিত— সেখানে ব্যবধান-বিচ্ছিন্নতার চাষ চলে নিত্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘকাল মাটি-মানুষ ও সংস্কৃতির যথাযথ প্রতিফলন ছিলো না। ফলে ছিলো না অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের উপায়, যার মাধ্যমে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে মনুষ্যত্বের আলো।

এমতাবস্থায় আমাদের কর্তব্য নির্ধারণের দায় সামনে এসে যায়। আমাদের দেশে সে-অর্থে ধনতন্ত্রও বিকশিত হয় নি— না ধনতন্ত্র না সামন্ততন্ত্র অবস্থার মধ্যে আমরা কাটিয়ে দিয়েছি অনেকটা কাল। এদিকে বিশ্ব দ্রুত বদলে গেছে, বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ নিয়েছে। অনেক পেছনে বসে থাকা আমরা আজ বদলে যাওয়া সেই বিশ্বের সঙ্গে তাল সামলে এগোতে পারবো কিনা সে-প্রশ্ন জরুরি। সেকথাই ব্যক্ত হয়েছে তাঁর শেষ দুটি প্রবন্ধে। দুটো প্রবন্ধরই রচনাকাল আজ থেকে সিকি শতাব্দীকালেরও অধিক। কিন্তু প্রবন্ধকারের ইঙ্গিত আজকের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক। মুক্তবাজার অর্থনীতির ধাক্কায় সমাজতন্ত্রের মতো শক্তিশালী অবস্থানও টলে গেছে। বিশ্ব সম্পদ আহরণের দুরন্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। অনুপম সেন তাঁর প্রবন্ধে দেখান, এক বিল গেটসের সম্পদের পরিমাণ কয়েকটি দেশের জাতীয় উৎপাদনের সমান। ব্যক্তি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রচণ্ডতার সামনে আমাদের দেশের মতো বিকাশমান দেশগুলোর অবস্থা শোচনীয়। এরকম পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজ-পরিবর্তন ও আদর্শের নব-উদ্বোধনের জন্য নবোদ্যোগ নিয়ে জনশক্তিকে সংগঠন করতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, প্রগতির পক্ষের সব দল ও মুক্তিকামী সব মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, সংঘবদ্ধ হতে হবে।’ গত দুই দশকের বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থা বিশে¬ষণ করে সমাজ-রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা হয়তো গভীরতর জ্ঞানের খোঁজ দিতে পারবেন কিন্তু অনুপম সেনের যে-বক্তব্য পঁচিশ বছরেরও অধিককাল আগে রচিত প্রবন্ধে অভিব্যক্ত হয়েছিলো তার সত্যতা প্রবন্ধ-রচনার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের নিরিখেই  মিলতে পারে।

তাঁর গ্রন্থ-শিরোনাম ব্যক্তি ও রাষ্ট্র হলেও অনুপম সেন সমাজ-সন্নিহিতির অবস্থান থেকে চ্যুত হন না। যেজন্য গ্রন্থে যুক্ত হয় বাড়তি বা উপ-শিরোনাম— ‘সমাজ-বিন্যাস ও সমাজ-দর্শনের আলোকে’। রচয়িতার লক্ষ্য সেই ব্যক্তি যিনি সর্বস্বতাযুক্ত নন, স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। ব্যক্তি সমাজ বা রাষ্ট্রেরই একক। অনুপম সেনের এই গ্রন্থের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য এই যে এতে তিনি সমাজের সমালোচনা উপস্থাপন করতে-করতে সাহিত্যের সমালোচনাতেও মনোনিবিষ্ট আর সেক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বিস্ময়কর। এই গ্রন্থ, এ-গ্রন্থের এবং অন্যতর গ্রন্থের সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত না হলে আমরা কখনই জানতে পেতাম না যে একজন সমাজবিজ্ঞানী একজন স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন সাহিত্য-সমালোচকও। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া-মিশর-এসিরিয়া কিংবা গ্রিস-রোমের ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই সেসব সভ্যতায়ও ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন ব্যক্তিত্ব এবং তাঁদের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলো সামাজিকতারও পটভূমি। উন্নততর সভ্যতার সমাজ-রাষ্ট্র কখনও-কখনও ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য মেনে নিয়ে তাঁদেরকে অবস্থানের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলো আবার কখনওবা ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্যকে সহ্য করতে না পেরে তাদেরকে করেছে আক্রমণ-নিপীড়ণ এমনকি হত্যা। ইতিহাস থেকে আমরা জানি, যে-লিওনার্দো মধ্যদুপুরের সিয়েস্তায় লাশকাটা ঘরে ঘুরে-ঘুরে মৃতদেহাভ্যন্তরের চিত্র আঁকতেন তিনিই প্রতিভার গুণে ‘মোনালিসা’ এঁকে রোমের শত-হাজার লিওনার্দোর (এটি রোমের বহুলব্যবহৃত একটি ব্যক্তিনাম।) চাইতেও সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে চিরকালের প্রেক্ষাপটে হয়ে থাকলেন ‘ভিঞ্চি’-গ্রামের লিওনার্দো। কে ভাবতে পেরেছিলো সিসটিন চ্যাপেল নামের একটি ধর্মীয় উপাসনাগারের অভ্যন্তরভাগ একদিন অকস্মাৎ ঐতিহ্যের বিপরীতে গিয়ে আশ্চর্য নান্দনিক হয়ে উঠবে একজন সাধারণ মানুষ মিকেলেঞ্জোলো’র শিল্প-স্পর্শে আর ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনেও নেবে এই নব নান্দনিকতাকে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, মই বেয়ে আর মইয়ে দাঁড়িয়ে থেকে-থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে চ্যাপেলের সিলিংয়ে ফ্রেসকো পদ্ধতির চিত্র আঁকতে-আঁকতে তাঁর চির-জনমের ঘাড়-ব্যথার জন্ম হয়েছিলো। মিকেলেঞ্জোলো আজ এক স্রষ্টার নাম। অনুপম সেন তাঁর গ্রন্থটিতে বিশ্বসভ্যতার বিপুল ইতিহাসের পরিধি অধ্যয়ন করে তারই আলোকে যে-ব্যক্তির সন্ধান আমাদের দেন সেই ব্যক্তিকে প্রচলিত ধর্ম বা মতবাদের আলোকে বিচার করা সর্বদা সম্ভবপর না-ও হতে পারে। কখনও-কখনও প্রচলিত দৃষ্টি সেসব ব্যক্তিকে অভিহিত করেছে ব্যতিক্রম বলে। অনুপম সেনের গ্রন্থে সভ্যতার সেই ব্যতিক্রমী দিকগুলোই উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও যেসব ব্যতিক্রমী ব্যক্তি তাঁদের কর্মাবদানে ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন এবং যাঁদের বিভা তাঁদের দৈহিক অপসৃতির পরেও উজ্জ্বলতা হারায় না, তাঁদের কয়েকজনকে নিয়ে এ-গ্রন্থে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ।

সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান এবং শশাঙ্কমোহন সেন— এই তিনজনকে নিয়ে রচিত হয়েছে তিন ধরনের তিনটি প্রবন্ধ। নারী নির্যাতন বিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংগ্রামী সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমানের কবিতা ‘চাঁদ সদাগর’ এবং বাংলা তুলনামূলক সমালোচনা-সাহিত্যের পথিকৃৎ কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন-এর সাহিত্যিক অবদান-পর্যালোচনা এসব প্রবন্ধের মুখ্য দিক। শেষোক্ত প্রবন্ধটি আরও ছয় বছর পরে বিস্তৃততর রূপ পরিগ্রহ করে কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন (উপ-শিরোনাম : বাংলা তুলনামূলক সমালোচনা সাহিত্যের নির্মাতা) নামক গ্রন্থ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। সে-গ্রন্থ নিয়ে খানিকটা পরিসর-আলোচনার মানসে আমরা এখানে আপাতত বাকি দুটি প্রবন্ধ সম্পর্কে কিছু কথা বলি। সুফিয়া কামালকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটির সূত্রে অনুপম সেনের কাছ থেকে আমরা পাই বিশ্বে-ভারতবর্ষে এবং বাংলায় নারী-নির্যাতনের সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকর রূপরেখা। এই প্রেক্ষাপটটির ফলে আমরা একদিক থেকে পরিবারে-সমাজে-রাষ্ট্রে নারীর অবস্থানটিকে বুঝতে পারি এবং অন্যদিক থেকে অনুধাবন করি সুফিয়া কামালের সংগ্রামের গুরুত্ব। একজন নারী অভ্যন্তরের নিরাপদ-আরামের অবস্থান ত্যাগ করে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েও নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আজীবন কাটিয়ে দিলেন— তাঁর উপলব্ধি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তাঁকে নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধের সূত্রে। সুফিয়া কামালের কাব্যিক বা সৃজনশীল সত্তা তাঁর কর্মী-সত্তার অঙ্গীকার দ্বারা অনুপ্রাণিত— তিনি যে একটা প্রতীক-চরিত্রে পরিণত হয়ে যাবেন সেটা হয়তো ইতিহাস-নির্ধারিতই ছিলো। অভ্যন্তরবাসী যে-কবি একদিন বিশ্বকবির আশীর্বাণী লাভ করেছিলেন বাংলাদেশের নারীসমাজের নতুন দিনের নেত্রী হওয়া তাঁকেই মানায়। অনুপম সেনের মোহমুক্ত দৃষ্টি (আরেকটু জোর দিয়ে বলতে পারি ‘শোভিনিজম’-মুক্ত দৃষ্টি) নারী-পুরুষের মানদণ্ডে নয়, কর্মের মানদণ্ডে বিচার করে সমাজ ও ইতিহাসকে। ফলে তাঁর সাহিত্যালোচনাও আর শুদ্ধবাদী পথ অনুসরণ করে না। তাঁর দৃষ্টিতে সাহিত্য সামাজিকতার অভিঘাতমুক্ত নয়। সাহিত্যকে কেবল রসের নিষ্পন্নতায় দেখলে কিংবা প্রচলিত কতিপয় মাপকাঠিতে দেখলে সাহিত্যের ভেতরে থাকা মানবাত্মার তরঙ্গিত ধ্বনি-প্রতিধ্বনির দেখা মেলে না। বাংলাদেশ ও বাঙালি রেনেসাঁস স্বাধীনতা চিন্তা ও আত্মানুসন্ধান গ্রন্থের সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলিতে আমরা অনুপম সেনের প্রসারিত মনের সাহিত্যালোচনাই লক্ষ করি। কবি মধুসূদনকে তিনি অভিহিত করেন বাঙালির প্রমিথিউস বলে। তাঁর কাব্য-নাটক প্রভৃতি আলোচনা করে তিনি দেখান যে মধুসূদন বাঙালির প্রয়োজনেই নব-নব আঙ্গিকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং একই কবি তাঁর কাব্যে ধ্র“পদী এবং ব্রাত্যজনীয় অর্থাৎ দ্বিবিধ ভাষারূপের ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্র-সাহিত্য সমালোচনায় তিনি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আবিষ্কার করেন মগ্ন চৈতন্যের আর পবিত্র আনন্দের অবস্থান। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের সুন্দর এক পরম স্তরের সুন্দর কিন্তু মানুষের অন্তরতম আত্মার অনুসন্ধানী বিশ্বকবি সমাজ-সংসারের নিত্যতাকেও অপূর্বভাবে ভাষায়িত করেন। তাঁর যুগেরও কবি যুগান্তরেরও কবি নজরুল অনুপম সেনের সাহিত্য-সমালোচনামূলক একটি অসাধারণ প্রবন্ধ। বিশ্বসাহিত্যের উলে¬খযোগ্য স্রষ্টাদের সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করে তিনি নজরুলের আবাহনী রচনা করেন। স্বাধীনতার গান ও কবিতা-রচনাই যে নজরুলের অনন্য অবদান সেটা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। গ্রিসের যুদ্ধের পটভূমিতে বায়রনের সৃষ্টি কিংবা জার্মানির যুদ্ধের ক্ষেত্রে হ্ইানের সৃষ্টির মতো উপনিবেশ-বিরোধী নজরুলের গানে-কবিতায় সমগ্র বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আর্তি প্রতিফলিত হয়েছিলো। কাজেই অনুপম সেনের মতে নজরুলকে ভারতবর্ষীয় বৃহত্তর জীবনচেতনা দিয়েই অন্বেষণ করতে হয়। নেতাজী সুভাষ বসু যে নজরুলের স্বাধীনতার গান-কবিতার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন সেই তথ্যটিও আমরা তাঁর কাছে পাই। আবার এ-ও অনুপম সেন আমাদের জানান, রবীন্দ্রনাথও নজরুলের যুদ্ধংদেহী সাহিত্যের সমর্থক ছিলেন। নজরুলের প্রতিকূল সমালোচনার পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন নজরুলের সপক্ষে। অনুপম সেন যথার্থই আবিষ্কার করেন— রেনেসাঁসের সর্বশেষ প্রতিনিধি আসলে কবি কাজী নজরুল ইসলাম-ই। গভীরতর দৃষ্টিতে তাঁর একথাটি আমাদের নজরুল সম্পর্কে পুনর্ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে। নজরুল যে কেবল সর্বশেষ প্রতিনিধি তাই নয়, নজরুল এক পরিণতিরও নাম। কেননা, রেনেসাঁস-এর মধ্যে যে-জাগরণ বা পুনর্জাগরণ-চেতনার অবস্থিতি এবং যার খানিকটা ভিন্নরূপ ঝাঁকুনি আমরা অনুভব করি রামমোহন, মাইকেল, বঙ্কিম এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তারই সম্পূর্ণ প্রচণ্ডতা সৃষ্টি হয় নজরুলে এসে। আর নজরুল  যুগের  চাহিদাকে এমন  সার্থকভাবে  বাণীবদ্ধ  করেন  যার  সুর-স্বরে আকৃষ্ট হয় অগণিত স্বাধীনতাকামী সত্তা। অনুপম সেন নজরুলের সাহিত্যালোচনাকে স্থাপন করেন বাঙালির সাংস্কৃতিক-জাতীয় বিবর্তন, রেনেসাঁস এবং বাঙালির স্বপ্নচেতনার পরিবৃত্তে।

অনুপম সেনের সাহিত্য-সমালোচনার ম্যাগনাম ওপাস তাঁর গ্রন্থ কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন (২০১৩)। প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, এ-গ্রন্থটি তাঁর রচনা করবার কথা নয়— তিনি সমাজবিজ্ঞানী সেজন্যে নয়, এ-গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত ছিলো আরও বহুকাল আগেই এবং বাংলা সাহিত্য-জগতের কোনো সমালোচক-রচয়িতাই হতে পারতেন সে-গ্রন্থের আরাধ্য লেখক। (১৯৯০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় ভুঁইয়া ইকবাল রচিত তাঁর জীবনী-গ্রন্থ।) বাস্তবে সেটি ঘটে নি এবং বাস্তবে যা হয়েছে তার মূল্যও অনেকখানি। এ-গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা তুলনামূলক সমালোচনা-সাহিত্যের পথিকৃৎ চট্টগ্রামের সন্তান শশাঙ্কমোহন সেনের সাহিত্যকর্মের একটি সার্বিক মূল্যায়ন ঘটেছে— বিলম্বে হলেও এটি সাধিত হয়েছে। আর এর রচয়িতা মূলত সমাজবিজ্ঞানের জগতের পর্যটক অনুপম সেন স্মরণীয় হয়ে রইলেন বাংলা সমালোচনা সাহিত্য তথা বাংলা সাহিত্যের জগতেও। শশাঙ্কমোহন সেনের অবদানের মূল্যায়ন কিন্তু তাঁর জীবদ্দশাতে ও পরবর্তীকালেও হয়েছিলো— বিচ্ছিন্ন ও ছড়ানো-ছিটানোভাবে। বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বের উল্লেখে শংসাবৃত হয়েছেন তিনি। তাঁর সমালোচনার মৌলিকতা, দার্ঢ্য, যুক্তিনিষ্ঠতা প্রভৃতি চিহ্নিত হয়েছিলো তখনই। এমনকি আজ থেকে প্রায় শত বছর পূর্বে সাহিত্যে তুলনামূলক বিদ্যার চর্চার প্রয়োজনিয়তার গুরুত্ব উত্থাপনকারী শশাঙ্কমোহন সেনের স্বপ্ন যে বাস্তবে রূপ নিয়েছে তা তো আমরা পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক সাহিত্য-বিভাগের দৃষ্টান্ত দেখেই বুঝতে পারি। আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় আমাদের দেশেও সাহিত্যের তুলনামূলক বিদ্যার প্রয়োজনিয়তা বিষয়ে বিদ্বানগণ সচেতন হয়ে উঠেছেন।

কারা মূল্যায়ন করেছিলেন শশাঙ্কমোহন সেনের সাহিত্য-সমালোচনার! নলিণীকান্ত ভট্টশালী শশাঙ্কমোহনের সমালোচনাকে সাহিত্যের মৌলিক সৃষ্টি বলে অভিহিত করেছিলেন। অনুপম সেন ইতিহাসের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা এমন সব মূল্যায়নকে জড়ো করে পাশাপাশি তাঁর নিজের রূপতত্ত্বকে প্রয়োগ করে শশাঙ্কমোহন সেনের এযাবৎকালের সম্পূর্ণাঙ্গ অবয়ব দাঁড় করান। আমরা অবগত হই সেই ১৯২১ সালে শশাঙ্কমোহন সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুসূদন : তাঁর অন্তর্জীবন ও প্রতিভা শীর্ষক যে-গোপাল দাশ চৌধুরী অধ্যাপক বক্তৃতা প্রদান করেন সেটিই বাংলা সাহিত্যে মধুসূদন-সমালোচনার আদি গ্রন্থ। শশাঙ্কমোহন মধুসূদনকে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিচারপূর্বক কবির সৃষ্টির সঙ্গে কবির অন্তর্জীবনের যোগসূত্র আবিষ্কার করেন। এই মূল্যায়ন পরবর্তীতে উত্তরসুরীদের প্রশংসা পেয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যে মোহিতলাল মজুমদারের মতন খ্যাতিমান সমালোচকগণও মধুসূদন-সাহিত্যের সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছিলেন শশাঙ্কমোহন সেনের সমালোচনার দ্বারা। পরবর্তীতে তারাপদ ভট্টাচার্য, প্রমথনাথ বিশী, মোহিতলাল মজুমদার, শিশিরকুমার দাশ, ড. অধীর দে প্রত্যেকেই শশাঙ্কমোহন সেনের মধুসূদন-সমালোচনার গুরুত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। বিখ্যাত সমালোচক উজ্জ্বলকুমার মজুমদারের মতে, তুলনামূলক ধারায় বঙ্কিম সমালোচনার সূচনা করেন শশাঙ্কমোহন সেন। বঙ্কিম-সমালোচনায় সেই কতোকাল আগেই যে তিনি মনোবিশে¬ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন তা আমাদের পর্যালোচনা করে দেখান অনুপম সেন। ১৯০৫ সালে শশাঙ্কমোহন সেনের করা রবীন্দ্র-সমালোচনায় পরবর্তীকালে প্রভাবিত হয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর মতো পরাক্রমশালী পণ্ডিত। আজকের যুগের আধুনিক সমালোচক হাসান হাফিজুর রহমানও শশাঙ্কমোহন সেনের সমালোচনা-পদ্ধতির প্রশংসা করতে ভোলেন নি। রবীন্দ্রনাথের মনের স্বাধীনতার বোধই যে তাঁর সাহিত্যের এক চালিকাশক্তি বলে শশাঙ্কমোহন উলে¬খ করেন, হাসান হাফিজুর রহমান তাঁর ‘বাংলা কাব্যে মূল্যবোধের বিবর্তন : রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে সে-মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধচন্দ্র সেন, নীলরতন সেনের মতো ছান্দসিকদের মতে বাংলা ছন্দ বিষয়ে শশাঙ্কমোহন সেনের আলোচনা পথিকৃতের এবং তা মৌলিকতাসম্পন্ন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, শশাঙ্কমোহন সেনই প্রথম প্রচলিত ভ্রান্তি দূর করে চিহ্নিত করেন যে বাংলা ছন্দ সংস্কৃতানুসারী ছন্দ নয় বরং সেটি এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাংলার লোক-মানস থেকেই জন্ম নিয়েছিলো। ‘বাংলা ছন্দ’ শীর্ষক শশাঙ্কমোহনের প্রবন্ধটি যে ছন্দ বিষয়ে ‘আধুনিক চিন্তার আদিতম রচনা’ অনুপম সেনের এ-বক্তব্য খুবই যৌক্তিক— পরবর্তী ছন্দ-চিন্তকদেরও প্রভাবিত করেন শশাঙ্কমোহন। মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্বরূপ পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও শশাঙ্কমোহন সেনের কৃতিত্ব অগ্রগণ্য। তিনিই বলেছিলেন, ‘মিলটনী’ ছন্দের অনুপম ধ্বনি-শক্তির সঙ্গে মধুকবি কালিদাস, ভার্জিল ও ট্যাসোর কোমল মধুর রাগিনী মিলিয়ে তাঁর নিজের জীবনের কারুণ্যকে অতুলনীয় করে তোলেন তাঁর মহাকাব্যে। প্রসঙ্গত মৌলিক সাহিত্য-রচয়িতা শশাঙ্কমোহন সেনের কবিপ্রতিভারও মূল্যায়ন করেন অনুপম সেন। যার ফলে চকিতে চমকপ্রদ তথ্যের সন্ধান আমরা পাই।  আমরা  জানতে  পারি, চট্টগ্রামের পাহাড় এবং সমুদ্র নিয়ে শশাঙ্কমোহন সেনই সার্থক কাব্য রচনা করেছিলেন সর্বপ্রথম। ভেবে দেখুন, ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রামের সমুদ্র দেখে শশাঙ্কমোহন রচনা করেছিলেন তাঁর কাব্য সিন্ধুসঙ্গীত। বিদ্রোহী কবি নজরুল তখন জন্মলাভই করেন নি। এর প্রায় ত্রিশ বছরেরও অধিককাল পরে এই চট্টগ্রামের সমুদ্র দেখেই কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছিলেন তাঁর সিন্ধু-হিন্দোল কাব্য। হতে পারে নজরুল শশাঙ্কমোহন সেনের কাব্যটি পাঠ করেছিলেন। এ-ও তো হতে পারে যে নজরুল চট্টগ্রামের সমুদ্র নিয়ে প্রথম কাব্য রচনাকারী চট্টগ্রামেরই সন্তান শশাঙ্কমোহনকে পূর্বসুরীত্বের মর্যাদা দিয়ে স্মরণ করতে চেয়েছিলেন তাঁর নিজের কবিতার মাধ্যমে। একথা বলবার আরেকটি কারণ এই যে নজরুলের সমুদ্র নিয়ে কাব্য-রচনা এবং শশাঙ্কমোহন সেনের মৃত্যু সম্ভবত একই সময়কার ঘটনা। অনুপম সেন-এর শশাঙ্কমোহন সেনের গ্রন্থকে বলা যায় পথিকৃৎ তুলনামূলক সাহিত্য-সমালোচকের সার্থক সমালোচনা। বাংলা সমালোচনা সাহিত্য-জগত নিঃসন্দেহে স্মরণ করে যাবে গ্রন্থটির রচয়িতা অনুপম সেনকে।

অনুপম সেনের সামগ্রিক সৃষ্টি নিয়ে এমন অনতিপরিসর আলেচনায় তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন হয় না। বর্তমান প্রবন্ধটি কোনোভাবেই অনুপম সেন-সম্পর্কিত একটি পরিপূর্ণ গ্রন্থের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভবপর নয়। প্রবন্ধটি হয়তো অনুপম সেন-বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সম্ভাবনাকেই উত্থাপন করলো। তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে যা-যা বলবো বলে মনে-মনে ঠিক করা গিয়েছিলো তার অধিকাংশই বলা গেলো না, যা বলা হলো তা-ও সুশৃঙ্খলভাবে হলো না। তাঁর মৌলিক কাব্যকর্ম এবং কাব্যানুবাদের জায়গাটা অনালোচিতই রয়ে গেলো। তবে এটুকু বলা উচিৎ, অনুপম সেনের মানসজগতের সবটা উপলব্ধি করবার জন্য তাঁর মৌলিক কাব্য এবং তাঁর কাব্যানুবাদকর্মের হদিস নেওয়া প্রয়োজন। তিনি যেসব বিদেশি কবির কাব্যানুবাদ করেছেন তাঁরা যে কেবল ইংরেজ-ফরাসি-জার্মান তা-ই নয়, অনূদিত তাঁদের কবিতাগুলো যে-জীবনবোধের জানান দেয় তা হলো মানবপ্রেম-সত্য-সৌন্দর্য-বন্ধুত্ব প্রভৃতির বোধ অনুবাদ করা হোক না হোক তা সারা পৃথিবী জুড়ে সৃজিত হয়েই যাবে যুগ-যুগ ধরে। সেই বোধ স্বয়ং কবি হিসেবেও লালন করেন অনুপম সেন :

তোমাকে দুষছি প্রভু
ক্ষমা করো, ক্ষমা করো,
এই অসুন্দর
তুমিতো করোনি সৃষ্টি
মানুষ করেছে,
মানুষের মহা অপমান
মানুষের নিজেরই সৃজন,
এইসব মানুষের
ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই,
সুন্দরের বিচার সভাতে।

তাঁরই কবিতার (‘সুন্দরের বিচার সভাতে’, সুন্দরের বিচার সভাতে, ২০০৮) উদ্ধৃতাংশ পাঠ করে অনুপম সেনের কবিতার ভাব-বিষয়-আঙ্গিক ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথাই হয়তো উত্থাপন করা যাবে কিন্তু এতে যে মানবিকতার সুরটি স্পষ্ট তাতে ভিন্নমত কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। বর্তমান প্রবন্ধের গোড়ার দিকে অনুপম সেনকে মানবিক সমাজবিজ্ঞানী বলে অভিহিত করা হয়েছিলো— বস্তুত তাঁর সমস্ত কর্মের মধ্যেই মানবিকতার বোধটি সুস্পষ্ট। সেই বোধ তাঁর কর্ম তো বটেই, তাঁর সমগ্র জীবনেরও চালিকাশক্তি।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা